Sunday, September 22, 2013

সমাপনী পরীক্ষা : রাষ্ট্র মালির ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক by শেখ মাসুদ কামাল

শিক্ষা প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, মানুষ অজ্ঞ হয়ে জন্মায়, নির্বোধ হয়ে নয়। কিন্তু শিক্ষা মানুষকে নির্বোধ বানায়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে এবার যে ধরনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ-আয়োজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে মনে হয় যে, শিক্ষার্থীদের অতি শিক্ষণের নামে এবার নিশ্চিতভাবে বোকা বানানো হবে। প্রথমেই বলা যায়, এ বছর শিক্ষার্থীরা নতুন বই পড়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্নগুলো কোনো সহায়ক ভূমিকা রাখবে না। এ ছাড়া পরীক্ষার্থীদের হাতে এবার নতুন সিলেবাসের বই এসেছে খানিকটা দেরিতে। ফলে চতুর্থ শ্রেণীর পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে। এ রকম একটি লেজেগোবরে অবস্থায় পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য সর্বমোট দুই ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু সময় সংকটের কারণে যথাযথ প্রস্তুতিহীন এ পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীরা তাদের স্ব-স্ব স্কুলের পরীক্ষায় খারাপ করেছিল বিধায় এখন সেখানে সময় ৩০ মিনিট বাড়িয়ে মোট আড়াই ঘণ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে এক সংবাদ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ক্ষুদে পরীক্ষার্থীদের কঠিন সিলেবাসের কারণে স্বল্প সময়ে পরীক্ষা দিতে সমস্যা হয়। তাই এ সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এ ৩০ মিনিট সময় বৃদ্ধি পরীক্ষা সুসম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হবে কি-না, তা পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে।
কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য পরীক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকবে। কিন্তু নতুন সিলেবাসে নির্দিষ্ট এ কাঠামোটি প্রণয়ন ও তা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগেছে। আর প্রশ্ন কাঠামো না পাওয়ায় শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের হাতে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র তুলে দিতে পারেননি। আর নতুন নিয়মের প্রশ্নকাঠামো প্রচলিত হওয়ায় পুরনো নিয়মের প্রস্তুতি আর কোনো কাজে আসেনি বলেই প্রমাণিত হয়েছে। অন্তত শিক্ষকরা এমন অভিমতই পোষণ করেন।
উপরন্তু বিগত বছরগুলোর সঙ্গে তুলনায় এ বছর প্রশ্ন কাঠামো তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়েছে। কারণ আগে যেখানে প্রতি বিষয়ের জন্য পাঠ্যপুস্তক-বহির্ভূত যোগ্যতাভিত্তিক অংশের জন্য ১০ নম্বর বরাদ্দ ছিল এখন সেক্ষেত্রে তা ২.৫ গুণ বাড়িয়ে ২৫ করা হয়েছে। এছাড়া এ যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নের ধরন, বিশেষত বাংলা ও ইংরেজি, এরকম যে বাবা-মা উচ্চশিক্ষিত না হলে সন্তানদের পড়াতে পারবেন না। এ ছাড়া বিগত বছরের তুলনায় এ বছর হরতাল-অবরোধের কারণে শিক্ষার্থীদের বেশি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। আমার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোড এলাকায় অবস্থিত একটি স্কুলের ছাত্রী এবং তাদের একটি ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা হরতালের কারণে অন্তত তিনবার পিছিয়েছে। রাজধানীর অন্যান্য স্কুলের অবস্থাও তথৈবচ, যার জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তদুপরি পরীক্ষার মধ্যবর্তী গ্যাপ অত্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। বাংলা, সমাজ ও ধর্ম পরীক্ষার মাঝখানে কোনো গ্যাপই নেই। আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই একটু রিভিশনের জন্য সময় চাইতে পারে। এ চাওয়াটি একবারে মানবিক ও বৈজ্ঞানিক। বরং রিভিশন বা পুনর্পাঠের সুযোগ না দেয়াটাই অবৈজ্ঞানিক। এসব দিক বিবেচনায় পরীক্ষার গ্যাপ একটু বাড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। যেহেতু নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা, তাই পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে প্রশ্নপত্রে ‘অথবা’র সংযোজন বা পরিমাণ বৃদ্ধি করা দরকার।
একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন। শিক্ষণ বিষয়টিকে শিশুদের কাছে ভয়াবহ না করে আনন্দদায়ক করে তোলা দরকার। ঘন ঘন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শিক্ষার বিষয়টিকে শিশুদের কাছে বিভীষিকাময় করে তোলে। আমাদের শিশুরা পিএসসির নামে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে না, তারা প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট বা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে, যা তাদের জীবনের প্রথম কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ। এসব বিষয় মাথায় রেখে পরীক্ষার সময়সূচি ও প্রশ্নকাঠামোর পুরো বিষয়টিকে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ‘মালি’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। ‘মালি’ তার বাগানের কলিগুলোকে পরম যতœ আর মমতার উষ্ণতা দিয়ে বিকশিত হতে সাহায্য করবে। আর সবগুলো কলি যখন একত্রে ফুটে উঠবে, তখন এক অপূর্ব নন্দনকানন তৈরি হবে। এক্ষেত্রে যা জরুরি তা হল- শিশুর অতিবিকাশের প্রয়াস শিশুদের বিকশিত করার পরিবর্তে বিনষ্ট করে দিতে পারে। অনাবশ্যক আর অনিচ্ছুক এ ক্ষতিটা যেন শিশুদের বেলায় না ঘটে- এ দিকটিতে খেয়াল রেখে শিক্ষা পদ্ধতি, পাঠসূচি, প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত শিশুবান্ধব (ইন্টিগ্রেটেড চিলড্রেন ফ্রেন্ডলি) ব্যবস্থা গ্রহণ করা যুগপৎভাবে অনিবার্য ও অনস্বীকার্য।
শেখ মাসুদ কামাল : প্রাবন্ধিক

সংসদ বহাল রেখে, নাকি না রেখে নির্বাচন by ইকতেদার আহমেদ

রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে সংসদ অন্যতম। সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে। এ নির্দেশনার আলোকেই নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে ’৭২-র সংবিধানে পর্যায়ক্রমিকভাবে ১২৩(৩) (ক) ও (খ)-তে বলা ছিল, (৩) সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে, ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। পরে ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে বিধান প্রণয়ন করা হয় যে, মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৭২-পরবর্তী ৭ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান পর্যন্ত মূল সংবিধানে সংসদ নির্বাচন বিষয়ে অনুচ্ছেদ নং ১২৩(৩) (ক)-তে বর্ণিত বিধানাবলী অনুসরণপূর্বক নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। প্রথম সংসদ পাকিস্তানের সামরিক আইন কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী এ সংসদের নামকরণ করা হয়েছিল গণ-পরিষদ (ঈড়হংঃরঃঁবহঃ অংংবসনষু)। সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর এ সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংসদ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে দেয়া হয়েছিল।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে মূল ’৭২-এর সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ১২৩(৩) (ক) ও (খ)-তে বর্ণিত বিধানাবলী পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। বর্তমান ৯ম সংসদে যাদের অবস্থান সংসদ সদস্য হিসেবে, তারা সংবিধানের ১২৩(৩)(ক)-এ বর্ণিত বিধানের আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে অযোগ্য প্রতীয়মান হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য করতে হলে ৬৬নং অনুচ্ছেদের (৩) উপ-দফায় অপরাপর পদধারীদের সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধনী আনা আবশ্যক। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা অনুসৃত কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ ভেঙে দেয়ার পর রাজা বা রানী অথবা রাষ্ট্রপতি অব্যবহিত পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভাকে সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে নিয়মমাফিক দৈনন্দিন কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে বলেন।
সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে যেসব জটিলতা দেখা দেবে তা হল- প্রথমত, বিদ্যমান সংসদ সদস্য নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারলে দেখা যাবে একই সময়ে একই আসন হতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ২ জন; দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তারা নির্বিঘেœ ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন কি-না সে বিষয়ে অনেকেরই আশংকা রয়েছে; তৃতীয়ত, নির্বাচনে পরাভূত ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে কীভাবে এর সমাধান করা হবে; চতুর্থত, রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে থাকলে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যে কোনো বিবদমান পরিস্থিতিতে তার পক্ষে ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ কতটুকু সম্ভব; পঞ্চমত, ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন যে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে সে নিশ্চয়তা কোথায়; ষষ্ঠত, ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়োগপ্রাপ্ত বিভিন্ন বাহিনীপ্রধান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ তত্ত্বাবধায়ক ও থানা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা কিরূপে নিশ্চিত করা হবে; সপ্তমত, মন্ত্রিসভার যেসব সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কী কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে তাদের নিরপেরক্ষতা নিশ্চিত করা হবে এবং কী পদ্ধতি অবলম্বনে বড় দুটি দলসহ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাপর দলের জন্য সমসুযোগ সংবলিত মাঠের ব্যবস্থা করা হবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত উপরোক্ত জটিলতাগুলো নিরসন করা না হবে, ততক্ষণ সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হলে তা একদিকে যেমন নির্বাচনে সার্বজনীন অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করবে না, অপরদিকে বিদ্যমান সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হবে। সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আগে ভেঙে না দিয়ে থাকলে প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৫ বছর অতিবাহিত হলে সংসদ ভেঙে যাবে। নবম সংসদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ এবং সে হিসাব অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সংসদ আপনাআপনি ভেঙে যাবে। যদিও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শদানের বিধান রয়েছে; কিন্তু সেক্ষেত্রে অন্য কোনো সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নন, এ মর্মে রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট হলে তিনি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের বিদ্যমান বিধানাবলী বিবেচনায় নিলে প্রতীয়মান হয়, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংসদ বহাল থাকাবস্থায় ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন থাকাবস্থায় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে তা সংবিধান সম্মত হবে কি-না সে প্রশ্নটি দেখা দেবে।
’৭২-এর সংবিধানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার বিধান ছিল। ওই সংবিধানে বলা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল থাকবেন। ওই সংবিধানে সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে মন্ত্রী নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত আগে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, তাদের সংসদ সদস্য গণ্যে মন্ত্রী পদে নিয়োগদান আইনসম্মত ছিল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে উপরোক্ত দুটি বিধান রহিত করা হয়। অতঃপর দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐকমত্যের ফলে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন করা হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা বিষয়ে ’৭২-এর সংবিধানের বিধানাবলী পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন পূর্ববর্তী প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকলেও ২য়, ৩য় ও ৪র্থ সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বহাল ছিল। উপরোক্ত ৪টি সংসদের কোনোটিই মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারায় এবং উপরোক্ত সংসদগুলো ভেঙে যাওয়া পরবর্তী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকায় মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টির অবকাশ হয়নি। পঞ্চম সংসদ নির্বাচন তিন দলীয় জোটের রূপরেখায় অস্থায়ী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ বিষয়টি উত্থাপনের অবকাশ সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া মূল কথা হল, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় এ প্রশ্নটি উত্থাপনের কোনো সুযোগ ছিল না। পরে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে ৭ম, ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা বিষয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, পরবর্তী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তিত হওয়ায় প্রথমবারের মতো আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর স্বপদে বহাল থাকাকালীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের দফা নং (৩)-এর উপদফা (ক) এবং (খ) একটি অপরটির সংযোজক। এ দুটি উপদফার মধ্যে ‘এবং’ শব্দটি ব্যবহার করায় একটির সঙ্গে অপরটি সংযোজক হয়েছে। এখানে ‘এবং’-এর পরিবর্তে ‘অথবা’ শব্দটি ব্যবহার করা হলে একটি অপরটির বিয়োজক হতো। উপদফাদ্বয়ের একটি অপরটির বিয়োজক হলে সময়ের বাধ্যবাধকতা ছাড়া একটি বিকল্পের পরিবর্তে অপর বিকল্প অবলম্বনে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব ছিল। কিন্তু উভয় উপদফার মধ্যবর্তী ‘এবং’ শব্দটি ব্যবহারের কারণে যে মুহূর্তে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিন সময়ের গণনা শুরু হবে, সে মুহূর্ত থেকে অবশ্যই দফা নং (৩)-এর (ক) উপদফা অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিন পূর্ববর্তী যে কোনো সময় সংসদ ভেঙে যায়, সেক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে প্রথমোক্ত বিকল্প অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের অবকাশ সৃষ্টি হলে এটি কার্যকর থাকাকালীন দ্বিতীয় বিকল্পে, অর্থাৎ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থার সুযোগ আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই, দফা নং (৩)-এর (ক) উপদফায় বর্ণিত সময়ের মধ্যে সংসদ ভেঙে দিয়ে উপদফা (খ) অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে, তবে তা কোনোভাবেই নৈতিকতা, নীতিজ্ঞান ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার দ্বারা সমর্থিত হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া এ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন যে, দফা নং (৩)-এর (ক) উপদফা অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হলে মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার যে পূর্ববর্তী ৯০ দিন সময়ের মধ্যে এই সময়টি ব্যাপৃত থাকবে, সে সময় সংসদ বহাল থাকলেও সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২নং অনুচ্ছেদের প্রথম শর্তাংশে ১২৩ অনুচ্ছেদের দফা নং (৩)-এর (ক) উপদফায় উল্লিখিত সময়কে সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অধিক বিরতিকাল হতে বহির্ভূত রাখায় এ সময়ের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের দফা নং (৩)-এর (ক) উপদফা অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি হতে অপর অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যবর্তী সময় ৬০ দিনের বেশি না হওয়ায় উপরোক্ত উপদফায় বর্ণিত ৯০ দিন সময়ের শেষ প্রান্তে এসে যদি সংসদ ভেঙে দিয়ে ভেঙে দেয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেবে, সংসদের এক অধিবেশন হতে অপর অধিবেশনের মধ্যবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সংবিধান লংঘিত হয়েছে কি-না?
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বাধ্যবাধকতার কারণে যদিও ১২৩ অনুচ্ছেদের দফা নং (৩)-এর (ক) উপদফায় মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু এই ৯০ দিন সময়ের শেষ ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার আগে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়, সেক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতায় জটিলতা দেখা দেবে এ কারণে যে, একটি সংসদ বহাল থাকাকালীন অপর সংসদের বৈঠক আহ্বানের কোনো সুযোগ নেই । আর এ জটিলতা মানে সংবিধান লংঘন। তাই মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিন সময়ের মধ্যে সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হলে সংবিধান লংঘনের একাধিক কারণের উদ্ভব ঘটতে পারে। এ জটিলতা পরিহার্থে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা সংসদ বহাল রেখে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন, নাকি মেয়াদ অবসানের কারণে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিন সময় উপনীত হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

বেবি মানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় by মোকাম্মেল হোসেন

ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাসের আঁচ লাগতেই পেছন ফিরে দেখি লবণ বেগম চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে একটি প্রশ্ন ছিল। লবণ বেগমের চোখের তারায় প্রস্ফুটিত প্রশ্নের বিপরীতে আমিও আমার চোখ জোড়ায় প্রশ্নের আলপনা আঁকার চেষ্টা করলাম। তাতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হল না দেখে জিজ্ঞেস করলাম-
: কী হইছে!
- বেবি কে?
বেবি একটি ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে শিশু। অনেকের নামও বেবি রাখা হয়। লবণ বেগমের জিজ্ঞাসার ধরন শুনে মনে হল, শেষোক্তটিকে ঘিরেই তার প্রশ্ন আবর্তিত হচ্ছে। বিস্মিত হয়ে বললাম-
: বেবি কে- মানে!
- অত মানে-মানে করতেছ কেন? তুমি জান না- বেবি কে?
: না, জানি না!
- না জানলে বেবির কাছে তোমার কী কাজ?
: বেবির কাছে আমার কাজ মানে?
- কিছুক্ষণ আগে ফোন কইরা তুমি বেবির কাছে যাওয়ার কথা বল নাই?
এতক্ষণে বিষয়টা বুঝতে পারলাম। এ বেবি মানে হল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আজ আমার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ভিসি বেসরকারি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির দায়িত্ব পালন করছেন। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। এ বিষয়ে সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলার সময় মজা করে বেবি-বেবি করছিলাম। লবণ বেগম এ বেবিকে রক্ত-মাংসের কোনো রমণী মনে করায় আমি হো-হো শব্দে হেসে উঠলাম। আমাকে হাসতে দেখে লবণ বেগম কঠিন গলায় বলল-
- হাসতেছ কেন? আমি হাসির কিছু বলি নাই।
: অবশ্যই বলছ! তুমি যারে লইয়া সন্দেহ পোষণ করতেছ- সে কোনো মানবী না। আমি বেবি বলতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বুঝাইছি। আজ আমার সেইখানে যাওয়ার কথা।
- সেইখানে তোমার কী কাজ?
: একজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করব।
- কার?
: ভিসির।
ধানমণ্ডির ২৭ নম্বরে অবস্থিত সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর দারোয়ান পথরোধ করল। বলল-
: স্যার, জুতা খুইল্যা যান।
- কেন?
: জুতা পায়ে দিয়া ভেতরে যাওয়া নিষেধ।
- কে নিষেধ দিছে?
: স্যারেরা।
- অই মিয়া, ফাইজলামি পাইছ? এইটা কী কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় যে, পায়ের জুতা বগলে লইয়া এর ভেতরে যাওন লাগব?
- আপনেরে জুতা বগলে লইতে বলি নাই; বাক্সে রাইখ্যা যাইতে বলছি।
: আমি জুতা বাক্সে রাখতে যাব কোন দুঃখে!
- এইটাই নিয়ম।
এসময় একজন ভদ্রলোক সেখানে উপস্থিত হতেই দারোয়ান সিনা টান করে তাকে স্যালুট জানাল। ভদ্রলোককে জুতা পায়ে গটগট করে ভেতরে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে দারোয়ানকে বললাম-
: উনারে জুতা রাইখ্যা যাইতে বললা না কেন?
- উনি আমাদের স্যার।
: যে নিয়ম তোমার স্যারেরা মানে না- সেইটা অন্যদের ওপর চাপাইছে কীজন্য?
- এইটা আমি কেমনে বলব! আমি হইলাম হুকুমের দাস। যেইভাবে তারা হুকুম দেয়- আমি সেইভাবে ডিউটি পালন করি...
দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭১। এরই একটির মধ্যবয়স্ক এক দারোয়ান যখন জুতা নিয়ে আমাকে নিয়মের নামতা শেখাচ্ছিল, ঠিক তখনই সেখানে একটা অনিয়মের ঘটনা ঘটল। এটাকে আমি উদাহরণ বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু তারপরও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই- নিয়মের আড়ালে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়ংকর সব অনিয়ম আর অনাচার চলছে। মালিকানা দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে নামকাওয়াস্তে পাঠদান, কোচিং সেন্টারের আদলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, ভাড়ায় শিক্ষক এনে জোড়াতালির ক্যাম্পাস পরিচালনা, সনদ বিক্রি, ক্যাম্পাস ও শাখা বিক্রিসহ এমনসব কীর্তিকলাপ সেখানে চলছে- যা এক কথায় ভয়াবহ। কিছুদিন আগে ফুটপাতে চা পান করতে গিয়ে এদের একটা কীর্তির কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী চায়ের দোকানের পাশে আড্ডা দিচ্ছিল। এসময় একজনকে বলতে শুনলাম-
: ফ্রেন্ড, আমি তো চিপায় পইড়া গেলাম।
- কেন, কী হইছে!
: গত মাসে বেতন পেমেন্ট করতে পারি নাই। আইজ সেইটা দিতে যাওয়ার পর বলল- বকেয়া বেতনের বিপরীতে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ প্রদানসহ তা পরিশোধ করতে হবে...
শিক্ষাগুরু সক্রেটিস থেকে শুরু করে নিকট-অতীতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত জ্ঞান বিতরণের কাজকে ঐশ্বরিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু যুগ পরিবর্তনের হাওয়ায় সে দৃশ্যপট আমূল পাল্টে গেছে। জ্ঞান বিতরণের কাজ এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যের প্রধান উপকরণে। প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টার ইত্যাদির পর শিক্ষা-বাণিজ্যে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা এক-একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে প্যাকেজ আওতায় জাতিকে জ্ঞান বিতরণের মহৎ কাজটি করে চলেছেন। জ্ঞানার্জনের উপায়, পদ্ধতি ও পরিবেশ যাই হোক না কেন, ট্যাকে যথেষ্ট পরিমাণ ‘কড়ি’ না থাকলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব অর্জন করা যায় না। অনেকেই কোচিং সেন্টারের আদলে বহুতল ভবনের একটি বা দুটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে রাতারাতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বাণিজ্যের পসরা খুলে বসেছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মানে হাজার-বারশ’ বর্গফুট আয়তন বিশিষ্ট কয়েকটি ক্লাসরুম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা অনেক ব্যাপক। নিজস্ব ক্যাম্পাসের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক, পাঠাগার ও গবেষণাগারসহ সমন্বিত পাঠদানের জন্য আনুষঙ্গিক সবকিছুই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা প্রয়োজন। এখানকার শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি শরীরচর্চা ও খেলাধুলায় যেমন পারদর্শী হয়ে উঠবে, তেমনি সবুজ ক্যাম্পাসের শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ফুল-পাখি-প্রজাপতি চিনবে। অথচ বাস্তবে আমরা কী দেখছি? বিপণিবিতান, বাসস্ট্যান্ড, আবাসিক এলাকা, এমনকি শিল্প-কারখানার আশপাশের ভবনে গড়ে ওঠা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় না আছে বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা, না আছে জ্ঞানচর্চার মুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ। দামি কার্পেট যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য এসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীছাত্রীদের জুতা খুলে ভেতরে যাওয়ার নিয়ম করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিদার এসব প্রতিষ্ঠান চটকদার বিজ্ঞাপন আর নানা কৌশলের আড়ালে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে গলা কাটা ফি আদায় করে কার্পেট কালচারে মোড়ানো যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাতে প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষ গড়ে তোলার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। শ্যামলী আশা ইউনিভার্সিটির পাশে সম্প্রতি একটি নতুন মার্কেট উদ্বোধন করা হয়েছে। পঙ্গুসহ অন্যান্য হাসপাতালের পাশে হওয়ায় মার্কেটের অধিকাংশ দোকানপাট ওষুধ ও সার্জিকেল যন্ত্রপাতি দ্বারা সজ্জিত। কিছু দোকান এখনও ভাড়া হয়নি। টু-লেট ঝুলছে। একদিন একটা কাজে মার্কেটের ভেতরে গিয়ে দেখি- একটা দোকানের সাটারের ওপর একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লেখা। কৌতূহল হওয়ায় সেখানকার একজনকে জিজ্ঞেস করলাম-
: ভাই, এইটা কী!
লোকটা আমার দিকে সরু চোখে তাকাল। আমি এটাকে কোনো মঘা দাওয়াখানা বা হারবাল সেন্টার ভেবেছি মনে করে সে তাচ্ছিল্যমাখা ভঙ্গিতে আমাকে বারকয়েক পরিমাপ করার পর গম্ভীর কণ্ঠে বলল-
: এটা একটা ইউনিভার্সিটি।
পনের বাই বিশ ফুটের একটা রুম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্রাবাসের একটি টাট্টিখানার যে আয়তন, এটা তার চেয়েও ছোট। অথচ এটাকে ইউনিভার্সিটি বলা হচ্ছে। হায়! দুঃখ রাখি কোথায়! বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিরাজমান অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃংখল অবস্থা দূর করার জন্য অভিভাবক হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন রয়েছে। দেশের আর দশটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেভাবে চলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে সেভাবে না চলে সেজন্য তাদের অনেক কিছু করার কথা। কিন্তু অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার প্রশ্নে এ দুই কর্তৃপক্ষ দুই সাইডে চলে যায়। স্বার্থ হাসিলের জন্য একপক্ষ যেটাকে বেঠিক বলে, অন্যপক্ষ সেটাকে সঠিক হিসেবে ঘোষণা দেয়। দু’পক্ষের ঠিক-বেঠিকের ডামাডোলে অনিয়ম-অনাচার ও স্বেচ্ছাচারের সীমা অতিক্রম কতটা অতিক্রম করেছে তা বুঝতে পারলাম পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
: বর্তমানে কী করতেছ?
- একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করতেছি।
তার কথা শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল। বললাম-
: মাস্টারি করতেছ মানে? তুমি তো অনার্সে থার্ডক্লাস পাইছ!
- এইটা কোনো ব্যাপার না!
: বুঝলাম না!
- আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন তো! তাই আমার জন্য এইটা কোনো সমস্যাই না।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

প্রধানমন্ত্রী যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন by একেএম শাহনাওয়াজ

মানতেই হবে এবার আওয়ামী লীগ সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্র“তির অনেকটাই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে সাফল্যের হারও কম নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার চলছে আন্তরিকতার সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্যও সম্পন্ন হয়েছে। অনেকটাই উন্নতি হয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে নিুমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সঠিক সময়ে বিন্যামূল্যে বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া সরকারের একটি যুগান্তকারী সাফল্য। কৃষি ক্ষেত্রেও উন্নয়ন ঘটেছে। বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার তৈরি করে ঢাকা শহরের যাতায়াত সমস্যার কিছুটা হলেও সুরাহা করার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। এসবের পরও একে একে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা যখন করুণভাবে হেরে যেতে থাকেন, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হতাশ ও ক্ষুব্ধ হতেই পারেন! তিনি অনেক মঞ্চে উত্তর খুঁজে ফিরছেন। বলছেন, এত কাজ করার পরও মানুষ কেন আওয়ামী লীগকে ভোট দিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রশ্নের মধ্যে একটি সরলতা আছে সন্দেহ নেই। তবে স্পষ্ট যে, এখানে চিন্তার গভীরতা নেই। অথবা কঠিন সত্যকে জোর করে অস্বীকার করার প্রবণতা রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের ভোলার কথা নয় ২০০১-এর নির্বাচনে তারা কেন খারাপ ফলাফল করেছিলেন। ১৯৯৬-তে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নমূলক কাজে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সব গুবলেট করে দেয় দলীয় সন্ত্রাস। দেশের কয়েকটি জেলায় সন্ত্রাসী গডফাদারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের অপকীর্তি ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল সাধারণ মানুষকে। প্রতিদিনের যাপিত জীবনে আসুরিক দাপট যখন মানুষের সুখ কেড়ে নেয়, তখন সরকারের অন্যসব অর্জন ফিকে হয়ে যায়। সরকার সন্ত্রাসীদের রাশ টানতে পারেনি। অধিকন্তু আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এবং বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কখনও কখনও প্রকাশ্যে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন সন্ত্রাসী গডফাদারদের। সাধারণ মানুষ এর ক্ষুব্ধ জবাব ব্যালটের মাধ্যমে দিয়েছিল।
এ দেশের আশাবাদী মানুষের প্রত্যাশা ছিল, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা আÍসমালোচনা করবেন। একই ভুল করবেন না। চেষ্টা করবেন দলীয় সন্ত্রাস যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সে পথে হাঁটেননি কেউ। রাজনীতিতে টিকে থাকতে পেশিশক্তিকেই বড় মনে করেছেন। ২০০১-এর বিএনপির শাসন দুঃশাসনে পরিণত হয়েছিল। দুর্নীতির প্রতীক হয়ে পড়েছিল হাওয়া ভবন। দলীয় সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। ছাত্রদলের তাণ্ডবে অশান্ত হয়ে পড়েছিল ক্যাম্পাস। ছাত্রদল-যুবদলের অত্যাচার, টেন্ডারবাজি, দখল বাণিজ্য, নেতা-নেত্রীদের দুর্নীতি মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তার জবাবও দেয়া হয়েছিল ব্যালটে। কিন্তু ক্ষমতায় বসে অতীত ভুলে যাওয়াটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে এ দেশের রাজনীতিকদের। আমাদের বিবেচনায় এমনটি হয়েছে নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার অভাবে। ফলে একমাত্র পাঁচ বছর অন্তে ভোটারের ব্যালট প্রয়োগের আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে মূর্খ ও নির্বীর্য ভাবতেই অভ্যস্ত ক্ষমতাপ্রিয় রাজনীতিকরা। মোটা দাগে বুঝতে হবে, মানুষের কষ্ট কী? কী চায় মানুষ? অথবা অগ্রাধিকার পাবে কোন কাজটি? যদি সাধারণ মানুষকে বলা হয়, তোমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারদলীয় ছাত্রসহ কোনো পক্ষ সন্ত্রাস করবে না; সন্ত্রাসকারীকে কঠোর হাতে দমন করা হবে; টেন্ডারবাজ-দখলদারদের দলীয় প্রশ্রয় দেয়া হবে না; আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী খুন, রাহাজানি, ছিনতাই থেকে মানুষকে রক্ষা করবে; দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে; বিনিময়ে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিং মানতে হবে- মানুষ নিশ্চয়ই তা মেনে নিত। অর্থাৎ এসব অন্যায় আর নৈরাজ্য বহাল রেখে বড় বড় উন্নয়ন হলেও তা শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে খুব কাজে দেয় না। আর কে না জানে কষ্টদায়ক মন্দ বিষয় ভালো কর্মকে ক্ষণিকের জন্য হলেও ঢেকে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
গত নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোট যখন সরকার গঠন করে, তখন দলটির কাছে মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। দিন বদলের স্লোগানটিকে বিশ্বাস করেছিল সাধারণ মানুষ। এর বড় কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ঝাঁকুনি। রাজনীতির চোর-বাটপার আর দুর্নীতিবাজদের প্রকাশ্যে টেনে আনতে পেরেছিল এ বিশেষ সরকার। বিশাল প্রভাবশালীরা বুঝতে পেরেছিল একসময় না একসময় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই হয়। এ কারণে আশাবাদী মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছিল, নির্বাচনের বৈতরণী পাড়ি দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা এসব শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আসবেন। এমন এক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রতিশ্র“তিতে আওয়ামী লীগ দিন বদলের লোভ দেখিয়েছিল। এ কারণেই মানুষ ভেবে বসেছিল, সরকারের ও দলের কঠোর শাসনে এবার আমরা পরিশুদ্ধ ছাত্রলীগ পাব। ক্যাম্পাস রাজনীতি ফিরে যাবে আবার তার পরিশুদ্ধ অতীতে। এভাবে ছাত্র রাজনীতির চলমান চরিত্র বদলে দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন এ সময়ের আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা। দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, দখলদারিত্ব নির্বাসিত হয়ে তা ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। বদলে যাওয়া দিনের কারণে প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে খর্গহস্ত হবে সরকার। দলীয়করণের অচলায়তন এবার ভেঙে ফেলা হবে। দলীয় পরিচয়ে নয়, যোগ্যতার বিচারে গুণী সম্মান পাবেন, পদাধিকারী হবেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য এ দেশবাসীর, মানুষের দেয়া আস্থার সম্মান তেমনভাবে রক্ষা করতে পারলেন না আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। গণমানুষের সরকার না হয়ে আওয়ামী লীগের সরকার তৈরি করে ফেললেন তারা। দিন বদলালো না। সরকারের যাত্রা শুরু থেকেই ছাত্রলীগ-যুবলীগ বুভুক্ষু দশায় হামলে পড়ল যেন। তারা দেশব্যাপী শিক্ষাঙ্গনে এতটাই বেপরোয়া ও হার্মাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হল যে একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের অভিভাবকত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার ঘোষণা দিলেন। কিন্তু এর সুফল মিলল না। রাজনীতির কূট দর্শনেরই জয় হল। পুরনো দিনের মতোই ছাত্রলীগ-যুবলীগ বা ছাত্রদল-যুবদলের মতো ছাত্রলীগ-যুবলীগ চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও অস্ত্রবাজ হিসেবে আবির্ভূত হল। সন্ত্রাস ছড়াতে লাগল। খুনোখুনিতে জড়িয়ে গেল। পরাস্ত হলেন প্রধানমন্ত্রী। ছাত্রলীগ এতটাই বেপরোয়া হয়েছে যে, যখন নির্বাচনের মাঠে কিছুটা ব্যাকফুটে থেকে আওয়ামী লীগ নিজেকে গোছাতে চেষ্টা করছে, প্রধানমন্ত্রী এবং তার পুত্র জয় নির্বাচনী বক্তৃতায় জনমত গঠনে ব্যস্ত, তখন সব অর্জন লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে সিলেটে ছাত্রলীগ সিপিবির মঞ্চে হামলা করল। সিপিবি নেতা প্রবীণ রাজনীতিক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ অনেকে আহত হলেন। পত্রিকা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় আক্রমণের কারণ। মঞ্চের বক্তারা এ সময় বক্তৃতায় সরকারের সমালোচনা করছিলেন, যা সহ্য করতে পারল না আওয়ামী লীগের পেশিশক্তি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ। গণতন্ত্রী নেতারা সমালোচনাকে স্বাগত জানান। কারণ এ থেকে নিজেদের শুধরে নেয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি করা দলগুলোয় কি গণতান্ত্রিক চর্চা রয়েছে? ছাত্রলীগ বিরুদ্ধ মত কী করে সহ্য করবে? তার নেতা-নেত্রীরা কি সহ্য করেন? হরহামেশাই তো তারা সমালোচকদের নিন্দা করেন। টকশোতে যাওয়া বক্তারা নিন্দিত হন, মধ্যরাতের সিঁধেল চোরের অভিধা পান। কলাম লেখকরা গুণগান না করলে ক্ষুব্ধ হন সরকারপ্রধান পর্যন্ত। আর অন্যায় করে মামলায় জড়িয়ে পড়া দলীয় সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক বিবেচনার পুরনো প্রথায় মুক্তি পেতে থাকেন। এভাবে দিন বদলের বেলুন ফুটো হয়ে চুপসে যেতে থাকে। এ অবস্থা সাধারণ মানুষকে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ করছে। বিগত নির্বাচনে দেয়া ভোটের এহেন অমর্যাদায় হতাশায় ডুবে যায় জাতি।
মানুষ আশা করেছিল, দিনবদলের কাণ্ডারিরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করবেন। দেশকে সম্মানিত করবেন বিশ্বের দরবারে। শেয়ারবাজার কেলেংকারির পথঘাট কেমন তা পূর্ব অভিজ্ঞতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের জানা। তারপর একদিনে নয়, দিনে দিনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা মানুষ সর্বস্বান্ত হতে থাকে, কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রতিবিধান পাওয়া যায় না। দলীয় ক্ষমতাবানরা ফেঁসে যাবে বলে তদন্ত রিপোর্টের নির্দেশনা মুখ থুবড়ে পড়ে। পদ্মা সেতু কেলেংকারি নিয়ে কম তো হল না। সরকার যা বোঝাতে চায় বোঝাতে পারে, তবে ভোটারের যেটুকু বোঝার তা বুঝে নিয়েছে। দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ যেখানে বড়, সেখানে কোনো যুক্তি কাজে লাগে না। পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি- সরকারের এই সিদ্ধান্ত যদি সত্য হয়, তবে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে মানুষের ভেতরকার ধোঁয়াশা মোচন করা সরকারেরই কর্তব্য।
ড. ইউনূসকে নিয়ে সরকার পক্ষের যত নিন্দাই থাক, সাধারণ মানুষ এই নোবেল বিজয়ীকে ত্যাগ করেনি। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় বাঙালির অহংকার করার মতো অনেক ঘটনা ছিল। ঔপনিবেশিক যুগ এবং পাকিস্তান শাসনামলে গৌরব করার মতো অনেক বাঙালি নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা ধারাবাহিক গৌরবের পতাকা বহন করেছিলেন। এর পরই গ্রাস করল ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার রাজনীতি। এ প্রজন্ম চারপাশ থেকে যখন গৌরব খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি তাদের নতুন করে জাগিয়ে তুলেছিল। ইউনূস কোন পথে নোবেল পেলেন, তার কী কী সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে তো ঈর্ষাকাতর অন্য কোনো দেশ গবেষণা করবে। আমরা আমাদের গৌরবের অংশটুকু ধারণ করতে চাই। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে মানুষ লক্ষ্য করল এ নোবেল বিজয়ী কীভাবে সরকারি দল ও সরকারের রোষানলে পড়লেন। সরকারি এসব অভব্য আচরণ ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতেই পারে। এত কিছুর পরও মুক্তিযুদ্ধøাত এ দেশের মুক্ত বিবেকের মানুষ চাইবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থানে থাকুক। কিন্তু তা কী করে সম্ভব হবে, এখন এটাই আমাদের ভাবনা। কারণ আওয়ামী লীগ সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এতকিছুর পরও বক্তৃতায় যখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট না দেয়ার কারণ বুঝতে পারেন না, তখন আমরা হতাশা বোধ করি। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি বরাবর আশাবাদী। তাই বলব, আওয়ামী লীগ সবকিছু হারিয়ে ফেলেনি। তার প্রতিপক্ষরাও ধোয়া তুলসীপাতা নয়। আওয়ামী লীগ এখনও যদি ভুল শুধরে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক সৎ রাজনীতির পথে হাঁটতে পারে, তবে ভোটারদের আস্থায় ফিরে আসতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়