Showing posts with label আলোকিত বাংলাদেশ. Show all posts
Showing posts with label আলোকিত বাংলাদেশ. Show all posts

Friday, September 4, 2026

জানেন কালো বিড়াল অশুভ কেন?

সুদূর প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের মধ্যে কিছু প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তি-দর্শনও মানুষকে সেই বিশ্বাস থেকে দূরে সরাতে পারেনি। এরকমই এক অশুভ প্রাণী কালো বিড়াল। প্রচলিত ধারণায়, যেকোনও কাজে কালো বিড়াল দেখলে সেই কাজ অশুভ হয়। কাজে সফলতা আসে না। বিপত্তি ও বিড়ম্বনা তৈরি হয়।
বিশ্বের বহু মনীষী ও প্রখ্যাত লেখকগণও তাদের ভৌতিক গল্প বা কাহিনিতে কালো বিড়ালকে ‘বিভীষিকার প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু কেন কালো বিড়ালকে অশুভ শক্তির প্রতীক ভাবা হয়?
যুক্তিবাদীরা মনে করেন, কালো বিড়ালকে অশুভ ভাবার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তারা জানান, অতীতে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। আর গরুদের সামনে দিয়ে কালো বিড়াল গেলেই তারা অস্থির হয়ে পড়ত। গরুদের শান্ত করতে চালককে কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থামিয়ে দিতে হত।
সেই রেওয়াজই নাকি পরবর্তীকালে কুসংস্কারে পরিণত হয় এবং সেই থেকেই নাকি যেকোনও গাড়ির সামনে দিয়ে কালো বিড়াল গেলেই গাড়ি থামিয়ে দেয়ার রীতি শুরু হয়।
যুক্তিবাদীদের এরকম আরও যুক্তি হচ্ছে, বিড়াল কালো হোক কিংবা সাদা- এ জাতীয় ছোট প্রাণীদের সাধারণত অন্য বড় প্রাণী বা মানুষ তাড়া করে। ফলে এসকল প্রাণী সবসময় দৌড়ের ওপর থাকে। মানুষের সঙ্গে তাদের ধাক্কা লাগারও সম্ভাবনা কম। সেজন্যও কালো বিড়ালকে অনেকেই অশুভ ভাবেন।

Friday, March 24, 2023

সদকাতুল ফিতর কেন দেবেন by মাহবুবুর রহমান নোমানি

যাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব তাদের জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। মা, বাবা, দাদা, দাদি এবং তাদের বাবা-মাকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। এভাবে নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতিকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া জায়েজ নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত-ফেতরা দিতে পারবে না। ধনী ব্যক্তির নাবালক সন্তান এবং অমুসলিমকে জাকাত-ফেতরা দিলে আদায় হবে না।
সদকাতুল ফিতর আমাদের সমাজে ‘ফেতরা’ নামেই অধিক পরিচিত। দ্বিতীয় হিজরিতে ঈদুল ফিতরের মাত্র দুই দিন আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) জনগণের উদ্দেশে খুতবা প্রদানকালে প্রথমবারের মতো সদকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেন। এ সদকার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রোজার ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ এবং ঈদের দিন গরিব-অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করা। এদিন যেন তারা খাদ্য সংকটে কষ্ট ভোগ না করে। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ঈদের দিন ফকির-মিসকিনকে আহারের সন্ধানে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো থেকে মুক্তি দাও।’ (দারাকুতনি : ২১৩৩)। আবু দাউদ শরিফের বর্ণনায় রয়েছেÑ ‘ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন রোজা পালনে ত্রুটিবিচ্যুতি, অহেতুক কথা-বার্তা, অশ্লীল কাজ-কর্ম ইত্যাদির ক্ষতিপূরণ এবং গরিব-মিসকিনদের আহারের চাহিদা পূরণস্বরূপ। আমাদের হানাফি মাজহাব মতে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। রোজা রাখতে না পারলেও সদকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক।
সদকাতুল ফিতর কার ওপর ওয়াজিব
ঈদের দিন সকালে যার কাছে জাকাত ওয়াজিব হওয়া পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ থাকে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তবে জাকাতের নিসাবের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র, জায়গা-জমিন ইত্যাদি ধরা হয় না। কিন্তু সদকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যতীত অন্যান্য আসবাবপত্রের মূল্য ধর্তব্য। সুতরাং সেসব জিনিসপত্রের মূল্য সাড়ে বায়ান্না তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হলে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। সদকাতুল ফিতর নিজের পক্ষ থেকে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের পক্ষ থেকে আদায় করা জরুরি। স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ফেতরা দেওয়া বাবার ওপর আবশ্যক নয়। তবে তিনি তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে দিলে শুদ্ধ হবে। সদকাতুল ফিতর ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় ওয়াজিব হয়। সুতরাং যে সন্তান ঈদের দিন সুবহে সাদিকের কিছু সময় পর জন্মগ্রহণ করেছে তার ফেতরা দেওয়া আবশ্যক নয়। কেননা সে সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় অনুপস্থিত ছিল। হ্যাঁ, ঈদের রাতে জন্মগ্রহণকারী সন্তানের ফেতরা আদায় করতে হবে। কারণ এ সন্তান সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় বাবার সংসারে উপস্থিত।
সদকাতুল ফিতর কী দিয়ে আদায় করবে
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুগে সাধারণত খেজুর, যব, কিশমিশ, ঘি এবং গম দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। সুতরাং কেউ যদি এসব খাদ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করতে চায়, তাহলে সেই পরিমাণ আদায় করতে হবে, যা নবীযুগে আদায় করা হতো। হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবীজির যুগে খেজুর, যব, কিশমিশ এবং ঘি ‘এক সা’ (৩ কেজি ১৮৪ গ্রাম) পরিমাণে দেওয়া হতো। আর গমের ক্ষেত্রে এক সা এবং আধা সা দুই বর্ণনাই পাওয়া যায়। অতএব গম বা আটা দ্বারা ফেতরা আদায় করতে চাইলে ‘আধা সা’ (১ কেজি ৬৬২ গ্রাম) গম, আটা বা তার মূল দিলেই যথেষ্ট হবে। কিন্তু অন্য জিনিসের বেলায় এক সা (৩ কেজি ১৮৪ গ্রাম) খাদ্য বা তার মূল্য আদায় করতে হবে। এ নীতিমালা অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এ বছর ফেতরা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ৭০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৮০ টাকা। জাকাত-ফেতরা আদায়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপকারের প্রতি লক্ষ করে জাকাতযোগ্য সম্পদের মূল্য পরিমাণ অর্থ দান করা উত্তম। এটি ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীদের অভিমত। সুতরাং কাপড়, খাদ্য ইত্যাদি দ্বারা জাকাত-ফেতরা না দিয়ে টাকা প্রদান উত্তম।
যাদের সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে না
যাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব তাদের জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। মা, বাবা, দাদা, দাদি এবং তাদের বাবা-মাকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে না। এভাবে নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতিকে জাকাত-ফেতরা দেওয়া জায়েজ নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত-ফেতরা দিতে পারবে না। ধনী ব্যক্তির নাবালক সন্তান এবং অমুসলিমকে জাকাত-ফেতরা দিলে আদায় হবে না।
যাদের সদকাতুল ফিতর দেওয়া যাবে
যাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয় তারা জাকাত, ফেতরা, কোরবানির চামড়ার অর্থ এবং সদকার টাকা গ্রহণ করতে পারবে। কারণ তাদেরই শরিয়তে ফকির বা মিসকিন বলা হয়েছে। আপন ভাইবোন, চাচা-চাচি, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, মামা-মামি, শ্বশুর-শাশুড়ি-জামাই প্রভৃতি লোক গরিব হলে জাকাত-ফেতরা দেওয়া যাবে। বরং এতে আত্মীয়তার হকও আদায় হবে। সবচেয়ে উত্তম দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে গরিব তালিবুল ইলমদের দান করা। এতে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব পাওয়া যাবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘দান-খয়রাত ওইসব গরিব লোকের জন্য, যারাা আল্লাহর রাস্তায় আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে জীবিকার সন্ধান করতে পারে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭৩)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে মারেফুল কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘যারা ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে জীবিকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো কাজ করতে পারে না এখানে তারাই উদ্দেশ্য।’
সদকাতুল ফিতর আদায়ের উত্তম সময়
হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম ও মুস্তাহাব। এ মর্মে হজরত ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ দিতেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ৬৭৭)। তবে ঈদের নামাজের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে না পারলেও ওয়াজিব রহিত হবে না। বরং অনতিবিলম্বে তা আদায় করতে হবে। পক্ষান্তরে ঈদের রাতের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করলে নির্ভরযোগ্য মতানুসারে আদায় হয়ে যাবে। এমনকি রমজানের শুরুতে আদায় করলেও শুদ্ধ হবে। পুনরায় আদায় করা জরুরি নয়। (তুহফাতুল আলমায়ি : ২/২০৮)।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল উলুম, সাতাইশ, টঙ্গী

Monday, February 13, 2023

প্রকৃতির সৌন্দর্য বাংলাদেশের পাখি by মোস্তফা কামাল গাজী

‘এদেশ পাখির দেশ, কত পাখি আছে এইখানে/কত রূপ! কত রঙ! কত গান সে পাখিরা জানে।’
নানা রং আর রূপের বৈচিত্র্যময় পাখিরা বাংলাদেশকে করেছে রূপময়। ভোরের আলো ফুটতেই ঝোপঝাড় আর বন-জঙ্গল থেকে ভেসে আসে পাখিদের মিষ্টি-মধুর কলতান। সকালের হিমেল হাওয়া আর পাখিদের হৃদয়কাড়া গানে মনটা আরও সতেজ হয়ে ওঠে। বিকালে আকাশের দিগন্তে উড়তে দেখা যায় ঝাঁকে ঝাঁকে নাম না জানা পাখিদের। সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে কিচিরমিচির রব তোলে। এই পাখিদের কারণেই আমাদের দেশটা এত সুন্দর, এত মুগ্ধকর। অন্যসব প্রাণীর মতো পাখিরাও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা জানে এবং নিজ নিজ ভাষার পদ্ধতিজ্ঞানে তা পালন করে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তুমি কি দেখো না যে আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যারা আছে, তারা এবং উড্ডীয়মান পক্ষিকুল তাদের পাখা বিস্তার করে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তার প্রার্থনার এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি। তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।’ (সূরা নুর : ৪১)।
আল্লাহর নবী হজরত সুলায়মান (আ.) কে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেওয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘সুলায়মান হয়েছিল দাউদের উত্তরাধিকারী এবং বলেছিল, হে মানুষ! আমাকে পাখিকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে...এটা অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।’ (সূরা নাহল : ১৬)।
নানা বর্ণ আর বহু প্রজাতির পাখির বসবাস রয়েছে এ দেশে। এর মধ্যে রয়েছে জলচর, স্থলচর, উভচর, গায়ক, কথক ইত্যাদি পাখি। বাংলাদেশে দেখতে পাওয়া যায় এমন কিছু পাখির পরিচিতি নিম্নে তুলে ধরা হলো।
দোয়েল
দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি। বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গায় এদের দেখতে পাওয়া যায়। পুরুষ দোয়েলের উপরিভাগ চকচকে নীলাভ-কালো। ডানা স্পষ্ট সাদা লম্বা দাগসহ কালচে বাদামি রঙের। লেজ কালো তবে প্রান্ত অংশ সাদা। স্ত্রী দোয়েলের দেহের কালো অংশগুলো বাদামি এবং ময়লা বালির মতো দেখায়। গাছের প্রাকৃতিক খোঁড়লে কিংবা ঝোপঝাড়ে এরা বাসা বাঁধে। সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় ঝোপঝাড়যুক্ত বন, বাগান, গ্রাম তথা লোকালয়ে এদের দেখতে পাওয়া যায়। মিষ্টি মোলায়েম শিস দিয়ে লেজের ডগা নাচায়। স্থিরভাবে বসা অবস্থায় দোয়েলের লেজ মোরগের লেজের মতো দেখায়। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ দোয়েল খুব ভোরে এবং পড়ন্ত দুপুরে সুরেলা গলায় অত্যন্ত জোরে গান গায়। অন্য পাখির ডাকও এরা নকল করতে পারে। দোয়েল প্রধানত পোকা-মাকড়, কীটপতঙ্গ খায়। এপ্রিল থেকে জুলাই মাস এদের প্রজনন ঋতু। স্ত্রী দোয়েল ৩ থেকে ৫টি ডিম দেয়। সাধারণভাবে ডিমগুলো ফ্যাকাশে মনে হয়। তবে দোয়েলের ডিমের রং লালচে-বাদামি আভা ও ছোপযুক্ত নীলাভ সবুজ হয়ে থাকে। স্ত্রী দোয়েল ডিমে তা দেয়। দোয়েল ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
কোকিল
কুহু কুহু ডাকা লাল চোখের কালো পাখিটি আমাদের অতি পরিচিত কোকিল। কুলি বা এশীয় কোকিল নামেও পরিচিত। ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত কোকিলের দৈর্ঘ্য ৪০ থেকে ৪৩ সেন্টিমিটার। ওজন ১৭০ গ্রাম। পুরুষের দেহের পালক কুচকুচে কালো ও তাতে সবুজ আভা রয়েছে। অন্যদিকে, স্ত্রীর বাদামি দেহে অসংখ্য সাদা ছিট ও রেখা আঁকা। পুরুষের ঠোঁট চকচকে সবুজ হলেও স্ত্রীর হালকা ধূসর। চোখ টকটকে লাল। পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো।
কোকিল বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই দেখা যায়। মূলত একাকী থাকতে পছন্দ করে। প্রজননকাল ছাড়া সচরাচর জোড়ায় দেখা যায় না। ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পাকা ফল এদের প্রিয়। গাছের ছায়ার পাতার আড়ালে থাকতেই ভালোবাসে। পুরুষ কোকিল গলায় মধুর সুর তুললেও স্ত্রী কোকিল নীরব থাকে।
মার্চ-আগস্ট কোকিলের প্রজনন মৌসুম। এ সময় পুরুষ স্ত্রীকে গলায় সুর তুলে আকৃষ্ট করে ও মিলিত হয়। এরা কিন্তু বাসাও বানায় না, ডিমেও তা দেয় না। ডিম পাড়ার সময় লুকিয়ে কাক, হাঁড়িচাঁচা বা শালিকের বাসায় ডিম পাড়ে। ধাত্রী পাখির ডিমের সঙ্গে মিল রেখে ডিম পাড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা এদের দিয়েছেন। বংশধর নিশ্চিত করতে একটি বাসায় ডিম না পেড়ে কয়েকটি বাসায় ডিম পাড়ে। বিভিন্ন বাসায় ডিমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬টি। না বুঝে কাক ও অন্য পাখি এদের ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১২ থেকে ১৩ দিনে। ছানা ১৮ থেকে ২০ দিনে বড় হয়ে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।
ময়না
কথা বলতে পারে বলে অনেকে শখ করে ময়না পুষে থাকেন। এরা দেখতে বেশ দৃষ্টিনন্দন। ময়না পাখি পাহাড়-টিলাঘেরা বন পছন্দ করে। সিলেট ও চট্টগ্রামের বন-জঙ্গলে এ পাখি দেখতে পাওয়া যায়। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী, গুলশান, বারিধারা ও ধানমন্ডির অনেক বাসা ও ফ্ল্যাটে এদের পুষতে দেখা যায়।
ময়না পাখির রং কালো। শরীরের কিছু অংশজুড়ে হলুদে রঙের। ঠোঁট কমলা-লাল। চোখের নিচে ও মাথার পেছনে হলুদ রঙের চওড়া রেখা রয়েছে। এ রেখার জন্য ময়নাকে খুবই সুন্দর দেখায়। পাখিটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি মিষ্টি এদের গলা। এমনকি এরা অন্য পাখির ডাকও নকল করতে পারে। গলায় তুলতে পারে নানা রকম বিচিত্র শব্দ। শীতকাল ছাড়া অন্য যে কোনো সময় ময়না বাসা তৈরি করে। পাহাড়-টিলার ফাঁকফোকরে এবং উঁচু গাছের কোটরে ঘাস-লতা দিয়ে বাসা তৈরি করে। স্ত্রী ময়না একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে, ডিমের রং নীলচে হয়। পুরুষ ও স্ত্রী ময়না পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। ১৫ থেকে ১৭ দিন পর ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। বাচ্চারা চোখ ফোটার ১৫ দিন পর উড়তে পারে। এরা দলবেঁধে থাকতে পছন্দ করে। প্রভুভক্ত হয় ময়না পাখি। প্রভুর যে কোনো বিপদে-আপদে চিৎকার করে শক্রপক্ষকে ব্যস্ত রাখে। এরা পোকা-মাকড়, ছোলা, কচি পাতা খেতে পছন্দ করে। অনেক ময়না কলা ও কামরাঙ্গা খেতে ভালোবাসে। ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানা ও গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে ময়না পাখির দেখা মেলে।
শালিক
শালিক বেশ কয়েক ধরনের হয়। সাদা-কালো শালিককে ডাকা হয় গো-শালিক বা গোবরে-শালিক নামে। এদের ঠোঁটের রং গাঢ় কমলা-হলুদ এবং চোখের মণি হালকা হলুদ রঙের। অন্যদিকে ঝুঁটি-শালিকও সাদা-কালো রঙের হয় কিন্তু এর মাথায় একটি ঝুঁটি রয়েছে। গাঢ় বাদামি শালিককে বলা হয় ভাত শালিক। এদের ঠোঁট ও পা উজ্জ্বল হলুদ রঙের। এর বাইরেও রয়েছে গাঙশালিক, বামন-শালিক ইত্যাদি।
শালিকের স্বরতন্ত্রী বেশ জটিল হওয়ায় এদের ডাক বিচিত্র ও বিভিন্ন স্বরে ওঠানামা করে। এরা খুব সহজেই আশপাশের আওয়াজ আর মানুষের কথা অনুকরণ করতে পারে। এরা মানুষের গলার স্বর শুনে নির্দিষ্ট কাউকে চিনতে সক্ষম হয়। বর্তমানে এরা মানব ভাষা বিষয়ক গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। গায়ক পাখি হিসেবেও শালিকের সুনাম রয়েছে, তবে কাঠ-শালিক সবচাইতে ভালো গাইতে পারে। প্রায় সব প্রজাতির শালিকই বিভিন্ন স্বরে ডাকতে পারে এবং অন্য শালিকের কণ্ঠ নকল করতে পারে।
সামাজিক পাখি হিসেবে শালিকের সুনাম রয়েছে। এরা দলবেঁধে ডাকে ও বসবাস করে।
টিয়া
খুবই পরিচিত একটি পাখি টিয়া। সবুজ রঙ, লম্বা লেজ ও বড় চ্যাপ্টা ঠোঁট দেখলেই সবাই টিয়া পাখি চিনে ফেলে। বাংলাদেশে মোট ৬ প্রকার টিয়া পাওয়া যায়। যেমনÑ বাসন্তী লটকন টিয়া। লাল ঠোঁট ও সবুজ দেহের সুন্দর গোলগাল এই টিয়া। এর লেজ অন্য টিয়াদের মতো লম্বা নয় বরং খাট। এর কোমরের কিছু পালক লাল হয়ে থাকে। সচরাচর পারিবারিক দল বা ঝাঁকে এদের পাওয়া যায়। বাংলাদেশের কাপ্তাইয়ের ন্যাশনাল পার্কে বেশি দেখা যায়। এরা ডুমুর ফল, বট ফল, বাঁশ বীজ, ফুলের মিষ্টি রস খেয়ে থাকে। এরা গাছে উল্টো করে ঝুলে থাকতে, খাবার খেতে ও বিশ্রাম নিতে পছন্দ করে। খাঁচায় পালনের জন্য এই টিয়া অনেক জনপ্রিয়।

Wednesday, August 24, 2022

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ: সুলতান মাহমুদ গজনভী ও আয়ায by ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

আমিরের নেতৃত্বে সিপাহিরা রাতে তালা ভেঙে আয়াযের কামরায় প্রবেশ করে। সতর্ক নজরদারিতে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালায় সংরক্ষিত কক্ষে। কিন্তু একজোড়া ছেঁড়া জুতা আর জীর্ণশীর্ণ জুব্বাটি ছাড়া আর কিছু পেল না। তখন ভয়ে আতঙ্কে হলুদাভ হলো তাদের চেহারা। বাদশাহর কাছে কী কৈফিয়ত দেবে ভেবে পায় না। আয়াযের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পরিণাম কী হবে তারা জানে। আবার আত্মস্থ হয়ে তারা বলল, এমন তো হতে পারে না।

সুলতান মাহমুদ গজনভীর প্রাণপ্রিয় গোলাম আয়ায। আয়ায কৃতদাস হয়ে এসেছিল সুলতানের দরবারে। এখন ঈর্ষণীয় রাজকীয় পদে সমাসীন। সুলতানের প্রিয়ভাজন হওয়ায় চারদিকে তার জয়জয়কার। আয়ায একজোড়া পুরোনো চামড়ার সেন্ডেল আর ছেঁড়া জুব্বা ঝুলিয়ে রেখেছিল একটি নির্জন কামরায়। রোজ দরবারে আসার আগে আয়ায সে কামরায় যায়। জুব্বা আর জুতার সামনে নিজের সঙ্গে কথা বলে আয়ায! তুমি সেই লোক, যার সম্বল ছিল পরিধানের এই ছেঁড়া আলখেল্লা আর পায়ে ছিল পুরোনো চপ্পল। কাজেই নিজেকে অত বড় মনে করো না। উচ্চাভিলাষী হইও না। সাবধান!
আপন যোগ্যতায় যারা বড় হয় তাদের শত্রুর অভাব হয় না। আয়াযের বেলায়ও ব্যতিক্রম হলো না। কাছের লোকেরা বাদশাহর কাছে গিয়ে নালিশ করল, জাঁহাপনা! আয়ায তার খাস কামরায় অনেক সোনাদানা জমা করেছে। একটি মটকা তো রতœালংকার হীরা-জহরতে ভর্তি। এ কামরার দরজায় সবসময় তালা ঝুলে। কারও প্রবেশাধিকার নেই। বাদশাহ বললেন, আমার আয়াযের কথা বলছ? তার এমনকি আছে, যা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে বা আমি জানব না?
কাহিনির প্রধান চরিত্রের বাদশাহ গজনীর অধিপতি সুলতান মাহমুদ। গজনী তখনকার বৃহত্তর ইরানের অংশ, বর্তমানে আফগানিস্তানের অন্তর্গত। তার পিতা ছিলেন গজনীর শাসক আবু মনসুর সাবুকতাগীন। ৩৮৭ হিজরিতে সুলতান মাহমুদ ক্ষমতায় আরোহণ করেন। একের পর এক দেশ জয়, দরবারে জ্ঞানী মনীষীদের সমাদর আর ভারতে ইসলামের বিজেতা হিসেবে তার খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। ১৭তম ভারত অভিযানে তিনি সোমনাথ মন্দিরে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। অসাধারণ বিচক্ষণ, জ্ঞানী, দূরদর্শী ও সাহসী যোদ্ধা সুলতান মাহমুদ গজনভী হিজরি ৪২১ সালে রাজত্বের ৩৩ বছরে ৫১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। প্রিয়ভাজন গোলাম আয়াযকে নিয়ে সুলতান মাহমুদের নানা আখ্যান ফারসি সাহিত্যের অলংকার।
আয়াযের বিরুদ্ধে সভাসদদের অভিযোগ শুনে সুলতান একজন আমিরকে নির্দেশ দিলেন, যাও, গভীর রাতে তার কামরায় অভিযান চালাও। তল্লাশিতে ধনরতœ যা পাবে, তোমাদের। একটি সুরতহাল রিপোর্ট জানিয়ে দেবে রাজসভার সবার কাছে। কারণ এত আদর, যতœ, সম্মান পেয়ে কেউ মাথায় উঠবে, সহ্য করা হবে না। গোপনে ধনরতœ জমা করার মতো হীন কাজ করার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? সে কি তাহলে বাইরে প্রেম, ভক্তি, বিশ্বস্ততা আর উদ্দীপনা দেখায় আর ভেতরে ভেতরে আখের গোছায়? প্রেমের বিধান হলো, প্রকৃত প্রেমের সন্ধান যে পেয়েছে বন্দেগি ছাড়া অন্যকিছু করলে তার কুফরি হিসেবে গণ্য হবে।
সেনা অধিনায়ক আমির অভিযানের ছক আঁকলেন। ত্রিশজন বিশ্বস্ত সিপাহিসহ আয়াযের সংরক্ষিত কামরায় অভিযান চালাবেন গভীর রাতে। সিপাহিদের মনে আজ আনন্দের কোলাহল। কারণ তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলেই হীরা-জহরত যা কিছু পাবে তাদের হয়ে যাবে। অবশ্য আয়াযের প্রতি বাদশাহর মনে সন্দেহ অবিশ্বাস ছিল না। হিংসুকদের হাতেনাতে জব্দ করার জন্য তিনি এ সুযোগটি দিলেন। তারপরও আয়ায সম্পর্কে মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হলে বাদশাহ তা দূর করেন আনমনে কথা বলে, আয়ায আমার, আমি আয়াযের। আয়াযের ব্যাপারে কেউ কিছু বলবে, আমি তা সহ্য করব না। আয়ায তো সাধারণ কোনো মানুষ নয়। অসাধারণ তার চলন, বলন, ব্যবহার। আয়াযের প্রশংসায় মওলানা রুমির চিন্তায় ভেসে উঠল একজন ‘ইনসানে কামেল’ এর প্রতিচ্ছবি। তার সামনে এখন ইনসানে কামেলের মহান সত্তার উদ্ভাস। সেই উদ্ভাসে প্রতিফলিত আল্লাহর গুণাবলির ঝলক। ফলে তিনি সব মানবীয় গুণ ও স্বভাবের কেন্দ্র। মহান চরিত্র সুষমায় সুবাসিত তার জীবন। তিনি আল্লাহর প্রিয়ভাজন। তার প্রশংসা করার সাধ্য মানুষের নেই। তিনি বাদশাহ নন; তবে বাদশাহর বাদশাহ, বাদশাহ নির্মাতা। তিনি সৃষ্টির সার নির্যাস। মওলানা যেন বোঝাতে চান তিনি আল্লাহর হাবিব মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। তার উপমা সাগর। তার থেকেই দুনিয়ার মানুষ পায় সজীবতা, জীবনের স্পন্দন। মওলানা আরও বলেন, এই বর্ণনায় এসে আমার মনে পড়ে গেল হাতির দেশ হিন্দুস্তানের কথা। সে এখন কবিতার ক্ষেত-খামার দুমড়ে-মুচড়ে যাবে।
কাইফা য়া-তীন নাযমু লী ওয়াল কাফিয়া
বা-দা মা যাআত উসুলুল আফিয়া
আমার কীভাবে আসবে কবিতা অন্ত্যমিল
প্রেমের তাড়ায় যেখানে পালায় মনের স্বস্তি।
আল্লাহর প্রেমে আমি আত্মহারা। পাগলামি, উন্মতত্তা, উন্মাদনায় আমি বেসামাল। আয়ায আমি তোমার কিচ্ছা বলছিলাম। এখন তুমি আমার কিচ্ছা বল। মওলানা রুমি এখানে আধ্যাত্মিক সাধনার ফানা (নির্বাণ) ও বাকা (স্থিতি) এর জটিল বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করেছেন। যার অপার রহস্যের প্রান্তরে প্রবেশ করার জন্য আমাদের মসনবি পঞ্চম খ- অনুবাদ ও ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এই গল্পের শুরু ১৭৬০ বয়েত থেকে আর শেষ ২১৬২ বয়েতে গিয়ে। কাজেই গল্পের ফাঁকে মওলানা কত আধ্যাত্মিক তত্ত্বরহস্য ব্যক্ত করেছেন অনুমান করাও কঠিন।
ফিরে আসি সুলতান ও আয়াযের গল্পের ধারাবাহিকতায়। আমিরের নেতৃত্বে সিপাহিরা রাতে তালা ভেঙে আয়াযের কামরায় প্রবেশ করে। সতর্ক নজরদারিতে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালায় সংরক্ষিত কক্ষে। কিন্তু একজোড়া ছেঁড়া জুতা আর জীর্ণশীর্ণ জুব্বাটি ছাড়া আর কিছু পেল না। তখন ভয়ে আতঙ্কে হলুদাভ হলো তাদের চেহারা। বাদশাহর কাছে কী কৈফিয়ত দেবে ভেবে পায় না। আয়াযের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পরিণাম কী হবে তারা জানে। আবার আত্মস্থ হয়ে তারা বলল, এমন তো হতে পারে না। এই জুতা-জুব্বা চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। নিশ্চয়ই সোনা-জহরত মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছে সংগোপনে। শুরু হলো খননকার্য কামরার তলায়, এমনকি দেয়ালগাত্রে কোণায় কোণায়। কিন্তু কিছুর সন্ধান পেল না। কামরার দেয়াল, দরজা-জানালা যেন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছিল আয়াযের সততার। তারা হতবাক। আয়াযের প্রতি সন্দেহ ও শত্রুতার জন্য লজ্জায় জড়োসড়ো। নিদারুণ হতাশা ও লজ্জা নিয়ে বেরিয়ে এলো আয়াযের কামরা থেকে। ক্ষমার আর্জির ভঙ্গিতে মাথায় দুহাত দিয়ে পরদিন হাজির হলো দরবারে।
তাদের দেখেই বাদশাহ বললেন, কী খবর তোমাদের? তোমাদের কাঁধের ঝুলি যে খালি, কী ব্যাপার? আয়াযের ধনরতœ কোথাও গোপন করে এখানে এসেছ নাকি? তারপরও তোমাদের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক থাকার কথা। গাছের শিকড় মাটির নিচে পোঁতা হলে তার পাতা বাইরে পল্লবিত হয়। অনুরূপ যারা দুনিয়ায় ভালো কাজের সঞ্চয় গড়ে আখেরাতে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। আর যারা দুনিয়ার জীবনে মন্দের সদাই করে তাদের চেহারা হবে বিধ্বস্ত কদাকার।
বাদশাহর নিরাপত্তা বিভাগের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নির্বাক। নিজেদের অন্যায়-অপকর্মের জন্য বাদশাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। হামবড়া ভাব, রূঢ়-রুক্ষ স্বভাব আর মিথ্যা মামলার প্রায়শ্চিত্য ভোগার ভয়ে তারা আতঙ্কিত। এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যেন নিজেরা নিহত হওয়ার তলোয়ার আর কাফন এগিয়ে দিয়েছে বাদশাহর সামনে। জাঁহাপনা! আমাদের প্রাণদ- দিলে তা আমাদের প্রাপ্য। আর যদি ক্ষমা করেন, তা হবে আপনার মহানুভবতা ও দয়ার প্রকাশ। আমরা যা করেছি, তা আমাদের স্বভাবের দোষ। আপনি বাদশাহ, আপনার কাছে আমাদের আশা, আপনার দয়া, ক্ষমা ও মহানুভবতার পরশ। মওলানার চেতনা এখানে গজনীর বাদশাহকে ছেড়ে আরশপানে উঁকি দেয়। তুমি যদি আমার পাপতাপ মাফ করে দাও, তা তো তোমার শানের জন্য মানায়। দিনের ধর্ম আলো দেবে, রাতের স্বভাব আঁধারের চাদরে আবৃত্ত করবে। তোমার দয়ার স্বভাব দিয়ে যদি আমাদের মাফ করে দাও, তোমার দান বখশিশের সাগরের পানি তো এতটুকুন কমবে না।
সুলতান মাহমুদ বললেন, না আমি তোমাদের ক্ষমা করতে পারব না। এ অধিকার আমি সংরক্ষণ করি না। কারণ তোমরা দোষ করেছ আয়াযের, তার মানহানি করেছ, মানহানির মামলায় তোমরা প্রত্যেকে আসামি। তোমাদের ক্ষমা করবে নাকি প্রতিশোধ নেবে, আয়াযই সিদ্ধান্ত দেবে।
সুলতান আয়াযকে ডেকে বললেন, আয়ায তুমি নির্দোষ। এরা হিংসার বশে তোমাকে পরীক্ষা করেছে। এখন তোমার ব্যাপারে সবধরনের খারাপ ধারণা পরিহার করে অনুতপ্ত হয়ে এসেছে। তারা লজ্জিত। তাদের বিচার তোমার হাতে।
আমার প্রতি আপনার দয়া অনুগ্রহ সীমাহীন। নচেৎ আমার অবস্থা তো সেই ছেঁড়া জুতা, জীর্ণ জুব্বার চেয়ে বেশি নয়- আয়ায বললেন। মওলানা রুমি (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, আয়ায ঠিকই বলেছে, মানুষের আসল হলো এক ফোঁটা বীর্য আর তাতে রক্তের প্রবাহ। মানুষের যা কিছু আছে সব আল্লাহর দান। এই চেতনা যে মনে লালন করে অহংকার ও আত্মম্ভরিতা তাকে আক্রান্ত করতে পারে না। তবে আল্লাহর অফুরান দয়া-দানের হকিকত হলো-
বাহরে আন দা’দে আস্ত তা জুয়ী দিগর
তো মগূ কে নীস্তাশ জুয ইন কদর
তোমাকে দিয়েছে যেন আরও আরও চাও
বলো না যে, নেয়ামত এটুকুই, এর বেশি নাই।
আল্লাহ তায়ালা তোমাকে এত নেয়ামত দেওয়ার কারণ হলো, তুমি যাতে আরও নেয়ামত চাও। যেন এ কথা না বল যে, আমার জন্য এসব নেয়ামতই যথেষ্ট। তোমাকে দেওয়া বস্তুগত নেয়ামত সীমাহীন আধ্যাত্মিক ও নৈতিক নেয়ামত পাওয়ার পটভূমি।
আয়ায বললেন, এ ব্যাপারে বিচার করার, সিদ্ধান্ত দেওয়ার আমি কে? আকাশে যদি সূর্য দেদীপ্যমান থাকে গ্রহ-নক্ষত্রের অস্তিত্ব কি দৃশ্যমান থাকে? আপনার সামনে আমার অস্তিত্বের কী দাম আছে?
সুলতান বললেন, তুমি যে খাস কামরায় প্রতিদিন যাও তার রহস্য তাহলে বলো।
‘আমি যাই, যাতে নিজের অতীত ভুলে না যাই। আমি আগে কী ছিলাম, কত অসহায় ছিলাম, বাদশাহর দয়ায় এখন কোথায়, সেই শুকরিয়া, চেতনা যেন মনে জাগরুক থাকে। বর্তমান অবস্থার ওপর যেন মনে অহংকার না আসে। আসলে এভাবে একটি খাস কামরা রাখাই আমার ভুল হয়েছে। তাতে মানুষের মনে সন্দেহ জাগার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কামরার দরজায় যে তালা ঝুলালাম, তারও কি প্রয়োজন ছিল? হিংসুক কল্পনিকদের মাঝে এমন কাজটি করে সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছিলাম।’ এমন পরিস্থিতি এড়ানোর পথ তো নীরবতা। হে সাধক! তুমি কথার ফুলঝুরিতে ব্যস্ত। নীরবে একবার চিন্তা কর, আমলনামা কীভাবে হাতে আসবে? এখানে মানুষের যাবতীয় কাজকর্মের রেকর্ড হচ্ছে নীরবে নিঃশব্দে। ওখানে সে লিপি প্রকাশ হবে বাস্তবে। তবে এখানেই তুমি দেখতে পার, তোমার আমলনামা কী ডান হাতে পাবে, না বাম হাতে। তুমি এখনই যাচাই করে দেখ, তুমি যে যে কাজ করছ, তা কি ডান হাতের আমলনামার উপযুক্ত? তা না হলে বাম হাতে অবশ্যই আসবে।

>>(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫খ. বয়েত-১৭৬০-২১৬২)

Friday, August 5, 2022

আলো অন্ধকারে যাই by মাসউদ আহমাদ

ভ্যান থেকে যখন নামল সে, বহু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে বেশ আগেই। বাড়ির পরিবেশ বিষণœ। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখগুলোও ছেয়ে আছে গভীর বিষাদে। সবাই রোমেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। রোমেল বাড়ির সীমানায় পা রাখতেই আরেক দফা কান্নার দমক উঠল; মুহূর্তখানেক পর থেমেও এলো সবকিছু। বড় ভাইকে দেখল, দূরে দাঁড়িয়ে আছে রসালো চোখে। ছোট দু-বোন এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকলÑ ও ভাইরে, তুমি আস্যাছো... আমাহারে আর কেহু থাইকলো না গো... জানাজা শেষ হওয়ার পর, কেউ একজন বলে, মায়ের মুখটা বাপজিকে একটু দেখাও। মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়ে সে বলে ওঠে, ‘না থাক।’ শেষ দেখাটা একটু দেখি ল্যাও, বাপ।
মতিঝিল থেকে শাহবাগ এমন কিছু দূরের পথ নয়, তবু চল্লিশ মিনিটের বেশি সময় লেগে গেল। শাহবাগে এসে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে রোমেল। এখন বাসায় গিয়ে টুক করে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে। কল্যাণপুর থেকে দূরপাল্লার বাসে করে উত্তরবঙ্গে, রাজশাহীতে।
শাহবাগ থেকে বাসাটা কাছেই, পরীবাগে। বাস থেকে নামার পর, আজ শাহবাগকে অন্যরকম লাগে। কেন লাগে? এমন অসময়ে অফিস ডে-তে খুব একটা আসা হয় না। শাহবাগ যেন এক স্মৃতিকুঞ্জ, ভাবে সে। কত আনন্দ-বেদনার গল্প জমে আছে বুকের তোরণে আমার, তার এবং অনেকের- শাহবাগকে ঘিরে। অজস্র সামান্যতর ও বিখ্যাত মানুষ হেঁটে গেছেন এই পথ হয়ে। বছর খানেক আগে শাহবাগের পটভূমিতে সে একটা কবিতাও লিখেছিল। কবিতা? আহা, যৌবনে কবিতার মতো কিছু রচনার চেষ্টা কে না করেছে।
কিন্তু রোমেলের নিজের ধারণা, তার কবিতায় সময়-পরিপার্শ্ব আর অনুভূতির টুকরো কণা ও বিভাগুলো এমনভাবে ধরা পড়ে, পুরনো হতে অন্তত মুহূর্ত কয়েক সময় নেবে।
মুহূর্ত? এখনকার অনেক কবিতা সেভাবেই ভূমিষ্ঠ হয়। দুপুরের রোদের তীব্র তাপ মোকাবেলা করার আগেই তো ঝরে পড়ে কবিতা নামের রচনাগুলো। এ এক নিয়তি। রোমেলের এক বন্ধু বলেছিলÑ নিয়তি নয়, প-শ্রম।
গত শতাব্দীতে শাহবাগের মোড়ে বৃষ্টিতে ভিজেছি নীলিমার পাশাপাশি, বিমুগ্ধ আলিঙ্গনে।
আজকাল বৃষ্টিতে খুব একটা ভেজা হয় না; এই সুযোগে ভালোবাসা ফিকে হয়ে যায়।
পথের দূরত্ব বাড়ে, দিন দিন
আজও বর্ষায় কিংবা বসন্তে শাহবাগের মোড়ে বৃষ্টির উৎসব জমে।
শুধু আমার আর রিকশার হুড ফেলে একা বৃষ্টিতে ভেজা হয় না আনন্দের বেদনায়।...
সহসা টুকরো একটি বাক্য মাথায় উঁকি দেয় রোমেলেরÑ দূরত্ব কি দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়, সম্পর্কে?
মুঠোফোনে সময়টা দেখে নেয় সে। এগারোটা পঞ্চাশ। মতিঝিলের অফিস পাড়ায়, সকালের তুমুল ভিড়-জ্যাম ও মানুষের কোলাহল ঠেলে বাস থেকে যখন নামে সে, একবারও কি ভাবতে পেরেছিল, কিছু সময় পরে আবার ফিরে আসতে হবে?
প্রতিদিনের মতো, অফিসের লিফটের সামনে লম্বা সারি পেরিয়ে একসময় সে বারো তলায় এসে নিজের ঘরে গিয়ে বসে। যথারীতি দুধ-চিনি ছাড়া লিকার চা এসে যায়। লেট লতিফ তখনও আসেনি, খেয়াল করে সে; আর তখন, অফিসে পৌঁছুনোর কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফোনটা আসে। ফোন যিনি করেন, প্রায় ফুরিয়ে আসা সম্পর্কের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বড় ভাই করিম শেখ; তিনি, ফোন করে কোনো ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি সংবাদটা দেনÑ ‘হ্যালো রোমেল, আজ সকালে মা মারা গেছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আয়।’
টেলিগ্রাফের মতো সংক্ষেপে খবরটুকু দিয়েই তিনি নিঃশব্দ হয়ে যান। তখন খুব নীরবতা নামে ফোনে, ইথারের এপার ওপার।
চোখের পলকে চেনা অফিসঘরও ভীষণ অচেনা আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো লাগে রোমেলের। মুঠোফোনটা কোনোরকমে টেবিলে রেখে সামনের দিকে ঝুকে আসে। দু-হাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ শূন্য অনুভূতি নিয়ে বসে থাকে। এসি ঘরে বসেও সে ঘামতে থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। ধাতস্থ হতে দু-দ- সময় লাগে। কিন্তু বস তার টেবিলের সামনে এসে কখন দাঁড়িয়েছেন, মাথায় হাত রেখে একই প্রশ্ন বারকয়েক জিজ্ঞেস করে ফেলেছেন, একদমই টের পায়নি। সে উঠে দাঁড়িয়ে যায় এবং কোনোমতে বলতে পারেÑ স্যার...
সাধারণত এই অফিসে ছুটি মেলে না। কিন্তু আজ অন্যরকম ব্যাপার ঘটে। মাসের একুশ তারিখ চলছে, ছুটি তো বটেই, বস রোমেলকে অগ্রিম স্যালারিও দিয়ে দেন। সান্ত¡না দেন। বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে দরজাও খুলে ধরেন।
রাস্তায় নেমে প্রথম যে কথাটি মনে আসে- মায়ের সঙ্গে শেষ কথাটুকুও আর হলো না...
বুক চিরে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রোমেলের।
মাকে শেষ কবে দেখেছে, দিনক্ষণের হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারে না রোমেল। এখন যে-কোনো কিছুতেই হিসাব মেলানো কঠিন ঠেকে তার কাছে। কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। কী আশ্চর্য, এত দ্রুত মায়ের মুখখানা এমন অস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারছে? হায়- নিয়তি!
নাগরিক ব্যস্ততা আর কাজের বাহানা, কিংবা সত্যিই কিছু কাজের দেয়াল থাকেও; দেয়ালগুলো আলুর বস্তার মতো। দু-হাতে সরিয়ে সামনের কুয়াশাময় দরজা খুলতে হয়। এসব করতে গিয়ে শরীরের চেয়ে মনটাই বরং ক্লান্ত ও বিপন্ন হয়ে চলে, দিনের পর দিন।
কিন্তু আজ সব কাজ ও ব্যস্ততা স্তিমিত হয়ে আসে রোমেলের। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই মনের ভেতর সাড়া ফেলে না।
সব মিলিয়ে ছ-ঘণ্টার মতো পথ। এই পথটুকুই ছয় মাসের পথ হয়ে যায়। কখনও বছর। মাকে দেখা হয়নি, ছ-ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে। কেন হয়নি? অভিমান? এই শহরে অভিমান বা ঠুনকো দুঃখ-সুখের কোনো মূল্য নেই, গুরুত্ব তো নয়ই। সেটুকু অনুধাবন করতে পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর।
মা কতদিন বলেছেন- কবে বাড়ি আসবি, বাপ?
রোমেল এড়িয়ে গেছে- মা, জুন মাসের ক্লোজিং চলছে। আর প্রায় নিয়মিত হরতাল। এখন বাড়ি গেলে ফিরতে পারব না। অফিসে সমস্যা হবে।
তাহলে থাক, বাবা। কাজ শেষ হোক, পরেই আসিস।
কিন্তু, মাকে দেওয়া কথা আর রাখতে পারল না- ভেবে শ্বাস ভারি হয়ে আসে তার।
সিএনজি স্টার্ট বন্ধ করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাম। একটা গাড়িও নড়ে না। ফার্মগেট পেরিয়ে আসাদ গেটের পরে কলেজ গেটে এসে গাড়িগুলো থিতু হয়েছে, দীর্ঘসময়। এই জ্যাম কখন ছুটবে কে জানে। -কখন কল্যাণপুর পৌঁছুব আমি? বাস ধরব? কখন বাড়ি পৌঁছুব? মাকে শেষ দেখাটুকুও কি দেখতে পাব না...
ভেতরে অস্থিরতা টের পায় রোমেল। আজ পরিষ্কারভাবেই সে বুঝতে পারে, মৃত্যু সবচেয়ে নির্মম। একপেশে সত্য। বাস্তব। মৃত্যু সব শেষ করে ফেলে জীবনের। সব রকম অজুহাত, ক্ষোভ এবং অভিমান...
গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে। কল্যাণপুর থেকে বাস পাল্টে রাজশাহীগামী কোচে পুঠিয়া। পুঠিয়া থেকে রিকশাভ্যানে ধোপাপাড়া। সেখান থেকে ভ্যানে করে কুসুমপুর।
কিন্তু কুয়াশা। সিএনজি থেকে নেমেই রোমেলের মনে হয় সব চরাচর, এমনকি মনের আকাশটুকুও অভেদ্য কুয়াশার দেয়ালে আড়াল হয়ে আছে।
রোমেলের ঢাকার জীবনের স্থিতিকাল নেহায়েত কম নয়, বছর পনেরো তো হবেই। এই যে দীর্ঘ সময়, খুব কি পরিবর্তন এসেছে তার জীবনে- চিন্তা বা চরিত্রে? পনেরো বছরে সে একটুও লম্বা হয়নি, বরং কমেছে; তা নিশ্চিত করে বলা যায়। মাথার চুলও খোয়া গেছে বেশকিছু। এর মধ্যে বাবা গত হয়েছেন। বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুতÑ চোর-পুলিশের মতো কি? হতে পারে। বৈঠকখানায় বাবার একটা বড় ফটোগ্রাফ ছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর, মা এমনিতেই কথা কম বলতেন, আরও নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। প্রায়ই গম্ভীর মুখে সেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতেন, একা।
একসময় নিজেকেই যেন শুধায় রোমেল : কতদিন পর বাড়ি যাচ্ছি আমি?
একটা বয়স্ক মহিলা সিএনজির বন্ধ দরজার ওপাশে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ায়; তখনই কথাটুকু মনে আসে। সচরাচর বাড়িতে সে যায় না। হয়তো বছরে, কিংবা দু-বছরে একবার যায়। এবং বাড়ি থেকে ফেরার সময় তার আচরণ ও চোখমুখ থেকে এমন ইঙ্গিত কেউ দেখে ওঠে না যে, সে আবার এই পথে আসবে। মাঝে মাঝে সে এত দীর্ঘ সময় বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকে যে, বাড়ি যাওয়ার কথা মনেও থাকে না। ঢাকা শহর মানুষের মনকে এমন ভোঁতা করেও রাখতে জানে!
কল্যাণপুরে নেমেই বাস পেয়ে যায় রোমেল। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়েছে। তাড়াহুড়োয় কিছু খাওয়াও হলো না। অনেকদিন পর বাড়ি যাচ্ছে সে; কিন্তু মা আর নেইÑ ভাবতেই শ্বাস দ্রুততর হয়ে যায়। চোখ ফেটে জল আসে না ঠিক; কিন্তু গলার কাছে কিছু আটকে আছে মনে হয়। আর তাতে খুব অস্বস্তি লাগে।
গাবতলী ব্রিজ পেরিয়ে শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে চলে। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত গতিতে মনটা পেছনের দিকে ছুটে যায়। হঠাৎ মনে হয়, মা-ই একমাত্র ব্যক্তি যার কাছে সব অভিযোগ ও দাবি তোলা যায়Ñ খেতে দাও, ঘুম পাড়িয়ে দাও; নতুন জামা লাগবে, কুচকিতে এত চুলকায় কেন মা? শোনো মা, আমার কিন্তু এটা লাগবে। টাকা নাই, কিছু টাকা দাও। ভারি মুশকিল, তোমার বোনের মেয়েটা কিন্তু খুব জ্বালাচ্ছে...
এই শহরে এসে জীবনের কত কিছু শেখা হলো, কত কিছু খোয়া গেল হৃদয়ের। হিসাব মেলানো যায় না। হিসাব মেলাতে গেলেই ভাবনা আসে। ভাবনাটুকু মাথায় নিতে চায় না সে। ভাবতে যে সে পছন্দ করে না, এমন নয়। বিশেষ করে শুদ্ধতাকে নিয়ে ভাবতে। কিন্তু এখন যে-কোনোরকম ভাবনা বড় যন্ত্রণা দেয় তাকে।
জীবনকে সে পরিষ্কার দু-ভাগে ভাগ করে নিতে পেরেছে এখন। ঢাকার জীবন এবং ঢাকায় আসার আগের জীবন। যে জীবনে ঢাকা শহর নেই বা ছিল না কখনও- ঢাকার রূপ-গন্ধ-অভিজ্ঞতা নেই, সেই জীবন যত বর্ণিলই হোক, পূর্ণাঙ্গ নয়। এভাবে বলতে ইচ্ছে করে তার। কেবলই মনে হয়, স্বপ্ন ও কল্পনা বাস্তবায়নের শহর ঢাকা, স্বপ্ন ভঙ্গেরও কি নয়?
এতদিনেও একাই আছে রোমেল। মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তাই এমন টুক করে বেরিয়ে পড়তে পেরেছে। বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেলে কি পারত অফিস থেকে বেরিয়েই বাসে উঠে পড়তে?
আর বিয়ে! এই বৈরী মানসিক অবস্থার মধ্যেও নিজের মনেই একবার হেসে ওঠে সে। ঢাকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর আছেন, রোমেলের পরিচিত। খুব মজার মানুষ সেই প্রফেসর। সৈয়দ বংশের মানুষ। ক্লাসে তিনি ইংরেজি পড়ান। বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি আছে ভদ্রলোকের। তার নানা ছিলেন আর এক ত্যাঁদড়, মজার লেখক হিসেবে তার নানার খ্যাতি গোটা বাংলাজুড়ে, আজও। অবশ্য তার কথা কে না জানে। প্রফেসর সাহেব একদিন বললেন, জানো রোমেল, নানা বলতেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে বিয়ে করা। আর ভুল করে বিয়ে না হয় করলেনই; কিন্তু বেশি বয়সে বাচ্চার বাবা হওয়া- সেটি তার চেয়েও বড় ভুল।
প্রফেসরের গল্প শুনে রোমেল মুখ টিপে হাসে। -কিন্তু স্যার, মানুষের একটাই তো জীবন; বিয়ে না করলে এই জীবনটা কি সুন্দর বা আনন্দময় হয়? নতুন বউয়ের গন্ধ যে কখনও পেল না জীবনে, নীল ঘূর্ণি আঁচল ও রঙিন দোপাট্টার প্রান্ত যার নাকে বাড়ি খেল না- তার জীবনে কী আর থাকল, বলুন!
আচ্ছা, বেশ বলেছ তো তুমি...
------২------
বাড়ি পৌঁছুনোর পর...
ভ্যান থেকে যখন নামল সে, বহু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে বেশ আগেই। বাড়ির পরিবেশ বিষণ্ন। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখগুলোও ছেয়ে আছে গভীর বিষাদে। সবাই রোমেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। রোমেল বাড়ির সীমানায় পা রাখতেই আরেক দফা কান্নার দমক উঠল; মুহূর্তখানেক পর থেমেও এলো সবকিছু। বড় ভাইকে দেখল, দূরে দাঁড়িয়ে আছে রসালো চোখে। ছোট দু-বোন এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকলÑ ও ভাইরে, তুমি আস্যাছো... আমাহারে আর কেহু থাইকলো না গো...
জানাজা শেষ হওয়ার পর, কেউ একজন বলে, মায়ের মুখটা বাপজিকে একটু দেখাও। মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়ে সে বলে ওঠে, ‘না থাক।’
শেষ দেখাটা একটু দেখি ল্যাও, বাপ।
রোমেল দেখতে রাজি হয় না। সবাই বেশ অবাক হয়। কিন্তু কেউ আর আপত্তি করে না। মায়ের যে মুখটি অন্তর্গত চোখে ধরা আছে রোমেলের, এখনকার ছবির সঙ্গে তা কিছুতেই মিলবে না। বিবর্ণ-ধূসর মুখ দেখে মাকে আরও পর করে দিতে চায় না সে।
কী যে হয় রোমেলের, হঠাৎ একদৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে যেতে ইচ্ছে করে। বুক ফেটে যেতে চায়, তবু কান্না আসে না। শুকনো চোখে সে একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ এত অন্ধকার। আজ অমাবস্যা নাকি?
সবার অলক্ষে সে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায়। উঠোনেও অনেক মানুষ, তার দিকে নরম চোখে তাকায়। এত মানুষ এত আলো; কিন্তু কেউ তাকে বসতে বলে না, এগিয়ে এসে হাতটি ধরে না। কলতলার ওপাশে ঝিঁঝিপোকার ডাক ভেসে আসে।
গাঢ় ভঙ্গিতে রাত বাড়তে থাকে।
>>গল্পে ব্যবহৃত কবিতাটি লিখেছেন তরুণ কবি ফেরারী কৌশিক।

Thursday, May 20, 2021

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য by ড. ইউসুফ আলকারযাভি

ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত প্রবৃত্তি হলো তা ব্যবসায়ীকে মূলধন ও লাভের অংশের ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত করে ফেলে। এমনকি আমরা মহানবী (সা.) এর যুগের একটি কাফেলাকে দেখতে পাই যারা ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হয়েছিল। ওই সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন শ্রবণকারীদের অনেকেই খুতবা না শুনে অমনোযোগী হয়ে সেদিকে চলে যান। তাই তাদের তিরস্কার করে আল্লাহ তায়ালার এ বাণী উচ্চারিত হয়, ‘তারা যখন কোনো ব্যবসায়ের সুযোগ অথবা ক্রীড়া-কৌতুক দেখে তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তারা সেদিকে ছুটে যায়। বলুন : আল্লাহর কাছে যা আছে, তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা জুমুআ : ১১)
ইসলাম কোরআনের স্পষ্ট ভাষ্য এবং মহানবী (সা.) এর বাণীর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করার প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছে এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে পর্যটন ও ভ্রমণ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। কোরআন ব্যবসাকে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং যারা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করে, তাদের আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও সংগ্রামকারীদের সমান্তরালে উল্লেখ করেছে। মহাগ্রন্থ কোরআনের এ বাণীর প্রতি লক্ষ্য করুন, ‘কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত হবে।’ (সূরা মুয্যাম্মিল : ২০)।
মহাগ্রন্থ কোরআনে এসেছে, সবসময় বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম উপায় সামুুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বারগুলো উন্মুক্ত করে মানুষের ওপর  অনুগ্রহ করেছেন। সমুদ্রকে মানুষের অনুগত করা এবং তাতে নৌযান চলাচল করার বিষয়টি সহজ করে দেওয়া আল্লাহ তায়ালার অপার অনুগ্রহ। কোরআন শরিফের ভাষ্য হলো, ‘তুমি তাতে তার বুক চিরে জাহাজ চলতে দেখ, যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সূরা ফাতির : ১২)। এর সঙ্গে কখনও কখনও বাতাস প্রবাহিত করার বিষয়টিকে এভাবে উল্লেখ করেছে, ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি এই যে, তিনি সুসংবাদবাহী বায়ু প্রেরণ করেন, যাতে তিনি তার অনুগ্রহ তোমাদের আস্বাদন করান এবং যাতে তার নির্দেশে জাহাজগুলো বিচরণ করে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ তালাশ করো এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সূরা রোম : ৪৬)।
কোরআন শরিফ এ বিষয়টির নেয়ামত স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং এর উপকারিতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বারবার আলোচনা করেছে। এমনকি মহাগ্রন্থ কোরআন নৌযানকে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, শক্তিমত্তা ও প্রজ্ঞার প্রতি ইঙ্গিতবাহী নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘এবং নদীতে নৌকাগুলোর চলাচলে মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে।’ (সূরা বাকারা : ১৬৪)।  আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘সমুদ্রে ভাসমান পর্বতসম জাহাজগুলো তার অন্যতম নিদর্শন।’ (সূরা শূরা : ৩২)।
আল্লাহ তায়ালা মক্কাবাসীর ওপর  অনুগ্রহ করেছেন। কেননা তিনি তাদের জন্য এমন সব উপায়-উপকরণ সৃষ্টি করেছেন যে, মক্কা শহরকে আরব উপদ্বীপে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ শহর-হরম প্রতিষ্ঠিত করিনি? এখানে সব ধরনের ফলমূল আমদানি হয় আমার দেওয়া রিজিকস্বরূপ।’ (সূরা কাসাস : ৫৭)। এর মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আ.) এর দোয়া সত্যে পরিণত হয়েছে। তিনি এই বলে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি; হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা নামাজ কায়েম রাখে। এরপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন, সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৭)।
প্রতি বছর ব্যবসাসংক্রান্ত দুটি ভ্রমণ সহজ করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা কোরাইশদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তারা শীতকালে ইয়ামান অভিমুখে একটি ভ্রমণ করত এবং গ্রীষ্মকালে শাম অভিমুখে একটি সফর করত। তারা বাইতুল্লাহর তত্ত্বাবধান ও দেখাশোনা করার ফলে এ দুই ঋতুতে নিরাপদে সফর করত। সুতরাং তাদের জন্য উচিত হলো তারা যেন এ ঘরের মালিক ও প্রতিপালক এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করার মাধ্যমে এ মহা নেয়ামতের শোকর আদায় করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যেহেতু কোরাইশের আসক্তি আছে, আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরেরÑ অতএব, তারা যেন ইবাদত করে এই ঘরের মালিকের, যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন।’ (সূরা কোরাইশ : ১, ২, ৩, ৪)।
ইসলাম মুসলমানদের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে হজের মৌসুমে পারস্পরিক ব্যবসা-বিনিময় করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কেননা হজের মৌসুমে বিশ্বের আনাচে-কানাচে ও দিগ-দিগন্ত থেকে অনেক মানুষ বাইতুল্লাহয় সমবেত হয়ে থাকেন। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা তোমার কাছে আসবে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সূরা হজ : ২৭, ২৮)।
আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আয়াতের মধ্যকার উপকারিতা ও কল্যাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা-বাণিজ্য। ইমাম বোখারি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, মুসলমানরা হজের মৌসুমে ব্যবসা করা থেকে দূরে থাকতেন। তারা ভাবতেন, এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা তাদের নির্ভেজাল নিয়তকে কলঙ্কিত করবে এবং তাদের ইবাদত-বন্দেগির স্বচ্ছতাকে মলিন করে দেবে। মহাগ্রন্থ কোরআন তাদের এ চিন্তাধারার অপনোদন করে বলেছে, ‘তোমাদের ওপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোনো পাপ নেই।’ (সূরা বাকারা : ১৯৮)। 
সপ্রশংস তসবিহ পাঠ করে যারা সকাল-সন্ধ্যায়  মসজিদে আগমন করে তাদের প্রশংসা করে কোরআন শরিফ বলেছে, ‘এমন লোকেরা যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না।’ (সূরা নুর : ৩৭)।  
সুতরাং কোরআনের আলোকে তারাই শুধু মোমিন নয় যারা মোটা কাপড় পরে মসজিদে বসে থাকে কিংবা গদিতে হেলান দিয়ে দরবেশি ভাব ধরে অথবা খানকায় বসে সন্ন্যাসী-জীবন অবলম্বন করে, বরং ইসলাম তাদেরই মোমিন বলে অভিহিত করেছে, যাদের পার্থিব কাজকর্ম সম্পাদন পরকালীন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এতক্ষণ আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে মহাগ্রন্থ কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলাম।
অনুরূপভাবে মহানবী (সা.) এর বাণী সুন্নাহতেও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এর মূলনীতিগুলোকে তার উক্তি, কর্ম ও সমর্থনের মাধ্যমে সুদৃঢ় করেছেন। তার প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী থেকে শুনতে পাই, ‘সত্যবাদী, বিশ্বস্ত মুসলিম ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৩৯)। মহানবী (সা.) আর বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী ব্যক্তি নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ১২০৯)।
আপনি এ কারণে আশ্চর্য হবেন না যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীকে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামকারী মুজাহিদ ও এ পথে শাহাদাত বরণকারী ব্যক্তির মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। কেননা আমাদের এমন কতক অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, জিহাদ শুধু যুদ্ধের ময়দানেই হয় না, বরং অর্থনীতির ময়দানেও সংগ্রাম এবং জিহাদ অব্যাহত রয়েছে। সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীর জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ মহা মর্যাদা ও প্রচুর সওয়াব দানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্য সাধারণত লোভ-লালসার সৃষ্টি করে এবং যে কোনো পন্থায় লাভ উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করে। সম্পদ সম্পদের জন্ম দেয় এবং লাভ আরও প্রচুর লাভের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। সুতরাং এতসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করে সে এমন এক মুজাহিদ, যে অনৈতিক লালসার ময়দানে বিজয়ী হয়েছে; ফলে তার জন্য মুজাহিদদের মর্যাদা অর্জিত হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত প্রবৃত্তি হলো তা ব্যবসায়ীকে মূলধন ও লাভের অংশের ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত করে ফেলে। এমনকি আমরা মহানবী (সা.) এর যুগের একটি কাফেলাকে দেখতে পাই যারা ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হয়েছিল। ওই সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন শ্রবণকারীদের অনেকেই খুতবা না শুনে অমনোযোগী হয়ে সেদিকে চলে যান। তাই তাদের তিরস্কার করে আল্লাহ তায়ালার এ বাণী উচ্চারিত হয়, ‘তারা যখন কোনো ব্যবসায়ের সুযোগ অথবা ক্রীড়া-কৌতুক দেখে তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তারা সেদিকে ছুটে যায়। বলুন : আল্লাহর কাছে যা আছে, তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা জুমুআ : ১১)।
সুতরাং বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের এ ঘূর্ণাবর্তে যে ব্যক্তি শক্তিশালী বিশ্বাসের অধিকারী হয় এবং আল্লাহর ভয়ে অন্তরকে পূর্ণ এবং আল্লাহর স্মরণ দ্বারা তার জিহ্বাকে সতেজ রাখে; সে এর যোগ্য বলে বিবেচিত হয় যে, পরকালে নবী, সিদ্দিক এবং শহীদদের সঙ্গে থাকবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এ কর্মই আমাদের জন্য যথেষ্ট যে, তিনি যেভাবে মানুষের আত্মার প্রতি লক্ষ্য করে তাকওয়া ও খোদাভীরুতার ওপর মসজিদে নববি নির্মাণ করেছেন; যাতে সেটা ইবাদত-বন্দেগির সমাবেশস্থল, ইলম ও জ্ঞানের বিদ্যালয়, দাওয়াতের আবাস এবং  রাষ্ট্রের কেন্দ্র হতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে তিনি অর্থনীতির প্রতি লক্ষ্য করে নিরেট ইসলামি বাজার প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং ইহুদিদের ক্ষমতা নিঃশেষ করেছেন; এর আগে বনি কাইনুকার বাজারে যেমন তাদের ক্ষমতা ছিল। মহানবী (সা.) তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাজারের মূলনীতি নিজে নির্ধারণ করেন এবং আপন শিক্ষামালা ও দিকনির্দেশনা দ্বারা সবসময় এর তত্ত্বাবধান করেন। এর ফল এই দাঁড়ায় যে, তার বাজারে ধোঁকা, প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া ও বেশি নেওয়া, গুদামজাতকরণ এবং অন্যকে প্রতারিত করার মতো কোনো দুর্নীতি ছিল না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবিদের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তাদের অনেকেই কালের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী, দক্ষ কারিগর ও কৃষক এবং সব ধরনের শিল্প ও বৃত্তিতে নৈপুণ্যের অধিকারী ছিলেন। মহানবী (সা.) তাদের মাঝে ছিলেন। তার ওপর আল্লাহ তায়ালার বাণী অবতীর্ণ হচ্ছিল; আর তিনি সাহাবিদের আসমানের আহ্বান শোনাচ্ছিলেন। হজরত জিবরাইল (আ.) আল্লাহর ওহি ও প্রত্যাদেশ নিয়ে সকাল-সন্ধ্যায় আগমন করতেন। সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকেই অত্যধিক ভালোবাসার দরুন এক মুহূর্তের জন্যও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছ থেকে পৃথক হতে চাইতেন না। এতদসত্ত্বেও তাদের প্রত্যেককেই দেখতে পাই, তারা কাজে মশগুল এবং কর্মে ব্যস্ত ছিলেন। একজন ব্যবসার উদ্দেশ্যে জমিনে ভ্রমণ করছেন তো অন্যজন তার বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন। একজন চাষবাস করছেন তো অন্যজন কারিগরি শিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন। যদি কেউ উপস্থিত থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী ও শিক্ষা শুনতে না পারতেন, তাহলে যথাসম্ভব অন্যদের কাছে তা জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতেন। কেননা তাদের আদেশ করা হয়েছিল, তাদের উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়।
আনসারদের অধিকাংশ ব্যক্তি কৃষক ছিলেন, আর মুহাজিরদের অধিকাংশ ব্যক্তি ব্যবসায়ী ছিলেন। মুহাজির আবদুর রহমান ইবনে আওফের কাছে তার আনসারি মুসলিম ভাই সাদ ইবনে রবি এ দরখাস্ত পেশ করেন, যেন আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) তার সম্পদ দুটি ঘর সমানভাগে ভাগাভাগি করে অর্ধেক নিয়ে নেন এবং তার দুই স্ত্রীর কোনো একজনকে পছন্দ করেন; তাহলে তিনি তাকে তালাক দিয়ে দেবেন! আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বলেন : আমি তার অসাধারণ এ পরার্থপরায়ণতাকে অত্যন্ত সংযম ও মহত্ত্বের সঙ্গে এ কথা বলে ফিরিয়ে দিই যে, আল্লাহ আপনার সম্পদ ও পরিজনের মধ্যে বরকত দান করুন। এসবে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। ব্যবসা করা যায় এমন কোনো বাজার থাকলে বলুন। তখন সাদ (রা.) বললেন, হ্যাঁ! বনি কাইনুকার বাজার রয়েছে, যেখানে ব্যবসা করা যায়। এর পরদিন আবদুর রহমান ইবনে আওফ ঘি ও পনির নিয়ে বাজারে যান এবং এগুলো ক্রয়-বিক্রয় করেন। এরপর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে বাজারে যেতে থাকেন। এক সময় তিনি মুসলমানদের মধ্যে একজন বড় সম্পদশালী হয়ে যান! মৃত্যুবরণ করার সময় তিনি প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে যান।
হজরত আবু বকর (রা.) সবসময় ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি যেদিন তিনি খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেদিনও তার পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহের জন্য বাজারে যেতে চেয়েছিলেন। হজরত ওমর (রা.) বলেন, বাজার আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী শোনা থেকে বিরত রেখেছে। হজরত উসমান (রা.) সহ অনেকেই বিভিন্ন পেশায় অভ্যস্ত ছিলেন।
অনুবাদ : আবদুল কাইয়ুম শেখ

Wednesday, December 16, 2020

ছোটাচু এবং সোনালি বিকেল by কামাল হোসাইন

হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও...
>>সেদিন বিকেল। সিফাত ওর পড়ার ঘরে পড়ছিল। ঠিক ওই সময় ছোটাচুর ডাক- সিফু, বাবু তুমি কোথায়?
ছোটাচু সিফাতকে ছোট্ট করে একটু মোডিফাই করে ‘সিফু’ বলে ডাকে।
ছোটাচু খুব ছোট্ট করে ডাকলেও সিফাত তা শুনতে পায়। যেন হৃদয়তন্ত্রীতে তা বেজে ওঠে বেহালার সুরে। যেখানেই থাকুক, শুনতে যেন পাবেই, এমন ব্যাপার।
আজও তার ব্যত্যয় ঘটল না।
সে-ও উত্তর করল- ছোটাচু, এই তো আমি, পড়ছি। আসব?
বাড়ির সবার কাছেই সে অত্যন্ত প্রিয়। সবাই ওকে আদর-স্নেহ-ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখে।
তবে ছোটাচু যেন একটু বেশিই ভালোবাসে ওকে।
ওকে না দেখে যেন থাকতে পারে না ছোটাচু। সিফাতও তেমনি ছোটাচুর দারুণ ভক্ত। ছোটাচু বলতে ও অজ্ঞান।
ছোটাচুর সাইকেলটাও সিফাতের আরও একটু আকর্ষণের অন্যতম কারণ। সিফাত যখন সাইকেলে বসতে শিখেছে, সেই ছোটবেলা থেকেই ছোটাচুর সাইকেলে উঠে ঘুরঘুর করে বেড়ানোর অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার। যদি ছোটাচু সাইকেল নিয়ে একটু বের হয়েছে, আর ওর চোখে তা পড়েছে, তাহলে ওকে একটু সাইকেলে না চড়িয়ে চলে যাবে, এমন সাধ্যি ছোটাচুর নেই। তাড়াহুড়োর কারণে যদিবা চলে যায়, তাহলে ওর কান্না দেখে কে? বাড়ি মাথায় করবে কেঁদেকেটে।
সাইকেলে চড়তে ও খুব পছন্দ করে। সাইকেল চলবে, আর ও দুলে দুলে আধো বোলে নানারকম ছড়া কাটবে।
সুতরাং প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে তাকে সাইকেলে চড়িয়ে, মামা বিস্কুট, চিপস কিনে দিয়ে তবেই রক্ষে।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ছোটাচুর শিয়রের পাশে হাজির হবে। তারপর ছোটাচুর চুল টেনে ঘুম ভাঙাবে। কখনও সখনো সে ছোটাচুর বুকের মধ্যে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে। তারপর একসময় উঠে শুরু হয় ছোটাচুর প্রতিদিনকার চাকরি।
ছোটাচুও সিফাতের এ রকম নানা পদের বায়না, দুষ্টুমিপনায় নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে ভালোবাসে খুব।
এতে সামান্য কোনো বিরক্তির কারণও ঘটে না কখনও।
আবার সিফাতের অন্য তিন চাচু এলে ওর আনন্দের পালা আরও বেড়ে দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ হয়ে যায়। এই তিন চাচু হলো সবুজ চাচু, নাইম চাচু আর সোহাগ চাচু। ওদেরও বেজায় ন্যাওটা সিফাত।
ওদের তিনজন তিন ধরনের গল্প করে সিফাতের সঙ্গে।
একজন রূপকথার গল্প শোনায় তো অন্যজন ভূত-প্রেতের। অপরজন তো কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সিফাতকে মাতিয়ে রাখে।
তাই ওরা তিনজন যখন এসে হাজির হয়, তখন সিফাতকে আর পায় কে?
সিফাতের ছোটাচু কাজের মানুষ। নানারকম কাজের সঙ্গে সে জড়িত। এই যেমন গ্রামের মানুষের বই পড়ার জন্য পাঠাগার গড়া। কোথাও কোনো সাঁকো ভেঙে পড়েছে, তা ‘পিচ্চিবাহিনী’ নিয়ে মেরামত করা। কোনো গরিব মানুষ অসুখে পড়েছে, তার চিকিৎসার জন্য পয়সা কালেকশন করা। কেউ টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, তার বইপত্র-খাতাকলম কেনার ব্যবস্থা করা। সে যাতে স্কুলে বিনাবেতনে পড়তে পারে, তার জন্য দরখাস্ত লেখাসহ নানাবিধ কাজের সঙ্গে সে সরাসরি জড়িত।
সিফাতের উত্তরে ছোটাচু বলেÑ আয় খোকা।
সিফাত ছোটাচুর উত্তরেরও অপেক্ষা করে না। ছুটতে ছুটতে সে চলে আসে ছোটাচুর ঘরে।
এসেই ছোটাচুর কোলে ধপাস করে বসে পড়ে সে।
হাঁপাতে-হাঁপাতে বলেÑ বল চাচু, কী জন্য ডেকেছ?
পড়াশোনার কী হাল, বাবা?
ভালো চাচু। তবে কী জান চাচু? অঙ্ক নাÑ ও জিনিসটা একদম মাথায় ঢোকে না আমার। কী যে করি!
কী আর করবি। মাথায় ঢোকে না বললেই তো চলবে না। মাথায় ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু...
কোনো কিন্তু নয়, অসম্ভব বলে কোনো কথা নেই। বেশি বেশি চর্চা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাহলে কিন্তু আমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে হবে।
আচ্ছা সে হবে।
আচ্ছা এবার বল, কী জন্য ডেকেছ আমায়?
ছোটাচু বলল, এখন তো বিকেল, সন্ধ্যা হই হই করছে। চল একটু সবুজ মাঠের সবুজের বিশাল সমারোহ দেখে আসি।
সিফাত ছোটাচুর কথায় এককথায় রাজি। ছোটাচুর কেবল বলা দরকার, কোথাও যেতে হবে। ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট। কোথায় তা ওর বিবেচ্য নয়, ছোটাচু বলেছে মানে যেতে হবে। বিনাবাক্যে সে রাজি।
বিকেলের কমলা রোদ তখন মাঠে ভেসে যাচ্ছে। হেমন্তের শেষ বিকেলের এই সোনারোদ যেন ওদের গায়ে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। মাঠভরা পাকা ধান তাদের সরব উপস্থিতি যেন ঝনঝন শব্দে জানান দিয়ে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে।
ছোটাচু বলল- আজ তোকে আমাদের দেশের গল্প শোনাব।
ছোটাচু শুরু করে ঠিক গল্পের মতো করেই-
সুনীল আকাশ। পেঁজা তুলোর পাহাড়ে ঘেরা। কুয়াশাচ্ছন্ন। আস্তে-আস্তে ফিকে হয়। টুপটুপ শিশির ঝরে পাতায়-ঘাসে। মৃদু হাওয়ায় দোল খায় লাউডগা। জারুল গাছের পাতার ফাঁকে দোয়েলের শিস। পুকুর-ডোবায় আকাশের তারার মতো শাপলা ফোটে। হাসে কুটিকুটি। ঢেউ লেগে আহ্লাদে ফেটে পড়ে। পুব আকাশে চিকচিক উঁকি দেয় সূর্যিমামা। শুরু হয়ে যায় নতুন একটা দিনের।
আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশের গায়ে সোনারোদ ঝিকমিক। নদীর ঢেউ খেলে কুলকুল। পাল উড়িয়ে চলে নৌকার সারি। মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালির মিহি সুর। এক মায়াবী জগৎ। ভালো লাগার দুর্বার হাতছানি।
এমন যে দৃশ্য, তাতে মন ব্যাকুল করে। আকুল হয়।
ছোটাচুর এমন চমৎকার শব্দমালার উচ্চারণে সিফাত যেন কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে যায়। কথাগুলো শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগে।
মনে হয় যেন ছোটাচুর বলা কথাগুলো হৃদয়ের কোন গহিন ভেতর থেকে উঠে আসছে।
ছোটাচু মাঝে মধ্যে একটু ঢোঁক গিলে আবার শুরু করে।
শুরু করার আগে সিফাতের দিকে তাকায়। দেখেÑ তার শ্রোতাটি ঠিকমতো শুনছে কিনা।
ছোটাচু একটু থামে। তারপর আবার বলতে থাকেÑ
এই যে চমৎকার স্বপ্নসুন্দর পরিবেশ, সে আমাদের দেশের। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের চিরচেনা ছবি। এমন মনকাড়া ছবি বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। তাই তো আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠি একটা মিষ্টি গানÑ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...।’
হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও।
কিন্তু এ সোনার দেশটি একদিন আমাদের ছিল না। পাকিস্তান নামের দেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আমাদের এ অংশের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান।’
আমরা বাঙালি। আমাদের মিষ্টি একটা ভাষা আছে। নাম বাংলা। আর পাকিস্তানিরা ভিনভাষী। তাদের সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গে অমিল। চলায়। বলায়। ভাষায়। বলতে পারিস সবকিছুতেই।
মুখের ভাষাটাও তারা কেড়ে নিতে চাইল। এ দেশের মানুষ সমস্বরে ‘না’ বলল।
এ ‘না’কে প্রতিষ্ঠা করতে কারা ভূমিকা রেখেছিল জানিস? এ দেশের অসংখ্য ছাত্র। শিক্ষক। যুবক। জেলে। চাষা। কুলি। মজুর। তাঁতি। মাঝি। আর তোদের চেয়ে একটু বয়সে বড় দামাল কিশোরটিও।
এত লোকের ‘না’ বলা কণ্ঠ তারা আবার থামিয়ে দিতে চাইল। আর এর জন্য আবার এক নয়, দুই নয় দীর্ঘ ৯ মাস লড়াই চলল তাদের সঙ্গে আমাদের।
১৯৭১ সালে সংঘটিত ওই লড়াইয়ের নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’। গোটা বাঙালি জাতিই সেদিন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মুক্ত হতে চেয়েছিল। তাই অমন নাম। ওরা ওইসব মুক্তিকামী মানুষকে রুখে দিতে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রমাণ হয়েছিলÑ দেশপ্রেমের কাছে সবকিছু নস্যি।
লড়াই করার অর্থ হলোÑ আমরা আর তাদের সঙ্গে থাকতে চাই না। স্বাধীনতা চাই। চলার স্বাধীনতা। বলার স্বাধীনতা। দেখার স্বাধীনতা। ভাবার স্বাধীনতা। ভাষার স্বাধীনতাÑ কেবলই স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতা বিশ্বে আমাদের আলাদা করে চেনাবে। আমাদের একটা নিজস্ব মানচিত্র হবে। পতাকা হবে। এ দাবিই ছিল মূল। আমরা বললামÑ ‘আমাদের দাবি মানতে হবে।’
ওরা ‘না’ বলল।
‘না’ বললেই হলো? এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার নেশায় মেতে উঠল। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে গেল। বীরের মতো লড়াই করে রক্ত দিল।
ছোটাচু থামে। তার কথাগুলো কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। ছোটাচুও যেন সেই স্বপ্নের জগতের এক ‘অন্য মানুষ’ হয়ে গেছে।
সিফাত এগুলো একটু একটু তার বইতে পড়েছে। কিন্তু এমনভাবে তার মাথায় আজ অবধি ঢোকেনি। এজন্যই তো সে ছোটাচুর কাছে অঙ্ক শিখতে চায়। তাহলে এখন থেকে আর পরীক্ষায় তাকে অঙ্কে কম নম্বর পেতে হবে না।
সিফাত ছোটাচুর কথা শুনতে উদগ্রীব। থামল মানেই যেন সব শেষ হয়ে গেল। তাই সে ছোটাচুকে তাড়া দেয়, ছোটাচু তারপর?
ছোটাচু অতিরিক্ত কোনো কথা না বলে আবার শুরু করে-
তারপর কত রক্ত! তারপর ওরা হারল। আমাদের চরম মনোবলের কাছে ওরা পরাজিত হলো।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা নতুন একটা পতাকা পেলাম। আর পেলাম নতুন একটা দেশের ঠিকানা। পেলাম স্বাধীন মানচিত্র। গর্বে আমাদের বুকটা টান টান হলো। তার মানে ওই দিন আমরা পাকিস্তানি দস্যু বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে বিজয় অর্জন করলাম।
আমাদের নতুন দেশটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ’। বিশ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা নতুন করে পরিচিতি পেলাম।
স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা সেদিন থেকে সগৌরবে পতপত করে আকাশে ওড়ে। ঘোষণা করে তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা।
আমাদের এ গর্বের ইতিহাস আর প্রিয় এ দেশটির কথা আমরা কখনও ভুলব না। যাদের রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ, এই মাটি, তাদের মনে রাখব চিরদিন। দেশকে ভালোবেসে প্রতিদিন অন্তত একবার আমরা সবাই বলবÑ ‘প্রিয় বাংলাদেশ, আমি তোমায় ভালোবাসি। যতদিন শরীরে প্রাণ আছে ততদিন ভালোবাসব।’
পূর্ণ গল্পটি শেষ করে নড়েচড়ে বসল ছোটাচু।
ছোটাচু এভাবেই অনেক জ্ঞানের কথা, জানার কথা দারুণ সব গল্পের মাধ্যমে শিখিয়ে দেয়।
যখন গল্পটি শেষ হলো তখন সূর্য প্রায় ডুবুডুবু।
এখন ঘরে ফেরার পালা। একটু বাদে একটু একটু শিশির পড়তে শুরু করবে। এ সময় বাইরে থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে। তাই আর মাঠে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। চাচা-ভাইপোতে আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করে বাড়ির দিকে।
তবে সিফাতের কাছে আজকের এ বিকেলটা অন্যরকম হয়ে ওর স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে। স্মৃতিময় এ দিনটির কথা কি সে কখনও ভুলতে পারবে?

Thursday, August 20, 2020

ঊর্ধ্বলোকে সংযোগ পাওয়ার পথ -মওলানা রুমির মসনবি শরিফ by ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

তুমি দুনিয়াপূজার রোগে আক্রান্ত। তাই মন বাজে চিন্তার আখড়া। জীবনটা চলে যাচ্ছে অর্থহীন কাজের পেছনে। কাজেই তোমাকে সংযমের জীবন বেছে নিতে হবে। চিন্তা ও কর্মে শয়তানি মন্ত্রণা সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। নচেৎ তা হবে তোমার আত্মিক ও নৈতিক জীবনের জন্য বিষ-জহর-হলাহল। ডায়াবেটিস রোগীর দেহে মিষ্টান্ন খাবার মরণ ডেকে আনে। নফসের রোগে আক্রান্ত রুহে ভোগ বিলাসিতা, শয়তানি চিন্তামগ্নতা রুহানি মৃত্যু ঘটায়।
মওলানা রুমি (রহ.) এর জীবনদর্শনের মূলকথা, আধ্যাত্মিক স্বাদে হৃদয় পরিতৃপ্ত কর আর যে দেশ থেকে এসেছ সে দেশে ফিরে যেতে উড়াল দাও। মওলানার কাছে একজন প্রশ্ন করে, সে দেশ কোথায়? কীভাবে উড়াল দেব এই জগৎ ছেড়ে? মওলানা বলেন, তোমার প্রশ্নের জবাব আমি হাকিম সানায়ির ভাষায় দিতে চাই।
গর রা’হ রওয়ী রা’হ বরত বগুশা’য়ন্দ
ওয়ার নীস্ত শওয়ী বে হাস্তিয়ত বেগ্রা’য়ন্দ
যদি সম্মুখে এগিয়ে চল তোমার জন্য রাস্তা খুলে দেবে
যদি ‘অস্তিত্বহীন’ হতে পার ‘অস্তিত্ব’ তোমায় দেওয়া হবে।

সেই দেশে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে হলে সম্মুখে এগিয়ে চলো। দেখবে, তোমার পথের বাধা একেক করে সরে যাচ্ছে। রাস্তা খুলে যাবে। নিজেকে তার কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে অস্তিত্বহীন হয়ে যাও। তোমাকে মানবিক গুণাবলিতে সজ্জিত নতুন জীবন দেওয়া হবে। তার দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। আল্লাহ তো বলেছেন, ‘আর যারা আমার পথে প্রাণান্ত সাধনা করে, জিহাদ করে, তাদের অবশ্যই আমার পথগুলোয় পরিচালিত করব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্র্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯)।
তুমি পথ খুঁজে না পাওয়ার কারণ হলো, তোমার হুঁশজ্ঞান, চিন্তা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছ। আজেবাজে অনর্থক চিন্তায় ও কাজে নিজেকে মহাব্যস্ত করে রেখেছ। তোমার অস্তিত্বের বাগানে জ্ঞানবুদ্ধির যে পানি আছে, তা কাঁটাগুল্মের শিকড় চুষে নিচ্ছে। অনর্থক বিষয়, আজেবাজে চিন্তা, সৎ-উদ্দেশ্যহীন তৎপরতা কাঁটাগুল্মস্বরূপ। এগুলো তোমার জ্ঞানের বুদ্ধিমত্তার রস চুষে খাচ্ছে। ভোগ-বিলাসিতা, আত্মপূজা ও অহঙ্কারের নানা অনুষঙ্গের পেছনে তোমার ধ্যান-জ্ঞান, চেষ্টা ও সাধনা উজাড় হচ্ছে। ফলে তোমার অস্তিত্বের ভালো গুণ, উপাদেয় উপকারী বীজ ও চারাগাছ, তোমার জ্ঞানবুদ্ধির পানি দ্বারা সিঞ্চিত হতে পারছে না।
তোমার গোটা অস্তিত্ব শস্যক্ষেতের মতো। এখানে আগাছা আছে, ভালো ফল-ফুলের চারাগাছও আছে। বাজে বাতিল চিন্তা ও কর্মের আগাছা, যদি শস্যক্ষেতের পানি চুষে নেয়, আসল চারাগাছ তো পানি পাবে না। কাজেই ভালো ফল কীভাবে আশা করতে পার? তুমি আল্লাহর কথা নিত্যস্মরণ রেখে অস্তিত্বের চারাগাছে পানি দাও। অন্তরের জমি জিকির ও ফিকিরে তরতাজা রাখ। চোখ-কান খাড়া রেখে ক্ষেতের যত আগাছা শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেল।
বাগানের পানি আগাছার জন্য হারাম আর চারাগাছের জন্য হালাল- এই পার্থক্যটুকু তোমাকে বুঝতে হবে। বাগানের পানি মানে আকল বুদ্ধি, হুঁশজ্ঞান, যা তোমাকে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামত। এ নেয়ামতের সদ্ব্যবহার কর, হক আদায় কর, কদর কর, যথাস্থানে কাজে লাগাও। এটি হালাল। অযথা অপাত্রে অপব্যবহার করা হারাম।
নে‘মতে হক রা’ বে জা’ন ও আকল দেহ
না বে তাবএ পুর যহীর ও পুর গেরেহ
আল্লাহর নেয়ামত উৎসর্র্গ কর প্রাণ ও আকলের কাজে
রোগশোকের আখড়া দেহের সেবায় উজাড় কর না তাকে।

তোমার রূহের উন্নয়নের কাজে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ব্যবহার কর, কেবল দেহের সেবায় ব্যয় করলে তা হবে ‘উলু বনে মুক্তা ছড়ানো’। চোখের শোভা ও জ্যোতির জন্য আমরা সুরমা মাখি। এই সুরমা যদি চোখের পরিবর্তে কানে ঢাল, কী অবস্থা হবে? কেউ যদি বুঝতে পারে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে তাহলে সংযম অবলম্বন করতেই হবে। চিনি ও মিষ্টান্ন পরিহার করে চলতে হবে। তুমি দুনিয়াপূজার রোগে আক্রান্ত। তাই মন বাজে চিন্তার আখড়া। জীবনটা চলে যাচ্ছে অর্থহীন কাজের পেছনে। কাজেই তোমাকে সংযমের জীবন বেছে নিতে হবে। চিন্তা ও কর্মে শয়তানি মন্ত্রণা সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। নচেৎ তা হবে তোমার আত্মিক ও নৈতিক জীবনের জন্য বিষ-জহর-হলাহল। ডায়াবেটিস রোগীর দেহে মিষ্টান্ন খাবার মরণ ডেকে আনে। নফসের রোগে আক্রান্ত রুহে ভোগ বিলাসিতা, শয়তানি চিন্তামগ্নতা রুহানি মৃত্যু ঘটায়।
হে সাধক! তোমার অস্তিত্বের জমিনে দুই ধরনের গাছ আছে, দেখতে একই রকম সবুজাভ লিকলিকে। এক রকম চারাগাছ ফুলের বা ফলের, আরেক রকম চারাগাছ আগাছার। আগাছার শিকড় বিস্তৃত দোজখের আগুন ও ধোঁয়া থেকে। আর ফল-ফুলের চারাগাছের গোড়া সাত আসমানের উপরে। দূর থেকে মনে হবে, খামার বাড়িতে উভয় চারাগাছে সবুজের সমারোহ জেগেছে। যদি আগাছা আর চারাগাছের মাঝে ফারাক করতে না পার, জীবন বৃথা যাবে। ফারাক করতে চাইলে চোখ মেলে তাকাতে হবে। এই তাকানো বাহ্যদৃষ্টিতে নয়। কারণ, বাহ্যইন্দ্রিয়ের চোখ সাধারণত ভুল দেখে। যেমন অনেক দূরে হলে দেখে না, চোখের একেবারে কাছে ধরলেও দেখা যায় না। তাই তোমাকে দিলের চোখ খুলতে হবে। দিব্যদৃষ্টি খুলতে হলে তোমাকে আসতে হবে যিনি প্রাণের প্রাণ তার কাছে।
আগন্তুক প্রশ্ন করে, কীভাবে আসব? আমাকে যে জড়িয়ে ধরেছে দুনিয়ার সহায় সম্পদ, নামধাম, পদবি খ্যাতির মোহ? মওলানা রুমি বলেন, দৌড় দাও, তাহলে ছিঁড়ে যাবে দুনিয়ার বাঁধন। তারপরের প্রশ্ন, দৌড় কীভাবে দেব? মওলানা বাতলে দিচ্ছেন-
গর যুলায়খা বস্ত দরহা’ হার তরফ
ইয়াফত ইউসুফ হাম যে জুম্বিশ মুনসারাফ
জুলায়খা যদিও বন্ধ করেছিল সবদিক থেকে দরজা
ইউসুফ চেষ্টার দৌড়ে পেয়েছিল বাঁচবার আশ্রয় রাস্তা।

মওলানা এখানে কোরআন মজিদে বর্ণিত হজরত ইউসুফ (আ.) এর জীবনের একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সৎভাইরা খেলার নাম করে বাবা ইয়াকুব (আ.) এর কাছ থেকে ইউসুফকে মাঠে নিয়ে পরিত্যক্ত কুয়ায় নিক্ষেপ করেছিল। একটি বাণিজ্য কাফেলা যাত্রাবিরতিকালে কুয়ার পানি সংগ্রহে গিয়ে ফুটফুটে বালক ইউসুফকে পেয়ে মিসরের দাস বাজারে বিক্রি করে। পাল্লার একদিকে স্বর্ণ অন্যদিকে ইউসুফের ওজনে ইউসুফকে খরিদ করেন প্রধানমন্ত্রী আজিজ। রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলে আজিজপতœী জুলায়খা আসক্ত হয়ে পড়ে অনিন্দ্য সুন্দর ইউসুফের প্রতি। জুলায়খা ইউসুফের কাছে বারবার প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয়। মনিবের ঘরে অসহায় ইউসুফকে একদিন জুলায়খা নানা ছলে অন্দর মহলে আটকায়। শাহী মহলের সব দরজায় তালা লাগায়। তারপর নিজেকে নিবেদন করে ইউসুফের কাছে। কোথাও ছিদ্রপথ পর্যন্ত ছিল না স্বপ্নপুরীতে। হঠাৎ ইউসুফ দৌড় দেন প্রেমাসক্ত জুলায়খার হাত থেকে বাঁচার জন্য। তখই দেখেন, তালা খোলা, দরজা মেলা, পালানোর রাস্তা সম্মুখে। কারণ, ইউসুফ তাওয়াক্কুল করেছিল আল্লাহর ওপর, তারপর চেষ্টার বদৌলতে জুলায়খার ফুসলানোর বাঁধনমুক্ত হতে পেরেছেন আল্লাহর সাহায্যে।
তুমিও যদি দেখ, দুনিয়ার বাঁধন থেকে মুক্তির পথ খোলা নেই, ফাঁকফোকর দেখা যায় না পালানোর, তাহলে ইউসুফের মতো বিচলিত হয়ে তাঁর আশ্রয় পেতে দৌড় দাও। মন থেকে বল, আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিমÑ ‘আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে।’ তখন তোমার সামনেও খুলে যাবে মুক্তির পথ। খুলে যাবে ওই জগতের তালা। দেখবে, দরজা খোলা। তোমাকে তখন এমন জায়গায় নিয়ে যাবে, যার কোনো নাম-ঠিকানা নেই।
মওলানা এখন প্রশ্ন করেন, এই যে দুনিয়াতে এসেছ, জান কি কোত্থেকে এসেছ? তুমি হকিকতের এক বিশাল জগতে ছিলে। সেখান থেকে জড় জগত, উদ্ভিদ জগতের পথপরিক্রমা শেষে পরীক্ষার জন্য নেমে এসেছ পার্থিব জগতে, দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে, সমাজে, সংসারে।
তো যে জা’য়ী আ’মাদী ওয়ায মাওতনী
আ’মদন রা’ রা’হ দানী হীচ নয়ী
তুমি এসেছে এমন অঞ্চল হতে এমন এক দেশ ছেড়ে
কীভাবে এখানে, নিশ্চয়ই জান না, এসেছ কোন পথে।

তুমি আগে ছিলে অন্য দেশের নাগরিক। বাস করতে এমন এলাকায়, যার পরিচয় এখন তোমার মনে নেই। কোন পথে এখানে এসেছ তাও অচেনা।
সেই আদি নিবাসের কথা বা আসার পথের কথা তোমার এখন মনে নেই। তাই বলে সেই দেশ ও পথের অস্তিত্বই নেই- এমন কথা তুমি বিশ্বাস কর না। কাজেই তোমাকে যে পথে, যে দেশে যাওয়ার জন্য বলছি তা তুমি চিন না বলে বলতে পার না যে, সেই দেশ ও পথের অস্তিত্ব নেই।
মওলানা আরও বলেন, সেই দেশ সেই ঠিকানার কথা তো আমি আগেই বলেছি।
মা যে বা’লা’য়ীম ও বা’লা’ মী রওয়ীম
মা’ যে উ য়ীম ও বে সূয়ে উ রওয়ীম
আমরা সেই ঊর্ধ্বলোকের, যাব সেই ঊর্ধ্বপানে
এসেছি যেখান থেকে ফিরে যাব তার সন্নিধানে।
ইন ওয়াতান মিসরো ইরাকো ও শা’ম নীস্ত
ইন ওয়াতান জা’য়ী স্ত কূ রা’ না’ম নীস্ত
এই দেশ বলতে মিসর সিরিয়া ও ইরাক নয়
এই দেশ এমন জায়গা, যার নাম-ঠিকানা নেই।
(এই বয়েত দুটি নিকলসন সংকলনে নেই)

সে জগতের একটু পরিচয় নাও। রাতে নিদ্রায় স্বপ্নের জগতে তুমি বিচরণ কর বিশাল প্রান্তরে। বল তো, স্বপ্নের জগতের বিশাল ভুবন কোথায় আছে, তার পথঘাট কোন দিকে? নিশ্চয়ই জান না। হকিকতের জগতের বাস্তবতা স্বপ্নের বিশাল ভুবনের সঙ্গে তুলনা করে বোঝার সাধনা কর। এই বুঝে সমৃদ্ধ হওয়ার জন্যÑ
তো বেবন্দ অ’ন চশমো খোদ তসলীম কুন
খেশ রা বীনী দর অ’ন শহরে কুহুন
তুমি বন্ধ করো এই চোখ সঁপে দাও নিজেকে
তখন দেখবে নিজেই উপস্থিত সেই পুরোনো দেশে।

দুনিয়ার চাকচিক্য, ভোগ, মোহ, দম্ভ আরও যতকিছু হকিকতের পথে ডাকাত সেজে আছে সব বন্ধন ছিন্ন করে তার দিকে ছুটে যাও, নিজেকে তাঁর কাছে সঁপে দিয়ে বল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন’, ‘আমরা তো একান্ত আল্লাহরই এবং নিশ্চিতই আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব।’ (সূরা বাকারা : ১৫৬)।
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫খ. বয়েত-১০৮৪-১১১৮)

Friday, August 14, 2020

হজ-পরবর্তী জীবন হোক পাপমুক্ত by সাঈদ কাদির

হাজীকে যে মানুষ নিষ্পাপ ভাবে, এ ভাবনাটা এমনি এমনি আসেনি মানুষের ভেতর, বরং এটি হাদিস থেকে আহরিত ধারণা। এরশাদ হয়েছে ‘যে ব্যক্তি হজ করল আর যৌনতা বা নিষিদ্ধ (হজ মৌসুমে) কোনো গোনাহের কাজে জড়িত হলো না, সে হজ থেকে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফেরে।’ (বোখারি)
হজ ইসলামি শরিয়তের অন্যতম ভিত্তিমূল। তবে ব্যতিক্রমী ব্যাপার হলো, হজ সবার ওপর ফরজ নয়; শুধু শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সামর্থ্যবানদের ওপরই এটি ফরজ। যারা হজব্রত পালনের তৌফিক পান, এটি তাদের জন্য এক অনন্য সৌভাগ্য; মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অপার দান। কারণ এ তৌফিক সবার হয় না। এই হজ এমন একটি কল্যাণকর ইবাদত, যা হাজীকে ধারাবাহিক পুণ্যবান হতে সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে পুরো বছরের মধ্যে রমজানুল মোবারকে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনাকে ফরজ করে আল্লাহ তায়ালা যেভাবে মানবজাতিকে ধৈর্য, সংযম ও খোদাভীতির এক অনন্য ছবক দিয়েছেন, তেমনি সামর্থ্যবানদের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ করে দয়ময় তাঁর বান্দাদের প্রভুপ্রেমের এক মহান প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।
মুসলিমদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সম্মিলন, সেতুবন্ধন ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় হজ এক অনন্য মাধ্যম; বেনজির ইবাদত। হজের মাধ্যমে হাজীদের একদিকে সুযোগ হয় রবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার, অন্যদিকে হজ মৌসুমের পুরো সময়কালে ভ্রাতৃত্ব ও আত্মত্যাগের এক সুমহান সবক পায় প্রত্যেক হাজী। এছাড়া মসজিদুল হারামে হাজরে আসওয়াদ, মুলতাজাম, জমজম ও মাতাফসহ কাবার প্রতিটি স্থানই হাজীকে আল্লাহর নৈকট্যলাভের দিকে টানতে থাকে। আরাফা, মুজদালিফা, মিনা, জাবালে রহমত ও হেরা গুহাসহ আল্লাহকে চিনিয়ে দেওয়ার এসব পবিত্র স্থান হাজীর কলবে এনে দেয় এক আধ্যাত্মিক চেতনা। আল্লাহকে চেনার এসব নিদর্শনকে যে-কেউ পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাভরে অবলোকন ও প্রদক্ষিণ করবে, আল্লাহ তার হৃদয়কে খোদাভীতি দিয়ে প্রাচুর্যপূর্ণ করে দেবেন। (দ্রষ্টব্য, সূরা হজ : ৩২)।
আমাদের সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, হাজী সাহেব মানেই সাচ্ছা-পাক্কা ঈমানদার; নিষ্কলুষ খাঁটি মানুষ। হাজী মানেই গোনাহমুক্ত, নির্ভেজাল ও নিরেট একজন কামেল ইনসান। এ সুধারণা আর প্রত্যাশার কারণেই হাজী সাহেব কোনো অসংগত বা গর্হিত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়লে মানুষ তাকে একহাত নেয়, নেহাত বাজে কর্মের ভর্ৎসনা দেয়, এমনকি ইসলামের অন্যতম ভিত্তিমূল হজকেই দোষারোপ করতে শুরু করে কেউ কেউ।
এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, হাজীকে যে মানুষ নিষ্পাপ ভাবে, এ ভাবনাটা এমনি এমনি আসেনি মানুষের ভেতর, বরং এটি হাদিস থেকে আহরিত ধারণা। এরশাদ হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি হজ করল আর যৌনতা বা নিষিদ্ধ (হজ মৌসুমে) কোনো গোনাহের কাজে জড়িত হলো না, সে হজ থেকে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফেরে।’ (বোখারি : ১৫২১, মুসলিম : ১৩৫০)।
এছাড়া সূরা বাকারার ১৯৭নং আয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে, রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন- ‘যে ব্যক্তি হজের মৌসুমে হজ করার নিয়ত করে (ইহরাম বেঁধে ফেলে), তার জন্য যৌনাচার, অশোভন কাজ ও ঝগড়াবিবাদ জায়েজ নেই।’ এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাজীর হজ পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হলেই তিনি পাপমুক্ত হবেন বলে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং যেমনিভাবে সব হাজী সাহেবের হজ ত্রুটিমুক্ত নয়, তেমনি সব হাজী সাহেবের হজ-পরবর্তী জীবনও ত্রুটিমুক্ত হয় না।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যক মানুষ তার আমলের ইহকালীন ও পরকালীন ফায়দা তখনই পাবে, যখন সংশ্লিষ্ট আমলের জন্য তার নিয়ত বিশুদ্ধ হবে। সুতরাং শুধু আল্লাহর হুকুম পালন ও তাকে সন্তুষ্ট করার নিয়ত ছাড়া যে হজ হবে, সে হজ নিয়তে গলদ থাকার কারণে হাজীকে ধারাবাহিক পুণ্যবান হতে সাহায্য করবে না। এরশাদ হয়েছে- ‘প্রত্যেক আমলই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বোখারি : ১/১)। শুধু হজই নয়, সব আমলকে আল্লাহ তায়ালা বিশুদ্ধ নিয়তে সম্পাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে- ‘মানুষকে শুধু খালেস আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ নিয়তে ইবাদত করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।’ (সূরা বাইয়িনাহ : ৫)।
তৃতীয়ত, অনেকেই হাজীদের দোষারোপ করতে গিয়ে পুরো হজের বিধানটাকেই খাটো করা শুরু করে দেয়। এটা নিছক অজ্ঞতা থেকেই মানুষ করে। কারণ কোনো একজন মানুষের ব্যক্তিগত কাজকর্ম বা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের কর্মকান্ডের কারণে একটা খোদায়ি বিধানকে খাটো করা অযৌক্তিক। বিষয়টা বোঝানোর জন্য সহজ একটা উদাহরণ দেওয়া যাক- ধরুন আপনি আপনার শারীরিক কোনো সমস্যার কারণে ‘হেলথকেয়ার’ কোম্পানির ওষুধ সেবন করলেন, সেটা আপনার রোগ কমাতে ব্যর্থ হলো। অথচ একই ওষুধ একই রোগের জন্য হাজারো রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সহায়ক হচ্ছে। সুতরাং আপনি একটি ট্যাবলেট কাজ না করার কারণে পুরো কোম্পানিকেই দোষ দিতে পারেন না। কারণ হতে পারে আপনার রোগের ধরন আলাদা, আপনাকে ওই ওষুধের সঙ্গে আরও কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তদ্রুপ সব হাজীর রিপুর গতি ও অবস্থা একই রকম থাকে না। হজ ছাড়াও আরও কিছু বিশেষ আমলের প্র্যাকটিস নিয়মিত করলে, কিছু নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করলে হাজী সাহেব পাপমুক্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারবেন বলে আশা রাখি।
চতুর্থত, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত- সব ইবাদতই ফরজ। আর সব ফরজ ইবাদত পালন করারই দাবি হলো গোনাহমুক্ত হয়ে যাওয়া। শুধু হজের পরে গোনাহমুক্ত হতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। নামাজের ব্যাপারে তো সরাসরি কোরআনেই ঘোষণা আছে- ‘নামাজ যাবতীয় মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে নামাজি ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখে।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৪)। তারপরও তো আমরা অনেক পাক্কা নামাজিকে পাপকর্মে লিপ্ত দেখি। এখানেও ওই একই কারণ, নামাজিকে তার নামাজ তখনই যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখবে, যখন তার নামাজ ইসলামি শরিয়ত কর্তৃক আরোপিত সব শর্তাবলি ঠিক রেখে, খালেস নিয়তে পড়া হবে। কেউ অসম্পূর্ণ নামাজ পড়ে যদি অবৈধ কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে না পারে, আর নামাজকে দোষ দেয়, তাহলে সে অযৌক্তিক ও অবাস্তব বিষয়ের চর্চা করে। তেমনিভাবে কেউ হারাম মাল দ্বারা বা পাপযুক্ত অথবা লোক-দেখানোর নিয়তে হজ করলে সে ধারাবাহিক পুণ্যবান হবে না- এটাই স্বাভাবিক।
সবশেষ কথা হলো, আল্লাহর হুকুম মানার সম্পর্ক হলো ঈমানের সঙ্গে। যেমন আমি হজ করেছি, এজন্যই আমাকে ভালো থাকতে হবে, আর অন্যরা যা খুশি তাই করে বেড়াবে, বিষয়টা কখনও এমন নয়। আমি মুসলমান, আমি ঈমানদারÑ এ মুসলিম হওয়া আর ঈমানদার হওয়ার দাবিই হলো পাপমুক্ত জীবনযাপন করা। হজ করার তৌফিক হলেও আমাকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে, আর হজ করার তৌফিক না হলেও আমাকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতে হবে। আল্লাহ এরশাদ করেছেন- ‘হে ঈমানদাররা তোমরা আল্লাহকে যথার্থরূপে ভয় করো এবং পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে কবরে এসো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২)।

Friday, July 24, 2020

অর্থনীতিতে কোরবানি ঈদের ইতিবাচক ভূমিকা by সাজ্জাদ আকবর

কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমারি ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- চাঁদা, টোল, বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও এক বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে। কতটা বিপুল সে হাতবদল? অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকা। সংক্ষেপ কথায় অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ প্রচুর বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ তার এক রচনায় ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতির বর্ণনায় পাঁচটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কোরবানির বহুমুখী অর্থনৈতিক তাৎপর্য। হজ, কোরবানির পশু, পশুর চামড়াসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় কীভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবদান রেখে চলে।
বছরঘুরে আমাদের মাথার ওপর ওঠে একফালি চাঁদ। ঈদের চাঁদ। আমাদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ ও ত্যাগের মিশ্র অনুভূতি। সব আবিলতা, বিভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যের বন্ধনে আমাদের আবদ্ধ করে ঈদ। ত্যাগের মহিমায় করে ভাস্বর। ঈদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক আবেদন আমাদের ভেতরটাকে করে পরিশুদ্ধ। ঈদগাহ মানেই ধনী-গরিব, ইতর-ভদ্র শ্রেণিবিভেদের দেয়াল ভেঙে অসীম সাম্যের পতাকায় সমবেত হওয়া। ঈদ মানে ধনীর সম্পদে গরিবের ন্যায়সংগত অধিকার। বছরঘুরে ঈদ আসে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিশুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান নিয়ে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা, শ্রেণিবিভেদের অবৈধ দেয়াল, অন্যায়, ধোঁকাবাজি, কালোবাজারি, গরিবের হক মেরে খাওয়া পুঁজির পাহাড় গুঁড়িয়ে দিয়ে অনাবিল সাম্য-সম্প্রীতিতে সমাজকে ভরিয়ে দেওয়ার আহ্বান নিয়ে ঈদের আগমন। ঈদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এ তাৎপর্যের বাইরে আছে বহুমুখী অর্থনৈতিক তাৎপর্য, যা ঈদকে করে তোলে আরও অর্থবহ, আরও সামাজিক, আরও সর্বজনীন।
বিশেষত ঈদুল আজহা উদযাপনে পশু কোরবানির মধ্যে রয়েছে বিশেষ আর্থসামাজিক তাৎপর্য। হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশের মহান স্মৃতি স্মরণ করে ইতিহাসের ধারাবাহিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব-প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতারই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ-উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তির সংশোধন করার সুযোগ আসে। এজন্য জীবজন্তু কোরবানি করাকে নিছক জীবের জীবন-সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব-প্রবৃত্তি অবদমনের প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ। সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব চরিত্র বলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।
হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের মুসলমানরা সমবেত হন এক মহাসম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সব ভেদাভেদ ভুলে সবার অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরিফে একই পোশাকে, একই ভাষায়, একই রীতি-রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয় তার চেয়ে বড় ধরনের কোনো সাম্য-মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথাও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ পালনের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রং ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বাচনীয় সখ্য সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হতে পারে। এ হজকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির ব্যাপক তারল্য দেখা দেয়, যা সচল অর্থনীতির অনিবার্য প্রয়োজন। এ বছর প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ হজে যাচ্ছেন। প্রতিজনে গড়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় নির্বাহ করলে এ খাতে মোট অর্থব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। এর সঙ্গে হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ থাকে। ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবা-সূত্রে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।
কোরবানির ঈদের মূল অর্থনৈতিক অনুষঙ্গ হলো পশু। পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে ঘটে মহাআয়োজন সমারোহ। গত বছর ঈদে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর মোট সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ এবং কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখের মতো। এ বছর সেটা আরও অনেক বেড়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর দেশীয় কোরবানির পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে রয়েছে ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭২ লাখ ছাগল-ভেড়া এবং ৬ হাজার ৫৬৩টি অন্যান্য পশু। এখন গরুপ্রতি গড় মূল্য ৪০ হাজার টাকা দাম ধরলে ৪৬ লাখ গরু-মহিষের দাম দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ৭২ লাখ খাসি-ভেড়ার দাম গড়ে ২ হাজার টাকা ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। মোটকথা পশু কোরবানিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে।
এছাড়া কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমারি ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়Ñ চাঁদা, টোল, বখশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও বানানো এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও এক বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে। কতটা বিপুল সে হাতবদল? অন্তত কয়েক হাজার কোটি টাকা। সংক্ষেপ কথায় অর্থনীতিতে ফর্মাল-ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ প্রচুর বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ তার এক রচনায় ঈদে চাঙ্গা অর্থনীতির বর্ণনায় পাঁচটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কোরবানির বহুমুখী অর্থনৈতিক তাৎপর্য। হজ, কোরবানির পশু, পশুর চামড়াসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় কীভাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবদান রেখে চলে। চামড়া শিল্পের বার্ষিক সংগ্রহ ও বেচাকেনার অর্ধেকের বেশি জোগান আসে শুধু কোরবানির ঈদে। কোরবানিকৃত পশুর চামড়া রপ্তানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে, পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। এ চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। এর বাইরে আছে কোরবানি উপলক্ষে দা, বটি, পশুর হাড়গোড়, মাংসের মশলাসহ নানা আসবাব ও পণ্যের জমজমাট ব্যবসা। তার মধ্যে শুধু মশলার ব্যবসা হয় তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার। পশুর হাড়গোড়, শিং ও অন্যান্য অংশের ব্যবসায় হাতবদল হয় অন্যূন শতকোটি টাকা।
আর এসব লেনদেনে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। এসবের সঙ্গে যোগ হয় ঈদ উপলক্ষে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সারা বছরের তুলনায় আশাব্যঞ্জক হারে বেড়ে যায়। প্রবল হয় অর্থনীতির চাকা। অন্যদিকে ঈদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সৃষ্টি হয় নানা কর্মসংস্থান। ফলে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে দোকানে দোকানে নতুন কর্মচারী নিয়োগ হয়।
ঈদকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় ঘটে আরও বড় এলাহি কা-। শহরের মানুষ আপনজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ছোটে। এক মাস আগে থেকে ট্রেন, বাস, লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ দামে ফর্মাল টিকিট আর ইনফর্মাল টাউট, দালাল ও বিবিধ উপায়ে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে সাকুল্যে ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়ে থাকে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
মোদ্দাকথা, ঈদকেন্দ্রিক মুদ্রা লেনদেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য গোটা দেশের অর্থনীতির উজ্জীবন ঘটায়। দুই ঈদে যত কেনাবেচা ও লেনদেন হয়, সারা বছরেও তা হয় না। বলা যায়, ঈদে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। দারিদ্র্য মোচনে ঈদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কোরবানির পশুর গোশতের একটা অংশ দরিদ্রদের প্রাপ্য। সারা বছর যারা সামর্থ্যরে অভাবে গোশত কিনে খেতে পারে না, এ সময় তারাও অন্তত কয়েক দিন গোশত খেতে পারে। তাছাড়া কোরবানির পশুর চামড়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থের হকদার দরিদ্র, এতিম ও অসহায় মানুষ। কোরবানির পশুর চামড়ার অর্থে দেশের বহু মাদ্রাসা ও এতিমখানার সারা বছরের খরচ চলে।
সামগ্রিক বিবেচনায়, অন্যান্য ধর্মীয় জাতি-সম্প্রদায়ের আনন্দ-উৎসবের তুলনায় মুসলমানদের আনন্দ-উৎসব যে আধ্যাত্মিক, সামাজিক, মানবিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভিন্নতর তাৎপর্যে মহিমাময় ও কল্যাণবহ তাতে কোনো সন্দেহ আছে কি?

>>>তথ্যসূত্র : ১. প্রথম আলো ১৬ জুলাই ২০১৯; ২. নয়া দিগন্ত, ২৩ এপ্রিল ২০১৯; ৩. ইত্তেফাক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫; ৪. বিবিসি বাংলা ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
>>>লেখক : রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা

Wednesday, July 15, 2020

সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী by সৈয়দ শামীম শিরাজী

১৮৯৯ সালের কোনো একদিন। সিরাজগঞ্জ শহরতলির বড়ইতলা মাঠে (বর্তমানে পদ্ম পুকুরের পাশে) সভা চলছে। সভার প্রধান আকর্ষণ তৎকালীন মুসলিম বাংলার জনপ্রিয় নেতা, প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক যশোরের মুন্সী মেহেরুল্লাহ। খ্রিষ্টান মিশনারিদের সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে তিনি তখন মর্দে মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করেছেন। এ সময় বাংলাদেশের সহজ সরল দরিদ্র শ্রেণির মুসলমানদের সামনে নানা প্রলোভনের ফাঁদ পেতে খ্রিষ্টান পাদ্রিরা তাদের ধর্মান্তরিত করছিল। সেদিন মুসলমানদের ধর্মান্তর রোধ করতে বাংলাদেশের কোনো জমিদার, নেতা কেউই এগিয়ে আসেননি- এলেন যশোরের দড়াটানার একজন অতি সাধারণ মানুষ- দর্জি মুন্সী মেহেরুল্লাহ। তার জ্ঞানগর্ভ ও বুদ্ধিমত্তার বলে প্রতিরোধের মুখে খ্রিষ্টান মিশনারিদের সে অপতৎপরতা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। তিনি তাদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠেন। একের পর এক বাহাসে তার কাছে পরাজিত হয়ে মুখ কালি করে নিজেদের মিশনে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে বাঘা বাঘা পাদ্রি। এ সাহসী ভূমিকার কারণে সারা বাংলাদেশেই অত্যন্ত মশহুর হয়ে ওঠেন মুন্সী মেহেরুল্লাহ। অক্লান্ত এ মানুষটি যেখান থেকে ডাক আসে, সেখানেই ছুটে যান। শোনান ধর্মের কথা। ইসলামের মূল আদর্শের কথা। তার যুক্তিপূর্ণ জ্ঞানগর্ভের কথা শুনে মুসলমানরা বিপর্যয়ের মধ্যে আশার আলো দেখতে পায়, ঈমানি জজবায় নতুন করে বলীয়ান হয়ে ওঠে। সেই ত্যাগী মুন্সী মেহেরুল্লাহ আসছেন বড়ইতলার ধর্মসভায়Ñ এ কথা শুনে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল, বগুড়াসহ নানা স্থান থেকে মানুষ এসে হাজির হয়েছে। মুন্সী মেহেরউল্লাহর জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনবে তারা।
স্থানীয় বক্তাদের বক্তৃতা শেষ পর্যায়ে। এর পরই মুন্সী মেহেরউল্লাহ জ্বালাময়ী বক্তৃতা করবেন। এমন সময় সভার আয়োজকদের মধ্যে এক বিশিষ্ট ব্যক্তি মুন্সী সাহেবের কাছে এসে বললেন, হুজুর একটি ছেলে সভায় কিছু কথা বলতে চায়। একটি কবিতা সে পাঠ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করছে এ সভায়। আমরা তাকে চিনি। এ শহরেরই ছেলে, খুব শরিফ ঘরের। যেমন তেজস্বী তেমনি ভালো বক্তা। আপনি যদি মেহেরবানি পূর্বক অনুমতি দেন তাহলে ছেলেটি দু-চার কথা বলতে পারে। উদার হৃদয়ের খাঁটি মানুষ মুন্সী মেহেরউল্লাহ সাহেব সহজেই অনুমতি দিলেন। ছেলেমানুষ বলুক দু-চার কথা। সভা-সমিতিতে কথা বলতে পারে এমন ছেলের দেখা-সাক্ষাৎ মুসলমান সমাজে বেশি মেলে না। এ ছেলেটি যখন আগ্রহ করে সভায় কথা বলতে দুঃসাহস করছে, তাকে সুযোগ দিয়ে দেখা যাক না কী বলে।
সুঠাম দেহের তরুণ যুবক বক্তৃতা শুরু করলেন। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর মুন্সী মেহেরউল্লাহর মনোযোগের পুরোটাই কেড়ে নেয় সেই তরুণ। ততক্ষণে তার কণ্ঠে মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনের আভাস ধ্বনিত হতে শুরু করেছে। মুন্সী সাহেব অবাক দৃষ্টিতে এই প্রথম যুবকের দিকে তাকালেন। ছেলে ঠিক নয়- মাঝারি উচ্চতার কিন্তু বলিষ্ঠ দেহের সদ্য কৈশোর পেরোনো এক উচ্ছল তরুণ। কোরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস, মুসলমানদের বর্তমান দুরবস্থা সবই তার কথায় উঠে আসছে। আশ্চর্য! এত বড় সভা, হাজার হাজার লোক। মাইক নেই; কিন্তু বিনা মাইকেই তার বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর সভাস্থলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে অনায়াসে। কিছুক্ষণ পরই শেষ করল সে। সবার কাছে সবিনয়ে অনুমতি চাইল একটি জাতীয় কবিতা পাঠের। অতি সহজেই তা মিলে গেল। জানাল, কবিতাটি তার নিজেরই লেখা। যা হোক, কবিতা পাঠ শুরু করল সে। কবিতাটির নাম ‘অনল প্রবাহ’- বিশাল অগ্নিঝরা কবিতা।
আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া
ওঠরে মুসলিম ওঠরে জাগিয়া
আলস্য জড়তা পায়েতে ঠেলিয়া
পূত বিভু নাম স্মরণ করি।

বিস্ময়, আনন্দে শিহরিত হয়ে উঠলেন মুন্সী মেহেরউল্লাহ। সুদীর্ঘ সে বক্তৃতার পুরোটাই শুনলেন তিনি মুগ্ধ হয়ে। কবিতা নয়- যেন আগুন ঝরছে লেখকের কণ্ঠে। তার বক্তব্যে মুসলমানরা ঘুমিয়ে আছে। তারা বেখেয়াল। তারা সব জায়গায় মার খাচ্ছে। ইংরেজরা এদেশের শাসক। হিন্দুরা তাদের সহযোগিতা করে কত উন্নতি লাভ করছে। আর বাদশাহর জাতি মুসলমান আজ সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তাদের অবস্থা যেন মৃতপ্রায়। একদিন সারা বিশ্বে যে মুসলমানরা সভ্যতার আলো ছড়িয়েছিল, তারা আজ চরম দুর্দশায়; কিন্তু আর নয়। ওঠ, মুসলমানরা জাগো। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন দাও, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করো। ব্রিটিশদের অধীনে আর গোলাম থাকা নয়। স্বাধীনতা লাভ করতে হবে। মুসলমানরা, সিংহের বিক্রমে মাথা তুলে দাঁড়াও। আল্লাহর নাম স্মরণ করে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়। তোমরা বিশ্বের সেরা জাতি ছিলে। আবার সেরা জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর দেরি নয়, ওঠো মুসলমান জেগে ওঠো।
মুন্সী মেহেরউল্লাহ নিজেই নিজেকে বললেন, এ যেন আমারই উত্তরসূরি। বাংলাদেশে এত মুসলমান, দু-চারজন লেখকের দেখাও এখন মিলছে। কিন্তু এ রকম বজ্রনিনাদ, মুসলমানদের জেগে ওঠার এমন বলিষ্ঠ আহ্বান তো আর কারও কণ্ঠে শোনা যায়নি। কিংবা কারও লেখায়ও দেখা যায়নি। এ রকম সাহস তো আর কারও মধ্যে দেখিনি। মহাশক্তিমান ব্রিটিশ সরকারকেও পরোয়া করে না- কে এই তরুণ!
তরতাজা এ তরুণকে মুন্সী সাহেব কাছে ডেকে নিলেন। কত আর বয়স, আঠারো-উনিশ হবে বোধ হয়। বুকে জড়িয়ে ধরে যেন সান্ত¡না খুঁজে পেলেন। ভাবলেন ভবিষ্যতে আমার দলের কান্ডারি হবে। উৎসাহ দিলেন আরও লেখার জন্য। এ রকম আগুনঝরা লেখাই তো এখন চাই। মোক্ষম সময়ই তুমি লিখেছ। বাংলার ঘুমন্ত মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলতে হলে তাদের বজ্রের গর্জন শোনাতে হবে, সেতারের সুললিত ঝংকার নয়, এখানেই থেমে থাকলেন না বাংলার মর্দে মুজাহিদ মুন্সী মেহেরউল্লাহ। কিছুদিনের মধ্যে টাকা-পয়সা জোগাড় করে তার সেই কাব্য পুস্তকটি প্রকাশ করলেন যশোর থেকে। বাংলার মুসলমান বিশেষ করে যুব তরুণ সমাজের কাছে পৌঁছে গেল জ্বালাময়ী কাব্য ‘অনল প্রবাহ’। সেই তরুণের নাম সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী। এ গ্রন্থ প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে অনল প্রবাহ কাব্য সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজীকে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে দুই বছর সশ্রম কারাদ- দেয়। মুসলমানদের মধ্যে সিরাজীই প্রথম যিনি কবিতা লেখার অভিযোগে কারাদ- ভোগ করেন। সে সময় মহকুমা ম্যাজিস্ট্র্রেট লয়েড অনল প্রবাহ বাজেয়াপ্ত করতে এসে সিরাজী সাহেবের ফ্যামিলি লাইব্রেরির গ্রন্থগুলো আগ্রহ সহকারে দেখে মন্তব্য করেন,  "সিরাজী শুধু একজন জাতীয় কবি এবং উচ্চস্তরের বাগ্মীই নহেন, তিনি একজন বিরাট পন্ডিত ব্যক্তি)।" মুন্সী মেহেরউল্লাহর বদৌলতে সিরাজী গ্রন্থখানা ছাপা হওয়ায় এবং ব্রিটিশ সরকার তাকে জেল দেওয়ায় সিরাজীর নাম সর্বত্র আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।  উৎসাহ-উদ্দীপনায় সিরাজী আরও ক্ষুরধার অস্ত্রে পরিণত হয়ে উঠল। ইংরেজীতে একটি কথা আছে, যার সারকথা ‘রচনাশৈলীর ভেতরেই মানুষটির যথার্থ পরিচয়।’ সিরাজী সাহেবের রচনাভঙ্গি তার বৈশিষ্ট্য সূচিত করে। সে অগ্নি তার কবিতা, সংগীত, কাব্য, বাগ্মিতা ও কর্মপ্রচেষ্টায় ছড়িয়ে পড়েছিল। জাতির জীবনে তা নিষ্ফল হয়নি। মানুষের প্রতি, জাতির প্রতি, কওমের প্রতি কোনো অন্যায় জুলুম তিনি সহ্য করেননি। জাতির মানমর্যাদা রক্ষার্থে আজীবন আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। জাতির কল্যাণ, সমাজের কল্যাণ এবং মুসলমান সমাজভুক্ত মানুষের কল্যাণ তার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল। ধর্মের অনুসারীদের তিনি সব ভয়-ভীতি, দুঃখ-দৈন্যের, ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও অগ্রসর হওয়ার আহ্বান শুনিয়েছেন। শিক্ষায়, সাহিত্যে, জীবনে তিনি বিজাতীয় অন্ধ অনুকরণের তীব্র প্রতিবাদ যেমন করেছিলেন, তেমনি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত করার জন্য প্রবল উৎসাহ সঞ্চার করাও তার জীবনের ব্রত ছিল। দেশের স্বাধীনতার অর্থে এ দেশের কোটি কোটি শ্রমক্লিষ্ট, কৃষক-মজুরের জীবন বিকাশের সুষ্ঠু ব্যবস্থাই বুঝিয়েছেন।
সর্বগুণে গুণান্বিত মুন্সী সাহেব একাই একাধিক দায়িত্ব পালন করে সফলকাম হয়েছেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন অতুলনীয় বাগ্মী। বাগ্মিতায় সে সময় মুসলমানদের মধ্যে তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। ধর্ম-সমাজ, স্বাধীনতা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা, মুসলমানদের জাগরণের কথা, সব বিষয়ে কথা বলার যোগ্যতা ছিল তার। তার সেই তেজস্বী কণ্ঠের বক্তৃতা লোকজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। মানুষকে বক্তৃতার মাধ্যমে প্রভাবিত করার ঈর্ষণীয় ক্ষমতা ছিল তার। একইভাবে গাজী সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজীও পরবর্তীকালে বাংলার অদ্বিতীয় বাগ্মী, বক্তৃতার জাদুকর, বাংলার এডমন্ড বার্ক ইত্যাদি আখ্যায় আখ্যায়িত হয়েছিলেন। এজন্যই বলা যায়Ñ যখন এক ধাপ এগিয়ে যায় তখনই তো আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়। মুন্সী মেহেরুল্লাহর সান্নিধ্য, সংস্পর্শ পেয়ে তেমনি বেগবান হয়ে উঠেছিল সিরাজী। সেই সঙ্গে মুন্সী সাহেবের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে সিরাজী বিদ্রোহী কবি নজরুলকে উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত করেছিলেন। নজরুলের ভাষায়Ñ “আমি তখন প্রথম ভয়ে ভয়ে কাব্য-কাননে পা টিপে টিপে প্রবেশ করেছি- ফিঙ্গে বায়স বাজপাখির ভয়ে ভীরু পাখির মতো কণ্ঠ ছেড়ে গাইবারও দুঃসাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। নখচক্ষুর আঘাতও যে না খেয়েছি এমন নয়- এমনি ভীতির দুর্দিনে মানি অর্ডারে আমার নামে দশটা টাকা এসে হাজির। একপাশে সিরাজী সাহেবের হাতের লেখা, ‘তোমার লেখা পড়িয়া সুখী হইয়া দশটি টাকা পাঠাইলাম। ফিরাইয়া দিও না, ব্যথা পাইব। আমার থাকিলে দশ হাজার টাকা পাঠাইতাম।’ চোখের জলে স্নেহ-সুধাসিক্ত ওই কয় পঙ্্ক্তি লেখা বারে বারে পড়লাম। টাকা দশটা লয়ে মাথায় ঠেকালাম। তখনও আমি তাকে দেখিনি। কাঙ্গাল ভক্তের মত দূর হতেই তার লেখা পড়েছি। মুখস্থ করেছি। শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি।”
সে সময়ে সিরাজীর দশটি টাকা কবি নজরুলকে কতটা অনুপ্রাণিত করেছিল নজরুলের উপর্যুক্ত অভিমতে তা স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, কায়কোবাদ যখন মহাশ্মশান লিখে অর্ধশিক্ষিত মুসলমানদের চাপের মুখে পড়লেন। ঠিক তখনি সিরাজী তাকে সোনার দোয়াত-কলম উপঢৌকন দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তাকে সে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন। একইভাবে পল্লীকবি জসীমউদ্্দীনকে সিরাজী উৎসাহিত করেছিলেন। আবার সিরাজীর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র তূর্যনাদের অমর কবি সৈয়দ আসাদুদ্দৌলা সিরাজী কবি নজরুল ইসলামকে সিরাজগঞ্জে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহী কবি তখন বাণীকুঞ্চে এসে সিরাজীর মাজারে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এ যেন হজ্ব করতে এসে কাবা শরিফ না দেখে ফিরে যাওয়া।’

জাকাত কে কাকে দেবেন by মুফতি এহছানুল হক মুজাদ্দেদী

প্রধানত ইসলামি রাষ্ট্রের জিহাদরত, জিহাদে আহত বা জিহাদের খাত। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ- যারা ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে নিয়োজিত আছেন।
‘জাকাত’ আরবি শব্দ। অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্রতা বা পরিশুদ্ধতা। জাকাতের আরেক অর্থ পরিবর্ধন। ইসলামি বিশ্বকোষে জাকাতের অর্থ লেখা আছে, জাকাত অর্থ পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী (সা.)! আপনি তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ করুন, যাতে আপনি এর মাধ্যমে সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং বরকতময় পরিশুদ্ধ করতে পারেন।’ (সূরা তওবা : ১০৩)। এটাকে জাকাত বলার কারণ হলো এভাবে জাকাত দাতার অর্থসম্পদ এবং তার নিজের আত্মা পবিত্র-পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। প্রিয় রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘জাকাত ইসলামে ধনী-গরিবের সেতুবন্ধন।’ (মুসলিম)।
যাদের ওপর জাকাত ফরজ
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন সব ‘সাহেবে নিসাব’ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মালিক মুসলিম পরুষ-নারীর ওপর জাকাত প্রদান করা ফরজ। কোনো ব্যক্তি মৌলিক প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যতীত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর চাঁদের হিসাবে পরিপূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে তার ওপর পূর্ববর্তী বছরের জাকাত প্রদান করা ফরজ। অবশ্য যদি কোনো ব্যক্তি জাকাতের নিসাবের মালিক হওয়ার পাশাপাশি ঋণগ্রস্ত হয়; তবে ঋণ বাদ দিয়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে, তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। জাকাত ফরজ হওয়ার পর যদি কোনো ব্যক্তি জাকাত প্রদান না করে টাকা খরচ করে ফেলে, তাহলেও তাকে তার পূর্বের জাকাত দিতে হবে। নাবালেগ ও পাগলের ওপর জাকাত ফরজ হবে না। কারণ তাদের ওপর শরিয়তের বিধান আরোপিত হয় না। তবে যদি কোনো মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তি নিসাবের মালিক হওয়ার সময় এবং বছর পরিপূর্ণ হওয়ার সময় সুস্থ থাকে; কিন্তু মধ্যবর্তী সময় মস্তিষ্ক বিকৃতির শিকার হয়, তাহলেও তাকে জাকাত প্রদান করতে হবে।
জাকাত বণ্টনের খাত
জাকাত বণ্টনের ব্যাপারে কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটাই আল্লাহর বিধান।’ (সূরা তওবা : ৬০)।
মহাগ্রন্থ কোরআনের আলোকে জাকাত ব্যয়ের খাত আটটি। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো।
নিঃস্ব ফকির : ফকির বলা হয় যার কোনো সম্পদ নেই, নেই তার উপযোগী হালাল উপার্জন, যা দ্বারা তার প্রয়োজন পূরণ হতে পারে। যার খাওয়া-পরা ও থাকার স্থান নেই। অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই। আবার কেউ বলেছেন, ফকির সে, যার সামান্য সম্পদ আছে। তবে জীবন ধারণের জন্য অপরের ওপর নির্ভর করে।
অভাবগ্রস্ত মিসকিন : মিসকিন বলা হয় যার এমন পরিমাণ সম্পদ আছে, যা দ্বারা তার ওপর নির্ভরশীল লোকদের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নয়। মিসকিন সেই, যার কোনো কিছুই নেই। আবার কারও মতে, মিসকিন সে ব্যক্তি যার কিছু সম্পদ আছে; কিন্তু লজ্জা সম্মানের ভয়ে কারও কাছে হাত পাতেন না যারা। তারা জীবন-জীবিকার জন্য প্রানান্তকর প্রচেষ্টা করার পরও প্রয়োজন মতো উপার্জন করতে পারেন না। এতকিছুর পরও নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেন না। মোটকথা, মিসকিন এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যার কিছুই নেই, যিনি মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়ান এবং খোরাক-পোশাকের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হন।
জাকাত বিভাগের কর্মচারী : যারা জাকাত আদায়কারী, সংরক্ষণকারী, পাহারাদার, লেখক, হিসাবরক্ষক এবং জাকাতের বণ্টনকারী এদের সবাইকে জাকাতের ফান্ড থেকে বেতন দিতে হবে। তবে এমন যেন না হয়, আমিল কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দিতে গিয়ে জাকাতের কোনো অর্থ অবশিষ্ট না থাকে, সে ক্ষেত্রে তাদের আদায়কৃত জাকাতের অর্ধেকের বেশি দেওয়া যাবে না। এ ব্যবস্থা এজন্য করা হয়েছে, যেন তারা জাকাতের মালের মালিকদের থেকে অন্য কিছু গ্রহণ না করেন। বরং এটা আসলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের আওতায় পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ববান জাকাতের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা, গঠন ও পরিচালনা করবেন।
যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য : ইসলামের জন্য যাদের মন আকর্ষণ করা প্রয়োজন কিংবা ইসলামের ওপর তাদের সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য এমন লোকদের জাকাতের খাত থেকে জাকাত প্রদান করা। অধিকাংশ হানাফি আলেমের মতে, এ খাতটি রহিত হয়ে গেছে।
দাসমুক্তির জন্য : যে ক্রীতদাস তার মালিককে অর্থ প্রদানের বিনিময়ে মুক্তিলাভের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এখানে এ পর্যায়ে মুসলিম যুদ্ধবন্দিও এ খাতের আওতায় পড়বেন। কাজি ইবনুল আরাবি বলেন, মুসলিম দাসকে যখন মুক্ত করতে জাকাতের খাত থেকে দেওয়া যাবে, ঠিক তেমনি মুসলিম বন্দিকে ও কাফেরদের দাসত্ব শৃঙ্খলা ও লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত করার কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা অধিক উত্তম বলে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে বিখ্যাত তাফসিরকারদের অভিমত, কোরআনে ফির রিকাব বলে জাকাতের যে ব্যয় খাতটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে তাকে পরাধীন গোত্র ও জাতিগুলোকে মুক্ত করার কাজে ও ব্যবহার করা যাবে।
ঋণগ্রস্তদের জন্য : এমন ব্যক্তি, যিনি ঋণভারে জর্জরিত অবস্থায় পতিত। তাকে জাকাতের ফান্ড থেকে সাহায্য করা। তবে যে কোনো অসৎ কাজে বা অপব্যয়ের কারণে ঋণগ্রস্ত হলে তওবা না করা পর্যন্ত জাকাতের ফান্ড তাকে দেওয়া যাবে না। আবার ঋণগ্রস্ত এর পর্যায়ে যেমন জীবিত ব্যক্তি শামিল, তেমনি মৃত ব্যক্তিও এর আওতায় পড়ে, মৃতব্যক্তি যিনি ঋণ রেখে মারা গেছেন। ইমাম কুরতুবি (রহ.)ও তাই বলেছেন।
আল্লাহর পথে : প্রধানত ইসলামি রাষ্ট্রের জিহাদরত, জিহাদে আহত বা জিহাদের খাত। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ফি সাবিলিল্লাহর অর্থ- যারা ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে নিয়োজিত আছেন।
মুসাফিরদের জন্য : এমন ব্যক্তি, যার নিজ আবাসস্থলে সম্পদ আছে; কিন্তু সফরে তিনি বিপদগ্রস্ত ও নিঃস্ব অবস্থায় আছেন, তাকে জাকাতের তহবিল থেকে সাহায্য করা। তবে তার সফর পাপের কাজের বা অনুরূপ পর্যায়ের কোনো সফর হওয়া যাবে না। আল্লামা তাবারি (রহ.) মুজাহিদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন, জাকাতের সম্পদ ধনীর হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের নিঃস্ব পথিকেরও একটি হক রয়েছে। যদি তিনি নিজের ধনসম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

Sunday, June 28, 2020

কেরান হজে করণীয় by মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী

হজের মাসগুলোতে একসঙ্গে ওমরা ও হজ উভয়টির ইহরাম বেঁধে প্রথমে ওমরা পালন করে ইহরাম না খুলে ওই একই ইহরামে হজ সমাপন করাকে হজে কেরান বা কেরান হজ বলে।
১. প্রথমে ওমরা ও হজ উভয়টার নিয়তে ইহরাম বাঁধবে। ইহরাম বাঁধা ফরজ।
২. বায়তুল্লায় প্রবেশ করে তাওয়াফে ওমরা বা ওমরার তাওয়াফ আদায় করবে। এই তাওয়াফ ফরজ।
৩. তাওয়াফের পর ওমরার সায়ি করবে। এই সায়ি ওয়াজিব।
৪. তারপর তাওয়াফে কুদুম করবে। মিকাতের বাইরে থেকে মক্কায় প্রবেশকারীদের জন্য এই তাওয়াফ সুন্নত।
৫. তারপর সায়ি করবে। এই সায়ি ওয়াজিব। কেরানকারীর জন্য এই সায়ি এখানেই করে নেওয়া উত্তম। না করলে তাওয়াফে জিয়ারতের পর এই ওয়াজিব সায়ি আদায় করতে হবে।
৬. ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় থেকে আদায় করবে। এটা সুন্নত।
৭. ৯ জিলহজ সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত উকুফে আরাফা (আরাফায় অবস্থান) করবে। উকুফে আরফা হজের প্রধান ফরজ।
৮. ৯ জিলহজ রাতে উকুফে মুজদালিফা (মুজদালিফায় অবস্থান) করবে। এটা ওয়াজিব।
৯. ১০ জিলহজ মিনায় এসে জামারায়ে আকাবায় (বড় শয়তানকে) কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
১০. তারপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
১১. তারপর মাথা মু-ন করে বা চুল ছোট করে ইহরাম খুলবে। এই মাথা মুন্ডানো বা চুল ছোট করা ওয়াজিব।
১২. তাওয়াফে জিয়ারত করা ফরজ।
১৩. ১১ ও ১২ জিলহজ প্রতিদিন তিন জামারায় কংকর নিক্ষেপ করবে। এই কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
১৪. বিদায়ি তাওয়াফ করবে। এই বিদায়ি তাওয়াফ ওয়াজিব। মক্কা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বিদায়ি তাওয়াফ করলে হজে কেরানের কার্যাবলি শেষ হবে।
ইহরাম অবস্থায় করণীয় : নির্দিষ্ট পোশাক পরিধানপূর্বক (পুরুষের জন্য) হজ অথবা ওমরা কিংবা হজ ও ওমরা উভয়টির নিয়ত করে বায়তুল্লাহ শরিফের তাওয়াফ এবং সাফা-মারওয়ার সায়ি করার পর মাথা মু-ন করে বা চুল ছোট করে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত অবস্থাকে ইহরাম বলে।
যেখান থেকে ইহরাম বাঁধে : হজ বা ওমরার উদ্দেশে রওনা হলে মিকাত অর্থাৎ শরিয়ত কর্তৃক ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার আগেই ইহরাম বেঁধে নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান প্রভৃতি পূর্বঞ্চালীয় লোকদের জন্য এই নির্ধারিত স্থানটি হলো ইয়ালামলাম (মক্কা থেকে দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম)। এর আগে অবশ্যই ইহরাম বেঁধে নেবেন। বিমানবন্দরে গিয়ে বা হাজীক্যাম্প থেকে রওনা হওয়ার আগে বাসায় বা মসজিদে যে কোনো জায়গায় এহরাম বাঁধা যায়। যারা মদিনা শরিফ আগে যাওয়ার ইচ্ছা করবেন, তারা বিনা ইহরামে রওনা হতে পারেন। মদিনা জিয়ারতের পর যখন মক্কা শরিফের উদ্দেশে রওনা হবেন, তখন মদিনা থেকে মক্কা শরিফ গমনকরীদের মিকাত যেহেতু জুলহুলাইফা, তাই জুলহুলাইফা নামক স্থান থেকে বা মদিনা থেকেই ইহরাম বেঁধে মক্কা শরিফে রওনা হবেন। যারা মক্কা শরিফে থাকা অবস্থায় নফল ওমরা করতে চান ইহরাম বাঁধার জন্য তাদের হারামের সীমানার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে আসতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে উত্তম স্থান হলো তানয়িম। বর্তমানে সেখানে মসজিদে আয়েশা নামক একটি মসজিদ আছে। সেখানে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে নফল ওমরা করবেন। জেরানা নামক স্থান থেকেও ইহরাম বেঁধে আসা যায়।
>>>মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী

Friday, May 22, 2020

আদর্শ জাতি গঠনে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা by ইমামুদ্দীন সুলতান

বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহাগ্রন্থ আল কোরআনকে জীবন বিধানরূপে পাঠিয়েছেন। এ কোরআন পুরো মানবজাতির সমাজ সভ্যতা ও আত্মিক পবিত্রতা এবং পরিশুদ্ধির জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। তাই এ মহাগ্রন্থের প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে আছে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কার-সংশোধনের পন্থা ও পদ্ধতি এবং পবিত্র ও পরিশুদ্ধ জীবনের বাস্তব রূপরেখা। পরিশুদ্ধ ও পবিত্র সভ্যতার অপরিহার্য দাবি হচ্ছে পরিশুদ্ধ ও সৎ খোদাভীরু মানুষ। কেননা আত্মার পরিশুদ্ধি ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত কল্যাণ বা সফলতা অর্জন করতে পারে না। তাই পবিত্র কোরআনে ব্যক্তির পবিত্রতা ও আত্মার পরিশুদ্ধির প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে- ‘যে নিজেকে শুদ্ধ করে সে সফলকাম এবং যে নিজেকে কলুষিত করে সে ব্যর্থমনোরথ হয়।’ (সূরা শামস : ৯)।
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আত্মশুদ্ধিকে মানবজীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার কারণ সাব্যস্ত করেছেন। যার আত্মার পরিশুদ্ধতা আছে সে সফল। আর যার আত্মার পরিশুদ্ধতা নেই সে ব্যর্থ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জন করে সে সফলকাম। আর সে ব্যক্তি ব্যর্থ যে নিজের নফসকে পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত করে দেয়। মোটকথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার চাবিকাঠি হলো আত্মার পরিশুদ্ধতা ও পবিত্রতা। তাই আল্লাহ তায়ালা রাসুলে করিম (সা.) কে এ মিশন নিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। রাসুল (সা.) পৃথিবীতে আগমনের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন- ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করবেন তাঁর আয়াত। তাদের পবিত্র করবেন এবং শিক্ষা দেবেন কিতাব এবং হিকমত। এর আগে তারা ছিল পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।’ (সূরা জুমা : ২)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসুলে করিম (সা.) এর পৃথিবীতে আগমনের চারটি উদ্দেশ্য ও মিশনের কথা উল্লেখ করেন। যার দ্বিতীয়টি হলো, তিনি মানুষকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবেন।
মানুষকে আল্লাহ তায়ালা দুটি জিনিস দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আত্মা এবং দেহ। এ দুটি জিনিসের সমন্বয়ে যেহেতু প্রতিটি মানুষের সৃষ্টি; তাই এ দুটি জিনিস তথা দেহ এবং আত্মা উভয়টা সুস্থ থাকলেই একজন মানুষকে পরিপূর্ণ সুস্থ বলা হবে। দেহ সুস্থ থাকে দেহের খোরাকের মাধ্যমে আর আত্মা সুস্থ থাকে তার খোরাকের মাধ্যমে। দেহের সৃষ্টি উপাদান থেকে; তাই তার খাদ্যও ব্যবস্থা করেছেনে উপাদান থেকে, যাতে মানবদেহ ঠিক থাকে। আত্মা যেহেতু অবিনশ্বর তার কোনো মৃত্যু নেই, এজন্য আত্মার খোরাকও সেই ধ্বংসহীন বস্তু। তা হলো নেক আমল। উৎপাদনমূলক খাবারের মাধ্যমে যেমন মানবদেহ ঠিক থাকে, সতেজ থাকে, তেমনি আত্মা সতেজ হয় নেক আমলের মাধ্যমে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আজ আমরা দেহের সুস্থতা নিয়ে বেশ সচেতন। দেহের সুস্থতার জন্য আমরা সর্বদা সতেষ্ট থাকি, চেষ্টা অব্যাহত রাখি। সামান্য কিছু হলে চিকিৎসার জন্য দেশ-বিদেশের ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। কিন্তু আত্মার সুস্থতার জন্য কোনো আধ্যাত্মিক ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই না। অথচ দেহের চেয়ে আত্মার গুরুত্ব বেশি। কেননা এ দেহের মূল্যায়ন তো আত্মাকে দিয়েই। আত্মা আছে বলেইে তো আমাকে-আপনাকে মানুষ বলে বা কোনো নাম ধরে সম্মোধন করা হয়। পক্ষান্তরে আত্মা যখন দেহের সঙ্গ ত্যাগ করে, তখন আর নাম ধরে সম্বোধন করা হয় না। সেটাকে লাশ বলা হয়। অতএব এর গুরুত্ব দেওয়া এবং এটাকে সুস্থ রাখা বেশি প্রয়োজন। আত্মা সুস্থ থাকবে গোনাহমুক্ত থাকার মাধ্যমে। আর যার আত্মা শুদ্ধ থাকে তার সবকিছু ভালো হয় আর যার আত্মা পরিশুদ্ধ না হয় তার সবকিছু খারাপ হয়ে যায়। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘জেনে রাখো মানবদেহে এমন একটি গোশতের টুকরা রয়েছে, যা ঠিক হলে পুরো দেহ ঠিক হয়ে যায় এবং তা খারাপ হলে সারা দেহ খারাপ হয়ে যায়। শুনো! তা হচ্ছে ‘কলব’ বা আত্মা।’ (বোখারি : ৫২, মুসলিম : ৩৯৭৩)।
এই হাদিসে রাসুলে করিম (সা.) পুরো দেহের আমলের ইসলাহ ও সংশোধনকে আত্মার সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘তাজকিয়ায়ে নফস’ বা আত্মশুদ্ধি বলা হয়। যার আত্মা পরিশুদ্ধ থাকবে তার দ্বারা কখনও খারাপ ও অন্যায়মূলক কোনো কাজ সংঘটিত হবে না। আর এ আত্মা শুদ্ধ হয় কিছু গুণাবলি অর্জন এবং কিছু বিষয় বর্জন করার মাধ্যমে। আর তা হলো, প্রথমত শিরক ও কুফরি থেকে বেঁচে থেকে ঈমান ও তাওহিদের নেয়ামত লাভ করা এবং আত্মিক রোগব্যাধি থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখা। আত্মিক রোগব্যাধি হলো রিয়া, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, অবৈধ যৌনাচার, কুপ্রবৃত্তি, ধনসম্পদ ও সম্মানের মোহ, লোভ-লালসা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে আত্মার গুণাবলি হলোÑ ইখলাস, খোদাভীতি, তাওয়াক্কুল, সবর, শোকর, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি, আল্লাহর প্রেম, বদান্যতা, নম্রতা ভদ্রতা, সততা ইত্যাদি।
একটি সৎ ও কল্যাণমূলক সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ে তোলা কখনও সম্ভব না, যদি ওই সমাজের মানুষগুলো সৎ ও খোদাভীরু না হয় এবং ওই গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে তাদের আত্মা পরিশুদ্ধ না থাকে। তাই একটি আদর্শ সমাজ গড়ার জন্য আদর্শ মানুষ তৈরি করা প্রয়োজন। আর আদর্শ মানুষ তৈরি হয় আত্মার সংশোধনের মাধ্যমে। যে সমাজের প্রতিটি জনগণ পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী হবে, সে সমাজে কখনও রাষ্ট্রদ্রোহী বা খোদাদ্রোহী কোনো কাজ সংঘটিত হবে না। কারও অধিকার খর্ব হবে না। কোনো অন্যায়- জুলুম-নির্যাতন হবে না। যার স্পষ্ট প্রমাণ রাসুলে করিম (সা.) এর যুগ, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ। অথচ রাসুলের আগমনের আগে এ যুগটিই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগকে রাসুলে করিম (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সোনালি ও আদর্শরূপে গঠন করেছেন একমাত্র ব্যক্তির আত্মার সংশোধনের মাধ্যমে। এটিই হচ্ছে কোরআন প্রদর্শিত পথ ও পন্থা। তাই আজও নব্য জাহেলিয়াতমুক্ত পরিশুদ্ধ ও পবিত্র সমাজ রচনা করতে হলে আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে পবিত্র কোরআনের নির্দেশিত পথেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজেদের আত্মা পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে একটি আদর্শ জাতি ও সমাজ গঠন করার তৌফিক দিন।