Wednesday, September 16, 2026
ইউরোপে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ছে মুসলিমদের
ইসলাম নিয়ে এই আতঙ্ক শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই; যুক্তরাষ্ট্রেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর যে ধরনের সন্ত্রাসবাদভিত্তিক ভয় প্রধান ছিল, এখন তার জায়গায় একটি নতুন ধারণা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—ইসলাম নাকি ইউরোপের ভেতর থেকেই ইউরোপকে দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যও ‘সভ্যতার বিলুপ্তি’ বা ‘সিভিলাইজেশনাল ইরেজার’-এর মতো ভাষা ব্যবহার করেছেন। এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাস্তবে ইউরোপে ইসলামের কোনো ‘দখল’ বা মুসলমানদের ব্যাপক উগ্রপন্থায় পরিণত হওয়ার ঘটনা ঘটছে না। ইউরোপীয় সংস্কৃতিও মুছে যাচ্ছে না। ইউরোপে ‘নো-গো জোন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, শরিয়াহ জাতীয় আইনে ঢুকে পড়ছে কিংবা কোনো পরিকল্পিত ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ বা বৃহৎ জনসংখ্যাগত প্রতিস্থাপন চলছে—এমন দাবিরও বাস্তব ভিত্তি নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসলামপন্থিদের কোনো ভুল-ত্রুটি নেই। ইউরোপের প্রকৃত ঝুঁকি দুটি ধরন থেকে আসছে—একদিকে রাষ্ট্রকে ইসলামি নীতির অধীন করার রাজনৈতিক মতাদর্শ, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর উগ্র ডানপন্থি ইসলামভীতি।ইউরোপের বামপন্থিরা ইসলামিজমের বাস্তব কিন্তু সীমিত হুমকিকে অস্বীকার করে সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে। একইভাবে মধ্যপন্থি রাজনীতিকরা বর্ণবাদের অভিযোগের আশঙ্কায় অনেক সময় নীরব থাকেন।
ইউরোপের জনসংখ্যার হিসাব দিয়ে ‘ইসলামি দখল’-এর ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ । সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলো থেকে অভিবাসন বেড়ে গেলেও ইউরোপের ৫০ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৬ শতাংশ। নতুন অভিবাসীদের সন্তানসংখ্যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি হলেও প্রজন্মের সঙ্গে তাদের জন্মহার সাধারণত স্থানীয়দের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে ইউরোপের সভ্যতা বা সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাস্তবসম্মত নয়।
অন্যদিকে অধিকাংশ মুসলিম অভিবাসী তাদের নতুন দেশে নিজেদের জীবন প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেই দেশকে তারা পূর্বের সমাজব্যবস্থায় রূপান্তর করতে চান—এমন ধারণারও সমর্থন নেই। তাদের সন্তানরা অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চেয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো করছে। উদাহরণ হিসেবে ব্রিটেনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালে ব্রিটেনে মানসম্মত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩৮ শতাংশ। ব্রিটিশ রাজনীতিতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ বেড়েছে—দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও লন্ডনের মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে মুসলিমরা রয়েছেন।
মুসলিমদের অনেক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যান্য ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে। ব্রিটিশ মুসলমানদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বিষয়ে বড় ধরনের বিরোধিতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম পরিচয় থাকা মানেই ইউরোপীয় সমাজের মূলধারার মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘাত—এমন সরলীকরণ যথার্থ নয়।
তাহলে কেন ইউরোপের এত মানুষ ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে— এই প্রশ্নও ওঠেছে। এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথা এসেছে। বিশেষ করে ইলন মাস্ক তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করেছেন এবং ইউরোপের ইসলামবিরোধী ডানপন্থী শক্তিগুলোকে উত্সাহিত করেছেন। ব্রিটিশ ইসলামবিরোধী কর্মী টমি রবিনসনের প্রসঙ্গও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
পপুলিস্ট ডানপন্থীদের প্রস্তাবিত সমাধানগুলো নিজেরাই সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পোশাক নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ মুসলমানদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পারে, তাদের সমাজের মূলধারা থেকে আরো দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং উগ্রপন্থীদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থাৎ ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত একই ধরনের বিভাজনকে আরো গভীর করে।
এ কারণে ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরামর্শ হলো—সহিংসতা ও সহিংসতার হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার নামে কোনো বিষয়কে আলোচনার বাইরে রাখা যাবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সহনশীলতার শত্রু নয়; বরং সেটিই সহনশীলতার পূর্বশর্ত। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক গোষ্ঠীর গোপন অনুপ্রবেশ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থাকলে তা প্রকাশ্যে আনতে হবে, আবার একইভাবে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষকেও মোকাবিলা করতে হবে।
তথ্যের গুরুত্বের ওপরও জোর দিয়েছে। সরকারের কাছে অভিবাসন, জনসংখ্যা ও সামাজিক পরিবর্তন সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা এবং তা প্রকাশ করা জরুরি। কারণ সরকার তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশে অনীহা দেখালে সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় অনুমান, অতিরঞ্জন ও ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্ব।
ইউরোপের মুসলমানরা ধীরে ধীরে সমাজের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। অতীতে ইউরোপে ক্যাথলিক, ইহুদি ও ক্যারিবীয় অভিবাসীদের নিয়েও একই ধরনের সামাজিক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল—তারা আদৌ নতুন সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে এসব জনগোষ্ঠী ইউরোপীয় সমাজের অংশ হয়ে উঠেছে। মুসলমানদের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া ঘটতে পারে—যদি বিভাজন, চরমপন্থা ও অযৌক্তিক আতঙ্ক সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে।
ইসলাম নিজে ইউরোপের জন্য কোনো অস্তিত্বগত হুমকি নয়; কিন্তু ইসলামিজমের উগ্র রাজনৈতিক রূপ এবং ইসলামভিত্তিক অযৌক্তিক ভয়—দুটিই ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামকে ঘিরে অতিরঞ্জিত ‘ইউরোপ দখল’, ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ বা ‘শরিয়াহর মাধ্যমে ইউরোপের পতন’-এর মতো ধারণাগুলোকেও তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট ও হিন্দুস্তান টাইমস

Thursday, September 10, 2026
সংসদে নামাজ নিয়ে জামায়াত এমপির বক্তব্য, ‘ধর্ম পালন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বললেন স্পিকার
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলেন মুজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘সংবিধানে একটা ধারা ছিল, আল্লাহর প্রতি ইমান এবং আস্থা সকল কাজের মূল উৎস। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এটাকে বাতিল করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ, তার চেয়েও বেশি মানুষ আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছে এবং মুসলমান বলে দাবি করি আমরা।’
সংসদে আসর ও মাগরিবের নামাজের জন্য দেওয়া বিরতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আপনি কিছুক্ষণ আগে আসরের এক আধা ঘণ্টা বিরতি দিয়েছেন। মাগরিবের সময়ও আরও আধা ঘণ্টা বিরতি দেবেন। টার্গেট হচ্ছে, আল্লাহর সেই বিধানকে যারা ঈমান এনেছে তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে।’
নামাজ মানুষের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘গোটা বাংলাদেশের মানুষ নামাজ যারা আদায় করে তাদের সম্মান করে। তাদের সৎ বলে জানে এবং তাদের ওপর আস্থা রাখে।’
কোরআনের আয়াতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। যাকাত ব্যবস্থা চালু হলে মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, যারা ক্ষমতা পাবে, আল্লাহ তায়ালা যাদের হাতে ক্ষমতা দেবেন, তাদের এক নম্বর কাজ হচ্ছে নামাজ চালু করে মানুষের চরিত্র ভালো করা এবং যাকাত চালু করে মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করা।’
তিনি সংসদে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা যাতে নিজেরা নামাজি হই, দেশে নামাজ কায়েম হয়, আমাদের সন্তানরা যাতে সাত বছর বয়সে নামাজের প্রশিক্ষণ পায় এবং ১০ বছর হলে তাকে প্রশাসনিকভাবেও নামাজি বানানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন।’
সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে মুজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘শুধু আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, সকল সংসদ সদস্যের এটা উপকারে লাগবে। ১০০ বছর পরে কেউ সংসদে থাকবে না। মাননীয় স্পিকার, আপনিও থাকবেন না, আমরাও থাকব না। কবরে গিয়ে কী অসুবিধা হবে, সেদিন টের পাওয়া যাবে।’
রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্পিকার যেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে দেশে সালাত কায়েম ও জাকাত ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে নাগরিকদের চরিত্র গঠন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার আবেদন জানান তিনি।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ধর্ম পালন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের বিষয়। প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে।
স্পিকার বলেন, ‘এটা তো পুরোই একটা ধর্মীয় ব্যাপার। প্রত্যেকের স্বাধীনতা রয়েছে নিজ নিজ ধর্ম পালন করার জন্য। এবং ইসলাম মানবতার ধর্ম।’
তিনি বলেন, ধর্ম সঠিকভাবে পালন করলে বেহেশত এবং ধর্ম পালনে অবহেলা করলে জাহান্নামে যাওয়ার বিষয়টি ধর্মীয় বিধানের অংশ। সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে অবগত এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে সংসদ থেকে কোনো নোটিশ জারি করে কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা যাবে না উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, ‘এটা সংসদীয় স্পিকারের নোটিশ দিয়ে বলবৎ করা যাবে না।’
একই সঙ্গে মুজিবুর রহমানের বক্তব্যের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে স্পিকার বলেন, ‘তবুও আপনি আপনার সেন্টিমেন্টকে আমরা সম্মান করি। এবং আমরা নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রদত্ত নির্দেশ মান্য করার জন্য সচেষ্ট থাকব।’
![]() |
| স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত |
Wednesday, September 9, 2026
ফাঁসির আতঙ্কে আ.লীগের পলাতক নেতারা, হাসিনার সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও হতাশা
নেতাদের এই ভয় ও ক্ষোভের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও লুকোচুরি করে দিন কাটানো এই নেতা নিজের হতাশা আর চেপে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক একটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশে ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার যে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আসাদুজ্জামান কামাল। নানকের এমন ফাঁকা আস্ফালনে ক্ষুব্ধ হয়ে কামাল বলেন, নানক বললেই কি ইচ্ছেমতো দেশে ফেরা যায়? তার গলায় ইতিমধ্যেই ফাঁসির দড়ি ঝুলছে। যদি এই ধরনের কঠোর আইনি নির্দেশ বা ফাঁসির সাজা নানকের ওপর থাকত, তবে কি তিনি এভাবে বুক ফুলিয়ে কথা বলতে পারতেন?
চরম আতঙ্কে দিন কাটানো আসাদুজ্জামান কামাল জানান, তার ওপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি ভয়ে আছেন যে, তার মুখ থেকে সামান্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বের হলেই তাকে ধরে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, তার তো ফাঁসি হবে, আর নানক বেঁচে যাবেন; তাই তিনি কোনোভাবেই এভাবে দেশে ফিরতে চান না। একসময়ের দাপুটে এসব মন্ত্রীরা আজ অর্থকষ্ট, পুলিশি গ্রেপ্তারের ভয় এবং বন্দিদশার মতো মানবেতর জীবন পার করছেন। অথচ বিপদের এই চরম মুহূর্তে শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে থাকলেও তাদের কোনো খোঁজ নিচ্ছেন না। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও আজ পুরোপুরি কোণঠাসা ও নেত্রীর সুনজর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
নেতাদের এই হতাশার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে শেখ হাসিনার একটি সাম্প্রতিক বার্তা। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দেন যে, তার অনুপস্থিতিতে দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও তার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রকাশ্য বিদ্রোহ দেখা দেয়। কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় গোপনে জড়ো হয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
ওই গোপন বৈঠকে আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজমসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা সরাসরি অভিযোগ করেন যে, শেখ সেলিম দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছিলেন এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ অত্যন্ত খারাপ। গত পনেরো বছরে তদবির ছাড়া কোনো দলীয় কাজে তাকে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে নেতারা বলেন, যিনি দলের সাথে সম্পর্ক রাখেননি তাকে সভাপতির দায়িত্ব দিলে কেউ তা মেনে নেবে না। দলের এই দুঃসময়ে শেখ সেলিমের বদলে অন্য নেতাদের মূল্যায়ন করার জন্য তারা শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেন।
সব মিলিয়ে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। একদিকে দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ড বা গ্রেপ্তারের নিশ্চিত আতঙ্ক, অন্যদিকে দলের প্রধান শেখ হাসিনার অবিবেচক সিদ্ধান্ত ও তাদের প্রতি চরম অবহেলা পুরনো নেতাদের দিশেহারা করে তুলেছে। বিপদের দিনে নেত্রীর এমন স্বার্থপর আচরণ ও কিছু নেতার আত্মপ্রচারের রাজনীতিতে তারা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। দলের ভেতরে তৈরি হওয়া এই গভীর ফাটল ও অনাস্থা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের অস্তিত্বকেই এখন চরম সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।
![]() |
| ছবি: উপরের বাঁ থেকে- আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক; নিচের বাঁ থেকে- মির্জা আজম ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। |
Tuesday, September 8, 2026
আয়শা ওয়াহাবের বিজয় আমেরিকার যে চেহারা তুলে ধরে by সালেহ উদ্দিন আহমদ
সম্প্রতি ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও অনেক সমালোচনা হচ্ছে। এসব নিয়ে আমিও অনেক সমালোচনামূলক কলাম লিখেছি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রর সবই কি নেতিবাচক? সবকিছুই কি সমালোচনার বিষয়? যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভালো ও ইতিবাচক দিকগুলো আমরা অনেক সময় এড়িয়ে যাই। নানাভাবে সমালোচিত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও আরেক যুক্তরাষ্ট্র আছে, যার উন্মুক্ত সুযোগ–সুবিধা অনেক আলোচনা থেকেই বাদ পড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুদ্ধ, আধিপত্য ও ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতির ধারক নয়। যুক্তরাষ্ট্র মানুষের স্বপ্ন গড়ারও দেশ। পৃথিবীর সব জায়গা থেকে মানুষ আসে এখানে স্বপ্ন গড়তে। কে কার ছেলে, কার মেয়ে, কোথা থেকে এসেছেন, এসব কোনো ব্যাপার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ নিজ নিজ মেধা দিয়ে নিজের স্বপ্ন গড়ে তোলে।
একজন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্ট ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করেছেন প্রথম সাত বছর, এখন তিনি বারোটা ম্যাকডোনাল্ডের মালিক। যাঁরা পেশাজীবী নন, তাঁদের অনেকেই ট্যাক্সি চালিয়ে বা ছোটোখাটো কাজ করে বাড়ি-গাড়ি কিনে ছেলেমেয়েদেরকে ভালো কলেজে পড়াচ্ছেন। তবে সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রে আইন মেনে আসতে হয় এবং আইন মেনে চলতে হয়।
বাংলাদেশিরা নিউইয়র্ক শহরের জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, পার্কচেস্টার এবং ব্রুকলিনের চার্লস ম্যাকডোনাল্ডে গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট বাংলাদেশ, তাঁরা সবাই নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছেন নিজেদের সাফল্য। পৃথিবীর কোন জায়গায় বাংলাদেশিরা পাবেন এই সুযোগ?
সুন্দর পিচাই ভারতের তামিলনাড়ুর এক মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তাঁর বাড়িতে একমাত্র ইলেকট্রনিকস যন্ত্র ছিল, একটা পুরোনো সাদাকালো টেলিভিশন। যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করে তিনি এখন গুগলের সিইও, তাঁর তিন বছরের পারিশ্রমিক প্যাকেজ ৬৯২ মিলিয়ন ডলার। অন্য দেশ থেকে আসা অসংখ্য পেশাজীবী মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, যাঁদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে রাজনীতিতেও আজকাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলমান অধিবাসী এবং তাঁদের সন্তানেরা দারুণভাবে উৎসাহিত এবং নিজেদের অবদান রাখছেন। তাঁদের অনেকেই মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দারুণ সাফল্য পাচ্ছেন।
বাংলাদেশি বংশধর রাজনীতিবিদেরাও পিছিয়ে নেই। হ্যানসেন ক্লার্ক প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, যিনি ২০১১ সালে মিশিগান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যপদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নুসরাত জাহান চৌধুরী এখন একজন ফেডারেল বিচারপতি।
বিভিন্ন রাজ্যের সিনেটর হিসেবেও বেশ কয়জন নির্বাচিত হয়েছেন—শেখ রহমান (জর্জিয়া), নাবিলা ইসলাম (জর্জিয়া), সাদ্দাম সালিম (ভার্জিনিয়া) এবং আবুল খান (নিউ হ্যামশায়ার) তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
উগান্ডা থেকে আগত এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান জোহরান মামদানিকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্ক শহরের নির্বাচিত মেয়র।
এটাই শুধু তাঁর পরিচয় নয়। মামদানি যে প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক, তাঁকে অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যেও আরও অনেক প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন এবং তাঁদের বেশ কয়জনের সাফল্য নিশ্চিত।
তাঁদের মধ্যে একজন আবদুল আল-সাইয়েদ, এক মিসরীয় অভিবাসী দম্পতির সন্তান, যিনি মিশিগানে প্রাইমারি নির্বাচনে জয়লাভ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জনমত জরিপে বর্তমানে তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন।
নভেম্বরে যদি তিনি সিনেটর নির্বাচিত হতে পারেন, তাহলে আবদুল আল-সাইয়েদই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলমান সিনেটর।
আজকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন মুসলমান রাজনীতিবিদকে নিয়ে কথা বলব, তাঁর নাম ড. আয়শা ওয়াহাব। তিনি এক আফগান শরণার্থী দম্পতির মেয়ে, যিনি ছোটকালে মা-বাবা হারিয়ে এক ফস্টার কেয়ারে (সরকারি তত্ত্বাবধানে পালিত হওয়ার ব্যবস্থা) বড় হয়েছেন। আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের একজন সম্মানিত সদস্য।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার এক ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য পদত্যাগ করাতে যে আসনটি খালি হয়, সেখানে বিশেষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আয়শা ওয়াহাব কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর জয় সহজ ছিল না। তাঁকে পরাজিত করার জন্য ইসরায়েলি লবি আইপাক চার মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।
কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪ কংগ্রেস এলাকা সান ফ্রান্সিসকোর জনগণ আয়শা ওয়াহাবকে বিপুলভাবে নির্বাচিত করেন তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে। এটা শুধু আয়শা ওয়াহাবের জয় নয়; যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির এক বিরাট জয় এবং ইসরায়েলি লবি যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি যে হারে সমর্থন হারাচ্ছে, তার একটা বড় উদহারণ।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর অভিবাসী ও তাঁদের ছেলেমেয়েরা যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন এবং প্রাথমিক নির্বাচন করে বড় দলগুলোর মনোনয়ন পাচ্ছেন। তাঁদের সাফল্য গর্ব করার মতো।
আফগানিস্তানে এখন মেয়েদের চলাফেরা অনেক সীমাবদ্ধ, লেখাপড়ার সুযোগ আরও সীমিত। আয়শা ওয়াহাব যদি আফগানিস্তানে বড় হতেন, তাহলে আজ আয়শার মেধা ও স্বপ্ন কোনোটাই বিকশিত হওয়ার সুযোগ হতো না।
১৯৮৭ সালে নিউইয়র্কে আয়শা ওয়াহাবের জন্ম। তাঁর বাবা-মা ছিলেন আফগান শরণার্থী। আয়শার খুব অল্প বয়সেই তাঁর বাবা আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান এবং এর কিছুকাল পরেই তাঁর মা মারা যান। এরপর আয়শা ও তাঁর বোনকে ফস্টার কেয়ারে নেওয়া হয়; পরবর্তী সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আফগান পরিবার তাঁদেরকে দত্তক নেয়।
আয়শা ওয়াহাব ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সমাজকর্মে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার আগে আয়শা প্রযুক্তি খাত, অলাভজনক সংস্থা এবং সামাজিক ও জনস্বার্থমূলক প্রচারণায় কাজ করেছেন।
তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় অবস্থিত হেওয়ার্ডে স্থানীয় রাজনীতি এবং সাশ্রয়ী আবাসনবিষয়ক প্রচারণায় ক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০১৮ সালে তিনি হেওয়ার্ড সিটি কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার আগপর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।
সাম্প্রতিক কংগ্রেস নির্বাচনে ইসরায়েল ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে আয়শার মতামত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এপ্রিল মাসে প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত এক ফোরামে তিনি বলেছিলেন যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যা ঘটছে, তাকে তিনি ‘গণহত্যা’ হিসেবেই বিবেচনা করেন।
তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হার্নান্দেজ অবশ্য তাঁর সঙ্গে একমত হননি। হার্নান্দেজও ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য, তাঁকে নির্বাচিত করার জন্য ইসরায়েলি লবি আইপাক বিপুল অর্থ ব্যয় করে। আইপাকের এই অর্থব্যয় বিফলে গেল, আয়শা ওয়াহাবই নির্বাচনে জয়লাভ করলেন।
এই জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরে প্রগতিশীল ও ইসরায়েলি সমর্থক অংশের মধ্যকার বৃহত্তর দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। এইবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অনেক ইসরায়েলপন্থী প্রার্থী কুপোকাত হয়েছেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ এখন দুই–তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচিত ইসরায়েলে অস্ত্রশস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীলেরা, বিশেষ করে মুসলমান রাজনীতিবিদেরা মার্কিন জনমতের সুযোগ নিয়ে এইবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অনেক ভালো করতে পারবেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকেও বাহবা দিতে হয়—ইলহাম ওমর, রাশিদা তালিব, লতিফ সাইমন, গাজালা হাশমি, জোহরান মামদানি, আবদুল আল-সাইয়েদ, আয়শা ওয়াহাবের মতো অপরিচিত নামের মুসলমান প্রার্থীদের ভোট দিয়ে তাঁরা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করছেন, বিশেষভাবে ইসরায়েলি লবি ও রিপাবলিকান পার্টি যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে অনবরত বিষোদ্গার করছে। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই তা সম্ভব, এই যেন আরেক যুক্তরাষ্ট্র!
* সালেহ উদ্দিন আহমদ। শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
![]() |
| ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সেনেটর আয়েশা ওয়াহাব। এএফপি |
Saturday, September 5, 2026
লংমার্চে বাধা এলে ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে :-নাহিদ ইসলাম
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ লংমার্চ আপামর জনতার। সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেয় তাহলে সব বাধা উপেক্ষা করে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে এবং ১১ দলের ৬ দফা দাবি এক দফা রূপ নেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক এক দফার জন্য সারাদেশের মানুষ লংমার্চ টু ঢাকায় এসে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগে লংমার্চে যাচ্ছি নতুন করে যারা স্বৈরাচার হচ্ছে, সেই পথ বন্ধ করার জন্য।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমাদের এই লংমার্চ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। যারা সিন্ডিকেট করে তেল-বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে—তাদের বিরুদ্ধে। এই লংমার্চ যারা ৭০ শতাংশ মানুষের ভোটের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তাদের বিরুদ্ধে।’
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, ‘১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বানে আজ এতো ভোরে যেভাবে নেতাকর্মীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল এতো ভোরে রাজপথে আসতে পারবে না।’ তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজনে তারেক রহমান সাহেব একটা সমাবেশ এতো ভোরে আহ্বান করে দেখতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজ-মাস্তানদের ভোট দিলে দেশ ভালো চলবে না তার দৃষ্টান্ত বর্তমান সরকার। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায় করা হবে, ইনশাআল্লাহ।’
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক বলেন, ‘সরকার জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। ক্ষমতার মসনদে বসে যদি জাতিকে ভুলপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে তাহলে টেনে নামাতে আমাদের হাত এক চুলও কাঁপবে না।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সরকার জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যর্থ হয়েছে। দিনে দিনে দুর্ভোগ বাড়ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। জনগণকে দেয়া সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সরকারকে সংসদে ভুল স্বীকার করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে চাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের এই লংমার্চ। যারা গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেনি এই লংমার্চ তাদের বিরুদ্ধে।
তিনি দেশবাসীকে লংমার্চে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘লংমার্চে বাধা আসলে ছয় দফা থেকে একদফা দাবিতে আন্দোলন দুর্বার গতিতে শুরু হবে।’

সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে :-নারায়ণগঞ্জে লংমার্চে শফিকুর রহমান
পথসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা রাজপথে নেমেছি গণভোট বাস্তবায়ন করার জন্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের জন্য। এই সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে, ভাঁওতাবাজি করছে। জনগণ তাদেরকে ক্ষমা করবে না।’
১১ দলীয় জোট জনগণের পাশে আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস, এই চেষ্টা আল্লাহ কবুল করবেন। আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গড়বো। আপনারা বিজয়ের শেষ হাসি হেসে ঘরে ফিরবেন।’
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লংমার্চ সফল হবে। তেল ও গ্যাসের দাম না কমালে এই সরকারকে গদি ছাড়তে হবে।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য আমরা কঠিন মুহূর্তেও প্রস্তুত আছি। সরকার প্রধানকে বলবো—এই জাতির পালস বুঝার চেষ্টা করেন, শেখ হাসিনা ৩ বার মানুষের ভোট নিয়ে খেলেছেন, তাই তাকে এই দেশের মানুষ ছক্কা মেরে বিদায় করেছে। ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে প্রতারণা করলে এই দেশের মানুষ লাল কার্ড দেখাবে।’
এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন, এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন এমপি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা, জুলাই গণহত্যার বিচার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবি সামনে রেখে ঢাকা-চট্টগ্রামমুখি লংমার্চ করছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

Thursday, August 27, 2026
পুরোনো জাহাজ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ালেন নেতানিয়াহু ও তার নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গভির
ইরগুন ছিল ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ও ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় সক্রিয় একটি ইহুদি আধাসামরিক সংগঠন। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে সংগঠনটির জড়িত থাকার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। ফিলিস্তিনিদের কাছে এ ঘটনা ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় হিসেবে পরিচিত।
সোমবার আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দেন বেন-গভির। তার ঘোষণার পরই বিষয়টি রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। দ্রুত ঘটনাস্থলে যান নেতানিয়াহুও। এরপর একই স্থান থেকে আলাদা ভিডিও বার্তা দেন দুই নেতা।
জাফার কাছে ইরগুনের হিব্রু নাম ‘এতজেল’-এর নামে প্রতিষ্ঠিত এতজেল জাদুঘরে গিয়ে নেতানিয়াহু আলতালেনার ইতিহাস তুলে ধরেন। তার দল লিকুদ নিজেদের ইরগুনের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দাবি করে।
কী হয়েছিল আলতালেনার
১৯৪৮ সালের জুনে ফ্রান্স থেকে ইরগুনের জন্য অস্ত্র নিয়ে ইসরাইলে আসে আলতালেনা। কিন্তু অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরগুন ও নবগঠিত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় ইসরাইলিদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে ওই সময়ের ইরগুন কমান্ডার মেনাখেম বেগিনের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি বাহিনী গুলি চালালেও বেগিন তার যোদ্ধাদের পাল্টা গুলি না চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এরপর নেতানিয়াহু বর্তমান সময়ের রাজনীতির সঙ্গে ওই ঘটনার তুলনা করেন। নিজের ও লিকুদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও ইসরাইলিরা পরস্পরের ভাই।
নাকবার রক্তাক্ত ইতিহাস
ইরগুনের সঙ্গে ইসরাইলের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার ইতিহাসও।
১৯৪৮ সালের এপ্রিলে জেরুজালেমের কাছে দেইর ইয়াসিন গ্রামে ইরগুন ও আরেক উগ্রপন্থি আধাসামরিক সংগঠন লেহির যোদ্ধারা হামলা চালান। নারী ও শিশুসহ শতাধিক গ্রামবাসী নিহত হন। এর আগে গ্রামটির সঙ্গে নবগঠিত ইসরাইলি বাহিনীর অনাক্রমণ চুক্তি হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন।
এর কয়েক সপ্তাহ পর জাফায় হামলা চালায় ইরগুন। শহরের প্রান্তে গোলাবর্ষণসহ ওই অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বাসিন্দা জাফা ছেড়ে পালিয়ে যান।
ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেও ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছিল ইরগুন। ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে বোমা হামলায় ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
তবে ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি মনে করেন, নাকবার সব দায় শুধু ইরগুনের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তার মতে, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ঘটনায় লেবার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জায়নবাদী আধাসামরিক সংগঠনগুলোরও প্রধান ভূমিকা ছিল।
নির্বাচনের আগে নতুন সমীকরণ
আলতালেনার ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়ার ঘটনা এমন সময়ে সামনে এল, যখন অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন নেতানিয়াহু। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তার দল লিকুদ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির পেছনে রয়েছে।
এই নির্বাচনে কট্টর উগ্রপন্থি ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর সেই ভোটারদের মধ্যে বেন-গভিরেরও শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তালের মতে, আলতালেনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ মূলত নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই। অধিকাংশ ইসরাইলি ভোটারের কাছে বিষয়টির তেমন গুরুত্ব নেই।
বার-তালের ভাষ্য, আলতালেনা আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে বেন-গভির নেতানিয়াহুকে কিছুটা চাপে ফেলেছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে রাজি হননি—এ বিষয়টিও সামনে আনেন বেন-গভির।
বেন-গভির নিজেকে মেনাখেম বেগিনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, অন্যরা যখন তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে চায় না, তখন বেগিনের মতো তিনিও সেই পরিস্থিতির স্বাদ জানেন।
‘বেন-গভির নেতানিয়াহুকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন’
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, ‘বেন-গভির নেতানিয়াহুর চেয়েও বেশি নেতানিয়াহু হয়ে উঠছেন।’
তার মতে, অন্য দেশের জনতুষ্টিবাদী নেতাদের মতো নেতানিয়াহু ও বেন-গভির—দুজনই নিজেদের সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত ও অন্যায়ের শিকার হিসেবে তুলে ধরতে চান। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে আরো জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।
ইসরাইলে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার সময়ে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলা মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণার অংশ বলে মনে করেন মেকেলবার্গ। তবে এমন বক্তব্যকে তিনি বিপজ্জনক বলেও সতর্ক করেছেন।
১৯৯৫ সালে প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন হত্যার আগে ইসরাইলে উসকানিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল—এমন দীর্ঘদিনের অভিযোগের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
মেকেলবার্গের মতে, নেতানিয়াহু সংকটের অনুভূতি জিইয়ে রাখতে এ ধরনের বক্তব্য ব্যবহার করেন। এরপর নিজেকেই সেই সংকট থেকে দেশকে উদ্ধারের নেতা হিসেবে তুলে ধরেন।
![]() |
| বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ইতামার বেন গভির। ছবি: সংগৃহীত |
Saturday, August 22, 2026
ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ইসলাম বিদ্বেষকে হাতিয়ার করছে ইসরাইল
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচারণা বেড়েছে। ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’-এর মতো উদ্যোগ এবং মুসলিমদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মসজিদে হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষমূলক রাজনীতি জোরদার হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়কার অবস্থানের সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বুশ একটি মসজিদে গিয়ে বলেছিলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু বর্তমান মার্কিন ডানপন্থি রাজনীতিতে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা অনেকটাই অনুপস্থিত।
ইসরাইলও এই রাজনৈতিক পরিবেশকে কাজে লাগাচ্ছে বলে মতামত নিবন্ধটিতে দাবি করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেরুজালেমে ইসরাইল আয়োজিত একটি ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী সম্মেলনে ইউরোপের বিভিন্ন কট্টর ডানপন্থি দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। নেতানিয়াহু সেখানে ‘র্যাডিক্যাল ইসলামের আগ্রাসন’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এসব রাজনৈতিক শক্তিকে মিত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রবণতার পেছনে ট্রাম্পপন্থি রাজনীতির পাশাপাশি ইসরাইলের জনসংযোগ ও ‘হাসবারা’ প্রচারণারও ভূমিকা রয়েছে। ইসরাইলি সরকার পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসীদের ঘিরে ভয় তৈরি করে নিজেদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে সামনে আনতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কানাডাতেও ইসরাইল-সমর্থিত একটি প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণার মাধ্যমে মুসলিম অভিবাসীদের হুমকি হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ উঠেছিল।
ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি সমালোচকদের মোকাবিলায় আরো আগ্রাসী প্রচারণার পথ বেছে নিয়েছে। এ প্রচারণায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ডানপন্থিদের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কও দৃঢ় হচ্ছে।
তবে ইসলামোফোবিয়া উসকে দিয়ে ইসরাইল পশ্চিমা জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে। মুসলিম প্রার্থীদের নির্বাচনী সাফল্যও দেখাচ্ছে যে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে।
নিবন্ধের শেষ দিকে বলা হয়, ভয় ও বিদ্বেষ সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে পারলেও তা পশ্চিমা সমাজে বিভাজন ও সহিংসতা আরো বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইসরাইল যদি পশ্চিমা সমর্থন ধরে রাখতে চায়, তাহলে ইসলামোফোবিয়াকে উসকে দেওয়ার পরিবর্তে সমতা, শান্তি ও রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোই বেশি কার্যকর হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোরও উচিত বিদেশি প্রভাব ও প্রচারণার বিষয়টি উপলব্ধি করে নিজেদের বহুত্ববাদী মূল্যবোধ রক্ষা করা।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Friday, August 21, 2026
স্বৈরাচারের পরিণতি বড়ই নির্মম by জালাল উদ্দিন ওমর
পৃথিবীতে আমরা সবাই ক্ষণিকের অতিথি। নির্দিষ্ট সময় পর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যায়। অর্থ, বিত্ত, আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং প্রভাব প্রতিপত্তি কোনোটাই মানুষের সঙ্গে যায় না। খালি হাতেই পৃথিবীতে মানুষের আগমন এবং খালি হাতেই বিদায়। একজন ভিখারি এবং প্রেসিডেন্টের বিদায় ও একই রকম। তবু কিছু মানুষ এই চিরন্তন সত্যকে ভুলে যায়। পৃথিবীতে প্রভাব-পতিপ্রত্তি এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যায়। এরা সত্যকে হত্যা করে, আইনকে মানে না এবং অন্যের অধিকার হরণ করে। নিজের স্বার্থকে হাসিল করতে মানুষের ওপর জুলুম করে। তারা মনে করে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী এবং কখনো পতন হবে না। দম্ভ এবং অহংকারে মানুষকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, যা ইচ্ছা তাই করে এবং শক্তির জোরে মানুষকে দমিয়ে রাখে। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি যে নিজেকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে চায় না। অবশেষে একদিন ধ্বংসের সময় এসে যায় এবং ধ্বংস হয়ে যায়। সব হারানোর পর তিনি ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু তখন শোধরানোর সময় থাকে না। ধ্বংসই হয় তার জীবনের অনিবার্য পরিণতি, যা তাকে ভোগ করতেই হয়।
সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষের মধ্যে সত্য-মিথ্যা লড়াই বিদ্যমান। কিছু মানুষ ন্যায় ও সত্যকে বর্জন করে অন্যায় এবং মিথ্যার পথে চলে। কিছু মানুষ অন্যায় ও মিথ্যাকে বর্জন করে ন্যায় ও সত্যের পথে চলে। ন্যায় ও সত্যপন্থিদের সঙ্গে অন্যায় ও মিথ্যাপান্থিদের দ্বন্দ্ব সংঘাত চলে। অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীরা প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সবসময় ন্যায় ও সত্যের অনুসারীদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও সত্যপন্থিদের বিজয় হয় এবং অন্যায় ও মিথ্যার অনুসারীদের পরাজয় হয়। অন্যায়ও মিথ্যার অনুসারীদের জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়, অপমান এবং লাঞ্ছনা। ইতিহাসের এই নিয়ম বহতা নদীর মতোই বয়ে চলছে। ফেরাউন সবসময় হজরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ওপর, নমরুদ সবসময় হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তার অনুসারীদের ওপর এবং আবু জেহেল ও আবু লাহাবরা সবসময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার অনুসারীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফেরাউন, নমরুদ, আবু জেহেল এবং আবু লাহাবদের করুণ পরিণতি হয়েছে। ইতিহাসে অভিশপ্ত এবং ঘৃণিত হয়েছে। যুগে যুগে সব স্বৈরাচারেরই করুণ পরিণতি এবং সবাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এরা মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান অর্জন করতে পারেনি বরং ঘৃণা এবং অসম্মানই অর্জন করেছে।
কিছু মানুষ সবসময় বিজয়ী হতে চায়। বিজয়ী হতে আইনলঙ্ঘন করে এবং সত্যকে হত্যা করে। কিন্তু সব বিজয় বিজয় নয় এবং সব পরাজয় পরাজয় নয়। কিছু বিজয় আসলে পরাজয় এবং কিছু পরাজয় আসলে বিজয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলে পরাজিত হলেও তা আসলে বিজয় এবং মিথ্যা ও অন্যায়ের পথে চলে বিজয়ী হলেও তা আসলে পরাজয়। কারবালায় ইয়াজিদ এবং পলাশীতে মীরজাফর বিজয়ী হলেও, তারা আসলে পরাজিতই হয়েছে। এজন্য বিশ্বজুড়ে ইয়াজিদ এবং মীরজাফর অতি ঘৃণিত এবং বাবা-মায়েরা সন্তানের নাম ইয়াজিদ এবং মীরজাফর রাখে না। কিন্তু ইমাম হোসেন (রা.) এবং সিরাজউদ্দৌলা সেদিন পরাজিত এবং মৃত্যুবরণ করলেও, দুজনেই বিশ্বজুড়ে অতি সম্মানিত । ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে সবারই শিক্ষা নিতে হবে।
প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা আছে। মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন, অবিচার এবং তাদের অধিকার হরণ করলে এর পরিণতি ভোগ করতেই হবে। যেভাবেই হোক জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এর প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এটি পৃথিবীর অতীত ইতিহাসের প্রমাণিত সত্য এবং আগামী দিনের অনিবার্য বাস্তবতা। জুলুম এবং অবিচার শুধু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এবং সমাজের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাই করে তা নয়। সবাই কিন্তু নিজ নিজ অবস্থানে ক্ষমতাবান। কারো ক্ষমতা ছোট এবং কারো ক্ষমতা বড়। সবাইকে নিজস্ব পরিমণ্ডলে অধীনস্থ মানুষগুলোর প্রতি সদয় আচরণ করতে হবে। জনগণের শাসক না হয়ে সেবক এবং জনগণকে শোষণ না করে সাহায্য করতে হবে। জনগণ না চাইলে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু ভোটাধিকার হরণ করে, বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে স্বৈরাচার হয়ে মানুষের অধিকার হরণ করা যাবে না। প্রত্যেকেই নিজ অবস্থান থেকে মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করলে বং কারো প্রতি জুলুম না করলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বÑসর্বত্রই শান্তি বিরাজ করবে। জালিম এবং স্বৈরাচার হয়ে মানুষের প্রতি অবিচার করলে পরিণতি নিশ্চিতভাবেই নির্মম ও করুণ হবে। এ দ্রুব সত্যটি সবারই বোঝা দরকার।
* লেখক : জালাল উদ্দিন ওমর, প্রকৌশলী, ইমেইল : omar_ctg123@yahoo.com
![]() |
| এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি। |
Thursday, August 20, 2026
টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও
বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
জুনের শুরুর দিকে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন গুলাম কেহার। টেক্সাসের আরভিংয়ে নিজের স্থানীয় মসজিদ ভ্যালি র্যাঞ্চ ইসলামিক সেন্টারে দিনের প্রথম নামাজ আদায় করে কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার কথা ছিল তার।
এর আগেও তিনি দায়িত্ব পালনে গিয়েছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে টেক্সাসে রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
টেক্সাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার সময় কিংবা পার্কে বসে থাকার সময় তাদের উদ্দেশে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিউস্টনের একটি বড় ইসলামিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কনরো শহরে এক নারী মুসলিম ক্রেতাদের বলেন, তারা ‘এই অঙ্গরাজ্য বা এই দেশে স্বাগত নয়’। ওই মন্তব্যের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীটি চাকরি হারান। পরে সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পান তিনি।
ডালাসের উপশহর ম্যাককিনিতেও একটি মসজিদ সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তপ্ত সিটি কাউন্সিলের শুনানির সময় এক নারী সাবেক মেয়রের জামার ভেতরে ইসলামবিরোধী বার্তা লেখা কাগজ ঢুকিয়ে দেন।
‘এমন পরিবেশে তাদের একা রেখে যাওয়া কিছুটা উদ্বেগের বিষয় ছিল,’ নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে বলেন কেহার। ‘বাইরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।’
পরে দায়িত্ব পালনের এলাকায় তার পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।
কেহারের মতো গত কয়েক দশকে টেক্সাসে বসতি গড়া মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে। ডালাসের দক্ষিণে ‘ডিসোটো হাউস অব পিস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মুসলিম সম্প্রদায়ের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
‘আমেরিকান মুসলিমদের জন্য এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা,’ বলেন তাম্মাম আলওয়ান। ডেট্রয়েট থেকে আরভিংয়ে চলে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করেছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে আরভিংয়ে পাঠান।’
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় যত বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও তত বেড়েছে।
‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতির অংশ। জাতীয় পর্যায়েও এই বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে। মুসলিম রাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে টেক্সাসের রাজনীতিকরা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা কিছু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। পূর্ব প্লানোর ইসলামিক সেন্টার বা এপিকের সদস্যরা ডালাসের পূর্বদিকে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মসজিদকেন্দ্রিক একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করলে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় এপিক সিটি । পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য মেডো’ রাখা হয়। প্রকল্পটিতে এক হাজারের বেশি বাড়ি, মসজিদ, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনমূলক স্থাপনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি নিয়ে ইসলামবিরোধী প্রভাবক অ্যামি মেকেলবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, টেক্সাসের বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোকে একটি সমন্বিত ‘দখল’-এর অংশ হিসেবে ‘আরব শপিং প্লাজা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এপিক সিটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের পতন হয়।’
তার প্রচারণা টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর অ্যাবট প্রস্তাবিত প্রকল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যীয় তদন্ত শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
প্রকল্পটির সমালোচকেরা এটিকে ‘শরিয়াহ-নিয়ন্ত্রিত’ বা মুসলিমদের জন্য আলাদা এলাকা হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত।
রিপাবলিকান কনভেনশনে শরিয়াহবিরোধী প্রপাগাণ্ডা
মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিস্তার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস স্টেট রিপাবলিকান কনভেনশনে ‘Don’t Sharia Our Texas’ বা টেক্সাসকে শরিয়াহমুক্ত রাখার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। একাধিক প্যানেলে মুসলিম ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও সম্মেলনে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনস্থলে টেক্সাস হাউসের নতুন ‘শরিয়াহ-মুক্ত ককাস’-এর একটি বুথও ছিল। সেখানে অ্যামি মেকেলবার্গের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হয়।
এক নারীর হাতে থাকা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার টেক্সাসকে শরিয়াহ আইনে শাসিত করো না। স্বাধীনতা রক্ষা করো। টেক্সাস রক্ষা করো।’
এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’
২০১৫ থেকেই শরিয়াহবিরোধী রাজনীতি
টেক্সাসে মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে আরভিংয়ের তৎকালীন মেয়র বেথ ভ্যান ডুইন শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। তিনি বর্তমানে কংগ্রেসের সদস্য।
এর দুই বছর পর, ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ডানপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি-র উদ্যোগে আনা একাধিক বিলের অংশ হিসেবে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা শরিয়াহবিরোধী আইন পাস করেন।
এরপর কিছু সময়ের জন্য কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসলাম ইস্যুর গুরুত্ব কমে যায়। অভিবাসন, মহামারি ও লিঙ্গ রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়।
কিন্তু পরে কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ নতুন করে এমন একটি বিতর্কিত ধারণা সামনে আনে—ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এপিক সিটি নিয়ে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ
রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শক অ্যান্থনি হোমের মতে, ইসলাম নিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্বেগ মূলত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তাদের ভীতিরই সম্প্রসারণ। গভর্নর অ্যাবটের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি যা কিছু করেন, তা জনমত জরিপ দ্বারা চালিত।’
এদিকে অ্যাবট মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় অজুর জন্য ব্যবস্থা রাখা টেক্সাসের বিমানবন্দরগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দেন। মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক অনুষ্ঠান বাতিলের নির্দেশও দেন তিনি।
একই সঙ্গে অ্যাবট জাতীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন। সংগঠনটি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, সিএআইআর-কে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মুসলিম নেতাদের অবস্থান
টেক্সাসের মুসলিম নেতারা কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততার পক্ষে। আবার কেউ মনে করছেন, শুধু নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।
ভ্যালি র্যাঞ্চ মসজিদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. ওমর সুলেইমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আমাদের কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছি, আমাদের কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিকভাবে আমাদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা সেটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’
তার মতে, এখন পরিস্থিতির জন্য ‘শক্ত অবস্থান’ প্রয়োজন এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।
‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাকে এসব মানুষের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে,’ বলেন তিনি। ‘আমাদের তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’
তিনি এমন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তবে কট্টর রক্ষণশীলরা কীভাবে সেই সুরক্ষা সীমিত করা যায়, তার পথ খুঁজছেন।
টেক্সাসে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে কিছু ইসলামি সাংস্কৃতিক চর্চা—যেমন বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয় বিধানভিত্তিক সালিশি ব্যবস্থা—নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য আইন ব্যবহারের কথা আলোচনা হচ্ছে।
সান অ্যান্টোনিওর রিপাবলিকান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালান স্কুলক্রাফট বলেন, ‘আমরা প্রথম যে বিষয়গুলো করার চেষ্টা করব, তার একটি হলো—ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেটি সংজ্ঞায়িত করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’
মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং সরকারি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও এর প্রকাশ ঘটছে।
সিএআইআর-এর অস্টিন শাখার শাইমা জায়ান বলেন, ‘আমরা ইসলামোফোবিয়ার ঢেউয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঢেউ।’
সব মিলিয়ে, টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম অধ্যুষিত কমিউনিটি গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অঙ্গরাজ্যটির মুসলিমদের ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Tuesday, August 18, 2026
পশ্চিমবঙ্গে পরপর তিন খুন ঘিরে উত্তেজনা, নিহতদের সবাই মুসলিম
পাশাপাশি রাঙ্কা পুরো ঘটনার একটি আদালতের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিহতের পরিবারের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এবং নিহত ব্যক্তির স্মৃতিতে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয় স্থাপনেরও দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিবারটির অভিযোগ, সিজেপির কর্মীর বৃদ্ধ বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ গত সপ্তাহান্তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে খুনের ঘটনায় রাজ্যে কিছুটা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত শনিবার রাতে নদীয়া জেলায় বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা ৫৪ বছর বয়সী আনিসুর রহমান এবং তাঁর ২৩ বছর বয়সী ছেলে আবু সুফিয়ানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের হাত। গত রোববার এই ঘটনায় পুলিশ স্থানীয় হরনগর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফাতেমা বিবি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাহেব আলী মণ্ডল ও মিঠু শেখকে গ্রেপ্তার করেছে। ঠিক এই সময়ই অর্থাৎ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক তাণ্ডব চলার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেন।
এই চারটি মৃত্যুর জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি স্বাভাবিকভাবেই এসব খুনের দায় এড়াতে পারে না; কারণ, তারা রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষ সরকারকে খুব একটা কোণঠাসা করতে পারেনি। কারণ, প্রধান বিরোধী মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া বাকি তিন বিরোধী অর্থাৎ সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ঋতব্রতপন্থী অংশ এখনো ঘর গুছিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে বিজেপির ওপর চাপ খুব একটা বাড়েনি। তবে পরপর এতগুলো খুন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রবল উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
বাঁকুড়ার ঘটনা
ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা দিল্লি থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ইন্দাসের কারিশুন্ডা গ্রামে এসে পৌঁছান এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মারা যাওয়া মোহাম্মদ মাফিকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন।
দুদিন আগে নিজের বাড়িতেই নির্মমভাবে পেটানোর পর মাফিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী। তাঁদের আসার ও এই ঘটনা নিয়ে আন্দোলনে নামার কারণ, নিহত মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ সিজেপির সদস্য। দিল্লিতে সিজেপির প্রতিবাদ চলাকালে তিনি সক্রিয়ভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।
রাঙ্কা জানিয়ে দেন, ১০ দিনের মধ্যে সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত আইনি ধারায় কঠোর সাজা দিতে হবে এবং ইন্দাস থানার পুলিশ কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও আদালত-পর্যবেক্ষিত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ, পুলিশ প্রশাসন পরিবারটির পাশে সঠিকভাবে দাঁড়ায়নি।
নিহত মাফিকের পরিবার রাজ্য সরকারের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ তাঁর বাবার স্মরণে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্কুল গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন।
হাফিজের কথায়, শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে এ ধরনের স্কুল তৈরি হওয়াই হবে তাঁর বাবার প্রতি সঠিক শ্রদ্ধাঞ্জলি। এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সিজেপি নেতা রাঙ্কা ঘোষণা করেন, তাঁরা হাফিজকে আর্থিক সহায়তা দেবেন এবং রাজ্যজুড়ে ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন গড়ে তুলবেন, একই সঙ্গে সময়সীমার মধ্যে আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে জেলা প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করারও হুঁশিয়ারি দেন।
নদীয়া জেলার ঘটনা
এরই মধ্যে নদীয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তৃণমূল নেত্রীসহ তিনজনকে শারীরিক পরীক্ষার পর আদালতে পেশ করে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে চায়। আদালত তাঁদের ৯ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শনিবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ কংগ্রেসের নদীয়া জেলা সম্পাদক আনিসুর রহমান তাঁর ছেলে, পেশায় আইনজীবী আবু সুফিয়ানকে নিয়ে গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন। একটি রেলওয়ে আন্ডারপাসের কাছে তাঁদের গাড়ি আটকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয় এবং পরে গাড়ি থেকে টেনে বের করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।
তদন্তের শুরুতেই পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ইঙ্গিত দিয়েছে, এই জোড়া হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অতুল ভি এই তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর নিশ্চিত করেছেন।
তবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য কী এবং এর পেছনে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা নিয়ে এখনই মন্তব্য করা তড়িঘড়ি হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।
![]() |
| নিহত কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান (বাঁয়ে) ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান ছবি: সংগৃহীত। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় বাড়ি ফেরার পথে এক কংগ্রেস নেতা ও তাঁর ছেলেকে কুপিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। নিহত ব্যক্তিরা হলেন আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান। গত শনিবার রাতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় এক পঞ্চায়েতপ্রধানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, কারাবন্দী তৃণমূল নেতা জব্বার শেখের পরিকল্পনা ও নির্দেশে এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর আগে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ জব্বারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমান, নিজের গ্রেপ্তারের বদলা নিতেই এই নেতার নির্দেশে প্রতিপক্ষ কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া পঞ্চায়েতপ্রধান ফাতেমা বিবি জব্বার শেখের স্ত্রী। রাজ্য সচিবালয়ে রোববার সাংবাদিকদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘তৃণমূলই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ আমাকে জানিয়েছে, জব্বার শেখ এখন জেলে আছে। জেল থেকেই সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। জব্বার শেখের স্ত্রীও গ্রেপ্তার হয়েছেন, যিনি তৃণমূলের পঞ্চায়েতপ্রধান।’ জব্বার শেখের স্ত্রী হরনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। তাঁর নাম ফাতেমা বিবি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাতে নদীয়ার নাগাদি রেলগেটের কাছে একদল দুষ্কৃতকারী বেথুয়াডহরী থেকে ফেরার পথে আনিসুর রহমানের গাড়ি আটকে বোমা ছুড়ে তাঁকে গাড়ির ভেতর থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে। স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে বেথুয়াডহরী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জব্বার শেখের গ্রেপ্তারের বদলা নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। |
Sunday, August 16, 2026
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন ফিলিস্তিনপন্থি ওকাসিও-কর্টেজ!
সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রকফেলার মেমোরিয়াল চ্যাপেলে দেওয়া এক বক্তব্যে ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো পদ বা আসন দখল করা নয়; বরং ‘দেশকে পরিবর্তন করা’। তার এ বক্তব্য উপস্থিত শ্রোতাদের ব্যাপক করতালির জন্ম দেয়। এরপর থেকেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ওকাসিও-কর্টেজের জন্য অনুকূল হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একটি অংশ পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বে হতাশ। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রবীণ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে সামনে রেখে প্রগতিশীল প্রার্থীদের সাম্প্রতিক কিছু নির্বাচনি সাফল্যও ওকাসিও-কর্টেজের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
জুলাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি জরিপে সম্ভাব্য ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের মধ্যে ওকাসিও-কর্টেজ এগিয়ে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। শুধু ইনস্টাগ্রামেই তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তার সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ)-এর মতো প্রগতিশীল সংগঠন থেকে শুরু করে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির মতো শীর্ষস্থানীয় নেতাও।
ডিএসএর কো-চেয়ার আশিক সিদ্দিকি বলেন, ওকাসিও-কর্টেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়লে সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হবে। তার মতে, ২০২৮ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে শ্রমজীবী মানুষের শক্তিশালী কণ্ঠ থাকা প্রয়োজন।
জাতীয় পরিচিতি তৈরিতে দীর্ঘ প্রস্তুতি
ওকাসিও-কর্টেজ ২০১৬ সালে বার্নি স্যান্ডার্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীতে নিজেই নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ২০১৮ সালে নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ১০ মেয়াদের কংগ্রেসম্যান জো ক্রাউলিকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন। তখন তিনি ছিলেন সাবেক বারটেন্ডার ও ওয়েট্রেস, নির্বাচনি প্রচারের জন্যও তার হাতে ছিল খুব সামান্য অর্থ।
তবে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সহায়তায় তিনি দ্রুত জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসেন। তার প্রথম নির্বাচনি চক্রেই প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকেও সাক্ষাতের অনুরোধ আসতে শুরু করে।
ওকাসিও-কর্টেজের সাবেক যোগাযোগ পরিচালক ও জাস্টিস ডেমোক্র্যাটসের সহপ্রতিষ্ঠাতা করবিন ট্রেন্টের ভাষ্য, ২০১৮ সালে ক্রাউলিকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহল তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করে। কিন্তু তিনি নিজে কখনো প্রেসিডেন্ট, গভর্নর বা সিনেটর হওয়ার কোনো দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করেননি।
ট্রেন্টের মতে, ওকাসিও-কর্টেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাভাবিকতা ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগকে তিনি নিজের ভাষায় তুলে ধরতে পারেন বলেই তার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক কৌশলবিদ ক্রিস স্কটও মনে করেন, তার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা—বিশেষ করে বারটেন্ডার হিসেবে কাজ করার অতীত—অনেক ভোটারের সঙ্গে তাকে সহজে সংযুক্ত করে। ক্রমেই মেরুকৃত মার্কিন রাজনীতিতে ভোটাররা এমন প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছেন, যাদের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পান।
প্রগতিশীলদের সমর্থন, আবার সমালোচনাও
গাজা ইস্যুতেও তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তিনি ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে কমলা হ্যারিসের গাজা নীতির প্রশংসা করায় বামপন্থী কর্মীদের একাংশ তার সমালোচনা করে।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ২০২০ সালের মহামারি-পরবর্তী সময়ের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও ‘পুলিশের অর্থায়ন বন্ধ’ করার মতো কিছু বামপন্থী দাবির প্রসঙ্গে ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, সেই সময়ের ‘ওয়োক’ রাজনীতি ছিল অতিরিক্ত উগ্র। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কিছুটা মধ্যপন্থী করার কৌশলও হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৮ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি যে কঠিন প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে, তা নিয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই। ওকাসিও-কর্টেজ প্রার্থী হলে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় থাকতে পারেন কমলা হ্যারিস, পিট বুটিগিগ, গ্যাভিন নিউজম, জন অসফ এবং প্রগতিশীল কংগ্রেসম্যান রো খান্নার মতো নেতারা।
২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে ওকাসিও-কর্টেজ মার্কিন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পাবেন—এমনকি থিওডোর রুজভেল্ট ও জন এফ কেনেডির রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারেন।
তবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন অংশের সমর্থন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বার্নি স্যান্ডার্সের ২০২০ সালের নির্বাচনি প্রচারের জাতীয় কো-চেয়ার নিনা টার্নার বলেন, ডিএসএ ও প্রগতিশীলরা কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের কাছে যথেষ্ট কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারেনি। তার মতে, ২০২৮ সালে ওকাসিও-কর্টেজকে জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হতে হলে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ ও সংগ্রামকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে।
দক্ষিণ ক্যারোলিনার ডেমোক্রেটিক কৌশলবিদ অ্যান্টুয়ান সিওরাইটের মতে, ওকাসিও-কর্টেজকে এমন ইস্যুতে মনোযোগ দিতে হবে যা সাধারণ আমেরিকান পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়কে সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরতে পারলে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন।
রিপাবলিকানদের আক্রমণও হবে বড় বাধা
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকান ও ডানপন্থী গণমাধ্যমের তীব্র আক্রমণের মুখেও পড়তে পারেন ওকাসিও-কর্টেজ। বহু বছর ধরে তাকে উগ্র বামপন্থী বা ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে চিত্রিত করে আসছে ডানপন্থী মহল।
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল যোগাযোগ পরিচালক তারা সেটমেয়ার মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ওকাসিও-কর্টেজের কিছু মন্তব্য তার অবস্থানকে মধ্যপন্থী দেখানোর কৌশল হতে পারে। তবে ইন্টারনেটের যুগে তার পুরোনো বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান সহজে হারিয়ে যাবে না।
সেটমেয়ারের পরামর্শ, সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে না গিয়ে ওকাসিও-কর্টেজের বরং নিউইয়র্কের সিনেট আসনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তার মতে, সিনেটর হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
তবে ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণও রয়েছে, যেখানে নেতারা ‘সঠিক সময়ের’ অপেক্ষায় থেকে সুযোগ হারিয়েছেন। আবার বারাক ওবামার মতো নেতারা সঠিক মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
![]() |
| নিউইয়র্কের কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ |
কুষ্টিয়ায় আমির হামজার গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর
এ হামলার জন্য গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত করছেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মহসীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণ অধিকার পরিষদের লোকজন আক্রমণ করেছে। তাঁদের সঙ্গে বিএনপির ছাত্রদল যোগ দিয়েছে। এমপি সাহেব (আমির হামজা) বাইরে থেকে আসছিলেন, ওরা ইটপাটকেল মেরে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙেছে। আমাদের লোকজন প্রতিহত করতে গেলে মারামারি হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে কেস (মামলা) করব।’
হামলায় আমির হামজা আঘাত পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে জেলা জামায়াতের আমির বলেন, ‘আঘাতপ্রাপ্ত হননি। এমপি সাহেব ওনার বাসায় আছেন। আমাদের লোকজন প্রটেকশন দিচ্ছে।’
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গণ অধিকার পরিষদ সম্পর্কে আমির হামজা একটি বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের জেরে গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আজ বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে প্রতিবাদ সভা করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে আমির হামজা নিজ গাড়িতে করে মোড় হয়ে পাশেই তাঁর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে স্লোগান দিতে থাকেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। তখন আমির হামজার গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের একাধিক গাড়ি ছিল।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ছয় রাস্তার মোড় অতিক্রম করার সময় গণ অধিকার পরিষদ ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের (এমপির গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা) মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। পাল্টাপাল্টি স্লোগানও চলতে থাকে। একপর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা আমির হামজাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। গাড়িটিও তাঁদের পেছন পেছন যেতে থাকে। দুই দলের নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে দুই পক্ষই ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ইটের আঘাতে আমির হামজার গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। গাড়ির আরও কয়েক জায়গায় ইটের আঘাত লাগে।
দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের সময় ছয় রাস্তার মোড় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। ঘটনার সময় পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সাথেই ছিলাম। এরই মধ্যে হঠাৎ করে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এমপি সাহেব বাড়িতে আছেন। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে।’
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আমির হামজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর গাড়িটি গ্যারেজে রাখা। তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। নেতা-কর্মীদেরও ভিড় ছিল। ওই সময় ৫০-৬০ জন নেতা-কর্মীকে লাঠিসোঁটা বের হতে দেখা যায়।
আমির হামজার মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তানভীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একটা অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। এমপি সাহেবের গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও র্যাবের গাড়ি ছিল। এমপি সাহেব চলে যাওয়ার সময় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা আক্রমণ করে। ইট দিয়ে গাড়িতে আঘাত করে। সদর থানার ওসির উপস্থিতি থাকা সত্বেও হত্যার উদ্দেশে এ আক্রমণ হয়। ইটের আঘাতে আমার পায়ে রক্ত ঝড়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন তাঁর ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, কুষ্টিয়ার এমপি আমির হামজা তাঁর এক বক্তব্যে গণ অধিকার পরিষদকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সেই বক্তব্যের প্রতিবাদে কুষ্টিয়ায় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল করলে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে গণ অধিকার পরিষদের ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন।
হাসান আল মামুন ফেসবুকে আরও লিখেছেন, ‘প্রিয় জামাত, আপনারা ভুলে গেছেন গণ অধিকার পরিষদের অবদান? সমস্যা নেই, সময় বলে দিবে আপনারা কোন পথে যাবেন! শেখ হাসিনার পথ আপনাদের ডাকছে।’
গণ অধিকার কার্যালয়ে হামলা
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমির হামজার সর্মথকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরের হাইস্কুল মার্কেটে গণ অধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে শহরের ছয় রাস্তা মোড়ের পাশে হরিপুর সংযোগ সেতুর নিচে যায়। সেতুর নিচে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। এতে শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে গেলে তাঁদের ওপর চড়াও হয় ভাঙচুরকারীরা।
এ বিষয়ে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় আমির হামজার সমর্থকেরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজন এসেছিলেন। তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। তাঁদের সামান্য কাটাছেঁড়া দেখা গেছে। ইটের আঘাত হতে পারে।
গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে
আমির হামজার ওপর হামলার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের ছেলেরা গিয়ে দুই পক্ষকেই সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা কখনোই চাইনি মারামারি হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমির হামজা গণ অধিকার ও আমাদের নিয়ে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছেন। এ জন্য গণ অধিকার ছয় রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করছিল। জামায়াত যে অভিযোগ করছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন। গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে।’
![]() |
| হামলায় আমির হামজার গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তোলা ছবি। প্রথম আলো |
Tuesday, August 11, 2026
দিল্লির চাপ সামাল দিতে ঝাড়খন্ডকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পুঁজি করছে বিজেপি
বিরোধীদের যে দাবিতে টানা তিন সপ্তাহ সংসদ অচল রয়েছে, সেই দাবিই এবার হাতিয়ার হলো কেন্দ্রের শাসকশিবিরের সদস্যদের। ঝাড়খন্ডের ঘটনার জন্য আজ কংগ্রেস নেতার রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে সরব হয়েছে বিজেপি। সংসদ চত্বর গম গম করে ওঠে সরকার ও বিরোধীদের মুখোমুখি বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি স্লোগানে।
এর ফলে আজও সংসদের উভয় কক্ষে স্বাভাবিক কাজ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও লোকসভা বা রাজ্যসভায় যাননি। টানা তিন সপ্তাহ সংসদে বিরোধীদের মুখোমুখি না হয়ে মোদি ও শাহ এক বিরল নজির সৃষ্টি করলেন।
সরকারপক্ষ জানিয়েছে, অমিত শাহ বিবৃতি দিতে রাজি। বিরোধীরা জানিয়েছেন, দায়সারা বিবৃতি নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, পেলেট গান ছোড়াসহ পুলিশকে অত্যাচারের নির্দেশ কে দিয়েছিল। আগামী বৃহস্পতিবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ দিন।
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে ঝাড়খন্ডের শিক্ষার্থীরা কিছুদিন ধরেই বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সময় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সদস্যদের পাশাপাশি অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতানেত্রীরা অনশন করেছিলেন, ঝাড়খন্ডে তেমনই অনশন করছেন ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতো।
নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, অপরাধীদের শাস্তিদান ও দুর্নীতির তদন্তের ভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে গতকাল সোমবার শিক্ষার্থীরা বিধানসভা ভবন অভিযানে শামিল হন। তা ঠেকাতে ঝাড়খন্ড পুলিশ জলকামান ছোড়ে। লাঠি চালায়। আজ সংসদ ভবন চত্বরে তা নিয়ে সরব হন বিজেপি ও এনডিএ সদস্যরা। পুলিশি অত্যাচারের জন্য পাল্টা তাঁরা রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। কংগ্রেস ঝাড়খন্ডে ইন্ডিয়া জোট সরকারের শরিক। ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) নেতৃত্বাধীন মোর্চায় কংগ্রেস ছাড়াও রয়েছে আরজেডি ও বামপন্থীরা।
দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশ, র্যাফ ও সিআরপিএফ লাঠি চালিয়েছিল, কাঁদানে গ্রাসের শেল ছুড়েছিল, পেরেক পোঁতা ও ইলেকট্রিক শক দেওয়া লাঠি (শক ব্যাটন) ব্যবহার করেছিল এবং পেলেট গান থেকে ছররা গুলি ছুড়েছিল।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ সিজেপি নেতারা সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীকে ওভাবে শক্তি প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছিলেন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই। সে কারণে তাঁর জবাবদিহির দাবিতে বিরোধীরা আজও সংসদ অচল রেখেছে।
বিরোধীদের দাবি, অমিত শাহকে জানাতে হবে ওই নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন কি না। না দিলে কে পেলেট গান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিল। বস্তুত, তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও অমিত শাহ সেই দাবি মানেননি। প্রধানমন্ত্রী মোদিও শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাননি।
ঝাড়খন্ডের ঘটনা নিয়ে আজ সকালে কোণঠাসা বিজেপি ও এনডিএ জোট সরব হয়ে ওঠেন। বিরোধীদের মতো তাঁরাও প্ল্যাকার্ড নিয়ে সংসদ ভবনে আসেন। কংগ্রেস নেতা রাহুলের ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে মুখর হন, যদিও রাহুল ঝাড়খন্ড সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন।
২০ জুলাই দিল্লিতে পুলিশি অত্যাচার নিয়ে মোদি-শাহ এখনো মুখ খোলেননি। কিন্তু রাহুল গতকালই রাঁচিতে পুলিশি লাঠি চালনার নিন্দা করে বিবৃতি দেন। গতকালই ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘ঝাড়খন্ডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগ ভুল সিদ্ধান্ত। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। একমাত্র আলোচনার মধ্য দিয়েই সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে।’
রাহুল রাজ্য সরকারকে অনুরোধ জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে দ্রুত সমস্যার সুরাহা করতে।
ইনস্টাগ্রামে রাহুল গান্ধী ‘আস্ক মি এনিথিং’ নামে এক অনুষ্ঠান করছেন। তাতে ঝাড়খন্ডের শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাহুল বলেন, ‘দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করছেন বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কোটা, দেরাদুন, এলাহাবাদে (প্রয়াগরাজ) আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও নিপীড়নমূলক। কেন্দ্রীয় সরকার, ঝাড়খন্ড সরকার বা কংগ্রেস সরকার, সবার উচিত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনা।’
শিক্ষার্থী আন্দোলন নিয়ে রাহুলের অবস্থান স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হলেও সংসদ ভবন চত্বরে বিজেপি সদস্যরা তাঁকেই আক্রমণের লক্ষ্য করে তোলেন। ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে মুখর হন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকেন বিরোধীরাও। তাঁরাও মুখর নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে। এক সময় ওইখান দিয়ে আসতে দেখা যায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদেরাকে। বিজেপি সদস্যরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন রাহুল কেন চুপ। জবাবে প্রিয়াঙ্কা বলেন, রাহুল পুলিশি অত্যাচারের নিন্দা করেছেন। ঝাড়খন্ডের পড়ুয়াদের সঙ্গেও দেখা করেছেন।
ঝাড়খন্ডের অনশনকারী ছাত্র নেতা দেবেন্দ্র মাহাতো গতকাল বিধানসভা অভিযানে শামিল হন অ্যাম্বুলেন্সে চেপে। পরে শরীর খারাপ হয়ে গেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেবেন্দ্র ১০ দিন ধরে অনশন করছেন। গতকাল গভীর রাতে তাঁকে ভিডিও কল করেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে।
পরে দিপকে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘দেবেন্দ্র মাহাতোর সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশের লাঠিতে আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ওকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বুকে ব্যথা অনুভব করছেন। যন্তর মন্তর হোক বা ঝাড়খন্ড, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এই বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা অমানবিক। সিজেপি দৃঢ়ভাবে দেবেন্দ্র ও তাঁর সংগ্রামের পাশে আছে। তিনি একজন প্রকৃত বীর। তাঁর সাহস ও শক্তিকে কুর্নিশ করি।’
ঝাড়খন্ড সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বারবার আলোচনা করেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, ৯৮ শতাংশ দাবি মানা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যে দুই দাবি মানতে সরকার নারাজ তার একটি হলো দুর্নীতির তদন্তের ভার সিবিআইয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া। অন্যটি হলো ঝাড়খন্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি) ও কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (সিজিএল) পরীক্ষা দুটি বাতিল করার।
এই দুই দাবি নিয়ে টানাপোড়েন চলছে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। রাজ্যে বিজেপি বিরোধী পক্ষ। তারা ছাত্রদের সমর্থনে ও পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে আজ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
![]() |
| সিজেপির সমর্থকদের ওপর পুলিশের দমন–পীড়ন ও রামমন্দিরের অর্থ লোপাটের প্রতিবাদের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য অভিনেত্রী জয়া বচ্চনসহ বিরোধী সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভ করেন। ১১ আগস্ট ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: এএনআই |
Monday, August 10, 2026
ডিনায়াল ও ডিফেমেশনের রাজনীতি by দিলশানা পারুল
আজকে দুই বছর পর, ২০২৬-এর জুলাই মাসেও একইভাবে দেখবেন, পুরো এই দুই বছর জুড়েই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে যে রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং এই দুই বছর যাবৎই যেটা করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা। এমনকি এই ছাত্র-জনতার প্রতিরোধগুলোকেও অস্বীকার করা এবং এই যে ঘটমান সত্যকে তারা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে, ডিনাই করে, এটি কোনো র্যান্ডম ঘটনা না; বরং এটা ডেলিবারেটলি দুই বছর ধরে করে আসা ঘটনা। এটাই তাদের সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান যে, আওয়ামী লীগের দ্বারা সংঘটিত সব অপরাধকে চোখ বন্ধ করে অস্বীকার করে ফেলতে হবে। তাহলে বোধহয় তাদের দায়মুক্তি ঘটে গেল। এটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান। অনেকটা এ রকম, যতক্ষণ অপরাধী অপরাধের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাধী অপরাধ ঘটিয়েছে—এর কোনো প্রমাণ নেই। আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এটা মনে করে এবং রিলিজিয়াসলি এটা চর্চা করে।
এটাই হচ্ছে অস্বীকার বা ডিনায়ালের রাজনীতি। খুব দুঃখজনকভাবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে গত দুই বছরে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্টেকহোল্ডার আরো অনেক দল এই অস্বীকারের রাজনীতিকে এনডোর্স করেছে, প্যাট্রোনাইজ করেছে।
আরো কতগুলো রাজনৈতিক গোষ্ঠী আছে, যারা আওয়ামী লীগের দ্বারা হত্যাকাণ্ডকে স্বীকার করে, কিন্তু তার বিপরীতে জুলাইয়ের সময় মাঠে যে ছাত্র-জনতার রেজিস্ট্যান্স ছিল, সেই প্রতিরোধকারী স্টেকগুলোকে ক্রমাগত অস্বীকার করে। জুলাই অভ্যুত্থানে পরিষ্কার দুটি ভাগ ছিল। একটা হচ্ছে শেখ হাসিনা রেজিম দ্বারা ছাত্র-জনতাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা আর দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে রাস্তায় ছাত্র-জনতার গড়ে তোলা রেজিস্ট্যান্স। আওয়ামী লীগ সরাসরি ডিনাই করে তাদের দ্বারা যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে সেটাকে আর বাংলাদেশের অপরাপর অনেক রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার তারা অস্বীকার করে ছাত্র-জনতার যে শক্তিটা মাঠে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তুলেছিল সেই অংশটাকে। তারা প্রধানত অস্বীকার করে মাঠের রেজিস্ট্যান্সের যে নিউক্লিয়াস ছিল, যারা খুব পরিকল্পিতভাবে অন্তত নিউক্লিয়াসের অংশটাকে সংগঠিত করেছে এবং দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই রেজিস্ট্যান্সের নিউক্লিয়াসটাকে তারা অস্বীকার করে। এটাও ডিনায়ালের রাজনীতিই। ঘটমান সত্যকে অস্বীকার করা।
এবার একটু দেখতে চাই ডিফেম বা কলঙ্কিতকরণের রাজনীতিটা কীভাবে ঘটেছে। তার আগে একটু বলে নিই, ডিফেম বা কলঙ্কিতকরণ কেন করা হয়। আপনি যখন কোনো কিছুর গ্রহণযোগ্যতাকে নষ্ট করতে চান, তখন সে বিষয় বা ব্যক্তিকে ধরে ডিফেম করবেন বা কলঙ্কিত করবেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে যদি ওই বিষয় বা ব্যক্তির ওপর কলঙ্ক আরোপ করা যায়, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতাকে সরাসরি নষ্ট করে দেওয়া যায় এবং রাজনীতিতে এটা খুবই কার্যকর একটা পন্থা। ঠিক এ বিষয়টিকেই আমরা দেখেছি জুলাই অভ্যুত্থানের আন্দোলন এবং তার পরবর্তী গত দুই বছর।
এবার একটু দেখতে চাই এই কলঙ্কিতকরণ প্রকল্পটা কী কীভাবে চলেছে
পুরো জুলাই মাসে ছাত্ররা যখন মাঠে আন্দোলন গড়ে তুলছে, তখন এটাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে জঙ্গিদের আন্দোলন হিসেবে।
আওয়ামী লীগ যেহেতু নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পোর্ট্রে করতে পেরেছিল, কাজেই এই আন্দোলনকে তারা ট্যাপ ইন করার চেষ্টা করল ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় হেরে যাওয়া শক্তি জামায়াত-শিবির-রাজাকারের চক্রান্ত হিসেবে’।
আন্দোলনের মধ্যে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে গেছে—এই ন্যারেটিভ মাঠে আমদানি করে। তবে এই কলঙ্কিতকরণ সবচেয়ে বেশি চলেছে ৫ আগস্টের পর। ৫ আগস্টের পর যেটি হলো, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারের পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে ছাত্র সংগঠনটি নেতৃত্বদানকারী এবং অন্যতম প্রধান সংগঠকের ভূমিকায় ছিল, সেই ‘ছাত্রশক্তি’ সংগঠনটিকে ভিলেন হিসেবে হাজির করা হলো। কোনো ধরনের ডকুমেন্ট এবং ঐতিহাসিক রেফারেন্স ছাড়া ছাত্রশক্তি সংগঠনটিকে বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, রাজনীতি না বোঝা, ক্ষমতালোভী একদল ছেলেমেয়ের ক্ষতিকারক ক্লাব হিসেবে হাজির করলেন। একটি লেজিটিমেট, শক্তিশালী নতুন ধরনের ছাত্র সংগঠনের ক্রেডিবিলিটিকে সম্পূর্ণভাবে ধসিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো এই কলঙ্কিতকরণের মধ্য দিয়ে।
আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারের নিচে ‘ছাত্র সমন্বয়ক’ এই পদটা। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত করা হয়েছে এই ছাত্র সমন্বয়ক দাবি করা এবং পরিচয়ে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আন্দোলনের যে সংগঠকরা ছিল, তাদের। সত্য-মিথ্যা জড়িয়ে অথবা বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ—এসব কিছু প্রয়োগ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়ক পদটাকে সম্পূর্ণভাবে কলঙ্কিত করা গেছে। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতিতে যে আন্দোলনের ব্যানারটা হতে পারত অসম্ভব শক্তিশালী একটা ব্যানার এবং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারত, তাকে সম্পূর্ণভাবে ধসিয়ে দেওয়া গেছে।
পরে এই অভ্যুত্থানের মধ্যে থেকে উঠে আসা ছাত্র নেতৃত্বরা যখন রাজনৈতিক দল করতে চাইল, সে রাজনৈতিক দলের সম্মুখভাগে থাকা নেতৃত্বদের একজন একজন করে ধরে ভিলিফাই করা হয়েছে, কলঙ্কিত করা হয়েছে। তার অর্থনৈতিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, পদবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত—এই ধরনের বহুবিধ সত্য-মিথ্যা অ্যালিগেশন এনে, যেগুলো পরে প্রমাণও করা যায়নি, এগুলো করার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক ফোর্সটাকেও খুব সফলভাবে কলঙ্কিত করা গেছে।
অভ্যুত্থানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে কলঙ্কিত করার জন্য বা ডিফেম করার জন্য কতগুলো মতাদর্শিক অবস্থানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন : অভ্যুত্থানপন্থি যে দলীয় রাজনৈতিক এবং নির্দলীয় রাজনৈতিক বর্গ বা এনটিটিগুলো ছিল, তাদের হরেদরে ডানপন্থি, উগ্রবাদী, নারীবিদ্বেষী, সংস্কৃতিবিদ্বেষী অথবা ধর্মবিদ্বেষী, শাহবাগি—এ ধরনের বিভিন্ন মতাদর্শিক কম্পাসের নিক্তিতে মেপে এই জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে ভিলিফাই করা হয়েছে এবং তারা সমাজের জন্য ক্ষতিকারক, এই মতাদর্শিক অবস্থানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়—সেটি প্রমাণ করা গেছে এবং এই মতাদর্শিক স্কেলে মেপে তাদের কলঙ্কিত করা হয়েছে, তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে খারিজ করা হয়েছে। রাজনীতির ময়দানে এই ডিনায়াল এবং ডিফেমেশন খুবই কার্যকর দুটি টুলস। অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে পারপেট্রেটর বা অপরাধী সব অপরাধকে যেমন ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, একইভাবে গণমানুষের রেজিস্ট্যান্সকে অস্বীকার করে গণমানুষের যে সম্ভাবনা, সেটাকেও ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
আর ডিফেমেশন বা কলঙ্কিতকরণ টুলসের মধ্য দিয়ে সব সম্ভাবনাময় যে বিপ্লবী বা পরিবর্তনকামী রাজনৈতিক ফোর্স ছিল, তাদের গণমানুষের সামনে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে হাজির করা হয়েছে। যেন গণমানুষের রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠার জন্য ন্যূনতম শর্তও মাঠে হাজির না থাকে।
* দিলশানা পারুল, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Sunday, August 9, 2026
দুই বছর পর প্রকাশ্যে শামীম ওসমান, করলেন কর্মীসভা by আবু সাউদ মাসুদ
প্রতিপক্ষের উদ্দেশে আক্রমণাত্মক বিভিন্ন মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই সাবেক সংসদ সদস্যকে নিউইয়র্কের ওই সভায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রকাশ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। দুই বছর পরে অবশেষে তাকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা গেল।
সভায় নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অনেকটা আত্মসমালোচনার সুরেই কথা বলেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যর্থ।’ একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শামীম ওসমানের বক্তব্যে অবশ্য পুরোনো রাজনৈতিক ‘খেলার’ প্রসঙ্গও ফিরে আসে। তিনি বলেন, কে বড় নেতা আর কে ছোট নেতা—এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; এখন প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অনেক আগেই তিনি দেশে কী হতে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরেছিলেন। তার দাবি, তিনি ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখতেন। বিএনপিকে নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।
নিউইয়র্কের সভায় শামীম ওসমান দাবি করেন, তার রাজনৈতিক মনোযোগের মূল লক্ষ্য ছিল এমন গোষ্ঠী, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মানে না। এ প্রসঙ্গে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা গোলাম আজমের নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। নিজের কার্যালয়ে দেশের বড় বোমা হামলার ঘটনাও স্মরণ করেন তিনি।
এরপর আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল সময়ের প্রসঙ্গ। শামীম ওসমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট রাতে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন তিনি সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া, কারফিউ প্রত্যাহার এবং নারায়ণগঞ্জে বড় ধরনের জনসমাবেশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে তার দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ জড়ো করার সক্ষমতা ছিল। আশপাশের এলাকাতেও খবর পাঠানোর কথা বলেছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস ছিল জনগণ। তবে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় শেখ হাসিনা রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন।
১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় শামীম ওসমানসহ ওসমান পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। ওই সময় সংঘর্ষ ও গুলিতে শিশু রিয়া গোপসহ বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হন। এসব ঘটনায় শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও ওঠে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির আলোচিত-সমালোচিত এই নেতাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এরপর তিনি দেশ ছাড়েন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার চলমান রয়েছে।
তবে নিউইয়র্কের কর্মীসভায় শামীম ওসমানের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন পর তাকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেখা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া।

Friday, August 7, 2026
গালি ও বিদ্রূপে ভ্যান্সের ‘ট্রল’ রাজনীতি
ইরান ইস্যুতে ভ্যান্সের অবস্থানের সমালোচনা করেছিলেন রক্ষণশীল কলাম লেখক মার্ক থিয়েসেন। এর কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করেন ভ্যান্স।
এক পোস্টে থিয়েসেন লিখেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের তালিকায় বুরিটো থাকলে দাম নিয়ে অভিযোগ করার প্রয়োজন নেই। এর জবাবে ভ্যান্স ইঙ্গিত করেন, থিয়েসেন হয়তো ক্যাফেটেরিয়ায় একাধিকবার বুরিটো নিয়েছেন।
ভ্যান্সের এই মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়। কেউ কেউ থিয়েসেনের পক্ষ নেন। তারা ভ্যান্সের নিজের ওজন কমানোর বিষয়টিও তুলে ধরেন। ভ্যান্সের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ পাউন্ড ওজন কমিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ নতুন নয়। তবে কোনো বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের সরাসরি শারীরিক কটাক্ষ বিরল।
সমালোচকদের ছাড় দেন না ভ্যান্স
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। তার আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছেন বামপন্থি সমালোচক থেকে শুরু করে নিজ দলের রক্ষণশীলরাও।
সমালোচকদের তিনি ‘বোকা’, ‘অযোগ্য’ বা ‘লজ্জাজনক’ বলেও মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য শুধু নীতির পার্থক্য নয়; অনেক সময় প্রতিপক্ষকে তিনি অসৎ বা অযোগ্য হিসেবেও তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদেরও আক্রমণ করেছেন ভ্যান্স। এবিসি নিউজের সাবেক প্রতিবেদক টেরি মোরানকে তিনি ‘বামপন্থি উগ্রবাদী’ বলে মন্তব্য করেন।
জিউইশ ইনসাইডারের সাংবাদিক জশ ক্রুশার সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি হয় ‘ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিক’, নয়তো ‘সবচেয়ে বোকা সাংবাদিক’।
নিজ দলের সমালোচকদেরও ছাড় দেননি তিনি। ইরান নীতি নিয়ে মন্তব্য করায় ডেভিড রিবোইকে তিনি ‘লুজার’ বলেন।
ডানপন্থি প্রভাবশালী লরা লুমারের সমালোচনা করে বলেন, তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে বিভেদ তৈরি করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া ভাষা
ভ্যান্সের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তার সরাসরি আক্রমণ ও কটু শব্দ ব্যবহারের কারণে।
এক পডকাস্টারের মন্তব্যের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি এই আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী বাজে কথাকে ঘৃণা করি।’
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে ট্রাম্প ও জেফ্রি এপস্টেইন সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের পর ভ্যান্স সেটিকে ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’ বলে মন্তব্য করেন।
স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিষয়ক মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিয়ে সিনেটরদের প্রশ্নের সমালোচনা করে তিনি লেখেন, আপনারা মিথ্যা বলছেন এবং সবাই তা জানে।’
পুরোনো রাজনৈতিক শিষ্টাচার থেকে আলাদা
ভাইস প্রেসিডেন্টরা ঐতিহাসিকভাবে অনেক সময় সরকারের আক্রমণাত্মক মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন। তবে সাধারণত তারা ব্যক্তিগত অপমানের ভাষা এড়িয়ে গেছেন।
আধুনিক যুগের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেকেই স্পাইরো টি. অ্যাগনিউর নাম উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সময়ে তিনি সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতেন।
তবে অ্যাগনিউয়ের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। ফলে তার বক্তব্য এত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও ছিল না।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে যথেষ্ট সংযত ছিলেন।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির যোগাযোগ পরিচালক কেভিন কেলেমস বলেন, ‘এটি এমন আচরণ, যা ওই পদের সঙ্গে মানানসই নয়।’
তার মতে, ভ্যান্সের আচরণ অনেকটা এমন, যেন তিনি জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য তরুণদের মতো আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের যোগাযোগ পরিচালক জামাল সিমন্স বলেন, ভ্যান্স হয়তো ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার জন্য নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করছেন।
সমর্থকদের দাবি, এটি ‘খোলামেলা রাজনীতি’
ভ্যান্সের সহযোগী ও সমর্থকেরা অবশ্য বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন।
তাদের দাবি, ভ্যান্স সাধারণ মানুষের মতো সরাসরি কথা বলেন। রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রচলিত ভদ্রতার বাইরে গিয়ে তিনি মানুষের বাস্তব উদ্বেগ তুলে ধরছেন।
ভ্যান্স নিজেও বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে সাধারণ মানুষের ‘ফিল্টারহীন ও বাস্তব মতামত’ শোনার সুযোগ দেয়।
গত বছরের শুরুতে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি তার প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্মের মানুষ হিসেবে তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে বিশ্বাস করেন।
তবে ভ্যান্স নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে সতর্ক ছিলেন। চলতি বছরের মে মাসে তিনি জানান, ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ হিসেবে কিছুদিনের জন্য এক্স অ্যাপ ফোন থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকার সময় তিনি বেশি মনোযোগী ও উৎপাদনশীল ছিলেন।
অন্য জায়গায় ভিন্ন ভ্যান্স
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক হলেও অন্য অনেক জায়গায় ভ্যান্স তুলনামূলক সংযত আচরণ করেন।
জুন মাসে প্রকাশিত তার বই Communion-এ নিজের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় যাত্রার কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান থেকে নাস্তিকতা এবং পরে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তিনি।
বইটির প্রচারে তিনি এবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ভিউ’-তে অংশ নেন। সেখানে মূলত উদারপন্থি উপস্থাপকদের সঙ্গে তার আলোচনা ছিল তীব্র, তবে ভদ্র।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জয় বেহার পরে বলেন, ভ্যান্সের রসবোধ রয়েছে। মতপার্থক্য থাকলেও তিনি মনে করেন, ২০২৮ সালে ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো আরো নমনীয় হতে পারেন।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব?
বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্সের এই আচরণ অনেকটা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে মিল রয়েছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু ও শত্রু—দুই পক্ষকেই আক্রমণ করে আসছেন। তবে ভ্যান্সের বিশেষত্ব হলো, তিনি সমালোচকদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে জড়িয়ে পড়েন।
গত বছর নিজের এক সহযোগী বাকলি কার্লসনকে নিয়ে আক্রমণের জবাবে ভ্যান্স লিখেছিলেন, তিনি মতপার্থক্য সহ্য করতে পারেন। কিন্তু তার কর্মীদের নিয়ে মিথ্যা আক্রমণ তিনি সহ্য করবেন না।
ভ্যান্স থামছেন না
ধর্মীয় কারণে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকলেও এখন আবার সক্রিয় হয়েছেন ভ্যান্স।
মার্ক থিয়েসেনকে নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্য দেখিয়েছে, আগের মতোই তিনি সমালোচকদের সরাসরি জবাব দিতে প্রস্তুত।
সমালোচনা থাকলেও ভ্যান্সের রাজনৈতিক কৌশলের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে এই সরাসরি, সংঘাতমুখী যোগাযোগ।
আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই আক্রমণাত্মক উপস্থিতি যে সহজে থামছে না, তা স্পষ্ট।
![]() |
| ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স |
Thursday, August 6, 2026
হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের প্রশ্ন।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।’
‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিলে’—এই প্রশ্নও রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পাঁচই আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সরকারি দল বিএনপির নেতৃত্বের মাঝেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।
বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না, নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তিনি।
ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।
দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই।’
‘বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ,’ মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
দুই বছর আগে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে সে সময় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান এনে ওই অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে যায়।
নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।’
একইসাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।’
এদিকে, ভারতের নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন, এমন খবর যখন আলোচনায় আসে, তখনই বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দিল্লিতে শেখ হাসিনা যাতে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালায়, সেজন্য ভারত সরকারের সহযোগিতা চান।
একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এছাড়া এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।
যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এরসাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক নেই। এবং সেখানে যে বক্তব্য আসবে, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরও নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং তাতে শেখ হাসিনা সরাসরি বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।
আর সেকারণে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে।
![]() |
| সালাহউদ্দিন আহমদ |
‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’
বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘তারেক রহমানের ডাকে সরকার পড়লে হাসিনা সরকার পড়ার কথা ছিল ২৮ অক্টোবর। তারেক রহমানের ডাকে ১০ লাখ লোক ঢাকা আসলো। পুলিশ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে ১০ মিনিটে ১০ লাখ পালাইয়া গেল। নেতা নাকি কর্মীরা আগে পালাইসিল, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আরও বড় প্রশ্ন, ১০ লাখ লোক কেমনে ১০ মিনিটে পালাইয়া যায়? এরা এসেছিল ক্ষমতার জন্য।
একজন মানুষও তারেক রহমানের ডাকে মরতে রাজি হয় নাই। একজনও না। নেতাও না। কর্মীও না। জুলাই আগস্টে মির্জা ফখরুলকে বারবার বলতে হইছে এই আন্দোলন আমাদের আন্দোলন না। আমরা এর সাথে জড়িত না। কারণ জুলাই বিএনপির আন্দোলন হইলে কোটি কোটি মানুষ এই আন্দোলনে আসতই না।
১৭ বছরে এক দফা কি কম দিসে?
একটা মানুষ পাত্তা দিসে?
দেয় নাই।
মানুষ যাইয়া শুনলো নাহিদ ইসলাম নামের অপরিচিত, অরাজনৈতিক একটা ছেলের কথা। ৩ আগস্ট নাহিদ ইসলামের এক দফাতেই সরকারের নৈতিক পতন হয়ে যায়। হাসিনা পরিবারের সবাই পালাতে শুরু করে ৩ তারিখ থেকেই। আর ৪ আগস্ট আসিফ মাহমুদ ঢাকা দখলের ডাক দেন। ৫ আগস্ট মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকার রাজপথ দখলে নেয়। শহীদ হয় দুইশরও বেশি মানুষ। বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনদিন পালাইতে হয় নাই। কারণ হাসিনা জানত, পুলিশের বাঁশি শুনলেই এরা পালাবে। ১৭ বছর তো তাই পালাইসে।
জুলাইয়ে কারা রাজপথে ছিল, সেটা ডকুমেন্টারিতে দেখানোর কিছু নাই। মানুষ দেখেছে জুলাইয়ে কে লন্ডনে ছিল, কে শিলং এ ছিল আর কে ঢাকায় ছিল। এই জেনারেশনের সাথে তামাশা করে লাভ নাই। জুলাইয়ের নেতা কারা, জুলাইয়ের ইমাম কে, বাংলাদেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় যাইয়া ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন, যান, ১০ সেকেন্ডে এই দেশের বাচ্চারা সাক্ষ্য দেবে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত আর আখতারদের নাম।
জুলাইয়ের ইতিহাসে এই প্রজন্মের অন্তরে লেখা আছে। দুই পয়সার ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই লেখা মুছতে পারবেন না। আপনাদের কর্মীরা হইলো ১০ মিনিটে সব রাইখা পালাইয়া যাওয়া বিড়ালের দল,
আর নাহিদের ডাকে যারা আসছিল, তাদের ব্যাপারে হাসিনার শুনতে হয়েছিল, একটা গুলি করি। একটা মরে, ঐ একটাই যায় স্যার। বাকিডি যায় না।
গুলি করে যেই জেনারেশনের সাথে হাসিনা পারে নাই, মিথ্যা ইতিহাস আর মিথ্যা ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই জেনারেশনকে মুছে ফেলতে চাওয়ার দু:সাহস কেমনে হয় আপনাদের?’

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












