Sunday, August 4, 2024

‘মগজখেকো’ অ্যামিবাতে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে গেল কেরালার কিশোর

‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবা’ সৃষ্ট রোগের কবলে পড়েও আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে ফিরেছেন ভারতের কেরালার ১৪ বছরের এক কিশোর। আফনান জসিম নামে দশম শ্রেণীর ওই শিক্ষার্থী বিশ্বের নবম ব্যক্তি, যিনি এই জীবনঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে গিয়েছেন।

মস্তিষ্কে আক্রমণকারী এই আণুবীক্ষণিক জীবাণু যে রোগ সৃষ্টি করে তাতে মৃত্যুর হার ৯৭ শতাংশ।

‘ব্রেন ইটিং অ্যামিবা’ বা মস্তিষ্ক ভক্ষণকারী অ্যামিবায় আক্রান্ত হয়ে কেরালার কোঝিকোড়ের এক হাসপাতালে ২২ দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান এই ভারতীয় কিশোর।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার সুস্থ হয়ে ওঠার পেছনে মূল কারণ হলো প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল এই রোগকে।

শুধুমাত্র আফনান জসিমই নন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় এই জীবনঘাতী রোগে আক্রান্ত যে আটজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রেও কারণ সেই একই- সময় মতো রোগ শনাক্ত করা ও চিকিৎসা শুরু করা গিয়েছিল।

প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোয়েন্সফালাইটিস (পিএএম) নামে পরিচিত এই রোগের জন্য দায়ী ‘নিগলেরিয়া ফওলেরি’ নামক অ্যামিবা- যাতে আক্রান্ত হলে জীবনের তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এর প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৭১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও পাকিস্তানের মতো চারটি দেশে এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েও এর আগে বেঁচে গিয়েছেন মাত্র আটজন।

গবেষণা বলছে, আক্রান্ত হওয়ার নয় ঘণ্টা থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে এই রোগ ধরা পড়লে তবেই বেঁচে ফেরা সম্ভব।

এই বিরল অ্যামিবার কারণে সৃষ্ট রোগের সাথে লড়াইয়ের পর বেঁচে ফেরা বিশ্বের নবম ব্যক্তি আফনান জসিমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল এবং সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

হঠাৎ এই কিশোরের তীব্র মাথা ব্যথা হতে থাকে। পরে তার খিঁচুনি শুরু হওয়ায়, আফনান জসিমের পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

চিকিৎসার প্রথম দু’দিন তিনি খিঁচুনির পরবর্তী অবস্থায় (এই রোগে আক্রান্ত হলে যে লক্ষণ দেখা যায় তার পর্যায় অনুযায়ী) ছিলেন।

কোঝিকোড়ের বেবি মেমোরিয়াল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভিস্ট ডা. আব্দুল রউফ বলছিলেন, ‘আফনানকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তত দিনে এই রোগে কেরালায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি মামলা আমাদের কাছে অনেক পরে রেফার করা হয়েছিল। ওই সময় আমরা সরকারকে জানাই যে এটা একটা জনস্বাস্থ্যমূলক সমস্যা এবং এর সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো উচিত।’

সময় মতো যে আক্রান্ত কিশোরের চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছিল তার কৃতিত্ব অবশ্য ডা. আব্দুল রউফ দিয়েছেন আফনান জসিমের বাবা এম কে সিদ্দিকীকে।

কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন ওই কিশোর?

আফনান জসিমের বাবা পশুপালন পেশার সাথে যুক্ত। ৪৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি জানান, দিন কয়েক আগে তার ছেলে কোঝিকোড় জেলার পায়োল্লি পৌরসভার অন্তর্গত টিক্কোটি গ্রামের একটা পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন।

এম কে সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গের কথা পড়ছিলাম, তখনই এই অ্যামিবা সম্পর্কে জানতে পারি। আমি সংক্রমণের কারণে খিঁচুনির কথাও পড়েছি। আফনানের খিঁচুনি শুরু হলে আমি তাকে স্থানীয় একটা হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপরেও ওর খিঁচুনি বন্ধ না হওয়ায় ওকে ভাদাক্কারার অন্য একটা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। ওই হাসপাতালের তরফেই আফনানকে বেবি মেমোরিয়াল হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয়।’

ছেলের খিঁচুনি বন্ধ না হওয়ার কারণ চিকিৎসকের কাছ থেকে জানতে চান সিদ্দিকী। এর আগে ওই কিশোরের এ জাতীয় কোনো সমস্যা হয়নি।

আফনানের বাবা বলেন, ‘আমি ডাক্তারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন ওর খিঁচুনি হচ্ছে, কারণ এর আগে তো কখনো খিঁচুনি হয়নি। ওই সময় আমি ডাক্তারকে বলেছিলাম, পাঁচ দিন আগে আফনান পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়েছিল। এরপরই ও মাথা যন্ত্রণার কথা বলে আর পরে জ্বরও আসে।’

কিভাবে মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছায় এই অ্যামিবা?
নাক দিয়ে মানবদেহে ঢোকে নিগলেরিয়া ফওলেরি। সেখান থেকে খুলির কাছে অবস্থিত ক্রিব্রিফর্ম প্লেটের মাধ্যমে পৌঁছে যায় ব্রেনে।

ডা. রউফ বলেন, ‘এটা এক প্রকারের প্যারাসাইট (পরজীবী) যা বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল নিঃসরণ করে এবং মস্তিষ্ককে নষ্ট করে দেয়।’

এই অ্যামিবা যে রোগের সৃষ্টি করে তার প্রধান লক্ষণগুলো হলো জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, গলা শক্ত হয়ে যাওয়া, সংজ্ঞা হারানো, খিঁচুনি এবং কোমার মতো পরিস্থিতিতে চলে যাওয়া। মাথার খুলিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে বেশিভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়ে থাকে।

ডা. রউফ বলেন, ‘মিষ্টি জলে, বিশেষত একটু উষ্ণ জলাশয়ে এটা দেখা যায়। তাই মনে রাখতে হবে কেউ যাতে যাতে জলাশয়ের জলে ঝাঁপিয়ে না পড়েন বা ডুব না দেন। এভাবেই কিন্তু ওই অ্যামিবা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে থাকে।’

বিষয়টা আরো বিশদে ব্যাখ্যা করেন ওই চিকিৎসক।

তার কথায়, ‘পানি দূষিত হলে অ্যামিবা নাক দিয়ে মানব শরীরে প্রবেশ করে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি দূষিত জলাশয় থেকে দূরে থাকা যায়। এমন কী সুইমিং পুল থেকেও দূরত্ব রাখা ভালো। অথবা সাঁতারুদের উচিত তাদের মুখ পানির ওপরে রাখা। পানি ক্লোরিন মেশানো খুবই জরুরি।’

তবে কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালুরুর কস্তুরবা মেডিক্যাল কলেজের তরফে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে নাইজেরিয়া এবং ম্যাঙ্গালুরুর নবজাতকদের মধ্যে নিগলেরিয়া ফওলেরি অ্যামিবা সংক্রমণ সেখানকার পানির উৎসর মাধ্যমে হয়েছে। এক্ষেত্রে গোসলের পানিও এই রোগের উৎস হতে পারে।

যারা বেঁচে গিয়েছেন
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এর তরফে পাকিস্তানের একটা বিশেষজ্ঞ দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে এই মগজ খেকো রোগে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বয়স নয় বছর থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

১৯৭১ সালে আফনান জসিমের মতোই অস্ট্রেলিয়ার ১৪ বছরের এক রোগী এই রোগে আক্রান্ত হলেও বেঁচে যান। তার লক্ষণের বিষয়ে তেমন জানা যায়নি।

এই তালিকায় দ্বিতীয় হলো এক নয় বছরের আরেক রোগী, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বাসিন্দা। তার শরীরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল তিন দিনের মধ্যে।

পরের ঘটনা ২০০৩ সালের। ওই বছর মেক্সিকোর ১৪ বছরের এক রোগীর শরীরে নয় ঘণ্টার মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।

এই তালিকায় থাকা চতুর্থ ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সেখানে এক ১২ বছরের এক রোগীর শরীরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে লেগেছিল দু’দিন।

২০১৫ সালে পাকিস্তানের যে রোগী এই রোগে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে ফিরেছেন, তার ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল তিন দিনে। রোগীর বয়স ছিল ২৫ বছর।

২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬ বছরের যে রোগী এই মস্তিষ্ক নষ্ট করে দেয়া অ্যামিবার কবলে পড়ে বেঁচে ফিরতে সক্ষম হয়েছিলেন তার শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল মাত্র এক দিনেই।

২০২৩ সালে পাকিস্তানের ২২ বছরের রোগীর ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ছিল দু’দিন।

এই তালিকায় নবম ব্যক্তি হলেন ভারতের এই কিশোর।

এর চিকিৎসা কী?
ডা. রউফ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পুরো বিশ্বে পিএএম-এর ৪০০টা ঘটনা সম্পর্কে জানা গেছে। ভারতে এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত হয়েছে ৩০টা ঘটনা। কেরালায় ২০১৮ ও ২০২০ সালে একটা করে ঘটনা সম্পর্কে জানা গেছে এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পাঁচজন আক্রান্ত হয়েছেন।’

জানা গেছে, আফনান জসিমের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘লাম্বার ট্রিটমেন্ট’ (কটিদেশীয় চিকিৎসা) এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল’ ড্রাগের (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ইত্যাদি সংক্রমণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ওষুধ) সংমিশ্রণ (অ্যাম্ফোটেরিসিন বি, রিফাম্পিন এবং অ্যাজিথ্রোমাইসিন) ব্যবহার করেছিলেন।

ডা. রউফ বলেন, ‘রোগীর সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুয়িডে এন ফোভালারি শনাক্ত করতে আমরা পিসিআর (পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন) করেছি। আমরা ওকে মিল্টেফোসিন (অ্যামিবা সংক্রমণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ওষুধ) দিয়েছিলাম, যা আগে পাওয়া কঠিন ছিল। এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে থাকলে সরকারের তরফে এই ওষুধ জার্মানি থেকে আমদানি করা শুরু হয়। ভারতে বিরল রোগের চিকিৎসার জন্য এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে এটা কিন্তু খুব একটা ব্যয়বহুল নয়।’

ধীরে ধীরে চিকিৎসায় সাড়া দিতে থাকেন ওই ছাত্র। চিকিৎসক আব্দুল রউফ বলেন, ‘প্রথম দিন খিঁচুনির কারণে রোগী খুব একটা সচেতন অবস্থায় ছিল না। তিন দিনের মধ্যে আফনানের অবস্থার উন্নতি হয়। এক সপ্তাহ পরে, আমরা আবার লাম্বার পাংচারের আশ্রয় নিয়েছি এবং নমুনার ফলাফল নেতিবাচক এসেছিল। আমরা ওকে একটা কক্ষে স্থানান্তর করে চিকিৎসা চালিয়ে যাই।’

আফনান জসিমের ওষুধ আগামী এক মাস চলবে। আপাতত সে বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছে আর আশা করছে দশম শ্রেণীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার।

কথা বলার সময় ছেলে আফনান সম্পর্কে একটা একটা বিষয় উল্লেখ করেন সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা আফনানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ভবিষ্যতে কী নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়। সে চিকিৎসকদের জানিয়েছিল নার্সিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করতে চায়। হাসপাতালে নার্সদের কাজ দেখে খুবই মুগ্ধ আফনান। সে ডাক্তারদের জানায়, রোগীদের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন নার্সরা। তাই ওর এই সিদ্ধান্ত।’
সূত্র : বিবিসি


আমার অচেনা দেশ by ড. এম সাখাওয়াত হোসেন

কোটা আন্দোলন নিয়ে লিখতে গিয়ে সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। খুব সুচিন্তিত লেখা হবে মনে করছি না। কারণ প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই আহত তরুণদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরা সবাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতি বল প্রয়োগ এবং নির্বিচারে গুলি আর টিয়ারশেলের আঘাতে হতাহত হয়েছেন। এই আন্দোলনের অগণিত তরুণদের জীবনহানি হলেও রংপুরের আবু সাঈদের নির্ভীক ভঙ্গিতে খালি হাতে বুক পেতে দেয়ার সেই জীবন্ত প্রতীকের মধ্যে বেঁচে থাকবে সব শহীদ। এ পর্যন্ত পত্রপত্রিকার হিসাব মতে ২১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং তা ক্রমাগত বাড়ছে। গুজবে প্রকাশ এর দ্বিগুণ হয়তো হবে মৃত্যুর সংবাদ। পত্রপত্রিকায় আরও একটি ছোট খবর প্রকাশ হলেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। খবরটি হলো যে, ঢাকার পুলিশ হাসপাতালের মর্গের এবং অন্যান্য হতাহতের রেজিস্ট্রার জব্দ করা হয়েছে। এ তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হলো যে, আরও হতাহতের তথ্য প্রকাশিত হোক তা যাতে জনসম্মুখে প্রকাশ না পায়। খবরটি অবশ্যই দুঃখজনক। এমন হওয়ার কথা নয়।

শুধু আবু সাঈদের মৃত্যুই নয় বেশির ভাগ মৃত্যুই হয়েছে গুলির আঘাতে এবং অর্ধেকের বেশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্র- যার মধ্যে কলেজ এবং স্কুলের ছাত্রও রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ছয় জন ছাত্রীও রয়েছেন। এ ধরনের এবং এসব মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যদিও সরকার একক বিচারপতির নেতৃত্বে আবু সাঈদের মৃত্যুর (যদি আমার অনুমান সঠিক হয়) বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের হুকুম দিয়েছেন; তবে এতগুলো আন্দোলনরত ছাত্রের মৃত্যুর প্রতিটির কোনো অনুসন্ধান হবে কিনা জানা যায়নি। যেমন জানা যায়নি- এ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সহিংসতার অনেক বিষয়। এসব মৃত্যুর কারণও হয়তো জানা যাবে না- বুলেটে না প্যালেটে। এ আন্দোলনে বেশ কিছু সংরক্ষিত স্থানে হামলা হলো আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করার বেশ কয়েকদিন পার হওয়ার পর। এর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন, ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের কেন্দ্র, বিআরটিএ ভবন। যেখানে ঢাকা শহর তথা অন্যান্য জেলার যানবাহনের বিভিন্ন ডিজিটাল খতিয়ান হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। বিআরটিএ ভবনের অদূরেই সেতু ভবন; সেখানেও ভাঙচুর এবং আগুন লাগানো হয়েছিল। প্রশ্ন থাকে, এসব স্থাপনা সংরক্ষিত স্থাপনা; যাকে নিরাপত্তার আলোকে ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন’ (কচও) হিসেবে লিস্ট পুলিশের হাতে থাকার কথা। এই স্থাপনাগুলোকে যেকোনো আন্দোলন অথবা নাশকতার মতো অবস্থা হলে এসব সংরক্ষিত স্থান (কেপিআই) অবশ্য নিরাপদ করার জন্য প্রতিরক্ষা করবার কথা। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করার কল্পে বাড়তি বা অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করার কথা। এরই আওতায় কারাগারও অন্তর্ভুক্ত- বিশেষ করে নরসিংদীর কারাগার। যেখানে বেশ কয়েকজন কথিত জঙ্গিরাও ছিলেন।

আমি কেপিআই বা সংরক্ষিত স্থাপনাগুলোর বিষয় আগেও বলেছি। এগুলো সময় সময় পরিবর্ধন এবং পরিবর্তন হতে থাকে। সংযোজন ও বিয়োজন হতে থাকে। যত নতুন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাড়তে থাকে তত বাড়তে থাকে তালিকা। এসব তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর, জেলা পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর নিকট রক্ষিত। আমার এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো দৃশ্যত এসব স্থাপনা, বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশন, ডাটা সেন্টার এবং বিআরটিএ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য কেপিআই বর্ণিত রক্ষা ব্যবস্থা ছিল কিনা? থাকলে ঘণ্টাব্যাপী কর্মকর্তাদের মতে, কথিত দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালালো কীভাবে? রাস্তায় নয়, হতাহত হওয়ার কথা ছিল ওই সব স্থাপনার আশপাশে তেমনটি শোনা যায়নি। জানা যায়নি- আক্রমণকারীদের কতোজন হতাহত হয়েছিল? কাজেই ধরে নেয়া হয় কেপিআই (কচও) হওয়া সত্ত্বেও এবং ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (ঝঙচ) থাকা সত্ত্বেও মেট্রোরেল স্টেশনসহ সব প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণে কেন ঝঙচ মানা হয়নি? এগুলো সংরক্ষণের ঝঙচ মোতাবেক কাদের বা কার দায়িত্ব ছিল? আমি মনে করি সরকারের এ বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। দুষ্কৃতকারীদের বিষয়ে তাদের খুঁজে বের করার আগে সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরির হোতাদের চিহ্নিত করা উচিত এবং ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণের জন্যও এ ধরনের তদন্তের প্রয়োজন। এসব স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা কেন প্রতিহত করা গেল না। অন্যতম স্থাপনা নরসিংদীর জেলা কারাগার আক্রমণ এবং প্রায় ৯শ’ কয়েদি যার মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক কথিত জঙ্গি- যেখানে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বেশ কিছু কয়েদি ছিল। কারাগারও নিশ্চয় সংরক্ষিত স্থাপনা বা কেপিআই (কচও)। এমন স্থাপনার সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে এটা রক্ষা কেন করা গেল না? এই আক্রমণের সময় কতোজন হতাহত হয়েছিল জানা যায়নি। প্রশ্ন থাকে কীভাবে (কতোগুলো) রাইফেল বা আগ্নেয়াস্ত্র লুট হলো। দুষ্কৃতকারী শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে এসব স্থাপনা অরক্ষিত কেন ছিল এবং কার ব্যর্থতা তা খুঁজে বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

মাত্র কয়েকদিন আগে চ্যানেল একাত্তরের একটা এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখলাম- যেখানে দৃশ্যত কথিত টোকাইরা অনায়াসে সেতু ভবনের খোলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রথমে গাড়িতে পরে হয়তো মেইন অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। অথচ সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তৎপরতাই দেখা যায়নি। ভবনটি মহাখালি ফ্লাইওভার সংলগ্ন। ওই এলাকায় ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসংখ্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দুষ্কৃতকারীরা কীভাবে নির্বিঘ্নে আগুন লাগিয়ে চলে গেল? এগুলো কিসের আলামত? প্রশ্ন হলো যে এরা কারা? ভবনের দায়িত্বে কারা ছিল এবং কেন সুরক্ষিত ছিল না? এর উত্তর কে দেবে?

এ লেখার মধ্যেই কয়েকটি প্রিন্ট মিডিয়ায় যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে ২১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে- যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ১৪৭ জনের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। তার মতে আরও বাড়তে পারে। এ ধরনের মৃত্যুর কথা এমন একটি দেশে, যে দেশ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীন হয়েছে। গণতান্ত্রিক বলে দাবিদার বাংলাদেশে অতীতে এমন মৃত্যুর খবর শোনা যায়নি। আমরা এখনো নিশ্চিত নই যে, কতোজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে মনে হয় কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা দেরিতে হলেও সঠিক তথ্য বের করে ফেলবে।

যাই হোক, কতোজনের মৃত্যু হয়েছে সেটা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো একটি জীবনেরও এভাবে অবসান গ্রহণযোগ্য ও কাম্য নয়। যেসব স্থাপনা নষ্ট হয়েছে যেগুলো আবার নতুনভাবে তৈরি করা যাবে তবে পৃথিবীর সমস্ত অর্থ দিয়ে আবু সাঈদ সহ যে দুই শতের বেশি, যার প্রায় ৭৫ ভাগ ছাত্র ও যুবক, তাদের কী আমরা ফিরে পাবো? এভাবে এত প্রাণ শুধুমাত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়া স্মরণকালের ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তারা হয়তো আইনের ফাঁকফোকর থেকে ত্রাণ পাবেন কিন্তু কোনোদিন কি বিবেকের অবক্ষয়ে জ্বলবেন না? ইতিহাস তা বলে না। ঝযড়ড়ঃ ঃড় করষষ? কেন? আমরা কি যুদ্ধে রয়েছি? পুলিশের হাতে স্বয়ংক্রিয় ৭.৬২ রাইফেল যার একটি বুলেট মানে নির্ঘাত মৃত্যু। পুলিশের হাতে এ অস্ত্র দেয়া হয় কোনো ইমার্জেন্সি মোকাবিলায়। প্রশ্ন কেন এভাবে পুলিশের অ্যাকশনে যেতে হবে। সে দৃশ্যগুলো যখন দেখেছি তখন আমার মনে হলো আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো ছায়াছবির দৃশ্য দেখছি। তবে প্রতিপক্ষ- ছাত্র-জনতার হাতের অস্ত্র ছিল ইটের টুকরো আর লাঠি, খুঁজছিলাম কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র- পাইনি অবশ্য। সরকার সমর্থিত ছাত্রদের কাছে দেখেছি। প্রশ্ন থাকে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানে গেল? এর জবাব কী শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেবে- না তাদের নিয়ন্ত্রকরা দেবেন? কেন আমাদের সাধারণ পুলিশের হাতে এমন স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র? আমরা এই পরিবর্তন দেখেছি তথাকথিত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর পর। সাধারণত নগর পুলিশের কাছে যে ধরনের সরঞ্জাম থাকে তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জলকামান সহ রঙিন পানির কামান, বড়জোর ছররা বন্দুক বা শটগান থাকার কথা। যদিও রয়েছে সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস- এগুলো অবশ্যই দাঙ্গা দমানোর হাতিয়ার কিন্তু আমরা যা দেখলাম তাহলো একতরফা যুদ্ধ। স্বাধীন দেশে এমন কিছু দেখবো ভাবিনি।

যুদ্ধের ময়দানেও যুদ্ধ করার কতোগুলো নিয়মনীতি থাকে; যেখানে যুদ্ধাহত অথবা আহত প্রতিপক্ষ সৈনিককে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হয়; কিন্তু এ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহতকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। এটা শুধু অমানবিকই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। এসব ধারণকৃত দৃশ্য বহির্বিশ্বে প্রচারিত হয়েছে। আমি জীবনের এতগুলো বছরে কোনো দেশের সাধারণ মানুষের আন্দোলনে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড বা অন্য অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখিনি। যা বাংলাদেশে গত জুলাই মাসে দেখলাম। আমি হতবাক।

এ সময়ে পৃথিবীর দুটি দেশে বেসামরিক জনগণের আন্দোলনে পুলিশের তৎপরতা দেখেছি। এর একটি আফ্রিকার দেশ কেনিয়া অপরটি ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। কেনিয়াতে শাসক রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটোর বিরুদ্ধে অব্যাহত আন্দোলনে পুলিশ- জনতার সংঘর্ষ চলেছে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস আর জলকামান ব্যবহার করেছে- কোথাও ৭.৬২ রাইফেল যত্রতত্র ব্যবহার করেনি। অকাতরে মানুষ মরেনি, মরেনি কোনো ছাত্র বা ছাত্রী। তথাপি একজনের মৃত্যু হয়েছে কথিত দুর্বৃত্ত পুলিশের ক্যানেস্তারে এবং একজন সাংবাদিক গান শটে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। এই আক্রমণকে ইচ্ছাকৃত বলা হয়েছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন সঙ্গে সঙ্গে সে দেশের ‘স্বাধীন পুলিশ ওভারসাইট অথরিটির’ কাছে দ্রুত তদন্ত চেয়েছে; যাতে ওই পুলিশকে দোষী সাব্যস্ত করে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।

আর একটি ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত এবং সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডে আহত হলেও ব্যাপক নিহত হওয়ার অভিযোগ না উঠলেও হানাহানিতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বলা হয়ে থাকে দু’পক্ষের সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে। তথাপি আমেরিকান অর্গানাইজেশন উদ্বিগ্ন। যাই হোক উপরের দু’টি দেশ যেখানে বেসামরিক মূলত রাজনৈতিক বিষয়ে সংঘর্ষ বিদ্যমান সেখানে এমন মৃত্যু ও আহতের মিছিল দেখা যায়নি। আগেও পত্রপত্রিকায় মৃত্যুর যে সংখ্যা পাওয়া গেল তার প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ ছাত্রছাত্রী এবং কয়েকজন স্কুলের এবং কোলের শিশুও রয়েছে। এদের সিংহভাগের মৃত্যু হয়েছে রাইফেলের গুলিতে। রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে এ ধরনের মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বের ইতিহাসে এমন মৃত্যুর উদাহরণ ১৯৮৯ সালে চীনের তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে ছাত্র ও জনসাধারণের রিফর্ম-এর দাবির বিরুদ্ধে প্রায় দশ হাজার ছাত্র-জনতার মৃত্যু হয়েছে বলে  কথিত। সেখানে আন্দোলন ও অকুতোভয় মৃত্যুর প্রতীক হয়ে অমর শহীদ হয়েছিলেন নাম না জানা এক তরুণ; যিনি দু’হাত প্রসারিত করে সেনাবাহিনীর ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন- তিনি ট্যাংক ম্যান নামে বিশ্বে পরিচিত। তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সের ছাত্র ছিলেন। বিশ্বের বহু জায়গায় এই ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছুটা হলেও রংপুরের ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ এমনই প্রতীক হয়ে পড়েছেন বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে প্রায় ২১৬ জনের মৃত্যু চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে যা ঘটে গেল- এত মৃত্যু, এত রক্ত, যেভাবেই চিত্রায়িত করুক না কেন এ হত্যাকাণ্ডে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃত্যু নিয়ে সুবিধাবাদীরা যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

উপসংহারে পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, সরকার বা সমাজের এক শ্রেণির মানুষ যারা ক্ষমতা ভোগ করছেন, তারা এ হত্যাকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব কতোখানি নেবেন? আর যারা ‘ট্রিগার চাপার’ সময় একবারও পরিণতির কথা ভাবেননি। হয়তো বলবেন, এটা ছিল তাদের দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব কি নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ট্রিগারে বিবেকহীনভাবে চাপ দেয়া? সংরক্ষিত স্থাপনাগুলো রক্ষার দায়িত্ব কি ছিল না? এত মৃত্যু, এত লাশ যাদের কারণে হয়েছে/পড়েছে- তারা কী কোনো না কোনো সময় বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হবেন না? নিজের সন্তানদের দিকে চোখ তুলে কীভাবে তাকাবেন। একবারও মনে হবে না তাদের এক সদস্যের আকুতি, ‘স্যার একটা মানুষ মারতে ক’টা বুলেট লাগে’ তখন ওই সদস্যের নিজের সন্তানের বুক ঝাঁঝরা হয়েছিল তারই কোনো সহকর্মীর গুলিতে। এর উত্তর খুঁজছি।

এখন হাজার হাজার তরুণ জেল হাজতে আর কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তারপরেও অভিযান থামছে না। একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস হওয়ার পর অধিকারের দাবিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং অভিভাবকদের ধৈর্য ধরার আকুতি জানাচ্ছি।

লেখক: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

রণক্ষেত্র সিলেট: মুহুর্মুহু গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল by ওয়েছ খছরু

সন্ধ্যা যখন নামছিল তখন অন্ধকার চারদিকে। এই অবস্থায়ও সিলেট নগরের প্রাণকেন্দ্র চৌহাট্টার চতুর্দিকের এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সংঘর্ষ চলছিল। ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছিল গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের শব্দ। এর আগে বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। প্রায় ৩ ঘণ্টা কয়েকশ’ রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে সিলেট নগর। নগরের হাওয়াপাড়া, তাঁতিপাড়া, রিকাবীবাজার, দরগাহ মহল্লা, জিন্দাবাজার, মীরবক্সটুলা, আম্বরখানা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। এ কারণে বাসাবাড়িতে আটকে থাকা বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাটের শাটার বন্ধ রেখে ভেতরে ভয়ে কাঁপছিল আশ্রয় নেয়া সাধারণ লোকজন। বাইরে শুধু শব্দ আর শব্দ। সেই সঙ্গে চিৎকারের শব্দ কানে ভেসে আসছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন; শত শত রাউন্ড গুলির শব্দ তারা বাসাবাড়িতে বসেই শুনেছেন। অনেকেরই দরোজা, জানালায় এসে ছররা গুলি লেগেছে। টিয়ারশেলের ঝাঁঝে বাসাবাড়িতে থাকা শিশু ও বৃদ্ধ লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিনের শুরুতে সিলেটের পরিস্থিতি শান্তই ছিল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী অভিভাবকদের গন্তব্যস্থল ছিল সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।  বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় কর্মসূচি। নানা ব্যানারে লোকজন এসে শহীদ মিনারে জমায়েত হয়ে কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। দুপুরে সেখানে অভিভাবক ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কর্মসূচি শুরু হয়। পুলিশের গুলি ও শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় তাদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবস্থান থাকতে থাকতেই সেখানে আসেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বেলা আড়াইটার মধ্যে হাজারো শিক্ষার্থী অবস্থান নেন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে।

এ সময় সেখানে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ- সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে বিএনপি’র এক দল  কর্মী-সমর্থক আসেন। তারাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এভাবে বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে চলে কর্মসূচি পালন। এ সময় সাঁজোয়া যান নিয়ে পুলিশের একটি টিম চৌহাট্টা এলাকায় অবস্থান করছিল। একই সঙ্গে আরেকটি টিম নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থান করে। এ ছাড়া চৌহাট্টাকে ঘিরে চতুর্দিকে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যুহ তৈরি করা হয়। ৫টার দিকে শুরু হয় সংঘাত। চৌহাট্টা ও শহীদ মিনার এলাকায় সড়কে থাকা শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে লাঠিচার্জ চালায় পুলিশ। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড সহ ছররা গুলি শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুরুতেই পুলিশের ছররা গুলি ও লাঠিচার্জে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী আহত হন। এ সময় পুলিশের কয়েকজনকেও রক্তাক্ত অবস্থায় ওই এলাকায় দেখা যায়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে নগরের হাওয়াপাড়া, তাঁতীপাড়া, জিন্দাবাজার, দরগাহ গেইট, রিকাবীবাজার, মীরবক্সটুলা এলাকায়। এতে করে কয়েকটি এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত পুলিশও কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে এসব এলাকায় শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে টিয়ারশেল, ফাঁকা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। নগরের হাওয়াপাড়া এলাকার গুলজার টাওয়ারের কয়েকজন বাসিন্দা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- টাওয়ারের বাইরে যেনো যুদ্ধ চলছিল। টাওয়ারের সামনে ও আশপাশ এলাকায় অবিরত গুলি ছোড়া হয়। ছররা গুলি এসে তাদের ঘরেও ঢুকে। এ সময় টিয়ারশেলের গন্ধে গোটা এলাকা ছেয়ে যায়। এতে করে মানুষজনও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা জানান- বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁতীপাড়ার একটি মসজিদের মাইক থেকে সাহায্য চেয়ে একজন মাইকিং করেছেন। বাইরে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হওয়ার কারণে তারা বের হতে পারেননি। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা চৌহাট্টা এলাকা থেকে এসে পাড়া- মহল্লায় আশ্রয় নেন। এ সময় পুলিশ এসে তাদের গলির ভেতরে ঢুকে গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। গোলাগুলির প্রকম্পিত শব্দে ঘণ্টাখানেক তারা বাসাবাড়িতেই বন্দি ছিলেন।

নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে পুলিশও সেখানে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিকালে সিলেট নগরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার কারণে নগরের সব দোকানপাট ও বিপণি বিতান বন্ধ করে দেয়া হয়। যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ী সহ স্থানীয়রা দোকানপাটের ভেতরেই বন্দি হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় সন্ধ্যার দিকে যখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছিলো তখন নগরের দরগাহ’র মূল গেইট থেকে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ সদস্যরা গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ শুরু করলে তারা চলে যায়। এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা নগরের আম্বরখানা এলাকা পর্যন্ত গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এদিকে সংঘর্ষের সময় সিলেটে পুলিশ, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, পথচারী সহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) আজবাহার আলী শেখ জানিয়েছেন, তাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ কয়েকজনকে আটক করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ  চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি। গতকাল সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কর্মসূচিতে এসে যুক্ত হয়েছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিব। তিনি জানিয়েছেন- পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি কী ঘটেছে তারা পরবর্তীতে সেটি জানাবেন। এছাড়া; কেন্দ্রীয় ভাবে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে সেটি পালনে তারা সিলেটে সক্রিয় থাকবেন বলে জানান। সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী ও নগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা জানিয়েছেন, ছাত্র- জনতার এই বিক্ষোভ গুলি করে দমানো যাবে না। জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। এদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সিলেটে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ আসছিল। নগরের লোকজন ভয়ে-আতঙ্কে ঘরবন্দি অবস্থায় ছিলেন।

সিলেট নগরের চৌহাট্টা এলাকায় ছাত্র-জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বিএনপি’র পদত্যাগকারী সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট শামসুজ্জামান জামান। মদিনা মার্কেটে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ: জামায়াত-শিবিরের ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে গতকাল সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেটে শান্তি সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ। স্থানীয় ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এ শান্তি সমাবেশ করা হয় বলে জানিয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বিজিত চৌধুরী। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন; শান্তি সমাবেশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহ ফরিদ, নাজনিন হোসেন, নগরের সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন, ফয়জুল আনোয়ার আলাউর, আব্দুল খালিক, স্থানীয় কাউন্সিলর জগদীশ চন্দ্র দাস, জেলা যুবলীগ সভাপতি শামীম আহমদ ভিপি, নগর যুবলীগ সভাপতি আলম খান মুক্তি সহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জেলা ও নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি: ব্যবস্থা চেয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের চিঠি

বাংলাদেশে সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনকে চিঠি লিখেছেন ২২ জন সিনেটর ও কংগ্রেসম্যান। এতে তারা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন সম্প্রতি ছাত্রদের বিক্ষোভ দমন করতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ব্যবহার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সহিংসতা ও সংঘর্ষে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে। তারা গত ৭ই জানুয়ারি নির্বাচনের ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জানুয়ারিতে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অবনতিশীল গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। ক্ষমতাসীন দলের এবং বিরোধী রিপাবলিকান উভয় দলের সদস্য রয়েছেন তাদের মধ্যে। ২রা আগস্ট লেখা ওই চিঠিতে তারা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহে সারা বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। এতে বর্তমান সরকারের অধীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এই চিঠির উদ্যোক্তা সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মারকি (ডেমোক্রেট-ম্যাচাচুসেটস), প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জিম ম্যাকগভার্ন ও বিল কেটিং। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অন্যরা হলেন- সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন (ডেমোক্রেট), ডিক ডারবান  (ডেমোক্রেট), টিম কেইন (ডেমোক্রেট), টামি বল্ডউইন (ডেমোক্রেট), জেফ মারকি (ডেমোক্রেট) এবং ক্রিস মারফি। এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হলেন- শেঠ মুলটন, লোরি ট্রাহান, জো উইলসন, দিনা তিতাস, গ্রেস মেং, গেরি কনোলি, গাবি আমো, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, ইলহান ওমর, নিদিয়া ভেলাজকুয়ে, ড্যান কিলডি, বারবারা লি এবং ডেলিগেট জেমস মোইলান। চিঠিতে তারা লিখেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে খর্ব করে এমন পদক্ষেপ অব্যাহতভাবে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে আছে জানুয়ারিতে ভয়াবহ ত্রুটিপূর্ণ এক নির্বাচন। শ্রমিকদের বিষয়ে বিধান উন্নত করতে ব্যর্থতা। আর অতি সমপ্রতি গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহভাবে দমনপীড়ন চালাচ্ছে। এই চিঠিতে জোর দিয়ে বলা হয়, এসব উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং অব্যাহতভাবে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে আমরা  আশা  করি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে জোরালো সম্পর্ক আছে তার প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে সমুন্নত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে উদ্যোগ নেবেন আপনি। সব রকম সহিংসতার অবশ্যই নিন্দা জানাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। নিশ্চিত করতে হবে নাগরিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতাকে। এর মধ্যে আছে মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে উপরে বর্ণিত নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিতে হবে। উপরন্তু গণতন্ত্রের আরও অবনতি রোধ করার জন্য বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সরকারের বিষয়ে বাংলাদেশি জনগণের অধিকারকে সমর্থন করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। যে সরকার জনগণের মানবাধিকার ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখবে।  উল্লেখ্য, সিনেটর মারকি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এর মধ্যে আছে- শান্তিতে নোবেল  পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানি বন্ধে এ বছর জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি ও তার সহকর্মীরা চিঠি লিখেছেন। একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে সরকারের সমালোচকদের টার্গেট করতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে নিয়ম লঙ্ঘন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সিনেটর মারকি ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার। একই সঙ্গে তাদেরকে ভাসানচরে পুনর্বাসন স্থগিত করার আহ্বান জানান, যতক্ষণ ওই স্থানকে জাতিসংঘ নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী বলে নিশ্চয়তা না দেয়।

সংঘর্ষ হামলা গুলি: সিলেট, কুমিল্লা, জামালপুর রণক্ষেত্র, চট্টগ্রামে মন্ত্রীর বাসায় হামলা, গাজীপুরে নিহত ১

দেশের বিভিন্ন জেলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে হামলা, সংঘর্ষ ও গুলি এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্নস্থানে। সংঘর্ষের  মধ্যে পড়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম জাহাঙ্গীর আলম। তিনি লেপ-তোষকের ব্যবসা করতেন। পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওদিকে কুমিল্লায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে ৯ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সিলেটে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও ছররা গুলিতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এ সময় শিক্ষার্থীদের পাল্টা ইটপাটকেলে পুলিশের কয়েকজন আহত হন।

জামালপুরে শিক্ষার্থীদের নিপীড়নবিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। এসময় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল ছুড়ে পুলিশ। এতে  ১০  শিক্ষার্থী আহত হন।
এদিকে রাতে চট্টগ্রামে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনে। একই সময়ে স্থানীয় এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে হামলা করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগের গুলি গুলিবিদ্ধ ৯, আহত অর্ধশত, এসিল্যান্ডের গাড়িতে আগুন
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, কুমিল্লায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে ৯ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। শনিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইন ও রেসকোর্স এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চান্দিনা এসিল্যান্ডের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে চান্দিনা ইউএনও বলেছেন এটি দুর্বৃত্তরা পুড়িয়েছে, শিক্ষার্থীরা নয়।
সরজমিন দেখা যায়, দুপুর ১টায় কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইনে অবস্থান নিয়েছিলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে শিক্ষার্থীরাও পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়ে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। গুলিবিদ্ধরা হলেনÑ  কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কোটা আন্দোলনকারীর সমন্বয়ক জন্নাতুল মিলি (২০), রেসকোর্স এলাকার মনিরুল হকের ছেলে মাহাবুবুল হক (২০), রামমালা এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে আরেফিন (২০), ঠাকুরপাড়া এলাকার শাহাদাতের ছেলে রাহাতুল হাসান মৃদুল (১৭), জুয়েলের ছেলে আরফান মজুমদার (১৬), দিলীপের ছেলে সৌরভ (২৫), আবদুল করীমের ছেলে মারুফ (১৬), ফরিদ উদ্দিনের ছেলে আসিফ (১৮), ইউসুফ মিয়ার ছেলে সুজন (১৮), তোফায়েলের ছেলে সানি (১৮)। আর আহতরা হলেনÑ কুমিল্লা নগরীর কাপ্তানবাজার এলাকার মিজানুর রহমানের ছেলে নাজমুল রহমান (২৭), টমসমব্রীজ এলাকার মহিন উদ্দিন মিয়ার ছেলে শাওন (৪২), বাগিচাগাঁও এলাকার জলিল মিয়ার ছেলে মিরাজ (১৭), ধর্মপুর এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে অপু (৩২), মুনাফের ছেলে সবুর (৩০), রানীর দীঘির পাড় এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে রাব্বি (১৬), মনোহরপুর এলাকার খোকনের মেয়ে আছিয়া (১৮), দৌলতপুর এলাকার জব্বারের ছেলে সফিক (৬০)সহ আরও অনেকে চিকিৎসাধীন আছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলের ব্যানারে অনুষ্ঠিত এ গণমিছিলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এতে কুমিল্লা জিলা স্কুল, কুমিল্লা ইবনেতাইমিয়া স্কুল, কুমিল্লা হাই স্কুল, কুমিল্লা মডার্ন স্কুল, ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

জানা যায়, কুমিল্লা সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র সৌরভ চক্রবর্তী নিহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। তবে সৌরভ এখন কুমেকে চিকিৎসা শেষে ঢাকা চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছে বলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা শেখ ফজলে রাব্বি নিশ্চিত করেছেন। গুলিবিদ্ধ মৃদুলের বাবা শাহাদাত বলেন, আমার ছেলেকে কতো মানা করলাম তাও গেল এ দেশের স্বার্থে। এখন আমার ছেলের একটি চোখে গুলি লেগেছে। কাল অপারেশন হবে, জানি না সে এ চোখে আর দেখতে পাবে কিনা। গুলিবিদ্ধ আরেক শিক্ষার্থী আসিফের বাবা ফরিদ বলেন, আমরা দেশের এ পরিস্থিতি আর দেখতে চাই না। ছেলেদের দাবিগুলো সরকার মানলে তো তারা আর রাস্তায় আসবে না। সরকারকে বলবো আর আমাদের সন্তানদের এভাবে রক্ত দিতে রাস্তায় নামাবেন না। দাবিগুলো মেনে নিন।
এ বিষয়ে কুমিল্লা পুলিশ সুপার সাইদুর ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুর গুজব রটানো হচ্ছে। কুমিল্লায় কেউ মারা যায়নি। পুলিশ ছাত্রদের নিরাপত্তা দিয়েছে। ঘটনার সময় পুলিশ লাইনে আটকে পড়া প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের নিরাপত্তা দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

শ্রীপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়ি ও বক্সে আগুন
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে আশপাশের বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়।  সংঘর্ষে পুলিশের কয়েকটি গাড়ি ও বক্সে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা।

শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুইটা পর্যন্ত দফায় দফায় এ সংঘর্ষে বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহসড়কের যান চলাচল। দুপুর ৩টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে নানা সেøাগান দিচ্ছেন। আটকেপড়া যাত্রীরা পড়েছেন ভোগান্তিতে।
সরজমিন ঘটনাস্থল থেকে দেখা যায়, বেলা ১১টার দিকে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের উড়াল সড়কের মুখ পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেয়। এ সময় পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাওনা চৌরাস্তা  উড়াল সড়কের নিচে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন।  পুলিশ প্রথম থেকেই পিছু হটলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়ার চেষ্টা করে এগিয়ে যান। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে পিছু হটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ। একপর্যায়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে স্থানীয় একটি মার্কেটে অবরুদ্ধ করলে  পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের ৩টি গাড়িতে ও ৩টি পুলিশ বক্সে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা।  এর একপর্যায়ে পুলিশও পিছু হটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিরাপত্তায় সকাল থেকেই পুলিশের সঙ্গে  ঘটনাস্থলে ছিলেন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোভন রাংসা।

মাওনা চৌরাস্তার বেশ কয়েকটি বেসরকারি  হাসপাতালে ও শ্রীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের এখানে প্রায় ২৪ জন আহত রোগী এসেছিল, তাদের অধিকাংশই রাবার বুলেটে আহত। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহে প্রেরণ করা হয়েছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম বলেন, পুলিশ প্রথম থেকেই তাদের দাযিত্ব পালন করে গেছে, তারা কারও উপর চড়াও হয়নি, এরপর আন্দোলনকারীরা তাদের ধাওয়া করে পুলিশের গাড়িতে ও পুলিশ বক্সে আগুন দেয়।

বিক্ষোভ সর্বত্র, একদফা দাবি: ঢাকাসহ সারা দেশে রাজপথে লাখো শিক্ষার্থী-জনতা

চারদিকে মানুষ আর মানুষ। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গতকাল ঢল নেমেছিল লাখো ছাত্র-জনতার। সেখানে ছাত্র-জনতার সমাবেশ থেকে সরকার পতনের একদফা ঘোষণা করা হয়। চূড়ান্ত এই ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ হাসান। তিনি  বলেন, আর নয় ৯ দফা, এখন দফা একটি- প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে আজ থেকে অসহযোগের ডাক দেয়া হয়। এদিন পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে জড়ো হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান থেকে ছাত্র-জনতার স্রোত ঠেকে চানখাঁরপুল, দোয়েল চত্বর, টিএসসি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য পর্যন্ত। হাজার হাজার মানুষের এ সমাবেশে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ঢাকার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের দেখা যায় সমাবেশে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফরম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে এদিন বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, বরিশাল, বরগুনা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, গাজীপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, পাবনা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, ফরিদপুর, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ-সংঘর্ষ হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অনেকে। গতকালও চিকিৎসাধীন একজনসহ দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এদিন বিভিন্ন স্থানে পুলিশকে খুবই সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুরের পর থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। এদিন আগে থেকেই ঘোষণা দেয়া হয় শহীদ মিনারের বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেবেন এ আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা। বিকাল ৩টার আগেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সহস্র মানুষের জমায়েত থেকে হত্যা- খুনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে ছিল- ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘দফা এক, দাবি এক-শেখ হাসিনার পদত্যাগ’, ‘৯ দফা বাদ দে, একদফার ডাক দে’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’, ‘আবু সাঈদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’ ইত্যাদি।

দুপুরের পর থেকে মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ বিকালে ঘোষণা হয় নতুন কর্মসূচি। এ সময় বক্তব্য দেন ডিবি হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা। সেখান থেকে অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একদফা ঘোষণা করে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এখন একদফা দাবি। তা হলো- এই যে খুন-হত্যা হয়েছে এর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। শুধু পদত্যাগ করলেই হবে না বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু শেখ হাসিনা নয় সকল মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আর তাদের কাছে কী বিচার চাইবো। তারাই তো খুনি। আমাদের ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনাদের আন্দোলনের কারণে আমরা ছাড় পেয়েছি। আজকেও গুলি চলেছে। এই পরিস্থিতিতে একদফা ঘোষণা করছি। শেখ হাসিনা বলেছেন আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে। তিনি আগেই বুঝেছেন দরজা খোলা রাখার সময় হয়েছে। আমরা আসছি। তিনি আরও বলেন, আমাদের একদফা হলো শেখ হাসিনার পতন এবং এই সরকারের লুটপাট ও দুর্নীতির বিচার করতে হবে। আমরা জেলের তালা ভেঙে আমাদের  ভাইকে আনবো। যে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে এতে সকল জনতা যোগ দিন। আমরা সকলের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করবো। আমরা আমাদের দেশের রূপরেখা ঘোষণা করবো। আগামীকাল থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলবে। নাহিদ বলেন, যদি ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি হয় আমরা মেনে নেবো না। এখন ছাত্র-জনতা সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলন পালন করবেন। সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এটা জনগণ মানবে না। আমরা সকল গণহত্যার বিচার করবো বাংলার মাটিতে। বাংলাদেশের জনগণ অসহযোগের নেতৃত্ব দেবে। আপনারা যদি অস্ত্র চালান তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। ছাত্র-নাগরিক সবাই অসহযোগ আন্দোলন সফল করুন। অসহযোগের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচি পালন করুন। আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা দেন। ছাত্র আন্দোলনের আরেক অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আমরা শত শত ভাইয়ের লাশের ওপর দাঁড়িয়েছি। আমরা স্বৈরাচারী সরকারের পতনের দাবি ও ডাক দিয়েছি। পুলিশ সদস্যদের ওপর আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ পোশাকটার ওপর। এই পোশাক পরে অসংখ্য গুম, খুন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী আপনারা সম্মানের অনেক উপরে রয়েছেন। আপনারা ক্যান্টনমেন্টে থাকুন। আসতে হলে পোশাক রেখে আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিন। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সরকার বিভাজন করে রাখতে চায়। আমরা ডান-বাম বুঝি না। আমরা খুনি সরকারের পতন চাই। আমাদের যাতে বিভক্ত করার সুযোগ না পায়। সজাগ থাকবেন।

অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, খুনি সরকার থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত, বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। এখানে আবু সাঈদ রয়েছেন, মুগ্ধ রয়েছেন। আপনারাই আন্দোলন সফল করুন। সমাবেশ শেষে ছাত্র-জনতা বেশকিছু সময় অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর সকলে মিছিল নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। একেকটি মিছিলে কয়েক হাজার করে শিক্ষার্থী বের হচ্ছিল। তারা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখে চারপাশ। শিক্ষার্থীরা বের হয়ে অনেকে টিএসসি’র রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। এর আগে মিছিল নিয়ে আসার সময় আন্দোলনকারী কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছোড়েন। এরপর শিক্ষার্থীরা মানবঢাল হয়ে বোতল হামলা ঠেকান।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনে ছাত্র-জনতা হত্যা, নির্যাতন এবং গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদ এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে র‍্যালি ও সংহতি সমাবেশ করেছে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। দুপুরে র‍্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর থেকে শুরু করে শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর হয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়।
এর আগে রাজধানীর সাইন্সল্যাব, মিরপুর-১০, ডিওএইচ, রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, প্রগতি সরণি, উত্তরা, বসুন্ধরা, খিলগাঁও, আফতাবনগর, শনির আখড়া, কাজলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। এ সব কর্মসূচিতে অনেক জায়গায় জড়ো হন অভিভাবকরাও।  

এদিকে রাজধানীর বাইরেও বিক্ষোভ-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। সেখান থেকেও সরকারের বিদায়ের দাবি তোলা হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও জনতার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন। আহত হয়েছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। চট্টগ্রামে ভাঙচুর চালানো হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবনে। চট্টগ্রামের মেয়রের বাসায়ও হামলা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ অফিসসহ পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লায় বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে চান্দিনা উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) সৌম্য চৌধুরীর গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা-বাগুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী লেনে এসি ল্যান্ডের ব্যবহৃত সরকারি ওই গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে হামলা চালিয়েছে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুপুর দেড়টার দিকে কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইনস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। সন্ধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চট্টগ্রামের চশমা হিলের বাসায় হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে। তার আগে বাড়ির অভ্যন্তরে ভাঙচুর ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়াও হামলা হয়েছে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনেও। টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা মূল গেট ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। এ সময় হলগুলো খুলে দেয়ার জন্য বিক্ষোভ করেন তারা। পরে হল খুলে দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে স্মারকলিপি দেয়া হয়। বিকাল ৪টার দিকে টাঙ্গাইল শহর ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে মাভাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা হাইওয়ে থানায় হামলা চালিয়ে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে থানার সীমানা প্রাচীরের ভেতরে থাকা রেকার ও থানার একটি গাড়িসহ পুলিশের তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। বিকাল ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

সিলেটে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর জেলখানা মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। বিকাল ৩টা থেকে মহাসড়ক দখলে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিকাল সোয়া ৫টার দিকে নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

নোয়াখালীতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর আড়াইটা থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে জেলা শহরের মাইজদী বাজার থেকে কর্মসূচি শুরু করা হয়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা জিলা স্কুলের সামনে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সবক’টি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। একাত্মতা পোষণ করে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক, আইনজীবী ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীদের সমাবেশ শেষে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বরগুনায় বৃষ্টিতে ভিজে সড়কে অবস্থান করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অনেক অভিভাবক। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। পরে শহরের কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বরগুনা সদর রোড এলাকার প্রেস ক্লাব চত্বর প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।

কুষ্টিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের পাশাপাশি বিক্ষোভে অনেক অভিভাবক, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের যোগ দিতে দেখা গেছে। এ সময় মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে কুষ্টিয়া শহর।

বিক্ষোভ হয়েছে চাঁদপুরেও। সকাল ১১টার দিকে চাঁদপুর সরকারি কলেজের গেট থেকে সমবেত হতে থাকেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। নওগাঁয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর জেরে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। সাংবাদিক, পুলিশসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১৮জন। সকাল সাড়ে ১১টায় শহরের কাজীর মোড়ে সমবেত হয়ে এ কর্মসূচি শুরু করেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের একাংশ।

জামালপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দুপুরে শহরের নতুন বাইপাস মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হয়ে মির্জা আজম চত্বরে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ ও জামালপুর-মাদারগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এরপর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ।

যশোরেও বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের সঙ্গে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন অভিভাবকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষেরা। এতে দেশের বৃহত্তর স্থলবন্দর বেনাপোলের সঙ্গে সড়কপথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিক্ষোভ হয়েছে বরিশালে। এ সময় পুলিশ সদস্যদের বহনকারী একটি গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে সিফাত নামে পুলিশের এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। দুপুর সোয়া ২টার দিকে নগরীর চৌমাথা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ফেনীতেও বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। তবে এ নিয়ে পুলিশ পাল্টা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। দুপুর দেড়টার দিকে শহরের জহিরিয়া মসজিদের সামনে থেকে এ বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলতে কর্তৃপক্ষতে ২৪ ঘণ্টা আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা। দুপুর পৌনে ১টা থেকে পৌনে ২টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। বিক্ষোভ হয়েছে রংপুরেও। এতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন  শিক্ষক, আইনজীবী অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বৃষ্টির মধ্যে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়।

ময়মনসিংহে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ২টায় নগরীর টাউন হল মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে নগরীর নতুন বাজার, গাঙ্গিনাপাড়, দুর্গাবাড়ী, কাচারি সড়ক হয়ে ফের টাউন হলে গিয়ে শেষ হয়। এর আগে বেলা ১১টা থেকে টাউন হল মোড়ে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ মিছিলের জন‍্য শিক্ষার্থীরা জড়ো হন।

রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সমবেত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিলে শেষে পুলিশ বক্স, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নগরীতে তিনটি পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালিয়েছে। এ ছাড়া ভদ্রা পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছে। এ সময় দুটি আওয়ামী লীগ ও একটি ছাত্রলীগের কার্যালয় ভাঙচুর চালায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।  
ঢাকার ধামরাইয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা  ঘোষণা করে অভিভাবকরাও অংশ নিয়েছেন এ আন্দোলনে।

ছাত্রদের গণমিছিল ও বিক্ষোভের আয়োজন করেছেন শরীয়তপুরের জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের ধাওয়ায় বিক্ষোভ মিছিলটি পণ্ড হয়ে গেছে। এ সময় কয়েকজনকে মারধর করা হয়।

টাঙ্গাইলে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। শহর থে‌কে মহাসড়‌কে গ‌ড়ি‌য়ে‌ছে আন্দোলন। এখনো পর্যন্ত টাঙ্গাইল শহরে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটলেও জেলার সখীপুর উপজেলায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। এ সময় পুলিশসহ অন্তত ১৫জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলমান।

বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন জয়পুরহাটের শিক্ষার্থীরা। ফরিদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় অন্তত ৮ থেকে ১০ জন ছাত্রের গায়ে রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। এক ছাত্র ১৮টি বুলেট বিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।