Friday, March 11, 2016

কার্গোর পরে কি

আশঙ্কা ছিল আগে থেকেই। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল অনেক দেশই। সতর্ক করা হয়েছে বারবার। তবে অস্ট্রেলিয়ার পর যুক্তরাজ্যও বাংলাদেশ থেকে কার্গো বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় নতুন করে তৈরি হয়েছে উৎকণ্ঠা। পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, এ নিষেধাজ্ঞা পোশাক রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে পারে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইটেও। এমন আশঙ্কার আভাস রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের চিঠিতে। সেখানে স্পষ্টই ৩১শে মার্চের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরুর তাগিদ দেয়া হয়েছে। কার্গো নিষেধাজ্ঞার পর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আসে কি না তা নিয়ে চিন্তিত পররাষ্ট্র ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য মতে, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পশ্চিমা দুনিয়ার তরফে পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়নের দায়িত্ব পেয়েছে যুক্তরাজ্য। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও জোট রয়েছে। ওই দেশগুলোর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। যার বহিঃপ্রকাশ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিঠি। সরকারি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা বৃটেনের দেখানো পথে আরও অনেক দেশ হাঁটতে পারে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কারণ হিসেবে যে বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তাদের বিবেচনায় তা হলো- গ্রাউন্ড ল্যান্ডলিংয়ের কাজটি বিমানের কাছে থাকায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষোভ রয়েছে। এ সুযোগে তারা পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে পারে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজে বাংলাদেশ বিমান প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করে, যা দিয়ে অন্য খাতে ভর্তুকি দেয়া হয় জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, এ কাজটি পেতে বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব রয়েছে। দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গতকাল মানবজমিনকে বলেন, পুরো বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ বিবেচনায় বাংলাদেশও বসে নেই। এটি কেবল সন্ত্রাসবাদের হুমকি বা নিরাপত্তা সতর্কতা, নাকি কোনো রাজনৈতিক চাপ? তা-ও পর্যালোচনা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, বৃটেনের চাওয়া মতে, ৩১শে মার্চের মধ্যে গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিষয়গুলো মনিটরিংয়ে এখন থেকে বিমানমন্ত্রী ও সচিবের বিমানবন্দরে নিয়মিত অফিস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারে সরকার আগেই নতুন নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য বাড়তি অর্থও বরাদ্দ করা হয়েছে। গত একনেক সভায় প্রায় ৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর আওতায় উন্নতমানের স্ক্যানার, তরল ও বিস্ফোরক দ্রব্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ব্যারিয়ার গেটসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার কথা রয়েছে। বৃটেন নির্ধারিত (৩১শে মার্চে) সময়ের মধ্যে দেশটির একাধিক কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করতে পারেন জানিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি টিমও চলতি মাসের শেষের দিকে ঢাকা সফর করবে। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট গতকাল সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে এ নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। সেখানে বিমানবন্দরসহ সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। রাষ্ট্রদূত ঢাকাকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রতিনিধিরা এখানে আসছেন। তারা শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহী। ঢাকার পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানো হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। সরকারের অন্য দায়িত্বশীল সূত্র মতে, ঢাকা থেকে সরাসরি পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কয়েক মাস ধরে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু কাঙিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বৃটেনের নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অবস্থান পরিবর্তন না হলে ঢাকা থেকে তৃতীয় দেশ হয়ে লন্ডনে যাওয়া কার্গো বিমানের ফ্লাইট পরিচালনায়ও বিঘ্ন হতে পারে। তৃতীয় কোনো স্থানে ‘পুনরায় স্ক্যান’ করার শর্তে বৃটেন এখনও সেই সুবিধাটি চালু রেখেছে।
একাধিকবার ঢাকা সফরের পর বৃটেন যে মূল্যায়ন রিপোর্ট দিয়েছে তার অধিকাংশ অভিযোগের সত্যতা রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন পররাষ্ট্র ও বিমান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, যে বিষয়ে বিদেশিরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, তা হলো যথাযথভাবে স্ক্যান না হওয়া। বৃটেনের তরফে অনেক অগেই বিমানবন্দরে স্ক্যানিং মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, মূল্যায়ন রিপোর্টে বৃটেন জানিয়েছে তারা সরজমিন দেখেছেন ওই স্ক্যানিং মেশিনও ঠিকমতো অপারেট করা হয় না। এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের দুর্নীতি এবং ঊর্ধ্বতনদের মনিটরিং না থাকাকে দায়ী করা হয়েছে। কার্গো ভিলেজে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অবাধ প্রবেশের বিষয়টিকে নিরাপত্তার জন্য সবচয়ে বড় হুমকি বলে উল্লেখ করেছে বৃটেন। ঢাকার কর্মকর্তারাও এটি স্বীকার করেছেন। জানিয়েছেন, সেখানে যারা কাজ করেন তার ৬০-৬৫ ভাগ হচ্ছেন বহিরাগত। তারা কর্মকর্তাদের হয়ে সব কাজ করেন। যার জন্য চোরাচালানসহ অন্য অপকর্ম করেও তারা পার পেয়ে যান।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে যা আছে: ১০ ডাউনিং স্ট্রিট, লন্ডন, এসডব্লিউ১এ২এএ মাস্টহেডে চিঠিটি লিখেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ৮ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর পাঠানো চিঠির শুরুতে ‘ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ওই চিঠির সূচনায় গত নভেম্বর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগে বৃটিশ কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নের পর নিরাপত্তা ঘাটতি চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথাও সেখানে উল্লেখ করেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। চিঠির দ্বিতীয় প্যারায় তিনি লিখেন- এটি আমার কাছে স্পষ্ট যে সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে ন্যূনতম ছাড় না দেয়ার (জিরো টলারেন্স) নীতির ধারাবাহিকতায় আপনি এবং আপনার কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার সমস্যা দূর করতেও আপনি (শেখ হাসিনা) দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সর্বশেষ মূল্যায়নে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের ঘাটতি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সমপ্রতি মিসর ও সোমালিয়ায় বিমানে হামলার পর এটি আমার কাছে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তৃতীয় প্যারায় তিনি লিখেন- এটি স্পষ্ট যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাজনিত সমস্যার মূলে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী এবং যথাযথ নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণের লক্ষ্যে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য আপনাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানাই। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি দূর করার লক্ষ্যে দ্রুততার সঙ্গে একটি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করতে আমি নির্দেশনা দিয়েছি। যা আগামী ৩১শে মার্চের মধ্যে বাস্তবায়নে প্রক্রিয়া শুরুর কথা।  ৩১শে মার্চের মধ্যে এটি হলে তা নতুন করে বৃটেনের আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া এড়াতে সহায়তা করবে। এ ধরনের পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সরাসরি যুক্তরাজ্যে ফ্লাইট চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা। চতুর্থ প্যারায় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার আগে আমাদের অবশ্যই নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো কমাতে হবে। তাই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে সরাসরি পণ্য পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা নিশ্চিত করতে আমাদের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা পণ্য নিরাপত্তায়ও ঘাটতি খুঁজে পেয়েছেন। পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাজ্যগামী সরাসরি ফ্লাইটের অন্যান্য নিরাপত্তার ব্যাপারে বিমানবন্দরের কর্মীদের মনোযোগের সঙ্গে কাজ করতে সহায়ক হবে। বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান অংশীদার বাংলাদেশের ওপর এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাবের ব্যাপারে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী সচেতন রয়েছেন জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, বিমানবন্দরে বৃটেনের চলমান সহযোগিতার অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহ থেকে স্ক্যানার অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হবে। এ মাসের শেষে বাড়তি আরও কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে দেশটির কর্মকর্তারা প্রস্তুত রয়েছেন জানিয়ে ক্যামেরন বলেন, আশা করি, দ্রুততার সঙ্গে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি আপনি বুঝতে পারছেন। আকাশপথে সত্যিকারের ঝুঁকি আছে এবং আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়া প্রয়োজন। আকাশপথে একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তুলতে বিশ্বের সব দেশের অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে যে কোনো সহযোগিতার জন্য বৃটেন প্রস্তুত রয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কায় বিজিএমইএ
যুক্তরাজ্যে সরাসরি পণ্য পরিবহনে কার্গো চলাচলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, কার্গো চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে নিশ্চিতভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে পোশাক রপ্তানি কমারও আশঙ্কা করছেন তারা। গতকাল বিজিএমই কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এমন শঙ্কার কথা জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির ও পরিচালক মিরান আলী।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়, যা ওই সময়ের মোট পোশাক রপ্তানির ১১.৩৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ বাজারে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬.১০ শতাংশ বেশি। এ পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যুক্তরাজ্যের বাজার বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ বাজারে কোনো রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক তা কাম্য নয়।
বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, ক্রেতারা অনেক সময় দ্রুত পণ্য পাঠাতে বলেন। তখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পাঠানো সম্ভব হয় না। ফলে নিজেদের খরচে বিমানে পণ্য পাঠাতে হয়। যুক্তরাজ্যের এ নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন আমাদের সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড ও দুবাই হয়ে পণ্য পাঠাতে হবে। এতে একদিকে খরচ বাড়বে, অন্যদিকে সময়ও বেশি লাগবে। এতে আমাদের প্রতিযোগী সক্ষমতাও কমে আসবে। রপ্তানি হ্রাস পাবে বলে জানান তিনি।
সভাপতি বলেন, মোট রপ্তানির প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য প্রতি বছর উড়োজাহাজে পাঠাতে হয়। এ সময় সরকারকে দ্রুত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান তিনি। এ ছাড়া বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদারে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা যুক্তরাজ্য সরকারকে অবহিত করে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, যুক্তরাজ্য আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। এ বাজারে কোনো রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক তা কাম্য নয়। যখনই আমরা নতুন নতুন বাজারে অনুপ্রবেশ করছি, তখনই একটি তৈরি হওয়া বাজার পেছনের দিকে হাঁটবে তা কখনই কাম্য নয়।
সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, যেহেতু যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তাই বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করে দ্রুত সমাধান হওয়া জরুরি। যুক্তরাজ্য কোনো কারণ দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জানতে হবে এবং প্রয়োজনে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করে সমাধান করতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৯শে ডিসেম্বরের পর ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি বিমানযোগে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হলো যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে যুক্তরাজ্যের বিমান নিরাপত্তাবিষয়ক দপ্তর বিশ্বের ২০টি দেশের ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরের তালিকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রয়েছে।

‘রাজকোষে’ চুরি by আলী রীয়াজ

‘চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে’—১৯৩৬ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথের গান যে ২০১৬ সালে এসে বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থেই সত্য হবে, তা মনে হয় কারও কল্পনায়ও আসেনি। এখন রবীন্দ্রনাথের শ্যামা নৃত্যনাট্যে বর্ণিত কল্পিত ‘রাজকোষ’ না থাকলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগার আছে এবং সেখান থেকেই চুরি হয়ে গেছে ১০ কোটি ডলার। ঘটনার সারসংক্ষেপ এ রকম—যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের স্থিতি অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত বাংলাদেশের ১০ কোটি ডলার (বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) ওই ব্যাংক থেকে চুরি করে (অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করে) নিয়ে যাওয়া হয়েছে ফিলিপাইনে ও শ্রীলঙ্কায়।
ঘটনা ঘটেছে ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে। ফিলিপাইনের একটি সংবাদপত্রে এ বিষয়ে তদন্তের খবর বেরোনোর পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে অবগত হয়। তখন জানা গেল যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ফিলিপাইনে ছোটাছুটি করে কিছু অর্থ উদ্ধার করেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সেই প্রথম এ বিষয়ে কোনো স্বীকৃতি পাওয়া গেল। কিন্তু বেশির ভাগ অর্থ উদ্ধার হয়নি বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। বাংলাদেশের দাবি হলো যে হ্যাক হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে, অতএব দায়িত্ব তাদের। অন্যদিকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের ভাষ্য, তাদের সিস্টেম হ্যাক হয়নি। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল যে তিনি এ বিষয়ে অবগত নন, কিন্তু পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দিয়েছেন।
কিন্তু ইতিমধ্যে আরও খবর এসেছে, যাতে দেখা যায়, টাকা হস্তান্তরের জন্য অ্যাডভাইস গেছে বাংলাদেশ থেকে, বলা হচ্ছে যে সব মিলিয়ে ৩০টি অ্যাডভাইসের মধ্যে পাঁচটি মাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যক্রম করার পর বাকিগুলো আটকে দেওয়া হয়, অন্যথায় এর পরিমাণ আরও বেশি হতো। ফিলিপাইনের ‘এনকোয়ার’ নামের যে কাগজের তদন্তের কারণে এসব খবর প্রথম দৃষ্টিগোচর হয় এবং ফিলিপাইনের সিনেটসহ অনেক প্রতিষ্ঠান তদন্ত শুরু করেছে, তারা জানাচ্ছে যে আরও ৮৭ কোটি ডলার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কারণে সফল হয়নি। এই লেখা পাঠকের দৃষ্টিগোচর হতে হতে আরও নতুন কিছু জানা গেলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক রকম প্রশ্ন উঠেছে—অর্থ যদি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকের কারণে খোয়া গিয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ছোটাছুটি করতে হচ্ছে কেন? অন্যদিকে যদি অ্যাডভাইসগুলো বাংলাদেশ থেকে যায়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তি নিরাপত্তা যে ভাঙা হয়েছে সেটা নিশ্চিত। এতে বোঝা যায়, হয় ব্যাংকের ভেতরের লোকজনের কোনো না কোনোভাবে যুক্ততা আছে, নয়তো প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে।
এসব আলোচনা, বিতর্ক ও ধোঁয়াশে অবস্থার মধ্যে কেউ যদি মৃদুস্বরে বলেন যে খোয়া যাওয়া অর্থ নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই—অর্থের পরিমাণ খুব বেশি নয়, তাহলে আমি নিশ্চিত যে সবাই সমস্বরে তাঁর বিরোধিতা করবেন, ক্ষুব্ধ হবেন। বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, খোয়া যাওয়া এই অর্থের পরিমাণ তার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। ফলে অঙ্কের হিসাবে সেটা ভুল হবে না, সেটা বলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু ভালো করে বিবেচনা করে দেখুন, দেশের অর্থ এভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা কি এই প্রথম? হ্যাঁ, এভাবে হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে সবার জ্ঞাতসারে কি প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে যায়নি? ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে এ খবর দেওয়ার সময় প্রথম আলোর প্রতিবেদনে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে এই অর্থ দিয়ে অন্তত দুই বছরের বাজেট তৈরি করতে পারত বাংলাদেশ। বছরে গড়ে পাচার হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
২০১৩ সালে পাচার হওয়া অর্থ আগের বছরের তুলনায় ৩৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি ছিল। ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নিশ্চয় হল–মার্ক কেলেঙ্কারির কথা মনে হবে। সোনালী ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৫২৫ কোটি টাকা। ২০১২ সালের ঘটনার সময় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ৪ লাখ কোটি টাকার সেক্টরে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি এমন কিছু নয়। বেসিক ব্যাংকের ঘটনাও সবার মনে থাকার কথা। দুদকের করা মামলার সূত্রে জানা যায় যে কমপক্ষে ২ হাজার ২৬৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে বড় ধরনের ডাকাতি ও জালিয়াতি হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা লুট করার চেষ্টা করেছেন। এসব ডাকাতির ঘটনায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর গতিকে সাংবাদিকেরা ‘মন্থর’ বলেই বর্ণনা করেন। যদিও অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি।
এগুলো কেবল উদাহরণ। উদাহরণ সেই দেশে, যেখানে মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ বানানোর এক প্রতিযোগিতা সহজেই লক্ষণীয়। ২০০৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩ হাজার বাংলাদেশি সেকেন্ড হোম মালয়েশিয়ার জন্য আবেদন করেছেন। এই কর্মসূচির জন্য কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, তার একটা ধারণা নিলে বোঝা যায় যে কেউ চাইলেই আবেদন করতে পারেন না। এর একটি শর্ত হচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ রিঙ্গিত বা ১ কোটি ৬ লাখ টাকা থাকা, মালয়েশিয়ার ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করতে হয় ৬৫ লাখ টাকা এবং মাসিক আয় হতে হয় কমপক্ষে ২ লাখ ১২ হাজার টাকা। এ রকম লোকের যে অভাব হচ্ছে না, তা বাংলাদেশে এ জন্য নিয়োজিত সাব-এজেন্টের সংখ্যাই বলে দেবে। কেউ কেউ বলবেন বাংলাদেশের উন্নতি হচ্ছে, ধনীর সংখ্যা বাড়ছে, ফলে এ আর বিচিত্র কী! তাঁদের সঙ্গে একমত, বাংলাদেশে কোটিপতি বাড়ছে। সেই হিসাব আমাদের অজ্ঞাত নয়। ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের হিসাব ধরলে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি ৪০ হাজার ৬৮৭ জন। কিন্তু এর সঙ্গে এটাও তো আমরা জানি যে বৈষম্য বাড়ছে। গত বছরের মাঝামাঝি একটি সংবাদপত্রকে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেছিলেন, ১৯৭২ সালের তুলনায় ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এখন বেশি (‘বাড়ছে কোটিপতি বাড়ছে বৈষম্য’, মানবজমিন, ২৬ জুলাই ২০১৫)। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে এ কথা আমাদের কেন শুনতে হবে, সেই প্রশ্ন তো করাই যায়।
বৈষম্য বৃদ্ধির এই প্রেক্ষাপটে যখন ব্যাংকের টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, তখন স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় যে দেশের এই অর্থের উৎস কী? বাংলাদেশের ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিকের শ্রমে–ঘামে বছরে ২ হাজার ৬২৫ কোটি ডলার আয় হয়। এই অর্থের উৎস সেই শ্রম। বাংলাদেশের ৮০ লাখ শ্রমিক দেশের বাইরে উদয়াস্ত কাজ করে গত বছর ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, এই অর্থ তার অংশ। যে অর্থ হারিয়ে গেছে, তা খুঁজে না পাওয়া গেলেও নিশ্চিত করেই বলা যায় যে প্রকারান্তরে পোশাকশ্রমিকদের শ্রম থেকে তা পুষিয়ে নেওয়া হবে। খেয়ে না–খেয়ে যে প্রবাসী শ্রমিক দেশে অর্থ পাঠান, তাঁর অর্থ থেকে তা আবার রিজার্ভে জমা হবে। দেশে ও দেশের বাইরের ১ কোটি ২০ লাখ শ্রমিকের কত দিনের শ্রম এই ১০ কোটি ডলার, সেই হিসাব যত দিন না পর্যন্ত আমরা করতে চাইব, তত দিন এভাবেই কথিত হ্যাকাররা, হল–মার্ক ও বেসিক ব্যাংকের পরিচালকেরা, অর্থ পাচারকারীরা, সেকেন্ড হোমের আবেদনকারীরা দেশের অর্থ লোপাট করতে সক্ষম হবেন। এ নিয়ে মামলা চলবে মন্থর গতিতে।
এই মুহূর্তে অবশ্য করণীয় এই ১০ কোটি ডলার কীভাবে খোয়া গেল তার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা। ফিলিপাইনে এ নিয়ে যতটা উদ্যোগ দেখি, বাংলাদেশে এখনো তা চোখে পড়ে না। কিন্তু তার চেয়ে বেশি দরকার জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরির দাবি তোলা। এসব যে জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতির প্রমাণ, তা বুঝতে না পারলে; সেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যে রাজনীতিতে জবাবদিহির ব্যবস্থার বাইরে নয়, সেটা উপলব্ধি করতে না পারলে, সে বিষয়ে সরব না হলে হা–হুতাশ করে লাভ হবে না। বড়জোর ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের মতো পরিণতি হতে পারে।
* আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

ভেতরের যুক্ততা ছাড়া হ্যাকিং সহজ নয় by মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
যাঁরা রিজার্ভের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কাজ করেন, তাঁদের গতিবিধির ওপর নজরদারি রাখতে হবে। আমি যদি বলে দিই সবাই সন্দেহের ঊর্ধ্বে, তাহলে কিন্তু তা ক্ষতিকর আমি স্বীকার করি এটা একটা বড় সমস্যা, তবে সংকট নয়। জাতীয় বিপর্যয়ও নয়। এখানে দেখতে হবে যে অর্থ স্থানান্তরটি কীভাবে হয়। রিজার্ভ জনসাধারণের সম্পদ। এর মালিক জনগণের পক্ষে সরকার। আর বাংলাদেশ ব্যাংক এর ব্যবস্থাপক মাত্র। অর্থাৎ ম্যানেজার। এমনভাবে ম্যানেজ করে যাতে আয় বাড়ে। ’৯০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় সমস্ত রিজার্ভই ডলারে রাখা হতো। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিময় হারের খুব ওঠা-নামা হচ্ছিল। তখন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করেছে যে সব অর্থ একটা মুদ্রায় রাখলে হয় লাভ হবে, না হয় ক্ষতি হবে। ক্ষতির আশঙ্কাটাই বেশি ছিল। কারণ, তখন ডলারের ছিল পড়ন্ত অবস্থা। সে জন্য নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে বিভিন্ন মুদ্রায় রিজার্ভ রাখা হয়।
এখন কথা হচ্ছে, আমার ব্যাংক হিসাব থেকে যদি বড় অঙ্কের একটি চেক যায়, আমার স্বাক্ষর থাকলেও ব্যাংক কিন্তু আমার কাছে জানতে চাইবে যে আমি চেকটি দিয়েছি কি না। স্বাক্ষর মিললেও কিন্তু করে। একইভাবে আমাদের রিজার্ভের অর্থ যেসব ব্যাংকে রাখা আছে, সেখানে অস্বাভাবিক কোনো লেনদেন যদি হয় তাহলে তারা প্রথমে কোড পরীক্ষা করবে। কোড ঠিক থাকলে যদি টাকার পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে তারা জানতে চাইতে পারত।
আমি জানি, আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা খুবই দক্ষ, সৎ, কর্মঠ, দেশপ্রেমিক ও নীতিমান। আমি এ কথা বলার পরও যাঁরা রিজার্ভের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কাজ করেন, তাঁদের গতিবিধির ওপর নজরদারি রাখতে হবে। আমি যদি বলে দিই সবাই সন্দেহের ঊর্ধ্বে, তাহলে কিন্তু তা ক্ষতিকর। নজরদারিতে রাখতেই হবে। হয়তো রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক, হয়তো রাখে না। আমি জানি না। তারপরে টাকা যে চলে গেল, শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিন্তু তা ছাড় করেনি। তাদের নজরদারির ব্যবস্থাটা অনেক বেশি কার্যকর। তার মানে আমাদেরটা কিন্তু অতটা নয়। ফিলিপাইনেরটাও নয়। শ্রীলঙ্কায় যাওয়া অর্থ উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ফিলিপাইনেরটা কপাল ভালো থাকলে হয়তো উদ্ধার হতে পারে। তবে এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুরক্ষা ব্যবস্থাটি শতভাগ নিশ্ছিদ্র করাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক রক্ষণশীল হলে অনেকগুলো সুবিধা আছে। অসুবিধাও আছে। ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১ সালে খুব দাবি উঠেছিল ই-কমার্স শুরু করতে। আমি কিন্তু খুব শক্ত ভাষায় এর বিরোধিতা করেছিলাম। আমি এই জন্য করেছি যে আমার এখানে এ নিয়ে কোনো আইন নেই। এ জন্য যে সতর্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, সেটি করতে পারিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত এটা না করতে পারব, আমি নিশ্চিন্ত যত দিন না হব যে এর মধ্যে গেলে আমার রিজার্ভটা টান দিয়ে নিয়ে যাবে, তত দিন অনুমোদন দেব না। আমি হুবহু এই কথাটিই বলেছিলাম। একই নীতিতে আমরা যখন ঋণ তথ্য ব্যুরোর সফটওয়্যারটি করি, তখন ব্যবস্থাটি ছিল যে বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য ব্যাংকে প্রবেশ করতে পারবে, কিন্তু অন্যরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে ঢুকতে পারবে না। ওই রকম নিশ্ছিদ্র একটা ব্যবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের থাকা উচিত। আছে কি না জানি না, হয়তো আছে।
এই যে কিছুদিন আগে এটিএম কার্ড জালিয়াতি হলো। সারা পৃথিবী যখন ম্যাগনেটিক ব্যবস্থা বাদ দিয়ে চিপস ব্যবস্থায় গেল, তখন আমরা গেলাম না। গেলাম না যখন, তখন কেন এতগুলো বুথ চালুর অনুমোদন দেওয়া হলো? কেন ম্যাগনেটিক ব্যবস্থা চালু রাখলাম? এটা তো গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে আরও বেশি যত্ন নেওয়া উচিত ছিল। যেহেতু ঘটনা ঘটেছে, সে কারণে এখনো ম্যাগনেটিক কার্ড ব্যবহার করার যে এটিএম বুথ আছে, সেগুলো দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া উচিত। বন্ধ না করলে ব্যাংকগুলো বাধ্য হবে না ব্যবস্থা নিতে।
একইভাবে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার যে সফটওয়্যার আছে তাকে এমন লোক দিয়েই পরীক্ষা করাতে হবে, যাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব গোয়েন্দা সংস্থা নিরাপদ বলে ছাড় দিয়েছে। কারণ, ভেতরের কোনো সম্পৃক্ততা ছাড়া এ ধরনের হ্যাকিং সহজ নয়। এমন হতে পারে হ্যাকাররা হয়তো ঢুকতে পারে, হয়তো এভাবে করেও, তবে তা অনেক কষ্টসাধ্য। আর যদি কোনো অভ্যন্তরীণ সহায়তা পায়, তাহলে সেটা অনেক সহজ।
আমার প্রার্থনা যাতে এ ব্যাপারে কম কথা বলা হয়, কাজ যেন বেশি করা হয়। যদি বাংলাদেশ ব্যাংককে একতরফা দোষারোপ করে যাই, তাহলে তো ঠিক হবে না। আবার যদি বলি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনোই দোষ নেই, তাহলে যদি কেউ দোষ করে থাকে তাদের আড়াল করছি। সুতরাং তদন্তের সময় দিতে হবে। তদন্তটা বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। অভিজ্ঞদের দিয়ে তা করাতে হবে।
আবার সুইফট যে বক্তব্য দিয়েছে তাকেও গ্রহণযোগ্য মনে করি না। তারা বলে দিল তাদের কোনো দায় নেই। তারা বলতে পারত যে আপাতদৃষ্টিতে কোনো সমস্যা দেখতে পারছে না তারা, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। আমরা জানি সুইফটের আঞ্চলিক অফিস থেকে বাংলাদেশ তেমন সহযোগিতা পাচ্ছে না। এতে কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে। যে সংকেতলিপি ব্যবহৃত হয়, তা তারা জানে তা বলব না। তবে সেটি তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। সেই জন্য মনে হয় এটি ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
বাংলাদেশে এখন অসাধারণ ও অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে, সারা পৃথিবী সাধুবাদ দিচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সব অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য বিধ্বংসী শক্তিও আছে। সাধারণত দেখা গেছে সারা পৃথিবীতেই জঙ্গিবাদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের যে সক্ষমতা, তা অন্যদের তুলনায় বেশি। সুতরাং এর সঙ্গে তাদের কোনো যুক্ততা আছে কি না তা তলিয়ে দেখা দরকার।

স্যান্ডার্স ও ট্রাম্পের চমক লাগানো জয়

পণ্ডিতদের সব ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স যুক্তরাষ্ট্রের জনবহুল মিশিগান অঙ্গরাজ্যে বাছাইপর্বের নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। সেখানে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে মিসিসিপিতে আফ্রিকান-আমেরিকান অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গদের একচেটিয়া ভোটে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। এই দুই রাজ্যের প্রাইমারি নির্বাচনের পর দুই ডেমোক্র্যাট মনোনয়নপ্রার্থী স্যান্ডার্স ও হিলারির মোট ডেলিগেট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৫৪৬ ও ৭৬০। এর বাইরে রয়েছে দলীয় নেতাদের ভোট। ‘সুপার ডেলিগেট’ নামে পরিচিত এসব নেতার ৪৫৮ জন হিলারিকে সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে স্যান্ডার্সের পক্ষে রয়েছে মাত্র ২২ জন সুপার ডেলিগেট।
হিলারি কয়েক দিন ধরে মিশিগানে ব্যাপক প্রচার অভিযানে অংশ নেন। পরিচিত নমনীয় ভাষা ছেড়ে তিনি স্যান্ডার্সের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন। হিলারি যুক্তি দেখান, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বড় রকমের অর্থ সাহায্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির ঐতিহ্য সেখানকার মোটরশিল্পকে প্রায় মৃত অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে তুলেছেন। হিলারি সে কাজে ওবামাকে সমর্থন করলেও স্যান্ডার্স তার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তারপরও ডেমোক্রেটিক ভোটারদের একটা বড় অংশ দীর্ঘদিনের রাজনীতিক হিলারিকে প্রত্যাখ্যান করে স্যান্ডার্সের ‘রাজনৈতিক বিপ্লবের’ প্রতিই সমর্থন দিল। মঙ্গলবারের অন্য বড় চমক ছিল মিশিগান, মিসিসিপি ও হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান দলের অগ্রগামী প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চোখধাঁধানো বিজয়। মিশিগান ও মিসিসিপির জয়ের পর ট্রাম্পের বাক্সে মোট ডেলিগেটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪৬। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর টেড ক্রুজের জন্য একমাত্র সান্ত্বনা ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট রাজ্য আইডাহোতে বড় ব্যবধানে বিজয়। সেখানে ক্রুজ ও ট্রাম্প যথাক্রমে পেয়েছেন ৪৫ দশমিক ৪ ও ২৮ শতাংশ ভোট। তবে মোট ডেলিগেটের হিসাবে ট্রাম্প অনেক এগিয়ে। ক্রুজের ডেলিগেট সংখ্যা ট্রাম্পের চেয়ে প্রায় এক শ কম, মাত্র ৩৪৭। রিপাবলিকান দলের অন্য দুই প্রার্থী, মার্কো রুবিও ও গভর্নর কেইসিক এই চার রাজ্যেই পরাস্ত হয়েছেন।
ভোটের আনুপাতিক হিসাবে বিভক্ত হওয়ায় তাদের বাক্সে সংগৃহীত মোট ডেলিগেটের সংখ্যা যথাক্রমে ১৫১ ও ৫৪। এক সপ্তাহ ধরে সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনির নেতৃত্বে রিপাবলিকান নেতৃত্বের প্রবল বিরোধী প্রচারণা সত্ত্বেও বিতর্কিত ধনকুবের ট্রাম্পের এই সহজ বিজয় বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। রিপাবলিকান নেতৃত্বের একাংশ এখন প্রকাশ্যে বলছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই প্রচারণা উল্টো ফল দিয়েছে। ইউএসএটুডে পত্রিকায় প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, রিপাবলিকান ভোটারদের ৩১ শতাংশ জানিয়েছে, রমনির কড়া সমালোচনার ফলে তারা বরং ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিতে বেশি আগ্রহী হয়েছে। মিশিগানের ফলাফল প্রকাশের পর ফ্লোরিডায় নিজের নির্বাচনী প্রচারণা দপ্তরে এক ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, একমাত্র তিনিই পারেন রিপাবলিকান দলকে একত্র করতে। এদিকে এনবিসি ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর নেওয়া এক নতুন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে ট্রাম্প ও ক্রুজ সমানে সমান লড়ে যাচ্ছেন। এই জরিপ অনুসারে, রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ৩০ শতাংশের সমর্থন পেয়ে শীর্ষে রয়েছেন ট্রাম্প। ২৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ২ নম্বরে রয়েছেন সিনেটর টেড ক্রুজ।

সু চির সঙ্গে তিক্ততা বাড়ছে সেনাবাহিনীর

অং সান সু চি
মিয়ানমারের প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর সঙ্গে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দ্বন্দ্ব বাড়ছে। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ভোটে বিজয়ের সবে শুরু হয়েছে গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা। কিন্তু এরই মধ্যে প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে এ দ্বন্দ্ব। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর ফলে গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্য হুমকির মুখে পড়েছে। গণতন্ত্রের পথে এগোনোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট পদে তিনজনের নাম উপস্থাপন করা হবে মিয়ানমারের পার্লামেন্টে। অচিরেই সু চির দল এনএলডি সরকার গঠন করবে। এনএলডি তার পুরোনো শত্রু সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছে—এমন একটা ধারণা গড়ে তোলার চেষ্টার কমতি নেই। তবে মিয়ানমারের রাজনীতিক এবং সরকারি স্তরের নেতৃস্থানীয়রা বলছেন, সেই প্রচেষ্টা অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে সাম্প্রতিক নানা ঘটনায়। মিয়ানমারের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের এনএলডি দলীয় এক সদস্য বলেন, নির্বাচনে বিজয়ের পর সু চি ভেবেছিলেন, তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ভালোভাবেই কাজ করতে পারবেন। কিন্তু সেনাপ্রধানের সঙ্গে সবশেষ যে আলোচনা হলো এরপর বুঝতে পেরেছেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ তিনি করতে পারবেন না। গত বছরের ৮ নভেম্বরের নির্বাচনের পরপরই দেশটির প্রবল ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর সঙ্গে সু চির আলোচনা শুরু হয়।
এনএলডি সূত্র জানায়, প্রথমে ওই আলোচনা ভালোভাবে এগোলেও সেনাবাহিনীর অনমনীয় আচরণের জন্য সু চি কিছুদিনের মধ্যেই হতাশ হয়ে পড়েন। মিয়ানমারের রাজনীতিতে তাদের বড় একটি ভূমিকা আছে, এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে দেশটির সেনাবাহিনী। অন্তত যত দিন পর্যন্ত গণতন্ত্র সুসংহত না হচ্ছে। তারা এও মনে করে, সংবিধানের দ্রুত সংশোধন দেশে একটি ‘ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত’ তৈরি করবে। দীর্ঘদিনের শাসনের পর ২০১১ সালে একটি আধা সামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও সু চি যাতে প্রেসিডেন্ট না হতে পারেন, সংবিধানে সে ব্যবস্থা করে যায় সেনাবাহিনী। সু চির দুই সন্তান আর প্রয়াত স্বামী বিদেশি নাগরিক। সংবিধান অনুযায়ী স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান বিদেশি হলে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হওয়া যাবে না। সংবিধানের এখন যে কাঠামো তাতে নিরাপত্তা বাহিনী এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ওপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থাকবেই। এর ফলে এনএলডি সরকারকেও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতেই হবে। কিন্তু এর ফল যে ভালো হবে না, সাম্প্রতিক নানা ঘটনা তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সপ্তাহ দু-এক আগে পার্লামেন্টে এনএলডির এমপিরা কয়েকটি প্রকল্পে সাবেক প্রশাসনের দুর্নীতির বিষয়ে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে একযোগে দাঁড়িয়ে পড়েন সেনাবাহিনীর মনোনীত এমপিরা। সেনাবাহিনী-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) সাবেক সদস্য উইন উ বললেন, ‘এনএলডি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এখন একটা ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে।’ আজ যে তিনজনের নাম প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হিসেবে উঠছে, এর মধ্যে এনএলডির প্রার্থী বিজয়ী হবে তা নিশ্চিত। হেরে যাওয়া দুই প্রার্থী দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন। তবে এনএলডির পার্লামেন্ট সদস্য তিন্ত সোয়ে বলেন, ‘সু চির ভবিষ্যৎ যে ভালো হবে, তা মনে হয় না। কেননা এটি নিশ্চিত, সেনাবাহিনী তাঁকে সহযোগিতা করবে না। এ পরিস্থিতি সত্যিই দুঃখজনক।’

‘গণতন্ত্রের প্রধান শর্তই হল অংশগ্রহণ’

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, গণতন্ত্রের প্রধান শর্তই হল অংশগ্রহণ। কোন রাজনৈতিক দল হলে তাকে নির্বাচনে প্রার্থী দিতে হবে। নাগরিক হলে তাকে ভোট দিতে হবে। বাংলাদেশ ও আমেরিকার নাগরিকরা ভাগ্যবান এই অর্থে যে, আমরা গণতন্ত্রের মধ্যে বাস করি। গণতন্ত্র শুধু অংশহ গ্রহণের মধ্যে কাজ করে। দৈনিক যুগান্তরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপ আহবানের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা প্রকৃতপক্ষে সতর্কতার সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছি না। আমরা প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক স্পেস উন্মুক্ত করার আহ্বান জানাই। এক বছর আগে আমরা সহিংসতার ব্যাপারে শংকার কথা বলেছিলাম। রাজনীতিতে সহিংসতার কোন স্থান নেই। তাই আমাদের ফোকাস গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আবদ্ধ আছে। দলগুলোকে একসঙ্গে এসে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। গণতন্ত্রের প্রধান শর্তই হল অংশগ্রহণ। কোন রাজনৈতিক দল হলে তাকে নির্বাচনে প্রার্থী দিতে হবে। নাগরিক হলে তাকে ভোট দিতে হবে। বাংলাদেশ ও আমেরিকার নাগরিকরা ভাগ্যবান এই অর্থে যে, আমরা গণতন্ত্রের মধ্যে বাস করি। গণতন্ত্র শুধু অংশগ্রহণের মধ্যে কাজ করে। দ্বিতীয় কথা হল, প্রক্রিয়াকে অবশ্যই সহিংসতামুক্ত হতে হবে। গত বছরের তুলনায় এ বছর পরিস্থিতি অনেক শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সহিংসতা ছাড়াই যাতে জনগণ তাদের নাম প্রার্থী হিসেবে দিতে পারে, প্রচার করতে পারে, নির্বাচনের দিনে ভোট দিতে পারে- এটিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রতিটি পদক্ষেপ-তা নির্বাচন হোক কিংবা সমাবেশ করাই হোক- প্রতি ক্ষেত্রেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রে জনগণ হল বস। জনগণই আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। নির্বাচনে প্রার্থী নিবন্ধনের সুযোগ দিতে জনগণকে দাবি তুলতে হবে। গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য জনগণকে সোচ্চার হতে হবে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বার্নিকাট বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হল যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সাংবাদিকের প্রকাশ করার অধিকার থাকতে হবে। তবে সাংবাদিকের এটিও দায়িত্ব যে, যেটা প্রকাশ করা হচ্ছে সেটা অবশ্যই যথার্থ হতে হবে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশ সম্পর্কে, আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের সরকারগুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেন সাংবাদিকরা। এটি আমাদের অনেক ভালো অবস্থায় রাখে। এটি আমাদের অনেক শক্তিশালী করে। এটি যাদের কোনো কণ্ঠ নেই তাদের বাকস্বাধীনতা দেয়, ন্যায়বিচারকে সামনে তুলে ধরে এবং আমার মতো নেতাদের জবাবদিহি করে। প্রেসিডেন্ট ওবামার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সর্বদা আরও মানোন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হল সবচেয়ে বাজে ধরনের মানবাধিকার লংঘন। আমাদের আদালত ব্যবস্থা আছে, পুলিশ আছে, নাগরিকের জন্য নিশ্চয়তার স্থান আছে। কিন্তু আমি এটিও বলব যে, পুলিশ কিংবা অন্য কোনো আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য নিয়ম-কানুন আছে যা তাদের মেনে চলতে হয়। কোন ঘটনা ঘটলে পুলিশ গুলি কিংবা পাল্টা গুলি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের হাতে কেউ নিহত হলে সেই হত্যার পর্যালোচনা করা হয়। ওই হত্যাকা- ভুল ছিল কিনা সেই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হতে হবে। এতে করে জনগণ বুঝতে পারে যে, ওই ব্যক্তির নিহত হওয়ার পেছনে আর কোন বিকল্প ছিল না। এ প্রক্রিয়াটি এখানেও চালু করা যেতে পারে। পুলিশ যদি ভালো চর্চা করে তবে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা সৃষ্টি হবে।
বার্নিকাটের কাছে প্রশ্ন ছিল-বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষদিক থেকে কিছু সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
জবাবে তিনি বলেন, প্রথমে আমি ওইসব সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি হামলায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের প্রতি শোক প্রকাশ করছি। এসব হামলা যারা করেছে তারা জঘন্য অপরাধী। এ নিয়ে আমাদের দুই দেশের সরকারের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমরা অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পাচ্ছি। জাপানের নাগরিক কুনিও হোশিসহ আরও অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনা বাংলাদেশের জাতীয় চরিত্রের প্রকাশ নয়। গত পাঁচ মাসে দশটি ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। আমাদের উভয় দেশই এটি স্বীকার করে যে, আইএস আমাদের দুই দেশের জন্যই হুমকি। আইএস সন্ত্রাসীরা কোন দেশে তাদের অফিস চালু করতে আসছে না। তারা ইন্টারনেট, প্রকাশনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের জঙ্গি আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা এ বিশ্লেষণ বাংলাদেশ সরকারের কাছে শেয়ার করেছি। আমেরিকায় সম্প্রতি সবচেয়ে বড় যে হামলার ঘটনাটি ঘটেছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া একজন এবং তার স্ত্রী ওই হামলা করেছে, যারা এক শিশুকে রেখে এ কাজ করেছে। ফলে বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থানকে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে সামরিক বাহিনীর জন্য। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে এবং পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবির জন্য আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে। নতুন কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গঠনে আমরা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছি। আমরা সোয়াদ টিম ও বোম্ব স্কোয়ার্ডকে প্রশিক্ষণ দেই। আমরা ব্রিটেন, জাপান ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার লক্ষ্যে কাজ করছি। সন্ত্রাসের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানকে আমরা স্বাগত জানাই। জাতিসংঘের বিগত সাধারণ অধিবেশনে তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই, সীমানা নেই। তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাস দমন কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন। এ কারণে আমি এ ক্ষেত্রে আমাদের অংশীদারিত্বকে খুবই ভালো বলে মনে করি।
জিএসপি’র বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিএসপি পুনর্বহালের বিষয়টি ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের হাতে। এ ক্ষেত্রে সত্যিকার মূল বিষয় হল শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের অধিকার দেয়ার নিশ্চয়তার আগ্রহ থাকতে হবে। এ সংস্কারের লক্ষ্যে জিএসপি পুনর্বহালে আমরা কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি। এগুলোর সবই বাংলাদেশ আইএলও’র সঙ্গে অঙ্গীকার করেছে। আরেকটি বিষয় হল, পোশাক শিল্প খুবই প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে গেছে। ৩০ বছর আগে যে অবস্থা ছিল এখন সে অবস্থা নেই। এখন নতুন প্রতিযোগী দেশ হিসেবে এসেছে ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ইথিওপিয়া ও কেনিয়া। এখন তাই আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করতে হবে। এটিই হল এ শিল্পের কাছ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া। সুসংবাদ হল, এই মান বৃদ্ধি পেলে শিল্পের মালিকদের ও শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ২০১৫ সালে ৭২ ভাগ ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সরকার। ইপিজেডের জন্য নতুন আইনের যে খসড়া সেখানেও সংশোধনের প্রয়োজন আছে।
বাংলাদেশে সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক কারণে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিচ্ছে না। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?-এমন প্রশ্নে-
বার্নিকাট বলেন, জিএসপি একটি আইনগত ইস্যু। আমাদের কংগ্রেস জিএসপি প্রথা সৃষ্টি করে কিছু সুস্পষ্ট নিয়ম-কানুন করে দিয়েছে। কোন দেশকে জিএসপি থেকে লাভবান হতে হলে এ ক্রাইটেরিয়া অবশ্যই পূরণ করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জিএসপি স্থগিত করার পর বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে অগ্রগতি ঘটিয়েছে। ফলে জিএসপি পুনর্বহালের বিষয়টি ব্যাপক অর্থে বাংলাদেশের হাতেই রয়েছে। এটি ফিরে পাওয়ার জন্য অ্যাকশন প্ল্যান রয়েছে। এর আওতায় মূল বিষয়ই হল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দেয়ার সদিচ্ছা। এ অধিকার হতে হবে আইএলও’র সমান মানসম্পন্ন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হলে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক শিল্পে সংস্কার হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। কেননা শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হলে তাদের অনুপস্থিতির হার কমে যায়। দেখা গেছে, একটি কারখানায় অনুপস্থিতির পরিমাণ অর্ধেকে নেমে গেছে। ছুটির দিনেও শ্রমিকরা কাজ করতে আগ্রহী হয়েছেন। এতে করে শিল্পটি পুরো উৎপাদন করতে পেরেছে। এ সময়ে কারখানায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়া কম হয়েছে। ফলে কারখানায় ১০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে কারখানার মালিক অর্থ সাশ্রয় করতে পেরেছেন। ফলে সুসংবাদ হল, এ সংস্কার কার্যক্রমের ফলে শ্রমিকের সুরক্ষা হচ্ছে, কারখানার সুরক্ষা হচ্ছে এবং কারখানার মালিক মুনাফা পাচ্ছেন। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
১৯৭১ সালে যুদ্ধে বাংলাদেশে যারা নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে, তাদের বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে পাশাপাশি এটিও ঠিক, এ বিচারে কোন ব্যক্তির দায়-দায়িত্বের বিচারে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র অবাধ ও সুষ্ঠু বিচার কামনা করে। এ বিচারে মৃত্যুদ- থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে, ন্যায়বিচার যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। সেটি অবশ্যই সন্তোষজনক আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে।