Wednesday, September 10, 2025
বদরুদ্দীন উমর নিজ বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেননি by মহিউদ্দিন আহমদ
বদরুদ্দীন উমরের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭০ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। তাঁর তিনটি বই সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা পড়ে আমাদের প্রজন্ম সেক্যুলার ধ্যানধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। আমরা ঋদ্ধ হয়েছি। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে পাকিস্তানবাদের মোড়কে প্রতিক্রিয়াশীলতার যে আফিম আমাদের গেলানো হচ্ছিল, তার নিপুণ একাডেমিক ব্যবচ্ছেদ দেখেছি এই সব বইয়ে। তরুণ বয়সে বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি অনেক কিছুই জানতাম না।
এর পরপরই ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হলো ভাষা আন্দোলন নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি বইয়ের প্রথম খণ্ড। এ দেশে একাডেমিক ধাঁচের ইতিহাস গবেষণা তাঁর হাত দিয়েই শুরু, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এ ক্ষেত্রে তিনি তো পথিকৃৎ।
আমাদের দেশে অনেকেই লেখেন। অনেকেই রাজনীতি করেন। বদরুদ্দীন উমরের মধ্যে এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটেছিল। বলা যায়, রাজনীতি আর লেখালেখি এক মোহনায় মিশে গিয়েছিল তাঁর জীবনে। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে রাজনীতির অ্যাকটিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবী। এ ধরনের ব্যক্তিকে বলা হয় ‘অরগানিক ইন্টেলেকচুয়াল’। এটা আমাদের দেশে বিরল।
বদরুদ্দীন উমর একসময় পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। একই সঙ্গে নিয়মিত লিখেছেন গণশক্তি, হলিডে ও গণকণ্ঠ পত্রিকায়। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ গণকণ্ঠ পত্রিকার সুবাদে। আমি তখন ওই পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা। গণকণ্ঠ পত্রিকায় তাঁর উপসম্পাদকীয় ছাপা হতো প্রতি রোববার। আমি তাঁর শান্তিনগরের বাসা থেকে লেখা নিয়ে আসতাম শুক্রবার। সম্মানীর চেক হাতে করে পৌঁছে দিতাম বাসায়। তারপর দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না।
বছর দুই আগে তাঁর সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। আমার বেলা-অবেলা বইটি পড়ে তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তারপর তাঁর রূপনগরের বাসায় গেছি অনেকবার। গণকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় আর প্রবন্ধের একটা সংকলন তৈরি করেছিলাম বাতিঘরের জন্য। সেখানে বদরুদ্দীন উমরের ৯টি লেখা ছিল। তাঁর অনুমতি নিতে গিয়েছিলাম। আমার চেহারা দেখেই তিনি রাজি হয়ে যান। আমি তাঁকে ঢাউস সাইজের বেশ কয়েকটি বই দিলাম। তিনি বললেন, ‘আপনি এত লেখেন?’ জবাবে বলেছিলাম, ‘আপনাকে বিট দেব।’
বদরুদ্দীন উমর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার নিরাপদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) মুখপত্র গণশক্তির সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বেতন-ভাতার ঠিক ছিল না। পার্টির কাজে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ‘শ্রেণিচ্যুত’ হওয়া বলতে যা বোঝায়, তিনি সেটি হয়েছিলেন। গরিব চাষির বাড়িতে থাকা-খাওয়া, রাস্তার ধারে প্রাতঃকৃত্য সারা। বিচিত্র তাঁর সে সময়ের অভিজ্ঞতা। তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি এখন ডি-ক্লাসড, গ্রামে থাকি।’ বাড়ির ছবি দেখালাম। ছবি দেখে তিনি খুবই উচ্ছ্বসিত। বললেন, ‘আমি যাব।’ পরে শরীর-স্বাস্থ্য বিবেচনা করে ক্ষান্ত হন।
বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছে। আমি এক বন্ধুর মাধ্যমে অনুরোধ জানালাম, সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তিনিও জানালেন, কখন কী হয়, বলা যায় না। কিছু কথা বলে যেতে চান। তো গেলাম তাঁর বাসায়। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু মুহাম্মদ কাইউম। ঝাড়া তিন ঘণ্টা সাক্ষাৎকার নিলাম। কাইউম ভিডিও করলেন। কথা তখনো ফুরায়নি। পরদিন আবার গেলাম। আবারও তিন ঘণ্টা। ছয় ঘণ্টার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি হলো পাণ্ডুলিপি। প্রথমা প্রকাশন এটি ছাপল ২০২৪ সালের আগস্টে। বইয়ের নাম ‘বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা’।
সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর অনেক খোলামেলা কথা বলেছেন। আমি সবই লিখে দিয়েছি। এ ধরনের সাক্ষাৎকারে অনেক বৈঠকি আলাপ হয়। কেউ কেউ মনে করেন, সব ছাপানো ঠিক নয়। আমি সে রকম ভাবি না। কে কী মনে করলেন, সেটা নিয়ে ভাবতে গেলে অনেক কিছুই লেখা যায় না। পশ্চিমের দেশগুলোয় এ ধরনের রাখঢাক বা শুচিবাই নেই। আমাদের সমাজে এটা প্রবল-পাছে লোকে কিছু বলে। জীবন তো একটাই। যা মনে আসে, তা বলা দরকার, লেখা দরকার; আমি এমনটাই মনে করি। সমস্যা হলো ‘মব’। দেখা যায়, একটা কিছু লিখলে ভবঘুরে, অর্বাচীন বা মূর্খের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, ‘সুশীল’রাও ‘মব’ তৈরি করে বলতে থাকে, এটা বলা উচিত হয়নি, ওটা লেখা ঠিক নয় ইত্যাদি।
বদরুদ্দীন উমর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। তাঁর দল কখনোই পাদপ্রদীপের আলোয় আসেনি। সুতরাং তাঁকে অনেকেই এককথায় নাকচ করে দিতে পারেন। এটা নিয়ে তাঁর কোনো দুর্ভাবনা ছিল বলে শুনিনি। এমন তো হয় অনেক সময় যে মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটছে একদিকে, আর অন্য একজন স্থির দাঁড়িয়ে আছে বা অন্যদিকে হাঁটছে। সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করার মানসিকতা দিয়ে আমরা রায় দিতে বসি, কে ঠিক আর কে বেঠিক।
আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যেখানে দ্বিধান্বিত, ভণ্ডামি, ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের ছড়াছড়ি। আমি অনেককে জানি, যাঁদের প্রতি রোমকূপ দিয়ে বিপ্লব ফেটে বেরোচ্ছে। তাঁরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা সরকারি কোনো সংস্থায় চাকরি করেন। কিন্তু তাঁদের চাকরি যায় না। বহাল থাকে। কীভাবে সম্ভব? সেদিক দিয়ে বদরুদ্দীন উমর ব্যতিক্রম। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে কখনো প্রতারণা করেননি।
উমর বাংলা একাডেমি পুরস্কার নেননি। একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিছুদিন আগে একটি প্রতিষ্ঠান তাঁকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছিল। তিনি সেটি গ্রহণ করেননি। তাঁর একটা নীতি ছিল, তিনি সরকার বা করপোরেট জগতের কাছ থেকে কিছু নেবেন না। বলতেন, ‘লেখালেখি আমার প্যাশন। মনের আনন্দে লিখি। সে জন্য পুরস্কার নিতে হবে কেন।’
বদরুদ্দীন উমর ধূমপায়ী ছিলেন। পাইপ ব্যবহার করতেন। তাঁর প্রিয় তামাক ছিল ‘এরিনমোর’। একবার তাঁকে বলেছিলাম, পরেরবার এলে তাঁর জন্য তামাক নিয়ে আসব। বাজারে খুঁজে পাইনি। তিনি বললেন, ‘না এনে ভালো করেছেন। বন্ধুরা কেউ বিদেশ থেকে এলে গিফট করে যায়। এখনো ছয় মাসের স্টক আছে।’ মিষ্টি পছন্দ করতেন। আর এ বয়সেও পড়াশোনা করতেন প্রচুর।
বদরুদ্দীন উমরের অনুযোগ ছিল, অনেক প্রকাশক তাঁকে ঠকিয়েছেন। আমাকে খোলাখুলি বলেছেন, নাম ধরে ধরে। আমার বইয়ে সেসব উল্লেখ করেছি।
শেখ হাসিনা তাঁর ওপর খুবই ক্ষিপ্ত ছিলেন। কারণ, উমর বলতেন, প্রথম পর্যায়ে ১৯৪৮ সালে পাঁচ দিন জেলে থাকা ছাড়া ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ভূমিকা নেই। এ ধরনের কথা হাসিনার পক্ষে হজম করা সম্ভব ছিল না। উমর এতটাই জানতেন যে হাসিনা তাঁকে ঘাঁটাতে সাহস পাননি। সহ্য করে গেছেন। যা উমর কখনো কারও কাছে বলেননি, তাঁর অনেক কিছুই আমাকে বলেছেন। সময় ও সুযোগ পেলে সেসব প্রকাশ করব।
দাপটের সঙ্গে একটা জীবন কাটিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর। অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, তিনি অহংকারী। তাঁর তো তেমন ধন-সম্পদ নেই। ব্যাংকার স্ত্রীর চাকরির সুবাদে মীরপুরের রূপনগরে ছোট একটা বাড়ি তৈরি হয়েছিল। মাথার ওপর ছাদ ছিল। আর ছিল জ্ঞানের, পাণ্ডিত্যের অহংকার। এটা থাকতেই পারে।
আমরা কাউকে বড় করে তুলতে তাঁর নামের সঙ্গে অনেক বিশেষণ যুক্ত করি। বদরুদ্দীন উমরের ক্ষেত্রে এটার দরকার হয় না। তিনি লিজেন্ড, সাহসী, বিদ্রোহী, এসব বলে কী হবে। তাঁর বইগুলোই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। প্রশ্ন হলো, মূর্খের দেশে প্রবন্ধকারের জীবন খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তিনি এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমার প্রার্থনা, তাঁর সাহসের কিছুটা হলেও যেন আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়। আমি সেটাই আগলে ধরে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব আর স্মরণ করব তাঁকে।
* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫) ফাইল ছবি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
কাতারে হামলা চালিয়ে সীমা ছাড়িয়ে গেছে ইসরায়েল
অল্প সময়ের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে লক্ষ্য করে চালানো এ হামলার প্রকাশ্য দায় নেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েল এটি শুরু করেছে, ইসরায়েল এটি পরিচালনা করেছে এবং ইসরায়েল পূর্ণ দায় নিচ্ছে।
এ হামলার মধ্য দিয়ে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াতে এক ধাপ এগোল ইসরায়েল। এর আগে দেশটি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, সিরিয়ার আরও ভূমি দখল করেছে, লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতাদের হত্যা করেছে আর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৬৪ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।
কিন্তু দোহায় হামলা নতুন মাত্রা তৈরি করল। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র কাতারে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। দেশটি ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি সই এবং সেখান থেকে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেই দেশেই কিনা সরাসরি হামলা চালাল ইসরায়েল।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মায়েরাভ জোনজেইন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ইসরায়েল যখন ইচ্ছা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জনবহুল এলাকা ও রাজধানীতে হামলা চালায়। এখনো করছে, ভবিষ্যতেও করবে—যদি না কেউ গুরুত্বের সঙ্গে এটি ঠেকানোর উদ্যোগ নেয়।’
ফিলিস্তিনি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তার বলেন, এ হামলায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। কারণ, এটি মোসাদের প্রচলিত কাজের ধারা থেকে অনেক বাইরে, যেখানে হত্যাকাণ্ড সাধারণত গাড়িবোমা, বিষপ্রয়োগ কিংবা গুলি ও স্নাইপার হামলার মাধ্যমে ঘটানো হয়।
হামজা আত্তার বলেন, ‘আমি মনে করি না...কাতারিরা কখনো ভেবেছিলেন, ইসরায়েল দোহায় বোমা ফেলবে।’
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো চিনজিয়া বিয়াঙ্কো বলেন, ‘আগে ইসরায়েলের বিশ্বজুড়ে হামলার কারণে কাতার জানত যে তারা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কিন্তু সরাসরি আক্রমণ, এমন দুঃসাহসিক ও বেপরোয়া পদক্ষেপের কথা কেউ কল্পনাও করেনি। আমি বলব, এটা সবাইকেই অবাক করেছে।’
যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তেমন কোনো প্রতিবাদ পায়নি ইসরায়েল—না বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়, না তাঁর আগের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়।
হামলার পর হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্পের প্রথম মন্তব্যে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে অবগত ছিল, তবে ইসরায়েল একতরফাভাবে এ হামলা চালিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এ হামলা ইসরায়েলি বা মার্কিন লক্ষ্য পূরণ করেনি, তবে হামাসকে আঘাত করা একটি ‘যথাযথ লক্ষ্য’।
আল–জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, ‘বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া ইসরায়েল এমন হামলা চালানোর সাহস করবে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই অনুমোদন না দিয়ে থাকে, তবে আমাদের উচিত তাদের কাছ থেকে নিন্দা শোনা। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলার সময় ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত তাদের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র ইসরায়েলের এ আচরণের নিন্দা করা।’
যুদ্ধবিরতি আলোচনার সমাপ্তি
গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা ট্রাম্প নিজেই জোর দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছেন। তবে শর্ত হিসেবে তিনি হামাসকে হুমকি দিয়েছেন—চুক্তি না হলে গাজায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে যেন মূল বাধা হামাসই। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অতীতে হামাস যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মত হলেও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছে কিংবা আলোচনার শর্ত পাল্টে দিয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে কিছু জিম্মি মুক্তি ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির শর্ত ছিল। সেই সময় স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার কথা ছিল।
প্রথমে সমর্থন দিলেও পরে ইসরায়েল সেই প্রস্তাব বাতিল করে। এখনকার আলোচনায় বলা হচ্ছে, হামাস সব জিম্মিকে মুক্তি দেবে, কিন্তু এর বিনিময়ে শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাজা সিটিতে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান, যেখানে তারা সব ফিলিস্তিনিকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েল বারবার বলছে, হামাসকে ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, আলোচনার ফল যা–ই হোক না কেন, ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়।
বিশ্লেষক জোনজেইন বলেন, ‘মূলত দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েল কোনো যুদ্ধবিরতিতে বা যুদ্ধবিরতি বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহী নয়। ট্রাম্পের হামাসের সঙ্গে আলোচনা কিংবা নতুন প্রস্তাব আসলে শুধু নাটক। আর দোহায় হামাস নেতাদের হত্যাও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কৌশলগতভাবে পাল্টে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়।’
অন্যান্য বিশ্লেষকও এ মতামতের সঙ্গে একমত। যেমন ‘যুক্তরাষ্ট্র/মধ্যপ্রাচ্য প্রকল্প’–এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ইসরায়েলি আলোচক ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ‘ইসরায়েল আলোচনার প্রতি, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞাকে একেবারে স্পষ্ট নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। অনেক আগেই আমাদের উচিত ছিল বুঝে নেওয়া—ইসরায়েল সৎভাবে আলোচনায় বসছে কি না। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’
কাতারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
কাতার দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয়ের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় দেশটি যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে দোহায় ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা করেছে কাতার। যুদ্ধ শুরুর আগেও গাজায় ত্রাণ পাঠাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করেছিল তারা।
দোহাভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল-ইমাদি বলেন, ‘কাতার গাজায় পরিস্থিতি শান্ত করতে ও উভয় পক্ষকে যুদ্ধ থেকে বের করে আনতে সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করছে, কিন্তু ইসরায়েল এসব প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’
এর আগেই কাতারকে টেনে আনা হয়েছিল আঞ্চলিক সংঘাতে। গত জুনে ইরান কাতারে আল উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, যদিও তেহরান স্পষ্ট করেছিল, এটি কাতারকে লক্ষ্য করে নয়। আর এখন ইসরায়েলের হামলা হলো দোহায়।
আল-ইমাদি মনে করেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কাতার আন্তর্জাতিক মহলে আরও জোরালোভাবে ইসরায়েলের আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলবে। তিনি বলেন, কাতার চেষ্টা করবে বিশ্ব জনমতকে সংগঠিত করে ইসরায়েলকে চাপের মুখে ফেলতে; যাতে তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানায়।
টেক্সাসের রাইস ইউনিভার্সিটির ‘বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’র মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন বলেন, তিনি আশা করছেন, কাতার ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জানতে চাইবেন, ট্রাম্প প্রশাসন আসলেই এ হামলায় সম্মতি দিয়েছিল কি না।
উলরিখসেন বলেন, যদি সত্য হয়, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র–উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বকে সরাসরি আঘাত করবে।
বিশ্লেষকেরা আরও বলেন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর উচিত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ানো।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো বিয়াঙ্কো বলেন, (মধ্যপ্রাচ্যে) যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সেনা মোতায়েন একসময় কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করত, কিন্তু এখন সেটি ভেঙে পড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া হতে পারে—মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আর আগের মতো গুরুত্ব নেই।
বিয়াঙ্কো আরও বলেন, আসলে কেউ নিরাপদ নয়, আর কোনো জায়গাই (ইসরায়েলের হামলার জন্য) নিষিদ্ধ নয়। এর প্রভাব অবশ্যই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সবার জন্যই আছে।
সাবেক ইসরায়েলি আলোচক লেভি বলেন, ‘প্রতিটি রাষ্ট্রেরই উচিত (ইসরায়েলের) এমন দায়মুক্তির অবসান ঘটাতে আগ্রহী হওয়া। কারণ, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ও তাদের বোমা একদিন আপনার পাড়াতেই পৌঁছাবে, যদি এখনই একজোট হয়ে এটি ঠেকানো না যায়।’
লেভি প্রশ্ন রাখেন, যুক্তরাষ্ট্র কি গোটা অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক চাইবে, নাকি ইসরায়েলের অপরাধী আচরণকে প্রশ্রয় দেবে?
![]() |
| কাতারের রাজধানী দোহায় হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি একজন সামরিক কর্মকর্তা জানান, গতকাল দোহায় তাঁদের এ বিমান হামলা ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করা চালানো হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
নয়া রাজনীতির পথে নেপাল, আলোচনায় কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, বহু দশক ধরে নেপালের শাসনব্যবস্থা ছিল কিছু রাজনীতিবিদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। তারা দেশকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছেন এবং জনগণকে দেখেছেন দাস হিসেবে। এই পুরনো প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব করেন কেপি শর্মা ওলি, শের বাহাদুর দেউবা, পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) প্রমুখ। তরুণদের উপর গুলি চালানোর মতো সহিংস দমননীতি অনুসরণ করে ওলি সরকার নিজের পতনের পথ নিজেই তৈরি করে দেয়। সোমবারের সেই বর্বর হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পদত্যাগ করেন তিনি।
সম্পাদকীয়টি বলছে, এবারের গণআন্দোলন ছিল আত্মত্যাগে ভরা, তবু গভীরভাবে সচেতন ও সংগঠিত। লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছে। তাদের একটাই দাবি- পরিবর্তন। তারা নতুন নেতৃত্ব চায়। চায় জবাবদিহিতা ও সুশাসন। এই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল জেনারেশন জেড বা জেন জি। অর্থাৎ তরুণ ও নবীন নাগরিকরা। যারা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণরা এখন সরাসরি কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন- এসো বালেন্দ্র, আমাদের এই সংকট থেকে রক্ষা করো। ১৯৯০ এবং ২০০৬ সালের মতো বড় রাজনৈতিক পালাবদলের সময় যেমন নেতৃত্ব উঠে এসেছিল আন্দোলনের মাঝ থেকে, তেমনি এবারও বালেন্দ্র হয়ে উঠেছেন জাতির প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু।
সম্পাদকীয় মতে, নেপালের সামনে এখন যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা এক ঐতিহাসিক মোড়। এই পরিবর্তনকে অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজন নতুন পরিকল্পনা, শান্তি, সংলাপ এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার রূপরেখা। এই প্রক্রিয়ায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে নতুন নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী, বিরোধী দলসমূহ এবং সাধারণ জনগণের উচিত- তরুণ নেতৃত্ব ও বালেন্দ্রর প্রতি আস্থা রাখা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ, এখন সময় এসেছে কার্যকর এবং নৈতিক নেতৃত্বের।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট বলছে, এবারের আন্দোলন শুধু সরকারের বিরুদ্ধে নয়- এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সংগ্রাম। এই সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হবে জবাবদিহিতা, সুশাসন ও নৈতিকতা। আর সেই নতুন নেপালের চালকের আসনে গোটা জাতি বালেন্দ্র শাহকে দেখতে চায়।
জেন-জি’র বিজয়, নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি’র পদত্যাগ
তীব্র জনরোষের পর অবশেষে পদত্যাগ করলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। কিছুক্ষণ আগে তিনি টেলিভিশনে দেয়া বিবৃতিতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এ খবরে আনন্দে ভাসছে নেপাল। পদত্যাগ করার পর ওলি’র ভবিষ্যত কি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মিডিয়ায় একটি কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। তাহলো তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন। আশ্রয় নিতে পারেন অন্য কোনো দেশে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তিনি বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মতো পরিণতি ভোগ করতে পারেন। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ওলি বলেছেন, তিনি সাংবিধানিক সমাধানের পথ তৈরি করে দেয়ার জন্য পদত্যাগ করছেন।
এর আগে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ধরিয়ে দেয় বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপির বাসভবনে। এ অবস্থায় দেশটির আভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল অচল হয়ে গেছে। আংশিক বন্ধ হয়ে গেছে কাঠমান্ডু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মঙ্গলবার সানেপায় শাসকদল নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় জেন-জি আন্দোলনকারীরা। আগুনে পুড়ছে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির ব্যক্তিগত বাসভবন। দাউ দাউ জ্বলছে আরও মন্ত্রী, এমপিদের বাসভবন। বিক্ষোভকারীদের এখন একটাই দাবি পদত্যাগ করতে হবে প্রধানমন্ত্রী ওলি’কে। কিন্তু এক বিবৃতিতে তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু ক্ষোভের আগুন কিছুতেই প্রশমিত হয়নি। কারফিউ ভঙ্গ করে বিভিন্ন শহরে নেমে পড়েছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ওলি’র পদত্যাগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে প্রভাবশালী পত্রিকা কাঠমান্ডু পোস্ট।
অনলাইন এনডিটিভি বলছে, এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কৃষি বিষয়ক মন্ত্রী সহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পাউডেলের বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে মন্ত্রী আরজু রানা দেউবা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখাকের বাড়িতে। জ্বলছে যোগাযোগ বিষয়ক মন্ত্রী পৃথ্বি শুভ গুরুংয়ের বাসভবন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ডের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল। এর বাইরে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।
কাঠমান্ডু পোস্ট আরও বলছে, সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে ১৯ তরুণ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর থেকেই এ আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করে। এ ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে দুর্নীতি ও কুশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ সড়ক বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ও বড় বড় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। কাঠমান্ডু উপত্যকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। অশান্তি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
কাতারে ইসরায়েলের হামলার ঘটনায় ‘খুবই অসন্তুষ্ট’ ট্রাম্প
এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের এ হামলার ‘প্রতিটি দিক নিয়েই আমি খুবই অসন্তুষ্ট।’ এ বিষয়ে আজ বুধবার পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
ওয়াশিংটনের একটি রেস্তোরাঁয় কাতার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের এ হামলা নিয়ে আমি আনন্দিত নই। এটা ভালো পরিস্থিতি নয়। তবে আমি এটুকু বলব—আমরা জিম্মিদের ফেরত চাই; কিন্তু আজ যেভাবে ঘটনাটা ঘটেছে, তাতে আমরা মোটেও খুশি নই।’
মঙ্গলবারের ওই হামলাকে ইসরায়েল ন্যায্য বলে দাবি করলেও কাতার একে বিশ্বাসঘাতকতা ও ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি বলেন, হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি আলোচনার জন্য কাতার যে চেষ্টা চালাচ্ছিল, তা এ বিমান হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেস্তে যেতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, হামাসকে হামলার নিশানা করাকে যৌক্তিক মনে করেন তিনি। তবে উপসাগরীয় দেশ কাতারে হামলা হওয়ায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত। ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র কাতার ন্যাটোর সদস্য নয়। তবে কাতারেই অনেক বছর ধরে হামাসের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা অবস্থান করছেন।
সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এ হামলার কারণে গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা এবং প্রায় দুই বছর ধরে চলা সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ট্রাম্পের প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগী দেশ কাতার। সেখানে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার ও মিসর। তবে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এখন ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে।
হামাস বলেছে, হামলায় সংগঠনটির গাজা অঞ্চলের প্রধান (নির্বাসিত) এবং শীর্ষ আলোচনাকারী খলিল আল-হায়ার ছেলেসহ তাঁদের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। হামাস বলেছে, ইসরায়েল তাদের যুদ্ধবিরতিবিষয়ক আলোচনাকারী দলের সদস্যদের হত্যার চেষ্টা করেছিল। তবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প লিখেছেন, হামলার ঠিক আগে মার্কিন সেনারা তাঁর প্রশাসনকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছে। তবে এ সতর্কবার্তা ইসরায়েলের কাছ থেকেই এসেছে কি না, তা তিনি বলেননি।
ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ কাতার শান্তিপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মধ্যস্থতার জন্য অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম এবং ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। দেশটির অভ্যন্তরে একতরফাভাবে বোমা হামলা চালিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।’
হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য সুহাইল আল-হিন্দি আল জাজিরা টিভিকে বলেন, ইসরায়েলের হামলায় তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব অক্ষত আছে।
ট্রাম্প বলেন, তিনি তাঁর দূত স্টিভ উইটকফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন কাতারকে হামলার আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়। তবে কাতার বলছে, হামলার আগে তাদের সতর্কবার্তা দেওয়ার খবর মিথ্যা। একজন মার্কিন কর্মকর্তা ফোন দিয়েছেন ঠিকই, তবে ততক্ষণে দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল-থানি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কাতার এ হামলার ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার রাখে এবং তারা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।’
হামলায় কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার।
হামলার পর কাতারের আমিরকে ফোন করে এ ধরনের ঘটনা ওই দেশে আর ঘটবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেছেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, খলিল আল-হায়াসহ হামাসের শীর্ষ নেতারা এই হামলার লক্ষ্য ছিলেন। এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেছেন, ইসরায়েল এখনো হামলার তথ্য সংগ্রহ করছে ও হামলায় কোনো হামাস নেতা বা কর্মকর্তা মারা গেছেন কি না, তা এখনো ঠিক জানা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েল হামলার ঠিক আগে মার্কিন সেনাদের জানিয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের সঙ্গে আগে থেকে এ ব্যাপারে কোনো সমন্বয় করা হয়নি বা ওয়াশিংটন থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
গত মে মাসে কাতার সফর করেছেন ট্রাম্প। ওই সময় তিনি যে হোটেলে ছিলেন সেটির অবস্থান গতকালের হামলাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে।
সোমবার জেরুজালেমের উপকণ্ঠে একটি বাস স্টপেজে হামলায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেড দায় স্বীকার করে।
নেতানিয়াহু কাতারে চালানো হামলাকে সম্পূর্ণ ন্যায্য বলে দাবি করেছেন।
![]() |
| কাতারে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবন। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
নেপালে বাংলাদেশের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে by কে. এম. সীথি
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র জনতার আন্দোলন কয়েক দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটায়। পাকিস্তান রাস্তায় সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে টলতে থাকে। আর এবার পালা নেপালের।
হিমালয়ান প্রজাতন্ত্র নেপাল কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতার মুখে পড়েছে। কাঠমান্ডু ও অন্যান্য বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে প্রবল বিক্ষোভের ঝড়। এর নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেনারেশন জেড বা জেন-জি।
দুর্নীতি, ব্যর্থ শাসন এবং হঠাৎ করে ডিজিটাল স্বাধীনতার ওপর হামলার মিশ্রণ এই আন্দোলনের জ্বালানি। সেখানে এ পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শত শত মানুষ। সেনাবাহিনী এখন রাস্তায়।
ধারণা করা হচ্ছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভাঙছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। এমনকি সংসদ ভবনের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করছে।
এসব দৃশ্য পুরো অঞ্চলকে নাড়া দিয়েছে। নেপাল নামের যে দেশটিকে বাইরে থেকে অনেকেই শান্ত একটি পর্যটন স্বর্গ বলে ভাবেন, আজ সে দেশ গণবিপ্লবের ময়দানে পরিণত হয়েছে।
এই অস্থিরতার স্ফুলিঙ্গ ছিল সরকারের একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তটি হলো দুই ডজনেরও বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব আর এক্স (আগের টুইটার) এক রাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেবল টিকটক টিকে ছিল, কারণ তারা সরকারের নিবন্ধন নীতি মেনে নিয়েছিল। সরকারের ব্যাখ্যা ছিল—বিধি লঙ্ঘন, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও অনলাইন অপব্যবহারের কারণে এগুলো বন্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু তরুণ নেপালিদের কাছে এটি ছিল স্রেফ সেন্সরশিপ। তাঁরা এটিকে নিজেদের মতপ্রকাশ, সংগঠন গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল যুগে বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছেন।
শুরুতে নির্দিষ্ট স্থানে সমাবেশ হলেও দ্রুত তা গণমিছিলে রূপ নেয়। এটি ছড়িয়ে পড়ে কাঠমান্ডু, পোখারা, বিরাটনগর ও ভরতপুরে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে দেন। সরকারি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এমনকি সংসদ ভবনও আক্রান্ত হয়।
কঠোর দমননীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র এসবের জবাব দিয়েছে। রাস্তায় গুলি ছোড়া হয়েছে। রাবার বুলেট আর টিয়ারগ্যাসে বাতাস ভরে গেছে। লাঠিপেটায় বহু মানুষ রক্তাক্ত হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর ধরপাকড়ের পর হাসপাতালে শয্যা ফুরিয়ে গিয়েছিল, কারণ আহতদের ভিড় সামলানো যাচ্ছিল না। কারফিউ আর রাস্তা অবরোধে এখনো পাড়া-মহল্লা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে সেনা নামানো হয়েছে।
তবুও প্রতিবাদ থামেনি। বরং তা আরও বড় হয়েছে। আরও ক্ষুব্ধ হয়েছে—যেন তরুণ প্রজন্ম বিশ্বাস করে বসেছে, সরকার কেবল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার জন্যই তাদের ওপর দমন চালাচ্ছে। যা শুরু হয়েছিল ডিজিটাল অধিকারের দাবিতে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
ক্ষমতাসীন অভিজাতরা ভেবেছিলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করলেই বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তার উল্টোটা হয়েছে। এটাই তরুণদের জন্য হয়ে উঠেছে স্লোগান ও সংগ্রামের ডাক।
‘দুর্নীতি বন্ধ করো, সামাজিক মাধ্যম নয়’—এটিই এখন আন্দোলনের মূল স্লোগান। এটি প্রকৃত ক্ষতকে সামনে এনেছে। সেই ক্ষতটি হলো, দশকের পর দশক ধরে নেপালের রাজনীতিকে গ্রাস করা দুর্নীতি আর দায়মুক্তির সংস্কৃতি।
নেপালের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীলতা ও কেলেঙ্কারিতে ভরা। সরকার গড়া ও ভাঙা যেন এক অন্তহীন খেলা। জোট ভেঙে যায় তুচ্ছ প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। নেতারা সহজেই দলবদল করেন। কিন্তু যে জিনিস কখনো বদলায় না, তা হলো দুর্নীতির কালো ছায়া।
শুধু ২০২৫ সালেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ বিষয়ক মন্ত্রী ঘুষের অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন। এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
বিমানবন্দর নির্মাণে জালিয়াতি, নেপাল টেলিকমে অর্থ আত্মসাৎ, অভিবাসন দপ্তরে চাঁদাবাজি—এসব কেলেঙ্কারিতে রীতিমতো তোলপাড় হয়েছে। স্বর্ণ চোরাচালান ও শরণার্থী প্রতারণা কেলেঙ্কারিতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখেছে, বড় নেতাদের আসলে কোনো সাজা হয় না। সেখানে দেখা যায়, তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়, নিচুতলার কর্মীরা শাস্তি পান, অথচ ক্ষমতাবানরা বেঁচে যান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনীতিকদের সন্তানদের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাক-গয়না প্রদর্শনের ছবি ভাইরাল হয়েছে। তাঁদের ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে—‘নেপো কিডস’। #NepoKids এবং #PoliticiansNepoBabyNepal হ্যাশট্যাগ সেখানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একটি তীব্র তুলনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে—‘তাদের সন্তানরা গুচির ব্যাগ নিয়ে ফেরে, আমাদের সন্তানরা কফিনে ফেরে।’
এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সেই বাস্তবতা: নেতাদের সন্তানরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরে দামি পণ্যের ঝাঁপি নিয়ে, আর সাধারণ পরিবারের সন্তানরা অসুরক্ষিত প্রবাসী শ্রমের শিকার হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে কফিনে লাশ হয়ে ফেরে।
এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি জনআস্থাকে ভেঙে চুরমার করেছে। অর্থনীতি তীব্র ধাক্কা খেয়েছে। নেপালিরা কর দেন, কিন্তু এর বিনিময়ে সড়ক, হাসপাতাল, স্কুলের উন্নতি পান না। মন্ত্রীরা কেবল নিজেদের পকেট ভারী করেন।
তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হওয়া কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ঘটনা নয়, এটি জনগণের চোখে ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত শ্রেণির অপরাধ ঢাকার নতুন কৌশল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই ছিল সেই মঞ্চ, যেখানে তরুণেরা নেতাদের বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল ট্রায়াল’ চালাতেন। মিম, ভিডিও ও ভাইরাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দুর্নীতি ফাঁস করতেন।
এই প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করার পদক্ষেপ ছিল যেন সেই নৈতিক জবাবদিহিকে শ্বাসরোধ করে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে জেন-জি। নেপালে এটাই সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার গোষ্ঠী। এ প্রজন্ম বড় হয়েছে স্মার্টফোন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বৈশ্বিক সংযোগের ভেতর দিয়ে।
কিন্তু তাঁদের অনেকেই দেশে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পর্যটন ও সেবা খাতের সংকুচিত সুযোগের মধ্যে তাঁরা আটকে আছেন অথবা বাধ্য হচ্ছেন অনিশ্চিত গিগ অর্থনীতির কাজে যুক্ত হতে। অন্যরা দেশ ছাড়ছেন, যোগ দিচ্ছেন সেই প্রবাসী শ্রমিকদের দলে, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স নেপালের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
এই রকম একটা সময়ে জেন-জি সেই হতাশাকে আন্দোলনে রূপ দিল। তাঁরা মিম, হ্যাশট্যাগ আর নাটুকা স্কিট ব্যবহার করে দুর্নীতিকে তুলে ধরলেন এক প্রজন্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে।
তাঁরা এনক্রিপটেড চ্যাট আর অফলাইন নেটওয়ার্কে মিছিল সংগঠিত করলেন। আন্দোলনে দেখা গেল এমন সব প্ল্যাকার্ড, যেগুলো সরাসরি ভাইরাল পোস্ট থেকে অনুপ্রাণিত। অনলাইন আর অফলাইনের সীমারেখা একেবারে ঝাপসা হয়ে গেল। যে প্ল্যাটফর্মগুলো আগে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের জায়গা ছিল, তার সম্প্রসারণ হয়ে উঠল রাজপথ।
এই আন্দোলন ছিল নেতাবিহীন। কোনো দল বা ব্যক্তি এর মালিকানা দাবি করতে পারেনি। এটা ছিল সচেতন কৌশল। নেপালে রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতি আর সুযোগসন্ধানীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই দলীয় সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে তরুণেরা তৈরি করল এক বিবেক-নির্ভর আন্দোলন। সেই আন্দোলনের মূল বক্তব্য হলো—‘ক্ষমতা দখলের জন্য নয়’।
তাঁরা কৌশল আর অনুপ্রেরণা নিয়েছেন শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলন থেকে, যেখানে যুবকেরা প্রতিষ্ঠিত অভিজাতদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। নেপালে এই আন্দোলন নীতি বা নীতিমালার চেয়েও বেশি মর্যাদার প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে। এটা মূলত এক রাষ্ট্রের কাছে সম্মান দাবি, যে রাষ্ট্র তাঁদের সব সময় অবাধ্য শিশু হিসেবে দেখেছে।
তবে ঝুঁকিও আছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ডিজিটাল ট্রায়াল’ অনেক সময় পক্ষপাত আর ভুয়া তথ্য ছড়ায়। আর রাগ-ক্ষোভ যে বাস্তব সংস্কারে রূপ নেবে তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যা স্পষ্ট তা হলো—একটা পুরো প্রজন্ম আর নেতাদের পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে না। তাঁরা নিজেরাই পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার এখন এমন এক ঝড়ের কেন্দ্রে, যেটা তারা সামলাতে পারছে না। প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত উল্টো বিপর্যয় ডেকে এনেছে। দুর্নীতির কেলেঙ্কারি জনরোষকে আরও তীব্র করেছে।
সহিংস দমননীতিতে শিক্ষার্থীরা শহীদে পরিণত হয়েছে, প্রজন্মের বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। ইতিমধ্যেই মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেছেন। একের পর এক জরুরি কেবিনেট বৈঠক হচ্ছে। এমনকি উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির মামলাগুলোতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার বিভাগও এখন তীব্র সমালোচনার মুখে।
অনেক নেপালির কাছে রাষ্ট্র আর তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে এক অভিজাত ক্লাব—যারা জবাবদিহির বাইরে, শোনার চেয়ে চুপ করিয়ে দেওয়াতেই বেশি আগ্রহী। এ কারণেই রাজতন্ত্রপন্থী সমাবেশ আবারও মাথা তুলছে।
সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবি ফিসফিস করে শোনা যাচ্ছে। ওলির সরকার কেবল কর্তৃত্বকে নয়, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিটুকুকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
যদি দমননীতি চলতেই থাকে, তবে অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ইতিমধ্যেই টলে গেছে। নেপালের প্রাণরেখাখ্যাত পর্যটন খাত হুমকির মুখে। প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। নেপালের এই আন্দোলনে ভারতও শঙ্কিত। কারণ ইতিহাসে দেখা গেছে, নেপালের অস্থিরতা অনেক সময় সীমান্ত ছাপিয়ে যায়। শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি এখানে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
মৃত্যুর সংখ্যা যত বাড়বে, নেপালের তরুণ আন্দোলন ততই তীব্র হবে। এটা নিঃসন্দেহে এক প্রজন্মের বিদ্রোহ—দুর্নীতি, বঞ্চনা আর দমননীতির বিরুদ্ধে। এ বিদ্রোহ শাসক শ্রেণিকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—‘যে রাজনীতি এত দিন চলে আসছিল, তার অবসান হয়েছে।’
রাষ্ট্রের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয় তারা নিষেধাজ্ঞা, গুলি আর ঘুষের নীতি আঁকড়ে ধরতে পারে যা কিনা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভাঙবে। অথবা তারা সংলাপের দরজা খুলতে পারে, সেন্সরশিপ তুলে নিতে পারে, আর সত্যিকারের সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতির মোকাবিলা করতে পারে।
সরকার কোন পথ বেছে নেবে তার ওপরই নির্ভর করছে—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর কেবল আরেকটি অস্থিরতার অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে, নাকি এটি হবে নতুন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনা।
পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই একটা স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কায়, বাংলাদেশে, আর এখন নেপালে—তরুণ প্রজন্মই ব্যর্থ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। যে সামাজিক মাধ্যমকে একসময় তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো, সেটাই হয়ে উঠেছে সংগঠন, দুর্নীতি ফাঁস আর বিদ্রোহের হাতিয়ার।
সরকারগুলো যখন একে বন্ধ করতে চেয়েছে, তখন তারা আবিষ্কার করেছে—দমননীতি কেবল বিদ্রোহকেই উসকে দেয়।
অঞ্চলের পুরোনো অভিজাত শ্রেণিকে এখন সতর্ক হতে হবে। তারা চাইলেই এই জোয়ার থামাতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়ছে—আর তারা চুপচাপ ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা রাখে না।
* কে. এম. সীথি, মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কেরালা) ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ অ্যান্ড এক্সটেনশন (আইইউএসএসআরই)-এর পরিচালক
- ইউরেশিয়া রিভিউ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার মুছে দিতে চায় বাংলাদেশ by অমিত রঞ্জন ও ধীময়ী ব্যানার্জি
এমনই একজন বীর হলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাধর অভিজাতদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দেশের ইতিহাসে মুজিবের অবদানকে বিরোধীরা যতই নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করুক না কেন, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নেতৃত্বের ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এই বছর মুজিবের (১৯২০-১৯৭৫) ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মুজিবকে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে হত্যা করা হয়। তার উপর অসন্তুষ্ট সেনা কর্মকর্তারা তাকে হত্যা করেন। ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনের অধীনে হোক বা সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার, মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য আখ্যানগুলোও জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই বছরগুলোতে ইসলামপন্থীরাও বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভিত্তি অর্জন করে।
বাংলাদেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের বীরোচিত ভূমিকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে মুজিবের নেতৃত্ব কতটা গণতান্ত্রিক ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য তার সরকার জাতীয় রক্ষী বাহিনী (ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স) গঠন করে, যা মূলত তার রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর নৃশংসতা চালায়। মুজিব সরকার দেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করে, একদলীয় শাসন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করে। ১৯৭৫ সালে সাংবিধানিক সংশোধনীর পর বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অধীনে অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৭৫ সালের জুন মাসে বেশিরভাগ সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়।
শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪) মেয়াদে মুজিব দেশের মানুষের মননের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নেন। হাসিনা হলেন মুজিবের কন্যা। ১৯৭৫ সালের গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া তার পরিবারের একমাত্র সদস্য ছিলেন তিনি এবং তার বোন রেহানা। ২০২৪ সালে যখন হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয় তখন মুজিবের উত্তরাধিকারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিক্ষোভকারীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়ালচিত্র, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে থেমিসের মূর্তি, স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাস্কর্য, ময়মনসিংহে শিল্পাচার্য জয়নুল
আবেদিনের ভাস্কর্য, মেহেরপুরে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্য - ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বিক্ষোভকারীরা ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামেও ভাঙচুর করে।
ছয় মাস পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপনকারী হাসিনা অনলাইনে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি তার সমর্থকদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তখন একদল জনতা, যাদের অনেকেই ছাত্র বিক্ষোভকারীদের সাথে যুক্ত, মুজিবুর রহমানের বাসভবন ধানমন্ডি-৩২-এ আগুন ধরিয়ে দেয়। পাবনা, চুয়াডাঙ্গা এবং রংপুরেও বিক্ষোভকারীরা মুজিবুর রহমানের দেয়ালচিত্র নষ্ট করে এবং জেলা আওয়ামী লীগ অফিস লক্ষ্য করে হামলা চালায়। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সম্পর্কিত মূর্তি এবং প্রতিকৃতি লক্ষ্য করে। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সম্পর্কিত মূর্তি এবং প্রতিকৃতি নষ্ট করে দেয়।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির(এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন যে, ‘ তাঁর (শেখ মুজিব) নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারতের একটি উপনিবেশ রাজ্যে পরিণত হয়। তার সময়েই ১৯৭২ সালে জনবিরোধী সংবিধান আরোপিত হয় এবং লুটপাট, রাজনৈতিক হত্যা ও একদলীয় বাকশাল একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।’ প্রতিষ্ঠিত আখ্যানের বিরুদ্ধে যেকোনো চ্যালেঞ্জের শুরু হয় তরুণ শিক্ষার্থীদের চেতনা গঠনের মাধ্যমে। হাসিনার পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি ভিন্ন দৃশ্যকল্প তৈরির পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা পূর্বে বিদ্যমান পাঠ্যপুস্তকগুলো সংশোধন করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। পাঠ্যপুস্তকগুলোতে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়ায় জড়িত রাখাল রাহার ভাষায়, সংশোধনের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাস থেকে তাদের মুক্ত করা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা শ্রেণি নবম ও দশম’ ( “History of Bangladesh and World Civilization Classes Nine and Ten) শীর্ষক ২০২৫ সালের সংশোধিত পাঠ্যপুস্তকে, মুক্তিযুদ্ধে মুজিবের ভূমিকা সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা করা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের ২০২ পৃষ্ঠায় মুজিবের ১৯৭১ সালের বিখ্যাত 'মার্চের' ভাষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই ভাষণে মুজিব বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির জন্য। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার জন্য’।
বইটির ২০৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- ‘২৬শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তারপর ২৭শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হয়ে তিনি আবার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’ তবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অসন্তোষের মুখেও বইটিতে মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই বছরের জুন মাসে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে 'জাতির পিতা' হিসেবে উল্লেখকারী ২০২২ সালের আইন পরিবর্তন করে। দেশ নায়ক এবং প্রতীকগুলো কেবল ইতিহাসের অংশ নয়। কিছু ক্ষেত্রে, ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিবৃত্ত করার জন্যও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ইতিহাস তৈরি করা হয়। আর তাই প্রতীকগুলো একটি জাতির মনন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং প্রায়শই সহিংস ঐতিহাসিক ভাঙ্গনের কারণে পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে মুজিবের ভূমিকা মুছে ফেলা যাবে না। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্নভাবে তা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। হাসিনা-পরবর্তী যুগে মুজিবের মূর্তির উপর আক্রমণ এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন মূলত হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রতিফলন। যিনি তার স্বৈরাচারী শাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য বাবার ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করেছিলেন। এখন মুজিব বিরোধী শক্তিগুলোও ভুল ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার করছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট
* অমিত রঞ্জন, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের একজন রিসার্চ ফেলো।
* ধীময়ী ব্যানার্জি, যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডক্টরেট ছাত্রী।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
কারাগারে আটক বম নাগরিকেরা কবে স্বজনের কাছে ফিরবে by মিলিন্দ মারমা
গ্রন্থের ভূমিকায় শুরুতেই রয়েছে একটি সহজ-সরল স্বীকারোক্তি: ‘সত্তর দশকের শেষ দিকে একটি আদিবাসী তরুণীর প্রেমে পড়ি। বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহ দেখতে গিয়ে। সে ছিল পরমারূপসী আর অত্যন্ত মিষ্টভাষী। ডিভাইন লাভ বা বেহেশতি প্রেমের সেই অনুভূতিগুলো আজও আমাকে ভাবায়। আমি সেই মেয়েটার স্বপ্নময়তায় আদিবাসী পল্লি এলাকায় অনেক ঘুরেছি।
অনেকের তিরস্কার, অনেকের পুরস্কার পেয়েছি। আবার দুঃখ-দারিদ্র্যজীর্ণ অনেক আদিবাসী মানুষের অসম্ভব সুন্দর আর ভালো মনের প্রকাশও লক্ষ করেছি। আমার স্বীকার করতে ভালো লাগে: আগের জন্মে আমি আদিবাসীই ছিলাম। টিলার ওপর ছিল আমাদের ঘর। লাউয়ের খোলে করে জল আনতাম অনেক দূরের ঝরনা থেকে, জুমচাষে আসত জীবিকা। নাপ্পি ও তরকারি পেলে সবচেয়ে ভালো মনে পেটপুরে খেতাম। বুনোহাঁস আর কালো হরিণের মাংসে আমাদের পালা-পার্বণগুলো বেশ জমত। আমার সেসব স্পষ্ট মনে পড়ে—আমি তো জাতিস্মর।’
এই স্বীকারোক্তিকে আমরা ‘কাব্যসত্য’ বলেই আপাতত মেনে নিই। আসলেই তো। কবিরা হচ্ছেন মানবজাতির জাতিস্মর। বহুকাল ধরে মানুষের চেতনার মধ্যে যে স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত রয়েছে, কবিরা সে অভিজ্ঞতা নিজের চেতনায় ধারণ করেন। সমালোচকদের মতে, আদিবাসী মানুষের চেতনার মধ্যে যে স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত আছে, তিনি সে অভিজ্ঞতা নিজের চেতনায় ধারণ করতে পেরেছেন। সেই অর্থে তিনি অবশ্যই একজন ‘জাতিস্মর’।
‘আদিবাসী কাব্য’ নিয়ে তিনি সবার সামনে মেলে ধরেছিলেন এক অপরূপ সৌন্দর্যের সুষমামণ্ডিত কার্পাসমহল। কবি হওয়াতেই হয়তোবা, পাহাড়ে থাকাকালে রীতিমতো তাঁকে কন্দর্পবাণে, অর্থাৎ প্রেম দেবতার বাণে বারবার আহত হতে হয়েছিল। তা না হলে তাঁর কবিতায় প্রেম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠবেই–বা কেন! ব্যক্তিপ্রেমের অন্বেষণে বেরিয়ে কবি আবিষ্কার করেছিলেন, একটি জনপদ ও সংস্কৃতির যুগ্ম সত্তাকে চিহ্নিত করে তিনি বিনির্মাণ শুরু করেছেন কবিতার।
একজন বম আদিবাসী তরুণীকে নিয়ে অক্ষরবৃত্তে লেখা তাঁর একটি কবিতায় ফুটে ওঠে বম তরুণীদের সহজ–সরল, নম্র, ভদ্র, কোমল, মিষ্টি, কোমল ব্যক্তিত্ব আর স্বভাবের প্রতিচ্ছবি। সিয়ামপুই বম লনচেয়ো হচ্ছেন একজন বম আদিবাসী তরুণী। তাঁর ভাঙা ভাঙা বাংলা উচ্চারণ কবির কাছে কেমন মিষ্টি আর আদুরে লাগত।
প্রতিটি বিকেলে হতো তাঁদের দেখাসাক্ষাৎ। দেখা হলে নম্র ভঙ্গিতে পদ্মের মুদ্রায় দুহাত কপালে ঠেকিয়ে উচ্চারণ করত মেয়েটা, ‘নমস্কার, স্যার।’ এক জোছনার বন্যায় প্লাবিত ঝকঝকে রুপালি রাতে কবির মনে পড়ে গিয়েছিল সেই তরুণীকে। তরুণীর ভীরুতা যেন রূপান্তরিত হলো খরগোশের নম্র আর কোমল স্বভাব বা চলনের মধ্যে। সবুজ সবুজ দূর্বাঘাসে সাদা আর নানা রঙের খরগোশের ভীরু ভীরু বিচরণ। ফলে জন্ম হলো একটি কবিতার:
কচি ঘাসের নেশায় খরগোশ
ত্রস্ত চোখ
শাদা আর এলোমেলো রঙে...
সুন্দরী সিয়ামপুই বম লনচেয়ো
বুনোফুলের প্ররোচনায়
প্রেমে খাবি খাওয়া তোমার আশেক
আদরের কেশর ফোলায়...
তুমি
সারামুখে সন্ন্যাসিনী-হাসি
মাংসল পদ্মের মুদ্রায়
দূর-দেবতার চোখে চোখে
সাজালে পরমা
একটা কোমল নমস্কার...
(বুনোফুলের প্ররোচনায়, আদিবাসী কাব্য, ১৯৯৭, কবি হাফিজ রশিদ খান)
কবি যখন সিয়ামপুই বম লনচেয়ো নামের তরুণীকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, তখন তিনি আসলে একটি ব্যক্তিকে নয়; বরং গোটা বম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরেছিলেন। তরুণীর ভদ্রতা, নম্রতা, কোমলতা ও মিষ্টি স্বভাব কেবল ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়, এটি পুরো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতিফলন।
কবির দৃষ্টিতে বম তরুণী হয়ে ওঠেন এক বহুমাত্রিক প্রতীক। তিনি প্রেমিকা, তিনি প্রকৃতির কোমলতার অংশ, আবার তিনি আধ্যাত্মিক সত্তারও প্রতীক। তাঁর মধ্যে ফুটে ওঠে গোটা বম জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বাক্ষর। ফলে এই কবিতা কেবল প্রেমানুভূতির প্রকাশ নয়; বরং প্রেম, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের এক নান্দনিক সমাহার।
বমদের মধ্যে নিজেদের ভাষায় তুমুল ঝগড়াবিবাদ চলতে থাকলেও অন্য কারও পক্ষে ঝগড়া চলছে বলে সেটা বুঝে ওঠা কখনো সম্ভব হয় না। বরং মনে হতে পারে, তারা মৃদু স্বরে খোশগল্প করছে। কারণ, রাগান্বিত হলেও তাদের স্বভাবে একে অপরের প্রতি চিৎকার–চেঁচামেচি কিংবা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজের কোনো রেওয়াজ নেই। তাদের ভাষা, উচ্চারণ ও আচরণে কোনো অশ্রাব্যতা, খিস্তিখেউড় বা আক্রমণাত্মকতা নেই। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক শালীনতা, যা আজকের পটভূমিতে নিতান্তই বিরল।
সম্প্রতি এই নম্র-ভদ্র-নিরীহ জনগোষ্ঠীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। কয়েক বছর ধরে এই জনগোষ্ঠীর নারীসহ বেশ কয়েকজন মানুষ কারাগারে অন্তরিণ। কেউ কেউ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। ২১ আগস্ট কুকি–চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট দমনের নামে সাধারণ বম জনগণের ওপর গণগ্রেপ্তারের ৫০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে নারী-শিশুসহ শতাধিক নিরপরাধ বম নাগরিক বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী আছেন।
বিচারবহির্ভূত এই দমননীতি শুধু মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও ন্যায়বিচারের মূলনীতির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা। ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও চিকিৎসাবঞ্চনার কারণে তিনজন বম পুরুষ কারাগারে মারা গেছেন। বর্তমানে শতাধিক মানুষ, যাঁদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ রোগীও আছেন, এখনো বন্দী অবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এ অন্যায় দেখে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ বম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন। গত ২১ আগস্ট একযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ওয়ালে পোস্ট দিয়ে অধিকারকর্মীরা এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একযোগে একই দিনে দাবি তুলেছেন নিরীহ ব্যক্তিদের মুক্তিদানের।
বান্দরবান জেলার রুমার বেথেলপাড়া এবং থানচির শাহজাহানপাড়া। এই দুটি পাহাড়ি গ্রামের সাতজন বম নারী ৫০০ দিন ধরে কারাগারে দিন গুনছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শিউলি বম (থ্যালাসেমিয়া রোগী), আলমন বম (কলেজপড়ুয়া), জিংরুনএং বম (মা–বাবাহারা), লালসিংপার বম (দেবর নিখোঁজ, পিতা কারাগারে), জিংরেমঙাক বম (স্বামী নিখোঁজ), লালনুনজির বম (বিবাহিতা) এবং ভানইনকিম বম (ছোট ভাই বন্দী)।
অভিযোগ ছিল ভয়াবহ—ব্যাংক ডাকাতি আর অস্ত্র লুট। কিন্তু গ্রামবাসী সবাই জানতেন, এসব অভিযোগ তাঁদের জীবনের সঙ্গে কোনো দিনও মেলেনি। অবশেষে দীর্ঘ ৫০০ দিনের মাথায়, ২১ আগস্ট তাঁরা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির সেই মুহূর্তে হয়তো বা আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বেদনা। কারণ, তাঁদের স্বজনেরা কেউ এখনো বন্দী, কেউবা নিখোঁজ।
তাঁদের গল্পগুলো যেন একই সূত্রে গাঁথা—অভিযোগ, গ্রেপ্তার, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুক্তির স্বাদ। কিন্তু এই মুক্তির মধ্যেও তাঁদের মনে রয়ে গেছে শূন্যতা। কারণ, শতাধিক বম নাগরিক এখনো কারাগারের ভেতরে দিন গুনছেন আর পরিবারগুলো প্রতিদিন অপেক্ষা করছে—কবে তাঁরা ফিরবেন ঘরে!
বম লাইভস ম্যাটার নামক অধিকারকর্মীদের পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজে (২৩ আগস্ট, ২০২৫) বলা হয়েছে, ‘কুকি–চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পরে গত বছর এপ্রিল মাসে বান্দরবানে গণগ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে প্রায় ২০০ জন বম আদিবাসী নাগরিককে কোনো উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই নির্বিচারে আটক করা হয়। আটককৃত অনেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
‘একদিকে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই, অন্যদিকে অনেকের জামিনের আবেদন বারবার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। ২৬ মে উচ্চ আদালত থেকে চারজন বম নারীর জামিন হয়, সেই জামিনের আদেশ জুনের ৩ তারিখ আপেলেট ডিভিশন থেকে খারিজ করে দেওয়া হয়।
‘সম্প্রতি ৯ জন নারী এবং ৪ জন শিশুকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো ১৪ জন নারী কারাবন্দী। তাদের মধ্যে আছেন ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত লালনুন কিম বম। আরও আছেন আলসারের রোগী ল্যারি বম। আটককৃত পুরুষদের মধ্যে ৩২ জন জামিন পেয়েছেন। আটককৃতদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা টাকাপয়সার অভাবে জামিনের আবেদনও করতে পারেন নাই।’
একই ফেসবুক পেজের (২৪ আগস্ট ২০২৫) আরেকটি পোস্টে বলা হয়েছে, ‘৫০৩ দিন বিনা বিচারে কারাবন্দী থাকার পর আলসার রোগী লেরি বমসহ আরও ৪ জন বম নারী আজ ২৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে অবশেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সপক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখতে পারেনি, তদন্তে হয়নি কোনো অগ্রগতি, কিন্তু জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়েছে বারবার। এখন রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন না করলে তাদের মুক্তি নিশ্চিত হবে। আমরা উচ্চ আদালতের আদেশ দ্রুত কার্যকর করে লেরি বমসহ সকলের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানাই।’
একই ফেসবুক পেজের (১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) আরেকটি পোস্টে বলা হয়েছে: ‘রামথাং, টিনা ও গিলবার্ট—তিনজনই কলেজের শিক্ষার্থী। বেথেলপাড়ায় গণগ্রেপ্তারের সময় তাদের আটক করা হয়। আটককালে প্রত্যেকের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর।
রামথাং (১৮): নটর ডেম কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন রামথাং। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তাকে জামিন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে। কিন্তু তাঁর জামিনের শুনানি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে স্থগিত হয়ে যায়। বাবা-মা নিম্ন আদালতে জামিনের জন্য আবেদনের পেছনে দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন, তারপরও জামিন পাননি রামথাং। বর্তমানে তাঁর মামলা হাইকোর্টে প্রক্রিয়াধীন।
টিনা (১৮): টিনা সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ কোর্টে টিনার জামিনের আবেদন করলেও সেগুলো নাকচ হতে থাকে। কাছাকাছি সময়ে উচ্চ আদালত থেকে একই মামলায় দশজন পুরুষের জামিন হওয়ায় তাঁর অভিভাবকেরা আশান্বিত হয়ে হাইকোর্টেই আপিল করেন। ২৬ মে ২০২৫ তারিখে হাইকোর্ট জামিন মঞ্জুর করেন। কিন্তু তার কিছুদিন পরই রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ৩ জুন ২০২৫ তারিখে চেম্বার কোর্ট থেকে সেই জামিন স্থগিত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে তাঁর জামিনপ্রক্রিয়া বান্দরবানের নিম্ন আদালতে চলমান।
গিলবার্ট বম (১৮): তিনি ঢাকার একটি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। গণগ্রেপ্তারের সময় তিনি বাড়িতে ছুটিতে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর থেকেই তাঁর মামলার জামিনপ্রক্রিয়া বারবার জটিল হয়ে ওঠে। বান্দরবান জেলা আদালতে জামিনের আবেদন করা হলেও প্রতিবারই তা নাকচ হয়। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আইনি প্রক্রিয়াই কার্যকর না হওয়ায় গিলবার্ট এখনো চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে মামলা উচ্চ আদালতে এলেও এখন পর্যন্ত শুনানি আদৌ হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
একটি বিষয় লক্ষণীয় যে অপরাধের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকার ফলে উচ্চ আদালত থেকে জামিন দেওয়া হলেও সেগুলো বারবার আটকে দেওয়া হচ্ছে, রাষ্ট্রপক্ষের দিক থেকে প্রবল আপত্তির মাধ্যমে। নিরপরাধ বম নারী, পুরুষ ও শিক্ষার্থীরা এখনো কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। এটি মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ব্যক্তি আর নীতিনির্ধারকদের প্রান্তিক মানুষের প্রতি চরম অসংবেদনশীলতা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
হয়তোবা আদিবাসী হিসেবে জন্ম গ্রহণ না করলে কারও পক্ষে কোনো দিনই তাঁদের জীবনের বঞ্চনাকে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। আদিবাসী জীবনের প্রথম কাব্যকার কবি হাফিজ রশিদ খান আদিবাসীদের সংস্পর্শে এসে ‘জাতিস্মর’ হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, আদিবাসীদের চেতনায় যে স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত আছে, তিনি সেই অভিজ্ঞতা নিজের চেতনায় ধারণ করতে পেরেছেন। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরাও যেদিন এ রকম ‘জাতিস্মর’ হয়ে উঠবেন, সেদিনই হয়তো তাঁরা আদিবাসীদের জীবনের বঞ্চনা ও যন্ত্রণার কথা উপলব্ধি করতে পারবেন। মমতার সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারবেন আদিবাসী সত্তার সঙ্গে।
* মিলিন্দ মারমা, লেখক ও অধিকারকর্মী
- ই-মেইল: milinda.marma@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| সাধারণ বম জনগোষ্ঠীর ব্যানারে কেএনএফ কর্তৃক ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন। |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ট্রাম্প যা করছেন, তাতে তুরস্ক আর হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না by আহমেত দাভুতোগলু
এ
ছবির বার্তা বোঝা দরকার। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে
ক্ষমতার ভারসাম্য উপেক্ষা করে ট্রাম্প শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গই
করেননি, তিনি রাশিয়া ও চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ইউরোপসংক্রান্ত যেকোনো
সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর সঙ্গেই আলোচনায় বসতে হবে।
দ্বিতীয় মেয়াদে
প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাত মাসের মাথায় ট্রাম্প যেন বিশ্ব চালাচ্ছেন নিজের
একেবারে ব্যক্তিগত করপোরেশনের মতো। সেখানে প্রচলিত নিয়মকানুন বা
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কোনো গুরুত্ব নেই। ওভাল অফিস এখন যেন একটি কোম্পানির
নির্বাহী কক্ষ। ট্রাম্প যেন সেখানকার সিইও আর অন্যান্য বিশ্বনেতারা যেন
কর্মচারী।
শতাব্দীপ্রাচীন কূটনৈতিক রীতিগুলো এখানে নিছক আনুষ্ঠানিকতামাত্র।
ট্রাম্পের
লক্ষ্য হলো এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করা, যা সহযোগিতার ওপর নয় বরং
তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার ওপর দাঁড়াবে। বৈঠকে ইউরোপীয় নেতাদের আচরণ দেখে মনে
হয়েছে, ট্রাম্প তাঁর লক্ষ্যে বেশ এগিয়ে গেছেন। উইনস্টন চার্চিল, শার্ল দ্য
গল কিংবা এমনকি আঙ্গেলা ম্যার্কেলের মতো নেতারা ট্রাম্পের এমন ঔদ্ধত্য মেনে
নিতেন, এটা কল্পনারও অতীত।
কিন্তু আজকের ইউরোপ জনতুষ্টিবাদে বিভক্ত
হয়ে আছে। নেতৃত্বে পিছিয়ে গেছে। বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার
মতো সক্ষমতা এখন তার নেই।
ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিও একই
ধাঁচের। তিনি ন্যাটোকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একটি কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত
করতে চাইছেন। তাঁর এই সর্বনাশা চাওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে
বিশেষভাবে বিপজ্জনক। আগে ন্যাটো-রাশিয়া কাউন্সিল এবং ন্যাটো-ইউক্রেন
কমিশনের (যা ২০২৩ সালে ন্যাটো-ইউক্রেন কাউন্সিল দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়)
মাধ্যমে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের সঙ্গেই ন্যাটো সমান্তরালভাবে যোগাযোগ রাখত।
এই সমান্তরাল চ্যানেলগুলো সংলাপ ও প্রতিরোধের মধ্যে একটি নাজুক ভারসাম্য
বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। সেই ভারসাম্য এখন ট্রাম্পের নীতির কারণে
ঝুঁকিতে পড়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে যে দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
অবস্থায় পড়েছে, সেই তুরস্ক, পোল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন এবং কৃষ্ণসাগর ও
বাল্টিক অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক সম্মেলনে উপস্থিত
ছিল না। তাদের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই ফ্রন্টলাইন দেশগুলোকে বাদ
দেওয়ার মধ্য দিয়ে ন্যাটোর মূলনীতিকে, অর্থাৎ সমষ্টিগত নিরাপত্তাকে হুমকির
মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটি ন্যাটো জোটের কৌশলগত ঐক্যকে নষ্ট করছে।
তুরস্কের
জন্য এ অবস্থা আরও গুরুতর প্রভাব বয়ে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পর
ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী থাকার পরও এবং কৃষ্ণসাগর, ককেশাস ও
ইউরেশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরও তুরস্ক এখন ন্যাটোর কেবল
প্রান্তিক পর্যবেক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে এখন একটি কৌশলগত অংশীদার না ভেবে
কেবল মাঝেমধ্যে বৈঠক আয়োজনের জন্য ‘সুবিধাজনক হোস্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা
হচ্ছে।
ইউক্রেন সম্মেলনে তুরস্ককে বাদ দেওয়ার বিষয়ে কোনো রাখঢাক করা হয়নি।
একেবারে
খুল্লামখুল্লাভাবেই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প সম্মেলনের আগে বা পরে
তুরস্ককে সরাসরি কোনো তথ্য দেননি, বরং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের মাধ্যমে
পরোক্ষভাবে আঙ্কারাকে সম্মেলনের বিষয়ে জানানো হয়। এমনকি আজারবাইজান ও
আর্মেনিয়া–সম্পর্কিত সাম্প্রতিক বৈঠক থেকেও তুরস্ককে বাদ দেওয়া হয়।
তুরস্কের
এই মর্যাদাহানি একটি বড় কৌশলগত ভুলের প্রতিফলন। ওয়াশিংটন সম্মেলনের পর
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা
দেওয়ার ক্ষেত্রে তুরস্কের ভূমিকা হবে ‘গুরুত্বপূর্ণ’। প্রথমে এটি প্রশংসার
মতো শোনালেও আসলে এটি শীতলযুদ্ধ-পূর্ব যুগের সেই মানসিকতার পুনরুজ্জীবনকে
বোঝায়, যেখানে তুরস্ককে তার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের
ক্ষমতা দিয়ে বিচার না করে কেবল তার সেনাবাহিনীর আকার দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়।
এভাবে
তুরস্ককে ১৯৫০-এর দশকের কোরিয়া যুদ্ধের সময়কার ভূমিকায় ফিরিয়ে নেওয়া
হয়েছে, যেখানে তুরস্ক সামনের সারির নিরাপত্তারক্ষক, কিন্তু ভবিষ্যৎ
নির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত। আজও তুরস্কের একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে। দেখা
যাচ্ছে, তুরস্ককে বাদ দিয়ে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো
নেওয়া হচ্ছে, অথচ সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তাকে।
অর্থাৎ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের প্রশ্নে তুরস্ককে আলোচনা থেকে বাদ
রেখে তাকে দিয়েই এমন সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করা হচ্ছে,
যেগুলোতে তুরস্কের কোনো মতামতই নেওয়া হয়নি।
২০০১ সালে প্রকাশিত আমার
বই ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’-এ আমি এই পুরোনো মানসিকতার সমালোচনা করেছি। পরে
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও আমি এ নিয়ে কথা বলেছি।
এটি আসলে মার্কিন ও ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের একধরনের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত
অন্ধত্বের পরিচায়ক। এটিকে কোনো তুর্কি নেতারই স্বাভাবিক বা সহনীয় বলে মেনে
নেওয়া উচিত নয়।
পশ্চিমা দেশগুলোকে বুঝতে হবে, তুরস্ক কোনো
‘ছেলেছোকরা’ ধরনের দেশ নয় যে একটু প্রশংসাসূচক কথা বলে বা পৃষ্ঠপোষকতার মতো
করে পিঠচাপড়ানি দিয়ে তার মর্যাদাহানিজনিত ক্ষোভ মিটিয়ে ফেলা যাবে। তুরস্ক
শতাব্দীপ্রাচীন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ একটি দেশ। এটি কৌশলগতভাবে পরিণত একটি
আঞ্চলিক শক্তি। এটি একটি সভ্যতার প্রতিনিধি, যা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও
বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। তুরস্ককে শুধু সামরিক সম্পদ হিসেবে
দেখা মানে তার প্রকৃত কৌশলগত পরিচয়কে ভুল বোঝা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
মহাদেশজুড়ে ক্ষমতার পালাবদল সামলে যে কূটনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহ্য
গড়ে উঠেছে, তুরস্ক তারই ধারক।
ট্রাম্প যা করছেন, তাতে তুরস্ক আর হাত
পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। তাকে পাশ কাটিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে
তাকে নতুন কৌশলগত সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রথম ধাপে তাকে তিনটি
জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, তুরস্ককে ন্যাটোর ভেতরে সমমনা
দেশগুলোর সঙ্গে একটি ব্লক গঠন করতে হবে। এর জন্য তাকে হোয়াইট হাউসে
অনুষ্ঠিত ইউক্রেন সম্মেলন থেকে বাদ পড়া দেশগুলোর (যেমন পোল্যান্ড, নরওয়ে,
সুইডেন ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো) সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। এভাবে একটি
বিকল্প কৌশলগত সমন্বয় মঞ্চ গড়ে তোলা গেলে ন্যাটোর ভেতরের শক্তির ভারসাম্যে
নতুন প্রাণ সঞ্চার করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, তুরস্কের উচিত
কৃষ্ণসাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোকে (যেমন রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, জর্জিয়া ও
মলদোভা) একত্র করে একটি পরামর্শমূলক কাঠামো তৈরি করার নেতৃত্ব দেওয়া।
পাশাপাশি ইউক্রেন ও রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আরও জোরদার করা। শীতল
যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতার মূলভিত্তি হিসেবে একসময় কাজ করা ‘ব্ল্যাক সি
নেভাল ফোর্স’ এবং ‘ব্ল্যাক সি ইকোনমিক কো–অপারেশন’-এর মতো উদ্যোগগুলোকে
পুনরুজ্জীবিত করলে রাশিয়া, ইউক্রেনসহ সব আঞ্চলিক পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক
সংলাপ শুরু হতে পারে।
তৃতীয়ত, তুরস্ককে তার কৌশলগত কেন্দ্রীয়
অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে স্পষ্ট করে
জানাতে হবে, তুরস্ক কোনো নিষ্ক্রিয় মধ্যপ্রাচ্যের আউটপোস্ট নয়, এটি একটি
গুরুত্বপূর্ণ ইউরেশীয় শক্তি। এ জন্য আরও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী কূটনৈতিক
অবস্থান গ্রহণ জরুরি।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পকে ঘিরে ইউরোপীয় নেতাদের
সেই ছবি নিছক একটি ‘ফটো-অপ’ নয়। এটি ইউরোপের নেতৃত্বহীনতা, ন্যাটোর
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং তুরস্কের গুরুত্ব হ্রাসের প্রতীক। ইউরোপ ও
তুরস্কের নীতিনির্ধারকদের এখনই সতর্ক হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে দ্রুত ও দৃঢ়
পদক্ষেপ না নিলে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা শুধু তাদের বাইরে রেখেই গড়ে উঠবে
না, বরং তা তাদের স্বার্থকে আঘাত করে গড়ে উঠবে।
* আহমেত দাভুতোগলু, তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী (২০১৪-২০১৬) ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০০৯-২০১৪)
- সত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এরদোয়ান কি তাঁর কৌশলী নীতি ধরে রাখতে পারবেন। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1426)
-
▼
2025
(3281)
-
▼
September
(221)
-
▼
Sep 10
(8)
- বদরুদ্দীন উমর নিজ বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেননি ...
- কাতারে হামলা চালিয়ে সীমা ছাড়িয়ে গেছে ইসরায়েল
- নয়া রাজনীতির পথে নেপাল, আলোচনায় কাঠমান্ডুর মেয়র বা...
- কাতারে ইসরায়েলের হামলার ঘটনায় ‘খুবই অসন্তুষ্ট’ ট্র...
- নেপালে বাংলাদেশের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে by...
- শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার মুছে দিতে চায় বাংল...
- কারাগারে আটক বম নাগরিকেরা কবে স্বজনের কাছে ফিরবে b...
- ট্রাম্প যা করছেন, তাতে তুরস্ক আর হাত পা গুটিয়ে বসে...
-
▼
Sep 10
(8)
-
▼
September
(221)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




