Thursday, June 5, 2014

কোটিপতি গাড়িচালক বাতেনের স্ত্রীর যত অভিযোগ by শর্মী চক্রবর্তী

শুধু টাকার নেশাই নয় নারীর নেশাতে আসক্ত কোটিপতি গাড়িচালক আবদুল বাতেন। বিবাহিত স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীদের সঙ্গে তার রয়েছে অবৈধ সম্পর্ক। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে স্বামীর পরকীয়া ও যৌতুকের জন্য অত্যাচারের কারণে অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী নার্গিস আক্তার। ১৯৯৬ সালে তাদের বিয়ে হয়েছিল। তখন তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। একবেলা খেতে পারলে আর একবেলা পারতেন না। নার্গিস জানান, আমাদের যখন টাকা তেমন ছিল না তখন ভালই ছিল। সংসারে কোন অশান্তি ছিল না। আমি আমার বাবারবাড়ি থেকে টাকা এনেও সংসার চালিয়েছি। বাবারবাড়ি থেকে সম্পত্তি পেয়েছি। কিন্তু যখনই সে টাকার কাঙাল হয়ে গেল তখনই শুরু হয় অশান্তি। বিভিন্ন সময় আমার ওপর নির্যাতন করতো। একাধিক মেয়ের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্কও রয়েছে। তাকে আমি হাতেনাতে কয়েকবার ধরেছি। কিন্তু এসব কথা বলতে গেলেই সে আমাকে ধরে মারধর করে। হাজারীবাগের হেমায়েতগঞ্জের বাসায় সে কয়েকবার মেয়ে নিয়ে এসেছে। এমনকি সে বিয়ে করেছে বলেও আমি জানতে পেরেছি। কিন্তু আমার কাছে এ কথা সে স্বীকার করে না। বিয়ের পর থেকে আমাদের ভালই চলছিল। ১৮ বছরের সংসারে আমার দু’টি ছেলে আছে। কোন বিষয়ে ঝগড়া হলেই সে আমাকে মারধর করে বাসা থেকে বের করে দেয়। আমি প্রতিবাদ করলে সে বলে আমি যেভাবে বলবো সেভাবে থাকো। কোন কথা বলতে পারবি না। চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকে সে ঘুষবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়। আমি যদি বলতাম এত টাকা দিয়ে কি করবা। আমার কথা একবারের জন্যও শুনতো না। আমাকে বলে তোর না পোষালে আমার বাসা থেকে চলে যা। নার্গিস বলেন, প্রায় দিনই রাতে দেরি করে বাসায় আসে সে। অনেক রাতে সে বাসায় আসে না। সকালে এলে যথন জিজ্ঞেস করি কোথায় ছিলে তখন আমাকে বলে অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল। ২০১১ সালে বাতেন আমাকে বলে তুমি বাবারবাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এসো আমরা কেরানীগঞ্জে জায়গা কিনি। সে জায়গাটা তোমার নামে থাকবে। তার এ কথা শুনে ভাবলাম নিজের নামে জায়গা থাকাটা তো ভাল। তাই সৌদি প্রবাসী বড় ভাই মকবুলের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা এনে আমি বাতেনকে দিই। সেই টাকা দিয়ে জায়গা কেনা হয় ঠিকই কিন্তু তা রেজিস্ট্রি করে সে নিজের নামে। প্রথম দিকে তা আমি বুঝতে পারিনি। পরে যখন জানলাম তখন প্রতিবাদ করলে সে আমাকে তালাক দেয়ার হুমকি দেয়। এ জন্য কাগজে আমার স্বাক্ষর নিতে চেয়েছিল, আমি দিইনি। এরপর আমাকে সে মারধর করে। সে আমার সঙ্গে সংসার করবে না বলে অনেক দিন আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তখন আমি বাবার বাড়িতে চলে যাই। পরে পরিবারের সবাই মিলে কথা বলে আবার সমাধান করে দেয়। তবে এতেও তার অত্যাচার বন্ধ হয়নি। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ৩ লাখ টাকার জন্য সে আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। এমনকি আমাকে পুড়িয়ে মারার জন্য গায়ে অকটেন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিতে চায়। আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নিজের জীবন রক্ষা করি। এত সব কিছুর পরও আমি তার সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাতেন আমার সঙ্গে সংসার করতে চায় না। তার এ ইচ্ছার সঙ্গে পরিবারের সবাই একমত ছিল। এ কারণেই ৩০শে জানুয়ারি বাতেন ও তার ৪ ভাই মিলে আমাকে মারধর করে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আমার ছেলে দুটিকেও আমার কাছে আসতে দেয়নি। আর কোন উপায় না পেয়ে আমি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে অভিযোগ করেছি। এ অভিযোগ করার পর সে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। এমনকি আমি ও আমার বড়বোনের বিরুদ্ধে সে হাজারীবাগ থানায় মামলা করেছে অভিযোগ তুলে নেয়ার জন্য। তার টাকার ক্ষমতা আছে বলে এসব কিছু করছে। নার্গিস জানান, আমাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়ার পর সবাইকে সে বলছে সে আমাকে তালাক দিয়েছে। আবার নাকি বিয়ে করবে, আমার সঙ্গে সংসার করবে না। কিন্তু আমি কোন তালাকনামা এখনও পাইনি। আমি চাই তার শাস্তি হোক, এ কারণে এখানে এসেছি ন্যায্য বিচার পেতে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল সূত্র জানায়, অভিযোগ দেয়ার পর বাতেন নিয়মিত হাজিরা দেন না। পুলিশসহ সেলে হাজির হয়ে উল্টো তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন।

বিকৃত রুচির এক ভয়ঙ্কর খুনি by ইমরান আলী

সমাজে বসবাস করে একজনের পাশে আরেকজন মানুষ দাঁড়াবে- এটাই স্বাভাবিক। তেমনি কোন কারণে একজনের উপর আরেকজনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা যদি হয় চরম অন্যায়ের পর্যায়ে স্বয়ং আরেকজনকে খুন এর মাধ্যমে তাহলে সেটা স্বাভাবিক মানুষের কাজ হতে পারে না, সেটা শুধু অন্যায়ই নয়, মহাঅন্যায়। যুগে যুগে এমন সব কুখ্যাত মানুষ নামের নরপশু বেড়ে উঠে অন্যের উপর ক্ষোভ প্রকাশ বা প্রতিশোধ নিতেই নয় সরাসরি অন্যের জীবন নিতে কোন কারণ ছাড়াই। এমনই একজন আন্দ্রি চিকাতিলো (জন্ম  ১৬অক্টোবর ১৯৩৬- মৃত্যু ১৪ ফেব্রুয়ারি  ১৯৯৪)। যার পশুত্বমূলক আচরণ থেকে রেহাই পাইনি অনেক নারী, শিশু ও যুবক। ইউক্রেনিয়ান সিরিয়াল কিলার। রস্তোভ-এর কসাই নামেও পরিচিত ছিলেন এই খুনি। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ এর সময়ে অন্তত ৫৬ জন নারী ও শিশু হত্যার জন্য অভিযুক্ত। এর মধ্যে ৫৩টি প্রমাণিত।

রস্তোভ শহরে ১৯৭৮ এ সে প্রথম খুন করে। সে বছরেই ২২ ডিসেম্বরে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে গোপনে জায়গায় কেনা তার পুরাতন বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে । না  পেরে তাকে নির্মমভাবে নিঃশ্বাস বন্ধ করে হত্যা করে। এই ভয়ঙ্কর খুনি যে শুধুমাত্র খুনই  করতো তা নয়। তার হাতে নিহত নারীদের উপর চলতো যৌন লালসা পূরণের নোংরা কর্মকাণ্ড। তার প্রথম ভিকটিম ছিল ৯ বছরের এক মেয়ে শিশু। যখন তাকে হত্যা করে তখন সে নিজে থেকে সেক্সুয়ালি সেটিস্ফাইড হয়। এমন বিকৃত রুচির মানুষটি শুধুমাত্র মৃত নারীর উপর যৌন আকাক্সক্ষা পূরণ করতেই একের পর এক খুন করতে থাকে। তার টার্গেট ছিল মূলত পতিতালয়ের কোন নারী,   গৃহহীন যেসব নারীরা রাস্তায় ঘুরতো তারা। তবে কেন তিনি অন্য স্বাভাবিক মানুষের মতো বেড়ে না উঠে হয়ে উঠলেন দুর্ধর্ষ খুনি  সে নিয়েও আছে নানান কথা। জন্মের পর  থেকে অভাবী বাবা-মার ঘরে বড় হওয়াকে অনেকে কারণ হিসেবে দেখেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় তার ছোটবেলা অনেক সময়  কেটেছে না খেয়ে কখনো ক্ষুধার তাড়নায় ঘাস লতা পাতা খেয়েও নাকি থাকতে হয়েছে। শহরের ভ্রাম্যমাণ মানুষজন থাকতো এই খুনির আতঙ্কে। ১৯৯৪ সালে এই খুনির ডান কানের পেছনে গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

ভারত-পাকিস্তান সংলাপের নতুন কাঠামো by নাজাম শেঠি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভারত সফর যুদ্ধংদেহী মনোভাবের মানুষদের কিছু খিটখিটে প্রশ্ন তুলতে উসকে দিয়েছে। শরিফ কেন মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন? গত বছর মনমোহন সিং তো নওয়াজ শরিফের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি! ভারতীয়রা জনসমক্ষে পাকিস্তানের তরফ থেকে সন্ত্রাসবাদ রপ্তানির অভিযোগ তুললেও নওয়াজ কেন কাশ্মীর ইস্যু তুললেন না? নওয়াজ কেন সামগ্রিক বিষয়ে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ না করে একতরফাভাবে মোদির সরকারকে এমএফএন মর্যাদা একপ্রকার ‘উপহার’ হিসেবে তুলে দিলেন? এ থেকে বোঝা যায়, নওয়াজের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ হয়েছে৷ কারণ ভারত ২৬/১১-এর মুম্বাই হামলার পর নিজের এই অবস্থান থেকে এক চুলও সরে আসেনি যে, ‘মুম্বাইয়ে হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি না হলে ও হাফিজ সাঈদের লস্কর-ই-তাইয়েবা ভেঙে না দিলে কোনো বিমিশ্র সংলাপ হবে না।’ অথচ পাকিস্তান সামগ্রিক সংলাপের মূল ইস্যু কাশ্মীর একদম খাপছাড়াভাবে ছেড়ে দিয়েছে। উপসংহার হচ্ছে, কূটনীতির খেলায় পাকিস্তান হেরেছে আর ভারত আবারও জিতেছে। প্রশ্নটা ভালো, কিন্তু উপসংহারগুলো ভুল। এই হারা-জেতার মানদণ্ডে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক বিচার করলে বা কে কী পেল এই চিন্তা করলে পুরো বিষয়টিকে যোগফল-শূন্যর খেলা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ভারত জিতলে পাকিস্তান হারে, আবার পাকিস্তান জিতলে ভারত হারে। এই যোগফল-শূন্যর খেলাটিতে দুই পক্ষ জেতে না, বরং এটি তার বিপরীত। যেমন একটি বাণিজ্য চুক্তিতে উভয় দেশেরই বাণিজ্য বেড়ে যায় ও পারস্পরিক কল্যাণ সাধিত হয়। ভারতের সঙ্গে আন্তসম্পর্কের ক্ষেত্রে এই যোগফল-শূন্য মনোভাবের সমস্যা দ্বিমুখী। প্রথমত, এর ফলে পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহে একটি জঙ্গি গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে, যারা সব সময় ভারতকে আঘাত করার চেষ্টা করে ও জোর করে কাশ্মীর ছিনিয়ে নিতে চায়। তারা লক্ষ্যে কামিয়াব তো হতেই পারে না, উল্টো দেশের ভেতরে তারা সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়। কাশ্মীরিদের প্রতি বৈরী মনোভাব সৃষ্টি করে ও শেষ বিচারে পাকিস্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত, এর ফলে ভারত আন্তর্দেশীয় সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ওপর নিজের শর্তাদি চাপিয়ে দেয়, আর কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের শর্ত এতে চাপা পড়ে যায়, সংলাপও বন্ধ হয়ে যায়। ভারত বাজপেয়ির নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে ‘সামগ্রিক সংলাপ’-এর প্রস্তাব দিয়েছিল এবং শরিফের নেতৃত্বে পাকিস্তান ১৯৯৯ সালে তা গ্রহণ করেছিল। মনমোহন ও মোশাররফ তা চালিয়েও নিয়ে গেছেন, কিন্তু মুম্বাই হামলার পর তা ভেস্তে যায়। পাকিস্তান কী কী কারণে সেটা লঙ্ঘন করার দিকে গেল, সেগুলোকে বিবেচনায় না এনে শর্তহীনভাবে এই সংলাপ নতুন করে শুরু করার প্রস্তাব তোলা হলে তা আসলে খুব জোরালো হয় না।

সে কারণে নওয়াজ শরিফ এই যোগফল-শূন্য কর্মকৌশল বাদ দিয়ে তাঁর ভারত নীতিকে উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বৈষম্যহীনভাবে দুই দেশের বাজারে উভয় পক্ষের প্রবেশ—এ রকম একটি বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে নওয়াজ এই চেষ্টা করছেন। আসলে তিনি মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে চুক্তিটি স্বাক্ষর না করে ঠিকই করেছেন৷ কারণ তিনি জানতেন, মনমোহনের বিদায় আসন্ন, তাঁর জায়গায় আসছেন মোদি। তা হলে নওয়াজ শরিফের দিল্লি যাত্রার ফল কী? প্রথমত, মোদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফকে ‘প্রাইমাস ইন্টার পেয়ারস’ মর্যাদা দিয়েছেন (সার্কের সমশ্রেণির নেতাদের মধ্যে তিনিই প্রথম)। দুটি প্রবল করমর্দন, সম্মেলনকক্ষে ঢোকার মুখে ‘পেহেলে আপ’ (মোদির নেতৃত্বেই সবাই ঢোকেন), এলইটির বিরুদ্ধে হামিদ কারজাইয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সত্ত্বেও দক্ষিণ ব্লকের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য না করা—এসব ইঙ্গিতপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, সারতাজ আজিজ যে বললেন ‘সংলাপের নতুন কাঠামো’ প্রস্তুত, দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের আগামী বৈঠকে এর বাস্তবায়ন দেখা যাবে, এই মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তবে মনে হচ্ছে, দুই দেশই তাঁদের মূল ইস্যু (পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কাশ্মীর ও ভারতের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ) দূরে ঠেলে সামগ্রিক সংলাপে বসতে রাজি (সব ইস্যুই কমবেশি একসঙ্গে)। অন্য কথায়, কোনো যোগফল-শূন্য ধাঁচের আর খেলা নয়।
নওয়াজ শরিফ ও সারতাজ আজিজ যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তাতে এই ধারণা পাওয়া যায় যে ১৯৯৯ সালে যে িভত্তিতে আলোচনা হয়েছে, সেই ভিত্তিতে আবারও আলোচনা হবে। এতে দুই পক্ষই বাণিজ্যক্ষেত্রে জয়ী হওয়ার মতো জায়গায় থাকবে, দুই দেশেই উপকারভোগী শ্রেণি তৈরি হবে, দ্বিপক্ষীয় ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না। এতে বোঝা যায়, দুই পক্ষই তাঁদের মূল ইস্যুকে (ভারতের ক্ষেত্রে আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কাশ্মীর) ঠেলে পেছনে সরিয়ে দেবে। এতে প্রাপ্তিশূন্যতা এড়ানো যাবে ও সিয়াচেন, সার ক্রিক, পানি প্রভৃতি ইস্যুতে যে সংলাপের সম্ভাবনা আছে, সেটাকে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-ব্যবসা ও জনগণ-জনগণ পর্যায়ে আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
দুই প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেই দুটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি আছে: অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচন। বৃহত্তর পরিসরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাঁদের একটি ভীতি আছে: আরেকটি মুম্বাই ধরনের ঘটনা, কাশ্মীরে ইসলামি জিহাদ কার্যক্রম বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর যুদ্ধ। এই যে মূল ইস্যুগুলোকে ঠেলে পেছনে সরানোর কথা বলা হলো, এতে হয়তো দুই দেশের মধ্যকার সমস্যার সমাধান ও ভুল বোঝাবুঝির দ্রুত অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। নীতিগতভাবে, পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো কৌশলগত ক্ষেত্রে নওয়াজ শিরফের পথেই আছে, যে পথে তিনি ভারতের সঙ্গে শান্তির খোঁজ করছেন। কীভাবে তা করা হবে, সে নিয়ে হয়তো কিছু মতান্তর থাকবে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যায়। নওয়াজ শরিফ কি নরেন্দ্র মোদিকে বোঝাতে পেরেছেন যে তিনি সামনের দিকে তাকাতে চান? অতীত নিয়ে আবিষ্ট তিনি নন? দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ভবিষ্যৎমুখী যাত্রার পথ তৈরি করতে চান?
সত্য হচ্ছে, নওয়াজ শরিফ যদি দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবাদের রাশ টেনে না ধরেন, তাহলে তাঁর সব প্রচেষ্টা ভেস্তে যাবে। আবার দুই দেশের মিলিত প্রচেষ্টায় এই সন্ত্রাসবাদ উড়ে যেতে বাধ্য।

পাকিস্তানের ফ্রাইডে টাইমস সাময়িকী থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
নাজাম শেঠি: সম্পাদক, ফ্রাইডে টাইমস।

ঢাকা–টোকিও: লেনদেনের হিসাব-নিকাশ by মনজুরুল হক

চার দিনের জাপান সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও সফল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের দিক থেকে সফরের প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এই সফরকে নতুন মাত্রার সাফল্য নিয়ে আসা এক সফর হিসেবে অবশ্যই আখ্যায়িত করতে হয়। জাপানের পক্ষ থেকে তাঁকে দেওয়া অভ্যর্থনা আতিথেয়তা ছিল নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব। দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়তর করার বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শান্তিরক্ষায় দুই দেশের দৃঢ় অঙ্গীকার নতুন করে তুলে ধরা হয় এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে করণীয় দিকগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়।

শীর্ষ বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বাইরে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সম্প্রসারণ ও নাগরিক পর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপান যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাংলাদেশের এযাবৎকালে পাওয়া একক বৈদেশিক সাহায্য থোকের মধ্যে সর্ববৃহৎ। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিনিময় দলিলে উল্লেখ থাকা এক হাজার ২০০ কোটি ইয়েন ঋণ-সাহায্যের বাইরে চলতি বছর থেকে শুরু করে আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে জাপান ছয় হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬০ কোটি ডলার সাহায্য বাংলাদেশকে দেবে৷ এর পুরোটাই আসবে ঋণ-সাহায্য হিসেবে, অর্থাৎ বাংলাদেশকে এই অর্থ একসময় ফিরিয়ে দিতে হবে। তবে জাপানের ঋণ-সাহায্যের অংশবিশেষ দেশটি একসময় গ্র্যান্ট বা অনুদান সাহায্যে রূপান্তরিত করে নেয়, যার অর্থ হলো, গ্রহীতা দেশকে সেটা আর ফেরত দিতে হয় না। এ ক্ষেত্রেও যে তেমনটা হবে না, তা বলার কোনো কারণ নেই। বৈদেশিক উন্নয়ন সাহায্যের যে তিনটি ভিন্ন অংশ রয়েছে তা হলো অনুদান, ঋণ ও কারিগরি সহায়তা।
জাপানের নতুন ঋণ-সাহায্যের সিংহভাগ খরচ করা হবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় জাপানি পুঁজির প্রবেশপথ সম্প্রসারণে বঙ্গোপসাগরীয় বলয়ের শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চলের নতুন যে ধারণা শীর্ষ বৈঠকের মধ্যে দিয়ে প্রচারিত হয়, সেটার বাস্তবায়নে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন জাপান বাংলাদেশের দিকে এতটা উদার সহায়তার হাত সম্প্রসারিত করছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে জাপানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অগ্রগতি, পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি এবং সার্বিকভাবে নতুন ভূরাজনৈতিক বিভাজনের দিকে নজর দেওয়া দরকার। জাপানের অর্থনীতিতে নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ায় হঠাৎ করে উদ্ভূত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির আলোকে বিকল্প বাজার ও উৎপাদন ভিত্তির খোঁজ করা জাপানের জন্য আবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিরোধ নিয়ে টানাপোড়েন সৃষ্টির মুখে এবং দেশের ভেতরে ক্রমেই উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠতে থাকা জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর অব্যাহত চাপের সামনে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে বাগাড়ম্বরপূর্ণ যেসব বক্তব্য তুলে ধরতে দেখা যায়, চীনের তাতে অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত বোধ করার যথেষ্ট কারণ আছে৷ আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উসকানি দেওয়ার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চীনকে দায়ী করছেন এবং সুযোগ বুঝে চীনের হাত কামড়ে দিতেও তিনি যে পিছপা হবেন না, তার প্রমাণ তিনি তুলে ধরেছেন কদিন আগে সিঙ্গাপুরে শাংগ্রিলা সংলাপে রাখা ভাষণে।
চীন-জাপানের রাজনৈতিক সম্পর্কে বৈরী হাওয়ার মুখে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে এখন পর্যন্ত এর ক্ষতিকর প্রভাব সেভাবে লক্ষ করা যায়নি। তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে যে খুব বেশিদিন প্রভাবমুক্ত রাখা যাবে না, জাপানের নীতিনির্ধারকেরা সে বিষয়ে সচেতন। ফলে জাপানি পুঁজির বিকল্প একাধিক যে গন্তব্যের কথা তাঁরা এখন ভাবছেন, সেই তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি আমাদের জন্য অবশ্যই সুখবর। তবে জাপানি পুঁজির গন্তব্যকে সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত করে তুলতে হলে বাংলাদেশের এখনো বেশ বড় এক পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে এবং সেই গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ করে দেওয়া হচ্ছে জাপানের প্রাথমিক লক্ষ্য। যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে অবকাঠামো, এবং বিশেষ করে জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বলা যেতে পারে, সে রকম এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখেই এতটা উদার সাহায্যের হাত জাপানের সম্প্রসারিত করা। তবে এর একটা রাজনৈতিক দিকও অবশ্যই আছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার বাসনা অনেক দিন থেকেই জাপান পোষণ করে আসছে। তবে এখন পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের আলোকে সে পথ অনেকটাই যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বদরবারে উপস্থিত থাকাকে জাপানের নীতিনির্ধারকেরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করছেন। চলতি বছর শরৎকালে নির্ধারিত নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুটি দেশ হচ্ছে জাপান ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশ প্রার্থী হিসেবে থেকে গেলে জাপান নির্বাচনে জয়লাভ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছে না৷ চীনের সঙ্গে বিরোধময় সম্পর্কের বাইরেও তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ এবং সেই সঙ্গে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে ভোট টেনে নেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সহজ হতে পারে বলে জাপানে অনেকের ধারণা। আর তাই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা থেকে সরে গেলে জাপানের নিরাপত্তা পরিষদে প্রবেশ খুব সহজ হয়ে উঠবে। সেদিক থেকে উদার সাহায্য প্রদান করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে সে রকম প্রতিশ্রুতি আদায় হচ্ছে জাপানের লক্ষ্য। নিরাপত্তা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা বাংলাদেশের সামনে তাই বলা যায় অনেকটা যেন অযাচিত এক দুয়ার খুলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, জাপানের কোনো কোনো মহল বাংলাদেশের এই ভোট কেনার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না। জাপানের বৈদেশিক উন্নয়ন সাহায্যবিষয়ক এক গবেষক বলেছেন, বিশাল অঙ্কের যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সহযোগিতা জাপান প্রত্যাশা করছে, সেই অর্থ বাংলাদেশের জনগণের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নে খরচ হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না বলে সরকারের সেই পদক্ষেপে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে, যৌথ ঘোষণার প্রায় সবটা জুড়েই আছে আমলাতান্ত্রিক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক খাতের মধ্যকার যোগাযোগ সম্প্রসারণের বাসনা, যা থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে লাভবান হবে জাপানের বিনিয়োগ খাত এবং বাংলাদেশের মধ্যস্বত্বভোগীরা। একই সঙ্গে আবার পরমাণু বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতার বিষয়টিও যৌথ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পরমাণু জ্বালানি নিয়ে জাপানজুড়ে উদ্বেগের এই সময়ে উন্নয়নশীল বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বিতর্কিত সেই জ্বালানি প্রযুক্তি নিয়ে জাপানের উপস্থিত হওয়াকে তিনি বিপজ্জনক বলেও মনে করেন। তবে সে রকম মতপার্থক্য সত্ত্বেও সফরের সার্বিক ফলাফলে বাংলাদেশের অতৃপ্তি বোধ করার কোনো কারণ নেই। নাগরিক পর্যায়ে জাপানের সঙ্গে যোগাযোগের চমৎকার একটি মাধ্যম যে এখন হয়ে উঠেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য সম্মানিত জাপানি নাগরিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা, জাপান সফরের একেবারে সূচনায় তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ সেই প্রমাণ রাখছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনও ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, দুই দেশের মৈত্রীর সম্পর্ক আরও জোরদার করায় নিজের আন্তরিকতার প্রকাশ প্রধানমন্ত্রী যেখানে তুলে ধরতে পেরেছেন।
তবে পুরো সফরসূচির সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ অধ্যায়টি ছিল নাগরিক সংবর্ধনার নামে প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মঞ্চজুড়ে অবস্থান গ্রহণ। নামে সেই আয়োজনকে নাগরিক সংবর্ধনা বলা হলেও এমনকি সরকারের মনোনীত প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূতের জন্যও মঞ্চে রাখা হয়নি কোনো আসন। ফলে সেই নাগরিক সংবর্ধনা হয়ে উঠেছে বিশুদ্ধ অর্থেই আওয়ামী সংবর্ধনা। প্রবাসে রাজনৈতিক দলের এ রকম বাড়ন্ত উপস্থিতি শুধু দুটি দেশের বেলাতেই চোখে পড়ে। সেই দেশ দুটি হচ্ছে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান। অন্য কোনো দেশের বেলায় এ রকম কিছু দেখা যায় না, এমনকি ভারতের বেলায়ও নয়। তাই আমরা যা দেখছি তা হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা দেশের স্বাধীনতা অর্জন করলেও এই একটি দিক থেকে আমরা এখনো পাকিস্তানের বস্তাপচা নীতির অনুসারী রয়ে গেছি। ফলে অন্য সব রাষ্ট্রের কাছে পরিত্যক্ত, প্রবাসে নিজস্ব রাজনৈতিক দল ধরে রাখার এই বাসনা নিজেদের জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এখন গুরুত্বের সঙ্গে সেই চিন্তাভাবনা করে দেখা দরকার।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা জরুরি by মো. নজরুল ইসলাম

জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে-পরে কৃষি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়। এ প্রক্রিয়ার ফলে বাজেট প্রস্তাব সংশোধন ও পরিমার্জনের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত, কারণ প্রতিরক্ষা বাজেট কেমন হওয়া উচিত, কীভাবে কোন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাজেট বাস্তবায়িত হওয়া উচিত, কী ধরনের যুদ্ধাস্ত্র প্রয়োজন, সাংগঠনিক কাঠামোয় কিরূপ সংস্কার জরুরি ইত্যাদি বিষয়ে সংসদে বা সংসদের বাইরে কখনো উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা হয় না। এ খাতে বরাদ্দের প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে সংসদের বাইরে গণমাধ্যমে ও বিভিন্ন সেমিনারে সামান্য আলোচনা-সমালোচনা হলেও সে আলোচনা কোনো কাজে আসে না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পক্ষ থেকেও প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে কোনো ধরনের মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয় না। অথচ, প্রতিবছরই এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়ে চলেছে। ২০১২ সালে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সামরিক খাতে বাংলাদেশের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২ গুণ। ১৯৮৮ সালে যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ছিল ১,০০৪.৫০ কোটি টাকা, সেখানে ২০১২-১৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬ থেকে ৭ শতাংশ (অবশ্য, এ খাতে প্রকৃত ব্যয় প্রতিবছরই বিভিন্ন কারণে বৃদ্ধি পায়)। গত অর্থবছরের তুলনায় এ বরাদ্দ ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ হয়তো আরও বাড়বে। গত বাজেটগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ হয়ে আসছে (যদিও তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম)।
২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ এবং সশস্ত্র বাহিনীকে একুশ শতকের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র কেনা এবং সাংগঠনিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান। যদিও তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি। ২০১৩-১৪ সালের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, বিগত তিন বছরে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা পাঁচ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে।

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্পষ্টবাদিতা ও পাণ্ডিত্যের জন্য সুপরিচিত। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও জাতীয় ঐকমত্য গ্রন্থে তিনি মত প্রকাশ করেন যে ‘দেশের সম্পদের একটি বিরাট অংশ সামরিক অপব্যয়ে উবে যায়’, (পৃ. ৩৯-৪০)। বাজেট বরাদ্দে সামরিক খাতে অনেক লুক্কায়িত খরচও সংযোজিত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন, (পৃ. ৬৬)। তিনি আরও লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা খাতে খরচ অনবরত বাড়ছে ...সমরাস্ত্র ব্যবসায় স্বভাবতই নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। দুর্নীতির প্রসার, প্রভাব বলয়ের বিস্তার এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি অস্ত্র ব্যবসায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত’, (পৃ. ১৪৩)। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর রাজনৈতিক ঐকমত্যের সন্ধানে গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে ‘মূল্যবান সম্পদের অপচয় হচ্ছে, বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয় থাকছে না’। এ ছাড়া, ‘সামরিক খাতে ব্যয় দুর্নীতির প্রসারে বিশেষ অবদান রাখে এবং বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না, (পৃ. ৩০-৩১)। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ দেশে নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না’, (পৃ. ৭২)। সর্বোপরি তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাজেট বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এবং খোলামেলা আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অনুমান করি, অর্থমন্ত্রী হিসেবে গত কয়েক বছর তিনি জাতীয় নিরাপত্তা বিধানে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানার সুযোগ পেয়েছেন, উপলব্ধি করেছেন, দেশে শক্তিশালী ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সে কারণেই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং একুশ শতকের উপযোগী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রত্যয়ে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করে চলেছেন। নাগরিক সমাজ দেশের প্রতিরক্ষা নীতি ও প্রতিরক্ষা বাজেট সম্পর্কে জানার সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য যে দেশের সব বড় রাজনৈতিক দল সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, যুগোপযোগী এবং শক্তিশালী করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। সরকারে থাকাকালে বিএনপিও সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার্থে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল। একই সঙ্গে ছিল প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের ওয়াদা।
গত কয়েক বছরে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে চার পর্যায়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সমন্বিত ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণীত হয়েছে। এর আওতায় দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-রাজনীতি বিবেচনায় দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, সময়োপযোগী, সুদক্ষ, কার্যকর ও সমরশক্তিতে পর্যাপ্তভাবে বলীয়ান করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে বর্ধিত হারে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন, হেলিকপ্টার, ফ্রিগেট, যুদ্ধজাহাজ, ট্যাংক, লোকেটিং রাডার, মিসাইল সিস্টেমসহ বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র কেনা হয়েছে বা কেনার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋণের আওতায় এসব যুদ্ধসরঞ্জাম কেনা হয়েছে বা হবে। ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে ভবিষ্যতে বর্ধিত হারে অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। এ ছাড়া, সশস্ত্র বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্ধন ও নতুন সেনানিবাস, নৌ ও বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তুলনায় পিছিয়ে পড়া নৌ ও বিমানবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিও সরকারের লক্ষ্য। অতএব, সব দিক মিলিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে অনুমান করা যায়।
সামরিক বাহিনী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনীর অবদানকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা ও আধুনিকায়ন সম্পর্কে দ্বিমত নেই। তবে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিধি বা মাত্রা নিয়ে আলোচনা ও ঐকমত্য প্রয়োজন। জাতীয় প্রতিরক্ষা সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অংশমাত্র। জাতীয় নিরাপত্তা বলতে এখন আর শুধু সীমান্ত প্রতিরক্ষা বা বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা বোঝায় না। জাতীয় নিরাপত্তা বলতে এখন অর্থনৈতিক, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, খাদ্য, পরিবেশ, জ্বালানি, পানি, চিকিৎসা, মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নের সবদিককে বোঝায়। তাই, জাতীয় প্রতিরক্ষা আজ সব দেশেই জাতীয় নিরাপত্তার সমার্থক, যা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের জন্য সরকারকে জাতীয় নিরাপত্তার সার্বিক দিকগুলো বিবেচনার পাশাপাশি সীমাবদ্ধ সম্পদেরও সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হয়।
ভূকৌশলগতভাবে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তাঝুঁকিগুলো নিরূপণ করে সুবিন্যস্ত প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে, দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সশস্ত্র বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্ধন এবং যুদ্ধসরঞ্জাম সংগ্রহ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে স্বতন্ত্রভাবে যুদ্ধাস্ত্র ক্রয় বা সংগ্রহ নীতি থাকাও বাঞ্ছনীয়। সুবিন্যস্ত ও সুস্পষ্ট প্রতিরক্ষা নীতি না থাকায় অতীতে অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর সম্প্রসারণ অ্যাডহক ভিত্তিতে হয়েছে। সম্ভবত সে কারণেই সরকার ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দকালে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ‘প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন’-এর দায়িত্ব দিয়েছে। এই কাজটি করা গেলে প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে বাজেট প্রণয়নের কাজ যেমন সহজ হবে, তেমনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাও অনিবার্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে সমরাস্ত্র ক্রয় চুক্তি চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু জানা যায় না বলে অভিযোগ করা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রতিরক্ষা ব্যয় খাতে বাংলাদেশকে উচ্চমাত্রার দুর্নীতি ঝুঁকিসম্পন্ন দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দেশ যখন মধ্য আয়ের কাতারভুক্ত একটি দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে, তখন দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুন্নয়ন খাত হিসেবে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ও ব্যয় প্রসঙ্গে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রণয়ন ও এ খাতে ব্যয়-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা ঠিক করারও সময় হয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদকে আরও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নির্ধারণ করাও এখন সময়ের দাবি। এসব পদক্ষেপ দেশে–বিদেশে সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে।
যেকোনো ক্রয় চুক্তিতে গোপনীয়তা অবলম্বন করা হলে সেখানে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতির এ যুগে আসলে নিরাপত্তার নামে তেমন কিছু গোপন রাখাও কঠিন৷ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে জবাবদিহির পথ উন্মুক্ত করতে হবে। যুদ্ধাস্ত্র ক্রয় চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষর এবং চুক্তি অনুসারে কার্যক্রম সম্পাদনের বিভিন্ন পর্যায় মূল্যায়ন ও তদারক করার জন্য অভিজ্ঞ সাংসদ, সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বাহিনীপ্রধানদের নিজ নিজ বাহিনীর কার্যক্রম ও উন্নয়ন পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার প্রথা প্রবর্তন করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এরূপ প্রথা রয়েছে।
বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয়-প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে সংশয় সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল কার্যকারিতা হ্রাস করে। তাই, নাগরিক সমাজকে দূরে না রেখে, গণমাধ্যমকে শুধুই সমালোচক না ভেবে, দেশের জনগণকে আস্থায় নিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন পরিকল্পনা করা গেলে অহেতুক বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হবে। এতে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক যেমন আরও হৃদ্যতাপূর্ণ হবে তেমনি পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে। বিষয়টি এ কারণেও জরুরি যে যেকোনো নিরাপত্তা হুমকি বেসামরিক-সামরিক প্রশাসনকে যৌথভাবে মোকাবিলা করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের এবং একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার জন্য এমনভাবে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, যেন তা জাতীয় অর্থনীতির পক্ষে সহনীয় হয়। প্রয়োজনে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়বে বা কমবে।
প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং সেনানিবাস, নৌ ও বিমানঘাঁটি সম্প্রসারণ, তিন বাহিনীর জন্য আধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম ক্রয়, সাংগঠনিক পরিবর্ধন এবং সম্পদ বণ্টনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করবে। দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মূল স্তম্ভ জনগণ। জনগণ আশ্বস্ত হতে চায়, তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে দেশের জন্য সর্বোচ্চ মানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে, যা নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল রাখবে।

মো. নজরুল ইসলাম: বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্লেষক, প্রথম আলো।

এদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না- চরমপন্থী শক্তির পুনরুত্থান?

পাবনার পুষ্পপাড়া বাজারে অতর্কিত হামলায় চার ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার পেছনে স্থানীয় হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব কাজ করেছে বলে সাধারণভাবে অভিযোগ রয়েছে৷ কিন্তু বিএনপির নেতা ও পুলিশ সদস্যরা অভিযোগ করছেন, উপলক্ষ যা-ই হোক, হত্যাকারীরা ছিল চরমপন্থী দলের সদস্য৷ এই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য ভিিত্ত থাকলে বিষয়টি হালকাভাবে দেখা যাবে না৷ কারণ একসময় পাবনা, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের এক বিরাট অংশে চরমপন্থী দলের সদস্য নামধারী সন্ত্রাসী চক্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল৷ পরে সাময়িকভাবে দমন করা সম্ভব হয়৷ এখন যদি আবার ওই সব অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে, তাহলে জননিরাপত্তা আরও বেশি হুমকির মুখে পড়বে৷
পাবনার পুষ্পবাজার এলাকাটি প্রধানত বিএনপি-জামায়াতের প্রভাবাধীন ছিল৷ গত বছরের ১০ মে বিএনপিদলীয় একজন ইউপি চেয়ারম্যান নিহত হলে আওয়ামী লীগ এলাকায় শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করতে থাকে৷ এ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত জোটের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল৷ এই সুযোগে স্থানীয় কিছু চরমপন্থী নেতা-কর্মী বিএনপি-জামায়াত চক্রের সঙ্গে মিশে চাঁদাবাজিসহ নাশকতামূলক তৎপরতায় লিপ্ত হয় বলে অভিযোগ ওঠে৷ কিন্তু স্থানীয় বিএনপির নেতারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চরমপন্থীরা বিএনপিতে নেই, ওদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেওয়া হয় না৷ অবশ্য চরমপন্থীরাই যে চার খুনের নায়ক, সে অভিযোগ বিএনপিও করছে৷
কথিত চরমপন্থীরা একসময় সাম্যবাদ-সমাজবাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন৷ বিপ্লবের নামে গ্রামে গ্রামে জোতদার বা ধনী কৃষক হত্যা, লুটপাট ও অরাজকতা সৃষ্টি করতেন৷ এলাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও অবস্থাপন্নদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, ডাকাতি, রাহাজানি নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে উঠেছিল৷ পাবনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের দাপট এতই প্রবল ছিল যে থানা-পুলিশও ভয়ে কাঁপত৷
পরবর্তীকালে সরকার, প্রশাসন ও বামপন্থী কিছু রাজনৈতিক দলের মধ্যস্থতায় চরমপন্থী সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধানের কৌশল গ্রহণ করা হয়৷ সরকার গৃহীত কর্মসূচি অনুযায়ী অনেক চরমপন্থী নেতা-কর্মী আত্মসমর্পণ করেন৷ সরকার তাঁদের চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়৷ কিছু নেতা-কর্মী এভাবে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরে আসেন৷ অনেকে আনসার সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান৷ কিন্তু অনেককে পুনর্বাসন করা সম্ভব না হওয়ায় তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন৷ তাঁদের জীবনের ঝুঁকি দেখা দেয়৷ তাঁদের অনেকে আবার তাঁদেরই পরিত্যক্ত চরমপন্থী রাজনীতিতে ফিরে যেতে বাধ্য হন৷
চরমপন্থীরা যখন খুন, চাঁদাবাজি, লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন, তখন আর তাঁদের আদর্শ বলে কিছু থাকে না৷ তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে৷ পাশাপাশি দেখতে হবে চরমপন্থী দলের কোনো সদস্য যদি আত্মসমর্পণ করে সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ গ্রহণ করতে চান, তিনি যেন সেই সুযোগ পান৷
চরমপন্থীরা সব সময় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ছাতার নিচে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে৷ বিশেষভাবে বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াত জোট এবং একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-মহাজোটের ভেতরের দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে৷ কোনো অছিলাতেই এসব চরমপন্থী দলের সদস্যদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না৷

বিসিএস প্রশ্নপত্র পরিবর্তন কেন? by সৌমিত্র শেখর

চাকরিপ্রার্থীদের কাছে যন্তর–মন্তর ভবন বলে পরিচিত বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন ভবন আবার আলোচনায় এসেছে৷ নির্দিষ্ট সময় পরীক্ষা না নেওয়া, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর অনুষ্ঠিত পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হওয়া, ফলাফল প্রকাশ করার পর পুনর্মূল্যায়ন করে আবার প্রকাশ করা, মৌখিক পরীক্ষার সময় ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে পরীক্ষার্থীকে বিব্রত করা, নিয়োগের সময় নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ ইত্যাদি নিয়ে বেশ আগে থেকেই এই মহল আলোচনায় এসেছে৷
বিগত বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় নিজেদের কারণে প্রকাশিত ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন করে পুনঃপ্রকাশ করতে হয় প্রতিষ্ঠানটির এবং তাতে রেকর্ডসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করিয়ে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজে তারা৷ সব সময়ই পার পেয়ে গেছে এই মহল৷ সাধারণের কাছেও এই ভবন যন্তর-মন্তর ভবন নামে পরিচিতি পেয়েছে৷

এবার আলোচনার বিষয়: নতুন ধারার প্রশ্নপত্র৷ কিন্তু প্রশ্নপত্র পরিবর্তনে যে প্রকৃত সমস্যার সমাধান নেই, পিএসসি সেটা ভালোভাবেই জানে৷ জেনেও সাধারণের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টায় এই প্রশ্নপত্র পরিবর্তনের তাদের প্রস্তাব৷
সরকারি কর্মকমিশনের প্রধান কাজ হলো সৎ ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা নিয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হওয়ার যোগ্যদের নির্বাচন করে সরকারের কাছে চাকরি প্রদানের জন্য সুপারিশ করা৷ কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বারবার এই ‘নিরপেক্ষতা’ ভঙ্গের অভিযোগই উঠেছে, এই অভিযোগ থেকে মুক্তির চেষ্টা তারা করেনি৷ সমস্যা এখানেই৷
বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধারা এর আগে বহুবার পরিবর্তন করা হয়েছে৷ আগে বাছাই বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষাই ছিল না৷ দশম বিসিএস থেকে ১০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি বা বাছাই পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়৷ পরে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নকাঠামোও বদলানো হয়৷ তার পরে যুক্ত হয় দুটি ভুল উত্তরের জন্য ১ নম্বর কর্তনের ধারা৷ লিখিত পরীক্ষায়ও ১০০ নম্বরের বাংলা ও ইংরেজির বদলে আসে ২০০ নম্বর করে বাংলা ও ইংরেজি পরীক্ষা৷ আগে ৩০০ নম্বরের ঐচ্ছিক বিষয়ে পরীক্ষা হতো, পরে সেটাও বাদ যায়৷ সব বিষয় হয়ে যায় আবশ্যিক৷ মৌখিক পরীক্ষায় কখনো থাকে ২০০ নম্বর, কখনো ১০০ নম্বর৷ সম্প্রতি আবার ফিরে যাওয়া হয় ২০০ নম্বরে৷ এখন প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ২০০ বা ৩০০ নম্বরে হবে বলে রব উঠেছে৷ পরীক্ষার প্রশ্নকাঠামোতে শুধু বদল আর বদল! যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, প্রশ্নপত্রের এত বদলেও কি প্রশ্নমুক্ত হয়েছে সরকারি কর্মকমিশন? উত্তর, না৷ তাহলে এ কথা কি নিশ্চিত নয় যে প্রশ্নপত্রের কাঠামো বদলে সমস্যার সমাধান নেই৷
বিসিএস পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে প্রস্তাবিত নতুন ধারা এনে আমাদের তরুণসমাজকে আরও বেশি উদ্বিগ্নই করা হবে৷ প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতে যদি সামান্যতমও লিখে উত্তর দেওয়ার প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে জটিলতায় পড়বে পিএসসি নিজেই৷ এখন প্রায় দুই লাখ পরীক্ষার্থী প্রতি বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবেন৷ তাঁদের লিখিত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন কারা এবং কত দিনে তাঁরা এই মূল্যায়ন করবেন? এ প্রশ্ন সর্বাগ্রে ভেবে দেখা উচিত৷
বাস্তবতা এই, দুই লাখ উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও মূল্যায়ন-পরবর্তী কর্ম সমাধান করে ফলাফল প্রকাশ করতে পিএসসির দীর্ঘ সময় লেগে যাবে৷ এতে বাধাগ্রস্ত হবে পরবর্তী বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠান৷ আরেকটি বিষয় হলো, এই পরীক্ষাপদ্ধতি সামগ্রিক উচ্চশিক্ষায় বিরূপ ফল ফেলবে৷ শিক্ষার্থীরা যে যাঁর শৃঙ্খলার স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার আগেই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অধিকতর সময় দিতে চাইবেন৷ তাঁরা চাইবেন যেনতেনভাবে ডিগ্রি অর্জন করে চাকরির পরীক্ষায় মনোযোগী হতে৷ তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে হবে কোচিংমুখী৷ এর ফলে নির্দিষ্ট বিষয়ে স্নাতক হলেও সেই বিষয়ে ভালোভাবে দক্ষতা অর্জন তাঁরা করবেন না৷ শুধু সার্টিফিকেট লাভের আশা থাকবে তাঁদের৷ শিক্ষাজগতে এর কুফল পড়বে নিশ্চিত৷ আবার যাঁরা প্রকৃতভাবে লেখাপড়া করে স্নাতক হতে চাইবেন, তাঁরা ডিগ্রি অর্জনের পর চাকরির পরীক্ষার জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেবেন৷ এই প্রস্তুতিপর্বের কারণে তাঁদের শিক্ষাজীবন হবে প্রলম্বিত—এটিও কাম্য হতে পারে না৷
আমাদের প্রস্তাব, নতুন ধারার প্রশ্নকাঠামো স্থগিত করা হোক৷ প্রশ্নপত্র নিয়ে আপাতত আর নিরীক্ষা নয়৷ এ নিয়ে পিএসসি অনেক সভা-সেমিনার করেছে৷ যাঁরা এতে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগে থেকে চিন্তাভাবনা নেই৷ বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনকে তরুণসমাজের প্রত্যাশা বুঝতে হবে৷ তরুণসমাজের প্রত্যাশা মাত্র দুটি: প্রথম প্রত্যাশা হলো: প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের মধ্যে বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হোক; আর দ্বিতীয় প্রত্যাশা হলো: নির্ভুল প্রশ্ন ও প্রশ্ন ফাঁসহীনভাবে প্রিলিমিনারি (ও অন্যান্য) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হোক৷ এতে যদি প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা থেকে তিন বা চারজনকেও লিখিত পরীক্ষার জন্য আহ্বান করা হয়, তাতেও আপত্তি নেই কারও৷
প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় হাজার হাজার পরীক্ষার্থী পাস করুক, এটা প্রকৃত পরীক্ষার্থীরাও চান না৷ প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অল্পসংখ্যক পরীক্ষার্থীর লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা পিএসসির জন্য অসম্ভব ব্যাপার নয়৷ অনেক দিন হয়ে গেল, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন পরবর্তী বিসিএস পরীক্ষা নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রচার করছে না৷ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিসিএস পরীক্ষা প্রকারান্তরে বন্ধ থাকতে পারে না৷ বিদ্যমান জট খুলতে উদ্যোগী হতে হবে সরকারি কর্মকমিশনকেই৷

ড. সৌমিত্র শেখর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷
scpcdu@gmail.com

জাস্টিন বিবারের কাছেই কুমারীত্ব হারিয়েছে সেলেনা গোমেজ

পপস্টার জাস্টিন বিবারের কাছেই কুমারীত্ব হারিয়েছেন হলিউড অভিনেত্রী ও কন্ঠশিল্পী সেলেনা গোমেজ। সম্প্রতি এমন খবর জানিয়েছেন বিবারের এক বন্ধু। বন্ধুর দাবি বিবারই তাকে বলেছেন এ কথা। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

জাস্টিন ও সেলেনার প্রেমের সম্পর্কের কথা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। সে বছরে তারা একসঙ্গে একটি ছুটিও কাটান। ১৯ বছর বয়সি জাস্টিন তার সেই বন্ধুকে বলেন, সেই অবকাশ যাপনের সময়েই সেলেনা প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে যৌনতায় সম্মতি জানায়।

সেই বন্ধুটি পরে রেডার অনলাইনে বলেন, জাস্টিন আমাকে বলেছে, আমি জানি সে আমাকে ভালোবেসেছিল এবং তার কুমারীত্ব আমাকে দিয়েছিল। এসময় তার মাঝে কোনো দুঃখবোধ বা লজ্জাবোধ দেখা যায়নি।

সূত্র জানিয়েছে, সে সময়টি ছিল ২০১১ সালের গ্রীষ্মকাল। তারা পাম স্প্রিংস-এ উড়ে গিয়েছিল দুদিনের জন্য। সেখানে তাদের থাকার একটি প্রাইভেট স্থানও ছিল। সে সফরের উদ্দেশ্য ছিল ১০০ ভাগ সেলেনা নির্ভর থাকা। তিনি সেসময় জাস্টিনের প্রেমে বিভোর ছিলেন এবং তার সঙ্গে যৌনতায় সম্মতি জানিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি তাদের সম্পর্কে অবনতি হয়েছে।

বাজেটপূর্ব সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী- গুরুত্ব পাবে নারীর ক্ষমতায়ন স্থানীয় সরকার ও সংস্কৃতি

বাজেট পেশের প্রাক্কালে গতকাল বুধবার প্রথম আলো মুখোমুখি হয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের। বেলা ১১টায় তাঁর দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে তেমন ব্যস্ততা লক্ষ করা গেল না। আগের দিন রাত ১২টা পর্যন্ত মন্ত্রী মহোদয় কাজ করেছেন, জানান এক কর্মকর্তা। আমাদের নির্ধারিত সময় ছিল বেলা ১১টা। তিনি সময়টি ৩০ মিনিট পিছিয়ে নিলেন। ঘরে ঢুকতেই সহাস্যমুখে নীল পাঞ্জাবি পরা আবুল মাল আবদুল মুহিত আমাদের স্বাগত জানালেন।
আলাপচারিতায় বাজেট ছাড়াও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, সাংসদ-স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিরোধ, বিনিয়োগ সমস্যা, বিদেশে অর্থ পাচার ইত্যাদি নিয়ে। অর্থমন্ত্রী বললেন, প্রতিটি বাজেটেই তিনি নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবারে গুরুত্ব পাবে নারীর ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকার ও সংস্কৃতি। তিনি স্বীকার করলেন, বেসিক ব্যাংকে দুর্বৃত্তপনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে না।
পৌনে এক ঘণ্টার আলাপচারিতায় কখনো তাঁকে বেশ প্রত্যয়দীপ্ত, কখনো গম্ভীর, কখনো খানিকটা বিরক্ত মনে হয়েছে। তবে চলমান রাজনীতির গুমোট হাওয়া তাঁকে স্পর্শ করেছে বলে মনে হলো না। আলোচনায় আসে রাজনীতিও। সরকারের ‘অংশীদার বিরোধী দলের’ অকার্যকর ভূমিকা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বললেন, এ জন্য বিএনপির নির্বুদ্ধিতাই দায়ী।

>>সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ​কারে আবুল মাল আবদুল মুহিত l প্রথম আলো
প্রথম আলো: আপনি এর আগে সাতটি বাজেট পেশ করেছেন। সে সব বাজেট থেকে এবারের বাজেটকে আলাদা করা যাবে কি?
আবুল মাল আবদুল মুহিত: নতুন একটি সরকারের আমলে এই বাজেটটি পেশ হতে যাচ্ছে। আগের সরকারেরও প্রধান ছিলেন শেখ হাসিনা। ফলে ধারাবাহিকতা তো থাকবেই। কিন্তু আগের বাজেটগুলো থেকে কিছুটা ভিন্নতাও থাকবে। আগের পাঁচ বছর আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে একধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সে কারণেই আমাদের লক্ষ্য থাকবে ২০২১ সালের মধ্যে কীভাবে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়।

প্রতিবছরই আমি বাজেটে কিছু কিছু বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দিই। এবার নারীর ক্ষমতায়ন ও সংস্কৃতির ওপর আলাদা দৃষ্টি থাকবে। নতুন সংস্কৃতিমন্ত্রীর (আসাদুজ্জামান নূর) হাতে দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে আশা করি।
বার্ষিক বাজেটে মোটামুটি ধারাবাহিকতা থাকবে। ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন আসবে।
আর যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চাই সেটি হলো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও ভুক্ত হবে না। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক ও প্রশাসকদের সহায়তায় অর্থ ব্যয় হয়। শিক্ষার উন্নয়ন হয় না। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীও একমত হয়েছেন। বাজেট পাসের পর আমরা বসব কীভাবে এটি পুনর্বিন্যাস (রিকাস্ট) করা যায়। আমাদের আরেকটি বড় অঙ্গীকার স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা। বাজেটে এরও প্রতিফলন থাকবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের জেলা সরকারেই যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জেলা সরকারের ধারণা গ্রহণ করেননি, তবে এর অন্তর্নিিহত ভাবটি অনুমোদন করেছেন৷
প্রথম আলো: গত পাঁচ বছরে তো স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হয়নি।
মুহিত: স্থানীয় সরকার ক্ষমতাশালী না হলেও এটি কাজ করছে। তাদের হাতে যেসব বিষয় ছেড়ে দেওয়ার কথা সেগুলো দেওয়া হয়েছে। যেটি হয়নি সেটি হলো জেলা পরিষদ নির্বাচন। আগামী এক বছরের মধ্যে জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে। এর পরই সংস্থার সংস্করণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রথম আলো: স্থানীয় সরকার তথা উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সাংসদেরাই কি প্রধান বাধা নন?
মুহিত: হ্যাঁ, বলতে পারেন সাংসদেরা তাঁদের ক্ষমতা ছাড়তে চান না। কিন্তু এই মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়েছেও। অনেক জায়গায়ই সাংসদদেরই সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানের ভালো বোঝাপড়াও তৈরি হয়েছে।
প্রথম আলো: রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকে হল-মার্ক কেলেঙ্কারির কথা বলা যায়। এ থেকে উত্তরণের পথ কী?
মুহিত: বেসিক ব্যাংকই একমাত্র সমস্যা। এখানে দুর্বৃত্তপনা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের কোনো ভূমিকা ছিল না। সেখানে ব্যবস্থাপনার সমস্যা ছিল। আর বেসিক ব্যাংকে তো সম্পূর্ণ ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদারক করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের। কিন্তু তাদের তদারকি ছিল দুর্বল। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি উন্নত হয়েছে। এখন এই অবস্থা থেকে বেসিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে আর্থিক ক্ষতির বিনিময়েই।
প্রথম আলো: কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কি স্বাধীন মতো কাজ করতে পারছে?
মুহিত: তারা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করছে। যদিও তারা কাজ করতে পারছে না অভিযোগ করছে। গত পাঁচ বছরে আমি এক বা দুবার মাত্র নির্দেশ দিয়েছি, কারণ তাঁরা কাজটি ঠিকমতো করছিল না।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ ব্যাংক কি তার মূল কাজ তদারকি রেখে অন্যান্য বিষয় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে করেন?
মুহিত: হ্যাঁ। বাংলাদেশ ব্যাংক জনসংযোগে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর তদারকি নিয়ন্ত্রণ করা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে তার কর্তৃত্ব সীমিত হলেও আমরা তাদের কথা শুনি। বিভিন্ন ব্যাংক সম্পর্কে তারা কিছু কিছু সুপারিশ করেছে। আমরা তা বাস্তবায়নও করছি। তাদের নিজেদের সিস্টেম ছিল দুর্বল। আমি বলেছি, তাদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে। এখন অডিট ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন আইনকানুন করেছে।
প্রথম আলো: অন্যান্য দেশে তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত। কিন্তু এখানে কি সেভাবে চলছে?
মুহিত: তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আছে বলে তারা দািব করে। তারা জানে না কীভাবে কাজ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তাদের সনদ অনুযায়ী চলত তাহলে স্বাধীনভাবেই চলতে পারত। কিন্তু সেভাবে চলতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম গভর্নর এসেছিলেন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। নূরুল ইসলাম সাহেব সাত বছর ছিলেন। এরপর সরকারি কর্মকর্তারা এসেছেন। তাঁরা সেভাবে কাজ করেননি।
প্রথম আলো: বাজেটে রাজস্ব খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার কথা বলা হচ্ছে। আয়করই এই খাতের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে?
মুহিত: আমি মনে করি আয়করই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আয়কর ও মূসকই এটি হলো বাজেটের অর্থের সবচেয়ে বড় উৎস। শুল্ক আয় কমে যাচ্ছে। আয় বাড়ানোর উপায় হিসেবে সব দেশে দেশে আয়কর ও ব্যবহারকারী করকে প্রধান উৎস ভাবা হয়। আমাদের এখানে ব্যবহারকারী কর সেভাবে আরোপ করা হয় না।
প্রথম আলো: আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার তো তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি।
মুহিত: এটি ঠিক নয়। আমরা বহু লোককে এই আয়করের আওতায় নিয়ে এসেছি। গত পাঁচ বছরে আয়কর ও করপোরেট কর আদায়ের হারও সন্তোষজনক। আগামী দুই বছরের মধ্যে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে আশা করি।
প্রথম আলো: ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া প্রদানের বিধান বাজেটে থাকছে কি?
মুহিত: হ্যাঁ, থাকছে।
প্রথম আলো: বাজেট এলেই কালোটাকা সাদা করার বিষয়টি সামনে চলে আসে। এবার বাজেটে সেই সুযোগ থাকবে কি না?
মুহিত: আমি পরিষ্কার বলেছি, আয়কর আইন অনুযায়ী যে কেউ জরিমানা দিয়ে প্রদর্শিত অর্থ সাদা করতে পারবেন। সেটি আইনেই আছে। আর কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আমার আমলেই চালু হয়নি। এটি আগে থেকেই হয়ে আসছিল।
প্রথম আলো: কালোটাকা সাদা করায় খুব কি লাভ হয়?
মুহিত: খুবই সীমিত। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সব চেয়ে বেশি অর্থ আদায় হয়েছে।
প্রথম আলো: প্রতিবারই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সমস্যা হয়। বিরোধী দলের আন্দোলন কর্মসূচি থাকে। গত অর্থবছরেও যা আরও ভয়ানক রূপ নিয়েছিল। এবারে কী হবে?
মুহিত: আমার আমলে বাজেট বাস্তবায়নের রেকর্ড ভালো। সমস্যা হয়নি। এমনকি গত বছরও তেমন সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয় না।
প্রথম আলো: বাজেট বাস্তবায়নে এ ছাড়া আপনাকে কী কী সমস্যায় পড়তে হয়?
মুহিত: সংসদে উপস্থাপিত বাজেট ও সংশোধিত বাজেটের মধ্যে ফারাক সব দেশেই থাকে। বাংলাদেশে হয়তো খানিকটা বেশি। গত পাঁচ বছরে সংশোধিত বাজেটের ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। আগে কখনো এটি ৯০ শতাংশের ওপরে ওঠেনি।
প্রথম আলো: গত কয়েক বছরেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপিতে অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন হয়নি কেন? এর জন্য কি সরকার দায়ী না বেসরকারি খাত?
মুহিত: পারস্পরিক অবস্থা একটি বিষয় আছে। তবে পিপিপি কিছুই হয়নি তা ঠিক নয়। খুব কম হলেও বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। বিশেষভাবে রেলওয়ের জমিতে কিছু হাসপাতাল ও ডায়াগনসিস সেন্টার করা হচ্ছে। বড় প্রকল্পের মধ্যে উড়াল সেতু হচ্ছে।
প্রথম আলো: একসময় আপনি পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন এই যে যত্রতত্র উড়ালসেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, তাতে কি পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে না?
মুহিত: উড়াল সেতুতে সেভাবে হচ্ছে না। আমাদের কৌশলগত ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের অধীনেই এগুলো হচ্ছে। যদিও এর ওপর দিয়ে চলা যানবাহনে কার্বন নির্গত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের তো বিকল্প নেই। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিবেশ দূষণ হবে, স্বীকার করি। সে ক্ষেত্রে আমাদের চেষ্টা থাকবে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে যথাসম্ভব দূষণ নিয়ন্ত্রণের।
প্রথম আলো: কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক চলছে বহু বছর ধরে। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সরকার।
মুহিত: এবার পারবে। তবে সমস্যা হলো আমাদের দেশটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। যেখানে প্রকল্প নেওয়া হোক না কেন স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় সমস্যা আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সম্পর্কে খুব বেশি সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্যই সময় লাগছে।
প্রথম আলো: রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে আপাতত চাহিদা মেটালেও বিদু্৵ৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে যে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো কেন এগোচ্ছে না?
মুহিত: এগোচ্ছে না, এটা ঠিক নয়। কতটা প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, কতটা প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে তার সব বিবরণ আছে। আমরা আশা করি ২০১৭ সালের মধ্যে ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কার্যাদেশ ও চুক্তি সইয়ে দেরি হয়। আবার চুক্তি সইয়ের পর অতিরিক্ত সময় নেওয়া হয়।
প্রথম আলো: সরকারি বিনিেয়াগ বাড়ালেও বেসরকারি বিনিযোগ বাড়ছে না। এবারের বাজেটে এ সম্পর্কে কোনো আহ্বান থাকবে কি?
মুহিত: দেশে বিনিয়োগের যে পরিবেশ ছিল সেটি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমার ধারণা যে সেই পরিস্থিতি থেকে আমরা উদ্ধার পেয়েছি। এই উদ্ধার স্থায়ী হবে বলেই আমার বিশ্বাস। কোথাও তার গ্রহণযোগ্যতা নেই।
প্রথম আলো: উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল তো তা বলে না।
মুহিত: উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল প্রায় সমান সমান। তিনি (খালেদা জিয়া) জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলে হয়তো জিততেন। কী ধরনের নির্বুদ্ধিতা করেছেন তারা।
প্রথম আলো: এখন যে বিরোধী দল আছে, সেটি তো সরকারেরও অংশ। তাদের ভূমিকা কী হবে?
মুহিত: একটা বিরোধী দল আছে, যারা কোয়ালিশন সরকারেরও অংশ। অনেক দেশেই জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে এভাবে সরকার ও বিরোধী দল ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক যে বাংলাদেশে সেটি কাজ করে না। তবে এখন বিরোধী দলকে সরকারের অংশ করার অবস্থাটি হয়েছে বিএনপির নির্বুদ্ধিতার কারণে। আমার ধারণা, এতে বিএনপি আরও মারজিনালাইজড (প্রান্তিক) অবস্থায় চলে যাবে। সে জন্য আমাদের অন্য কোনো বিরোধী দলের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আর বিএনপির মূল সমস্যা এটি কোনো রাজনৈতিক দলই নয়। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব প্রতিদিনই উল্টাপাল্টা কথা বলছেন।
প্রথম আলো: সরকারি দলের নেতারাও কম বলছেন না।
মুহিত : তাঁর মতো কেউ বলছেন না। আজকের পত্রিকায় দেখলাম, তিনি বলেছেন, ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে শেখ হাসিনাও জড়িত থাকতে পারেন। কী আহাম্মকি কথা।
প্রথম আলো: বিএনপির এই প্রান্তিক অবস্থা জাতীয় রাজনীতিতে সুস্থতা আনবে কি?
মুহিত: আনবে। হয়তো সময় লাগবে।
প্রথম আলো: বিএনপি না হয় প্রান্তিক অবস্থায় চলে গেল। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নারায়ণগঞ্জে, ফেনীতে ও লক্ষ্মীপুরে যা করছে তা কি সুস্থতার লক্ষণ?
মুহিত: দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী দলের হাইকমান্ড ও সংসদদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন ‘আমরা সমস্যা সম্পর্কে সজাগ আছি।’
প্রথম আলো: বাজেটে সাংসদদের জন্য থোক বরাদ্দের ব্যবস্থা থাকে, যার বেশির ভাগই অপচয় হয় বলে অভিযোগ আছে।
মুহিত: অপচয় হয়। কিন্তু সেই অপচয়কে অন্যায় বলা যাবে না। তাদের যে বরাদ্দ দেওয়া হয় সেই বরাদ্দ ব্যয়ের ব্যাপারে একটি শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। তদারকি প্রয়োজন। কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী যেভাবে এলজিইডি শুরু করেছিলেন, সেভাবে এখন নেই। সে সময় তদারকিটা ছিল। সাংসদদের প্রকল্পের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করা দরকার।
প্রথম আলো: এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এই মন্ত্রণালয় চলেছে দিকনির্দেশনাহীনভাবে।
মুহিত: মন্ত্রণালয় ঠিকই চলেছে। হয়তো আগের সচিব অনেক বেশি ক্ষমতাবান ছিলেন।
প্রথম আলো: এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারের স্থিতি আনতে কোনো প্রণোদনা থাকছে িক?
মুহিত: আমি তো মনে করি শেয়ারবাজার স্থিতিশীলই আছে। এটাকে ধরে রাখতে হবে।
প্রথম আলো: কিন্তু ১৯৯৬ সালেও এবারের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির দায়ে যেসব মামলা হলো, তার কিছুই হলো না? কেউ শাস্তি পেলেন না?
মুহিত: এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই। এটাই হলো আমাদের বিচারিক ব্যবস্থা।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের বিষয়টি সম্পর্কে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ শীর্ষ তালিকায়। কানাডায়ও প্রচুর বাঙালি যাচ্ছে, নাগরিকত্ব নিচ্ছেন। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
মুহিত: টাকা পাচার বন্ধের উপায় হলো দেশে বিনিয়োগ করা। কিন্তু মুখে বললেই তো বিনিয়োগ হবে না, এ জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ দিতে হবে।
প্রথম আলো: এর অর্থ কি আপনারা বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ দিতে পারছেন না?
মুহিত: যখন সবাই মনে করবে এখানে বিনিয়োগ নিরাপদ, তখন বিনিয়োগ করবেন। আমরা সেই পরিবেশ আনার চেষ্টা করছি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, হেড অব রিপোর্টিং শওকত হোসেন ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ফখরুল ইসলাম|

যে কারণে সন্ত্রাস দমন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই খুন, গুম, অপহরণ আর সন্ত্রাসের খবর। দেশবাসী আতংকের মধ্যে রয়েছেন। অথচ সরকারের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হল জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরাপত্তা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে না পারলে কেউই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো কাজ করতে চান না। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। কাজেই কোনো দেশের সরকার যদি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না করে কেবল স্বপ্নের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গ্রাফ আঁকে, তাহলে সে সরকারকে বোকা বলা যায়। আবার সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে যদি কোনো সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস ও দুর্নীতিকে পরোক্ষ ছাড় দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস ও দুর্নীতিবাজদের শক্ত হাতে দমন করার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়, তাহলে সরকারের ওই কাজকে আহাম্মকি বলতে হবে। কারণ, নিজ দলীয় সন্ত্রাসীদের পরোক্ষ ছাড় দিলে ওইসব সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজরা একপর্যায়ে বেপরোয়া হয়ে ফ্রাংকস্টাইনের মতো একদিকে যেমন নিজ দলকেই আক্রমণ করে শেষ করে দেয়, তেমনি অন্যদিকে পরোক্ষ সরকারি প্রশ্রয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ এত বেশি বিশৃংখল করে ফেলে যে, পরে সরকার শত চেষ্টা করেও এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ অবস্থায় উপায়ান্তর না দেখে অনেক ক্ষেত্রে সরকার অবিবেচকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা বাহিনীকে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনের কাজে ব্যবহার করে। আর এভাবে সরকার একদিকে নিজের জনপ্রিয়তা ভূলুণ্ঠিত করে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের বিরাগভাজন হয়ে নির্বাচন এলে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালের ব্যাপক খুন, গুম ও সন্ত্রাস পরিস্থিতির নির্মোহ পর্যালোচনা করলে এসব বিষয় আলোচনায় উঠে আসে।

এ আলোচনায় সরকার কী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কীভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটি স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে সে সরকারের সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দলীয় সাংগঠনিক তৎপরতা ও শক্তিবৃদ্ধি ঘটিয়ে সরকার দলীয় জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু সরকার যদি রাজনৈতিক দল ও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি অগ্রহণযোগ্য একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে ওই সরকারের পক্ষে পূর্ণমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। আর একতরফা নামকাওয়াস্তের নির্বাচনে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় আসতে সরকার যদি নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও দলীয় ক্যাডারদের নির্বাচনী সন্ত্রাস করতে ছাড় দেয়, তাহলে ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারের পক্ষে ওই প্রশ্রয় পাওয়া সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চরিত্র বিশ্লেষণ করে যে কেউ বুঝতে পারেন যে, ওই নির্বাচনটি একটি স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল না। বিরোধী দলের বর্জন ও প্রতিরোধের হুমকির মুখে ওই নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে নির্বাচনই হয়নি; বেশির ভাগ ভোটার ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পাননি। আর যাদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ ছিল, তারাও ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিরাপদ মনে করেননি। ৪১টি ভোট কেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি এবং রাজধানীর মতো ব্যস্ত এলাকার অনেক ভোট কেন্দ্রে ভোটারের অনুপস্থিতি এবং কুকুরের শুয়ে থাকার ছবি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অথচ এ নির্বাচনে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে কিছু ভোট কাস্ট করানো সম্ভব হলেও হুকুমবরদার নির্বাচন কমিশন কয়েক দিন হিসাব-নিকাশ করার পর শতকরা ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে ঘোষণা করে। সরকারদলীয় ক্যাডার ও সরকারের প্রশ্রয় পাওয়া সন্ত্রাসীরা এ নির্বাচনে সরকারি দলের জয়লাভের পেছনে ভূমিকা পালন করে।
একই প্রক্রিয়ায় নবনির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার মাত্র মাসাধিককাল পর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে নিজ দলের সমর্থিত প্রার্থীদের জয়যুক্ত করতে আবারও নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের প্রশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীদেরও ব্যবহার করা হয়। এসব সন্ত্রাসী ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনতাই, ভোটের আগের রাতেই নির্বাচনী কর্মকর্তাদের আয়ত্তে নিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, ভোট কেন্দ্র দখলে নিয়ে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরা, বিরোধী দল সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে মারধর করে বের করে দেয়া, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের জীবনের হুমকি দিয়ে কথা শুনতে বাধ্য করাসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত হয়। উল্লেখ্য, এ ধরনের সন্ত্রাসীর উল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়নি। দুদুটো বড় নির্বাচনে সরকারের পরোক্ষ প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস করে ছাড় পাওয়ায় পরবর্তী সময়ে যে এরা অধিকতর বেপরোয়া হয়ে উঠবে সেটাই স্বাভাবিক। এ কারণে এ দুই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সামাজিক সন্ত্রাস আশংকাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়, যার নমুনা নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীসহ কতিপয় এলাকায় দেখা গেছে।

সরকার যদি দলীয় সন্ত্রাসীদের ছাড় দেয় এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীকে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনের কাজে ব্যবহার করে তাহলে তো ওইসব সন্ত্রাসী এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরবর্তীকালে ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজেরা সন্ত্রাসে জড়িত হবেই। র‌্যাব কর্মকর্তা কর্তৃক মাজারের টাকা লুট এবং অতি সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুলসহ সাতজনকে ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগ, ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যানকে একই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রভাব বিস্তারকেন্দ্রিক সংঘর্ষের জেরে ৩ কোটি টাকার বিনিময়ে ফিল্মি ভঙ্গিমায় গুলি করে ও আগুনে পুড়িয়ে পাশবিকভাবে হত্যার ঘটনাকে উপরের বিশ্লেষণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পর সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে পরিচালিত বিএনপি সরকারের অপারেশন ক্লিনহার্ট কর্মসূচি মানবাধিকার কর্মীদের সমালোচনার মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমেরিকার এফবিআইয়ের আদলে ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার আইন-শৃংখলা বাহিনীর বাছাইকৃত সদস্যদের নিয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গঠন করে। পুলিশ বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাব থাকায় এবং এ বাহিনীর সদস্যরা দুর্নীতি জড়িত হওয়ার কারণে সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্য নিয়ে এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাব সৃষ্টি করা হয়। সন্ত্রাস দমনে বিএনপি সরকার প্রথমদিকে র‌্যাবের ওপর কোনো রকম প্রভাব বিস্তার না করে একে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে। এ কারণে ২০০৪ সালে র‌্যাব কাজ শুরু করলে চট্টগ্রামে সংঘটিত প্রথম ১৬টি ক্রসফায়ারের মধ্যে ১৫ জনই ছিল সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মী এবং মাত্র একজন ছিল বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের (ছাত্রলীগ) নেতা (প্রথম আলো, ৪ ও ২৪ ডিসেম্বর ২০০৪)। এ ঘটনা থেকে অনুধাবন করা যায়, জন্মকালে র‌্যাব পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে সন্ত্রাস দমনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিল। এজন্য ওই সময় এ বাহিনী এর কাজের দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা ও পেশাদারিত্ব দিয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে কাঁপন ধরাতে পেরেছিল। দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান এবং সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইসহ অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে র‌্যাব সন্ত্রাস দমনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পেরেছিল।

র‌্যাব কাজ শুরু করার পর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে র‌্যাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে সন্ত্রাস দমনে এলিট ফোর্স হিসেবে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। এ লক্ষ্যে ২০০৪ সালে প্রথম আলো পত্রিকা র‌্যাব নিয়ে বিতর্ক শুরু করলে ওই পত্রিকায় ২৪ এপ্রিল সংখ্যায় এ লেখক র‌্যাবকে দয়া করে পুলিশ বানাবেন না শিরোনামে নিবন্ধ লিখেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, র‌্যাব খুব বেশি দিন রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে পেরেছে মনে করা যায় না। সম্প্রতি রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনের টুল হিসেবে র‌্যাবকে ব্যবহার করার জোরালো অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ কারণে মানবাধিকার সংগঠন এবং বিরোধী দল থেকে র‌্যাব বন্ধ করে দেয়ার প্রস্তাবও একাধিকবার উত্থাপন করা হয়েছে। মনে রাখা দরকার, র‌্যাব সদস্যরা আসমানের ফেরেশতা নন। তারাও সাধারণ নাগরিকদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ। র‌্যাবকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে এ বাহিনীর সদস্যরা যে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য অপকর্ম করবে না, সে নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। র‌্যাবকে পেশাদার বাহিনী হিসেবে কাজ করতে না দেয়ার কারণেই হয়তো কিছু র‌্যাব সদস্য মাজারের টাকা লুট করতে বা কোটি টাকার বিনিময়ে মানুষ অপহরণ বা খুন করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে এ বাহিনীর সুনাম ভূলুণ্ঠিত করেছে।
র‌্যাব গঠিত হওয়ার পর এ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংস্কার করা হয়নি। আমাদের কাছে মনে হয়, র‌্যাবের একটি বড় ত্র“টি হল এ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য ধার করে এনে এমন একটি বাহিনী তৈরি করলে সে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে একই রকম চিন্তাভাবনা থাকবে এমনটি আশা করা যায় না। তা ছাড়া সেনাবাহিনী থেকে আসা র‌্যাব সদস্যরা যে মর্যাদা পান, কোস্টগার্ড, আনসার, বিজিবি, পুলিশ বা অন্য বাহিনী থেকে এ বাহিনীতে আসা সদস্যরা একই রকম মর্যাদা পান কি-না তা নিয়ে ভাবার আছে। একটি সমন্বিত এবং একই রকম চিন্তা চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাহিনী হিসেবে র‌্যাবকে গড়ে তুলতে হলে অন্য কোনো বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ধার করে একে ককটেল বাহিনী না বানিয়ে এ বাহিনীর জন্য পৃথকভাবে লোক নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাহলে র‌্যাব একটি পেশাদার পৃথক এলিট ফোর্স হিসেবে সন্ত্রাস দমনে কাজ করতে পারবে এবং এর দায়িত্বশীলতাও বাড়বে। তা না হলে এখন যেভাবে র‌্যাব কাজ করছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ বা বিজিবির কেউ র‌্যাবে এসে দুর্নীতি করলে সে দায় র‌্যাবের ওপর পড়ছে, যা পরোক্ষভাবে পড়ছে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ওপর। কারণ, বর্তমানে র‌্যাবে সেনাবাহিনীরই প্রাধান্য রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সমাজে আমাদের সেনাবাহিনীর সুনাম ক্ষুুণ্ন হচ্ছে। কোনো বাহিনী থেকে লোক ধার না করে পৃথকভাবে লোক নিয়োগ করে র‌্যাবকে একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পর র‌্যাবের কোনো সদস্য দুর্নীতি বা অন্যায় করলে সে দায় তখন দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ওপর পড়বে না।

সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও সামাজিক অস্থিরতা কমাতে চাইলে সরকারকে আগে নিজের গণসমর্থন ও বৈধতা সুনিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার যদি হয় নড়বড়ে ও প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত, তাহলে তো ওই সরকারের অধীনে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বাড়বেই। সঠিকভাবে গণরায় না নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের পক্ষে সন্ত্রাস দমনে সফল হওয়া সম্ভব নয়। কাজেই দেশে সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে হলে সরকারের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে জনগণের প্রকৃত রায় নিয়ে সরকারে এসে তারপর সন্ত্রাস দমন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্মাণে মনোযোগী হওয়া।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com

আলোচনায় অপারেশন সাতছড়ি by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

অপারেশন সাতছড়ির পর আলোচনায় উঠে এসেছে সিলেটের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পাহাড়-অরণ্যেঘেরা দুর্গম জনপদ। সিলেটের  পাহাড়-অরণ্যে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আনাগোনা আগেও অনেক খবর সৃষ্টি করেছে। তবে চমকে দিয়েছে হবিগঞ্জের সাতছড়ির অস্ত্রাগার উদ্ধার ঘটনা। এমন সংবাদে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সীমান্তবর্তী অনেক গহিন এলাকায়। সিলেট বিভাগের তিন দিকে ঘিরে আছে ভারতের তিনটি রাজ্য আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়। এর মধ্যে আসাম ও ত্রিপুরায় স্বাধীনতার দাবিতে তৎপর রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা) আতঙ্কে রেখেছে আসামের জনসাধারণকে আর অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স (এটিটিএফ) আতঙ্কে রেখেছে ত্রিপুরার বাসিন্দাদের। তবে ভারত সরকারের অনমনীয় ও কঠোর মনোভাবের কারণে সুবিধা করতে না পেরে পাহাড়ে-অরণ্যে লুকিয়ে থেকে কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সীমানা পেরিয়ে চলে আসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। গহিন এলাকায় গড়ে তোলে নিরাপদ আস্তানা। সাতছড়ির অরণ্য আসাম-ত্রিপুরা দুই রাজ্যের সীমানার কাছেই। এ অরণ্য তাই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পছন্দের জায়গা হয়ে ওঠে। তবে এর ভেতরে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যে এমন শক্ত অবস্থান গড়ে উঠেছে তা টের পাওয়া যায়নি সাতছড়ির অস্ত্রাগার উদ্ধারের আগ পর্যন্ত। এমনকি দেশের কোন নিরাপত্তা সংস্থা বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এর তথ্য ছিল না। কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজারের দাবি, ভারতীয় গোয়েন্দারা এ অস্ত্রাগারের সন্ধান দিয়েছেন বাংলাদেশকে। আনন্দবাজারের ভাষ্য, ‘আলফা’র (উলফা) সহযোগী জঙ্গি সংগঠন এটিটিএফ (অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স) নেতা রঞ্জিত দেববর্মা ধরা পড়ার পরে তাকে জেরা করেই ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে তিন কিলোমিটার দূরে সাতছড়ির জঙ্গলে অস্ত্রভা-ারের খবর পান গোয়েন্দারা। তারপর বারেবারেই বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়। কয়েকবার অভিযান চালিয়েও পুলিশ কিছু পায়নি। সমপ্রতি ফের ভারতীয় গোয়েন্দারা সাতছড়িতে অস্ত্রের হদিস দিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য পাঠান। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, আলফা’র বহিষ্কৃত নেতা পরেশ বড়ুয়া চীন থেকে মিয়ানমারের পথে যে অস্ত্র পাঠান, তা এই সাতছড়ির জঙ্গলে জমা করে রাখা হয়। সুযোগমতো তা ভারতে জঙ্গিদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বার তল্লাশির দায়িত্ব দেয় র‌্যাবকে। স্থানীয় চুনারুঘাট থানার ওসি স্বীকার করেছেন, অভিযানের বিষয়ে এবার পুলিশকেও আড়ালে রাখা হয়।’
সাতছড়ির মতো সিলেটের আর কোন গহিন অরণ্যে কি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এমন আস্তানা নেই-এমন প্রশ্ন অনেকের মনে দেখা দিয়েছে। সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী দুর্গম স্থানে আগে থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আনাগোনার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। উলফা নেতাদের আনাগোনার সংবাদে বারবারই সংবাদ শিরোনাম হয়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা। ২০০৫ সালের ২৭শে মে উপজেলার মাধবপুরের মেন্দিটিলায় র‌্যাব ও বিডিআরের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ত্রিপুরার ৬ বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়। পরে মৃতদেহের কোন দাবিদার না থাকায় মৌলভীবাজার পৌর এলাকার একটি গোরস্থানে কবর দেয়া হয়। মাধবপুরের ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগান এলাকা, ছনগাঁও, নয়াপতন, মাজেরগাঁও, কেওয়ালিঘাট, কোনাগাঁওয়ের মতো দুর্গম পল্লীতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আনাগোনার খবর স্থানীয়দের মাঝে একটি ওপেন সিক্রেট। আতঙ্কের চোখ দিয়েই স্থানীয়রা এসব এলাকাকে দেখে থাকেন। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর খবর রটেছিল গহিন অরণ্যে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়েই আছেন তিনি। এমনকি র‌্যাবও তার সন্ধানে এ এলাকায় অভিযান চালিয়েছিল।

আসাম সীমান্তবর্তী সিলেটের জৈন্তাপুরের খাসিয়া পাহাড়ে উলফা নেতাকর্মীদের আনাগোনার সংবাদও অনেকবার আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় এক প্রভাবশালী খাসিয়া নেত্রীর সঙ্গে উলফা কানেকশনের অভিযোগও বেশ পুরনো। শুধু গহিন এলাকা নয় সিলেট নগরকেন্দ্রিক উলফা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছিল আগে। ২০০৫ সালে ভারতের সীমান্ত রক্ষাবাহিনী বিএসএফ দাবি করেছিল ঢাকার বাইরে সিলেটে উলফা’র পরিচালনাধীন দু’টো হোটেল রয়েছে। সে সময় প্রচার হয়েছিল নগরীর জিন্দাবাজার ও শহরতলীর আখালিয়া এলাকায় উলফা’র হোটেল দু’টো পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন দুলাল রায় ওরফে সাইদুল এবং অনিল কুমার দে ওরফে সোহেল। এমনকি সিলেটের একটি ব্যাংকে উলফা’র হিসাব রয়েছে বলেও সে সময় অভিযোগ উঠেছিল।
আপাতত অভিযান সমাপ্ত
নুরুল আমিন, চুনারুঘাট থেকে জানান, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ির গভীর জঙ্গলে ৪ দিনের অস্ত্র অভিযান আপাতত সমাপ্ত করেছে র‌্যাব। ওই অভিযানে কামান বিধ্বংসী রকেট লঞ্চার ১টি, রকেট ২২২টি , মেশিন গান ৪টি, মেশিনগানের অতিরিক্ত ব্যারেল ৫টি, ৭.২০ মিলিমিটার গুলি ১১ হাজার ৬৬৭ রাউন্ড, ১২.০৭ পয়েন্টের গুলি ১ হাজার ৩২০ রাউন্ড, ২৪৮টি রকেট চার্জার, এমজি এমিনেশন বক্স ১৩টি, ওয়েল ক্যান ৪০৪ টিসহ বিপুল পরিমাণ গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। ওই জঙ্গলে আরও অস্ত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করছে র‌্যাব। র‌্যাব হেডকোয়ার্টার  ও র‌্যাব-৯ এর আড়াই শতাধিক জওয়ান এ অভিযান পরিচালনা করে। তবে এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। র‌্যাবের মিডিয়া উইং কমান্ডের প্রধান কর্ণেল হাবিবুর রহমান গতকাল এক ব্রিফিংয়ে বলেন, সাতছড়িতে তাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে আরও কয়েক দিন। তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব সদস্যরা গত রবিবার রাত ১টার দিকে র‌্যাব-৯ এর অধিনায়ক সানা শাহীনুর রহমানের নেতৃত্বে সাতছড়ি বনবিটের অভ্যন্তরে এবং টিপরা পল্লীতে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে টিপরা পল্লীতে দু‘টি এবং পল্লীর অদূরে গভীর জঙ্গলে একটি টিলায় ৫টি ব্যাংকারের সন্ধান পায় তারা। গতকাল টিপরা পল্লীতে আরও একটি গোপন আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই আস্তানাটি সন্ত্রাসী সংগঠনের আহত সদস্যদের চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর এসব ব্যাংকার আরসিসি ঢালাই করা। ৫টি ব্যাংকারের মধ্যে একটি ব্যাংকার খনন করে  গোলাবারুদ পাওয়া যায়। বাকিগুলো ছিল পরিত্যক্ত। ওই  গোলা-বারুদ ভারতীয় নিষিদ্ধ ঘোষিত কোন সংগঠনের কিনা এমন প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে হাবিব বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে তা জানানো হবে। এদিকে র‌্যাবের এ অভিযান অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে চালানোর কারণে সোমবার বিষয়টি জানাজানি হয়নি। র‌্যাবের উপস্থিতির পর রোববার রাতেই টিপরা পল্লী থেকে দেব বর্মা সম্প্রদায়ের লোকজন আত্মগোপন করে। বিপুুল সংখ্যক র‌্যাব সদস্যের আনাগোনায় মঙ্গলবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়। র‌্যাবের এ অভিযান সম্পর্কে পুলিশ বা বিজিবি জওয়ানরা কিছুই জানেন না। র‌্যাবের অভিযান দেখার জন্য সাংবাদিকের বহর নিয়ে মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে করে সাতছড়ি ছুটে আসেন র‌্যাবের সহকারী ডাইরেক্টর জেনারেল কর্নেল জিয়াউল হাসান, মিডিয়া উইং কমান্ডের প্রধান কর্নেল হাবিবুর রহমান, ব্যাটালিয়ান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ছুটে যান স্থানীয় মিডিয়া কর্মীরাও।
বাংলাদেশে জংলা পাহাড়ে অস্ত্রের ভা-ার পরেশের
ওদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, বাংলাদেশের হবিগঞ্জে সাতছড়ির দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল। হাত বাড়ালেই ভারত সীমান্ত। তার ওপারে যে সবুজ অরণ্য তা পড়ে ত্রিপুরা রাজ্যে। এই জঙ্গলের মধ্যেই জঙ্গিদের অস্ত্রভা-ার রয়েছে বলে খবর দিয়েছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। তার পরে রাতভর অভিযান চালিয়ে জঙ্গলে সাতটি লুকোনো বাংকারের হদিস পায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সেই বাংকারে মিলেছে ১৮৪টি শক্তিশালী রকেট লঞ্চার, বেশকিছু ট্যাঙ্কবিধ্বংসী গোলা, ১৫৩টি রকেট চার্জার, শ’দুয়েক মর্টারের গোলা ও বিস্ফোরক। আরও দু’দিন তল্লাশি-অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান। আলফা’র সহযোগী জঙ্গি সংগঠন এটিটিএফ (অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স) নেতা রঞ্জিত দেববর্মা ধরা পড়ার পরে তাকে জেরা করেই ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে তিন কিলোমিটার দূরে সাতছড়ির জঙ্গলে অস্ত্রভা-ারের খবর পান গোয়েন্দারা। তারপর বারে বারেই বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়। কয়েক বার অভিযান চালিয়েও পুলিশ কিছু পায়নি। সমপ্রতি ফের ভারতীয় গোয়েন্দারা সাতছড়িতে অস্ত্রের হদিস দিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য পাঠান। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, আলফা’র বহিষ্কৃত নেতা পরেশ বড়ুয়া চীন থেকে মিয়ানমারের পথে যে অস্ত্র পাঠান, তা এই সাতছড়ির জঙ্গলে জমা করে রাখা হয়। সুযোগ মতো তা ভারতে জঙ্গিদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবার তল্লাশির দায়িত্ব দেয় র‌্যাবকে। স্থানীয় চুনারুঘাট থানার ওসি স্বীকার করেছেন, অভিযানের বিষয়ে এবার পুলিশকেও আড়ালে রাখা হয়। রাতভর অভিযানে র‌্যাবও প্রথমে বিশেষ কিছু পায় নি। একটি টিলার ওপর কয়েকটি কুয়ো দেখেন তল্লাশিকারীরা। ভোরের দিকে র‌্যাবের এক সদস্য দড়ির মই বেয়ে ধরে তার মধ্যে নামতেই লুকানো বাংকারের বিষয়টি জানা যায়। খবর পেয়ে ঢাকা থেকে পদস্থ কর্তারা  হেলিকপ্টারে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সকাল ১১টায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান শুরুর পরে একে একে সাতটি কুয়োর মধ্যে সাতটি বাংকার মেলে। সেগুলোতেই পাওয়া যায় থরে থরে সাজানো অস্ত্রশস্ত্র। র‌্যাবের একটি সূত্র জানিয়েছে, মেয়াদ ফুরোনো বেশকিছু বিস্ফোরক মেলায় মনে করা হচ্ছে, অনেক দিন ধরেই সেগুলো জমা করে রাখা আছে। নজরদারি বাড়ায় জঙ্গিরা সেগুলো পাচার করে উঠতে পারেনি। র‌্যাবের মুখপাত্র হাবিব জানান, মজুত অস্ত্রের এক তৃতীয়াংশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও বাঙ্কারের সন্ধানে আগামী দু’দিনও চুনারুঘাট উপজেলার এই জঙ্গলে অভিযান চলবে। তবে ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য পেয়ে তারা এই অভিযান চালিয়েছেন, এই তথ্য মানতে চান নি হাবিব। তিনি বলেন, বিভিন্ন সূত্রেই অস্ত্র থাকার খবর মিলছিল। তার ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়। আলফা’র অধিকাংশ নেতাকেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে ঢাকা। চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় পরেশ বড়ুয়াকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। পরেশ বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতে অস্ত্র চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে। তারা মনে করছেন, সাতছড়ির অস্ত্রভা-ার ধরা পড়ার পরে এই পথে পরেশের অস্ত্র চালানও বন্ধ হবে। সূত্র আনন্দবাজার পত্রিকা

হত্যায় জড়িত ছিল ১১ জন-দায় স্বীকার আরিফের by বিল্লাল হোসেন রবিন

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সেভেন মার্ডারের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আরিফ হোসেন। গতকাল দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক কে এম মহিউদ্দীন জবাববন্দি গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার জবানবন্দিতে আরিফ হোসেন ৭ জনকে অপহরণের পর কোথায়, কিভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হয়েছে তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন এবং হত্যাকা-ের সঙ্গে তিনি ছাড়াও আরও কারা কারা জড়িত তাদের নামও বলেছেন। এর মধ্যে র‌্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার নাম রয়েছে। এ ছাড়া জবানবন্দিতে আরিফ হোসেন ৭ জনকে অপহরণ ও হত্যার প্রধান আসামি আলোচিত নাসিক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তার কয়েকজন লোকের নামও বলেছেন। এদিকে আইনজীবী চন্দন সরকার হত্যা মামলায় লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদকে চতুর্থ দফায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। সেভেন মার্ডার মামলার আসামি রিমান্ডে থাকা মেজর (অব.) আরিফ হোসেনকে কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন থেকে গতকাল সকাল ৮টার দিকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দীনের আদালতে হাজির করা হয়। জবানবন্দি দানে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বেলা ১১টা পর্যন্ত আরিফ হোসেনকে সময় বেঁধে দেন আদালত। বেলা ১১টার পর আরিফকে বিচারকের খাসকামরায় নেয়া হয়। সেখানে ৪ ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ জবানবন্দি দেন আরিফ হোসেন।

সূত্র মতে, দু’টি হত্যা মামলার মধ্যে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় ২০ পৃষ্ঠা এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় ১৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে আদালত। আদালতের একটি সূত্র জানায়, স্বীকারোক্তিতে আরিফ হোসেন বলেন, তিনি এবং লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ ও নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানাসহ র‌্যাব ১১-এর নিচের ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ আরও ১০-১১ জন জড়িত রয়েছে এ হত্যাকা-ের সঙ্গে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়ার কথা বলেছেন। এ ছাড়া শীর্ষ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা এবং নাসিক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও তার কয়েক সহযোগীর নাম বলেছেন। তবে নূর হোসেনকে ঘটনার পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের খানসাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম সংলগ্ন (ময়লা ফেলার স্থান) এলাকা থেকে ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। গাড়িতে তুলেই তাদের প্রত্যেকের শরীরে চেতনানাশক ইনজেকশন পুশ করা হয়। এতে তারা অচেতন হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা অচেতন অবস্থায় তাদের কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে রাখা হয় এবং হত্যার পর কাঁচপুর ব্রিজের নিচ থেকে নৌকাযোগে লাশগুলো নিয়ে শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীর মোহনায় ফেলে দেয়া হয়। এর আগে লাশ যাতে ভেসে না ওঠে এ জন্য প্রত্যেকটি লাশের সঙ্গে ইট বাঁধার পর লাশের পেট ফুটো করে দেয়া হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ ম-ল বলেন, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ৭ হত্যাকা-ের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘স্বীকারোক্তিতে মেজর (অব.) আরিফ হোসেন নিজের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তদন্তের স্বার্থে তা বলা সম্ভব নয়।’ এ ছাড়া কিভাবে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা এ ৭ হত্যাকা- নিয়ে এতদিন যা বলে এসেছি এবং যাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার ৯৫ ভাগই আরিফের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে।
আদালত সূত্র মতে, সেভেন মার্ডারের ঘটনার পর করা দু’টি মামলাতেই জবানবন্দি দিয়েছেন আরিফ হোসেন। দু’টি মামলার মধ্যে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিলেন। এ মামলায় নাসিক কাউন্সিলর নূর হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিন মিয়াসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহরণ ও পরে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি উল্লেখ করে চন্দন সরকারের মেয়ের জামাতা বিজয় পাল বাদী হয়ে অপর মামলাটি করেন।
আরিফ কারাগারে, তারেক চতুর্থ দফায় রিমান্ডে
এদিকে নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার বিকালে তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও আরিফ হোসেনকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইশতিয়াক আহমেদের আদালতে হাজির করে আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার হত্যা মামলায় ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত চতুর্থ দফায় তারেক সাঈদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে এবং আরিফ হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। শুনানির সময়ে আদালত রাষ্ট্রপক্ষে পুলিশের এসআই আশরাফুজ্জামান বলেন, এ হত্যাকা- ঘটিয়েছে র‌্যাব। এ জন্য আরও তথ্য জানতে ৭ দিন করে রিমান্ড প্রয়োজন। হত্যা ঘটনায় র‌্যাবের সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
রিমান্ড শুনানির সময়ে আদালতের এপিপি ফজলুর রহমান, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনসহ কমপক্ষে ২৫ জন অংশ নেন। তারা আদালতকে জানান, ইতিমধ্যে আরিফ হোসেন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের অপর কর্মকর্তারা তারেক সাঈদও এ হত্যাকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ জন্যই তারেক সাঈদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। আদালতে শুনানির সময়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের ঘটনায় আদালতে দায় স্বীকার করে আরিফ হোসেনের দেয়া বক্তব্য সাধারণ মানুষ শুনলে কেঁদে দিবে। তার জবানবন্দিতে ৭ জনকে হত্যার পুরো বিবরণ উঠে এসেছে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নূর হোসেন ও গডফাদারদের যোগসাজশে এ হত্যা ঘটনাটি ঘটেছে। এ হত্যাকা-ে র‌্যাবের তিনজনসহ অনেকে জড়িত রয়েছে। তাদের মধ্যে আরিফ হোসেন ইতিমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারেক সাঈদের কাছ থেকে আরও তথ্য বের করতে তাকে রিমান্ড দেয়া দরকার। আসামিদের পক্ষে কোন আইনজীবী না থাকায় আজও (বুধবার) তারেক সাঈদ আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। আমি সুষ্ঠু তদন্ত চাই। সুষ্ঠু বিচার চাই। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তারেক সাঈদের চতুর্থ দফায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং যেহেতু আরিফ হোসেন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, সেহেতু তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হলো।
২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম প্রাইভেট কারযোগে বাসায় ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড থেকে গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমসহ ৫ জনকে অপহরণ করা হয়। একই সময় একই স্থান থেকে অপহরণ করা হয় আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিমকে। এ ঘটনায় ২৭শে এপ্রিল রাতেই চন্দন সরকারের পরিবার নিখোঁজ উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি জিডি করেন। ২৮শে এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় নাসিক কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম একটি মামলা করেন। ৩০শে এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১লা মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রত্যেকটি লাশের সঙ্গে ২৪টি করে ইট বাঁধা ছিল এবং নাভির নিচে ফুটো করা ছিল।
এদিকে অপহরণের পর হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্পষ্ট হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৫ই মে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেনকে সেনাবাহিনী থেকে এবং নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের সাবেক প্রধান লে. কমান্ডার এমএম রানাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ১৬ই মে রাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৭ই মে তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। একই দিন রাতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানাকে। ১৮ই মে আদালত তার ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ২২শে মে তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেনকে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ২৬শে মে এম রানাকেও ৭ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জর করে। ৮ দিন রিমান্ড শেষে ৩০শে মে তারেক সাঈদ ও আরিফকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৮ দিনের রিমান্ড শেষে এম এম রানাকে ২রা মে আদালতে হাজির করে তৃতীয় দফায় ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তৃতীয় দফায় তিন র‌্যাব কর্মকর্তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
৭ খুন তদন্তে আরও সময়
স্টাফ রিপোর্টার জানান, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় তদন্তে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সরকারি তদন্ত কমিটিসহ সংশ্লিষ্টরা আরও সময় পেয়েছে। আগামী ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তদন্তের আলাদা চারটি অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ আদেশ দেয়। অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম। এ ঘটনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি, পুলিশের আইজি, র‌্যাব ও সিআইডি’র পাঠানো অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল উপস্থাপন করেন তিনি। শুরুতে আইজিপি’র পক্ষে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের পাঠানো প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এটর্নি জেনারেল। এরপর পর্যায়ক্রমে র‌্যাব মহাপরিচালক, সিআইডি প্রধান ও সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদন উপস্থাপনের এক পর্যায়ে এটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে আদালত বলেন, আমরা আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য। এফিডেভিট আকারে আদালতে উনার প্রতিবেদন দিতে সমস্যা কোথায়? আদালতের অনুমতি ব্যতীত তিনি (আইজিপি) কি তার ক্ষমতা ডেলিগেট করবেন? এ পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল বলেন, এটা আনুষ্ঠানিকতার বিষয়। মূল বিষয় হচ্ছে আদালতের আদেশ যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে কিনা। কারণ আদালতের উদ্বেগ ছিল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা প্রদানের ব্যাপারে। তিনি সেই আদেশ পালন করেছেন। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, সিআইডি’র প্রতিবেদনটি দেখুন। যথাযথ মাধ্যমে তারা সঠিকভাবে আদালতের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। আদালত আরও বলেন, সশরীরে পুলিশের আইজির আদালতে হাজির হতে কোন আইনি বাধা নেই।  র‌্যাব মহাপরিচালকের প্রতিবেদনে বলা হয়, র‌্যাব-১১তে কর্মরত ৫৬ জন সদস্যকে বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সিআইডি প্রধানের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, সাত খুনের ঘটনায় চাকরিচ্যুত র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এছাড়া, র‌্যাব সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয়ে দু’জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া, র‌্যাব কর্মকর্তাদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিবেদন উপস্থাপনের ব্যাপারে কথা বলেন এটর্নি জেনারেল। সিআইডি’র প্রতিবেদনে তিন কর্মকর্তাসহ র‌্যাব কর্মকর্তাদের জড়িত হওয়া নিয়ে একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ব্যাপারে এটর্নি জেনারেল বলেন, এ ধরনের কথা প্রতিবেদনে পাইনি।

রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে ইউরোপে ওবামা

ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো এবং ইউক্রেনে রুশ আগ্রসনের ক্ষেত্রে মিত্রদেশগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিতে চারদিনের ইউরোপ সফরের শুরুতেই পোল্যান্ডে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। মঙ্গলবার পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর বিমানবন্দরে পোলিশ প্রেসিডেন্ট ব্রোনিস্লাভ কোমোরোভস্কির সঙ্গে দেখা করার মধ্য দিয়ে দেশটিতে সফর শুরু করেন ওবামা। বিমানবন্দরে পৌঁছেই তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তার ভিত্তিমূল হিসেবেই পোল্যান্ডসহ পূর্ব ইউরোপ অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। বন্ধু এবং মিত্রদেশ হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওবামার সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। এরপর জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য তার বেলজিয়াম ও ফ্রান্স সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ইউরোপে এ সফরকালে ওবামা ইউক্রেনে রাশিয়ার হুমকি ঠেকাতে মস্কোর ওপর চাপ বহাল রাখার জন্য নেতাদের আহ্বান জানাবেন। ইউক্রেনে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই ওবামা ইউরোপে এ সফরে যাওয়ায় তার অন্যতম কর্মসূচি হচ্ছে ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেত্রো পেরোশেঙ্কোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। বুধবার পোল্যান্ডের রাজধানীতেই পেরোশেঙ্কোর সঙ্গে তার দেখা করার কথা রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব
সহিংসতাকবলিত ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব তুলেছে রাশিয়া। এ প্রস্তাবে শিগগিরি যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি মানবিক সাহায্য পাঠানের জন্য নিরাপদ করিডোর প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ করিডোর দিয়ে বেসামরিক লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার কথা বলছে রাশিয়া। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর পরই এ প্রস্তাব তুললো রাশিয়া। চলতি জুন মাসে রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবে মস্কো। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাশিয়া বলেছে, মস্কো আর কিছুই চায় না শুধু ইউক্রেন সরকার ও রুশপন্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষ বন্ধ চায়।

বার্তা উপেক্ষিত, বার্তাবাহক কাঠগড়ায়

কয়েক দিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নামক সংস্থাটিকে অভিযুক্ত করলেন। তিনি বললেন, টিআইবি বিদেশ থেকে আনা টাকা গবেষণায় কতটা ব্যয় করছে, তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সময় হলে সংস্থাটির মুখোশ উন্মোচন করা হবে বলেও একটি সভায় তিনি ঘোষণা করেন। এ বক্তব্যটি নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। এটা স্বীকৃত যে টিআইবি বিদেশি অনুদানপুষ্ট একটি সংস্থা। আর এ অনুদান আসে সরকারের সম্মতি নিয়ে।
তা ছাড়া সংস্থাটির আয়-ব্যয়ের ওপর যেকোনো সময় অনুসন্ধান চালানোর ক্ষমতা দুদকের রয়েছে। এ জন্য কোনো ‘উপযুক্ত সময়ের’ অপেক্ষায় থাকার আবশ্যকতা অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। আশার কথা, টিআইবিও এ ধরনের যেকোনো তদন্ত অনুষ্ঠানের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য টিআইবিসহ দেশের সুশীল সমাজ সব সময় সোচ্চার ছিল। উন্নয়ন-সহযোগীরা বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্তির সঙ্গে স্বাধীন দুদক গঠনকে শর্তাধীন করেছিল একপর্যায়ে। সময়াবদ্ধ করেছিল তাদের শর্তের প্রতিপালন। বর্তমান রূপে দুদক প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত অল্প দিন আগের কথা। দুদক গঠনের পরও একে শক্তিশালী করতে সেই উন্নয়ন-সহযোগী আর দেশের সুশীল সমাজ বরাবর সক্রিয় অবদান রেখে চলছে। দুদকের ক্ষমতা খর্বের যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছে তারা। তবে দুদকের ব্যর্থতা কিংবা সীমাবদ্ধতা নিয়ে টিআইবি কিংবা সুশীল সমাজ কিছু কথা বললে তা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে যায় না; বরং সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে দুদকের জন্য সহায়ক হয়। দুদক অতীতে কখনো সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত ছিল না। এটা বাস্তব। আর এখনো তা নেই। এটাকেও অসত্য বলার সুযোগ দেখা যায় না। তদন্তাধীন এ বিষয়ে দায়িত্বশীল মহলের আগাম মন্তব্য তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন। দুদক বিষয়টি অস্বীকার করলেও বাস্তবতা তাই। আলোচ্য বিতর্কের সূচনা দুদককে একটি প্রায় অকার্যকর সংস্থা হিসেবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে।
প্রতিবেদনে যে মতামত এসেছে, তা অপ্রিয়; সন্দেহ নেই। তবে অসত্য কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে গিয়ে অসহিষ্ণু সমালোচনার কোনো আবশ্যকতা আছে বলে মনে হয় না। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটাই ঘটে চলেছে দুদক ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে। নবম জাতীয় সংসদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ নিয়ে টিআইবির এরূপ একটি প্রতিবেদন আলোচনার ঝড় তুলেছিল গত মার্চের মাঝামাঝি। তারা সেই বিশ্লেষণসূচক প্রতিবেদনটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জনগণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করেছিল। বিতর্ক হয়েছিল সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে সাংসদেরা আইন প্রণয়নে খুব কম সময় ব্যয় করেছেন। তথ্যে উল্লেখ করা হয়, এ সংসদ এক হাজার ৩৩২ ঘণ্টা অধিবেশনে মিলিত হয়। এর মধ্যে ২৭১টি আইন পাস করতে সময় ব্যয় করেছে ৫৪ ঘণ্টা। বলা হয়, ৩৫০ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে মাত্র ৫৭ জন এতৎসংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেন। দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি আইন পাস করতে গড়ে ১২ মিনিট সময় লেগেছে। এ বিষয়ে জানা যায়, যুক্তরাজ্য ও ভারতে আইন পাস করতে তাদের আইনসভার মোট কর্মঘণ্টার অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়। টিআইবির প্রতিবেদনের উল্লেখ রয়েছে, সেই সংসদের অধিবেশনগুলোতে কোরাম–সংকটে ২২২ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে। অপব্যয় হয়েছে ১০৪ কোটি টাকা। এতে আরও জানা যায়, বর্তমান সংসদে ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ কোনো বিরোধী দল নেই। এ অবস্থায় সরকারকে দায়বদ্ধ করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত।
প্রতিবেদনটি প্রকাশকালে টিআইবি বর্তমান সংসদকে সাময়িক বলে আখ্যায়িত করেছে। তারা আশা করছে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের। টিআইবির প্রতিবেদনটিতে নবম সংসদের শুধু নেতিবাচক চিত্রই আসেনি। এসেছে অষ্টম সংসদের তুলনায় ইতিবাচক কিছু চিত্র। যেমন, অষ্টম সংসদে কোরাম–সংকটে সময় নষ্ট হয়েছিল ২২৭ ঘণ্টা। সেই সংসদে সদস্যদের উপস্থিতির হার ছিল ৫৫ শতাংশ। নবম সংসদে তা ৬৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তেমনি বিরোধী দলের নেতারা অষ্টম ও নবম সংসদে উপস্থিত ছিলেন যথাক্রমে ৪৫ ও ১০ দিন। তদুপরি প্রথমবারের মতো নবম সংসদে প্রথম অধিবেশনে সব সংসদীয় কমিটি গঠন করা উৎসাহজনক বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রতিবেদনটি নির্ভরযোগ্য তথ্যবহুল। বিভ্রান্তির সুযোগ খুব কম। আর মতামতের ভিন্নতা তো থাকতেই পারে। এ-জাতীয় তথ্য প্রকাশের পর আশা করা যায়, স্বাভাবিক দায়িত্বশীল মহল বিচ্যুতি দূর করতে যত্নবান হবে। কিন্তু প্রতিক্রিয়া বরাবরের মতোই উল্টো দেখা গেল। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী বললেন, প্রতিবেদনটি পক্ষপাতদুষ্ট। কেউ টিআইবির এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। এ ক্ষেত্রেও সংস্থাটির অর্থায়নের উৎস এবং তা জিঙ্গবাদ পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যয় করা হয় কি না, সে বিষয়েও তদন্তের দাবি ওঠে। আরও দািব ওঠে সুশীল সমাজের সদস্যদের আয়ের উৎস খুঁজে দেখার। টিআইবি-সংক্রান্ত অভিযোগের জবাব তারাই দিয়েছে। আর সুশীল সমাজ সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসাবও দুদক দেখতে পারে যেকোনো সময়। বর্তমান সংসদে বিরোধী দল প্রকৃত অর্থে নেই বলে টিআইবির মন্তব্যে সংসদ ও এর বাইরে প্রতিবাদ হয়েছে। আমাদের বর্তমান সংসদের বিরোধী দল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নতুন কোন সূত্রে গ্রহণযোগ্য, আর কতটা জনসমর্থিত, তার কিছুটা প্রমাণ এবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে নিয়ে এল।
আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। সংসদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দািবটিও অভিনব নয়। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে এটা করা হয়েছে বলে মনে হয়। সংসদে আলোচনার পরদিনই ১৪-দলীয় জোটের সভা শেষে এর আহ্বায়ক একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, টিআইবি ও সুজন দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। তিনি এও বলেন যে দেশে অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার অভিলাষে সংস্থা দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দািব জানাচ্ছে। এদের আয় ও ক্ষমতার উৎস তল্লািশ করা দরকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন। শেষোক্ত দাবিটির বিরোধিতার কোনো অবকাশ নেই। সরকার তা করতেই পারে। তবে সংস্থা দুটি দেশকে অস্থিতিশীল করতে কিংবা অসাংবিধানিক সরকার আনতে কখনো সচেষ্ট ছিল, এ বক্তব্যের সমর্থনে কোনো তথ্য আছে কি না? ২০০৭-এ সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও টিআইবি আর সুজনের প্রচেষ্টার ফল নয়। কিছুসংখ্যক রাজনীতিবিদের বিরতিহীন সহিংস কোন্দলে সৃষ্ট অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এরূপ একটি সরকার আসা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল বলেই অনেকে মনে করেন। টিআইবি, সুজনসহ এ ধরনের সংস্থার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। ক্ষমতায় থাকলে এক নীতি আর না থাকলে ভিন্ন, এ বৈপরীত্য আমাদের গণতন্ত্রের যাত্রাপথকে কণ্টকিত করছে। দুর্নীতির সূচক নিয়ে বিগত সরকারের সময়ে টিআইবির প্রতিবেদনগুলো বর্তমান সরকাির দল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে অবলীলায়। আর এখনকার প্রতিবেদনে উৎসাহী আগের সরকাির দল।
তারাও ক্ষমতায় থাকাকালে এসব প্রতিবেদন নিয়ে বিপরীত আচরণই করেছিল। ১৪ দলের মুখপাত্র টিআইবির প্রতিবেদন-সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে সুজনকেও যুক্ত করেছেন। কোথাও তাদেরও কোনো বিচ্যুতি থাকলে অবশ্যই সমালোচনা করা যায়। তবে অনেকের মতে, সুজন শাসকশ্রেণির বিরাগভাজন হওয়ার প্রধান কারণ নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ নিয়ে। তাদের প্রকাশিত তথ্যাদিতে পাঁচ বছর আগে প্রার্থীদের সম্পদের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হচ্ছে। আর এ ধরনের তথ্যাদি প্রার্থীদের হলফনামামূলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া বিবরণী থেকে নেওয়া। সুজন সেগুলো সংকলন করে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের সচেতন করতে সহায়তা করছে। আর এ কাজটা করতে গিয়ে কারও ‘চরিত্রহনন’ হলে সে দায় তাদেরই, সুজনের নয়। এ জন্য সংস্থাটিকে দায়ী করা নৈতিক দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য। মনে হচ্ছে, বার্তাটির দিকে কেউ নজর দিতে ইচ্ছুক নন; বরং পাশ কাটিয়ে যেতে চান। দায়ী করতে থাকেন বার্তাবাহককে। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। অথচ সমালোচকের বক্তব্যকে বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের সংশোধনের সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে সচরাচর তা ঘটে না। কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় বার্তাবাহককে। বার্তা থেকে যায় উপেক্ষিত।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

শিক্ষার জন্য অর্থ

অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক—সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন শিক্ষাবিস্তারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পৃথিবীর সব জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতির ইতিহাস থেকে এই সত্য ইতিমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশেও শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করা হয় না, কিন্তু এ জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, জাতীয় বাজেটে তার সামান্যই বরাদ্দ করা হয়৷ যদিও বাজেটে শিক্ষাক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকে, তবু এখন পর্যন্ত তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এই প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের প্রাক্কালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর যে তাগিদ দিয়েছেন, তা যথাযথ৷ গত রোববার রাজধানীতে ‘সবার জন্য শিক্ষা, গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট ২০১৩-১৪’ প্রকাশের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, শিক্ষা খাতে অর্থবরাদ্দ হওয়া উচিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কমপক্ষে ৬ শতাংশ৷ আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বিগত বছরগুলোতে সামান্য বাড়ানো হয়েছে বটে, কিন্তু তা কখনো জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের তুলনায় তেমন উন্নত না হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের বরাদ্দ লক্ষণীয়ভাবে বেশি। ভারত ও নেপালে ৪ শতাংশের বেশি, আর ভুটানে আরও বেশি, ৫ দশমিক ২ শতাংশ৷ পাকিস্তান গত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে ১৭ শতাংশ এবং তারা এখন জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় করছে শিক্ষা খাতে। শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয়ের সুফল কতটা উৎসাহব্যঞ্জক হতে পারে, এশীয় দেশগুলোর মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায়-ধ্বংসপ্রাপ্ত জাপান যুদ্ধের অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে শিক্ষার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করেছিল বলেই তারা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হতে পেরেছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে মালয়েশিয়ার অগ্রগতিও লক্ষণীয়, তারা শিক্ষার জন্য জিডিপির ৮ শতাংশের বেশি অর্থ ব্যয় করে৷ ব্রাজিল, চিলিসহ যেসব দেশ দ্রুত অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে, তাদের সবারই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৪ শতাংশের ওপরে। আমাদের অত্যন্ত জনবহুল এই দেশে শিক্ষাবঞ্চিত, অদক্ষ বিপুল জনগোষ্ঠী জাতীয় বোঝার মতো। এই বোঝাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থবরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন অনেক—জিডিপির ৬ শতাংশও হয়তো যথেষ্ট হবে না। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য স্পষ্টতই সীমিত। তবু শিক্ষা খাতে অর্থবরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তা যদি এক বছরে ৬ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব নাও হয়, ক্রমান্বয়ে তা বাড়ানোর প্রয়াস আমাদের নিতেই হবে৷ রাষ্ট্রীয় অর্থের বিপুল অংশের অপচয় ঘটে এমন অনেক খাত আমাদের আছে৷ রাজনৈতিক কারণে অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে অর্থব্যয় ও দুর্নীতি-পুকুরচুরির কথা বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া আরও যেসব অনুৎপাদনশীল, কম গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে, সেগুলো সংকুচিত করা হলে শিক্ষার জন্য অর্থের সংস্থান অবশ্যই বাড়ানো সম্ভব এবং তা-ই করা উচিত৷

নিমতলী ট্র্যাজেডির চার বছর

চার বছর আগে রাজধানীর নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ১২৩ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা দেশবাসীকে নাড়া দিলেও সরকারকে কতটা নাড়া দিয়েছে, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ৷ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা থাকা ঠিক নয়৷ অথচ এত বড় ট্র্যাজেডির চার বছর পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলা যাবে না৷ সাবেক শিল্পমন্ত্রী রাসায়নিক গুদামগুলো সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ তিনি নিজে সরে গেছেন, কিন্তু তঁার নির্দেশ কার্যকর হয়নি৷ নতুন শিল্পসচিব বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় নতুন রাসায়নিক পিল্ল করার কথা জানালেও সেই কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে কিংবা পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কখন সরানো সম্ভব হবে, তা বলতে পারেননি৷ সেখানে ২০ একর জমির ওপর ছয়তলা ১৭টি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ এতে এক হাজার ৭৯টি গুদামের সংকুলান হতে পারে৷ কিন্তু পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম ও কারখানার সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি৷ বািকগুলোর কী হবে?
আমরা ভুলে যাইনি হাজারীবাগে অবস্থিত চামড়াশিল্প সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল দুই দশকের বেশি সময় আগে৷ এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্তাব্যক্তিদের গড়িমসির কারণও অজানা নয়। স্বার্থান্বেষী মহল অনেক সময়ই সরকারের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া থামিয়ে দেয়৷ এ ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন৷ শিল্প–কারখানার চাহিদা মেটাতে রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলোর প্রয়োজনীয়তা আছে, একথা অস্বীকার করা যাবে না৷ কিন্তু সেসব গুদাম ও কারখানা অবশ্যই আবাসিক এলাকার বাইরে থাকতে হবে৷ অতএব, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা অবিলম্বে সোনাকান্দায় সরিয়ে নেওয়া হোক৷