Sunday, December 14, 2025

পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমান শক্তিশালী করে ভারতকে কী বার্তা দিতে চান ট্রাম্প

পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিক্রিতে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব যুদ্ধবিমানের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও পাবে পাকিস্তান। সব মিলিয়ে ৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কিনবে ইসলামাবাদ।

এমন এক সময়ে দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি হলো, যখন পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনা চলছে। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর চলতি বছরের মে মাসেই পাঁচ দিনের সংঘাতে জড়িয়েছিল নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনতে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চাপ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।

যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তানের সমঝোতা

যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ বিক্রির যে অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে, তা ২০২২ সালের একটি চুক্তির অংশ বলে জানিয়েছেন ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান (এনজিও) ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পারভীন দোনথি। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমানগুলো হালনাগাদ করার জন্য ওই চুক্তি করা হয়েছিল।

পারভীন দোনথি বলেন, বড় পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এফ–১৬। এ কারণেই সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। এ অঞ্চলে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে এই এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতার ওপর দুই পক্ষই জোর দিয়ে থাকে।

পাকিস্তানের কাছে বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০টি ব্যবহারযোগ্য এফ–১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে বলে মনে করা হয়। এর কিছু পুরোনো ‘ব্লক–১৫’ সংস্করণের। পরে সেগুলো হালনাগাদ করা হয়েছিলেন। কিছু আবার জর্ডানের ব্যবহার করা। আর কিছু এফ–১৬ তুলনামূলক নতুন—‘ব্লক–৫২’ সংস্করণের।

এফ–১৬ হালনাগাদের জন্য যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি ছাড়াও পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রাংশ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এগুলোর দাম ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ যন্ত্রাংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ৯২টি ‘লিংক–১৬’ ব্যবস্থা। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে একই সময়ে সামরিক বিমান, জাহাজ ও স্থলবাহিনীর মধ্যে বার্তা ও ছবির মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে।

এফ–১৬ যুদ্ধবিমান কী

এফ–১৬ যুদ্ধবিমানগুলো ‘এফ–১৬ ফাইটিং ফ্যালক্রন’ বা ‘এফ–১৬ ভাইপার’ নামেও পরিচিত। এর একটি ইঞ্জিন। যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা আকাশে যুদ্ধবিমানের মধ্যে লড়াই এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার জন্য এই এফ–১৬ ব্যবহার করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান জেনারেল ডায়নামিকস প্রথমে এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের উৎপাদন শুরু করে। এ যুদ্ধবিমান তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষের দিকে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি মিগ যুদ্ধবিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্র ভারী ও ধীরগতির যুদ্ধবিমানগুলোর ওপর আধিপত্য সৃষ্টি করেছিল। এফ–১৬ প্রথম আকাশে ওড়ে ১৯৭৪ সালে।

এফ–১৬ বর্তমানে উৎপাদন করছে মার্কিন অস্ত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন। এটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। লকহিড মার্টিনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৯টি দেশ তাদের সামরিক বাহিনীতে এফ–১৬ ব্যবহার করে। এর মধ্যে পাকিস্তান ছাড়াও রয়েছে ইউক্রেন, তুরস্ক, ইসরায়েল, মিসর, পোল্যান্ড, গ্রিস, তাইওয়ান, চিলি, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে।

ভারত–পাকিস্তান সংঘাতে এফ–১৬–এর ভূমিকা

চলতি বছরের ২২ এপ্রিল বন্দুকধারীরা ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে ২৬ জনকে হত্যা করে। ওই হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত ছিল বলে দাবি করে ভারত। তবে তা অস্বীকার করেছিল ইসলামাবাদ। এরপর দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়। ৭ মে থেকে পাল্টাপাল্টি সংঘাতে জড়ায় দুই দেশ।

দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে সংঘাতের সময় ৪২টি সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছিল পাকিস্তান। এর মধ্যে এফ–১৬ ও চীনের তৈরি এফ–১৭ (জেএফ–১৭ থান্ডার) ও এফ–১০ (জে–১০) ছিল বলে জানিয়েছিলেন পাকিস্তানের এয়ার ভাইস মার্শাল আওরঙ্গজেব আহমেদ।

ওই সংঘাতের সময় ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছিল ইসলামাদ। ভারত প্রথমে তা অস্বীকার করলেও পরে যুদ্ধবিমান ধ্বংস হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছিল।

ভারতের ওপর কি যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে

এর জবাব হলো, হ্যাঁ। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এমন সময় পাকিস্তানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে, যখন ভারতকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে চাপ দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা স্থগিত করেছিল নয়াদিল্লি।

এ ছাড়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার ঘোষণা দিতে ওয়াশিংটন সফরের কথা ছিল ভারতের প্রতিরক্ষমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের। তবে ওই সফর বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়েও নাখোশ হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। এর বাইরে বিগত কয়েক মাসে ওয়াশিংটন–নয়াদিল্লি সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা গেছে।

চলতি বছরের ৬ আগস্ট ভারতের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। কম মূল্যে রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে এমন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। আগে থেকেই ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে।

মার্কিন চাপে রাশিয়ার তেল কেনা কিছুটা কমিয়েছে ভারত। এরপরও চীনের পর রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা নয়াদিল্লি। গত সপ্তাহেই ভারত সফর করেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তখন তিনি বলেছিলেন, ভারতে অব্যাহতভাবে জ্বালানি পাঠাতে প্রস্তুত আছে রাশিয়া।

এরই মধ্যে এফ–১৬ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ ভারত ভালোভাবে নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। বিশ্লেষক পারভীন দোনথি বলেন, এর আগেও এফ–১৬ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বিরোধিতা করে এসেছে নয়াদিল্লি। কারণ, তাদের দাবি, এই যুদ্ধবিমানগুলো ভারতেই বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হচ্ছে।

এদিকে মে মাসের সংঘাতের সময় চীনের তৈরি যুদ্ধবিমানও ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে পাকিস্তান। পারভীন দোনথি বলেন, ‘সে সময় পাকিস্তান চীনের তৈরি জে–১০ মোতায়েন করেছিল। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখছে ইসলামাবাদ। এভাবে দুই পক্ষ থেকেই তারা সুবিধা নিচ্ছে।’

এফ–১৬ যুদ্ধবিমান
এফ–১৬ যুদ্ধবিমান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের ব্যবস্থা ভাঙার রাজনীতির আড়ালে কী by জেনিন আর ওয়েডেল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে দুর্নীতি হয়তো স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। কিন্তু আরও গুরুতর সমস্যা হলো তাঁর প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় পরিচয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই দুর্নীতি। অর্থ বা সুবিধার বিনিময়ে ক্ষমা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত দেওয়া, আবার বিদেশি সরকার ও রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীগুলোকে তাঁর পরিবারের ক্রিপ্টো পণ্যে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া—এসবের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দুর্নীতির কৌশল এমন মাত্রা ও অভিনব রূপ নিয়েছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও নিয়মকানুন ধ্বংসের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থ কীভাবে জড়িয়ে আছে তা যদি বোঝা না যায়, তাহলে ট্রাম্পের এ দুর্নীতির গুরুত্ব বোঝা যাবে না।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি যে পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, তা শুধু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কেলেঙ্কারিপূর্ণ (ক্লেপ্টোক্রেটিক) ক্রেমলিনের মতো নয়; বরং সোভিয়েত যুগের কমিউনিস্ট ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও মিল রয়েছে। ট্রাম্প শাসন করেন খেয়ালখুশি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা দিয়ে এবং আইনের তোয়াক্কা না করে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আমি লিখেছিলাম, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসার লাভ বাড়াতে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের কোনো সমস্যা নেই। প্রকাশ্য স্বজনপ্রীতি, ছোটখাটো দুর্নীতি আর অর্থ ও প্রভাবের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি—সবই এখানে চলেছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন প্রথমটির তুলনায় অনেক বেশি চরম। তিনি ও তাঁর নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সরকারকে এমনভাবে ঢেলে সাজাচ্ছেন, যাতে দুর্নীতি করা সহজ হয়, লাভজনক হয় ও শাস্তিযোগ্য না থাকে। এসবের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থাকেই ধ্বংস করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি আর ‘ব্যবস্থা ধ্বংসের’ লক্ষ্য—দুটোই একসঙ্গে এগোচ্ছে।

ট্রাম্পের ‘মিম কয়েন’ তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এর মাধ্যমে বিশ্বের যে কেউ গোপনে তাঁকে অর্থ দিতে পারেন এবং বদলে ব্যক্তিগত সুবিধা পেতে পারেন। তাঁর পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকে ইতিমধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। এই লোভী ও লুটেরা মানসিকতা মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর কিছু অলিগার্ক-দুর্নীতিবাজ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল করে নিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় ‘গ্র্যাবিটাইজেশন’ (প্রিখভাতিজাতসিয়া)। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। ট্রাম্প এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে আগে আলাদা থাকা দুটি জগৎ (পশ্চিমা বিশ্ব ও সাবেক সোভিয়েত ব্লক) এখন একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এক হয়ে গেছে।

ট্রাম্প ‘সিস্টেম ভাঙার’ অংশ হিসেবে যে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’ (ডিওজিই) গঠন করেছেন, সেটি কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থারই একধরনের অনুকরণ। সোভিয়েত ব্যবস্থায় প্রায়ই দেখা যেত, ক্ষমতাসীন দলের অনানুষ্ঠানিক সংগঠনগুলো সরকারি দপ্তর ও আইনি কাঠামোর ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিত।

কংগ্রেসের অনুমোদন বা যাচাই ছাড়াই ইলন মাস্ককে ফেডারেল সরকারের মধ্যে এক নজিরবিহীন ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁর কাজ আইনসম্মত কি না, তা প্রায় গুরুত্বই পায়নি। কমিউনিস্ট শাসনের মতো এখানেও দলের নেতা ছাড়া আর কোনো নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল না।

অবশ্য অনানুষ্ঠানিক ও আইনের বাইরে চলে সরাসরি নেতার কাছে জবাবদিহি করার এমন একটি মডেলের ছোটখাটো আমেরিকান দৃষ্টান্ত আছে। যেমন ১৯৮০-এর দশকের ‘ইরান-কন্ট্রা’ কেলেঙ্কারি।

তখন রিগ্যান প্রশাসন সরকার ও কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে কয়েকজন বিশ্বাসভাজন কর্মকর্তাকে দিয়ে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করিয়েছিল। সেই অর্থ দিয়ে নিকারাগুয়ার কন্ট্রা বিদ্রোহীদের অর্থায়ন করা হয়, যা কিনা কংগ্রেস আগেই নিষিদ্ধ করেছিল। তবে ইরান-কন্ট্রার সঙ্গে ডিওজিইর একটি বড় পার্থক্য আছে। ইরান-কন্ট্রা ফাঁস হওয়ার পর কংগ্রেস এবং উভয় রাজনৈতিক দল সেটির নিন্দা করেছিল এবং অন্তত কিছু মানুষকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু আজ রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস বা সুপ্রিম কোর্ট—কেউই ডিওজিই বন্ধ করার চেষ্টা করেননি। এ ব্যবস্থায় স্বার্থসংঘাতের নিয়মকানুন যেন হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর নিজের পদকে ‘দুধেল গাই’ হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প কোনো গোপনীয়তাই রাখেননি। আর তিনি এটা করতে পারছেন এক পরীক্ষিত সোভিয়েত কৌশলে। সেই কৌশল হলো অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ লোকদের বড় পদে বসানো, যাতে তাঁরা পুরোপুরি তাঁর ওপর নির্ভরশীল থাকেন। তাঁর মন্ত্রিসভার প্রায় হাস্যকর অপেশাদারি সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে ‘পুতুলে’ পরিণত করেছে। এক অনুগত, কিন্তু পুরোপুরি জড়িত একটি দলকে নিয়ে (যা প্রথম মেয়াদে সব সময় তাঁর ছিল না) ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতি ও বিদেশি প্রভাব নজরদারি করা এবং তা ঠেকানোর নিয়ম কার্যকর করা সরকারি দপ্তরগুলো ভেঙে দিচ্ছেন।

ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো কারেন্সির প্রতি আগ্রহ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ আছে, অন্যদিকে তেমনি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল বা অস্থিতিশীল করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

বাস্তবতা হলো ক্রিপ্টো কারেন্সি অনেক ক্ষেত্রেই মানি লন্ডারিং ও আইন এড়িয়ে অর্থ লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই লেনদেনগুলো বেশির ভাগ সময় গোপন থাকে। কে এসব এক্সচেঞ্জ চালায়, কোথায় চালায় বা কারা ব্যবহার করছে—এগুলো অনেক সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাও জানে না। ‘ট্রাম্প ডলার’ নামের কয়েনের দাম যেভাবে হঠাৎ হঠাৎ বেড়ে যায়, এর পেছনে কারা কাজ করছে, তা স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর এই অস্বচ্ছ আর্থিক কর্মকাণ্ডই একসময় পুরো ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। তাঁর প্রথম মেয়াদেই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেকটা অস্থির হয়ে পড়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, তিনি শুধু রাজনীতিই নয়—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিতে চাইছেন। সোভিয়েত যুগের নেতারা হলে হয়তো তাঁর এই কৌশল দেখে অবাক হওয়ার পাশাপাশি মুগ্ধও হতেন।

* জেনিন আর ওয়েডেল, জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কার স্কুল অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নমেন্টের সামাজিক নৃবিজ্ঞানী
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-02%2F7gk3qhhp%2Fdonaldtrump-reuters.jpg?rect=0%2C0%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর অস্বচ্ছ আর্থিক কর্মকাণ্ড একসময় ভয়াবহ ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। রয়টার্স

রাশিয়ার সাবমেরিন রুখতে আটলান্টিকের গভীরে যুক্তরাজ্যের ড্রোন, কতটা কাজে দেবে

আটলান্টিক মহাসাগরে স্কটল্যান্ডের পশ্চিত উপকূল। সাগরের পানিতে ছেড়ে দেওয়া হলো সাবমেরিন আকৃতির ছোট একটি যন্ত্র। দেখতে ডানাওয়ালা টর্পেডো বা পানির নিচ দিয়ে চলা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। দ্রুতই সেটি হারিয়ে গেল গভীর সমুদ্রে।

এই যন্ত্র আসলে একধরনের ড্রোন। নাম ‘এসজি–১ ফ্যাথম’। ফ্যাথমের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ক্যাটি রেইন বলেন, এই ড্রোনগুলো গভীর সাগরে টহল দিতে পারে। একই সঙ্গে সাগরের ওই অঞ্চলে শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।

শত্রু বলতে মূলত বোঝানো হচ্ছে রাশিয়ার নৌবাহিনীর সাবমেরিনগুলোকে। অনেক সময় সেগুলো যুক্তরাজ্যের জলসীমার কাছাকাছি এসে গোপনে অভিযান চালায়। সন্দেহ করা হয়, সাগরের নিচে যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ তার ও পাইপলাইনের তথ্য নিতে গোয়েন্দা জাহাজের সঙ্গে মিলে কাজ করে এসব রুশ সাবমেরিন।

ফ্যাথম তৈরি করেছে জার্মানির প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান হেলসিং। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভি এটির আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করছে। ফ্যাথম সাগরের নিচ দিয়ে নিঃশব্দে চলাচল করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের সেন্সরের মাধ্যমে অবিরাম সংগ্রহ করে যেতে পারে নানা তথ্য।

সাগরের নিচে মাসের পর মাস ধরে টহল দিয়ে যেতে পারে এ ড্রোন। এ ক্ষেত্রে একই ধরনের অন্যান্য ড্রোনের সহায়তা নিতে পারে তারা। এগুলো পরিচালনার সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে। ক্যাটি রেইন বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এগুলো বেশি দ্রুত হুমকি শনাক্ত করতে পারে।

ফ্যাথম যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তা আটলান্টিক ব্যাস্টিয়নের একটি অংশ হতে পারে। রয়্যাল নেভির আটলান্টিক ব্যাস্টিয়ন ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ ও নজরদারি উড়োজাহাজের একটি নেটওয়ার্ক। আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অবকাঠামোর সুরক্ষা দেওয়াই এ নেটওয়ার্কের কাজ।

আটলান্টিক ব্যাস্টিয়ন নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়ার সাবমেরিনের এবং পানির নিচে দেশটির অন্যান্য কার্যক্রমে নতুন করে যে তৎপরতা শুরু হয়েছে, তার সরাসরি জবাব এই নেটওয়ার্ক। যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে তাদের জলসীমার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা রুশ নৌযানের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

রাশিয়ার মহাসাগর গবেষণাসংক্রান্ত নৌযান ইয়ানতার গত মাসে যুক্তরাজ্যের জলসীমার নিচের তার ও পাইপলাইনের তথ্য নিচ্ছিল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। ওই নৌযান থেকে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমানের পাইলটদের ওপর লেজার রশ্মি ফেলা হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের জলসীমার কাছে রুশ নৌযানটির ওপর নজরদারি করছিল ওই যুদ্ধবিমানগুলো।

রাশিয়ার নৌযানের ওই কর্মকাণ্ডকে ‘খুবই বিপজ্জনক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলে। গত সপ্তাহে দেশটির পোর্টসমাউথ শহর সফরের সময় তিনি বলেছিলেন, এ ধরনের হুমকি মোকাবিলার জন্য নতুন প্রযুক্তিতে সরকারের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

র‍য়্যাল নেভির জাহাজ ‘পঞ্চদশ প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট’–এ বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা পল অ্যাডামসের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয়েছিল জন হিলের। এই জাহাজ নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। জন হিলে বলেন, রাশিয়ার চেয়ে যুক্তরাজ্যকে এগিয়ে রাখার জন্যই হুমকি মোকাবিলায় নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রয়োজন।

তখন এসব নতুন প্রযুক্তির কিছু প্রদর্শন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দূরনিয়ন্ত্রিত স্পিডবোট। ছিল যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর প্রথম পাইলটবিহীন হেলিকপ্টারের একটি নমুনা। আরও ছিল ১২ মিটার দীর্ঘ ও ১৯ টন ওজনের একটি সাবমেরিন। সাবমেরিনটি চালানোর জন্য সেটিতে মানুষ থাকা লাগে না। চলতি বছরের প্রথম দিকে সেটি প্রথম উদ্বোধন করা হয়েছিল।

সে সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলে বলেছিলেন, ‘আমরা জানি, রাশিয়া কী ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে। তাদের জাহাজ ও সাবমেরিনগুলো কী করছে, তা আমরা শনাক্ত করছি। আমরা জানি, তারা আমাদের সাগরের নিচের তার, আমাদের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও পাইপলাইনের অবকাঠামোর তথ্য নিচ্ছে। এটিও জানি যে এগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলার জন্য নতুন সক্ষমতা তৈরি করছে দেশটি।’

র‍য়্যাল নেভির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেনারেল গুইন জেনকিনস বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপক ব্যয়ের পরও শত শত কোটি ডলার নিজেদের সাবমেরিন বহরে বিনিয়োগ করছে রাশিয়া। আটলান্টিকে রাশিয়ার চেয়ে এখনো এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাজ্য। তবে যতটা এগিয়ে থাকা দরকার, ততটা নয়।

রুশ হুমকি মোকাবিলায় রয়্যাল নেভির নতুন কৌশল কাগজ–কলমে ভালো মনে হলেও তা মুখোশ দিয়ে সমস্যা আড়াল করার মতো বলে উল্লেখ করেছেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র‍য়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার রবার্টস। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম আটলান্টিকের অভিভাবক হওয়ার যে দায়িত্ব যুক্তরাজ্যের ছিল, তা অবহেলা করেছে দেশটি।

পিটার রবার্টস বলেন, রয়্যাল নেভির কাছে এ হুমকি মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত জাহাজ নেই। তারা হুমকিটিকে ড্রোনের মাধ্যমে মোকাবিলার চেষ্টা করছে। কারণ, এগুলোর দাম কম। আর নতুন জাহাজ কেনার বদলে এগুলো দিয়ে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নজরদারি করা যায়। তবে এগুলো দিয়ে যুক্তরাজ্যের জলসীমায় রাশিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব নয়।

এসজি-১ ফ্যাথম
এসজি-১ ফ্যাথম। ফাইল ছবি: জার্মানির প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান হেলসিংয়ের সৌজন্যে

দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন: পানির নিচে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এশিয়ায়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনের পর দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন সংগ্রহের উদ্যোগ গতি পেয়েছে। এর মাধ্যমে কয়েক দশকজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিরোধিতা ছিল, তার অবসান হলো। এ পদক্ষেপ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির চিত্র বদলে দিতে পারে এবং পানির নিচে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করতে পারে।

উত্তর কোরিয়ার মোকাবিলায় পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনাকারী অভিজাত দেশগুলোর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে সিউল। দুই দেশের মধ্যে থাকা পারমাণবিক চুক্তির আওতায় জ্বালানির প্রবেশাধিকার অনুমোদনের মাধ্যমে ট্রাম্পের সম্মতি সেই পথে একটি বড় বাধা সরিয়ে দিয়েছে।

তবু বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার দ্রুত অগ্রসরমাণ এই কর্মসূচি চীনকে অসন্তুষ্ট করতে পারে এবং জাপানকেও অনুরূপ সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাপের মুখে ফেলতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সাবমেরিন ক্যাপ্টেন চই ইল বলেন, সাবমেরিন অত্যন্ত কার্যকর আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা। এই অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা অনিবার্য।

সিউলের যুক্তি, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ উত্তর কোরিয়ার পানির নিচের হুমকি মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দেশটি বারবার বলেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধব্যবস্থাকে সম্মান করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর এই চুক্তিকে একটি বড় অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এতে নিরাপত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও প্রতিরক্ষা স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী হবে।

উত্তর কোরিয়াও দাবি করেছে, তারা একই ধরনের সক্ষমতা উন্নয়ন করছে। মার্চ মাসে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নেতা কিম জং-উনকে একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পরিদর্শন করতে দেখা যায় বলে প্রচার করা হয়।

তবে তাদের কর্মসূচি আসলে কতটা অগ্রসর, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, পিয়ংইয়ং এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার সহায়তা পাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া দুই দেশই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের কথা বললেও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

চীনকে মোকাবিলা

দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদ সদস্য ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ইউ ইয়ং-ওন বলেন, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ডিজেলচালিত সাবমেরিনের তুলনায় দ্রুতগামী এবং অনেক বেশি সময় পানির নিচে থাকতে পারে। ফলে এগুলো উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন নজরদারিতে সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।

সিউলের এই সক্ষমতা অর্জন জাপানকেও তাদের অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন ইউ।

সরকারি আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্পের সিউলের কর্মসূচির প্রতি সমর্থনের খবর শুনে টোকিও বিস্মিত হয়। জাপানের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগে সমর্থন দেয়, তবে দক্ষিণ কোরিয়ার আগে জাপানই এগিয়ে থাকবে।

জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সম্প্রতি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তর একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে, যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে—এ মুহূর্তে এ নিয়ে কোনো গবেষণা চলছে না। এক জাপানি কর্মকর্তা জানান, টোকিও যদি সত্যিই পারমাণবিক সাবমেরিনের পথে এগোয়, তবে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করবে।

টোকিওভিত্তিক এক নৌ-বিশেষজ্ঞ বলেন, জাপানের তুলনামূলক ছোট ডিজেলচালিত সাবমেরিনগুলো অগভীর পানিতে কার্যকর হলেও পারমাণবিক সাবমেরিন প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত কার্যক্রম সম্প্রসারণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতে প্রতিশোধমূলক সক্ষমতার পথও তৈরি করতে পারে। সংবেদনশীলতার কারণে তিনি অন্য সূত্রগুলোর মতোই নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা চীনের সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান (চিফ অব নেভাল অপারেশনস) অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল চীনকে একটি ‘পেসিং থ্রেট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সম্প্রতি সিউলে বলেন, ভবিষ্যতে আঞ্চলিক প্রতিরোধে দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করছেন।

হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার

দক্ষিণ কোরিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া আপাতত নরম হলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ৩৮ নর্থ।

দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-লাকের বরাতে জানা গেছে, গত মাসে প্রেসিডেন্ট লি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে আশ্বস্ত করেছেন যে সাবমেরিনগুলো হবে প্রতিরক্ষামূলক এবং উত্তর কোরিয়াকে নিবৃত্ত করাই এর উদ্দেশ্য।

উই বলেন, ‘সব দেশ হয়তো বিষয়টি স্বাগত জানাবে না, কিন্তু আমাদের অবস্থান আছে। আমরা ব্যাখ্যা করতে ও বোঝাতে পারব।’

এদিকে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সাবমেরিন পরিকল্পনা একটি ‘পারমাণবিক ডোমিনো’ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

ডোমিনো প্রভাব হলো একটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা অর্জন করলে তার প্রতিক্রিয়ায় আশপাশের অন্য দেশগুলোও একই পথে এগিয়ে যেতে পারে। ঠিক ডোমিনো খেলার মতো একটির পর একটি দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে ওঠার প্রবণতাকেই পারমাণবিক ডোমিনো প্রভাব বলা হয়।

সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক চিয়ং সঙ-চ্যাং মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে পারমাণবিক সাবমেরিন উন্নয়নে এগোতে পারে, যা ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন

বর্তমানে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ভারত ও যুক্তরাজ্যের কাছেই পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন রয়েছে। ২০২১ সালের অকাস চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়াও এ ধরনের একটি বহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

সেজং ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম ১৯৯৪ সালে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট সংকটের সময় এ ধারণা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। তবে কারিগরি জটিলতার কারণে তখন অগ্রগতি থেমে যায়।

২০১৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন পারমাণবিক সাবমেরিনের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন চেয়েছিলেন, যা তিনি ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার বিরোধিতার কারণে সেই সমর্থন বাস্তব রূপ পায়নি বলে সূত্রগুলো জানায়।

মুন সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চোই জং-কুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি বিভাগের মতো সংস্থাগুলো পারমাণবিক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

ট্রেন ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে

বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া স্বাধীনভাবেই অগ্রগতি সাধন করেছে এবং মৌলিক সাবমেরিন নকশা তৈরি করেছে বলে অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্নেল মুন কুন-সিক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানান।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহন গিউ-ব্যাক বলেন, রিয়্যাক্টর সংযোজন এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সিউল ১০ বছরের মধ্যে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ করতে পারে এবং অন্তত চারটি ৫ হাজার টন ক্ষমতার পারমাণবিক সাবমেরিন প্রয়োজন হবে।

১৪ নভেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ একটি তথ্যমূলক নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, পারমাণবিক জ্বালানি সংগ্রহে ওয়াশিংটন সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে।

আহন সংসদে বলেন, ‘এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের “অনুমোদন” বলার চেয়ে বলা যায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ আমরা আগেই প্রস্তুত করে ফেলেছিলাম, শুধু জ্বালানিটুকুই ছিল শেষ অংশ।’

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে অর্জন করে চলেছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মিত্রতা রেখে দেশটির জন্য হুমকি প্রতিরোধ এবং দায়িত্ব ভাগাভাগি বাড়ানোর লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন উন্নয়নসহ সিউলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে।

সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চোই জানান, অস্ট্রেলিয়ার অকাস চুক্তি সিউলের জন্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ট্রেন ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে, দরজা খোলা রয়েছে—অর্থাৎ আরও কিছু কাজ বাকি আছে, তবে যাত্রা শুরু হয়ে গেছে।

পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন লং মার্চ
পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন লং মার্চ। ফাইল ছবি রয়টার্স

ট্রাম্প-পুতিনের ইউক্রেন ছকের বিরুদ্ধে কতক্ষণ টিকবে ইউরোপ by মার্টিন কেটল

ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে এই সপ্তাহে যে শান্তি আলোচনা হয়েছে, তা স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইউক্রেন ইস্যুতে চলতে থাকা অচলাবস্থার আরেকটি উদাহরণ।

তবে যে পরিস্থিতিতে এ আলোচনা হয়েছে, তা এখন আরও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। প্রক্রিয়াটি যে মার্কিন ও রুশ স্বার্থ দ্বারা চালিত, তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং মাঠের সংঘর্ষ আরও তীব্র হচ্ছে।

এই সপ্তাহে অগ্রগতি না হওয়ার অর্থ হলো খুব শিগগির যুদ্ধ বন্ধের আরেকটি চেষ্টা হবে। তারপর হয়তো আরও একটি চেষ্টা চালানো হবে। এভাবে একদিন এমন একটি মার্কিন-সমর্থিত সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে, যা মোটামুটি রাশিয়ার পক্ষেই যাবে।

এই প্রচেষ্টার পেছনে যে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে, তা এতটাই স্পষ্ট ও ধারাবাহিক যে একে উপেক্ষা করা যায় না।

জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই এটি বারবার দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। বাস্তবে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে (যেদিন ট্রাম্প প্রথমবার পুতিনের সঙ্গে সরাসরি ইউক্রেন নিয়ে কথা বলেন) তাঁর উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি একই আছে।

এখন তা বদলাবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং মঙ্গলবারের অচলাবস্থা হয়তো তাঁদের আরও একবার চেষ্টা করতে উৎসাহ দেবে।

এ অবস্থায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তার ভেতরের যুক্তিও এখন সবার কাছে পরিচিত। ট্রাম্প ইউক্রেনকে অস্ত্র দিতে অস্বীকার করেছেন। এর বদলে তিনি পুতিনের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তির চেষ্টা করেছেন, যাতে ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ড হারানোর বিনিময়ে যুদ্ধ থামানো যায়।

রাশিয়া ইউক্রেনে বোমা হামলা চালায় এবং ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করে। ইউক্রেন ও তার অন্য মিত্ররা রাশিয়াপন্থী চুক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে নিজের পরিকল্পনা কিছুটা বদলায়। এ নিয়ে আলোচনা হয়। পুতিন চুক্তিতে ‘না’ বলেন। যুদ্ধ চলতে থাকে, কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতাও চলতে থাকে।

এই প্রক্রিয়া যখন বারবার চলতে থাকবে, তখন দুটি পরিণতির একটিই ঘটতে পারে। হয় এই প্রক্রিয়াকে একেবারে ব্যর্থ বলে মেনে নিয়ে চুক্তির উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। নয়তো এর কোনো না কোনো দিক বদলানো হবে, যাতে কোনো ফল পাওয়া সম্ভব হয়।

প্রথম বিকল্পটি, অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করা যদি সম্ভব হয়ও, তা হলেও তা ট্রাম্পের জন্য বড় অপমানের কারণ হবে। এর আরেকটি ফল হবে—যুদ্ধ আরও তীব্র, আরও প্রাণঘাতী, আরও ধ্বংসাত্মক, আরও অস্থির হয়ে উঠবে। তখন যুদ্ধ বন্ধের চাপ আবার বাড়বে। আর সেই চাপ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করবে।

দ্বিতীয় বিকল্পটি (অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ার কোনো অংশ বদলে দেওয়া বা কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা) সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে হচ্ছে। এর ফলে ন্যাটো ও ইউরোপ সরাসরি মস্কোর, আর কিছুটা ওয়াশিংটনেরও নজরদারি ও চাপের মুখে পড়বে।

এ কারণেই গতকাল ক্রেমলিন ইঙ্গিত দিয়েছে, এখনো কিছু চুক্তি করা সম্ভব। অর্থাৎ এমন চুক্তি সম্ভব, যা হবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। কিন্তু তাতে ইউরোপ থাকবে না।
পুতিন খুব স্পষ্টভাবেই দেখিয়েছেন, তিনি ইউরোপকে ট্রাম্পের দুর্বল জায়গা হিসেবে দেখেন। এই সপ্তাহে উইটকফের সঙ্গে আলোচনার আগে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে দিচ্ছে না।’ কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন, ‘তারা যুদ্ধের পক্ষে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু ইউরোপ যদি শুরু করে, আমরা এখনই প্রস্তুত।’

এ কথার কিছু অংশ অর্থহীন। কিন্তু পুতিনের একটি মূল ধারণা ঠিক আছে। ইউরোপ (আরও নির্দিষ্ট করে বললে, যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটো) সত্যিই ট্রাম্পকে পুতিনের সঙ্গে নিজের পছন্দমতো চুক্তি করতে বাধা দিচ্ছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর এই ধারাবাহিক অবস্থান খুব একটা প্রকাশ্যে প্রশংসা পায়নি। কারণ, তারা ট্রাম্পকে খেপাতে চায় না। কিন্তু বিষয়টি স্পষ্টভাবেই চোখে পড়ে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওভাল অফিসে জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্সের প্রকাশ্য অপমানের ঘটনার পর থেকেই এই প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। আর মোটামুটি তা সফলও হয়েছে।

এই তথাকথিত ‘ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট’ বা ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরিকল্পনায় আঘাত করতে পারে। কিন্তু সে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই।

এই জোটে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ ও কানাডা রয়েছে। তারা সবাই যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনকে অর্থনৈতিক ও বাস্তব সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাদের প্রচেষ্টা অনেকটাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়েছে এবং আংশিকভাবে ন্যাটোর ভেতরেই সমন্বয় করা হয়েছে। যেমন ৩ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবেই অনুপস্থিত ছিলেন।

যেভাবেই দেখা হোক, ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপের এই মরিয়া উদ্যোগ বারবার ট্রাম্প ও পুতিনের বিপক্ষে একটি দেয়াল তৈরি করেছে।

এ সপ্তাহে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে উইটকফের প্রস্তাবে যখন কিছু পরিবর্তন আনা হয়, তখন তা হয়েছে। ওভাল অফিসের ওই বিপর্যয়কর ঘটনার পর থেকেই জেলেনস্কির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়া এই কৌশলের একটি বড় অংশ।
সব দেখে মনে হয়, মিত্রদেশগুলো জেলেনস্কির প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই ঘনিষ্ঠভাবে পরামর্শ ও নির্দেশনা দিচ্ছে।

আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যদি কোনো দিন জেলেনস্কির বার্তা, নোট, বৈঠক ও সফরের একটি বিস্তারিত তথ্যভান্ডার প্রকাশ পায়, তাহলে সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলের প্রভাবশালী ভূমিকা স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।

তবু এটি চিরকাল চলতে পারে না। ইউক্রেন ও ইউরোপের জন্য মূল সমস্যা হলো, ২১ শতকের ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের বিরুদ্ধে গেছে।

যুদ্ধ–পরবর্তী পশ্চিমাদের ধারণা হয়তো মৃত নয়, কিন্তু এখন তা ‘ইনটেনসিভ কেয়ার’-এ আছে। ইউরোপীয় ও কিছু আমেরিকান বিশেষজ্ঞ তাঁদের সব দক্ষতা নিয়ে এটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। সত্যি কথা হলো, ট্রাম্প চাইলে এক দিনেই এটিকে শেষ করতে পারতেন।

যদি সত্যিই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে রাশিয়ার সেনাদের লন্ডনের হোয়াইট হল পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের প্রধান সড়ক খ্রেশচাটিক অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ট্রাম্প এটা ঠিকভাবে বোঝেন কি না বা বুঝলেও গুরুত্ব দেন কি না, তা বলা কঠিন।

জেলেনস্কি ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, ইউক্রেনে যদি একটি কার্যকর সরকার টিকে থাকে, তাহলে দেশটি কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। তারা আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছ থেকে অর্থ ও সামরিক সহায়তা পেতেও পারে, যাতে যুদ্ধের পর নতুন করে গড়ে তোলা যায়। তবে এ সবকিছুর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এক বড় প্রশ্নের ওপর। সেটি হলো পশ্চিমা দেশগুলো যে ২৫৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করে রেখেছে, তা কি কিয়েভ পাবে, নাকি সে অর্থ আবার মস্কোতে ফিরে যাবে?

যা–ই হোক না কেন, তখন ন্যাটো আগামী দিনের হুমকি মোকাবিলায় হয়তো আর কার্যকর সংগঠন থাকবে না। এটি তখন হয়ে যেতে পারে ‘গতকালের সমাধান’। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর কাছে তখনো অস্ত্র ও সেনাবাহিনী থাকবে। তারা স্বাধীন ইউক্রেন এবং নিজেদের মূল্যবোধের পক্ষে থাকবে। লন্ডনের ইতিহাসবিদ জর্জিওস ভারুক্সাকিস যেমন বলেছেন, তাদের মধ্যে ‘নিজেদের ভুল স্বীকার ও সংশোধনের ক্ষমতা’ও থাকবে।

তবু সত্য হলো, যদি যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে ইউরোপকে একাই হাতে বড় কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে। সেটা হবে খুবই কঠিন। এর মূল্য এত বেশি হতে পারে যে অনেক ইউরোপীয় দেশ ও তাদের নাগরিকেরা তা মেনে নিতে চাইবে না।

সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো ইতিহাস ইউরোপকে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানোর বড় দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইউরোপ সেই দায়িত্ব প্রয়োজনীয় মাত্রায় পালন করতে পারছে না।

* মার্টিন কেটল, দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: এএফপি

হাদিকে গুলি, সন্দেহভাজন শনাক্ত: ধরিয়ে দিলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের এমপি প্রার্থী ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীকে শনাক্ত করার দাবি করলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ইতিমধ্যে একজনের ছবি ও নাম প্রকাশ করে তার বিষয়ে তথ্য চেয়েছে। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। ছবি প্রকাশের পরপরই ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুরু হয় নানা আলোচনা। অনেকেই শনাক্ত হওয়া ব্যক্তি আদাবর ছাত্রলীগ নেতা বলে দাবি করছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানানো হলেও তার নাম পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলাকারীকে ধরিয়ে দিলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আর ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, হত্যাচেষ্টায় জড়িতদের শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি তিনি প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন। হাদির হত্যাচেষ্টাকারীরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে এজন্য দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

কে এই ফয়সাল:
ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৯ সালের ১১ই মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি সদস্য হিসেবে ছিলেন। পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে ফয়সাল করিমের নামের প্রোফাইলে তিনি নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ফয়সাল করিম ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমবিএ করেছেন। ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে মাঠে ছিলেন। ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় নাম আসার পর ফয়সাল করিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের দুইবারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতার ছবি ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে হাদির সঙ্গে ঢাকা-৮ আসনে গণসংযোগ এবং বাংলামোটরে হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আড্ডায় ফয়সালের অংশ নেয়ার ছবিও ভাইরাল হয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, ফয়সাল করিম ওসমান হাদিকে বেশ কিছুদিন ধরে অনুসরণ করছিলেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সহযোগিতা ও সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামে একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছিল ফয়সাল করিমের মালিকানাধীন ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড। সে বছরের নভেম্বরে ওই গেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেসিসের তৎকালীন সভাপতি এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারও উপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আসনভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয়ক কমিটি’ করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ঢাকা- ১২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এই আসনের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন ফয়সাল করিম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২৮শে অক্টোবর ঢাকার আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি এলাকায় বৃটিশ কলম্বিয়া স্কুলের চতুর্থতলায় অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আদাবর থানায় একটি মামলা হয়েছিল। ওই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন ফয়সাল করিম। ৭ই নভেম্বর আদাবর এলাকা থেকে ফয়সাল করিমকে গ্রেপ্তার করেছিল র‍্যাব। তখন তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মুঠোফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই মামলায় গত ১৬ই ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান ফয়সাল। জামিনের সময়সীমা বাড়াতে গত ১২ই আগস্ট আবারো আবেদন করলে হাইকোর্ট নতুন করে তার এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনে থাকা অবস্থায় এবার তার বিরুদ্ধে ওসমান হাদিকে গুলি করার অভিযোগ এলো। এরকম লুটের ঘটনায় দুটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এত অল্প সময়ের (৩ মাস ৮ দিন) মধ্যে কীভাবে জামিন পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ওসমান হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় তার সঙ্গে ফয়সাল করিমের সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ছবি রয়েছে। সেই ছবিগুলোতে থাকা ফয়সাল করিমের সঙ্গে গুলি করা ব্যক্তির চেহারার সাদৃশ্য থাকায় গুলি ছোড়ার ঘটনায় তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে।

ফয়সাল করিমের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় বলে জানা গেছে। পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, ফয়সাল করিম মাসুদের স্থায়ী ঠিকানা বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে, কেশবপুর কলেজ সংলগ্ন এলাকায়। তার বাবার নাম হুমায়ুন কবির। তিনি ঢাকার আদাবর থানাধীন পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি এলাকায় বসবাস করতেন। আদাবর থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে বলেও পিসিআর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরিবারের কেউ বর্তমানে ওই বাড়িতে বসবাস করছেন না। তারা অনেক আগেই তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে এলাকা ত্যাগ করেছেন।

মামলা হয়নি এখনো: হাদি হত্যার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি। পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান বলেন, ঘটনার পর থেকেই সন্ত্রাসীদের আটক করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। ইতিমধ্যে মূল আসামিকে শনাক্তও করা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। আমরা হাদির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।

শিগগির আইনের আওতায় আনা সম্ভব: শনিবার রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়োমে বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশগ্রহণ শেষে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, হাদিকে হত্যাচেষ্টায় জড়িতদের শিগগিরই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। আমরা খুঁজতেছি, প্রাইম সাসপেক্টকে খুঁজতেছি। এখনো ২৪ ঘণ্টা পার হয়নি। হোপফুলি আমরা হিট করতে পারবো। আমরা জনগণের সহযোগিতা চাইছি।

৫০ লাখ টাকা পুরস্কার: গতকাল আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি, জুলাইযোদ্ধা ওসমান হাদিসহ জুলাইয়ের সম্মুখ-সারির যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হয়েছে। সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী হাদিকে ধরিয়ে দিলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, এই বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অনতিবিলম্বে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এতদিন শুধু সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হতো। এখন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে যারা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চাইবেন, তাদেরও লাইসেন্স ইস্যু করা হবে। আগামী ২৫শে ডিসেম্বর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার নিরাপত্তার ব্যাপারে যত ধরনের প্রস্তুতি আছে, আমরা নেবো এবং তার নিরাপত্তা দেবো।

ডিএমপি’র বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হলো: আসামি শনাক্তের বিষয়ে ডিএমপি’র সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি গুরুতর আহত হন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে রাজধানীতে জোর অভিযান পরিচালনা করছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ছবির ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। এই ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে বা তার সন্ধান পেলে দ্রুত ডিসি ও ওসি মতিঝিলের মোবাইল নম্বর অথবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে পুলিশকে জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো।

সীমান্তে সতর্কতা: অন্যদিকে হাদির হত্যাচেষ্টাকারী যাতে দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতে না পারে সেজন্য সীমান্তবর্তী এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। যশোরের বেনাপোল সীমান্তে নজরদারি ও তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে  যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। সীমান্তের মেইন পিলার ১৮/১ এস থেকে ৪৭/৩ এস পর্যন্ত প্রায় ৭০.২৭৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কড়া তল্লাশি চলমান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তের যে স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সে স্থান সিলগালা করা হয়েছে। যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত আসামিরা যাতে কোনোভাবেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালাতে না পারে, সেজন্য বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বেনাপোল আইসিপি, আমড়াখালি, সাদীপুর, রঘুনাথপুর, ঘিবা, শিকারপুর, শালকোনা, কাশিপুর, মাসিলা, আন্দুলিয়া এবং পাঁচপিসতলা এলাকাসহ সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে বিজিবি’র নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

যা বলছেন হাদির ঘনিষ্ঠজনরা: গত কযেকদিন ধরে এক ব্যক্তি হাদির সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি কয়েকবার তার সঙ্গে দেখাও করেন। অল্প দিনেই গড়ে তুলেন সখ্যতা। এমনকি বাংলামোটরে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে আলোচনায় অংশ নেন ওই ব্যক্তি। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে নির্বাচনী নানা বিষয়ে সহযোগিতা করার কথাও জানান। সন্দেহভাজন এই ব্যক্তি একা নয় তার সঙ্গে আরও দু’একজন এসেছিলেন। শনাক্ত এই ব্যক্তি অধিকাংশ সময় মুখে মাস্ক পরে থাকতেন। তাকে মাস্ক খুলতে বললেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন।

জুলাই ঐক্যের অন্যতম সংগঠক ইসরাফিল ফরায়েজী মানবজমিনকে বলেন, প্রায় সপ্তাহখানেকের বেশি সময় ধরে সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তি ঘোরাফেরা করে এবং হাদির ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। ৭ই ডিসেম্বর তিনি ইনকিলাব সেন্টারে আসেন। এর আগে আরও একবার এসেছিলেন, সেদিন শুধুমাত্র দেখা-সাক্ষাৎ করে চলে গেছেন। যখন তিনি হাদির সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন- ‘তার অনেক লোকজন আছে তিনি হাদি ভাইকে সাপোর্ট দিবেন। যেকোনো ইভেন্টে তিনি থাকবেন এবং দুইশ’ বাংলাদেশের পতাকা বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আরও অনেকগুলো কথা উপস্থাপন করেছিল। এ ছাড়া মিছিলের সময় লোক দিবে, তার কোনো সমস্যা নেই এ রকম নানান কথা বলেছে। প্রায়ই এ ধরনের ইস্যুগুলো হাদি ভাইয়ের সঙ্গে নানা সময়ে বলতো। হাদি ভাইয়ের সঙ্গে যখন পরিচয় হয় তখন সে নিজ থেকে তার নম্বর দেয়। যত রকমভাবে পেরেছে সে হাদি ভাইয়ের কার্যক্রমের ভেতরে ঢুকে যেতে চেয়েছে। ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছে। ইনকিলাব সেন্টারে প্রায়ই বিকালে মিটিং হতো। ৯ই ডিসেম্বর বিকালে সে আসে ইনকিলাব সেন্টারে। সেখানে হাদি ভাইসহ অনেকে মিটিং করছিল। মিটিংয়ে নির্বাচনী পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল, কোথায় কোথায় তারা মুভ করবে, কোথায় যাবে এই সময়টাতেই ওই ব্যক্তিও সেখানে ছিল। সন্দেহভাজন ব্যক্তির পাশে আরেকজন ব্যক্তি এসেছিল সেও তার পাশে বসে ছিল কিন্তু তার বিষয়ে এখনো আইডেন্টিটি করতে পারিনি, তবে যেহেতু তারা একসঙ্গে এসেছে পাশাপাশি বসেছে, একই লোক হতে পারে। তবে গুলির সময় সে ছিল কিনা এখনো কনফার্ম হতে পারছি না। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পেরেছি তারা এক সঙ্গেরই লোক। ভিডিও ফুটেজে অন্য যাদের দেখা যাচ্ছে তারা হাদি ভাইয়ের লোক, সবসময়ই হাদি ভাইয়ের পাশে থাকে।

‘মঞ্চ ২৪’-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী বলেন, তারা দুই সপ্তাহ ধরে প্রচারণা টিমের সঙ্গে জড়িত। বাংলামোটরে অবস্থিত ইনকিলাব সেন্টারে আসে। ইনকিলাব সেন্টারে সবার জন্য বসার সুযোগ আছে। তারা সেখানে আসে এবং তাদের যখন মাস্ক খুলতে বলা হয় তখন সে বলে তার সমস্যা আছে। এবং শরীফ ওসমান হাদি ভাই খুবই উদার মনের সেজন্য তিনি তাদের সন্দেহ না করে নির্বাচনী প্রচারণার যে টিম সেটাতে নিয়েছিল এবং ঘটনার দিন জুমার নামাজের পূর্বেও তারা হাদির সঙ্গে ছিল। হাদি যখন জুমার নামাজে প্রবেশ করে সেই দু’জন ব্যক্তি অর্থাৎ যিনি কিলিং করেছেন এবং যিনি বাইক চালিয়েছেন তারা বাইরে অপেক্ষা করে হাদির গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য। এবং হাদি যখন নামাজ থেকে বের হয় তার পরবর্তীতে তারা তার পিছু নেয়।
৪ঠা ডিসেম্বরের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্দেভাজন এই ব্যক্তি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ভেতরে প্রবেশ করেছেন। সেখানে হাদির সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন। ৯ই ডিসেম্বর বিকালে বাংলামোটর ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্দেহভাজন শনাক্তকারী ব্যক্তি ইনকিলাব মঞ্চের একটি আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে ওসমান হাদির ডান পাশে মেঝেতে বসে ছিলেন। এ ছাড়া তাকে এ রকম বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় মাস্ক পরিহিত অবস্থায়।

এই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের নির্বাচনী ক্যাম্পের সদস্য রাকিব আহমেদ রাফি। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ওইদিনের আলোচনাটা ছিল আমাদের বিজয় দিবসের প্রোগ্রাম নিয়ে। সেখানে আমরা যারা ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করি তারা ছিলাম। অপরিচিত এই দু’জন ব্যক্তি মিটিংয়ের মাঝামাঝি সময়ে আসে। তারা এসে হাদি ভাইয়ের পাশে বসে। সেদিনই প্রথম আমি তাদের দেখেছি। ওই লোকটি আমাদের র‌্যালির জন্য লোকও দেয়ার কথা বলে। এবং টি-শার্ট, পতাকা এসব নিয়ে আলোচনা চলছিল- এগুলো সে দিতেও চেয়েছিল।

mzamin

টাইম ম্যাগাজিনের পারসন অব দ্য ইয়ার ‘আর্কিটেক্টস অব এআই’

যুক্তরাষ্ট্রের যেসব প্রযুক্তিবিদের উদ্ভাবনী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানব সভ্যতাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, সেই ‘আর্কিটেক্টস অব এআই’কে পারসন অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করেছে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন। এই প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে আছেন এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআই-এর ইলন মাস্ক। তাদের বিষয়ে টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে- তারা ‘তারা এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছেন এবং এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করেছেন যা তথ্যপ্রবাহ, জলবায়ু ও মানুষের জীবিকাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তারা ইতিহাসের চাকা নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।’

ম্যাগাজিনের কভারের একটিতে রয়েছে ১৯৩২ সালের বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক সিটির উঁচু বিমে বসে খাওয়া শ্রমিকদের ছবির প্রতি শ্রদ্ধা। টাইম-এর তৈরি সেই চিত্রে শহরকে ছাপিয়ে বসে আছেন মেটা’র মার্ক জাকারবার্গ, এএমডি প্রধান লিসা সু, মাস্ক, হুয়াং, অল্টম্যান, গুগলের এআইপ্রধান ডেমিস হাসাবিস, অ্যানথ্রপিকের ডারিও আমোডেই এবং স্ট্যানফোর্ড অধ্যাপক ফেই-ফেই লি। টাইম লিখেছে, একদিকে একসঙ্গে দৌড়াতে দৌড়াতে আবার একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করতে করতে তারা বহু বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরেছেন মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর। তারা সরকারি নীতি বদলে দিয়েছেন, ভূরাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুনভাবে গড়েছেন, আর রোবটকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কারের পর থেকে মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতায় এআই-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

চ্যাটজিপিটি ও ক্লদ-এর মতো জনপ্রিয় এআই মডেলের পাশাপাশি টাইম বিনিয়োগকারীদের ভূমিকার কথাও স্বীকার করেছে। বিশেষ করে সফটব্যাঙ্কের সিইও মাসায়োশি সন। তিনি এই প্রযুক্তিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। টাইম-এর পারসন অব দ্য ইয়ার কোনও ব্যক্তিকে সেই বছরে বিশ্বের ওপর তার প্রভাবের ভিত্তিতে দেয়া সম্মান।  গত বছর এই খেতাব পেয়েছিলেন তখনকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডনাল্ড ট্রাম্প। আগের তালিকায় ছিলেন গায়িকা টেলর সুইফট ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও।
ম্যাগাজিনটির মালিক সিলিকন ভ্যালির বিলিয়নিয়ার মার্ক বেনিওফ। তিনি বলেছে, ২০২৫ সালেই এআই প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবে পরিণত হয়েছে এবং চ্যাটজিপিটির ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়ে বিশ্বের ১০ ভাগ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং বলেছেন, এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, এআই বিশ্ব অর্থনীতিকে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাবে।

তবে টাইম এআই-এর অন্ধকার দিকের কথাও তুলে ধরেছে। মার্কিন কয়েকটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটবট মানুষের মানসিক চাপ বাড়িয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্তেও ভূমিকা রেখেছে।

‘চ্যাটবট সাইকোসিস’- এমন বিতর্কও উঠেছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা ভ্রম বা প্যারানয়িয়ায় ভুগতে শুরু করে। এক ঘটনায় ১৬ বছর বয়সী অ্যাডাম রেইন আত্মহত্যা করার পর তার পরিবার ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ- চ্যাটজিপিটি তাকে আত্মহত্যার পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিল।

mzamin

ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন কে এই ফয়সাল করিম দাউদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। বলা হচ্ছে, ওই ব্যক্তির নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। এই ব্যক্তি কে, তাঁর পরিচয় কী, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

প্রথম আলো খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে, ফয়সাল করিম নামের এই ব্যক্তি কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৯ সালের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি সদস্য হয়েছিলেন। তাঁর পুরো নাম ফয়সাল করিম দাউদ খান।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা–৮ সংসদীয় আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদি। মোটরসাইকেলে থাকা আততায়ী তাঁকে গুলি করে মোটরসাইকেলে করেই পালিয়ে যায়। হাদি এখন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর অবস্থা এখনো শঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।

ওসমান হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর সঙ্গে ফয়সাল করিমের সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ছবি রয়েছে। সেই ছবিগুলোতে থাকা ফয়সাল করিমের সঙ্গে গুলি করা ব্যক্তির চেহারার সাদৃশ্য থাকায় গুলি ছোড়ার ঘটনায় তাঁকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।

এর মধ্যে আজ দুপুরে একই ব্যক্তির ছবি গণমাধ্যমে পাঠিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলেছে, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর ব্যাপারে তথ্য দিতে সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি। এ ছাড়া ওসমান হাদিকে গুলি করা ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

ফয়সাল করিম সম্পর্কে যা জানা গেল

পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে ফয়সাল করিমের নামে প্রোফাইল আছে। এই অ্যাকাউন্টটি যে ফয়সালেরই তা ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নিশ্চিত করেছেন। লিংকডইনে ফয়সাল নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমবিএ করেছেন বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা–কর্মীদের সঙ্গে মাঠে ছিলেন বলে ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য (রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও গোলাম রাব্বানী নেতৃত্বাধীন কমিটি) ফয়সাল করিম দাউদ খান একই ব্যক্তি।

ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় নাম আসার পর ফয়সাল করিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের দুইবারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতার ছবি ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে হাদির সঙ্গে ঢাকা–৮ আসনে গণসংযোগ এবং বাংলামোটরে হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আড্ডায় ফয়সালের অংশ নেওয়ার ছবিও ভাইরাল হয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, ফয়সাল করিম ওসমান হাদিকে বেশ কিছুদিন ধরে অনুসরণ করছিলেন।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সহযোগিতা ও সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামে একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছিল ফয়সাল করিমের মালিকানাধীন ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড। সে বছরের নভেম্বরে ওই গেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেসিসের তৎকালীন সভাপতি এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারও উপস্থিত ছিলেন।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আসনভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয়ক কমিটি’ করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ঢাকা–১২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এই আসনের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন ফয়সাল করিম।

অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার, পরে জামিন নিয়ে প্রশ্ন

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকার আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি এলাকায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলের চতুর্থ তলায় অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আদাবর থানায় একটি মামলা হয়েছিল। ওই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন ফয়সাল করিম।

মামলা হওয়ার কিছুদিন পর ৭ নভেম্বর আদাবর এলাকা থেকে ফয়সাল করিমকে গ্রেপ্তার করেছিল র‍্যাব। তখন তাঁর কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মুঠোফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল।

ওই মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান ফয়সাল করিম। জামিনের সময়সীমা বাড়াতে গত ১২ আগস্ট আবারও আবেদন করলে হাইকোর্ট নতুন করে তাঁর এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনে থাকা অবস্থায় এবার তাঁর বিরুদ্ধে ওসমান হাদিকে গুলি করার অভিযোগ এল। এ রকম লুটের ঘটনায় দুটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এত অল্প সময়ের (৩ মাস ৮ দিন) মধ্যে কীভাবে জামিন পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এ নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা–সমালোচনা চলছে।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে পুলিশ
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। ছবি: সিসিটিভির ফুটেজ থেকে

সুপার ফ্লু’র প্রকোপে নাজেহাল বৃটেনের হাসপাতালগুলো, বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

সুপার ফ্লু’র সংক্রমন ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে বৃটেন সরকার। এক সপ্তাহের মধ্যে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির বহু হাসপাতাল। এ নিয়ে লন্ডনের চিকিৎসকরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গত এক সপ্তাহে হাসপাতালে ফ্লু-আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, ক্ষেত্র বিশেষে বারতি সতর্কতা জারি করেছে বৃটেন সরকার। গণপরিবহনে মাস্ক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিছু হাসপাতাল ইতিমধ্যেই মাস্ক বাধ্যতামূলক করেছে। আর ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের মধ্যে বেশি সংখ্যক মানুষকে ফ্লু টিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

এনএইচএস ইংল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে গড়ে ২৬৬০ জন রোগী ফ্লু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। যা বছরের এ সময়ে সর্বোচ্চ। মাত্র এক সপ্তাহেই অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটি একে ‘অপ্রত্যাশিত সুপার ফ্লু ঢেউ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এনএইচএস-এর ন্যাশনাল মেডিকেল ডিরেক্টর প্রফেসর মেঘনা পণ্ডিত বলেন, এই সময়ের তুলনায় হাসপাতালে ফ্লু রোগীর সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। আরও উদ্বেগজনক হলো- সংক্রমণ এখনো বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে।

বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ইউরোপজুড়ে আগাম ও তীব্র ফ্লু মৌসুম দেখা দিয়েছে। মহাদেশজুড়ে সংক্রমণ বাড়ছে একটি মিউটেটেড স্ট্রেইনের কারণে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল গত মাসেই জানায়, সংক্রমণ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক আগেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে বৃটেনে আগামী ১৭ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ দিনের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে রেসিডেন্ট ডাক্তারা। ফলে স্বাস্থ্যসেবা খাতে চাপ আরও বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির মোট চিকিৎসকদের প্রায় অর্ধেকই এ ধরনের রেসিডেন্ট ডাক্তার। ধর্মঘট ঠেকাতে বৃটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বুধবার নতুন কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত প্রস্তাব দিয়েছেন। যা বর্তমানে বিবেচনা করছে ডাক্তারদের ইউনিয়ন। 

mzamin