Monday, December 12, 2016

পাকিস্তানে ধরপাকড়, ২৫০০ কারাগারে

সরকারবিরোধী আন্দোলন-বিক্ষোভে উত্তাল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। সাবেক পাক ক্রিকেটার ইমরান খানের নেতৃত্বে আজাদী ও বিতর্কিত আধাত্মিক নেতা তাহির-উল কাদরির নেতৃত্বে ইনকিলাব র‌্যালি চলছে। পুরো পাঞ্জাব প্রদেশকে ঘিরে বড় ধরনের শো-ডাউনের আগে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে সরকার। এ পর্যন্ত ইমরানের পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) ও কাদরির পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি) দলের প্রায় আড়াই হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আটকের পর তাদের পাঞ্জাবের ২৭টি কারাগারে রাখা হয়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশ বলে (৩-এমপিও) সাত দিন থেকে একমাস পর্যন্ত আটককৃতদের কারাগারে রাখতে পারবেন। ডন এক প্রতিবেদনে জানায়, সরকারের কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কারাগারেই রাখা হবে। দুদিন ধরে চলমান এই সমাবেশকে ঘিরে পুরো ইসলামাবাদকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করেছে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন)।
সরকার প্রথমে সমাবেশে কড়াকড়ি আরোপ করলেও পরে তা কিছুটা শিথিল করে। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে দুই দলই অটল আছেন। এদিকে বর্তমানে পাকিস্তানে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন ইমরান খান। তাকে ঘিরেই অনেকে সরকার উৎখাতের কথা বলছেন। রোববার ডন নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরান খান বলেন, সর্বোচ্চে এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের পতন হবে। সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দিয়ে তাহির-উল কাদরি বলেন, এই সময়ের মধ্যেই তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে হবে। পুলিশের কাছে নওয়াজ শরিফের আত্মসমর্পণেরও দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে সমাবেশকে ঘিরে আত্মঘাতী হামলার আশংকা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান। উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, পিটিআই ও পিএটি র‌্যালি ঘিরে জঙ্গিরা হামলার পরিকল্পনা করছে। ডনের খবরে বলা হয়, ইমরান-কাদরিকে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। ডন। এদিকে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাজপথে সমবেত হয়েছে। এদিকে জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতা তাহির-উল কাদরি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে গ্রেফতারের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করেছেন। লাহোর থেকে তাহির-উল কাদরি ও ইমরান খানের নেতৃত্বে আসা বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবি আদায়ে ইসলামাবাদে একত্রে মিশে যায়। ইমরান শনিবার নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তিনি নির্বাচনে কারচুপির জন্য সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। রোববার বিকালে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে ইমরান খানের এক বক্তৃতায় সরকারের কাছে তার দলের দাবিগুলো তুলে ধরার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) একজন মুখপাত্র শিরিন মাজারি। ইমরান খান এর আগে বলেন, আমাদের দাবি পূরণ না করে আমরা ফিরে যাব না। তিনি নির্বাচনে কারচুপির জন্য অভিযুক্ত সব কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের বিচারের দাবি জানান। শনিবার বিকালে ইমরান খান শরিফকে পদত্যাগের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, অন্যথায় তার সমর্থকরা রোববার রাজধানীর রেড জোন-এ ঢুকে পড়বে। এদিকে অপর সরকারবিরোধী রাজনীতিক তাহির-উল কাদরি তার সমর্থকদের হত্যার অভিযোগে নওয়াজ শরিফকে গ্রেফতারের দাবি জানান। তিনি শনিবার তার দাবি মানতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন। তিনি বলেন, তার দাবি পূরণ করা না হলে এ জন্য কোনো প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হলে তিনি দায়ী হবেন না। কাদরি বলেন, নওয়াজ শরিফ ও তার ভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ খানের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই এবং তাদের মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ও তাদের গ্রেফতার করতে হবে। এএফপি।

গাছের ডিজিটাল পরিচয়পত্র!

পূর্ব চীনের শানদং প্রদেশের মাউন্ট তাই এলাকার প্রায় ২০ হাজার পুরোনো গাছের এখন ডিজিটাল আইডি কার্ড বা পরিচয়পত্র আছে। এতে সেখানকার পরিবেশ, গাছগুলোর অবস্থা, জলবায়ু, অসুখ-বিসুখ ও ক্ষতিকর পোকামাকড়—এসবের তথ্য থাকবে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া গতকাল রোববার এ খবর দিয়েছে। নতুন একটি পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় গাছের পরিচয়পত্রের এসব মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে গাছগুলোর অবস্থানের তাৎক্ষণিক মানচিত্রও পাওয়া যাবে। এই ব্যবস্থায় পরিবেশের পরিবর্তন, গাছের শারীরবৃত্তিক অবস্থা, জলবায়ু, রোগ-বালাই ও স্থানীয় চিত্র পাওয়া সহজ হবে।
সেগুলো মিলিয়ে প্রতিটি গাছের সুস্থতা, দুর্বলতা বা মুমূর্ষু অবস্থা, ক্ষতি ইত্যাদি যাচাই করা যাবে। মাউন্ট তাই এলাকায় ১৮ হাজার ১৯৫টি অনেক পুরোনো গাছ আছে। সেগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৮২১টি প্রথম শ্রেণির (বয়স কমপক্ষে ৩০০ বছর)। এসব গাছ বিরল অথবা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওই পর্বতে বেশ কিছু বিখ্যাত গাছ আছে, যেমন ইংকেসং নামের পাইন। পর্যটকদের কাছে মাউন্ট তাই অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। সেখানে ৫০০ বছরের বেশি বয়সী পাইনগাছও আছে। জায়গাটি বিশ্ব সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। চীনাদের কাছে যে পাঁচটি পর্বত পবিত্র বলে বিবেচিত, মাউন্ট তাই সেগুলোর একটি। এর চূড়ার নাম ‘জেইড এমপেরর পিক’। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক দেড় হাজার মিটার উঁচু।

কোটি কোটি রুপি আর সোনা উদ্ধার

হুন্ডি ব্যবসায়ীর ঘরে পাওয়া রুপি
ও সোনার অলঙ্কার। এনডিটিভি
৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিলের পর থেকে কালোটাকার ‘কুমির’ ধরতে ভারতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আয়কর দপ্তর। অপ্রদর্শিত অর্থ ও সম্পদ বাঁচাতে এবং নিজে বাঁচতে কালোটাকার মালিকেরা বেছে নিচ্ছেন নানা কৌশল। নানা ফন্দিফিকির করে অর্থ লুকিয়ে রাখছেন। তারপরও অনেকে পার পাননি। গত কয়েক দিনেই ২০০ কোটি রুপির বেশি উদ্ধার করা হয়েছে। চেন্নাইয়ের ধনকুবের জে শেখর রেড্ডির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে রুপি ও সোনার বার, যার মূল্যমান ১৮১ কোটি রুপি। দিল্লির একটি আইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ কোটি ৫৬ লাখ রুপি এবং কর্ণাটকের এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর বাড়ি তল্লাশি করে ৫ কোটি ৭০ লাখ রুপি ও ৩২ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, শুক্রবার চেন্নাইয়ে শেখর রেড্ডির বাড়ি তল্লাশি করে ১০৬ কোটি রুপি ও ৩৬ কোটি রুপি মূল্যের সোনার বার উদ্ধার করা হয়। শনিবার ভেলোরের রাস্তায় রেড্ডির একটি গাড়ি তল্লাশি করে সেখান থেকে আরও ২৪ কোটি রুপি উদ্ধার করা হয়।
ওই দিনই শেখর রেড্ডিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর দেওয়া তথ্যমতে বাসা থেকে ৫০ কোটি রুপি মূল্যের সোনার বার উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে তাঁর কাছ থেকে ১৩০ কোটি ৫০ লাখ রুপি এবং ৫০ কোটি ৫০ লাখ রুপি মূল্যের ১৭৭ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে, দিল্লিতে টিঅ্যান্ডটি ল ফার্ম নামের একটি আইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে শনিবার রাতে তল্লাশি চালান কর কর্মকর্তারা। তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের আলমারি থেকে ১৩ কোটি ৫৬ লাখ রুপি উদ্ধার করেন। এ সময় একজন তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কেউ ছিলেন না। এ ছাড়া শনিবার কর্ণাটকের চাল্লাকেরে শহরের এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর বাড়ির গোসলখানায় লুকানো ৫ কোটি ৭০ লাখ রুপি এবং ৯০ লাখ রুপি মূল্যের ৩২ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, গোসলখানার ছাদে একটি বাক্সে রুপি ও সোনার বার লুকিয়ে রেখে টাইলস দিয়ে কায়দা করে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। টাইলস খুলে ওই অর্থ ও সোনার বার বের করে আনা হয়। ওই হুন্ডি ব্যবসায়ীর নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আয়কর কর্মকর্তারা বলেন, দেশজুড়ে অভিযান চলছে। আরও অনেক কালোটাকার সন্ধান পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশাবাদী।

পাকিস্তানকে রাজনাথ সিংয়ের হুঁশিয়ারি

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তান যদি নিজেদের সংশোধন না করে, তাহলে দেশটি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে এবং ভারত তার জন্য দায়ী থাকবে না। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে গতকাল রোববার এক সমাবেশে রাজনাথ এ সতর্কতা উচ্চারণ করেন। রাজনাথ সিং অভিযোগ করেন, আন্তরিকতার জবাবে পাকিস্তানের কাছ থেকে উরি, গুরুদাসপুর, পাঠানকোটে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা পেয়েছে ভারত। ভারত থেকে কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করতে দেশটি সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। ধর্মীয় ইস্যুতে ভারতকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্রে মেতেছে।
কিন্তু ভারত ধর্মীয় দিক থেকে আর বিভক্ত হবে না। একই সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান যদি সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভারত সহযোগিতা করতে রাজি আছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাস নির্মূলে সহায়তা করতে আমরা প্রস্তুত আছি।’ এর আগে গত সপ্তাহে ভারতের অমৃতসরে ‘হার্ট অব এশিয়া’ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজের উপস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সন্ত্রাস নির্মূলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সে সময় তিনি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘নীরবতা অবলম্বন ও নিষ্ক্রিয়তা আফগানিস্তান এবং আমাদের এই অঞ্চলে সন্ত্রাসী ও তাদের নাটের গুরুদের উৎসাহিত করবে।’ উল্লেখ্য, আফগানিস্তানও সে দেশে জঙ্গি তৎপরতার জন্য প্রতিবেশী পাকিস্তানের ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ করে আসছে।

‘চিনাম্মাকে আম্মাই স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন’

‘তিনি (শশীকলা) দীর্ঘ দিন ধরে আম্মার (জয়ললিতা) সঙ্গে রয়েছেন। কয়েক বছর আগে আমরা তাঁকে চিনাম্মা বলে ডাকা শুরু করি। আম্মার এতে সায় ছিল, কোনো আপত্তি ছিল না। এটাই ইঙ্গিত করে যে এআইএডিএমকের শীর্ষ পদের উত্তরাধিকারী চিনাম্মা।’ এভাবেই তামিলনাড়ুর সদ্য প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার প্রভাবশালী বান্ধবী শশীকলার দলের নেতা হওয়ার পক্ষে কথা বললেন তাঁর দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগামের (এআইএডিএমকে) প্রচার সম্পাদক এম থামবিদুরাই। ভারতের লোকসভার ডেপুটি স্পিকার থামবিদুরাই গতকাল রোববার বলেন, এআইএডিএমকের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা শশীকলারই রয়েছে।
উল্লেখ্য, এআইএডিএমকে সদস্যদের কাছে শশীকলা চিনাম্মা বা ‘ছোট আম্মা’ নামে পরিচিত। তামিল ভাষায় মায়ের ছোট বোনকে চিনাম্মা বলা হয়ে থাকে। শশীকলার নেতৃত্বে আসা প্রয়োজন উল্লেখ করে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে থামবিদুরাই বলেন, ‘আম্মার সঙ্গে বিগত ৩৫ বছর ধরে ছিলেন চিনাম্মা। এ জন্য তিনি জীবনে অনেক ত্যাগও স্বীকার করেছেন। রাজনৈতিক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা হয়েছে; জেলও খেটেছেন। তিনি অনেক ঝুঁকি থেকে আম্মাকে রক্ষা করেছেন এবং সরকার ও দলকে চালাতে পরামর্শ দিয়েছেন।’ এর আগে শনিবার তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী পনিরসেলভামসহ এআইএডিএমকের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা শশীকলাকে দলীয় নেতৃত্বে আসার জন্য অনুরোধ করেন। জানা গেছে, চলতি মাসে এআইএডিএমকের জাতীয় সম্মেলনে শশীকলাকে দলটির সাধারণ সম্পাদক করা হতে পারে। জয়ললিতা ২৭ বছর দলটির এই প্রভাবশালী পদে ছিলেন।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত, তবে

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা আবারও সংবিধানের বর্তমান ১১৬ অনুচ্ছেদকে সংশোধন করে বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরিয়ে নিতে বলেছেন। এই অনুচ্ছেদটিই অধস্তন আদালত পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত শাসন তৈরি করেছে। কোনো বিচারককে বদলি বা তাঁর বিষয়ে শৃঙ্খলামূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে সেটা সরকার আগে একটা প্রস্তাব দেবে, এরপর সুপ্রিম কোর্ট যে পরামর্শ দেবেন, সেটা কার্যকর হবে। কিন্তু ওই আগে প্রস্তাব দেওয়াটাই গোলমেলে। কারণ এ ধরনের প্রস্তাবই বিচারকের ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা দেখেছি যে প্রতি কার্যদিবসে সরকার গড়ে পাঁচজনকে বদলির প্রস্তাব দেয় আর সুপ্রিম কোর্ট তাঁর চারটিতেই রাজি হন।
গণতন্ত্রে ক্ষমতা বা এখতিয়ার কখনো একতরফা ও অস্বচ্ছ কোনো প্রক্রিয়া সমর্থন করে না, সেটা জনগণের পক্ষে যে বা যাঁরাই প্রয়োগ করুন না কেন। বাংলাদেশের সংকট স্বচ্ছতার ঘাটতির। সেটা কী করে দূর করা যায়, সেটাই আজ ভাবতে হবে। বিষয়টি শুধুই সরকার মুছে সুপ্রিম কোর্ট লিখে দেওয়ার মধ্যেই সীমিত নয়। রাষ্ট্রের যে অঙ্গই ক্ষমতা অনুশীলন করুন, সেটা হতে হবে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ। এই দুটো দিতে অপারগ থাকলে শুধু শাসনের জায়গা বদলিয়ে খুব প্রতিকার পাওয়া যাবে না। বৈশ্বক প্রবণতা হলো, অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কাছেই ন্যস্ত রাখা। প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে বর্তমানে আমাদের একটি ভালো কমিশন রয়েছে। কিন্তু তাকে শুধু বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে হয়, এটা ভাবার সময় এসেছে যে বিচারক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও ওই কমিশনকেই দেওয়া যায় কি না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনী পাস পর্যন্ত বিচারক নিয়ন্ত্রণ যখন শুধু সুপ্রিম কোর্টের কাছেই ন্যস্ত ছিল, তখন সেটা যথাযথভাবে অনুসৃত হয়নি। কারণ, ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া হলেও ১৫০ অনুচ্ছেদে ক্রান্তিকালীন বিধানাবলিতে আরেকটি বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত সংবিধানে এই বিধান টিকে ছিল যে, বিচার বিভাগ পৃথক্করণ ‘যথাশীঘ্র’ বাস্তবায়ন করা হবে, যা এক-এগারোর আগে কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। প্রধান বিচারপতি প্রবীণ আইনজীবী আবদুল বাছেত মজুমদারের আইন পেশায় ৫০ বছরের অনুষ্ঠানে ১১৬ক অনুচ্ছেদ বিষয়েও কথা বলেছেন।
তবে কেউ কেউ বলতে পারেন ১১৬ক থাকলে ক্ষতি কী। কারণ, সেখানে শুধু বিচারকার্যে বিচারকদের স্বাধীনতার কথাই বলা আছে। আমরা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জোরেশোরে বলে আসছি, ১১৬ অনুচ্ছেদকে মূল সংবিধানে, মানে বিচারক নিয়ন্ত্রণ কেবল সুপ্রিম কোর্টের কাছেই ন্যস্ত থাকবে। আমরা কখনো ১১৬ক নিয়ে আলাদাভাবে ভাবিনি। প্রধান বিচারপতি কেন ১১৬ক অনুচ্ছেদটিকেও অপসারণ করতে বলেছেন, তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি। আমরা জানি যে মাসদার হোসেনসহ অনেক মামলাতেই আমাদের বিচারব্যবস্থা এতকাল এই অনুচ্ছেদটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবান্ধব মনে করেছেন। কিন্তু এখন আমরা দেখলাম, চতুর্থ সংশোধনীতে ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ কর্তন ও ১১৬ক সংযোজন একত্রে করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য (জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে) এই হতে পারে যে বিচারক নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী বিভাগ তাঁর ভূমিকাকে ‘সংবিধানসম্মত’ করতে চেয়েছে। তাঁরা দ্বৈত বাঁধ সৃষ্টি করেছিলেন। আজকে আমরা যে ১১৬ অনুচ্ছেদ দেখি সেখানে জেনারেল জিয়ার অপেক্ষাকৃত ভালো ভূমিকা আছে। কারণ, বিচারক নিয়ন্ত্রণ পঞ্চম সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত রাখা ধরে রাখলেও বলা হয়েছে, সেটা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করেই প্রযুক্ত হবে। কিন্তু ১১৬ক বলেছে, সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে বিচারকেরা স্বাধীনতা ভোগ করবেন। তার মানে বিচারকেরা বিচারকার্য সম্পাদনকালে বিবেক ও ন্যায়পরায়ণতার সর্বজনীন নীতি নয়; বরং ‘সংবিধানের বিধানাবলির’ দিকে খেয়াল রাখবেন,
যা তাদের সর্বক্ষণ স্মরণ করায় যে, তাদের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী। তাই আমরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত যে ১১৬ ও ১১৬ক দুটোই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করে। আমরা ১৯৭৫ সাল থেকে একটা ধাঁধায় ছিলাম, কী করে চতুর্থ সংশোধনীতে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘সুপ্রিম কোর্ট’ মুছে দিয়ে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। এ নিবন্ধ লিখতে গিয়ে সেই ধাঁধার একটি ব্যাখ্যা পেলাম। তানজানিয়ার জাতির জনক জুলিয়াস নায়ারে ১৯৬৪ সালে একদলীয় শাসন চালু করেছিলেন। চতুর্থ সংশোধনীতে অনেক কিছুই সেখান থেকে আমদানি করা। তবে ক্ষতিকরভাবে আনা হয়েছে। কারণ, সেখানে ১৯৬১ সালের সংবিধানেই কমিশন ছিল। এবং এই কমিশন বিচারক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা দেখত। তানজানিয়ার বর্তমান সংবিধানের ১১৩ অনুচ্ছেদের ১ দফার (ক) উপদফায় বিচারকদের নিয়োগ প্রেসিডেন্টের কাছে ন্যস্ত রয়েছে। আবার (খ) উপদফায় বলা আছে, বিচারিক কর্মে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলা বিধানের অনুশীলন এবং তাঁদের অপসারণ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
কেনিয়ার সংবিধানের ১৭১ অনুচ্ছেদে নিয়োগ ও শৃঙ্খলা–সংক্রান্ত কমিশন গঠনের কথা আছে। আমরা মনে রাখব, বিচারক নিয়ন্ত্রণ ‘সুপ্রিম কোর্টের’ কাছে ন্যস্ত থাকার মানে কী, সেটা কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানে পরিষ্কার নেই। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন জিএ (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) কমিটি বদলি, হাইকোর্ট পদোন্নতি ও অপসারণ দেখেন। কোনো কোনো দেশে এই প্রক্রিয়ায় সংসদকেও যুক্ত করেছে। গাম্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতির পরামর্শে এবং সংসদের কনফারমেশন সাপেক্ষে কমিশনের সদস্য নিয়োগ দেন। প্রধান বিচারপতিই নেতা। সেখানে অ্যাটর্নি জেনারেলের মনোনয়নে একজন আইনজীবী এবং সংসদের মনোনয়নে একজন ও রাষ্ট্রপতি নিজ বিবেচনায় নিয়োগ দিতে পারেন একজনকে। আফ্রিকার আরেক দেশ মালাওয়ির সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদেও আমরা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এমন একটা জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন দেখতে পাচ্ছি, যার কাজ শুধু বাংলাদেশের সার্ভিস কমিশনের মতো শুধুই বিচারক নিয়োগ নয়, বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়টিও তাদের কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেখানে সদস্যদের মধ্যে সিভিল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানকেও রাখা হয়েছে। আমরা ২০০৭ সালের আগে পিএসসির মাধ্যমেই বিচারক পেতাম। অধস্তন আদালতের বিচারকদের স্বাধীনতার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার বিষয়ে প্রতিকারের পথ সহজ থাকতে হবে। আমাদের দেশে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন জিএ কমিটি বা ফুলকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট দায়েরের উদহারণ রয়েছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত প্রতিকারের পথ অনিশ্চিত। মালাওয়ির সংবিধানে আরও দেখতে পাচ্ছি, নিম্ন আদালতের বিচারকদের অপসারণেও জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের পরামর্শসাপেক্ষ
একধরনের অভিশংসন ব্যবস্থা চালু আছে। মালয়েশিয়ার প্রধান বিচারপতি সম্প্রতি আমাদের সুপ্রিম কোর্ট ঘুরে গেছেন। তাঁদের দেশের সংবিধানের ১৩৮ অনুচ্ছেদে জুডিশিয়াল অ্যান্ড লিগ্যাল সার্ভিস কমিশনের কথা বলা আছে। সেখানে সার্ভিস কমিশনের ‘সম্মতি’ ব্যতিরেকে বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনো শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। ১৩৫ অনুচ্ছেদের ৩ উপদফা বলেছে, বিচারকার্য করতে গিয়ে তাঁদের কোনো অসদাচরণ বা ভুলের দায়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কিন্তু সরকারের যে কোনো বক্তব্য থাকতে পারে, সেটা প্রকারান্তরে স্বীকার করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য থাকলে সেটা দেখবেন অ্যাটর্নি জেনারেল। এখানে লক্ষণীয় যে তাদের লিগ্যাল সার্ভিস কমিশনটি কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের নেতৃত্বে করা হয়নি। কমিশনের দুজন সদস্য সংবিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। বাকিদের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে মালয়েশিয়ার রাজা হাইকোর্টের কর্মরত, অবসরপ্রাপ্ত বা বিচারক হওয়ার যোগ্যতা থাকাদের মধ্য থেকে নিতে পারেন। আমরা এতকাল এটাই জেনে আসছি যে হাইকোর্টের রুলস মানে হাইকোর্ট কী করে চলবেন, সেটা শুধুই সুপ্রিম কোর্টের নিরঙ্কুশ এখতিয়ারের বিষয়। কিন্তু সলোমন আইল্যান্ডস সংবিধানে দেখলাম প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন রুলস কমিটিতে গভর্নর জেনারেল প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন নাগরিকদের নিয়ে থাকেন। ক্ষুদ্ররাষ্ট্র বলে চক্ষু চড়কগাছ করবেন না। কারণ, এরা বড় গণতন্ত্রের কলোনি ছিল। আর অন্তত সংবিধান লিখতে গিয়ে এরা সাধারণত বড় বড় আইনবিদের পরামর্শ মানেন। আধুনিক সংবিধানের আরেকটি প্রবণতা হচ্ছে, নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভিস কমিশনগুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। আমাদের জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনটি একটি মামুলি প্রজ্ঞাপনে টিকে আছে। এটির জায়গা সংবিধানের ভেতরে হতে হবে। আমরা যদি বলি ১৯৭৫ সালে তানজানিয়াকে কপি করেছি, তাহলে তানজানিয়াকে খাটো করা হবে।
কারণ, তানজানিয়া ১৯৬১ সালেই তার সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদে বলেছে, ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যান্য বিচারিক কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন থাকবে। আমরা মনে করি নিয়োগ ও অপসারণ একই সংস্থার কাছে থাকতে পারে। বর্তমান সংবিধানের আওতায় যদি সার্ভিস কমিশন নিয়োগ দিতে পারে। তাহলে তারা কেন শৃঙ্খলা ইত্যাদি দেখতে পারবে না। তানজানিয়ার সংবিধানে বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধান প্রসঙ্গে ‘ডিভিশন অব পাওয়ার’ শব্দের উল্লেখ দেখলাম। কিন্তু আমাদের সংবিধান এই নীতির বিষয়ে নিশ্চুপ। আমরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত। শুধু ভিন্নমত এতটুকু যে এটাই যথেষ্ট নয়। দুটো অনুচ্ছেদই নয়, অধস্তন আদালত নিয়ে থাকা ১১৪ থেকে ১১৬ক পুরোটাই ঢেলে সাজাতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে সংবিধানের সৃষ্টি, সেভাবে অধস্তন আদালত নয়, তারা প্রধানত আইনের দ্বারা সৃষ্টি। বাহাত্তরের সংবিধানে ১১৫ অনুচ্ছেদে ‘জেলা জজ’ কথাটি ছিল। অথচ চতুর্থ সংশোধনীতে তা মুছে ফেলা হয়। বিচারকদের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করাটাই বর্তমান সংবিধানের লক্ষ্য। সংবিধানগতভাবেই তাঁরা এখন সরকার ও সংসদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। তবে দ্বৈত শাসন অবসানের উদ্দেশ্য যদি অধিকতর স্বচ্ছতা, অধিকতর স্বাধীনতা ও অধিকতর স্বাধীনতা প্রদানের নিশ্চয়তা হয়, তাহলে শুধু আর বাহাত্তরে ফেরাই যথেষ্ট নয়। তানজানিয়া, মালয়েশিয়া ও কেনিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যমান জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে কিছুটা পরিবর্তন এনে (যেমন এর প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি) একে সংবিধানে জায়গা করে দিতে হবে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে আমরা পুনশ্চ বলব, আমরা কিন্তু প্রধানত প্রধান বিচারপতির সঙ্গেই একমত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

‘পূর্ব বাংলার জনগণ যা চাইবে, তা–ই হবে’

বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ১৫ অক্টোবর (১৯৭১) এক চিঠিতে বাংলাদেশকে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। ৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এখনো কি রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা আছে, নাকি গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনই একমাত্র পথ? জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘পূর্ব বাংলার জনগণ যা চাইবে, তা-ই হবে। তারা কোন পথে যাবে তা নির্ধারণ করার অধিকার আমাদের নেই। এটি তাদের দেশ, এটি তাদের লড়াই এবং তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’ ১৯ অক্টোবর ফ্রান্সের লা মঁদ পত্রিকায় ইয়াহিয়া খানের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। বিচারে শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ড হলে প্রেসিডেন্ট তাঁর ক্ষমতাবলে মুজিবকে ক্ষমা করে দেবেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে ইয়াহিয়া বলেন, ‘আমাকে দেশের মানুষের মনোভাব জানতে হবে। জনগণ চাইলে আমি ক্ষমা করব।’ ২৮ নভেম্বর সাপ্তাহিক নিউজউইক-এ প্রকাশিত আর্নল্ড ডি বোচগ্রেভকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া বলেন, ‘বিচারে তাঁর দণ্ড হলে কী করা হবে, তা প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারে। এটি বড় একটি ঝামেলা। কিন্তু জাতি চাইলে আমি তাঁকে ছেড়ে দেব।’ সরকারি পত্রিকা পাকিস্তান টাইমস-এ ইয়াহিয়ার কথার ব্যাখ্যা করে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট আদতে মুজিবের মুক্তির কথা ভাবছেন, তবে এটি একান্তই পাকিস্তানের নিজস্ব ব্যাপার।
ইয়াহিয়ার মন্তব্যে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তানের ৪২ জন খ্যাতনামা ব্যক্তি শেখ মুজিবের আশু মুক্তি চেয়ে যৌথ বিবৃতি দেন। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ছিলেন তেহরিক-ই-ইস্তিকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান, লেনিন শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, পাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা চৌধুরী আসলাম, পাকিস্তান টাইমস-এর সাবেক সম্পাদক মাজহার আলী খান, পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি মির্জা মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রমুখ। বিবৃতিদাতাদের বেশির ভাগই ছিলেন বামপন্থী। পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ প্রশ্নে দূতিয়ালি করার জন্য পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। বাংলাদেশ প্রশ্নে একটি সম্মানজনক সমাধান এবং শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে দেনদরবার করছিলেন। এই পর্যায়ে নভেম্বরে তাঁর ওয়াশিংটন সফর ঠিক হয়। মার্কিন প্রশাসনের মনোভাবে অবশ্য কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। ইন্দিরা ও মুজিবের ব্যাপারে নিক্সন ও কিসিঞ্জারের বিন্দুমাত্র আগ্রহ কিংবা শ্রদ্ধাবোধ ছিল না। ৪ নভেম্বর নিক্সন-ইন্দিরা বৈঠক হয়। বৈঠকে কিসিঞ্জার ও হাকসার উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পর ওভাল অফিসে কিসিঞ্জারের সঙ্গে নিক্সন একান্তে আলাপ করেন। তাঁদের কথোপকথন থেকে জানা যায়:
নিক্সন: অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্র যে সাহায্য দেয়, ভারতকে তার চেয়ে বেশি দেওয়া হয়। তারপরও ওরা এটি স্বীকার করে না। জাহান্নামে যাক তারা।
কিসিঞ্জার: আমি রাখঢাক করে বলব না। এই বেজন্মারা আমাদের সঙ্গে চূড়ান্ত রকমের নিষ্ঠুর খেলা খেলছে। দুর্ভিক্ষ ঠেকানো, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সরবরাহ (পূর্ব পাকিস্তানে), অসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা, সাধারণ ক্ষমা, একতরফা সেনা প্রত্যাহার, কী না আমরা করেছি। অস্ত্র পাঠানোও শেষ হয়ে গেছে।
নিক্সন: আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাকে ফাঁসি না দেওয়ার ব্যাপারটি পাকিস্তানিরা মেনে নিয়েছে। তাঁর নামটা যেন কী? মুজিব? কীভাবে উচ্চারণ করো?
কিসিঞ্জার: ইয়াহিয়া বলেছে, সে বাংলাদেশের একজন নেতার সঙ্গে দেখা করতে রাজি। না না না, মুজিব নয়। মুজিবের সঙ্গে দেখা করা ইয়াহিয়ার জন্য হবে আত্মহত্যার শামিল।
নিক্সন: ইন্দিরা গান্ধীকে জানাতে হবে, ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যদিও কোনো চুক্তি নেই, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। (ইন্দিরার উদ্দেশে কর্কশ কণ্ঠে) ওল্ড বিচ!
কিসিঞ্জার: আপনাকে প্রকাশ্যে (ইন্দিরাকে) সৌজন্য দেখাতে হবে।...
নিক্সন: তারা বলেছে, তাঁকে (মুজিবকে) ফাঁসিতে ঝোলাবে না-মুজু, মুজু হ্যাঁ, তুমি তাঁর নামটা বলেছ।
কিসিঞ্জার: মুজিব।
নিক্সন: আমি শক্তভাবে (ইন্দিরার সঙ্গে) কথা বলব।
নিক্সন-ইন্দিরা দ্বিতীয় বৈঠকটি হয় ৫ নভেম্বর বিকেলে। বৈঠকের পর নিক্সন কিসিঞ্জারকে বলেন, সে (ইন্দিরা) আমাদের নিয়ে খেলছে। এই নারী আমাদের চুষে নিচ্ছে।
ইয়াহিয়া নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি চাল চাললেন। তিনি নুরুল আমিনকে প্রধানমন্ত্রী এবং ভুট্টোকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করে একধরনের অন্তর্বর্তী অসামরিক সরকার গঠন করলেন। নুরুল আমিন ছিলেন নামমাত্র প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের জনগণ থেকে তখন তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছিল। ইয়াহিয়া চীনা সমর্থন আদায়ের জন্য তাঁর বিশেষ দূত হিসেবে ভুট্টোকে চীনে পাঠালেন। তাঁর সঙ্গে গেলেন এয়ার মার্শাল রহিম খান এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান। নভেম্বরের ৬-৮ তারিখে তাঁরা বেইজিংয়ে চীনা নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। চীনা আলোচকদের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের নেতারা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেন ই। তাঁরা পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের আশ্বাস দিলেও সামরিক সমর্থনের ব্যাপারে কোনো অঙ্গীকার করেননি। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে শীত ক্রমেই জেঁকে বসছে। সিকিম সীমান্তে হিমালয়ে চীনা সেনা সমাবেশ করা এ সময় প্রায় অসম্ভব। সুতরাং চীনা সেনাবাহিনী এই মুহূর্তে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।
চৌ এন লাই ‘পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন’ রাজনৈতিকভাবে মীমাংসার ওপর জোর দেন এবং শক্তি প্রয়োগ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে বলে মন্তব্য করেন। ওই সময় পাকিস্তানে একটি গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণ করলে চীন পাকিস্তানের সাহায্যে এগিয়ে আসবে বলে চীনা নেতারা কথা দিয়েছেন। অথচ এ রকম কিছু আলোচনা হয়নি।
ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) প্রধান কে এফ রুস্তমজির ডায়েরি থেকে জানা যায়, জেনারেল মানেকশ এবং অন্যান্য বাহিনীর প্রধানেরা জানতেন যে যুদ্ধের জন্য তাঁদের তৈরি হতে হবে। কিন্তু তখনো তাঁরা ইন্দিরার মন বুঝে উঠতে পারেননি। ৭ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ২০ বছরমেয়াদি ‘মৈত্রী চুক্তি’ সই হয়। আগস্টের শেষ দিকে ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গ সফরে যান। তিনি ঘুরে ঘুরে সামরিক প্রস্তুতি দেখেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি শিবির ঘুরে দেখেন। তখন পর্যন্ত বিএসএফই মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য দিয়ে আসছিল। সফর শেষে তিনি বিএসএফের ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলক মজুমদারকে ডেকে খোলাখুলিভাবে জানতে চান, এই গতিতে চললে ঢাকায় পৌঁছাতে তাদের কত দিন লাগবে? জবাবে গোলক মজুমদার বলেন, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া কখনো সম্ভব নয়।’ বিএসএফ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করতে পারবে না, ভারতীয় সেনা ও বিমানবাহিনীর সমর্থন লাগবে।
ইন্দিরা একমত হন। তিনি বলেন, তাঁর চিন্তা হলো পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে। মজুমদার বলেন, এ জন্য জমি ভালো রকম শুকনো থাকতে হবে, যাতে করে ট্যাংক চলতে পারে। তিনি জানতে চান, কখন সবুজ সংকেত পাওয়া যাবে? জবাবে ইন্দিরা বলেন, ‘ধরুন, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে।’ এপ্রিলেই জেনারেল মানেকশ ইন্দিরাকে জানিয়েছিলেন ২৫ নভেম্বরের আগে তাঁদের প্রস্তুতি শেষ হবে না। ১৫ নভেম্বর জেনারেল জ্যাকব জেনারেল ইন্দরজিৎ সিং গিলকে ব্যক্তিগত এক বার্তায় বলেন, ‘আগের পরিস্থিতি দ্রুত আক্রমণের জন্য তৈরি। বর্ষাকাল শেষ। সেনাবাহিনী তৈরি হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছে এবং হিমালয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া চীনা সেনাদের যেকোনো পদক্ষেপ পর্যুদস্ত করবে।’
আগামীকাল: ভুট্টো ইয়াহিয়াকে নিয়ে খেলছিলেন
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com