Saturday, November 9, 2013

শ্রীলংকার নাম্বার ওয়ান বিউটিশিয়ানকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের সম্মাননা

প্রত্যেক জুটির জীবনে মালা বদলের দিন বা বিবাহের দিন এক বিশেষ কিছু। উইলিয়াম কিংবা কেট হয়ে জন্ম না নিলেও বিবাহের ক্ষণে রাজকীয় জুটি হতে দোষ কী?
আর সফল বিয়ের জুটিদের জাঁকজমক পোশাকে, আকর্ষণীয় মোহনীয় করার নেপথ্যে থাকে বিউটিশিয়ানরা। ছবিতে শ্রীলংকার নাম্বার ওয়ান বিউটিশিয়ানকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, এ বিউটিশিয়ান বর ও কনে পক্ষের ১২৬ জনকে সাজিয়ে গিনেসে নাম লেখান

আলোচনার প্রস্তাব নাকচ প্রতিশোধ নেবে তালেবান

পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আর কোনো শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন পাকিস্তানি তালেবানের (টিটিপি) নয়া প্রধান মোল্লা ফজলুল্লাহ। তিনি বলেছেন, তার পূর্বসূরির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবেন। রেডিওতে ফজলুল্লাহর এই ঘোষণার পর উত্তর ওয়াজিরিস্তানের প্রধান শহর মিরানশাহ’র চারদিকে গুলি করে উল্লাস প্রকাশ করে তালেবান সদস্যরা। এদিকে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। তালেবান গোষ্ঠীর এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, তালেবান জঙ্গিরা পাকিস্তানের বর্তমান সরকার এবং দেশটির সেনাবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। মানুষ্যবিহীন বিমান (ড্রোন) হামলায় পাকিস্তানি তালেবান প্রধান হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিহত হওয়ার ছয়দিন পর নতুন প্রধান হিসেবে মোল্লা ফজলুল্লাহর নাম ঘোষণা করা হয়।
ফজলুল্লাহ মূলত নিষ্ঠুর প্রকৃতির কমান্ডার। তার বাহিনীই পাকিস্তানের নারীশিক্ষা আন্দোলনকর্মী স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইকে গুলি করেছিল। এছাড়া সেপ্টেম্বরে রাস্তায় বোমা পেতে সোয়াতের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সানাউল্লাহ নিয়াজিসহ আরও দুই সামরিক কর্মকর্তাকে ফজলুল্লাহর বাহিনীই হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মে মাসে নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর এক বিবৃতিতে দেশটির বিদ্রোহী জঙ্গি দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, হাকিমুল্লাহ মেহসুদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সরকারি আলোচকরা উত্তর ওয়াজিরিস্তানে যাবেন। কিন্তু তাদের যাওয়ার নির্ধারিত দিনের মাত্র একদিন আগে ড্রোন হামলায় মেহসুদ নিহত হন। ১ নভেম্বর উত্তর ওয়াজিরিস্তানে মেহসুদের গাড়িতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তালেবানের নেতৃ পরিষদের নেতা আসমতউল্লাহ শাহিন বিত্তানি বলেন, শহীদ হাকিমুল্লাহর মৃত্যুর প্রতিশোধ আমরা পাকিস্তানের মাটিতেই নেব। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান এবং তালেবান নেতাদের মধ্যে শান্তি আলোচনার বিষয়টি আসলে শত্র“দের পাতা ফাঁদ ছিল, যাতে জনগণ বিভ্রান্ত হয়। সব রাজনৈতিক দল যারা বর্তমান সরকারের অংশ তারা আমাদের শত্র“ হিসেবে বিবেচিত হবে। তেহরিক-ই-তালেবানের মুখপাত্র শহিদুল্লাহ শহিদ সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, স্থগিত করে রাখা শান্তি আলোচনা এমনকি একটি আলোচ্য বিষয়বস্তুও ছিল না।

আরও সাহসী হয়েছেন তিনি : মুরসি পত্নী

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির স্ত্রী কারাগারে তার সঙ্গে দেখা করার পর বলেছেন, তিনি কারাগারে ‘অবিচল’ রয়েছেন। বৃহস্পতিবার মুরসির স্ত্রী নাগলা আলীসহ কয়েক জন আত্মীয় আলেকজান্দ্রিয়ার কাছে বুর্জ আল আরব কারাগারে মুরসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারা কর্মকর্তা জানান, মুরসির সঙ্গে তার স্ত্রী, কন্যা ও দুই পুত্র সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় মুরসির জন্য দুই ব্যাগ খাবার ও কিছু পোশাক নিতে দেখা গেছে পরিবারের সদস্যদের। মিসরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি গত বছর কায়রোতে সংঘর্ষকালে বিক্ষোভকারীদের হত্যায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছেন।
সামরিক বাহিনী গত জুলাইয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুরসির বিচার জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। মুরসির সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের ১৪ জন শীর্ষ কর্মকর্তারও বিচার হচ্ছে। নাজলা আলী বৃহস্পতিবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, আমি যেমন আশা করেছিলাম তেমনি দেখেছি তাকে। আল্লাহর শুকরিয়া তিনি ঠিক তেমনই আছেন। তাকে দেখে মনে হল, বুধবারও যেন তাকে দেখেছিলাম। অথচ জুলাইয়ে তিন তারিখের পর আজই (বৃহস্পতিবার) তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। তিনি আরও সাহসী হয়েছেন দমে যাননি। মোটেও ভেঙে পড়েননি তিনি, অটল রয়েছেন নিজ সিদ্ধান্তে।

ভরসা রাখুন বাংলাদেশের জনগণে

শেখ হাসিনা, মনমোহন সিং, খালেদা জিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে গত ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশসংক্রান্ত দুটি প্রশ্ন উঠেছিল। গতকালের লেখায় প্রথমটি আলোচনা করেছি। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল: আপনি কি দয়া করে বলতে পারেন যে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ভারতের স্বার্থ কী? এর উত্তর সংগত কারণেই কেতাবি: ‘আমি এখানে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে আসিনি। সে কারণে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ তবে বাস্তবে প্রতিবেশীদের ‘অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে’ ভারত প্রায় সর্বদা সক্রিয় রয়েছে। ইন্দ্রানী বাগচী হয়তো বাংলাদেশের নির্বাচনের পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণে ভারতীয় একটি প্রভাবশালী সরকারি মহলের ইঙ্গিতকেই তাঁর লেখায় ‘ভারতের’ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাদের একটি বিষয় বুঝতে হবে। অন্তত শতকরা ৩৩ ভাগ ভোট পায় বিএনপি। দিল্লির কাছে তারা ‘বিরক্তিকর’। বাংলাদেশের ওই ৩৩ ভাগের কাছে তারা সুখকর।
একে অগ্রাহ্য করে ভারত তার নিজের স্বার্থ টেকসই ভাবতে পারে না। সেটা তার অজানা নয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ইন্দ্রানী বাগচী বিএনপি-জামায়াতকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন, ‘ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবা এবং আল-কায়েদার প্রভাব চিহ্নিত করেছে।’ মনমোহন-ওবামা ইশতেহারে এদের নির্মূলে অভিন্ন লড়াইয়ের দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার রয়েছে। তাই ভারতীয় গোয়েন্দারা এমন তথ্য মার্কিনদের না জানিয়ে পারে না। এতে ড্যান মজীনা শুধু নন, এই অঞ্চলের সব মার্কিন এবং দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রদূতেরা কান খাড়া না করে পারবেন না। সেটা সত্যি ঘটলে তা ঠেকাতে গণতন্ত্র মেনে কৌশল নিতে হবে। আফগানিস্তানের ‘ক্রান্তিকাল’ সামলাতে শশব্যস্ত বহিঃশক্তিগুলোর বাংলাদেশ নীতি কী? তারা আরেকটি ক্রান্তিকাল এড়াচ্ছে, নাকি ডেকে আনার বা ক্রান্তিকাল এলে নীরব দর্শক থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে? ২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি ওয়েবচ্যাটে অংশ নিয়েছিলাম। বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের মার্কিনরা আশ্রয় দেবে কি না—এর উত্তরে মার্কিন মুখপাত্র ডেভিড লুনা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জি-৮ ক্লেপটোক্র্যাটদের (যারা সরকারি পদ ব্যবহার করে অর্থ ও সম্পদ গড়ে) বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
প্রেসিডেন্টের ৭৭৫০ নম্বর ফরমানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রবেশ স্থগিত করতে পারে। ২০০৮ সালে মার্কিন দূতাবাস ‘ক্লেপটোক্র্যাট সরকার ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক’ হিসেবে তারেকের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে সুপারিশ করল। জি-৮ ভুক্ত ব্রিটেনই হলো তারেকের নিরাপদ আশ্রয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বরে সেখানেই তারেকের সঙ্গে ৪০ মিনিট বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন পলিটিক্যাল কাউন্সেলর পুশপিন্দার ধিলন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ২০০৮ সালে তারেককে নির্দিষ্টভাবে মার্কিন ‘জাতীয় স্বার্থের’ জন্য বিপজ্জনক মনে করেছিলেন। তারেক-ধিলনের লন্ডন বৈঠকও হয়তো বর্তমানের মার্কিন ‘জাতীয় স্বার্থের’ সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নয়। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, তারেকের সঙ্গে আলোচনায় ধিলন আস্থা পাননি। সীমান্তের বাইরে তাদের কারও সঙ্গেই কারও শত্রুমিত্রতা নয়, প্রত্যেকের স্বার্থটাই স্থায়ী। বাংলাদেশের কোনো কোনো দল তা বুঝতেই চায় না। মজীনার চীন সফরের খবরটি ঠিক ছিল না। ঢাকা সফররত রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাবট স্পষ্টভাষী না হয়ে যান না। ২০০৬ সালের পর সাতটা বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি একই আবহাওয়ায় ঢাকায় এসেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির পূর্বাভাস দিতে বললে তিনি বলেন, ‘দুই নেত্রী কারাগারে যেতে চাইবেন না।’
অধুনা প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের সহিংস হওয়া মানেই হাজার হাজার লাশ। অনলাইনে ইরাক বডিকাউন্টের মতো বাংলাদেশ বডিকাউন্ট আমরা দেখতে চাই না। ২২ বছরে আড়াই হাজার লাশের খবর জেনে অনেক মুসলিম দেশ আমাদের এখনো ঈর্ষা করতে পারে। খালেদা জিয়া তাঁর নির্বাচনী ফর্মুলা ভাষণে নির্দিষ্টভাবে সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে ভারত ও অন্যদের আশ্বস্ত করতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। এতে মার্কিন ও তার মিত্ররা যত সহজে আশ্বস্ত হতে পারে, সেটা ভারত হতে পারে না। ভারতের আস্থা পেতে খালেদা জিয়াকে সম্ভবত আরও প্রমাণ দিতে হবে। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে ভারত তার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মুচকুন্দ দুবেকে বিশেষ দূত করে পাঠিয়েছিল। এরপর তিনবিঘা চুক্তি হলো। সাইফুর রহমান আওয়ামী লীগের নিন্দা কুড়িয়েও ভারতের জন্য বাংলাদেশকে উন্মুক্ত করলেন। সেই দুয়ার কিন্তু আর বন্ধ হয়নি। তবে এর ধারাবাহিকতা থাকেনি। ২০০১ সালের পরে আবার সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা চলে। কিন্তু তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। ডিজিএফআই এবং এনএসআইতে কট্টর ভারতবিরোধীদের নিয়োগ দিল্লিকে বিচলিত করে। উলফাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও দশ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনায় বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়ে। গত ১ নভেম্বর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করেন ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার সন্দ্বীপ চক্রবর্তী। তাঁর দ্বিধান্বিত উক্তি: ‘রাজনৈতিক ফলাফল যা-ই হোক, দুই দেশের আত্মীয়তা আরও বাড়বে।’ আশির দশকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন মুচকুন্দ দুবে।
সেই সময় তিনি বাংলাদেশি পণ্যে শূন্য শুল্ক দিতে ভারত সরকারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শেষে আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আফসোস করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার যুক্তি ছিল, এটা দিলে বাংলাদেশি পণ্যে ভারতের বাজার সয়লাব হবে না।’ দুঁদে দুবে দূরদর্শী ছিলেন। বহু বছরের দেনদরবারের পর ভারত ২০১১ সালে এসে প্রায় শতভাগ বাংলাদেশি পণ্যকে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দিয়েছে। দুবের কথা ফলতে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় লেগেছে। কারণ, দেওয়া-নেওয়ার কূটনীতি নানা মাত্রায় ওঠানামা করেছে। এখন ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিকূলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি এখন ৪১৭ কোটি ডলার। রাজনৈতিক সহিংসতা ও ধর্মের নামে সহিংসতার মধ্যে তফাত গৌণ। রাষ্ট্রের সন্ত্রাস, নাকি বেসরকারি বাহিনীর সন্ত্রাস, কোনটা ভয়ংকর—নাগরিকের কাছে এই তর্ক বৃথা। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে রাজনীতির র‌্যাডিকালাইজেশন বা সহিংসতার বিস্তার ঘটতে পারে। সুতরাং, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার বড় হুমকি একতরফা নির্বাচন। একটি অপেক্ষাকৃত অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং তার মধ্য দিয়ে অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠা একটি শাসনব্যবস্থা আঞ্চলিক শান্তির জন্য হুমকি। কারণ, তা আপনাআপনি সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।
ভারত যুক্তি দিতে পারে যে, তারা বারংবার ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিতে, মার্কিনদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে ও ড. ইউনূসকে ক্ষুব্ধ না করার নীতি মানিয়ে চলারই তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু তাতে আমল না দিলে তার কী করার আছে? এই মুহূর্তে বিএনপি না এলে বা তাকে না আনতে পারলে ‘সংবিধান অনুযায়ী’ নির্বাচনকে সমর্থন না দেওয়ার বিকল্প কী? বিএনপি-জামায়াত জোটের সম্ভাব্য সরকার গঠনজনিত নিরাপত্তাহীনতা, নাকি প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি ‘অবৈধ’ সরকারব্যবস্থার নিরাপত্তাহীনতা আখেরে বেশি ক্ষতিকর, সেই প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার নয়। যদিও দুটোই বিপজ্জনক। আমরা কৃত্রিম অস্ত্রোপচার নয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষে। জঙ্গিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র দুটোই সন্ত্রাসবাদ। দুই হুমকি মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা লাগবেই। রাষ্ট্রধর্ম দিয়ে সংখ্যালঘুর স্নায়ুপীড়নকারী জেনারেল এরশাদের বন্দুকের নলে প্রজাপতি দেখেছিল আনন্দবাজার গ্রুপ। এরশাদ আজও দিল্লির বিরক্তিকর বন্ধু নন। পয়গাম পাঠিয়ে দিল্লিতে তাঁর উষ্ণ আতিথেয়তা তারই প্রমাণ। সন্দ্বীপ চক্রবর্তী বাংলা-ভারত সম্পর্ক বলতে গিয়ে দুই দেশের জনগণ ‘বন্ধু নয় আত্মীয়’ কথাটা বলেন। আমরা তা খুবই মানি। তিনি প্রথমে গত ‘পাঁচ-ছয় বছরে’ বলতে গিয়েই বিপদ টের পান। তাই দ্রুত ২০০০ সাল থেকে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি কর্তব্য পালনে ভারত কোনো কোনো সময় বিফল হয়েছে, তা আমি স্বীকার করব।’ তিনি আমাদের তাঁর কথায় সম্পর্কের ব্যালান্স শিটের দিকে তাকানোর পরামর্শ দেন। আর বলেন, এতটা বিশাল অর্জন আগে কখনো দেখা যায়নি। কী দিয়ে মাপব বলুন? 
বাংলাদেশের কোনো দলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে মানুষের সঙ্গে।’ বহুল উচ্চারিত এই উক্তিটিও যথারীতি তাঁকে করতে হয়। এটা ভারতীয় কূটনীতির সীমাবদ্ধতারই স্বীকৃতি। প্রণব মুখার্জিকে সাক্ষাৎ না দিয়ে একটি পাকিস্তানবৎ আশ্চর্য আচরণ করেছিলেন বিএনপির নেত্রী। দিল্লিতে তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করার প্রতিদান তিনি দিতে পারেননি। এটুকু বাদে এও সত্য যে, ভারতীয় প্রতিনিধিগণ বিএনপির নেত্রীর সঙ্গে নিয়মিত সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে গত পাঁচ বছরে সাউথ ব্লকের বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে কি না? সোনিয়া গান্ধীর ছায়ায় মনমোহন সিংয়ের মতো নিষ্কলুষ ব্যক্তিত্ব কেন ঢাকা-দিল্লির জং ধরা রেকর্ড ভাঙতে পারলেন না? পাঁচ বছরের একটি মেয়াদে কেন অন্তত দুটি ফিরতি শীর্ষ সফরও করা গেল না? একজন মনমোহন যা পারেননি, তা একজন সম্ভাব্য নরেন্দ্র মোদি কেন পারবেন? ভারতের সম্ভাব্য নির্বাচনী ফলাফল ও তার প্রভাব ক্ষমতাসীনেরা উপেক্ষা করতে পারে না। সি. রাজা মোহন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রদায়ক সম্পাদক। তিনি বাংলা-ভারত সম্পর্কবিষয়ক একজন স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। গত ১৯ আগস্ট তিনি ওই পত্রিকায় যে নিবন্ধটি লিখেছেন, সেটি সন্দ্বীপ চক্রবর্তীর উল্লিখিত ‘ব্যালান্স শিট’ বুঝতে সহায়ক। গত প্রায় পাঁচ বছরে বাণিজ্যে-বিদ্যুতে অনেক উন্নতি ঘটেছে। রাজা মোহন তা জেনেও লিখেছেন, ‘যখন দিল্লির সঙ্গে তার সব প্রতিবেশীর সম্পর্কে ঝোড়ো হাওয়ার অধ্যায়টা শুরু হলো, হাসিনাই তখন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে ভারতের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করলেন।’ ভারত বিরোধিতার অবতার থেকেও বিএনপি কিন্তু ভারত বিরোধিতার জিগির তোলেনি। জমিজিরাত নষ্ট করে বাংলাদেশ কেবল ভারতীয় ভারী মালামাল ত্রিপুরায় পৌঁছাতে আশুগঞ্জ নদীবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ক্রান্তিকালীন বিশেষ মৈত্রী সড়ক সৃষ্টি করেছিল।
এ নিয়ে অযথা মানুষ খেপানোর রাজনীতি করেনি বিরোধী দল। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, শেখ হাসিনা ভোটের রাজনীতির জন্য নয়, জাতীয় স্বার্থে ভারতের প্রতি উদারতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিদান মেলেনি। রামমোহন তাই যথার্থই মন্তব্য করেন: ‘তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি করতে দিল্লি যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে কথোপকথক হিসেবে দিল্লির বিশ্বাসযোগ্যতায় তা ভয়ংকর আঘাত হানবে।’ ভারতে বাংলাদেশের বন্ধুগণ অন্তত উড়িয়ে দেবেন না যে, এটা ইতিমধ্যে উপকূলে আঘাত হেনেছে। বান কি মুন নাকি প্রধানমন্ত্রীকে শুধিয়েছেন, লেভেল ঠিক করতে যথেষ্ট কিছু করা হয়েছে কি? শেখ হাসিনা তাঁকে শোনান সংবিধানের কথা। বান কি মুন ‘সবার অংশগ্রহণের নির্বাচনের ওপর জোর দেন। হাসিনা পর্যবেক্ষক পাঠাতে অনুরোধ করেছেন। তবে তিনি তা রক্ষা করবেন কি না, তা পরিষ্কার নয়। ঢাকার কূটনীতিতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এবং ‘ইনক্লুসিভ’ কথাটি বেশ চালু হয়েছে। কিন্তু ইনক্লুসিভ অর্থাৎ বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচনে ভারতের সংকেত আমাদের বুঝতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কাছে কি তা স্পষ্ট? কোথাও কি ভুল হচ্ছে? আরটিভি থেকে নেওয়া ভিডিও ফুটেজ দেখলাম। অনেক সূচকে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার কথা বলছিলেন তিনি। বাংলা ভাষায় দেওয়া তাঁর বর্ণনায় ‘আত্মীয়ের’ অত্যুজ্জ্বল আভা। বলছিলেন, আত্মীয়ের প্রতি বাধ্যবাধকতা ও দায়িত্বশীলতা থাকে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, দুই দলই মনে করে, জিততে হলে ভারত ও মার্কিন আশীর্বাদ লাগবেই। শেখ হাসিনা হয়তো এখন মনে করছেন, মার্কিনকে তার লাগবে না। খালেদা জিয়া নাকি ভাবেন, ২০০১ সালে ভারত-মার্কিনের কারণে তাঁর দল বড় জয়ের মুখ দেখেছিল। এবারও মার্কিন দোয়া আছে। তবে সহিংসতা ও অশান্তি হলে তার দায়দায়িত্ব দুই প্রধান দলকেই নিতে হবে।
আমরা বলি, দিল্লি ও ওয়াশিংটনকে না বলুন। কেবল ভরসা রাখুন বাংলাদেশের জনগণে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

ব্যাপক শিল্পায়নের বিকল্প নেই by মোহাম্মদ কবীর আহমদ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন বিশেষ অবদান রাখলেও সম্প্রতি রেমিটেন্স প্রবাহ ভালো থাকার প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু উচ্চহারে রেমিটেন্স প্রাপ্তি কখনও কখনও কতটা অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে, তা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে রেমিটেন্স খাতে অনিশ্চয়তার বিষয়টি সব সময় বিবেচনায় রাখা উচিত। বাংলাদেশে ২০১৩ সালের রেমিটেন্স প্রবাহের দিকে তাকালে এক ধরনের স্বস্তি মেলে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালে রেমিটেন্স প্রবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে রেমিটেন্স খাতে বাংলাদেশের ১৫ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে। ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে রেমিটেন্স খাতে বাংলাদেশের আয় ছিল যথাক্রমে ৮.৯৩, ১০.৫২, ১০.৮৫ ও ১২.০৭ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে হয়তো আগামী বছরই আমরা ২০০৮ সালের দ্বিগুণ রেমিটেন্স অর্জন করতে সক্ষম হব। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধসও নামতে পারে। কারণ বিশ্বমন্দাসহ অনেক কারণে এ খাতে আয় কমে যেতে পারে।
গত কয়েক বছরে কৃষি খাতে বাংলাদেশের যে অর্জন হয়েছে, তা অব্যাহত রাখার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে কৃষি খাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও কৃষি খাতে যাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায় তার জন্য বিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিশেষভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কৃষি খাতের কিছু বৈজ্ঞানিক সাফল্য আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষী হতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক সাফল্যের বহুমুখী প্রয়োগের জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা জেনেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের বিস্তৃত নিচুভূমি সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে আগামীতে বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির পরিমাণ অনেক কমে যাবে। ক্ষতিপূরণ বাবদ উন্নত দেশ থেকে প্রাপ্ত অর্থ উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়ক হবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি, বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে উন্নত দেশগুলো যেসব আশ্বাস দিয়ে থাকে পরবর্তী সময়ে সেসব আশ্বাস বাস্তবায়নে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। কাজেই উন্নত দেশগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ আমরা কী পাব, তা নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের কৃষিজ উৎপাদনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তার লক্ষণ এখনই স্পষ্ট। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আবাসন ও অন্যান্য খাতে আবাদি জমির পরিমাণও কমে যাচ্ছে।
উল্লিখিত আলোচনায় এটাই স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চহারের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখার জন্য শিল্প খাত নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদ্যমান শিল্প-কারখানার উৎপাদন কোনো কারণে হ্রাস পাওয়ার আশংকা দেখা দিলে সমস্যা সমাধানে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিল্প-কারখানা বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তি একটি বড় ভূমিকা পালন করে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে যাতে কোনো রকম জটিলতা সৃষ্টি না হয় তার জন্য জ্বালানি ব্যবহারে বৈচিত্র্য আনতে হবে। আগামী দিনগুলোতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট কতটা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, বিভিন্ন জ্বালানির উচ্চমূল্যে তারই আভাস মেলে। আগামী কয়েক দশক পরও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে যাতে কোনোরকম সংকট সৃষ্টি না হয়, তা বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা শহরে নানারকম ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকশিত হয়েছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারা আরও নতুন উদ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে পারবেন। জেলা এবং উপজেলা শহরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মূল ক্রেতা দরিদ্র কৃষক। সরকারি পর্যায় থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদান অব্যাহত রাখা হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচ কমবে। এতে কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে তা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিভিন্ন পণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেলে শিল্প-কারখানার শ্রমিকসহ সীমিত আয়ের মানুষের জীবনমানও কমে যাবে। তাই নিত্যপণ্যের বাজার যাতে অস্থিতিশীল না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে। কৃষি ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারাই এক সময় যৌথভাবে বৃহৎ পরিসরে শিল্প-কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত হবেন। দেশে শিল্প-কারখানা বিকশিত হলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে প্রযুক্তির গবেষণায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। এভাবেই একদিন আমাদের দেশের গবেষকরা নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে চমক দেখাতে সক্ষম হবেন।
কম আমদানি এবং কাক্সিক্ষত মাত্রায় রেমিটেন্স প্রবাহ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু আমদানি বাড়লে এবং রেমিটেন্স প্রবাহে বিঘ ঘটলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ দ্রুত কমে যাবে। ওই রকম পরিস্থিতি মোকাবেলায় রফতানি আয় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের মান নিশ্চিত করতে পারলে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন রফতানি পণ্যের চাহিদা বাড়বে।
রফতানি পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে অনেক কৃষিজ পণ্য রফতানির উপযোগী হয় না। ওই পরিস্থিতিতে উৎপাদনকারী স্থানীয় বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। এসব সমস্যা দূর করার জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য কম সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। প্রযুক্তির গবেষণা একটি দেশকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তার অন্যতম দৃষ্টান্ত ভারত। সাধারণভাবে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির নির্মাতা দেশের কথা বললে যেসব দেশের নাম আলোচনায় আসে, সেখানে ভারতের নাম খুব একটা আলোচিত হয় না। অথচ স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে মঙ্গল অভিযানে অংশ নিয়ে দেশটি নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। মঙ্গল অভিযানের জন্য তৈরি করা নাসার মহাকাশ যানের তুলনায় ভারতের তৈরি মহাকাশ যানের খরচ পড়েছে অনেক কম। এটাও একটা বড় ধরনের রেকর্ড। মাত্র কয়েক দশকের মহাকাশ গবেষণার মধ্য দিয়ে ভারত আজকের অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছে। এ দৃষ্টান্ত বিবেচনায় রাখলেই স্পষ্ট হয় প্রযুক্তির গবেষণা একটি দেশকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে যাতে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার নজর রাখতে হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির সময়ও যাতে কলকারখানার উৎপাদন অব্যাহত থাকে, তা নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য জরুরি।
পরিবেশ সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহার কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নানারকম চাপ আসতে থাকবে। সম্প্রতি জাপানে সংঘটিত দুর্ঘটনার পর পরমাণু-বিদ্যুতের বিপক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত জোরালো হচ্ছে। পরমাণু-বিদ্যুৎবিষয়ক বিদ্যমান প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান জনমতের ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন আসবে না, এমনটাই অনুমান করা যায়। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিরাপদ জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের ব্যবহার বাড়তে থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির মূল্যও দ্রুত বাড়তে থাকবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেভাবে ব্যাপক শিল্পায়ন শুরু হয়েছে, উন্নয়নের এ ধারা আরও গতিশীল হবে, এটাও অনুমান করা যায়। উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ওই পরিস্থিতিতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা কত কঠিন হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আগামী দিনগুলোতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই রফতানি বাণিজ্যে টিকে থাকতে হবে। তখন এমনও হতে পারে, নামমাত্র লাভে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এসব পরিস্থিতি যেসব দেশ যত সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে, রফতানি বাণিজ্যে তাদেরই আধিপত্য তত বিস্তৃত হবে। আগামী দিনের প্রতিযোগিতার বিশ্বে আমরা যাতে আমাদের বাণিজ্যের প্রসার অব্যাহত রাখতে পারি তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আগামী দিনের বাস্তবতার কথা বিবেচনায় রেখে সব দেশই দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে চেষ্টা করবে। ওই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণায় যে দেশে যত সাফল্য আসবে, তারাই তত দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যাপক উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রতিটি দেশ বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরও প্রায় সাত দশক পর বিশ্বমন্দার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে অনুমান করা যায়, আগামীতেও যে কোনো সময় পরিস্থিতির আরও অবনতির আশংকা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সব দেশই আগাম প্রস্তুতির কথা ভাবছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে আগামীতে সৃষ্ট যে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবেলার জন্য আমাদের দেশে বিদ্যমান শিল্প-কারখানার উৎপাদন যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুুক্তির গবেষণায় যাতে এগিয়ে থাকা যায় সে জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
মোহাম্মদ কবীর আহমদ : সাংবাদিক

প্রয়োজন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি by সুনীল শুভ রায়

রাজধানী ঢাকা শহরে একটি বিশেষ চত্ব¡র ও একটি স্কয়ার রয়েছে। একটির নাম ‘শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার’ আর একটির নাম ‘শহীদ ডা. মিলন চত্বর’। শহীদ হওয়া, নিহত হওয়া, মারা যাওয়া কিংবা মেরে ফেলা, মৃত্যুবরণ করা, গুম হওয়া, খুন হওয়া অথবা আত্মহত্যা করা- ভিন্নার্থক এ শব্দগুলোর যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন, মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে ইহলোক থেকে বিদায় নেয়া। যে কোনো মৃত্যুই এ লৌকিক জগতের সবচেয়ে শোকের ও বেদনার। তাই কোনো মৃত মানুষের প্রতি অসম্মান করা যায় না এবং সেটা করা চরম অন্যায় ও অনৈতিক। তাই যাদের নামে ঢাকায় স্কয়ার বা চত্ব¡র হয়েছে- তারা শহীদের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত কি-না সে প্রশ্নে যাব না। তাদের ইহজগৎ থেকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে- এটাই বড় শোকের ও বেদনার- সে কথাই মেনে নেব। তাই তাদের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাব, সম্মান নিবেদন করব। তবে তারা প্রাণ হারালেন কীভাবে, কেন তাদের জীবন বিসর্জন দিতে হল- এর জন্য তারা যদি শহীদের মর্যাদা পেতে পারেন, তাহলে নূর হোসেন বা ডা. মিলন পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে শহীদের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাদের শহীদের মর্যাদা দিয়ে স্কয়ার কিংবা চত্বর বানানো হবে কোথায়? তাদের জন্য এলাকা বরাদ্দ করতে কত জায়গার প্রয়োজন হবে?
পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে নূর হোসেনের পিঠে গুলি লাগার কথাই বলা হয়েছে। সে তখন মিছিলের সামনে ছিল। পেছনে তো পুলিশ ছিল না। ছিল তার সহযোদ্ধারা। তাহলে কে গুলি করল তাকে। দোষ দেয়া হল রাষ্ট্রপতি এরশাদের সরকারকে। তারপর যারা তাকে শহীদ বানিয়ে ফায়দা লুটল, তাদের কাউকে নূর হোসেনের পরিবারের পাশে দেখা যায়নি। দেখা গেছে তাকে, যার কাঁধে নূর হোসেনের হত্যার দায় চাপানো হয়েছিল। সেই রাষ্ট্রপতি এরশাদ কারামুক্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন নূর হোসেনের পরিবারের কাছে। প্রতি মাসে তার বাবাকে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। এখন প্রতি বছর ১০ নভেম্বর ‘নূর হোসেন দিবস’ পালন করা হয়। এইচএম এরশাদের বানানো চত্বরের নাম ‘নূর হোসেন স্কয়ার’ বানিয়ে সেখানে ফুল দেয়া হয়। অলক্ষ্যে নূর হোসেনের বিদেহী আত্মা কী বলে জানি না। হয়তো বলে- ‘তুমি মহারাজ, সাধু সেজে আজ, আমারে শহীদ বানালে বটে/তোমাদের কথা, তোমাদের কাজ- জেগে আছে আমার স্মৃতিপটে’।
আসা যাক শহীদ ডা. মিলনের কথায়। যিনি আন্দোলনের মাঠে-ময়দানে নেই, সংগ্রামে নেই, ধর্মযুদ্ধেও নেই যে তিনি বাঁচলে গাজী, মরলে শহীদ হবেন, তিনি পিজি হাসপাতাল থেকে রিকশাযোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। তিনি ঢাকা ভার্সিটি এলাকায় দু’দল ছাত্রের ক্রসফায়ারের মধ্যে পড়লেন। আচমকা গুলি তার বুকে লাগল। তার নামে চত্ব¡র হয়ে গেছে। কিন্তু তারপর যা ঘটেছে- তার মূল্যায়ন কীভাবে হবে? তারপর যারা আন্দোলনের মাঠে, সংগ্রামের ময়দানে জীবন দিয়েছে, তাদের নামে চত্বর বা স্কয়ার হয় না কেন? ‘স্বৈরতন্ত্র’ নিপাত করে তো ‘গণতন্ত্র’ আনা হয়েছে। কিন্তু সেটা কোন গণতন্ত্র? এ গণতন্ত্রে কি হাজার হাজার নূর হোসেন কিংবা ডা. মিলন প্রাণ দেয়নি? যদি দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের নামে চত্বর বা স্কয়ার হচ্ছে না কেন?
অতি সম্প্র্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ব্যানার হেডিং হয়েছে- ‘হত্যার রাজনীতি, লাশের মিছিল’। তথ্যে ভরা প্রতিবেদন ছিল সেটি। সেখানে বলা হয়েছে, ২২ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি হয়েছে ২ হাজার ৩৮৮ জনের। তার মধ্যে বিএনপির ১৯৯১-৯৬ সময়ের শাসনামলে ১৭৪ জন, আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-০১ আমলে ৭৬৭ জন, বিএনপির ২০০১-০৬ আমলে ৮৭২ জন, তত্ত্বাবধায়কের ২০০৭-০৮ আমলে ১১ জন এবং বর্তমান আওয়ামী লীগের ২০০৯-১৩ আমলে এ পর্যন্ত ৫৬৪ জন মানুষ রাজনৈতিক আন্দোলনে ইহলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের শহীদ বলা হয় না, তাদের নামে স্কয়ার, চত্ব¡র কিংবা কোনো স্মৃতিসৌধ হয় না। নূর হোসেন বা ডা. মিলনকে শহীদ বলা হলে তারাও নিশ্চয়ই শহীদ। আর এ শহীদের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে- সেই অজানা আতংক গোটা দেশবাসীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সঠিক গণতন্ত্র আবার কবে মুক্তি পাবে- তার প্রতীক্ষায় নীরবে গোটা জাতিকে প্রহর গুনতে হচ্ছে। সামনের রাজনীতি কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের পুরো ৯ বছর সময়ের মধ্যে মোট যতজন মানুষ মারা গেছে, পরবর্তী কথিত গণতান্ত্রিক শাসনামলের মধ্যে যে কোনো একদিনে তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষ মারা গেছে ও যাচ্ছে। সামনে এ পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সে কথা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। তারপরও আমাদের ভাগ্যকে পালাক্রমে ফুটন্ত কড়াই আর জ্বলন্ত চুলার মধ্যে সমর্পণ করতে হচ্ছে।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দাবি হচ্ছে দুই নেত্রীর সংলাপ। মনে হচ্ছে, দুই নেত্রী সংলাপে বসলেই সারা বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে মিলন মঙ্গলিকের সুর বেজে উঠবে, নহবত বাজবে, দুই দলের মানুষ হানাহানি-মারামারি-কাটাকাটি ভুলে প্রেমালিঙ্গনে মেতে উঠবে! সংলাপ হলে কী হবে তা তো ৩৭ মিনিটের ফোনালাপে বোঝা গেছে। নৈতিক হোক আর অনৈতিকই হোক- ফোনালাপটি প্রচার হওয়ায় ভালোই হয়েছে। জাতি প্রকৃত রূপটা দেখেছে। প্রেস সচিব সাহেবরা মোলায়েম সুরে জাতিকে যা জানিয়েছিলেন সেটা যে আসল চেহারা নয়, মানুষ তো তা জানতে ও বুঝতে পেরেছে। ৩৭ মিনিটের ঝগড়া ও আলোচনার মধ্যে দেশের কথা, জনগণের কথা কত সেকেন্ড ছিল? গোটা জাতির মধ্যে একটা আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, সম্ভাব্য টেলি সংলাপের মধ্য দিয়ে সংকট উত্তোরণের একট পথ উন্মোচন হবে। কিন্তু সেই স্যাম্পলে যা দেখা গেল, তাতে গোডাউনের মধ্যে কী আছে বা থাকতে পারে, তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। বলতে খারাপ লাগলেও বলতে হয় যে, সংলাপে বসার অসম্ভব কাজটি যদি সম্ভব হয়ও তাহলে সেই সংলাপ মঞ্চের মাঝখানে লোহার জালের একটা বেড়া থাকবে তো?
পাদটিকা : সম্ভাব্য সংলাপ এখন এক অর্থহীন সান্ত্বনা। সংলাপ হলেও কোনো লাভ হবে না। এরা কী দিয়েছেন এ জাতিকে? নিয়েছেন তো অনেক। আড়াই হাজার মানুষের রক্তের মূল্য কী দিয়ে পরিশোধ হবে? কেন এ রক্ত ঝরল? বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে, যাদের স্বাধীনতা অর্জনে এত রক্ত ঢালতে হয়নি। এ রক্ত নেয়া হয়েছে শুধু একটি লোভের বশে। আর তা হচ্ছে ক্ষমতা। এখন লড়াই চলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য। কেন এ চাওয়া- নিশ্চয় জনগণের কল্যাণের জন্য নয়। চাওয়া হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। আর একপক্ষ সংবিধানের অজুহাত দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক দিতে চায় না। এই না চাওয়া কি শুধুই সংবিধানকে ভালোবেসে? নিশ্চয় এর পেছনে আছে ক্ষমতা আগলে রাখার মানসিকতা। এর আগে ১৯৯৬ সালে যখন এ তত্ত্বাবধায়কের জন্য আন্দোলন হয়েছিল, সেটাও দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য ছিল না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যা করেছে, এখন বিএনপি তাই করছে। ওই সময় বিএনপি যেভাবে সংবিধানের অজুহাত দিয়েছে, এখন আওয়ামী লীগ তাই করছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকবে? এখন মুক্তির উপায় খোঁজার সময় এসে গেছে। এখনই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত না নিলে সামনের ঘোর অমানিষার অবসান ঘটবে না। অবিলম্বে প্রয়োজন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। সেই শক্তি এখনও আছে, তবে তা বিচ্ছিন্নভাবে। তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অতীতের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, মত-পার্থক্য ভুলতে হবে। চক্ষু লজ্জা মুছতে হবে।
গোটা জাতি আজ সংকটাপন্ন। প্রকৃত জাতীয়তাবাদ, ইসলামী মূল্যবোধ, স্বাধীনতার চেতনা, অসাম্প্রদায়িক আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত ধারার সঙ্গে সচেতন নাগরিক সমাজের ঐক্যের মাধ্যমে যদি বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে ওঠে- গোটা জাতি সেই মঞ্চে একত্রিত হবেই। আজকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আসছে দিনের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থানই একমাত্র পথ। নতুন করে শহীদের তালিকা আর প্রত্যাশিত নয়। শহীদের নামে কোনো চত্ব¡র-স্কয়ার-স্মৃতিসৌধও আর প্রত্যাশিত নয়। যারা যা করেছেন, এখন তার জন্য ক্ষমা চেয়ে বিদায় হোন- জাতিকে মুক্তি দিন।
সুনীল শুভ রায় : লেখক ও সাংবাদিক

মানবতার ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব

জন্মগতভাবে বিশ্বের সব মানুষ রক্তসম্পর্কীয় গভীর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। তারা সবাই মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.) এবং আদি মাতা বিবি হাওয়া (আ.)-এর সন্তান। এ কারণেই জগতের সব মানুষ পরস্পর ভাই ভাই। একই পিতামাতা থেকে জন্মগ্রহণ করে বংশপরম্পরায় মানুষ বিভিন্ন জাতি-ধর্ম, দল-মত, সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি; যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
প্রাক-ইসলামি যুগে আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ, সংঘাত-সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও শত্রুতা বিরাজ করছিল। কথায় কথায় ঝগড়া-বিবাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, খুনোখুনি ও বিনা কারণে রক্তপাত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। প্রতিশোধ গ্রহণই ছিল তাদের নেশা। ফলে গোটা আরব জাতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এহেন নিশ্চিত ধ্বংসোন্মুখ কঠিন অবস্থা থেকে তাদের ইসলামই রক্ষা করেছিল। কাজেই মানবজাতির জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থাস্বরূপ ইসলাম হচ্ছে মুসলমানদের প্রতি সৃষ্টিকর্তার একান্ত অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে এবং তিনি তোমাদের হূদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, যাতে তোমরা সৎ পথ লাভ করতে পারো।’
(সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩) ইসলাম-পূর্ব মানবজাতি একে অপরের শত্রুভাবাপন্ন ছিল। এই শত্রুতা এমন চরম আকার ধারণ করত যে তারা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হতো আর এই যুদ্ধ বহুদিন যাবৎ স্থায়ী থাকত। শান্তির ধর্ম ইসলাম এক মুসলমানের সঙ্গে অন্য মুসলমানের ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপন করেছে এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাদ মীমাংসার তাগিদ দিয়েছে। জাহেলি যুগে আরব ও অনারবদের মধ্যে সর্বদাই দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগে থাকত। ইসলাম তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলে ঐক্যবদ্ধ করল। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘অনারবদের ওপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং আরবদের ওপরও অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ এতে প্রাক-ইসলামি যুগের যাবতীয় কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ এবং ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত-সংঘর্ষ ও হানাহানি অপসৃত হয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় তাওহিদভিত্তিক মানবতার ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের সমাজ, যা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে নিতান্তই বিরল। ইসলামই সব মুসলমানকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার হাত প্রসারিত করল। তাই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একতাবদ্ধ হয়ে এক মুসলমান অপর মুসলমানকে কোনো প্রকার দুঃখ-কষ্ট দিতে পারে না এবং অন্যায়-অত্যাচার বা জুলুম-নির্যাতন করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তাকে অত্যাচার করবে না এবং তাকে শত্রুর কাছে সমর্পণও করবে না।
আর যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে, আল্লাহ তার প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন।’ (বুখারি ও মুসলিম) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো। সে অত্যাচারী হোক অথবা অত্যাচারিতই হোক, যদি সে অত্যাচারী হয় তবে তাকে তার অত্যাচার করা হতে বাধা প্রদান করো। আর যদি সে অত্যাচারিত হয় তবে তাকে সাহায্য করো।’ (দারেমি) আরববাসী যে কদর্য অবস্থার মধ্যে নিপতিত ছিল তা থেকে আল্লাহ তাদের রক্ষা করেছেন এবং বলেছেন এখন থেকে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে, কাজেই তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহ ও বিবাদ-বিসম্বাদে লিপ্ত হবে না। ইসলাম পৃথিবীতে বিরাজমান সর্বপ্রকার শত্রুতা, বিভেদ ও বৈষম্য বিদূরিত করে দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে; আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৬) ঐক্য শব্দের অর্থ হলো একতা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ফলে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দিক দিয়েও মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
যেমন দুটো দেশ বা দুটো দল ঐক্যবদ্ধ হলে বা শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় উপনীত হলে তখন আর কোনো অশান্তি নেই। শান্তি চুক্তিতে ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি হিসেবে তাদের গড়ে তুলতে এ সমুদয় সাযুজ্য কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। প্রকৃতপক্ষে ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন হলো একজন মানুষ অন্য মানুষের প্রতি দয়া, মায়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করবে। তারা একে অপরের সুখে সুখী হবে এবং একে অপরের দুঃখে দুঃখী হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি মুমিনদের তাদের পারস্পরিক দয়া প্রদর্শন, পারস্পরিক ভালোবাসা প্রদর্শন এবং পারস্পরিক সহানুভূতি প্রদর্শনের ব্যাপারে একই দেহের ন্যায় দেখবে। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ কষ্ট অনুভব করে তখন এ জন্য সব দেহই নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে।’ (বুখারি ও মুসলিম) অতএব, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে মানবজাতিকে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। এক দল বা গোত্র অন্য দল বা গোত্রের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের ওপর আভিজাত্য প্রকাশ করবে না। সবার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সৌহার্দ্য ভাব স্থাপন করতে হবে। সমাজে মানুষে মানুষে যে সংঘাত-সহিংসতা, কলহ-বিগ্রহ, হানাহানি, খুনোখুনি, লুটতরাজ, হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা চলছে, এসব অনাচার থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সবাইকে মানবতার ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে by বিভুরঞ্জন সরকার

২৭, ২৮ ও ২৯ অক্টোবর টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালের পর আবার ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর ৬০ ঘণ্টার হরতাল দিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ হরতাল কর্মসূচির কথা বলা হলেও আজকাল বেশির ভাগ হরতালই শান্তিপূর্ণ থাকে না। এখন হরতাল মানেই বোমাবাজি, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, নিরীহ মানুষ হত্যা, রক্তারক্তি, হানাহানি ইত্যাদি। ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবরের ৬০ ঘণ্টার হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়নি। ওই হরতালকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ২০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকশ’। ককটেল বিস্ফোরণে কারও কারও শরীর ঝলসে গেছে, কারও বা চোখ নষ্ট হয়েছে। আবার ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বরের হরতালও যে শান্তিপূর্ণ হবে না, তা আগে থেকে বলা যায়। এখন হরতাল মানেই যে লাশ সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। বিরোধী দল কর্মসূচি দেবে, সরকার ও সরকারি দল প্রতিহত করার ঘোষণা দেবে, আর মানুষের লাশ পড়বে। হিংসা-হানাহানি-রক্তপাতের ধারা থেকে দেশের রাজনীতি কবে মুক্ত হবে সেটা কেউ বলতে পারে না। যারা রাজনীতি করেন তারা মানুষের জন্যই রাজনীতি করেন বলে দাবি করে থাকেন, অথচ রাজনীতির নামে মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে খেলা করতে তারা একটুও দ্বিধা করেন না। আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে মানবিকতা দূর হয়েছে, নিষ্ঠুরতা গ্রাস করেছে রাজনীতিকে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন পর ফোনালাপ হওয়ায় আশা করা গিয়েছিল যে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনীতিতে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে তা দূর হবে, সংঘাতের পথ থেকে সংলাপের পথে অগ্রসর হবে রাজনীতির ধারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করবেন- এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর মানুষের মধ্যে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা হতাশায় পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি। দুই নেত্রীর ফোনালাপের বিস্তারিত বিবরণ গণমাধ্যমে প্রচারের পর মানুষ বুঝতে পেরেছেন, দুই নেত্রীর মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তা সহজে দূর হওয়ার নয়। বিভিন্ন মহল থেকে অনেক দিন ধরেই এটা বলা হচ্ছিল যে, দুই নেত্রী একসঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করলেই দেশের রাজনৈতিক সংকট দূর হয়ে যাবে। কিন্তু এ ধারণাটা যে বাস্তবভিত্তিক নয়, দুই নেত্রীর রাজনৈতিক অবস্থান যে দুই বিপরীত মেরুতে সেটা বুঝতে না পারার জন্যই দুই নেত্রীর বৈঠকের ওপর কেউ কেউ এতদিন অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে এসেছেন। ২৬ অক্টোবর অনেক নাটকীয়তার শেষে সন্ধ্যা ৬টার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। তাদের ৩৭ মিনিটের ফোনালাপ মোটেও সুখকর ছিল না। শুরু থেকেই বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন আক্রমণাত্মক এবং কিছুটা উত্তেজিত। তার ভাষা ছিল রূঢ় ও অসৌজন্যমূলক। শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তাকে সালাম দিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন। অথচ পাল্টা কুশল জিজ্ঞাসা করার সৌজন্য বিরোধীদলীয় নেতা দেখাননি। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর জন্য যে টেলিফোন তা শেষ পর্যন্ত তপ্ত বিতর্কে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী নমনীয়তা দেখালেও বিরোধীদলীয় নেতা একের পর এক আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে থাকলে প্রধানমন্ত্রীও পাল্টা জবাব দিতে থাকেন। এ পুরো ফোনালাপ যারা টিভিতে শুনেছেন কিংবা সংবাদপত্রে পড়েছেন, তারা এটা স্বীকার করবেন যে, দুই নেত্রীর ফোনালাপ সমঝোতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার বদলে আনুষ্ঠানিক ঝগড়াঝাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। কেউ কেউ সেজন্য এমন মন্তব্যও করছেন যে, দুই নেত্রীর এই ফোনালাপটি না হলেই বরং ভালো হতো। এ ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী যে খুশি হতে পারেননি, বরং যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন, সেটা বোঝা যায় তার বক্তব্য থেকে। তিনি গণভবনে এক বৈঠকে বলেছেন, ‘যেসব কথা আমাকে শুনতে হল, আমার ঠিক ওই ঝগড়া বা ওই ধরনের ইচ্ছা ছিল না। অনেক অপমান সহ্য করেও আমাকে চুপ থাকতে হয়েছে। দেশের মানুষের কথা ভেবেই এসব অবাস্তব কথা সহ্য করেছি।’ এরপর শেখ হাসিনা সহসা আর খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবেন বলে যারা আশা করেন, তাদের অতি আশাবাদী বলা গেলেও বাস্তববাদী বলা যাবে না। দুই নেত্রীর ফোনালাপ গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কারা এ ফোনালাপ প্রকাশ বা প্রচার করলেন সেটা জানা না গেলেও বুঝতে কষ্ট হয় না যে, সরকারি তরফেই এটা প্রচার-প্রকাশে সহযোগিতা করা হয়েছে। অবশ্য একটি দৈনিকে এটা ফাঁস হওয়ার পেছনে বিরোধীদলীয় নেতার তথ্য সচিবের হাত আছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ফোনালাপ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটা জানার অধিকার জনগণের আছে। কারণ এটা রাষ্ট্রীয় ফোনালাপ, জনগণের অধিকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিএনপির তরফ থেকেই প্রথম এটার অনেক কিছু পেপারে ছাপিয়ে দেয়। কাজেই পেপারে দিয়ে দেয়ার পর পুরোটাই মানুষের শোনা ভালো। আমি কী শুনলাম, উকি কী বললেন?’ অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফোনালাপ গণমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনাকে শিষ্টাচার ও নীতিবহির্ভূত বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটা করা হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। ফোনালাপের আংশিক বিবরণ যখন সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়, তখন অবশ্য বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বা ক্ষুব্ধ হয়নি। পুরোটা প্রকাশের পর হয়তো তাদের অস্বস্তি বেড়েছে। কারণ তাদের নেত্রীর বাচনভঙ্গি যে খুব শোভন ছিল না, একজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় যে সাধারণ শিষ্টাচার মেনে চলতে হয়, রাগের কারণে তিনি সেটা সম্ভবত ভুলে গিয়েছিলেন। আবার এমনও হতে পারে তিনি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বীকারই করেন না। একপর্যায়ে কিন্তু তিনি বলে ফেলেছেন, ‘আপনি তো প্রধানমন্ত্রী নন। দলের প্রধানমন্ত্রী। আপনি তো দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে আপনি যেতে পারেননি। ...’
ফোনালাপ প্রকাশের ব্যাপারে কেউ কেউ তুলেছেন নৈতিকতার প্রশ্ন অর্থাৎ তারা মনে করেন নীতিগতভাবে এটা ঠিক হয়নি। আবার কেউ তুলেছেন আইনি প্রশ্ন। তবে এসব বিতর্ক এ ইস্যুতে এ কারণেই গৌণ যে, এটা ছিল একটি রাষ্ট্রীয় সংলাপ। দুই নেত্রী কোনো গোপন আলাপে অংশ নেননি। তারা পরস্পর কী কথা বলেছেন, দেশের সংকট সমাধানে তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরেছেন কিনা সেটা জানার আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল দেশবাসীর। বলা যায় রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় ছিল গোটা জাতি। কাজেই তথ্য জানার যে অধিকার নাগরিকদের আছে, সে অনুযায়ী দুই নেত্রীর ফোনালাপ পুরো প্রকাশ করা অনেকের কাছেই অসমীচীন বলে মনে হয়নি। তবে এটাও ঠিক যে, দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং দুই নেত্রীর মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন মহলের উদ্যোগ-তৎপরতার কথা বিবেচনা করে ফোনালাপের বিস্তারিত বিবরণ এখনই প্রকাশ না করলেই হয়তো ভালো হতো। তাহলে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো না। অবশ্য দুই পক্ষ থেকে যদি আলাদা আলাদাভাবে নিজ নিজ পছন্দের অংশটুকু গণমাধ্যমে ফাঁস করা হতো, তাহলে বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি যে মাত্রায় হতো, এখন পুরোটা প্রকাশ হওয়ায় তা থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া গেছে। এখন যারা দুই নেত্রীর বক্তব্য পড়েছেন, শুনেছেন, তারা সবাই বিবেচনা করার সুযোগ পেয়েছেন, কোন নেত্রী সমস্যা সমাধানে কতটা আন্তরিক।
৩৭ মিনিটের ফোনালাপে দুই নেত্রীর মধ্যে কাজের কথা হয়েছে খুব সামান্য সময়ই। অথচ এ দীর্ঘ সময় যদি তারা নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতেন, তাহলে হয়তো পরিবেশটা ভিন্ন হতে পারত। এতদিন যারা মনে করতেন যে খোঁচা দিয়ে কথা বলতে কিংবা কটাক্ষ করতে শেখ হাসিনার জুড়ি নেই- তারা এবার বিস্মিত হয়েছেন খালেদা জিয়ার কথা শুনে। খালেদা জিয়া যে বাঁকা কথায় এত পটু এটা এ ফোনালাপ প্রকাশ না পেলে অনেকেরই অজানা থেকে যেত। বিরোধীদলীয় নেতার ‘রেড টেলিফোন’ ডেড হওয়া নিয়ে দুই নেত্রীর মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাহাস হয়েছে। আলোচনার প্রায় শুরুতেই খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আপনারা গভর্নমেন্ট চালান, কী খবর রাখেন? গভর্নমেন্ট চালাচ্ছেন, এ খবর রাখেন না যে বিরোধীদলীয় নেতার ফোন ঠিক আছে কিনা।’ এরপর শেখ হাসিনা যখন বলেন, ‘আমি যখন ফোন করেছিলাম, সেটা ভালো ছিল’, তার উত্তরে বেগম জিয়া বলেছেন, ‘হঠাৎ করে মৃত টেলিফোন জেগে উঠবে? আপনার টেলিফোন এত পাওয়ারফুল যে ডেড অবস্থায় জেগে উঠবে?’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতাকে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় গণভবনে আলাপ-আলোচনার জন্য দাওয়াত দিলে খালেদা জিয়া হরতালের কারণে সেদিন যাওয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা ‘জাতির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে হরতাল প্রত্যাহার’ করে দেয়ার অনুরোধ জানালে বেগম জিয়া হরতাল প্রত্যাহার করবেন না উল্লেখ করে উল্টো বলেন, ‘দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থেই আমি এ হরতাল দিয়েছি।’ ‘হরতালের নামে মানুষ খুন করা অব্যাহত রাখবেন’- প্রধানমন্ত্রীর এ জিজ্ঞাসার জবাবে বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেন, ‘আমি মানুষ খুন করতে চাই না, আপনারা মানুষ খুন করছেন। ... আপনাদের তো পুরনো অভ্যাস। আপনারা সেই স্বাধীনতার পর থেকে ’৭১-এ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখনও এ হত্যা করেছেন...।’ শেখ হাসিনা জানতে চান, ‘একাত্তরে আমরা হত্যা করেছি?’ খালেদার জবাব, ‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ একপর্যায়ে শেখ হাসিনা ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছেন’ বললে খালেদা জিয়া জবাব দেন, ‘দেখেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আপনারা করিয়েছেন। আপনাকে হত্যা করতে কেউ চায়নি। ... আপনি যত থাকবেন, তত আমাদের জন্য ভালো। ... আপনি যত এ রকম অশ্লীল ভাষায় কথা বলবেন, তত আমাদের জন্য ভালো।’ শেখ হাসিনা নামাজ পড়েন বলে উল্লেখ করায় জবাবে খালেদা জিয়া বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, ‘আপনি নামাজ পড়েন, কোরআন পড়েন... আরও কত কী পড়েন। সব জানি।’
১৫ আগস্ট কেক কাটা, জন্মদিন পালন করার প্রসঙ্গ শেখ হাসিনা উঠালে বেগম জিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে জবাব দেন, ‘... এটা বলবেন না। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে কোনো মানুষের জন্ম হবে না? কোনো মানুষ পালন করবে না? এগুলো বাদ দেন। ... অনেক কথা বলেন জিয়াউর রহমানকে। আরে জিয়াউর রহমান তো আপনাদের নতুন জীবন দান করেছেন। ... আপনারা তো বাকশাল দিলেন। ... আপনারা জিয়াউর রহমানের বদৌলতে বাকশাল হতে পেরেছেন।’ এখানে বেগম জিয়ার বক্তব্যে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে বলে সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং ২০ আগস্টেই বাকশাল এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো বাতিল করেছিলেন। মোশতাক ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দান করেছিলেন। বাকশাল বাতিল করার পর স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগসহ বাকশালে অঙ্গীভূত রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল, এখানে জিয়ার কোনো অবদান বা ভূমিকা নেই। শেখ হাসিনা ৬০ ঘণ্টার হরতাল প্রত্যাহারের জন্য বিরোধীদলীয় নেতাকে বারবার অনুরোধ করলে খালেদা জিয়া একপর্যায়ে বলেন, ‘না আমি হরতাল প্রত্যাহার করতে পারব না। এটা তো আমার ডিসিশন নয়। এটা ১৮ দলের ডিসিশন। আমি এটা কী করে একলা করব।’ অথচ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি বলেন যে, এখন আপনি নিরপেক্ষ সরকারের জন্য রাজি আছেন, তাহলে আমি হরতাল উইথড্র করে নেব।’ এ ক্ষেত্রে ১৮ দলের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি ভুলে গেলেন কেন?
দুই নেত্রী আলোচনায় বসলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে যারা মনে করেন, তারা দুই নেত্রীর ৩৭ মিনিটের ফোনালাপে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছেন বলেই মনে হয়। এ ফোনালাপ দুই নেত্রীর দূরত্ব ঘোচাতে সহায়ক হয়নি। এ ফোনালাপটি না হলেই ভালো হতো বলে যারা মনে করছেন, তাদের এ মনে করাটি একেবারে বেঠিক নয়। কারণ এ ফোনালাপে দুই নেত্রীর মুখোমুখি বসে সংলাপ করার পরিবেশ তৈরি না হয়ে বরং তা বিঘিœত হয়েছে বলেই মনে হয়। সংলাপ নিয়ে সরকারপক্ষ আর নতুন কোনো উদ্যোগ না নেয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলও নিজেরা কোনো উদ্যোগ নেবে না। অথচ দেশের মানুষ দুই নেত্রীর সংলাপের জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। কারণ সংলাপ না হওয়ার পরিণতি যে অনিবার্য সংঘাত, সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সংঘাত কারও কাম্য নয়। সবাই সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ না দেখে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা না কমে বরং বাড়ছে।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জনগণের নির্বাচিত নেতাদের কাছেই জনগণ অসহায় by মইনুল হোসেন

আমরা সবাই রাস্তার সহিংসতা এবং হরতালের রাজনীতির নিন্দা জানাই। সাধারণ মানুষরাই জানমালের ক্ষতি স্বীকার করে এর চরম মূল্য দিয়ে থাকে। সহিংসতার পরিমাণ ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরেই বেশি এবং জীবনহানির ঘটনা ঢাকার বাইরেই বেশি ঘটছে। সব জায়গার সব ঘটনার তথ্যাদি আমরা পাইও না। যারা হরতাল আহ্বান করেন, তারা কখনও চান না হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হোক। আমরা যদি সত্যি সত্যি জনসাধারণকে বিরোধীদলীয় সহিংস হরতালের রাজনীতি থেকে বাঁচাতে চাই তাহলে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে এবং সমস্যাকে যথাযথ পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি করতে শিখতে হবে। জনগণের নির্বাচিত নেতাদের কাছেই জনগণ অসহায় থাকবে, তা গ্রহণীয় হতে পারে না। আর বিচার করার সময় নির্বাচনী রাজনীতির ছদ্মাবরণে আমরা যে দীর্ঘকাল ধরে অগণতান্ত্রিক সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন করে আসছি, সে ব্যাপারে অমনোযোগী হলে চলবে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিচার বিভাগসহ সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। যখন আমি বলি আমরা তখন আমি আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংবাদপত্রকে বুঝিয়ে থাকি। দুঃখের বিষয়, নির্বাচন নিয়ে আজ যে সংকট, তা তৈরির সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
হরতালের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে রাস্তার সহিংসতায় প্রাণহানি ও মানুষের ভোগান্তি নিয়ে অন্যদের মতো আমরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছি। প্রতিদিন হরতালকেন্দ্রিক নৃশংস কর্মকাণ্ড বাড়তে দেখে হৃদয় বেদনাভারাক্রান্ত হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিকে নানাভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে গিয়ে নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্যে প্রতিদিন দগ্ধ হচ্ছে। এ নিয়ে নেতাদের কোনো দুর্ভাবনা নেই। মনে হয়, কে কিভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করবেন সেটাই তাদের একমাত্র চিন্তা।
আমরা অসহায় বোধ করার কারণে বিবেকের তাড়নায় লজ্জার মাথা খেয়ে বাইরের বন্ধুদের কাছে আবেদন করছি আমাদের উদ্ধার করতে আসার জন্য। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমাদের নির্বাচন ক্ষমতালোভী রাজনীতির কারণে কিভাবে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে, সেটা আমরা সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এ রাজনীতিকে টেঙ্গো নাচের সঙ্গেই তুলনা করা যায়, যেখানে মাত্র দু’জনেই নৃত্য পরিবেশন করতে পারে। সরকার এবং বিরোধী দলকে ঠিকভাবে খেলতে হবে- আইনহীনতা ও সহিংসতায় যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে। তারা সেভাবে খেলতে ব্যর্থ হলে দোষ বা দায়-দায়িত্ব তো উভয়ের ওপর সমানভাবে বর্তাবে। পুলিশ কেবল রাস্তার সহিংস রাজনীতিকে অধিকতর নৃশংস করতে পারে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক বর্তমান সংকট হচ্ছে গণবিরোধী লোভী রাজনীতির ঘনীভূত রূপ। জনগণের ইচ্ছানুসারে জনগণের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এটাই তো গণতন্ত্রের কথা। সবাই সমঅবস্থানে থেকে নির্বাচন করতে না পারলে কিংবা সবার কাছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে সেটা কেবল গণতন্ত্রবিরোধী নয়, কাণ্ডজ্ঞানেরও বিরোধী। আমাদের দেশে যে ধরনের দলীয় রাজনীতি বিরাজ করছে, তাতে দলীয় নেতৃত্বের জবাবদিহির বা যুক্তিপূর্ণ হওয়ার দরকার করে না। জবাবদিহি বলতে আদতে কী বোঝায়, সেটা উপলব্ধির তোয়াক্কা না করেই রাজনৈতিক নেতারা জনগণের কাছে জবাবদিহির কথা বলে থাকেন। জবাবদিহি বলতে জনমতকে উপেক্ষা করা বোঝায় না। জনমত জরিপ সংক্রান্ত প্রতিবেদন নেতাদের জানা আছে, তারা ভালো করেই জানেন, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। নেতারা নিজেদের যতটা জনসমর্থিত মনে করেন, ততটা জনসমর্থিত নন।
এটা আমাদের স্বীকার করতে হবে, যেখানে গণতন্ত্র কাজ করে সেখানে হরতালের রাজনীতি কিংবা হিংসার রাজনীতির দেখা মেলে না। হরতালের জন্য সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি হচ্ছে, রাস্তায় ভাংচুর ও আগুন জ্বালানোর ঘটনায় জনমনে যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তাকে উপেক্ষা করে তো বিরোধী দল নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার চিন্তা করতে পারত না। সব ধরনের অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতি করেও নির্বাচনে কিভাবে জয়ী হতে হয় তার কলাকৌশল আমাদের রাজনীতিকদের জানা আছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন এখন একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। এ নিয়েই সবার দুশ্চিন্তা। দেশে নির্বাচন আছে, গণতন্ত্র নেই। এটা অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল যে, সরকারের সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব বিরোধী জোটের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। বিএনপি এখন সুস্পষ্টভাবে সর্বদলীয় সরকারের অংশীদার হতে অস্বীকার করেছে।
সরকার, অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি উপদেষ্টাদের পরামর্শে, এ প্রস্তাব উত্থাপন করে মনে করেছে, এটা একটা চাতুর্যপূর্ণ চাল হয়েছে। আর এটা এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, এটা একটা আপসমূলক ফর্মুলা। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের প্রস্তাব দিয়েছে তার বিপরীতে সরকার এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। সরকার সমর্থকরা সবাইকে বিশ্বাস করাতে চান যে, তারা একটা বড় ধরনের ছাড় দিচ্ছেন বিরোধী দলকে তাদের সরকারে যোগদান করার আমন্ত্রণ জানিয়ে। এটাই হচ্ছে আত্মস্বার্থান্ধ রাজনীতি, যা রাজনীতিকে এতটা একরোখা, অন্ধ, হিংস্র করে তুলেছে- সরকার ও বিরোধী উভয়ের জন্য।
নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে না, সরকার চাচ্ছে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে একটা কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন আর কোয়ালিশন সরকার এক হতে পারে না। সর্বদলীয় সরকারের নামে বিএনপির লোকদেরও চাকরি দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে যাতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় সুনিশ্চিত করা যায়। ১৯৭৫ সালেও একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল অন্যদের চাকরি দিয়ে। বহুদলীয় গণতন্ত্র ধ্বংস করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা হয়েছিল, এভাবে অনেকে ব্যাপারটাকে চিত্রিত করে থাকেন। ওই সময়ে জনপ্রিয় নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও প্রয়োজন অনুভব করা হয়নি।
সেই সময়টাতে যে কর্মকাণ্ডের অনুশীলন হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক ভূমিকা রেখেছিলেন সাংবাদিকরা। সব সংবাদপত্রকে সরকারি মালিকানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাংবাদিকরাও প্রতিবাদ করার বদলে দলে দলে অসহায়ভাবে হলেও বাহ্যিকভাবে উৎসাহভরে সেই প্রক্রিয়ায় শামিল হয়েছিল। দু-চারজন শামিল না হলেও তাদের সবার আড়ালে চলে যেতে হয়েছিল। গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিমান স্তম্ভ প্রেস সহজেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সাংবাদিকদের জন্য আবারও কঠিন অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। রাজনীতিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক সমাজ আজ বিভক্ত এবং তাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির সক্রিয় দলীয় কর্মী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ দলীয়করণের বিভক্তি জনপ্রশাসন, পুলিশ, সরকারি কার্যালয়ের সর্বত্র বিদ্যমান। এটা দুঃখজনক যে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির স্বার্থে বিচার বিভাগকেও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে।
স্বাধীন ভূমিকার বদলে সাংবাদিকরা যখন সক্রিয় দলীয় কর্মীর চেহারা নিয়ে জনসমক্ষে হাজির হন, তখন সাংবাদিক হিসেবে তার সম্মানজনক অবস্থানটি সবচেয়ে বিব্রতকর রূপ ধারণ করে। সর্বত্র সাংবাদিকদের যে সম্মানের আসন দেয়া হয়, দলীয় রাজনীতির অ্যাক্টিভিস্টের ভাবমূর্তি সেই আসন পাওয়ার অনুকূল হতে পারে না। প্রবীণ সাংবাদিকদের স্মরণ রাখা উচিত, প্রখ্যাত সাংবাদিক মানিক মিয়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক হিসেবে পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
বাকশালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিয়োগান্তক পরিসমাপ্তি ঘটেছিল কয়েক মাসের মধ্যে। আমাদের অনেকেরই চিন্তা ছিল, এ থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনীতিকে নিরাপদ করা হবে ভবিষ্যতে। রাজনীতি এক ধরনের বিজ্ঞান, এ বিজ্ঞানের ব্যবহার অগ্রাহ্য করা হলে তার ফল মারাত্মক পরিণতি বহন করে আনতে পারে। কারণ, তখন রাজনীতি আর রাজনীতি থাকে না। গণতন্ত্রের চর্চা ভিন্ন গণতন্ত্র টিকে না। ক্ষমতার লোভ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যেটা স্মরণ রাখা দরকার, এ ক্ষমতার লোভ কখনও একতরফা হয় না। বিজ্ঞ লোকেরা গণতন্ত্র সমর্থন করে, কারণ নিরাপদ রাজনীতির বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা রয়েছে এ ব্যবস্থায়।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

কুকুরের এমবিএ ডিগ্রি ও অন্যান্য

একটা কুকুর লাভ করেছে এমবিএ ডিগ্রি। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে। বিবিসি নিউজনাইট এই তথ্য উন্মোচন করেছে। আবার একটা কুকুরকেও যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় এমবিএ ডিগ্রি দিতে পারে, সেই নাটকটা সাজিয়েছেও তারাই। তারা এইউওএল নামের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএর জন্য আবেদন করেছে কুকুরের নামে। বলেছে, এমবিএ ডিগ্রি চাই।
তারা একটা জীবনবৃত্তান্ত বানিয়েছে, সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম হলো, পুরোনো ডিগ্রির কপি, শিক্ষার্থীর ফটো জমা দিতে হবে। যেহেতু আবেদনকারী একটা কুকুর, কাজেই তারা তা জমা দিতে পারেনি। ‘তাই বলে কি আমি ডিগ্রি পাব না?’ ফোনে জানতে চাওয়া হয়েছে। ‘কেন নয়? আপনাকে ৪৫০০ পাউন্ড জমা দিতে হবে।’ ওই পরিমাণ পাউন্ড দেওয়া হয়ে গেলে কুকুরের নামে চলে এসেছে এমবিএ ডিগ্রি। কুকুরটির নাম পিট। সে থাকে ব্যাট্রেরেসা কুকুর-সদনে। সম্প্রতি এই খবর প্রকাশিত হয়েছে, হইচই পড়ে গেছে বিলেতে। সবচেয়ে লজ্জায় আছেন তাঁরা, যাঁরা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাঁদের নামের শেষে ব্যবহার করে মুখ-উজ্জ্বল করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। ডিগ্রি নিয়ে নানা ধরনের রসিকতা চালু আছে। যাঁদের ডিগ্রি অকৃত্রিম; পরিশ্রম, মেধা আর সময় বিনিয়োগের মাধ্যমে পাওয়া, তাঁরা আশা করি ক্ষমার চোখেই দেখেন এই সব রসিকতাকে। ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। পাঠশালার সামনে দিয়ে যাচ্ছে এক ধোপা। সে শুনতে পেল, ক্লাসরুমে একজন শিক্ষক তার কোনো ছাত্রের উদ্দেশে বলছে, ‘কত গাধা পিটিয়ে মানুষ করলাম, আর তোকে মানুষ করতে পারব না?’ শুনে ধোপা তার গাধাটিকে নিয়ে এসে হাজির: ‘মাস্টার সাব, আমার গাধাটাকেও পিটিয়ে মানুষ করে দিন না?’ ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে একটা নির্মম কৌতুক প্রচলিত আছে।
এক লোক যাচ্ছে ঘোড়ার পিঠে চড়ে। পথে শুনতে পেল, এখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেখানে টাকার বিনিময়ে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। পথিকের সঙ্গে টাকা ছিল। কাজেই সে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বলল, ‘ডিগ্রি দিন। কত টাকা লাগবে?’ টাকাপয়সার লেনদেন হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করল। ডক্টরেট ডিগ্রি সঙ্গে নিয়ে লোকটা ফিরছে ঘোড়ার পিঠে চড়ে। তার মনে হলো, টাকা দিলেই যদি ডিগ্রি পাওয়া যায়, তাহলে আমার ঘোড়াটার জন্যও তো একটা ডিগ্রি কেনা যায়। সে আবার গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে, বলল, ‘এই নিন টাকা, আমার ঘোড়াটাকেও একটা পিএইচডি ডিগ্রি দিন।’ তখন কর্তৃপক্ষ জবাব দিল, ‘স্যরি, আমরা শুধু গাধাদেরই ডিগ্রি দিই, ঘোড়াদের দিই না।’ একবার একটা কুকুরের প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছিল আদালতে। ঘটনা তানজানিয়ার। কুকুরটিকে দেওয়া হয় প্রাণদণ্ড, আর তার মালিককে কারাদণ্ড। কারণ, কুকুরের মালিক কুকুরের নাম রেখেছিলেন ‘ইমিগ্রেশন’। তানজানিয়ার বহিরাগত পুনর্বাসন বা ইমিগ্রেশন বিভাগ তাতে চটে যায়। তারা মামলা করে দিলে এই নাম ধারণ করার অপরাধে কুকুরটির মৃত্যুদণ্ড আর তার মালিকের কারাদণ্ডের রায় দেন মাননীয় আদালত। আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। চারদিক থেকে লোকজন আসতে লাগল তাঁর কাছে। তারা বলতে লাগল, ‘আমরা বিপ্লবের জন্য অনেক কিছু করেছি। অনেক ত্যাগ করেছি। আমাদের মূল্যায়ন করুন। আমাদেরকে পদ দিন।’ লিংকন তখন একটা গল্প বলেছিলেন: এক রাজা বেরিয়েছেন শিকারে। তিনি তাঁর মন্ত্রীদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস কী? ঝড়বৃষ্টি কি হবে?’
মন্ত্রীরা বলল, ‘জি না হুজুর, আজ আবহাওয়া চমৎকার। ঝড়বৃষ্টি হবে না।’ রাজা চলেছেন। পথে দেখা একজন ধোপার সঙ্গে। রাজাকে সে বলল, ‘রাজামশাই, আপনি যে সামনে এগোচ্ছেন, সামনে তো ঝড়বৃষ্টি হবে।’ রাজা তার কথা শুনলেন না। এগোতে লাগলেন। খানিক পরে সত্যি সত্যি ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। রাজা ফিরে এলেন। বললেন, ‘আবহাওয়ামন্ত্রীকে বরখাস্ত করো। ধরে নিয়ে এসো ওই ধোপাকে। ওকেই মন্ত্রী করব।’ রাজা ধোপাকে মন্ত্রী করলেন। রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুমি কেমন করে বললে, সামনে ঝড়বৃষ্টি হবে?’ ধোপা বলল, ‘যখন ঝড়বৃষ্টি আসন্ন, তখন আমার গাধার কান নড়ে। তখন আমার গাধার কান নড়ছিল। সেটা দেখে আমি বুঝলাম, একটু পরেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে।’ রাজা বললেন, ‘তাহলে আর তোমাকে মন্ত্রী করব কেন? তুমি বরখাস্ত। যাও, নিয়ে এসো সেই গাধাকে। তাকেই আমি মন্ত্রী বানাব।’ রাজা গাধাকেই মন্ত্রী বানালেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তখন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। একজন চাষি নিজের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। মুখ্যমন্ত্রীকে বললেন, ‘হুজুর, ছেলেকে চাকরি দিন।’
‘লেখাপড়া কত দূর?
 ‘ম্যাট্রিক ফেল।’
‘তাহলে চাষবাসের কাজে ওকে লাগাও না কেন?’
‘হুজুর, লেখাপড়া শিখেছে, ওকে কী করে হালচাষ করতে লাগাই?’
‘তাহলে ওকে একটা দোকান করে দাও।’ ‘দোকানের কাজে ওর মন নাই।’ ‘তাহলে তো তোমার ছেলের আর কোনো উপায় নাই। ওকে মন্ত্রী করেই নিতে হয়।’ শেরেবাংলাকে নিয়ে আরেকটা গল্প। তখনো তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কাছে একটা আবেদন এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদের মালটানা গাড়ির বলদের জন্য খড় কেনা বাবদ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দের আবেদন। শেরেবাংলা খড়ের দাম জানতেন। তিনি ওই দরখাস্তে লিখলেন, ‘এত খড় কি কেবল বলদে খাবে?’
আজকের এই লেখায় কোনো সিরিয়াস বিষয়ে গেলাম না; কারণ, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যা চলছে, তা নিয়ে রসিকতা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।