Sunday, January 17, 2010

কিশোরগঞ্জে ছড়ার মেলা -চারদিক by সাইফুল হক মোল্লা

২০০৫ সালে এ স্লোগান ধারণ করে শুরু হয়েছিল কিশোরগঞ্জ ছড়া উত্সব। পরে ২০০৬ সালে ‘মানবিক শুভতার লক্ষ্যে, ছড়া হোক মানুষের পক্ষে’। ২০০৭ সালে ‘বিবেকের মুক্তির জন্য, ছড়া হোক হাতিয়ারে গণ্য’। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘ছড়া দিয়ে রুখবোই যত ষড়যন্ত্র, জয় হোক মানুষের, জয় গণতন্ত্র’। ২০০৯ সালে ‘দিনবদলের অঙ্গীকারে, জাগবে ছড়া বারেবারে’। আর সর্বশেষ, ২০১০ সালে ‘উত্সবের অঙ্গীকার, যুদ্ধাপরাধীর বিচার’ স্লোগান ব্যক্ত করে কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাব মুক্তমঞ্চে ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জ ছড়া উত্সব।
৯ জানুয়ারি প্রেসক্লাব মুক্তমঞ্চে ছড়া উত্সবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত কবি-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা বসেছিল।
পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় এবার ভিন্ন রকম আমেজে দিনব্যাপী ‘ষষ্ঠ কিশোরগঞ্জ ছড়া উত্সব’ উদ্যাপিত হয়েছে। উত্সব কেন্দ্র করে সর্বস্তরের ছড়াকার, কবি ও সাহিত্যপ্রেমীদের উত্সাহ-উদ্দীপনা ছিল দেখার মতো। সাহিত্যাঙ্গনে তা সৃষ্টি করে অভূতপূর্ব প্রাণের স্পন্দন। এই মহতী উত্সবকে কেন্দ্র করে ছড়াকার-কবি-সাহিত্যিকেরা যেন এক মঞ্চে এককাট্টা হয়েছিলেন।
সকালে ছিল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি প্রেসক্লাব মুক্তমঞ্চ থেকে বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে পুনরায় প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বেলুন উড়িয়ে ছড়া উত্সবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফজলুল হক।
‘আব্বে হালায় কয় কি হুনেন, রাজাকারের পোলা/চাপার জোরে সাদা পানি, করবার চায় ঘোলা/আমরা মাগার জিন্দা আছি/না খায়া-না পিন্দা আছি/তব্বু হালায় তোগোর লগে/নাইকা আপস-মিল/আমরা মাগার মুক্তিসেনা/সাহস ভরা দিল্।’ ‘ধর, রাজাকার ধর, ছালার ভেতর ভর।’ ‘রাজাকার, দেশ ছাড়, হবে তোর বিচার।’ এ রকম অসংখ্য তেজি ছড়া একঝাঁক শিশুর সম্মিলিত সুরে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ছড়া উত্সবের পর্দা ওঠে।
পরে ছড়া উত্সব পরিচালনা পর্ষদের আহ্বায়ক আহমেদ উল্লাহর সভাপতিত্বে প্রথম পর্বের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফজলুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নূরে আলম সিদ্দিকী, এম এ আফজল, শাহ আজিজুল হক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আসাদ উল্লাহ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ প্রমুখ।
প্রধান অতিথি তাঁর আলোচনায় ছড়াকে প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে জনমত তীব্রতর করার জন্য ছড়াকারদের আরও ঝাঁঝালো ভাষায় নতুন নতুন ছড়া লেখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘ছড়াকে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্ব না দেওয়ার একটি প্রবণতা অনেক দিন ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু আধুনিক ছড়াকারেরা তাঁদের লেখনীর জোরে প্রমাণ করে দিয়েছেন, ছড়া কোনো হেলাফেলা বা তাচ্ছিল্যের বিষয় নয়।’ তিনি ছড়াকারদের সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী কলমযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘এই কলমযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জে প্রতিবছর ছড়া উত্সব করে নিজেদের সেই ঐক্য ও শক্তিমত্তার প্রমাণ রাখছেন।’ তিনি উত্সবকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত ছড়ার বই ও ছড়ার কাগজের সবগুলো ছড়াকে পশ্চিমবঙ্গের ছড়ার সঙ্গে তুলনা করে একটি গ্রন্থে দুই বাংলার সব ছড়াকে মলাটবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দ্বিতীয় পর্বে অধ্যাপক প্রাণেশ কুমার চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব শাফিক আলম মেহেদী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. শাহ কামাল, বাংলাদেশ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের পরিচালক ছড়াকার আলম তালুকদার, ছড়াকার ফারুক নওয়াজ, আহমেদ জসীম, সিরাজুল ফরিদ, অধ্যক্ষ গোলসান আরা বেগম, অধ্যক্ষ শরীফ সাদী প্রমুখ।
এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন উত্সব পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসচিব ছড়াকার জাহাঙ্গীর আলম জাহান। তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জে ছড়া উত্সবকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যে যাত্রার সূচনা করেছিলাম, সবার সম্মিলিত প্রয়াসে তা ক্রমান্বয়ে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; যা আগামী দিনে ছড়াকারদের জাতীয় ঐক্যকে নিশ্চিত করবে।’
উত্সবকে কেন্দ্র করে ছয়টি বই প্রকাশিত হয়। উত্সবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়াত ছড়াকার শাহ সোহরাব উদ্দিনের গীতিকাব্য ভাণ্ডারীয় শাহী গীতি, মাজহার মান্নার কাব্যগ্রন্থ নিঃসঙ্গ লাটাই, আমিনুল ইসলাম সেলিমের ছড়াগ্রন্থ চিচিংফাঁকের দেশ, সাহিত্যের কাগজ বুনন, ছড়ার কাগজ আড়াঙ্গি ও খামচার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
পরে উত্সবের অন্যতম আকর্ষণ সুকুমার রায় সাহিত্য পদক ও বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয় কবি অজামিল বণিককে তাঁর কেউ কেউ দেখে কাব্যের জন্য এবং ছড়াকার মো. নবী হোসেনকে তাঁর টাট্টুঘোড়ার ডিম ছড়াগ্রন্থের জন্য।
তৃতীয় পর্বে কিশোরগঞ্জ জেলাসহ অন্যান্য জেলা থেকে আগত কবি, ছড়াকার ও সাহিত্যিকদের কণ্ঠে উন্মুক্ত ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করা হয়। এতে প্রায় দুই শতাধিক কবি-ছড়াকার অংশ নেন। পরে শিশু-কিশোর-তরুণদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ও ছড়ালিখন প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অধিকারীদের মধ্যে পুরস্কার ও সনদ বিতরণ করা হয়।
ছড়ায় ছড়ায় কিশোরগঞ্জ মাতিয়ে গেলেন ছড়াকারেরা। যৌবনের দীপ্তি যেন প্রকাশ পাচ্ছিল তাঁদের উপস্থিতিতে।

কথায় নয়, কাজে বড় হতে হবে -দুর্নীতি দমন by বদিউল আলম মজুমদার

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণকে ‘অগ্রাধিকারের পাঁচটি বিষয়’-এর মধ্যে দ্বিতীয়—দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধের পরই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে: ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদের বিবরণ দিতে হবে। দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালো টাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এ ছাড়া ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে, বিশেষত দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি নির্মূলে তাঁর দৃঢ়প্রত্যয়ের কথা বারবার ব্যক্ত করে আসছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গত এক বছরে বহু হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো উল্লেখ ও বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণাকালে আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছিলেন।
দিনবদলের সনদে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাস পরই কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধূরীকে পদত্যাগ করতে হয়। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি যখন দুদক কমিশনারদের কমিটির সামনে তলব করার মাধ্যমে হয়রানি করছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করাসহ বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই বলা হয়নি। মাননীয় স্পিকারও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করেন। এ ধরনের নীরবতা ছিল সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্যজনক।
দুর্ভাগ্যবশত পুনর্গঠনের পরও সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনকে শক্তিশালী করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং আইন সংশোধন করে কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করার কথা শোনা যাচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা প্রায় দেড় শ মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করার ফলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশের ক্ষেত্রেও সরকার চরম পক্ষপাতিত্ব করছে। যেমন, রাজনৈতিক হয়রানির অজুহাতে প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশকৃত মামলাগুলোর প্রায় সবগুলোই সরকারি দলের নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলা। আমরা আনন্দিত যে দুদক সরকারের চাপের কাছে এ পর্যন্ত নতিস্বীকার করেনি। আমরা মনে করি, মামলাগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পন্ন হওয়া আবশ্যক। মামলাগুলো যদি সত্যিকার অর্থেই হয়রানিমূলক হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই বিচার-প্রক্রিয়ায় আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। এ জন্য অবশ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান সরকারের আমলে গত এক বছরে একটি দুর্নীতির মামলাও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি এবং একজন দুর্নীতিবাজকেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়নি, যা নিঃসন্দেহে সরকারের দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বস্তুত সরকারের অনাগ্রহের কারণে সবগুলো দুর্নীতির মামলা বর্তমানে উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। মামলাগুলো ঝুলে আছে মূলত দুটি মামলার কারণে, যার একটির প্রতিপক্ষ হাবিবুর রহমান মোল্লা এবং অন্যটির প্রতিপক্ষ মহীউদ্দীন খান আলমগীর।
হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলাটি পর্যালোচনা করা যাক। স্মরণ করা যেতে পারে যে দুদকের পক্ষ থেকে ২৫.৫.২০০৭ তারিখে হাবিবুর রহমান মোল্লার কাছ থেকে ১৯৭১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে অর্জিত সব সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে আইনের ২৬(২)/২৭(১) ধারার অধীনে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে এবং যথারীতি বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচার-প্রক্রিয়া শুরুর এবং মোট ২৫ জনের মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর মামলাটি বাতিলের জন্য হাবিবুর রহমান মোল্লা হাইকোর্টে আবেদন করেন। মামলার আরজিতে তিনি দাবি করেন, দুদক আইনের অধীনে প্রণীত বিধি ১০ অনুযায়ী নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। এ ছাড়া মামলার বিচারও ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করা হয়নি। উপরন্তু তদন্ত প্রতিবেদনের অনুমোদনপত্র (sanction) পুরো কমিশন প্রদান করেনি। আরজিতে আরও দাবি করা হয়, হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের সময়ে আইনের ৩২(১) এবং রুল ১৫(৭) অনুযায়ী দুদক থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র দেওয়া হয়নি। অর্থাত্ সম্পূর্ণ ‘টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে’ বা যান্ত্রিক যুক্তিতে মামলাটি করা হয়—আরজিতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ হাবিবুর রহমান মোল্লা অস্বীকার করেননি।
বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি ফারাহ্ মাহবুবের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে প্রদত্ত রায়ে হাবিবুর রহমান মোল্লার পক্ষে উত্থাপিত যুক্তিগুলো নাকচ এবং মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ করে দেন [হাবিবুর রহমান মোল্লা বনাম রাষ্ট্র (ঢাকা ল রিপোর্টস) ৬১(২০০৯)]। রায়ে বিজ্ঞ বিচারপতিদ্বয় বলেন, ‘বস্তুত আইনে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে চাপ সৃষ্টির জন্য, যাতে এগুলো মেনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পন্ন করে। এর উদ্দেশ্য বিচার ছাড়া অপরাধীকে যান্ত্রিক যুক্তিতে মুক্তি দেওয়া নয়।’ এ ছাড়া আদালতের মতে, ফৌজদারি অপরাধের বিচারের কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই।
আদালত তাঁর রায়ে আরও বলেন, যেহেতু নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ না করলে আইনে কোনো শাস্তির বিধান নেই, তাই সময়সীমার এ বাধ্যবাধকতা মানা ঐচ্ছিক (directory), বাধ্যতামূলক (mandatory) নয়। যদি আইনপ্রণেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ওপর বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে চাইতেন, তাহলে তা না মানার জন্য আইনে শাস্তির বিধান থাকত। দুদক আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
পুরো কমিশনের সম্মতি সম্পর্কে দুদক আইনের ধারা ৩২ ও বিধি ১৫ উল্লেখ করে আদালত বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে একজন কমিশনার স্বাক্ষর করলেই যথেষ্ট। এ ছাড়া যেহেতু অনুমতিপত্র প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট ছক আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেহেতু অনুমতিপত্রে অনুমতি প্রদানের জন্য অতিরিক্ত কারণ প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নেই।
হাইকোর্টে পরাজিত হওয়ার পর হাবিবুর রহমান সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন এবং আদালত ‘লিভ টু আপিল’ গ্রাহ্য করেন। আপিলের আরজিতে বলা হয়, যেহেতু দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৫৭ এবং দুর্নীতি দমন (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ, ১৯৬০-এর আওতায় হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ, তদন্ত, মামলা বা অনুমতিপত্র নেই, তাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর অধীনে ১৯৭১-২০০৭ সময়সীমা কালে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের আইনসিদ্ধ নয়। উপরন্তু এর মাধ্যমে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অপরাধের দায়যুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবত্ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না।’
লিভ টু আপিল গ্রাহ্য করার জন্য আপিল বিভাগের এ যুক্তিটি গ্রহণের যৌক্তিকতা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। কারণ, দুর্নীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া, তাই সম্পদের মালিক হওয়ার এবং দুর্নীতিতে লিপ্ত হওয়ার সময় এক এবং অভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। এ দুটির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রতা না থাকাই স্বাভাবিক। এ কারণে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অপেক্ষাকৃত অধিক নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য দীর্ঘকালীন সময় ধরে তা হিসাব করা দরকার। হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে ২০০৪-০৭ সময়সীমার মধ্যে অর্জিত সম্পদ ওই সময়ে দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা অর্থ থেকে এসেছে, তা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। বস্তুত, এ ধরনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করলে কোনো দুর্নীতির মামলাই প্রমাণ করা যাবে না। অন্যভাবে বলতে গেলে, দুর্নীতি একটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ—এটি চুরি বা খুনের মতো অপরাধ নয়, যা একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে ঘটে। তাই চুরি কিংবা খুনের জন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় বলবত্ আইন প্রয়োগ বাঞ্ছিত, কিন্তু দুর্নীতির মতো চলমান অপরাধের ক্ষেত্রে তা যৌক্তিক নয়। কারণ, আইনের পরিবর্তন হলেও দুর্নীতিমূলক কার্যক্রম থেমে থাকে না এবং পরবর্তী দুর্নীতি আগের দুর্নীতিরই অনেকটা শাখা-প্রশাখা। আর শুধু শাখা-প্রশাখা ছেঁটে ফেললেই দুর্নীতি নির্মূল হবে না—এ জন্য আগের থেকে প্রোথিত দুর্নীতির মূলোত্পাটন প্রয়োজন।
দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৫৭ এবং দুর্নীতি দমন (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ, ১৯৬০-এর ধারাবাহিকতাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ প্রণীত হয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য, এমনকি অনেক বিধানও এক ও অভিন্ন। যেমন, ১৯৫৭ সালের আইনের ধারা ৪ ও ৫, সাম্প্র্রতিক আইনের ধারা ২৬ ও ২৭-এর সমতুল্য। অর্থাত্ এগুলো মূলত একই আইন এবং এগুলোর প্রায় অভিন্ন উদ্দেশ্য হলো সমাজকে দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে মুক্ত করা। পরের আইন মূলত আগের আইনের পরিবর্তিত, বর্ধিত ও উন্নত সংস্করণ এবং দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্দেশ্যেই নতুন আইন—পুরোনো আইন বলবত্ থাকাকালে দুর্নীতিমূলক অপরাধকে, যা বৈশিষ্ট্যগতভাবে চলমান, বিচারালয়ের বাইরে রাখা এর উদ্দেশ্য নয়। তাই চুরি কিংবা খুনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ দুদক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয় বলেই আমাদের ধারণা।
সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধের জন্য শাস্তি সম্পর্কে পূর্ব সতর্কীকরণের ব্যবস্থা ছিল কি না। এ প্রসঙ্গে মাহমুদুল ইসলাম তাঁর Constitutional Law of Bangladesh (দ্বিতীয় সংস্করণ) গ্রন্থে Marks v. U.S, 430 US 188; Beazell v. Ohio, 269 US 166 মামলার রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে মৌলিক নীতি হলো যেকোনো ব্যক্তির আচরণের জন্য ফৌজদারি আইনের অধীনে শাস্তি প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকলে, যা তার স্বার্থের পরিপন্থী—সে সম্ভাবনা সম্পর্কে তার উপযুক্ত পূর্ব সতর্কবাণী পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’ যেহেতু দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অতীতের আইনের ধারাবাহিকতায়ই প্রণীত হয়েছে, তাই অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান যথাযথ পূর্ব সতর্কবাণী পেয়েছেন বলে ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না।
এ ছাড়া সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে প্রয়োগের যৌক্তিকতা নির্ণয়ে General Clauses Act, 1897 প্রাসঙ্গিক। ওই আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো আইন বাতিল হলেও এর আওতাভুক্ত বিষয়ে তদন্ত, বিচার, শাস্তি প্রদান ইত্যাদি করা যাবে ধরে নিয়ে যে বাতিল করা আইনের পরিবর্তে নতুন আইন পাস করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ভূমিকা বা প্রস্তাবনার (preamble) দিকে, যেখানে এর উদ্দেশ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে, দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এটি হলো ‘দেশে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে ... প্রণীত আইন’। অর্থাত্ আইনের উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করে কার্যকরভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা, ‘হাইপার টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে’ বা অতি যান্ত্রিক যুক্তিতে দুর্নীতিবাজদের বিচার-প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা নয়। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তারা যাতে বেরিয়ে যেতে পারে, সে ব্যাপারে সহায়তা করা নয়। অর্থাত্ দুদক আইনের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের সময়ে আইনসভার সদস্যদের উদ্দেশ্য, যা আইনের প্রস্তাবনায় বর্ণিত রয়েছে, বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। তাহলে বিচারালয় ‘সুপার লেজিসলেটর’ বা আরও বড় আইনসভায় পরিণত হবে না।
পরিশেষে, আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন—গত ১৭ অক্টোবর দারিদ্র্যবিরোধী এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ যে দলেরই হোক না কেন, তাদের রেহাই নেই। কারণ, দুর্নীতিমুক্ত না হলে দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে না।’ অর্থাত্ কবি কুসুম কুমারী দাশের ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের কামনা যে তিনি কথায় না বড় হয়ে, কাজে বড় হবেন। আশা করি, আমাদের উচ্চ আদালতও হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলাটি দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পন্ন করবেন এবং এ ব্যাপারে সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন। কারণ, এ মামলাটির ব্যাপারে সিদ্ধান্তের জন্য অসংখ্য দুর্নীতির মামলা ঝুলে আছে। আমরা আরও আশা করি, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস দুর্নীতির মামলাগুলো সম্পর্কে আরও তত্পর হবে। কারণ, তিনি সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রের—সরকারের বা দলের নন—সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা এবং তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ইতিমধ্যে কেউ কেউ তুলছেন। সর্বোপরি আমরা আশা করি যে নাগরিক সমাজ এ বিষয়ে সক্রিয় ও সোচ্চার হবেন, কারণ ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতির ইজারাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকলে এবং দুর্নীতি করে পার পেয়ে যেতে পারলে বা ‘কালচার অব ইম্পিউনিটি’ বিরাজ করলে আমাদের গণতান্ত্রিকব্যবস্থাও টিকে থাকবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

আঞ্চলিক বৈষম্য বনাম বিভেদকারী আঞ্চলিকতাবাদ -পরিকল্পনা by সাজ্জাদ জহির

আঞ্চলিক বৈষম্যের সূত্র ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা রচিত হয়েছিল। আজ সেই স্বাধীন দেশেই আঞ্চলিক বৈষম্য লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুষ্ঠু সমাজ অগ্রগতির প্রয়োজনে সাধারণভাবেই অর্থনৈতিক বৈষম্য কাম্য নয়। আর বৈষম্য আঞ্চলিক ব্যাপ্তি নিলে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিভেদমুখী ধারা প্ররোচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
মোট দেশজ উত্পাদন বা জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে বা সেসবের প্রবৃদ্ধির আলোকে বৈষম্য যাচাই সম্ভব। জেলা পর্যায়ে সেসব তথ্য মাঝেমধ্যে পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশ করলেও সেগুলোকে নির্ভরযোগ্য গণ্য করা হয় না। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দারিদ্র্যের পরিমাপের ভিত্তিতে অগ্রগতি যাচাইয়ের প্রথা শুরু হয়। কোনো এক জনগোষ্ঠীর শতকরা কত অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে এবং গড় ভোগের পরিমাণ কত—এ দুটো তথ্য প্রতি পাঁচ বছর পরপর (খানা আয়-ব্যয়ের) জরিপের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে সেসবের পরিমাপই আঞ্চলিক বৈষম্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের কিছুটা ধারণা দেয়।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে ঘিরে মঙ্গার আলোচনা দীর্ঘকাল চললেও ১৯৯৫-৯৬-এর (আয়-ব্যয়) জরিপের পর আঞ্চলিক ভেদাভেদের তথ্যভিত্তিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার উদ্যোগে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দারিদ্র্য মানচিত্র প্রস্তুত হয়, যা খাদ্য ও অন্যান্য সাহায্য বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনায় বিশেষ প্রভাব রেখেছে।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, আগের তৈরি মানচিত্র উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলের দুরবস্থা যথার্থভাবে ধরতে পারেনি—এমনকি, ২০০৫ এর জরিপের ফলাফল জানার পরও সাহায্য সংস্থা, সরকার ও সুশীল সমাজের মধ্যে এ বিষয়ে বোধোদয় হতে ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রয়োজন হয়েছিল।
বিভিন্ন জরিপ-তথ্য তুলনা করে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার সর্বাধিক ছিল। নব্বইয়ের শেষাংশে বরিশালে সেই হার অনেক হ্রাস পায়, যা দারিদ্র্যের মাপকাঠিতে বরিশালকে স্থবির খুলনার কাতারে আনে। আর এ শতাব্দীর শুরুতে এ দুটো বিভাগেই স্থবিরতা লক্ষ করা যায়। অথচ যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর রাজশাহী বিভাগে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
যদিও ২০০৫ সালের জরিপের তথ্যানুযায়ী, উল্লিখিত তিনটি বিভাগে দারিদ্র্যের হার প্রায় সমান, অগ্রগতি ও সম্ভাবনার আলোকে অনেকেই মনে করেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে এবং উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চল ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এসবের তুলনায় সামগ্রিক চিত্রে সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে দারিদ্র্যের হার অনেক হ্রাস পেয়েছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য, খানাভিত্তিক তথ্যের বিশ্লেষণ এবং দারিদ্র্য-মানচিত্রের ভিত্তিতে এটা সাধারণভাবে স্বীকৃত যে মঙ্গা-পীড়িত নদীভাঙনের এলাকা, নেত্রকোনা-সিলেটের হাওর এলাকা, আদিবাসী অধ্যুষিত পার্বত্যাঞ্চল এবং খুলনা-বরিশাল-চট্টগ্রামের উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে বেশি।
গত দু-তিন বছর ধরে আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে বেশ আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০০৮ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পূর্ব-পশ্চিম বিভাজনের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল দুটো মেরু—ঢাকা ও চট্টগ্রাম—পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এবং যমুনা ও পদ্মা নদী-সৃষ্ট ভৌগোলিক বিভেদের কারণে পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এলাকা ওই দুটো মেরুর প্রবৃদ্ধির সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আমাদের অনেক চিন্তাবিদের মধ্যেও সমধর্মী আরেকটি চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়, যা নিম্নোক্ত উক্তিতে ধরা পড়ে: ‘মঙ্গাপীড়িত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দারিদ্র্যের কেন্দ্রবিন্দু দক্ষিণাঞ্চলে সরে গিয়েছে’। শুনে মনে হয়, দারিদ্র্য যেন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা অতীতে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানত এবং বর্তমানে দক্ষিণে আঘাত হানছে।
আবার উভয় ক্ষেত্রেই নীতি-পরামর্শে সাদৃশ রয়েছে—দরিদ্র মানুষের ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী’র জন্য সাহায্য-সম্পদ বণ্টনে এখন থেকে দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন প্রস্তাব সমর্থনযোগ্য হলেও আবেগের ধূম্রজালে আমাদের উন্নয়ন-ধারা ও তা থেকে সৃষ্ট বৈষম্যের কারণের প্রতি অন্ধদৃষ্টি রাখলে ভুল হবে। আর কারণ খুঁজে না পেলে সমাধান আয়ত্তের বাইরে রয়ে যাবে।
তা ছাড়া যাঁরা এ জাতীয় সাহায্যদানের কথা বলছেন, তাঁরা কেউই নিঃশর্তে সীমাহীন ভান্ডার খুলে দেননি। বরং, ‘দাতা’ হিসেবে অভিহিত অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব-সাহায্য বিতরণে নিজের দখলী নিশ্চিত করতে অধিক আগ্রহী।
অর্থনীতির পরিভাষায়, উত্পাদনের উপকরণ ও উত্পাদিত পণ্য নির্বিবাদে চলাচলের (স্থানান্তরের) সুযোগ থাকলে যেকোনো স্থানের বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত সুফল সংযুক্ত অন্যান্য এলাকায়ও পৌঁছানোর কথা। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এ যুক্তি দেওয়া হলেও সেখানে শ্রম চলাচলে বিশাল অঙ্কের আর্থিক খরচের বাইরেও ভিসা নামের বাধা রয়েছে, আর পণ্য চলাচলে রয়েছে আমদানি শুল্কসহ নানা বাধা-নিষেধ।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে আইনের সে রকম বাধা নেই। তবে যাত্রী ও পণ্য চলাচলে খরচ আছে। তাই মজুরি আয় অথবা পণ্যের দাম এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় কমবেশি হতে পারে। এমনকি এক এলাকার প্রবৃদ্ধি সমভাবে অন্য এলাকাগুলোতে বিস্তৃত নাও হতে পারে।
শ্রম, কাঁচামাল বা পণ্যের মতো উত্পাদনের অনেক উপকরণ (সম্পদ) সহজে চলাচল করতে পারে না এবং উত্পাদনে অপরিহার্য এ রকম কিছু সম্পদের বণ্টন আঞ্চলিক বৈষম্যের মূল কারণ হতে পারে। যেমন, বাঁধ নির্মাণ করে জমির উত্পাদিকা বৃদ্ধি অথবা রাস্তা তৈরি করে বাজার-সংযুক্তি বৃদ্ধি একটি এলাকাকে অধিকতর উন্নত হওয়ার সুযোগ দেয়। তাই এ জাতীয় ভৌত কাঠামো নির্মাণে সরকারি বিনিয়োগে পক্ষপাতিত্ব থাকলে তা আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ায়। বিশেষ জ্বালানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও এটা সত্যি।
ডিজেল তেল বা কয়লা সহজে স্থানান্তরযোগ্য। কিন্তু বিপুল পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পাইপলাইন-ভিত্তিক বিতরণব্যবস্থা। তবে এ জাতীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা ব্যয়বহুল।
সংগত কারণেই উত্সস্থলের কাছাকাছি এলাকাগুলো গ্যাসপ্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পেয়েছে, যা যমুনা সেতু চালু হওয়ার আগে পূর্বাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। শুরুতে সার উত্পাদনে গ্যাসের ব্যবহার চালু হয়। পরে বিদ্যুত্ উত্পাদন ও অন্যান্য শিল্পে গ্যাস ব্যবহার উন্মুক্ত হলে এটিই বিনিয়োগ আকর্ষণের মূল নিয়ামক হয়। আর গৃহস্থালি কাজে গ্যাসপ্রাপ্তি জীবনযাত্রাকে সহজ করায় বিনিয়োগের জন্য আবশ্যিক দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্তি গ্যাসপ্রাপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি রাস্তাঘাটে (বিশেষত, গ্রামীণ অবকাঠামোতে) ব্যাপক বিনিয়োগে শ্রমের চলাচল সহজ হয়। সে তুলনায় রেল ও নদীপথে নজর না দেওয়ায় পণ্য বহনের খরচ কমেনি। গ্যাস ব্যবহারের শেষ পর্যায়ে যানবাহনে সিএনজি চালু হয়। এর দ্বারা উপকৃত এলাকায় পণ্য বহনের খরচ অনেক কমে। এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েছে।
তার মানে নদী-সৃষ্ট ভৌগোলিক বিভাজন বা আকস্মিকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ উত্তরাঞ্চল থেকে (খরা ও নদীভাঙন) দক্ষিণাঞ্চলে (সিডর বা আইলা) সরে আসায় আঞ্চলিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়নি। বরং অবকাঠামোতে বিনিয়োগে আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্ব, যোগাযোগব্যবস্থায় সড়ক ও মোটরযান-নির্ভরতা এবং গ্যাসের মতো দুর্লভ সম্পদ ব্যবহারে সঠিক নীতিমালার অভাবেই আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে।
যদি ভবিষ্যতে গ্যাস উত্তোলন ও দেশের অভ্যন্তরে তা বিতরণের সম্ভাবনা থাকে, তার খাতওয়ারি ও অঞ্চলভিত্তিক সর্বোত্তম (পাইপলাইন-ভিত্তিক) বণ্টন কী হওয়া উচিত, ভেবে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি শহরে কি গ্যাস পৌঁছে দেওয়া ঠিক? নাকি সার্বিক বিবেচনায় সুনির্দিষ্ট উন্নয়নকেন্দ্র চিহ্নিত করে সেখানে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত? আর এটা তো স্পষ্ট যে ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণ টেকসই নয়, যা প্রতিনিয়ত নগরবাসী উপলব্ধি করছে। এ ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা জরুরি।
এটা অনস্বীকার্য যে এক এলাকার অধিবাসী কোনো প্রাকৃতিক সম্পদে অগ্রাধিকার পাওয়ায় অন্যদের চেয়ে লাভবান হয়েছে। তবে শিল্পায়নের মতো ভোক্তা পর্যায়েও বৈষম্য আছে। দক্ষিণাঞ্চলের একটি পরিবার প্রতি মাসে সিলিন্ডার গ্যাসে এক হাজার টাকার বেশি ব্যয় করে। তার থেকেও বেশি গ্যাস ব্যবহার করে ঢাকায় একটি পরিবার মাত্র ৪৫০ টাকা দেয়। এ জাতীয় ক্ষেত্রে সমতা আনার লক্ষ্যে গৃহে প্রাপ্ত গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করে সিলিন্ডার গ্যাসে ভর্তুকি দেওয়ার কথা ভাবা যায়।
তুলনামূলকভাবে পণ্য চলাচল সহজ ও সাশ্রয়ী হলে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পেতে পারে। অনেক পণ্যের রেল ও নৌপথে স্থানান্তর সুলভে সম্ভব। পাশাপাশি পণ্য যাতায়াতে চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য হয়রানি দূর করা আবশ্যক।
সম্পদের সর্বোত্তম আর্থিক ব্যবহার ও আঞ্চলিক সাম্যতার মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধ পরিবার, গোষ্ঠী, দেশ, আন্তর্জাতিক—সম্পদ-বণ্টনের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তার পরও মানুষ সমতা খোঁজে, তবে তা নির্ভর করে নিজ অবস্থানের ওপর। যিনি বিশ্বব্যাপী বিচরণ করেন, তাঁর দৃষ্টিতে ঢাকা-চট্টগ্রামের সীমিত করিডরে দুর্লভ জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার অধিক দক্ষ মনে হতে পারে। আবার যিনি ভিন্ন বিচারে দেশে সমতা খোঁজেন, তাঁকে ভিন্ন মাপকাঠিতে দুর্লভ সম্পদের বণ্টন-নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তবে তিনিও সম্ভবত চাইবেন না, ঢালাওভাবে দুর্লভ সম্পদের ক্ষীণ বিতরণ করে ব্যবহারের অদক্ষতা বাড়াতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেন এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পান—সেটাই প্রত্যাশা।
সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ, পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ।
sajjadzohir@gmail.com

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হাইতির হাহাকার -বিশ্ব মানবতার সামনে হাইতিকে রক্ষার দায়িত্ব

অসহায় মানবতার করুণ কান্নায় নিমজ্জিত ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞে নিহত হয়েছে এক লাখেরও বেশি মানুষ। এর সঙ্গে কেবল প্রলয়েরই তুলনা চলে। দারিদ্র্য, জনসংখ্যার ভারে নিমজ্জিত, প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার চরমে থাকা দেশটি আজ তীব্র মানবিক সংকটে। উপর্যুপরি ভূমিকম্পে খোদ রাজধানী বিধ্বস্ত হওয়ায়, নিজে থেকে উদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ করা দেশটির জন্য কঠিন। হাইতির জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমগ্র বিশ্বের সহযোগিতার হাত, এবং তা করতে হবে সম্ভবপর সবচেয়ে দ্রুত সময়ে।
২০০৪ সালের ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের সুনামি জলোচ্ছ্বাসের পর হাইতির এ ভূমিকম্পই বৃহত্তম প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সুনামির পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সুনামি-দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। আজ হাইতিরও তেমন সহযোগিতা প্রয়োজন। এরই মধ্যে চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশও পারে সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়াতে, বিশেষত দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্বাসনকাজে বাংলাদেশের ভূমিকা পালনের বিরাট সুযোগ রয়েছে। তবে সময়ের জ্বলন্ত প্রয়োজন হলো খাদ্য, চিকিত্সা, আশ্রয় ও পুনর্গঠনের তহবিল। ধনী দেশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় এই দায়িত্ব নিতে পারে জাতিসংঘ। বিশ্ব সম্পদ ও প্রযুক্তিতে যতটা এগিয়েছে, তার সুফল দিয়ে বিপন্ন হাইতিবাসীকে রক্ষা করার দায়িত্ব আজ বিশ্বমানবতার সামনে।
হাইতি এক দুর্ভাগা দেশ। স্পেনীয় অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাসের হাইতিতে আগমনের পর থেকেই একের পর এক ইউরোপীয় উপনিবেশকারী দেশটিতে হত্যা-লুণ্ঠন চালায় এবং দ্বীপবাসীকে দাস করে। আবার হাইতিই একমাত্র দেশ, যেখানে দাস-বিদ্রোহের বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা আসে। হাইতি লাতিন আমেরিকার প্রথম স্বাধীন দেশ হলেও বারবার সেখানে সামরিক অভ্যুত্থান ও বিদেশি আগ্রাসন চলে। এ সবকিছুর সম্মিলিত ফল হিসেবেই হাইতির দারিদ্র্য ও দুর্বলতা তাকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে অসহায় করে রেখেছে।
বাংলাদেশও জনসংখ্যার ভারে নিমজ্জিত এক দরিদ্র দেশ। রাজধানী ঢাকায় প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও উঁচু ভবন নির্মাণের কারণে ঢাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে থাকা এক নগর। ৬ মাত্রার ভূমিকম্পেই ঢাকা ধূলিসাত্ হয়ে যেতে পারে। হাইতির ঘটনা থেকে তাই হুঁশিয়ার হওয়ার আছে।

চড়া বাজারদর ভোগান্তি বাড়াচ্ছে -আগামী দিনগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

বাজারদর সন্তোষজনক অবস্থায় নেই, থাকতে পারছে না। চড়া হয়ে রয়েছে। এটি ভোগান্তি বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের। বিশেষত, চালের দাম যেভাবে বেড়েছে, তা খানিকটা বিস্ময়করই বটে। এবং যথারীতি দাম বাড়ার যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শীতকালীন শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে বাজারে আসতে আরম্ভ হওয়ার পরও এসবের দাম সেভাবে কমছে না। পাশাপাশি বেড়েছে আটা, চিনি ও পামতেলের দাম। ফলে সাধারণ মানুষের নিয়মিত খাদ্যগ্রহণের ব্যয় বেড়ে গেছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে একই সঙ্গে চড়া দরে চাল কিনতে বাধ্য হওয়ার জন্য ক্রেতাদের হতাশা ও ক্ষোভের কথাও প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়টি কিছুটা উদ্বেগজনকও বটে।
বস্তুত, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে বিশৃঙ্খলা অনেক পুরোনো সমস্যা। সরকার এই বিশৃঙ্খলা দূর করার ক্ষেত্রে খুব কম সময়ই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এর ফলে সাধারণ মানুষকে বারবার ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। সরকার একদিকে কৃষকদের উত্সাহিত করার জন্য ধান-চালের দর কিছুটা উঁচু রাখতে চায়, অন্যদিকে দেশের মানুষকে কমমূল্যে চাল খাওয়াতে চায়। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করা যথেষ্ট দুরূহ কাজ। বর্তমান সরকার শুরু থেকেই কৃষি খাতে ভর্তুকি ও সমর্থন বাড়িয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কৃষকেরা কতটা ন্যায্য দাম পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর তাই কৃষি নিয়ে সরকারের যাবতীয় প্রয়াসের সুফল জনগণ কতটা ও কত দিন পাবে, তাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সুতরাং, বাজারশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের আরও কাজ যে বাকি আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এদিকে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। খাদ্যপণ্যে আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর হওয়ায় এটি দেশের ভেতরে খাদ্যের দামে প্রভাব ফেলবে। তা ছাড়া ভারতসহ কোনো কোনো দেশ চাল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে আবার প্রবাসী আয়ের উচ্চ প্রবাহসহ বিভিন্ন কারণে মুদ্রাবাজারে অর্থের জোগানও বাড়ছে। এগুলোর সমন্বিত প্রভাবে আগামী দিনগুলোতে দেশের ভেতর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অক্টোবর মাসে মূল্যস্ফীতির হার পৌনে সাত শতাংশে চলে গেছে, যদিও গড় হার পাঁচ শতাংশের সামান্য ওপরে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বাড়িয়ে দিতে পারে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করে আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনাকে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছে। নীতিনির্ধারকেরা পুরো বিষয়টি যত দ্রুত আমলে নেবেন, তত দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে জনজীবনে দুর্ভোগ লাঘব করার কাজটি করা সম্ভব হবে।

আটকে পড়া একজনের করুণ আকুতি

মাথায় আঘাত পেয়েছেন তিনি। পা আটকে গেছে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে। ব্যথায়-আতঙ্কে আর্তচিত্কার করছেন, ‘উদ্ধার করুন’। বাঁচার জন্য করুণ আকুতি তাঁর। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে তাঁকে বের করে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সহকর্মীরা। ঘটনাটি হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কর কার্যালয়ের।
বিধ্বস্ত কর কার্যালয়ের ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন ওই কার্যালয়ের এক কর্মী। কংক্রিটের একটি স্ল্যাবের নিচে চিরতরে চাপা পড়তে যাচ্ছিলেন তিনি। সহকর্মীরা প্রাণান্ত চেষ্টায় ওই স্ল্যাবের পতন ঠেকাতে সক্ষম হন। আপাতত তাঁকে রক্ষা করতে সক্ষম হলেও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে এখনো তাঁকে বের করে আনতে পারেননি।
কর কার্যালয়টি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে ঢিল মারা দূরত্বে অবস্থিত। প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে চলছে উদ্ধারকাজ। উদ্ধারকাজের কারণে সেখান থেকে উড়ে আসা পাথরের টুকরো থেকে বিপন্ন ওই ব্যক্তিকে রক্ষায় মুখটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে একটি কাঠের তক্তা দিয়ে।

ভূমিকম্পে মারা গেছেন লেখক জর্জেস অ্যাংলেড

হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান লেখক ও ভূগোলবিদ জর্জেস অ্যাংলেড হাইতির ভূমিকম্পে নিহত হয়েছেন। তাঁর মেয়ে গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানান। ভূমিকম্পের সময় বন্ধুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন জর্জেস অ্যাংলেড ও তাঁর স্ত্রী। ভূমিকম্পে বন্ধুর বাড়িটি ভেঙে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা যান ওই দম্পতি। তাঁদের দুজনেরই বয়স ছিল ৬৫ বছর। একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উত্সবে যোগ দেওয়ার জন্য হাইতি গিয়েছিলেন জর্জেস অ্যাংলেড।
গত বৃহস্পতিবার ওই উত্সব শুরু হওয়ার কথা ছিল। হাইতির তত্কালীন প্রেসিডেন্ট দুভালিয়র ও তাঁর ছেলের নিষ্ঠুর শাসনের প্রতিবাদে ১৯৬৫ সালে হাইতি ছেড়ে পালিয়েযান জর্জেস অ্যাংলেড।

হারিসারা কাঁদায় আশা জাগায় ক্লডরা

দুই দিন হয়ে গেছে। নয় বছরের ছোট্ট শিশু হারিসা কিম ক্লার্গের আশা অনেকেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার হঠাত্ প্রতিবেশীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিসার ঘন ঘন নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পেল। রব পড়ে গেল চারদিকে—‘হারিসা বেঁচে আছে’। ছুটে এলেন উদ্ধারকর্মীরা। হারিসাকে উদ্ধারে নেমে পড়লেন তাঁরা। বাড়ির ভূগর্ভস্থ অংশে আটকে পড়া হারিসাকে বাঁচাতে প্রতিবেশীরাও যোগ দিল।
ঘণ্টা কয়েকের চেষ্টায় হারিসাকে উদ্ধার করা গেছে। তবে ততক্ষণে সবার চোখের কোণেও পানি জমে গেছে। হারিসার গোঙানি থেমে গেছে, চিরতরে। মৃত্যুর আগে হারিসার মুখে ফোঁটা কয়েক পানি দেওয়া গেলেও বাঁচানো যায়নি।
হারিসার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি শোকাতুর হয়েছেন কেটলি ক্লার্গ। হারিসার এই ধর্ম-মা আক্ষেপ করে বলেন, হারিসাকে উদ্ধারে কেউই এগিয়ে আসেনি। পুলিশের দেখা পাওয়া যায়নি।
আগের দিন হারিসার মা লরেন জিয়ানকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে। তবে তাঁর অবস্থা ভালো নয়। তাঁর সারা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন। স্বেচ্ছাসেবকেরা ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছেন তাঁকে। যন্ত্রনায় জিয়ানের চিত্কারে তাঁবুর পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
এলাকার সবার মধ্যমণি মেধাবীস্কুল শিক্ষার্থী হারিসার মৃত্যুতে সবাই যখন মুষড়ে পড়েছে, ঠিক তখন একঝলক আশার আলো নিয়ে এসেছে রেডজেসন হস্টিন ক্লড। দুই বছরের খুদে এই শিশুটিকে বৃহস্পতিবার রাতে স্পেনের উদ্ধারকর্মীরা জীবিত উদ্ধার করেছেন। সন্তানকে ফিরে পেয়ে ক্লডের মায়ের আনন্দ যেন আর ধরে না। ক্লডকে দেখেএখন অন্য মায়েরাও তাঁদের হারানো সন্তানদের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
মঙ্গলবারের ভূমিকম্পের পর পোর্ট অব প্রিন্স এখন মৃত্যুপুরি। চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই মরদেহের মিছিল। কর্ণকুহরে শুধুই আহতদের গোঙানি। তার ওপর নেই খাবার, পানি, ওষুধ। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে কারও আকুতি কানে এলেও অসহায়ত্ব ছাড়া উপায় নেই। দু-চারটি হাতুড়ি আর শাবল দিয়ে কিইবা করার আছে। খালি হাতে এগুলো দিয়ে দু-পাঁচটি ইট সরানো যায় বৈকি, কিন্তু মৃত্যুপুরির গহিনে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধারে হাতগুলো যে বড়ই অবশ হয়ে যায়। চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রিয় মুখের আশায় ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি-দুটি করে ইট আর খোয়া সরাচ্ছে স্বজনেরা। পোর্ট অব প্রিন্সের মেয়র যেমনটা বলছিলেন, ‘হতাহতদের উদ্ধারে আমাদের কিছুই করার নেই। উদ্ধারকাজের কোনো সরঞ্জামই নেই আমাদের। একদম কিছুই না।’
ভয়াল ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া দালানকোঠা বাড়ির নিচে অসংখ্য মানুষ চাপা পড়েছে। তাদের কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছে। সাহায্য চেয়ে মৃত্যুপুরির নীরবতা ভেঙে ভেসে আসছে তাদের কোঁকানি, ভাঙা ভাঙা শব্দে পানির আকুতি। কিছু সময় পর সেই আকুতিটুকুও বন্ধ হয়েযায়। প্রিয় মুখ হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের পাশে অসহায় দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে নারী-পুরুষেরা। আর অপেক্ষা, কখন আসবে সহায়তা।
খাবার, পানি, ওষুধ যেমন জরুরি, তেমনি এ মুহূর্তে হাইতিতে সবচেয়ে বেশি জরুরি আধুনিক সরঞ্জামসহ দক্ষ উদ্ধারকর্মী। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধারে পাগল হয়ে ছুটছে স্বজনেরা। ২৭ বছরের মিচেল রিয়্যু বলছিলেন, ‘আমাদের খাবার নেই, নেই পানি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করা। তারা যে আমাদের পথ চেয়ে আছে।’ মিচেল বলেন, ভূমিকম্পে তাঁর বাড়িটি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। খোলা পার্কে স্ত্রী আর নবজাতক শিশুকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বলেন, ‘খোলা মাঠে আশ্রয় নেওয়া লোকজনও পথ চেয়ে আছেন। খাবার, পানি, ওষুধ জরুরি হয়ে পড়েছে তাদের জন্য।’

দুর্গতদের পাশে ওবামা, বুশ ও ক্লিনটন

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হাইতিতে মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১০ কোটি ডলার ত্রাণ দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির বিপন্ন জনগণের পাশে দাঁড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আর তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও বিল ক্লিনটন।
গত বৃহস্পতিবার সাবেক এই দুই প্রেসিডেন্ট এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘হাইতির জনগণের জরুরি প্রয়োজন মোকাবিলায় আগামী দিনগুলোয় মার্কিন জনগণ ও ব্যবসায়ীদের মনোযোগ আকর্ষণে আমরা একযোগে কাজ করব।’
উল্লেখ্য, হাইতিতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বুধবার থেকেই তহবিল গঠনের কাজ শুরু করেছেন। বিপর্যস্ত হাইতির জনগণের জন্য নগদ অর্থ সহযোগিতার বিষয়ে তিনি সব মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব শেষ করে জর্জ বুশ অনেকটাই নীরবে সময় কাটাচ্ছেন টেক্সাস নগরের উপকণ্ঠে। তাঁর আট বছরের শাসনকালের ওপর গ্রন্থ রচনায় ব্যস্ত তিনি। ডালাস নগরে নিজের নামে প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠারও কাজ করছেন জর্জ বুশ। হাইতির মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় ওবামার ডাকে সাড়া দিয়েছেন জর্জ বুশ।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সমন্বিত উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের বৃহত্তম ত্রাণ তত্পরতার ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, হাইতির জনগণের চরম এ প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র পাশে দাঁড়িয়েছে। সারা বিশ্ব আজ দুর্দশাগ্রস্ত হাইতির পাশে দাঁড়িয়ে বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তরিক বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজারো মানুষ

হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো আটকা পড়ে আছে হাজার হাজার মানুষ। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের অভাবে পরিকল্পিতভাবে উদ্ধারকাজ শুরুই হয়নি। বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণ এবং অন্যান্য সাহায্য রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে পৌঁছালেও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তাও পৌঁছাচ্ছে না দুর্গত মানুষের হাতে। ত্রাণের অপেক্ষায় থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে অসহায় মানুষ। মৃতদেহ স্তূপ করে রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে কোথাও কোথাও বিক্ষোভও করেছে তারা। এদিকে হাইতি সরকারের বরাত দিয়ে রেডক্রস জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার হতে পারে।
উদ্ধার তত্পরতা ব্যাহত
ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যতম দরিদ্র দেশ হাইতিতে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য তেমন কোনো অবকাঠামো নেই। দুই পাশ থেকে ভবন ধসে পড়ে প্রায় সব রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল পোর্ট অব স্পেনে পৌঁছালেও তারা শহরের বেশির ভাগ এলাকায় যেতে পারছে না। এতে উদ্ধার তত্পরতা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। ভূমিকম্পের পর তৃতীয় রাতও খোলা আকাশের নিচে রাস্তার ওপর কাটিয়েছে বেশির ভাগ মানুষ।
রাস্তার ওপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে মৃতদেহ। বুলডোজারে করে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পোর্ট অব প্রিন্স থেকে বিবিসির প্রতিনিধি এন্ডি গ্লাসার জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আটকে পড়া মানুষের যে আকুতি আগে শোনা যাচ্ছিল, তাও এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে।
বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে তারা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বৃহস্পতিবার বলেছেন, কিছু মার্কিন উদ্ধারকারী ইতিমধ্যে পোর্ট অব প্রিন্সে পৌঁছেছে এবং আরও অনেককে পাঠানো হচ্ছে।
ভারী সরঞ্জাম এবং উদ্ধারকাজে সহযোগিতার জন্য প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে একটি ব্রিটিশ উদ্ধারকারী দল হাইতিতে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ এবং কানাডা, চীন, রাশিয়া ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে।
মৃতের সংখ্যা
রেডক্রস জানিয়েছে, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার হতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অব অ্যান্ড রেডক্রিসেন্টের আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান জ্যাভিয়ার ক্যাসেলানোস গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘হাইতি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার হতে পারে।’ তিনি জানান, হাইতির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ অর্থাত্ প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাইতির প্রেসিডেন্ট রেনি প্রিভাল বলেছেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে সাত হাজার মৃতদেহ গণকবর দিয়েছি।’
সাহায্যে ভরে গেছে
বিমানবন্দর
মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো সাহায্যে পোর্ট অব প্রিন্সের বিমানবন্দর ভর্তি হয়ে গেছে। সেখানে বিমান ওঠানামার জায়গা নেই। তাই এ মুহূর্তে সাহায্য না পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জনিয়েছে হাইতি।
মার্কিন কেন্দ্রীয় বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার জানান, একটি সামরিক ও ১০টি বেসামরিক বিমান পোর্ট অব প্রিন্সের বিমানবন্দরে অবতরণের জন্য অপেক্ষা করছে। অন্য বিমানগুলো বন্দর ত্যাগ করার পর সেগুলো অবতরণ করবে।
মার্কিন বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডগলাস ফ্রাসের জানিয়েছেন, বিমানবন্দর সচল করতে মার্কিন বাহিনী আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
পুনর্গঠন তহবিল সংগ্রহে
আন্তর্জাতিক সম্মেলন
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি জানিয়েছেন, হাইতি পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তহবিল সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশকে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হবে। হাইতি কানাডার সাবেক উপনিবেশ।
কানাডার প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেবে কানাডা।
হাইতির জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে ১০ কোটি মার্কিন ডলার ত্রাণ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন কাজে আগামী বছরগুলোতে সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানো হবে। এএফপি, এপি, বিবিসি ও আল জাজিরা।

বারলুসকোনির দুর্নীতির বিচার শুরু হয়েছে

ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনির বিচার গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে। তবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বারলুসকোনির বিরুদ্ধে অভিযোগ, নব্বইয়ের দশকে দুটি মামলায় আদালতে নিজের পক্ষে মিথ্যা বলার জন্য তিনি তাঁর সাবেক আইনজীবীকে ঘুষ দিয়েছিলেন। সাড়ে চার লাখ ইউরো ঘুষ নেওয়ার দায়ে ব্রিটিশ কর আইনজীবী ডেভিড মিলসকে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালত।
বারলুসকোনির আইনজীবী নিক্কোলো জানিয়েছেন, প্রথম দিনের শুনানিতে তাঁর মক্কেল সম্ভবত উপস্থিত থাকবেন না। আগামী মাসে তথ্য-প্রমাণ নিয়ে শুনানিকালে তিনি আদালতে উপস্থিত থাকবেন।
নিজের অপরাধের দায়মুক্তির জন্য একটি আইন করেছিলেন বারলুসকোনি। কিন্তু ইতালির সাংবিধানিক আদালত গত বছর ওই আইনটি বাতিল করে দেওয়ায় তাঁর বিচার শুরু হলো।

জ্যোতি বসুর অবস্থার আরও অবনতি

পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। বুধবার গভীর রাতে তাঁর হূদযন্ত্রে সমস্যা শুরু হওয়ার পর এখনো কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়নি।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে কলকাতার সল্টলেকের বেসরকারি এএমআরআই হাসপাতাল থেকে প্রচারিত চিকিত্সা বুলেটিনে বলা হয়েছে, জ্যোতি বসু এখন অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর মস্তিষ্ক, কিডনি ও হূদযন্ত্রের কাজ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। রয়েছেন পুরোপুরি ভেন্টিলেশনে। বাড়ানো হয়েছে অক্সিজেনের মাত্রা। ফুসফুসের সংক্রমণ এখনো কমেনি। ওষুধেও আশানুরূপ সাড়া দিচ্ছেন না তিনি। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে গেছে।

ফের ভাসছে টাইটানিক

আবার পানিতে ভাসবে টাইটানিক। তবে আসল টাইটানিক জাহাজের মতো বড় আকারের নয় সেটি। সম্প্রতি টাইটানিক জাহাজের ছয় ফুট দীর্ঘ একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। মূল জাহাজের ১৫০ ভাগের এক ভাগ আকারের এই টাইটানিক ৩০০টির বেশি হাতে তৈরি ছোট টুকরো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। শান্ত পানিতে এর গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার। ব্যাটারিচালিত তিনটি প্রপেলারযুক্ত এই ক্ষুদ্র জাহাজ দূরনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি দিয়ে চালানো যায়।
নিউইয়র্কভিত্তিক প্রযুক্তি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হ্যামাচের শ্লেমার টাইটানিকের ওই ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি বিক্রির জন্য তুলেছে। এটির দাম ধরা হয়েছে দেড় হাজার পাউন্ড। ছোট জাহাজটি ৭৫ ফুট দূর থেকেও দূরনিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার মাধ্যমে চালানো যাবে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজটির দরজা, জানালা, রেলিং তৈরি করতে প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। ডেক আর মাস্তুল তৈরি করা হয়েছে মেহগনি এবং সাদা ম্যাপল কাঠ দিয়ে। ছোট এই টাইটানিকেও জীবন রক্ষাকারী নৌকা, ক্রেন, ডকিং ডেক ইত্যাদি রাখা হয়েছে। ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল ৮৮২ ফুট দীর্ঘ আসল টাইটানিক জাহাজটি ডুবে যায়। ওই দুর্ঘটনায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।

বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ

আফ্রিকা ও এশিয়ার হাজার হাজার মানুষ গতকাল শুক্রবার বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে কোথাও কোথাও মেঘের কারণে এটা পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। মহাজাগতিক এ ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য সারা বিশ্বে বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। খবর এপির।
আফ্রিকায় গতকাল শাদ, কঙ্গো, উগান্ডা, কেনিয়া ও সোমালিয়া থেকে প্রথম সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা যায়। এরপর এশিয়ার মালদ্বীপ, মিয়ানমার, চীন, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।
কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে মেঘের কারণে তা পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। এতে যারা সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে আগে-ভাগে ঘুম থেকে জেগেছিল, তারা হতাশ হয়েছে। মোনিকা কামাউ নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে খুব সকালেই ঘুম থেকে জেগেছিলাম। কিন্তু মেঘের কারণে মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি।’
উগান্ডার মানুষ সূর্যগ্রহণকে সূর্য ও চাঁদের মধ্যে যুদ্ধ বলে অভিহিত করে থাকে। কাম্পালার বাসিন্দা দামালি নাকাজা বলেন, ‘সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করাটা দুর্লভ ব্যাপার। এটা পর্যবেক্ষণ করতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দ অনুভব করছি।’
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় ছোট শহর ধানুসকুদিতে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণে শত শত লোক সমবেত হয়। সেখানে প্রায় ১০ মিনিট ধরে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। তবে বলয়গ্রাসের সময় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। এ সময় সূর্যের চারদিকে একটি বলয় বা চুড়ির মতো দেখা যায়।

জেনারেলদের আদালতে তোলা হচ্ছে

অভ্যুত্থানের সময় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে হন্ডুরাসের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ জ্যেষ্ঠ সেনা কমান্ডারদের আদালতে তোলা হচ্ছে। গত জুনের ওই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়া।
গত বৃহস্পতিবার হন্ডুরাসের সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট জর্জ রিভেরা দেশটির জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের ছয় সদস্যের সবাইকে দেশে উপস্থিত থাকতে এবং পরবর্তী সপ্তাহে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ওই ঘোষণার ছয় ঘণ্টা আগে রিভেরার সঙ্গে দেখা করেছিলেন সেনাপ্রধানসহ জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা।
সরকারি কৌঁসুলি মারিয়ো ক্যাভানাস বলেন, ওই সেনা কমান্ডাররা দেশ ত্যাগ করতে পারবেন না এবং নির্দিষ্ট সময় বিরতিতে তাঁদের আদালতে হাজিরা দিতে হবে।
গত সপ্তাহে হন্ডুরাসের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি লুইস আলবার্তো রুবি সেনা কমান্ডারদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যাঁদের আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল রোমেও ভাসকুয়েজ, বিমানবাহিনীর প্রধান জেনারেল জেভিয়ার প্রিন্স ও নৌবাহিনীর কমান্ডার হুয়ান পাবলো রডরিগুয়েজ।
সেনা কমান্ডারদের আইনজীবী হুয়ান কার্লোস সানচেজ বলেন, মক্কেলদের নির্দোষ প্রমাণের মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে তাঁর হাতে। তিনি বলেন, প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার দিকে তাঁরা মনোনিবেশ করতে চান। অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণের জন্য তাঁরা আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করবেন।
সেনা কমান্ডাররা সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গেলে আদালত ভবনের বাইরে উপস্থিত ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট জেলায়ার সমর্থকেরা তাঁদের উদ্দেশে নিন্দাসূচক ধ্বনি দেন। অন্যদিকে অপর একটি দল সেনা কমান্ডারদের পক্ষে সমর্থনসূচক বিভিন্ন ধরনের পতাকা নাড়ান।
২৮ জুনের অভ্যুত্থান বৈধ ছিল কি না, সরকারি কৌঁসুলিরা এই প্রশ্ন তোলেননি। শুধু জেলায়াকে কোস্টারিকায় নির্বাসনে যেতে বাধ্য করতে সেনাবাহিনী বাড়াবাড়ি করেছিল কি না, ওই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
গত সপ্তাহে অ্যাটর্নি জেনারেল যখন সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আহ্বান জানান তখন ম্যানুয়েল জেলায়া এটাকে অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, সেনাবাহিনীর মতো অ্যাটর্নি জেনারেলও সমভাবে দায়ী কিংবা সেনাবাহিনীর চেয়েও তিনি বেশি দায়ী। সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে ছোটখাটো অপরাধের অভিযোগ তুলে তাঁদের দণ্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্যই এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পোরফিরিয়ো লোবো বলেছেন, ম্যানুয়েল জেলায়া এবং অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার পক্ষে তিনি। উল্লেখ্য, ২৭ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

পাকিস্তানকে দেওয়া সাহায্যের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে

পাকিস্তানকে সাহায্য হিসেবে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলার যেন অপব্যবহার না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও। ‘ইন্ডিয়ান ইনিশিয়েটিভ অব দ্য সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’ এবং ‘এএসপিইএন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’-এর একটি অনুষ্ঠানে গত বৃহস্পতিবার তিনি এ কথা বলেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা তাঁর পাকিস্তানি প্রতিপক্ষ শাহ মেহমুদ কুরেশির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন গত বুধবার। এ সময় তিনি মুম্বাই হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করার কথা বলেছিলেন কুরেশিকে। এর এক দিন পরই পররাষ্ট্রসচিব এ কথা বললেন।
নিরুপমা রাও পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান ভারতবিরোধী শক্তিকে মদদ দেওয়া বন্ধ করলেই কেবল তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি আরও জটিল করে তুলছে।’
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে অপশক্তির মোকাবিলা করতে হচ্ছে আমাদের। যদিও পাকিস্তানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি, সুশীল সমাজের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য আমরা সব সময় সর্বাত্মক সহযোগিতার চেষ্টা করে আসছি।’
ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের পাকিস্তানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সেনাবাহিনী যে মদদ দিচ্ছে, তা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রাও বলেন, ‘এ ধরনের মদদ বন্ধ করা খুবই জরুরি। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য করণীয় সব কিছুই এ বিষয়টির ওপর নির্ভর করছে। কেননা এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় চিন্তা করা বাস্তববাদী হবে না।’
পাকিস্তানের সীমান্ত সন্ত্রাসীদের অভয়স্থলে পরিণত হওয়া এবং অব্যাহতভাবে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে যোগসূত্র আছে উল্লেখ করে নিরুপমা রাও এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের জন্য কোনো হুমকি নেই জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমরা এর আগেও অনেকবার বলেছি, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো আক্রমণাত্মক মনোভাব নেই।’

চতুর্থ উইকেট জুটিতে

মাত্র ৩৬টি রান। এই কটা রান করতে পারলে কাল রিকি পন্টিং ও মাইকেল ক্লার্ক ছুঁয়ে ফেলতে পারতেন ডন ব্র্যাডম্যান ও বিল পন্সফোর্ডের জুটির রেকর্ডটাকে। ১৯৩৬ সালের অ্যাশেজে হেডিংলি টেস্টে চতুর্থ উইকেটে ৩৮৮ রানের জুটি গড়েছিলেন ব্র্যাডম্যান-পন্সফোর্ড। ক্যারিয়ারের দুটি ত্রিশতকের দ্বিতীয়টি পেয়েছিলেন ব্র্যাডম্যান। দুটোই এই একই মাঠে। এখন পর্যন্ত চতুর্থ উইকেটে ওটাই অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ জুটি। পন্টিং-ক্লার্কেরটা অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, সব মিলিয়ে ষষ্ঠ। সব দেশ মিলে রেকর্ডটা মাহেলা জয়াবর্ধনে ও থিলান সামারাবীরার; গত বছর করাচি টেস্টে তাঁরা গড়েছিলেন ৪৩৭ রানের জুটি। টেস্টে চতুর্থ উইকেটে চার শ রানের জুটি আছে আর একটিই। ১৯৫৭ সালে এজবাস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪১১ রান তুলেছিলেন পিটার মে ও কলিন কাউড্রে। চতুর্থ উইকেটে বাংলাদেশের রেকর্ড জুটিটা হাবিবুল বাশার ও প্রয়াত মানজারুল ইসলামের। ২০০৪ সালে কিংস্টন টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১২০ রান তুলেছিল এই জুটি।

আকাশের মুখ ভার, স্মিথদেরও

প্রথম দিন খেলা হয়েছে ৬০ ওভার। বাকি ৩০ ওভার ‘খেলেছে’ বৃষ্টি। বৃষ্টির খেলা জোহানেসবার্গ টেস্টের দ্বিতীয় দিনেও চলছে। আকাশের চেয়ে বেশি মুখ কালো গ্রায়েম স্মিথের। নিজে সেঞ্চুরি করেছেন। তার পরও মুখ ভার। বোলিংয়ের পর ব্যাট হাতেও দাপট চলছে দক্ষিণ আফ্রিকানদের। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরো তাদের হাতে। কিন্তু প্রকৃতি এমন শত্রু হয়ে উঠবে কে জানত!
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চা-বিরতি প্রলম্বিত হয়েছে বৃষ্টির কারণে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ২০৮/২। লিড ২৮ রানের। ৭১ রানে অপরাজিত হাশিম আমলার সঙ্গী জ্যাক ক্যালিসের রান ২।
প্রথম দুই সেশনে মাত্র ৪৭.৩ ওভার খেলা হয়েছে। অবশ্যই এই সময়টুকুতেই ম্যাচে আরও গেড়ে বসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। বিনা উইকেটে ২৯ রান দিয়ে দিন শুরু করেছিল তারা। ফর্মে না থাকা অ্যাশওয়েল প্রিন্স মাত্র ১৯ রান করে স্টুয়ার্ট ব্রডের শিকার হলে ৩৬ রানে প্রথম উইকেটের পতন। এর পর আমলা ও স্মিথের ১৬৫ রানের জুটি। ক্যারিয়ারের ২০তম আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ষষ্ঠ সেঞ্চুরি করেছেন স্মিথ। প্রথম ৫০ রান তুলতে ১০৫ রান খরচ করা এই বাঁহাতি পরের ৫০ তুলেছেন ৭৭ বলে। কিন্তু সেঞ্চুরির পর পরই রায়ান সাইডবটমের বলে ক্যাচ তুলে বিদায় নিয়েছেন।
এই ছোট্ট সময়ে ঘটে গেছে আরেক নাটক। দিনের চতুর্থ ওভারে স্মিথের বিপক্ষে কট বিহাইন্ডের জোরাল আবেদন জানায় ইংল্যান্ড। আম্পায়ার টনি হিল ‘না’ বলে দিলে রিভিউ চেয়েছিলেন অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস। টিভি রিপ্লেতে শব্দ শোনা গেলেও থার্ড আম্পায়ার ড্যারিল হার্পার হিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
যদিও ভাগ্য স্মিথের পক্ষেই গেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আসল জায়গায় কি ভাগ্য তাঁর পক্ষে যাবে? গত টেস্টে ১৮৩ রান করেও দলকে জেতাতে পারেননি ইংল্যান্ড রুখে দাঁড়ানোয়। আর এই টেস্টে স্মিথদের প্রতিপক্ষ যে প্রকৃতিও। আগামী তিন দিন আবহাওয়ার অবস্থা আরও খারাপ হবে বলেই পূর্বাভাস!

নাঈম-আসিফের সেঞ্চুরি, তালহার ৭ উইকেট

নামই হয়ে গেছে ‘ছক্কা-নাঈম’, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মারকাটারি ব্যাটিংয়ের জন্য। এখনো তিনি টেস্ট দলে খেলার যোগ্য বিবেচিত হতে পারেননি। তাই তাঁর জাতীয় দলের সতীর্থরা যখন ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলতে চট্টগ্রামের বিমান ধরেছেন, রাজশাহীর হয়ে সিলেটের বিপক্ষে জাতীয় লিগের প্রথম চার দিনের ম্যাচ খেলতে তিনি বাস ধরেছেন ফতুল্লার।
আর এই ফতুল্লা স্টেডিয়ামেই ‘ছক্কা-নাঈম’ আবির্ভূত হলেন অন্য রূপে। ধুম-ধাড়াক্কা ব্যাটিং রেখে এখানে তিনি পুরোদস্তুর এক টেস্ট ব্যাটসম্যান। তাঁর ১৯২ বলে ১২৩ রানের ইনিংসের কল্যাণেই সিলেটের বিপক্ষে রানের পাহাড় গড়েছে রাজশাহী। ৭ উইকেটে ৫২৯ রান তুলে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করেছে গত জাতীয় লিগের চার দিনের ম্যাচের চ্যাম্পিয়নরা। কাল সেঞ্চুরি করেছেন আরও একজন—বরিশালের ওপেনার আসিফ আহমেদ। তাঁর সেঞ্চুরিতে খুলনায় চট্টগ্রামের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২৩৯ রান তুলেছে বরিশাল। ৩৯ রান পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে দিন শেষের আগে ২ উইকেটে ৯০ রান তুলেছে চট্টগ্রাম।
জাতীয় লিগের প্রথম দিনটি ছিল বোলারদের। নাঈম-আসিফের সেঞ্চুরির পরও দ্বিতীয় দিনটি শুধুই ব্যাটসম্যানদের হয়নি, রাজশাহীতে ঢাকা-খুলনা ম্যাচে কালকের দিনটি ছিল একজন বোলারেরও। ৫৯ রানে ৭ উইকেট নিয়ে খুলনাকে ২২০ রানে অলআউট করায় বড় ভূমিকা রেখেছেন তালহা জুবায়ের। এর পরও এ ম্যাচে ঢাকাই পিছিয়ে। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১২০ রানে অলআউট হয়েছে তারা।
আমাদের রাজশাহী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আলোকস্বল্পতায় ৮ ওভার বাকি থাকতেই শেষ হয়ে যায় দিনের খেলা। আগের দিনের ৮ উইকেটে ৭৭ রানের সঙ্গে অবশিষ্ট ২ উইকেট হারিয়ে কাল আর মাত্র ৪৩ রান যোগ করতে পারে ঢাকা। ১২ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে খুলনা। ওপেনার নাজমুস সাদাত (৬০) ও হাবিবুল বাশারের (৬৯) হাফ সেঞ্চুরিতে অলআউট হওয়ার আগে ২২০ রান তোলে তারা। তবে খুলনার রানের লাগাম টেনে ধরেছেন তালহা। ৫৯ রানে ৭ উইকেট নেন তিনি। ২৩৩ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করছে ঢাকা। উইকেটে আছেন দুই ওপেনার উত্তম সরকার (৮) ও রনি তালুকদার (৯)।
ফতুল্লায় জহুরুলের সেঞ্চুরির পরদিনই আরেকটি সেঞ্চুরি করলেন নাঈম ইসলাম। টেস্ট দলে ডাক না পেয়ে প্রথম ম্যাচেই তিনি যেন নির্বাচকদের দেখিয়ে দিলেন ‘আমিও পারি’। পাঁচ নম্বরে খেলতে নেমে ১৯২ বলে করেছেন অপরাজিত ১২৩ রান (১৬ চার, ১ ছক্কা)। আট নম্বরে খেলতে নামা আনিসুরের হাফ সেঞ্চুরিতে (৭৯) রান-পাহাড়ে ওঠে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ৭ উইকেটে ৫২৯ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেন রাজশাহীর অধিনায়ক খালেদ মাসুদ। জবাবে বাঁহাতি স্পিনার সাকলাইন সজীবের আঘাতে (৪/২৪) ফলোঅনের শঙ্কায় ধুঁকছে সিলেট। ৩৫ ওভারে ৮৬ রান তুলতেই ৬ উইকেট খোয়াতে হয়েছে রাজিন সালেহর দলকে।
খুলনায় আসিফের ১০৮ রানের সুবাদে অলআউট হওয়ার আগে ২৩৯ রান তোলে বরিশাল। জবাবে ৩৩ ওভারে ২ উইকেটে ৯০ রান তুলেছে চট্টগ্রাম।

বসানোই না হলে সরঞ্জাম এনে লাভ কী

এক সাঁতার সংগঠকের মুখে তীব্র ক্ষোভ, ‘২০টা স্টার্টিং ব্লক ঠিকাদার দিয়ে গেছেন এক সপ্তাহ আগে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসএ গেমস করা হচ্ছে, কিন্তু সামান্য কয়েক হাজার টাকা খরচ করে এগুলো পুলে বসানোর খবর নেই!’
ক্ষোভের জ্বালামুখই যেন খুলে দিলেন ওই সংগঠক, ‘পুরোনো স্টার্টিং ব্লক কেটে ফেলে দিতে হবে। নতুনগুলো লাগাতে কয়েক দিন সময় লেগে যাবে। এগুলো লাগানোর পর সাঁতারুদের অভ্যস্ত হওয়ার ব্যাপার আছে। অথচ গেমসের আর বাকি মাত্র ১২-১৩ দিন! এখন সবাই শুধু সাঁতারে এসে জিজ্ঞেস করছে, কয়টা সোনা জিতব। সামান্য স্টার্টিং ব্লক লাগানোর কাজটা ৭ দিনেও যেখানে হয় না, সেখানে সোনা তো আকাশ থেকে পেড়ে আনা যাবে না!’
সাঁতার ফেডারেশন হয়তো এখনো ধৈর্য ধরতে পারে, কিন্তু অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন ধৈর্যই হারিয়ে ফেলেছে। অ্যাথলেটিকসের ইলেকট্রনিকসামগ্রী আনা হয়েছে প্রায় দেড় মাস আগে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এগুলো এখনো বসানো হয়নি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলছেন, ‘আমরা চিঠির পর চিঠি দিয়েছি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে। তারা বলছে, বিদেশ থেকে টেকনিশিয়ান আসবে। সর্বশেষ বলা হয়েছিল, ৫ জানুয়ারির মধ্যে সব হয়ে যাবে। কিন্তু আজ ১৫ জানুয়ারি গেল, তবু হলো না। এখনো পরিষদ বলছে, শিগগিরই হয়ে যাবে। সেই ‘শিগরিগই’ আর শেষ হচ্ছে না!’
অপেক্ষায় থেকে লাভ নেই, তাই কাল বিকেএসপিতে হ্যান্ড টাইমিংয়েই শেষ করা হলো অ্যাথলেটদের চূড়ান্ত বাছাই। গেমসের আগে নিজেদের আসল টাইমিংটা অজানাই রয়ে গেল অ্যাথলেটদের।
এদিন হ্যান্ড টাইমিংয়ে সম্প্রতি নিজের গড়া জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছেন সুমিতা দাস। ১০০ মিটার হার্ডলসে ১৩.৮০ থেকে সময় কমিয়ে এনেছেন ১৩.৬০। এসএ গেমসে তাঁর সোনা জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। একই ইভেন্টে জেসমিন আক্তারের টাইমিংও খুব কাছাকাছি—১৩.৭০ সেকেন্ড। হাইজাম্পে আবারও নিজের রেকর্ড ভেঙেছেন সজীব হোসেন (২.৬ মিটার)। ১১০ মিটার হার্ডলসে আসাদুর রহমানের টাইমিংও ১৪.২০ বেশ ভালো মনে করা হচ্ছে।
তারপরও জোর দিয়ে কিছু বলতে পারছেন না অ্যাথলেটরা। হ্যান্ড টামিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকায় তাদের মনের মধ্যে একটা সংশয় থেকেই গেছে।
জানা গেছে, অ্যাথলেটিকসের স্টার্টিং ব্লকগুলো এখনো আসেনি। ওটা না হলে ইলেকট্রনিক ডিভাইস পুরোপুরি কার্যকর করা যাবে না।

অঘটনকে বিদায় দিল আলজেরিয়া

অঘটনের বৃত্ত ভাঙল আলজেরিয়া। পরশু মালিকে ১-০ গোলে হারিয়ে আফ্রিকান নেশনস কাপে আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া দলগুলোর মধ্যে প্রথম জয় পেল তারা। এদিন জয় পেয়েছে স্বাগতিক অ্যাঙ্গোলাও। ফ্লাবিও ও মানুচোর গোলে মালাবিকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছে নেশনস কাপের স্বাগতিকেরা।
মিসরের কাছে নাইজেরিয়ার হার, ক্যামেরুনের গ্যাবন-হতাশা, আইভরিকোস্ট আটকে গেছে বারকিনা ফাসোতে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের টিকিট যে দেশগুলোর হাতে, আফ্রিকান নেশনস কাপের প্রথম সপ্তাহে এভাবেই একের পর এক অঘটনের শিকার হয়েছে সে দেশগুলো। নিজেদের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াও মালাবির কাছে হেরেছে ৩-০ গোলে। এ কারণে সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি তাদের। পরশুর জয় আলজেরিয়ার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বাঁচিয়ে সুযোগ করে দিয়েছে সমালোচনার জবাব দেওয়ার। আলজেরিয়ার কোচ রাবাহ সাদানে বলেছেন, ‘এই জয়টা আমাদের সমালোচকদের জন্য উচিত জবাব। আজ (পরশু) আমরা দল হিসেবে খেলেছি এবং যা চেয়েছি, সেই জয় পেয়েছি।’
অ্যাঙ্গোলা কোচ ম্যানুয়েল হোসের কণ্ঠেও নিজের খেলোয়াড়দের প্রশংসাগাথা। নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৪ গোল করেও মালির সঙ্গে ড্র করতে হয়েছিল তাদের। সেই দুঃখ পরশু কিছুটা হলেও ভুলতে পেরেছে স্বাগতিকেরা। ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘এ’ গ্রুপের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে এখন তারাই। ৩ পয়েন্ট করে অ্যাঙ্গোলা ও মালাবির। ১ পয়েন্ট নিয়ে মালি আছে সবার শেষে। তবে এখনো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা আছে সব কটি দলেরই।
এর মধ্যে অ্যাঙ্গোলাই সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায়। ম্যাচ শেষে অ্যাঙ্গোলা অধিনায়ক কার্লোস ‘কালি’ আলোন্সো বলেছেন, ‘আমরা এখন অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছি। দলের মানসিক অবস্থাও ভালো।’ কোচ ম্যানুয়েল হোসে করলেন খেলোয়াড়দের প্রশংসা, ‘আজ (পরশু) দলের সবাই খুব উদ্যম নিয়ে খেলেছে।’

যুবরাজকে সরিয়ে সাঙ্গাকারা

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের অধিনায়কত্ব হারাতে পারেন যুবরাজ সিং—এমন ইঙ্গিত ছিল আগেই। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হলো, দলটির নতুন অধিনায়ক করা হয়েছে কুমার সাঙ্গাকারাকে।
যুবরাজের নেতৃত্বে আইপিএলের প্রথম মৌসুমে কিংস ইলেভেন সেমিফাইনাল খেলেছিল, পরের মৌসুমে জায়গা পায়নি শেষ চারে। তবে কেন যুবরাজকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, দলের পক্ষ থেকে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। এটুকু বলা হয়েছে—যুবরাজ যাতে তাঁর ব্যাটিংয়ে আরও মনোযোগী হতে পারে সেজন্যই এই অব্যাহতি। তবে দলের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটার হিসেবে যুবরাজই পাবেন সর্বোচ্চ মর্যাদা, দলের পক্ষ থেকে এটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

লোথার ম্যাথাউস এখন ফুটবল-দূত

সেদিন ছিল জার্মানির জার্সি। আর এ দিন তিনি স্যুটেড-বুটেড। সেটি ছিল মিলানের সান সিরো। এ দিন কলকাতার এক হোটেল। মাঝখানে বি-শ বছর।
লোথার ম্যাথাউসকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই!
খেলোয়াড়ি জীবনের চেহারাটা এখনো এমনভাবেই ধরে রেখেছেন যে, চাইলে এই ৪৭ বছর বয়সেও যেন আবার নেমে যেতে পারেন মাঠে!
বিশ বছর আগে তাঁর ফুটবল-জীবনকে পূর্ণতা দিতে এসেছিল সেই রাত। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তুলে ধরেছিলেন বিশ্বকাপ ট্রফি। কাল কলকাতার শীতার্ত দুপুরে সেই ট্রফি লোথার ম্যাথাউসকে আবার ভাসিয়ে দিল বিশ বছর আগের সেই অনির্বচনীয় অনুভূতিতে। ‘বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে এই ট্রফিটা তুলে ধরার অনুভূতি আসলে বলে বোঝানোর নয়’—বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটাও ধরা আছে এতেই।
এই বিশ্বে কজনেরই বা পরিচয় আছে সেই সুখানুভূতির সঙ্গে! তবে কাছ থেকে চর্মচক্ষে সোনার ওই ট্রফিটা দেখার অনুভূতিই কি কম রোমাঞ্চের! ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম স্পনসর কোকাকোলার সৌজন্যে যেটির সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে কলকাতাবাসীর। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের আগে কোকের হাত ধরে এই ট্রফির বিশ্বভ্রমণের সূচনা হলো কলকাতায়। সেটিকে কেন্দ্র করে তিন দিনের উত্সব। মধ্যমণি অবশ্যই লোথার ম্যাথাউস।
এই ট্রফি যেখানেই যাবে, ম্যাথাউসের মতো কাউকে লাগবেই। বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় বা রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া আর কারও যে ওই ট্রফি তুলে ধরার অধিকার নেই। আপনি কী ভাবছেন, তা অনুমান করতে পারছি। ২০০২ সালেই না বাংলাদেশ ঘুরে গেছে ওই ট্রফি। কতজনই তো তা ছুঁয়েছেন। আবেগে উদ্বেল বাংলাদেশের স্ট্রাইকার আলফাজ আহমেদ যে অনুভূতি বোঝাতে দিয়েছিলেন অমর এক বাণী, ‘আজগুবি ব্যাপার!’ স্পনসরদের প্রভাবে আলফাজের মতো বাংলাদেশের অনেকেই বুঝতেও পারেননি, ওটি ছিল বিশ্বকাপ ট্রফির রেপ্লিকা। আসল ট্রফি নয়।
আসল ট্রফির এমনই মহিমা যে, সেটির জন্য বরাদ্দ প্রায় রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা। গত পরশু কলকাতায় আগমনের পরই যেমন বোমা মারলেও কিছু হবে না এমন বিশেষ একটা ভল্টে রাখা হয়েছে এটিকে। ট্রফির এই বিশ্বভ্রমণে সঙ্গী হয়েছে ফিফার নিজস্ব নিরাপত্তাদলও।
আজ সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সাধারণ্যে প্রদর্শিত হবে সেই ট্রফি। গতকাল দুপুরের আয়োজন শুধুই সংবাদমাধ্যমের জন্য। যেটির মূল আকর্ষণ অবশ্যই লোথার ম্যাথাউসের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব। যাতে দারুণ সপ্রতিভ ফিফার প্রথম বিশ্বসেরা ফুটবলার। উপস্থাপক দোভাষীর কথা বলেছিলেন। হাত নেড়ে সে প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়ে ইংরেজিতে কথা বললেন। মাঝেমধ্যেই পরিচয় দিলেন দারুণ রসবোধেরও।
নিজের ক্যারিয়ার, জার্মান ফুটবল, ২০১০ বিশ্বকাপ, ম্যারাডোনা, মেসি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দ্বৈরথ, অঁরি-বিতর্ক...বিচিত্র সব বিষয় ছুঁয়ে যাওয়া সেই প্রশ্নোত্তর পর্বে সবচেয়ে বেশি মূর্ত হয়ে উঠল ম্যাথাউসের ফুটবল-প্রেম। ‘চাইলেই কেউ ম্যারাডোনা-রোনালদো হতে পারবে না। আমি শুধু বলি, খেলাটা উপভোগ করো। এটা দারুণ একটা খেলা, যা জাতি-বর্ণ-ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়’—বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে এত সব অর্জনের চেয়েও এই উপভোগ্যতাই ফুটবলে ম্যাথাউসের পাওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।
অর্জনের কথা বললে একটা জায়গায় তো পেলে-ম্যারাডোনাও তাঁর পেছনে! ১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত পাঁচটি বিশ্বকাপে খেলেছেন ২৫টি ম্যাচ। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার এই রেকর্ড কোনো দিন ভাঙবে কি না, এ নিয়ে তর্ক হতেই পারে।
সময়টা আবার লক্ষ করুন। এটা তো ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার সময়! ম্যাথাউসের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারেও স্মরণীয়তম স্মৃতি হয়ে আছে ম্যারাডোনার সঙ্গে দ্বৈরথের সেই হিরণ্ময় মুহূর্তগুলো। স্মৃতিচারণার সময় ম্যাথাউসও যেন এক দশকেরও বেশি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডফিল্ডার থেকে ম্যারাডোনা-ভক্তে রূপান্তরিত! ‘আমি বিশ বছর পেশাদার ফুটবল খেলেছি। ম্যারাডোনার চেয়ে ভালো কোনো খেলোয়াড় দেখিনি।’
ম্যারাডোনার প্রতি এই পেশাদার শ্রদ্ধা ফেরতও পেয়েছেন। আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা তাঁর কঠিনতম প্রতিপক্ষের স্বীকৃতি দিয়েছেন ম্যাথাউসকে। আজও যেটিকে মাথায় করে রাখেন ম্যাথাউস, ‘একটা কারণ হয়তো আমি ফেয়ার খেলেও ওকে আটকাতে চেয়েছি। ওর পা ভেঙে দিতে চাইনি।’
ছিয়াশির বিশ্বকাপ ফাইনালে ম্যারাডোনাকে মার্কিং করার কঠিন দায়িত্বটাও পড়েছিল তাঁর ওপর। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? ম্যাথাউস হাসেন, ‘খুব কঠিন। ম্যারাডোনা এমন সব কিছু করত যে, ওর দিকে সারাক্ষণই মনোযোগ রাখতে হতো। তবে আমি ওর চেয়ে দ্রুততর ছিলাম বলে অনেক বল কেড়ে নিতে পেরেছি।’ হাসিটা আরও বিস্তৃত করে এরপরই ম্যাথাউস জানান, ‘শুধু জার্মানি-আর্জেন্টিনা কেন, ইন্টার মিলান-নাপোলিতেও আমরা ছিলাম প্রতিপক্ষ। আমি যেসব ম্যাচে খেলেছি, ম্যারাডোনা কোনো গোল করতে পারেনি, এটা আমার অনেক বড় তৃপ্তির জায়গা।’
২০১০ বিশ্বকাপে তাঁর ফেবারিট স্পেন। তবে সঙ্গে যোগ করে দিতে ভুললেন না, ‘এর মানে এই নয় যে, স্পেনই বিশ্বকাপ জিতবে।’ কিন্তু ম্যাথাউসের জার্মানি? ট্রফি হাতে ম্যাথাউসের সেই ছবিতেই থমকে আছে যাদের বিশ্বকাপ-সাফল্য! ম্যাথাউস আবার মনে করিয়ে দিলেন জার্মান ফুটবলের মাহাত্ম্যটা, ‘জার্মানি সব সময়ই ফেবারিট। হয়তো দলে অনেক গ্রেট খেলোয়াড় নেই, কিন্তু জার্মানি দল হিসেবে সব সময়ই দুর্দান্ত। কারণ আমরা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত হার মানি না। এটাই জার্মানির শক্তি। এই যে কদিন আগে আফ্রিকান নেশসন কাপে ৪-০ এগিয়ে গিয়েও ড্র করতে হলো অ্যাঙ্গোলাকে। জার্মানির বিপক্ষে এটা কখনোই হবে না।’
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে না হোক, ক্লাব ফুটবলে এই শেষ বাঁশি বাজার আগেই ম্যাচ শেষ ভেবে নেওয়ার পরিণতির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ম্যাথাউসেরও। ১৯৯৯ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ফাইনালে বাড়তি সময়ে দুই গোল খেয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে বায়ার্ন মিউনিখের পরাজয় এখনো পোড়ায় তাঁকে, ‘মাত্র ৯০ সেকেন্ডে আমাদের ট্রফিটা ম্যানইউ নিয়ে গেল! এই একটা ম্যাচ আমি ভুলে যেতে চাই। আবার চাইও না। বরং আমি সবাইকে এটি মনে করিয়ে দিয়ে বলি, শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো উদ্যাপন নয়।’ সবচেয়ে যন্ত্রণার ম্যাচ এটি, সবচেয়ে আনন্দের? ১৯৯০ বিশ্বকাপে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ৪-১ গোলে জয়, যাতে তাঁর নিজের দুই গোল।
বর্তমানে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের কথা উঠল (‘২০০৯ মনে রাখলে অবশ্যই মেসি’), বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকা-এশিয়ার উঠে আসা, স্টেফি গ্রাফের সঙ্গে টেনিস খেলার স্মৃতি...। তবে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে ঘুরে বেড়ানো লোথার ম্যাথাউসের যে ছবিটা শেষ পর্যন্ত মনে গেঁথে রইল, সেটি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লোথার ম্যাথাউস নন।
ফুটবলের দূত লোথার ম্যাথাউস!

পন্টিংয়ের উদ্যাপন, পাকিস্তানের আত্মহনন

ক্রিকইনফোর দশক-সেরা নির্বাচিত হওয়ার দিনই করেছিলেন ক্যারিয়ারের ৩৯তম টেস্ট সেঞ্চুরি। কাল সেটাকেই রূপ দিলেন ক্যারিয়ারের পঞ্চম ডাবল সেঞ্চুরিতে। রিকি পন্টিং কি তাহলে আগামী দশকেরও সেরা খেলোয়াড় হওয়ার ব্রত নিয়ে এগোচ্ছেন? চতুর্থ উইকেটে মাইকেল ক্লার্কের সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ৩৫২ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়ার চোখে দ্বিতীয় দিনেই এঁকে দিয়েছে জয়ের ছবি।
অধিনায়কের দ্বিশতক, সহ-অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ১৬৬ আর ব্র্যাড হাডিনের ৪১ রানের ‘ক্যামিও’ নিয়ে ৮ উইকেটে ৫১৯ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেছে অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ৪ উইকেটে ৯৪ রানে দিন শেষ করা পাকিস্তান কাঁপছে ফলোঅনের শঙ্কায়।
আগের দিনই সেঞ্চুরি করে অপরাজিত ছিলেন পন্টিং আর ক্লার্ক। কাল নিজের মাঠে পন্টিং যেন তাঁর উত্তরসূরি ক্লার্ককে নিয়ে হাতে-কলমে পাঠ দিলেন। ক্লার্ক শিখছেন। তবে পুরোটা এখনো শেখা হয়নি। হলে নখদন্তহীন হয়ে পড়া পাকিস্তানি বোলিং আক্রমণকে চিবিয়ে নিজের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটাও পেয়ে যেতেন। যা থেকে ৪৪ রান দূরে থাকার সময় দানিশ কানেরিয়ার বলে বোল্ড। আগের ৩২ ওভার উইকেটশূন্য থাকা কানেরিয়া এর পর তুলে নিয়েছিলেন হাডিন ও মিচেল জনসনের উইকেটও। জনসনের বিদায়ের পরপরই ইনিংস ঘোষণা করেন পন্টিং।
শুরুটা দুই পাকিস্তানি ওপেনার ভালোই করেছিলেন। ইমরান ফারহাত ও সালমান বাট বিনা উইকেটে তুলে ফেলেছিলেন ৬৩ রান। এর পরই ২৩তম ওভারে পিটার সিডলের জোড়া আঘাত। আগের চার টেস্টে ছয়টি উইকেট নেওয়া সিডল ফারহাতকে হাডিনের ক্যাচ বানান।
ফয়সাল ইকবালের বদলে তিন নম্বরে জায়গা পেয়েছিলেন খুররম মনজুর। কিন্তু চার বল খেলে রানের খাতা খোলার আগেই ২৩তম ওভারের শেষ বলে ক্যাচ দিয়ে যান তিনি স্লিপে।
সিডলের এই জোড়া আঘাতে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের ভূমিকাই বেশি কি না—ভাষ্যকারদের এমন আলোচনার ফাঁকেই আরও দুটি আত্মহনন। দুবারই রানআউট। এবং দুবারই ভুল বোঝাবুঝি বাটের সঙ্গে। মিডঅফে ঠেলে দিয়ে তিন রান নিতে চেয়েছিলেন মোহাম্মদ ইউসুফ। কিন্তু বাট নিতে নারাজ। উইকেটের মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন ইউসুফ। কিন্তু নিরাপদ সীমানায় ব্যাট ছোঁয়ানোর আগেই ডিপ মিডঅফ থেকে জনসনের থ্রো এবং হাডিনের বেল ফেলে দেওয়া। মাত্র ৭ রান করে বিদায় নিয়েছেন অধিনায়ক। তার আগে উইকেটে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ ঝেরেছেন বাটের ওপর।
তাতেও খুব একটা কাজ যে হয়নি সেটা দেখা গেল চার ওভার পরেই। জনসনকে আগের ওভারে দুটো চার মেরে রানের খাতা খোলা উমর আকমল পরের ওভারে রানআউটের শিকার। এবারও সেই মিডঅফ। এবারও উইকেটে মাঝপথ থেকে ফিরে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।
দুটি রানআউটে জড়িত ‘অপরাধী’ বাট এখনো উইকেটে। ৩৪ রানে অপরাজিত এই ওপেনারের সঙ্গে ৪ রান নিয়ে ব্যাট করছেন শোয়েব মালিক। প্রায়শ্চিত্তের জন্য বাটের সামনে পড়ে আছে হোবার্টের খোলা মঞ্চ।

উইকেটই দেখলেন না টেন্ডুলকার

নেট থেকে ফিরে বীরেন্দর শেবাগের সঙ্গে কী নিয়ে অত কথা বললেন শচীন টেন্ডুলকার? বোলিংয়ে যাওয়ার আগে জহির খানের খুনসুটিটাই বা কী নিয়ে হলো ম্যানেজার আরশাদ আইয়ুবের সঙ্গে? প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যায়। ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতার কথা দূরে থাক, বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট নিয়ে তারা কী ভাবছে কাল সেটিও জানার উপায় ছিল না। এক সাংবাদিক যাও রাহুল দ্রাবিড়ের একটু কাছাকাছি গেলেন, কিন্তু ‘দ্য ওয়ালে’ প্রতিহত হয়ে ফিরে এল তাঁর প্রশ্ন।
কথা বলার উদারতাটুকু দেখানো ছাড়া টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দলটা অবশ্য আর সবকিছুতেই উদার, হাসিখুশি, ফুরফুরে। সূর্যগ্রহণের প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামের ম্রিয়মাণ হয়ে আসা আলোতেও বেশ উজ্জ্বল তাদের অনুশীলনের প্রতিটি মুহূর্ত। সেই ঔজ্জ্বল্যে সবচেয়ে বেশি আলোকিত দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষ্মণ, ইশান্ত শর্মা, প্রজ্ঞান ওঝা ও মুরালি বিজয়ের সঙ্গে টেস্ট দলে যোগ দেওয়া শচীন টেন্ডুলকার। টেস্ট ক্রিকেটে নিজের ১২৯৭০ রানের আলোয় তো বটেই, ক্যামেরার মুহুর্মুহু ফ্লাশে ঝলসে ওঠা আলোতেও। টেন্ডুলকার যেদিকে যান, ক্যামেরা ঘুরে যায় সেদিকে। যখন নেটে ব্যাট করছেন তখনো। যখন লক্ষ্মণ, দ্রাবিড়দের সঙ্গে স্লিপ ক্যাচ প্র্যাকটিস করে বিশ্রাম নিতে নিতে মিনারেল ওয়াটারের বোতলে চুমুক দেন, তখনো।
১৬২ টেস্টের বিশাল ক্যারিয়ারে টেন্ডুলকারের জন্য বাংলাদেশ অংশটা ক্ষুদ্র। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেন্ডুলকার টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান করা টেন্ডুলকারেরই প্রতিচ্ছবি। এ পর্যন্ত ৫টা টেস্ট খেলেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে, ১৩৯ গড়ে রান করেছেন ৫৫৬। ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে খেলা অপরাজিত ২৪৮ রানের ইনিংসটাকেই হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছেন তিনি, তবে ভুলে যাওয়ার কথা নয় এই চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামকেও। সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে ওই টেস্টে সেঞ্চুরি ছিল টেন্ডুলকারেরও।
সেই টেন্ডুলকার কাল উইকেটই দেখতে গেলেন না। রুটিন নেট প্র্যাকটিসের পর অন্য নেটে দীর্ঘক্ষণ কোচ গ্যারি কারস্টেনের করা থ্রোতে ‘নক’ করলেন। দুপুরে মাঠে এসেই উইকেট দর্শনে গিয়েছিলেন দ্রাবিড়, লক্ষ্মণ আর হরভজন সিং। দ্বিতীয় দিন থেকে স্পিন ধরবে মনে হওয়ায় হরভজন মোটামুটি খুশি এই উইকেটে। আর দ্রাবিড়কে প্রায় বছর দুই আগের সেই টেস্টে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন লক্ষ্মণ। ২০০৪ সালের চট্টগ্রাম টেস্টের দলে নিজে না থাকলেও উইকেটের পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মণ নাকি মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই মাঠ, এই উইকেটে দ্রাবিড়ের খেলে যাওয়ার কথা। দ্রাবিড় তাতে খুব বেশি নস্টালজিক নন। একে তো দুই ইনিংসে রান করেছিলেন ৬১ আর ২, তার ওপর ড্র হওয়া ওই টেস্টটা তো বৃষ্টিতেই ধুয়ে গিয়েছিল একরকম।

ফিরছেন সেমেনিয়া

নারী না পুরুষ—এ বিতর্কের ঝড় যেভাবে বয়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকান অ্যাথলেট কাস্টার সেমেনিয়ার ওপর দিয়ে তাতে মনে হয়েছিল তিনি হয়তো অ্যাথলেটিকসই ছেড়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর লিঙ্গ নির্ধারণী পরীক্ষা পুরোপুরি শেষ না হলেও আগামী ফেব্রুয়ারিতেই ট্র্যাকে ফিরছেন তিনি। অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে।

পিসিবির সভাপতি হতে পারেন জহির আব্বাস

ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সভাপতি পদে নতুন মুখ খুঁজছে পাকিস্তান সরকার। অনেকের বিশ্বাস, তলানিতে চলে যাওয়া পিসিবির ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার জন্য যোগ্য লোকটি হতে পারেন সাবেক অধিনায়ক জহির আব্বাস। এবং শিগগিরই তাঁকে প্রস্তাব দিতে পারে সরকার।
পাকিস্তানের সাবেক ব্যাটসম্যানের কথায় বোঝা যাচ্ছে, প্রস্তাব পেলে দায়িত্ব নিতে তাঁর আপত্তি নেই, ‘বেশ কয়েকটি কারণে পাকিস্তানের ক্রিকেট সমস্যার মুখে পড়ছে। সরকার যদি আমাকে বোর্ডের প্রধান হতে বলে, পাকিস্তানের ক্রিকেট সঠিকভাবে চালানোর জন্য আমি রাজি আছি।

আবার অস্ট্রেলিয়ায় যাবেন মাশরাফি

অস্ট্রেলীয় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডেভিড ইয়াংয়ের দেওয়া ডেড লাইন পার হয়ে গেছে গত নভেম্বরে। অথচ বল হাতে এখনো পুুরোপুরি স্বস্তি পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় আবারও অস্ট্রেলিয়া যাবেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। এর আগে ২০ জানুয়ারি থেকে খুলনার হয়ে খেলবেন জাতীয় ক্রিকেট লিগের দ্বিতীয় ম্যাচ। চিকিত্সকের কাছে যাওয়ার আগে এই ম্যাচ খেলে নিজেই আরেকবার বুঝে নিতে চান ইনজুরিগ্রস্ত হাঁটুর সর্বশেষ অবস্থা। জাতীয় দলের ফিজিও মাইকেল হেনরি জাতীয় লিগের এই ম্যাচ খেলার ছাড়পত্র দিয়েছেন মাশরাফিকে।
বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, মাশরাফিকে চেকআপের জন্য অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর প্রক্রিয়া এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডেভিড ইয়াংকে দেখাতে আরেকবার অস্ট্রেলিয়ার বিমানে উঠবেন তিনি। তবে কাল টেলিফোনে মাশরাফি জানিয়েছেন যাওয়ার আগে জাতীয় লিগে খেলার কথা, ‘জাতীয় লিগের ম্যাচটা খেলে দেখি কেমন লাগে। তবে হয়তো পুরো চাপ নিয়ে খেলব না। প্রতি ইনিংসে ১০-১২ ওভার বল করে দেখব কোনো সমস্যা হয় কি না।’ জানা গেছে, বোর্ড আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার আগে আরেকবার ডেভিড ইয়াংয়ের কাছে যাওয়ার ইচ্ছাটা বোর্ড সভাপতির কাছে মাশরাফি নিজেই প্রকাশ করেছেন। সভাপতিও তাতে সম্মতি দিয়েছেন। তবে মাশরাফির মনে হচ্ছে, জাতীয় লিগের ম্যাচটা সমস্যা ছাড়া খেলতে পারলে হয়তো নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়ানডে সিরিজে এমনিতেই খেলতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ওয়ানডে সিরিজের পর নিউজিল্যান্ড থেকেই যাবেন অস্ট্রেলিয়া। আর ইনজুরি নিউজিল্যান্ড সফরেও দলের বাইরে রাখলে মাশরাফি ডেভিড ইয়াংয়ের শরণাপন্ন হবেন আগেই।

দেশের হয়ে খেলতে এলেন দুই ‘লন্ডনি ফুটবলার’

দুজনেরই বয়স ২২ এবং বাড়ি সিলেটে। একজন পরিবারের সঙ্গে মাত্র ৩ বছর বয়সে লন্ডন চলে যান। অন্যজনের জন্মই সেখানে। কাল তাঁরা দুজন একসঙ্গে বাংলাদেশে এলেন। সন্ধ্যায় ঢাকায় নামার পরই সোজা তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় বিকেএসপিতে।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবল দলের আবাসিক ক্যাম্পে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুই ব্রিটিশ ফুটবলার যোগ দিচ্ছেন—এই খবর জানা গিয়েছিল কয়েক দিন আগেই। আজ থেকে তাঁরা জোরান জর্জেভিচের ক্যাম্পে অনুশীলন শুরু করবেন। পছন্দ হলে এসএ গেমসের বাংলাদেশ দলে এই দুজনকে সুযোগ দিতে পারেন সার্বিয়ান কোচ।
লেফট ব্যাক সারোয়ার আহমেদ সাদিকের জন্ম বাংলাদেশে হলেও এর আগে একবারই এসেছিলেন পিতৃভূমিতে। লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিদের আধাপেশাদার ফুটবল লিগে খেলেন স্পোর্টিং বেঙ্গলের হয়ে। স্ট্রাইকার শিবলু মিয়ার দলের নাম অ্যাইলেসবুরি ইউনাউটেড। তিনিও এর আগে বাংলাদেশে এসেছেন একবারই।
সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা কিছুটা জানেন। তবে কাল রাতে ফোনে বেশি কথা বলতে চাইলেন না কেউই। সাদিক শুধু এটুকু বললেন, ‘দারুণ লাগছে। তবে এখন আমরা ক্লান্ত।’ দুজনের সঙ্গে আসা লিয়াজোঁ ফারুক মাহফুজ আহমেদ জানালেন, ‘ওরা যাতে বাংলাদেশ দলে খেলতে পারে সেজন্য অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছিলাম আমরা। অবশেষে প্রাথমিক সুযোগ পাওয়া গেল। দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন সবারই আছে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই এই দুজনের এখানে আসা।’

বাংলাদেশের সামনে পাপুয়া নিউগিনি

‘ডি’ গ্রুপে বাংলাদেশের অন্য দুই প্রতিপক্ষ পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের লড়াইটা হবে মূলত এই দুই প্রতিপক্ষের সঙ্গেই। তবে পাপুয়া নিউগিনি গ্রুপের ‘পয়েন্ট ব্যাংক’ হওয়ায় এ ম্যাচটিও গুরুত্ব পাচ্ছে বাংলাদেশ দলের কাছে। ভোররাত সাড়ে তিনটায় পালমার্সটন নর্থে বাংলাদেশ কী করল, সেটা হয়তো এতক্ষণে জেনে গেছে পাঠকেরা। তবে কালো ঘোড়া (ডার্ক হর্স) হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করা বাংলাদেশ ছিল ম্যাচের নিরঙ্কুশ ফেবারিট।
এদিকে কাল বাংলাদেশের গ্রুপ প্রতিপক্ষ পাকিস্তান বাবর আজমের সেঞ্চুরিতে (১২৯) ৪০ রানে হারিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান ৭ উইকেটে তোলে ২৯৭ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৫৭ রানে অলআউট। দিনের অন্য খেলায় ভারত (১২২/২) ৮ উইকেটে আফগানিস্তানকে (১১৮), দক্ষিণ আফ্রিকা (২২০/৫) ৫ উইকেটে আয়ারল্যান্ডকে (২১৬/৬) ও কানাডা (২০১) ১০ রানে জিম্বাবুয়েকে (১৯১) হারিয়েছে।