Sunday, April 18, 2010

চিত্তের বৈভবে ঐশ্বর্যশালী নারী by কাজী সুফিয়া আখ্তার

বেলা আপা আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন ১৪১৬ সনের ২৭ চৈত্রে।
বেলা আপার সঙ্গে পরিচয় ১৯৮০ সালের দিকে। প্রয়াত শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী রোকেয়া রহমান কবীরের বাসায়। প্রতি মাসে রোকেয়া খালাম্মার বাসায় তিনি যেতেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য দেওয়া চাঁদা সংগ্রহ করতে। স্নিগ্ধ, ধীর-স্থির, মার্জিত পোশাক ও সুশ্রী চেহারার বেলা নবীকে প্রথম দেখায় অনেকেরই ভালো লাগত। আমারও লেগেছিল। শান্ত কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলছিলেন তিনি। খালাম্মা পরিচয় করিয়ে দিলেন—‘তোদের মহিলা পরিষদ’। বেলা আপাকে আমি তারও আগে দেখেছিলাম চট্টগ্রামে মহিলা পরিষদের এক অনুষ্ঠানে। কথা হয়নি। শুধু দূর থেকে দেখা।
আমাদের মহিলা পরিষদের নেত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল সপ্তগ্রাম নারী স্বনির্ভর পরিষদের অফিসে বসেই, ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ এবং ‘সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ ও নারী নির্যাতন বন্ধে’র উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটির সুবাদে। সেই সময়ে সেগুনবাগিচার সপ্তগ্রাম নারী স্বনির্ভর পরিষদের অফিসে উল্লিখিত দুই কমিটির অনেক সভা হতো। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সমাজকর্মী, চাকরিজীবীসহ মানবতাবাদী সবাই উপস্থিত থাকতেন। মহিলা পরিষদ থেকে মালেকা বেগম অথবা বেলা নবী প্রায় সময়ই উপস্থিত থাকতেন। সপ্তগ্রামে কর্মরত থাকায় শারমীন, আমি, কৃষ্ণা প্রায় প্রতিটি সভায় উপস্থিত থাকতাম। ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ ছিল ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজের নেতৃত্বে ছিলেন বেলা নবী।
এই পরিচয় আরও গভীর হলো ১৯৮৫ সালে। আমি তখন মহিলা পরিষদ পরিচালিত নির্যাতনের শিকার মেয়েদের সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র ‘রোকেয়া সদন’-এর দায়িত্বে। সুফিয়া কামাল সংগঠনের সভানেত্রী। মালেকা বেগম সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। বেলা নবী নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও আইন সহায়তা উপ-পরিষদের সম্পাদক। আয়শা খানম সাংগঠনিক সম্পাদক। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের চার দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় আশির দশক। অনেক অগ্রগতির বাঁক এই দশকে। মহিলা পরিষদ মনুবালা, অনিমা, শবমেহের, সালেহা হত্যা মামলা একের পর এক হাতে নিচ্ছে আর মামলায় জয়লাভ করছে। সাংবাদিক, আইনজীবী এবং প্রশাসন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক পুঁজি বাড়ছে। প্রচলিত আইনের সংস্কার এবং ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের স্বার্থে নতুন আইন তৈরির লক্ষ্যে সর্বজনীন পারিবারিক আইনের খসড়া প্রণয়নে ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে সব পেশাজীবী, আইনজীবীর সঙ্গে মতবিনিময়, সেমিনারের আয়োজন চলছে। এখানে ব্যারিস্টার কামাল হোসেন যেমন কর্মরত, তেমনি ব্যারিস্টার ইশতিয়াকও সক্রিয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি নয়। সব আইনেই নারী বৈষম্যের শিকার। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সব নারীর জন্য একই আইন করা জরুরি এই প্রত্যয় দৃঢ় হতে শুরু করেছে। ভিন্ন মতের, ভিন্ন শ্রেণীর, ভিন্ন ধারার মানুষজনকে একত্র করার দুরূহ কাজটি অত্যন্ত সতর্কভাবে, আন্তরিক প্রচেষ্টায় সম্পন্ন করেছিলেন মালেকা বেগম ও বেলা নবী। আন্তর্জাতিক নারী দশক উপলক্ষে বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের কাজ চলছে। ফতোয়া বন্ধের সোচ্চার দাবি জানানো হচ্ছে।
বেলা নবী বরিশাল শহরের সবুজ প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন। পরিবারে রাজনৈতিক আবহ ছিল। চার ভাইবোনের মধ্যে বেলা নবী ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র কন্যা। অনেক আদরের। ফলে জীবনের ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা গেলেও আজীবন মনের সজীবতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। স্বামী মোহাম্মদ নবী কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। স্বামীর সঙ্গে ডেন-এ জীবনযাপন করেছেন দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিকে। সব কাজই অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করতেন।
রবীন্দ্রনাথ, লালন প্রিয় ছিল তাঁর। মানুষকে ভালোবাসতেন। বিশ্বাস করতেন মানব মুক্তিতে, নারী মুক্তিতে। সেই লক্ষ্যেই কাজ করে গেছেন আমৃত্যু। ঢাকা সিটি করপোরেশনের গুলশান এলাকার নির্বাচিত প্রথম মহিলা কমিশনার ছিলেন।
বেলা নবী ও মোহাম্মদ নবী দুজনই সুফিয়া কামালকে ‘মা-মণি’ বলে সম্বোধন করতেন। সুফিয়া খালাম্মার বাড়ি বরিশালে ছিল বলে একটু গর্বও অনুভব করতেন। তাঁর সঙ্গে প্রাগ ও মস্কোতে গিয়েছিলেন। নোয়াখালীতে বন্যা-ত্রাণের কাজে গেছেন। ‘মুক্তধারা’র মালিকের বাড়িতে উঠেছেন। সে বাড়িতেও পানি। উঠোন জলমগ্ন। বারান্দা, ঘরের মেঝেতে পানি। ইট বিছিয়ে তার ওপর তক্তা পেতে বিছানা করা হলো। দুজনের কারোরই কোনো অসুবিধা হলো না। সব কাজ ঠিকভাবে করেই ঢাকায় ফিরলেন।
অমায়িক, বন্ধুবৎসল বেলা আপার সঙ্গে মহিলা পরিষদের কাজে একাধিকবার চট্টগ্রাম, নাটোর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, বেলাব, নওগাঁ গিয়েছি। তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ এতটাই আনন্দদায়ক ছিল যে পথের কোনো ক্লান্তি কখনো আমাকে স্পর্শ করেনি। সংসার, কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কাজ পেশাগত দক্ষতা নিয়ে করেছেন। স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের কাজে যুক্ত হলেন বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে। চিত্তের বৈভবে ঐশ্বর্যশালী বেলা নবী নিজের মনের তারুণ্য দিয়ে সংগঠনের সব তরুণ-তরুণীর মন জয় করে নিলেন। বই পড়তে পছন্দ করতেন। পছন্দ করতেন বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন ধ্যান-ধারণায় আলোকিত করতে ভালোবাসতেন। এ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ছিল সক্রিয় ভূমিকা, উজ্জ্বল উপস্থিতি। অং সান সু চির মুক্তি, যুদ্ধ নয় শান্তি আন্দোলনে তিনি ছিলেন সম্মুখ সারিতে। আইন পড়েননি। কিন্তু বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও আইন সহায়তা উপ-পরিষদটি তাঁরই নেতৃত্বে, শ্রমে, সযত্ন প্রয়াসে গড়ে উঠেছে। সংগঠনের প্রতি ছিল তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা। দেশপ্রেমিক, মানবিক, সদালাপী এই মানুষটি ৭৮ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সৃজনশীল এই মানবী মৃত্যুর কিছু দিন আগে আত্মকথা লিখেছেন।
তাঁর মৃত্যু অসহনীয় বেদনায় গ্রাস করে আমাদের। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি থাকবেন আমাদের স্মরণে। কর্মে। তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তি লাভ করুক। নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনের এই নেত্রীকে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সেই স্বপ্ন, সেই মূল্যবোধ—সেই মুজিবনগর সরকার by সৈয়দ বদরুল আহ্সান

আজ যখন আমরা মুজিবনগর সরকারকে পুনরায় স্মরণ করি, তখন আমাদের মনের গভীরে একটিই প্রশ্ন জাগে—১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে যে সাহস ও যে মূল্যবোধ আমাদের নিজেদের জন্য, দেশের জন্য তুলে ধরেছিলাম এবং এসবের মাধ্যমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েছিলাম, সেই সাহস, সেই মূল্যবোধ আজ আমাদের মধ্যে, আমাদের সন্তানদের মধ্যে কতটুকু রয়ে গেছে? যখন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান বাঙালির ইতিহাসে সর্বপ্রথম সেই সরকারটি গঠন করলেন, যে সরকার দ্বারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হলো এবং অবশেষে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে তার স্থান করে নিল, তখন আমরা যথার্থই জাতি হিসেবে গর্ববোধ করেছিলাম। আমরা পলাশীর যুদ্ধের কথা বলি এবং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। কিন্তু বাঙালি জনগণের সরকার এবং বাঙালির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার বলতে যা বোঝায়, তা ওই এপ্রিল ১৯৭১ সালেই আমরা দেখেছি। কী হতো আমাদের জীবনে, যদি তাজউদ্দীন আহমদ সেই দিন সরকার গঠনের উদ্যোগ না নিতেন এবং তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতেন না? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি টিকে যেত আর আমরা বাঙালিরা যারা ওই দেশটির দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বরাবরই ছিলাম, পরিণত হতাম পাকিস্তানের দাসে। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে নিজে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সহকর্মীদের তাঁদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যে একজন বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন, তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন সেই ২৫-২৬ মার্চ রাতে। দেশের নির্বাচিত নেতা হয়ে তিনি পালিয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর গ্রেপ্তার হতে পারেন এবং এসবের আগে তিনি দলের অন্য নেতাদের নির্দেশ দিয়ে যেতে পারেন তাঁরা যেন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এবং হয়েছিলও তা-ই।
মুজিবনগর সরকার তাই বাঙালি জাতির জীবনে একটি বড় ধরনের প্রেরণা জুগিয়েছিল। সর্বমোট যে এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা অনায়াসে শরণার্থী হয়েই থেকে যেত, যদি ১৭ এপ্রিলের ঘটনাটি না ঘটত। যাঁরা সেই সরকার পরিচালনা করেছেন, তাঁরা সেই দায়িত্বটি পালন না করে বিদেশের মাটিতে থেকে যেতে পারতেন, যেমনটি পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই বিভিন্ন সময়ে করেছেন। যদি মুজিবনগর সরকার গঠিত না হতো, তাহলে একটা বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকত না এবং সেটা এই যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধুকে জীবিত রাখত না। আর আগেই যেটা বলেছি, এই দেশটি দাসের রাজ্যে পরিণত হতো। কিন্তু তা হয়নি। আজ যখন আমরা ১৭ এপ্রিল ১৯৭১-এর কথা ভাবি, তখন মনে পড়ে ওই সব বাঙালি সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাকে, যাঁরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। ওই সরকার ছিল বলেই হাজার হাজার যুবক বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ছুটে গেছে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখানোর জন্য। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তা যে পেশা এবং ক্ষেত্র থেকেই হোক, সবাই সেই দিন অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে মুজিবনগর সরকার গঠনের অর্থই হচ্ছে একটা আদর্শকে তুলে ধরা। আমরা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, আমাদের স্মৃতিতে চিরদিন প্রতিদিনের নতুন নতুন যুবকের যুদ্ধে যাওয়ার দৃশ্যগুলো অম্লান থেকে যাবে। সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী এবং অন্যান্য সবাই যুদ্ধের ময়দানে চলে গেছেন ওই মুজিবনগর সরকারের জন্যই।
কী ছিল সেই দিন আমাদের মূল্যবোধ? অতি সহজ ভাষায় বলতে গেলে সেই মূল্যবোধ ছিল দেশকে শত্রুমুক্ত করে নিজেদের মুক্ত করা। এবং সেই মূল্যবোধগুলো আমরা তুলে ধরেছিলাম বিভিন্ন কায়দায়। সরকারের পত্রিকা জয় বাংলার মাধ্যমে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়ে একত্র হয়েছেন দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা। মুক্তিযুদ্ধটি যে ছিল সমগ্র জাতির যুদ্ধ এবং কোনো দলীয় যুদ্ধ ছিল না, সেটিই ছিল বাস্তবতা। বাঙালি ঐতিহ্য যে রক্ষা করা প্রয়োজন—এই সত্যটিই সেদিন মুজিবনগর সরকার তুলে ধরেছিল। তাজউদ্দীন নিজের কাপড় নিজেই ধুয়েছেন। সৈয়দ নজরুল যুদ্ধের বিভিন্ন রণাঙ্গন ঘুরেছেন। সরকারি কর্মচারী যে যেমন করে পেরেছেন, যুদ্ধে অবদান রেখেছেন। মুক্তিবাহিনী গঠন করার পেছনে এ সরকারই মূল শক্তি ছিল। বিদেশে পাকিস্তান সরকারের বাঙালি কূটনীতিকেরা দ্বিধা করেননি মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে এই কারণে যে, তাঁরা সেই সাহস পেয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের উপস্থিতি থেকেই। এখানে অবশ্য স্মরণ রাখা প্রয়োজন, এমনও বড় মাপের মানুষ ছিলেন, যাঁরা আবার মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই পাকিস্তান রাষ্ট্র ত্যাগ করেছিলেন। কে এম শাহাবউদ্দিনের স্থান এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। যে জাতি ১৯৭০-এর নির্বাচন থেকে শুরু করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যের পরিচয় দিয়েছে, সেই জাতি প্রাথমিক পর্যায়ে এবং সেটা পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতার সূচনার পরপরই কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই মুজিবনগর সরকার ইতিহাসের মোড়টা একেবারে ঘুরিয়ে ফেলে। যে বাঙালি জাতি এত দিন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আস্থা রেখে আসছিল, সেই জাতিই রাতারাতি পরিণত হয় বলতে গেলে একটি যুদ্ধের জাতিতে। মুজিবনগর সরকারের কথা স্মরণ করলে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব আমাদের মনে জেগে ওঠে এবং সেটা এই যে, যাঁরা সেদিন সরকার গঠন ও যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়েছিলেন, তাঁদের কেউই কোনো দিন যুদ্ধের বিষয়ে কোনোভাবেই পারদর্শী ছিলেন না। কিন্তু ইতিহাস যেমন বড় মাপের নেতার উদ্ভব ঘটায়, তেমনি এমন নেতা থাকেন, যাঁরা অনেকটা অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ইতিহাস রচনা করেন। মুজিবনগর সরকারের নেতাদের ক্ষেত্রে এই দুটি কথাই প্রযোজ্য।
মুজিবনগর সরকার যাঁরা পরিচালনা করেছেন এবং যাঁরা ওই সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তাঁরা সবাই ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। কিন্তু এই বাস্তব সত্যটি কি আমাদের বর্তমানের যুবসমাজ অথবা যুদ্ধের পর যাদের জন্ম, তাদের সামনে আমরা তুলে ধরতে পেরেছি? আজ যেসব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসকে বিকৃত করার কাজে ব্যস্ত, তারা দেশের প্রচুর ক্ষতিসাধন করেছে। যখন বিএনপির মহাসচিব বলে ফেলেন যে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিয়াউর রহমান, তখন আমরা সবাই দল-মতনির্বিশেষে লজ্জায় মাথা নত করি। তিনি তো যুদ্ধ দেখেছেন। তাহলে তিনি এই অসত্য জুড়িয়ে দিচ্ছেন কেন আমাদের জীবনের সঙ্গে? এই তো গেল ইতিহাস বিকৃতকারীদের কথা। ওই সব ছাত্রলীগ কর্মীর কথা ভাবেন, যারা বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে টেন্ডার ও ভর্তি-ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে। এরা কি ইতিহাসের কথা জানে না? ১৯৭১ সালেও তো ছাত্রলীগ ছিল এবং সেই ছাত্রলীগ তো অনেক ক্ষেত্রে জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কই, তারা তো ছাত্রের সম্মান কখনোই হারায়নি এবং সন্ত্রাসী হয়নি। সেই ১৯৭১-এর ছাত্র তো মুজিবনগর সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা বন্দুক হাতে নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। কেউ তাঁদের হাতে কখনো কোনো চাপাতি-রামদা বা ছুরি দেখেনি।
মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাঁরা; নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিচক্ষণ ছিলেন এবং তাঁদের দেশপ্রেমের সামনে আমরা আজও মাথা নত করি। মুজিবনগর সরকার যে দেশপ্রেমে গোটা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, পরবর্তী সরকারগুলো সেই ধারাটা কেন ধরে রাখতে পারল না এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে পারল না? ১৯৭১-এ আমরা চেয়েছিলাম একটি কল্যাণ রাষ্ট্র। আজ যখন আমাদের ভয় পেতে হয় পুলিশকে, যখন কোনো বৃদ্ধ বছরের পর বছর তাঁর পেনশনের টাকার জন্য সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান, যখন শ্রমিককে তাঁর প্রাপ্য না দিয়ে মালিকপক্ষ বিদেশ ভ্রমণে চলে যায়, যখন আতঙ্কে থাকতে হয়—এই বুঝি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল এবং অসাংবিধানিক কিছু ঘটতে চলল, যখন অনেক আইনজীবী একযোগে চিৎকার করে আদালতে বিচারপতিকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন—তখন সেই ভালো মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে, যাঁরা একদিন আমাদের জীবনে আমাদেরই জন্য সর্বপ্রথম একটি সরকার গঠন করেছিলেন। তাঁরা আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেই স্বপ্নগুলোর মধ্যে আমরা কতগুলোই বা ধরে রাখতে পেরেছি?
সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক।

বঙ্গবন্ধু ‘বনাম’ শহীদ জিয়া by আসিফ নজরুল

প্রথম আলোর ২৭ মার্চ সংখ্যায় ‘বঙ্গবন্ধু “বনাম” শহীদ জিয়া’ শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে টরন্টো থেকে অধ্যাপক মোজ্জাম্মেল খান ৬ এপ্রিল এবং ঢাকা থেকে জনাব এনামুল হক ৭ এপ্রিল প্রথম আলোতে লিখেছেন। তা ছাড়া প্রথম আলোর ওয়েব সংস্করণে এই লেখার ওপর ৭৩টি মন্তব্য ছাপা হয়েছে। ওয়েবে অধিকাংশ পাঠক আমার লেখার বক্তব্য সমর্থন করলেও কয়েকজনের মন্তব্যে কিছু সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত উল্লিখিত দুজনের লেখায় এবং ওয়েবে প্রকাশিত কয়েকটি মন্তব্যে আমার নিবন্ধ সম্পর্কে মূলত চারটি আপত্তি বা প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। এগুলো নিম্নরূপ:
১. আমার লেখাতে বিশেষ করে শিরোনামে বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়ার তুলনা করা হয়েছে, যা অনভিপ্রেত। ২. জিয়াকে শহীদ জিয়া নামে লেখা হয়েছে, এটি সংগত কি না। ৩. জিয়াউর রহমানের শাসনকালে বহু সামরিক অফিসারকে অভ্যুত্থানকালে ও পরে হত্যা করা হয়েছে—এ প্রসঙ্গে আমি কিছু লিখলাম না কেন। ৪. বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করতেন—এটি আমি কীভাবে লিখলাম।
প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপনকারীদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সবিনয়ে আমার বক্তব্য এবার পেশ করছি। প্রথমত, আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শহীদ জিয়া বা অন্য কারও তুলনা করিনি, বরং প্রকারান্তরে তুলনা করার প্রবণতার সমালোচনা করেছি। বঙ্গবন্ধুকে যেখানে আমার লেখাতে অতুলনীয় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধানতম ব্যক্তি বলা হয়েছে, সেখানে তুলনা কোথায় করা হলো? আর লেখার শিরোনামে ‘বনাম’ কথাটি উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে লেখা হয়েছে। তুলনা করার প্রবণতার বিরুদ্ধে আমার প্রশ্ন বা ভিন্নমত আছে বলেই এই উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। মূল লেখায় যেভাবে বলেছি, এখনো ঠিক সেভাবেই বলি, বঙ্গবন্ধুই ছিলেন সকল প্রেরণার উৎস, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। তাই বলে এই স্থপতির নির্দেশ, চেতনা, রূপকল্পকে যারা চরম ঝুঁকি নিয়ে ’৭১-এর নয় মাসে বিভিন্নভাবে বাস্তবায়ন করেছেন, তাদেরকে খাটো করার কোনো অবকাশ নেই, এর কোনো প্রয়োজনও নেই।
দ্বিতীয়ত, জিয়াকে শহীদ জিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটো দলের একটি তাঁকে শহীদ জিয়া হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানায়। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর এই প্রকাশভঙ্গিকে সম্মান জানিয়ে আমি বরাবর মরহুম জিয়াউর রহমানকে শহীদ জিয়া নামে লিখি। বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের বা খালেদ মোশাররফকে যদি উল্লেখযোগ্য কোনো জনগোষ্ঠী শহীদ কর্নেল তাহের বা শহীদ খালেদ মোশাররফ হিসেবে উল্লেখ করে, তাহলে আমিও তা-ই করব। মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রাখার কারণে তাঁরা আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাঁদের প্রতি যেকোনোভাবে প্রকাশিত শ্রদ্ধায় শামিল হতে পারলে অন্য অনেকের মতো আমিও নিজেকে ধন্য মনে করব।
তৃতীয়ত, আমি আমার লেখায় কারও শাসনকাল নিয়ে আলোচনা করিনি। শহীদ জিয়ার শাসনকালে কতজন সামরিক অফিসারকে বিচার কিংবা হত্যা করা হয়েছে তা যেমন আমি আলোচনা করিনি, তেমনি অন্য কারও শাসনকালে কতজন রাজনৈতিক বিরুদ্ধবাদীকে হত্যা করা হয়েছে তাও আমি উল্লেখ করিনি। আমার লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার ঘোষণাকেন্দ্রিক। আমি মূলত যা বলতে চেয়েছি তা হচ্ছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধে যাঁরাই অবদান রেখেছেন, তাঁদের সবাইকে আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত। বেশি অবদান যাঁর তাঁকে সম্মান জানাতে গিয়ে অন্যদের খাটো বা অস্বীকার করা অনুচিত, বেশি অবদান যাঁর, তাঁকে খাটো বা অস্বীকার করা আরও অনুচিত।
চতুর্থত, শহীদ জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে তার কিছু বর্ণনা আমাকে টেলিফোনেও কেউ কেউ দিয়েছেন। তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। শাসক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু তাই বলে স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় অবদানকে অস্বীকার করার অধিকার অবশ্যই কারও নেই। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর অবদানকে মুছে ফেলার চেষ্টা যেটুকু করেছেন তা তাঁর সম্পর্কে বাজে উচ্চারণ করার মাধ্যমে যৌক্তিক করার চেষ্টা অন্তত করেননি। অথচ পরবর্তী বিএনপি বা আওয়ামী লীগ সরকারগুলো এ দুটো কাজই করেছে, করে চলেছে।
উপরিউক্ত চারটি প্রসঙ্গ ছাড়াও আরেকটি কথা বলতে হয়। অধ্যাপক মোজ্জাম্মেল খান লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আছে। তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া, সংবিধানে তাঁদের ইনডেমনিটি দেওয়া—এসব পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। তিনি এই প্রসঙ্গে আমার অভিমতও সম্ভবত জানতে চেয়েছেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে, জনাব খানের পর্যবেক্ষণ সঠিক হলে ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচারকালে এই সংশ্লিষ্টতা পরিষ্কারভাবে উদ্ঘাটন করা হলো না কেন? খুনের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা অবশ্যই সেই খুনের বিচারের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হওয়া উচিত। তা না করে এটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়বস্তু হিসেবে বছরের পর বছর জিইয়ে রাখা সম্ভবত কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
আমি সত্যি বিশ্বাস করি, পরলোকগত নেতাদের অবদানকেন্দ্রিক বিতর্কে আবদ্ধ থাকার প্রবণতা থেকে বড় দুটো রাজনৈতিক দলের যথাসম্ভব সরে আসা উচিত। তাদের উচিত সুশাসনের লক্ষ্যে কর্মসূচি ও কার্যপরিকল্পনাভিত্তিক বিতর্কে নিয়োজিত থাকা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় কাজ দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করা। উচিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের কার কী অবদান তা ইতিহাসবিদ, গবেষক ও লেখকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরাফাতকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন বেনজির -রক্ত ও তরবারির গান by ফাতিমা ভুট্টো

বেনজির হলেন তাঁর পরিবারের প্রথম মেয়ে, যিনি প্রথাগত বিয়েতে রাজি হয়েছেন। তিনি ভেবেছেন, তিনি দেশের সর্বোচ্চ পদের অধিকারী হচ্ছেন এবং প্রত্যহ পুরুষের সঙ্গে কাজ করতে হবে, তাই তাঁর কুমারী থাকা ঠিক নয়। এটি তাঁর ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনজির মাথায় দোপাট্টা পরার সিদ্ধান্ত নিলেন। এ ক্ষেত্রেও তিনি ভুট্টো পরিবারের প্রথম মেয়ে, যিনি ‘হিজাব’ পরলেন। কিন্ত জাতির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ কখনো মাথায় কাপড় পরতেন না। এমনকি বেনজিরের মা নুসরাতও না। ফাতিমা জিন্নাহ ষাটের দশকে জেনারেল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
দামেস্কে তাঁদের কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে মা বলেছেন, বেনজিরের বক্তব্য হলো, এ ক্ষেত্রে তাঁর বিকল্প ছিল না। কে তাঁকে বিয়ে করবেন? একজন ক্ষমতাবান নারী এবং জনগণের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত জীবনের পেছনের সারিতে বসতে রাজি থাকবেন? তিনি ইয়াসির আরাফাতের কথাও ভেবেছিলেন। মা বললেন, তাঁর (আরাফাত) কথা বলায় বেনজিরের মুখে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, আরাফাতই হতে পারেন তাঁর উপযুক্ত সঙ্গী।
করাচির মানুষের ধারণা, জিয়াউল হকের সচিব রোয়েদাদ খান আসিফের মাকে বেনজিরের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর পরামর্শ দিলেন। আসিফের মা ধারণাটি দিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর বোন মান্নাকে।
লারকানার বাসিন্দা ড. সিকান্দার জাতুই আসিফ জারদারির নাম শুনেই মন্তব্য করেছেন, ‘বিয়ের আগে তিনি ছিলেন রাস্তার ছেলে, কে তাঁকে চিনত? কেউ না।’
পিপিপি কর্মীসোহেল জবাব দিয়েছেন কূটনৈতিক ভাষায়। ‘তাঁর বাবা হাকিম জারদারি ১৯৭০ সালে শত বছরের পুরোনো শহর নওয়াবশাহ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং পিপিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হয়ে জারদারি শহরের নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন ‘শহীদ মোহাতারেমা বেনজির ভুট্টো’র নামে। ভুট্টোর জীবদ্দশায়ই হাকিম ভুট্টো পিপিপি ত্যাগ করেন অথবা তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি ভুট্টোর বিরোধী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দিয়ে সিন্ধুর প্রাদেশিক প্রধান হয়েছিলেন। তিনি আরও জানান, ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি তোমার দাদার (জুলফিকার আলী ভুট্টো) বিরোধী জোটের শরিক ছিল এবং জিয়াউল হককে সমর্থন করেছিল।’ তারা স্লোগান তুলেছিল, ‘একবার নয়, ভুট্টোকে শতবার ফাঁসি দাও।’ তবে সোহেলও স্বীকার করেন, মি. বেনজির হওয়ার আগে আসিফ জারদারিকে কেউ চিনত না। করাচির সুধী মহলে তিনি ছিলেন অনাহূত ব্যক্তি।
আগস্টের শেষ দিকে মা ও আমি একসঙ্গে পাকিস্তান সফর করি। এটি ছিল তাঁর প্রথম ও আমার দ্বিতীয় সফর। করাচিতে এসে বাড়ির চেয়েও বেশি আপন মনে হয়। কিন্তু মায়ের জন্য এটি ছিল বেশ কঠিন। তিনি বললেন, ‘মীর (মুর্তজা) কখনো দেশের বাইরে থাকার কথা ভাবেননি। তিনি সব সময় দেশে ফেরার কথা বলতেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হতো তা সম্ভব নয়। যখনই আমি ফ্ল্যাটের কিছু পরিবর্তন করতে চাইতাম। মীর বলতেন, এটি আমাদের নয়। আমরা শিগগিরই দেশে ফিরে যাব।’
মুর্তজা দেশে ফেরা নিয়ে তাঁর মায়ের (নুসরাত) সঙ্গেও আলোচনা করতেন। জিয়াউল হকের আমলে শুরু হওয়া নির্বাসিত জীবন তাঁর মৃত্যুর পরই শেষ হওয়া উচিত। নুসরাতও তাঁকে সমর্থন করতেন। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্য বেনজির বাধা দিতেন।
মুর্তজা যখন দেশে ফিরে সামরিক শাসনামলের রাষ্ট্রদোহসহ সব মামলা মোকাবিলা করবেন বলে জানালেন, তখন বেনজির বললেন, ‘মীর, দয়া করে এখনই এসো না। সেটি হবে আমার জন্য আরও কঠিন অবস্থা।’
বেনজির আরও বললেন, আইএসআই তাঁর (মুর্তজার) ফাইলগুলো হারিয়ে ফেলেছে। ফলে কেউ জানেন না তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক জান্তা কতগুলো মামলা ঠুকেছিল। তিনি এও জানালেন, ‘তাঁর (বেনজির) হাত বাঁধা।’
বেনজির সরকারের বিদায়টা সুখকর হয়নি। জাতিগত ও সম্প্রদায়গত সহিংসতা বেনজিরের দ্বিতীয় সরকারকেও মেঘাচ্ছন্ন করে তুলল। ব্যাপকভিত্তিক মানবাধিকার লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ উঠল, যার সূচনা হয়েছিল তাঁর প্রথম সরকারের আমলেই। ১৯৮৯ সালে, দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে আসা মোহাজির ও স্থানীয় সিন্ধ জনগোষ্ঠীর সংঘাত-সংঘর্ষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, সিন্ধুতে যা ঘটেছে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং ‘মিনি বিদ্রোহ’।
সোহেল বললেন, ‘বেনজিরের ২০ মাস স্থায়ী সরকারের আমলে মুর্তজা নীরব ছিলেন। এমনকি যা ঘটেছে তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও কিছু বলেননি। তিনি রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পথই বেছে নিলেন। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু নির্বাসনে থেকে কজন নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন? ১৯৯৩ সালের গ্রীষ্মে মুর্তজা তাঁর মনস্থির করে ফেললেন, দেশে ফিরবেন। তিনি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতার জন্য নুসরাতকে দরখাস্ত করতে বললেন। কিন্তু পিপিপির অস্থায়ী চেয়ারপারসন বেনজির ও তাঁর স্বামী জারদারিই দলীয় প্রার্থী বাছাই করতেন। বেনজির সরাসরি মুর্তজার সঙ্গে কথা বললেন। বেনজির তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দিতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, ‘সত্যিই যদি মুর্তজা দেশে ফিরতে চান, তাহলে তাঁকে সিরিয়া ছেড়ে লন্ডনে কয়েক বছর থাকতে হবে, সমাজতন্ত্রের চিন্তা বাদ দিতে হবে। তারপরই এবার বা পরের নির্বাচনে তাঁর মনোনয়নের ব্যাপারে আলোচনা করা যেতে পারে।’
মুর্তজা দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁকে বললেন, ‘আমি এবারের নির্বাচনেই লড়ব।’ তিনি নয়টি আসনের কথা বললেন, যা ইতিমধ্যে জারদারি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের দেওয়া হয়ে গেছে। বেনজির তাঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমি তোমাকে ও তোমার লোককে নয়টি আসন দিতে পারব না।’
তিনি মুর্তজাকে প্রাদেশিক পরিষদের একটি আসনের প্রস্তাব দিলেন।
মুর্তজা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৯০ সালের আগস্টে মা জুলফিকে নিয়ে পাকিস্তানে এলেন বাবার মনোনয়নপত্র জমা দিতে।
মুর্তজা যখন পাকিস্তান অবতরণ করলেন, তখন রাত। পুলিশ ছিল খুবই আক্রমণাত্মক। তাঁরা রাতের আঁধারে বহু পার্টি-কর্মীকে জেলখানায় নিয়ে গেল এবং জনসমাবেশ ভেঙে দিতে মরিয়া হয়ে উঠল, কিন্তু জনসমাবেশ ভাঙা সম্ভব হলো না। মুর্তজাকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা জনতাকে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে গেলে তাঁরা তাদের যানবাহনে পাথর ছুড়ে মারে।
মুর্তজা একা নিচে নেমে এলেন এবং প্রথমবারের মতো রাতের করাচি প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি টারমাকে নামলেন ও মাটিতে চুমু খেলেন। সেখানে উপস্থিত নুসরাত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকেন। মুর্তজা তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর পুলিশ তাঁকে নিয়ে গেল এবং করাচির ল্যান্ডি জেলখানায় পাঠিয়ে দিল। পরবর্তী আট মাস সেটাই ছিল তাঁর ঘর।
আগামীকাল: জারদারি, নায়ক না খলনায়ক?
গ্রন্থনা ও ভাষান্তর: সোহরাব হাসান।

বাঙালির সামাজিক উৎসব -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

বাংলা নববর্ষ অবশেষে বাঙালির উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সামাজিক উৎসব হিসেবে এ বছর ব্যাপকভাবে উদ্যাপিত হলো পয়লা বৈশাখ। ধীরে ধীরে এ উৎসব শহর ছাপিয়ে গ্রামেও ছড়িয়েছে। এককালের নাগরিক মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক এ উৎসব বর্তমানে অরাজনৈতিক সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।
আমাদের দেশে সব বাঙালির যৌথভাবে উদ্যাপনের মতো কোনো সামাজিক উৎসব ছিল না। দুই ঈদ কিংবা দুর্গাপূজা হলো ধর্মীয় উৎসব—মুসলমান ও হিন্দু সীমিতভাবে এ সময় পরস্পরের সঙ্গে লৌকিকতা বা সৌহার্দ্য বিনিময় করলেও তা কখনো ধর্মীয় গণ্ডি ভাঙতে পারেনি, পারার কথাও নয়।
ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কিছু কিছু উৎসব অনুষ্ঠান চালু হয়েছিল, যেমন রাখি উৎসব বা হিন্দুমেলা। কিন্তু এর মধ্যে কখনো প্রকটভাবে কখনো প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক চেতনা কাজ করেছে। উভয় ক্ষেত্রে হিন্দুধর্মীয় প্রভাব থাকায় মুসলিম জনগণ এসবে প্রতীকীভাবে অংশগ্রহণ করলেও ব্যাপকভাবে কখনো অংশ নেয়নি। অত্যন্ত বড় মাপের নেতা হলেও মহাত্মা গান্ধীর জীবনচর্যার সংস্কৃতি হিন্দুধর্মীয় শিক্ষাদর্শে প্রভাবিত হওয়ায় ভারতীয় কংগ্রেস ব্যাপক হারে মুসলমানদের আকৃষ্ট করতে পারেনি, পারেনি তার প্রতিস্পর্ধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে ধর্মান্ধ মুসলিম লীগের উত্থান ঠেকাতে।
বাংলাদেশে, সে তুলনায়, রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী নানান অনুষ্ঠান উৎসবের সূচনা হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল শহীদ দিবস হিসেবে, যেখানে শোকই ছিল মুখ্য বিষয়। কিন্তু দিন দিন রাজনৈতিক সংগ্রামের তীব্রতা ও ব্যাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এ দিনের তাৎপর্যও পাল্টে গেছে। শোককে সত্যিই বাঙালি শক্তিতে পরিণত করেছে। মানুষ এদিন শপথ নিয়েছে, দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছে। এভাবে শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে বাঙালির জাতীয় জাগরণ ঘটেছে আর দেশব্যাপী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাগরণ, তা যদি হয় একটি জাতির ঐক্যবদ্ধ জাগরণ, স্বাধীনতা ও সার্থকতার লক্ষ্যে জাগরণ, তাহলে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনুষ্ঠানাদিই তো আয়োজিত হবে। ফলে একুশকে কেন্দ্র করে বাঙালির সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটতে থাকল—শুরু হলো বাংলা একাডেমীর মাসব্যাপী বইমেলা, প্রকাশনার জোয়ার, সারা দেশে ছোটবড় বইমেলা আর সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে এক দিনের অধিক, কখনো সপ্তাহব্যাপী, পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালা ও উৎসব। একুশেও আজ উৎসবের রূপ ধারণ করেছে। এর আলাদা তাৎপর্য তৈরি হয়েছে জাতিসংঘ এ দিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করায়।
তবুও একুশে ঠিক আনন্দ উৎসবের দিন নয়—এ দিনটি জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির করণীয় নির্ধারণের দিন। জাতীয় প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব পালন ও দায়বদ্ধতার মতো সিরিয়াস বিষয় এখানে বিবেচ্য। তাই হয়তো উৎসবের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক এখানে উপেক্ষিত—নতুন পোশাক ও উন্নত খাবার-দাবার। তা ছাড়া প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা এবং সামাজিক পরিমণ্ডল ছাড়াও পারিবারিক পরিমণ্ডলে পালনের বিশেষ সুযোগ নেই একুশের এই দিনটি। এটা সব সময়ই গণ-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু বক্তব্যসহ জাতীয় প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রকাশ ঘটিয়েই পালন করা সম্ভব।
পয়লা বৈশাখ কিন্তু কোনো অনুষ্ঠানে যুক্ত না থেকেও আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করা যায়। বাড়িতেই নতুন পোশাক ও ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেই তা সম্ভব।
এবার পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠানের রীতিমতো জোয়ার বয়েছে। অথচ একসময় বছরের শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তি আর বাংলা নববর্ষ শহরাঞ্চলে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। ছায়ানট যখন আইয়ুবের সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রমনার বটমূলে নববর্ষ উদ্যাপন শুরু করেছে গত শতকের ছয়ের দশকের গোড়ায়, তখন সারা দেশে এটিই ছিল বাংলা বর্ষবরণের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। হয়তো এর বাইরে কোনো কোনো জেলা শহরে ছোটখাটো অনুষ্ঠান হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ নববর্ষ উদ্যাপন ও উপভোগ করেছে, অংশ নিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত হয়েছে ছায়ানটের অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই। দেশের অনেক জায়গায় এটিকে অনুসরণ করে নববর্ষে প্রভাতি সংগীতানুষ্ঠান চালু হয়।
এখন বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের জন্য দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চালু হয়েছে। কোথাও কোথাও সপ্তাহব্যাপী দেশীয় পণ্যের মেলাও চালু হচ্ছে। এবার সরকারের আগ্রহে ও নির্দেশে প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, শিল্পকলা একাডেমী ও শিশু একাডেমীতে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হয়েছে সম্ভবত সরকারি নির্দেশনার ফলেই। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আমি একটি কথা বলতে চাই, যেহেতু এটি হলো সামাজিক উৎসব, তাই এ উৎসবটি শিক্ষক ও ছাত্রদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অংশ নিয়ে উদ্যাপনের সুযোগ দেওয়া উচিত। একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ বা ষোলোই ডিসেম্বরের সঙ্গে পয়লা বৈশাখের চরিত্রগত পার্থক্য আছে। একুশে হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস, আর বাকি দুটি হলো আমাদের রাষ্ট্র অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দিন। ফলে এগুলো সরকারি নির্দেশে রাষ্ট্রীয়-জাতীয় দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হতে পারে। পতাকা উত্তোলন থেকে নানা আনুষ্ঠানিকতার বাধ্যবাধকতায় এগুলো একটু ফরমাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্যাপনের দিন। কিন্তু যেটি সামাজিক উৎসব সেটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উদ্যাপন করতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব হবে যাতে আপামর মানুষ শান্তিতে আনন্দে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসব উদ্যাপন করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। কিন্তু নির্দেশনা দেওয়ার দরকার নেই, প্রেরণা ও উৎসাহ দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। বিষয়টি আশা করি সরকার খেয়াল করবে।
উৎসবের প্রসঙ্গে এবার আরেকটি দিকে আলোচনা করতে চাই।
প্রশ্নটা হলো, আমরা তো বলছি উৎসব, বলছি বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব। উৎসব কেবল ভোগে-বিলাসে হইচইয়ের মধ্যেই কাটিয়ে দিচ্ছি না তো? সারাটা দিন মাইকে মাইকে গীতকলরব, বাদ্যগীতসহ শোভাযাত্রা, পথে পথে ভিড়-জনসমুদ্র, দিন শেষে ক্লান্তিই কি থাকল অবশেষ?
বছরের এই শুরুর দিনটি নানা আনন্দ-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হোক। কিন্তু প্রভাতি অনুষ্ঠানটি হোক সুপরিকল্পিত। সারা বছরের জন্য মন ও মস্তিষ্ক কিছু কিছু রসদ পাক সে অনুষ্ঠানে। উৎসব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা একটা দিকনির্দেশনা পেতে পারি, তাঁর লেখা থেকে এ বিষয়ে জানতে পারি।
‘মানুষের উৎসব কবে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেই দিন।’
এই প্রতিপাদ্য আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এভাবে—‘যেদিন আমরা আপনাদিগকে প্রাত্যহিক প্রয়োজনের দ্বারা চালিত করি, সেদিন না—যেদিন আমরা আপনাদিগকে সাংসারিক সুখ-দুঃখের দ্বারা ক্ষুব্ধ করি, সেদিন না—যেদিন প্রাকৃতিক নিয়মপরম্পরার হস্তে আপনাদিগকে ক্রীড়াপুত্তলির মতো ক্ষুদ্র ও জড়ভাবে অনুভব করি, সেদিন আমাদের উৎসবের দিন নহে; সেদিন তো আমরা জড়ের মতো উদ্ভিদের মতো সাধারণ জন্তুর মতো—সেদিন তো আমরা আমাদের নিজের মধ্যে সর্বজয়ী মানবশক্তি উপলব্ধি করি না—সেদিন আমাদের আনন্দ কিসের? সেদিন আমরা গৃহে অবরুদ্ধ, সেদিন আমরা কর্মে ক্লিষ্ট—সেদিন আমরা উজ্জ্বলভাবে আপনাকে ভূষিত করি না—সেদিন আমরা উদারভাবে কাহাকেও আহ্বান করি না—সেদিন আমাদের ঘরে সংসারচক্রের ঘর্ঘরধ্বনি শোনা যায়, কিন্তু সংগীত শোনা যায় না।’
আরও স্পষ্টভাবে কথাটা এ রকম—‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী—কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহত্, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহত্, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’ এদিন আমরা ব্যক্তিবিশেষ নই, মানুষ হিসেবেই নিজেকে জেনে ও সেভাবে প্রকাশ করে ধন্য হই।
রবীন্দ্রনাথের এই ভাবাদর্শিক পথনির্দেশের সূত্রে আমরা বলতে পারি, নববর্ষের উৎসবের ভাবাদর্শের মধ্যে থাকবে দেশ ও জাতির জন্য, বিশ্ব ও মানবতার জন্য কল্যাণ কামনা ও আত্মনিবেদনের অঙ্গীকার; মহৎ আদর্শ ও উচ্চভাবে ত্যাগের উদ্দীপনায় শ্রীময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কাজে ব্রতী হওয়ার অঙ্গীকার। ফলে অনুষ্ঠানের একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারি আমরা। প্রভাতি সমাবেশ হবে এদিন, রমনার বটমূলে যেমন ছায়ানটের আয়োজনে হয়ে থাকে—ছোটবড় যত বেশি সম্ভব সারা দেশে, সর্বত্র। তাতে কোনো সর্বমান্য শ্রদ্ধেয় বয়স্কজন—নারী বা পুরুষ, হিন্দু বা মুসলমান বা বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান বা ধর্ম বিষয়ে মুক্ত ব্যক্তি—সমাগতদের উদ্দেশে মূল ভাবাদর্শের আলোকে আশীর্বচন উচ্চারণ করবেন। এতে সমস্যা দেখা দিলে উদ্যোক্তাদের সর্বসম্মতিতে লিখিতভাবে নববর্ষের ঘোষণা পাঠ হতে পারে। তারপর নৃত্য ও বাদ্যসহ সংগীত ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান। এরপর রাখিবন্ধন হলে কেমন হয়? বঙ্গভঙ্গের আদলে শুধু হিন্দু-মুসলিমে নয়, নারী-পুরুষে, ধনী-দরিদ্রে, ছোট-বড়তে, হিন্দু-মুসলিমে, শহুরে-গ্রাম্যে এবং যেকোনো রকম বিন্যাসে (অর্থাৎ নারীতে-নারীতে, মুসলিমে-মুসলিমে, ধনীতে-ধনীতে ইত্যাদি) রাখিবন্ধন হবে। ইতিহাসের এখনকার দাবি ও চাহিদা এ রকমই। শোভাযাত্রায় তারপর যোগ দেওয়া যায়, কিংবা শোভাযাত্রা থেকে দিনের সব কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তার পরই শেষ? না, নববর্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় ও জ্ঞাপনের রেওয়াজটা অনুষ্ঠানস্থল থেকে বাড়ি পর্যন্ত আসুক। ছোটরা বড়দের ফুল দেবে, বড়রা ছোটদের বই দেবে, বয়স্ক সমবয়সীরা ফুল/বই বিনিময় করবে—মোট কথা, উপহার বিনিময় ও প্রীতি সম্ভাষণ চলবে। আর বাড়ি পর্যন্ত আসা-যাওয়ার প্রথা শুরু হলে মিষ্টিমুখ, বিশেষ খাবারের আয়োজন স্বভাবতই চলে আসবে।
তখন অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসব সত্যিকারের রূপ পাবে, সংসারের মাটিতে শেকড়বদ্ধ হবে এবং জীবনকে শিল্প ও সংস্কৃতির রসদ জোগাবে। উৎসবের আবহে জীবন আনন্দময় হবে, মুক্তি ও বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
এবার পয়লা বৈশাখে সেই লক্ষণ দেখতে পেয়ে মন কিছুটা আশ্বস্ত হয়, আবার খানিকটা এগিয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ার যে ইতিহাস আছে, আমাদের তা মনে পড়লে শঙ্কিত না হয়ে পারি না।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

গ্রীষ্মে আগুনের ঝুঁকি -অগ্নিনির্বাপণের যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে তো

অগ্নিকাণ্ড যতটা দুর্ঘটনা ততটাই অসাবধানতা ও দায়িত্বহীনতারই ফল। নিজকে বা অপরকে আগুনের দুর্ঘটনার সামনে অরক্ষিত রাখা যে অপরাধ, ভ্রাম্যমাণ আদালত তা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিককে জরিমানা করে বুঝিয়ে দিলেন। জরিমানা করা আবাসিক ও কারখানা প্রতিষ্ঠানে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ-ব্যবস্থা তো ছিলই না, উপরন্তু ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র না নিয়েই ভবনগুলো ব্যবহূত হচ্ছিল। আশা করি, অন্যরাও এই জরিমানা থেকে শিখবেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত এ অভিযান নিয়মিত করবেন।
গ্রীষ্ম কি শীত, প্রায়ই শহরাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে দেখা যায়। সম্পদ ও প্রাণের অপচয় হলেও এ ব্যাপারে সরকার বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান কারোরই বিশেষ মাথাব্যথা দেখা যায় না। এর বড় প্রমাণ হলো, বেশির ভাগ ভবনের নকশা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাছ থেকে অনুমোদন করিয়ে না নেওয়া এবং ভবনে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ-ব্যবস্থা না থাকা। এ বিষয়ে কারও কাছেই কোনো পরিসংখ্যান নেই যে ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ শহরে কতটি ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণের নিয়ম পালন করা হয়। এ কারণেই গত বুধবারের প্রথম আলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানবিষয়ক সংবাদটি ইতিবাচক। তবে সংবাদের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিতভাবে এ দায়িত্ব পালন করে যাওয়া; বিশেষ করে বহুতল ভবন, গার্মেন্টসসহ শিল্পকারখানা এবং বড় বড় শপিং মলকে কোনোভাবেই আগুনের হুমকির সামনে অপ্রস্তুত অবস্থায় রাখা যাবে না। কেননা, তদারকির অভাবে কিংবা ভবনগুলোর মালিকদের দায়িত্বহীনতার খেসারত সেখানে দিতে হয় সাধারণ মানুষকে, যাঁরা সেখানে কেনাকাটা, বসবাস কিংবা পেশাগত কাজে অবস্থান করেন।
প্রায়ই ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় বড় শহরে বড় আকারে আগুন লাগতে দেখা যায়। তারপর ফাঁস হয়ে পড়ে যে প্রতিষ্ঠানটিতে আগুন নেভানোর উপায়, জরুরি নির্গমনপথ ইত্যাদি ছিল না। এ নিয়ে তখন অনেক সমালোচনা হয়। অথচ দরকার হলো আগাম অভিযান চালিয়ে গাফিলতি দূর করার ব্যবস্থা করা। এ কাজে জাতীয় অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা ফায়ার সার্ভিসকে লোকবল, সরঞ্জাম ও তহবিল দিয়ে শক্তিশালী করা দরকার। দরকার উপযুক্ত আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার -রাজনৈতিক মতৈক্য প্রতিষ্ঠা জরুরি

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগকে যে গোটা জাতি স্বাগত জানিয়েছে, তার প্রতিধ্বনি শোনা গেল গত মঙ্গলবার প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকেও। এতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী, বিরোধীদলীয় সাংসদ, বিচারক, আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামও কম হয়নি। একাত্তরে দেশের সর্বস্তরের মানুষ জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে শরিক হলেও কতিপয় গাদ্দার এর কেবল বিরোধিতাই করেনি, দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধ করেছে। এরা দেশদ্রোহী ও মানবতার শত্রু। স্বাধীনতার পর ভিন্ন নামে হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা কেবল বন্ধই হয়নি, চিহ্নিত অপরাধীদের কেউ কেউ রাজনৈতিকভাবেও পুনর্বাসিত হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে প্রণীত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ (আদালত) আইন। সে আইনেই একাত্তরে এ দেশের মাটিতে সংঘটিত সব অপরাধের বিচার হওয়া সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা এ ব্যাপারে কিছু কিছু সংশোধনীরও সুপারিশ করেছেন। এ ক্ষেত্রে যদি সংবিধানের সংশ্লিষ্ট কোন অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তা করার জন্য সংসদে যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার তা এই সরকারের আছে। অতীতে বেশ কিছু আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে এবং তা যথারীতি বাতিলও হয়ে গেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় সে ধরনের আইনগত ত্রুটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর সঙ্গে যেমন ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জড়িত, তেমনি জড়িত জাতির আবেগ-অনুভূতিও। আইনগত ত্রুটির কারণে বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে প্রকৃত অপরাধীরা যাতে ছাড়া না পায়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। যারা এই বিচারকে ৩৯ বছর আগের মীমাংসিত ঘটনা বলে কূটতর্কে লিপ্ত হচ্ছে, তাদের মতলব বুঝতে অসুবিধা হয় না। অপরাধীরা বরাবর সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়ে নািস বাহিনীর সদস্যদের এখনো আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গেলে একাত্তরের অপরাধীদের বিচারে বাধা কোথায়?
সরকার ইতিমধ্যে বিচারক, তদন্তকারী ও আইনজীবী নিয়োগ করেছে। প্রয়োজনে তদন্ত কর্মকর্তা ও আইনজীবীর সংখ্যা বাড়াতে হবে, গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারাও সেরূপ দাবি জানিয়েছেন। সরকারকে এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও জাতীয় তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে। বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর মন্ত্রীদেরও এ বিষয়ে বেশি কথা বলা ঠিক নয়। বরং বিচারের আনুষঙ্গিক সমর্থন জোগানোর দিকেই সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক মতৈক্য। অন্তত এই একটি বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলকে একমত হতে হবে। বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, ক্ষমতার পালাবদলেও তা ব্যাহত হবে না, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে বিরোধী দলকে। অনুরূপ বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না বলে সরকার যে অঙ্গীকার করেছে, কার্যক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন থাকা চাই। সংকীর্ণ রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে থেকে জাতির এই আরব্ধ কাজকে এগিয়ে নিতে সবাই একযোগে কাজ করবেন, সেটাই প্রত্যাশিত।

ইরানে গ্যাসোলিন সরবরাহ বন্ধ করেছে মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেছেন, তাঁর দেশ ইরানে গ্যাসোলিন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে তেহরান তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে নতুন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে বৈঠক করার তিন দিন পর নাজিব এ ঘোষণা দিলেন। ওবামা সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে ‘জোরালো ও দ্রুত’ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে নরবলি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি মন্দিরে এক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন মস্তক এবং হাত-পা ও মস্তকবিহীন দেহ পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, এটা ‘মানব বলি’র ঘটনা।
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা বীরভূমের ছোট মাকদমপুর গ্রামের কাছে স্থানীয় একটি কালীমন্দিরে ওই মাথা ও দেহ পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজন আদিবাসীকে আটক করা হয়েছে।
ভারতে নরবলি নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রত্যন্ত ও অনুন্নত এলাকায় মাঝেমধ্যে কিছু নরবলির ঘটনা ঘটে থাকে।
স্থানীয় কর্মকর্তা কল্যাণ মুখার্জি বলেন, দেবতাকে প্রসন্ন করার জন্য ওই ব্যক্তিকে বলি দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে

ইসরায়েল লেবাননভিত্তিক গেরিলা সংগঠন হিজবুল্লাহর সঙ্গে যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। হিজবুল্লাহ গেরিলারা সিরিয়ার কাছ থেকে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে বলে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি এই আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন।
ওয়াশিংটনে পরমাণু শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে জর্ডান ককাশের সঙ্গে বৈঠকে আশঙ্কা প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযমী থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন বাদশা আবদুল্লাহ।
সিরিয়া অবশ্য হিজবুল্লাহ গেরিলাদের ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সিরিয়া হিজবুল্লাহ গেরিলাদের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র তুলে দিয়েছে—বেশ কিছুদিন থেকেই ইসরায়েল এমন অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতেই ইসরায়েল এমন অজুহাত তুলছে। সিরিয়া এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহর অস্ত্রের মজুদ বাড়ানো ও সিরিয়ার ভূমিকা ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য চরম হুমকি। এ বিষয়ে আমরা অবগত আছি।

কিরগিজ নেতাদের মেদভেদেভের হুঁশিয়ারি

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ গতকাল শুক্রবার কিরগিজস্তানের নতুন নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তাঁদের পূর্বসূরিদের ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। ব্রাজিল সফরকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কিরগিজস্তানের নতুন কর্তৃপক্ষের কাছে খুবই প্রত্যাশা করি তাঁরা যেন ভুলগুলো থেকে মুক্ত থাকেন।’ এদিকে কিরগিজস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভের স্বজনেরা গতকাল শুক্রবার সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে অস্ত্র জমা দিয়েছেন। কুরমানবেক গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেশী দেশ কাজাখস্তানে চলে যাওয়ার এক দিন পর তাঁরা এ অস্ত্র জমা দিলেন। খবর এএফপি ও এপি।
মেদভেদেভ আবারও বলেছেন, রাশিয়া কিরগিজস্তানকে মানবিক সহায়তা দেবে। কিন্তু তিনি সতর্ক করেছেন, রাশিয়া তখনই কেবল বড় প্রকল্পগুলো চালিয়ে যাবে যখন তারা মনে করবে কিরগিজস্তানের নতুন নেতৃত্বের তা চালানোর মতো দক্ষতা আছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি নতুন নেতাদের প্রচণ্ড রাজনৈতিক সাহস আছে। কাজেই তারা এটি পারবে। তা না হলে এটি তেমন সহজ হবে না।’ মেদভেদেভ আরও বলেন, কুরমানবেকের দেশ ত্যাগ সে দেশের মানুষকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

মৃত ব্যক্তিকে মেয়র নির্বাচিত

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ট্রেসি শহরে মেয়র হিসেবে এক মৃত ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছেন। এক মাস আগে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় মৃত্যুবরণ করেন কার্ল গিয়ারি। তাঁর বিধবা স্ত্রী সুসান গিয়ারি বলেন, ‘নির্বাচনে কার্লের বিজয়ের বিষয়টি আমার কাছে মোটেই বিস্ময়কর নয়।’
তিনি বলেন, কার্ল যেদিন মারা যান, সেদিন লোকজন শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমরা কার্লকেই ভোট দেব।’ হয়েছেও তা-ই। নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ২৮৫ ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৮৫ ভোট।
কার্ল গিয়ারি (৫৮) সোজাসাপ্টা কথা বলার জন্য সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্রিস রোগার বলেন, বর্তমান মেয়র বারবারা ব্রুকের বিরোধিতা করতেই লোকজন গিয়ারিকে বিজয়ী করেছে।

ব্যাংককে নেতাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের যে হোটেলে লাল শার্ট পরা নেতারা অবস্থান করছিলেন, গতকাল শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনী সেই হোটেলটি ঘিরে রাখে। তবে নেতাদের গ্রেপ্তার অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের এক মুখপাত্র এ তথ্য দিয়েছেন। লাল শার্ট পরা বিক্ষোভকারীদের দমাতে এবার সরকারপন্থী কয়েক হাজার মানুষ ব্যাংককে গতকাল বিক্ষোভ করেছে।
সে দেশের উপপ্রধানমন্ত্রী সুথেপ থউগসুবান গতকাল জাতীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘বিশেষ বাহিনী এসসি পার্ক হোটেলটি ঘিরে রেখেছে। আমার বিশ্বাস, হোটেলটিতে “সন্ত্রাসীরা” ও লাল শার্ট বিক্ষোভকারীদের নেতারা লুকিয়ে আছেন।’ সুথেপ বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে। আশা করি, আমরা সফল হব।’
সরকারের মুখপাত্র পানিতান ওয়াত্তানায়াগরন বলেছেন, ‘বিক্ষোভকারী নেতাদের গ্রেপ্তার অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। তবে তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।’ চলতি মাসের শুরুর দিকে পার্লামেন্টে ভাঙচুর করার অভিযোগে লাল শার্ট নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এসসি পার্ক হোটেলটি থাইল্যান্ডের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার পারিবারিক সম্পত্তি। সিনাওয়াত্রাকে ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। লাল শার্ট পরা বিক্ষোভকারীরা থাকসিনের সমর্থক। তাঁরা প্রায় এক মাস ধরে প্রধানমন্ত্রী ভেজ্জাজিভার পদত্যাগ এবং নতুন নির্বাচন ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ করে আসছেন। এসসি পার্ক হোটেলে অবস্থান করে নেতারা এই আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন এত দিন।
লাল শার্ট নেতা অরিসমান পোনগ্রুনগ্রোং বলেছেন, ‘আমাদের সব নেতাই নিরাপদে হোটেল ত্যাগ করতে সমর্থ হয়েছেন।’ তিনি ম্যাগাফোনে বিক্ষোভকারীদের বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের খুন করার মতলবে অভিযান চালায়। যাক, এ দফা তারা ব্যর্থ হয়েছে। আমার সবাই হোটেল থেকে চলে আসতে পেরেছি।’
লাল শার্ট বিক্ষোভকারীরা এরপর হোটেলের বাইরে বিক্ষোভ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের হাতাহাতি হয়।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ ভেজ্জাজিভার সমর্থনে গোলাপি শার্ট পরা অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী গতকাল রাজধানীর একটি সেনাঘাঁটির বাইরে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় গোলাপি শার্ট বিক্ষোভকারীরা হাতে থাইল্যান্ডের জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্লোগান দেন।
গত শনিবার সেনাবাহিনীর সঙ্গে লাল শার্ট বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ২৩ জন নিহত ও আট শতাধিক আহত হয়েছে।

ভারতে মাওবাদী দমনে চালকবিহীন বিমান উড্ডয়ন

ভারতে মাওবাদীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে গত বুধবার রাতে ছত্তিশগড়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালকবিহীন বিমান উড্ডয়ন করা হয়েছে। এ সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ওডিশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, অন্ধ্র প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মনুষ্যবিহীন এই বিমান ১০ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। একটানা চলতে পারে চার ঘণ্টা। উড়তে উড়তেই মাওবাদীদের গতিবিধি, তাদের আস্তানার তথ্য দেবে বিমানটি।
বিমান থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী মাওবাদী মোকাবিলায় কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে পারবে।
আফগানিস্তান ও ইরাকে আল-কায়েদা ও তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে এত দিন মার্কিন সেনারা এ ধরনের মনুষ্যবিহীন বিমানের ব্যবহার করে আসছিল।
ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াদায় ৬ এপ্রিল মাওবাদীদের হামলায় ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান নিহত হওয়ার ঘটনার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালকবিহীন বিমান থেকে মাওবাদীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ছত্তিশগড়ে ওই হামলার পর থেকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে কেন্দ্রীয়সরকার।

সুদানে ভোট গণনা শুরু, বশিরের জয়ের সম্ভাবনা বেশি

সুদানে নির্বাচন গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ওমর-আল বশির পুনর্নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের একজন সহযোগী বলেছেন, এ নির্বাচনে বশির জয়লাভ করলে ধরে নিতে হবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে কোনো সাড়া ফেলেনি। তবে দেশের প্রধান বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জন করে। খবর এএফপির।
নির্বাচন শেষ হয়েছে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টায়। ভোটকেন্দ্রের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের ভোট পরেও নেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার ভোট গণনা শুরু হয়েছে। এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল এক কোটি ৬০ লাখ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি পার্লামেন্ট ও স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়।
দুই যুগের মধ্যে সুদানে এটাই প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এ বছরের মার্চে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

গড়ে উঠছে আফগান বিমানবাহিনী

যুদ্ধ আফগানদের জীবনাচরণে বিশাল প্রভাব ফেলেছে। বছরের পর বছর যুদ্ধের ঘানি টেনে দেশটি এখন বুদ্ধিবৃত্তি, মেধার দিক দিয়ে বিরাট শূন্যতার মুখোমুখি। নিয়মতান্ত্রিকতার সঙ্গে যে জাতির কোনো দিন পরিচয় ঘটেনি, বিশৃঙ্খল যুদ্ধের অনিয়ম যে জাতির প্রতিটি রক্তকণিকায়, সেখানে নিয়মতান্ত্রিকতার উন্মেষ ঘটানো সত্যিই এক কঠিন বাস্তবতা।
আফগানিস্তানে এখন নিয়মতান্ত্রিক বিভিন্ন বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রই এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিমানবাহিনীকে গড়ে তোলার এই মহাযজ্ঞে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি মার্কিন প্রশিক্ষকেরা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স সম্প্রতি আফগান বিমানসেনাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর এভিয়েশন উইংয়ের কর্নেল বার্নার্ড মাটারের মুখোমুখি হয়েছিল। আফগানিস্তানের জন্য একটি সুপ্রশিক্ষিত বিমানবাহিনী গড়ে তোলার দায়িত্বে থাকা মাটার এই কাজকে বিশ্বের অন্যতম কঠিন একটি দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আক্ষরিক অর্থেই একটি কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছি।’ আফগানিস্তানে মেধাবী ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকজনের খুব অভাব। বিজ্ঞান শিক্ষার চর্চা দূরে থাক, মৌলিক পড়াশোনা ও শিক্ষিত মানুষই খুঁজে বের করা শক্ত এই দেশে। প্রশিক্ষণের সময় বার্নার্ড সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, সেটা হলো ভাষাগত সমস্যা। বেশির ভাগ আফগানই ইংরেজি ভালো করে বোঝে না। বিমানবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিতে আসা ছেলেদের কোনো কারিগরি বিষয় ভালো করে বোঝানোই দুরূহ একটি কাজ। প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার কিছু হেলিকপ্টার ও পুরোনো বিমান নিয়ে গড়ে উঠেছে আফগানিস্তানের বিমানবাহিনী। সেই হেলিকপ্টার ও বিমানগুলোর নির্দেশনা পুস্তিকাগুলো রাশিয়ান ভাষায় হওয়ার কারণে প্রশিক্ষকেরাও তা তাঁদের প্রশিক্ষণার্থীদের ভালো করে বোঝাতে পারেন না।
বার্নার্ড একবার অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, বিমানবাহিনীর বিমান চালনা যুদ্ধজ্ঞান তো অনেক দূরের ব্যাপার, বিমানবাহিনীর সদস্যদের ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বেশ কিছু গাড়িই চালানোর মতো অভিজ্ঞ চালকের অভাব সেই বিমানবাহিনীতে। অর্থাৎ বিমানবাহিনীর বৈমানিক নয়, প্রথমেই বিমানবাহিনীর দাপ্তরিক, প্রশাসনিক কাজের জন্য গড়ে তুলতে হচ্ছে কর্মীবাহিনী।
তবে, এখনো অ-আ-ক-খ-এর পর্যায়ে থাকা এই বিমানবাহিনী গড়ে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৫০টি বিমান ও হেলিকপ্টারের সমন্বয়ে এর বহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বিমানবাহিনীর সদস্যসংখ্যা দুই হাজার থেকে আট হাজারে উন্নীত করা হচ্ছে। কান্দাহারে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারে গড়ে তোলা হচ্ছে বিমানবাহিনীর ঘাঁটি।
আফগানিস্তানের নতুন করে গড়ে ওঠার চেষ্টায় রত বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় সমস্যা দক্ষ লোকবলের অভাব। এই মুহূর্তে কান্দাহারের বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা প্রতিটি বিমান বা হেলিকপ্টারে একজন আফগান বৈমানিকের সঙ্গে একজন মার্কিন প্রশিক্ষককে থাকতে হয়। কারণ একা একা সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি বিমান বা হেলিকপ্টার চালানোর মতো দক্ষতা এখনো অর্জন করতে পারেননি কোনো আফগান বৈমানিক।
তবে, হাল ছাড়েননি বার্নার্ড মাটার। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন এই আফগানিস্তান বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানগুলোই সমরে স্বস্তি দেবে আফগানদের। সেই হেলিকপ্টার ও বিমানগুলোই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেবে বিভিন্ন দুর্যোগে। সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়। বার্নার্ড সেই ক্ষণটুকু নিজের চোখেই দেখে যেতে চান।

সংগীতে পুরস্কার পাচ্ছেন পুতিন

রাশিয়ার সংগীতভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল মিউজ টিভি কর্তৃপক্ষ এ সপ্তাহে ঘোষণা করেছে, এবারের ‘ইভেন্ট অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারের জন্য সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনকে মনোনীত করেছে তারা। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘হিপ হপ’ ধারার সংগীতের প্রসারে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
এই মনোনয়ন অনেকখানি অপ্রত্যাশিত, কারণ, ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে ৫৭ বছর বয়সী পুতিন বেশ খানিকটা জড়োসড়ো ভঙ্গিতে স্থিরভাবে কিশোর-কিশোরীদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর তাঁর চারপাশে ওই কিশোর-কিশোরীরা র্যাপ সংগীত গাইছে। নভেম্বরে পুতিন ‘ব্যাটেল ফর রেসপেক্ট’ নামের ‘হিপ হপ’ ধারার গানের ওই প্রতিযোগিতায় উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেন।
সমালোচকেরা বলছেন, জনপ্রিয়তা বাড়ানোর এটি একটি কৌশল পুতিনের। কিন্তু ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি মাদক ও মদ্যপানের কুফল সম্পর্কে যুবসমাজকে সচেতন করতে ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
২১ এপ্রিল মস্কোতে পুরস্কার বিতরণ করা হবে। তবে পুতিন এতে যোগ দেবেন কি না, সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

মঙ্গলে মানুষ গেছে দেখে যেতে চান ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আশা করেন, তাঁর জীবদ্দশায়ই মার্কিন নভোচারীরা মঙ্গলের মাটিতে পা রাখবেন। তিনি বেঁচে থাকতেই সেটা দেখে যেতে চান। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানভেরালে কেনেডি মহাকাশকেন্দ্রে গত বৃহস্পতিবার একটি অনুষ্ঠানে ভাষণে তিনি এ কথা জানান।
ওবামা জানান, মহাকাশ অনুসন্ধানে তাঁর নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে মার্কিন নভোচারীরা মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছে যাবেন এবং এরপরই মঙ্গলের মাটিতে পা রাখতে পারবেন। তিনি বেঁচে থাকতেই তা দেখে যেতে চান। ওবামা বলেন, ‘আশা করি, আমি তা দেখে যেতে পারব। আর মহাকাশ অভিযানে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে আমার চেয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অন্য কেউ নেই। তবে আমাদের সেটা করতে হবে খুবই সুচারুভাবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, নাসার বাজেট ৬০০ কোটি ডলার বাড়ানোর ফলে সৌরজগতে অনুসন্ধান, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে পৃথিবীকেন্দ্রিক পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ডের প্রতি সহযোগিতা বাড়বে।
ওবামা আশা প্রকাশ করেন, ২০২৫ সালের মধ্যে দূরের যাত্রার উপযোগী মহাকাশযান তৈরি করা সম্ভব হবে। আর ওই যানে করে চাঁদ থেকে মঙ্গল ও বৃহস্পতির কক্ষপথে গভীর মহাকাশে অবস্থানকারী গ্রহাণুপুঞ্জে নভোচারী পাঠানো যাবে।
ওবামা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ আমরা মঙ্গলের কক্ষপথে মানুষ পাঠাতে এবং তাঁদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারব। এরপর মানুষ মঙ্গলের ভূমিতে পা রাখতে পারবে।’
ওবামার এই কথা দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির একটি ঘোষণা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৬১ সালে কেনেডি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এ দশকের মধ্যেই চাঁদে মানুষ পাঠাতে এবং নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে আমেরিকা।’ কেনিডির ঘোষিত সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছিল ১৯৬৯ সালে।

ভারতে ক্ষমতাসীন দলে বিতর্ক

মাওবাদীদের মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের কঠোর কৌশলের কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা। তাঁদের মধ্যে মধ্য প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং ও মনি শংকর আয়ারের মতো নেতাও রয়েছেন।
মাওবাদী সংকট মোকাবিলায় অংশীদারমূলক উন্নয়ন জরুরি—দিগ্বিজয় সিংয়ের এই মতামতের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছেন মনি শংকর আয়ারের মতো অনেক জ্যেষ্ঠ কংগ্রেস নেতা। অজিত যোগী ও সুবোধ কান্ত সাহের মতো কংগ্রেসের অনেক নেতাই মনে করেন, মাওবাদী হুমকি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার চেয়ে অনেক বেশি আর্থ-সামাজিক সমস্যা। মনি শংকর আয়ার মনে করছেন, মাওবাদীদের বিরুদ্ধে সরকারের লৌহকঠিন ওই কৌশল শুধু উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে যাচ্ছে না, এই কৌশল আদিবাসীদের বিক্ষুব্ধ করে তুলবে।
গত বুধবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে দরিদ্র আদিবাসীদের ক্ষমতায়ন ও তাদের মাওবাদী সংসর্গ থেকে মুক্ত করতে অংশীদারমূলক উন্নয়নের কথা বলেছেন মনি শংকর আয়ার। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর অপারেশন গ্রিন হান্ট বা ম্যান হান্ট নিয়ে একাগ্রচিত্ত।
মাওবাদী ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য না দেওয়ার জন্য সহকর্মীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের পরিষ্কার নির্দেশনা সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কৌশলের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটালেন কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
গত বুধবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক নিবন্ধে পি চিদাম্বরমকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উদ্ধত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন দিগ্বিজয় সিং। তিনি লেখেন, ‘১৯৮৫ সাল থেকেই আমি পি চিদাম্বরমকে চিনি, যখন আমরা দুজনেই পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছিলাম। তিনি সত্যিকার অর্থেই বুদ্ধিমান, স্পষ্টভাষী, সংকল্পবদ্ধ ও আন্তরিক রাজনীতিক। কিন্তু তিনি যখন তাঁর মনস্থির করে ফেলেন, তখন তিনি চূড়ান্তভাবে অনমনীয়। আমি অনেকবার তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্যের শিকার হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা এখনো ভালো বন্ধু।’
দিগ্বিজয় সিং তাঁর নিবন্ধে বলেন, মাওবাদী সংকট মোকাবিলায় পি চিদাম্বরমের কৌশলের সঙ্গে তিনি একমত নন। ওই কৌশলে আক্রান্ত এলাকায় বসবাসরত লোকজনকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। মাওবাদী সংকটকে পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে নিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
দিগ্বিজয় সিং আরও লেখেন, ‘আমি যখন তাঁর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন যে এটা তাঁর দায়িত্ব নয়।’
কংগ্রেসের গণমাধ্যম বিভাগের প্রধান জনার্দন দ্বিবেদী বলেন, কংগ্রেস একটি গণতান্ত্রিক দল। সবারই নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের মতামত দলের অভ্যন্তরেই প্রকাশ করা উচিত।

পাইলট জানতেন বিমানটি বিধ্বস্ত হতে চলেছে

রাশিয়ায় বিধ্বস্ত পোলিশ বিমানের ব্ল্যাক বক্স ফ্লাইট রেকর্ডারে ধারণকৃত কণ্ঠস্বর থেকে জানা গেছে, বিধ্বস্ত বিমানের পাইলট জানতেন তাঁদের বিমান বিধ্বস্ত হতে চলেছে। গত বৃহস্পতিবার পোলিশ কর্মকর্তারা এ কথা বলেছেন। গত শনিবারের ওই বিমান দুর্ঘটনায় পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট লেস কাচজিনস্কিসহ বহু ঊর্ধ্বতন বেসামরিক-সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন।
পোল্যান্ডের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আন্দ্রজেজ সেরেমেন্ট বলেন, এ বিষয়টি পরিষ্কার যে গাছের মাথায় বিমানের আঘাত লাগার পর ক্রুরা বুঝতে পেরেছিলেন বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী।
একটি রুশ সূত্র জানায়, ধারণকৃত টেপ থেকে বোঝা গেছে, অবতরণের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য বিমানের ভিআইপি যাত্রীদের পক্ষ থেকে পাইলটের ওপর কোনো ধরনের চাপ ছিল না।
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর রাশিয়ার তদন্তকারীরা বলেছিলেন, স্মোলেনস্কে ঘন কুয়াশার কারণে রাশিয়ার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা বারবার বিমানটিকে বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সতর্কতা উপেক্ষা করেই পাইলট অবতরণের চেষ্টা করেন। কয়েকটি সূত্র জানায়, অবতরণের জন্য বিমানের ক্রুরা চাপের মুখে ছিলেন।
তদন্তের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে জানায়, স্মোলেনস্কের কাছে অবতরণের জন্য ভিআইপি যাত্রীদের কেউ কেউ পাইলটের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, এমন প্রমাণ ফ্লাইট রেকর্ডারে পাওয়া যায়নি। সূত্র আরও জানায়, ব্ল্যাক বক্স থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে বোঝা গেছে, পাইলটের ভুলের কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।
পোল্যান্ডের প্রধান সামরিক কৌঁসুলি রুশ প্রতিবেদনকে ‘অনুমান’ হিসেবে অভিহিত করে তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখনো তদন্ত চলছে, তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
অপর এক পোলিশ সামরিক কৌঁসুলি বলেন, আসন্ন বিপর্যয় সম্পর্কে পাইলট জানতেন। শেষ মুহূর্তে ধারণ করা কণ্ঠস্বরকে ‘নাটকীয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

শেষকৃত্য পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট লেস কাচজিনস্কির শেষকৃত্যানুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে পোলিশ কর্তৃপক্ষ। আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ছাইয়ের কারণে দেশটির অধিকাংশ বিমানবন্দরই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বনেতাদের ভ্রমণ বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পোলিশ প্রেসিডেন্টের সহকারী জেসেক সাশিন গত শুক্রবার পোলিশ রেডিওকে বলেন, এটা হচ্ছে একটি গুরুতর বিকল্প; যা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

আসছে দক্ষিণ আফ্রিকার একাডেমি দল

দুটি চার দিনের, ৩টি এক দিনের ও দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে ২০ এপ্রিল বাংলাদেশে আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা একাডেমি ক্রিকেট দল। চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ একাডেমি দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচ। ২৮ এপ্রিল দ্বিতীয় চার দিনের ম্যাচ বগুড়া শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে। এর পর ৪ ও ৬ মে একই ভেন্যুতে তারা খেলবে দুটি এক দিনের ম্যাচ। তৃতীয় এক দিনের ম্যাচটি বিকেএসপিতে হবে ৮ মে। আগামী ১০ ও ১১ মে দুটি টি-টোয়েন্টিও বিকেএসপিতেই।

সেমিফাইনালে মোহামেডান

সালমা খাতুনের দারুণ বোলিংয়ে (৪/১৩) ইন্দিরা রোডকে ৭ উইকেটে হারাল মোহামেডান। এই জয়ে মেয়েদের ক্লাব কাপ ক্রিকেটের সেমিফাইনালেও উঠে গেল তারা।
ধানমন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ইন্দিরা রোডকে ৭০ রানের মধ্যে বেঁধে ফেলে মোহামেডান। অধিনায়ক সালমা ছাড়াও কাল বোলিংয়ে সফল ছিলেন রুমানা আহমেদ, ১২ রানে তিনি নিয়েছেন ৩ উইকেট। ইন্দিরার সোহেলি (১৩) ছাড়া আর কেউই দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি। জবাবে ১৯.৩ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে এই রান টপকে যায় মোহামেডান। রুমানা করেন সর্বোচ্চ অপরাজিত ২৫ রান।

রুনির দাম আকাশছোঁয়া

রোনালদো-কাকাকে এনেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না, চ্যাম্পিয়নস লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বাদ পড়তে হয়েছে, ‘এল ক্লাসিকো’তে হেরে লা লিগাতেও নেমে যেতে হয়েছে দুইয়ে।
এবার রিয়াল মাদ্রিদের নজর পড়েছে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ওয়েইন রুনির দিকে। কিন্তু এই মৌসুমে ৩৪ গোল করা স্ট্রাইকারকে ছাড়বে কেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড? তবে মোক্ষম অস্ত্র তো রিয়ালের আছেই—অর্থ! শোনা যাচ্ছে রুনির জন্য ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের চোখ ধাঁধানো প্রস্তাব দিয়েছে রিয়াল।
এর মধ্যে ট্রান্সফার ফি ৯০ মিলিয়ন পাউন্ড, আর রুনির সাপ্তাহিক বেতন আড়াই লাখ পাউন্ড, পাঁচ বছরে যা দাঁড়াবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সমান বেতন ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। সব মিলিয়ে রীতিমতো লোভনীয় টোপ। এ ছাড়া ফ্যাবিও ক্যাপেলোকেও নাকি ফিরিয়ে আনতে চায় রিয়াল। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ক্যাপেলোর চুক্তি ২০১২ সাল পর্যন্ত হলেও সেটি নিয়ে ভাবছেন না রিয়াল প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।

জিতল শুধু রহমতগঞ্জ

বাংলাদেশ ফুটবল লিগে গতকাল ছিল তিনটি ম্যাচ, এর মধ্যে জিতেছে শুধু রহমতগঞ্জ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তারা ৩-২ গোলে হারিয়েছে ব্রাদার্সকে। চট্টগ্রামে স্থানীয় মোহামেডানের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে ফরাশগঞ্জ। ফেনীতে বিয়ানীবাজার-ফেনী সকার ম্যাচ ড্র হয়েছে ১-১ গোলে।
ব্রাদার্সের সঙ্গে ২-২-এর পর ৮৪ মিনিটে গোল করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে রহমতগঞ্জ। পল মেকজেমস করেন মহামূল্যবান ওই গোল। ১৪ মিনিটে মুরাদ আহমেদের (মিলন) গোলে এগিয়ে যায় ব্রাদার্স। এর পর তাদের গোলরক্ষক আহত হওয়ার পর বিপর্যয়ের শুরু। ৩২ মিনিটে ১-১ করেন জাকির। মিনিট চারেক পর ইদ্রিস কাসুরের গোলে এগিয়ে যায় রহমতগঞ্জ। জয়ের জন্য মরিয়া ব্রাদার্সকে ৪৩ মিনিটে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন খলিলুর রহমান।
আমাদের ফেনী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ফেনীর ভাষাশহীদ সালাম স্টেডিয়ামে ৫ মিনিটে আনোয়ারের পাস থেকে গোল করে সকারকে এগিয়ে দিয়েছিলেন আসিফ। কিন্তু ঘরের মাঠে জয় পাওয়া হলো না তাদের। ৫৯ মিনিটে সোহেল রানার গোলে (১-১) অন্তত একটা পয়েন্ট নিশ্চিত করে ফেলে বিয়ানীবাজার। শেষ দিকে বেশ কয়েকটি সুযোগ নষ্ট করেছেন সকারের স্ট্রাইকাররা। আগের ম্যাচগুলোর তুলনায় কাল দর্শক ছিল কম। কিন্তু এই দর্শকদেরই প্রত্যাশা ছিল অনেক, নিজেদের দলের জয় দেখতে চেয়েছিল তারা। সেটি পূরণ না হওয়ায় চিৎকার করে ক্ষোভ জানিয়েছে নিজেদের দলের প্রতি। শুনতে হয়েছে দুয়োও।
১৫ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট বিয়ানীবাজারের। নিচের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছে দলটি। ১৫ ম্যাচে সকারের পয়েন্ট ১৮। রহমতগঞ্জের পয়েন্টও ১৮। এক ম্যাচ বেশি খেলে ব্রাদার্সের সংগ্রহ ১৬। চট্টগ্রাম মোহামেডানের পয়েন্ট ১৬ ম্যাচে ১৫। সমান ম্যাচে ফরাশগঞ্জের পয়েন্ট ১৬।
গায়ে গায়ে লেগে থাকা এই দলগুলোর এখন একটাই চেষ্টা—অবনমন এড়ানো!

দুই দলের উল্টো যাত্রা

সাইক্লোনস অব চিটাগংয়ের জন্য দুঃস্মৃতিরই হয়ে থাকল প্রথম এনসিএল টি-টোয়েটি ক্রিকেট লিগ। পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে তারা। অন্যদিকে কাল বরিশাল ব্লেজার্সের বিপক্ষে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে উঠে গেছে সুলতানস অব সিলেট।

সেমিফাইনালে সিলেট

টিম টিম করে এখনো জ্বলছে সম্ভাবনা। আজ যদি সুলতানস অব সিলেটের কাছে হেরে যায় কিংস অব খুলনা, আগামীকালের বরিশাল ব্লেজার্স-খুলনার ম্যাচটি হয়ে যাবে এনসিএল টি-টোয়েন্টি লিগের অলিখিত কোয়ার্টার ফাইনাল। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে গতকাল সন্ধ্যার ম্যাচে সুলতানস অব সিলেটের কাছে ৪ উইকেটে হারের পরও এই সমীকরণই টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রেখেছে শাহরিয়ার নাফীসের দলকে। অন্যদিকে কালকের জয় দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে তুলে দিয়েছে সিলেটকে।
তবে মাশরাফি বিন মুর্তজার সুলতানস অব সিলেট খুব সহজ জয় পায়নি। ১২০ রানের ছোট লক্ষ্য ছুঁতেই খেলতে হয়েছে শেষ ওভার পর্যন্ত, হারিয়েছে ৬টি উইকেট। বরিশাল ব্লেজার্সের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান ইন্ডিকা ডি সারামই দিয়েছেন সিলেটের জয়ের নেতৃত্ব। ম্যান অব দ্য ম্যাচও তিনি। ওয়ান ডাউনে নেমে ৩৯ বলে অপরাজিত ৩৯ রান করেছেন ইন্ডিকা। ২১ বলে ১৮ রান করে অধিনায়ক মাশরাফি দিয়েছেন সময়োপযোগী সমর্থন।
এর আগে ইনিংসের ১ বল বাকি থাকতেই ১১৯ রানে অলআউট হয়েছে বরিশাল ব্লেজার্স। ১৭ বলে সর্বোচ্চ ২৬ রান শ্রীলঙ্কার জীবন্থার। শাহরিয়ার নাফীস করেছেন ২৬ বলে ২০। বরিশালকে অল্প রানে আটকে রাখতে সিলেটের বোলারদের সবার প্রায় সমান অবদান। তবে দুই উইকেট করে নিয়েছেন দুই স্পিনার মোশাররফ হোসেন ও ফরিদউদ্দিন।
সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলা সিলেটের ৪ ম্যাচে পয়েন্ট ৬। দুটি সেমিফাইনালই হবে ১৯ এপ্রিল। খেলোয়াড়দের এক দিন বিশ্রাম দিতে ফাইনাল হবে ২০ এপ্রিলের পরিবর্তে ২১ এপ্রিল, খেলা শুরু হবে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে।