Monday, March 9, 2015

অসাধারণ একটি গ্রন্থ by শাহ্ আব্দুল হান্নান

শাহ্ আব্দুল হান্নান
ইসলামি আইনের উৎস সুন্নাহ বা হাদিস সম্পর্কে বহু দিন থেকে পড়াশোনা করছি। কারণ সুন্নাহর উপলব্ধি মুসলিম ব্যক্তি ও জাতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ড. ইউসুফ আল কারজাবির সুন্নাহর ওপর আরবি বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ Approaching the Sunnah : Comprehension and Controversy নেই। বইটি পড়ে আমার মনে হলো, সুন্নাহ বা হাদিস সম্পর্কে প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর এ বইতে আছে। এখন এ বইয়ের বাংলা অনুবাদ ‘সুন্নাহর সান্নিধ্যে’ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (BIIT) উত্তরা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের ইমেইল নম্বর biit_or@yahoo.com। বইটির গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো তুলে ধরছি। বইটির তিনটি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ে তিনি সুন্নাহর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেছেন। ড. কারজাবির মতে, সুন্নাহর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ১. এটা একটি সুবিস্তৃত নমুনা। এতে জীবনের সব দিকের জন্যই হেদায়েত রয়েছে। ২. এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি। ৩. কুরআনের ব্যাখ্যা। ৪. সুন্নাহ একটি বাস্তব প্রয়োগযোগ্য পদ্ধতি উপস্থাপন করে। ৫. সুন্নাহ একটি সহজ পথ। সুন্নাহর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জীবনকে সহজ করা, কঠিন না করা। কুরআনের সূরা আরাফের ১৫৭ আয়াতে বলা হয়েছে, রাসূল সা: তাদের (মানবজাতির) পিঠের বোঝা নামিয়ে দেবেন। অর্থাৎ নানা ধরনের রীতি রেওয়াজ ও সামাজিকতার বোঝা বাদ দিয়ে দেবেন এবং যেসব শিকল দ্বারা তারা আবদ্ধ, তা কেটে দেবেন (অর্থাৎ অতিরিক্ত আইন কানুনের বোঝা কমিয়ে দেবেন)। রাসূল সা: সুন্নাহ দ্বারা তাই নিশ্চিত করেছেন।
এরপর তিনি তিনটি বিষয় সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেনÑ ১. চরমপন্থীদের কর্তৃক সুন্নাহর বিকৃতি। ২. জাল হাদিস অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা এবং ৩. মূর্খদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা (দ্রষ্টব্য পৃ-১২-১৫)। তিনি একই সাথে সুন্নাহর প্রমাণের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা অবলম্বন করতে বলেছেন। নেক কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য হাদিস জাল করা যায়, এ মত তিনি শক্তভাবে খণ্ডন করেছেন (পৃ. ২৪-২৭)।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি আইন ও প্রচারের উৎস হিসেবে সুন্নাহর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সব আইনবিদই সুন্নাহকে আইনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথম অধ্যায়ে সুন্নাহর বিরুদ্ধে অতীত ও বর্তমানকালে যারা যুক্তি দিয়েছেন, তাদের যুক্তি খণ্ডন করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি আরো বলেন, ফিকাহর ইজতিহাদভিত্তিক যেসব বিধান রয়েছে, তার মধ্যে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিলে কেবল ইসলামের শ্রেষ্ঠ আলেমরাই তা করতে পারেন। তিনি দু’টি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি মুসলিম-অমুসলিমের রক্তপণ বা রক্তমূল্য (প্রাণের মূল্য) অসমানÑ এ মত প্রত্যাখ্যান করেন এবং তা সমানÑ এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তেমনিভাবে নারী ও পুরুষের রক্তপণ (প্রাণের মূল্য) একÑ এ মতকেই প্রাধান্য দিলেন।
তিনি বলেন, আমাদের জন্য সহিহ ও হাসান হাদিসই যথেষ্ট। জয়িফের কোনো প্রয়োজনই নেই।
তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি সহিহ হাদিস গ্রহণের নীতিমালা বা বোঝার নীতিমালা আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি মোট আটটি নীতি দিচ্ছেন। ১. কুরআনের আলোকে বোঝা। কুরআন হচ্ছে ইসলামের হৃদয় এবং ইসলামের সংবিধান। সুন্নাহ্ হচ্ছে তার ভাষ্য। তাই সুন্নাহকে কুরআনের আলোকেই বুঝতে হবে। কুরআন-পরিপন্থী কোনো ব্যাখ্যা করা যাবে না হাদিসের। যদি কোনো সহিহ হাদিসের দু’টি ব্যাখ্যা হয়, তা হলে যে ব্যাখ্যা কুরআনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সে ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হাদিস বুঝতে হলে একই বিষয়ের সব সহিহ হাদিসকে একত্রে দেখতে হবে। তা হলে হাদিসের সঠিক তাৎপর্য বোঝা সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি পায়ের গিরার নিচে চলে যায় এমন ইজারসংক্রান্ত হাদিসগুলো একত্র করে মন্তব্য করেন, এ নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা গর্বের প্রকাশ হিসেবে তা করে, অন্যদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয় (পৃষ্ঠা ১১২-১১৪)।
এ প্রসঙ্গে তিনি আল বুখারির একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘যে বাড়িতে লাঙ্গল প্রবেশ করে তা সম্মানহানির কারণ হয়।’ কিন্তু ড. কারজাবি এ-সংক্রান্ত সব সহিহ হাদিস একত্র করে দেখান, এটি কেবল প্রযোজ্য তাদের ক্ষেত্রে যারা জিহাদের সময় নিজের দায়িত্ব পালন না করে কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকে। অন্যান্য হাদিসে কৃষিকাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে (পৃ ১১৭-১২০)।
তৃতীয় নীতি হচ্ছে, সহিহ হাদিসে পার্থক্য থাকলে সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয় করতে না পারলে কোনো একটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহিলাদের কবর জিয়ারতসংক্রান্ত সব সহিহ হাদিস উল্লেখ করেছেন যার অধিকাংশ নারীদের। তেমনিভাবে কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যেমন পুরুষদের। এ হাদিসগুলো অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। তবে নিষেধাজ্ঞাসূচক হাদিসগুলোর সাথে এভাবে সমন্বয়ও করা যায় যে, মহিলারা অতিরিক্ত কবর জিয়ারত করবেন না (পৃ. ১২৩-১২৫)।
হাদিস বোঝার জন্য চতুর্থ মূলনীতি হচ্ছে, হাদিসে উল্লিখিত ঘটনাগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলি বিবেচনায় নিতে হবে। হাদিস বোঝার জন্য পঞ্চম মূলনীতি হচ্ছে, হাদিসের লক্ষ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। উপকরণে পরিবর্তন হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি রাসূল সা:-এর নির্দেশ যে, মক্কার ওজন ও মদিনার পরিমাপকে গ্রহণদর উল্লেখ করেন। সে সময় মক্কার ওজন ও মদিনার পরিমাণ সবচেয়ে স্ট্যান্ডার্ড ছিল। সুতরাং হাদিসের লক্ষ্য হচ্ছে ওজন ও পরিমাপ যেন উন্নতমানের হয়। আজকের মিটার মাপ এবং কিলোগ্রাম ওজন গ্রহণ করা ইসলামি নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে তিনি আধুনিককালে যন্ত্রের সাহায্যে চাঁদ দেখার বিষয় আলোচনা করেছেন। রাসূল সা: বলেছেন, চাঁদ দেখে রোজা রাখা এবং রোজা ভাঙা। চাঁদ দেখা না গেলে হিসাব করো। ড. কারজাবি বলেন, সে যুগে চাঁদ দেখার উন্নত যন্ত্রপাতি ছিল না। কিন্তু এখন তা আছে। সুতরাং যন্ত্রের সাহায্যে চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও রোজা ভাঙা তিনি অধিকতর সঙ্গত মনে করেন। কারণ এ হিসাব অধিক সঠিক (পৃ. ১৫২-১৬২)।
ড. কারজাবি হাদিস উপলব্ধির জন্য ৬ নম্বর নীতি উল্লেখ করেছেনÑ আলঙ্কারিক এবং আক্ষরিক অর্থের মধ্যে পার্থক্য করা। ড. কারজাবি উল্লেখ করছেন, নীল ও ফোরাত নদী জান্নাত থেকে, জান্নাত তরবারির ছায়ার নিচে, মায়ের পায়ের তলে জান্নাত এবং কালো পাথর জান্নাত থেকেÑ এসব কথাকে রূপক বা আলঙ্কারিক অর্থে গ্রহণ করতে হবে।
হাদিস বোঝার জন্য সপ্তম নীতি হচ্ছে, দৃশ্যমান পৃথিবী এবং অদৃশ্য আখিরাতসংক্রান্ত হাদিসগুলোর পার্থক্য বোঝা। আখিরাতের বর্ণনা-সংক্রান্ত হাদিসগুলো দুনিয়ার ঢ়যুংরপং বা পদার্থবিদ্যা দ্বারা বোঝা যাবে না। যদি হাদিসটি সহিহ হয়, তবে কেবল পদার্থবিদ্যার আলোকে তা অসম্ভব বলে গ্রহণ না করা অযৌক্তিক হবে। আখিরাতের নিয়মকানুন ভিন্ন হবে।
হাদিস বোঝার জন্য অষ্টম নীতিমালা হচ্ছে, কুরআন ও হাদিসে ব্যবহৃত শব্দগুলো আধুনিককালের অর্থে নয়; বরং কুরআন নাজিল কালের অর্থের আলোকে তা গ্রহণ করতে হবে। যেমনÑ আধুনিক ফটোগ্রাফিকে আগের যুগের তাসবির বলা যাবে না।
‘সুন্নাহর সান্নিধ্যে’ বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বইটি পড়লে সুন্নাহ বা হাদিস সম্পর্কে আমরা গভীর বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে সক্ষম হবো।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

কূটনীতিকদের টেবিলে এখন তারানকোর ফর্মুলা

এই মুহূর্তে বিদেশী কূটনীতিকদের আলোচনার টেবিলে স্থান পেয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেস তারানকোর ফর্মুলা। গত বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে দুই দলকে সমঝোতায় পৌঁছতে এই ফর্মুলা দিয়েছিলেন তারানকো। এতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা খর্ব করে তার নেতৃত্বে অথবা রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব ছিল। তবে কূটনীতিকদের টেবিলে তারানকোর ফর্মুলা স্থান পেলেও এ মুহূর্তে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা তাদের প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানা গেছে। সেই লক্ষ্যেই তারা দু’পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সম্প্রতি এই বিশ্ব সংস্থার সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেস তারানকোকে দুই দলের নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁর দায়িত্ব দিয়েছেন। বর্তমান সংকট সমাধানে তারানকো বাংলাদেশে আসতে চাইলেও এখনও পর্যন্ত মেলেনি সরকারের সবুজ সংকেত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ১৫ দেশের রাষ্ট্রদূতরা। ইতিমধ্যেই কূটনীতিকদের এই গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল পৃথকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই সঙ্গে বিদেশী কূটনীতিকরা সমাধান সূত্র খুঁজে পেতে সুশীল সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তাদের পরামর্শও গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছেন কূটনীতিকরা।
কূটনীতিকদের তৎপরতার পাশাপাশি চলমান সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন দেশের সুশীল সমাজও। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ পৃথক একটি রূপরেখা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।
সূত্র মতে, কূটনীতিকরা তাদের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবেন। প্রাথমিকভাবে তারা আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সহিংসতা বন্ধ করা, হরতাল ও অবরোধ স্থগিত করা, নাশকতায় জড়িতদের বিচার এবং জামায়াতকে আলোচনা থেকে দূরে রাখা। অপরদিকে বিএনপির দেয়া শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সংকট নিরসনে সংলাপে বসতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া, দলের চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তি ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয় খুলে দেয়াসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অবাধে পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করা। সরকার আন্তরিকভাবে এসব শর্ত পূরণে উদ্যোগ নিলে চলমান আন্দোলন স্থগিত বা শিথিল করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। সংঘাত বন্ধ হলে দুই দলের মধ্যে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির পর নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা আলোচনায় আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তারানকোর সফরকালে নির্বাচনকালীন সরকারে সংবিধানের আওতায় সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সব পক্ষই একমত হয়েছিল। তবে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করার প্রস্তাবে আপত্তি করেছিল আওয়ামী লীগ। ফলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা এবারও এ ফর্মুলা কার্যকর হবে না। কূটনীতিকরা স্পষ্ট মনে করেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা বারবার যাতে ফিরে না আসে সেজন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রবর্তন করা জরুরি। এমন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হলে নির্বাচনের ফল দু’পক্ষই মেনে নেবে বলে কূটনীতিকদের ধারণা।
সূত্র মতে, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তারানকোর মধ্যস্থতায় আলোচনায় রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবও আলোচনায় ছিল। সেই আলোচনা এবারও ফিরে আসতে পারে এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন। তবে গোটা পরিস্থিতিতে অর্থনীতি সচল রাখা, বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রেখে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষ্যে সংকট নিরসন করতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা পর্দার আড়ালে কাজ করছেন। ১৬ কূটনীতিক ও সুশীল সমাজের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মদ আরাফাত সমন্বয় করছেন বলে জানা গেছে। বিএনপির পক্ষে যোগাযোগ করছেন সাবেক মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক, সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে কোনো একটা সমাধানের কাছাকাছি গেলে এবং পরবর্তীকালে সরকারের সম্মতি পেলে জাতিসংঘ থেকে অস্কার ফার্নান্দেস তারানকো বাংলাদেশে আসতে পারেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান জটিল পরিস্থিতি রাতারাতি সমাধানের কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে কূটনীতিকরা অনেক বেশি দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজ করতে চান। আপাতত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে জ্বালাময়ী বক্তব্য পরিহার করার জন্য কূটনীতিকরা সরকার ও বিএনপিকে পরামর্শ দিয়েছেন।
কূটনীতিকদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সবাই চাচ্ছেন বর্তমান সংকটের সমাধান হোক। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় হলেও তো কোনো সমস্যা নেই। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিশ্বের ১৬ কূটনীতিক সম্পৃক্ত রয়েছেন। তারা যদি আরও চাপ দেন, তবে প্রভাব পড়তে বাধ্য। এর সঙ্গে জাতিসংঘও সংকট নিরসনে নানামুখী চাপ অব্যাহত রেখেছে। তবে কূটনীতিকদের উদ্যোগেই সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাব বা তারা সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন, এমনটা ভাবা ভুল। তবে শ্বাসরুদ্ধকর যে অবস্থা ছিল কূটনীতিকদের তৎপরতায় কেউ কেউ আশার আলো দেখছে।
কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে দলের চেয়ারপারসন কোনো শর্ত দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান বলেন, বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে তা বলা সম্ভব হবে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, চলমান সংকট নিরসনে চেয়ারপারসন সংলাপের ওপরই গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ আমাদের দাবি হচ্ছে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়া। আলোচনায় বসলেই নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। এর আগে সরকারকে বলতে হবে তারা নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আলোচনায় বসতে চান।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ যুগান্তরকে বলেন, এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা। আর কোনো সন্ত্রাসীর সঙ্গে সরকার আলোচনা করতে রাজি নয়। ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন নিয়ে সরকার ভাবছে না বলে জানান তিনি। রাষ্ট্রপতির অধীনে জাতীয় সরকারের ধারণাকে নাকচ করে দেন তিনি।
রূপরেখা দেবে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ : দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসানোর তাগিদ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধানে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন ১৩ সদস্যবিশিষ্ট উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের সদস্যরা এ নিয়ে দফায় দফায় নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন। আলোচনা করে সংকটের স্থায়ী সমাধানে একটি রূপরেখা প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছেন। শিগগিরই তারা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই রূপরেখা দেশবাসীকে অবহিত করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
সংকট নিরসনে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের পক্ষে ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করার কথা ছিল। রাজনীতির বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিসহ দেশের বিশিষ্টজনরা এতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়েছিল উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। কিন্তু নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমদুদুর রহমান মান্নার দুটি অডিও টেপ প্রকাশিত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হওয়ায় বদলে যায় দৃশ্যপট। ওই ঘটনার পর কিছুটা ‘ধীরে চলো নীতি’ অবলম্বন করেন তারা।
উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের একাধিক সদস্য যুগান্তরকে জানিয়েছেন, তাদের উদ্যোগ থেমে নেই। চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার উপায় নিয়ে তারা নিজেরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সব মহলের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার জন্য যোগাযোগও করেছেন। প্রয়োজনে দুই শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গেও দেখা করার চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া না গেলে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ব্যানারে সংকটের স্থায়ী সমাধানে একটি রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, সংসদ কার্যকর ও সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিচারপতি নিয়োগে নীতিমালা প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং এই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করতে জনবল নিয়োগের ক্ষমতা ও আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও শক্তিশালী করাসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হবে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের রূপরেখায়।
এছাড়া সংকট নিরসনে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন ও সব ধরনের কালাকানুন বাতিল, কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড চলতে দেয়া, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাসহ বেশকিছু প্রস্তাব থাকবে তাদের।
এ প্রসঙ্গে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক শনিবার যুগান্তরকে বলেন, তাদের উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে দুটি। একটি- চলমান সংকট নিরসনে সংঘাতের পথ পরিহার করে অবিলম্বে সংলাপে বসা। সমঝোতায় আসা। বাস্তবতা হচ্ছে এক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তিনি আরও বলেন, তাদের উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান। সংলাপে না বসলে সংকটের সমাধান হবে না। তাই সংলাপ হতে হবে। আবার এটাও ঠিক, সংলাপে বসলে হয়তো আপাতদৃষ্টিতে সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হবে না।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান করতে না পারলে পাঁচ বছর পরপর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। এজন্য প্রয়োজন সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ এই কাজটিই করছে। তিনি জানান, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের মধ্যে আরও আলাপ-আলোচনা করে শিগগিরই তারা এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করবেন।
জানতে চাইলে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের সদস্য ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, তারা বর্তমান অচলাবস্থার অবসানে দুই প্রধান দলকে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। এই তাগিদ দেয়ার বিষয়টি অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি শুধু সংলাপে বসলেই হবে না- এমন বিবেচনায় সমস্যা সমাধানের স্থায়ী উপায় খুঁজে বের করার জন্য তারা কাজ করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বসে নেই। মানুষ সমাধান চায়। আমরাও সমাধানের কথা বলছি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। সমাধানের পথ বের হবেই।’
গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশের চলমান সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় সংলাপ আয়োজনে উদ্যোগ নিতে নাগরিক সমাজের পক্ষে লিখিত অনুরোধ জানান সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা। একই অনুরোধ তিনি প্রধানমন্ত্রীকেও জানান। পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে এ উদ্যোগে সহায়তা করতেও চিঠি দেন সাবেক এই সিইসি। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট তার এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও আপত্তি জানায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের শরিক ১৪ দল। এ অবস্থায় ১৩ ফেব্র“য়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেন ড. এটিএম শামসুল হুদা।
সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন লোকজন বাদ দিয়ে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে তিনি তার অবস্থান তুলে ধরেন। ওইদিনই তাকে আহ্বায়ক করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার কথাও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন- সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, এএসএম শাহজাহান, ড. আকবর আলি খান, সিএম শফি সামী, রাশেদা কে চৌধূরী, রোকেয়া আফজাল রহমান, শিক্ষাবিদ ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, লেখক-কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ব্যবসায়ী নেতা আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ এবং অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর এবং সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

আইন শৃংখলা বাহিনী দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারলে এরশাদ এখনও প্রেসিডেন্ট থাকতেন : কাদের সিদ্দিকী

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের জোরে সরকার ইয়াহিয়ার ভাষায় কথা বলছেন। আইন শৃংখলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে যদি ক্ষমতায় থাকা যেত তাহলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখনও প্রেসিডেন্ট থাকতেন।
দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে মতিঝিলের ফুটপাতে অবস্থান কর্মসূচির ৪১তম দিনে সংহতি প্রকাশ করতে আসা ব্যক্তিদের সাথে আলাপকালে আজ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী একথা বলেন। অবরোধ প্রত্যাহার ও আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের দাবিতে গত ২৮ জানুয়ারি থেকে মতিঝিলের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ফুটপাথে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তিনি। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে অবরোধ চলছে, মানুষের কামাই-রুজি নেই। পেট্রলবোমার আতঙ্কে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। এমন দেশ দেখার জন্য একাত্তরে যুদ্ধ করিনি।
অবস্থান কর্মসূচির ৪১ তম দিনে আজ দলের যুগ্ম-সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, কেন্দ্রীয় নেতা ফরিদ আহমেদ, যুবনেতা হাবিবুননবী সোহেল, মিঠুন সিদ্দিকী, ছাত্রনেতা রিফাতুল ইসলাম দীপ, কাওসার জামান খান, সাইফুল ইসলাম শিমুলসহ শতাধিক নেতাকর্মী বঙ্গবীরের সাথে অবস্থান করছেন।
এদিকে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সব খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। তিনি বলেন ক্রিকেটে যেমন পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, তেমনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ।

প্রধানমন্ত্রী আমার চেয়েও বড় স্বৈরাচার : এরশাদ

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের দুই মেয়র  প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে
এরশাদ বলেন, ‘এখনকার প্রধানমন্ত্রী আমার চেয়েও বড় স্বৈরাচার
ঢাকার আসন্ন দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। দক্ষিণে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন এবং উত্তরে দলের যুগ্ম মহাসচিব বাহাউদ্দিন আহম্মেদ বাবুলকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে। রোববার বনানী কার্যালয়ে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দলের মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের যৌথ সভা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। পার্টির মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু সভায় সভাপতিত্ব করেন। দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে এরশাদ বলেন, ‘এখনকার প্রধানমন্ত্রী আমার চেয়েও বড় স্বৈরাচার। আমি গুলি করে মানুষ মারি নাই, মানুষ হত্যা করি নাই। এখন প্রতিদিন নূর হোসেন, বিশ্বজিৎ মরছে। কিন্তু আমাদের চোখে পানি আসে না। গণতন্ত্র এখন কবরে, নির্বাসনে। আজ থেকে আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের শপথ নিলাম। আজ থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যাত্রা শুরু হল।’ তিনি বলেন, মানুষ মেরে ক্ষমতায় যাওয়া যায় না, আবার ক্ষমতায় থাকাও যায় না। এই দুই দলের প্রতি মানুষের আস্থার লেশমাত্র নেই। সুযোগ এসেছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের। এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
সাবেক এই রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন হরতাল, অবরোধ। আজ হরতালে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাব কিনা চিন্তায় আছি। ঢাকায় যানজটে আপনারা খুশি। কিন্তু বাইরের অবস্থা কী? ঢাকা এখন বিচ্ছিন্ন। এরশাদ বলেন, ঢাকার বাইরের কৃষক না খেয়ে আছে। রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ঢাকায় কোথায় যানজট? আমরা পুরো দেশকে রাজনীতির যানজটমুক্ত করতে চাই। এবার সেই সুযোগ এসেছে। তিনি বলেন, এবার আল্লাহ আমাদের একটা সুযোগ দিয়েছেন। এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এখন বার্ন ইউনিটে যাওয়ার নামে নাটক হচ্ছে দাবি করে এরশাদ বলেন, আমি নাটক করার জন্য বার্ন ইউনিটে যাই না। আমি রংপুরে বার্ন ইউনিটে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, সঙ্গে কোনো ক্যামেরা থাকবে না। এই রাজনীতি আমরা চাই না। এই গণতন্ত্র আমরা চাই না। সত্যিকারের গণতন্ত্র চাই।
এরশাদ বলেন, ক্ষমতা ছাড়া আমাদের দেশে এখন আর গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রের কবর রচনা হয়েছে। আমরা আর বিরোধী দলে থাকতে চাই না। এবার আমরা ক্ষমতায় যাব। আমরা এখন তালগাছ চাই। গণতন্ত্র চাই না। জনগণের ভোটে এবার তালগাছ আমরা নেব।
দুই মেয়র প্রার্থী ছাড়াও এ সময় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফয়সল চিশতী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, সুনীল শুভরায়, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব নুরুল ইসলাম নুরু, কেন্দ্রীয় নেতা জহিরুল আলম রুবেল, সুলতান মাহমুদ, বেলাল হোসেন, মনিরুল ইসলাম মিলন, হাসান আহম্মেদ জুয়েল, সোলায়মান সামি, ছাত্র সমাজের সভাপতি ইফতেখার আহসান হাসান, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিরু প্রমুখ নেতা উপস্থিত ছিলেন।

দ্যাশ তো যায় যায় অবস্থা -এক রিকশাচালকের রাষ্ট্র চিন্তা

‘দেশের সুন্দরের জন্য দুই নেত্রীরে সমঝোতার মইধ্যে যাইতে হইবো। একটা সংলাপের মধ্যে গ্যালে হয় না ? সংলাপের মধ্যে গ্যালেই মনে করেন সবকিছু শ্যাষ। এইসব কথা বলাও ঠিক না ভাই। ঢাহা শহরে থাহি বোঝেন না? আমারে কইলাম গুলি কইরা মাইর‌্যা ফালাইবো। এই যে এইট্যা কইতাছি যদি পত্রিকায় দ্যান তো কি হইবো আমার! এসব কথা জানতে পারলে আমারে ধইর‌্যা ফালাইবো, রিমান্ডে নিবো। আমারে ছুটানোর কেউ নাই।’ এ বক্তব্য মো. দুলাল মিঞার। থাকেন মগবাজার এলাকায়। পেশায় রিকশাচালক। জীবিকার সন্ধানে মাত্র ১২ বছর বয়সে ঢাকায় আসেন তিনি। এরপর কেটে গেছে ২২ বছর। নানা পেশা ঘুরে থিতু হয়েছেন রিকশা চালনায়। বাংলাদেশের সব মানুষই হয়তো রাজনীতি নিয়ে ভাবেন। দুলাল মিঞাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট ছুঁয়ে গেছে তার জীবনেও। কমে গেছে আয়। এ রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করেন তিনি। ভাবেন সমাধানের পথ নিয়েও।
দুলাল মিঞার সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন, আমাদের স্টাফ রিপোর্টার রোকনুজ্জামান পিয়াস দুলালের পৈতৃক বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মোমারেজপুর গ্রামে। পিতা দেলোয়ার হোসেনের বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এলাকার নারকেল গাছ পরিষ্কার করে দুই ছেলে নিয়ে চলতো তার সংসার। দুলাল তার ছোট ছেলে। ১৯৯২ সালে দুলালের বয়স যখন ১১-১২ বছর তখন তিনি মারা যান। মা মারা যান আরও আগে, তার বয়স যখন ৩ বছর। ঠিক মনেও করতে পারেন না তিনি। পিতা মারা যাওয়ার বছরই তার বড় ভাই আলাউদ্দিন তাকে ঢাকায় নিয়ে এসে একটি লন্ড্রিতে চাকরি দেন। ওই সময় তার কোন বেতন ছিল না। পেটে-ভাতে কাজ করতেন প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে। এরপর দীর্ঘ চার বছর কাজ করার পর ১৯৯৬ সালে তার বেতন ধরা হয় মাসিক ৮ হাজার টাকা। ওই বছরই বিয়ে করেন খালাতো বোনকে। সস্ত্রীক বস্তিতে একটি কক্ষ ভাড়া করে থাকতেন। এভাবেই কাটছিলো দিন। ২০০৬ সালে তার বেতন বেড়ে ৯ হাজার টাকা হয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার (তারমতে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকার) এসে বস্তি সংলগ্ল কারখানাটি ভেঙে ফেলে। তখন তিনি ভাড়ায় চালানো শুরু করেন। পরিবার-পরিজন গ্রামে পাঠিয়ে দেন। এখন দুলালের দুই ছেলে। বড় ছেলেটির বয়স ১২ বছর। আর ছোট ছেলেটির ৭-৮ বছর। দুলাল বলেন, বড় ছেলেটি ক্লাস সিক্স কি সেভেনে পড়ে। আর ছোটটি পড়ে কেজি ওয়ানে। তাদের পড়াশোনা বাবদ প্রতিমাসে দিতে হয় ১৬০০ টাকা। গ্রামে ভিটেমাটির ওপর টিনের ঘর বানাতে দুটি এনজিও থেকে কিছু ঋণ নিয়েছিলেন, সেখানে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয় ১১৫০ টাকা। লেখাপড়া, কিস্তি, আনুষঙ্গিক সাংসারিক খরচসহ প্রতিমাসে কমপক্ষে বাড়ি পাঠাতে হয় ১২ হাজার টাকা। আর ঢাকাতে প্রতিদিন মেসভাড়া, খাবার বিল এবং রিকশা ভাড়া দিতে হয় সর্বমোট ৪০০ টাকা। তাছাড়া, হাত খরচতো আছেই। দুলাল জানান, ‘আগে খুব ভালোভাবেই তিনি এসব খরচ মেটাতে পারতেন। কিন্তু গত দুই মাস ধরে তার দিন কাটছে অতিকষ্টে। তিনি বলেন, এলাকার বাইরে কখনও ক্ষ্যাপ মারিনি। কিন্তু এখন আর এলাকায় ভাড়া নেই। এলাকায় ৮টি স্কুল-কলেজ আছে জানিয়ে বলেন, এখন ওগুলো বন্ধ, তাই ভাড়াভুতো হয় না। জানুয়ারি মাসের শেষে বাড়িতন (বাড়িতে) টাকা পাঠাইছি ৩ হাজার ৯শ’ ৪০ টাকা। দু’নো (দুই) কিস্তি বাকি পড়ছে। এলাকার দোকানে বলা আছে, বাকিতো চলছে। তিনি বলেন, ডেইলি মেসভাড়া, রিকশা ভাড়া দেওন লাগে। খাবার টাকা বাকি পড়লে খালার কথা শুনতে হয়। তাই মাঝে মাঝে দুপুরেত না খেয়ে থাকন লাগে। কিন্তু রাতে না খাইলে তো চলে না। বেশি ক্ষ্যাপ পাওন যায় না। খরচের টাকার পর কিছু থাকে না। তবে আশাবাদী দুলাল বলেন, অবস্থা ভালো হলে ঠিক হয়ে যাবে। কেমন ভালো এ কথার জবাবে সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন এ মানুষটি বলেন, দ্যাশ তো যায় যায় অবস্থা। হরতাল-আন্দোলনের কারণে ইনকাম নাই। স্কুল-কলেজ বন্ধ ইনকাম হইবো ক্যামনে। এলাকায় ৮টি স্কুল আছে ওগুলোত ক্ষ্যাপ মারলেই অনেক ইনকাম হতো। দেশের পরিস্থিতির কারণেই আমার ইনকামের এ অবস্থা। কেন এ পরিস্থিতি এর জবাবে বলেন, সরকারের কারণে হইবো নয়তো বা ধরেন বিরোধী দলের কারণে হইবো। ’৯৬ সালের কথা উল্লেখ করে দুলাল বলেন, তহনও এই অবস্থা হইছে তবে এতো না।’

রিমান্ডের রেকর্ড- উপেক্ষিত হাইকোর্টের নির্দেশনা by কাজী সুমন

৩০শে জানুয়ারি রাতে গুলশানের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে। ১লা ফেব্রুয়ারি তাকে হাজির করা হয় আদালতে। বাড্ডা থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এরপর একে একে বিভিন্ন মামলায় এখন পর্যন্ত ২৭ দিন রিমান্ড ভোগ করেছেন তিনি। রিজভী আহমেদ একা নন। গত দু’মাসে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বেশির ভাগকেই রিমান্ডে যেতে হচ্ছে। রিমান্ডের ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে নানা রেকর্ড। বাংলাদেশে রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ অবশ্য পুরনো। এ নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনাও রয়েছে। তবে এ নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে প্রতিদিনই। মানছেন না কেউই। যদিও মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে বহুলাংশেই অনুসরণ করা হয় ওই নির্দেশনা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ড. শাহদীন মালিক এ ব্যাপারে বলেন, ‘বাংলাদেশে সব জায়গায় নাগরিক অধিকার সঙ্কুচিত হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে অভিযুক্তদের কোন সাংবিধানিক বা আইনগত অধিকার নেই বললেই চলে। মন্টেস্কু ক্ষমতার পৃথকীকরণের কথা বলেছিলেন যেন অভিযুক্ত তার অধিকার পায়। কোন দেশে যদি অভিযুক্ত তার অধিকার না পায় তবে সে দেশে গণতন্ত্র আছে- তা বলা যাবে না।’ ড. মালিক বলেন, ‘রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের বিচারকরা হাইকোর্টের নির্দেশনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করছেন না। নিয়তির পরিহাস এই যে, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা হাইকোর্টের নির্দেশনার সুফল ভোগ করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক কর্মীরা সে সুযোগ পাচ্ছেন না।’
রিমান্ডের পর রিমান্ড:  গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে আটক করা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। একদিন পরে তাকে হাজির করা হয় আদালতে। এসময়  সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহে উস্কানির চেষ্টা ও প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তার বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আদালত ১০ দিনের রিমান্ডই মঞ্জুর করে।  ওই ১০ দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর গত ৭ই মার্চ ফের আদালতে হাজির করা হয় সাবেক এই আওয়ামী লীগ নেতাকে। ওই দিন রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দায়েরকৃত একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আদালত ১০ দিনের রিমান্ডই মঞ্জুর করে। গত ৬ই জানুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। পরদিন পল্টন থানার একটি গাড়ি পোড়ানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। তবে শুনানি শেষে বিচারক রিমান্ড এবং জামিনের দুটি আবেদনই নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে অবশ্য চারদফায় ১২ দিন রিমান্ড ভোগ করেন মির্জা আলমগীর। পল্টন থানায় গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে দায়েরকৃত একটি মামলায় ৩ দিন, রাজধানীর মতিঝিল থানায় করা একটি মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এরপর আরও দু’দফায় ২ দিন করে ৪ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পর নানা রাজনৈতিক তিক্ততার মধ্যেও গণতান্ত্রিক শাসনের সময় সাধারণত প্রধান বিরোধী দলের মহাসচিবকে কখনওই গ্রেপ্তার করা হয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষেত্রেই প্রথম সে রীতি ভঙ্গ করা হয়। এখন তাকে রিমান্ডেও যেতে হচ্ছে।  গত ৮ই জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা শমসের মবিন চৌধুরী বীরবিক্রমকে। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করে রাজধানীর বংশাল থানায় নাশকতার অভিযোগে দায়েরকৃত একটি মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ১লা ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে আটক করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন (এ্যাটকো)-এর সভাপতি মোসাদ্দেক আলী ফালুকে। এরপর রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় তিন দফায় তাকে ১৩ দিন রিমান্ডে নেয়া হয়। ২রা ফেব্রুয়ারি খিলগাঁও থানায় দায়ের করা গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় ৫ দিন, ৭ই ফেব্রুয়ারি বিস্ফোরক আইনে বাড্ডা থানায় দায়ের করা মামলায় ৩ দিন ও ১১ই ফেব্রুয়ারি অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণ মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গত ১১ই জানুয়ারি রাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুুদুকে। এরপর কয়েকদফা অন্তত দুই সপ্তাহ রিমান্ড ভোগ করেন সাবেক এই ছাত্রনেতা। ১২ই জানুয়ারি মিরপুর থানার একটি মামলায় ৫ দিন, ২৮শে জানুয়ারি একই থানার আরেকটি মামলায় ২ দিন এবং মিরপুর থানায় দায়েরকৃত আরেকটি মামলায় তার ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। ১২ই জানুয়ারি গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়  বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহানকে। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করে অগ্নিসংযোগ ও গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ১৮ই জানুয়ারি গুলশানের একটি বাসা থেকে বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ও রাজশাহী জেলা সভাপতি নাদিম মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। শুনানি শেষে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিনা সুলতানা নিশিতাকে আটক করে পুলিশ। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করে শাহজাদপুর এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এদিকে রাজনীতিবিদ ছাড়াও গণমাধ্যম ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। গত ৫ই জানুয়ারি রাতে গ্রেপ্তার করা হয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইটিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে। এরপর তাকে আদালতে হাজির করে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। গত ৩রা মার্চ গ্রেপ্তার করা হয় একুশে টেলিভিশনের সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার কনক সারওয়ারকে। তিনি একুশে টেলিভিশনের প্রচারিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘জনতার মঞ্চ’-এর উপস্থাপক ছিলেন। শুধু গ্রেপ্তার করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, পরদিন পর্নোগ্রাফির একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৫ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয় তাকে। ২১শে ফেব্রুয়ারি  মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একটি পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এসএসসি পরীক্ষার্থী  ও ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির রফিকুল ইসলাম খানের ছেলে রিফাত আবদুল্লাহ খান। এরপর তাকে আদালতে হাজির করে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ওই  রিমান্ড শেষে ফের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত আবারও ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
উপেক্ষিত হাইকোর্টের নির্দেশনা: সন্দেহজনক গ্রেপ্তার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা এবং রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারার অপব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)সহ আরও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ২০০৩ সালের ২৭শে এপ্রিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ দুটি বিষয়ে প্রচলিত আইন সংশোধনের নির্দেশ দেয়। আইন সংশোধনের পূর্বে হাইকোর্টে কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলারও নির্দেশ দেয়। যে নির্দেশনা আপিলও বিভাগও স্থগিত করেনি।  হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়, ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে না। খ. কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ. গ্রেপ্তারের কারণ একটি পৃথক নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে। ঘ. গ্রেপ্তারকৃতদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার কারণ লিখে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে ডাক্তারি সনদ আনবে পুলিশ। ঙ. গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের এর কারণ জানাতে হবে। চ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেপ্তারকৃতদের নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। ছ. গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। জ. গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাঁচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। ঝ. কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিনদিন পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে। ঞ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দ বিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে। ঠ. পুলিশ হেফাজতে বা কারাগারে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে। ড. পুলিশ বা কারা হেফাজতে কেউ মারা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে তা তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্তে বা তদন্তে যদি মনে হয় ওই ব্যক্তি কারা বা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছে তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তা তদন্তের নির্দেশ দিবেন।

সংলাপ নয় প্রশাসনেই ভরসা আওয়ামী লীগের by লুৎফর রহমান

চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপরই ভরসা করছে আওয়ামী লীগ। বিরোধী জোটের ডাকা টানা অবরোধ ও হরতালসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে অন্য কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি এ পর্যন্ত। এমনকি পরিস্থিতিকে নিছক আইনশৃঙ্খলা সমস্যা বলে আসছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে হরতাল-অবরোধে ক্ষতির খতিয়ান দেয়া হলেও এটি রাজনৈতিক সমস্যা বলে স্বীকার করা হয়নি। বিরোধী জোটের আন্দোলনকে সন্ত্রাসী নাশকতামূলক কাজ আখ্যা দিয়ে তা দমনে সরকার ও প্রশাসনের উদ্যোগের ওপরই জোর দিয়ে আসছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অন্যান্য দল এবং আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে সঙ্কট সমাধানে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের তাগিদ দেয়া হলেও এ পর্যন্ত সংলাপ বা আলোচনার পক্ষে সরকারের দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং সংলাপের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাবই দেখানো হচ্ছে সরকারি দলের তরফে। বিরোধী জোটের অবরোধ শুরুর পর বলা হয়েছিল এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার। তবে অবরোধের দুই মাস পার হলেও এখনও সরকারই রাতে যাত্রীবাহী যান চলাচল বন্ধ রেখেছে নির্দেশনা দিয়ে। স্বাভাবিকের অর্ধেক যানবাহনও চলাচল করছে না মহাসড়কে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে দিন দিন। কাজ না থাকায় শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এমন অবস্থায় সমালোচনা আসছে খোদ সরকার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে। গত দুই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনায় কড়া সমালোচনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বর্তমান উদ্যোগ কতটা ফল আনবে এবং আর কতদিন এমন অবস্থা চলবে এ প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে। চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এখন পর্যন্ত বিরোধী জোটের সঙ্গে আলাপ বা সংলাপের কোন আলোচনা হয়নি দলীয় ফোরামে। এ নিয়ে কোন চিন্তাও করা হচ্ছে না। নেতারা বলছেন, টানা অবরোধ-হরতাল মানুষ বেশিদিন মেনে নেবে না। ইতিমধ্যে তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। মানুষ ভয় ভেঙ্গে রাস্তায় নামছে। যানবাহন চলাচল বেড়েছে। কর্মসূচির নামে মানুষকে যানবাহনে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে এখন সাধারণ মানুষ সোচ্চার হচ্ছে। এভাবে হরতাল-অবরোধ চললে মানুষ একসময় তা পরোয়া করবে না। সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এমন কোন প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট মিলছে না নেতাদের কাছ থেকে। রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে শনিবার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের সমাবেশের আগে অনেকে আশা করেছিলেন ওই সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য থেকে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের কোন ইঙ্গিত আসতে পারে। তবে তেমন কিছু মেলেনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। বরং বিরোধী পক্ষের প্রতি আক্রমণই ছিল তার বক্তব্যজুড়ে। একই দিনে দলের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, সারা দুনিয়াতে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে তাদের সঙ্গে কারও সংলাপ হয় না। দেশে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে তাদের সঙ্গে কোন সংলাপ হবে না। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন হবে না। বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব- উল-আলম হানিফ সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিএনপির মতো একটি বড় দলের অনেক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। তারা বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাই এসব  নিয়ন্ত্রণ করতে আরও সময় লাগবে।
দুই রাজনৈকি জোটের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে কূটনীতিকরা সরব থাকলেও তাদের উদ্যোগের বিষয়ে ইতিবাচক কোন মনোভাব দেখাচ্ছে না সরকার। সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিবের দেয়া চিঠি, সর্বশেষ ১৬ জন কূটনীতিকের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া চিঠির বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি সরকারি দলের। তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির যে জবাব দেয়া হয়েছে তাতে সংলাপের বিষয়ে অনেকটা নেতিবাচক মনোভাবই দেখানো হয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে। এ ছাড়া ১৬ কূটনীতিকের চিঠির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। তবে দলীয় সূত্র জানিয়েছে, কূটনীতিকদের কাছে সরকারের অবস্থান ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপরও তাদের কোন বক্তব্য বা আলোচনার বিষয় থাকলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে এ বিষয়ে তাদের ব্রিফিং করবে।
‘উদ্বিগ্ন’ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নেয়া সংলাপ উদ্যোগের বিষয়ে সরকারের নেতিবাচক মনোভাব দেখানোয় ইতিমধ্যে এ উদ্যোগে শ্লথ গতি দেখা যাচ্ছে। যদিও সংলাপের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংলাপ ও সমঝোতার উদ্যোগ অহ্বান করে যে চিঠি দেয়া হয়েছিল তারও জবাব মেলেনি এখন পর্যন্ত। উল্টো এ উদ্যোগ নেয়ার পর থেকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কটু বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া ত্বরিত কোন উদ্যোগের বিষয়ে ভাবছেন না নাগরিক সমাজ। তবে দুই রাজনৈতিক জোট শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় আসতে বাধ্য হবে এমনটি ধরে নিয়ে উদ্যোগ অব্যাহত রাখার পক্ষে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
এদিকে গত জানুয়ারি থেকে চলমান বিরোধী জোটের আন্দোলনের বিপরীতে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের পক্ষ থেকে তেমন কোন রাজনৈতিক তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি। রাজধানীতে আওয়ামী লীগ সহযোগী সংগঠনের হরতাল এবং অবরোধী বিরোধী কর্মসূচি পালিত হলেও সারা দেশে অনেকটাই নিষ্প্রাণ দলীয় কর্মকাণ্ড। অনেক এলাকায় দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা নিয়মিত যাচ্ছেন না। এছাড়া হরতাল-অবরোধ শুরুর পরই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল সারা দেশে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের। কিন্তু এ পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি জেলায় নামমাত্র কমিটি গঠন করা হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অধিকাংশ জেলা এবং উপজেলায় এ ধরনের কোন কমিটি হয়নি। এমনকি কমিটি গঠনের উদ্যোগও নেই। এমন অবস্থায় আজ ১২টি জেলায় পালন করা হবে সন্ত্রাস ও সহিংসতা বিরোধী পদযাত্রা কর্মসূচি।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় অবস্থান জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে তাহলে সংবিধান ও আইনের মাধ্যমেই তার বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেক্ষেত্রে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে প্রচলিত আইনেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপির আন্দোলন যদি যৌক্তিক ও জনসম্পৃক্ত হতো তাহলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু হরতাল-অবরোধের নামে গত দু’মাস ধরে যা হচ্ছে তা কোন আন্দোলন নয়। এর সঙ্গে জনগণের কোন সম্পৃক্ততা নেই।  তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার সর্বতোভাবে চেষ্টা করছে। সরকারের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন সরকার তাই করবে। এটি সরকারের দায়িত্ব।

জয় দেখছে বাংলাদেশ, বিশ্বকাপে প্রথম মাহমুদউল্লাহ

বিশ্বকাপে দেশের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি পেলেন মাহমুদউল্লাহ, ছবি: শামসুল হক
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়েরই সেঞ্চুরি নেই। ব্যাপারটা বড় ধরনের এক আক্ষেপ হয়েই ছিল এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে। সেই আক্ষেপ আজ ঘুচিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। ক্রিকেটের বিশ্ব আসরে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি পেয়ে গেলেন তিন অঙ্কের স্বাদ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাডিলেডে ১৩৮ বলে ১০৩ রানের ইনিংসটি খেলে মাহমুদউল্লাহ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করলেন নিজের নাম। নিজেদের পঞ্চম বিশ্বকাপ আর ৩০তম বিশ্বকাপ ম্যাচে এসে বাংলাদেশ পেল সেঞ্চুরির আনন্দ। অস্বস্তিকর বিষয় হয়ে ওঠা ব্যাপারটিরও অবসান হলো। মাহমুদউল্লাহ সেঞ্চুরি না পাওয়ার আক্ষেপ দূর করে জানিয়ে দিলেন—আমরাও পারি। ১১৪টি ওয়ানডে খেলা মাহমুদউল্লাহর এটি প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। টেস্টে সেঞ্চুরি থাকলেও ৫০ ওভারের ফরম্যাটে তিন অঙ্ক ছুঁতে পারছিলেন না। আজ সেটাই করে দেখালেন। আর করলেন কোথায়! বিশ্বকাপের মঞ্চে! প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে। তবে স্টুয়ার্ট ব্রডের বলটি আলতো করে ঠেলে দিয়ে দৌড়ে যখন প্রান্ত বদল করেন মাহমুদউল্লাহ এবং মুশফিক, উচ্ছ্বাসটা যেন মুশফিকেরই বেশি ছিল। ম্যাচ শেষেও মাহমুদউল্লাহর কণ্ঠে একটু হতাশা। তবে আনন্দটাও মিইয়ে যায়নি অবশ্য। বলেন, ‘অবশ্যই খুব ভালো লাগছে। দলের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথম সেঞ্চুরি অবশ্যই বিশেষ কিছু। তবে স্কোরকার্ডে আর ১৫-২০ রান যোগ করতে পারলে আরও বেশি খুশি হতাম।’ সেঞ্চুরিটা তিনি উৎসর্গ করেছেন স্ত্রী-পুত্রকে। এক ম্যাচ আগেই সেঞ্চুরির খুব কাছাকাছি গিয়েও ফিরে এসেছেন তামিম ইকবাল। ৯৫ রান করে সাজঘরে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। বিশ্বকাপে তামিম ছাড়া কাছাকাছি গিয়েও সেঞ্চুরি বঞ্চিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুলও। ২০০৭ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৮৭ করেছিলেন তিনি।
জয় দেখছে বাংলাদেশ
শুরুটা ছিল ঘোর অমানিশার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইতিহাস সৃষ্টির ম্যাচের শুরুটা এর চেয়ে আর খারাপ আর হতে পারত না। জেমস অ্যান্ডারসনের প্রথম দুই ওভারেই পরপর উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার—তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস। স্কোরবোর্ডে মাত্র ৮ রান উঠতেই দুই ওপেনারকে হারানোর ধাক্কা সামলানো তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। সেই ধাক্কা সামলে মাহমুদউল্লাহ তৈরি করলেন নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে ৩০তম ম্যাচে দেশকে উপহার দিলেন সেঞ্চুরির গৌরব। মুশফিকুর রহিম খেললেন ৮৯ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। সঙ্গে সৌম্য সরকারের ৪০। এই তিন ব্যাটসম্যানের মিলিত প্রয়াসে অ্যাডিলেড ওভালে ইংল্যান্ডকে ২৭৬ রানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। জবাবে ভীষণ চাপের মধ্যে ইংল্যান্ড। মাত্র ৩৫ রানের ব্যবধানে তারা হারিয়েছে চারটি উইকেট। ৩০ ওভার শেষে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ১৩৩। রানআউটের খাঁড়ায় ব্যক্তিগত ১৯ রানে ফিরে যান মঈন আলী। তার পরেও অ্যালেক্স হেলসকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন ইয়ান বেল। ৫৪ রানের জুটিও গড়ে ফেলেছিলেন। তখনই মাশরাফির আঘাত। হেলসকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন। তবে ইংল্যান্ডের আসল সর্বনাশ করেছেন রুবেল হোসেন। ইনিংসের ২৭ তম ওভারে তাঁর জোড়া আঘাত। প্রথমে ফিরিয়েছেন ৬৩ রান করা ইয়ান বেলকে। তিন বল পরেই রানের খাতা খোলার আগেই ফিরিয়েছেন অধিনায়ক এউইন মরগানকেও। প্রতিরোধ গড়বেন কি, মাত্র এক রান করে তাসকিনের শিকার হন জেমস টেলর। ১ উইকেটে ৯৭ থেকে হুট করে ৫ উইকেটে ১৩২!
এখনও ২০ রানে বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে উইকেটে আছেন জো রুট। তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন জস বাটলার। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে এক পা দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ।
পুরো ৫০ ওভার খেলে ৭ উইকেটে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২৭৫। শুরুর সঙ্গে কী দারুণ বৈপরীত্য! রানটা আরও বড় হতে পারত। তবে ইনিংসের শেষ দিকে ইংলিশ বোলারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে সেটা সম্ভব হয়নি। শেষ ৫ ওভারে রান এসেছে মাত্র ৩৮! অথচ হাতে ছিল আরও ৫ উইকেট। এর চেয়ে বড় কথা, ক্রিজে তখন জমিয়ে ব্যাট করছিলেন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। অবশ্য তার পরও এটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। বাংলাদেশ কি পারবে এই রানে ইংলিশ দর্প চূর্ণ করতে? এই প্রশ্ন আপাতত তোলা থাক সময়ের হাতেই। তবে অ্যাডিলেডে এর চেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড আছে মাত্র দুটি।
ইমরুল কায়েস ফেরেন অ্যান্ডারসনের বলে স্লিপে ক্রিস জর্ডানকে ক্যাচ দিয়ে। এনামুল হকের চোটের কারণে হঠাৎই সুযোগ পাওয়া ইমরুল বুঝতে পারেননি বলের লাইনই। কিন্তু তামিম ইকবাল যেভাবে অ্যান্ডারসনের অফ স্টাম্পের বাইরের একটি বলকে খোঁচা দিলেন, সেটা ছিল যথেষ্টই হতাশাজনক। তাঁর ক্যাচটি যখন জো রুট ধরলেন, তখন ইংল্যান্ডকে চ্যালেঞ্জ-ট্যালেঞ্জ জানানো দূরে থাক বাংলাদেশের তখন ‘আগে ঘর সামলাই’ অবস্থা।
সেই ঘর সামলানোর দায়িত্ব দারুণভাবে ঘাড়ে তুলে নেন সৌম্য সরকার ও মাহমুদউল্লাহ। নিজেদের মধ্যে ৮৬ রানের দারুণ এক জুটি গড়ে সামাল দেন শুরুর বিপর্যয়। সৌম্য সরকারের ৪০ রানের ইনিংসটি থামান ক্রিস জর্ডান। তাঁর শর্ট বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে সৌম্য যখন ফিরলেন, তখন স্কোরবোর্ডে ৯৪ রান তুলে ফেলেছে বাংলাদেশ। তাঁর ইনিংসটি ছিল পাঁচটি চার ও একটি ছয়ে সাজানো।
৩ উইকেটে ৯৪ রান হঠাৎই ৪ উইকেটে ৯৯ হয়ে গেল সাকিব আল হাসানকে হারিয়ে। মঈন আলীর বলে সাকিব ৪ রান করে স্লিপে ক্যাচ দেন রুটকে। বাংলাদেশের সামনে তখন আবারও বিপর্যয়ের শঙ্কা।
মাহমুদউল্লাহ কিন্তু উইকেটে ছিলেন। এবার বিপদ সামাল দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর ‘ভায়রা’ মুশফিকুর রহিম। দুই ভায়রা পঞ্চম উইকেটে ১৪১ রান তুলে এবার স্বপ্ন দেখালেন বড় সংগ্রহের। পঞ্চম উইকেটে এটি বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের জুটি। মাহমুদউল্লাহ ১৩৮ বলে খেললেন ১০৩ রানের ইনিংস। মুশফিকুর রহিমের ব্যাট থেকে এল ৮৯ রান।
মাহমুদউল্লাহর ১০৩ রানের ইনিংসে ছিল ৭ চার ও ২টি ছয়ের মার। মুশফিকুর রহিমের ৮৯ রানে আছে ৮ চার ও একটি ছয়ের মার।
ইংল্যান্ডের পক্ষে দুটি করে উইকেট জেমস অ্যান্ডারসন ও ক্রিস জর্ডানের। একটি করে উইকেট স্টুয়ার্ট ব্রড ও মঈন আলীর

ছাড়া পেয়েছেন কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী নেতা আলম ভাট -দ্য ডন

কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাসরাত আলম ভাটকে মুক্তি দিয়েছে রাজ্য সরকার। এ ঘটনা নিয়ে শরিক দল পিডিপির সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছে বিজেপি। এ নিয়ে তারা বিােভও করেছে। জম্মু-কাশ্মিরের রাজ্য সরকার শনিবার হুরিয়াত কনফারেন্স দলের ঊর্ধ্বতন নেতা মাসরাত আলম ভাটকে মুক্তি দিয়েছে। কাশ্মির উপত্যকায় সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে তাকে চার বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছিল।
কাশ্মিরের নতুন মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ ‘রাজবন্দীদের মুক্তি’ দেয়ার প্রক্রিয়ায় এই হুরিয়াত নেতাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন বলে ডন পত্রিকা জানিয়েছে। তবে এ ঘটনায় নাখোশ হয়েছে তার সরকারের শরিক দল বিজেপি। ব্যাপক দর কষাকষির পর গত ১ মার্চ জম্মু ও কাশ্মিরে জোট সরকার গঠন করেছে আঞ্চলিক দল পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কিন্তু হুরিয়াত নেতাকে মুক্তি দেয়াকে কেন্দ্র করে শরিক দল দু’টির মধ্যে শুরুতেই মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
২০১০ সালে কাশ্মিরে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় নেতাদের একজন হলেন আলম ভাট। ভারতের গণনিরাপত্তা আইনে ওই বছরই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
এ দিকে হুরিয়াত নেতাকে মুক্তি দেয়ায় শনিবার কাশ্মিরে বিক্ষোভ করেছে বিজেপির তরুণ শাখার কর্মীরা। তারা তাকে আবার গ্রেফতার করারও দাবি জানিয়েছে।

শ্যানন-সীমার অন্যজীবন

বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই সমলিঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ। তবে পশ্চিমা কিছু দেশে এ সংস্কৃতি চালু রয়েছে। শুধু চালু রয়েছে বললে ভুল হবে। সরকার এ বিয়েকে স্বীকৃতি দিতে আইন পাকা করেছে। ফলে এক নারী তার পছন্দের আরেক নারীকে বিয়ে করছেন পারস্পরিক প্রেম-ভালবাসার মাধ্যমে। পুরুষের ক্ষেত্রেও ঘটছে তাই। পাশের দেশ ভারতেও আছে সমলিঙ্গে বিয়ে। তবে তা বিরল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নারী নাগরিক জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন আরেক নারীকে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম মার্কিনি হিসেবে তিনিই সমলিঙ্গে বিয়ে করলেন। গোপনে সেই বিয়ে করেন নি ভারতীয় ওই যুবতী সীমা। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সাধারণ একটি বিয়ে যেসব আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এ ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের লসঅ্যাঞ্জেলেসে তাদের ওই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বিলম্বে প্রকাশিত হয়েছে খবরটি। তাতে বলা হয়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত সীমা ও মার্কিন নাগরিক শ্যানন একে অপরের প্রেমে পড়ে যান। তারা একে অন্যের এত কাছাকাছি চলে আসেন, কাউকে ছাড়া কেউ থাকতে পারছিলেন না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতরা যখন তাদের আশীর্বাদে সিক্ত করছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখে কান্নাও ছিল। অতিথিরা তাদের জন্য বিরল ভালবাসা ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশা করেন। তাদের বিয়ের ছবি তুলেছিলেন স্টেফ গ্রান্ট। তিনি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ডে লিখেছেন, এমন বিয়েতে অংশ নেয়ার আশা করছিলাম বছরের পর বছর। শ্যানন ও সীমা আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আমাকে তারা বিয়ের ফটোগ্রাফার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এজন্য আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি। বিয়ে শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে আমি বিমানযোগে লসঅ্যাঞ্জেলেসে উড়ে যাই। সেখানে বন্ধুবান্ধব, পারিবারিক অতিথিতেপূর্ণ এমন একটি বাড়িতে আমাকে অভিবাদন জানানো হলো। শ্যানন ও সীমার বিয়ে হয়ে গেছে। এখনও তাদের বিয়ের ছবি ইন্টারনেটে ভরপুর। সামাজিক মিডিয়ায় তো প্রতিদিন দেখা যাচ্ছেই। বিয়েতে স্বামী যেমন স্ত্রীকে মিষ্টিমুখ করান- শ্যানন ও সীমার বিয়েতেও তাই হয়েছে। তাদের পুরোহিত দিয়ে বিয়ে পড়ানো হয়েছে।

ডলারের রিজার্ভ বৃদ্ধি : সদ্ব্যবহার করতে হবে by ড. আর এম দেবনাথ

যে খবরটি দিয়ে আজকের নিবন্ধ শুরু করতে চাই, আমার ধারণা এ সম্পর্কে অনেকেই অবহিত। খবরটি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য সংক্রান্ত। বাংলাদেশের বাজারে এ মুহূর্তে এক ডলার সমান ৭৭-৭৮ টাকা। সরকারিভাবে যা ‘কার্ব’ মার্কেটেও মোটামুটি তাই। এক সময় ডলারের মূল্য ছিল ঊর্ধ্বমুখী, এখন তা বলা যায় নিুমুখী। আমাদের তুলনায় প্রতিবেশী দেশগুলোয় ডলারের অবস্থা কী? আমি শ্রীলংকা, নেপাল অথবা ভুটানের দিকে যাব না। আমি তুলনা করতে চাই ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থার সঙ্গে। ভারতে এ মুহূর্তে ডলারের বাজারমূল্য মোটামুটি ৬১-৬২ ভারতীয় রুপি। শুনেছি হুন্ডিতেও নাকি একই বিনিময় মূল্য যাচ্ছে। ১০০ বাংলা টাকায় ৮০-৮১ ভারতীয় রুপি পাওয়া যায় কলকাতা নিউমার্কেটের আশপাশের দোকানগুলোতে। এটা ‘ওপেন সিক্রেট’। অর্থাৎ ৭৭-৭৮ টাকা দিয়ে ডলার কিনে ভারতীয় রুপিতে পাওয়া যাচ্ছে ৬১-৬২ রুপি। আবার ‘হুন্ডিতে’ ১০০-এর বদলে ৮০-৮১ রুপি।
পাকিস্তানের রুপির বিনিময় মূল্য কত? এ মুহূর্তে এক ডলারে পাওয়া যায় ১০২-০৩ পাকিস্তানি রুপি। এ অবস্থায় বাংলাদেশী টাকার মূল্যমান কতটা শক্ত- তুলনাটা করা যায় অতীতের তথ্য নিলে। আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে ১০০ টাকায় পাওয়া যেত ৪০-৪২ ভারতীয় রুপি। কখনও কখনও ৩৮-৪০ রুপি। পাকিস্তানের রুপি ১৯৭০ সালের দিকেও ভারতীয় রুপির তুলনায় শক্ত ছিল। বলা যায় বিগত ২০-৩০ বছরে বাংলাদেশের টাকার বিনিময় মূল্য যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। টাকা অনেক ‘সাবালক’ অথবা শক্ত হয়েছে। এটা কোনো ফেলনা কারেন্সি নয়। প্রমাণ ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় মূল্য। প্রমাণ ডলারের মাধ্যমে ভারতীয় রুপি বা পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে আমাদের টাকার মূল্যমান।
প্রশ্ন, টাকার এ সামর্থ্য অর্জন কি এমনি এমনি হয়েছে? টাকা যে ডলারের বিপরীতে, ভারতীয় রুপি ও পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল, তার কারণ কী? কারণ আর কিছুই নয়, অর্থনীতির ‘সাবালকত্ব’ অর্জন। সাবালকত্বের প্রমাণ অনেক কিছু হতে পারে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার, আমদানি ও রফতানির তথ্য, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, রেমিটেন্স, শিল্পায়ন ইত্যাদির তথ্য সাবালকত্বের সপক্ষে হাজির করা যায়। এসবের সম্মিলিত ফলই হচ্ছে ‘বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ’ (ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ)। কয়েকদিন আগেই খবরের কাগজগুলোতে বিশাল শিরোনামে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংক্রান্ত একটা খবর ছাপা হয়েছে। একটি শিরোনাম হচ্ছে : ‘রিজার্ভ বেড়ে ২৩০০ কোটি ডলার’। উল্লেখ্য, এ পরিমাণ রিজার্ভ সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। বস্তুত বেশ কিছুদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে বাংলাদেশ একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে।
বলা হয়, একটি দেশের তিন মাসের পণ্য আমদানির জন্য যে পরিমাণ ডলার দরকার সেই পরিমাণ ডলার ‘রিজার্ভ’ হিসাবে থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু হিসাবে দেখা যায় আমাদের এ মুহূর্তে আছে সাত-আট মাসের আমদানির সমপরিমাণ ডলার। আমাদের ২৩০০ কোটি তথা ২৩ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ভারতের রিজার্ভের পরিমাণ কত? সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায়, তাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩৩ বিলিয়ন ডলার। এদিকে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ মাত্র ১৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পাকিস্তানের রিজার্ভের তুলনায় আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ সাত বিলিয়ন ডলার বেশি। এ খবর আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। কারণ স্বাধীনতার আগে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক প্রচার করতেন, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ‘আলাদা’ হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে বাঁচতে পারবে না। বাংলাদেশের কোনো রফতানিযোগ্য পণ্য থাকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে তার অর্থনীতি অনেক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার মুদ্রার মানই এর প্রমাণ। পাকিস্তানের মুদ্রার তুলনায় বাংলাদেশের টাকা অনেক বেশি শক্ত। বৈদেশিক মুদ্রা তার পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কী? এটা কি সত্যি সত্যি অবিমিশ্র আশীর্বাদ, না এ ক্ষেত্রে আমাদের সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত? বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রথমত বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছে, খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো নয় বিধায় ডলারের খরচ কম হচ্ছে। এদিকে রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধির হার মোটামুটি সন্তোষজনক। সন্তোষজনক রফতানি প্রবৃদ্ধির হারও। অধিকন্তু, আমাদের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এর ডলার আমাদের রিজার্ভে যোগ হচ্ছে। মোটামুটি এসব কারণের কথাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে এবং আমরাও সাদামাটা চোখে তা দেখছি। কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সত্যি সত্যি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। শুধু তেলের দাম নয়, আমাদের আমদানিযোগ্য প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই আন্তর্জাতিক বাজারে হ্রাস পেয়েছে। এতে অনেক টাকা বা ডলার সাশ্রয় হচ্ছে। আবার স্থানীয় বাজারে পণ্যের কাটতি কম থাকায় আমদানিও কম হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা পণ্যের দামে যেমন স্বস্তি পাচ্ছি, তেমনি ‘ভলিউম’ বা পরিমাণেও স্বস্তি পাচ্ছি।
কিন্তু এর বিপরীতে একটা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। তেল বাদে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম কমার ফলে দেশীয়ভাবে অনেক ব্যবসায়ী লোকসান দিয়েছেন। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি এর কুফল পড়ছে এখন ব্যাংকের ওপর। ব্যাংকগুলোকে ঋণ পুনঃতফসিল করতে হচ্ছে, সুদ মওকুফ করতে হচ্ছে। এদিকে তেলের দাম হ্রাসের কোনো সুবিধা সাধারণ ভোক্তারা পায়নি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে তেলের দাম কমার সুবিধা সাধারণ মানুষ পেয়েছে। ভারত সরকার কমপক্ষে সাতবার তেলের দাম কমিয়েছে। কিন্তু আমাদের সরকার একবারও কমায়নি। এটা একটা বাজে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। দ্বিতীয় যে কারণের কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে খাদ্যশস্যের আমদানি হ্রাস। এটা সত্য। আমাদের আগের মতো লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় না। বরং কিছু চাল আমরা শ্রীলংকায় রফতানি করেছি। এই অর্থে চালের আমদানি সূত্রে ডলারের ওপর কোনো চাপ নেই। আবার বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও রয়েছে মন্দা। অবকাঠামোর দুর্বলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তো আছেই। সর্বোপরি বাধা এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা বললে কম বলা হয়। আজ প্রায় দুই মাস ধরে চলছে হরতাল-অবরোধ। এর মাঝেই ঘটছে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনা। নিরীহ লোক মারা যাচ্ছে সহিংসতা ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে। এতে এমনিতেই মন্দাভাব, বিনিয়োগে নিয়ে এসেছে আরও গভীরতর মন্দা। ফলে শিল্পায়নের কাজে মন্থরতা দেখা দিয়েছে। শিল্পায়ন না হলে ক্যাপিটেল মেশিনারিজ আমদানি কম হয়। এতে ডলার খরচ কম হয়। এ কারণেও ডলার রিজার্ভে স্ফীতি ঘটছে। অধিকন্তু বিদেশী ঋণের ফলে ডলার রিজার্ভ আরও স্ফীত হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রটি আবার উদ্বেগের বিষয় হয়েও দেখা দিচ্ছে।
খবরের কাগজের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকছেন। তাদের যুক্তি- বিদেশী ঋণ সস্তা, এতে সুদের হার কম। এটা খুবই সত্য। দেশী ব্যাংকগুলো ঋণের ওপর চড়া সুদ চার্জ করে। অধিকন্তু রয়েছে নানাবিধ চার্জ ও কমিশন। ব্যবসায়ীদের কথা, এত সুদ ও চার্জ দিয়ে ব্যবসা করা যায় না, বিশেষ করে বিদেশে প্রতিযোগিতা করা যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে হয় এ যুক্তি মেনে নিয়েছে। তারা অনেকটা উদারভাবেই বড় বড় পার্টিকে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে উৎসাহিত করছে। ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েছেন। এসব ঋণ কাজে লাগার কথা নতুন বিনিয়োগে, বিনিয়োগ সম্প্রসারণে। কিন্তু কাগজে খবর দেখছি নানা ধরনের। দেখা যাচ্ছে, অনেক ব্যবসায়ী বিদেশী ঋণের টাকা শিল্পায়নে ব্যবহার না করে দেশীয় ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখছেন। দেশী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন। অনেকের ধারণা, তারা বিদেশী ঋণের টাকা আবার বিদেশেই নিয়ে যাচ্ছেন। ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে যে ফান্ড বিল্ড-আপ করার কথা, তারা তা করছেন না। এসব খুবই উদ্বেগের খবর। একটা ভালো উদ্যোগ কিন্তু শেষে একটা বিষফোঁড়া হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবধানি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। বিপদ কিন্তু বলে-কয়ে আসে না। ডলার পরিস্থিতি ভালো বলে ব্যবসায়ীদের বিদেশী ঋণ নিতে উৎসাহিত করার নীতিটি গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। যেসব ব্যবসায়ী বিদেশী ঋণ নিয়েছেন তাদের ব্যবসা, বিনিয়োগ, স্থানীয় ব্যাংকের ঋণ, ঋণ পরিশোধ, ফান্ড বিল্ড-আপ অবস্থা ইত্যাদি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার।
এসবের বিপরীতে দেখা যাচ্ছে ডলারের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বিরাট অবদান রাখছে রেমিটেন্স। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জুলাই-জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেমিটেন্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ হারে। এ দুর্দিনে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা টালমাটাল, সেখানে আমাদের রেমিটেন্স বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কয়েকটি দেশ থেকে রেমিটেন্স কম আসছে বলে খবর রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে কুয়েত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও লিবিয়া। অতএব রেমিটেন্স সব সময়, সব দেশ থেকে অব্যাহতভাবে বাড়বে এ কথা ধরে নিয়ে ডলারের পরিকল্পনা করলে ভুল হবে। এদিকে দেখা যাচ্ছে রফতানি আয়ও বাড়ছে, যদিও তা আশানুরূপ হারে নয়। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রফতানির পরিমাণ প্রায় আড়াই শতাংশ হারে বেড়েছে। এই হচ্ছে মোটামুটিভাবে ডলার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ।
আরও একটা কথা বলা দরকার। ব্যক্তিগতভাবে মানুষের হাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা হলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিটির মাথা ‘খারাপ’ হয়ে যায়। সে কী করবে, কী করবে না, তা ভাবতে পারে না। দেশের ব্যাপারেও এটা সত্য। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ভালো। কিন্তু এটা শেষ কথা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানি বাড়তে পারে। তখন ডলারের চাহিদা বাড়বে। যখন বাড়বে, তখন ডলার খরচ হতে বেশি সময় লাগবে না। এছাড়া বড় কথা, ডলার সরকারের নয়। ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নয়। যারা রেমিটেন্স পাঠায় এবং যারা রফতানি করে তাদেরই ডলার। তাদের টাকায় পরিশোধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা নিয়ে নেয়। আবার যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে। অতএব, এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই যে, সরকার অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভের টাকা যাচ্ছেতাইভাবে ব্যয় করতে পারে। অতএব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত প্রতিটি ডলার সুচিন্তিতভাবে ব্যবহার করা। বিদ্যমান ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং বন্ধ করা, অথবা নিদেনপক্ষে তা কিছুটা হ্রাস করার ব্যবস্থা করতে পারলে দেশ উপকৃত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এ ব্যাপারে একটা উপায় বের করা। কাজটি কঠিন নয়। রেমিট্যান্সের টাকা বা ডলারের অপব্যবহার হচ্ছে এ কথা দিবালোকের মতো সত্য। এ টাকা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও উদ্যোগী হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।
পরিশেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ধন্যবাদ একটি কারণে। এত রিজার্ভের পরও তারা মূল্যস্ফীতিটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে। তবে এ ক্ষেত্রেও অব্যাহত পদক্ষেপ দরকার হবে নিয়ন্ত্রণ ঠিক রাখার জন্য।
ড. আরএম দেবনাথ : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও সাবেক শিক্ষক, ঢাবি
rmdebnath@yahoo.com

মুজিকা হতে পারেন এ প্রজন্মের আইকন by এম সাখাওয়াত হোসেন

নিজের গাড়ি ভক্সওয়াগন বিটল–এ পেপে মুজিকা
বাল্যকালে স্কুলের পাঠ্য হিসেবে এবং তার বাইরে বহু মহৎ আর বড় বড় নেতার জীবনী পড়েছি। পড়েছি তাঁদের নেতৃত্বের মাহাত্ম্য আর অসাধারণ গুণের কথা। অনেককেই সেই সময় এবং এখনো আদর্শ মনে হয়। অনেকের মধ্যে পড়েছি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর অসাধারণ গুণ আর তাঁর নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্তের কথা। সাধারণ মানুষের নেতা হওয়ার গুণাবলির বিষয়। আমাকে ছোটবেলা থেকেই হজরত উমরের রাষ্ট্র পরিচালনা, তাঁর নেতৃত্ব, যতটুকু পড়েছি, দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আজও দেয়। তেমনি বাগদাদের কিংবদন্তি খলিফা হারুনুর রশিদের ইতিহাস, অনেকের সঙ্গে তিনিও আমার ভক্তি আর সমীহের প্রতীক। আব্রাহাম লিঙ্কনসহ অনেকেই অনুপ্রাণিত করতেন আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে। হজরত উমরের সেই অসাধারণ গল্পগুলো পাঠ্যপুস্তকে পড়ার পর থেকে গেঁথে গিয়েছিল আমার স্মৃতিতে। আজও মনে হয় এমন নেতা কি হতে পারে, যিনি শুধু সাধারণের মতোই থাকবেন না, তাঁর নেতৃত্ব রেখে যাবেন এক অনন্য উদাহরণ?
আজ বিংশ শতাব্দী পার হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বে এমনতর নেতৃত্ব খোঁজা যেন অবাস্তব মনে হতো। এখন নেতাদের আড়ম্বর মধ্যযুগের রাজা-বাদশাহদেরও মাঝেমধ্যে হার মানায়। অফুরন্ত ক্ষমতাধর সব শীর্ষ নেতা দেশ পরিচালনায় অনেকে জার অথবা মোগলদেরও পিছে ফেলে দেয়। এমনকি বর্তমান বিশ্বের গণতান্ত্রিকমনা নেতাদেরও বাহ্যিক চাকচিক্য এমনভাবে গ্রাস করেছে যে সাধারণ মানুষের মতো ব্যবহার করাও ভুলে যান। ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতার দাপটে ভুলে যান যে সাধারণ মানুষই তাঁদের নেতা তৈরি করেন। আমাদের দেশের ছোট থেকে বড় নেতাদেরও ওই একই মন-মানসিকতা। বিশেষভাবে প্রটোকল তৈরি করতে হয়। কার কত গাড়ির বহর তার ওপর নির্ভর করে নেতা-নেত্রীর ওজন। ট্রাফিক রুল ভেঙে চলাচল নেতার গুরুত্ব বহন করে বলে মনে করেন। অহরহ এমনটা হতে দেখা যায়।
আমাদের দেশের শুধু বড় নেতারাই নন, ছোটখাটো পাতিনেতাদের দাপটে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তো একরকম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। রাজধানীতে মাঝেমধ্যে জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় আমাদের দেশের নেতাদের গাড়ির বহরকে নির্বিঘ্নে পার হতে দেওয়ার জন্য। ফেরি থেকে বিমান পর্যন্ত মন্ত্রী বা নেতার আগমনের অপেক্ষায় থাকে, তাতে অন্যদের সুবিধা-অসুবিধা ধর্তব্য নয়। অপেক্ষায় থাকেন সাধারণ মানুষগুলো, যাঁরা তাঁদের নেতা বানিয়েছেন। নিজের এলাকায় আগমনে সংবর্ধনা দিতে শত শত তোরণ তৈরি করা হয়, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে নেতাকে স্বাগত জানাতে হয়। বিশ্বের কম দেশই আছে, যেখানে এমন নজির রয়েছে। তার ওপর রয়েছে উপঢৌকন।
শুধু যে আমাদের দেশে এমন হয়, তা নয়। তবে আমাদের দেশে এর মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের পাশের দেশের অতি সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে আসা নেতার অতি দামি পরিধেয় নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় হয়েছে। অবশেষে বিক্রি হয়েছে চড়া মূল্যে। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ ভবনে থাকেন সে দেশের রাষ্ট্রের কর্ণধার। অথচ আমাদের অঞ্চলেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন গান্ধীর মতো নেতা, যিনি সারা জীবন চাকচিক্য বর্জন করে চলেছেন। আমাদের দেশের অতীতের নেতাদের সেই জৌলুশ ছিল না। বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন কাটিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত এলাকার একটি সাধারণ বাড়িতে।
বিশ্বে যখন নেতাদের চাকচিক্য নিয়ে মুখরোচক রচনা রচিত হয়, তখনো পৃথিবীর আনাচকানাচে অনুসরণযোগ্য নেতাদের কথাও ক্ষীণ স্বরে হলেও শোনা যায়। খুব বড় প্রচার না হলেও প্রচারিত হয়। বিশ্বের এক কোনায় একটি ছোট আয়তনের মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রের সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির কথা এমনই রূপকথার মতো ছড়াচ্ছে। তিনি বলেন যে তাঁর জীবনধারণ তাঁর দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতো, সংখ্যালঘু বিত্তবান জনগোষ্ঠীর মতো নয়। তিনি হলেন লাতিন আমেরিকার বা দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের দেশ উরুগুয়ের সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি, ৮০ বছর বয়স্ক জোস, এলবার্তো ‘পেপে’ মুজিকা কোরডানো, সংক্ষেপে পেপে মুজিকা। একসময়ের অতি বাম ‘টুম্পারোস’ গেরিলা সদস্য বাম মোর্চা ব্রড ফ্রন্ট পার্টির হয়ে বিগত পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাঁকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিনম্র নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি নিজেকে তাঁর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নেতা হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর জনপ্রিয়তা শতকরা ৯৫ ভাগ থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হতে অনীহা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আমি সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই মৃত্যুবরণ করতে চাই।’
পেপে মুজিকার অতীত জীবন সুখকর ছিল না। স্প্যানিশ মুনের এই নেতা একসময়ের নিষিদ্ধঘোষিত বাম গেরিলা সংগঠনের সদস্য, ওই সময়কার অত্যাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিলেন। জীবন ফিরে পেলেও বহু বছর কারাগারে কাটাতে হয়। দুবার কারাগার থেকে পলায়ন করলেও প্রতিবারই তাঁকে কারাগারে ফিরতে হয়। কাটাতে হয়েছিল জীবনের আট বছর ‘সলিটারি কনফাইনমেন্টে’। ওই সময়কার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন যে জীবনের ওই আট বছরে তিনি বিশ্ব থেকে, এমনকি নিজের জ্ঞাতিগোষ্ঠী থেকেও ছিলেন বিচ্ছিন্ন। কারাগারের প্রকোষ্ঠ থেকে বহির্বিশ্ব সম্বন্ধে কিছু জানতে পারতেন না। তবে তাঁর মতে, ওই আট বছর জীবন সম্বন্ধে তাঁর ধারণা পাল্টে দেয়। ওই আট বছরে খবরের কাগজ তো দূরের কথা, একটি বইও পড়েননি। ওই সময়েই তিনি তাঁর পরবর্তী জীবনের ছক তৈরি করেন।
উরুগুয়েতে গণতন্ত্রের ধারা পুনঃপ্রবর্তন হলে পেপে মুজিকা প্রথমে সাংসদ ও পরে কৃষিমন্ত্রী হন। অবশেষে তিনি ২০১০ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় দফা ভোটে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট হন। ২০০৫ সালে বহু বছরের সংগ্রামী সঙ্গী ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত লুসি টপোলানস্কিকে বিয়ে করেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এক দিনও রাজধানী মন্টেভিডিওর জৌলুশপূর্ণ প্রেসিডেন্ট ভবনে কাটাননি, এমনকি প্রেসিডেন্টের জন্য বরাদ্দ যানবাহন এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবহার করেননি। ১২ হাজার মার্কিন ডলারের মাসিক বেতনের ৯০ শতাংশ দাতব্যকাজে দান করেছেন। থাকতেন, এখনো থাকেন, রাজধানীর বাইরে তাঁর স্ত্রীর ছোট খামারবাড়িতে, যেখানে এই নিঃসন্তান দম্পতির সঙ্গী ছিল, এখনো আছে ১৯৮৭ সালের তৈরি গাড়ি ভক্সওয়াগন বিটল, যা এখন আর ঢাকার এমনকি বাংলাদেশের কোনো রাস্তায়ও দৃশ্যমান নয়। যেন তিন পা–বিশিষ্ট বিকলাঙ্গ এক কুকুর। ২০১০ সালে যখন পেপে মুজিকা প্রেসিডেন্ট হন, তখন তাঁর ওই গাড়ির দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার। প্রতিবছর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাবে এমন তথ্যই রয়েছে। স্ত্রীর কৃষি খামারে উৎপাদিত ‘ক্রিসেনথিমাম’ ফুল বেচে আর বেতনের বাকি অংশ দিয়ে দুজনের সংসার চলে। উল্লেখ্য, উরুগুয়ে মধ্যম আয়ের দেশ, যার মাথাপিছু আয় ১৬ হাজার ৯৯৬ মার্কিন ডলার। এমন দেশের প্রেসিডেন্টের এমনই গল্প, মনে হয় কল্পকথা।
পেপে মুজিকার নিজস্ব গাড়ি ভক্সওয়াগন বিটল এখন বিশ্বপরিচিত। ইদানীং নির্মাতা সংস্থা ওই গাড়িটি এক মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনতে চেয়েছে। পেপে এখনো বিক্রির মন স্থির করেননি, তবে তিনি বলেছেন যে তাঁর এই বয়সে এ অর্থের প্রয়োজন নেই। তবে অর্থলাভ হলে তিনি পুরোটাই দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দেবেন। তাঁর মতে, তিনি কোনো অসাধারণ ব্যক্তি নন। ছোটবেলা থেকেই কাঠের টুলে বসে লেখাপড়া করেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবেও ওই কাঠের টুলে বসেই কাজ করেছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর সব দেশের নেতাদের উচিত ওই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবন ধারণ করা। বিশেষ করে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর পূর্বপুরুষদের দেশের, স্পেন ও ইতালির নেতাদের উদ্দেশে এমন কথা বলেন।
পেপে মুজিকা যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে বিরল ঘটনা। বিরল ব্যক্তিত্ব পেপে মুজিকা। বিশ্বে যখন এমন ব্যক্তি ও নেতার অভাব, তখন পেপে মুজিকার জীবনবৃত্তান্ত আগামী প্রজন্মকে নিরহংকার, বিনয়ী ও সাধারণের নেতা হওয়ার প্রেরণা জোগাবে। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের তরুণদের অনুপ্রেরণা দেবে, যাদের সামনে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের অভাবের কারণে কিংবদন্তি নেতা তৈরির পথ সুগম হচ্ছে না।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনুপ্রেরণা জোগানোর মতো নেতাদের অভাবে রাজনীতির প্রতি এই প্রজন্ম যেমন বীতশ্রদ্ধ হচ্ছে, তেমনি বিপথগামী হওয়ার লক্ষণ বাড়ছে। আমাদের সবার জন্য, বিশেষ করে আমাদের দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নেতাদের জন্য, শিক্ষণীয় হতে পারে জোস এলবার্তো ‘পেপে’ মুজিকা কোরডানো, সংক্ষেপে ‘পেপে’ মুজিকা।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

‘অসামাজিক কাজে জড়িত নই’ -কণ্ঠশিল্পী কাকলী দে

‘আমি কখনও অনৈতিক কিংবা অসামাজিক কোন কাজে জড়িত নই। ওই মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে ফটোশপে কাজ করে অশ্লীল ছবি আপলোড দিচ্ছে।’ -এ কথা জানিয়েছেন পুলিশের হাতে আটকের পর হাজতবাসকারী কণ্ঠশিল্পী কাকলী দে এ্যানী। তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিপক্ষ মহল তার বিরুদ্ধে নানা রকম অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। ওই মহল তাকে সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং তার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে ষড়যন্ত্র করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। গতকাল সিলেট প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে কণ্ঠশিল্পী কাকলী দে এ অভিযোগ করেছেন। লিখিত বক্তব্যে কাকলী দে বলেন, গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে আমার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। যা দেখে আমি হতবাক ও বিস্মিত হয়েছি। প্রকৃত অর্থে ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাতে আমি বিমানবন্দর এলাকায় একটি গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিই। একজন শিল্পী হিসেবে সহকর্মী শিল্পীদের সঙ্গে ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফেরার পথে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। আমার সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন আরও কয়েকজন শিল্পী ও যন্ত্রবাধক। লাক্কাতুরা এলাকায় আসার পর পুলিশ আমাদের গাড়িকে সিগন্যাল দিলে চালক গাড়ি থামান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আমাদের একজন কণ্ঠশিল্পীর বাদানুবাদ হলে পুলিশ আমাদের গাড়িকে আটক করে সবাইকে থানায় নিয়ে যায়। পরে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলে এয়ারপের্ট থানা পুলিশ আমাদের ছেড়ে দেয়। অথচ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে আমাকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। যা দেখে আমি ব্যথিত হয়েছি। তিনি বলেন, আমি একজন শিল্পী। আমি নিয়মিত বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে গান গেয়ে থাকি। সিলেটের সংগীতাঙ্গনের মানুষ আমাকে চেনেন এবং জানেন। আমি কখনও অনৈতিক কিংবা অসামাজিক কোন কাজে জড়িত নই। ওই কুচক্রী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে ফটোশপে কাজ করে অশ্লীল ছবি আপলোড দিচ্ছে। তারা আমার মানসম্মান ক্ষুণ্ন করতে এ ধরনের চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে কাকলী দে ওই কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিলেটের প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মহলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

অভিজিৎ হত্যা ও বাংলাদেশের রাজনীতি by এরশাদ মজুমদার

অভিজিৎ হত্যা একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক দুঃখজনক ঘটনা। আমি অন্তর থেকে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করছি। অভিজিৎ একজন শিক্ষিত মুক্তমনের মানুষ। বিদেশে থাকেন। মুক্তমন নামের একটি ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা। সালমান রুশদি যেমন মুক্তমন নিয়ে ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ নামে একটি বই লিখে জগৎজোড়া নাম কামিয়েছেন, এর পরে বাজারে তার দামও বেড়েছে। ব্রিটিশ সরকার তাকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। বড় বড় মঞ্চে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আপ্যায়িত হচ্ছেন। লেখক হিসেবে তিনি বড় মাপের লেখক। শয়তানের কবিতা বা শয়তান কাব্য না লিখলেও তিনি বড় লেখক থাকতেন। তবুও তিনি শয়তানের কাব্য লিখেছেন। যখন বইটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী হইচই পড়েছে, তখনো আমি লিখেছিলাম চৌদ্দ শ’ বছর ধরেই তো জগতের শ্রেষ্ঠতম মানুষ নবীজী সা:-এর বিরুদ্ধে কিছু লোক লিখে চলেছেন। অনেকেই আল্লাহ পাকের বিরুদ্ধে লিখেও নাম কামাচ্ছেন। এতে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা:-এর কিছু আসে-যায় না।
ব্যক্তিগত জীবনে একজন ধার্মিক মানুষ মুক্তমনের হতে পারেন। অন্তত আমি তাই মনে করি। একজন অবিশ্বাসী মানুষও ভালো হতে পারেন। আবার বিশ্বাসী মন্দ হতে পারেন। বহু লেখাপড়া জানা মানুষকে আমি মন্দ হতে দেখেছি। স্টিফেন হকিন্স জগদ্বিখ্যাত একজন বিজ্ঞানী। তিনি জগতের সৃষ্টি নিয়ে ভাবেন। জগতের সব মানুষই তাকে সম্মান করেন। তিনি কখনো স্রষ্টাকে বা ধর্মকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেননি। তার মতো জগদ্বিখ্যাত আরো অনেক মুক্তমনের মানুষ ছিলেন, যারা কখনোই ধর্মকে নিয়ে তামাশা করতেন না। মুক্তমনের মানুষ মানেই তো হচ্ছে উদার মনের মানুষ। যারা পরের মত বা বিশ্বাসকে সব সময় সম্মান করেন। আমি মাঝে মাঝে বিদেশী নাস্তিক ও যুক্তিবাদীদের ওয়েবসাইট ভিজিট করি তাদের যুক্তিগুলো জানার জন্য। এদের বেশির ভাগই যুবক। এদের ভেতর খুব অল্প ক’জনকে দেখেছি বাজে কথা বলেন ও গালমন্দ করেন।
এক সময়ে ইসলামে মুতাজিলা নামের একটি গ্রুপ ছিল। এরা ছিলেন যুক্তিবাদী। বিনা প্রমাণে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আব্বাসিয়া আমলে এদের বিকাশ হয়েছিল। এ চিন্তাধারার মানুষ এখন জগতে নেই। এরা বলতেন, জ্ঞান লাভের প্রধান হাতিয়ার হলো জিজ্ঞাসা করা। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে ফরজ বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইসলামের মূলমন্ত্র হচ্ছে মানবতা, মানবসেবা। আমি মনে করি, স্রষ্টা হচ্ছেন জ্ঞানের প্রতীক। তাই মানুষকে জ্ঞান সাধনা করতে হবে। দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, know thyself. নিজেকে চেনো। আর ইসলাম বলে, ‘মান আরাফা নাফসা, ফাকাদ আরাফা রাব্বা।’ এর মানে, আগে নিজেকে চেনো, তাহলেই তুমি প্রভুকে জানতে বা চিনতে পারবে। আমাদের বাংলাদেশের তথাকথিত জ্ঞানী সমাজ নিজেকে চেনে না। কারণ, জ্ঞানসাধনা না করেই তারা সমাজে সম্মানিত। হজরত আলী রা:-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সমাজ বা দেশ অসুস্থ হয়ে গেছে কিভাবে জানা যাবে। তিনি বলেছিলেন, যে সমাজে দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছেন, ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছেন, জ্ঞানীরা পালিয়ে গেছেন, মূর্খরা মঞ্চে বসে থাকেন, বিচারকেরা রাজা বা খলিফার তাঁবেদারি করেন এবং রাজা মিথ্যা কথা বলেন। আপনারা নিজেরাই ভাবুন আমাদের প্রিয়তম মাতৃভূমি বা রাষ্ট্র এখন কেমন আছে।
বাংলাদেশে ব্লগার শব্দটির একধরনের নেগেটিভ বা নেতিবাচক ইমেজ সৃষ্টি হয়েছে। পরমত বা ধর্মবিশ্বাসকে গালমন্দ করে কিছু শিতি তরুণ কিছু ব্লগ সৃষ্টি করে লেখালেখি করেছে। শুনেছি, সরকার নাকি ওসব ব্লগ বন্ধ করে দিয়েছে। অভিজিৎ একজন ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক। এখন তার নাম হয়ে গেছে ব্লগার অভিজিৎ। কেমন যেন মনে হয় তার বোধ হয় আর কোনো পরিচয় নেই। তিনি আমেরিকায় থাকেন, মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসেন। সমমনা বন্ধুদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ করেন। আবার আমেরিকায় ফিরে যান। আমাদের দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে মুক্তমনাদের দাম বা কদর বেশি। অভিজিৎকে নিয়ে দেশে-বিদেশে এখন হইচই চলছে। এমন প্রতিক্রিয়া সাধারণত দেখা যায় না। এ ব্যাপারে পশ্চিমা জগতের সাথে আমাদের দেশের মুক্তমনারা এক কাতারে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সে কারণটা কী?
চলমান সময়ে বা চলতি সপ্তাহে অভিজিৎ বিশ্বের এক নম্বর ব্যক্তি। সৌদি আরবে এক ব্লগারকে সৌদি আদালত দশ বছর জেল ও এক হাজার বেত্রাঘাত শাস্তি দিয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ শাস্তির নিন্দা করি। এ ব্যাপারে পশ্চিমা মিডিয়া অনেক লেখালেখি করছে। কিন্তু সরকারগুলো চুপ। কারণ, ঘটনাটা সৌদি আরবের। কেউ সৌদি বাদশাহকে ঘাঁটাতে চায় না। বাদশাহর বন্ধুত্বকে কেউ অবহেলা করতে চায় না। সৌদি সরকার সেকুলার বা ধর্মহীন নয়। বাংলাদেশ সরকার সেকুলার। তাই ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশে এমন সরকার দেখতে চায়। এটা আদর্শ ও দর্শন স্বার্থগত ব্যাপার।
গত বছর কিছু দিনের জন্য আমি আমেরিকার সিয়াটল শহরে ছিলাম। এটা মাইক্রোসফটের শহর। এ শহরের প্রধান দৈনিক সিয়াটল টাইমস। ক্যাথি বেস্ট হচ্ছেন সম্পাদক। তার অফিসে গিয়েছিলাম মতবিনিময়ের জন্য। প্রায় ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তখন সেকুলারিজম নিয়ে তার সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, এখানে ৫৭ ভাগ মানুষ সরাসরি ধর্মে বিশ্বাস করে। তবে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না। ওই কাগজে ধর্ম বিষয়ে একটি কলাম আছে। সপ্তাহে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সব ধর্মের লোকেরাই লিখতে পারেন। তবে ধর্মবিরোধী কোনো মত ছাপা হয় না। বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষিত ধর্মহীনের (সেকুলার) কদর বেশি। এরা ধর্ম নিয়ে কথা উঠলেই আলেমসমাজকে গালাগাল করেন। কিন্তু নিজেরা ধর্মজ্ঞান লাভ করেন না। এর আগে বহুবার বলেছি, এ দেশে ধর্মহীন বা ধর্মজ্ঞানহীনেরাই রাষ্ট্রীয় মতায় থাকেন। ধর্মের বিরুদ্ধে যারা জোরগলায় কথা বলেন তারাই পদবি লাভ করেন। আমি মনে করি, ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মহীন বা ধর্মমুক্ত থাকা কোনো অপরাধ নয়। ধর্মমুক্তির আন্দোলনও করতে পারেন। কিন্তু অন্য ধর্মকে গালাগাল করা বা অন্য মতকে নিন্দা করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এখন বুদ্ধিজীবী জ্ঞানীগুণীরা বলছেন, ’৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দেশবাসীকে ১০০ ভাগ খাঁটি সেকুলার (ধর্মহীন বা ধর্মমুক্ত) বাঙালি বানানোর জন্য। অনেকেই বলেন- শুধু মুক্তিযোদ্ধা হলেই চলবে না, ধর্মহীন চেতনা থাকতে হবে। ভারতও চায় বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলমান যেন ধর্মমুক্ত থাকে। ধর্মচেতনা শক্তিশালী হলে ভারতের দর্শন বাস্তবায়ন হবে না। বাংলাদেশে ধর্মমুক্ত চেতনায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে। এরাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে। যদিও সংবিধানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এটা হচ্ছে ভোটারদের ধোঁকা দেয়ার জন্য।
অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হওয়া অবশ্যই দরকার। তাহলে জানা যাবে কারা এমন ঘৃণ্য কাজ করেছে, কেন করেছে। অভিজিৎ নিহত হাওয়ার সাথে সাথে রাজনীতিতে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সরকারি নেতারা বলতে শুরু করেছেন, জঙ্গিরা এ কাজ করেছে। জঙ্গিদের নেতা হচ্ছেন খালেদা জিয়া। নেতা-মন্ত্রীদের এমন সহি বক্তব্যকে তদন্তকারীদের অবশ্যই গাইডলাইন হিসেবে নিতে হবে।
এমন এক সময় অভিজিৎকে হত্যা করা হয়েছে যখন দেশ এক মহাসঙ্কটের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। এমন সময় অভিজিৎকে হত্যা করার পেছনে কারা আছে এবং কী উদ্দেশ্যে তারা এমন ঘৃণ্য কাজ করেছে, তা অবশ্যই দেশবাসীকে জানতে হবে। সময়কে আরো ঘোলাটে করে কি কেউ রাজনীতিতে সুবিধা নিতে চাইছে? ডাক্তার মিলন হত্যা হয়েছে রাজনৈতিক ঘোলাটে অবস্থায়। মিলন হত্যার মাধ্যমেই জেনারেল এরশাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। এর আগে সাংবাদিক দুলাল ও শ্রমিক নেতা আবদুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। তারও বেশ আগে অ্যাসেম্বলিতে স্পিকারকে হত্যা করা হয়েছে। ব্লগার রাজীব হত্যায় তেমন বেশি রাজনীতি হয়নি, যেমন হচ্ছে অভিজিৎ হত্যা নিয়ে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কথা বলতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। অভিজিৎ নাস্তিক বলে বিদেশেও অভিজিৎকে নায়ক বানানোর চেষ্টা চলছে। অভিজিৎ ব্যক্তিগত জীবনে বিনীত ও হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। কিন্তু মুক্তমনের নামে তিনি ধর্ম নিয়ে আজেবাজে কথা বলতেন। তার সাথে আরো কিছু আরবি নামধারী যুবক যোগ দিয়েছিল। ফলে কিছু ইসলামপন্থী যুবক নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করে এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে শুরু করে। সরকারের দায়িত্ব ছিল উভয় গ্রুপকে কঠোরভাবে দমন করা। কিন্তু সরকার তা করেনি।
ইসলাম সম্পর্কে সরকার নিরপে ভূমিকা পালন করে। এ দেশে ভোট ছাড়া অন্য কোনো কাজে মুসলমানদের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। শুধু ভোটের জন্যই তারা মেজরিটি। ফলে দেশের ১৪ কোটি মানুষের ধর্মমর্যাদা ও চিন্তা অবহেলিত। ইসলামের ব্যাপারে নিরপেতা আর অন্যদের ব্যাপারে সহমর্মিতা দেশের ৯০ ভাগ মানুষের মনে বেদনার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষা সংস্কৃতি ইতিহাস কোথাও ইসলামের প্রভাব নেই। ইসলাম মসজিদে ছাড়া আর কোথাও নেই। তবুও বলা হয়- মডারেট মুসলিম কান্ট্রি। কেউ কেউ বলেন, লিবারেল মুসলিম কান্ট্রি। ইদানীং শুনতে পাচ্ছি পলিটিক্যাল ইসলাম। আমার দৃষ্টিতে ইসলাম একটিই। কিতাব একটি। এর বহু তাফসির বা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। একমাত্র ধর্ম ইসলাম যার নিজস্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি আছে। এর আগের কিতাবগুলোও ইসলামের। কালক্রমে সময়ের প্রয়োজনে আল্লাহ পাক নিজেই সংস্কার করে আল কুরআন নামে অভিহিত করে নাজিল করেছেন। কোথাও ধোঁয়াশা নেই, একেবারেই সুস্পষ্ট। এর ভেতর বাঁকা পথ খোঁজেন তথাকথিত ধর্মমুক্ত শিক্ষিতজনেরা। এরা নিজেরা ধর্ম পালন করেন না। ধর্ম যারা পালন করেন, তাদের সমালোচনা করেন। এরাই সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। এরাই মুক্তমনের নামের উগ্রপন্থী নাস্তিক ব্লগার সৃষ্টি করেছেন।
অপর দিকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু তরুণকে বিভ্রান্ত করে উগ্রপন্থী সৃষ্টি করেছে। এই উগ্রপন্থী তরুণেরাই মনে করে ইসলামের সমালোচকদের হত্যা করতে হবে। ইসলাম কখনোই এ ধরনের শিক্ষা দেয় না। ইসলাম হচ্ছে জগতের সবচেয়ে বেশি সহনশীল উদার ধর্ম। ইসলাম হচ্ছে সবচেয়ে বেশি মাশীল ধর্ম। আল্লাহ পাকের প্রধানতম গুণ হচ্ছে ভালোবাসা ও মা। মানুষকে বলেছেন, তোমরা আমার ভালোবাসা ও মায় আস্থা রাখো। আমার মা হচ্ছে অসীম সাগর, আর মানুষের অপরাধ হচ্ছে এক বিন্দু পানি। সেই দয়াবান ও ক্ষমাশীল খোদাকে গালমন্দ করে একশ্রেণীর তথাকথিত জ্ঞানী মানুষ আর তাদের অনুসারী বিপথগামী এক শ্রেণীর তরুণ। আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের বেশির ভাগই ইসলাম বা কুরআনকে জানে না। না জানাই নাকি সমাজে তাদের সম্মানিত করেছে। এরাই মানবতা আর মানবিক অধিকারের নামে নারী-পুরুষের সমকামিতা, নারীমৈথুন, লিভ টুগেদার, ধর্মহীন বিয়েকে সমর্থন করে। প্রগতি মুক্তমনের নামে সমাজ বন্ধনকে ধ্বংস করতে চলেছে। খোদা সার্বভৌম বললে তারা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করে।
খোদা ও রাসূল সা:-বিরোধী শক্তি আগেও ছিল, আজো আছে। ফেরাউন, নমরুদ ও সাদ্দাদ কখনোই আল্লাহ বিশ্বাস করত না। এরা নবীদের হত্যা করেছে। বিশ্বাসী মানুষদের ওপর অত্যাচার করেছে। আল্লাহ নিজেই খোদাদ্রোহীদের শাস্তি দিয়েছেন। খোদাদ্রোহী জাতিকেও আল্লাহ শাস্তি দিয়েছেন। যেমন- সদম ও গোমোরাহ নগরীকে ধ্বংস করে দিয়ে সেসব নগরীর মানুষদের শাস্তি দিয়েছেন। এখনো জগতে ফেরাউনের মতো শাসক আছে। এখনো প্রকৃতির শোধ আছে। জ্ঞানপাপীরা বুঝতে পারে না। তবে একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই, তা হলো মুখোশধারী মুনাফেক। এরা মুসলমান সেজে সমাজে চলাফেরা করে। কিন্তু মুক্তমনের নামে দিনরাত ইসলাম, মুসলমানের বিরুদ্ধে কথা বলে। বাংলাদেশে এ রকম মুনাফেকের সংখ্যা কম নয়। আমরা সমাজে কঠোরভাবে শান্তি রা করতে চাই, কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে বলতে চাই না। মুনাফেকদের আল কুরআনে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এরা কাফেরের চেয়ে খারাপ। এরাই প্রচার করে মাদরাসাশিক্ষা নাকি সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীর জন্ম দেয়। এরাই প্রচার করে খতিব, ইমাম মুয়াজ্জিনরা তেমন লেখাপড়া জানেন না ও করেন না। অথচ ইসলামের ব্যাপারে তাদের অ আ ক খ বিদ্যাও নেই। বাংলাদেশে ইসলামের ব্যাপারে এমন বৈষম্য শক্তিশালীভাবে বিরাজ করছে। এরা জানে না ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে (১৭৫৭-১৮৫৮) আলেমসমাজই সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে। তখন অমুসলমান মুনাফেকরা দখলদার লুটেরা বাহিনীকে সাহায্য করেছে। ’৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়েছে অমুসলমানদের কারণে। ’৭১ সালে মুনাফেকদের কারণেই পাকিস্তানি বেঈমানরা বাঙালি মুসলমানদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে। ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন। সেই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে এক শ্রেণীর অমুসলমান ও মুনাফেক। এদের সমর্থন ও সহযোগিতা করছে প্রতিবেশীরা। আজ এদের কারণেই দর্শনগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ দ্বিধাবিভক্ত। মাত্র ৪৪ বছরের মাথায় বাংলাদেশের এমন হাল করেছে তথাকথিত প্রগতিশীল ও মুনাফেকরা। আল কুরআন না জানার ফলে মুসলমানেরা আজ দ্বিধাবিভক্ত। কুরআন না জানার ফলেই ফারাবী ও অভিজিতের মতো বিভ্রান্ত-বিপথে পরিচালিত তরুণদের জন্ম হয়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, জগতে এখন ইসলামের সহনশীল, উদার, মানবিক ধর্ম আর নেই। এ কারণেই আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারত ও পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের উত্থানের বিরোধিতা করছে। হার্ভার্ডের শিক্ষক নোয়া ফেল্ডম্যান বলেছেন, গণতন্ত্র কায়েম হলে ও অবাধ নির্বাচন হলে উদারপন্থী মুসলমানেরাই জয়ী হবে। পশ্চিমা ধর্মহীন গণতন্ত্র তাই মুসলমানদের ভয় পায়।
এরশাদ মজুমদার
লেখক : কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com

কাউন্সিলর পদ নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য! by শাহেদ চৌধুরী

তফসিল ঘোষণার আগেই ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা বাছাইয়ে মনোনয়ন-বাণিজ্য শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় নেতাদের সমর্থন পেতে রীতিমতো দৌড়ঝাঁপও শুরু করেছেন। একাধিক সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক এমপি-মন্ত্রী মনোনয়ন-বাণিজ্যে মশগুল। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মহানগর কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে আগ্রহী মাঝারি সারির এক নেতাও। আওয়ামী লীগের দুটি সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
ডিসিসি নির্বাচনে উত্তর ও দক্ষিণ- দুই অংশের মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রাথমিকভাবে ঠিক করা হয়েছে। এদিকে, কোমর বেঁধে মনোনয়নপ্রাপ্তির লড়াইয়ে নেমেছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মন্ত্রী-এমপিদের বাসাবাড়ি তো বটেই, সংশ্লিষ্ট নেতাদের অফিস-আদালতেও ধরনা দিচ্ছেন তারা। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনেক নতুন মুখের আনাগোনাও বেড়েছে। পরিচয় জানতে চাইলেই স্মিত হেসে অবলীলায় জবাব দিচ্ছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন চান তিনি। তাদের কারোই দলীয় পদপদবি নেই।
মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং অবৈধভাবে বাড়ি-জমি দখলদার থেকে শুরু করে সামাজিক অপরাধীরাও ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে দলীয় সমর্থন পেতেমরিয়া হয়ে উঠেছেন।
এ ব্যাপারে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী 'নেতাদের' সঙ্গে যোগাযোগ করছেন দালালের মাধ্যমে। ওই দালাল চক্র দলের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে। পুরান ঢাকার একজন নেতার নাম ভাঙিয়েও সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে যোগ্য দলীয় প্রার্থী খুঁজে বের করার কাজেও আর্থিক সম্পৃক্ততার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কথিত 'নবাগত'দের কারণে পিছিয়ে পড়ছেন ত্যাগী, সৎ ও পরীক্ষিত অনেক নেতাকর্মী। বিপাকে পড়েছেন দলের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনাররাও। তারা না পারছেন চিহ্নিত নেতার হাতে টাকার বান্ডিল গুঁজে দিতে, না পারছেন ওই নেতাদের ইঙ্গিতপূর্ণ চাহনি এড়িয়ে যেতে। তারা আকার-ইঙ্গিতে 'সুবিধা' চাইছেন।
সম্মেলন হলেও মহানগরসহ থানা ও ওয়ার্ড কমিটিগুলো এখনও গঠন করা হয়নি। ডিসিসি নির্বাচনের পর এসব কমিটি ঘোষণার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই মনোনয়ন-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাদের নাম বলে কেউই দলের পদপদবি লাভের সুযোগ হারাতে চাইছেন না। অবশ্য অনেকেই আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন, মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েই চিহ্নিত নেতাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন তারা। ওই সব নেতা যে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন, তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই। এর পরও দলের বড় পদে থাকায় ওই নেতারাই হয়ে উঠছেন আগ্রহী প্রার্থীদের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।
কয়েকজন নেতা মনে করেন, বিএনপি ডিসিসি নির্বাচনে আসছে না- এমনটি ধরে নিয়েই আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভিড় বাড়ছে। দলীয় সমর্থন জুটিয়ে দিতে না পারলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটি এক ধরনের জুয়া। লাগলে লাগল, না লাগলে কী আর করা!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা সমকালকে বলেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সমর্থন নিয়ে দলের ভেতরে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা বিরাজ করছে। সব ওয়ার্ডেই একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী থাকায় এবং বেশির ভাগই অর্থকড়ি দিয়ে দলীয় সমর্থন লাভে সচেষ্ট হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে বড় ধরনের ঝামেলা তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।
মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিষয় ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি অবশ্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা বাছাইয়ের বেলায় কোনো ধরনের ভূমিকা না রাখার জন্য দুই সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও আনিসুল হককে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের ওপর একটি জরিপও করিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাইয়ের তাগিদও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মেয়র পদে দক্ষিণ ঢাকার সম্ভাব্য প্রার্থী মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এবং উত্তর ঢাকার প্রার্থী আনিসুল হকও একই মনোভাব পোষণ করছেন।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজ সমকালকে জানিয়েছেন, দল-সমর্থিত প্রার্থী বাছাইয়ের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগর নেতাদের বৈঠকে ডাকবেন। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ বৈঠক হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই-বাছাই করার কাজ শেষ হয়েছে। প্রার্থিতা বাছাইয়ের বেলায় মনোনয়ন-বাণিজ্য প্রসঙ্গ উঠলে এম এ আজিজ বলেন, এ ধরনের কোনো বিষয় তার জানা নেই। তারা এখন গ্রহণযোগ্য ও ভালো প্রার্থী খুঁজছেন।
ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের বাছাই প্রক্রিয়া এবং মনোনয়ন-বাণিজ্য নিয়ে জানতে চাইলে টেলিফোনে কোনো মন্তব্য করতে চাননি মহানগর সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম। তিনি গতকাল রোববার তার নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুরে ছিলেন।

এফবিআইয়ের হাতে ১০ সন্দেহভাজনের নাম

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১০ সন্দেহভাজনের নাম তদন্তে সহযোগিতা করতে আসা এফবিআইয়ের হাতে দিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তারকৃত ফারাবির মতো এই ১০ জনও বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। ফারাবীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ফারাবীর ফেসবুক-ব্লগ এবং অভিজিতের ফেসবুক ঘেঁটে এসব তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ফেসবুকে বিভিন্ন পরিচয়ে দেয়া এসব হুমকিদাতার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফেসবুক থেকে তথ্য সংগ্রহের এই কাজে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সহায়তা করছে এফবিআই। এছাড়া গতকাল এফবিআইয়ের চার সদস্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ক্রাইম সিন দলের সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। ঘটনার পরপরই সিআইডির ক্রাইম সিনের একটি টিম ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহের পর পরীক্ষা করছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম জানান, দশ সন্দেহভাজনের একটি তালিকা করা হয়েছে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিচয় সনাক্তের পর তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনের তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ ও বৃহস্পতিবার থেকে তদন্তে সহযোগিতা করতে আসা এফবিআই ধারণা করছে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনও উগ্রপন্থি দলই জড়িত। এ কারণে উগ্রপন্থিদের সামনে রেখেই চলছে তদন্ত। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিজিৎকে গত ৩-৪ বছর ধরেই বিভিন্ন উগ্রপন্থিরা হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। এই তালিকায় ছিল গ্রেপ্তারকৃত ফারাবী। ফারাবীর কাছ থেকে নেয়া তথ্য ও তার ফেসবুক-ব্লগ ঘেঁটে সন্দেহভাজনের তালিকা করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে যে আলামত উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে একটি কালো ব্যাগের ভেতর অন্যান্য আলামতের সঙ্গে একটি ইনজেকশন পাওয়া গিয়েছে। ইনজেকশনের সঙ্গে ‘এন্টি ক্লটিং’ অ্যাম্পুলও ছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ইনজেকশন দেয়া হলে ক্ষত থেকে রক্ত বেরোনো বন্ধ করা যায় না। খুনিদের পরিকল্পনা ছিল যদি অভিজিতের মৃত্যু ছুরিকাঘাতে না হয় তাহলে ইনজেকশন পুশ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে মিরপুরের মণিপুর স্কুলের দুই শিক্ষককের হত্যা চেষ্টায় আটককৃতদের কাছেও একই ধরনের ইনজেকশন পাওয়া গিয়েছিল। ওই দুই শিক্ষকদ্বয়ের বিরুদ্ধে এক স্কুলছাত্রীর হিজাব পরা নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ ছিল। এছাড়া কালো ওই ব্যাগে ডেটলসহ ‘ফাস্ট এইডে’র প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল। যাতে হামলাকারীরা কেউ আক্রান্ত হলে তারা সহজেই ফাস্ট এইড নিতে পারে।
সিআইডিতে এফবিআই: এদিকে গতকাল দুপুরে এফবিআইয়ের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল উইলিয়াম ফ্রাঙ্ক, ড্যান ক্লেগ, জাগদি সিং খাংগুরা ও ক্রিস্ট সিআইডির ক্রাইম সিনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রায় ঘণ্টা খানেক তারা সিআইডি কার্যালয়ে অবস্থান করেন। এসময় তারা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণ করেছেন। মামলার অন্যতম তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির (দক্ষিণ) উপ-পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর সংগৃহীত আলামত আমেরিকায় নিয়ে পরীক্ষা করা হতে পারে। এ বিষয়ে আদালতের অনুমতি নিয়েই পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘এছাড়া অভিজিৎ রায় যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, ভবিষ্যতে এফবিআই চাইলে তাদের নিজ দেশেও এই ঘটনায় মামলা করতে পারে। তারা তখন যদি আমাদের সহায়তা চায়, আমরা করব।’ তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন গ্রুপ ও লোকজনের প্রতি নজরদারি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় অপর একজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করা হয়েছিল। হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতার কোনও তথ্য-প্রমাণ না থাকায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়ছে by জাহাঙ্গীর শাহ

মানসুরা বেগমের মাথায় পাথরের ঝুড়ি তুলে দিচ্ছেন সহকর্মী কামাল হোসেন।
প্রতি ঝুড়ি পাথর বয়ে নিয়ে ফেলার জন্য মানসুরা পান দুই টাকা করে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের
বছিলা বেড়িবাঁধ থেকে ছবিটি তুলেছেন সাবিনা ইয়াসমিন
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা—অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। অর্থনীতিতে নারীর আরেকটি বড় সাফল্য হলো, উৎপাদনব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।
মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উৎপাদন খাতের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেকই এখন নারী। এ খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে নারী ২২ লাখ ১৭ হাজার। তবে নারী কর্মীদের সিংহভাগই শ্রমজীবী। বাকিদের মধ্যে কেউ উদ্যোক্তা, কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ নির্বাহী ও উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থনীতির ভাষায় বলা হচ্ছে, এই নারীরা অর্থনীতির সক্রিয় কর্মী (ইকোনমিক্যালি অ্যাকটিভ)। তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য মজুরি বা বেতন পান। আবার এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে মূল্য সংযোজন অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন।
বছরে দুই লাখ নারীর কর্মসংস্থান: ২০১০ থেকে ২০১৩—এ তিন বছরে প্রায় ছয় লাখ নারী কাজ পেয়েছেন। প্রতিবছর গড়ে দুই লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে যুক্ত হচ্ছেন। কর্মসংস্থান, শ্রমবাজার নিয়ে বিবিএসের সমীক্ষার প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, ২০১০ সালে দেশের ১ কোটি ৬২ লাখ নারী কোনো না কোনোভাবে কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০১৩ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখে।
কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকের বেশি কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। বিবিএস বলছে, বর্তমানে কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। এ ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করেন যথাক্রমে ৪০ লাখ ৯০ হাজার এবং ৩৭ লাখ নারী। বিবিএসের হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ নারী-পুরুষ কোনো না কোনোভাবে কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন। উল্লেখ্য, সপ্তাহে কমপক্ষে এক ঘণ্টা কাজ করেন এমন ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয় না।
শিক্ষক, নির্মাণকর্মী, বিজ্ঞানী, ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী— প্রায় সব পেশাই বেছে নিচ্ছেন নারী। এমনকি এখন পেশা হিসেবে গৃহকর্মকেও বেছে নিচ্ছেন তাঁরা। বিবিএসের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে নয় লাখ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বিনোদন ও শিল্পকর্মেই জড়িত আছেন প্রায় নয় হাজার নারী। এ ছাড়া ব্যাংক-বিমার মতো আর্থিক খাতে কাজ করেন ৭০ হাজার নারী। আর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন সাড়ে ছয় লাখ নারী। সেবা ও শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার নারী দায়িত্ব পালন করছেন।
কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিক বেশি: উৎপাদন খাতই যেকোনো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। শ্রমঘন এই খাতে এ দেশের নারীদের অংশগ্রহণ বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। বিশেষ করে পোশাক কারখানায় লাখ লাখ নারী কর্মী কাজ করছেন।
উৎপাদন খাত নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বিবিএসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে এক লাখ বেশি নারী শ্রমিক কাজ করেন। বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে ২১ লাখ ১ হাজার ৮৩০ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন। পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫৭ জন।
তবে একই সমীক্ষা অনুযায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে এখনো নারীরা পিছিয়ে রয়েছেন। দেশের মোট ২ হাজার ১৭৭টি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ কারখানার মালিক নারী। দেশে ৪২ হাজারের বেশি কলকারখানা রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় নিয়োগকারীরা শিল্পশ্রমিক হিসেবে নারীর জোগানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন না। কিন্তু পোশাকশিল্পে নারীর বিপুল অংশগ্রহণের পর থেকে অন্য শিল্পোদ্যোক্তারাও সহজলভ্য শ্রম হিসেবে নারী শ্রমিক নিয়োগের কথা ভাবতে পারছেন।
কর্মজীবী নারীরা শুধু বাইরে কাজ করেন তা নয়। রান্নাবান্না, শিশু পরিচর্যাসহ গৃহস্থালির কাজও করেন। পুরুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি সময় ধরে গৃহস্থালির কাজ করেন নারীরা, কিন্তু এর জন্য কোনো মজুরি পান না। গত বছর প্রকাশিত বিবিএসের ‘সময় ব্যবহার’ জরিপে দেখা গেছে, কর্মজীবী একজন পুরুষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থের বিনিময়ে ৬ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট কাজ করেন। আর নারীরা ৫ ঘণ্টা ১২ মিনিট কাজ করেন। তবে একজন কর্মজীবী নারী বাসায় এসে দৈনিক গড়ে ৩ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট গৃহস্থালির কাজ করেন। আর পুরুষেরা ঘরের কাজে গড়ে মাত্র ১ ঘণ্টা ২৪ মিনিট সময় ব্যয় করেন।
কিন্তু রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালনসহ গৃহস্থালির কাজকর্মের স্বীকৃতি নেই মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি)। এই শ্রমের আর্থিক মূল্যমানও নির্ধারণ করা হয় না। এর ফলে অর্থনীতিতে নারীর এ কাজের অবদান আড়ালেই থাকছে। বাংলাদেশে ১ কোটি ৬ লাখ লোক গৃহস্থালির কাজ করেন। তাঁদের সিংহভাগই নারী।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি রোকিয়া আফজাল রহমান মনে করেন, আগে মেয়েদের কাজ করার বিষয়ে পারিবারিক বাধা ছিল। কিন্তু এখন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মেয়েরা শহরে এসে কাজ করছেন। তাঁদের বেতন-ভাতা গ্রামে পাঠিয়ে পরিবারে স্বাচ্ছন্দ্য আনছেন। এতে নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনও এসেছে। তিনি বলেন, কর্মজীবী নারীর হাতে টাকা থাকায় প্রসাধনসামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। এ জন্য বিপুলসংখ্যক কারখানা তৈরি হয়েছে।
এই নারী উদ্যোক্তার অভিমত, ৯৭-৯৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাই ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেন, যা একটি বিরাট সাফল্য। প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদাভাবে শিল্প প্লট বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করেন তিনি।