Wednesday, May 8, 2013

সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তেও অন্ধকার

সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে আলোর ক্ষীণ রশ্মি দেখা দিয়েছিল। দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে প্রধান দুটি দলের সংলাপের উদ্যোগে জনগণ আশ্বস্ত হয়। তবে এতেও আগাম অবস্থান নির্ধারণ কিংবা শর্ত আরোপের ফলে সাফল্য সম্পর্কে সংশয়বাদী অনেকেই। কিন্তু জনগণ চায় একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা তিক্ততায় পরিপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ সমাধানে রাজনীতিকেরা সাম্প্রতিক কালে কোনো সাফল্যের ছাপ রাখেননি। তাই সংশয়বাদীদেরও দোষ দেওয়া যাবে না। সত্যি সত্যি দেখা গেল, সে ক্ষীণ রশ্মি আবার বিলীন হয়ে গেছে গভীর তমসায়। প্রধান বিরোধী দল একটি সময়সূচি দিয়ে সরকারকে তাদের দাবি মেনে নিতে বলছে। অন্যদিকে সরকারও তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। তাহলে কি আমাদের জন্য সামনে রয়ে গেল সংঘাতের রাজনীতি? অথচ আমাদের এ স্বপ্নলব্ধ দেশটিতে এরূপ গোল বাধার কোনো কারণ ছিল না। এখানে অতি অল্প ব্যতিক্রম ছাড়া একই ভাষাভাষী এবং মূলত একই নৃগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী। অন্য কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা সাম্প্রতিক কালে আমাদের জন্য তেমন কোনো গোলযোগই সৃষ্টি করেনি, বরং ক্ষেত্রবিশেষে বিশাল সংখ্যাগুরু অংশের কিছু লোক তাদের অনিষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে গোল বাধল কেন? রবীন্দ্রনাথের ‘হালদার গোষ্ঠী’তেও কোনো সংগত কারণ ছাড়াই গোল বেধেছিল। তাদের ‘অবস্থা স্বচ্ছল, মানুষগুলিও কেহই মন্দ নহে। কিন্তু তবু গোল বাধিল।’ রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘সঙ্গত কারণেই যদি মানুষের সব-কিছু ঘটিত তবে তো লোকালয়টা একটা অঙ্কের খাতার মত হইত, একটু সাবধানে চলিলেই হিসাবে কোথাও কোন ভুল ঘটিত না; যদি বা ঘটিত সেটাকে রবার দিয়া মুছিয়া সংশোধন করিলেই চলিয়া যাইত।’ একই গল্পে তিনি আরও বলেছেন, ‘মানুষের ভাগ্যদেবতার রসবোধ আছে; গণিত শাস্ত্রে তাঁহার পাণ্ডিত্য আছে কিনা জানি না, কিন্তু অনুরাগ নাই; মানব জীবনের বিশুদ্ধ অঙ্ক-ফলটি উদ্ধার করিতে তিনি মনোযোগ করেন না। এই জন্য তাঁহার ব্যবস্থার মধ্যে একটা পদার্থ তিনি সংগ্রহ করিয়াছেন, সেটা অসংগতি। যাহা হইতে পারিত সেটাকে সে হঠাৎ আসিয়া লন্ড ভন্ড করিয়া দেয়। ইহাতেই নাট্যলীলা জমিয়া উঠে, সংসারের দুই কূল ছাপাইয়া হাসি কান্নার তুফান চলিতে থাকে।’ হয়তো বা এ অসংগতির জন্যই আমাদের দেশটিতে আজ চারদিকে হানাহানি। কেউ কারও কোনো কথা শুনছে না বা মানছে না। যেমন কমলবনে মত্তহস্তী সবকিছু উলটপালট করে দিতে সচেষ্ট। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের প্রিয় দেশটি আজ বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করছে। হরতাল, অবরোধ আর এগুলোর আনুষঙ্গিক সংঘাত আজ প্রায় প্রাত্যহিক ব্যাপার। এর ক্ষতিকর দিক সবার জানা। এটা সবারই জানা, কীভাবে আজকের এ সংকট আমাদের ওপর চেপে বসেছে। ১৯৯১-এ দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে আজতক কোনো জাতীয় ইস্যুতে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থান এ সংকট সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা রেখে চলছে। তারা ক্ষমতায় থাকলে যে মতামত দেয়, বিরোধী দলে গেলে নেয় এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান। তাই নানা আকৃতি আর প্রকৃতিতে এ ধরনের সংকট দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিকূলে ভূমিকা রেখে চলছে। তারা মুখে বললেও প্রকৃতপক্ষে ন্যূনতম রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করছে না বলেই অনেকে অভিযোগ করেন। এ সময়কালে সরকারগুলো নির্বাচিত, সন্দেহ নেই। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কিন্তু সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক নয়। ১৯৯১ থেকে এযাবৎ সময়ে সময়ে যেসব সংকট বড় হয়ে দেখা দেয়, সেগুলো সহজ পথে সমাধান হয়নি। আজকের সরকারি দলটির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলনকে উপেক্ষা করে এখনকার বিরোধী দল ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন একতরফা একটি নির্বাচন করে, তখন আন্দোলনের মুখে দেশের শাসনব্যবস্থা অচল হয়ে যায়। তখনকার সরকার (আজকের বিরোধী দল) বাধ্য হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে। এর আগেই দেশি-বিদেশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সমঝোতার প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি ব্যর্থ হয়েছিল কমনওয়েলথ মহাসচিবের আনুষ্ঠানিক প্রচেষ্টাও।
২০০১-এ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। গোল বাধে আবার ২০০৬-এ। তখন আজকের বিরোধী দল ক্ষমতায়। তারা নানা কারসাজি এবং শেষতক রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে ক্ষমতা ছাড়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্রপতি ও নির্বাচন কমিশন নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান প্রমাণে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এবারও ব্যর্থ হয় দেশি-বিদেশি সব সমঝোতা প্রয়াস। ফলে আসে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত এক-এগারো। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় দুই বছরের বিরতি পড়ল। তবে দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি হলো সব ভোটারের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র। ২০০৯-এর সূচনায় ক্ষমতায় এল বর্তমান সরকার।
সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলবে মনে করা হলো। সংবিধানের কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় কমিটি হয়েছিল। সেখানে সব দলমতের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে সুপারিশ করা হয়। এর মাঝে সুপ্রিম কোর্ট এক বিভক্ত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেন। তবে তাঁদের প্রথম সংক্ষিপ্ত আদেশে পর পর দুটি নির্বাচন কিছু সংস্কার সাপেক্ষে এ ব্যবস্থায় করা যাবে বলে মতামত দেওয়া হয়েছিল। এসব মতামতের প্রতি কোনো মর্যাদা না দিয়ে, এমনকি নিজেদের পূর্বাবস্থানের বিপরীতে গিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া রদ হয়ে যায়। পরিণতিতে দফায় দফায় আসতে লাগল হরতাল আর অবরোধ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতা কী ছিল, তা দেশবাসীর স্মৃতিতে আজও অম্লান। এটাও ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়, সে প্রাসঙ্গিকতা এখনো অপরিবর্তিত।
উল্লেখ্য, ২০১০-এর শুরুর দিকে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হলে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির এর বিরোধিতা করতে থাকে। ২০১২-এর শেষ দিক থেকে তাদের আন্দোলনও তীব্রতা পায়। তারা বিচার-প্রক্রিয়া বাতিল এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি করছে। প্রধান বিরোধী দল সূচনায় বিষয়টি একটু এড়িয়ে চললেও একপর্যায়ে এসে বিচারে নিরপেক্ষতা না থাকার অভিযোগ করে ওই দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ে। আন্দোলনে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকে ব্যাপক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে শাহবাগকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মের একটি আন্দোলন সূচনায় ব্যাপক সাড়া জাগায়। তাদের দাবি, এসব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দণ্ড দিতে হবে। বেআইনি ঘোষণা করতে হবে জামায়াত ও শিবিরকে। এ আন্দোলনের সঙ্গে বেশ কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনও একাত্মতা ঘোষণা করে।
আবার গত মার্চ মাসে এসে হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন শাহবাগকেন্দ্রিক আন্দোলনের বিপরীতে অবস্থান নেয়। তারা দাবি করে, এ আন্দোলনকারীদের মাঝে বেশ কিছু নাস্তিক ব্লগার রয়েছে। এটা বন্ধ ও নাস্তিক ব্লগারদের সাজা দেওয়ার দাবিও তারা করতে থাকে। এ ছাড়া তারা দেশে ব্লাসফেমি আইন চালুসহ আরও কতিপয় দাবিতে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ, অবরোধ ও হরতাল করেছে। রাজধানীতে তাদের সাম্প্রতিক অবরোধকালে যে সহিংস তাণ্ডব দেখা গেল, তা ভয়াবহ। সরকার শক্তি প্রয়োগে এবারের মতো তাদের হটিয়েছে। কিছু ইসলামি সংগঠন অবশ্য তাদের বিপরীতেও অবস্থান নিয়েছে। এর মাঝে সরকার কয়েকজন ব্লগারকেও অন্যদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও মামলা দায়ের করেছে। এই ঘটনাবলির ফলে দেশের সংকট আজ বহুমুখী।
এ সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশের সুশীল সমাজ প্রধান দুটি দলকে একটি সমঝোতার জন্য ক্রমাগত তাগিদ দিচ্ছে। একই পরামর্শ দিচ্ছে আমাদের উন্নয়ন-সহযোগী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। ১০টি আরব দেশের রাষ্ট্রদূতেরাও একত্র হয়ে একটি সমঝোতার প্রয়াস নিয়েছেন বলে সংবাদপত্রে দেখা যায়। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত এ দেশের বিরাজমান সহিংসতার জন্য হতাশা ব্যক্ত করেছেন। দেশের সব শ্রেণীর মানুষ চায় এ সংকট থেকে সফলভাবে উত্তরণ। তবে আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের জেদ, তাদের অবস্থান থেকে কোনো রূপ ছাড় না দেওয়ার ঐতিহ্য লক্ষ করলে আমরা আশাবাদী হতে পারি না। নেহাত বাধ্য না হলে অতীতে তারা কখনো নিজ অবস্থান থেকে সামান্যতম ছাড় দেয়নি। ফলে মাশুল দেয় এ দেশের জনগণ। জনগণ কিন্তু দেশে গণতন্ত্রই চায়। চায় রাজনীতিবিদদের শাসন। আর রাজনীতি তো সমন্বয় ও আপস করে চলারই শিক্ষা দেওয়ার কথা।
আগামী নির্বাচন আর প্রায় নয় মাস পরে হবে। এ নির্বাচনে যাতে সব দল অংশ নেয় এবং নির্বাচনটি যাতে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এমন একটি ব্যবস্থা কি করা যায় না? প্রধান দুটি দল এ বিষয়ে একমত হলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই সামনে থাকবে না। সূত্র একটা বেরিয়ে আসবে। সে ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল অন্য আন্দোলনগুলোর সঙ্গে এতটা একাত্ম হয়তো বা হবে না বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। কেননা নির্বাচনে তাদের জনগণের কাছে ভোটের জন্য যেতে হবে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর ফলাফল সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে আদালতই নির্ধারণ করতে পারেন। এই বিচারকাজে কোনো পক্ষেরই এমন কিছু করা সমীচীন হবে না, যাতে বিচারকেরা মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে থাকেন।
এই সংকটময় মুহূর্তে আপসের বিকল্প কী আছে, তা বোধগম্য নয়। প্রধান বিরোধী দলকে বাদ রেখে নির্বাচন করে সংসদ ও সরকার কি স্থিতিশীল হবে? অতীত তো তা বলে না। রাজনৈতিক সহিংসতা আরও বাড়ার সম্ভাবনাই থাকবে। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে উভয় প্রধান দল দ্রুত একটি আপস নিষ্পত্তিতে পৌঁছাক—এটাই সবার প্রত্যাশা। জাতি চায় সমাধানটা রাজনীতিবিদদের দ্বারাই হোক। তাই কোনো রূপ পূর্বশর্ত ব্যতিরেকে সংলাপের উদ্যোগ আবার চালু করা হোক। সব বাধা-বিপত্তির অবসান ঘটিয়ে তা সফল হোক—এ আশা আমরা করতে থাকব। আশা করতে থাকব, ভ্রান্ত প্রমাণিত হবে সংশয়বাদীদের আশঙ্কা।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সবার শান্তি ও কল্যাণহোক

বাংলাদেশ ক্রিশ্চিয়ান সমাজের সবার পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি আমাদের আন্তরিক অভিবাদন ও শুভেচ্ছা। বাংলাদেশে ক্রিশ্চিয়ান সমাজ হিসেবে আমরা দেশের আনন্দ ও আশা, দুঃখ ও বেদনার সবকিছুতেই সবার সঙ্গে একাত্ম হয়ে চলেছি। আমরা সর্বদাই আনন্দিত হই, যখন আমাদের প্রিয় দেশ ও দেশবাসীর সম্পর্কে দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্দেশে প্রশংসার কথা শুনে থাকি। ইদানীং ক্রিশ্চিয়ান সর্বোচ্চ ধর্মগুরুরাও আমাদের দেশ ও দেশের সব মানুষের বিষয়ে শুভকথা ব্যক্ত করেছেন এবং শুভ আশীর্বাদ রেখে এসেছেন। আমরাও একই মনোভাব পোষণ করি। দেশের সব মানুষের ব্যাপারে আমাদের শ্রেষ্ঠ গর্ব ও আনন্দ হলো যে, আমাদের দেশের বহু দীন-দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ জীবনের বহুবিধ সংঘাতপূর্ণ বিপর্যয়, ঘাত-প্রতিঘাত, দুঃখ-কষ্টের মাঝে দৃঢ়চিত্তে ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে মানবীয় জীবনের উন্নত মান বহন ও রক্ষা করে পথ চলেছে ও চলতে সমর্থ; দ্বিতীয়ত, বহু শতাব্দী ধরে এ দেশের মানুষ ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্ম ও অন্যান্য ধর্মীয় কৃষ্টির অনুসারী হয়ে এবং বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে সুদৃঢ় সম্প্রীতি ও শান্তিতে জীবনযাপন করে এসেছে। এর মাঝে দেশের সর্বোচ্চ মান ও মর্যাদা নিহিত হয়ে আছে বহু শতাব্দী ধরে। উপনিবেশীয় যুগ অতিক্রম করে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা লাভে ধর্মীয় গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের ফলে রাষ্ট্রে ধর্মীয় গরিষ্ঠতা ও লঘিষ্ঠতার ভাব প্রবিষ্ট হওয়ায় ধর্মীয়, কৃষ্টিগত ও জাতিগত সম্প্রীতি ও শান্তির বিষয়টি অধিক চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা একেক রাষ্ট্র নিজের সামর্থ্য অনুসারে মোকাবিলা করেছে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার চেতনায়, সংগ্রামে ও স্বাধীনতা লাভে আমরা বাংলাদেশে সব ধর্ম, কৃষ্টি ও জাতির মানুষের মাঝে সেই সুপ্রতিষ্ঠিত সম্প্রীতি ও শান্তি সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় আচরণের দিক থেকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করে চলছি। আমাদের জাতিগত আচরণে প্রতিটি ধর্মের মানুষের জন্য নিজ নিজ ধর্ম যথাযথভাবে পালন ও রক্ষা করার কথা সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্তও হয়েছে। এ ধারা চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তবে তা লঙ্ঘনীয় বিষয় নয়। প্রতিটি ধর্ম তার যথার্থ ধর্মীয় শিক্ষা ও আচরণ রক্ষা করবে—এই উদ্দেশ্য উত্তম এবং তার জন্য প্রচেষ্টা চালানো সঠিক বিষয়, এবং তা যথার্থভাবে হলে কখনো অন্যের জন্য ক্ষতিকর না হয়ে; বরং অন্তরে মিলন নিয়ে আসে। দেশে দায়িত্বশীল সব রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ব্যক্তি ও সংগঠন তা মনোযোগসহকারে যেন রক্ষা করে চলে। ইদানীং সার্বিকভাবে ধর্মীয় বিষয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ধর্মের অনুসারী, ধর্মীয় স্থান, বস্তু ও স্বাধীনতা ইত্যাদির প্রতি ক্ষতিকারক আচরণ দেখে আমরা চিন্তিত ও ব্যথিত। এসব আমাদের দেশের সর্বব্যাপী সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ জীবনধারার পরিপন্থী। আমরা এসবের অবসান কামনা করি। আমরা আরও মনে করি, নারী-পুরুষের সাম্য, ধর্মবিশ্বাস অনুশীলনের স্বাধীনতা, অন্যের ধর্মবিশ্বাসে হস্তক্ষেপ বা আঘাত না করা এবং মতপ্রকাশের অধিকার—এগুলো মূল সংবিধানের ভিত্তি। দেশ ও জাতির অগ্রগতির স্বার্থে এগুলো লালন ও পালন করা নিতান্ত প্রয়োজন। আমাদের একান্ত প্রার্থনা, আমরা যেন সবাই রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ইত্যাদি অবস্থানে আমাদের ঐতিহ্যগত সম্প্রীতি ও শান্তি রক্ষা করে চলি। আমাদের দেশের বহু দীন-দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জন্য জীবনের মান সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিষয়টি মনোযোগে রাখা একান্ত প্রয়োজন। দেশের ও বহির্বিশ্বের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাদের দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা ভাইবোনদের উন্নয়নের পক্ষ নিচ্ছেন দেখে আমরা আশ্বস্ত হই। দেশের পোশাকশিল্পে বিদেশিদের ব্যাপক বিনিয়োগ এবং বিশেষভাবে দরিদ্র যুব ভাইবোনদের কর্মসংস্থান ও জীবনের মানোন্নয়নের বিষয়টি দেশের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছিল। তবে বর্তমানে তা বহুমাত্রিক অন্যায্যতা ও গভীর বেদনার কারণ হয়ে উঠেছে, যা সাম্প্রতিক সাভার ট্র্যাজেডিতে মর্মান্তিক আকারে প্রকাশ পেয়েছে, যা দেশবাসীকে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। এ মুহূর্তে এর আশু সমাধানে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিসকল এবং একই সঙ্গে বহির্বিশ্বের ক্রেতাদের পক্ষ থেকে অধিক মনোযোগী হওয়া ও বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ হলো দেশের রাজনৈতিক শক্তিসমূহের নানা আলোচনা ও কর্মসূচির মধ্যে দেশের দীন-দরিদ্র ও সাধারণ জনগণ কেন্দ্রীয় স্থানে নেই। সব রাজনৈতিক শক্তির মূলে ও কেন্দ্রে যদি সাধারণ মানুষের শুভ শক্তিগুলো, তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিবোধ, আর্থিক জীবনে তাদের কষ্ট-বেদনা, যেমন—শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা, জনমানুষের কল্যাণ ইত্যাদি গণমানুষের ঐকমত্যের বিষয়গুলো প্রধান ও কেন্দ্রীয় ভাবনা হয়ে আসত, তা হলে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেক সংযত হয়ে ফলপ্রসূ ধারায় চলত বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের দেশ কয়েক বছরের মধ্যে স্বাধীনতার ৫০ বছরের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের লক্ষ্যে পথ চলছে। দেশের মানুষের সর্বাঙ্গীণ ও সর্বজনের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যগত সম্প্রীতি ও শান্তি এবং আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনের মান সংরক্ষণ। এই সম্পদকে আরও অধিক পরিমাণে সমৃদ্ধ করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ মাথা উন্নত করে চলমান থাকতে পারে। আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি রোজারিও: সিএসসি, ঢাকার আর্চবিশপ, সভাপতি, সম্মিলিত চার্চ ফোরাম, বাংলাদেশ (সিবিসিবি, এনসিসিবি, এনসিএফবি)।

গডফাদার ও তাঁদেরধর্মপুত্ররা

‘রানা’রা এখন বাংলাদেশের আঞ্চলিক রাজপুত্র। নেপালের সাবেক রাজপরিবারের যে পুত্রটি ‘রাজা’ হন, তাঁর উপাধি হয় রানা। রাজপুত ভাষায়ও রানা মানে রাজপুত্র বা রাজা। আমাদের রানারা সাধারণ ঘরেই জন্মান। কিন্তু ‘রানা’ নামের সার্থকতা প্রতিষ্ঠা তো আর সাধারণ যোগ্যতায় হয় না। যাঁর ঔরসে তাঁদের জন্ম তিনি জন্মপিতা, আর যাঁর আশ্রয়ে তাঁদের প্রতিষ্ঠা তিনি ধর্মপিতা বা গডফাদার। একদা ইতালি গডফাদারদের স্বর্গরাজ্য ছিল। আইনকানুনের তেমন বালাই ছিল না। সে সময়ই ইতালি দেশে কথা চালু হয়, দুনিয়াটা এতই কঠিন জায়গা যে লোকের আর একটা ফাদার হলে চলে না, গডফাদারও লাগে। সে সময়ের ইতালির সঙ্গে এ সময়ের বাংলাদেশের মিলের মধ্যে বড় মিল হলো, এখানেও কিছু বীরপুঙ্গব জন্মান, যাঁরা আর বাপের সন্তান থাকতে রাজি নন, গডফাদারের ধর্মপুত্র হওয়ার সাধনায় নামেন। এই সাধনায় অনেক পরীক্ষা দিতে হয় তাঁকে। গডফাদার নেতার জয়ধ্বনি দেওয়া মিছিল নামাতে হয়, তাঁর হয়ে মারামারি করতে হয়, গডফাদারের গোপন ব্যবসার খুঁটি হতে হয়। বিনিময়ে ধর্মপুত্র ছাত্রনেতা থেকে যুবনেতা হন। যুবনেতা থেকে জননেতা করার আশ্বাসও দেওয়া হয় তাঁকে। গডফাদার ও তাঁর ধর্মপুত্রদের জোড়া লাগানোর রসায়ন হলো বিশ্বাস আর আনুগত্য। গডফাদার প্রতিশ্রুতি দেন, ধর্মপুত্রকে তিনি ক্ষমতার উচ্চ নম্বরের সিঁড়িতে টেনে তুলবেন, প্রতিষ্ঠা দেবেন; সেখান থেকে পড়ে গেলে রক্ষাও করবেন। একদিন জনগণ দেখতে পায়, গডফাদার প্রকাশ্যে রানার কপালে চুম্বন করে সন্তানের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। রানাদের জীবনে সেই দিনটা পরম সুখের আর গর্বের। তারপর একদিন যখন নিজের পাপের ভবনের নিচে নিজেই চাপা পড়ে থাকেন, তখন সবার আগে গডফাদারই আসেন তাঁকে উদ্ধার করতে। লোকচক্ষু আর মিডিয়ার শক্তিশালী ক্যামেরার দৃষ্টি থেকে এত দূর নিয়ে যান যে রানা পাখি হয়ে উড়ে যান একেবারে সীমান্তের দিকে। এ রকম অনেক ‘রানা’ই এভাবে বিপদে পড়ে উড়ে গেছেন বিভিন্ন দেশে। মাঝেমধ্যে রাষ্ট্রীয় খাঁচায় ঢোকা বা বিদেশে পলায়ন করা রানাদের কাজের অংশ। সেখানেও গডফাদারের লম্বা হাত তাঁকে ভরসা দেয়। প্লাস্টিকম্যানের মতো সেই লম্বা হাত থানা থেকে আদালত, মিডিয়া থেকে মন্ত্রণালয়—সবখানেই পৌঁছায়। এভাবে কোনো রানা যদি বা বন্দীও হন, গারদের ভেতর তাঁরা দিন গোনেন, একদিন গডফাদার আসবেন, একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবেন। দূর আকাশের বিদেশ পানে খুশিতে বেড়াবেন। পাঠক, আগে দেখে আসি রানার যৌবনকালটা। মার্কিন সাময়িকী কাউন্টারপাঞ্চে প্রবাসী মার্কিনঅধ্যাপক বিজয় প্রসাদ লিখেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সোহেল রানা খুবই নাম-ডাকওয়ালা চরিত্র। ছোটবেলায় তাকেই তো দেখি রাস্তার কোণে দুর্ধর্ষ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। চাঁদার জন্য হুমকি দিত আবার চাঁদা পেলে দেখেও রাখত। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো বিশ্বায়নের চুক্তিতে ঢুকলে, পাড়ার মাস্তান সোহেল রানা অফিস খোলে। সেখানে সাইনবোর্ড ওঠে: ল্যান্ড ডেভেলপার অথবা ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ইত্যাদি। সস্তা পোশাক ছেড়ে গায়ে চড়ায় দামি ব্র্যান্ডের পোশাক। ধারালো ইমেজের জানান দিতে বাড়িয়ে ধরে চমৎকার বিজনেস কার্ড। তাদের মাস্তানিবিদ্যা ভাড়া নেয় বড় রাজনৈতিক দলগুলো। তারা হয়ে ওঠে দলের যুবসংগঠনের নেতা, জনসভায় জোগান দেয় মানুষ আর কেনে বস্তির ভোট। বাজার অর্থনীতি জেঁকে বসলে এসব পাড়ার মাস্তান রিয়েল এস্টেট ব্যবসা খুলে বসে। গায়ের জোরে বা সামান্য মূল্যে সাধারণ মানুষের জমি হাতিয়ে নেয় কিংবা গডফাদারদের ছত্রচ্ছায়ায় অন্যের জমি দখল করে। এসব জমি তারা প্লট করে বিক্রি করে কিংবা তার ওপর বানায় আলিশান ভবন। সে তখন যাতেই হাত দেয়, সেখান থেকেই টাকা বানায়। এই টাকা দিয়ে নতুন রানাদের পোষে। নিজের অঞ্চলে সে নিজেই রাজপুত্র। এলাকাই তার সব।’ সেখানে তিনি তাঁর নাম সার্থক করেন। এভাবে যদি তাঁর ভবন না ধসে, যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে মারতে না পারে, যদি কখনো জনগণের বিদ্রোহে তাঁর পতন না হয়; তাহলে রাজপুত্র রানা আঞ্চলিক রাজা হয়ে ওঠেন। গডফাদারের ধর্মপুত্ররা এভাবে একদিন নিজেই গডফাদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দুর্ভাগ্য রানার যে গডফাদার হয়ে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তেই নিজেরই পাপের সৌধ তাঁর ওপরই ধসে পড়ল। সাভারের ‘রানা’ তাই আমাদের সমাজের সাবেকি মাস্তান চরিত্রের ধনকুবের নেতা হয়ে ওঠার কাহিনি। এক রানা কারাগারে হলেও আরও অনেক রানা যে বহাল তবিয়তেই আছেন, তা জানিয়েছেন আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী। দুই দিন আগে তিনি বলেছেন, ‘শুধু সাভারের রানা নয়, দেশে আরও অনেক রানা রয়েছে।’ ইদানীং মন্ত্রীরা যা-ই বলেন, মানুষ হাসে নয়তো রাগে। এ রকম দিনে শুধু যোগাযোগমন্ত্রীর কথাটাই গম্ভীর। গম্ভীর হয়েই আমরা ভাবতে পারি, দেশে যদি অনেক রানা থাকেন, তাহলে তাঁদের পেলেপুষে বড় করার জন্য নিশ্চয়ই অনেক মুরাদ জং আছেন। যেমন নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যার প্রতিবাদ সমাবেশে প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে হুমকিদাতা ক্যাঙ্গারু পারভেজের জন্য আছেন এক সিনেম্যাটিক গডফাদার। সেই গডফাদারের জন্যআছেন আরও বড় কেউ। বাংলা সিনেমার নায়ক একদা গেয়েছিল ‘আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার’। আজকের রানারা, ‘আছেন আমার গডফাদার। তিনিই আমায় এনে দেবেন মন্ত্রী আর মিনিস্টার’। আশির দশকের পাড়ার মাস্তানরা সবাই হুমায়ূন আহমেদের বাকের ভাইয়ের মতো ট্র্যাজিক গল্প জন্ম দিয়ে হারিয়ে যাননি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে তাঁদের অনেকে গডফাদার ধরে ‘রানা’ হওয়া শুরু করেন। যুগটাই ছিল তেমন। হইহই করে মুক্তবাজার, বিশ্বায়ন ইত্যাদি চলে এল দেশে। একদিকে ভূমিহীনতা অন্যদিকে বাণিজ্যিকতা বাড়তে থাকল। প্রচুর কোটিপতি দাঁড়িয়ে গেলেন। ভূমি-নদী-জলা-বন-পাহাড় ইত্যাদি দখলের হিড়িক লাগল। ঋণখেলাপ করে ধনী হলে যখন শাস্তি হয় না, তখন আর লজ্জা করে লাভ কী? নগরে ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার হলো, মফস্বলে ঢুকে গেল ফুটানি কালচার। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো পানির দামে বেচা হতে থাকার তালে বেকার শ্রমিকেরাও বাতাসের দরে বিকোতে থাকলেন। গ্রাম-শহরের গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের দাম এতই পড়ে গেল, পোশাকশিল্পে কিংবা বিদেশের শ্রমদাসত্বে খাটানোও সস্তা হয়ে গেল। অফুরান জনশক্তি ব্যয় হলো ধনিক শ্রেণী তৈরির কাছে। সে সময়ই হিন্দি চ্যানেলে অমিতাভ বচ্চন গমগমে কণ্ঠে ডাক দিলেন, ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’! অনেকেই সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বড়লোক হওয়ার রাস্তা ধরলেন। সে সময়ের অনেক তরুণের মনের গোপন বাসনায় এক্স-রে করলে দেখা যেত, মনের ভেতর সবারই শ্রেণীহীন বড়লোকি বাসনা। দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে পাওয়া কালোটাকার ছড়াছড়ি অর্থনীতিতে। ফরমাল অর্থনীতি আর প্রকাশ্য রাজনীতি ঝোলের ওপরের তেলের মতো ভেসে থাকল বটে, কিন্তু তলার মাছ-মাংস হয়ে উঠল ইনফরমাল অর্থনীতি ও রাজনীতি। চোরাকারবার, ভূমিদস্যুতা, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, জনগণের বা সরকারের সম্পদ লুণ্ঠনের কারবার অবাধ হলো। অর্থনীতি এভাবে লুণ্ঠন-দুর্নীতিনির্ভর হয়ে পড়লে রাজনীতিকে নিয়োজিত করা হলো এসবের প্রতিরক্ষায়। পেশিশক্তি-অস্ত্রশক্তি-দখলশক্তির চাহিদা বেড়ে গেল। এই বিপুল দুর্বৃত্ত ক্ষমতাব্যবস্থার ধাপে ধাপে দরকার হলো বিকল্প নেতার। লুটপাটের রাজনীতি ও অর্থনীতির অশুভ বিবাহের সন্তান হিসেবে সে সময়ই জেলায় জেলায় একেকজন গডফাদার দাঁড়িয়ে গেল। গজিয়ে উঠল অজস্র গডফাদার আর তাদের ধর্মপুত্ররা। তারাই হয়ে উঠল সমাজপতি, রাজনীতির অধিপতি আর অর্থনীতির চালক। গডফাদার মুরাদ জং ও ধর্মপুত্র রানাদের ছাড়া বর্তমান ব্যবস্থা তাই এক দিনও চলতে পারবে না। চলবে না দখলদারি, শ্রমদাস ব্যবসা, সন্ত্রাস-নাশকতা আর জনগণকে দাবিয়ে রাখার রাজনীতি। এমনকি বাংলাদেশের শ্রম, সম্পদ আর প্রকৃতি নিয়ে মুনাফা করতে আসা বহুজাতিক পুঁজিও দেশীয় দোসর হিসেবে জবরদস্ত গডফাদারদের খোঁজ করে। যোগাযোগমন্ত্রীর সত্যবচনের কয়েক দিন আগে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রীও নারায়ণগঞ্জের জনসভায় এলান করেছিলেন যে জেলায় জেলায় গডফাদার আছে। উভয়ই সত্যদর্শন করেছেন বটে, কিন্তু যে ব্যবস্থার তাঁরা সুফলভোগী, যে ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যই তাঁদের রাজনীতি; রানাদের সত্যিকার গডফাদার হলো সেই ব্যবস্থা। রক্তের পিতাকে ত্যাজ্য করা যায় কিন্তু ধর্মপিতাকে ত্যাজ্য করার উপায় কী? ভবনের স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করলে ভবন ধসে না, কিন্তু ব্যবস্থার খুঁটি ধরে ধাক্কাধাক্কি করলে গডফাদার বানানোর পুরো ব্যবস্থাটাই রানা প্লাজার মতো ধসে যেতে পারে। জনগণ কিন্তু তখন উদ্ধার বা ত্রাণ—কোনোটাই এগিয়েদিতে আসবে না। ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ওলেখক। farukwasif@yahoo.com

দুটি টিভি চ্যানেলবন্ধ

নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার আকস্মিকভাবে বন্ধ করার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় সরকারের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের প্রতি এটা আঘাতও বটে। আদালতের নির্দেশের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশে দৈনিক আমার দেশ-এর ছাপাখানায় তালা ঝোলানোর পর সরকার ৬ মের প্রথম প্রহরে ইসলামিক টিভি ও দিগন্ত টিভি বন্ধ করে দিল। সরকার একদিকে দাবি করছে যে তারা বাকস্বাধীনতা ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার প্রতি পুরোপুরি শ্রদ্ধাশীল, অন্যদিকে একের পর এক বিরোধী মনোভাবাপন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দমনমূলক আচরণ করছে।  দিগন্ত টিভির একজন মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী কী কারণে চ্যানেলটি বন্ধ করা হয়েছে, সরকারি কর্তৃপক্ষ তা তাদের জানায়নি। যদিও তথ্যমন্ত্রী উসকানিমূলক প্রচারণার অভিযোগ এনেছেন এবং এই পদক্ষেপকে সাময়িক বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমার দেশ-এর ছাপাখানা বন্ধের কারণ সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত জানানো হয়েছিল। গণমাধ্যম এবং সচেতন সব মহলের উচিত হবে সরকারের এই অগণতান্ত্রিক ও গণমাধ্যমবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দল ও মতের গ্রহণযোগ্য তফাত বজায় রেখেই প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া। কারণ, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এভাবে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা যায় না। সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই তাদের আছে। আমরা যদি ধরেও নেই যে ওই দুটি টিভি চ্যানেল প্রচলিত আইন বা নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে, তাহলেও তাদের কণ্ঠ এভাবে স্তব্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। আজকের যুগে কথিত ‘মৌখিক আদেশে’ মধ্যরাতে সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি জব্দ করার ঘটনা অভাবনীয়। আমরা এসব পদক্ষেপের নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে দুটি টিভির ওপর সরকারের আরোপিত তথাকথিত সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার আবেদন জানাই। একই সঙ্গে সব সংবাদমাধ্যমের কাছেও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। ভুল ও অতিরঞ্জিত তথ্য বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা, যা সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ হতে পারে, তা থেকে অবশ্যই বিরত থাকা উচিত।

আবারও হরতাল

আজ ও আগামীকাল আবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল দিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল। শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে তাদের ভাষায় ‘গণহত্যা’ চালানো হয়েছে এমন অভিযোগে এ হরতালের ডাক দেওয়া হয়েছে। আমরা যেকোনো পরিস্থিতিতে হরতালের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরোধী, আর দেশের বর্তমান দুর্যোগ ও সংঘাত-সহিংসতার পরিস্থিতিতে পর পর দুই দিনের এই হরতাল একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক বলে মনে করি। সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় উদ্ধারকাজ এখনো শেষ হয়নি। গত ২৪ এপ্রিল মর্মান্তিক এই ভবনধসের ঘটনার পর এখনো সেখান থেকে লাশ উদ্ধার হচ্ছে। অসংখ্য লোক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের স্বজনেরা অন্তত লাশটি পাওয়ার আশায় এখনো অপেক্ষা করে আছেন। এ অবস্থায় দুই দিনের এই হরতাল সাভারের চলমান উদ্ধার কার্যক্রম ও দুর্যোগে কাবু এই মানুষগুলোর ওপর বাড়তি এক আঘাত হিসেবেই বিবেচিত হবে। অন্যদিকে গত রোববার হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে রাজধানীতে যে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়েছিল, যার রেশ এখনো কেটে যায়নি। সেদিন ঢাকায় যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তা আমাদের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে। এর প্রতিক্রিয়া দেশের অন্যান্য স্থানেও পড়েছে। সহিংসতা শুরুর পর এ পর্যন্ত ৫০ জনেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে। পরিস্থিতি এখন পুরো শান্ত হয়েছে এমন বলা যাবে না। এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ‘গণহত্যার’ অভিযোগ এনে হরতালের কর্মসূচি নতুন করে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এটা স্পষ্ট যে রাজনৈতিক দাবি আদায় বা গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে সংঘাত ও সহিংসতার একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক ক্ষতি বা জনগণের দুর্ভোগ—কোনো কিছুই আসলে রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় থাকে না। গত কয়েক মাসের নানা রাজনৈতিক সহিংসতা ও হরতাল দেশের সাধারণ মানুষের চরম সর্বনাশ ঘটিয়েছে। এরপর সাভার ট্র্যাজেডি এবং সর্বশেষ হেফাজতের ধ্বংসযজ্ঞ ও সহিংসতা দেশকে কার্যত বিপর্যয়কর এক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। আজ ও আগামীকালের হরতাল এই পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সরকারের আচরণের প্রতিবাদ বা সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ের জন্য সংঘাত ও সহিংসতার পরিস্থিতি সৃষ্টির বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপি ও ১৮-দলীয় জোটের এই হরতাল সরকারের কতটুকু ক্ষতি করতে পারবে, সেটা স্পষ্ট না হলেও এমনিতেই বিপর্যস্ত দেশ ও দেশের জনগণের যে সর্বনাশ করতে পারবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই নোংরা রাজনীতিই যেন এ দেশ ও এর জনগণের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল থেকে ‘ও’ লেভেলের পরীক্ষা শুরু হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষা চাইলেই পেছানো যাবে না। হরতাল ডাকার সময় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কথা কেউ বিবেচনায় নেয় না, এ ক্ষেত্রে নেওয়া হবে এমন আশা কোথায়!আমরা আবারও বলি, গণতান্ত্রিক সমাজে সংলাপ ও আলাপ-আলোচনাই হচ্ছে সব রাজনৈতিক বিরোধ দূর করার পথ। হরতাল ডেকে দেশ ও জনগণের সর্বনাশ করা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করা যায় না।

এবং সমাধান খুঁজতে হবে সংলাপের পথে

এখন প্রশ্ন হলো, এই সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে যে ন্যূনতম কর্মসম্পর্ক থাকা অপরিহার্য, তা গড়ে তোলা যাবে কীভাবে? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা: আলোচনায় বসতে হবে, কথা বলতে হবে। কিন্তু সরকারি দলকে এটা মনে রাখতে হবে, এবারের সংলাপে সরকারি দলের দায় স্মরণকালের অন্যান্য সংকটের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, তারা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করে একতরফা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করে দিয়ে এক গভীর সংকট ও শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। একথা সত্য যে, অব্যাহত আলোচনা ও চর্চার মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দর্শন থেকে গণতন্ত্রের ফারাক হলো, এই ব্যবস্থায় সংলাপের অগ্রাধিকার রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক কাঠামো বহাল থাকলেও সংলাপের অনুশীলন ও চর্চা তেমনটি হয়নি। বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার মূলেও রয়েছে পারস্পরিক অনাস্থা ও সন্দেহ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দেয়ালটি রাজনীতির ক্ষেত্র ছাড়িয়ে বিভিন্ন সামাজিক স্তরেও প্রসারিত হচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তসংযোগের অভাবই এর কারণ। আজ যদি সংসদীয় গণতন্ত্র কার্যকর থাকত, তাহলে হেফাজতে ইসলামের এ ধরনের অবরোধ চাপিয়ে দিতে পারত কি না, তা নিয়ে বেশ জোরালো প্রশ্ন তোলা চলে। এই অবস্থায় সব রাজনৈতিক পক্ষের উচিত, তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয়টি নিয়ে অবিলম্বে আলোচনায় বসা। কোনো কিছু গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়ার ফল যে ভালো হয় না, নিকট-অতীতে তার বহু নজির আছে। সমাজে একজন লোকও যদি একটি মতের অনুসারী হন, তাঁর কথা শোনাই হলো গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, আলোচনার মাধ্যমেই তার সমাধান হতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতার ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং তাকে দ্রুত নাকচ করার রাজনীতি দেশে শান্তি আনবে না। সরকারের উচিত এ মুহূর্তে আলোচনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া। যতটুকু নমনীয়তা তারা এখন দেখিয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা তাদের দিতে হবে। এই সরকারের প্রধান কে হবেন, সে বিষয়ে বিরোধী দলকেও সরকারি দলের মনোভাব মনে রেখেই সাড়া দিতে হবে। অপরাজনীতি সামলাতে হলে নির্বাচনকালীন সরকারের আশু ফয়সালা কাম্য।

দুজনের পদত্যাগের আগে কোনো বিল নয়: বিজেপি

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) হুমকি দিয়েছে, কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল ও আইনমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত পার্লামেন্টে কোনো বিল উত্থাপন করতে দেওয়া হবে না। গতকাল মঙ্গলবার বিজেপির নেতা গোপীনাথ মুন্ডে বলেন, দুই মন্ত্রীর (বানসাল ও অশ্বিনী) পদত্যাগ বা অব্যাহতির ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পার্লামেন্টের কার্যক্রমে বিজেপির অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সুষ্ঠু আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ের নিষ্পত্তির পরই জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা বিল ও ভূমি অধিগ্রহণ বিল নিয়ে আলোচনা হতে পারে। জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিল পার্লামেন্টে শিগগিরই পাস হওয়ার কথা রয়েছে। তবে রেলওয়ে কেলেঙ্কারি ও কয়লাখনি কেলেঙ্কারির ঘটনায় ওই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিজেপি এসব বিলের বিরোধিতা করবে। লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে দলটির পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। দলটির নেতারা বিষয়টি নিয়ে স্পিকার মীরা কুমারের সঙ্গেও দেখা করবেন। রেলওয়ে বোর্ডের একটি নিয়োগের ব্যাপারে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে বানসালের ভাগনে বিজয় সিংলাকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সরকারের তীব্র সমালোচনা করে আসছে বিজেপি। তবে বানসাল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এ ছাড়া অশ্বিনী কুমার কয়লাখনি কেলেঙ্কারিতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারকে চাপের মুখে রেখে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের ব্যাপারে অটল অবস্থান নিয়েছে বিজেপি।

রাশিয়া সফরে গেলেন মার্কিনপররাষ্ট্রমন্ত্রী

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গতকাল মঙ্গলবার রাশিয়া সফরে গেছেন। সফরকালে তিনি সিরিয়ার সহিংসতার প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মতবিরোধ নিরসনের চেষ্টা করবেন। মস্কোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক করার কথা। তবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে দুজনেই পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া বাশারকে পদত্যাগে চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দিতে অস্বীকার করেছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও দেশটি বাশারকে সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি বলেছে, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি তারা নাকচ করেনি। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের বিকল্প বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের বিমান হামলার কয়েক দিন পর রাশিয়া সফরে গেলেন জন।

মিসরে মন্ত্রিসভায় ব্যাপক রদবদল, নয়জননিয়োগ

মিসরে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল করেছেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। তিনি গতকালমঙ্গলবার নতুন নয়জন মন্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনের দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (এফজেপি) দুজন রয়েছেন। মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া এফজেপির দুজন হলেন কূটনীতি বিশেষজ্ঞ আমর দারাগ ও ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ফাইয়াদ আবদেল মোনেইম। দারাগকে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং মোনেইমকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে। এ ছাড়া একই দলের নেতা ইয়াহিয়া হামেদকে বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আএমএফ) কাছ থেকে ৪৮০ কোটি ডলার সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম করতেই মুরসি মন্ত্রিসভায় এই রদবদল এনেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী হিসাম কান্দিলের পদত্যাগসহ আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য নিরপেক্ষ মন্ত্রিসভা গঠনের দাবি জানায়। তবে মুরসি সেই দাবি পূরণে ব্যর্থ হন। সম্প্রতি মিসর বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে মিসর আইএমএফের কাছ থেকে ৪৮০ কোটি ডলার সহায়তার আবেদন করে। আইএমএফ এই সহায়তার শর্ত হিসেবে মুরসিকে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কারের সুপারিশ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সহায়তা পাওয়ার শর্ত হিসেবে সরকার মন্ত্রিসভায় সংস্কার আনলেও এই উদ্যোগ রাজনৈতিক মতৈক্য গঠনে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে না। বিরোধী নেতা আমর মূসা গতকালই এক বিবৃতিতে মুরসির সংস্কার উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, মুসলিম ব্রাদারহুডকে আরও ক্ষমতাসম্পন্ন করার আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, নিকট ভবিষ্যতেই আরও একটি রদবদলের প্রয়োজন হবে।

পূর্ব উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরাল উত্তরকোরিয়া

উত্তর কোরিয়া পূর্ব উপকূল থেকে মাঝারি পাল্লার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা এই তথ্য জানিয়েছেন। তবে পিয়ংইয়ং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক জিয়ন-হাইয়ের বৈঠকের পূর্ব মুহূর্তে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়ায় এ ঘটনা ঘটল। ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকে উভয় নেতা দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। জিয়ন-হাইয়ের আজ বুধবার মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেওয়ার কথাও রয়েছে।গত মাসে উত্তর কোরিয়া পূর্ব উপকূলে মাঝারি পাল্লার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে বলে খবর প্রকাশিত হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো সময় উৎক্ষেপণের জন্য মুসুদান ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে উত্তর কোরিয়া সেগুলো সরিয়ে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সম্ভবত পিয়ংইয়ং তার সর্বোচ্চ সতর্কতা তুলে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিয়েছে। তবে এই ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে তা জানা যায়নি। পূর্ব উপকূল থেকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, আপাত এটা আনন্দের খবর। কিন্তু পিয়ংইয়ং যে অন্যত্র ওই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে না, এখনই তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

গলফ খেলায় পারলেন না ওবামা

মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটরদের কাছে গলফ খেলায় হেরে গেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।গত সোমবার আয়োজিত খেলায় ওবামার সঙ্গে ছিলেন ডেমোক্র্যাট দলের সিনেটর মার্ক উডাল। তাঁদের প্রতিপক্ষ ছিলেন রিপাবলিকান দলের দুই সিনেটর স্যাক্সবি চ্যামব্লিস ও বব ক্রোকার।খেলা শেষে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, গলফ মাঠে সিনেটরদের সঙ্গে দারুণ সময় কাটিয়েছেন ওবামা। এই সময় তাঁদের মধ্যে খেলা নিয়েই কথাবার্তা হয়েছে বেশি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জেই কার্নি বলেন, গলফ খেলা একটা উপলক্ষ। আসলে এর মাধ্যমে রিপাবলিকান দলের সিনেটরদের সঙ্গে মতভেদ ঘোচানোর চেষ্টা করছেন ওবামা। তাঁর বিশ্বাস, এভাবে একটা ফল আসতে পারে, যা দেখার জন্য প্রত্যেকে অথবা দেশের অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অপেক্ষা করছে। কার্নি বলেন, বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। এ লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় বা গোষ্ঠীগত আলোচনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ভোজনে অংশ নেওয়া, গলফ খেলা, আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে ভাবাবেগহীন আলোচনা এমনকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে তিনি দেশের আনাচে-কানাচে ছুটে যাচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য একটাই—মধ্যবিত্তদের কল্যাণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করা।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন নিয়েঅনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্কার আইন প্রণয়নের বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। আটজন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা ইতিমধ্যে অভিবাসন সংস্কার আইনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছেন। চলতি সপ্তাহেই প্রস্তাবটি কংগ্রেসের জুডিশিয়াল কমিটিতে যাওয়ার কথা। কংগ্রেসের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে উপস্থাপনের আগেই প্রস্তাবটি বাধার মুখে পড়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের রক্ষণশীল অংশের মতে, ‘গ্যাং অব এইট’ প্রণীত প্রস্তাবটি আকারে অনেক বড়। অভিবাসন সমস্যার সব বিষয় ধারণ করার জন্য ৮৪৪ পৃষ্ঠার খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। সমস্যাগুলো আলাদা করে পৃথক আইন করার পক্ষে অতিরক্ষণশীলেরা। ডেমোক্রেটিক পার্টিথেকে চার এবং রিপাবলিকান পার্টিথেকে চারজন সিনেটর নিয়ে অভিবাসন সংস্কারের জন্যকমিটি করা হয়।গত মাসে বোস্টনে বোমা হামলার পর অভিবাসন সংস্কার আইন প্রণয়নে ধীরে চলো নীতিতে চলতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। অভিবাসন সংস্কার আইন প্রণয়ন নিয়ে উচ্চকণ্ঠ রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও বলেন, আইনটি এ অবস্থায় কংগ্রেসে পাস করা সম্ভব হবে না। আইনপ্রণেতাদের আরও কিছু মতামত নিতে হবে। উদারনৈতিক একটি ধারাও ‘গ্যাং অব এইট’-এর খসড়া প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এখন। প্রস্তাবে বৈধতা পাওয়ার পর নাগরিকত্বের জন্য ১৩ বছর অপেক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে আসা ব্যক্তিদের বৈধতার জন্য বিবেচনা করা হবে না। সমকামীদের জন্য আইন প্রস্তাবে পর্যাপ্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা পেট্রিক লেহি বলেছেন, সমকামীদের জীবনসঙ্গীরা যাতে গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন, তার জন্য তিনি আইন প্রস্তাবে সংশোধনী আনবেন। ব্যয় বৃদ্ধিও অভিবাসন সংস্কার আইন প্রণয়নে অন্যতম বাধা বলে তুলে ধরা হচ্ছে। ব্যাপকসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী বৈধতা পাওয়ার পর তাঁদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে বহু গুণ। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিবাসন সংস্কার আইন বাস্তবায়িত হলে প্রায় সাড়ে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়বে। এতে করে নাগরিকদের ওপর করের বোঝা বাড়বে বলে রক্ষণশীলদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও অভিবাসন সংস্কার আইন পাস হবে বলে আবারও হোয়াইট হাউস থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি জে কারনি বলেন, অভিবাসন আইনে স্বাক্ষর করাটা হবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য বিরাট এক অর্জন। শিগগিরই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের উপযোগী করে আইন তাঁর কাছে উপস্থাপন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কম্পিউটার নেটওয়ার্কে হামলা করেছেচীন

চীনের সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে হামলা চালিয়েছে চীন। পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে। গত সোমবার কংগ্রেসে উত্থাপিত ৮৩ পৃষ্ঠার ওই বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম বিমান ও সমুদ্র প্রতিরক্ষা বাড়াতে যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ তৈরির পরিকল্পনায় এগিয়ে গেছে চীন। বেইজিং এই প্রতিবেদনকে ‘ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এর মধ্য দিয়ে ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবিশ্বাস’-এর চরিত্রই ফুটে উঠেছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) গবেষক ওয়াং জিনজুন বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রতিবেদন ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ক্ষতিকর’। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যেসব সাইবার হামলার (হ্যাকিং) শিকার হচ্ছে, তার কিছু চীনের সরকার ও সামরিক বাহিনী চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এতে বলা হয়, হ্যাকিংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর, সামরিক পরিকল্পনা ও সরকারি কর্মকর্তাদের গোপন তথ্য সংগ্রহ করা। সাইবার হামলা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন যতটা না উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন চীনের সামরিক উদ্দেশ্য নিয়ে। পেন্টাগনের পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড হেলভে বলেন, ‘আমার কাছে যেটি উদ্বেগের, সেটি হলো স্বচ্ছতা আর উন্মুক্ততা ছাড়াই চীনের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষায় ব্যয় হচ্ছে।’ দক্ষিণ চীন সাগরের একটি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্ব যখন চরমে, তখনই পেন্টাগনের এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় দ্বিগুণের বেশি।

নিখোঁজের এক দশক পর ফেরা

প্রায় এক দশক আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন তাঁরা তিনজন। গত সোমবার তাঁদের সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছেএক শিশুকে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড শহরের এই তিনজন হলেন আমান্ডা বেরি, জিনা ডেজেসাস ও মিচেল নাইট। আর শিশুটি আমান্ডা বেরির সন্তান বলেধারণা করা হচ্ছে। তবে শিশুটির নাম জানা যায়নি।তিন নারীর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০০৩ সালে ১৬ বছর বয়সে নিখোঁজ হন বেরি। তার এক বছর পর ১৪ বছর বয়সে নিখোঁজ হন গিনা। আর ২০০২ সালে মিচেল নিখোঁজ হন ২০ বছর বয়সে। স্থানীয় পুলিশ জানায়, বেরির কাছ থেকে তথ্য পেয়ে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। একজন প্রতিবেশীর সহায়তায় উদ্ধার হওয়ার পর বেরি ফোনে বিষয়টি পুলিশকে জানান। এরপর পুলিশ সবাইকে উদ্ধার করে। পুলিশ আরও জানায়, এ ঘটনায় হিস্পানিক তিন ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বয়স ৫০, ৫২ ও ৫৪ বছর। পুরো ঘটনা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। ঘটনার তদন্ত চলছে। তিনজনকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, তাঁরা সুস্থ আছেন। তার পরও বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। একদিন পর গতকাল মঙ্গলবার তাদের হাসাপাতালথেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যে প্রতিবেশীর সহায়তায় বেরি উদ্ধার হন, সেই প্রতিবেশী চার্লস রামসে বলেন, ‘আমি লক্ষ করছিলাম, বেরি ওই বাড়ি থেকে বাইরে আসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দরজা ঠিকভাবে খুলতে পারছিলেন না। পরে আমি তাঁকে সহায়তা করি।’ বেরি নিখোঁজ হওয়ার তিন বছর পর ২০০৬ সালে তাঁর মা লোওয়ানা মারা যান। গিনা ডেজেসাস উদ্ধার হওয়ায় তাঁর চাচা খুশি। গিনার চাচা বলেন, ‘এভাবে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি আতঙ্কের। তবে গিনাকে পেয়ে ভালো লাগছে। এই ১০ বছরে আমরা কোনোভাবেই জানতে পারিনি, সে কোথায় আছে, কেমন আছে।’ ক্লিভল্যান্ডের মেয়র ফ্রাঙ্ক জ্যাকসন বলেন, ‘তিন নারীকে উদ্ধার করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানাই। তবে এ ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। এ জন্য তদন্ত চলছে।’

তালেবানের ভয়ে মাঠে নেই অনেকে

পাকিস্তানের রাজনীতিক মিয়া হুসেইন। দলের প্রধান কার্যালয়ে বসে আছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের হাঁকডাক নেই। পাশে দুটি টেলিফোন পড়ে আছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজনের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।তালেবানবিরোধী রাজনীতিকদের অন্যতম মিয়া হুসেইন। তালেবানের হুমকিতে এখন নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারছেন না তিনি। ১১ মে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে একটি জনসমাবেশও করেননি। অসাধারণ বক্তা হিসেবে পরিচিত মিয়া হুসেইন এর আগে অনেক বড় বড় সমাবেশ করেছেন। আর এখন ফোনে ছোট ছোট বার্তা দিচ্ছেন নেতা-কর্মীদের। কখনো কখনো তাঁদের নিয়ে গোপনে বৈঠক করছেন। আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) নেতা মিয়া হুসেইন এখন এক অর্থে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন।তালেবান হামলার ভয়ে অনেকে টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন, ব্যানার, ফেস্টুন দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।এএনপির একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের জন্য বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক ব্যাপার।’ বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্যমতে, গত এপ্রিল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তালেবান হামলায় অন্তত ১০১ জন নিহত হয়েছেন। মূলত শীর্ষ তিন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলায় তাঁরা নিহত হন। এই দলগুলোর বেশির ভাগ শীর্ষস্থানীয় নেতাকে দলের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে প্রচারণা না চালাতে বলা হয়েছে।তালেবান হামলা এখনো চলছে। গতকাল মঙ্গলবারও পেশোয়ারে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত নয়জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। স্থানীয় পুলিশের কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ জানান, হামলায় অন্তত নয়জন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়েছেন। তবে অন্য একজন সরকারি কর্মকর্তা নিহতের সংখ্যা ১০ জন বলে উল্লেখ করেন। গত সোমবার জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলামের (জেইউআই) সমাবেশে হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হন। এএনপির নেতা মিয়া হুসেইন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তালেবানের প্রতি সহানুভূতি আছে এমন দলকে জয়ী করতে কাজ করছে তালেবান। তিনি বলেন, তালেবান জঙ্গিরা হামলার জন্য পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতৃত্বাধীন বিদায়ী ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দল এএনপি ও মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টকে (এমকিউএম) বেছে নিয়েছে। এই দলগুলোর নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হচ্ছে বেশি। এই জোটের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রধান কারণ হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকতে পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে তালেবানবিরোধী সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছিল বিদায়ী সরকার। তালেবান বলছে, তারা সেই দলগুলোর সমাবেশেই হামলা করছে, যারা নাস্তিকদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে এবং ইসলামের শত্রুর মতো আচরণ করে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ধর্মভিত্তিক ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তালেবানের হামলার লক্ষ্য নয়। সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দলের সমাবেশে তারা হামলা করছে না। ইমরান পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন ড্রোন (মানুষবিহীন বিমান) হামলা এবং কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর বিরোধী।

মঞ্চ থেকে পড়ে গিয়ে ইমরান খান আহত

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লাহোরে এক সমাবেশে মঞ্চে ওঠার লিফ্ট  থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। আগামী শনিবার অনুষ্ঠেয় নির্বাচন উপলক্ষে সমাবেশে বক্তব্য দিতে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। স্থানীয় টেলিভিশনের ভিডিওচিত্রে দেখা যায়,  তিন থেকে চারজন দেহরক্ষীসহ ইমরান লাহোরের গুলবাগ এলাকার গালিব মার্কেটে স্থাপিত একটি মঞ্চ থেকে একটি পিকাপ ভ্যানের ওপরে পড়ে যান। পরে সমর্থকেরা তাঁকে তাড়াহুড়া করে শহরের লিবার্টি হাসপাতালে নিয়ে যান। ৬০ বছর বয়সেও ইমরান শারীরিকভাবে এখনো অনেক সুস্থ-সবল। প্রত্যক্ষদর্শী রাজা জাইদি বলেন, ইমরান তাঁর তিন বা চারজন দেহরক্ষীকে নিয়ে এক লিফেট উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁদের একজন নিয়ন্ত্রণ হারালে ইমরান পড়ে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ইমরান মাথায় ও মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছেন। তাঁর মাথায় ১৬টি সেলাই দিতে হয়েছে এবং তিনি মাথার পেছন দিকে বেশ আঘাত পেয়েছেন। বিবিসি ও দ্য ডন।

ঐক্যের ডাক মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রীরাজাকের

মালোয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের বিজয়ের পর দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। রাজধানী কুয়ালালামপুরের জাতীয় প্রাসাদ ভবনে দেশটির রাজা গতকাল সোমবার এ শপথ পাঠ করান।তবে নির্বাচনে প্রতারণার অভিযোগ এনে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধীরা।ফলাফল ঘোষণার পর তা মেনে নিয়ে দেশে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তার জন্য সব নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী রাজাক। তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ফ্রন্ট (বিএন) ওই নির্বাচনে মোট ২২২টি আসনের মধ্যে ১৩৩টিতে জয়লাভ করে।বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম নির্বাচনে ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম জালিয়াতি’ এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে ওই নির্বাচনে ‘নজিরবিহীন প্রতারণার’ প্রতিবাদে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইব্রাহিম। কুয়ালালামপুরের এক স্টেডিয়ামে আগামীকাল বুধবার তাঁর দলের সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে।বিএন জোট ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই মালোয়েশিয়ার শাসনক্ষমতায় রয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে তারা সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়। চীনা বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী বিএনকে বর্জনের ধারা অব্যাহত রেখেছে। বিজয়ের পরপরই রাজাক বলেন, সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলাফলে এক ধরনের বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন।
নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল অন্তত এক কোটি। ভোট পড়েছে ৮০ শতাংশ। ক্ষমতাসীনরা ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এএফপি ও বিবিসি।