Showing posts with label উইঘুর মুসলিম. Show all posts
Showing posts with label উইঘুর মুসলিম. Show all posts

Friday, October 23, 2026

থেমেছে কি ভাগ্যবিড়ম্বিত উইঘুরদের কান্না, বদলেছে কি জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগাযোগ, প্রাচীন সিল্ক রোডের বাণিজ্যপথ এবং তুর্কি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে অঞ্চলটির রয়েছে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়। এখানকার প্রধান জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উইঘুর, কাজাখ, কিরগিজ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের অনেকেই মুসলমান। বিশেষ করে উইঘুররা প্রধানত সুন্নি মুসলিম এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জীবনযাপন চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র।

কিন্তু গত এক দশকে জিনজিয়াং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ব্যাপক আটক, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, নজরদারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয় নিয়ে চীনা সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চীনা সরকার এসব অভিযোগের বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

তাহলে জিনজিয়াংয়ের মুসলমানরা এখন কেমন আছেন? পরিস্থিতি কি আগের চেয়ে স্বাভাবিক হয়েছে, নাকি বন্দিশিবিরের বিতর্কের বাইরে অন্য ধরনের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে চীনা সরকারের বক্তব্য, জাতিসংঘের মূল্যায়ন, স্বাধীন গবেষণা, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং জনসংখ্যার সরকারি পরিসংখ্যান পাশাপাশি বিচার করতে হবে।

নিরাপত্তানীতির পটভূমি: কীভাবে সংকটের বিস্তার?

জিনজিয়াংয়ে সহিংসতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান চীনা সরকারের নিরাপত্তানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৪ সালে চীন ‘সহিংস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান’ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা ও নজরদারিব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার হয়। ২০১৭ সাল থেকে উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের বিপুলসংখ্যক মানুষকে তথাকথিত ‘রাজনৈতিক শিক্ষা’ বা ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে’ আটক রাখার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

চীনা সরকারের বক্তব্য, এসব কেন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিরোধ, ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা শেখানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। সরকার দাবি করে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা চরমপন্থা থেকে দূরে সরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বেইজিং আরও বলেছে, জিনজিয়াংয়ে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেড়েছে।

কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এসব কেন্দ্রের অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বচ্ছ বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবীর সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অর্থাৎ বিতর্কটি শুধু সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং সেই ক্ষমতার ওপর কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কি না, তা নিয়েও।

২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা এখনো গুরুতর উদ্বেগের কারণ। সংস্থাটি নির্বিচার আটক, অন্যায্য কারাদণ্ড, ব্যাপক নজরদারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে বসবাসকারী উইঘুরদের ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছে। এসব সংস্থার মূল্যায়নকে চূড়ান্ত আদালতের রায় হিসেবে নয়, বরং নথি, সাক্ষ্য ও উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে করা মানবাধিকার মূল্যায়ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের মূল্যায়ন: মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা

জিনজিয়াং নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২২ সালের প্রতিবেদন। ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এই মূল্যায়নে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনের নামে চীনা সরকারের নীতি ও ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। প্রতিবেদনের উপসংহারে উল্লেখ করা হয়, এসব লঙ্ঘনের কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধ—বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধ—হিসেবে গণ্য হতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে নির্বিচার ও বৈষম্যমূলক আটক, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, যৌন ও প্রজনন অধিকার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। জাতিসংঘের দপ্তর চীনা সরকারের আইন, নীতিমালা, প্রকাশিত তথ্য ও বক্তব্যও বিবেচনায় নিয়েছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়; এটি মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি অনুসন্ধানমূলক মূল্যায়ন। ফলে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা’ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কিন্তু জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এ ধরনের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশিত হওয়া আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

চীনা সরকার জাতিসংঘের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, প্রতিবেদনটি ভুল তথ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী বৈধ পদক্ষেপকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অজুহাত হতে পারে না।

বন্দিশিবিরের পর: কারাগার ও আটকব্যবস্থার বর্তমান চিত্র

জিনজিয়াং নিয়ে বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো, তথাকথিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার পর আটক মানুষদের কী হয়েছে। চীনা সরকার জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীরা কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য, কিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে থাকলেও বহু উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপলব্ধ সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কয়েক লাখ উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম এখনো কারাগারে থাকতে পারেন। সংস্থাটি ইলহাম তোহতি, রাহিলে দাওত, গুলশান আব্বাস, ইয়ালকুন রোজি ও একপার আসাতের মতো পরিচিত ব্যক্তিদের কারাবন্দিত্বের বিষয়ও উল্লেখ করেছে। তবে বর্তমান সময়ে আটক থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তালিকা প্রকাশ্যে নেই। ফলে সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন।

বন্দিশিবির ও কারাগারকে এক করে দেখাও ঠিক নয়। কোনো ব্যক্তি প্রশাসনিকভাবে আটক ছিলেন, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি সাজা পেয়েছেন—এসব আলাদা পরিস্থিতি। একইভাবে অতীতে আটক মানুষের সংখ্যা থেকে বর্তমান বন্দির সংখ্যা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।

তবে বর্তমান চিত্রের একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব। আটক ব্যক্তিদের নাম, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচারসংক্রান্ত নথি, আইনজীবীর সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য না থাকলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কঠিন হয়। মানবাধিকারের প্রশ্নে তাই শুধু কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; মানুষ সত্যিকার অর্থে মুক্তি পেয়েছেন কি না, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং মুক্তির পর তাঁরা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় স্বাধীনতা: মসজিদ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা কতটা?

উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। মসজিদে নামাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, রোজা, ইসলামি পোশাক, দাড়ি, ধর্মীয় বই এবং ধর্মীয় নেতাদের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ’ দমনের বিস্তৃত সংজ্ঞার কারণে কিছু বৈধ ধর্মীয় আচরণও সন্দেহের আওতায় পড়েছে।

চীনা সরকার অবশ্য বলছে, দেশটির সংবিধান ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং জিনজিয়াংয়ে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আইন অনুযায়ী ধর্ম পালন করতে পারেন। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চীনা সরকারের একটি শ্বেতপত্রে বলা হয়, অঞ্চলটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষিত হচ্ছে এবং ধর্মীয় বিষয়গুলো আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ধর্মীয় কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার কথা বলেছে।

কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু মসজিদের অস্তিত্ব দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষ বাধাহীনভাবে নামাজ পড়তে পারছেন কি না, রমজানে রোজা রাখতে পারছেন কি না, ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদান করতে পারছেন কি না, নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের কারণে হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে কি না এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের দেশভিত্তিক মূল্যায়ন, যা ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা হয়েছে, বলেছে যে জিনজিয়াংয়ের মুসলমানেরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। ওই মূল্যায়নে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, নজরদারি, আটক, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনার পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটি যুক্তরাজ্যের আশ্রয়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত একটি দেশভিত্তিক মূল্যায়ন; চীনের প্রতিটি নাগরিকের অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জরিপ নয়।

মসজিদ ভাঙা বা বন্ধ করার সব ঘটনাকে একই কারণের ফল হিসেবে দেখাও যথার্থ নয়। কোনো স্থাপনা নগর উন্নয়ন, পুনর্নির্মাণ বা অন্য কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস, ধর্মীয় কার্যক্রম সীমিত করা কিংবা উপাসনালয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকলে প্রতিটি ঘটনা ও নীতির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

ভাষা, শিক্ষা ও পরিচয়ের ভবিষ্যৎ

উইঘুর ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে তাদের সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্মীয় জ্ঞান, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি যুক্ত। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার অবস্থান জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, জিনজিয়াংয়ে রাষ্ট্রীয় আবাসিক বিদ্যালয়ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিম শিশুদের পরিবার ও সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন; উইঘুর ভাষার ব্যবহার সীমিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে শিশুদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।

চীনা সরকারের বক্তব্য, ম্যান্ডারিন ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বৃহত্তর চীনা সমাজে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ায়। ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা নিজে কোনো অধিকার লঙ্ঘন নয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় মাতৃভাষার শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়লে প্রশ্ন দেখা দেয়—শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিজস্ব পরিচয় রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জরিপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া এবং একক সাংস্কৃতিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, যাতে স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রাপ্তি প্রয়োজন।

নজরদারি প্রযুক্তি: ব্যক্তিগত জীবন কতটা স্বাধীন?

জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি শুধু বন্দিশিবির বা কারাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈনন্দিন চলাচল, ফোন ব্যবহার, যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ওপর নজরদারিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদন ও গবেষণায় ব্যাপক সিসিটিভি ক্যামেরা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন পরীক্ষা এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দেশভিত্তিক মূল্যায়নেও জিনজিয়াংয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং পরিবারের ভেতর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ পৌঁছানোর অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে।

রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও চলাচলের স্বাধীনতাকে অযৌক্তিকভাবে সীমিত করে, তাহলে তা মানবাধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন: কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কত দিন তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কারা ব্যবহার করছে, ভুল শনাক্তকরণের বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে কি না এবং নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন কি না। প্রযুক্তির ব্যবহারকে শুধু আধুনিকায়নের মাপকাঠিতে বিচার করলে এর সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতি আড়ালে থেকে যেতে পারে।

জনসংখ্যার পরিসংখ্যান: পরিবর্তন কী বোঝায়?

চীনের ২০২০ সালের জাতীয় জনশুমারি অনুযায়ী, জিনজিয়াংয়ের মোট জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৫। এর মধ্যে উইঘুর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ২৫৭, যা মোট জনসংখ্যার ৪৪.৯৬ শতাংশ। হান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৯৮, অর্থাৎ ৪২.২৪ শতাংশ। অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মিলিয়ে ছিল ১২.৮০ শতাংশ। একই সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে উইঘুর জনসংখ্যা ১৬.২ শতাংশ বেড়েছিল।

এই উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, জিনজিয়াং বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি এবং উইঘুররা অঞ্চলটির বৃহত্তম একক জাতিগোষ্ঠী। তবে জনসংখ্যার অনুপাত বা পরিবর্তনের তথ্য একা দিয়ে জোরপূর্বক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, পরিকল্পিত জাতিগত প্রতিস্থাপন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট নীতির উদ্দেশ্য প্রমাণ করা যায় না। এসব দাবি যাচাই করতে জন্মহার, অভিবাসন, অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, পরিবার পরিকল্পনা নীতি এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।

অন্যদিকে, জনসংখ্যা বেড়েছে বলেই কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ অমূলক হয়ে যায় না। জনসংখ্যার সংখ্যা এবং ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষার অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা—দুটি আলাদা প্রশ্ন। তাই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং মানুষের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ: জিনজিয়াং থেকে বিশ্ববাজার

জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গেও যুক্ত। তুলা ও বস্ত্র, কৃষিপণ্য, সৌরশক্তি শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন উৎপাদন খাতে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। ফলে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষকে এমন শ্রম কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে কাজ বেছে নেওয়া, প্রত্যাখ্যান করা বা কর্মস্থল পরিবর্তনের স্বাধীনতা বাস্তবে সীমিত হতে পারে। চীনা সরকার এসব কর্মসূচিকে দারিদ্র্য হ্রাস, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে।

কোনো সরকারি কর্মসূচির আওতায় কাজ করলেই তা জোরপূর্বক শ্রম হয়ে যায় না। মূল প্রশ্ন হলো, শ্রমিক স্বাধীনভাবে কাজ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারছেন কি না, কাজ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না, জবরদস্তি বা শাস্তির ভয় রয়েছে কি না এবং মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিষয়ে স্বচ্ছতা আছে কি না।

এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২১ সালের উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইনটি জিনজিয়াংয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার একটি আইনগত অনুমান প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রযোজ্য শর্তে সেসব পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে। এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরবরাহব্যবস্থার উৎস ও শ্রমিকের অধিকার যাচাই করার চাপ বেড়েছে।

তবে জিনজিয়াংয়ের প্রতিটি পণ্য বা প্রতিটি শ্রমিককে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে ঘোষণা করা সঠিক নয়। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পণ্য ও সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে নথি, শ্রমিকের স্বাধীন সাক্ষ্য এবং স্বাধীন পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।

পরিবার বিচ্ছিন্নতা ও প্রবাসী উইঘুরদের উদ্বেগ

জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতির একটি গভীর মানবিক দিক হলো পরিবার বিচ্ছিন্নতা। কোনো ব্যক্তি আটক থাকলে তাঁর সন্তান, স্ত্রী, স্বামী, বাবা-মা ও আত্মীয়দের জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। অনেক উইঘুর বিদেশে বসবাস করেন; তাঁদের অভিযোগ, চীনে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা কঠিন, কখনো কখনো দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। কিছু প্রবাসী আরও অভিযোগ করেছেন, বিদেশে থাকা অধিকারকর্মী বা সমালোচকদের সম্পর্কে তথ্য দিতে তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দক্ষিণ জিনজিয়াংয়ে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বলে জিনজিয়াং ভিকটিমস ডেটাবেস নামের একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে। এই সংখ্যা ওই উদ্যোগের হিসাব; জাতিসংঘের যাচাইকৃত সরকারি গণনা নয়। এসব শিশুর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তথ্য নেই।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনিশ্চয়তা নিজেই গভীর মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে প্রতিটি বিচ্ছিন্নতার কারণ এক নয়—কেউ কারাবন্দি, কেউ বিদেশে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ বা যোগাযোগের অন্য বাধা থাকতে পারে। তাই প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া: সংহতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের টানাপোড়েন

জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের বিষয়ে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া একরকম ছিল না। কিছু দেশ মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আবার কিছু দেশ চীনের নিরাপত্তানীতি বা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কিংবা প্রকাশ্য সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে চীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত উদ্বেগের বিপরীতে চীন-সমর্থিত একটি চিঠিতে এক ডজনেরও বেশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্যরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ চীনের নীতির প্রতি সমর্থন জানায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই সময় মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছিল।

এই অবস্থানের পেছনে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্বার্থ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব দেশের নীতিকে একই বলে ধরে নেওয়া যাবে না; রাষ্ট্রভেদে অবস্থান এবং সময়ের সঙ্গে নীতিও পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো দেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখলেই সে জিনজিয়াংয়ের প্রতিটি নীতিকে সমর্থন করে—এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টানা যায় না।

এখানে মুসলিম বিশ্বের সামনে একটি নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে: ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলে মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় যে মানবিক নীতি অনুসরণ করা হয়, তা কি জিনজিয়াংয়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োগ করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং একই মানবাধিকার মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগের ভিত্তিতে খোঁজা উচিত।

আন্তর্জাতিক জবাবদিহি: প্রতিবেদন আছে, অগ্রগতি কতটা?

জিনজিয়াং নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, গুরুতর অভিযোগ নথিবদ্ধ হলেও পরবর্তী তদন্ত, প্রতিকার এবং জবাবদিহির অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত। জাতিসংঘের ২০২২ সালের মূল্যায়ন সুপারিশ করেছিল, যাদের স্বাধীনতা অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মুক্তি দেওয়া হোক এবং লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করা হোক।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সংস্থাটি আরো বলেছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২২ সালের পর জিনজিয়াং বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নতুন প্রকাশ্য মূল্যায়ন দেয়নি।

জবাবদিহির অর্থ কেবল কোনো রাষ্ট্রকে দোষী ঘোষণা করা নয়। এর অর্থ হলো আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা, নির্যাতন ও বৈষম্যের অভিযোগ তদন্ত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার দেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের লঙ্ঘন ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ জন্য জাতিসংঘের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিরাপদে ও গোপনীয়ভাবে কথা বলার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির গুরুত্ব

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সদস্য। তাই জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও নাগরিক সমাজের আগ্রহ স্বাভাবিক।

তবে এ বিষয়ে আলোচনার ভিত্তি হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্য, মানবাধিকারের সার্বজনীন নীতি এবং সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করার আগ্রহ। কোনো একটি রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বক্তব্যকে একমাত্র সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করাও যুক্তিসংগত নয়।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও গবেষকদের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: জিনজিয়াংয়ে আটক ব্যক্তিদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কতটা স্বাধীন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে? ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মাতৃভাষায় শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতি কী? শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কাজ বেছে নেওয়ার অধিকার কতটা নিশ্চিত? বিদেশে থাকা উইঘুরদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কতটা?

উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, কিন্তু অধিকারও

জিনজিয়াংয়ের মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্র কীভাবে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবে, অথচ কোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে না?

চীনা সরকার সন্ত্রাসবাদ দমন, স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থানের অগ্রগতির কথা বলছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ও বিভিন্ন অধিকার সংস্থা গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে এবং আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে। এসব অবস্থানের মধ্যে সত্য যাচাইয়ের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো স্বাধীন তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি, আটক ব্যক্তিদের ন্যায্য বিচার, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নিশ্চয়তা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বাস্তব প্রমাণ।

উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা মানে চীনের জনগণ বা চীনা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিকের অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে একটি মানবিক প্রশ্ন। কোনো দেশের উন্নয়ন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার সাফল্য মূল্যায়নের সময় মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও পরিচয় রক্ষার বিষয়টি বাদ দেওয়া যায় না।

জিনজিয়াংয়ের বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করার জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। সেই তথ্য পাওয়ার পথ খুলে দেওয়া, নিরপেক্ষ অনুসন্ধানকে অনুমতি দেওয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করাই দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জিনজিয়াংয়ের মানুষের অবস্থার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে শুধু সরকারি ঘোষণার ওপর নয়, বরং তাঁরা কতটা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারেন, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারেন, পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেন এবং ভয় বা বৈষম্য ছাড়াই জীবনযাপন করতে পারেন—তার ওপর।

সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইউকে হোম অফিস ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর)

থেমেছে কি ভাগ্যবিড়ম্বিত উইঘুরদের কান্না, বদলেছে কি জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি

Friday, February 28, 2025

চাপে নতি স্বীকার , উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করলো থাইল্যান্ড

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ৪০ জন উইঘুরকে  চীনে নির্বাসিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থাই কর্তৃপক্ষ। তাদের উপর সম্ভাব্য নির্যাতন এমনকি মৃত্যুরও আশঙ্কা রয়েছে।ব্যাংককের একটি আটক কেন্দ্রে ১০ বছর আটক থাকার পর বৃহস্পতিবার এই দলটিকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে ফেরত পাঠানো  হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।চীনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং  জিনজিয়াংয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উইঘুর জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও বেইজিং সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। বিবিসিতে প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের পর এ বারই তাইল্যান্ড প্রথম উইঘুর অভিবাসীদের চিনে ফেরত পাঠাল।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের গুরুতর উদ্বেগ উত্থাপনের পর, গোটা নির্বাসন প্রক্রিয়াকে গোপনীয়তার মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।থাই মিডিয়া জানিয়েছে যে বৃহস্পতিবার ভোরে ব্যাংককের প্রধান অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে বেশ কয়েকটি ট্রাক বেরিয়ে গেছে,   যেগুলোর জানালা কালো প্লাস্টিক দিয়ে বন্ধ করা ছিল ।কয়েক ঘন্টা পরে, ট্র্যাকার Flightrader24 ব্যাংকক থেকে ছেড়ে আসা চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি অনির্ধারিত ফ্লাইট দেখায়, যা  জিনজিয়াংয়ে পৌঁছায়। কতজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।থাই সরকার পরে বলেছে যে তারা ৪০ জন উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ তাদের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা ঠিক হচ্ছে না। তবে অন্য কোনও তৃতীয় দেশ তাদের গ্রহণের প্রস্তাব দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, যারা  অতীতে উইঘুরদের আশ্রয় দিয়েছে।আটজন উইঘুর থাইল্যান্ডে রয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন আটক থাকাকালীন অপরাধের জন্য জেল খাটছেন। সরকার আরও জানিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী পায়েটোংটার্ন সিনাওয়াত্রাকে তার সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে উইঘুরদের চীনে ফিরিয়ে আনা হলে তাদের যথাযথ দেখাশোনা করা হবে।বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি ।সিনাওয়াত্রা বলেন, '"বিশ্বের যেকোনো দেশকেই  আইন, আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকারের নীতি মেনে চলতে হবে। 'বেইজিং জানিয়েছে যে ৪০ জন চীনা অবৈধ অভিবাসীকে থাইল্যান্ড থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, কিন্তু তারা যে উইঘুর ছিল তা নিশ্চিত করেনি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ,' চীন ও থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ আইন ও  আন্তর্জাতিক আইন মেনেই  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। 'ফিরে আসা দলটিতে  ৩০০ জনেরও বেশি উইঘুর ছিল   যারা ২০১৪ সালে জিনজিয়াংয়ে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার পর থাই সীমান্তে আটক করা হয়েছিল।অনেককে তুরস্কে পাঠানো হয়েছিল, আবার অনেককে ২০১৫ সালে চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছিল - যার ফলে সরকার এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা কান্নাভি সুয়েবসাং প্রশ্ন তোলেন - '"থাই সরকার কী করছে?উইঘুরদের নির্বাসনের মাধ্যমে নির্যাতনের মুখোমুখি করা উচিত নয়। তাদের ১১ বছর জেল খাটতে হয়েছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছি।'যে আটক কেন্দ্রে উইঘুরদের রাখা হয়েছিল   তা অস্বাস্থ্যকর এবং জনাকীর্ণ ছিল বলে জানা গেছে। পাঁচজন উইঘুর হেফাজতেই  মারা গেছেন।বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে এই গোষ্ঠীটি এখন নির্যাতন, জোরপূর্বক অন্তর্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। সংস্থার এশিয়া পরিচালক, এলেন পিয়ারসন বলেছেন - ' থাইল্যান্ডের উইঘুর বন্দীদের চীনে স্থানান্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে থাইল্যান্ডের বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।  ঊর্ধ্বতন থাই কর্মকর্তারা একাধিকবার প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এই ব্যক্তিদের হস্তান্তর করা হবে না।' এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থাইল্যান্ডের এই নির্বাসন প্রক্রিয়ার  নিন্দা জানিয়ে বলেছেন -' যেসব দেশে উইঘুররা সুরক্ষা চান, সেইসব দেশের সরকারকে জোরপূর্বক জাতিগত উইঘুরদের চীনে ফেরত না পাঠানোর আহ্বান জানাতে হবে। "অনলাইনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি চীনকে জিনজিয়াংয়ে প্রধানত মুসলিম উইঘুর এবং অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ করেছেন।জাতিসংঘ বলেছে যে তারা এই নির্বাসনের জন্য "গভীরভাবে অনুতপ্ত" ।যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন যে তারা  থাইল্যান্ডের সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়।জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ উইঘুর বাস করেন, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম। এই অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (Xinjiang Uyghur Autonomous Region বা XUAR) নামে পরিচিত।

উইঘুররা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, যার সাথে  তুর্কি ভাষার  সাদৃশ্য রয়েছে।  সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে মধ্য এশীয় দেশগুলির সঙ্গে এদের সাযুজ্য রয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং এই অঞ্চলে ধর্মীয় অনুশীলন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মসজিদ ও সমাধি ধ্বংস করার অভিযোগ  রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

mzamin

Sunday, June 20, 2021

উইঘুর নির্যাতনে মুসলিম উম্মাহ কেন নিশ্চুপ? by রাশেদুল আলম

০৪ ডিসেম্বর ২০১৮ প্রথম আলো'য় প্রকাশিতঃ একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আপনার বাড়িতে ঢুকে প্রিয়জনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। সন্তানদের ধরে নিয়ে রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। এ অবস্থা চীনের উইঘুর সম্প্রদায়ের।
রুকিয়ে তুরদুশ একজন উইঘুর কর্মী। উইঘুর কানাডা সোসাইটির সাবেক সভাপতি তুরদুশ গয়নার ব্যবসা করেন। চার বছর ধরে তিনি নিয়মিত তুরস্ক ও চীনে যাতায়াত করেন। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই গ্রেপ্তার হন। চীনে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। তুরদুশের হারানোর কিছুই নেই। কারণ, তাঁর স্ত্রীকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করেছে চীনের সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী। তুরদুশ জানেনও না তাঁর দুই সন্তান কোথায়?
রুকিয়ে তুরদুশের এ গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো উইঘুরের প্রায় সবার জীবনের গল্পটাই এক সুতায় গাঁথা। গল্পের উপাদান, স্থান, কাল, পাত্র হয়তো আলাদা, কিন্তু পরিণতি সবার একই। অথচ পুরো বিশ্বের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা যেন নেই, যেমন আছে সাংবাদিক জামাল খাসোগি ও সিরিয়ার হামলা নিয়ে।
রুকিয়ে তুরদুশরা শান্তি, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা চান। তুরদুশের মতো যাঁরা চীনের বাইরে থাকেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, তাঁরা চীনে শান্তির জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন।
এ বছরের আগস্টে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় আটক রাখা হয়েছে। ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। চীন সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কমিটির প্রতিবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদও জানায় সি চিন পিংয়ের দেশ।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ
ধর্মীয় ক্ষেত্রে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীন সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। তারা আরও বলেছে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ।
চরমপন্থী মতাদর্শের শিক্ষা চালু
জিনজিয়াংয়ে স্থানীয় আইন পরিবর্তন করে শিক্ষা শিবিরের ‘চরমপন্থী মতাদর্শিক শিক্ষা’ বাস্তবায়নের অনুমতি দিয়েছে চীন। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব শিবিরে বন্দীদের মান্দারিন ভাষা শিখতে বাধ্য করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হয়। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষাশিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে তাদের পরিবার, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়।
মেকিং ফ্যামিলি
২০১৬ সালে ‘মেকিং ফ্যামিলি’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে চীন। এর মাধ্যমে উইঘুর পরিবারকে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য তাদের ঘরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হোস্ট করতে বাধ্য করে। চীন রাষ্ট্রীয়ভাবে উইঘুরদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে।
চীন সরকার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনের জন্য তিনটি অভিযোগ ব্যবহার করেছে—চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। প্রথম অভিযোগ, যেকেউ গৌরব প্রকাশ করে তাদের উইঘুর পরিচয় প্রকাশ করে। আবার শিক্ষাশিবিরে পাঠানো লাখো বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছরে আটক বা অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এঁদের মধ্য আছেন ইসলামি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সালিহ হাজিম, অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, পপশিল্পী আবদুর রহিম হায়াত, ফুটবল খেলোয়াড় এরফান হিজিম প্রমুখ।
উইঘুর কারা
উইঘুর জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর আগের। মূলত, এরা স্বাধীন পূর্ব তুর্কিস্তানের অধিবাসী। পূর্ব তুর্কিস্তান প্রাচীন সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার একটি দেশ, যার চতুর্পাশ্বে চীন, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই উইঘুর সম্প্রদায়ের বাস রয়েছে।
সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুক অনুযায়ী চীনের মোট জনসংখ্যার ১ থেকে ২ শতাংশ মুসলিম। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুসলিমরা চীনা জনসংখ্যার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, এসব দেশের মধ্যে চীনের জিনজিয়াংয়ে ১ কোটি ২০ হাজারের মতো উইঘুর লোক বসবাস করে। কাজাখস্তানে ২ লাখ ২৩ হাজার, উজবেকিস্তানে ৫৫ হাজার, কিরগিজস্তানে ৪৯ হাজার, তুরস্কে ১৯ হাজার, রাশিয়ায় ৪ হাজার, ইউক্রেনে ১ হাজারের মতো উইঘুর লোক বাস করে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেও প্রাচীন এ সম্প্রদায়ের লোকদের উইঘুর না বলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো। মূলত, ১৯২১ সালে উজবেকিস্তানে এক সম্মেলনের পর উইঘুররা তাদের পুরোনো পরিচয় ফিরে পায়। ভাষাবিদ ও ইতিহাসবেত্তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন যে ‘উইঘুর’ শব্দটি ‘উয়্যুঘুর’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ সংঘবদ্ধ।
১৯১১ সালে মাঙ্কু সাম্রাজ্য উৎখাতের মাধ্যমে পূর্ব তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনচেতা বীর উইঘুররা এই বৈদেশিক শাসনের সামনে মাথা নোয়ায়নি। এ কারণে ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে তারা দুবার চীনাদের সঙ্গে সাহসিকতার চরম রূপ দেখিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ভাগ্য তাদের অনুকূলে ছিল না। এ কারণে ১৯৪৯ সালে আবারও তারা চীনা কমিউনিস্টদের হাতে পরাজিত হয় আর জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গড়ে ওঠে। তখন সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দিন আজিজি।
জিনজিয়াং চীনের অন্যতম সর্ববৃহৎ একটি অঞ্চল। এর আয়তন ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের আয়তনের ১২ গুণ)। দেশটির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ এলাকা আয়তনে চীনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। এর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে মুসলিম দেশ তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ও কাজাখস্তান; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে আফগানিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীর। জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের মতো। এর মধ্যে মুসলমান প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ। প্রায় ৫৮ শতাংশ মুসলিম।
মধ্যযুগে তাং সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকেই সেখানে ইসলাম ও আরবের প্রভাব বাড়তে থাকে। স্থানীয় উইঘুর জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। উইঘুর বললেই আজকে মুসলিম জনগোষ্ঠী বোঝানো হয়। অন্যদিকে, চীনা মুসলমানদের হুই বলা হয়। উইঘুরের বর্ণমালাও আরবি। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এরা তুর্কি ও আরবি প্রভাবিত। উরুমকি বর্তমান জিনজিয়াংয়ের রাজধানী। কাশগড় অন্যতম বৃহৎ শহর। জিনজিয়াং একটি প্রধান ফসল উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে বিপুল পরিমাণ খনিজ ও তেলসম্পদ মজুত রয়েছে।
১৮৮৪ সালে কিং রাজত্বের সময় জিনজিয়াং চীনের একটি প্রদেশ হয়। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর চীনা কমিউনিস্ট সেনারা জিনজিয়াংয়ে অভিযান চালায়। এর সূত্র ধরে চীনের হান সামরিক গোষ্ঠী জিনজিয়াংয়ে অভিবাসী হয়েছে। ১৯৫৫ সালে জিনজিয়াং চীনের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। হান সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের বিরুদ্ধে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে বহু মানুষ নির্যাতিত হয়। বিপুল সংখ্যায় কাজাখ জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী কাজাখস্তানে পালিয়ে যান। এরপর থেকে উইঘুর মুসলমানদের সঙ্গে চীনা কর্তৃপক্ষের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একসময় তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত শতাব্দীর শেষে উইঘুর মুসলমানরা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে।
ফ্রিডম ওয়াচের মতে, চীন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় নিপীড়ক দেশ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় এসব নিপীড়নের গোঙানির শব্দ বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না। কালেভদ্রে কিছু জানা যায়।
উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নীতির ব্যাপারে চীন বলে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার মোকাবিলা করার জন্যই তারা নানান পলিসি নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দাড়ি রাখা, রমজান মাসে রোজা রাখা কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা, তা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে পারে না। আসলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান তাদের মতে চরমপন্থা। আর এই চরমপন্থা দমনের নামে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জেল-জরিমানা চলছে।
চীনের অর্থনীতির রমরমা অবস্থা এবং তাদের কাছ থেকে নানান সুবিধা পেয়ে অধিকাংশ মুসলিম দেশ এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। আসল কথাটি হলো বলতে চায় না। বুদ্ধিজীবীরাও কথা বলেন না। কারণ, এঁদের অনেকেই মার্ক্সীয় তত্ত্ব, মাও তত্ত্ব ভর করে আছেন। আর মুসলিমদের ব্যাপারে বরাবরই মুসলিম সুশীল সমাজ বা আমরা একরকম অন্ধ। এসব মানুষের কান্না তাদের কানে যায় না। উইঘুর মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা (সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী) কথা বলতে পারে না, কারণ তারা ‘বোবা’।

Wednesday, April 22, 2020

উইঘুর কারা? কেন চীন তাদের উপর নির্যাতন করে? by এস. মোর্শেদ

চীনের উইঘুরে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার। প্রায় ১০ লাখ মুসলিমকে বন্দী শিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। গত অগাস্ট মাসে জাতিসংঘের একটি কমিটি জানতে পারে যে, ১০ লাখের মতো উইঘুর মুসলিমকে পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে কয়েকটি শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। কিন্তু বেইজিং সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
উইঘুর হচ্ছে তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলমানদের একটি গ্রুপ। পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের বসবাস। উইঘুর মুসলমানদের মোট সংখ্যা প্রায় এক কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে চীনের জিংজিয়াং প্রদেশেই বাস করে ৮৫ লাখের মতো। হুনানসহ অন্যান্য চীনা প্রদেশ ও রাজধানী বেইজিংসহ বিভিন্ন নগরীতেও অল্পসংখ্যক উইঘুর বাস করে। এ ছাড়া কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, পাকিস্তান ও মঙ্গোলিয়াতে উইঘুরদের বসবাস রয়েছে। এরা সুন্নি মুসলমান এবং অনেকেই সুফিবাদ চর্চা করেন।
উইঘুর শব্দের অর্থ হচ্ছে নয়টি গোত্রের সমষ্টি বা সমন্বয়। তুর্কি ভাষায় এ জন্য উইঘুর শব্দকে বলা হয় টকুজ-ওগুজ। টকুজ অর্থ নয় এবং গুর অর্থ উপজাতি। ওগুজ থেকে গুর শব্দটি এসেছে। প্রাচীন আমলে আলতাই পর্বতমালার পাদদেশে তুর্কিভাষী বিভিন্ন গোত্র বা উপজাতি বাস করত। এদের মধ্যে নয়টি উপজাতিকে নিয়ে উইঘুর সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। উইঘুরদের কখনো কখনো ‘গাউচি’ এবং পরে ‘তিয়েলে’ জনগোষ্ঠী হিসেবেও ডাকা হতো। তুর্কি শব্দ তিয়েলে বা তেলে এর অর্থ হচ্ছে নয়টি পরিবার। বৈকাল হ্রদের আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী সিয়র তারদুস, বাসমিল, ওগুজ, খাজার, আলানস, কিরগিজসহ মোট নয়টি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে উইঘুর নামের জনগোষ্ঠী বা জাতি গড়ে ওঠে।

১৬৬৪ সালে বর্তমান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাঞ্চু শাসকরা প্রতিষ্ঠা করেন কিং সাম্রাজ্য। তারা মঙ্গোলিয়ার অধিকাংশ এলাকা, পূর্ব তুর্কিস্তান ও তিব্বত দখল করে এবং ২০০ বছর পর্যন্ত এই এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই সময়কালে কিং সম্রাটদের বিরুদ্ধে উইঘুররা অন্তত ৪২ বার বিদ্রোহ করেছে। শেষ পর্যন্ত ১৮৬৪ সালে উইঘুররা পূর্ব তুর্কিস্তান থেকে কিং শাসকদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হন এবং কাশগড়কেন্দ্রিক এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এটাকে ইয়েতিসার বা সাত নগরীর দেশও বলা হতো। কারণ কাশগড়, ইয়ারখন্ড, হোতান, আকসু, কুচা, কোরলা ও তুরফান নামে সাতটি নগরী এই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অটোমান সাম্রাজ্য (১৮৭৩), জার শাসিত রাশিয়া (১৮৭২) ও গ্রেট ব্রিটেন (১৮৭৪) উইঘুরদের নতুন এই রাজ্য পূর্ব তুর্কিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এমনকি এর রাজধানী কাশগড়ে এই তিনটি দেশ তাদের কূটনৈতিক মিশনও খুলেছিল। কিন্তু রাশিয়ার জার পূর্ব তুর্কিস্তান দখল করে নিতে পারে এমন আশঙ্কায় মাঞ্চু শাসকরা ১৮৭৬ সালে হামলা করেন পূর্ব তুর্কিস্তানে।
জেনারেল ঝু জংতাংয়ের নেতৃত্বে ওই বাহিনীর হামলার প্রতি সমর্থন জানায় ব্রিটেন। দখলের পর ১৮৮৪ সালের ১৮ নভেম্বর পূর্ব তুর্কিস্তানের নাম পাল্টে রাখা হয় জিংজিয়াং বা সিনকিয়াং যার অর্থ ‘নতুন ভূখণ্ড’। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব এখনো এই এলাকাকে মোগলিস্তান বা তুর্কিস্তানের পূর্ব অংশ হিসেবেই জানে। জিংজিয়াং নামকরণের আগে এই ভূখণ্ড মাঞ্চু চীনাদের কাছে হুইজিয়াং বা মুসলমানদের ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত ছিল।
পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার পর উইঘুর স্বাধীনতাকামীরা তাদের মুক্তির লড়াই অব্যাহত রাখে। ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে তারা দুইবার বিদ্রোহ করেছে এবং শেষবার তারা সফলও হয়। তারা আবার পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। চীনের জাতীয়তাবাদী সরকার স্বাধীন তুর্কিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং জোসেফ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নও নতুন এই রাষ্ট্রকে সমর্থন জানায়। কিন্তু চীনের গৃহযুদ্ধে জাতীয়তাবাদীরা হেরে যাওয়ার পর মাওসেতুংয়ের নেতৃত্বে বিজয়ী কমিউনিস্টরা তুর্কিস্তানকে চীনের সাথে কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু এতে উইঘুর নেতারা রাজি হননি।

এরপর এক রহস্যঘেরা বিমান দুর্ঘটনায় পূর্ব তুর্কিস্তানের সব শীর্ষ উইঘুর নেতা প্রাণ হারান। প্রচলিত আছে যে, মাওসেতুংয়ের চক্রান্তেই ওই বিমান দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। ওই বিমান দুর্ঘটনার পরপরই জেনারেল ওয়াং ঝেনের নেতৃত্বে বিশাল এক চীনা বাহিনী মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পূর্ব তুর্কিস্তানে হামলা চালিয়ে সেটি দখল করে। এরপর ওই ভূখণ্ডের নাম পরিবর্তন করে আবার জিংজিয়াং রাখা হয়। চীনা দখলের পর অনেক স্বাধীনতাকামী উইঘুর নেতা পালিয়ে তুরস্কে ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে চলে যান। তখন থেকেই জিংজিয়াংয়ের উইঘুর মুসলমানদের ওপর চীনা কমিউনিস্ট সরকার নানাভাবে নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। অন্য দিকে স্বাধীনতাকামী উইঘুররা ১৯৪৯ সাল থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কিছু তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
চীনের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ জাতিগত হান হওয়ার কারণে জিংজিয়াং প্রদেশে তারা সংখ্যালঘু হয়েও উইঘুরদের বেশি সুবিধা ভোগ করছে। আগে সরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘুদের নিয়োগের বিধান থাকায় উইঘুররা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোটা অনুযায়ী কিছু সুবিধা পেত। কিন্তু বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর উইঘুররা এখন সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এখন তাদের নিজ প্রদেশ জিংজিয়াংয়েও চাকরির ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। যেকোনো একটি চাকরির জন্য তাদের জিংজিয়াং থেকে শত শত মাইল এমনকি হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো প্রদেশে চলে যেতে হচ্ছে সংখ্যালঘুদের উপকূলীয় এলাকায় প্রেরণের নীতির কারণে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর চাকরিপ্রত্যাশীদের নাম নিবন্ধন করার পর অনেক দূরের উপকূলীয় প্রদেশগুলোতে জোর করে তাদের পাঠিয়ে দেয় কাজ করার জন্য। সেখানে বিভিন্ন কারখানায় তারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে হানদের নানা অত্যাচার ও বিদ্রুপের মধ্যে।

প্রায় ৬০ বছর আগে কমিউনিস্ট চীনের সৈন্যরা জিংজিয়াংয়ে আসার পর থেকে এই ভূখণ্ডের মুসলমানরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার হারিয়েছে। নানা আইন-কানুন ও বিধিবিধান করে সরকার উইঘুরদের ধর্মীয় জীবন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে চীন সরকার মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি বাড়িতেও উইঘুরদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করে থাকে। মসজিদের বাইরে সব সময়ই নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়। সরকারিভাবে মসজিদে ইমাম নিয়োগ দেয়া হয় এবং ইমামদের প্রতি নজর রাখা হয়। উইঘুরদের সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ যেকোনো ধরনের প্রকাশনা সরকারি সেন্সর ছাড়া আলোর মুখ দেখতে পারে না। কারো ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ হলেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
জিংজিয়াংয়ে চীন সরকারের অনুসৃত কঠোর নীতির কারণে খুব সামান্যসংখ্যক উইঘুর মুসলমানই হজে যাওয়ার সুযোগ পান। রমজান মাসে উইঘুর সরকারি কর্মচারীরা রোজা রাখতে পারেন না কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার কারণে। জুমার নামাজের খুৎবায় কী কথা বলা হবে সেটাও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগেই ইমামকে বলে দেন। উইঘুরদের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কাশগড় নগরীর অনেক মসজিদ ও ভবন ভেঙে ফেলে সেখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। নগরীর অনেক এলাকার মুসলমানদের উচ্ছেদ করে কাশগড় থেকে শত মাইল দূরে নির্মিত আবাসিক কমপ্লেক্সে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের কোনো অনুমতি নেয়া কিংবা জিজ্ঞাসা করারও প্রয়োজন মনে করেনি সরকার।
>>>ব্লগ একাত্তর ডট কম

Wednesday, April 15, 2020

চীনা নিপীড়ন শিবিরে ১০ লাখের বেশি মুসলিম: যুক্তরাষ্ট্র

সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ১০ লাখের বেশি মানুষকে চীন নিপীড়ন শিবিরে আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। বেইজিংয়ে উইঘুরসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মুসলিমদের গণ–আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের এশিয়া নীতির পরিচালক র‍্যান্ডেল শ্রিভারের এই মন্তব্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ‘নিপীড়ন শিবির’ কথাটি আন্তর্জাতিক সমালোচনার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল। কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে ইসলামি চরমপন্থীদের ঝুঁকি স্তিমিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী সচিব শ্রিভার আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় জার্মানির নাৎসি বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শব্দ ‘নিপীড়ন শিবির’ কথাটি ব্যবহার করেছেন তিনি।
এর আগে বন্দিশিবিরের সাবেক বাসিন্দারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। শিবিরের প্রতিটি কক্ষে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। প্রতিদিনকার পাশবিক নির্যাতনের পাশাপাশি মগজ ধোলাইয়ের কারণে অনেকেই আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়। কাঁটাতারের বেড়া আর পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে ঘেরা নিপীড়ন শিবিরগুলো বন্দীদের জন্য রীতিমতো বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের সেনাবাহিনীর ব্যাপারে পেন্টাগনে বিস্তারিত এক আলোচনায় শ্রিভার বলেন, ‘চায়নিজ সমাজতান্ত্রিক দলগুলো নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে চীনের মুসলমানদের গণহারে গ্রেপ্তার করে বন্দিশিবিরে আটকে রাখছে।’ তাঁর মতে, আটক মুসলিমের সংখ্যা ‘৩০ লাখের কাছাকাছি’ হবে।
ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও মুসলমান নাগরিকদের প্রতি চীনের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার শিবিরগুলোকে পুনঃশিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। চায়নিজদের এহেন কর্মকাণ্ড ‘১৯৩০ সালের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে’ বলে দাবি করেন পম্পেও।
জিনজিয়াংয়ের জ্যেষ্ঠ চায়নিজ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন সরকার। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সীমান্তবর্তী এ বিশাল এলাকায় ঠাঁই মিলেছে উইঘুরসহ অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের। মার্কিন যেকোনো অবরোধের বিরুদ্ধে ‘গুনে গুনে প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে চীন।
জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষ গত মার্চ মাসে ‘নিপীড়ন শিবিরের’ সঙ্গে এলাকাটির তুলনা সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, ‘এটি আর দশটি সাধারণ বোর্ডিং স্কুলের মতোই।’ তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, উইঘুর মা–বাবার ওপর সন্তানের উপাধি পরিবর্তনে বাধ্য করা থেকে শুরু করে তাদের ইসলামি শিক্ষার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে জিনজিয়াং। শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, তাদের আদেশ অনুযায়ী না চললে শাস্তিও পেতে হচ্ছে চীনা মুসলিমদের।

Tuesday, February 4, 2020

চীনে উইগর মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারে যা জানা গেছে

একজন উইগর মুসলিম
চীনে সংখ্যালঘু উইগর মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে চীনা সরকারের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।
চীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা বিপুল সংখ্যক উইগর মুসলিমকে কতোগুলো বন্দী শিবিরের ভেতরে আটকে রেখেছে।
গত অগাস্ট মাসে জাতিসংঘের একটি কমিটি জানতে পেরেছে যে ১০ লাখের মতো উইগর মুসলিমকে পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে কয়েকটি শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ক্যাম্পে তাদেরকে 'নতুন করে শিক্ষা' দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেইজিং সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
কিন্তু একইসাথে শিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসকারী লোকজনের ওপর চীন সরকারের নিপীড়নমূলক নজরদারির তথ্যপ্রমাণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কারা এই উইগর

উইগরদের বেশিরভাগই মুসলিম। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে এদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি দশ লাখ।
আত্মপরিচয়ের বেলায় তারা নিজেদেরকে সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে মধ্য এশীয়র লোকজনের কাছাকাছি বলে মনে করেন। তাদের ভাষা অনেকটা তুর্কী ভাষার মতো।
শিনিজিয়াং-এ একজন মুসলিম আজান দিচ্ছেন।
তবে গত কয়েক দশকে সংখ্যাগুরু চীনা হান জাতির বহু মানুষ শিনজিয়াং অঞ্চলে গেছেন সেখানে বসবাস করতে। উইগর সম্প্রদায়ের লোকজন মনে করছেন এর ফলে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাপন হুমকির মুখে পড়েছে।

শিনজিয়াং কোথায়?

এটা চীনের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে। এবং একই সাথে এই অঞ্চল চীনের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। এর সীমান্তের ওপাশে আছে আরো কয়েকটি দেশ- ভারত, আফগানিস্তান এবং মঙ্গোলিয়া।
তিব্বতের মতো শিনজিয়াংও স্বায়ত্তশাসিত এলাকা। তার অর্থ হচ্ছে, কাগজে কলমে হলেও, বেইজিং-এর বাইরেও তারা নিজেদের মতো করে অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই দুটো এলাকাই চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিনজিয়াং এর অর্থনীতি কৃষি ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। কারণ এই অঞ্চলের শহরগুলোর ভেতর দিয়েই গেছে সিল্ক রোড।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উইগররা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু এই অঞ্চলটিকে ১৯৪৯ সালে চীনের নতুন কমিউনিস্ট সরকারের পুরো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়।

শিনজিয়াং-এ কী হচ্ছে

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক একটি কমিটি ২০১৮ সালের অগাস্ট মাসে জানতে পারে যে চীন সরকার উইগরদের স্বায়ত্তশাসিত এলাকাকে মূলত একটি বন্দী শিবিরে পরিণত করেছে। সেখানে ১০ লাখের মতো মানুষকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।
একটি বাজারে কয়েকজন উইঘুর মুসলিম।
এসব তথ্যের সাথে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগের মিল পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যেসব লোকজনের ২৬টি তথাকথিত 'স্পর্শকাতর দেশের' আত্মীয় স্বজন আছেন তাদেরকে এসব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে।
এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান এবং তুরস্কসহ আরো কিছু দেশ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এছাড়াও যারা মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিদেশের কারো সাথে যোগাযোগ করেছে তাদেরকে টার্গেট করেছে কর্তৃপক্ষ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরো বলছে, এসব ক্যাম্পে যাদেরকে রাখা হয়েছে তাদেরকে চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর অনুগত থাকতে। আরো বলা হচ্ছে, তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে অথবা সেই ধর্ম পরিত্যাগ করতে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে,উইগর সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। তাদের বাড়িঘরের দরজায় লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ কোড, বসানো হয়েছে মুখ দেখে সনাক্ত করা যায় এরকম ক্যামেরা।
ফলে কোন বাড়িতে কারা যাচ্ছেন, থাকছেন বা বের হচ্ছেন তার উপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক নজর রাখতে পারছে। তাদেরকে নানা ধরনের বায়োমেট্রিক পরীক্ষাও দিতে হচ্ছে।

বিবিসি কী জানতে পারছে

শিনজিয়াং-এ সংবাদ মাধ্যম নিষিদ্ধ। ফলে সেখান থেকে প্রকৃত তথ্য পাওয়া কঠিন।
তবে বিবিসির সাংবাদিকরা বেশ কয়েকবার ওই এলাকায় যেতে পেরেছেন। তখন সেখানে বেশ কিছু ক্যাম্প এবং প্রত্যেকটি স্তরে পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়েছে।
দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তারা লোকজনের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে দেখছেন।
এসব ক্যাম্প থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এরকম কয়েকজনের সাথেও কথা বলতে পেরেছে বিবিসি।
সহিংসতার ছবি।
ওমির নামে তাদের একজন বলেছেন, "তারা আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হতো। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটাতো। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সুই দিয়ে শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেওয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এসব যন্ত্রপাতি রাখা হতো। এসময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতো সেটাও আমি শুনতে পেতাম।"

সহিংসতার ব্যাপারে কী জানা যায়

চীন সরকারের দাবি তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি ইসলামপন্থী গ্রুপের সন্ত্রাসী তৎপরতা মোকাবেলা করছে।
বেইজিং বলছে, উইগর মুসলিমদের কেউ কেউ জঙ্গি গ্রুপ ইসলামিক স্টেটে যোগ দিয়েছে।
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সেখানকার লোকজনের ওপর চীনের দমন-পীড়নের কারণেই সেখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
সেখানকার আঞ্চলিক রাজধানী উরুমকিতে ২০০৯ সালের দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছে কমপক্ষে ২০০ জন। তাদের বেশিরভাগই চীনা হান। তারপর থেকে সেখানে আরো কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলা হয়েছে পুলিশ স্টেশন এবং সরকারি ভবনেও। ২০১৪ সালে এরকম কিছু হামলায় নিহত হয়েছে ৯৬ জন।
সরকারের পক্ষ থেকে এসব হামলার জন্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করা হয়েছে। বেইজিং বলছে, শিনজিয়াং-এর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা চীনের অন্যত্রও হামলা চালিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে তারা তিয়েনানমেন স্কয়ারে গাড়ি দিয়েও হামলা করেছিল।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিনজিয়াং-এ ছুরি দিয়ে চালানো হামলায় পাঁচজন নিহত হওয়ার পর সরকার সেখানে নতুন করে অভিযান চালাতে শুরু করে। এসময় সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাও 'সন্ত্রাসীদের' বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

কী বলছে চীন

চীনের সর্বত্র সৈন্যদের নজরদারি বাড়ছে।
চীন বলছে তারা 'জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের অপরাধমূলক তৎপরতা' মোকাবেলা করছে।
জেনেভায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের এক অধিবেশনে চীনা কর্মকর্তা বলছেন, ১০ লাখ উইগরকে বন্দী শিবিরে আটকের রাখার খবর 'সম্পূর্ণ মিথ্যা।'
কিন্তু তারপরে চীনের একজন কর্মকর্তা লিও শিয়াওজুন সাংবাদিকদের বলেছেন, চীন সেখানে কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে যেখানে লোকজনকে নানা ধরনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেকেই হয়তো এটাকে উত্তম পদ্ধতি বলবেন না। কিন্তু মনে রাখতে হবে সন্ত্রাস মোকাবেলায় পশ্চিমা বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।
শিনজিয়াং-এ কী হচ্ছে সেব্যাপারে চীনের সরকারি তরফ থেকে কখনো পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সেখানে যেহেতু সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ সেকারণে আসলেই কী হচ্ছে সেবিষয়ে নিরপেক্ষ খবর পাওয়া খুব কঠিন।

কী করছে বিশ্ব

উইগর মুসলিমদের সাথে আচরণ নিয়ে চীন সরকারের সমালোচনা ক্রমশ বাড়ছে। তবে নিন্দা করে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কোন দেশ তেমন কিছু করেনি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে চীন সফরে যাওয়ার আগে শিনজিয়াং প্রদেশে মুসলিমদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে চীন বিষয়ক কংগ্রেসের একটি কমিটির পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে শিনজিয়াং-এ যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্যে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মিশেল ব্যাশেলেটও দাবি জানিয়েছেন শিনজিয়াং-এর পরিস্থিতি দেখতে পর্যবেক্ষকদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্যে।
এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বেইজিং সরকার।
শিনজিয়াং চীনের একেবারে পশ্চিমে। সীমান্তের ওপারে আছে আরো কয়েকটি দেশ।

Wednesday, October 9, 2019

চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিসায় বিধিনিষেধ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণে জড়িত চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিসা ইস্যুতে বিধিনিষেধ আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। চীন সরকারের কর্মকর্তা, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এর আগে সোমবার চীনের ২৮টি সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সিনজিয়াং অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণের অভিযোগে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। উচ্চ মাত্রায় নিষ্পেষণ চালিয়েছে চীন সরকার- এমন অভিযোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে চীন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

উইঘুর, জাতিগত কাজাখ, কিরগিজ মুসলিম ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চীন সরকার টানা নির্যাতন চালিয়ে আসছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন মাইক পম্পেও।
এসব নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী শিবিরে বিপুল সংখ্যক মানুষকে আটক রাখা, এর ব্যাপকতা, উচ্চ মাত্রায় নজরদারি করা, সাংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চায় কুখ্যাত নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া ব্যক্তিবিশেষ বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এক ভয়াবহ পরিণতির শিকার হন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগ আমলে নেয় নি চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং সোমবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার বিষয়ক তথাকথিত যেসব ইস্যুর অবতারণা করেছে তেমন কিছুই নেই চীনে। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তক্ষেপ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তাই তারা অজুহাত হিসেবে এসব অভিযোগ উত্থাপন করছে। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যুক্তরাষ্ট্র তার বিবৃতিতে বলেছে, সিনজিয়াং প্রদেশে যে নিষ্পেষণ চালাচ্ছে চীন অবিলম্বে তার ইতি চায় যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার করা সব ব্যক্তির মুক্তি দাবি করে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানকারী চীনা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের সদস্যদের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাতে হবে, যাতে তারা দেশে ফিরে অনিশ্চিত ভাগ্যের মুখে না পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে বাণিজ্য যুদ্ধের মুখোমুখি। এই উত্তেজনা নিরসনের জন্য এ সপ্তাহের শেষের দিকে আলোচনার জন্য এরই মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে চীন। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের একেবারে পশ্চিমের সিনজিয়াং প্রদেশে বড় ধরনের নিরাপত্তামুলক অভিযান চালু করেছে চীন। এ অভিযান নিয়ে সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ও জাতিসংঘ। তারা বলেছে, চীন ওই অঞ্চল থেকে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের কমপক্ষে ১০ লাখ সদস্যকে আটক করেছে এবং তাদেরকে রেখেছে বন্দিশিবিরে। সেখানে তাদেরকে জোর করে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদেরকে শুধু মান্দারিন চাইনিজ ভাষায় কথা বলতে দেয়া হচ্ছে। শিখানো হচ্ছে কমিউনিস্ট সরকারের প্রতি অনুগত থাকার শিক্ষা।

এর জবাবে চীন বলছে, এসব মানুষ ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ সেন্টারে যোগ দিয়েছে। এসব সেন্টার তাদেরকে কাজ দিচ্ছে। তাদেরকে চীন সমাজের সঙ্গে অঙ্গীভূত হতে সহায়তা করছে। এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে সন্ত্রাস থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এর কড়া নিন্দা করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ থেকে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন যে, চীন চায় জনগণ ঈশ্বরের প্রার্থনা না করে সরকারের উপাসনা করুক। উইঘুর ও অন্য মুসলিমদের সঙ্গে চীনের আচরণের কড়া সমালোচনা করে জুলাইয়ে কমপক্ষে ২০টি দেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক পরিষদে একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করে।

Friday, October 4, 2019

উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমনপীড়ন: সমগ্র বিশ্বকে চুপ রাখতে সফল চীন

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজ দেশে ইসলামিক মূল্যবোধ তথা ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছেন। মুসলিম বিশ্বের নানা ইস্যুতেও তাকে বিভিন্ন সময় সোচ্চার দেখা গেছে। কিন্তু চীনের উইঘুরে মুসলিমদের ওপর দেশটির সরকারের কঠিন নজরদারি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তিনি একদমই চুপ। এ বছরের জুলাইতে বেইজিং সফর করেন তিনি। এ সময় তিনি চীনের সিল্ক রোডের পরিকল্পনার পক্ষে নিজের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তার দেশে চীনের বিনিয়োগের প্রস্তাবও উৎসাহের সঙ্গে স্বাগত জানান।
এরদোগান যখন উইঘুরের মুসলিমদের নিয়ে কথা বলেছিলেন তার প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেছে। এরপর তিনি এ ইস্যু যেন বেমালুম ভুলে গেছেন। শুধু এরদোগানই নয়, সমগ্র বিশ্বই যেন শিনজিয়াং নিয়ে একদম চুপ হয়ে গেছে। সেখানে চীন বিশ্বের অন্যতম বড় বন্দিশিবির তৈরি করেছে এবং সমগ্র এলাকাকে রেখেছে কঠিন নজরদারির আওতায়। গত দুই বছর ধরে উইঘুর মুসলিমদের রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত, ধর্মনিরপেক্ষ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে চীন।
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর পরই দেশটির প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্ডা আর্ডেন বেইজিং সফর করেন। অনেকেরই ধারণা ছিলো ওই সফরে উইঘুরদের বিষয়ে চীনকে কিছুটা হলেও চাপ দেবেন তিনি। কিন্তু সফর শেষে এরকম কিছুই ঘটেনি। কারণ কারোরই অজানা নয়। নিউজিল্যান্ডের জন্য চীন একটি বড় বাজার। দেশটি চীনে ব্যাপক পরিমাণে দুধ, মাংস ও ওয়াইন বিক্রি করে থাকে। তুরস্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইরকম। গত বছর চীন শক্তি ও যোগাযোগ খাতে উন্নয়নের জন্য তুরস্ককে ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে। এরদোগান যখন চীন সফরে ছিলেন তখন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীনা স্বার্থ রক্ষায় তাকে বাহবা দিয়েছিলেন। চীনের কাছ থেকে প্রশংসিত হওয়া অনেক শাসকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীন তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সমালোচনাকে দমিয়ে রেখেছে। উল্টো উইঘুরে মুসলিমদের মানবাধিকার হরণ প্রসঙ্গে চীনকে সমর্থন দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বেশিরভাগ মুসলিম রাষ্ট্রই। এমনকি জাতিসংঘেও যাতে বিষয়টি আলোচনা হয় তার পথও আটকে দিয়েছে চীন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা বিষয়ক আলোচনায়ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প উইঘুরদের নিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স চীনে খ্রিষ্টানদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে উইঘুরদের বিষয়ে খুব সামান্যই প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
চীন প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে, উইঘুরদের বিষয়ে তারা যা করছে তা ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ। দেশটি উইঘুরে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে বোর্ডিং স্কুল হিসেবে দাবি করছে। বলছে, যেসব মানুষ ওই বন্দিশিবিরে আটক রয়েছে তারা সবাই স্বেচ্ছায়ই রয়েছে সেখানে। সমপ্রতি চীন জানিয়েছে, শিংজিয়াংয়ের সকল বন্দি শিবির বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিশ্বব্যাপী চীনের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। জাতিসংঘে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, গত ৩ বছরে চীনে একটিও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি। এইসব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো উইঘুরের মুসলিমদের সন্ত্রাসবাদ থেকে দূরে রাখছে ও তাদেরকে কর্মদক্ষ হিসেবে গড়ে তুলছে।
উইঘুরে চীনের আচরণ নিয়ে যারা নিন্দা জানাচ্ছেন তাদের মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকার। প্রথম থেকেই চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সক্রিয় দেশটি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইতিমধ্যে একে শতাব্দীর বড় কলঙ্ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার একজন সহকারী জন সালিভান মঙ্গলবার জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা দমন-পীড়ন নিয়ে কথা বলেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উইঘুর ইস্যুতে কিছু বলতে দেখা যায়নি। কোনো এক অদ্ভুত কারণে তিনিও বিষয়টি এড়িয়ে চলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমিত পদক্ষেপের একটি বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। যদি ওয়াশিংটন উইঘুরদের ওপর দমন-পীড়ন নিয়ে কিছু না করে তাহলে অন্যান্য দেশও এই ইস্যুতে চাপ বোধ করবে না। অর্থনৈতিক কারণে বেশিরভাগ দেশই চীনের বিষয়ে সাবধানে কথা বলে। ওবামা প্রশাসনের ইস্ট এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক অ্যাফায়ার্সের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ড্যানিয়েল আর রাসেল বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, অনেক সরকারই এখন চীনের এই ইস্যুতে সেলফ-সেন্সরিং করছে। বেইজিং তার নিজের স্বার্থের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। আর তাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে চীন যখন তার দেশের মানবাধিকারের বিষয়ে প্রেজেন্টেশন দিলো তখন ১২০টিরও বেশি দেশ তাতে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছিল। বিশ্বের খুব কম দেশই রয়েছে যে মুখ ফসকেও কিছু বলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার ঝুঁকি নিতে চাইবে। তাই কোনো রাষ্ট্র যখন চীনের সমালোচনা করেও তখনো দেখা যায় তারা কোনো একটি দল হয়ে করছে। এবং এই সমালোচনাটাও তারা করছে যতখানি নিরাপদ থেকে সম্ভব।
(নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে)

Sunday, September 29, 2019

‘উইঘুরদের নিয়ে চুপ কেন পাকিস্তান’ ইমরানকে কটাক্ষ

বিশ্বব্যাপী নির্যাতনের শিকার মুসলিমদের নিয়ে পাকিস্তানের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কটাক্ষ করলো যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক দপ্তরের অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি অ্যালিস ওয়েলস গতকাল শুক্রবার ইসলামাবাদের কাছে চীনের মুসলিম নির্যাতন নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি বলেন, চীনে মুসলিমদের ওপর যে দমন-পীড়ন হচ্ছে তা কাশ্মীরের থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ। আমি দেখতে চাই, ইমরান খান চীনের মুসলিমদের নিয়েও সম পরিমাণ উদ্বেগ প্রকাশ করবেন।
এর আগে সোমবার ইমরান খানের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন নিয়ে তিনি কী ভাবেন? কিন্তু ইমরান খান ওই প্রশ্নে উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। খান বলেন, চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। আর এ মন্তব্য করেই বিতর্কের মধ্যে পরেন তিনি। শুক্রবার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মুসলিমদের নিয়ে ইমরান খানের উদ্বেগের বিষয়ে অ্যালিস ওয়েলসকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, চীনের পশ্চিমাংশে মুসলিমদের আটক করে রাখা হয়েছে। আমি দেখতে চাই ইমরান খান সেটি নিয়েও একইরকম উদ্বেগ জানিয়েছেন। সেখানে কাশ্মীরের থেকে কয়েকগুণ বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও চীনে আটক কয়েক লাখ উইঘুর ও তুর্কিভাষী মুসলিমদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে কথা জানিয়ে অ্যালিসের প্রশ্ন, সেখানে কেন পাকিস্তান একটি কথাও বলল না?
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সব থেকে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার চীন। বিশ্লেষকরা দাবি করে আসছেন, দেশটির শিনজিয়াং প্রদেশে অন্তত ১০ লাখ মুসলিমকে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। তাদেরকে জোরপূর্বক চীনের সেক্যুলার ও কমিউনিস্ট চিন্তাধারায় প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। তবে এ নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি পাকিস্তানকে।

Wednesday, September 25, 2019

প্রবাসী উইঘুরদের চীনের কাছে হস্তান্তর নয়: যুক্তরাষ্ট্র

মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা চীনের প্রবাসী উইঘুরদের বেইজিং-এর কাছে হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠকে দেশগুলোর প্রতি এ আহ্বান জানান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি।
মাইক পম্পেও বলেন, উইঘুর মুসলমানদের চীনে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বেইজিং-এর দাবি যেন নাকচ করে দেয় মধ্য এশিয়ার দেশগুলো।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মধ্য এশীয় দেশগুলোর সহায়তা চান মাইক পম্পেও। তিনি বলেন, এ লড়াইয়ে দেশগুলোর পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে চীনে উইঘুর নিপীড়নের বিষয়টির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোনও যোগসূত্র নেই। প্রকৃতপক্ষে চীন জিনজিয়াং অঞ্চল থেকে তার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে মুছে দিতে চায়।
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মত স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার ওপর এখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু গত বেশ কয়েক ধরে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে যে, সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা গণগ্রেফতারের শিকার হচ্ছে।
২০১৮ সালের আগস্টে জেনেভায় চীনের ওপর জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির দুই দিনের বিশেষ সভায় উঠে আসে চীনে উইঘুরদের বন্দিশিবিরে আটকে রাখার বিষয়টি। সভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির জাতিগত বৈষম্য বিষয়ক সংস্থা জানায়, চীনে ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমকে আটকে রাখা হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ স্বায়ত্তশাসিত উইঘুর প্রদেশকে কার্যত ‘বিশাল একটি বন্দিশিবিরে’ পরিণত করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসংঘের কাছে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটকের অভিযোগ তোলা হয় চীনের বিরুদ্ধে। তবে উইঘুরদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে ‘সন্ত্রাস ও চরমপন্থা’র বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে বেইজিং।
চীনকে কেন অভিযুক্ত করা হচ্ছে?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির কাছে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উইঘুর মুসলিমদের গণহারে ধরে বিভিন্ন বন্দিশিবিরে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেসব শিবিরে তাদের জোর করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য করা হচ্ছে।
নির্বাসিত উইঘুর মুসলিমদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস তাদের এক রিপোর্টে বলেছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই উইঘুরদের আটক করা হচ্ছে। তাদের জোর করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে স্লোগান দিতে বলা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস জানিয়েছে, বন্দিদের ঠিকমত খাবার দেওয়া হয় না এবং নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। অধিকাংশ বন্দিকে দীর্ঘদিন আটকে রাখলেও তাদের অভিযুক্ত করা হয় না এবং কোনও আইনি সহায়তা নিতেও দেওয়া হয় না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিদেশি ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ এখন ‘সিনিসাইজ রিলিজিওন’ নামে এক প্রচারণা শুরু করেছে যাতে বলা হচ্ছে ‘ধর্মকে যতটা পারো চীনের মতো করে নাও।’ ইতোমধ্যেই সরকারিভাবে উইঘুরদের ঘরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে হান সম্প্রদায়ের ‘গুপ্তচরদের।’ চীনের সরকারি এসব কর্মচারীরা উইঘুর পরিবারের সঙ্গে থাকেন, যাতে তাদেরকে ‘চীনা সংস্কৃতি’র সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে এবং প্রয়োজনে সরকারকে উইঘুরদের ‘অগ্রহণযোগ্য’ জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন।
আল জাজিরা জানিয়েছে, হান সম্প্রদায়ের ১০ লাখেরও বেশি সরকারি চাকরিজীবীকে উইঘুরদের পরিবারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরা উইঘুর পরিবারের ‘সদস্য’ হয়ে পরিবারগুলোর ওপর নজরদারি করছে। এর বাইরে সরাসরি বন্দিশিবিরে রয়েছেন আরও বিপুল সংখ্যক উইঘুর মুসলিম। সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি, টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

Wednesday, September 18, 2019

মুসলিমদের ওপর চীনের অকথ্য নির্যাতন প্রকাশ্যে আনলেন বন্দিশিবিরের প্রশিক্ষক

অনেকদিন ধরেই সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত সরকারের নিপীড়নের কথা জোরোশোরে শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানাবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন থেকে এরইমধ্যে জানা গেছে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রের নামে তাদের আটক করে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শে দীক্ষিত করার চেষ্টা চলছে। আটককেন্দ্রের বন্দিদের ভাষ্য থেকে নিপীড়নের প্রচণ্ডতার কথা জানা গেছে আগেই। তবে এবার প্রথমবারের মতো ওইসব আটককেন্দ্রে কর্মরতদের একজন সেখানকার অকথ্য নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। একটি আটককেন্দ্রে চাকরি করা সারায়গুল সাউতবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর কাছে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলমান নিপীড়নের ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন।
চীনে প্রায় দেড় কোটি উইঘুর মুসলমানের বাস। তাদের প্রতি চীনের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে বেইজিং। গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় সেখানকার ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে ওই অঞ্চল সফরের প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছিল। যুক্তরাজ্য সরকারও এনিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে চীনকে তাদের মনোভাব পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছে।
জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মত স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার ওপর এখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু গত বেশ কয়েক ধরে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে যে, সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ব্যাপক হারে আটকের শিকার হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসংঘের কাছে এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে। উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটকের অভিযোগ এনেছে তারা। তবে চীন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চীন উইঘুর মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন ও তাদের মানবাধিকার হরণের অভিযোগ অস্বীকার করলেও কথিত ওইসব প্রশিক্ষণকেন্দ্রের একটিতে চাকরি করা সারায়গুল সাউত বলছেন ভিন্ন কথা। সাউতবে বলেন, ‘আমি জানতাম সেখানে সবাই দোষী না। কিন্তু তাদের কষ্ট লাঘবে আমার কিছুই করার ছিলো না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নেই যে একদিন এই সত্য প্রকাশ করবো।’ ২০১৮ সালে জিনজিয়াংয়ের ক্যাম্প থেকে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে আসেন সাউতবে। এখন কাজাখস্তানে তার পরিবারের সঙ্গে থাকেন। এখানেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রার্থনা করেছেন। সেখান থেকেই জানিয়েছেন তার অভিজ্ঞতার কথা। 
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিনজিয়াং প্রদেশে চীনা সরকার উইঘুর মুসলিমদের বেশকয়েকটি ক্যাম্পে আটক রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র দফতরের হিসেব অনুযায়ী বিগত কয়েক বছর ধরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ সেখানে বন্দি রয়েছে।  উইঘুর ছাড়াও কাজাখ, কিরগিজ মুসলিমরাও সেখানে বন্দি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বেশ কয়েকটি দেশ ও মানবধিকার সংগঠন জানিয়েছে এই ক্যাম্পগুলো আটকশিবির ছাড়া কিছুই নয়। তবে চীন এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এটা স্বেচ্ছামূলক উন্মক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।  তবে সাউতবে বলেছেন, ‘চীন বিশ্বের কাছে মিথ্যা বলছে। তাদের দাবি এগুলো আটককেন্দ্র নয় বরং প্রশিক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু এটা মিথ্যা কথা। আমি নিজের চোখে দেখেছি সেখানে কি হয়।’ সাউতবের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া চীনের দাবি, তিনি ঘটনা বানিয়ে বানিয়ে বলেছেন। আর চীন সরকারের কাছে এখনও আর্থিকভাবে ঋণী তিনি।  তবে সেখানকার কয়েকজন বন্দিও নিপীড়নের প্রচণ্ডতার কথা জানিয়েছেন সিএনএনকে।  তারা বলেছেন,  শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে তাদের নির্যাতন করে রাজনৈতিক ভাবাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

Friday, August 23, 2019

মুসলিম শিশুদেরকে বাবা-মা থেকে বিছিন্ন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে চীন

চীনে নিখোঁজ শিশুদের ছবি।
চীনের পশ্চিম জিনজিয়াং এলাকায় মুসলিম শিশুদেরকে কৌশলে তাদের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, সংখ্যালঘু উইগর মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেক শিশুর বাবা-মা হয় জেলে, না হয় ক্যাম্পে বন্দী আছেন।
পাশাপাশি উইগর মুসলিম শিশুদের জন্য বোর্ডিং স্কুল তৈরির জন্য দেশটিতে ব্যাপক ভিত্তিতে একটি প্রচারণা কার্যক্রম নেয়া হয়েছে।
সমালোচকেরা বলছেন, শিশুদেরকে তাদের মুসলিম কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন করতেই মূলত এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবে, এসকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চীনা রাষ্ট্রদূত লিউ জিয়াওমিং।
রবিবারে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, "শিশুদেরকে তাদের অভিভাবকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে না। মোটেও না।"
কিন্তু বিবিসি এর আগে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছে যে, জিনজিয়াং-এর একটি এলাকাতেই ৪০০ এর অধিক শিশু বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, উগ্রবাদকে মোকাবেলা করতে উইগর সম্পদ্রায়ের সদস্যদের শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।
কিন্তু বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে দেখা যায় যে, এমনকি নিজের বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নামাজ পড়া বা হিজাব পড়া বা তুরস্কে কারো সাথে যোগাযোগ থাকার কারণেও অনেককে আটক করা হচ্ছে।
এই ব্যবস্থায় দশ লাখেরও বেশি মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাবা-মাকে আটক করার পর কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে শিশুটিকে 'সেন্ট্রালাইজ কেয়ার' বা কেন্দ্রীয় পরিচর্যার আওতায় নেয়া হবে কিনা।
জিনজিয়াং-এর স্থানীয় একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব শিশুর বাবা-মাকে আটক করা হয় তাদেরকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
সেখানেই শিশুদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয় এবং এই শিশুদেরকে ভালোভাবে দেখ-ভাল করার নির্দেশ দেয়া হয়।
শিশুদেরকে বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই বিষয়টি নিয়ে বিবিসির হয়ে গবেষণা করেছেন যেই ড. আদ্রিয়ান জেঞ্জ। তিনি বলেছেন, বোর্ডিং স্কুলগুলোতে মূলত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে সাংস্কৃতিকভাবে রি-ইঞ্জিনিয়ারিং বা নতুন করে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়।
তার এর মতে, বোর্ডিং স্কুলে রাখার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মূলত জিনজিয়াং-এর সরকার এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছে যারা নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ে উঠছে।
উইগর সম্পদ্রায়ের হাজার হাজার মানুষ তুরস্কে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে, কেউ নিজের পরিবারের সদস্যদের দেখতে আর কেউ-বা পাড়ি জমিয়েছেন ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে বাঁচতে।
চীনা রাষ্ট্রদূত লিউ জিয়াওমিং।

Wednesday, August 7, 2019

চীনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে মুসলিম শিশুদের

চীনে মুসলিম শিশুদেরকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এর আগে হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ককে আটককেন্দ্রে আটকে রাখার খবর এসেছিলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এবার শিশুদের বিচ্ছিন্ন করে রাখারা জন্য আবাসিক স্কুল তৈরির খবর মিলেছে। গত শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়।  সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও অন্যান্য নথি বিশ্লেষণ করে বিবিসির পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা করা হয়।
চীনে প্রায় দেড় কোটি উইঘুর মুসলমানের বাস। তাদের প্রতি চীনের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে বেইজিং। গত ডিসেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় সেখানকার ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে ওই অঞ্চল সফরের প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছিল। যুক্তরাজ্য সরকারও এনিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে চীনকে তাদের মনোভাব পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছে।
বিবিসি জানায়, জিনজিয়াংয়ের একটি শহরের চার শতাধিক শিশু হারিয়ে গেছে। তাদের বাবা-মাকেও আটকে রাখা হয়েছে। হয় আটককেন্দ্রে নয়তো কারাগারে।  মুসলিমদের তাদের পরিচয় নিশ্চিহ্ন করার পাশাপাশি শিশুদেরও তাদের মূল থেকে সরানোর প্রক্রিয়া ছিলো এটা।
জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মত স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার ওপর এখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু গত বেশ কয়েক ধরে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে যে, সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ব্যাপক হারে আটকের শিকার হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসংঘের কাছে এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে। উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটকের অভিযোগ এনেছে তারা। তবে চীন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া অনেক উইঘুর চীনের নিপীড়নের কথা শুনিয়েছে। ইস্তানবুলে একটি হলে বেশ কয়েকজন বিবিসিকে শুনিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতা। একজন নারী তার সন্তানদের ছবি দেখিয়ে বলেন, আমি জানি না তাদের কে দেখাশোনা করছে। আমার সঙ্গে তাদের কোনও যোগাযোগই নেই।    আরেকজন মা তার তিন ছেলে ও এক মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে কান্না করতে থাকেন। তিনি বলেন, আমি শুনেছি তাদের এতিমখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এমন ৬০ জনের পৃথক সাক্ষাতকার নিয়েছে বিবিসি। তাদের সবার কথাতেই উঠে এসেছে শিশুদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিনজিয়াং প্রদেশে চীনা সরকার উইঘুর মুসলিমদের বেশকয়েকটি ক্যাম্পে আটক রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র দফতরের হিসেব অনুযায়ী বিগত কয়েক বছর ধরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ সেখানে বন্দি রয়েছে।  উইঘুর ছাড়াও কাজাখ, কিরগিজ মুসলিমরাও সেখানে বন্দি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বেশ কয়েকটি দেশ ও মানবধিকার সংগঠন জানিয়েছে এই ক্যাম্পগুলো আটকশিবির ছাড়া কিছুই নয়। তবে চীন এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, এটা স্বেচ্ছামূলক উন্মক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
এক উইঘুর মুসলিম জানান, চীনে তার স্ত্রীকে ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে। তার ৮ সন্তান এখন চীনা কর্তৃপক্ষের অধীনে। তাদের সম্ভবত শিশু শিক্ষা ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে।
জার্মানির গবেষক অ্যাড্রিয়ান জেনজ বলেন,জিনজিয়াংয়ে স্কুল সম্প্রসারণের ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। নতুন ডরমিটরি তৈরি হচ্ছে এবং সেখানে ধারণক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এখন রাষ্ট্র অনেক শিশুর ২৪ ঘণ্টা তদারকির সক্ষমতা অর্জন করেছে। একই সঙ্গে তারা জিজ্ঞাসাবাদের ক্যাম্প তৈরি করছে। এসবই মুসলিমদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।
মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু শিশুদের কিন্টারগার্টেনের ভর্তির হার ৯০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালেই এই সংখ্যা ছিলো ৫ লাখেরও বেশি।  জিনজিয়াং প্রদেশে এই কিন্ডারগার্টেনের উন্নয়নে ১২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে চীন।  
জেনজ বলেন, এই নির্মাণ কাজ আসলে তাদের আটক রাখার উদ্দেশ্যেই করা।  গত বছর এপ্রিলে প্রায় দুই হাজার শিশুকে আবাসিক স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সরকারের দাবি, শিশুরো যেন সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখে সেজনও এটি করা। তবে জেনজ মনে করেন এর উদ্দেশ্য আরও গভীর। তিনি বলেন, আবাসিক স্কুলের মাধ্যমে শিশুদের চিন্তাধারা পাল্টে সাংস্কৃতিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব।

Sunday, July 28, 2019

উইঘুরদের জোর করে মুসলিম বানানো হয়েছে: চীন

উইঘুরদের প্রতি নৃশংস আচরণের পক্ষে সাফাই গাইতে শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসের দোহাই হাজির করছে চীন। দেশটির জিনজিয়াং প্রদেশে ২০ লাখ উইঘুর মুসলিম নিপীড়নের শিকার বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসার পর চীন এখন দাবি করছে, ওই অঞ্চলে কেউই ইচ্ছা করে ইসলাম গ্রহণ করেনি, বরং দশম শতকে যুদ্ধের পর তা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মত স্বশাসিত একটি অঞ্চল। বিদেশি মিডিয়ার ওপর এখানে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু গত বেশ কয়েক ধরে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে যে, সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ব্যাপক হারে আটকের শিকার হচ্ছে। চীনে হান চাইনিজরা সংখ্যাগুরু। তাদের তুলনায় মুসলিম উইঘুরদের সংখ্যা নগন্য।

গত রবিবার চীনের রাষ্ট্রীয় তথ্য পরিষদ দফতর থেকে ৬ হাজার ৮০০ শব্দের একটি নথি প্রকাশ করা হয়। নথিতে দাবি করা হয়, জিনজিয়াংয়ে সব ধর্মের মানুষই শত শত বছর ধরে সহাবস্থান করছে আসছে। ওই প্রদেশ তাদের নাগরিকদের ধর্ম বিশ্বাস কিংবা বিশ্বাস না করার প্রতি সম্মান জানায়।

প্রতিবেদনে চীন দাবি করে, ১০তম শতকে যুদ্ধের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মুসলিমরা প্রবেশ করে। ফলে শত শত বছর ধরে বজায় রাখা বৌদ্ধ ধর্মের আধিপত্য  ক্ষুণ্ন হয়। বলা হয়, উইঘুররা নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেনি। বরং ধর্মীয় যুদ্ধ ও শাসকদের চাপে পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।  ওই অঞ্চলের ইতিহাস বিদেশি শক্তি, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসী বাহিনীর দ্বারা বিকৃত হয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর ফ্যাক্টবুকের তথ্য অনুযায়ী চীনের মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ বৌদ্ধ, ৫ শতাংশ খ্রিস্টান ও ২ শতাংশ মুসলিম। তবে চীনের নথিতে দাবি করা হয়, ‘উইঘুর মুসলিমরা মূলত তুর্কিস্তান থেকে এসেছে এই ধারণা ঠিক নয়। জিনজিয়াং যুগ যুগ ধরেই চীনা ভূখণ্ডের অংশ। এটা কখনোই তথাকথিত পূর্ব তুর্কিস্তানের অংশ ছিলো না।’

ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে চীন ওই  প্রতিবেদনে দাবি করে, জিনজিয়াংয়ে ২৪ হাজার ৮০০টি স্থানে ধর্মীয় কার্যক্রম চলে। সেখানে ২৪ হাজার ৪০০ মসজিদ রয়েছে আর ৪০০ মন্দির ও গির্জা রয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি জিনজিয়ানে উইঘুরদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাদের ওপর চীনের অভিযানকে ‘সাংস্কৃতিক নিশ্চিহ্নকরণ’ বলছে তাদের আটককেন্দ্রে থাকা সাবেক বন্দিরা।

এর আগে ২০১৭ সালে জিনজিয়াংয়ে বড় দাড়ি রাখা এবং পর্দা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। ‘অদ্ভুত উপায়ে’ শিশুদের নাম রাখাও নিষেধ ছিলো। ২০১৮ সালে চীনা সরকারি কর্মকর্তারা উইঘুর পরিবারকে জোরপূর্বক বাড়িতে রাখতে শুরু করেছিলো। চলতি বছর গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জিনজিয়াংয়ে অনেক মসজিদও গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

জিনিজিয়াংয়ে এই আটককেন্দ্রগুলোকে ‘উন্মুক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ দাবি করে চীন। তাদের দাবি, ইসলামি উগ্রবাদ রুখতে এই কেন্দ্রগুলো খুবই জরুরি। রবিবার প্রকাশিত শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়, জিনজিয়াংয়ে এমন ঘটনার অনেক আগেই বিশ্বে এমন ঘটনা ঘটেছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে এই প্রবণতা বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়ে।

চীনের দাবি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং এই অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় আইন মেনেই সন্ত্রাস ও উগ্রবাদবিরোধী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ এই পদক্ষেপের যেকোনও ধরনের সমালোচনা আসলে ‘দ্বিমুখী‘ আচরণ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ধরনের সমালোচনা আসলে বিবেক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রকৃত ন্যায়বিচার নিয়ে যারা সত্যিই কাজ করে তাদের কেউই এই সমালোচনা সমর্থন করবেন না।

Monday, July 15, 2019

উইঘুর মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের নিন্দা ২২ দেশের

উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলছে নিপীড়ন
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নিপীড়নের নিন্দা জানিয়েছে ২২টি দেশ। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের কাছে এক লিখিত বার্তায় তারা চীনের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। চীনে প্রায় দেড় কোটি উইঘুর মুসলমানের বাস। তাদের প্রতি চীনের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে বেইজিং।
জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ উইঘুর মুসলিম। এই প্রদেশটি তিব্বতের মতো স্বায়ত্তশাসিত একটি অঞ্চল। সেখানে বিদেশী মিডিয়ার প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গত ডিসেম্বরে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কার্যালয় সেখানকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে ওই অঞ্চল সফরের প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছিল।
সর্বশেষ গত বুধবার অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানসহ মোট ২২টি দেশের রাষ্ট্রদূত জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের কলি সিক এবং হাইকমিশনার মিশেল ব্ল্যাচেতের কাছে একটি চিঠি দিয়ে নিন্দা জানান।
চিঠিতে উইঘুরদের আটক রাখার নির্ভরযোগ্য খবরের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জিনজিয়াংয়ে উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুর ওপর নজরদারির ব্যাপারেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। চীনকে এই আটক রাখা বন্ধ করে উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুর চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বলা হয়। চিঠি পাঠিয়ে ওই দেশগুলোর পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়, এটা যেন মানবাধিকার পরিষদের দাফতরিক নথি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোনো দেশের সমালোচনা করে ৪৭ সদস্যের এই পরিষদে চিঠি পাঠানোর ঘটনা বিরল। তবে জিনজিয়াংয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে এটাই হয়তো একমাত্র পথ এখন। চাপ প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়া হলে চীনের পক্ষে অনেক ভোট পড়ারও সম্ভাবনা আছে।
গত বেশ কিছু দিন ধরে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে যে, সেখানে বসবাসরত উইঘুরসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ব্যাপক হারে আটকের শিকার হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোও জাতিসঙ্ঘের কাছে এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে। উইঘুর মুসলিমদের গণহারে আটকের অভিযোগ এনেছে তারা। তবে চীন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

Sunday, July 7, 2019

উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি দেখতে তুর্কি প্রতিনিধি দলকে চীনের আমন্ত্রণ

জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে তুরস্কের একটি প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন সরকার। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট দফতরের কমিউনিকেশন ডিরেক্টর ফারহেতিন আলতুন টুইটারে জানিয়েছে এই তথ্য। খরব দিয়েছে তুরস্কের ইংরেজী সংবদা মাধ্যম ডেইলি সাবাহ।
জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলমনাদের ওপর চীনা সরকারের দমনমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে আসে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক সব সময়ই এর বিরুদ্ধে স্বোচ্চার। তুস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান একাধিকবার এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারই প্রতিক্রিয়ায় হয়তো তুর্কি প্রতিনিধি দলকে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন।
এ মাসের শুরুতে চীন সফর করেছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। সে সময় তিনি বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে। গত এক মাসে এটি দুই নেতার তৃতীয় সাক্ষাৎ। এরদোগানের সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চীন ঠিক কিভাবে তুরস্কের প্রতিনিধি দলকে উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তার স্পষ্ট করেননি ফারহেতিন আলতুন।
চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের অধিকাংশ বাসিন্দা উইঘুর মুসলমান। তারা জাতিগত তুর্কি বংশোদ্ভূত। দেশটিতে মুসলমানদের জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক কঠোরতা আরো করেছে চীনের কমিউনিস্ট সরকার ধর্মীয় রীতিনীতি পালনেরও স্বাধীনতা নেই তাদের।  এরই মধ্যে খবর বেড়িয়েছে কয়েক লাখ ‍উইঘুর মুসলমানকে একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী করে রেখেছে চীন। চীনের দাবি তাদের সংশোধন করতেই এই ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।