Wednesday, March 25, 2026

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইসরায়েলের ফাঁদে পড়েছে by সুমাইয়া ঘানুশি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন একটি কাজ করেছেন, একসময় ওয়াশিংটনের অনেকেই যা ঘটতে দিতে চাননি। নেতানিয়াহু আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে টেনে এনেছেন। এর আগে এমনটি ঘটেছিল ২০০৩ সালে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরাকে আক্রমণ করেছিল। সেই যুদ্ধের পেছনে ছিল নব্যরক্ষণশীলদের ‘নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ নামের রাজনৈতিক চেতনা। ইরাক আক্রমণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের দুর্বল হয়ে পড়া সরকারকে উৎখাত করে।

কিন্তু প্রথমে এটাকে বিজয় মনে করা হলেও দ্রুতই বাস্তবতা ভিন্নরূপ নেয়। বাগদাদের পতন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আধিপত্যের বদলে তা দীর্ঘ বিদ্রোহ, অস্থিরতা ও অন্তহীন যুদ্ধের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বের অনেক জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমেছে।

এই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসেছিলেন ইরাক যুদ্ধের ভুল স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তখন মার্কিন রাজনৈতিক অভিজাতদের বড় একটি অংশ মনে করতে শুরু করেছিল যে, ইরাক আক্রমণ ছিল গুরুতর ভুল। এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি আর কখনো করা উচিত নয়। পরে একই অসন্তোষের ঢেউ থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষমতায় আসেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র আর মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধে জড়াবে না।

কিন্তু বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে ভিন্নচিত্র। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে আবার সেই জটিল মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ভেতরেই টেনে এনেছেন। ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তিনি চেষ্টা করে গেছেন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যায়। নিয়মিত ওয়াশিংটন সফর, রাজনৈতিক চাপ এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি এই লক্ষ্য এগিয়ে নেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল, বিশেষ করে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমেও এই প্রভাব কাজ করেছে।

ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয় যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে এবং ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অনুমোদন দেয় এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু হয়।

কিন্তু এখনই বোঝা যাচ্ছে, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার নয়। নেতানিয়াহু যে সহজ বিজয়ের কথা বলেছিলেন, বাস্তবতা তা নয়। এই সংঘাত এমন পরিস্থিতি থেকেও তৈরি হয়নি, যেখানে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে আসন্ন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইরানের কাছে এমন কোনো কৌশলগত অস্ত্রও নেই, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা তৈরি করেছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি জোরদার হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত ইরান মূলত তা মেনে চলছিল। পরবর্তী আলোচনাগুলোতেও তেহরান আবার সমৃদ্ধকরণ কমাতে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছিল। অথচ কয়েক মাস আগেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি থেকে জন্ম নেয়নি। বরং এটি এসেছে ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাব এবং সেই কৌশল গ্রহণে প্রস্তুত একটি মার্কিন প্রশাসনের সমন্বয় থেকে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ প্রায় এক হয়ে গেছে। আগে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিজস্ব যুদ্ধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তাতে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সমর্থন দিত। কিন্তু এখন দুই দেশ একই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।

এর প্রভাব ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকাঠামো একটি সহজ সমঝোতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করবে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিমাণ বিশাল। ২০২৫ সালে ট্রাম্পের উপসাগর সফরের সময় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সময়ে উপসাগরীয় অর্থ ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও প্রবাহিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স উপসাগরীয় সার্বভৌম তহবিল থেকে বিলিয়ন ডলার পরিচালনা করছে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড একাই সেখানে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প কার্যত সেই দীর্ঘদিনের সমঝোতাকেই দুর্বল করে ফেলেছেন। কারণ, উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে অঞ্চলটির সরকারগুলো আগেই সতর্ক করেছিল এবং ওয়াশিংটনকে যুদ্ধের পথে না যেতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের কথা গুরুত্ব পায়নি।

প্রভাবশালী আমিরাতি ব্যবসায়ী খালাফ আল হাবতুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, গুলি চালানোর আগে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়েছিল কি না? কারণ, এই উত্তেজনার প্রথম ভুক্তভোগী হবে এই অঞ্চলের দেশগুলোই। তাঁর বক্তব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরে তৈরি হওয়া এক বিস্তৃত অস্বস্তির প্রতিফলন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধে জড়ায়, তখন এই দেশগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সেখানে হাজার হাজার সৈন্য, যুদ্ধবিমান এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি এখন অনেকের কাছেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার চাপ দিচ্ছে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রকাশ্যে সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি সংঘাতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ইরান–ইরাক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খলা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর লাভ নেই। আরব বিশ্বেরও নেই। কিন্তু একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মনে করে, অঞ্চলে শক্তির শূন্যতা তৈরি হলে তার আপেক্ষিক শক্তি বাড়ে। সেই রাষ্ট্রটি হলো ইসরায়েল। অনেক ইসরায়েলি কৌশলবিদ মনে করেন, আশপাশের রাষ্ট্রগুলো দুর্বল হলে বা ভেঙে পড়লে ইসরায়েলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।

কিন্তু এ ধরনের ভাঙন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সব সময় মেলে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল। বিশেষ করে উপসাগর অঞ্চল তার বৈশ্বিক প্রভাবের একটি প্রধান ভিত্তি। এখানেই রয়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের কেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন অর্থনীতিতে বড় বিনিয়োগের উৎস

দীর্ঘদিন ধরে এই অংশীদারত্ব একটি সহজ বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সহযোগিতা ও প্রবেশাধিকার থাকবে এবং বিনিময়ে থাকবে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে।

ইসরায়েলের কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক পথে এগোচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত স্পষ্ট হবে একটি বৈপরীত্য। ইসরায়েলের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই অঞ্চলে নিজের অবস্থান দুর্বল করছে, যে অঞ্চল বহুদিন ধরে তার বৈশ্বিক শক্তিকে জোরদার করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখন একটি শিক্ষা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে ব্যবস্থাকে তারা নিরাপত্তার গ্যারান্টি মনে করেছিল, সেটিই এখন তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে ইরান নয়, বরং ইসরায়েলকে ঘিরেই। তাদের কৌশল অনুসরণ করা কি সত্যিই ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি ধীরে ধীরে সেটিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

* সুমাইয়া ঘানুশি, ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিবিশেষজ্ঞ
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা তেল শিল্প এলাকার একটি স্থাপনায় হামলার পর সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া। ফুজাইরা মিডিয়া অফিসের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের মধ্যে গত ৪ মার্চ ফুজাইরায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা তেল শিল্প এলাকার একটি স্থাপনায় হামলার পর সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া। ফুজাইরা মিডিয়া অফিসের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের মধ্যে গত ৪ মার্চ ফুজাইরায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। ছবি: রয়টার্স

ইরানের সম্মতির পর হরমুজ প্রণালি পার হলো থাই তেলবাহী ট্যাংকার

থাইল্যান্ড ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পর একটি থাই তেলবাহী ট্যাংকার নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ব্যাংচাক করপোরেশন এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অনুরোধ করেছিলাম যে থাই জাহাজগুলোর যদি এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে তারা নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে কি না?’

থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তারা (ইরান) ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে তারা বিষয়টি দেখবে। পাশাপাশি কোন কোন জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করবে, আমাদের কাছে সেগুলোর নাম চেয়েছে।’

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। তবে ইরানের সম্মতি নিয়ে কিছু তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর জ্বালানি-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ১১ মার্চ, ২০২৬
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর জ্বালানি-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ১১ মার্চ, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স


ইরানে ট্রাম্পের আমেরিকার ধর্মযুদ্ধ! by রায়ান জিকগ্রাফ

প্রায় ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে শুধু রাজনীতি বা ভূরাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখে না; তাদের অনেকেই মনে করে, এসব ঘটনার মধ্যেই বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে উঠছে। এ বিশ্বাসে লাখ লাখ মানুষকে বড় করা হয়েছে। একসময় আমিও সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসীদের একজন ছিলাম।

সম্প্রতি খবর এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ইউনিটের কমান্ডার গত সোমবার এক ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তাদের বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নাকি ঈশ্বরের পরিকল্পনারই অংশ। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যিশু বেছে নিয়েছেন ইরানে সেই আগুন জ্বালানোর জন্য, যেখান থেকে আরমাগেডনের শুরু হবে এবং যিশুর পৃথিবীতে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে।

খ্রিষ্টান বিশ্বাস অনুযায়ী, আরমাগেডন হচ্ছে শেষ সময়ের এক চূড়ান্ত যুদ্ধ। বাইবেলের রেভেলেশন গ্রন্থে বলা আছে, পৃথিবীর শেষ দিকে ভালো ও মন্দ শক্তির মধ্যে একটি বড় যুদ্ধ হবে। এ যুদ্ধকে আরমাগেডন বলা হয়। অনেকের বিশ্বাস, এই যুদ্ধের পর যিশু ফিরে আসবেন এবং পৃথিবীতে নতুন শান্তির যুগ শুরু হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সদস্য এমন আরও অনেক ঘটনা নিয়ে অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগ পেয়েছে মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা জানিয়েছেন, কিছু কমান্ডারের মধ্যে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, তাঁরা শুধু যুদ্ধ করছেন না, বরং বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এ বলা শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়নের কাজ করছেন।

আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া প্রচারক জন নেলসন ডারবি আঠারো শতকের ত্রিশের দশকে বাইবেল ব্যাখ্যার একটি নতুন ধারণা দেন। এ ধারণার নাম ডিসপেনসেশনালিজম। তাঁর মতে, মানব ইতিহাস সাতটি আলাদা যুগে ভাগ করা। প্রতিটি যুগে ঈশ্বর মানুষের সঙ্গে ভিন্নভাবে সম্পর্ক রাখেন। যেমন আদম ও হাওয়ার সময়, মহাপ্লাবনের সময় ও যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময়।

এই বিশ্বাস অনুযায়ী, শেষ জামানায় পৃথিবীতে বড় অস্থিরতা দেখা দেবে। এরপর ঘটবে ‘র‍্যাপচার’। অর্থাৎ বিশ্বাসীরা অলৌকিকভাবে স্বর্গে চলে যাবেন। তারপর কিছু সময় পৃথিবী শাসন করবে অ্যান্টিক্রাইস্ট বা ধর্মদ্রোহীরা। শেষে যিশু ফিরে এসে পৃথিবীতে হাজার বছরের শান্তির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।

ডারবির এ ধারণাই পরে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইভানজেলিক্যাল সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলে। তবে অধিকাংশ খ্রিষ্টান এই ব্যাখ্যা মানেন না। ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও অনেক প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা ‘রেভেলেশন’ গ্রন্থকে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করে। অনেক গবেষকের মতে, সেখানে উল্লেখিত ‘বিস্ট’ বা পশু আসলে রোমান সম্রাট নিরোর প্রতীক, যিনি প্রাচীন খ্রিষ্টানদের ওপর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিলেন।

১৯০৯ সালে প্রকাশিত ‘স্কোফিল্ড রেফারেন্স বাইবেল’-এ ডারবির ব্যাখ্যাগুলো বাইবেলের পাশে নোট হিসেবে ছাপা হয়। এতে অনেক পাঠক বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে বিশ্বরাজনীতির একধরনের সংকেত হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এই ধারণা আরও জনপ্রিয় হয় ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হাল লিন্ডসের বই ‘দ্য লেট গ্রেট প্ল্যানেট আর্থ’-এর মাধ্যমে। বইটিতে তিনি বলেন, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং পরে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া শেষ যুগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

এ ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইবেলের ‘ইজেকিয়েল’ গ্রন্থের ৩৮ নম্বর অধ্যায়। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোট বাঁধবে। অনেকের মতে, সেখানে উল্লেখ করা পারস্য বলতে আজকের ইরানকে বোঝানো হয়েছে। লিন্ডসে মনে করেছিলেন, সেই জোটের উত্তরের শক্তি হতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আশির দশকেই আরমাগেডন ঘটতে পারে।

আজ অনেকেই ভুলে গেছেন, কিন্তু ষাটের দশকের অস্থিরতা, শীতল যুদ্ধের ভয় ও পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার সময় এই বই আমেরিকায় বড় আলোড়ন তুলেছিল। ১৯৭৪ সালে হাল লিন্ডসে এ বিষয়ে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান করেন, যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দেখেছিল। পরে এ নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি হয়।

১৯৭৬ সালের হরর চলচ্চিত্র ‘দ্য ওমেন’-এ অ্যান্টিক্রাইস্টকে শয়তানের সন্তান হিসেবে দেখানো হয়, যার শরীরে ৬৬৬ সংখ্যার জন্মচিহ্ন থাকে। আশির দশকে কিছু হেভি মেটাল ব্যান্ডও বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে গান করে। এর একটি উদাহরণ হলো জনপ্রিয় মেটাল ব্যান্ড আয়রন মেইডেনের গান ‘নাম্বার অব দ্য বিস্ট’।

আমার বাবা স্কোফিল্ড বাইবেল ও হাল লিন্ডসের বই পড়ে ধীরে ধীরে এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীমুখী ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। একসময় তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে বারাক ওবামা হলেন অ্যান্টিক্রাইস্ট।

ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্লেষকের কাছে ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা নতুন প্রতিপক্ষ খুঁজতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টি ঘুরে যায় ইরানের দিকে।

এই ধারার একজন পরিচিত প্রচারক ওকলাহোমার পাদ্রি মার্ক হিচকক। তিনি বিভিন্ন বইয়ে দাবি করেছেন, আধুনিক ইরানই বাইবেলে উল্লেখ করা পারস্য এবং ইরানই ভবিষ্যতের শেষ যুদ্ধের কেন্দ্র হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সেই ঘটনারই প্রস্তুতি।

অনেক ইভানজেলিক্যাল গির্জায় যে খ্রিষ্টান জায়নবাদ দেখা যায়, তার শিকড়ও এই বিশ্বাসে। সেখানে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলেই শেষ যুগের ঘটনাগুলো শুরু করবে, যার মধ্যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনে এই গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়ে। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৮ সালে ইসরায়েল সফরে গিয়ে তিনি ইরান চুক্তি বাতিল এবং জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস দ্রুত খোলার প্রতিশ্রুতি দেন। তখন ইসরায়েলের একটি পত্রিকা লিখেছিল, অনেক ইভানজেলিক্যাল ও মেসিয়ানিক ইহুদির কাছে এটি যেন নতুন যুগের ইঙ্গিত।

কিছু বছর এই ধর্মীয় ভাষা কম শোনা গেলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা আবার জোরালো হয়েছে। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি সামরিক ঘাঁটির ৪০টির বেশি ইউনিট থেকে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। এতে বোঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাষ্ট্রনীতির মিশ্রণ এখন পেন্টাগন পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এদিকে সম্প্রতি সিনেটর জন করনিন সান আন্তোনিওতে একটি ধর্মসভায় অংশ নেন, যার শিরোনাম ছিল ‘এন্ড অব ডেজ অপারেশন এপিক ফিউরি’। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘শেষ সময়ের মহা অভিযান’। সভাটি পরিচালনা করেন টেলিভিশন প্রচারক জন হাগি, যিনি ‘ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল’-এর প্রতিষ্ঠাতা।

ট্রাম্প নিজে ধর্মতত্ত্বে খুব একটা আগ্রহী নন। তবে তিনি ধর্মীয় প্রতীকের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝেন। বাইবেল হাতে ছবি তোলা বা নিজের বেঁচে যাওয়াকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলা—এ ধরনের কাজ তিনি প্রায়ই করেছেন। তাই ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া ভবিষ্যদ্বাণীর আলোচনায় ট্রাম্প এক অদ্ভুত অবস্থানে আছেন। কারও কাছে তিনি বাইবেলের সাইরাস রাজার মতো, যাঁকে ঈশ্বর ইতিহাসের শেষ অধ্যায় শুরু করার জন্য ব্যবহার করছেন। আবার অন্যদের কাছে তিনি সেই আকর্ষণীয় নেতার প্রতীক, যাঁর কথা ‘রেভেলেশন’ গ্রন্থে বলা হয়েছে; যিনি বিশৃঙ্খলার সময়ে উঠে এসে মানুষের আনুগত্য অর্জন করেন।

মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও প্রায়ই বলেন, ইরানের শিয়া ধর্মগুরুদের ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁদের নীতিকে প্রভাবিত করছে। কিছু ক্ষেত্রে তা সত্যও হতে পারে।

কিন্তু যখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাই ব্রিফিংয়ে আরমাগেডনের কথা বলেন এবং সিনেটররা ‘শেষ দিনের’ ধর্মসভায় অংশ নেন, তখন মনে হয়, ভবিষ্যদ্বাণীর প্রভাব শুধু এক পক্ষের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়।

* রায়ান জিকগ্রাফ, আটলান্টাভিত্তিক একজন সাংবাদিক
- ইংরেজি সাময়িকী জ্যাকবান থেকে নেওয়া, সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছেন ট্রাম্প
বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নিচ্ছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

সৌদির নতুন পরিকল্পনা: ইসরায়েলকে বর্জন নাকি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল? by শন ম্যাথিউস

সৌদি আরব একটি ফাইবার অপটিক কেব্‌ল প্রকল্পে সিরিয়াকে ট্রানজিট দেশ হিসেবে বেছে নিতে চায়। এই কেব্‌লটি ভূমধ্যসাগর হয়ে সৌদি আরবকে গ্রিসের সঙ্গে যুক্ত করবে। প্রকল্পটির সঙ্গে পরিচিত দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এর আগে আলোচনা ছিল, কেব্‌লটি ইসরায়েল হয়ে যাবে। কিন্তু রিয়াদ এখন জোর দিচ্ছে সিরিয়া হয়ে গ্রিসের সঙ্গে সংযোগে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণ বদলাচ্ছে। সৌদি আরব একদিকে দামেস্কের আঞ্চলিক অবস্থান শক্ত করতে চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করতে চায়।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। গাজায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইয়েমেন, সুদান ও লোহিত সাগর ইস্যুতেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের মতপার্থক্য রয়েছে। আরব বিশ্বের মধ্যে আমিরাতই ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদার।

এদিকে গ্রিস নিজেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে জ্বালানি, রিয়েল এস্টেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এথেন্স কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তবে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে গ্রিস ইসরায়েলকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখে। তুরস্কের সঙ্গে বিরোধের প্রেক্ষাপটে এথেন্স মনে করে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সক্রিয় রাখার একধরনের নিশ্চয়তা।

সৌদি আরব যদি নতুন রুটে ইসরায়েলকে বাদ দেয়, তাহলে গ্রিসের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।

ফাইবার অপটিক কেব্‌ল আলোর স্পন্দনের মাধ্যমে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ডিজিটাল তথ্য পৌঁছে দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ইউরোপে তথ্য পাঠানোর জন্য এই অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়ছে।

২০২২ সালে গ্রিস ও সৌদি আরব ‘ইস্ট টু মেড ডেটা করিডর’ বা ইএমসি প্রকল্প ঘোষণা করে। এটি সৌদি টেলিকম কোম্পানি এসটিসি, গ্রিসের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী পিপিসি, গ্রিক টেলিকম কোম্পানি এবং স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশন কোম্পানি টিটিএসএ–এর যৌথ উদ্যোগ।

সে সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা চালাচ্ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যা জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইসরায়েল লেবানন, সিরিয়া ও ইরানেও হামলা চালায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাবমেরিন ফাইবার অপটিক কেব্‌ল বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান রল বলেন, আগে কয়েকটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েল হয়ে যাওয়ার। এই প্রকল্পও তার একটি ছিল। এখন সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সিরিয়া হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নতুন বিষয়। ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে বিকল্প স্থলপথ খোঁজা হচ্ছে। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আস্থা তৈরি হলে এটি একটি বিকল্প হতে পারে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে গ্রিসের পিপিসির একটি উপস্থাপনায় দেখা যায়, ইএমসি নেটওয়ার্কে সিরিয়ার সংযোগ দেখানো হয়নি। সেখানে করিডরটি ইসরায়েল ও তার উপকূলীয় জলসীমা হয়ে গেছে বলে চিত্র রয়েছে।

আরেকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব গ্রিসের সঙ্গে একটি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রকল্পও কল্পনা করছে, যা ইসরায়েলকে এড়িয়ে সিরিয়া হয়ে যাবে। এটি হবে উচ্চ ভোল্টেজ ডাইরেক্ট কারেন্ট সংযোগের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের মধ্যে বিদ্যুৎ আদানপ্রদান।

সৌদি আরব সিরিয়াকে এসব প্রকল্পে যুক্ত করতে চাওয়ায় বোঝা যায়, রিয়াদ আঞ্চলিক মিত্রদের শক্ত করতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ইঙ্গিতও দেয়।

রিয়াদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের দৃষ্টিতে দামেস্ক আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। তারা চায় সড়ক, কেব্‌ল ও রেলপথ সিরিয়া হয়ে যাক।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসটিসি ঘোষণা দিয়েছে, তারা সিরিয়ার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত একটি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সিরিয়াকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত করাই লক্ষ্য।

রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন বলেন, ইসরায়েলের বদলে সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা দেখায়, অঞ্চলটি কতটা নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এটি সিরিয়াকে আঞ্চলিক পরিসরে ফিরিয়ে আনার সৌদি প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পর্ক কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়।

২০২২ সালে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল। বর্তমান অবস্থান রিয়াদের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

গ্রিস একাধিক কেব্‌ল রুটের কেন্দ্র হতে চায়। উপসাগরীয় দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং সিঙ্গাপুরের মতো পূর্ব এশীয় ব্যবসাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ জোরদার করছে।

একসময় ইউরোপে প্রবেশের প্রধান বন্দর ছিল মার্সেই ও জেনোয়া। এখন রুট বৈচিত্র্যের কারণে প্রবেশপথ পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। এতে গ্রিস ও তুরস্ক নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বহু উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প অতীতে বাস্তবায়িত হয়নি। গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলকে যুক্ত করার গ্যাস পাইপলাইন পরিকল্পনা থেমে গেছে। একইভাবে গ্রেট সি ইন্টারকানেক্টর কেব্‌ল প্রকল্পও একাধিকবার বিলম্বের মুখে পড়েছে।

তুরস্ক পূর্ব ভূমধ্যসাগরের একটি বড় অংশে দাবি জানায়, যা গ্রিসের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। এ ছাড়া ভারত, গ্রিস, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্ত করার একটি বাণিজ্য করিডর নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইস্ট টু মেড ডেটা করিডর তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্পে অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ। গ্রিক ও সৌদি ব্যাংক প্রকল্পের ৬০ শতাংশ অর্থায়নে চুক্তি করেছে। ২০২৩ সালে ইএমসি আলকাতেল সাবমেরিন নেটওয়ার্কসের সঙ্গে দুটি সাবসি ও স্থলভিত্তিক ডেটা কেব্‌ল নির্মাণে সরবরাহ চুক্তি সই করে।

* শন ম্যাথিউস, সাংবাদিক মিডল ইস্ট আই
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে), ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু (ডানে)
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে), ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু (ডানে) ফাইল ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে কীভাবে ধ্বংস করছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি ও ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরসহ দেশটির নেতৃত্বে থাকা বেশ কয়েকজন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের নিহত হওয়ার ঘটনা এ অঞ্চলের জন্য ভূমিকম্পসম। কেননা এ ঘটনায় পুরো অঞ্চলজুড়ে নজিরবিহীন এক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

তবে উত্তেজনার মাত্রা নজিরবিহীন হলেও এর পেছনের যুক্তি নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রশাসন গোপনে ও প্রকাশ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক এবং সামরিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারগুলো পুনর্গঠন, প্রতিপক্ষকে উৎখাত ও এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। বর্তমান সংকট এ চক্রেরই পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত।

ইরানে গণতন্ত্রকে শ্বাস রোধ করা

মধ্যপ্রাচ্যকে নিজের আধিপত্যে আনার যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার শুরু সেই ১৯৫০–এর দশক থেকে; মূলত তেল ও বাণিজ্যের প্রশ্নকে ঘিরে।

ওই সময় ওয়াশিংটন নিজের তেলের জোগান ও মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি যুদ্ধকালীন অংশীদারত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে। অন্যদিকে ইরান যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নিজেদের তেলচুক্তি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়।

১৯৫১ সালে ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নেতৃত্বে ইরানি পার্লামেন্ট শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতা সীমিত করার ও দেশের বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা শুরু করে।

মোসাদ্দেক তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন ও দেশে রাজতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানান। এর জেরে যুক্তরাজ্য ইরানের তেল রপ্তানিতে অবরোধ আরোপ করে। এ কারণে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও গভীর হয়।

তেহরান ও লন্ডনের মধ্যে বিরোধ মেটাতে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ওয়াশিংটনকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন।

১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মিলে ইরানে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটাতে সহায়তা করে। তারা ইরানে বিক্ষোভে অর্থায়ন, সামরিক জোট তৈরি ও রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলে। ওই বছর আগস্ট মাসে রাজতন্ত্রপন্থী কর্মকর্তারা ট্যাংকসহ মোসাদ্দেকের বাসভবন ঘেরাও করে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত ও শাহর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন।

এবার ইরানের ওপর যুক্তরাজ্যকে আর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়নি ওয়াশিংটন; বরং ইরানকে একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন তেল কনসোর্টিয়াম গঠনের দিকে ঠেলে দেয় ওয়াশিংটন, যেন পশ্চিমা কোম্পানিগুলোও ইরানের তেল থেকে মুনাফা পেতে পারে।

একই সঙ্গে সিআইএ শাহর নতুন নিরাপত্তা সংস্থা ‘সাবাক’ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সিআইএ সাবাক সদস্যদের প্রশিক্ষণও দিত। পরে ভিন্ন–মতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি, তাঁদের দমন করা ও অত্যাচারের জন্য শাহর এ বাহিনী কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ওই অভ্যুত্থান ইরানে শক্তিশালী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পশ্চিমা কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

মস্কোর স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান প্রিমাকভ ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের প্রধান গবেষক ও মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাই সুকহভ আরটিকে বলেন, ইরানের এই নতুন ধারা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে অনেকটাই সংজ্ঞায়িত করেছিল।

সুকহভ জোর দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডের মূল চালিকা শক্তি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে জ্বালানি খাত নিয়ন্ত্রণে রাখার মধ্যে নিহিত।

নিজ মহাদেশে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সম্পদসমৃদ্ধ বিদেশি অঞ্চলে হস্তক্ষেপ পর্যন্ত, মার্কিন নীতি বারবার নিজের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার অনুসরণ করেছে। তারা প্রথমে ভূমি ও কৌশলগত পথের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারপর সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে।

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন হয়। এ বিপ্লবের কেন্দ্রেও ছিল বিদেশি হস্তক্ষেপের স্মৃতি। শাহর পতনের পর বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে প্রবেশ করে এটিকে গুপ্তচরদের আড্ডা হিসেবে ঘোষণা করেন ও ৪৪৪ দিন ধরে মার্কিন কূটনীতিকদের জিম্মি করে রাখেন।

এ সংকট ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় এবং দুই দেশের মধ্যে শত্রুতার একটি চক্র শুরু হয়, যা পরে মার্কিন-ইরান সম্পর্ককে ভিন্ন রূপ দিয়েছে।

সুয়েজ ১৯৫৬: উপনিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টা

ইরানে ইসলামী বিপ্লব অন্য একটি সংকটের পথ উন্মোচন করেছিল, যে সংকট ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ভঙ্গুর অবস্থা প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ-ফরাসি কনসোর্টিয়ামের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং বিশ্ববাণিজ্য ও তেল পরিবহনে এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনির মতো কাজ করছিল। তাই মিসরের পদক্ষেপ লন্ডন ও প্যারিসের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি ইডেন গোপনে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে সুয়েজ খাল দখলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা ছিল, ইসরায়েল মিসর আক্রমণ করবে, আর অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনী ‘যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত ও শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন’ করার অজুহাতে হস্তক্ষেপ করবে।

কিন্তু তাদের সেই অভিযান দ্রুতই ব্যর্থ হয়। মার্কিন গোয়েন্দারা আগেই এ পরিকল্পনার খবর জানতে পারেন এবং প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এটি সমর্থন করতে অস্বীকার জানান।

কারণ, আইজেনহাওয়ার এটিকে একটি নতুন উপনিবেশবাদী বেপরোয়া হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন, যা নতুন স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মস্কো মিসরকে সমর্থন দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে সংকট দুই পরাশক্তির সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি।

ওয়াশিংটন জাতিসংঘকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।

এ ঘটনা ওই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সেটি হলো, যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র।

যে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলার দ্বার উন্মুক্ত করে

২০০৩ সালে ইরাকে আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের আরেক উচ্চাভিলাষী পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে নাইন–ইলেভেন হামলার পর তথাকথিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে দেশটি। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক মার্কিন নীতিনির্ধারকের কাছে শুধু আফগানিস্তানে অভিযান যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না।

সে সময় নানান নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ইরাক ছিল অনেকটাই দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দেশটি একই সঙ্গে একটি হুমকি এবং একটি সুযোগ হিসেবে ধরা দেয়।

ইরাকে সামরিক অভিযানের পক্ষে জনমত তৈরি করতে তৎকালীন বুশ প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এবং তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।  

এ দাবি এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল যে দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইরাকে অভিযানের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করতে তা সহায়তা করেছিল।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সামরিক জয়ের পর সে দেশে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। ইরাকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস ও সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করার কারণে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হয়।

বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ভিত্তিক মিলিশিয়ারা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয় পড়েন,  বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু হয় এবং আত্মঘাতী বোমা হামলা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রতিশোধ, নির্যাতন এবং জাতিগত নির্মূল অভিযান চালায়।

এমন বিশৃঙ্খলার সুযোগে আল-কায়েদা (যুক্তরাষ্ট্রে নাইন–ইলেভেন হামলায় অভিযুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী) ইরাকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে।

‘(মার্কিন) সামরিক অভিযানের এ ফলাফল একটি বৈপরীত্য তুলে ধরে। সেটি হলো, মার্কিন সামরিক অভিযান ইরাকের জন্য ধ্বংসাত্মক এবং এ অঞ্চলের জন্য অস্থিতিশীলতা তৈরি করলেও, দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়িয়েছিল’, বলেন সুকহভ।  

এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লিবিয়া এবং অন্যান্য দেশেও একই ধরনের প্রক্রিয়া লক্ষ করা যায়। তা হলো, মার্কিন অভিযানের কারণে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা মানবিক ও আঞ্চলিক দিক থেকে ব্যর্থতার পরিচায়ক হতে পারে, কিন্তু এই নিরাপত্তাশূন্যতা সেখানে বাইরের শক্তিকে হস্তক্ষেপ করতে কৌশলগত সুবিধা দেয়।

ওয়াশিংটনের পরবর্তী শত্রু লিবিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির পরবর্তী ধাপে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার ইচ্ছার প্রকাশ ঘটতে থাকে। সেই ১৯৮০–এর দশকের শুরুতেই ওয়াশিংটন লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কারণ, গাদ্দাফি শীতল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরে সোভিয়েত প্রভাবের সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই লিবিয়া থেকে গাদ্দাফিকে সরানোর বা তাঁকে দুর্বল করার উপায় খুঁজতে শুরু করেন।

১৯৮৬ সালে ‘গালফ অব সিদ্রা’য় (লিবিয়ার উত্তরে মিসরাতা থেকে বেনগাজি পর্যন্ত প্রায় ৪৪৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সির্ত উপসাগর) সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ার পর মার্কিন বাহিনী লিবিয়ার তল্লাশি নৌযানগুলো ডুবিয়ে দেয় এবং দেশটির উপকূলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে।

সে সময় বার্লিনের একটি নৈশক্লাবে বোমা হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন। ওয়াশিংটন এ জন্য লিবিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করে ত্রিপোলি ও বেনগাজি শহরে বিমান হামলা চালায়। এ অভিযান শুধু লিবিয়াকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নয়; বরং গাদ্দাফিকে অপসারণ বা তাঁর শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যেও ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

সেবার গাদ্দাফি বেঁচে যান ও নিজেদের বিজয়ের ঘোষণা দেন। তবে এ সংঘাত এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সূচিত করে। পরবর্তী দশকে লিবিয়া কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়।

যদিও চলতি শতাব্দীর শুরুর দশকে গাদ্দাফি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও দেশকে আবার অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তিনি অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করেন, পশ্চিমা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেন এবং বিদেশি শক্তি ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে তাঁর দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেন।

তবে ২০১১ সালের শুরুতে শুরু হওয়া আরব বসন্তের (ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণ–বিক্ষোভ, যা শুরু হয়েছিল তিউনিসিয়া থেকে) ধাক্কা লিবিয়াতেও লাগে। লিবিয়ায় বিক্ষোভ সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। সরকারি বাহিনী সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে লিবিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিন্দা শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো গাদ্দাফি বিরোধী বাহিনীর পক্ষ নিয়ে বিমান হামলার মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে, যা দেশটিতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে।

২০১১ সালের আগস্টের মধ্যে, বিদ্রোহীরা ত্রিপোলি দখল করে। গাদ্দাফি পালিয়ে যান, কিন্তু দুই মাস পর তিনি ধরা পড়েন এবং তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এর মাধ্যমে লিবিয়ায় গাদ্দাফির চার দশকের শাসনের অবসান ঘটলেও এখন পর্যন্ত দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফেরেনি।

তবে দীর্ঘ কয়েক বছরের অস্থিতিশীলতার পর লিবিয়ার জ্বালানি খাতে ধীরে ধীরে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার খুলছে।

চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে, শেভরনের নেতৃত্বে মার্কিন কোম্পানিগুলো লিবিয়ায় তেল ও গ্যাস সম্পদ উন্নয়নের অনুমোদন (লাইসেন্স) পেয়েছে।

শাসন পরিবর্তন থেকে অনন্ত সংঘাত: সিরিয়া

আরব বসন্তের সবচেয়ে বিধ্বংসী পরিণতির একটি হয়ে ওঠে সিরিয়ার সংঘাত। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ কঠোর বলপ্রয়োগ করেন এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে রাশিয়া ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেন।

২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৩ সালে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে না গিয়ে গোপনে হস্তক্ষেপের নীতি গ্রহণ করে।

সিআইএ গোপন প্রকল্পের মাধ্যমে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়।
সিরিয়া যুদ্ধ দ্রুত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঘটে। আইএস সিরিয়া ও ইরাকে বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়।

বছরের পর বছর ধরে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী। দীর্ঘ ১৩ বছর গৃহযুদ্ধ চলার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আহমেদ আল–শারার নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের ঝোড়ো আক্রমণের মুখে স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদ পালিয়ে রাশিয়া যান।

সিরিয়ায় এখন ক্ষমতায় আহমেদ আল-শারার অন্তর্বর্তী সরকার। আল–কায়েদার সাবেক সদস্য আল–শারাকে যুক্তরাষ্ট্র একসময় সন্ত্রাসীদের তালিকাভুক্ত করেছিল। তবে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।

সিরিয়া যুদ্ধ দেখিয়েছে কীভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপ, প্রক্সি যুদ্ধ (বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সহায়তা–সমর্থন) শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের প্রাথমিক লক্ষ্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফলও এনে দিতে পারে।

মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাই সুকহভ বলেন, ‘বিংশ শতাব্দীতে মার্কিন হস্তক্ষেপ প্রায়শ সরকার পরিবর্তন এবং পশ্চিমা কোম্পানির জন্য সরাসরি তেলক্ষেত্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হতো। তবে ২১ শতকে এসে ওয়াশিংটন ভিন্ন ধরনের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে, যেমনটা ভেনেজুয়েলায় ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখাতে চাইছে। সেই সঙ্গে চাইছে, জ্বালানি পরিবহনের পথ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মুনাফা আদায় ও জ্বালানি প্রবাহকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-04%2Fpq7fn2wp%2FKhameni.jpg?rect=10%2C0%2C587%2C391&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারে স্বৈরাচারদের পতন হয় না কেন by ক্যো জ্ওয়া মো

বিশ্ব ইতিহাসে স্বৈরশাসকের অভাব নেই। পার্থক্যটা তৈরি হয় তাঁদের পরিণতিতে। কেউ ক্ষমতাচ্যুত হন গণ-অভ্যুত্থানে। কারও পতন ঘটে নিজের ঘনিষ্ঠ মহলের ক্ষমতার লড়াইয়ে। কেউ দেশছাড়া হয়ে মারা যান। কেউ শেষ দিনগুলো কাটান কারাগারে। খুব কম ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো বিদেশি শক্তি সরাসরি হস্তক্ষেপ করে স্বৈরশাসককে গ্রেপ্তার করে অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

তবে মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অদ্ভুত ভাগ্যবান। জেনারেল নে উইন থেকে থান শ্বে কিংবা মিন অং হ্লাইং পর্যন্ত গল্পটা প্রায় একই। তাঁরা দেশটাকে ধ্বংস করেছেন। মানুষকে নির্মমভাবে দমন করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা কেউই প্রায় কখনো জবাবদিহির মুখে পড়েননি। এই ভাগ্য বলতে আমি নৈতিক ভাগ্য বোঝাচ্ছি না। কোনো কর্মফলের ধারণাও নয়। এটি আসলে দায়মুক্তি, যেখানে জোর করে কাউকে জবাবদিহি করানো হয় না।

চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ব চমকে ওঠে একটি খবরে। ভেনেজুয়েলার শক্তিশালী নেতা নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নাকি কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে। সেখানে তাঁদের মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটক রাখা হয়েছে। এই অভিযানের আইনগত বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে বিতর্ক চলছেই। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট। একটি পরাশক্তি চাইলে কোনো স্বৈরশাসকের ক্ষমতার অবসান এক রাতেই ঘটতে পারে।

মাদুরোই প্রথম নন, যাঁর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করে। ওয়াশিংটন এই অভিযানকে ন্যায্যতা দিয়েছিল মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা, গণতন্ত্র রক্ষা, মাদক পাচার দমন এবং পানামা খাল চুক্তি রক্ষার যুক্তিতে। নোরিয়েগাকে পরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিচার করা হয়।

২০০৩ সালে ইরাকে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। পরে তদন্তে দেখা যায়, এই দাবি সত্য ছিল না।

লিবিয়ার ঘটনা আবার কিছুটা আলাদা। ২০১১ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে ন্যাটো সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। লক্ষ্য ছিল বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করা। ন্যাটো মূলত আকাশ ও নৌপথে ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার ভেতরের শক্তিগুলোই মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ধরে হত্যা করে।

এই ঘটনাগুলো এক রকম নয়। কিন্তু এগুলো একটি নির্মম সত্য সামনে আনে। অনেক সময় স্বৈরশাসকের পতন শুধু জনগণের প্রতিরোধে ঘটে না, বরং ঘটে কোনো শক্তিধর দেশের সিদ্ধান্তে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তিনভাবে অপছন্দের সরকার বা শাসকদের অপসারণ করেছে। একটি হলো সরাসরি সামরিক আগ্রাসন। সেনা নামিয়ে শাসককে ধরে ফেলা এবং পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। সাদ্দাম বা নোরিয়েগার ঘটনা এর উদাহরণ।

দ্বিতীয়টি হলো গোপন হস্তক্ষেপ। প্রকাশ্যে সেনা না নামিয়ে স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া। ইরান, গুয়াতেমালা বা চিলির ঘটনাগুলো এই ধরনের।

তৃতীয়টি হলো অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের সমর্থন দেওয়া। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা এবং ভেতরের অসন্তোষকে শক্তিশালী করা। নিকারাগুয়া বা লিবিয়ায় এই কৌশল দেখা গেছে।

তবে বাস্তবতা হলো, এই ধরনের হস্তক্ষেপ বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যর্থ হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাক তার বড় উদাহরণ।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়। যখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য অনেক দেশে এমন হস্তক্ষেপ করেছে, তখন মিয়ানমারের জেনারেলদের ক্ষেত্রে কেন নয়। তাঁরা কি সত্যিই অতিমাত্রায় ভাগ্যবান। নাকি ওয়াশিংটনের চোখে মিয়ানমার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। নে উইন ২৬ বছর একনায়কতন্ত্র চালিয়ে দেশটিকে ধ্বংস করেছিলেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবু তিনি নব্বইয়ের বেশি বয়সে নীরবে মারা যান। কোনো আদালতে তাঁকে দাঁড়াতে হয়নি।

থান শ্বের শাসনকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রকাশ্যে অত্যাচারের প্রতীক বলেছিল। তিনি প্রায় দুই দশক ভয় আর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। তবু তাঁকে কেউ গ্রেপ্তার করেনি। তিনি নিজ শর্তেই ক্ষমতা ছেড়েছেন এবং দৃশ্যত এখনো দায়মুক্ত। এরপর এলেন মিন অং হ্লাইং। অনেকের মতে, তিনিই মিয়ানমারের ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক শাসক।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে যে মামলা চলছে, সেখানে রাষ্ট্রের দায় বিচার করা হয়। ব্যক্তির বিচার সেখানে হয় না। ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য অন্য কাঠামো রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার একটি আদালতও সর্বজনীন বিচারব্যবস্থার আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছেন। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অপরাধ অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবৈধ আফিম উৎপাদকদের একটি। সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেই এই উৎপাদন ১০ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই সবকিছু সত্ত্বেও মিন অং হ্লাইং এখনো মুক্ত। তিনি বিদেশে যাতায়াত করছেন। রাজনৈতিক সমঝোতা করছেন। ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বৈধতা তৈরির চেষ্টা করছেন।

তাহলে প্রশ্নটি থেকেই যায়। কেন মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অন্যদের মতো গ্রেপ্তার হন না, অপসারিত হন না। ভেনেজুয়েলা বা পানামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী। তাদের যুক্তরাষ্ট্র নিজের উঠান বলে মনে করে। সেখানে সমস্যা হলে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মূল কারণগুলো সাধারণত তিনটি। একটি হলো মতাদর্শ। শীতল যুদ্ধের সময় সমাজতন্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশে সরকার পরিবর্তনে নেমেছিল।

দ্বিতীয়টি হলো জাতীয় স্বার্থ। গণতন্ত্রের নামে তখন আমেরিকার অভিযানের প্রকৃত চালিকা শক্তি থাকে নিরাপত্তা ও অর্থনীতি। ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদ কিংবা ইরাকের তেল এর উদাহরণ।

মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এই স্বার্থগুলো তেমনভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত নয়। এখানকার জেনারেলরা নিষ্ঠুর হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অর্থনীতির জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করে না।

তৃতীয়টি হলো ভূরাজনীতি। মিয়ানমার চীনের প্রতিবেশী। কার্যত এটি এখন চীনের ছায়াতলে। সেখানে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ মানে বেইজিংয়ের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাত। ওয়াশিংটনের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিয়ানমার নয়।

এই কারণেই ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়। নেতৃত্ব দেওয়া হয় আঞ্চলিক জোটকে। মিয়ানমারের জেনারেলদের এই নিরাপত্তাই তাঁদের ভাগ্য।

তবে একটি বার্মিজ প্রবাদ আছে। দীর্ঘ জীবন মানেই গৌরব নয়। নে উইন দীর্ঘজীবী ছিলেন, কিন্তু অপমান নিয়েই মারা গেছেন। তাঁর দাফনও হয়নি। ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে।

থান শ্বে বা মিন অং হ্লাইং হয়তো একদিন সামরিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন। কিন্তু একদিন যখন স্বৈরতন্ত্রের অবসান হবে, তখন তাঁদের কবর মানুষের ঘৃণার স্মৃতিস্তম্ভ হয়েই থাকবে।

ক্যো জ্ওয়া মো, দ্য ইরাবতীর নির্বাহী সম্পাদক
- দ্য ইরাবতী থেকে নেওয়া, ইংরেজিতে থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-26%2Fcvliw7ks%2FWhatsApp-Image-2026-01-26-at-4.32.53-PM.jpeg?rect=112%2C0%2C1178%2C785&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমারের স্বৈরশাসকেরা অদ্ভুত ভাগ্যবান। জেনারেল নে উইন থেকে থান শ্বে কিংবা মিন অং হ্লাইং পর্যন্ত গল্পটা প্রায় একই। ছবি: দ্য ইরাবতীর সৌজন্যে

আলী লারিজানির বিকল্প কে এই বাকের জোলকাদর

ইরানের নতুন জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান বাকের জোলকাদর দেশটির বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ এক সেনানি। ইসরায়েলের হামলায় আলী লারিজানি নিহত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্বে আনা হলো বাকের জোলকাদরকে।

বাকের জোলকাদর বিভিন্ন সময়ে সামরিক, বেসামরিক এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে শীর্ষপর্যায়ের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একটি ডিভিশন পরিচালনা করার পর তাঁর উত্থান ঘটে। ওই সময় তাঁকে ইরাকের কুর্দিসহ সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এরপর কয়েক বছরের জন্য বিপ্লবী গার্ডের সেকন্ড-ইন-কমান্ড হয়ে ওঠেন বাকের জোলকাদর। সম্প্রতি তিনি এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের দায়িত্ব পান। এই কাউন্সিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেয় এবং দেশটির পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে মধ্যস্থতার কাজ করে।

পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের ফলে জোলকাদর নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আস্থা অর্জন করেছিলেন।

জোলকাদরের মতো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দিয়ে ইরান এই বার্তা দিল যে, তেহরান তার জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চায়।

সূত্র: সিএনএন।

ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রধান বাকের জোলকাদর
ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রধান বাকের জোলকাদর। ছবি: তাসনিম নিউজ এজেন্সি

৬ বছরের সাধনা, হাতে লেখা বিশাল কোরআন

প্রকাশ ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ভোর থেকে সন্ধ্যা—টানা ছয়টি বছর এভাবেই কেটেছে তাঁর। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের মিহরিমাহ সুলতান মসজিদের একটি ছোট কামরায় নিবিষ্ট মনে তুলি চালিয়েছেন তিনি।

লক্ষ্য ছিল পবিত্র কোরআনের এক অনন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করা। দীর্ঘ শ্রম ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের পর অবশেষে সেই মহৎ কাজ শেষ করেছেন ইরাকি ক্যালিগ্রাফার আলী জামান।

৫৪ বছর বয়সী এই শিল্পীর তৈরি করা কোরআনের পাণ্ডুলিপিটি এখন ইস্তাম্বুলের ওই মসজিদেই সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটির বিশালত্ব যে কাউকেই চমকে দেবে। এতে রয়েছে ৩০২টি দ্বিমুখী স্ক্রল বা পাতা, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪ মিটার (১৩ ফুট) এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৫ মিটার (৫ ফুট)।

আলী জামান বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘যখনই আমি এই কোরআনটির কথা ভাবি, আমার এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে। মহান আল্লাহ আমাকে এটি শেষ করার তৌফিক দিয়েছেন, এ জন্য আমি গর্বিত।’

অদম্য স্পৃহা

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সাধারণ কাগজ ব্যবহার করেননি জামান। ডিমের সাদা অংশ, কর্ন স্টার্চ (ভুট্টার আটা) এবং ফিটকিরির বিশেষ মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছিল টেকসই বিশেষ কাগজ।

১২ বছর বয়স থেকে ক্যালিগ্রাফির প্রেমে পড়া জামান মূলত ইরাকের সোলাইমানিয়া প্রদেশের বাসিন্দা। তবে ক্যালিগ্রাফি বা হস্তশিল্পের কদর তুরস্কে বেশি হওয়ায় ২০১৭ সালে সপরিবারে ইস্তাম্বুলে চলে আসেন তিনি।

আলী জামানের এই দীর্ঘ সাধনায় বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাঁর পরিবারকেও।

তাঁর ছেলে রেকার জামান স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বাবার এই প্রকল্পের কাজ চলাকালীন আমরা তাঁকে খুব কমই কাছে পেয়েছি। শুধু তাঁর খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় অথবা রাতে যখন তিনি ঘুমাতে আসতেন, তখনই তাঁর দেখা মিলত। আলহামদুলিল্লাহ, কাজ শেষ হওয়ার পর এখন আমরা তাঁকে বেশি সময় পাচ্ছি।’

বিশ্ব রেকর্ডের হাতছানি

আলী জামানের দাবি, এটি বিশ্বের বৃহত্তম হাতে লেখা কোরআন। যদিও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ এখনো এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের মক্কার ‘হলি কোরআন মিউজিয়ামে’ সংরক্ষিত একটি কোরআনকে বিশ্বের বৃহত্তম ছাপানো কোরআন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে জামানের শিল্পকর্মটি হাতে লেখা হওয়ার কারণে এর গুরুত্ব আলাদা।

শিল্প বিশেষজ্ঞ উমিত কোসকুনসু বলেন, ‘ইসলামি ক্যালিগ্রাফি কেবল সাধারণ কোনো লেখা নয়, এটি একধরনের ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।’

বর্তমানে এই বিশাল পাণ্ডুলিপিটি ধুলাবালি ও আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে বিশেষ আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে।

আলী জামানের শেষ ইচ্ছা, কোনো বিশেষ জাদুঘর বা শিল্পসংগ্রাহক যেন এটি সংগ্রহ করেন, যেখানে সাধারণ মানুষ এই অনন্য শিল্পকর্মটি দেখার ও মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে।

সূত্র: এপি

নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামান
নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামান। ছবি: এপি

সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান: আব্বাস আরাঘচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, সাময়িক নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিই চায় ইরান। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে আলোচনায় তিনি এ অবস্থান তুলে ধরেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আলোচনায় আরাঘচি বলেন, “ইরান শুধু অস্থায়ী নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী।”
বিজ্ঞাপন

হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, প্রণালিটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শত্রু দেশগুলোর ক্ষেত্রে সেই বিবেচনা প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে, ওয়াং ই বলেন, যুদ্ধের চেয়ে আলোচনা সবসময় উত্তম। তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শান্তির জন্য প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত সংলাপ শুরু করার আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই ধরনের কূটনৈতিক বার্তা অঞ্চলজুড়ে সম্ভাব্য উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান: আব্বাস আরাঘচি

ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদ: পদত্যাগপত্রে ট্রাম্পের উদ্দেশে কী লিখেছেন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা

ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। ওই কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাঁর ‘সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেরও’ আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের (ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টার) পরিচালক জো কেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক চিঠিতে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তাঁর চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

​প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প,

অনেক চিন্তাভাবনার পর আমি জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ থেকেই আমার এই পদত্যাগ কার্যকর হবে।

নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে আমি ইরানে চলমান এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন দিতে পারি না। ইরান আমাদের দেশের জন্য আসন্ন কোনো হুমকি ছিল না। এটা এখন স্পষ্ট যে ইসরায়েল এবং তাদের শক্তিশালী মার্কিন লবির চাপেই আমরা এই যুদ্ধ শুরু করেছি।

আপনি ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় যেসব মূল্যবোধ ও পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেছিলেন এবং যা আপনার প্রথম মেয়াদে কার্যকর করেছিলেন, আমি সেগুলোকে সমর্থন করি। ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত আপনি অন্তত এটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো মূলত একটি ফাঁদ। এসব যুদ্ধ আমাদের দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং আমাদের জাতির সম্পদ ও সমৃদ্ধিকে নিঃশেষ করেছে।

আপনি প্রথম মেয়াদে অন্তহীন যুদ্ধে না জড়িয়েও কীভাবে চূড়ান্তভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে হয়, সেটি আধুনিক যুগের অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে ভালো বুঝেছিলেন। (ইরানের কুদস বাহিনী কমান্ডার) কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা এবং (জঙ্গিগোষ্ঠী) আইএসকে পরাজিত করার মাধ্যমে আপনি তা প্রমাণ করেছিলেন।

এই প্রশাসনের শুরুর দিকে উচ্চপদস্থ ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রভাবশালী সদস্যরা একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়েছিলেন। এটি আপনার ‘আমেরিকা ফার্স্ট (সবার আগে আমেরিকা)’ নীতিকে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করতে যুদ্ধংদেহী মনোভাব উসকে দিয়েছে।

এই একপেশে প্রচারণাকে ব্যবহার করে আপনাকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আসন্ন হুমকি এবং এখনই হামলা চালালে দ্রুত জয় পাওয়া নিশ্চিত। এটি ছিল একটি মিথ্যা। ইসরায়েলিরা ঠিক একই কৌশল ব্যবহার করে আমাদের সেই ধ্বংসাত্মক ইরাক যুদ্ধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমাদের দেশের কয়েক হাজার সেরা নারী-পুরুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। আমরা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে পারি না।

১১ বার যুদ্ধের ময়দানে দায়িত্ব পালন করা একজন অভিজ্ঞ সৈনিক হিসেবে এবং একজন ‘গোল্ড স্টার’ স্বামী হিসেবে—যে তার প্রিয়তমা স্ত্রী শ্যাননকে ইসরায়েলের তৈরি এক যুদ্ধে হারিয়েছে—আমি পরবর্তী প্রজন্মকে এমন এক যুদ্ধে লড়তে এবং মরতে পাঠাতে পারি না, যেই যুদ্ধ আমেরিকান জনগণের কোনো কল্যাণে আসবে না এবং আমেরিকানদের জীবনদানের কোনো ন্যায্যতাও এতে নেই।

আমি প্রার্থনা করি, আমরা ইরানে কী করছি এবং কাদের স্বার্থে করছি, সে বিষয়ে আপনি আবার ভেবে দেখবেন। এখন সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। আপনি চাইলে বর্তমান পথ থেকে সরে এসে আমাদের জাতির জন্য এক নতুন পথ তৈরি করতে পারেন, নতুবা আমাদের আরও পতন এবং বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারেন। সব ক্ষমতা এখন আপনার হাতে।

আপনার প্রশাসনে কাজ করা এবং আমাদের মহান জাতির সেবা করতে পারা আমার জন্য সম্মানের বিষয় ছিল।

জোসেফ কেন্ট

পরিচালক

জাতীয় সন্ত্রাসবাদবিরোধী কেন্দ্র

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-17%2Foanmjscm%2FJOEKENT.avif?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জোসেফ কেন্ট। ছবি: রয়টার্স