Showing posts with label ওয়াসি আহমেদ. Show all posts
Showing posts with label ওয়াসি আহমেদ. Show all posts

Saturday, June 15, 2024

গল্প- অন্তরঙ্গ দূরত্ব by ওয়াসি আহমেদ

অনেকক্ষণ বসে আছি। বাইরে বৃষ্টি, সঙ্গে বাতাস। উঠে যে পড়ব, উপায় নেই। অসময়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎ বৃষ্টি কেন এ নিয়ে হাবিজাবি ভেবে সময় যখন আর কাটে না, ঘড়িতে দেখি বেলা দুটো। অচেনা মানুষের বাড়িতে ভরদুপুরে এভাবে বসে থাকা নিজের কাছে যেমন অস্বস্তির, বাড়ির লোকজনের জন্যও বিরক্তিকর। এদের সম্ভবত এখনো খাওয়া হয়নি, হতে পারে আমার কারণেই। এদিকে একটু পরপর জানালার ওপারে চোখ ফেলে আকাশ দেখা না গেলেও বৃষ্টি-বাতাসের দিকে তাকিয়ে আমি যেন একটা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছি। আসলে তো অজুহাত নয়। বৃষ্টি না হলে কি এতক্ষণ বসে থাকি? বাড়ির লোকজনও হয়তো তা-ই ভাবছে, ভাববারই কথা। তারপরও আমি যে বারবার জানালার দিকে চোখ ফিরিয়ে অজুহাতটাকে পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তমালের জন্য এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকবো আজ সকালেও কি ভেবেছি? আর এখন যখন তা-ই করছি, ভিতরে ভিতরে একধরনের হতাশা জমছে। তমালের অপেক্ষায় বসে আছি বলে, না বাড়ির লোকজন আমার কারণে খেতে পারছে না এ দুশ্চিন্তায়, ঠিক ধরতে পারছি না। হতে পারে দুটোর কোনোটাই নয়, কারণ পাগলাটে বৃষ্টি।

দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনের এই বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ৫-৪-এ পেরেক দিয়ে মাথায় গাঁথা থাকলেও সহজে খুঁজে পাব আশা করিনি। ভয় ছিল, বাড়িটা চিনতে পারব না। এত বছরে সিটি করপোরেশন হয়তো বাড়ির নম্বর বদলে ফেলেছে, বা বাড়িটাই নেই, ডেভেলপার ভেঙে মাল্টিস্টোরিড করেছে। তবে ভরসা একটা ছিল। যে ঘিঞ্জি এলাকায় বাড়ি – তাও কুড়ি-একুশ বছর আগে যেমন দেখেছি – ডেভেলপার ঢুকবে কী করে! এছাড়া বাড়িটা বড়ও ছিল না, গা ঘেঁষাঘেঁষি অনেক বাড়িঘরের মধ্যে ছোটখাটো দোতলা। গাঢ় সবুজ রঙের পুরু কাঠের দুই পাল্লা দরজা রাস্তার কিনারে, এ দিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ, কয়েক পা এগোলে ডানপাশে সিঁড়ি, সিঁড়ির মুখে আবার দরজা, দুই পাল্লারই, রং হয়তো সবুজই ছিল। এতদূর পর্যন্ত ভালোই মনে ছিল। পরেরটুকু কিছুটা ঝাপসা। ঢোকার পর ছোট বাড়ির তুলনায় মোটামুটি বড়সড়ো বসার ঘর, হ্যাঁ, শুধু বসার-ই, খাট বা পড়ার টেবিল এরকম কিছুর স্মৃতি মাথায় ছিল না। পাশে সম্ভবত পরপর দুটো ঘর। কখনো ওদিকে যাওয়া পড়েনি। এর পরেরটুকু আবার মাথায় গোছগাছ করে সাজানো। রং-মরা রেড অক্সাইডের সরু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই সিঁড়ির মুখে তমালের ঘর। আশপাশে আর কটা ঘর, এসব কি আর এত বছরে মাথায় থাকে!

সকালে একটা কাজে এসেছিলাম সূত্রাপুর। অকাজ বলাই ভালো। এক আত্মীয় টরন্টো থেকে একজনের হাতে একটা প্যাকেট পাঠিয়েছে। বাঙালিদের যা স্বভাব, কেউ দেশে যাচ্ছে শুনলেই কিছু না কিছু গছানো চাই। খুব প্রয়োজনের কিছু হলে বা যে আসছে সে চেনাজানা কেউ হলে আপত্তির কারণ থাকে না, কিন্তু যাকে-তাকে দিয়ে এটা-ওটা পাঠানো, আবার সেই জিনিস আনতে নিজে যাও বা লোক পাঠাও – গোটা ব্যাপারটাই ঝঞ্ঝাটের। এতে একধরনের গ্রাম্যতা থাকলেও থাকতে পারে। আমি জানি, রুবির কাজিন যে প্যাকেটটা তসলিম নামের টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সপড়া ছেলেটার হাতে পাঠিয়েছে ওতে হয়তো একটা মেয়েদের মিনি পার্টি ব্যাগ বা অ্যান্টি রিনকেল ক্রিম বা ওভার দ্য কাউন্টার কেনা যায় এমন কোনো গাঁজাখুরি ওষুধ-টষুদ রয়েছে। রুবি হয়তো নেড়েচেড়ে সেটা কাউকে দিয়ে দেবে, আবার এই তসলিম ছেলেটা ফিরে যাওয়ার সময় বদলা কিছু আড়ং বা পিংক সিটি থেকে কিনে গছাবে। যা-ই হোক, তসলিমের সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে। মায়ের অসুখের খবর পেয়ে এসেছে, আসার পর তার ধারণা তাকে দেখেই মায়ের অসুখ ভালো হয়ে গেছে। বাসায় যেতে বলায় মাথা নেড়ে জানাল যাবে।

প্যাকেটটা নিয়ে বেরিয়েছি, রাস্তায় ভিড়-ভাট্টা, গাড়ি আনিনি ইচ্ছা করেই। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম কতকাল পর এলাম! পুরান ঢাকা খুব একটা বদলায়নি, আর রাস্তায় আগে যেমন একটা পাঁচমিশেলি গন্ধ পেতাম, সে-গন্ধটা পাচ্ছিলাম। এই গন্ধটা সম্ভবত আর কোথাও পাওয়া যাবে না। হরেকরকম দোকানপাটে হরেকরকম জিনিসের মাদকতাময় গন্ধ। আশ্চর্য লাগছিল গন্ধটা সেরকমই আছে। আবার এও ভাবছিলাম, সত্যি কি গন্ধটা একই রয়ে গেছে, না কল্পনা করে নিচ্ছি।

সত্যি হোক বা কল্পনা, মাদকতা যে একটা আছে পরিষ্কার টের পাচ্ছিলাম, আর তখনই মনে পড়েছিল তমালের কথা। হেঁটে রাস্তা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়েছিলাম। আশ্চর্য হচ্ছিলাম ভেবে দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনে যাচ্ছি এত বছর পর। খুব যে খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে তা নয়। ভেবে রেখেছিলাম খুঁজে যদি না পাই, মহল্লার লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে তমালের খবর অন্তত পাওয়া যাবে, এমনকি তমাল বা তার পরিবার যদি দেশে ছেড়ে চলে গিয়েও থাকে।

তেমন কিছুর দরকার পড়ল না। বাড়িটা শুধু পেলামই না, অবাক হলাম এত বছরেও সিটি করপোরেশন আগের নম্বরটা বদলায়নি। তবে সবুজ রঙের দুই পাল্লা কাঠের দরজা-টরজা কিছু নেই, সে-জায়গায় ইটের উঁচু দেয়াল। বাড়িতে ঢোকার পথ বলতে এখন সরাসরি রাস্তা থেকে দুটো খাড়া সিঁড়ি। অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর দরজা খুলতে তমাল কি আছে জিজ্ঞেস না করে যা করা উচিত তা-ই করলাম। দরজা খুলেছিলেন এক বৃদ্ধ, জানতে চাইলাম তমালদের বাড়ি কি না। বৃদ্ধ মাথা নাড়তে আমি তমালের বন্ধু বলে ভেতরে ঢোকার ভঙ্গি করতে তিনি পথ করে দিয়ে বললেন, নাই।

ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে থেকে নাই-এর প্রতিক্রিয়ায় কী বলব ভেবে পেলাম না। আবার এ নিয়ে সোজাসাপটা কিছু জিজ্ঞেস করব কি না ভাবছি, তিনি বললেন, ‘আপনের নাম?’ জবাবে আমার মুখ ছিটকে তার আগের কথাটাই অন্যভাবে, হয়তো কোলাহল তুলে বেরোল, ‘নাই?’

বয়স হলেও ভদ্রলোকের রিফ্লেক্স ভালো, নাই-এর মানে চট করে পরিষ্কার করে বললেন, ‘আমি তো কইতে পারি না কই গ্যাছে, ভিত্রে গিয়া জিগাই, আপনে বহেন। নামটা কন নাই।’

নাম সাজ্জাদ শুনে তিনি একঝলক চোখ তুলে ডানপাশের দরজা ঠেলে সরে গেলেন। ফিরলেন পরপরই। অনেকটা নিজের মনে গজগজ করে বললেন, ‘মোবাইল ফালাইয়া যে ক্যান যায়, অহন হেরে কই বিছরাই!’

ভাবলাম এসেছি যখন, পাঁচ মিনিট বসি বা একটা চিরকুট রেখে যাই, কার্ডও রেখে যেতে পারি। তখনই এই বৃষ্টিটা।

এ তবে সেই বসার ঘর – ছোট বাড়ির তুলনায় বড়সড়ো! কী করে বলি, এ-ঘরে আগে কোনোদিন এসেছি। গাদাগাদি জিনিসপত্র চারদিকে। দুপাশে দুটো খাট, একটা তো একাই ঘরের প্রায় অর্ধেকটা  জুড়ে আছে। খাটের ওপরে রাজ্যের বালিশ, গোটানো তোশক, ভাঁজ করা কাঁথা-চাদর, রংজ্বলা ওয়াড়ের পাশবালিশ। মনে হলো রাতে মেঝেতেও বিছানা পাতা হয়। এছাড়া এক পাশের দেয়ালে পেরেকে ঝোলানো অন্তত ডজনখানেক হ্যাংগার। তাতে শার্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি বাদেও কীসব জামাকাপড়। মাঝখানে একটা সেন্টার টেবিলের ওপর এ-ঘরের জন্য বেমানান কারুকাজময় মুরাদাবাদি ফুলদানিতে একতোড়া কাগজের ফ্যাকাশে গোলাপ। আর ধুলো। দুটোমাত্র বেতের চেয়ারের একটায় আমি, অন্যটায় বৃদ্ধ। এদিকে ঘরে একটু পরপর লোকজন ঢুকছে, কোনো দিকে না তাকিয়ে হ্যাংগার থেকে জামা টেনে পরছে, লুঙ্গির তলায় পাজামা টেনে ওঠাচ্ছে, খালি গায়ে শার্ট বা পাঞ্জাবি চড়াচ্ছে। এসবের ফাঁকে চোখে পড়ল বাঁপাশের দেয়ালে মরা গাঁদা ফুলের মালা ঝোলানো ছবিটা। তমালের বড়দা। একনজর তাকিয়ে ধরতে অসুবিধা হলো না। কী যেন নাম, বয়সে তমালের অন্তত দশ বছরের বড়, তমালের অনুপস্থিতিতে আমি এলে সমাদর করে এ-ঘরেই বসাতেন। ঢাকাইয়া না বলে শুদ্ধ বাংলায় জানতে চাইতেন, ‘কী খাবে বলো।’ মনে পড়ছে, নাম ছিল হিজল, তমাল সমাদ্দারের বড়দা হিজল সমাদ্দার। কাঠের ওই দুই পাট দরজার গায়ে নামটা কত দেখেছি।

বসে আছি তো আছিই। কথা নেই। বলতে ইচ্ছা করছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে বৃদ্ধ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চান। আমি মুখে খিল এঁটে রয়েছি দেখে নিজে থেকে উদ্যোগী হতে পারছেন না। শুধু এক ফাঁকে জানিয়েছেন তিনি তমালের জ্যাঠা, পরিবার নিয়ে এখন এখানে থাকেন। জবাবে কিছু না বলে আমি ঘাড় ফিরিয়ে বৃষ্টি দেখেছি, থামছে না বলে মনে মনে গালাগাল দিয়েছি।

দুটো পঁচিশ। আর বসা যায় না। বৃষ্টি ধরার লক্ষণ নেই। ঠিক করলাম রাস্তা পার হয়ে ওপারে গিয়ে কোনো দোকানের ছাউনিতে দাঁড়াব। সিএনজি অটোরিকশা যদি পাই ভালো, না হলে রিকশা করে যতটা যাওয়া যায়। ‘আসি তাহলে’ বলে উঠে দাঁড়াতে তমালের জ্যাঠাও ওঠার ভঙ্গি করলেন, উঠলেন না, বসে বসেই বললেন, ‘তমালরে কিছু কওয়া লাগব?’ আগে ভেবেছিলাম একটা চিরকুট বা কার্ড রেখে যাব, কিন্তু হঠাৎ উঠে পড়তে গিয়ে ইচ্ছাটা বাতিল করে বললাম, ‘নাহ্।’

বাইরের দরজাটা নিজে নিজেই খুললাম, তখনই ডানপাশের দরজা ঠেলে, ‘আপনি যাবেন না’ বলে বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশের যে মেয়ে বা মহিলা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল তাকে আগে দেখেছি বলে মনে পড়ল না।

এতক্ষণ ঠায় বসে থাকার বিপরীত চিত্র। এত সময়ে এক কাপ চা পর্যন্ত এলো না, আর এখন এ কোথা থেকে উড়ে এসে যেতে মানা করছে? তাকিয়ে আছি, মেয়ে বা মহিলাটা আমাকে অবাক করে বলল, ‘সাজুদা না? বদলাননি একটুও। আশ্চর্য, এত বছরে একটুও বদলাননি। আমি বাইরে ছিলাম, এসে শুনি কে একজন মেজদার জন্য বসে আছে, নাম বলল সাজ্জাদ, আপনার এ-নাম তা তো জানতাম না। আমি খুকি, খুকি। আপনি  বসেন, আমি কাপড় চেঞ্জ করে আসছি, একদম ভিজে গেছি।’

তমালের বোনের নাম ছিল খুকি। তাই তো। বছর দশ-বারোর খুকিকে এ-বাড়িতে এলে প্রায়ই দেখতাম সাড়া নেই শব্দ নেই, মাথা ঝুঁকিয়ে বসে কারো না কারো সঙ্গে দাবা খেলছে। সে-সময় এক ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্টে নাকি ফার্স্ট হয়েছিল। সেই খুকি এত বড় হবে এ-ই স্বাভাবিক – বিশ-একুশ বছর কম করে হলেও। চিনতে পারব না, এও খুব স্বাভাবিক, তবে ও যে এখন কথাবার্তায় চটপটে তা হয়তো বয়স বাড়ার কারণে।

খুকির কথায় খোলা দরজা বন্ধ করব কি না ভাবছি, এদিকে বৃষ্টির ছাঁটও লাগছে গায়ে, এমন সময় রিকশা থেকে যে নামল তাকে তমাল বলে চেনা বেশ কঠিন। ওর বাড়িতে ওর জন্য অপেক্ষা করছি বলেই হয়তো পারলাম। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে ও অযথাই কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজল, জামাকাপড়ের যেটুকু শুকনো ছিল তাও ভিজিয়ে একশেষ করে বলল, ‘সাজু!’

আবার সেই চেয়ারে। তমালের জ্যাঠা উঠে গেছেন। একটু পর তমাল জামাকাপড় বদলে মাথায় তোয়ালে ঘষতে ঘষতে ফিরে এলো, পেছন পেছন খুকি। খুকির হাতে রেকাবিতে ম্যালা খাবারদাবার। ঘরের খাবারের বদলে খুকিই নিশ্চয় এসব আনিয়েছে – নানরুটি, খাসির চাপ, কাবাব, দই। খুকি রেকাবিটা কাগজের গোলাপওয়ালা সেন্টার টেবিলে রাখল।

প্রচ- খিদা পেয়েছিল। ‘নে শুরু কর’ বলে তমাল পেস্নট এগিয়ে দিতে গোগ্রাসে শুরু করলাম। খেতে খেতে কতক্ষণ এসেছি, বাড়ি চিনলাম কী করে, এত বছরেও একই রকম কী করে আছি এসব নানা ফালতু প্রশ্ন করল তমাল, যেসবের জবাব দেওয়ার দরকার পড়ে না। রিকশা থেকে নামার সময়ই খেয়াল করেছিলাম তমালের বেশ একটা উপচানো ভুঁড়ি হয়েছে। খেতে খেতে দেখলাম, গায়ের রং আগে যেমন ফর্সার দিকে ছিল, তেমনি আছে, মাথাভরতি কোঁকড়ানো চুল ছিল, খুব একটা কমেনি; পাক ধরেছে কান ঘিরে। তবে আগে যা ছিল না, তা দুই চোয়াল ঘিরে ঘোর কালো মেচেতার দাগ, চোখের নিচটাও কালচে।

খেয়ে উঠে আবার সেই প্রশ্নগুলোই। বিশেষ করে বাড়ি খুঁজে পেলাম কী করে? এ যেন প্রশ্ন না, একটা ধাঁধা। বুঝলাম ও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। তবে মনে হলো যে-কথাটা সরাসরি বলতে পারছে না তা এই – কেন এসেছি? বা নরম করে বললে, এতো বছর পর কী মনে করে? যেভাবেই করুক, ও হয়তো ভাবছে প্রশ্নটা অভব্য। আর তাই অপেক্ষা করছে আমিই যেন মুখ খুলি। নিজে থেকে বলে কি ওর দুশ্চিন্তা দূর করব, না অপেক্ষা করব ও কীভাবে শুরু করে?

এত বড় ভুঁড়ি বানালি কী করে? – আমি বলি।

আর বলিস না, একশ একটা অসুখবিসুখ।

অসুখবিসুখে শরীর রোগা হয়, তোর তো উলটো, ভালো হয়েছে।

এর নাম ভালো? থাইরয়েডের গোলমালে শরীর ফুলে গেছে।

অসুখবিসুখ বাদ দে, অন্য খবর বল। বিয়ে তো করেছিস, ছেলেমেয়ে কী? তোর বউকে ডাক।

তমাল হাসল। বলল, এত বছর বাদে তোর সঙ্গে দেখা, আর আমরা কার কী নাম এও যেন ভুলে গেছি। কেউ কারো কোনো খোঁজ রাখিনি। তুই দেশে থাকলে বিয়ের সময় অন্তত খবর দিতাম। ছেলেমেয়ে দুইজন, মেয়ে ছোট, ক্লাস সিক্সে; ছেলে সামনে মাধ্যমিক মানে এখানকার এসএসসি দেবে।

এখানকার মানে?

ওরা তো ইন্ডিয়ায়।

বউ?

ওখানেই।

কলকাতায়?

শিলিগুড়ি। বউয়ের মামা-কাকারা ওখানে।

বউ-ছেলেমেয়ে কাছে নেই, তোর তো স্বাধীন জীবন।

মজা করার জন্য বললাম, তমাল মজায় যোগ দিলো না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তোর খবর কিছু কিছু জানি। জার্মানি থেকে ফিরে বড় ফ্যাক্টরি দিয়েছিস, মহাবড়লোক। একসময় ভেবেছি দেখা করতে যাই, হয়ে ওঠেনি রে। কিসের ফ্যাক্টরি?’

স্পিনিং।

তুই না লেদার টেকনোলজি পড়তে জার্মানি গেলি!

তোর মনে আছে?

ফ্যাক্টরি কোথায়, আশুলিয়ায়?

সাভার ইপিজেডে। খবরাখবর কিছু যখন জানতি খোঁজ করলে পারতি। আমি অবশ্য তোর কোনো খবর না জেনেই এলাম। বন্ধুবান্ধবও তোর ব্যাপারে কিছু জানে না। কার কাছে যেন শুনেছিলাম তোরা ইন্ডিয়ায় চলে গেছিস। আজ এখানে এসে তোর দেখা পাবো  ভাবিনি, আর বাড়িটা পেলেও এটা যে এখনো তোদেরই এ নিয়ে সন্দেহ ছিল।

কথা শেষ না করতেই তমাল বলল, ‘সন্দেহ কেন বলছিস, বল অনুমান, তোর অনুমান ঠিক। এটা শরিকি বাড়ি, আমার জ্যাঠা থাকেন পরিবার নিয়ে, এক কাকা ছিলেন, মারা গেছেন, তার ছেলেরা থাকে। আর আমি আর খুকি।’

খুকি কি এখনো দাবা খেলে? ওর তো এতদিনে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার কথা।

ওকে দেখে তোর কী মনে হলো? ও নিজেই মনে করতে পারবে না একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাবা নিয়ে পড়ে থাকত। বিয়েটা ভালোই হয়েছিল, ওর নিজের পছন্দে, টিকল না। একটা আট বছরের মেয়ে আছে, খুব সুন্দর, ওর বর মেয়েকে নিয়ে চলে গেছে, শুনেছি ব্যাঙ্গালোরে থাকে। খুকি এখানে একটা চাকরি করে, মন্দ না, ব্যাংকে, আজ মনে হয় ছুটি নিয়েছে।

কতক্ষণ চুপচাপ কাটে। বাইরে বৃষ্টি ধরে এসেছে। তমাল হঠাৎ বলে, ‘সিগারেট খাচ্ছিস না এতক্ষণ হয়ে গেল?’

খাই না। খাওয়ার পরিবেশ নাই।

কলেজে থাকতেই তো চেইন স্মোকার ছিলি।

তোকে কি ঘনঘন শিলিগুড়ি যেতে হয়? ওরা আসে না?

আমিই যাই। কী করব, প্রথমদিকে ভাবতাম এক পা এখানে, আরেক পা ওখানে, আর এখন ভাবি পা এখানে, মু-ুটা ওখানে।

এ নিয়ে আর কথা তুলি না। নতুন করে কিছু জানতেও ইচ্ছা করে না।

তবে তমাল হয়তো ভাবে কিছু তথ্য দেওয়া দরকার। বলে, ‘বড়দাকে তো মনে আছে? ইন্ডেন্টিংয়ের ব্যবসা করত, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের সোল ডিস্ট্রিবিউটার ছিল, এছাড়া নবাবগঞ্জে মেশিন-টুলসের দোকান। পনেরো বছর আগে বড়দা মারা গেল, আর আমরাও ডুবলাম। ইন্ডেন্টিংয়ের ব্যবসাটা পার্টনার দখল করল। মেশিন-টুলসের দোকান আমিই অল্প দামে ছেড়ে দিলাম। এরপর এটা-ওটা অনেক কিছু করলাম। বড়দার ছিল বিজনেস ব্রেন, আমি এ-জায়গায় ফাঁকা, তাও বড়দার দেখাদেখি কিছু যা শিখেছিলাম কোনো কাজে লাগল না। বড়দা মারা গেল একচলিস্নশ বছর বয়সে। এটা একটা বয়স মরার! বড়দা যদি থাকত এ-অবস্থা হতো না। ঘরের হাল তো দেখছিস, ওই যে সিঙ্গেল খাট, কোণের দিকে একটা পায়ার বদলে ইট, ওতে আমি রাতে ঘুমাই, খুকি ওপরতলায় বারান্দা ঘের দেওয়া হাতচারেক জায়গায় জেঠির মেয়ের সঙ্গে শোয়। এইটুকু বাড়ি, মানুষ কতজন ভাবতে পারবি না। বড়দা থাকলে …’

এতক্ষণে একটা জরুরি কথা জানতে ইচ্ছা জাগে। বলি, ‘বউদি এখন এখানে থাকে না, আর ছেলেমেয়েরা?’

‘নাই রে। সবাই একটা পথই চেনে। বউদি ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাইদের কাছে কলকাতায়। একটা মানুষ মরে যাওয়ায় কী অবস্থা চিন্তা কর। বড়দা যদি থাকত, এসব কিছু হতো না, হতে দিত না। বড়দার ব্রেনটা যদি আমার থাকত, আমিও হতে দিতাম না। কত কিছু করলাম, দাঁড়াতেই পারলাম না। কিছু করতে গেলে শক্তি তো দরকার, আমার শক্তি দ্যাখ’, বলে নাটুকে ভঙ্গিতে ঘাড়-মাথা পিছিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল।

খুকি চা নিয়ে ঢুকল। ভাবলাম পরিস্থিতি হালকা করতে ওর দাবা খেলার কথা তুলি। কিন্তু চায়ের কাপ নিতে গিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। খুকি পারল। ‘কেন আসেননি এতদিন?’ বলে যেন জেদ ধরল, কারণ জানা চাই। নিজের কাপ নিয়ে সে বড় খাটের এক কোণে সাবধানে বসল। পরিষ্কার বুঝতে পারছি ও আমাকে দেখছে, খুঁটিয়েই যেন। ওর নিজের ব্যাপারে যে কিছু জানতে চাচ্ছি না, এও হয়তো খুঁটিয়ে দেখার কারণ। হঠাৎ খুকি বলে উঠল, ‘মেজদাকে আজ আপনি নিয়ে যান। আপনার সঙ্গে থাকবে, অনেক রাত পর্যন্ত দুজন গল্প করবেন। নেবেন না?’

‘যাবি, চল।’ খুকির কথায় তমালের দিকে তাকিয়ে কথাটা না বলে পারি না। তবে বলার পরপরই টের পাই গা শিরশির করছে, ভালো লাগছে। সেই দুপুর বারোটা থেকে এখানে – এই বদ্ধ, দম-আটকানো চারকোনা গুদামের মতো ঘরের বাসি গন্ধে এই প্রথম একটা টাটকা ঘ্রাণ আমাকে চমকে দিলো।

চল, আজ আমরা একসঙ্গে থাকব।

তমাল সেদিকে গেল না। মেচেতা-ছিটানো চোয়াল আর কালি লেপ্টানো মরা, সাদা চোখে আমার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই থাকল। তারপর মেঝেতে বারকয়েক স্যান্ডেল ঘষে অনেকটা যেন নিজেকে চাঙ্গা করে বলল, ‘বলছিলাম না বড়দা বেঁচে থাকলে আমাদের এ দশা হতো না। বড়দা ছিল সিংহ রাশির, বল তো এ আমার দেশ, যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, কোন শালা আমাকে কী বলে দেখি। জান দিয়ে দেবো, তবু আমার দাবি আমি ছাড়ব না। কোন সুখে বিদেশে থাকতে যাব, জাতভাইদের সঙ্গে উঠবস করলেই জনম ধন্য! কে কার জাতভাই?’

চল আমার সঙ্গে। খুকি ঠিক বলেছে আজ অনেক রাত পর্যন্ত তোর সঙ্গে আড্ডা দেবো।

বড়দার এক ফোঁটা জোর যদি আমার থাকত! একবার এরশাদ আমলে একটা রায়ট সাজানো হয়েছিল না? সরকারের স্পন্সার্ড রায়ট, ওই যে কালাচান্দ আর মরণচান্দের মিষ্টির দোকান লুট হলো, বড়দা একা একা গিয়ে চিৎকার করে বলল, তোরা মিষ্টিই খাবি তো খালি হিন্দুর দোকান লুট করে খাবি কেন, আলাউদ্দিনের দোকানও লুট কর, মুসলমান ময়রাও আজকাল মিষ্টি ভালো বানায়। কার বুকের পাটায় এমন শক্তি যে সামনে দাঁড়ায়।

খালি চায়ের কাপ ট্রেতে নিতে নিতে খুকি চোখেমুখে বিরক্তি ঝরিয়ে বলল, ‘বেশি বড়দা বড়দা করো না। সাহসে সব হয় না।’

কিসে হয়?

তুমি জানো না, আমাকে জিজ্ঞেস করো? কিসে হয়! আদিখ্যেতা। সাজুদা, আরেক কাপ চা?

মাথা নেড়ে মানা করে ওর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো, গাধার মতো বলি, ‘তুমি কেমন আছ খুকি?’

একবার বলে ফেলে কথাটাকে ঠেকা দিতে অন্য কথাও বলতে হয়, ‘ব্যাংকের কাজ কেমন লাগে? এখান থেকে কত দূরে?’

এতটুকুতে থেমে গেলেও হতো। কিন্তু কী এক পাগলামিতে বলি, ‘তোমার মেয়ে নাকি খুব সুন্দর?’

মেজদা বলেছে? ভাগ্যিস, মেয়ে আমার মতো হয়নি, চোখমুখ অবিকল আমাদের মায়ের, গায়ের রংও। আপনি তো মাকে দেখেননি, না দেখেছেন?

মাথা নেড়ে জানাই দেখেছি। মুখে বলি, ‘চেহারা ঠিক মনে নাই।’  ‘দেখাই’, বলে সে চট করে তার মোবাইল ফোন খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরতে ভাবি ওর মায়ের ছবি, না দেখি পাঁচ-ছয় বছরের হাসিখুশি মেয়ের ছবি। সুন্দরই না, অপরূপা বললে মানায়। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবি, ভুলচুক যা করে ফেলেছি, আর নয়।

আমার মেয়ের নাম রূপকথা। কার রাখা জানেন? মেজদার। মেজদা যে এমন একটা নাম দিতে পারে ভাবা যায়?

খা না আরেক কাপ চা? তমাল জোরের ওপর বলে।

হ্যাঁ-না কিছু না বলে ভাইবোন দুজনকে দেখি। দুজন দুই জায়গায় বসা, একসঙ্গে এক ফ্রেমে দুজনকে ধরা যায় না। একবার একে, একবার ওকে দেখি। আবার শিরশির টের পাই, আবার একটা টাটকা সুবাস।

খুকি উঠে যায়। বুঝতে পারি চা আনতে।

বাইরে বৃষ্টি শুকিয়ে জানালায় কাঠের পাল্লায় আঠার মতো শেষ বিকেলের পাতলা আলো।

নরেন্দ্র মোদি কি এবারো জিতবে?

তমালের আচমকা প্রশ্নে ধাক্কা খাই। সে বলে চলে, ‘ইউপিতে কংগ্রেসই যাবে, মধ্যপ্রদেশেও মনে হয়, তাহলে কিন্তু বিজেপির কেস খারাপ। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল যত নষ্টামিই করুক, এক মমতার জোরেই বিজেপি-কংগ্রেস টিকতে পারবে না। ত্রিপুরার গতবারের ঘটনাটা আশ্চর্যের না? মানিক সরকার তো জানতাম ভালোই পপুলার, অনেস্টও।’

মনে হয় কথাগুলো সে হয়ত আনমনে বলছে। এমনও হতে পারে … কী হতে পারে ভাবতে গিয়ে মনে হয় তমাল হয়তো সবসময় ঠিক বুঝতে পারে না সে কোথায়?

দ্বিতীয় কাপ চা খেয়ে উঠি। খুকির দিকে তাকিয়ে ‘আসি’ বলে দরজামুখো হই। দরজা খোলে তমাল। সিঁড়িদুটো ভেঙে রাস্তায় নামতে দেখি সে আমার পাশাপাশি হাঁটছে। ওকে কি আবার বলব আমার সঙ্গে যেতে? মনে হয় না রাজি হবে। তারপরও কি বলব, যদি রাজি হয়?

একটা মোড় পেরোতে তমাল তড়বড় করে বলে ওঠে, ‘এই যে-গলিটা, সামনে ডানদিকে চলে গেছে এটা না আমাকে বিপদে ফেলে, শিলিগুড়িতে মালারা যেখানে থাকে সেখানে ঠিক এরকম একটা গলি, না দেখলে বিশ্বাস করবি না।’

বউয়ের নাম মালা? কোন মালা?

তমাল পা চালিয়ে পাশের ঘুপচি দোকান থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এসে বলে, ‘খাই না, আজ ইচ্ছা হলো, মনে কর তোর কারণে। কী সিগারেট না খেতি রে! মালাকে তোর মনে আছে? সেই মালা-ই, মালা আবার কয়টা, অভয় দাশ লেনের মালা, ওর দাদা বিমল পড়ত আমাদের এক ক্লাস নিচে।’

মালার কথা এতক্ষণে বললি!

আরে এ-মালা কি আর সে-মালা আছে! ওকে তোর মনে আছে ভাবিনি।

তমাল হঠাৎ থেমে পড়ে। সিগারেট-ধরা হাত মুখের কাছে এনেও নামিয়ে ফেলে। বলে, ‘একটা কথা বলি, মনে কিছু করবি না তো?’

মনে করব মানে?

তুই কি এমনি এমনি, মানে আমার খোঁজ করতেই …

মিথ্যা বলতে ইচ্ছা করে না। বলি, ‘এসেছিলাম সূত্রাপুরে, এই প্যাকেটটা আমার বউয়ের কাজিন কানাডা থেকে একজনের হাতে পাঠিয়েছে, এটা কালেক্ট করতেই এদিকে আসা। তো ভাবলাম, দেখি দেবেন্দ্রনাথ দাশ লেনের ৫/৪/এ বাড়িটা খুঁজে পাই কি না।’

স্যান্ডেলের তলায় জোরে জোরে আধখাওয়া সিগারেট ঘষে তমাল মুখ তুলে অপ্রস্ত্তত হাসে। দিনশেষের বিলীয়মান আলোয় তার মুখ বীভৎস দেখায়। কয়েক পা এগিয়ে বলে, ‘কত হাঁটবি, এখান থেকেই একটা কিছু ধর, আমি এই ডানপাশের গলিতে একটু ঘুরব। বলেছিলাম না গলিটা আমাকে বিপদে ফেলে? প্রায় দিনই এক পাক ঘুরি।’

এর নাম কি ফর্কিং পাথ্স? তমাল ডানদিকে এগোয়, আমি এদিকে-ওদিকে চোখ ফেলে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজি। যাব সোজা, কিছুদূর গিয়ে গলিটা বাঁয়ে ঘুরে গেছে।

মিথ্যা যদি বলতাম, যদি বলতাম ওর খোঁজ করতেই, ওকে দেখতেই এত বছর বাদে …

Tuesday, March 15, 2022

গল্প- মেহেরজান by ওয়াসি আহমেদ

চোখের আড়াল হতে না হতে পদ্ম এমন বদলে যাবে, পদ্ম ওরফে পার্লির মা মেহেরজান যদি আগে আন্দাজ করতে পারত! পরের ঘটনা আগে জানার উপায় নেই; তবু ভাবে যদি জানত, অন্তত একটা ইশারাও মিলত, তাহলে কি দিনের পর দিন চুলমুঠি টেনে মাটিতে আছড়ে মুগুরছেঁচা দিত! কিল, লাথি-উষ্টা, ডালঘুটনির বাড়ি। লম্বা, ঘন কোঁকড়া চুল – ধরার সুবিধা বলে শুরুতেই হাতদুটো চুল পাকড়ে ফেলত। মারধর হজম করার তাকত ছিল গায়ে; তবে চিলস্নাত, চিল্লিয়ে খিসিত্ম করতেও ছাড়ত না। বেশিক্ষণ না – রাগ হোক, মার খাওয়ার কষ্ট হোক, ভুলে যেতে সময় লাগত না। এতে মেহেরজানের রোখ আরো চাপত। মেরে হাতে সুখ পেত না। মরে না ক্যান, বিলাইর জান। মুখে হরহামেশা বললেও মন থেকে বলত – এ কী করে হয়! আজকাল এরকমই ভাবে মেহেরজান।

এবার পদ্মর পাঠানো টাকার পরিমাণ বেশি। একুশ হাজার সাতশো হয়ে কিছু খুচরাও। বরাবর মাসে মাসে যা পাঠায় তাতে বাংলা টাকায় দশ-এগারো হয়। এবার যে বেশি পাঠাল, ফোনে তো কিছু বলল না। দিনতিনেক আগে শেষ ফোন। কথা বেশি বলেনি, টাকা পাঠাচ্ছে, মেহেরজান যেন ব্যাংকে সুকুমার স্যারের কাছে গিয়ে খোঁজ করে, বলেই পরে কথা বলবে বলে লাইন কেটে দিয়েছিল। খোদা হাফেজ, ভালা থাইকো, দুয়া কইরো – এসব কথার কথা ফোন ছাড়ার আগে বরাবর বললেও সেদিন বলেনি। হয়তো ডিউটির টাইম, বা হতে পারে তার ম্যাডামের পার্লি পার্লি ডাক শুনে খাস আরবি জবানে জবাব দিতে দিতে ছুটে গেছে।

মেয়ের নামটাও মেহেরজানের মনে থাকে না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে পদ্ম পদ্ম। ফোনে যখন কথা হয়, মেহেরজান সোহাগ করে পদ্মসোনা ডাকে, পার্লি আপত্তি করে না। তবে একবার মনে আছে – বলেছিল, পদ্মরে ভুলতে পারতেছ না, ঠিকাছে মন চায় ডাইকো। ডাকনাম ইলু বিলু কতকিছুই অয়, কিন্তু আমার গুডনেম মানে ভালা নাম মনে রাখবা পার্লি আক্তার। পাসপুটের নাম। আর ভোটার আইডি যে করছিলাম, কেরামত হারামি দুই মাস ঘুরাইয়া চাইর হাজার টেকা দালালি খাইলো, ওইখানেও নাম পার্লি, পার্লি আক্তার। আরো আছে, ব্যাংকে সুকুমার স্যার অ্যাকাউন্ট খুইলা বই দিলো, নাম একই। তুমি আমারে পদ্ম কইতে চাও কও, মাইনষ্যেরে গুডনেম বলবা। বলবা আকিকা কইরা এই নাম রাখছো।

বুক তড়পায় মেয়ের কথায়। পদ্ম আকিকার কথা বলতে পারল! জন্মানোর পর তো যায়-যায় অবস্থা। তিন-চার মাস বসিত্মর পাতানো খালা জয়তুনবুড়িই পালল, কী মনে করে যে পদ্ম ডাকত সে-ই জানে। আর মেহেরজানের নিজেরও তখন বাঁচা-মরার ঠিক ছিল না। তোরাব আগে থেকেই ভাগার তালে ছিল; যেই দেখল ঘরের এমন হাল – একে বাচ্চা, মেয়ে বাচ্চা, তার ওপর বউ মরোমরো, বাঁচে যদি, বাসাবাড়ির কাম-কাজ ধরার ভরসা কম – সে তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে, মানে বেপাত্তা হতে দেরি করেনি। আকিকা করে নাম রাখতে হয় এ-খবর তাহলে পদ্ম জানে! নিজের তার আকিকা হয়নি, নামও রাখা হয়নি, তারপরও বাচ্চার নাম রাখতে আকিকার মতো ঘটনার খবর পদ্ম জানে না – কী করে হয়! পদ্ম কি আগের পদ্ম আছে!

সুকুমার স্যার বলল, কী গো, মেয়ের রোজগার সব শেষ করে দিবা নাকি? বিদেশে খাটনি খেটে টাকা পাঠায়, মাসে মাসে কিছু জমাও। মেয়ে সারাজীবন বিদেশে থাকব নাকি!

পদ্ম সারাজীবন বিদেশে থাকবে না এ-কথা মনে হলেই মেহেরজানের বুক ধড়ফড় করে। চার বছরের বেশি পদ্ম দেশছাড়া। চার বছর কম সময় নয়। মেয়েকে একনজর দেখতে সারাক্ষণ ভেতরে জ্বালাপোড়া, তাই বলে ফিরে আসবে ভাবলেই মাথায় বুঝি আসমান ভেঙে পড়ে। রুজি-রোজগারের ধান্ধা বাদ দিয়ে গত চার বছর মেয়ের টাকায় চলছে, বয়স বাড়ায় শরীর-গতর ভারী হয়েছে। বসে বসে খেলে যা হয়। এদিকে মেয়ের কড়া হুকুম – কাম করতে পারবা না। আমি আছি না? কথায় কী জোর, আর পরান-উথালি মায়া! কী কপালেই-না এমন সোনার টুকরা পেটে ধরেছিল, আগে যদি জানত!

কাজ করতে দিতে পদ্মর আপত্তি নিয়ে কথা বলে লাভ হয়নি। যেন জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মাকে কাজ করতে দেখে দেখে সে অতিষ্ঠ। পদ্ম তখন সবে দুই-চার পা হাঁটে, জয়তুনবুড়ি মেহেরজানকে রোজগারের বুদ্ধি বাতলালো। বাসাবাড়ির কাম তো করছস, কয়টা টেকাই-বা, তোর বেশি বেশি রুজি দরকার। সেই বেশির পথ ছিল খোয়া ভাঙা। জয়তুনখালা একসময় করেছে। খাটনি যেমন, পয়সাও তেমন। তোর আর তোর মাইয়ার খাওন-পরন ভালাই চালাইতে পারবি, বুদ্ধি কইরা খরচ করলে কিছু জমাইতেও পারবি। মেহেরজান রাজি। খোলা আসমানের নিচে আগুন-রোদে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে হাতুড়ি-ঘাই মেরে ইট ভেঙে সাইজমতো খোয়া বানানো। প্রথম প্রথম ব্যথার চোটে কনুই-ঘাড়-কোমর মনে হতো খুলে খুলে পড়বে। ব্যথা কমার বড়ি খেয়েও রাতে ঘুমাতে পারত না। তার ওপর ভয়ডরও কম ছিল না। ইটের টুকরা-ধরা হাতে বা আঙুলে একটা ঘা পড়লে হাড়-হাড্ডি মিসমার হতে কতক্ষণ! টায়ারের টিউব কেটে আঙুল-বাঁচানি হাতা কত আর ঠেকাতে পারত। কপাল ভালো যে অঘটন কিছু ঘটেনি। তবে রুজি যে বেশি হবে বলেছিল জয়তুনখালা, কথা ঠিক। প্রথম যখন কাজ ধরল তখনই দিনে দুইশো টাকা। সেই আমলে সোজা কথা! ঘরভাড়া ম্যালা বাকি পড়েছিল, এছাড়া নানাজনের কাছে ধারকর্জ। আসেত্ম আসেত্ম মিটিয়েছে। টাকার গন্ধ শুঁকে তোরাব ভিড়তে নানা কায়দাকানুন করেছে। মেহেরজান পাত্তা দেয়নি, মনে মনে বলেছে, সামনে যুদি পাই এই আতুড়ির তলে কলস্না খুয়াইবি হারামির বাচ্চা।

সুকুমার স্যারের কথা ঠিক; কিন্তু নিজের খোরাকির খরচ আর ঘরভাড়া মিটিয়ে পদ্মের দশ-এগারো থেকে হাতে কী-ই-বা থাকে! তবে একেবারে কিছুই যে মেহেরজান জমায় না তা-না। জমাতে পারত আরো, যদি নিজে কিছু করত। মেয়ে বাগড়া দিয়েছে ঠিক, কিন্তু যদি কিছু একটা করার পথ পায় পদ্ম জানবে কী করে!  সেলাই-ফোঁড়াই জানলে কিসিত্মতে একটা মেশিন কিনে বাড়তি রোজগারের পথ বের করতে পারত। কিন্তু এ-বয়সে কার কাছে সেলাই শিখবে! বাসাবাড়িতে ছোটা-কাজ চাইলেই পাওয়া যায়। বসিত্মতে কতজনই তো করে। মুখ ফুটে বললেই কাজ জুটবে। কিন্তু পদ্মর কানে যদি যায়? মাঝে মাঝে ভেবেছে পদ্মকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করাবে, সাহসে কুলায়নি। এ পদ্ম আগের পদ্ম না, শুনে কী করবে বলা মুশকিল। পদ্ম নিজে অবশ্য যে-কাজ করে সেও বাসাবাড়ির কাজ, তবে বিদেশ তো বাংলাদেশ না যে বাসাবাড়ির কাজ মানে ঝিগিরি। পদ্ম যে-কাজ করে সেটা বাচ্চা রাখার, ইংরেজি নাম বেবিসিটিং – পদ্ম বলেছে। তার ম্যাডামের দুই বাচ্চা, দুইটাই মেয়ে। কাজ বলতে বাচ্চাদের মম-ড্যাডি মানে মা-বাবা বাইরে কাজে চলে গেলে ওদের খাওয়ানো, জামাকাপড় বদলানো, ওদের  নিয়ে টিভিতে কার্টুন ছবি দেখা, আর দুনিয়ার খেলার জিনিস নিয়ে ওদের সঙ্গে খেলা। ঝিগিরি যে নয়, তার প্রমাণ পদ্মর পাঠানো ছবি। কে বলবে এ আগের পদ্ম! পার্লি, হ্যাঁ পার্লি বললে মানায়। পরনে জিনসের প্যান্ট, গাঢ় গোলাপি টিশার্ট, আর পায়ে যে-জুতা এদেশে কয়জন বড়লোকের মেয়ে এমন তুলতুলে লোম-লোম জুতা পায়ে দেয়! পুরু গদির সোফায় বসে মেয়ে তার টিভি দেখে, হাতের পাঞ্জায় বেড় না পাওয়া চ্যাপ্টা মোবাইল। চেয়ার-টেবিলে বসে খায়। চেহারা-সুরত আগেও খারাপ ছিল না, যত্নের অভাবে আসল চেহারা চাপা পড়ে ছিল। এখন দেখলে, নিজের মেয়ে বলে না, চোখ ফেরানো কঠিন। পথেঘাটে কত মেয়েই তো দেখে, কয়জনের ক্ষমতা আছে তার পদ্মর পাশে দাঁড়ায়! লেখাপড়া তো বসিত্মর ইশকুলে ফাইভ পর্যন্ত, কেউ বলবে এখন এ-কথা! আর আরবি জবান যে ও শিখল, কেউ শিখিয়েছে? নিজে নিজে এর-ওর মুখে শুনে এখন তো তার জবান পাক্কা সে-দেশের মানুষের জবানের মতোই।

এই পদ্মর কারণে একটা সময় গেছে মেহেরজানের শান্তিতে শ্বাস ফেলার ফুরসত মিলত না। সারাদিন খাটনি খেটে ঘরে ফিরতে না ফিরতে নালিশ আর নালিশ। একে মেরেছে, ওর খেলনা চুরি করেছে। কিছুটা বয়স বাড়তে বড় বড় নালিশও আসতে শুরু করল। বসিত্মর উঠতি মাস্তানদের সঙ্গে ফুসুর-ফুসুর, ঢলাঢলি। দু-একবার  বেকায়দায় ধরা পড়ে বিচার-সালিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ-অবস্থায় মেহেরজান হাত গুটিয়ে থাকে কী করে! খোয়া-ভাঙা হাতে হাতুড়ি থাকলে বুঝি সুবিধা হতো, মাথা গুঁড়ো করে মাপমতো খোয়া বানাতে না পারলেও ছেঁচতে অসুবিধা কী!

কী মারটা না মারত! মার খেয়ে খেয়ে ও হয়তো ঠিক করে ফেলেছিল – মারবা মারো, কত আর মারবা, আমার মন যা চায় করুম। খোয়াভাঙা রুজি তোমার, আমার পথ আমার। অনেকদিন ধরেই হয়তো মনে এমন জেদ বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল, মেহেরজান টের পায়নি। পরিবর্তনটা নজরে পড়ল পদ্মর বয়স যখন পনেরো-ষোলো, শরীরে বাড় বেশি বলে মনে হতো সতেরো-আঠারো – একদিন ঘোষণা দিলো সে কাজ ধরবে, কাজ নাকি ঠিকও
করে ফেলেছে। না, খোয়া ভাঙাভাঙি না, বাসাবাড়িতে ঝিগিরিও না। সে করবে চাকরি, চাকরির নাম সেলসগার্ল। এক বড়লোক মহিলার এলাহি দোকান, মেহেরজান বুঝবে না তাই বলেছিল দোকান, আসল নাম শোরুম। বাচ্চাদের, মহিলাদের জামাকাপড়, অলংকার, ঘর সাজানোর হাজারো জিনিসে ঠাসা। আরো বলেছিল – দোকান বড়লোকগো পাড়ায়, ধানম–তে। মাস গেলে বেতন পাঁচ হাজার, লাঞ্চ মানে দুইফরের খাওয়া ফিরি, উপরি ওভারটাইমও আছে।

মেহেরজান শুনছিল আর ভাবছিল কোন গুণ্ডা-বদমাইশের খপ্পরে পড়ল কে জানে! চাকরিটা তাকে দিলো কে, খোঁজই-বা পেল কী করে – এসবের সোজাসাপটা জবাব –  তুমার চিমন্তা করন লাগব না গো, বুইজা-শুইনা আগাইছি। কথাবার্তার ধরন নতুন। বুইজা-শুইনা আগাইছি কথাটা কানে আঠার মতো লেগে থাকলেও কী বুঝেছে জানতে মেহেরজান কী করবে! খুব যে বলল বড়লোকের দোকান, তো চাকরিতে যে যাবে, ভালো জামাকাপড় কোথায় পাবে, খালি কি জামাকাপড়, কিছু সাজগোজও তো লাগবে। পদ্মর সেই এক কথা – তুমার চিমন্তা করন লাগব না।

সেই শুরু। দেখা গেল মুখে যা বলেছিল তার থেকে এক চুলও এদিক-ওদিক না। মেহেরজান একদিন চুপিচুপি বাইরে থেকে দোকান দেখে তাজ্জব হয়েছে, সত্যিই বড়লোকি কারবার। সকাল আটটায় পদ্ম বেরিয়ে যেত, প্রথমদিকে নিজের পুরনো জামাকাপড়ই ধুয়ে আবুলের লন্ড্রি থেকে ইস্ত্রি করিয়ে পরত। মাস-দুই যেতে নতুন সালোয়ার-কামিজ, স্যান্ডেল, মোবাইল। সেইসঙ্গে শ্যাম্পু, সাবান, ক্রিম, লিপস্টিক, এমনকি সেন্টও। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মেহেরজানের জন্য নিয়ে এলো কমলা রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি। বলল, ঈদের বোনাস দিয়ে ঘরে ফ্যান লাগাবে, রাতে গরমে ঘুমাতে পারে না, সারাদিন এসির ঠান্ডায় পার করে এমন দোজখের গরম।

এক ঘরে, এক চৌকিতে পাশাপাশি শুয়েও মেহেরজানের উপায় ছিল না পদ্মর মতিগতির হদিস পায়। খুব ইচ্ছা করত জানতে সারাদিন কী করল; বড় দোকান, আরো নিশ্চয় মেয়েরা আছে, ওদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কেমন। দুপুরে কী খায়? আরো কত কী! তবে একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খেলেও মুখে আনার সাহস পেত না। পদ্ম যদি দোকান থেকে চুরি-টুরি করে তাহলে জেলখাটা ছাড়া পথ থাকবে না – কথাটা দুদিন আগে হলে বলতে মুখে আটকাত না। মুখে আটকানোর মতো আরো কত কথা! মারগুলো যে দিত উঠতে-বসতে, এতে তার নিজের কষ্টও কম হতো না। বলতে পারলে বুক হালকা লাগত; কিন্তু পদ্ম বিশ্বাস করবে এমন কথা? আর কথাটা কি সত্যি? মারত যখন, বিলাইর জান বলত, তখন তাকে বিলাই ভেবেই পেটাত।

বছর না ঘুরতে সংসারের চেহারা বদলে গিয়েছিল। মেহেরজানের খটকা লাগত, বেতন মোটে পাঁচ হাজার, কিন্তু খরচের সঙ্গে পাঁচ হাজারের হিসাব মেলাতে পারত না। বসিত্মতে যে ঘুপচিঘরে তারা থাকত, সেটা ছেড়ে কাছেই বড় একটা ঘর নিল পদ্ম। ফ্যানের ব্যবস্থা আগেই হয়েছিল, নতুন ঘরে খাট-জাজিম ঢুকল, চোদ্দ ইঞ্চি টিভি, এমনকি বেঁটেখাটো ফ্রিজও। সবই নাকি কিসিত্মতে। তো কিসিত্মতে হোক বা বিনা পয়সায়ই হোক, এমন পরিবর্তনে মানুষের চোখ টাটাবে জানা কথা। শুরু হলো কানাঘুষা। মেহেরজানের কানে সব না এলেও কিছু কিছু যা আসত সেসব আমলে না নিলেও নিজের মনের খটকাই তাকে সময়-অসময় খোঁচাত। পদ্মর চাকরি বুঝি নামেই, ওটা নাকি সাইনবোর্ড, রুজির আসল পথ অন্য। না হলে দুদিনে কী করে প্রিন্সেস বনে যায়! আড়ালে-আবডালে না, সামনাসামনিই বলাবলি করত – এমুন পিন্সেস থাকতে খোয়া ভাঙো!

নিজে থেকে জানতে চাওয়ার দরকার পড়ল না, পদ্মই মুখ খুলল – মাইনষ্যের কতা কানে তুলবা না। আমার যা উচিত মনে অয়, করি। মাইনষ্যের খাই না, পিন্দিও না। আমার মন যা চায় করুম। আমার ভালা আমি বুজুম, না হেরা বুজব! চিমন্তা করবা না, ভালা খবর আছে, বিদেশ যাওয়ার পথ পাইছি।

কথাটা কানে নিয়ে মেহেরজান থ হয়ে বসে থাকল। কথার কথা যে না, বলার ঢংয়ে পরিষ্কার। মাসখানেক যেতে একরাতে ঘটনা খুলে বলতে মেহেরজান থম ধরে শুনে গেল। পদ্ম জানাল, কামাই-রুজির জন্য বিদেশ যাওয়া ছাড়া গতি নেই। অনেকদিন ধরেই নাকি পাত্তা লাগাচ্ছিল, এতদিনে যাওয়ার ব্যবস্থা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। যাচ্ছে সে লেবাননে, একা না, সঙ্গে আরো মেয়ে যাবে। তবে যাওয়ার পর কাজের জায়গা যার যার আলাদা। কেউ কারখানায়, কেউ হাসপাতালে, কেউ বাসাবাড়িতে। তবে বাসার কাজ মানে বাংলাদেশের চাকরানিগিরি নয়। বেবিসিটিং। কাজটা যে কী বুঝিয়ে বলে এও বলেছিল, বিদেশে এই কাজ ভালো ঘরের শিক্ষিত মেয়েরা করে। তাকে এ-কাজে নেওয়া হচ্ছে তার কপালের জোরে। কথায় কথায় পদ্ম আরো বলল, যেন বলাটা তেমন জরুরি নয়, টাকা লাগবে ম্যালা। তবে একসঙ্গে দিতে হবে না, যারা পাঠাচ্ছে তারা মাসে মাসে বেতন থেকে কেটে রাখবে। সত্য-মিথ্যা মেহেরজান কী বুঝবে! বোঝার মধ্যে এটুকু – মেয়েকে হারাচ্ছে। বিদেশে যাবে, কিন্তু টাকা-পয়সার এমন সোজাসরল ফয়সালা! তার মন বলল, পদ্ম পাচার হয়ে যাচ্ছে, নিজের ইচ্ছাতেই হচ্ছে। মানুষ যা নিয়ে কানাঘুষা করে তা তবে সত্যি। পদ্ম খানকি হয়ে গেছে। দিন কয়েক আগে সে তার ব্যাগ ঘাটতে গিয়ে রাঙতায় মোড়ানো বেশকিছু রঙিন বড়ি পেয়ে  কিসের ওষুধ জানতে চাইলে ব্যাগ হাতড়ানোর জন্য পদ্ম তেড়েমেড়ে এক চোট নিয়েছে। কিছু সময় পর গলা নরম করে বলেছে – মাথা ধরার ওষুধ, সারাদিন এসির ঠান্ডা।

তেমন তোড়জোড় ছাড়াই পদ্ম মাসতিনেক পর চলে গেল। যাওয়ার আগে মেহেরজানকে ধরে খুব কাঁদল, আর একটা খামভর্তি টাকা হাতে গছিয়ে বলল – কাম ছাইড়া দিবা, যতদিন টেকা না পাঠাইছি এই দিয়া চলবা। নিজের মোবাইলটা দিয়ে বলল – ফোন দিমু।

পদ্ম চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন ধন্ধ কাটেনি। কাজ মেহেরজান ছাড়েনি। খরচ কমাতে ছোট একটা ঘর নেওয়ার কথা চিমন্তা করছিল, আর টিভি-ফ্রিজ বেচে দেবে ভেবেছিল। মাঝে মাঝে এমনও ভাবত, অন্য কোথাও গিয়ে ঘর নেয়। পদ্ম না থাকলেও তাকে নিয়ে কথাবার্তা কানে আসত। নতুন জায়গায় গেলে এ থেকে অন্তত রেহাই পাবে, যদিও জানত তার নিজের মাথার পোকা ঠিকই কামড়াবে। কিন্তু যেই পদ্মর ফোন আসা শুরু করল, মেহেরজান অবাক হলো – সে যা ভেবেছিল তা কি সত্যি নয়? পদ্ম তবে পাচার হয়নি? এক বড়লোকের বাড়িতে নাদুসনুদুস দুইটা বাচ্চা দেখাশোনা করছে। বাচ্চাদের সঙ্গে, তাদের মায়ের সঙ্গে তার নিজের ছবি পাঠিয়েছে।

ধন্ধ কাটানো মুশকিল। তারপর যখন মাসে মাসে টাকা পাঠানো ধরল, পাঠিয়েই ফোন, যেন টাকার অভাবে তার মা না খেয়ে মরছে, মেহেরজানের মাথায় তখন অন্য পোকা – এ পদ্ম কোন পদ্ম! মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েও যে-কথা বলার দরকার মনে করত না, সে-ই বিদেশে পা দিয়ে সারাক্ষণ মাকে নিয়ে দুশ্চিমন্তায়! দিনে দিনে মেহেরজানেরও জড়তা কেটেছে। আগে মেয়ের সঙ্গে ভালোমন্দ কিছু বলার ইচ্ছা থাকলেও পারত না; যখন তখন চুলমুঠি পাকড়ে আছড়ানোর ঘটনাগুলো মনে পড়ামাত্র সে কুঁকড়ে যেত। সমস্যা থেকে পদ্মই তাকে বের করে আনল। তারপর যেদিন মেহেরজান পদ্মসোনা ডাকল, বুকটা হুহু করে উঠল। শুনে ওপাশে পদ্মর কী হয়েছিল বলতে পারবে না, তবে ডাকটা মেহেরজানের জ্বালাপোড়ায় মলমের কাজ দিয়েছিল। ওদিকে পদ্মও যেন হঠাৎ করে মায়ের আদর-সোহাগের কাঙাল। কোনোদিন যেসব কথা বলেনি, বলত। আইজ রান্দা কী গো মা বলে এমনভাবে ফোনের ওপাশে জবাবের অপেক্ষায় থাকত যেন মেহেরজান ভাত বেড়ে দিতে দেরি করায় তার তর সইছে না।

এবার কী ভেবে টাকা বেশি পাঠাল? অন্য এক ব্যাংকে পদ্মর আলাদা অ্যাকাউন্ট আছে, মেহেরজান জানে। সেখানে সে নিশ্চয় কিছু না কিছু জমায়। কিছু কিছু কেন, বেশি বেশিই জমানোর কথা। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পদ্ম যদি তাই করে –  করা অবশ্যই উচিত – সেটা খুবই ভালো খবর।

ঘরে ফিরে সারাদিন ফোনের অপেক্ষায় থেকে ফোন না পেয়ে মেহেরজান টাকার চিমন্তাতেই ফিরে গেল। অন্যান্যবারের চেয়ে যে বেশি পাঠাল! সে তো বাড়তি কোনো খরচের কথা বলেনি, পদ্মও জানতে চায়নি। পদ্মর ফোন এলো আরো দুদিন পর। ব্যস্ত ছিল তাই ফোন দিতে পারেনি বলে জানতে চাইল মেহেরজান টাকা তুলেছে কি না। টাকা বেশি কেন পাঠিয়েছে এর জবাবে পদ্মর গলায় অভিমান – আমি আমার মারে টেকা বেশি পাঠামু আমার ইচ্ছা। এখন থাইকা এরমই পাইবা। তুমার শখ মিটাইয়া খরচ করবা।

মেহেরজানের মুখে কথা ফোটে না। এই পাগলিকে কী বলবে! মাকে বেশি টাকা পাঠাচ্ছে এ তার ইচ্ছা – এ কেমন যুক্তি! খাটনির রোজগার, সাবধানে আগলে রাখতে হয়। অবশ্য মেহেরজান মাথায় কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি রাখে, টাকা বেশি পাঠালেই খরচ করে ফেলতে হবে কোন আহ্লাদে! দরকারের বেশি ব্যাংক থেকে না তুললেই হলো। তারপরও মেহেরজান না বলে পারল না, সব কামাই যদি মাকে দিয়ে দেয় তার কী থাকে? এক সুযোগে কায়দা করে কথাটা বলে ফেলে সে অপেক্ষা করল পদ্ম কী বলে। পদ্ম হাসল। আমার জইন্য একদম চিমন্তা করবা না বলে মেহেরজানের দুশ্চিমন্তাকে এক ফুঁতে উড়িয়ে দিয়ে জানাল, সে তার টাকাকড়ির ভালোই ব্যবস্থা করে রাখছে। কথা শেষ করেই বলল – সামনে বকরি ঈদে একটা ছাগল কোরবানি দিবা। কুচকুইচা কালা। পারবা না?

পদ্ম চলে যাওয়ার পর বসিত্মতে তাকে নিয়ে কথাবার্তা কানে কম আসে। তারপরও ইতর পোলাপান পথেঘাটে খোঁচায় – ও খালা পিন্সেসের খবর কী, কবে আসব? পড়শিরা তার সুখে জ্বলেপুড়ে খাক হলেও জানতে চায় – মাস-মাস কত জানি পাডায়? জয়তুনবুড়ি একমাত্র যে পদ্মর খোঁজ নিতে গিয়ে মেহেরজানকে হিংসা করে বলে মনে হয় না। ছোটবেলা পদ্মকে সে-ই দেখেছে, পদ্ম নামটাও তার দেওয়া। পদ্ম সেসব ভোলেনি। দেশে যখন চাকরি করত, প্রায়ই বুড়িকে এটা-ওটা এনে দিত। এবার পদ্ম যে এতগুলো টাকা পাঠাল, এর থেকে বুড়িকে হাজার দুয়েক দিলে পদ্ম খুশি হবে।

ঈদে ছাগল কোরবানির কথা পদ্মর মাথায় কেন এলো বুঝতে পারছে না। বসিত্মতে  কেউ কোনোদিন কোরবানি দিয়েছে মেহেরজান শোনেনি। পদ্মর টাকায় এবার সে-ই প্রথম দেবে। মানুষের চোখ টাটায়, টাটাক। অন্যের ভালো দেখতে-না-পারা মানুষের রক্তের দোষ। বড়লোক ছোটলোক এ-জায়গায় সমান।

টাকা পেয়ে জয়তুনবুড়ি কেঁদে ফেলল। সে এখন বলতে গেলে ঘরবন্দি, হাঁটাচলা তেমন করতে পারে না, শরীরে একশটা অসুখ। বুড়ি বিড়বিড় করে কতক্ষণ পদ্ম পদ্ম করল, তারপর চোখ মুছে গলা নামিয়ে বলল – আইচ্ছা ক তো পদ্ম ওইখানে কী করে? তোরে কাম ধরতে মানা করে, মাস-মাস টেকা পাডায়, ও কত রুজি করে? তোরে কী কমু, মাইনষ্যে কত কতা কয়! বুড়ি থেমে গলার সুর বদলে বলল, ভালা আছে আমাগো পদ্ম? দেখতে দেখতে কত বড় অইয়া গেল, বিদেশে একলা থাকে, কামাই করে। কী মাইর না মারতি গো! দোয়া করি ভালা থাউক। আওনের সুময় আমার লাইগা একখান পশমের কম্বল আনতে কইবি। মারপিটের কথা মনে করিয়ে দেওয়ায়, না-কি মানুষের মুখে পদ্মকে নিয়ে আকথা-কুকথা শুনেছে বলে মেহেরজানের ইচ্ছা করল বুড়ির হাত থেকে টাকাগুলো কেড়ে নেয়।

বেশ রাতে ঘরে বসে তার মনে হলো বুড়ি শুনেছে বলে বলেছে, বিশ্বাস করেছে বলেনি। সে নিজেও তো শুনেছে, আগে বেশি বেশি শুনত, এখন পদ্ম এখানে নেই বলে কম শোনে। একসময় তো এমন ছিল, সে মা হয়েও ধন্ধে ছিল। ভাবতে ভাবতে একসময় সে আনমনা হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে যা ভাবল তা তাকে চমকে দিলো। পদ্মকে নিয়ে যা শোনে সেসব যদি সত্যি হয়, হয়ই যদি, কার কী! কোন হারামির বাচ্চার কী! পদ্মর নিজের মুখের কথা মনে করে ভাবল, পদ্ম কারো খায় না, পিন্দেও না, ওর যা মন চায় করুক, তোগো কী! চমকানোর ধাক্কাটা সয়ে নিয়ে সে অন্য কথা ভাবল। দুনিয়ায় পদ্মর মতো কে আছে যে মার কথা চিমন্তা করে এমন আছাড়িপিছাড়ি করে, তাও যে মা কথায় কথায় কিল-লাথি ছাড়া কিছু বুঝত না! বুকে দুধ ছিল না বলে জন্মানোর পর মায়ের এক ফোঁটা দুধ পর্যন্ত পায়নি। চোখ ভাসিয়ে কান্না চাপতে তার ইচ্ছা জাগল, গোটা বসিত্মর লোকজনের ঘুম ছুটিয়ে চিল্লিয়ে কাঁদে। কেন কাঁদছে বলবে না। কাউকে না, কেউ জানবে না। প্রাণভরে গলা খুলে কাঁদবে। সবাই ভাববে, পদ্ম মরে গেছে। পদ্ম ছাড়া তার কে আছে যে কাঁদবে! ভাবুক, যার যেমন খুশি ভাবুক। কেবল সে জানবে পদ্ম ওরফে পার্লি মরবে কোন দুঃখে, তার মা আছে না? যেমন পদ্ম তাকে বলে, বলেছিল, আমি আছি না?