Sunday, June 21, 2015

জনসমুদ্রে যোগচর্চা করলেন মোদি

জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ রোববার সকালে যোগচর্চার সবচেয়ে বড় আসর বসে। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ অংশ নেয়। সেখানে ছিলেন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এনডিটিভি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস আজ ২১ জুন। বিশ্বের ১৯১টি দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসের উদ্যোক্তা ভারত। দিবসটি পালনের আয়োজনে তারা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে ভারত। দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে আজ যোগচর্চার আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বিভিন্ন সদস্যসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অংশ নেন।
ভারতে যোগ দিবসের প্রধান অনুষ্ঠান হয় রাষ্ট্রপতি ভবন ও ইন্ডিয়া গেটের মধ্যবর্তী রাজপথে। সেখানে আজ সকালে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে যোগচর্চায় অংশ নেয়। এই মহাআয়োজনে উপস্থিত থেকে হাজারো মানুষের সঙ্গে যোগচর্চা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। অনুষ্ঠানে যোগগুরু বাবা রামদেবও ছিলেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ছিলেন মন্ত্রী, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, কূটনীতিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
যোগচর্চা শুরুর আগে সমবেত জনতার উদ্দেশে মোদি বলেন, ‘রাজপথ যে যোগ পথে পরিণত হবে, তা কে জানত।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আজ বিশ্বের সব অংশে যোগ পৌঁছে যাবে। যোগ দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।’
জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
এরপর রাজপথের জনসমুদ্রে যোগচর্চায় অংশ নেন মোদি। তাঁর পরনে ছিল পুরোপুরি সাদা পোশাক। গলায় ঝোলানো ছিল তিন রঙের একটি চাদর। সেখানে তিনি বিভিন্ন ধরনের যোগচর্চা করেন। অনেকগুলো বড় পর্দায় রাজপথের আয়োজন দেখানো হয়। আয়োজন পর্যবেক্ষণ ও তা রেকর্ড করতে উপস্থিত ছিল গিনেস বুক কর্তৃপক্ষ। কোনো একক স্থানে যোগচর্চার সবচেয়ে বড় আসর হিসেবে রাজপথের এই আয়োজন বিশ্ব রেকর্ড গড়বে বলে আয়োজকদের প্রত্যাশা।
রাজপথের এই আয়োজনকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দিবসটি পালনে ৩০-৪০ কোটি রুপি খরচ হয়েছে। আজ প্রকাশ করা হয়েছে ডাকটিকিট।
দিবসটি উপলক্ষে সকালে টুইটারে দেওয়া এক বার্তায় বিশ্ববাসীকে শুভেচ্ছা জানান মোদি।
জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
মোদি সরকারের দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ করে ২১ জুনকে ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ ঘোষণা করে জাতিসংঘ। এবারই প্রথম দিবসটি পালিত হচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ দেন মোদি। তখন তিনি এমন একটি দিবসকে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। মোদি বলেন, তিনি নিজে প্রতিদিন যোগ সাধনা করেন। এটি তাঁর কর্মশক্তি জোগায়। যোগসাধনা করলে রাতে কম ঘুমালেও চলে।
যোগব্যায়াম ও ভেষজ ওষুধকে জনপ্রিয় করতে নভেম্বরে মোদি ভারতে প্রথমবার এ বিষয়ে একজন মন্ত্রী নিয়োগ দেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কর্মস্থলে যোগচর্চার একটি পরিকল্পনা নেন মোদি।

কাজ কেন জরুরি by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শার্লক হোমসের একটি পরিচিত মন্তব্য পড়লাম সেদিন একটি প্রবন্ধে। মনে হলো পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা। খুব ভালো লাগল। শার্লক হোমসকে তার সেই বিখ্যাত ও অত্যন্ত অনুগত এবং কিছুটা বোকা বোকা বন্ধু ডা. ওয়াটসন জিজ্ঞেস করছেন, ‘এখন তোমার হাতে কী কাজ?’ জবাবে শার্লক হোমস বলছেন, ‘না, কোনো কাজ নেই, দেখছ না সে জন্য কোকেনের ইনজেকশন নিচ্ছি।’ খুবই নাড়া দেয় এ কথাটা আমাকে, যখনই ভাবি। মানুষকে বলা হয়েছে চিন্তাশীল প্রাণী। গ্রিক দার্শনিকরাই বলেছেন প্রথমে। কথাটা অবশ্য সত্য, কিন্তু আরো বেশি সত্য বোধহয় এই কথাটা যে, মানুষ একটি কর্মপ্রিয় প্রাণী। হ্যাঁ, কাজ ইতর প্রাণীও করে বটে, কিন্তু সেসব কাজ থেকে মানুষের কাজ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কেননা মানুষের সব কাজের পেছনেই চিন্তা থাকে, এমনকি বোকামির কাজগুলোতেও থাকে সৃষ্টিশীলতা। মানুষের কাজ সৃষ্টিশীল। পশুর কাজ নয়। ওদিকে চিন্তা মাত্রেই কাজ বটে। অলস চিন্তাও কাজের মধ্যেই পড়ে। শুয়ে-বসে দিন কাটাই এ কথা বলেন যিনি, এমনকি যদি প্রচণ্ড আত্মসুখের সঙ্গে বলেন, তবুও নিশ্চিতে বলা যায় যে, তিনি কেবল শোন আর বসেন না। আরো অনেক কিছু করেন এবং শোয়া-বসাতে এক সময়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। যখন কাজ পায় না, মানুষ তখন অকাজ করে। যেমন শার্লক হোমসের মতো জগদ্বিখ্যাত ডিটেকটিভও করেন, কোকেনের সেবা করেন, কর্মহীন অবস্থায় তিনি আর অতিবুদ্ধিমান মানুষটি থাকেন না। অতিসামান্য মাদকাসক্ততে পরিণত হয়ে যান, রাস্তাঘাটের যুবকদের মতো।
হোমস আরো বলেছেন ওই সংলাপে, ‘কাজ না থাকলে বেঁচে থাকার কী থাকে। ক্ষমতা থেকে লাভ কী, ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র যদি না পাওয়া যায়।’ খুবই সত্য কথা। মনে কি পড়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় কচের প্রতি দেবযানীর সেই বিখ্যাত অভিশাপ, ‘পারিবে না করিতে প্রয়োগ।’ এ বড়ই নিষ্ঠুর পরিস্থিতি; ক্ষমতা আছে জানি, টেরও পাই, কিন্তু প্রয়োগ করতে পারি না। এর নাম বেকার থাকা। বেগার খাটা তবু সহ্য হয়, কিন্তু বেকার থাকা? একদিন, দু’দিন, দশ দিন, বিশ দিন চলে, কিন্তু যদি হয় অন্তহীন থাকা, তবে? না, তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না। তার কর্মপ্রিয়তা এবং সৃষ্টিশীলতা ভেতর থেকে ঠেলাঠেলি করে একটা প্রলয়কাণ্ড বাধিয়ে ছাড়ে। হয়তো সে কোকেন, হেরোইন এসব ধরে, ঝিমোয়, নয়তো মস্তানি করে। কর্মহীনতা তার মনুষ্যত্বকেই মাটি করে দিতে চায়, একেবারে।
বাংলাদেশে এখন আমরা ওই দশাতেই পড়েছি। ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কর্মশালা’ এ বক্তব্য আমাদের ক্ষেত্রে খুবই সত্য। কিন্তু সেটা কিছুই নয় শার্লক হোমসের পাশে। ‘কাজ না থাকলে কী থাকে ওয়াটসন। বেঁচে থাকার কি অর্থ থাকে?’ শয়তানের কায়কারবার বেশ অশরীরী, সে তুলনায় কোকেনের ইনজেকশন নিজেই নিজের ধমনীতে প্রবেশ করানো অনেক বেশি বাস্তবিক, খুব স্থূলরূপেই দৃষ্টিগ্রাহ্য। বেকারত্ব মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করে তোলে। আর সৃষ্টিশীলতা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে এবং সেই স্তূপের বোঝা বহন করে সে ক্লান্ত হয়। কেবলই ক্লান্ত হয়। আত্মবিশ্বাস যায় হারিয়ে। পরনির্ভরশীলতা হয়ে পড়ে মজ্জাগত। আর ওই যে দুই বড় বিপদ, মস্তানির ও মাদকাসক্তি তারা তো আছেই রয়েই গেছে।
এসব কথা থাক। মূল কথায় ফেরত যাই। না, আমাদের বড় রাজনৈতিক দল দুটি যে দুর্বৃত্তদের আশকারা দিচ্ছে, সেটা যে শুধু আমি দেখছি না তা নয়। চাওয়ামাত্রই তারা যে মস্তান পেয়ে যায় এবং রাজধানী থেকে ইউনিয়ন কাউন্সিল, পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত সর্বত্র তাদের কাজে লাগাতে পারে এর কারণ কী সেটা নিয়েই একটু চিন্তিত ছিলাম, এই যা। পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশের প্রথম দিকেও দেখেছি সরকারি দল (তাদের হাতেই যখন টাকা ছিল) বস্তি থেকে লোক ভাড়া করে এনে মিটিং-মিছিল করত। এখন আর বস্তিতে যেতে হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব এত বেড়েছে যে এখন মস্তান মাশআল্লাহ যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়। ওই যে যুব কমান্ডের নাম শোনা গিয়েছিল ও শ্রীমানেরা হঠাৎ এলো কোত্থেকে? সন্দেহ নেই এদের অনেকেই এরশাদের আমলে যুব সংহতি করত। কেন করত? না, দরিদ্র ও বেকার বলে। যেদিন জেনারেল (অব.) এরশাদের মুক্তির দাবিতে জাতীয় পার্টি স্বেচ্ছাকারাবরণ কর্মসূচি পালন করেছিল। তাদের কেউ কারাগারে যায়নি, পুলিশ তাদের কাউকে গ্রেফতার করেনি। তবে হ্যাঁ, বায়তুল মোকাররমে তাদের দলের যুবকরা লুটপাট করেছিল। আসলে এরশাদপ্রীতি নয়, সত্য হলো লুটপাটপ্রীতি। এটাই হচ্ছে আসল ঘটনা। বেকার যুবক আছে বলেই সন্ত্রাসে লাগানো যাচ্ছে। না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো হাজার চেষ্টা করলেও তাদের কোথায় পেত?
রাজনৈতিক দল তো বিলেত-আমেরিকাতেও আছে, কই সেখানে তো তারা সন্ত্রাসী যুবকদের এমনভাবে কাজে লাগাতে পারে না অথবা ধরা যাক না কেন, আমাদের বড় দুই দলের নেতারা জাপানে গেলেন চলে (এশিয়ার দেশ বলে)। আইন তো তাদের হাতেই, তাই সেদিক থেকে অসুবিধা থাকবে না, টাকাও থাকবে হাতে (এখন যেমন রয়েছে), তবু কি তারা মস্তান ভাড়া করতে পারবে রাজনীতি করার জন্য? কল্পনা করা যায়? না, পারবে না। পারবে না এই সহজ কারণে যে, কোনো জাপানি যুবকই রাজি হবে না ওইভাবে খুন-জখম হয়ে শেষ হতে। সেখানে এখানকার মতো দারিদ্র্য নেই, এত বেকারও নেই, সেখানে ভাড়া খাটা মস্তান পাওয়া বড়ই কঠিন। সে জন্যই বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, আসল কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। অন্য কারণ যে নেই তা নয়, তবে তা প্রধান নয়।
কাজের ব্যাপারটাকে আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে তেমন গুরুত্ব দেইনি। ‘কাজের লোক’ বলতে ভৃত্যদের বোঝানো হয়েছে, কাজ তারাই করবে, অন্যরা করবে ভোগ ও উপভোগ। গৌরবের দাবি বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা এক সময়ে হতো, মেয়েদের বিয়ের কথাবার্তার ক্ষেত্রে। কাজ জানে না অর্থ কাজ জানার প্রয়োজন পড়েনি। কাজকর্ম যা করার দাস-দাসীরাই করেছে। ভাবটা ছিল এই রকমের। সর্বত্র এতটা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ না পেলেও মনোভাবটা বহু ক্ষেত্রেই বিদ্যমান থাকত। অযোগ্যতা নিয়ে বড়াই চলত, আলস্য আদর্শায়িত হতো। কত কম শ্রমে কত বেশি সাফল্য লাভ হয়েছে এটা হতো গর্ব করার বিষয়। আর মেয়েদের তেমন কোনো কাজই দেয়া সম্ভব হতো না। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ ছিল বিয়ে করা এবং তারপর তথাকথিত ঘরকন্না করা। অত্যন্ত উচ্চমূল্য দেয়া হতো তাদের মাতৃত্বকে। এখনো যে এসব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে তা মোটেই নয়। এখনো মেয়েদের আমরা কাজের মতো কাজ দিতে পারি না। বিপুলসংখ্যক মানুষকে এভাবে কর্মহীন করে রাখা হয়েছে এবং বেকারত্বের যে অভিশাপ তা তাদের এবং তার ফলে গোটা সমাজকে জর্জরিত করছে। মেয়েদের জন্য কাজ যে কত প্রয়োজনীয় গার্মেন্টস শ্রমিকদের দিকে তাকালে তা বোঝা যায়। যে পরিশ্রম তাদের করতে হয় যে কোনো বিচারেই তা অমানবিক। আলোকিত শহরে অন্ধকার চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যেন শ্রমিকদের জন্য। কিন্তু তবু গার্মেন্টসের যে কোনো নারী শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করুন, বলবে অতি সামান্য বেতনে এই অমানবিক শ্রম, তবু ভালো গৃহের অভ্যন্তরে দাসিত্বের তুলনায়; কেননা এ কাজ তাকে চলাফেরার কিছুটা হলেও স্বাধীনতা দিয়েছে, সামান্য হলেও কিছু আয় করে নিজের ও অপরের কাছে মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ সে পেয়েছে, অপরের সঙ্গে মেলামেশার একটা ক্ষেত্রও সে লাভ করেছে।
আসলে কাজ খুবই দরকার। কাজ যারা পেয়েছে তারাও অনেকেই পুরোপুরি পায়নি। অর্থাৎ এমন কাজ পায়নি, যা তাদের পূর্ণ সময় ও মনোযোগ দাবি করতে পারে। ওদিকে লাখ লাখ মানুষ দেশে বেকার, যাদের কাজ দেয়া যাচ্ছে না এবং এই বেকারদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, তাদের জন্য নতুন কোনো কাজ তৈরি হচ্ছে না। এ কে ফজলুল হক বলেছিলেন, বাংলার অর্থনীতিই হচ্ছে বাংলার রাজনীতি। বড়ই সত্য কথা। অর্থনীতি রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয় এবং তাকে এদিকে ঘোরায়, ওদিকে ঘোরায়, দুমড়ে দেয়, মুচড়ে দেয়। অর্থনীতিতে মন্দা ভাব। শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। না ওঠার কারণ পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে বাইরে। আরো একটি কারণ দেশীয় পণ্য বাজার পাচ্ছে না। বৈধ পথে কিছুটা, অবৈধ পথে অধিক পরিমাণে বিদেশি পণ্য এসে দেশি পণ্যের বাজার তছনছ করে দিচ্ছে। তদুপরি মানুষের নেই ক্রয়ক্ষমতা।
মূল সমস্যাটা অর্থনৈতিক বটে, কিন্তু এর সঙ্গে রাজনীতিও জড়িত, ওতপ্রোতভাবেই। রাজনীতিকে কেবল অর্থনীতির প্রতিফল ভাবলে ভুল করা হবে। কেননা রাজনীতিও যে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে না, তা নয়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও নীতি অর্থনীতির ক্ষেত্রে খুবই জরুরি বটে। এই প্রসঙ্গটা সংবেদনশীল একজন পাঠকের চিঠিতেও আছে। তা সমাজতন্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের কথা। লিখেছেন, ‘এই বিপর্যয়ে যতটা অপমানিত ও মর্মাহত হয়েছি নৈর্ব্যক্তিক কারণে, এতটা অন্য কোনো কারণে খুব কমই হয়েছি। তবু ভালো, কিছুটা লেখাপড়া ছিল বলে যুক্তি দিয়ে সামলে নিলেও অপমানটা বিঁধছে।’ এখন চতুর্দিকে ওই প্রচণ্ড আওয়াজ সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাই কি? বিপ্লবের আগে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের অবস্থার সঙ্গে পরের অবস্থার তুলনা করুন। তাহলেই বুঝতে পারবেন সমাজতন্ত্র মানুষকে কতটা এগিয়ে নিয়ে গেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে আর যাই থাক বেকারত্ব ছিল না, ছিল না মুদ্রাস্ফীতি, যে দুই দানব আমাদের মতো গরিব দেশকে আজ উত্ত্যক্ত করে রাখছে। আর কেবল সমাজতান্ত্রিক দেশ বলে তো নয়, পুঁজিবাদী দুনিয়াতেও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ শ্রমজীবী মানুষের জন্য যে ছাড় আদায় করে নিয়েছে তা উপেক্ষা করার বিষয় নয়।
শ্রমিকবহুল পরিবহন ব্যবস্থায় কাজ করেন এমন আমার একজন আত্মীয় সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিল; সমাজতন্ত্র তখন পড়ো পড়ো। তিনি পুঁজিবাদী বিশ্বের শ্রমিক নিয়োগনীতি দেখেছেন, ওখানেও দেখলেন। দেখেন রেলওয়েতে যত লোক লাগে তার চেয়ে বেশি লাগানো রয়েছে। ‘এত লোক কি লাগে?’ জিজ্ঞেস করায় রুশ কর্মকর্তা যে জবাব দিয়েছিলেন সেটা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অন্তরের কথা। না, লাগে না। তাহলে রেখেছেন কেন? রেখেছি সামাজিক প্রয়োজনে। এদের ছাঁটাই করে দিলে এরা যাবে কোথায়? খাবে কী? কোথায় দাঁড়াবে ওদের পরিবার? আসল ব্যবধানটা এখানেই। পুঁজিবাদ মুনাফা দেখে, সমাজতন্ত্র দেখে উপকার। দুই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর ব্যবধান সামান্য নয়, ব্যবধান রাত ও দিনের। রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন আমরা মুনাফার লাইনে চলছি। বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দেয় এই এই খাতে লোক ছাঁটাই কর, তাহলে তোমাদের উন্নতি হবে। কার উন্নতি? কিসের উন্নতি? উন্নতি যা হচ্ছে তা তো দেখতে পাচ্ছি, উন্নতির ধাক্কায় যে যেভাবে পারে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। কর্ম সৃষ্টি না করে উল্টো বেকার সৃষ্টির চেয়ে বড় আত্মঘাতী পদক্ষেপ আবিষ্কার করা আমাদের পক্ষেও কঠিন হবে বৈকি! যেসব প্রশ্নে সরকারের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকার থাকা উচিত আমাদের তার মধ্যে অবশ্যই থাকা দরকার কর্ম সৃষ্টির এই জিজ্ঞাসাটা। এটি প্রধান বিবেচনাগুলোর একটি হওয়া আবশ্যক। যোগ্যতার বিচার কথায় নয় কাজে চাই এবং একটা বড় কাজ হচ্ছে দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করা। সাফল্য ও ব্যর্থতা বিচারের এই নিরিখটাকে উচ্চে তুলে ধরা চাই, বলা চাই, কাজ দিতে হবে; বেকার রাখা চলবে না। একটা কথা বলে শেষ করি, ধর্মঘট ও হরতালকে একমাত্র রাজনৈতিক অস্ত্র করা আর উচিত নয়। নতুন উদ্ভাবন দরকার। কাজ ও চলাচল থামিয়ে রেখে আমরা এগোতে পারব না। পারছিও না।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

মোদির যোগ উৎ​সবের মাজেজা

জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে
আজ রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে
আয়োজিত যোগচর্চার অনুষ্ঠানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: পিআইবি ইন্ডিয়া
রীতিমতো যোগব্যায়াম জ্বরে আক্রান্ত পুরো ভারত। আজ ২১ জুন জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে যোগচর্চার এক মহাযজ্ঞে মেতেছে ভারত। এই আয়োজন নিয়ে মাতামাতি যেমন আছে, তেমনি আছে সমালোচনা। বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমনটাই বলা হয়েছে।
‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ কীভাবে এল, তা জানতে একটু পেছনে ফিরতে হবে। দিবসটির উদ্যোক্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম ভাষণ দেন তিনি। সেখানে তিনি এমন একটি দিবসকে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। মোদির আহ্বানে সাড়া দেয় জাতিসংঘ। তাঁর দেওয়া প্রস্তাব গ্রহণ করে ২১ জুনকে ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ ঘোষণা করে জাতিসংঘ। দিবসটি এবারই প্রথম পালিত হচ্ছে।
যোগব্যায়াম ও ভেষজ ওষুধকে জনপ্রিয় করতে নভেম্বরে মোদি ভারতে প্রথমবার এ বিষয়ে একজন মন্ত্রী নিয়োগ দেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কর্মস্থলে যোগচর্চার পরিকল্পনা নেন।
পরে মোদি ভারতজুড়ে প্রথম আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠান মহাসমারোহে করার ঘোষণা দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আজ সকালে দিবসটির প্রধান অনুষ্ঠান হয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবন ও ইন্ডিয়া গেটের মধ্যবর্তী রাজপথে। সেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ সমবেত হয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে যোগচর্চা করেছেন। সে এক মহাআয়োজন! ভারতের অন্য অনেক স্থানেও আজ যোগচর্চার আয়োজন করা হয়।
ভারতের সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, দিবসটি পালনে প্রায় ৩০-৪০ কোটি রুপি খরচ হয়েছে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এত ধুমধাম করে যোগচর্চার এই মহাযজ্ঞ আয়োজনের উদ্দেশ্য কী? রাষ্ট্র কিংবা জনগণের জন্য এই আয়োজনের লাভক্ষতিই-বা কী?-এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছে বিবিসি।
প্রধানমন্ত্রী মোদি যোগচর্চার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি তাঁর এক জীবনী লেখককে বলেছেন, সকালে হাঁটার পর এক ঘণ্টা যোগচর্চা করার চেষ্টা করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মোদি বলেন, তিনি নিজে প্রতিদিন যোগচর্চা করেন। যোগচর্চা তাঁর কর্মশক্তি জোগায়। যোগচর্চা করলে রাতে কম ঘুমালেও তাঁর চলে।
এ তো গেল যোগচর্চার ব্যাপারে ব্যক্তি মোদির আগ্রহের কথা। কিন্তু আজ ভারতে যোগচর্চার যে মহাযজ্ঞ বসেছে, তার মাজেজা কী?
বিবিসি বলছে, ভারতীয়রা বিশ্ব রেকর্ড ভালোবাসে। আজ রাজপথে প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে হাজারো জনতার অংশগ্রহণে যোগচর্চার যে মহাআয়োজন হয়েছে, তার অন্যতম লক্ষ্য গিনেস বুকে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়া। একক কোনো স্থানে (ভেন্যু) যোগচর্চার সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে রাজপথের অনুষ্ঠানটি বিশ্ব রেকর্ড হবে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা। সে জন্য ওই অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ ও তা রেকর্ড করতে গিনেস বুক কর্তৃপক্ষকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়।
যোগচর্চা-সংক্রান্ত বেশ কিছু রেকর্ড ইতিমধ্যেই ভারতের ঝুলিতে আছে। তবে তারা আরও রেকর্ড গড়ে চায়।
বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়তে ও বিশ্ব রেকর্ড ভাঙতে ভারতীয়দের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা আছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে অন্তর্ভুক্তির জন্য ২০১৩ সালে ভারত থেকে তিন হাজার আবেদন পড়েছে। গত পাঁচ বছরে ভারতে রেকর্ডধারীদের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার ২৫০ শতাংশ। ভারতীয়দের এই প্রবণতাকে ‘রেকর্ড গড়ার জ্বরাক্রান্ত উপসংস্কৃতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন লেখক সামান্থ সুব্রামানিয়ান।
রেকর্ড গড়া-সংক্রান্ত আলোচনার বাইরে মোদি আয়োজিত যোগচর্চা মহাযজ্ঞের আরেকটি দিক, রাজনীতি। আজকের দিনকে ঘিরে মোদি যখন তাঁর পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন, তখনই এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
দলিত নেত্রী মায়াবতী অভিযোগ করেন, সাম্প্রদায়িক ঐক্য দুর্বল করতে মোদির দল ও তার কট্টর মিত্ররা যোগচর্চাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও যোগচর্চার এই আয়োজন নিয়ে কটাক্ষ করা হয়।
যোগচর্চার ব্যাপারে মোদি সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক মুসলিম নেতার মধ্যে অস্বস্তি আছে। যোগচর্চা ও হিন্দুত্ববাদের প্রসারের মধ্যেও কেউ কেউ সম্পর্ক খোঁজেন। এ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনেও শিরোনাম হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিরজা চৌধুরীর ভাষ্যমতে, যোগচর্চার আজকের আয়োজনে মোদি উপকৃত হবে। এটা তাঁর জন্য ‘স্বস্তির’ পরিস্থিতি। এর মধ্যে দিয়ে তাঁর ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটবে। কট্টরপন্থীরাও খুশি হবেন।
সমালোচকেরা বলছেন, মোদি এমন এক সময় এই যোগচর্চা নিয়ে তোড়জোড় চালাচ্ছেন, যখন ভারতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
মোদির এই যোগ-উৎসবকে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ, বাণিজ্যিকীকরণ ও অতি সূক্ষ্ম দমননীতির শাসনের সংমিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিশ্লেষক আজাজ আশরাফ।

চট্টগ্রামে তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনা- কর্ণফুলী নদীতে তেল ছড়াচ্ছে by প্রণব বল

বোয়ালখালীতে সেতু ভেঙে খালে পড়ে যায় তেলবাহী ট্রেন। এতে
ট্রেনের তিনটি ওয়াগন থেকে ৭০ হাজার লিটারের বেশি তেল
কর্ণফুলীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল তোলা ছবি l প্রথম আলো
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী রেলসেতু ভেঙে খালে পড়ে যাওয়া ট্রেনের তিনটি ওয়াগন থেকে কর্ণফুলী নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত এই খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে কর্ণফুলী নদীর দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। ছড়িয়ে পড়া তেলের দূষণে খালসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
তেল ছড়িয়ে পড়ায় নদীর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হবে বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সস অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. শাহাদত হোসেন। তিনি জানান, নদীর পানির অক্সিজেন কমে গিয়ে ছোট মাছ মরে যাবে। এর পর বালুকণার সঙ্গে তেল মিশে নদীর নিচের অংশ দূষিত করবে। এতে পানির নিচে বসবাসকারী জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়বে। এ ছাড়া যে এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়বে সেখানে মাছের আবাস নষ্ট হবে। এতে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গতকাল শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. মকবুল হোসেনসহ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাঁরা খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করেন। মো. মকবুল হোসেন জানান, ৭০ হাজার লিটারের বেশি তেল খাল-বিল, পুকুর ও কর্ণফুলী নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আশপাশের ২০ কিলোমিটার এলাকায় এই তেল ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দূষণ কমাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, রশি ও খড় দিয়ে তেল অপসারণ করার চেষ্টা করছেন রেলের কর্মীরা। তিনি জানান, প্রতিটি ওয়াগনে ২৫ হাজার লিটার তেল ছিল। দুর্ঘটনাকবলিত তিনটি ওয়াগন থেকে বেশির ভাগ তেল বের হয়ে গেছে।
গত শুক্রবার দুপুরে বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার সীমান্তে শাইরাপুল এলাকায় হারগেজি খালের (বোয়ালখালী খাল) সেতু পার হওয়ার সময় সেটি ভেঙে খালে পড়ে যায় তেলবাহী ট্রেন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা তেল ডিপো থেকে ফার্নেস অয়েল নিয়ে ট্রেনটি চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী যাচ্ছিল। দোহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য আটটি ওয়াগনে করে তেল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। দুর্ঘটনায় দুটি ওয়াগন খালে পড়ে যায়। আরেকটি ওয়াগন অর্ধেক ডুবে যায়। এ ছাড়া ট্রেনের ইঞ্জিন খালের পাশে কাত হয়ে পড়ে যায় এবং আরও একটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়।
সরেজমিনে গতকাল দুপুরে দুর্ঘটনাস্থলে দেখা যায়, খালের পানিতে কালচে তেল ভেসে আছে। দুই পাড়ের গাছের গোড়া ও সবজিখেতে কালো তেল লেগে রয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে ১০ কিলোমিটার ঘুরে খালের মিলিটারি পুল এলাকা দিয়ে তেল নদীতে মিশছে।
কর্ণফুলী নদীর মাঝি আবু জাকের জানান, শুক্রবার রাতেই নদীতে তেল ভাসতে দেখা যায়। কালুরঘাট সেতুর নিচে নদীতে গতকাল দুপুরেও তেল ভাসতে দেখেছেন তিনি।
হারগেজি খাল এলাকার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন জানান, ট্রেন দুর্ঘটনার পর জোয়ারের সঙ্গে তেল করলডাঙ্গা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। আবার ভাটার সঙ্গে তা গিয়ে মিশছে কর্ণফুলী নদীতে। জোয়ারের সঙ্গে পুকুরেও ছড়িয়ে পড়েছে তেল।
গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদল। তিনি খাল থেকে তেল অপসারণের জন্য রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
দোহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের মহাব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়াও গতকাল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে তেল ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
উদ্ধারকাজ: দুর্ঘটনার পর চারটি ওয়াগনকে রিলিফ ট্রেনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লাইনচ্যুত একটি ওয়াগন থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রেলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান জানান, উদ্ধারকাজ শেষ করতে অনেক সময় লাগবে। দুই দিনের মধ্যে ইঞ্জিনটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। রেললাইন সচল করতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগবে।

আমরা পারি! by আসিফ নজরুল

মুস্তাফিজুর রহমান: বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন বিস্ময়
পলকা একটা শরীর, চেহারায় এখনো কৈশোর, দেখলে মনে হবে হঠাৎ এসে হারিয়ে গেছে ঢাকা শহরে। বুঝলাম পাকিস্তানের সঙ্গে একটা টি-টোয়েন্টিতে সে ভালো করেছিল। তাই বলে ভারতের সঙ্গে ওয়ান-ডে ম্যাচে নামিয়ে দিতে হবে? ভারত আর পাকিস্তানের ব্যাটিং কি এক রকম? টি-টোয়েন্টি আর ওয়ান-ডে এক হলো? মুস্তাফিজুর রহমান যখন তার চতুর্থ ওভারে পরপর ছয় আর চারের মার খেল, রাগে গজগজ করে এসব ভাবতে থাকি! আরাফাত সানি থাকতে মুস্তাফিজকে নামানো হলো কেন?
ভারতের রান ৭৬ বিনা উইকেটে। ভাবি, প্রথম রমজানের নামাজ পড়াই এখন সবচেয়ে উত্তম কাজ! মন উশখুশ করতে থাকে তবু সেখানে আমার। হলো না এবার জয় তিন শর ওপর রান করেও! কিন্তু আসলেই কি হলো না? মসজিদ থেকে বের হয়ে শুনি আশপাশের ছাত্রাবাসগুলো থেকে উল্লাসধ্বনি। একটা উইকেট পড়ল তাহলে? একটাই, নাকি আরও পড়েছে ইতিমধ্যে? আকুল হয়ে দারোয়ান আর আমার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি, এ রকম উল্লাসধ্বনি আর কয়বার শুনেছেন ভাই? তাঁরা বলতে পারেন না। তার মানে, উইকেট একটাই পড়েছে মাত্র।
বাসায় ঢুকে টিভি ছেড়ে চমকে উঠি। উইকেট পড়েছে চারটি, রান মাত্র ১২২। বল করছে সাকিব। তার প্রথম ওভার। তার মানে সাকিবকে ছাড়াই চার উইকেট ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ! সাকিবই বা তাহলে বসে থাকবে কেন? ধোনিকে বোকা বানিয়ে পঞ্চম উইকেট বাংলাদেশের! আমি কম্পিউটারে ইএসপিএন খুলে দেখি চার উইকেটের দুটো নিয়েছে সেই মুস্তাফিজ!
তারপর মুস্তাফিজের সেই স্মরণীয় ওভার। পরপর দুই বলে রায়না আর অশ্বিনের বিদায়! নিজের গগনবিদারী চিৎকারে নিজেই চমকে উঠি। আমার স্ত্রী শীলাকে ছুটে গিয়ে বোঝাতে থাকি কী অসাধারণ, কী অকল্পনীয়, কী অবিস্মরণীয় কাণ্ড করে চলেছে এই বাচ্চা ছেলেটা! সে হেসে মাথা ঝাঁকায়। বুঝেছে। আর একটা উইকেট হলে ডেবু ম্যাচে হ্যাটট্রিক! এই হ্যাটট্রিক মানে বোঝ তো? হ্যাঁ বোঝে! বাংলাদেশের বিজয়ে আমার এই ছেলেমানুষি আনন্দ বহু বছর ধরে চেনে সে!
২...
বাংলাদেশের বিজয়! এই পৃথিবীতে এর চেয়ে প্রিয় শব্দ আর নেই আমাদের। আমরা ১৯৭১ সালের বিজয়ী দেশ। চীন-আমেরিকা পক্ষে থাকার পরও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে স্বাধীন হওয়া দেশ। সেই বিজয়ের গল্প শুনলে এখনো দুই চোখ ভিজে যায় আমাদের। কিন্তু আমাদের বিশ্ব কাঁপানো বিজয় যেন থেমে গেছে এখানেই। অথচ এই বিজয়ের পর আরও বহু বিজয় প্রাপ্য ছিল আমাদের। আরও বহু রকম আনন্দে অশ্রুসিক্ত হওয়ার কথা ছিল আমাদের।
আবুল কাশেম গাজী: মুস্তাফিজের বাবা
আমরা খেলাপাগল মানুষ। জিডিপি, এমডিজি কিংবা গভর্নেন্স সূচকে জিততে না পারি, তাই বলে খেলাধুলায়ও নয়? খেলাধুলায় বিজয় তো একটুও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় আমার কাছে, অনেকের কাছে! অস্কার বিজয়ীর হাসির চেয়ে অলিম্পিক গোল্ড মেডেলিস্টের আবেগমথিত কান্না কম প্রিয় নয় আমার, আমাদের!
বাংলাদেশ অলিম্পিক জিতবে না হয়তো, কোনো দিনও জিতবে না বিশ্বকাপ ফুটবল। কিন্তু আমাদের তো ক্রিকেট আছে। আর কিছুতে না পারি, বহু অবিচার, বহু অন্যায়, বহু অবজ্ঞার জবাব ক্রিকেটের জয়ে দিতে পারি আমরা। তিন মোড়লের এক দেশ ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে ফেলি আমরা, একাত্তরের খুনি পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ করে ফেলি। আমাদের খেলায় বিজয়-আনন্দে মিশে থাকে জাতিগত আত্মমর্যাদাবোধ আর অহং, জাতিসত্তার গৌরবানূভূতি!
মোখলেছুর রহমান: মুস্তাফিজের সেজভাই
আমরা তাই ভারতের বিরুদ্ধেও জিততে চেয়েছি প্রচণ্ডভাবে। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট টিমকে কোনো দিনও আমন্ত্রণ জানায়নি ভারত, আজও! বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে ক্রিকেটের ব্রাত্যজন করার পরিকল্পনায় শামিল ছিল ভারতও! তার চেয়ে বড় ক্ষরণ ছিল আমাদের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিয়ে। সেদিন ভারতের সঙ্গে খেলায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্যায় সিদ্ধান্তগুলো না হলে আমরাই জিতে যেতাম! আমরা এটা বিশ্বাস করি। আমাদের এই বিশ্বাসের মূল্য থাকবে না? ‘ভারতবধের’ হুংকারে আমরা সয়লাব করে দিয়েছিলাম ফেসবুক আর ইএসপিএন। তারপরও দেশের মাটিতে একবারও হারাতে পারব না ভারতকে!
আমরা পেরেছি! ভারত দলের হাড্ডি-মাংস ধসিয়ে দেওয়া বিজয়ই অর্জন করতে পেরেছি। খেলার মাঝপথে আমাদের মুস্তাফিজকে বুনো ষাঁড়ের মতো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন ভারতের অধিনায়ক। ১২ ওভার পরে সুস্থ হয়ে খেলায় ফিরে এসে পাঁচ বলে পুরো ভারতকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছেন মুস্তাফিজ। ক্রিকেট অভিজাততন্ত্রের গালে এমন নান্দনিক চপেটাঘাত আমরাই পারি।।
৩...
মুস্তাফিজ যদি প্রথম ওয়ানডের নায়ক হন, তাসকিনকে
দিতে হবে পার্শ্বনায়কের মর্যাদা। আজ কি আবারও
জ্বলে উঠতে পারবেন তাঁরা? l শামসুল হক
আমরা পারি আরও বহু কিছু। নোবেলে প্রাইজ জিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, আমরা পারি। বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও করে স্যার আবেদ দেখিয়েছেন, আমরা পারি। সারা বিশ্বে পাণ্ডিত্যের সম্মান অর্জন করে ড. কামাল হোসেন দেখিয়েছিলেন, আমরা পারি! আমাদের মেয়ে নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া দেখিয়েছেন কতটা উঁচুতে উঠতে পারি আমরা। আমাদের সাকিব আল হাসান দেখিয়েছেন আমাদের একজনও পারে প্রবল দাপটে বিশ্বের এক নম্বর হতে!
ব্যক্তির চেয়ে দেশের বিজয় আরও বেশি হৃদয়গ্রাহী। কিন্তু সেখানে আমরা যোজন যোজন পেছনে অনেক ক্ষেত্রে। দুর্নীতিমুক্ত হওয়া, মানবাধিকার বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কিংবা সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার পথে অনেক ব্যর্থতা রয়েছে বাংলাদেশের। উন্নয়নের যত বুলিই আওড়ানো হোক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচকে এখনো বহু পেছনে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ তাই গ্লানিময় শিরোনাম হয় বারবার, বাংলাদেশের মানুষও হয় অসম্মানিত। রানা প্লাজা ধসে কোথায়? বাংলাদেশে। লঞ্চ ডুবে শত শত মানুষ মরে কোথায়? একটু ভাত একটু আশ্রয়ের জন্য সাগর পাড়ি দিয়ে গণকবরে ঠাঁই হয় কোন দেশের মানুষের? কোন দেশের পাসপোর্ট দেখলে ভ্রু কুঁচকে যায় মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের ইমিগ্রেশনের? কোন দেশের মানুষ পাখির মতো গুলি খেয়ে মরে অন্য দেশের সঙ্গে সীমান্তে। সবই বাংলাদেশ!
এই দেশটার একটু পরাক্রম, একটু বিজয়, একটু সম্মানে তাই বুকের ভেতর প্লাবন নামে, চোখে আসে জল। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে—আমরা পারি, আমরাও পারি।
আমাদের আছে মুস্তাফিজ আর সৌম্যের মতো অপার প্রতিভা, তামিম আর সাকিবের মতো প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, মুশফিকের মতো দৃঢ়সংকল্প আর মাশরাফির মতো সিংহ–হৃদয় নেতৃত্ব। আছে জিতে নেওয়া আর দেশকে জয়ী করার সংকল্পে এদের নিখাদ ইচ্ছার সুদৃঢ় ঐক্য।
এমন সম্মিলন দেশের রাজনীতি আর সমাজে এলে আমরা জিতে যাব আরও বহু লক্ষ্যে। আমরা পারব আরও বহু কিছু!
এমন দিন, এমন সময় খুব দ্রুত আসুক আমার এই প্রিয় জন্মভূমিতে!
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জাফরুল্লাহর চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিত

পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিত করেছেন মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আফতাব-উজ-জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সময়মতো আর্থিক জরিমানা প্রদান না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে এ পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। তবে এরই মধ্যে আপিল বিভাগে দণ্ড মওকুফের আবেদনের ভিত্তিতে ৫ জুলাই পর্যন্ত দণ্ড স্থগিতাদেশ পান তিনি। রোববার এই স্থগিতাদেশের সার্টিফাইড কপি ট্রাইব্যুনালে জমা দিলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন বিচারপতি এম ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২।
রোববার বেলা ১১টার দিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা স্থগিতের আদেশের কপি ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেয়া হয়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে এটি জমা দেন।
জরিমানা নির্ধারিত সময়ে না দেয়ায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত ১৮ জুন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। তবে জরিমানা জমা দেয়ার নির্ধারিত সময়ের আগেই ১৬ জুন ট্রাইব্যুনালের দেয়া পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার আদেশের কার্যকারিতা ৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। একইসঙ্গে জাফরুল্লাহর আবেদনটি আগামী ৫ জুলাই আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়।
আপিল বিভাগের জরিমানা স্থগিতের আদেশ ট্রাইব্যুনাল জানে না তাই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলে ওইদিন জানিয়েছিলেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার আফতাবুজ্জামান।

একটি বিশ্ব, না করি নিঃস্ব by এম জাকির হোসেন খান

‘শতকোটি মানুষের অপার স্বপ্ন, একটি বিশ্ব, না করি নিঃস্ব’—স্লোগানে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারও ৫ জুন পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস। শিল্পবিপ্লবের নামে উন্নত দেশগুলো কর্তৃক নির্বিচারে কার্বন নিঃসরণের কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে শতকোটি মানুষের স্বপ্নের পৃথিবীর ভৌগোলিক, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ এবং বাস্তুসংস্থান স্থায়ী পরিবর্তনের সম্মুখীন। উন্নত দেশগুলো নির্বিচারে বনভূমি নিধন, অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশদূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়িয়েছে। ফলে পৃথিবীর অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন।
গবেষকেরা বলছেন, বর্তমান হারে ভোগ এবং উৎপাদন বজায় থাকলে ২০৫০ সালে যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯৬০ কোটি, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য জোগাতে পৃথিবীর মতো কমপক্ষে তিনটি গ্রহ লাগবে, যা প্রকৃতই অসম্ভব। এ পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত দেশগুলোর নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বৃহৎ করপোরেট কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির ভেতর আনতে হবে। তাই শুধু জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব ব্যবসার নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবুজবান্ধব টেকসই বাণিজ্য চুক্তি (গ্রিন এইড ট্রেড) প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক উন্নতির নামে বনাঞ্চল ও বিভিন্ন বাস্তুসংস্থান উজাড় করা হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তনে কৃষির রোপণ-প্রক্রিয়াতেও ঘটছে পরিবর্তন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য ধরিত্রীর আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে বনভূমির হার মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবছর দুই হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শালবন হারিয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন হুমকির সম্মুখীন। তারপরও নির্বিচারে গাছ নিধন ও সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। এ কারণে ভবিষ্যতে জলবায়ু অভিযোজন ব্যয় আরও বেড়ে যাতে পারে।
শুধু ঢাকায় ট্রাফিক জ্যামের কারণে নাগরিকেরা প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়
২০১৪ সালে প্রকাশিত আইপিসিসির পঞ্চম অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সমুদ্রস্ফীতিজনিত লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান ও গমের উৎপাদন যথাক্রমে ৮ শতাংশ ও ৩২ শতাংশ হ্রাসসহ ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার আরও ১৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে আশঙ্কাজনক হারে কৃষিজমি ও বনাঞ্চল নষ্ট করে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নগরগুলোও ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের এক-তৃতীয়াংশ নগরের দালানগুলো থেকে আসে।
দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা করে পানির পুনর্ব্যবহার ও দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা গড়া, বর্জ্য পুনঃ চক্রায়ণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ভবন নির্মাণে টেকসই উপকরণ ব্যবহার করে ৩০ থেকে ৮০ শতাংশ জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয় সম্ভব। পরিবেশবান্ধব নগরের যাতায়াতব্যবস্থা হবে পরিষ্কার, সহজলভ্য ও যানজটমুক্ত। শুধু ঢাকায় ট্রাফিক জ্যামের কারণে নাগরিকেরা প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই পরিবেশবান্ধব টেকসই যাতায়াতব্যবস্থা গড়তে জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনব্যবস্থা উদ্ভাবন, নিরাপদে পায়ে চলা পথ ও বাইসাইকেল চালানোর সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।
বাংলাদেশে নদ-নদী, খাল ও জলাশয় দখলের কারণে ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে ঝুঁকির সম্মুখীন। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বিভিন্ন জলাশয় দূষণ করছে ডাইং কারখানা ও ট্যানারিগুলো, যা রোধে প্রস্তাবিত সবুজ কর কঠোরভাবে আরোপ করা উচিত। ঢাকা শহরে উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ বর্জ্য পুনঃ চক্রায়ণযোগ্য, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা বা পুনঃ চক্রায়ণের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় কমপক্ষে ১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় সম্ভব। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ÿক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রিডলাইন তৈরি করে যতখানি সম্ভব পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর ও বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা বিতরণে দক্ষতা সুনিশ্চিত করার ওপরই নির্ভর করছে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব নগরের ভবিষ্যৎ। সার্বিকভাবে মানুষের কল্যাণ, পরিবেশ ও অর্থনীতির সচলতা নির্ভর করছে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সংযত ব্যবহারের ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত পদক্ষেপ, প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, যথার্থতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন নীতিমালা প্রণয়ন এবং এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে নিপতিত জনগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ সব মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি তুলতে হবে, ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই কেবল বাসযোগ্য পৃথিবী গড়া সম্ভব’।
এম জাকির হোসেন খান: টিআইবিতে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন বিষয়ে কর্মরত।
zhkhan@ti-bangladesh.org

উপেক্ষিত যুব সম্প্রদায় by মুনির হাসান

বাংলাদেশের তরুণদের নতুন একটি ছবি ইদানীং বিশ্বব্যাপী আলোচিত। এটি হলো ভাগ্যান্বেষণে আমাদের যুবাদের সমুদ্রে ভেসে থাকা কিংবা ত্রাণশিবিরে আহাজারি করার চিত্র। যে সময়ে এমন অনেক ছবি বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়া প্রকাশ করেছে, ঠিক তখনই জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পেশ করেছেন আমাদের অর্থমন্ত্রী। বড় আকারের, উচ্চাভিলাষী ও বিশাল আশ্বাসের বাজেট। সামগ্রিকভাবে বাজেটে অনেক আশার কথা আছে, আছে উন্নয়নের ফিরিস্তিও। তবে সামগ্রিক বাজেটের ভালো-মন্দ বিবেচনা এই লেখার বিষয় নয়। কর্মসূত্রে ও প্যাশনসূত্রে আমাকে তরুণ-যুবাদের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটাতে হয়। তাদের অনেক স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের অংশীদারও হতে হয়। তাই আমি খোঁজার চেষ্টা করেছি অর্থমন্ত্রী আমাদের যুবাদের জন্য এই বাজেটে কী রেখেছেন।
ধরা যাক শিক্ষার কথা। একুশ শতকের জ্ঞানভিত্তিক সমাজের জন্য নিজেকে তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের মনের গভীরে স্থায়ী আসন নিয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। নিয়েছে বলে তারা রাস্তায় নেমে শিক্ষার অধিকার আদায়ে মিছিল-মিটিংয়ের পরিবর্তে নিজেরাই নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্র যেহেতু তাদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে পারছে না, তারা তাই রাষ্ট্রকে এ কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ফলে, দুই দশক আগে যে পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিত কিন্তু অনেকখানি বদলে গেছে। একসময় ধরা হতো কেবল ধনীর দুলালই সেখানকার শিক্ষার্থী।
এখন কিন্তু তা নয়। বরং ছবিটা উল্টো। প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে গরিব, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সেখানে সুযোগ পাওয়া এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। যারা এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে, তাদের অনেককেই বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ে ভর্তি হতে হয় এবং কোচিং না করলে ভর্তি হওয়া কঠিন। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষার অন্তত চার-ছয় মাস আগে থেকে কোচিং সেন্টারে আগাম টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয়! যারা কোচিংয়ের সুবিধা পাচ্ছে না এবং যারা প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসছে, তাদের পক্ষে তাই কম টাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাবা-ভাইয়ের কষ্টের টাকা দিয়ে তাকে এসে ভর্তি হতে হচ্ছে বেশি খরচের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন-সুবিধা নেই। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো শায়েস্তা খাঁর আমলের খরচে সে থাকার সুবিধাও পাচ্ছে না। অথচ অর্থমন্ত্রী এবার তার পড়ালেখার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছেন শতকরা ১০ ভাগ!
অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছর নতুন ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে। কিন্তু তিনি প্রতিবছর কতজন কর্মপ্রত্যাশী কর্মবাজারে যোগ দিচ্ছে, সেই সংখ্যাটি বলেননি। প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রায় ২২ লাখ ছেলেমেয়ে কর্মবাজারে প্রবেশ করছে এবং এটি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে যেখানে বিএমইটির হিসাবে বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার জন, সেখানে ২০১৪ সালে একই উদ্দেশ্যে গিয়েছে মাত্র ৪ লাখ ২৫ হাজার। অথচ বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান বাড়ছে ভয়াবহভাবে। দুই বছর আগে দেশে কর্মরত বিদেশিরা ৩১৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স তাদের দেশে পাঠিয়েছে। আর বাজেট বক্তৃতার কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী নিজেই সেটি ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন। এদের একটি বড় অংশ কাজ করছে গার্মেন্টস এবং কয়েকটি বিশেষায়িত সেক্টরে। বলা হয়, দক্ষতার অভাবে আমাদের কর্মীরা এগিয়ে যেতে পারছে না। তাই যদি হবে, আমাদের কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চলতি বাজেটে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কেন আলাদা করে মাত্র ১০০ কোটি টাকাও রাখা হলো না!
আমাদের যুবারা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অধিক হারে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অথচ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুখবর এই বাজেটে দেখা যায়নি। প্রায় গণদাবিতে পরিণত হওয়া দাবিকে কলা দেখিয়ে ইন্টারনেটের ওপর সকল পর্যায়ে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বহাল রাখা হয়েছে। ভ্যাটের মূল ধারণাই হলো উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সব মিলিয়ে ভ্যাটের পরিমাণ হবে ১৫ শতাংশ। কিন্তু ইন্টারনেটের বেলায় সেটি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির কাছ থেকে আমি যে হিসাবটি পেয়েছি, সেটি খুবই ভয়াবহ।
একটি সহজ হিসাব দেখা যাক। সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি বা অনুরূপ কোম্পানিগুলো নিজেদের ১০ শতাংশ লাভ ধরে ১০০ টাকার ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করতে পারে ১১০ টাকায়। তার ওপর তাকে ১ শতাংশ রাজস্ব সরকারকে দিতে হয়। বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে সেটির বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ১২৭ দশমিক ৭৭ টাকা। এই টাকায় ব্যান্ডউইডথ কিনতে পারে কেব্ল ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজি। এখানে ১০ শতাংশ লাভে তাদের মূল্য দাঁড়ায় ১৪০ দশমিক ৫৫ টাকা। আইআইজিকে রাজস্বের ১০ শতাংশ সরকারকে দিয়ে দিতে হয়। সেটি এবং এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করে ওই ১০০ টাকার ব্যান্ডউইডথের বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ১৭৭ দশমিক ৮১ টাকা। এই টাকায় ব্যান্ডউইডথ কেনে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা (আইএসপি), যারা আপনার-আমার কাছে ইন্টারনেটকে নিয়ে যাচ্ছে। আইএসপি-ওয়ালারাও যদি ১০ শতাংশ লাভ আর ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করে, তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে ১০০ টাকার ব্যান্ডউইডথের দাম পড়ে যাচ্ছে মাত্র ২২৪ দশমিক ৯৪! অবশ্য আইআইজি এবং আইএসপিগুলো তাদের ভ্যাটের রিবেট পায়, যা একুনে ৩৪ দশমিক ৬৯ টাকা। এই রিবেট বাদ দিলে ২২৪ দশমিক ৯৪ টাকার মধ্যে সরকারের হিস্যা দাঁড়াচ্ছে মোট ৭৬ দশমিক ৩৬ টাকা, যা কিনা ৩৪ শতাংশ। অন্য কথায় বলা যায়, আমাদের যুবাটি ইন্টারনেটের জন্য অহেতুক দ্বিগুণ দামে ইন্টারনেট কিনছে। ১০০০ টাকার ইন্টারনেট বিলের ৩৪০ টাকাই সরকার নিয়ে যাচ্ছে। এবার অর্থমন্ত্রী এই খরচ আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯০ শতাংশই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সুবিধার আওতায় আছে। মোবাইল-সেবার ওপর ৫ শতাংশ অতিরিক্ত এরই মধ্যে আরোপ হতে শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে একদল যুবা নিজেরাই একটা কিছু করার চেষ্টা করছে। ফেসবুকে নিজের নেটওয়ার্ক তৈরি করছে ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’ নামে, চেষ্টা করছে আত্মকর্মসংস্থানের। কয়েক বছরে এদেরই বিরাট একটা অংশ দেশে চালু করেছে ই-কমার্স ব্যবসা। ফলে চট্টগ্রামে বসে এখন খুব সহজে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম খাওয়া যাচ্ছে, ঢাকায় বসে পাওয়া যাচ্ছে মংলার গলদা চিংড়ি। কষ্ট করে কেবল একটি ফোন বা একটা ক্লিক করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য সেই খাতে প্রচুর প্রণোদনা দেওয়া হয়। কিন্তু এবারের বাজেটে ই-কমার্সের সব সেবার ওপর ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এখন আপনি যদি বাটার কোনো দোকান থেকে এক জোড়া জুতা কেনেন, তাহলে যত টাকায় সেটা কিনতে পারবেন, ই-কমার্স স্টোর থেকে কিনলে দাম দিতে হবে বেশি!
এই তালিকা আর বাড়াতে চাই না। আমার মনে হয়েছে, আমরা কথায় কথায় আমাদের যুব সম্প্রদায়কে যেভাবে আগামী দিনের মূল চালিকাশক্তি, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রসৈনিক বলি, আদতে সেটা মোটেই বিশ্বাস করি না।
না হলে কথায় আর কাজে এত অমিল কেমনে থাকে?
মুনির হাসান : যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো।

বরখাস্তকৃত জনপ্রতিনিধির লাইন দীর্ঘ হচ্ছে by সিরাজুস সালেকিন

দীর্ঘ হচ্ছে বরখাস্ত হওয়া জনপ্রতিনিধিদের তালিকা। সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ। মেয়র থেকে ইউপি সদস্য। বাদ যাচ্ছেন না কেউই। গত দুই বছরে বরখাস্তকৃত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা অর্ধশতক ছাড়িয়ে গেছে। অপেক্ষায় আছেন আরও অর্ধশত। তারা সবাই রাজনৈতিক সহিংসতার মামলার আসামি। তারা বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কারও কারও মতে, বরখাস্তের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে থাকবে। বরখাস্তকৃত এ জনপ্রতিনিধিদের বাইরেও অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা।
১১ সিটি কাপোরেশনের ৬টিতেই ২০ দল সমর্থিত মেয়ররা নির্বাচিত হয়েছেন। বেশ কয়েকটি পৌরসভায় মেয়র পদেও রয়েছেন তারা। অন্যদিকে সাড়ে চার শতাধিক উপজেলার মধ্যে ২০ দলীয় জোট সমর্থিত চেয়ারম্যানের সংখ্যা প্রায় ২০০ এবং ভাইস চেয়ারম্যান তার দ্বিগুণ। বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের মামলা দিয়ে কলমের খোঁচায় বরখাস্ত করা হচ্ছে। একই জায়গায় বসানো হচ্ছে সরকারদলীয়দের। ২০০৯ সালে প্রণীত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় (সিটি করপোরেশন) আইনে মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের নিয়মিত বরখাস্ত করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের প্রণীত আইনের ধারা ১২-এর ১ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন সিটি করপোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র গৃহীত হলে সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবে।’ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর একজন জনপ্রতিনিধিকে ঠুনকো অজুহাতে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তাদের বরখাস্ত করা মানে ওই এলাকার মানুষকে শাস্তি দেয়া। এভাবে গণবরখাস্তের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় সরকার আইন পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, বরখাস্তের কারণে ও গ্রেপ্তারের কারণে জনপ্রতিনিধিরা এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারছে না। আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের বরখাস্ত করা হচ্ছে। এই আইনের পরিবর্তন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
হরতাল-অবরোধে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় সিটি করপোরেশন, পৌর মেয়র-কাউন্সিলর ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মামলার কারণে এসব জনপ্রতিনিধির অনেকে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতির কারণে নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্য সুবিধা পাচ্ছেন না। কোন কোন এলাকায় প্যানেল মেয়র বা চেয়ারম্যান না থাকায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সুযোগে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন প্যানেল মেয়রের তালিকায় থাকা আওয়ামী লীগ দলীয় নেতারা।
চলতি বছরের ৮ই জানুয়ারি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে তিনি বর্তমানে কারাগারে। এর আগে একই মামলায় অভিযুক্ত বর্তমানে কারারুদ্ধ হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জিকে গউছকেও বরখাস্ত করে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গত ৭ই মে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বুলবুলের বিরুদ্ধে পুলিশ কনস্টেবল সিদ্ধার্থ রায় হত্যাসহ ১৭টি নাশকতার মামলা আছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নানের বিরুদ্ধে দু’টি মামলার অভিযোগপত্র এরই মধ্যে দাখিল করা হয়েছে। বরিশাল সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামালের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি মামলা দায়ের হয়েছে। চার্জশিট দেয়া হয়েছে খুলনা সিটি মেয়র মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় তারা তিনজন বরখাস্তের তালিকায় আছেন। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি উপজেলাগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে বরখাস্ত করা হচ্ছে। গত ২৫শে মে একসঙ্গে ৫ জন প্রতিনিধির বরখাস্তের আদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বরখাস্ত হওয়া জনপ্রতিনিধিরা হলেন- নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ একরামুল আলম, নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণ, বগুড়ার শেরপুর পৌরসভার মেয়র ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক স্বাধীন কুমার কুণ্ডু এবং বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. আবদুস ছামাদ। গত ২৭শে মে হবিগঞ্জ পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আওয়াল মজনুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ৩০শে এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কেরামত আলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কেরামত আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির। গত ২০শে এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাঁশখালী উপজেলা চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমীর জহিরুল ইসলামকে বরখাস্ত করা হয়। ১৪ই এপ্রিল চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র বিএনপি নেতা শামীম কবীর হেলিমকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় চট্টগ্রামের মীরসরাইয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি নেতা নুরুল আমীনকে। একই উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি নেতা মাইনউদ্দিন মামুন মামলায় পড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদকে সমপ্রতি সহিংসতার মামলায় সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা নাজমুল হক রয়েছেন কারাগারে। নাটোর পৌরসভার মেয়র ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ এমদাদুল হক আল মামুনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার পর উচ্চ আদালতের রায়ে দায়িত্ব ফিরে পান। ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায়  চেয়ারম্যান, আজিজুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা সামপ্রতিক সহিংসতার মামলার আসামি। এই উপজেলা পরিষদে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে প্যানেল চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বিরোধীদলীয় তিন জনপ্রতিনিধিই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপি নেতা আবুল বাসার আকন্দ, তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, মুক্তাগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা জাকারিয়া হারুনের রাজনৈতিক সহিংসতার মামলা হয়েছে। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান এবিএম নুরুল বশর চৌধুরী বরখাস্তের পর উচ্চ আদালতে রায় নিয়ে আবার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। গাইবান্ধা সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল করিমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মোর্শেদ হাবীব একটি মামলার আসামি হয়ে পলাতক রয়েছেন। এই অবস্থায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের সমর্থক রশিদা বেগম ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মাজেদুর রহমান এবং ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলা জামায়াতের নেতা আবু সোলায়মানকে মামলার কারণে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পলাশবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াত নেতা নজরুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা আবু তালেবকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জামায়াত নেতা নুরুন্নবী প্রামাণিককে বরখাস্ত করে সেখানে নির্বাচন দেয়া হলে আওয়ামী লীগ নেতা মেয়র নির্বাচিত হন। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে চারটি মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের পর সমপ্রতি উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আবার দায়িত্ব নিয়েছেন। একই জেলার সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আহসানুল তৈয়ব মামলার কারণে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে  গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দুপচাঁচিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা আবদুল গণি মণ্ডল বর্তমানে জেলে আছেন। একই পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবদুল মোত্তালেব সাময়িক বরখান্ত হয়েছেন। বগুড়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আলী আসগর তালুকদার জেলে আছেন। বগুড়ার শেরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি দবিবুর রহমান সাময়িকভাবে বরখাস্তের পর উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আবার দায়িত্ব পান। শেরপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সারওয়ার জাহান চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরীকে মামলার কারণে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাবনার আটঘরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর জহুরুল ইসলামকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে তিনি উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৪ সালের ২২শে ডিসেম্বর পাবনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা জহুরুল ইসলাম খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। গত বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর নলছিটি পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র ও বিএনপি নেতা মো. মজিবুর রহমানকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দ্বিতীয় দফায় বরখাস্ত করা হয়। ওই বছরের ১৮ই নভেম্বর বরখাস্ত করা হয় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলায়মান সরকার সাজুকে। ডিসেম্বরে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু নছর মোহাম্মদ আলমগীর হুসাইনকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ১৩ই নভেম্বর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলামকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নাশকতার কয়েকটি মামলায় চার্জশিট হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাঈদ চাঁদকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ৮ই অক্টোবর গাইবান্ধা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল করিমকে ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তারুল হক মকুকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলার ফাঁদে ধুনট উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল আলম মামুন, বগুড়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আজগর তালুকদার হেনা ও সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান আহসানুল তৈয়ব জাকির পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে হরতাল-অবরোধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন নাশকতা মামলা রয়েছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান আবু কাউসার মো. নজরুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান আবু তালেব সরকারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের প্রতিবাদে যশোরে এক মানববন্ধনে হামলার ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের হয়। এতে যশোর পৌরসভা মেয়র মারুফুল ইসলাম, কেশবপুর পৌরসভার মেয়র আবদুস সামাদ বিশ্বাস, মনিরামপুর পৌরসভার মেয়র শহীদ ইকবাল, বাঘারপাড়া পৌরসভার মেয়র আবদুর রহিম মনা, কাউন্সিলর হাজী আনিসুর রহমান মুকুলসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। তাদেরও পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি করে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের কেউ কেউ উচ্চ আদালতে সরকারি সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মামলা চালাচ্ছেন। যেসব জায়গায় মামলা নেই সেসব ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় শুনানি করছে। শুনানি শেষে চূড়ান্তভাবে তাদের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত হবে।

বাংলাদেশের উদ্‌যাপনও ‘দৃষ্টিকটু’!

মাশরাফি-তাসকিনের এমন উদ্‌যাপন নাকি
দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে ভারতীয়দের ছবি: এএফপি।
বাংলাদেশের কাছে হেরে গেলে উদ্দাম উদ্‌যাপনের মধ্যে পড়তে হবে—ব্যাপারটা অজানা থাকার কথা নয় ভারতীয় দলের। সেই ২০০৪ থেকে বাংলাদেশের কাছে প্রতিটি হারের পর বৈচিত্র্যপূর্ণ উদ্‌যাপনের মুখোমুখি হয়েছে ভারতীয় দল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার প্রথম ওয়ানডেতে ৭৯ রানে হারের পর উদ্‌যাপনের উদ্দামতায় রীতিমতো ভড়কে গেছে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। মাশরাফি বিন মুর্তজা আর তাসিকন আহমেদের পরস্পরের বুকে বুক ঠুকে উদ্‌যাপনের ভঙ্গিটা হয়তো চেনা। কিন্তু ভারতীয় দল বেশ মর্মাহত ম্যাশ-তাসকিনের নতুন উদ্‌যাপনটায়। খেলা শেষে এই দুজন কোমরের সঙ্গে কোমর ঠুকে যে উদ্‌যাপনটা করলেন, তা নাকি রীতিমতো দৃষ্টিকটু ঠেকছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের। আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জিতেই সেই উদ্‌যাপনের বদলা নিতে চায় তারা।
কিছু হার আছে সবকিছু হারানোরই। সে সব হারে প্রতিপক্ষের উদ্‌যাপনও গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। আজ মিরপুরের দ্বিতীয় ওয়ানডেটা ভারতের বাঁচা-মরার। আর এই মরণ-বাঁচন ম্যাচের আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের উদ্‌যাপনের কথা মনে করিয়ে দিয়েই ভারতীয় ক্রিকেটারদের উজ্জীবিত করা হচ্ছে। মাশরাফি-তাসকিনের ওই কোমর ঠোকাঠুকির ব্যাপারটাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখছে ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে। অনেকেই এটাতে তেঁতে উঠছেন, অনেকেই উদ্‌যাপনটাকে দৃষ্টিকটু হিসেবে অভিহিত করছেন। টিম ম্যানেজমেন্ট নাকি ব্রিফিংয়ের সময় এই উদ্‌যাপন-ভঙ্গির প্রসঙ্গ তুলে ভারতীয় ক্রিকেটারদের বলেছেন, ‘এর পরেও তোমরা যদি নিজেদের জাগাতে না পার, তাহলে আর কীসে জাগবে! ’
ভারতীয় দল আজ ওই ‘দৃষ্টিকটু’ বিজয়-উৎসবের জবাব দিতে মুখিয়ে আছে। খেলোয়াড়দের চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা—জবাব দিতেই হবে। বাংলাদেশও চুপ করে নেই। আগের দিনের বিজয় উদ্‌যাপনের জবাব দেওয়াটাও যে এক কঠিন মিশন, আজ মিরপুরে সেটাই ভারতীয়দের বুঝিয়ে দিতে প্রস্তুতি প্রায় শেষ মাশরাফিদের। তথ্য সূত্র: ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম

মিয়ানমার এখনও কোন আশ্বাস দেয়নি by মিজানুর রহমান

অপহরণের ৫দিন অতিবাহিত হলেও সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি’র নায়েক আবদুর রাজ্জাককে এখনও ফেরত দেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। তাকে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে দেশটি কোন সুনির্দিষ্ট আশ্বাসও দেয়নি। গতকাল মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নেপিডোতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে কোন সাড়া মিলেনি। ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক গতরাতে মানবজমিনকে ওই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু তাকে ফেরতের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস এখনও পাইনি। তবে আমরা আশাবাদী যে ফেরত পাবো।
এদিকে, মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ বিজিপি’র জিম্মায় থাকা নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ছাড়িয়ে আনার কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই তার আপত্তিকর তিনটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ছবিগুলোতে দেখা যায়, আবদুর রাজ্জাককে হাতকড়া পরানো। মুখে আঘাতের চিহ্ন। তার নাকের কাছে ক্ষত এবং শুকিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। তার পরনে লুঙ্গি, গায়ে বিজিবি’র ইউনিফর্ম। সামনে কিছু অস্ত্র রাখা। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ ছবিগুলো প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা। প্রতিষ্ঠানটির বার্মিজ সার্ভিসের সাংবাদিক কো কো আং জানিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট সংবাদপত্র মায়াওয়াদিতেও ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যের ছবি  ফেসবুকে প্রকাশের পর বাংলাদেশব্যাপী ক্ষোভ ও  নিন্দার ঝড় ওঠেছে। অনেকেই ছবিগুলো ফেসবুকে  শেয়ার করছেন। তারা আটক সীমান্তরক্ষীর সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ তুলছেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে।
এদিকে বাহিনী পর্যায়ে পতাকা বৈঠকে দেশটির সাড়া না পেয়ে ঢাকার তরফে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকাস্থ মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ঘটনার কড়া প্রতিবাদ এবং আটক বিজিবি সদস্যকে দ্রুত মুক্তির তাগিদ দেয়া হয়েছে প্রায় ৬০ ঘণ্টা আগে। কিন্তু কোন ফল হয়নি। রাষ্ট্রদূত মিও মিন্ট থান নেপিড’র সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি এরইমধ্যে ঢাকাকে জানিয়েছেন। সর্বশেষ দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান মিয়ানমার পররাষ্ট্র দপ্তরের পার্মানেন্ট সেক্রেটারির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, গতকাল বিকালে বৈঠকটি হয়েছে। সেখানে বিজিপির হাতে আটক নায়েক রাজ্জাকের দ্রুত ফেরতের ব্যবস্থা নেয়ার জোর তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ দূত। ফেসবুকে প্রকাশিত আপত্তিকর ছবি নিয়েও কথা বলেছেন। অবশ্য মিয়ানমারের তরফে ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। বলা হয়েছে, ওই সদস্য অবৈধভাবে দেশটির সীমান্তে ঢুকে গিয়েছিলেন। তার গায়ে বিজিবি’র পোশাক থাকলেও পরনে লুঙ্গি ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। আটক নায়েকের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন আইনে ব্যবস্থা নেয়ার হতে পারে এমন আভাসও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলাপে সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল রাতে মানবজমিনকে বলেন, আটক বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়া মানেই তাকে এখনই তারা ফেরত দিতে চায় না সেটি স্পষ্ট। অন্তত আজকাল তো নয়ই। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপে রয়েছে। ওই ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্যই তারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
উল্লেখ্য, এক বছরের মাথায় বিজিবি সদস্যদের ওপর মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ বা বিজিপি’র আক্রমণ এবং নায়েক পদমর্যাদার কোন কর্মকর্তাকে অপহরণের দ্বিতীয় ঘটনা এটি। গত বছরের ২৮শে মে বান্দরবানের পানছড়ি সীমান্তে কোন রকম  উস্‌কানি ছাড়াই বিজিবির সদস্যদের ওপর গুলি চালায় বিজেপি। সে সময় নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায় তারা। পরে তাকে হত্যা করা হয়। অবশ্য ওই ঘটনায় দু’দিন সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে নায়েক মিজানুর রহমানের লাশ হস্তান্তর করে বিজিপি। এবারের ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার রাতে। বিজিবি সূত্র জানায়, নায়েক রাজ্জাকের নেতৃত্বে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল সেদিন মধ্যরাতে নাফ নদীতে টহল দেয়াকালে মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যামেপর বিজিপির একটি দল ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। একপর্যায়ে টহল দলটি বিজিবির নৌযানের কাছে গিয়ে থামে।  বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা নায়েক রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয়। এ সময় বিজিবির অন্য সদস্যরা বাধা দিলে দুইপক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এতে বিজিবির সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। এরপর বিজিপির ট্রলারটি রাজ্জাককে নিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়। বিপ্লবকে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিজিবি বলছে, আটক রাজ্জাককে ফেরত চেয়ে কয়েক দিন ধরেই যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে বিজিবি ও বিজিপির মধ্যে বৃহসপতিবার সকালে টেকনাফ স্থলবন্দরের ডাকবাংলোতে পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিয়ানমার বলছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় বৈঠক হয়নি।
‘অবমাননাকর’ প্রচারণায় বিস্ময়
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার থেকে জানান, বিজিবির বিরুদ্ধে মিয়ানমারের ‘অবমাননাকর’ প্রচারণায় বিস্মিত বিজিবির কর্মকর্তারা। এ ঘটনাকে অমানবিক উল্লেখ করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শুক্রবার ই-মেইল ও ফ্যাক্সযোগে বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ পাঠানো হয় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে। এতে বলা হয়, বিজিবির একজন সদস্যকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা আন্তর্জাতিক কোনো আইনের মধ্যেই পড়ে না। এ ঘটনাকে মানবতাবিরোধী কাজ বলে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এর মাধ্যমে শুধু বিজিবিকেই নয়, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে অপমান করা হয়েছে। বিজিবি সূত্র জানায়, রাজ্জাককে ফেরত না দিয়ে বৃহসপতিবার রাত ১২টা ৪০ মিনিটে বিজিপির ফেসবুকে তিনটি ছবি প্রকাশ করা হয়। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাজ্জাকের সামনে তার অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী রেখে তাকে আসামির মতো করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আরেকটি ছবিতে তাকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল আনিসুর রহমান জানান, মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশের কাছে পতাকা বৈঠকে বসার জন্য দফায় দফায় চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে এখনও সাড়া মেলেনি। তাই কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেও নায়েক রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সীমান্ত এলাকায় মানুষের ক্ষোভ
ওদিকে আমাদের টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, অপহৃত বিজিবি জওয়ানের ছবি ফেসবুকে প্রকাশের পর সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাকে একটি সীমান্ত ক্যামেপ হাতকড়া পড়ে আটকে রাখা হয়েছে। তার মুখমণ্ডলে রক্তের দাগ রয়েছে। ছবিটি যারা দেখছেন তারা হতাশা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। টেকনাফ ৪২ অধিনায়ক লে. মো. আবুজার আল জাহিদ জানান, মিয়ানমার সঙ্গে শনিবার  যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা এখনও কোন সাড়া দেয়নি। তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেলে বৈঠকে আসবে বলে বিজিবিকে জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমার পক্ষ সাড়া দিলে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নায়েক রাজ্জাককে ফেরত আনা হবে।
বিজিবি সদস্য অপহরণ জাতির জন্য লজ্জার: বিএনপি
স্টাফ রিপোর্টার জানান, বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাককে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। একইসঙ্গে তাকে উদ্ধারে সরকারকে দ্রুত জোরদার তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি মিয়ানমারকে সতর্ক করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। গতকাল নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকে বিজিবি নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তার প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পরিয়ে হাতকড়া পরা একটি ছবি আমরা ফেসবুকে দেখলাম, যা মিয়ানমারের পত্রিকায় ছেপেছে। এ ঘটনা আমাদের গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার। এই ছবি দেখে লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। বিজিবি মহাপরিচালকের সমালোচনা করে আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন দমনের সময় বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ গর্ব করে বলেছিলেন, আমাদেরকে অস্ত্র দেয়া হয় ব্যবহার করার জন্য। আমরাও বিশ্বাস করি বিজিবির অস্ত্র আইন সম্মতভাবে ব্যবহার করার জন্যই। কিন্তু সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব পালনের সময় অস্ত্র থাকার পরও বিজিবি সদস্য অপহৃত হয়ে যায়। আমি প্রশ্ন করতে চাই- তখন তারা অস্ত্র দিয়ে কি করেন। বিএনপির এই মুখপাত্র অভিযোগ করেন, বিজিবির দায়িত্ব বিরোধী দলের আন্দোলন দমানোর জন্য নয়, তাদের দায়িত্ব সীমান্ত রক্ষা করা। সরকার যথাযথভাবে বিজিবিকে ব্যবহার করছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে  ভবিষ্যতে এমন অপমানজনকভাবে কোন বিদেশী রাষ্ট্র বিজিবি সদস্যদের যাতে তুলে নিতে না পারে সেজন্য সরকারকে সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের নেতাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে রিপন বলেন, এখন মাঠে কোন আন্দোলন নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। তা সত্ত্বেও আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদসহ অনেক নেতৃবৃন্দ কারাগারেই রয়েছেন। এটা দুঃখজনক। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি বাংলাদেশে অতীতে দেখা গেলেও এবার সরকারের আচরণে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আর হানাহানি নয়, বিভেদ নয়। রাজনৈতিক কারণে আমরা একে অপরের বিরোধিতা করবো, সমালোচনা করবো। তবে তা যেন প্রতিহিংসামূলক না হয়, অন্য কোন রাজনীতি দলকে ধ্বংস করার জন্য না হয়। রমজান মাসের কথা বিবেচনা করে সরকার বিরোধী নেতাদের মুক্তি দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন- রমজানের আগে দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী তার কথা রাখতে পারেননি। বরাবরের মতো এবারও রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। তিনি বলেন, এখনও সময় আছে, তিনি ভেজাল বিরোধী অভিযান জোরদার করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসেন তাহলে রোজাদার জন্য রোজা অনেকটা প্রতিপালন সহজ হতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি বিএনপির যুববিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার, তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি, আসাদুল করিম শাহীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গন্তব্য এখন দরজির বাড়ি by তাসনীম হাসান

সেন্ট্রাল প্লাজার একটি দোকানে পোশাকের মাপ নিচ্ছেন দরজি
ঈদের পোশাকে নতুনত্ব কে না চায়! তাই গৎবাঁধা বাদ দিয়ে নিজস্ব নকশায় পোশাক বানাতে চান অনেকেই। তাঁদের গন্তব্য এখন দরজিবাড়ি। চলছে শেষ মুহূর্তের ফরমায়েশ (অর্ডার) নেওয়া।
নগরের সেন্ট্রাল প্লাজা, নিউমার্কেট, ষোলশহর শপিং কমপ্লেক্স, মিমি সুপার মার্কেট, টেরিবাজার, আমিন সেন্টারসহ বিভিন্ন মার্কেটের দরজি দোকানগুলোতে দেখা গেছে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরেরা। অবিরাম ঘুরছে সেলাইযন্ত্র। চার থেকে পাঁচ রমজানের পর এই ব্যস্ততা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। কিছু কিছু দোকানে এখনই ফরমায়েশ নেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য বেশির ভাগ দোকানেই ১৫ রোজা পর্যন্ত কাপড় দেওয়া যাবে।
নগরের ষোলশহর শপিং কমপ্লেক্সে ফরমায়েশ দিতে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়–পড়ুয়া ফারহানা শারমিন। তিনি বলেন, ‘এবার ঈদে আমার চাই গোড়ালি ছুঁই ছুঁই কামিজের সঙ্গে পালোজ্জো। এই নকশায় পোশাকের ফরমায়েশ দিলাম।’
শুধু শারমিন নন, এ রকম নিজস্ব নকশায় পোশাক বানাতে দরজিবাড়িতে ছুটছেন কিশোরী ও তরুণীরা। তাদের কেউ ক্যাটালগ দেখে ডিজাইন দিচ্ছেন, কেউ কেউ আবার নিজের মতো নকশা দিচ্ছেন পোশাকের।
দরজিরা জানালেন, গতবারের মতো এবারও আনারকলি ও জিপসির কদর রয়েছে। তবে পাশাপাশি গাউন, সারারা ও প্লাজো ডিজাইনও চলছে। ঈদের দিন গরমের পাশাপাশি বৃষ্টির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সুতি আর লিলেনের পাশাপাশি জর্জেট কাপড়ের চল বেশি এবার।
মিমি সুপার মার্কেটের পাপ্পু টেইলার্সের কারিগর প্রণব তালুকদার বলেন, গোড়ালি পর্যন্ত কামিজের চল রয়েছে এবারও। পাশাপাশি বড় ঝুলের কামিজ বানাচ্ছেন অনেকে।
সালোয়ারের মধ্যে বেশি চলছে পালোজ্জা ধাঁচের প্যান্ট। এ ছাড়া কুচি সালোয়ার ও চুড়িদারও বানিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। গরমের কথা বিবেচনা করে কিশোরীদের অনেকেই পালোজ্জা প্যান্টের সঙ্গে খাটো কামিজ ও টপস সেলাই করছে।
তিনি আরও বলেন, কামিজ আর ব্লাউজের গলা হিসেবে গোল, কলার, ভিসহ সব ধরনের কাট এবারও চলছে।
দরদাম: স্থান ও দোকানভেদে সেলাইয়ের দরদাম ভিন্ন। টেরিবাজারের কৃষ্ণা টেইলার্সের কাটিং মাস্টার মোহাম্মদ ইসলাম জানালেন, সাধারণ কাটের সালোয়ার-কামিজের খরচ ৪৫০ টাকা। নকশা ও ছাঁটের ওপর নির্ভর করে জিপসি সেলাইয়ের দাম ধরা হয়েছে ১০০০ টাকা। আর আনারকলি ও গাউনের ডিজাইনে পোশাক তৈরি করতে খরচ পড়বে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। চাঁদরাত পর্যন্ত চলবে কাপড় ডেলিভারি।
এ তো গেল মেয়েদের সেলাইয়ের কথা। ছেলেরাও পিছিয়ে নেই পোশাক বানানোতে। তাদের বেশির ভাগই পাঞ্জাবি আর পায়জামা বানাচ্ছেন। তবে অনেকেই শার্ট-প্যান্ট সেলাই করে নিচ্ছেন। মিমি সুপার মার্কেটের চ্যান্সেলর টেইলার্সের তত্ত্বাবধায়ক মো. আবুল কাশেম জানান, ‘সাধারণ শার্ট ও পাঞ্জাবির জন্য ৪৫০ টাকা। প্যান্টের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা করে নিচ্ছি। তবে শেরোয়ানি কাট পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে দাম নিচ্ছি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।’

অদৃশ্য রাজাকে সত্যিকারের দৃশ্যমান হতে হবে by জয়ন্ত ঘোষাল

আজকের দিনটাকে বোঝার জন্য ক্যালেন্ডারের পিছনের পৃষ্ঠাগুলি জানা প্রয়োজন। সেই লাল-কালো দিনগুলি তো নিছক সংখ্যা নয়। পৃথিবীর মানুষ ক্রমশ গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে। আব্রাহাম লিঙ্কন (১৮০৯-১৮৬৫) আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন এক জটিল সঙ্কটজনক সময়ে (১৮৬০)। সমগ্র দেশ তখন দাসপ্রথা অবলুপ্তির প্রশ্নে বিভক্ত। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশ যেগুলি ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক, তারা দাসত্বকে বজায় রাখতে চেয়েছিল। তারা কী মনে করত? তারা মনে করত তাদের অর্থনীতির জন্য এই প্রথা চালু থাকা প্রয়োজন। উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলিও দাসপ্রথা বহাল রাখার জন্য পৃথক এক কনফেডারেশন গঠন করেছিল। তাতে প্রমাণ হয়, উত্তরের প্রদেশগুলি সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়িত। অবশেষে আব্রাহাম লিঙ্কন মনে করলেন যে সমগ্র দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখার জন্য যুদ্ধ এবং দাসত্বের অবলুপ্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে আমেরিকা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় চার বছর এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। অবশেষে দাসপ্রথা পরাস্ত হয়।
এখন নরেন্দ্র মোদী আবার এ দেশে রাজত্ব করবেন কি করবেন না তার জন্য পাঁচ বছরের শাসন সম্পূর্ণ হলে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে মানুষ তার মতামতের মাধ্যমে ঠিক করবেন। এখন ১৮৬০ নয়, ২০১৫।
রাষ্ট্রপতি পদে ১৮৬৪ সালে লিঙ্কনের পুনর্নির্বাচন হয়। সেই উপলক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সঙ্ঘ তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বার্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সেটির খসড়া করেছিলেন কার্ল মার্কস। মার্কসের রচনাবলিতে এটি পাওয়া যায় না। তবে প্রথম আন্তর্জাতিক কার্যবিবরণীতে (মিনিটস) সেটি সংরক্ষিত হয়েছে।
শৈলেশ বিশ্বাস এই কার্যবিবরণীর গ্রন্থনা ও তর্জমা করেন। ‘উৎস মানুষ’-এর ৪৮তম বর্ষ তিন নম্বর সংখ্যায় সেটি প্রকাশিত হয়। ‘দ্য বী হাইভ’ সংবাদপত্রে ১৮৬৫ সালের ৭ নভেম্বর এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। লন্ডনস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস ফ্রান্সিস আডামসকে ১৮৬৫-র ২৮ জানুয়ারি এটি প্রদান করা হয়।
এই বার্তায় বলা হয়, দাসশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যদি আপনার প্রথম নির্বাচন ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা হয়ে থাকে তা হলে পুনর্নির্বাচনের বিজোয়ল্লাসের রণধ্বনি হচ্ছে দাসত্বের মৃত্যু।
রাষ্ট্রদূত অ্যাডামস জবাব দেন এই প্রস্তাবের। তাতে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের একটা স্বচ্ছ চেতনা রয়েছে যে তার নীতি এখনও যেমন, ভবিষ্যতেও তেমন কখনও প্রতিক্রিয়াশীল হবে না। কিন্তু একই সময়ে শুরুতেই তারা স্থির করেছে যে সর্বত্র তারা স্বমত প্রচারে এবং বেআইনি হস্তক্ষেপে বিরত থাকবে।…এখানেই শেষ নয়। এর পর তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হিসাবে যা লেখেন তা দেখে চমস্কির বা জিজেকের মতো চিন্তবিদেরা কী বলবেন সেটাই ভাবাবে আমাদের। চার্লস অ্যাডামস লেখেন, জাতিসমূহ কেবলমাত্র নিজের জন্য বেঁচে থাকে না, কল্যাণমুখী আদানপ্রদানের ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মানবজাতির কল্যাণ ও সুখের চেষ্টা করে। এ ভাবে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দাসত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সমর্থন করছে এবং ইউরোপের শ্রমজীবী মানুষের বিভিন্ন সংগ্রামর ইতিহাস থেকে নতুন প্রেরণা পেয়েছে। তাদের উচ্ছ্বসিত সমর্থন এবং আন্তরিক সহানুভূতি তাদের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনসূচক। আর আজ আমেরিকা কী করছে সে আলোচনায় আমরা নাই বা গেলাম!
কিন্তু কার্ল মার্কসের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বলশেভিক বিপ্লব করলেন লেনিন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের কী পরিণতি দেখলাম আমরা। দুনিয়া থমকে দেওয়া সেই তিন দিনটি মনে করুন, শুধু দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন মনে রাখলে হবে?
গোরবাচেভ তিন-চার দিনের জন্য ছুটি উপভোগ করছিলেন তাঁর স্ত্রী, জামাতা-কন্যা ও নাতনিদের নিয়ে। এ সময় সন্ধ্যের দিকে একটি সোভিয়েত টোপোলেভ ১৩৪ প্লেন ক্রিমিয়াতে নামল। এলেন কেজিবি-র জেনারেল ইউরি প্লেখানভ। গোরবাচেভ তাঁকে আসতে বলেননি, কিন্তু কেজিবি-র নির্দেশে তিনি এসেছেন। এবং তাঁকে ইস্তফা দেওয়ার নির্দেশ নিয়ে। গোরবাচেভ দেখলেন, তিনি যে প্রাসাদে আছেন তার সমস্ত টেলিফোনের লাইন কাটা। স্বাস্থ্যের কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেন এবং তারপর ইয়ানায়েভ ক্ষমতাসীন হলেন। প্রাভদা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তারপর গন্ডগোল, এলেন ইয়েলেৎসিন।
ভারতের ইতিহাস সুপ্রাচীন। ভারতীয় সভ্যতাও সুপ্রাচীন। মোগল সাম্রাজ্য, তার পর ব্রিটিশরাজ, তার পর স্বাধীন ভারতের পথ চলা। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার দেখিয়েছেন, মোগল সাম্রাজ্যের ত্রুটি-বিচ্যুতি যা-ই হোক, ভারতে এই দীর্ঘ শাসন এক অখণ্ড বিস্তৃত কিন্তু কেন্দ্রীভূত ভারত নামক এক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল। সম্রাট অশোক যেমন একদা অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন, ঠিক সে ভাবে আকবরও সম্ভব করেছিলেন। আর এই দু’টি ক্ষেত্রেই ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভাবনার বহুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছি। দারার মুসলিম ধর্ম পরিত্যাগ না করেও উপনিষদ পড়া এবং তা অনুবাদ করা খুব ছোট ঘটনা নয়।
ব্রিটিশ জমানাতেও প্রশাসনিক দক্ষতার বিশ্লেষণ এখন নানা দিক থেকে হচ্ছে। যদুনাথ সরকারের রচনা থেকেও জানছি, মোগল সম্রাটদের নিযুক্ত গোয়েন্দা রাজকর্মচারী ছিলেন, তাঁরা নিয়মিত প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে রাজকর্মচারীরা ঘুষ নিচ্ছেন কি না তা জানাতেন। ব্রিটিশ জমানাতেও, এমনকী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনেও গোয়েন্দাবিভাগ ছিল খুব কার্যকর।
কাজেই এক দিকে প্রজাবৎসল রাজা, অন্য দিকে প্রশাসনিক দক্ষতা— এই দুই-ই প্রয়োজন। প্লেটোর রিপাবলিকের কথোপকথনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের দু’টি ধর্ম, প্রথমত- মিতাচার আর দ্বিতীয় ন্যায়। মিতাচার হচ্ছে আনন্দ আর আকাঙ্খাকে শৃঙ্খলায় আনা বা নিয়ন্ত্রণ করা। রাজা চাকরও বটে, আবার চাকরদের কর্তাও বটে।
সুষমা স্বরাজকে নিয়ে বিতর্ক। রাজাকে জবাব দিতে হবে। রাজা নীরব কেন? মায়ানমার নিয়ে নিজের ঢাক নিজে পেটাবেন না বলছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধানেরা। রাজা নীরব কেন? এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর যদি মানুষের মনে আসে অসন্তোষ, জাগে প্রশ্ন, তবে তার উত্তর দিতে হবে রাজাকেই। বিশু জবাব দেবে না, নন্দিনীর ও দায় নেই, দায় কিন্তু রাজার। গণতন্ত্রের দাবি, অদৃশ্য রাজাকে সত্যিকারের দৃশ্যমান হতে হবে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নয়।
- আনন্দবাজার

ঢাকা উত্তর- সড়ক সংস্কারকাজের দীর্ঘসূত্রতায় দুর্ভোগ

ইন্দিরা রোডে পয়োনিষ্কাশনের জন্য পাইপ বসানোর
কাজ চলছে। মাস খানেক ধরে এই পথে যানবাহন চলাচল
বন্ধ রয়েছে। লোকজনকে হেঁটে যেতেও পোহাতে হচ্ছে
দুর্ভোগ। ছবিটি গতকাল তোলা l সাহাদাত পারভেজ
ফার্মগেট-সংলগ্ন ইন্দিরা রোড থেকে রাজাবাজার এলাকায় আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে পয়োনিষ্কাশনের পাইপলাইন ও রাস্তা উন্নয়নকাজের দীর্ঘসূত্রতায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এখানকার মানুষ। মূল সড়কের যানজট এড়িয়ে এ পথটি ধরে স্বল্প সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার, সোবহানবাগ, পান্থপথ, কলাবাগানসহ আরও কয়েকটি গন্তব্যে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে রাস্তাটি বন্ধ থাকায় তাঁদের বিড়ম্বনার শেষ নেই।
গতকাল শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকার ভেতরে আলাদা দুটি জায়গায় ৬০ ফুটের বেশি রাস্তা খোঁড়া। আরও কয়েকটি জায়গায় বড় বড় পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা। পাইপ বসাতে সেখানকার রাস্তাগুলো এখনো খোঁড়া হয়নি। কোনো যানবাহন চলছে না। লোকজন পথের মাঝ দিয়ে খনন করা গভীর গর্ত, পাশে স্তূপ করে রাখা মাটি ও পাইপের পাশ দিয়ে চলাচল করেছেন। এই এলাকাটি উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য, সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকাটি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য গত মাসের মাঝামাঝি থেকে উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পয়োনিষ্কাশনের পুরাতন পাইপলাইন সরিয়ে সেখানে নতুন বড় পাইপ বসানো ও সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান কাজটি দেখভাল করছেন।
এ কাজের ধীর গতির অভিযোগ এনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, এক মাস ধরে কাজ বন্ধ থাকায় রাস্তাটিতে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ কোনো ধরনের যানবাহনই চলাচল করতে পারছে না। এ সময়ের মধ্যে অনেকে গাড়ি বের করতে পারেননি। বাড়ি থেকে বের হয়ে কোথাও যেতে হলে গ্রিন রোড, পান্থপথ কিংবা ফার্মগেট পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে যানবাহনে উঠতে হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন প্রচুর মানুষ এলাকাটির ভেতর দিয়ে যাতায়াত করেন। জনভোগান্তির কথা বিবেচনা করেও কাজটি আরও দ্রুত শেষ করা উচিত ছিল।
এ বিষয়ে কথা হয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খানের সঙ্গে। কবে নাগাদ কাজটি শুরু হয়েছে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগ থেকে।’ তাহলে এক মাস ধরে রাস্তাটি বন্ধ রাখার কারণ কী—জানতে চাইলে তিনি উত্তরে বলেন, ‘আমরা ধাপে ধাপে কাজ করছি তো, এ জন্য দেরি হচ্ছে।’
গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটির দায়িত্ব পেয়েছে, সেটিতে তাঁর অংশীদারি ছিল। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তা ছেড়ে দেন বলে জানান। তিনি বলেন, অংশীদারি ছেড়ে দিলেও এখন পর্যন্ত এক অর্থে তিনিই কাজটি দেখভাল করছেন। তবে কাজটি শুরু থেকে শেষে হওয়ার নির্ধারিত সময় সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি। বলেন, ‘আমরা দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। পুরোনো পাইপ বদলে নতুন পাইপ বসানোর জন্য লেভেলিংয়ের কাজটা সবচেয়ে কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
তবে কাউন্সিলরের এই কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না এলাকার লোকজন ও পথচলতি মানুষেরা। তাঁদের ধারণা, গোটা কাজটি শেষ হতে আরও অন্তত দুই মাস সময় লাগবে। তত দিন পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে এ ভোগান্তির হাত হাত থেকে তাঁদের নিষ্কৃতি নেই।

তুরস্কে নতুন সরকার কেমন হবে

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
সরকার গঠন করতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে হিমশিম খাচ্ছে তুরস্কের ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। এই প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়নি একেপি। তাই সরকার গঠনে বিরোধী দলের সঙ্গে জোট বাঁধা ছাড়া উপায় নেই প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের।
জোট গঠনে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরোধী দলের মন গলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। কিন্তু এরদোয়ানের পক্ষে কাজটি সহজ হচ্ছে না। এখন একেপির সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। সেগুলো হলো:
ডানপন্থী ন্যাশনালিস্টের সঙ্গে জোট: একেপি ডানপন্থী দল ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির (এমএইচপি) সঙ্গে জোটে যেতে পারে। এটিই তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ। রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের মিশেলে থাকা এই দলের সঙ্গে মানিয়ে চলাটা ইসলামপন্থী একেপির জন্য সহজ। এমএইচপি দলের নেতা ডেভলেট বাহসেলি এর আগে তুরস্কে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার চালু করতে এরদোয়ানের সমালোচনা করেন। জোট গড়তে চাইলে এসব ব্যাপারে এরদোয়ানকে ছাড় দিতে হবে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর গত রোববার বাহসেলি বলেন, এরদোয়ানের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা উচিত। তিনি বলেন, পার্লামেন্টে থাকা দুটি বিরোধী দলের সঙ্গে জোট গড়তে না পারলে নতুন নির্বাচনের ব্যাপারে ভাবতে হবে এরদোয়ানকে। এতে জোট গড়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেল। এটা ঠিক যে একেপি-এমএইচপি জোট গড়লে কুর্দি জঙ্গিদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া আরও খানিকটা এগিয়ে যাবে। এমএইচপির সমর্থকেরা কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সঙ্গে ঐকমত্যকে সমর্থন করে না। একেপি-এমএইচপি জোট হলে পার্লামেন্টের ৫৫০ আসনের মধ্যে ৩৩০ আসন দখল করা সম্ভব।
ধর্মনিরপেক্ষ রিপাবলিকানের সঙ্গে জোট: নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তুর্কি প্রধানমন্ত্রী ও একেপি নেতা আহমেদ দাভুতোগলু মন্তব্য করেন, তিনি কুর্দি-সমর্থিত দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ (এইচডিপি) নির্বাচনে আসন পাওয়া তিনটি দলের সঙ্গে বৈঠক করবেন। যদি দাভুতোগলু জোট গড়তে ব্যর্থ হন, তাহলে এরদোয়ানের পরের টার্গেট হতে পারে পার্লামেন্টের আরেক বড় দল রিপাবলিক পিপলস পার্টি (সিএইচপি)। নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুসারে সিএইচপি ১৩২ আসনে জয়ী হয়েছে। এতে সিএইচপি একেপির সঙ্গে জোট গড়তে আগ্রহী না-ও হতে পারে। এর কারণ হলো এমএইচপি ও কুর্দি-সমর্থিত পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (এইচডিপি) সঙ্গে তারা সহজেই জোট বাঁধতে পারে। তবে এমএইচপি ও এইচডিপি এতে কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এরই মধ্যে তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী বুলেন্ট আরিঙ্ক জোট গড়তে তিন বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তিনি হুঁশিয়ার করেন, যদি বিরোধীরা জোট গড়তে না পারে, তাহলে একেপি যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে।
সংখ্যালঘু সরকার: বিরোধী দলের নেতাদের সমর্থন নিয়ে একেপি সংখ্যালঘু সরকার গড়ার চেষ্টা করতে পারে। এভাবে একেপি পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয়ী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। আগাম নির্বাচনের শর্ত জুড়ে দিয়ে এমএইচপি এ ব্যাপারে একেপিকে সমর্থন দিতে পারে। তবে সিএইচপি ও এইচডিপি এ ব্যাপারে একেপিকে খুব বেশি সমর্থন দেবে না।
আগাম নির্বাচনের ডাক: একেপি যদি জোট গঠন করতে না পারে অথবা নির্বাচনের ৪৫ দিনের মধ্যে আস্থা ভোটে জয়ী হতে না পারে, তাহলে সংবিধান অনুসারে আগাম নির্বাচনের ডাক দিতে বাধ্য হবেন এরদোয়ান। ৯০ দিন পরে ওই নির্বাচন হবে।
গত বৃহস্পতিবার তুরস্কে যত শিগগির সম্ভব নতুন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান এরদোয়ান। পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি এ বিষয়ে নীরবতা ভাঙেন। এরদোয়ান বলেন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিগগিরই একটি সরকার গঠন করতে হবে। এ জন্য প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অহংবোধ উপেক্ষা করে তৎপর হওয়া উচিত।
এত দিন ক্ষমতায় থাকা এরদোয়ানের সমর্থনপুষ্ট দল একেপি এবারের নির্বাচনে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এতে অন্য দলগুলোর সমন্বয়ে নতুন জোট সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে হচ্ছে, জোট গড়তে অনেকটাই নমনীয় একেপি। এমনকি আলোচনা ব্যর্থ হলে আগাম নির্বাচনের জন্যও একেপির প্রস্তুতি রয়েছে। ৫৫০ আসনের পার্লামেন্টে একেপি পেয়েছে ২৫৮টি। ১৩ বছরের মধ্যে এবারই কম আসন পেল দলটি। রয়টার্স অবলম্বনে