Thursday, December 12, 2019

কেন কিছু দেশ অন্য স্থানে তাদের রাজধানী সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে

ইন্দোনেশিয়া তাদের রাজধানী জাকার্তা থেকে বোর্নিও দ্বীপে সরিয়ে নিচ্ছে।
নির্দিষ্ট সময় স্থান এখনো ঠিক হয় নি কিন্তু প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো পার্লামেন্টে ১৬ই অগাস্ট এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
কেন জাকার্তা থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে রাজধানী তার কারণ বের করা খুব কঠিন না।
কারণ প্রতিবছর ১ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার দেবে যাচ্ছে শহরটি। শহরটির অর্ধেক এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে অবস্থান করছে।
শহরটি একটা জলাভূমির উপর রয়েছে কারণ এখানে জাভা সাগর রয়েছে এবং ১৩টি নদী বয়ে যাচ্ছে শহরটির উপর দিয়ে।
এর যানজটের অবস্থা ভয়াবহ। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় এই বড় শহরটির যানজট বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ যানজট।
সরকারের মন্ত্রীদের পুলিশ পাহারায় নির্দিষ্ট সময়ে মিটিং এ পৌছানোর জন্য যেতে হয়। শহুরে এলাকায় ৩০ মিলিয়ন লোকের বাস। এত বড় জনসংখ্যার জন্য মাত্র ২-৪% ময়লা পানি বিশুদ্ধ করা হচ্ছে।
নতুন রাজধানী হতে পারে কালিমানটান। এই পরিবর্তনের জন্য ৩৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। এর জন্য ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার হেক্টর জমির প্রয়োজন হবে।
শহরটির অর্ধেক এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে অবস্থান করছে।
যেখানে ৯ লক্ষ থেকে এক দশমিক পাঁচ মিলিয়ন লোকের বাসস্থান করা হবে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া কোনভাবেই প্রথম দেশ না , যে দেশ তাদের রাজধানী সরিয়ে অন্য স্থানে নিচ্ছে। এর আরো বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে।

কাজাখাস্তান

১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট নুর সুলতান নাজারবেইভ সিদ্ধান্ত নেন প্রধান শহর আলমাতি থেকে রাজধানী সরিয়ে নেবেন।
তিনি ধুলোমাখা এক প্রদেশ বেছে নিলেন। যেটা ৭৫০ মাইল উত্তরে। তিনি প্রথমে যে কাজটি করলেন সেটা হল নাম পরিবর্তন করা।
তিনি এর নাম আকমোলা তকে আসতানা করলেন। যার অর্থ 'সাদা কবর'।
এরপর তিনি বিশ্বের নানা স্থান থেকে স্থাপত্যবিদদের নিয়ে আসলেন। একেবারে মাটি থেকে তিনি তার রাজধানী তৈরি করা শুরু করলেন।
এর অন্যতম চমকপ্রদ ল্যান্ডমার্কটি হল কান সাটআর। যেটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তাবু। এর নকশা করেন নরমান ফস্টার।
এর মধ্যে শপিং মল এবং বিনোদন কমপ্লেক্স রয়েছে। সেখানে আরো রয়েছে বেতারেক টাওয়ার, প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস আরো অনেক অবকাঠামো।
কান সাটআর। যেটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তাবু। এর নকশা করেন নরমান ফস্টার
এর সবকিছু সম্ভব হয়েছিল কাজাখাস্তানের উদীয়মান তেল ক্ষেত্রের জন্য। ২০১৮ সালে অর্থনীতি বেড়েছে ৪.৮%।
কৃতজ্ঞতাবশত প্রেসিডেন্ট নাজারবেইভ মার্চে যখন ক্ষমতা ছেড়ে দেন তখন তাকে সম্মান জানিয়ে সংসদের ভোটে শহরটির নাম তার নামে করা হয়।
এখন কাজাখের রাজধানী বিশ্বের দ্বিতীয় শীতলতম শহর, প্রথমে রয়েছে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটার। যার নাম এখন নুর সুলতান সিটি।

মিয়ানমার

নেপিডো শহরটি লন্ডনের চেয়ে চারগুণ বড় কিন্তু জনসংখ্যা ভগ্নাংশ পরিমাণ।
এর অর্থ ছিল 'রাজার স্থান'। কি কারণে বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে নেপিডোতে রাজধানী সরিয়ে আনা হল সেটা কখনো পরিষ্কার করা হয়নি।
৩৭০ কি.মি. দুরে বড় শহর ইয়াঙ্গুন যার আগের নাম ছিল রেঙ্গুন।
সেই সময় বিবিসিকে দেশটির তথ্য মন্ত্রী বলেছিলেন স্থানটি কৌশলগত দিক দিয়ে ভাল। কিন্তু বিশ্লেষকরা এড়িয়ে গেছেন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে।
তারা বলেছেন এটা হতে পারে সেনাবাহিনী ভয় পাচ্ছে কোন বিদেশি শক্তি এসে দখল করে নেয় আবার অনেকে মনে করতেন সীমান্তে জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর বেশি করে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
একটা পরিকল্পিত রাজধানীর শহরের সব চিহ্ন এখানে আছে। যে রাস্তাটা সংসদ ভবন থেকে প্রেসিডেন্ট প্যালেস এর দিকে গেছে সেটা ২০ লেন চওড়া।
কি কারণে ইয়াঙ্গুনে রাজধানী সরিয়ে নেয়া হল সেটা কখনো পরিষ্কার করা হয়নি
যানজট নেই বললেই চলে। ঝকঝকে শপিং মল, দামি হোটেল যেসব খালি পড়ে আছে।
এখানে একটা সাফারি পার্ক, একটা চিড়িয়াখানা, এবং অন্তত তিনটি স্টেডিয়াম আছে।
দেশটির অন্যান্য স্থানে বিদ্যুৎ না থাকলেও রাজধানীতে সবসময় বিদ্যুৎ থাকে।

বলিভিয়া

বলিভিয়ার দুটি রাজধানী ছিল। একটি শাকরে এবং অন্য টি লা পায।
১৮৯৯ সালে লা পাযের সাথে সংক্ষিপ্ত গৃহযুদ্ধে হেরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শাকরে ছিল মূল রাজধানী।
এরপর সংসদ এবং সিভিল সার্ভিস বলিভিয়ার বড় শহর লা পাযে সরে গেলো, কিন্তু বিচারবিভাগ শাকরে তে থেকে গেল।
১৮২৫ সালে বলিভিয়া যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন শাকরে ছিল দেশটির কেন্দ্রবিন্দু।
এর জনসংখ্যা দুই লাখ ৫০ হাজার যেখানে লা পাযের রয়েছে এক দশমিক সাত মিলিয়ন।
২০০৭ সালে সংসদ এবং সরকারকে শাকরে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
ফলাফল, লা পাযে সর্ববৃহৎ বিক্ষোভ তৈরি হয়। বিষয়টাকে অনেকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখে।
প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস এর পশ্চিমের উচ্চভূমির গরিব সমর্থক এবং তার প্রতিপক্ষ পূর্বের ধনীদের মধ্যে। তাই সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
সংসদ এবং সিভিল সার্ভিস বলিভিয়ার বড় শহর লা পাযে
বলিভিয়াতে এখন দুটি রাজধানীই রয়েছে।

নাইজেরিয়া

১৯৯১ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ার বড় শহর লাগোস দেশটির রাজধানী ছিল।
আবুজাতে রাজধানী স্থানান্তরের অনেক কারণ ছিল।
প্রথমত এটার ভৌগলিক অবস্থান। আবুজা ছিল দেশটির কেন্দ্রে।
মাইদুগুড়ি থেকে সড়কে লাগোসে যেতে সময় লাগতো দুই দিন কারণ যেতে হত ১৬শ কি.মি পথ পাড়ি দিয়ে।
সেই তুলনায় আবুজা ছিল কাছে। লাগোস ছিল ঘনবসতিপূর্ণ। সাব সাহারান আফ্রিকার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর ছিল এটা। এটাও ছিল অনেক কারণের মধ্যে একটি। আবুজা রাজনৈতিক এবং জাতিগত ভাবে ছিল নিরপেক্ষ।
যেখানে লাগোস গড়ে উঠেছিল প্রাকৃতিক-ভাবে সেখানে আবুজা ছিল পরিকল্পিত শহর।
যেটা ছিল নাইজেরিয়ায় প্রথম। যানজটের জন্য লাগোস কুখ্যাত, শুরুতেই আবুজার রাস্তার পরিকল্পনা করা হয়েছে চওড়া করে।
জাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট , সুপ্রিম কোর্ট, ন্যাশনাল এসেম্বলি এবং প্রেসিডেন্ট ভবন আবুজাতে। যাইহোক অনেক কেন্দ্রীয় সংস্থা এখনো অনানুষ্ঠানিক-ভাবে লাগোসে রয়েছে।

পর্তুগাল

১৩ বছর ধরে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন ছিল না বরং এটা ছিল রিও ডি জেনরিও। কারণ কি? নেপোলিয়ন।
পেনিনসুলা যুদ্ধের সময় ফ্রান্স তিন বার পর্তুগাল দখল করে।
আবুজা ছিল পরিকল্পিত শহর।
১৮০৭ সালের ডিসেম্বরের আগে ব্রাগানজা রাজ পরিবার এবং আদালত ব্রাজিলে যান যেটা একটা পর্তুগিজ কলোনি ছিল।
তারা ১৮০৮ সালের মার্চে রিওতে পৌছায়। ১৯ শতকে রিও ছিল একটি উঠতি শহর। সেখানে সোনা, ডায়মন্ড এবং চিনি ছিল আর ছিল দাস।
ডম জোআও ৬ষ্ঠ প্রিন্স রিজেন্ট ইউনাইটেড কিংডম অব পর্তুগাল, ব্রাজিল, এবং দ্যা আলগারভেস তৈরি করেন।
এটা ব্রাজিলকে একটা কলোনি থেকে পর্তুগালের সমমর্যাদায় নিয়ে যায়। ব্রাজিল সেসময় আরো প্রশাসনিক স্বাধীনতা পেল।
যখন রানী ১৮১৬ সালে মারা যান , তিনি হয়ে যান রাজা।
১৮২১ সালে পর্তুগীজ আদালত লিসবনে ফিরে আসে এবং ১৯৯০ সালের রাজতন্ত্র শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিল।
রিও এক সময় পর্তুগালের রাজধানী ছিল

আটলান্টিক থেকে লিখছি by মারুফা ইসহাক

প্রধান বিজ্ঞানী ক্যারেনের সঙ্গে লেখক
বিশ্বের ২৩টি দেশের ২৫ জন তরুণ সমুদ্রবিজ্ঞানী এখন জাহাজে ভাসছেন আটলান্টিক মহাসাগরে। দলটি নির্বাচিত হয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮০০ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে। তাঁদের সঙ্গে আছেন নামজাদা সমুদ্রবিজ্ঞানী আর সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। দলটির যাত্রা শুরু হয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে, এক মাসের যাত্রায় তাঁরা পৌঁছাবেন জার্মানিতে। এই দলে আছেন বাংলাদেশের তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মারুফা ইসহাক। জাহাজ থেকেই লিখে পাঠিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতা।
গিটার বাজিয়ে লুকাস গান গাইছে। স্প্যানিশ ভাষায় ওর প্রিয় কোনো গান। কফি রুমে আমরা কয়েকজন বসে আছি। আমাদের এখন কিছু বিরতি। কেউ গল্প করছে, কেউ দাবা খেলছে, কেউ আবার কফি হাতে আকাশকুসুম ভাবছে। কফি রুমে বড় বড় দুইটা মনিটর। একটায় জাহাজের গতিপথ দেখাচ্ছে, আরেকটাতে কতক্ষণ পরে লাইফ জ্যাকেট আর হেলমেট পরে জাহাজের ডেকে ছুটতে হবে, সেটার ক্ষণগণনা চলছে।
আটলান্টিক মহাসাগরের ওপরে আমাদের প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেল। ২৩টি দেশ থেকে আমরা ২৫ জন তরুণ সমুদ্রবিজ্ঞানী এখন জার্মান জাহাজ আরভি পোলারস্টার্নে। আমাদের সব ব্যয় বহন করছে নিপ্পন ফাউন্ডেশন এবং আটলান্টোস। এই আটলান্টিক অভিযানের মূল আয়োজক হলো পার্টনারশিপ ফর অবজারভেশন অব গ্লোবাল ওশান এবং জার্মানির আলফ্রেড ওয়েগেনার ইনস্টিটিউট।
মই বেয়ে জাহাজে
আমাদের সবাইকে শুরুতে যেতে হয়েছিল চিলির পুনেতে এরেনাস শহরে। সেখানে দুই দিনের কর্মশালা শেষে আমরা বিমানে করে পৌঁছালাম ফকল্যান্ড দ্বীপে। ফকল্যান্ড দ্বীপের পোর্ট স্ট্যানলি থেকে আমরা স্পিডবোটে করে রওনা দিলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা চলার পর সমুদ্রের মধ্যে বেশ দূরে মিটিমিটি হলুদ আলো দেখা গেল। ধীরে ধীরে আলো স্পষ্ট হলো। ছোটবেলায় গল্প–কাহিনিতে পড়েছিলাম, পাতাল ফুঁড়ে রাজকন্যা বেরিয়ে এল, আর আমার কাছে মনে হচ্ছিল, এ যেন মহাসমুদ্র ফুঁড়ে উঠে এল একটা আস্ত বড় জাহাজ।
স্পিডবোট জাহাজের কাছে পৌঁছাতেই জাহাজের ডেক থেকে একটা দড়ি, কাঠের মই ফেলা হলো। ঢেউয়ের প্রবল গর্জন, ভীষণ বাতাস আর স্পিডবোটের দুলুনি। এই মই বেয়ে উঠতে পারলে জাহাজ, না পারলে মহাসমুদ্র! তখন সন্ধ্যার নিবুনিবু আলো। দড়ি ধরে কাঠের মইয়ের ওপর একটা পা রেখে টের পেলাম আমার আরেকটা পা রাখার জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না। বাতাসের চোটে কোনো রকম ব্যাকরণ ছাড়াই মই শূন্যে দুলছে। অবশেষে মই বেয়ে ডেকে ওঠার পরেই জাহাজের কর্মকর্তা আমাদের পরিচয়পত্র দিয়ে পাসপোর্টটা রেখে দিলেন।
একপ্রস্থ আরভি পোলারস্টার্ন
সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়া করার জন্য সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। মূলত বরফ কেটে আর্কটিক অথবা দক্ষিণ মহাসাগর পাড়ি দিয়ে অ্যান্টার্কটিকার মতো দুর্গম জায়গায় সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে আরভি পোলারস্টার্ন। এই জাহাজে মোট ছয়টা ডেক আছে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা সি-ডেকে। আমার রুমমেট অ্যাঞ্জেলা, এসেছে কলম্বিয়া থেকে। আমাদের রুমে আছে ব্যাঙ্ক বেড, টেবিল-চেয়ার, সোফা, ক্লোজেট, ফ্রিজ, এমনকি লাগোয়া স্নানঘরও। জাহাজে সুইমিংপুল, সাউনারুম, জিম, স্পোর্টস রুম, লন্ড্রি রুম—সবই আছে। মেস রুম (ডাইনিং) আছে দু-একটা ডি ডেকে, আরেকটা সি ডেকে-আমাদের আর কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য। মেস রুমের পাশেই লালগালিচা আর লাল সোফা দিয়ে সাজানো কফি রুম। জাহাজের বেশির ভাগ আসবাবই এদিক-ওদিক নাড়ানো যায় না। এমনকি প্লেট-গ্লাস, ল্যাবরেটরির সব ছোট-বড় যন্ত্রপাতি সবকিছুই রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা আছে, যেন জাহাজের দুলুনিতে কিছু ভজকট না হয়।
আটলান্টিকের দিনরাত্রি
প্রথম দিন জার্মান জাহাজের অতি সুস্বাদু খাবার পেট পুরে খেয়ে প্রধান বিজ্ঞানী ক্যারেনের কথা শুনতে শুনতে বুঝলাম যে রীতিমতো ঘুমে ঢুলছি। তার ওপর জাহাজের নিরাপত্তা কর্মকর্তা তার ব্রিফিং শেষে বলে কিনা আমাদের একবার প্র্যাকটিস করাবে। অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে ছুটতে ছুটতে আমরা হেলিপ্যাডে পৌঁছালাম। এখানে বলে রাখি, আমাদের এই জাহাজে খুব সুন্দর চকচকে দুটো হেলিকপ্টার লুকানো আছে—একটা লাল, আরেকটা কমলা রঙের। হুটহাট যখন গ্যারেজের ঢাকনা কিছুটা খোলা থাকে, তখন সেই হেলিকপ্টার দুটি দেখা যায়। রাতের ঠান্ডা বাতাসে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে সেদিন নিরাপত্তা অনুশীলনের পর্ব শেষ করেই আমি ঘুম এবং পরের দিন সি-সিকনেসের শিকার। ডাক্তার দেখিয়ে, গোটা চারেক ট্যাবলেট খেয়ে এক দিন পর আমি অবশ্য বিছানা থেকে উঠতে পারলাম।
আমরা ২৫ জন পাঁচটা দলে কাজ করা শুরু করলাম জাহাজে ওঠার পরের দিন থেকেই। প্রতিটা দলের কাজের ধরন আলাদা। এক সপ্তাহ পরপর প্রতিটা গ্রুপের কাজের ধরন পরিবর্তন হয়। নাসা (আমেরিকা), আলফ্রেড-ওয়াগেনার ইনস্টিটিউট (জার্মানি) এবং আরও কয়েকটা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫ জনের মতো বিশিষ্ট সমুদ্রবিজ্ঞানী আমাদের প্রশিক্ষক হিসেবে এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সমুদ্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ—এসব নিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, যেকোনো বিষয়ে হুটহাট গুগল করার কোনো সুযোগ নেই এখানে। আমাদের কম্পিউটার রুমে অনেক কম্পিউটার থাকলেও কেবল দুটি কম্পিউটারে ইন্টারনেট আছে। কাজেই যখন-তখন ইন্টারনেট ব্যবহারের কথা ভাবা যায় না। তবে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের আধা ঘণ্টা আলাপ হয় স্কাইপে। সমুদ্র আর এই আটলান্টিক অভিযান নিয়ে তাদের উৎসাহ আর আগ্রহের কমতি নেই। সারা দিনের ছোটাছুটি আর কাজের শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আমাদের ব্রিফিং হয় বিশাল একটা হলঘরে, তখন কাজের অগ্রগতির ওপর আমাদের প্রেজেন্টেশন দিতে হয়।
জাহাজ চলতে শুরু করামাত্রই বুঝেছিলাম, কেন আমাদের এত শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে আটলান্টিক অভিযানে নামতে হয়েছে। মহাসমুদ্রের তাণ্ডব–নৃত্যের সঙ্গে ল্যাপটপ খুলে কাজ করা এবং সমুদ্রের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে, বাতাসের জোরালো ধাক্কা সামলে যন্ত্রপাতি সেট করে উপাত্ত সংগ্রহ করা—এসব কিছু পুরোই ফিল্মি স্টাইলের অ্যাডভেঞ্চার। কখনো আটলান্টিক থেকে উপাত্ত সংগ্রহের জন্য আমাদের রাত তিনটায় উঠতে হয়, কখনো সকাল সাতটায়, কখনো দুপুরে বা সন্ধ্যায় ছুটতে হয়। জাহাজের ডেকে কাজের সময় কখনো দেখা হয় সাদা উড়ুক্কু মাছের (ফ্লাইং ফিশ) সঙ্গে, কখনো অতি আগ্রহী সামুদ্রিক কচ্ছপ আমাদের যন্ত্রপাতির পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে যায়। দক্ষিণ আটলান্টিকের প্রচণ্ড শীত থেকে এখন আমরা বিষুবরেখার কাছাকাছি গরম আবহাওয়ার দিকে যাচ্ছি। এরই মধ্যে কয়েক দফা ঘড়ির সময় বদলাতে হয়েছে। আমাদের এই আটলান্টিক অভিযান শেষ হবে ৩০ জুন। সেদিন আমরা জার্মানিতে পৌঁছাব।
জাহাজের হেলিপ্যাডে লেখকসহ (মাঝে ডােন দাঁড়ানো) বিভিন্ন দেশের তরুণ সমুদ্রগবেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত

প্রস্রাবের সমস্যা থেকে সহজে মুক্তি পা‌ওয়ার ৯টি ঘরোয়া উপায়

মুত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউরিন ইনফেকশন একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর সমস্যা।
প্রস্রাবের বেগ হওয়া সত্ত্বেও ঠিকমতো প্রস্রাব না হওয়া বা খুবই সামান্য প্রস্রাব হওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া করা, প্রস্রাবের রং পরিবর্তন হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবে দুর্গন্ধ হওয়া, পেটে ব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া,অবসন্ন ও ক্লান্ত অনুভব করা – এই উপসর্গ গুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে যে আপনার মূত্রনালীর সংক্রমণ হয়েছে।
এই সমস্যায় তখনই মানুষ আক্রান্ত হয় যখন মুত্রাশয় এবং তার প্রস্থান টিউব ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়। এছাড়াও আরও কিছু কারণ আছে এই সমস্যা হওয়ার তা হল- যৌনমিলন, দীর্ঘ সময় প্রস্রাব ধরে রাখা, গর্ভাবস্থা, মেনোপজ, এবং ডায়াবেটিস।
ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই এই রোগে বেশী আক্রান্ত হয়। কারণ মেয়েদের ইউরিথ্রা বা মূত্রনালী পায়ুর খুব কাছাকাছি থাকে ফলে মলদার দিয়ে নির্গত ব্যাকটেরিয়া সহজেই মূত্রনালিতে প্রবেশ করতে পারে।
এছাড়াও মেয়েদের মুত্রনালী ছোট হওয়ায় ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই মুত্রথলিতে ও কিডনিতে পৌঁছে ইনফেকশন ঘটাতে পারে।
প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে মূত্রনালির সংক্রমন বা ইউটিআই নির্ণয় করা যায়।
কী জীবাণুর সংক্রমণ হয়েছে তা দেখে ডাক্তার আপনাকে এন্টিবায়োটিক সেবন করতে দেবেন।এন্টিবায়োটিক-এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে বলাই বাহুল্য।
যেমন- ডায়রিয়া, বমি , র্যা শ ও চুলকানি হওয়া ইত্যাদি। এই সংক্রমণ প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়।
এখন আমরা এমন কিছু ঘরোয়া পদ্ধতির কথা জানবো যা ব্যাবহার করে মুত্রনালীর সংক্রমন থেকে পরিপূর্ণ ভাবে মুক্ত হওয়া যায়।
(১) অ্যাপেল সাইডার ভিনেগারঃ
এই ভিনেগারে আছে নানান রকম এনজাইম, পটাশিয়াম এবং গুরুত্বপূর্ণ মিনারেল যা ইউরিনারি নালীর ইনফেকশন রোধ করতে সক্ষম।
এই ভিনেগার প্রাকৃতিক অ্যান্টবায়টিক হিসেবে কাজ করে এই সমস্যা রোধ করতে।
১। একগ্লাস পানির সাথে ২ চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে খেয়ে নিন।
এছাড়াও আপনি লেবুর রসের সাথে মধু মিশিয়ে খেতে পারেন।
২। দ্রুত ইনফেকশন সারিয়ে তোলার জন্য এই পানীয়টি প্রতিদিন ২ বার খান।
(২) বেকিং সোডাঃ
বেকিং সোডার এসিড উপাদান, এসিড জাতীয় প্রস্রাবের সমস্যা রোধ করে এবং ব্যথাও দূর করে।
তাই এই সমস্যা এড়াতে একচামচ বেকিং সোডার সাথে একগ্লাস পানি মিশিয়ে প্রতিদিন ১/২ বার খেয়ে নিন।
(৩) আনারসঃ
সুস্বাদু ফল আনারসে আছে একটি এনজাইম উপাদান যা ব্রোমেলাইন নামে পরিচিত এবং এই উপদানটি ইউরিনারি ইনফেকশন এর জ্বালাপোড়া রোধ করে।
এই সমস্যায় শুধু আনারস না খেয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়টিকও খাওয়া ভালো দ্রুত ইনফেকশন রোধ করার জন্য।
প্রতিদিন ১ কাপ আনারস খাওয়া ভালো ইউরিনারি ইনফেকশন রোধ করার জন্য।
চাইলে আপনি আনারস জুস বানিয়েও খেতে পারেন তবে ক্যানে বহন করা আনারস না খাওয়া ভালো কারণ এগুলোতে প্রিজারভেটিভ দেয়া থাকে।
(৪) প্রচুর পানি পান করুনঃ
যাদের ইউটিআই আছে তাদের প্রচুর পানি পান করা প্রয়োজন ।
বেশী পানি পান করলে প্রস্রাবের বেগ বৃদ্ধি পায় এবং প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া বের হয়ে যায়।
(৫) সোডা পান করুনঃ
না কোন সফট ড্রিংক এর কথা বলছি না, বেকিং সোডার কথা বলছি।
এক গ্লাস পানিতে এক চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে সপ্তাহে একদিন সকাল বেলা পান করুন প্রস্রাবের জ্বালা পোড়া কমবে।
(৬) কিছু সেলারি বীজ চিবানঃ
সেলারি বীজ মূত্র বর্ধক হিসাবে কাজ করে।
এক মুঠো সেলেরি বীজ চিবিয়ে রস খেতে পারেন অথবা এক কাপ গরম পানিতে কিছু সেলেরি বীজ দিয়ে ঢেকে দিন ,৮ মিনিট পর মিশ্রণটি ছেঁকে নিয়ে পান করুন।
এটা ইউ টি আই প্রতিরোধ করে।
(৭) শসা খানঃ
শসাতে প্রচুর পানি আছে। প্রতিদিন কম পক্ষে একটি শসা স্লাইস করে খেতে পারেন।
(৮) গরম সেঁক নিনঃ
হট ওয়াটার ব্যাগ এ গরম পানি নিয়ে আপনার তলপেটের উপর রাখুন, এতে খুব দ্রুত প্রস্রাবের জ্বালা পোরা ও ব্যথা দূর হবে।
(৯) আরামদায়ক পোশাক পড়ুনঃ
স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। সূতির অন্তর্বাস পরলে ও ঢিলেঢালা পোশাক পরলে স্পর্শকাতর অঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

হাতুড়িতেও ভাঙে না ডিম

পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল যুদ্ধক্ষেত্র বলা হয় হিমালয়ের সিয়াচেন হিমবাহকে। ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের অন্তর্গত এই ঘাঁটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত। সেখানে হিমাঙ্কের নিচে থাকা তাপমাত্রায় খাবার জমে ইটের মতো শক্ত হয়ে থাকে। সেই জমে যাওয়া খাবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনার চেষ্টায় সেনাদের অনেক সময়ই বেগ পেতে হয়। এমনকি হাতুড়ি দিয়ে ডিম ভাঙার চেষ্টা করতে হয় তাঁদের। ফলের রসও জমে কঠিন ইটের দশা সেখানে।
গত ৮ জুন শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, একদল ভারতীয় সেনা হাতুড়ি দিয়ে ডিম ভাঙার চেষ্টা করছেন। হিমাঙ্কের নিচে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ডিম জমে এতই শক্ত হয়ে গেছে যে হাতুড়ি দিয়েও তা ভাঙতে পারছেন না সেনারা। শুধু ডিম কেন, তাপমাত্রা কম হওয়ায় সবজিও কঠিন বরফ হয়ে যায়। সিয়াচেনে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের জন্যও লড়তে হয় সেনাদের।
ভিডিওতে দেখা যায়, হাতুড়ি হাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে এক সেনা পাথরের ওপরে আছাড় মারেন একটি ডিম। তবু ডিম যেমন ছিল, তেমনই রয়ে যায়। সহকর্মীর এই চেষ্টা দেখে মজা করে এক সেনার মন্তব্য, ‘এই ধরনের ডিম একমাত্র সিয়াচেন হিমবাহেই পাবেন।’
ডিমের পাশাপাশি সেনারা ঠান্ডায় জমে যাওয়া পেঁয়াজ, টমেটো, আদা, আলুও এভাবেই হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেন। ফলাফল, ঠান্ডাতেও যথারীতি গলদঘর্ম দশা!
হাতুড়ি দিয়ে ডিম ভাঙার চেষ্টা করছেন এক সেনা। ছবি: টুইটার