Showing posts with label WikiPolitics. Show all posts
Showing posts with label WikiPolitics. Show all posts

Monday, November 16, 2015

হরতাল নয়, প্রয়োজন সংলাপ ও সমঝোতা by বদিউল আলম মজুমদার

৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত গত সাত দশকে—১৯৪৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত—আমাদের দেশে ডাকা হরতালের একটি ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তাঁর সংগৃহীত তথ্যগুলো মূল্যবান। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই।
অজয় দাশগুপ্তর সন্নিবেশিত তথ্যগুলো এখনো বিশ্লেষণের অপেক্ষায় আছে, যে কাজটি তিনি করবেন বলে উপস্থিত শ্রোতাদের আশ্বস্ত করেছেন। তবে সন্নিবেশিত ‘র’ বা কাঁচা তথ্যগুলো, গভীর বিশ্লেষণের আগেই আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের, বিশেষত রাজনৈতিক ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে, যা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য।
অনেকেই অবগত আছেন যে হরতালের জনক মহাত্মা গান্ধী। তিনি ১৯১৯ সালে প্রথম হরতাল ডাকেন ভারতে ব্রিটিশদের একটি নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের বিরুদ্ধে নীরব ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে এই হরতালের আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও গান্ধীর হরতাল ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, তবে এই অভিনব প্রতিবাদ ছিল অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু কালের পরিক্রমায় হরতাল আর অহিংস থাকেনি, এটি বহুলাংশে তার কার্যকারিতাও হারিয়ে ফেলেছে এবং রাজনীতিবিদদের একটি আয়েশি কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। এখন অনেকেই হরতালকে ‘না’ বলার দাবি তুলছেন।
গবেষক দেখিয়েছেন যে ১৯৪৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতীয়ভাবে মোট ৬০৫টি হরতাল ডাকা হয়। এর মধ্যে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ইস্যুতে মোট ৪৭টি হরতাল পালিত হয়। জাতীয় হরতালের সঙ্গে আঞ্চলিকভাবেও অনেকগুলো হরতাল ডাকা হয়। মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসব হরতাল আহ্বান করে। তবে এর কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, সর্বশেষ হরতাল ডাকে গণজাগরণ মঞ্চ, ৩ নভেম্বর তারিখে ব্লগার ও প্রকাশক হত্যার প্রতিবাদে।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম হরতাল পালিত হয় ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর। সচিবালয়ের কর্মচারীরা ওই হরতালটি ডেকেছিলেন কিছু দাবিদাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে এবং পাকিস্তানি মুদ্রা ও ডাকটিকিটে বাংলা না লেখার প্রতিবাদে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই হরতালের মাধ্যমেই সম্ভবত পাকিস্তানের বিলুপ্তির প্রথম বীজ রোপিত হয়।
আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে ১৯৭১ সালে একমাত্র হরতাল ডাকা হয় ৩ ডিসেম্বর তারিখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবেশের প্রতিবাদে। জামায়াতে ইসলামী এই হরতালের ডাক দেয়।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে জাতীয়ভাবে ৫৫৭ দিন হরতাল ডাকা হয়। এর মধ্যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ দিন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৮২ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত ছয় দিন, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭২ দিন, ১৯৯০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৮১ দিন, ১৯৯৬ সালের ৩১ মার্চ থেকে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৫৯ দিন, ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ৯১ দিন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৮৩ দিন হরতাল ডাকা হয়। অর্থাৎ হরতালের সংখ্যা একটি ব্যতিক্রম ছাড়া দিন দিন বেড়েছে।
হরতালের এই তথ্য-উপাত্তগুলোকে গবেষক ভিন্ন সময়কালের ভিত্তিতেও উপস্থাপন করেন। তাঁর উপস্থাপনা থেকে দেখা যায় যে জাতীয়ভাবে মার্চ ১৯৮২ সাল থেকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ পর্যন্ত ৭২ দিন, ৭ ডিসেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০০০ পর্যন্ত ১৩০ দিন এবং ২০০১ সাল থেকে জুন ২০১৫ পর্যন্ত ৩৩৩ দিন হরতাল ডাকা হয়। এভাবে দেখলেও হরতালের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয় যে এসব হরতালের কারণে ১৯৪৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬৫৫ জন নিহত, প্রায় ২৫ হাজার ব্যক্তি আহত এবং ১৭ হাজার জন গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া প্রতিবেদনে হরতালের আর্থিক ক্ষতির তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে, যদিও এ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন মত রয়েছে।
রাজনৈতিক হানাহানি ও দমন-পীড়ন সংকটকে আরও ঘনীভূতই করবে, যা জঙ্গিবাদের বিস্তৃতির জন্য উর্বর ক্ষেত্র বিস্তার করবে এবং জাতিকে বিপর্যয়ের দিকেই ঠেলে দেবে বলে আমাদের আশঙ্কা অজয় দাশগুপ্তর উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত থেকে এটি সুস্পষ্ট যে হরতালের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের ইতিহাস, বিশেষত বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস। এ ছাড়া এগুলো বাংলাদেশের আগত দিনেরই ইতিহাসের ইঙ্গিত বাহকও। চলমান রাজনৈতিক বিরোধ, খুনখারাবি এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা। বস্তুত হরতালের সংখ্যার ঊর্ধ্বগতি আমরা যে ক্রমাগতভাবে এই সংকটের গহ্বরে প্রবেশ করছি, তারই সুস্পষ্ট ভবিষ্যৎ বার্তা বহন করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, বেশি বেশি হরতাল আমাদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বিরোধ নিয়মতান্ত্রিকভাবে মীমাংসায় অপারগতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি চলমান অসহিষ্ণুতারই প্রতিফলন, আর এ অসহিষ্ণুতাই আমাদের সংকটকে দিন দিন আরও ঘনীভূত করে তুলছে।
এটি সুস্পষ্ট যে নীরব প্রতিবাদের পরিবর্তে হরতাল ক্রমাগতভাবে আমাদের দেশে রাজপথে জোর করে সমস্যা সমাধানের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা ক্রমান্বয়ে সহিংস রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক ও অন্যান্য জাতীয় সমস্যা সমাধানের সর্বোত্তম, বহু পরীক্ষিত ও টেকসই পন্থা হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতের আদান-প্রদান, সংলাপ ও সমঝোতা। রাজপথের লড়াকু আন্দোলন, তার প্রতিক্রিয়ায় দমন-পীড়ন ও সহিংসতা সমস্যার সমাধান তো করেই না; বরং সমস্যাকে আরও প্রকট, জটিল ও বেসামাল করে। মনে হয়, বাংলাদেশে আজ যেন আমরা এমনই জটিল একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি।
গবেষকের উপস্থাপিত হরতালের সংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি থেকে এটি আরও সুস্পষ্ট যে আমাদের রাজনৈতিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমরা প্রচলিত গণতান্ত্রিক পন্থা ও দায়িত্বশীলতার আশ্রয় নিইনি। আমরা সংসদকে কার্যকর ও সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করিনি। অন্যান্য গণতান্ত্রিক ও দায়বদ্ধতার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করিনি। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা করিনি। জনগণের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করিনি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধাগুলো দূর করিনি। প্রদর্শন করিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধাশীলতা। সর্বোপরি সংলাপের মাধ্যমে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলিনি। বরং সংসদীয় ‘টিরানি অব দ্য মেজরিটি’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র কাজে লাগিয়ে কিংবা হরতাল-অবরোধসহ অজয় দাশগুপ্তর উপস্থাপিত তথ্যমতে, রাজপথে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে মতৈক্যের ক্ষেত্রগুলোকে আরও সংকুচিত করেছি। প্রসঙ্গত, ১৯৭২-এর সংবিধান ছিল আমাদের জাতীয় মতৈক্যের এক অনন্য উদাহরণ, যা কতগুলো হীন স্বার্থে গৃহীত সংশোধনী এবং আদালতের বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে আমরা চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলেছি। অনেকের মতে, আমাদের বর্তমান সংকট এসব পাপেরই মাশুল।
দুর্ভাগ্যবশত অতীতের এসব ভুল থেকে আমরা যেন এখনো শিক্ষা গ্রহণ করিনি। আমরা এখনো ‘মেজরিটারিয়ান’ বা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর খাটিয়ে এবং মূলত বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছি। আমাদের আশঙ্কা যে বর্তমান সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলা-সম্পর্কিত বিষয়ই নয়, যদিও যারা খুনখারাবি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কতগুলো বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে এবং মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় মতৈক্যের ভিত্তিতেই সম্মিলিতভাবে জঙ্গিদের আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, জঙ্গি কারও বন্ধু নয় এবং বন্ধু হতেও পারে না। রাজনৈতিক হানাহানি ও দমন-পীড়ন সংকটকে আরও ঘনীভূতই করবে, যা জঙ্গিবাদের বিস্তৃতির জন্য উর্বর ক্ষেত্র বিস্তার করবে এবং জাতিকে বিপর্যয়ের দিকেই ঠেলে দেবে বলে আমাদের আশঙ্কা। এটাই আমরা মনে করি অজয় দাশগুপ্তর গবেষণার অন্তর্নিহিত বার্তা।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

Friday, November 13, 2015

তবু আলোচনায় বসুন by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শালীনতা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব নিয়ে বহু কথা বলা হয়েছে। এ দেশে যাঁরা শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ আছেন, তাঁদের অনেকে তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা বিভিন্ন সময় প্রতিপক্ষ দলের প্রধানদের চরিত্রহীন, খুনি, অশিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ, চোর-বাটপারসহ নানা বিশেষণে অভিহিত করেছেন। এসব গালাগালিতে আমরা এখন আর তাই চমকে উঠি না।
সমস্যা হচ্ছে, যখন এসব বলে কাউকে বর্জন করার চেষ্টা হয় এবং জাতীয় সংকটের কোনো বিষয়ে আলোচনা-সমঝোতার সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করা হয়। আমাদের মনে করার কারণ রয়েছে যে দেশ বর্তমানে এ ধরনের একটি সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে একের পর এক বিদেশি হত্যা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি অভাবিত বিষয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, এসবের সঙ্গে আইএস জড়িত আছে—এই প্রচারণা চালিয়ে সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো আক্রমণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার যড়যন্ত্র রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক মহলের এতে জড়িত থাকার সন্দেহের কথাও বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা বোঝার মতো যথেষ্ট তথ্য আমাদের কাছে না থাকলেও এটি উদ্বেগজনক।
এ ধরনের আশঙ্কা তিনি বা তাঁর দলের নেতারা বাংলাদেশে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের সফর বর্জনের পর থেকেই প্রকাশ করেছেন। এমন এক সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানানো তাই অনেকের কাছেই স্বস্তিকর মনে হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর যে উত্তর দিয়েছেন, তা বর্জনের রাজনীতির পরিচায়ক। তিনি খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, কোনো ‘খুনির’ সঙ্গে তিনি আলোচনায় বসবেন না। এ ধরনের বক্তব্যে তাঁর শক্তিমত্তা ও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ হতে পারে। দলের কট্টরপন্থীদের তা আরও চাঙা করে তুলতে পারে। কিন্তু কোনো স্বাভাবিক চিন্তার মানুষকে তা আশ্বস্ত করতে পারে না। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদকের কথায়ও। তিনি পরদিনই বলেছেন, রাজনীতিতে আলোচনার দুয়ার কখনো বন্ধ থাকতে পারে না। তিনি খালেদা জিয়াকে গঠনমূলক রাজনীতির পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, এটি করা হলে আলোচনা বা সংলাপের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে।
সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ এবং আশাব্যঞ্জক। আমরা যদি জাতীয় সংকটের চরিত্র, সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের ভূমিকা ও অতীত অভিজ্ঞতার নির্মোহ মূল্যায়ন করি, তাহলে বোঝা যাবে সংলাপ না হোক একটি সহনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি আজ কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
২.
আমাদের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও জনগণের বৃহত্তর একটি অংশ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে ছিটকে পড়েছে। অতীতে ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালেও এ ধরনের সংকট হয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনগুলোর পর নির্বাচন বর্জন করা রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত ছিল। বর্জনকারী রাজনৈতিক দলগুলো সমাবেশ, বাক্স্বাধীনতা চর্চা, হরতালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পেরেছিল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ স্বাধীনভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল এবং দেশের বিচার বিভাগ মোটামুটি স্বাধীনভাবে তার কাজ পরিচালনা করতে পেরেছিল।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বিএনপি দূরের কথা, অন্য কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলই তার স্বাভাবিক কর্মসূচি এখন পরিচালনা করতে পারছে না। মাত্র কিছুদিন আগে বাম মোর্চার কর্মীরা পরিবেশবিনাশী রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ পথযাত্রা কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের বেধড়ক হামলার শিকার হয়েছেন। দেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণও আগের তুলনায় বেড়েছে। নিম্ন আদালতে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের জামিনের আবেদন বাতিল হচ্ছে, অন্যদিকে বিনা প্ররোচনায় শিশুর পায়ে গুলিবর্ষণকারী আওয়ামী লীগের সাংসদের জামিন মঞ্জুর হয়েছে।
সংসদ এবং সংসদের বাইরে সরকারের এমন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এ দেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পরে বা সামরিক শাসন ছাড়া আর কখনো ছিল না। বিরোধী রাজনীতির চর্চা ও মুক্তভাবে মতামত প্রকাশ করার সুযোগ এভাবে রুদ্ধ থাকলে যড়যন্ত্রের রাজনীতি ডালপালা মেলতে থাকে, জঙ্গি বা উগ্রপন্থার বিকাশ ঘটে, দেশের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের স্বার্থান্বেষী মহলও এর সুযোগ গ্রহণের পরিবেশ পেয়ে যায়। বাংলাদেশে, দক্ষিণ এশিয়ায়, সারা বিশ্ব এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে, আরও ঘটার আশঙ্কা থাকাও তাই স্বাভাবিক হতে পারে।
সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি (সভা, সমাবেশ, ভিন্নমত ও সমালোচনার অধিকার) করার এবং অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ থাকলে দেশের ভেতরে কোনো মহল নাশকতা বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, এমন নজির পৃথিবীতে খুবই বিরল। এমন পরিস্থিতি থাকলে এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ন্যূনতম ঐক্য থাকলে বিদেশি কোনো মহল দেশের ভেতর কোনো যড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, এমন নজিরও নেই বললে চলে। ইয়েমেন বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাই বিদেশি যড়যন্ত্র যতটা সহজ, ভারত বা ইরানের বিরুদ্ধে তা কখনো সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রীর কথামতো যড়যন্ত্রের তথ্য বা আশঙ্কা সত্যি থাকলে তাই এটি নস্যাৎ করার জন্য হলেও দেশে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। ‘লিবিয়া বা সিরিয়া’ বানানোর মতো কোনো আশঙ্কা সত্যি থাকলে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বরং আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে স্বাভাবিক রাজনীতি ও সমাজচিন্তা চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে একমত যে বিরোধী দলকে গঠনমূলক রাজনীতি করতে হবে এবং সব সহিংসতা থেকে দূরে থাকতে হবে। কিন্তু আমরা এও যুক্ত করতে চাই যে গঠনমূলক রাজনীতির চর্চা দেশে অবাধে করা যাবে এবং ভবিষ্যতে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিরা দেশ চালানোর সুযোগ পাবেন—এমন আত্মবিশ্বাস বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকারকেই সৃষ্টি করতে হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে ২০১৪ সালেও বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে অনেকগুলো বড় জনসভা করেছে এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অনেকেই মনে করতে পারেন যে ২০১৫ সালে পেট্রলবোমা-নির্ভর বর্বরোচিত আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে অনেকাংশে দলটির সমাবেশ করার অধিকারকে পুলিশ আর দলীয় মাস্তানের মাধ্যমে ধূলিসাৎ করার মধ্য দিয়ে।
পেট্রলবোমার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই বিচার করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু তাই বলে এ জন্য হুকুমের আসামির নামে বিএনপির সব স্তরের নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার এবং জামিন নাকচ করে কারাবন্দী রাখা এবং বিএনপিসহ সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করা কোনো সুষ্ঠু সমাধান হতে পারে না। দেশে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের পথ একেবারে রুদ্ধ—এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে যড়যন্ত্র, হঠকারিতা ও উগ্র রাজনীতি বরং ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
৩.
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ বা সমঝোতা দেশের সংকটকালে কতটা জরুরি, তার বহু নজির আমাদের আশপাশে রয়েছে। বিহারে সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই সমঝোতার জোরে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উগ্র জোয়ার ঠেকিয়ে দেওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর প্রভাবে ভবিষ্যতে আসাম, উত্তর প্রদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেও ঐক্যের রাজনীতির বিজয় দেখা যাবে। পাকিস্তানে সামরিক শাসন এবং বৈদেশিক প্রভাব এড়াতে পিপিপি ও মুসলিম লিগ একে অপরকে সমর্থন করেছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের খবরদারি বা এর হুমকির জবাবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন বা তার সঙ্গে একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকলে বাংলাদেশের দুই দলকেও তাই গোপন বা প্রকাশ্যে আলোচনা করতে হবে।
তা ছাড়া, ‘খুনি’ বলে মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করারও কোনো যুক্তি নেই। নরেন্দ্র মোদি একসময় গুজরাটের কসাই, আসিফ আলী জারদারি মিস্টার টেন পার্সেন্ট এবং অং সান সু চি বিদেশি গুপ্তচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নানা অভিযোগ উঠেছিল। এঁদের সবাইকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মহলগুলো অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিতে মেনে নিতে বা তাতে ফিরে আসতে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
‘খুনি’ কেউ হয়ে থাকলে তাঁর বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক সুবিধাবাদী চিন্তা থেকে কাউকে বা কোনো দলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার চেষ্টা হলে এবং বিরোধীদের ওপর অবাধে দমন আর নিপীড়ন চললে দেশ বিভাজিত হয়, দেশের জনগণের অন্তর্নিহিত শক্তির ক্ষয় ঘটে এবং দেশের ভবিষ্যৎ যড়যন্ত্রকারীদের কালো জালে বন্দী হয়ে পড়ে।
আমাদের দুই প্রধান দলকে সৎভাবে চিন্তা করতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর বিনাশের চেয়ে দেশ বাঁচানোর চিন্তা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Thursday, November 5, 2015

রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য by আলী ইমাম মজুমদার

রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ সফরকালে বলেছেন, ‘রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেছেন, এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এবং এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এমনই কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিও। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্যে আমাদের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক মাত্রায় অংশগ্রহণের বিষয়টিকে বেদনাহত বলে উল্লেখ করেন। তিনি এটাও বলেন যে উন্নত দেশগুলোর আইনপ্রণেতাদের সিংহভাগ আইনের ছাত্র। আর আমাদের দেশে ঘটে চলছে এর বিপরীত ঘটনা। চলমান রাজনীতির এ দিকটির সুবিধাভোগীরা ছাড়া দেশে রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই।
রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার। রাজনীতিবিদেরাই হন দলের নীতিনির্ধারক, আইনপ্রণেতা কিংবা মন্ত্রী। তাঁরাই হন সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান। আমাদের উপমহাদেশে আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। তখন দুটি প্রধান দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত আইনজীবীরা। সমাজের অন্য পেশাজীবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থাকলেও মূল ভূমিকায় আইনজীবীরাই থাকতেন। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরাও অবশ্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করতেন দলগুলোকে। তাঁদের কেউ কেউ দলের নীতিনির্ধারণী পদ, আইনপ্রণেতা বা মন্ত্রী হয়েছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। তবে তুলনামূলক বিচারে তা ছিল অতি স্বল্প অনুপাতে। ছাত্রজীবনেই আইন পড়ে ওকালতি ও পাশাপাশি রাজনীতি করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন কেউ কেউ। সেভাবেই তাঁরা পেশা বা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্রিয়ও থাকতেন।
তখন ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা সন্তুষ্ট ছিলেন নিজ অবস্থানে। তবে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্য বা গোপনে একটি সুসম্পর্ক রাখার প্রয়োজন তাঁরা সব সময়ই অনুধাবন করে এসেছেন। আর রাজনৈতিক নেতারাও এ বিষয়ে তাঁদের বিমুখ করতেন না। গরজটা ছিল উভয় পক্ষেরই। দল চালাতে, নির্বাচন করতে টাকা লাগে। তা জোগান দিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরাই। এ ধরনের সম্পর্কের সুফল নিতেও ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা স্বাভাবিকভাবেই সচেষ্ট ছিলেন। রাষ্ট্রশক্তির শুভেচ্ছা তাঁদের প্রয়োজন হয়। আর সে শুভেচ্ছা আসতে পারে ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিকের কাছ থেকে। বিরোধী দলও কোনো সময়ে ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, এটাও তাঁদের অনেকেই বিবেচনায় রাখেন। আর সে বিবেচনা থেকেই বিস্তার ঘটান সম্পর্ক।
রাষ্ট্র পরিচালনা একটি ব্যাপক বিষয়। এর তিনটি প্রধান অঙ্গের দুটি হলো নির্বাহী বিভাগ ও জাতীয় সংসদ। সংসদীয় ব্যবস্থায় এ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব মূলত সরকারের। তাদের সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হয়। সরকার গঠিত হয় জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সাংসদদের মধ্য থেকে। তাঁরা সংসদের কাছে জবাবদিহিও করেন। সরকার পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন, করারোপ ও অর্থ বরাদ্দের কর্তৃত্ব জাতীয় সংসদের। রাজনীতিবিদেরা সমাজের সব স্তরের মানুষের চাহিদা সম্পর্কে অবগত। অনেক দেশেই তাঁদের অনেকে আইন পেশা থেকে আসেন। আমাদের ঐতিহ্যও তা-ই ছিল। আর আইন পেশা থেকে না এলেও তরুণ বয়স থেকে সারাক্ষণ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণাই থাকে তাঁদের। যেমনটা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কিংবা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতাদের।
তরুণ বয়স থেকে সারাক্ষণ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণাই থাকে তাঁদের। যেমনটা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কিংবা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতাদের তবে রাজনীতিতে এবং মূলত জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রবল আধিক্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাঁদের প্রতি অতিরিক্ত আনুকূল্য দেখানোর ঝুঁকি থাকে। একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে গত সময়ে কয়েকটি নির্বাচনের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ১৯৫৪, ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে নির্বাচিত সাংসদদের মাঝে ব্যবসায়ীদের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৪, ১৩, ৩৪, ৪৮, ৫১ ও ৬৩। তাহলে এতে কোনো ভিন্নমত পোষণের সুযোগ নেই যে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের হাতে ক্রমবর্ধমান হারে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে। অন্য পেশাজীবীরা ক্রমান্বয়ে চলে যাচ্ছেন প্রান্তিক অবস্থানে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সমাজের অত্যন্ত আবশ্যকীয় ও সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে বিনিয়োগের সুফলও ভোগ করেন বটে। তবে এর সুফল বহুমাত্রিক। প্রধানত কর্মসংস্থান হয়। তা ছাড়া, বিনিয়োগের ফলে দেশের ব্যাংক, বিমা, পরিবহন অবকাঠামোসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধির ধারা দেখা দেয়। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বেড়ে যায় ভোগ। এতে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ে। সরকার আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক পায়। এ শ্রেণিটিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আজ দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে, এতে তাঁদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সে ভূমিকা জোরদার করতে সরকার তাঁদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেয়। তবে নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ভূমিকার জন্য কোনো কোনো আনুকূল্যের মাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
আর রাজনীতিতে তাঁদের প্রবেশের বিষয়? তাঁরা জোর করে এ অবস্থানে আসেননি। ক্ষেত্রবিশেষে ডেকে আনা হয়েছে। রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এখানে অসংগত হবে না। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর দুটি সামরিক শাসনকালে ক্ষমতাসীনেরা নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে গিয়ে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের একটি অংশকে রাজনীতিতে টেনে এনেছেন। আবার তখনকার নির্বাচনগুলোও ছিল মূলত নিয়ন্ত্রিত এবং কোনোটা ভোটারবিহীন। তাই নির্বাচিত হওয়ার জন্য জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন হতো না। আবার অনেক পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদকে নিজের দলে নিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে বেশুমার ঋণ দিয়ে ব্যবসায়ী বানিয়ে ফেলা হয়। সে অগ্রযাত্রা আর থেমে রইল না। ১৯৯০-এর পটপরিবর্তনের পরেও রাজনীতি ক্রমান্বয়ে তাঁদের হাতেই যাচ্ছে। এর জন্য অবশ্য নিন্দুকেরা মনোনয়ন-বাণিজ্য নামের একটি অনাসৃষ্টির কথা বলে থাকেন।
সেটা যা-ই হোক, প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা যে আজ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, এটা তো তথ্যই বলে দিচ্ছে। আরেকটি দিক, ভালো ছাত্রদের রাজনীতির প্রতি অনীহা এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ রাজনীতির প্রতিকূল পরিবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় না আজ প্রায় সিকি শতাব্দী। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও একই রকম। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেও বেশ কিছু নেতা এসে রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং এখনো কেউ কেউ রাখছেন। তবে তাঁদের প্রকৃত উত্তরসূরি নেই বললে ভুল হবে না। তাহলে রাজনীতিবিদ আসবেন কোথা থেকে, এটা কি আমাদের সত্যিকারের রাজনীতিকেরা চিন্তা করেন না! রাজনীতিবিদ হঠাৎ করে হওয়া যায় না। এর জন্য অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে পথ পাড়ি দিতে হয়। এ অবস্থায় রাজনীতিকের শূন্যস্থান পূরণ করতে নিয়ে আসা হচ্ছে ব্যবসায়ী এবং সামরিক ও বেসামরিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের। অবশ্য রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে। অধিকার আছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও। তবে দেশের প্রধান দুটো দল এ বিষয়ে কোনো সচেতন উদ্যোগ না নিয়ে বরং বিপরীত ধারাতে চলছে বললে অত্যুক্তি হবে না। দেশকে বিরাজনীতিকরণের দায় তাদের ওপরও আসে।
রাষ্ট্রপতি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে। কিন্তু তা করতে হলে দেশের চলমান রাজনীতিকে নিয়ে আসতে হবে একটি মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানে। নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। দলগুলোর মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। থাকবে না শত্রুতা এবং অকারণে চরিত্র হননের প্রচেষ্টা। এমনটা করা গেলে দেশের সব শ্রেণি, পেশার উৎকৃষ্ট লোকেরাই রাজনীতিতে আসবেন। তাঁরা তাঁদের শ্রম ও মেধায় উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি করবেন দেশ ও জাতিকে। আর এর বিপরীতটা কী হয়, তার নজির আমাদের সামনেই রয়েছে। রাজনীতিবিদেরা নির্বাসিত হতে চলেছেন রাজনীতি থেকে। চালকের আসনে ক্রমান্বয়ে অবস্থান নিচ্ছেন ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে বাণিজ্য করতে এসেছিল। কিন্তু তখনকার ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ইত্যাদি সুযোগে তারা নিয়ে নেয় রাষ্ট্রক্ষমতা। সে সময়কার অবস্থার কথাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিবাজি-উৎসব’ কবিতায় লিখেছেন:
‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল পোহালে শর্বরী
রাজদণ্ডরূপে।।’
এ বক্তব্য আজকের পরিপ্রেক্ষিতেও প্রাসঙ্গিক। আমরা কিন্তু চাই রাজদণ্ড থাকুক রাজনীতিবিদদের হাতেই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই by আবুল মোমেন

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করছে। বলা হয়ে থাকে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চরম দুর্নীতির জন্ম দেয়। তবে দেখা গেছে, সর্বাত্মক ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি শোচনীয় হয়। প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের মর্মান্তিক হত্যা ও অপর তিনজনের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাতে সমগ্র জাতি স্তম্ভিত, শোকার্ত। দীপনের বাবা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত একজন শিক্ষক, একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে চরম শোকের মুহূর্তেও অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ মত ব্যক্ত করেছেন। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, হত্যাকারীদের শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই।’ তিনি বলেছেন, ‘আমি আইনে বিশ্বাস করি, তাই মামলা করব, কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড নিছক ধর্মীয় বিষয় নয়, এর পেছনে আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত আছে।’ এ সময় তাঁর শোকার্ত চেহারার আড়ালে একজন রক্ত-মাংসের বাবার মর্মান্তিক যন্ত্রণা ঢাকা থাকেনি। প্রত্যেক সংবেদনশীল মানুষ এই শোকার্ত বাবার সমব্যথী হয়েছেন। কিন্তু কী বললেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলের মুখপাত্রের ভূমিকা পালনকারী মাহবুব উল আলম হানিফ? তিনি তাঁকে উপহাস করলেন, প্রতিপক্ষ বানালেন?
একজন শোকার্ত বাবার ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তে উচ্চারিত বক্তব্যের গভীরতা বোঝার ক্ষমতা ক্ষমতায় থাকা মানুষের না-ও থাকতে পারে। কেননা, এই অবস্থায় অনেকেই কেবল ক্ষমতার বিচারেই পক্ষ-প্রতিপক্ষ হিসেবে পৃথিবীকে দেখতে জানেন। দৃষ্টি ও বিবেচনাশক্তিকে আরও একটু প্রসারিত করে এর নিকট ও সুদূরপ্রসারী কুশীলবদের দেখার মতো ক্ষমতা তাঁরা হারিয়ে ফেলেন। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর বক্তব্য যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এর ধাক্কা লাগবে আওয়ামী লীগের গায়ে। এসব গায়ে না মাখলে আখেরে দলের ও দেশেরও ক্ষতি। তাই শোকের পাশাপাশি সচেতন মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বেড়ে যায়।
যারা দীপনের মতো মুক্তমনা মানুষদের হত্যাযজ্ঞে নেমেছে, তারা কেবল বাংলাদেশে তৎপর তা নয়, ধর্মান্ধ মানুষের তৎপরতা ভারত-পাকিস্তানে যেমন আছে, আছে মধ্যপ্রাচ্যে-আফ্রিকায়, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও তাদের তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের চরমপন্থী মতাদর্শের উত্থানের সময় এবং তৎপরতার ক্ষেত্রগুলো বিচার করলে এর পেছনের উদ্দেশ্য আমরা বুঝতে পারব। সেই সূত্রে স্মরণ করিয়ে দেব মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিমভাবে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং সৌদি আরবের বর্তমান রাজবংশকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে তৎকালীন ইঙ্গ-যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার কথা।
এমনকি এই সেদিন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ভাঙার সূচনাকর্মটির ক্ষেত্র হিসেবে পোল্যান্ডকে বাছাই করা, সে দেশের একজন বন্দরশ্রমিক ওয়ালেসাকে নায়ক বানানো (আজ তিনি বিস্মৃত) এবং এই সময়ে পোলিশ বংশোদ্ভূত একজনকে পোপ বানিয়ে দূতিয়ালির কাজে লাগানোর গভীর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথাও স্মরণ করা যায়। এসবই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির চাল। তারা যেকোনো মূল্যে সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি থাকতে চায়।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ হয়নি। ইরান ও ভারতের মধ্যবর্তী ও চীনের নিকট প্রতিবেশী এই পাহাড়ি দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে কী করল? জঙ্গি ইসলামি তালেবানদের সমর্থন দিল, তাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে শক্তিশালী করে তুলল। পরবর্তীকালে মুসলিম-অধ্যুষিত বিরাট অঞ্চলজুড়ে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর জন্য তারা আল-কায়েদা সৃষ্টি করল। একসময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির অবসান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারির কাল শুরু হলো। গোত্রভিত্তিক সমাজটিতে অস্থিরতা দেখা দিল এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত সে দেশে এখনো শান্তি আসেনি, মুসলমানরা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে ব্যস্ত রয়েছে।
জজিরাতুল আরবে সৌদি বংশকে ক্ষমতায় বসিয়ে সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের দখল নিয়েছে। কে না জানে এসব রাজা-বাদশাহ ইসলামসম্মত জীবনাদর্শের পরিপন্থী ভোগবিলাসের জীবনেই অভ্যস্ত। তদুপরি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার তাঁবেদার আরও রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে তারা প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে। আরব-ইসরায়েল কোনো যুদ্ধেই সৌদি আরব অংশ নেয়নি। কিন্তু আরব বিশ্বের দুই স্বাধীনচেতা শাসক ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার আগ্রাসী বাহিনীকে সব রকম সহযোগিতা দিয়েছে সৌদি সরকার। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র সিরিয়া ছাড়া সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের বাইরে আর কোনো দেশ নেই। তাই ঠিক ইরাকের মতোই এখানেও শাসক পরিবর্তনের ধুয়া তুলেছে তারা। ঠিক আগের মতোই সৌদি আরব রয়েছে তাদের পাশে। ইরাক থেকে সিরিয়ায় অস্থিরতা নৃশংসতায় লিপ্ত জঙ্গি ইসলামি দল আইএস বা আইসিস সবই একসুতোয় গাঁথা।
ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের আদি উদ্গাতা কারা? বহুকাল ধরে আমাদের দেশের আলেম-মাওলানারা ওয়াহাবি পন্থা ও মওদুদিবাদীদের ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে এসেছেন। কারণ, এঁরা ইসলামের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা হাজির করে দেশে অনেককাল ধরেই অস্থিরতা সৃষ্টির কাজ করেছেন। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার কারণে বিচারে মওদুদির ফাঁসির রায় হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সে আদেশ মওকুফ হয়েছিল। একইভাবে তারা এ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিরোধিতা করে ক্ষান্ত হয়নি, পাকিস্তান সরকারের দোসর হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় দেশের চিন্তাবিদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। সেই সময়ও দখলদার পাকিস্তান সরকারকে মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখনো পরাজিত এই শক্তি বাঙালি মুসলমানদের চিরায়ত মানবিক ধর্মসাধনার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে অশান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে আখেরে কার লাভ? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এতে বিএনপি লাভবান হবে। কিন্তু কার্যত আওয়ামী লীগ-বিরোধিতার সূত্রে তখন সব ধারার ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তৎপর হয়ে এক হবে এবং তারা ক্ষমতার অংশীদার হবে এবং কিছুকালের মধ্যেই ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। যেহেতু ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র এবং তারা যেহেতু গণতান্ত্রিক কোনো মূল্যবোধেই বিশ্বাস করে না, তাই তাদের মধ্যে পরস্পর ব্যাপক সংঘাত অনিবার্য, যা ইরাক, আফগানিস্তানসহ মুসলিম দেশে দেশে চলছে। বিএনপি এই দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে ব্যর্থ হবে এবং দেশ চরম অস্থিরতা ও নৈরাজ্যে আবর্তিত হবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পরিণতি কী হয়—একনায়ক, নয় তো নৈরাজ্য?
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আকারে ছোট হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশটির ভূমিকা হতে পারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই আমরা দেখি, এ দেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে চীন-জাপানে প্রতিযোগিতা, ভারতের আগ্রহ, সহায়তার প্রতিযোগিতায় বিশ্বব্যাংকও এগিয়ে আসছে, যার অর্থ পশ্চিমও তাদের স্বার্থ দেখতে পাচ্ছে এখানে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক রকম চুক্তিতে আমাদের আবদ্ধ রাখতে চায়, নানা সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে আমাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে।
বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্কে আমরা তো জড়িয়ে আছিই। ফলে অস্থিরতার সুযোগ নেওয়ার পক্ষ রয়েছে অনেক। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মুসলিম দেশে ইসলামের জঙ্গি ব্যাখ্যা হাজির করে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপশক্তির অভাব কখনো হয় না। মনে হয় এরা ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় সাহিত্যের মর্ম উপলব্ধি করে পাঠ করে না। ফলে শক্তিশালী চতুর স্বার্থান্বেষীর দল এদের ব্যবহার করে নিজেদের সুদূরপ্রসারী স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে অতীতে এরা পারেনি। আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং ক্রমাগত অসহিষ্ণু দ্বন্দ্বের কারণে সমাজের অভ্যন্তরে নীরব প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এরা ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পেরেছে। তাতে রাজনৈতিক সংকট গভীর হয়েছে। এরা এই সংকটের সদ্ব্যবহার করে তলেতলে শক্তি সঞ্চয় করে এখন আঘাত করে চলেছে। এ সময়ে অতীতের মতোই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ দরকার এবং সেই সঙ্গে প্রকৃত আলেম-ওলামাদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
গুপ্তহত্যার ঘটনা ইসলামকে নিচে নামাচ্ছে। কারণ, ইসলাম নিশ্চয় এমন ধর্ম নয়, যা যুক্তির যুদ্ধে বিজয়ী হতে অক্ষম, যে ধর্মে অসির চেয়ে মসি এবং শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি শক্তিশালী ও পবিত্র বলা হয়েছে, সে ধর্ম কি জ্ঞান ও লেখনীর লড়াইয়ে অসমর্থ? মুসলিম সমাজ কি কাপুরুষের আচরণ চিনতে অপারগ? আর যা-ই হোক, ইসলাম কাপুরুষদের ধর্ম নয়, এসব ঘটনা এ ধর্মকে কলুষিত করছে। এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মমোহ’ কবিতার কথা মনে পড়ছে—
‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
....
বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে,
নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,’
ধর্মের মোহজালে জড়িয়ে এরা নিজে মরে, অন্যকে মারে এবং বারংবার নিজের ধর্মকেই অপমান করে যায়। শেষ দুই পঙ্ক্তিতে কবি বলেছেন:
‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’
কীভাবে জ্ঞানের আলোক আনব? ক্ষমতায় বসে কেবল বিএনপির ছায়া দেখে আঁতকে উঠলে হবে? আর শোকার্ত মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর বাক্য উচ্চারণ করলে চলবে? আমি মনে করি, সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনায় সম্পন্ন সামাজিক জাগরণ আজ অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। রাজনীতিকে সেটারই সহযোগী হয়ে পরিশুদ্ধ হতে হবে। তবেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের অভীষ্ট এমন এক মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েম করতে সক্ষম হব, যেখানে ইসলাম ও অন্য সব ধর্ম ও মত মর্যাদার সঙ্গে বিকশিত হতে সক্ষম হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

Tuesday, November 3, 2015

ব্র্যাকেটবন্দী বিএনপি, ব্র্যাকেটমুক্ত বিএনপি by সোহরাব হাসান

ভয়মুক্ত নন ক্ষমতাসীনেরা: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপি এখন সংসদের বাইরে। তারপরও জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৪ সালজুড়ে গণসংযোগ ও মহাসমাবেশ করে আসছিলেন। কিন্তু লন্ডন থেকে অদৃশ্য সুতার টানে কোথা থেকে কী হয়ে গেল। সেখান থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিহাস নিয়ে একেকটি অ্যাটম বোমা ছুড়তে থাকেন আর বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঘটতে থাকে। অবশ্য এই অ্যাটম বোমার পেছনে কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতার ‘জিয়ার আইএসআই সংযোগতত্ত্ব’ও কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
চলতি বছরের শুরুতে বিএনপির তিন মাসব্যাপী হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়ার পর দলটির প্রকাশ্য কার্যক্রম এখন দলীয় অফিসে রুটিন প্রেস ব্রিফিং, আদালতে মামলা মোকাবিলা এবং ঘরোয়া আলোচনা সভা বা সেমিনারের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে। তারপরও বিএনপি নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দারুণ উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যায় মন্ত্রী-নেতাদের বিরতিহীন বক্তৃতা-বিবৃতিতে। অনেকের মতে, নিষ্ক্রিয় বিএনপিকে এখন আওয়ামী লীগের নেতারাই ‘সক্রিয়’ রেখেছেন। চাঁদের যেমন নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের কাছ থেকে ধার করে, তেমনি বাংলাদেশে বিরোধী দলের জনসমর্থনের জন্যও নিজেদের কিছু করতে হয় না। ক্ষমতাসীনদের বাড়াবাড়ির কারণেই ‘মধ্যবর্তী’ ভোটাররা বিরোধী দলের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নিজস্ব ভোটব্যাংক যত সমৃদ্ধই হোক না কেন, তাতে ‘মধ্যবর্তী’ ভোট ছাড়া নৌকা কিংবা ধানের শীষ কারও জিতে আসা সম্ভব নয়। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর নির্বাচন সেটাই প্রমাণ করে। এই ‘মধ্যবর্তী’ ভোটাররা যে দলকে ভোট দিয়েছেন, সে দলই জিতেছে।
তাই, ক্ষমতাসীনেরা মুখে যতই বিএনপিকে জনগণ থেকে ধিক্কৃত ও নিন্দিত বলে বুলন্দ আওয়াজ তুলুক না কেন, ভেতরে-ভেতরে ভয় রয়েই গেছে। নাবিক বুদ্ধিমান হলে উজানে নৌকা না চালিয়ে অনুকূল স্রোত তৈরি করেন। অন্য দলের দোষ খোঁজার চেয়ে নিজ দলের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে তুলতে সচেষ্ট থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাসে ক্ষমতাসীনেরা সে রকম শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে হয় না। এমনকি তারা যে জনগণের নামে রাজনীতি করেন, সেই জনগণের রায়ের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল সব সময় থাকেন না। ফলে নির্বাচনে হেরে গেলেই তারা ভোট কারচুপির অভিযোগ আনেন এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তী পাঁচ বছর তারা সরকারকে রাজপথে ফেলে দেওয়ার আন্দোলনে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনেরা দায়িত্ব গ্রহণের পয়লা দিন থেকেই সবকিছু বিজয়ীর দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা পরস্পরের কাছ থেকে যে শিক্ষা নেন, তা হলো আমার জন্য যা অবশ্যকর্তব্য, তোমার জন্য তা হারাম। তোমার জন্য যা অবশ্যপালনীয়, আমার জন্য তা পরিত্যাজ্য। আমাদের দেশে সরকার ও বিরোধী দল এভাবেই ‘গণতান্ত্রিক কর্মসম্পর্ক’ গড়ে তুলেছে। তবে ৫ জানুয়ারির পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিএনপি যদি এতই গণধিক্কৃত ও নিন্দিত দল হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিয়ে প্রতিদিন মন্ত্রী ও নেতাদের গলা ফাটানোর প্রয়োজন পড়ে না। তাদের কৃত অপরাধ ও দুষ্কর্মগুলো সবারই জানা। কিন্তু সেসবের পরও কেন মানুষ ক্ষমতাসীনদের প্রতি বিরূপ, সেটি একবার চিন্তা করা উচিত। আওয়ামী লীগের বক্তৃতাবাজ নেতাদের বলব, বিএনপি নিয়ে ঘুম হারাম না করে একটু জনগণের সমস্যার দিকে নজর দিন। উন্নয়নের ঢক্কানিনাদের মধ্যেও ঢাকা শহর প্রায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শহরের রাস্তাঘাটের দুরবস্থা অবর্ণনীয়। ভিভিআইপি সড়ক ছাড়া সর্বত্রই খানাখন্দে ভরা। এ ব্যাপারে কি গণবান্ধব সরকারের কিংবা সরকারের বিশ্বস্ত দুই মেয়রের কিছুই করণীয় নেই?
খালেদা জিয়ার ফেরা না-ফেরা: গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর ফেরা না-ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন চলছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে যে বিচার–প্রক্রিয়া এড়াতেই তিনি লন্ডন গিয়েছেন এবং শিগগিরই দেশে ফিরছেন না। কিন্তু বিএনপির নেতাদের দাবি, তিনি চিকিৎসা ও ছেলেকে দেখতে লন্ডন গিয়েছেন এবং শিগগিরই দেশে ফিরে আসবেন। তবে বিএনপির কোনো কোনো নেতা এ কথাও বলছেন যে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া লন্ডনে গেলেও সেখানে দল ও রাজনীতি নিয়ে কথা হবে। যেহেতু তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান, সেহেতু সাংগঠনিক বিষয় এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতেই পারে। বিএনপি দীর্ঘদিন চলেছে স্থায়ী মহাসচিব ছাড়া। আগামী ডিসেম্বরে দলের সম্মেলন হলে অস্থায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেও কেউ কেউ আভাস দিচ্ছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন লন্ডন থাকতেই দেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। এই সময়েই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এতে আপিল বিভাগ কর্তৃক তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথ প্রশস্ত হলো। তাঁরা দুজনই রিভিউয়ের জন্য যে আবেদন করেছেন এবং তাও অবিলম্বে নিষ্পত্তি হবে আশা করা যায়। এরই মধ্যে ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলা ঢাকায় ও ৩ অক্টোবর জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি রংপুরে আততায়ীর হাতে নিহত হন। ক্ষমতাসীনদের দাবি, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তাঁরা বিএনপির প্রতিই সন্দেহের তির ছুড়ছেন। কুনিও হোশি হত্যার ঘটনায় যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীও আছেন। তবে তদন্তকারী সংস্থা এখনো হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বিএনপি নেত্রীর নাম ধরে অভিযোগ করছেন। এ অবস্থায় তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা চলছে। কেউ বলছেন, তিনি শিগগিরই ফিরে আসবেন। আবার কারও মতে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।
এদিকে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন করার সিদ্ধান্তকে বিএনপি দুরভিসন্ধিমূলক বললেও শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারপারসনই। ডিসেম্বরে দুই শতাধিক পৌরসভায় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী মনে করেন, চ্যালেঞ্জ হিসেবে হলেও নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া উচিত। নির্বাচনী প্রচারের সুযোগে দলের প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ পাবেন। বিএনপি নির্বাচনে গেলে ভালো ফল করবে বলেও আশাবাদী তাঁরা। নির্বাচনে না গেলে সরকার এ কথা বলার সুযোগ পাবে যে জামায়াতে ইসলামীর কারণেই বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী জামায়াত দলীয়ভাবে কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
ব্র্যাকেটবন্দী-ব্র্যাকেটমুক্ত: সম্প্রতি দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের নেতারা সেটিকে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কাজ বলে অভিযোগ করেছিলেন। এ বিষয়ে ডেইলি স্টার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেছেন, ‘সব ব্যাপারে বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দী করা উচিত নয়। বিএনপি জামায়াতের রাজনীতি করে না। বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি আছে। সে অনুযায়ী বিএনপি চলে। গণতন্ত্র উদ্ধারে বিএনপি যে ২০-দলীয় জোট করেছে, জামায়াত তার একটি শরিক মাত্র। এর আগে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তাই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিকে ব্র্যাকেটবন্দী করা ঠিক নয়।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির জোট নিয়ে দলের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে নানা প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। দলের উদারপন্থীরা মনে করেন, মৌলবাদী এই দলটির সঙ্গে জোট বেঁধে বিএনপি লাভবান হয়নি। তাঁরা মনে করেন, বিএনপির উচিত সময় ও সুযোগমতো জামায়াতকে ত্যাগ করা। বিএনপি যে সরকারবিরোধী সব শক্তিকে এক করতে চাইছে, তারও অন্তরায় জামায়াত। তাদের ধারণা, বিএনপি জামায়াতকে ছাড়লেই সরকারবিরোধী বৃহত্তর মোর্চা হতে পারে। আর সেটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই নয়, জামায়াত যে রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি পোষণ করে, তা কখনোই গণতন্ত্রের সহায়ক নয়।
পত্রিকায় খবর দেখলাম, বিএনপি নেত্রী নাকি জামায়াতকে সংস্কারের জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়েই দল করার কথা বলেছেন। তাঁর সেই যুক্তি মেনে নিলে বিএনপির ভেতরের সংস্কারটি আরও বেশি জরুরি। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরও তাঁকে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ না দেওয়া সংস্কারের লক্ষণ নয়।
বিএনপি নেতারা স্বীকার করুন আর না-ই করুন, পাঁচ বছরের জোট সরকারের শাসন এবং নয় বছরের জোটীয় রাজনীতি বিএনপি নিজেকে জামায়াতের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দী করে ফেলেছে। এই ব্র্যাকেট মুক্ত করতে হলে কেবল মুখে বিএনপির রাজনীতি আলাদা বললে হবে না, কাজেও তার প্রমাণ দিতে হবে। সেটি কীভাবে সম্ভব? প্রথমত, বিএনপিকে প্রকাশ্যে বলতে হবে, তারাও যুদ্ধাপরাধের বিচার সমর্থন করে। দ্বিতীয়ত, দলে যেসব যুদ্ধাপরাধী আছেন, তাঁরা দণ্ডিত হোন বা অভিযুক্ত, তাঁদের দল থেকে বের করে দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় থাকাকালে দলের যেসব নেতা-কর্মী জঙ্গিবাদীদের মদদ দিয়েছেন, নানাভাবে সহায়তা করেছেন, যাঁরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার জোগানদার হয়ে কাজ করেছেন, যাঁরা জজ মিয়া কাহিনি বানিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।
কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বের পক্ষে সেটি করা সম্ভব হবে না, যদি না তাঁরা লন্ডনের গ্রিন সিগন্যাল পান। তত তিন হয়তো বিএনপিকে ব্র্যাকেটবন্দী হয়েই থাকতে হবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

Wednesday, October 14, 2015

নিখোঁজ সাংসদ, এলোপাতাড়ি মন্ত্রিকুল by শাহদীন মালিক

প্রায়ই মাননীয় মন্ত্রিকুলের বক্তব্যে আমরা যেকোনো ইস্যুর ভিন্ন ভিন্ন দিকের ব্যাপারে আলোকিত হয়ে হরহামেশা পুলকিত হই। নিকট অতীেত বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল টক শোগুলোতে কোনো একটা বিষয়ে বা ইস্যুতে আলোচনা করার জন্য টক শো ভেদে দু-তিন-চারজনকে ডাকত। অংশগ্রহণকারীরা কেউ সাংবাদিক, কেউ বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এনজিও কর্মকর্তা ইত্যাদি। এই হরেক গোছের অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত তুলে ধরতেন। আইনজীবীরাও সুযোগ পেতেন, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও মাঝেমধ্যে সামরিক কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী—সবাই থাকতেন ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলের বিভিন্ন টক শোতে। মতবিরোধ হতো, বাহাস হতো, দু-চারবার গালমন্দও যে হয়নি তা-ও নয়। সব হয়েছে। ধারণা হয়, টক শোগুলো বেশ ‘পপুলার’ হয়ে উঠেছিল।
টক শোতে অংশগ্রহণকারীর ভিন্ন ভিন্ন মতামতের প্রভাব—ধারণা হয়—মন্ত্রিকুলের ওপর আছর করেছে। টক শোর অংশগ্রহণকারীরা যেহেতু একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিতেন, তর্ক-বিতর্ক-বাহাস করতেন এবং মতানৈক্যের কারণেই তাঁদের পপুলারিটি—এই চিন্তা থেকেই পপুলার হওয়ার জন্যই বোধ হয় মন্ত্রিকুল একই বিষয়ে বিভিন্ন মতামত বিশ্লেষণ জাতিকে উপহার দিচ্ছেন।
অধমের এই মূল্যায়নের ভিত্তি হলো ইদানীং দুই বিদেশি হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, সে ব্যাপারে মাননীয় মন্ত্রিকুলের মতামত ও বিশ্লেষণ। টক শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা কস্মিনকালেও যেমন একে অপরের সঙ্গে একমত হতে চাইতেন না, তেমনি আজকাল মন্ত্রিকুলও বোধ হয় পণ করেছেন ভিন্নমত পোষণ করবেনই। একজন যদি বলেন যে আইএস আছে, তো অন্যজন বলেন নেই। কেউ বলেন বিদেশি জঙ্গি, আর কেউ বলেন দেশি। কারও মতে গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, কারও মতে দেশীয় চক্রান্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, সাবেক এক প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে দেশকে অস্থিতিশীল ইত্যাদি করার জন্য—ইত্যাদি।
বলা বাহুল্য, আগের টক শো আর নেই। মন্ত্রীরাই তো তার্কিকের জায়গা নিয়ে নিয়েছেন। যেহেতু মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনলেই আপনি যেকোনো ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ পাবেন, তাই আজকাল টক শো দেখা কমে গেছে। চ্যানেলওয়ালারাও সেটা টের পেয়েছে। তাই টক শোগুলোতে আজকাল মতৈক্যই বেশি। কেউ হয়তো সরকারি দলের কট্টর সমর্থক, কারও সমর্থন কিছুটা প্রচ্ছন্ন। অতটা প্রকট না। এই সুযোগে মাননীয় মন্ত্রিকুলকে গায়ে পড়ে একটু সাবধান করে দিই। টক শোগুলোতে আজকাল যে নির্জলা-নির্ভেজাল তোষামোদি হয়, তাতে একটু খেয়াল রাখবেন ওই টক শোওয়ালারা আপনাদের না আবার গদিশূন্য করতে লেগে পড়ে।
প্রশ্ন জাগে, আপনারা কেমনে জানলেন, কারা এই দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখে রা নেই। ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে কুল্লে চার দিন পরেই নিস্তার। ১০ দিন রিমান্ড শেষে আরও রিমান্ড চাওয়াই যেখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে বিদেশি হত্যায় চার দিনেই রিমান্ড শেষ।
সচরাচরের মতো এবং অন্য সরকারগুলোর সময়ের মতো যেসব মন্ত্রী বেশি সবজান্তা, তদন্তের ভার তাঁদেরই নেওয়া উচিত। বিদেশিরা নিঃসন্দেহে শঙ্কিত। বিভিন্ন রঙের অ্যালার্ট তাঁরা জারি করে বসে আছেন। বায়াররা বিদেশে মিটিং ডাকছে। অধম ধানমন্ডিতে মিটিং ডাকলাম, গুলশান থেকেই আসতে চায় না। বলে, এখন বারণ আছে। সেটা ছিল বিজিবি নামার আগে। ধারণা করছি, জানালার পর্দা সরিয়ে টহল যান একেবারে তাঁদের গুলশান-বারিধারার অ্যাপার্টমেন্টের জানালার নিচে দেখে তারা ধানমন্ডি তো নয়ই, হয়তো হজরত শাহজালালমুখী হবেন। খোদ রাজধানীতে দিনদুপুরে সান্ত্রিবাহী বিরাট বিরাট গাড়ি দেখে তাঁরা যদি ভাবেন যে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ দেশে থাকা নিরাপদ নয়, তাহলে অন্তত অধম তাঁদের দোষারোপ করব না। আর বিদেশি গণমাধ্যমে রাজধানীর গুলশান-বারিধারায় যদি সামরিক পোশাকে বিজিবির টহল দেওয়ার ‘ফুটেজ’ প্রচারিত হয়? পরিণতি পাঠকেরাই সহজে অনুমান করতে পারবেন।
২.
টক শোগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা কস্মিনকালেও যেমন একে অপরের সঙ্গে একমত হতে চাইতেন না, তেমনি আজকাল মন্ত্রিকুলও বোধ হয় পণ করেছেন ভিন্নমত পোষণ করবেনই। একজন যদি বলেন যে আইএস আছে, তো অন্যজন বলেন নেই। কেউ বলেন বিদেশি জঙ্গি, আর কেউ বলেন দেশি সরকারদলীয় সাংসদ, স্পষ্টতই অপরাধে অভিযুক্ত—তাঁকেই পুলিশ খুঁজে পায় না বেশ কিছুদিন ধরে। গোলাগুলি করা তাঁর নাকি বেশ কিছুকালের অভ্যাস (‘সামান্য ঘটনায় গুলি করা তাঁর স্বভাব’ শিরোনামে ১১ অক্টোবর, ২০১৫-এর প্রথম আলোর তৃতীয় পৃষ্ঠার খবর দ্রষ্টব্য)। যেহেতু মাননীয় সাংসদ, সেহেতু পুলিশের কাছে তাঁর নাম-ঠিকানা, ছবি, ফোন নম্বর—সবই থাকার কথা। তা-ও তারা পাচ্ছে না। অবশ্য ইতিমধ্যে অনেক সংবাদকর্মীই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেকেই জানেন। জানে পুলিশ।
গ্রেপ্তার না করার সম্ভাব্য কারণ তিনটি। প্রথমত, অদক্ষতা। খুঁজেই পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, পেয়েও গ্রেপ্তার করছে না—আর্থিক বা অন্য কোনো তদ্রূপ কারণে। তৃতীয়ত, ‘রাজনৈতিক নির্দেশ’ নেই। কারণ, এক বা একাধিক যেটাই হোক, জনমনের নিরাপত্তার জন্য কোনো কারণই আস্থার সৃষ্টি করে না। অদক্ষ পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে না। অথবা দক্ষতা থাকলেও তারা যদি আর্থিক অথবা রাজনৈতিক কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে অর্থ বা রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা জনগণের জন্য পুলিশ সহায়ক নয়।
আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতন তো আছেই। বিদেশি হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা হবে বলে অধম আশাবাদী নয়। বলা বাহুল্য, এ হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা আমরা সবাই চাই। বিদেশিরাও আশ্বস্ত হবে, ভরসা পাবে, বিদেশিদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বহাল থাকবে। কিন্তু এত কিছু পাব কি এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে? তবে আশায় থাকতে দোষ কী।
৩.
বিভিন্ন জাতির হরেক গোছের আর্কাইভ থাকে। বর্তমানকাল ভিডিওর যুগ। সবার মুঠোফোনে আজকাল ভিডিওর সুব্যবস্থা আছে। তাই অধমের প্রস্তাব—আমরা একটি ঘুষের ভিডিও আর্কাইভ চালু করি। প্রথম আলো (৯ অক্টোবর, প্রথম পাতার খবর) বলছে, ‘গুনে গুনে ঘুষ খান তিনি’-এর ছয় মিনিটের ভিডিওটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে, বিশেষত যাঁরা ঘুষ দেবেন, তাঁরা যদি তাঁদের ঘুষ প্রদানের ভিডিও চিত্র গ্রহণ করেন এবং আপাতত সেটা কখন কীভাবে দেখা যাবে, সে খবর প্রচার করেন, তাহলে ‘বক্স অফিস হিট’ না হলেও উৎসাহী দর্শকের কমতি হওয়ার কথা নয়।
বলা বাহুল্য, এরূপ ভিডিও সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে আদালতে পাত্তা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যল্প। মাঝপথে আছে দুদক নামক প্রতিষ্ঠান, সেই প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ ঘুষ নেওয়া-দেওয়ার ভিডিওটা নেহাত আর্কাইভে সংরক্ষণের জন্য।
তবে হ্যাঁ, যদি এ দেশে কখনো আইন, বিচার ইত্যাদি ফেরত আসে, ঘুষ-দুর্নীতি আবার খারাপ বলে বিবেচিত হয়; দুদক সাফাই সার্টিফিকেট দেওয়ার পরিবর্তে ঘুষখোরদের সন্ধান করে, নির্বাচন কমিশন আসলেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৫-১৬ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিবর্তে ভোটার তালাশ করে, ইত্যাদি ইত্যাদি যদি হয়, তখন নাহয় ভিডিও দেখে ঘুষখোর খোঁজা হবে।
আইনের শাসন আর গণতন্ত্র ছাড়া পৃথিবীর দু-তিনটি দেশে উন্নতি হয়েছে। আর তাই দেখে গত ৫০ বছরে শ খানেক দেশ আইন আর গণতন্ত্র ছাড়াই উন্নতি করার পথ ধরেছিল। হয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, কঙ্গো, রুয়ান্ডা, নাইজেরিয়া, সুদান—অগায়রা, অগায়রা। প্রায় কেউই পারেনি। আমরা কি পারব উন্নতি করতে? আইন অমান্যকারী সাংসদেরা কি ধরা পড়বেন?
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

Saturday, October 10, 2015

বাম জাগছে: সত্যি না কল্পনা? by হাসান ফেরদৌস

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কয়েক দিনের জন্য নিউইয়র্কে এসেছিলেন। মেয়েকে কলেজে ভর্তি করানোর কাজ ছিল, সেটা সেরে প্রবাসের বাঙালিদের সঙ্গে বার দুয়েক মতবিনিময়ে অংশ নিলেন। সেখানেই শুনলাম, সিপিবি এখন দুর্দান্ত অবস্থায় রয়েছে। দেশের প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্বেই তারা। সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চ—সর্বত্রই কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। সে কথা শুনে আমরা কেউ কেউ ঢোঁক গিলছি, তা ঠাহর করায় সেলিম ভাই বোঝালেন: চুলায় ভাত রান্না হচ্ছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি সেদ্ধ হয়নি। হলেই সে খবর আপনারা জানতে পারবেন।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি জানালেন। বঙ্গবন্ধু নাকি একসময় সেলিম ভাইকেই সরাসরি বলেছিলেন, তোদের, অর্থাৎ কমিউনিস্টদের বুদ্ধি আছে, কিন্তু আক্কেল নেই। ‘এখন আমরা আক্কেলমন্দ হওয়ার পথে আছি।’ বললেন সেলিম ভাই।
চলতি রাজনীতি নিয়েও কিছু কথা বললেন। আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্রের পথে আসার বুদ্ধি দিলেন, বিএনপিকে বললেন জামায়াত ছাড়ো। বামপন্থী বিভিন্ন দলকে এক হওয়ার আহ্বান জানালেন, কিন্তু এক হওয়ার ডাক প্রকাশ্যে কেন দিচ্ছেন না, সে কথার ব্যাখ্যা অবশ্য খুব স্পষ্ট হলো না। আশ্বাস দিলেন, খুব শিগগির দেশের মানুষ জেগে উঠবে, দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে। তবে আর যা-ই হোক, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের গাঁটছড়া বাঁধার সম্ভাবনা নেই।
বাম জাগরণের এ কথা কতটা সত্যি, কতটা কল্পনা, সে বিতর্কে যাব না। সেলিম ভাই ছাত্রজীবনে আমার নেতা ছিলেন, তাঁর প্রতিটি কথা হাঁ করে গিলতাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, তিনি কান্ডারি হয়ে এগিয়ে এসেছেন। তাঁর চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান সতীর্থরা অবশ্য সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন মন্ত্রী বাহাদুর। অনুমান করি, চাইলে তিনিও সে কোটায় ঢুকে পড়তে পারতেন।
একসময় কমিউনিস্টরা আমাদের নতুন বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ত্যাগী, আদর্শবান নেতা-কর্মীর অভাব ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর যে দেশেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দেখল করেছে, সেখানে নতুন বিশ্ব গড়ার বদলে নিজেদের পকেট ভরেছে, আর বিরোধী সবাইকে হয় গুলির সামনে পাঠিয়েছে, অথবা জেলে পুরেছে। আমি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলছি না, সে দেশের কথা সবাই জানেন। চীন থেকে কিউবা, ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেন, সর্বত্র একই দৃশ্য। আর আঙুল ফুলে কলাগাছ? একসময়ের মহা বাম নিকারাগুয়ার দানিয়েল অরতেগা এখন সে দেশের নব্য ধনীদের শিরোমণি। প্রমাণের জন্য অত দূর নয়, পাশের বাড়ির বাম নেতা জ্যোতি বসুর সুযোগ্য পুত্র চন্দন বসুর আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার উদাহরণটা মনে রাখলেই চলবে। বস্তুত, ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেন—যেখানেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছে, দেশটা চিড়ে-ছিবড়ে খেয়ে তারপর মানুষের দাবড়ানি খেয়ে ইঁদুরের গর্তে ঢুকেছে।
ইউরোপের বাইরে লাতিন আমেরিকায় একটি শক্ত বাম হাওয়া বইছে দীর্ঘদিন থেকেই। ব্রাজিল, বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলায় সরকার জনগণতন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য অবলুপ্তি ও বৈষম্য হ্রাস কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হয়তো হয়েছে, কিন্তু বিশ্বকে বদলানোর যে কথা একসময় কমিউনিস্টরা বলতেন, তা যে উবে গেছে, তা মোটেই নয়। কমিউনিস্ট শব্দটা এখন আর তেমন সম্মানজনক নয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের রাজা-বাদশাহদের হাতের রক্ত বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্টের হাতেও লেগে রয়েছে। বিলম্বে হলেও নিজেদের পাপমুক্ত করতে পৃথিবীর অনেক দেশেই কমিউনিস্ট পার্টির বদলে গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। বিপ্লবের বদলে তারা এখন পরিবর্তনের কথা বলে, যে পরিবর্তনের লক্ষ্য নাগরিক অধিকারের সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অসাম্যের অবসান। কমিউনিস্টরা এই পরিবর্তনটাই চাইত, কিন্তু কোথাও তারা সেই স্বপ্ন পূরণে যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারেনি। আশার কথা, কমিউনিস্টদের সেই স্বপ্ন পূরণে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছে এক ‘নতুন বাম’।
আমেরিকার কথা ভাবুন। লেনিন আমেরিকার কথা মাথায় রেখেই সাম্রাজ্যবাদকে ধনতন্ত্রের শেষ পর্যায় বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই আমেরিকায় এখন যে লোকটি দেশের মানুষকে এক ভিন্ন ধরনের গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তিনি নিজেকে কোনো রাখঢাক ছাড়াই ‘সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে পরিচিত করান। ভারমন্টের প্রবীণ স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এ দেশের ‘বিলিয়নিয়ার ক্লাস’-এর বিরুদ্ধে তাঁর নিজস্ব ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছেন। এ দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ওয়ালস্ট্রিটের ধনকুবেরদের আধিপত্য ভেঙে দেওয়ার জন্য তিনি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। অসাম্যের শিকার দরিদ্র শ্রেণি এবং বৈষম্যের শিকার অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে জনমত গড়ার এক কঠিন লড়াইয়ে অংশ নিতে দেশের মানুষকে ডাক দিয়েছেন। আমেরিকার আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থিতার জন্য লড়াই করছেন। তিনি সেই মনোনয়ন পান অথবা না পান, তাঁর জনপ্রিয়তার কারণেই দলের প্রধান প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন নিজের এজেন্ডা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন, অসাম্য হ্রাসের পক্ষে ও অভিবাসী অধিকারের সমর্থনে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রণকৌশলের দিক দিয়ে গ্রিসের সিরিজা পার্টি কোনো রাখঢাক ছাড়াই বামপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছে। অথবা স্পেনে পদেমোস পার্টি তাত্ত্বিক শুদ্ধতার কথা ভেবে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তবর্তী মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সিরিজার প্রধান এলেক্সি সিপরাস ও পদেমোসের প্রধান পাবলো ইগ্লেশিয়াস একসময় যাঁর যাঁর দেশের যুব কমিউনিস্ট লিগের সদস্য ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ব্যয় সংকোচন’ নীতির চাপে চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে আসা প্রান্তবর্তী মানুষের সংখ্যা এ দুই দেশে ক্রমেই বাড়ছে। তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে সরকারি খাত সংকোচনের বদলে তা সম্প্রসারণের পক্ষে তাঁরা। তাঁরা উভয়েই সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমার পক্ষে, সবার ওপর সম্পত্তি কর আরোপের বদলে শুধু ধনিক শ্রেণি, বিশেষত যাঁদের একাধিক বাড়ি আছে, তাঁদের ওপর ধার্য করার নীতি তাঁরা প্রস্তাব করেছেন। এই নীতিকে যদি কেউ কমিউনিস্ট বলে, তাতে ক্ষতি নেই। চীনা নেতা দেং শিয়াও পিংই তো বলেছিলেন, বিড়ালটা কালো না সাদা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো তা ইঁদুর ধরতে পারে কি না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর খবর এসেছে আমেরিকার ‘ছোট ভাই’ ব্রিটেন থেকে। সেখানে প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন জেরেমি করবিন। তিনি এ দলের সবচেয়ে পরিচিত, সবচেয়ে পরীক্ষিত বাম নেতা। সিরিজা ও পদেমোসের মতো তিনিও সরকারি খাতের সম্প্রসারণ চান, অভাবীদের জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’ বাড়াতে চান এবং চলতি রক্ষণশীল সরকারের ‘ব্যয় সংকোচন’ নীতি আমূল বদলে দিতে চান। এমনকি তিনি ব্রিটেনের প্রধান শিল্পসমূহের রাষ্ট্রীয়করণ ও আণবিক অস্ত্রভান্ডার পুরোপুরি বাতিল করতে চান। এর চেয়ে অধিক বামপন্থী—কারও কারও ভাষ্যে কমিউনিস্ট—কর্মসূচি আর কী হতে পারে? আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালেও বামপন্থীরা জনমত জরিপে এগিয়ে।
ইউরোপের বাইরে লাতিন আমেরিকায় একটি শক্ত বাম হাওয়া বইছে দীর্ঘদিন থেকেই। ব্রাজিল, বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলায় সরকার জনগণতন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য অবলুপ্তি ও বৈষম্য হ্রাস। তবে এ কথাও যোগ করা ভালো, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে এসব দেশে একনায়কতন্ত্রী একটি লক্ষণ ফুটে উঠছে। বাড়ির পাশে পশ্চিম বাংলায় বামপন্থীদের পতনের সেটি ছিল অন্যতম কারণ।
বামপন্থীদের এই উত্থান, যা মোটেই কল্পনা নয়, তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আসলে তথাকথিত বিশ্বায়নের চাপে সর্বত্রই ক্ষমতার মেরুকরণ ঘটছে। প্রতিটি দেশেই মাত্র ১-২ শতাংশ মানুষের হাতে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদই নয়, সব রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অক্সফামের হিসাব অনুসারে, ২০১৬ সালের মধ্যে বিশ্বের সব সম্পদের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করবে এই ১ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পদ। বাংলাদেশের চিত্র যে এ থেকে ভিন্ন নয়, সে কথা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানে?
এই পাহাড়সমান অসাম্যের কারণেই একসময় ফ্রান্সে বিপ্লব হয়েছিল। বিপ্লব হয়েছিল রাশিয়ায় ও চীনে। তথাকথিত মূলধারার দলসমূহ—যেমন: আমেরিকার রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টি, ব্রিটেনের লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টি বা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—তারা বরাবরই ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছে, ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। এই অবস্থায় অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশের পক্ষে যারা, অবাক কী, দেশের মানুষ তাদের দিকেই ঝুঁকবে।
সেলিম ভাই ভাত সেদ্ধ হওয়ার যে উপমাটি ব্যবহার করেছেন, এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রাখলে তার অর্থ পরিষ্কার হয়। দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা ও ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে রণকৌশল। সিরিজা ও পদেমোসের সাফল্যের সেটিই কারণ। তারা উভয়েই নিজেদের কর্মসূচির সপক্ষে রাজনৈতিক জোট গড়তে সক্ষম হয়েছে।
নিজের শত্রু-মিত্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তেমন ইস্যুভিত্তিক কোয়ালিশন বাংলাদেশের বামেরাই বা পারবে না কেন? ভাত যদি সেদ্ধ হতে হয়, তাহলে চুলায় হাঁড়ি বসানোর আগে এই জোগাড়যন্ত্রটুকু অত্যন্ত জরুরি। তবে এর জন্য যে আক্কেল দরকার, সন্দেহ হয়, আমাদের কমিউনিস্টদের তা এখনো হয়নি।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

Monday, October 5, 2015

বিদেশি হত্যায় বিএনপি ও জামায়াতের মদদ আছে -সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
*দেশে রাজনৈতিক সংকট নেই। বিদেশি রাষ্ট্রনায়কেরাও সরকারের বৈধতা কিংবা নির্বাচনের বিষয়ে প্রশ্ন করেননি
*এতই যদি রাজনৈতিক সংকট থাকত, তাহলে বাংলাদেশ এলডিসির নেতৃত্ব কীভাবে পেল?
ইতালি ও জাপানের নাগরিক হত্যাকাণ্ডে বিএনপি-জামায়াতের হাত থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি মনে করেন, এ ঘটনায় সরকারের সব অর্জন ম্লান হয়ে যায়নি। বিদেশি নাগরিকদের হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে দেশে ফেরার পর গতকাল রোববার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি-জামায়াতের যোগসূত্র বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ঘটনার পেছনে নিশ্চয়ই তাদের মদদ আছে। আমাদের অর্জনগুলো ম্লান করার জন্য এ ঘটনাগুলো ঘটানো হয়। এটার পেছনে নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে। তাদের হাত আছে।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘দুজন বিদেশি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের হত্যার স্টাইলটা একই রকম। ইতালির নাগরিককে চারটি গুলি মারা হয়েছে। একটা গুলিও মিসফায়ার হয়নি। চারটা গুলিই লাগল। এটা সুপরিকল্পিত। আমি স্মরণ করাতে চাই এর আগে বিএনপির এক নেতার বক্তব্য। এরপর তাঁর রি-অ্যাকশন। সেগুলো যদি মিলিয়ে দেখেন, তাহলে জিনিসটা খুব স্পষ্ট হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। তারাই পঁচাত্তরের পর ২১ বছর ক্ষমতায় ছিল। আজকে তাদের যখন বিচার হচ্ছে, কিছু রি-অ্যাকশন তো হবেই। এখানে কিছু গণসচেতনতা দরকার।’
প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন বেলা সাড়ে ১১টায়। প্রথমে তিনি লিখিত বক্তব্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে যোগদান, বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেওয়া এবং সরকারের নানা অর্জন তুলে ধরেন। এরপর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেন, দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই। বিদেশি রাষ্ট্রনায়কেরাও সংকটের কথা বলেননি। সরকারের বৈধতা কিংবা নির্বাচনের বিষয়েও কেউ তাঁকে প্রশ্ন করেননি। প্রধানমন্ত্রী বেতন ও মর্যাদার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের ব্যাপারে বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করার আহ্বান জানান।
বড় অর্জন বাদ দিয়ে ছোট দুর্ঘটনা নিয়ে বেশি সংবেদনশীল না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানেই থাকি, এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। যখন যে ঘটনা ঘটছে খবর পাচ্ছি। ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছি। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। কাজেই আমি আপনাদের বলব, সব অর্জন একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল এ ঘটনায়; এই যদি আপনাদের চিন্তাভাবনা হয়, তাহলে আমার মনে হয়, ওই বিএনপি-জামায়াত রাজাকারদের যে উদ্দেশ্য, সেটাই সফল।’
প্রধানমন্ত্রী অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল না আসার প্রসঙ্গে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল যে এল না, অস্ট্রেলিয়ায় কী ঘটল? সেখানেও সঙ্গে সঙ্গে দুজনকে গুলি করে মারল। আমি জানি না, আমাদের মিডিয়াগুলো হাইলাইট করেছে কি না। অস্ট্রেলিয়া কী জবাব দেবে? যেসব দেশ বাংলাদেশে একজন হত্যার পর রি-অ্যাকশন দেখাল, তারা অস্ট্রেলিয়ার এই হত্যাকাণ্ড এবং আমেরিকার স্কুলে গুলি করে হত্যার পর কী করল? তারা কি সেখানে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে, এখানে রেড অ্যালার্ট হয়ে গেছে? আমরা একটা ঘটনা ঘটলে বেশি সেনসেটিভ হয়ে যাই। অর্জনগুলো যেন শ্যাডো হয়ে গেল। অর্জনগুলো হারিয়ে গেল। আমরা এত মানসিক দৈন্যে কেন ভুগি?’
গবেষণায় এসেছে, সরকার ও দলের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয়। দল, সরকার ও ব্যক্তি শেখ হাসিনার মধ্যে এই পার্থক্য কেন—এ প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা গাছ যখন বেড়ে ওঠে, সেই গাছের শিকড় থাকে। আপনি গাছটা দেখেন, ফুলটা দেখেন, ফলটা দেখেন। কিন্তু শিকড়টা দেখেন না। আমার রেটিং যাই হোক না কেন, আমার শিকড় হচ্ছে আমার দল। দলের সহযোগিতা আছে, সমর্থন আছে বলেই আমি এত দূর উঠতে পেরেছি।’
বাংলা নববর্ষে উৎসব ভাতা চালু করা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এই উৎসবে সবাই যোগ দেয়। সর্বজনীনভাবে এই উৎসব পালিত হয়। সেটা বিবেচনায় নিয়ে পয়লা বৈশাখে উৎসব বোনাস দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ মন্ত্রিপরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশে সংকট নেই, বিদেশিদের আগ্রহ উন্নয়ন: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা, মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিদেশি সরকারপ্রধানদের মনোভাবের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, নেদারল্যান্ডসের রানি, সুইডেন ও বেনিনের প্রধানমন্ত্রী—কেউ এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কেউ বাংলাদেশে সংকট বা নির্বাচন বিষয়ে আলোচনাই করেননি। বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকেই তাঁরা সাধুবাদ জানিয়েছেন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশ বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন এলডিসির নেতৃত্বে বাংলাদেশ। এতই যদি রাজনৈতিক সংকট থাকত, তাহলে বাংলাদেশ এলডিসির নেতৃত্ব কীভাবে পেল? সংকট দেশের বাইরে না, দেশের ভেতরের কিছু মানুষের মনের সংকট চলছে। বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়। বাইরে কোনো সংকটের কথা কেউ বলেননি, দেখিওনি।’
বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের সময় মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনাকে বিদেশিরা ভালোভাবে নেয়নি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা-ওটা ঘটনা তো ঘটতেই থাকবে এবং তারা চুপ করে তো বসে থাকবে না। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব আর তারা চুপ করে বসে থাকবে, এটা আপনারা আশা করেন কী করে? তারা তো প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতেই থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি দরকার জনসচেতনতা। আমাদের সচেতন হতে হবে। হ্যাঁ, তাদের লবিস্ট আছে, টাকাপয়সা আছে। হয়তো লবিস্ট নিয়োগ করে কিছু কথা বলাতে পারে, লেখাতে পারে, এটা ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাটা আমরা রাখতে পেরেছি।’
আইএস নেই: দুজন বিদেশি নাগরিক হত্যায় আইএসের মতো জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার খবর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতালির নাগরিককে হত্যার পর শিকাগো থেকে সোশ্যাল স্ট্যাটাস আসে—আইএস এর সঙ্গে জড়িত। তার সম্পৃক্ততা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ঘটনা তো তদন্ত করতে হবে। এখানকার গোয়েন্দারা কোনো সূত্র এখনো পায়নি। তখন কে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে দিল, তা আমাদের গ্রহণ করতে হবে? কেন করতে হবে?’
জঙ্গি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার নতুন কোনো কৌশল নিয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম ও সীমানা নেই। কেউ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। দেশে কেউ কোথাও এ ধরনের কোনো খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে: গাইবান্ধার আওয়ামী লীগের সাংসদ মন্জুরুল ইসলামের গুলিতে শিশু রক্তাক্ত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটা বিশাল সংগঠন, সেই সংগঠনে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি কি না, সেটাই বড় কথা। আমরা কিন্তু ঘটনা ধামাচাপা দিই না, প্রশ্রয়ও দিই না। কাল আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে আলাপ করেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের রাজনৈতিক অবস্থা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সুন্দরগঞ্জে জামায়াতের উৎপাত আছে। ওখানে সংগঠন টিকিয়ে রাখাই কঠিন। কারণ, ওখানে জামায়াতে ইসলামী খুন-খারাবি করছে। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করতে হবে। তবে সরকার সাংসদের অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করেছে, মামলা দেওয়া হয়েছে।
দেশের সমস্যা দেশেরই সম্পদ দিয়ে মোকাবিলা করছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা করছি, শুরু করেছি। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। হাত পেতে চলা আর দাও দাও করা, এটা চাই না। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। বিজয়ী জাতি। মাথা উঁচু করে চলতে চাই। যদি আমাদের নুন-ভাতও খেতে হয়, নিজের উপার্জনে খাব। ধার করা টাকা দিয়ে বিরিয়ানি খেতে রাজি না।’
আওয়ামী লীগেও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি আছেন, ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে তাঁদের নিয়েই দেশ পরিচালনা করা হবে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে এমন বক্তৃতা করেছেন বলে একজন সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি কী বললেন? উনি আওয়ামী লীগে প্রেমিক খুঁজে পেয়েছেন? উনি আওয়ামী লীগে প্রেমিক কীভাবে খুঁজে পেলেন, আমি জানি না। উনি যদি আওয়ামী লীগে দেশপ্রেমিক খুঁজে পান, খুব ভালো কথা।’
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের বিক্ষোভে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁর ব্যাপারে আমার কমেন্ট করার কিছু নাই। যার যে আপন জায়গা খুঁজে পেয়েছে। দেশবাসী বিচার করুক।’

Tuesday, September 29, 2015

নাম ও ছবি মুছে ফেলার অপরাজনীতি by সোহরাব হাসান

আগে ছবি ওঠানো-নামানো ও নাম মুছে ফেলার রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতিকদের একচেটিয়া সম্পত্তি থাকলেও ইদানীং এর সংক্রমণ প্রতিবেশী ভারতেও মহামারি রূপে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ওরফে এনডিএ জোট ক্ষমতায় আসার পর ভারতের মনোরাজনৈতিক জগতে যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে, তাকে স্বাভাবিক ঘটনা বলা যায় না। এর পেছনে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের সহযোগী আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনই কাজ করেছে। কংগ্রেস যেহেতু সেক্যুলার রাজনীতির কথা বলে, সেহেতু তারা ভারতের রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করে না—এটাই বিজেপি জোটের দাবি।
ক্ষমতায় আসার দেড় বছরের মাথায় নরেন্দ্র মোদি সরকার সরকারি ডাকটিকিট থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর ছবি ও নাম ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কংগ্রেস সরকারের আমলে আধুনিক ভারতের নির্মাতা হিসেবে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর ছবিসংবলিত ডাকটিকিট ছাপে, যা এত দিন ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। নরেন্দ্র মোদি সরকার বলছে, এখন থেকে ডাকটিকিটে ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর নাম থাকবে না। নামের সঙ্গে পরিচয়ের পরিবর্তনও লক্ষণীয়। কংগ্রেস বলেছিল, এঁরা আধুনিক ভারতের নির্মাতা। বিজেপি বলছে, ভারত-নির্মাতা। আধুনিকতার ব্যাপারে তাদের আপত্তিটা অবোধগম্য নয়।
কংগ্রেস সরকার ২০০৮ সালে আধুনিক ভারতের নির্মাতা নামে যেসব নেতার নামে ডাকটিকিট ছেপেছিল, তাঁদের মধ্যে ইন্দিরা ও রাজীব ছাড়াও ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, বি আর আম্বেদকার, হোমি ভাবা, জে আর ডি টাটা, সত্যজিৎ রায় ও মাদার তেরেসা। নরেন্দ্র মোদি সরকার সেই তালিকায় অদলবদল এনে ইন্দিরা ও রাজীবের সঙ্গে সি ভি রমণ, হোমি ভাবা, জে আর ডি টাটা ও সত্যজিৎ রায়কেও বাদ দিয়েছে।
সত্যজিৎ রায়কে বাদ দেওয়া! যিনি ভারতের চলচ্চিত্রকে বিশ্বসভায় পরিচিত করিয়েছেন, অস্কারের লাইফটাইম অ্যাসিভমেন্ট পুরস্কার পেয়েছেন, বিজেপি সরকারের কাছে তাঁর কোনো গুরুত্বই নেই। অথচ এই সত্যজিৎ রায় অসুস্থ থাকাকালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরা কলকাতায় এসে তাঁর হাতে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দিয়ে গিয়েছিলেন। মিতেরা সত্যজিৎ রায়কে চিনতেন, কিন্তু নরেন্দ্র মোদি চেনেন না। মোদির কাছে ভারতের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার হওয়াই যথেষ্ট নয়; তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে হিন্দুত্ববাদের মিশেল থাকতে হবে। সত্যজিৎ রায় বা সি ভি রমণের স্থলে তিনি বেছে নিয়েছেন ছত্রপতি শিবাজি, মহারানা প্রতাপ, বাল গঙ্গাধরকে। এটাই বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে খাপ খায়। বিজেপি সরকারের নতুন তালিকায় আরও আছেন হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়; ১৯৪৭ সালে যিনি ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ করতে হবে বলে গোঁ ধরেছিলেন।
দুই.
বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে কংগ্রেস। দলের কেন্দ্রীয় নেতা আনন্দ শর্মা বলেছেন, ‘আমরা ইন্দিরা ও রাজীবের প্রতি সরকারের এই উদ্যোগ ও মনোভাবের তীব্র নিন্দা জানাই।’ দিল্লিতে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে কংগ্রেস নেতা শোভা ওঝা সস্তা রাজনীতি না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সিং সূর্যওয়ালার দাবি, নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেছেন, দুই ধরনের ডাকটিকিট ছাপানো হয়। একটি কোনো স্থানের বা ব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে স্মারক, আরেকটি হলো নির্দিষ্ট বা দৈনন্দিন ব্যবহারের ডাকটিকিট। ইন্দিরা গান্ধীর ওপর চারবার ও রাজীব গান্ধীর ওপর দুবার স্মারক ডাকটিকিট ছাপানো হয়েছে। তাই আর ছাপানো যাবে না। কিন্তু সাম্প্রদায়িক নেতা বাল গঙ্গাধর ও শ্যামা প্রসাদের নামে ডাকটিকিট ছাপতে কোনো বাধা নেই। এরপর হয়তো বিজেপি সরকার বাল ঠাকরের নামেও ডাকটিকিট ছাপবে এবং সেটি ভারতের জনগণকে ব্যবহার করতে বাধ্য করবে।
ডাকটিকিটের সঙ্গে চিঠির খামের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সরকার ইন্দিরা গান্ধীর ছবিসংবলিত খামের পরিবর্তে যোগব্যায়ামের ছবিযুক্ত খাম ছাড়ার চিন্তাভাবনা করছে মোদি সরকার। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে যোগব্যায়াম চলে আসছে। কিন্তু বিজেপি নেতারা এটিকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক যোগব্যায়াম বা ইয়োগা দিবস পালনেরও ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
বিজেপি নেতারা বলছেন, জাতীয় নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, দীন দয়াল উপাধ্যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সর্দার বল্লভ ভাই, ছত্রপতি শিবাজি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ভগবৎ সিং, বাল গঙ্গাধর, জয়প্রকাশ নারায়ণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাম মনোহর লোহিয়া, বিবেকানন্দ, মাদার তেরেসা ও মহারানা প্রতাপের স্মরণে নির্দিষ্ট ডাকটিকিট প্রকাশ করা হবে। বিজেপির দাবি, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও ভারত নির্মাণে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের সবাইকে সম্মান জানানো উচিত। একটি পরিবারে এটি সীমিত রাখা যায় না। নির্বাচনের আগে মোদি ভারতকে কংগ্রেসমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর সরকার ভারতকে সেকু৵লারমুক্ত করার কাজটি জোরেশোরে শুরু করেছে।
স্বাধীনতার বহু বছর পর বিজেপি গঠিত হলেও দলের নেতারা এখন স্বাধীনতাসংগ্রামে ভাগ বসাতে চাইছেন। বিজেপি নেতারা বলছেন, স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় বিজেপি না থাকুক, আরএসএস ও হিন্দু মহাসভা ছিল। তাহলে কংগ্রেস স্বাধীনতার একমাত্র হকদার হবে কেন? এই যুক্তিতেই মোদি সরকার ইতিহাসের পরিত্যক্ত পাতা থেকে হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস নেতাদের খুঁজে বের করছে।
তিন.
বিজেপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কেন্দ্রীয়ভাবে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ছবি ওঠা-নামা এবং নাম পরিবর্তনের মহড়া চলছে। নাম বদলের এই পাঠ তারা বাংলাদেশ থেকে নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উপমহাদেশের সব দেশেই এখন রাজনৈতিক অবক্ষয় চলছে। ক্ষমতাসীনেরা সামনে তাকানোর কথা বলে দেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। হিন্দুত্ববাদ, তথা ধর্মীয় জাগরণের বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসাকে বিজেপি সরকার নৈতিক দায়িত্ব মনে করছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোয় পাঠ্যবই পরিবর্তনসহ সবকিছু গৈরিকীকরণ চলছে। অটল বিহারি বাজপেয়ি ক্ষমতায় থাকতেও হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটানো হয়েছিল। তবে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিপুল ভোটে বিজয়ী নরেন্দ্র মোদি নব ভারত নির্মাণের যে হিন্দুত্ববাদী পথ নিয়েছেন, তা কেবল ভারত নয়, উপমহাদেশের জন্যই বিপজ্জনক।
কেবল ডাকটিকিট বা চিঠির খাম নয়, বিজেপি সরকার জাদুঘরসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনায় হাত দিয়েছে বিজেপি সরকার। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী মহেশ শর্মা বলেছেন, এসব জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য যাতে আরও বেশি কার্যকরভাবে জনগণের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের পাশাপাশি সমসাময়িক উপাদানগুলো সন্নিবেশিত করা হবে। বিজেপি সরকার নেহরু স্মৃতি জাদুঘর ও লাইব্রেরি, ত্রিমূর্তি ভাবনসহ ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে সাজাতে চাইছে। নেহরু স্মৃতি জাদুঘরে নাকি কেবল একটি পরিবারের কীর্তি তুলে ধরা হয়েছে।
কংগ্রেস বলেছে, সরকারের এই পরিকল্পনা একরকম ‘শয়তানি’। সরকার মানুষের মৌলিক চেতনা ও চরিত্র ‘দুর্বল ও নিষ্প্রভ’ করে দিচ্ছে। দলের মুখপাত্র রণদীপ সিং বলেছেন, ‘আমাদের জাতি গঠনে আরএসএস ও বিজেপির কোনো ভূমিকা নেই। এখন তারা আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের গৌরবময় ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিকৃত করার শয়তানি শুরু করেছে।’ নেহরু স্মৃতি জাদুঘর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের সংগ্রামের স্মারক; এটি ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রতীকও বটে। আর স্বাধীনতার পর সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের গড়ে ওঠার প্রতীক হিসেবেও দাঁড়িয়ে আছে এই নেহরু স্মৃতি জাদুঘর। আরএসএস, বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও দেশের অন্যতম সেরা সন্তান পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে খাটো করার চেষ্টা করলেও সফল হবেন না, মানুষ সেটা গ্রহণ করবে না।
চার.
দেড় বছর আগে নরেন্দ্র মোদি নতুন ভারত নির্মাণের যে স্বপ্ন দেশবাসীকে দেখিয়েছিলেন, সেটি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? প্রথম বছরটিতে তিনি জনপ্রিয়তা মোটামুটি ধরে রাখতে পারলেও দ্বিতীয় বছরে এসেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। তাঁর ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগানও খুব সাড়া জাগাতে পারেনি। কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল দুর্নীতি, অনুন্নয়ন ও বেকারত্ব নিয়ে। কিন্তু গত এক বছরে খুব কম ক্ষেত্রেই বিজেপি সাফল্য দেখাতে পেরেছে। মন্ত্রীরাও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। গত দেড় বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকেরা। একমাত্র মহারাষ্ট্রেই গত এক বছরের ১ হাজর ৩০৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, যা আগের এক বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি এক সমাবেশে বলেছেন, ‘কৃষকেরা এখন নরেন্দ্র মোদিকে গালাগাল দিতে শুরু করেছেন।’ অন্যদিকে উচ্চ বেতন-ভাতার দাবিতে শ্রমিকেরা আন্দোলন করেছেন। মোদি সরকারের আমলে শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমেছে। শিক্ষা খাতে আগের সরকারের আমলে বরাদ্দ ছিল ৮২ হাজার ৭৭১ কোটি রুপি, মোদি সরকার নামিয়ে এনেছে ৬৯ হাজার ৭৪ কোটিতে। নৈতিক শিক্ষা, ইতিহাস সংশোধনের নামে হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরণ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন বলে সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন জওহরলাল ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক জয়া হাসান।
পাঁচ.
বহু বছর আগে কবি আবদুল হাসান লিখেছিলেন—
দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি,
দেবদারু কেটে নিচ্ছে নরম কুঠার তাও রাজনীতি,
গোলাপ ফুটছে তাও রাজনীতি, গোলাপ ঝরছে তাও রাজনীতি!
মানুষ জন্মাচ্ছে তাও রাজনীতি, মানুষ মরছে তাও রাজনীতি!
এখন দালান ওঠা আর দালান ভাঙা রাজনীতি নয়। রাজনীতি হলো ছবি ওঠানো। ছবি নামানো। ছবি সরানো। বাংলাদেশে ছবি নামানোর রাজনীতি শুরু হয়েছিল ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার করার পর। ছবিই–বা বলি কেন, একসময় তাঁর নাম নেওয়াও ছিল অপরাধ। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যারা বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল, তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
তাই বাংলাদেশ ও ভারতের যাঁরাই ছবি-ডাকটিকিট-খাম-জাদুঘর নিয়ে রাজনীতি করছেন, তাঁদের আয়নায় একবার নিজেদের মুখ দেখতে বলব। ‘অন্যের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া’ নিজের মহিমা বাড়ানো যায় না। ইতিহাসে যাঁর যেটুকু অবদান আছে, স্বীকার করুন। ইতিহাস যাঁরা গড়েন, ইতিহাস নিয়ে তাঁদের টানাটানি করতে হয় না। এই সরল সত্য ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা মনে রাখবেন আশা করি।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

Friday, September 25, 2015

আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে কারাগারে পরিণত করেছে : খালেদা জিয়া

আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে কারাগারে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
বৃহস্পতিবার পূর্ব লন্ডনের ফেয়ারলোপ ওয়াটার কান্ট্রি পার্কে দলের প্রবাসী নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুরবানির ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপির যত নেতাকর্মী আছে, প্রত্যেকের নামে মামলা দিয়েছে, এই হলো বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ ঠিক মত ঘুমাতে পারে না। কোথায় ঘুমাবে? দেশে কোনো মৌলিক অধিকার নাই, মানবাধিকার নাই, আইনের শাসন নেই, গণতন্ত্র নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ইংগিত করে বিএনপিনেত্রী বলেন, এই আওয়ামী লীগ কিছুতেই ক্ষমতা ছাড়বে না। উনি গদি ছাড়বেন না। এতো লুটপাট ও খুন সরকার করেছে যে ক্ষমতা ছাড়লে তারা পার পাবে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যেও ভালো লোক ও দেশপ্রেমিক আছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং তাতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাদের সঙ্গে নিয়েই তিনি দেশকে সামনের দিকে চালিয়ে নিতে চান।
খালেদা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে এখন সরকার বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হচ্ছে না। পুলিশের মাধ্যমে এ সরকারকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কাউকে কথা বলতে দেওয় হচ্ছে না।
দেশের মানুষ একদিন রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার স্ত্রী জোবাইদা রহমানও অনুষ্ঠানমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র : এ ওয়ান নিউজ

ক্রমাগত কর্তৃত্বপরায়ণতার পথে ধাবিত বাংলাদেশ

ক্রমাগত কর্তৃত্ব-পরায়ণতার পথে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর গুম, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তার, সমালোচনাকারী মিডিয়ার মুখ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে এখানে। সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে সম্পাদক, ব্লগার, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের সদস্যদের অভিযুক্ত করার ঘটনা। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ করতেই সরকার গুমের পথ বেছে নিচ্ছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৭ বছরে গুমের ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ২১২টি। গুম বন্ধ, এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিলের শুনানিতে বাংলাদেশ বিষয়ে এসব কথা বলা হয়েছে। এ শুনানিতে অংশ নেয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার, এফআইডিএইচ, এএফএডি। গুমের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, বিচার ও এর জন্য যারা দায়ী, তাদের শাস্তি দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের যে বাধ্যবাধকতা আছে তা তুলে ধরা হয় শুনানিতে। যেসব দেশের পরিস্থিতিতে মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিলের গুরুতর উদ্বেগ বা সচেতনতা প্রয়োজন- তা নিয়ে আলোচনা হয় সেখানে। এতে বাংলাদেশ সম্পর্কে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বিরোধীদলীয় হাজার হাজার সদস্য ও প্রতিবাদীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলে রয়েছেন অজ্ঞাত সংখ্যক। বিরোধী দলের অনেক নেতা হয়তো দেশ ছাড়ার অথবা আত্মগোপনে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন। নাস্তিক মত প্রকাশকারী ব্লগারদের নিরাপত্তায় যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে শুধু ২০১৫ সালেই নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন ৪ ব্লগার। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর শ্রম আইন সংস্কার করার পর শ্রমিক ইউনিয়ন করার পথ সহজ হলেও গবেষণায় দেখা গেছে যে, তৈরী পোশাক খাতে যারা শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করতে বা এতে যোগ দিতে চাইছেন তাদের বিরুদ্ধে চলছে দমন-পীড়ন। পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলোর সময়ে নিরপেক্ষভাবে প্রামাণ্য হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ঘন ঘন তারা যে নিয়মের লঙ্ঘন করেন তা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী এসব বিষয়ে প্রায় পুরোপুরি দায়মুক্তি ভোগ করছে। ওই শুনানিতে বাংলাদেশে অব্যাহত জোরপূর্বক গুমের বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে নজর দেয়ার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ‘এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপেয়ারেন্সেস’ (জোর করে অথবা স্বেচ্ছায় গুম) বিষয়ের ওপর শুনানিতে যৌথ বিবৃতি দেয় এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি), এফআইডিএইচ, এএফএডি। এতে বলা হয়, এতে বাংলাদেশে চলমান গুম ও দায়মুক্তির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় কাউন্সিলের। বলা হয়, এসব অপরাধের সঙ্গে নিপীড়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যৌথ ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছর আগস্ট পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশে কমপক্ষে ২১২টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা প্রামাণ্য আকারে উপস্থাপন করেছে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী তাদের সাক্ষ্যে বলেছেন, এসব গুমে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এজেন্টরা। অপহরণের ধরন ও অপহৃতের প্রোফাইল যে সাক্ষ্য দেয় তাতে দেখা যায় যে, বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নীরব করে দিতেই সরকার গুমের পথ বেছে নিয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবার তার সম্পর্কে তথ্য ও বিচার চাওয়ার বিষয়টিকে পুলিশ ও আদালত কর্তৃক অবজ্ঞা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আদর্শ বিষয় হলো দায়মুক্তি। সম্প্রতি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদেরকে ভয়ভীতি ও প্রতিবন্ধকতা দেয়া হয়েছে। ওই সাক্ষ্যে গুমের শিকার ব্যক্তিদেরকে তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দিতে আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও এ অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। এতে বলা হয়, আইসিসি’র রোম স্ট্যাচুট অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে তারা জোর করে গুমকে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাধ্য। এতে আরও বলা হয়, প্রটেকশন অব অল পারসনস এগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপেয়ারেন্সেস বিষয়ক ১৯৯২ সালের ঘোষণায় নিশ্চিত করে বলা হয়েছে যে, যেকোন দেশে জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ করতে বা বিলুপ্তি ঘটাতে প্রতিটি দেশকে কার্যকর আইনি, প্রশাসনিক, বিচারিক ও অন্যান্য পদক্ষেপ নিতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, জোরপূর্বক গুমের ইতি ঘটানোর লক্ষ্য অর্জনে এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, বিচার ও জড়িতদের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাধ্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো ও মানবাধিকারবিষয়ক কর্মীদের কথা বলা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে ও তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বাংলাদেশ সফরের অনুরোধ করছি ওয়ার্কিং গ্রুপকে। ঘটনার জরুরি বিষয়টি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারকে এমন একটি সফর মেনে নিতে আহ্বান জানানো হয়।

Monday, September 21, 2015

‘আপসহীন’ নেত্রীর তালিকায় হাসিনা তৃতীয়, খালেদা চতুর্থ by তানজির আহমেদ রাসেল

বিশ্বের ‘আপসহীন’ ১০ মুসলিম নেত্রীর তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রাউন গার্ল ম্যাগাজিন কর্তৃক প্রকাশিত এক তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে। তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। ওই তালিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হাফিংটন পোস্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমগ্র বিশ্বে মুসলিম নারীকে নির্যাতিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ এর মধ্যে কিছু মুসলিম নেত্রী আছেন যারা নিজ গুণে সারা বিশ্বের আলোকবর্তিকা হয়েছেন। নিজের যোগ্যতায় শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ব্রাউন গার্ল ম্যাগাজিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তিন বার তিনি দেশের  প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে দেশ শাসন করে চলেছেন শক্ত হাতে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন। জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৪৫ সালে। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বামী প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের হাল ধরেন তিনি।
তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা ‘ডটার অব ইস্ট’ খ্যাত পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ১৯৫৩ সালের ২১শে জুন করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। মুসলিম বিশ্বের প্রথম ও পাকিস্তানের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী তিনি। তিনি দুই বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুর পর পকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) হাল ধরেন তিনি। ২০০৭ সালের ২৭শে ডিসেম্বরে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় ভাষণদানকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তিনি হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতির ওপর পড়াশোনা করেন। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার পঞ্চম প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী। দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রজাতান্ত্রিক দল পিডিআই-এর চেয়ারম্যান তিনি। তালিকায় ৫ম স্থানে রয়েছেন কসোভোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট আতিফিতে জাহজাগা। তিনি ২০১১ সালে কসোভোর প্রথম নির্বাচিত নারী প্রেসিডেন্ট শপথ গ্রহণ করেন তিনি । ৬ষ্ঠ স্থানে থাকা তানসু সিলার তুরস্কের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী । ১৯৯৩ সালে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পর রয়েছেন সেনেগালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী মামে মাদিওর বোয়ে। তিনি ২০০১ মার্চ থেকে ২০০২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তালিকার ৮ম স্থানে সেনেগালের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী আমিনাতা তৌরে আর নবম স্থানে রয়েছেন আফ্রিকার দেশ মালির মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী সিসে মরিয়ম কাইদামা সিদিবি। তালিকার সর্বশেষ হচ্ছেন ভারত মহাসাগরের দ্বীপ মরিশাসের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট খ্যাতিমান জীববিজ্ঞানী আমিনা গারিব ফাকিম। গত জুনে মরিসাসের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ৫৬ বছর বয়সী আমিনা। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারে ও ইউনিভার্সিটি অব এক্সটার থেকে পড়শোনা করা আমিনা মরিশাস বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগেরও চেয়ারপারসন।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে জাতীয় ঐকমত্য গড়ার আহ্বান

ক্ষমতার পৃথকীকরণের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা প্রয়োগের ভারসাম্য প্রায়শই বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই তিনটি বিভাগের ক্ষমতা ও কাজের ভারসাম্য আনা জরুরি বলে মনে করছেন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। এ লক্ষ্যে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠক থেকে তারা এ দাবি জানান। পূর্ণ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ব্যানারে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা ধারাবাহিক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করছেন। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর তারা একটি বৈঠকের আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকালের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সঞ্চালক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, নাগরিকদের বৈঠকে আলোচিত বিষয়বস্তু পরবর্তীকালে ভলিউম আকারে প্রকাশ করা হবে। নাগরিকরা দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চান। এ বছরের শুরুতে দেশব্যাপী শুরু হওয়া সংঘাতের ফলে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়। সে পরিপেক্ষিতে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ গঠিত হয়। আমরা দেখেছি যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার আনয়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কথা হচ্ছে নির্বাচনী গণতন্ত্র। এটা প্রমাণিত হয়েছে ওই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ১৯৯১ সাল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়ে আসছে। কিন্তু এরপরও আরও কিছু করা দরকার। নির্বাচনে কেউ হারলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। তাই শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, দুদক যদি সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকে না। আমরা এই বিষয়টার দিকে নজর দেই না। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আজ ১২টা বিষয় চিহ্নিত করেছে। আমরা এসব বিষয়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বলছি। কিন্তু কাজ করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। এ প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকট থাকলেও মৌলিক বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ। তাই সকল সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হয়। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আমরা সমালোচনার জবাব দেই না। কারণ, এর প্রয়োজন মনে করি না। নাগরিক সমাজের সদস্যরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কাজ করেছেন। নিজেরা যেচে কারও কাছে তারা পদ চায়নি। আমাদের ডেকে পদ দেয়া হয়েছে। এখানে কারও স্বার্থের বিষয় নেই। আমরা ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেয়েছি তা সমুন্নত রাখা আমাদের উদ্দেশ্য। বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এমএম শওকত আলী বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর বাইরে কোনভাবেই সম্ভব না। কোন কোন জায়গায় সংস্কার করা উচিত, করলে ভাল হবে, সুশাসনের জন্য সহায়ক হবে তা নাগরিকরা সুপারিশ করতে পারে। তিনি বলেন, একক রাষ্ট্রে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে খুব বেশি দূর নিয়ে যাওয়া যায় না। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। প্রাইভেটাইজেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা করলেই যে সুফল পাওয়া যাবে তা ঠিক না। রেগুলেটরি অথরিটিকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। সকল সেক্টরে এ রকম অথরিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রধান বিচারপতির একটি পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আজকাল নতুন নতুন যেসব আইন হচ্ছে সেগুলো বিচার নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি করছে কি না গবেষণা হওয়া দরকার। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রকৃতপক্ষে একটা দেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয় না যদি সেখানে অর্থের একটা স্বয়ংক্রিয় বণ্টন ব্যবস্থা না থাকে। এটা ভারতে আছে এবং ছয় দফা আন্দোলনে অন্যতম বিষয় ছিল যে আমাদের সম্পদ আমরা পাবো কি না। বাংলাদেশে এটা আলোচনায় আসে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলেও অর্থের বণ্টন সঠিকভাবে না হলে কোন লাভ হবে না। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আমরা এটা দেখতে পাই। পুলিশের কথা তো বলাই যাবে না। কারণ, এটা রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর্থিক ক্ষমতাই হচ্ছে আসল ক্ষমতা। অর্থকে যদি কেন্দ্র থেকে বের করে আনা না যায় তবে ক্ষমতাকে বের করা যাবে না। জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী উন্নয়ন কাজে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ কমিশন গঠন করার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় সরকারে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না তা ক্ষতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারে এমপি সাহেবরা বসতে পারেন কি না এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হওয়া দরকার। কোন অধিকার বলে তারা সেখানে বসবেন তার বৈধতা জানা দরকার। হাইকোর্টে থাকলে আমাদের আপিল বিভাগে যাওয়া উচিত। কারণ হিসেবে, জনগণ এই বিষয়ে তাদের কোন সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। প্রবন্ধে বিকেন্দ্রায়নের যৌক্তিকতায় বলা হয় ক্ষমতার ভারসাম্য, অধিকতর গণতন্ত্র, সমতা ও জনমুখী সেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, জনসম্পৃক্ততা, সমতায়ন, গণক্ষমতায়ন, স্বশাসন, সুশাসন এবং প্রশাসনিক ও অর্থব্যবস্থার দক্ষতার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকতার কুফল উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, বোকারা ক্ষমতাকে ভাগাভাগি ও বিকশিত না করে মুষ্টিবদ্ধ করতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের ক্ষমতার কারাগারে বন্দি হয়ে যান। ক্ষমতা একটি যন্ত্রণাময় জাল। এখানে বেশি জড়িয়ে গেলে বের হওয়ার পথ সঙ্কুচিত হয়। অতি ক্ষমতা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে। ক্ষমতার প্রতি মাদকতা ও উন্মাদনায় কিছু কিছু মানুষ পাগল হয়ে যায়। গ্রিক পৌরাণিক সাহিত্যে কিং মিডাসের স্বর্ণ অনুরাগের মতো। শেষ পর্যন্ত তাকে দেবতার স্পর্শমাত্র স্বর্ণ রূপান্তরের বর শাপে পরিণত হয়। ইতিহাসের অনেক মহানায়কের করুণ পরিণতি ক্ষমতার প্রতি অনুরাগ থেকেই সৃষ্ট। প্রবন্ধে বাংলাদেশের বিকেন্দ্রীকরণের কিছু দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারের তিনটি বিভাগ বা অঙ্গকে ধরেই একটি বিকেন্দ্রায়ন নীতি রচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে আইন, শাসন, ও বিচার বিভাগকে মূল কেন্দ্র নির্ধারণ করে কোথায়, কতটুকু, কার কাছে কিভাবে বিকেন্দ্রায়ন প্রয়োজন তা নির্ধারণ জরুরি। সংসদের ভেতরে ও বাইরে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্ন থাকে। এ বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সংসদের উচ্চ কক্ষ ও নিম্ন কক্ষ, দুটি কক্ষের সৃষ্টি এবং আইনবিভাগের অভ্যন্তরে ভারসাম্য আনয়ন, নির্দিষ্ট বা ন্যূনতম গণস্বাক্ষরে উত্থাপিত কোন বিষয় বিল আকারে সংসদে উত্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে পেশের পূর্বে জনমত যাচাই, সংবিধানের মৌলিক বিষয় সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট গ্রহণ, সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থাকে অধিক কার্যকর করা। নির্বাহী বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে বলা হয়, এর একাধিক স্তর ও বিন্যাস ভেবে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে অনেক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী এবং আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ক্ষমতা, কার্যক্রমের নবতর বিন্যাস নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। সচিবের কর্তৃত্বের একটি সুনির্দিষ্ট বলয় ও সীমারেখা থাকতে হবে। সচিব কখনও মন্ত্রীর কর্তৃত্বে বিলীন হয়ে যাবে না। বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে হাইকোর্টের বিশেষ কোন বেঞ্চ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া যায় কি না সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। প্রবন্ধে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার ও অধিক দায়িত্ব ক্ষমতা অর্পণের জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনিপন্থায় ক্ষমতা চর্চা ও প্রয়োগে হস্তক্ষেপ না করা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে সরকারি দপ্তর, জনবল এবং অর্থসম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে স্থানীয় সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা, সেবা ব্যবস্থা প্রশাসনিক জবাবদিহি স্বচ্ছ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।  সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার সঞ্চালনায় বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংশ নেন।