Thursday, September 23, 2021

জেনে নিন গর্ভবতী অবস্থায় কি খেলে বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি পাবে

অনেক সময় আমরা শুনে থাকি অপুষ্ট সন্তান হয়েছে। পরিবারের সবাই বলে মাকে অনেক ভাল খাবার দেওয়া হয়েছে তারপরও বাচ্চা অপুষ্ট কেন হয়েছে।

এই কেনোর উত্তর যদি মানুষ গর্ভধারণের প্রথম দিকে খেয়াল করে তবে অপুষ্ট হয়ে জন্মগ্রহণ করার জন্য হাসপাতালে ১ বা ২ দিনের বাচ্চাগুলো মারা যেতো না। সাধারণত ২ কেজির কম ওজনের বাচ্চাগুলোকে জন্মের পর বাঁচানো খুব কঠিন হয়ে যায়। এদের মাঝে ৭০% বাচ্চা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে।আর দেড় কেজির নিচের ওজনের বাচ্চাগুলো ৯৯% মারা যায়।

গর্ভধারণের ৭ মাস হলে মানুষ আলট্রাসোনো করে এটা জানতে আকুল হয়ে পড়ে যে কি সন্তান হবে। মাত্র ২০% মানুষ এটা জানতে চায় বাচ্চার ওজন কতো টুকু হয়েছে। কিন্তু এটা জানা খুব জরুরি। যদি ৭ মাসে বাচ্চার ওজন ১ কেজি বা তার বেশি হয় তবে বুঝতে হবে বাচ্চা ভাল মতো বেড়ে উঠছে কারণ শেষের ৩ মাসে বাচ্চার বৃদ্ধি বেশি হয়।

প্রথম ৬-৭ মাসে বাচ্চার বৃদ্ধি হার কম থাকে। ৭ মাসে বাচ্চার ওজন ৮০০-৯০০ গ্রাম হলেও চিন্তার কিছু নেই, এ ক্ষেত্রে মায়ের খাবারের দিকে আরো ভাল করে নজর দিতে হবে। তবে বাচ্চার ওজন এর কম হলে অবশ্যয় ডক্তারের পরামর্শ মেনে ভিটামিন জাতীয় ঔষুধ সেবন করতে হবে।  দেখে নিন কোন খাবারগুলো খেলে বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি পাবে।

১।ছোলা: ছোলা খেলে ওজন বৃদ্ধি পায় এটা সবাই জানে। এটা হাই প্রোটিন যুক্ত যুক্ত খাবার যা গর্ভের সন্তানের ওজন বৃদ্ধি করে। ছোলার ঘুগনি বানিয়ে খান এনে সন্তান পুষ্টি পাবে। তবে পানিতে ভেজানো কাঁচা ছোলা একদম নয়।

২।মসুর ডাল: মসুর ডালে আছে হাই প্রোটিন ও শর্করা। এটি গর্ভের সন্তানের জন্য ভিষণ উপকারী। প্রতিদিনের খাবার তালিকায় ২ কাপ মসুর ডাল রাখুন।

৩।নুডুলস: ডায়েট করলে যে নুডলস কে টাটা বলতে হয় এটা জানতে কারো বাকি নেই। মোটা ব্যক্তির জন্য এটা যেমন ক্ষতিকর তেমনি গর্ভবতী নারীর জন্য এটা আদর্শ খাবার। সপ্তাহে ৩-৪ দিন সকাল বা বিকেলের নাস্তায় নুডলস খান, আপনার গর্ভের সন্তানের ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

৪।বাচ্চা মুরগি: অনেকের ধারণা দুধ বা ডিম বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি করবে। কিন্তু এটা ঠিক কথা না। দুধ ডিম খেতে বলা হয় শুধু মাকে সুস্থ রাখার জন্য,এটি বাচ্চার ওজন বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কীত নয়। দুধ, ডিমের পাশাপাশি মাকে খাওয়াতে হবে বাচ্চা মুরগি বা কবুতরের মাংস। এটি বাচ্চার ওজন বৃৃদ্ধি করবে ও সন্তান জন্মদানের পর মাকে সুস্থ রাখবে।

৫।মাছ: বড় মাছ নয়, ছোট সামুদ্রিক বা নদীর মাছ বাচ্চার ওজন বৃদ্ধিতে ভিষণ কার্যকরি। যেমন: বাসপাতা, পাবদা, চিংড়ি, মায়া, মলা ইত্যাদি। তবে চিংড়ি মাছটা গর্ভবতী অবস্থায় বেশি উপকারী।

৬।আম: পাকা আম খুব দ্রুত বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি করে। যদি আমের মৌসুমে আপনি গর্ভবতী হয়ে থাকেন তবে এটি হবে আপনার ও আপনার বাচ্চার জন্য সব থেকে উৎকৃষ্ট খাবার।

৭।ঢেড়শ: সবুজ সবজির মধ্যে বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি করতে বেশি সাহায্য করে ঢেড়শ। তাই খাবার তালিকায় ঢেড়শ রাখতে ভুলবেন না। এতে আছে প্রচুর পরিমাণ আয়রণ।

৮।চিড়া: চিড়া যেমন শরীরের জন্য উপকারী তেমন বাচ্চার ওজন বৃ্দ্ধি করে।গর্ভবতী অবস্থায় অনেকের খুব বমি হয়, খেতে পারে না। তারা চিড়া ভিজিয়ে খেতে পারে। চিড়া বমি ভাব দূর করে। খাবারের রুচি বাড়ায় ও বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি করে।

Wednesday, September 22, 2021

ইরাক-ইরান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যের ৮ বছরের নৃশংস যে লড়াইতে কেউ জেতেনি

ইরাক-ইরান যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৮০ সালে। সেপ্টেম্বরের একদিনে সাদ্দাম হোসেন ইরানে সৈন্য পাঠালেন। তারপর সেই লড়াই বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটিতে রূপ নেয়।
যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে বড় ধরণের সাফল্য পেয়ে যায় ইরাক। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর খোররামশা দখল করে নেয় ইরাক।
"প্রথম ক'সপ্তাহে ইরাকিরা কোনো প্রতিরোধের মুখেই পড়েনি। তারা ইরানের অনেক জায়গা দখল করে নেয়। ইরাকের সবাই তখন ভেবেছিল সাদ্দাম হোসেন যুদ্ধে জিতে গেছেন। সাদ্দাম হোসেন টিভিতে একদিন বললেন, ছয় দিনে তিনি যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। কিন্তু তিনি ভুল ছিলেন।"
যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিবিসিকে বলছিলেন, ইরাকি চিকিৎসক ও কবি আহমেদ আল-মুশতাত যাকে যুদ্ধের শেষ দিকে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয়েছিল। দক্ষিণে বসরা এবং পরে উত্তর আল-হাফজার রণাঙ্গনে পাঠানো হয়েছিল তাকে।
ইরানের সৈন্যরা বসরার কাছে একটি যুদ্ধে বিজয় উদযাপন করছে (২৪ জানুয়ারি, ১৯৮৭)
১৯৮০ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয় আহমেদ আল-মুশতাতের বয়স ছিল ১৮। বাগদাদে তিনি তখন একজন মেডিকেল ছাত্র ছিলেন।
আট বছর পর যখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ যখন শেষ হয়েছিল তিনি তখন ২৬ বছরের যুবক।
"আমি মেডিকেল স্কুল শেষ করলাম । এক বছর হাসপাতালে কাজ করলাম। তারপর চলে গেলাম যুদ্ধে।"
তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, একটা সময় যুদ্ধে না গিয়ে উপায় থাকবে না।
"ঐ সময় শুধু আমি নই - প্রতিটি ইরাকির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যুদ্ধ দ্বারা প্রভাবিত হতো। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর। হঠাৎ একদিন শুনলেন আপনার প্রতিবেশীর ছেলে রণাঙ্গনে মারা গেছে। আমি আমার অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। পরিবারের অনেক সদস্য হারিয়েছি। জঘন্য সময় ছিল সেটা।"
'"আমি লেখালেখি করতাম। কিন্তু যুদ্ধের বিরুদ্ধে কিছু লেখা সম্ভবই ছিলনা। নিরাপত্তা গোয়েন্দারা সর্বক্ষণ সবার ওপর কড়া নজর রাখতো।"

জবরদস্তি করে রণাঙ্গনে

যুদ্ধ শুরুর সাত বছর পর আহমেদ চিঠি পেলেন তাকে সেনাবাহিনীর মেডিকেল ইউনিটে যোগ দিতে হবে।
"এরকম একটি চিঠি একদিন আসবে আমি ধরেই নিয়েছিলাম, কিন্তু আমি চাইনি তা আসুক। কারণ ঐ সময় রণাঙ্গনে গিয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল ৯০ ভাগ। কিন্তু নিয়তি অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না, কারণ আপনি ঐ নির্দেশ অবজ্ঞা করতে পারতেন না। পালানোর কোনো উপায় ছিলনা। পালালেই আপনাকে ধরা পড়তে হবে, আপনাকে না পেলেও আপনার পরিবারকে তারা রেহাই দেবেনা।
দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে ইরানের সৈন্যদের কাছ থেকে একটি জায়গা পুনর্দখলের পর ইরাকি সৈন্যদের বিজয় উদযাপন, ২০ এপ্রিল, ১৯৮৮
খুঁজে না পেলে কি হতে পারতো?
"সোজা মেরে ফেলতো। আত্মরক্ষার, আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই ছিলনা।"
১৯৮৭ সাল নাগাদ যুদ্ধে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। কোনো পক্ষই বলতে পারছিল না তারাই সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। লাখ লাখ মানুষ তার মধ্যে মারা গেছে। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেহারা

এত সৈন্য মারা গিয়েছিল যে এক পর্যায়ে দুটি দেশই জোর করে তরুণ যুবকদের ধরে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিচ্ছিল।
যুদ্ধের চেহারা নিয়েছিল অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো - কাঁটাতার, মাইন আর ট্রেঞ্চে ভরা রণাঙ্গন। সব সময় মাস্টার্ড গ্যাস হামলার ভয়।

বসরার মরুতে ৫০ হাজার মৃতদেহ

ইরাকের তেল সমৃদ্ধ বসরার দখল নিয়ে লড়াইতে ১০ হাজার ইরাকির মৃত্যু হয়। অন্যদিকে ১২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার মরুতে ৫০ হাজার ইরানির মৃতদেহ পচছিল।
খোমেনির ছবিতে লাথি মারছে ইরাকি সৈন্যরা
ইরাকিদের শক্ত অবস্থানের ওপর ইরানি তরুণ স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারা ঢেউয়ের মতো একের পর এক হামলা চালিয়েছিল।
আয়াতোল্লাহ খোমেনির ডাকে শহীদ হওয়ার উন্মাদনা নিয়ে ইরাকি মেশিনগান উপেক্ষা করে মাইন-ভর্তি এলাকা পেরিয়ে দলে দলে তারা ইরাকি অবস্থানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে।
আহমেদ তখন বসরার কাছেই একটি ইরাকি ব্রিগেডের সাথে ছিলেন।
"আমাকে বসরার কাছে আমরা নামে একটি জায়গায় একটি ব্রিগেডের সাথে যুক্ত করা হলো। সে বছর যুদ্ধে তখন তুঙ্গে। আমি যখন প্রথমবার আমার ইউনিটের কাছে যাচ্ছিলাম, গোলার শব্দ ততই জোরালো হচ্ছিল। সেইসাথে আমার হৃৎপিণ্ডের গতিও বাড়ছিল।"
ইউনিটে মোট আটজন পুরুষ নার্স ছিল, ইরাকের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা। উত্তরের কুর্দি এলাকা থেকে কুর্দি, সুন্নি, শিয়া।
"সবই আমার খেয়াল রাখছিল, কারণ আমার কোনো সামরিক অভিজ্ঞতাই ছিলনা। সুতরাং তারা আমাকে শেখাতো কীভাবে মাইনফিল্ড এড়িয়ে চলতে হবে, কিভাবে বোমা থেকে বাঁচতে হবে। রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা কিভাবে বুঝতে হবে, কী করতে হবে। খুব ভালো ছিল তারা।"
"ঐ দিনগুলোর কথা আমি সবসময় মনে পড়ে। অনেক সময় স্বপ্নেও দেখি।"
১৯৮৮ সাল নাগাদ দুই দেশই ক্লান্ত হয়ে পড়লো। শেষের দিকে যুদ্ধ ইরাকের উত্তরের সীমান্তে জোরদার হলো। আহমেদের ব্যাটালিয়ানকে সেখানে পাঠানো হলো। যদিও ইরান তখন জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাজী হয়েছিল, তারপরও উত্তর সীমান্তে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিলো।
আহবাজ বন্দী শিবিরে ইরাকি যুদ্ধবন্দীদের ওপর নজর রাখছে ইরানের একজন সৈন্য, ২২ জানুয়ারি, ১৯৮৭
"তিন দিনে আমরা প্রায় দেড় হাজার সৈন্য হারাই। রক্তে ভেজা আহত সৈন্যরা যন্ত্রণায় চিৎকার করতো। ভয়ানক দৃশ্য সব। আমরা যতটুকু পারতাম করতাম। এখনও সেই বারুদ মেশানো ধোঁয়ার গন্ধ পাই আমি।"

প্রাণে বাঁচতে সৈন্যদের আকুতি

যুদ্ধ হচ্ছিল হালাপজা শহরের কাছে ছোটো একটি পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ইরানী বাহিনীর হামলার মুখে তিনদিন পর ইরাকি বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছিল।
এরপর ব্রিগেড কমান্ডার আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন, তিনি সৈন্যদের লড়াই থেকে পালাতে সাহায্য করেছেন - কারণ অল্প জখম সৈন্যদের তিনি ফিল্ড হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
"তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্যই আমরা এই লড়াইতে হেরে গেলাম। আমি অবশ্য বুঝতে পারছিলাম তিনি কারো ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছিলেন।"
আহমেদ ভয় পেয়েছিলেন, তাকে হয়ত কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্ত অন্য ক'জন অফিসারের হস্তক্ষেপে তিনি রক্ষা পান।
কিন্তু কমান্ডারের অভিযোগ কি সত্যি ছিল? তিনি কি সত্যিই রণাঙ্গন থেকে সরতে সৈন্যদের সাহায্য করেছিলেন?
এই প্রশ্নে একটু মৃদু হেসে আহমেদ বলেন, "আমি সবাইকে রক্ষা করতে চাইছিলাম। তারা আমার চোখের দিকে এমনভাবে তাকাতো যেন বলতো 'প্লিজ আমাকে আর যুদ্ধ করতে পাঠিও না।' আমি এখনও অনেক সৈন্যের নাম মনে করতে পারি। আমি মনে করতে পারি তারা আমার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ ছিল। তাদের জীবন বেঁচেছিল।
রামাদির কাছে এক ইরাকি বন্দী শিবিরে ইরানী যুদ্ধবন্দী, এপ্রিল, ১৯৮৫
কম-বেশি ১০ লাখ ইরাকির মৃত্যু হয়েছিল আট বছর ধরে চলা ঐ যুদ্ধে।
যদিও এই যুদ্ধ নিয়ে বাইরের বিশ্বে তত বেশি কথা হয়নি, কিন্তু আহমেদের মতো ঐ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, যারা যুদ্ধ করেছে এবং বেঁচে গেছে, তারা কখনো ভোলেননা।
"এখনো বহু সৈন্যর মুখ আমার মনে আছে। লড়াইতে যাওয়ার আগে তারা বিদায় জানিয়ে যেত। তারাও বুঝতো, আমিও জানতাম তারা হয়তো ফিরবে না। আমি সব মুখগুলো মনে করতে পারি।
১৯৮৮ সালের ২০ অগাস্ট ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষ হয়। দু'বছর পর ইরাক আরেকটি যুদ্ধ শুরু করে, কুয়েতে সৈন্য পাঠিয়ে।
আহমেদ অবশ্য সেই যুদ্ধে যাননি। ১৯৯৪ সালে তিনি ইরাক ছেড়ে যান। এখনও তিনি ডাক্তার। একইসাথে তিনি একজন কবি। কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে তার।

Sunday, September 19, 2021

ধ্বংসের পথে ঢাকার দুটি ক্যারাভান সরাই by শফিক রহমান

বড় কাটারা
অযত্ন-অবহেলা আর দখল-বেদখলে ধ্বংসের পথে ঢাকার দুটি ক্যারাভান সরাই। স্থানীয়ভাবে ‘কাটরা’ (বড় কাটরা ও ছোট কাটরা) হিসেবে পরিচিত এ স্থাপনা দুটি ঢাকায় মোঘল যুগের সূচনার চার থেকে পাঁচ দশকের মাথায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেষে দক্ষিণমুখী করে নির্মাণ করা হয়। আজকে নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা চারদিক থেকে যেমন স্থাপনা দুটির গলা টিপে ধরেছে তেমনি ভবনের মধ্যেও চেপে বসেছে দখলদাররা। যদিও বৃটিশ সরকারের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারও নানা সময়ে স্থাপনা দুটিকে ‘হেরিটেজ ভবন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এছাড়া সংরক্ষণের অভাবে একদিকে যেমন ভবন দুটির জৌলুস ফিঁকে হয়ে যাচ্ছে। তেমনি গবেষণার অভাবে ধোয়াশা কাটছে না এর নির্মাণের প্রকৃত কারণ ও নানা সময়ে ব্যবহারের ধরন প্রকৃতি নিয়েও।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, বড় কাটরাটি ১৬৪৪ সালে নির্মিত হয় মোঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে। নির্মাণ করেন তারই প্রধান স্থপতি (মীর-ই-ইমারত) মীর মুহম্মদ আবুল কাসেম। বলা হয়, প্রথমে এটি প্যালেস হিসেবে নির্মিত হয় এবং এখানে শাহ সুজার বসবাস করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি এখানে থাকেননি। পরে এটি ক্যারাভান সরাইতে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এ তথ্যের সঙ্গে একমত নন আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এ স্থপতি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, এটির লেআউট, চেহারা কোনটাই বুঝায় না যে এটি প্যালেস হিসেবে নির্মিত হয়েছে।
এদিকে তথ্যানুসন্ধানে বড় কাটরায় ফারসি ভাষায় লিখিত দুটি শিলালিপির খোঁজ পাওয়া গেছে। এর একটিতে ভবনটির নির্মাণের সময় হিসেবে ১৬৪৪ সালকে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটিতে স্থাপনাটির নির্মাতা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহের উপায় সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন লেখায় যার বাংলায় অনুবাদ হিসেবে পাওয়া যায়, ‘সুলতান শাহ্ সুজা সব সময় দান-খয়রাতে মশগুল থাকিতেন। তাই খোদার করুণালাভের আশায় আবুল কাসেম তুব্বা হোসায়নি সৌভাগ্যসূচক এই দালানটি নির্মাণ করিলেন। ইহার সঙ্গে ২২টি দোকানঘর যুক্ত হইল যাহাতে এইগুলোর আয়ে ইহার মেরামতকার্য চলিতে পারে এবং ইহাতে মুসাফিরদের বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা হইতে পারে। এই বিধি কখনো বাতিল করা যাইবে না। বাতিল করিলে অপ্রাধী শেষ বিচার দিনে শাস্তি লাভ করিবে। শাদুদ্দিন মুহম্মদ সিরাজি কর্তৃক এই ফলকটি লিখিত হইল।’
ফলকে উল্লেখ করা দোকান কাঠামোগুলো বড় কাটরায় এখনও আছে কিন্তু সেখানে অবস্থান নিয়েছে সেলুন, খাবারের দোকান, মুদি দোকান, এম্ব্রয়ডারি কারখানাসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তাতে হারিয়ে গেছে মোঘল স্থাপত্য কলার নির্মাণ শৈলী।
বর্তমানে বড় কাটরার উত্তরাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। পূর্ব ও পশ্চিমাংশের সামান্য কিছু এখনও আছে। কিন্তু দক্ষিণাংশের কাঠামো এখনও আছে। দক্ষিণাংশের দৈর্ঘ ৬৭.৯৭ মিটার। এ অংশের মাঝখানে রয়েছে তিন তলা গেট হাউজ।
তাইমুর ইসলাম বলেন, বড় কাটরার নির্মাণ কাঠামোর অনন্য বৈশিষ্ট হচ্ছে গেট হাউজটা। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যার বাইরে থেকে দেখলে পুরা তিন তলা উচ্চতাটা দেখা যায়। কিন্তু কাটরার প্রাঙ্গনের ভিতরের অংশে ঢুকলে তখন আর বাইরের মাপের ওই উচ্চতাটা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ ভিতরের অংশে ‘স্পেস মেনুপুলেশন’ করা হয়েছে। এটাকে ‘মোঘল স্থাপত্য রীতি’ উল্লেখ করে উদাহরণ হিসেবে বুলন্দ দরওয়াজ, আগ্রাফোর্ট ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করেন তাইমুর ইসলাম।
বড় কাটারা, মুঘল আমলের স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ
গেট হাউজের নিচ তলায় দুই পাশে চারটি করে মোট ৮টি বিশাল আকারের চেম্বার রয়েছে। যেগুলোতেও রয়েছে মোঘল স্থাপত্য রীতির ফোর পয়েন্ট আর্চের অনুকরণে পয়েন্টেড ভল্ট। যেই চেম্বারগুলোর উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট এবং লম্বায় ও চওড়ায় প্রায় ৬০ ও ৫০ ফুট আকারের প্রতিটি। যেগুলোতে বর্তমানে সাদা পলেস্তরা করা হয়েছে। উভয় দিকেরই শেষ দুটি কক্ষ থেকে উত্তর দিকের কিছু অংশ কেটে নিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে ১টি করে আলাদা কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া বড় কাটরার মূল কাঠামো জুড়ে রয়েছে একটি মাদ্রাসা। জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসা নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকায় বড় কাটরার অবয়বটা এখনও আছে। না হলে এটির অবস্থা ছোট কাটরার চেয়েও খারাপ হতো।’
মাদরাসাটির অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাউথ এশিয়ান মনিটরকে জানান, ১৯০৮ সালে খান বাহাদুর হাফেজ মোহাম্মদ হোসাইন রেকর্ড সূত্রে বড় কাটরার মালিক হন। ১৯৩১ সালে ওয়াকফ করেন এবং ওই বছরই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠার নেতৃত্বে ছিলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা যফর আহমদ উসমানী, আবদুল ওয়াহ্হাব পীরজী হুজুর, শামছুল হক ফরিদপুরী এবং মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর।
বর্তমানে মাদরাসাটিতে প্রাথমিক থেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স সমমান) শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে সাত শতাধিক এবং শিক্ষকের সংখ্যা ৪৫ জন।
ছোট কাটরা
বড় কাটরা হতে প্রায় ১৮৩ মি. পূর্ব দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরেই শায়েস্তা খানের সময় নির্মিত হয়েছিল ছোট কাটরা। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৬৬৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৬৬৬ সালের দিকে শেষ হয়। তাইমুর ইসলাম জানান, ক্যারাভান সরাইর আদলে এটি নির্মিত হলেও আসলে কি কাজে ব্যবহার হতো তার কোন প্রামাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে বড় কাটরার সঙ্গে ছোট কাটরার নির্মাণ শৈলীর পার্থক্য টেনে তিনি বলেন, বড় কাটরার প্রত্যেকটি চেম্বারে যেমন পয়েন্টেড ভল্ট পাওয়া যাচ্ছে ছোট কাটরাতে কিন্তু সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। সেখান স্লিংটা ফ্লাট আর কর্ণারগুলো কার্ভ করা। যাকে ‘শায়েস্তা খান স্টাইল’ হিসেবেই উল্লেখ করলেন স্থপতি তাইমুর ইসলাম।
কিন্তু দখল আর বেদখলে ছোট কাটরার অস্তিত্বও আজ খুঁজে পাওয়া কষ্টের। চারদিকেই রয়েছে নানা ধরনের স্থাপনা। এসব ঠেলে এগুলে দেখা যাবে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে রয়েছে দুটি প্রবেশপথ। এর মধ্যে দক্ষিণেরটি প্রধান গেট হাউজ। সম্প্রতি ওই তিন তলা গেট হাউজের ভাঙ্গা-নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল দ্বিতীয় তলার তিনটি কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে গোডাউন হিসেবে। তিন তলায় রয়েছে ‘সাপ লুডু’ তৈরির কারখানা। এছাড়া নিচ তলাও রয়েছে ভাঙ্গারির দোকানসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
ছোট কাটারায় বই বাঁধাইয়ের দোকান
বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, ১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনারদ ছোট কাটরায় খুলেছিলেন ঢাকার প্রথম ইংরাজি স্কুল। ১৮৫৭ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকার প্রথম নরমাল স্কুল। পরে এটি ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের দখলে এবং তাতে তখন কয়লা ও চুণার কারখানার কাজ চলত।
হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সর্বপ্রথম ১৯০৮ সালে বড় কাটরাটিকে হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বৃটিশ সরকার। যদিও ১৯১২ সালের দিকে তা আবার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ১৯৫৭ সালে আবার হেরিটেজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং ২০০৯ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বড় কাটরা ও ছোট কাটরাকে হেরিটেজ হিসেবে তালিকা ভুক্ত করে। কিন্তু সরকারের ওই দুটি সংস্থার কোন সংস্থাই স্থাপনা দুটির সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও অবৈধ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে না। অথচ, এখনও উদ্যোগ নিলে পর্যায়ক্রমে স্থাপনা দুটির সংরক্ষণ সম্ভব বলে বিশ্বাস তাইমুরের। তিনি বলেন, বড় কাটরা ও ছোট কাটরার সংরক্ষণের উদ্যোগ আরবান ডিজাইনেরই অংশ হিসেবে হওয়া উচিত এবং আর্কিটেক্ট, প্লানারসহ নানা পেশাজীবীর সমন্বয়ে একটি টিম করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, ওখানে যারা দখলে আছেন তাদের মধ্যে তিন চার ধরনের মালিকানা দাবি করছেন। কেউ দখলে আছেন ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে, কেউ অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে। আবার কেউ ব্যক্তিগত মালিকানাও দাবি করছেন। এই সব কিছু নিয়েই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি জরিপ করা উচিত।
তবে সেই উদ্যোগটিই নেয়া হচ্ছে না বলে জানালেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক (ঢাকা ডিভিশন) রাখী রায়। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ হেরিটেজ হিসেবে স্থাপনা দুটিকে তালিভুক্ত করেছে। কিন্তু ছোট কাটরা নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখলে, বড় কাটরাও একটি মাদ্রাসাসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখলে। তাদেরকে উচ্ছেদ করে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সংরক্ষণ বলতে যেটা বুঝায় সেটা এখনও হয়ে ওঠেনি। বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পরিদর্শনে যাচ্ছি। কেউ কোন ভাবে ক্ষয়-ক্ষতি করছে কিনা সেটা দেখছি।’
তারপরওতো দেখা যাচ্ছে যে যার মতো ব্যবহার করছে, তাতে ধ্বংসও হচ্ছে। সেটা আকটাবেন কিভাবে? জানতে চাইলে রাখী রায় বলেন, ধ্বংস যা হওয়ার আগে হয়েছে। এখন আর হচ্ছে না।
ছোটকাটার মধ্য দিয়ে চলে গেছে একটি পায়ে চলা পথ

Wednesday, September 15, 2021

গল্প- অদরকারি by মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

বাস্তব জগতে যখন কিছু ঘটে, তখন তা ঘটতে যা যা লাগে তার সবকিছু নিয়েই সে ঘটে – যেমন আসমান থেকে জমিনে বৃষ্টি পড়তে পানি লাগে, আসমান লাগে আর জমিন লাগে। তিনটে জিনিসের উপস্থিতিতেই কেবল ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা’ হয়। মুশকিল হচ্ছে, যা লাগে না তা-ও থাকে, যেমন সুলতাদের ঘিনঘিনে কানাচে একটি আত্মজ্বালা মানকচু গাছ – অঝোর বৃষ্টিধারায় ওর পাতা কেবল নুয়ে নুয়ে পড়ে।

বাসে বাসে গুঁতোগুঁতি লাগার সময় দুটো বাস, দুই বাসের দুই চালক, আর একটা রাস্তা হলেই হয়; গুঁতোগুঁতির কাজে সাহায্যের জন্য বড়জোর দুই বাসের দুই হেলপার লাগতে পারে, কিন্তু রাস্তার পাশে যে শিরীষ গাছটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতাস টানছিল, ওটার নিশ্চয় দরকার ছিল না। কিন্তু সেদিন টাল সামলাতে না পেরে, পেছনের বাসটা গিয়ে ওটার সঙ্গেই দ্বিতীয় গোত্তাটা খেল, পেছনের দুই চাকা একবার শূন্যে তুলে দিয়ে মুখ ভচকে দাঁড়িয়ে পড়ল, যাওয়ার সময় সামনের বাসের হেলপারের কাঁধ থেকে বাঁ-হাত আর ধড় থেকে মাথা ছিঁড়ে নিয়ে গেল। ওই প্রকা- শিরীষ গাছের ডালপাতার ফাঁকে ফাঁকে যে অতগুলো কাকদুপুরে বিশ্রাম করছিল, সেটা বোঝা গেল, যখন বিকট দানবীয় শব্দ শুনে তারা কা-কা করতে করতে ডানা ঝাপটে ত্রস্তস্রস্ত বেরিয়ে এলো। অবশ্য তারপর মানবীয় চিৎকার শুরু হলে তারা একে একে আবার পাশের গাছে গিয়ে বসেছিল।

সামনের ডানপাশের বাসটা পশ্চাদ্দেশ দুলিয়ে যখন গোঁ-গোঁ করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিল, তখন বাঁপাশ থেকে ওই হতভাগা বাসটি মাথা গুঁজে ওটার পেছনে পেছনে আসছিল। দুই হেলপার পরস্পরের দিকে দুবার চোখ গোল করে তাকিয়েছিল। পেছনের চালক তার পান-খাওয়া ঠোঁটে রাঙা হাসি দেখিয়েছিল সামনের হেলপারকে, ও যখন পেছনের ওস্তাদের সঙ্গে তামাশা করার জন্য ঘাড় ঘুরিয়েছিল। ওস্তাদের রস বোধহয় একটু বেশিই বেরিয়ে গিয়েছিল – বাঁ-হাতের চেটোর উলটো পিঠ দিয়ে ঘষে ঠোঁট মুছে নিয়েছিল। সামনেরটার চালক যখন টের পেল পরকীয়া চলছে, তখন বাঁয়ে কাত হয়ে পেছনেরটাকে বেমক্কা চাপ দিলো। পেছনেরটা তাড়া খেয়ে সরে না গিয়ে ঝাড়া দিয়ে মাথা এগিয়ে দিলো। সে-মাথা গিয়ে সামনেরটার দরজা গলে ঢুকে পড়ল, তারপর খানিক কড়কড়-ক্যাঁচক্যাঁচ ঝনাৎ-ঝনাৎ আওয়াজ করে অবশেষে ঘোঁতঘোঁত করে বেরিয়ে এলো। আসার সময় হামানদিস্তার মতো ছেঁচে বের করে আনল হেলপারের শরীরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ – মুখে করে নিয়ে বেগতিক ছুটল শিরীষ গাছটির দিকে। প্রকা- শিরীষ গাছের কা- সেঁধিয়ে গেল বাসের নাক বরাবর – গাছের বাকলের সঙ্গে বাসের মুখ ভাঁজ হয়ে লেপটে গেল। মুহূর্তে বাসের সামনের অর্ধেকটা বালকের শিশ্নের মতো কুঁচকে গেল।

থানা থেকে লোকজন এসে বাস কাটতে আরম্ভ করল। তখন দেড়টা বাজে। গনগনে রোদ। কাকের কা-কা। মাঝেমধ্যে খয়েরি-সাদা বিষ্ঠা ঝরে পড়ছে শিরীষ গাছগুলো থেকে। ক্রেনের কমলা রঙের বিশাল বাহুর ধীর ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বাসের সামনের দিক থেকে শুরু করল উদ্ধারকাজ। প্রথমে একটা একটা করে দুটো হাত বেরোল – একটা কাঁধ থেকে ছেঁড়া, আরেকটা কনুই থেকে। দুটোই বাঁহাত। ইন্সপেক্টর তপন ছোট্ট করে বললেন, ‘ড্রাইভার মরেছে।’ কেউ শুনতে পেল না। লোকজনের চেঁচামেচি, বাঁশির ফুঁকাফুঁকি, ওয়াকিটকির টুঁত-টুঁত, পুলিশভ্যানের হর্ন, দমকল গাড়ির সাইরেন – সবকিছুর সমবেত পরিবেশনার মাঝে ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই। যে-লোকটা বলেছিল ড্রাইভার পালিয়েছে, তাকেও আর দেখা যাচ্ছে না, এতক্ষণে সমষ্টির মাঝে মিশে গেছে সে। হয়তো এত মানুষের কোলাহলে সে ভুলেও গেছে, কাকে সে ‘কালপ্রিট’ বলে গালি দিয়েছিল। ব্যক্তির অপরাধ সমষ্টির ঔৎসুক্যে মিশে গেছে – কিন্তু শোক মেশেনি; শোক মেশে না – শোক ব্যক্তির, সমষ্টির না। সেই ব্যক্তিরা এখনো অকুস্থলে এসে পৌঁছায়নি।

সকালে আতোয়ার সাহেব কাজে বেরিয়েছিলেন। দুটো বাসে গুঁতোগুঁতি ঘটার জন্য আতোয়ার সাহেবকে কি প্রয়োজন ছিল? – না, ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন – পেছনের বাসটাতে ছিলেন – পুরো ঘটনার সাক্ষী। তার দরকার না থাকলেও মাঝেমধ্যে তিনি অনেক জায়গায়ই থাকেন। যেমন তার শ্যালিকার গায়ে হলুদে তাকে দাওয়াত দেওয়া হলো না, শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, অথচ গায়েহলুদের দিন সকালবেলায়ই তিনি পাঞ্জাবি-পাজামা পরে ড্রইংরুমে বসে হাঁক দিচ্ছিলেন, ‘কই, তোমার হলো? যেতে যেতে তো সবাই ওরা চলে যাবে। নতুন আত্মীয়রা আসবে, ওদের সঙ্গে একটু মোয়ামেলাদ না করলে কেমন হয়?’ ‘এই হলো’, বলে জোহরা রান্নাঘরে ঢুকল। সিংকে ছরছর করে পানি ছেড়ে মাজুনি দিয়ে পরিষ্কার করতে শুরু করে দিলো। আবার হাঁক দিলে, বালিশের কভারগুলো খুলে নতুন কভার লাগাতে বসল। কিন্তু শাড়ি পরছিল না, সাজগোজ করছিল না। আর আতোয়ার সাহেব কেবল ক্ষেপে যাচ্ছিলেন।

জোহরা কী করে বোঝায়, ওদের বাড়ির লোকজন আতোয়ারকে যেতে বলেনি, শুধু জোহরাকে যেতে বলেছে। জোহরা গটগট করে ড্রইংরুমে ঢুকল, হাতের মুঠোয় পর্দার কোনা ধরে দাঁড়াল, সোফায় পা-তুলে বসা আতোয়ার সাহেবকে সোজা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কাপড় পরেছ কেন, তোমাকে তো যেতে বলেনি?’ আতোয়ার সাহেব বললেন, ‘এসব প্রোগ্রামে আবার বলা লাগে নাকি? হাজার হলেও শালির গায়েহলুদ, না গেলে ও খুব মাইন্ড করবে।’ ‘না, করবে না’, জোহরার কণ্ঠে শাসনের সুর, কিন্তু চোখে অভিমানের অশ্রু। ‘এটা পুরুষদের প্রোগ্রাম নয়, মহিলাদের’, জোহরা অন্যদিকে তাকিয়ে কথাটা বাতাসে ছেড়ে দিলো। আতোয়ার সাহেবের কানে পৌঁছালে তিনি সোফা থেকে পা নামিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বসলেন, ‘কেন? ফরিদ যাচ্ছে না? ওর সাথে আমার এই একটু আগেই কথা হলো।’ জোহরা চুপ। জবাবে কী বলবে, সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে এলো না – একটু দেরি হলো। ও কেবল বলতে যাচ্ছিল, ‘যাচ্ছে, ও সাবিনাকে দিয়ে চলে আসবে’, কিন্তু বলতে পারল না, ততক্ষণে আতোয়ার সাহেব একটার পর একটা পুরুষ মানুষের নাম আওড়াতে শুরু করে দিয়েছেন, ‘ছোটকাকা, বড় দুলাভাই, মিমের আব্বা, মাহতাবভাই, মিজান, মারুফ, মতিন … শাড়ি পরো, শাড়ি পরো। বাসন্তিটা পরো …।’ ‘তাহলে, তুমি যাও। আমি যাব না।’ জোহরা বলল।

‘তা কী করে হয়? তোমার ছোটবোন, আর তুমি যাবে না? ওরা কী ভাববে, বলো তো?’

জোহরা মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিল যে, শাকিলা ওর কাজিন, ছোটবোন নয়। কিন্তু কথাটা আটকে গেল। শাকিলা এ-বাসায় এতবার এসেছে, আর আতোয়ারকে নিয়ে ও ওদের বাসায় এতবার গিয়েছে যে, আপন-পরের পার্থক্য ওরা অনেক আগেই ভুলে গেছে। এত আগে ভুলেছে যে, এতদিন পরে তা মনে করিয়ে দিলেও মনে পড়বে না। আর মনে পড়লেও তাতে কোনো কাজ হবে বলে মনে হলো না। জোহরা যে উদ্দেশ্যে কথাটা বলতে চাচ্ছিল, সে উদ্দেশ্য সাধন হবে না – আতোয়ার সাহেব শাকিলার কপালে হলুদ লাগাবেনই।

মাসদুই আগে শাকিলাকে পাত্রপক্ষ যেদিন দেখতে এসেছিল, কাছের মানুষ হিসেবেই হোক আর কাজের মানুষ হিসেবেই হোক, আতোয়ার-জোহরারা সেখানে ছিলেন। জোহরা সারাদিন পাটায় মরিচ বেটেছে, টিকিয়ার মাংস ছেঁচেছে, খুঁটে খুঁটে রাজহাঁসের পশম তুলেছে, গরুর ভুঁড়ি সিদ্ধ করে পর্দা ছাড়িয়েছে, পাটায় পিষে ফলি মাছের কাঁটা বের করেছে। শাকিলার মা বারবার বলেছেন, ‘দোয়া কর, যেন ওই বাড়িতে বিয়ে না হয়, তাহলে মেয়ে দুইটাই পাঠাতে হবে।’

‘ক্যান চাচি?’ জোহরা পাটার ওপরে নোড়া ঘষতে ঘষতে বলেছিল।

‘তুই না গেলে শাকিলা একদিনও ও বাড়িতে টিকতে পারবে না, ওদের যে খাওয়ার মুখ।’ শাকিলার মা হেসে গড়িয়ে পড়ছিলেন। জোহরা দুই কাঁধ তুলে নোড়া দিয়ে পাটার ওপর জোরে জোরে দুই ঘষা দিয়ে দম নিল। হাসিতে যোগ দিতে গিয়েও থেমে গেল। শাকিলার মা জোহরার দিকে তাকিয়ে নেই, আনমনে পাত্রপক্ষের গাড়িবাড়ি শান-শওকত নিয়ে ব্যঙ্গ করতে শুরু করেছে। জোহরা আবার একমনে নোড়া ঘষতে লাগল।

সন্ধ্যায় পাত্রপক্ষ শাকিলাকে দেখতে এলে আতোয়ার সাহেবের সারামুখে অনুনয়-বিনয় গলে গলে পড়ছিল – কাকে কী বলে, কাকে কোথায় বসতে দেয়, কার কী লাগে, কে কখন টয়লেটে যায়। পাত্রপক্ষ আর কথা কী বলবে, বলার আগেই তিনি সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছিলেন। মেয়ে যে হীরের টুকরো সে-কথা বিশ^াস করাতে যতরকম প্রমাণ হাজির করতে হয়, তার সব তিনি গড়গড় করে হাজির করছিলেন। পাত্রের বাবা তো দূরের কথা, শাকিলার বাবাও দুকথা বলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে পাত্রের মামা চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘তিনি কে?’ আতোয়ার সাহেব নিজেই সে-প্রশ্নের উত্তর দিতে আরম্ভ করলে শাকিলার ছোটকাকা বিষয়টা সামলালেন। তাতেই সর্বনাশ ঘটল। ছোটকাকা যা বলেছিলেন তাতে কোনোভাবেই বোঝা গেল না আতোয়ার সাহেব শাকিলার কত আপনজন, শাকিলা সম্পর্কে খুঁটিনাটি কথা কেবল তিনিই বলতে পারেন, ঘনিষ্ঠতার সূত্রে শাকিলা সম্পর্কে তিনি এমন কিছু জানেন, যা তার পরিবারের কেউ জানে না; তিনি জানেন, শাকিলা একা একা বৃষ্টি দেখতে পছন্দ করে। বলতে বলতে আতোয়ার সাহেবের স্নেহবিগলিত মুখটি প্রিয়জনের সুখসম্ভাবনায় যতই প্রস্ফুটিত হতে থাকল পাত্রপক্ষের সবার চোখ ততই সরু হতে থাকল। মাঝখানে ছোটকাকা আতোয়ার সাহেবকে ডেকে আড়ালে নিয়ে না গেলে সেদিন হয়তো ওদের চোখ একেবারেই বুজে যেত। পাশের ঘর থেকে শুধু শোনা যাচ্ছিল আতোয়ার সাহেব ছোটকাকার চাপা কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে চেঁচাচ্ছেন, ‘… আমি তো সেই কথাই বলছি … আমি তো সেই কথাই বলছি …।’

সেদিন পাত্রপক্ষের চোখ যতটুকু বুজেছিল, সেটুকু খুলতেই ছোটকাকার দুমাস লেগে গিয়েছিল। দুমাস পর, বিয়ের তারিখ দিলে, ছোটকাকা গায়ে হলুদের জন্য দুদিন আগের তারিখটা নিয়ে নিলেন। দাওয়াত দেওয়ার সময় শাকিলার মা জোহরাকে বলেছিলেন, ‘তুই আসিস। … দ্যাখ, পাত্রপক্ষ থেকে কয়েকজন হলুদ দিতে আসবে …।’

মানুষের যে-কোনো খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতিই আতোয়ার সাহেবের অতি আগ্রহ; কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে দুপক্ষের আগ্রহ তিনি একাই দেখিয়ে দেন, দেখানোর জন্য অন্যপক্ষের আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। বাইরে সবার ব্যাপারে যার সীমাহীন আগ্রহ সেই আতোয়ার সাহেব ঘরে জোহরার গুরুতর ব্যাপারগুলোতে কোনো আগ্রহই দেখান না। আজ সকালে বেরোনোর আগে চায়ের কাপ হাতে দিয়ে জোহরা যখন বলল, ‘তুমি কী ভাবছ, আইভিএফ করাবে না?’ আতোয়ার সাহেব কিছু বললেন না। প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইলেন। জোহরা বলল, ‘অনেকেই তো এভাবে বাচ্চা নিচ্ছে।’ আতোয়ার সাহেব জানেন, জোহরার আর বাচ্চা হবে না – ডাক্তার অনেক আগেই পরিষ্কার বলে দিয়েছেন। আর জোহরা জানে আইভিএফ করালেই ওর বাচ্চা হবে – একবারে না হলে দুবারে হবে, কিন্তু হবে। জোহরা জানে, ওর হাজব্যান্ড রাজি হচ্ছে না বলেই ওদের বাচ্চা হচ্ছে না; আর আতোয়ার সাহেব জানেন, জোহরার ওভারি ড্যামেজড, যে-কথা তিনি ওকে কোনোদিনই বলবেন না, ওর মুখ ছোট হয়ে যাবে, ও আর ঝগড়া করতে পারবে না। ও যেন ঝগড়া করতে পারে, তাই ওকে আতোয়ার সাহেব বলেছেন, তিনি আইভিএফ পছন্দ করেন না, ওনার শুচিবায়ু আছে, সন্তানের প্রতি অশুচিবোধ নিয়ে উনি স্বাভাবিক থাকতে পারবেন না – এসব। এ নিয়ে জোহরা রোজ ঝগড়া করে, হাজব্যান্ডকে বোঝায়, আইভিএফে তার শরীরের উপাদানই কীভাবে প্রসেস করা হয়, আর তাতে তারই পুরোপুরি সম্পৃক্ততা, অন্য কারো নয়। আতোয়ার সাহেব বোঝেন, কথাগুলো জোহরার, কিন্তু শব্দগুলো জোহরার নয় – ওর কোনো বান্ধবী ওকে বুঝিয়েছে। জোহরা কঠিন শব্দ মনে রাখতে পারে না। জোর করে মনে রাখলে বলার সময় ধরা পড়ে যায় – উচ্চারণে ভুল হয় – ও ‘ফেলোপিয়ান টিউবকে’ ‘পোলাপান টিউব’ বলছিল।

জোহরা ঝগড়া করুক। যে মেয়ে ঝগড়া করে না, সে মেয়ে হতে পারে, স্ত্রী নয়। আতোয়ার সাহেবের ভালো লাগে, জোহরা যখন ঝগড়া করে, ঝগড়া করতে করতে ও যখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, সত্যিমিথ্যে ভুলে যায়, অসম্ভব মিথ্যে কথা বলতে থাকে, কঠিন কঠিন মিথ্যে কথা বলতে থাকে। আর প্রতিটা মিথ্যে কথা ঢাকার জন্য আবার মিথ্যে কথা বলে। তারপর আবার। তারপর আবার। যতই এগোতে থাকে, মিথ্যে কথা তরল থেকে তরলতর হতে থাকে; শেষে হয় হাসি, না হয় কান্না, না হয় হাসিকান্না হয়ে সব একবারে বেরিয়ে যায়।

আতোয়ার সাহেব বিশ^াস করেন, স্ত্রীর মিথ্যে কথাগুলোই সত্যিকার কথা, আর নীরবতা মিথ্যে। সংসার করতে হয় সত্যিকারের কথা নিয়ে, সত্যি কথা নিয়ে সংসার করা যায় না। জোহরা সত্যিকারের কথা বলুক। সত্যিকারভাবে বেঁচে থাকুক।

যেদিন জোহরা বলেছিল, বিয়ের আগে জাফর নামে একটা ছেলের সঙ্গে ওর প্রেম হয়েছিল, ছেলেটা ওকে পাগলের মতো ভালোবাসত, ওর সঙ্গে বিয়ে হলে ও সুখী হতো, ছেলেটা জাপান থেকে বার-অ্যাট-ল করেছিল, আতোয়ার সাহেব শুনে বুঝেছিলেন, এটা স্রেফ মিথ্যে কথা। জোহরাদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় জাপানে থাকে। সেই থেকে জাপানের নামটা ওর মাথায় ঢুকেছে। ওর বড়বোনের জন্য এক প্রস্তাব এসেছিল। ছেলেটা বার-অ্যাট-ল করা। সেই থেকে বার-অ্যাট-ল ওর মাথায় ঢুকে আছে। আর জাফর হচ্ছে – জাফর ইকবাল – নায়ক। বিয়ের আগে ও যখন টিভিতে সিনেমা দেখত, তখন জাফর ইকবাল ছিল ওর প্রিয় নায়ক, তার হঠাৎ মৃত্যুতে ও খুব শক্ড হয়েছিল। ওর হৃদয় অনেক গভীর। সেখানে যা ঢোকে, হারিয়ে যায়। ওর হৃদয়ের গহিনে ঠাঁই-নেওয়া এই তিনটি শব্দবিন্দুর মাঝে রেখা টেনে একটা ত্রিভুজ এঁকেছে ও – একটা প্রেমের গল্প ফেঁদেছে। ওর কল্পনাশক্তি খুবই নিম্নমানের। ও একটা নিম্নমানের মানুষ। নিম্নমানের মিথ্যুক। একজন নিম্নমানের মিথ্যুককে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, এদের অবিরাম স্নেহ করে যাওয়া ছাড়া কোনো গতি নেই। প্রকৃতি এদের আশ্চর্য এক বল দিয়ে সৃষ্টি করেছে। একবার সেই বল কাউকে টানতে থাকলে, সে বলকে উপেক্ষা করতে পারে না সে, এক অপার্থিব মায়া তাকে পেয়ে বসে; যতই দিন যেতে থাকে, এক প্রশান্ত আনন্দ এসে ভর করে তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। যে কেউ এ বলে ধরা পড়ে না। আতোয়ার সাহেবের মতো কিছু মানুষ, মানুষের ব্যাপারে যাদের অসীম আগ্রহ, কেবল তারাই এদের সন্ধান পায়।

অতএব, দুর্ঘটনার সাক্ষ্য আতোয়ার সাহেবেরই দেওয়ার কথা। দুই চালক আর দুই হেলপার – এই চারটি মানুষের মনোজগতে আর বহির্জগতে কী ঘটছিল, তা যদি কেউ অনুপুঙ্খ দেখে থাকেন, তিনি হচ্ছেন আতোয়ার সাহেব। তিনিই পরম নিরপেক্ষভাবে তাদের নিজ নিজ ভূমিকাও মূল্যায়ন করতে পারবেন। তিনি গাড়ির পেছনের দিকে বসে ছিলেন। আগ্রহ নিয়ে সবকিছু দেখছিলেন। ফাঁকে ফাঁকে কথাও বলছিলেন। কিন্তু প্রচ- ঝাঁকুনিতে তার মাথা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। হালকা-পাতলা মানুষ, জীবনে অনেক ঝাঁকুনি খেয়ে এসেছেন, কিন্তু অত বড় ঝাঁকুনি বোধহয় কখনো খাননি। এক ধাক্কায় উড়ে গিয়ে বাসের ছাদের সঙ্গে মাথা ঠেকালেন, কপালের দুপাশ বেয়ে গলগল করে বেরোতে লাগল রক্ত। সেই রক্ত গালে মেখেই ইন্সপেক্টর তপনের কাছে ঘটনার কিছু না বলেই তিনি মর্গে চলে গেলেন, পোস্টমর্টেমের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এগারোজন মারা গেছে। আটজন তো তার সামনেই ছেঁচে গেল – তাদের সাতজন তার বাসেই ছিল, সামনের দিকে বসে ছিল। বাসে ওঠার সময় তাদের দু-একজনের সঙ্গে তার কথাও হয়েছিল। তাদের নাম কী, গ্রামের বাড়ি কোথায়, কী করেন, অমুককে চেনেন কি না, ছেলেমেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে – এসবই জিজ্ঞাসা করেছিলেন। প্রথমবার কথা হলো বলে এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাননি।

জোহরা অপেক্ষা করছে। মাঝেমধ্যে একটু-আধটু করতে হয়। তবে আজ একটু বেশিই করতে হচ্ছে। হবে না কেন? দুই বাস মিলে মারা গেছে এগারোজন, আরো পাঁচ-ছয়জন মরবে বলে বসে আছে, বাকিরা যারা বেঁচে আছে, তাদের অনেকেই হাত-পা-চোখ-মুখ মুচলেকা দিয়ে এসেছে। এত লোকের ঝামেলা নিয়ে ডাক্তার-পুলিশের গলদঘর্ম অবস্থা। কাকে ফেলে কাকে আগে দেখবে – ব্লাড কালেকশন, সার্জিক্যাল মেডিসিন জোগাড় করা, আত্মীয়স্বজনকে খবর দেওয়া। আতোয়ার সাহেবের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

গনগনে রোদ। শিরীষ গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টর তপন বুকের বোতাম লাগিয়ে নিচ্ছিলেন। অকুস্থলে এসপি সাহেব এসেছেন। খটাস খটাস করে চারপাশ থেকে স্যালুট পড়ছে।

দুপুরের খাবার খেতে জোহরার বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে। জোহরা মনে মনে ভাবছে, ‘এতই যখন দেরি হবে, একটিবার ফোন দিয়ে জানিয়ে দিলেও তো পারত – দেবে না। আমার জন্য ওর কোনো গরজ নেই, যত গরজ শুধু হাটবাজারের লোকদের জন্য। … ও যখন দেবে না, আমিও দেব না …।’ জোহরা মনে মনে আরো ভেবে রাখল, আজ এলে ও একটা মিথ্যে কথা বলে ওকে শায়েস্তা করবে, ‘আমি খেয়েছি, তুমি খেয়ে নাও।’ তখন ও বুঝবে একা একা খাওয়ার কী যন্ত্রণা।

ডাক্তার এসে দেখে গেছে; অপেক্ষমাণ সবাইকে একবার করে পর্যবেক্ষণ করে গেছে। আতোয়ার সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভেবে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে।

আতোয়ার সাহেবের আরো দেরি হবে। আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে – তার শুধু মাথা ফেটেছে বলে তার পোস্টমর্টেমটা সবার পরে হবে।

Tuesday, September 14, 2021

খোসপাঁচড়া কেন হয়? by অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার

এটি এক প্রকার ছোঁয়াচে রোগ। চর্মের ওপর প্রথম রস ও পুঁজযুক্ত বড় বড় ফুসকুড়ি প্রকাশ পায়। প্রথমে আক্রান্ত স্থান অত্যন্ত চুলকায়। কতগুলো উদ্ভেদ একসঙ্গে উৎপন্ন হলে চুলকানির জন্য ছিঁড়ে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পরে মামড়ি পড়ে। Sarcoptes Scabies  নামক পরজীব Parasite এ রোগের কারণ। এরা চামড়া দিয়ে ঢুকে, চামড়ার নিচে বাসা বাঁধে। এদেরকে চুলকানি পোকও বলা যায়। স্ত্রী পোকা চর্মের একদম উপরিভাগের মৃত কোষে গর্ত করে এবং এ গর্ত করা বাসায় Burrow অসংখ্য ডিম পাড়ে।
এভাবে এরা অসংখ্য Burrow সৃষ্টি করে ও ডিম ছড়াতে ছড়াতে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে হানা দেয়। ২/৪ দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে অসংখ্য বাচ্চা পোকাদের সৃষ্টি হয় এবং এক সঙ্গে সব জমা হয়ে চর্মের Hair follicles বা কেশগর্ভগুলোতে আশ্রয় নেয়। ফলে এসব স্থানে চুলকানি হয়। যখন এ পোকাগুলো গর্ত বা নালীর Burrow  মধ্যে নড়াচড়া করে তখন চুলকানি সৃষ্টি হয়। অপরিষ্কার জামা-কাপড় ও বিছানা পত্র থেকে এ রোগ বেশি ছড়ায়। যেহেতু রোগটি ছোঁয়াচে, সেহেতু খুব সহজেই পরিবারের অন্য সদস্যরা আক্রান্ত হয়। সাধারণত একই বিছানায় শোয়া বা ঘনিষ্ঠ সাহচার্যে থাকলে, একই কাপড় চোপড় ব্যবহার করলে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে চামড়ার নানা সমস্যা দেখা দেয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ 
পরিহার করা। আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্য যারা একই বিছানা, তোয়ালে ও কাপড় চোপড় ব্যবহার করে, ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থাকে তাদের রোগের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক তাদের চিকিৎসা করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার
লেখক: চেয়ারম্যান, চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগ ও  প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। তার এই লেখাটি ‘চর্ম ও যৌন রোগ চিকিৎসা’ শীর্ষক বই থেকে নেয়া।

শুধু ফোটালেই কি পানি বিশুদ্ধ হয়? by শাহনাজ খান

সুমাইয়ার দুমাস হয় বিয়ে হয়েছে। নতুন সংসার গোছানোর আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত সে। ইশ্বরদীর মেয়ে সুমাইয়া। বর তার পাশের গ্রামের তবে চাকরি করে ঢাকায়। বিয়ের পর সুমাইয়ার বসবাস শুরু স্বামীর সাথে ঢাকার মগবাজারে। ঢাকায় আসার পর থেকেই সুমাইয়া পানি নিয়ে পড়েছে মহা ঝামেলায়। গ্রামে টিউবয়েলের পানি পান করা সুমাইয়ার কাছে সাপ্লাইয়ের পানি খেতে ভালো লাগছে না। তার উপর প্রায়ই ডায়রিয়ার সমস্যায় পড়ছে সে। বিষয়টা তার স্বামীকে বলতেই একেবারে পাত্তাই দিলো না। বললো, “আরে আমরা মেসে থাকতে এই পানিই তো খেতাম, বুয়া না আসলে ফুটানো ছাড়া সরাসরি টেপের পানিই খেতে হতো। আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে” বলে- সুমাইয়ার স্বামী। কিন্তু সুমাইয়া লক্ষ্য করলো তার স্বামীরও পেটের সমস্যা লেগেই থাকে, আর অনেক দূর্বলও সে।
সুমাইয়াদের গ্রামের বাড়িতে সব কাজে টিউবয়েলের পানি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু চৈত্র মাস আসলেই দেখা দেয় বিপত্তি। তখন ওদের গ্রামের টিউবয়েল গুলোতে আর পানি উঠে না। তখন পুকুরের পানিই ভরসা। ওর মাকে দেখেছে, পুকুরের পানিতে ফিটকিরি ব্যবহার করতে। এতে পানি পরিষ্কার হয়ে যায়, শ্যাওলার সবুজ আর থাকে না। কিন্তু গ্রামের সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী ওদের বলেছে, ফিটকিরি দিলেই পানি জীবাণুমুক্ত হয় না। তাই পানি ফুটাতে হবে। এতে সব জীবাণু মরে যায়। তারপর থেকে সুমাইয়াদের বাড়ির সবাই এভাবেই পানি বিশুদ্ধ করে।
কিন্তু ঢাকার ওয়াসার সাপ্লাইয়ের পানি দেখতে পরিষ্কার তাই সুমাইয়া ফিটকিরি দেয় না, শুধু ফুটায়। সে মনে মনে ভাবে তাহলে কি ফিটকিরি না দেয়াতেই এই সমস্যা। এসব নিয়ে পাশের বাসার ভাবীর সাথে কথা বলে সুমাইয়া। জানতে চায়, তাদেরও একই সমস্যা আছে কিনা।
প্রতিবেশি ভাবী সুমাইয়াকে বুঝিয়ে বলে, পানি ফুটালে এর মধ্যে থাকা জীবাণু, পরজীবী এমনকি এর ডিম, লার্ভাসহ ধ্বংস হয়ে যায়। তাই পানি ১০০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় দশ মিনিট ধরে ফুটানো উচিত। তবে, ফুটানো পদ্ধতিতে পানিতে থাকা রাসায়নিক উপাদান ধ্বংস হয় না। যেমনঃ ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। অনেক সময় পানি ফুটিয়ে ওই একই পাত্রে রেখে দিলে তলানি জমে থাকতে দেখা যায়। এগুলোই ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। এছাড়া দীর্ঘ সময় ফুটানো পানিতে ফ্লোরাইডের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এটি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। অনেকেই রান্না শেষে পানির হাড়ি সারাদিন ধরে চুলাতেই রেখে দেয়, যা কোনভাবেই করা উচিত না।
ফ্লোরাইড শিশুর মস্তিষ্কের গঠন প্রক্রিয়াতে বাঁধা দেয়, আইকিউ কমায় এমনকি পানিতে থাকা এই ফ্লোরাইডকে সন্তান জন্মদান ক্ষমতা হ্রাসের জন্য দায়ী করা হয়। ২০১৩ সালে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয় এনভায়রনমেন্ট হেলথ সায়েন্সেস’ সাময়িকীতে। এছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অধিক ফোটানো পানিতে আর্সেনিকের প্রভাব দেখা যায়। আর্সেনিকযুক্ত পানি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ফুসফুসের নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আর্সেনিকের বিষক্রিয়া পরিপাক অঙ্গগুলোরও ক্ষতি করে। প্রতিবেশি ভাবী সুমাইয়াকে বলেন যে তিনি এসব জেনেছেন একটি হেলথ ম্যাগাজিন থেকে।
সুমাইয়া জানতে চায় তাহলে আপনারা কিভাবে পানি বিশুদ্ধ করেন? ভাবী জানায়, বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার ব্যবহার করেন তারা। ফিল্টারের পানি খেতেও ভালো লাগে। তবে, ফিল্টার কিনতে হবে বুঝেশুনে, বলেন ভাবী। গল্প করতে করতে তিনি আরো বলেন, পানি অনেক উপায়ে বিশুদ্ধ করা যায়। যেমনঃ আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি, সৌর তাপ, রাসায়নিক (ওজোন, ক্লোরিন, আয়োডিন ও ব্রোমিন দ্বারা)ব্যবহার, প্রভৃতি। তবে সহজ হলো ফিল্টার ব্যবহার করা।সে রাতেই সুমাইয়া তার স্বামীর কাছে ফিল্টার কেনার আবদার করে।
পরদিন ওরা যায় ঢাকার নিউমার্কেটে। দোকানে ঢুকে তো সুমাইয়া একেবারে অবাক। কত নাম ও ডিজাইনের ফিল্টার। ভাবনায় পড়ে যায় কোনটা ভালো, কোনটাই বা কিনবে সে। দোকানীকে বললে, তিনি তাদের একটা ফিল্টার দেখান। এই ওয়াটার ফিল্টার, পানি বিশুদ্ধকরণের এমন এক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে দূষিত পানি পুরোপুরি বিশুদ্ধ করে ফেলা সম্ভব। শতভাগ বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা পাওয়া যায় এই ফিল্টারে। কিন্তু এটা ব্যবহারে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। আর তিন লিটার পানি দিলে এ থেকে পাওয়া যায় এক লিটার বিশুদ্ধ পানি, বাকীটা পান করা যায় না। তবে অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়। এটি রিভার্স অসমোসিস ফিল্টার বা আরও (RO) ওয়াটার পিউরিফায়ার।
এরপর আরো একধরনের ফিল্টার দেখে। এগুলো ইউভি ওয়াটার পিউরিফায়ার। এটাতেও বিদ্যুৎের প্রয়োজন হয়। দোকানী জানায়, এ ধরনের ফিল্টার পানিতে থাকা জীবাণু, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলতে সক্ষম। তবে মৃত ব্যাকটেরিয়াগুলো পানিতেই থেকে যায়। এগুলো সম্পূর্ণভাবে কেমিক্যাল ফ্রি এবং পানির স্বাদ কিংবা রংয়ের পরিবর্তন হয় না। এই ফিল্টারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও সহজ।
সুমাইয়া আরেক ধরনের ফিল্টার দেখিয়ে জানতে চায়, ওগুলো কেমন? দোকানী বলে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করে এগুলো। এটা ইউএফ ওয়াটার পিউরিফায়ার। এ ফিল্টারগুলো পানি থেকে সব জীবাণু, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে সরিয়ে ফেলতে পারে। তবে, এগুলো পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থগুলোকে দূর করতে পারেনা। সেক্ষেত্রে এই ফিল্টারগুলোর উপরে ছাকনি সিস্টেম থাকে। সাধারণত এধরণের ফিল্টার অনেক বছর ব্যবহার করা যায়।
সুমাইয়া জানতে চায় কোনটা বেশি ভালো? দোকানী বলে এর সবগুলো দিয়েই পানি বিশুদ্ধকরণ সম্ভব। যার যেমন সামর্থ্য বা চাহিদা, সে তেমনটা কেনে।
এতো কিছু দেখে সে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। দোকানীর সব কথায় ভরসাও পায় না সে।  তারপর সে বিভিন্ন অনলাইন ও ফেসবুক পেইজে আরো একটু খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারে গ্রিনবাড নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের ফিল্টার বাজারজাত করে, যা অনেক বেশি আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য। তারপর GREENBUD Water Purification System এর ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে সেখান থেকেই ফিল্টার কিনে নেন।
তবে কেনার সময় সাবধান থাকতে হবে নকল কোম্পানি থেকে। ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে নির্দেশিকার নিয়ম মেনে। যথাযথ পদ্ধতি ও পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চললেই পাওয়া যাবে জীবন রক্ষাকারী বিশুদ্ধ পানি। পানি সঠিক উপায়ে বিশুদ্ধ করা না হলে এ থেকে পানিবাহিত রোগ যেমন- ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিস হতে পারে। শিশুদের জন্য এর যে কোনটাই হতে পারে প্রাণঘাতী।
>>নিয়ন আলোয়

খালি পেটে কলা খেলে কী হয়?

সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়েছেন, খাওয়ার সময় পাননি।‌ কিংবা বিকেলে পড়া–ক্লাস সব সেরে আর খাওয়ার সময় পাওয়া যায়নি। অতএব উপায়!‌ দোকান থেকে কলা কিনে খেয়ে ফেলা। কারণ ফলের মধ্যে এটাই তো স্বাস্থ্যকর। রোজকার দিনে এরকম করে থাকেন এমন অনেকেই কিন্তু আছেন। পেট হয়ত ভরে গেল, কিন্তু জানেন কী?‌ খালি পেটে কলা খেয়ে আখেরে নিজেরই ক্ষতি করছেন।
উচ্চ মাত্রার পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়াম বিদ্যমান থাকায় কলা পুষ্টিকর একটি খাবার। এর নানা স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। কলা হার্ট ভালো রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোষ্ঠকাঠিন্য, আলসারের মতো রোগের হাত থেকে রক্ষা করে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন বাড়াতে এবং অ্যানিমিয়া দূর করতেও কলার জুড়ি মেলা ভার। কলায় শতকরা ২৫ ভাগ চিনি থাকে এবং এগুলো শরীরে শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু এগুলো তখনই হতে পারে, যখন পেট ভরা থাকে। খালি পেটে কলা খেলে কিন্তু সমূহ বিপদ।
খালি পেটে কলা খেলে কী হয়?
পুষ্টিগুণের কারণেই অনেকে সকালে খালি পেটে কলা খেয়ে থাকেন। ভাবেন, অন্য অনেক খাবারের মতো এটিও শরীরে অনেক পুষ্টি জোগাবে। কিন্তু কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কলায় উচ্চ মাত্রার চিনি বিদ্যমান রয়েছে যা শরীরে শক্তি জোগাতে কাজ করে। তাই আপনি যদি সকালে খালি পেটে কলা খান, তাহলে আপনার শক্তি কয়েক ঘণ্টা পরই বেরিয়ে যাবে। এর ফলে আপনি অলস হয়ে পড়বেন। ক্লান্ত লাগবে এবং ঘুম পাবে। তাই খালি পেটে কলা না খাওয়াই ভালো।
অ্যাসিডিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় শুকনো কিছু খাবারের সঙ্গে কলা মিলিয়ে খাওয়া ভালো। তা না হলে শরীরে উচ্চ মাত্রার ম্যাগনেশিয়ামের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এতে হৃদয়ের রোগ হওয়ার শঙ্কাও দেখা দেয়। শুধু সকালে কলা নয়, বরং কোনো ফলই খালি পেটে খাওয়া উচিত নয়। কারণ এখনকার দিনে সতেজ কোনো ফল খুঁজে পাওয়া যায় না বললেই চলে। এ ছাড়া ফলগুলোতে নানা রাসায়নিক থাকে। তাই সকালে খালি পেটে এসব খাবারের রাসায়নিকগুলো সরাসরি পেটে প্রবেশ করে। তখন পুষ্টি সরবরাহ করার বদলে এগুলো শরীরে নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করে।

Friday, September 10, 2021

ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন খেলে কী হয় by মিজানুর রহমান খান

ইয়াবা ট্যাবলেট- বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়
বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত মাদক ইয়াবা। বলা হচ্ছে, দেশে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ৭০ লাখের উপরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের ৫৮ শতাংশ ইয়াবাসেবী। ২৮ শতাংশ আসক্ত ফেনসিডিল এবং হেরোইনে।
গবেষকরা বলছেন, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে ইয়াবা জনপ্রিয় হতে শুরু করে ২০০০ সালের পর থেকে যখন টেকনাফ বর্ডার দিয়ে মিয়ানমার থেকে এই ট্যাবলেট আসতে শুরু করে। তারপর এটি খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। তার আগে নব্বই এর দশকে জনপ্রিয় ড্রাগ ছিল হেরোইন।
তারও আগে আশির দশকে ফেনসিডিল, সেটি নব্বই এর দশকেও ছিল।
ঢাকায় মুক্তি নামের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে বেডের সংখ্যা ১০০। এই কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, চিকিৎসার জন্যে তাদের কাছে যতো রোগী আসেন তার ৮০ শতাংশই এখন ইয়াবাসেবী। হেরোইন ও ফেনসিডিলের চল এখনও আছে, কিন্তু সীমিত পর্যায়ে।
ইয়াবার জনপ্রিয়তার পেছনে দুটো কারণকে উল্লেখ করছেন চিকিৎসকরা।
  • একটি কারণ শরীরের উপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব
  • আর অন্যটি সহজলভ্যতা।
মুক্তির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান কনসালটেন্ট ড. আলী আসকার কোরেশী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ইয়াবা গ্রহণ করলে সেটি শুরুতেই মানুষকে চাঙ্গা করে তোলে। আর সব মানুষই নিজেকে চাঙ্গা দেখতে ভালোবাসে। একারণে তারা ইয়াবার দিকে ঝুঁকে পড়ে।"
"এটি অত্যন্ত ছোট্ট একটি ট্যাবলেট। ওয়ালেটে এবং নারীদের ভ্যানিটি ব্যাগেও এটি সহজে বহন করা যায়। অনলাইনে অর্ডার দিলে পৌঁছে যায় বাড়িতে। মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দেওয়া যায়। কিন্তু ফেনসিডিলের জন্যে বড় বোতল লাগে। সেটা বহন করা, খাওয়ার পর ফেলা অনেকের জন্যেই ঝামেলার। এছাড়াও এটি অনেক বেশি পরিমাণে খেতে হয়," বলেন মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেনটাল হেলথের সাইকোথেরাপির অধ্যাপক তিনি।
গবেষকরা বলছেন, মাদকাসক্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা কতো সেটা বলা কঠিন।
"মনে রাখতে হবে ছেলেরা যতো সংখ্যায় চিকিৎসা নিতে আসে, মেয়েরা কিন্তু অতোটা আসে না। সামাজিক কারণেই তাদের নেশা সংক্রান্ত সমস্যা পরিবার থেকে গোপন রাখা হয়। ফলে এটা বোঝা একটু কঠিন যে মেয়েরা কি পরিমাণে আসক্ত," বলেন মি. কোরেশী।
মনোবিজ্ঞানী ড. কামাল জানিয়েছেন, মেয়েদের ইয়াবার নেশা শুরু হয় ঘুমের বড়ি থেকে। নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রণার কারণে তারা যখন রাতে ঘুমাতে পারে না তখন তারা ঘুমের বড়ির আশ্রয় নেয়। তারপর ধীরে ধীরে ইয়াবার মতো অন্যান্য মাদকেও আসক্ত হয়ে যায়।
কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের আইন অনুসারে হেরোইন হচ্ছে 'ক শ্রেণি'র মাদক আর ফেনসিডিল ও ইয়াবা 'খ শ্রেণি'র।

কোন ধরনের মাদক?

ইয়াবা হচ্ছে এমফিটামিন জাতীয় ড্রাগ- মেথাএমফিটামিন।
অনেকের মধ্যেই এটি সম্পর্কে ভুল ধারণা আছে। তারা মনে করেন, ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো গিলে খাওয়া হয়। আসলে কিন্তু তা নয়।
হেরোইনের মতো করেই খেতে হয় ইয়াবা। এলোমুনিয়ামের ফয়েলের উপর ইয়াবা ট্যাবলেট রেখে নিচ থেকে তাপ দিয়ে ওটাকে গলাতে হয়। তখন সেখান থেকে যে ধোঁয়া বের হয় সেটা একটা নলের মাধ্যমে মুখ দিয়ে গ্রহণ করা হয়। তখন সেটা মুহূর্তের মধ্যেই সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রে গিয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ইয়াবাকে বলা হয় 'আপার ড্রাগ' কারণ এটি গ্রহণ করলে শুরুতে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
হেরোইন ও ফেনসিডিল হচ্ছে ইয়াবার বিপরীতধর্মী ড্রাগ। এগুলো নারকোটিক এনালজেসিক। অর্থাৎ ব্যথানাশক ওষুধ। এটিকে বলা হয় 'ডাউনার ড্রাগ' কারণ এটি খেলে সে ঝিম মেরে থাকে।
চিকিৎসকরা বলছেন, এই দুটো একই ধরনের মাদক। হেরোইন হচ্ছে ওপিয়ামের একটি প্রাকৃতিক ডেরিভেটিভ আর ফেনসিডিল সিনথেটিকের। এই দুটো ড্রাগের মধ্যে যে রাসায়নিকটি থাকে সেটি হচ্ছে কোডিন ফসফেট। হেরোইনের মধ্যে এটি একটু বেশি পরিমাণে থাকে।
কোডিন ফসফেট খেলে মানুষ স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করে। নিজেকে রাজা বাদশাহ ভাবতেও অসুবিধা হয় না।

শরীরের উপর প্রভাব

মুক্তির চিকিৎসক আলী আসকার কোরেশী বলেন, " ইয়াবা খেলে শরীরে উত্তেজনা আসে। ফলে ঠিকমতো ঘুম হয় না। এক নাগাড়ে দুই তিনদিনও না ঘুমিয়ে জেগে থাকতে পারে। মনে করে যে সে ভীষণ কাজ কর্ম করবে কিন্তু আসলে কোন কাজই হয় না। কেউ হয়তো মনে করে যে আমি আজকে রাতে পড়ে কাল পরীক্ষা দেব, কিন্তু সে সারা রাত ধরে একটা পাতাও উল্টাতে পারে না, এক পাতাতেই বসে থাকে।"
আবার যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন আবার এক নাগাড়ে দুই তিনদিন ঘুমাতে থাকে।
অন্যদিকে, ফেনসিডিল ও হেরোইন খেলে শরীরে ঘুম ঘুম ভাব আসে। তন্দ্রার মতো হয়। "একটা জায়গায় বসে তারা ঝিমুতে থাকে। সিগারেটের পর সিগারেট, চায়ের পর চা খেতে থাকে। এবং তখন সে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে।"
মোহিত কামাল বলছেন, "যতো মাদক আছে সেগুলোর সবই মানুষের 'মস্তিষ্কের পুরষ্কারতন্ত্রের' মাধ্যমে কাজ করে। কারণ উদ্দীপ্ত হলে মানুষ একই কাজ বারবার করতে বাধ্য হয়। ব্রেনের ভেতরে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটে। সেটা শরীরের ভেতরে একটা উত্তেজনা তৈরি করে। সব মাদকের বেলাতেই মোটা-দাগে প্রভাবটা এরকম।"
"যখন নেয় তখন শরীরে একটু ফুরফুরা ভাব কাজ করে। কিন্তু যখন নেয় না তখন শরীরে ব্যথা করে। মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। হাড়ের ভেতরে শিরশির করতে থাকে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তারা আবারও মাদক নিতে বাধ্য হয়," বলেন তিনি।
  • ইয়াবায় শরীর চাঙা হয়
  • রাতের পর রাত জেগে থাকা যায়
  • যৌন উদ্দীপনা বেড়ে যায়
  • হেরোইন ও ফেনসিডিল খেলে শরীর ঝিম মেরে থাকে
  • তখন বিচরণ করে কল্পনার রাজ্যে
তিনি বলেন, "যেখানে যাকে যেভাবে মোটিভেশন করা দরকার তার কাছে সেভাবেই ইয়াবা তুলে দেওয়া হচ্ছে। যেমন শিক্ষার্থীদেরকে বলছে যে, এটা খেলে তুমি রাত জেগে পড়তে পারবে। কেউ মোটা হলে তাকে বলা হচ্ছে শরীর শুকিয়ে যাবে। গানের শিল্পীকে বলছে, ইয়াবা খেলে গলার কাজ ভালো হবে।"
চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবার কারণে পুরোপুরি বদলে যায় মানুষের জীবন ধারা। এই পরিবর্তনটা হয় খুব দ্রুত গতিতে। "দিনে সে ঘুমাচ্ছে, রাতে জেগে থাকছে। পরপর কয়েকদিন সে ঘুমাচ্ছে না কিন্তু আবার একটানা ঘুমাচ্ছে। ফলে মেজাজ অত্যন্ত চরমে উঠে যাচ্ছে," বলেন মি. কোরেশী।
তিনি বলছেন, কয়েকদিন পর দেখা যায় পরিবারের সবার সাথে তার ঝগড়াবিবাদ গণ্ডগোল লেগে যায়। আশেপাশের আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সাথেও তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। তার মনে হয় সবাই খারাপ। তিনি একাই শুধু ভালো।
"কিছুদিন পর দেখা যায় যে প্যারানয়েড হয়ে গেছে। সে ভাবতে থাকে যে সবাই তার শত্রু বা সবাই তার পেছনে লেগেছে। সে সন্দেহ করতে শুরু করে যে তাকে কেউ মেরে ফেলবে, বিষ খাওয়াবে। তারপর ধীরে ধীরে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।"
মোহিত কামাল বলেন, "ইয়াবা খেয়ে শিক্ষার্থীরা রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকলেও কোন লাভ হয় না। কারণ পড়ালেখায় তার মনোযোগ থাকে না। মোটা মানুষকে ইয়াবা চিকনও করে না। এটা খেলে তার খিদে কমে যায়। তখন সে কম খায়। তার পেশীকে ক্ষয় করে ফেলে। মাংসপেশি শুকিয়ে গেলে একটু শুকনা মনে হয়, গাল ভেঙে যায়। কিন্তু চিকন হওয়ার তথ্য পুরোপুরি ভুল।"

স্বাস্থ্য ঝুঁকি

অনেকে ইয়াবা গ্রহণ করে যৌন উদ্দীপক হিসেবে। প্রথম দিকে সেটা কাজ করে যেহেতু এটা খেলে শারীরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তার যৌন ক্ষমতা একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়। শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যায়। মেয়েদের মাসিকেও সমস্যা হয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি থেকে শুরু করে শরীরে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ইয়াবা খেলে উচ্চ রক্তচাপ হয়। লিভার সিরোসিস থেকে সেটা লিভার ক্যান্সারেও পরিণত হতে পারে।
  • যৌন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়
  • ফুসফুসে পানি জমে
  • কিডনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়
  • লিভার সিরোসিস থেকে ক্যন্সারও হতে পারে
  • মেজাজ চড়ে যায়, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, নিষ্ঠুর হয়ে যায়
  • রক্তচাপ বেড়ে যায়
  • সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়
  • মানসিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়
মোহিত কামাল বলেন, "ইয়াবা খেলে মস্তিষ্কের সরু রক্তনালী ছিঁড়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কে রক্তপাতও হওয়ার ঘটনাও আমরা পেয়েছি। ব্রেইন ম্যাটার সঙ্কুচিত হয়ে যায়। সেটা যদি ১৫০০ গ্রাম থাকে সেটা শুকিয়ে এক হাজার গ্রামের নিচে নেমে যেতে পারে। জেনেটিক মলিকিউলকেও নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মও স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে থাকে।"
চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবা খেলে শরীরে একটা তাপ তৈরি হয় যা কিডনিরও ক্ষতি করতে পারে। যেহেতু এটিকে ধোঁয়া হিসেবে নেওয়া হচ্ছে তাই ফুসফুসে পানিও জমে যেতে পারে।
"রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিষ্ঠুর নির্মম হয়ে যায়। আমাদের ব্রেনের ফ্রন্টাল একটি লোপে যেখানে বিচার বিবেচনার বোধ তৈরি হয়, যেখানে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, পরিকল্পনা করি সে জায়গাটা কাজ করতে পারে না। ফলে মানুষ পাষণ্ড হয়ে যায়, হিংস্র হয়ে যায়। মায়ের গলায় ছুরি ধরে টাকার জন্যে। মা বাবার বুকে বসে ছুরি চালাতে তার বুকও কাঁপে না," বলেন ড. কামাল।
  • স্বাস্থ্যের অবনতি হয়
  • ভিটামিনের অভাব দেখা দেয় শরীরে
  • যৌন ক্ষমতা হারিয়ে যায়
  • ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ
চিকিৎসকরা বলছেন, ফেনসিডিল ও হেরোইনের বেলাতেও দ্রুত গতিতে স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। কারণ তারা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে পারে না। তাদের খাওয়ার প্রয়োজনও খুব একটা পড়ে না। কারণ হেরোইন কিম্বা ফেনসিডিল খেলে ক্ষুধা কেটে যায়। ফলে তাদের সাধারণ পুষ্টি চাহিদাও পূরণ হয় না। যার কারণে তাদের শরীরে সব ধরনের ভিটামিনের অভাব দেখা দিতে শুরু করে।
হেরোইন ও ফেনসিডিলের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু ইয়াবার ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে সময় লাগে না। "ইয়াবা হচ্ছে অনেক বেশি মানসিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল ড্রাগ যেখানে হেরোইন আর ফেনসিডিল শারীরিকভাবে নির্ভরশীল," বলেন ড. কোরেশী।
হেরোইন ও ফেনসিডিল গ্রহণ করলেও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ড. কোরেশী বলেন, "এদুটো নেশাও প্রাথমিকভাবে যৌন উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এসবও যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। একজন ৩০ বছরের যুবক পরিণত হয় ৮০ বছরের বৃদ্ধ মানুষে।"
  • *কেউ হয়তো মনে করে যে আমি আজকে রাতে পড়ে কাল পরীক্ষা দেব, কিন্তু সে সারা রাত ধরে একটা পাতাও উল্টাতে পারে না, এক পাতাতেই বসে থাকে।" -ড. আলী আসকার কোরেশী, মুক্তি।


ইয়াবাসেবী এক নারীর কথা
"আমার দ্বিতীয় স্বামীর মাধ্যমে ইয়াবার সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। সে আমাকে অনেক ভালোবাসতো। একদিন সে অনেকগুলো ইয়াবা নিয়ে আসে। সে বলে, এটা খুব ভালো জিনিস। এখন এটা সবাই খায়, মেয়েরাও খায়। আর তুমি তো আমার স্ত্রী। সুতরাং তুমিও আমার সাথে খাবে। আমি মনে করলাম, যদি তার সাথে বসে না খাই তাহলে হয়তো সে বাইরের মেয়েদের সাথে গিয়ে খাবে।
কয়েক মাস ধরে খেলাম। তিন মাস পর আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। এতো শুকিয়ে যাই আমাকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ মহিলার মতো দেখাতো। শরীর পুরোটা কালো হয়ে গিয়েছিল। আমার শরীরে অর্ধেক কাপড় থাকতো, অর্ধেক থাকতো না। আমি সারাক্ষণ মাথা আঁচড়াতাম। মনে হতো মাথায় শুধু উকুন। যে-ই দেখবে সে-ই আমাকে পাগল মনে করতো।
মা যখন আসতো তখন আমি তার সাথে খুব খারাপ আচরণ করতে শুরু করি। আমি চোখে অনেক কিছু দেখতে থাকি। মুরগির মাংস দেখলে মনে হতো তার ভেতরে অনেক কেঁচো। মাথার চামড়াকে মনে হতো লাল রক্ত। খেতে পারতাম না।
আমার মা একদিন ভাত মেখে খাওয়াতে যাবে তখন আমার মনে হলো আমাকে তিনি কেঁচো খাওয়াচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আমি বমি করতে শুরু করি। তখন তারা আমাকে আমার মায়ের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্বামীকে না জানিয়েও আমার চিকিৎসা চলতে থাকে।
মায়ের বাসায় তিন বছরের মতো ছিলাম। তারপর নিজের বাসায় চলে যাই। তখন আবার স্বামী প্রত্যেকদিন ইয়াবা নিয়ে আসতে শুরু করে। প্রতিদিন রাতে সে ইয়াবা খেত। প্রত্যেক রাতে ২০টা করে খেতো। সে নিজে নষ্ট, এবং তার নোংরামির শিকার আমিও হয়েছি। তারপর আমি আবারও ইয়াবাতে আসক্ত হয়ে পড়ি।"

  • **ফলে মানুষ পাষণ্ড হয়ে যায়, হিংস্র হয়ে যায়। মায়ের গলায় ছুরি ধরে টাকার জন্যে। মা বাবার বুকে বসে ছুরি চালাতে তার বুকও কাঁপে না। -ড. মোহিত কামাল, মনোবিজ্ঞানী।
ভারতে তৈরি কফ সিরাপ 'ফেনসিডিল' বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে নেশার দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে হেরোইন জনপ্রিয় ছিল নব্বই-এর দশকে