Sunday, April 5, 2026

থাইল্যান্ডের ডাবের পানি মাত করল চীনের বাজার

থাইল্যান্ডে বেড়ে ওঠা পংসাকর্ন পংসাকের প্রিয় পানীয় ছিল কচি নারকেলের পানি। দেশজুড়ে রাস্তার দোকানে সহজলভ্য এ পানীয় আসে সেখানকার উর্বর মাটিতে ফলানো সবুজ কচি নারকেল থেকে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তিনি এ স্বাদ খুঁজে পাননি। সেই শূন্যতার বোধ থেকে তাঁর মধ্যে এক ব্যবসায়িক ধারণা তৈরি হয়। সেটা হলো থাই নারকেলের পানি বোতলজাত করে বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়া।

৪৫ বছর বয়সী পংসাকর্ন ব্যাংকক থেকে অনলাইন সাক্ষাৎকারে ফোর্বস ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘আমাদের নারকেলের ঘ্রাণ দারুণ। তাই ভাবলাম, কেন এই ভালো জিনিসটা আমরা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরব না?’ তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি জেনারেল বেভারেজ ১২ বছর আগে আইএফ ব্র্যান্ডের নামে বোতলজাত নারকেলের পানি বাজারে নিয়ে আসে। বর্তমানে তাঁর কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফবিএইচের মাধ্যমে এই ব্র্যান্ড বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।

চীনের মূল ভূখণ্ডে এখন আইএফ সর্বাধিক বিক্রীত নারকেলের পানির ব্র্যান্ড। সাংহাইভিত্তিক চায়না ইনসাইটস ইন্ডাস্ট্রি কনসালট্যান্সির তথ্য অনুযায়ী, বাজারে তাদের অংশীদারত্ব এক-তৃতীয়াংশের বেশি—আইএফ একাই ২৮ শতাংশ এবং তাদের আরেক পণ্য ইনোসোকো ৬ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছে আরও অনেক ব্র্যান্ড, যেমন স্থানীয় ডেলগার্ডেন (যার বাজার হিস্যা ৫ শতাংশের কম), দেশীয় চিংশাং ড্রিংক, মার্কিন ভিটা কোকো ও থাইল্যান্ডের মালি গ্রুপের মালি কোকো।

পংসাকর্ন আত্মবিশ্বাসী, এ অবস্থান টেকসই হবে। তিনি বলেন, ‘নারকেলের পানি বললেই আইএফের নাম আসে।’ ২০২৪ সালে কোম্পানির বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫৮ মিলিয়ন বা ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার; আগের বছরের চেয়ে যা ৮০ শতাংশ বেশি। নিট মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৩৩ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এই আয়ের ৯৭ শতাংশই আসে চীন থেকে।

চীনের বাজারে এ সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে পংসাকর্ন এবার আরও বিস্তৃত বাজারে চোখ রাখছেন। চলতি বছরের জুন মাসে হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় আইএফবিএইচ। এর মাধ্যমে ১৪৫ মিলিয়ন বা ১৪ কোটি ৫০ ডলার তোলা হয়। এই কোম্পানির শেয়ারের প্রতি আকৃষ্ট হয় বড় বিনিয়োগকারীরা—যেমন চারোয়েন পকফান্ড গ্রুপ, ইউবিএস ও চীনের হংশান ভিসি ফার্মের সহযোগী তহবিল এই কোম্পানির শেয়ার কেনে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও পংসাকর্ন পংসাকের হিস্যা ৬০ শতাংশ। বর্তমানে তাঁর শেয়ারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন বা ৭০ কোটি ডলার। ফলে তিনি এখন থাইল্যান্ডের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা। এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি; আইপিও থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ব্যয় করবেন চীনের বাইরের বাজার সম্প্রসারণে।

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে নারকেলের পানি ও উদ্ভিদভিত্তিক পানীয় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের ইউরোমনিটরের হিসাবে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে এ ধরনের পানীয়র বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। সফট ড্রিংকস শিল্পের গড় প্রবৃদ্ধির (৬.৬%) চেয়ে যা অনেক বেশি।

পংসাকর্নের লক্ষ্য এখন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা। বর্তমানে এ দুই দেশ থেকে রাজস্ব আসে অতি সামান্যই। অথচ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারকেলের পানির বাজার, যেখানে ২০২৪ সালে বিক্রি হয়েছে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি ডলারের পানীয়। তবে সেখানে প্রবেশ সহজ নয়। কেননা, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ভিটা কোকোর অবস্থান শক্তিশালী।

পংসাকর্ন জানাচ্ছেন, তিনি এখনো থাইল্যান্ডকেই মূল সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখতে চান। এর মধ্য দিয়ে ‘থাই স্বাদকে’ বিশ্বদরবারে তুলে ধরা সম্ভব। তবে প্রয়োজনে অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ থেকেও সরবরাহ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

চীনে কৌশলগত সময়োপযোগী পদক্ষেপ থেকে তারা সফলতা অর্জন করেছে। ২০১৫ সালে প্রথমে হংকংয়ে এই পণ্য বিক্রি শুরু হয়, এরপর ২০১৭ সালে চীনের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এই পানীয়—প্রথমে আলিবাবার টিমল ও জেডি ডটকমে অনলাইন বিক্রির মাধ্যমে। পরে যোগ হয় নতুন স্বাদের ভ্যারিয়েশন—যেমন জেসমিন চালের স্বাদযুক্ত নারকেলের পানি কিংবা আম-নারকেলের দুধ। তরুণ ভোক্তাদের টার্গেট করে জনপ্রিয় তারকা শিয়াও ঝানকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করা হয়।

কোম্পানির মডেল হলো অ্যাসেট–লাইট—অর্থাৎ উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত অনেক কাজ আউটসোর্সে করা হয়, যদিও কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আগামী দুই বছরে তারা সরবরাহের উৎস আরও বহুমুখী করতে চায়।

পংসাকর্নের পথচলা শুরু হয়েছিল পারিবারিক ব্যবসা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক শেষে পরিবারের মালিকানাধীন সুয়ান গ্রুপে কাজ করেন। ২০১১ সালে দেশে ফিরে তিনি গড়ে তোলেন জেনারেল বেভারেজ, প্রথমে বিভিন্ন ফলের জুস দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ২০১৫ সালে তিনি নারকেলের পানিতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আমি যখন কোনো কিছুর মধ্যে ডুবে যাই, তখন কোনো পিছুটান থাকে না; পেছনে ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই আমার।’

কোভিড মহামারিতে স্বাস্থ্যকর পানীয়র চাহিদা বেড়ে গেলে কোম্পানিটি চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়। তখন আন্তর্জাতিক ব্যবসাকে আলাদা করে আইএফবিএইচ গড়ে তোলা হয়। এখন রাজস্বের প্রায় ৯৮ শতাংশ আসে নারকেলের পানি থেকে। ভবিষ্যতে তিনি ফলের রস, থাই মিল্ক টি, স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস ও বিকল্প প্রোটিন পণ্যে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন।

পংসাকর্ন বলেন, নারকেলের পানি আজ হয়তো ছোট একটি খাত, কিন্তু এর সম্ভাবনা কমলার রসের মতো। সেই সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তাও করছেন তিনি। নতুন পানীয় বাজারে আনার পাশাপাশি পংসাকর্ন স্বাস্থ্যকর পানীয়, উদ্ভিদভিত্তিক স্ন্যাকস ও বিকল্প প্রোটিনে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন তিনি। এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণের জন্য ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার বরাদ্দ রেখেছেন।

ডাব

তিলে তিলে গড়া নৈতিক বিশ্বব্যবস্থা ভাঙতেই কি এই ‘ধর্মযুদ্ধ’ by সাইমন টিসডাল

আমেরিকায় ‘অনওয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ান সোলজার্স’ গানটি খুব জনপ্রিয় ছিল। ১৮৬৫ সালে ইংরেজ ধর্মযাজক ও ধর্মতত্ত্ববিদ সাবিন বারিং গৌল্ড গানটি লিখেছিলেন। পুরোনো সেই যুদ্ধংদেহী সংগীত এখন আর তেমন শোনা যায় না।

একসময় গির্জার প্রার্থনা আর স্কুলের সমাবেশে এটি ছিল খুবই জনপ্রিয় গান। আক্রমণাত্মক সুরে গানটিতে বিশ্বাসীদের ধর্মযুদ্ধে ডাকা হয়। জয় আর দখলের পথে এগিয়ে যেতে আহ্বান জানানো হয়: ‘আগাও, খ্রিষ্টান সৈনিকেরা/যুদ্ধের মাঠে ছুটে যাও/যিশুর ক্রুশ সামনে নিয়ে/এগিয়ে চলো—আগাও!’

ভিক্টোরিয়ান যুগের মানসিকতার সঙ্গে এই সামরিক সুর মানানসই ছিল। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে (যদিও ১৯৬০-এর দশকের শুরুতেও আমার প্রাইমারি স্কুলেও এটি গাওয়া হতো)। এখন এই ধরনের বিজয়োন্মাদ মনোভাবই বরং ধর্মের বদনাম ডেকে আনে।

কিন্তু নিজেকে একরকম ‘খ্রিষ্টান সৈনিক’ হিসেবে ভাবা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই কথার ব্যাপারে একমত হবেন না। কে জানে, হয়তো তিনি অফিসে যাওয়ার পথেই এই গান গুনগুন করেন।

সম্প্রতি পেন্টাগনে এক ধর্মীয় প্রার্থনায় হেগসেথ ইরানের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, ‘যাদের প্রতি কোনো দয়া দেখানোর সুযোগ নেই, তাদের বিরুদ্ধে প্রবল শক্তি প্রয়োগ করা হোক।’ তাঁর বিশ্বাসের কেন্দ্রে যেন রয়েছে সহিংসতা। তিনি ইরানিদের ‘ধর্মান্ধ’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। অথচ তাঁর নিজের ইভানজেলিক খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদই মার্কিন মানদণ্ডেও চরমপন্থী। আর এই অবস্থানকে সমর্থন করেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প ২০২০ সাল পর্যন্ত নিজেকে প্রেসবাইটেরিয়ান খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দিতেন। তারপর হঠাৎ তিনি জানালেন, তিনি আর তা নন। তবে এখন তিনি কী, তা হয়তো ঈশ্বরই জানেন।

রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে খ্রিষ্টধর্মকে ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রে বহুদিনের পুরোনো এবং নিতান্তই নিন্দনীয় একটি প্রথা। কিন্তু এর আরও এক অন্ধকার ও ঘৃণ্য দিকও আছে।

ইরানকে সরকারি ভাষায় যেভাবে দানবায়িত ও অমানবিক করে তোলা হচ্ছে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে ‘অন্য’কে ভয় পাওয়া ও ঘৃণা করার মনোভাব। এ ক্ষেত্রে শিয়া মুসলমানদের প্রতি সেই বিদ্বেষ স্পষ্ট।

২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের অভিবাসীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর পর থেকেও তিনি একই ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।

অন্যদিকে, অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টানের কাছে ধর্মকে বিকৃত করে যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিভাজনের হাতিয়ার বানানো গভীরভাবে বেদনাদায়ক। তাঁরা বিশ্বাস করেন, যিশু মানবজাতির পাপ মোচনের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন—প্রতিশোধ, অহংকার বা আধিপত্যের জন্য নয়।

রোমে পাম সানডের প্রার্থনায় পোপ লিও এই বার্তাই জোর দিয়ে বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘যিশুকে ব্যবহার করে কেউ যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।’ তিনি বাইবেলের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, যুদ্ধপ্রিয়দের প্রার্থনা শোনা হবে না—‘তোমাদের হাতে রক্ত লেগে আছে।’

সব খ্রিষ্টান যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরানবিরোধী এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন—তা নয়। কিন্তু পোপ লিওর ক্ষোভের সঙ্গে একমত হয়েছেন ব্রিটেনের সাবেক ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ রাওয়ান উইলিয়ামসসহ আরও অনেকে।

এই প্রতিক্রিয়া শুধু সেখানেই থেমে নেই—এটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে গোটা ইসলামি বিশ্বে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের ইহুদিদের মধ্যেও।

এটা আসলে বড় একটা সমস্যার অংশ। আজকের অনেক ক্ষমতাধর নেতা আন্তর্জাতিক আইন মানতে চান না। তাঁরা নিজের সুবিধামতো নিয়ম ভেঙে ফেলছেন। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে ‘নিয়ম মেনে চলা বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে উঠেছিল, সেটাই ভেঙে পড়ছে।

এর প্রভাব আমরা দেখি—বিশ্বরাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়ছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় কোনো শাস্তির ভয় ছাড়াই একতরফাভাবে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেমনটা আমরা ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং গাজায় গণহত্যার ক্ষেত্রে দেখেছি।

সোজা কথায়, বিশ্বটা এখন নিয়মের বদলে শক্তির ওপর বেশি চলে যাচ্ছে—এটাই মূল সমস্যা।

কিন্তু বৈশ্বিক ব্যবস্থার এই নিষ্ঠুরতা ও মানসিক ভাঙনকে শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেখলে চলবে না। এটি একটি গভীর নৈতিক প্রশ্নও। এই ব্যবস্থার পতন আসলে এক মৌলিক, সর্বজনীন নৈতিক সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।

এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এই বিভক্ত পৃথিবীর দরকার এমন স্বাধীন, নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর—যারা ক্ষমতার মুখে সত্য বলার সাহস রাখবে, স্বৈরাচারীদের সামনে দাঁড়াবে, দুর্বল ও অসহায়দের রক্ষা করবে এবং অন্যায় ও রাষ্ট্রীয় আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে সরব হবে।

কিন্তু যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, যখন সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ওপর আস্থা কমে যায়, যখন গণতন্ত্রে বিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে থাকে, আর মানুষের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা শক্তির কারণে হুমকির মুখে পড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কে?

হতাশাগ্রস্ত ও নিজেদেরই তৈরি করা সংকটে আটকে পড়া ভাঙা সমাজগুলো তখন আধ্যাত্মিক মুক্তির খোঁজে যেন ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় চিৎকার করে ওঠে।

এই বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব ধর্মেরই ভূমিকা থাকা উচিত। কিন্তু ইরান প্রসঙ্গে (যা এই সংকটের সর্বশেষ রূপ) ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই সতর্ক ও বিভক্ত বলে মনে হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ ও বিশ্বব্যাপী অ্যাংলিকান গির্জার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া সারাহ ম্যুলালি তাঁর প্রথম ভাষণে এই যুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইরানি বংশোদ্ভূত গুলি ফ্রান্সিস ডেকানি স্পষ্ট ভাষায় এই যুদ্ধকে অবৈধ, অনৈতিক ও অন্যায্য বলে নিন্দা করেছেন।

এদিকে ইসরায়েলের হাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত উসকানিমূলক (এবং অবৈধও)। তিনি শুধু ইরানের রাজনৈতিক নেতা নন, বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলমানদের একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তবু এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রেখায় ভাগ হয়ে গেছে। সিরিয়ায় কিছু সুন্নি মুসলমান তাঁর মৃত্যুকে উদ্‌যাপন করেছেন।

এই যুদ্ধ ইসরায়েলের ইহুদিদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও আমেরিকান ইহুদিদের বেশির ভাগই এর বিরোধী। জে স্ট্রিট-এর এক জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকান ইহুদিদের ৭৭ শতাংশ মনে করেন—এই যুদ্ধে ট্রাম্পের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও একই ধরনের বিভাজন দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন সরকার সেখানে রুশ অর্থোডক্স গির্জার সঙ্গে যুক্ত (যারা পুতিনপন্থী ও যুদ্ধসমর্থক) ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে।

এই ধরনের বিভাজন নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজ যখন বিশ্ব এক ভয়াবহ ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে, তখন সব ধারার খ্রিষ্টান নেতাদের ওপর একটি স্পষ্ট নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়। তা হলো—তাদের একজোট হয়ে আরও সরব, আরও সক্রিয়, স্পষ্টভাবে যুদ্ধবিরোধী ও ন্যায়বিচারপন্থী ধর্মীয় ঐক্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

তেহরান, বৈরুত ও গাজার মসজিদের মুসল্লি, তেল আবিব, জেরুজালেম ও উত্তর লন্ডনের সিনাগগের উপাসক, ক্যান্টারবারি থেকে সিনসিনাটি পর্যন্ত গির্জার বিশ্বাসী—সবাই আসলে এক সাধারণ অধিকারের ভাগীদার। সেই অধিকার হলো, নিজের বিবেকমতো ধর্ম পালন করে শান্তিতে বাঁচা।

মিনাবে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পুড়ে যাওয়া শিশুদের মতো করুণ পরিণতি যেন আর কারও না হয়—এটাই সবার চাওয়া।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বনাশা বক্তব্য, আর অনলাইনে ‘শেষ সময়’ বা ‘আর্মাগেডন’ নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার মাঝেও এই ভয়াবহ, অন্যায় ও লজ্জাজনক যুদ্ধ হয়তো আমেরিকানদের নিজেদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

মার্কিন কলামিস্ট লিডিয়া পলগ্রিন প্রশ্ন তুলেছেন—সব দোষ কি শুধু ট্রাম্পের? নাকি তিনি আসলে সেই আমেরিকারই প্রতিফলন, যে নিজেকে সব সময় শ্রেষ্ঠ মনে করে, নিজের নিয়তির বিশেষত্বে বিশ্বাস রেখে যা খুশি তাই করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে?

আসন্ন ইস্টারে প্রার্থনা থাকুক—ট্রাম্প ও তাঁর এই ধর্মবিরোধী সহযোগীরা যেন অন্তত কিছুটা আত্মসমালোচনার পথে হাঁটেন এবং ইরানবিরোধী এই ‘ক্রুসেড’ থামান। সেই পুরোনো ভিক্টোরিয়ান যুদ্ধংদেহী গানটাকেও এবার বিদায় জানানোর সময় এসেছে।

* সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান–এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক ভাষ্যকার।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বুকে জেরুজালেম ক্রস–এর ট্যাটু। ক্রুসেড যুগে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই প্রতীক ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর হাতে আরবিতে লেখা আছে ‘কাফের’।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বুকে জেরুজালেম ক্রস–এর ট্যাটু। ক্রুসেড যুগে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই প্রতীক ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর হাতে আরবিতে লেখা আছে ‘কাফের’। ছবি: পিট হেগসেথের ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া


চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফলের চাষ, এখন হোসেনের বাগানে কাজ করেন ৫ জন by নেয়ামতউল্যাহ

একসময় ধান ছাড়া কিছুই চাষ হতো না। অথচ সেই ধানি জমিতেই ফলছে মিষ্টি কুল, আম ও কমলা। ভোলার লালমোহন উপজেলার এক কৃষকের সাহসী সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে এলাকার কৃষিচিত্র। করোনাকালে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে মো. হোসেন বিশ্বাস (৪৫) প্রমাণ করেছেন—সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে ধানি জমিতেও ফলানো যায় স্বাবলম্বিতার গল্প।

ভোলার লালমোহন উপজেলার পূর্ব চরউমেদ গ্রামের হোসেন বিশ্বাস ১৮০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি মিশ্র ফলের বাগান। এখানে ফল কিনতে এখন আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।

মো. হোসেন বিশ্বাসের বাবা জালাল আহমেদ বিশ্বাস (৭১) বলেন, করোনার লকডাউনের সময় তাঁর ছেলে বেকার হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন। ফল চাষের জন্য জমি চাইলে তিনি প্রথমে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, ১৮০ শতাংশ জমিতে যেখানে ৬০–৭০ মণ ধান হয়, সেখানে ফল চাষ করে লাভ কী। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘ফল তো পাখি ছাড়া কেউ খায় না।’ কিন্তু ছেলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এখন বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বিমুখ করে না, প্রথম বছরেই লাভ হলো। এখন তো আর কথা নেই।’

সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ডাওরী–বাহাদুর চৌমহনী–রায়চাঁদ বাজার সড়কের পূর্ব পাশে ধানি জমিতে মাটি ফেলে কাঁটা মান্দারের ডাল পুঁতে সুপারির চারা লাগানো হয়েছে। মান্দার পাতা পচে সারে পরিণত হয়—এটি ভোলার শত বছরের পুরোনো চাষপদ্ধতি। এই সুপারিবাগানের পাশেই নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে মো. হোসেনের মিশ্র ফলের বাগান।

যাঁরা একসময় হোসেন বিশ্বাসকে ‘পাগল’ বলতেন, তাঁরাই এখন ফলের বাগান করার কথা ভাবছেন। লালমোহন ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা ক্রেতাদের বাগান থেকে বরই কিনতে দেখা যায়। তাঁদের ভাষ্য, সুপারিবাগানের তুলনায় অন্যান্য ফলের বাগানে আয় অনেক বেশি।

হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেল, ভারত সুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুলের চাষ করেছেন। এসব চারা তিনি সংগ্রহ করেছেন রাজশাহীর এক বন্ধুর খামার থেকে। এ ছাড়া বাগানে আছে ১৩০টি হলুদ মাল্টা, ৬০টি দার্জিলিং কমলা ও ১৪০টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ।

ভোলায় আগে থেকেই বাউকুল, নারকেলি কুল, টক বোল, মিষ্টি বোল ও খুদে আপেল কুলের চাষ হলেও ২০২২ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে বলসুন্দরী, চায়না টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের আবাদ শুরু হয়। এসব জাতের ফলন ও দাম দুটিই ভালো। মো. হোসেন এ বছর বাড়ি থেকেই কুল বিক্রি শুরু করেছেন ২০০ টাকা কেজি দরে, বর্তমানে বলসুন্দরী বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি।

মো. হোসেন বিশ্বাস বলেন, তিনি দীর্ঘদিন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সদরুল আমিনের অধীনে কাজ করেছেন। সেখান থেকে ফল চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে মেট্রোরেলে চাকরি করলেও করোনায় বেকার হয়ে পড়েন। তিনি বলেন,‘আল্লাহ প্রথম বছরেই মুখ তুলে তাকিয়েছেন। গত বছর ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। এ বছর শুধু কুল থেকেই ১৮ লাখ টাকার বিক্রি আশা করছি।’

হোসেনের বাগানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। তাঁদের প্রতিদিন ৮০০ টাকা মজুরি ও চারবার নাশতা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেরাও ভবিষ্যতে বাগান করতে পারেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে ফলের আবাদ হয়। এর মধ্যে নারকেল, সুপারি, কাঁঠাল ও তরমুজের আবাদ প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর। তবে অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে সারা বছর বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়।

লালমোহন উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেলে দোআঁশ মাটি ও আবহাওয়া বলসুন্দরী, টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের জন্য খুবই উপযোগী। এমনকি লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও কুল ভালো হয়। তাই বেকার যুবকেরা সহজেই এই চাষে স্বাবলম্বী হতে পারেন। মো. হোসেনের বাগান দেখে ইতিমধ্যে ওই গ্রামের বেকার যুবকেরা প্রায় ১২ একর জমিতে ফলের আবাদ শুরু করেছেন।

ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কৃষিবিদ এ আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুল উচ্চফলনশীল। ভোলার উর্বর জমিতে এসব জাতের ফলন আরও বেশি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ফলের সরবরাহ বেড়েছে। ভোলায় ফল চাষের সম্ভাবনা ও চাহিদা—দুটিই আছে। কৃষি বিভাগ ফলের আবাদ বাড়াতে নানা প্রকল্প নিয়ে কৃষকদের পাশে আছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Ffg8hqd0j%2FBhola-1.jpg?rect=480%2C0%2C3204%2C2136&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেলের চাষ করেছেন। ছবি: প্রথম আলো

মৃত্যুর ২৯ বছর পরও ফ্যাশন ও স্টাইলে সালমান শাহ যে কারণে অনন্য

ঢালিউডের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ২৯ বছর পর আদালত অবশেষে হত্যা মামলা পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই ২৯ বছরেও তাঁর জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। ফেসবুকে এখন কিছুক্ষণ স্ক্রল করলে এর প্রমাণ মিলছে। স্মার্টনেস, ফ্যাশন, অভিনয়, বাচনভঙ্গি, ব্যক্তিত্বের কারিশমা—সব মিলিয়ে এখনো তিনি সেই ২৪ বছরের আকর্ষণীয় তরুণই আছেন। কেমন ছিল সালমান শাহর ফ্যাশন ও স্টাইল? বিশ্লেষণ করেছেন জিনাত শারমিন

সবকিছুতেই স্বচ্ছন্দ্য

ফ্যাশন, স্টাইল, রুচিশীল জীবনযাপনের জন্য সালমান শাহ ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন। বিভিন্ন ধরনের পোশাকে ছিলেন সাবলীল। নিউট্রাল-শেডের পোশাক ও জিনসেই তাঁকে বেশি দেখা গেছে।

ওভারসাইজড ও ফিটেড—সব ধরনের শার্টেই ছিলেন স্বচ্ছন্দ্য। তাঁর ব্যাকব্রাশ হেয়ারস্টাইলও ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। ব্যান্ডানা, নেপালি টুপি ও মধ্যপ্রাচ্যের রুমাল তাঁর মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পায়।

নিজেই নিজের স্টাইলিস্ট

এখনকার সময়ে একজন তারকার স্টাইলের পেছনে থাকে বেশ কয়েকজনের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল। ফলে সেখানে ব্যক্তিগত স্টাইলের প্রতিফলন ঘটার সম্ভাবনা থাকে খুবই কম। আবার একই দল একাধিক তারকার ফ্যাশন, স্টাইল ও মেকআপের বিষয়টি দেখভাল করে বলে প্রায় সবার স্টাইল অনেকটা একই রকম লাগে। তবে শুরু থেকেই সালমান শাহ ছিলেন ব্যতিক্রম।

সালমান শাহর সঙ্গে কাজ করা একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাতা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সিনেমায় পোশাক নির্বাচনের ব্যাপারটা সালমান শাহর ওপর ছেড়ে দিতেন তাঁরা। ফরমাল পরবেন নাকি ক্যাজুয়াল, সিদ্ধান্ত নিতেন সালমানই। এমনও হয়েছে, পরদিন শুটিং, আগের দিন সারা বিকেল-সন্ধ্যা সালমানের কেটেছে নিউমার্কেটের দোতলায়।

নিজে কাপড় কিনে, টেইলরের পাশে বসে নিজেই দেখিয়ে দিয়েছেন ডিজাইন। এ দোকান ও দোকান ঘুরে নিজেই জামা কিনেছেন। জামাকাপড়ের সঙ্গে কিনেছেন মানানসই অনুষঙ্গ। কোন দৃশ্যে কী পরবেন, সে সবই গুছিয়ে ঠিক করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছেন। যেকোনো প্রয়োজনে আউটডোরে গেলে কিংবা শুটিংয়ের জন্য দেশের বাইরে গেলে ফিরে আসার সময় তাঁর সঙ্গে থাকত নানা ধরনের পোশাকআশাক ভর্তি ৬–৭টি লাগেজ।

জুতার সংগ্রহ ছিল বিশাল

সালমানের বাসায় শত শত জোড়া জুতা, লোফার, কনভার্স, হাই বুট ও স্নিকার্স ছিল। দেশের বাইরে গেলে অবশ্যই কয়েক জোড়া জুতা নিয়ে আসতেন। জুতা পরিবর্তন করতেন সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে। অল্প দিনের ক্যারিয়ারে সালমান সিনেমায় তিন শতাধিক জোড়া জুতা ব্যবহার করেছিলেন!

যেদিন সালমান মারা গেলেন

পুরুষেরা সাধারণত বাঁ হাতে ঘড়ি পরেন। তবে সালমান সব সময় ডান হাতে ঘড়ি পরতেন। বিভিন্ন লাক্সারি ব্র্যান্ডের ঘড়ি ছিল তাঁর সংগ্রহে। সালমান শাহ যেদিন মারা যান, সেদিনও তাঁর হাতে ছিল দেড় লাখ টাকা দামের রাডো ব্র্যান্ডের ঘড়ি।

অলংকারও পরতেন দেদার

ফরমাল ও ক্যাজুয়াল—উভয় ধরনের পোশাকের সঙ্গে সালমান বিভিন্ন ধরনের ব্রেসলেট ব্যবহার করতেন। গলায় থাকত সোনার চেইন। সেই চেইনে মাঝেমধ্যে পেনডেন্টও ঝুলত। কানে থাকত এক পাথরের মেন স্টাড। হাতের আঙুলে সোনার আংটির সঙ্গে পাথরের আংটিও পরতেন।

চশমা, সানগ্লাস, ক্যাপ

সালমানের ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল সানগ্লাস ও চশমা। তাঁর চেহারা ছিল ওভাল শেপড বা ডিম্বাকার। সে কারণে যেকোনো ফ্রেমের চশমা বা রোদচশমায় তাঁকে দিব্যি মানিয়ে যেত। সিনেমায় তাঁকে গোলাকার, এভিয়েটর, ক্লাব মাস্টার ও ওয়েফ্যারার রোদচশমা পরতে দেখা গেছে। গোলাকার ফ্রেমের চশমাও ব্যবহার করতেন। চশমার পাশাপাশি কনটাক্ট লেন্সও ব্যবহার করতেন সালমান।

সালমান শাহর ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ সিনেমার নির্মাতা বাদল খন্দকার একবার বলেছিলেন, ‘তখন রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ত অসংখ্য তরুণের সালমান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তরুণীদের কাছে তিনি ছিলেন স্বপ্নের নায়ক। এখনো সালমান সবার হৃদয়ে আছেন। নতুন যাঁরা নায়ক হতে চান, তাঁরা আদতে সালমান শাহই হতে চান।’

সালমান শাহ এখনো সেই ২৪ বছরের আকর্ষণীয় তরুণই আছেন
সালমান শাহ এখনো সেই ২৪ বছরের আকর্ষণীয় তরুণই আছেন। ছবি: আর্কাইভ থেকে

এত উষ্ণ যে আর টিকছে না, ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড ‘এ২৩এ’ (এ২৩এ)। প্রায় ৪০ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এই বরফখণ্ড অবশেষে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন অক্ষত থাকা এই বরফখণ্ড এখন উষ্ণ সমুদ্রজলের আঘাতে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু মেইজার্স বলেন, এটি ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে… পানি এতটাই উষ্ণ যে, এটি আর টিকে থাকতে পারছে না।

তিনি আরও জানান, অধিকাংশ বরফখণ্ড এতদিন স্থায়ী হয় না, তবে এ২৩এ আকারে এত বড় হওয়ায় এতদিন টিকে ছিল।

১৯৮৬ সালে অ্যান্টার্কটিকা থেকে আলাদা হওয়া এই বরফখণ্ডটি একসময় গ্রেটার লন্ডনের দ্বিগুণ আকারের ছিল এবং ওজন ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘কোপার্নিকাস’-এর স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর আয়তন ছিল ১ হাজার ৭৭০ বর্গকিমি। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে প্রায় ৪০০ বর্গকিমি অংশ ভেঙে গেছে।

ওডেল সাগরে তিন দশকের বেশি সময় স্থির থাকার পর ২০২০ সালে বরফখণ্ডটি মুক্ত হয়ে ‘আইসবার্গ অ্যালি’ ধরে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ করে। পরে সাউথ জর্জিয়া দ্বীপের কাছে কিছুদিন থেমে থাকলেও, গত মে মাসে এটি আবার উত্তরের দিকে ভাসতে শুরু করে। বর্তমানে দিনে প্রায় ২০ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছে, যা দ্রুত বিলীন হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বরফখণ্ড ভাঙা নতুন কিছু নয়, তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকায় বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়ার হার এখন অনেক বেশি। উষ্ণ জল, ঢেউ ও শক্তিশালী বাতাসের কারণে এ২৩এ-এর মতো বিশাল ‘মেগাবার্গ’ আর টিকে থাকতে পারছে না।

এ২৩এ-এর পতন জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশ্বকে হুঁশিয়ার করছে, পৃথিবীর বরফ আর নিরাপদ নেই, এবং আমাদের জলবায়ু নীতিতে অবিলম্বে পরিবর্তন আনা জরুরি। 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড অ্যান্টার্কটিকায়। ছবি: রয়টার্স
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড অ্যান্টার্কটিকায়। ছবি: রয়টার্স