Wednesday, June 20, 2018

ইতিহাস কি ছিল, কি দেখি আমরা… by তাজবীর তন্ময়

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্টার চার্চিল
নতুন প্রজন্ম জানে না পূর্বে কি ঘটেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন কিংবা ইতিহাসের ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেমন ছিল তা নিজ চোখে দেখা সম্ভব ছিল না এ প্রজন্মের। ইতিহাসের উপর লেখা বই, প্রবীণদের মুখে শোনা ইতিহাস কিংবা সেলুলয়েড পর্দায় দেখা সিনেমাই তাদের একমাত্র সম্বল। ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বল্প সময়ে দ্রুত পৌঁছে দিতে সিনেমা কিংবা ফিল্মের চেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় আর নেই। আর এ জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, হিটলারের উন্মাদনা, মিত্র বাহিনীর সাহসিকতা, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের বীরত্বের উপর মুভি, সিরিজ, ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে ভুরি ভুরি। এ প্রজন্ম সেগুলো দেখেই শিখছে ইতিহাসকে, নিজে শিখে আরেকজনকেও শিখাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, যা দেখছি এই ফিল্ম, সিরিজে তাই কি পুরো ইতিহাস? কিছু গোপন করা হচ্ছে না তো? দর্শকদের সামনে কি পুরো সত্যটাই তুলে ধরা হচ্ছে?
কয়েকদিন আগেই রিলিজ হল যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ডানকার্ক থেকে সাড়ে তিন লাখ ব্রিটিশ সৈন্যকে উদ্ধার কাজে চার্চিলের অসামান্য অবদান নিয়ে মুভি ‘দা ডার্কেস্ট আওয়ার’। উইনস্টন চার্চিল চরিত্রে অভিনয় করা গ্যারি ওল্ডম্যান জিতেও গেলেন সেরা অভিনেতার অ্যাকাডেমি পুরষ্কার। শুধু ‘দা ডার্কেস্ট আওয়ার’ নয়, চার্চিলের দূরদর্শিতা, সাহসিকতার ছোঁয়া পাওয়া যাবে ‘ডানকার্ক’, ‘চার্চিল’, ‘ইনটু দা স্ট্রোম’, ‘দা ফাইনেস্ট আওয়ার’ ইত্যাদি মুভি এবং ‘দা ক্রাউন’ সিরিজেও। এ শতকের সেরা ব্যাক্তিত্বদের একজন ধরা হয় চার্চিলকে। কিন্তু আমরা কি জানি যুদ্ধকালীন সময়ে ১৯৪৩ সালে ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ কিংবা ৪.৩ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর (তৎকালীন মোট জনসংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ) জন্য চার্চিল সরাসরি দায়ী? জেনেশুনেও তিনি ভারতীয়দের জন্য যে কোন সাহায্যের ব্যবস্থা করেন নি, এ জন্য যে তাঁকে অনেক ঐতিহাসিকগণ এ শতাব্দীর কুখ্যাত একনায়ক হিটলার, স্টালিন কিংবা মাও সে তুংয়ের সাথে দায়ী করে এই সত্যও থেকে যায় আমাদের অগোচরে।

চার্চিলকে ‘গণহত্যাকারী একনায়ক’ বলে আখ্যায়িত করেন এমনই একজন লেখক, ডক্টর শশী থারুর। তিনি তাঁর লেখা ‘ইনগ্লোরিয়াস এম্পায়ার’ বইতে তুলে ধরেছেন যুদ্ধকালীন সেরা নেতার বর্ণবাদী আদর্শের।
মেলবোর্ন লেখক সম্মেলনে তিনি বলেন, চার্চিল ভারতবর্ষে মজুতকৃত শস্য যুদ্ধরত সৈন্য এবং গ্রিকদের সাহায্যের জন্য মজুত রাখেন যখন ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষে চার মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি চার্চিলের বলা বিবৃতি সরাসরি তুলে ধরেন। চার্চিল বলেছিলেন,
  • *“আমি এই ব্লাডি ভারতীয়দের প্রচণ্ড ঘৃণা করি। দুর্ভিক্ষ হোক বা না হোক এরা ইঁদুরের ন্যায় বংশবিস্তার করতে থাকবে। ভারতবর্ষ বন্য ধর্মের অনুসারী একদল বন্য মানুষে পরিপূর্ণ”।
১৯৪২ সালের শেষদিকে ভয়াবহ সাইক্লোন হানা দেয় ভারতবর্ষে এবং সাইক্লোন পরবর্তী সময়ে ফাঙ্গাসের আক্রমণে কয়েক মণ শস্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও চার মিলিয়ন মানুষকে বাঁচানো সম্ভব ছিল যদি অন্য কোথাও থেকে সাহায্য পাঠানো হতো। ২০১১ সালে প্রখ্যাত সাংবাদিক মাধুশ্রী মুখার্জী দাবী করেন, “চালকের আসনে থাকা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল সাহেবই সাহায্য করার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। দুর্ভিক্ষ আসন্ন এমন পূর্বাভাস থাকার পরও চার্চিলের নির্দেশে ভারতবর্ষ থেকে ৭০,০০০ টন ধান (৪০০,০০০ মানুষের একবছরের খাবার) ব্রিটেনে মজুদ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনের তৎকালীন জনসংখ্যা ছিল ভারতবর্ষ থেকে ১৫ মিলিয়ন কম। তিনি যে শুধু ভারতবর্ষের মজুত শস্য দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন এমন নয়; অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র ভারতবর্ষের জন্য ত্রাণ এবং খাবার সাহায্য পাঠাতে চাইলেও তিনি বাধা দেন। কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান জাহাজ ত্রাণ নিয়ে ভারতবর্ষ ঘেঁষে ইউরোপে প্রবেশ করলেও চার্চিল ভারতে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এমনকি নাৎসী মিত্র জাপান বার্মা দখল করে নিলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এক বিরাট বহর ভারতবর্ষে এসে উপস্থিত হয়। তারা ১৮০,০০০ কৃষককে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের ১৭৫,০০০ একর আবাদি জমি মিলিটারি ক্যাম্পের জন্য দখল করে। এমনকি বাংলার খাদ্যশস্য সর্বদা জলযানে করে আনা নেওয়া করা হয় জানা সত্ত্বেও সকল নৌযান মিলিটারির নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উপরন্তু, এসময় চার্চিল ভারতবর্ষের উপর “স্কর্চড আর্থ পদ্ধতি প্রয়োগ করে সকল শস্যক্ষেত পুড়িয়ে দেন যাতে করে জাপান আর্মি আক্রমণ করেও বেশি কিছু অর্জন করতে না পারে”।

দুর্ভিক্ষ ছিল ভয়াবহ। মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় ঘাস, লতাপাতা খাওয়া শুরু করেছিলো। মৃতপ্রায়রা আগে থেকেই কবরস্থান কিংবা নদীর পাড়ে চলে যেতো কারণ মৃত লাশ বহন করার মতো শক্তিসামর্থ্য জীবিতদের ছিল না। মা-বাবা মৃতপ্রায় সন্তানদের নদীতে কিংবা পুকুরের পানিতে ফেলে দিত মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে রক্ষা দিতে। মরা লাশের গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে ছিল, খাওয়ার মতো পানি ছিল না। এ দুর্ভিক্ষে তারাই কোনমতে বেঁচে ছিল যারা কলকাতায় কোনমতে চাকরি জোগাড় করতে পেরেছিল কিংবা বেশ্যাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো।
ব্রিটেনের মানুষজন যাতে দুর্ভিক্ষের সংবাদ না পায় তা নিয়ে কড়াকড়ি নির্দেশ ছিল চার্চিল সরকারের। এমনকি দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা, চিত্রকর্ম এবং একটি বই সরাসরি ব্যান করা হয়েছিলো। স্যার আর্চিবাল্ড ওয়াভেল এবং তৎকালীন সেক্রেটারি অফ ষ্টেট অফ ইন্ডিয়া, লিওপড এ্যমিরী বারংবার সাহায্যের জন্য নিবেদন করলেও চার্চিল আগ্রহ দেখাননি। তিনি ভারতবাসীদের সাহায্য করার চেয়ে গ্রীসে ত্রাণ পাঠাতে অধিক আগ্রহী ছিলেন। এমনকি তিনি এও বলেন,
  • *“এতো দুর্ভিক্ষ হলে অর্ধনগ্ন সাধু বাবা গান্ধী মরে না কেন?”
২.৫ মিলিয়নের অধিক ভারতীয় সেনা যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর পক্ষে শরিক হয়েছিলেন। ভারতবর্ষের সেনাবাহিনী কিংবা সম্পদ উভয়ই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, এই সত্য অস্বীকার করেনি কোন ঐতিহাসিকই। কিন্তু তারপরও ভারতবর্ষের প্রতি এতো অনীহা ছিল কেন চার্চিলের?
সুদূর ইউরোপে হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাওয়া লেগেছিলো এই বাংলা পর্যন্ত! আর পাশের দুই প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে সে আগুনের আঁচ কি আমাদের গায়ে লাগবে না? এরপরেও কি আসন্ন যুদ্ধের কথা ভেবে আপনার মনে পুলক জাগছে?

মাধুশ্রী মুখার্জীর মতে, ৪০’র দশকের শুরুতেই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে তাদের পক্ষে আর বেশীদিন ভারতবর্ষ শাসন করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যের অধীনে থাকবে না এমন রাজ্যকে সাহায্য করতে চার্চিলের ইচ্ছা ছিল না। এমনকি চার্চিল প্রচণ্ড বর্ণবাদী ছিলেন, উপমহাদেশের মানুষকে দেখতে পারতেন না এমন তথ্য উঠে এসেছে তাঁর নিকট বন্ধু, আত্মীয়বর্গের কাছ থেকেই।
চার্চিলের পরিবার এবং সমর্থকরা দাবী করেন, চার্চিল দায়ী ছিলেন না এই গণমৃত্যুর জন্য। ইউরোপের ভালোর জন্য তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মূলত ভারত সরকারই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী। অনেক ঐতিহাসিকের দাবী, সময়ের তাগিদে, যুদ্ধের প্রয়োজনেই অনেক নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
কিন্তু সত্যিই কি এই দুর্ভিক্ষপীড়িত ৪ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু প্রয়োজন ছিল নাকি শাসকদের অবহেলায় এ গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটলো এইটাই বিচারের বিষয়।

বিশ্বকাপে যৌন বাণিজ্য

রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল মহারণ যেন যৌনকর্মীদের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে সেখানে পাচার করে আনা হয়েছে যৌনকর্মী। ভিজিট ভিসা বা স্বাভাবিক ভিসায় তারা মস্কো ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে সমবেত হয়েছেন বাড়তি উপার্জনের আশায়। এ বিষয়টিকে এক রকম দাসত্ব হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীরা। তার কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে রাশিয়ার একটি পত্রিকায়। তাতে ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে- মস্কো ও সেইন্ট পিটার্সবুর্গের মাঝামাঝি প্রধানতম একটি এলাকা লেনিনগ্রাদস্কোয়ে হাইওয়ে। তার পাশে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দাঁড়ানো দেখতে পাবেন সুন্দরী নারীদের। এই এলাকাটির স্থানীয় নাম মায়াচকি। এর অর্থ হলো ছোট্ট ছোট্ট লাইটহাউজ। সেখানে ফ্লাশলাইট জ্বলছে। নিয়ন-হলুদ পোশাকে শরীরের অনেকটা অংশ অনাবৃত করে দিয়ে ইশারায় ডাকছেন তারা মহাসড়কে গাড়ির চালকদের অথবা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। তাদের  পেছনে, নিচের দিকে মহাসড়ক থেকে নেমে গেছে পথ। তা ধরে এগিয়ে গেলে স্কিন-টাইট পোশাক পরা নারীদের অবস্থান। তাদের পায়ে অনেকটা উঁচু হিল। অপেক্ষা করছেন খদ্দেরের জন্য। মে মাসের শেষের দিকের কোনো এক বৃহস্পতিবার রাত। তাদের অবস্থানস্থলের ঠিক বাইরের দিকে এসে দাঁড়িয়েছেন এসব নারী। তাদেরকে থামিয়ে দিয়েছিল পুলিশ। এমন কি তারা আর এ পেশায় ফিরতে পারবেন কিনা তাও ছিল অনিশ্চিত। পুলিশের এমন অপারেশনের নাম দেয়া হয়েছে জাছিসতকি। ঘন ঘনই এমন অভিযান চালায় পুলিশ। রাশিয়ায় পতিতাবৃতি অবৈধ। তবু অধিকার বিষয়ক গ্রুপ সিলভার রোজ-এর হিসাবে সারা রাশিয়ায় প্রায় ৩০ লাখ নিয়মিত যৌনকর্মী রয়েছেন। এই গ্রুপটি সম্প্রতি বলেছে যে, এ বিষয়ে পুলিশ চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অথবা তারা সামান্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে হাজার হাজার পর্যটকের সমাবেশ ঘটেছে  রাশিয়ায়। আর এ সময়ে দেশের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সে জন্য কর্তৃপক্ষ দমন-পীড়ন শুরু করেছে। রাশিয়ার ১১টি শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপের লড়াই। আর সে উপলক্ষে যৌনকর্মীরাও ছড়িয়ে পড়েছেন। তারা এসব শহরে অবস্থান নিয়ে হাঁকিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা। তবে যেসব স্থান পতিতাবৃত্তির জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে সেখানে মাঝে মাঝেই হানা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তাদের এমন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অধিকারকর্মীরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখানোয় এমন যৌনকর্মীদের রাশিয়ায় আসা সহজ হয়ে পড়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়ায় পাচার করা হয়েছে নারী, যুবতীদের। মস্কোভিত্তিক দাসত্ব বিরোধী সংগঠন অল্টারনেটিভা’র ইউলিয়া সিলুয়ানোভার  মতে, পাচারকারীদের কাছে বিশ্বকাপ হলো একটি উপহার। সম্প্রতি এক বিকালে ক্রেমলিনের কাছে নিজের অফিসে বসে তিনি বলেছেন তার উদ্বেগের কথা। তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ১৪ই জুন। শেষ হবে ১৫ই জুলাই। এর মধ্যে মাত্র একটি ম্যাচের টিকিট পেয়েছেন এমন বিদেশিকেও ভিসা দিয়েছে রাশিয়া। এটাই বড় ঝুঁকি। নাইজেরিয়ার নাগরিকদেরকে নিয়েই বেশির ভাগ কাজ ইউলিয়া সিলুয়ানোভার। তিনি বলেছেন, প্রতি বছর রাশিয়ায় কয়েক হাজার নারীকে পাচার করে নেয়া হয়। গত গ্রীষ্মে ফিফা কনফেডারেশন কাপের সময় নতুন করে ভিসা দেয়া হয়। সে সময় থেকেই পাচারের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করেন ইউলিয়া সিলুয়ানোভা। তিনি বলেন, এর মধ্যে অর্ধেক নারীই বলেছেন তারা দেহব্যবসা করতে গিয়েছেন। বাকি অর্ধেক বলেছেন, তারা বাচ্চা রাখার মতো কাজ করতে চান। ইউলিয়া সিলুয়ানোভা আরো বলেন, রাশিয়ায় পাচার করে যেসব নারীকে এবং কিছু পুরুষকে নেয়া হয় তারা পশ্চিম আফ্রিকার, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার ফলে যেসব রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে সেখানকার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। তবে এদের কেউই জানেন না, একবার তারা রাশিয়ায় পৌঁছালে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হবে। তা ফেরত পেতে হলে প্রতিজনকে গড়ে ৫০ হাজার ডলার করে অর্থ পরিশোধ করতে হবে পাচারকারীদের। এদেরকে নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট গ্রুপে রাখা হয় এপার্টমেন্টসে। যখন ফোনে বা ইন্টারনেটে কোনো খদ্দের তাদেরকে ডাকে শুধু তখনই বাইরে যেতে দেয়া হয়। এতে কেউ আপত্তি করলে তাকে শারীরিক ও মৌখিক নির্যাতন করা হয়। হুমকি দেয়া হয়, দেশে ফেলে আসা তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি হবে।

প্রবীণদের কাছে মানুষের চেয়ে যন্ত্র আপন! by সাদ্দিফ অভি

প্রবীণ হিতৈসী সংঘ পরিচালিত প্রবীণ নিবাসের চার তলার বারান্দায় উদাস চোখে বসে আছেন মুজিবুল হক। তার মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘একমাত্র সঙ্গী টেলিভিশনটি নষ্ট, তাই মন খারাপ।’ বৃদ্ধ বয়সে একা প্রবীণ নিবাসে মানুষের বদলে যন্ত্রকে আপন করে নিয়েছেন তিনি। কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই যন্ত্রের সঙ্গে আমার ভালো সময় কাটে, মানুষের সঙ্গে নয়!’
রবিবার (১৭ জুন) ঈদের পর দিন রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রবীণ হিতৈষী সংঘে গিয়ে দেখা যায় একা বারান্দায় বসে উদাস হয়ে চারতলা থেকে প্রধান গেটের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার প্রশ্ন এই গেট কেন বন্ধ করে রাখে? কেউ আসতে চাইলে কীভাবে আসবে? এ রকম অনেক প্রশ্ন মনে নিয়ে বারান্দায় বসে ভাবেন তিনি। তার সঙ্গী টেলিভিশনটি কবে ঠিক হবে তাও জানেন না তিনি। তাই আফসোস করে মন খারাপ করে বসে আছেন। ঈদের দিন কেমন কাটালেন, জানতে চাইলে মুজিবুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের মধ্যে আহামরি কিছু খুঁজে পাই না। আগে শুয়ে থাকতাম, টিভি দেখতাম। ঈদে শুয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। মেয়ে এসেছিল খিচুড়ি নিয়ে, খেয়ে দেখলাম খুব একটা ভালো হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ে হাতের নখ কেটে দিয়ে গেছে। তবে এবার ঈদে মন ভরে খাওয়া হয়নি।’      
প্রবীণ হিতৈসী সংঘের বারান্দায় বাইরে তাকিয়ে থাকেন মুজিবুল হকসহ প্রবীণ নিবাসে থাকা কিছু মানুষ। স্বজনদের সাক্ষাতে বিশেষ খাবার খেয়ে ঈদের দিনটি কাটালেও পরের দিনই আবারও নিঃসঙ্গ একাকিত্বের জীবনে ফিরে যান তারা।
সকালে প্রবীণ হিতৈসী সংঘে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা। যে যার ঘরে নিজেদের মতো আছেন। আজ আর তাদের সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসেননি। নেই কোনও বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। রান্নাঘরে চলছে অন্যান্য দিনের মতো সাধারণ খাবারের আয়োজন।
বর্তমানে এই নিবাসে অবস্থান করছেন ৪৬ জন প্রবীণ। তাদের কারও কারও পরিবারের লোকজন ঈদে দেখা করতে এলেও কেউ কেউ ঈদ কাটিয়েছেন একদম একা। যাদের স্বজনরা ঈদের দিন এসেছিলেন, তারাও আজ একা।
নিবাসের বারান্দায় নিজের বানানো সিংহাসনে বসেই রাস্তার দিকে নীরব দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন মুজিবুল হক।গেটের কাছে কেউ গাড়ি নিয়ে এলেই ওপর থেকে সবাইকে ডাকা শুরু করেন গেট খোলার জন্য। তার মতে, ‘গেট কেন লাগানো থাকবে? গেট থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত, যে যখন চাইবে তখনই আসবে।’ মুজিবুল হক বলেন, ‘মানুষকে ঠকিও না কোনোদিন। জীবন অনেক কঠিন ব্যাপার, এখানে নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন। নিজের মতো চলতে পারি না।’
বাড়ি যেতে মন চায় না?—এমন প্রশ্নের জবাবে মজিবুল হক বলেন, ‘ওরা জানে আমি এখানে ভালো আছি।’
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে আছেন শেখ মুজিবুল হক। তার বাড়ি যশোরে। ষাটের দশকে ঢাকায় এসেছিলে তিনি। প্রমিত উচ্চারণ কথা বলেন। ১৯৬৯ সালে লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেন। বাসায় টিউশনি করাতেন তিনি। বেশিরভাগই ইংরেজি পড়াতেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ইংরেজি দৈনিকে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন প্রচুর। দেশের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই তার উপযুক্ত জবাব দিতেন লেখালেখির মাধ্যমে। কাজ করেছেন লালমাটিয়ার একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসেবেও। পারিবারিক কলহের কারণে ছেলে-মেয়েরা উত্তরায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকলেও বৃদ্ধ বয়সে মুজিবুল হক এখন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা।
মুজিবুল হকের মতো এই প্রবীণ নিবাসে কেউ থাকেন বাধ্য হয়ে কেউবা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে। তেমন আরেকজন মীরা চৌধুরী। তার বয়স ৮০’র বেশি। ছেলে আমেরিকায় গিয়েছে কয়েক মাস হলো তাই তাকে থাকতে হচ্ছে প্রবীণ নিবাসে। মাস চারেক হলো তিনি এসেছেন এখানে। ছেলের সঙ্গে কথা হয় তার নিয়মিত। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলের সম্প্রতি নতুন চাকরি হয়েছে আমেরিকায়। গতকালকেও ফোন দিয়েছিল, কথা হয়েছে।’
প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি ক্যাপ্টেন (অব.) একে এম শামসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ৫০ জনের ব্যবস্থা আছে। বর্তমানে ৪৬ জন আছেন নিবাসে। আমরা আরও কিছু আবেদন পেয়েছি। যাচাই-বাছাই করে দেখছি কিভাবে কাকে দেওয়া যায়।

জীবিকার জন্য নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছেন। সরকারি নজরদারির মধ্যে থেকেই সামান্য পারিশ্রমিক বা কখনও মাছের ভাগের জন্য তারা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরাও শুরু করেছেন। অনেকেই কাজ করছেন শুটকি পল্লীতে, কেউবা বিভিন্ন লবণের মাঠে কাজ নিয়েছেন। এসব কাজ থেকে সামান্য আয়ের পরিবারের সদস্যদের জন্য বাড়তি কিছু করার চেষ্টা করছেন রোহিঙ্গারা।
সাগরে মাছ ধরার নৌকায় কাজ করছে রোহিঙ্গা শিশুরা
সাগরে মাছ ধরার নৌকায় কাজ করছে রোহিঙ্গা শিশুরা
গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালায় আরসা সদস্যরা। জবাবে ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। স্থানীয় বৌদ্ধদের সহায়তায় সেখানে বহু বাসিন্দাকে হত্যা ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। জাতিসংঘ ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক। তারা বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।
স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে ইউসুফ
স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে ইউসুফ
সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কাছের জেলে পল্লীর কাছেই শ্যামলাপুর শরণার্থী শিবির। এই শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গার বাস করেন। সেখানকারই রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ ইউসুফ এখন মাছ ধরার জন্য প্রতি পাঁচ দিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে পান। তিনি বলেন, ‘এখানে পালিয়ে এসে আমরা আমাদের জীবন বাঁচিয়েছি। তাই আমরা এখানে থাকতে পেরে খুশি।’
ইউসুফ জানান, তিনি তার ৯ মাসের অন্তস্বত্তা স্ত্রী সবুরা খাতুনকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। তার আগে তিনি দুইমাস মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। নদী পার হওয়ার সময় তাদের তিন বছরের ছেলে ডুবে মারা যায়। তবে এখানে আসার পর মেয়ে রুকিয়ার জন্ম নিরাপদেই হয়।
ট্রাক থেকে মাছ নামানোর কাজ করছে এক রোহিঙ্গা শিশু
ট্রাক থেকে মাছ নামানোর কাজ করছে এক রোহিঙ্গা শিশু
শরণার্থীরা বৈধভাবে কাজ করতে না পারলেও শ্যামলাপুর শরণার্থী শিবিরের কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকায় কাজ নিয়েছেন। অনেকে আবার নৌকা থেকে মাছ নামানোর কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। রোহিঙ্গারা এই ধরনের নৌকায় করেই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। শিবিরটির অন্যরা মাছের জন্য বরফের দলা ভাঙ্গার পাশাপাশি জাল ও নৌকা মেরামতের কাজ করেও উপার্জনের ব্যবস্থা করেছে।
নৌকা ঢেলে সাগরে নামানোর কাজ করছে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোররা
নৌকা ঢেলে সাগরে নামানোর কাজ করছে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোররা
অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সচেঞ্জ ফাউন্ডেশনে’র গবেষণায় বলা হয়েছে, শ্যামলাপুরের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুইজন রোহিঙ্গা তাদের পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন রোহিঙ্গা তার পরিবারের প্রবাসী সদস্যের আর্থিক সহায়তা নিয়ে থাকেন। সংস্থাটি গত মার্চ মাসে বলেছে, শ্যামলাপুরের রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই অস্থায়ী বাসস্থানে বাস করে। তারা মাঝে মধে অবৈধ ও স্পর্শকাতরভাবে ভাল কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছে।
শ্যামলাপুরের রোহিঙ্গা নারীরাও পাশের নাজিরটেক শুটকি পল্লীতে কাজ জুটিয়ে নিয়েছেন। সেখানে তারা দৈনিক একশ থেকে ২০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। প্রতিবছর শুটকি শিল্প প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার আয় হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তারা। প্রায় ২০০ একর এলাকাজুড়ে থাকা নাজিরটেক শুটকি পল্লীটিতে সেপ্টেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত ব্যস্ত মৌসুমে দৈনিক প্রায় একশ টন মাছ শুকানো হয়।
নাজিরটেক শুটকি পল্লীতে শুকাতে দেওয়া মাছ
নাজিরটেক শুটকি পল্লীতে শুকাতে দেওয়া মাছ
সরেজমিনে দেখা যায়, কাঠফাটা রোদের মধ্যে শুটকি পল্লীতে একজন রোহিঙ্গা নারী বড় কাঠের টেবিলের ওপর বিভিন্ন ধরনের মাছ আলাদা করার কাজ করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি মাছি ও মশাও তাড়াচ্ছিলেন। আর অন্য নারীরা বাঁশের সঙ্গে মাছগুলো বেঁধে শুকাতে দিচ্ছেন।
শুটকি পল্লীতে কাজ করা হাসিনা বেগম প্রথমে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে কাজের সন্ধান পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে শ্যামলাপুরে আসেন। হাসিনা বেগম তার পালিয়ে আসার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘মুখে তরবারির আঘাতে জখম হয়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মাটিতে পড়েছিলাম। আমার কয়েকজন প্রতিবেশি আমাকে তুলে নৌকায় নিয়ে আসে। আমরা নদী পার হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাই’। তরবারির আঘাতেই একটি চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন তিনি।
শুটকি পল্লীতে কাজ করেন রোহিঙ্গা নারী হাসিনা বেগম
শুটকি পল্লীতে কাজ করেন রোহিঙ্গা নারী হাসিনা বেগম
হাসিনা বেগম তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এই জীবনই ভাল। কারণ আমি মাছ শুকানোর কাজ করে উপার্জন করতে পারছি।’
রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও নানা ধরনের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। ভোর বেলায় তারা নৌকা ঢেলে পানিতে নামানো বা মাছ ধরতে সাগরে পাড়ি জমানো সব কাজেই যোগ দিচ্ছে শিশুরা। বিনিময়ে ছোট এক ব্যাগ মাছ পেয়েই খুশি এসব শিশুরা। অনেক সময় মাছের পরিবর্তে তাদের সামান্য কিছু টাকা দেওয়া হয়।
৪৫ বছর বয়সী রোহিঙ্গা হাকিম আলী কাজ পেয়েছেন টেকনাফের একটি লবণের মাঠে। সেখানে প্রতি বস্তা লবণ বহণ করার জন্য তাকে ১০ টাকা করে দেওয়া হয়। প্রতিদিন তিনি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
জাল মেরামতের কাজ করছে এক রোহিঙ্গা শিশু
জাল মেরামতের কাজ করছে এক রোহিঙ্গা শিশু
হাকিম আলী বলেন, আট মাস আগে তিনি মিয়ানমারের বুথিডাং শহরের কাছে তার বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছেন। মিয়ানমার সেনারা তার এক ভাইকে হত্যা করেছে, আরেকজনকে জেলে দিয়েছে। এছাড়া তার ঘর-বাড়ি ও ফসলের মাঠে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। দেশে ফিরে গিয়ে তারা কী চান জানতে চাইলে হাকিম আলী বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার ও মিয়ানমারে অবাধে চলাফেরার অধিকার চাই। মিয়ানমার সরকার যেদিন এই দাবি মানবে, সেইদিন আমি সেখানে যাবো।’ সূত্র: রয়টার্স।

সাবেক ইসরাইলি মন্ত্রী ইরানের গুপ্তচর?

ইসরাইলের সাবেক একজন আইনপ্রণেতা ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেট তার বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন সময়ে শত্রুপক্ষকে সহায়তা করার অভিযোগও এনেছে। ইসরাইলের হারেৎস পত্রিকা এক প্রতিবেদনে বলেছে, গোনেন সেগেভ নামে ওই ব্যক্তি ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দেশের জ্বালানী ও অবকাঠামো মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডস থেকে ইসরাইলে ৩ লাখ মাদক ট্যাবলেট পাচারের চেষ্টা ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে তিনি মুক্তি পান।
এক বিবৃতিতে শিন বেট জানিয়েছে, গোনেন সেগেভের বিরুদ্ধে শুক্রবার আদালতে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে শত্রু রাষ্ট্রকে সহায়তা, ইসরাইলের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও দেশের শত্রুকে একাধিক বার্তা প্রেরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
হারেৎসের খবরে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেগেভ নাইজেরিয়ায় বসবাস করতেন। সেখানে তিনি একটি ক্লিনিক পরিচালনা করতেন। ওই ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রদূত, দূতাবাস কর্মী, কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী। এই বছরের শুরুর দিকে তিনি একুয়েটোরিয়াল গিনিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। তবে তাকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে দেশটি তাকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করে। ইসরাইলে প্রবেশের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ইসরাইলি গোয়েন্দারা যেসব তথ্য পেয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, তিনি ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পাশাপাশি, ইসরাইল-বিরোধী তৎপরতায় ইরানকে সহযোগিতা করেছেন।
খবরে বলা হয়, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের যৌথ তদন্তে দেখা গেছে, সেগেভকে অনেক আগেই রিক্রুট করেছে ইরান। তিনি পরে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টে পরিণত হন। পরে দুইবার ইরানে তিনি নিজের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করনে।
সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, গোনেন সেগেভ গ্রেপ্তারের পর থেকে তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। ইরানিয়ানদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত বলেছেন। তিনি অবশ্য বলেছেন, ইসরাইলের ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তবে গোয়েন্দা সংস্থার সংগৃহীত প্রমাণের সঙ্গে তার দেওয়া বক্তব্যের বৈপরীত্য আছে। ইসরাইলি পুলিশ বলেছে, এই ঘটনা ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক নিরাপত্তা ফুটোর একটি।
তদন্ত মোতাবেক, ২০১২ সালে প্রথম সেগেভের সঙ্গে দুই ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ হয়। নাইজেরিয়ায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাসের মাধ্যমে এই যোগাযোয় স্থাপিত হয়। সেগেভ দাবি করেন, ওই দুই ব্যক্তি তার কাছ থেকে মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ কিনতে চেয়েছিলেন। তবে এরপর থেকে তিনি ইরানের এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ইরানকে তিনি ইসরাইলের জ্বালানী খাত, নিরাপত্তা স্থাপনা, কাঠামো, ইসরাইলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালীদের পরিচয়, ইত্যাদি সরবরাহ করেন। তথ্য পেতে সেগেভ এতদিন প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ইসরাইলিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এসেছেন। এমনকি কিছু ইসরাইলি নাগরিককে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করেন তিনি।

রুশ নারীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে মেসি

বিশ্বকাপে মেসিকে নিয়ে বাড়তি প্রত্যাশা ছিলো সবার। মাঠে বল গড়াতেই মন ভাঙে ভক্তদের। প্রথম ম্যাচেই পেনাল্টি নষ্ট। তার উপরে আর্জেন্টিনাও জেতেনি। নিন্দুকেরা নানাভাবে সমালোচনায় বিদ্ধ করছেন সময়ের সেরা ফুটবলারকে। রক্তাক্ত হচ্ছেন মেসি। কিন্তু ভক্তদের মেসিতে যে প্রবল ভরসা। মেসি যে ভরসারই নাম। রুশ নারীদের কাছেও মেসি এক স্বপ্নের পুরুষ। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ব্রাজিলের নেইমারের চেয়ে মেসি বহুগুণ বেশি জনপ্রিয় এদের কাছে। মেসির এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তার ব্যক্তিত্ব, এক নারীতে বিশ্বাস রাখার কারণে।
খেলার মাঠে তিনি ফুটবলের ঈশ্বর, রাজপুত্র, সেরার সেরা। কিন্তু মানুষ মেসির ব্যাপ্তি বোধহয় আরো বেশি। ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর   মতো তার ঔদ্ধত্য নেই। হাত-পা ছোড়েন না। সস্তা জনপ্রিয়তাও পছন্দ নয় তার। সব সময়েই তিনি শান্ত। নির্বিকার। দল হারলেও নির্দ্বিধায় দায় স্বীকার করেন। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের পরও নিজের দায় স্বীকার করে ব্যর্থতা নিজের কাঁধে নিয়েছেন। রোনালদো বা নেইমারের মতো ভাবমূর্তিও নেই তার। এদের মতো পোশাক বদলানোর মতো বান্ধবী বদলে খবর হন না। বরং এক নারীতেই তিনি বেজায় খুশি। তাকেই  সোপেছেন মনপ্রাণ। মেসির এই জায়গাটাই রোনালদো নেইমারের চেয়ে তাকে আলাদা করেছে বলে দাবি করেন রুশ নারীরা। আলবিনাবারোচকা নাকে এক রুশ নারী বলেন, মেসি মাঠে ও মাঠের বাইরে দারুণ এক ব্যক্তি। তাকে আমার অনেক ভালো লাগে মাঠের বাইরে বিতর্ক না থাকার কারণে। সেরিন, পেরিচদের কাছেও এক নারীকে নিয়ে জীবন পার করে দেয়ার জন্য মেসি অধিক জনপ্রিয়। শুধু এক নারী নয় এক ক্লাবের প্রতিই তার দায়বদ্ধতা। তার এই সহজ, সরল মানবিক চেহারা দেখে রুশ নারীরা ভালোবেসে ফেলেছেন মেসিকে। তাই তো নিজ দেশের তারকাদের ট্যাটু না করে মেসির ট্যাটু করিয়েছেন নিজ শরীরে।
মেসি এমনই এক আবেগের নাম যার জন্য যে কোনো প্রেমিক তার সঙ্গিনীকে পর্যন্ত ত্যাগ করতে পারেন হাসি মুখে। বাস্তবেও মেসির জীবনেও এমনই ঘটেছে। মাত্র ৯ বছর বয়সে রোজারিওয় আলাপ মেসি ও তার বর্তমান স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোর। তখন আন্তোনেল্লার রোকুজ্জোর বয়স ৮। রোকুজ্জোর এক দূর সম্পর্কের ভাই লুকা স্ক্যাগলিয়ার মাধ্যমেই দু’জনের পরিচয়। রূপকথার জন্মও তখন থেকেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘৯০ মিন’-এ মাধ্যমে জানা যায়, সেই সময়েই রোকুজ্জোকে চিঠি লিখে মেসি জানিয়েছিলেন একদিন আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা হবো। রোজারিও ছেড়ে মেসিকে চলে যেতে হয় বার্সেলোনায়। শৈশব প্রেমও কি হারিয়ে গেল? মেসি বার্সেলোনায়। চোখের থেকে দূরে চলে গেলে মেসি রোকুজ্জোর হৃদয় থেকেও হারিয়ে যায়। মেসির ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয়নি। মেসির হৃদয়ে যে ছাপ ফেলে গিয়েছিল রোজারিওর এক সুপারমার্কেট মালিকের মেয়ে। আন্তোনেল্লার হৃদয়ের তল কি খুঁজে পেয়েছিলেন মেসি?  মেসি আর্জেন্টিনা ছাড়ার পরে আন্তোনেল্লার জীবনে চলে আসেন অন্য এক পুরুষ। তিন-তিনটে বছর তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল রোকুজ্জোর। মেসি কি সেই সময়ে রোকুজ্জোর মনে ঝড় তুলতেন না? প্রথম প্রেম’কে কি কেউ কোনো দিন ভুলতে পেরেছে! ছেলেবেলার প্রেমিকের মনে রোকুজ্জোর থেকেই গিয়েছিলেন স্বপ্নচারিণী হিসেবে। এর মধ্যেই কেটে গিয়েছে অনেকগুলো বছর। আর্জেন্টিনায় মেসির ফেরার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই উথালপাতাল রোকুজ্জোর মনে। তখন মেসি পরিণত এক ব্যক্তি। রোকুজ্জোও অনেক পরিণত। মেসির নাম শোনামাত্রই বর্তমান প্রেমিকের সঙ্গে হয়ে যায় বিচ্ছেদ। রোকুজ্জোর জীবনে ফিরে আসেন মেসি। মেসির এই প্রেম কাহিনী রাশিয়ান মেয়েদেরও মুখে মুখে। তাদের দাবি এমন পুরুষ পাওয়া প্রতিটি রুশ নারীদের আরাদ্ধ প্রার্থনা।
পেনাল্টি স্পট থেকে গোললাইন পৃথিবীর রহস্যময় সরণিতে প্রথম ম্যাচেই দিগভ্রষ্ট হয়েছেন মেসি। তাই বলে যে তিনি হারিয়ে গিয়েছেন তা নয়। মেসি সব সময় নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকেন বলে দাবি করেন রাশিয়ান নারীরা। তাদের বিশ্বাস মেসি ঠিকই স্বরূপে ফিরবেন পরের ম্যাচগুলোতে। যা তারা মাঠে কিংবা ফ্যান ফেস্টে বসে উপভোগ করবেন মনভরে।

মৌলভীবাজারে বন্যা: বিশুদ্ধ পানি স্যানিটেশন ও খাদ্য সংকট চরমে by ইমাদ উদ দীন

বসত ভিটা বানের পানির নিচে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষজন ঠাঁই নিয়েছেন আশ্রয় কেন্দ্র  কিংবা বাসাবাড়ির ছাদে। চারদিকে পানি আর পানি। তারপরও খাওয়ার মতো বিশুদ্ধ পানির জন্য চলছে হাহাকার। নেই সেনিটেশন ব্যবস্থা। আর খাদ্য সংকটও চরমে। মানুষের মতো দুর্ভোগে পড়েছে গবাদি পশুও। বন্যাকবলিতরা অন্তহীন দুর্ভোগে চরম অসহায়। চারদিকে শুধু নেই আর নেই। সব কেড়ে নিয়েছে আকস্মিক বন্যা। সহায় সম্বল হারিয়ে এখন তারা নিঃস্ব। গ্রামের পর গ্রাম গ্রাস করেছে বানের পানি। ডুবেছে টয়লেট, টিউবওয়েল, ধান আর সবজি ক্ষেত। ১৩ই জুন দুপুর থেকে মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যায় দুর্ভোগের যাত্রা শুরু। গ্রামের মতো শহরের বাসিন্দাদেরও দুর্ভোগের অবস্থা আরো ভয়াবহ। শহরের বন্যাকবলিত এলাকার প্রতিটি বাসাবাড়িতে পৌরসভাকর্তৃক সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ পানির রিজার্ভার এখন কয়েক ফুট পানির নিচে। আর নলকূপের পানি ট্যাংকিতে রিজার্ভ রাখার ব্যবস্থাও এখন অচল। কারণ বন্যাকবলিত শহর ও গ্রামের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। তাই খাওয়ার বিশুদ্ধ পানির যেমন চরম সংকট তেমনি গোসল, রান্নাবান্না ও প্রয়োজনীয় কাজের ব্যবহারের জন্য মিলছে না পানি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন অতীতের সকল বন্যার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে এবারকার বন্যা। মৌলভীবাজার শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন ১৯৮৪ সালে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল এবারকার বন্যা অনেকটা তারই প্রতিচ্ছবি। আকস্মিক বন্যা হওয়ায় চোখের সামনেই সবকিছু তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে পৌর এলাকার বাসাবাড়িতে অনেকের ঘরে খাদ্য থাকার পরও পানি ও বিদ্যুৎ না থাকায় তারা অর্ধাহারে অনাহারে দিনযাপন করছেন। গ্রাম কিংবা শহরে গাড়ি চলাচলের রাস্তায় ৩ থেকে ৪ ফুট পানি থাকায় সেখানে নৌকা চলাচল করছে। মৌলভীবাজার শহরের বন্যাকবলিত ৩টি ওয়ার্ডের প্রতিটি বাসায় নৌকা ছাড়া বের হওয়া যাচ্ছে না। একতলার বাসিন্দারা বাসার ছাদে কিংবা অন্যান্য উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। শহর এবং গ্রামের বন্যাকবলিত অনেকেই বানের পানি ঠেলে পায়ে হেঁটে অথবা নৌকাযোগে দূর দূরান্ত থেকে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করছেন। তবে অনেক এলাকায়ই বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বানের পানিই তাদের একমাত্র সম্বল। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায় আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত জেলার ৪টি উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৩০টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার পরিবারের ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪শ’ জন মানুষ আক্রান্ত। এ পর্যন্ত ৯.৭শ’ টন বরাদ্দকৃত চাল ও নগদ ১০ লাখ টাকা বন্যাকবলিত এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরো ৫শ’ টন চাল ও নগদ টাকা ত্রাণ সহায়তার জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। খোলা হয়েছে ৫০টি আশ্রয় কেন্দ্র। তাছাড়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে ৭৪টি মেডিকেল টিম বন্যাকবলিত এলাকায় কাজ করছে। তবে নতুন করে কোনো এলাকা প্লাবিত হলে আশ্রয় কেন্দ্র ও মেডিকেল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এমন প্রস্তুতিও রয়েছে তাদের। এ ছাড়া যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকাও করা হচ্ছে। যাতে বানের পানি চলে গেলে সরকারি তরফে তাদের ঘর বাড়ি মেরামতে সহযোগিতা করা যায়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন জানিয়েছেন কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর তীরবর্তী প্রায় ৪০টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার প্রায় চার শতাধিক গ্রামের ৪ লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি। তাদের ধারণা উজানের পানি আসা না কমলে ও ভারি বৃষ্টিপাত বন্ধ না হলে এই পরিসংখ্যান দ্বিগুণ হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান বন্যাকবলিত অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকার পানি জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদিঘি হাওরে গিয়ে পড়ায় এখন নতুন করে হাওর তীরবর্তী এলাকাও বন্যাকবলিত হচ্ছে। বানভাসি মানুষের অভিযোগ সরকারি তরফে তারা পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তা ছাড়া দেশ ও প্রবাসে থাকা অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে এসব  বন্যার্ত অসহায় মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন। তারা রান্না করা খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওরস্যালাইন, মোমবাতি, ম্যাচ ও শুকনো খাবার বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণ করছেন। মৌলভীবাজার পৌর সভার উদ্যোগে শহরের বন্যাকবলিতদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে রান্নাকরা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি। বন্যার শুরু থেকে বিষয়টি তদারকি করছেন পৌর মেয়র মো. ফজলুর রহমান। গতকাল ব্যক্তি উদ্যোগে শহরের বন্যাকবলিতদের রান্নাকরা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করেন সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন ও পৌর কাউন্সিলর মসুদ আহমদ। এ ছাড়া বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠনগুলোও বন্যার্তদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন। প্রতিদিনই তারা সাধ্যানুযায়ী খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করছেন। বন্যা শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর একটি দল পুরো জেলায় বন্যাকবলিতদের উদ্ধার, নদীর ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরক্ষা বাঁধ মেরামত ও ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তাদের এমন প্রশংসনীয় নিরবচ্ছিন্ন সেবা কাজে সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বন্যার্তদের। মৌলভীবাজার শহরের ধরকাপন এলাকার সৈয়দ মাহমুদ আলী, সৈয়দ হুমায়েদ আলী শাহিন, শাহ ইমরুল আক্তার কয়েছ ও বড়হাট এলাকার আ.স.ম সালেহ সুহেল জানান, গেল ২-৩ দিন থেকে তারা বিশুদ্ধ পানির জন্য চরম সংকটে ভোগছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্লাবনের পানিতে নিমজ্জিত থাকা বাসা যেমন আলোহীন অন্ধকার। তেমনি বিশুদ্ধ পানিহীনতায় খাবার পানিসহ রান্নাবান্নার কাজও অচল। তাছাড়া পানিবন্দি থাকায় বাসা থেকে বের হওয়াও যেমন কষ্টকর। তেমনি রাত দিন বন্দি অবস্থায় অন্ধকার বাসায় থাকাও যন্ত্রণার। বলতে গেলে বিশুদ্ধ পানি সংকট আর বাসায় খাবার থাকার পরও তা পানির অভাবে রান্নাবান্না না করতে পারায় চরম সংকটে শহরের বন্যাকবলিতরা। কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের মো. আব্দুস ছালাম, মো. কনর মিয়া, শাহীদ আহমেদ ও মাছুম আহমদ জানান তাদের এলাকায় বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে রাস্তাঘাটের উপর দিয়ে প্রবাহিত বানের পানি অনেকটা কমলেও বসতবাড়ি থেকে এখন সরেনি পানি। তারা জানান তাদের এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন ও খাদ্য সংকট চরমে। তাদের মতো একই অবস্থা জেলার অন্যান্য উপজেলার বন্যাদুর্গতদের। জানা যায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণ মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের অন্তত ৩৫-৪০টি স্থান ভাঙন ও এখনো ভাঙার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন সোমবার দুপুর থেকে জেলার বন্যা পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নতি হচ্ছে। নতুন করে কুশিয়ারা নদীর ১-২টি স্থানে ভাঙন দেখা দিলেও উজান থেকে ঢলের পানি কম আসায় ও ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভাঙার ঝুঁকি অনেকটাই কমছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায় বন্যাকবলিতদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে জেলা জুড়ে ৭৪টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। তারা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওরস্যালাইন সহ প্রাথমিক চিকিৎসা ও ঔষধ দিচ্ছেন। এবং পানিবাহিত নানা রোগবালাই থেকে নিরাপদ থাকতে বন্যাকবলিতদের পরামর্শও দিচ্ছেন।