Thursday, September 10, 2009

প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ আকবর আলি খান ভারতে সরকার ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের স্বার্থ

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও জনগণ অভিন্ন। বাস্তব জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক সরকার সংখ্যাগুরুর সরকার। জর্জ বার্নার্ডশ ঠাট্টা করে লিখেছেন, ‘A government that robs Peter to pay Paul can always depend on the support of Peter.’ (যে সরকার পিটারের টাকা লুট করে পলকে দেয়, সে পিটারের সমর্থনের ওপর সব সময়ই নির্ভর করে)। যে তথ্য বার্নার্ডশ উহ্য রেখেছেন তা হলো বেচারা পিটারদের জন্য এমন অবস্থা সৃষ্টি করা হয় যে তাদের সরকারকে সমর্থন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষেত্রে পল হলেন সমতলবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। আর পিটার হলো বাঁধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি অঞ্চলের প্রান্তজনেরা। পল আর পিটারদের স্বার্থ ভিন্ন। পলদের স্বার্থ রক্ষা করে সরকার। তাই সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে লাভ-লোকসান দেখাটা যথেষ্ট নয়। পল ও পিটার উভয়ের স্বার্থই দেখতে হবে। ভারত সরকারের স্বার্থের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের স্বার্থও এ নিবন্ধে পরীক্ষা করা হবে।
ভারত সরকারের বক্তব্য হলো, টিপাইমুখ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। যদিও দীর্ঘদিন ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্ষাকালে জল জমিয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে, তবু টিপাইমুখের মুখ্য লক্ষ্য জলবিদ্যুত্, বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়। এর কারণ হলো জলবিদ্যুতের আর্থিক মুনাফা বন্যা নিয়ন্ত্রণের ফিরতির বা লাভের চেয়ে অনেক বেশি।
ভারতে দ্রুত জলবিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জরুরি। ২০০৪ সালে ভারতে মাথাপিছু বিদ্যুত্ ব্যবহূত হয় ৪৫৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা, চীনে মাথাপিছু ১৫৮৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুত্ ব্যবহূত হয়। চীনে মাথাপিছু বিদ্যুত্ ব্যবহার ভারতের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। কাজেই ভারতকে শিল্পায়নে চীনের কাছাকাছি যেতে হলে বিদ্যুত্ উত্পাদন নাটকীয় হারে বাড়াতে হবে। নিম্ন পর্যায়ে বিদ্যুত্ ব্যবহার সত্ত্বেও ২০০৬-০৭ সালে ভারতে মোট বিদ্যুত্ সরবরাহে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ ঘাটতি ছিল। এই অবস্থায় ১৫০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্প ভারতের জন্য বিধাতার আশীর্বাদ।
টিপাইমুখ প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াটে বিদ্যুতের বিনিয়োগ ব্যয় হবে ৪ দশমিক ৬৫ কোটি রুপি। অথচ চেন্নাইয়ে একটি ১০০০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রে মেগাওয়াট-প্রতি খরচ হচ্ছে ছয় কোটি রুপি। অন্যদিকে জলবিদ্যুত্ কেন্দ্রে জ্বালানি খরচ শূন্য এবং পরিচালনা ও মেরামত ব্যয় খুবই নগণ্য। একটি সংবাদ প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে যে ত্রিপুরা রাজ্যে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুত্ কেন্দ্রের বার্ষিক খরচ হয় তিন কোটি টাকা আর আয় হয় ২১ কোটি টাকা। এই হারে টিপাইমুখের আয় হলে টিপাইমুখ থেকে বছরে কমপক্ষে দুই হাজার ৭০০ কোটি ভারতীয় রুপি আয় হবে। উপরন্তু ভারতের বিদ্যুতের সিংহভাগ আসে কয়লা থেকে। এতে পরিবেশদূষণের সমস্যা রয়েছে। জলবিদ্যুতে এ সমস্যা নেই। পৃথিবীর যেকোনো দেশে এ ধরনের প্রকল্প সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করবে। স্বভাবতই এ ধরনের আকর্ষণীয় প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশের আপত্তি অথবা ভারতের ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আপত্তি ভারত সরকার শুনবে না। আসলে ঘটেছেও তা-ই।
এ প্রকল্পের বিপক্ষে উপদ্রুত উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষ করে মণিপুর রাজ্যে প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। এই আপত্তির কারণ চারটি। প্রথমত, প্রস্তাবিত বাঁধটি নিরাপদ নয়। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প অঞ্চলে আদিবাসীদের চিরাচরিত জীবনযাত্রার জন্য এটি একটি বড় হুমকি। তৃতীয়ত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ ধরনের প্রকল্প ইতিমধ্যে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। চতুর্থত, প্রস্তাবিত বাঁধ পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
টিপাইমুখ ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে একটি অতি স্পর্শকাতর এলাকা। এখানে সতত চলছে মহাদেশীয় ভূতাত্ত্বিক প্লেটের সংঘাত এবং ভূমির অধোগমন (বা নিচের দিকে বসে যাওয়া)। এ প্রকল্পের উদ্যোক্তারাও এ সমস্যা স্বীকার করেন। এ প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের প্রণীত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন দলিলে এ প্রক্রিয়াকে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছে: Subduction process between Indian Plate and Shan-Teanagserim Block along Indo-Burma Mobile Belt has made this area tectonically very active. In addition, continent-continent collision of (1) NE Projection of India shield with Himalayan Thrust Front and (2) Eastern Mishimi Block and thrust implicated Indo-Burmese Block have added to this subduction process (P XII). (ভারত-ব্রহ্ম পরিপ্লব বলয়ের সমান্তরালে ভারতীয় ভূতাত্ত্বিক প্লেট এবং শান-টেনাসেরিম ব্লকের মধ্যে অবস্থিত অঞ্চলে অধোগমন প্রক্রিয়া ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সক্রিয় রেখেছে। উপরন্তু মহাদেশ প্লেটের সঙ্গে মহাদেশ প্লেটের মধ্যে ১. হিমালয়ের ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখ ভাগসহ ভারতীয় ভূখণ্ডের উত্তর-পূর্ব অভিক্ষেপ ২. পূর্ব মিশিমি ব্লক এবং ভারত-ব্রহ্ম ব্লকের ঘাত-প্রতিঘাত অধোগমন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে)।
এই ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বেশি। উদ্যোক্তাদের হিসাবে এখানে রিখটার স্কেলে ৭-এর বড় ভূমিকম্প ১৬টি হয়েছে। এর মধ্যে দুটি হচ্ছে অত্যন্ত বড়, রিখটার স্কেলে এদের পরিমাপ ৮ দশমিক ৫-এর বেশি এবং এ দুটি ভূমিকম্প বিশ্বের সর্ববৃহত্ ভূমিকম্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত (পৃষ্ঠা-১১২)। উদ্যোক্তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে টিপাইমুখে ভূমিকম্পের অভিঘাত ভারতের অতি বিতর্কিত তেহরি বাঁধ এলাকা থেকে বেশি। তেহরি বাঁধে সর্বোচ্চ গড় ত্বরণ (Peak Mean Acceleration) অনুমান করা হয়েছে ০.২২ম। টিপাইমুখ বাঁধে এই মাত্রা ০.২৩ম থেকে ০.৩৫ম অনুমান করা হয়েছে। এই হিসাবও কম হতে পারে এ বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ করার কথা বলা হয়েছে। ভারত সরকারের বক্তব্য হলো যে ভূমিকম্পের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভয়ের কারণ নেই। কিন্তু নিরাপদ বাঁধের ডিজাইন সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে তেহরি বাঁধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গড় ত্বরণ (PMA) ০.৭০ম বলে অনেকে মত প্রকাশ করছেন। সে ক্ষেত্রে টিপাইমুখের প্রস্তাবিত ডিজাইন নিরাপত্তার জন্য অনেক কম। তাই এ প্রস্তাবিত বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের শেষ নেই। বাঁধের প্রস্তাবিত উচ্চতার ফলে এ উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, ৬৭টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার আদিবাসী এ বাঁধের ফলে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ৬৭টি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মধ্যে ১৬টি সম্পূর্ণ তলিয়ে যাবে। এখানে বাস করে নাগাদের জেলিয়ানগ্রং (Zelian grong) উপজাতির লোকেরা। এদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলেও এদের চিরাচরিত জীবনযাত্রা ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। বরাক নদীর স্থানীয় নাম আহু। এ নদী ও টিপাইমুখ অঞ্চলে রয়েছে তাদের অনেক পবিত্র স্থান। বাঁধের জলে তলিয়ে যাবে আহু জলপ্রপাত, যাকে ঘিরে শত শতাব্দী ধরে আদিবাসীদের রূপকথা ও ধর্ম বিশ্বাস গড়ে উঠেছে, হারিয়ে যাবে আহু জলপ্রপাতের ওপর পাঁচটি হ্রদ, যেখানে তাদের জাতীয় বীর যদুনংয়ের মায়াবি তরবারি লুকিয়ে আছে। এখানকার আদিবাসীরা ক্ষতিপূরণ চায় না, বিদ্যুত্ চায় না; চায় তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। তাদের দাবি, বরাকে প্রবাহের ওপর সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা হোক।
তৃতীয়ত, ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ইতিমধ্যে দুটি জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র ব্যর্থ হয়েছে অথচ এ প্রকল্প দুটি স্থানীয় আদিবাসীদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। একটি হলো ত্রিপুরায় গোমতী নদীতে ডুম্বুর বাঁধ। ৩০ মিটার উঁচু এই বাঁধ ১০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য ১৯৭৬ সালে চালু করা হয়। এতে ৪৬ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। সরকারি হিসাবে জমির মালিকানার রেকর্ড অনুসারে দুই হাজার ৫৫৮টি পরিবার বা প্রায় ১৫ হাজার লোক উদ্বাস্তু হয়েছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা হবে আট থেকে ১০ হাজার আর মোট ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা হবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার আদিবাসী। বাঁধে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ পরিবার জমির দলিল না থাকায় কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। তাই সরকারি হিসাবে এরা অন্তর্ভুক্ত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা বাধ্য হয়ে বনাঞ্চলে জুম চাষ করে ও গাছ কাটার ব্যবসায় লিপ্ত হয়। এতে গোমতী অববাহিকায় পরিবেশগত বিপর্যয় শুরু হয়। গাছ কেটে ফেলায় পাহাড়গুলোর আচ্ছাদন উঠে যায়। ফলে অনেক বেশি পলি আসতে থাকে। পলি জমে ৩০ বছরের মধ্যে গোমতীর ওপর বাঁধ অকার্যকর হয়ে গেছে। বাঁধ তৈরির সময় অনুমান করা হয়েছিল বছরে শূন্য দশমিক ৩৬২ মিলিমিটার পলি বাঁধে জমবে। প্রকৃতপক্ষে বছরে ৯ দশমিক ৯৪ মিলিমিটার পলি জমে। যে পরিমাণ পলি জমবে বলে অনুমান করা হয়েছিল তার চেয়ে ২৭ গুণ বেশি হারে পলি জমেছে। কোনো মতে ব্যয়বহুল ড্রেজিং করে চালু রাখার চেষ্টা চললেও প্রকল্পটি প্রকৃতপক্ষে অকার্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দাবি উঠেছে, এ বাঁধ খুলে দেওয়ার জন্য এবং আদিবাসীদের তাদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। বাঁধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য এত বড় খেসারত কোনো দেশ এখন পর্যন্ত দেয়নি।
দ্বিতীয় ব্যর্থ প্রকল্প মণিপুরে অবস্থিত। এটি ইথাই বাঁধ বা লোকটাক প্রকল্প নামে পরিচিত। ১১৫ কোটি রুপি ব্যয়ে ১৯৮৩ সালে ১০৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ জলবিদ্যুত্ প্রকল্প চালু করা হয়। ইতিমধ্যে পলি জমে বিদ্যুত্ কেন্দ্রের জলাধারের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে। জলাধারের পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। কচুরিপানা ও বিভিন্ন আগাছার প্রসার জলকে দূষিত করেছে ও প্রবাহ বিঘ্নিত করেছে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি এমফিল থিসিসের হিসাব অনুসারে লোকটাক প্রকল্প এলাকায় গত দুই দশকে পরিবারগুলোর আয় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে। বাঁধ এলাকায় পরিবেশসংকটের ফলে প্রতিদিন উদ্বাস্তুর পরিমাণ বাড়ছে। জলাধারে মাছের পরিমাণ কমে গেছে। মণিপুরবাসীর দাবি, তাই লোকটাক প্রকল্প বন্ধ করা হোক। মণিপুরে জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র ব্যর্থতার ফলে নতুন জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই। কোনো নির্বাচিত সরকার মণিপুর রাজ্যে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেয়নি। রাষ্ট্রপতির শাসনকালে মণিপুরে যখন কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না, তখন এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।
চতুর্থত, বাঁধ ও জলবিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মণিপুরে নাগা মহিলা ইউনিয়নের সম্পাদিকা আরাম পামে (Aram Pamei) এক খোলাচিঠিতে সুন্দরভাবে লিখেছেন, “Manipur also falls in one of the genetic hot spots of the world where rare bio-diversity resources are found. The project will submerge the exotic and rare flora and fauna and rich gene pools” (‘মণিপুর রাজ্য জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে পৃথিবীর সর্বাধিক সম্ভাবনাময় অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে দুর্লভ জীববৈচিত্র্যের সম্পদ রয়েছে। প্রকল্পে তলিয়ে যাবে বিচিত্র, অচেনা ও দুর্লভ উদ্ভিদকুল ও প্রাণিকুল ও সমৃদ্ধ জিনের সম্পদভাণ্ডার।’) ইতিমধ্যে লোকটাক প্রকল্পে পাঁচ প্রজাতির মাছ লুপ্ত হয়ে গেছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় জনগণের বিরোধিতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কারণে টিপাইমুখ জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। স্থানীয় জনগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য ভারত সরকার ইতিমধ্যে কয়েকটি ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রটি নির্মাণের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানাধীন North Eastern Electric Power Company (NEEPCO) থেকে মণিপুর সরকারের মালিকানাধীন National Hydro Electric Power Company-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এতে জলবিদ্যুত্ কেন্দ্রের মুনাফার একটি বড় হিস্সা মণিপুর পাবে। দ্বিতীয়ত, জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতে প্রতিটি পরিবারকে ১০০ ইউনিট বিদ্যুত্ ১০ বছর পর্যন্ত বিনামূল্যে দেওয়া হবে। বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান উত্পাদিত বিদ্যুতের আয়ের মোট এক শতাংশ ও রাজ্য সরকার সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করবে। তৃতীয়ত, জলবিদ্যুত্ প্রকল্পগুলোর পরিবেশের ওপর প্রভাব মূল্যায়ন করে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
ভারত সরকারের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে সরকার ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে মতানৈক্য নিরসন সম্ভব হয়নি। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হওয়ার ফলে সংক্ষুব্ধ মণিপুরের বাসিন্দারা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কোনো দাগ কাটতে পারেনি। তবু তারা হরতাল, মিছিল, সভা ও আবেদন-নিবেদন করে তাদের বক্তব্য পেশ করে চলছে। আধুনিক ভারতের স্থপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বাঁধকে আধুনিক ভারতের মন্দির বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা সঠিক। তবে তিনি লক্ষ করেননি যে এ মন্দিরের সোপনগুলো সংখ্যালঘু আদিবাসীদের শোনিতে রঞ্জিত ও অশ্রুতে সিক্ত। প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধ শুধু ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। টিপাইমুখে বৃহত্ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশেও প্রান্তজনের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
আগামীকাল: টিপাইমুখ বাঁধ ও বাংলাদেশের স্বার্থ
আকবর আলি খান: গবেষক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। অর্থ, বন ও পরিবেশ ও মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব। এ ছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

অরণ্যে রোদন আনিসুল হক কত দূর বদলাল দিন

বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। বাংলাদেশের মানুষ বারবার পরিবর্তনের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে, আপ্লুত হয়। ২০০১ থেকে ২০০৭-এর বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সর্বত্র দলীয়করণ, সবকিছুর দখল মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ফেলেছিল। নদীদখল, চরদখল, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলো দখল—সর্বত্রই ছিল সেই দখলের কালো থাবার বিস্তার। হাসপাতাল হাসপাতাল ছিল না, বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, মাঠ-ঘাট সবকিছু দখল করে নিয়েছিল ক্ষমতাসীন জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা, তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী। দখল করেছিল, কারণ দখলটা আসলে লাভজনক, অর্থকরী। একটা হাসপাতাল দখল করলে নানা সূত্র থেকে টাকার বখরা আসে, ঠিকাদারেরা দেয়, অ্যাম্বুলেন্সওয়ালারা দেয়, অবৈধ দোকানপাটওয়ালারা দেয়। আর নিয়োগ-বদলি যদি কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে তাঁকে আর পায় কে? তিনি হয়ে ওঠেন একজন ক্ষমতার দৈত্য। অর্থ বলি, প্রতিপত্তি বলি, সব তাঁর পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়ে।
এই রকম একচ্ছত্র ক্ষমতাচর্চা, সর্বব্যাপী দখল-লুণ্ঠন-আত্মসাতের মোচ্ছবের মউজ থেকে কে নিজেকে সরিয়ে নিতে চায়। ওই সময়ের ক্ষমতাসীনরা চাননি। তাঁরা ষড়যন্ত্র করেছেন, তাঁরা নির্বাচনের নামে প্রহসন করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছেন, সেই কাজে তাঁরা অনেক দূর পর্যন্ত সফল হয়েছিলেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি, অ্যাক্ট অব গড নামে পরিচিত একটা ঘটনা এই দেশে ঘটেছে, তাতে দুই বছর দেশ গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিত ছিল বটে, আখেরে একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে এবং দিনবদলের সনদ ঘোষণা করে, পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
আট মাস পেরিয়ে গেল। দিনবদল কত দূর হলো?
কতগুলো বদল ঘটেছে। হাওয়া ভবনের খবরাখবর এখন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কিন্তু সে তো কেয়ারটেকার সরকারের টেক-কেয়ারের ফল। শেখ হাসিনার একটা অনেক বড় প্লাস পয়েন্ট হলো, তাঁর ছেলেমেয়েদের কেউই দেশে থাকেন না, ফলে হাওয়া ভবন, বাতাস ভবন, আব-ভবন, আদম ভবন—এই জাতীয় কোনো খবর তাঁদের ঘিরে আমাদের পড়তে হয় না। আশা করি কোনো দিনও পড়তে হবে না।
কিন্তু দেশে পরিবর্তনের লক্ষণ কি দেখা দিয়েছে?
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো একাত্তরে, তখন আমরা খুবই ছোট, স্কুলে পড়ি। বাহাত্তরে নতুন দেশে নতুন ক্লাসে গেছি, কিন্তু বই তো রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। পুরোনো বইই আমাদের পাঠ্য রইল, শুধু একটা নির্দেশ জুড়ে দেওয়া হলো বইয়ের সঙ্গে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশ পড়িতে হইবে।’ এখন এই দিনবদলের দিনে আমাদের কি মাত্র একটা পরিবর্তনই দেখতে হবে, সেটা হলো—‘বিএনপির বদলে আওয়ামী লীগ পড়িতে হইবে।’ আগে সবকিছু দখল করেছিল বিএনপিওয়ালারা, এখন সবকিছু দখল করবে আওয়ামী লীগওয়ালারা! এইটুকুন কেবল পার্থক্য রচিত হবে?
পরিবর্তন মানে নিজের পরিবর্তন সবার আগে। ১৯৯৬-২০০১-এর আওয়ামী লীগ আর ২০০৯-এর আওয়ামী লীগ যদি একই থাকে, একই আচরণ করে, তাহলে সেটাকে মোটেও ভালো বলা যাবে না।
একটু আগেই বলেছি, শেখ হাসিনার একটা ইতিবাচক দিক হলো, তাঁর ছেলেমেয়েরা এই দেশে ব্যবসা, পদায়ন, ক্ষমতার হালুয়া-রুটিতে ভাগ বসাচ্ছেন না। কিন্তু সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগাররা যদি দখল-দলীয়করণ-লুটপাটের পুরোনো চক্রটাই প্রতিষ্ঠা করে ফেলে, তাতে আর যাই হোক দিনবদল ঘটে না।
শেখ হাসিনার নিজের উক্তি আমার মনে পড়ছে, তিনি নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি হবে যোগ্যতা অনুসারে, দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।’ সেই নীতি কি অব্যাহত আছে?
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকার দেশটা খারাপ চালায়নি, কিন্তু এমন কতগুলো কাণ্ড ঘটিয়েছিল, যেগুলো না ঘটালেও চলত। অথচ সেসবের কারণে দেশবাসী চরম বিরক্ত হয়ে তার শোধ নিয়েছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে। যেমন দেশের বিভিন্ন স্থানে গডফাদারতুল্য দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সন্ত্রাসী নেতার উদ্ভব ও রাজত্ব কায়েম, যারা বাঘ ও মহিষকে এক ঘাটে পানি খেতে বাধ্য করত। সাংসদদের ছেলেরা হঠাত্ করে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হতে শুরু করলেন। সারা দেশে সাংবাদিক নির্যাতন চলল, অথচ কেন্দ্রীয় নেতারা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করার বদলে সাংবাদিকতাকেই তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করতে লাগলেন। সারা দেশের কর্মীরা তাতে ভুল ইঙ্গিত পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। ব্যাপক হারে নামকরণ করা শুরু হলো এবং নির্বাচনের আগে আগে কোন স্তাবকের অসত্ সর্বনাশা পরামর্শে জানি না, জাতির জনকের কন্যার নামে গণভবনটা বরাদ্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। শোনা যায়, যুক্তিটা এই ছিল, ‘আপনি তো আবার নির্বাচনের পরে ক্ষমতায় ফিরবেনই, এই তিন মাসের জন্য কেন গণভবন ছেড়ে যাবেন, অযথা বাসা বদলানোর ঝামেলা!’
ভোটাররা এই মনোভাব খুব অপছন্দ করে। ১৯৯৬-এর নির্বাচনের আগে টেলিভিশনের ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ অনুষ্ঠানে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘তাঁরা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার কথা চিন্তাই করছেন না, আগামী কুড়ি বছরেও তাঁদের কেউ হারাতে পারবে না।’ ফল তিনি পেয়েছিলেন হাতে হাতে। ২০০১-এ বাড়ি না বদলানোর মনোভাবের ফলটাও আওয়ামী লীগ পেয়েছিল চরমভাবে। আর বিএনপিওয়ালাদের মনোভাব ছিল ‘ক্ষমতা ছাড়ব না, ছলেবলে কৌশলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান পদে নিজের লোক বসিয়ে হলেও আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবই’, সেই মনোভাবের শাস্তিও জনগণ কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করেছে।
এখন এসেছে ঘোষিতভাবে দিনবদলের দিন। কতটুকু বদল ঘটল? পত্রিকার প্রথম পাতায় ছবি ছাপা হয়েছে, ঢাকায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ছেলেরা গাড়ির ওপরে চড়ে উড়ন্ত লাথি বা ফ্লাইং কিক দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তিনি যখন টেন্ডারবাজির সঙ্গে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার খবর পান, তখন তাঁর বড় দুঃখ হয়।’ তাঁর দুঃখে দুঃখ পেতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ওই টেন্ডারবাজদের বয়েই গেছে। তাঁরা তো আদর্শের জন্য রাজনীতি করেন না, তাঁদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো টাকা।
এবার গত কয়েক দিনের প্রথম আলোর শিরোনামগুলোর ওপরে দ্রুত একবার চোখ বোলাই। ‘টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতেই খুনোখুনি হচ্ছে কুষ্টিয়ায়’ (২০ আগস্ট, ২০০৯)। খবরে বলা হয়েছে, খুন বেড়ে যাওয়ার কারণ সড়ক ও জনপথের ১৮ কোটি টাকার টেন্ডার। এর সঙ্গে আছে জিকে প্রকল্প, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ। চরমপন্থী দুটি দল গণমুক্তি ফৌজ ও জাসদ গণবাহিনী এর নিয়ন্ত্রণ পেতে মরিয়া। এর পেছনে মদদ দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। তিনটি কাটা মাথা ফেলে রাখা ছিল এরই অংশ। সর্বনাশ!
‘শান্তিতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করুন, দাবি কুষ্টিয়াবাসীর’ (২১ আগস্ট, ২০০৯), ‘তিন সাংসদের সহযোগী ও ছেলেদের নিয়ন্ত্রণে কুষ্টিয়া’ (২২ আগস্ট, ২০০৯), ‘চেয়ারম্যান সদরউদ্দিন ও মেয়র নুরুলের কাজে ত্রস্ত এলাকাবাসী’ (২৩ আগস্ট ২০০৯), ‘মেহেরপুরে বোমা আর বোমা, নেপথ্যে চাঁদাবাজি আর ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ’ (২৪ আগস্ট, ২০০৯), ‘মেহেরপুরে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক সাংসদ জয়নুলের স্বজনেরা’ (২৫ আগস্ট ২০০৯), ‘চাল সরবরাহেও দলীয়করণ’ (২৬ আগস্ট ২০০৯), ‘দুই ভাইয়ের ইচ্ছায় চলছে চুয়াডাঙ্গা’ (২৭ আগস্ট ২০০৯), ‘যশোরে আট মাসে ৬৯ খুন, নেপথ্যে টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি’ (১ সেপ্টেম্বর ২০০৯)। বলা হচ্ছে, সন্ত্রাসী চক্রগুলোর পৃষ্ঠপোষক কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতা। আর সক্রিয় আছে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। ‘শাহীন চাকলাদারকে ঘিরে যশোরে নানা শঙ্কা’ (২ সেপ্টেম্বর ২০০৯), ‘গ্রামেও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-দখল’ (৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯)। এই খবরে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজেরা চাঁদা চেয়েছিল দরিদ্র কৃষক আনোয়ারুল ইসলামের কাছে। চাঁদা দিতে পারেননি তিনি, সামর্থ্য ছিল না, চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন তিনি। এই চাঁদাবাজেরা পরিচিত সাখাওয়াত বাহিনী বলে, আর তার পেছনে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
শুধু এই সর্বব্যাপী সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজি আধিপত্য কায়েমের লড়াই নয়, এরা এখন চড়াও হয়েছে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ওপর। চুয়াডাঙ্গার সাংসদের সম্পর্কে খবর প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোর প্রতিনিধি শাহ আলমের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের একদল সন্ত্রাসী। সাংবাদিকের স্ত্রী শিশুসন্তান নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এই পুরো পরিবার এখন এলাকাছাড়া। প্রথম আলো ছাড়াও আরও দুটি সংবাদপত্রের সাংবাদিকেরা শিকার হয়েছেন এই সন্ত্রাসীচক্রের হামলার। যশোরে সমাবেশ করে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের হাত-পা ভাঙার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।
এখন পর্যন্ত না সরকার না সরকারি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—কারও কাছ থেকেই এ সম্পর্কে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ওপরে নিন্দনীয় পুলিশি হামলার পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এই দুঃখ প্রকাশের মধ্যে পরিবর্তন বা দিনবদলের কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।
কিন্তু গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ-খুনোখুনির মগের মুল্লুক প্রতিষ্ঠা আর তাতে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ মদদ প্রদান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ আমাদের ঘোরতর দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলেছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো সাংবাদিকের ওপর হামলা। চুয়াডাঙ্গার সাংসদ ও পৌর চেয়ারম্যান জোয়ার্দার ভ্রাতৃদ্বয়ের সাংবাদিকদের বাড়িঘরে হামলা-অভিযান যে শেখ হাসিনা ঘোষিত দিনবদলের সনদের ওপরেই এক ভয়ঙ্কর থাবা, সেটা কি কেউ ভেবে দেখেছে?
চুয়াডাঙ্গার এই ঘটনা একটা লিটমাস টেস্ট। সরকার এখনো এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, না রাজনৈতিক না প্রশাসনিক। এর দ্বারাই বোঝা যাচ্ছে, পরিবর্তন শুধু কথার কথা।
আবার এই দেশে নেমে আসছে সেই তিমির। পরিবর্তনের আশায় বুক বেঁধে রাখা বাংলার হতভাগ্য মানুষকে আবার আশাভঙ্গের বেদনায় ভেঙে পড়তে হবে।
তবে মাত্র আট মাস গেছে। এখনো সবকিছু ভেঙে পড়েনি। সরকার ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চাইলে এখনো স্রোতের উল্টো দিকে যাত্রা সম্ভব। এখনই যদি কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার দ্বারা সারা দেশের নেতা-কর্মীরা এক ধরনের সংকেত পাবেন। আর যদি কোনো ব্যবস্থাই না নেওয়া হয়, তা তাঁদের করে তুলবে সম্পূর্ণ বেপরোয়া। তার ফলটা দাঁড়াবে, দেশটা বসবাস-অযোগ্য হয়ে উঠবে। আর ব্যর্থ হবে সরকার। দিন পাল্টাবে না। একটা সরকার ব্যর্থ হলে কেবল কয়েকজন মন্ত্রী বা সাংসদ ব্যর্থ হন না, বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষ ব্যর্থ হয়। সেটা কি নেতারা একবার চোখ বন্ধ করে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে দেখবেন?
আমরা এখনো বিশ্বাস করি, সর্বস্ব হারানো শেখ হাসিনা, নির্লোভ আদর্শবাদী মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আবুল মাল আবদুল মুহিতরা যে সরকারে আছেন, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা আছে। কাজটা কঠিন। কঠিন কাজই তো করতে হবে। দলকে, দলের বল্গাহীন ছাত্র-যুব ক্যাডারদের, বেপরোয়া সাংসদ-চেয়ারম্যান-সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর দলের আদর্শে উদ্বুদ্ধ নিঃস্বার্থ কর্মীদের সামনে সৃষ্টি করতে হবে একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন, দেশ গড়ার একটা বড় কর্মযজ্ঞে তাদের শামিল করতে হবে।
চুয়াডাঙ্গার সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় সরকার ও নেতারা কী করেন, সবাই মিলে আমরা তাকিয়ে আছি সেই দিকে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

দুর্নীতির নতুন রকম ‘চালবাজি’ ব্যবসায়ীদের ‘হক’ বনাম দলের লোকের ‘হক’

গোল্ডফিশ মাছের স্মৃতি না থাকা সুবিদিত; দলীয়করণের হোতাদের লজ্জাহীনতাও তেমনই এক প্রতিষ্ঠিত ব্যাপার। দুর্নীতিতে বারবার আন্তর্জাতিক শিরোমণি হওয়া কিংবা এ বিষয়ে জাতীয় আলোড়ন যেন বিস্মৃত হয়েছেন ক্ষমতাসীনেরা। নাটোরে চাল সরবরাহে দলীয় একচেটিয়া প্রভাব এই স্মৃতিহীনতারই সতর্কসংকেত।
সোমবারের প্রথম আলোয় নাটোর-৪ আসনের সাংসদ আব্দুল কুদ্দুস বলেছেন, ‘দলীয় লোকজন সুযোগ-সুবিধার জন্য আমার কাছে এসেছিল। আমি মিলমালিকদের বলেছি, আপনারা একচেটিয়া ব্যবসা ছেড়ে দলীয় লোকজন নিয়ে চাল সরবরাহ করেন।’ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হক নষ্ট করা হচ্ছে। কিন্তু আসলে হক নষ্ট হচ্ছে কৃষকের এবং জনগণের করের টাকার।
প্রথমত, উপজেলার ১২৯ মিল থেকে যেখানে মিলপ্রতি প্রায় ১০ টন করে চাল সরবরাহের অনুমতি পাওয়ার কথা, সেখানে ৫১টি মিল মাত্র এক টন করে সরবরাহের অনুমতি পেয়েছে। অন্যদিকে সরবরাহ তালিকার ছয়জন সরবরাহ করেছেন ৬০ টন করে। বাজারমূল্যের চেয়ে সেরপ্রতি প্রায় পাঁচ টাকা দাম বেশি ধরা হচ্ছে। মিলমালিকদের লাইসেন্স ব্যবহার করে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা বাগিয়ে নিয়েছে দলীয় লোকজন। লাভের সীমা আর দুর্নীতির সীমা এখানে একাকার। কিন্তু ইউএনও বা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসক জানেন না, তাঁদের কী করণীয়। কেবল নাটোর নয়, সারা দেশেই প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন ধারার অনিয়ম হচ্ছে, সংবাদও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের টনক অনড়! সত্যি, কী বিচিত্র এই ‘না-জানার’ ব্যাধি!
একটি দেশ সরকার বা রাষ্ট্রের জন্য দুর্নীতির চেয়ে ক্ষতিকর আর কিছু হতে পারে না। বিগত বছরগুলোয়, এমনকি গত নির্বাচনের রায়ে এর বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র ঘৃণা প্রকাশিত হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই সব অবগত আছেন, যেমন অবগত থাকার কথা দলীয় লোকদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি সম্পর্কে। গোড়াতেই যদি এর প্রতিকার না হয়, তাহলে দেশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও সেই তিমিরেই থাকবেন, যে তিমিরে দেশ এর আগে ছিল।

জনশক্তি রপ্তানি নতুন বাজার ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নজর দিতে হবে

যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাত প্রবাসী শ্রমশক্তি, সে দেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় অর্ধেক হ্রাস পাওয়া একটা বড় দুঃসংবাদ। বাংলাদেশের জন্য সত্যি তা-ই ঘটছে: গত এক বছরে এ দেশের জনশক্তি রপ্তানি হ্রাস পেয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন দেশে আমাদের যেসব নাগরিক কাজকর্ম করে স্বদেশে অর্থ পাঠাচ্ছিলেন, তাঁদের এক বিরাট অংশ চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসছেন। ফিরে আসা শ্রমিকদের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানি হ্রাস পাওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসার নেতিবাচক প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার প্রবৃদ্ধিতে এখনো তেমন দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি বটে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। এটা তো পরিষ্কার যে রপ্তানি কমে না গেলে, শ্রমিকেরা ফিরে না এলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবৃদ্ধি বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হতো। অর্থাত্ প্রবৃদ্ধির হার না কমলেও ক্ষতি হচ্ছে এবং আরও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, দুবাই, ওমান, কাতার প্রভৃতি দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়; আর শ্রমিক রপ্তানি কমে যাওয়া ও শ্রমিকদের ফিরে আসার হার বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে এসব দেশেই সবচেয়ে বেশি। লক্ষ করার বিষয়, এসব দেশে আমাদের শ্রমিকেরা মূলত অদক্ষ; বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণশিল্পসহ শ্রমঘন শিল্পগুলোতে সংকট সৃষ্টিই মূলত এসব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার কারণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করার তেমন কিছু নেই। কিন্তু আমরা যদি আমাদের শ্রমশক্তিকে অদক্ষ থেকে আধাদক্ষ পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা করি, তাহলে বহির্বিশ্বে আমাদের শ্রমবাজারের আরও অনেক সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। কারণ অনেক দেশেই আধাদক্ষ ও দক্ষ শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে; যেমন—হাসপাতাল-ক্লিনিকের নার্স, বিভিন্ন ধরনের টেকিনিশিয়ান, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির অপারেটর, পর্যটনশিল্পের মাঝারি পর্যায়ের কর্মী, গাড়িচালক ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব, যারা বিদেশে গিয়ে অদক্ষ শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারবেন।
নিকট ও দূর-ভবিষ্যতের জন্য এই লক্ষ্যেই আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। তবে এ মুহূর্তে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেটা মোকাবিলারও বাস্তব কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যে মানের শ্রমশক্তি আছে, তাকেই সম্ভাব্য সব বাজারে রপ্তানির জন্য কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা বন্ধ করতে হবে, কারণ এদের কারণে মালয়েশিয়াসহ কিছু দেশের বাজার আমাদের জন্য নষ্ট হয়েছে। দেশের ভাবমূর্তিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না কেন তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর মধ্যে আরও সাতটি দেশে নতুন মিশন সৃষ্টির সিদ্ধান্ত হয়েছে, তারা যেন বিদেশে আমাদের নাগরিকদের জন্য নতুন নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করায় উদ্যোগী হন। মোটের ওপর, শ্রমশক্তি রপ্তানি খাতে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা করতে সরকারকে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে বিপুল জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত, নানামুখী সমস্যায় আক্রান্ত এই দেশে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও অগ্রগতিসাধন সত্যি কঠিন হয়ে উঠবে।

পোশাক শ্রমিক সংগঠনের ঘোষণা ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না করলে ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি

গার্মেন্টস কারখানার মালিকেরা শ্রমিকদের বেতন-বোনাস না দেওয়ার চেষ্টা করলে ১৬ সেপ্টেম্বরের পর ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। বেতন-বোনাসের দাবিতে গতকাল সোমবার বিভিন্ন কর্মসূচি পালনকালে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
বেতন-বোনাস না দেওয়ার উদ্দেশে বিজিএমইএ সংবাদ সম্মেলন করেছে মর্মে অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। আশুলিয়া, উত্তরা, তেজগাঁও, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
মানববন্ধন পালনকালে শ্রমিক নেতারা বলেন, সরকারের কাছে অর্থ দাবি করার সঙ্গে শ্রমিকদের বেতন-বোনাসকে সংশ্লিষ্ট করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না করলে ধর্মঘটসহ বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
এদিকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির এক মতবিনিময় সভায় সাংসদ রাশেদ খান মেনন গার্মেন্টস কারখানার মালিকদের বক্তব্যকে আপত্তিকর, অশালীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিষয় সংসদে উত্থাপনের আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রম আইন ও মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলারও প্রতিশ্রুতি দেন।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সফিউদ্দিন আহমেদ, দেলোয়ার হোসেন খান, শাফিয়া পারভীন প্রমুখ।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, প্রতি ঈদের আগে নানা অজুহাতে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস না দেওয়ার টালবাহানা চলে। এটাকে চক্রান্ত উল্লেখ করে বিবৃতিতে মালিকদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে ঈদের আগেই শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ ও বোনাস দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

আইবিএর এমবিএ ভর্তি পরীক্ষা ২০ নভেম্বর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) এমবিএ ভর্তি পরীক্ষা আগামী ২০ নভেম্বর শুক্রবার বিকেল চারটায় অনুষ্ঠিত হবে। ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিতরণ শুরু হবে ২৫ অক্টোবর থেকে। ফরম পাওয়া যাবে আইবিএ ভবনের এমবিএ প্রোগ্রাম কার্যালয়ে।
আগামী ১৬ নভেম্বরের মধ্যে সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে একই কার্যালয়ে ফরম জমা দিতে হবে। এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে www.iba-du.edu ওয়েবসাইটে।

ঈদে বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত লঞ্চ সার্ভিস

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কয়েকটি নৌ-রুটে অতিরিক্ত লঞ্চ সার্ভিসের ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৬ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সার্ভিস চালু থাকবে। এ ছাড়া ঈদে দুর্ঘটনা এড়াতে মালিক, চালক ও যাত্রীদের প্রতি কিছু অনুরোধ জানানো হয়েছে। গতকাল সোমবার বিআইডব্লিউটিএর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
যেসব রুটে অতিরিক্ত লঞ্চ চলবে সেগুলো হলো ঢাকা থেকে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ইচলী, মাদারবাড়ী, কালাইয়া, বোরহানউদ্দিন, পটুয়াখালী, আমতলী, হুলারহাট, লালমোহন, রাঙ্গাবালী, নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর, তালতলা, রামচন্দ্রপুর, মাচুয়াখালী, সুরেশ্বর, মতলব ও চাঁদপুর থেকে বরিশাল।
মালিক, চালক ও যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ: লঞ্চ দুর্ঘটনা এড়াতে মালিক, চালক ও যাত্রীদের প্রতি কিছু নিয়ম মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। মালিকদের প্রতি উপযুক্ত মাস্টার/সারেং ও চালকের সাহায্যে লঞ্চ পরিচালনা করা, লঞ্চে বিশুদ্ধ পানীয় ও প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থা রাখা এবং নৈশযাত্রায় যাত্রীদের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
চালকদের প্রতি অতিরিক্ত মালামাল বহন না করা, জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম রাখা, যাত্রার আগে ইঞ্জিন পরীক্ষা করা, আবহাওয়া সংকেত মেনে চলা এবং যাত্রীদের প্রতি লঞ্চের ছাদে না ওঠা, খারাপ আবহাওয়া দেখলে যাত্রা না করা, নির্ধারিত হারের বেশি ভাড়া ও কুলি চার্জ না দেওয়া ইত্যাদি অনুরোধ জানানো হয়।

চট্টগ্রামে পোশাক শ্রমিক এসিডদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় এসিড বিক্রেতা গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামে পোশাক শ্রমিক নাসিমা বেগম (৩০) এসিডদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় মেজবাহ উদ্দিন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার করা মেজবাহ উদ্দিন এসিড বিক্রেতা। চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানহাটে ‘ডায়মন্ড কেমিক্যাল ওয়ার্কস’ নামে তাঁর একটি দোকান রয়েছে।
গত রোববার নাসিমার সাবেক স্বামী রুহুল আমিন তাঁকে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে এসিড নিক্ষেপ করে। রুহুলকে জনতা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে।

বরিশাল মেডিকেল সোয়াইন ফ্লু চিকিত্সায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই

বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সোয়াইন ফ্লু আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। একটি অপরিচ্ছন্ন কক্ষ বরাদ্দ করা ছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সোয়াইন ফ্লুর চিকিত্সায় এক কক্ষের একটি ইউনিট খোলা হলেও মেডিকেলে কর্মরত অনেকেই তা জানেন না।
জানা গেছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটি কক্ষ সোয়াইন ফ্লু চিকিত্সার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে কোনো ব্যবস্থাই নেই। চারটি শয্যা থাকলেও সেখানে নেই কোনো বিছানাপত্র। কক্ষটি স্যাঁতসেঁতে, জানালাগুলোও ভাঙা।
জরুরি বিভাগের ব্রাদার আনোয়ার হোসেন ও শাহাবুদ্দিন জানান, এখানে সোয়াইন ফ্লুর পরীক্ষা করা হয় না। পরীক্ষা করাতে হলে ঢাকায় যেতে হবে। এখানে ভর্তি হলে শুধু কাশি ও শ্বাসকষ্টের চিকিত্সা দেওয়া হয়।
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ধীরেন্দ্রনাথ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোয়াইন ফ্লুর চিকিত্সা আমরা দিতে পারব, তবে রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।’
এদিকে সোয়াইন ফ্লু হয়েছে কি না, পরীক্ষা করাতে গতকাল সোমবার এক নারী হাসপাতালে এলে জরুরি বিভাগের এক চিকিত্সক খারাপ আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁর স্বামী। সাজিয়া আফরীন নামের ওই রোগী জানান, জ্বর, গলা ব্যাথা ও চোখ দিয়ে পানি পড়ার সমস্যা নিয়ে তিনি হাসপাতালে আসেন। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সোয়াইন ফ্লুর একটি ইউনিটের খোঁজ পেলেও সেখানে কোনো চিকিত্সার ব্যবস্থা না থাকায় তিনি হতাশ হন।

ট্রেনের অগ্রিম টিকিট প্রথম দিনে বেশির ভাগ টিকিটই অবিক্রীত

ঈদ উপলক্ষে আন্তনগর ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার থেকে। প্রথম দিন সাধারণ আসনের অনেক টিকিট অবিক্রীত রয়ে গেছে। তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বগির আসন পাননি আগ্রহীদের অনেকেই।
প্রথম দিন সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি হয়েছে ৯৫৮টি। অবিক্রীত টিকিটগুলো কমলাপুর স্টেশনের চলতি কাউন্টারে পাওয়া যাবে। ১৪ সেপ্টেম্বর যেসব ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে, গতকাল সেগুলোর টিকিট বিক্রি করা হয়েছে।
গাজীপুরের জয়দেবপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনেও গতকাল অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়েছে। টিকিট বিক্রি শুরু হয় সকাল নয়টায়। কিন্তু সেহিরর পর থেকেই লোকজন লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। তবে সকাল ১০টার আগেই লাইন ফাঁকা হয়ে যায়। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, এবার তুলনামূলকভাবে টিকিট কিনতে আগ্রহীদের ভিড় ছিল কম। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, অন্যবার পাঁচ দিনের অগ্রিম টিকিট দেওয়া হলেও এবার সাত দিনের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। তাই প্রথম কয়েক দিন টিকিট বিক্রি কম হলেও ঈদের দু-তিন দিন আগের ট্রেনগুলোর টিকিটের জন্য ভিড় বেশি হবে।
কমলাপুর স্টেশনে রাজশাহীগামী সিল্কসিটি ট্রেনের টিকিট কিনতে আসা লোকমান হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, তিনি নিজে পরে যাবেন। পরিবারের সদস্যদের আগে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যই অগ্রিম টিকিট কিনেছেন।
একতা ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর টিকিট নিতে এসে পাননি দিনাজপুরের যাত্রী আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণীর টিকিট কিনতে না পেয়ে শোভন চেয়ার টিকিট কিনেছেন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে কমলাপুর, জয়দেবপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর হয়ে ২২টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করবে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবে। ঈদ ঘনিয়ে এলে চাহিদার কথা বিবেচনা করে ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত কিছু বগি সংযোজন করা হবে। এর ফলে ট্রেনগুলো অতিরিক্ত প্রায় আড়াই হাজার যাত্রী বহন করতে পারবে।
জানা গেছে, ২২টি আন্তনগর ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে আসন রয়েছে এক হাজার ৭০০, প্রথম শ্রেণীতে ৯০০, শোভন চেয়ার সাড়ে সাত হাজার এবং শোভন চার হাজার ৭০০টি।
এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুটি বিশেষ আন্তনগর ও দুটি বিশেষ মেইল ট্রেন চালু করা হবে। এই ট্রেনগুলোর টিকিট বিক্রি শুরু হবে ১১ সেপ্টেম্বর থেকে। একটি আন্তনগর বিশেষ ট্রেন ঢাকার সেনানিবাস স্টেশন থেকে রাজশাহী যাবে। অপরটি চলাচল করবে জয়দেবপুর থেকে সান্তাহার পর্যন্ত। দুটি মেইল ট্রেন চলবে ঢাকার কমলাপুর-ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ রুটে। কমলাপুর ও সেনানিবাস থেকে যে বিশেষ ট্রেনগুলো ছেড়ে যাবে, সেগুলোর টিকিট কমলাপুর, বিমানবন্দর ও জয়দেবপুরে পাওয়া যাবে। জয়দেবপুর-সান্তাহার রুটের জন্য নির্ধারিত ট্রেনের টিকিট বিক্রি হবে শুধু জয়দেবপুর থেকে।
রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মিয়াজাহান প্রথম আলোকে বলেন, তুলনামূলকভাবে এবার টিকিট বিক্রি কম। অনেক টিকিট অবিক্রীত রয়ে গেছে। অবিক্রীত টিকিট যাত্রার আগমুহূর্ত পর্যন্ত বিক্রি করা হবে।

মহাকাশ স্টেশনে শব্দ-গন্ধের অভিজ্ঞতায় অভিভূত নভোচারীরা

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) প্রথমবার ভ্রমণে যাওয়া একজন নভোচারীর কাছে সেখানকার খাবার, সেখানে খেয়াযান চালু হওয়ার শব্দ, বাতাসের গন্ধ সবকিছুই চমকপ্রদ মনে হয়েছে। এ যেন এক মহাজাগতিক অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি খেয়াযান ডিসকভারিতে চড়ে আইএসএসে প্রথমবার পদার্পণকারী নভোচারীরা এমন অভিজ্ঞতার কথাই জানালেন। গত সপ্তাহে ডিসকভারিতে করে সাতজন নভোচারী আইএসএসে যান। তাঁদের মধ্যে তিনজনের এটা প্রথম মহাকাশ অভিযান ।
ডিসকভারির পাইলট কেভিন ফোর্ডের প্রথম মহাকাশ অভিযান এটি। অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে গত শুক্রবার আইএসএস থেকে তিনি বললেন, ‘আমি যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে খুবই খুবই আলাদা এখানকার (আইএসএস) পরিবেশ। বিশেষ করে মহাকাশে হাঁটাহাঁটি শেষে নভোচারীরা আইএসএসে ফিরলে যে গন্ধটা পাওয়া যায় তা খুবই অদ্ভুত। এমন গন্ধ আমি আগে কখনোই পাইনি। তবে এই গন্ধ কখনো ভুলবও না।’ অতীতে নভোচারীরা মহাশূন্যের ওই গন্ধ সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে একে ওজোন গ্যাস বা বারুদের গন্ধের সঙ্গে তুলনা করেন।
ফোর্ড জানালেন, মহাকাশ স্টেশনে শব্দও ভিন্ন মাত্রায় শোনা যায়। ডিসকভারির ইঞ্জিন যখন চালু হয়, তখন পৃথিবীর তুলনায় তা অনেক জোরে শোনা যায় সেখানে। আইএসএসের খাবারকে অসাধারণ উল্লেখ করে প্রথমবার মহাকাশ অভিযানে আসা আরেক নভোচারী নিকোল স্কট বলেন, ‘এখানে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও ইউরোপের খাবার পাওয়া যায়। সবার জন্যই কিছু না কিছু পাবেন আপনি।’
মহাকাশ স্টেশনের বর্তমান অবস্থা জানাতে গিয়ে মহাকাশ যাত্রায় অভিজ্ঞ ডিসকভারির কমান্ডার রিক স্টুরকো বললেন, ‘গত ফ্লাইটে এসে যেসব কাজ বাকি দেখে গিয়েছিলাম, তার সবই করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনটি নিয়ে এর অংশীদাররা গর্ববোধ করতে পারেন।’ এ নিয়ে চতুর্থবার আইএসএসে এলেন তিনি। এই অভিযানে ডিসকভারির ১৩ দিন আইএসএসে অবস্থান করার কথা।

ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ অস্বীকার চীন সরকারের

ভারতের লাদাখ সীমান্তে চীনের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করেছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে চীনা সরকার। গতকাল সোমবার সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘সীমানা লঙ্ঘনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। চীনা সামরিক বাহিনী কখনোই ভারতে অনুপ্রবেশ করেনি। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানে আগ্রহী আমরা।’
গত রোববার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম খবর প্রচার করে যে চীনা সামরিক বাহিনী ভারতের দেড় কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং তারা সেখানকার পাথর ও বোল্ডারে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করেছে। সেখানে চীনা ভাষায় ‘চীন’ শব্দটি লেখা ছিল। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে চীনের সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশের ব্যাপারে জানতে পারে।
এ ব্যাপারে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, (সরকারের পক্ষ থেকে) বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কারণ সহযোগিতা বিনিময় কার্যক্রমের আওতায় তিনজন ভারতীয় জেনারেল বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন।

আফগানিস্তান নিয়ে জার্মানি ও ব্রিটেনের সম্মেলনের ডাক

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল বলেছেন, আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় যদি কোনো বেসামরিক লোক নিহত হয়ে থাকে, তাহলে তিনি গভীরভাবে দুঃখিত। এদিকে আফগানিস্তান নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছে জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্স।
বার্লিনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মারকেল বলেন, ‘যদি সেখানে কোনো বেসামরিক লোক নিহত হয়ে থাকে, তাহলে আমি গভীরভাবে দুঃখিত।’ উত্তরাঞ্চলীয় কুন্দুজ প্রদেশে চালানো ওই বিমান হামলার দ্রুত, সম্পূর্ণ ও খোলামেলা তদন্তের আহ্বান জানান তিনি।
কুন্দুজ প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ ওমর জানান, ওই বিমান হামলায় নিহত হয়েছে ৫৪ জন। তাদের মধ্যে একটি শিশুসহ ছয়জন বেসামরিক লোক ছিল।
জার্মান চ্যান্সেলর মারকেল ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্রাউন এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, আফগানিস্তানের ওপর এ বছরের মধ্যে বড় ধরনের সম্মেলন হওয়া উচিত। বার্লিনের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির সঙ্গে যৌথভাবে তাঁরা এই সম্মেলনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে কথা হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ‘ক্ষমতার উত্তরণের আসন্ন এই সময়ে আফগান সরকারকে আরও বেশি দায়দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করার পরিকল্পনা করছি আমরা। আমরা তাদের প্রশিক্ষণ ও বেসামরিক পুনর্গঠন কর্মসূচিতে সহায়তা করব। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা-কাঠামো সুদৃঢ় করাও আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে আমাদের চূড়ান্তভাবে এগোতে হবে। আর আফগানরা যত বেশি নিরাপত্তার দায়দায়িত্ব নেবে, আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি ততই কমবে।’
গর্ডন ব্রাউন অবশ্য আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা কমানোর কোনো উল্লেখ করেননি। এ ব্যাপারে কোনো সময়সীমা উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মারকেল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্রাউন বলেন, সম্মেলনে আফগান সরকার, জাতিসংঘ, ন্যাটো ও আফগানিস্তানে ন্যাটো মিশনে অবদান রাখা গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সম্মিলন ঘটবে।
ব্রাউন বলেন, নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী আট বছরে আফগানিস্তানের অর্জন অনেক। এখন নিজেদের দায়দায়িত্ব গ্রহণে আফগান জনগণকে কীভাবে আরও সম্পৃক্ত করা যায়, সেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্মেলনে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া হবে। সম্মেলনের স্থান এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

ইরানের ‘অনস্বীকার্য’ পরমাণু অধিকার নিয়ে আলোচনা নয়: আহমাদিনেজাদ

ইরানের ‘অনস্বীকার্য’ পারমাণবিক অধিকার নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি বলেন, পরমাণু ইস্যুতে যেকোনো সংলাপের আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকতে হবে ‘পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে সহযোগিতা’ এবং ‘পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ’।
জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) সপ্তাহব্যাপী বৈঠক শুরুর আগে ইরানি প্রেসিডেন্ট এ মন্তব্য করলেন। ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকে আলোচনার শীর্ষে থাকছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি।
গতকাল সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘ইরানের অনস্বীকার্য অধিকার নিয়ে আমরা কোনো আলোচনা করব না।’
বিশ্বশক্তির সঙ্গে আলোচনার জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে ইরান। ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দেশটির সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে প্রভাবশালী দেশগুলো। আলোচনা ব্যর্থ হলে তেহরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে তারা। ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আলোচনা শুরুর জন্য তাদের অনুরোধের জবাবে আমাদের এই প্রস্তাব।’
আহমাদিনেজাদ বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ‘ন্যায্য ও যৌক্তিক’ আলোচনার জন্য ইরান প্রস্তুত। গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে বৈঠকের ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন তিনি।
চলতি মাসের শেষের দিকে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ সভায় যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন আহমাদিনেজাদ।
ইরানের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’ ও কোনো দেশের ‘অধিকারের স্বীকৃতি’ দিতে ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
পশ্চিমা শক্তি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সন্দেহ, তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ইরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ।

ইরানে দৈনিক ২০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করবে ভেনেজুয়েলা

জ্বালানিসংকটে পড়া ইরানের কাছে প্রতিদিন ২০ হাজার ব্যারেল করে তেল বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেনেজুয়েলা। ইরানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ তাঁর দুই দিনের সফরের সময় এ ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। গত রোববার শাভেজ তাঁর সফরের শেষ দিন ইরান ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। খবর এএফপির।
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাসহাদ সফরকালে শাভেজ বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার ব্যারেল পেট্রল ইরানে রপ্তানির ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অক্টোবর মাস থেকেই ৮০ কোটি ডলারের ওই চুক্তি কার্যকর হবে।’ চুক্তির মেয়াদ সম্পর্কে অবশ্য শাভেজ কোনো ইঙ্গিত দেননি। ওষুধ ও অন্যান্য বাণিজ্যের বিষয়ও ওই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তেলসমৃদ্ধ ইরানের তেল শোধনাগারের সংকট রয়েছে। এ কারণে তারা পেট্রলের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এভাবে তারা প্রায় ৪০ শতাংশ পেট্রলের চাহিদা পূরণ করে।
মাসহাদ সফরকালে শাভেজের সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। সেখানে আহমাদিনেজাদ বলেছেন, ‘লাতিন আমেরিকায় মার্কিন নীতির পরাজয় ঘটবে। আমি বিশ্বাস করি, সেখানে রাজনৈতিক ও দর্শনতাত্ত্বিক একটি বিপ্লব চলছে। বিভিন্ন দেশ জেগে উঠছে। এ অবস্থায় হুমকি দিয়ে দাবিয়ে রাখার মার্কিন সামরিক নীতির নিশ্চিত পরাজয় ঘটবে। এ কারণে তাদের হুমকি বন্ধ করতে হবে।’

বাসমতী চালের ভাত খেতে চান কাসাব

মুম্বাই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার পাকিস্তানি জঙ্গি আজমল কাসাব এবার কারাগারে বাসমতী চালের ভাত খেতে চেয়েছেন। সঙ্গে কড়া ঝালের তরকারি। কারাগার কর্তৃপক্ষ এ কথা জানিয়েছে।
আর্থার রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক রাজেন্দ্র ধামনি গতকাল সোমবার জানান, কাসাব গত সপ্তাহে বাসমতী চালের ভাত খেতে চান। এর আগে তিনি খাসির বিরিয়ানি খাওয়ার আবদার করেন। না পেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তাঁর মেজাজ প্রায়ই বিগড়ে যাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে খাবার খেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। আদালতে হাজির হওয়ার আগে পোশাক পরতে দেরি করছেন এবং কারাকর্মীদের সঙ্গে মেজাজ দেখাচ্ছেন। কারা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বিশেষ আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছে।

তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী লিউ পদত্যাগ করেছেন

তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী লিউ চাও-শিউয়ান গতকাল সোমবার পদত্যাগ করেছেন। গত মাসে দেশে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী টাইফুনের বিপর্যয় সামলাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে—এমন সমালোচনার মুখে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। গতকালই দেশটির প্রেসিডেন্ট নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাসীন দল কুমিনতাং পার্টির সাধারণ সম্পাদক উ ডেন-ইয়াহর নাম ঘোষণা করেছেন। এএফপি।
তাইপেতে এক সংবাদ সম্মেলনে লিউ চাও-শিউয়ান বলেন, টাইফুনে সাত শরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ওই ঘটনায় দুর্গত লোকজনকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ ব্যাপারে এখন কাউকে না কাউকে রাজনৈতিক দায় তো নিতেই হবে।
গত মাসের শুরুর দিকে মোরাকট নামের ওই টাইফুন আঘাত হানে। ৫০ বছরের মধ্যে ওই টাইফুন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। টাইফুনে দুর্গত মানুষকে রক্ষার ব্যর্থতা নিয়ে সরকারের সমালোচনা হচ্ছিল। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী লিউ পদত্যাগ করলেন।

আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে চান কাকাও

শুধু আর্জেন্টাইন বা আর্জেন্টিনারই নয়, বিশ্বজুড়ে নিখাদ ফুটবল-ভক্তদের মনের কথাটিই যেন শোনা গেল ব্রাজিলীয় মহাতারকা কাকার কণ্ঠে। রিয়াল মাদ্রিদ প্লে-মেকার মনে করেন ফুটবলের স্বার্থেই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া উচিত, ‘আর্জেন্টিনাবিহীন বিশ্বকাপ কখনোই ভালো হতে পারে না।’
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ব্রাজিলকে ৩-১ গোলে জেতানোয় বড় ভূমিকা আছে কাকার। লুইস ফ্যাবিয়ানোর দুটি গোলেরই উত্স ছিলেন তিনি। এই জয়ে ব্রাজিলের দক্ষিণ আফ্রিকা-যাত্রা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৭০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে সুযোগ না পাওয়ার শঙ্কায় পড়ে গেছে আর্জেন্টিনা। তবে কাকা বলেছেন, তিনি মনে-প্রাণেই চান আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে আসুক, ‘আমরা আমাদের কাজ করেছি এবং কোয়ালিফাই করেছি। তাদের হারাতে পেরে ভালোই লাগছে, কিন্তু সত্যিই বলছি, তারা (বিশ্বকাপে) থাকলে আমি আরও খুশি হব। বিশ্বের সেরা দলগুলোরই বিশ্বকাপে খেলা উচিত।’
কাকা সত্যি সত্যিই বলুন আর সহানুভূতি থেকে, আর্জেন্টাইনদের ক্ষতে প্রলেপ পড়ছে না সহজেই। কোনো কিছুতেই সান্ত্বনা পাচ্ছে না তারা। দল দাঁড়িয়ে খাদের কিনারায়, তাই আর্জেন্টিনায় ‘ঈশ্বর-তুল্য’ ডিয়েগো ম্যারাডোনার ভূমিকাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ম্যারাডোনা নিজেও হারের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, ‘পরাজয়ের দায়ভার আমার, শুধুই আমার।’ তবে এতেও ক্ষোভ কমছে না আর্জেন্টাইনদের। ম্যারাডোনার প্রাণের ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের সাবেক ফুটবলার হোসে সানফিলিপো সরাসরিই বলেছেন রাস্তা মাপার সময় হয়েছে ‘এল পেলুসা’র, ‘ম্যারাডোনা কিছুই জানে না, সে কোনো কাজেরই না। যত দ্রুত সম্ভব তার ব্যাগ গোছানো উচিত। আর্জেন্টিনা এখন একটা ধ্বংসস্তূপ।’
শুধু সানফিলিপোই নন, আর্জেন্টিনার আমজনতার চাওয়াটাও প্রায় একই রকম। স্প্যানিশ ভাষার পত্রিকা এএস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ আর্জেন্টাইন মনে করেন ম্যারাডোনার সরে পড়ার এখনই সময়। শুধু ম্যারাডোনাই নয়, কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁর উত্তরসূরি বিবেচিত লিওনেল মেসিকেও। আগামী পরশু যাদের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার আরেকটি মরণপণ লড়াই, সেই প্যারাগুয়ের সাবেক অধিনায়ক ও খ্যাপাটে গোলরক্ষক হোসে লুই চিলাভার্টের কথা, মেসি-জাদু শুধু ক্লাব ফুটবলেই সীমাবদ্ধ, ‘আর্জেন্টিনা এখনো তাদের সেরা দলটা খুঁজে পায়নি। মেসি ইউরোপে হয়তো ঈশ্বর, কিন্তু এখানে সে কিছুই করতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ছাড়লেন পন্টিং

টেস্ট-ওয়ানডে দুই ধরনের ক্রিকেটেই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। ২২ হাজারেরও বেশি আন্তর্জাতিক রান, ৬৪টি সেঞ্চুরি—এমন উজ্জ্বল ক্যারিয়ারেও কলঙ্ক হয়ে আছে তাঁর নেতৃত্বেই দুটি অ্যাশেজ হার। এই কলঙ্ক ঘোচাতেই কি না, অ্যাশেজ শেষেই ২০১৩ সালেও ইংল্যান্ডে আরেকটি অ্যাশেজ খেলার কথা বলেছেন রিকি পন্টিং। অ্যাশেজ হারের দিন পনেরো পর দিলেন আরেক ঘোষণা এবং সেটাও টেস্ট ও ওয়ানডে ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে। আর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলবেন না অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক।
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততর সংস্করণ থেকে অবসরের ঘোষণাটা হলো এ রকম, ‘অনেক চিন্তাভাবনা এবং সতর্ক বিবেচনার পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত আমি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে জানিয়েছি।’ কারণটাও জানিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক, ‘আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলীয় দলের হয়ে আমার টেস্ট ও ওয়ানডে ক্যারিয়ারকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ করে দেবে।’
হঠাত্ করেই যে পন্টিংয়ের এই সিদ্ধান্ত, সেটা নয়। অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক মনে করিয়ে দিলেন, ‘লন্ডনে (অ্যাশেজ সিরিজের) পঞ্চম টেস্ট শেষে আমি যেমন বলেছিলাম, যতটা সম্ভব আমি আমার টেস্ট ক্যারিয়ারটাকে দীর্ঘায়িত করতে চাই। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়ায় সে সুযোগটা পাব আমি। এখন আমি বিশ্রামের সময় পাব, যা আমার খুব কাজে দেবে।’
অ্যাশেজ সিরিজে পরাজয়ের পর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি, ‘গত ১০-১২ দিন আমি অনেক ভেবেছি, অ্যাশেজ নিয়ে, ক্যারিয়ারের ভবিষ্যত্ নিয়ে।’
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ছাড়লেও অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে তাসমানিয়া এবং ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলে যাবেন পন্টিং।
২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি শুরু হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেললেও পন্টিং খেলেছেন ১৭টি। প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৫৫ বলে হার না-মানা ৯৮ রানের ইনিংস খেললেও ক্রিকেটের এই ফরম্যাটে পন্টিং তাঁর সেরাটা দেখাতে পেরেছেন, এমনটা বলা যায় না। ১৭ ম্যাচে ২৮.৬৪ গড়ে করেছেন ৪০১ রান। টি-টোয়েন্টির বিবেচনায় মোটেও খারাপ নয়, কিন্তু ব্যাটসম্যান পন্টিংয়ের নামের সঙ্গে এটা ঠিক মানায় না। শেষ চারটি টি-টোয়েন্টি তাঁর রান ১, ১, ০, ২৫!

ক্লাইস্টার্সকে ডাকছে ইতিহাস

একটা সময় ছিল যখন জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারতেন না। কোনো ম্যাচ হারলেই তাঁর মনে হতো সবকিছুই বুঝি শেষ। অথচ এখন জয়-পরাজয় খুব বেশি স্পর্শ করে না কিম ক্লাইস্টার্সকে। কোনো ম্যাচে জয়ের চেয়ে বাড়ি ফিরে স্বামী-সন্তানের মুখের হাসি দেখতেই আকুল থাকেন এই বেলজিয়ান। এমন নির্ভার হয়ে খেলার কারণেই হয়তো দুই বছর পর কোনো গ্র্যান্ড স্লামে নেমেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছেন ক্লাইস্টার্স।
চতুর্থ রাউন্ডে বিপুল জনপ্রিয়, তৃতীয় বাছাই ভেনাস উইলিয়ামসকে স্বাগতিক দর্শকদের সামনেই হারিয়ে দিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী ক্লাইস্টার্স। উত্থান-পতনে ভরা ম্যাচটির স্কোরলাইন ৬-০, ০-৬, ৬-৪। এমন জয়ের পরও ক্লাইস্টার্সের মাথাজুড়ে রয়েছে পরিবার, ‘আগে শুধু জিততেই চাইতাম, কখনো কখনো একটু বেশিই চাইতাম। কিন্তু এখন আমি জানি টেনিসের বাইরেও অন্য জীবন আছে। অনুশীলন বা ম্যাচ শেষে আমি যখন বাড়ি ফিরি, আমি হারলাম কি জিতলাম—আমার স্বামী ও মেয়ের কাছে এর কোনো মূল্য নেই।’ ক্লাইস্টার্সকে হাত ইশারায় ডাকছে ইতিহাস। এই টুর্নামেন্ট জিতলে ইভোন গুলাগং ও মার্গারেট কোর্টের পর তিনিই হবেন গ্র্যান্ড স্লাম বিজয়ী একমাত্র ‘মা’।
ইতিহাস গড়ার হাতছানি আছে ক্লাইস্টার্সের কোয়ার্টার ফাইনাল প্রতিপক্ষ লি নার সামনেও। তৃতীয় চীনা খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্লামের শেষ আটে উঠেছেন তিনি, ক্লাইস্টার্সকে হারাতে পারলে দ্বিতীয় চীনা হিসেবে পাবেন শেষ চারে ওঠার স্বাদ। একের পর এক ফেবারিটদের বিদায়ী মিছিলের পাশেও অবশ্য এগিয়ে চলেছে সেরেনা উইলিয়ামসের জয়রথ। ড্যানিয়েলা হানতুচোভাকে মাত্র ৬৪ মিনিটে ৬-০, ৬-২ গেমে উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছেন দ্বিতীয় বাছাই। এ বছর সেরেনার গ্র্যান্ড স্লাম রেকর্ড ২২-১, একমাত্র পরাজয়টি ফ্রেঞ্চ ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে সভেত্লনা কুজনেতসভার কাছে। সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সেরেনা মুখোমুখি ইতালির ফ্লাভিয়া পেনেত্তার। দশম বাছাই পেনেত্তার কাছে হেরে এবারের টুর্নামেন্টে রুশ দুঃস্বপ্নের ধারায় যোগ হয়েছে সপ্তম বাছাই ভেরা জভোনারেভার নাম।
পুরুষদের বিভাগে অবশ্য অব্যাহত ফেবারিটদের জয়যাত্রা। ক্যারিয়ার-বিনাশী ইনজুরিকে জয় করে কোর্টে ফেরা টেলর ডেন্টকে চতুর্থ রাউন্ডেই থামিয়ে দিয়েছেন দ্বিতীয় বাছাই অ্যান্ডি মারে। সহজ জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছেন তৃতীয় বাছাই রাফায়েল নাদালও। তবে তৃতীয় সেটে পেশির ইনজুরিতে পড়ে ট্রেনারের সাহায্য নেওয়ায় সদ্য ইনজুরি কাটানো এই স্প্যানিয়ার্ডকে নিয়ে আবারও জেগেছে শঙ্কা। তবে ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্লামের চক্র পূরণের আশায় আসা নাদাল এ নিয়ে কোনো মন্তব্যই করতে চাননি, ‘ইনজুরি নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। আমি তিন সেটে জিতেছি, প্রতিদিনই নিজের সেরাটা খেলার চেষ্টা করি।’ মারে-নাদালের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছেন হুয়ান কার্লোস ফেরেরো, জে-উইলফ্রায়েড সোঙ্গা, হুয়ান মার্টিন দেল পোত্রোও।

ব্রাজিলের সঙ্গী হলো ঘানা

আগের দিন দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করল আসল ব্রাজিল। আর পরদিনই দক্ষিণ আফ্রিকার টিকিট হাতে তুলল ‘আফ্রিকার ব্রাজিল’ খ্যাত ঘানা। পরশু আক্রায় নিজেদের দর্শকের সামনে সুলে মুনতারি ও মাইকেল এসিয়েনের গোলে সুদানকে হারিয়ে (২-০) নিজেদের কাজটা সেরে রেখেছিল ঘানা। তবে একই দিনে বেনিন ও মালির ম্যাচটা ড্র (১-১) হওয়াতেই বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত হয়েছে তাদের।
ঘানা কোচ মিলোভান রাজেভাচের কথা, আগে বা পরে হোক; এবারের বিশ্বকাপে ঘানা যে খেলবেই এই বিশ্বাসটা তাঁর ছিল। খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপে খেলার তাড়নাই রাজেভাচকে এনে দিয়েছে এই বিশ্বাস, ‘আবার বিশ্বকাপে খেলতে মরিয়া এই দলটি। কী অর্জন করতে পারে, সেটা খেলোয়াড়েরা জানে এবং আরও এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের আছে। বাছাইপর্ব উতরে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়াটা ওদের জন্য অমূল্য সম্মান।’
আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বের শেষ পর্যায়ে পাঁচটি গ্রুপে ভাগ হয়ে ২০টি দল খেলছে। প্রত্যেক গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দলই বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলবে। সে হিসেবে ঘানার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দিদিয়ের দ্রগবার আইভরি কোস্ট অনেকটাই এগিয়ে গেছে। পরশু আবিদজানে বারকিনা ফাসোকে ৫-০ গোলে হারিয়েছে তারা। দুটি করে গোল করেছেন কাদের কেইটা ও দ্রগবা। বাকি গোলটি ইয়াইয়া তোরের। এই জয়ের পর ‘ই’ গ্রুপে ১২ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে আইভরি কোস্ট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বারকিনা ফাসোর পয়েন্ট ৬।

মোহামেডানের হয়ে গেলেন তামিম


এখন পর্যন্ত এগিয়ে থাকল মোহামেডানই। লিগ শুরুর আগেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর চেয়ে মোহামেডানকে এগিয়ে দিলেন তামিম ইকবাল। মোহামেডানের লোভনীয় প্রস্তাবে আবাহনী ছেড়ে জাতীয় দলের এই বাঁহাতি ওপেনার কাল দেড় শ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে হয়ে গেলেন মোহামেডানের। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলসহ মোট ১৪ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে এ রকম চুক্তি হয়েছে বলে দাবি মোহামেডান কর্মকর্তাদের।
আবাহনীর পর ক্রিকেটারদের সঙ্গে মোহামেডানের এ ধরনের চুক্তি দলবদলের ধারণাই পাল্টে দিল এবার। আগে দলবদলের তিন দিন ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে গিয়ে বিভিন্ন দলে নাম লেখাতেন ক্রিকেটাররা। আর এবার দলবদলের এক মাস আগেই ঢাকার ক্রিকেটের দুই পরাশক্তি লিখিত চুক্তি করল ক্রিকেটারদের সঙ্গে। প্রথমে মাশরাফি ও সাকিবের সঙ্গে চুক্তি হলো আবাহনীর। কাল মোহামেডানও গেল সে পথে। এ প্রসঙ্গে মোহামেডানের ক্রিকেট কমিটির প্রধান লুত্ফর রহমানের বক্তব্য পরিষ্কার, ‘আমাদের প্রতিপক্ষরাই (আবাহনী) এই রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। তারা মাশরাফি-সাকিবের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আমরা সেটার কাউন্টার দিলাম।’
তিনি ‘কাউন্টার’ দিয়েছেন আবাহনী কর্মকর্তারা তামিমের যে সমালোচনা করেছেন সেটারও, ‘আমার সঙ্গে তামিমের অনেক আগে থেকেই কথাবার্তা চলছিল। পত্রিকায় ওর সম্পর্কে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে, যেটা খুবই দুঃখজনক। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। মৌখিকভাবে অনেক রকম কথাই হতে পারে। কিন্তু তার তো কারও সঙ্গে লিখিত চুক্তি হয়নি।’
তামিমও আরও একবার ব্যাখ্যা করেছেন প্রতিশ্রুতি দিয়েও আবাহনীতে না যাওয়ার কারণ, ‘এ জিনিসটা আমি গত বছর মোহামেডানের সঙ্গেও করেছিলাম। মোহামেডানের সঙ্গে কথা বলার পর একটা ভালো প্রস্তাব আসে। আমি এটা তাদের জানিয়ে সেবার অন্য দলে খেলি। একই ব্যাপার এবারও হয়েছে। মোহামেডানের প্রস্তাব পাওয়ার পর আমি আবাহনীকে জানাই, আমার ১৮ লাখ টাকার একটা প্রস্তাব আছে। এর পর আবাহনীর কাছ থেকে যে উত্তর পেয়েছি, সেটা না বলাই ভালো। ওখানে খেলার ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায় এর পরই। পরে মোহামেডানকে আমি আমার দাবি জানাই। ওনারা আমাকে ২০ লাখ টাকায় নিতে রাজি হয়েছে।’ আবাহনী ছেড়ে আসাটাকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গও বলতে রাজি নন তামিম, ‘যতক্ষণ আমি সাইন করব না, টাকা নেব না, ততক্ষণ তো আসলে কোনোটাই প্রতিশ্রুতি না। আমি যখন একটা বড় প্রস্তাব পাব আমার তো এক শ ভাগ অধিকার আছে সেটা নিয়ে কথা বলার। মুখে কথা দেওয়ার পর আমার আর কোনো অধিকার থাকবে না, এটা তো ঠিক না।’ তামিম বলেছেন, তার মোহামেডানে যাওয়ার আরেকটা কারণ, এ বছর বড় ভাই নাফিস ইকবালেরও একই দলে খেলা, ‘যখন ভাইয়ের সঙ্গে একই দলে খেলার প্রস্তাব পেলাম, আমার জন্য সবচেয়ে বড় জিনিস ছিল এটাই। এর আগে বিমানে দুজন একসঙ্গে খেললেও একসঙ্গে ওপেন করিনি। এবারই প্রথম হবে সেটা।’
তামিম, আশরাফুল, নাফিস ছাড়াও আর যাঁদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে মোহামেডান; তাঁদের মধ্যে আছেন খালেদ মাসুদ, আফতাব আহমেদ, শামসুর রহমান, মাহমুদউল্লাহ, ফয়সাল হোসেন ও নাবিল সামাদ। বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে এবার শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার ফারভিজ মাহারুফকে শুরু থেকেই খেলানোর ইচ্ছা মোহামেডানের।
তামিমের আগেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আশরাফুলের মোহামেডানে খেলা। কাল সেই আশরাফুলকেও আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের বলে ঘোষণা করল মোহামেডান। আশরাফুলও এতে খুব খুশি, ‘ছোটবেলা থেকে আমি মোহামেডানের সমর্থক। আগে এক বছর মোহামেডানে খেললেও এবারের দলটা অনেক ব্যালান্সড। আমি মনে করি, কাগজে-কলমে মোহামেডানই এক নম্বর দল। আশা করব, এবার আমরা টি-টোয়েন্টি এবং লিগ দুটিরই শিরোপা জিতব।’
আশরাফুলকে মোহামেডান ঠিক কত টাকা দিচ্ছে, সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। আশরাফুল এবং মোহামেডানের ক্রিকেট কমিটির প্রধান কেউই অবশ্য পারিশ্রমিকটাকে ‘টাকা’ বলছেন না, বলছেন ‘আর্থিক সুবিধা’ এবং সেটা নাকি প্রায় ২৫ লাখ টাকার। সে হিসাবে আশরাফুলই কি তাহলে এবার সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া ক্রিকেটার?