Monday, July 6, 2026

খামেনির শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে কী বার্তা দিচ্ছে ইরান

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে সরকারপন্থী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বার্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে।

সুচিন্তিত বক্তব্য, পরিকল্পিত কর্মসূচি এবং সংগঠিত জনসমাবেশের মাধ্যমে তেহরান এমন একটি বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যেন ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানি সরকারের সমর্থকদের মধ্যে ঐক্যের চিত্র ফুটে উঠছে।

তেহরানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের মধ্য দিয়ে খামেনির শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। শোকযাত্রার মধ্য দিয়ে তাঁর মরদেহ ইরানের বিভিন্ন শহরে নেওয়া হবে। ইরাকের বিভিন্ন শহরেও হবে শোকযাত্রা। এই শোকযাত্রার প্রতিটি ধাপে খামেনির জীবন, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং সামগ্রিকভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের নানা প্রতীকী দিককে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হবে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে তিনি নিহত হন। এরপর গত মার্চ মাসে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ইরানে সরকারিভাবে দেওয়া বার্তাগুলোতে খামেনির মৃত্যুকে ‘শাহাদাত’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

শেষবিদায়ের আয়োজনের আনুষ্ঠানিক স্লোগান ‘আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে’। ইরানের বিভিন্ন স্থানে টানানো ব্যানার এবং শোকহত মানুষের বহন করা পোস্টারে এ স্লোগান দেখা যাচ্ছে।

খামেনির মুষ্টিবদ্ধ হাত

মুষ্টিবদ্ধ হাতের একটি প্রতীকী চিত্র খামেনির শেষকৃত্যের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে ইরানের সরকারি প্রচারে এই প্রতীক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত একটি খুদে বার্তা থেকে অনুপ্রাণিত বলে জানানো হচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি এবং তাঁর কোনো প্রকাশ্য বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে হত্যার কিছুদিন আগে গত ১২ মার্চ ওই খুদে বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় হত্যাচেষ্টার সময় স্প্লিন্টারের গুরুতর আঘাত ও দগ্ধ হওয়ার কারণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁর ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারিয়েছিলেন। মোজতবা নাকি শুনেছেন, ওই সময় খামেনির সুস্থ হাতের মুষ্টি শক্ত করে বন্ধ ছিল।

নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা এড়ানোর জন্য মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিগুলোতে প্রকাশ্যে অংশ নেবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

শেষবিদায়–সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে বিভিন্ন সাজসজ্জা ও প্রচারে কালো ও লাল রঙের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুই রঙের মাধ্যমে শোক, শাহাদাত এবং প্রতিশোধের আহ্বান—এই তিন বার্তা একসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।

গতকাল রোববার বিকেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, ‘নিজেদের নেতাকে শেষবিদায় জানাতে এবং তাঁর শোকযাত্রায় অংশ নিতে সমবেত এই জনসমুদ্র দুটি স্লোগান উচ্চারণ করছে—শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ইরানের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।’

আজ সোমবার তেহরানে মূল শোকযাত্রা শুরুর আগে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন ও রাষ্ট্রীয় প্রার্থনার জন্য গত শনিবার ও গতকাল রোববার খামেনির মরদেহ রাজধানীর বৃহত্তম ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে রাখা হয়। সেখানে একটি বিশাল লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

পতাকাটিতে আরবি ভাষায় লেখা হয়, ‘হে, হুসেনের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’, এই স্লোগানের মাধ্যমে খামেনির হত্যাকাণ্ডকে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের কারবালার ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর আগে সেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর দৌহিত্র ইমাম হুসেনকে প্রথম উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া প্রতিষ্ঠিত বাহিনীর হাতে নিহত হতে হয়েছিল। বহু শিয়া মুসলিমের কাছে উমাইয়া রাজবংশের শাসন অবৈধ ও নিপীড়নমূলক শাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

খামেনির শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় বিভিন্ন প্রতীকী বার্তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ কীভাবে সেই প্রতিশোধ নিতে চায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানি সেনাবাহিনী ইরাকে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। তবে ওই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হয়নি। এরপরও ইরান বলেছিল, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীকে পুরোপুরি বিতাড়িত করাটাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশোধের কৌশল।

শিয়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক মানচিত্র

খামেনির মরদেহ বহনের জন্য যে পথ বেছে নেওয়া হয়েছে, সেটিও একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বার্তা বহন করছে। এই পথ তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র শহর কোম থেকে শুরু হয়ে ইরাকে শিয়াদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নাজাফ ও কারবালা অতিক্রম করবে। এরপর তাঁকে সমাহিত করা হবে মাশহাদে, ইমাম রেজার মাজারে।

শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ থেকে। এই মসজিদ ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনিকে সম্মান জানাতে নির্মাণ করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার মধ্যে একটি প্রতীকী ধারাবাহিকতা ও সংযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কোম শহরটি ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বৈধতা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমর্থনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রগুলোই ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। খোমেনির সমর্থনে পাহলভি রাজবংশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদও এই শহর থেকেই শুরু হয়েছিল। ওই আন্দোলন এক বছর পর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে রূপ নেয়।

ইরাকের নাজাফ ইরানের বাইরে শিয়া মুসলিমদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্র। এই শহরের সঙ্গে শিয়া সম্প্রদায়ের ১২ ইমামের প্রথম ইমাম হজরত আলী (রা.)-এর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক আছে। তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করেই নাজাফ শহরের বিকাশ ঘটেছে। বর্তমানে এটি শিয়া মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

কারবালা ও মাশহাদে শোকযাত্রা শেষে খামেনির মরদেহ এমন এক প্রতীকী সফর সম্পন্ন করবে, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আদর্শিক ভিত্তি এবং শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান প্রধান কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ দশক ধরে সীমান্ত ছাড়িয়ে শিয়া সম্প্রদায়ের আদর্শ ও প্রভাব বিস্তারে ইরানি ধর্মীয় নেতৃত্ব যে প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে, এই শোকযাত্রা সেই আদর্শিক ধারাকেই প্রতীকীভাবে তুলে ধরছে।

ইরাকের নাজাফ হলো ইরানের বাইরে শিয়া মুসলিমদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। শিয়া মুসলিমদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে বিবেচিত ১২ ইমামের মধ্যে প্রথম ইমাম হজরত আলী (রা.)-এর সঙ্গে এই শহরের গভীর সম্পর্ক আছে। তাঁর মাজারকে ঘিরেই নাজাফ নগরীর বিকাশ হয়েছে। বর্তমানে এটি শিয়া মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

কারবালা ও মাশহাদে শোকযাত্রার মধ্য দিয়ে খামেনির মরদেহ এমন একটি প্রতীকী সফর শেষ করবে, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আদর্শিক ভিত্তি এবং শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ দশক ধরে জাতীয় সীমানার বাইরে শিয়া ইসলামের আদর্শ ও প্রভাব বিস্তারে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব যে প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে, এই শোকযাত্রা সেই আদর্শিক ধারারই প্রতীক।

গত শুক্রবার খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এবং ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।

খামেনির কফিনের সামনে উপস্থিত প্রতিটি বিদেশি প্রতিনিধিদলের জন্য সরকার-নির্ধারিত একজন পবিত্র কোরআনের একটি করে নির্দিষ্ট আয়াত তিলাওয়াত করেন। এরপর তাঁরা ইরানের নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

হামাস, হিজবুল্লাহ এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোতে অঙ্গীকারের প্রতি আনুগত্য, অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার বার্তা তুলে ধরা হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানকে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ইসলামাবাদ যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে।

রিয়াদ থেকে আসা প্রতিনিধিদলের জন্য নির্বাচিত একটি কোরআনের আয়াত নিয়ে আরবি ভাষার গণমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচনা হয়েছে। ওই আয়াতে বর্তমান সৌদি আরবের মদিনার কাছে সপ্তম শতকে সংঘটিত বদরের যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়া মুসলিম ও কাফিরদের দুই পক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়াতটির অর্থ হলো: ‘মুমিনেরা নিজেদের চোখে দেখেছিলেন, তাঁদের শত্রুদের সংখ্যা তাঁদের তুলনায় দ্বিগুণ। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাঁকে সাহায্যের মাধ্যমে বিজয় দান করেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।’

এই নির্দিষ্ট আয়াত বেছে নেওয়ার বিষয়টিকে বিশ্লেষকেরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি (বাঁয়ে), প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (মাঝখানে) এবং তাঁর ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি-সংবলিত একটি বিলবোর্ড
ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি (বাঁয়ে), প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (মাঝখানে) এবং তাঁর ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি-সংবলিত একটি বিলবোর্ড। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

খামেনির জানাজায় শত্রুদের প্রতিরোধ আর ট্রাম্পকে হত্যার ডাক

দ্য গার্ডিয়ানঃ ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ডাক দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার তেহরানের একটি জনাকীর্ণ প্রার্থনা অনুষ্ঠানে খামেনির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই স্লোগান তোলা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। যুদ্ধের কারণে এত দিন খামেনির দাফনপ্রক্রিয়া স্থগিত ছিল। এখন ইরানজুড়ে তাঁর সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলছে।

তেহরানের বৃহত্তম মসজিদ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাবেক এই সর্বোচ্চ নেতার জানাজাকে কেন্দ্র করে এক রাজনৈতিক আবহের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে শোকের পাশাপাশি প্রতিশোধের দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। বহু মানুষ আগের রাতেই গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অবস্থান নেন।

অনেকেই সকাল আটটায় জানাজা শুরুর বেশ আগে থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা ছিল।

গত শনিবারের তুলনায় গতকাল মানুষের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। উপস্থিত জনতা ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। ইরান যে এখনো অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী এবং নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—বিশ্বদরবারে তা প্রমাণ করতেই এই বিশাল জানাজার আয়োজন করা হয়েছে।

জানাজা শুরুর ঠিক আগে কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে কবি মোহাম্মদ রাসুলি বলেন, ‘এখন থেকে কাফনের কাপড়ই আমাদের পোশাক। আপনার রক্তের কসম, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব।’

মোহাম্মদ রাসুলি আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত মানুষটি এখনো কেন বেঁচে আছেন? ট্রাম্পের জন্য পৃথিবী আর নিরাপদ জায়গা নয়। যে ব্যক্তি আমাদের ইমামকে হত্যা করেছেন, আমরা কেন তাঁকে হত্যা করব না? তা না করা আমাদের জন্য কলঙ্কের।’ তাঁর এই পরিকল্পিত ও সরকার অনুমোদিত বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে অধিকাংশ মানুষই তুমুল করতালির মাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আপনি মানুষকে হত্যা করতে পারবেন, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়। আপনারা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছেন সত্যি, তবে প্রকৃতপক্ষে আপনারা একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙেছেন, যার সুবাস এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।’

খলিল শিরঘোলামি আরও বলেন, ‘আপনাদের কোনো সভ্যতা নেই, ইতিহাস নেই, কোনো সম্মান নেই। তাই আপনারা কখনোই এটি উপলব্ধি করতে পারবেন না।’

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর বলেন, ‘জনগণ তাঁদের নেতাকে বিদায় জানাতে দুটি স্লোগান দিচ্ছেন—শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ইরানের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।’

মূল জানাজা পড়ান কোম শহরের ৯৭ বছর বয়সী প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। এই অনুষ্ঠানে শুধু খামেনি নন, তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যেরও জানাজা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানি। ছোট্ট নাতনির কফিনটি ছিল পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্যগুলোর একটি।

বাবার মৃত্যুর পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে না আসাটা গতকাল আরও বেশি নজরে পড়েছে। জানাজায় অন্য তিন ভাই উপস্থিত থাকলেও মোজতবা খামেনিকে দেখা যায়নি।

বাবার মৃত্যুর ১০ দিন পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন মোজতবা। তবে তিন মাস ধরে তিনি জনসমক্ষে আসেননি, কোনো অডিও বার্তাও দেননি। এমনকি গত বৃহস্পতিবার নিজের স্ত্রীর জানাজায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর অন্য তিন ভাই মুস্তফা, মাসুদ ও মেসাম বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

জানাজায় ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানি কর্মকর্তারা হয়তো যুদ্ধবিরতির কারণে আশ্বস্ত ছিলেন, এই অনুষ্ঠানে কোনো হামলা হবে না।

আল-কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদিও সবার সামনে উপস্থিত ছিলেন। এই দৃশ্য যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোয় কল্পনাও করা যেত না।

তবে কিছু মার্কিন ব্যক্তিত্বের মানসিকতার দিকে লক্ষ করলে মোজতবা খামেনিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষার এই কঠোর সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লরা লুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই জানাজাকে একটি সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন রক্ষণশীল ভাষ্যকার মার্ক লেভিন মন্তব্য করেছেন, এই জানাজাটি ছিল হাতছাড়া হওয়া একটি সুযোগ।

গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদের চারপাশের রাস্তাগুলো মোজতবা খামেনি এবং তাঁর বাবার ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল। পাশাপাশি আলেমরা বিভিন্ন স্টল বসিয়ে মোজতবার দেওয়া বক্তব্যের সংকলন–সংবলিত বই বিতরণ করছিলেন।

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মোজতবা আহত হয়েছিলেন। তবে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন, ওই হামলায় তাঁর স্থায়ী কোনো অঙ্গহানি ঘটেনি।

কফিনগুলো যে মঞ্চে রাখা ছিল, সেখানে শোকাহত জনতা বিভিন্ন বার্তা লিখে রাখেন। ইংরেজিতে লেখা তেমনই একটি বার্তা ছিল-‘কিল ট্রাম্প’ (ট্রাম্পকে হত্যা করো)।

জানাজায় অংশ নেওয়া বিশাল জনতার অনেকেই ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও লাল পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। বিশাল চত্বরটি বারবার একটি স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছিল—‘কোনো আপস নয়, কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কেবলই প্রতিশোধ।’

প্রায় ৩০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই চত্বরটি ভোরের অনেক আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কিছু পুরুষ সাদা কাফনের কাপড় পরে এসেছিলেন, যা মূলত খামেনির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তুতির প্রতীক।

৪০ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পরও গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদটির বেশ কিছু অংশের কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। মসজিদের বড় একটি অংশ ত্রিপল দিয়ে ঢাকা রয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এর নির্মাণকাজ বারবার পিছিয়ে গেছে। ফলে ভবনটি পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের এক প্রতীকী স্মারকে পরিণত হয়েছে।

জানাজা ঠিক কত মানুষ এসেছিলেন, তার আনুষ্ঠানিক কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথম দিনেই ২০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। সাত দিনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে আজ সোমবার তেহরানে একটি বিশাল শোকমিছিল হবে। এরপর খামেনির মরদেহ পবিত্র নগরী কোমে নেওয়া হবে। সেখান থেকে ইরাকের দুটি পবিত্র শহরে এবং সবশেষে তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শোকাহত জনতাকে কাঁদতে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন, যা ইরানি নেতৃত্বের পক্ষেই গেছে। ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম তারা তাঁকে (খামেনি) ঘৃণা করত।’ তিনি আরও অনুমান করেন, ‘হয়তো এগুলো সাজানো কান্না।’

তবে শোকাহত জনতার এই কান্না ছিল সত্য। ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা ও প্রধান অভিভাবককে হারানোর বেদনায় তাঁরা মূহ্যমান। অনেকেই জানিয়েছেন, অত্যন্ত সীমিত আয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এই শেষবিদায়ে অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন। তাঁরা তেহরানের বিভিন্ন স্কুল বা তেলশিল্প প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় অথবা ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে তৈরি অস্থায়ী ডরমিটরিতে তিন দিন ধরে মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন। বিভিন্ন মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে গভীর রাত পর্যন্ত পথচারীদের তরমুজ, কাবাব এবং ফলের রস বিনা মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

এমনই একজন লায়লা আহমাদি। তিনি বোয়ের-আহমাদ থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমরা লাঠিসোঁটা ও কোদাল দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করব।’

মধ্যরাতের পর তেহরানের রাস্তায় হাজার হাজার শোকাহত মানুষ সমবেত হন। তাঁদের হাতে ছিল খামেনির ছবি–সংবলিত পতাকা ও ব্যানার। তেহরানের প্রধান চত্বরগুলোয় প্রতি রাতেই তীব্র আবেগঘন মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সমাবেশে অংশ নেওয়া ৭০ বছর বয়সী বই অনুবাদক হোসেন দেহঘান বলেন, ‘আমাদের নেতাকে সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যার পর মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও শোক জন্ম নিয়েছে। এই সমাবেশগুলো মূলত পারস্পরিক সংহতি প্রকাশ এবং তথ্য আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম।’

হোসেন দেহঘান আরও বলেন, ‘নেতাকে হারিয়ে দেশের মানুষ এক চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি, পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে একনায়ক বলে ডাকত এবং তিনি সব ইরানির কাছে জনপ্রিয় ছিলেন না ঠিকই, তবে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল।’

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হোসেন দেহঘান বলেন, ‘কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই একটি স্বাধীন দেশের শীর্ষ নেতাকে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আলোচনার মাঝপথে এভাবে যুদ্ধ শুরু করা স্পষ্টতই একধরনের প্রতারণা। এটি প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলের গুরুত্ব কতটা বেশি। তাদের উদ্দেশ্য হয়তো ইরানকে মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করা। কিন্তু এই জাতির দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যখন কোনো দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন আক্রান্ত জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ হয়।’

চলতি বছরের শুরুতে সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া যে গণবিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল, সেটির কথা উল্লেখ করে হোসেন দেহঘান বলেন, ‘গত জানুয়ারিতে যেসব তরুণ বিক্ষোভ করেছিল, তাদের অনেকেই এখন বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সরকার পরিবর্তন করতে চাওয়ার অর্থ হলো আসলে তারা এ দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ চায় না।’

তেহরানের আরেক বাসিন্দা ইব্রাহিম কালিম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘একটি ইসরায়েলি বোমার আঘাত থেকে আমি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমি আজ জীবিত।’

যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইব্রাহিম কালিম বলেন, ‘রাতে মাত্র কয়েক মাইল দূরে ২০টিরও বেশি বোমা পড়ার শব্দ গোনার অভিজ্ঞতা কেমন, তা আপনারা বুঝবেন না। আকাশ দিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখার অনুভূতি একাধারে ভীতিকর ও অপমানজনক।’

ইব্রাহিম আরও বলেন, ‘এই দেশের অনেকেই হয়তো পরিবর্তন চান, তবে তা আমাদের নিজেদের মতো করে হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এই সাধারণ বিষয়টি বোঝে না। নিজের সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ থাকা এবং আক্রান্ত হলে নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা—দুটিই অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মানবিক বিষয়।’

গতকাল রোববার তেহরানে আয়োজিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
গতকাল রোববার তেহরানে আয়োজিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: রয়টার্স

ইসরাইলকে বন্ধুতালিকায় রাখছেন না ট্রাম্প!

ইসরাইলের অনেকের কাছেই এখন অবশ্যম্ভাবী মনে হচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে যাচ্ছেন। ১৯৪৮ সালে বিভিন্ন ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গঠনের পর থেকেই এই মার্কিন জোট তাদের টিকিয়ে রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে আসছে।

বর্তমানে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক বিপজ্জনক খেলায় মেতেছেন। চলমান দুর্নীতি মামলার কারণে তার সম্ভাব্য কারাদণ্ড হতে পারে, আবার চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।

লেবাননসহ ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এখন ওয়াশিংটনের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলি জনগণ চায় এই যুদ্ধ চলুক। এ দুইয়ের টানাপোড়েনে পড়ে নেতানিয়াহু তার চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন।

২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির সময় মার্কিন-ইরান বিরোধের খবর পাওয়া গিয়েছিল। এর এক বছর পর তেহরানের সাথে কীভাবে পথ চলা যায় তা নিয়ে মতভেদের কারণে আমেরিকার সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।

আমেরিকার সঙ্গে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আলোচনায় ইরান একটি প্রধান শর্ত জুড়ে দিয়েছে—দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এই শর্তই মূলত আমেরিকা ও ইসরাইলকে বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গত মাসে একটি ফোনালাপ ফাঁসের খবর পাওয়া যায়, যা হোয়াইট হাউস অস্বীকার করেনি। সেখানে দেখা যায়, ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধ না করায় নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করছেন।

খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন এবং তার প্রতি অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ এনে বলেন, প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপ না থাকলে তিনি এতদিনে জেলেই থাকতেন। ট্রাম্প নাকি নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এসবের কারণে সবাই এখন ইসরাইলকে ঘৃণা করছে।’

গত সপ্তাহে অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন আসল বস কে’—যা দুই নেতার মধ্যকার উত্তপ্ত সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।

জুন মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স ট্রাম্পকে এই মুহূর্তে ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল একমাত্র বিশ্বনেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সাথে তিনি ইসরাইলি মন্ত্রীদের সতর্ক করে বলেন, ‘আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র মার্কিনীদের হাতে তৈরি এবং মার্কিন করদাতাদের টাকায় কেনা।’

সাম্প্রতিক জরিপগুলো দেখাচ্ছে, কেবল সাধারণ মার্কিন জনগণই ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে না, বরং ট্রাম্পের ডানপন্থী পপুলিস্ট ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের একটি বড় অংশের মধ্যেও ইসরাইলকে নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।

ম্যাগা শিবিরের সাবেক কট্টর সমর্থক মার্জোরি টেইলর গ্রিনের মতো নেতারা এখন ইসরাইলকে মার্কিন সহায়তার বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন। ডানপন্থী রাজনীতিতে অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর, সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন জুনের শেষের দিকে বলেন, ট্রাম্প অবশেষে বুঝতে পেরেছেন যে ইসরাইলই তার প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

কার্লসন তার পডকাস্টের শুরুতে অভিযোগ করেন, ইসরাইল ট্রাম্পকে ফুসলিয়ে, বুঝিয়ে ও হুমকি দিয়ে ইরানে হামলা করিয়েছে, যাতে প্রতিবেশী লেবাননের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার উছিলা পাওয়া যায়।

ওয়াশিংটনের 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ'-এর গবেষক ও জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল বাইম্যান আলজাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে ইসরাইলপন্থী দল 'রিপাবলিকান'-এর প্রধান হলেও, ইসরাইলের সাথে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে তার হাতে বেশ কিছু বিকল্প রয়েছে।

বাইম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যথেষ্ট নমনীয়তা রয়েছে। অনেক রিপাবলিকান কট্টর ইসরাইলপন্থী হলেও প্রেসিডেন্টের একটি অত্যন্ত অনুগত কর্মী বাহিনী রয়েছে এবং তিনি দেখিয়েছেন যে দলের বিশাল অংশকে তিনি নিজের মতে আনতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি অনেক ডেমোক্র্যাটকেও পাশে পাবেন, কারণ ডেমোক্র্যাট দলটির ভেতরেও ইসরাইলের প্রতি সমালোচনা দিন দিন বাড়ছে।’

ইতিহাসজুড়ে আমেরিকার কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন ইসরাইলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ইসরাইলের খুব কম মানুষই না বোঝার ভান করতে পারেন। ২০১৬ সাল থেকে ইসরাইল একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, যা আমেরিকার ইতিহাসে অন্য কোনো দেশকে দেওয়া সবচেয়ে বড় অনুদান।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলের নৃশংস যুদ্ধে মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে এ পর্যন্ত অন্তত ৭২,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই ইস্যুতে জাতিসংঘে ইসরাইলের পক্ষে ওয়াশিংটন কম করে হলেও ছয়বার তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা আমেরিকার সাথে দেশের দূরত্ব এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। অথচ, এই কূটনৈতিক সংকটের পেছনে দায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোকে তাদের অধিকাংশই সমর্থন করেছিলেন।

জুনের মাঝামাঝিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ইসরাইলের প্রধান মিত্রকে ধরে রাখতে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘আমরা যদি দ্রুত এই সরকারকে পরিবর্তন করতে না পারি, তবে ইসরাইলের বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।’

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকোট, যিনি এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে বড় দাবিদার, তিনিও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

আইজেনকোট সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু পরিস্থিতি এতটাই খারাপ করেছেন যে ট্রাম্পকে বাধ্য হয়ে ইসরাইলকে ছাড়াই একলা চলার নীতি নিতে হয়েছে এবং ইরানের সাথে চুক্তি করতে হচ্ছে, যা ইসরাইলকে তার এক নম্বর মিত্রের কাছ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিম্রোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ‘বিশ্বের বুকে ইসরাইলের অবস্থানের মূল চাবিকাঠি হলো আমেরিকা। আমেরিকার অবদানই ইসরাইলের জন্য সবকিছু; তারা ইসরাইলকে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক মর্যাদা—সবকিছু দেয়।’

আমেরিকান লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার উল্লেখ করেন, ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ইসরাইলের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন, তবে খুব কম নেতাই এটি এত জনসমক্ষে করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রশাসনের মতো ভাষায় কথা বলেননি, কিংবা ইসরাইলি সমকক্ষদের সাথে আলোচনা এভাবে ফাঁস করেননি, যেখানে তাদের খাটো ও হেয় করা হয়েছে। কংগ্রেস বা সাধারণ জনগণ—রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট ভোটারদের কাছে ইসরাইল এর আগে কখনো এতখানি অজনপ্রিয় ছিল না।’

তবে এই উত্তেজনার পরও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করার কথা ভাবছে।

মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প যদি ইসরাইলের ওপর বড় কোনো চাপ সৃষ্টি করতে চান, তবে তা হতে হবে এমন কোনো বড় সাফল্যের উদ্দেশ্যে, যা তাকে বিশ্বমঞ্চে বীর হিসেবে জাহির করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘লেবানন, গাজা কিংবা ইসরাইল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ—কোনো ইস্যুরই এই মুহূর্তে এমন কোনো বড় সাফল্যের সম্ভাবনা নেই, যা ইসরাইলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্পকে প্ররোচিত করবে।’

ইসরাইলকে বন্ধুতালিকায় রাখছেন না ট্রাম্প!

যে কারণে রাতে খাওয়ার পর থালাবাসন না মেজে ফেলে রাখবেন না by আলিয়া রিফাত

আপনি হয়তো সারা দিন ঘরে–বাইরে কাজ করে ক্লান্ত। রাতে খাওয়ার পর একটু বিশ্রামের জন্য তর সইছে না। এ অবস্থায় খাওয়ার পর বাসনকোসন, হাড়িপাতিল সব মেজে ফেলার কথা চিন্তাও করতে পারছেন না। কিন্তু এই কষ্টটুকু রাতে করে ফেলাই আখেরে আপনার স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। অণুজীববিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা এমনটিই বলছেন।

নোংরা থালাবাসন সিঙ্কে জমিয়ে রাখলে সমস্যা কী

আপনার কিচেন সিঙ্কটি দেখতে কত নিরীহ, তাই না? কিন্তু না, ওই সিঙ্ক আসলে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে যদি আপনি মাছ-মাংস ধোয়ার কাজটি সিঙ্কে করে থাকেন।

‘দ্য জার্ম কোড’ ও ‘দ্য জার্ম ফাইল’ বই দুটির লেখক জেসন টেট্রো আরও জানিয়েছেন, সিঙ্কের জীবাণুগুলোর মধ্যে ই কোলাই, স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস ইত্যাদি বেশি দেখা যায়। ধরুন, আপনি কোনো একটি পাত্রে কাঁচা মুরগি রেখেছিলেন। তারপর সেই পাত্র সিঙ্কে ধুয়ে ফেললেন। এ অবস্থায় সালমোনেলার মতো জীবাণুও আপনার সিঙ্কে থাকতে পারে।

সিঙ্ক এমন বিপজ্জনক হয়ে ওঠার মূল কারণ কী

আমরা যেসব খাবার খাই, সেসবের অধিকাংশে ব্যাকটেরিয়া থাকে। ফলে ধোয়ার সময় সিঙ্কেও ঠাঁই পায়। আর ব্যাকটেরিয়া থাকে বলেই খাবারগুলো রান্না করে খেতে হয়। কিন্তু সিঙ্ক বাসার সবচেয়ে জীবাণুপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ আছে।

সেটি হলো, এঁটো থালাবাসন সেখানে ফেলে রাখা। ব্যাকটেরিয়া উষ্ণ, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় দ্রুত বংশবিস্তার করে। এঁটো থালাবাসনের কারণে আপনার সিঙ্ক হয়ে ওঠে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর একটি আদর্শ স্থান।

এঁটো বাসন শুকনা নাকি ভেজা

এঁটো বাসন শুকনা রেখে দেওয়ার চেয়ে উষ্ণ, জীবাণুতে পরিপূর্ণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা একটু বেশিই ক্ষতিকর। মোটের ওপর, উষ্ণ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া বেশি জন্মায়। তবে এর মানে এই নয় যে শুকনা সিঙ্ক নিরাপদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুকনা পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করতে পারে না। কিন্তু বেঁচে ঠিকই থাকতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে বংশবিস্তার করতে পারে। আর এঁটো বাসনে যেহেতু খাবার লেগে থাকে, পোকামাকড় সহজেই সেসবের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং ব্যাকটেরিয়া রান্নাঘরের অন্যান্য জায়গায়ও ছড়িয়ে পড়ে।

এই অভ্যাস কি অসুস্থতার কারণ হতে পারে

ব্যাকটেরিয়ায় পরিপূর্ণ পানি সিঙ্কে জমিয়ে রাখলে আপনি অসুস্থ হতেই পারেন। ই কোলাই এবং সালমোনেলার মতো ব্যাকটেরিয়া খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং পেটের বিভিন্ন অসুখবিসুখের জন্য দায়ী।

এসব রোগ মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, এমনকি আপনার কিডনিকেও রোগাক্রান্ত করতে পারে। স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস ত্বকে ইনফেকশন সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনি গ্লাভস না পরে থালাবাসন ধুয়ে থাকেন।

ত্বকে ছোটখাটো কাটাছেঁড়া থেকে সংক্রমণ হওয়ার যে আশঙ্কা থাকে, গ্লাভস ছাড়া থালাবাসন মাজলেও সেই পরিমাণ সংক্রমণ হতে পারে।

সিঙ্কের ব্যাকটেরিয়া ঠিক কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা না জেনেই স্পঞ্জ, হাত কিংবা পানির বোতলে জীবাণু ছড়িয়ে দিই। সিঙ্কের ব্যাকটেরিয়া সহজেই আশপাশে এবং খাবারে স্থানান্তরিত হয়। নোংরা পানির ছিটা থেকে ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়।

নোংরা পানিতে ভেজা হাত দিয়ে জিনিসপত্র ধরার কারণেও আমাদের হাত থেকে জীবাণু ছড়ায়। সিঙ্কের কল থেকে আপনি যদি একটি গ্লাসে বা কলসিতে পানি ভরেন এবং ঠিক সেই মুহূর্তে সিঙ্কে এঁটো বাসনকোসন পড়ে থাকে, আপনার শরীরে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে।

সিঙ্কে যত বেশি এঁটো বাসন জমিয়ে রাখবেন, সিঙ্কটিকে জীবাণুমুক্ত করা ততই কঠিন হবে। যদি বাসনকোসন ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ায় ডুবে থাকে, তাহলে পরিষ্কারের সময় সব ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

নোংরা বাসনকোসন নিয়ে তাহলে কী করা উচিত

যদি আপনার থালাবাসন ধোয়ার আধুনিক যন্ত্র থাকে, তাহলে সেটি ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আপনার বাসনকোসন পরিষ্কার করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। ডিশওয়াশারগুলোয় তাপমাত্রা সেট করে দেওয়া যায়। তাই ডিশওয়াশার নিশ্চিত করে যে আপনার নোংরা পাত্র, প্লেট ও বাসনপত্র সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত থাকবে।

কিছু বাসনকোসন ডিশওয়াশারে ধোয়ার উপযুক্ত নয়। কোনো সমস্যা নেই। এ ক্ষেত্রে কেবল গরম সাবান-পানি দিয়ে সাবধানে সেসব জিনিস পরিষ্কার করে বাতাসে পুরোপুরি শুকিয়ে নিন। থালাবাটি ধোয়ার স্পঞ্জগুলোও ভালোভাবে পরিষ্কার করতে ভুলবেন না। এটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আরেক প্রশ্ন সামনে এসে যায়, এঁটো বাসনকোসন কিছুক্ষণের জন্য ভিজিয়ে রাখা যাবে কী? উত্তর হলো—‘না’।

হাতে সময় না থাকলে কী করবেন

হয়তো আপনার শিশুসন্তানকে ঘুম পাড়াতে হবে, কাউকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে, অথবা জরুরি ই-মেইলের উত্তর দিতে হবে, কিংবা একসঙ্গে তিনটিই—এ অবস্থায়ও কি কড়াইয়ে লেগে যাওয়া পোড়া তরকারি ওঠানোর জন্য সেটিকে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখা যাবে না?

এ রকম পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে না হলেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার বাসনকোসন পরিষ্কার করে ফেলুন।
থালাবাসন রেখে দিলে সিঙ্ক পরিষ্কার করবেন কীভাবে

রান্নাঘরের সিঙ্ক পরিষ্কারে ও জীবাণুমুক্ত করার একটি সহজ উপায় আছে। সাবান-পানি দিয়ে সিঙ্ক পরিষ্কার করুন। তারপর একটি অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কিংবা ব্লিচযুক্ত স্প্রে ব্যবহার করুন। স্প্রে করে সঙ্গে সঙ্গেই ধুয়ে ফেলবেন না। স্প্রের সুফল পুরোপুরি পেতে চাইলে ৫-১০ মিনিট অপেক্ষা করুন।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

রাতে আপনি যখন বিশ্রাম নেন, ব্যাকটেরিয়ারা তখনই কাজে নেমে পড়ে, এ কারণেই রাতে খাওয়ার পর এঁটো বাসনকোসন সিঙ্কে ফেলে রাখা যাবে না
রাতে আপনি যখন বিশ্রাম নেন, ব্যাকটেরিয়ারা তখনই কাজে নেমে পড়ে, এ কারণেই রাতে খাওয়ার পর এঁটো বাসনকোসন সিঙ্কে ফেলে রাখা যাবে না। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

বাল্যবিবাহ এবং আমাদের মাধ্যমিক পড়াশোনায় বাধা by জান্নাতি আক্তার

আমাদের সমাজে এখনো অনেক মেয়েকে খুব ছোট বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় তারা তখনো শিশু। এ ধরনের বিয়ে হলো বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহ মানে এক শিশুকে তার বয়সের জন্য অনুপযুক্ত দায়িত্বে আবদ্ধ করা। সে তখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপূর্ণ নয়। কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাকে বাধ্য করে সংসারের জন্য। তারা বলবে, ‘তোমার বয়স এখন পড়াশোনার নয়, সংসারের।’ এই বাক্য তার ছোট্ট হৃদয় ভেঙে দেয়, স্বপ্নকে থামিয়ে দেয় আর শিশুর হাসিকে থামিয়ে দেয়।

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, একটি মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার বয়সে যদি ঘরে আটকে রাখা হয়, তার জীবন কতটা কঠিন হয়ে যায়? সে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার আনন্দ উপভোগ করতে চায়, নতুন কিছু শিখতে চায়, কিন্তু সে বাধাপ্রাপ্ত হয়। স্কুলে নিয়মিত যাওয়া কঠিন হয়ে যায়, পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি অসম্ভব হয়ে যায়, হোমওয়ার্ক করা মুশকিল হয়ে ওঠে। তার স্বপ্ন থেমে যায়।

মাধ্যমিক শিক্ষা হলো এমন এক সময়, যখন একটি শিশু তার ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু বাল্যবিবাহ সেই সময়কেই ভেঙে দেয়। ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকা, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, নতুন কিছু শেখা—সবই বাধাপ্রাপ্ত হয়। ঘরের দায়িত্ব, সংসার পরিচালনা, সন্তান দেখাশোনার মতো দায়িত্ব এসে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সে তার স্বপ্ন পূরণের পথ হারিয়ে ফেলে।

শুধু পড়াশোনা নয়, বাল্যবিবাহ মেয়েদের মানসিক ও সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করে। বন্ধুর সঙ্গে খেলার সময় কমে যায়। নতুন কিছু শেখার সুযোগ সীমিত হয়। সমাজের নানা রকম সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। কেউ বলে, ‘ছোট বয়সে বিয়ে করলে কী হবে?’ বা ‘এটা ঠিক হয়নি।’ এই কথাগুলো শিশুর মনকে আরও দমিয়ে দেয়, তার স্বপ্নের জগৎকে ছোট করে দেয়।

বাল্যবিবাহের ফলে স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেয়েরা প্রাকৃতিকভাবে বয়সের জন্য প্রস্তুত নয়। যখন তারা সন্তান ধারণ করে, তখন তাদের শরীর ও মন উভয়ই প্রভাবিত হয়। ক্লাসে যাওয়া বা হোমওয়ার্ক করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের প্রভাব আরও বেশি। অনেক পরিবার মেয়েকে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেয়ে বিয়ে করাতে আগ্রহী। কেউ ভাবেন, ‘মেয়ের নিরাপত্তা সবচেয়ে বড়।’ কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তার নামে মেয়েদের পড়াশোনা ও স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। স্কুল হলো প্রতিটি শিশুর জন্য জ্ঞান ও স্বাধীনতার জায়গা। বাল্যবিবাহ তা বন্ধ করে দেয়।

আপনি যদি একনজরে দেখেন, দেশের বহু গ্রামের মেয়েরা মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পারে না। তারা ছোট বয়সেই সংসারের দায়িত্বে আবদ্ধ হয়। বন্ধুর সঙ্গে খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়ার আনন্দ, নতুন বই পড়ার সুযোগ—সবই সীমিত হয়ে যায়। অনেক সময় তারা হতাশ হয়। স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। তারা মনে করে, ‘আমার জীবন শেষ।’

তবে শুধু স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়া নয়; বাল্যবিবাহ মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিকেও নষ্ট করে। তারা নিজের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে। মনে হয়, ‘আমি কীভাবে বড় হয়ে নিজের জীবন গড়ব?’ বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। নতুন কিছু শেখার আগ্রহও কমে যায়। মানসিক চাপ বাড়ে।

আমরা যদি সত্যিই চাই আমাদের মেয়েরা স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, তাহলে বাল্যবিবাহ রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ, সরকার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মা–বাবা যদি সচেতন থাকেন, তাঁরা মেয়েকে ছোট বয়সে বিয়ে না দিয়ে পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারেন। তাঁরা মেয়েকে বলবেন, ‘তুমি পড়াশোনা করো, বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াও।’ এই ছোট্ট কথাগুলোই মেয়ের জন্য বড় শক্তি। শিক্ষকেরা মেয়েদের উৎসাহিত করবেন। বন্ধুরা সহমর্মিতা দেখাবে। সমাজও সমর্থন করলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব।

আইনও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। অনেক পরিবার আইনের উপেক্ষা করে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়। স্কুলের পরিবেশ, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আর আইনের কঠোর প্রয়োগ—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজে মেয়েদের শিক্ষার পথ খোলা রাখতে হবে।

মাধ্যমিক পড়াশোনা মেয়ের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি তার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বাল্যবিবাহ সেই সম্ভাবনা কেড়ে নেয়। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিটি মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে, তার পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হবে।

আজও অনেক মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে পড়েছে। কেউ চাকরি করছে না, কেউ ব্যবসা করছে না, কেউ একাই সংসার সামলাচ্ছে। তারা প্রমাণ করছে—বাল্যবিবাহ শুধু তাদের শিক্ষা ও স্বপ্নকে থামায়, কিন্তু সাহস ও সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নষ্ট করতে পারে না। তারা বড় হয়ে জীবন গড়ার চেষ্টা করছে।

আমরা সবাই যদি সচেতন হই, তাহলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, সমাজ—সবাইকে মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের শিক্ষা চালিয়ে নিতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শেষ করার সুযোগ দিতে হবে। এভাবে তারা স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।

শিক্ষিত মেয়ে শুধু নিজের জীবন গড়বে না, সমাজ ও দেশের জন্যও উপকার করবে। সে ভালো চাকরি করতে পারবে। নিজের পরিবারকে সাহায্য করতে পারবে। সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে। সমাজে উদাহরণ স্থাপন করতে পারবে। বাল্যবিবাহ সবকিছু ধ্বংস করে। তাই এটি রোধ করা জরুরি।

আমাদের সমাজের প্রত্যেককে বোঝানো দরকার, বাল্যবিবাহ মানে কোনো সুবিধা নয়; এটি শিশুর জীবন, স্বপ্ন ও শিক্ষা নষ্ট করে। আমাদের কাজ হলো মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করা। ছোট্ট শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারবে—পড়াশোনা করা জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

* জান্নাতি আক্তার, শিক্ষার্থী
- ঝুমুরবাড়ি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়

বাল্যবিবাহ

মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা

সিএনএনের রিপোর্টঃ রাত নামতেই মুম্বাইয়ের একটি বিশাল বিমান হ্যাঙ্গারের মতো কনসার্ট ভেন্যুর বাইরে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজারো তরুণ-তরুণী। প্রবেশপথে ইভেন্ট কর্মীরা কিউআর কোড স্ক্যান করছেন, হাতে পরিয়ে দিচ্ছেন রিস্টব্যান্ড। বন্ধুরা সেলফি তুলছেন, অপেক্ষা করছেন দরজা খোলার।

ভেতরে ঢুকে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক জুতা খুলে মেঝেতে পা গুটিয়ে বসে পড়েন। আলো নিভে আসে। সামনের সারিতে এক তরুণী মা তার শিশুকে কাঁধে নিয়ে সংগীত শুরুর অপেক্ষায়।
তবে এটি কোনো সাধারণ পপ বা ইলেকট্রনিক মিউজিক কনসার্ট নয়। স্পিকারে বেজে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন হিন্দু ভক্তিমূলক সংগীত- ‘ভজন’, যা সাধারণত মন্দির বা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় শোনা যায়।
সংগীতের তালে তালে দর্শকদের বড় একটি অংশ উঠে দাঁড়ায়। তারা একসঙ্গে হাততালি দেয়, ভজন গায় এবং নাচে। পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কিন্তু এখানে নেই মদ, মাদক কিংবা ধূমপানের কোনো আয়োজন। বরং আয়োজকদের পক্ষ থেকেই অ্যালকোহল ও মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর অংশগ্রহণকারীরাও সেটিই সমর্থন করছেন।

তরুণদের নতুন আকর্ষণ ‘ভজন ক্লাবিং’
ভারতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ভজন ক্লাবিং’ নামে নতুন একটি সাংস্কৃতিক ধারা। এটি মূলত ‘সোবার ক্লাবিং’ বা ‘কফি রেভ’-এর ভারতীয় সংস্করণ, যেখানে মাদক বা মদ ছাড়াই সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করেন তরুণরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জেন-জি প্রজন্ম ধীরে ধীরে অ্যালকোহল ও মাদক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় যেমন ‘সোবার কিউরিয়াস’ সংস্কৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে, তেমনি ভারতে তার ধর্মীয় সংস্করণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘ভজন ক্লাবিং’।
২৫ বছর বয়সী জিল ভীরা প্রথমবারের মতো এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেন, এমন একটি কনসার্ট, যা সত্যিই মানুষকে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে যায়। অভিজ্ঞতাটি ছিল অসাধারণ।
তিনি বলেন, সাধারণ কনসার্টে ধূমপান, ভেপিং বা মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এখানে এসে মাখন-ঘোল পান করাই যেন আমার কাছে অ্যালকোহলের বিকল্প হয়ে উঠেছিল।

প্রার্থনা ও পার্টির মিশেল
ভজন ভারতের শত শত বছরের পুরোনো ভক্তিমূলক সংগীত। সাধারণত মন্দির, ধর্মীয় শোভাযাত্রা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে পরিবেশিত হয়।
তবে নতুনত্ব এসেছে এর উপস্থাপনায়। এখন বড় ভেন্যুতে টিকিট কেটে এসব অনুষ্ঠান দেখতে আসছেন মানুষ। থাকছে স্মোক মেশিন, বিশাল এলইডি স্ক্রিন, আলোকসজ্জা ও আধুনিক কনসার্টের সব আয়োজন।
২৬ বছর বয়সী ধ্বনি পারাডিয়া বলেন, ধোঁয়া, আগুনের বিশেষ প্রভাব আর সংগীতের বিট- এসবই আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
তার ছোট বোন ২৩ বছর বয়সী ফিওনি পারাডিয়ার ভাষায়, মঞ্চের সাজসজ্জা অনেকটা টেকনো কনসার্টের মতো। তাই এটি জেন-জি প্রজন্মকে সহজেই আকর্ষণ করছে।

ব্যাকস্টেজ সিবলিংসের হাত ধরে জনপ্রিয়তা
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভাই-বোনের সংগীত জুটি ‘ব্যাকস্টেজ সিবলিংস’। ছোটবেলা থেকেই তারা ভজন গেয়ে আসছেন। এখন আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন শহরে তরুণদের কাছে ভজনকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এই
জুটির সদস্য রাঘব আগারওয়াল বলেন, অ্যালকোহল আর ক্লাবিং এক জিনিস নয়। অ্যালকোহল মানে নেশা, আর ক্লাবিং মানে আনন্দ উপভোগ করা।
তার বোন প্রাচি আগারওয়াল বলেন, এখানে মানুষ দাদা-দাদি, বাবা-মা, বন্ধু কিংবা সঙ্গী- যাকে খুশি সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি দর্শক
ভারতের অন্যতম প্রাচীন সংগীত প্রতিষ্ঠান সারেগামাও এই উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব অনুষ্ঠানের ভিডিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কনসার্টের আলোয় হাজারো মানুষের একসঙ্গে ভজন গাওয়া, খালি পায়ে নাচ, আবেগে কান্না কিংবা অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ দেখছেন।
সমর্থকদের মতে, এটি কঠোর ধর্মীয় নিয়মের বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিকতার একটি সহজ ও উন্মুক্ত প্রকাশ। তবে সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ, এ ধরনের অনুষ্ঠান আধ্যাত্মিকতাকে বিনোদন ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করছে।

ধর্মীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালে ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী এক দশকে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
একই সময়ে ভারতে হিন্দু ধর্মীয় পরিচয় ও প্রতীকও জনজীবনে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এতে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে ‘ভজন ক্লাবিং’-এর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, জেন-জি প্রজন্ম ভজনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রেখে এটিকে নিজেদের জীবনযাত্রার অংশ করে নিয়েছে- এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।

কেন আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণরা?
সনাতন জার্নি’র আয়োজক নিকুঞ্জ গুপ্তা জানান, এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক বা কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণ।
তার ভাষায়, মানুষের জীবনে এখন প্রচুর উদ্বেগ ও মানসিক চাপ। এখানে এসে তারা স্বস্তি অনুভব করে।
ভারতের গড় বয়স মাত্র ২৯ বছর, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশে পরিণত করেছে। দেশটির তরুণরা আগের তুলনায় আরও বেশি শিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে সীমিতসংখ্যক চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তাদের অনেকেই হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও ভজনের আসর তাদের মানসিক শান্তি, আনন্দ ও একাত্মতার অনুভূতি এনে দিচ্ছে।
বর্তমানে মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু হয়েছে।

নিকুঞ্জ গুপ্তা বলেন, মদ্যপানের পরের ক্লান্তি নয়, এখান থেকে মানুষ মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। সম্ভবত এ কারণেই আরও বেশি তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ফিওনি পারাডিয়া বলেন, প্রত্যেক মানুষই নিজের মতো করে আধ্যাত্মিকতার সন্ধান পান। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত।
আর তার চাচাতো বোন হেতা সোলাঙ্কির ভাষায়, একবার আসুন, তারপর দেখবেন আপনি নিজেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সত্যিই দারুণ আনন্দের অভিজ্ঞতা।

মদ-ড্রাগকে বিদায়, নতুন ‘নেশায়’ ভারতের জেন-জিরা