Showing posts with label আনু মুহাম্মদ. Show all posts
Showing posts with label আনু মুহাম্মদ. Show all posts

Friday, July 31, 2026

মাওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ by আনু মুহাম্মদ

‘মাওলানা ভাসানী’ বলে যাঁকে আমরা চিনি, সেই ব্যক্তির প্রকৃত নাম তা নয়। তাঁর আসল নামে এ দুই শব্দের কোনোটিই ছিল না। ‘মাওলানা’ ও ‘ভাসানী’—দুটি শব্দই পরবর্তী সময়ে তাঁর অর্জিত পদবি বা বিশেষণ। ‘মাওলানা’ তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও চর্চার পরিচয়, আর ‘ভাসানী’ সংগ্রাম ও বিদ্রোহের স্মারক। তাঁর জীবন ও তৎপরতা এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল, যাতে পদবি ও বিশেষণের আড়ালে তাঁর আসল নামই হারিয়ে গেছে। আসলে তাঁর নাম ছিল আবদুল হামিদ খান। ডাকনাম ছিল চ্যাগা, শৈশবে এই নামই ছিল তাঁর পরিচয়।

প্রাচুর্য, বিত্তবৈভব, বংশের প্রভাব, যেগুলো রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠায় সাধারণত কাজে লাগে, সেগুলোর কোনোটিই তাঁর ছিল না। জীবনে তিনি যাত্রাদল থেকে শুরু করে দেওবন্দ মাদ্রাসা—সব অভিজ্ঞতাই ধারণ করেছিলেন। এসবের মধ্যে তাঁর সাধারণ যে প্রবণতা তাঁকে পরবর্তীকালে বিশিষ্ট করে তুলেছিল, তা হলো তাঁর গণসম্পৃক্ততা।

এই গণসম্পৃক্ততা তাঁকে নিজের ও চারপাশের সমষ্টির জীবনকে এক করে দেখার ক্ষমতা দান করেছিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদকে দেখেছিলেন ওপর থেকে নয়, চারপাশের পিষ্ট মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।

দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, মানবেতর জীবন যে নিয়তি নয়; নির্দিষ্ট কিছু কারণ, ব্যবস্থা ও ক্ষমতা এগুলোকে সৃজন করে, টিকিয়ে রাখে—এ উপলব্ধি তাঁকে আর সব মাওলানা-পীর থেকে ভিন্ন করে ফেলে। এই কপট জগতে তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ আর জনতার মধ্যে তিনি পরিণত হন মজলুম জননেতায়। তিনি শুধু মুসলমান নন, হয়ে উঠেছিলেন কথিত তৃতীয় বিশ্বের সব ধর্ম, জাতি ও লিঙ্গের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

মাওলানা, পীর-মাশায়েখরা আমাদের সমাজে খুবই ক্ষমতাধর। শাসক ও শোষকেরা তাঁদের সব সময়ই পৃষ্ঠপোষকতা দেন নিজেদের ভিত্তি শক্ত রাখার জন্য। অন্যদিকে বহু মানুষ নিজেদের অসহনীয় জীবনকে সহনীয় করার জন্য এই ধর্মীয় নেতা বা পেশাজীবীদের কাছেই হাজির হন। দোয়া, ভরসা, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ দিয়ে অসহায় মানুষ শরীরের অসুখ সারাতে চান, সন্তানের নিরাপত্তা চান, বিপদে-আপদে আল্লাহর আশ্রয় চান, বিভিন্ন কায়দার জালেমের হাত থেকে বাঁচার জন্য কোনো অলৌকিক সহায়তার প্রার্থনা করেন। যেখানে চিকিৎসার পয়সা নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই; যেখানে মানুষের নিজেদের যে প্রবল শক্তি আছে, সেই বোধ স্পষ্ট নয়; যেখানে নদীভাঙন, জুলুমবাজ, ক্ষমতাধরদের অত্যাচার-শোষণে বর্তমান রক্তাক্ত, ভবিষ্যৎ ভীতিকর সেখানে এই পথ ছাড়া মানুষ আর কোনো উপায় দেখে না।

অধিকাংশ ধর্মীয় নেতা পয়সা নেন, এসব বিষয়ে দাওয়াই দেন এবং মানুষকে ধৈর্য ধরতে বলেন, সবুর করতে বলেন, কপাল আর বরাত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেন। কিন্তু নিজেরা নানাভাবে আটকে থাকেন তাঁদের সঙ্গেই, যাঁরা সংখ্যালঘু, কিন্তু জালেম ক্ষমতাধর। জালেমদের ওপর ধর্মীয় নেতাদের নির্ভরতা, আবার ধর্মীয় সার্টিফিকেটের ব্যাপারে তাঁদের ওপর জালেমদের নির্ভরতা এক দুষ্টচক্র তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা রক্ষা করেন পরস্পরকে।

এভাবেই নিপীড়িত মানুষের সামনে তৈরি হয় এক অচলায়তন। নানা ঝড়ঝাপটা আর আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত মানুষদের কাছে তাঁদের একমাত্র বক্তব্য থাকে ধর্মীয় আচার পালনে, পরকালের অসীম সুখ পাওয়ার জন্য ইহকালের বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে। এ ধরনের ধর্মীয় নেতাদের বয়ানে তাই ক্ষমতার তোয়াজ, নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বিষ থাকে।

মাওলানা ভাসানীও পীর ছিলেন। লাখ লাখ মানুষ তাঁর মুরিদ ছিলেন। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদ না থাকায় তাঁর কাছে কারও আসতে বাধা ছিল না। বিভিন্ন ধর্মের নারী-পুরুষ এবং বলাই বাহুল্য গরিব মানুষ, যাঁরা জমিদার, মহাজন আর মালিকশ্রেণির শোষণ-পীড়নে বিপর্যস্ত ও ক্লিষ্ট, তাঁর কাছে হাজির হতেন। অন্যান্য ধর্মজীবীর মতো এসব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মাওলানা ভাসানীর আয়-উপার্জনের উৎস ছিল না। তিনি দোয়া, পানিপড়া, ঝাড়ফুঁক—সবই দিতেন, কিন্তু অসুখ বেশি হলে পরামর্শ দিতেন ডাক্তার দেখাতে, প্রয়োজনে ওষুধ কেনার জন্য টাকাও দিতেন।

আরও যে জায়গায় এসে মাওলানা ভাসানী অন্যদের চেয়ে শুধু আলাদা নয়, প্রায় বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন নিজেকে, সেটিই এক মাওলানাকে যুক্ত করেছিল এক ভাসানীর সঙ্গে। মানুষ তাঁর কাছে ভরসা চাইতেন আর বলতেন তাঁদের অবর্ণনীয় অন্যায় ও অবিচার ভরা জীবনের কথা।

এ ক্ষেত্রে ভাসানীর অবস্থান ছিল এ-ই যে এই নারকীয় অবস্থা নিয়তি নয়, এটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিধান নয় আর সর্বোপরি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে এ অবস্থা পরিবর্তন করা যায়। এই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই তিনি জীবনের তরুণকাল থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত’, এটি তাঁর জীবনের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মাওলানা ভাসানীর জীবন, উচ্চারণ ও সংগ্রাম, ইসলাম ধর্মের মালিকানায় অধিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র, সামরিক শাসক, জোতদার, মহাজন, সামন্ত প্রভু এবং তাঁদের প্রিয় ধর্মীয় নেতাদের ক্ষিপ্ত করেছিল। তাঁকে অভিহিত করা হতো ‘ভারতের দালাল’, ‘লুঙ্গিসর্বস্ব মাওলানা’ এমনকি ‘মুরতাদ’ হিসেবে! শাসক-শোষকদের এই ক্ষিপ্ততা আসলে ছিল একটা শ্রেণিগত রোষ। পোশাক, জীবনযাপন, বয়ান, আওয়াজ—সব দিক থেকেই ভাসানী ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষ। লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অভিজাত ইসলামের বিপরীতে তাঁর কাছে ইসলামের নিপীড়িত মানুষের ভাষা তৈরি হয়। ধর্ম যেখানে শাসক-জালেমদের একচেটিয়া মালিকানাধীন নিরাপদ অবলম্বন, সেখানে মাওলানা ভাসানী সেই নিরাপদ দুর্গকেই প্রশ্ন করেন।

অন্যায়-অবিচার তো বিমূর্ত নয়, দুঃখ-দুর্দশাও অজানা গ্রহ থেকে নেমে আসা ব্যাপার নয়। দায়িত্ব আর সংবেদনশীলতা দিয়ে মানুষের এসব অভিজ্ঞতা দেখলে উন্মোচিত হয় এক বিরাট রহস্য। আবিষ্কার করা যায় মানুষের মানবেতর জীবনের কারণ, শনাক্ত করা যায় এর পেছনের সামাজিক ব্যবস্থা, নিয়ম ও বিধি। পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করা যায় সেসব শ্রেণি-গোষ্ঠীকে, যারা এসব ব্যবস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে, এসব ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করে; ধর্মও যা থেকে বাদ যায় না।

এর থেকে সার্বিক মুক্তি লাভের লড়াই তাই অনির্দিষ্ট হতে পারে না, লক্ষ্যহীন হতে পারে না। এর জন্য দরকার এমন একটা সমাজ, এর চিন্তা করা, স্বপ্ন দেখা ও দেখানো, যার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানুষ এই নারকীয় অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করবে। তাই সৌদি আরবের রাজতন্ত্র নয়, ভাসানী লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্য থেকে মুক্ত সমাজব্যবস্থা। যে সমাজ মানুষকে হাসি দিতে পারে, মানবিক জীবন দিতে পারে, কর্তৃত্ব দিতে পারে, সে রকম সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই-ই তিনি কর্তব্য হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থিত করেছিলেন।

সুতরাং অন্যায়-অবিচার আর দুঃখ-দুর্দশা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য দোয়া-দরুদ নয়, দরকার সমষ্টিগত লড়াইয়ের রাস্তা তৈরি—এ উপলব্ধি মাওলানাকে একই সঙ্গে সক্ষম করেছিল সংগ্রামের প্রতীক ভাসানী হয়ে উঠতে। যে ভাসানী সব রকম জালেমদের প্রবল দাপট আর আগ্রাসনের সামনে লাখো মানুষের স্বর নিজের কণ্ঠে ধারণ করে পাল্টা ক্ষমতার প্রবল শক্তিতে রুখে দাঁড়াতেন, এক কণ্ঠে জনতার ভেতর থেকে উঠে আসা অসীম শক্তিকে মূর্ত রূপ দিতেন। ক্লান্ত, বিবর্ণ, ক্লিষ্ট মানুষ শুধু নয়, প্রকৃতিকেও প্রাণবন্ত, তরতাজা করে তুলত জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের হুঁশিয়ারি—‘খামোশ’!

এই উচ্চারণ নিয়ে মাওলানা ভাসানী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে, স্বপ্নভঙ্গের কালে মানুষের হতাশা ও প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, ভারতের শাসকশ্রেণির পরাক্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফারাক্কার অভিশাপের বিরুদ্ধে সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বামপন্থী নেতাদের ভ্রান্তি ও হঠকারিতায় ভাসানীর ক্ষমতা নানা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনিও হতাশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাঁর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই তাই আমাদের লড়াইয়ের শিক্ষা।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে, গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার বিপরীত যাত্রায়, বাংলাদেশের মানুষ যখন সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির নানামুখী আগ্রাসনে বিপর্যস্ত, বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠীর দখল, লুণ্ঠন, জোরজবরদস্তিতে দিশাহারা, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্প্রসারণে বিভ্রান্ত, তখন নিপীড়িত মানুষের ধর্মের মুক্তির ভাষা নিয়ে মাওলানা ভাসানী দেশি-বিদেশি দানবের বিরুদ্ধে বিশ্বমানবের প্রবল আওয়াজ হয়ে বারবার হাজির হন—‘খামোশ’!

● আনু মুহাম্মদ, শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2Fhcidyqo2%2FMotamot.jpg?rect=0%2C0%2C718%2C479&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর্ট: মাসুক হেলাল

Saturday, August 9, 2025

দেশে অনেক ছোট ছোট শামীম ওসমানের জন্ম হচ্ছে: আনু মুহাম্মদ

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শামীম ওসমানের মতো মাফিয়া চলে গেলেও দেশে অনেক ছোট ছোট শামীম ওসমানের জন্ম হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এই সরকারের এক বছর পূর্তি হলেও ত্বকী হত্যার বিচারের জন্য কথা বলতে হচ্ছে, এটা খুবই দুঃখজনক ও বিস্ময়কর।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ নগরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার মিলনায়তন প্রাঙ্গণে ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ১৪৯ মাস উপলক্ষে মোমশিখা প্রজ্জ্বালন কর্মসূচিতে আনু মুহাম্মদ এই মন্তব্য করেন।

প্রতি মাসের ৮ তারিখে ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে এই মোমশিখা প্রজ্জ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।

কর্মসূচিতে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ত্বকী, তনু, সাগর-রুনি, মুনিয়াসহ এই হত্যাকাণ্ডগুলো শেখ হাসিনা শাসনামলের একেকটা চিহ্ন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অন্যতম বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল মাফিয়াতন্ত্রের পরিবর্তন হবে, হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। এই সরকারের অনেক উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি ছিল বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলো তারা দ্রুত সমাধান করবেন। কিন্তু এক বছর পার হওয়ার পরও আমরা দেখছি একই জায়গায় আছি।’

আনু মুহাম্মদ বলেন, শামীম ওসমানের মতো মাফিয়া চলে গেলেও অনেক ছোট ছোট শামীম ওসমানের জন্ম হচ্ছে দেশে। তিনি আরও বলেন, শামীম ওসমানের জন্ম হচ্ছে, মব সন্ত্রাস হচ্ছে, নারীর ওপর আক্রমণ হচ্ছে; সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যেও যারা দুর্বল, তাদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে এবং বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোরজবরদস্তি, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নতুন নতুন মাফিয়াতন্ত্র তৈরি হচ্ছে, সরকারের মধ্য থেকে একধরনের নিষ্ক্রিয়তা, নির্লিপ্ততা ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে।

ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে গেছে। যে স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাজপথে দলে দলে নেমে এসেছে, দেড় হাজার মানুষ জীবন দিয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ববরণ ও আহত হয়েছে, তাদের আকাঙ্ক্ষার কোনো বাস্তবায়ন নাই। বরং এর বিপরীত দিকটা আমরা লক্ষ করছি। ত্বকীর ঘাতক ওসমান পরিবার পালিয়ে গেলেও তাদের সহযোগী সন্ত্রাসী ও খুনিরা বিএনপির বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ছে। প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় ওসমান পরিবারের সেই চাঁদাবাজি, হাট–ঘাট, মাঠ, মাদক এখন বিএনপির লোকেরা নিয়ন্ত্রণ করছে। ওসমান পরিবারের এই খুনিরা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তোলার তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি জিয়াউল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হালিম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক, ন্যাপের জেলা সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শংকর, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক তরিকুল সুজন, সামাজিক সংগঠন সমমনার সাবেক সভাপতি দুলাল সাহা।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ নগরের শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। ৫ মার্চ ২০১৪ তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদের টর্চার সেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের মোমশিখা প্রজ্জ্বালন কর্মসূচি। শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার মিলনায়তন প্রাঙ্গণে
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের মোমশিখা প্রজ্জ্বালন কর্মসূচি। শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার মিলনায়তন প্রাঙ্গণে। ছবি: প্রথম আলো

Monday, July 21, 2025

গণ–অভ্যুত্থানের মালিকানা কাদের হাতে চলে যায় by আনু মুহাম্মদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণ–অভ্যুত্থানের একটি বড় প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা চিহ্নিত করা কঠিন নয়। ১৯৫২ সাল থেকে আমরা এটি বিশেষভাবে লক্ষ করতে পারি। সে সময় ভাষা আন্দোলন যখন একটি গণ–অভ্যুত্থানের রূপ নেয়, তখনই পাকিস্তান সরকার ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। যদিও এখনো বাংলা ভাষার পরাজিত প্রান্তিক অপমানিত অবস্থা, তারপরও এই আন্দোলনের শক্তিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাত্রাপথ তৈরি করেছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লিগকে ধরাশায়ী করে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের বিজয় এর প্রত্যক্ষ ফল।

এরপর জাতীয় পর্যায়ে দেশকাঁপানো গণ–অভ্যুত্থান আমরা দেখেছি ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং সর্বশেষ ২০২৪–এ। শ্রমিক–কৃষকের ব্যাপক অংশগ্রহণে উত্তাল ১৯৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ বলে পরিচিত সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়েছিল, তা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শক্তি তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন, সপরিবার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যার পর সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার পর ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় দফা সামরিক শাসন শুরু হলে ১৯৮৩ সাল থেকে সামরিক শাসক এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হলেও ১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দশকব্যাপী দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়।

এরপরও আমরা বেশ কয়টি ছোট–বড় গণপ্রতিরোধ দেখেছি। যেমন ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন থেকে গণ–আদালত, ১৯৯৬ সালে গণপ্রতিরোধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা অন্যতম। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বাংলাদেশে কার্যত আর কোনো নির্বাচন হয়নি। দেশের নির্বাচনব্যবস্থার মধ্যে ধস নেমেছিল। ২০১৪ সাল থেকে হাসিনা সরকার ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ অনির্বাচিত সরকার। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান সেই সরকারের পতন ঘটিয়েছে।

এটা মনে রাখা দরকার যে গণ–অভ্যুত্থান এক দিনে হঠাৎ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে না। এর পেছনে লম্বা ইতিহাস থাকে। ষাটের দশকে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই থেকে ১৯৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান, আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই থেকে ১৯৮৭ ও ১৯৯০–এর গণ–অভ্যুত্থান হয়। ২০১৪ থেকে গণতন্ত্র; নিরাপদ সড়ক আন্দোলন; সুন্দরবন আন্দোলন; কোটা সংস্কার আন্দোলন; গুম-খুন-অত্যাচারবিরোধী আন্দোলন এবং নিরাপত্তা–ভোটের অধিকারসহ জনস্বার্থের বিভিন্ন লড়াই থেকে ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের শক্তি তৈরি হয়েছে।

এগুলো দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশের জনগণের ওপর অবিচার, শোষণ, অত্যাচার, দখল, আধিপত্য, স্বৈরশাসন ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ–প্রতিরোধক্রমে কীভাবে গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আসলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গণ–অভ্যুত্থান হচ্ছে এই জনপদের মানুষের প্রতিবাদ–প্রতিরোধের সর্বোচ্চ বিন্দুর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ভাষা।

১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪—এই তিন গণ–অভ্যুত্থানেই তিন স্বৈরশাসকের, আইয়ুব-এরশাদ-হাসিনার পতন হয়। তিন শাসনকালেই স্বৈরশাসনের প্রধান যুক্তি ছিল উন্নয়ন, তিন শাসকের মধ্যে প্রথম দুজন ছিলেন জেনারেল, তৃতীয়জন রাজনৈতিক পরিবারের লড়াই, অর্জন এবং নিপীড়নের অভিজ্ঞতার অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও নিজেই কুশাসন, দুর্নীতি ও নিপীড়নে কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

আইয়ুবের পতন হয় তাঁর প্রচারিত উন্নয়ন দশক উদ্‌যাপনের পর, এরশাদের পতন হয় একই রকম দশকের শেষে এবং হাসিনার পতন হয় অনির্বাচিতকালে কথিত উন্নয়ন দশকের মহাসড়কে অবস্থানকালে। তিন আমলেই জিডিপি বেড়েছে, শানশওকতও দেখা গেছে কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে বিবিধ বৈষম্য। দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ও বৈষম্য বৃদ্ধি সামগ্রিক নীতিকাঠামোর মধ্য দিয়েই ঘটেছে। স্বৈরশাসন তারই রাজনৈতিক রূপ।

মনে রাখতে হবে যে তিন আমলেই এই উন্নয়ন মডেলের প্রধান কারিগর ছিল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি গোষ্ঠী। তিন আমলেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বৃহৎ ব্যবসায়ী এবং সামরিক-বেসামরিক আমলা ও নানা বাহিনীর হাতে। একদিকে সম্পদ কেন্দ্রীভবন, অন্যদিকে মানুষের ওপর নজরদারি, জুলুম অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। শেষ দশকে নজরদারি, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে যায় অনেক বেশি।

১৯৬৯–এ গণ–অভ্যুত্থান প্রবল রূপ নেয় আসাদুজ্জামান নামের একজন রাজনৈতিক সংগঠক মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর। ১৯৮৭ সালে নূর হোসেন, ১৯৯০ সালে ডা. মিলনের নিহত হওয়ার ঘটনাও একই রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, ২০২৪ সালেও রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পরই আন্দোলন তীব্র হয়। এরপরও সরকার যখন নির্বিচার হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তখনই ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থান অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালে এর নেতৃত্ব ছিল সবার চেনাজানা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের হাতে। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এবং তাদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ছিল মূল ভূমিকায়, মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্ব গণ–অভ্যুত্থানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। আওয়ামী লীগের ৬ দফা, ন্যাপের ১৪ দফা এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ছিল এর চালিকা শক্তি। ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল এবং বামপন্থী ৫ দল এই তিন জোট এবং তাদের সম্মিলিত ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ছিল প্রধান গন্তব্য।

কিন্তু ২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানে এ রকম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও নেতৃত্ব ছিল না। প্রতিরোধ আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অসংখ্য নতুন নতুন কেন্দ্র গড়ে ওঠা ছিল এবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

তবে রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কেন্দ্র অনির্দিষ্ট থাকলেও দেয়ালের গ্রাফিতি ও জনসমাবেশ থেকে গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে। সে সময় সৃষ্ট দেয়ালচিত্রগুলোকেই তাই গণ–অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সেখানে যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে, গত ১২ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলো তা থেকে অনেক পেছনে চলে গেছে, কোথাও কোথাও বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছে।

গণ–অভ্যুত্থানে সব ধর্ম-মত, লিঙ্গ, জাতি, শ্রেণির মানুষ অংশ নিয়েছে। অপ্রতিরোধ্য শক্তি, সংহতি ও গণতান্ত্রিক চৈতন্য খুবই শক্তিশালী পর্যায়ে গেছে এই সময়। কিন্তু আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পর অসহিষ্ণু বা নিপীড়ক একেকটা পক্ষ আবির্ভূত হচ্ছে। মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করা, সহিংসতা বা চাপ সৃষ্টি করা, হামলা-হুমকির একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সেটা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মের নামে হচ্ছে।

উগ্র ধর্মবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতায় শুধু ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষেরাই নন, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সুফি–আহমদিয়া–বাউল ধারার মানুষেরাও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছেন। শিল্পকর্মসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিহ্ন আক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোরজবরদস্তি ও দখলদারত্ব চলতে থাকায় তা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে দিচ্ছে না।

সারা দেশে মব সন্ত্রাস, খুন-জখম-সহিংসতা, দখল, চাঁদাবাজি, হুংকারের পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়, কোথাও কোথাও প্রশ্রয়দানের ভূমিকা বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর বহু ঘটনাই ঘটছে গণ–অভ্যুত্থানের ওপর গোষ্ঠী মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদগ্র বাসনা থেকে।

এসবের মধ্য দিয়ে আবার প্রত্যাশার উচ্চস্থান থেকে হতাশার চোরাবালিতে পতিত হওয়ার চিত্রই ক্রমে স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতি কখন দেখা দেয়? যখন নারী, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ভিন্ন লিঙ্গ-ধর্ম-জাতির মানুষসহ গণ–অভ্যুত্থানের মূল কারিগরদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। জনগণের বৃহৎ অংশ এটাকেই স্বাভাবিক ধরে কোনো না কোনো নেতা–নেত্রীর ওপর পরের ভার ছেড়ে দেন।

ধারাটা বরাবর এমনই হওয়ার কারণে বারবার গণ–অভ্যুত্থানের মালিকানা শুধু নয়, দেশের মালিকানাও চলে যায় ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতে। মানুষকে শেখানো হয় অমুক বা তমুক নেতা বা নেত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়তে। নিজে স্বপ্ন দেখার শক্তি বিসর্জন দিয়ে নেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে জনগণের ভূমিকা হয়ে যায় নিষ্ক্রিয় অনুসারীর।

প্রকৃতপক্ষে কোনো নেতা–নেত্রী নয়, মানুষ যখন নিজেরা নিজেদের মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শিখবে, সাহস করবে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেরা দেশের মালিকানা নিতে সক্রিয় হবে, সরব থাকবে, তখনই কেবল বারবার হতাশায় পতিত হওয়ার পর্ব থেকে আমাদের মুক্তির সূচনা হতে পারে।

* আনু মুহাম্মদ, শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবরে উল্লোসিত জনতা। জাতীয় সংসদ এলাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪
স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবরে উল্লোসিত জনতা। জাতীয় সংসদ এলাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪ ছবি: প্রথম আলো

Thursday, May 8, 2025

গ্রাফিতির চাওয়াগুলো কি তবে ভুল ছিল by আনু মুহাম্মদ

পরপর তিনটি নির্বাচনী তামাশার মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার পর রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের ৯ মাস পূর্ণ হলো। ১৯৬৯ বা ১৯৯০-এর মতো এবারের গণ-অভ্যুত্থানেও কোনো দলীয় নেতৃত্ব ছিল না। ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, জাতি, পেশা, বয়সের নারীর অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য শক্তি দিয়েছিল।

দেয়ালের গ্রাফিতিতে সমাজের বিক্ষুব্ধ মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, দাবি ও প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই ঘোষণাপত্রের কাজ করেছে। সেখানে কথা, স্লোগান, ছবি, কার্টুনে জাতিগত, লিঙ্গীয়, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং নিপীড়ন আধিপত্য স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত এক দেশের প্রত্যাশা প্রকাশিত হয়েছিল।

কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে এর উল্টো তৎপরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। বৈষম্যবাদীদের দাপট বাড়তে থাকে। মাজার-মসজিদ, মন্দির, নারী, শিল্পকর্ম, ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষী ও আক্রমণাত্মক তৎপরতা বাড়ে। ভাস্কর্য, নাটক, গান, মেলা, গ্রন্থাগার ও শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র বহুবার আক্রমণের শিকার হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জোরজবরদস্তি করে কাউকে বসানো কাউকে নামানো।

নারী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ, মব সহিংসতা চলতেই থাকে। আগের মতো চাঁদাবাজি দখল আবার শুরু হয়। শ্রমিক আন্দোলনে হামলা-মামলা, এমনকি গুলিও চলেছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে ধরপাকড় চলছে। শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় সরকার ১৮ দফা চুক্তি করলেও তা বাস্তবায়ন করেনি।

নিহত ও আহত ব্যক্তিদের নিয়ে এখনো যথাযথ তালিকা, পুনর্বাসন, চিকিৎসা সম্পন্ন হয়নি। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে যে টালবাহানা চলছে। তার প্রমাণ বাছবিচারহীনভাবে শিক্ষক, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা পাইকারি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা। আর সঙ্গে অজ্ঞাতনামা শত শত আসামি।

এগুলোতে লাভ হচ্ছে গ্রেপ্তার ও আটক বাণিজ্যে নিয়োজিত ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত লোকজনের। লাভ হচ্ছে আসল খুনি লুটেরাদের এবং শেষমেশ আওয়ামী লীগেরও। ত্রাস ছড়ানোর ফলে বহু শিক্ষা–সংস্কৃতির তৎপরতা বন্ধ হয়ে গেছে।

অনেক মামলায় খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু বহুল আলোচিত ত্বকী, তনু, সাগর-রুনি, মুনিয়াসহ বহু মামলার সমাধান হয় না। ফুলবাড়ীতে ১২ বছরের পুরোনো হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার হয় না। শিশুসহ বম মানুষদের ভয়ংকর মিথ্যা মামলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।

মিথ্যা মামলায় আটক দলিত-হরিজনদের জামিনের শুনানি পর্যন্ত হচ্ছে না। হাসিনা আমলে আদালতে বিচারের রায় কী হবে আমরা বুঝতাম। এখনো কে জামিন পাবে, কে আটকে থাকবে আগেই বোঝা যায়। এই সরকার যে সংস্কার বা পরিবর্তন করতে আগ্রহী, তার প্রকাশটা কোথায়?

সংস্কার আর নির্বাচন নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তোলা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারগুলো করতে পারে, সেগুলো করতে বাধা কোথায়? ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকের আত্মহত্যা বেড়ে গেছে। হিমাগার, কিংবা সরকারি ক্রয়ের মতো সাধারণ কাজগুলো করলে কৃষকের জন্য বড় একটা পরিবর্তন হয়।

মার্কিন কোম্পানি থেকে এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে পেট্রোবাংলাকে না জানিয়েই। অথচ আমাদের দরকার এলএনজি আমদানি, কয়লামুখী নীতি থেকে বের হয়ে আসা। তাই গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রে জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে এই সম্পদ আমরা যাতে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারি, সেই উদ্যোগ ছিল জরুরি। দরকার ছিল আদানি-রামপাল-রূপপুর চুক্তি বাতিলের রাস্তা তৈরি। ৯ মাসে এসবে সরকারের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তারা গত সরকারের নীতিমালা অনুযায়ীই কাজ করে যাচ্ছে।

স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। রাখাইনে করিডর এখন উদ্বেগ আর আলোচনার বিষয়। লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার বন্দোবস্ত হচ্ছে। দেশের মানুষ কিছুই জানে না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বা বিশেষ সহকারীরা বললেই তো হবে না। দেশের মানুষকে তো জানতে হবে, তাদের জীবন–সম্পদ নিয়ে আসলে কী করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহির ব্যবস্থা না করে পুরোনো পথই কেন সরকারের পছন্দ?

এর মধ্যে ভালো কাজ হয়েছে ১১টা বিষয়ে কমিশন গঠন। সেগুলোর রিপোর্টও এসেছে। এর মধ্যে সংবিধান, নির্বাচন, গণমাধ্যম, প্রশাসন, নারী ও শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনগুলোতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আছে, যেগুলো ৫ আগস্টের পর আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিরও বক্তব্য ছিল।

যেমন বলেছিলাম, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে জমি-সম্পত্তিতে নারীদের সমানাধিকার নিশ্চিত করা এবং সব কাজে সমশ্রমে সমমজুরি নিশ্চিত করার কথা। যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ২০০৯ সালের হাইকোর্ট নির্দেশনা অবলম্বন করে কারখানা-সচিবালয়সহ সব প্রতিষ্ঠানে “যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা” কার্যকর করা।’ শ্রমিক বিষয়ে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, নিয়মিত মজুরি পরিশোধের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইত্যাদি অন্যতম। এ রকম অনেক সুপারিশই বর্তমান সরকার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে।

সংস্কার কমিশনগুলোর রিপোর্ট নিয়ে সমাজে যথেষ্ট আলোচনা নেই। তবে ধর্মীয় দল-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে। উত্তরাধিকার প্রশ্ন কিংবা নারীর অধিকার প্রশ্ন এলেই বাংলাদেশের বৈষম্যবাদী রাজনীতি বা মতাদর্শ ধারণকারীদের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

কোনো যুক্তিযুক্ত আলোচনা নয়, ধর্ম আর সংস্কৃতির নামে হুংকার শোনা যায়, উন্মাদনা ও সহিংসতা তৈরি করার চেষ্টা চলে। এবারও তাই হচ্ছে। নারীকে প্রতিপক্ষ ধরে তাদের সক্রিয়তা হুংকার যত আওয়াজ দেয়, সমাজের বৈষম্য, নিপীড়ন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের অনেকগুলোর সঙ্গে আমরা একমত। তবে দুটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। মূলনীতি নতুনভাবে দাঁড় করাতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর যুক্তিটাই সমস্যাজনক।

বলা হয়েছে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভক্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে...এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।...’ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিলে বহুত্ববাদ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক কী করে হয়? কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে—রাষ্ট্র সব ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে, সব ধর্ম–মতের মানুষকে ধারণ করবে। এতে কীভাবে ‘বিভক্তি ও বিভ্রান্তি’ তৈরি হয়? দেয়ালের গ্রাফিতিতে বহু জায়গায় বলা হয়েছে ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। সেটাই ধর্মনিরপেক্ষতা।

শুধু অন্য ধর্মের মানুষ নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যেও বহু সংখ্যালঘু থাকে। তাদের জন্যও নীতি–বিধিব্যবস্থা প্রণয়নে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের আরও দাবি—এটি ‘অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে’। বস্তুত, উল্টো সেই শাসন তৈরি হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রতারণা করে, ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা জারি করে, মুক্তিযুদ্ধকে অপব্যবহার করে এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারের ব্যবস্থা করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার উদগ্র বাসনায়।

সংবিধানের মূলনীতিতে ‘সমাজতন্ত্র’ ছিল অলংকার হিসেবে। তবে এটি বাদ দেওয়ার যুক্তিটিও ভুল। বলা হয়েছে, ‘সমাজতন্ত্র মূলত গণতন্ত্রবিরোধী শাসনব্যবস্থা।’ সমাজতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে হবে পুঁজিবাদ আর গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে হবে স্বৈরতন্ত্রকে। পুঁজিবাদের মতো সমাজতন্ত্রেরও বিভিন্ন ধরন আছে।

বর্তমানে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভেনেজুয়েলা, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়ার মতো বহু দেশে বামপন্থী/সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত দলগুলো নির্বাচন করছে, ক্ষমতায়ও যাচ্ছে। ইউরোপের বহু দেশে ডানপন্থী আক্রমণের মুখে প্রবাসী মানুষ এ রকম দলের ভরসাতেই থাকেন।

কমিশন ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র কথা বলেছে। আসলে এটি কতিপয় গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত প্রাণবিনাশী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই পন্থী কিছু গোষ্ঠী ছাড়া দুনিয়ার কেউ এটাকে আর কাঙ্ক্ষিত পথ বলে মনে করে না; ইউরোপ-আমেরিকাতেও নয়।

এই পথ ধরলে এটাও বলতে হবে—‘সাম্য’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ কথাগুলো আমরা রেখেছি অলংকার হিসেবে। আর এটাও বলতে হবে যে বৈষম্যহীনতার দিকে যাওয়ার পরিবর্তে বৈষম্য বৃদ্ধির দিকে যাওয়ার অর্থনীতিই অব্যাহত থাকবে। বলতে হবে এটাই ‘বৈশ্বিক এবং জাতীয় প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক’। মানতে হবে যে দেয়ালের গ্রাফিতিতে ভুল প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছিল!

● আনু মুহাম্মদ শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

গ্রাফিতির চাওয়াগুলো কি তবে ভুল ছিল

Sunday, April 27, 2025

কীভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল আওয়ামী লীগ, যা বললেন আনু মুহাম্মদ

আওয়ামী লীগের শাসনামলে কীভাবে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, সে বিষয়ে একটি ভাষ্য সামনে এনেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা ফ্যাসিবাদী শাসনের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে—সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসা এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেছেন, ‘সত্যটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যে ফ্যাসিবাদ হয়েছে, সেটা ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে হয়নি, ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রতারণা করার কারণে হয়েছে।’

আনু মুহাম্মদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার সঙ্গে প্রতারণা করে, ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে, ধর্মীয় নিপীড়নকে নানাভাবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, মুক্তিযুদ্ধকে অপব্যবহার করে এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল আওয়ামী লীগ।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাস: ভূমিকা ও সংস্কার প্রস্তাব’ শিরোনামে পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। এতে সভাপ্রধানের বক্তব্য দেন আনু মুহাম্মদ। সভায় জননিরাপত্তা, সংবিধান, শিক্ষা, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, শ্রমিক, কৃষকের সংকটসহ ১৩টি বিষয়ে বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির অন্য সদস্যরা।

সংবিধানের মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে বহুত্ববাদ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশের কঠোর সমালোচনা করে সভায় আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিলে বহুত্ববাদ কী করে হয়? কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই হচ্ছে যে রাষ্ট্র সব ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে। কোনো ধর্মের ব্যাপারে পক্ষপাত থাকলে বহুত্ববাদ কী করে হবে?’

ধর্মনিরপেক্ষতা ফ্যাসিবাদী শাসনের ভিত্তি কায়েম করেছে—এ ধরনের বিপজ্জনক কথা কী করে সংবিধান সংস্কার কমিশন থেকে আসতে পারে, তা বুঝতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সত্যটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে যে ফ্যাসিবাদ হয়েছে, সেটা ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে হয়নি, ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রতারণা করার কারণে হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতারণা করে, ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে, ধর্মীয় নিপীড়নকে নানাভাবে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, মুক্তিযুদ্ধকে অপব্যবহার করে এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল আওয়ামী লীগ।

সংবিধানের মূলনীতি থেকে সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সংস্কার কমিশন যেভাবে বলছে সমাজতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থা, তারা তো নিশ্চয়ই জানে যে পুঁজিবাদের যেমন অনেক রকম মডেল আছে, সমাজতন্ত্রেরও বিভিন্ন ধরন আছে।...তার চেয়ে পরিষ্কার করে বলুক সমাজতন্ত্র বাদ দিয়ে পুঁজিবাদ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা সংবিধানের সংস্কার করার কথা বলে এই মাধ্যম যদি আপনারা গ্রহণ করেন, তাহলে বৈষম্যহীনতার দিকে যাওয়ার পরিবর্তে বৈষম্য বৃদ্ধির দিকে যাওয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তিটা তৈরি করছেন। সেটা তাহলে কোথায় সংস্কার, কোথায় পরিবর্তন?’

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, উত্তরাধিকার প্রশ্ন কিংবা নারীর অধিকার প্রশ্ন এলেই বাংলাদেশের বৈষম্যবাদী রাজনীতি বা মতাদর্শ যারা ধারণ করে, ধর্মের নামে হোক, জাতির নামে হোক, তাদের মধ্যে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। কারণ, ধর্ম পালন করুক বা না করুক, নারী প্রশ্ন এলেই ধর্মের অজুহাত দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আবার সেটা নিয়ে একটা উন্মাদনা ও সহিংসতা তৈরি করার চেষ্টা চলে। কিছু লোক ধর্মের নাম করে হত্যার কথা বলছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই।

সংস্কার বিষয়ে সভায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু কিছু কাজ আছে, যেগুলো বর্তমান সরকারই করে ফেলতে পারে। কিন্তু সংস্কার আগে না নির্বাচন আগে—এই অপ্রয়োজনীয় একটা বিতর্কের কথা শোনা যাচ্ছে। কিছু কিছু সংস্কার এই অন্তর্বর্তী সরকারই করতে পারে, আবার কিছু কিছু সংস্কার আছে যেগুলো করার জন্য নির্বাচিত সরকার দরকার। অন্তর্বর্তী সরকারই যেগুলো করতে পারে, সেগুলো করতে বাধা কোথায়, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘সম্পর্কের’ বিষয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বসুন্ধরা গোষ্ঠীর সঙ্গে খাতির করে তো কোনো পরিবর্তন আসবে না। একদিকে পাইকারি মামলা হচ্ছে, বহু নিরপরাধ ও নিরীহ লোক হামলা-মামলায় আতঙ্কিত আর অন্যদিকে বসুন্ধরার মতো প্রভাবশালী লোকেরা আপনাদের সঙ্গে বৈঠক করে, তাদের নানা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে—এই বৈপরীত্য চলবে না। এগুলোর অবসান এবং পরিবর্তন আমাদের দাবি, করতে হবে।’

মূলত ‘দীর্ঘকালীন স্থায়ী সরকারের’ কথা বলতে গিয়ে আনু মুহাম্মদ বসুন্ধরা গ্রুপের প্রসঙ্গ টানেন। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবি বা বহুজাতিক কোম্পানি—এই তিন গোষ্ঠীকে স্থায়ী সরকারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরা যদি একই রকম ক্ষমতাবান থাকে, একই রকম সক্রিয় থাকে এবং একইভাবে তাদের নীতিমালায় যদি দেশ চলতে থাকে, তাহলে কোনো ধরনের পরিবর্তন হবে না।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, বিগত সরকারের সময় বোঝা যেত আদালতের রায় কী হবে। এখনো বোঝা যায় যে রায় কী হবে। তাহলে পরিবর্তনটা কী হলো? কে জামিন পাবে, কে খালাস পাবে, কে আটক থাকবে, কার জামিন হবে না, এগুলো তো পরিষ্কার বোঝাই যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাইরের জানা-অজানা বিভিন্ন ধরনের গোষ্ঠীর প্রভাবে যদি আদালত চলে, তাহলে এই সরকার যে সংস্কার বা পরিবর্তন করতে আগ্রহী, তার প্রকাশটা কোথায়?

মডেল মেঘনা আলমের গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রসঙ্গে এই অধ্যাপক বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক, এমনকি যুদ্ধাপরাধীও যদি হয়, তার ঘরবাড়ি, ঘরের জানালা, দরজা ভেঙে, কোনো রকম কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসবে, এটা কারও ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য নয়।’

মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তির ব্যাপারে তো মানুষের জানতে হবে। খালি সরকার, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী কিংবা যে প্রবাসী লোকজন এখন দেশের স্বার্থে বিদেশের আরাম-আয়েশ ছেড়ে বাংলাদেশে কাজ করতে এসেছেন, তাঁরা বললেই তো হবে না। আমাদের তো পরিষ্কার জানতে হবে যে আসলে ঘটনাটা কী হচ্ছে। আমাদের স্বার্থ আছে কি না, সেটা জানতে হবে।’

মার্কিন কোম্পানি থেকে এলএনজি আমদানির সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, দরকার হচ্ছে এলএনজি আমদানির নীতিমালা থেকেই বের হয়ে আসা। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কাজটা এই সরকারকে করতে হবে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে আমাদের শতভাগ মালিকানায় গ্যাস সম্পদটা পুরোপুরি আমরা যাতে ব্যবহার করতে পারি, সেই উদ্যোগগুলো নিতে হবে। আট মাসে এটার ব্যাপারে কি কোনো উদ্যোগ নেওয়া যেত না? আট মাসে কি নীতিমালার মধ্যে কিছু পরিবর্তন আনা যেত না?’

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এই সভায় সংবিধান ও বিচার বিভাগ নিয়ে কথা বলেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। ‘কৃষি ও কৃষকের সংকট’ নিয়ে বক্তব্য দেন লেখক-গবেষক মাহা মির্জা।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে বক্তব্য দেন চিকিৎসক মো. হারুন-অর-রশিদ। শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সামিনা লুৎফা ও গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছায়েদুল হক। শিল্প ও শ্রমিকের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন শ্রমিকনেতা সত্যজিৎ বিশ্বাস। দ্রব্যমূল্য ও অর্থনীতি নিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু। জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন সাবেক ছাত্রনেতা বাকি বিল্লাহ। হরিজন জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কথা বলেন সীমা দত্ত। পাহাড় ও সমতলের জাতিগোষ্ঠীর বিষয়ে আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হেমা চাকমা। নারী ও লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী বিষয়ে বক্তব্য দেন ফেরদৌস আরা রুমী। সভার সঞ্চালক ছিলেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলীপ রায়।

‘অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাস: ভূমিকা ও সংস্কার প্রস্তাব’ শিরোনামে পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ঢাকা, ২৬ এপ্রিল
‘অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাস: ভূমিকা ও সংস্কার প্রস্তাব’ শিরোনামে পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ঢাকা, ২৬ এপ্রিল। ছবি: প্রথম আলো

Thursday, November 14, 2024

জনগণকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সংস্কার সম্ভব

জনগণকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক তৎপরতা ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সংস্কার করতে হবে। ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ ও সংস্কার ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এমন মত পোষণ করেছেন আলোচকরা। বুধবার বিকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাসদ (মার্ক্সবাদী) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। রাষ্ট্র সংস্কারে ছয়টি বিষয় নিয়ে এতে বিশদ আলোচনা করা হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, আমাদের দেশে যত নীতিমালা করা হয়েছে একটাও বাংলা ভাষায় লেখা না। সবগুলো ইংরেজি ভাষায় লেখা। এটা করে জনগণকে তার স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশের যতগুলো নীতিমালা মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সবগুলো বাংলা ভাষায় লিখতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত যারা আছেন, তাদের সবাইকে পাবলিক এডুকেশন ও পাবলিক হেলথ কেয়ার ব্যবহার করতে হবে। তাদের ছেলেমেয়েরা যেন ব্যয়বহুল স্কুল ছেড়ে দেশের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা নেন এবং সদর হাসপাতালগুলোতে সেবা গ্রহণ করেন, সেটা বাধ্যবাধকতা করা। তবেই এসব প্রতিষ্ঠানগুলো প্রসিদ্ধ হবে। এটাকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা দিতে হবে।

আনু মুহাম্মদ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সব থেকে কম খরচ করা হয় শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে। পুরো অর্থনৈতিক নীতিমালার মধ্যে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, ’৭১কে ’২৪-এর মুখোমুখি দাঁড় করানো বা বিপরীতে নিয়ে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রবণতা। কী কারণে ’৭১ থেকে ’২৪ বিচ্ছিন্ন হবে? ’৭১ এই জনপদের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধের জায়গা, অভ্যুত্থানের জায়গা। জনগণের আত্মবিশ্বাসের জায়গা। এখনো ’৭১ থেকেই মানুষ অনুপ্রেরণা পায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও আমরা একাত্তরের আওয়াজ নানাভাবে শুনেছি।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের কারণে, চাপে সংবিধানে অনেকগুলো মৌলিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংবিধানে আছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার রাষ্ট্র বহন করবে। মুক্তিযুদ্ধের কারণেই এই অধিকারগুলো সংবিধানে আছে। এসবের সঙ্গে ’২৪-এর অর্জন যোগ করতে হবে। কোনো কিছু বিয়োগ করা যাবে না।  

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দু’টি বড় সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে একটা অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতন হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজধানী সহ সারা দেশে বিভিন্ন প্রস্তাব হচ্ছে, আলোচনা, বিতর্ক হচ্ছে এটা দ্বিতীয় সাফল্য।

অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের মধ্যদিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন সরকারের মধ্যে পড়েছে, এটা আমার মনে হয় না। সরকারের ভূমিকা এই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে- এটা বলা যায় না। দেয়ালের গ্রাফিতিগুলোর মধ্যে যে আকাক্সক্ষা ব্যক্ত হয়েছে সেটা সরকারের ভূমিকার চেয়ে অনেক বেশি পরিণত মনে হয়েছে। দেয়ালে যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থা দেখা যাচ্ছে, সরকারের ভূমিকার মধ্যে আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি না।

সরকার ও জনসাধারণের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের লোক পরিচয় পাওয়া গেলে, তাদের উপরে হামলা করলে- তাদের পতন হবে না। এতে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা আরও বাড়বে। এতে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে বিরোধিতা করা হবে। আপনারা যদি এমন কাউকে চেনেন যারা হামলা,  বিদ্বেষী তৎপরতা চালাচ্ছে তাহলে মনে করবেন তারাই পতিত স্বৈরাচারের দোসর, সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। তাদের থামানোটা আপনাদের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

লেখক, গবেষক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, প্রধান সমস্যা সংবিধান নয়, নির্বাচন কমিশনও নয়। জনগণের সংগঠিত চাপ না থাকলে আজকে আমরা এই সভা করতে পারতাম না।

তিনি বলেন, আমাদের যদি প্রশাসনকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাই তাহলে তাদেরও নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলের ভেতরে যদি গণতন্ত্র না থাকে তবে আপনি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চা করতে পারবেন না।

এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, শিক্ষা যদি একটি জাতীয় সম্পদ হয় তাহলে এটা বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয় হতে পারে না। অন্য দেশে ৬ বছর প্রাথমিক ও ৬ বছর মাধ্যমিক শিক্ষা যদি অপরিহার্য হয়, তাহলে সেটা কেন আমরা বিনা পয়সায় দেবো না। শিক্ষায় গণতন্ত্র মানে হলো- জাতীয় খরচে মাধ্যমিক পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পাবে। একজন শিশু সাবালক হওয়া পর্যন্ত তার সব ধরনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। আমরা এটি শুধু তার পরিবারের উপর বণ্টন করে দিয়েছি।

নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, এই সরকারের মধ্যে অধিকাংশই একেবারে বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া এরা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি না। তাদের জীবনে তারা স্বল্পমাত্রায়ও কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাদের আমরা যে দায়িত্ব দিয়েছি বা তারা যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সেটা পুরোটাই একটা রাজনৈতিক ব্যাপার। আর যাদেরকে চিনি না তাদের সম্পর্কে আমার ন্যূনতম ধারণা নাই। এই অচেনা লোকেরা কী করবেন আর কী করবেন না তা নিয়ে একটা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। যাদের চিনি তারা তো উদ্বেগের মধ্যে আছেনই।

তিনি আরও বলেন, সংবিধানে পরিবর্তন আসবে কি আসবে নাÑ এটা নির্ভর করে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রয়োগের উপরে। আমরা মনে করি, আমাদের সবাইকে রাজনৈতিকভাবে তৎপর হতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করে চাপ প্রয়োগ করেই সংস্কার সম্ভব।

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, সব রাজনৈতিক দলগুলোকে এক জায়গায় না এনে সংস্কার বাস্তবায়ন করা যাবে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটি নিশ্চিত।

বাসদ (মার্কসবাদী) সভাপতি মাসুদ রানার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ।

Friday, November 1, 2024

’৭২ ও ’৯১-এর মতো গত তিন মাসেও আশাভঙ্গের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে: আনু মুহাম্মদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এবং এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে মানুষের যে আশাভঙ্গ হয়েছিল, গত তিন মাসেও তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এসব লক্ষণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলোশহর রেলস্টেশনে আয়োজিত এক সমাবেশে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদের ব্যানারে এই সমাবেশ হয়।

সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা যদি মনে করি, যে লঙ্কায় যায় সে–ই রাবণ হবে, তাহলে পরিবর্তন করে আর লাভ হলো না। এটি কী কারণে হয়, সেটি আমাদের বুঝতে হবে।’

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, কৃষক-শ্রমিকসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ দেখার মতো রাজনৈতিক সংগঠিত শক্তি বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। তৈরি হয়নি বলেই এত বড় একটি মুক্তিযুদ্ধের পরে, লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হওয়ার পরেও, বাংলাদেশে শোষক-লুটেরা শ্রেণি আবার নতুন করে তৈরি হয়েছে। নব্বইয়ে গণ-অভ্যুত্থান হলো, এরশাদ গেল, কিন্তু লুটেরা শক্তি আবার ক্ষমতায় থাকল। তিন মাস আগে এত বড় গণ-অভ্যুত্থানের পরেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন কিংবা ভবিষ্যৎ চিন্তায় সেই পরিবর্তনের লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে না।

সমাবেশে দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি করার সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখি ছাত্ররা দিনের পর দিন সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে রাখে, কিন্তু শ্রমিকেরা বকেয়া মজুরির দাবি জানালে আগের সরকারের মতো গুলি করছে, বিভিন্ন অপবাদ দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, এরা আওয়ামী লীগের লোকজন। আওয়ামী লীগ বললেই তো হবে না। আওয়ামী লীগ এখানে সুযোগ নিতেই পারে। সুযোগ নিতে সুবিধা তখনই হবে যখন এই সরকার আওয়ামী লীগের মতো ভূমিকা নেবে।’

দেশে ঢালাও মামলা হওয়ার কারণে আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘কিছুদিন আগে বড় বড় অপরাধীদের বেশ কয়েকজন ছাড়া পেয়ে গেল। আমি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এত বড় বড় অপরাধী ছাড়া কীভাবে পাচ্ছে? তিনি উত্তর দিলেন “আমি কিছু জানি না।” তাহলে কারা জানে? সেটাও তিনি জানেন না। তাহলে সিদ্ধান্ত কীভাবে হচ্ছে? একদিকে দেখতে পাচ্ছি  বড় বড় অপরাধী  ছাড়া পাচ্ছে, অপরাধীরা দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে এমন অনেকের নামে মামলা হচ্ছে, যাতে মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।’

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে থাকা আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আগের সরকারের সময় আদালত সরকারের নির্দেশ দ্বারা পরিচালিত হতো। আদালত বলে কিছু ছিল না। আদালত এবং বিচারপ্রক্রিয়া যদি যথাযথ না হয় তাহলে একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার কথা বলছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কীভাবে হচ্ছে, এটিই আমাদের অজানা।’

সমাবেশে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানান আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শ্রমজীবী। তাঁরা দেশে কাজ করছেন, বিদেশে কাজ করছেন। ঘরের শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, বিনা মজুরিতে কাজ করছেন। তাঁরা প্রতারিত হচ্ছেন, জুলুমের শিকার হচ্ছেন। এই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাঁদের স্বার্থে যদি রাষ্ট্র না আসে, তাহলে লুটেরাদের পুনরুৎপাদন হবে। শ্রমিকদের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ কোনো সরকারই করতে পারেনি। এই সরকার এসেই এটি করতে পারত। কিন্তু সরকার এটি বিবেচনা করেনি।’

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতার অভাবে গত সরকার স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান সরকারে এই দুটির অভাব কোনোভাবেই গ্রহণ করব না। এখানে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কীভাবে খুনিরা ছাড়া পেয়ে যায়, সেটির জবাবদিহি থাকতে হবে। কীভাবে মামলাগুলো যথাযথ না হয়ে পাইকারিভাবে হয়, সেটির জবাবদিহি করতে হবে। কেন নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি হয় না, এর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কেন কাজ করছে না, সেটির জবাবদিহি থাকতে হবে। কী কারণে জিনিসপত্রের দাম কমছে না, কাদের কারণে কমছে না, এর জবাবদিহি করতে হবে। এই জবাবদিহি কিংবা স্বচ্ছতার জায়গাটা খুব শক্তিশালীভাবে থাকতে হবে।’

সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মাহা মির্জা বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া জনতার একটি বড় অংশ কিন্তু মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত কিংবা ঢাকাবাসীর ধনীরা ছিল না। বড় অংশ ছিল শ্রমজীবী মানুষ, শ্রমিক, হকার, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ছোট দোকানদার, ছোট ব্যবসায়ী। অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ রাস্তায় নেমেছেন, জীবন দিয়েছেন। ছাত্র, জনতা এবং শ্রমজীবী মানুষ এক হয়ে লড়াইটা করেছিলেন। ছাত্র-জনতা এক না হলে প্রতাপশালী স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হতো না।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা আরও বলেন, ‘হতাশার সঙ্গে বলতে হচ্ছে এই যে নতুন বাংলাদেশ আমরা বলছি, স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা বলছি, তা আসলে কতটুকু নতুন? শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর নতুন সরকার গঠনের পরে আমরা নতুন কী পেলাম? আদৌ নতুন কিছু পেলাম কি না, এই প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে সরকার আসে সরকার যায়; কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষ, দরিদ্র মানুষ এবং শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের কেন পরিবর্তন হয় না? সরকার পরিবর্তনের পরে নতুন আশার সঞ্চার হয়, কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।’

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা অধিকার রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক আসমা আক্তার। সংগঠনটির সদস্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওমর সমুদ্রের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনটির উপদেষ্টা অধ্যাপক তাহুরিন সবুর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জি এইচ হাবীব, কবি ও সাংবাদিক আহমেদ মুনির, আন্দোলনে চোখ হারানো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শুভ, গৃহকর্মী নূপুর বেগম প্রমুখ।

সমাবেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, আর্থিক সহযোগিতা ও আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন, সরকারি খাসজমি উদ্ধার করে ভূমিহীনদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা ঘোষণা, গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াসহ ১০ দফা দাবি জানায় আয়োজক সংগঠন।

সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।  আজ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলোশহর রেলওয়ে স্টেশনে
সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলোশহর রেলওয়ে স্টেশনেছবি: প্রথম আলো

Wednesday, October 30, 2024

আ.লীগ ভেবেছিল ক্ষমতা চিরস্থায়ী : আনু মুহাম্মদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ ভেবেছিল ক্ষমতা চিরস্থায়ী। জনগণকে কিছু শুধু দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখিয়েছে। পরবর্তীতে কী হতে পারে, সেটা তারা ভাবেনি।

মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠিত ‘ফ্যাসিবাদ নিয়ে বোঝাপড়া’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। জবি শিক্ষার্থীরা ত্রৈমাসিক ‘চিন্তক’ এই সেমিনারটির আয়োজন করে।

তিনি বলেন, আমাদের টাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন যা হয়েছে- সে বিষয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। কত টাকায় হওয়ার কথা- কত টাকায় হলো সেটাও জানার বা প্রশ্ন করার অধিকার ছিল না আমাদের। তাদের কথা একটাই ছিল, বঙ্গবন্ধুর কন্যার দ্বারা কোনো ক্ষতি হবে না।

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, আমরা বিগত বছরগুলোতে যে নির্বাচন দেখেছি তা কোনো নির্বাচন ছিল না। এটা ছিলো একটা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা। তাছাড়া আমরা যখন দুর্নীতি, গুম, খুন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতাম, তখন তারাও স্বীকার করতো বিষয়গুলো কিন্তু ব্যবস্থাটা এমন ছিল যে এর বিরুদ্ধে কারও কিছু বলার ছিল না। কারণ এসব কার্যক্রম একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মধ্যে আটকে ছিল।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে সতর্ক করতাম, তারা শুধু এটাই বলতো যে বঙ্গবন্ধুর কন্যার দ্বারা ক্ষতিকর কিছু হবে না।

অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে মাসিক সাম্যবাদের সম্পাদক ডা. জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য বলেন, ফ্যাসিবাদ আসলে একটা ব্যবস্থা। এটা শুধু একটা দলের কাজ নয়। এখানে বিভিন্ন অনুষঙ্গের মাধ্যমে এই ধরণের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পিছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বড় বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ।

জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য আরও বলেন, আমাদের কাঠামোটাই ফ্যাসিবাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান সরকারও এর ভেতর থেকে বের হতে পারছে না। আওয়ামী লীগ যে এত মানুষ হত্যা করেছে, তারপরও তাদের বিন্দু মাত্র অনুশোচনা নাই। আমরা দেখেছি সরকার নিপীড়নের জন্য পুলিশকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে। আমরা চাই সংবিধান এমনভাবে সংশোধন করা হউক, যাতে করে ভবিষ্যতে চাইলেই কেউ আমাদের হাতে হাতকড়া পড়াতে না পারে। একটা গণআন্দোলনকে জোরপূর্বক যাতে দমন না করা হয়। 

জবিতে ‘ফ্যাসিবাদ নিয়ে বোঝাপড়া’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থিত অতিথিরা। ছবি : কালবেলা
জবিতে ‘ফ্যাসিবাদ নিয়ে বোঝাপড়া’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থিত অতিথিরা। ছবি : কালবেলা

Saturday, September 14, 2024

আনু মুহাম্মদের বিশেষ সাক্ষাৎকার: বৈষম্য সৃষ্টিকারী রাজনীতি বন্ধ করতে হবে

আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্যবিরোধী তত্ত্বচর্চা ও লড়াইয়ে সক্রিয় তিনি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ যে কোনো ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন সব সময়। ছিলেন তেল-গ্যাস-খর‌্যসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব। বাংলাদেশে মার্কসীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি সবচেয়ে পরিচিত লেখক। সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকারসহ নানা বিষয় নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন।

কালবেলা: জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের কী বার্তা দেয়?

আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থানের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি দীর্ঘ সময় ধরে যেভাবে জনগণকে নির্যাতন করেছে, যেভাবে জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে, যেভাবে স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকাশ করেছে— তাতে মানুষ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ধরে দেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে গেছে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি করেছে, মেগা প্রকল্পের নামে ভয়ংকর সব দুর্নীতি করেছে এবং বিভিন্নভাবে দখলবাজি ও নানা উপায়ে মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছে। মানুষ বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাতে তারা কর্ণপাত না করে লুটপাট করে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সেভাবে আস্থা রাখতে পারেনি। তাই রাজনৈতিক দলের ব্যানারে বৃহদাকার তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু আন্দোলন কোনো না কোনোভাবে ছিল। বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে, একাধিক বড় বড় ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। হাসিনা সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে লেখালেখি হয়েছে। হামলা, হুমকি, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনসহ বিভিন্ন আইনের ভয় মাথায় নিয়েই প্রতিবাদ হয়েছে। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও প্রতিবাদ উঠেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনও সাধারণ একটি আন্দোলন ছিল। এটা ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকারের আন্দোলন। সরকারের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া মোটেই কঠিন বিষয় ছিল না। কিন্তু সরকার তার স্বৈরতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব এবং জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার অভ্যাস থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মানতে অস্বীকার করে। সরকার শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। সরকার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নানা টালবাহানা এবং বল প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। কিন্তু বল প্রয়োগের ফলে ছাত্রদের এই আন্দোলন স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে এবং ব্যাপক আকার ধারণ করে। পহেলা জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করেছে। পাশাপাশি শিক্ষকরাও সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে তাদের বাদ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। এ দুই জায়গাতেই সরকারি দলের অনেক লোকজন অংশগ্রহণ করে। যে শিক্ষকরা সারাক্ষণ সরকারের তোষামদি করতে ব্যস্ত থাকত তারাও আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে কর্মবিরতিতে যায়। একই সঙ্গে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের অনেক কর্মীও অংশগ্রহণ করে। কারণ ছাত্রলীগের কিছু সুবিধাভোগী থাকলেও বাকিদের চাকরি প্রয়োজন ছিল। তাদের জীবিকা দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের লুণ্ঠনমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি। তাই জীবিকার কথা চিন্তা করে অনেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশে মূলত চারটি দল স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশে বড় কোনো আন্দোলন তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানারে হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। কারণ দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর গায়ে অনেক কলঙ্ক রয়েছে। তাদের অতীত ইতিহাস এবং রেকর্ড মানুষ ভোলেনি। আমরা দেখেছি এই আন্দোলনটা কিভাবে রাজনীতির ব্যানারের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনগণের ভেতর থেকে উঠে এসেছে। এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে বৃহৎ আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিক দল আবশ্যকীয় না। জনগণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেও একটি ব্যাপক আন্দোলন তৈরি হতে পারে।

এই আন্দোলন থেকে আমাদের শিক্ষা হলো, কোনো অন্যায় চিরদিন চলতে পারে না। একটা দীর্ঘ অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যখন মানুষ জেগে ওঠে এবং বিদ্রোহ করে তখন সেটা অপ্রতিরোধ্য হয়।

কালবেলা: আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ কখন ঘটতে থাকে এবং কেন ঘটে?

আনু মুহাম্মদ: মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের সামনে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। তাছাড়া এটা ছিল একটা ন্যায্য আন্দোলন। তাই দল-মত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনে। প্রথমে তারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেনি শুধু তাদের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তাদের উপর আক্রমণ করা শুরু করে, সেটা জনগণ গ্রহণ করতে পারেনি। প্রথমত, জনগণের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল তারপর শিক্ষার্থীদের ন্যায্য এই আন্দোলনে নৃশংসভাবে হামলা- সবমিলে জনগণ মাঠে নেমে আসে। সেখানে শ্রমিক, কৃষকের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আন্দোলনে সরকার যত নৃশংসতা বাড়াতে থাকে আন্দোলনে জনগণের সমর্থন এবং সম্পৃক্ততা তত বাড়তে থাকে। মানুষ সরকারি বাহিনী ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের আক্রমণকে সম্পূর্ণ তুচ্ছ জ্ঞান করে দৃঢ়তার সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে।

শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের সূত্রপাত করলেও এক সময় এই আন্দোলন হয়ে ওঠে গণমানুষের। শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, শিল্পী, আইনজীবী নির্বিশেষে এই আন্দোলন হয়ে ওঠে সবার। আন্দোলনে একদিকে গণমানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে অন্যদিকে সরকারকে দেখা যায় আক্রমণাত্মক। ৪ আগস্ট আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তেও সরকারের মধ্যে কোনো অনুতাপ দেখা যায়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনও বলেছিলেন, এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করছে তারা সবাই সন্ত্রাসী, তাদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শেখ হাসিনা সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংসতা আরও বাড়াবে।

২ আগস্ট দ্রোহযাত্রার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবিটা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। এরপর সরকারের পতন ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। কারণ সরকারের বল প্রয়োগের সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা আর সম্ভব ছিল না। গুলি করে মানুষ মেরে তাদের পক্ষে আর টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। একদিকে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো অব্যাহত রাখে, অপরদিকে ছাত্র-জনতার মিছিলে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

কালবেলা: গণআন্দোলন সফল হওয়ার পর এখন রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠছে। এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কি বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণমানুষের একটি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। তারা একটি পরিবর্তন চান- এজন্য তারা রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছেন। মানুষ বলছে, আমরা আর আগের মতো অবস্থা চাই না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির যে শাসনকাল মানুষ এখনো মনে রেখেছে সেই ধরনের শাসন মানুষ আর দেখতে চায় না। তরুণ শিক্ষার্থীদের আঁকা দেওয়ালের গ্রাফিতিগুলোতে বলছে, আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই - যেখানে কোনো নিপীড়ন থাকবে না, কোনো বৈষম্য থাকবে না।

বৈষম্যহীন কথাটির ক্ষেত্র অনেক বড়। এই বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে একটা দেশকে অগ্রসর হতে গেলে তার রাজনীতি খুবই স্পষ্ট হতে হবে। রাজনীতির লক্ষ্য এবং কর্মসূচি স্পষ্ট হতে হবে। আমরা এখন পর্যন্ত সেটা দেখিনি। মানুষের মধ্যে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে সেটা কোন দিকে যাবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক দলগুলো বৈষম্যহীনতার কথা বলছে কিন্তু বৈষম্যেরই রাজনীতি করছে। যদি এমনটাও ঘটে যে, ভিন্নমতের ওপর হামলা হচ্ছে তাহলে সেটাও এই সম্পূর্ণ বৈষম্যহীনতার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। যত দ্রুত রাজনীতির লক্ষ্য এবং কর্মসূচি স্পষ্ট হবে ততই ভালো।

আমরা জানি স্বৈরাচারী সরকারের নানা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ছিল। একটা সুবিধাভোগী শ্রেণি ছিল যারা খুব দ্রুত অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে। এছাড়াও নানারকমের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ছিল যাদের সরকার নানাভাবে সুবিধা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তির নানা রকম স্বার্থ এখানে যুক্ত। ফলে এসব সুবিধাভোগী এবং আন্তর্জাতিক শক্তির নানা রকমের প্রচেষ্টা ছিল এই দেশকে নিজেদের স্বার্থের দিকে নিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশ যদি জনগণের হাতে আসে তাহলে তারা কেউ খুশি হয় না। তারা সবাই চাইবে তাদের পালিত বা তাদের সুবিধা দেবে এমন কোনো গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা থাকুক। এই চেষ্টা এখনো দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার একটি বড় দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের সামনে বিরাট পরীক্ষা। এই গণঅভ্যুত্থান থেকে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, গুরু দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

কালবেলা: আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং সাহসী ভূমিকা দেখেছি। তাদের এমন ব্যাপক অংশগ্রহণকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আনু মুহাম্মদ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমাদের প্রায় সবার সাধারণ ধারণা যে, এখানে শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই পড়ালেখা করে। কিন্তু এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। আমি এমন অনেক পরিবারকে চিনি যারা ঋণ করে এবং পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি করে সন্তানকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াচ্ছেন। শিক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে মানুষ সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে পরিবারের অন্য সদস্যরা রক্ত বিক্রি করে হলেও তার চিকিৎসা করার চেষ্টা করে। তেমনি সন্তানের লেখাপড়ায় একজন অতি দরিদ্র ব্যক্তিও তার সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশে গত এক দশকে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একজন দরিদ্র পিতাও মনে করছেন শিক্ষার উপর ভর করে তার সন্তান যেন দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্র থেকে বের হতে পারে।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুপাতে যথেষ্ট আসন নেই। এ কারণে কষ্ট করে হলেও অভিভাবকরা সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দিতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করাচ্ছেন। উচ্চবিত্ত শ্রেণির সন্তানরা দেশে লেখাপড়া করে না। তারা সন্তানদের বিদেশে লেখাপড়া করতে পাঠায় এবং তাদের এ দেশে কোনো চাকরিও দরকার নেই। কিন্তু এই দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জীবিকার প্রয়োজন।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা আন্দোলনের শুরু থেকেই সমর্থন জুগিয়েছে। তারা যখন দেখছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এভাবে আক্রান্ত হচ্ছে তখন তারা ঘরে বসে থাকতে পারেনি। তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং রাস্তায় নেমেছে। আমাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেছে, যখন পুলিশ আমাদের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালালো আমার সামনে ছয়জন শিক্ষার্থী মারা গেল। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি কিন্তু আমি সেখান থেকে সরতে পারিনি। কারণ আমার মনে হয়েছে, অন্যদের রেখে আমি এখান থেকে সরে যেতে পারব না।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল যে, মানুষের মধ্যে এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে। এই সময়টাতে মানুষ তার বিবেক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল এবং তাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ সামনে ছিল না। প্রত্যেকে চিন্তা করছিল যাতে সবাই নিরাপদ থাকে এবং সবাইকে রক্ষা করা যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠছে না, মার খাচ্ছে তখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তারাও যখন রাস্তায় মার খাচ্ছে তখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসে। দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী তার মাকে চিঠি লিখে যাচ্ছে, আমি আর ঘরে থাকতে পারছি না, আমি মিছিলে যাচ্ছি।

আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন ও নৃশংসতা সমাজের সব মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে দিয়েছে। এটাই ছিল এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা।

কালবেলা: অনেকেই অভিযোগ করতেন, এই জেনারেশন সমাজের কোথায় কি হচ্ছে সেটা নিয়ে সচেতন নয়। তারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ও নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু তারা সে ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আনু মুহাম্মদ: তরুণদের সম্পর্কে বড়রা সবসময়ই একটু ভুল ধারণা করে। বড়োরা সব সময় বলে, তরুণরা অবক্ষয়ের শিকার। এমন প্রবণতা সব সময়ই ছিল, সব জেনারেশনেই ছিল। আমরা জানি শিশু, কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে সংবেদনশীলতা অনেক বেশি থাকে। তাদের মধ্যে মায়া-মমতা ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা বেশি থাকে। তরুণরা অনেক বেশি মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে সত্যি, তারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে থাকে বিষয়টি তেমন নয়। মোবাইলে আরো অনেক কিছুই দেখা যায় ও করা যায়। দেশের এবং বিদেশের সব খবরাখবরও মোবাইলেই রাখা যায়। ফলে আমাদের তরুণরা টেকনিক্যালি সক্ষম ও দক্ষ হচ্ছে। এই জেনারেশনটি কমিউনিকেশনের দিক থেকে এবং তথ্য সংগ্রহের দিক থেকে অনেক বেশি দক্ষ। বিষয়টা এমন যে, যখন সে ব্যক্তিগত জগতে থাকে তখন সে এক রকম আর যখন সমাজের মধ্যে কোনো নড়াচড়া হয় তখন সে দ্রুত তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। এখানে টেকনোলজির বড় ভূমিকা রয়েছে।

কালবেলা: রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠছে। অনেকে সংবিধান সংস্কারের কথাও বলছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই?

আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশে জাতিবিদ্বেষ, ধর্মীয় বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, সম্পদ বন্টনের বৈষম্যসহ নানা রকম বৈষম্য রয়েছে। এই সব কিছু থেকে বের হতে হলে একটা কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। আমরা একটি ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছি যেটাকে পুঁজিবাদ বলে। আর এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৈষম্য একটি অনিবার্য পরিণতি। এখানে কিছু লোকের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং তারাই রাষ্ট্র চালাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে পুলিশ, বল প্রয়োগকারী সংস্থা ও আইনগত কাঠামো। ফলে আমরা যদি বৈষম্যহীন এবং সর্বজনীন বাংলাদেশ করতে চাই তাহলে এসব সমস্যাকে নির্দিষ্ট করতে হবে। এ দায়-দায়িত্ব এতটাই বেশি যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়।

শুধু সংবিধান পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। কারণ সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা চলে না। বরং ক্ষমতা অনুযায়ী সংবিধান তৈরি হয়। সংবিধান অনেক বেশি স্বৈরতান্ত্রিক বা সাম্প্রদায়িক তার মূল কারণ সিস্টেম বা ব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক এবং সাম্প্রদায়িক। আমরা যে রাষ্ট্রের মেরামতের কথা শুনছি সেখানে সংবিধান একটি অংশমাত্র। আমাদের প্রয়োজন সামগ্রিক কাঠামোর সংস্কার। যেমন, দেশের শিক্ষা কি বাণিজ্যিক থাকবে নাকি সর্বজনীন হবে? দেশের চিকিৎসা বাণিজ্যিকীকরণ হবে নাকি সবার অধিকারে আসবে? পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কি সবার হবে নাকি কিছু মানুষ প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট দিয়ে সারা ঢাকা শহরের রাস্তা দখল করে রাখবে আর অন্যরা বাসে ঝুলবে? মোটকথা পাবলিক ইন্টারেস্ট অর্থাৎ সর্বজনের স্বার্থকে সামনে নিয়ে যে রাজনীতি তার শক্তি বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হবে।

সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। আর এর জন্য সরকারের একটি সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠন করা উচিত। সেখানে বিশেষজ্ঞরা দেখবেন যে কোন কোন জায়গায় বৈষম্য এবং নিপীড়নের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। সেগুলো থেকে মুক্ত একটি সংবিধান তৈরির জন্য তারা সুপারিশ করবেন। বৈষম্যহীন সংবিধান প্রস্তাব করে সেটা জনমতের জন্যও ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।

দেশের সম্পদের মালিকানা ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পুরোপুরি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অথচ এগুলোর মালিক বাংলাদেশের মানুষ। এগুলো রাষ্ট্রের নীতি-কৌশলগত বিষয়। এভাবে বিভিন্ন সেক্টরে যে প্রশ্নগুলো রয়েছে তার উত্তর খুঁজতে হবে। সেই উত্তরগুলোকে জনগণের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সত্যি হিসেবে দাঁড় করাতে হবে।

কালবেলা: রাজনৈতিক দলগুলো কী বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রস্তুত বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো একদমই প্রস্তুত নয়। প্রতিটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের একটি শক্তি প্রকাশিত হয়। জনগণের সংগঠিত শক্তি যখন দুর্বল হয় তখন রাজনৈতিক দল, সামরিক বাহিনী কিংবা আমলাতন্ত্র আবার তাদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। এজন্য জনগণের মধ্য থেকে যে শক্তি বা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয় সেটা ধরে রাখাই বড় কাজ। যারা জনগণের সেই শক্তির পক্ষে এবং যারা মনে করেন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ তৈরি করা প্রয়োজন তারা আপাতদৃষ্টিতে যতই ছোট হোক তারা যদি এই শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং একত্র হয় তাহলে ক্রমাগত সমাজের মধ্যে একটি মতাদর্শিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটি একটি সংগ্রামের বিষয়। বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা সহজে ছাড়বে না। সুতরাং তাদের মোকাবিলা করা এবং তাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য জনগণের শক্তিকে দাঁড় করানো প্রয়োজন। জনগণের সেই শক্তিকে দাঁড় করানোর জন্য অব্যাহত চেষ্টা এবং লড়াই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের যে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে সেটা জনগণের শক্তিকে একটি কাঠামো দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই জনগণের শক্তি আমাদের জন্য একটি বড় অবলম্বন। একই রকম আরেকটা অবলম্বন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমরা সব সময়, অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ থেকে প্রেরণা খুঁজি। ফলে সেই শক্তির সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের এই শক্তি যুক্ত করতে হবে। আমি আশা করি অবশ্যই এমনটা ঘটবে। বাংলাদেশের মানুষ বৈষম্যবিহীন একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণে একট্টা হয়ে দাঁড়াবে। 

আনু মুহাম্মদ। ছবি : সংগৃহীত

Saturday, September 28, 2019

এই অভিযান হচ্ছে ক্যাসিনোকেন্দ্রিক কিছু তৎপরতা : - আনু মুহাম্মদ by তামান্না মোমিন খান

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, বর্তমানে যে অভিযান চলছে এটিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান বলা যাবে না। এই অভিযান হচ্ছে ক্যাসিনোকেন্দ্রিক কিছু তৎপরতা। ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কয়েকজনের ব্যাপারে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযান।এ অভিযান কতদূর যাবে সেটাও বলা মুশকিল। মানবজমিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

যেকোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে বা  যখন কোনো সরকারের ভাবমূর্তি সংকটের মধ্যে পড়ে বা সরকারের নিজেদের লোকদের মধ্যে সমস্যা তৈরি হলে এ ধরনের অভিযান চালানো হয়। কিন্তু এ ধরনের অভিযান বেশিদিন চলে না। যেই পুলিশ ও র‌্যাবের তত্ত্বাবধানে এইসব ক্যাসিনো চলছিল তারাই আবার এখন অভিযান চালাচ্ছে। এর পেছনে কি ঘটনা সেটা তো আর আমরা বলতে পারব না। এ অভিযানকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, এভাবে বলা যাবে না।

আনু মুহাম্মদ বলেন, দুর্নীতি অনেক বড় বিষয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান হতে হলে সরকারের সকল চুক্তি প্রকাশ করতে হবে। এসব চুক্তিতে যে অনিয়ম হচ্ছে সেসব খতিয়ে দেখতে হবে। যতরকম নির্মাণ কাজ আছে এসব কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যে অনিয়ম আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। দেশের সর্বত্র দুর্নীতি ছড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা অনিয়মের মাধ্যমে। তাদের একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে তারা সরকারের অনুগত। সরকার যা বলে তারা তাই করে। এসব বড় বড় পদে যদি বিতর্কিতরা থাকে, তারা নিজেরা তো দুর্নীতি করে অন্যদের দুর্নীতি ঠেকানোর ক্ষমতাও তাদের থাকে না। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

Saturday, March 2, 2019

একজন আনু মুহাম্মদের চোখে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র by মরিয়ম চম্পা

মা। মানুষের জীবনে শৃঙ্খলার প্রতীক। খুব অল্প বয়সে মা’কে হারান। এই দুর্ভাগ্য তাকে তাড়া করে ফিরেছে বহুদিন। মুক্তিযুদ্ধ তাকে আলোড়িত করেছিল ভীষণভাবে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে যোগ দেন মিছিলে। স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি চেষ্টা করে যুদ্ধে যোগ দেয়ার। ধরা পড়েন রাজাকারদের হাতে। বেঁচে যান অলৌকিকভাবে। সেই যে যুদ্ধ শুরু তা আর থামেনি।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ থেকে সুন্দরবন। দেশের সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। আক্রান্তও হয়েছেন। চিরকালের লড়াকু আনু মুহাম্মদ। তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব। ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক। পেশা শিক্ষকতা। বাংলাদেশের প্রচলিত উন্নয়ন আর গণতন্ত্র নিয়ে রয়েছে তার নিজস্ব ভাবনা। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কথা বলেছেন, জীবনের প্রায় সব অধ্যায় নিয়েই।
আনু মুহাম্মদ বলেন, আমার জন্ম নানা বাড়ি। ১৯৫৬ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর। বাংলায় আশ্বিন মাস। সময়টা ছিল অভাবের। দুই বছরের মধ্যেই ঢাকায় আসা। আমরা থাকতাম কমলাপুর। বাবা ছিলেন কলেজ শিক্ষক। একপর্যায়ে চলে আসি খিলগাঁও আবাসিক এলাকায়। সেখানে থাকতেই আমি স্কুলে ভর্তি হই। প্রথম স্কুল সিদ্ধেশ্বরী প্রাথমিক স্কুল। ওখানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পর খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিউ মার্কেটের কাছে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে কয়েকটি সিট খালির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। এই স্কুল ছিল তখন দেশ সেরা। আব্বা আমাকে ওখানে ভর্তি করার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ওখানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। এর আগে আমার জীবনে বড় ধরনের একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার পরে আমার মা মারা যান। তখন আমার বয়স মাত্র ১১ বছর। আমরা ৭ ভাই-বোন। আমি তৃতীয়। সবার ছোট বোনের বয়স ছিল তখন মাত্র দুই বছর। মাকে হারিয়ে আমরা ৭ ভাইবোনসহ পরিবারের সবাই একটি দুর্যোগের মধ্যে পড়ে যাই।
মা না থাকার কারণে পড়ালেখা ও স্কুলের তদারকির বিষয়টি কিছুটা কমে যায়। তাই আমি যখন ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হই তখন আমার বাউণ্ডুলে অবস্থা। এর ফলে স্কুলে আমার অনিয়ম হতো অনেক। বাসে করে স্কুলে একা একাই যেতাম। তবে বই পড়ার অভ্যাস ছিল ছোটবেলা থেকেই। স্কুলে অনিয়মিত হলেও বইপড়া বাড়তে থাকে। অনিয়মিত হবার কারণে ক্লাসে আমার নাম কাটা যায়। তখন হেড স্যার ছিলেন খুব বিখ্যাত লোক খান মোহাম্মদ সালেক। অনুরোধ করলে ক্ষমা চাইলে হয়তো কাজ হতো। কিন্তু তখন অনুরোধ করতে ইচ্ছা করলো না। এরপর ১৯৭০ সালে ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। সেখানে এসে অতো বেশি ভালো লাগেনি। ওখানেও অনিয়ম হতে লাগলো। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চে একটি বড় ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেলাম। সেসময় আমি স্কুলে যাচ্ছিলাম। তখন রামপুরা থেকে সদরঘাটগামী একটি বাসে করে স্টেডিয়ামের সামনে গেলে দেখি ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। বাস থেকে নেমে গিয়ে দেখি ওখানে পাকিস্তান এবং নিউজিল্যান্ডের খেলা হচ্ছে। পুরো স্টেডিয়ামের দর্শকরা তখন পাকিস্তানের পক্ষে।
ওইদিন দুপুর ১২টায় ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন ‘জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত’। কয়েক মিনিটের মধ্যে স্টেডিয়ামের পরিবেশ বদলে গেলো। যে পাকিস্তান টিমের পক্ষে পুরো স্টেডিয়ামের মানুষের সাপোর্ট ছিল সেই পুরো স্টেডিয়াম দেখা গেলো পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গেছে। তখন পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের পেছনে বাঁশ-আগুন ইত্যাদি নিয়ে দৌড়াচ্ছে মানুষ। ওখান থেকেই প্রথম মিছিল বের হয়। আমিও মিছিলের সঙ্গে বেরিয়ে গেলাম।
কোথায় কোথায় গেলাম মনে নেই। সারা দিন মিছিলে মিছিলে ছিলাম। ওইদিন থেকেই শুরু হয়ে গেল স্বাধীনতার সংগ্রাম। ২৫শে মার্চ পর্যন্ত চলল। ২৫শে মার্চ এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে মিলে আমরা ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করলাম। অনেক রাতে যখন প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হলো তখন আমরা বাসায় গেলাম। তারপরতো ৭১ সালে অনেক ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। রাজাকারদের হাতে বন্দি হলাম। মার খেলাম। এরপর একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। রাজাকাররা যে ঘরে আমাদের বন্দি করে রাখে সেই বাড়ির এক মহিলা রাতের বেলা আমাদের দুজনকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। অথচ দুদিন আটকে রেখে পরের দিন খুব সকালে আমাদেরকে ক্যান্টনমেন্টে হস্তান্তরের কথাবার্তা শুনেছি। সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলাম।
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রিক পরীক্ষা শুরু হয়। নকলে পরিপূর্ণ খুবই খারাপ একটি পরীক্ষা ছিল সেটা। ’৭৩ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। সেসময় আমার একটি সাইকেল ছিল যেটা দিয়ে ঢাকা কলেজে যেতাম, শহরে ঘোরার একটি স্বাধীনতা ছিল। সাইকেলে করে অনেক সেমিনারে যেতাম, লাইব্রেরিতে যেতাম। মুক্তিযুদ্ধের কারণে অনেকের মতো আমারও মানসিক বয়স বেড়ে গিয়েছিল। অনেক বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয় তখন। যেটা ওই বয়সে হওয়ার কথা না। রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজ পরিবর্তন ইত্যাদি। বিভিন্ন দলের অফিসে যেতাম। স্টাডি সার্কেলে যেতাম। লেখালেখি করতাম। লেখালেখির সূত্রে বিচিত্রার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে বিচিত্রায় আমি নিয়মিত লেখালেখি করি। ৭৪ সালে দেশে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় তখন সাইকেল দিয়ে ঢাকা শহরে ঘুরতাম আর দুর্ভিক্ষের ওপর বিচিত্রায় সিরিজ লিখতাম। সিরিজের নাম ছিল ‘আপনারা কেমন আছেন।’
১৯৭৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে ৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। জাহাঙ্গীরনগরে যাওয়াটা আমার পরিকল্পিত ছিল না। আম্মা আব্বার ইচ্ছা অনুযায়ী আমার ভর্তি হওয়ার কথা মেডিকেল কলেজে। ডাক্তার হওয়ার কথা ছিল। মেডিকেল কলেজে গিয়ে মনে হলো আমি এটার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব না। দ্বিতীয়বার ভর্তি নোটিশ পেয়ে জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হই। কারণ আমার হলে থাকার ইচ্ছা। তারপর বিভিন্ন লেখালেখি, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। ৮১ সালে মাস্টার্স পাস করি। এরপরতো শিক্ষকতা শুরু হয়।
যৌবনে রোমান্টিকতা প্রসঙ্গে বলেন, রোমান্টিক সময়তো মানুষের সবসময়ই থাকে। রোমান্টিকতার কি কোনো বয়স লাগে না কী। এটা সবসময় সব বয়সেই থাকে। স্কুল জীবনে দু-একজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগটা বেশি হয়। মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়ার পর আমার বর্তমান জীবনসঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এবং আমরা ১৯৮৫ সালে বিয়ে করি। বর্তমান ও আগের সময়ের সম্পর্কের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে টেকনোলজির কারণে এখনকার ছেলে মেয়েদের সম্পর্কগুলো অনেকটা পজেটিভ। কারও জন্য কোনো বিরতি বা সময় থাকে না। সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা ভাবনার সময়ও নেই। আগে যেটা ছিল একজন আরেকজনকে চিঠি দিতে গিয়ে একবার লিখলো দুইবার তিনবার। চিঠিটা পাঠালো।
এর মাঝে একবার ভাবার সময় পেলো। এরপর দু-জনের দেখা হলো। সম্পর্কটা টিকে থাকা না থাকার জন্য যে সময়গুলো দরকার সে সময়গুলো উভয়পক্ষই পেতো। এখনকার সময়ে মোবাইলে ফেসবুকে একটি মেসেজ লিখে সরাসরি পাঠিয়ে দিচ্ছে। রিভাইজ বা চিন্তা করারও সময় নেই। সারাক্ষণই কথা বলছে। সম্পর্কেও ভাঙন সবসময় খারাপ নয়। জোর করে বা সমাজের ভয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। এ ছাড়া ছেলেদের পাশাপাশি এখনকার মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। তার ফলে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বেড়েছে।  
আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান সময়ে সারা দুনিয়াতে বেকারত্ব বিশেষ করে স্থিতিশীল কাজের সংকট অনেক বেড়েছে। অনেকরকম কাজ আছে ঠিকই কিন্তু গুণগত দিক থেকে ভালো নয়। আমাদের সমাজে এখন যাদের হাতে ক্ষমতা বা প্রচুর টাকা আছে তাদের জমি দখল করতে হয়। বন দখল করতে হয়। এই ক্ষমতাবানদের জন্য দরকার হয় বড় বাহিনী। যারা তাদের কাজের সাহায্য করবে। এভাবে কিন্তু সন্ত্রাসী তৈরি হয়। তরুণদের যে মাস্তানি ও সন্ত্রাস আমরা দেখি এর বড় পৃষ্ঠপোষক থাকে ক্ষমতাবান লোকেরা। থানার সোর্স, ডেসটিনির মতো জালিয়াতি ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, নারী শিশু পাচার ইত্যাদিতে কর্মসংস্থান তো বেকারত্বেও সমাধান বলা যায় না। কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ, অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। সম্মানজনক নিরাপদ কাজের অভাব অনেক বেশি। লেখাপড়া শিখেও একটি টেকসই, স্থিতিশীল ও সম্মানজনক কাজের বড় সংকটের জায়গা তৈরি হয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে যে কাজগুলো তৈরি হচ্ছে এসব কাজের কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। যেকোনো সময় কাজ চলে যেতে পারে। সেখানে কাজের চাপ অনেক বেশি।
সম্মানজনক বেতন নিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এর ফলে একজনকে দুই থেকে তিনটি কাজ খুঁজতে হয়। অথচ একটি চাকরি করে পুরো একটি পরিবার চালানোর কথা। কিন্তু সেটা এখন সম্ভব নয়। বাঁচার মতো বেতন মজুরি কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে সমাজের মধ্যে বড় একটি টেনশন তৈরি হয়েছে। এর ওপর নিয়োগ বাণিজ্য গত কয়েক বছরে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে।
দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যেগুলোকে উন্নয়ন বলছে সেগুলোকে আমি উন্নয়ন বলতে রাজি না। সরকার এখন উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, সেতু এগুলোকেই বোঝায়। কোনো চিন্তা ভাবনা না করে খরচ, পরিবেশগত চিন্তাভাবনা, যে টাকায় করা হচ্ছে সে টাকায় এরচেয়ে ভালো কাজ করা যেত কিনা এসব কিছুই ভাবা হচ্ছে না। শিক্ষা চিকিৎসার বেশি বেশি বাণিজ্যিকীকরণ, সর্বজনের সম্পদ নদীনালাখালবিল বন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরই উন্নয়ন হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। নির্মাণকেন্দ্রিক উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের যে আগ্রহ এর একটি বড় কারণই হচ্ছে এই প্রকল্প নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। যে কাজ ১শ’ টাকায় করা যায় সেটা ৫শ’ টাকায় করা হচ্ছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনের থেকে ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি খরচে প্রকল্প ব্যয় হচ্ছে। এক পদ্মা সেতুর বিজ্ঞাপনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে পুরো দেশের প্রচুর ভাঙ্গাচুরা রাস্তাঘাট আর সেতু। এটাকে উন্নয়ন প্রকল্প না বলে বিজ্ঞাপন প্রকল্প বলাই সঙ্গত। যেসব ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়েছে সেগুলো আরো কম খরচে আরো ভালোভাবে করা যেত। চট্টগ্রামে এমন ফ্লইওভার আছে যেটা ব্যবহারই হচ্ছে না।
সুন্দরবন শেষ হয়ে যাবে এমন প্রকল্প করা হচ্ছে রামপালে। যেটা নিয়ে গত ৭ থেকে ৮ বছরে অনেক আন্দোলন হয়েছে। দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে এটা দেশের জন্য ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকারক। এটার সঙ্গে ভারতের অনেকগুলো কোম্পানি জড়িত। এ ছাড়া সুন্দরবন এলাকায় যারা জমি ও বন দখল করে তারা বন দখল করার প্রকল্প নিয়েছে। পুরো সুন্দরবনটি দেশি বিদেশি দস্যুতার শিকার হচ্ছে। রূপপুরে পারমাণবিক প্রকল্প শুরু হয়েছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। সেটা এখন চলে গেছে ১ লাখ কোটি টাকায়। কেন বেড়েছে এটা নিয়ে জনগণের কাছে সরকারের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই প্রকল্প নিয়ে সরকার গৌরবের গাঁথা তৈরি করছে। অথচ এটি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ প্রকল্প। সড়ক সেতু যোগাযোগ সেগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে যেখানে ভারতের ট্রানজিট সম্পর্কিত। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজিক স্বার্থ আর দেশি বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবসাই বিভিন্ন প্রকল্পের পেছনের শক্তি। এরজন্য দেশ বেশি বেশি ঋণ আর পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় বিপদে।
যেগুলোকে উন্নয়ন প্রকল্প বলা হচ্ছে সেগুলো স্বল্প মেয়াদেই দেশের জন্য অনেকগুলো বোঝা হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি আর্থিক বিপদ ও পরিবেশগত মহাবিপদ তৈরি হবে। এখনই বায়ুদূষণ পানিদূষণ জীবনমানে বাংলাদেশ বিশ্বেও একেবারে নিচের সারিতে। একে কীভাবে উন্নয়ন বলবো?  প্রকল্পগুলো যারা তৈরি করছে তারা লাভবান হবে। দেশি বিদেশি অনেক গোষ্ঠি এর থেকে অনেক মুনাফা লাভ করবে। পক্ষান্তরে দেশের মানুষ দীর্ঘ মেয়াদের বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবে। এই ধরনের উন্নয়নের সুবিধাভোগী ও সহযোগীরাই ব্যাংক লুট করছে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বিদেশে। আমাদের শিক্ষা খাতে বা চিকিৎসা খাতে যে ব্যয় ধরা হয় তার থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে যায় প্রতিবছর। 
তিনি বলেন, গত নির্বাচন কোনো নির্বাচন ছিল না। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হবে যে কিভাবে নির্বাচনের নামে কতো ভয়াবহ তামাশা করা যায়। এই ধারা বিশ্লেষণ করেই এখন আন্তর্জাতিকভাবে একটি তত্ত্ব আলোচনা হচ্ছে- ‘নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ’। নির্বাচনকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেখে পুরো ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন, পুলিশ, আইন-আদালত, আমলাতন্ত্র কোনোটারই কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। সবগুলোই হচ্ছে সরকারের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান। যার ফলে একটি একচেটিয়া কর্তৃত্ববাদ জন্ম নিয়েছে যা এই মাত্রায় বাংলাদেশে এর আগে দেখা যায়নি।
দীর্ঘ ৪৭ বছরে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাংলাদেশে ঠিকমত দাঁড়াতেই পারেনি। কিন্তু এখন একচেটিয়া কর্তৃত্ববাদ যে মাত্রায় দেখা যাচ্ছে তার কোনো পূর্বদৃষ্টান্ত নেই। সেটারই ধারাবাহিকতায় এখন যে উপজেলা নির্বাচন এবং ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে সেটার যে ভিন্ন ফল হবে না তা বোঝার জন্য খুব বড় ব্যাখ্যার দরকার হয় না। সরকার অতুলনীয় দক্ষতা দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তামাশায় পরিণত করেছে। এরকম দক্ষতা যদি তারা অন্য কোনো কাজে লাগাতো তাহলে বাংলাদেশ অনেক ভালো অবস্থায় থাকতে পারতো। নদী বন শিক্ষা চিকিৎসা সন্ত্রাস মাদক সড়ক দুর্ঘটনা এসব ক্ষেত্রে তো কোনো দক্ষতা দেখা যায় না।
তিনি বলেন, আমার লেখা প্রথম বই হচ্ছে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ। এ পর্যন্ত আমার লেখা প্রায় ৩৫টি বই বেরিয়েছে। পুরো নাম আনু মুহাম্মদ আনিসুর রহমান হলেও আনু মুহাম্মদ নামেই অধিক পরিচিত তিনি। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। ঢাকায় লেখাপড়া শেষ করে ১৯৮২ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগদান করেন। এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষকতা করেছেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্য বিরোধী তত্ত্বচর্চ?া ও লড়াইয়ে সক্রিয় অংশ নেন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ যেকোনো প্রকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে তিনি তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব।

Monday, June 13, 2016

আনু মুহাম্মদের লড়াই by জাকারিয়া পলাশ

বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা। ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের মূলেই আঘাত করেন তিনি। আধুনিকতার মোড়কে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ অর্থনীতির এ অধ্যাপক। মার্কসবাদের কঠিন তত্ত্বকথা আর ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’র জটিল ধাঁধাও তার বর্ণনায় সরল হয়ে হাজির হয় শ্রমজীবী, দরিদ্র জনসাধারণের কাছে। তিনি একজন শিক্ষক। নাম মো. আনিসুর রহমান। আনু তার ডাক নাম। দেশ-বিদেশে তার পরিচয় আনু মুহাম্মদ হিসেবে। তার শিক্ষকতার গণ্ডি ক্লাসরুমের বাইরেও বিস্তৃত বহুদূর। ফুলবাড়ি থেকে রামপাল; সর্বত্র। পরিবেশ-প্রকৃতি আর গরিবের স্বার্থের লড়াইয়ে এই শিক্ষক ছুটে বেড়ান। রাজপথে তার উপস্থিতি আর রাজনৈতিক বক্তৃতাও যেন অর্থনীতির পাঠ। আপনি একজন শিক্ষক না বিপ্লবী? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘দুটোই। একজন অ্যাকাডেমিক একটা বিষয়ে জানার্জন করে। তারপর সেটা তুলে ধরে লেখা বা কথায়; ক্লাসে। আর একজন অ্যাকটিভিস্ট সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করে। কেউ এই দুটো একসঙ্গে করলে তার দায়িত্বটা পূর্ণতা পায়। আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। জনগণের টাকায় বেতন পাই। সুতরাং, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ আমি। কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায় তা পরিষ্কারভাবে জানানো আমার দায়িত্ব।’ বাংলাদেশের বামপন্থীরা বিভক্ত বহুভাবে। নানা পন্থার পক্ষে-বিপক্ষে। কিন্তু, আনু মুহাম্মদ সকল ‘পন্থিবাজি’ বিভক্তির ঊর্ধ্বে। বিপ্লবের প্রসব বেদনা নিয়ে বামপন্থায় শরিক হওয়া অনেকেই হাল আমলে ভিড় করেছেন পুঁজিবাদ কিংবা দেশীয় সামন্তবাদের ছায়ায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাতো বলেই ছিলেন, ‘ঝানু বাম সব আমরা নিয়ে নিয়েছি। এখন যা আছে তা চিটা।’ কিন্তু, আনু মুহাম্মদ স্রোতের বিপরীতে, অটল-অবিচল। জনগণের স্বার্থই তার কাছে দেশের স্বার্থ। দেশের বুদ্ধিজীবীরা অধিকাংশই যখন এদল-ওদলে বিভক্ত তখন আনু মুহাম্মদ সাদাকে বলছেন সাদা, আর কালোকে কালো। প্রতিবাদী রাজনীতির সক্রিয় নেতৃত্বে তিনি। জাতীয় সম্পদ রক্ষায় গঠিত তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির তিনি সদস্য সচিব। তবুও, অর্থনীতির অধ্যাপক হিসাবে তার বিরুদ্ধে ক্লাস ফাঁকির অভিযোগ নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি হলেন সকলের আস্থাভাজন এক ক্লাস শিক্ষক। রাজধানীর মালিবাগের নিজ বাসভবনে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান তার বেড়ে ওঠার কথা। স্কুল জীবনেই বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। এমন সময় এসেছিল মুক্তিযুদ্ধ। তার মতে, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্র, জনগণের মুক্তির লড়াই, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গণহত্যা, অন্যান্য দেশের মুক্তিযুদ্ধ, বিপ্লব ও ইতিহাসের দিকে কৌতূহল সৃষ্টি হয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। আর ৭১’র পর দেশ, সরকার ও আগামী নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থিরতার কারণে আশাভঙ্গ হয় দ্রুতই।’ ৬/৭ম শ্রেণিতে পড়াকালীন থেকেই তিনি লিখতেন। স্বাধীনতার পরপরই তিনি লিখেছিলেন, ‘স্কুল-কলেজগুলো কিছুকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হোক। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠানো হোক গ্রামেগঞ্জে। তারা নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও গ্রামোন্নয়নের মতো কাজে স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করুক। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের পর সব শিশু-কিশোরেরও মনে স্পৃহা ছিল দেশের জন্য কাজ করার।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষের সেই বিপ্লবী অনুভূতি বুঝতে না পারার কারণে দুই কূল হারাতে হলো। জোর করেও অনেককে স্কুলে আনা যায়নি। অন্যদিকে জনসেবাও হয়নি।’ সেই পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকেই তিনি বেড়ে ওঠেন আজকের আনু মুহাম্মদ হিসেবে। তিনি জানান, জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, হলের জীবন তাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। পাঠচক্র, পত্রিকা প্রকাশ, বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি জনসংযোগের সঙ্গে অভ্যস্ত হন সেখান থেকেই। অন্যান্য দেশের জ্বালানি সম্পদ নিয়ে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের বিষয়ে তিনি গবেষণা করতেন শুরু থেকেই। পরে, নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলাদেশের গ্যাস সম্পদ ভারতে রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়, যখন মাগুরছড়ায় বিস্ফোরণ ঘটে, তখনই জাতীয় কমিটি হয়। জাতীয় কমিটির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলছিলেন, ‘২০০৫ সালে ফুলবাড়ির মানুষের কাছ থেকে আমরা শিক্ষা পাই কিভাবে প্রতিরোধ গড়তে হয়। জাতীয় কমিটির কোনও তৎপরতা ছিল না ফুলবাড়িতে। সেখানকার জনগণই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনে সহায়তার জন্য। পরে আমরা গবেষণা করে দেখি যে সেটা ভয়ঙ্কর প্রজেক্ট।’ 
আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকতা করছেন ১৯৮২ সাল থেকে। পড়িয়েছেন নৃবিজ্ঞানেও। ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি। উইনিবেগ ও মনিটোবায় ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন ভিজিটিং স্কলার (১৯৯৩)। কমিউনিস্ট জগতের কিউবা ও ভেনিজুয়েলায় সফর করেছেন তিনি। হুগো শ্যাভেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল তার। সাম্রাজ্যবাদের কড়া সমালোচক এই অধ্যাপক মনে করেন, ‘মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা বা শিক্ষার চেয়ে সমরাস্ত্র এবং যুদ্ধ সরঞ্জামের পেছনে পৃথিবীর সম্পদ ব্যয় হয় বেশি। প্রতি বছর ৯০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এ খাতে। আর এর ৬০ ভাগ অর্থাৎ ৬০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে একা আমেরিকাই। এর বিরুদ্ধে তার সোচ্চার ভূমিকা। ২০০৯ সালে দুইটি বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে জাতীয় তেল সম্পদ উত্তোলনের বিষয়ে চুক্তির উদ্যোগ নেয় সরকার। ‘জনস্বার্থবিরোধী’ সেই চুক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন আনু মুহাম্মদ। ২০১১ সালে তাকে আটকও করা হয়েছিল। আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘পন্থিবাজী রাজনীতি বাংলাদেশের বাম রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে, জাতীয় কমিটি গঠিত হওয়ার পর ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সব বামগ্রুপকে একসঙ্গে আনা গেছে। এটা জাতীয় কমিটির একটা সাফল্য।’ আনু মুহাম্মদের বেড়ে ওঠা ঢাকার মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায়। সাত ভাই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাসের পর তিনি ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগরে ১৯৭৬-৭৭ সালে। ব্যক্তিগত জীবনে আনু মুহাম্মদ বিবাহিত। তার স্ত্রী শিল্পী বড়ুয়াও ছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী।

Sunday, February 28, 2016

দেশকে যা বিপন্ন করে, তা উন্নয়ন নয় by আনু মুহাম্মদ

অবশেষে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র এই সত্যটি স্বীকার করলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে ঠিকই।’ একই সঙ্গে এই কথাও বললেন, ‘কিন্তু এই স্থান পরিবর্তন করা যাবে না।’ তাই এই মাসেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতীয় হেভি ইলেকট্রিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির আয়োজন চলছে।
বাংলাদেশের এই অতুলনীয় সম্পদ ও আশ্রয় ধ্বংস হবে জেনেও সরকারকে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই হবে? কেন? কোথায় তাদের হাত-পা বাঁধা? অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, যঁাদের হাত-পা বাঁধা নেই, তঁাদের এই সর্বনাশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই দায়িত্ব। সে জন্যই সুন্দরবন-বিনাশী এই প্রকল্প বাতিলসহ সাত দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ২৪ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে সুন্দরবন লংমার্চ সংগঠিত করেছিল তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। দাবি পূরণ না হওয়ায় এই কমিটি থেকে আবারও আগামী ১০ থেকে ১৫ মার্চ জনযাত্রা বা বৃহত্তর লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও সংগঠন বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য, যুক্তিসহ সরকারের কাছে সুন্দরবনের জন্য বিপজ্জনক এসব প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। প্রবল জনমত তৈরি হয়েছে এর বিরুদ্ধে।
কারণ, মহাপ্রাণ সুন্দরবনের আঙিনায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রকল্পটি অস্বচ্ছ ও অসম। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে যে সুন্দরবন বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করে, অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের আঁধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে, সেই সুন্দরবনকে এই প্রকল্প ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। সুন্দরবন আছে বলে প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচে। সুন্দরবন বিনষ্ট হওয়া মানে বহু মানুষের জীবিকা হারানো, উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষকে মৃত্যু ও ধ্বংসের হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন, এক অতুলনীয় ইকোসিস্টেম, পরিবেশ শোধনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই।
সুন্দরবনের গুরুত্ব যেমন এ দেশের মানুষ জানে, তেমনি জানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তাই সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিপদ নিশ্চিত জেনে রামসার ও ইউনেসকোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। সরকার যদি তারপরও এই কাজ অব্যাহত রাখে, তাহলে তারা বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে সুন্দরবনের নাম বাদ দেবে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের জন্য বিপজ্জনক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি থেকে নরওয়ে সরকারের গ্লোবাল পেনশন ফান্ড বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থসংস্থানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার সংস্থা সরেজমিনে তদন্ত শেষে এই প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে। প্রথমদিকে খোদ সরকারের বিভিন্ন বিভাগও লিখিতভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল! অথচ একদিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করে এই নবায়নযোগ্য বিশাল আশ্রয় সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন চলছে, অন্যদিকে এই প্রকল্প সামনে রেখে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিপইয়ার্ড, সাইলো, সিমেন্ট কারখানাসহ নানা বাণিজ্যিক ও দখলদারি তৎপরতা বাড়ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকট নিরসনের যুক্তি তুলেই সরকার এসব কাজ করছে। এই সংকট নিরসন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে বোঝা যায়, সংকট সমাধানের চেয়ে দেশি-বিদেশি কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই যেন তাদের প্রধান লক্ষ্য। সুন্দরবন-কৃষিজমি-শহরধ্বংসী প্রকল্প ছাড়াও ফুলবাড়ী-বড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত খনির চক্রান্ত অব্যাহত রাখা, বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক একতরফা সুবিধা দিয়ে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা, কুইক রেন্টালের নামে অনেক বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয়, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি শতকরা ২০ ভাগে নেমে এলেও দেশে দাম বাড়িয়ে রাখা, কক্সবাজারের সম্পদ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে অস্বচ্ছ, অনির্ভরযোগ্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, নিরাপত্তা পারমাণবিক বর্জ্যসহ ভয়াবহ ঝুঁকির নিষ্পত্তি না করে রূপপুরে বিপুল ঋণ ও বিদেশি কোম্পানি-নির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ ইত্যাদি এর দৃষ্টান্ত।
যেখানে বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস সম্পদই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধান অবলম্বন, সেখানে এই সম্পদ নিয়ে সতর্ক সুচিন্তিত দায়িত্বশীল পরিকল্পনা হওয়াই বাঞ্ছিত। না হলে দেশ এক বিশাল সুযোগ ও সম্ভাবনা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবে। অথচ উল্টো এই বিষয়ে যেসব তৎপরতা চলছে, তা জেনে যে কেউ স্তম্ভিত হবেন। সরকার বিনা টেন্ডারে ‘পারস্পরিক বোঝাপড়া’র ভিত্তিতে সমুদ্রের তেল-গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কাজে ২০১০ সালে প্রণীত ‘দায়মুক্তি আইন’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায় না। তাড়াহুড়ার কথা বলেই এর যৌক্তিকতা দেখানো হচ্ছে। অথচ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টার কারণেই সমুদ্র সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানে বিলম্ব হচ্ছে। আমরা কনোকো–ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করেছিলাম। সে সময় সরকার এই তাড়াহুড়ার অজুহাত দিয়েই জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছিল। কনোকো–ফিলিপস চুক্তি করে ঠিকই সাবকন্ট্রাক্ট দিয়েছে, তাদের শেয়ারের দাম বাড়িয়ে লাভবান হয়েছে, কোনো কাজের কাজ করেনি। বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে, সময় নষ্ট হয়েছে।
আমরা বলেছিলাম যেহেতু সমুদ্রের গ্যাস সম্পদের সম্ভাব্য বিশাল মজুত দেশের ভবিষ্যতের বড় অবলম্বন, সেহেতু জাতীয় সংস্থার মালিকানায়, প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতার ঘাটতি থাকলে সাবকন্ট্রাক্টর নিয়োগের মাধ্যমে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ করা হোক। এভাবে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কর্মসূচি নিলে দেশের শতভাগ সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত নির্মাণ সম্ভব হতো, উল্লিখিত বিভিন্ন মানবধ্বংসী প্রকল্প নিতে হতো না। সরকার সে পথে যাওয়ার কোনো চেষ্টা না করে নানা রকম ভুল নীতি ও দুর্নীতির পথে গেছে। পিএসসি মডেল বারবার সংশোধন করে এখন যেভাবে দাঁড় করানো হয়েছে, তা দুর্নীতি ছাড়া আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রস্তাব অনুযায়ী, যে দামে গ্যাস কেনা হবে, তা আমদানি করা গ্যাসের দামের সমান কিংবা তার চেয়ে বেশি হবে। উপরন্তু, পাইপলাইনের ব্যয়, কোম্পানির কর সবই বহন করবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া প্রতিবছর গ্যাসের দাম শতকরা ৫ ভাগ হারে বৃদ্ধির ব্যবস্থা, ব্যয় পরিশোধ পর্বে বিদেশি কোম্পানির অংশীদারত্ব শতকরা ৫৫ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে শতকরা ৭০ ভাগ করা হয়েছে। এই রকম মডেলে চুক্তি সম্পাদন করলে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের কাজে লাগানোর সুযোগ থাকবে না। তার ওপর এ ধরনের চুক্তির কারণে বাংলাদেশের আর্থিক বোঝাও বাড়বে।
শুধু জ্বালানি খাতে দায়মুক্তি নয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তা-পরিচালকদের সম্ভাব্য সব ক্ষতি ও ব্যয়ের জন্যও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিল ২০১৫’ পাস করা হয়েছে। ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ’ শিরোনামে ২৮তম ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই অধ্যাদেশ জারির পূর্বে বা পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়ে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কাজকর্মের জন্য সরকার, চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক, অন্য কোনো পরিচালক, পরামর্শক, উপদেষ্টা, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোেনা আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’ ক্ষতি হলে তার কোনো দায়দায়িত্ব কেউ নেবে না। শুধু বিপদ টানবে বাংলাদেশের মানুষ।
কিন্তু দেশের সর্বজনের সম্পদ নিয়ে যথেচ্ছাচার ও ‘হাত–পা বাঁধা’ ভূমিকার অধিকার কোনো সরকারের থাকতে পারে না। বিদ্যুৎ-সংকট সমাধানে যথাযথ পথ অবশ্যই আছে। সর্বজনের সম্পদে শতভাগ জাতীয় মালিকানা ও শতভাগ সম্পদ দেশের কাজে ব্যবহার, দুর্নীতি করার দায়মুক্তি আইন বাতিল করে ‘খনিজসম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ আইন’ প্রণয়ন, পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট মেরামত ও নবায়ন, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদের সর্বোত্তম মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, দীর্ঘ মেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব প্রদান ইত্যাদি যথাযথ পথ। এই পথই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, সুলভ, নিরাপদ ও জনবান্ধব উন্নয়ন ধারা তৈরি করতে সক্ষম।
সরকার যাচ্ছে উল্টো পথে: ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ, বন-পানি-মানুষ-পরিবেশবিধ্বংসী ও ঋণনির্ভর। এতে কিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর লাভ হলেও দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অনিশ্চয়তা, বিপদ ও বিপন্নতার দিকে। এগুলোকে যতই উন্নয়ন বলে ঢোল পেটানো হোক, এগুলো মানববিধ্বংসী অস্ত্রের মতোই মানুষ ও প্রকৃতিবিধ্বংসী প্রকল্প। মানুষ ও দেশকে বিপন্ন করার এসব আয়োজন আমরা মানতে পারি না।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anujuniv@gmail.com

Saturday, February 13, 2016

দমিত মানুষের শক্তির খোঁজে by আনু মুহাম্মদ

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: অসাধারণ শিল্পস্রষ্টা
যদি বেঁচে থাকতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, এই ১২ ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বয়স হতো ৭৩। অথচ মাত্র ৫৪ হওয়ার আগেই তিনি অকাল মৃত্যুর কবলে পড়লেন। গত ১৯ বছরে কী গভীর অবদান যোগ হতো বাংলা সাহিত্যে, আমাদের দেখা ও বোঝার শক্তিতে, আমাদের লড়াইয়ের দিগন্তে, তা কি চিন্তা দিয়ে ধরা সম্ভব? মৃত্যুর আগের ১৭ বছরে ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুটি উপন্যাসসহ বেশ কিছু অসাধারণ গল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। মৃত্যুর আগের ১৩ বছরে হয়ে উঠেছিলেন অদম্য সংগঠকও। একজন মানুষের বেঁচে থাকা ও না থাকার মধ্যে কী তফাৎ তৈরি হয়, স্বজনদের মধ্যে কতটা শূন্যতা তৈরি হয়, সে অভিজ্ঞতা সবারই আছে। কিন্তু ইলিয়াসের মতো একজন মানুষের অকাল মৃত্যু পুরো একটা জনপদের, একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর এবং তাঁর সাহিত্যের, তাঁর জগৎকে নতুনভাবে নির্মাণের আবছা স্বপ্ন ও চলমান লড়াইয়ে যে কী অপূরণীয় ক্ষতি তৈরি করে, তা বলে বোঝানো কঠিন।
ইলিয়াস ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে থেকেই তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। ১৯৮৪ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ অনেক ঘনিষ্ঠ হয় একই সংগঠনে একসঙ্গে কাজ করার সূত্রে। সেই সময় দেড় দশক ধরে যে কয়েক দফা আমি ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’ নামে লেখক শিল্পী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, তার পুরো সময়টাতেই ইলিয়াস ভাই খুবই সক্রিয়ভাবে সঙ্গে ছিলেন—ছিলেন তারপরও। বদরুদ্দীন উমরের পর ১৯৮৬ তে আমাদের অনুরোধে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক সুদূর রাজশাহী থেকেও সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, এটা ইলিয়াস ভাইয়ের জন্য পরম স্বস্তির ব্যাপার ছিল। তিনি হাসান ভাইকে কখনো ছাড়তে রাজি ছিলেন না। আর ইলিয়াস তখন থেকেই সহসভাপতি। আরেকজন সহসভাপতি ছিলেন চট্টগ্রাম থেকে অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ। এই সময়কালে এঁদের সঙ্গে আলোচনা, পাঠ, বিতর্ক, পথসন্ধান, অনুষ্ঠান, সাংগঠনিক কাজ, আড্ডা, বিভিন্ন অঞ্চল সফর, কী যে আনন্দ আর সমৃদ্ধির সময়—তা মনে করলে ইলিয়াসের অভাবের কষ্টই বাড়ে।
তৃণমূল সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হলো ১৯৯২ সালে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসই ছিলেন সম্পাদক। যেমন আলোচনা, লেখা, শিক্ষকতা তেমনি সম্পাদনা—সব জায়গায় ইলিয়াস একই রকম আনন্দ আর গভীর নিষ্ঠা ও শ্রম দিয়ে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, পুরো দায়দায়িত্ব নিয়ে পরম মমতায় সব কাজ করতেন। সেই তৃণমূল-এর চতুর্থ সংখ্যা ছিল আয়তনে বৃহত্তম, কিন্তু তা প্রকাশিত হয়েছিল ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস’ সংখ্যা হিসেবে। আমাকেই সেই সংখ্যা সম্পাদনা করতে হয়েছিল!
ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই বহুদিন পর আমার আঠার মতো লেগে থেকে পড়া উপন্যাস। আমি ‘সাহিত্যের মানুষ’ নই। সাহিত্য সমালোচনার এখতিয়ার নিয়ে দ্বিধান্বিত থাকলেও এই উপন্যাসটি পাঠের পর এটা নিয়ে লেখার তীব্র তাগিদ অনুভব করেছিলাম। সেই তাগিদ থেকেই একটি দীর্ঘ পর্যালোচনা হিসেবে যা লিখেছিলাম, তা আসলে এই গ্রন্থ পাঠে আমার নিজের উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়া। আমার লেখার কথা ইলিয়াস জানতেন না, একেবারে ছাপা অবস্থায় দেখেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী চিলেকোঠার সেপাই বিষয়ে পরে লিখেছেন, ‘...এ এক নতুন বাংলা ভাষা, শহরের ধুলো-কাদা-মবিল-আবর্জনা-হঠাৎ ধনীর বর্বর অসভ্যতা আস্তাকুঁড়ের মানুষদের বারুদ হয়ে ওঠার ভাষা। শহরের নিচুতলার সমাজের মানুষের বাংলা ভাষা এমন ইজ্জত পায়নি সাহিত্যে। যেমন দেখার চোখ, তেমনি স্বচ্ছ ও কঠিন রাজনীতিক বিশ্বাস, তেমনি ধারালো হিউমার।’ (তৃণমূল, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা, জানুয়ারি ১৯৯৮) এরপর খোয়াবনামা নিয়েও একই রকম কিংবা আরও তীব্র তাগিদ থেকে লিখেছিলাম। খোয়াবনামা যখন পড়েছি ও তা নিয়ে যখন লিখছি তখন ইলিয়াস কমিউনিটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
লেখায় ও জীবনে সব ধরনের মানুষই ছিল ইলিয়াসের মনোযোগের ক্ষেত্র। সব মানুষই বাস করে একই শারীরতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে। কিন্তু সামাজিক, ঐতিহাসিক কারণে এর মধ্যেই ঘটে বহু বিভাজন: শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতপাত, জাতি, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ...। বৈচিত্র্য অস্বীকৃত হয়, মহিমান্বিত হয় বৈষম্য। সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানা, বৈষয়িক লোভ, দখল, ক্ষমতা সর্বোপরি মানুষ ও প্রকৃতি বিদ্বেষী মতাদর্শ একই চেহারার মানুষের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক তৈরি করে। কেউ কেউ শাসন, দখল, বিত্ত আর নির্মমতায় অমানুষ হয়; বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তার জগৎ থেকে উৎপাটিত হয়, বঞ্চিত, প্রতারিত হয়ে দলিত আর দমিত থাকে। নিপীড়নের নানা ব্যবস্থা বৈধতা দিতে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, সাহিত্য-সংস্কৃতি। ইলিয়াস তাঁর শিল্পসৃষ্টিতে এই বৈপরীত্য অনুসন্ধান করেন নিজে নির্মোহ থেকে, সন্ধান করেন মানুষের ভেতর মানুষকে।
নিজ গণ্ডির মধ্যবিত্ত ব্যক্তি অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইলিয়াসের লেখক ও চিন্তা জীবনের শুরু। কিন্তু তার মধ্য দিয়েই তিনি এই জগতের বন্দিশালা অতিক্রম করেছেন। পরিবর্তিত হয়েছে তাঁর ইতিহাস-জীবন-দর্শন সম্পর্কিত চিন্তার কাঠামো। মধ্যবিত্তের আত্মপ্রবঞ্চনায় ভরা চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন তিনি, কিন্তু তাঁর মধ্যে আটকে থাকেনি। দৃষ্টি ও চিন্তাশক্তি প্রসারিত হয়েছে, সমাজের জালের মুখোমুখি হয়েছেন, ইতিহাস তাঁকে খুলে দিয়েছে অজানা জগৎ। মানুষের মধ্যে দেখেছেন বহু মানুষ, সন্ধান পেয়েছেন মানুষের অসীম শক্তি ও সৃজনশীলতার বিশাল সমুদ্র।
চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে কৃষককর্মী চেংটু নিহত হয়, মিছিল সভা সমাবেশ দখল হয়ে যায়, হাড্ডি খিজির বুকে গুলি খায়। কিন্তু এখানেই তো জগৎ শেষ হয় না। চেংটু, খিজির থেকে যায় কোথাও না কোথাও। খোয়াবনামায় ব্রিটিশদের হাতে গুলি খাওয়া মুন্সী যেভাবে পাকুড়গাছে গিয়ে বসে, তার মরণ হয় না। তেভাগা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় কিন্তু তমিজ তার ডাকেই অনির্দিষ্ট পথে পা বাড়ায়। ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিয়ে শক্ত মাটির ওপর দাঁড়ায় তমিজ-ফুলজানের মেয়ে সখিনা। সামরিক শাসন ভেঙে বুকে গুলি নিয়ে হাড্ডি খিজির যখন রাস্তায়, তখন দেখা-অদেখা অসংখ্য মানুষের মিছিল মুক্তির এক প্রবল মানবিক স্রোত তৈরি করে।
বহু রকম শৃঙ্খলের মধ্যেও অতীত থেকে ভবিষ্যতে প্রবাহিত মানুষের চৈতন্য অনুসন্ধান করতে করতেই ইলিয়াস নতুন নতুন প্রান্তরে হাজির হচ্ছিলেন। এভাবেই বাস্তবতার ভেতর পরাবাস্তব, চেতনের মধ্যে অচেতন, জাগরণের মধ্যে স্বপ্ন, বর্তমানের ভেতর অতীত মানুষকে এক থেকে অসংখ্য রূপে হাজির করতে থাকেন তাঁর লেখায়।
প্রকৃতপক্ষে অতীত থেকে ভবিষ্যতে প্রবাহিত মানুষের অন্তর্গত শক্তির সন্ধান এবং তাঁকে পুষ্ট করাই ইলিয়াসের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই অনুসন্ধানে তিনি একজন অসাধারণ শিল্পস্রষ্টাই কেবল নন, একই সঙ্গে একজন বিপ্লবী তাত্ত্বিকও বটে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu/anujuniv@gmail.com