Thursday, June 14, 2018

বিশ্ব কুদস দিবস: মুসলমানদের প্রেরণা ও ঐক্যের উৎস

গত প্রায় ৭০ বছর ধরে ইহুদিবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জবর দখল করে আছে। ফিলিস্তিন জবর দখলের এতো বছর পরও ইসরাইল বর্বর নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের এই ন্যক্কারজনক আগ্রাসনের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মজলুম জনতা তাদের দেশের ভূখণ্ডকে স্বাধীন করার তথা ইহুদিবাদী দখলমুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্রও হাল ছাড়ে নি। বরং ফিলিস্তিনিদের মনোবল ও সংগ্রাম আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেগবান হয়েছে। ইরানের জনগণ সেই বিপ্লব বিজয়ের আগে থেকেই ফিলিস্তিনের মজলুম জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয় ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য চপেটাঘাত। কেননা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কেবল ইরানের জনগণকেই নয় বরং বিশ্বের সকল মুসলমান ও স্বাধীনচেতা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য। ইমামের ওই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবস পালিত হয়।
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ) ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষাক্ত টিউমার বা ক্যান্সার বলে অভিহিত করেছেন। ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অধিকারের প্রতি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্যে রমযানের শেষ শুক্রবারে নানা কর্মসূচি, অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ঘোষণার আহ্বান জানান। বিশ্ববাসী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তাঁর এই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং এই দিনকে কুদস দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। এই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখা এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
এ বছর এমন সময় বিশ্ব কুদস দিবস পালিত হতে যাচ্ছে যখন মার্কিন নতুন ষড়যন্ত্রের কারণে ফিলিস্তিন সংকট অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সমাজের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্বেও তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করে আমেরিকা। আমেরিকার এ পদক্ষেপ দখলদার ইসরাইলের সম্প্রসারণকামীতাকে পূর্ণতা দিয়েছে যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক পরিণতি ডেকে আনবে। বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে আমেরিকা ফিলিস্তিনিদেরকে এ বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে যে, ইসরাইলের স্থিতিশীলতা ও দখলদারিত্বের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে। আল আকসা মসজিদ ইসলাম ও ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচিতি। এটি মুসলমানদের প্রথম কেবলা হওয়ার কারণে শুধু ফিলিস্তিন নয় বরং সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এর ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। মুসলমানদের সবচেয়ে তিনটি পবিত্র স্থানের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস হচ্ছে অন্যতম। অথচ আমেরিকা দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে শুধু যে মুসলমানদের অবমাননা করেছে তাই নয় একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রীতি ও জাতিসংঘের ২৩৩৪ ও ৪৭৮ নম্বর প্রস্তাবও লঙ্ঘন করেছে।
দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে আমেরিকা দু'টি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করা। আর দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে, লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগ্রামীদেরকে নির্মূল করা যাতে দখলদার ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
বর্তমানে আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন নিয়ে দখলদার ইসরাইল পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইসরাইল গাজার নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তা তারা গত সাত দশক ধরে চালিয়ে আসছে। অথচ জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী আগ্রাসীদের মোকাবেলায় অস্ত্র ধারণা করার অধিকার ফিলিস্তিনিদের রয়েছে।
আমেরিকা তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করায় এর প্রতিবাদে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি সেনাদের হামলায় প্রথম দিনেই ৬০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হন। প্রকৃতপক্ষে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের প্রধান শরীক হচ্ছে আমেরিকা। এ কারণে ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজা উপত্যকায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, "ফিলিস্তিনি জনগণ আর তাদের সংকট সমাধানের জন্য আমেরিকাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেবে না।" তিনি বলেন, "এই অপরাধযজ্ঞের ঘটনায় 'ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায়' আমেরিকার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কার্যত শেষ হয়ে গেছে।" তবে সব ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ ও অন্যায় আচরণ সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে আমেরিকা নতুন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচয় অর্থাৎ বায়তুল মোকাদ্দাসের পরিচিতি ধ্বংসের চেষ্টা করছে যাতে ফিলিস্তিনিদের আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইল-মার্কিন ষড়যন্ত্রে নতুন করে যোগ দিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক এতদিন গোপন থাকলেও এখন তা প্রকাশ্যে এসেছে। সৌদি আরবের সাবেক সামরিক কমান্ডার জেনারেল আনোয়ার এশকি বলেছেন, তার দেশ ইসরাইলি দখলদারিত্বের মুখে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে বাধ্য নয়।" তিনি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, "ফিলিস্তিনিদের রক্ষার বিষয়ে সৌদি আরবের বাড়তি কোনো দায়িত্ব নেই। ফিলিস্তিনিরা যেহেতু সৌদি নাগরিক নন সে কারণে রিয়াদের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তারা রাখেন না।"  তিনি বলেন, "ইসরাইলকে শুধু শুধু শত্রু ভাবা হয়।”
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনি দখলদার ইসরাইলের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন। বিশ্ব কুদস দিবস পালন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, "কুদস দিবস কেবল ফিলিস্তিনিদের দিবস নয়। এটি এমন একটি দিবস যে, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে এটা বুঝিয়ে দেয়া, তারা আর কোনো মুসলিম ভূখণ্ডকে এভাবে গ্রাস করতে পারবে না।" ইমাম খোমেনি(র.) আরো বলেছিলেন, "বিশ্ব কুদস দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা বলদর্পী শক্তিগুলোকে এমন একটি হুঁশিয়ারি সংকেত দিতে চাই যে তারা মুসলমানদের ওপর আর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না এবং কুদস দিবস বিশ্ব মুসলমানদের প্রেরণা ও বেঁচে থাকার দিবস।"
ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, "ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করা সব মুসলমানের দায়িত্ব।"
ইহুদিবাদী ইসরাইলের নির্যাতনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে কখনোই দমানো যায় নি বরং কুদস দিবস পালন কিংবা মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপের মাধ্যমে তাদেরকে কিছুটা দমানো সম্ভব হয়েছে। এবারের বিশ্ব কুদস দিবস ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের জন্য এ বার্তাই পৌঁছে দেবে যে, ফিলিস্তিনের ওপর দখলদারিত্ব ও জুলুম নির্যাতনের দিন শেষ হয়ে এসেছে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের উচিত মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা উদ্ধারে বিশ্ব কুদস দিবসে শরীক হওয়া যাতে ইসরাইলের দখল থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড উদ্ধারকে আরো তরান্বিত করা যায়।

রাশিয়ান নারী ও যুবতীদের সতর্ক করলেন পার্লামেন্টারি কমিটির প্রধান

রাশিয়ান নারী ও যুবতীদের সতর্ক করেছেন দেশটির পার্লামেন্টারি কমিটির প্রধান তামারা প্লেটনিওভা। তিনি দুমা নামে রাশিয়ান পার্লামেন্টের পরিবার, নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির প্রধান। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আর কয়েক ঘন্টার মধ্যে যে মহাযজ্ঞ শুরু হতে চলেছে এ সময়ে শুধু যে ফুটবল যুদ্ধই হবে তা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫ লাখ ফুটবল ভক্ত রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যেন রাশিয়ার মেয়েরা যৌন সম্পর্ক স্থাপন না করেন সে জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তামারা। বলেছেন, এমন সম্পর্কে অসংখ্য শিশুর জন্ম হতে পারে, যাদের কোনো পিতৃপরিচয় থাকবে না। সৃষ্টি হবে ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’। অর্থাৎ পরিবারের পিতা থাকবেন এক দেশে। মা থাকবেন আরেক দেশে। বুধবার এক সাক্ষাতকারে তামারা আরও সতর্ক করে বলেছেন, এমন সব শিশু পরে ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগবে। সোভিয়েত যুগে এমনটা ঘটেছে। তিনি বলেছেন, ১৯৮০ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের পর এ ঘটনা দেখা দিয়েছিল। তাই রাশিয়ানরা যেন কোনো বিদেশীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে না জড়ান সে জন্য এমন আহ্বান তার। স্থানীয় গভোরিত মস্কভা রেডিওকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, অনেক যুবতী বিদেশী অনেক পুরুষের সান্নিধ্য পাবেন। এ সময় তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এর ফল হিসেবে তারা জন্ম দেবেন সন্তান। এমনও হতে পারে তারা বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধও হতে পারেন। আবার এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু যা-ই ঘটুক, এভাবে জন্ম নেয়া শিশুরা দুর্ভোগ পোহাবে। যদি এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী দু’জনেই একই গোত্রের বা বর্ণের হন বা না হন, তাহলেও ওই সন্তান মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করবে। অনেকেই বলে থাকেন রাশিয়া শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এক উদার জমিন। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে, বিভিন্ন বয়সের কয়েক লাখ ফুটবল ভক্ত গিজগিজ করছে এখন। কি হোটেল, কি এপার্টমেন্ট- সব জায়গায় শুধু বিদেশী আর বিদেশী। তাদেরকে মনোরঞ্জনের জন্য এরই মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে ‘সেক্স রোবটের’ পতিতালয়। কিন্তু এর বাইরে দেহপসারিণীরা সাজিয়েছেন পসরা। তারা এ সময়টাকে বাড়তি অর্থ উপার্জনের মওসুম হিসেবে দেখছেন। আর যেসব বিদেশী রাশিয়ায় গিয়েছেন বা যাচ্ছে, তাদের সবাই যে শুধু ফুটবল যুদ্ধ ভোগ করতে যাচ্ছেন তা কেউ হলফ করে বলতে পারেন না। তাদের অনেকের মধ্যে চাড়া দিয়ে উঠবে আদিম নেশা। তা নিয়েই আতঙ্কিত তামারা। এ জন্যই তিনি রাশিয়ান নারী ও যুবতীদের সতর্ক করেছেন, যেন বিদেশীদের সঙ্গে তারা যৌন সম্পর্ক স্থাপন না করেন। তবে এক্ষেত্রে কনডম ব্যবহার করে প্রতিরোধমুলক ব্যবস্থা অবলম্বনের কথা তিনি উল্লেখ করেন নি। উল্লেখ্য, ইউরোপে সবচেচয়ে বেশি এইচআইভির সংক্রমণ। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছে এই দেশেই। যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের অর্ধেকের বেশি অপ্রকৃত যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জরুরী বিশেষ সেশনে ফিলিস্তিনী বেসমারিক নাগরিকদের সুরক্ষা শীর্ষক রেজুলেশন পাস

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘পূর্ব জেরুজালেমসহ ও সকল অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে ইসরাইলের অন্যায় হামলা বিষয়ে এক জরুরী বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ পরিষদের এই ১০ম জরুরী বিশেষ সেশনে ‘ফিলিস্তিনী বেসমারিক নাগরিকদের সুরক্ষা  শীর্ষক একটি রেজুলেশন পাশ হয়। রেজুলেশনটিতে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ/পরীক্ষা করে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইসরাইলী দখলদারিত্বে থাকা ফিলিস্তিনী সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিতের জন্য এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় সম্ভাব্য উপায়সমূহ প্রস্তাব আকারে পেশ করার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়। আরব গ্রুপ এবং ওআইসি যৌথ উদ্যোগে আনীত এই রেজুলেশনের পক্ষে ভোট পড়ে ১২০টি, বিপক্ষে ৮টি এবং ভোটদানে বিরত থাকে ৪৫টি দেশ। বাংলাদেশ এই রেজুলেশনের পক্ষে ভোট দেয়। এর আগে গত পহেলা জুন ফিলিস্তিনের বেসমারিক নাগরিকদের সুরক্ষা বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদে কুয়েত একই ধরণের একটি রেজুলেশন উত্থাপন করে। কিন্তু পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে কুয়েত উত্থাপিত এই রেজুলেশন নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত হয়নি। রেজুলেশনটি পাশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের এই ব্যর্থতার পটভূমিতে আরব গ্রুপ এবং ওআইসি’র অনুরোধের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এ বিষয়ে ১০ম জরুরি বিশেষ সেশনের আহ্বান করে যা আজ অনুষ্ঠিত হল। আরব লীগের পক্ষে আলজেরিয়া এবং ওআইসি সামিটের পক্ষে তুরস্ক সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে বিশেষ সেশন অনুষ্ঠানের এ আহ্বান জানায়।
স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় শুরু হওয়া এই জরুরী বিশেষ সেশনের সভাপতিত্ব করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি মিরোস্লাভ লাইচ্যাক । অনুষ্ঠানটির শুরুতেই স্বপক্ষে যুক্তি প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ পরিষদে রেজুলেশনটি উত্থাপন করেন আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সাবরি বৌকাদুম। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি আলজেরিয়া উত্থাপিত এই রেজুলেশনে একটি কাউন্টার অ্যামেন্ডমেন্ট আনেন। এতে হামাসের রকেট নিক্ষেপের বিষয়ে নিন্দা জানিয়ে একটি প্যারা সংযোজনের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও বিভিন্ন গ্রুপের বক্তব্য শেষে শুরু হয় রেজুলেশন গ্রহণ সংক্রান্ত কার্যক্রম। শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র আনীত ‘কাউন্টার অ্যামেন্ডমেন্ট’ এর বিপরীতে আরব গ্রুপ এবং ওআইসি’র পক্ষে আলজেরিয়া ‘নো অ্যাকশন মোশন’ অর্থাৎ সাধারণ পরিষদে অ্যামেন্ডমেন্টটি যাতে বিবেচিত না হয় সে প্রস্তাবনা উত্থাপন করে। ‘নো অ্যাকশন মোশন’ প্রস্তাবনাটি ভোটে পাশ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আনীত সংশোধনী প্যারাটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর ভোটে যায় ‘ফিলিস্তিনী বেসমারিক নাগরিকদের সুরক্ষা’ শীর্ষক রেজুলেশনটি যার পক্ষে ১২০টি ভোট পড়ায় এটি সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ওআইসি’র চলতি সভাপতি হিসাবে এই সভায় বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে আগ্রাসী ইসরাইল কর্তৃক বেসমারিক ফিলিস্তিনী নাগরিদের উপর বর্বরোচিত হামলায় সৃষ্ট ভয়াবাহ পরিস্থিতির বিষয়ে ওআইসি’র গভীর উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বলেন, “আমরা নিরীহ বেসমারিক নাগরিকদের উপর এ ধরণের উদ্দেশ্য প্রণোদিত, পদ্ধতিগত ও বেআইনী হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। সম্প্রতি ইসরাইলের ন্যাক্কারজনক এই হামলার শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন কমপক্ষে ১২৯ জন বেসমারিক ফিলিস্তিনী নাগরিক। যারমধ্যে রয়েছে ১৬ জন শিশু। আর আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬০০ জন যাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে গেছেন”।
গুরুতর এই পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে এবং ‘ওআইসি কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টারস্’ ও ‘৭ম এক্সট্রা অর্ডিনারি ইসলামিক সামিট’ এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওআইসি রেজুলেশনটি সাধারণ পরিষদে উত্থাপনে আরব গ্রুপের সাথে কো-স্পনসর করেছে মর্মে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ। বেসমারিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও জীবন বাঁচানো, গাজা ভূখন্ডকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে উত্তরণ, তীব্র উত্তেজনা প্রশমন, এ অঞ্চলে শান্তভাব বজায় রাখাসহ সকল বেসমারিক নাগরিকদের উপর সহিংসতা বন্ধের উদ্দেশ্যে আনীত এই রেজুলেশনকে জোর সমর্থন জানাতে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আহ্বান জানান বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। রেজুলেশনটি ফিলিস্তিনী সংকটের ন্যায়সঙ্গত, টেকসই, ব্যাপকভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে দশকের পর দশক ধরে গৃহীত প্রচেষ্টাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করবে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ। জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনী জনগণের স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার সমুন্নত রেখে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাও তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ। সাধারণ পরিষদের এই ১০ম জরুরী বিশেষ সেশনে আরও বক্তব্য রাখেন ফিলিস্তিন, ইসরাইল, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া ও ভ্যাটিক্যানের প্রতিনিধিগণ। উল্লেখ্য বাংলাদেশ গত মে মাস থেকে ওআইসি’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।

১০৩৯ কলেজ শিক্ষার্থী শূন্য by নূর মোহাম্মদ

নামসর্বস্ব কলেজের বিরুদ্ধে অভিযানে নামছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। চলতি বছর একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই এ অভিযান শুরু হবে। তার আগে এসব কলেজের সব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এদিকে গত রোববার প্রকাশিত একাদশ শ্রেণির ভর্তির ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে সারা দেশের ১৭৩টি কলেজে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তির জন্য আবেদন করেনি। আর ৮৬৬টি কলেজকে শিক্ষার্থীরা আবেদনের তালিকায় রাখলেও কোনো শিক্ষার্থী পায়নি। সব মিলিয়ে ১০৩৬টি কলেজ প্রথম দফায় প্রকাশিত ভর্তি ফলাফলে শিক্ষার্থী শূন্য রয়েছে। তবে আরো দুই দফা ভর্তি নিশ্চয়নের সুযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী শূন্য থাকলে কলেজগুলো বন্ধ করে দেয়ার আভাস দিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার সারা দেশে ১৬ হাজার ৪০৬টি কলেজে ভর্তির আবেদন নেয়া হয়। এর মধ্যে ১৭৩টি কলেজে কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করেনি। ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী কমপক্ষে দশটি কলেজ পছন্দ দিতে পারেন। মেধা অনুযায়ী বোর্ড থেকে কলেজ নির্ধারণ করে দেয়া হয়। আর শিক্ষার্থীরা ৮৬৬টি কলেজ পছন্দ দিলেও শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী পায়নি এসব কলেজ। এ ব্যাপারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর মো. হারুন-অর-রশিদ মানবজমিনকে বলেন, কলেজে শিক্ষার্থী থাকবে না, আর কলেজ চলবে এটা হতে পারে না। এসব ভুঁইফোঁড় কলেজের বিরুদ্ধে অভিযানে নামা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী শূন্য কলেজগুলোর বিগত তিন বছরের শিক্ষার্থী ভর্তির তথ্য পর্যালোচনা করে বন্ধ করে দেয়া হবে। ভর্তি কার্যক্রম শেষ হলেই প্রথমে কারণ দর্শানো হবে। তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, ভুঁইফোঁড় কলেজ নিয়মিত পরিদর্শন করা হবে। সেখানে কারা কি পড়াচ্ছেন কত জন শিক্ষার্থী রয়েছে এসব দেখা হবে। শিগগিরই আমরা এ কার্যক্রম শুরু করবো।
আন্তঃবোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১৩৫টি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি আবেদন করেনি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালের ২৪শে নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে উচ্চ মাধ্যমিকে শতভাগ ফেল করায় এবং একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি না হওয়ায় ২১৯টি কলেজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। গত বছর ১৪৩টি কলেজ বন্ধ করা দেয়া হয়েছে। তবে কলেজগুলোর কোনো কোনোটি এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড প্রকাশিত একাদশ শ্রেণির ভর্তির ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৩ লাখ ১৯ হাজার ৬৭৫ জন ভর্তি ইচ্ছুক আবেদনকারীর মধ্যে ১২ লাখ ৩৮ হাজার ২৫২ জনকে ভর্তির জন্য মনোনীত করা হয়েছে। যা মোট আবেদনের ৯৬ শতাংশ। বাকিরা কোনো কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়নি। তারা দ্বিতীয় ধাপে পুনরায় আবেদন করতে পারবে। দ্বিতীয় দফায় সুযোগ না পেলে তৃতীয়বার সুযোগ পাবে। এবার আসনের চেয়ে শিক্ষার্থী কম হওয়ায় সবাই সুযোগ পাবে।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থী না পাওয়া বেশির ভাগ কলেজ ঢাকা বোর্ডের অধীন ঢাকা শহরে। প্রয়োজন না থাকলেও বোর্ডের সাবেক কয়েকজন কলেজ পরিদর্শক টাকার বিনিময়ে নতুন নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পাঠদানের অনুমতি দেয়ার পক্ষে প্রতিবেদন দেন। আর কলেজের অনুমোদন দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এসব কলেজের অধ্যক্ষ ও কর্মকর্তারা প্রশ্ন ফাঁস, জিপিএ-৫ বিক্রি ও পরীক্ষা কেন্দ্রে অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদেনেও এসব বিষয় ওঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজধানীসহ দেশের অলিগলিতে ভাড়া বাসায় গড়ে উঠেছে ভুঁইফোঁড় কলেজগুলো। মানহীন এসব কলেজের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নেই। এসব কলেজে নেই ভালো খেলাধুলার ব্যবস্থা, নেই বিনোদন ও সংস্কৃতি চর্চার জায়গা। কোনো কোনো কলেজে রয়েছে ক্লাসরুম সংকট। আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। সর্বোপরি মানহীন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করায় বোর্ড পরীক্ষায় ফল খারাপ করছে। আগে চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে ভুঁইফোঁড় কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম চালুর পর কলেজগুলোর আসল চিত্র বেরিয়ে আসে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা নিজেদের পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন। এতেই বিপাকে পরে অখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ভুঁইফোঁড় কলেজগুলেকে আশ্রয় দিয়েছেন বোর্ডের কয়েজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এর মধ্যে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অদ্বৈত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে জিপিএ-৫ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তে দুটি কমিটি কাজ করছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বাণিজ্যিক কলেজে পরীক্ষা কেন্দ্র ও ভেন্যুর অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তাকে বদলি করা হলেও তদবির করে স্বপদে বহাল আছেন। কেনাকাটাসহ বোর্ডের সকল দুর্নীতির নাটের গুরু সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী। বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান (বর্তমানে মাউশির মহাপরিচালক) প্রফেসর মো. মাহাবুবুর রহমান দুর্নীতি মুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। গত ২২শে ডিসেম্বর আটজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে বোর্ড থেকে বদলি করা হয়েছে। তাদের স্থলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তাকে পদায়ন করেছে মন্ত্রণালয়। বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক দায়িত্ব নেয়ার পর বোর্ডকে কলঙ্কমুক্ত করার কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু দুর্নীতির দুই নাটের গুরুকে সরিয়ে না দিলে ঢাকা বোর্ড দুর্নীতিমুক্ত করা কঠিন হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন।

সৌদি অবরোধ জয় করেছে কাতার

এক বছর পূর্বে কাতারের ওপর স্থল, নৌ ও আকাশপথে অবরোধ আরোপ করে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব দেশগুলো। কয়েকটি দাবি মানতে বাধ্য করার জন্যই বিত্তবান দোহার ওপর এই অবরোধ আরোপ করা হয়। একদিন পরেই অবরোধ আরোপকারী চার দেশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের তরফ থেকে সাধুবাদ পান। এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, আরব দেশগুলো বলেছে, তারা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। আর সব সূচকই কাতারের প্রতি ইঙ্গত করছে। সম্ভবত সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতার সমাপ্তি শুরু হয়েছে।’
এর ঠিক এক বছর পর, কাতার অবরোধে শুধু টিকেই থাকে নি। বরং দু’পক্ষের দ্বন্দ্বে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চাপ প্রয়োগ করে কাতারকে ১৩ দফা দাবি মানতে বাধ্য করার মিশনে ব্যর্থ হয়েছে কাতারবিরোধী জোট। এসব দাবির মধ্যে বহুল প্রচারিত আল জাজিরা টিভি চ্যানেল বন্ধ করার দাবিও রয়েছে। এছাড়া, কাতারের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছে সৌদি জোট। পূর্বে কাতার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযানে সমর্থন দিত। কিন্তু সৌদি জোটের অভিযোগ, কাতার বিশ্বাসঘাতকতা করে হুতি বিদ্রোহীদের সহায়তা দেয়া শুরু করেছে।
তবে পরিষ্কারভাবে এসব দাবি তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেয়া কাতারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। উপসাগরীয় সংকটের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাও বলেছেন যে, প্রকৃতপক্ষেই কাতার তার কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আনলেও সৌদি জোটকে তা বোঝানো সম্ভব ছিল না। অবরোধ আরোপের মূল উদ্দেশ্য ছিল কাতারকে একটি পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা। যার কোনো স্বাধীন বৈদেশিক নীতি অনুসরণের সক্ষমতা থাকবে না। এ উদ্দেশ্যে কাতারের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোতে লবিং করে সৌদি জোট। গোটা বিশ্বে কাতারের বিরুদ্ধে একটি জনমত গঠনের চেষ্টা চালায় তারা।
কিন্তু সৌদি জোটের এসব পদক্ষেপ কাতার নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। এর বাস্তব উদাহরণ হতে পারে এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানির যৌথ বিবৃতি। এতে ট্রাম্প উল্টো সৌদি আরব বিরোধী বক্তব্য দেন।

পুরাতন গাড়ি যেভাবে নতুন করা হয় by রিপন আনসারী

ঈদে এলেই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এই রুটে ফিটনেসবিহীন লক্কড় ঝক্কর গাড়ির দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বহু বছরের পুরানো গাড়ির গায়ে রং চং লাগিয়ে নতুন রূপে সাজানো হয় যাত্রী আকৃষ্টের জন্য। আর এই লক্কড় ঝক্কর গাড়ি মেরামতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মানিকগঞ্জের সবগুলো ওয়ার্কসপের কারিগর ও রং মিস্ত্রিরা।
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ২১টি জেলায় সড়ক পথে যাতায়াতের অন্যতম পথ হচ্ছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। অত্যন্ত ব্যস্ততম এই মহাসড়ককে এক সময় বলা হতো মৃত্যুর ফাঁদ। তবে কিছুটা কমে এলেও দুর্ঘটনা এখনো কমেনি। আর দুর্ঘটনার অন্যতম কারণই হচ্ছে লক্কর ঝক্কর এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এই গাড়িগুলো বিশেষ করে ঈদের আগে পরে দাপট বেড়ে যায় অনেকাংশে।
ঈদের আগের তিন-চারদিন সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে চলেন যে যার আপনালয়। মানুষের চাপের বিপরীতে যানবাহন সংকট হয়ে পড়ার সেই সুযোগ কাজে লাগায় একশ্রেণির পরিবহন ব্যবসায়ী। রাস্তায় তখন ভালোমন্দ গাড়ির বাছ বিচার না করে মানুষজন হাতের কাছে যা পায় সেসব গাড়িতেই উঠে যাত্রা শুরু করেন। উপরে রং লাগিয়ে লক্কড়-ঝক্কর এসব গাড়ি সড়কের নামানোর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও না কোথাও বিকল হয়ে পড়ে। ফলে রং চং মাখা এসব গাড়ির কারণে ঈদে ঘরমুখো মানুষজন রাস্তায় রাস্তায় ভোগান্তির শিকার হন। সেই ঘটে দুর্ঘটনাও।
সরজমিন মানিকগঞ্জের গাড়ি মেরামতের কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, ফিটনেসবিহীন ভাঙ্গাচোরা গাড়িগুলো জোড়াতালি দেয়া হচ্ছে ওয়ার্কসপে। এই মুহূর্তে গ্যারেজের মিত্রিরা পুরাতন গাড়ি মেরামতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। কোন গাড়ির ইঞ্জিন, ব্রেকে সমস্যা কিংবা সিটগুলো ছেঁড়া। আবার কোনো গাড়ির বডিতে রং চং নেই। ঈদের সময় বহু বছরের পুরাতন এসব গাড়িগুলো মেরামত করে নতুন সাজে রোডে নামানো হবে। বিশেষ করে ২৫-২৬ রোজার পর ওপরে ফিটফাট গাড়িগুলো রোডে নামানো হবে বলে জানিয়েছেন ওযার্কসপের কর্মচারীরা।
মানিকগঞ্জের উচুটিয়া এলাকায় রাব্বি মটর্সের এক শ্রমিক জানালেন, ঈদকে সামনে রেখে তাদের গ্যারেজে পুরাতন গাড়ির কাজ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। গাড়িতে রং চং ও ইঞ্জিনের ত্রুটিগুলো মেরামত করা হচ্ছে বেশি। ২৬ রোজার আগেই এসব গাড়ির কাজ শেষ হবে আর ২৭ রোজায় রোডে নামানো হবে।
রং মিস্ত্রি উজ্জল জানালেন, পুরাতন গাড়ি ঈদের সামনে রং করে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। যাতে যাত্রীরা আকৃষ্ট হয়। সময়মতো ডেলিভারি দেয়ার জন্য দিন-রাত গাড়িতে রঙের কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
পাশেই সানি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের দেখা গেলে সেখানকার লক্কড় ঝক্কর কয়েকটি গাড়ি মেরামতের কাজ চলছে বেশ জোরেশোরে। কেউ বাসে রং করছে আবার কেউ ইঞ্জিন খুলে বসেছে আবার কেউ সিট ও বডির কাজ করছে। এই কারখানায় মেরামত করতে আসা যাত্রী সেবা গাড়ির চালক ইমরান জানালেন, ঈদের সময় প্রত্যেক যাত্রীই চায় রং চং করা সুন্দর গাড়িতে উঠতে। তাই বাসের ভেতরের সিট ও বডিতে রঙের কাজ করাতে আনা হয়েছে। ঈদের সময় গাড়ির ফিটনেস না থাকলে পুলিশ ও সার্জেন্টরা বিরক্ত করে। আর সারা বছরের চাইতে ঈদের সময় কিছু বাড়তি টাকা কামানো যায়।
রং মিস্ত্রি আলিম জানালেন, আমরা এখন পুরো ব্যস্ত সময় পার করছি। ২৭ রোজার মধ্যে গাড়িতে রং চং শেষ করে ডেলিভারি দিতে হবে। আমাদের হাতের যাদুতে গাড়িগুলোকে একদম নতুন সাজে সাজিয়ে দিচ্ছি। দেখে বুঝার উপায় নেই কোনটা পুরাতন আর কোনটা নতুন। এই গ্যারেজের মতো মানিকগঞ্জসহ দেশের আরো সব গ্যারেজে চলছে লক্কড় ঝক্কর গাড়ি মেরামতের কাজ।
এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা বলছে, ঈদ এলেই রোডে লক্কর ঝক্কর গাড়ির দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। ফিটনেসবিহীন বহু বছরের পুরাতন গাড়িগুলো রং করে রোডে চলাচল করলেও রোড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো মনিটরিং দেখা য়ায় না।
বাস যাত্রী রফিকুল ইসলাম জানালেন, রং চং মেখে গাড়িগুলো রোডে নামানোর ফলে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। আসলে এই গাড়িগুলো হচ্ছে ওপরে ফিটফাট এবং ভেতরে সদর ঘাট। প্রশাসনের নজরদারি থাকলে ঈদে পুরানো ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো চলাচলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
মানিকগঞ্জ শহরের বাসিন্দা আব্বাস আলী জানালেন, লক্কড় ঝক্কর বাসের পাশাপাশি মহাসড়কে টেম্পো, সিএসজি চলাচল আবারও বেড়ে গেছে। এসব গাড়ি মহাসড়কে চলাচলে বন্ধ না হলে ঈদে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম বলেন, প্রতি বারের মতো এবারের ঈদে মহাসড়কে আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রেখেছি। তিন দিন আগে থেকে মহাসড়কে ট্রাক উঠতে দেওয়া হবে না পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি যাতে আসতে না পারে সেদিকে আমরা ব্যবস্থা রাখবো।

আসাম সীমান্তে বাংলাভাষীদের নির্ঘুম রাত

বশিরহাটের কাছে আসামের ৮৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা। তার পাশেই কুচবিহারের গ্রামবাসীদের নির্ঘুম রাত কাটছে। অনেক বছর আগে এসব গ্রামের বহু যুবতীর বিয়ে নিয়ে পরিবারগুলোতে আতঙ্ক। যেসব যুবক বা ব্যক্তির সঙ্গে তাদের বিয়ে হয়েছে তাদেরকে বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। আসামে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা নিয়ে যে প্রক্রিয়া চলছে তার শিকার হতে পারেন এসব পুরুষ। ফলে ওই পরিবারগুলোতে তাদের মেয়েদের নিয়ে, তাদের পরিবার নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এতে বলা হয়েছে, আসামে নাগরিকত্ব বিষয়ক ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন (এনআরসি) আধুনিকায়ন করা হয়েছে বা হচ্ছে। এর ফলে প্রায় ৬৯০০০ বাংলাভাষী পুরুষ, যারা ডি- ভোটার (ডাউটফুল ভোটার), তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তাই সীমান্তের অন্যপাড়ে ছাগুলিয়া, ফেলাকুরা, আগামোনি ও গোলাপগঞ্জ গ্রামে উত্তেজনার পারদ বাড়ছেই। কয়েক মাস আগে আসামে এমন বাংলাভাষীদের মধ্যে তাদের পূর্ব পুরুষদের সন্ধান বের করতে হিমশিম খেতে হয়। তারা নিজেদেরকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ দিতে মরিয়া হয়ে যান। তৃণমূল এমএলএ উদয়ণ গুহ বলেছেন, এখনো আসামের অনেক মানুষ আমাদের কাছে আসছেন। তারা অনুরোধ করছেন একটি সনদের জন্য। তাতে যেন বলে দেয়া হয় তাদের পিতামহরা কুচবিহারের অধিবাসী ছিলেন এবং তাদের নাম যেন ভোটার তালিকায় থাকে। আমরা এমন ব্যক্তিদের সনদ দিয়েছি। কিন্তু ডি-ভোটার হিসেবে অভিহিত হওয়া থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি সনদই যথেষ্ট নয়। কারণ, তাদেরকে সময়ে অসময়ে স্থানীয় প্রশাসন থেকে তলব করা হয়েছে। এমন কি বৈদেশিক বিষয়ক ট্রাইব্যুনালও অনেক মামলাকে শুধু সনদের ওপর ভিত্তি করে সন্তোষজনক রায় দেয়নি। এ মাসের শেষের দিকে দ্বিতীয় এনআরসি তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এমনই নির্দেশনা রয়েছে। এ তালিকা প্রকাশ হয়ে গেলে এসব মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে। বিষয়টিতে বিরক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১১ই এপ্রিল ফিরহাদ হাকিম, গৌতম দেব ও রবীন্দ্রনাথ ঘোষের সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছেন আসামে। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, আসামের বিভিন্ন এলাকায় ডি-ভোটার, যারা বাংলাভাষী, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তাদের অভিযোগ, অনেক ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন সনদপত্রকে প্রত্যাখ্যান করছে। খারাপ বিষয় হলো প্রশাসন এরই মধ্যে তিনটি স্থানে বন্দিশিবির স্থাপন করেছে। সেখানে কিছু ডি-ভোটারকে আটকে রাখা হয়েছে। আমি এমন কিছু বন্দিশিবিরে গিয়েছি। তাদের দুর্ভোগের বিষয়টি আমি প্রকাশ্যে বর্ণনা করতে পারবো না।
তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আসাম থেকে বিজেপির আটজন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের ভিত্তিতে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। যে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তা রক্ষা করতে না পারার জন্য তাদের সবারই পদত্যাগ করা উচিত। যদি আসাম বাংলাভাষীদেরকে ‘বিদেশি’ হিসেবে অভিহিত করে তাহলে তাদের জন্য দরজা উন্মুক্ত করে রেখেছেন মমতা সরকার।

বিশ্ব রাজনীতি ছাপিয়ে ফুটবল উৎসব

২০১০ সালের ডিসেম্বর। স্থান জার্মানির জুরিখ। মুখে হাসি নিয়ে উপস্থিত হলেন ভ্লাদিমির পুতিন। পায়ে বসন্তের ছন্দ। পকেটে একটি ভাষণ। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে রাশিয়ার। প্রেসিডেন্ট পুতিন যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তার মুখভরা হাসি। উপস্থিতদের সামনে বক্তব্য রাখলেন সেই ভাষায় যে ভাষায় তিনি ভালো করে কথা বলতে পারেন। তবে সাধারণত তিনি প্রকাশ্যে এ ভাষায় কথা বলেন না। তিনি সাবলীল ইংরেজিতে বললেন, ‘ফ্রম দ্য বটম অব মাই হার্ট, থ্যাংক ইউ’। তিনি বিশ্বের জন্য একটি শুভ শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করলেন ফুটবলকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার নিজের শহর লেনিনগ্রাদ (যা বর্তমানে সেন্ট পিটার্সবুর্গ)-এর কাহিনী বললেন। ওই সময় নাৎসীরা ওই শহর দখল করে নিয়েছিল। বৃষ্টির মতো বোমা ফেলা হয়েছিল। খাদ্য ও জ্বালানি শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও একটি বিষয় অব্যাহত ছিল। তা হলো ফুটবল। গত আট বছরে দুনিয়ায় অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। তবে বিশ্বরাজনীতিতে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রভাব একটুও কমেনি। বরং বেড়েছে। গত শুক্রবার ফিফার ওয়ার্ল্ড কাপ ইউটিউব চ্যানেল ভ্লাদিমির পুতিনের একটি স্বাগত বক্তব্য প্রচার করেছে। তাতে পুতিনকে দাঁড়ানো দেখা গেছে। তিনি ছিলেন গুরুগম্ভীর। তার মুখে তেমন হাসি ছিল না। দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্রেমলিনের কোনো একটি ভবনে। পুরো বক্তব্যটিই ছিল রাশিয়ান ভাষায়। তাতে পরিষ্কার যে বার্তা দেয়া হয়েছে তা হলো- এখন চার্জে আছি আমরাই।
সে যাই হোক রাজনীতি এখন ব্যাকফুটে চলে গেছে। ফুটবল। চামড়ার এক গোলকের দুর্বার আকর্ষণে পুরো বিশ্বের নজর এখন এক বিন্দুতে। আর কেন্দ্রস্থল রাশিয়া। দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ- ফুটবল বিশ্বকাপ আসরের পর্দা উঠছে আজ। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে রাত ৯টায় আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক রাশিয়া ও সৌদি আরব। আধাঘণ্টা আগে হবে ৩০ মিনিটব্যাপী উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মাসব্যাপী এ আসরকে ঘিরে ফুটবল জ্বরে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নেই এখানে। কিন্তু আনন্দ আর উৎসবে দুনিয়ার আর কোন দেশ থেকে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে উন্মাদনা। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মোটামুটি এ দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বাংলাদেশ। পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। পছন্দের দলের পক্ষে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন ফুটবলপ্রেমীরা। আবার সমর্থকদের কথার লড়াই জমেছে ফেসবুক, টু্‌ইটারের মতো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।
২০১০ সালে দেয়া বক্তব্যে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বকে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিকর স্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পুতিন। তিনি তখন ইংরেজিতে বলেছিলেন, এক্ষেত্রে আমাদের কাছে কতিপয় প্রস্তাবনা আছে। তা হলো- ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার। এক শহর থেকে আরেক শহরে ভাড়াহীন চলাচল। এছাড়াও আপনি রাশিয়াকে জানতে পারেন। এটি হলো এমন একটি দেশ যার রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। এটা মোটেও বাজে কিছু নয়। বিশ্ব সুপার পাওয়ার হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটা ছিল রাশিয়ার একটি অভিবাদন বার্তা। বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে তারা এক ধাপ এগিয়ে গেল। জানিয়ে গেল রাশিয়াকে ভালোবাসার আহ্বান। তাদের মধ্যে এক রকম স্বস্তি কাজ করেছিল। তা হলো তারা স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও হল্যান্ডকে পেছনে ফেলে বিড জিতে প্রথম হয়েছে। ডেভিড বেকহ্যাম, ডেভিড ক্যামেরন ও প্রিন্স উইলিয়ামের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয় রাশিয়া। ফলে অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো সবকিছু পাল্টে গেছে। বিশ্বের প্রতি বাহু উন্মুক্ত করেছে রাশিয়া। তাতে সহায়তা প্রয়োজন।
বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর প্রাক্কালে এটা যেন এক অতিশয়োক্তি নয়, এক অসীম শ্রেষ্ঠত্ব। সারা বিশ্বকে মাত করেছে। রাশিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে কি করেছে সেদিকে ফিরে তাকানোর অবকাশ কারো নেই এখন। এখন শুধু দৃষ্টি রাশিয়ার দিকে। কখন বাঁশিতে ফুঁ দেবেন রেফারি! সঙ্গে সঙ্গে মেতে উঠবে বিশ্ব। তার আগে জমকালো উদ্বোধনী এক আসর অবলোকন করবে বিশ্ববাসী। ফুটবলের এক জ্বলজ্বলে পিণ্ডে পরিণত হবে রাশিয়া। সিরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার বেসামরিক নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির কথা ভুলে যাবে বিশ্ব। ভুলে যাবে চীন-ভারতের মধ্যে বৈরিতা, ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষির কথা। ইয়েমেনে হয়তো ঝরবে আরো রক্ত। ইরাক, লিবিয়ায় বয়ে যেতে পারে রক্তের বন্যা। আফগানিস্তানে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে হয়তো কোনো মা, বোন, ভাইয়ের মৃতদেহ। বিশ্বকাপের এই উন্মাদনায় তাদের কথা হয়তো ভুলে যাবে অনেক মানুষ। তারা বিশ্ব রাজনীতিকে পেছনে ফেলে, রেষারেষিকে পেছনে ফেলে, পারমাণবিক অস্ত্রের ঝনঝনানি থেকে মুক্ত হয়ে ভেসে বেড়াবেন এক অপার আনন্দের ভুবনে।
রাজনীতিকে ছাপিয়ে ফুটবল সামনের সারিতে চলে এলেও রাজনীতিকে বাইরেও রাখা যাচ্ছে না। তার আদর্শ উদাহরণ জার্মানির মেসুত ওজিল, ইলকাই গুনডোয়ান, মিশরের মোহাম্মদ সালাহ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে দেখা করে গত মাসে একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত দুই জার্মান ফুটবলার ওজিল-গুনডোয়ান। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জার্মানির সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচে গুনডোয়ানের পায়ে বল গেলেই দুয়োধ্বনি দিয়ে উঠছিলেন জার্মানির সমর্থকরা। ওজিল-গুনডোয়ানের ঘটনায় হইচই যে থামেনি, তা বোঝা গেল জার্মানি দলের ম্যানেজার অলিভার বিয়েরহফের কথায়। বিয়েরহফ বলেন, ওজিল এ নিয়ে একটা কথাও বলবে না। ও ভুল করেছে, বুঝতে পেরেছে। বুঝিয়ে দেয়াও হয়েছে।’ আর জার্মানি থেকে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মরকেলের মন্তব্য আরো কঠিন। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, ওই দুই ফুটবলার বুঝতে পারেনি এটার গুরুত্ব কোথায়। বার্লিন এবং আঙ্কারার রাজনৈতিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে। আর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির যে কোনো সংবাদ সম্মেলনে ঘুরে ফিরে আসছে ওজিল-গুনডোয়ান সংক্রান্ত প্রশ্ন।
ওজিলে যদি জড়িয়ে যায় ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজনীতিক মরকেলের নাম, তাহলে মোহাম্মদ সালাহর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন স্তালিনের পর রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি রাজত্ব করা ভ্লাদিমির পুতিন। সালাহর দেশ মিশর এবার বেস ক্যাম্প করেছে চেচনিয়ায়। আর দুদিন আগে মোহাম্মদ সালাহকে নিজের গাড়িতে পাশের সিটে বসিয়ে মিশরের অনুশীলনে হাজির হন চেচনিয়ার আলোচিত নেতা রমজান কাদিরভ। ওঠে সমালোচনার ঝড়। কাদিরভের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অনেক অভিযোগ রয়েছে। রাশিয়া থেকে আলাদা হতে চাওয়া চেচনিয়া নব্বইয়ের দশকে দুবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। আর ক’দিন আগে ব্লুমবার্গে একটি লেখার শিরোনাম ছিল, ওয়ার্ল্ড কাপ পলিটিক্স: মস্কো ১-০ লন্ডন। বৃটেন থেকে বিশ্বকাপ বয়কটের যে যে বেসরকারি ডাক উঠেছিল, তাতে আইসল্যান্ডের নেতারা ছাড়া তেমন সাড়া দেয়নি কেউ।
বিশ্বকাপের এটি ২১তম আসর। তবে পূর্ব ইউরোপে বিশ্বকাপ আসর বসছে প্রথমবার। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রথমবার মঞ্চস্থ হয় ৮৮ বছর আগে। ১৯৩০-এ উরুগুয়েতে আয়োজিত হয় ফুটবলের এ মহাযজ্ঞ। এবার রাশিয়ার ১১ শহরের ভিন্ন ১২টি ভেন্যুতে হবে এবারের বিশ্বকাপের খেলাগুলো। এতে মোট ম্যাচ ৬৪। দর্শকরা প্রথমবার টেলিভিশনে বিশ্বকাপের খেলা দেখার সুযোগ পান ১৯৫০’র আসরে। তবে কালক্রমে টিভিতে বিশ্বকাপের দর্শকপ্রিয়তা বেড়েছে ব্যাপকহারে। টেলিভিশনে এবারের বিশ্বকাপের খেলা উপভোগ করবে বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটি দর্শক। এবারের বিশ্বকাপেও খেলছে ৩২টি দেশ। ব্রাজিলের মাটিতে গত বিশ্বকাপে অংশ নেয়া ২০ দেশ খেলছে এবারো।
রাশিয়ায় এবারো আর্জেন্টিনার প্রত্যাশা আবর্তিত লিওনেল মেসিকে ঘিরে। সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে এফসি বার্সেলোনার জার্সি গায়ে ৫৭ ম্যাচে সর্বাধিক ৪৫ গোলের রেকর্ড মেসির। আর আর্জেন্টিনার সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে হ্যাটট্রিক নৈপুণ্য নিয়ে নিজের টাটকা ফর্মই দেখাচ্ছেন মেসি। এবারের হট ফেভারিট ব্রাজিল। আর ইনজুরি থেকে ফিরে ভক্ত-সমর্থকদের প্রত্যাশার পালে হাওয়া দিচ্ছেন ট্রান্সফার ফি বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার নেইমার। শেষ দুই প্রস্তুতি ম্যাচেই গোল পেয়েছে এ ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। মৌসুমে ৪৪ ম্যাচে ৪৪ গোলের কৃতিত্ব ২০১৬’র ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপাজয়ী পর্তুগিজ স্ট্রাইকার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চমক
সাধারণত বিশ্বকাপের থিম সংয়ের গায়করা পারফর্ম করে থাকেন আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। গত ক’আসরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ মাতান পপ শিল্পী রিকি মার্টিন, শাকিরা, জেনিফার লোপেজ, ব্যান্ড পিট বল। তবে প্রথা ভাঙছে এবার। এবারের বিশ্বকাপের থিম সং গেয়েছেন মার্কিন তারকা উইল স্মিথ, পুয়ের্তোরিকান নিকি জ্যাম ও আলবেনিয়ান শিল্পী এরা এসত্রেফি। কিন্তু মস্কোয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতে দেখা যাবে না এদের কাউকেই। এবার মঞ্চ মাতাবেন বৃটিশ রক মিউজিক তারকা রবি উইলিয়ামস। প্রতিবছর কিকঅফের একঘণ্টা আগে শুরু হয় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি ৩০ মিনিট। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে আটটায় শুরু হবে অনুষ্ঠান। পারফর্ম করবেন জনপ্রিয় রুশ শিল্পী আইদা গারিফুলিনা। এই দু’জনের পাশাপাশি মঞ্চে উঠবেন কিংবদন্তি স্প্যানিশ শিল্পী এবং অপেরা আইকন প্লাসিদো ডমিঙ্গো। তার পরে মঞ্চে উঠবেন আরেক জনপ্রিয় শিল্পী জুয়ান ডিয়েগো ফ্লোরেজ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনাল্ডোও। রবি উইলিয়ামস তার জনপ্রিয় গানের কয়েকটি গাইবেন। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ঘরানার ক্লাসিক্যাল মিউজিককে প্রাধান্য দেয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০০ নৃত্যশিল্পী থাকবেন। তারা রাশিয়ান সংস্কৃতি তুলে ধরবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে। এখানে ৮০ হাজার দর্শক অনুষ্ঠানটি মাঠ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন। একই সময়ে শহরের বিখ্যাত রেড স্কয়ারে কনসার্ট হবে।
রিপোর্টটি লিখেছেন মোহাম্মদ আবুল হোসেন ও পিন্টু আনোয়ার

এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কোন হাসপাতালে হবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের সম্মতি না পাওয়ায় এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। এদিকে খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়ার বিষয়ে তার ছোট ভাই শামীম এস্কানদারের আবেদনের বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। বুধবার বিকালে রাজধানীর তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনের সম্মতি না পাওয়ায় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়নি। তার সম্মতি পাওয়া গেলে কারা কর্তৃপক্ষের দেয়া অপশনগুলোতে চিকিৎসা দেয়া হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে সর্বশেষ কী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, দেখুন আমরা কী করতে যাচ্ছি। খালেদা জিয়াকে যারা চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন, যাদের চিকিৎসা তিনি নেন, সেই বিশেষজ্ঞ চারজনকে আমরা নিয়ে গিয়েছিলাম, সেটা আপনারা জানেন। আমাদের সিভিল সার্জন, কারাগারের ডাক্তার সবাই একসঙ্গে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। তাদের সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আবার তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আমরা তাদের জানিয়ে দিয়েছি। আমরা কোথায় নিয়ে যাবো। এখন তিনি যদি সম্মতি প্রকাশ করেন, তাহলেই আমরা সেই ব্যবস্থা করবো। আইজি প্রিজনস কিছুক্ষণ আগে (বুধবার বিকালে) জানিয়েছেন খালেদা জিয়া এখনও কোনো সম্মতি দেননি। আমরা আশা করি, যেকোনো সময়ে তিনি সম্মতি প্রকাশ করবেন। তখনই আমরা আমাদের যে অপশনগুলো ছিল, সেসব অপশনে নিয়ে যাবো। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. জাহাঙ্গীর কবির মানজমিনকে বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কোন হাসপাতালে হবে সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি। উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়া এমন অসুস্থ নন যে, তার জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলে তো তাকে জরুরিভাবে চিকিৎসা দেয়া হবে। সেজন্য এত অনুমতিরও প্রয়োজন নেই। সঙ্গে সঙ্গে আমরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাব। এখন তার সঙ্গে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক ও একজন নারী ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। তারা তার স্বাস্থ্যের দেখভাল করছেন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা দিচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন। এ পর্যন্ত খালেদা জিয়া সব রোজা রেখেছেন বলেও জানান জেল সুপার।
গত ৫ই জুন কারাগারে পড়ে গিয়ে খালেদা জিয়া সংজ্ঞা হারান বলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এরপরই তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার দাবি করেন বিএনপি নেতারা। সরকারের তরফে বলা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। তবে এ হাসপাতালে চিকিৎসায় সম্মতি দেননি খালেদা জিয়া। তিনি বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী। বিএসএমএমইউতে রাজি না হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার বিকল্প প্রস্তাবের কথা জানান।

ঈদ যাত্রায় কোথাও স্বস্তি কোথাও ভোগান্তি

প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সবাই ছুটছে জন্মভূমিতে। বাস, ট্রেন-লঞ্চে করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। গতকাল সকাল থেকেই বাস-লঞ্চ টার্মিনাল ও রেল স্টেশনে ছিল উপচেপড়া ভিড়। বাড়তি মানুষের চাপে সড়কে কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে যানজট। আবার ভাঙা ও বৃষ্টির কারণে কর্দমাক্ত সড়কে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। ঈদ যাত্রায় পথে পথে দুর্ভোগে পড়লেও মানুষের চেহারায় ছিল বাড়ি ফেরার আনন্দ। মহাসড়কে কোথাও কোথাও যানজটের কবলে পড়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাওয়া কয়েকটি ট্রেনও শিডিউল বিপর্যয়ে পড়েছে। বুধবার সরকারি ছুটি থাকায় অনেক চাকরিজীবী বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়ে ঈদ ছুটির সঙ্গে মিল করে বাড়ি চলে গেছেন। ব্যস্ত শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামমুখী হওয়ায় চিরচেনা ঢাকা ফাঁকা হয়ে আসছে। সরজমিন কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানুষ আর মানুষ। ব্যাগ, লাগেজ হাতে নিয়ে সবাই ছুটছেন কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের দিকে। তবে ট্রেন ছাড়তে দেরি হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। বুধবার বাড়ি যাচ্ছিলেন ৪ঠা জুন অগ্রিম টিকিট কেনা যাত্রীরা। এদিন সকালে রাজশাহী, দেওয়ানগঞ্জ, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট ও খুলনার সকালে কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পর কমলাপুর স্টেশন ছেড়েছে। এর মধ্যে দুটি বিশেষ ট্রেনের দুটিই ছাড়তে দেরি হয়। দেওয়ানগঞ্জ ঈদ স্পেশাল ট্রেন ছাড়ার সময় ছিল সকাল পৌনে ৯টায়।
তা ছেড়েছে নির্ধারিত সমরের পৌনে এক ঘণ্টা পর। লালমনিরহাটের লালমনি ঈদ স্পেশাল ট্রেন বেলা সোয়া ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা। এটি ছাড়ে বেলা ১১টায়। দেওয়ানগঞ্জ স্পেশাল ট্রেনের যাত্রী হাসান সরকার বলেন, সকাল ৮টায় এখানে এসে বসে আছি। কিন্তু ট্রেন ছাড়তে দেরি করছে। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা থাকলেও তা সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়েছে। অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস আধাঘণ্টা দেরি করে সকাল সোয়া ৯টায় ছেড়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেস ২০ মিনিট দেরি করে বেলা ১০টা ২০ মিনিটে ছেড়েছে। নীলসাগর এক্সপ্রেস ছাড়ার সময় সকাল ৮টায়; তবে ট্রেনটি আধাঘণ্টা দেরি করে সকাল সাড়ে ৮টায় গেছে। নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ভেতরে পা ফেলার জায়গা ছিল না। আর যারা ভিড়ের কারণে সিট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি, তারাও দাঁড়িয়েছিলেন সিট না পাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে। সবমিলিয়ে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়ে ট্রেনের ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। জানালা দিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের ট্রেনের ভেতরে ঢোকানোর দৃশ্য ছিল প্রায় বগির জানালাতেই। আর ট্রেনের ছাদের পুরোটাজুড়েই মানুষ আর মানুষ। সিদ্দিকুর রহমান নামের এক যাত্রী নীল সাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ভেতরে উঠতে না পেরে চড়ে বসেছেন ছাদে। তখন ট্রেনের ছাদজুড়েই মানুষ আর মানুষ। তিনি বলেন, স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটেছি, কিন্তু ট্রেনের ভেতরে এত যাত্রী যে উঠার মতো পরিস্থিতি নেই। ট্রেনের ছাদে অতিরিক্ত যাত্রী উঠার বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যেন ছাদে যাত্রীরা না ওঠে। তারপরও ট্রেন কমলাপুর আসার আগে এয়ারপোর্ট স্টেশনে এসব যাত্রী ছাদে উঠে পড়েছে। এত যাত্রী যে চেষ্টা করেও তাদের নামানো যাচ্ছে না। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ঈদ যাত্রায় আমরা চেষ্টা করছি যেন সব ট্রেনই ঠিকমতো এসে নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়। মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ঈদে বাড়ি ফিরতে পারে সেজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। যাত্রী চাপ সামলাতে প্রায় প্রতিটি ট্রেনেই অতিরিক্ত বগি লাগানোর পাশাপাশি যাত্রীদের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও আছে।
এদিকে রেলপথ মন্ত্রী মো. মুজিবুল হক গতকাল কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া দুটি ট্রেনে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো যাত্রীদের বিদায়ী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ সময় তিনি রাজশাহীগামী সিল্কসিটি ও চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন পরিদর্শন করেন। মন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমরা সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে যাত্রীদের সেবা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাত্রীরা যেন নির্বিঘ্নে ঈদ পালন করে আবার ঢাকায় ফিরে আসতে পারে তার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রী এ সময় বলেন, বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৩০টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। তার মধ্যে ২টি ট্রেন কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
এদিকে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে অগ্রিম টিকিট কিনেও বাসের জন্য বসে ছিলেন যাত্রীরা। সমস্যা হতে পারে এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে টার্মিনালে আসেন তারা। বুধবার রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সূত্র জানায় যায়, ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল। বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা কাউন্টারে কাউন্টারে ভিড় করে। কাঙ্ক্ষিত সময়ের বাস আসার অপেক্ষা করছিলেন তারা। ভোর বেলা থেকে বিভিন্ন রুটের বাস যথাসময়ে ছেড়ে গেছে। তবে কিছু বাস দেরিতে ছাড়ার এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাবতলীর হানিফ, এসআর, নাবিল, শ্যামলী ছাড়াও প্রত্যেকটি কাউন্টারেই ভিড় ছিল। কল্যাণপুরে রাজশাহীগামী যাত্রী আলম বাবু বলেন, বাড়ি যাচ্ছি। খুব ভালো লাগছে। সিডিউল বিপর্যয়ে পড়তে হয়নি।
অন্যদিকে সকাল থেকেই আস্তে আস্তে সদরঘাটে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে লঞ্চযাত্রীরা আগেভাগেই ঘাটে পৌঁছান। কাঙিক্ষত লঞ্চের অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করেন টার্মিনালে। বরিশালাগামী যাত্রী হাসান মিয়া বলেন, ঈদের সময় বাড়ি যেতে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। তারপরও বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদে বাড়ি থাকলে আনন্দের কমতি থাকে না। ঘাটে কোনো লঞ্চ না পেয়ে যাত্রীরা টার্মিনাল থেকে নৌকাযোগে নদীর মাঝখানে নোঙর করে রাখা লঞ্চে উঠেন। পল্টুনে আসার আগেই নদীর মাঝখানেই লঞ্চগুলো পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিছু কিছু লঞ্চের ছাদে উঠে বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা।

যাকাতের কাপড় নিয়ে মারামারি

যাকাতের কাপড় নিয়ে মারামারির জেরে স্বামীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। নাছোড়বান্দা অন্তঃসত্ত্বার স্ত্রী। তিনিও যেতে চান স্বামীর সঙ্গে। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে উঠতে চাইছেন ভ্যানে। শহীদ মিনার এলাকা থেকে ছবিটি তুলেছেন নাসির উদ্দিন।