Friday, January 15, 2016

রিপাবলিকানে বিবেকবান প্রার্থী নেই : ডান দিকে ঝুঁকছে ডেমোক্র্যাটরা -মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রসঙ্গে চমস্কি

ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক একিউরেসির পক্ষ থেকে অ্যাবে মার্টিন সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ক্যামব্রিজের এমআইটিতে বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ও ভাষাতত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কির একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তার এই সাক্ষাতকারের চৌম্বক অংশটি নয়া দিগন্তের পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ খায়রুল বাশার।
প্রশ্ন : এখন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক দৃশ্যপট যেমন চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, তেমনি সেখানে এখনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে সবার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ মিল দেখা যাচ্ছে। যেমন- ল্যাটিন আমেরিকার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করা যায়। কিন্তু যুদ্ধের বিরোধিতার ব্যাপারে একটি জন ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও সেখানে সত্যিকার অর্থে যুদ্ধবিরোধী কোনো প্রার্থী নেই। কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই কেন বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন না?
নোয়াম চমস্কি : দৃশ্যপটটা অস্বাভাবিক বড়। এই দৃশ্যপটটি মূলত চরম ডানদের একটি কেন্দ্র। রিপাবলিকান পার্টি একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়ে ২০ বছর আগে মৌলিকভাবে যেকোনো পূর্ব-উত্তেজনা পরিত্যাগ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে ডানপন্থী থিংক ট্যাংক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের নরম্যান অর্নেস্টিনের মতো প্রসিদ্ধ ভাষ্যকারেরা রিপাবলিকান পার্টিকে রেডিক্যাল ইনসারজেন্সি তথা সহজাত বিদ্রোহী হিসেবে বর্ণনা করেছেন- যারা পার্লামেন্টারি রাজনীতিকে পরিত্যাগ করেছিল। কোনো কিছু ঘটুক তা তারা চায় না, তাদের একমাত্র নীতি হচ্ছে ‘কোনো কিছু কোরো না।’ ওটা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। যা ঘটেছে তা হচ্ছে নিউ লিবারেলের পুরো সময় দলটি এবং উভয় দলই ডান দিকে স্থান পরিবর্তন করেছে। বিশ্বের সর্বত্র এটা ঘটেছে। রিপাবলিকানেরা দৃশ্যপট থেকে সরে যায়। তারা বিপুল সম্পদের মালিক এবং ক্ষমতাশালী হওয়ার জন্য এতই পাগলপারা হয়ে যায় যে, তারা নিজস্ব অবস্থানে থেকে ভোট পায়নি। তাই তাদের অন্য নির্বাচনী এলাকায় যেতে হয়। সেখানে অন্য নির্বাচনী এলাকা রয়েছে। কিন্তু সেগুলো কখনো রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত ছিল না। খ্রিশ্চিয়ান ইভেনজেলিক্যালস তথা ঈশ্বরে বিশ্বাসই একমাত্র পথ এই মতাবলম্বী প্রটেস্টাইন সম্প্রদায়, মানুষের সহজাত ধারণা যারা পোষণ করে এবং যারা ‘আমাদের দেশকে আমাদের কাছ থেকে তারা নিয়ে যাবে’ এই ধারণা পোষণ করে ভয় পেয়ে যায়। যেসব লোক ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কফিশপে বন্দুক সাথে নিয়ে প্রবেশ করে অথচ ওটা তাদের অত্যাবশ্যকীয় ঘাঁটি। আপনি প্রাইমারিগুলোর দিকে তাকালে যুক্তিবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তথা বিবেকবান প্রার্থীকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখতে পাবেন না। সুতরাং এটাই হচ্ছে রিপাবলিকানদের অবস্থা। ডেমোক্র্যাটরাও তাদের কৌশল পরিবর্তন করে ডান দিকে ঝুঁকেছে।
আজকের ডেমোক্র্যাটদের প্রধান ধারাটি বেশ সুন্দর, যেটাকে মডারেট রিপাবলিকান্স বা উদার রিপাবলিকান বলা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ আইজেন হাওয়ারের মতো কাউকে না কাউকে বামপন্থীদের জন্য অপ্রচলিত প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সুতরাং উদাহরণের জন্য আইজেন হাওয়ার দৃঢ়তার সাথে এটা স্পষ্ট করেছেন যে, নতুন চুক্তির কর্মসূচির ব্যাপারে যিনি প্রশ্ন করেন তিনি আমেরিকান রাজনৈতিক জীবনের অংশ হবেন না। ভালো, এখন এটা একটি বামপন্থী কর্মসূচি। এটা মৌলিকভাবে বার্নিসেন্ডারের কর্মসূচি। তিনি হচ্ছেন আইজেন হাওয়ার। সুতরাং দৃশ্যপট যে বড় তা সত্য। কিন্তু এটা একটা অত্যন্ত অদ্ভুত অনুভূতি।
যতদূর জানা যায়, যুদ্ধবিরোধী প্রার্থীরা উদ্বিগ্ন। আপনি এর অর্থ কী তা জিজ্ঞেস করতে পারেন। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ওবামাকে একজন যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ইরাক যুদ্ধকে একটি ভুল, একটি কৌশলগত সাংঘাতিক ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৯৮০-এর দশকের প্রথমাংশে আফগানিস্তানের রুশ জেনারেলরা আফগান আগ্রাসনকে কৌশলগত একটি মারাত্মক ভুল বলে সমালোচনা করেছিলেন। ওটা যুদ্ধের সমালোচনা ছিল না। ওই সমালোচনায় বলা হয়েছে, আপনি ভুল করছেন। ওবামা প্রশাসন বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, সে ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী এই কর্মসূচিকে ড্রোন কর্মসূচির আগে তেমন একটা বিবেচনা করা হয়নি। সম্প্রতি বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এর বিস্তৃতি বা ব্যাপকতা আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে তা অতিবিজ্ঞ জেরেমি স্কাহিল অথবা গ্লিন গ্রিনওয়ালসের নয়।
কিন্তু এটা সম্পর্কে যারা কথা বলেছেন তাদের বেশির ভাগই বলেছেন, ‘আপনি কি অনেক বেসামরিক লোককে হত্যা করছেন?’ যেসব লোককে গোপনে হত্যা করেছেন, তাতে কী হলো? কারণ আপনি মনে করেন, একদিন তারা হয়তো আপনার ক্ষতি করতে চাইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ মনে করুন- ইরান যুক্তরাষ্ট্রের লোকদের খুন করছে? কারণ তারা মনে করে, কিছু কারণে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) হয়তো ইরানের ক্ষতি করতে চাইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ দি নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকেরা ইরানে বোমা হামলা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাই মনে করুন তারা বললেন যে, এটা একটা হুমকি দেয়া হয়েছে। চলুন তাদের হত্যা করি। এ ধরনের বক্তব্য কী আমরা গ্রহণ করব? মনে করুন, আমাদের শক্তি প্রয়োগ করার এবং সহিংসতা করার অধিকার আছে। কিন্তু এটা কি সবাই ভালোভাবে মেনে নেবে? যেমন- ইরান নিয়ে আলোচনার কথাই ধরুন। প্রকৃতপক্ষে, প্রেসিডেন্ট, রাজনৈতিক নেতারা, পত্রপত্রিকার ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক প্রত্যেকেই সর্বজনীনভাবে বলেন, আমরা যদি একতরফাভাবে চিহ্নিত করি, চিহ্নিত থাকার জন্য চিন্তাভাবনা করি, কিছুসংখ্যক ইরানি নাগরিক চুক্তি লঙ্ঘন করছে। তাই তাদের ওপর হামলা করার জন্য আমাদের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করার অধিকার আছে। এর অর্থ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইন ও এর প্রয়োগ বা বাস্তবতা অনুযায়ী এটা অস্বাভাবিক। কিন্তু এটা সর্বজনীন, প্রকৃতপক্ষে সর্বজনীন।
প্রশ্ন : এসব প্রার্থীর কোনো একজনের পক্ষ থেকেও গুপ্তহত্যা কর্মসূচি অথবা এমনকি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যাপারে মৃদু সমালোচনাও করা হয়নি। প্রত্যেক চার বছর আমরা এই বিরাট ভূমিকা পালনের জন্য তাদের নির্বাচিত করি। এসব নেতাকে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অনুশীলন করে আমাদের দেশকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য আমরা ভোট দেই। আমাদের সমাজে ক্ষমতা সত্যিকার অর্থে কিভাবে কাজ করে?
নোয়াম চমস্কি : মূলধারার রাজনৈতিক বিজ্ঞানে এসংক্রান্ত ভালো গবেষণা হয়েছে। অ্যাকাডেমিক রাজনীতিবিজ্ঞানে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সরকারি নীতির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। এটা সুন্দর ও সরাসরি গবেষণা বা সমীক্ষা। সরকারি নীতির দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়- ভোটদানের একটি ভালো প্রমাণ রয়েছে। মানুষ যেভাবে চিন্তা করে সেভাবে তারা তা কার্যকর করতে পারে। সুতরাং ৪০ বছরের উদাহরণ হলো জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করে, ধনীদের কর বাড়ানো উচিত। জনগণের অপর একটি বড় অংশ মনে করে, আমাদের একটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি থাকা উচিত। কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যখন পত্রপত্রিকায় আলোচনা করা হয় তখন বলা হয়, রাজনৈতিকভাবে এটা অসম্ভব। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এটা গ্রহণ করবে না। ... ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং মূলত ৭০ শতাংশ মানুষের মতামতের বিষয়টিকে বলা হয়, তারা আয় বিবেচনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ের। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের নীতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। সর্বোচ্চপর্যায়ে যারা আছে শুধু তাদের জন্যই কি নীতি তৈরি হবে? সর্বোচ্চ পর্যায়ে ১ শতাংশ লোক আছে, তা হলে এটা তো গণতন্ত্রের মোড়কে পলিটুক্র্যাসি অর্থাৎ ধনীদের শাসন। আমি মনে করি, এখন নির্বাচন একটি কৌতুকে পরিণত হয়েছে। তবে সবসময় এটা সত্য যে, নির্বাচনী প্রচারের জন্য অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০০ বছর আগে গ্রেট ক্যাম্পেইন ম্যানেজার মার্ক হান্নানকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- নির্বাচনী প্রচারণায় কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ? তিনি বলেন, তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম হচ্ছে : অর্থ, দ্বিতীয়টিও হচ্ছে অর্থ এবং তৃতীয়টি কি তা আমি ভুলে গেছি। এটাই হলো সত্য। বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণায় শত শত কোটি ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল সুপ্রিম কোর্ট তা দেখেও দেখছে না।
প্রশ্ন : কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানের কুন্দুজে একটি হাসপাতালে বোমা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাকেই যথেষ্ট হয়েছে বলে মনে করেছে। মার্কিন সিদ্ধান্তকে সঠিক হয়েছে বলে সাফাই গাওয়ার লোকের অভাব নেই। তালেবান জুজুর ভয় দেখিয়েও এটাকে তারা জায়েজ করার চেষ্টা করছে। ইসরাইল যেভাবে যুক্তি দেখায়- তাদের বক্তব্যও একই রকম। তা হলে আমেরিকা যে ব্যতিক্রমধর্মী বলে প্রচার করে এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় তার প্রমাণ কী?
নোয়াম চমস্কি : ভালো, আমাদের ‘আমেরিকান ব্যতিক্রমধর্মী’ বিষয়ক শব্দ চয়নের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। একটা বিষয় হলো এটা ব্যতিক্রমধর্মী কিছু নয়। প্রত্যেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একইভাবে জনগণের সাথে তাদের আচার-আচরণ ও ভাবভঙ্গি প্রকাশ করে থাকে। কোনো কোনো সময় তারা আরো খারাপ আচরণ করে। সুতরাং এটা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বাভাবিক প্র্যাকটিস। ব্রিটিশেরা যখন বিশ্বকে ধ্বংস করছিল তখন তারা মনে করেছিল তারা নিশ্চিতভাবে সর্বোচ্চ আদর্শ নিয়ে কাজ করছে। জন স্টুয়ার্ট মিলের মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী নেতারা ইংল্যান্ডকে একটি এনজেলিক দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কুন্দুজ হাসপাতালের ক্ষেত্রে আমি সবকিছু আমাদের সামনে এসেছে বলে মনে করি না। তারা তালেবান নেতাদের হত্যা করার চেষ্টা করছে। হাসপাতালে হামলা করে তারা অন্যদেরও হত্যা করছে। অন্যদের হত্যা করায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। আমরা যাদের পছন্দ করি না- অন্যান্য দেশে আমরা তাদের হত্যা করছি। আমি তালেবানদের পছন্দ করি না। তার অর্থ কি আমরা তাদের হত্যা করার অধিকারী? আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তারা আমাদের পছন্দ না করলে আমাদের হত্যা করার অধিকার কি তাদের আছে? একটি হাসপাতালে হামলা করে, হাসপাতালের কর্মচারী ও রোগীদের হত্যা করাকে আমরা কী বলব? আর এ ধরনের ঘটনা একবারই নয়- বহুবার ঘটেছে। ফালুজা বিজয় হচ্ছে ইরাকে মার্কিন বাহিনীর অন্যতম প্রশংসনীয় জয়। ২০০৪ সালের নভেম্বরে মার্কিন সৈন্যরা ফালুজা দখল করেছিল। আমরা ফালুজা হামলার সময়কার নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটু দৃষ্টিপাত করতে চাই। হামলার প্রথম দিন পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি ছবি ছাপা হয়। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল মেরিন সেনারা ফালুজার জেনারেল হাসপাতালে হামলা চালাচ্ছে। তারা রোগীদের টেনেহিঁচড়ে বেড থেকে নিচে ফেলে দিচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রহার করে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে তাদের হাত পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিচ্ছে। হাসপাতালে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন। তারা হাসপাতালে কেন হামলা করছে জিজ্ঞেস করলে তাদের জবাব ছিল : এটা বিদ্রোহীদের প্রোপাগান্ডা এজেন্সি। কিভাবে, জিজ্ঞেস করলে তারা জানায়, হাসপাতাল কত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে তা জানিয়ে দিচ্ছিল। ইরাক আগ্রাসন হচ্ছে শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ। এই আগ্রাসনের ফলে গোটা অঞ্চলে এখন গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। মনে করুন, আগ্রাসন চালিয়ে ইরাককে শান্ত করা গেছে। সেখানে কোনো বিপর্যয় নেই। তা হলেও এটা একটা বড় অপরাধ। অন্য একটি দেশে আগ্রাসন চালানোর অধিকার আমাদের কে দিয়েছে? আপনি যদি পেছনে ফিরে তাকান যেখানে অন্য অপরাধ হয়েছে, যা কখনো আলোচনা করা হয়নি।
১৯৯০-এর দশকে ইরাকের ওপর যে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে তাতে সেখানকার সমাজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেরা এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছিল। সে সময় দায়িত্ব পালনরত আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ড্যানিস হালিডে, হ্যান্সভন স্পোনেক উভয়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে গণহত্যার শামিল আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন। এটা তাদের উক্তি আমার নয়। তারা বলেছিলেন, এই নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে গণহত্যা। নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা সমাজকে ধ্বংস করছে এবং স্বৈরশাসককে শক্তিশালী করছে। জনগণকে তার ওপর নির্ভর করতে তারা বাধ্য করছে। এভাবে একের পর এক স্বৈরশাসকেরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ওটাকে কোনো সমস্যা মনে করা হয়নি।
ওটা হচ্ছে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের কাণ্ড। আমি বুশ এবং ব্লেয়ারের শাসনকালকে বোঝাচ্ছি। তারা ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছে। ওই সমাজকে তারা প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। সেখানে একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে এখন তার মারাত্মক নেতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। আগ্রাসন চালিয়ে অন্য দেশ দখল করা ফৌজদারি অপরাধ।
প্রশ্ন : সঠিক
নোয়াম চমস্কি : ওবামার প্রশংসা করা যায়। কারণ তিনি ইরাক আগ্রাসনকে ভুল বলেছেন। তিনি কি এটাকে অপরাধ বলেছেন? কেউ কি বলেছেন?
প্রশ্ন : ওটাকে কি ‘ডাম্ব ওয়ার’ বলা সঠিক হবে?
নোয়াম চমস্কি : ডাম্ব ওয়ার বা বোবাযুদ্ধ। আমাদের এটা করা উচিত নয়। আমরা স্মার্ট বিষয় নিয়ে কাজ করব।
প্রশ্ন : হ্যাঁ, আমরা ‘স্মার্টযুদ্ধ’ করব।
নোয়াম চমস্কি : স্ট্যালিন গ্রাফের পর জার্মান জেনারেলরা যা করেছিল তার মতোই ওটা। তারা বলেছিল দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করা সত্যিই বোকামি। আমাদের প্রথমেই ইংল্যান্ডকে ধ্বংস করা উচিত।
প্রশ্ন : আমি সবসময় চিন্তা করি মানুষ ডব্লিউএমডি তথা মারাত্মক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র পেলেই কোনো দেশে আগ্রাসন চালানোকে যৌক্তিক মনে করে, এটা কেমন কথা? এই যুক্তি দেখিয়ে কোনো দেশে আক্রমণ চালিয়ে কি দেশ দখল করা যায়? এটা তো কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ।
নোয়াম চমস্কি : অবশ্যই না। মারাত্মক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ব্যাপারে উদ্বেগ থাকলে তার সমাধানও রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ পরিদর্শকেরা এ ব্যাপারে চমৎকারভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইরানের পরমাণু চুক্তির বিষয়েও একই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরান বিশ্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ওটা হচ্ছে আমেরিকান ও ইসরাইলি বদ্ধ সংস্কার। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ইরানকে হুমকি হিসেবে দেখছে না। ধরুন ইরান হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। তাহলে আপনি কী করবেন? সত্যিকার অর্থে এরও একটা পথ আছে। খুব পপুলার একটা পথ আছে। সবচেয়ে ভালো বা সর্বোত্তম পথ হলো ওই এলাকায় একটি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য কাজ করা। গোটা বিশ্বই ওটার প্রতি সমর্থন দেবে। ইরানও এই উদ্যোগের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেবে।
প্রশ্ন : ইসরাইল এতে থাকবে কিনা সেটাতো আপনি জানাচ্ছেন না?
নোয়াম চমস্কি : ওটা হচ্ছে একটা সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্র তার অনুমতি দেবে না। কারণ তারা চায় না ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্র পরিদর্শনের জন্য খুলে দেয়া হোক। প্রত্যেক পাঁচ বছর পর পরমাণু বিস্তাররোধ চুক্তি পর্যালোচনা সম্মেলন হবে। ২০ বছর আগে এই চুক্তি হয়েছে। ওটাই হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ চুক্তি। ওই চুক্তি ব্যর্থ হলে আমরা চলে যাবো। প্রত্যেকের পরমাণু অস্ত্র থাকবে এবং তারা তা ব্যবহার করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্র রক্ষা করার ব্যাপারে এতটাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, তারা অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিকে বিপন্ন করতে চায়। অপর দিকে, তারা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র লাভের সুযোগ দিতে চায় না।

এবার ডিসিসি কর্মকর্তাকে বেধড়ক পেটালো পুলিশ

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে পুলিশের নির্যাতনের জের না কাটতেই আবারো নির্যাতনের শিকার হলেন আরেক সরকারি কর্মকর্তা।
এবার সাদা পোশাকধারী পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫ নম্বর জোনের পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র দাস (৪৫)। দায়িত্ব পালনকালে আজ শুক্রবার ভোররাতে রাজধানীর মীরহাজিরবাগ খালপাড় মোড়ে পুলিশ তাকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে বলে অভিযোগ করেছেন বিকাশ ও তার পরিবার। মোহাম্মদপুরে ব্যাংক কর্মকর্তার ওপর নির্যাতনের ঘটনার কোনো কুল কিনারা না হতেই এবার নির্যাতনের অভিযোগ যাত্রাবাড়ি পুলিশের বিরুদ্ধে।
এদিকে একের পর এক ঘটনার পরও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না নেয়ায় পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী, আহত বিকাশের স্বজন ও সহকর্মীরা।
বিকাশ চন্দ্রে দাস অভিযোগ করেন, পুলিশ তাকে বেধড়ক পিটিয়েছে। লাঠি ও পিস্তলের বাট দিয়ে মাথায় আঘাত করেছে।
জানা গেছে, ঘটনার পরপরই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য শুক্রবার সন্ধ্যায় বিকাশকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা।
বিকাশের বড় ভাই দীপক কুমার দাস জানান, বিকাশ চন্দ্র ডিএসসিসির ৫ নম্বর জোনের (ওয়ার্ড-৪৮ ও ৫০) পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক (সিআই) হিসেবে কর্মরত। প্রতিদিনের মতো ভোররাতে দায়িত্ব পালনের জন্য দয়াগঞ্জের জেলে পাড়া ১০ নম্বর বাসা থেকে মোটরসাইকেল যোগে বের হয়। মীরহাজিরবাগ এলাকায় পৌঁছালে যাত্রাবাড়ি থানার সাদা পোশাকধারী চারজন পুলিশ তাকে থামার সংকেত দেন। বিকাশ তার পরিচয় দেয়ার পরও ওই পুলিশরা তাকে মারধর করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, যাত্রাবাড়ি থানার এসআই আশরাদ হোসেন আকাশ মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই কোনো কারণ ছাড়াই ঘাড়ে আঘাত করে। এ সময় বিকাশ তার পরিচয় দিলেই গলা চেপে ধরে বলে, তোর কোন বাপ আছে নিয়ে আয়। এ কথা বলেই, বেদড়ক পিটাতে থাকে এবং পিস্তলের বাট দিয়ে বিকাশের কপালে আঘাত করে। এ সময় যাত্রাবাড়ি থানার এসআই মনোজ ও রাসেল উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, বিকাশকে পুলিশ নির্যাতন করছে দেখে ওই এলাকার পরিচ্ছন্নকর্মীরা ছুটে এসে বাধা দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পরবর্তীতে পরিচ্ছন্নকর্মীরা তাদের গাড়ি দিয়ে পুলিশের গাড়ি বেরিকেড দেয়। পরবর্তীতে খবর পেয়ে ওই এলাকার প্যানেল মেয়র, আমরা স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। দ্রুত বিকাশকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকের বরাত দিয়ে দীপক কুমার দাস জানান, চিকিৎসকরা বলছে ২৪ ঘণ্টার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। বিকেলে তিনটা পর্যন্ত অচেতন ছিলেন বিকাশ। সন্ধ্যার পরে তাকে ল্যাবএইডে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন দীপক কুমার।
ঢাকা মেডিক্যালে বিকাশের স্ত্রী স্বরস্বতী দাস জানান, রাত ৪টার দিকে প্রতিদিনের মতো কাজে বের হন বিকাশ। ভোর সোয়া ৫টার দিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি লাশের মতো ভ্যানগাড়িতে ফেলে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, পিস্তল দিয়ে আঘাত করায় কপাল ফুলে গেছে। ঘাড়ে আঘাত ও বাম পায়ে বেশি জখম রয়েছে। পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে বেশ কয়েক ঘণ্টা বিকাশ অচেতন ছিলেন বলে অভিযোগ স্বরস্বতীর।
আজ দুপুরে ঢাকা মেডিক্যালের ২০১ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বিকাশের নাকে রক্তজমাট বেধে আছে। তিনি অচেতন অবস্থায় চিৎ হয়ে হাসপাতালের বেডে পড়ে আছেন। বেডের পাশে স্বজনরা ভির করে আছেন।
বিকাশের চাচতো ভাই গোপাল দাস বলেন, পুলিশ আমাদের রক্ষা করবে। সে পুলিশ যদি এমন আচড়ন করে তাহলে আমরা সাধারণ মানুষে যাবো কোথায়। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না নেয়ায় পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। আমরা স্বরাস্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর ঘটনার সুস্থ বিচার চাই।
আজ দুপুরে আহত বিকাশকে ঢাকা মেডিক্যালে দেখতে এসে যাত্রাবাড়ি থানার ওসি অবনী শঙ্কর কর সাংবাদিকদের বলেন, ওই এলাকাটি ছিনতাই প্রবণ এলাকা। তাই পুলিশ ওই এলাকায় টহল দিচ্ছিলো। এ সময় সাদা পোশাকধারী চারজন পুলিশ তাকে থামার সঙ্কেত দেয়। বিকাশ পুলিশকে ছিনতাইকারী ভেবে মোটরসাইকেল রেখে দৌঁড় দেয়। আর পুলিশও বিকাশকে ছিনতাইকারী ভেবে মারধর করে।
তিনি বলেন, ঘটনাটি অনাকাঙ্খিত। এসআই আকাশ তাকে ছিনতাইকারী ভেবেই মারধর করেছে। এছাড়া অন্য এসআই মনোজ, আকাশের টিমের সহযোগী টিম হিসেবে কাজ করছিলো। এছাড়া রাসেল নামে কোনো পুলিশ আমার থানায় নেই।
তিনি বলেন, খবর পাওয়া মাত্রই আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। তার সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, বিকাশ আশঙ্কা মুক্ত।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ভোর রাতে যাত্রাবাড়ি পুলিশ ডিসিসির এক পরিদর্শককে বেধড়ক প্রহর করেছে। আমি নিজে গিয়ে দেখলাম তার রক্তাক্ত শরির। জনগণের জানমাল হেফাজত করর কথা হচ্ছে পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। মনে হচ্ছে, পুলিশ বাহিনীর যে নীতি আদর্শ আছে তার বিচ্চুতি ঘটছে। এখন ভাবার সময় এসেছে এই বাহিনীকে ঠিক তাদের নিয়ম নীতির মধ্যে আনার। এ বাহিনীর যে সব দুর্বৃত্ত এ ধরনের ঘটনার সাথে যুক্ত তাদেরকে কি করে আইনের আওতায় আনা যায়, সে বিষয়টিও ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় দৃষ্টিকোন থেকে চিন্তা না করে জাতীয় মঙ্গলের জন্য দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সরকারকে এ কাজটি করতে হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, যখন একটি বাহিনীকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহার করা হয়। যখন তাকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার চিন্তা করবেন। যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যে আপনি ঢুকে যাবেন তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে। অন্যায়ভাবে মানুষের ওপর পুলিশ যে শারিরিক-মানসিক নির্যাতন করছে। সেসব ঘটনাগুলো তদন্ত হওয়া দরকার। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আমাদের সান্তনা না দিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে পুলিশ বাহিনীর এই দুর্বৃত্তদের কিভাবে চিহ্নিত করবেন এবং কিভাবে আইনের আওতায় আনবেন।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ডিসি সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, ওয়ারী এলাকায় ছিনতাই ঠেকাতে ছিনতাই প্রতিরোধ টিম গঠন করা হয়েছে। তাদের অর্জনও বেশ ভালো। বিকাশের ঘটনাটি স্রেফ ভুল-বুঝাবুঝি। এ ঘটনায় এডিসি মোহাম্মদ মইনুল হাসান ও এসি (প্রশাসন) কামরুল হাসানকে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে, গত ৯ জানুয়ারী মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে চাঁদার দাবিতে মধ্যরাতে আটকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এসআই মাসুদ মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের কাছে রাব্বীকে আটক করেন এবং থানায় না নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়িতে রেখে ‘ইয়াবা ব্যবসায়ী’ বানানোর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশের গাড়িতে থাকার সময় একইভাবে পথচারীদের আটকে পুলিশ সদস্যদের অর্থ আদায় করতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন রাব্বী। ওই ঘটনার পর এসআই মাসুদকে প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায়ও পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

‘রাজনৈতিক নেতাদের কারণে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার’

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) মো. আমির হোসেন বলেছেন রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু নেতা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই জন্য দেশে মাদক সেবনের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। শুক্রবার দুপুরে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার একুশে স্কুল মাঠে মাদকবিরোধী সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশের ৭০ লাখ মানুষ মাদক নিচ্ছেন। এর বেশির ভাগই তরুণ। মাদকের এই ভয়াবহ থাবা থেকে বাচার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার প্রয়োজন। একই সঙ্গে দলগুলোকে মাদক দ্রব্য বিক্রেতা ও সেবনকারীদের দল থেকে বাদ দিতে হবে। মো. আমির হোসেন বলেন, মাদক আসছে ভারত ও মিয়ানমার থেকে। এসব মাদক শুধু পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব বা প্রশাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এ জন্য সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মানজুরুল ইসলাম বলেন, আগে এ দেশের যুব সমাজ হেরোইন সেবন করত। পরবর্তী সময়ে ফেনসিডিল সেবন শুরু করে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ৩০ লাখ মানুষ ইয়াবা সেবন করে। মাদক দ্রব্য বিক্রেতারা শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্ত করতে নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন। অধিদপ্তরের পরিচালক নাজমুল আহসান মজুমদারের সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মুর্শিদুল ইসলাম, হাজীগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল হানিফ, এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম মজিবুর রহমান, একুশে গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল হক প্রমুখ।

আইএস-আল কায়দা ইসলামের শত্রু

আরব বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম তরুণ মনে করেন, জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল কায়দা ইসলামের শত্রু। তারা ইসলামী শিক্ষার বিপরীত কাজ করে ইসলামের ক্ষতি করছে। নতুন এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার সৌদি গেজেট এ খবর দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ৫ হাজার ৩৭৪ জন মুসলিম তরুণ তরুণীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এ জরিপ করেছে জগবি রিসার্চ সার্ভিস। রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায়, তিন চতুর্থাংশ তরুণ-তরুণী মনে করেন, আইএস আল কায়দার মতো সংগঠনের কার্যক্রম ইসলামী শিক্ষার পুরোপুরি বিপরীত। তারা যা করছে ‘একেবারেই ভুল’। অধিকাংশ আরব তরুণের মতে, শাসকদের দুর্নীতির কারণে চরমপন্থীর উত্থান ঘটছে। বাকিদের মতে, উপযুক্ত ইসলামী শিক্ষার অভাবে জঙ্গিদের জন্ম হচ্ছে।
২০১৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে এই জরিপ করা হয়েছিল। মরক্কো, মিসর, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও ফিলিস্তিনের ১৫-৩৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা ওই জরিপে অংশগ্রহণ করেন। মরক্কো ও আরব আমিরাতের শতকরা ৯০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারীর মতে, চরমপন্থী গ্রুপগুলোর কার্যক্রম ‘ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত’। মিসরের ৮৩ শতাংশ, বাহরাইন জর্ডানের ৬০ শতাংশ একই ধরনের মত দেন। ফিলিস্তিন ও সৌদি আরবের ৫৫ শতাংশের বেশি লোকের মতে, চরমপন্থী গ্রুপ ইসলামী শিক্ষাকে ধ্বংস করছে।

জাকার্তায় আইএসের সিরিজ বোমা হামলা

মুহূর্তেই নরককুণ্ডে পরিণত হল ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। আইএসের ভয়াবহ বন্দুক হামলা ও সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের পর মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা এক পুলিশ সদস্যের মৃতদেহের পাশে তৎপরতা চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী (উপরে বামে)। খবর পেয়ে জাভা থেকে দ্রুত রাজধানীতে ফিরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো।
একটি ভবনে জঙ্গিদের সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলির সময় সহায়তা করতে অতিরিক্ত পুলিশের উপস্থিতি (ডান দিকে মাঝে) সন্দেহভাজন হামলাকারীকে ধরতে রাস্তায় একটি গাড়ির আড়ালে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ (বামে নিচে) এবং রাস্তা থেকে হামলার আলামত সংগ্রহ করছে গোয়েন্দারা। বৃহস্পতিবারের ছবি এএফপি

গণতন্ত্র ও শক্তির ভারসাম্য by হায়দার আকবর খান রনো

এটা খুবই ভালো এবং স্বস্তিকর সংবাদ যে ৫ জানুয়ারি দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দল একই দিনে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন স্থানে জনসভা করতে পেরেছে। খালেদা জিয়া সরকারের যথারীতি সমালোচনা করলেও তাঁর সুর ছিল নরম এবং তিনি আলাপ-আলোচনা করে ‘নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে’ পথ বের করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান রেখেছেন। এমনকি এ কথাও বলেছেন যে ‘এর জন্য একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’ এরকম সহনশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা যদি তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে রাখতে পারতেন, তাহলে বোধ হয় ঘটনাপ্রবাহ অন্য রকম হতো।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও বিএনপি ও খালেদা জিয়ার সমালোচনা করলেও কড়া কথা বলেননি। অবশ্য সৈয়দ আশরাফুল আজেবাজে কথা খুব একটা বলেন না। ভদ্রোচিত তাঁর আচরণ ও বক্তব্য। তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান রেখে বলেছেন, ‘আসুন, আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যাই।’ এই যে ‘আমরা’ কথাটা ব্যবহার করেছেন, সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ‘উড়িয়ে দেব’, ‘গুঁড়িয়ে দেব’, ‘রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না’—এ ধরনের কথায় অভ্যস্ত সরকারি দলের অন্যান্য নেতার মতো তিনি নন। মির্জা আলমগীরও সৈয়দ আশরাফের মতো ভদ্রলোক এবং শিক্ষিত মানুষ। তিনি সংযত ও যুক্তিপূর্ণ কথা বলেন এবং তা ভদ্র ভাষায়। কিন্তু বিএনপির দুই নম্বর নেতা খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের সে ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। অর্বাচীনের মতো নানা অবান্তর কথা বলে তিনি প্রায়ই রাজনৈতিক পরিবেশকে নষ্ট করেন। তাতে তাঁর নিজের বা দলের কোনো লাভ অবশ্য হয়নি।
৫ জানুয়ারির চিত্র ২০১৫ ও ২১১৪ সালের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। শান্তিপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এভাবে অগ্রসর হলে আমরা আশাবাদী হতে পারি। তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। মাত্র কিছুদিন আগে যে পৌরসভার নির্বাচন হয়ে গেল, তা কিন্তু সুস্থ পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার ইঙ্গিত বহন করে না। উপজেলা নির্বাচন এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের করপোরেশন নির্বাচনের প্যাটার্নে একই ধারাবাহিকতায় প্রহসনমূলক হয়েছে সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচন। এই নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করলেও বিএনপি কিন্তু কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। এমনকি যে সৌভাগ্যবান মাত্র ২২ জন পৌরসভায় জয়ী বলে ঘোষিত হয়েছেন, তাঁরা নির্বাচনের রায় মেনে নিয়ে কাজ করবেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশও নেই পৌরসভার মেয়রের পদ প্রত্যাখ্যান করার জন্য। মোট কথা, বিএনপি এখন অনেক সুর নামিয়েছে। অবশ্য অনেক ঠেকে, অনেক ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে তাদের এই উপলব্ধি হয়েছে। ভবিষ্যতে এটা অব্যাহত থাকলেই ভালো আমাদের জন্য, দেশের জনগণের জন্য এবং দলটির নিজের জন্যও। বিএনপি নিজের ভালো চাইলে তাকে আরও কিছুটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মধ্যে একটি হলো জামায়াতকে পরিত্যাগ করতে হবে। আরেকটি হলো সংযত কথা বলতে হবে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কোনো প্রকার খারাপ মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে। বলাই বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে শ্রদ্ধা রেখেই আচরণ করতে হবে। আমি জানি না, জামায়াতকে এখনই পরিত্যাগ করা খালেদা জিয়ার পক্ষে সম্ভব কি না।
এবার আসা যাক, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে। সৈয়দ আশরাফ একত্রে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে আহ্বান রেখেছেন, সেটা কথার কথা না হয়ে বাস্তবে কার্যকর করতে হলে তো গণতান্ত্রিক চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে এবং বিএনপিসহ সবাইকে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে। গত বছর তো বিএনপিকে সভা বা মানববন্ধন—কোনো কিছুই করতে দেওয়া হয়নি। এবার যে জনসভা করার অধিকার পেল, এটা ভালো কথা। কিন্তু নির্বাচনও তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি স্তম্ভ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর থেকে কোনো স্থানীয় নির্বাচন যথাযথ হয়েছে, এ কথা বলা যাবে না। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর এল উপজেলা নির্বাচন। উপজেলা নির্বাচন পাঁচ পর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথম দুই পর্বে দেখা গেল বিএনপির বিশাল বিজয়। পরবর্তী তিন দফায় উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল কারচুপির আশ্রয় নিল। ভোটকেন্দ্র দখল, পুলিশের সামনেই ব্যালট বাক্সে বেপরোয়া সিল মারার ঘটনা ঘটল। একই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল গত বছর ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে।
মাত্র কয়েক দিন আগে যে সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচন হলো, সেখানেও একই চেহারা। ৬ জানুয়ারির প্রথম আলোর সংখ্যায় সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক নিবন্ধে দাবি করেছেন, ‘৭৪ শতাংশ ভোটকে স্বাভাবিক বলা যাবে না।’ ১ জানুয়ারি প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে সংঘাতপূর্ণ পৌর নির্বাচনের জন্য দায়ী করা হয়েছে ‘নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাতে’। সেখানে ‘নির্বাচন কমিশনের সময়োচিত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতাসীন দলের বাড়াবাড়ি’কে দায়ী করা হয়েছে এই নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার কারণ হিসেবে। এর পরদিন ২ জানুয়ারি প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘পরিবেশ দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ থাকলেও বহু স্থানে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।’ বিএনপি জোটের বাইরেও যেসব বিরোধী দল আছে, তারাও এই নির্বাচনের ফলাফলকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। কমিউনিস্ট পার্টি পৌর নির্বাচনকেও প্রহসন বলে আখ্যায়িত করেছে।
১ জানুয়ারির প্রথম আলোর সংখ্যায় মিজানুর রহমান খান একটা বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ লিখেছেন, ‘কী বার্তা বয়ে আনল পৌর নির্বাচন’। ১৯৯১ সাল থেকে সব কটি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন আসনসংখ্যা যা-ই হোক, ‘দুই প্রধান দলের মধ্যে ভোটের সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে।’ ২০০৮ সালে বিপর্যস্ত হওয়ার দুই বছরের মাথায় পৗর নির্বাচনে তারা অন্যতম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল। তখনো তাদের সাংগঠনিক শক্তি ছিল না, তবে নীরব সমর্থক ছিল অনেক। এমনকি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনসংখ্যা নিতান্ত কম হলেও মোট প্রাপ্ত ভোট খুব কম ছিল না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েরই একটা রিজার্ভ ভোটব্যাংক আছে। এবারের পৌর নির্বাচনে বিএনপি যে মাত্র ২২টি মেয়র পেয়েছে তাই-ই নয়, মোট ভোটসংখ্যাও অবিশ্বাস্য রকমের কম। এর কারণ, নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারেনি। বিএনপির দুর্বলতা ছিল এই যে তারা ভোটকেন্দ্র দখল, কারচুপি ইত্যাদি ঠেকাতে পারেনি। তাই ‘নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে কোথাও জোরালো কণ্ঠ শোনা যায়নি।’ কারণটাও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। বিএনপির ভোটার হলেও তাঁরা ‘কিসের জন্য ঝুঁকি নেবেন? বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের একটি বিশাল অংশ মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে আগে থেকেই কোণঠাসা, যা ২০১১ সালে ছিল না। তদুপরি বিএনপির কারচুপির অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হলেও তার দলীয় স্বার্থ রক্ষায় মানুষ রাস্তায় নামবে না।’
বিএনপির এই পরিণতির জন্য আমারও দুঃখবোধ নেই। কারণ, বিএনপি কোনো আদর্শবাদী দল নয়। বরং যেটুকু মতাদর্শকে দলটি প্রতিনিধিত্ব করে, তা খুবই প্রতিক্রিয়াশীল—তারা হেফাজতকে সমর্থন করে এবং গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিক বলে গালি দেয়। অথচ একসময় দলটি মধ্যমপন্থী বলে পরিচিতি ছিল। কিন্তু জামায়াতের ওপর নির্ভরশীলতা তাকে ক্রমাগত চরম দক্ষিণে নিয়ে গেছে।
তবে আমার উদ্বেগ অন্য জায়গায়। সরকার যেভাবে সর্বক্ষেত্রে একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাতে গণতন্ত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক-সামাজিক ভারসাম্যও বিনষ্ট হয়েছে। প্রশাসন থেকে আরম্ভ করে সর্বক্ষেত্রে চলছে দলীয়করণ। ফলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।
রাস্তায়, প্রচারে, মাঠে, বিলবোর্ডে, অফিস-আদালতে, ব্যবসায়ে যদি কোনো দলের একক আধিপত্য থাকে, তাহলে তা যেমন কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত করে, তেমনি এরই ফলে সামাজিক ভারসাম্যও হারিয়ে যায়। এর ফলে শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালকে উদ্ধৃত করে প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে (৩ জানুয়ারি ২০১৬) বলা হয়েছে, ‘গুম, গুপ্তহত্যা ও ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নানা ঘোষিত-অঘোষিত বিধিনিষেধ।’
অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। সে প্রসঙ্গে আজকের আলোচনায় যাচ্ছি না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি যে সামাজিক-রাজনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হলে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তা ছাড়া জাতীয় আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিত্তবৈষম্য যে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে একটা সীমা লঙ্ঘন করলে, সেখানেও ভারসাম্য বিনষ্ট হবে। আমরা প্রায় সেই সীমা ছুঁয়ে গেছি। ভারসাম্য হারালে কোনো বস্তুই স্থিতিশীল হতে পারে না। এটা পদার্থবিজ্ঞানের কথা। একই কথা রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ সম্পর্কেও প্রযোজ্য।
আজ ১২ জানুয়ারি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। যদিও সেই নির্বাচনটিতে অধিকাংশ বিরোধী দল অংশ নেয়নি। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার। অন্যথায় ভারসাম্য হারিয়ে যাবে এবং কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হবে অথবা ধর্মীয় সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এই দিকটি মনে রেখে সরকারের উচিত সবার জন্য গণতান্ত্রিক ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া এবং নিজেকেও গণতান্ত্রিক আচরণ করতে হবে। বিএনপিকেও সন্ত্রাস ও মৌলবাদ পরিত্যাগ করে সুস্থ গণতান্ত্রিক পথে আসতে হবে। এ দুই দলের বাইরেও মানুষ আছে। রাজনৈতিক দল আছে। বুদ্ধিজীবী আছেন, সমাজ নিয়ে ভাবেন এমন মানুষ আছেন। সবারই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে গণতন্ত্রের পতাকা সমুন্নত রাখা যায়। এবারের ৫ জানুয়ারি একটা শুভ লক্ষণ মাত্র। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের তুলনায় তো বটেই। তবু বলব, এখনো অনেক দূর যেতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রধান দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদেরই। একই সঙ্গে জনগণের ভূমিকাও কম নয়।
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

জাতীয় ঐক্যের আহবান

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
শাসনক্ষমতার শেষ বছরে এসে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া শেষ স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানালেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষের নিন্দা জানান তিনি। দেশকে এখনো ঐক্যবদ্ধ করতে না পারার ব্যর্থতার কথাও অকপটে স্বীকারও করে নিয়েছেন ওবামা। তাই ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের নানা আশাবাদের চিত্র তুলে ধরে জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক মন্দা থেকে দেশকে বের করে আনার সাফল্যের কাহিনি। আহ্বান জানিয়েছেন, ধর্ম-বর্ণভিত্তিক রাজনৈতিক আক্রমণ পরিহার করার। কংগ্রেসের যৌথসভায় গত মঙ্গলবার এই স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দেন বারাক ওবামা। প্রতিবছর তিনি তাঁর ভাষণ শুরু করেছেন ‘যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত মজবুত অবস্থায় রয়েছে’-এই বলে। কিন্তু পরপর দুই দফার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সপ্তম বছরে এসে সে কথাটাই বলেন তিনি ভাষণের শেষ ভাগে এসে, ‘আপনাদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। সে জন্যই আমি পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি-আমাদের রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা মজবুত।’ ইতিপূর্বে দেওয়া ছয়টি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে নিজের প্রশাসনের সাফল্যের পাশাপাশি পরবর্তী রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা এজেন্ডা তুলে ধরেন ওবামা। তবে এবার নতুন কোনো পরিকল্পনার বদলে জাতির কাছে ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের আশাব্যঞ্জক এক চিত্র তুলে ধরেন তিনি। ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ওবামা জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা যদি সবার জন্য সুযোগ, নিরাপত্তা, অধিকতর ভালো জীবনমান এবং শিশুদের জন্য শান্তিপূর্ণ বিশ্ব চাই, যা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে; তবে ঐক্যবদ্ধ হয়েই কাজ করতে হবে আমাদের।’
মার্কিনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির ঊর্ধ্বে ওঠার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি থেকে পাওয়ার কিছু নেই, এটা বলা সহজ। কিন্তু আমরা যদি এখনই হাল ছেড়ে দিই, তাহলে নিজেদের ভবিষ্যৎকেই আমরা বিসর্জন দেব।’ ওবামা তাঁর ভাষণের বড় একটি অংশই ব্যয় করেন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা কাটিয়ে উঠল তার ব্যাখ্যায়। এ সময় তিনি বলেন, তাঁর ভাষায়, ‘যাঁরা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দুর্বল, তাঁরা গালগপ্প করে বেড়ান।’ হাতে মাত্র এক বছর সময় থাকলেও তিনি তাঁর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ত্যাগ না করারও ইঙ্গিত দেন। ওবামার প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের বিশেষত, দলটির প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একহাত দেখে নেওয়ার সুযোগ ছাড়া করেননি। এ মুহূর্তে জনমত গণনায় এগিয়ে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচার-প্রচারণার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করারœট্রাম্পের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ধর্ম বা বর্ণভিত্তিক রাজনৈতিক আক্রমণ পরিহার করা প্রয়োজন। বিশ্ব আমাদের সম্মান করে শুধু অস্ত্রসম্ভারের জন্য নয়। তারা সম্মান করে আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্য, অকপটতা এবং সব ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সমান শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য।’ ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে প্রেসিডেন্ট ওবামা আরও বলেন, ‘রাজনীতিকেরা মুসলিমদের অসম্মান করলে আমরা মোটেই অধিক নিরাপদ হয়ে উঠি না।’ ভাষণের শুরু থেকেই ওবামা অত্যন্ত হাসিখুশি ছিলেন। তাঁকে আর কংগ্রেসের সভাকক্ষে রিপাবলিকান প্রতিপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে না; সে সম্ভাবনাই হয়তো তাঁকে প্রফুল্ল করে রেখেছিল। কিন্তু ভাষণ শেষে কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে একবার পেছনে ফিরে তাকান তিনি। এ সময় তাঁকে অনুচ্চস্বরে বলতে শোনা যায়, ‘একবার শেষবারের মতো দেখে নিই জায়গাটা।’

কেমন করছেন ট্রুডো?

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো
কানাডার নাটকীয় নির্বাচনে দুই মাস আগে জয়ী হয়েছেন উদারপন্থী নেতা জাস্টিন ট্রুডো। পরাজিত করেছেন প্রায় এক দশক ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী ও রক্ষণশীল নেতা স্টিফেন হার্পারকে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোর ছেলে জাস্টিন ট্রুডো বিজয়ী ভাষণে কানাডাবাসীকে এক ‘রৌদ্রোজ্জ্বল পথ’ উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এরই মধ্যে অফিসে ব্যস্ত ১০টি সপ্তাহ পার করেছেন জাস্টিন। এ কয়টা দিনে কেমন করলেন তিনি? এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয় সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসে বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন কপ-২১-এ হাজির হন ট্রুডো। ৯০ দিনের মধ্যে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি কাঠামো দাঁড় করানোর অঙ্গীকার করেন তিনি। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মন্ত্রিসভার ১৫টি পদে নারীদের নিয়োগ করেছেন ট্রুডো। কেন এটা করেছেন, সে প্রশ্নে এক কথায় জবাব দেন, ‘এটা ২০১৫’। গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ার বাস্তুহারা মানুষের সহায়তায় হাত বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কানাডার এই নেতা। বলেছেন, ২৫ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে কানাডায় আশ্রয় দেওয়া হবে। গত বছরের মধ্যে তা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ১৩ নভেম্বর প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে এ সময় খানিকটা বাড়িয়ে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে। সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চলা বিমান হামলা থেকে কানাডাকে এ বছরই সরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন ট্রুডো।
আরও অঙ্গীকার করেছেন কানাডায় প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ১ হাজার ২০০ নারীর নিখোঁজ হওয়া বা তাঁদের হত্যার ঘটনা পুনরায় তদন্ত শুরু করার। ট্রুডো বা তাঁর উদারপন্থী সরকার কানাডায় কেমন করছে—এ বিষয়ে দেশটির কয়েকজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মত এ রকম: শ্যাটেলাইন ম্যাগাজিনের এডিটর-এট-লার্জ র্যাচেল গাইজের কথায়, ‘এখন পর্যন্ত, বেশ ভালো। এটাও ঠিক, এখনো তাঁকে সত্যিকারের পরীক্ষায় পড়তে হয়নি। এক বছর পর আমরা তাঁর ব্যাপারে মূল্যায়ন করতে পারব।’ র্যাচেল বলেন, ট্রুডোর মনোভাব স্টিফেন হার্পারের ‘কঠোর নিয়ন্ত্রিত’ মনোভাবের বিপরীত। প্রতীকী আচরণ ও ভাবমূর্তি সম্পর্কে ট্রুডোর ধারণা যথেষ্ট রয়েছে। কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সুবিধা আদায় করতে হয় সেটা জানেন তিনি। সম্ভবত এসব তিনি রপ্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দেখে। টক শোর উপস্থাপক ও বিশ্লেষক ইভান সলোমনের কথায়, ‘ট্রুডোর ঘোষিত কর্মসূচি কানাডায় কয়েক প্রজন্মের মধ্যে উচ্চাভিলাষী। এটা বাস্তবায়নে বিপুল রাজনৈতিক পুঁজিও সঞ্চয় করে রেখেছেন তিনি।’ তবে সলোমনের ধারণা, সবকিছু ছাপিয়ে আগামী দিনে ট্রুডোর সামনে সবচেয়ে বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে দেশের অর্থনীতি। ইতিমধ্যে নতুন সরকারের ওপর আস্থা নিয়ে এক জনমত জরিপ চালিয়েছে কানাডার ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন পাবলিক পলিসি। এক হাজার লোকের ওপর চালানো এ জরিপে দেখা গেছে, তাঁদের অধিকাংশই ট্রুডো সরকারের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। একই সঙ্গে ট্রুডোর ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও সন্তোষ প্রকাশ করেন তাঁরা।

বিএনপির জন্য ভাবনা by আবুল মোমেন

আমাদের সমাজে নেই বলে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আত্মবিশ্লেষণের অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। মনে হচ্ছে, প্রতিকূল পরিস্থিতি উত্তরণের সনাতন পথগুলো অকার্যকর হওয়ার পরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবার আত্মবিশ্লেষণের কথা ভাবছে।
বিএনপির প্রধান শক্তি বিপুল জনসমর্থন, যাতে তারা প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের কাছাকাছি। তাদের প্রধান দুর্বলতা সংগঠন। এর কারণ বিএনপির জন্মের মধ্যেই নিহিত আছে। এটি একজন সামরিক শাসক মূলত আওয়ামী লীগ-বিরোধী লোকজন নিয়ে ক্ষমতায় বসে গঠন করেছিলেন। তখন তাঁর অগ্রাধিকার ছিল বৈধতা অর্জন ও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা। তাই নিজের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন পড়েছিল। দলটি গঠনতান্ত্রিকভাবেই অগণতান্ত্রিক—সামরিক কর্তা তাঁর একক নেতৃত্ব কোনোভাবেই ভাগ করতে সাহস পাননি। ফলে দলের শাখা সংগঠন ও নানান অঙ্গসংগঠন তৈরি হলেও নেতৃত্বের কেন্দ্রিকতার ধরন পাল্টায়নি। তাতে দল সাংগঠনিকভাবে মজবুত হয়নি। এখানে এ আলোচনায় আওয়ামী লীগকেও একটু টানতে হবে। ক্ষমতাসীন এই দলের ইতিহাসের প্রায় সবটাজুড়েই গণতন্ত্রের সংগ্রামই মুখ্য হলেও কালে কালে আওয়ামী লীগও আজ এক নেত্রীকেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে এবং আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করছি সামাজিকভাবে বরাবর সক্রিয় সজীব একটি সংগঠন কীভাবে ক্ষমতার প্রশ্রয়ে থেকে নির্জীব ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। হয়তো এই সংগঠনের শিকড় অনেক গভীরে বলে এ অবস্থায়ও প্রয়োজনে আন্দোলন দাঁড় করাতে পারে এবং এখনো দেশের আনাচকানাচে দলের আদর্শে নিবেদিত অনেক কর্মী-সমর্থকও রয়েছেন, যাঁদের সত্তার গভীরে রাজনৈতিক বীজ প্রবাহিত হয়।
বিএনপির দ্বিতীয় দুর্বলতা হলো তাদের রাজনৈতিক আদর্শ। দেশে সিংহভাগ মানুষের চেতনার কথা বিচার করলে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের জায়গা বেশ বিস্তৃত। কিন্তু ধর্ম নিয়ে রাজনীতির নানামুখী বিপদ আছে এবং বিএনপিও এ থেকে বিপদে পড়েছে বলেই মনে হয়। মোটের ওপর দলটিকে রাজনীতি সাজাতে হয়েছে প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান অস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ এমন এক ভাবাবেগ, যা ঘাঁটাঘাঁটি করা সহজ নয়। কিন্তু সমর্থক ভোটারদের মান বিচার করলে দেশের রাজনীতিতে ভাবাবেগের প্রয়োজন পড়ে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিরুত্তাপ থেকে ভাবাবেগের অস্ত্র হিসেবে নিয়েছে ইসলামকে। এই দুই ভাবাবেগ যদি দুটি ভরকেন্দ্র হয়ে থাকে, তাহলে তাদের ঘিরে আরও সমমনা সমধর্মী দল, গোষ্ঠী, জনগণ জুটে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে একসময় দেশ বড় দুটি দলকে ঘিরে মোটামুটি দুটি মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে গেল।
এই পরিবর্তনের সময় রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগ কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েছে এবং একটি প্রধান ক্ষেত্রে প্রায় প্রজ্ঞাপূর্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। সম্ভবত এটিই তাদের এগিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষের শক্তির প্রধান উৎস ভাবাবেগের ভান্ডারে ভাগ বসাতে সক্ষম হলো। তারা প্রমাণ করতে পারল যে মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম পরস্পরবিরোধী কোনো ভাবাদর্শ নয় এবং ভাবাবেগের দুটি পৃথক ভরকেন্দ্রও নয়। আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতিক এবং নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিগত সংস্কৃতিতে ইসলাম একটি বড় জায়গা জুড়ে আছে। এটা আরোপিতও নয়, বানানোও নয়, অতীতে ধর্মপ্রাণ মানুষ হয়েও অনেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার পক্ষপাতী ছিলেন না। এখানে আমরা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে পার্থক্য দেখতে পাই।
বিরোধিতা ও প্রতিপক্ষতার চর্চা যত তীব্র, ব্যাপক ও দীর্ঘায়িত হয়েছে, বিএনপি ততই কট্টর ইসলামি দলগুলোর কাছাকাছি চলে এসেছে, দলের অভ্যন্তরে জামায়াতপন্থী অনেক নেতাই শক্ত অবস্থানে চলে এসেছেন। ফলে দেশের তরুণসমাজ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ভাবাবেগে জেগে উঠছে, তখনো বিএনপি তাদের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ করতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। আর এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটল স্বয়ং বেগম জিয়ার মুখে, তিনি যখন মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কথা ও মনোভাবই দলের বক্তব্য ও ভাবনা হিসেবে মানুষের কাছে প্রকাশ পায়। তাঁর এ বক্তব্য রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটা মারাত্মক ভুল বলেই প্রমাণিত হচ্ছে।
কোনো সচেতন মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদের মাথা গোনা সংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না। যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ছয় কোটি মানুষের মৃত্যু বা লেনিনগ্রাদ (প্রাক্তন ও বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) রক্ষায় ২০০ রুশবাসীর শাহাদাত বরণ কিংবা নাৎসিদের হাতে ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। সবাই জানেন যে নিহত ও শহীদের সংখ্যা ছিল বেশুমার। প্রশ্নটা হচ্ছে, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা গণহত্যা চালিয়েছিল কি না, নারী নির্যাতন করেছিল কি না, জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল কি না। এরই ফাঁকে বেগম জিয়ার জ্ঞাতার্থে জানাই, একাত্তরের সেপ্টেম্বর নাগাদ শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে আসা মার্কিন সিনেটর প্রয়াত এডওয়ার্ড কেনেডি একটি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন যে শরণার্থী শিবিরগুলোতেই তখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বলি। তাদের সে সম্মান দিতে হবে।
যা হোক, আমরা আগের কথায় ফিরে আসি। দল পুনর্গঠন বা সাংগঠনিকভাবে দলকে গুছিয়ে নেওয়ার আগে তাদের ভাবতে হবে মানুষকে উজ্জীবিত করার হাতিয়ার কী হবে? তারা কি এর জন্য মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শকেই ধারণ করে এগোবে? এই মনোভাবের মানুষের সংখ্যা দেশে অনেক এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে নতুনভাবে তরুণসমাজের মধ্যে মুসলিম পরিচয় তুলে ধরা ও প্রমাণ করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ দুটি কারণে বিএনপি তাদের সনাতন আদর্শেই অবিচল থাকতে পারে। এখানে তাদের জন্য বিপদ দেখতে পাই দুদিক থেকে। একদিকে হলো নতুন পরিস্থিতির কারণে মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতির, অন্তত কিছুকালের জন্য, চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপির গায়ে জেএমবি-জামায়াত পৃষ্ঠপোষকতার দাগ রয়েছে, ফলে আবারও নতুন কোনো সম্পর্ক তাদের সমস্যায় ফেলতে পারে। বিপদের দ্বিতীয় দিকটি হলো, ইসলামে শান্তিপূর্ণ পথে মানুষের মন জয় ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করার শিক্ষা ও আদর্শ রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় বৈশ্বিক পটভূমিতে আমরা মুসলিম আলেম-মনীষীদের মধ্যে ইসলামের এই ভাষ্য তুলে ধরা এবং তার ভিত্তিতে একটি সমঝোতা ও শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ করছি। তা ছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ধর্মভীরু মুসলিম হলেও সাংস্কৃতিক-সামাজিকভাবে তাদের মজ্জাগত প্রবণতা উদার মানবিক দিকে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতারা বিষয়টি ধরতে পারেননি। সে কারণেই শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ও বর্তমান বাংলাদেশে মুসলিম লীগ অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো বিএনপি নেতাদের মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
আজকের বাস্তবতায় বিএনপির পক্ষে প্রমাণ করা শক্ত যে তারা ইসলামচর্চায় আওয়ামী লীগের চেয়ে গুণগতভাবে বেশি আন্তরিক ও শ্রেয়তর। ইতিমধ্যে ছিটমহল বিনিময়, বিদ্যুৎ সরবরাহে উন্নতি ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতবিরোধিতার কার্ড রাজনীতিতে কোনো বাড়তি সুবিধা দেবে না।
বলা যায়, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ভাবাদর্শিক ভ্রান্ত মোহে কেটেছে বিএনপির। দলের এই মোহ দীর্ঘায়িত হওয়ায় নানা রকম ভুলভ্রান্তি ঘটে চলেছে এবং বিপরীতে আওয়ামী লীগ একতরফা সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু, সরকারে থাকায় সবটা জায়গাজুড়েই দলটি খেলছে। বিএনপি মাঠে নামার জায়গা পাচ্ছে না।
তবে স্থানীয় নির্বাচনগুলো তাদের জন্য সুযোগ নিয়ে আসছে এবং আশার কথা, বিএনপির নেতৃত্ব সেটা গ্রহণ করছেন। এর বাইরে তাদের জন্য আরেকটা বড় কাজ আছে বলে মনে হয়। তা হলো মানসিকতার পরিবর্তন। কাজটা সহজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে যেমন ধর্মকে একদম বাদ রেখে রাজনীতির কথা ভাবা যায় না, তেমনি অমোঘ আরেক বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বা চেতনা বলতে একটা বিষয় আছে, তা হলো প্রকৃত গণতন্ত্র; যা অসাম্প্রদায়িক মানবতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়কে নিশ্চিত করে। স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন, বিচার বিভাগের যথার্থ স্বাধীনতা, সরকার ও প্রশাসনের জবাবদিহিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও প্রকৃত গণতন্ত্রেই নিষ্পত্তি হবে। আর এখানেই বিএনপির জন্য রাজনীতির আদর্শ, ভাবাবেগ তৈরির খনি রয়েছে। কারণ ক্ষমতা সংহত করা বা পাকাপোক্ত করার দৌড়ে নেমে বর্তমান সরকার অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে এবং গণতান্ত্রিক অধিকারে অনেকটাই ঘাটতি তৈরি করছে। দুর্নীতি, বিচারহীনতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেপরোয়া ক্ষমতা, গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অনেকভাবেই গণতন্ত্র খর্ব হচ্ছে। কোনো কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে সাধারণত ক্ষমতাসীনদের এভাবে ক্ষমতামদমত্ত হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়তে থাকে। তার কিছু আলামত সমাজে রয়েছে। ফলে বিএনপির জন্য রাজনীতির সুযোগ কম, এ কথা ঠিক নয়। কেবল তাদের পুরোনো ধাঁচের চিন্তার বাইরে এসে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
তাদের জন্য শেষ এবং শক্ত ফাঁড়া হলো দলের ভাবাদর্শিক নেতা জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর বিকল্প একজন ভাবার অভ্যাস পরিবর্তন। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, জেএমবি সম্পৃক্ততা ইত্যাদি যেমন খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপির গায়ে বড় আঁচড়, তেমনি জিয়াউর রহমানের উত্থানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই এ দেশে স্বাধীনতাসংগ্রাম হয়েছে, তাঁর নামে স্লোগান দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদসহ চার নেতাই সরকার চালিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে জাতি এঁদের হত্যাকাণ্ডের কেবল বিচার নয়, সব রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাইবে। এটা তাদের কর্তব্য ও অধিকার। ফলে এ নিয়ে বিরোধপূর্ণ মনোভাবের অবসান টানতে হবে।
তবে, এই বিপদ কীভাবে কাটাবেন, সেটা বেগম জিয়া ও তাঁর সহকর্মীদেরই আজ ভাবতে হবে। সে ভাবনার দায় কলামিস্টের নয়, তাঁদেরই।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

আন্দোলন নয়, প্রয়োজন আলোচনা by আলী ইমাম মজুমদার

চলছে শিক্ষক কর্মবিরতি। ক্লাসরুম ফাঁকা।
মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছবিটি তোলা
অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর থেকে বেশ কিছু বাদ-প্রতিবাদ চলমান রয়েছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে এর তীব্রতা। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। সরকার এবার উদারভাবে বেতন বৃদ্ধি করেছে। বাড়িয়েছে ভাতাদি ও পেনশনের সুবিধা। নতুন স্কেলে এ বছর শুধু মূল বেতনই দেওয়া হবে। আর তাতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এই উদারতার প্রশংসা করা উচিত সংশ্লিষ্ট সবার। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর বিপরীতটাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে।
প্রকৃচি আর বিসিএস সমন্বয় পরিষদ সুস্পষ্টভাবে কিছু দাবি রেখেছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদেরও কিছু মৌলিক দাবি আছে। এ দাবি আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে তাঁরা কর্মবিরতি পালন করছেন। অবশ্যই পরীক্ষাগুলো নিচ্ছেন যথারীতি। কর্মবিরতিতেও তাঁরা না গেলে ভালো করতেন। এ দাবিগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা যায় না এমন নয়। বেশ কিছু আলোচনা হয়েছেও। এখন ব্যাপারটি নেতিবাচক ভিন্ন মাত্রা পেলেও আলোচনার মাধ্যমেই এর নিষ্পত্তি করতে হবে। তা হবেও। প্রকৃচি আর বিসিএস সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে তো মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে কয়েকজন সচিবের একটি সভা হয়ে গেল। আশা করা যায়, এটিও সবার কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে শেষ হবে।
শিক্ষার প্রসারে স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সবগুলো সরকার অবিরাম প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সীমিত সম্পদের একটি বড় অংশই ব্যয় হয় এ খাতে। বর্তমান সরকারও সেই প্রচেষ্টাকে জোরদারই করেছে। এর সুফলও ভোগ করছে জাতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১০ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশে শিক্ষার হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। অনুমান করা যায়, এখন এটা ৭০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আর এ অর্জন সম্ভব হয়েছে সরকারের সর্বমুখী প্রচেষ্টার জন্য। শুধু লিখিত লোকের সংখ্যা নয়, এর গুণগত মান বৃদ্ধিতেও বেশ কিছু কর্মসূচি চলছে। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, এ কর্মকাণ্ডের প্রথম সারির সৈনিক আমাদের শিক্ষকেরা। তাঁরা মানুষ গড়ার কারিগররূপেই সমাজে যুগ যুগ ধরে পরিচিত। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ তার জীবনের পূর্ণতা পায় শিক্ষার মাধ্যমে। আর সেই শিক্ষা দেন শিক্ষক। তাঁদের মানমর্যাদা সবার কাছে বিতর্কের ঊর্ধ্বে।
এবারের মূল বিতর্কটি বেতন-ভাতার পরিমাণ নিয়ে নয়। বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে যেটুকু বিতর্ক, তা পারস্পরিক অবস্থান নিয়ে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অসন্তোষের কারণও অনেকটা তা–ই। এই জটিলতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড উঠিয়ে দেওয়া আর নবাগত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্যাডার কর্মকর্তার চেয়ে এক ধাপ নিচে রাখায়। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের পরিবর্তে অষ্টম বেতন স্কেলে ভিন্ন একটি ব্যবস্থা রয়েছে। এটা যদি ব্যাপকভাবে সমর্থিত না হয়, তাহলে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া কি অসম্ভব? নতুন ব্যবস্থায় লাভ বেশি হবে বলে কেউ কেউ বলছেন। বেশির পরিবর্তে কম নিয়েই যদি কেউ সন্তুষ্ট থাকেন, তবে ‘অকারণ’ বেশি দিতে যাবেন কেন? প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের বিবেচনায় এতে ওপরের গ্রেডে যেতে সুবিধা বেশি হবে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা থেকে হঠাৎ করে বিপরীত দিকে গিয়ে ভুল বোঝার কারণ কেন আমরা ঘটাই? এ বিষয়টির সমাধানও কঠিন কিছু নয়। আর নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্যাডার পদের এক ধাপ নিচে সূচনা স্তরে রাখার খোঁড়া যুক্তিও দেওয়া যাবে না। বিজ্ঞানী, গবেষক, ব্যাংকারসহ অনেকেই নন-ক্যাডার পদে রয়েছেন। তাঁদের অবমূল্যায়ন যথার্থ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন স্কেল-সংক্রান্ত বিষয়টি একটি স্পর্শকাতর পর্যায়ে রয়েছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। বেশ কিছুকাল ধরেই তাঁদের অধ্যাপক পদটি ছিল বেতন স্কেলের তৃতীয় ধাপে। এর শতকরা ২৫ শতাংশ পদ প্রথম গ্রেডে উন্নীত করার বিধানও ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই শূন্য পদের ভিত্তিতে বিভিন্ন মানদণ্ড ধরে তা করত। এবার প্রথমে এরূপ কিছুরই উল্লেখ ছিল না। পরে একটি আদেশ করে প্রথম গ্রেডে মানোন্নয়নের দায়িত্ব ইউজিসিকে দেওয়া হয়। শর্ত থাকে বেশ কিছু। এটাও কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুতি এবং অনেকটাই অকারণ। যে ব্যবস্থা ছিল, তা থাকতে আপত্তির কারণটি দুর্বোধ্য।
আরেকটি দাবি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের রয়েছে। তা হলো বছর দু-তিন আগে সৃষ্ট সিনিয়র সচিবের বেতনের সমান কিছুসংখ্যক পদ। এই স্তরে আটজন সচিব ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনীতে লে. জেনারেল ও সমমানের কর্মকর্তা আর পুলিশের আইজি পদটি রয়েছে। যেখানে সাধারণত মেধাবী ছাত্ররা কাজ করছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ স্তরে কিছু পদের দাবিকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। আর একটি বিভ্রান্তির এখানে অবসান দরকার। প্রথম গ্রেড কিংবা সিনিয়র সচিবের সমান বেতন পাওয়া কিন্তু কারও সচিব হওয়া বোঝায় না। প্রত্যেকের পদের পরিচিতি তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক পদের বিবেচনায়। সচিব সচিবালয়ের পদ। এর সৃজন ও ক্ষমতার উৎস রুলস অব বিজনেস। সচিবেরা ছাড়াও প্রথম গ্রেডে কিছু রাষ্ট্রদূত, সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপক, মেজর জেনারেলসহ অনেক সংস্থার প্রধানই থাকছেন। তাই বলে সচিব যেমন নিজকে সচিব ও রাষ্ট্রদূত বলতে পারেন না, তেমনি রাষ্ট্রদূতেরাও পররাষ্ট্রসচিব না হলে রাষ্ট্রদূত ও সচিব লেখা অসংগত। তেমনি সব ক্ষেত্রের জন্যই এটা প্রযোজ্য। ঠিক একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকেরাও সচিব হয়ে গেলেন এমনটা কারও মনে করা ঠিক নয়। তাঁরা অধ্যাপক রূপেই পরিচিত ও সম্মানিত।
এটাও নির্জলা সত্য যে সচিব সৃষ্টি করেন শিক্ষকেরাই। আর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকেরা এ দাবি সংগতভাবেই করতে পারেন। তেমনি সচিবেরাও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে এসে বিভিন্ন ঘাট পেরিয়ে অনেক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পর এ পদ লাভ করেছেন। সরকারি প্রশাসনে রয়েছে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এঁদের সবাই না হলেও অনেকেরই শিক্ষার মান যথেষ্ট উঁচুতে। আর অবক্ষয়ের যে কথা আসছে, তা শুধু জনপ্রশাসনেই নয়, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এটা ঠাঁই করেছে। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ও একই মানের নয়। সমান নয় সব শিক্ষকের মানও। তা সত্ত্বেও সবচেয়ে মেধাবীদের প্রধান আকর্ষণ নামকরা গুটি কয়েক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিই থাকে, এটা অনস্বীকার্য। তাই তাঁদের দাবির ন্যায্যতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সংশয় থাকে দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে।
খুব কম দেশেই পারস্পরিক মানমর্যাদা শুধু বেতন স্কেল দিয়ে নির্ধারিত হয়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রধান নির্বাহীর বেতন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কয়েক গুণ। আমাদের দেশেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরূপ দৃষ্টান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের পাইলট এবং শিপিং করপোরেশনের জাহাজে কর্মরত কর্মকর্তারা অনেক বেশি বেতন পান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বেতনও অনেক বেশি। এই নিবন্ধকারকে ২৪ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে থাকাকালে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করতে হয়েছিল। দায়িত্ব ভাতা ছিল মাসে পাঁচ হাজার টাকা। তখন সেই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসিক বেতন পেতেন ১০ লাখ টাকা। এতে কোনো বিভ্রাট ঘটেনি। এরূপ দৃষ্টান্ত একেবারেই কম নয়। তা সত্ত্বেও এটা বলা যাবে না যে বেতন স্কেলের ধাপগুলো একেবারেই গুরুত্বহীন। তবে এটাও ঠিক নয় যে স্কেলই মানমর্যাদার একমাত্র পরিমাপক। যাঁরা সরকারি চাকরি করেন না, তাঁরাও কেউ কেউ সরকারি অনুষ্ঠানাদিতে আমন্ত্রিত হন। সেখানে তাঁদের অবস্থান বেশ কিছু ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তাদের ঊর্ধ্বে থাকতে দেখা যায়। আর তা থাকে সংগত কারণেই।
বর্তমানে বিষয়টি যে পর্যায়ে রয়েছে, তা মীমাংসার অযোগ্য মোটেই নয়। সরকার যে কারণে এত ব্যয় সাপেক্ষ স্কেলটি দিলেন, তা নিয়ে সামান্য কিছু অসংগতির জন্য বিভ্রাট হবে, এটা ভাবতেও কষ্ট হয়। যেটুকু জট তা দ্রুতই দূর করা যায়। এর জন্য সরকার ও যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। কোনো পক্ষই অনড় অবস্থানে থাকলে চলবে না। আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই। জরাজীর্ণ অতীত আর সমস্যা সংকুল বর্তমানকে পেছনে ফেলে উদার ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়গুলো মীমাংসিত হোক এটা সবাই চায়। এমনকি চান আন্দোলনকারীরাও। আর অবশ্যই সবচেয়ে বেশি চায় সরকার। সমস্যা থাকলে সেগুলো খতিয়ে দেখা হবে, এমনটা সেদিনও বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সন্ত্রাসী হামলায় কাঁপলো জাকার্তা নিহত ৭, আইএসের দায় স্বীকার

জাকার্তায় গুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনার পর একটি
গাড়ির আড়ালে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।
সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবিনিময়ের পর
জাকার্তার সড়কে পড়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: এএফপি
এবার সন্ত্রাসী হামলায় কাঁপলো ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। গতকাল শহরের প্রাণকেন্দ্রে কয়েক দফা বিস্ফোরণ ও গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এতে ৫ হামলাকারীসহ মোট ৭ জন নিহত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সহযোগী একটি গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি ও আল-জাজিরা। জাকার্তার পুলিশ প্রধান টিটো কার্নাভিয়ান বলেন, হামলার পেছনে নিশ্চিতভাবে আইসিসের হাত রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়ান বংশোদ্ভূত আইসিসের এক যোদ্ধা বাহরুন নাইম দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি হামলার পরিকল্পনা করছে। গতকালের এ হামলার পেছনে তার ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করছেন তিনি। জাকার্তার প্রাণকেন্দ্রে সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরত্বে মোট ৬টি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণস্থলের নিকটেই রয়েছে জাতিসংঘের কার্যালয়। তিনটি বিস্ফোরণ হয়েছে সিকনি, সিলপি ও কুনিঙ্গানে। এ স্থানগুলোতে তুরস্ক, পাকিস্তানের দূতাবাস অবস্থিত। হামলা শুরু হয় স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে। তিন ঘণ্টা অভিযানের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় পুলিশ। ইন্দোনেশিয়া পুলিশের মুখপাত্র অ্যান্টন চার্লিয়ান বলেন, হামলাকারীরা প্যারিস হামলার অনুকরণ করতে চেয়েছিল। আইএস সংশ্লিষ্ট স্থানীয় একটি গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে ঠিক কোন গোষ্ঠীর দিকে তার ইঙ্গিত ছিল তা স্পষ্ট করেননি। তিনি আরও বলেন, নভেম্বর মাসে তারা আইএসের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন যে ইন্দোনেশিয়ায় হামলার পরিকল্পনা রয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠীটির। ৫ হামলাকারীর দুজন আত্মঘাতী বিস্ফোরণে ও অপর তিন জন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন বলে জানান চার্লিয়ান। জঙ্গিদের হামলায় নিহত দুজনের একজন কানাডিয়ান নাগরিক, অপরজন ইন্দোনেশিয়ান। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসবাদের এমন ঘটনায় পরাজিত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। টিভিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এমন হামলার স্পষ্টত লক্ষ্য হলো আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করা এবং মানুষের মধ্যে ত্রাস ছড়িয়ে দেয়া। পুলিশের মুখপাত্র চার্লিয়ান জানান, সবমিলিয়ে কমপক্ষে ৬টি বিস্ফোরণ হয়েছে। পুলিশ পরে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত বোমা ও দুটি পিস্তল উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা হামলার প্রধান টার্গেট ছিল বিদেশি নাগরিক ও পুলিশ। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ অপর সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করতে অভিযান চালাচ্ছিল। সিরিজ এই সন্ত্রাসী হামলায় কমপক্ষে দুই বেসামরিক ব্যক্তি নিহত ও ২০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় জঙ্গি হামলার
সময় পুলিশের সতর্ক অবস্থান l ছবি: রয়টার্স
সিঙ্গাপুরে নিরাপত্তা জোরদার:
এদিকে, ইন্দোনেশিয়ায় সিরিজ বোমা হামলার পর প্রতিবেশী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর নিরাপত্তা জোরদার করেছে। হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি হসেইন লুং বলেছেন, হামলার পেছনে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে ইন্দোনেশিয়াকে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা দিতে প্রস্তুত সিঙ্গাপুর।
ইন্দোনেশিয়ায় যত জঙ্গি হামলা
ইন্দোনেশিয়ায় এটাই প্রথম কোনো জঙ্গি হামলা নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এ ধরনের হামলার শিকার হয়েছে দেশটি। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের ছয়টি জঙ্গি হামলা হয়েছে দেশটিতে। হামলার ঘটনাগুলো তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য—
জুলাই, ২০০৯
জাকার্তার ম্যারিয়ট অ্যান্ড রিটজ কার্লটন হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। দুজন হামলাকারীর হামলায় সাতজন নিহত এবং অনেকেই আহত হয়।
অক্টোবর, ২০০৫
বালিতে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে হামলাকারীসহ ২৩ জন নিহত হয়।
সেপ্টেম্বর, ২০০৪
জাকার্তায় অস্ট্রেলিয়ান অ্যাম্বেসির বাইরে একটি বোমা হামলায় অন্তত নয়জন নিহত হয়।
আগস্ট, ২০০৩
জাকার্তার ম্যারিয়ট হোটেলে বোমা হামলায় ১২ জন নিহত হয়।
অক্টোবর, ২০০২
বালিতে বোমা হামলাতে ২০২ জন নিহত হয়, যার মধ্যে ৮৮ জনই ছিল অস্ট্রেলিয়ান।
ডিসেম্বর, ২০০০
দেশজুড়ে চার্চে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে যাতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়।
ইন্দোনেশিয়া নিয়ে কিছু তথ্য
বিশ্বের অন্যতম প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য দিয়েছে বিবিসি বাংলা। এই তথ্যগুলো থেকে দেশটি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
১. এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে এক হাজারেরও বেশি দ্বীপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করে দেশটিতে। সারা দেশে ৩০০ টিরও বেশি স্থানীয় ভাষা রয়েছে।
২. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে দেশটিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে দুর্বল অবকাঠামো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ রয়েছে।
৩. বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। জনসংখ্যা ২৫ কোটিরও বেশি।
৪. ভূমিকম্পপ্রবণ এবং আগ্নেয়গিরি থাকা দেশগুলোর একটি ইন্দোনেশিয়া। সর্বশেষ সুনামিতে ইন্দোনেশিয়াতেই দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে।
৫. কয়েক বছর ধরে দেশটিতে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে। এর অনেকগুলোই আল-কায়েদার সঙ্গে জড়িত বলে বলা হয়ে থাকে।
৬. দেশটির অনেকগুলো প্রদেশেই স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন চলছে। -প্রথম আলো

সরকার ও বিএনপির পক্ষে দুটি ঘোষণা আসা প্রয়োজন: ফরাসউদ্দিন by শুভংকর কর্মকার

দ্য সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড
ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে ‘দ্রুত অগ্রগতির
সোপানে বাংলাদেশ: সিলেটের ভূমিকা’
শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য দেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। ছবি: প্রথম আলো
অনেক ঘটনা ও প্রাণক্ষয়ের পর রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। একই সঙ্গে সেটিকে অব্যাহত রাখতে হলে সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি ঘোষণা আসা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেছেন, দুটি ঘোষণা রাজনীতির জন্য প্রয়োজন। এক. ২০১৯ সালে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। দুই. সরকারকে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ঢেলে সাজানো হবে। তাহলে রাজনীতিতে যে সুবাতাস বইছে, সেটি শক্তিশালী হবে।’ একপর্যায়ে দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অস্বস্তি চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দ্য সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে ‘দ্রুত অগ্রগতির সোপানে বাংলাদেশ: সিলেটের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বৃহস্পতিবার এসব কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। চেম্বার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে সহযোগিতায় ছিল প্রথম আলো।
চেম্বারের সভাপতি সালাহ্‌ উদ্দিন আলী আহমদের সভাপতিত্বে সেমিনারে অতিথি আলোচক ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংকার, আইনজীবী, বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে দেশের অগ্রগতি তুলে ধরার পাশাপাশি সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা, জাতীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
সিলেটে বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা উঠে আসে
প্রথম আলোর সম্পাদক ম​তিউর রহমানের
বক্তৃতায়। ছবি: প্রথম আলো
সিলেটের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, সিলেটে বিনিয়োগের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও এখনো সেটি কাজে লাগানো যায়নি। পর্যটনের অনেকগুলো আকর্ষণীয় জায়গা থাকলেও সেখানকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। এ ছাড়া প্রবাসীরা বিভিন্ন জটিলতার কারণে এখানে শিল্পকারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করেন না। তাঁরা ব্যাংকের উচ্চসুদের হারকে বিনিয়োগের বড় প্রতিবন্ধকতা বলে উল্লেখ করেন।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, হবিগঞ্জের বাহুবলে সরকার একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। সেখানে বস্ত্রকল স্থাপনে সরকার যদি শূন্য থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যাংক সুদে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি এবং ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুযোগ দেয়, তবে সিলেটের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন। তিনি আরও বলেন, পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেলেও পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পে পিছিয়ে আছে। কারখানার মালিকদের অনেক কাপড় আমদানি করতে হয়। তাই বস্ত্রকল স্থাপন করা গেলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তবে যেহেতু বস্ত্রকল স্থাপনে অনেক মূলধনের প্রয়োজন, তাই সরকারকেই ওই সুবিধাগুলো দিতে হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ড. ফরাসউদ্দিনকে
ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সিলেট
চেম্বারের সভাপতি সালাহ্‌ উদ্দিন
আলী আহমদ। ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সিলেটের অবস্থান এমন এক জায়গায়, যার পাশেই ভারতের সাতটি রাজ্য। ফলে বাজার কিন্তু তৈরিই আছে। তাই এখানে কলকারখানা স্থাপন করা গেলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে। তিনি আরও বলেন, সিলেট প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। পাথর, সিলিকা বালু, বাঁশ-বেত, হাওরের মাছ, চা-বাগান, নদী-পাহাড়, জলপ্রপাত—এই সম্পদ কাজে লাগানো গেলে সিলেটের পাশাপাশি দেশও এগিয়ে যাবে।
রাজনীতির বিষয়ে ফরাসউদ্দিনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে মতিউর রহমান বলেন, ‘রাজনীতিতে যে অস্বস্তি আছে, সেটি কাটিয়ে উঠতে সরকার ও বিরোধী দলকে দায়িত্ব নিতে হবে।’ অর্থমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ কম হয়। দুর্নীতি হয়তো বন্ধ হবে না। তবে চেষ্টা ও উদ্যোগ নিলে কমানো সম্ভব।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক
সুলতানা কামালের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট
তুলে দেন সিলেট চেম্বারের সহসভাপতি
মাসুদ আহমদ চৌধুরী। ছবি: প্রথম আলো
সুলতানা কামাল বলেন, দেশ শিল্পায়নের যে ধারায় পৌঁছেছে, সেটি প্রশংসনীয়। তৈরি পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ অনেক সুনাম অর্জন করেছে। তবে পশ্চাৎমুখী সংযোগশিল্পে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সে জন্য অনেকে বলে, আমরা দরজির কাজ করি। তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যবসা ও বাণিজ্যে অনেক বেশি গুরুত্ব দিই। সে জন্য অনেক বেশি শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। দেশ যদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং সব মানুষ যদি এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে কিংবা সুযোগ দেওয়া হয়, তবে ১৯৭১ সালের মতোই একটি চমক সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, প্রত্যেক কাজের সময় মানুষের কল্যাণ হবে কি না, সেটি ভাবতে হবে। একই সঙ্গে নারীর অংশগ্রহণের পাশাপাশি নারী অধিকার বিষয়ে সচেতন থাকার কথা বলেন এই মানবাধিকার-কর্মী।

নির্মাণকাজে শ্রমিকনিরাপত্তা উপেক্ষিত by সজল চৌধুরী

শহরের বিল্ডিংগুলোকে নতুনভাবে রং করা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ কারণে হয়তো শহরটাকে সাময়িক ঝকঝকে দেখাবে, কিন্তু যাঁরা নির্মাণকাজে নিয়োজিত, সুপরিকল্পিত নগরায়ণে তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে সব থেকে আগে। সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির তথ্যমতে, ২০১৪ সালে ২৬০ জনের অধিক শ্রমিক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য, যার মধ্যে শুধু ঢাকাতেই এর সংখ্যা ৭২ জনের বেশি এবং বিগত পাঁচ বছরে প্রায় তিন হাজারেরও অধিক শ্রমিকের পেশাগত বিপত্তির কারণে প্রাণহানি ঘটেছে।
এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নির্মাণাধীন প্রকল্পে ছাদ থেকে পড়ে, ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট, আর্থিং, দেয়াল ভেঙে, সিঁড়ি থেকে পড়ে, নামা-ওঠার দড়ি ছিঁড়ে ইত্যাদি কারণে অযাচিতভাবে সাধারণ শ্রমিকসহ প্রকল্পের সান্নিধ্যে থাকা সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত জীবন ধ্বংসকারী দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, যার মূল্য কেবল ভুক্তভোগীদের পরিবারই অনুধাবন করতে পারে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের পর প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা শহরে প্রায় ৩০১টি ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী খোদ রাজধানীতেই ৭২ হাজার বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। ভূমিকম্পের সময় নির্মাণাধীন প্রকল্পের দেয়াল ভেঙে পড়াসহ প্রাণহানির ঘটনাও মোটেই সুখকর বিষয় নয়, যাকে প্রতিরোধ অসম্ভব।
এ কথা প্রমাণিত যে প্রতিবছর স্থাপনা নির্মাণকল্পে আমাদের দেশে ঘটে চলেছে বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, তথাপি এর নিরসনে তেমন কোনো নিয়মনীতির বাস্তবায়ন চোখে পড়ার মতো নয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বড় শহরের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জনসাধারণকে অনেকটাই আতঙ্কগ্রস্ত থাকতে হয়। কারণ পাশের নির্মাণাধীন প্রকল্পের ছাদ থেকে যেকোনো সময় মাথার ওপর পড়তে পারে শক্ত ইট, রড, পাথরসহ ভারী কোনো বস্তু, যার আঘাতে যেকোনো সময় প্রাণহানি খুবই সাধারণ। এমনকি দড়ি বেয়ে ঝুলে থাকা সাধারণ লুঙ্গি অথবা শাড়ি পরিহিত নির্মাণকাজে কর্মরত শ্রমিকের পড়ে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনা প্রতিনিয়তই খবরে আসে। অথচ এটি হচ্ছে শুধু আমাদের দায়িত্বহীনতা ও অসাবধানতা এবং সঠিক নিয়ম বাস্তবায়নের অভাবে। এ বিষয়ে কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় এমন দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হয় সাধারণ অনেককেই, যা অত্যন্ত পরিতাপের।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আজ যাঁরা বিনির্মাণে ব্যস্ত, কাল তার মূল্য হাজারো কোটি, যার সুফল ভোগ করবে সাধারণত সবাই। তাই তাঁদের নিরাপত্তার দিকটা আমাদেরই ভাবতে হবে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, দেশগুলোতে যখন কোনো স্থাপনা নির্মাণাধীন থাকে, সেখানে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বেশ কিছু পদক্ষেপ অবশ্যই কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং একে প্রথম প্রধান শর্ত হিসেবে কার্যকর করাকে বাধ্যতামূলক ধরা হয়। যেমন নির্মাণাধীন স্থাপনায় শ্রমিকের পোশাকের ধরন, সার্বক্ষণিকভাবে শ্রমিকের নিকট সাধারণ জীবনরক্ষাকারী কিছু যন্ত্রপাতি, হেলমেট, তাপ প্রতিরোধক জুতা, হাতমোজা, মাস্ক এমনকি নির্মাণাধীন স্থাপনায় অধিক শব্দদূষণ হলে শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাকে প্রধান শর্ত হিসেবে পালন করতে হয়। এ ছাড়া নির্মাণাধীন স্থাপনা থেকে যেন কোনো ধরনের উপাদান (ইট, রড, কাচ, বালু, সিমেন্টসহ অন্যান্য) বাইরে ছিটকে না পড়ে, সে জন্য বিভিন্ন স্তরের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এ ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেকোনো নির্মাণাধীন স্থাপনার বহির্ভাগে শক্ত নেটিং করা হয়, তারপর বিভিন্ন স্তরে স্টিলের লেয়ারিং করা হয় এবং শ্রমিকদের ওঠানামা ও চলাফেরার জন্য অস্থায়ী টেকসই সিঁড়ি, ল্যাডার, লিফট স্থাপন করা হয়। অথচ আমাদের দেশের শহরগুলোতে বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে দড়ি কোমরে পেঁচিয়ে সুউচ্চে নির্মাণকাজ করতে দেখা যায়। এমনকি নির্মাণাধীন স্থাপনায় ধারালো মরিচা ধরা লোহার রড কোনো রাবার ক্যাপ ছাড়াই পড়ে থাকে বছরের পর বছর। তা ছাড়া নিরাপত্তার জন্য কোনো বিশেষ ধরনের পার্শ্ব রেলিংও খুব বেশি দেখা যায় না। যত্রতত্র ধূমপান করা—যা বড় অগ্নিকাণ্ডের কারণ—খুবই সাধারণ ব্যাপার আমাদের দেশে।
আমাদের দেশে নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলো এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য এসব ব্যবস্থা সঠিক উপায়ে গ্রহণ করছে না। এ ছাড়া বর্তমানে প্রণীত আন্তর্জাতিক পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতিমালায় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা হয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক নির্মাণপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোর প্রায় বেশির ভাগেরই নিরাপত্তাবিষয়ক নিজস্ব অভিজ্ঞ পরামর্শক নেই। অথচ এ ধরনের পরামর্শক থাকা প্রয়োজন। যাদের দায়িত্ব নির্মাণশ্রমিকদের নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজে পর্যাপ্ত সতর্কতাবিষয়ক পরামর্শ প্রদান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিষয়ক ট্রেনিং প্রদানের মাধ্যমে অযাচিত দুর্ঘটনা থেকে তাঁদের রক্ষা করা।
নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সব যন্ত্রাংশের পর্যায়ক্রমিক পর্যবেক্ষণ বিষয়টিকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগী নির্মাণ যন্ত্রাংশ ভেঙে গিয়ে কিংবা বিকল হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা যেকোনো সময় ঘটাতে সক্ষম। অন্ততপক্ষে প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী যথাস্থানে রাখাটা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শ্রমিকদের জানতে হবে তাঁদের অধিকার সম্পর্কে, তাঁদের মালিকদের বুঝতে হবে শ্রমের মূল্য ও দায়িত্ব, আর সরকারকে হতে হবে আইনের দিক থেকে আরও কঠোর শ্রমিকদের স্বার্থে। কারণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আজ যাঁরা বিনির্মাণে ব্যস্ত, কাল তার মূল্য হাজারো কোটি, যার সুফল ভোগ করবে সাধারণত সবাই। তাই তাঁদের নিরাপত্তার দিকটা আমাদেরই ভাবতে হবে।
সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। (বর্তমানে জাপানে গবেষণারত)
sajal_c@yahoo.com

ভালোবাসার জন্য পুরুষ হলেন নারী

প্রেমিককে আপন করে পেতে ভারতের এক যুবক লিঙ্গ পরিবর্তন করিয়ে এখন নারীতে পরিণত হয়েছেন। যে পাকিস্তানের সঙ্গে তার দেশের চির প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই দেশের এক প্রেমিকের প্রেমে মজেছিলেন গৌরব। পাকিস্তানের রিজওয়ানের সঙ্গে তার দহরম-মহরম এতটাই গাঢ় হয়, তারা একে অন্যকে ছাড়া কিছুই কল্পনা করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে যখন গৌরব খবর পেলেন রিজওয়ানের পিতামাতা তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য মেয়ে খুঁজছেন, তখনই গৌরব সিদ্ধান্ত নিলেন- নাহ তাদের আর সুযোগ দেয়া যায় না। লক্ষ্ণৌয়ের এই পুরুষ ছুটে যান মুম্বই। সেখানে লিঙ্গ পরিবর্তন করেন এমন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই চিকিৎসক তাকে এক বছরের হরমোন থেরাপি দেন। এরপর তিনবার তার দেহে অস্ত্রোপচার করা হয়। এর মাধ্যমে পুরুষ গৌরব নারী মীরায় পরিণত হন। এ খবর দিয়েছে দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানের মীরার সঙ্গে রিজওয়ানের প্রেমের সূত্রপাত এখন থেকে প্রায় ৫ বছর আগে। মীরা স্বীকার করেন প্রথমবার যখন তিনি পিএইচডি করার সূত্রে সামাজিক নেটওয়ার্কে রিজওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখনই তারা যেন বিয়ে করে ফেলেন- এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরই মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎও হয়। প্রথমবার দেখেই একের ভেতর হারিয়ে যান অন্যজন। মীরা বলেন, আমাদের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রিজওয়ান আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। সুফিবাদে ভালোবাসা এ রকমই। তা কোনো জাত, কুল, গোষ্ঠী, লিঙ্গ মানে না। তখনকার গৌরব ও রিজওয়ান একে অন্যকে বুঝতে পারেন। ওদিকে রিজওয়ানের মা ছেলের বউ আনতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। গৌরব তখনো পুরুষ। পুরুষে পুরুষে বিয়ে তিনি মানবেন না। তাই গৌরব সিদ্ধান্ত নেন লিঙ্গ পরিবর্তনের।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে আইনাঙ্গনে উদ্বেগ by গোলাম রব্বানী

‘নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের কাছ থেকে সব ক্ষমতা নিয়ে যেতে চাচ্ছে’- প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যে উদ্বিগ্ন আইনজীবী সমাজ। তারা বলছেন, আমরা আগে থেকেই বলে আসছি যে বর্তমান সময়ে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য আমাদের সেই অবস্থানকেই সমর্থন করে।
গত ১০ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে একটি বইমেলার উদ্বোধনকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের কাছ থেকে সব ক্ষমতা নিয়ে যেতে চাচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে, যখনই এ ধরনের কিছু হয়েছে, তখন আইনজীবীরা সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু এখন বিচার বিভাগের দিকে আইনজীবী মহল, নির্বাহী বিভাগ, বিচারপ্রার্থী- সব দিক থেকে যদি আঘাত আসতে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগকে রক্ষা করবে কে?’
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য আমরা এর আগে কখনো কোনো প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে শুনিনি। বিষয়টি স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য শুভ নয়।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, নির্বাহী বিভাগ সব সময় বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে খর্ব করতে চায়। কারণ, বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে চলে তাহলে তারা অন্যায়-অনিয়ম কম করতে পারে। তাদের এসব কাজে স্বাধীন বিচার বিভাগ অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা আছে। কিন্তু নিজস্ব সুবিধার কথা বিবেচনা করে কোনো রাজনৈতিক সরকারই বিচার বিভাগকে কখনো পৃথক করেনি। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে পৃথক করে। এর পর ধীরে ধীরে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা পাচ্ছিল। কিন্তু সে জন্য যে অবকাঠামো, জনবল ও বেতনভাতা দরকার সে ব্যাপারে সব সময় বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হচ্ছিল বিচার বিভাগ। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পরও প্রশাসন বিভিন্ন অজুহাতে বিচারকদের বেতনভাতা বৃদ্ধির ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছে। অথচ এরই মধ্যে নির্বাহী বিভাগের বেতনভাতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক এই ভাইস চেয়ারম্যান আরো বলেন, বিচার বিভাগ অবহেলিত। এখনো দেশে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন কার্যত আইন মন্ত্রণালয় করে থাকে। এসব করার কথা সুপ্রিম কোর্টের। কিন্তু সরকার এখানে জনবল দেয়ার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে আইন মন্ত্রণালয় যে প্রস্তাব পাঠায় তাতে মতামত দেয়া আপিল বিভাগের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সে জন্য প্রধান বিচারপতি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিচার বিভাগ যে স্বাধীনতা পেয়েছিল, তা খর্ব হতে পারে। আমরা আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির আশঙ্কাকে সমর্থন জানাই। এই আশঙ্কা অমূলক নয়।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, আমরা বরাবরই বলে আসছি যে, বর্তমান সময়ে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য আমাদের সেই অবস্থানকেই সমর্থন করে। তিনি বলেন, আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ দেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ব্যাহত হলে আইনের শাসন যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা-ও থাকবে না। আইনজীবীদের এই নেতা আরো বলেন, আজ দেশে মানবাধিকার কোথায়? আইনের শাসন কোথায়? গণতন্ত্র কোথায়? বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া না হলে এসব কিছুই থাকবে না।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান বলেছেন, নির্বাহী বিভাগ যে বিচার বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব করছে বা করার চেষ্টা করছে, প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যই তার প্রমাণ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আইনের শাসন ব্যাহত হবে, বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করতে আমরা আইনজীবী সমাজ সব সময় সোচ্চার।
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ও বিশিষ্ট সংবিধান বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ বলেছেন, আমাদের সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ যতক্ষণ সংশোধন করা না হচ্ছে ততক্ষণ বিচার বিভাগের ওপর বিশেষত অধঃস্তন বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে। বর্তমান সরকার যদিও ’৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের কথা বলে আসছে; কিন্তু পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর যখন পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হলো তখন দেখা গেল, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছ থেকে জেলা জজদের কাছে হস্তান্তর বুঝায়। আসলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হলো- বিচারিক কাজে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি মঞ্জুর প্রভৃতি বিষয় এককভাবে সুপ্রিম কোর্ট নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে যেন গুরুত্ব দেয়া হয়। সেটি নিশ্চিত করা অত্যাবশক।