Thursday, February 15, 2018

যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব চ্যালেঞ্জ করছে চীন, রাশিয়া

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে চীন ও রাশিয়া। পশ্চিমারা এক্ষেত্রে যে কৌশলগত সুবিধা এতদিন ভোগ করেছে তারা তা আর পারবে না। বার্কিস এক রিপোর্টে এসব কথা বলেছে শীর্ষ স্থানীয় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান। ‘দ্য মিলিটারি ব্যালেন্স ২০১৮’ রিপোর্টে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)। এতে বলা হয়েছে, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধ অপরিহার্য না হলেও সম্ভাব্য একটি সংঘাতের জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন, মস্কো ও বেইজিং। চীন কিভাবে তার অস্ত্রশস্ত্র বৃদ্ধি করছে তার বিস্তারিত রয়েছে ওই রিপোর্টে।
বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে চীনের সার্ভিসে প্রবেশ করছে যুদ্ধবিমান চেংডু জে-২০। এ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পিএল-১৫ আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। নৌবাহিনীও আধুনিকায়ন করছে চীন। গত ১৫ বছরে চীন এ কর্মসূচিতে অনেক নতুন নতুন অস্ত্র যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অধিকতর রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন। জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে মোট যে পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে নৌবাহিনীর কাছে চীন একার কাছে আছে তার চেয়ে বেশি। তাদের কাছে আছে নতুন নতুন যুদ্ধবিমান। তাদের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে টাইপ-০৫৫ ক্রুজার। এটি ইউরোপের উপকূলে মোতায়েন হতে পারে। তবে সামরিকীকরণে অস্ত্র সমৃদ্ধ হওয়া রাশিয়ার ক্ষেত্রে ধীরগতিতে হয়েছে। সেখানে রয়েছে তহবিলে সঙ্কট। রয়েছে শিল্প বিষয়ক বিভিন্ন জটিলতা। তারা সিরিয়া ও ইউক্রেনে বাস্তব যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। তারা সাইবার হামলার মাধ্যমে সক্ষমতা অর্জন করছে। আইআইএসএসের মহাপরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক ড. জন চিপম্যান এসব কথা বলেছেন।

রোহিঙ্গাদের ওপর যেসব সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে মিয়ানমার সরকার

গত বছর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকটি ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা তদন্তের অজুহাতে সেনাবাহিনী গত আগস্ট থেকে রাখাই রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নতুন করে সহিংসতা শুরু করে।
সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড এখনো অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারের কর্মকর্তারা  দাবি করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে হামলার সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানরা জড়িত ছিল। যদিও ওই হামলার ঘটনায় মুসলমানদের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেনি। তারপরও রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হওয়া মানবতা বিরোধী অপরাধযজ্ঞে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিরাও অংশ নিয়েছে। মিয়ানমার সরকার রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে অভিবাসী বলে মনে করে এবং তাদের কোনো নাগরিক অধিকার নেই। সরকারের দাবি তারা বাংলাদেশসহ আশেপাশের আরো কয়েকটি দেশ থেকে মিয়ানমারে এসেছিল। মিয়ানমার সরকার মুসলমানদের ওপর যেসব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে সেসব বিষয়ে আজকে আলোচনায় তুলে ধরছি।
রোহিঙ্গা মুসলমানরা সেদেশের নাগরিক হলেও সরকার তাদের পরিচয়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে স্বাধীনভাবে তারা নিজ দেশেও চলাফেরা করতে পারছে না। এ ছাড়া, সরকার মুসলমানদেরকে পাসপোর্ট না দেয়ার কারণে তারা দেশের বাইরেও যেতে পারছে না। এমনকি রোহিঙ্গা মুসলমানরা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে  চাইলেও সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি নেই এবং তাদেরকে সরকারি চাকরি থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। এমনকি সরকারের অনুমতি ছাড়া মুসলমানরা বিয়েও করতে পারে না। বিয়ের অনুমতির জন্য সরকারকে আলাদাভাবে কর দিতে। বিয়ের পরও কোনো দম্পতি দু'টির বেশি সন্তান নিতে পারে না। মিয়ানমারের মুসলমানদেরকে বাধ্যতামূলক কাজে নিয়োগ দেয়া হয় এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই। আর যদি সুযোগ দেয়া হয় তাহলেও সেখানে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মিয়ানমারের মুসলমানদেরকে সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা ছাড়াও সেনাবাহিনী তাদের ওপর যে গণহত্যা ও ধর্ষণ চালাচ্ছে তার সঙ্গে উগ্র বৌদ্ধরাও যোগ দিয়েছে এবং সেখানে মানবেতর অবস্থা বিরাজ করছে। মিয়ানমার সরকার এমন সময় মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে যখন অং সান সুচির নেতৃত্বে ন্যশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডি দলটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয় লাভ করে এবং নতুন সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে মিয়ানমার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্বপালনকারী অং সান সুচি রোহিঙ্গা মুসলমানদের নানা অভিযোগ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তিনি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন তো করেননি বরং রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা আরো বেড়েছে।
রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সহিংসতা থেকে বোঝা যায়, সরকার ও সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে রাখাইন রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার জনসংখ্যায় কাঠামোয় পরিবর্তন আনার জন্য বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে তাদের চলে যেতে বাধ্য করছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী সহিংসতায় লিপ্ত। তারা মুসলমানদের হত্যার পাশাপাশি, তাদের ঘরবাড়ি ও ফসলে আগুন দেয়া এবং নারীদের ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত যাতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। আঙ্কারার আন্তর্জাতিক গবেষণা বিষয়ক সংস্থার বিশেষজ্ঞ সালেকুম কুলাক ওগলু বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকেই মিয়ানমার সরকার মুসলমানদেরকে সেদেশ থেকে বিতাড়িত করার নীতি নিয়েছিল যাতে মিয়ানমারকে মুসলিম শূন্য বৌদ্ধ দেশে পরিণত করা যায়। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু সব ধর্মীয় সম্প্রদায়কে হয় বৌদ্ধদের নীতি আদর্শের সঙ্গে মিশে যেতে বাধ্য হবে অথবা দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে হবে। অন্যান্য ধর্মের প্রভাব ঠেকানোই ছিল মিয়ানমার সরকারের এ ধরণের নীতির প্রধান উদ্দেশ্য। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সহিংসতা এমন সময় অব্যাহত রয়েছে যখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলমান হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত রয়েছে।
২০১৬ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত হত্যা ও নির্যাতনের ভয়ে পলাতক আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে আরো ছয় হাজার মুসলমান। হত্যা ও সহিংসতার মাত্রা এতটাই নৃশংস ছিল যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা একে জাতিগত শুদ্ধিঅভিযান এবং মানবতা বিরোধী অপরাধ হিসাবে অভিহিত করেছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার এক বিবৃতিতে বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানরা সেনাবাহিনীর হাতে ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞের স্বীকার হতে পারে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য মিয়ানমার সরকারকে অভিযুক্ত করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার এটা সামান্য চিত্রমাত্র যা থেকে মিয়ানমার সরকারের মানবতা বিরোধী চরিত্রের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ঢল নেমেছে বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে এতো বিশার সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। এ কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে।                
বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আগমন, বাংলাদেশ সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সমাজের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে মানবাধিকার সংস্থাগুলো খাদ্য ও ওষুধের অভাবে শরণার্থী ক্যাম্পে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিরা শরণার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে একটি সমাঝোতায় পৌঁছেছেন যদিও সেটা কাগজে কলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে তাতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। অবশ্য মিয়ানমার সরকার আদৌ শরণার্থীদেরকে ফিরিয়ে নেবে কিনা তাতে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যাপক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার আপাতত এ ধরণের চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। এ অবস্থায় সবার মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা যদি মিয়ানমারে ফিরেও যায় তাহলে সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা যে ফের তাদের ওপর সহিংসতা, জুলুম-নির্যাতন চালাবে না তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে? হিউম্যান রাইসট ওয়াচের মহাসচিব বিল ফারলিক বলেছেন, বিশ্ববাসীকে এটা বুঝতে হবে যে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। তিন বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরকে ফিরে যাওয়া মুসলমানদের অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।

ডিএসইর অংশীদার হতে চাপ

দর প্রস্তাবে পিছিয়ে থেকে এখন নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মালিকানার অংশীদার হতে চাচ্ছে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ও বাংলাদেশের কোম্পানি ফ্রন্টিয়ারের সমন্বয়ে গঠিত জোট। এ জোটের অংশীদার ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশের নাম এসেছে বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত অর্থ পাচার-সংক্রান্ত ঘটনা প্যারাডাইস পেপার কেলেঙ্কারিতে। অর্থ পাচারের জন্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গঠন করা জোট এখন ডিএসইর শেয়ার কিনতে নানামুখী তদবির চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হতে দর প্রস্তাবে অংশ নিয়ে শেয়ার কেনার আগ্রহ দেখায় চীনের বৃহৎ দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ সেনজেন ও সাংহাইয়ের সমন্বয়ে গঠিত জোট এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক ও ফ্রন্টিয়ারের সমন্বয়ে গঠিত জোট। এ দুটি জোট আলাদাভাবে দর প্রস্তাব করে। তাতে সর্বোচ্চ ২২ টাকা দর প্রস্তাব করে সেনজেন ও সাংহাই জোট। আর ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক ও ফ্রন্টিয়ারের জোট শেয়ারের জন্য দর প্রস্তাব করে ১৫ টাকা। এ অবস্থায় গত শনিবার ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের সভায় সর্বোচ্চ দরদাতা চীনের সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জকে কৌশলগত অংশীদার করার বিষয়ে একমত হয় ডিএসইর পর্ষদ। এরপরই দেখা দেয় বিপত্তি। দর প্রস্তাবে পিছিয়ে থাকা জোটের হয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ তৈরি হয়। এ নিয়ে ডিএসইর বর্তমান শেয়ারধারীদের মধ্যে একধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করে ডিএসইকে এখন বলা হচ্ছে চীনের দুই প্রতিষ্ঠানের জোট এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক ও ফ্রন্টিয়ার জোটের মধ্যে সাড়ে ১২ শতাংশ করে মোট ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করার। এতে আপত্তি জানিয়েছে ডিএসইর বর্তমান শেয়ারধারীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর শেয়ারধারী প্রভাবশালী একাধিক সদস্য বলেন, দর প্রস্তাবের নিয়ম অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দরদাতার কাছেই শেয়ার বিক্রি করা হবে, এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। এখন এসে যদি ভাগ-বাঁটোয়ারা করে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে দর প্রস্তাব ডাকার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেবে।
এ বিষয়ে জানতে ডিএসইর চেয়ারম্যান আবুল হাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলবেন না বলে টেলিফোনের লাইন কেটে দেন। গেছে, সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ডিএসইর ওপর চাপ তৈরি করা হয় ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক ও ফ্রন্টিয়ার জোটের কাছে শেয়ার বিক্রির বিষয়ে।জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে কেউ যেকোনো অভিযোগ তুলতে পারে। তবে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে বৃহত্তর নানা বিষয় বিবেচনা করে। এখনো আমাদের কাছে ডিএসইর শেয়ার বিক্রি-সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব আসেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে না। এমনকি এ বিষয়ে ডিএসইর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত এখতিয়ার নেই। নানা বিষয়ে বিএসইসি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাজার-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। পরামর্শ করতে পারে। এটিকে চাপ প্রয়োগ বলে ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ নেই।’সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইর অংশীদার হতে এখন আরও বেশি দাম দিতে রাজি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক ও ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ জোট। সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ জোটের প্রস্তাব করা দামেই ডিএসইর শেয়ার কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে জোটটি।ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী, মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদা করার পর ডিএসইর মোট শেয়ার ২৫০ সদস্যের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হয়। এসব শেয়ারের মধ্যে ৪০ শতাংশ সদস্যদের নিজেদের জন্য আলাদা করা হয়। বাকি ৬০ শতাংশ শেয়ার সদস্যদের বাইরে বিক্রির জন্য আলাদা করে ব্লক হিসেবে রাখা হয়। এ ৬০ শতাংশ শেয়ারের মধ্যে ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির জন্য আইনিভাবে নির্দিষ্ট করা ছিল। বাকি ৩৫ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য আইনিভাবে নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।আইন অনুযায়ী, আগামী ৮ মার্চ বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তিন দফা বাড়িয়ে এ সময়সীমা নির্ধারণ করেছে বিএসইসি। বিএসইসির নির্দেশনায় এ সময়সীমা আরও বাড়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। ২০১০ সালে শেয়ারবাজার ধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৩ সালে আইনের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এ প্রক্রিয়ায় আইনের মাধ্যমে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা হয়। ১৩ সদস্যের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক রাখা হয়েছে সাতজনকে। আইনে বিধান করা হয়েছে, সাত স্বতন্ত্র পরিচালকের মধ্য থেকেই সভাপতি নির্বাচিত করতে হবে। এ ছাড়া পর্ষদে শেয়ারধারী পরিচালক থাকবেন চারজন। পর্ষদে কৌশলগত বিনিয়োগকারীর জন্য একটি পরিচালক পদও সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের জোট চূড়ান্তভাবে কৌশলগত মালিকানার অংশীদার হওয়ার অনুমোদন পেলে তাদের একজন প্রতিনিধি থাকবেন ডিএসইর পর্ষদে।

নাগরিক আন্দোলন ও আসমা জাহাঙ্গীর by মহিউদ্দিন আহমদ

১৯৬২ সালের ১ মার্চ সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান নতুন একটি সংবিধান জারি করেন। সংবিধান অনুযায়ী পাকিস্তানে চালু হলো রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা। ইউনিয়ন কাউন্সিলের (এখন নাম ইউনিয়ন পরিষদ) ৮০ হাজার সদস্যের ভোটে ২৮ এপ্রিল জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। তখনো সামরিক আইন জারি থাকায় নির্বাচন হয়েছিল নির্দলীয় ভিত্তিতে। জাতীয় পরিষদে আসনসংখ্যা ছিল ১৫০। এ ছাড়া অতিরিক্ত ৬টি আসন ছিল নারীদের জন্য সংরক্ষিত। জাতীয় পরিষদে আইয়ুব খানের অনুগত ব্যক্তিরাই বেশি সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ৮ জুন। ওই দিন সামরিক আইন তুলে নেওয়া হয়। প্রথম অধিবেশনে ফরিদপুরের মৌলভি তমিজুদ্দিন খান স্পিকার নির্বাচিত হন। বিধি মোতাবেক ১৯৫৮ সালের অক্টোবর থেকে জারি হওয়া সামরিক আইনের অধ্যাদেশগুলো জাতীয় পরিষদে পাস করিয়ে নিতে হবে। একপর্যায়ে আলোচ্যসূচিতে এল ১৯৬১ সালের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’। জাতীয় পরিষদে ‘নির্দলীয়’ হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই ছিলেন কোনো না কোনো দলের সদস্য বা সমর্থক। জামায়াতে ইসলামীরও সদস্য ছিলেন কয়েকজন। তাঁদের একজন হলেন বগুড়ার আব্বাস আলী খান। নারী অধিকার তথা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন ছিল একটি প্রগতিশীল আইন। অতীতের গণতান্ত্রিক সরকারগুলো এ ধরনের একটি প্রথাবিরোধী আইন পাস করার সাহস দেখাতে পারেনি। সাহসটি দেখালেন সামরিক একনায়ক আইয়ুব খান। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কয়েকজন সদস্য ছিলেন। তাঁরা প্রগতিশীল এই আইনের পক্ষে ছিলেন। আইয়ুবের সমর্থক মুসলিম লীগের সদস্যরা তো এই আইন পাসের জন্য ছিলেন একপায়ে খাড়া। কিন্তু বাদ সাধল জামায়াতে ইসলামী। তারা এই আইনকে ইসলামি শরিয়াহবিরোধী বলে প্রচার করল। জাতীয় পরিষদে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। এই বিতর্কে আব্বাস আলী খান প্রস্তাবিত আইনটির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন।
পশ্চিম পাকিস্তানে রাওয়ালপিন্ডির ‘আইয়ুব হলে’ যখন পরিষদের বিতর্ক চলছিল, তার বাইরে পাঞ্জাবের নাগরিক সমাজের নারী প্রতিনিধিরা জড়ো হয়ে আইনটির পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলেন। পরিষদ ভবনের সামনে পুলিশের পাহারা ছিল। সমবেত নারী প্রতিনিধিরা ছিলেন বেশ মারমুখী। কিন্তু পুলিশ তাঁদের ওপর চড়াও হয়নি। তা ছাড়া তাঁরা তো আইয়ুব খানের জারি করা আইনের পক্ষেই আওয়াজ তুলেছিলেন। এ সময় একজন নারীনেত্রী পুলিশের প্রায় গায়ের ওপরে পড়ে আহ্বান জানালেন, ‘আব্বাস আলীকো হামারা পাস ছোড় দো’, অর্থাৎ আব্বাস আলীকে আমাদের কাছে তুলে দাও। সমাবেশটি ছিল বেশ জঙ্গি। পুলিশ এই আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিলে আব্বাস আলী খানের কী দশা হতো, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ওই সময় ওখানে পেশাগত কাজে গিয়েছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তানের তরুণ রিপোর্টার আমানউল্লাহ। ঘটনাটি তাঁর কাছ থেকেই শোনা। পাকিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিশেষ করে নারীর অবস্থা ক্রমাগত শোচনীয় হয়েছে এবং অবস্থান ঠেকেছে তলানিতে। কিন্তু এটা এক দিনে হয়নি। ১৯৬৪ সালে যখন আইয়ুববিরোধী কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ) তৈরি হয়, তার কর্মসূচির অন্যতম ছিল ১৯৬১ সালের এই আইনের সংশোধনের অঙ্গীকার। কপের নয় দফা দাবির আট নম্বর দফায় ছিল ‘কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ অনুযায়ী সত্যিকার ইসলামি সমাজব্যবস্থা ও শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে পারিবারিক আইন সংশোধন’। অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী ও প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ জামায়াতের ওই দাবিকে মেনে নিয়েছিল শুধু ভোটের রাজনীতির জন্য। এ দেশের নারীরা বেঁচে গেছেন। কারণ, কপের প্রার্থী মিস ফাতেমা জিন্নাহ ভোটে আইয়ুব খানের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে তুষ্ট করতে ১৯৭৫ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করেছিল। ১৯৭৭ সালে ভুট্টোর সরকারের পতন এবং জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের নারীসমাজের উল্টোযাত্রা শুরু হলো অন্ধকারের পথে। কিন্তু পাকিস্তানের নাগরিক সমাজ কখনোই এই অবস্থা মেনে নেয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী বরাবরই পাকিস্তানে সামরিক শাসন, একনায়কতন্ত্র এবং মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ১৯৮০-র দশকে এসে আমরা দেখি ‘পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশন’ নামের একটি নাগরিক সংগঠন সামনের কাতারে থেকে নাগরিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর সঙ্গে যে কয়েকজনের নাম জড়িয়ে আছে, তার একজন হলেন আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর। অতিসম্প্রতি তিনি প্রয়াত হয়েছেন। আসমা আমার কাছাকাছি বয়সের। তাঁর সঙ্গে প্রথম মানবাধিকার-সংক্রান্ত এক সম্মেলনে দেখা ১৯৮৯ সালের মে মাসে। বাংলাদেশে তখন মানবাধিকার সংগঠন বলতে ছিল মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে ঢাকার গণ-উন্নয়ন গ্রন্থাগারে আমরা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি চ্যাপ্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। ব্যক্তিগত কোন্দলের কারণে এটি বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। ব্যাংকভিত্তিক একটি আঞ্চলিক সংগঠন ‘অ্যাকফোড’ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল মানবাধিকারবিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি করার। আমি তার একটা খসড়া নিয়ে ব্যাংককে যাই। আমার সহযাত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূঁইয়া। পাঁচ দিনের ওই সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলে ছিলেন আসমা জাহাঙ্গীর ও মুনীর মালিক। মুনীর মালিক পরে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে জোর লড়াই চালিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ওই সম্মেলনে আমরা আলোচনা করে ঠিক করলাম, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। সুতরাং আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংহতি থাকা দরকার, দরকার যূথবদ্ধ আন্দোলনের। আমরা যে কয়টা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তার মধ্যে ছিল একটি ‘এশিয়ান কোড অব কনডাক্ট অন মাল্টিন্যাশনালস ফর এশিয়ান গভর্নমেন্টস’ তৈরি এবং একটি ‘এশিয়ান হিউম্যান রাইটস এনজিও কমিশন অন্য দ্য ট্রাফিকিং অব উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন’ আহ্বান করা। ওই সময় আসমার সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। এই ধারা অব্যাহত ছিল পরবর্তী বছরগুলোতেও। ১৯৯৮ সালে করাচিতে পাকিস্তান পিস কোয়ালিশন গঠনের পেছনে তিনি অনেক শ্রম দিয়েছেন। করাচির মেট্রোপল হোটেলের ওই সম্মেলনে আমিও উপস্থিত ছিলাম একমাত্র বাংলাদেশি প্রতিনিধি হিসেবে। আসমাকে দেখেছি ‘পাক-ইন্ডিয়া ফোরাম অন পিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’, ‘পিপলস সার্ক’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’-এর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। পাকিস্তানের সামরিক ও আধা সামরিক সরকারগুলোর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মানবাধিকারের আলোর শিখাটি তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন গত চার দশকের বেশি সময়। ওই মাপের প্রতিবাদী মানুষ এই অঞ্চলে আরেকজন খুঁজে পাওয়া কঠিন। আসমা কখনোই নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলেননি। ক্ষমতাসীন সব দলই তাঁকে অপছন্দ করেছে বা তাঁকে নিয়ে বিব্রত হয়েছে, কিন্তু নাগরিকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ন্যায্যতা ও প্রতিবাদের প্রতীক। এই অঞ্চলে আমরা তাঁর অভাব অনুভব করব। তাঁর আত্মার শান্তি হোক।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক
mohi2005@gmail.co
m

চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে তো! by ইয়াও ইয়াং

গত অক্টোবরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম ন্যাশনাল কংগ্রেস উদ্বোধন করার সময় প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ঘোষণা দেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীন ‘সম্পূর্ণ আধুনিক’ অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠবে। এ ছাড়া গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সময়, অর্থাৎ ২০৪৯ সালে দেশটি উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। অনেকে মনে করেন, চীনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের চেয়ে চিন পিং অনেক বেশি সফল। ১৯৬৪ সালে দেওয়া ভাষণে চৌ এন লাই বিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ চীন চারটি দিক থেকে ‘আধুনিক’ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। চৌ এন লাই যে চারটি বিষয়ে সংস্কার আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলো হলো কৃষি, শিল্প, প্রতিরক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। তিনি তখন চীনের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। তবে এটুকু বোঝা যায়, বিশ্বব্যাংকের মান অনুযায়ী চীনের তৎকালীন নিম্ন-মধ্যম আয়কে তিনি উন্নীত করার কথা বলেছিলেন। চীনের এখনকার অর্থনৈতিক গতিবিধি দেখে বোঝা যায়, দেশটির পক্ষে তার লক্ষ্য অর্জন দুরূহ হবে না। দেশটির বর্তমান সামষ্টিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ২৫ শতাংশের সমান। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ক্লাব হিসেবে পরিচিত সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (ওইসিডি) চীনকে যোগ দিতে হলে এই উৎপাদন ৪৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। ২০৪৯ সাল নাগাদ ধনী দেশগুলোর ক্লাবে নাম লেখাতে হলে চীনকে এখন থেকেই প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে গড়ে কমপক্ষে ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি পয়েন্ট অর্জন করতে হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির হার ২ শতাংশ ধরে রেখেছে। আর চীনকে তার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিবছর ৩ দশমিক ৭ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখতে হবে। চীনের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ; তার মানে লক্ষ্য অর্জনে যা দরকার, তার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে দেশটি। এই প্রবৃদ্ধির হার ২০৪৯ সাল নাগাদ কমতে কমতে যদি ২ শতাংশেও এসে দাঁড়ায়, তাহলেও গড় প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের নিচে নামবে না। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে চীনের উচ্চ আয়ের দেশ হওয়া একরকম নিশ্চিত। কিন্তু ‘আধুনিক’ হতে গেলে শুধু ধনী হলেই হবে না। এর জন্য অর্থের বাইরে আরও কিছু দরকার। এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। আধুনিক রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায়, চীন যদি সত্যিই তাই হয়ে ওঠে, তাহলে দেশটিকে অবধারিতভাবেই এমন একটি সমাজব্যবস্থার মধ্যে ঢুকতে হবে, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য আধুনিক দেশের মতোই মানুষ তার চলাফেরা, ব্যক্তিগত অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবে। এ কারণে আয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলেও চীনের জন্য ‘আধুনিক’ হওয়া খুব সহজ হবে না। আধুনিক হওয়ার শর্ত পূরণে চীনকে প্রথমেই তার পরিবেশকে দূষণমুক্ত করার দিকে মন দিতে হবে। সাধারণ চীনাদের কাছে এটি বিলাসিতাপূর্ণ চাওয়া নয়, এটি তাদের জন্য খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন বেইজিং ও তার চারপাশের বায়ুদূষণ এবারের শীতকালে লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। শহরের চারপাশের দূষণকারী কারখানা বন্ধ করে দেওয়া এবং ঘর গরম রাখার জন্য জ্বালানি কাঠের বদলে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার চালু করার ফলে এটি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এটি করতে সরকারকে বিস্তর খরচ করতে হয়েছে। বিশেষ করে এতে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। অন্য শহরগুলোতেও বায়ু এবং নদী-নালায় দূষণ ঠেকাতে উদ্যোগ নিলে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। চীনের আধুনিক হওয়ার পথে দ্বিতীয় বৃহৎ চ্যালেঞ্জ হলো শহর আর গ্রামের জীবনমানের তফাত কমিয়ে আনা। বর্তমানে শুধু উপার্জনের দিক দিয়েই নয়, শিক্ষা, অবকাঠামো, সরকারি সেবাসহ নানা দিক থেকে শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামের মানুষ পিছিয়ে আছে। এই বাধা দূর করতে নগরায়ণ সহায়ক হবে। কিন্তু এরপরও ২০৩৫ সালেও চীনের অন্তত ৩০ কোটি মানুষ এসব সুবিধাবঞ্চিত হয়ে গ্রামে বাস করবে। এত লোককে নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে কোনো দেশের পক্ষে আধুনিক হওয়া সম্ভব নয়। ২০৪০ সাল নাগাদ সক্ষম নাগরিকের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি কমে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি বাড়লেও শ্রমশক্তির ঘাটতি দেখা দেবে। এটি সামাজিক নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দেখা দেবে। আধুনিক রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে দেশে জোরালোভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দরকার। অবশ্য সি চিন পিং তাঁর ন্যাশনাল কংগ্রেসের ভাষণে প্রায় ২০ বার এই কথাটি উল্লেখ করেছেন। আরেকটি বড় অন্তরায় হলো চীনের রাজনৈতিক মতাদর্শ। এখানে যে কারও পক্ষে সরকারবিরোধী কিছু বলা সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে এই অধিকার থাকা অপরিহার্য। তবে আশার কথা, এই গতিতে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে থাকলে মুক্তভাবে মত প্রকাশ করার পরিবেশ ধীরে ধীরে প্রসারিত হবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
ইয়াও ইয়াং: পিকিং ইউনিভার্সিটির চায়না সেন্টার ফর ইকোনমিক রিসার্চের পরিচালক

ভালোবাসা দিবসে কুকুর-গাধার বিয়ে!

দেশের নানা প্রান্তে ভ্যালেন্টাইনস ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে দাপিয়ে বেড়ালো বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলসহ বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন। কোথাও তারা মারমুখী, কোথাও দিয়েছে হুমকি। ধাওয়া করেছে তরুণ-তরুণীদের। এমনকি প্রেম দিবস পালনকে বিদ্রূপ করে কুকুর-গাধার বিয়েও দিয়েছে এক হিন্দু সংগঠন! জানা গেছে, আহমদাবাদে সাবরমতী নদীর তীরে গেরুয়া পতাকা ও লাঠি নিয়ে বজরং দলের লোকজন প্রেমিক যুগলদের হুমকি দিচ্ছেন। যারা পালাচ্ছিলেন, তাদেরও ধাওয়া করছেন। পরে ওই দলের ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাড়ানো হয় পুলিশি পাহারা। উত্তর গুজরাতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রচার সচিব হেমেন্দ্র ত্রিবেদী জানান, হামলা হয়নি। প্রেমিক-প্রেমিকাদের ওই জায়গা ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। ভ্যালেন্টাইনস ডে বিরোধী বজরং দল নাগপুরে ঘোষণা করে, এদিন রাস্তায় যুগলকে দেখা গেলেই বিয়ে দেওয়া হবে। ভ্যালেন্টাইনস ডের উদ্‌যাপন রুখতে এদিন শহরে মিছিলও বের করে তারা। একই চিত্র ছিল হায়দরাবাদেও। তারা ভুবনেশ্বরে কলিঙ্গ শপিংমুল ও পার্কে অভিযান চালাবে বলে হুমকি দিয়েছিল। অপরদিকে ভ্যালেন্টাইনস ডের সমর্থনে বেঙ্গালুরুতে দুটি ভেড়ার বিয়ে দিয়েছে কর্নাটক রক্ষণা বেদিকে নামে এক সংগঠন। তাদের বক্তব্য- ‘ভ্যালেন্টাইনস ডের বিরোধিতা করা উচিত নয়। কারণ ভালোবাসা জাত-ধর্ম মানে না। এই ভালোবাসার জন্য একদিনের ছুটিও ঘোষণা করা উচিত।’

বন্দুক নিয়েই মেতে থাকত নিকোলাস ক্রুজ

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের স্কুলে গুলিবর্ষণ করে ১৭ জনকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার নিকোলাস ক্রুজকে মার্জরি স্টোনম্যান ডগলাস হাইস্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। যেখান থেকে সে গুলি করছিল, সেখান থেকেই পুলিশ তাকে আটক করেছে। তাকে কাছের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শৃঙ্খলাজনিত কারণে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।-খবর রয়টার্স ও বিবিসি অনলাইন। তার আচরণ নিয়ে স্কুল থেকে নানাজনে আপত্তি তুলেছিল। সে অন্য শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখাত এবং তার মোবাইল ফোনটি বন্দুকের ছবিতে ভরা থাকত বলে জানিয়েছেন পরিচিতজনরা। তার সাবেক সহপাঠীররা জানিয়েছে, সে অস্থির চিত্তের এক তরুণ এবং বন্দুক ভালোবাসত।
তাকে যখন গ্রেফতার করা হয়, তখন তার কাছে অনেক গুলিভর্তি ম্যাগজিনসহ একটি আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল পাওয়া যায়। ডগালাস হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষার্থী ১৮ বছর বয়সী চাদ উইলিয়ামস জানিয়েছেন, মাধ্যমিক স্কুল থেকেই ক্রুজ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করছিল। ক্রুজ স্কুলের ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে দিত আর দিনের পর দিন সে একই কাজ করত বলে জানিয়েছেন তিনি। পরে অষ্টম গ্রেডে ওঠার পর তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯ বছর বয়সী জিলিয়ান ডেভিস জানান, নবম গ্রেডে থাকার সময় তিনি ক্রুজের সঙ্গে স্কুলের জুনিয়র রিজার্ভ অফিসার ট্রেনিং কোরে (জেআরওটিসি) ছিলেন। ক্রুজকে শান্ত ও লাজুক ছেলে বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। তবে ক্রুজ রাগান্বিত হলে পুরোপুরি বদলে যেত বলেও জানিয়েছেন। তিনি জানান, ক্রুজ বন্দুক ও ছুরি নিয়ে অনেক কথা বলত; কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দিত না। গণিতের শিক্ষক জিমগার্ড বলেন, স্কুলের সবাই তাকে খারাপ আচরণের জন্য চিনত। গত বছর সে অন্য শিক্ষার্থীদের ভয় দেখালে তাকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে যত পোস্ট দিত, তার সবই ছিল বন্দুক নিয়ে।

ইরানের প্রতীকী আদালতে সূ চির ১৫ ও হ্লিয়াংয়ের ২৫ বছর কারাদণ্ড

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযানে সমর্থনের দায়ে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ও দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লিয়াংয়ের বিরুদ্ধে তেহরানের গণআদালতে প্রতীকী বিচার হয়েছে।
বুধবার ইমাম সাদেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আদালত বসেছিল। এতে ইরান ও বাংলাদেশের অনেক মুসলিম মানবাধিকারকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তারা বিচারকদের কাছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও জাতিগত নিধনের বর্ণনা দেন। এতে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচারকরা সু চির ১৫ বছর ও হ্লিয়াংয়ের ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। এতে দুই ইরানি আইনজীবী মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

চীন-ভারত উভয়কে খুশি রাখার চেষ্টা by মনির হোসেন

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ার বিক্রি ইস্যুতে চীন ও ভারত উভয়কে খুশি রাখার চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এক্ষেত্রে ভারতকে অবশ্যই শেয়ারের দাম বাড়াতে হবে। তবে প্যারাডাইস পেপার্সে নাম থাকায় ভারতীয় কনসোর্টিয়ামে থাকা ফ্রন্ট্রিয়ার বাংলাদেশ কোনো শেয়ার পাবে না। অন্যদিকে স্টক এক্সচেঞ্জের মেম্বাররা এখনও শুধু চীনের কাছে শেয়ার বিক্রির অবস্থানে অনঢ় রয়েছেন। প্রয়োজনে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইবেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে। স্টক এক্সচেঞ্জ ও সরকারের ঊর্ধ্বতনসূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু শেয়ারবাজার নয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আর্থিক খাতে অন্যতম গরম ইস্যু এটি। জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বুধবার বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব এখনও আমাদের কাছে আসেনি। প্রস্তাব এলে সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দেশ, সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং স্টক এক্সচেঞ্জের মেম্বারদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হবে।’ তার মতে, ‘বিষয়টি দেশের জন্য অত্যন্ত খুশির খবর। কারণ চীন ও ভারতের মতো দেশের স্টক এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার কিনতে আগ্রহী। অর্থাৎ দেশের শেয়ারবাজার ওই মানে পৌঁছেছে।’ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজার একটি স্পর্শকাতর জায়গা। ফলে বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে কোনো বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার বিক্রি করা হলে এই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা থাকবে না। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের শেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই। ১০ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ। স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশনের (ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা আলাদাকরণ) শর্ত অনুসারে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসাবে তাদের কাছে এই শেয়ার বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের দাম ২২ টাকা দিচ্ছে চীনা প্রতিষ্ঠান। এতে শেয়ারের মোট মূল্য দাঁড়ায় ৯৯২ কোটি টাকা। এছাড়া আরও ৩০৭ কোটি টাকার কারিগরি সহায়তা দেবে চীন। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়ার নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম এই শেয়ারের দাম ১৫ টাকা প্রস্তাব করেছে। এতে মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৬৫ কোটি টাকা। তবে চীনকে শেয়ার দেয়ার সিদ্ধান্তের পর ভারত দাম বাড়িয়েও শেয়ার কিনতে আগ্রহ জানিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ভারতকে শেয়ার দিতে চায়। ফলে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষকেই খুশি রাখার উপায় খোঁজা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মেম্বারদের মতামতের প্রতি সম্মান জানিয়ে চীনকেই অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। আর ভারতকে অন্তর্ভুক্তির জন্য দুটি বিকল্প অপশন নিয়ে ভাবছেন নীতি-নির্ধারকরা। প্রথমত চীনের প্রস্তাব করা দামে ভারতকেও শেয়ার দেয়া হবে এই সিদ্ধান্তে স্টক এক্সচেঞ্জ মেম্বার এবং চীনকে রাজি করানো। এক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে একজন বাদ দিয়ে দুই কনসোর্টিয়াম থেকে দু’জন পরিচালক নেয়া হবে। আর এই প্রস্তাবে মেম্বররা এবং চীন রাজি না হলে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হবে।
সেক্ষেত্রে যেই গ্রুপ বেশি দাম দেবে তারা পাবে। এছাড়াও ২৫ শতাংশ শেয়ারের পুরোটা নয়, আপাতত ৫ থেকে ১৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করা হবে। বাকি শেয়ার হাতে রাখা হবে। তবে কোনো কিছুতেই বিএসইসি দায় নেবে না। আন-অফিসিয়ালি আলোচনা চূড়ান্ত হবে। এরপর স্টক এক্সচেঞ্জের বোর্ড থেকে প্রস্তাব গেলে বিএসইসি তা কার্যকর করবে। ভারতীয় কনসোর্টিয়ামে থাকা ব্রামার্স পার্টনার্স অ্যান্ড এসেট ম্যানেজমেন্ট (ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ) লিমিটেড ডিএসইর ৩ শতাংশ শেয়ার কিনতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের প্রস্তাবিত মূল্য ৮১ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরের প্যারাডাইস পেপার্স কেলেঙ্কারিতে তাদের নাম আসে। ওই তালিকায় ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ারবাজারের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ব্রামার্স। সংসদেও ওই নামগুলো উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদেরকে অর্থপাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতদিন বিষয়টি চাপা থাকলেও কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসাবে শেয়ার কেনার আবেদন করায় বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। ফলে শেয়ার ভাগ হলেও আপাতত তারা কোনো শেয়ার পাচ্ছে না। সূত্র বলছে, ব্রামার্সের কাছে শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করছে শেয়ারবাজারের প্রভাবশালী একটি গ্রুপ। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের মতো কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠানকেও বিতর্কিত করছে ওই গ্রুপটি। জানতে চাইলে ব্রামার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খালিদ কাদের যুগান্তরকে বলেন, প্যারাডাইস পেপার্সের বিষয়টি আপনারা খোঁজ নেন। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি কনসোর্টিয়ামে যোগ দিয়ে শেয়ার কেনার প্রস্তাব করেছি মাত্র।’ প্রতিষ্ঠানটির অন্য কর্মকর্তা মোয়াল্লেম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্যারাডাইস পেপার্সে নাম থাকার তথ্য সঠিক নয়। মূল পেপার্সে বাংলাদেশের কোনো কোম্পানির নাম নেই। জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, প্যারাডাইস পেপার্সে যেসব কোম্পানির নাম এসেছে, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যদি শেয়ারবাজারে ব্যবসা করে, তবে তাদেরকে আপাতত নিবিড়ভাবে নজরদারি (ক্লোজলি মনিটরিং) করা উচিত। কোনো অনিয়ম পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তবে চীনকে শেয়ার দেয়ার ব্যাপারে অনঢ় অবস্থানে স্টক এক্সচেঞ্জের নেতারা। এ নিয়ে তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন।

বাঁশিওয়ালার মাঝে বসন্তের হাওয়া by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

সেদিন বাতাসে ছিল ফাল্গুনের গুঞ্জরন। এক রাতেই শীতের পলায়ন। কোকিলের কাছে ক্যালেন্ডার নেই। তবু গানের বিরতি নেই। সারা দিন ধরে। গীতবিতান খুলতে হয়নি, আপন মনে গানগুলো গেয়ে চলেছি। এরপরেও আবার একটু শীতের হাওয়া। এর নাম জলবায়ু পরিবর্তন। আটকে পড়লাম ‘বাঁশিওয়ালা’তে। অনেক দিন পড়েছি কবিতাটি। সেদিন লাগল একদম ভিন্ন। কীভাবে, তা-ই বলছি। এই প্রথম একটি কবিতাতে রবীন্দ্রনাথ চিহ্নিত করছেন একজন কিশোরীকে, সে বলছে-‘আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে।’ আমাকে তুমি নতুন নামে ডাকো। হে কবি, আমি শুনতে চাই আমার নতুন নাম। ওগো কবি, তোমার কাছে এটি আমার প্রথম চিঠি হতে পারে। কবি নিজেই লিখেছেন, কারণ এ দেশের মেয়ে এত সুন্দর কবিতা লিখবে কেমন করে, যদিও পারে আবৃত্তি করতে এত সুন্দর করে, যাতে পঙ্ক্তিমালা নিয়ে আসে নবব্যঞ্জনা, নব-উপলব্ধি। সেদিন সীমা ইসলামের আবৃত্তি চয়নে ‘বাঁশিওয়ালা’ জীবন্ত হয়ে এল আমার চোখের সামনে। ১৩৪৩ সালের ২ আষাঢ়ে সম্ভবত শান্তিনিকেতনের সেই সুন্দর ঘরটিতে খুঁজে পান কবি বাংলাদেশের সেই মেয়েকে। আমিও সেই ঘরে গিয়েছিলাম বইকি। বেশ খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দেখছিলাম ঘরটির বাইরে বানানো একটি কৃত্রিম হ্রদ, যেখানে বাঁধা একটি তরণি। কবির সামনে কবিতা লেখার ডেস্ক, ঝরনা কলম, কয়েকটি সাদা পাতা। কালস্রোতের বালুকাবেলায় কালো মেয়েটির চিহ্ন ভালো করে ফুটে ওঠেনি, যেন তাকে দেখা যায় আবছা আলোয়। বিধাতা তাকে পুরোপুরি গড়তে গিয়ে আনমনা হয়ে পড়েছিলেন। তাই সে অদেখার আহ্বানে অধীর হয়ে উঠেছেন কবি। যাকে দেখা যায়নি, তাকে দেখতে চেয়েছে অধীর কাঙাল মন। মেয়েটি ঝাপসা, যাকে কোনো দিন এ যুগের পারানি নৌকায় পা ফেলতে দেখা যায়নি।
বিধাতার সময় হয়নি তাকে পূর্ণতা দিতে। তাতে কী? তরুণীর মনের ভাবনা কলমের কালিতে বন্দী করেছেন কবি। বাঁশিওয়ালা কী বাজায়, তা যেমন তরুণী জানতে পারেনি, তেমনি কবির মনে কী ব্যথা জেগে উঠেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি নবযৌবনের ভাটিয়ারিতে। পাহাড়তলির ঝিরঝিরে নদী কখনো এসে বুকের তলায় সৃষ্টি করেছে শ্রাবণের বাদল রাত্রি, আর নদীতীরের জমানো পাথর ছড়িয়ে দিয়েছে অজস্র স্রোতের ঘূর্ণি মাতন। রক্তে যে সুর বাজে, তা কেমন করে থামাবেন কবি? সব ডাক একসঙ্গে এসে জড়ো হয়েছে। কী ডাক? কেন: ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক, আগুনের ডাক, পাঁজরের পরে আছাড় খাওয়া মরণসাগরের ডাক, আছে উদাসী পথিকের ঘরের-শিকল-নাড়ার-ডাক। এতগুলো ডাক কেমন করে অস্বীকার করবেন কবি? বিধাতা দেননি ডানা কাউকেই। কবিকেও না। গান দিয়েছেন তাঁর স্বপ্নে। সব কবিকে উজাড় করে দিয়েছেন ফাল্গুন সমাগমে উড়ো প্রাণের মাতলামি। যারা ভালোবাসার কবিকে কাছে নিয়ে আসতে চাই, তারাও অনুভব করি বাঁশিকে। ওই বাঁশি নাহলে চেনা যাবে না ভালোবাসা, চেনা যাবে না বিরহানুভূতি, চেনা যাবে না ফাল্গুন। ‘বাঁশির সুরে হরিল পরান, কেমনে ঘরে থাকি রে’। মৈমনসিংহ গীতিকা জুড়ে বাঁশিওয়ালার গান। কেউ শুনেছেন কি? না শুনলে, বাঁশিওয়ালা চিনবেন কেমন করে? এ এমন বাঁশিওয়ালা, কোথায় না নিয়ে যান-ঘর থেকে অমর্ত্যলোকে। ফাল্গুন বিরহের প্রতীক জানা ছিল না। জানতাম সে মিলন ডেকে আনে। এখন ভাবছি, কৃষ্ণচূড়া ডেকে আনে বাঁশিওয়ালার অস্ফুট বাঁশরি, এমন মানবীর ছবি, যাকে দেখা যায় অর্ধেক, অর্ধেক দেখা যায় না। কবি লিখছেন, ‘দোসর হারা আষাঢ়ে ঝিল্লি ঝনক রাত্রে।’ নারী সে তো ছায়ার দোসর। তাকে তো দেখা যায় না। সে শুধু বাঁশিওয়ালা হয়ে চমকিত প্রহরের নির্জন নিঃসঙ্গ সঙ্গী। তবু কবি তাকেই মালা পরিয়ে দেন। সে মালাও দেখা যায় না। ওটা যে ছন্দের মালা, যে মালার সুর শুকোয় না। এই ঘোমটাখসা নারীই হঠাৎ চমক আনে গানে, ফাল্গুনে-বৈশাখে। তার ঠিকানাই সারা জীবন খুঁজে ফিরি। আজ সকালে সেই বাঁশিওয়ালার সুরে খুঁজে পেলাম আরেক অদেখা নারীকে। যাকে চিনিনি, জানিনি। আজ নতুন চোখে পেলাম বিদ্রোহিনীকে, যার তীক্ষ্ণ চোখে ঘৃণা চারদিকের কুটিল কাপুরুষতাকে। সবই আবৃত্তির গুণে। তাই কবিতা আবৃত্তির এত আয়োজন। আজকে মেলায় মেলায় যে নপুংসকদের আবির্ভাব, তাদের তির্যক চোখে প্রহার করেছেন কবি। আজ ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ছে কোথায় খুঁজে পাব সেই বাঁশিওয়ালাকে, শ্যামলীতে নেই, নেই ‘ইচ্ছামতী’ নদীর তীরে, নেই ‘শেষ চিঠিতে’, নেই ‘ছুটির আয়োজনে’। এমনকি স্বহস্তলিপিতে। কখনোবা চকিতে চিনতে পারি সেই অধরার ঠিকানা, যেখানে বাংলাদেশের সেই মেয়ে ‘যে বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে, মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে’। কবি তাকে দেখতে আসেননি কোনো মোহ নিয়ে এই সভায়। ‘স্নিগ্ধ তুমি, হিংস্র তুমি, পুরাতনী, তুমি নিত্য নবীনা’। ১১ ও ১২ ফাল্গুন কবিগুরুকে গান শোনাতে যাব। পিতা তাঁকে গান শোনাতে যাননি, যদিও আমন্ত্রণ ছিল। কাজী নজরুল ইসলাম বললেন, ‘আব্বাস, তুমি যেও। তিনি তোমার প্রতীক্ষায়। তোমার কল্পনা হার মানবে তাঁর কাছে।’ পিতা বললেন, ‘না, আমি তাঁকে যে বাঁশির সুরে রচনা করেছি, তা আমার একান্ত নিজস্ব কল্পনায় সৃষ্টি।’ আজ আমি বাঁশিওয়ালার আহ্বান শুনতে পাচ্ছি। এবারই প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার দেখা।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সাহিত্যিক ও সংগীত ব্যক্তিত্ব

শিক্ষায় বাণিজ্য ঢুকে গেছে by রাশেদা কে চৌধূরী

পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। আগেও টুকটাক ছিল, কিন্তু এখন তা ভয়াবহ হয়ে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষানির্ভর হওয়ায় এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আবার সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি ঠিকমতো আয়ত্তে আনা যাচ্ছে না। এর কারণ হলো, এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ পর্যাপ্ত নয়। স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ হয়। কিন্তু এটা শিক্ষকেরা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছেন না। সৃজনশীল পদ্ধতিটা কিন্তু ভালো। সমস্যা হলো, সেটাকে যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত চারটি পাবলিক পরীক্ষা হচ্ছে। এত পরীক্ষার প্রয়োজন আছে কি? শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন করতে হবে। এতে শিক্ষকদেরও মূল্যায়ন হবে। কিন্তু এখন তো কোচিং-প্রাইভেটসহ শিক্ষায় বাণিজ্য ঢুকে গেছে। এর মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অনৈতিকতা যুক্ত হয়েছে।
রাশেদা কে চৌধূরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

শিক্ষাব্যবস্থাই ধসে পড়ার নামান্তর by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল বিষয় হলো পরীক্ষা। আর পরীক্ষার মূল হলো প্রশ্নপত্র। সেই প্রশ্নপত্রই যদি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে পরীক্ষাব্যবস্থাই তো ভেঙে পড়ে। এটা তো শিক্ষাব্যবস্থাই ধসে পড়ার নামান্তর। এখন আমাদের দেশ হয়েছে ডিজিটাল।
কিন্তু আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থাটা রয়ে গেছে অ্যানালগ ব্যবস্থায়। অ্যানালগ-ব্যবস্থা দিয়ে ডিজিটাল যুগের সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পূর্বতন ব্যবস্থা দিয়ে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা যায় না। এ জন্য আমাদের উন্নত দেশের পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। উন্নত দেশগুলো যেভাবে তাদের পরীক্ষাব্যবস্থা ডিজিটাল করেছে, আমাদেরও সে রকম উন্নত ব্যবস্থায় যেতে হবে। প্রায় প্রতিদিন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর প্রকাশ হচ্ছে। এই অবস্থায় আমি হতাশ ও উদ্বিগ্ন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
শিক্ষাবিদ ও সভাপতি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র

এলএনজি এপ্রিলে by একরামুল হক

কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনাল থেকে ২৫ এপ্রিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ শুরু হবে। প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মূল গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ জন্য মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কাতার থেকে জাহাজে করে এলএনজি গ্যাস আমদানি করে তা মহেশখালীর টার্মিনাল দিয়ে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হবে। দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে, বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলতি বছর থেকে গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। বর্তমান ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায়ও এই প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তখন তিনি বলেছিলেন, গ্যাস দেওয়ার আগে এলএনজি আমদানি করা হবে এবং তা রাখার জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণ করা হবে একটি টার্মিনাল। বাজেটে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটিকে দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য বলে বা ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় সরকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের তিন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহেশখালীতে টার্মিনাল নির্মাণ এবং সেখান থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিটি গেট স্টেশন এবং আনোয়ারা থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের আরও ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ। এসব ভৌত কাঠামোর কাজ আগামী এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে ওই কর্মকর্তারা জানান। প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলীকরণ (রেফ্রিজারেশন) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তা তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকেই বলা হয় এলএনজি। একটি জাহাজে করে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মিলিয়ন বা ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আনা সম্ভব। দেশে গ্যাসের মজুত কমে আসায় বিকল্প হিসেবে কাতার থেকে গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে মূল গ্রিডে দেওয়া হবে।
এতে শিল্পকারখানায় গ্যাস–সংকট কমবে। ভবিষ্যতে সরকার আরও ১ হাজার মিলিয়ন বা ১০০ কোটি ঘনমিটার এলএনজি সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জানতে চাইলে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, মহেশখালীতে টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপনের কাজ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হচ্ছে। এর পরপরই এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির একজন জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে জানান, আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে এলএনজি সরবরাহ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দিনক্ষণ কিছুটা পেছানোর সম্ভাবনা আছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। জানা গেছে, দেশে বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৬৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। এরপরও শিল্পকারখানায় গ্যাস–সংকট রয়েছে। বর্তমানে শিল্পকারখানায় প্রতি ঘনমিটার (৩৫ দশমিক ৩১৪৭ ঘনফুট) গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা দরে। এলএনজি আমদানি-পরবর্তী প্রতি ঘনমিটারের প্রস্তাবিত মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। এতে শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা দেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে এলএনজির দাম সমন্বয় করার দাবি জানিয়েছেন।চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, এলএনজি সরবরাহের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। এতে শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট কমে আসবে। তবে সারা দেশে একই মূল্যে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। নইলে শিল্প-কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় টিকবে না। এদিকে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের একজন ব্যবস্থাপক জানান, এলএনজি সরবরাহের সিদ্ধান্তের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২৬৫টি শিল্পকারখানাকে চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের সরকারি সেবায় মাশুল


রাষ্ট্রমালিকানাধীন আট ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বাড়ছেই। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে গত ডিসেম্বরে এই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ও চিন্তিত। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারকে প্রতিবছরই বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হয়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও রাখা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা, যা এখন বিতরণের অপেক্ষায়। ব্যাংকের গুরুতর প্রয়োজন বুঝে বাজেটের মাধ্যমে দেওয়া হবে জনগণের টাকা। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে জাতীয় বাজেটে টাকা রাখার চর্চাটি শুরু হয় ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে। ব্যাংক খাতে বড় কেলেঙ্কারিগুলোও শুরু হয় ওই বছর থেকেই। সমাধানের পথ বের করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গতকাল বুধবার সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়ে সচিবালয়ে বৈঠক করেছে। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এক সোনালী ব্যাংকের কারণেই রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট মূলধন ঘাটতি অল্প সময়ের ব্যবধানে এত বেড়েছে। এই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি যেখানে গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, সেখানে তা বেড়ে ডিসেম্বরে হয়েছে ৬ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলোর জন্য যত টাকা বাজেটে রাখা হচ্ছে, সে তুলনায় মূলধন ঘাটতি পূরণের চাহিদা ১০ গুণ বেশি। এভাবে দেশের গরিব মানুষের করের টাকায় মূলধন ঘাটতি মেটানো হয় বলে সমালোচনাও রয়েছে। তবে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য বাজেটে টাকা বরাদ্দ না-ও রাখা হতে পারে। বদলে বিকল্প পথ খুঁজছে সরকার। সেটি হচ্ছে ব্যাংকগুলো বর্তমানে সরকারের যেসব সেবা বিনা মূল্যে দিয়ে থাকে, তা আর বিনা মূল্যে দেবে না। বৈঠক শেষে ইউনুসুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ‘বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংক কোনো সেবাই বিনা মূল্যে দেয় না। আর রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো বিনা মূল্যে অন্তত ২৭ ধরনের সেবা দেয়। তাই বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেবার বদলে ব্যাংকের মাশুল নেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক মত এসেছে।’এর আগে মূলধন ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মিলে চারটি উপায় বের করেছিল। এগুলো হচ্ছে সরাসরি নগদ মূলধন সরবরাহ, বন্ড প্রচলন, বোনাস শেয়ার ছাড়া এবং খেলাপি ঋণ কমানো।
এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে অবশ্য গতকালের বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। এদিকে হতদরিদ্র ও পেনশনভোগীদের সামান্য ভাতা দেওয়ার বিনিময়ে মাশুল নেওয়ার উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য নয় বলে জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর বরাদ্দ এমনিতেই প্রতিবছর কমছে। তার ওপর গরিবদের থেকে মাশুল নেওয়ার চিন্তা হবে ভুল উদ্যোগ, বরং ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে মনোযোগী হওয়া উচিত।’মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন,‘সব তালগোলে লাগছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো নিজেরাই মূলধন ঘাটতিতে আছে। তাদের দিয়ে আবার বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।’ অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মূলধন ঘাটতি পূরণে প্রথম ২০১১-২০১২ অর্থবছরে রাখা হয় ৩৪১ কোটি টাকা। পরের ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা রাখা হলেও ওই অর্থবছরে শেষ পর্যন্ত দেওয়া হয় ৫৪১ কোটি টাকা। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪২০ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার ওইবার খরচ করে প্রায় ১২ গুণ বেশি, পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত খরচ হয় ৫ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। তবে ওই অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা করা হয়। ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছর দেওয়া হয় ২ হাজার কোটি টাকা করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পর্যালোচনা করে দেখেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির অন্যতম কারণ বহুল আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। এ কারণে সরকার ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সোনালী ব্যাংককে ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা দিয়েছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারির ক্ষতি মেটাতে জনতা ব্যাংকও টাকা পেয়েছে। আর বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর এই ব্যাংককে সরকার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা দিয়েছে।বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি), ৭ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস-উল-ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, তাঁর ব্যাংকে কোনো মূলধন ঘাটতি নেই। আর সেবা মাশুলের বিষয়টি একান্তই সরকারের সিদ্ধান্ত।

রাশিয়া-চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি ট্রাম্পের! by মাহফুজার রহমান

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় তিন দশক এই ভূমিকায় থাকা দেশটি গত কয়েক বছরে যেন কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া ও শি চিন পিংয়ের চীন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটনের। আর এটা ভালোই টের পাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই কিনা ট্রাম্প প্রশাসন রাখঢাক না রেখেই নিজেদের অবস্থানের কথা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ওয়াশিংটন বলছে, এখন আর সন্ত্রাসবাদ নয়, একক পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান ধরে রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। এ জন্য রাশিয়া-চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে হবে। শুধু জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে লক্ষ্য বদলানোই নয়, অস্ত্র আধুনিকায়নের প্রতিও জোর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী মনে করে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রগুলো ‘সেকেলে’। এগুলো আকারেও বড়। তাই ছোট বোমার আকারে তৈরি করে পারমাণবিক অস্ত্র আরও আধুনিক করতে হবে। গত কয়েক বছরে পুতিনের রাশিয়ার কাছে বেশ কয়েক জায়গায় মার খেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারাভিযানে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে ওয়াশিংটনে এখনো তুলকালাম চলছে। সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিদ্রোহীদের পক্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে সরকারের পক্ষে অভিযানে অংশ নিয়ে ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে রাশিয়া। তারও আগে রাশিয়া ইউক্রেনকে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত করার সময় এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু ঠেকাতে পারেনি। এদিকে শি চিন পিংয়ের নেতৃত্বে সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তো বটেই সামরিক দিক থেকে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে দেশটি। শুধু দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বারবার হুঁশিয়ারি ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ-যুদ্ধবিমানের টহল সত্ত্বেও সেখানে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে চীন। ওই জলসীমায় যে কোনো মূল্যে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে মরিয়া বেইজিং। মার্কিন নতুন নিরাপত্তা কৌশল প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস বলেন, নতুন নিরাপত্তা কৌশলে নানা ইস্যুর কথা বলা আছে। আফগানিস্তানে অভিযানের প্রসঙ্গ যেমন আছে, তেমনি উত্তর কোরিয়ার মতো ‘দুর্বৃত্ত’ দেশগুলোর বিরুদ্ধে করণীয় সম্পর্কে বলা আছে। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যেন বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিজের সেরা অবস্থান ধরে রাখতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান তাঁর পূর্বসূরিদের নিরাপত্তা কৌশলের মূল লক্ষ্য থেকে ভিন্ন। নাইন-ইলেভেনে নিউইয়র্কে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সন্ত্রাসবাদ দমন। সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানের নামেই আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যার ঘানি এখনো টানছে দেশ দুটির জনগণ তথা সারা বিশ্বের মানুষ।
জন্ম নিয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো অনেক জঙ্গি সংগঠন। নানা ধরনের হামলা চলছে বিভিন্ন দেশে। এ প্রসঙ্গে ম্যাটিসের ভাষ্য, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলবে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ফোকাস আর সন্ত্রাসবাদ নয়। পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এটাই এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে সঠিক কৌশল। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা-ও রাশিয়াকে মাথায় রেখেই। মার্কিন সামরিক বাহিনী মনে করে, রাশিয়া ইতিমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের দিকে অনেক দূর এগিয়েছে। সেই তুলনায় ওয়াশিংটন পিছিয়ে রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নে প্রস্তাবের নথিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের কৌশলের মাধ্যমে রাশিয়াকে বুঝিয়ে দিতে হবে, যে কোনা মাত্রায় পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’ ২০১০ সালের পর এই প্রথম মার্কিন বাহিনী পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হলো। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিচ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র মজুতের দিক থেকে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাশিয়া। দেশটির অস্ত্র ভান্ডারে রয়েছে সাত হাজার পারমাণবিক অস্ত্র। এর পরের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের আছে ৬ হাজার ৮০০ পারমাণবিক অস্ত্র। তার পরে রয়েছে ফ্রান্স (৩০০), চীন (২৭০), যুক্তরাজ্য (২১৫), পাকিস্তান (১৪০) ও ভারতের (১৩০) অবস্থান। এর বাইরে ইসরায়েলের ৮০টি ও উত্তর কোরিয়ার ২০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পারমাণবিক অস্ত্রের এই হিসাব ও ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর তিন দেশ মুখোমুখি হচ্ছে! আর স্বাভাবিকভাবে এই তিন দেশের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেবে অন্যান্য দেশগুলো। তার মানে ট্রাম্প প্রশাসন কী নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে?
মাহফুজার রহমান: সাংবাদিক
mahfuzsarker@prothom-alo.info

চড়ুইগুলো সব কোথায় গেল? by মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী

মুঠোফোনের পর্দায় জীবন এখন বন্দী। প্রকৃতি ও পাখির সঙ্গে বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। শিশুরা পাখি দেখে স্ক্রিনে। আর স্ক্রিনের বাইরে প্রাণহীন পুতুল, মনোগ্রামের ছবি, খেলনা পাখি তাদের সঙ্গী। অথচ একসময় চোখ ফেরালেই আমাদের চারপাশে শুধু চড়ুই আর চড়ুই। তাদের ফুড়ুত ফুড়ুত আসা-যাওয়া দেখেই কেটে যেত কত শিশু-কিশোরবেলা। দল বেঁধে আসা, খুঁটে খুঁটে খাওয়া, ঠোঁট ডুবিয়ে পানি পান, হঠাৎ উড়াল, হঠাৎ আড়াল—এত মায়াবী, এত আদুরে পাখি! সারা দিনে একটি চড়ুই পাখি মাত্র পাঁচ থেকে সাত গ্রাম খাবার খায়। কত খাবার আমাদের নষ্ট হয়, বিদেশি কুকুর পুষে কত অর্থের অপচয় হয়, আবর্জনায় কত খাবার ফেলে দেওয়া হয়। সুবোধ চড়ুই পাখি আমাদের জীবন বিঘ্নিত করে না, কাকের মতো ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে যায় না। ইঁদুরের মতো গর্ত করে খাবার মজুত করে না। কিন্তু নগরায়ণের দিগন্ত যতই প্রসারিত হচ্ছে, ততই বিলুপ্ত হচ্ছে চড়ুই পাখিদের জলাধার, খাবার, ঝোপঝাড়। ১৯৮৯ সালে ঢাকার বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালে ২৪ থেকে ৩০ ডিগ্রি এবং ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ ডিগ্রি। রাত-দিন হাইড্রোলিক হর্নের অসহনীয় শব্দদূষণে চড়ুই আজ সংকটাপন্ন। শব্দদূষণের মাত্রা এখন ঢাকা মহানগরীতে ১৩১ ডেসিবেল পৌঁছেছে। কংক্রিটের এ নগরীতে চড়ুই পাখিরা আজ ছিন্নমূল। নগরায়ণ, ধোঁয়া ও ধুলার আস্তরণ এবং অগণিত এসির আগ্রাসনে চড়ুই পাখি জীবনযুদ্ধকে আরও কঠোর করে তুলেছে। উঠান নেই, বাগান নেই; তবু নগরের ভবনগুলোর কার্নিশ, ছাদ, বারান্দা ও চিলেকোঠায় নিজেদের আবাস গাড়তে সচেষ্ট ওরা। মাত্র পাঁচ–ছয় বছর আয়ুষ্কালের এ পাখি মানুষের আড়াল হতে চায় না, শত সংকটেও এ নগরী তাদের প্রাণপ্রিয় চারণভূমি। তারাও এখন শীতার্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত। নির্বিচারে চড়ুই পাখি হত্যার পরিণামে ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শাস্তি ভোগ করেছিল, তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চীন। চড়ুই ফসলের ক্ষতি করে,
এ ভ্রান্ত ধারণায় ৫০-এর দশকে মাও সে তুংয়ের নির্দেশে লাখ লাখ চড়ুই নিধন করা হয়। কিন্তু চার–পাঁচ বছরের মাথায় চড়ুইয়ের অভাবে শস্যক্ষেত্রে পোকামাকড়ের বিধ্বংসী আক্রমণে খাদ্যসংকটের কবলে পড়ে চীন। দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ। এরপর আবার শুরু হয় চড়ুই রক্ষার আন্দোলন। একসময়ের সবুজ আঙিনা, মাধবীলতার ঝাড়, ফুলের বাগানে সমৃদ্ধ ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে এ নগরী থেকে। স্থান পাচ্ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা। ভূস্থাপত্যিক এ বিবর্তনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চড়ুইদের বংশবৃদ্ধি ও টিকে থাকা। মেঘের গর্জনে, মুষলধারে বৃষ্টিতে, কালবৈশাখীর ঝড়ে এরা দলে দলে আশ্রয় নেয় বাসাবাড়ির বারান্দায়, চিপেচাপায়। এ নগরীর হিমশীতলতা, তপ্ত হাওয়া, মশার যন্ত্রণা, তথাপি জীবন-জীবিকার সন্ধানে পেতে চায় মানুষের উষ্ণতা। যত নিঃসীম আকাশ থাকুক, যত অনন্তে ওড়ার ডানা থাকুক, বারবার ফিরে আসে মানুষের কোলাহলে। কীটপতঙ্গ এবং মাছি সাবাড় করে পরিবেশের রক্ষাকবচ হিসেবে অবদান রাখছে এরা। চড়ুই পাখিদের বাঁচতে দিন। তরুণ প্রজন্মের প্রতি অনুরোধ, পড়া আর বিনোদনের ফাঁকে প্রতিদিন দুবেলা ছাদে বা বারান্দায় চড়ুইদের জন্য সামান্য খাবার ছিটিয়ে দাও। দেখবে, তাদের কত আনন্দ, আহ্লাদ। প্রিয় গৃহিণীরা, সাংসারিক ব্যস্ততার মাঝে মিটিয়ে দিন চড়ুইদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা। এ মহৎ কাজে সন্তানদের অনুপ্রাণিত করুন। বিশাল এ প্রকৃতির রাজ্যে জীবনটা পারস্পরিক, সামষ্টিক। কোনো জীবনই ক্ষুদ্র নয়, কোনো প্রাণীই সামান্য নয়। শুধু জৈব প্রবৃত্তি পূরণের জন্য মানুষের জীবন নয়। আমাদের প্রতিটি ঘরবাড়ি যেন হয় চড়ুই পাখির জন্য পরম মমতায় ভরা ভুবন, নির্ভয় আবাসন। আসুন, কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশননির্ভর যান্ত্রিক বিনোদনের আসক্তি কমিয়ে গড়ে তুলি চড়ুই পাখির সঙ্গে মিতালি। শ্রমনিষ্ঠ এ পাখি সারা দিন নগরজুড়ে খুঁজে বেড়ায় আহার। মানুষের একটু খাবার, একটু আদরে এদের অনাবিল প্রশান্তি। ঘরের বারান্দায়, জানালায় ছোট পাত্রে সামান্য চাল, ভাত, পানি রাখলে চড়ুইদের ভীষণ তুষ্টি। নিয়মিত খাবার পেলে এরা কাছে আসবেই, এটা পরীক্ষিত।
মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী: মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন

অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিপাকে by বদিউল আলম মজুমদার

জর্জ সান্তায়ানার একটি বহুল উচ্চারিত উক্তি—যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তাদেরকে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মাশুল গুনতে হয়। মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর বহু দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। এর মূল কারণ, স্টিভ এরিকসনের মতে, ইতিহাসের অন্যতম শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে মানুষ সাধারণত শিক্ষা নেয় না, এর পরিণতি যত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং মূল্য যত উচ্চই হোক। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসেও এর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। এর একটি জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার-সম্পর্কিত মতবিরোধকে কেন্দ্র করে আমাদের প্রধান দুটি দল-আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অব্যাহত ডিগবাজির অবস্থান। এটা অনেকেরই মনে থাকার কথা যে নব্বইয়ের দশকে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি প্রবল গণ-আন্দোলন পরিচালিত হয়, যে আন্দোলনে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীও যুক্ত ছিল। রাজপথের সেই আন্দোলনের সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার অনমনীয় অবস্থান ছিল: পরবর্তী নির্বাচন বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোতেই হবে, যে কাঠামোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিধান নেই। মূলত নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আমাদের প্রধান দুটি দলের মধ্যে সৃষ্ট এ বিরোধ কমনওয়েলথের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিনিধি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টিফেনও মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিরসন করতে পারেননি। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ আবার ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ২০০৪ সালের পর, যখন বিএনপি-জামায়াত সরকার সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে তাদের পছন্দের বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্যোগ নেয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবিধানের এমন পরিবর্তন আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোটের শরিকেরা মেনে নেয়নি; বরং রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে তারা তা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। সেই আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল আবারও সাংবিধানিক বিধানের প্রতি অনমনীয়তা। এরপর বিচারপতি হাসান, যিনি একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেন এবং ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানে নির্ধারিত পদক্ষেপগুলো উপেক্ষা করে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট পরিচালিত রাজপথের আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়।
তখনো খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থান ছিল-সংবিধান অনুযায়ী পূর্বঘোষিত সংসদ নির্বাচন ২২ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখেই অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট একইভাবে সংসদে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও উচ্চ আদালতের একটি সংক্ষিপ্ত ও বিভক্ত আদেশকে কাজে লাগিয়ে, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে, যে সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই বাতিল করা হয়। প্রসঙ্গত, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কোনোভাবেই ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’ (অনুচ্ছেদ ৭) ছিল না। এরপর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল-সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে এবং তা থেকে তিনি একচুলও নড়বেন না। এটি সুস্পষ্ট যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আমাদের প্রধান দুটি দলের মধ্যে একটি প্রবল মতবিরোধ দীর্ঘদিন থেকে বিরাজমান, যা নির্বাচনের সময় বারবারই একটি চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতির একটি উদ্ভট দিক হলো যে দল দুটির অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, তারা ক্ষমতায় আছে কি নেই, তার ওপর। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা সংবিধানের বাইরে কিছুই ভাবতে সম্পূর্ণ নারাজ ছিল, কিন্তু বিরোধী দলে থাকার সময় তাদের অবস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবল সমর্থক হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের আচরণও ছিল বস্তুত একই রকমের। এ ছাড়া ‘মেজরেটারিয়ানিজম’-যাকে জেমস মেডিসন ‘টিরানি অব দ্য মেজরিটি’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন-ব্যবহার করে উভয় দলই নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধার জন্য অন্যায্যভাবে সংবিধান সংশোধন করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। অর্থাৎ উভয় দলই ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তির অনুঘটক। অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রবল স্বার্থসংশ্লিষ্ট মতবিরোধ এবং তা থেকে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার পরিণতি মোটেই মঙ্গলকর ছিল না। বিএনপির সংবিধান নিয়ে অনমনীয়তার কারণে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একটি একতরফা, বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শুধু তা-ই নয়, তাদেরকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান সংবিধানে যুক্ত করে ১১ দিনের মধ্যে ষষ্ঠ সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হয়। এরপর নবম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ২০০৬-০৭ সালেও অনেক অপ্রত্যাশিত ও বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল এক-এগারোর মাধ্যমে ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে ঘটিত পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি, ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ, দুই নেত্রীসহ অনেককে জেলে প্রেরণ, সর্বোপরি ২২ জানুয়ারি ২০০৭-এ অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধের কারণে আমাদের সর্বশেষ অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক নয়, যা প্রতিভাত হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আবারও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ১৫৩ জন দশম সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হন এবং নির্বাচনের আগে ও পরে ব্যাপক সহিংসতার সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। এটি সুস্পষ্ট যে নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে অব্যাহত ও নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত মতবিরোধের কারণে নির্বাচনের সময়ে যে অস্থিতিশীলতা এবং অনেক ক্ষেত্রে যে সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিণতি ছিল অস্বাভাবিকতা। বস্তুত আমরা দেখছি যে বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, কারণ আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করিনি। আমাদের সামনে আরেকটি নির্বাচন আসন্ন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার জোটের শরিকদের পক্ষ থেকে বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধানের আলোকেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড় অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। সংবিধানকেই এ ক্ষেত্রে একমাত্র যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। আমরা লক্ষ করছি, সংবিধানের প্রতি অনেকের অন্ধত্ব অযৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বিএনপি ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের দাবি না তুললেও অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনকালীন বা এ ধরনের সহায়ক সরকারের দাবিতে এখনো অনড় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াতে পারে তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনীতিতে একধরনের অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বর্তমান পরিস্থিতি এবং অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে আগামী নির্বাচন নিয়ে খুব আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। বরং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা আমলে নিলে সামনে একটি অনিশ্চিত ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির আশঙ্কাই জোরালো হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের দণ্ডপ্রাপ্তির ফলে তিনি আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি পারবেন না, সেই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। বস্তুত আগামী নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে বিরাজমান অনিশ্চয়তার মধ্যে খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে আগামী নির্বাচনটিকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করার কোনো বিকল্প নেই। সামনে আরেকটি একতরফা ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্রের জন্য বিপর্যয়কর হবে। এ ধরনের বিপর্যয় এড়ানোর পথ হচ্ছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছা। গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতায় থাকা বা রদবদলের পথ রুদ্ধ হলে যে অশান্তির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

মিয়ানমারের গণহত্যাকে হোয়াইটওয়াশ by রামজি বারুদ

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, তা মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। কিন্তু মিডিয়ার বৃহত্তর পরিসরে বিষয়টি আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো অর্থপূর্ণ পথে বা স্বেচ্ছায় যে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত, তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, দেশ থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্ত শিবিরগুলোতে আটকা পড়ে আছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়ারা রোহিঙ্গাদের ওপর যে ব্যাপক বর্বরতা চালিয়েছে, পদস্থ জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তারা তাকে এখন ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু এই গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো পরিকল্পনা এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ২০১৭ সালের আগস্টের শুরু থেকে ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই বছর সময়সীমার মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। একই সময়ে ছয় লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে অথবা তাদের সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মূল অভিযানকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নাম দিয়েছে- ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস।’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে মেডিসিন সানস ফ্রন্টিয়ারস জানায়, গণহত্যা অভিযানের প্রথম মাসেই বহু রোহিঙ্গা মুসলিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট ও ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৭৩০টি শিশুও রয়েছে। রিফিউজি ইন্টারন্যাশনালের এরিক শোয়ার্টজ আমেরিকান ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর (এনপিআর) সাথে এক সাক্ষাৎকারে ‘এসব ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জোরপূর্বক ভিটেমাটি ছাড়ানো একটি বৃহত্তম অপরাধ।’ ব্যাপক গণধর্ষণ, সরাসরি হত্যা, রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর ব্যাপকভাবে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া এবং অবর্ণনীয় নৃশংসতা ও বর্বরতার মুখে সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীনভাবে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো গ্যারান্টি দেয়া হয়নি। মিয়ানমারে তাদের কোনো আইনগত মর্যাদা দেয়া হয়নি। তাই তাদের ফিরে যাওয়াটা পালিয়ে আসার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ।তাদের কোনো প্রোটেকশন বা মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই উদ্বাস্তুদের ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে মিয়ানমার সরকারের অপরাধের ‘হোয়াইটওয়াশ’ বা অপরাধ দেবে রাখার ব্যাপারে একটি বৃহত্তর প্রচারণার অংশ।
এটা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা বিধান বা তাদের সুরক্ষা দেয়ার বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের ভিন্নমতেরই পুনরাবৃত্তি। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকার কয়েক দশক ধরে বর্বরতা ও নৃশংসতা চালিয়ে আসছে। ২০১২ সালে তারা নতুন করে জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু করে। ওই সময় এক লাখ রোহিঙ্গাকে নিজেদের গ্রাম এবং শহরগুলো থেকে জোরপূর্বক বের করে দিয়ে কারাগারের মতো কথিত অস্থায়ী উদ্বাস্তুশিবিরে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়। এরপর ২০১৩ সালে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করা হলো। গত বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত মিয়ানমার সরকারের এ নৃশংসতা অব্যাহত ছিল। এরপর সরকারের সব নিরাপত্তা শাখা জাতিগত নির্মূল অভিযানে সম্পৃক্ত হয়ে গণহত্যায় মেতে ওঠে। সু চি এবং তার দেশের সামরিক বাহিনীকে অবশ্যই জরুরিভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) সোপর্দ করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর জন্য সরাসরি দায়ী করে তাদের আটক করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো এই সহিংসতা ও বর্বরতার প্রতি অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের কর্মকর্তারা নির্লজ্জ সমর্থন জানিয়েছেন। সু চিকে কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা মিডিয়া এবং সরকারগুলো গণতন্ত্রের আইকন ও মানবাধিকার হিরোইন হিসেবে স্বাগত জানিয়ে আসছিল। যা হোক, সু চি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে ২০১৫ সালে মিয়ানমারের নেত্রী হয়ে ওঠার সাথে সাথে তিনি তার সাবেক সামরিক শত্রুদের রক্ষা করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সহিংসতার নিন্দা করতেও অস্বীকৃতি জানান। তিনি এমনকি ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ‘রোহিঙ্গা’ নাম ব্যবহার করতেও অস্বীকৃতি জানালেন। সু চি সামরিক বাহিনীর অব্যাহত নির্যাতন ও সহিংসতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। এখনো বিশ্বব্যাপী তার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার ন্যায়বিচারের নৈতিক চেতনার আবেদনের প্রতি খুব বেশি জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারে সরকার ও সামরিক বাহিনীর অপরাধের বিরোধিতা করার জন্য কোনো নীতি বা কৌশল প্রণয়ন করা হয়নি। ‘আসিয়ান’ নেতারা অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেউ এ ধরনের কোনো নীতি বা কৌশল প্রণয়ন করেননি। এর পরিবর্তে জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত অপর একটি উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য দায়সারা গোছের ‘আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ড’ গঠন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, উপদেষ্টা বোর্ড কিছুই প্রমাণ করবে না; বরং তারা সামরিক বাহিনীর অপরাধকে হোয়াইটওয়াশ বা অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মার্কিন মন্ত্রিসভার সাবেক মন্ত্রী ও পদস্থ কূটনীতিক বিল রিচার্ডসন যিনি সম্প্রতি বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছেন- তিনিই বাস্তবে এ মূল্যায়ন করেছেন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমার পদত্যাগ করার প্রধান কারণ হচ্ছে- উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা একটা হোয়াইটওয়াশ মাত্র। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘সরকারের জন্য একটি আনন্দদায়ক স্কোয়াডের’ অংশ হতে চাই না। রিচার্ডসন ‘নৈতিক নেতৃত্বের ঘাটতি বা দুর্বলতার জন্য সু চিকে দায়ী করেছেন। সু চিকে তার নৈতিক ব্যর্থতার জন্য অবশ্যই জওয়াবদিহি করতে বাধ্য করা উচিত। সু চির নেতৃত্বের অবস্থান বা মর্যাদা বিবেচনা করে অবশ্যই তার পদস্থ নিরাপত্তা ও সেনাপ্রধানের সাথে একত্রে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তাকে সরাসরি দায়ী করা উচিত। মানবাধিকার গ্রুপের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন জাতিসঙ্ঘ মিয়ানমারকে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে পেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি। কারণ, মিয়ানমার রোমের সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইনে স্বাক্ষরকারী নয়। তাই এ ধরনের রেফারেন্স পেশ করা হচ্ছে রাষ্ট্রটিকে আইসিসির কাছে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। এ পদক্ষেপ আইনগতভাবে সমর্থনযোগ্য ও জরুরি। কারণ, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিষ্ঠুর নির্যাতন ও সহিংসতা চালিয়েছে, সেজন্য অনুতপ্ত নয়। রবার্টসন ‘টার্গেট করা অবরোধ’ আরোপের আহ্বান চালিয়েছেন। এ অবরোধের ফলে দেশের ধনী ও ক্ষমতাশালী এলিটদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে এবং এতে করে সামরিক বাহিনী ও সরকারের ওপর তারা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সহায়তায় মিয়ানমার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে তাদের অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেয়ার অনুমতি পেয়েছে। মিয়ানমারে ইতোমধ্যেই শত শত কোটি ডলারের সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ২০১৮ সালে দেশটিতে ছয় শত কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এশিয়ায়, পশ্চিমা বিশ্বে এবং বিশ্বের অবশিষ্ট অনেক দেশের পক্ষ থেকে এটাকে নৈতিক ব্যর্থতার একটি বড় নজির হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের গোটা সম্প্রদায়কে যেখানে হত্যাযজ্ঞ ও বর্বর নির্যাতন চালিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত করা হয়েছে- যেখানে মিয়ানমারকে অবশ্যই পুরস্কৃত করা উচিত নয়। মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ এবং সু চিসহ মিয়ানমারের নেতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া এবং তাদের আইসিসির কাছে পেশ করা না গেলে রোহিঙ্গা গণহত্যা কিছুতেই বন্ধ করা যাবে না- এই গণহত্যা অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক ও গ্রন্থকার। ফিলিস্তিন ক্রনিকলের সম্পাদক। ফিলিস্তিন বিষয়ের ওপর ডক্টরেট।
আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

রাজনীতি এবার খুব ভোগায়নি by জসিম উদ্দিন

বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা ছিল। রাস্তায় ব্যক্তিগত পরিবহন ছিল না। গণপরিবহনও সংখ্যায় ছিল হাতেগোনা। আর রাস্তায় বের হননি সাধারণ মানুষ। জরুরি কাজ ছাড়া মানুষ ঘরেই ছিল। মানুষের ধারণা ছিল, বড় ধরনের প্রতিবাদ বিক্ষোভ হবে। তাতে পুলিশি অ্যাকশনে রক্তপাতের ঘটনা ঘটবে। প্রতিটি প্রতিবাদ বিক্ষোভের ঘটনায় পুলিশ যেভাবে কড়া অ্যাকশন দেখিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে আন্দোলনের উল্টো ফল হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর বিরোধীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর এক মহাসুযোগ সৃষ্টি হয়। সেটাকে সরকার কাজে লাগিয়েছে বিরোধীদের উচ্ছেদ করতে। পুলিশ কাজে লাগিয়েছে গণহারে তাদের বাণিজ্য বাড়িয়ে নিতে। সম্ভাবত এবার বিরোধীরা অনেক বেশি সাবধান ছিল। কয়েক কোটি টাকার মামলায় তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। এই মামলার রায় এমন এক সময় হলো; যখন দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অনেক ঘটনা রয়েছে। ওইসব লুটপাটের কিছু ঘটনার বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বটে; সেটি অত্যন্ত ধীরগতির। সেখানে সুবিচারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাসহ আরো ডজন ডজন মামলা বিদ্যুৎ গতিতে বিচারপ্রক্রিয়ায় খালেদার জিয়ার বিরুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছে। এই গতি দেখে এটাই মনে হতে পারে, একটি নির্দিষ্ট সময়কে টার্গেট করে এগুলো গতি পেয়েছে। সেই হিসেবে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বড় ফলাফল বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভ হিংসাত্মক রূপ লাভ করার কথা ছিল। সেটা না হওয়ায় অনেকে আশ্চর্যজনকভাবে হতাশ হয়েছেন। সরকারও বিস্মিত হয়েছে। ধরপাকড় ও দলনের কাক্সিক্ষত পথে সেভাবে অগ্রসর হওয়া যায়নি। তবে প্রতিবাদ বিক্ষোভ কিছু হয়েছে। সেটা ছিল সতর্ক ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ। প্রতিবাদকারীদের হাতে বোমা ছিল না। রিভলবার, পিস্তল ও বন্দুক ছিল না।
তাদের আচরণ মারমুখী ছিল না। এর বিপরীতে সরকারি দলের সমর্থক ও পুলিশের যথাযথ প্রস্তুতি ছিল। অনেক জায়গায় লাঠিসোটা হাতে সরকারি সমর্থকদের দেখা গেছে। পিস্তল-রিভলবার নিয়ে তারা প্রকাশ্যে নেমেছে। রায় নিয়ে আনন্দ মিছিল করেছে তারা। নিজেরা মিষ্টি খেয়েছে, বিতরণও করেছে। বিরোধীদের ওপর চড়াও হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে মিষ্টি খেতে দেখেছে। লাশের কোনো অপরাধ থাকে না। সেই লাশের ওপর ঘৃণা প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। সমাজে এ ধরনের পতন বাড়াবাড়ি, হিংসা ও উসকানির নজির হয়ে রয়ে গেল বাংলাদেশের ইতিহাসে। এবার বিরোধীরা এমন কোনো বিক্ষোভ করেনি, যাতে করে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও জঙ্গিপনার আভিযোগ আনতে পারে। এর আগে বিরোধীদের প্রতিটি আন্দোলন সহিংসতা ও নাশকতার সাজানো অভিযোগ এনে দমিয়ে দিতে সরকার দারুণভাবে সফল হয়েছে। খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর খালি মাঠে আওয়ামী লীগ নিজেও হতাশ হয়ে গেছে। তাই অনেক জায়গায় নিজেরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে রক্তপাত ঘটিয়েছে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে খালি মাঠে পুলিশও তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। বিএনপির সম্ভাব্য বিক্ষোভ দমনে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের পাশাপাশি মাঠে নামে আওয়ামী লীগ। প্রতিপক্ষকে না পেয়ে পরে নিজেরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এর একপর্যায়ে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে পুলিশ এতে অংশ নেয়। বিএনপি ছাড়াই ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়ে যায়। এর মধ্যে গুলি খেয়ে প্রাণ হারান যুবলীগের এক কর্মী।মামলার রায় উপলক্ষে সিলেটে চলেছে অস্ত্র প্রদর্শনী। সেখানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেন। রিভলবার, পিস্তলÑ এগুলো মামুলি অস্ত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। প্রকাশ্যে মিছিলের অগ্রভাগে থেকে রাজকীয় বন্দুকের প্রদর্শনীর ছবি মিডিয়ায় এসেছে। মাথায় হেলমেট পরা এই ‘রাজপুত্ররা’ দারুণ অ্যাকশন দেখিয়েছে। ওই সময় মাঠে বিএনপির নেতাকর্মীরাও ছিলেন। পুলিশ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে, এমনটি ঘটেনি। অস্ত্রধারী পুলিশ ও সরকারদলীয় অস্ত্রধারী নেতাকর্মী উভয়ের লক্ষ্য ছিল একটাই- তারা বিক্ষুব্ধ নিরস্ত্র বিরোধী নেতাকর্মীদের আক্রমণ করেছে। যদিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শন অবৈধ নয়। কিন্তু কাউকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ভয় দেখানো অবৈধ। ভয়ভীতি দেখানোর জন্য ফাঁকা গুলিও বর্ষণ করেছে। পুলিশ এ উপলক্ষে আগের মতো সাধারণ মানুষকে ভুগিয়েছে। বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ব্যাপকতা সেভাবে না থাকায় এই ভোগান্তির মাত্রাও ব্যাপক হতে পারেনি। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় বিএনপি বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করার পর পুলিশ রাস্তা ও ফুটপাথ থেকে এলোপাতাড়ি আটক করে। তাদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মচারীও ছিলেন। তিনি বারবার পরিচয়পত্র দেখিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য আকুতি করেন। সেই আকুতির দৃশ্য একটি দৈনিকে ১১ ফেব্রুয়ারি ছাপা হয়েছে। ছবিতে দেখা গেল তিনি সামনে ধরে আছেন তার পরিচয়পত্রটি। ছবিতে সেই পরিচয়পত্রে তার নামধাম স্পষ্ট দেখা গেছে। তার চোখেমুখে করুণ আকুতি। পাশে মেঝেতে রাইফেল দাঁড় করিয়ে বসে আছেন পুুলিশ সদস্য।
তার নির্লিপ্ত চাহনিটি কোনো ধরনের অপরাধের চিহ্নটিও নেই। অন্য একটি ঘটনায় পত্রিকা লিখেছে, শাহবাগ থানার বারান্দায় শুক্রবার সকালে বসেছিলেন ৭২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে তার স্ত্রীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে আটক করে পুলিশ। খবর পেয়ে দুপুর পর্যন্ত তিনিও থানায় রয়ে গেছেন। এই বৃদ্ধ ওই পত্রিকাকে বলেছে, তার স্ত্রীর বয়স ৬৭ বছর। খালেদা জিয়ার রায়ের পর ভাঙচুর হতে পারে, এমন আশঙ্কায় তিনি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের হননি। একটি সিএনজিতে করে চালককে সাথে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। সিএনজি থেকে নামার সাথে সাথে চালকসহ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। প্রায় ২৮ ঘণ্টা থানায় আটক থাকার পর দুপুরে জুমার নামাজের আগে আগে মুক্তি মেলে ওই বৃদ্ধ ও তার চালকের। পত্রিকাটি আরো লিখেছে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় শাহবাগ থানায় আটক ব্যক্তিদের প্রায় ৫০ জন স্বজনের জটলা দেখা যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে ওই বৃদ্ধের মতো আরো কিছু স্বজনকে পাওয়া যায়, যাদের ভাষ্য ছিল তাদের আটক স্বজনেরা নিরপরাধ। কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, কেউ অসুস্থ স্বজনকে দেখতে এসেছিলেন। কেউ জরুরি ব্যবসায়িক কাজে বেরিয়েছিলেন। তাদের কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। শুধু ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে আটক করে নিয়ে আসা হয়েছে। অন্য আরেকটি পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেল ফুটপাথে ফেরিওয়ালাদের পেটাচ্ছে সাদা পোশাকে পুলিশ। কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়া সাদা পোশাকে এভাবে সাধারণ নাগরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া বাংলাদেশ পুলিশের নির্লজ্জ কাজটি কখন শেষ হবে কেউ জানে না। বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এমনটি ঘটে থাকে। ওইসব ফুটপাথে চলাচল পুলিশ নিষিদ্ধ করেনি কিংবা ওই এলাকায় ফুটপাথে ফেরি করে নিয়মিত ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়নি। সাদা পোশাক পুলিশের জন্য একটি বাড়তি সুযোগ এনে দিয়েছে। এতে করে তাদের কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। যা খুশি তা করে সটকে পড়তে পারে। দেশে গুম-অপহরণের প্রায় সব ঘটনাই সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয়ে ঘটে থাকে। রাজনীতি হিংসাত্মক হওয়ার সুযোগ থাকার পরও কেন এমনটি হলো না। মানুষকে এ উপলক্ষে আবার বিপদে পড়তে হলো না। এটা দারুণ এক আলোচনার বিষয় হয়েছে। রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশে আর কখনো যদি কাউকে ভোগান্তিতে পড়তে না হতো, কতই না ভালো হতো! বিএনপি কি সে ধরনের একটি শুভ ও উন্নত সংস্কৃতির চর্চা শুরু করল। বরাবরের মতো এবারো মানুষ ধরে নিয়েছিলেন একটা বড় ধরনের রক্তপাত হবে। জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। পুলিশের উৎপাত হবে উপর্যুপরি। ভাবনার বিপরীত শান্তিপূর্ণ পরিস্তিতি হওয়ার জন্য ক্রেডিটটি কারা পেতে পারেন? বাংলাদেশের মিডিয়া আগে থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। সাধারণত তারা আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলোর পৃষ্ঠপোষক। আওয়ামী লীগকে সমালোচনা করার জায়গাগুলোকে বরং উল্টো পালিশ লাগিয়ে ধবধবে পরিষ্কার করে দেয়। অন্য দিকে অস্তিত্বহীন বামদের তারা প্রায় বাঘ-সিংহ বানিয়ে রাখে। এদেরই কিছু ব্যক্তিত্বকে তারা সব সময় বাড়তি প্রচারণা দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রাখে। সেই তুলনায় ইসলামি ঘরানার লোকেরা কোনোভাবেই মিডিয়ার দৃষ্টিতে বিবেচ্য হিসেবে স্থান পান না। তাদের খুঁত ধরার জন্য মিডিয়া তলোয়ার নিয়ে বসে থাকে। কখন তাদের দোষত্রুটি পাওয়া যাবে।
শান্তিপূর্ণ অহিংস বিক্ষোভ কর্মসূচির একটি ইতিবাচক ফল হয়েছে। এবার রাজনৈতিক নেতারা গ্রেফতার হয়েছেন। তারা সংখ্যায় হাজার হাজার গ্রেফতার হননি। নগদ মারধর ও নির্যাতনের শিকার সেভাবে তাদের হতে হয়নি। ক্রসফায়ার এনকাউন্টার এ উপলক্ষে দেখা যায়নি। তবে বিএনপি একজন কার্যকর নেতা ঢাকা মহানগর থেকে গুম হয়েছেন। গত কয়েক বছরে যে হারে গুম হয়েছেন, সে তুলনায় এটি নগণ্য। পুলিশ সাধারণ মানুষের ব্যাপারে কোনো ধরনের দায়দায়িত্ব অনুভব করে না। বিরোধী নেত্রীর মামলার রায় ঘোষণার ডামাডোলের মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, এক শিশুকে চাপা দিয়ে পুলিশ দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে সটকে পড়ে। রাজধানীর সায়েদাবাদে ৯ বছরের শিশুর ওপর যখন গাড়িটি চাপা দেয় অনেকে সেটা দেখেছে। তারা অবাক হয়েছে কেন শিশুটিকে তারা তাৎক্ষণিক উদ্ধার করল না। পরে শিশুটি প্রাণ হারায়। ওই শিশু রাস্তার পাশে সমবয়সী অন্যদের সাথে খেলছিল। আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা দূরের কথা, গাড়িটি দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা একপর্যায়ে গাড়িটিকে আটক করে। কিন্তু ওই গাড়িটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশ বলছে, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হচ্ছে না। তারা বলছে, কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। ছেলে তো চলেই গেছে। স্থানীয় দায়িত্বশীল পুলিশ বলছে, পরিবার কোনো অভিযোগ না করলে তারাও কোনো তদন্ত করবে না।ভুক্তভোগীরা কেন আইনের আশ্রয় নিতে চায় না, সেটা প্রায় সবার জানা। বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়ে একটি পরিবার মুষড়ে পড়ে। ওই পরিবারের জন্য তখন সান্ত্বনা দরকার হয়। বাংলাদেশের পুলিশ মানে মানুষের মনে একটি নেতিবাচক ধারণা থাকে। তাদের কাছে গেলে নির্দয় আচরণের শিকার হতে হয়। প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে নতুন করে আরো ভোগান্তি নেমে আসা স্বাভাবিক।শিশুটিকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি পুলিশের জন্য স্পর্শকাতর। অন্য দিকে শিশুটির বাবা ভীতসন্ত্রস্ত এ কারণে যে, তাকে পুলিশের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। তার ঢাল নেই তলোয়ার নেই। তিনি সরকারি দলের রাজনীতির সাথে জড়িত নন। নেই তার বেশি অর্থকড়ি। এ অবস্থায় যদি তার কাছে থাকা গাড়ির নাম্বার ধরে বিচারের পথে অগ্রসর হতে চান, প্রথমে হুমকি আসবে পুলিশের পক্ষ থেকে। এ হুমকির ওজন কতটুকু হতে পারে সাধারণ মানুষ তা জানে। পুলিশ যেভাবে এই মামলার তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতে তারা এই অপরাধের সাথে জড়িত না হলেও অভিযুক্ত হয়ে থাকবেন। ওই গাড়িটি যদি পুলিশের না হয়ে থাকে, এর চালক যদি পুলিশ না হয়ে থাকেন। তাহলেও তদন্ত না হলে পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষের মনে সন্দেহ বদ্ধমূল হবে। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের স্বার্থে এ দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যুর যথাযথ তদন্ত করা উচিত পুলিশের।
jjshim146@yahoo.com

আপস করার জায়গা নেই by মাসুদ মজুমদার

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ যে ঝড় বয়ে গেল এর স্থিতি কতক্ষণ তা কেউ জানেন না। এটা শুধু একজন নেত্রীর শাস্তি বা কারাবাস নয়, এর সাথে রাজনীতির অনেক গুণগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। কিছু গুণগত পরিবর্তনও হয়ে যেতে পারে। এমন হতে পারে, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে সরে যেতে পারে। বিএনপিকে এখন মামলার পাহাড় ডিঙাতে হবে। আন্দোলন ও আইনি লড়াই চালাতে হবে। রাজনীতির কৌশল নির্ধারণ করে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হবে। এই মোকাবেলা হবে অসম। কারণ, ক্ষমতা ও প্রশাসন এক পক্ষে অবস্থান নিয়েই আছে, এই অবস্থায় মাঠ সমতল পাওয়ার কোনো ভরসা নেই। একজন নেত্রীর কারাবাস অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, এর ইতিবাচক-নেতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই হবে। ঝড়ে অনেক গাছের ডাল ভাঙে। অনেক গাছ উপড়ে পড়ে যায়। অনেক নদী গতি পরিবর্তন করে। সব চেয়ে বড় প্রভাবটা পড়ে মানুষের মনোজগতের ওপর। মানুষ এমন কোনো ভাবনায় জড়িয়ে যায়- যা একসময় ভাবতে চায়নি। অনেক চিন্তা করে, যা গতানুগতিক অবস্থায় করা হতো না। যেমন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক ধরনের মেরুকরণ দেখা দেবে; যা গতানুগতিকভাবে হওয়ার কথা ছিল না। এমন মেরুকরণ হবে, যা গতানুগতিকভাবে হতো না। এমন সব ঘটনা ঘটবে, যা একসময় ঘটার কথা ছিল না। এখন ভবিষ্যদ্বাণী করে বলা সম্ভব নয়, বাস্তবে কেমন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি একটা সময় অতিক্রম করে সব সময় ধারা পাল্টায়, ডান বাম হয়ে যায়, বাম ডান হয়ে পড়ে। মধ্যপন্থী চরমপন্থী হয়ে পড়ে। এই নজির নতুন নয়।
আখেরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটনা ঘটবে, যা এখন ভাবা কঠিন ও দুঃসাধ্য। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা পাল্টে দিয়েছে। সেটা সাধারণের ভাবনার মধ্যে ছিল না। সাধারণ ভাবনায় ছিল- মুক্তিযুদ্ধ শেষে রাজনীতির শ্রেণিচরিত্র পাল্টে যাবে। অবশ্যই শ্রেণিচরিত্র পাল্টেছে; কিন্তু কারো তত্ত্ব অনুযায়ী হয়নি। কারো যোগবিয়োগ অনুযায়ী হয়নি। কারো ধারণাকে ধারণ করে হয়নি। যা কিছু হয়েছে জনগণের ভাবনার বাইরে হয়ে গেছে। জনগণ বাম ভাবনার প্রতি কখনো সংবেদনশীল ছিল না। এটা এই মাটির ধর্ম। এর সাথে ধর্মবিশ্বাস মানুষকে বাম হতে উৎসাহিত করে না। এর মূল কারণ, বাম রাজনীতি ধর্মকে প্রতিপক্ষে রেখে নিজেদের রাজনীতি করতে চেয়েছে। একসময় চরম বামপন্থীর উত্থান ঘটল। সেই বামপন্থী জাতীয়তাবাদী ধারাকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলো, জাতীয়তাবাদী ধারা খোলস পাল্টে, ধারা পরিবর্তন করে নতুন এক অবয়ব পেল; যা জনগণ চায়নি; কিন্তু মেনে নিতে হয়েছে। বামপন্থী রাজধানীর মড়ক লাগবে- এটা কি কেউ ভেবেছেন? রাজনীতিতে রাজনৈতিক ইসলাম জায়গা করে নেবে। তা-ও কি কারো ভাবনার ভেতর ছিল, নিশ্চয় ছিল না। এক-এগার রাজনীতি পঁচাত্তরের মতো তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আনেনি; কিন্তু রাজনীতির মাঠে দু’টি স্রোত প্রবাহিত হতে শুরু করল, সেই স্রোত কেউ পরিকল্পনা করে শুরু করল না। কিন্তু কোনো কোনো মানুষ যেন প্রাকৃতিক পরিকল্পনার মধ্যেই পড়ে গেল, দেশে দেদার দুর্নীতি চলছে। কেউ কথা বলছে না। নানা ধরনের কেলেঙ্কারি চলছে কেউ চিৎকার করে বলছে না- এসব থামাও, বন্ধ করো। যারা বলছেন, তারা এ সময়ে এসে মৃদুকণ্ঠ। ওই মামলা হচ্ছে- সবাই জানে এর রাজনৈতিক চরিত্র কী, কিন্তু যেভাবে চিৎকার করে বলা প্রয়োজন তা কি কেউ বলছেন- ঠিক বিচার আচার নিয়ে কেউ প্রাণ খুলে কথা বলেন না।
আইনি বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়ার দায়ও কারো নেই। সবাই এমন সব ভাষায় কথা বলছেন, যেমন এটাও হতে পারে- ওটাও হতে পারে। আইন কেন দ্বিধান্বিত ব্যাখ্যায় হবে। আইনের একক ব্যাখ্যা থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ধরনের কোনো স্বাভাবিকতা কোথাও লক্ষ করা যাবে না- না টক শো শোতে, না রাজনৈতিক বিতর্কে। এটাকে সুবিধাবাদ- আশ্রয়ী সময় বলা হবে কি না, জানি না। তবে যারা মামলা নিয়ে মাতম করেন, জেল জুলুম নিয়ে কান্না করেন- তারা রাজনীতির পোক্ত খেলোয়াড় নন, রাজনীতিতে এক পক্ষ কাঁদে, অন্য পক্ষ বগল বাজায়। তাহলে ঝড় যে অদৃশ্য একটি বিষয় জন্ম দিয়েছে সেটি ভীতি, ক্ষতি, লোভ। এই ভীতি নিজের অস্তিত্বের ভীতি, এই ক্ষতি নিজের অস্তিত্বের ক্ষতি। এই লোভ নিজের প্রাপ্তিযোগের অংশ। এখানে সমাজের মোহ, ক্ষমতার আশীর্বাদ, নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখার মোহটা মোক্ষম। এ লেখার উদ্দেশ্য কাউকে রাজনৈতিক সবক দেয়া নয়। রাজনীতিতে যে ভাঙা-গড়া শুরু হয়েছে, যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে, যে ভাগ-বিভাজন চলছে, তার একটা উপসংহার চাই। এটার জন্য রাজনৈতিক শক্তির দায় একক নয়। সামাজিক শান্তির দায়টাও বড় হয়ে এসেছে। সুশীলসমাজকে সামনে বাড়াবার তাগিদ দিচ্ছে, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিক্ষক সবাইকে ভাবতে হবে- এ সময়টা পাল্টাবে, এই সমাজটা পাল্টাবে। এই রাজনীতি পাল্টাবে। এই অবস্থা পাল্টাবে। সেই পাল্টানোর সময় যে যার ভূমিকা পালন না করে বসে থাকার সুযোগ পাবেন না। সময় সেই সুযোগ দেবে না। সেই সুযোগ বলে কয়ে আসবে না। জানান দিয়ে আসবে না। এটা ঠিক, রাজনীতিতে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি হওয়া জরুরি, সেটা অতি প্রাকৃতিক নিয়মেই হবে- এমনটি নয়, রাজনীতিবিদদের চেষ্টায়ই সেটা হওয়া সম্ভব। সব জাতির ইতিহাসে একটা সময় আসে- যখন অনেক কিছু পাল্টে যায়, স্রোত পাল্টে যায়, রাজনীতির স্লোগান পাল্টে যায়। সেই সময় কে কোন ভূমিকা পালন করবেন- সেটা নির্ণয় করার সময় এখনই। কারণ, সময়টা বহতা নদীর মতো। এটা চলছে, চলবে।
থামবে যেখানে- সেখানে পলি মাটির স্তূপ পড়বে। সেটাই হবে আগামী দিনের রাজনীতির পুঁজি। সেটা নিয়ে সবাই ভাবতে হবে। আজকের রাজনীতিটাকে খালেদা জিয়ার ও শেখ হাসিনার হার জিতের মধ্যে ভাবলে ভুল করা হবে। এর সাথে আধিপত্যের সংযোগ আছে, আঞ্চলিক রাজনীতির পাঠ আছে, বিশ্বরাজনীতির যোগ-বিয়োগ আছে, বিকাশমান পুঁজির সংযোগ আছে। সে সংযোগ শুধু রাজনীতির হাতের পুঁজি নয়। ভূরাজনীতির খেলাও সংশ্লিষ্ট। তাই বাংলাদেশ পুরোটা এখন রাজনীতির একটা উপাত্ত, পুরো মানচিত্রটা একটা মাঠ, এই মাঠে দাবা খেলা আছে, পাশা খেলা আছে, আছে বিকশিত পুঁজির ভাগ, বিভাজনের খেলা। তাই নেত্রীর কারাবাস দীর্ঘতর হলো কি সংক্ষিপ্ত হলো, তা কিভাবে মুখ্য হয়? হ্যাঁ, রাজনীতির সিমপ্যাথি খালেদা জিয়া পেয়েছেন, এবারো পেলেন। তার ওপর জুলুম বাড়লে তা আরো পাবেন। এই খালেদাকে যারা চেনেন স্বৈরশাসকবিরোধী রাজনীতির একজন মাঠের নেত্রী লড়াকু সৈনিকরূপে, তাদের কাছে এই নেত্রী অন্য ধাতুতে গড়া। সেই ধাতু রোদে পুড়বে, জেলে কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করে কষ্টের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তিনি সঞ্চিত পুঁজি ‘আপসহীনতা’র তকমাটা কাউকে বন্ধক দেবেন না। তার এই পথচলা কোথায় থামবে- সেটা বড় কথা নয়। সব চেয়ে বড় কথা তিনি যে আপসহীনতার অর্থ বুঝেছেন- সেখানে ছাড় দেবেন বলে মনে হয় না।
masud2151@gmail.com

ভর্তুকি দাবি ১৯ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংক সচল রাখতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ব্যাংক। এ টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হবে। ভর্তুকির এ দাবি সর্বকালের সর্বোচ্চ। যা চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দের নয় গুণের বেশি। ভর্তুকি দাবির শীর্ষে রয়েছে সোনালী এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। বিপুল অঙ্কের অর্থ পূরণের বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
তবে এ অর্থায়নের বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বুধবার ব্যাংকগুলোর এমডি ও সিইওদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে চলতি বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকগুলো চেয়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দের অর্থ দেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর ঘাটতি অর্থায়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলো সঠিক নিয়মে ঋণ দেয়নি। অধিকাংশ ঋণের অর্থ লুটপাট হয়েছে। যে কারণে এখন টাকা ফেরত আসবে না। গত কয়েক বছর ধরেই এ প্রক্রিয়া চলছে, একদিনে হয়নি। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ঘটনার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না। এ বক্তব্যের পর ব্যাংকগুলোয় ভুল বার্তা গেছে। ফলে ব্যাংকগুলো লুটপাটকারীদের উৎসাহিত ও নিরাপত্তা দিয়েছে। যে কারণে আজকে এ মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আগ থেকে সাবধান হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পৃথকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে এ টাকা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি মূলধনের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক ৭০০ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতি নিয়ে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। সূত্রমতে, বেসিক ব্যাংকের টাকা বস্তায় ভর্তি করে ব্যাংক থেকে বের করে নেয়া হয়। ঋণের নামে এ টাকা সরানো হয় ব্যাংক থেকে। একইভাবে হলমার্কের দুর্নীতির কারণে সোনালী ব্যাংক বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়ে। অন্যান্য ব্যাংকের মূলধন ঋণের নামে বের করে নেয়া হয়। ফলে সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোয় বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার সোনালী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শীর্ষ প্রধানদের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বৈঠক করেছেন। প্রতিবছর কেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে, এর নেপথ্যে মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত করতে ওই বৈঠকে ব্যাপক আলোচনা হয়। মূলধন ঘাটতির বড় একটি কারণ হিসেবে খেলাপি ঋণকে শনাক্ত করা হয়। বৈঠকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয় এমডিদের। বৈঠকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার কৃষকদের ঋণ দিচ্ছে, ভর্তুকি দিয়েছে। ফলে এ ব্যাংক দুটির লোকসান ও মূলধন ঘাটতি হবে এটিই স্বাভাবিক। সূত্রমতে, বৈঠকে ব্যাংকের এমডিরা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণের সার্ভিস চার্জ দাবি করেন। তারা বলেন, প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের আরও ২৫-৩০ ধরনের সার্ভিস বিনা মূল্যে কোটি কোটি মানুষকে দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বড় একটি অংশ সম্পৃক্ত থাকার কারণে তারা অন্য কোনো কাজ করতে পারে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবছর মূলধন ঘাটতি পূরণে টাকা দেয়া হচ্ছে। জনগণের টাকায় ঘাটতি মূলধন পূরণ নিয়ে বাইরে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিতরণে তাদের সার্ভিস চার্জ দেয়ার বিধান রাখা হলে ব্যাংকগুলো বেশকিছু টাকা পাবে। যা মূলধন ঘাটতি পূরণের বিকল্প কৌশল হিসেবে ব্যবহার হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মান ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয় বৈঠকে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে গত ৯টি অর্থবছরে ১৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকাই দেয়া হয়েছে গত পাঁচটি অর্থবছরে। এই অর্থের মধ্যে সর্বাধিক পেয়েছে বেসিক ও সোনালী ব্যাংক। জানা গেছে, বিগত চার অর্থবছরে শুধু সোনালী ও বেসিক ব্যাংককে মূলধন ঘাটতি পূরণে ৬ হাজার ৯৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। ২০১৩-২০১৪ এবং ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে সোনালী ব্যাংক এ খাত থেকে অর্থ পেয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা ও ৭১০ কোটি টাকা। ‘হলমার্ক’ কেলেঙ্কারির কারণে সোনালী ব্যাংকের খোয়া গেছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা, যা এখনও অনাদায়ী। একইভাবে বেসিক ব্যাংককে ২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি পূরণ দেয়া হয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং ১২০০ কোটি টাকা।

রিজার্ভ চুরিতে উত্তর কোরিয়া জড়িত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়া জড়িত রয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক ড্যান কোটস। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তার প্রতি বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে দেশটি। মার্কিন কংগ্রেসের সিনেট কমিটিতে মঙ্গলবার বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার হুমকির বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন কোটস। ড্যান কোটস তার বক্তব্যে বলেন, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন অর্থ সরানোর ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস। চলতি সপ্তাহে চুরি যাওয়া অর্থ লেনদেন করায় ম্যানিলাভিত্তিক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মামলা দায়ের হওয়ার কথা রয়েছে। কোটস জানান, ২০১৭ সালে বিশ্বে ওয়ানাক্রাই নামে যে কম্পিউটার ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে সেটাও তৈরি করেছে উত্তর কোরিয়ার অপরাধীরা। এই ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বের শতাধিক দেশে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি তৈরি করেছে উত্তর কোরিয়া। পরবর্তী বছর যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশগুলো আগ্রাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর হুমকি তৈরি করছে।
এ সময় অর্থ সংক্রান্ত অপরাধ, প্রচারণা এবং বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে অপরাধীরা সাইবার ক্ষেত্র ব্যবহারের চেষ্টা চালাতে থাকবে বলেও সতর্ক করেন এই গোয়েন্দা প্রধান। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘সম্ভাব্য বড় ধরনের হুমকি’ হয়ে উঠেছে। আমরা কীভাবে এর জবাব দেব সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই সময়। আমাদের লক্ষ্য একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান। সেক্ষেত্রে আমরা দেশটির ওপর বিভিন্নভাবে সর্বোচ্চ চাপ দিচ্ছি।’ শীর্ষ এই গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছ থেকে হুশিয়ারিটি এমন সময়ে এলো যখন চলতি বছরের শীতকালীন অলিম্পিক উপলক্ষে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। একইসঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ব্যাপারে একটি কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

প্যারাডাইস পেপারসের নতুন তালিকায় ২০ বাংলাদেশির নাম

প্যারাডাইস পেপারসের নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে জানানো হয়েছে, কর ফাঁকি দিতে মাস্টার কোম্পানি খুলেছিলেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরসহ ২০ বাংলাদেশি। গত বছর প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে বিশ্বব্যাপী রাঘববোয়ালদের থলের বেড়াল বের হতে শুরু করে।
তাতে বিশ্বের ক্ষমতাধর অনেক ব্যক্তির গোপন তথ্য বেরিয়ে আসে। বেশিরভাগ তথ্যই বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের, যারা কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন ট্যাক্স হেভেনে বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এর আগে প্যারাডাইস পেপারসে ১০ বাংলাদেশির নাম এসেছিল। বিএনপি নেতা আবদুল আউয়ার মিন্টুসহ তার পরিবারের সদস্যদের নাম তাতে ছিল।

যে কারণে সিলেটে হক-মুক্তাদির মাঠে by ওয়েছ খছরু

একজন বয়োবৃদ্ধ নেতা। অন্যজন বয়সে তরুণ। দুজনের ‘র‌্যাংক’ সমান। পদবি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। কাগজে-কলমে এই দুই নেতা  হলেন এখন সিলেট বিএনপির শীর্ষ নেতা। একজন হলেন সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ এমএ হক।
আর অপরজন হলেন- খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অনেক দিন ধরে তারা রাজপথের আন্দোলনে ছিলেন অনুপস্থিত। বয়সের ভারে, অসুস্থতায় কাবু এমএ হক। আর মুক্তাদির বসবাস করেন ঢাকায়। এ কারণে আর এক হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর সিলেট বিএনপির ওই দুই নেতা এখন আন্দোলন-সংগ্রামে একাট্টা। গতকাল সিলেট বিএনপির অনশন কর্মসূচিতে সকাল ১০টা থেকেই দুজনকে অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। এর আগের দিনের অবস্থান কর্মসূচিতেও তারা সরব ছিলেন। আর সিনিয়র দুজন মাঠে থাকায় নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত রয়েছেন। এমএ হকের রাজনৈতিক জীবন বর্ণাঢ্য। পাকিস্তান আমল থেকে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এখনো রাজনীতিই তার নেশা। যদিও তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। এর পরও তাকে রাজনীতিবিদ হিসেবে এক নামেই চিনে সবাই। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের খুব ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এমএ হক। প্রভাব নিয়ে রাজনীতি করলেও কখনো অপব্যবহার করেননি। বিগত দিনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নানাভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন তিনি। সিটি নির্বাচনে দাঁড়ালেও ভাগ্য সহায় ছিল না। আর সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু এমএ হক সাম্প্রতিক সময়ে মাঠে সরব হয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় মানবজমিনকে জানালেন- ‘ভালোবেসে বিএনপি করি। অনেক পেয়েছি। দিয়েছিও। এখন দলের দুর্দিন। ম্যাডাম কারাগারে। মন মানে না। এ কারণে অসুস্থ শরীর নিয়ে কর্মসূচিতে হাজির হই। দুর্দিনে সক্রিয় থাকাটা নৈতিক দায়িত্ব। কর্মীরা উজ্জীবিত।’ এমএ হক জানালেন- ‘বিএনপি দেশে গণমানুষের দল। এই দলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা অনেক। বিএনপিকে কেউ কখনো নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে না।’ সিলেট বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খন্দকার আব্দুল মালিকের ছেলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সিলেট বিএনপির ত্যাগী নেতা ছিলেন খন্দকার আব্দুল মালিক। এক সময় খন্দকার মালিক নিজ বাসা থেকেই বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। বিএনপির রাজনীতিতে একসময় তিনি চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মৃত্যুবরণও করেন। খন্দকার মালিকের ছেলে আব্দুল মুক্তাদির। ঢাকায় ব্যবসা করেন। সিলেটে খন্দকার মালিক ফাউন্ডেশনের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে তার। পিতার রাজনৈতিক সূত্র ধরে তিনি কয়েক বছর ধরে রাজনীতিতে পা মাড়িয়েছেন। বিএনপির বিগত কাউন্সিলে তাকে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হয়। সিলেট বিএনপিতে এখন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রভাব বেশি। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ঢাকার বাসিন্দা। সপ্তাহে দুদিন এসে সিলেটের দলীয় কর্মকাণ্ড চালাতেন। কিন্তু ৮ই ফেব্রুয়ারির পর থেকে তিনি সিলেট ছাড়ছেন না। আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে রয়েছেন। ৯ই ফেব্রুয়ারি নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে বিএনপি পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ করেছে। চলমান আন্দোলনে অগ্রভাগে থেকে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখছেন মুক্তাদির। দলের দুর্দিনে সবাইকে শান্ত থেকে এক হয়ে আন্দোলন চালানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ গতকাল জানিয়েছেন- ‘সিলেট বিএনপির এখন আর কেউ ঘরে বসে নেই। কিংবা পালিয়ে প্রবাসেও নয়। সবাই মাঠের আন্দোলনে একাট্টা। এমএ হক, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, দিলদার হোসেন সেলিম, আরিফুল হক চৌধুরী, ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী সবাই রাজপথে আন্দোলনে একাকার। এতে করে দলের নেতাকর্মীরা শক্তি পাচ্ছেন। সিনিয়র নেতাদের নির্দেশে সিলেটে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করছি।’ এদিকে মাঠের রাজনীতিতে প্রায় সময় বিএনপিতে বিরোধ দেখা যেত; এমনকি খুনোখুনিও হয়েছে। কিন্তু দলের চেয়ারপারসনের কারাবরণের পর থেকে সিলেটে সব দ্বন্দ্ব ভুলে নেতারা এক কাতারে এসেছেন।