Showing posts with label জেলহত্যা দিবস. Show all posts
Showing posts with label জেলহত্যা দিবস. Show all posts

Saturday, November 5, 2011

কতটুকু দুঃখ পেলে দুঃখগুলো প্রতিবাদী হয়ে ওঠে? by সিমিন হোসেন রিমি

আমরা কয়েকজন নানা বয়সের বন্ধু নতুন কোনো লেখা, কোনো নতুন বই অথবা যেকোনো ভালো লাগার মতো কিছু পেলেই যতক্ষণ না নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারছি, রীতিমতো অস্থির হয়ে থাকি। অবশ্য বিষয়গুলো যে সব সময় আনন্দের হয়, তা কিন্তু নয়। সত্যি বলতে, দৈনিক পত্রিকা থেকে যা পড়ে আমরা শেয়ার করি, তার বেশির ভাগই কষ্টের। তবে কষ্ট থেকে যেসব চিন্তা আসে মনে, তা আশাবাদেরও জন্ম দেয়। আমাদের প্রচণ্ড আশাবাদী এবং সুস্থির এক বন্ধু আছে। সে নানা রকম উদাহরণ টেনে আনে সামনে। আমাদের স্বপ্নের বুনন থেমে থাকে না।
২৬ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের বৈঠকের একটি খবর ছিল। সেই খবরের একটি লাইন ছিল: ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় সামরিক শাসকেরা থাকায় দেশটির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি।’
খবরটির এটুকু কথা শত কথার জন্ম দিল মনে। যথারীতি এ বিষয়টি নিয়ে যখন কথা হচ্ছিল, আমার আশাবাদী বন্ধু আমাকে মনে করিয়ে দিল একটি যোগসূত্র। বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর পর্যন্ত বলে দিল, যেন আমি আবার পড়ি। আমি নতুন করে আবার পড়লাম। কথাগুলো ঠিক ৪০ বছর আগের—মুক্তিযুদ্ধকালের। মনে হয়, দিব্যদৃষ্টিতে দেখা কোনো অবলোকন। আসলে, বাস্তববাদী জ্ঞানী প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অনন্য এক মানুষের অঙ্ক কষা ফলাফল।
১৯৭১ সালে জয় বাংলা পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে এক রাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাঁকে ডেকে পাঠান। সেই রাতে তাঁদের যে কথা হয়, তা আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা থেকে তুলে ধরছি।
তাজউদ্দীন আহমদ: আপনাকে একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি। শত্রু এখন বন্ধুর ছদ্মবেশে আমাদের ভেতরে ঢুকছে। এখন আমাদের আরও বেশি সাবধান হওয়া দরকার।...সবচেয়ে বিপদের কথা, সাহায্য দেওয়ার নাম করে এগিয়ে এসে টাকা ছড়িয়ে পাশ্চাত্যের কোনো কোনো দেশ আমাদের সরকারের মধ্যে তাদের শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি করেছে এবং মুক্তিবাহিনী ও বুদ্ধিজীবীদের নানাভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলার জন্য চেষ্টা করেছে।...এই বিদেশিরা আমাদের মুক্তিবাহিনীর অফিসারদের সঙ্গেও গোপন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের তারা বোঝাচ্ছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতারা অপদার্থ, অযোগ্য এবং ভারতের দালাল। এরা ক্ষমতায় গিয়ে ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে মোতায়েন রেখে রাজত্ব চালাবে। সুতরাং, বাঙালি অফিসারদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে একটা মিটমাট হলে অটোনোমাস বাংলাদেশে বাঙালি অফিসাররাই হবে মিলিটারি চিফ ও হর্তাকর্তা। পাকিস্তানের মিলিটারি বাজেটের সিংহভাগ দেয় আমেরিকা। তার সমান ভাগ বাংলাদেশ আর্মিও পাবে। আর পাকিস্তান যদি ভেঙেই যায়, তাহলেও মুক্তিবাহিনীর অফিসারদের উচিত হবে, অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে নিজেদের হাতেই ক্ষমতা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া।...তৃতীয় বিশ্বে ফরেন এইড বা বিদেশি সাহায্য এবং তার রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে মার্কিন লেখকদেরই কয়েকটি লেখা আমি পড়েছি। এই লেখা পড়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমি শঙ্কিত। এদের অপারেশন হবে অনেকটা এ ধরনের—বাংলাদেশ মুক্ত হলে এরা বিপুল সাহায্যের অফার নিয়ে এগিয়ে যাবে এবং নিজেদের তত্ত্বাবধানে সাহায্য বিতরণ করতে চাইবে। সাহায্য যা পাওয়া যাবে, তার বারো আনা ব্যয় হবে তাদের তদারকিতে, সাহায্য প্রেরণের জাহাজ ভাড়ায় ও তাদের লোকজনের খরচ মেটাতে। কিন্তু বাইরে প্রচার হবে, বাংলাদেশে সাহায্যের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সাহায্য প্রকৃত অভাবী লোকদের হাতে পৌঁছাবে না। সাহায্যের টাকার দৌলতে সরকারি প্রশাসনে তাদের সমর্থক শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি করা হবে। দেশপ্রেমিক অফিসার ও মুক্তিবাহিনীর লোকজনকে দুর্নীতিপরায়ণ করার চেষ্টা হবে। সরকারবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের সমর্থক রাজনৈতিক দল ও পত্রিকাকে টাকা দেওয়া হবে। সরকারি দলের মধ্যে নিজেদের গ্রুপ তৈরি করা হবে। সামরিক বাহিনীর আনুগত্য ও দেশাত্মবোধ নষ্ট করা হবে। তারপর বাংলাদেশের নতুন সরকার যদি এই বিদেশিদের কথামতো না চলে, তাহলে সব দুর্নীতি ও খারাপ কাজের দায়দায়িত্ব সরকারের কাঁধে চাপানো হবে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলা হবে। এভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করার পর সিভিল অথবা মিলিটারি ক্যু ঘটিয়ে তাদের পছন্দমতো তাঁবেদার সরকার বসানো হবে।...মুজিব ভাই দেশে ফিরে কী করতে চাইবেন, আমি জানি না। যদি তিনি আমার কথা শোনেন, তাহলে এই বিপদও মোকাবিলা করা যাবে। (সূত্র: ইতিহাসের রক্তপলাশ পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর, পৃষ্ঠা ১০২-১০৫, ঢাকা ১৯৯৪)
আজ ৩ নভেম্বর, জেল হত্যা দিবস। ৩৬ বছর আগে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর বিনা অপরাধে জেলে বন্দী করে রাখা মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও দুজন জাতীয় নেতা এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয়। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, লাখো মানুষের জীবনদান ও একাত্মতা এবং অবিস্মরণীয় নেতৃত্বের গুণে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে জন্মলাভের মাত্র তিন বছর ১০ মাসের মধ্যে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং জেলের ভেতর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ফলে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারাই শুধু ব্যাহত হয়নি, দেশের চরিত্রটাও কেমন বদলে যায়। হয়তো তাই এখানে ৪০ বছরেও দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতির বিকাশ ঘটে না।
আমি আজকের লেখার শিরোনামটি ধার করেছি প্রথম আলোর গত ২৭ অক্টোবর সংখ্যার চিঠিপত্র বিভাগের একটি চিঠি থেকে। সেই চিঠির শেষ লাইনটি ছিল: ‘আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, কতটুকু দুঃখ পেলে পদ্মার ভাঙন আসে অসহায় চোখের কিনারে; আর কতটুকু দুঃখ পেলে দুঃখগুলো প্রতিবাদী হয়ে ওঠে?’
ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন পৃথিবীতে তরুণদের সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবাদী হবে তরুণেরা। সুস্থ সমাজ, যোগ্যতাসম্পন্ন রাষ্ট্র নির্মাণে তারা এগিয়ে আসবে—এ বিশ্বাসে পথচলা যেন থেমে না থাকে।
সিমিন হোসেন রিমি: সমাজকর্মী।
simrim_71@hotmail.com

Wednesday, November 4, 2009

জেলহত্যা দিবস -ন্যায্য বিচার ছাড়া কলঙ্কমোচন ঘটবে না

শোকাবহ জেলহত্যা দিবস আজ। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে অশুভ রাজনৈতিক শক্তির চক্রান্তে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বাংলাদেশের জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের কলঙ্কিত এক অধ্যায়। আমরা আজ চার জাতীয় নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।
এ হত্যাকাণ্ড ছিল বিরাট ট্র্যাজেডি, কিন্তু ঘটনার ২৯ বছর পরও বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় বিচার-প্রক্রিয়াটি দৃশ্যত পরিহাস হয়ে উঠেছে। সন্দেহ নেই যে এ হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারার অপরাধে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধাকে আদালতের ভাষায় ‘নৃশংস, পৈশাচিক ও বর্বরোচিতভাবে গুলি করে হত্যা’র দায়ে মৃত্যুদণ্ড এবং ৩০২/১০৯ ধারার অপরাধে ফারুক-রশিদসহ ১৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত মেজর মো. খায়রুজ্জামানসহ চার রাজনীতিক তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কে এম ওবায়েদুর রহমান ও নুরুল ইসলাম মঞ্জুর অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’ না হওয়ায় খালাস পান। খায়রুজ্জামান ছাড়া বাকি অভিযুক্তদের মৃত্যু হয়েছে। লক্ষণীয় যে বিচারিক আদালতের ওই রায়ে ফারুক-রশিদসহ ২০ জনকে দণ্ডবিধির ১২০বি ধারার অভিযোগ থেকে ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ গণ্যে প্রত্যেককে বেকসুর খালাস’ দেওয়া হয়।
মামলার মূল আসামিদের বেশির ভাগই ছাড়া পেয়ে যাওয়ায় রায়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ ওঠে। গভীর ষড়যন্ত্র ছাড়া এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও বাস্তব। জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরা এ রায় মেনে নেননি, সাধারণ মানুষের মনেও রয়েছে সংশয় ও ক্ষোভ। অনেক আইনবিদ মনে করেন, ওই ২০ জনকে ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ’ ঘোষণার বিরুদ্ধে যথাসময়ে রিভিশন মামলা হওয়া উচিত ছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল না করার বিষয়টিও বিস্ময়কর। উপরন্তু উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি তো দূরের কথা, আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমের (কজলিস্ট) তালিকায়ও তা ঠাঁই পায়নি। এ মামলার প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক মন্তব্য করেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের উচিত আপিল করা। কারণ এ রায় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বাস্তবতাবিবর্জিত।’ সুতরাং যা করা হয়নি, তা করাটা জরুরী।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল, ‘জেলখানায় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচার করা হবে।’ কিন্তু ইতিমধ্যে হাইকোর্ট কেবল রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ছাড়া অন্য দুজনের ফাঁসি মওকুফ এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ১৫ আসামিকেই খালাস দেন। এই হলো জেলহত্যা মামলার পরিহাসময় পরিণতি, যেখানে কেবল একজনের ফাঁসি ছাড়া বাকি সবাই রেয়াত পেয়ে গেছেন, যাঁদের বেশির ভাগই এখন পলাতক।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিলের আবেদন মঞ্জুরের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেছে। আইনের শাসনের স্বার্থে দ্রুতই আপিল আবেদনের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তির কোনো বিকল্প নেই। এবং এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতিতে ছাড় পাওয়া আসামিদের শাস্তির আওতায় আনার আইনি দিকগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।