Monday, March 2, 2026

সৌদি যুবরাজের অনুরোধেই কি তাহলে ইরানে হামলা চালালেন ট্রাম্প

ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কয়েক সপ্তাহ জোরালো লবিং চালিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ সৌদি আরব। আরও নির্দিষ্ট করলে বললে, সৌদি যুবরাজ নিজেই ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের কাছে লবিং করেছেন। আর তাঁর সঙ্গে উগ্র জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল তো ছিলই। এ বিষয় সম্পর্কে জানেন, এমন চার ব্যক্তি ওয়াশিংটন পোস্টকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এমন এক সময়ে সৌদি আরব এই লবিং করছিল, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রায় চার দশক ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উৎখাত করার লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করছিল।

ওই চার ব্যক্তি বলেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত মাসে ট্রাম্পকে বেশ কয়েকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেন। জনসমক্ষে ইরান বিষয়ে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও গোপনে তিনি মার্কিন হামলার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে তাঁর দেশের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখেন। তিনি দীর্ঘ সময় থেকে ইরানে মার্কিন হামলার জন্য প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে আসছিলেন।

এই দুই দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ট্রাম্পকে ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর ওপর ব্যাপক বিমান হামলার নির্দেশ দিতে প্রভাবিত করে। হামলার প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে খামেনি ও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী অন্তত এক দশকে ইরানের বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল না। তা সত্ত্বেও এ হামলা চালানো হয়েছে। অথচ ৯ কোটির বেশি মানুষের দেশটিতে সরকারকে উৎখাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান থেকে কয়েক দশক ধরে বিরত ছিল ওয়াশিংটন।

গত শনিবারের হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা সেই দীর্ঘকালীন মার্কিন নীতিতে ছেদ ঘটিয়েছে। তা ছাড়া এটি ট্রাম্পের আগের সামরিক অভিযানগুলো থেকে লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন। আগের অভিযানগুলো ছিল অনেক বেশি সীমিত ও কম বিস্তৃত।

ট্রাম্পকে এখন সেই বাজির ঝুঁকি নিতে হবে, যা তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বাজিটি হলো শুধু আকাশপথে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাটির রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে যখন মার্কিন বোমা হামলা হচ্ছিল, তখন ইরানের নাগরিকদের অনেকটা উসকানি দিয়ে এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আজ রাতে যা করতে যাচ্ছি, তা আগে কোনো প্রেসিডেন্ট করতে চাননি। এখন আপনারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি আপনাদের চাওয়া পূরণ করছেন। দেখা যাক, আপনারা এখন কী করেন।’

এমন এক সময়ে সৌদি আরব এই হামলার জন্য চাপ দিচ্ছিল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দেশটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য জেনেভায় পৌঁছান।

সে আলোচনা চলাকালে সৌদি যুবরাজ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি ফোনালাপ হয়। এরপর রিয়াদ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়, ইরানের ওপর কোনো হামলায় মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবেন না।

তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি যুবরাজ বিন সালমান ভিন্ন সতর্কবার্তা দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যুবরাজ মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এখনই হামলা না চালায়, তবে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সামরিক শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর পক্ষে মত দেন সৌদি যুবরাজ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অবস্থানকে তাঁর ভাই ও সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান সমর্থন জানান। গত জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনিও হামলা না চালানোর বিভিন্ন নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মোহাম্মদ বিন সালমানের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা বলেন, সৌদি আরবের নেতার এ জটিল অবস্থানে সম্ভবত দুটি বিষয়ের প্রতিফলন রয়েছে। একদিকে তিনি ইরানের পাল্টা হামলা থেকে নিজ দেশের সংবেদনশীল তেল অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তিনি তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যে রিয়াদের প্রধান শত্রু বলে মনে করেন।

শিয়াপ্রধান ইরান ও সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের এ বিরোধ পুরো অঞ্চলে ছায়া যুদ্ধ তৈরি করে রেখেছে।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার হামলার পর ইরান সৌদি আরবের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে রিয়াদ একটি ক্ষুব্ধ বিবৃতি দেয়। সেখানে তারা ইরানের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘প্রয়োজনীয় ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা’ নেওয়ার আহ্বান জানায়।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করলেও সৌদি দূতাবাস কোনো সাড়া দেয়নি।

বৃহস্পতিবার জেনেভায় উইটকফ ও কুশনার ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের শেষ বৈঠকটি করেন। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এটি ছিল তাদের তৃতীয় উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, তাঁরা এ বিশ্বাস নিয়ে ফিরে আসেন যে তেহরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে খেলা করছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, একটি বিষয় খুব স্পষ্ট ছিল, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা তাঁদের উদ্দেশ্য, যাতে সময়–সুযোগমতো তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারে।

আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ের (প্রাইমারি) প্রচারে অংশ নিতে শুক্রবার বিকেলে ট্রাম্প যখন টেক্সাসের করপাস ক্রিস্টি শহরে পৌঁছান, তখন তাঁর হতাশা ও ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তিনি বারবার ঘোষণা করেন, ইরানি আলোচকদের ওপর তিনি ‘সন্তুষ্ট নন’।

জ্বালানি নীতির ওপর দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতার শেষ দিকে জনতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার সামনে এখন অনেক কিছু চলছে। আমাদের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আপনারা তা জানেন। এটি সহজ নয়, মোটেও সহজ নয়। আমাদের খুব বড় একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

পরে ট্রাম্প সাপ্তাহিক ছুটি কাটানোর জন্য ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সৈকত শহর পাম বিচে যান। সেখানে শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের মালিকানাধীন মার-এ-লাগো রিসোর্টে সমর্থকদের সঙ্গে সময় কাটান তিনি।

সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তির মতে, ট্রাম্পকে তখন ক্লান্ত দেখালেও তিনি বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। এরপর তিনি নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে চলে যান এবং হামলার ঘোষণা দিতে একটি ভাষণ রেকর্ড করেন।

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে বৈঠক হয়। ১৮ নভেম্বর ২০২৫
হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে বৈঠক হয়। ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি

সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া। ছবি রয়টার্স

সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া। ছবি রয়টার্স

সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া। ছবি রয়টার্স

সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর ওই শোধনাগার বন্ধ করে দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আল আরাবিয়া টিভিকে বলেছিলেন, রাস তানুরা শোধনাগার লক্ষ্য করে দুটি ড্রোন হামলা চালানোর চেষ্টার সময় প্রতিহত করা হয়। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ থেকে এ সময় আগুন লেগে যায়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কেউ হতাহত হয়নি।

সূত্র: রয়টার্স

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিন যেভাবে ইরানের ওপর হামলা চালাল

ধরা হয়েছিল, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইরান সরকার কষ্টকর কিছু শিক্ষা পেয়েছিল।

সেই সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও কমান্ডারকে ভূগর্ভস্থ গোপন আস্তানায় খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়। পরে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, তাঁদের দেহরক্ষীরা মুঠোফোন ব্যবহার করছিলেন বলেই ইসরায়েল তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছিল।

ইরান ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এ ধরনের ব্যর্থতায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

কিন্তু এই সপ্তাহান্তে ইরান যেসব মারাত্মক ভুল করেছে, তা গত জুনের চেয়েও মারাত্মক ছিল। ফলে এবারের হামলায় দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অনেকেই ধারণা করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কিংবা উভয় দেশ ইরানে হামলা চালাতে পারে। ঠিক এমন একটা সময়ে গত শনিবার সকালে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কয়েকজন দিনের বেলায় মাটির ওপরে, তাঁদের পরিচিত ঠিকানা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করতে জড়ো হয়েছেন।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও মাটির ওপরে তাঁর সরকারি বাসভবন কম্পাউন্ডে অবস্থান করছিলেন, যা মোটেই গোপন নয়।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ওই সব নেতা কোথায় থাকবেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দারা সেটা কীভাবে জানলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ওই তথ্য ও ইরান থেকে সংগৃহীত অন্যান্য সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে দুই দেশ তিন দফা হামলা চালায়। এতে ইরানের উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। দ্রুতই তাদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়।

এরপর শুরু হয় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র অনুসন্ধান ও ধ্বংসের অভিযান। এতে ইরানে গোলাবারুদ, লঞ্চার, ক্রু, গুদাম, উৎপাদনকেন্দ্র—সবই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিশানায় পরিণত হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনিকে হত্যা করে ইসরায়েল ‘সর্বোচ্চ সীমা’ অতিক্রম করে। একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করেছে তারা। গত জুনে যুদ্ধের শুরুর দিকে তারা এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। এমনটাই জানিয়েছেন ইসরায়েলের দুই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।

রোববার দুপুরের মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানান, ইরানের আকাশে তাঁরা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের যুদ্ধবিমান এখন তেহরানের আকাশে নির্বিঘ্নে উড়ছে।

ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সাবেক কমান্ডার আমির এশেল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইরান পুরোপুরি বিমান হামলার জন্য উন্মুক্ত। কোথায়, কখন, কীভাবে আঘাত করা হবে, এটা এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা প্রায় কোনো চ্যালেঞ্জই ছুড়তে পারছে না। কার্যত পূর্ণ স্বাধীনতা আছে।’

কর্মকর্তারা বলেন, এই স্বাধীনতা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এতটাই আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল যে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো খুব দ্রুত এই আকাশ অভিযান শেষ করতে চাইছে। বিশেষ করে রোববার জেরুজালেমের পশ্চিমে একটি আবাসিক এলাকায় ইরানের প্রাণঘাতী হামলার পর এ উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পায়। অথচ ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর এখনো অনেক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা বাকি।

‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ ও আকস্মিক বিষয়

শনিবারের হামলা বহু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আকস্মিক বিষয়।

গত জুনের ১২ দিনের সংঘাতের শুরুতেই খামেনিকে হত্যা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি আড়ালে চলে যান এবং আর সুযোগ তৈরি হয়নি।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেন, এ কারণেই শনিবারের হামলার পরিকল্পনাকারীরা হিসাব করেছিলেন, যদি কোনো শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যা করতে হয়, তবে তা প্রথম ধাক্কাতেই করতে হবে। নইলে দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত আরেক ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, শনিবারের হামলার আগে কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা চলছিল। সামরিক গোয়েন্দারা এমন একটি সুযোগ খুঁজছিলেন, যখন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা একসঙ্গে এক স্থানে থাকবেন।

এবার রাতে নয়; বরং সকালে হামলা চালানো হয়, যা আগের অভিযানগুলোর থেকে ভিন্ন। এটিও কৌশলগতভাবে আকস্মিকতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

শনিবার সকালে প্রথম দফার হামলার পরপরই দ্বিতীয় দফা হামলা শুরু হয়। এতে তেহরানের প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি নিশানা করা হয়।

ইসরায়েলের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আগের সংঘর্ষে ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। কিন্তু দেখা যায়, গত জুনের পর ইরান নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে আংশিকভাবে আবার কিছু বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে।

শনিবার ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র ছিল দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা এফ-১৫ যুদ্ধবিমান থেকে দূর থেকে নিক্ষেপ করা যায়।

এটি মূলত ইসরায়েলের অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘অ্যারো’র জন্য অনুশীলন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন সংস্করণ ‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

২০২৪ সালে ইরানের এক হামলার জবাবে ইসরায়েল প্রথম এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটি রাডার সিস্টেমে আঘাত হানে। পরে একই বছরের নভেম্বরে এবং গত জুনেও ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি নিষ্ক্রিয় করতে এগুলো ব্যবহার করা হয়।

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারে হামাস নেতাদের একটি বৈঠকে হামলা চালাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। উদ্দেশ্য ছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলাকালে শীর্ষ হামাস নেতাদের হত্যা করা।

কিন্তু ওই হামলায় কোনো শীর্ষ হামাস নেতা নিহত হননি; বরং কাতারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হন। এতে ট্রাম্পের চাপের মুখে ইসরায়েলকে ক্ষমা চাইতে হয়।

‘কৌশলগত অতর্কিত হামলা’

এই সপ্তাহান্তে তৃতীয় দফার বিমান হামলার অভিযানে ইসরায়েল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিমানবহর মোতায়েন করে—প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েল এত বড় আকারে আর কখনো যুদ্ধবিমান পাঠায়নি। তখন ইসরায়েল মাত্র ১২টি বিমান বাদে বাকিগুলো মিসরের বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে হামলায় পাঠিয়েছিল।

এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষায়, কার্যত ‘পুরো বিমানবাহিনী’ পশ্চিম ও মধ্য ইরানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, যত দ্রুত সম্ভব যত বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা।

ইসরায়েল প্রথম দফায় হামলা চালানোর প্রায় আধা ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রও এ অভিযানে যুক্ত হয়। তারা পূর্ব ইরানে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, যা ইসরায়েল থেকে দূরে হলেও মার্কিন ঘাঁটির কাছাকাছি। ইসরায়েল নেয় পশ্চিম অংশের দায়িত্ব।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবহরেও হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র জানতে পেরেছি, আমরা ইরানের ৯টি নৌযান ধ্বংস করেছি ও ডুবিয়ে দিয়েছি, যার কিছু ছিল বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাকিগুলোর পেছনেও যাচ্ছি, শিগগিরই সেগুলোও সাগরের নিচে ডুববে।’

ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রোববার ইসরায়েল তেহরানে সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদর দপ্তর, গোয়েন্দা সদর দপ্তর, আইআরজিসি বিমানবাহিনীর কমান্ড সেন্টার, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তরসহ ইরানের ‘শাসনব্যবস্থার ডজন ডজন সামরিক কমান্ড সেন্টার’ আঘাত হেনেছে।

তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে ব্যাগ হাতে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নাগরিক। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে ব্যাগ হাতে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নাগরিক। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

‘ইসলামি ন্যাটো’ কেন ইসরায়েলের রক্ষক হয়ে উঠল by জুনায়েদ এস আহমাদ

প্রতিটি সাম্রাজ্যই একটি কৌশলকে নিখুঁত করতে চায়। তারা ভুক্তভোগীদের বোঝায় যে অংশগ্রহণ মানেই প্রভাব, আর আনুগত্যই নাকি পরিণত আচরণ। এই কৌশলের সাম্প্রতিক রূপ হলো তথাকথিত ইসলামি ন্যাটো। এটি একধরনের সুন্নি জোট, যার মূল লক্ষ্য পশ্চিমা শক্তিগুলোকে আশ্বস্ত করা যে মুসলিম ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে এবং নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা যাবে।

এই জোট আসলে ঝুঁকিহীন ঐক্য, কোনো মূল্য না দেওয়া প্রতিরোধ এবং উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে বন্দী সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভ্রান্তি দূর করা দরকার। যদি এই জোট সত্যিই কার্যকর হতো, তাহলে গাজা আজ এমন অবস্থায় থাকত না।

গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ কোনো গোপন ঘটনা ছিল না। তা টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে, সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে, বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে। এখানে ভয়াবহতাকে রুটিনে পরিণত করা হয়েছে প্রশাসনিক দক্ষতায়। হাসপাতাল ধ্বংস করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মুছে ফেলা হয়েছে। অনাহারকে পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র বানানো হয়েছে। শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, যেন শিল্পকারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়া।

এটি কোনো দুর্ঘটনা বা ভুল সিদ্ধান্ত নয়। এটি ছিল প্রকাশ্য এক নৈতিক পরীক্ষা। আর ইসলামি ন্যাটোর ছাতার নিচে থাকা প্রতিটি রাষ্ট্র সেই পরীক্ষায় একইভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ এই জোটের কেউই ইসরায়েল ও তার পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি।

তুরস্ক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল; কিন্তু একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে প্রতীকী এই বিচ্ছেদের সীমা কতটা সংকীর্ণ; যখন বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও পশ্চিমা প্রভাবের গভীর কাঠামো অক্ষত থাকে।

অন্য দেশগুলো নিষেধাজ্ঞার বদলে বিবৃতি দিয়েছে, বিচ্ছেদের বদলে বক্তৃতা করেছে, আর বাস্তব পরিণতির বদলে টেলিভিশনের শোক প্রদর্শন করেছে।

এমন নিষ্ক্রিয় সহযোগিতার পরও এই একই শাসকগোষ্ঠী এখন দাবি করছে যে তারা ট্রাম্পের কুৎসিত বোর্ড অব পিসে যোগ দিয়ে ঔপনিবেশিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি কোনো সরলতা নয়। এটি সরাসরি অপমান। যেন অগ্নিসংযোগকারী নিজেই আগুন লাগিয়ে পরে বলছে দমকল বাহিনী এসে গেছে।

কারণ, তার সহযোগীরাই এখন ছাইয়ের দেখভাল করবে। বোর্ড অব পিস কোনো নিরপেক্ষ মঞ্চ নয়। এটি কাঠামোগতভাবেই ঔপনিবেশিক। আন্তর্জাতিক আইন পাশ কাটানো, প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করা এবং গণহত্যাকে প্রশাসনের ভাষায় রূপান্তর করাই এর মূল নকশা।

তাহলে এই নাটক কেন। কারণ, ইসলামি ন্যাটোর আসল কাজ জায়নবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়। এর মূল কাজ মুসলিম জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এটি রাজতন্ত্র ও ধনকুবেরদের জন্য একধরনের সংবরণ কৌশল, যারা তেল আবিবের চেয়ে নিজেদের দেশের রাজপথকে বেশি ভয় পায়।

এই জোট ক্ষুব্ধ মানুষকে বলে শান্ত থাকুন। আপনার শাসকেরা ভেতরের ঘরে আছেন। অর্থাৎ যারা আপনার সহধর্মীদের হত্যা করছে, আমরা তাদের হয়ে আপনার ক্ষোভ সামলে দেব। এই কাঠামোর ওপর ইসরায়েল বসে আছে এমন এক পরজীবীর মতো, যে আশ্রয়দাতাকে বোঝাতে পেরেছে, সে আসলে একটি অপরিহার্য অঙ্গ।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বাস্তবতা খুব দ্রুত বুঝে নিয়েছে এবং আগ্রহের সঙ্গেই সেই পথে এগিয়েছে। যেখানে অন্য দেশগুলো দ্বিধায় ছিল, সেখানে আবুধাবি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। যেখানে অন্যরা আড়ালে কথা বলেছে, সেখানে আমিরাত প্রকাশ্যেই বিনিয়োগ করেছে। আজ আমিরাত বন্দর, দ্বীপ, ভাড়াটে বাহিনী ও নজরদারির ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা কার্যত ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। ইসরায়েল দেয় ভাবনা, কৌশল ও প্রযুক্তি। আর আমিরাত দেয় জায়গা, অর্থ ও দায় এড়ানোর সুযোগ।

এই ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিকতা আর সরাসরি দখলের নামে আসে না। এটি ধীরে ধীরে ব্যবসার মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রয়োজন হলে একটি রাষ্ট্র ভেঙে ফেলা হয়, আর সেই ধ্বংস থেকেই তৈরি করা হয় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ। যতক্ষণ লাভ বাড়ে, ততক্ষণ এই প্রক্রিয়া থামে না।

তবে এই প্রকাশ্য সমন্বয়ের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ইসলামি ন্যাটোর গোপন জায়নবাদ। প্রকাশ্য জায়নবাদ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে, প্রতিবাদ জাগায়; কিন্তু গোপন জায়নবাদ আনুগত্য তৈরি করে। এটি প্রতিরোধকে এমনভাবে শান্ত করে যে কোনো সতর্কসংকেতই বাজে না। সাম্রাজ্যের প্রকল্পে এটি মুসলিম মুখ বসায়। বিরোধিতার জায়গায় আনে সংলাপ। বিশ্বাসঘাতকতার জায়গায় বসায় বাস্তববাদ। আত্মসমর্পণকে বলা হয় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। এটি হিব্রু ছাড়া জায়নবাদ। কম দৃশ্যমান; কিন্তু অনেক বেশি কার্যকর এবং তাই আরও প্রাণঘাতী।

পাকিস্তানের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে অশোভন। পাকিস্তান একটি পারমাণবিক মুসলিম রাষ্ট্র, যেখানে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনসমর্থন প্রবল। অথচ সেখানকার শাসকেরা বোর্ড অব পিসে বসেন, আর দেশের ভেতরে আইনজীবীদের কারাগারে পাঠান, কর্মীদের গুম করেন, ডিজিটাল রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করেন। এ কারণেই ইমরান খান কারাগারেও শাসকদের জন্য অস্বস্তির নাম। তিনি প্রকাশ্যে বা আড়ালে কখনোই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি হননি। এতে সাম্রাজ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক ছক ভেঙে পড়ে।

ফিলিস্তিনের প্রতি তার নিঃশর্ত সমর্থন এবং কাশ্মীর ও গাজাকে কোনো কূটনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় না বানিয়ে নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখার অবস্থান সেই ধারণাকে চূর্ণ করে দেয় যে মুসলিম জনগণকে চিরকাল প্রতীকী কথা আর ফাঁকা আশ্বাসে ব্যস্ত রাখা যাবে। এই অবস্থানই তাকে শাসকগোষ্ঠীর কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০২২ সালের এপ্রিলের শাসন পরিবর্তন কেবল ঘরোয়া রাজনৈতিক প্রকৌশল ছিল না। এটি ছিল আঞ্চলিক শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার অংশ। জায়নবাদ গ্লোবাল সাউথে কোনো ক্যারিশম্যাটিক অবাধ্যতাকে সহ্য করে না। সে দৃষ্টান্ত চায়। সে চায় সার্বভৌমত্বকে শাস্তি দিতে, যতক্ষণ না তা অচল হয়ে পড়ে।

এদিকে ইসলামি ন্যাটো ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিরোধিতা করে কোনো নীতিগত কারণে নয়; বরং ভয়ের কারণে। তারা জানে, সেখানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নিজেদের শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকাশ্যে চলে আসবে।

এই বিরোধিতা তাই ন্যায়বোধের নয়, হিসাবের ফল। তারা অস্থিরতাকে ভয় পায়। অবিচারকে নয়। ট্রাম্পবাদ আসলে শুধু সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা উদার সাম্রাজ্যবাদ একসময় আড়াল করে রাখত। এখানে আইনের চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অধিকারের চেয়ে চুক্তি। মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবানই মুখ্য। দেশের ভেতরে আইসের সন্ত্রাস আর দেশের বাইরে দমননীতি একই মানসিকতার প্রকাশ। নিরাপত্তা মানে আধিপত্য। শৃঙ্খলা মানে সহিংসতা।

এ প্রেক্ষাপটেই শেষ বিদ্রূপটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি ন্যাটো নিজেকে মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে তারা কখনো এত দুর্বল ছিল না। তারা চাইলে সম্মিলিতভাবে বোর্ড অব পিস প্রত্যাখ্যান করে পুরো উদ্যোগকে অকার্যকর করে দিতে পারত। তারা তা করেনি। তারা চাইলে গণহত্যার জন্য বাস্তব মূল্য আরোপ করতে পারত। তারা দিয়েছে কেবল বিবৃতি। তারা চাইলে নিজেদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারত; কিন্তু তারা বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটনকে।

ইতিহাস কারও প্রতি সহানুভূতিশীল হবে না। ইসরায়েল হত্যা চালিয়ে যাবে এবং সেটিকে আত্মরক্ষার নামে চালাবে। আমিরাত মুনাফা করবে এবং তাকে আধুনিকায়নের ভাষায় সাজাবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন ফুরোলেই মিত্রদের ফেলে দেবে এবং সেটিকেই নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরবে। পাকিস্তানের শাসকেরা দমননীতি চালু রাখবে এবং তাকে স্থিতিশীলতা বলবে। ইসলামি ন্যাটো নিয়মিত বিবৃতি দেবে এবং সামান্য নড়াচড়াকেই অগ্রগতি বলে ধরে নেবে।

তবু এই বিশ্বাসঘাতকতার কাঠামোর নিচে ধীরে ধীরে আরেকটি উপলব্ধি জন্ম নিচ্ছে। সার্বভৌমত্ব কাউকে ভাড়া দেওয়া যায় না। সংহতি অভিনয় করে দেখানো যায় না। ধ্বংসের পর যে শান্তির কথা বলা হয়, তা আসলে ভালো আলোয় সাজানো সহিংসতারই আরেক রূপ। সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে তখনই, যখন তাদের মিথ্যা মানুষকে আর অবশ করে রাখতে পারে না।

যখন শান্তি শব্দটি আধিপত্য হিসেবেই শোনা যায়। যখন অংশগ্রহণ মানে আত্মসমর্পণ বলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি ন্যাটো গড়া হয়েছিল ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে, তার জবাব দিতে নয়। সেই ব্যবস্থায় এখন ফাটল ধরেছে। এরপর যা আসবে, তা আলোচনার টেবিলে মিটবে না। তা হবে হিসাব চুকানোর সময়।

* জুনায়েদ এস আহমাদ, পরিচালক, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকোলোনাইজেশনের, পাকিস্তান
- মিডিল ইস্ট মিরর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ এই জোটের কেউই ইসরায়েল ও তার পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি।
সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ এই জোটের কেউই ইসরায়েল ও তার পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত শনিবার যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে ইরানও। তেহরান বলেছে, তারা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোসহ ওই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ‘প্রতিশোধ’ নিতে ইরান কী কী অস্ত্র ব্যবহার করেছে বা তাদের হাতে কী কী অস্ত্র আছে, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

এ যুদ্ধে ইরানের মূল অস্ত্র তাদের ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিরক্ষা–বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ও সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্রের বহর রয়েছে ইরানের হাতে। ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বহরটি এমনভাবে তৈরি যে দেশটির হাতে অত্যাধুনিক বিমানবাহিনী না থাকলেও তেহরানকে দূর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেয়।

ইরানি কর্মকর্তারা দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তাঁদের প্রতিরোধব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এর একটি কারণ দেশটির দুর্বল বিমানবাহিনী। ইরানের বিমানবাহিনীর হাতে থাকা যুদ্ধবিমানগুলো বেশ পুরোনো।

পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতায় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের একটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দুই থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর অর্থ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এবং তার বাইরেও পৌঁছাতে সক্ষম।

স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

শত্রুর ওপর শুরুতেই দ্রুত আঘাত হানতে স্বল্পপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দারুণ কার্যকর। এগুলোর নকশাই করা হয়েছে কাছের সামরিক নিশানায় আঘাত করার এবং দ্রুত আঞ্চলিক হামলা চালাতে।

ইরানের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ফাতেহ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র: জলফাগর, কিয়াম-১ ও পুরোনো শাহাব-১/২।

সংকটকালে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে। কারণ, এগুলো দিয়ে একযোগে হামলা চালানো যায়। এ ছাড়া প্রতিপক্ষ সতর্ক হওয়ার সময় কম পায়, ফলে সেগুলো আগাম প্রতিহত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

যদি স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রাথমিক অস্ত্র হয়, তবে মাঝারিপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রতিশোধকে’ আঞ্চলিক মাত্রায় দেয়। ইরানের মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দেড় থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

ইরানের হাতে থাকা মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হলো শাহাব-৩, এমাদ, ঘাদর-১, খোররামশাহর সিরিজ এবং সেজিলের মতো ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা। এগুলো ইরানের দূরবর্তী লক্ষ্যে আঘাত করার সক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করে।

পাশাপাশি আধুনিক নকশার খেইবার শেকান এবং হজ কাসেমও এই সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করেছে।

একসঙ্গে বিবেচনা করলে ইরানের মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে যায়। ফলে সেগুলো ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে যেতে পারে। এ সুবিধার কারণে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা এবং সেটিকে অনুসরণ করা প্রায়ই কঠিন হয়ে যায়—বিশেষত যখন এগুলো ড্রোন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে একযোগে ছোড়া হয়, তখন আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপে পড়ে যায়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা মূলত আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতেই করা হয়েছে।

বিস্তৃত সমীক্ষা অনুযায়ী, ইরান ভূমি ও জাহাজ লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে সক্ষম। ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সুমার, ইয়াআলি, কুদস সিরিজ, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’আদ।

সুমার ক্ষেপণাস্ত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে।

ড্রোন

ইরানের হাতে থাকা আরেকটি বড় অস্ত্র ড্রোন। এটি ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ধীরগতির, কিন্তু দামে সস্তা এবং একবারে অনেকগুলোকে উৎক্ষেপণ করা যায়। একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ঢেউয়ের মতো আঘাত হানতে ব্যবহার করা যায়।

একটার পর একটা ড্রোন যখন আসতে থাকে, তখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া ড্রোন হামলার মাধ্যমে বিমানবন্দর, বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সতর্ক অবস্থায় রাখা যায়। ক্ষেপণাস্ত্রের বেলায় যেটা সম্ভব নয়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধ গভীর হয়, তবে ড্রোন ব্যবহার করে হামলার কৌশল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’

যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষে মূল প্রশ্ন হলো—ইরান কতক্ষণ পর্যন্ত আঘাত সহ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম থাকবে।

তেহরান দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কয়েকটি অংশকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছে। তারা দেশজুড়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, লুকানো ঘাঁটি এবং সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্র তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতাকে দ্রুত দুর্বল করা কঠিন হবে।

হরমুজ প্রণালি: আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ ছাড়াই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি সম্ভব

ইরানের প্রতিরক্ষা যুদ্ধ কেবল ভূমিতেই সীমাবদ্ধ নয়; উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি ইরানের কৌশলগত যুদ্ধে এক বড় হাতিয়ার। নৌপথে বিশ্ববাণিজ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে তেহরান চাইলে দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, জলজ মাইন, ড্রোন এবং দ্রুত আক্রমণে সক্ষম নৌযান পাঠিয়ে ইরান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করে পারে।

এ ছাড়া ইরান নিজেদের ‘হাইপারসনিক’ সিস্টেম হিসেবে পরিচিত কিছু প্রযুক্তি, যেমন ফাত্তাহ সিরিজ প্রদর্শন করেছে, যা খুব উচ্চগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে; যদিও সেগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কিত তথ্য স্বাধীনভাবে তেমন একটা পাওয়া যায় না।

হরমুজ প্রণালি আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ ছাড়াও ইরান বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নামে যদি রেডিও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, তাহলেই তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এতে খরচ বাড়বে। পাশাপাশি যুদ্ধের ঝুঁকিবিমার খরচ বাড়াবে। সব মিলিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

বিপ্লবী গার্ড বলেছে, তারা তিনটি মার্কিন ও ব্রিটিশ তেলের ট্যাংকারে হামলা করেছে।

তেহরানের বার্তা: সীমাহীন যুদ্ধ

ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানের ভূখণ্ডে আক্রমণ করে, তা একটি সীমিত অভিযান হিসেবে নয়, বরং বিস্তৃত যুদ্ধের সূচনা হিসেবে গণ্য করা হবে। খামেনিকে হত্যার পর থেকে এ বার্তা আরও কঠোর হয়ে গেছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড আরও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ইরান একবারে বড় আঘাতের পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনার সংকেত দিচ্ছে। ইরান–সমর্থিত বিভিন্ন বাহিনীও এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

এ বছর ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে তেহরান অস্ত্র প্রদর্শন করে
এ বছর ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে তেহরান অস্ত্র প্রদর্শন করে। ছবি: রয়টার্স

ইরানে চীনের এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

তেলের বিনিময়ে অস্ত্র চুক্তির অধীনে চীনের কাছ থেকে এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছিল ইরান। কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় যেভাবে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান কার্যালয় সহ পুরো ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হচ্ছে, তাতে ওই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে- তাহলে কি ওই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না? নাকি এগুলোর কার্যকারিতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত বিমান হামলায় ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠেছে। উড়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এগুলো সম্প্রতি ইরান তার সামরিক ভাণ্ডার শক্তিশালী করতে সংগ্রহ করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এর আগে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়, পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার জবাবে চালানো অভিযানে পাকিস্তানে এইচকিউ-৯বি কাক্সিক্ষতভাবে লক্ষ্যবস্তু রক্ষা করতে পারেনি বলে অভিযোগ ওঠে। ইরানেও এর দুর্বল পারফরম্যান্স সামরিক বিশ্লেষকদের এইচকিউ-৯বি’র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই ব্যর্থতা ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দিতে পারে। আবার এটাও সম্ভব যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত বিমান শক্তি এইচকিউ-৯বি-নির্ভর অবকাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে চাপে ফেলে দিয়েছে। বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা শুরুর পর তড়িঘড়ি করে এটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

এইচকিউ-৯বি কেমন ব্যবস্থা?

চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (সিএএসআইসি) নির্মিত এইচকিউ-৯বি মূলত রাশিয়ার এস-৩০০ পিএমইউএবং যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট পিএসি-২ সিস্টেম দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও পরবর্তীতে এটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়। ২০০৬ সালে প্রথম পরীক্ষা করা হয় এবং গত এক দশক ধরে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পাল্লা প্রায় ২৬০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় উঠে উচ্চ-উচ্চতায় থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। সক্রিয় রাডার হোমিং এবং প্যাসিভ ইনফ্রারেড সিকার প্রযুক্তির কারণে এটি স্টেলথ বিমানের বিরুদ্ধেও কার্যকর বলে দাবি করা হয়। খবরে বলা হয়, এইচকিউ-৯বি একসঙ্গে ৬-৮টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে সক্ষম। চীনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বেইজিং, তিব্বত ও দক্ষিণ চীন সাগরে এই সিস্টেম মোতায়েন রয়েছে। ফলে এটি চীনের আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের একটি প্রধান অংশ।

ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারে এইচকিউ-৯বি’র ভূমিকা

উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইরান তার সামরিক ভাণ্ডার শক্তিশালী করতে শুরু করে। চীনের সঙ্গে ‘তেলের বিনিময়ে অস্ত্র’ চুক্তির আওতায় ইরান এইচকিউ-৯বি সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালের সংঘাতে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এস-৩০০পিএমইউ-২ দুর্বল পারফরম্যান্স দেখানোর পর এইচকিউ-৯বি ছিল ইরানের বড় আপগ্রেড। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইচকিউ-৯বি দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা স্তর গঠন করেছিল। এটিকে সহায়তা করছিল এস-৩০০পিএমইউ-২ ও বাভার-৩৭৩ (দীর্ঘপাল্লা), খোরদাদ-১৫ ও রাদ (মাঝারি পাল্লা), এবং স্বল্পপাল্লার তোর-এম২, প্যান্টসার-এস১, জোলফাকার ও কৌশলগত এমএএনপিএডিএস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। সম্ভবত নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্স, ফোরদো সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং তেহরান ও ইসফাহানের নিকটবর্তী বিমানঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চারপাশে এইচকিউ-৯বি মোতায়েন ছিল।

দ্রুত উত্তেজনা বৃদ্ধি

সপ্তাহ ও মাসব্যাপী উত্তেজনাপূর্ণ বাক্যবিনিময়ের পর শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন শহরে সমন্বিত হামলা চালায়। যার জবাবে তেহরান তীব্র প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টির বেশি, রাজধানী তেহরানসহ এই হামলার প্রভাব পড়েছে। হামলা ও পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রভাবিত হয়েছে। বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি দুবাই বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইরান সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মাধ্যমে তারা বার্তা দিয়েছে যে, শত্রুপক্ষের সঙ্গে অবস্থান নিলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হামলায় নিহত হয়েছেন এবং তেহরান ঘোষণা দিয়েছে তাকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণাত্মক অভিযান’ চালানো হবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খামেনিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে দুষ্ট ব্যক্তিদের একজন’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান যতদিন প্রয়োজন, ততদিন চলবে।

ইরানে চীনের এইচকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাত: ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পবিত্র রক্ত জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে শক্তি যোগাবে’

পার্সটুডে: ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী শহীদ হবার পর এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা এবং প্রতিরোধ সংগঠনরে নেতারা তাদের শোকবার্তায় ইরানের জনগণ এবং মুসলিম উম্মাহকে সমবেদনা জানিয়েছেন।

পার্সটুডে জানিয়েছে, ইয়েমেনের আসনারুল্লাহ আন্দোলনের রাজনৈতিক দফতর আজ এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় ইরানের সরকার ও জনগণকে সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি জানবাজি রেখে মার্কিন নেতৃত্বে শয়তানি শক্তি, জুলুমবাজ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে জিহাদ করে এসেছেন কিন্তু কখনো তিনি এই জিহাদ থেকে সরে দাঁড়াননি। তার এই চেতনা আমাদের সবার জন্য বড় শিক্ষা এবং সবসময় মুক্তিকামী মানুষের আশার প্রদীপ হয়ে ছিল এবং থাকবে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই পবিত্র রক্ত জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে শক্তি যোগাবে এবং আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হতে খুব দেরি নেই।  

আয়াতুল্লাহিল খামেনেয়ী ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রতীক ছিলেন: আম্মার হাকিম

ইরাকের ইসলামী বিপ্লবী উচ্চ পরিষদ বা সাইরি আন্দোলনের নেতা সাইয়্যেদ আম্মার হাকিম এক বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর শাহাদাতে মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বের সকল সত্যপথের অনুসন্ধানকারীদেরকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি তার বরকতপূর্ণ জীবনে ধর্ম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।

আম্মার হাকিম তার বিবৃতিতে আরো বলেন, কল্যাণ এবং হকের পথ চলা কখনো বন্ধ হবে না এবং শহীদ আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ধর্ম ও মানবতার খেদমতে যে পথ দেখিয়ে গেছেন তা চিন্তাশীল ও মুমিন মানুষের হৃদয়ে চিরকাল গেঁথে থাকবে।

ইরাকের সাদর আন্দোলনের নেতা মোক্তাদা সাদরও এক শোকবার্তায় আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর শাহাদাতের ঘটনায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহার কাছে এই বিপ্লবী নেতার জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান কামনা করছি। মোক্তাদা সাদর ইরাকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন। এরই মধ্যে নাজাফ, কারবালাসহ ইরাকের বহু শহরে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।   

'শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে মুসলিম উম্মাহর  ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখা যাবে না'

ফিলিস্তিন মুজাহেদিন আন্দোলন এই পবিত্র রমজান মাসে ইসরায়েল-মার্কিন সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি দশকের পর দশক ধরে মজলুম জনগণ বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন দিয়ে এসেছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী

ইরান কি মাথা নোয়াবে? by হামিদ দাবাশি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার যখন ঘোষণা করলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বড়সড় হামলা চালিয়েছে, ঠিক সেই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের ‘ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ আঘাতের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানে এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করা, তাদের পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সরকার বদলে দেওয়া।

ইতিমধ্যেই তেহরানে একের পর এক বিস্ফোরণের খবর মিলেছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের বাস বলে মনে করা হয়, সেখান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে।

বিশ্ব যখন ঘুম ভেঙে এই খবরে চোখ রাখছে, তখন নানা প্রচারমাধ্যম নিজ নিজ মতো করে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। (এই লেখাটি যখন প্রকাশিত হয়, তখনো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার সংবাদ ইরান সরকারের দিক থেকে নিশ্চিত করা হয়নি)

তবে ৯ কোটির বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রেখে চারটি কঠোর বাস্তবতা এখন সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

নির্মম আগ্রাসন

প্রথম বাস্তবতা হলো—মার্কিন সামরিক শক্তির উন্মুক্ত প্রদর্শন। আর এই শক্তি প্রদর্শনের নেতৃত্বে আছেন এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি দেশীয় (এপস্টিন ফাইল কেলেঙ্কারি), আঞ্চলিক (ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হানা দেওয়া অথবা অভিযাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করা) এবং বৈশ্বিক (চীন ও রাশিয়া-সংক্রান্ত টানাপোড়েন) ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এখন সবাই বলছেন, ইরানের সঙ্গে ভুয়া আলোচনার নাটক সাজিয়ে ট্রাম্প আসলে সময় ক্ষেপণ করছিলেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে কার্যকর আঘাত হানার সুযোগ তৈরি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই যুদ্ধকে মোটেও পছন্দ করছে না। অথচ করপোরেট গণমাধ্যম, বিশেষ করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এখন এই যুদ্ধকে ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ হিসেবে তুলে ধরতে ব্যস্ত। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সবাইকে বিশ্বাস করানো সহজ হবে না।

ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট

দ্বিতীয় বাস্তবতা হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেই। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল। দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক সংকটই ছিল সেই বিক্ষোভের মূল কারণ।

এই সংকটের পেছনে দুটি সমান্তরাল কারণ কাজ করেছে। এক—রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অদক্ষতা, এবং দুই—যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

কিন্তু এই রাজনৈতিক কৌশল আর ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে আটকে রয়েছে ৯ কোটির বেশি সাধারণ মানুষ। তারা যেন নিজেদের দেশেই বন্দী। তাদের জীবনই এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে।

গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে গৃহযুদ্ধের ভয় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জাতিগত বিভাজন আরও প্রকট হয়ে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতাই এখন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য—সবটাই এখন এক ভয়াবহ ও অযৌক্তিক আগ্রাসনের মঞ্চে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় কাঁপছে।

এই যুদ্ধ যদি সত্যিই ইরানের ‘সরকার বদলের’ লক্ষ্যে হয়, তবে তার অভিঘাত কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার ভার বহন করবে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। আর সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

ইসরায়েল: এক নির্মম হত্যাযন্ত্র

তৃতীয় বাস্তবতার নাম খোদ ইসরায়েল। অঞ্চলের সবচেয়ে মারাত্মক সামরিক শক্তিতে সমৃদ্ধ এই রাষ্ট্র।

এটি সদ্যই ফিলিস্তিনে লাখো মানুষের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানের ওপরও সামরিক হামলা চালিয়েছে তারা।

এই নতুন যুদ্ধপর্বে ইসরায়েলের একাধিক লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যে বিশ্বব্যাপী নিন্দা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে তারা নজর ঘোরাতে চায়।

দ্বিতীয়ত, তারা নিজেদের ‘গ্যারিসন রাষ্ট্র’ আরও বিস্তৃত করতে চায়। পুরো ফিলিস্তিন, লেবাননের কিছু অংশ, সিরিয়ার কিছু অঞ্চল, এমনকি তারও বাইরে পর্যন্ত গ্রাস করার পরিকল্পনা আছে তাদের।

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ইসরায়েলের এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই সবুজ সংকেত দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি মধ্যপ্রাচ্য দখলের মৌখিক অনুমোদন দিয়েই দিয়েছেন।

ইসরায়েলের হামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো—ইরানকে জাতিগত ভিত্তিতে ভাগ করে ফেলা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক ছোট ছোট অঞ্চল বা এনক্লেভে দেশটিকে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায়।

তবে ইসরায়েল কেবল ইরানকে ভেঙেই থামবে না। তুরস্ক ও পাকিস্তানও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে।

পাহলভিদের স্বপ্ন ও বিভ্রম

চতুর্থ বাস্তবতা হলো পাহলভি রাজবংশের অবশিষ্ট অংশের একধরনের বিভ্রান্ত ফ্যাসিবাদ। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ইরানিরা যাদের দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনকে উৎখাত করেছিল, সেই পাহলভি বংশের নেতা রেজা পাহলভি ক্ষমতা ফের দখলের স্বপ্ন দেখছেন।

পাহলভিদের ইরানের ভেতরে তেমন কোনো জনপ্রিয় ভিত্তি নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদী গুন্ডামি আর ইসরায়েলের রক্তাক্ত যুদ্ধনীতির সঙ্গে তাদের সখ্য—এটিই এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পরিচয়চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই শক্তিগুলোই এখন সংবাদমাধ্যম দখল করবে এবং বিশ্বকে বোঝাতে চাইবে—তাদের লড়াই ন্যায়ের পক্ষে।

ইরানিদের দাসত্বে বাঁধার পরিকল্পনা?

এখন সংবাদমাধ্যমগুলো নির্লজ্জভাবে মিথ্যা প্রচার করতে থাকবে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও বিবিসি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের মুখপাত্র হয়ে উঠবে। ইন্টারনেটের উন্মুক্ত জগৎ ভরে যাবে পাহলভি-সমর্থক বট ও ট্রলের প্রচারে।

এখন বিশ্বের নজর থাকা উচিত সেই ৯ কোটির বেশি মানুষের দিকে, যারা এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার উত্তরাধিকারী এবং যারা আজ এক নির্মম নিয়তির হাতে জিম্মি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ ইরানিদের শাসকদের হাত থেকে ‘মুক্ত’ করার জন্য নয়—বরং তা তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ করার কৌশল। এই প্রক্রিয়ায় পাহলভিরা দালালের ভূমিকায় নেমেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি। তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর স্বপ্ন পূরণে ধাপে ধাপে এগোতে প্রস্তুত।

* হামিদ দাবাশি, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে তেহরানের এক চত্বরে শোক প্রকাশে জড়ো হয়েছেন মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে তেহরানের এক চত্বরে শোক প্রকাশে জড়ো হয়েছেন মানুষ। ছবি: এএফপি

ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘নিরাপদ আশ্রয়’ ভাবমূর্তি ভেঙে পড়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবির মতো শহর এবং কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো, যেগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এর ফলে ‘নিরাপদ ও উন্মুক্ত’ হিসেবে দেশগুলোর দীর্ঘদিনের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তা বড় ধাক্কা খেয়েছে।

শনিবার দুই শ যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরানজুড়ে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। ধনী উপসাগরীয় দেশগুলো, যেগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব লক্ষ্য করে এসব হামলা চালায় ইরান।

মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্যেও দুবাইকে দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখা হতো। ইরানি ব্যবসায়ী, মার্কিন তারকা, রুশ ধনকুবের—সবার জন্যই এটি ছিল বিলাসী ও নিশ্চিন্ত জীবনের ঠিকানা। কিন্তু এবারের হামলার পর সেই ধারণা ভেঙে গেছে।

দুবাইয়ে পাঁচতারা হোটেলে আগুন লাগে, বিস্ফোরণে উঁচু টাওয়ারগুলোর জানালা কেঁপে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে চারজন আহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও আতঙ্কিত অভিবাসী শ্রমিকেরা রাতের আকাশে জ্বলন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যাওয়ার ভিডিও শেয়ার করেন, যেগুলো শহরের বিখ্যাত আকাশচুম্বী ভবনগুলোর পাশ দিয়ে উড়ে যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুধু আমিরাতেই ২০০টির বেশি ড্রোন এবং ১৩৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর বেশির ভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট করা হলেও ১৪টি ড্রোন আমিরাতের ভূখণ্ড ও জলসীমায় আঘাত হানে। প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শহরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে, এতে অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক সিনজিয়া বিয়ানকো বলেন, ‘এটি খুবই কঠিন ও গুরুতর মুহূর্ত। নিরাপত্তার এই ভাবমূর্তির চেয়ে তারা আর বেশি কিছু দিত না। সবার সঙ্গে ভারসাম্য রেখে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েই তারা গর্ব করত।’

নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা ধরে রাখতে দুবাই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু এবার কোনো উপসাগরীয় দেশই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রেহাই পায়নি।

এমনকি ওমানও—যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে আলোচনা মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছিল, সে দেশেও হামলা হয়েছে। ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, আরব সাগর–তীরবর্তী দুকম বন্দরের একটি আবাসিক এলাকায় ড্রোন আঘাত হানে, এতে একজন বিদেশি শ্রমিক আহত হন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর জনসংখ্যার বড় অংশই বিদেশি শ্রমিক। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। কুয়েতে একটি ড্রোন বিমানবন্দরে আঘাত হানে, এতে নয়জন শ্রমিক আহত হন। আবুধাবিতে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়ে একজন এশীয় নাগরিক নিহত হন এবং সাতজন আহত হন।

আরেকটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আবুধাবির ইতিহাদ টাওয়ারস কমপ্লেক্সের সামনে পড়ে। এই কমপ্লেক্সেই ইসরায়েলি দূতাবাস অবস্থিত। এতে এক নারী ও তাঁর সন্তান সামান্য আহত হন।

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার জানায়, দেশজুড়ে ছোড়া ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছে। কাতারে একটি বড় মার্কিন বিমানঘাঁটি রয়েছে।

দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনে, যেখানে মার্কিন নৌঘাঁটি রয়েছে, সে দেশের সরকার জানিয়েছে, তারা ৪৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৯টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রাজধানী মানামার কয়েকটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। সরকারি হাসপাতালগুলো জানিয়েছে, অন্তত চারজন আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

কয়েক সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছিল। কারণ তারা আশঙ্কা করছিল, সংঘাতের প্রভাব তাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। এসব দেশের অর্থনৈতিক মডেল মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল—যাতে মধ্যপ্রাচ্যে বিনিয়োগকারী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

ইরানের হামলার পর জেবেল আলী বন্দর থেকে উড়ছে ধোঁয়া। দু্বাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১ মার্চ ২০২৬
ইরানের হামলার পর জেবেল আলী বন্দর থেকে উড়ছে ধোঁয়া। দু্বাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১ মার্চ ২০২৬ ছবি: এএফপি