Friday, April 14, 2017

রাজধানীর অলিতে গলিতে মাদকের হাট by রুদ্র মিজান



দুপুর গড়িয়ে বিকাল। ব্যস্ততম গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক যুবক। এগুতেই একটি পলিথিন উঁচু করে ধরে এক যুবক জানতে চায় ‘মামা লাগবে?’ পলিথিনে আনুমানিক শতাধিক মরণনেশা ইয়াবা। ছোট কত আর বড় কত? যুবক বলে, ‘ছোটটা শট পড়ছে। চাহিদা বেশি। কালকে নতুন চালান আসবে। আজ বড়টা নেন। দাম কমে রাখতাছি। মাত্র ২২০ টাকা।’ বড়টা কিনতে আগ্রহ না দেখিয়ে তার নাম জিজ্ঞাসা করতেই যুবক বলে, ‘নাম দিয়ে কি করবেন। এখানে আসলেই পাবেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই যুবকের নাম সালাম। ওই এলাকায় তাকে চিনে উল্টা সালাম নামে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এভাবেই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মাদক। শুধু মোহাম্মদপুর না, রাজধানীর বাড্ডা, ভাটারা, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, গুলিস্তান, মতিঝিল, কাওরানবাজার রেলগেট, খিলগাঁও, রামপুরা এলাকায় প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে মাদক।
মোহাম্মদপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে বিভিন্ন মোড়ে। অভিযানও হয় মাঝে-মধ্যে। গ্রেপ্তারও করা হয়। তারপরও থেমে নেই মাদকের হাট। দিনে-রাতে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের অভিযান হয় ‘জাস্ট আইওয়াশ’। অনেক সময় মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের রক্ষা করার জন্য অভিযোগকারীকেও ফাঁসানোর ঘটনা ঘটে বলে জানান এলাকাবাসী। এখানে রয়েছে মাদকের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। পুলিশের পাশাপাশি  কখনও কখনও মাঠে নামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। দরিদ্র মানুষকে ব্যবহার করে একটি প্রভাশালী চক্র রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে তুলেছে মাদকের হাট।  মোহাম্মদপুরের এই এলাকায় মাদক ব্যবসায় জড়িত রয়েছে ৫ শতাধিক নারী-পুরুষ। মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইয়াবা এমন কোনো মাদক নেই যা এখানে পাওয়া যায় না। রয়েছে ‘হোম ডেলিভারি’র ব্যবস্থা। এমনকি মাদক সেবন করার জন্য নিরাপদ স্থানও রয়েছে এই চক্রের। ৫০ টাকা দিলেই সেই নিরাপদ স্থানে মাদক সেবনের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। এরকম ‘নিরাপদ’ একটি স্থানের নাম মার্কেট ক্যাম্পের পাবলিট টয়লেট। সরজমিন সেখানে গিয়ে আশপাশেই পাওয়া গেছে ফেন্সিডিলের খালি বোতল, ইয়াবা সেবনের আলামত। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, সিসি, টাউনহল, সিআরও, স্টাফ কোয়ার্টার ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির দৃশ্য। প্রতিদিনই এই হাটে কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মাদক বিক্রি হয়। যদিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন অর্ধকোটি টাকা মূল্যের মাদক বিক্রি হয় সেখানে। এসব এলাকা থেকে রাজধানীর বিভিন্নস্থান ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে মাদক।
পরিচয় গোপন করে খুচরা মাদক বিক্রেতা বেজি নাদিম, উল্টা সালাম, কামরানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করেই এখানে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়। পরিচিত ক্রেতাদের হোম ডেলিভারি দেয়া হয়। ফোনে অর্ডার করলে পৌঁছে দেয়া হয় যথাস্থানে। এছাড়াও ক্রেতাদের দেখলেই চোখে-চোখে তাকান বিক্রেতারা। এ রকমই দুই তরুণকে দেখে চোখে চোখ রাখলেন মধ্য বয়সী এক  লোক। ওই ব্যক্তিসহ তিনজন বসে গল্প করছিলেন মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সংলগ্ন জেনেভা ক্যাম্পের ফুটপাতে। চোখে চোখ রাখতেই দুই তরুণের একজন এগিয়ে যান। তারপর কাছাকাছি যেতেই জানতে চান, মামা লাগবে? তরুণ মাথা নাড়ান। বিক্রেতা যুবক ইয়াবার নাম ধরে জানতে চান, কোনটা লাগবে আর সেভেন নাকি চম্পা? তরুণ আস্তে করে কিছু একটা বলেন। তারপর একটি পলিথিনের প্যাকেট এগিয়ে দেয়া হয়। তরুণ ক্রেতা মানিব্যাগ বের করে টাকা দেন। একইভাবে মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডের পাশেই এক গলিতে ঢুকতেই দেখা গেছে, পলিথিনে মোড়ানো ইয়াবা হাতে এক যুবক ক্রেতার হাতে তুলে দিচ্ছেন তা। সেখানে ঢুকতেই জানতে চাওয়া হয় কোথায় যাব। মাদকের এই হাটে মাদক বিক্রেতাদের নিরাপত্তার জন্য তাদের আশপাশে থাকে তাদের লোকজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউকে দেখলেই খবর পৌঁছে যায় মাদক বিক্রেতাদের কাছে। পাল্টে যায় পরিবেশ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় ওই এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়। ওই চক্রটির সঙ্গে জড়িত রয়েছে পাঁচ শতাধিক খুচরা মাদক বিক্রেতা। বিভিন্ন সময়ে চক্রের খুচরা বিক্রেতা ও কয়েক পাইকারি বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আড়ালে থেকে  মোহাম্মপুর, লালমাটিয়া, মিরপুর এলাকায় মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে ইশতিয়াক, নাদিম ওরফে পঁচিশ, পাপিয়া, পাঁচু, তানভীর, শামীম ও রানী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য আশীর্বাদে পাপিয়া, পঁচিশ, পাঁচু ছাড়া উল্লেখযোগ্যরা গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের গ্রেপ্তার করতে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের হামলার শিকার হয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। একইভাবে তেজগাঁও রেললাইন এলাকায় ডালায় সাজিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে। এখানে প্রকাশ্যে ডেকে ডেকে বিক্রি করা হয় ইয়াবা, গাঁজা। ওই রেললাইন দিয়ে হাঁটলে কিছুক্ষণ পরপর একটি জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হয় ‘মামা লাগবে?’ সূত্রমতে, এখানে শতাধিক খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা মাদক বিক্রিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। ভয়ানক তথ্য হচ্ছে, নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও বিক্রি করছে মাদক। প্রায় সন্ধ্যায় রেললাইনে বসে মাদক বিক্রি করতে দেখা যায় মিনা, মাহমুদা, নীলা, জরিনা, সাথী নামে কয়েক নারীকে। পাশাপাশি আনোয়ার, সালাম নামে ১২-১৩ বছরের দুই শিশুকেও গাঁজা বিক্রি করতে দেখা গেছে। এ রকম অন্তত ৩০ শিশুকে মাদক বিক্রি করানো হচ্ছে ওই এলাকায়। সূত্রমতে, দেশের অভ্যন্তরীণ ৪৭টি রুটের যানবাহন ও ট্রেনে মাদক পরিবহন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, ঢাকায় ছয় শতাধিক মাদকের স্পট রয়েছে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে ১০০ স্পটের হিসাব রয়েছে। এরমধ্যে ৩০ স্পটে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হয়। এই মাদকের হাটগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাগজপত্রে।
রামপুরার উলন, মুক্তির গলিতে রূপা নামে এক নারী ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এক নেতার ছেলে, মতিঝিলের রাজউক ভবনের উল্টা দিকে রাস্তায় হারুন ও রুবেল এবং তাদের লোকজন, গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চ সংলগ্ন এলাকায় রাসেল, খিলগাঁও আমান উল্লাহ মার্কেটের ছাদে আজিজ ও মানিক এবং তাদের লোকজন, সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড ও দয়াগঞ্জ রেললাইনে ময়না, রাজু, মুন্নী, কমলাপুর টিটিপাড়ায় তালাশ, উত্তরার আশকোনায় জ্যোতি, জাবেদ, সুজন প্রকাশ্যে মাদকের হাট নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও হাজারীবাগের গণকটুলি, বনানীর সাততলা বস্তি এলাকা, করাইলবস্তি, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, বাড্ডার  মোল্লাপাড়ায় বাজার গলি, কবরস্থান রোডের পাঁচতলা এলাকার বড়টেক, আফতাবনগর, ভাটারা থানার খিলবাড়ীরটেক খালপাড়, নূরেরচালা, বৌবাজার, শাহজাদপুর, নতুনবাজার, ফকিরাপুল গরমপানির গলি, শান্তিবাগ ঝিল মসজিদ এলাকা, খিলগাঁও তিলপাপাড়া কালভার্ট এলাকায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে মাদক। এসব স্পট নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের অনেকেই সরকারি দলের পদ-পদবি ব্যবহার করছেন। তাদের কাছে প্রশাসনও অনেকটা জিম্মি। যে কারণে এসব মাদকের হাট বন্ধ হচ্ছে না কিছুতেই। এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, ঢাকায় বিভিন্নস্থানে অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি নিয়ন্ত্রণ করতে। আমাদের জনবল কম। তারপরও প্রায়ই অভিযান চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাদকব্যবসায়ীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। গত বছরের নভেম্বরে জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালাতে গিয়ে আমাদের লোকজন হামলার শিকার হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সক্রিয় বলে জানান তিনি।

অদ্ভুত রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ

রাজনীতি কী অদ্ভুত। কত কিছুই না বদলে যায়। এত দ্রুত। বছর চারেক আগে হেফাজতে ইসলামের উত্থান ছিল নাটকীয়। মূলত শাহবাগের কাউন্টার থেকেই কওমি ভিত্তিক এই সংগঠনের আবির্ভাব। ঢাকায় বিরাট শো-ডাউন করে চমক তৈরি করেছিল সংগঠনটি। সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে শাপলা চত্বর থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় হেফাজত। সংঘাতে রক্তাক্ত হয় ঢাকার রাজপথ।
কে না জানে, হেফাজতে ইসলামের প্রতি বিএনপির সমর্থন ছিল প্রকাশ্য। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়েই দলটির নেতাকর্মীদের হেফাজতের পাশে দাঁড়াতে বলেছিলেন। সে আহ্বানে বিএনপির কয়জন নেতাকর্মী সাড়া দিয়েছিলেন সে বিতর্ক আলাদা। হেফাজতের অনেক নেতাও ছিলেন খালেদা জিয়ার জোটভুক্ত। যদিও সে নেতাদের সংখ্যা এখন কমে এসেছে। বিএনপিকে এ নিয়ে দেশি-বিদেশি চাপও মোকাবিলা করতে হয়েছে। হেফাজত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত পরামর্শকদের সঙ্গেও একপর্যায়ে দূরত্ব তৈরি হয় খালেদা জিয়ার।
হেফাজতে ইসলামের প্রতি সরকারের নীতি অবশ্য পাল্টাতে থাকে ধীরে ধীরে। ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে সমঝোতা প্রক্রিয়া। কর্মকর্তা আর নেতারা হেফাজত হেডকোয়ার্টারে ছুটেন দিনের পর দিন। সমঝোতা প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হেফাজত আমীর আল্লামা আহমদ শফির ছেলে আনাস মাদানী। ক্ষমতাসীনরা সাফল্যের সঙ্গেই ধীরে ধীরে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন ‘ইসলাম কার্ড।’ চাপ আর সমঝোতা প্রক্রিয়ায় বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের যোগাযোগ একেবারেই  কমে যায়। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কড়া সমালোচনার মুখেও হেফাজতের একাধিক দাবি পূরণ করে সরকার। পাঠ্যপুস্তকে আনা হয় পরিবর্তন। হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা চলে যায় ডিপ ফ্রিজে।
কওমি মাদরাসার শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতবিনিময়ের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের আলোচনায় এসেছে হেফাজত কার্ড। ওই অনুষ্ঠানে হেফাজত আমীর আল্লামা শফিও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানোর দাবি জানানো হয় আলেমদের পক্ষ থেকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খোলাখুলিভাবেই এ দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন ভোটের রাজনীতির সমীকরণ আর ইসলামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনীতি বিবেচনা করেই আওয়ামী লীগ এ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে। ইসলামপন্থিদের একটা অংশকে কাছে রাখতে চাইছে আওয়ামী লীগ। চমক অবশ্য এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। পরদিন বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কওমি মাদরাসার স্বীকৃতিতে খালেদা জিয়ার গায়ে জ্বালা ধরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সরকারের অবস্থানের সমালোচনাই করেছেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামপন্থিদের একের পর এক ছাড় দিচ্ছে। আর এটা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে আঘাত করছে বলে তিনি মনে করেন। রাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষক সলিমুল্লাহ খান অবশ্য মনে করেন, জামায়াতসহ ইসলামপন্থি কিছু দল নিয়ে বিএনপির জোট যে রাজনীতি করছে তা বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগ এ অবস্থান নিচ্ছে। এটাকে তিনি বিপজ্জনক বা আপস হিসেবে দেখতে রাজি নন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘বিএনপি জোটের রাজনীতি মোকাবিলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে  ইসলামপন্থিদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত যারা বাংলাদেশকে গ্রহণ করে, তাদের মিত্র করার বিষয়টি স্বাভাবিক। এটাকে ছাড় না বলে আমি উপলব্ধি হিসেবে বলবো। কারণ, মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির একটি ছিল সামাজিক সুবিচার। সেদিক থেকে দেখলে, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে অকারণে আহত করে রাজনৈতিক কোনো লাভ নেই এবং বুদ্ধির দিক থেকেও তা ঠিক নয়।’
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সরকারের কারো কারো মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাদের দলের এবং সরকারের অবস্থানের প্রতি সমর্থন রয়েছে। তারা মনে করেন, যারা সমালোচনা করছেন ভোটের রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রভাব নেই। ভোট তাদের নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হবে। বিএনপি-জামায়াত জোট আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যেসব সমালোচনা করে তা যে সঠিক নয়, তাও জনগণ বুঝতে পারবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কওমি মাদরাসার উচ্চশিক্ষার স্বীকৃতি দেয়া মানে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে কোনো আপস করা নয়। এটা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। জনগণের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি হেফাজতকে সন্তুষ্ট করেছে। হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ডয়চে ভেলেকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ওই মূর্তি সরিয়ে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমার ওপর আস্থা রাখেন, ভরসা রাখেন।’ আমরাও মনে করি তিনি মূর্তি সরিয়ে ফেলবেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, একটি মূর্তিকে কেন্দ্র করে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না। মাওলানা আজিজুল হক বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো আন্দোলন ছিল না। আমাদের আন্দোলন ছিল নাস্তিকদের বিরুদ্ধে। সরকারকে কেউ  ভুল বুঝিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে লাগিয়েছিল। কিন্তু সরকার তার ভুল বুঝতে পেরেছে। ভুল স্বীকার করেছে। বর্তমান সরকার উপলব্ধি করেছে, মুসলামনদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা ঠিক হবে না।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে যেসব নাটকীয় ঘটনা ঘটবে তার আভাস এরই মধ্যে দেখা যেতে শুরু করেছে। রাজনীতিতে প্রভাব থাকলেও হেফাজতে ইসলাম মূলত রাজনৈতিক সংগঠন নয়। ভোটেও তারা অংশ নেবে না। কিন্তু হেফাজত যেন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয় এবং বিএনপির সঙ্গে ভিড়তে না পারে সে বিষয়টিই নিশ্চিত করা হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। সরকারের ভূমিকায় হেফাজতের একটি অংশও সন্তুষ্ট। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি বিএনপির জন্য রাজনীতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। তবে সরকারের নীতি ভোটের রাজনীতির সমীকরণ কতটা বদলাতে পারে তা কেবল অবাধ এবং স্বচ্ছ নির্বাচনেই  বোঝা যাবে। বিশ্লেষকরা আরেকটি কথাও স্মরণ করছেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই- এ কথাটিই রাজনীতির একমাত্র শেষ কথা।
ওদিকে, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, তিনজন মন্ত্রী প্রথম আলোতে সরকারের বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। ভালো। মেনন, ইনু ভিন্ন দুটি দল করেন। তারা হয়তো মন্ত্রিসভায় কথা বলতে না পেরে পত্রিকায় লিখেছেন। তাদের নিয়ে আমার আপত্তি নেই। আপত্তি আসাদুজ্জামান নূরকে নিয়ে। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রী। নূরের  লেখার শিরোনাম- ‘নিরাপত্তার নামে নববর্ষের অনুষ্ঠান কাটছাঁট করা হলো  কেন? সেটা আমার বোধগম্য নয়’। আমার প্রশ্ন মাননীয় মন্ত্রী আপনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন? কাটছাঁট কেনো হলো এই প্রশ্নের জবাব আপনারই দেয়ার কথা সাধারণ মানুষকে। জানতে চাই, আপনি কার কাছে প্রশ্ন রাখছেন? তাহলে আপনি কি মন্ত্রিসভায় কথা বলার অধিকার রাখেন না? যদি না রাখেন তাহলে সে মন্ত্রিসভায় থাকবেন কেন? মন্ত্রী হয়ে আপনারা প্রশ্ন করলে আমরা সাধারণ মানুষ কি করবো? কার কাছে জানতে চাইবো?
প্রথম আলোতে লেখায় রাশেদ খান মেনন বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ের এসব ঘটনাপ্রবাহ এবং হেফাজতের সঙ্গে আপস অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, নিরাপত্তার নামে নববর্ষের অনুষ্ঠানে কাটছাঁট করা হলো কেন, সেটা আমার বোধগম্য নয়। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেছেন, দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটেছে। এতে রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন আছে বলে শঙ্কা হয়।