Saturday, February 21, 2015

বিদেশীদের কাছে ধরনা দিয়ে লাভ হবে না -১৪ দল

ক্ষমতাসীন ১৪ দলের নেতারা বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করছে, জনগণ তাদের সঙ্গে না থাকায় জোটটি শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে বিদেশীদের কাছে ধরনা দিচ্ছে। কিন্তু কোনো ধরনায় কাজ হবে না। কোনো বিদেশী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বিএনপি-জামায়াত পরাজিত হবে। এ সময় বিএনপির বিচ্ছিন্ন নাশকতা প্রচারণার দায়ে গণমাধ্যম মালিক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
বিএনপি-জামায়াত জোটের টানা অবরোধ-হরতাল, নাশকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে শুক্রবার রাজধানীতে ১৪ দলের গণমিছিলপূর্ব সমাবেশে তারা এসব কথা বলেন। এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানেও গণমিছিল করে দলের নেতাকর্মীরা। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জোড়া ট্রাকের অস্থায়ী মঞ্চে জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা অবস্থান গ্রহণ করেন। ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি ইউনিট থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশে জড়ো হন। গণমিছিলটি নূর হোসেন স্কয়ারের সামনে থেকে মুক্তাঙ্গন হয়ে প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট মোড়, মৎস্য ভবনের সামনে দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট হয়ে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনীতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে জোটের নেতাকর্মীদের কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতা মোহাম্মদ নাসিম স্বাধীনতাবিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার শপথ বাক্য পাঠ করান।
এর আগে গণমিছিলপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে নগর ১৪ দলের সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম, আওয়ামী লীগের মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, মাহবুবউল আলম হানিফ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুন্নাহার লাইলী, এমএ আজিজ, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, জেপির শেখ শহীদুল ইসলাম, ন্যাপের এনামুল হক, সাম্যবাদী দলের এমএ গনি প্রমুখ।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কিছু গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, কিছু কিছু গণমাধ্যম বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভাইয়েরা, আমরা যখন সন্ত্রাসীদের দমন করছি তখন আপনারা দু-একজন নাশকতাকারীর ছবি তোলেন। এগুলো টেলিভিশনে প্রচার করেন, রেডিওতে শোনান, পত্রিকায় ছাপান। সন্ত্রাসীরা যখন বোমা মারে, আপনারা (সাংবাদিক) জানেন কীভাবে? তাদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ আছে। আপনারা পুলিশকে না জানিয়ে গোপনে ছবি তুলে প্রচার করেন। মালিক (গণমাধ্যম), সম্পাদক ও সাংবাদিকসহ এসব জঘন্য অপরাধীরও বিচার হবে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সন্ত্রাসী দলের লোক আখ্যা দিয়ে সেলিম বলেন, সুশীল সমাজের কিছু লোক ও কিছু বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসের পক্ষ নিয়ে সংলাপের কথা বলছেন। তারা মূলত সন্ত্রাসী দলের লোক। এত রক্তের ওপর দিয়ে শেখ হাসিনা কোনো খুনির সঙ্গে সংলাপ করতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া কূটনীতিকদের কাছে কাঁদেন। আর বলেন, আমার কী হবে, আমার কী হবে। কোনো বিদেশী দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না।’ প্রত্যেকটা খুনের দায়ে খালেদা জিয়াকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বলেও উল্লেখ করেন সেলিম। এ সময় তিনি ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনেও অবরোধ দেয়ায় খালেদা জিয়াকে নাস্তিক বলে অভিহিত করেন।
আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, এতিমের টাকা মেরে খাওয়া খালেদা জিয়ার বাঁচার উপায় নেই। তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবেই হবে। ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান অমিত শাহের ‘মিথ্যা’ ফোনকল ও মার্কিন কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর জাল করায় বিএনপিকে তিনি ফোর টুয়ান্টি (পেনাল কোডের প্রতারণার ধারা) দল বলে মন্তব্য করেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, বিএনপি বিদেশীদের কাছে ধরনা দিচ্ছে তাতে কোনো লাভ হবে না। তারা পরাজিত হবেই হবে।
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, কঠিন এক সময়ে আমাদের সামনে কঠিন এক শত্রু আগুন সন্ত্রাসের নেত্রী খালেদা জিয়া। সুশীল সমাজের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা গণতন্ত্রের জন্য কান্নাকাটি করছেন, সংলাপের তদবির না করে খালেদা জিয়ার কাছে গিয়ে আগুনে মানুষ পোড়ানো বন্ধের তদবির করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করলেই বাংলাদেশ শান্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী।
মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, খালেদা জিয়া রাজনীতি থেকে আত্মহত্যা করেছে। তিনি এখন জঙ্গিবাদের নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আজ জনগণ ফুঁসে উঠেছে।
মিছিলপূর্ব সমাবেশে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন সংগঠনের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, বিএনপি জোটের নাশকতার বিরুদ্ধে আাগমী ৮, ৯ ও ১০ মার্চ সারা দেশে শান্তির সপক্ষে ও নাশকতার বিরুদ্ধে পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও রংপুরে তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করা হবে।
পরে মিছিল শেষে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করা এবং বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা প্রতিরোধ করতে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ করে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট।
গণমিছিলে সিটি নির্বাচনী আমেজ : এদিকে গণমিছিলে আসন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সম্ভাব্য মেয়র, কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজ নিজ নেতাকর্মীদের নিয়ে বড় ধরনের শোডাউন করেছে। তার মধ্যে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ খোকন, স্বতন্ত্র এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম, আসলামুল হক আসলাম এমপির শোডাউন ছিল দেখার মতো। এছাড়া ঢাকা এমপি অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সংরক্ষিত নারী আসনের সানজিদা খানম, সাবিনা আক্তার তুহিনের নেতৃত্বে মিছিল ছিল দৃষ্টিনন্দন। পিছিয়ে ছিলেন না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। ওমর ফারুক চৌধুরী ও হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় যুবলীগ, মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওসারের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, নাজমা আক্তার ও অপু উকিলের নেতৃত্বে যুব মহিলা লীগ মিছিলে অংশ নেয়। এছাড়া ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি চৌধুরী আশিকুর রহমান লাভলুর নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিল ছিল চোখে পড়ার মতো। জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, এছাড়া ১৪ দলের জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, তরিকত ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন এতে অংশ নেয়।
সারা দেশ : বিভিন্ন স্থান থেকে যুগান্তর ব্যুরো, স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বরিশাল : বিকালে নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে সমাবেশ করে ১৪ দল। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস এমপির সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ১৪ দল নেতা টিপু সুলতান এমপি, জাহিদ ফারুক শামিম, আফজালুল করিম, আবদুল হাই মাহাবুব, শান্তি দাস, দাসগুপ্ত আশীষ কুমার প্রমুখ। পরে একটি গণমিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
কিশোরগঞ্জ : বিকাল ৫টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বের হয়। মিছিল শেষে কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
খুলনা : বিকালে খুলনায় সমাবেশ ও গণমিছিল করেছে ১৪ দলীয় জোট। রূপসা ট্রাফিক স্ট্যান্ডে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য তালুকদার আবদুল খালেক। পরিচালনা করেন ১৪ দলের সমন্বয়ক এমপি মিজানুর রহমান মিজান। বক্তৃতা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ ও সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা, জাসদের রফিকুল হক খোকন, মো. খালিদ হোসেন, ন্যাপের ফজলুর রহমান প্রমুখ।
সিলেট : বিকালে নগরীর কোর্ট পয়েন্ট থেকে মিছিল শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌহাট্টা পয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুজ জহির চৌধুরী সুফিয়ান, সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, জেলা জাসদের সভাপতি কলমদর আলী প্রমুখ।

একুশের আন্তর্জাতিকতার স্বপ্নদ্রষ্টা by মোহাম্মদ আলী বোখারী

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এমনই একটি দিন, যে দিনটিতে মাতৃভাষায় সবার জন্য মানসম্মত ও বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষা প্রসারের পতাকাকে সুউচ্চে তুলে ধরতে হবে। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভার এ দিবস উপলক্ষে তার বাণীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাস্তবায়নের গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন। এ দিবসের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক ভূষিত কানাডার 'মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি বিসি'র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রফিকুল ইসলামও (প্রয়াত) নানাভাবে এ প্রসঙ্গ তুলেছেন। গত ১৫ বছরে তার সে স্বপ্ন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
যে প্রতিষ্ঠানটি তিনি গড়েছেন, সেটির বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম মওলা ২০০৯ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের বেয়ার ক্রিক পার্কে হেরিটেজ ইন্টার‌্যাকটিভ ল্যাংগুয়েজ আর্ট ওয়ার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত 'লিঙ্গুয়া আকুয়া' বাস্তবায়নে সবিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। এ বছর তিনি দিবসটির জন্য প্রাদেশিক সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বয়ে আনলেন। ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুজাতিকতা এই প্রদেশকে বিকশিত করেছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও মর্যাদা হচ্ছে কানাডীয় জীবনযাত্রার নিয়ামক উপাদান। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সম্মানজনকভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের মাধ্যমে আদিম ভাষাভাষী ও আবহমানকাল ধরে বিস্তৃত অপরাপর ভাষার সুরক্ষায় নেতৃত্ব দিতে পারে। কেননা, বিশ্বের বিগত প্রজন্মের সাড়ে ৬ হাজার ভাষার অধিকাংশই আজ বিলুপ্তির পথে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত অ্যাশফিল্ড হেরিটেজ পার্কে ২০০৬ সালে একুশে একাডেমির তৎকালীন সভাপতি নির্মল পালের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বিশ্বের প্রথম 'আন্তর্জাতিক ভাষা সৌধ'। এ বছর তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অস্ট্রেলিয়ান লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন অ্যাসোসিয়েশন-'আলিয়া'র গুরুত্বপূর্ণ মুখপত্র 'ইনসাইট'-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় 'কনজার্ভ ইওর মাদার ল্যাংগুয়েজ' বা 'আপনার মাতৃভাষা সংরক্ষণ করুন' শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশে সক্ষম হয়েছেন। টরন্টো শহরেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে কোনো কমতি ঘটেনি। ২০০৩ সাল থেকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফলে ২০০৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সিটি মেয়র ডেভিড মিলার কর্তৃক প্রোক্লামেশন প্রদান ও প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রিমিয়ার ডাল্টন মেগেন্টি এবং প্রাদেশিক অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় সহকারী তৎকালীন লন্ডন-ফেনসোঁর সাংসদ ড. খলিল রামাল কর্তৃক একটি বিবৃতি প্রদানে সক্ষম হয়েছি। এমনকি সে বছরের একুশের একটি অনুষ্ঠান স্থানীয় চারটি বাংলা সাপ্তাহিকী_ বাংলা রিপোর্টার, দেশে-বিদেশে, বাংলা কাগজ ও বাংলা নিউজের সহযোগিতায় ও বহুজাতিক সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহণে মেট্রো হলে আয়োজনে সফল হয়েছি।
এভাবেই একুশের আন্তর্জাতিকতার স্বপ্নদ্রষ্টা রফিকুল ইসলামের প্রচেষ্টাটি সারাবিশ্বে অর্থবহ প্রাণচাঞ্চল্য সঞ্চার করেছে এবং সবার জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্বকে সর্বজনীন মৌলিক অধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। স্বয়ং পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ওয়েব ইঞ্জিন 'গুগল' তাদের 'দ্য এনডেঞ্জার্ড ল্যাংগুয়েজেস প্রজেক্ট'-এ ৩,০০০ ভাষার সুরক্ষায় 'প্রিজার্ভ ল্যাংগুয়েজেস অন দ্য ব্রিঙ্ক অব ডিসঅ্যাপিয়ারিং' হিসেবে মুখ্য প্রতিপাদ্য করেছে। এমনকি যে পাকিস্তান থেকে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন, সে দেশটিতেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন গুরুত্ব লাভ করেছে। তাই নিয়ে ২০১৪ ও ২০১২ সালে পাকিস্তানের ইংরেজি পত্রিকা ইন্টারন্যাশনাল নিউজ ও ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন যথাক্রমে 'আওয়ার ল্যাংগুয়েজ ট্র্যাজেডি' ও 'ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাংগুয়েজ ডে :গিভ ন্যাশনাল স্ট্যাটাস টু অল রিজিওনাল ল্যাংগুয়েজেস' শিরোনামে জোবায়ের তরওয়ালি এবং মায়রা বারী ও পীর মুহাম্মদ রচিত দুটি পৃথক নিবন্ধ প্রকাশ করে।
ভাষার এই মহান মাসে আমরা যেন ভুলে না যাই কানাডার সেই প্রয়াত স্বপ্নদ্রষ্টাসহ তার অন্যতম সহযোগী আবদুস সালামকে, যাদের ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রয়াসে মহান একুশ তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বিলুপ্তপ্রায় পৃথিবীর সহস্রাধিক ভাষাকে দিকে দিকে সুরক্ষা ও পুনরুজ্জীবিত করে চলেছে। সে জন্য রফিকুল ইসলামের বিদেহী আত্মার প্রতি রইল অসীম শ্রদ্ধার্ঘ্য।
bukhari.toronto@gmail.com

সবার আগে চাই একটি ভাষানীতি by সৌরভ সিকদার

বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের বর্তমান মনোভাব, প্রাত্যহিক জীবনে বাংলা ভাষার প্রয়োগ এবং তার দুরবস্থা, সেই সঙ্গে ভাষার প্রতি আমাদের একমাসের ভালোবাসা নিয়ে গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে দৈনিক পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলাম। তার শিরোনাম ছিল_ 'আমি একমাস তোমায় ভালোবাসি'। লেখাটির মূল বক্তব্য ছিল ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং তাকে রক্ষার যে অসাধারণ দৃষ্টান্ত বাঙালিরা রেখেছিল তা ম্লান হতে হতে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে, ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের ভাষায় বলতে হয়_ 'কত বেশি টাকা হলে বাঙলাকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে?' আমরা জানি_ বিশ্বায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন, ইংরেজি ও হিন্দির আধিপত্য একুশ শতকের বাংলাদেশের নাগরিক বাস্তবতার এক অনিবার্য সত্য।
আমরা না চাইলেও প্রতিনিয়ত আমাদের বসার ঘরে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি সেই সঙ্গে ইংরেজি-হিন্দি উঁকি-ঝুঁকি মারে। কিন্তু সেই উঁকি-ঝুঁকি যখন শোবার ঘরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তা মোটেও সহজ করে নেওয়া যায় না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা শোবার ঘরটাও ক্রমশ ছেড়ে দিতে যাচ্ছি। নিজের ভাষা সংস্কৃতিকে যে বিশ্বায়ন আর বহুজাতিক আকাশ সংস্কৃতির ইবোলা ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন, সেই বোধও আমাদের লুপ্ত হতে বসেছে আজ।
তা না হলে যে শব্দ, যে উচ্চারণভঙ্গি, যে বাক্য গঠন বাংলা ভাষার নয় অথবা বাংলা ভাষায় যার কোনো প্রয়োজনই নেই, সেই অপ্রয়োজনীয় অথবা অযাচিত ভাষা সংস্কৃতির আগ্রাসনে কেন আমাদের পড়তে হবে? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা সম্ভবত বাংলা-ইংরেজির এক অদ্ভুত মিশেলে বকবক করে চলে আমাদের এফএম বেতার কেন্দ্রগুলো। গত বছর ঈদের সময় মুক্তি পাওয়া ১১টি বাংলা ছবির মধ্যে ১০টির নাম ছিল ইংরেজিতে; একই সময় টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রদর্শিত দুই শতাধিক নাটকের অর্ধেকের বেশি নাম ছিল ইংরেজি, সঙ্গীত আর বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের কথা নাইবা বললাম। কেননা আমাদের টিভিতে কোনো সঙ্গীত হয় না, তবে প্রতিদিন কোনো না কোনো 'মিউজিক্যাল প্রোগ্রাম' হয়। এ জন্যই সম্ভবত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ভাষাদূষণকে নদীদূষণের সঙ্গে তুলনা করে কয়েক বছর আগে একটি অসাধারণ লেখা লেখেন। এই লেখাটি আদালতের দৃষ্টিগোচর হয় এবং তারা সরকারকে বাংলা ভাষার 'সম্ভ্রম' রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়। বাকি ইতিহাস আমাদের সবার জানা।
দু'বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বাংলা ভাষার 'বিশুদ্ধতা' রক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। পরবর্তীকালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেও একই ধরনের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রমিত বাংলা, শুদ্ধ বানান ও বাংলায় নোট লেখার বিষয়ে কোষ গঠন করেছে, এ কমিটিগুলো আদৌ কার্যকর কিনা? তারা কী ধরনের সুপারিশ ও কার্যক্রমের প্রস্তাবনা করেছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র্র কিংবা মন্ত্রণালয় বাস্তবমুখী কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আমাদের আজও জানা হলো না।
লক্ষ্য করার বিষয়, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমাদের গণমাধ্যম, মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা সবাই মিলে বাংলা ভাষার করুণ দশা দেখে শুধুই দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকেন। অথচ অন্য সময় এই আমরা সবাই মিলে ভুলেই থাকি একুশের শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন দেশ, বাংলা ভাষা, দুঃখিনী বর্ণমালার কথা।
বাংলা ভাষার নানা বিকৃতি অসঙ্গতি, অপ্রয়োজনীয় মিশ্রণ, এমনকি ইংরেজি-হিন্দির ঢঙ্গে বাংলা বাক্য গঠন ও উচ্চারণ সে তো লেগেই আছে। সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত বিশেষ শ্রেণী জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি, কখনোবা হিন্দির ব্যবহারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আপনি কি জানেন আপনার সন্তান বিদ্যালয়ে তার বন্ধুর সঙ্গে ইংরেজি কিংবা হিন্দিতে কথা বলাকে মর্যাদার মনে করে। বাংলা ভাষার প্রতি তার মনে ভালোবাসা তৈরি করতে পরিবার অথবা বিদ্যালয় কিছু করেছে? রাষ্ট্র কি ভেবে দেখেছে তারও কিছু করার ছিল? যে মায়ের ভাষাকে ভালোবাসতে শেখেনি সে দেশকে কীভাবে ভালোবাসবে?
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হচ্ছে, ক্রমে ক্রমে বাংলার পরিবর্তে রোমান হরফ জায়গা দখল করে নিচ্ছে আমাদের চারপাশে। আবাসন কোম্পানির জায়গা দখলের মতো। এই তো মাত্র ক'দিন আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে আমাদের জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে ছবি নিয়ে দারুণ এক আন্তর্জাতিক মেলা হলো। মেলার নামটিও চমৎকার বাংলায় 'ছবিমেলা'। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মেলার পোস্টার এমনকি মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যানারেও অনেক বড় করে রোমান হরফে 'ছবিমেলা' লেখা হয়েছিল। সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হওয়া বহুজাতিক বিজ্ঞাপনে, রাস্তায় টাঙানো বড় বড় বিজ্ঞাপন ফলকে আজকাল প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে রোমান হরফের আধিক্য। এমনকি বাংলাদেশি চা কিংবা আলকাতরার ঘাড়েও ভর করেছে ঔপনিবেশিক ভূত। চানাচুর তো অনেক আগেই খাওয়া হয়েছে, সম্প্রতি ঝালমুড়িও খাচ্ছে রোমান হরফ।
এই তো আশির দশকেও ভারতের অপর্ণা সেন বাংলাদেশে পা দিয়ে চারদিকে বাংলা বর্ণমালার প্রসার দেখে অভিভূত হয়ে বলেছিলেন, 'বাংলা ভাষার কদর এখন শুধুই বাংলাদেশেই।' আজ ৩০ বছর পরে আমাদের চারপাশ এবং ঘরে-বাইরে তাকিয়ে আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না প্রিয় বাংলা ভাষা, প্রিয় বর্ণমালা আমি তোমায় ভালোবাসি।
বাংলা ভাষার অনুরাগী একজন পাঠক ও গবেষক হিসেবে বলতে পারি, ভাষা জোর করে কিংবা নদীর মতো বাঁধ দিয়ে আটকিয়ে রাখা যায় না সত্য। মুখের ভাষা নানা কারণে বদলাতেই পারে। বিশ্বায়ন, পণ্য ও সংস্কৃতির কারণে ইংরেজি কিংবা হিন্দি আসবেই। কিন্তু যে ভাষার সঙ্গে আমাদের মহান ত্যাগ, ঐতিহ্য এবং আবেগ জড়িয়ে আছে তার প্রতি অবহেলাও এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ অসম্মান গ্রহণ করতে পারি না। আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের কথা বলি, কিন্তু যেটুকু প্রচলিত আছে তার যে শুদ্ধ কিংবা প্রমিত রূপ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি কম। শিক্ষার মাধ্যম আর অভ্যন্তরীণ পণ্যের বাণিজ্যিক বিনিময়ে বাংলা অনিবার্য কেন হবে না, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনে অকারণ ইংরেজি কেন আমাদের মুখ ঢেকে দেবে, এ প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে। রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। উন্নত বিশ্বের কথা বাদই দিলাম, আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলংকায় ভাষা কমিশন রয়েছে, এমনকি ভাষানীতিও। বাংলাদেশে যুগোপযোগী শিক্ষানীতি আছে, নারীনীতি আছে; কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও ভাষা আন্দোলনের এই পুণ্যভূমিতে কোনো ভাষানীতি হয়নি। সময়, প্রকৃতি ও সভ্যতার নিয়মে ভাষা বদলাতেই পারে; কিন্তু রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব থেকে একটি ভাষানীতি দিতে পেরেছে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার উদ্যোগে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়েছে, আপনি আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট দিয়েছেন; এ বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা কি আপনার কাছে একটি ভাষানীতি কিংবা কার্যকর একটি ভাষা কমিশন প্রত্যাশা করতে পারি?
অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
murshedsm@du.ac.bd

একুশের অঙ্গীকার by মাতিয়া বানু শুকু

আমার প্রথম পরিচয় আমি বাঙালি। বাংলা ভাষাভাষী মা-বাবার সন্তান। জন্মসূত্রে আমার একটি ধর্ম আছে, একটি দেশ আছে, একটি ভাষা আছে। সামাজিক সূত্রে ধর্মীয় দিন, আনুষ্ঠানিকতা পালন করি। মুক্তি সংগ্রামের বিজয় সূত্রে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করি। উজ্জ্বল এক ইতিহাসের সূত্রে ভাষারও একটি বিশেষ দিন ও আনুষ্ঠানিকতা আমার আছে_ একুশে ফেব্রুয়ারি, সেটা পালন করি। ভাষার জন্য লড়াই করা শহীদদের স্মরণে স্মৃৃতিসৌধে ফুল দিই, মাথা নুইয়ে সেসব বীরকে শ্রদ্ধা জানাই। তারপর মাথা উঁচু করে গর্বের সঙ্গে একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে বলি_ মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।
আমার দ্বিতীয় পরিচয়, ভাষার জন্য লড়াই করা সেই সাহসী বীরদের একজন ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিন আমার বাবা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি অসহযোগ আন্দোলনের সেই বিশেষ দিনে তিনি প্রাণ হারাননি। পরবর্তী তেষট্টি বছর তার সহযোদ্ধা ভাইদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে তার প্রাণবন্ত পদচারণা ছিল। ছিল স্মৃৃতিচারণা। আর ছিল, তাকে ঘিরে অসংখ্য অনুরাগী আর মিডিয়া কর্মীদের উন্মাদনা। এই প্রথমবারের মতো ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিন শহীদ মিনারে আর বইমেলায় পা রাখবেন না। এই প্রথমবারের মতো আমাদের বাড়িতে নেই অসংখ্য মানুষের আনাগোনা। এই প্রথম ফেব্রুয়ারি মাস, যার ২০টা দিন পার হয়ে গেলেও কেউ আমার মাকে জ্বালাতন (স্মরণ বলছি না) করতে আসেননি। কারও প্রয়োজন পড়েনি। কারণ ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিন আর নেই। নাকি এই অল্প ক'দিনেই ভুলে গেছেন সবাই। যেতেই পারেন। বাঙালি সহজে বিস্মৃৃতিপ্রবণ এক জাতি।
এটা আমার দীর্ঘশ্বাস নয়; ভয়। ভয় হয়, এই বিস্মৃৃতিপ্রবণ জাতি খুব সহজে নিজেকে ভুলে যাবে না তো! প্রয়োজন নেই বলে নিজের ভাষা, মাতৃভাষাটাকে হারিয়ে ফেলবে না তো!
আমার তৃতীয় পরিচয়, সাধু-শান্তি-অগি্ন তিনটি ফুটফুটে শিশুর মা আমি। আমার ভয়ের শুরুটা এখানে। আমার ৩ বছরের অগি্ন ভালোমতো কথা বলতে শেখেনি, কিন্তু 'ফাইভ লিটল মাঙ্কি, জাম্পিং অন দ্য বেড' বলতে শিখেছে। আমার ৫ বছরের শান্তি বলে, 'মা, তুম আচ্ছা হো।' আমার ১০ বছরের ছেলে সাধু ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে যায় বলে, তার পাকিস্তানি আর শ্রীলংকান বন্ধু আছে। সে আর তার বন্ধুরা ইংরেজিতে উইক। তাই কমন ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দিতে কথা বলে। এই তিনজন টেকনো-ডিজিটাল শিশু ইংরেজি, হিন্দি, উর্দুর্র পাশাপাশি রাশিয়ান, স্প্যানিশ আর জাপানি ভাষাও অনেক ভালো বোঝে, কম্যুনিকেট করতে পারে। অবশ্যই সেটা ইউটিউব আর ইন্টারনেটের কল্যাণে। এমন একাধিক ভাষায় দক্ষ সন্তানদের মা হয়ে আমার গর্বিত হওয়ার কথা। কিন্তু আমি সেটা হতে পারি না। যখন দেখি সাধু তার বাংলা বই খুলে 'অর্ধচন্দ্র' উচ্চারণ করতে না পেরে জানতে চায়_ 'মা, এর প্রনানসিয়েশন কী!' তখন বুকের ভেতরে ধক করে ওঠে। কী সর্বনাশ! আমার পরের প্রজন্ম শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে দেবে না তো?
আমি নড়েচড়ে বসি, সচেতন হই। আমার শৈশবে ফিরে তাকাই। ৪ বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন ভোরবেলা শিশিরভেজা ঘাসে নগ্ন পা রেখে, ফুল হাতে শহীদ মিনারে গিয়েছিলাম। সেদিন মায়ের মুখে শুনলেও ভালোমতো বুঝতে পারিনি_ একুশে ফেব্রুয়ারি কী, ধীরে ধীরে জেনেছি। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনের বিশেষ আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে করতে ইতিহাস আর নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসাটা প্রগাঢ় হয়েছে। আমার বাবা সেই গর্বিত ইতিহাসের অংশ বলে জেনেছি, শুনেছি অন্যদের চেয়ে বেশি। একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই ছিল বাবার হাত ধরে বইমেলা যাওয়া, ঢাকা মেডিকেলের সেই ঐতিহাসিক আমতলা ঘুরে আসা। ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক চাচার বাসায় যাওয়া। ভাষাসংগ্রামী ড. আহমদ রফিক চাচাসহ আরও অনেকে আসতেন আমাদের বাড়িতে। হতো আলোচনা-সমালোচনা, উৎসবের আমেজে। নিজে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্রী, ২০ ফেব্রুয়ারি রাত মানেই শহীদ মিনারে আল্পনা এঁকে রাত ১২টা ১ মিনিটের জন্য অপেক্ষা করা। তার পর সাদা-কালো শাড়ি পরে পুরো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটা জুড়ে বইমেলা, ভাষা উৎসব আর কবিতা উৎসবে ঘুরে বেড়ানো।
আজ ২০১৫-এর ২১ ফেব্রুয়ারির আগের রাতে বাবাকে মনে পড়ছে খুব। অন্য একুশে ফেব্রুয়ারির দিনগুলো বাবাকে যত না কাছে পেয়েছি; আজকে মনে হচ্ছে তার চেয়েও বেশি কাছে আছেন তিনি। কত আফসোস মনের মধ্যে_ কেন বাবার সঙ্গে ভালো একটা ছবি তুলে রাখিনি! কেন বাবাকে দিয়ে অনেক কিছু লিখিয়ে রাখিনি! কেন তাকে নিয়ে একটা ভালো ডকুমেন্টারি বানিয়ে রাখিনি (যখন আমি নিজেই মিডিয়া কর্মী)! খুব কাছে ছিলাম বলে কোনোদিন বাড়তি খেয়াল করিনি, কী দুঃসাহস ছিল লোকটার! অর্থ-সম্পত্তি বা ক্ষমতার লোভে নয়; শুধু মায়ের মুখের ভাষার দাবিতে ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষুর সামনে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। বাঙালি জাতিসত্তার প্রতি বিশ্বাস রেখে ভাষার লড়াইয়ে এক হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন ছাত্র-বন্ধুদের। মৃত্যু অবধারিত জেনেও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সবাইকে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন।
ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিন সফল হয়েছিলেন ভাষার অধিকার আদায় করতে। কিন্তু শুধু ভাষাকে মুক্ত করার এই সাফল্যের অহমিকায় গা না ভাসিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন রাষ্ট্রের মুক্তির আন্দোলনে। আস্থা রাখলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে। এই আদর্শে অনুপ্রাণিত দলভুক্ত থেকেই দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে নামলেন। আজীবন যোদ্ধা এই লোকটাকে নিজ দলের ভেতরে থেকে ভুল নীতিমালার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করতে হয়েছে, একই সময়ে। সেখানে সফল হতে লেগেছে অনেক সময়। এর মধ্যবর্তী সময়ে ছিল অর্থের প্রলোভন, ক্ষমতার হাতছানি। কোনো কিছুই তাকে তার আদর্শ থেকে টলাতে পারেনি। উল্টো দলের হয়ে ভুল নীতিমালার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, ঠিক যেমন করে বীর যোদ্ধা যুদ্ধ শেষে তার ভুল স্বীকার করে জাতির সামনে মাথা নোয়ায়, প্রতিজ্ঞা করে_ অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষায় আজীবন জাগ্রত থাকবে। ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিন তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দেশ ও জাতির কল্যাণেই নিবেদিত ছিলেন_ আমি তার কন্যা জোর গলায় বলতে পারি পরিবারকে অবহেলা করে।
আজকে, ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিনের মৃত্যুর মাত্র চার মাসের মাথায় যখন আমরা সেলিব্রিটি পরিবার থেকে সাধারণ জনগণের কাতারে নেমে এসেছি, আমি পরিষ্কারভাবে অনুভব করছি, তার সেই অবহেলা আমার মনে কোনো আক্ষেপ তৈরি করে না; আমি হারাইনি কিছুই। আজ থেকে ৬৩ বছর আগে তার নির্ভীক প্রতিবাদ আজও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার, জাতির যে কোনো প্রয়োজনে সম্মিলিত হওয়ার।
বাবাকে ছুঁয়ে কোনোদিন কোনো অঙ্গীকার করিনি বলে, আজ রাতে আমার আফসোস হচ্ছে। আমি সেটাকে আর বাড়াতে চাই না। ভাষাসংগ্রামী আবদুুল মতিন ও তার সহযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার কাছে আমি অঙ্গীকার করছি, প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে আমরা বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করব, পৃৃথিবীর যে কোনো অধ্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে বাংলা ভাষা থাকবে শক্তিশালী ভূমিকায়। যেন কেউ আমাদের ভাষাকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বের করে দিতে না পারে।
প্রার্থনা করি, আমার সন্তানেরা যেন শুধু ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে না যায়। প্রত্যেকে যেন মনেপ্রাণে নিজেকে এক একজন ভাষার সৈনিক বলে মনে করে। ধর্মের প্রয়োজনে যদি জিহাদ হয়, ভাষা আর দেশের প্রয়োজনেও তারা জিহাদে নামবে। বুক ফুলিয়ে বলবে_ মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা।
ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিনের মেয়ে
নাট্যকার ও নির্মাতা

আবুধাবির আগুনে তাদের স্বপ্নও পুড়ে গেছে by সৈয়দ মোহাম্মদ মাসুদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির মোসাফফায় এলাকায় ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত ১০ জনের মধ্যে ৩ বাংলাদেশী রয়েছেন। এর ধ্যে ফটিকছড়ির দুজন। তারা হচ্ছেন আব্দুস শুক্কুর (৪৫) পিতা মৃত মীর আহম্মদ সাং আলমের ঘোনা, সুয়াবিল, ভূজপুর। অপরজন সেলিম উদ্দিন (৩৬), পিতা নুরুল আবছার, তিতা গাজীর বাড়ী, বাবুনগর, ফটিকছড়ি। এই আগুনের খবর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীদের স্বজন ও এলাকাবাসী হতবাক হয়ে পড়েন।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার সুয়াবিল আলমের ঘোনার আব্দুস শুক্কুর বুধবার শেষ বারের মতো তার স্ত্রী পপি আক্তারের সাথে টেলিফোনে কথা হয়। তার একদিন পর পপি আক্তার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ শুনে একমাত্র পুত্র ওয়াসফিয়াকে (৭) বুকে জড়িয়ে আহজারী করছেন। ছোট্ট ওয়াসফিয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে।
শুক্করের স্ত্রী বিলাপ করতে করতে করতে বলেন, কি হবে আমার ওয়াসফিয়ার? সে কাকে বাবা ডাকবে? আমি কিছু বুঝিনা তোমরা তার বাবাকে এনে দাও।
উপজেলার সুয়াবিল ইউনিয়নের নিহত আবদুল শুক্করের পরিবারে আজ সকালের এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
ঘটনায় নিহত ফটিকছড়ির অপরজন সেলিম উদ্দিন। উপজেলার বাবুনগর গ্রামের আজম কাবের তিতাগাজীর বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। নুরুল আবছারের দুই ছেলের মধ্যে সবার বড় সেলিম। সেলিম মা-বাবা, ভাই আর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে যৌথ পরিবারে থাকতেন। দুই ছেলে শাহাদাৎ (১৩) ও আরমান (১০)। তারা বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। সেলিম সর্বশেষ চার বছর আগে দেশে এসেছিলেন। আগামী ১ মার্চ দেশে আসার সব প্রস্তুতি নিয়ে বাড়িতে আসার দিনক্ষণ গুনছিলেন।
ঘটনার তিন দিন আগে স্বামীর সাথে কথা হয় স্ত্রী সাখু আকতারের। স্ত্রীকে বলেছিলেন, সব প্রস্ততি শেষ । আর ক‘টা দিন বাকি, বাড়িতে আসছি। অপেক্ষায় থেকো। কে জানতো এই অপোর প্রহর যে আর জীবনেও শেষ হবে না?
সাখু আকতার বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার ছেলেদেরকে মানুষের মতো মানুষ করার ইচ্ছা ছিল আমার স্বামীর। এখন কী হবে আমার ছেলেদের জীবন।

আট দিন পর মারা গেলেন দগ্ধ ট্রাক চালক জাহিদ

‘আমারে তুমি কার কাছে রাইখা গ্যালা’, অহন আমি পোলাডারে নিয়া কেমনে বাঁচুম’। স্বামীর পোড়া দেহ আঁকড়ে ধরে এভাবেই আহাজারি করছিলেন মধ্যবয়সী জাকিয়া আক্তার। তার আহাজারিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এ সময় বাকরুদ্ধ একমাত্র সন্তান জিদান। চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর চেষ্টা বিফল করে আট দিন চিকিসাধীন থেকে শুক্রবার সকালে মারা যান নরসিংদীর পলাশে অবরোধের মধ্যে পেট্রলবোমায় দগ্ধ জাহিদ হোসেন (৫০)। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়। রাত ৯টায় চাঁদপুরের আলিমপাড়ায় তার লাশ দাফন করা হয়।
নিহতের স্বজনরা বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে ঘোড়াশালের প্রাণ কোম্পানির ফ্যাক্টরি থেকে পণ্য নিয়ে একটি ট্রাক নরসিংদীর পাঁচদোনায় যাচ্ছিল। ট্রাকটি সদর উপজেলার ভাটপাড়া সাকুরার মোড় এলাকায় পৌঁছলে রাস্তার দুই পাশ থেকে দুর্বৃত্তরা ট্রাকটিতে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। আগুন দ্রুত পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ট্রাকচালক জাহিদ মিয়া (৫০), হেলপার সেলিম মিয়া (৪০) ও প্রাণ কোম্পানির নিরাপত্তা কর্মী জুয়েল মিয়া (৩০) আগুনে দগ্ধ হন। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর কর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে স্থানীয়রা দগ্ধদের উদ্ধার করে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আহত চালককে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। নিহত জাহিদের বাড়ি চাঁদপুর শহরের আলিমপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম ওয়াসিন আহমেদ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল জানান, আগুনে জাহিদের শরীরের ৪০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। এছাড়া তার শ্বাসনালি মারাÍক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি জোটের টানা অবরোধে প্রায় প্রতিদিনই নাশকতার ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত পেট্রলবোমা ও ককটেল হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৬ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন কয়েকশ’ ব্যক্তি।

মানব সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে দেশ: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশ এখন মানব সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এটি কোন সাধারণ ঘটনা নয়। এই দুর্যোগ জাতির স্বাধীনতা, ভাষা ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানছে। অমর একুশে উপলক্ষে শনিবার বিকেলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।
অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এই সেমিনারের আয়োজন করে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে এই সেমিনারে শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জিন্নাত ইমতিয়াজ আলীও বক্তৃতা করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সেলিনা হোসেন। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘ভাষা আন্দোলন থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : নারীর প্রজ্ঞা।’
অনুষ্ঠানে একুশের আমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ অনুবাদ করে মারমা, ত্রিপুরা, বম ও ম্রো ভাষায় গাওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় অর্জন ধরে রাখতে এবং দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে ও জাতির মাথা উঁচু রাখতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে এদের প্রতিরোধ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। বিএনপি-জামায়াতের চলমান সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিটি মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশ একটি রোলমডেলে পরিণত হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। এখানে কোন অমানবিক কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না। তিনি বলেন, মাতৃভাষার জন্য শাহাদাতকে আলিঙ্গন করে বাঙালি জাতি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্ববাসী তাদের সাহস ও ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি অথবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালি জনগণের জন্য শুধু একটি উৎসবের বিষয় নয়, এই দিবস ভাষা অনুরাগী প্রতিটি মানুষের বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। ওই সময় সরকারিভাবে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ করে। সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অর্জনে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কানাডা প্রবাসী দুই বাঙালি রফিক ও সালাম এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ক্লাবের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার অন্যান্য অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের মতো এটিও সমাপ্ত করার উদ্যোগ নেয়নি।

বিজেএমসির লোকসানি পাটকল

বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন মিলগুলোর অব্যাহত লোকসানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করতে ব্যালেন্সিং মডার্নাইজেশন রেনোভেশন অ্যান্ড এক্সপেনশন (বিএমআরই) প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। কথায় আছে, সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল। অর্থাৎ জিনিসটা যদি হয় রাষ্ট্রের, তাহলে সেটা দরিয়ার জলে ভাসিয়ে দিতে কোনো সমস্যা নেই। যুগ যুগ ধরে লোকসমাজে প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচনগুলো যে এখনও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বিজেএমসির আওতাধীন মিলগুলোর কর্মকাণ্ডে। এ স্বল্প সম্পদের দেশে দিনের পর দিন ভর্তুকি দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো গরিবের হাতি পোষার শামিল। অথচ এদিকে ভ্রুক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন মনে করছে না সংশ্লিষ্টরা, এটি দুঃখজনক। শুধু বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন মিলগুলোই নয়, অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই লোকসানে চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাঁধে বিপুল অংকের দায়-দেনাও রয়েছে। অপরিমেয় লোকসানের কারণে সরকার বা কর্পোরেশনের পক্ষে সেগুলো পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়াই স্বাভাবিক। লোকসানের বোঝা টানতে গিয়ে বাড়তি চাপ পড়ছে জাতীয় বাজেটের ওপর।
দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। ক্রমাগত লোকসানের মুখে এসব প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে, যা বলাই বাহুল্য। তাই এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত যাতে নিভে যাওয়া কিংবা নিভু নিভু প্রদীপ প্রাণ ফিরে পেয়ে পূর্ণ আলোয় উদ্ভাসিত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানি হওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকে। এর মধ্যে মাথাভারি প্রশাসন ও দুর্নীতি অন্যতম। বিজেএমসির আওতাভুক্ত মিলগুলোয় নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে হলে এদিকটায় মনোযোগ দেয়া জরুরি। বস্তুত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া বিল-ভাউচারসহ অন্যান্য আর্থিক দুর্নীতি স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেও রাষ্ট্র ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দেশ থেকে দুর্নীতির জঞ্জাল দূর করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শতভাগ কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সরকার বিজেএমসির লোকসানি মিলগুলোকে লাভজনক করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে- এটাই প্রত্যাশা।

অমর একুশে

আজকের দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ মহান শহীদ দিবস। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও আজ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিমাঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে তাদের অধীন করে রাখার পরিকল্পনা করে। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই তারা বাঙালিকে ভুলিয়ে দিতে চায় তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রভাষা- এ বাস্তব সত্য অস্বীকার করে বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায় তারা। উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে বাঙালির জাতিসত্তাকে পঙ্গু করে দেয়া। কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে বাঙালি। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। একপর্যায়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হয় গুলি। শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেকে।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। শহীদদের রক্ত তাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগায়। এর পরের ইতিহাস পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের। ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-র স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাঙালি মুক্ত হয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে ৫২-র ভাষা আন্দোলন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাই একুশ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চার দশক পেরিয়ে গেছে। এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের অর্জন কী- এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে আমরা একুশের শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা দেখাতে পারছি কি-না। দেশ অনেকটাই এগিয়েছে বলা যায়। কিন্তু একুশে ফেব্র“য়ারির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেসব তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, সেগুলোর কি নিষ্পত্তি করতে পেরেছি আমরা? বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সত্য, কিন্তু তা কি চালু করা সম্ভব হয়েছে সর্বস্তরে? একুশের অন্যতম চেতনা ছিল- রাষ্ট্রীয় জীবনে অসাম্য, বৈষম্য, দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্য ইত্যাদি থাকবে না। এই মহৎ আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছে কি? বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আবহমানকালের সংস্কৃতি ইত্যাদি সমুন্নত রাখার ঐক্যবদ্ধ সমন্বিত প্রচেষ্টা কি লক্ষ্য করা যাচ্ছে সমাজে? চিন্তার দিক থেকে আমরা হব আন্তর্জাতিক, কিন্তু পরিচয়ে থাকব বাঙালি- এই ধারায় কি যাপন করছি জীবন? এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক নয়। বিতর্ক রয়েছে, বিশ্বায়নের যুগে ভিন্ন সভ্যতা, ভিন্ন সংস্কৃতির যে অবাধ প্রবাহ, তাতে আমরা কতটা অথবা আদৌ অবগাহন করব কি-না? আকাশ সংস্কৃতির ফলে ভিনদেশের যেসব বিষয় আমাদের বিনোদিত করে, সেগুলো আমরা গ্রহণ করব কি-না? এ বিতর্কের মীমাংসা হতে পারে বিষয়টিকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচারের মাধ্যমে। প্রথমত, আমরা যেহেতু বাঙালি সেহেতু বাঙালিত্বকে সমুন্নত রাখতে হবে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র একটি জাতি হিসেবে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখেই ভিন্ন সংস্কৃতি-কৃষ্টির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে হবে। ভাষার প্রশ্নে বলতে হয়- আমাদের জীবন চলবে মাতৃভাষার মাধ্যমে। তবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য শিখতে হবে সাধ্যমতো অন্য ভাষাও। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর অর্থ পৃথিবীর সব মাতৃভাষাই স্ব স্ব জাতির নিজস্ব ও অপরিবর্তনযোগ্য ভাষা। সব মাতৃ ও আঞ্চলিক ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণের দায়িত্বও রয়েছে বিশ্ববাসীর।
একুশের শহীদদের প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

২১ ফেব্রুয়ারি, ভাষা ও মানুষের প্রান্তিকীকরণ by আনু মুহাম্মদ

২১ ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, ততদিনে বাংলাদেশেই বাংলা ভাষার বাজারদর একদম নিচের দিকে। বাজার অর্থনীতির চাহিদা জোগানের ভারসাম্যে বাংলা ভাষার দামের এ নিুগতি। অতএব যে বাংলা ভাষার জন্য লড়াইকে কেন্দ্র করে ২১ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ দিন হয়ে উঠল, সেই ভাষা মোটামুটি পরিত্যক্ত পর্যায়ে আসার কালে দিনটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। ফেব্রুয়ারি মাস তাই একদিকে গৌরবের অন্যদিকে প্রতারণা ও প্রহসনের মাস। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর থেকে এতে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
এটা বলা অনাবশ্যক যে, দেশে দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা থাকেই। প্রতিটি দেশে মানুষ লড়াই করে তার নিজ দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে। প্রতিটি দেশের মানুষ লড়াই করে নিজের ভূমিতে তার জায়গা তৈরির জন্য। কিন্তু এসব লড়াই ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে কখনও সঙ্গে সঙ্গে, কখনও একটু বিলম্বে। প্রতিটি দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক লড়াই অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে শক্তি জোগায়। এক দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অন্য দেশের অগণতান্ত্রিক শক্তির জন্যও হুমকি হয়ে ওঠে।
আমরা সবাই জানি, ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জনগণের লড়াই এবং দিবসের নাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি শুধু বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না। এটি ছিল সব জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় কথা বলা, লেখা ও ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও। সেজন্য ২১ ফেব্র“য়ারি প্রকৃতপক্ষে প্রথম থেকেই একটি আন্তর্জাতিক বহুজাতিক দিবস। এ অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশই ঘটেছে এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে। বস্তুত মাতৃভাষায় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও ভাব প্রকাশের অধিকার বিশ্বের অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই এখন কার্যকর করতে
পারছে না। অধিকাংশ ভাষাই এখন হুমকির সম্মুখীন। অধিকাংশ ভাষাভাষী মানুষই বর্তমানে পরাজিত, বিপর্যস্ত অবস্থায় প্রাণপণে চেষ্টা করছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার। ২১ ফেব্রুয়ারি তাদের সে চেষ্টাতেই একটি প্রতীকী অবলম্বন।
বেশিরভাগ জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে এরকম প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান উন্নয়ন ধারার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। এ প্রত্যক্ষ সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে গেলে আমরা এটাও উপলব্ধি করব যে, যাকে আমরা বিশ্বায়ন বলে জানি তা আসলে একচেটিয়াকরণ। বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষের জায়গা করে দিয়ে এ বিশ্বায়ন ঘটছে না। এ বিশ্বায়ন বস্তুত সব অঞ্চলের মানুষকে শৃংখলিত করে ক্ষুদ্র অংশের একক ভাষা, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, রুচি এবং একচেটিয়া মালিকানা সবার ওপর চাপিয়ে দেয়ার আরেক নাম।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি পুরো বিশ্বকে কিছু বহুজাতিক সংস্থার করতলগত করার মধ্যে; মতাদর্শিক ক্ষেত্রে আমরা এর প্রকাশ দেখি শ্রেণী, লিঙ্গ, জাতিগত, বর্ণগত নিপীড়ন ও মতাদর্শের স্পষ্ট-অস্পষ্ট একটি কাঠামোর আধিপত্য সৃষ্টির মধ্যে; এবং আমরা এর প্রকাশ দেখি অন্যসব ভাষার ওপর কয়েকটি ভাষার, বিশেষত একটি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উপনিবেশ-উত্তর দেশে ঔপনিবেশিক ভাষার যে আধিপত্য দেখা যায়, তা এক ঐতিহাসিক আধিপত্যেরই ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে ফরাসি বা স্প্যানিশ ভাষাও প্রধান ভাষা হয়ে উঠতে পারত যদি এ অঞ্চলের ঔপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স বা স্পেন ইত্যাদি হতো। ইংরেজি এ অঞ্চলে এখন প্রভুভাষা, কারণ ব্রিটিশরা এখানে ঔপনিবেশিক প্রভু ছিল। ইংরেজি এখন সারা বিশ্বের প্রভুভাষা, কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এখন কেন্দ্রীয় ও প্রধান শক্তি ইংরেজিভাষী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে মার্কিন ইংরেজিতে ভর স্থানান্তরের পেছনেও বিশ্ব ক্ষমতার বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস সম্পর্কিত।
ইংরেজি ভাষা এখন শুধু একটি ভাষাই নয়, এটি একটি ক্ষমতার প্রতীকও। ইংরেজি ভাষা জানা মানে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া। এ ভাষা জানা মানে অনেক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া। এ ভাষা জানা মানে হীন-দীন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ শক্তিধর অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা জানলে শুধু ক্ষমতার স্বাদই পাওয়া যায় তা নয়; কর্মসংস্থান ও উপার্জনের বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গেও এর যোগ প্রত্যক্ষ। ইংরেজি ভাষা জানা না থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ, বিশ্বের খবরাখবর, এমনকি চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়।
বাংলা ভাষার তাহলে সমস্যা কী? বাংলা ভাষায় এ কাজগুলো কি হয় না? যথেষ্ট যে হয় না, এটা কি ভাষার গাঠনিক সমস্যা, নাকি এ ভাষা যে সমাজের তার অবস্থান ও গতিপ্রকৃতির প্রকাশ? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অন্যান্য ভাষার এবং অন্য ভাষাভাষীদের অবস্থাও আমাদের দেখতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দি ভাষার কি একই অবস্থা? না, হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অধিপতি ভাষা। বিশ্বেও তার প্রভাব বাড়ছে। হিন্দি ভাষা বিভিন্ন ভাষা থেকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত ও শক্তিশালী থাকায় কেউ শুধু হিন্দি ভাষাভাষী হলেও তার বিশ্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশংকা নেই। ইংরেজির দাপট সেখানেও আছে; কিন্তু হিন্দি পাল্টা দাপটের জায়গাও তৈরি করেছে। পাশাপাশি হিন্দি ভাষা এ অঞ্চলের অন্যান্য ভাষার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ হিন্দিভাষী একচেটিয়া মালিকদের অর্থনৈতিক আধিপত্যও বাড়ছে।
আরবি ভাষাভাষীদের অবস্থা অতটা করুণ নয়। এ ভাষাটিও সচল, সক্রিয় এবং এতে বিশ্বের গতিধারাকে ধারণ করার মতো গতিশীলতা আমরা দেখি। চীনা ও জাপানি ভাষা এখন বিশ্ব পরিসরে পাল্টা ক্ষমতার জায়গা তৈরি করছে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে সর্বত্র এ চেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। এছাড়া কোরিয়া বা থাইল্যান্ডও ইংরেজি দিয়ে ভেসে যায়নি। এসব দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে যুদ্ধ করে টিকে থাকছে ও বিকশিত হচ্ছে।
বস্তুত পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশ, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে কাঠামোতেই হোক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বা করছে অথচ সে দেশের জনগণের ভাষা পরিত্যক্ত হয়েছে। চীন, জাপান তো বটেই, এমনকি দুর্বলতর কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন সর্বত্রই আমরা দেখি জোরদারভাবে তাদের জনগণের ভাষা যথেষ্ট গুরুত্ব ও কার্যকরিতা নিয়ে টিকে আছে। আর সেসব দেশেই ঔপনিবেশিক প্রভুর ভাষার দাপট একচেটিয়া, যেসব দেশে উন্নয়নের কোনো শেকড় তৈরি হয়নি। যে দশে শাসকশ্রেণী পরগাছার মতো ঝুলে থাকে সে দেশে শাসকশ্রেণীর পরজীবী লুণ্ঠন/পাচার প্রক্রিয়ায় মাতৃভাষা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাষা হিসেবে কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা এ ঘটনাই দেখি।
বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা যে রীতিমতো প্রান্তিক বা অপাংক্তেয় ভাষায় পরিণত হয়েছে, তার অনেকখানি ব্যাখ্যা এদেশের শাসকশ্রেণীর অবস্থান ও ঐতিহাসিক ধারা থেকে পাওয়া যাবে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তিক এবং এ প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছে ও টিকে থাকছে এদেশের পরজীবী শাসকশ্রেণীর কারণে। এ শ্রেণী তার গঠনপ্রকৃতি ও বিকাশধারার কারণে দেশে উৎপাদনশীল ভিত্তি নির্মাণ করার চেয়ে দ্রুত লুটপাট করে সম্পদ গঠন ও পাচারেই বেশি আগ্রহী।
উৎপাদনের ভিত্তি যে দেশে নির্মিত হয় না সে দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সাধারণ ভিত্তি নির্মাণের তাগিদও তৈরি হয় না। তৈরি হয় না দেশীয় কর্মসংস্থানের ভিত্তি। তৈরি হয় না জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সুতা দিয়ে ঝুলে থাকা শাসকশ্রেণী এদেশে প্রতিনিধিত্ব করে বাইরের ক্ষমতার, এ ক্ষমতাই তার দেশের ভেতরের দাপট নিশ্চিত করে। লোকাল এজেন্ট হতেই তারা বেশি আগ্রহী। তাদের নিজস্ব পরিচয় নেই। সেজন্য তাদের আধিপত্য থাকা অবস্থায় সামগ্রিকভাবে যে নৈরাজিক ধ্বংসাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে দেশীয় ভাষা/ভাষাসমূহ বাদ যায় না। মধ্যবিত্তের প্রবল হীনমন্যতাবোধের সঙ্গে যোগ হয়ে বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি পায়।
ক্ষমতার চর্চা হয় তারপরও। প্রান্তিক অবস্থানে কোণঠাসা বাংলা ভাষা দিয়ে আবার ক্ষমতার চর্চা হয় দুর্বলতর জাতিগোষ্ঠীর ওপর। মাতৃভাষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষাকে শাসকশ্রেণী অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার খর্ব করার কাজে লাগায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সাংবিধানিক অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনও নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণও সমর্থিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সামনে অনেক প্রশ্ন হাজির করে। অনেক বিষয়কে সামনে আনে। শুধু উৎসব আর সংবর্ধনা দিয়ে এ প্রশ্নগুলো ঢাকা যায় না যে- কেন এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষ এখনও ঠিকমতো নিজের মাতৃভাষার বর্ণমালা চেনেন না বা তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম নন?
কেন এদেশের মানুষ মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করতে পারেন না?
কেন এদেশে বাংলা ভাষা নিজেই একটি প্রান্তিক, কোণঠাসা দ্বিতীয় গ্রেডের ভাষা হিসেবে পরিগণিত?
বাংলা ভাষা কোনটি? তার জীবন কোন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য?
কেন এদেশে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতি ও ভাষাগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সাংবিধানিকভাবেও স্বীকৃতি নয়?
তরল আবেগ, প্রতারণা আর প্রহসনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে
২১ ফেব্রুয়ারির অন্তর্গত শক্তিকে ঠিকমতো উপলব্ধি করতে চাইলে
ভাষা ও মানুষ বিষয়ে এ প্রশ্নগুলোর জবাব-সন্ধান করেই আমাদের এগোতে হবে।
আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ
anujuniv@gmail.com

একুশের চেতনা by ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কোনো কোনো বিশেষ ঘটনা, কোনো কোনো আত্মত্যাগ আদর্শগত কারণে সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে। সেই আত্মত্যাগ যদি হয়ে থাকে মহত্তম কোনো আদর্শের প্রশ্নে, সেই বিশেষ ঘটনায় যদি ঘটে অনির্বাণ আকাক্সক্ষার অয়োময় প্রত্যয়ের প্রতিফলন- তাহলে স্থান-কাল-পাত্রের সীমানা পেরিয়ে সেই ঘটনা ভিন্নতর প্রেক্ষাপটেও নতুন নতুন চেতনার জন্মদাতা হিসেবে প্রতিভাত হয়ে থাকে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনে তেমনই এক অসীম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা আমাদের সার্বিক জাগরণের উৎসমুখও। একুশের চেতনা কখনও প্রত্যক্ষ কখনও পরোক্ষভাবে অনুপ্রেরণার সঞ্চারী হিসেবে অন্তরে অনির্বাণ শিখা হয়ে জ্বলে। একুশের চেতনা বারবার সংকটে দিকনির্দেশক, বিভ্রান্তিতে মোহজাল ছিন্নকারী এবং আপাত বন্ধ্যত্বে সৃষ্টিমুখরতার দ্যোতক বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের যে প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়, তার তাৎক্ষণিক তাৎপর্য মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু কালপরিক্রমায় এর তাৎপর্যের পরিধি বিস্তৃত হয়। ১৯৪৭-এ ভারত বিভক্তির পর নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ববঙ্গ প্রদেশবাসীর জাতীয় সত্তা ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে শুরু করে প্রথম থেকেই। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতিদানে প্রকাশ্য অস্বীকৃতি পূর্ববঙ্গবাসীদের জাতীয়তাবাদী চেতনার মর্মমূলে হানে আঘাত। বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এক নতুন প্রত্যয় ও প্রতীতী দান করে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে একুশের চেতনাই ছিল প্রাণশক্তি।
একুশের চেতনা যে সাংস্কৃতিক চেতনার জন্ম দেয়, তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও ছিল। একুশের চেতনা এমনই প্রগতিশীল ছিল, এমনই প্রগাঢ় ছিল যে, এর জন্য স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রাম তীব্রতর হয়েছিল। একুশের ভাবধারা প্রথমদিকে ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে তা দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণকেও আপ্লুত করে। একুশের মূল্যবোধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, স্বৈরাচারের পতনকার্যে একতাবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করতে, নিপীড়িত জনগণের পাশে এসে দাঁড়াতে এবং সর্বোপরি মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হতে শিক্ষা দেয়। একুশের চেতনা দেশের সাহিত্যাঙ্গনেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের পাশাপাশি গণমুখী সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন দেশের কবি-সাহিত্যিকরা। সাহিত্যধারায় সূচিত হয় নবযুগের।
ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেয়ার মধ্যেই একুশের চেতনার সার্থকতা। জাতীয় জীবনে নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, বলিষ্ঠ জাতীয় চরিত্র চেতনার বিকাশ এবং দারিদ্র্য মোচনের দ্বারা স্বনির্ভরতা অর্জনের মধ্যেই একুশের প্রকৃত প্রত্যয় নিহিত।
জাতীয়তাবোধকে দীর্ঘায়ু করার লক্ষ্যে অর্থনীতিকেও সুদৃঢ় করা আবশ্যক। কৃষিভিত্তিক দেশে কৃষির বাস্তবমুখী প্রসার ঘটানোর মাধ্যমে সমাজ কাঠামো বিনির্মাণ যন্ত্রশিল্পের শ্রমিকের গুরুত্ব নির্ধারণে তার তৈরি পণ্যের প্রয়োজনীয়তাকে অর্থবহকরণ, কর্মে অনীহা দূরীকরণে এবং জনজীবন থেকে অদৃষ্টের দোহাই দূরীকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের উন্নত জীবনবোধ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা উচিত। একটি সংহত অর্থনৈতিক ভিত্তিতেই তা সম্ভব। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সমাজের সব স্তরের মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে হবে।
একুশের চেতনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জ্ঞানের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং নিপীড়িত মানুষের প্রতি সম্মানবোধকে জাগিয়ে তুলেছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সেই মূল্যবোধের বলিষ্ঠ বিকাশ প্রত্যাশিত রয়ে গেছে আজও। তবে সেই মূল্যবোধের বাঞ্ছিত বিকাশের সুযোগ সুদূরপরাহত নয়। একুশের চেতনা কালপরিক্রমায় সেই মনোভঙ্গি ও দূরদৃষ্টিকে করে সবল ও স্বচ্ছ।
দেশের বিপুল জনসমষ্টির মানবসম্পদে রূপান্তরের মধ্যেই সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির উপায় নিহিত। স্বনির্ভর অর্থনীতির কারণে সৃষ্ট আত্মমর্যাদাবোধ জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম রক্ষাকবচ। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়ন আবশ্যক। বলিষ্ঠ চরিত্র চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে এটি এক মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি রচনা করে যেসব চরিত্রচেতনা, তার বলিষ্ঠ ও কাক্সিক্ষত বিকাশ প্রয়োজন। একুশের চেতনা সেই আকাক্সক্ষাকে অর্থবহ রূপদান করতে পারে। ইতিহাসের বিচিত্র পরিক্রমণে কখনও মানুষের নেতৃত্বে যুগের পরিবর্তন ঘটে, কখনও বা ঘটনার নেতৃত্বাধীনে মানুষ পরিবর্তিত মূল্যবোধে সংস্কৃত হয়ে ওঠে। একুশের চেতনা এ মুহূর্তে দেশবাসীকে সেই প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে এবং জাগাতে পারে শক্তি ও সাহস। নৈতিক চরিত্র ও কর্তব্যবোধকে সচেতন করতে মূল্যবোধ সংকট উত্তরণে সচেষ্ট হতে দেশের চিন্তাভাবনার রাজ্যে ও মূল্যবোধের প্রসারে একুশের চেতনার সজীব উপস্থিতি একান্ত আবশ্যক।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি মূলত বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাসের উদ্বোধনের দিন। বায়ান্নর একুশ এর আগের ও পরের ঘটনাবলীর একটি টার্নিং পয়েন্ট। বায়ান্নর একুশেই বাঙালি জাতি প্রথম প্রমাণ করল ভাষার জন্য রক্ত দেয়া যায় এবং এই রক্ত ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে দেয় অদম্য শক্তি এবং অয়োময় প্রত্যয়ের প্রেরণা। বায়ান্ন পর্যন্ত একুশ ছিল আত্মত্যাগ পর্বের প্রস্তুতিপর্ব; আর বায়ান্নর পরের একুশ ছিল স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনে উদ্দীপ্ত হওয়ার পথে প্রেরণার উৎস। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পূরণ হলে একুশের আন্দোলন স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে নিবেদিত হয়। বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ- এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নবজাগরণের প্রতিটি মাইলফলকে ভাষা আন্দোলনের চেতনাই বারবার প্রেরণা, দুরন্ত সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে বাঙালি জাতিকে। এসব প্রয়াস-প্রচেষ্টার পথ ধরেই চূড়ান্তভাবে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে মহান বিজয় সূচিত হয়েছে। জন্ম নিয়েছে ভাষার নামে একটি দেশ, ‘বাংলাদেশ’। পৃথিবীতে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একমাত্র ব্যতিক্রম। বায়ান্নর একুশে মূলত সেই অর্থে বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাসের উদ্বোধক। একুশে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত একটি দিন ও তারিখই শুধু নয়; স্বাধীনতার সোপান, জাতীয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের বাতিঘর। চীনা জাতির ইতিহাসে ৪ মে যেমন, তেমনি বাঙালি জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার চিন্তাচেতনা জাগ্রত হওয়ার দিন একুশে ফেব্র“য়ারি।
স্বাধীনতা লাভের পরও একুশ বিভিন্ন সংকট-সন্ধিক্ষণে, আপাত বন্ধ্যত্বের কালে জাতিকে জাগ্রত করতে চেতনাদায়ী হিসেবে কাজ করেছে। একুশের বইমেলা সে ধরনের একটি উপলক্ষ, যা বাঙালি জাতিকে এক অনবদ্য ঐক্যে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক আবহে উদ্বুদ্ধ করে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন এখন আর কোনো একপক্ষীয় দাবি বা কর্মসূচি নয়, বাংলা ভাষা এবং এর সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধকরণ সবার সম্মিলিত প্রয়াস-প্রচেষ্টার প্রতিফলনও। একুশের বাণী জাতিকে স্বয়ম্ভর হতেও উদ্বুদ্ধ করে। ‘একুশ মানে মাথানত না করা’।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

এবারের একুশে প্রধান বিচারপতির কাছে একটি আবেদন by ফরহাদ মজহার

আদালতে বাংলা ভাষা পুরোপুরি প্রবর্তন না হওয়ার কারণে সাধারণভাবে আদালত, তবে বিশেষভাবে উচ্চ আদালত, সংবিধান মানেন না এবং নিজেদের সংবিধান ও প্রজাতন্ত্রের অধীন গণ্য করেন না- এ ধরনের একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা এটা থাকার পরও সংবিধান আদালতের জন্য কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। একুশে ফেব্র“য়ারি উপলক্ষে বাংলা ভাষার প্রতি যদি আমরা আদৌ কোনো শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হবে সবাই মিলে উচ্চ আদালতের কাছে সংক্ষুব্ধ নাগরিক হিসেবে এই ফরিয়াদটুকু জানানো যে উচ্চ আদালতের ভাষা বাংলা না হওয়ার কারণে মহামান্য আদালত সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া আমল করছেন না, এই উদ্বেগ আশংকাজনকভাবে বাড়ছে এবং আদালতে বাংলা ভাষা চর্চা উপেক্ষিত হওয়ার কারণে নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি-না সেটা সংশয়ের মধ্যে পতিত হচ্ছে। এর আশু বিহিত হওয়া দরকার। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে যে ভাষায় অভিযুক্ত বোঝে সেই ভাষায় অভিযোগ ব্যাখ্যা ও বর্ণনা করা, যে আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেই আইন সহজ ভাষায় জানানো ও বোঝানো নিশ্চিত করা, আদালতের সওয়াল জবাব, সাক্ষ্য-প্রমাণ বাদী ও বিবাদী উভয়ে যেন বুঝতে পারে সেই ভাষায় করা এবং বিচারের রায় সমাজের প্রধান ভাষায় যথাসম্ভব বোধগম্যভাবে দেয়া জরুরি। দেশীয় আদালতে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য যেমন এসবের প্রয়োজন, তেমনি একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের রীতিনীতি মান্য করে চলার জন্যও দরকার। বলাবাহুল্য, আদালতের ভাষা যদি বাংলা না হয়ে ইংরেজি হয় কিংবা আদালত যদি সাধারণের বোধগম্য ভাষা চর্চা না করে, তাহলে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অসম্ভব। বিচারব্যবস্থার প্রকট অভাব অবিলম্বে নিরসন করা জরুরি। আদালতের সঙ্গে যুক্ত অল্প কিছু ব্যক্তি যদি আদালতের ভাষার নামে অবস্কিউর, অস্পষ্ট, প্রাচীন, ঔপনিবেশিক, অপরিচ্ছন্ন এবং সর্বোপরি গতিশীল সমাজের জীবন্ত ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন পরদেশী ল্যাঙ্গুয়েজ চর্চা করে, তাহলে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র উভয়ই মারাÍক হুমকির মুখে পড়ে।
বিষয়টিকে আইন ও বিচারের দিক থেকে বুঝতে হবে। রাষ্ট্রভাষা চেয়ে বাংলাদেশের জনগণ এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় স্থাপন করেছে এবং যার জন্য একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ধরা যাক সেগুলো আমাদের জাতীয় গৌরবের দিক, বিচারব্যবস্থার নিজস্ব তাগিদের বাইরের আবেগ। এটাও ধরা যাক সংবিধান যখন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বলে ঘোষণা দেয়, সেটাও জাতীয় আবেগেরই প্রক্ষেপ মাত্র। সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদের বিধান সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না দেখে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ (১৯৮৭ সালের ২নং আইন) জারি করা হয়েছিল। তর্কের খাতিরে ধরা যাক এই আইনটিও ভাষার জন্য আমাদের ভালোবাসা, আÍত্যাগ ও আবেগের সম্প্রসারণ মাত্র।
কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কিংবা কোনো জাতীয়তাবোধের প্রতি তাড়িত হয়ে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা বা না করা আদালতের দিক থেকে বাহ্যিক ব্যাপার। এগুলো বিচারব্যবস্থার বাইরের দিক। বাংলা ভাষার জন্য আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম না করলেও আদালতকে তা করতে হতো। সবার জন্য বোধগম্য ভাষায় আদালতকে বৈচারিক কর্মকাণ্ড নির্বাহ করতেই হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন করতে হবে? করতে হবে আদালতকে আদালত হওয়ার জন্যই, নইলে আদালত বড়জোর এজলাসে বসা কিছু ব্যক্তির হুকুম তামিল করার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে টিকে থাকবে; কিন্তু তার নিজের মর্ম ও মহিমা নিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেয় এবং যেভাবে দেয় তা বলবৎ করা যায় বলেই সেটা রায় হিসেবে আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ভূমিকার কারণে রায় বলে গণ্য হয়। নিছক এজলাসে বসা কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সিদ্ধান্তমাত্র হয়ে থাকে না। এমনও হতে পারে, সমাজে সেই মানুষগুলো নিন্দিত বা সমালোচিত। কোনো মামলা নিয়ে আদালতের বাইরে সমাজের যে কোনো ব্যক্তি সিদ্ধান্ত দিতেই পারে, যিনি সিদ্ধান্ত দেন, আদালতের হাকিমের চেয়ে তিনি অনেক বড় পণ্ডিত হতে পারেন; কিন্তু তার সিদ্ধান্ত আদালতের রায় হয় না। আদালতের সিদ্ধান্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য বলে, অর্থাৎ রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ তা কার্যকর করে বলেই আদালতের সিদ্ধান্ত শুধু সিদ্ধান্ত কিংবা আক্ষরিক অর্থে আর জাজমেন্ট থাকে না। রায় হয়। ক্ষমতার সঙ্গে আইন ও আদালতের এই সম্পর্ক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অচ্ছেদ্য ও অবিচ্ছিন্ন। কিন্তু সমাজ শুধু ক্ষমতা দিয়ে পরিচালিত হয় না। ক্ষমতা সমাজ থেকেই তৈরি হয় এবং সমাজ সেই ক্ষমতাকে ন্যায্যতা দিতে পারে। আবার নাও পারে। আদালতের রায় বলবৎ করার চরিত্র দিয়ে আদালতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভূমিকা বোঝা যায় না।
সেটা বুঝব কী করে? আমাদের বুঝতে হবে, আদালত শুধু একটি আইনি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, একই সঙ্গে সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক দ্বন্দ্ব মীমাংসারও ক্ষেত্র। বিশেষত এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে ব্যক্তি ও সমষ্টির দ্বন্দ্ব ও বিরোধের সামাজিক মীমাংসা এবং সেই মীমাংসাকে ন্যায্য বলে সমাজের উপলব্ধি করারও ক্ষেত্র। আদালতের সিদ্ধান্ত বা মীমাংসা সমাজ শুধু আদালত রায় দিয়েছে বলে মানে না, একই সঙ্গে সেই সমস্যার সমাধান সমাজের নীতি-নৈতিকতা, বিবেকবুদ্ধি বা বিবেচনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হয়। বিদ্যমান আইনের কারণে আদালত যদি সংবিধান বা আইনের দ্বারা নিজেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পতিত হয়েছে মনে করে, তাহলে সেই সীমা চিহ্নিত করা এবং নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তার দাবিও তুলতে পারে। আইনি পরিমণ্ডলে সমাজের চিন্তা-চেতনা বিচার-বিবেচনায় পরিবর্তন ঘটে, সেখানে বিবর্তন আছে। ক্ষেত্রবিশেষে আদালতের প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠার উদাহরণ থাকলেও সেই বিবর্তনেও আদালত ভূমিকা রাখে।
ব্যক্তি সামাজিক। কিন্তু সমাজের পক্ষে আদালত ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে একই সঙ্গে সমাজ ও ব্যক্তির স্বার্থের সীমা সমাজকে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আদালত নিজে সমাজের সীমা লংঘন করে সমাজের বিচারবুদ্ধি ও বিবেকের বিপরীতে দাঁড়ালে নিন্দা ও বিরোধিতার মুখোমুখি হয়। সমাজের সপ্রাণ বিবেক ও সজ্ঞান বিচারবুদ্ধির বাইরে আদালত যদি এমন কোনো রায় দেয় যা সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সমাজ মনে করে, তাহলে বিচারক ও আদালত নিন্দিত হয়। সাম্প্রতিককালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দেয়াসহ বেশ কয়েকটি রায় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় নাগরিকদের মৃত্যুর ব্যাপারে মানুষ আদালতের ভূমিকা আশা করে। এসব ক্ষেত্রে সমাজে তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সুযোগ না থাকলেও কোনো না কোনো সময়ে আদালত কিংবা বিচারককে সমাজের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বলাবাহুল্য, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা কিংবা বাস্তব বা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে জাত প্রজ্ঞা সংবিধান বা আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখে; কিন্তু তারা নিজের আইনের অন্তর্গত নয়, সেই পরিমণ্ডল আরও বৃহৎ আইনি বৃত্তের বাইরের ব্যাপার।
ওপরের কথাগুলো যদি আমরা বুঝে থাকি, তাহলে এই সত্য বোঝাও কঠিন নয় যে, আদালত সংবিধানের তিন অনুচ্ছেদ কিংবা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কার্যকর করা থেকে বিরত থাকছে। বাংলা ভাষায় সহজবোধ্যভাবে আদালতের কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার অর্থ শুধু উচ্চ আদালতকে সংবিধান বা আইনের বাইরে রাখা নয়, একই সঙ্গে সমাজের বাইরে রাখাও বটে। উচ্চ আদালতে ইংরেজির চর্চা সংবিধানবিরোধী, আইনবিরোধী এবং একই সঙ্গে সমাজবিরোধীও বটে। বাংলা ভাষায় সমাজের চিন্তাচেতনার বিকাশে আদালত সহায়ক হয়ে উঠতে পারছে না। যে বিকাশের সঙ্গে সামাজিক শৃংখলা এবং স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত শাসনব্যবস্থা জারি রাখার প্রশ্ন জড়িত। সর্বোপরি যেখানে সুষ্ঠু চিন্তা ও নীতি-নৈতিকতার পর্যালোচনার প্রশ্ন জড়িত, আদালত তাকে উপেক্ষা ও অবহেলা করছে।
আদালতকে প্রশ্ন করতে হবে, সংবিধান, আইন, আদালত ও বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভাষার সম্পর্কটা কী? এটা কি বাহ্যিক? নাকি আন্তরিক? স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু বিচার মাতৃভাষা অর্থাৎ সাধারণের বোধগম্য ভাষায় পরিচালনা ছাড়া নিশ্চিত করা অসম্ভব, এটা বৈচারিক বিধান আকারে মান্যগণ্য করলেও এর মর্ম কত গভীর সেটা আমরা ওপরের আলোচনা থেকে বুঝতে পারি। আইন চর্চার সঙ্গে ভাষা চর্চার এবং ভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে পুরো সমাজের সামষ্টিক চৈতন্য ও প্রজ্ঞা চর্চার ক্ষেত্রে আদালত যে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, সমাজের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
কিন্তু ভাষার সঙ্গে উচ্চ আদালতের আরেকটি গভীর সম্পর্ক আছে সে দিকটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। সংবিধান ও আইনের ভাষ্য বা ব্যাখ্যার ওপর আদালত, বিশেষভাবে উচ্চ আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ার মেনে নেয়ার রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আইনি কারণ রয়েছে। কারণ ভাষার অর্থ বিবিধ। অর্থাৎ সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ, বাক্য বা শব্দের নানা অর্থ হতে পারে। যদি অর্থ বিবিধ হয়, তাহলে বিচার যেমন অসম্ভব, একই সঙ্গে বিবিধার্থ গুরুতর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে। এ কারণে সংবিধান বা আইনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, এমনকি কোনো শব্দ বা বাক্যের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতেরই একমাত্র এখতিয়ার রয়েছে। অন্য কোনো ব্যাখ্যা রাষ্ট্রের কাছে এবং সমাজের দিক থেকে বলবৎযোগ্য নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডিং ফাদার আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি লিখেছিলেন, সংবিধান ব্যাখ্যার একচেটিয়া এখতিয়ার চর্চার ও জুডিশিয়াল রিভিউর মধ্য দিয়ে আদালত এ সত্যই নিশ্চিত করে যে, লিখিত সংবিধানের মধ্য দিয়ে জনগণ যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ব্যক্ত করে, সেটা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নী সংস্থা, অর্থাৎ সিনেট বা জাতীয় সংসদের চেয়েও ঊর্ধ্বে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদও এই ব্যাখ্যা মানতে বাধ্য। এটা সুপ্রিম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালতকে সুপ্রিমকোর্ট বলার গভীর অর্থ এখানেই নিহিত। উচ্চ আদালত ভাষা চর্চার মাধ্যমে সংবিধানের যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, যার এখতিয়ার একান্তই সুপ্রিমকোর্টের, সেই চর্চা জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আর সে কারণেই রাষ্ট্রের সব অঙ্গসহ প্রত্যেকে তা মানতে বাধ্য। ভাষার বিবিধার্থ এখানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কারণ সংবিধানকে সাহিত্যের বই হিসেবে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা গেলেও সুপ্রিমকোর্টের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত। সুপ্রিম। হ্যামিল্টন বলছেন, আইন প্রণয়নী সংস্থা বা জাতীয় সংসদ জনগণের সাময়িক বা জনগণের খণ্ডিত অংশের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে; কিন্তু সংবিধানের মধ্য দিয়ে যে সামষ্টিক ইচ্ছা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা ব্যাখ্যার এখতিয়ার সুপ্রিমকোর্টের। এ দিক থেকে সংসদ উচ্চ আদালতের অধীন, তার ঊর্ধ্বে নয়।
বলাবাহুল্য, জনগণ ইংরেজিতে কথা বলে না। ভাগ্য ভালো, ইংরেজিতে লিখলেও আমাদের সংবিধান বাংলা অনুবাদকেই প্রাধান্য দিয়েছে, ইংরেজিকে নয়। সুপ্রিমকোর্ট বাংলা ভাষায় রায় না লিখলে তাদের রায় জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ব্যক্ত করে- এটা দাবি করা যায় না। মহামান্য আদলতকে আমার প্রশ্ন, সুপ্রিমকোর্টের ইংরেজি রায় জনগণ মানতে বাধ্য কি-না?
তাহলে আমরা বুঝতে পারছি, উচ্চ আদালতসহ আদালতের সব স্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি মোটেও হালকা নয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির সঙ্গে কিংবা সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বলা কিংবা ১৯৮৭ সালের সব স্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের আইনের চেয়েও অধিক গুরুতর প্রশ্ন। বিচারব্যবস্থা ও আদালতের নিজের দিক থেকে, নিজের জন্য। ইংরেজি ভাষা জানে না বলে সংবিধান, আইন, অভিযোগ ও সওয়াল জবাব যদি বাদী ও বিবাদী বুঝতে না পারে, তাহলে উভয়কেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কেউ কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হলে কী কারণে এবং কোন আইনে অভিযুক্ত হয়েছেন সেটা অভিযুক্তের কাছে বোধগম্য ভাষায় বুঝিয়ে বলা আদালতের দায়। ইংরেজিতে লেখা আদালতের রায় জনগণ যদি পড়তে ও বুঝতে না পারে, জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের রক্ষাকর্তা হিসেবে আদালতের ভূমিকা জনগণ বিচার করবে কিভাবে?
উচ্চ আদালতের কাছে এই প্রশ্ন আমি অভিযোগ হিসেবে পেশ করতে চাই না, কারণ ওর মধ্যে আদালতের ভাষা বাংলা করার ব্যবহারিক ও বাস্তব জটিলতা অস্বীকার করে তাকে নিছকই একটি সাংবিধানিক অনুচ্ছেদ ও আইন পালনের বিষয়ে পরিণত করা হয়। এটা আমার ইচ্ছা নয়। শুধু আইন দিয়ে আদালত চলে না, জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে সম্পর্ক চর্চার ক্ষেত্র পরিচ্ছন্ন রাখা চাই। উচ্চ আদালত তাকে আমলে নিচ্ছেন কি-না, সেটাই নাগরিক হিসেবে আমার জানার বিষয়। ফলে একে আমি অভিযোগ হিসেবে নয়, ফরিয়াদ হিসেবে হাজির করতে চাই। ফরিয়াদ কথাটিকে আমরা বাংলা ভাষায় যেভাবে আত্মস্থ করেছি তার মাধুর্য বিপুল এবং তার আইনি তাৎপর্যও অসাধারণ। আদালতের কাছে ফরিয়াদ জানানোর মানে আদালতকে অভিযুক্ত করা নয়, কিংবা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচার চাওয়াও নয়, সেটা হল নাগরিক হিসেবে নিজের সংক্ষুব্ধি এমনভাবে প্রকাশ করা যাতে আদালত বুঝতে পারে এই ফরিয়াদ একজন ব্যক্তির নয়, বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের। একই সঙ্গে, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- আদালত আসলেই আদালত কি-না তার পরীক্ষার ক্ষেত্রও বটে। উচ্চ আদালতের ইংরেজি রায় অসাংবিধানিক, ১৯৮৭ সালের বিধান অনুযায়ী বেআইনি- এটা আদালত বোঝেন না, তা হতে পারে না। ইংরেজি চর্চার পক্ষে আদালতের একটি রায়ও আছে। যা আদালতের ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ন করে বলে এখানে তুলতে চাই না। কিন্তু মিনতি করি, উচ্চ আদালত দ্রুত একটি জাতীয় ভাষা কমিটি গঠন করবেন এবং এক্ষেত্রে জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন। এবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে নতুন প্রধান বিচারপতির কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আমার এ লেখাটিকে বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের পক্ষে একুশের শহীদদের স্মৃতি ধারণ করে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও আইনি মর্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আকাক্সক্ষা হিসেবে উচ্চ আদালত পাঠ করবেন, এটাই আমার মিনতি।
২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ৮ ফাল্গন ১৪২১। শ্যামলী। ঢাকা

‘পানি এলে ইলিশ যাবে’ -প্রধানমন্ত্রী

স্থলসীমা চুক্তিতে আপত্তি নেই জানিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিস্তা চুক্তিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন তিনি। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবার সোবহান চৌধুরী সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। বৈঠক ছাড়াও গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন মমতা ও তার সফরসঙ্গীরা। বেলা দুইটায় তিনি গণভবন থেকে বের হন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ইলিশ না পাওয়ার বিষয়টি শেখ হাসিনার কাছে তোলেন মমতা। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পানি এলে ইলিশও যাবে। স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে মমতা বলেন, ‘৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি নিয়ে সৃষ্ট সব সমস্যার সমাধান করে দিয়েছি। লোকসভায় তা জমা দেয়া আছে। চলতি মাসের ২৩ তারিখ থেকে শুরু হওয়া লোকসভার অধিবেশনে তা পাস হবে বলে আশা করি। ইকবাল সোবহান চৌধুরী জানান, গণভবনে দুই পক্ষের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি আধঘণ্টা একান্তে বৈঠক করেন।
গণভবন সূত্র জানায়, মধ্যাহ্নভোজে মমতার জন্য ছিল ইলিশের তিন পদের রান্না। এছাড়া মাছের কোপ্তা, মুরগি ও সবজিসহ ১২পদের খাবার আয়োজন ছিল অতিথিদের জন্য।
বিকালে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করবেন মমতা। তিন দিনের ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিনে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। এর আগে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। রাতে ভারতীয় হাইকমিশনারের বাসায় দেয়া নৈশভোজে অংশ নেন। এতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারাও আমন্ত্রিত ছিলেন। শুক্রবার ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর পরিদর্শন করেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী।

জনগনকে আতংকে রেখে সংলাপে বসা যায় না : ওবায়দুল কাদের

সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, ২০ দল একদিকে সংলাপের কথা বলছে অন্যদিকে বোমা মেরে সাধারণ জনগনকে আতংকে রেখেছে। বার্ন ইউনিটে গেলে বোঝা যায় সাধারণ মানুষের আহাজারী। বোমা হামলায় আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। হামলাকারীদের সাথে কোন সংলাপে বসা যায় না। তিনি শনিবার সকালে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের নিজ গ্রাম ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সালাম নগরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ খানমের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য জাহানআরা বেগম সুরমা, পুলিশ সুপার মো: রেজাউল হক, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ, ভাষা শহীদ সালামের ছোট ভাই আবদুল করিম, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বি.কম, দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন প্রমুখ।
মন্ত্রী আরও বলেন, বোমা ও চোরাগোপ্তা হামলায় সরকার পতন হয় না। এতে দিনদিন ২০ দল গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর আগে মন্ত্রী সালাম নগর শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, সালাম পরিবার, উপজেলা আওয়ামীলীগ, ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, আতাতুর্ক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, করিম উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়, মমারিজপুর উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তর আলীপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলোনীয়া উচ্চ বিদ্যালয়, সানরাইজ ইনস্টিটিউট, সালামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মকবুল আহমদ আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়, দুলা মিয়া কটন স্পিনিং মিলস সহ বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।

মার্চের শুরুতে ঢাকায় আসছেন জয়শঙ্কর

মার্চের প্রথম সপ্তাহেই ঢাকায় আসছেন ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। আনন্দ বাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এমনটাই আভাস দেয়া হয়েছে। সূত্রমতে, দেশজুড়ে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ঢাকা আসছেন ভারতের ওই শীর্ষ কূটনীতিক। ওই সফরের মধ্য দিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। কংগ্রেস আমলের নিয়োগ পাওয়া পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে গত ২৮শে জানুয়ারী নাটকীয়ভাবে বিদায় দিয়ে ওই পদে জয়শঙ্করকে বসায় বিজেপি সরকার। তাকে দিয়েই সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি নিজেই সেই ঘোষণা দিয়েছেন। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঢাকা সফর নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  শুধু তিস্তাই নয়, বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করতে স্থলসীমান্ত চুক্তিটি নিয়েও সরব হয়েছেন মমতা। বলেছেন, “ইতিমধ্যেই আমি স্থলসীমান্ত চুক্তিটি নিয়ে বিতর্ক মিটিয়ে দিয়েছি। রাজ্যসভায় সরকার শিগগিরই বিলটি পাস করিয়ে  নেবে। ছিটমহলবাসীদের পুনর্বাসন প্যাকেজটি এখন দেখা হচ্ছে। এটা একটা বড় কাজ হয়ে গেল। আরও যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এবং ঘোষণা তিনি করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে দুই বাংলার চলচ্চিত্র বিনিময়ের জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠন, পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসব শুরু, বাংলাদেশ থেকে কলকাতা যাওয়া মানুষের থাকার জন্য রাজারহাটের কাছে ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’ গড়া ইত্যাদি। মমতা ঢাকায় আসার আগে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। মার্চের প্রথম সপ্তাহেই ঢাকায় আসছেন বিদেশসচিব এস জয়শঙ্কর। সন্দেহ নেই মমতার সফরের ইতিবাচক সুরটাই বয়ে নিয়ে চলবেন তিনি।

আওয়ামী লীগ বিএনপিকে এক কাতারে বসালেন মমতা

গান, কবিতা আর আড্ডায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের এক কাতারে বসিয়ে আসর জমালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের গুলশানের বাড়ির লনে এ আসর জমে ওঠে। এ সময় দুই দেশের শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক ও সিনিয়র সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মমতার সঙ্গে একই সারিতে বসা ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ড. আবদুল মঈন খান। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, ড. মশিউর রহমান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. দীপু মনি, মাহবুব-উল আলম হানিফ প্রমুখ।  অনুষ্ঠান শুরু হয় পঙ্কজ শরণের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে মাইক তুলে দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হাতে। মাইক হাতে নিয়েই আসর জমিয়ে তোলেন মমতা। অনেকটা সঞ্চালকের দায়িত্ব নিয়ে একের পর এক শিল্পী-সাংবাদিকদের ডেকে কাউকে গান আবার কাউকে অনুরোধ করেন কবিতা আবৃত্তি করতে। এ সময় তাকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলে মনে হয়নি। চিরচেনা রাগী ভাব নিয়ে থাকা মমতা হয়ে ওঠেন আড্ডার মধ্যমণি। কখনো ডাকছেন পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক রজত রায়কে গান করার জন্য, আবার আবৃতির জন্য ডেকে আনছেন আসাদুজ্জামান নূর কিংবা সৈয়দ হাসান ইমামকে। একপর্যায়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদকেও বললেন একটা কবিতা আবৃতি করতে। লজ্জামুখ নিয়ে বসা ছিলেন এরশাদ। বার বার এড়াতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু মমতা ছাড়লেন না। বাধ্য হয়ে মাইক নিতে হলো এরশাদকে। কবিতাও আবৃত্তি করলেন এক লাইন। ‘এক পৃথিবী আগামী কালের জন্য’।  তারপর এরশাদের হাতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আনা একটি উপহার সামগ্রীও তুলে দেন মমতা। বললেন, ‘আপনার জন্যই আনা’। মমতার দুই পাশে বসে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতারা ছাড়াও সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। মনে হচ্ছিল, মঞ্চমাতানো কোনো পেশাদার উপস্থাপিকা অনুষ্ঠানকে মাতিয়ে তুলছেন। কখনো তিনি ডাকছেন কবিতা আবৃত্তি করতে, আবার কখনো গানের দুই লাইন নিজেই বলে দিচ্ছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই বললেন, এভাবে দুটি দলকে একসঙ্গে বসানো গেলে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট বলে কিছুই থাকত না। সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও দেখতে হতো না জনগণকে। সংলাপটা এখান থেকে শুরু করলেই পারতেন মমতা। আবার কেউ বললেন, যে যাত্রা শুরু করলেন মমতা দুই দলকে আড্ডায় গানে আর কবিতায়, তা যেন আগামীতেও ইতিবাচকভাবে অব্যাহত থাকে।
‘ঢাকা এলে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসব না?’ : যতবার বাংলাদেশে আসবেন, ততবারই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিতে আসবেন বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। পঙ্কজ শরণের বাড়িতে যাওয়ার আগে গতকাল বিকালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখেন তিনি। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই দেশে আসব আর মুক্তি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পথিকৃৎ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসব না- সেটা কী করে হয়?’ এ সময় আবেগপ্রবণ মমতা বলেন, ‘এ বাড়ি দেখে বার বার মন খারাপ হয়ে যায়। একদিকে গুলির দাগ, রক্তের দাগ। এতগুলো খুনের নিশানা  দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য ৩২ নম্বর সড়কে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। ৩২ নম্বরের পাশাপাশি উল্টো দিকে লেকের পাড়েও কাউকে চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। বিকাল ৫টা ৩৬ মিনিটে মমতা ও তার সফরসঙ্গীরা বঙ্গবন্ধু ভবনে এসে পৌঁছানোর পর প্রায় ২০ মিনিট ঘুরে ঘুরে দেখেন। বঙ্গবন্ধু দৌহিত্র রেদওয়ান সিদ্দিক ববি এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বাংলাদেশ সফরের কথা মনে করে মমতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ১৯৯৮ সালে এখানে এসেছিলাম আওয়ামী লীগের একটি কনফারেন্সে। তখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৭ বছর আগে। তখনও এখানে এসেছিলাম। এর সঙ্গে মুক্তি আন্দোলন, গণতন্ত্রের আন্দোলন- সব কিছু জড়িয়ে আছে।’ মমতা বলেন, ‘এই বাড়িটি একটি আবেগ প্লাবিত জায়গা। এখানেই বঙ্গবন্ধু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন তার পরিবারের অনেকেই খুন হয়েছিলেন। তাদের রক্তমাখা চেহারা, রক্তমাখা ফটোগুলো দেখা বিভীষিকাময়। এগুলো দেখে আমাদের গা শিউরে ওঠে।’ নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরার কথাও বলেন মমতা।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলা- এখানে যখন মুক্তি আন্দোলন চলছিল, তখন তাদের প্রত্যেক কথা, গান, স্লোগান, বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য আমাদের আবেগ জুড়ে ছিল।’

সংলাপ করব না এটা সমাধানের কথা নয়

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, কারও সঙ্গে সংলাপ হবে না- সরকারের এমন বক্তব্য সমাধানের কথা নয়। যে দল দেশের কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতেই হবে।  বুধবার চ্যানেল আইতে আজকের সংবাদপত্র শীর্ষক টকশোয় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, সরকারের বিভিন্ন মহল বলছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সংলাপ নয়। কিন্তু কার সঙ্গে যুদ্ধ? সাধারণ মানুষের সঙ্গে। সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেউ জিততে পারবে না। সঞ্চালক বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব সংলাপের জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি তারানকোকে দায়িত্ব দিয়েছেন দুই দলকে সমঝোতায় নিয়ে আসার জন্য। আওয়ামী লীগ এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংলাপ হতে পারে না। বিষয়টি খুব ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ভারতও উৎকণ্ঠায় আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জড়িত হয়েছে। সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। আবার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বাড়ছে। তিনি বলেন, কিছু পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। একবার বলছে আইএস বা হিযবুত তাহরীর হুমকি নয়। আবার প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ঘটনা যোগ হচ্ছে। বোমা আসছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে সব দলের লোকেরা বোমা সরঞ্জাম আনছে। তাহলে এসব ঘটনার জন্য দায়ী কারা?
সাবেক নির্বাচন কমিশনার বলেন, যারা এ বোমা সরঞ্জাম আনছে তারাই বোমাবাজি করছে। তারা কারা? বিএনপি নেতারা আত্মগোপনে বা জেলে আছেন। তাহলে এর নেতৃত্ব কে দিচ্ছে।

পরিবর্তনের আওয়াজ!

স্টিফেন ডুজাররিক নামটি হঠাৎ করেই পরিচিত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। ভদ্রলোক জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র। ইদানিং নিউ ইয়র্কে তার ডেইলি প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রায় প্রতিদিনই উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। টালমাটাল বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে নিত্যই আলোচনা হচ্ছে জাতিসংঘ হেডকোয়ার্টারে। দুনিয়ার অন্য সব বড় ক্রাইসিসের সঙ্গে খুব সম্ভবত যোগ হয়েছে বাংলাদেশের নামও।
‘৫ই জানুয়ারি’ থেকে সৃষ্ট সঙ্কটে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অচলাবস্থা চলছে বাংলাদেশে। মারা যাচ্ছে মানুষ। কেউ পেট্রলবোমায়, কেউ বন্দুকযুদ্ধে। ভিড় বার্ন ইউনিট আর পঙ্গু হাসপাতালে। এ অবস্থায় গত তিনদিনে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম ক্রীড়ণক তিন শক্তির প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিক্রিয়টিই সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট। বাংলাদেশ সফরে আসা ইইউর প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক অধিকারের বিনিময়ে হতে পারে না। সহিংসতা, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা। গণতন্ত্র আর মানবাধিকারকে বর্ণনা করা হয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহবানও জানানো হয়েছে।
স্টিফেন ডুজাররিকের সর্বশেষ ব্রিফিং এক ধরনের হুঁশিয়ারিও। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশ পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন এবং প্রয়োজনে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন। সন্ত্রাস বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে ওয়াশিংটনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। জাতিসংঘ মহাসচিব ফের আহবান জানান সংলাপের। আর জন কেরি প্রস্তাব করেছেন সহযোগিতার।
সরকার যথারীতি অনড় অবস্থায় রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনতো দূরের কথা কোন ধরনের সংলাপের সম্ভাবনাও নাকচ করে দেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে, বিএনপি জোট বরাবরই সংলাপের পক্ষে রয়েছে। তবে তাদের আন্দোলন সমালোচিত হচ্ছে সহিংসতার জন্য। হরতাল-অবরোধ ক্রমশ ঢিলা হয়ে যাচ্ছে। রাজপথে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম।
সরকারের অনড় অবস্থানের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন,  বিরোধী জোটের আন্দোলনকে জঙ্গি তৎপরতা হিসেবে প্রমাণের সরকারি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সারা দুনিয়াই বাংলাদেশের সঙ্কটকে রাজনৈতিক সঙ্কট হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। তবে জাতিসংঘ, ইইউ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর উদ্যোগ কোন ফল বয়ে আনবে কি-না তা এখনও নিশ্চিত নয়। এ অবস্থায় বেশ কয়েকটি পয়েন্টই আলোচিত হচ্ছে-
১. জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সহকারী মহাসচিব তারানকোকে বাংলাদেশ সঙ্কটের সমাধানে যে দায়িত্ব দিয়েছেন- তা কতদূর এগুবে? এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশ সরকার তারানকোকে ঢাকায় স্বাগত জানাতে প্রস্তুত নয়। এ অবস্থায় জাতিসংঘের উদ্যোগ কি সামনে এগুবে না থমকে যাবে? তারানকো প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন- ডুজাররিকের এ কথা কি বাতকি বাত?
২. বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে ফেরাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব কি কোন ইঙ্গিতবহ? জন কেরির আহবানের কি কোন ফল আছে?
৩. বাংলাদেশ প্রশ্নে কংগ্রেস-বিজেপি সরকারের নীতির প্রকাশ্য কিছু পরিবর্তন হলেও অন্দরমহলে বড় কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে বাংলাদেশে কোন জাতীয় ঐকমত্যের সরকার হলে তাতে ভারতের আপত্তি থাকবে না বলে সাউথ ব্লক সূত্রে আগেই খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বিএনপিরও একধরনের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারত আর আগের মতো সব আম এক ঝুঁড়িতে রাখতে চাচ্ছে না।
৪. নাগরিক সমাজের সংলাপ উদ্যোগ এখনও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তেমন বড় কোন চাপ তৈরি করতে পারেনি। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও বঙ্গভবন থেকে এ ব্যাপারে এখনও সাড়া পাওয়া যায়নি। সঙ্কটকালীন সময়ে বঙ্গভবনের নীরবতা অবশ্য নানা মহলে বিস্ময়ের তৈরি করেছে।
৫. ক্রসফায়ার-গ্রেপ্তার-বন্দুকযুদ্ধের প্রশাসনিক পদক্ষেপের বাইরে প্রায় অনুকূল সব শক্তিকেই মাঠে নামিয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন প্রতিদিনই বিশেষ করে রাজধানীতে শোডাউন করছে। বেগম খালেদা জিয়া যেন কার্যালয় ছেড়ে বাড়ি যান এ ব্যাপারে তার ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে।
৬. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপকে বিএনপি তাদের আন্দলনের এক ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখছে। তবে আন্দোলন চালিয়ে নেয়া এবং গতি বাড়ানোকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে দলটি।
শেষ কথা: একধরনের পরিবর্তনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা খুবই ক্ষীণ। কেউ বাধ্য না করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান দেখছেন না পর্যবেক্ষকরা।

দুই পক্ষের জেতার আশা বনাম দীর্ঘস্থায়ী সংকট by আলী রীয়াজ

দেশে বিরাজমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকে ‘অচলাবস্থা’ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এই অবস্থা নিরসনের জন্য দেশের ভেতরের বিভিন্ন মহলের এবং আন্তর্জাতিক সমাজের আবেদন-নিবেদন সত্ত্বেও অবস্থার আশু পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যেকোনো অচলাবস্থার ক্ষেত্রে যা ঘটে, এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটছে না। সরকার ও বিরোধীপক্ষ এখন আশু কোনো সমাধানের বিষয়ে ভাবিত বলে মনে হয় না। উভয় পক্ষ অনুমান বা আশা করছে যে প্রতিপক্ষের সঞ্চিত শক্তি এবং তার প্রতি সমর্থন একসময় শেষ হতে বাধ্য, সম্ভবত সেটা খুব দূরে নয়; ফলে তারা অবশ্যই বিজয়ী হবে, এটি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। সরকার ও সরকারি দলের অবস্থান এই রকম যে যেহেতু সহিংসতা, বিশেষ করে পেট্রলবোমা হামলা এবং সংশ্লিষ্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলি অবরোধের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে এবং তার সঙ্গেই যুক্ত বলে সাধারণ মানুষের কাছে মনে হচ্ছে, সেহেতু বিএনপির পক্ষে এই পরিস্থিতি আর বেশি দিন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। তারা এটাও আশা করছে যে ইতিমধ্যে যেহেতু বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকা হরতাল কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে, সেহেতু অচিরেই সাধারণ মানুষই সরকারের পক্ষে তা প্রতিহত করবে। এ ধরনের আশা থেকেই সরকার গোড়াতে এক সপ্তাহের মধ্যে অবস্থার উন্নতি ঘটবে বলে ঘোষণা দিয়ে আসছিল, সেটা এখন দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চললেও এর পরিণতি নিয়ে সরকারকে খুব বেশি উদ্বিগ্ন মনে হয় না। অন্যপক্ষে বিএনপি সম্ভবত এই আশা করছে যে বিরাজমান অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে নাগরিকেরা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন, যা তাদের অনুকূলে আসবে। এ ধরনের মনোভাব ও সমস্যা সমাধানের কৌশল অচলাবস্থার চিরায়ত লক্ষণ। দুই পক্ষ ধরে নেয় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাধান তৈরি হবে।
পৃথিবীতে যেসব দেশ দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ সংকটে নিপতিত হয়েছে, সেসব দেশের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে গোড়াতে উভয় পক্ষ স্বল্পসময়ে বিজয়ী হওয়ার আশায় দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে; সে ক্ষেত্রে লক্ষ্যও থাকে সীমিত। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা বা তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারা এই সংকটকে দীর্ঘসূত্রী করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় একেক পক্ষ একেক সময়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে এবং তারা সেটাকে ঘটনাধারা তাদের অনুকূলে আসার লক্ষণ বলে মনে করে। ফলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনের আগ্রহ কমতে থাকে। এখানে এটাও স্মরণ করা দরকার, সংকট যতই দীর্ঘমেয়াদি হয়, ততই আশু লক্ষ্যের বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি সরে যায়, নতুন নতুন বিষয় তাতে যুক্ত হয়, সংকটের চরিত্র ও প্রকৃতিতেও পরিবর্তন ঘটে। শুধু তা-ই নয়, এ ধরনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের শক্তিতে বদল ঘটে থাকে।
বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে মনে হয় যে দেশ সেই পথেই অগ্রসর হতে শুরু করেছে। দেড় মাস আগে যখন এই পরিস্থিতির সূচনা হয়, তখন যেসব বিষয় ছিল রাজনীতির মুখ্য বিষয়, ক্রমাগতভাবে তা থেকে আলোচনা সরে এসেছে বলেই মনে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দল সফল। একসময় যারা বিএনপি ও বিরোধী জোটকে শক্তিহীন বলে উপহাস করেছে, তারা এখন দেখাতে চায় যে দলটি সারা দেশে, তাদের ভাষায় ‘বিচ্ছিন্নভাবে’ হলেও, অব্যাহতভাবে সহিংসতা চালানোর মতো একটি জোট। এ ক্ষেত্রে বিএনপি যে তার দাবির পক্ষে তার কর্মীদের রাজপথে সমবেত করতে ব্যর্থ হয়েছে, বিশেষ করে বড় শহরগুলোয় তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতির কোনো প্রমাণ রাখতে পারেনি, সেটা সরকারের পক্ষেই গেছে। এ জন্য বিএনপি যে যুক্তিই দাঁড় করাক না কেন, সেটা দেশে ও দেশের বাইরে কেউ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না। সামগ্রিক রাজনৈতিক সংকটের পেছনে যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একপক্ষীয় নির্বাচনের কোনো ভূমিকা রয়েছে এবং পরিস্থিতির সমাধানের লক্ষ্যে সে বিষয়ে মনোনিবেশ করা জরুরি, সেখান থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনা কেবল সহিংসতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। যদিও বিএনপি এই দাবি করতে পারে যে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারাটা তাদের সাফল্যের দিক।
যেকোনো সংকট দীর্ঘসূত্রী হয়ে ওঠার লক্ষণ হলো যে সমাজে ও রাজনীতিতে কিছু কিছু প্রবণতার গ্রহণযোগ্যতা লাভ। অর্থাৎ নাগরিকদের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে মেনে নেওয়ার প্রবণতা। গত দেড় মাসের ঘটনাপ্রবাহ এবং আগে ২০১৩ সাল থেকে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দুই ধরনের সহিংসতা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। একদিকে বিরোধী দল কর্তৃক এবং তাদের নামে সংঘটিত সহিংসতা। বাংলাদেশে অতীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরাজমান সহিংসতাকে সাময়িক ও ব্যতিক্রমী বলে বিবেচনা করা হলেও এখন মনে হয় তা স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনার তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, তাদের বিচারের সম্মুখীন করার কোনো তাগিদ যেমন সরকারের পক্ষে দেখা যায়নি, তেমনি সমাজের ভেতরে থেকেও এই নিয়ে দাবি ওঠেনি। এটি নাগরিকদের মধ্যে আইন ও বিচার–প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আস্থাহীনতাই প্রমাণ করে। তাঁরা ধরেই নিচ্ছেন যে এই বিষয়ে বাক্যব্যয় নিরর্থক। ২০১৩ সালে থেকে এযাবৎ রাজনৈতিক সহিংসতা বিষয়ে সরকার ও সরকারি দলের নেতারা যত কথা বলেছেন, বিরোধীদের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছেন, সেই তুলনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ অকিঞ্চিৎকর। এগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী নেতাদের আটকের ঘটনা ঘটেছে বিস্তর। যদিও এসব একার্থে নতুন নয়, কিন্তু সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি সত্ত্বেও নাগরিকদের মধ্যে এটা মেনে নেওয়ার মানসিকতা সহিংসতা অব্যাহত রাখার অনুকূল অবস্থা তৈরি করেছে।
দ্বিতীয় ধরনের সহিংসতা হচ্ছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। গত দেড় মাসে বোমা হামলায় প্রায় ৭০ জনের বেশি মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পাশাপাশি কমপক্ষে ২০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন কথিত বন্দুকযুদ্ধে বা এ ধরনের ঘটনায়। লক্ষণীয়, কোনো ক্ষেত্রেই বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কোনো চেষ্টা হয়নি। উপরন্তু সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা এমন সব কথা বলেছেন, যেগুলো আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি হুমকি বলেই মনে হয়। এসব বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার পরও পুলিশের মহাপরিদর্শক যখন বলেন ‘যে পুলিশের গুলিতে নিহত হবে, সে নিঃসন্দেহে সন্ত্রাসী’, তখন এই আশঙ্কাই সত্য মনে হয় যে শক্তি প্রয়োগের এই পদ্ধতি অব্যাহত রাখারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই পরস্পরবিরোধী কিন্তু পরস্পর-সংশ্লিষ্ট প্রবণতার উপস্থিতি, সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা, এবং তার সমর্থনে সমাজে ‘যুক্তি প্রদর্শনের’ নগ্ন প্রচেষ্টা যেকোনো সমাজে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের লক্ষণ। আপাতদৃষ্টে এই মুহূর্তে বিবদমান পক্ষগুলোর যে-ই মনে করুক না কেন তারা এগিয়ে আছে এবং সময়ের ব্যবধানে তারাই বিজয়ী হবে, তারা আসলে শক্তি প্রয়োগের এই ধারাকে অব্যাহতভাবে বৈধতা প্রদান করছে, জ্ঞাতসারে বা বিবেচনাহীনভাবে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রক্ষমতার শক্তি যেহেতু বেশি থাকে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা মনে করে থাকেন যে তাঁদের জন্য অবস্থা অনুকূলেই থাকবে; যেসব দেশে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ঘটনা ঘটেছে, সেখানেও আমরা তা-ই দেখতে পেয়েছি। কিন্তু তাঁরা এটা বিবেচনা করতে ব্যর্থ হন যে তাতে মধ্যমেয়াদেই দেশের জন্য এটা ক্ষতিকর পরিণতি বহন করে। ক্ষমতাসীন হিসেবে তাঁদের ওপরেই এই দায়িত্ব বর্তায় দেশকে সেই পরিণতি থেকে রক্ষা করার।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

বর ফেলে অতিথিকে বিয়ে

ভারতের উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদের পঁচিশ বছরের তরুণ যুগল কিশোরের সঙ্গে রামপুরের ২৩ বছরের তরুণী ইন্দিরার বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল ভালোভাবেই। এমনকি মালাবদল পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু যখনই মালাবদলের জন্য হাত বাড়ালেন পাত্র তখনই তিনি সবার সামনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান ফ্লোরে। আর তখনি পাত্রী জানতে পারেন যে তার হবু স্বামীর মৃগী রোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে হবু বর কিশোরের অসুস্থতাজনিত সমস্যাটি তার পরিবারই তার কাছে গোপন করায় চরম ক্ষুব্ধ হন তরুণী পাত্রী।
সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার সিদ্ধান্ত বদল করেন এবং ওই অনুষ্ঠানেই তিনি অত্যন্ত খুশি মনে হরপাল সিং নামে একজনকে বিয়ে করবেন বলে ঘোষণা দেন। মিস্টার সিং নিজেও ওই অনুষ্ঠানে অতিথিদের মধ্যে ছিলেন এবং সম্পর্কে তার ভগ্নীপতির ভাই। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের একটি দৃশ্য। মুহূর্তের ঘোষণায় অপ্রস্তুত হলেও মিস্টার সিং হাসিমুখেই ইন্দিরাকে বউ করে নিবেন বলে জানান। পরে ওই অনুষ্ঠানেই ইন্দিরা ও হরপাল সিংয়ের মধ্য মালাবদল হয়। এরপর পণ্ডিত মন্ত্র পড়ান ও বর-কনে সাত পাক দেন। এর মধ্যে ডাক্তারের কাছে নেয়ার পর জ্ঞান ফিরে এলে কিশোর আবার ওই অনুষ্ঠানে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে তার প্রস্তাবিত বধূ অন্যের হয়ে গেছে। কিশোর এবং তার আত্মীয়স্বজনরা অবশ্য ইন্দিরাকে অনেক অনুরোধ করেছিল। তাতেও কাজ না হওয়ায় সংঘর্ষও বেধে যায় আর তাতে ব্যবহৃত হয় চামচ, প্লেট, ডিশ। কিন্তু সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায় ইন্দিরার দৃঢ়তার কাছে। পরে কিশোর আর তার পরিবার মোরাদাবাদে ফিরে যায়। বিবিসি।

মাঝ আকাশে বিমানে বিমানে ধাক্কা

ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে বিমানের প্রদর্শনীতে দুটি বিমানের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একটি বিমান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বিমানের পাইলটরা নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অ্যারো ইন্ডিয়া শোতে বৃহস্পতিবার এ ঘটনা ঘটে। ওই দুটো বিমানের একটি বিমানের পাইলট ছিলেন চেক প্রজাতন্ত্রের নারী পাইলট রাদকা ম্যাচোভ। ওই দেশ থেকে চার সদস্যের যে প্রতিনিধি দল অংশ নিয়েছে তিনি তার দলনেতা।
যে দুটো বিমানের সংঘর্ষ হয়েছে সেগুলো আকাশে অ্যারোবেটিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিল। প্রতি দু’বছর পরপর ব্যাঙ্গালুরুতে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার আশায় এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জঙ্গিবিমান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। প্রতিরক্ষার জন্য ভারত মূলত আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সমরাস্ত্র রফতানিকারকদের প্রিয় দেশ ভারত। এনডিটিভি।