Wednesday, July 22, 2026
‘এমন জন্ম, এমন মৃত্যু যেন কারও না হয়’ by মানসুরা হোসাইন
নারায়ণগঞ্জে ভুঁইগড়ের মামুদপুর কবরস্থানে নামহীন শিশুর এই কবরের পাশে দাঁড়ালে বোঝার উপায় নেই যে মৃত্যুর আগে বা পরে এই কন্যাসন্তান তার মা–বাবা বা কোনো স্বজনকেই কাছে পায়নি। তার চিকিৎসা ও দাফনের ব্যবস্থা করেছে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন।
কাগজে মায়ের নাম আছে, বাস্তবে মা নেই
৫ নভেম্বর ২০২৫ রাত ৩টার দিকে কে বা কারা নবজাতকটিকে শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক সমস্যা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন। এ সময় শিশুটির ওজন ছিল এক কেজির মতো। ভর্তির কাগজে মায়ের নাম লেখা ছিল—আঁখিমনি-রন্টি। ভর্তির পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে আর খুঁজে পায়নি। যোগাযোগের যে নম্বর দেওয়া ছিল, সেই নম্বরে কেউ ফোন ধরেননি।
মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক, পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে চিফ কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কন্যাসন্তানটিকে ভর্তির সময় মায়ের নাম আঁখিমনি-রন্টি বলে উল্লেখ করা ছিল। তাই তার কবরের ওপরে—বেবী অফ আঁখিমনি-রন্টি (কন্যা সন্তান) লিখে রাখা হয়েছে।
মজিবুর রহমান আরও বলেন, রাজধানীর বাইরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে না। তাই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলা এড়াতে নবজাতক উদ্ধার এবং মারা গেলে থানা ও প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। সকালে এই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুমতি নিতে নিতে লাশ দাফন করতে বিকেল হয়ে গেছে। জন্ম, মৃত্যু—সব জায়গাতেই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নবজাতকটিকে।
বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ মৃত্যু
এই নবজাতকের মৃত্যুর কয়েক দিন পর ১৪ নভেম্বর ২০২৫ রাজধানীর মেরুল বাড্ডার রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ৯৫ বছর বয়সী মো. আবদুল আজিজ চৌধুরী মারা যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর আগে তিনি বারবার স্বজনদের মুখ দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ আসেননি। এমনকি মৃত্যুর পর খবর দেওয়ার পরও তাঁর লাশ নিতে আসেননি কেউ। বৃদ্ধাশ্রমের প্রশাসন আইনি ঝামেলা সামলে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করেছে।
রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রম ও ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন জন্ম ও মৃত্যু যেন কারও না হয়।
বেসরকারি উদ্যোগ ‘ভালো কাজের হোটেল’-এর পাশাপাশি রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. আরিফুর রহমান ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, গত মাসের ৮ তারিখ থেকে আবদুল আজিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন থেকেই তাঁর পরিবারের সদস্যদের বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তাঁরা কেউ দেখতে আসেননি। এমনকি মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরও লাশ নেওয়া তো দূরের কথা তাঁর পরিবারের কেউ দেখতে আসেননি।
আরিফুর রহমান বলেন, ‘নিজের পরিবার অস্বীকার করলেও রাশমনা আপনঘরের পরিবার তাঁকে অস্বীকার করেনি। আমরা তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানের দাফন করেছি।’
‘কবি কাকা’—অপরিচয়েই কাটল শেষ জীবন
আরিফুর রহমান বলেন, তিন বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা আবদুল আজিজের পরিচয় ছিল ‘কবি কাকা’। বৃদ্ধাশ্রমের সবাই তাঁকে এই সম্বোধনেই ডাকতেন। তিনি কবিতা লিখতেন। আচরণ ও কথাবার্তায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষের ছাপ স্পষ্ট থাকলেও নিজের পরিচয় জানাতে চাইতেন না।
আবদুল আজিজের এক ভাই, এক বোন আর এক ভাগনের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করেছিল বৃদ্ধাশ্রম কর্মৃপক্ষ। এবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার কথা বলেছিলেন। সে সময় এবং মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের যে সদস্যদের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফোন কেটে দেন তাঁরা। আবদুল আজিজের ভাগনে ‘রং নম্বর’ জানিয়ে ফোন কেটে দেন জানিয়েছেন আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুসনদে আবদুল আজিজের বয়স লেখা ৯৫ বছর। তবে বৃদ্ধাশ্রমে কর্মরতারা বলছেন, বয়স এর চেয়ে কম হবে। চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, মৃত্যুসনদ ও আজিমপুর কবরস্থানের দাফন-সংক্রান্ত নথিতে রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের নাম লেখা হয়েছে।
বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তির সময় দেওয়া তথ্যে লেখা ছিল—আবদুল আজিজের স্থায়ী ঠিকানা দিনাজপুর। অস্থায়ী ঠিকানা রংপুরের বদরগঞ্জ। বাবার নাম আমিনুল হক চৌধুরী ও মায়ের নাম ফরিদা আমিন চৌধুরী।
বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আবদুল আজিজের পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কথা বলা হয়। ভাই পরিচয় স্বীকার করলেও ওই ব্যক্তি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফোন কেটে দেন।
আর নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোন পরিচয় দেওয়া একজন নারী বলেন, তাঁরা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। নিজের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়া বা ভাইয়ের লাশ আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁদের মা-বাবাও মারা গেছেন।
এই নারী আরও বলেন, তাঁর ভাই আবদুল আজিজ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। লেখালেখি করতেন। পৈতৃক ভিটা সম্পত্তি ভাগ–বাঁটোয়ারা হয়নি। তবে ধানি জমি ভাগের টাকা তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল আজিজ খুব সম্ভবত সিনেমাও বানিয়েছিলেন। বৃদ্ধাশ্রমে আসা অধিকাংশ মানুষের মনে চাপা কষ্ট থাকে। অভিমান বা যেকোনো কারণে তাঁরা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।
আবদুল আজিজের শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পচন ধরেছিল। দুটি হাসপাতালে টানাটানি করতে হয়েছে। মারা যাওয়ার পরও তাঁর লাশটা পরিবারের কেউ নিতে আসেননি। এমন মৃত্যু কোনোভাবেই কারও কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন আরিফুর রহমান।
নবজাতক ও একটি চিরকুট
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেক নবজাতক কন্যাসন্তানকে রেখে তার পরিবার উধাও হয়ে যায় বলে ৭ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। হাসপাতালের পঞ্চম তলায় শিশু ওয়ার্ডের বেডে তাকে রেখে যান স্বজনেরা। হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্ট্রারে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়—ইনছুয়ারা, শাহিনুর, আলাদিপুর, ফুলবাড়ী।
পঞ্চাশোর্ধ্ব এক দম্পতি নানা-নানি পরিচয় দিয়ে নবজাতকটিকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। পরে তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শিশুটির পাশে একটি বাজারের ব্যাগ রেখে যাওয়া হয়েছিল। কিছু ওষুধ ছাড়াও জন্মের তারিখ লেখা ছিল ওই ব্যাগের ভেতর মায়ের ফেলে যাওয়া চিরকুটে। লেখা ছিল—‘আমি মুসলিম। আমি একজন হতভাগী। পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বাচ্চা রেখে গেলাম। দয়া করে কেউ নিয়ে যাবেন। বাচ্চার জন্মতারিখ ৪ নভেম্বর ২০২৫ (মঙ্গলবার)। এগুলো সব বাচ্চার ওষুধ...।’
প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে শিশুটি দিনাজপুরের অরবিন্দু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মজিবুর রহমান বলেন, সামাজিক বা পারিবারিক কোনো কারণে এই নবজাতকদের তাদের পরিবার ফেলে রেখে যায়। তারা বেঁচে থাকতেই মা, বাবা বা অন্য কোনো অভিভাবক পাওয়া যায় না। আর মারা গেলে তো আরও পাওয়া যায় না। তাই কন্যাসন্তানটির পরিচয় জানার আর কোনো উপায় নেই।
মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতকদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ হওয়ার পরে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবক খুঁজে পেতে সহায়তা করে। হাসপাতালটিতে এই ধরনের বেওয়ারিশ নবজাতকদের জন্য আলাদা একটি বিভাগ আছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধারের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট নবজাতক মারা গেছে। হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আরও সাত নবজাতক। অনেককে নতুন পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মজিবুর রহমান।
![]() |
| বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রয়াত মো. আবদুল আজিজ চৌধুরীর (ডানে) সঙ্গে আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. আরিফুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত |
Friday, June 19, 2026
চিকিৎসা আছে, তবু রোগটি গোপন রেখে যন্ত্রণায় ভোগেন মায়েরা by মানসুরা হোসাইন
মর্জিনার বয়স প্রায় ৬০। ২০ বছর ধরে তাঁর অনবরত প্রস্রাব ঝরছে। এ কারণে কোথাও যাওয়া, মানুষের পাশে বসা তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন।
বাড়িতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই এই স্বাস্থ্যগত জটিলতার মধ্যে পড়েন মর্জিনা। তখন তিনি তাঁর প্রথম সন্তান হারান। একই সঙ্গে হারান স্বাভাবিক জীবনও।
লজ্জা, অপমান আর একাকিত্ব নিয়ে বছরের পর বছর মর্জিনার মতো প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন দেশের অসংখ্য নারী। তাঁদের এই নীরব যন্ত্রণার নাম—প্রসবজনিত ফিস্টুলা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে গত ১৩ মে কথা হয় খাগড়াছড়ির মর্জিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, সব সময় ন্যাকড়া পরা ঝামেলার। অনেক চুলকায়। আবার বারবার কাপড় ধুতে হয়। এই সমস্যার কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার ভয়ে মানুষের বাড়িতে যান না। কারও পাশে বসেন না।
ফিস্টুলা সেন্টারে আসার পর ডায়াপার পেয়েছেন মর্জিনা। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে তাঁর। তবে দীর্ঘক্ষণ ডায়াপার না পাল্টানোয় সেটিও ভিজে গিয়েছিল। এখন তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন।
ফিস্টুলা সেন্টারে ভোলার ৩৫ বছর বয়সী কুলসুম বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকে তিনি মল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। মূত্রনালি দিয়ে মল চলে আসে। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে তিনি এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
কুলসুম বলেন, ‘কারও সঙ্গে মিশতে পারি না। পায়খানা ধরলে দৌড়ে যেতে হয়।’
তবে এই কঠিন সময়েও স্বামী ছেড়ে যাননি—এ কথা বলতে গিয়ে কুলসুমের চোখ ভিজে ওঠে।
সিরাজগঞ্জের বিলকিস বেগম বাড়িতে প্রসব করতে জটিলতায় পড়েন। তাঁর সন্তানটি মারা যায়। তখন থেকে তিনি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক না দিলেও আরেকটি বিয়ে করেছেন। এখন এক ছেলে তাঁর দেখাশোনা করেন।
মর্জিনা, কুলসুম, বিলকিস—সবার জীবনই কাটছে এই প্রসবজনিত ফিস্টুলার ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে। নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার খেসারত দিচ্ছেন তাঁরা বছরের পর বছর।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা কী?
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও ফিস্টুলা সার্জন বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, তলপেট ও কোমরের নিচের হাড়গুলোকে একত্রে শ্রোণিচক্র বা পেলভিস বলে। প্রসূতির শ্রোণিচক্র তুলনামূলক ছোট হলে বা গর্ভের শিশুর মাথা বড় হলে প্রসবপথে শিশুর বের হতে বাধা সৃষ্টি হয়, যাকে বাধাগ্রস্ত প্রসব বলা হয়। বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে দীর্ঘ সময় শিশুর মাথা প্রসবপথে আটকে থাকলে আশপাশের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে সেই অংশে পচন ধরে। কয়েক দিনের মধ্যে টিস্যু খসে পড়ে। যোনিপথের সঙ্গে মূত্রাশয় বা মলদ্বারের অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। এতে অনবরত মল বা মূত্র বা উভয়ই বের হতে থাকে। এ অবস্থাই হলো প্রসবজনিত ফিস্টুলা।
চিকিৎসকেরা বলছেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসার আওতায় এলে প্রসবজনিত ফিস্টুলা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার কারণে এখনো বহু নারী ফিস্টুলার ভুক্তভোগী।
হাজারো নারী যন্ত্রণায়
দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় জরিপ হয়নি। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশসহ ৫৫টি দেশে একটি বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৩৫ জন প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত। এ হিসাবে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৩৩।
২০২২ সালে ‘বাংলাদেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা: ক্লিনিক্যাল যাচাইকরণভিত্তিক সংশোধনসহ একটি জাতীয় জরিপের প্রাক্কলন’শীর্ষক গবেষণা ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’–এ প্রকাশিত হয়। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ১৭ হাজার ৪৫৭ জন নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত।
গবেষণাগুলো বলছে, ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের একটি বড় অংশ বহু বছর চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকে। অনেকের বয়স ৫০ বা ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা এখনো এই যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন। ভুক্তভোগী নারীর প্রায় ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে নবজাতক মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়।
ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক মুনা সালিমা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীর সংখ্যাটা হয়তো কম। তবে আক্রান্ত কোনো কোনো নারী ৩০ বছর ধরে যন্ত্রণা ভোগ করছেন। কাপড় বা ন্যাকড়া পরতে পরতে সংক্রমণ হচ্ছে। মূত্রপথে ঘায়ের মতো হয়ে যাচ্ছে।
মুনা সালিমা জাহান আরও বলেন, আক্রান্ত নারীর শরীর থেকে সারাক্ষণ মলমূত্রের গন্ধ, স্বামীর পরিত্যাগ, পরিবারের অবহেলা, প্রসবের সময় সন্তান হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে এই সব নারী এক কঠিন ও দুর্বিষহ জীবন পার করছেন।
লজ্জা ও গোপনীয়তার দেয়াল
প্রসবজনিত ফিস্টুলাকে বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো, রোগটি লুকিয়ে রাখা।
খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিম বলেন, তাঁর মা এই স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়টি সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন। এ কারণে এত দিন তাঁর চিকিৎসা হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী তাঁর মাকে খুঁজে বের করেন। এখন তাঁকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।
ইউএনএফপিএর মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট চিকিৎসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ফিস্টুলা রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে রোগের নিরাময় সম্ভব।
এই চিকিৎসক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ও ইউএনএফপিএর সহায়তায় বাংলাদেশের ৩৫টি জেলা হাসপাতালে ‘ফিস্টুলা কর্নার’ চালু আছে। ফিস্টুলার উপসর্গ থাকা রোগীদের সেখানে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা। রোগ নিশ্চিত হলে উন্নত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারসহ সরকারি-বেসরকারি ২০টি ফিস্টুলা সেন্টারে পাঠানো হয়। রোগীদের যাতায়াত, পুনর্বাসনেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১৬টি শয্যা নির্ধারিত আছে বলে জানান অনিমেষ বিশ্বাস। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১১৬ জন মিডওয়াইফ নিয়োগ দিয়েছে ইউএনএফপিএ।
বাল্যবিবাহ ও বাড়িতে প্রসবের খেসারত
চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে বাড়িতে প্রসব কমিয়ে নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দেশে এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রসব বাড়িতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন না।
২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ অনুযায়ী, এখনো বাড়িতে প্রসবের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। বড় একটা অংশের প্রসব অদক্ষ দাইয়ের হাতে হয়ে থাকে। চার বা ততোধিক প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। প্রতি এক হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ২০ জন মারা যায়। প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মা মারা যান।
একই বছরে পিএলওএস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫৩ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রসব কোনো দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধান ছাড়াই বাড়িতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহেরও দায় রয়েছে।
দেশে প্রতি দুজন মেয়ের মধ্যে একজন বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫–শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশের। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে।
জাতীয় প্রসূতি ফিস্টুলা বার্ষিক প্রতিবেদনের (২০১৯-২০২৪) তথ্য বলছে, এই সময়ে শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৮৫ শতাংশই বাল্যবিবাহের শিকার ছিল। ৮৮ শতাংশের প্রথম সন্তান জন্ম হয়েছিল কিশোরী বয়সে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় অর্ধেকের শেষ প্রসব হয়েছিল বাড়িতে। আর ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবে সহায়তা করেছিলেন অদক্ষ দাই বা স্বজনেরা। ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কুসংস্কার বা সনাতন বিশ্বাস হাসপাতালে না যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল। ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের সঙ্গে সঙ্গেই ফিস্টুলা হয়েছে। আক্রান্ত নারীদের অধিকাংশই দীর্ঘ সময় চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় এই যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। ২৩ শতাংশ নারী ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলায় ভুগছিলেন।
চিকিৎসায় সাফল্য ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলের বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউএনএফপিএ, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও সুইডিশ সিডার সহায়তায় সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।
সরকারের তৃতীয় জাতীয় কৌশলপত্রে (২০২৩-২০৩০) প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং সব আক্রান্তকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার, তৃণমূল পর্যায়ে মিডওয়াইফ নিয়োগ, জেলা হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি ও অস্ত্রোপচার সেবা নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৮০৭ জন ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময় ৩ হাজার ২৭ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৭৯৫ জন সুস্থ হয়েছেন। অস্ত্রোপচারে সাফল্যের হার ৯২ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে জাতীয় ফিস্টুলা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এখানে (সেন্টার) ৩৬৬টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৭ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। ১৬ জন আংশিক সুস্থ হয়েছেন। রোগীদের হাসপাতালে অবস্থানের গড় সময় ছিল ৫০ দিন।
‘কোনো মা যেন এই ভুল না করে’
চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবন পেয়েছেন শেরপুরের জুলেখা বেগম। গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় শেরপুরে জুলেখার বাড়িতে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাড়িতে প্রসব করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন তিনি। অদক্ষ দাইয়ের টানাহেঁচড়ায় নবজাতকের মাথা আটকে গিয়েছিল। এরপর শুরু হয় অনবরত মলমূত্র ঝরার যন্ত্রণা।
সন্তান জন্মের পর সাত মাসের বেশি সময় ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেন ২৬ বছর বয়সী জুলেখা। মলমূত্র ধরে রাখতে না পারায় দিনে কয়েকবার তাঁকে গোসল করতে হতো। এই সমস্যার কারণে কখনো কখনো গভীর রাতেও গোসল করতে বাধ্য হতেন তিনি। মানুষ ভয় দেখাত, স্বামী তাঁকে তালাক দেবেন বা দ্বিতীয় বিয়ে করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি।
জুলেখা বলেন, তাঁর মেয়ের জন্ম হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল। ছেলের জন্মের সময় ভেবেছিলেন, বাড়িতে প্রসবে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এই ভুলের খেসারত তাঁকে দিতে হয়। তিনি ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন।
জুলেখা আরও বলেন, ‘লজ্জায় কারও বাড়িতেও যেতাম না। শুধু কাঁদতাম। আমি যে ভোগা ভুগছি, আর কোনো মা যেন এই ভুল না করে।’
স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মীর (‘শারমীনা আপা’) মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিস্টুলা সেন্টারের খোঁজ পান জুলেখা। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর এক মাস চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি সুস্থ। পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তিনি একটি ছাগল পেয়েছেন।
ইউএনএফপিএর সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গত বছর থেকে শেরপুরে ফিস্টুলা প্রতিরোধ ও রোগী শনাক্তকরণে কাজ করছে।
শেরপুরের সিভিল সার্জন মুহাম্মদ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, গত এক বছরে জেলার নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতি উপজেলায় ৩১ জন ফিস্টুলা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২২ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। ১৭ জনকে সেলাই মেশিন ও ছাগল দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে নালিতাবাড়ীকে ফিস্টুলামুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি মাসের সভার আলোচ্যসূচিতে ফিস্টুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অনেকটা সুস্থ জামেনা-জোমেলা
শেরপুরের দুই বোন জামেনা ও জোমেলা দীর্ঘদিন ফিস্টুলায় আক্রান্ত ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর এখন তাঁরা উভয়ে অনেকটা সুস্থ।
জামেনা বলেন, প্রস্রাব আটকে রাখতে পারতেন না বলে একসময় তাঁকে সবাই বিদ্রূপ করত। তবে এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন।
জোমেলা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। তিনি বলেন, সারাক্ষণ প্রস্রাব ঝরার কারণে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ পেলেও বারবার চাকরি হারাতে হয়েছে। তাঁর প্রথম সন্তান মৃত জন্ম নেয়। পরে যমজসহ আট সন্তানের জন্ম দিলেও বেঁচে আছে দুজন।
জুলেখার মতো এই দুই বোনও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ‘শারমীনা আপা’–কে। তিনি সিআইপিআরবির জেলা সমন্বয়কারী (ফিস্টুলা) শারমীনা পারভীন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের খুঁজে বের করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, হাসপাতালে পাঠানোর কাজ চলছে।
বাড়ছে সচেতনতা
শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে দেখা হয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মেহের বানুর সঙ্গে। ভাতিজা সাইফুল ইসলামের বাড়িতে তিনি থাকেন।
সাইফুল বলেন, তাঁর ফুফুর বিয়ে হয়েছিল ছোটবেলায়। প্রথম সন্তানের জন্মের পর থেকেই তিনি ফিস্টুলায় ভুগছেন। ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।
ফিস্টুলা নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন সাইফুল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম বাড়িতে হয়। জন্মের পর নবজাতক মারা যায়। এর পরে তাঁর দুই সন্তান হয়। উভয় ক্ষেত্রে প্রসবের জন্য তিনি তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিমও বলেন, মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট দেখে তিনি সচেতন হয়ে যান। এই সচেতনতা থেকেই তিনি তাঁর স্ত্রী ও বোনকে প্রসবের সময় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
জুলেখা, জামেনা, জোমেলা, মেহের বানুরা জানালেন, অনিরাপদ প্রসবের কারণে নিজেদের দুর্বিষহ ভোগান্তির কথা তাঁরা নিজেদের চেনা-জানা প্রসূতিদের বলছেন। সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
![]() |
| প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি |
Saturday, June 13, 2026
পরিচয় থাকার পরও ‘বেওয়ারিশ’ দুলালী, রেখে গেলেন অনেক প্রশ্ন by মানসুরা হোসাইন
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখন থেকেই পরিবারের কাছে তিনি নিখোঁজ। মানসিক ভারসাম্যহীনতায় হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের আসল নাম—শামীমা নাসরিন জাহান। আর ঘর হারিয়ে ঠাঁই হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের একটি ফুটপাতে। অবহেলা, ক্ষুধা ও অসুস্থতায় মৃত্যু হয় তাঁর। পরে তাঁর লাশ দাফন করা হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুলালী রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো বা নতুন করে ভাবার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।
আট হাসপাতাল ঘুরে ঠাঁই হলো রাস্তার পাশে
গত ২২ মে সকালে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের ৬০ ফিট সড়কের পাশে শামীমাকে দেখতে পান সমাজসেবামূলক সংগঠন হিরোজ ফর অলের ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মুছা করিম (রিপন)। হাড় জিরজিরে শামীমা কিছু খেতে পারছিলেন না।
চিকিৎসার জন্য দুজন নারী ভিক্ষুকের সহায়তায় শামীমাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান মুছা করিম। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ আটটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে ভর্তি করা হয়নি, কোথাও অভিভাবক চাওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে রোগী সামলানো কঠিন। এ কারণে তাঁর স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি।
মুছা করিম প্রথম আলোকে বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে কাজীপাড়ার এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করার পরও দুলালীকে রাখা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগী রুমে থাকতে চাইছেন না এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিরাময় ক্লিনিকে নেওয়া হলে এনআইডি ও আইনগত অভিভাবক না থাকায় ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শেল্টার হোমেও চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ৮ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের সুপারম্যাক্স হেলথকেয়ার লিমিটেডে চিকিৎসা শুরু হলেও সেখানেও তাঁকে রাখা হয়নি।
শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে ২৪ মে ধানমন্ডির একটি রাস্তার পাশে দুলালীকে রেখে আসতে বাধ্য হন মুছা করিম। একটি হোটেলে টাকা দিয়ে তাঁর জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে যান তিনি।
এক প্ল্যাকার্ডে বদলে গেল দৃশ্য
দুলালীদের মতো মানুষ কেন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা পাবেন না, তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেন মুছা করিম। ২৭ মে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তিনি একাই দাঁড়ান একটি প্ল্যাকার্ড হাতে। তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল— ‘নো হেলথ উইথআউট মেন্টাল হেলথ।’ আর বাংলায় লেখা ছিল— ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই, দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’
এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারের সহায়তায় ২৯ মে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় দুলালীকে। জিয়া উদ্দিন হায়দার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে হাসপাতালে দুলালীকে দেখতেও গিয়েছিলেন।
কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে দুলালীর। পরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) নেওয়া হয়। ৩১ মে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।
মৃত্যুর পর মিলল পরিচয়, তবু দাফন ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে
জীবিত অবস্থায় কেউ জানতেন না তিনি কে। মৃত্যুর পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে পরিচয়। তাঁর নাম দুলালী নয়, শামীমা নাসরিন জাহান। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। শামীমার বাবার বাড়ির ইউনিয়নের নাম মোল্লারহাট। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব একদম কাছে না হলেও খুব দূরেও না। যশোরের কেশবপুরেও তাঁর আরেকটি ঠিকানা পাওয়া যায়।
নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শামীমার স্বামীরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়েও কাউকে খুঁজে পায়নি। এ কারণে ৩ জুন রায়েরবাজার কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এর দুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর দেখে ৫ জুন ছুটে আসেন তাঁর ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা। ৭ জুন মেয়ের কবর দেখতে ঢাকায় আসেন মা।
‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পারলাম না’
শামীমার বড় ভাই মিজানুর রহমান ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে শামীমা ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি নলছিটি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন। বাবা আবদুল খালেক ২০১৭ সালে মারা গেছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে কারও কোনো ক্ষতি করতেন না। একা থাকতে পছন্দ করতেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কখনো কোনো মাজারে পাওয়া যেত, আবার কখনো নিজেই চলে আসতেন। তাঁর স্বামী আলাদা বাসা ভাড়া করে তাঁকে রাখতেন।
তাঁর নাম দুলালী ছিল কি না জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, না; এমন কোনো নাম ছিল না। হয়তো তাঁর বোন নিজে থেকেই এ নাম বলেছিলেন।
আক্ষেপ নিয়ে শামীমার বড় ভাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম না, দাফন করতে পারলাম না। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হলো। এ কষ্ট সারা জীবন থাকবে। আমরা মুছা ভাই ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁরা না থাকলে আমাদের বোনটা ফুটপাতেই মরে পরে থাকত।’
স্বামীর নীরবতা
শামীমার স্বামী শহিদুল ইসলাম হাওলাদার নিজেও একজন পুলিশ সদস্য। বর্তমানে তিনি বরগুনার আমতলি থানায় পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শামীমা নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রীকে খুঁজে পেতে তিনি থানায় জিডি করা বা অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ করছেন শামীমার বাবার বাড়ির সদস্যরা।
স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি না করার বিষয়টি স্বীকার করে শহিদুল ইসলাম হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে শামীমার তথ্য জানতে জানতে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে।’
শামীমার কখনো চিকিৎসা করিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে শহীদুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ও আমাকে সহ্য করতে পারত না। তাই চিকিৎসা করানোর জন্য শাশুড়িকে বলেছিলাম। তবে সন্তান না হওয়ার সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেছি।’
স্ত্রীর মরদেহ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত নেবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল বলেন, ‘এত দিনে মরদেহ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কবর খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে লাশ থেকে গন্ধ বের হবে, সবাই বিরক্ত হবে। অনেক ঝামেলাও করতে হবে।’
প্রশ্নের মুখে পুলিশি অনুসন্ধান
৩১ মে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি যশোরের কেশবপুর ও ঝালকাঠির নলছিটি থানায় বেতার বার্তা পাঠিয়ে দুলালী ওরফে শামীমা নাসরিন জাহানের তথ্য জানাতে বলেন। তবে ১ জুন নলছিটি থানা জানায়, স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে শামীমা নাসরিন জাহান নামে কাউকে খুঁজে পাননি এএসআই আনিসুর রহমান।
কেশবপুর থানা থেকেও একই বার্তা আসে বলে জানিয়েছেন মুছা করিম।
তবে পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর নলছিটি থানায় শামীমাকে নিখোঁজ দেখিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তাঁর মা মোসা. মনোয়ারা বেগম। ৪৫ বছর বয়সী নাসরীন জাহানের (শামীমা বাদ ছিল) স্বামী শহিদুল ইসলাম বাবুলসহ অন্যান্য তথ্য উল্লেখ করা ছিল।
এই দম্পতি আনুমানিক ২৪ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, বিবাহিত জীবনে সন্তান হয়নি। শামীমা মাঝেমধ্যেই স্বামীর বাড়ি থেকে মায়ের বাড়ি চলে আসতেন, কারও সঙ্গে মিশতেন না, মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না—এসব তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জিডির আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শামীমা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কেনাকাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। এলাকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর থানায় জিডি করা হলো। শ্যামলা, লম্বায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, কালো বোরকা গায়ে শামীমা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তা–ও উল্লেখ ছিল।
নলছিটি থানার তৎকালীন ওসি মো. আ. সালাম এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এএসআই সনজীব কুমার পাহলানকে দায়িত্বও দিয়েছিলেন।
কিন্তু শামীমার মৃত্যুর পর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত করলেও সেই জিডির সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে বের করা যায়নি।
শামীমার ভাই মিজানুর বলেন, তাঁর মা আর ভাই নলছিটি থানার একদম কাছেই একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। পুলিশ ভালোভাবে চেষ্টা করলে তাঁদের খুঁজে পেতেন।
নলছিটি থানার বর্তমান ওসি আরিফুল আলম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুজন কর্মকর্তা সারাদিন এলাকায় গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজেছেন, কিন্তু কেউ তাঁদের চিনতে পারেননি। থানার অনলাইন জিডির তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না।
শামীমার মৃত্যুর পর থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফনসহ বিষয়টি দেখভাল করেছেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিডি থাকার পরও পরিবারকে খুঁজে না পাওয়া দুঃখজনক এবং এ দায় নলছিটি থানা এড়াতে পারে না।’
এসআই সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা এখনো চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় কবর থেকে লাশ তুলে আবার দাফন করতে পারেন। শামীমার মৃত্যুসনদে ‘দুলালী’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সনদ শামীমার মা এবং তাঁর স্বামী দুজনই চাচ্ছেন। কাকে দেওয়া হবে, তা সুরাহা হয়নি। তাই সনদটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।
দুলালী বা শামীমা যে প্রশ্ন রেখে গেলেন
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এসব ব্যক্তির ৯২ শতাংশ চিকিৎসা নেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, বাংলাদেশ ২০২২ বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ।
২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনে মানসিক রোগী ভর্তির জন্য এনআইডির বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অভিভাবক, আত্মীয় বা ঠিকানাবিহীন মানসিক রোগীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিকটস্থ সরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রধানের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে শুরুতে শামীমাকে হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে।
তবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে রোগী ভর্তিতে এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মনিবন্ধন, ছবি, রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের উপস্থিতি ও অভিভাবকের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়। অভিভাবকহীন রোগীদের আদালতের নির্দেশে ভর্তি করা হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক রোগী হারিয়ে গেলে, পালিয়ে গেলে, আত্মহত্যা বা সহিংসতার চেষ্টা করলে কিংবা অভিভাবক রোগীকে নিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনগত প্রক্রিয়ায় এনআইডি ও ছবি প্রয়োজন হয়। এ কারণে ভর্তির সময় রোগীর ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়। তবে অভিভাবকহীন গুরুতর মানসিক রোগীরা জরুরি বিভাগ বা আউটডোরে এলে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তির সময় মা–বাবা বা অভিভাবকের ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে বিকল্প আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ মনোচিকিৎসকদের নিয়ে সভা করার পরিকল্পনা আছে জানিয়েছেন সাইফুন নাহার।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিন্নমূল মানুষ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন না—এটা হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। দুলালীর মৃত্যু রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারব্যবস্থার অনেকগুলো দিক সামনে এনেছে।
জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, এই নারী কেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা তখন কোন দায়িত্ব পালন করলেন, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব মিলে আইনের কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন করতে হবে, তা দেখতে হবে।
![]() |
| মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান। ছবি: মুছা করিমের সৌজন্যে |
Thursday, February 19, 2026
নির্বাচন কর্মকর্তার চোখে ২০১৮ ও ২০২৬: এক নির্বাচনে ভয়, আরেক নির্বাচনে ভরসা by মানসুরা হোসাইন
আট বছর পর, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর কণ্ঠে ভিন্ন সুর, ‘ন্যূনতম কোনো সমস্যা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।’
বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাজমুস সাকিব। নির্বাচনের পর পারিবারিক সময় কাটাতে ঢাকার বাইরে অবস্থানকালে শনিবার তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করে গেলেও নাজমুস সাকিব এ পর্যন্ত একবারও নিজের ভোট দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
২০২৬: সকালের বিস্ময় দিয়ে শুরু
রাজধানীর লালবাগের জামিলা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে নাজমুস সাকিবের বুথ ছিল ভবনের তৃতীয় তলায়। ভোট শুরুর নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে সাতটার আগেই ভোটার উপস্থিত—এ দৃশ্য তাঁকে বিস্মিত করেছে।
২০১৮ সালের ভোটে অনিয়মের চূড়ান্ত রূপ দেখা নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এবার ব্যালট পেপার হাতে আসার আগেই ভোটার হাজির। নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এত মানুষকে ভোট দিতে দেখা এবারই প্রথম।’
নাজমুস সাকিব বলেন, ভোট শুরুর পর দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটু সময়ের জন্যও তিনি নড়তে পারেননি। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে দুই মিনিটের জন্য ওয়াশরুমে যেতে পেরেছিলেন। তারপর বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত আবার একটানা কাজ করতে হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে ভোট নেওয়ার পর ভোট গণনা শেষে বাড়ি ফেরেন তিনি।
নাজমুস সাকিবের বুথে ভোট দিয়েছেন পুরুষ ভোটাররা। তিনি বলেন, ৯০ বছরের বেশি বয়সী এক ভোটার অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে এসেছেন। টিপসই দিতে বললে তিনি নিজেই সই করতে চাইলেন। ভোট দিয়ে বেরিয়ে বললেন, ‘জীবনে আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাব কি না, জানি না, তবে এবার সুষ্ঠুভাবে দিতে পারলাম।’
একজন বয়স্ক ভোটার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে গালাগালি করেছিলেন। কিন্তু বুথে ঢুকে প্রক্রিয়া দেখে পরে ক্ষমা চান।
নাজমুস সাকিব তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভোটারদের বেশ বড় একটা অংশ ‘গণভোট’ বিষয়টি বুঝতেই পারেনি। কিসের ‘হ্যাঁ’, কেন ‘হ্যাঁ’, কিসের ‘না’, কেন ‘না’—এ নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না অনেকের। বারবার বুঝিয়ে দিলেও বুঝতে পারছিলেন না। কয়েকজন গণভোটে ভোট না দিয়ে ব্যালটটি ফেরত দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। ব্যালট কেমন করে ভাঁজ করবেন, তা–ও বেশির ভাগ ভোটারকে দেখিয়ে দিতে হয়েছে।
বুথের ভেতরে নাজমুস সাকিবসহ অন্য যাঁরা দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁরা ভোটারদের বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করেছেন। একইভাবে বুথের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তা রক্ষায়, আনসার সদস্যরা ভোটারদের কক্ষ খুঁজে পেতে সহায়তা করাসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। নাজমুস সাকিব সুষ্ঠু ভোটের জন্য এই সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে নাজমুস সাকিব ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘...পুরো ২০২৫ সালে আমার যা পরিশ্রম হয়নি, আজ এক দিনে আমাকে তার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে।...মানুষের লাইন বেড়েই যাচ্ছে। লাঞ্চ করেছি বেলা পৌনে তিনটায়। ততক্ষণে ঘাড়ের পেছনে ব্যথা শুরু করেছে, প্রেশার বাড়ার লক্ষণ সম্ভবত।’
নাজমুস সাকিবের ফেসবুক পোস্টের নিচে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা অন্যরাও মন্তব্য করেছেন। তাঁরাও প্রায় একই রকমের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। ভোটাররাও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। সাদিয়া ফারহা লিজা নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘ভাই, আমি শাড়ি পরে ফাল্গুন লুকে ভোট দিতে গিয়েছি।’
শাহরিয়ার নীল শুভ্র নামের একজন লিখেছেন, ‘আমার মা জ্বর নিয়েও সকালের নাশতা শেষে ওষুধ খেয়ে পান চিবাতে চিবাতে ভোট দিতে গেছেন। অনেকক্ষণ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও হাসিমুখে ফিরেছেন। আবার ছোট খালার সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন, কে জিততে পারে বা ভোটের পরিস্থিতি কেমন। অথচ তাঁরা পুরোপুরি সংসার নিয়ে থাকা মানুষ। তাঁদের মাঝে এই আমেজ আগে দেখিনি।’
নির্বাচনে কোনো একটি কেন্দ্রে ১৯ জন দায়িত্ব পালনকারীর একজন ছিলেন ফাহরিন আহমেদ আনন্দ। তিনি নাজমুস সাকিবের পোস্টে মন্তব্যে লিখেছেন—সব দলের এজেন্টদের উপস্থিতিতে গণনা করা হয়েছে, এমনকি বাতিল ভোটগুলো একটা একটা করে তাঁদের দেখানো হয়েছে কেন বাতিল করা হয়েছে। এই ১৯ জনের সামনেই ভোট গণনা এবং লেখা শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সই করার পর তাঁরা কেন্দ্র ত্যাগ করেছেন। তাঁর মতে, মিডিয়ার এই যুগে তথ্য গোপন করা সম্ভব নয়।
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ফলাফল ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পেয়েছে। ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। আর তাঁদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অর্থাৎ বিএনপি ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১২ আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্ররা পেয়েছে ৭৭ আসন।
২০১৮: ‘রাতের ভোট’-এর স্মৃতি
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার আমলের সেই নির্বাচন দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘ফিরে দেখা নির্বাচন ২০১৮: ‘রাতের ভোট’: আপনাদের ভোট হয়ে গেছে, চলে যান’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে নাজমুস সাকিব পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে ধানমন্ডি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
নাজমুস সাকিব বলেন, সেদিন সকালে ভালোভাবেই ভোট শুরু হয়। কয়েকজন ভুয়া ভোটার এসে প্রথমে সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু দুপুরের মধ্যে পুরো চিত্র পাল্টে যায়। কয়েকজন এসে বুথ থেকে বের হয়ে না গেলে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিতে থাকে। এ সময় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে যাঁরা, তাঁরাও নিশ্চুপ ছিলেন। শুরুতে প্রতিবাদ করলেও পরে তাঁর মনে হয়, একলা প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই।
বুথে অনুপ্রবেশকারীরা নিজেরাই ব্যালটে সিল মারতে থাকেন। এমনকি বুথের দায়িত্বে থাকা সবার জন্য দুপুরের খাবারও নিয়ে আসেন। নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এর প্রতিবাদ হিসেবে বলেছিলাম, আপনাদের আনা খাবার খাব না।’
দায়িত্ব শেষে সেদিন রাতে বাসায় ফিরেও নিজের অভিজ্ঞতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফেসবুকে ওই পোস্টের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১২ মিনিট। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে মায়ের অনুরোধে তা মুছে ফেলেন। তিনি বলেন, তাঁর মায়ের ফোনে বিভিন্ন জায়গা থেকে কল আসা শুরু হয়েছিল। তাই মায়ের অনুরোধে তিনি পোস্টটি ফেসবুক থেকে ডিলিট করে দেন।
সম্প্রতি ২০১৮ সালের ভোট গ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আবারও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন নাজমুস সাকিব। ওই পোস্টে ইসমাইল হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘আপনার ২০১৮ সালের পোস্টটা এখনো মনে পড়ে। পরিচিত অনেকের এমন সাহস ছিল না। পরে যে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটাও মনে আছে।’
গত বছরের ২৩ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন বিতর্কিত হলেও সেই দায় নির্বাচন কমিশনের নয়, নির্বাচন সুষ্ঠু রাখতে অনেক স্টেকহোল্ডার জড়িত থাকেন। নির্বাচন আয়োজন শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের আর কিছুই করার থাকে না। বিষয়টি উচ্চ আদালতের ওপর ন্যস্ত থাকে।
এবারের ভোট গণনা এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ও ‘না’ ভোট নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমুস সাকিব বলেন, ‘আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতার কথা বলেছি। ঢাকায় পরিচিত অন্য যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরাও বড় কোনো অনিয়ম বা খারাপ পরিস্থিতির কথা বলেননি। তবে ঢাকার বাইরে অনেক জায়গাতেই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে খবর হয়েছে। এক দিনে সব অনিয়ম দূর হয়ে যাবে, তা তো বলা যাবে না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় সহিংস ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা প্রতিহত করেছে।’
![]() |
| চলতি বছরের নির্বাচনী দায়িত্বের পরিচয়পত্রসহ সৈয়দ নাজমুস সাকিব। ছবি: নাজমুস সাকিবের সৌজন্যে |
Monday, February 9, 2026
সরেজমিনে পাবনার মানসিক হাসপাতাল: ‘অমানবিকতা’র নানা গল্প জমা যেখানে by মানসুরা হোসাইন
সাইদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? কথা জড়িয়ে যায়, বললেন, ‘ভালো আছি।’ বাড়ি যেতে মন চায় কি না, জানতে চাইলে শিশুর মতো কান্না শুরু করলেন। অস্পষ্টভাবে বলতে থাকেন, ‘বাড়ি যাব, বাড়ি যাব।’ সেদিন ওয়ার্ডটিতে সাইদসহ ২২ জন রোগী ছিলেন।
সাইদকে এখন হাসপাতালে কর্মরতরা ডাকেন ‘সাইদ চাচা’। কয়েকজন বললেন, সাইদ চাচার হয়তো এই জীবনে আর বাড়ি ফেরা হবে না। তবে অন্যরা চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবেন, সে আশায় দিন গুনছেন।
পাবনার তৎকালীন সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী ছিলেন হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫৭ সালে প্রথমে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল পাবনা শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে। পরে সদর উপজেলার হিমাইতপুর ইউনিয়নের হিমাইতপুর গ্রামে অধিগ্রহণ করা হয় ১১১ দশমিক ২৫ একর জমি। এ জমির বেশির ভাগই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় গুরু শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের। হাসপাতালের মোট জমি থেকে পাবনা মেডিকেল কলেজকে ৮১ দশমিক ২৫ একর জমি দেওয়া হয়েছে।
৬০ শয্যা থেকে শুরু করা মানসিক হাসপাতালটি দফায় দফায় বেড়ে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। ৩০ অক্টোবর হাসপাতালটিতে মোট রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৭৩ জন। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮১। ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ২১১ জন। এ সময় মানসিক রোগের পাশাপাশি অন্যান্য অসুখ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯ জন হাসপাতালে মারা গেছেন।
ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ (প্রাপ্তবয়স্ক) কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। আর শিশুদের (১৮ বছরের কম বয়সী) মধ্যে এ হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে মানসিক রোগ থাকা ৯১ শতাংশ মানুষই চিকিৎসার বাইরে আছেন।
পাবনার মানসিক হাসপাতালটিতে বিনা মূল্যের শয্যা আছে ৩৫০টি। আর টাকা দিয়ে সেবা নিতে হয় ১৫০টি শয্যায়। মোট ১৯টি ওয়ার্ডে (মাদকাসক্ত পুরুষদের জন্য একটি পেয়িং ওয়ার্ডসহ) নারী ও পুরুষ রোগী ভর্তি করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পথ্য বাবদ ৩ কোটি টাকা এবং ওষুধ, যন্ত্রপাতি কেনাসহ অন্যান্য খাতে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরকার বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিকিট, সিটভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১১০ টাকা আয় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।
সরেজমিনে মানসিক হাসপাতাল
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর হাসপাতালটির সার্বিক চিত্র দেখার সুযোগ হয়। হাসপাতালের একটি কক্ষের সামনে ‘সিনেমা অপারেটর’ লেখা দেখে থমকে যেতে হলো। জানা গেল, রোগীদের বিনোদনের জন্য হাসপাতালের ভেতরেই বানানো হয়েছিল সিনেমা হল। বর্তমানে সিনেমা হলকে মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
১৯৯৩ সালে কাজে যোগ দেওয়া রেখা আক্তার বর্তমানে নার্সিং বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বললেন, কাজে যোগ দেওয়ার পর তিনি শুনেছেন, রোগীরা এখানে সিনেমা দেখতেন। রোগীদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। হাসপাতালে গরু পালন করা হতো, গরুর দুধ খাওয়ানো হতো রোগীদের। তবে এসবই এখন অতীত।
হাসপাতালের স্টাফ নার্স মঞ্জুয়ারা খাতুন প্রায় ২২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত। এলাকার মেয়ে হিসেবে ছোটবেলায় হাসপাতালে এসেছেন, সে স্মৃতিও মনে আছে তাঁর। তিনি বলেন, আগে হাসপাতাল আয়নার মতো ঝকঝক করত! এখন তো অবস্থা খুব খারাপ। সারাক্ষণ ভয় লাগে ছাদ থেকে কখন মাথায় পলেস্তারা খসে পড়ে!
এবার ফেরা যাক অতীত থেকে বর্তমানে। হাসপাতালের মূল ফটকে ঢোকার আগে চারপাশে যত দূর চোখ যায়, তার সবই মানসিক হাসপাতালের জমি। ফটক দিয়ে ঢুকেই যে সড়ক, সেটি বেহাল। ফটকের বাইরে ও ভেতরে একটু পরপর পরিত্যক্ত বাড়ি চোখে পড়ল। একসময় এগুলো হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিদের আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, বৃষ্টি হলে হাসপাতালের ভেতরে একতলায় পানি ঢুকে যায়। চারপাশের ঝোপঝাড়ে সাপ দেখা যায় মাঝেমধ্যে।
৩০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বহির্বিভাগের আশপাশে দেখা গেল, প্রকাশ্যেই চলছে এ হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার জন্য দালালদের তৎপরতা। হাসপাতাল চত্বরের বিভিন্ন গাছে মনোরোগ চিকিৎসক এবং জিন-পরি ধরলে কোথায় চিকিৎসা করাতে হবে, সেসবের বিজ্ঞাপন ঝুলছে।
মানসিক রোগ আছে, এমন ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হচ্ছে। অর্থাৎ শিশু-কিশোর মানসিক রোগীদের এ হাসপাতালে জায়গা নেই। এ ছাড়া কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলেও ভর্তি করা হচ্ছে না।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মো. শরিফুল হক ৪২ বছর বয়সী মো. শাহাবুদ্দিনের ছাড়পত্র লিখছিলেন। শরিফুল হক বলেন, নিয়মিত ওষুধ খেলে মানসিক রোগীর সুস্থ হতে ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। বর্তমানে হাসপাতালে দুই মাসের বেশি সময় রোগী ভর্তি রাখা হয় না। হাসপাতাল থেকে পাবনার ঈশ্বরদীতে বারবার ফোন করলেও শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কেউ তাঁকে নিতে আসেননি। তাই হাসপাতালের কর্মী দিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হচ্ছে। অবশ্য স্থানীয় থানা ও প্রশাসনের মাধ্যমে দেনদরবার করার পরও পরিবারের কেউ রোগীকে রাখতে না চাইলে আবার হাসপাতালে ফেরত আনতে হবে। হাসপাতালের কর্মী দিয়ে বাড়ি পাঠাতে হয় বলে যাতায়াতের ভাড়ার জন্য ভর্তির সময় জামানত বাবদ টাকা জমা রাখা হচ্ছে।
ভর্তির সময় রোগীর হালনাগাদ নাগরিকত্বের সনদ ও জন্মসনদ রাখা হচ্ছে। রোগী ও অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও রাখা হচ্ছে। মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রী, স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামী—এমন অভিভাবকদের রোগী ভর্তির জন্য চিকিৎসকদের বোর্ডে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। ভর্তি ফি ১৫ টাকার পাশাপাশি সাধারণ ও মাদকাসক্ত পেয়িং বেডের এক মাসের ভাড়া বাবদ ৯ হাজার ৭৫০ টাকা জমা রাখা হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে রোগীর সঙ্গে অভিভাবকেরা থাকতে পারেন না। ভর্তির পর দেখা করারও সুযোগ নেই। নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের রোগীদের কেউ কেউ ওষুধ বা খাবার না খেলে কর্মচারীরা বেত দিয়ে মারেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেল। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলেন, একটু কঠোর না হলে তাঁদের মানানো যায় না।
রোগী ভর্তির সময় হাসপাতালের মসজিদ উন্নয়নের জন্য ১০০ টাকা এবং রোগী কল্যাণ তহবিলের জন্য ২০০ টাকা করে রাখা হচ্ছে। কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণে স্থায়ী বরাদ্দ না থাকায় এটা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ভর্তির প্রথম দিন রোগীর খাবারের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। খাবার ও প্রথম দিনের অন্যান্য খরচের জন্য কল্যাণ তহবিলে এ টাকা রাখা হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে এক্স-রে, ইসিজি ও রক্তের কিছু পরীক্ষা করা হচ্ছে। একসময় ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির (ইসিটি) মতো থেরাপি পেতেন রোগীরা। বর্তমানে থেরাপির নষ্ট যন্ত্রটি পরিচালকের কক্ষে রাখা আছে। মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করার ইইজি পরীক্ষা করার যন্ত্রটিও নষ্ট।
পথ্য বা খাবারের জন্য রোগীপ্রতি বরাদ্দ ১৭৫ টাকা, এ টাকা দিয়েই চার বেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে। তবে এই ১৭৫ টাকা থেকে ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাক্স বাবদ ১৮ শতাংশ কেটে রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই টাকায় পুষ্টিমান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া একই ধরনের খাবার খেতে চান না অনেকে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মো. এহিয়া কামাল প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালটিতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রোগীর লাইন লেগেই থাকে। শয্যাস্বল্পতায় সবাইকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। মানসিক রোগ অনেকটা ডায়াবেটিস রোগের মতো। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। হাসপাতালে অন্যান্য অসুস্থ রোগীর সঙ্গে থাকলে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই রোগীর সুস্থতার জন্য পরিবারের যত্নও প্রয়োজন।
জনবলসংকটে ব্যাহত সেবা
১৯৯৬ সালে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যার করা হলেও জনবলকাঠামো পরিবর্তন করা হয়নি। হাসপাতালে তিনটি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পদ আছে। এর মধ্যে একজন দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত, গত বছর একজন অবসরে গেছেন, আরেকজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে একজন ইকোলজিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার দায়িত্ব পালন করছেন।
পদ না থাকায় হাসপাতালটির সহকারী অধ্যাপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সৌবর্ণ রায় মেডিকেল অফিসারের পদে কাজ করছেন। তিনি জানান, হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
সৌবর্ণ রায় বলেন, ‘বর্তমানে মোবাইল, ইন্টারনেট, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, পড়াশোনায় মনোযোগ কম—এমন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রসবপরবর্তী নানা জটিলতা নিয়ে নারীরা আসছেন। মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি বিশেষায়িত বিভাগ এবং দক্ষ জনবল থাকা জরুরি।’
হাসপাতালটিতে সিনিয়র কনসালট্যান্টের দুটি পদই শূন্য। ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, সহকারী শরীরচর্চা প্রশিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য। সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারের চারটি পদের মধ্যে দুটি, ইইজি টেকনিশিয়ানের দুটি পদের মধ্যে একটি, সহকারী অকুপেশনাল থেরাপিস্টের ৯টি পদের মধ্যে ৪টিই শূন্য। সব মিলিয়ে (চিকিৎসকসহ অন্যান্য) প্রথম শ্রেণির ৩৮টি পদের মধ্যে ১১টি শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণির ৩১৬টি পদের মধ্যে ১০টি, তৃতীয় শ্রেণির ১১৯টি পদের মধ্যে ২৩টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৭০টি পদের মধ্যে ১০৯টি পদ শূন্য। মোট ৬৪৩টি পদের মধ্যে ১৫৩টি পদ শূন্য। অবসর, বদলি ও মারা যাওয়ায় পদগুলো শূন্য হয়েছে।
১৯৯৪ সালে ওয়ার্ডবয় হিসেবে কাজ শুরু করা মো. বজলুর রহমান বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ‘সরদার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, এক ওয়ার্ডে কর্মীরা কাজ করলে অন্য ওয়ার্ডের কাজ ঠিকমতো হয় না। রোগীদের ‘আক্রমণ’ ঠেকানো থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ করতে গিয়ে পেরেশানি পোহাতে হয়। রোগীরা কখনো কামড় দেন, গলা টিপে ধরেন। তবে কর্মীদের কোনো ঝুঁকি ভাতা নেই।
৪ নম্বর কক্ষের মেঝেতে থাকা আবু সাইদকে পরিষ্কার করিয়ে দেওয়ার জন্য সেদিন দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া গেল না। ওয়ার্ডের অন্য রোগীদের কয়েকজন তাঁদের বুদ্ধিতে যতটুকু কুলায়, সেভাবেই সাইদকে হুইলচেয়ারে বসানো এবং জামা পরানোর চেষ্টা করছিলেন।
খাওয়া ও ঘুমানো ছাড়া কিছু করার নেই
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া তেমন কিছু করার নেই। ওয়ার্ডের ভেতরেই গোসলের ব্যবস্থা। পরনের কাপড় নিজেদের ধুতে হয়। ওয়ার্ড থেকে খাওয়ার রুমে গিয়ে খাবার খান রোগীরা। খাওয়ার আগে খাবারের পাত্র নিতে সহায়তা করার পাশাপাশি খাওয়ার পর নিজেদের প্লেট ধুতে হয়। খাওয়া শেষে লাইন ধরে নির্দিষ্ট কক্ষে ফেরার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা একজন একজন করে গুনে দেখেন হিসাব ঠিক আছে কি না। নিজের কাপড় ধোয়া, প্লেট ধোয়া—এমন কিছু কাজ ছাড়া আর কিছু করার নেই। একসময় রোগীদের জন্য তাঁত ও বেতের জিনিস তৈরি, কাঠের কাজ, দরজির কাজসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। রোগীরা বিভিন্ন পণ্য তৈরি করতেন। এখন সবই বন্ধ। এসব কারিগরি প্রশিক্ষণ ভবনে আনসার বাহিনীর সদস্যরা থাকছেন।
বিনোদন বলতে ওয়ার্ডের গ্রিলের কাছে দাঁড়িয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকা। এ টেলিভিশন রয়েছে নার্সরা যেখানে বসেন, সেখানকার দেয়ালে। রোগী ও টেলিভিশনের মাঝখানে অনেকটাই দূরত্ব। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে চ্যানেল পাল্টে দেওয়ার দাবি করেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে উদাস ভঙ্গিতে নিজের বিছানার দিকে হাঁটা দেন কেউ কেউ। আগে ওয়ার্ডের মধ্যে বসে সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে গান শোনানোর ব্যবস্থা ছিল, এখন তা–ও নেই।
ক্যারম বোর্ড, দাবার বোর্ড, একটি কাচের ছোট আলমারিতে কিছু বই ও চারটি পত্রিকা রাখা আছে মিলনায়তনে। তুলনামূলকভাবে ভালো রোগী ছাড়া অন্যদের ওয়ার্ড থেকে বাইরে বের করা হয় না। নারীদের জন্য বাগান করার কথা থাকলেও তা আলোর মুখে দেখেনি। অবশ্য গোলাপসহ কিছু ফুলের গাছ আছে হাসপাতাল চত্বরে।
তবে হাসপাতালটিতে কর্মরত ব্যক্তিরা সুদিনের সম্ভাবনা দেখছেন। এখানে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট করার জন্য সম্প্রতি একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দিয়েছে। ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির শুরু হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু; টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণ, পুনর্বাসনকেন্দ্রসহ নানা কিছু থাকার কথা। আশা করা হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন যথাযথভাবে হবে।
তাঁদেরও কি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে!
জীবনের দীর্ঘ সময় হাসপাতালের চার দেয়ালের ভেতরে কাটিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন সাইদ হোসেনের মতো ব্যক্তির সংখ্যা ৭। ঢাকার শাহানারা আক্তার ২৬ বছর বয়সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, এখন বয়স ৫৩ বছর। ২৫ বছরের অনামিকা বুবির বয়স হয়েছে ৫১ বছর। ২১ বছরের জাকিয়া সুলতানার ৩৭ বছর, ২৫ বছরের নাইমা চৌধুরীর ৪০ বছর, ২৩ বছরের গোলজার বিবির ৪৮, ৩২ বছরের শিপ্রা রানী রায়ের বয়স হয়েছে ৫৮ বছর।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মেজবাহুল ইসলাম হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারছেন না—এমন ব্যক্তিদের বাড়ি পাঠানোর জন্য ২০১৪ সালে একটি রিট করেছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তির সময় ভুল ঠিকানা দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে তাঁদের বাড়ি পাঠানো যাচ্ছে না। রিট করার সময় সংখ্যাটি ছিল ২৩। রিটের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েকজনকে বাড়ি পাঠাতে পেরেছিল। অন্যরা হাসপাতালেই মারা গেছেন। যাঁরা জীবিত, তাঁদের পুনর্বাসনের বিষয়টি এখনো আদালতে বিচারাধীন।
হাসপাতালে গিয়ে জানা গেল, ঢাকার নাজমা নিলুফার ২৮ বছর বয়সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, হাসপাতালেই ৬৩ বছর বয়সে মারা যান। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে স্থানীয় কবরস্থানে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে তাঁকে দাফন করা হয়।
‘পরিবার মনে হয় আমার কথা ভুইলেই গেছে’
ভর্তির পর পরিবারের সদস্যদের অনুমতি নিয়ে নারীদের চুল একদম ছোট করে কেটে দেওয়া হয়। মাথায় উকুন হয়। এ ছাড়া মারামারি লাগলে চুল টানাটানি করেন বলে এ ব্যবস্থা।
১৩ নম্বর নারী ওয়ার্ডের সামনে গেলে একজন আপন মনে বললেন, ‘পরিবার মনে হয় আমার কথা ভুইলেই গেছে।’ আরেকজন বললেন, ‘আমি কি বুঝি না, ভুলায়–ভালায় আমারে এইখানে রাইখ্যা গেছে। এইটা তো জেলখানা।’ সাংবাদিক পরিচয় জানার পর একজন গম্ভীর মুখে বললেন, ‘দেশের সবাই তো জাইন্যা যাইব আমরা পাগল!’ এ প্রতিবেদক যাতে তাঁদের বাড়িতে ফোন করেন, তেমন বায়না ধরলেন কয়েকজন। ছুটির ব্যবস্থা করতে পারবেন কি না, তা–ও জানতে চাইলেন। একজন নিজে থেকেই বললেন, ‘শেখ হাসিনা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) তাঁকে এখানে দিয়ে গেছেন; আর শেখ হাসিনা পাকিস্তানে পালিয়ে গেছেন।’
বিভিন্ন ওয়ার্ডে গেলে রোগীর বয়স যা-ই হোক, একেকজন শিশুদের মতো ছড়া বলতে থাকেন। কেউ গান গাওয়া শুরু করেন। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেও শোনান। কেউ কেউ নেচেও দেখালেন। বয়স ও পরিবেশ–পরিস্থিতি ভুলে তাঁরা একেকজন শিশুর মতো আচরণ করতে থাকেন। অনেকে গালিও দেন। বাদাম খাওয়ার জন্য বকশিশ দেওয়ার আবদার করেন। এই রোগীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কয়েকজন বললেন, ‘আপা, আবার আসবেন।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সরোয়ার মোরশেদ, প্রতিনিধি, পাবনা)
![]() |
| পাবনার মানসিক হাসপাতাল ছবি: হাসান মাহমুদ |
Friday, December 19, 2025
যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের পরীক্ষা করতেন, এবার নিজের মেয়ের সেই পরীক্ষা করতে হলো মাকে by মানসুরা হোসাইন
এই মা নিজে একজন চিকিৎসক, সার্জন। বর্তমানে বগুড়ায় কর্মরত। আগে রাজধানীর একটি হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে কাজ করার সময় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) অধীনে ভর্তি শিশুদের পরীক্ষা করেছেন, ক্ষতবিক্ষত যোনিপথ অস্ত্রোপচার করে ঠিক করেছেন। এবার তাঁকে নিজের মেয়ের একই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হলো। এরপর থানায় বসে তাঁর মেয়ে নারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বলে, ‘দাদু আমাকে ব্যথা দিয়েছে।’
বগুড়া থেকে এই মা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলছিলেন নিজের এই অভিজ্ঞতার কথা; শুনিয়েছেন তার একাকী লড়াইয়ের গল্প।
আশঙ্কা সত্যি হলো
শিশুটির দাদার বয়স প্রায় ৮০ বছর। মেয়ের বক্তব্য শোনার পর এই মা প্রথমে কিছুটা নিশ্চিত হন, মেয়ের প্যান্টে রক্ত দেখে তিনি যে আশঙ্কা করেছিলেন, তা হয়তো সত্যি।
এ ঘটনার পর মেয়ের যোনিপথ খালি চোখে পরীক্ষা করে যা দেখেছেন, তা তিনি মামলার এজাহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
তবে একদিকে নিজের মেয়ে, অন্যদিকে যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি শ্বশুর। এ কারণে স্বামীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা কেউই মামলা করতে চাননি। কিন্তু মা তা মানতে পারেননি। তাই তিনি একাই থানায় গিয়ে মামলা করেন।
একার লড়াই
মেয়েকে সরকারি হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছেন। এখনো একাই সব পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন এই মা।
মেয়েটি অনেক ছোট হওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়ার সময় পুলিশ মাকে কাছে থাকতে দেয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। আর বয়সসহ অন্যান্য বিবেচনায় আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন অভিযুক্ত শ্বশুর।
মামলা সঠিক ধারায় হয়েছে কি না—এসব নিয়ে এই মা এখন চরম সংশয়ে ভুগছেন। এ ছাড়া পরিবার-পরিজনের বিরোধিতার পরও মেয়ের জন্য তাঁকেই ন্যায়বিচারের লড়াই একা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
‘আমি যত দিন বেঁচে আছি, তত দিন মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য লড়ে যাব’—এভাবেই বলেছেন ওই মা।
ঘটনার দিন
এই মা বলেন, তাঁর স্বামীও একজন চিকিৎসক। গত ২৮ নভেম্বর ব্যক্তিগত কাজে তিনি ঢাকায় ছিলেন। সেদিন মেয়ে তার বাবার সঙ্গে বগুড়া শহরের বাসা থেকে পাশের উপজেলায় দাদার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। রাতে বগুড়ায় ফিরে তিনি বাসার গৃহকর্মীর কাছ থেকে মেয়ের রক্তাক্ত প্যান্ট দেখতে পান।
পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে মেয়ের যোনিপথ পরীক্ষা করে তাঁর মনে হয়েছে, বয়স অনুযায়ী জায়গাটি অস্বাভাবিকভাবে প্রশস্ত। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে যাওয়ার লক্ষণ, লালচে ভাব—সবই আঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত
এই মা যে হাসপাতালে বর্তমানে কর্মরত, সেখানকার আরেকজন সংশ্লিষ্ট নারী চিকিৎসককে বিষয়টি জানান তিনি। ওই চিকিৎসক বাসায় এসে মেয়েটিকে খালি চোখে পরীক্ষা করেন এবং প্রায় একই পর্যবেক্ষণের কথা বলেন। মেয়ের বাবার উপস্থিতিতেই এই পরীক্ষা করা হয়।
এর পরদিন মেয়েকে একটি হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা চলে। দায়িত্বরত চিকিৎসকদের মৌখিক বক্তব্যও শিশুটির মায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়।
মামলা ও সন্দেহ
শ্বশুরের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে এই মা বলেন, ঘটনার পরপরই তিনি মামলা করেননি। মেয়ের বাবার কাছে বারবার জানতে চেয়েছেন কীভাবে এমন ঘটনা ঘটতে পারে? কিন্তু তাকে একবার বলা হয়, বালুতে খেলতে গিয়ে জোঁক ঢুকেছে। আবার বলা হয়, লাঠি দিয়ে খেলতে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। এমনকি মাসিক হওয়ার কথাও বলা হয়।
এই মা বলেন, ‘মেয়ের এ অবস্থার জন্য তার বাবার কোনো উদ্বেগ কাজ করেনি। এ কারণে আমি একা প্রথমে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে মামলা করতে থানায় যাই। সে সময় মেয়ে নারী পুলিশ কর্মকর্তার কাছে বলেছে, ওর দাদু তাকে ব্যথা দিয়েছে। এরপর ৩ ডিসেম্বর শ্বশুরকে আসামি করে মামলা করি।’
শিশুটির বাবার সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। তাঁকে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব আসেনি।
যে ধারায় মামলা হয়েছে
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থানায় ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ নম্বর ধারা এবং ১৮৬০ দণ্ডবিধির ৩২৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তাঁর যৌন কামনা চরিতার্থ করার জন্য তাঁর শরীরের যেকোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দিয়ে কোনো নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন, তাহলে তাঁর এই কাজ হবে যৌনপীড়ন। এ অপরাধের শাস্তি অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।
অন্যদিকে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩২৪ ধারা বলছে, বিপজ্জনক অস্ত্র বা উপায় (যেমন ধারালো অস্ত্র) ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান আছে।
শিশুটির মা বলেন, ‘আমি মামলার এজাহারে সবকিছু স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছি। আমি একজন সার্জন। মেয়ের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পারলেও মামলার ধারা তো বুঝি না।’
নাতনিকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় দাদাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরে তিনি জামিন পেয়েছেন।
শিশুটির মা প্রথম আলোকে বলেন, এজাহারে ঘটনার বিস্তারিত উপাদান যথেষ্ট স্পষ্ট নয়—এই যুক্তিতে এবং আসামির বয়স বিবেচনায় জামিন আদালত আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।
হারিয়ে যাওয়া প্রমাণ
ঘটনার দিন মেয়ের রক্তমাখা প্যান্ট প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন মা। সকালে উঠে দেখেন, সেটি নেই। বাসার সিসি ক্যামেরাও কাজ করছিল না।
মা বলেন, ‘বাসায় আমার স্বামী, একজন অবিবাহিত ননদ ও চারজন কাজের মানুষ ছাড়া কেউ নেই। তাহলে প্যান্টটা কে নিল? বাসার সিসিটিভি কেন কাজ করছে না, তার উত্তরও স্বামীর কাছ থেকে পাইনি। সব মিলে আমার সন্দেহটা বাড়ছেই।’
স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন কারণে আগে থেকেই মনোমালিন্য চলছে বলে জানান এই মা। তিনি বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সংসার করতে চাচ্ছি না বলেই মিথ্যা অভিযোগ করেছি।’
এই মা বলেন, ‘আমি যদি সংসার না চাইতাম, তালাক দিতে পারতাম। স্বামীর বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ করতে পারতাম। আমি কেন আমার শ্বশুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করব?’
শিশুটির বর্তমান অবস্থা ও তদন্ত
ঘটনার পর শিশুটি মানসিক ট্রমায় ছিল উল্লেখ করে তার মা বলেন, ‘মেয়ে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে এসব নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে সে বিরক্ত হচ্ছে।
মামলাটির তদন্ত করছেন দুপচাঁচিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান সরকার। তিনি মুঠোফোন প্রথম আলোকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। এর বাইরে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
![]() |
| শিশু ধর্ষণ। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো |
Saturday, October 25, 2025
অভ্যুত্থানের পর যে রূপ নেয় গণভবনের অন্দরমহল by মানসুরা হোসাইন
গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের আবাসস্থল গণভবনে গত ২ জুন গিয়ে এই চিত্র দেখা যায়। তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা গত বছর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গণভবনে ঢোকে জনতার স্রোত। বিপুলসংখ্যক মানুষ বিশাল আয়তনের গণভবনে ইচ্ছেমতো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ভাঙচুরে অনেকটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। সেই সঙ্গে চলে লুটপাট। সেদিন লোকজন গুরুত্বপূর্ণ নথি থেকে শুরু করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত শাড়ি, তৈজসপত্র, পুকুরের মাছ, রান্না করা খাবার—সবই লুট করে নিয়ে যায়।
এই গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর করছে অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই–আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির দিন গত ৫ আগস্ট গণভবনে জাদুঘর তৈরির কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। জাদুঘরটি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ গণভবনের দায়িত্ব নিয়ে জাদুঘর তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়ায় সেখানে সাধারণের প্রবেশের সুযোগও গত কয়েক মাসে ছিল না।
এর মধ্যে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অনুমতি নিয়ে গত ২ জুন গণভবনে ঢোকার সুযোগ পাওয়া যায়। সর্বশেষ দেখা সেই চিত্রই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। গণভবনে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। সেখানকার সুইচ বোর্ড পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়েছিল। ভবনের অনেকগুলো কক্ষে ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। বড় করে গণভবন লেখা বোর্ডটিও কেউ একজন সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন।
সেদিন গণভবনের ভেতরে দেখা যায়, শেখ হাসিনার চিকিৎসা–সংক্রান্ত এক্স-রে ফিল্ম, এক্সক্লুসিভ সিরিজের স্টারলিং হাই কোয়ালিটি শটগান শেলের প্যাকেট, কোভিড–১৯–এর পরীক্ষার কার্ড, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্প উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্র, জাতীয় এসএমই পণ্য মেলা ২০২৪ এর রসিদ, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের জন্য একজনের পূরণ করা মেম্বারশিপ অ্যাপ্লিকেশন ফরম, শেখ মুজিবুর রহমানের জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রাপ্তির ৫০ বছর পূর্তির একটি কার্ড, আমার দেখা নয়া চীন-এর ৬৫ নম্বর পৃষ্ঠা, এইচ টি ইমামের পত্রিকায় লেখা হৃদয়বিদারক ১৫ আগস্ট, গদি ছাড়া চেয়ার, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের খালি প্যাকেট, ২০১৩ সালে ডিজিএফআইয়ের পাঠানো একটি খালি প্যাকেট, ২০২৩ সালের মহান বিজয় দিবসের ডাকটিকিটের লিফলেট, শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বানানো সিনেমার জন্য কাগজে লেখা ১৯৭৩ সালের দৃশ্যচিত্র—বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপের কপি, শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদের ২০১৭ সালের এমআরআই রিপোর্টের প্যাকেট, শটগান ক্লিনিং প্যাকেট, অটিজম ও স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যা–বিষয়ক কমিটিসহ আরও কিছু কাগজ, দাওয়াতপত্র, লাল মলাটে ইকবালের কবিতা, সাংবাদিকদের ভিজিটিং কার্ড, শেখ হাসিনার ভিজিটিং কার্ড এদিক–সেদিক থেকে উঁকি দিচ্ছে। লালমাটিয়া মহিলা মহাবিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর স্নাতকের রিপোর্ট কার্ড, সাদা–কালো অস্পষ্ট একটি পারিবারিক ছবি থেকে এখন আর সেগুলোর ইতিহাস বের করা সম্ভব না। ভবনের একটি কক্ষে দেখা গেল শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি দিয়ে একটি লিফলেটে লেখা, লক্ষ্য এবার স্মার্ট বাংলাদেশ।
ভবনের এক জায়গায় দেখা যায়, লেমিনেটিং করা পুড়ে যাওয়া লাশের একটি ছবি। ছবির ক্যাপশনে লেখা, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে জামায়াত-বিএনপির দেওয়া আগুনে মারা যায় বাসের হেলপার তোফাজ্জল হোসেন। হল রুমের তিনটি ঝাড়বাতি আস্তই ঝুলছিল। এটুকু দিয়ে গণভবনের অতীত জৌলুশের চিত্র যেন কিছুটা উঁকি দিচ্ছিল।
গণভবনের বিভিন্ন দেয়ালে বিক্ষুব্ধ লোকজন তাঁদের মনের কথা লিখে রেখে যান। শেখ হাসিনা খুনিসহ বিভিন্ন গালিও আছে তাতে। এক জায়গায় লেখা, ‘কিছু বললেই স্বজনহারা বেদনা শুরু হয় ডাইনির’। গণভবনের কয়েকটি কক্ষের দেয়াল সুন্দর করে রং করা। এই দেয়ালগুলোতে হাতে আঁকা গাছ ও পাখিও আছে। তেমনই একটি দেয়ালে লেখা হয়েছে, ‘জয় গণতন্ত্র ২০২৪’।
কুড়িয়ে পাওয়া একটি নোটে লেখা দেখা যায়, ‘জয় মামাকে সাধারণ খাবার দিতে হবে। পরোটা বানানো নিষেধ। সবজি, মুরগি, ডাল দিতে হবে। গরু ও খাসি কম।’ সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের খাবারের মেনুতে এই নোটটিতেই রুই মাছ, ইলিশ মাছ ভাজি, ভর্তা দুই রকম, কাচ্চি বিরিয়ানির কথা লেখা। আর ইলিয়াছ মোল্লার জন্য মেনুতে কই মাছ, শিং মাছ, শোল মাছ, টাকি মাছের কথা লেখা। মামির সালাদে টমেটো দেওয়া যাবে না— লেখা ছিল নোটটিতে। এটি কবেকার, তার তারিখ ছিল না।
৫ আগস্ট অনেকে গণভবনের লেকে নেমে গোসল করে। এই লেকের সংস্কারকাজের ফলকটি আস্তই ছিল। তাতে লেখা, গণভবনের লেক পুনঃখনন ও সংস্কার—লেকের বড় অংশের দৈর্ঘ্য ৩৭৬ দশমিক ১০ মিটার, প্রস্থ ১৮ দশমিক ৬০ মিটার। আর লেকের ছোট অংশের দৈর্ঘ্য ১০০ দশমিক ০০ মিটার এবং প্রস্থের মাপ লেখা ৬ দশমিক ৪০ মিটার। ২০১৪ সালে এ কাজটি বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন।
৫ আগস্ট গণভবনের একটি জার্মান শেফার্ডকে সঙ্গে করে নিয়ে যান একজন। পরে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে কুকুরটি উদ্ধার করে নিজের কাছে রাখেন ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০২৩ ’-এর মুকুটজয়ী শাম্মী ইসলাম (নীলা)। তবে ফেসবুকে নানা নেতিবাচক মন্তব্য দেখে শাম্মী ইসলাম গণভবনে গিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে কুকুরটিকে ফেরত দিয়ে আসেন। তবে এ কুকুর এখন কোথায় আছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
গণভবন থেকে লুট করা একটি সিন্দুক মোহাম্মদপুর থানার রায়েরবাজার বটতলা এলাকা থেকে উদ্ধার করেছিল র্যাব। এতে ৮ লাখ টাকা ছিল। পরে অবশ্য কেউ কেউ লুট করে নিয়ে যাওয়া কিছু জিনিস সেনাবাহিনীর কাছে ফেরত দিয়ে যান। তবে এসব জিনিসপত্র এখন কোথায় বা কার কাছে আছে, তা–ও জানা নেই জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের। দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ গণভবনের ধ্বংসস্তূপে যে অবশিষ্ট আসবাব বা অন্যান্য জিনিস পেয়েছিল তাতে নম্বর বসিয়েছে হিসাব রাখার জন্য।
গণভবন সম্পর্কে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ একরের বিশাল কমপ্লেক্স, উন্মুক্ত মাঠসহ ২৯ হাজার বর্গফুটের বিশাল দ্বিতল ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দাপ্তরিক কাজও হতো এখানে। গণভবনের খোলা জায়গায় নানা শাকসবজি, ফল এমনকি বিভিন্ন জাতের ধানের চাষও করতেন শেখ হাসিনা। বিশাল লেকে মাছ চাষ করতেন। গরু, মুরগি, কবুতরসহ নানা জাতের পশুপাখি পালন করতেন। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য ছিল বিশাল টেনিস কোর্ট। ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার দিন দুপুরের আগপর্যন্ত শেখ হাসিনা গণভবনেই ছিলেন। তাঁর জন্য সেদিনের খাবারও তৈরি ছিল।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে কী কী থাকছে
২ জুন সরেজমিনে দেখা যায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ গোলাম নাফিজের দেহ বহনকারী রিকশাটি একটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। জাদুঘরে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা হবে এটি। গত ৪ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটের পদচারী-সেতুর নিচে গুলিবিদ্ধ হয় নাফিজ। নাফিজ রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করে কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল।
গত ৫ নভেম্বর প্রথম আলোয় ‘নাফিজের নিথর দেহ পড়ে থাকা রিকশাটি বিক্রি করে দিয়েছেন নুরু’ শীর্ষক ভিডিও প্রতিবেদনটি দেখে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তাৎক্ষণিক রিকশাটি জাদুঘরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্য শহীদদের স্মারকগুলোও সংগ্রহ করছে সরকার।
বিশ্বের আধুনিক জাদুঘরের আদলেই এটি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তাঁর ভাষ্যমতে, এই জাদুঘর গল্প বলবে। মানুষ জানতে পারবে কীভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, তারা কী কী করেছে, কী কী করার ফলে মানুষ ফুঁসে উঠেছে এবং শেখ হাসিনাসহ নেতারা দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভবনটা তো ছিল আসলে একটা বাড়ি। যে বাড়িতে খুনি থাকতেন এবং এখানে বসে উনি পরিকল্পনা করতেন, মানুষদের নিশ্চিহ্ন করে দিতেন। অনেককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলতেন, গুম করতেন, হত্যার নির্দেশ দিতেন, ব্যাংক লুট করতেন এবং যাবতীয় অপকর্মের কেন্দ্রস্থল ছিল এটা।’
ইতিহাসের বাঁকবদলের সাক্ষী
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাজধানীর মিন্টো রোডে প্রেসিডেন্ট ভবনে অফিস করতেন। প্রেসিডেন্ট ভবন তখন গণভবন নামে পরিচিত ছিল। প্রেসিডেন্ট ভবনে স্থান সংকুলান হতো না। ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও সচিবালয় হিসেবে শেরেবাংলা নগরে এই গণভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গণভবনে বসবাস না করলেও ভবনটিকে অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন।
১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গণভবন সংস্কারের উদ্যোগ নেন। ১৯৮৬ সালে এটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে পরিণত করা হয়, নাম দেওয়া হয় করতোয়া ভবন।
গত ৯ সেপ্টেম্বর বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তখন তিনি গণভবন বরাদ্দ নিয়ে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় ২০০১ সালের ২০ জুন জাতীয় সংসদে ‘জাতির পিতার পরিবারের সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন ২০০১’ সংসদে পাস হয়। বছরটির ২ জুলাই শেখ হাসিনাকে গণভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে শেখ হাসিনার নামে গণভবন বরাদ্দ বাতিল করার দাবি জানান। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। বছরটির ১৬ আগস্ট শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে যান।
পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি উত্তরাধিকারীদের জন্য জাতির পিতার পরিবারের সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন পাস করে। ২০১০ সালের ৫ মার্চ থেকে আবারও গণভবনে থাকতে শুরু করেন শেখ হাসিনা, ছিলেন গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত।
গণভবন নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাম পরিবর্তন হয়েছে আবার গণভবন নামটি ফেরতও পেয়েছে। জাদুঘর করা হলে আবার কোনো সরকার ক্ষমতায় এসে তা পাল্টে ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে এবং সেটা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যে জুলাই এসেছে, তা সবার চোখের সামনে ঘটেছে। তথ্যপ্রমাণ সবার হাতে আছে। ফলে এবারের ইতিহাস বদলে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।’
Thursday, January 30, 2025
নির্যাতনে চার দাঁত হারানো গৃহকর্মী কল্পনা এবার হাসিমুখে বাড়ি ফিরবে
অথচ আজ থেকে ৩ মাস ১১ দিন আগে কল্পনার চেহারা দেখে যে কেউ আঁতকে উঠতেন। কল্পনার সামনের চারটি দাঁত ভাঙা ছিল। হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল ছ্যাঁকার ক্ষত। কোনো কোনো ক্ষত ছিল দগদগে। বুক, পিঠসহ সারা শরীরে মারের চিহ্ন। রক্তশূন্যতার পাশাপাশি মানসিক ট্রমা তো ছিলই।
কল্পনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের অধীনে চিকিৎসাধীন। এই চিকিৎসক জানান, দুই–এক দিনের মধ্যেই কল্পনা হাসিমুখে বাড়িতে ফিরবে। কল্পনার শরীরে অনেকগুলো অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কৃত্রিমভাবে চারটি দাঁত লাগানো হয়েছে। দাঁতগুলো স্থায়ীভাবে লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে। নিচের ঠোঁটেও ছোট একটি অস্ত্রোপচার লাগবে। সব মিলিয়ে তাকে ফলোআপে রাখা হবে।
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় সাড়ে চার বছর গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত কল্পনা। সেখানেই সে চরম নির্যাতনের শিকার হতে থাকে।
বেসরকারি চ্যানেল ৭১ টেলিভিশনের সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমন একটি ভিডিও ফুটেজের সূত্র ধরে কল্পনার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাঁর মাধ্যমে ভাটারা থানার পুলিশের সহায়তায় ১৯ অক্টোবর রাতে বসুন্ধরার ওই বাসা থেকে কল্পনাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কল্পনা প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে তাকে মারধর করার পাশাপাশি দিনে এক বেলা খাবার দেওয়া হতো। চুল সোজা করার যন্ত্র দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, লম্বা বেত দিয়ে মারধর করা এবং বন্দী করে রাখা হয়েছিল। মা ফোন করলেও ফোনের সামনে বাড়ির মালিক দিনাত জাহান থাকতেন বলে কল্পনা মাকেও নির্যাতনের কথা বলতে পারত না।
কল্পনারা পাঁচ বোন ও এক ভাই। কল্পনার বাবা শরিফ মিয়া সিলেটের হবিগঞ্জে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তবে মেয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী আফিয়া বেগম তিন মাসের বেশি সময় ধরে হাসপাতালেই ছিলেন।
মেয়েকে মারধরের অভিযোগে আফিয়া বেগম বাদী হয়ে বাড়ির মালিক দিনাত জাহানের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী মামলা করেন। দিনাত জাহান ও তাঁর এক ভাই বর্তমানে কারাগারে আছেন।
আজ বুধবার মুঠোফোনে কল্পনার মা আফিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইয়াডারে কামে দিয়া সব্বনাশ হইছে। মাইয়ারে আর কামে দিমু না। বাড়িত নিয়া ইস্কুলে ভর্তি করামু।’
পরে মায়ের মুঠোফোনেই কল্পনার সঙ্গে কথা হয়। শুরুতেই কেমন আছো, জানতে চাইলে কল্পনা জানায়, সে ভালো আছে। নিজে থেকেই প্রতিবেদককে ‘আপনি কেমন আছেন’ তা–ও জানতে চায়।
টুকটুকে লাল লিপস্টিক দেওয়া কল্পনার হাসিমুখের ছবিটি খুব সুন্দর হয়েছে বললে সে হাসতে থাকে। জানায়, লিপস্টিকটি বড় বোন রত্না কিনে দিয়েছেন। বাড়িতে ফিরে স্কুলে ভর্তি হবে এবং পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হবে বলেও জানিয়ে দিল সে। সে নির্যাতনকারী দিনাত জাহানের ফাঁসি চায়।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল কল্পনাকে দেখতে গিয়েছিল। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ কল্পনাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে তাঁর সুচিকিৎসার পাশাপাশি অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলার আসামি হিসেবে দিনাত জাহান এবং সহযোগী অপরাধী হিসেবে তাঁর এক ভাই বর্তমানে কারাগারে আছেন। মেয়েটির মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর মামলার নিষ্পত্তি করা হবে।
কল্পনার চিকিৎসক বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন আজ সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কল্পনা হাসিমুখে বাড়িতে ফিরছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে।’ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পরে উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কল্পনার সার্বিক অবস্থার কথা জানানো হয়েছে। উপদেষ্টা তাঁর মন্ত্রণালয়কে কল্পনার পড়াশোনাসহ পুনর্বাসনের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
হাসপাতালে ভর্তির পর ক্ষত জায়গার সংক্রমণ এড়াতে কল্পনার শরীর ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছিল। মানুষের ভিড় থেকে দূরে রাখতে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আইসিইউ) রাখতে হয়েছিল তাকে। তার শরীরের অনেকগুলো অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় চামড়া লাগাতে হয়েছে। হাসপাতালের দন্ত বিভাগ, মানসিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে কল্পনার চিকিৎসা চলে। সরকারি খরচে তার চিকিৎসা হয়েছে।
মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন জানান, কল্পনার শরীরে এখন শুধু অস্ত্রোপচারের দাগ আছে। আগে যে ট্রমা ছিল, তা এখন নেই বললেই চলে। কল্পনাও টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলে, সে এখন আর মানুষ দেখে ভয় পায় না।
গত ২০ অক্টোবর প্রথম আলো অনলাইনে ‘নির্যাতনে গৃহকর্মী শিশুটির চারটি দাঁত ভেঙেছে, শরীরে মারধর ও ছ্যাঁকার ক্ষত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
নির্যাতনে গৃহকর্মী শিশুটির চারটি দাঁত ভেঙেছে, শরীরে মারধর ও ছ্যাঁকার ক্ষত by মানসুরা হোসাইন
১৩ বছর বয়সী কল্পনার সামনের চারটি দাঁত ভাঙা। হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকার ক্ষত। কোনো কোনো ক্ষত শুকিয়ে টান ধরেছে। কোনো কোনো ক্ষত এখনো দগদগে। বুক, পিঠসহ সারা শরীরে মারের চিহ্ন। একদিকে মারধর, অন্যদিকে রক্তশূন্যতা। শারীরিক সমস্যার সঙ্গে মানসিক ট্রমা তো আছেই।
কল্পনা রাজধানীতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। সাড়ে চার বছর ধরে সে এই বাসায় কাজ করত। বর্তমানে কল্পনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
আজ রোববার কল্পনার শারীরিক ও মানসিক ট্রমার কথা এভাবেই বর্ণনা করলেন বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন। শনিবার থেকে এই চিকিৎসকের অধীনেই ভর্তি আছে কল্পনা।
নাসির উদ্দীন জানালেন, মেয়েটির সারা শরীরে ক্ষত। তাই সংক্রমণ এড়াতে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো হলে মঙ্গলবার প্রাথমিকভাবে একটি অস্ত্রোপচার করার সম্ভাবনা আছে। এরপর আরও অস্ত্রোপচার লাগবে। মানুষের ভিড় থেকে দূরে রাখতে এবং চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের দন্ত বিভাগ, মানসিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেয়েটির চিকিৎসা করতে হবে।
বেসরকারি চ্যানেল ৭১ টেলিভিশন একটি ভিডিও ফুটেজ থেকে কল্পনার বিষয়টি জানতে পারে। পরে চ্যানেলটির সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমনের মাধ্যমে ভাটারা থানার পুলিশের সহায়তায় গতকাল শনিবার রাতে বসুন্ধরার ওই বাসা থেকে কল্পনাকে উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় বাসার মালিক তরুণী দিনাত জাহানকে।
৭১ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে কল্পনা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে মারধর করার পাশাপাশি দিনে এক বেলা খাবার দেওয়া হতো। চুল সোজা করার যন্ত্র দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো তাকে। লম্বা বেত দিয়ে মারধর করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া এবং বন্দী করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছে কল্পনা।
কল্পনারা পাঁচ বোন ও এক ভাই। আজ মুঠোফোনে কথা হয় কল্পনার মা আফিয়া বেগমের সঙ্গে। তাঁর স্বামী শরিফ মিয়া কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। তাঁরা থাকেন সিলেটের হবিগঞ্জে। মেয়েকে মারধরের অভিযোগে আফিয়া আজ বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) এর অধীনে ভাটারা থানায় দিনাত জাহানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
আফিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে মেয়েকে ওই বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। দিনাত জাহানের মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেই মেয়েকে কাজে দেন। এক মাস আগে দিনাত জাহানকে ফোন দিলে তিনি বসুন্ধরা না, গুলশানে থাকেন (একা) বলে জানান। বাসায় গিয়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে দিনাত জাহান বাসায় যাওয়া যাবে না এবং মেয়ে ভালো আছে বলেও জানান। মেয়েও ভয়ে টেলিফোনে নির্যাতনের কথা বলতে পারেনি।
এই মা বললেন, ‘এক মাস আগেই মনে হয় দাঁত ভাইঙ্গা দিছিল। তাই মাইয়্যা কথাও কইতে পারতেছিল না। এখন দেখি মাইয়্যারে সারা শরীরে ছ্যাঁকাও দিছে। আমার কলিজাডা ফাইট্যা যাইতেছে। এইটা কোনো কারবার হইছে? আমি উপযুক্ত বিচার চাই।’
কল্পনার বোনের স্বামী হৃদয় ইসলাম গাজীপুরের চন্দ্রায় অটোরিকশা চালান। হাসপাতালে কল্পনাকে দেখতে এসেছেন। বললেন, ‘কল্পনার অবস্থা তো খুবই গুরুতর। চারটি দাঁত নাই। ওরে দেইখ্যা নিজেদেরই কষ্ট লাগতেছে।’
ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আসামিকে রিমান্ডে চাওয়া হয়েছে।
এদিকে কল্পনার সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে আজ দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। এ ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কমিশনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন চেয়ারম্যান। তিনি জানান, মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, শিশুটির চিকিৎসায় হাসপাতালের পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।
![]() |
| শিশুটির সারা শরীরে ক্ষত। তাই সংক্রমণ এড়াতে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত |
![]() |
| নির্যাতনে চারটি দাঁত ভেঙে গেছে শিশুটির। ছবি: সংগৃহীত |
Monday, November 18, 2024
অসীমার বেঁচে থাকার ‘অলৌকিক’ গল্প by মানসুরা হোসাইন
অসীমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি জানতে হলে ফিরতে হবে ২০০৬ সালের মে মাসে। তখন অসীমার বয়স আনুমানিক ৮ মাস। অপহরণের শিকার হয় শিশুটি। শুধু তা–ই নয়, অপহরণের ঘটনায় জড়িত এক কিশোরী মালবাহী ট্রেনে করে শিশুটিকে নিয়ে যাচ্ছিল। নরসিংদীর খানাবাড়ি স্টেশনের কাছে ওই কিশোরীর কাছ থেকে অসাবধানতাবশত ট্রেনের নিচে পড়ে যায় শিশুটি। গুরুতর আহত হয় সে। একটি পা কেটে যায়। আঘাত লাগে মাথায়।
নরসিংদীর স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। বিষয়টি আদালতে গড়ায়। দীর্ঘদিন মামলা চলে। তবে শিশুটির পরিবারের খোঁজ মেলেনি। ঠাঁই হয় রাজধানী ঢাকায়, সেন্টার ফর ট্রেনিং অ্যান্ড রিহেভিলিটেশন ফর ডেসটিটিউট উইমেন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার আশ্রয়ে। ওই সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিরা শিশুটির নাম দিয়েছিলেন ‘ভাগ্যশ্রী’।
‘ভাগ্যশ্রী’ থেকে ‘অসীমা’
২০০৬ সাল থেকে শামীম খান ও নীতা আফরোজা খান দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। শামীম খান যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বাস স্টেট ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। রিমি খান, তেসা শামীম খান ও শায়লা সাহেরা খান নামের তিন মেয়ে এই দম্পতির। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন অসীমাও। তাই শামীম ও নীতার ঘরে এখন চার মেয়ে। শামীম খান অসীমার আইনি অভিভাবক।
কিন্তু ঢাকার সেই ‘ভাগ্যশ্রী’ কীভাবে ‘অসীমা’ হলেন? কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেন?
২০০৮ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। শামীম খানের শ্বশুর থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। শ্বশুরকে জানিয়েছিলেন, তিনি ও নীতা একটা মেয়েশিশুর অভিভাবকত্ব নিতে চান। সেন্টার ফর ট্রেনিং অ্যান্ড রিহেভিলিটেশন ফর ডেসটিটিউট উইমেনের আশ্রয়ে থাকা ভাগ্যশ্রীর কথা শ্বশুর তাঁকে জানান।
এক পা কাটা ছোট্ট শিশুটির ছবি দেখে শামীম ও নীতা দম্পতির ভালো লেগে যায়। তাঁরা শিশুটিকে নিতে আগ্রহী হন। আদালতের মাধ্যমে যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে নতুন মা–বাবার হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায় ছোট্ট শিশুটি। ভাগ্যশ্রীর নতুন নাম হয় অসীমা।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন
যুক্তরাষ্ট্রে শিশু অসীমার গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। সেখানে পারিবারিক আবহে বড় হতে থাকে সে। শামীম খান বেশ গর্বের সঙ্গেই বললেন, ‘আমার চার মেয়ের একজন অসীমা। মেয়েটা বেশ চটপটে, স্মার্ট।’
শামীম খান আরও বলেন, ‘আমার কাছে চার মেয়েই সমান প্রিয়। তবে অসীমার জন্য মনের মধ্যে একটি স্পেশাল জায়গা আছে। একদম ছোটবেলায় সে তার মাকে হারিয়েছে। উদ্ধার করা সম্ভব না হলে, আমরা না পেলে মেয়েটা যে কোথায় ভেসে যেত, কেউ তা জানে না। তাই মেয়েটির জন্য বিশেষ অনুভূতি কাজ করে।’
অসীমার বয়স এখন প্রায় ১৯ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি। এখন থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে। কৃত্রিম পা লাগিয়ে চলাফেরা করেন। দাপিয়ে বেড়ান ক্যাম্পাসে।
অসীমার বয়স যখন ৯ বছর, তখন শৈশবে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জানতে পারেন তিনি। শামীম খান বলেন, ‘জানার পর অসীমার মুখটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। তবে এমন একটা ভঙ্গি করেছিল, যেন কোনো ব্যাপার না। পরে জিজ্ঞাসা করেছিল, “তোমরা কি আমাকে আমার আসল মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেবে?” তখন তাকে বলা হয়, তোমাকে কোথাও পাঠানো হবে না।’
আসল মায়ের খোঁজে
বড় হতে হতে অসীমার মধ্যে তাঁর আসল মায়ের মুখ দেখার, নিজের আসল পরিচয় জানার আগ্রহ তৈরি হয়, এমনটাই জানান শামীম খান।
ব্যক্তিগত কাজে দেশে এসেছিলেন শামীম খান। ব্যস্ততার ফাঁকে ৬ নভেম্বর তিনি কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে আসেন। অসীমার গল্পগুলো শোনান। এর আগে ২০০৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এসব গল্প নিয়ে প্রথম আলোর ছুটির দিনে পাতায় ‘অপহরণের কবল থেকে মায়ের কোলে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল।
শামীম খান জানান, মায়ের খোঁজে অসীমা দুবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রথমবার ২০১৭ সালে। সবশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। সঙ্গে ছিলেন শামীম-নীতা দম্পতি। নরসিংদীর যেখানকার রেললাইন থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন অসীমা।
ওই সময় শিশুটিকে যাঁরা উদ্ধার করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বোরহান উদ্দীন ও আলম। নরসিংদীতে গিয়ে আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন অসীমা। তখনকার ভিডিও দেখালেন শামীম খান। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অসীমা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কাঁদছেন।
যা বললেন উদ্ধারকারীরা
বোরহান উদ্দীন পেশায় ব্যবসায়ী। গত শনিবার মুঠোফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জানান, ওই ঘটনার দিন নরসিংদীর কাছাকাছি খানাবাড়ি স্টেশনমাস্টারের কক্ষে বসে ছিলেন তিনি। একজন রিকশাচালক শিশুটিকে নিয়ে আসেন। সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলতে চাইছিলেন শিশুটির চিকিৎসার জন্য। পরে তিনি চিকিৎসার ভার নেন। নরসিংদী সদর হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা চলে।
বোরহান উদ্দীন বলেন, সেখানেই শিশুটির সঙ্গে শেষবার দেখা হয় তাঁর। অসীমা যে দুবার নরসিংদী এসেছিলেন, তখন দেখা করা সম্ভব হয়নি।
অসীমা এখন ভালো আছেন—এটাই বোরহান উদ্দীনের তৃপ্তির জায়গা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাচ্চাটার বেঁচে থাকাটাই ছিল অলৌকিক বিষয়। চলন্ত মালবাহী ট্রেন থেকে পড়ে এক পা কেটে গিয়েছিল। মাথায় আঘাত লেগেছিল। তখন তো ছোট দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’
তথ্য দেয়নি অপহরণের সঙ্গে জড়িত কিশোরী
শামীম খানের সঙ্গে কথা বলে ও মামলার নথি ঘেঁটে জানা যায়, ওই সময় বেলাল ও এক কিশোরী ছোট্ট শিশুটিকে অপহরণ করেছিলেন। তাঁরা জবানবন্দিতে একবার বলেছেন টঙ্গী থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। আরেকবার বলেছেন, রাজধানীর তেজগাঁও থেকে শিশুটিকে চুরি করেছিলেন তাঁরা।
নথি অনুযায়ী, নরসিংদীর কাছাকাছি খানাবাড়ি রেলস্টেশন পার হওয়ার সময় অসাবধানে কিশোরীর হাত ফসকে শিশুটি নিচে পড়ে যায়। তারপর স্থানীয় লোকজন শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে বেলাল ও ওই কিশোরী হাসপাতালে গিয়ে শিশুটি তাঁদের সন্তান বলে দাবি করলে অন্যদের সন্দেহ হয়। পরে পুলিশ এসে বেলাল ও ওই কিশোরীকে আটক করে।
শামীম খান জানান, ২০১৭ সালে কারাগার থেকে ছাড়া পান বেলাল। আর গাজীপুরের জাতীয় কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে ওই কিশোরী ছাড়া পেয়েছেন চলতি বছরের শুরুর দিকে। তবে ২০১৭ সালেই শামীম খান দেশে এসে উন্নয়ন কেন্দ্রটিতে গিয়ে ওই কিশোরীর সঙ্গে দেখা করে কথা বলেন। অসীমার মায়ের বা বেলালের কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেই চেষ্টা করেন। তবে কিশোরীর কাছ থেকে কোনো তথ্য উদ্ধার করতে পারেননি।
আশায় আছেন অসীমা
শামীম খান বলেন, ‘আমার মেয়ের বয়স এখন ১৯ বছর হয়েছে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই মেয়ের আসল মাকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি।’
শামীম খান আরও বলেন, ‘অপহরণের সঙ্গে জড়িত কিশোরী জানিয়েছে, অসীমার আসল মায়ের নাম নাজমা। তেজগাঁও স্টেশন থেকে অসীমাকে বেলাল চুরি করেছিল। এর বাইরে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’
‘মেয়ের নরসিংদী যাওয়ার পর তার অনুভূতিটা বুঝতে পারি। অসীমাকে উদ্ধারের সময় আলম নামের যিনি ছিলেন, তাঁর বাড়িতে গেলে অসীমা তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। মাকে খুঁজে পেতে চায় বলেও জানায়,’ এমনটাই বলছিলেন শামীম খান।
অসীমা বাংলা বুঝতে পারেন। তবে লিখতে বা পড়তে পারেন না। কিছুটা বলতে পারেন। বাবা শামীম খান জানান, অসীমা প্রথম আলোর মাধ্যমে তাঁর আসল মায়ের চেহারাটা দেখতে চান। তবে সত্যি সত্যি যদি মায়ের খোঁজ পাওয়া যায়, তখন কী করবেন, তা এখনো ভাবেননি বলেও জানান অসীমা।
| মা নীতা আফরোজা খানের সঙ্গে অসীমা খান। ছবি: শামীম খানের সৌজন্যে |
Wednesday, August 14, 2024
‘পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে একজন জীবন্ত মানুষকে এভাবে কোনো মানুষ ফেলে দিতে পারে না’ by মানসুরা হোসাইন
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাভারের পাকিজা মডেল মসজিদের কাছে গত ১৮ জুলাই ঘটনাটি ঘটে।
যাঁকে ফেলে দেওয়া হয়, তাঁর নাম শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন। তিনি রাজধানীর মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন, থাকতেন এমআইএসটির ওসমানী হলে। বাসা সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকায়। তাঁকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা ইয়ামিন নামেই ডাকতেন।
গতকাল মঙ্গলবার সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকার বাসায় বসে কথা হয় ইয়ামিনের বাবা মো. মহিউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একজন জীবন্ত মানুষকে এভাবে কোনো মানুষ নিচে ফেলে দিতে পারে না। আমি কারও কাছে বিচার চাই না। জিডি করিনি। ছেলের লাশের পোস্টমর্টেম করাইনি। শুধু আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। সবাই দোয়া করবেন, আমরা যেন ধৈর্য ধরতে পারি।’
ইয়ামিনকে এভাবে ফেলে দেওয়ার ভিডিও তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। মহিউদ্দিন ভিডিওটি দেখেন ঘটনার দুই দিন পরে। অবশ্য বর্তমানে ফেসবুকে ভিডিওটি দেখা যাচ্ছে না। তবে অনেকেই ভিডিওটি ডাউনলোড করে রেখেছেন।
মহিউদ্দিন বলেন, তাঁর ছেলে ইয়ামিন মারা যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে ফেসবুকে একেকজন একেকভাবে মনগড়া কথা বলেছেন। তিনি চান, তাঁর ছেলে সম্পর্কে সবাই সঠিক তথ্য জানুক।
ইয়ামিনের জন্ম ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর। তিনি সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। এই দুই পরীক্ষাসহ বাংলাদেশ কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াড–গণিত অলিম্পিয়াডে পাওয়া সনদ ও বিভিন্ন কাগজপত্র গুছিয়ে রেখেছিলেন ইয়ামিন। বাবা মহিউদ্দিন ছেলের একেকটা সনদ দেখাচ্ছিলেন আর স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছিলেন।
ইয়ামিনের মা নাসরিন সুলতানা, তিনি গৃহিণী। বোন শাইখ আশহাবুল জান্নাত, তিনি পড়ছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মা ও বোন ইয়ামিনকে নিয়ে কোনো কথা বলতে চাইলেন না।
সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকায় ইয়ামিনকে কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁর কবরে একটি তুলসীগাছ ও একটি ফুলের চারা লাগিয়েছেন মা নাসরিন সুলতানা।
আবাসিক এলাকার ভেতরে থাকা শহীদ মিনারে ইয়ামিনের ছবি দিয়ে একটি ব্যানার টানানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ অন্যরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফুল দিচ্ছেন।
মহিউদ্দিন একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্তান মারা যাওয়ার মানে হলো আমৃত্যু কষ্ট। ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করার ভিডিও দেখাটা আরও কষ্টের।
ইয়ামিনের বাবার অভিযোগ, তাঁর ছেলে পুলিশের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ রাজনৈতিক দলের দাবার ঘুঁটি বানাক, তা আমরা চাই না। আমার ছেলে রাজনীতিসচেতন ছিল। আমিও রাজনীতিসচেতন। তবে কোনো দল করি না। ছেলে বুয়েট ও রংপুর মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েও পড়েনি। ছোটবেলায় পড়েছে সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে ভর্তি হয় এমআইএসটিতে। এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই রাজনীতি করার সুযোগ নেই।’
মহিউদ্দিন বলেন, ‘তবে আমরা ধার্মিক পরিবার। ছেলে নামাজ পড়ত। তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল। এটা দেখে কেউ যদি আমার ছেলেকে সন্ত্রাসী, জঙ্গি, জামায়াত-শিবির বা জামায়াত বানানোর চেষ্টা করে, তা তো আমরা হতে দেব না।’
সেদিন কী ঘটেছিল
মহিউদ্দিন বলেন, ফেসবুকে ভিডিওটি অনেকেই দেখেছেন। পরিবারের সদস্যরাও ভিডিওটি দেখেছেন। এর বাইরে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, তা এখন পর্যন্ত তাঁরা সুনির্দিষ্ঠভাবে জানেন না। ইয়ামিনের বন্ধুসহ অন্যদের মুখ থেকে ঘটনার টুকরো টুকরো খবর জানতে পারছেন।
১৭ জুলাই সকালে ইয়ামিন এমআইএসটির হল থেকে বাসায় ফেরেন। হল ছাড়ার নির্দেশনা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইয়ামিনদের বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল। ইয়ামিন মারা যাওয়ার পর তাঁর একটি লেখা থেকে এ কথা জানতে পারেন বাবা মহিউদ্দিন।
মহিউদ্দিন জানান, ইয়ামিন তাঁর মা ও বোনকে সব কথা বলতেন। তবে তাঁর সঙ্গে ছেলের সম্পর্কটা বন্ধুর মতো ছিল না। হল থেকে ছেলে বাসায় ফেরার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
মহিউদ্দিন বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার পর ফেসবুকে কেউ কেউ বলেছেন, মারা যাওয়ার দিন ইয়ামিন রোজা রেখেছিলেন। এ কথাটা সত্য নয়।
ছেলের কবরের পাশে একটি বিড়াল বসে আছে, এমন একটি ছবি মহিউদ্দিন ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। এই ছবি দেখে অনেকে প্রচার করছেন, বিড়ালটি ইয়ামিনের ছিল। ইয়ামিন মারা যাওয়ায় তাঁর কবরের পাশে গিয়ে বসে আছে বিড়ালটি, এটিও সত্য নয়। বিড়ালটি আশপাশের কারও হতে পারে। সেদিন ইয়ামিনের কবরের পাশে বিড়ালটি বসে ছিল। এই দৃশ্য দেখে তাঁর এক ভাগনে ছবিটি তুলেছিলেন।
১৮ জুলাই মহিউদ্দিন বাইরে যাচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইয়ামিন দৌড়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর কয়েকজন বন্ধু আন্দোলনে আহত হয়েছেন। মিরপুরের দিকে তাঁর পরিচিত কোনো হাসপাতাল আছে কি না, যেখানে বন্ধুদের ভর্তি করা যাবে।
মহিউদ্দিন ছেলেকে বলেছিলেন, মিরপুরে কোনো হাসপাতালে তাঁর পরিচিত কেউ নেই। তবে টেকনিক্যাল মোড়ের একটি হাসপাতালে আহত বন্ধুদের নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, এ কথা বলার পর ছেলে রাগ দেখান। সেটাই ছিল ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা।
১৮ জুলাই আন্দোলনে উত্তাল ছিল সাভার এলাকা। মহিউদ্দিন বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘরে ফিরে ছেলেকে বলি, শুধু ঢাকা নয়, সাভারেও তো গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে। ছেলে এ কথা শোনার পর কোনো কথা বলেনি। বুঝতে পারি, পরিচিত হাসপাতালের ঠিকানা দিতে পারিনি বলে ছেলে রাগ করেছে। তবে ছেলেকে দেখে বুঝতে পারি, সে তার বন্ধুদের নিয়ে চিন্তা করছিল।’
এদিন মহিউদ্দিন জোহরের নামাজ পড়তে মসজিদে যান। ইয়ামিনও নামাজে যান। রোজা রাখায় মহিউদ্দিন মসজিদ থেকে কিছুটা দেরিতে বেলা ২টার দিকে বের হন। বের হয়ে দেখেন, মোবাইলে তাঁর স্ত্রীর দুটো মিসড কল। স্ত্রীকে ফোন দিলে তিনি জানান, ইয়ামিন বন্ধুদের দেখতে যাবে বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। তারপর ছেলেকে বাসার সবাই ফোন দিতে থাকেন। কিন্তু ফোন ধরেননি ইয়ামিন।
ইয়ামিনের বন্ধুরা সাভার ও মিরপুর এলাকায় থাকেন। সেদিন রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল। তাই মহিউদ্দিন বুঝতে পারছিলেন না, ছেলেকে খুঁজতে কোথায় যাবেন।
মহিউদ্দিন বলেন, ‘বাসায় টেলিভিশন নেই। তাই বাইরের কোনো খবর দেখতে পাচ্ছিলাম না। ইন্টারনেট কাজ করছিল না। তাই ফেসবুকেও কোনো খবর জানতে পারছিলাম না। অথচ ততক্ষণে অনেক কিছুই ঘটে গেছে।’
বেলা ৩টার দিকে ইয়ামিনের মাকে একজন ফোন করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে যেতে বলেন। মহিউদ্দিন বলেন, ‘তখন মনে করেছি, ছেলে হয়তো আহত হয়েছে। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন পথ ঘুরে হাসপাতালে যাই। ছেলের নাম শুনে একজন বলেন, ওটিতে (অস্ত্রপচারকক্ষ) যান। সেখানে যাওয়ার পর আরেকজন নিচতলায় যেতে বলেন। এক নারী চিকিৎসক এসে ইয়ামিনের মাকে জড়িয়ে ধরেন। তখনো ছেলের মৃত্যুর কথা চিন্তা করিনি।’
মহিউদ্দিন জানান, ওই নারী চিকিৎসক তাঁদের একটি তালা দেওয়া রুমের সামনে নিয়ে যান। সেখানে শিক্ষার্থীদের অনেক জটলা ছিল। তালা খুললে দেখা গেল, একটি স্ট্রেচারে ইয়ামিন শুয়ে আছেন। তখন জানা গেল, এই হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর ছেলে মারা গেছেন। এখানে কোনো চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগই পাননি চিকিৎসকেরা। ছেলের বন্ধুরা জানান, ইয়ামিনকে প্রথমে বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ক্লিনিক ভর্তি করতে রাজি হয়নি।
এই বাবা বলেন, ছেলের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, ইয়ামিনকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় কেউ কেউ তাঁকে চোখ খোলা রাখতে বলছিলেন। ছেলে তখনো জীবিত ছিলেন।
‘ইয়ামিন সাহসী ছিল’
পারিবারিক সিদ্ধান্তে ইয়ামিনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়নি বলে জানান মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, তাঁরা ছেলের লাশ দ্রুত হাসপাতাল থেকে বের করতে চাইছিলেন। তখন বাইরে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে বলে হাসপাতালের কেউ কেউ লাশ দিতে ভয় পাচ্ছিলেন। কেউ কেউ লাশ বের করতে বাধাও দেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ইয়ামিনের লাশ নিয়ে মিছিল করতে চাচ্ছিলেন। তখন ছেলের এক বন্ধুর সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স এনে দ্রুত লাশ বাসায় আনা হয়।
মহিউদ্দিন বলেন, ছেলেকে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কুষ্টিয়া থেকে এক আত্মীয় ফোন করে জানান, স্থানীয় থানা থেকে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া লাশ দাফন করা যাবে না। দেশের পরিস্থিতিও এমন ছিল যে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া বা কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় যাওয়া-আসার মতো অবস্থা ছিল না। সাভারে লাশ দাফনের ক্ষেত্রেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন লাগবে বলে থানা থেকে জানানো হয়। পরে এক পুলিশ বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করলে তিনি জানান, পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করলে কোনো সমস্যা হবে না। তাই সাভারের এই আবাসিক কলোনির কবরস্থানেই ছেলেকে দাফন করা হয়।
মহিউদ্দিনের ভাষ্য, ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগপর্যন্ত তাঁর কাছে আওয়ামী লীগের নেতাসহ বিভিন্নজন ফোন করে ছেলের সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে চান। কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে পুলিশ যায়। খোঁজখবর নেয়।
মহিউদ্দিন গর্ব করে বলেন, তাঁর ছেলে সাহসী ছিলেন। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করতেন। ক্লাসে এক শিক্ষককে ইয়ামিন সরাসরি বলেছিলেন, তাঁর পড়ানো হচ্ছে না। দুই দিন পরে সেই শিক্ষক স্বীকার করেছিলেন, তিনি যেভাবে পড়াচ্ছিলেন, তা ঠিক ছিল না।
ইয়ামিন মেধাবী ছিলেন বলে জানান তাঁর বাবা। তিনি বলেন, বন্ধুরা কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে ইয়ামিন বুঝিয়ে দিতেন। ইয়ামিন বিতর্ক করতেন। এমআইএসটিতে বিতর্ক ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়ামিন। ছেলে বড় হলেও অবসরে ছোট বাচ্চাদের মতো ‘টম অ্যান্ড জেরি’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কার্টুন দেখতেন বলে জানান বাবা।
মহিউদ্দিন জানান, অনেক আগে থেকেই তিনি তাঁর বাবার নামে একটি ফাউন্ডেশন করার কথা চিন্তা করছিলেন। ইয়ামিন মারা যাওয়ার পর ঠিক করেছেন, ছেলের নামে একটি ফাউন্ডেশন করবেন। এই ফাউন্ডেশনে কেউ সহায়তা করলে তা ছাত্র আন্দোলনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবার বা আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে।
কথা শেষে ফিরে আসার সময় মুঠোফোনে ছেলের লাশের ছবি দেখিয়ে এই প্রতিবেদককে মহিউদ্দিন বলেন, ‘একদম কাছ থেকে টার্গেট করে ইয়ামিনকে রাবার বুলেট মারা হয়েছে। এই যে দেখেন, বুকের বাঁ পাশে এক জায়গায় অনেকগুলো বুলেটের আঘাত। তারপর তাকে সাজোয়া যান থেকে ফেলে দেওয়া হয়।’
{প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সাভারে কর্মরত প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামান}
Friday, September 13, 2019
ভাগ্য ফেরাতে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরা by মানসুরা হোসাইন

সালমার বাবা মো. জুলহাস সালমা যে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাদের কাছে শুনেছেন, মেয়ে নাকি পানিতে ডুবে মারা গেছেন। কিন্তু জুলহাসের মনের সন্দেহ দূর হচ্ছে না। জুলহাস বললেন, ‘মেয়ে পানি পাইলো কই? ও তো সাঁতার পারত, ডুইব্যা মরবো ক্যান? কেউ কেউ বলে, ওরে কেউ মাইরা ফালাইছে। বিদেশের কথা কেমনে কী কমু।’
জুলহাস খবর পেয়েছেন সালমা মারা যাওয়ারও তিন মাস পর। এরপর ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মেয়ের লাশ দেশে আনেন। মেয়ে লেবাননে কী কাজ করতেন, তা–ও জানেন না এই বাবা। সালমা ছেলের খরচের জন্য কখনো ৫ হাজার, কখনো ১০ হাজার টাকা পাঠাতেন দেশে। এ ছাড়া থোক কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন।লেবানন থেকে লাশ আনতে এই বাবার কোনো খরচ হয়নি। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাশ আনার সময় সরকারের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকার চেক পেয়েছেন। এর বাইরে সরকারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াচ্ছেন।
মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে লাভ কী হলো প্রশ্নে জুলহাস বললেন, ‘মেয়ের কথা মনে হইলে বুকটা ফাইট্যা যায়। দুই ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে ও ছিল সবার বড়। বলছিল, বিদেশ যাইয়্যা টাকা কামাই কইরা ছোট বইনরে বিয়া দিব। নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ বানাইবো। এখন লাভের মধ্যে লাভ হইলো, মেয়ের লাশটা দেখবার পারছি।’
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা লাশের তথ্য বিশ্লেষণ করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ২৯৪ জন নারী শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে। ২০১৬ সালে ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ১০২ জন এবং গত বছর ১১২ জনের লাশ দেশে আসে। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশে আসা লাশের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জনে।মারা যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে ব্র্যাক বলছে, ২৯৪ জনের মধ্যে সব থেকে বেশি ১১০ জনই মারা গেছেন স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে। স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের। বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫০ জন। আর আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন। অন্যান্য কারণে মারা গেছেন ৩১ জন নারী।
সরকারের হিসাব বলছে, এখন পর্যন্ত নারী শ্রমিকেরা বেশি যাচ্ছেন সৌদি আরবে। সেই হিসাবে সৌদি আরব থেকেই বেশি লাশ আসছে (১১২ লাশ)। এরপরেই জর্ডান, লেবানন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই পাঁচটি দেশ।
তবে দেশে থাকা মৃত নারীর পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দিহান। ২৫ বছর বয়সী জহুরা বেগম সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে ফিরেছেন লাশ হয়ে। জহুরার বৃদ্ধ মা আলেয়া বেগম জানালেন, জহুরা যখন ছোট, তখন তাঁর বাবা মারা যান। জহুরা যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন তাঁর স্বামী মারা যান। জহুরা মারা যাওয়ার ১০ মাস পর লাশ দেশে আনা সম্ভব হয়।মুন্সিগঞ্জের এই মা আলেয়া অন্যের বাড়িতে কাজ করে এখন মেয়ে জহুরার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন। জহুরার বড় বোন রোখসানা বললেন, ‘মনডায় কয়, বইনডারে কেউ মাইরা ফালাইছে। ও ছোট থেইক্যা কম তো কষ্ট করে নাই। ছেলে জন্মানোর তিন দিন পরেই কাজে যোগ দিছিল। মরতে চাইলে দ্যাশে থাকনের সময়ই আত্মহত্যা করত।’
জহুরার পরিবার লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক পেয়েছে, এর বাইরে আর কিছু পায়নি। জহুরার বোনের ভাষায়, ‘৩৫ হাজার টাকার বাইরে চাইর আনাও পাই নাই। বইনের লাশের সঙ্গে ম্যালা কাগজ দিছে, যা কোনো কামেই লাগে নাই।’
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বললেন, কয়েক বছর ধরে নারী শ্রমিকের লাশ আসার সংখ্যাটা বেড়েছে। ব্র্যাকের নিজস্ব পর্যালোচনায় গত তিন বছর দুই মাসে প্রায় ৩০০ নারীর লাশের মধ্যে বেশির ভাগ মারা গেছেন স্ট্রোক করে। কাজের চাপসহ বিভিন্ন কারণে না হয় মৃত্যু মেনে নেওয়া হলো। কিন্তু প্রায় অর্ধশত নারী কেন আত্মহত্যা করলেন? এই নারীরা তো ভাগ্যের উন্নয়নে চোখে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন। তাহলে কী এমন পরিস্থিতি হলো যে তাকে আত্মহত্যা করতে হলো? সরকারকে এ ধরনের মৃত্যুগুলো তদন্ত করে দেখা উচিত।হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে গত বছর অর্থাৎ ১০ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে ২৬ হাজার ৭৫২ শ্রমিকের লাশ এসেছে। তবে এই লাশের মধ্যে নারী শ্রমিকের লাশের আলাদা কোনো তথ্য নেই।প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বিদেশে মারা যাওয়া শ্রমিকের লাশ দেশে আনা, দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং মৃত কর্মীর পরিবারকে আর্থিক তিন লাখ টাকা অনুদান দিচ্ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ জুলহাস বললেন, প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ১০টি করে (নারীসহ) শ্রমিকের লাশ দেশে আসছে। অনেক পরিবার লাশ দেশে আনতে চায় না। যারা আনতে চায় তাদের সহায়তা করা হয়। আর মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ আছে—পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। পরিবার চ্যালেঞ্জ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই কুয়েত থেকে রিনা আক্তারের লাশ দেশে এনেছেন তাঁর স্বামী মো. আবু জাফর। ২০১০ সালে বিয়ের আগে থেকে কোম্পানিতে কাজের সুবাদে কুয়েতেই পরিচয় হয়েছিল জাফর আর রিনার। বর্তমানে দুই কোম্পানিতে কাজ করতেন স্বামী-স্ত্রী। বিয়ের আগে ও পরে সব মিলিয়ে কুয়েতে কেটে গেছে প্রায় ২২ বছর। একটি কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করা বরিশালের রিনা বাথরুমেই মারা যান। তাঁর মৃত্যু সনদে ‘স্ট্রোক’ লেখা আছে। এই দম্পতির কোনো ছেলেমেয়ে নেই।
আবু জাফর জানালেন, কোম্পানি নিজ খরচে রিনার লাশ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে, তবে আবু জাফরকে নিজের টাকায় লাশের সঙ্গে দেশে আসতে হয়েছে। আবু জাফরের মতে, রিনার তেমন কোনো অসুখ ছিল না। ‘হঠাৎ স্ট্রোক’ করেন তিনি। জানালেন, কুয়েতে রিনা যে কোম্পানিতে কাজ করতেন, সেখান থেকে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ। স্বামী-স্ত্রী যা আয় করতেন, তার বেশির ভাগই দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতেন, ফলে সঞ্চয় বলতেও তেমন কিছু নেই।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1966)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







