Monday, December 2, 2013

সহিংস রাজনীতি- চাই অহিংস নৈতিক শক্তির উত্থান by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে আর যা-ই হোক, স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করা যায় না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর সারা দেশে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সারা দেশে যে ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে কেবল যে উদ্বেগ, আশঙ্কা, আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে তা-ই নয়, অনেকেই এ প্রশ্ন তুলছেন যে এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে কি না।

চারিদিকে বারুদ, চাপা কান্না এবং দেশবাসীর আর্তনাদ! by গোলাম মাওলা রনি

কযেকদিন যাবৎ ঘুমাতে পারছিনা। পরিবার পরিজন, বন্ধু বান্ধব ও পরিচিত জনের কাউকেই হাসতে দেখিনি কয়েকমাসে। রুটি রুজির জন্য অফিসে আসতে হয়। আমার গাড়ীর গ্লাসটি ককটেলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হবার পর রিক্সায় ঘুরে বেড়াই।

‘সকলেই সরকারে থাকতে চায়’ by উৎপল রায়

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর সভাপতি অধ্যাপক মোজফ্‌ফর আহমদ বলেছেন, রাজনীতি জনগণের জন্য হলেও জনগণের জন্য কেউ রাজনীতি করে না।
গণতন্ত্রে কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়। আগে তা হতো। কিন্তু এখন কারও ছাড় দেয়ার মানসিকতা নেই। আর যদি তা না থাকে তাহলে সঙ্কট উত্তরণ হবে না। সমপ্রতি বারিধারার ৪৮ পার্ক রোডের বাসায় মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট ও তা থেকে উত্তরণসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নেপথ্য’ (বিদেশী) শক্তি রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মোজফ্‌ফর বলেন, আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিএনপির খালেদা জিয়া ‘নেপথ্য’ শক্তি দিয়ে পরিচালিত হন। এরা নিজেরাও তা জানেন না। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। কেউই সাধারণ জনগণের জন্য বোধগম্য সমাধান দিতে পারছে না। অনেকটা ‘পাটা-পোতায় ঘষাঘষি, মরিচের জান যায়’-এর মতো অবস্থা। যদি রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক বিধিবিধান মেনে চলতো তাহলে এ সঙ্কট হতো না। তারা গণতন্ত্র ও জনগণকে বিশ্বাস করে না। তাছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণ বিরোধী দলে না থাকার মানসিকতা। গণতন্ত্রে একজনকে হারতে হয়। কিন্তু তারা কেউই হারবে না। দু’দলের কেউ বিরোধী দলে থাকতে চায় না। সকলেই সরকারে থাকতে চায়, এ ফর্মুলা ত্যাগ করতে হবে। নতুন ফর্মুলা গ্রহণ করতে হবে। সমঝোতায় আসতে হবে। সংলাপ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশী ও কূটনৈতিক তৎপরতার কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম এ পুরোধা বলেন, মরণোন্মুখ সমাজব্যবস্থাকে দীর্ঘায়ু করার জন্য, নতজানু সরকার সৃষ্টির জন্য দেশী-বিদেশী সুবিধাভোগীরা তৎপর। তারা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিএ, এনজিও এবং নানা রকম কোরামিনসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও ফন্দিফিকির করছে। অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে হলে এসব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অংশীদার হতে হয়। বিদেশী সুবিধাভোগীদের কথা না শুনলে সরকার পরিচালনা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এজন্য সরকারকে নামে মাত্র গণতন্ত্রের চর্চা করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের দেশেও তা-ই চলছে। এ যেন অনেকটা ‘সুতার টানে পুতুল নাচে’র মতো। হরতালের সমালোচনা করে তিনি বলেন, হরতাল এখন ‘ডরতাল’। হরতাল ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। আন্দোলনের শেষ অস্ত্র। কিন্তু এ শেষ অস্ত্র আগেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেনতেনভাবে এর অপব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে হরতালের গুরুত্ব এখন আর আগের মতো নেই। তাছাড়া যারা হরতাল ডাকে, তারা নিজেরাও হরতালে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। হরতাল ডেকে তারা মাঠে নামে না। ঘরে বসে থাকে। এ ধরনের হরতাল আইন করে বন্ধ করা উচিত। দেশের জনগণ ‘চেইঞ্জ ইজ দ্য টেস্ট’ (পরিবর্তনই স্বাদ)- এ নীতিতে বিশ্বাসী মন্তব্য করে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের একমাত্র জীবিত এ উপদেষ্টা বলেন- তাদের বোঝা, তাদের ভাষা বোঝা রাজনীতির প্রথম পাঠ। জনগণের ভাষা বুঝতেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ বুঝতে চায় না বোঝে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’। বোঝে দুই দাবি ‘বৈষম্য’ ও ‘গণতন্ত্র’র জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। তারা মনে করে ধর্ম হচ্ছে মাথার তাজ। পবিত্র ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনে কলুষিত করা অধার্মিক কাজ। জনগণ একটা অপরাধকে আরেকটা অপরাধের সাফাই হিসেবে সমর্থন করে না। সে কারণে তারা একই চরিত্রের এক দলকে পর পর দু’বার ভোট দিতে চায় না। সুশীল সমাজের সমালোচনা করে ন্যাপ সভাপতি বলেন, ডিগ্রিধারী কুশিক্ষিতদের জনতার কাতারে ফেলা যাবে না। এদের নিয়েই সমাজের তথাকথিত উপরতলা। তাদের থেকেই রাজনীতির নেতৃত্ব আসে। কিন্তু আজ তারা সর্বদিক দিয়ে পচে গেছে। সঙ্কটকালে তাদের পাওয়া যায় না। উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করছে তারা। রাজনৈতিক সঙ্কট কেটে যাবে- এ আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, হতাশার কোন কারণ নেই। সমাধান হবে। দ্রুতই হবে। সমঝোতাও হবে। এজন্য নেতৃত্বে আসার একটি উজ্জ্বল উৎস হতে পারে ছাত্র-যুবক-তরুণ সমাজ। জয় সুনিশ্চিত। ইতিহাস তা-ই বলে।

সময়ের প্রতিবিম্ব- নির্বাচন না হলেও ফলাফল পাওয়া যাবে by এবিএম মূসা

প্রধান নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণা করে ফেলেছেন। ইতিপূর্বে তিনি বলেছিলেন, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করবেন। মনে হচ্ছে, তিনি কোথাও থেকে তাড়া খেয়ে কোনো অজ্ঞাত কারণে তাড়াহুড়ো করে টেলিভিশনে ‘ভাষণ’ দিয়েই নির্বাচনসংক্রান্ত দিন-তারিখসমূহ নির্ধারণ করে দিলেন।
বোঝা গেল, যাঁরা তাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা নির্বাচনটি সঠিক বা বেঠিক, সর্বজনগ্রাহ্য হবে কি না সেই ভাবনার তোয়াক্কা না করে নির্বাচন-জাতীয় কিছু করেই ফেলবেন। সাজানোই হোক অথবা ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ’ যাই হোক, কিছু যায় আসে না।

সত্যিকারের অথবা সাজানো কত রকমের নির্বাচনই তো সুদীর্ঘ জীবনে দেখলাম। যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটদান। সেই নির্বাচন সঠিক ও নিরপেক্ষ হওয়ার কৃতিত্ব তৎকালীন ক্ষমতাসীন মোসলেম লীগ সরকারের। এবার অবশ্য শেখ হাসিনা সরকার তেমন নিরপেক্ষ হবেন, এমনটি কেউ বিশ্বাস করে না। মোদ্দা কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর ছকবাঁধা পন্থায় ‘করে’ ফেলবেন। সেই পথে তিনি অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘পারবেন’ তো? উত্তর হচ্ছে, না পারলেইবা কী, পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসরণে প্রধানমন্ত্রিত্ব থাকবে।
তবে অনেকেই আমাকে যখন প্রশ্নটি করেছেন আমি বলেছি, কেন পারবেন না? জিয়াউর রহমান আর এরশাদ সাহেব তো গণভোট করে ভোট পান বা না পান শতকরা ১১০ জনের সমর্থন পেয়েছেন বলে ঘোষণাটি করে ফেলেছিলেন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার ছিল কি না তা দেখার জন্য বিদ্যমান স্বল্পসংখ্যক গণমাধ্যম প্রতিনিধি ছিলেন না। বিদেশি পর্যবেক্ষক প্রথাটি তখন চালুই হয়নি। ইচ্ছামাফিক ফলাফল ঘোষণা করলে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা বিবেচনার প্রয়োজন ছিল না। এখন তাঁদের আসতে ভিসা না দিলেই হলো।
সর্বোপরি পরম শুভাকাঙ্ক্ষী (আইনি ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কায় বশংবদ বললাম না) কমিশন তো আছেই। আরপিও তথা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন একটুখানি সংশোধন করে অনেক ব্যবস্থা করা যাবে। নির্বাচনের আগে-পরের জ্বালাও-পোড়াও নিয়ে ‘ডোন্ট কেয়ার’ বলে মাথা না ঘামালেই হলো। উলুখড় পুড়বে পুড়ুক না, ঘরে-বাইরে নিন্দা-সমালোচনা হবে, হোক না। বিরোধী দল অথবা জনগণ অথবা ‘জ্বালাও-পোড়াও’ করা দুর্বৃত্তরা হয়তো ভোটারের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করতে পারবে, করুক না। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের ফলাফল ঘোষণায় বাধা নেই। থাকলেও সংসদে আইন করে তা অপসারিত করলেই হলো। সুতরাং ভোট নাইবা পড়ল, ভোটারও না এলেও কিছু যায় আসে না, আওয়ামী প্রার্থীদের শুধু নির্বাচন কমিশনের কাছে ফলাফল চাই।
একটি নির্বাচন করে ফেলা নয়, যথাযথ ভোটে পরাজয়ের পরও জয়ী ঘোষণার তরিকাটির উদাহরণ দেব। তরিকাটির নাম ‘মিডিয়া ক্যু’, আবিষ্কারক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এই পদ্ধতির কীভাবে সফল প্রয়োগ করা যায়, এ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুধু নয়, অংশগ্রহণ আছে। অভিজ্ঞতাটি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের, সেটি আগেও বলেছি কি না মনে নেই, পাঠকদেরও মনে থাকার কথা না। আসন্ন নির্বাচনী প্রহসনের মঞ্চস্থকারীদের জন্য পুনর্ব্যক্ত করছি।
আমি তখন বাসস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক। এরশাদ সাধারণ নির্বাচন করতে ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসন বৈধ করার জন্য সংসদ বানাবেন। মানে গণতন্ত্রের একটি ভেক পরবেন। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া উভয়ে অংশগ্রহণ করবেন বলে যুক্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। উভয়েই ১৫০-১৫০ আসনে একাই প্রার্থী হবেন। বস্তুত কৌশলটি ছিল চমৎকার। কিন্তু তাঁরা চলেন ডালে ডালে, এরশাদ পাতায় পাতায়। সামরিক ফরমান বলে আরপিও সংশোধিত হলো, কেউ তিনটির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। সুতরাং দুই দল সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচনে যাবে না। দুই নেত্রীর বর্জন ঘোষণার পর সেই রাতে আর অফিসে থাকার প্রয়োজন ছিল না। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী চট্টগ্রামে জনসভায় ঘোষণা দিলেন, ‘যারা এই নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেইমান।’ তাই বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। টেলিফোনে বিশেষ স্থান থেকে নির্দেশ পেলাম, রাতভর দপ্তরে থাকতে হবে। চমক দেওয়া খবর আসছে, সেই চমকটি ছিল ঢাকায় ফিরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেন শেখ হাসিনা। রাত দুইটায় খবরটি টেলিপ্রিন্টারে সর্বত্র পাঠিয়ে দিলাম। অপরদিকে খালেদা জিয়া রইলেন অনড়, মাথায় পরলেন ‘আপসহীন’ মুকুটটি।
নির্দিষ্ট দিনে এরশাদের পাতানো নির্বাচন হলো। ব্যবস্থা ছিল ফলাফল ঢাকার কমিশন কার্যালয় থেকে ঘোষণা করা হবে, কেন্দ্র অথবা জেলা রিটার্নিং অফিস থেকে নয়। আমি আর রিপোর্টার মরহুম গিয়াস কামাল এবং স্বল্প কয়েকটি পত্রিকার প্রতিনিধি প্রধান নির্বাচন কমিশন দপ্তরে গেলাম। জেলা সদর থেকে ভোটের সংখ্যা আসছে একটি কামরায়। পাশের কামরায় ফলাফল লেখা হচ্ছে। বিরাট গণনা কক্ষ থেকে একজন বেরিয়ে এসে বোর্ডে ফলাফল চক দিয়ে লিখছেন। সেই ক্রমান্বয়ে পাওয়া ফলে দেখছি—আওয়ামী লীগ ১০০, জাতীয় পার্টি ৫০। অবাক কাণ্ড বটে। মনে মনে বেশ খুশি, হঠাৎ দেখি পাশের কামরা থেকে কেউ আসছে না। মিনিট-ঘণ্টা পার হয়ে গেল। ব্যাপার কী দেখার জন্য গণনাকক্ষে গিয়ে দেখি অন্ধকার, কেউ নেই।
বুঝলাম, ভোট গণনা বন্ধ করে কেন জানি সবাই পালিয়েছে। আমরা দুজনে বের হওয়ার জন্য বাইরে এসে দেখি, নির্বাচন কমিশন চারদিকে সেনাবাহিনী ঘেরাও করে রেখেছে। একটি চিপা পথ দিয়ে বের হয়ে বাসসে এলাম। এদিকে দুই দিন পরও ভোটের ফলাফল দেশবাসী জানছেন না। দুদিন পর আমার কাছে নির্দেশ এল, ভোটের ফল পাঠানো হচ্ছে, সেটিই সব পত্রিকায় টেলিপ্রিন্টারে যাবে। সেই ঘোষিত তথা পাঠানো ফলাফলে আওয়ামী লীগকে বোধ হয় ৪০-৪৫টি আসন দেওয়া হয়েছিল। সেই ফল আওয়ামী লীগ মেনে নিল, কারচুপি হয়েছে বলে তখনই প্রত্যাখ্যান অথবা সংসদ ‘বর্জন’ করল না।
এরই নাম ‘মিডিয়া ক্যু’, যা ২০১৪ সালে অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছি আওয়ামী লীগকে। ইতিমধ্যে বিরোধী দলের হরতাল বর্জন-অবরোধ চলতে থাকুক না। গাড়ি পুড়ুক, মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট রোগীতে ভরে যাক। তবে বর্তমান মিডিয়া যুগে বর্ণিত পদ্ধতি কতখানি কার্যকর হবে তা ভেবে অনেকে আমার বক্তব্যটি পরিহাস বলে উড়িয়ে দিতে পাবেন। তা ছাড়া এখন গণনা হয় কেন্দ্রে, সেখানে ফলাফল ওলটানো যাবে কী করে? অতি সহজ উপায়, নির্বাচন কমিশন বলবে, ওই পদ্ধতি বাতিল করা হলো। ইতিমধ্যে সাজানো আমলাতন্ত্রে ফলাফল ওলটপালট করে বশংবদ রিটার্নিং অফিসার যদি দুয়ে-দুয়ে পাঁচ গণনা করে শেরেবাংলা নগরে পাঠান, সেটিই কমিশন ঘোষণা করে মিডিয়ায় পাঠাবে। একই সঙ্গে নিজেদের প্রতিনিধির পাঠানো নিজস্ব সূত্রে পাওয়া ফলাফল মিডিয়ায় ছাপা হলেই কী আসে-যায়। তদুপরি কেন্দ্রে মিডিয়ার ‘প্রবেশ নিষেধ’ করলেই হলো। আর বিদেশি পর্যটক? ভিসা না দিলেই হলো।
এতদূর যা লিখলাম তা পড়ে পাঠক বলবেন আওয়ামী লীগকে বদবুদ্ধি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ আওয়ামী লীগকে কিছু করতে হবে না, যা করার নির্বাচন কমিশনই করবে। তারা ইচ্ছে করলে সারা দেশের জন্য একটি সাজানো নির্বাচনী ফলাফল ছকনির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করতে পারবে। কেন্দ্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সব ব্যবস্থা করে ফেলতে পারবেন। এ জন্য অবশ্য কমিশনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলতে আমরা যা বুঝি, সেই পুলিশ-বিজিবি-আনসার ছাড়াও সেনাবাহিনীর সাহায্য চাই। আর যদি একটি যেমনটি বললাম তেমনটি না করে নির্বাচনী প্রহসনের মঞ্চ সাজাতে হয়। দেশের ৩৯০০ কেন্দ্র পাহারা দেওয়া, ব্যালটে সিল মেরে হাজার হাজার বাক্স পুরানো এবং প্রার্থী ও লাখ খানেক পোলিং অফিসার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। এই কাজটি করতে শুধু র‌্যাব, পুলিশ আর সীমান্ত অরক্ষিত রেখে নিয়ে আসা বিজিবি দিয়ে সম্ভব হবে না। তাই তো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সেনা সাহায্য দরকার। তবে ইতিমধ্যে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সেনাবাহিনীকে, যাদের নামোচ্চারণে দেশপ্রেমিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তাদের দেশের সংখ্যাগুরু জনগণের মুখোমুখি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবার কোনো ঝামেলা বাধিয়ে ফেলবেন না তো? বলা হয়েছে সেনাবাহিনী হবে স্ট্রাইকিং ফোর্স, দরকার হলেই শুধু অকুস্থলে যাবে। খুব ভালো কথা, কিন্তু সেই কর্তব্যটি করতে গেলে যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর যথাস্থান থেকে চাই।
সবশেষে প্রশ্ন, আমার সলাপরামর্শ অনুযায়ী বর্ণিত এত ঝামেলায় কেন যাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? ষোড়শ সংশোধনী করতে পাঁচ মিনিট লাগবে। সংবিধান সংশোধন করে সংসদ তথা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল দুই-পাঁচ বছর বাড়িয়ে নিলেই হয়। নির্বাচন প্রতিরোধকারীদের মরতে বা মারতে হবে না। জনগণও হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, পুলিশের গুলি, আগুনে ঝলসানোর দুর্ভাগ্য, মর্মান্তিক মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাবে। যাঁরা সমঝোতা-সংলাপের জন্য ছোটাছুটি করছেন, পত্রিকায় কলাম লিখছেন, টক শোতে দুশ্চিন্তার ঝাঁপি খুলে বসেছেন, তাঁরাও বিশ্রাম পাবেন।
সর্বোপরি, তফসিলভুক্ত প্রার্থীদেরও এলাকায় যাওয়ার ভীতি বা ঝুঁকি থাকবে না। কথাটি বললাম এ জন্য, দুদিন আগে আমার গ্রামের এলাকা, ফুলগাজী-পরশুরামের আওয়ামী মনোনয়ন পাওয়া কোন এক তপন ঘোষ না বোসকে জনতার তাড়া খেয়ে ভাঙা গাড়িতে এলাকা ছাড়তে হয়েছে। নিশ্চিন্তে ঢাকায় বসে থাকবেন আর টেলিভিশনে কমিশনের সরবরাহকৃত ফলাফল ঘোষণা শুনবেন, এলাকায় তাড়া খেতে যেতে হবে না। সেই ফলাফল যত দিনই টিকুক, প্রাক্তন সাংসদ বা মন্ত্রী কথাটি নামের শেষে লিখতে পারবেন।
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আলিশাকে নিয়ে ৫ ছবি

একুশে পদকপ্রাপ্ত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসা আলোচিত মডেল আলিশাকে নিয়ে ৫ ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে নতুন প্রযোজনা সংস্থা কার্নিভাল মোশন পিকচার্স।
এর স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন মুরাদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ছবিটি নির্মাণ করছেন চাষী নজরুল ইসলাম। ছবির নাম ‘অন্তরঙ্গ’। আজ সন্ধ্যায় এফডিসির ৩ নম্বর ফ্লোরে মহরতের মাধ্যমে ‘অন্তরঙ্গ’ ছবির শুটিং শুরু করবেন পরিচালক। সেই সঙ্গে ছবি নির্মাণে যাত্রা শুরু করবে কার্নিভাল মোশন পিকচার্স। এফডিসিতে একটি ক্লাব ড্যান্সের শুটিং শেষে পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ইউনিট নিয়ে চলে যাবেন কক্সবাজারে। এ ছবিতে আলিশার নায়ক ইমন। একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করবেন দিতি। ইমন ও আলিশা চাষী নজরুল ইসলামের ‘ভুল যদি হয়’ ছবির মাধ্যমে প্রথম জুটি বাঁধেন। এ ছবিটির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। কার্নিভাল মোশন পিকচার্সের দ্বিতীয় ছবিটি পরিচালনা করবেন শাহিন-সুমন। এ ছবির নাম ‘মিয়া বিবি রাজি’। ছবিতে আলিশার নায়ক সাইমন। আরও থাকবেন সাদেক বাচ্চু, শাকিলা, মিশা সওদাগর এবং এটিএম শামসুজ্জামান। কার্নিভাল মোশন পিকচার্সের আরও দুটি ছবি পরিচালনা করবেন সোহানুর রহমান সোহান ও জাকির হোসেন রাজু। পাঁচ নম্বর ছবিটি ইফতেখার চৌধুরীর পরিচালনা করার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোকোলার বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হিসেবে আলোচনায় চলে আসা আলিশা প্রধানের স্বপ্নজুড়ে কেবল সিনেমা। ভাল মানের ছবিতে নতুনরূপে নিজেকে উপস্থাপন করে চলচ্চিত্র শিল্পে জায়গা করে নেয়ার জন্য মনেপ্রাণে প্রস্তুত আলিশা বলেন, একসঙ্গে পাঁচ ছবির ঘোষণা যে কোন শিল্পীর জন্য বিশাল একটা ব্যাপার। আমার মতো নতুনের জন্য তো আরও বড় একটা সৌভাগ্যের বিষয়। আমি কার্নিভাল মোশন পিকচার্সের প্রতি কৃতজ্ঞ যে তারা আমাকে এতো বড় সুযোগ দিয়েছেন। আমি আমার সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে সুযোগগুলো কাজে লাগানোর মাধ্যমে আমার স্বপ্নের চলচ্চিত্র শিল্পে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমার বিশ্বাস আমি তা পারবো।

আন্দোলন ঠেকাতে প্রশাসনই ভরসা আওয়ামী লীগের by হাসিবুল হাসান

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বড় দুই রাজনৈতিক জোটে এখনো সমঝোতা হয়নি। এরই মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এরপর থেকেই একের পর এক কঠোর কর্মসূচি দিচ্ছে বিরোধী দলীয় জোট।
আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ব্যস্ত নির্বাচন নিয়ে। বিরোধীদলের আন্দোলন মোকাবেলায় দলীয়ভাবে নেই কোনো পরিকল্পনা। আবার নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আন্দোলন মোকাবেলায় নেই কোনো সাড়া। তাই বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলায় বর্তমানে প্রশাসনের ওপরেই নির্ভরশীল ক্ষমতাসীন দলটি।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে সহিংসতা বাড়াতে চাইছেন তারা। তাই হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি এবং দেশব্যাপী নৈরাজ্য ও সহিংসতা মোকাবেলার ভার আপাতত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই থাকছে। আর এজন্যেই বিরোধী দলের হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি মোকাবেলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই ক্ষমতাসীনদের।

তফসিল ঘোষণার পরেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়ার সময় ‘বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলায় আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি থাকবে কি না?’ এমন এক প্রশ্নের জবাবে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছিলেন, “সব ধরনের সহিংসতা ও নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রশাসন প্রস্তুত আছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেলিন নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “আমরা এখন নির্বাচনমুখী। এই মুহূর্তে নির্বাচনের কর্মসূচির বাইরে অন্য কোনো কর্মসূচি দেয়ার চিন্তা করছি না।”

তিনি বলেন, “দেশের জনগণ নির্বাচন চায়। আমরা মনে করি নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের জনগণ বিরোধী দলের নৈরাজ্যেরও জবাব দেবে।”

দলীয় সূত্র এবং মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলায় দলীয় নেতা-কর্মীদেরও পাচ্ছে না ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের বড় শক্তি হিসেবে তৃণমূলকে ধরা হলেও দলের সুসময়ে সবখানেই তৃণমূল নেতারা থেকেছেন উপেক্ষিত, বঞ্চিত। তাই বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের দেখা গেছে প্রথমসারিতে, তারাই আজ ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

আবা্র অন্যদিকে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি আর নানা অপকর্ম করে, দলকে যারা নানাভাবে কঠিন সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছেন, সেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ নামধারী সুবিধাবাদীরা এখন মাঠে নেই, সুযোগ খুঁজছে ভোল পাল্টাবার। তাই বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলায় আইনশৃঙঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই ভরসা মানতে হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের।

আন্দোলন মেকাবেলার বর্তমানে বিরোধী দলকে চাপে রাখাকেই কৌশল হিসেবে নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হযেছে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ আরো অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আবার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘হরতাল ও অবরোধের নামে মানুষ হত্যার’ জন্য বিরোধীদলীয় নেতাকে দায়ী করে তাকে হুকুমের আসামি করা হতে পারে বলে হুমকি দিয়েছেন। এখন একই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের অন্য শীর্ষ নেতারাও।

বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলার পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। বিএনপি আর কী আন্দোলন করবে? তাদেরকে কেবল এক মামলা দিয়েই ঠাণ্ডা করে দেয়া যায়। মামলার ভয়ে পিঠ বাঁচানোর জন্যই তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অতীতেও দেখা তাদের দলের সিনিয়র অনেক নেতাকে মামলার ভয়ে বোরকা পরে আদালতে যেতে।”

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি খালেদা- জনগণের প্রতিপক্ষ হবেন না

জনগণের প্রতিপক্ষ না হয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন  বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া।

নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেছেন, “প্রহসনের একতরফা নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়ে বিশেষ দলের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার না হয়ে ঘোষিত তফসিল স্থগিত করে দেশকে বাঁচান।”

সোমবার রাতে গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য পাঠানো এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া এ আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বিগ্ন জাপান

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইয়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাপানের রাষ্ট্রদুত শিরো সাদোসিমা।

সোমবার বিকেলে বাংলাদেশস্থ জাপান রাষ্ট্রদূত এক বিবৃতি দিয়ে এ উদ্বেগের কথা জানান।

তিনি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে এই সহিংসতা বন্ধের সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু জাপান। কোনো ধরনের সহিংসতা জাপান চায় না। তাই বাংলাদেশের এই বর্তমান সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাই। এই সংঘাত ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জনগণের জীবন ও উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ভবিষ্যত স্বার্থে সহিংসতা পরিহার করে একটি গঠনমূলক আলোচনা মাধ্যমে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন চায় জাপান।”

গৃহপালিত নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর হুকুম তামিলে ব্যস্ত: সালাহ উদ্দিন

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও বর্তমান মুখপাত্র সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন,“সরকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।এছাড়া, গৃহপালিত নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর হুকুম তামিলে ব্যস্ত।”

সোমবার সন্ধ্যায় অজ্ঞাতস্থান থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক লিখিত বিবৃতিতে  সালাহউদ্দিন আহমেদ এ অভিযোগ করেন।

সরকার একদলীয় প্রহসনমূলক নির্বাচনের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে বলেও অভিযোগ এ নেতার।

তিনি বলেন,“প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল (রোববার) বিরোধীদলীয় নেতাকে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ চলাকালে গণহত্যার জঘন্য নজির স্থাপন করেছে সরকার। এ জঘন্য হত্যাকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই হয়েছে।”

অবরোধের তৃতীয় দিনে বিএনপি ও শরিক দলের ৩ জন নিহত হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করেন মুখপাত্র।

এছাড়া ৫৮৭ জনের অধিক নেতাকর্মী-সমর্থক আহত, ১৪৬ জন গুলিবিদ্ধ, ২৯১ জনকে গ্রেপ্তার, ২৫০০ জনকে আসামি করে মামলা, ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

দুই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীরা

চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসন করে দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেছেন পোশাকমালিকদের তিনটি সংগঠন বিজিএমই, বিকেএমই ও বিটিএমইএর নেতারা।

আজ সোমবার বিকেলে বিজেএমইএ ভবনে জরুরি মতবিনিময় সভা শেষে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরপর সন্ধ্যায় সাড়ে ছয়টার দিকে হেঁটে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের দিকে রওনা হন তাঁরা। যাওয়ার পথে ফার্মগেট খামারবাড়িতে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে গণভবনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যরা চলে যান গুলশানে বিরোধীদলীয় নেতার বাসার দিকে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর সভাপতির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে দেখা করবেন।

বিকেলে মতবিনিময় সভায় বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি ‘এয়ার বাকেটে’ আছে। এই সুযোগে ষড়যন্ত্রকারীরা পোশাকশিল্পকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চলমান সহিংসতার কারণে অনেক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এর দায়ভার কেউ নিচ্ছে না।

দেশবাসী তাকিয়ে আছে বঙ্গভবনের দিকে by মোঃ মাহমুদুর রহমান

জাতীয় জীবনের বর্তমান সহিংসতা, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় কে আমাদের সাহায্য করতে পারে? রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, সাধারণ মানুষ অথবা বিদেশী কূটনীতিকরা? আসলে তারা সবাই আমাদের সাহায্য করতে পারে যার যার দায়িত্ব থেকে। আমরা তথা সাধারণ মানুষের উন্নয়ন, শান্তি ও স্বস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত রাজনীতিকদের ওপর বর্তায়। দেশ ও জনগণের সেবা করার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে রাজনীতিকরা রাজনীতিতে এলেও বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। স্বাধীনতার ৪২ বছরের ইতিহাসে রাজনীতি আমাদের কিছুই দেয়নি বললে ভুল হবে। শিক্ষায় অগ্রগতি, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি এ রাজনীতিকদের নেতৃত্বেই। যদিও সাধারণ মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিক প্রচেষ্টাকে এক্ষেত্রে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনেকেই মনে করেন, সাধারণ মানুষই এ উন্নয়নের মূল দাবিদার। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে রাজনীতিকদের নেতৃত্বেই এসেছে। পূর্ববর্তী রাজনীতিকদের কারণে দেশটা আমরা পেয়েছি। শীর্ষ পর্যায়ে না থাকলেও তাদের অনেকেই আজও রাজনীতিতে সক্রিয়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখা রাজনীতিকদের জীবদ্দশায় মানুষ আজ আতংকিত। বর্তমান হিংসা ও বিভেদের রাজনীতি চূড়ান্তভাবে আমাদের অস্তিত্ব সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কি-না, জনগণের চোখে-মুখে আজ এ জিজ্ঞাসা।
এই হতাশাজনক অবস্থার জন্য দায়ী মূলত আমাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ অগণতান্ত্রিক রাজনীতি। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে সবাই ভাবছেন। রাজনীতির বাইরে এর কোনো সমাধান আছে কি-না খুঁজে দেখছেন সবাই। আসলে রাজনীতির সমস্যা রাজনীতিকদেরই সমাধান করতে হয়। অন্যদের সহযোগিতা ইতিবাচক ফল প্রদানে সহায়ক হয়, তবে সরাসরি হস্তক্ষেপ সাময়িক শান্তি নিয়ে এলেও দীর্ঘমেয়াদে ভালো কিছু দিতে পারে না। অনেকের মতে, শরীরে স্বাভাবিক ওষুধে কাজ না হলে যেভাবে অনেক সময় সার্জারির দ্বারস্থ হতে হয়, তেমনি আমাদের মতো দেশে মাঝে মাঝে রাজনীতির বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে। আমরা সম্ভবত এরকম একটি জায়গায় অবস্থান করছি বলে কেউ কেউ মনে করছেন। বিদেশী কূটনীতিকরা চেষ্টা করছেন অনেকদিন থেকে। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান রেজাল্ট জনগণ দেখতে পাচ্ছে না। তবে বিদেশীদের সহযোগিতা গ্রহণের আগে সবাইকে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, বিদেশীরা সব সময় তাদের নিজ নিজ দেশের স্বার্থ দেখবে সর্বাগ্রে। বাংলাদেশের স্বার্থের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আমাদের রাজনীতিকদেরই। এক্ষেত্রে তারা কে কতটুকু দক্ষতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে পারছেন, তা বিচারের দায়িত্ব জনগণের।
ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল সমাজের দায়িত্বও কম নয়। রাজনৈতিক অচলাবস্থার ক্ষেত্রে বিদেশী কূটনীতিক ও সামরিক বাহিনীর চেয়ে এই শ্রেণীর সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি কাম্য। রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে এরা সংকটের সময়ে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করতে পারেন। ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে রাজনীতিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করলে সত্যি সত্যি একটা সমাধানে পৌঁছা খুব কষ্টকর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সর্বগ্রাসী রাজনীতি আমাদের সব শ্রেণী-পেশার মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই কোনো ব্যবসায়ীর নাম বললে প্রথমেই সবাই চিন্তা করে তিনি কোন দলের সমর্থক। এভাবে শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সবাইকে আমরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে ফেলি। এখন যে কোনো সংকটে মধ্যস্থতা করার মতো কাউকে দেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই স্যার নিনিয়ান, বান কি মুনের প্রতিনিধি, রবার্ট ও ব্ল্যাক কিংবা নিশা দেশাই বিসওয়ালকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসতে হয়। আমরা তাদের কাছ থেকে সুবোধ বালকের মতো শুনি কী করতে হবে, কিভাবে চলতে হবে। এর জন্য শুধু রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীরাও দায়ী। রাজনীতির উচ্ছিষ্ট ভোগের জন্য এই শ্রেণীর অনেকেই যেভাবে লালায়িত থাকেন, তা দেখলে যে কারও লজ্জা পাওয়ার কথা। তাদের অন্ধ দলপ্রীতি ও নেতানেত্রীদের স্তুতির কারণে অনেকের ভাগ্যে উপদেষ্টা, ব্যাংকের পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নানা পদ-পদবি জোটে। এতে দুর্বল চিত্তের অনেকেই এ লাইনে অগ্রসর হয়ে নিজের আখের গোছানোর ফন্দি আঁটেন। আবার অনেকে অতি নিরপেক্ষ সাজতে গিয়ে সত্য প্রকাশে ভীত হয়ে পড়েন। যেমন- আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো অপকর্মের কথা বলতে বাধ্য হলে সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি সরকারের একই ধরনের অপকর্মের উদাহরণ টেনে এনে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেন। একইভাবে বর্তমান হরতাল-অবরোধে মানুষ হত্যার কথা বলতে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলতে হয় আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাবস্থায় কিভাবে আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করেছিল। এতে অপরাধগুলোকে এক ধরনের জায়েজ বা হালকা করার চেষ্টা থাকে, হয়তো তাদের অনিচ্ছায়। এরকম ভারসাম্য রক্ষা না করেও উপায় নেই। যারা সম্পূর্ণ সত্য কথা বলছেন, তাদের অন্য দলের সমর্থক বিবেচনা করে নাজেহাল করা হচ্ছে। পরিবারসহ নিজের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে দেশের জন্য কাজ করার মানুষ সত্যি কম।
তবে একেবারে যে নেই তা বলা যাবে না। অনেকেই বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধদের দেখে যেভাবে বিরোধী দলের সমালোচনা করছেন, একইভাবে সরকারের অনড় অবস্থান, একদলীয় নির্বাচনের চেষ্টা ও পুলিশের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধেও কথা বলছেন। কিন্তু কোনো পক্ষই কথা শুনছে না। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সুশীল সমাজের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বঙ্গভবনের বাইরে এসে ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন হলে গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হবে বলে রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির কিছু করার না থাকলেও রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়ে জাতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের হাত থেকে রক্ষা করবেন বলে সবাই আশা করছেন। যদিও এর আগে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে এরকম উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। তাই এখন রাষ্ট্রপতি কী করতে পারবেন বা করবেন, তা নিয়ে মানুষ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছে। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবে। দেশকে এভাবে নৈরাজ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। আজ মানুষের জীবন-জীবিকা ও গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন। দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচিতে আগের মতোই সহিংসতা চলছে। এতে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও প্রাণ হারাচ্ছেন। কারও মৃত্যুই কোনো সুস্থ বিবেকবান মানুষের কাম্য হতে পারে না। এ সংঘাতের মাধ্যমে কোন পক্ষের কী অর্জন হচ্ছে জনগণের কাছে তা পরিষ্কার না হলেও দেশ যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটা কারও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না কোনো আশ্রয়, কোনো অভিভাবক। এ অবস্থায় মানুষ তাকিয়ে আছে রাষ্ট্রপতির দিকে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা বলে রাষ্ট্রপতি কি চুপ করে থাকবেন? নাকি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে বিবেকের তাড়নায় সমঝোতার উদ্যোগ নেবেন? অন্য যে কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ বা উদ্যোগের চেয়ে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হবে। তাই ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি চোখ এখন বঙ্গভবনের দিকে। এই চোখে শুধু হতাশার চিহ্ন থাকবে, না আশার আলো ফুটে উঠবে, তা রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ নেয়া ও তাতে দুই পক্ষের ইতিবাচক সাড়া দেয়া না-দেয়ার ওপর নির্ভর করছে।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার

নির্বাচনের আগে-পরে গণমাধ্যমেরও পরীক্ষা হবে by মহিউদ্দিন আহমদ

আরও ১৩টি টিভি চ্যানেলের অনুমতি দিয়েছে বর্তমান সরকার। ২৬ নভেম্বর পত্র-পত্রিকায় এ খবরটি পড়ে তখনই কতগুলো স্মৃতি মনে পড়ল। প্রথমে মনে পড়ল, ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কে সিপিজে- ‘কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট’ নামের সংগঠনটির দুই কর্মকর্তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টার আলোচনার কথা। বব ডিটজ (Bob Dietz) এবং সুমিত গ্যালহোত্রা সিপিজের এশিয়া বিভাগে কাজ করেন; প্রথমজন বিভাগের প্রধান, দ্বিতীয়জন তার সহযোগী। বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতের সাফল্য, ‘গ্লোরিয়াস’ ভূমিকার বিপরীতে আমাদের সংবাদমাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকতার কেমন অপব্যবহার চলছে তা নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমার দেশ-এর ‘বাইচান্স এডিটর’ মাহমুদুর রহমান আমাদের সর্বোচ্চ আদালতে দুই দুইবার দণ্ডিত হওয়ার পরও কীভাবে সম্পাদক থাকতে পারেন, আমাদের অন্য সম্পাদক সাংবাদিক সাহেবরা কীভাবে তার পত্রিকায় উস্কানিমূলক প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও তার পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে পারেন, তাদের প্রশ্ন করেছিলাম আমি। বলেছিলাম আমি, এই আলোচনায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জার্মানির ‘দি স্টর্মার’ পত্রিকার সম্পাদক জুলিয়াস স্ট্রেচার (Julius Streicher)-কে তার পত্রিকায় ইহুদিবিরোধী উস্কানিমূলক অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে নুরেমবার্গ আদালতে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল এবং এ রায় কার্যকরও করা হয়েছিল। সম্পাদক বলে তাকে রেহাই দেয়া হয়নি, যেমনটা দাবি করেন আমাদের মতিউর রহমান চৌধুরীরা। আমাদের সম্পাদক সাহেবদের এককথা- সম্পাদক-সাংবাদিক হলে তাদের ‘টাচ’ স্পর্শও করা যাবে না। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় মাত্র ৯০ দিনে ১০ লাখ লোককে হত্যা করা হয়েছিল। এই গণহত্যার উস্কানি দেয়ার অভিযোগে রুয়ান্ডার টাংগুরা নামের পত্রিকা আরটিএলএম রেডিও নেটওয়ার্কের মালিক-সম্পাদক হাসান এনগেজে, ফাডিন্যান্ড নাহিমানা এবং জ্যঁ বস্কো বারাইয়াগ্বিজকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দিয়েছিল রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া গেল না। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালগুলোতে এখন আর মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। সিপিজে’র বব ডিটজ এবং সুমিত গ্যালহোত্রাকে তখন আরও বলেছিলাম, আমাদের অধিকাংশ সম্পাদকই এই মৃত্যুদণ্ড এবং কারাদণ্ডের রায়গুলোর কথা জানেন না। কিন্তু তারা আমাদের সম্পাদক। আমাদের কোনো কোনো সম্পাদক যে কী পরিমাণ অজ্ঞতা দেখাতে পারেন, তাদের লেখালেখি এবং কথাবার্তায়, তার ওপর বেশ কিছু ম্যাটেরিয়েল আমি জোগাড় এবং সংরক্ষণ করে চলেছি।
সিপিজে’র এই দুই কর্মকর্তাকে বললাম, যে দেশের রাজধানী ঢাকায় ২৩০টি ব্রডশিট দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় বলে সর্বশেষ ২০১১ সালের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের প্রতিবেদনে দেখা যায় এবং যে দেশে ২৭টি (তখন পর্যন্ত) টিভি চ্যানেল আছে, সেই দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অভাব আছে, এ অভিযোগটি কীভাবে ওঠে? গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই যদি না থাকবে, এতগুলো পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল কেন আছে? আরও শত শত মানুষ কেন আরও পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল চায়? দরখাস্তকারীদের মতলবটা কী?
আমার প্রশ্নটা বরং উল্টো, সংবাদপত্রের যে স্বাধীনতা আছে, তা কি সাংবাদিকরা প্রয়োগ করছেন? এই যে প্রায় প্রতিদিন বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে রুহুল কবীর রিজভী এবং অন্যসব নেতা কথা বলেই চলেছেন, তারা বলছেন সরকার পক্ষের লোকজনই বাস, ট্রেন, টেম্পোতে আগুন দিচ্ছে, মানুষ মারছেই; রিজভীকে কখনো পাল্টা কোনো প্রশ্ন কোনোদিন কোনো সাংবাদিক কি করেছেন?
অবরোধকারীদের ধাওয়া খেয়ে সিএনজি উল্টে গেল, তাতে মারা গেল সিএনজির ড্রাইভার। এই অবরোধকারীরাও কি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের কর্মী? সাংবাদিকরা যে প্রশ্নটি কখনোই করছেন না, এসব ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, আগুনে পোড়ানো, তার নিন্দা করছেন না কেন আপনারা? সরকার পক্ষের লোকজনের ‘ষড়যন্ত্রের’ কারণেই যদি এসব নাশকতামূলক ঘটনা ঘটে থাকে, তার নিন্দা জানানোটা তো বিএনপির পক্ষে আরও ‘ফরজ’। সরকার পক্ষের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা তো বিএনপির কর্তব্য। কিন্তু বিএনপি তার ধারেকাছেও নেই এবং আমাদের এই ঢাকা শহরেই এত হাজার হাজার সাংবাদিক, কিন্তু কেউই বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আমলগীরকে এ প্রশ্ন করে না। এখানে কি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অভাব আছে? স্বাধীনতার অভাবেই কি প্রশ্নগুলো করা হচ্ছে না?
বিএনপি নেত্রী কদাচিৎ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। কিন্তু সেদিন যখন তিনি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়া প্রেস ক্লাবে গেলেন, তখন তার ‘শর্ট’ বক্তৃতার পর তো তাকে কিছু প্রশ্ন করা যেত। এমন প্রশ্ন আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদেরও করা উচিত। আমাদের জাতীয় সংসদই তো কার্যকর হল না গত ২০ বছরেও। আমাদের সাংবাদিকরা যদি একটু সাহসী হন, একটু লেখাপড়া করে ঝুঁকি নেন, তাহলে তারাই নেতা-মন্ত্রীদের জবাবদিহিতা আদায় করতে পারতেন। বুঝতে পারি, একটু শক্ত প্রশ্ন করলে, পত্রিকার মালিক কর্তৃপক্ষই হয়তো সেই ‘বেয়াড়া’ সাংবাদিককে বরখাস্ত করে দেবে। তাহলে প্রশ্নটা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অভাব নয়; অভাব, সাহসের।
দুই.
নতুন আরও ১৩টি চ্যানেল মঞ্জুর করার খবরটি পড়ে মনে পড়ল সায়মন ড্রিং-এর কথা। বাংলাদেশে একুশে টেলিভিশনের মাধ্যমে এই মানুষটি আমাদের টিভি জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তার হাতে প্রশিক্ষিত টিভি কর্মীরা এখন অনেক টিভির দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন। তো এই মানুষটিকে বিএনপি-জামায়াত চক্র কীভাবে ২০০২ সালে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল, তা কি রুহুল কবীর রিজভীদের মনে করিয়ে দেয়া যায় না? মাহমুদুর রহমানের পক্ষে যারা কথা বলে তাদের সায়মন ড্রিং-এর কথাটি মনে করিয়ে দেন না আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাংবাদিকরাও। ২০০২ সালে একুশে টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়ার জন্য দরখাস্তকারী কারা ছিলেন? সদ্যপ্রয়াত এবং জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকদের এক ‘খাম্বা’ গিয়াস কামাল চৌধুরী, ঢাকা ইউনিভার্সিটির দুই প্রফেসর, ফার্মেসির চৌধুরী ফারুক এবং জিওগ্রাফির আবদুর রব। বর্তমান সরকার যখন চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি এবং ইসলামী টিভি বন্ধ করে দিল তখন জাতীয়তাবাদীরা হৈচৈ করতে থাকল। কিন্তু ‘একুশে টেলিভিশন’ বন্ধ করে দেয়ার কথাটি আমাদের কোনো সাংবাদিক তাদের মনে করিয়ে দেননি। তখন তো গিয়াস কামাল চৌধুরী, চৌধুরী ফারুক এবং আবদুর রবের সাক্ষাৎকার নেয়া উচিত ছিল। একুশে টিভি বন্ধ করে দেয়ার জন্য তারা মামলা করেছিলেন, সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত তারা লড়েছেন যেন একুশে টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমান সরকার যখন এই তিনটি চ্যানেল বন্ধ করে দিল তখন এই তিন জাতীয়তাবাদী খাম্বার প্রতিক্রিয়া জানতে আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল । কিন্তু কোনো সাংবাদিক তা করেননি।
গণমাধ্যমের অপব্যবহার কেমন হচ্ছে এখন তার তিনটি উদাহরণ। গোলাম আযমের সাক্ষাৎকার কে নিয়েছিল, কোন চ্যানেলে তার প্রচার হয়েছিল? মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাজাকার বাচ্চু কোন চ্যানেলে আমাদের বছরের পর বছর মুসলমান হওয়ার জন্য, মুসলমান থাকার জন্য ‘নসিহত’ করে গেছে? বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কর্নেল রশিদের সাক্ষাৎকারটি প্রথম পর্বটি প্রচারের পর বন্ধ করে দেয়া হল।
সায়মন ড্রিং বছর দুই আগে একটি কথা বলেছিলেন, নতুন টিভি চ্যানেলের জন্য শত কোটি টাকার মেশিন, সরঞ্জামাদি আনা হচ্ছে, কিন্তু এগুলো চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত লোক কি আছে? প্রসঙ্গত আমার খুব আমোদজনক একটি অভিজ্ঞতার কথা এখন বলি। ‘চ্যানেল আই’ তো পুরনো একটি চ্যানেল, তারা কত কিছু করছে দেশে-বিদেশে, কিন্তু চ্যানেল আইতে খবর শুনতে বসে একটি মজার অভিজ্ঞতা প্রায়ই হয়- খবর পাঠক/পাঠিকা হয়তো একটি শিরোনাম বললেন। কিন্তু বিস্তারিত বিবরণটি বলার সময় দেখা যায়, খবর পাঠক বা পাঠিকা তাকিয়ে আছেন, বিবরণটি তার হাতে আসেনি তখনও। সুতরাং তিনি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, কী করবেন বুঝতে পারছেন না, তারপর বলেই ফেললেন, ‘দর্শক, বিস্তারিত খবরটি এখনও আমাদের হাতে আসেনি বা প্রতিবেদনটি প্রক্রিয়াধীন আছে, খবরটি আমাদের হাতে এসে পৌঁছলেই আপনাদের জানিয়ে দেব।’ এত বছরের পুরনো একটি টিভি চ্যানেলে তারপরও এই সাধারণ ত্র“টিটি বছরের পর বছর চলছেই। মনে হয় নজর দেয়ার কেউ নেই।
গত ৩০ জুন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে অর্থমন্ত্রী মুহিতের বাজেটোত্তর ডিনারে চ্যানেল আইয়ের মালিক পক্ষের একজনকে দেখে তাকে এই ত্র“টিটির কথা জানাতে তার কাছে গেলাম। প্রথম বাক্যটি শেষ করিনি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসে গেছেন, এই বলে তিনি দিলেন ছুট দরজার দিকে। দেখলাম প্রধানমন্ত্রী দরজা দিয়ে ঢুকছেন। আমাকে একটি কথাও বললেন না, বা আবার ফিরেও এলেন না। প্রধানমন্ত্রীকে দেখে তার দৌড় দেয়ার স্মৃতিটা মনে পড়লে এখনও আমার হাসি পায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য তার এত ভক্তি প্রসঙ্গে বলি, বিএনপি-জামায়াত চক্রের শাসনামলে ২০০৩ বা ২০০৪-এ তারেক রহমান যখন বাংলাদেশের অনেকগুলো জেলা-উপজেলা সফরে বের হলেন, তখন সালেহ বিপ্লব নামের চ্যানেল আই-এর এক রিপোর্টার উৎসাহের যে আতিশয্য দেখিয়েছিল, তা এখনও মনে পড়ে।
দৈনিক ‘প্রথম আলো’ এবং ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’কে বাংলাদেশের দুটো উন্নত মানের পত্রিকা হিসেবে আমি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু দৈনিক প্রথম আলো কিছু দিন ধরে মনে হচ্ছে, প্রকাশ্যে অবরোধকারীদের পক্ষ নিয়েছে, বিএনপি-জামায়াতকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘আরও নয়জনের প্রাণ গেল’। তারা যদি নাশকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিত, তাহলে শিরোনামটি হওয়া উচিত ছিল, ‘আরও নয়জনকে পুড়িয়ে মারা হল’ বা ‘আরও নয়জনকে পোড়ানো হল’। পরদিন শুক্রবারেও প্রথম আলোর একই অবস্থান দেখতে পাই, আগুনে পুড়ল ১৯ বাসযাত্রী। কিন্তু শিরোনামটি হওয়া উচিত ছিল, ‘আগুনে পোড়ানো হল আরও ১৯ বাসযাত্রী।’ এসব নাশকতামূলক কাজে যারা জড়িত তাদের কীভাবে বর্ণনা করা হবে সেই বিষয়ে কোনো ‘ইউনিফরম’ নীতি সম্পাদকরা অনুসরণ করছেন না। তারা কি ‘অবরোধকারী’ নাকি ‘সন্ত্রাসী’ নাকি ‘জাতীয়তাবাদী-জামায়াত-শিবির’ কর্মী, নাকি দুষ্কৃতকারী? তাদের ‘অবরোধকারী’ বা ‘জামায়াত-শিবির’ কর্মী বললে তো সম্মান দেয়া হয়। কোনো রকমের দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করা উচিত আমাদের পত্রপত্রিকায় এবং টিভিতে।
তিন.
টিভি চ্যানেল আরও ১৩টি, সবগুলো প্রচারে গেলে সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০। আমাদের বিজ্ঞাপন বাজার কি এত বড়, এত ব্যাপক যে, এতগুলো টিভি চ্যানেল এবং পত্রপত্রিকা এই সীমিত বিজ্ঞাপন বাজারে টিকতে পারবে? মিরপুরের আওয়ামী লীগ এমপি কামাল মজুমদারের ‘মোহনা’ টিভি আধ্যাÍিক হুজুরদের দোয়ার বরকত, জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী এবং সর্বরোগের মহৌষধ পাথরের বিজ্ঞাপন প্রচার করে চলেছে। তবে এই বান্দা তার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সাফল্যের জন্য কী কী পাথর ব্যবহার করছে বা কোন হুজুরের দোয়া-দরুদ নিচ্ছে, অন্য কোনো একটি চ্যানেল তার ওপর একটি রিপোর্ট প্রচার করতে পারে। আমাদের সম্পাদক-সাংবাদিকরা জাতির বিবেক, এই প্রচারণা এ দেশে খুবই কার্যকর, কথাটি আংশিক সত্য, পুরো সত্য নয়।
জাতির এই বিবেকরা যেমন বিজ্ঞাপন সন্ত্রাস চালাচ্ছে তাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে, তার ওপর কি কোনো খবর থাকে? দেশের দর্শকরা যে এত বিরক্ত, তারপরও কি চ্যানেল মালিকরা, চ্যানেলগুলোর সম্পাদক-সাংবাদিকরা এতটুকু গ্রাহ্য করছেন, দর্শকদের অনুভূতিকে এতটুকু সম্মান দিচ্ছেন? দর্শকদের তো তারা বরং ‘কনটেম্পট’ দেখাচ্ছেন। দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার প্রতি মাসে তাদের অফিসে কোনো না কোনো বিষয়ের ওপর আলোচনাসভার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান সাংবাদিকতা, দর্শক-পাঠকদের পছন্দ-অপছন্দ বা অনুভূতির ওপর কখনও কি তারা একটিও রাউন্ড টেবিলের আয়োজন করেছে? শুধু রাজনৈতিক নেতারা নন, আমাদের সম্পাদক-সাংবাদিকরাও তাদের দুর্বলতার কথাগুলো বাইরের মানুষকে জানতে দেন না। সমালোচনা যে শুধু নেতা-মন্ত্রীরা সহ্য করেন না, তা নয়; সমালোচনা আমাদের গণমাধ্যমের মালিক-সম্পাদকরাও সহ্য করেন না।
চার.
দেশের সংকট গভীর থেকে মনে হচ্ছে গভীরতর হচ্ছে। আর আমার মনে পড়ছে নিউইয়র্কের বাঙালি পাড়া জ্যাকসন হাইটসে এক দুপুরে খাওয়ার সময় পাশের টেবিলের দুই বাংলাদেশীর কথাবার্তা। বাংলাদেশী তরিতরকারির খাবার দোকান। দেয়ালে বাংলাদেশী একটি টিভি চ্যানেল চলছে। তখনই পর্দায় ভেসে উঠল অনন্ত জলিলের একটি বিজ্ঞাপন চিত্র। একটি মোবাইল কোম্পানির।
এই বিজ্ঞাপন চিত্রে অনন্ত জলিলের শেষ বাক্যটির উদ্ধৃতি দিয়ে একজন অন্যজনকে বলল, আমাদের এসব রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের লোকজন, পত্রিকার সম্পাদক-সাংবাদিক, টকশোতে অংশগ্রহণকারী- তারা কি অনন্ত জলিলকে দেখতে পান না? প্রশ্নকারীর দিকে অন্যজন একটু তাকিয়ে থাকতেই প্রথমজন বললেন, এই যে অনন্ত জলিল বলছেন, অসম্ভবকে সম্ভব করাই অনন্ত জলিলের কাজ। দুই নেত্রীর মধ্যে সমঝোতা আনতে অনন্ত জলিলকে দায়িত্ব দিলেই তো হয়।
জবাবে দ্বিতীয়জন অনন্ত জলিলের পারিবারিক জীবনের কিছু কথা উল্লেখ করে যে কথাগুলো বললেন, তা এখানে উল্লেখ করা শোভনীয় হবে না।
‘শিউলীতলা’, উত্তরা,

হরতাল-অবরোধ কি চলতেই থাকবে? by মীর আবদুল আলীম

মনে হচ্ছে, হরতাল-অবরোধ বন্ধ হবে না। আরও সহিংস হবে। ফোনালাপ হবে, বৈঠক হবে না। হুমকি-ধমকি চলবে, সমঝোতা হবে না। গাড়ি পুড়বে, মানুষ মরবে; একদল গদি ছাড়বে না, অন্য দল গদির নেশায় হরতাল-অবরোধ দেবে; সংঘাতে জড়াবে। এখন হরতালের আগের দিনই ভাংচুর ও নৈরাজ্যের মাধ্যমে দেশজুড়ে আতংক সৃষ্টি করা হয়। ফলে মানুষ ভয়ে রাস্তাঘাটে বের হয় না। হরতাল আহ্বানকারী রাজনৈতিক দল এ চিত্র সামনে রেখে দাবি করে, হরতাল সফল হয়েছে। বাস্তবে হরতাল নয়, সফল হয় ভয়তাল। একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের শিরোনাম ছিল এরকম- Pre-strike violence rocks city. অপর দুটি বাংলা দৈনিকের শিরোনাম- হরতালের আগেই বোমা হামলা, রাজধানীতে হরতাল-পূর্ব নাশকতা। অন্যদিকে টেলিভিশনে যা দেখলাম, তা সংবাদপত্রের ছবি ও শিরোনামের চেয়ে আরও বেশি ভয়ংকর। হরতাল ছাড়া প্রতিবাদের আরও অনেক ভাষা আছে। সেসবের চর্চা না করে অবরোধ-হরতালের মতো ধ্বংসাÍক কর্মসূচি নেয়ার কারণ কী? জনকল্যাণের জন্যই যদি রাজনীতি হয়, তাহলে হরতালের নামে জ্বালাও-পোড়াও কেন? হরতালে সরকারি দল বিরোধী দলের কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে চায়। আর বিরোধী দল দেশব্যাপী ভাংচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। দু’দশক ধরে দেশে হরতালের নামে এসবই চলছে।
এক সময় হরতাল ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও জনমুখী। তখন হরতাল ছিল বিদেশি শাসকদের শোষণ, জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। তখন হরতাল পালনের জন্য কাউকে বাধ্য করা হতো না। কিন্তু হরতালের নামে এখন জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর ও লুটতরাজের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। মজার ব্যাপার হল- শাসক দল সব সময়ই হরতালের বিরুদ্ধে থাকে এবং তখন তারা বুঝতে পারেÑ হরতালে দেশের ক্ষতি হয়, প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর যখন তারা বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখন আর এসব কথা তাদের মনে থাকে না। তারা হরতালের পর হরতাল আহ্বান করতে থাকে। এক পরিসংখানে দেখা যায়, ১৯৭২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২৮ বছরে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৪৩৩টি পূর্ণ দিবস ও ৫৭৯টি অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭২ সালের শুরু থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচটি পূর্ণ দিবস ও ১২টি অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৮২ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত পালিত হয় ১০টি পূর্ণ দিবস ও ৪৩টি অর্ধদিবস হরতাল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০৪টি পূর্ণ দিবস ও ১৯৪টি অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। ১৯৯০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত পূর্ণ দিবস হরতালের সংখ্যা ১৫৫ ও অর্ধদিবস হরতালের সংখ্যা ২২৩টি। ১৯৯৬ সালের ৩১ মার্চ থেকে ২০০০ সালের ১২ জুন পর্যন্ত পালিত হয় ১৫৯টি পূর্ণ দিবস ও ১০৭টি অর্ধদিবস হরতাল। পত্র-পত্রিকার হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালের ১২ জুনের পর থেকে ২০১০ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত ১৭৭টি হরতাল পালিত হয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশে কোনো হরতাল পালিত হয়নি। এরপর ২০১০ সাল থেকে আবার হরতাল কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে খুব বেশি হরতাল হয়েছে- তা বলব না। তবে যেভাবে টানা হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি ঘোষিত হচ্ছে, তাতে শংকিত না হয়ে পারা যায় না। হরতালে দেশের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির একটা হিসাব পাওয়া যায় ইউএনডিপির স্থানীয় একটি গবেষণা থেকে। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ইউএনডিপির একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৯০-৯১ অর্থবছর থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর পর্যন্ত হরতালের কারণে প্রতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গড়ে ক্ষতি হয়েছে ৮৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। কেন ও কীভাবে হরতাল সফল হয়, তা সাধারণ মানুষের জানতে বাকি নেই। বস্তুত কর্মনাশা হরতাল দেশের কোনো স্বার্থই রক্ষা করতে পারে না। নিছক ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে, এক দলকে হটিয়ে আরেক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার অস্ত্র হিসেবে হরতাল ডাকা হয়। স্বাভাবিক কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকতে মানুষকে বাধ্য করা সংবিধান বহির্ভূত। হরতাল আহ্বানকারীদের কথিত ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’-এর নামে প্রকারান্তরে দেশের মানুষের নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়। আমাদের সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯ অনুচ্ছেদে মত প্রকাশের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও হরতালকে ‘সাংবিধানিক অধিকার’ বলা হয়নি। তাহলে হরতাল নামের এ ভয়তাল কোন অধিকারের মধ্যে পড়ে- জানতে ইচ্ছে করে।
পঞ্চাশের দশকে মাথাপিছু গড় আয়ের দিক থেকে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কোরিয়া ও তাইওয়ানের তুলনায় বাংলাদেশ খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ পর্যায়ে আমাদের দেশের তুলনায় উল্লিখিত দেশগুলো, বিশেষ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কোরিয়া ও তাইওয়ান প্রভূত উন্নয়ন করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে মন্থরগতি বা স্থবিরতার কারণ অনুসন্ধান করেছেন অনেকে। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, পরিকল্পনায় শৃংখলার অভাব, অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন, নানামুখী দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র, শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ, অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতা, আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে সুষম নীতিমালার অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি দুর্বল অর্থনীতির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে সুপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রক্রিয়ার আওতায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর দক্ষতা কাজে লাগানো সম্ভব হলে আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বপ্ন বাস্তবে রূপলাভ করবে বলেই মনে হয়। এজন্য স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের নানাভাবে উৎসাহ ও প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। এটা আমাদের রাজনীতিকরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবেন, ততই মঙ্গল।
মীর আবদুল আলীম : কলামিস্ট

একমাত্র শেখ হাসিনাই কেন এখন বিএনপির টার্গেট? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আপনারা চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকেরও দায়িত্ব নিন, তবু নির্বাচনকালীন সরকারে যোগদান করুন এবং নির্বাচনে অংশ নিন।’ বিরোধী দলকে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তাদের কি উচিত নয় ‘তালগাছটার দাবি’ ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দেয়া এবং সন্ত্রাস অবিলম্বে বন্ধ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য এগিয়ে আসা? নির্বাচন যাতে যথাসম্ভব সুষ্ঠু ও অবাধ হয় তার সর্বাধিক নিশ্চয়তা বিধানের জন্য তারা সরকারে যোগ দিতে পারেন। তারপরও তারা যদি দেখেন শেখ হাসিনার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপের জন্য নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারছে না, তাহলে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ ও নির্বাচন বর্জনের দরজা তো তাদের সামনে খোলাই থাকবে। দেশের মানুষকেও তখন তারা এই সত্যটা বোঝাতে পারবেন যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত কোনো সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। তখন দেশের মানুষই তাদের ডাকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেবে। এখনকার জনসমর্থনবিহীন সন্ত্রাস দ্বারা সাধারণ মানুষের ধিক্কার কুড়াতে হবে না। বিএনপি ও জামায়াত এখন পর্যন্ত যে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি তার বড় কারণ, হাসিনা-সরকার তাদের আগের জনপ্রিয়তা হয়তো ধরে রাখতে পারেনি কিন্তু তাদের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব নয়, এ কথাটি জনসাধারণ এখনও বিশ্বাস করে না। হয়তো বিএনপির নেতানেত্রীরাও মনে মনে বিশ্বাস করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব। তার প্রমাণও তারা বিভিন্ন নির্বাচন, উপনির্বাচন ও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পেয়েছেন। না পেলে সিটি কর্পোরেশনের পাঁচটি নির্বাচনে তারা যেতেন না এবং জয়ী হতেন না। এখনও তারা জানেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে যে সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে এবং তাতে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা ষোল আনা না থাকলেও দশ আনা রয়েছে।
তবু তারা জেদ ধরেছেন, শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান থাকলে তারা নির্বাচনে যাবেন না, তার একটি বড় কারণ, আমার অনুমান নয়, বিএনপির ঊর্ধ্বতন মহলের ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকেই জেনেছি। কারণটি হল, শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকলে বিএনপি যে ধরনের নির্বাচন-জয় চায় তা পাবে না। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এখনও জনপ্রিয়। তিনি সরকারপ্রধান থাকলে বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আওয়ামী লীগ টেনেটুনে নির্বাচনে জয়ী হয়ে যেতে পারে। আর জয়ী না হলে বিএনপি জয় পেতে পারে। কিন্তু নিরংকুশ বিজয়ের অধিকারী হবে না। একটি তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (সাহাবুদ্দীন-লতিফুর মার্কা) অথবা হাসিনাবিহীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে, ম্যানুপুলেট করে (২০০১ সালের মতো) সংসদে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব বলে মনে করে বিএনপি।
আমার সূত্রের মতে, বিএনপি আগামী নির্বাচনে এই ধরনের ম্যাসিভ ভিক্টরি চায়। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জয়লাভ চায় না। সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই মাত্র তারা সংবিধান সংশোধন করতে পারবে। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল, তাদের বিচার, দণ্ড সবকিছু বাতিল করে দিতে পারবে। জামায়াতকে শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরিয়ে দেয়া নয়, দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদেরও আবার ক্ষমতার পার্টনার করা যাবে। পাকিস্তানের মতো সংবিধানে শুধু শরিয়া আইন ঢোকানো নয়, তেতুলতত্ত্বের উদ্গাতা হেফাজতি মাওলানার মধ্যযুগীয় তের দফাকেও রাষ্ট্রের বিধান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর স্বার্থ ও অধিকার চূড়ান্তভাবে খর্ব করা যাবে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে খুশি করার জন্য বাংলাদেশের আহমদীয়া সম্প্রদায়কে সরকারিভাবে অমুসলমান ঘোষণা করে তাদের ধর্মীয় ও নাগরিক সব অধিকার হরণ করা হবে। তালিকা আরও বড়, সবটা লিখছি না।
আগামী সংসদে ব্রন্টাল মেজরিটি না পেলে, কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে একটি সরকার গঠন করা যাবে; কিন্তু উপরে বর্ণিত উদ্দেশ্যগুলোর কোনোটাই পূরণ করা যাবে না। তাছাড়া সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্র ও সেক্যুলার দলগুলো এক হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ সংসদের ভেতরে বিএনপি-জামায়াতের সব অপচেষ্টার প্রতিবাদ জানাবে এবং বাইরেও গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দ্বারা তা প্রতিহত করতে চাইবে।
সুতরাং আগামী নির্বাচনে কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিজয় বিএনপির কাম্য নয়। তার কাম্য এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরংকুশ বিজয়। যে বিজয় দ্বারা সংবিধান সংশোধন করা যায় এবং সংসদে আওয়ামী লীগের উপস্থিতি একেবারেই অর্থহীন করে দেয়া যায়। কিন্তু বিএনপির ভয় শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকলে তাদের এই উদ্দেশ্য পূরণ কিছুতেই সম্ভব নয়। তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার জন্য শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান হিসেবে কোনো প্রভাবই বিস্তার করতে দেয়া হবে না। তার সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেলেও বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে তার ইমেজ এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঘাটতি এখনও নেই। এই ইমেজ ও ক্যারিশমার জোরে তিনি আগামী নির্বাচনে সব ঝড়-ঝঞ্ঝার মুখে এই জোটকে জয়ী করে আনতে পারেন।
এখানে জয়ী করতে যদি নাও পারেন, নির্বাচনে বিএনপির জয় সম্ভব, নিরংকুশ বিজয় কিছুতেই সম্ভব হবে না। আর নিরংকুশ বিজয় যে কোনো উপায়ে নিশ্চিত করতে না পারলে বিএনপির উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব নয় এবং নির্বাচনে গিয়েও লাভ নেই। সুতরাং শেখ হাসিনাকে যে কোনোভাবে সরকারের বাইরে রাখার জন্য বিএনপির এই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে না পেরে জামায়াতের সাহায্যে জনজীবনে সন্ত্রাস ও ভীতি সৃষ্টি করে দেশ অচল করা ও সরকারের পতন ঘটানোর জন্য এই পৌনঃপুনিক ব্যর্থ চেষ্টা।
শেখ হাসিনাকে নির্বাচনী সরকারপ্রধান রাখার ব্যাপারে বিএনপির এত এলার্জি কেন, বিএনপির ঊর্ধ্বতন মহলের ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে যেমন আমি তা জানতে পেরেছি, তেমনি জানতে পেরেছেন আমার এক অনুজপ্রতিম সাংবাদিক ও কলামিস্ট বন্ধু মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুও। অবশ্য এটা তার নিজস্ব বিশ্লেষণও। তিনি তার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কলামে এই বিশ্লেষণ লিখেছেন এবং টেলিফোন আলাপে আমার সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। মঞ্জুর বিশ্লেষণের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি।
এখন প্রশ্ন, এত সহিংসতা ও সন্ত্রাস সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে যদি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের পদ থেকে সরানো না যায়, তাহলে বিএনপি কী করবে? প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তাদের জন্য বড় ধরনের ছাড় ঘোষণার পর তারা নির্বাচনে যোগ দেয়ার জন্য আলোচনার টেবিলে আসবেন, না জামায়াতের সহযোগিতায় এই সন্ত্রাস অব্যাহত রাখবেন? এই সন্ত্রাস যে আরেকটি যুদ্ধাপরাধ তা কি তারা জানেন? ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে গিয়ে বিএনপি যে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের মতো আরেকটি যুদ্ধাপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তা কি দলটির নেতানেত্রীরা এখনও উপলব্ধি করছেন না?
’৭১ সালে জামায়াতিরা বাংলাদেশে যে নৃশংস বর্বরতার অনুষ্ঠান করেছে, বর্তমানে ২০১৩ সালে তারা বিএনপির ছাতার আড়ালে সেই একই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। ’৭১ সালে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের ঘুমের শয্যা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ, নারী হরণ ও ধর্ষণ করা হয়েছে। অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে নিরীহ মানুষের ওপর, সংখ্যালঘুদের ওপর চলেছে অমানুষিক নির্যাতন। বর্তমানে সেই একই জামায়াত একই হত্যা, নৃশংসতা ও তাণ্ডবের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। তখন তাদের সহযোগী ছিল বিদেশী পাক হানাদাররা; এবার সহযোগী স্বদেশী বিএনপি।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো সংজ্ঞাতেই এই সন্ত্রাস রাজনৈতিক আন্দোলনের পর্যায়ে পড়ে না। যেমন পড়ে না একাত্তরের হত্যা ও সন্ত্রাস। দুই দেশের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধেও একটি আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ বলা হয়, অসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যেন বোমাবর্ষণ করা না হয়; সিভিলিয়ান যেন হত্যা করা না হয়। রাজনৈতিক আন্দোলনেও লক্ষ্য রাখা হয় নিরীহ সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবে আক্রান্ত না হয়।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়েও বঙ্গবন্ধু এই আন্দোলনের নাম দিয়েছিলেন অহিংস আন্দোলন। হরতাল-অবরোধের সময়ও তিনি অ্যাম্বুলেন্স, ছাত্রছাত্রীবাহী বাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বহনকারী ট্রাক, ওষুধের দোকান ইত্যাদি হরতালের আওতামুক্ত রেখেছিলেন। কোনো নিরীহ মানুষ যেন আক্রান্ত না হয় সে জন্য তার ছিল আন্দোলনকারীদের প্রতি কঠোর নির্দেশ। দেশের মানুষ তাতে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়েছিল।
বর্তমানে বিএনপি-জামায়াতের এটা কেমন ধরনের আন্দোলন? যেখানে বাসযাত্রী নিরীহ মানুষ, এমনকি চলাচল করছে না এমন বাসেও ঘুমন্ত বালককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নৃশংসতা দেখানো হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স আক্রান্ত হচ্ছে, ওষুধের গাড়ি, ধানবোঝাই ট্রাক আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ৩০ লাখ শিশু শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বন্ধ করা হচ্ছে। রেললাইন উপড়ে ফেলে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। শিশুখাদ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দোকান পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। রেহাই পাচ্ছে না বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
এটা কি আন্দোলন, না একাত্তরের সমতুল্য যুদ্ধাপরাধ? এই যুদ্ধ তো আসলে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে। হামলার টার্গেট সাধারণ মানুষ। এটা একাত্তরের পুনরাবৃত্তি। সুতরাং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি ২০১৩ সালে জামায়াত কর্তৃক একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। জনগণের সহযোগিতায় কঠোরভাবে এই সন্ত্রাস তথা নতুন যুদ্ধাপরাধ দমনে এগিয়ে যেতে হবে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতে হবে। বিএনপি যদি সেই নির্বাচনে না আসে, তাহলে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়িত্ব তাদেরই বহন করতে হবে।
বিএনপিকেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে সন্ত্রাস বর্জনপূর্বক নির্বাচনে অংশগ্রহণের আলোচনায় আসবেন, না একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তায় দেশের মানুষের বিরুদ্ধে আরেকটি নৃশংস যুদ্ধাপরাধ ঘটানোর ইতিহাস তৈরি করবেন। জনগণের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধাপরাধের জন্য তারা এখনই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচিত না হতে পারেন, এমনকি তাদের বিচারও সহসা না হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের কাছ থেকে তাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। ৪২ বছর পর যদি ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে পারে, তাহলে অনুরূপভাবে আরও ৪০ বছর পর আজকের অপরাধের যে বিচার হবে না তা কে বলতে পারে?
বাংলাদেশের ‘ন্যাশনালিস্টদের’ উচিত ত্রিশের জার্মানির ন্যাশনালিস্টদের পরিণতি (নাৎসি) থেকে শিক্ষা নেয়া। সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে তারা নির্বাচনে আসুন। দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করুন। জামায়াতের সমর্থন ও সন্ত্রাস নয়, জনগণের সমর্থনই তাদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারবে। জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ক্ষমতায় আসা যাবে না। শেখ হাসিনা সেখানে থাকবেন অপরাজেয়।

নির্বাচন না হলেও ফলাফল পাওয়া যাবে

প্রধান নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণা করে ফেলেছেন। ইতিপূর্বে তিনি বলেছিলেন, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করবেন। মনে হচ্ছে, তিনি কোথাও থেকে তাড়া খেয়ে কোনো অজ্ঞাত কারণে তাড়াহুড়ো করে টেলিভিশনে ‘ভাষণ’ দিয়েই নির্বাচনসংক্রান্ত দিন-তারিখসমূহ নির্ধারণ করে দিলেন। বোঝা গেল, যাঁরা তাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা নির্বাচনটি সঠিক বা বেঠিক, সর্বজনগ্রাহ্য হবে কি না সেই ভাবনার তোয়াক্কা না করে নির্বাচন-জাতীয় কিছু করেই ফেলবেন। সাজানোই হোক অথবা ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ’ যাই হোক, কিছু যায় আসে না। সত্যিকারের অথবা সাজানো কত রকমের নির্বাচনই তো সুদীর্ঘ জীবনে দেখলাম। যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটদান। সেই নির্বাচন সঠিক ও নিরপেক্ষ হওয়ার কৃতিত্ব তৎকালীন ক্ষমতাসীন মোসলেম লীগ সরকারের। এবার অবশ্য শেখ হাসিনা সরকার তেমন নিরপেক্ষ হবেন, এমনটি কেউ বিশ্বাস করে না। মোদ্দা কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর ছকবাঁধা পন্থায় ‘করে’ ফেলবেন। সেই পথে তিনি অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘পারবেন’ তো? উত্তর হচ্ছে, না পারলেইবা কী, পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসরণে প্রধানমন্ত্রিত্ব থাকবে। তবে অনেকেই আমাকে যখন প্রশ্নটি করেছেন আমি বলেছি, কেন পারবেন না?
জিয়াউর রহমান আর এরশাদ সাহেব তো গণভোট করে ভোট পান বা না পান শতকরা ১১০ জনের সমর্থন পেয়েছেন বলে ঘোষণাটি করে ফেলেছিলেন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার ছিল কি না তা দেখার জন্য বিদ্যমান স্বল্পসংখ্যক গণমাধ্যম প্রতিনিধি ছিলেন না। বিদেশি পর্যবেক্ষক প্রথাটি তখন চালুই হয়নি। ইচ্ছামাফিক ফলাফল ঘোষণা করলে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা বিবেচনার প্রয়োজন ছিল না। এখন তাঁদের আসতে ভিসা না দিলেই হলো। সর্বোপরি পরম শুভাকাঙ্ক্ষী (আইনি ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কায় বশংবদ বললাম না) কমিশন তো আছেই। আরপিও তথা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন একটুখানি সংশোধন করে অনেক ব্যবস্থা করা যাবে। নির্বাচনের আগে-পরের জ্বালাও-পোড়াও নিয়ে ‘ডোন্ট কেয়ার’ বলে মাথা না ঘামালেই হলো। উলুখড় পুড়বে পুড়ুক না, ঘরে-বাইরে নিন্দা-সমালোচনা হবে, হোক না। বিরোধী দল অথবা জনগণ অথবা ‘জ্বালাও-পোড়াও’ করা দুর্বৃত্তরা হয়তো ভোটারের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করতে পারবে, করুক না। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের ফলাফল ঘোষণায় বাধা নেই। থাকলেও সংসদে আইন করে তা অপসারিত করলেই হলো। সুতরাং ভোট নাইবা পড়ল, ভোটারও না এলেও কিছু যায় আসে না,
আওয়ামী প্রার্থীদের শুধু নির্বাচন কমিশনের কাছে ফলাফল চাই। একটি নির্বাচন করে ফেলা নয়, যথাযথ ভোটে পরাজয়ের পরও জয়ী ঘোষণার তরিকাটির উদাহরণ দেব। তরিকাটির নাম ‘মিডিয়া ক্যু’, আবিষ্কারক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এই পদ্ধতির কীভাবে সফল প্রয়োগ করা যায়, এ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুধু নয়, অংশগ্রহণ আছে। অভিজ্ঞতাটি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের, সেটি আগেও বলেছি কি না মনে নেই, পাঠকদেরও মনে থাকার কথা না। আসন্ন নির্বাচনী প্রহসনের মঞ্চস্থকারীদের জন্য পুনর্ব্যক্ত করছি। আমি তখন বাসস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক। এরশাদ সাধারণ নির্বাচন করতে ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসন বৈধ করার জন্য সংসদ বানাবেন। মানে গণতন্ত্রের একটি ভেক পরবেন। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া উভয়ে অংশগ্রহণ করবেন বলে যুক্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। উভয়েই ১৫০-১৫০ আসনে একাই প্রার্থী হবেন। বস্তুত কৌশলটি ছিল চমৎকার। কিন্তু তাঁরা চলেন ডালে ডালে, এরশাদ পাতায় পাতায়। সামরিক ফরমান বলে আরপিও সংশোধিত হলো, কেউ তিনটির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। সুতরাং দুই দল সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচনে যাবে না। দুই নেত্রীর বর্জন ঘোষণার পর সেই রাতে আর অফিসে থাকার প্রয়োজন ছিল না। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী চট্টগ্রামে জনসভায় ঘোষণা দিলেন, ‘যারা এই নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেইমান।’
তাই বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। টেলিফোনে বিশেষ স্থান থেকে নির্দেশ পেলাম, রাতভর দপ্তরে থাকতে হবে। চমক দেওয়া খবর আসছে, সেই চমকটি ছিল ঢাকায় ফিরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেন শেখ হাসিনা। রাত দুইটায় খবরটি টেলিপ্রিন্টারে সর্বত্র পাঠিয়ে দিলাম। অপরদিকে খালেদা জিয়া রইলেন অনড়, মাথায় পরলেন ‘আপসহীন’ মুকুটটি। নির্দিষ্ট দিনে এরশাদের পাতানো নির্বাচন হলো। ব্যবস্থা ছিল ফলাফল ঢাকার কমিশন কার্যালয় থেকে ঘোষণা করা হবে, কেন্দ্র অথবা জেলা রিটার্নিং অফিস থেকে নয়। আমি আর রিপোর্টার মরহুম গিয়াস কামাল এবং স্বল্প কয়েকটি পত্রিকার প্রতিনিধি প্রধান নির্বাচন কমিশন দপ্তরে গেলাম। জেলা সদর থেকে ভোটের সংখ্যা আসছে একটি কামরায়। পাশের কামরায় ফলাফল লেখা হচ্ছে। বিরাট গণনা কক্ষ থেকে একজন বেরিয়ে এসে বোর্ডে ফলাফল চক দিয়ে লিখছেন। সেই ক্রমান্বয়ে পাওয়া ফলে দেখছি—আওয়ামী লীগ ১০০, জাতীয় পার্টি ৫০। অবাক কাণ্ড বটে। মনে মনে বেশ খুশি, হঠাৎ দেখি পাশের কামরা থেকে কেউ আসছে না। মিনিট-ঘণ্টা পার হয়ে গেল। ব্যাপার কী দেখার জন্য গণনাকক্ষে গিয়ে দেখি অন্ধকার, কেউ নেই। বুঝলাম, ভোট গণনা বন্ধ করে কেন জানি সবাই পালিয়েছে।
আমরা দুজনে বের হওয়ার জন্য বাইরে এসে দেখি, নির্বাচন কমিশন চারদিকে সেনাবাহিনী ঘেরাও করে রেখেছে। একটি চিপা পথ দিয়ে বের হয়ে বাসসে এলাম। এদিকে দুই দিন পরও ভোটের ফলাফল দেশবাসী জানছেন না। দুদিন পর আমার কাছে নির্দেশ এল, ভোটের ফল পাঠানো হচ্ছে, সেটিই সব পত্রিকায় টেলিপ্রিন্টারে যাবে। সেই ঘোষিত তথা পাঠানো ফলাফলে আওয়ামী লীগকে বোধ হয় ৪০-৪৫টি আসন দেওয়া হয়েছিল। সেই ফল আওয়ামী লীগ মেনে নিল, কারচুপি হয়েছে বলে তখনই প্রত্যাখ্যান অথবা সংসদ ‘বর্জন’ করল না। এরই নাম ‘মিডিয়া ক্যু’, যা ২০১৪ সালে অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছি আওয়ামী লীগকে। ইতিমধ্যে বিরোধী দলের হরতাল বর্জন-অবরোধ চলতে থাকুক না। গাড়ি পুড়ুক, মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট রোগীতে ভরে যাক। তবে বর্তমান মিডিয়া যুগে বর্ণিত পদ্ধতি কতখানি কার্যকর হবে তা ভেবে অনেকে আমার বক্তব্যটি পরিহাস বলে উড়িয়ে দিতে পাবেন। তা ছাড়া এখন গণনা হয় কেন্দ্রে, সেখানে ফলাফল ওলটানো যাবে কী করে? অতি সহজ উপায়, নির্বাচন কমিশন বলবে, ওই পদ্ধতি বাতিল করা হলো।
ইতিমধ্যে সাজানো আমলাতন্ত্রে ফলাফল ওলটপালট করে বশংবদ রিটার্নিং অফিসার যদি দুয়ে-দুয়ে পাঁচ গণনা করে শেরেবাংলা নগরে পাঠান, সেটিই কমিশন ঘোষণা করে মিডিয়ায় পাঠাবে। একই সঙ্গে নিজেদের প্রতিনিধির পাঠানো নিজস্ব সূত্রে পাওয়া ফলাফল মিডিয়ায় ছাপা হলেই কী আসে-যায়। তদুপরি কেন্দ্রে মিডিয়ার ‘প্রবেশ নিষেধ’ করলেই হলো। আর বিদেশি পর্যটক? ভিসা না দিলেই হলো। এতদূর যা লিখলাম তা পড়ে পাঠক বলবেন আওয়ামী লীগকে বদবুদ্ধি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ আওয়ামী লীগকে কিছু করতে হবে না, যা করার নির্বাচন কমিশনই করবে। তারা ইচ্ছে করলে সারা দেশের জন্য একটি সাজানো নির্বাচনী ফলাফল ছকনির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করতে পারবে। কেন্দ্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সব ব্যবস্থা করে ফেলতে পারবেন। এ জন্য অবশ্য কমিশনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলতে আমরা যা বুঝি, সেই পুলিশ-বিজিবি-আনসার ছাড়াও সেনাবাহিনীর সাহায্য চাই। আর যদি একটি যেমনটি বললাম তেমনটি না করে নির্বাচনী প্রহসনের মঞ্চ সাজাতে হয়। দেশের ৩৯০০ কেন্দ্র পাহারা দেওয়া, ব্যালটে সিল মেরে হাজার হাজার বাক্স পুরানো এবং প্রার্থী ও লাখ খানেক পোলিং অফিসার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। এই কাজটি করতে শুধু র‌্যাব, পুলিশ আর সীমান্ত অরক্ষিত রেখে নিয়ে আসা বিজিবি দিয়ে সম্ভব হবে না।
তাই তো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সেনা সাহায্য দরকার। তবে ইতিমধ্যে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সেনাবাহিনীকে, যাদের নামোচ্চারণে দেশপ্রেমিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তাদের দেশের সংখ্যাগুরু জনগণের মুখোমুখি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবার কোনো ঝামেলা বাধিয়ে ফেলবেন না তো? বলা হয়েছে সেনাবাহিনী হবে স্ট্রাইকিং ফোর্স, দরকার হলেই শুধু অকুস্থলে যাবে। খুব ভালো কথা, কিন্তু সেই কর্তব্যটি করতে গেলে যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর যথাস্থান থেকে চাই। সবশেষে প্রশ্ন, আমার সলাপরামর্শ অনুযায়ী বর্ণিত এত ঝামেলায় কেন যাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? ষোড়শ সংশোধনী করতে পাঁচ মিনিট লাগবে। সংবিধান সংশোধন করে সংসদ তথা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল দুই-পাঁচ বছর বাড়িয়ে নিলেই হয়। নির্বাচন প্রতিরোধকারীদের মরতে বা মারতে হবে না। জনগণও হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, পুলিশের গুলি, আগুনে ঝলসানোর দুর্ভাগ্য, মর্মান্তিক মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাবে। যাঁরা সমঝোতা-সংলাপের জন্য ছোটাছুটি করছেন, পত্রিকায় কলাম লিখছেন, টক শোতে দুশ্চিন্তার ঝাঁপি খুলে বসেছেন, তাঁরাও বিশ্রাম পাবেন। সর্বোপরি, তফসিলভুক্ত প্রার্থীদেরও এলাকায় যাওয়ার ভীতি বা ঝুঁকি থাকবে না। কথাটি বললাম এ জন্য, দুদিন আগে আমার গ্রামের এলাকা, ফুলগাজী-পরশুরামের আওয়ামী মনোনয়ন পাওয়া কোন এক তপন ঘোষ না বোসকে জনতার তাড়া খেয়ে ভাঙা গাড়িতে এলাকা ছাড়তে হয়েছে। নিশ্চিন্তে ঢাকায় বসে থাকবেন আর টেলিভিশনে কমিশনের সরবরাহকৃত ফলাফল ঘোষণা শুনবেন, এলাকায় তাড়া খেতে যেতে হবে না। সেই ফলাফল যত দিনই টিকুক, প্রাক্তন সাংসদ বা মন্ত্রী কথাটি নামের শেষে লিখতে পারবেন।
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আমরা জনগণ বোকা, কিছুই বুঝি না?

আটক হওয়া বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী
অনলাইনে প্রথম আলো (prothom-alo.com) নিয়মিত পড়া হয় ১৯০টি দেশ থেকে। পড়ার পাশাপাশি পাঠকেরা প্রতিদিন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, খেলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত দেন। তাঁদের এ মতামত চিন্তার খোরাক জোগায় অন্যদের। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠকদের কিছু মন্তব্য ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে ছাপা হলো।
বিএনপি ক্ষমতার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছে: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতার জন্য উন্মাদ হয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারছে। প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাইদ মন্তব্য করেছেন: বাসে আগুন দিয়ে যারা মানুষ পোড়াচ্ছে, পুলিশ বা গোয়েন্দারা কেন তাদের ধরতে পারছে না? আমি বিশ্বাস করি, পুলিশ চাইলেই ওদের ধরতে পারে। কিন্তু তার পরও দুর্বৃত্তদের ধরা হবে না। কেন, ধরলে কি থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে? সরকার চাইলে বিএনপির সব নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করতে পারে। তবে কি, সরকার নিজে বাসে আগুন দিয়ে মানুষকে অবরোধের বিরুদ্ধে খেপিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে? প্রবাল: খালেদা জিয়া ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়েছেন। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, এবার ক্ষমতায় যেতে না পারলে মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, একাত্তরের ঘাতকদের বাঁচাতে পারবেন না। মামুন খান: দোহাই লাগে, আপনারা দুজন ক্ষান্ত দেন। দেশের মানুষকে একটু শান্তিতে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বাঁচতে দিন। আউয়াল: খালেদা জিয়া ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উন্মাদ, আপনি ক্ষমতায় চিরকাল থাকার জন্য পাগল। আর আমরা জনগণ বোকা, কিছুই বুঝি না? মনজুর: এসব বলে আর লাভ নেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আপনার দল বিএনপি থেকে আলাদা কিছু নয়। নিরীহ জনগণের মৃত্যুর জন্য আপনাদের সবার অপরিণামদর্শী রাজনীতিই দায়ী। রাজনীতিবিদেরা যদি সত্যিই জনগণের মঙ্গলের কথা ভাবতেন, তবে তাঁদের এভাবে জিম্মি করে রাজনীতি করতেন না। শামীম ওসমানের মতো চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে দলের মনোনয়ন দিতেন না।
আদালতে রিজভী, রিমান্ড চাইবে পুলিশ
গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় রাজধানীর শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় মতামত জানিয়ে রাইসুল ইসলাম খান লিখেছেন: সরকার ইচ্ছা করে দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে বিরোধী দল যা করছে, তাও কি মেনে নেওয়া যায়? এদের কর্মকাণ্ডের জন্য আজ পর্যন্ত যেসব সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাল, তাদের কী হবে? আনোয়ার: সরকারের এ কর্মকাণ্ডে স্বৈরাচারী মনোভাব আরও একবার প্রতিফলিত হলো। হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার করে আওয়ামী লীগ নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে। ইশতিয়াক: আটক-মামলা এসব দিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা যত দিন না আসে, তত দিন দেশে অস্থিরতা কমবে না। আশা করি, এসব দমন-পীড়ন বন্ধ হবে এবং সব দল মিলে নির্বাচন করে নতুন সরকার গড়বে। ফজলুল হক: আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না। ভবিষ্যতের কথা ভাবছি না। তাই দেশের এ অবস্থা। সরোয়ার: এ দেশে নাকি গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা হচ্ছে! এ তার হালচিত্র! রাস্তাঘাটে মানুষ মরছে-পুড়ছে তাতে কোনো দলের খবর নেই। সরকার তার সিংহাসন আঁকড়ে আছে। অগ্নিদগ্ধ-পিষ্টে মানুষদের দায় কোনো দলই নেয় না। সরকার বলে, এ দায়ভার বিরোধী দলের। বিরোধী দল বলে, সরকারি দলের। মাঝে পড়ে জনগণ বাধ্য হচ্ছে সবকিছুর দায়ভার নিতে।
আমরা এই রাজনীতির তীব্র নিন্দা জানাই
দেশের গোলযোগপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থা প্রসঙ্গে ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের অনূদিত মন্তব্য প্রতিবেদন পড়ে শাহনেওয়াজ রহমানি লিখেছেন: আমরা এ রাজনীতির নিন্দা জানাই। তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও চরম বিরক্তি প্রকাশ করছি। আমরা রাজনীতির নামে সহিংসতা ও উন্মত্ততার অবসান চাই। এ অনৈতিক, কুরুচিপূর্ণ, নৃশংস, স্বার্থান্বেষী ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির প্রতি আমাদের ধৈর্য এখন শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। আমরা এর মূলনীতির প্রতি চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। এটা গণতন্ত্র হতে পারে না। সাইফুল আলম: শান্তি চাই, কিন্তু তার আগে মনে হয় একটা যুদ্ধে অংশ নিতে হতে পারে। এম এ হাসনাত: আমার ভাই তাঁর অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পিকেটারের ইটের আঘাতে তিনিই এখন হাসপাতালে। তাঁর সামান্য আয়ে সংসার চলে। এখন কী হবে পরিবারটির? মনে হচ্ছে দেশে চেঙ্গিস খান, হালাকু খানের সময় ফিরে এসেছে। খায়রুল ইসলাম: বলা উচিত, ‘খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার হাতে রক্ত লেগে আছে’, যদিও আমি তাতে একমত নই। লেখকের বর্ণনা হূদয়বিদারক। কিন্তু আমরাও লক্ষ্যহীন। সমস্যার মূলে আঘাত করতে না পারার ব্যর্থতাই নৈরাজ্যকে যৌক্তিক শক্তি জুগিয়েছে। আমরা কেউই রোগের কারণ ধরতে চাই না বা মরে যাওয়ার ভয়ে রোগ নিয়ে চিন্তা করতে চাই না। আসলে উপসর্গগুলো নিয়ে অযথাই অনেক কথা বলি। এম আলী: এ দেশে গণতন্ত্র নেই। পরিষ্কার বোঝা যায়, এটা দুই পরিবারের রাজতন্ত্র। নতুন চমক (তারেক ও জয়) আসছেন, তাই সামনের দিনে এটা স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রও হয়ে যেতে পারে। হয়তো ইংরেজ বা পাকিস্তান আমলের ঔপনিবেশিক শাসন এর চেয়ে ভালো ছিল।
শাহবাগে বাসে আগুন, সাংবাদিক-আইনজীবীসহ দগ্ধ ১৮
শাহবাগে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইমরান হোসেন লিখেছেন: এই রাজনীতিকদের দেখে শয়তানও মুচকি হাসবে। এরা ইবলিশের চেয়ে কম যায় না। মারুফ: সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার, আহত ১৭ জনের অনেকেই দু-এক দিন পর মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বেন। দোয়া করি, যেন এমনটা না হয়। দেশের নেতা-বুদ্ধিজীবীরা মন্তব্য লিখছেন, চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন, টক শোতে হম্বিতম্বি করছেন, বিবৃতি দিচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ জনগণের জন্য স্থায়ী কোনো সমাধানের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বলছেন না। সবাই জনগণকে ব্যবহার করছেন। বিপুল: আজ বাজারে দেখলাম, কয়েকজন আলাপ করছে—মানুষ মেরে খালেদা কি ক্ষমতায় যেতে পারবেন? একজন বললেন, ক্ষমতায় যদি যানও, খালেদা কি দেশের মানুষের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবেন? কেউ একজন বললেন, ওটা হলে দেশের অবস্থা আরও খারাপ হবে। আমারও এমনটা মনে হচ্ছে। রাসেল মাহমুদ: সরকার বিএনপির জনপ্রিয়তা কমানোর জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এসব নাশকতা চালাচ্ছে না তো? আজাদ মাতুব্বর: দেশের রাজনীতিবিদেরা মানুষকে কি মানুষ ভাবেন না? এটা কেমন রাজনীতি? সাধারণ মানুষকে এভাবে পুড়িয়ে মারার অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে? দেশের সামরিক বাহিনীর উচিত জনগণের জানমাল রক্ষা করা। তাহলে দেশের ও মানুষের কিছু উপকার হয়।

১৬ বছর পরও আশার বাণী!

পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পর ১৬টি বছর পেরিয়ে গেল। চুক্তির সময় যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, সে এখন কিশোর। সেদিনের শিশুটি আজ দ্ব্যর্থহীনভাবে সরকারের কাছে চুক্তি অবাস্তবায়নের জন্য জবাব চাইতেই পারে! চুক্তি স্বাক্ষরের ষোলো বছর পর গত ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আবার খাগড়াছড়ি সফরে গেলেন। ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন শান্তিবাহিনীর প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার কাছ থেকে অস্ত্র গ্রহণ করে পার্বত্যবাসীকে যে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন, সেই স্টেডিয়ামে ষোলো বছর পর আবারও আশার বাণী শুনিয়ে এলেন। ষোলোটি বছর ধরে পাহাড়ের মানুষ আশার কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চুক্তির ৭৭টি ধারার মধ্যে ৫৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে দাবি করে আরও বলেন, পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু পার্বত্যবাসীর মনে একটা প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে—গত ষোলোটি বছরে আসলে কার উন্নয়ন এবং কী উন্নয়ন হয়েছে? কেবল অবকাঠামো উন্নয়নকেই কি পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন বলা যাবে? তুলনামূলক বিচারে অবকাঠামোগত উন্নয়নও উল্লেখযোগ্য নয়। সরকারের ভাষায়, ১৯৯৭ সালে ‘ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি’ সম্পাদিত হয়েছে।
কিন্তু গত দেড় দশকে পাহাড়ের মানুষ কি ‘শান্তি’ নামক জিনিসটি স্বস্তি নিয়ে অনুভব করতে পেরেছে? বরং চুক্তির পর একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলায় পাহাড়ের মানুষ সর্বহারা ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলার এই মিছিলে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে এ বছরের ৩ আগস্ট খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা থানার তাইন্দংয়ের সহিংস হামলা। এ হামলায় তাইন্দংয়ের কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামের কমপক্ষে ৩৭টি বাড়ি সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং দুটি বৌদ্ধমন্দিরসহ শতাধিক বাড়িতে লুটপাট ও ভাঙচুর করা হয়। কিন্তু সরকার এ পর্যন্ত ঘরপোড়া এসব মানুষের পুনর্বাসনের জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছে, দেশবাসী কেউ জানে না। পাহাড়ের মূল সমস্যা যে ভূমিবিরোধকে কেন্দ্র করে, সেটি প্রধানমন্ত্রীর অজানা নয়। তাই তিনি সেদিন তাঁর ভাষণে ভূমিহীন পরিবারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসনের কথা বলেছেন। এর পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করে সুকৌশলে নিজের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করেছেন। আবার ক্ষমতায় গেলে চুক্তি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়ে পাহাড়ের মানুষকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন! কিন্তু পাহাড়ের মানুষ বারবার কি বেলতলায় যেতে চাইবে? গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে পাহাড়ের মানুষ আশ্বস্ত হয়েছিল, কিন্তু সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বর্তমান সরকারের আসল রূপ বেরিয়ে পড়ে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এ দেশের আদিবাসীরা হয়ে গেল ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও চুক্তির মূল বিষয়গুলো হস্তান্তর করা হয়নি, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনে সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পেলেও সংসদে উত্থাপন না করে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনকে হিমাগারে পাঠানো হয়েছে। এসব কথা পাহাড়ের মানুষের মনে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচন ঘনিয়ে এলে প্রতিটি দলের মধুর কথার ইশতেহারে সাধারণ মানুষ নমনীয় হয়ে ভোটের ফলাফলের নিয়ামক হন। কিন্তু বিগত পাঁচ বছরে পাহাড়ের মানুষের মনে জন্মানো ক্ষত সারাবেন কিসে? খাগড়াছড়িবাসী কি ২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির ঘরপোড়ার জ্বালা ভুলতে পেরেছে, নাকি সাজেকে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত বুদ্ধপুদি চাকমার সন্তানেরা তাদের মায়ের মরা মুখটি মন থেকে মুছে ফেলতে পেরেছে! ২০১১ সালের এপ্রিলে রামগড়-জালিয়াপাড়ার হামলায় আহত মিইপ্রুর রক্তাক্ত মুখখানি যে একবার দেখেছে, সে কি কখনো মিইপ্রুর বিস্ময় ও রক্তমাখা মুখটি কোনো দিন ভুলতে পারবে? নাকি সাম্প্রতিক কালে তাইন্দংয়ের ঘরপোড়া মানুষ তাদের ওপর বয়ে যাওয়া সহিংসতার কথা ভুলতে পারবে, যাদের ঘরে এখনো ধানের গোলার ধান ধুঁকে ধুঁকে জ্বলছে! গুজবকে পুঁজি করে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রাঙামাটি শহরে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। সেই তাণ্ডবে একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি পেশায় চিকিৎসক, যাঁর কাছে রোগী পাহাড়ি নাকি বাঙালি, তা কোনো দিনই বিবেচ্য ছিল না, বীভৎস হামলায় সেই চিকিৎসকের একটি চোখ প্রায়ই নষ্ট হতে বসেছে, সে কথা লোকে ভুলবে কীভাবে! নির্বাচনী হাওয়া কি এসব ক্ষতের ওপর মলমের প্রলেপ ছোঁয়াতে পারবে? চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি ফিরে এসেছে— সরকারের এ দাবির অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ মেলে যখন দেখা যায় চুক্তি মোতাবেক মৌলিক কতগুলো বিষয় যেমন: ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ (স্থানীয়), পর্যটন—এসব বিভাগ সরকার এখনো জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করেনি। চুক্তি অবাস্তবায়নের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের বীজ ঢুকে পড়া। চুক্তিকে ঘিরে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখা দিলেও চুক্তি বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা ও পরিণতিতে তাদের মধ্যে ক্রমে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নিচ্ছে। তা কারও জন্যই মঙ্গলময় নয়।
ইলিরা দেওয়ান: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, হিল উইমেন্স ফেডারেশন

ব্যবসায় কারচুপি তদন্ত করা হবে : মাদুরো

সন্দেহজনক সম্ভাব্য মূল্যকারচুপি নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদন্তপর্ব শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী এই অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। খবর রয়টার্সের। শনিবার থেকে অভিযানটি শুরু হবে বলে শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে জানিয়েছেন মাদুরো।
তিনি বলেন, ‘আমরা মস্কারা করছি না, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অধিকার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’ এ সময় তিনি জানান, চলতি মাসে ১ হাজার ৭০৫টি ব্যবসা ক্ষেত্রে চালানো তদন্তে প্রায় ৯৯ শতাংশের মধ্যেই মূল্যে অনিয়ম ধরা পড়েছে। ভেনিজুয়েলার প্রয়াত সমাজতন্ত্রী নেতা হুগো শ্যাভেজের উত্তরসূরি মাদুরো দাম কমানোর লক্ষ্যে চলতি মাসে দেশটি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছেন। ‘পুঁজিবাদী চক্রগুলো’ ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে জোরপূর্বক সরাতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বিরোধীরা মাদুরোর এই উদ্যোগকে আসছে নির্বাচনে জেতার জন্য ‘সস্তা ও সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা ও ভেনিজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা ঢাকার অজুহাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। চলতি এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অর্থনৈতিক সমস্যা,
চলতি বার্ষিক ৫৪ শতাংশ হারের মূল্যস্ফীতি ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের অপ্রতুলতা মাদুরোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। মাদুরো আরও বলেন, ‘প্রতিদিন তদন্ত চলবে, এতে আমাদের গুপ্ত পুঁজিবাদের হদিস পাওয়া যাবে।’ দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো উৎপাদন খরচের ওপর এক হাজার শতাংশ দাম ধরে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করছে। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পণ্যের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি হারে বৈদেশিক মুদ্রা না পাওয়া যাওয়ায় বিদেশে থেকে পণ্য আমদানিও করতে পারছেন না আমদানিকারকরা।

সিরিয়া যুদ্ধের বলি শিশুরা!

সংকটে বিপর্যস্ত সিরিয়ায় শিশুর হাতে বই-খাতা নেই। ওরা যুদ্ধে নেই, পেটের যুদ্ধে শামিল শিশুরা ধুঁকছে। কি দোষ ওদের! কাজের ভারে কেন তারা ন্যুব্জ, চেহারায় কেন বলিরেখা স্পষ্ট? সিরিয়া সংকট সংঘাতে রূপ নেয়ার পর থেকেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে শুরু করে লাখো সিরীয়। কিন্তু এসব দেশে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী শিশু দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের সংস্থানে কেন তারা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে? যুদ্ধের বলি কেন শিশুরা?
জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করে দিয়ে বলছে, সিরিয়ার চলমান যুদ্ধে একটি প্রজন্মের শিশুরা মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়ে বেড়ে উঠছে। সিরিয়ায় যুদ্ধের মুখে আশপাশের দেশগুলোতে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থী শিশুরা শোষণ এবং অশিক্ষার ঝুঁকির মুখে দিন কাটাচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। লেবানন এবং জর্ডানে আশ্রয় নেয়া ৩ লাখ শিশুই অশিক্ষায় বেড়ে ওঠার ঝুঁকিতে আছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। পরিবারের চাহিদা মেটাতে অনেক শিশুকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। এই শ্রম থেকে বাদ যাচ্ছে না ৭ বছর বয়সী শিশুরাও। জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২২ লাখ সিরীয় শরণার্থীর অর্ধেকেরও বেশি শিশু। তাদের অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও মারাÍক বিপদের মুখে আছে। সিরিয়ায় যুদ্ধের কারণে অনেক শিশুই হয়ে গেছে অভিভাবকহীন।