Showing posts with label তথ্য অধিকার আইন. Show all posts
Showing posts with label তথ্য অধিকার আইন. Show all posts

Sunday, October 10, 2010

তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবেন by মশিউল আলম

২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে দেশের নাগরিক-সমাজের হতাশার কথা জানা গেল। অনেকগুলো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতা ও বিশিষ্ট নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত তথ্য অধিকার ফোরাম নামের একটি যৌথ মঞ্চ সেদিন ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন করেছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের মার্চ মাসে তথ্য অধিকার আইন নামের যে আইন পাস করেছে, সেটির বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে তাঁরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে দ্রুততম সময়ে তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা আরও দাবি করেছেন, তথ্য কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক, তা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হোক। এ ছাড়া জনস্বার্থে সম্পাদিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হোক এবং সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
৩ অক্টোবর আগারগাঁও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভবনে বাংলাদেশ তথ্য কমিশনের কার্যালয়ে প্রধান তথ্য কমিশনার এম জমির জানালেন, কমিশন গত মার্চ মাসে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেটি সংসদকে দেওয়া হয়েছে; সংসদ সদস্যরা তথ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই প্রতিবেদনে ২০০৯ সালের জুলাইতে তথ্য কমিশন গঠন থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ মাস কমিশন কী কী কাজ করেছে তার বিবরণ রয়েছে। কমিশনের প্রধান কাজের মধ্যে ছিল জেলায় জেলায় গিয়ে আইনটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে সভা-বৈঠক করা। কিন্তু আইন অনুযায়ী কাজটি তথ্য কমিশনের প্রধান দায়িত্ব নয়। প্রধান কাজ হলো, নাগরিকরা তথ্য চেয়ে না পেলে তার প্রতিকার করা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তথ্য কমিশনে কোনো নাগরিক গিয়ে বলেননি যে তিনি তথ্য চেয়ে পাননি, তাই কমিশনের কাছে আরজি নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি বললেই চলে।
আইনটি বাস্তবায়নের জন্য একদম প্রথমেই যে কাজ করা প্রয়োজন তা হলো, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থ ব্যয় করে বা বিদেশি সাহায্য পায়, তথ্য অধিকার আইনে যাদের ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেসব কর্তৃপক্ষের প্রত্যেক ইউনিটে একজন করে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা। এই কর্মকর্তা নিয়োগ না করা পর্যন্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করারই কোনো সুযোগ সৃষ্টি হয় না। অর্থাৎ আইনের প্রয়োগ শুরুই করা যায় না। তাই তথ্য অধিকার আইনে স্পষ্ট ভাষায় সময় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে সব ইউনিটে একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতা নিয়োগ করতে হবে। ৬০ দিন অর্থাৎ তিন মাসের মধ্যেই যে কাজটি সম্পন্ন করার নির্দেশনা খোদ আইনেই দেওয়া আছে, সেটি সম্পন্ন হয়নি ১৪ মাসেও।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মোট কতজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে সে হিসাব কারও কাছে নেই। তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিমের অনুমান, এ সংখ্যা হবে প্রায় ছয় লাখ। অবশ্য অনেকের ধারণা, এত বেশি নয়। তবে যা-ই হোক না কেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এই সংখ্যা দুই লাখের বেশি হতে পারে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার। তথ্য কমিশন বলছে, প্রতিদিনই নিয়োগ চলছে, নতুন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম তাঁদের কাছে প্রতিদিনই আসছে। এগুলো হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে। বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগে বড়ই অনীহা লক্ষ করছে তথ্য কমিশন। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, যেসব এনজিও এতকাল তথ্য অধিকার আইন পাসের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তাদের মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগে গড়িমসি প্রবল। প্রধান তথ্য কমিশনার এম জমির জানালেন, ২০০৯ সালের জুলাই থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে মাত্র ১০টি এনজিও তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিল। তারপর কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার কড়া ভাষায় তাগাদা দেওয়ার পর আরও কিছু এনজিও কাজটি করেছে, কিন্তু এখনো সে সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়। অনেক বড় বড়, খ্যাতিমান এনজিও তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেনি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন প্রধান তথ্য কমিশনার।
যতক্ষণ পর্যন্ত তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ হতে পারছে না। এভাবে আইনের একটি নির্দেশনা দীর্ঘ সময় ধরে লঙ্ঘিত হচ্ছে। সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত বা অধীনস্থ অধিদপ্তর, পরিদপ্তর বা দপ্তরের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা কার্যালয় ও উপজেলা কার্যালয়কে একজন করে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। কাজটি কোথাও আগে হচ্ছে, কোথাও পরে হচ্ছে, কেন সব ইউনিটে একই সঙ্গে হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিন মাসের মধ্যে যে কাজ শেষ করার কথা, ১৪ মাসে সম্পন্ন হয়েছে তার অতি সামান্য অংশ—এটি একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।
প্রধান তথ্য কমিশনার এই ক্ষেত্রে কতকগুলো বাস্তবিক সমস্যা লক্ষ করেছেন। যেমন, একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি ইতিমধ্যে কোনো না কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন, তাঁর ওপর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে যখন তথ্য প্রদানের দায়িত্ব আরোপ করা হবে তখন তিনি কেন তা গ্রহণে উৎসাহ বোধ করবেন? এটি প্রধান তথ্য কমিশনের জিজ্ঞাসা। কারণ এই দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো কর্মকর্তাকে বাড়তি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে না। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর তথ্য কমিশনকে জানাতে হবে, তিনি তথ্য প্রদানসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেটি ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই খরচ তাঁকে সরকার দেবে না। এটি একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, একটি অফিসের সব বিষয়ে তথ্য জনগণকে জানানোর দায়িত্ব পালন করা এক বিরাট দায়িত্ব। আইন অনুযায়ী কোনো নাগরিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে কোনো তথ্য চেয়ে আবেদন করলে আবেদনপত্র গ্রহণের দিন থেকে পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যে সেই তথ্য তাঁকে সরবরাহ করতে হবে। তথ্যটি কোথায় আছে, কীভাবে আছে তা যেমন একটি সমস্যা, তেমনই নিয়মিত অন্যান্য স্থায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনকারীকে তথ্য দিতে না পারেন, যদি অসুস্থ হন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে অন্যভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাঁর তথ্য প্রদানের দায়িত্ব পালন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে সম্ভব? প্রধান তথ্য কমিশনার বললেন, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা উচিত: দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কিছু আর্থিক প্রণোদনা, নিদেনপক্ষে মোবাইল ফোনের খরচ দেওয়া হলে তাঁরা উৎসাহিত বোধ করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, প্রত্যেকটি ইউনিটে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একজন করে বিকল্প কর্মকর্তা থাকা উচিত, যাতে একজনের অনুপস্থিতি বা অসুস্থতার সময় বিকল্প কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
জনসাধারণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে বাস্তবিক ক্ষেত্রে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন তিনি হচ্ছেন তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। একজন নাগরিক তথ্য চাইতে সর্বপ্রথমে হাজির হবেন তাঁরই দুয়ারে। তিনি তথ্যপ্রার্থী নাগরিকের প্রতিপক্ষ নন, বরং সহযোগী। এই সহযোগিতার দ্বারা তিনি জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। প্রার্থিত তথ্য যেন তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্যপ্রার্থী নাগরিকের হাতে তুলে দিতে পারেন, তার সব ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে অনেক কাজ বাকি রয়েছে। বস্তুত সে লক্ষ্যে কোনো কাজই এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি। তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সার্বিক সামর্থ্য বাড়াতে হবে; হাতের কাছেই যেন সব তথ্য সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিত থাকে, যেন নাগরিকেরা চাওয়ামাত্র তিনি তা সরবরাহ করতে পারেন, যেন তাঁকে অপারগতা প্রকাশ করতে না হয় এবং সে জন্য তথ্য কমিশনের সামনে আসামির মতো হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে না হয়, সে রকম একটি সমৃদ্ধ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ সামনে রয়েছে। এই কাজটি বিরাট। তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সরকারের (তথ্য কমিশনের নয়)। এর একদম প্রাথমিক প্রস্তুতির ধাপটি হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা। যত দ্রুত সম্ভব দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের কাজটি শেষ করা প্রয়োজন। কারণ এরপর তাঁদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজগুলো করতে হবে দ্রুতগতিতে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

Monday, March 29, 2010

নবীন আমলাদের দৃষ্টিভঙ্গি by প্রণব সাহা |

সরকারি যেকোনো তথ্য জনগণের জানার অধিকার আছে—এই বিবৃতি সম্পর্কে আপনার অবস্থান কী? এটা জানতে চাওয়া হয়েছিল সরকারের প্রশাসনে যোগ দেওয়া নবীন কর্মকর্তাদের কাছে। বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন। এটি একটি আশার ব্যাপার এ জন্য যে, দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা তৈরি করার মূল কেন্দ্র বিপিএটিসি তথ্য অধিকার আইনটি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া বিপিএটিসি তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে প্রশাসনে সদ্য যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিপিএটিসিতে চার মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তথ্য অধিকার আইনসম্পর্কিত প্রশিক্ষণকে। তিন দিনের একটি কোর্স মডিউল তৈরির লক্ষ্যে আয়োজিত কর্মশালায় যোগ দিয়ে জানা গেল জনগণের জানার অধিকার সম্পর্কে প্রশাসনে সদ্য যোগদানকারীদের অভিমত।
তথ্য কমিশন গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় প্রধান তথ্য কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক। সেদিক থেকে বিপিএটিসির এই উদ্যোগ একটা আশাব্যঞ্জক ঘটনা। তথ্য অধিকার আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য বিপিএটিসি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা গেল, তথ্য অধিকার আইন নিয়ে বিপিএটিসির পক্ষ থেকে একটি ছোট আকারের জরিপও করা হয়েছে। ওই জরিপের ফলাফলেই তথ্য অধিকার আইন নিয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের সুপারিশ এসেছে। পাওয়া গেছে সরকারি কর্মকর্তাদের অভিমত। এমন মতামতও এসেছে যে, এই আইন শুধু সাংবাদিকদের জন্য উপকারী হবে। আর সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। জরিপের তথ্য উপস্থাপনকারী কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জানালেন, তথ্য অধিকার আইন বিষয়ে যে প্রশাসনের নবীন কর্মকর্তারা খুব বেশি জানেন না, তা পরিষ্কার। ‘ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে কর্মকর্তারা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন’— এমন মন্তব্য এমডিএসের। তবে খুবই উৎসাহজনক তথ্যও পাওয়া গেল তাঁর কাছ থেকে। যেমন সেবাদানকারী হিসেবে তথ্য অধিকার আইনের উপযোগিতাকে নিজের জন্য ভীতিকর বলে উল্লেখ করলেও একই কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে একজন সেবা গ্রহণকারীর জন্য এই আইনের উপযোগিতা অনেক বেশি। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন দ্বিমুখী অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়ে তথ্য অধিকার আইনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরির জন্যই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা এ কথাও জানিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক আমলের পুরোনো আইন ছাড়াও ‘তথ্য গোপনের সংস্কৃতিও’ আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। এ ছাড়া তথ্য সংরক্ষণ ও সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলেও তথ্য অধিকারের সুফল পাওয়া যাবে না বলেও তাঁরা সঠিকভাবে মত দিয়েছেন বলেই মনে হয়েছে।
তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ যেমন ভালো, তেমনি এখনো এই আইনের আওতায় বিধিমালা তৈরির কাজ শেষ করতে না পারাটাও হতাশাজনক। আরও হতাশার বিষয় হচ্ছে, তথ্য কমিশনের প্রধানের পদটি শূন্য থাকার তথ্য। সাবেক সচিব আজিজুর রহমানকে নিয়োগ করা হয়েছিল প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে। দপ্তর গুছিয়ে ওঠার আগেই তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে বয়সের কারণে। তথ্য কমিশন আইনের ১৫(২) ধারায় স্পষ্ট করেই বলা আছে, ‘৬৭ বৎসর অপেক্ষা অধিক বয়স্ক কোনো ব্যক্তি প্রধান তথ্য কমিশনার বা তথ্য কমিশনার পদে নিয়োগ লাভের বা অধিষ্ঠিত থাকিবার যোগ্য হইবেন না।’ স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কেন আজিজুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়ার আগে দেখা হলো না যে কবে তাঁর বয়স ৬৭ হবে। যখন আজিজুর রহমানের নামটি আলোচিত হচ্ছিল বাছাই কমিটিতে, তখন বয়সের বিষয়টি বাছাই কমিটির নজরে আনা হয়নি কেন?
প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সভাপতিত্বে বাছাই কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে তথ্য কমিশনের তিনটি পদের বিপরীতে ছয়টি নাম পাঠাবে, আইনে এমন বিধান আছে। এই বাছাই কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের দুজন সাংসদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সম্পাদকের যোগ্যতাসম্পন্ন একজন সদস্য থাকেন। আমাদের প্রত্যাশা, পরবর্তী প্রধান তথ্য কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য নাম পাঠানোর সময় বয়সসীমাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে, যাতে করে তথ্য কমিশনের পথ চলার শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটিকে অভিভাবকত্বহীনতায় ভুগতে না হয়।
এখন পর্যন্ত তথ্য কমিশনের পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগ হয়নি। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের জনবলকাঠামো নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করতে চাই না। তখন এ নিয়ে এত প্রতিবেদন লিখতে হয়েছে যে এক সময় বিরক্তি প্রকাশ করতেন আমাদের সংবাদ ব্যবস্থাপকেরা। তথ্য কমিশনের বিধিমালা প্রণয়নের বিষয়টিও ঘুরপাক খাচ্ছে আমলাতন্ত্রের ঘূর্ণিপাকে। তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে প্রশাসনে যোগ দেওয়া নতুন আমলাদের মনোভাব লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি। শত বছরের পুরোনো আমলাতন্ত্র ‘লালফিতার’ রং বদলে ‘ধূসর’ করেছে। কিন্তু এখনো তথ্য গোপন করার মানসিকতা ধূসর হয়নি।
গত ১১ জানুয়ারি থেকে প্রধান তথ্য কমিশনারের পদটি শূন্য আছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাছাই কমিটির একটি বৈঠক হয়েছে, তাই খুব দ্রুতই আমরা প্রধান তথ্য কমিশনার পদে নতুন মুখ চাই। তথ্য কমিশনের বিধিমালা ও জনবলকাঠামো দ্রুত অনুমোদন এবং কার্যকর হওয়া জরুরি। বিধিমালার একটি প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর তাতে ত্রুটি ধরা পড়ায় তা কমিশনে ফেরত পাঠানো হয়। কমিশন বিধিমালা সংশোধন করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনে আট হাজার বর্গফুটের যে দপ্তর ভাড়া নেওয়া হয় তথ্য কমিশনের জন্য, সেই দপ্তরে এখন বসেন দুজন কমিশনার ছাড়া শুধু সচিব, একজন পরিচালক ও কয়েকজন কর্মচারী। কমিশনের জনবলকাঠামো সংস্থাপন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তথ্য কমিশনের জনবলকাঠামো সচিব কমিটিতে অনুমোদিত হতে হবে। এ ক্ষেত্রেও সরকারি প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের ইতিবাচক মনোভাব দরকার।
তথ্য কমিশন আইনের বিষয়টি লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা। দেশের আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্যোগী নাগরিকসমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন মনযোগী হতে হবে আইনটিকে সুষুম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রয়োগ করার কাজে সাহায্য করার জন্য।
প্রণব সাহা: এডিটর, এটিএন নিউজ লিমিটেড।
pranab67@hotmail.com

Monday, December 28, 2009

তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব রয়েছে -বিশেষ সাক্ষাত্কার by এম আজিজুর রহমান

প্রধান তথ্য কমিশনার এম আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৪৩ সালে ফরিদপুরের মাদারীপুরে। ১৯৬১ সালে তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনি তত্কালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যের কুইন ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার থেকে জনপ্রশাসন ও পল্লি উন্নয়ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০১ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অবসর নেন। তিনি এ বছরের এপ্রিল মাসে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ পাস এবং তারপর তিন সদস্যবিশিষ্ট তথ্য কমিশন গঠিত হলে প্রথম প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন জুলাই মাসে। আজিজুর রহমান আজিজ নামে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও নাটক লেখেন তিনি।
সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মশিউল আলম

প্রথম আলোতথ্য অধিকার আইন পাস হয়েছে, তথ্য কমিশন গঠিত হয়েছে, আপনারা তিনজন কমিশনার নিয়মিত অফিস করছেন। কিন্তু নাগরিকেরা এই আইন কতটা ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে তেমন কোনো সাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে না। আপনারা কী লক্ষ করছেন?
এম আজিজুর রহমান  আমরা এ লক্ষ্যেই আসলে কাজ করছি। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে যেসব প্রারম্ভিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়, সেগুলো আমরা প্রথম গুছিয়ে নিচ্ছি।
প্রথম আলোযেমন?
এম আজিজুর রহমান  যেমন, এখন আমরা একটি অস্থায়ী অফিসে কাজ করছি। এ অফিসের পরিসর খুবই সামান্য। এই স্বল্প পরিসর অফিসে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে ততোধিক স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে। অবশ্য ইতিমধ্যে আমরা আরও একটি বৃহত্ পরিসরে অফিস স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছি। সুখের কথা, এ মাসের মধ্যেই আমরা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তৃতীয় তলায় আট হাজার বর্গফুটের একটি স্থানে এ অফিস স্থানান্তর করতে সক্ষম হব। পাশাপাশি আমরা সরকারের কাছে তথ্য কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে এক বিঘা জায়গার জন্য আবেদন করেছি। সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি সমপরিমাণ প্লট বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছে এবং সে লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে।
প্রথম আলোতথ্য কমিশনের সাংগঠনিক কাঠামোর কী অবস্থা?
এম আজিজুর রহমান  তথ্য কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই সাংগঠনিক কাঠামো কী হবে, এর কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায়, আইনে বা অন্য কোথাও এর উল্লেখ নেই বিধায় আমরা নিজেরাই একটি সাংগঠনিক কাঠামো ও লজিস্টিকসের প্রয়োজনীয় খসড়া তৈরি করেছি। সরকার তা অনুমোদন করেছে। তবে এর জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় রেখে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে; বিশেষ করে, তাদের বসার জায়গার অভাব রয়েছে বলে এখনই জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে না। নতুন কার্যালয়ে যাওয়ার পর জনবল নিয়োগ করা হবে। ইতিমধ্যে সরকার তথ্য কমিশনের চাহিদা মোতাবেক একজন সচিব, একজন উপসচিব, একজন উপপরিচালক, একজন সহকারী অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং একজন অফিস সুপার কমিশনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এর বাইরে প্রধান তথ্য কমিশনারের প্রাধিকারবলে প্রাপ্ত জনবল কমিশনের কাজ করে যাচ্ছে।
প্রথম আলো এ মুহূর্তে তথ্য কমিশনের মোট জনবল কত?
এম আজিজুর রহমান  ৭৭ জন।
প্রথম আলোকমিশনের মূল কাজ শুরু করতে তো একটি বিধিমালা প্রয়োজন। কিছুদিন আগে আপনার কাছেই জেনেছিলাম, বিধিমালা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন কী অবস্থা?
এম আজিজুর রহমান  বিধিমালা অনুমোদিত হয়ে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি এখনো প্রচার করা হয়নি।
প্রথম আলোপ্রবিধান তৈরি করা হয়েছে?
এম আজিজুর রহমান  প্রবিধানমালার চূড়ান্ত খসড়া আজই মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
প্রথম আলোসরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরসহ সব পর্যায়ের সব কর্তৃপক্ষের তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করার কথা, যাঁদের কাছে নাগরিকেরা তথ্য চেয়ে আবেদন করবে। তথ্য কর্মকর্তা বা তথ্য দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হলো?
এম আজিজুর রহমান  কৃষি ও তথ্য মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চসংখ্যক তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে এবং কমিশনকে জানিয়েছে। অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ এখনো শেষ হয়নি।
প্রথম আলোমানুষ তথ্য চেয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করছে কি না?
এম আজিজুর রহমান  এই পাঁচ মাসে আমাদের কাছে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি আবেদন এসেছে।
প্রথম আলোআপনাদের কাছে? তথ্য চেয়ে আবেদন করেছে তথ্য কমিশনের কাছে?
এম আজিজুর রহমান  হ্যাঁ। যেসব আবেদন করার কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তাদের কাছে, কিন্তু কয়েক ব্যক্তি সেগুলো করেছেন আমাদের কাছে।
প্রথম আলোতার মানে, তাঁরা জানেন না তথ্য কমিশনের কাজ কী?
এম আজিজুর রহমান  এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে, তথ্য কমিশনের কাজ যে তথ্য দেওয়া নয়, এ বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে সম্যক ধারণার অভাব আছে। এই অভাব দূর করতেই কমিশন ১৪টি জেলা ও উপজেলায় গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে বসে জন-অবহিতকরণ সভার আয়োজন করেছে। সেসব সভায় তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ ব্যাখ্যা, জনগণের কী করণীয়, কর্মকর্তাদের কী করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যান্য জেলা-উপজেলায়ও এ ধরনের জন-অবহিতকরণ সভার আয়োজন করা হচ্ছে। এটি তথ্য কমিশন কর্মসূচির একটি চলমান প্রক্রিয়া।
প্রথম আলোকমিশনের কি আর্থিক কোনো অসুবিধা আছে?
এম আজিজুর রহমান  না। প্রথম দুই মাসে যদিও কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না, কিন্তু এর পর থেকেই কমিশন যখন যে পরিমাণ অর্থ চেয়েছে, থোক বরাদ্দ হিসেবে তা পেয়েছে।
প্রথম আলোএ পর্যন্ত আপনারা কত টাকা পেয়েছেন?
এম আজিজুর রহমান  চলতি অর্থবছরের জন্য ১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে, এ পর্যন্ত পাঁচ কোটি পেয়েছি, বাকিটাও সঠিক সময়ে পেয়ে যাব।
প্রথম আলোকী কাজে অর্থ ব্যয় হচ্ছে মূলত?
এম আজিজুর রহমান  কমিশনের ৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, যানবাহন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ক্রয়...।
প্রথম আলোজন-অবহিতকরণের কাজটি তথ্য কমিশনের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আর কার কী করার আছে বলে আপনি মনে করেন?
এম আজিজুর রহমান  এটা প্রথমত সরকার করবে। সরকার সে কাজটি শুরু করে দিয়েছে। তথ্য কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই তথ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেছে এবং জন-অবহিতকরণের কাজটিও তারা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের অবহিত করছে, যাঁরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এই আইন সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে পারেন। এমনকি তথ্য কমিশনের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে অনুরোধ করা হয়েছে, স্কুল-কলেজে শিক্ষকেরা ক্লাস শুরুর আগে যেন শিক্ষার্থীদের সামনে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে বক্তব্য দেন। ভবিষ্যতে তথ্য অধিকার আইনকে সমাজবিজ্ঞানের একটি অংশের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, আমরা সে বিষয়েও বিবেচনা করতে বলেছি।
প্রথম আলোতথ্য অধিকার আইনের একটি ধারায় লেখা আছে, কর্তৃপক্ষগুলো নিজ উদ্যোগেও তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নেবে। আপনারা কি জানেন, কর্তৃপক্ষগুলো সেটা করছে কি না?
এম আজিজুর রহমান  হ্যাঁ, অনেক জায়গায় এটা শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সার্বক্ষণিক তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাঁরা অন্যান্য অফিসের সঙ্গেও কম্পিউটারের মাধ্যমে সংযুক্ত। তাঁরা সিটিজেনস চার্টার সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করছেন। পুলিশ সুপারের অফিসগুলোয়ও আমরা তথ্যকেন্দ্র খুলতে বলেছি।
প্রথম আলোভূমি অফিস, আদালত, দুদক—এসব সংস্থা থেকে তথ্য পাওয়ার বিষয়গুলো কি আগের চেয়ে সহজ হয়েছে?
এম আজিজুর রহমান  জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যে তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে, তা ভূমি অফিসসহ জেলার সব সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। একই জায়গা থেকে সব দপ্তরের তথ্য পাওয়া সম্ভব। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ওয়েবসাইট আছে, ওয়েবসাইটেও অনেক তথ্য পাওয়া যায়। আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সব মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে বলেছি, তারা যেন শিগগিরই নিজ নিজ তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে। এ বিষয়ে আমরা তাগিদ দিয়ে চলেছি। সেই সঙ্গে আমরা বলেছি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হবে তাঁদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য সম্পর্কে আমাদের অবহিত করার জন্য। অনেকগুলো পেয়েছি, দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এখনো পাইনি।
প্রথম আলো দুদককে কি আপনারা নিজ উদ্যোগে তথ্য প্রকাশের জন্য বলেছেন?
এম আজিজুর রহমান  আমরা তো দুদককে বলব না, আমরা বলব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে। আমরা সরকারি কর্মকমিশনকে বলব না, বলব সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে। একইভাবে আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলব না, বলব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে। অর্থাত্ স্বাধীন কমিশনগুলো সরকারের যে যে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বলব।
প্রথম আলোকোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি?
এম আজিজুর রহমান  আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে নবীনগর থেকে এক ব্যক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব দপ্তর-অধিদপ্তরের কে কবে, কখন সিলেকশন গ্রেড পেয়েছেন, পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে পারসোনাল অফিসার হয়েছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তা জানতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই আবেদনপত্রে প্রেরকের নাম-ঠিকানা নেই।
প্রথম আলোভারতে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সে আইন ব্যবহারে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। সে দেশের তথ্য কমিশনে আপিল আবেদনের পাহাড় জমে উঠেছিল তিন মাসের মধ্যে। ভারতীয় প্রধান তথ্য কমিশনার ওজাহাত হাবিবুল্লাহ দায়িত্ব নেওয়ার মাস ছয়েক পর ঢাকা সফরে এলে তাঁর কাছে জানতে পেরেছিলাম, তথ্য কমিশন হাজার হাজার আপিলের শুনানি করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। আপনাদের কাছে আপিল আসা পরের কথা, লোকজন তথ্য চেয়ে আবেদন করছে, এমন খবরও তো পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
এম আজিজুর রহমান  ভারতে তথ্য অধিকার আইনের দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। বর্তমান তথ্য অধিকার আইনের আগে তারা একটি আইন করেছিল ফ্রিড অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট নামে। আইনটিতে অনেক ঘাটতি থাকায় তা বাতিল করে নতুনভাবে তথ্য অধিকার আইন নামে একটি আইনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এ নিয়ে ভারতজুড়েই বেশ একটা আলোড়ন চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এভাবে এ বিষয়ে জনগণের মধ্যে তথ্য অধিকারের বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ভারতে তথ্য অধিকার আইনের দাবিটা প্রথমে উঠে আসে একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে। আমাদের দেশে সে রকম ঘটেনি। এ দেশে তথ্য অধিকারের বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল মূলত রাজধানীর মধ্যেই। আর এটা নিয়ে বলেছেন প্রধানত শিক্ষিত শহুরে নাগরিক সমাজ: সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মীরা। সে কারণেই তথ্য অধিকার আইন বা সামগ্রিকভাবে তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সম্যক ধারণার অভাব রয়েছে। আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে এ অভাব দূর করার লক্ষ্যে। জনগণ যখন জানতে পারবে, ক্ষমতায়িত হওয়ার কী অপূর্ব এক আইনি হাতিয়ার তারা পেয়েছে, তখন তারা অবশ্যই আর বসে থাকবে না। তথ্য অধিকার আইনের ব্যাপক ব্যবহার তখন অবশ্যই শুরু হবে।
প্রথম আলোআমরা শেষ করছি। কোনো প্রসঙ্গ বাকি থেকে গেল কি?
এম আজিজুর রহমান  এটুকু যোগ করতে চাই যে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই তথ্যমন্ত্রী ও তথ্যসচিব যেভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, আমাদের সহযোগিতা দিচ্ছেন, তাতে কমিশন বিশ্বাস করে যে ঈপ্সিত সময়ের আগেই কমিশনের কর্মতত্পরতা দেশব্যাপী পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এ ছাড়া কমিশন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কালে তথ্য কমিশনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার যে অভিপ্রায় তাঁরা উভয়ে ব্যক্ত করেছেন, তাতে কমিশন আশান্বিত যে দেশ থেকে দুর্নীতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে, রাষ্ট্র ও সরকারের সব কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য আইন অনুযায়ী তথ্য কমিশন পরিচালিত হতে সক্ষম হবে। ফলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, সাধারণ নাগরিকদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুসংহত হবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
এম আজিজুর রহমান  আপনাকেও ধন্যবাদ। আবার আসবেন। তথ্য কমিশনের দরজা সবার জন্য সব সময় খোলা।

Tuesday, September 29, 2009

তথ্য অধিকার-চাই তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন by ইফতেখারুজ্জামান

২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস। তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে ২০০২ সালের এই দিনে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের তথ্য আন্দোলনকর্মীরা একটি কর্মশালায় মিলিত হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন থেকে প্রতিবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি উদ্যাপন করে আসছে। টিআইবিসহ বিভিন্ন সংগঠন ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশে দিবসটি পালন করে আসছে। এ দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার চাহিদা জোরদার করা, এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা, গোপনীয়তার সংস্কৃতি পরিহার এবং দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সরকার ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।
তথ্য অধিকার আইন
বাংলাদেশে ২০০৯ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এমন কয়েকটি আইন ও বিধানের প্রাধান্য ছিল, যেগুলো অবাধ তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টিকারী। যেমন—দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন ১৯২৩, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২, ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৯৬০, কার্যপ্রণাল বিধি ১৯৯৬, সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি ১৯৭৯ প্রভৃতি। এ আইনগুলোর কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য গোপন করার বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। একটি কার্যকর তথ্য অধিকার আইন ছাড়া এতগুলো আইনি বাধা পেরিয়ে এসব তথ্য জনগণের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না।
পৃথিবীর প্রায় ৭৫টি দেশে বর্তমানে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালে প্রেস কমিশন তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের ব্যাপারে আইন কমিশনের মাধ্যমে সুপারিশ জানায়। বাংলাদেশ আইন কমিশন ২০০২ সালে এ বিষয়ে একটি খসড়া কার্যপত্র প্রস্তাব করে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি কয়েক বছর থেমে থাকে। ২০০৮ সালে সরকার তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ জারি করে। চলতি বছরের ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে তথ্য অধিকার আইন পাস হয়। আইন অনুযায়ী ইতিমধ্যে সরকার তথ্য অধিকার কমিশন গঠন করেছে।

আইন বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জগুলো
তথ্য অধিকার আইন গৃহীত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে কোনো আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তথ্যের অবাধ আদান-প্রদানের মানসিকতা গড়ে তোলা। এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সরকারের উচ্চপর্যায়সহ সব পক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা আরো গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগে অগ্রসর হতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমসহ সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কৌশল প্রণীত হতে পারে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
তথ্য কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর স্বাধীনতা, সক্রিয়তা ও কার্যকারিতার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে। কমিশনারদের সক্রিয়তা, দক্ষতা, বিশ্বস্ততা ও যথাযথ নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। কমিশনের পর্যাপ্ত জনবল, অর্থসম্পদ ও কারিগরি সক্ষমতা থাকা জরুরি।
তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও সমর্থন এবং পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট ধারণা লাভ ছাড়া এ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজন।
গোপনীয়তার সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। বর্তমানে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে যে অনীহা রয়েছে, তা অতিক্রম করা সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। বিশেষ করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
তথ্যপ্রাপ্তি, ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অনুরোধ করা কোনো তথ্য যথাসময়ে খুঁজে পাওয়া না গেলে সময়মতো আবেদনের উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অদক্ষভাবে তথ্য সংরক্ষণের কারণে যদি অনুসন্ধান করা তথ্যগুলো পরীক্ষা করা বা অনুলিপি তৈরি করার উপযোগী না থাকে, তবে তা এ আইনকে উপেক্ষিত করে তুলবে। সে জন্য তথ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি। তথ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সরকারি অফিসগুলোকে আধুনিকায়ন করাও জরুরি, যাতে জনগণ প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পেতে পারে।
বর্তমানে যেসব আইন ও বিধি অবাধ তথ্যপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী, সেগুলো বাতিল, পরিবর্তন কিংবা সংশোধন করতে হবে। তা না হলে জনগণের তথ্য জানার অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হবে না।
নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচার সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। তাই তথ্য প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বাধা-বিপত্তি থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে গণমাধ্যমের কর্মীরা যাতে নির্ভয়ে এবং নির্বিঘ্নে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এ ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি করা একান্ত জরুরি।
তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। তথ্য অধিকারের বিষয়টি সম্পর্কে যখনই জনগণ সচেতন হবে, তখনই তারা এর সুবিধাদি ভোগ করতে পারবে।

পথটা সহজ নয়, চাই সবার সদিচ্ছা
তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে বাধা আসাটাও অসম্ভব কিছু নয়। অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণে যখন সরকারি কর্মকর্তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস পাবে, তখন তাঁরা এ ক্ষেত্রে বাধার কারণ হতে পারেন। একই কারণে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকেও বাধা আসতে পারে। গোপনীয়তার সংস্কৃতির কারণে বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং তথ্য প্রদানে অনীহার কারণে এনজিওগুলো এর সফল প্রয়োগে বাধার কারণ হতে পারে। বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্ষেত্র বিশেষে গণমাধ্যম তথ্যের অপব্যবহার করতে পারে। বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতার কারণে তথ্য অধিকার আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রলম্বিত হতে পারে। সর্বোপরি, সুশীল সমাজের মধ্যে অনৈক্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে তথ্য প্রকাশে অনীহাও বাধার কারণ হতে পারে।
দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশে একটি কার্যকর তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের কোনো বিকল্প ছিল না। তথ্যের আবদ্ধতায় জনগণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই শিকার হয় দুর্নীতি, শোষণ ও প্রতারণার। সরকারি কর্মকর্তাদের কার কী দায়দায়িত্ব, নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কী কী, কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ আছে, তা কীভাবে খরচ করার কথা, খরচ হচ্ছে কীভাবে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কী আলোচনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কোন প্রক্রিয়ায় ও কিসের ভিত্তিতে এবং কীভাবে—তথ্য অধিকার আইনানুযায়ী এসব তথ্য জনগণ এখন সহজেই জানতে পারবে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া কঠিন হবে। আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন করা হলে জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়বে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা। তথ্য অধিকার আইন যে অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি করেছে, বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ যেন তা প্রতিহত না করতে পারে, সে জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগের দরকার, যা তথ্যদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের স্বার্থকে সংরক্ষণ করবে। এ জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। পাশাপাশি আইন বাস্তবায়নে প্রয়োজন শক্তিশালী নেতৃত্ব। আমরা তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন চাই।
ড. ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।