Friday, December 26, 2014

গাজীপুরে সমাবেশ হচ্ছে না, ১৪৪ ধারা জারি- শনিবার গাজীপুরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

বিএনপি ও ছাত্রলীগ একই স্থানে সমাবেশ ডাকায় ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন। আজ শুক্রবার গাজীপুর জেলা প্রশাসক নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘দুটি পক্ষ একই স্থানে সমাবেশ ডাকায় এবং এটা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আজ বেলা দুইটা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ আদেশ বহাল থাকবে।’
তবে আজ শুক্রবার দুপুরে সমাবেশ স্থল পরিদর্শনে এসে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা অনেকবার চেষ্টা করেছিলাম দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনতে। যেহেতু তারা কোনো সমঝোতায় আসতে পারেনি, এ জন্য ২৭ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কলেজ মাঠসহ গাজীপুর জেলার কোথাও কারও সভা হবে না।’
১৪৪ ধারা জারির পরপরই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাবেশ স্থল, জেলা শহর ও আশপাশের এলাকায় মাইকিং করে তা নগরবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে কাল ১৪৪ ধারা জারি করা ও দলের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে আজ রাতে জরুরি বৈঠকে করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
মাঠ পুলিশের দখলে
বেলা দুইটায় সমাবেশ স্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভাওয়াল বদরে আলম কলেজের তিনটি গেটেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে। আর বদরে আলম মাঠের ভেতরে ও বাইরে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য রকিব সরকার, ভাওয়াল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য মোবারক হোসেন, মোশাররফ হোসেনসহ স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটানো। তবে ওই এলাকায় বিএনপির কোনো ব্যানার-ফেস্টুন কিংবা পোস্টার দেখা যায়নি।
এ সময় জানতে চাইলে সেখানে দায়িত্বরত জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার রেজাউল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমাবেশের মাঠ এখন পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। দুই দলের কাউকেই এখানে আসতে দেওয়া হচ্ছে না।’
যেখানে খালেদা, সেখানেই প্রতিরোধ
গাজীপুর জেলার প্রবেশমুখ টঙ্গী ব্রিজ, মাওনা শ্রীপুর, কালিয়াকৈরের চন্দ্রাসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নেবেন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ ও শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা। কোনোভাবেই ঢাকা বা অন্য জায়গা থেকে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীদের গাজীপুরে প্রবেশ করতে দেবেন না তাঁরা। এ জন্য কাল শনিবার সকাল থেকেই প্রশাসনের সঙ্গে অবস্থান নেবেন তাঁরা।
জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে গাজীপুরের যেখানে তারা সমাবেশ করবে, সেখানেই তাদের প্রতিহত করা হবে।’
আতঙ্কে নগরবাসী
সমাবেশ ও এর আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় দোকানপাট বন্ধ। এ ছাড়া সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই শহরের অন্য দোকানগুলো বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। ওই এলাকায় কমে যায় মানুষের চলাচল।
ইটাহাটা এলাকার সবজি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দিন ধরে দুই প‌ক্ষের মিছিল-মিটিং ও মারমুখী অবস্থানের কারণে ব্যবসাÿক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
জেলা শহর, জেলা শহরের রাজবাড়ি রোডে বিএনপির কার্যালয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কে আজ শুক্রবার সকাল থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) জলকামান, রায়ট কার নিয়ে মহড়া দিয়েছে।
নয়জন আটক
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে এখন পর্যন্ত নয়জনকে আটক করেছে পুলিশ।
টঙ্গী থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা সাজেদা লতা জানান, রাতে অভিযান চালিয়ে জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি বশির উদ্দিনসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল করিম জানান, জয়দেবপুর থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার বিএনপির ছয় কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আগেই নাশকতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার বাসায় তল্লাশি চালায় পুলিশ।
ক্ষমতাসীনদের মিছিল, দেখা মিলল না বিএনপির
ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ মাঠে সমাবেশের সমর্থনে আজ সকালে শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকায় মিছিল করেন। দুপুরে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য হীরা সরকারের নেতৃত্বে, পৌনে একটার দিকে গাজীপুর জেলা মহিলা লীগের সভাপতি দিলরুবা ফওজিয়ার নেতৃত্বে এবং বেলা একটার দিকে গাজীপুর মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একই মহাসড়কে পৃথক পৃথক মিছিল হয়। তবে কলেজ ক্যাম্পাস ও আশেপাশের এলাকায় বিএনপিসহ ২০-দলীয় জোটের কোনো নেতা-কর্মীর দেখা পাওয়া যায়নি।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম জানান, ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে আমাদের জনসভার ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। আমাদের আন্দোলনকে ভয় পেয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে একই স্থানে ছাত্রলীগকে দিয়ে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে।’
গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা ইতিমধ্যে আগামী ২৮, ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর গাজীপুরে সমাবেশ করার জন্য প্রশাসনের অনুমতি চেয়েছি।’ >>প্রথম আলো
শনিবার গাজীপুরে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
পাল্টাপাল্টি জনসভাকে ঘিরে গাজীপুরে প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির প্রতিবাদে শনিবার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে ওইদিন সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করবে ২০দলীয় জোট। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে চেয়ারপারসন বেগম খালেদার জিয়ার বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয়া হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা সভাপতি ফজলুল হক মিলন হরতালের ঘোষণা দেন।
উল্লেখ্য, শনিবার বিএনপির জনসভা ও একই স্থানে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ সমাবেশ ঘিরে গাজীপুরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নির্দেশ জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার হারুন-অর-রশিদ। >>মানবজমিন

বোড়োদের বিরুদ্ধে সেনা অপারেশন

আসামের বোড়ো জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেনা অপারেশন চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান দালবির সিং সুহাগ। শুক্রবার তিনি বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী বোড়ো জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ না করলে সামরিক অপারেশন চালিয়ে তাদের আটক করা হবে। খবর এএফপির।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথের সঙ্গে আসামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকের পর সেনাপ্রধান বলেন, আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সেনা অপারেশন চালাতে যাচ্ছি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের কোকড়াঝাড়ের পর নতুন করে শোনিতপুরে জঙ্গি হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন দেশটির রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন। ইতিমধ্যে কোকড়াঝাড়, শোনিতপুরসহ আসামের ৩টি জেলায় জারি করা হয়েছে সান্ধ্য আইন। সেইসঙ্গে এনডিএফবি জঙ্গিরা অবিলম্বে আত্মসমর্পণ না করলে তাদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশও দেয়া হয়েছে আইন-শৃংখলা বাহিনীকে।
মঙ্গলবার আসামের কোকড়াঝাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এনডিএফবি জঙ্গিদের হামলায় কমপক্ষে ৮২ জন নিহত হয়। এছাড়া আহত হয় শতাধিক মানুষ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্যমতে, অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। এএফপি বলছে, বাস্তুহারার সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার হবে। আসাম জুড়ে মোতায়েন করা আধা-সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, বুধবারের হামলার পর তারা কমপক্ষে ৭৫ এনডিএফবি জঙ্গিকে চিহ্নিত করেছে। তাদের অবিলম্বে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানো হয়। জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ না করলে দেখামাত্র তাদের লক্ষ্য করে গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিন আসামে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, জঙ্গি তৎপরতা দমনে আসাম সরকারকে সব ধরনের সাহায্য করবে কেন্দ্রীয় সরকার। ইতিমধ্যে আধা-সামরিক বাহিনীর একটি দল আসাম পৌঁছে গেছে। সীমান্ত এলাকায় নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। আর জঙ্গি দমনে ভুটান সরকারের কাছ থেকেও চাওয়া হয়েছে সহায়তা। এদিকে জঙ্গি হামলায় বিপর্যস্ত কোকড়াঝাড় ও শোনিতপুর এলাকা বৃহস্পতিবার পরিদর্শন করেছেন রাজনাথ সিং। সেখানকার আশ্রয় শিবিরগুলোতে ঘুরে তিনি জঙ্গিদের এই বর্বরোচিত হামলার কঠোর পাল্টা জবাব দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে শুক্রবার ভারত-ভুটান সীমান্তে বোড়ো জঙ্গিরা সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে। চিরাং জেলার ফৈসানা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে কলকাতা টুয়েন্টি ফোর।
সাত বছরের শিশুকে সাতবার গুলি : ভারতের আসামের কোকড়াঝড় জেলায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে সাতবার গুলিবিদ্ধ করেছে বোড়ো বিদ্রোহীদের একাংশ। তদু নামের শিশুটি বর্তমানে আসামের গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে। ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া সূত্রে এই খবরের সত্যতা জানা যায়।
২৪ ডিসেম্বর আসামের কোকড়াঝাড় এবং শোনিতপুর জেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে হামলা চালায় বোড়ো বিদ্রোহীরা। এ হামলায় কমপক্ষে ৭৬ জন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ২১ জন নারী এবং ১৮ জন শিশু। বোড়ো বিদ্রোহীদের হামলার সময় তদু তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল। বিদ্রোহীরা গুলি চালানো শুরু করলে সে এবং তার মা দু’জনেই ?গুলিবিদ্ধ হয়। তদুর মুখ, হাত, কোমরসহ আরও কয়েক স্থানে গুলি লাগে। তদুর বাবা সোম তদু জানান, আমার বড় ছেলেও গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় মারা যায়। আমার অন্য সন্তানরা ঘরের ভেতর থাকায় তাদের কিছু হয়নি। আমি নিজে কালু তদুকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছুটে যাই।
এছাড়াও বোড়ো বিদ্রোহীদের হামলায় রানী বাসুমাতৃ (৫০) নামের এক নারীও আহত হন। তাকে ধারালো ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। রানীর স্বামী বিশ্বনাথ জানান, চিরং জেলার শান্তিপুর গ্রামে আমাদের বসবাস। আমাদের ঘরবাড়ি সব জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা। এখন কিছুই নেই আমাদের। আক্রান্ত পাঁচটি স্থানই স্বায়ত্তশাসিত বোড়োল্যান্ডের বিচারাধীন এলাকার আওতাভুক্ত। এই অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়িদের অধিকাংশ ছোটনাগপুর প্লাতু ও ভারতের মধ্যাঞ্চল থেকে আগত বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের ভূমির দাবি নিয়ে লড়াই করে আসছে বোড়ো বিদ্রোহীরা।

শিপিং মাস্টার যখন দুর্নীতির মাস্টার

পদ তার শিপিং মাস্টার। কিন্তু শিপিং সেক্টরে তিনি পরিচিত ‘দুর্নীতির মাস্টার’ হিসেবেই। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের অধীনে পরিচালিত চট্টগ্রাম সরকারি শিপিং অফিসের এ কর্মকর্তার নাম শেখ আলী আম্বিয়া। দেশী-বিদেশী এবং অস্তিত্বহীন জাহাজের নামে ভুয়া ও জাল নিয়োগপত্রের বিপরীতে এনওসি সংগ্রহ, ক্যাপ্টেন-ক্রুদের সিডিসি ইস্যু, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নাবিক রিক্রুটিং এজেন্ট নিয়োগসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি একদিকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, অন্যদিকে সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম উদাসীনতা ও অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন। এসব অভিযোগে একাধিকবার তাকে বরখাস্তও করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। অবৈধ টাকায় তিনি প্লট-ফ্ল্যাট-গাড়ির মালিক বনে গেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তেও জ্ঞাতআয়-বহির্ভূত অর্ধকোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের প্রমাণ মিলেছে। এ কারণে দুদকও তার বিরুদ্ধে দায়ের করেছে মামলা।
এদিকে দ্বিতীয় দফায় চাকরিচ্যুতির আদেশের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে তথ্য গোপন করে রায় পক্ষে নেয়ার অভিযোগও উঠেছে এ শিপিং মাস্টারের বিরুদ্ধে। আর এমন কূটকৌশলে জয়ী হয়ে চট্টগ্রামে পুনর্বহাল হওয়ার চেষ্টায় চট্টগ্রাম শিপিং অফিসের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। তবে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক তথা ডিজি শিপিং ইতিমধ্যে দুই দফায় সলিসিটর বরাবরে চিঠি দিয়েছেন।
সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, মেরিন একাডেমি ও ন্যাশনাল মেরিটাইম ইন্সটিটিউটসহ (এনআইএম) সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট থেকে পাস করে বের হওয়া ছাত্ররাই সাধারণত দেশী-বিদেশী সমুদ্রগামী জাহাজে ক্যাপ্টেন-ক্রু হিসেবে চাকরি করার সুযোগ লাভ করে। মেরিন একাডেমি থেকে বের হয়ে অফিসার পদে এবং এনআইএমসহ বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট থেকে বিভিন্ন মেয়াদে কোর্স শেষ করে বের হয়ে ক্রু পদে চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের আওতাধীন নাবিক ও প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ পরিদফতর, চট্টগ্রাম তথা শিপিং অফিস থেকে নিতে হয় সিডিসি (কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট বা ধারাবাহিক নিষ্কৃতিপত্র)। শিপিং অফিসের ইস্যু করা এই সিডিসি পাওয়া গেলেই কেবল চাকরি নিয়ে দেশী-বিদেশী জাহাজে উঠতে পারেন ক্যাপ্টেন-ক্রুরা। সূত্র জানায়, সর্বনিু ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা সরকারি ফি ধার্য রয়েছে সিডিসি নেয়ার জন্য। এখানেই শুরু শিপিং মাস্টারের দুর্নীতির যাত্রা। একাধিক দফায় চট্টগ্রামে শিপিং মাস্টারের দায়িত্ব পালনকালে শেখ আলী আম্বিয়া চট্টগ্রামে শতাধিক ভুয়া সিডিসি ইস্যু করেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি সিডিসি ইস্যুর বিপরীতে ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। শতাধিক সিডিসির বিপরীতে গড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে এক কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে বলে সূত্রগুলোর অভিযোগ। আম্বিয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।
১৭ মে ২০১২ তারিখের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পত্র ও নির্দেশ অনুযায়ী অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে শিপিং মাস্টার শেখ আলী আম্বিয়াকে ওই বছরের ২২ মে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তৎকালীন ডিজি শিপিং কমডোর জোবায়ের আহমদ তাকে বরখাস্ত করেন। এই বরখাস্ত আদেশের বিরুদ্ধে শিপিং মাস্টার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, ঢাকায় মামলা দায়ের করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে শেখ আলী আম্বিয়ার বিরুদ্ধে আনীত বিভিন্ন ‘দণ্ডনীয় অপরাধ’ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হলেও ডিজি শিপিংয়ের বরখাস্ত আদেশটি ডিসমিস করা হয়। রায়ে এই বরখাস্ত আদেশ প্রদানের জন্য ডিজি শিপিং লিগ্যাল অথরিটি নয় উল্লেখ করে বলা হয় একমাত্র মন্ত্রণালয়ই শিপিং মাস্টারকে বরখাস্ত করতে পারে।
সূত্র জানায়, এমন রায় পাওয়ার পরই শিপিং মাস্টার শেখ আলী আম্বিয়া পুনরায় চট্টগ্রামে যোগ দেয়ার জন্য মন্ত্রী-এমপিদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। আর এতেই চট্টগ্রাম শিপিং অফিসের সাধারণ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দেশী-বিদেশী জাহাজের সাধারণ ক্যাডেটরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আবারও চট্টগ্রাম সরকারি শিপিং অফিসে ‘দুর্নীতি-হয়রানি’ ফিরে আসছে- এমন অভিযোগ করেছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, শিপিং মাস্টার শেখ আলী আম্বিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে নৌ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু চতুর শিপিং মাস্টার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে ওই তথ্যটি গোপন করে ডিজি শিপিং সরাসরি তাকে বরখাস্ত করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। এ কারণে রায় সরকারের বিপক্ষে গেছে।
সূত্র জানায়, সরকারি চাকরিকালীন দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে ঢাকার মহাখালী নিউ ডিওএইচএস-এ ফ্ল্যাট, রাজউকের পূর্বাচলে ৫ কাঠার প্লট, খুলনায় কয়েকশ’ শতক জায়গা ও দামি গাড়ির মালিক বনেছেন এই শিপিং মাস্টার। এর মধ্যে ৮৭ লাখ ৩ হাজার ৪০২ টাকার জ্ঞাতআয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে। দুদকের নির্দেশ অনুযায়ী যে সম্পদ বিবরণী এই শিপিং মাস্টার দাখিল করেন ওই সম্পদ বিবরণীতে তিনি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ২২৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেন। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. শফিউল আলম দুদক আইন ২০০৪-এর ২৬(২) ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় একটি মামলাও করেন। ওই মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। বরখাস্তকৃত শিপিং মাস্টার শেখ আলী আম্বিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল চাকরির শেষ বয়সে এসে আমার বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতি-অনিয়মের মিথ্যা অভিযোগ এনেছে। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুদকের মামলার ব্যাপারে আমি লিখিত প্রতিবাদ করেছি। দুদকের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিবাদ আর কেউ করেনি। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আমার বরখাস্ত আদেশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয়নি বলে রায় দিয়েছেন।’

খিলগাঁওয়ে গভীর গর্তে আটকা পড়েছে ৪ বছরের শিশু

রাজধানীর খিলগাঁও কলোনি মাঠের পাশে জিয়াউর রহমান নামে ৪ বছরের এক শিশু গভীর গর্তে আটকা পড়েছে। ওয়াসার পাইপের পাশের ওই গর্তটির গভীরতা কয়েকশ ফুট। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট শিশুটিকে দড়ি ফেলে তুলে আনার  চেষ্টা চালাচ্ছে। শিশুটির পিতা নাসিমউদ্দিন একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের নৈশ প্রহরী হিসাবে কাজ করেন। তিনি জানান, আজ বিকাল ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে জিয়াউর ওই গর্তে পড়ে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ৪টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা ব্রজেন কুমার সরকার জানান তারা বাচ্চাটিকে উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শাহজাহানপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান বলছেন, ওয়াসার পরিত্যক্ত ওই পাইপ কয়েকশ ফুট গভীর। তবে পাশের যে গর্তে শিশুটি পড়েছে তার পরিসর মাত্র ১৪ ইঞ্চি হওয়ায় কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা জানান, শিশুটির সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলা সম্ভব হয়েছে। ডাকলে সে সাড়া দিচ্ছে। তার জন্য খাবার ও অক্সিজেনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাইপে রশির সাহায্যে শিশুটিকে জুস দেওয়া হয়েছে। অন্ধকারে যাতে ভয় না পায়, সেজন্য দুটি টর্চলাইট পাঠানো হয়েছে। শিশুটি এসব জিনিস পেয়েছে বলে সাড়া দিয়েছে।

জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার ১৪৯

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, সন্ত্রাসীসহ ১৪৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতি ও শুক্রবার এদের গ্রেফতার করা হয়। এদের বেশিরভাগই বিভিন্ন মামলার আসামি। অভিযানকালে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। যুগান্তর প্রতিনিধিরা জানান-
বগুড়া : বগুড়ার এএসপি (মিডিয়া) গাজিউর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। বৃহস্পতিবার বিকালে ডিবি পুলিশ শহরের আটাপাড়া এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা থেকে দুই রাউন্ড গুলিভর্তি রিভলবারসহ রিপন ও রাব্বী নামে দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। সদর থানা পুলিশ রাতে মাটিডালি উত্তরপাড়া থেকে ৩ রাউন্ড গুলিসহ শাটারগান উদ্ধার এবং শাকিল নামে সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে। এছাড়া চারটি চোরাই মোটরসাইকেল, ৭০ বোতল ফেনসিডিল, ১৫০ পিস ইয়াবা, সাত কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন মামলা, ওয়ারেন্টমূলে গ্রেফতার হয়েছে ৭১ জন। এর মধ্যে রয়েছে সদর থানায় ২০ জন, শিবগঞ্জে ৮ জন, সোনাতলায় ৩ জন, গাবতলীতে ৪ জন, সারিয়াকান্দিতে ৩ জন, ধুনটে ৬ জন, শেরপুরে ৫ জন, নন্দীগ্রামে ৩ জন, আদমদীঘিতে ৬ জন, দুপচাচিয়ায় ৩ জন, কাহালুতে ৩ জন, শাজাহানপুরে ৫ জন।
পাবনা : ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিসহ অপরাধীদের ধরতে পাবনায় বিশেষ অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ বৃহস্পতিবার রাতে জেলার ১১ থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬১ জনকে গ্রেফতার করেছে। পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিদ্দিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মানিকগঞ্জ ও সাটুরিয়া : নাশকতার আশংকায় মানিকগঞ্জ সদর, সিংগাইর, ঘিওর, শিবালয়, সাটুরিয়া ও দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক অভিযান চালিয়ে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতাসহ সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে এদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন- দৌলতপুর উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মিজানুর রহমান মঞ্জু, সাটুরিয়া দরগ্রাম ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি এএম ইদ্রিস আলী, বিএনপি কর্মী সদর উপজেলার আলতাব হোসেন, শিবালয়ের মোবারক হোসেন ও মো. রাসেল হোসেন, সিংগাইরের আবদুল কুদ্দুস ও ঘিওরের আলতাব হোসেন আরিফ। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান সদর সার্কেল এএসপি কামরুল ইসলাম।
চৌদ্দগ্রাম : চৌদ্দগ্রামে পুলিশ ও বিজিবি পৃথক অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ চারজনকে আটক করেছে। আটককৃতরা হচ্ছেন- পৌরসভার রামরায় গ্রামের নুরুল আলম, গোমার বাড়ির জসিম উদ্দিন, গুণবতী ইউনিয়নের বুধড়া গ্রামের আলাউদ্দিন সবুজ, জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের সাতঘড়িয়া গ্রামের শাহ জালাল, কনকাপৈত ইউনিয়নের হিংগুলা গ্রামের আবদুল মমিন। আটককৃতদের মাদক আইনে মামলা শেষে শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বুধপাড়া এলাকা থেকে শিবিরের দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাদের আটক করা হয়। এরা হলেনÑ ৩০ নম্বর ওয়ার্ড শিবিরের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও তার ভাই শিবির কর্মী জাহিদ হাসান। নগরীতে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের কাজে বাধা প্রদান ও বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
মৌলভীবাজার : রাজনগর থানা পুলিশ শুক্রবার ভোরে উপজেলার কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত চার আসামিকে গ্রেফতার করেছে। এরা হলেন- বাহাদুরগঞ্জ গ্রামের মখলিছ মিয়া, কাশেমপুর গ্রামের সুরত আলী, রামভদ্রপুর গ্রামের ভানু দাস ও লছমন।

রাজশাহীতে মুক্তিপণ না পেয়ে শিশুকে গলা কেটে হত্যা

অপহরণের পর ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেয়ে ১০ বছরের এক শিশুকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। অপহরণের ৭ দিন পর শুক্রবার সকালে তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রাজশাহীর মোহনপুরে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এক নারীসহ আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শিশুটি উদ্ধারে পুলিশের চরম গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, পুলিশ বিষয়টিকে প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ঘটনার পরপরই গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধার চেষ্টা করলে হয় তো তাকে জীবিতই উদ্ধার করা সম্ভব হতো। রাজশাহী সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রশিদ যুগান্তরকে জানান, ২০ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে রাব্বী নিখোঁজ ছিল। পরদিন তার বাবা থানায় জিডি করেন। ২২ ডিসেম্বর দুপুরে একব্যক্তি মোবাইল ফোনে রাব্বীকে অপহরণের বিষয়টি স্বীকার করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ ঘটনা রাব্বীর বাবা পুলিশকে জানালে ওই ফোনের সূত্র ধরে ২৪ ডিসেম্বর বিকালে বেড়াবাড়ী গ্রামের আবদুল হাকিমের ছেলে শাহাবুদ্দিন ও আলাউদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলামকে আটক করে পুলিশ। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার ভোরে বেড়াবাড়ী গ্রামের নাজমুল হক, আবুল কাশেম, আছিনুর বেগম, মাজেদুর রহমান সাগর, রিপন সরকার লিটন, আলাউদ্দিন ও পবা উপজেলার বাগধানি গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনকে আটক করে পুলিশ।
মোহনপুর থানার ওসি আবদুল হামিদ জানান, জিজ্ঞাসাবাদে সাগর রাব্বীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তিনি বলেন, ২০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পাশের বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাব্বীকে কৌশলে ডেকে নেয় একই এলাকার সাগর। এ সময় সাগরের সঙ্গে রিপন ও নাজমুলও ছিল। পরে তারা রাব্বীকে ডাইংপাড়া মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে পেছন থেকে প্রথমে রাব্বীর মাথায় চাপাতির কোপ দেয়া হয়। এতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সাগর তার দুই পা চেপে ধরে আর রিপন ও নাজমুল জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে তারা তাকে সেচের কাজে ব্যবহৃত নালায় পুঁতে রেখে চলে যায়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতিটি পাশেই বারনই নদীতে ফেলে দেয় তারা।
ওসি আবদুল হামিদ আরও বলেন, সাগরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাব্বীর লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। একটি হাত পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে লাশ উদ্ধারের খবরে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়। এ সময় নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। রাব্বীর বাবা আলী হোসেন ও মা আরজিয়া বেগম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
স্থানীয়রা পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনে বলেন, অপহরণের পরপরই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে খুনিরা কেন মুক্তিপণ দাবি করবে? ২১ ডিসেম্বর থানায় জিডি করা হয়, এরপর ২৪ ডিসেম্বর মামলা হয়। এরপরও পুলিশ রাব্বীকে উদ্ধারে তেমন কোনো তৎপরতা দেখায়নি। প্রথম থেকে পুলিশ তৎপর
হলে রাব্বীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো।
তবে সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রশিদ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পুলিশ শুরু থেকে গুরুত্ব দিয়েই শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করে।

১২ ধরনের অবসর ভাতা বাড়তে পারে

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ১২ ধরনের অবসর ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। পাশাপাশি মৃত্যুর কারণে সরকারি সহায়তা ৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা, চাকরির পাঁচ বছর বয়সে পেনশন সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণের মেয়াদ ২০ বছর করার সুপারিশ করেছে কমিশন। জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কমিশন আরও বলেছে, অধিকাংশ অবসরভোগী পেনশন ও আনুতোষিক হিসাবের প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে থাকেন। বেতন ও চাকরি কমিশন সরকারের সার্বিক সম্পদ পরিস্থিতি ও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হল-
চাকরি পাঁচ বছর হলেই পেনশন : চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছর হলে পেনশন দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শেষ বেতনের ২০ শতাংশ পেনশন পাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। চাকরি ২৫ বছরের ওপরে হলে পেনশন পাবে শেষ বেতনের ৯০ শতাংশ হারে। অবশ্য বিদ্যমান বেতন স্কেলে চাকরির মেয়াদ ১০ বছর না হলে পেনশনের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। ১০ বছরের পর পেনশন ধরা হয় ৩২ শতাংশ এবং ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে ৮০ শতাংশ হারে পেনশন দেয়ার বিধান রয়েছে। স্বেচ্ছা অবসরের মেয়াদ ২০ বছর : চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণের মেয়াদ ন্যূনতম ২০ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমান অবসরগ্রহণের মেয়াদ হচ্ছে ২৫ বছর।
আনুতোষিকের (গ্রাচুইটি) হার : বর্তমানে অবসরগ্রহণকারীর মোট পেনশনের ৫০ শতাংশ সমর্পণ করা বাধ্যতামূলক। মোট পেনশনের অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ মাসিক নিট পেনশন হিসেবে গ্রহণ করা যায় অথবা সমর্পণ করা যায়। কমিশনের প্রতিবেদনে বাধ্যতামূলক সমর্পণের ক্ষেত্রে আনুতোষিকের হার বৃদ্ধি করে পাঁচ বছর বা ১০ বছরের কম এক টাকায় ২৭৫ টাকা, ১০ বছর বা ১৫ বছরের কম এক টাকায় ২৬০ টাকা, ১৫ বছর বা ২০ বছরের কম এক টাকায় ২৪৫ টাকা, ২০ বছর বা ঊর্ধ্বে এক টাকায় ২৩০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। নিট পেনশন সমর্পণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সমর্পিত ৫০ শতাংশ পেনশনের অর্ধেক হারে আনুতোষিক প্রদানের প্রচলিত নিয়ম চালু রাখার কথা বলা হয়।
পেনশনযোগ্য চাকরির মেয়াদপূর্ব বিশেষ আর্থিক সহায়তা : সরকারি চাকরিজীবীর মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্তির আগেই কেউ অক্ষম হয়ে পড়লে বিদ্যমান সুবিধার পাশাপাশি চাকরির মেয়াদের প্রতি বছরের জন্য নিজস্ব স্কেলের তিনটি মূল বেতনের সমপরিমাণ হারে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।
পারিবারিক পেনশন : পারিবারিক পেনশন সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য করার সুপারিশ করা হয়েছে।
চিকিৎসা ভাতা : ৬৫ বছর পর্যন্ত পেনশনভোগীর মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১৫শ’ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়। ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে এ ভাতা বিদ্যমান এক হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫শ’ টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
অবসরভোগীদের উৎসব ভাতা : একজন অবসরভোগীর জন্য তার মাসিক নিট পেনশনের সমান দ্বিগুণ হারে বছরে দুটি উৎসব ভাতা প্রদান। বর্তমান পেনশন গ্রহণকারী অবসরভোগীরা প্রতি বছর তাদের দু’মাসের নিট পেনশনের সমপরিমাণ অর্থ উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া নিট পেনশনপ্রাপ্ত অবসরভোগীদের নিট পেনশনের হার যে প্রক্রিয়ায় বাড়ানো হয়, অনুরূপ একশ’ শতাংশ পেনশন সমর্পণকারীদের ক্ষেত্রেও শুধু উৎসব ভাতাপ্রাপ্তির জন্য নিট পেনশনের হার বাড়বে।
পেনশনারদের বৈষম্য নিরসন : বৈষম্য নিরসনের জন্য চারটি সুপারিশ করেছে বেতন কমিশন। এগুলোর মধ্যে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিট পেনশনের পরিমাণ পেনশনারের শেষ বেতনের অনুরূপ স্কেলে বেতন বৃদ্ধির সমতুল্য হার পুনঃনির্ধারণ করা যেতে পারে। ৫০ শতাংশ নিট পেনশন সমর্পণকারী অবসরভোগীদের উৎসব ভাতা পুনঃনির্ধারণ করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া পেনশনারদের মাসিক পেনশনের পরিমাণ ন্যূনতম দুই হাজার টাকা নির্ধারণ এবং নিট পেনশনের পরিমাণ বার্ষিক ভিত্তিতে সমন্বয় করা যেতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীদেও জ্যেষ্ঠ নাগরিকের সুবিধা : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের সিনিয়র সিটিজেন বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ নাগরিক কার্ড প্রবর্তন করতে পারে। অবসরপ্রাপ্তদের কর্মক্ষেত্র অনুসন্ধান : অবসরে যাওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীরা অনেকে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না। এক্ষেত্রে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক, বীমা, কর্পোরেট সংস্থা এবং সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।
কল্যাণ তহবিল ও যৌথবীমা : চাকরিরত একজন বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা পাঁচ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা, অক্ষমতার ক্ষেত্রে দুই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা, দাফন-কাফন অথবা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া চাকরিরত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করার কথা বলেছে কমিশন।
পেনশন ফান্ড, বীমা ব্যবস্থাপনা ও কল্যাণ তহবিল : বর্তমান কল্যাণ তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিধি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি, অবসরপ্রাপ্তদের জন্য ট্রাস্ট ব্যাংকের আদলে ৪শ’ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে ‘সমৃদ্ধি সোপান ব্যাংক’ নামে একটি বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

সরকার দেশকে বন্দিশালায় পরিণত করেছে

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে গ্রেফতারের ঘটনা অবৈধ সরকারের প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, সব দেখে মনে হয়, ওই সন্ত্রাসী দুঃশাসনের প্রধান মুখপাত্র হচ্ছেন স্বয়ং বর্তমান অবৈধ সরকারের প্রধান। তার কাছে অহম ও ক্ষমতালিপ্সা বাংলাদেশের চেয়েও প্রিয়। একদলীয় অপশাসনের শৃংখলে গোটা দেশকেই বন্দিশালায় পরিণত করা হয়েছে। সরকারকে হুশিয়ার করে তিনি বলেন, মিছিলে মিছিলে সংগ্রামী জনগণ এখন শৃংখল ভেঙে এই অবৈধ ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাবিলাসের যবনিকাপাত ঘটাতে ধেয়ে আসছে। গয়েশ্বরের গ্রেফতারের প্রতিবাদে শুক্রবার দলের যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার শেষ মরণকামড় দেয়ার জন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে। কারণ ক্ষমতা জবরদখলকারী এ অবৈধ সরকার কোনোভাবেই জনগণকে কাছে টানতে না পেরে বীভৎস প্রতিহিংসায় মেতে উঠেছে। সেই প্রতিহিংসার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটল গয়েশ্বরকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে।
তিনি বলেন, আদালতে আমার হাজিরাকে কেন্দ্র করে ২৪ ডিসেম্বর বকশীবাজার এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী সশস্ত্র পাণ্ডারা যেভাবে পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে, তাতে মনে হয় এই অবৈধ সরকার এক বর্বর হিংসাযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এ যুদ্ধে তারা মূলত জনগণকেই প্রতিপক্ষ বানিয়েছে।
তিনি বলেন, এ অবৈধ সরকার জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে, জাতীয় সংসদ দখল করে ও জনগণের নাগরিক স্বাধীনতাকে হরণ করে মনে করেছিল চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতার রাজদণ্ড ধরে রাখবে। আর এজন্য তারা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নিজেদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে দুর্বৃত্ত বাহিনীতে পরিণত করেছে। তাদের সর্বনাশা আশকারা দিয়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলকে দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু তারা বাংলাদেশের জনগণকে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারে না। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এখন ভয়াবহ সংকটের মুখে। সাজানো প্রশাসন ও দুষ্কৃতকারী যুবলীগ-ছাত্রলীগের পাণ্ডাদের দিয়েই এ ভোটারবিহীন সরকার গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যার পথ ধরে জনগণের প্রতিবাদী স্বরকে থামাতে অপচেষ্টা করা, বিরুদ্ধ মত পেশের কোনো জায়গা না রাখা এবং রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর অত্যাচার ও জুলুম অব্যাহত রেখেছে। আর এভাবে নিজেদের মসনদ গায়ের জোরে ধরে রাখতে তারা মূলত দেশের জনগণকেই পরাধীন করে রেখেছে।
গ্রেফতারের উদ্দেশে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেলের বাসায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশিকে এ অবৈধ সরকারের দুর্বৃত্তায়িত চরিত্রেরই পুনরাবৃত্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি। বকশীবাজারের ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না করে আবদুল আউয়াল মিন্টু, বিএনপি নেতা হাবিব-উন নবী খান, আজিজুল বারী হেলাসহ শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার ও গয়েশ্বরের মুক্তি দাবি করেন বিএনপি প্রধান।

ছাত্রলীগের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করল সরকার

ছাত্রলীগের সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করল সরকার। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কোথাও জনসভা করতে দেয়া হবে না বলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়। গাজীপুরে খালেদা জিয়ার আজকের জনসভাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার ১৪৪ ধারা জারি করাকে তাদের সেই ঘোষণার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছে বিএনপি নেতারা। তাদের মতে, এটা সরকারের পূর্বপরিকল্পিত। বর্তমান সরকার বিএনপিকে রাজপথে নামতে দিতে চায় না। যেকোনো মূল্যে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি লন্ডনে এক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজাকার বলে মন্তব্য করেন। তার এমন মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। তারেক রহমান তার বক্তব্য প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত দেশের কোথাও খালেদা জিয়াকে জনসভা করতে দেয়া হবে না বলেও ঘোষণা করে ছাত্রলীগ। এরই অংশ হিসেবে গাজীপুর ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে খালেদা জিয়ার আজকের জনসভা যেকোনো মূল্যে করতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জেলা ছাত্রলীগ। এ লক্ষ্যে তারা একই দিন একই সময়ে ওই কলেজ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। পাশাপাশি গত কয়েক দিন ধরে তারা সমাবেশ স্থলে অবস্থান নেয়। জনসভা স্থল ও আশপাশের বিএনপির লাগানো ব্যানার-ফেস্টুন ভাংচুর করে তাতে আগুন দেয়া হয়। মাঠ দখলে নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা বৃহস্পতিবার থেকেই সেখানে দফায় দফায় মিছিল করতে থাকে। মাঠের ভেতরে সামিয়ানা টাঙিয়ে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ-সমাবেশের ব্যানার ঝুলিয়ে রাখে। তাদের এসব কর্মকাণ্ডে গাজীপুর প্রশাসন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ ওঠে। সবশেষ খালেদা জিয়া যাতে জনসভা করতে না পারেন সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
১৪৪ ধারা জারির পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার জনসভার দিন গাজীপুরে ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিত। গাজীপুরে ২০ দলীয় জোটের জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে খালেদা জিয়ার ভাষণ দেয়ার কথা। এই জনসভা বানচাল করতেই সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছে। ছাত্রলীগকে সামনে রেখে সরকার এসব করিয়েছে- বিষয়টি সেরকম নয়। ছাত্রলীগের মাধ্যমে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ইচ্ছারই বাস্তবায়ন করিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, তারা জনসভার জন্য আগেই অনুমতি নিয়েছিলেন। সব নিয়ম মেনেই তা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার বিরোধী দলকে জনসভা করতে দেবে না। সেজন্য গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরে স্থানীয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ যা কিছু করছে, তা সাজানো নাটকের বিভিন্ন পর্ব ছিল। সরকার শুধু ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ মাঠে নয়, গোটা গাজীপুরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে।
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান দুদু যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগ শেখ হাসিনার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যিনি ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করেন। গাজীপুরে ১৪৪ ধারা জারি করে সেই ক্ষমতার দাপট দেখালেন। এর মধ্য দিয়ে ডিসেম্বর মাসে ৭১-এর বিজয়ের সঙ্গে উপহাস করা হল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান যুগান্তরকে বলেন, কার ইন্ধনে এসব করা হচ্ছে তা দেশবাসীর বুঝতে আর অসুবিধা হচ্ছে না। দেশের শিক্ষাঙ্গনে যখন ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি আর খুনাখুনি চলছে তখন মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে শেখ হাসিনা এ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। ছাত্রলীগের হাতে অস্ত্র আর লাঠি তুলে দিয়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করছেন। এ জন্য একদিন তাকে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ছাত্রলীগ যদি এতটাই শক্তিশালী হয়ে থাকে তবে র‌্যাব-পুলিশ বাদ দিয়ে রাজপথে আসুক। দেখি কার কত ক্ষমতা।

জিহাদের জন্য প্রার্থনা

অন্যদিনের মতো শুক্রবার বিকালে শাহজাহানপুর বালুর মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল সাড়ে ৩ বছরের শিশু জিহাদ। হঠাৎ মাঠের পাশে প্রায় সাতশ’ ফুট গভীর পরিত্যক্ত একটি ১৭ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পানির পাইপের মধ্যে পড়ে যায় সে। মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় খেলার সঙ্গী বিল্লাল, মুনসুর আর সেতুদের ছোটাছুটি। ঘটনার আকস্মিকতায় তারাও হতভম্ব হয়ে যায়। খেলার সঙ্গী পড়ে গেছে খোলা পাইপের ভেতর। তার ভেতর থেকে ভেসে আসছে বাঁচাও-বাঁচাও ক্ষীণ শব্দ। খেলার সঙ্গীকে বাঁচাতে ছোট্ট এ শিশুরাও শুরু করে চিৎকার, কান্নাকাটি। ততক্ষণে আশপাশের লোকজন জড়ো হন ঘটনাস্থলে। প্রাথমিকভাবে দড়ি ফেলে ওই পাইপের ভেতর থেকে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টাও করেন তারা। জিহাদের বাবা নাসির উদ্দিন মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী। তার মা খাদিজা বেগম। বড় বোন স্বর্ণা স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। মেজ ভাই জিশান (৬) প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। তারা শাহজাহানপুর কলোনির ৪১নং ভবনের দোতলায় বসবাস করে।
এদিকে এ ঘটনার খবর পেয়ে একে-একে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আসে। ছুটে আসেন র‌্যাব ও পুলিশের সদস্যরা। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে হাজার-হাজার মানুষ জড়ো হন সেখানে। ছোট্ট এ শিশুটির জীবন বাঁচাতে প্রার্থনা করেন সবাই। ঘটনাস্থলের পাশে একটি ইসলামী সভায় শিশুটির জন্য বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন ওই উদ্ধার অভিযান সরাসরি সম্প্রচার করায় দেশের কোটি-কোটি মানুষ রাত জেগে শ্বাসরুদ্ধকর ওই অভিযান প্রত্যক্ষ করে। সারা দেশের মানুষ ছোট্ট এ শিশুটির জন্য প্রার্থনা করেন। সর্বশেষ প্রায় ১২ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও রাত ৩টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে রাত দেড়টার দিকে বিশেষভাবে লোহার পাইপ দিয়ে তৈরি ক্যাচারের মুখে ওয়াসার শক্তিশালী ‘বোর হোল’ ক্যামেরার মাধ্যমে শিশুটির অবস্থান চিহ্নিত করা গেছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, শিশুটি বেঁচে আছে এবং ওই ক্যাচারের মাধ্যমে পাঠানো জুস গ্রহণ করেছে জিহাদ। এর আগে পরিত্যক্ত ওই পাইপটি কেটে কেটে ক্রেনের মাধ্যমে টেনে তোলার চেষ্টা করা হয়। ওই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রাত ১টার দিকে লোহার পাইপ দিয়ে ক্যাচার তৈরি করে তা পাইপের ভেতরে পাঠানো হয়। ওই ক্যাচারের সম্মুখভাগে একটি ক্যামেরাও পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধার অভিযানে থাকা ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম। এর আগে বশির আহমেদ নামে এক ব্যক্তি শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য ওই পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করলে প্রথমে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা রাজি হন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বশির আহমেদকে পাইপের ভেতর নামতে বাধা দেয়া হয়। বশির আহমেদ সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। বর্তমানে তিনি এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানে কাজ করেন।
যেভাবে ঘটনা : জিহাদের খেলার সঙ্গী মুনসুর জানায়, জিহাদসহ তারা চারজন গোল্লাছুট খেলছিল। বিল্লাল হঠাৎ ধাওয়া দিলে জিহাদ দৌড় দেয়। এ সময় সে মাঠের শেষদিকে ওই পাইপের ভেতর পড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী শাহজাহানপুর বালুর মাঠের পাশের মুদি দোকানি সিরাজ মিয়া যুগান্তরকে জানান, তখন বিকাল সাড়ে ৩টা হবে। হঠাৎ কয়েকটি শিশুর চিৎকারে তিনি পরিত্যক্ত ওই পাইপের কাছে ছুটে যান। পাইপের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়ার পর তার আর ঘটনা বুঝতে দেরি হয়নি। সিরাজ মিয়া জানান, তখনও পাইপের ভেতর থেকে শিশুটির বাঁচাও-বাঁচাও ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছিল। সিরাজ মিয়া বলেন, উপস্থিত লোকজন দড়ি ফেলে ওই শিশুটিকে উদ্ধারে চেষ্টা চালান। কিন্তু এত গভীর পাইপের নিচ পর্যন্ত পাঠানোর মতো দড়ি না পাওয়ায় তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ঘটনার অপর প্রত্যক্ষদর্শী আরিফুল ইসলাম জানান, প্রায় আধ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। রাত ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, শিশুটিকে তারা জীবিত উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৯টার দিকেও তিনি শিশুটির কান্নার আওয়াজ শুনেছেন। তাদের ডাকে শিশুটি সাড়াও দিয়েছে। শিশুটিকে ওপর থেকে কয়েক দফা জুস দেয়া হয়েছে এবং সে তা গ্রহণ করেছে। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে ওপর থেকে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেনও সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান রফিকুল ইসলাম।  রশি ফেলে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা : ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ জানান, রাত ৮টার দিকে তারা ওপর থেকে চার বার রশি ফেলে শিশুটিকে ওপরে তুলে আনার চেষ্টা চালিয়েছেন। দু’বার রশি ধরেও পরে সে ছেড়ে দেয়। পরে রশির মুখে বস্তা বেঁধে ফের তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হলেও তাতে কাজ হয়নি। দড়ি দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি দোলনা পাঠিয়েও জিহাদকে ওপরে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হয়নি। মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, দীর্ঘক্ষণ অন্ধকার পাইপের ভেতর থাকায় আতংকে শিশুটি দুর্বল হয়ে পড়ায় রশি ধরে রাখতে পারছে না। আর এ কারণে বারবার চেষ্টা করেও তাকে ওপরে তুলে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, ১৭ ইঞ্চি ব্যাসের ওই পানির পাইপটি কত গভীরে আছে তা কেউ নিশ্চিত করে জানাতে না পারলেও  প্রায় ৭০০ ফুট গভীর হবে বলে তারা ধারণা করছেন। ওই ৭০০ ফিট গভীর পাইপের ৬০০ ফিট স্থানে পানি তোলার জন্য স্থাপন করা একটি ছোট্ট মোটরের ওপর শিশুটি রয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে পরিত্যক্ত ওই পানির পাইপটি টেনে তুলে ফেলার জন্য ফায়ার সার্ভিসের ভারি ক্রেন আনা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনটি লোহার পাইপ দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি ক্যাচারের মাধ্যমে শিশুটিকে ওপরে তোলার কাজ শুরু হয়। কিন্তু এ চেষ্টাও বিফলে যায়। ঠিক ওই সময়ে ঘটনাস্থলে আসে বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল। ওই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পরামর্শের পর লোহার তিনটি পাইপ একত্র করে ‘ক্যাচার’ তৈরি করে পানির পাইপের ভেতর পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই ক্যাচারের মুখে একটি শক্তিশালী ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
শিশুটিকে উদ্ধারে স্বেচ্ছাসেবীরা : শিশু জিহাদকে উদ্ধারের জন্য পানির ওই পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বশির আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। বশির আহমেদ সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের জানান। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের বশির বলেন, জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি শিশুটিকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা করতে চান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সহায়তায় তিনি দু’দফা ওই পাইপের ভেতর প্রবেশেরও চেষ্টা করেন। প্রথম দিকে বাধা না দিলেও কয়েক মিনিট পর তাকে পাইপের ভেতর প্রবেশে বাধা দেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
এ সময় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ যুগান্তরকে জানান, জেনেশুনে কাউকে নিশ্চিত বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারি না। শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজনের জীবন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া যায় না। পরে বশির আহমেদ জানান, বর্তমানে তিনি এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানে কাজ করেন। এর কিছু সময় পর জিয়াউর রহমান নামে আরেক যুবক ওই শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে তাকেও পাইপের ভেতর নামার অনুমতি দেয়নি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
ওয়াসার ‘বোর হোল’ ক্যামেরা স্থাপনে এক ঘণ্টা : রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি ক্যাচারের সঙ্গে ওয়াসার শক্তিশালী ‘বোর হোল’ ক্যামেরা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। শিশুটির প্রকৃত অবস্থান এবং কেমন আছে তা জানতে ওই ক্যামেরা পাঠানোর কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ক্যামেরা স্থাপন এবং তা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় হয়। রাত ১টার দিকে ক্যামেরাসহ বিশেষভাবে তৈরি ক্যাচার পাইপের ভেতর প্রবেশ করা হয়। রাত দেড়টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ক্যামেরাটি শিশুটির অবস্থান চিহ্নিত করেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ক্যামেরার মাধ্যমে শিশুটিকে জীবিত দেখতে পেয়েছেন। শিশু জিহাদ ক্যাচারের মাধ্যমে পাঠানো জুস নিয়ে তা পান করছে বলেও তারা দেখতে পেরেছেন।       
পাম্প হাউস নিয়ে বিতর্ক : এদিকে শাহজাহানপুর বালুর মাঠের পাশে পরিত্যক্ত ওই পাইপটি কোন সংস্থার তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) কামরুল আলম চৌধুরী রাতে বলেছেন, এটি রেলওয়ের জমিতে তৈরি করা ওয়াসার পাম্প। সংশ্লিষ্ট জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী তাকে বলেছেন, ওই এলাকায় তাদের পরিত্যক্ত কোনো পাইপ নেই। প্রায় ৮ বছর আগে রেলওয়ে শাহজাহানপুর কলোনিতে পানি সরবরাহের জন্য এই পাম্পটি বসানো হয়। তবে পানি না উঠায় বছর খানেক আগে এ পাম্পটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পাশেই নতুন করে আরেকটি পাম্প বসানোর কাজ চলছে। কিন্তু ওই পাইপের মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কারা কিভাবে মুখ খুলে ফেলেছে তা তারা জানেন না।  
প্রধানমন্ত্রীর মনিটরিং : জিহাদ উদ্ধার অভিযানের শুরু থেকেই মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়েই ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তার সঙ্গে ছিলেন ডিএমপি কমিশনার বেনজির আহমেদসহ ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরো উদ্ধার অভিযান পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
হিমশিম খাচ্ছে র‌্যাব-পুলিশ : অভিযানে অংশ নেয়া র‌্যাব-পুলিশের সদস্যরা জানিয়েছেন, উৎসুক জনতার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক দফা লাঠিচার্জ করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
রেলওয়ের প্রকৌশলী বরখাস্ত : পরিত্যক্ত পাইপের মুখ খোলা থাকা এবং এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে কর্তব্যে অবহেলার জন্য রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এ পাইপ বসানোর কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

পূর্ব জেরুজালেমে নতুন বসতি নির্মাণের ঘোষণা ইসরাইলের

পূর্ব জেরুজালেমের দুটি এলাকায় নতুন করে আরও ৩৮০টি বসতবাড়ি নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইল। বুধবার ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এ অনুমোদন দেয় বলে স্থানীয় একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বিরোধী মেরেৎজ পার্টির জেরুজালেম শহরের এক কাউন্সিলর ইউসুফ পেপ আলালু এএফপিকে বলেন, পৌর কমিশন রামোতে ৩০৭টি এবং হর হোমাতে ৭৩টি বসতি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। তিনি জানান, আগামী বছর মার্চে ইসরাইলের নির্বাচনকে সামনে রেখে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুবিধা নেয়ার উদ্দেশ্যে এই জনবসতি সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছনোর সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন থেকে বার বার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেমে নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা ধারাবাহিকভাবে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে, যা উত্তেজনাকে নতুন করে উস্কে দিচ্ছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। যদিও ইসরাইলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকৃত দেয়নি।

আসামে আবার বোড়ো হামলা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের আরেকটি জেলায় হামলা চালিয়েছে বোড়ো জঙ্গিরা। বুধবার আক্রান্ত নতুন এই জেলার নাম উদলগুরি। এ নিয়ে চার জেলায় হামলা চালালো জঙ্গিরা। বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশ করছে জিনিউজ। আসামে জঙ্গি হামলার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮২-এ দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত শুধু কোকড়াঝাড় জেলাতেই মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩০ জনের। আরও হামলার আশংকায় রাজ্যজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী। কোকড়াঝাড়সহ আসামের চার জেলায় জারি করা হয়েছে কারফিউ। এদিকে আসামে বোড়ো জঙ্গিদের হামলার জেরে আতংকে রাজ্য ছেড়ে প্রায় ২০০০ মানুষ পালিয়ে গেছে। বুধবার সন্ধ্যায় আসামের কোকড়াঝাড় ও শিমুলবাড়ি থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার কুমারগঞ্জে এসে আশ্রয় নিয়েছেন ছয় শতাধিক শরণার্থী। এদের মধ্যে অধিকাংশই আদিবাসী নারী ও শিশু। তাদের জন্য স্থানীয় চ্যাংমাড়ি গ্রামপঞ্চায়েতের পাশে একটি স্কুল বাড়িতে খোলা হয়েছে ত্রাণশিবির।
অন্যদিকে সন্ত্রাসকবলিত এলাকা পরিদর্শনে বৃহস্পতিবার আসামে আসার কথা দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি সেখানে পৌঁছাননি। বুধবার এক বিবৃতিতে রাজনাথ সিং বলেছেন, বোড়ো জঙ্গিরা যদি কোনো শান্তির প্রস্তাব দেয় তারপরও তা মানা হবে না। সন্ত্রাস আইনের অধীনেই তাদের বিচার করা হবে। পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান শুরু হবে বলেও এদিন জানান রাজনাথ। বুধবার জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে রাজ্যের শোনিতপুর ও ঢেকিয়াঝুলি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে পুলিশ। এসময় পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন আহত হন। ফলে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নামানো হয় পঞ্চাশ কোম্পানি সিআরপিএফ। এদিকে বুধবার রাতেও আসামের বেশকিছু জায়গায় বাড়িতে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। ২৬ ডিসেম্বর আসামে হরতাল বা বন্ধের ডাক দিয়েছে বেশ কয়েকটি সংগঠন।

সুন্দরবনের সুন্দরী থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ

সুন্দরবন সংরক্ষণে সরকারের কাগুজে পদক্ষেপের সঙ্গে বাস্তবিক পদচারণার তেমন মিল নেই। অথচ প্রকৃতির জননী এই সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ থেকেই ভারতে তৈরি হতে চলেছে দুরারোগ্যব্যাধি ডায়াবেটিসের মহা ওষুধ। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় প্রচলিত ওষুধের সঙ্গে এই ওষুধ যোগ করলে দ্রুত রোগ সেরে যাবে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন যখন বিপন্নের খাতায় নাম লেখাতে চলেছে, তখন এই ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদের অপার সম্ভাবনা আবারও সামনে চলে এল। কলকাতার বিখ্যাত আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফার্মাকোলজিক্যাল বিভাগের গবেষণায় এই ওষুধ তৈরি হচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে প্রায় চার বছর ধরে চলা গবেষণার পর চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ডায়াবেটিসের ওষুধ হিসেবে সুন্দরী গাছের ব্যবহারে সফল হয়েছেন। এই প্রকল্পের মূল গবেষক ডা. অঞ্জন অধিকারী জানিয়েছেন, সুন্দরী গাছের শ্বাসমূলে ‘ফ্ল্যাভোনয়েরস’ নামে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি সফলভাবে কাজ করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রাণিদেহে প্রয়োগের মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই গবেষণার ফলাফল বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সব ঠিকঠাক থাকলে ভারতেই ডায়াবেটিসের নতুন ওষুধ বাজারজাত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ডা. অঞ্জন অধিকারী। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

‘সুন্দরবনের ক্ষতি ৫০০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে’

সুন্দরবনের শেলা নদীতে ট্যাংকারডুবির ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে দাবি করেছে বিএনপির তদন্ত কমিটি। তারা বলেছে, সরকারের উদাসীনতায় সুন্দরবনে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় বিপর্যয়ের ঘটনায় সরকার অপরাজনীতি করছে। সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শেলা নদীর চ্যানেল দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ ও দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনাসহ ছয়টি সুপারিশ করেছে তদন্ত টিম। আজ সকালে চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির তদন্ত টিমের প্রতিবেদন তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান টিম প্রধান ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) এম হাফিজউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সুন্দরবনের শেলা নদীতে ট্যাংকারডুবির ৪৮ ঘণ্টা পরও তেল অপসারণে সরকারের কোন উদ্যোগ নেইনি। চারদিকে বিষাক্ত তেল ছড়িয়ে পড়ায় সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল আতঙ্কত জনগণ নিজ উদ্যোগের তেল অপসারণ শুরু করে। তবে পরিদর্শনকালে স্থানীয় জনগণ আমাদের জানিয়েছে, বনের ভেতরে ও নদীতে ছীড়য়ে পড়া তেল  সামান্য পরিমাণই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ডুবে যাওয়া ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’-এর কোন ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল না। এটি অবৈধ রুটে বেআইনিভাবে তেল পরিবহন করছিল। সাউদার্ন স্টার ছিল বালু ও পাথরবাহী কার্গো। এটির মালিক সরকারের একজন মন্ত্রীর (বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ) শ্যালক। হাফিজউদ্দিন বলেন, বিএনপির ৭ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি ২২শে ডিসেম্বর থেকে এক সপ্তাহব্যাপী কাজ করে। এ সময় ওই এলাকায় মাছ, ইরাবতি ডলফিনসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রাণের স্পন্দন ছিল না। তেলের কারণে সুন্দরবনের শ্বাসমূল কালো হয়ে গেয়ে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবনের ওপর মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে।  পাখিও তেলের সংস্পর্শে প্রজনন ক্ষমতা হারাতে বসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক এই পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য নিজ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে যারা তেল আহরণ করেছেন, ইতিমধ্যে তাদের চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ঘষিয়াখালী-মংলা চ্যানেল বন্ধ হওয়ার পর নৌপথ মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শেলা নদীকে বৈধ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে এ রুট ব্যবহার করা হচ্ছিল। ঘটনার তিনদিন পর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান তেল নিঃসরণে সুন্দরবনের  তেমন ক্ষতি হবে না বলে দাবি করেন। আর ঘটনার ছয়দিন পর প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনের তেলের দূষণ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার মতো এখানে সরকার অপরাজনীতি কাজ করছে।  দেশে যখন আইনের শাসন থাকে না, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সরকারের দুঃশাসনের কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য দাবি জানান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পশ্চিমবঙ্গে হতে পারত। কিন্তু ভারত  সেখানে না করে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। সেখানে বিদ্যুৎ  কেন্দ্র হলে বাংলাদেশ নিজেই জলবায়ুু দূষণকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল গ্রিন ফান্ডের জন্য আবেদন করার যোগ্যতা হারাবে।
তদন্ত টিমের ৬ সুপারিশ
সুন্দরবনের ক্ষতি কমানোর জন্য বিএনপির তদন্ত কমিটি ৬টি সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হলোÑ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে শেলা নদীসহ সকল নদীর ওপর দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ, ঘষিয়াখালী-মংলা চ্যানেল চালু, সুন্দরবনের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাহাজ ভাঙা শিল্পসহ সব লাল শ্রেণীর শিল্প স্থাপন বন্ধ, ট্যাংকারডুবির ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তিদান, ক্ষতিপূরণ আদায় করা, নৌপথে টহল  জোরদার, সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদার এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বয়ংসম্পূর্ণ কর্তৃপক্ষ গঠন। সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত টিমের সদস্য ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শফিকুল ইসলাম মনা, খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুজ্জামান মনি, বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদসু সালাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত ৯ই ডিসেম্বর সুন্দরবনের  শেলা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যায়। প্রায় সাড়ে ৩ লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে।  এরপর ২২শে ডিসেম্বর বিএনপির সাত সদস্যের তদন্ত টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

পাকিস্তানে সন্ত্রাস নির্মূলে সেনা-আদালত

পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। এই আদালতে কেবল জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদেরই বিচার করা হবে। বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে এই ঘোষণা দেন তিনি। গত সপ্তাহে পেশোয়ারের একটি স্কুলে নৃশংস তালেবান হামলায় ১৩২ শিশুসহ ১৫০ জন নিহতের পর সন্ত্রাস নির্মূলে এই কর্মসূচির ঘোষণা দিল সরকার। সন্ত্রাস দমনে জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির ব্যাপারে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক বৈঠকে দীর্ঘ প্রায় ১১ ঘণ্টা আলাপ-আলোচনার পর মধ্যরাতে এক ভাষণে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটনে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। টেলিভিশনে প্রচারিত এ ভাষণে তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ নির্মূলে ২০ দফা কর্ম-পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হবে। নওয়াজ শরিফ হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের প্রতি কোনো মায়া-দয়া দেখানো হবে না। অতীতে বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েও হামলাকারীরা পার পেয়ে গেছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তাই বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হবে। রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা নিশ্চয়ই এ ধরনের আর কোনো দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করার আগেই সত্যিকারভাবে জেগে উঠব। নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের দ্রুত বিচারের জন্য সামরিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ তিনি বলেন, বিশেষ আদালতগুলো দুই বছর কাজ করবে। এএফপি। শরিফ বলেন, ‘এই জঘন্য হামলা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। সন্ত্রাসীরা ওই শিশুদের হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যতের ওপর আঘাত করেছে। আমাদের সন্তানেরা রক্ত দিয়ে আমাদের ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে একটি বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছে।’ পেশোয়ার হামলার পর সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত সব দলের সদস্যরাই এই বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একমত হন। বৈঠকে সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ বলেন, পাকিস্তানে আর কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা বরদাস্ত করবে না সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসমুক্ত দেশ উপহার দিতে সেনাবাহিনী আগামী প্রজন্মের কাছে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। এদিকে বিরোধীদলীয় নেতা সাইদ খুরশিদ শাহ বলেছেন, ‘এই আদালতে কেবল সন্ত্রাসীদের বিচার করা হবে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই আদালত ব্যবহৃত হবে না।’ দি ন্যাশন।
নওয়াজের জন্মদিনে মোদির শুভেচ্ছা : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বৃহস্পতিবার ৬৪ বছরে পা দিয়েছেন। তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এএফপি। পিটিআই।
অতীতে বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে হামলাকারীরা পার পেয়ে গেছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তাই এই বিশেষ আদালত
নওয়াজ শরিফ, প্রধানমন্ত্রী
পাকিস্তানে আর কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা বরদাস্ত করবে না সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসমুক্ত দেশ উপহার দিতে সেনাবাহিনী আগামী প্রজন্মের কাছে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ
রাহিল শরিফ, সেনাপ্রধান

বরিশালে কবর থেকে লাশের টিপসই!

দাফনের চার দিন পর কবর খুঁড়ে আবদুল জলিল সিকদার নামে এক বৃদ্ধের লাশের হাতের টিপসই নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুধবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে বরিশাল নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা সিকদারপাড়া এলাকায়। প্রয়াত জলিল সিকদারের নাতি আবদুর রহমান ইমন জানান, ২১ ডিসেম্বর ভোরে শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার নানার মৃত্যু হয়। জানাজা শেষে ওই দিনই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে তারা দেখতে পান কবর খোঁড়া। পরবর্তীতে মাটি সরিয়ে দেখতে পান কবরে দেয়া বাঁশগুলো এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। লাশ পেঁচিয়ে রাখা হোগলা কাটা এবং কাফনের কাপড় সরানো। তাদের ধারণা জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজন বুধবার রাতের যে কোনো সময় দলিলপত্রে তার নানার হাতের টিপসই নিয়ে তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দিয়েছে। বিষয়টি তারা স্থানীয় কাউন্সিলর মেহেদী হাসান আবির ও কামরুন্নাহার রোজিকে অবহিত করেছেন। কাউন্সিলররা জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, বিষয়টি তাদের অবহিত করা হয়নি।

বাণিজ্যিক লাগেজের ধান্ধায় শত কোটি টাকার বাণিজ্য

শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে নির্বিঘ্নে নির্বিচারে বেরিয়ে আসছে বাণিজ্যিক লাগেজ। এভাবে মাসে শতাধিক কোটি টাকার পণ্য ঢুকে পড়ছে কোনোরকম পরিদর্শন ও ট্যাক্স পরিশোধ ছাড়াই। এতে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি পুরো বিমানবন্দর এলাকার জন্য সৃষ্টি হচ্ছে চরম নিরাপত্তাঝুঁকি। পারস্পরিক যোগসাজশের কারণে এসব লাগেজ সঠিক নিয়মে তল্লাশিও করা হয় না।
জানা গেছে, বিমানবন্দর দিয়ে বাণিজ্যিক লাগেজের অধিকাংশ আসছে পাকিস্তান থেকে। এছাড়া থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাইভিত্তিক একটি সিন্ডিকেটও এ কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক লাগেজ আসার কথা কার্গো টার্মিনাল দিয়ে। সেখানে কাস্টমস পরিদর্শন শেষে ট্যাক্স পরিশোধ করে এসব লাগেজ খালাস দেয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব বাণিজ্যিক পণ্য ট্যাক্স না দিয়ে যাত্রীদের মাধ্যমে ঢাকায় নিয়ে আসে। তারপর কাস্টমসের একটি সিন্ডিকেটকে মোটা অংকের মাসোয়ারা দিয়ে যাত্রী সাজিয়ে লাগেজগুলো পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে।
কাস্টমসের একটি সূত্র জানায়, ডাইরেক্ট পারচেজ বা বিদেশে সরাসরি মূল্য পরিশোধের ভিত্তিতে পণ্য আমদানির অন্তরালে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মুদ্রা পাচার ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ২০০৫ সালে এভাবে ব্যাগেজ আনা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর থেকে ওই সিন্ডিকেট বিদেশী যাত্রী ও কার্গো কোম্পানির মাধ্যমে এই ব্যাগেজ ব্যবসায় নামে। এরপর থেকে যাত্রী সুবিধার কথা বলে তারা অবাধে এই পণ্য খালাস করছে। চক্রটি এতই শক্তিশালী যে অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা ব্যাগেজ বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগে কাস্টমস কিংবা এয়ার ফ্রাইট কর্তৃপক্ষ কোনো যাত্রীকে জরিমানা করলে তারা যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করে দেয়। যাত্রীদের মারধর করা, পাসপোর্ট কেড়ে নেয়াসহ নানা অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এসব কারণে সংশ্লিষ্টরা অহেতুক হয়রানির শিকার না হয়ে মালামাল ছেড়ে দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাণিজ্যিক লাগেজের সঙ্গে আসা অধিকাংশ যাত্রী ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে শতাধিক সুন্দরী নারীও জড়িত রয়েছে। এদের অনেকে প্রতি মাসে গড়ে ১০ বারের বেশি পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যাতায়াত করে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, বাণিজ্যিক লাগেজ পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন কাস্টমসের একজন বিভাগীয় সহকারী কমিশনার। তার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে অসংখ্য গোয়েন্দা রিপোর্টও আছে। জানা গেছে, ১৫টি পাচারকারী গ্র“পের মাধ্যমে প্রতি গ্র“পে ৫ জন করে প্রায় ৭৫ জন এই ব্যাগেজ পণ্য খালাসের সঙ্গে জড়িত। ২২ ডিসেম্বর দুপুরে শাহজালাল বিমানবন্দর কাস্টমস হলের গ্রিন চ্যানেল দিয়ে এ ধরনের একটি বড় ব্যাগেজ চালান পাচারের ঘটনা ঘটে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমসের ওই কর্মকর্তার নেতৃত্বে সিন্ডিকেট নামকাওয়াস্তে কাস্টমস রসিদ (বিআর) অথবা একই বিআর বারবার দেখিয়ে লাগেজ পাচার করে থাকে। সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (সিএএবি) ১৫-২০ জনের সংঘবদ্ধ ট্রলিম্যান ও সিকিউরিটি গার্ড, স্ক্যানার মেশিনম্যান এবং বহিরাগত ব্যাগেজ পাচারের গডফাদার ইদ্রিস ও চোরা রহুল পুরো সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছে। ইদ্রিস বিমানবন্দর থানার একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্যাশিয়ার (টোল কালেক্টর) বলে জানা গেছে। এদের সহযোগিতা করেন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ইয়াকুদ জাহিদ যিনি মাইক-১৫ ওয়াকিটকি ব্যবহার করে থাকেন। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহের একটি বড় পাচারের ঘটনা গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ জানতে পেরে কাস্টমসকে জানালে ইয়াকুদকে বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক লাগেজ পাচারের সঙ্গে জড়িত গ্রুপগুলো হল- ঝিনুক গ্রুপ, আলী গ্রুপ, জহির গ্রুপ ও সাঈদ গ্রুপ। জড়িত সিএএবির ট্রলিম্যানরা হল- মান্নান, আনিছ, ইব্রাহিম দেওয়ান ও ফারুক (ইনচার্জ)। পাচারকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ, সিগারেট, মোবাইল ফোনসেট, মোবাইল এক্সেসরিজ, কাপড়-চোপড় এবং প্রসাধনী সামগ্রী। আবু ইউসুফ নামে কাস্টমসের একজন সহকারী কমিশনার এবং প্রটোকল কর্মকর্তা ইয়াকুদ জাহিদের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় লাগেজপ্রতি ৩০-৪০ হাজার টাকার গোপন চুক্তিতে পাচারের ঘটনা ঘটে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। এর আগে এই পাচারের গডফাদার ছিলেন সাবেক সহকারী কমিশনার ওয়াজেদ আলী। পিকে করাচি ফ্লাইটে এসব পাচারকারীরা কাস্টমসের সঙ্গে মোবাইলে সমঝোতা করে শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এদের প্রত্যেকের একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে। এরা একাধিকবার ধরাও পড়েছে। কিন্তু পাচার বাণিজ্য বন্ধ হয়নি। পিকে করাচি ফ্লাইটটি এরা প্রায়ই নিলামে কিনে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর ওই ফ্লাইটে তাদের নিজস্ব লোকজনকে ডিউটি দিয়ে ও যাত্রী হিসেবে পাঠিয়ে কমার্শিয়াল লাগেজ পাচার করছে।
এ ব্যাপারে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আবু ইউসুফ জানান, তার শিফটে কোনো ধরনের পাচারের ঘটনা ঘটেনি। প্রটোকলের দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইয়াকুদ জাহিদ জানান, পাচার ঘটনা তিনি জানেন না। প্রিভেনটিভ কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছরে এ ধরনের শত শত অভিযোগের প্রমাণ তারা হাতেনাতে পেয়েছে। ব্যাগেজ অনিয়মের অভিযোগে গত এক বছরে প্রায় ২০টি ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা এসব দুর্নীতিবাজের একটি প্রাথমিক তালিকাও তৈরি করেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যে ২০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সেগুলো হল- মেসার্স এসএস কার্গো, মেসার্স শাহী ট্রেডার্স, মেসার্স এমএন শিপিং, মেসার্স আরটি এন্টারপ্রাইজ, লিমা এন্টারপ্রাইজ, নাভারন শিপিং লাইন, ট্রেড ওভারসিজ, এমএম ট্রেডার্স, মিলন অ্যান্ড কোম্পানি, প্যান্ডার্স ইন্টারন্যাশনাল, বিজনেস লাইন, এসএম ট্রেডার্স, মডার্ন এজেন্সি, মেসার্স আর কেএল, সুইফ হ্যান্ড লিমিটেড, কালকিনি কমার্শিয়াল, আফতাসিয়া এজেন্সি, একে এন্টারপ্রাইজ, সালাম এন্টারপ্রাইজ। এর মধ্যে এসএস কার্গো লি. শাহী ট্রেডার্স, এমএন শিপিং, আরটি এন্টারপ্রাইজ, এমএম ট্রেডার্স, বিজনেস লাইন, এসএম ট্রেডার্স, মডার্ন এজেন্সির লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু গোপনে মোটা অংকের বিনিময়ে এদের অনেকে আবারও লাইসেন্স ফিরে পেয়েছে। লিমা এন্টারপ্রাইজ, ট্রেড ওভারসিজ, নাভারন শিপিং লাইন, মিলন অ্যান্ড কোম্পানি, প্যান্ডোরা ইন্টারন্যাশনাল হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। আরকেএল, সুইফ হ্যান্ড, কালকিনি কমার্শিয়াল, আফতাসিয়া, একে এন্টারপ্রাইজ, সালাম এন্টারপ্রাইজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা করছে। এছাড়া দেশী-বিদেশী কিছু কার্গো কোম্পানিও এই সিন্ডিকেটের সদস্য। এসব কার্গো ক্যারিয়ারের মাধ্যমে বাংলাদেশে মালামাল আসছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওয়ার্ল্ড কার্গো সার্ভিস (জেদ্দা), মহসিন কার্গো (জেদ্দা), স্কাইলাইন কার্গো (জেদ্দা) ইত্যাদি এয়ার কার্গো (কুয়েত), আল আরাফা কার্গো সার্ভিসেস (জেদ্দা), ঢাকা কার্গো সার্ভিস (জেদ্দা), এস আলম এয়ার কার্গো (কুয়েত), কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার (রিয়াদ), ডোর টু ডোর কার্গো সার্ভিস (জেদ্দা) সম্পর্কে খোঁজ নেয়া শুরু করেছে।
কারা তাদের মালামাল দিচ্ছে, সেগুলো কোথায় যাচ্ছে এ নিয়েও তারা কাজ করছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কিছু কিছু কোম্পানির রয়েছে শক্তিশালী ক্যাডার বাহিনী। কেউ তাদের ওপর খবরদারি করলে এই ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে তাকে শায়েস্তা করা হয়। এজন্য প্রতি মাসে মোটা অংকের মাসোয়ারা পায় ক্যাডাররা। সাধারণ কর্মীরা জানান, এই ক্যাডার বাহিনীর কারণে এ এলাকায় প্রায়ই ছিনতাই, মালামাল লুট, যাত্রী অপহরণসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ডিওএইচএস, উত্তরা, মগবাজার, মৌচাক, মতিঝিল, গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, বসুন্ধরা, সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর রোড, মিরপুর, ধানমণ্ডি এলাকার কয়েকশ’ ব্যবসায়ী এই মালামাল আমদানির সঙ্গে জড়িত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এভাবে ব্যাগেজের মাধ্যমে ১ কোটি টাকার পণ্য আনলে তাদের লাভ হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। আর এলসির মাধ্যমে আনলে লাভ হয় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। এ কারণে বিভিন্ন যাত্রীর মাধ্যমে এরা পণ্য আনা-নেয়া করে।
লাগেজ ব্যবসার নমুনা : প্রবাসী যাত্রীদের ব্যবহার করেই মূলত চক্রটি ব্যাগেজ ব্যবসা পরিচালনা করছে। বেশ কিছুদিন আগে কুয়েত প্রবাসী যাত্রী মন্টু কুয়েতের এস আলম এয়ার কার্গোর মাধ্যমে ৪৯৫ কেজি পণ্য আনলেও তার নিজস্ব পণ্য ছিল মাত্র ২২ কেজি। অতিরিক্ত ৪৭৩ কেজি মালামালের সপক্ষে কোনো কাগজপত্র, আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ছাড়পত্র, মালামালের বিবরণ কিছুই ছিল না। এ কারণে কাস্টমস ওই মালামালের বিপরীতে জরিমানা ধার্য করে। জেদ্দার যাত্রী মোহাম্মদ সিরাজ মিয়া ঢাকা কার্গো সার্ভিসের মাধ্যমে ৪০৮ কেজি ওজনের মূল্যবান জিনিসপত্র আনলেও তার কাগজপত্রের সঙ্গে আনা মালামালের কোনো মিল ছিল না। জেদ্দার মোস্তফা কামাল ওয়ার্ল্ড কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ২০০ কেজি মালামাল আনলেও সেখানে তার নিজস্ব মালামাল ছিল ৫৩ কেজি। আবদুল জব্বার জেদ্দার মহসিন কার্গোর মাধ্যমে ৪৯০ কেজি মালামাল আনলেও তার নিজস্ব পণ্য ছিল ৮৬ কেজি। মোহাম্মদ দুদু মিয়া জেদ্দার স্কাইলাইন কার্গো এজেন্সির মাধ্যমে ৪৪৩ কেজি আনলেও নিজের ছিল মাত্র ৪৩ কেজি। কুয়েতের রেজওয়ানা কামাল মোস্তফা ইত্যাদি এয়ার কার্গোর মাধ্যমে ৫০৩ কেজি পণ্য আনলেও তার নিজস্ব মাত্র ৮৩ কেজি। মনির হোসেন কুয়েতের আল আরাফা কার্গো সার্ভিসের মাধ্যমে ২৩০ কেজি মালামাল আনেন, যার মধ্যে নিজস্ব মাত্র ২৯ কেজি। রিয়াদের যাত্রী শহীদ হোসেন কন্টিনেন্টাল কুরিয়ারের মাধ্যমে ৪৯৮ কেজি মালামাল ঢাকায় আনে। এর মধ্যে তার নিজস্ব মালামাল ছিল ৭৫ কেজি।
সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মিজানুর রহমান বলেন, কোনো প্রবাসী যাত্রীর মালামাল ছাড়ানোর জন্য সিএন্ডএফ কাজ করে না। তবে যাত্রীর মালামাল যদি কার্গোতে আসে সেক্ষেত্রে সিএন্ডএফ এজেন্ট লাগবেই। এজন্য যাত্রীকে অবশ্যই তার পাসপোর্টের কপি, মালামালের তালিকা, পণ্য পরিবহন চালান, এয়ারওয়ে বিল, ডিক্লারেশন ফরম দিতে হয়। এগুলো পাওয়ার পর সিএন্ডএফ এজেন্ট ওই পণ্য খালাস করে দেয়। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মালামাল নিয়ে সন্দেহ হলে ব্যাগেজের ক্ষেত্রে যাত্রীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে থাকেন। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে যদি কোন দুর্নীতি হয় আর সরকার যদি তাদের কাছে সহায়তা চায় তাহলে তারা দুর্নীতিবাজদের শনাক্ত করে বিচারের ব্যবস্থা করবেন।

চার বস্তা দেশী বিদেশী মুদ্রা ও দেড় মণ সোনা উদ্ধার

রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে চার বস্তা দেশী-বিদেশী মুদ্রা এবং দেড় মণ সোনা উদ্ধার করেছে শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় শুল্ক বিভাগ এ অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ৬১/১ পুরানা পল্টনের ওই ভবনের ৬/এ ফ্ল্যাটের মালিক মো. আলীকে গ্রেফতার করা হয়। ফ্ল্যাট থেকে বেশ কয়েকটি পাসপোর্টও উদ্ধার করা হয়েছে। রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় মুদ্রাগুলোর গণনা চলছিল। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান যুগান্তরকে জানান, গোপন খবরের ভিত্তিতে সন্ধ্যায় ৬১/১ পুরানা পল্টনের ৭ম ও ১১ তলার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৬/এ নম্বর ফ্ল্যাটে একটি বিছানা, সিলিং ও বিভিন্ন আসবাবপত্রের ভেতর থরে থরে সাজানো দেশী-বিদেশী মুদ্রা ছাড়াও প্রায় দেড় মণ ওজনের ৫২৮ পিস সোনার বার উদ্ধার করা হয়। টাকাগুলো প্লাস্টিকের চারটি বস্তা হবে বলে জানান ড. মইনুল খান। এ ঘটনায় ফ্ল্যাটের মালিক মো. আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযানের শুরুতে তার বাসায় কোনো অবৈধ মুদ্রা নেই বলে তিনি দাবি করেন। পরে তিনি জানান, তিনি ব্যবসা করেন এবং উদ্ধারকৃত টাকাগুলো সব তার ব্যবসার টাকা। ধানমণ্ডিতে আলী সুইটস নামে তার একটি মিষ্টির দোকান এবং হুন্ডির ব্যবসা রয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেছেন, মো. আলীর বাড়ি যশোর জেলায়। তিনি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত টাকা গণনার কাজ চলছিল জানিয়ে তিনি বলেন, গণনা শেষ হলে তা সংবাদমাধ্যমকে জানানো হবে। এ ঘটনায় বৈদেশিক মুদ্রা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ চারটি ধারায় মামলা দায়ের হবে বলে তিনি জানান।

ডিসিসির অবৈধ মার্কেট

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) চার কাঠা জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে তিন তলা মার্কেট। রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজসংলগ্ন এই জমির ওপর নির্মাণাধীন ভবনটির ফাউন্ডেশন দেয়া হয়েছে ছয় তলার। প্রায় দেড় বছর আগে ডিএসসিসির তদন্ত কমিটি ভবনটিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। উল্টো নির্বিঘ্নে চলছে বাকি তিন তলা নির্মাণের কাজ। পাশাপাশি শুরু হয়েছে এটিকে বৈধতা দেয়ার প্রক্রিয়াও। এর পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। বাজার দর অনুযায়ী এ জমির বর্তমান মূল্য কমপক্ষে শত কোটি টাকা। যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে এসব তথ্য। এছাড়া অবৈধ এই মার্কেটটি মেয়েদের কলেজের পরিবেশ নষ্ট করছে বলে অভিযোগ করেছেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ১৯-১০-১৪ তারিখে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শামছুন নাহার স্বাক্ষরিত এক আবেদনে বলা হয়েছে, কলেজসংলগ্ন জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা মার্কেটটি মেয়েদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো মূল্যে মার্কেটটি উচ্ছেদ করা দরকার। এই জন্য সংশ্লিষ্টদের সহায়তাও চেয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির অঞ্চল-৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী বাকের হোসেন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে মার্কেটটিকে বৈধতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ডিএসসিসির মাসিক বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিল্ডিং যেভাবেই গড়ে উঠুক না কেন ফিটনেস ঠিক থাকলে অবৈধভাবে গড়ে উঠা মার্কেটটিকে বৈধতা দেয়া হবে। সমিতির সদস্যদের দোকান বরাদ্দ দেয়ার পর অন্য দোকানগুলো প্রচলিত নিয়মেই বরাদ্দ দেয়া হবে। ফিটনেস যাচাইয়ের জন্য হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স ইন্সটিটিউটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ সালের ১ এপ্রিল নীলক্ষেতের ডিএসসিসির চার কাঠা জমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করেন নীলক্ষেত সিটি কর্পোরেশন মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি একেএম সামছুদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাদের আবেদনপত্রে একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশ ছিল। একই বছরের ১০ মে সমিতির নামে জমিটি বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই সময় ডিএসসিসির প্রশাসক ছিলেন খলিলুর রহমান। বরাদ্দপত্রে বলা হয়, এই জায়গার ওপর অস্থায়ী অবকাঠামো করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে সমিতির সদস্যরা। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করে ওই জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে ছয় তলা ফাউন্ডেশনের ওপর তিন তলা অবৈধ মার্কেট।
বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ করায় তা খতিয়ে দেখতে গত বছরের শুরুতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিএসসিসি। কমিটি তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে একই বছরের এপ্রিলে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে মার্কেটটিকে সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি জমির অস্থায়ী বরাদ্দ বাতিল এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া এই জমির আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
অবৈধ মার্কেট নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে, নীলক্ষেত মার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হোসেন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এর পেছনে অনেক বড় বড় লোক রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তারা যোগসাজশ করে এসব করেছেন। আমাদের সমিতিকে তারা ব্যবহার করেছেন। আমরা বলির পাঁঠা হয়েছি। ফুটপাতে অস্থায়ী ভিত্তিতে যে দোকানে আমরা ব্যবসা করতাম, সেই রকম একটি করেই দোকান পেয়েছি। আর ওপর তলার দোকানগুলো পেয়েছেন ডিএসসিসির কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, অস্থায়ী বরাদ্দ দেয়া হলেও স্থায়ী অবকাঠামোয় বহুতল মার্কেট নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে ওই সমিতি। ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে তিন তলার নির্মাণ কাজ। ঘটনাটি আলোচনায় চলে আসায় অতি গোপনে চলছে বাকি কাজ। স্থানীয়রা জানান, আগে দিনের বেলায় নির্মাণ কাজ চললেও এখন তা করা হয় রাতে। মার্কেটের নিচ তলার দোকানগুলোতে ব্যবসার পসরা সাজিয়েছেন লেপতোশক ব্যবসায়ীরা।
ডিএসসিসির সম্পত্তি ও প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কোনো সম্পত্তি অস্থায়ী বরাদ্দ দেয়া হলে সেখানে শুধু টিনশেডের অবকাঠামো নির্মাণ করা যায়। আর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে যে কোনো সময় তা ভেঙ্গে ফেলতে পারবে। ডিএসসিসির বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী অস্থায়ী বরাদ্দে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো করা যাবে না। যারা এই নীতিমালা লংঘন করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করারও ক্ষমতা রয়েছে ডিএসসিসির।
একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ডিএসসিসির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা থাকলেও এক্ষেত্রে উল্টো পথে হাঁটছে কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, বড় কর্তারা ওই অবৈধ মার্কেট নির্মাতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। এখানে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।
ডিএসসিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স প্রতিষ্ঠানের ফিটনেস সার্টিফিকেটের মাধ্যমে ভবনটির বৈধতা দেয়া হলে সমিতির সদস্যরা বৈধভাবে ওইসব দোকানের মালিক হয়ে যাবেন। আর নাটের গুরুরা অবৈধ প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নেবেন- যা ডিএসসিসিতে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। পরে আরও বড় ধরনের অনিয়ম করতে উৎসাহিত হবেন সংশ্লিষ্টরা।
হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স ইন্সটিটিউটের সিনিয়র রিসার্স ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সালাম যুগান্তরকে বলেন, ডিএসসিসি আমাদের কাছে ওই মার্কেটটির ফিটনেস যাচাইয়ের জন্য আবেদন করেছে। আমরা তিন লাখ টাকা ফি চেয়েছি। তারা এখনও কিছু জানায়নি। যদি তারা রাজি হয়, তাহলে আমরা বিল্ডিংটির মান যাচাই করে রিপোর্ট দেব।
এদিকে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শামছুন নাহার যুগান্তরকে বলেন, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ একটি ঐতিহ্যবাহী মেয়েদের কলেজ। এই কলেজের সঙ্গে বহুতল মার্কেট হলে মেয়েদের চলাচলসহ ভেতরের সার্বিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। যেহেতু জায়গাটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর মার্কেটটিও গড়ে উঠেছে অবৈধভাবে এটা ভেঙ্গে ফেলা উচিত। মার্কেটটি চালু হলে কলেজের সার্বিক কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘সরকার বীভৎস প্রতিহিংসায় মেতে উঠেছে’ -খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান ভোটারবিহীন অবৈধ সরকার এখন শেষ মরণকামড় দেয়ার জন্য বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ ক্ষমতা জবরদখলকারী এই অবৈধ সরকার কোনভাবেই জনগণকে কাছে টানতে না পেরে বীভৎস প্রতিহিংসায় মেতে উঠেছে। সেই প্রতিহিংসার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটলো বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। এছাড়াও গতকাল রাতে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের বাসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশিকে এই অবৈধ সরকারের দুর্বৃত্তায়িত চরিত্রেরই পুনরাবৃত্তি বলে তিনি  উল্লেখ করেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে আটকের পর শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া বলেন, এই অবৈধ সরকার জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে, জাতীয় সংসদ দখল করে, জনগণের নাগরিক স্বাধীনতাকে হরণ করে মনে করেছিল চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতার রাজদন্ড ধরে রাখবে। আর এজন্য তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নিজেদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে দুর্বৃত্ত বাহিনীতে পরিণত করে তাদেরকে সর্বনাশা আশকারা দিয়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলকে দমনে ব্যবহার করে যাচ্ছে। বিরোধী দলকে পর্যদুস্তু করার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবৈধ আওয়ামী সরকারের প্রিয়জনদের দিয়ে সাজিয়ে সবধরনের হিংসাত্মক অপতৎপরতা চলমান রাখা হয়েছে। আর সেজন্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা আর নির্বিচারে গ্রেপ্তার করতে এই অবৈধ আওয়ামী সরকারের জনপ্রশাসন অত্যন্ত পারঙ্গম। কিন্তু তারা বাংলাদেশের জনগণকে স্বস্তি ও নিরাপত্তা দিতে পারে না। তিনি বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এখন ভয়াবহ সংকটের মুখে। সাজানো প্রশাসন ও দুষ্কৃতিকারী যুবলীগ-ছাত্রলীগের পান্ডাদের দিয়েই এই ভোটারবিহীন সরকার গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যার পথ ধরে জনগণের প্রতিবাদী স্বরকে থামাতে অপচেষ্টা করা, বিরুদ্ধ মত-পেশার কোন জায়গা না রাখা এবং রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর অত্যাচার ও জুলুম অব্যাহত রেখেছে। আর এভাবে নিজেদের মসনদ গায়ের জোরে ধরে রাখতে তারা মূলত দেশের জনগণকেই পরাধীন করে রেখেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, গত ২৪শে ডিসেম্বর আমার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে বকশীবাজার এলাকায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর আওয়ামী সশস্ত্র পান্ডারা যেভাবে পৈশাচিক হামলা করে তাতে মনে হয় এই অবৈধ সরকার এক বর্বর হিংসাযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আর এই যুদ্ধে তারা মূলত জনগণকেই প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। সব দেখে শুনে মনে হয় এই সন্ত্রাসী দুঃশাসনের প্রধান মুখপাত্র হচ্ছেন স্বয়ং বর্তমান অবৈধ সরকারের প্রধান। তার কাছে অহম ও ক্ষমতালিপ্সা বাংলাদেশের চেয়েও প্রিয়। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, একদলীয় অপশাসনের শৃঙ্খলে গোটা দেশকেই বন্দীশালায় পরিণত করা হয়েছে। উদ্বেল মিছিলে মিছিলে সংগ্রামী জনগণ এখন শৃঙ্খল ভেঙে এই অবৈধ ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাবিলাসের যবনিকাপাত ঘটাতে ধেয়ে আসছে। বিএনপি চেয়ারপারসন অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন এবং বকশীবাজার এলাকায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনায় জনদৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে উল্টো বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান।
সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন খালেদা
পাল্টাপাল্টি জনসভাকে ঘিরে প্রশাসন গাজীপুর জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করায় দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাত ৮টায় গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ মানবজমিনকে এ তথ্য জানান।

টাকা-রিয়াল গুনতে গুনতে পিঠব্যথা!

(রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি বাসা থেকে গতকাল উদ্ধার করা সোনার বার এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা (বস্তার মধ্যে) l ছবি: প্রথম আলো) ‘এত টাকা-রিয়াল আমি একসঙ্গে কোনো দিন চোখেই দেখিনি। গোনা তো দূরে থাক। কাল রাত থেকে গুনেই যাচ্ছি। আমার পিঠ ব্যথা হয়ে গেছে।’ আজ দুপুর সোয়া দুইটার দিকে এসব কথা বলেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দা কার্যালয়ে টাকা ও রিয়াল গোনা হচ্ছে। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের ২৫ জন কর্মচারী টাকা-রিয়াল গোনার কাজ ও জব্দ তালিকা প্রস্তুত করছেন। এখানেই গতকাল বৃহস্পতিবার চারটি বস্তার মধ্যে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ সৌদি রিয়াল ও ৫২৮টি সোনার বার। শুল্ক গোয়েন্দা ও গোয়েন্দা বিভাগের এই অভিযানে এর সঙ্গে জড়িত ফ্ল্যাট মালিক মোহাম্মদ আলী আটক হন। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ধ্যার মধ্যে এই গণনার কাজ শেষ হবে। এর পর জব্দ তালিকা তৈরি করা হবে।’
মুস্তাফিজুর রহমান জানান, এর পর তিনি বাদী হয়ে মামলা করবেন। আটক মালিক মোহাম্মদ আলীকে শুল্ক গোয়েন্দা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া টাকার পরিমাণ চার কোটিরও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ১৫ লাখ রিয়াল উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশি টাকার হিসাবে যার মোট পরিমাণ তিন কোটি।
৫২৮টি সোনার বার বা ৬১ কেজি সোনা তো আছেই, যার মূল্য ৩০ কোটি টাকা।
এই বিপুল পরিমাণ সোনা, রিয়াল আর টাকা গুনতে গিয়ে ঢাকায় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আটক মোহাম্মদ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য বের করার চেষ্টাও করছেন।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা-রিয়াল গুনলেই চলবে না। প্রতিটি নোটের সিরিয়াল নম্বর লিখে রাখার কাজটি চলছে।’ তিনি বলেন, ‘জব্দ তালিকা করার পর আটক মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে শুল্ক আইন, বৈদেশিক মুদ্রা আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হবে।’

তারা হলেন বৈড়ইচারা গ্রামের আবদুল মতিন... by বদরুন নাহার

বৈড়ইচারা গ্রামের ১৪ বছরের ছেলে আবদুল মতিন যখন লুঙ্গির নিম্নাংশ উল্টিয়ে মালকোচা করে নামা জমির ক্যাঁতক্যাঁতা কাদার মধ্যে পিচ্ছিল শোল-টাকি মাছ পাঁচ আঙুলের চিপায় কেচকি দিয়ে ধরে, তখন ঢাকা শহরের মনিরা পারভীন তাকে দেখেনি। আবদুল হাশেম অন্যের জমিতে হালচাষ করে বাড়ি ফিরলে সামনে খালুই হাতে মতিনকে পেয়ে রাগে খালুইটা উঠানে ছুড়ে ফেলে দিলে টাকিগুলো শুকনো উঠোনেই সাঁতার কাটে, মতিন দৌড়ে পালায়। রাতে সেই মাছের ঝোল ছেলের প্লেটে তুলে দিতে দিতে মা সাইদা বেগম ভাতমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে মিনতিভরা স্বরে বলে, বাজান আর দুইডা ক্লাস পাড়লি কলেজে যাতি।  এই কথায় মতিনের গলায় বিষম লাগে, তবে গলায় কাঁটা ফোটে না। সে বলে, ঝোলে ম্যালা ঝাল। সাইদা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পড়াশোনা ফেলে দুই চারটা কই-টাকি মারলে ছেলের কোনো ভবিষ্যৎ হবে নানে। বরং দেখাদেখি পরের দুইটাও স্কুলে ফাঁকি দেওয়া শুরু করবি। আবদুল হাশেম সংসার চালাতে হিমশিম খায়। তার মতে, ডাঙ্গর পোলায় পড়ব না, তাইলি খেতের কামে যাবি। এ কথার পরদিন সকালে আর মতিনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সে মামাবড়ি পালিয়েছে! এমন করে আর কদ্দিন। শেষে মতিনের মামাই একটা ব্যবস্থা করে। ধার-কর্জ করে তার কোরিয়া যাওয়া চূড়ান্ত হয়। তখন সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা কিশোর মতিন মায়ের আঁচল ধরে কান্দে, ছোট বোনের গালে গাল লাগিয়ে কান্দে, ছোট ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ঢাকা এলে তার দেখা হয় মনিরা পারভীনের সঙ্গে।
গ্রামের কথা মনিরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎই হাশেম নামের দূরসম্পর্কের ভাই উপস্থিত হলে মনে পড়ে সে কথা। মতিন নতুন কেনা প্যান্ট-শার্ট পরে একপাশে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সেদিকে তাকিয়ে মনিরা ভাবে, ঘাড়টা গোঁজা করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি নিতান্তই গোবেচারা টাইপের, এমন ভঙ্গির ছেলেপেলেকে সে শেষ কবে দেখেছিল মনে নেই। ছেলেটি এক দিনেই তাকে বেশ ফুফু ফুফু ডেকেটেকে অস্থির, তাতেই কি মনিরার খুব বাবার কথা মনে পড়ে? বাবা-মা মারা গেছে বছর দশ হলো, নিজের ভাইবোন কেউ নেই দেশে। বহুদিন আগেই বড় ভাই অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হয়েছে। বড় বোনটা বিয়ের পর থেকে আমেরিকায়। এ বছর নিজের ছেলেটাও কানাডা চলে গেল, মেয়েটাই কেবল কাছে আছে। গ্রাম থেকে বহু বছর কেউ আসে টাসে না। স্কুল পেরোবার পর মনিরার আর গ্রামে যাওয়াই হয়নি। আবদুল মতিন কোরিয়া থেকে ফোন করে। ছেলেটা এত বেশি ফুফু ফুফু করতে থাকে, কদিন বাদেই বিরক্ত লাগতে শুরু করে মনিরা পারভীনের। বিশেষ করে যখন ফোনে দীর্ঘ প্যাঁচাল শুরু করে বলতে থাকে, ফুফু ছোট বোনটারে কলেজে ভর্তি করছি, মাসে আব্বারে এত টাকা দিসি, মায়রে আলাদা খরচা দিই। এসব শোনায় তেমন কোনো আগ্রহ হয় না মনিরা পারভীনের, তবুও ছেলেটা বলে যায় বলে বিরক্ত হলেও কানে ফোন ধরে থাকে সে। প্রায় ফোন কলেরই শেষ বক্তব্য, ভালো হইচ্ছে না ফুফু?
বৈড়ইচারায় মোবাইল আছে কিন্তু সব সময় লাইন পাওয়া যায় না, চার্জ দিতে গঞ্জে যেতে হয় বলেই বোধ হয় মতিন তাকে এত ফোন করে, যা এক প্রকার অত্যাচারই মনে হয়। সেদিন সবে টিভিতে সিরিয়াল দেখতে বসেছে, তখনই মতিনের ফোন, কুশল জেনেই প্যাঁচাল শুরু, ফুফু এই মাসে আব্বারে এক লাখ টাকা পাঠাইছি আমাগো হালটের পাশে বতু গো নামা জমিটা কিনবার জন্যি। ওই হানে ডাঁটা আর ঢ্যাঁড়সের চাষ যেমুন ভালো, হেমুন ধানের চারা গজায়। মনিরা পারভীন বুঝতেই পারে না নামা জমি কেমন, মতিনদের হালটটা সে কি জীবনে দেখেছে? এদিকে টিভি সিরিয়ালে তখন চলছে চরম ক্লাইমেক্স। তাই মনিরা বলেন, মতিন, বাসায় তো গেস্ট, এখন রাখি, পরে কথা হবে। ভালো থেকো। কিন্তু এর পরও মতিনের সঙ্গে মনিরা পারভীনের যোগাযোগটা কমে না, বরং বেড়েই যায়। মনিরা যত ব্যস্তই থাকুক, তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিক, মতিনের দূরালাপের লিস্টটা ততটা বড় না হওয়ায়, কিছুদিন পর পর সে ফোন করে। সম্প্রতি ফেসবুকে মতিনের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে মনিরা পারভীন অনেকক্ষণ ভাবে একসেপ্ট করবে কি না? প
রথমত মতিনের সঙ্গে তখনো সে তেমন আন্তরিকতাবোধ করছে না, কিন্তু ভেবে দেখল, ফেসবুকে দেখা হলে মতিনের যখন-তখন ফোন করাটা কমবে, তাই বন্ধু করে নিল তাকে। তিন বছর আগে যে ছেলেটি গোবেচারা চেহারা নিয়ে মনিরা পারভীনের বাড়িতে এসেছিল, সেই গেঁয়ো, হাঁদা আর নেওটা ভঙ্গির মুখশ্রী তার প্রোফাইলেই খুঁজে পাওয়া যায় না—মতিনের গায়ে এঁদো কাদামাটি যেন কোনো কালে ছিলই না। কোরিয়ান সহকর্মীদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে সমুদ্রে হাফপ্যান্ট পরা কিংবা বিশাল সুপারশপে ক্রিস্টমাস গাছের আলোর মধ্যে হাস্যোজ্জ্বল এই ছেলেটি কি আসলেই মতিন! কোরিয়ান পুতুল পুতুল মেয়েদের মাঝখানে দাঁড়ানো ছেলেটি! মনিরা আবার ভালো করে ইনফরমেশন দেখে, ছেলেটা বৈড়ইচারা গ্রামের নামটি পর্যন্ত ঠিক লিখেছে! সহসা মনিরার ভালো লাগে। কেন এই ভালোলাগা? বৈড়ইচারা নামের কথা তো সে নিজেই ভুলতে বসেছিল, যদি না মতিন কোরিয়া যাওয়ার সময় তার বাসায় আসত। এমন কি তার মনে হতে থাকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে ভাইয়ার ছেলেমেয়ের সঙ্গে কালেভদ্রে কথা হয়। ওরা খুব একটা বাংলা বলতে পারে না। অথচ মতিন কেমন ফুফু ফুফু ডেকে অস্থির করে ফেলে, কোরিয়ায় বসেও হালটের পাশের দোপের জমিতে ঢ্যাঁড়সের স্বপ্ন দেখে! তাতে মনিরার বা কী যায় আসে? সে তো গ্রামের কাদামাটি মেখে বড় হয়নি, সাঁতার কেটে কেটে শালুকের গোল মোটা ঢ্যাপ তুলে আনেনি। তবুও এত দিন বাদে মনিরা পারভীনের খুব মরিয়ম ফুফুর কথা মনে পড়ে।
ছেলেবেলায় দাদাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া মানেই বাবার সঙ্গে দল বেঁধে জ্ঞাতিদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো। তখন সে পঞ্চম না ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, নিশ্চিত হতে পারে না। বৈষ্ণবডাঙ্গি দিয়ে যাওয়ার সময় বাবা বলে উঠল, চল মরিয়মবুরে দেখে যাই। যে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলল, সেখানে বিরাট উঠোন, যেমন হয় আরকি, সামনে দুটো টিনের ঘর, খড়ের মাচা, লাউয়ের মাচা, বাচ্চাসহ মুরগির কক কক করে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু উঠোন পেরিয়ে দুই টিনের চৌচালা ঘরের মধ্যে সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরের বাড়ির উঠানের প্রান্তে রান্নাঘরের সারির মাঝখানে দোঁচালা মাটির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা ডেকেছিল, মরিয়ম বু ও মরিয়ম বু...।
শণের ছাউনিওয়ালা ঘরের দোরটা ছিল পাঠখড়ির। মাথাভর্তি সাদা চুল, কিন্তু বেশ পেটানো শরীরের গঠন—বিবি মরিয়ম শক্ত-সামর্থ্য। সহসা ভাই, ভাইরে...বলে জড়িয়ে ধরেছিল বাবাকে। তাদের আন্তরিকতায় মনেই হয় না তারা কেবল প্রতিবেশী ভাইবোন! সেই বয়সে মনিরা নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেছে, অথচ বিবি মরিয়ম হামলে পড়ে তাকে পাখির ছানার মতো নিল কোলে তুলে। বলল, কী ফুটফুইটা মাইয়া!
তবে মনিরার ভীষণ অবাক লেগেছিল যখন মরিয়ম বিবি তাদের খেতে বসাল। না, সে সময় তার সেই খাওয়ানোর জোরাজোরির চেয়েও সে অবাক হয়েছিল খাবার তালিকা দেখে। রাতের রান্না ভাত আর পাটশাক, যেন মহামূল্যবান সে খাদ্য না খেয়ে গেলে মরিয়ম ফুফুর জীবনে আর ভাত খাওয়া হবে না। বাপের বাড়ি থেকে আসা ভাই-ভাতিজি যদি না খেল, তবে তার খেয়ে কী লাভ।
তখন মনিরাই কি জানত শাক আর ভাত মরিয়ম বিবির কাছে কত স্বাদের খাবার, দিনের পর দিন ফ্যানের মধ্যে নুন বা ভাতের সঙ্গে মরিচ ডলে খেয়ে তার জীবন চলে। স্বামী নেই, সন্তান নেই। শশুরবাড়ির সবচেয়ে খারাপ একটা অংশে তার ঘর, জমি বলতেও ঘরের পাশে নামা একচিলতে মাটি। পরম যত্নে পাটশাকে ভাত মেখে মনিরার মুখে তুলে বিবি মরিয়ম বলেছিল, সোনা আমার আর এক ন্যালা খা। সেদিন সে ভাতের কোনো স্বাদ পায়নি। কিন্তু বহু বছর পর মতিনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার কাছে আজ পাটশাকে মাখা ভাতের স্বাদ যেন ফিরে এসেছে! মরিয়ম ফুফুর জন্য চোখ ভিজে ওঠে মনিরার।

২.
চার বছর বাদে দেশে ফিরবে আবদুল মতিন। সে ফোনে জিজ্ঞাসা করে, ফুফু আপনার লিগা কি আনমু?
মনিরা পারভীনের কাছে বিদেশি উপহার নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, কিছু লাগবে না, তুমি ভালোভাবে দেশে ফেরো।
তবুও মতিনের বিশাল তিনটা লাগেজের ভেতর থেকে তুলতুলে পশমি শাল বেরিয়ে আসে ফুফুর জন্য, ফুফার জন্য মাফলার। বৈড়ইচারা থেকে মতিনের বাবা আর খালু এসেছে। বিশাল সব বাক্সপেটরা। সঙ্গে লম্বা একটা কাগজের বাক্স। ৪২ ইঞ্চি এলইডি টিভি। মতিন যে বছর বিদেশে যায় সে বছরই বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়েছে বৈড়ইচারা গ্রামে, এত দিনেও লাইন যায় নাই। তবুও যাবে বলেই এনেছে। হাশেম বলল, কারেন্ট নাই, খামাখা ইয়া নিলে চোর-ডাকাতের চোখে পড়ব। ওরা গ্রামে যাওয়ার সময় মনিরা পারভীনের বাসায় রেখে গেল টিভিটা। সেটি স্টোররুমের আলমারির মাথার ওপরে তুলে রাখল সে। কবে তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ আসবে আল্লাহ জানেন।
কিন্তু দুদিন বাদে মতিন আবার ঢাকায় এসে হাজির। সারা গায়ে লাল চাকা চাকা, খুব বিধ্বস্ত অবস্থা তার। বলল, বিদাশে তো এসির মধ্যে কাম করতাম, বাইরে যা গরম! হাঁসের মাংস আর রুটি পিঠা বানিয়ে মতিনের মা সাইদা বেগমও এসেছে ছেলের সঙ্গে।
ছেলেকে ভালোমতো এক-দুই বেলা খাওয়াতেও পারেনি বলে আফসোস করে মতিনের মা। মনিরার সঙ্গে রান্নাঘরে ঢুকে নিজেই এটা-ওটা করতে যায়। হঠাৎ রাইসকুকার দেখিয়ে বলে, আপা, এমুন একখান জিনিস মতিনে আনছে।
: তাই নাকি?
: হঁ, পোলাডা কেমুন পাগল...বাড়িতে কারেন্ট নাই। পয়সাপাতি খরচা করনের কী দরকার?
: ছেলেটা শখ করে এনেছে, রেখে দাও, বিদ্যুৎ আসলে...।
সাইদা বেগমের চোখ বেশ জ্বল জ্বল করে। খানিকটা লাজুক হেসে বলে, মতিনে নাকি একখান টিপি আনছে...। আপনার বাসায় রাইখা যাইয়া ভালোই করছে...।
রান্নাঘরে হাতের কাজ করতে করতে মনিরা পারভীনের সবটা শোনা হয় না। তবে সে যখন বলে, টিপিটা একটু দেইখতাম, তখন মনিরা বলে, ড্রইংরুমে আছে, মতিনকে বললে ছেড়ে দেবে।
সাইদা বেগম সে কথায় খানিকটা লজ্জা পায়, না, ওইডা না। আমার মতিনে যেইডা আনছে...।
এত কাজের ভিড়ে স্টোর থেকে টিভির প্যাকেটা এনে খুলে দেখানোর ঝক্কি না নিয়ে মনিরা পারভীন সাইদা বেগমকে স্টোরের সামনে নিয়ে বলে, ওই তো।
সাইদার কণ্ঠে বিস্ময়, এমন চিকন আর বড় প্যাকেট!
সাইদা বেগম উঁচু হয়ে প্যাকেটটা ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে, বলে, চেয়ারম্যানের বাড়িরডা কেমুন বাক্সো নাহাল মোটা! দাঁড়িয়ে পরম মমতায় ছেলের আনা এলইডি টিভি বাক্সে হাত বুলায় সে, যেন ছোট্ট শিশুটিকে আদর করছে।
মনিরা পারভীন তা দেখেও না দেখার ভান করে সরে যায়।
এক মাস ছুটি কাটিয়ে বিদেশে যাওয়ার সময় আবার মনিরা পারভীনের বাসায় ঘুরে গেল মতিন। দুই মাস বাদে কোরিয়া থেকে ফোন করে মনিরাকে সে জানায়, নতুন চাকরি পেয়েছে, আরও বেশি বেতনের। সে সঙ্গে বাড়তি টাকার নতুন নতুন পরিকল্পনার ফিরিস্তি। সবশেষে বলে, ভ্যালা হইবো না, ফুফু? সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় মনিরা, হ্যাঁ, ভালোই হবে।
মনিরা পারভীন ইদানীং মানুষকে মতিনের গল্প বলতে শুরু করেছে। সেদিন বড় ভাইয়ের ফোন পেয়ে মতিনের গল্প বলল বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে। শুনে খানিকটা দুঃখভরা গলায় ভাইয়া বলল, শোন মনি, এটা কোনো সুখের কথা নয়। একটা দেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে, ভাবলেই আমার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।
ফোনের এপাশ থেকে মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির কারণে নয়, ভাইয়ের কথার জন্য, ভাইয়া যেন নিজের দেশের কথা বলছে না, ওর মুখে একটা দেশ কত দূরের মনে হলো! আসলেই বাংলাদেশ বহুদিন ওর দেশ নয়! ভাই তবুও কী চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলে চলে, শ্রমশক্তি রপ্তানি করে কোনো দেশের অর্থনীতি স্ট্যাবল হতে পারে? যদি কেউ শ্রমিক না নেয়? মনিরার মনটা কেবল খারাপই হতে থাকল ভাইয়ের কথায়। সে শুধু মতিনের উন্নয়নে ডুবে ছিল, অথচ তা মোটেও উন্নয়ন নয়! মনিরার খুব বাবা-মার কথা মনে পড়ল। তাদের মৃত্যুর সময় কেবল সে-ই ছিল কাছে। ভাইয়া আর আপা এসে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা করেই চলে গেল। ওদিকে শূন্য বাড়িতে গিয়ে কতবার সে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে উঠত! মতিনের সঙ্গে ফেসবুকে বেশ দেখাটেখা হয় মনিরার। ইনবক্সে মতিন জানাল, ছোট বোনটা ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে, ভাইটা ক্লাস নাইনে, ওকে কমার্স নিতে বলেছে। নানা রকম ব্যবসার চিন্তা আছে, পরে ভাইকেও নিয়ে যাবে, বাবার শরীরটা ভালো না, জেলা হাসপাতালে টেস্ট করার টাকা দিয়েছে, পাইলসের সমস্যা ধরা পড়ছে...ইত্যাদি ইত্যাদি। মনিরা ভাবে, বৈড়ইচারায় হাশেম ভাইকে ফোন করবে। আলসেমিতে আর হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া মতিন সব এত সবিস্তারে বলে যে জানা হয়ে যায়।
মনিরার বাসায় সেদিন একটা গেট-টুগেদার পার্টি চলছিল। মতিনের ফোন এল তখনই। বাসায় মেহমান বলে তেমন একটা কথা হয়নি। মনিরা ভেবেছিল, মতিনকে পরে ফোন দেবে। হয়ে ওঠেনি। বরং ফেসবুকের ইনবক্সে লিখেছে, কী খবর মতিন? কেমন আছো? তারপর দু-চার দিন নিজেই ফেসবুকে বসার সময় পেল না, মতিনের খবরও জানা হলো না। সন্ধ্যায় সে টিভি খুলেছে সিরিয়াল দেখবে বলে, কিন্তু গত রাতে আসিফ যে নিউজ চ্যানেল দেখছিল, শুরুতে পর্দায় ভেসে উঠল তার মনোগ্রাম। অনেকটা আনমনেই নিচে দিয়ে যাওয়া স্কলের ব্রেকিং নিউজে চোখ আটকাল মনিরা পারভীনের, সেখানে ভেসে যাচ্ছে—কোরিয়ায় আগুনে পুড়ে পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু। নামটাম নেই। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে একটা চ্যানেলে এসে যে নামের লিস্ট পাওয়া গেল তাতে লেখা, মৃত ব্যক্তিরা হলেন বৈড়ইচারার আবদুল মতিন...। নামটি জ্বল জ্বল করছে। সহসা ঘুরতে থাকে মনিরার মাথা, নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবে গ্রামে কি খবরটা গেছে? সে কি ওদের ফোন করবে? কী বলবে? টিভিতে ইতিমধ্যে ভিডিও ফুটেজও দেখাল, কালো হয়ে পুড়ে যাওয়া লাশ। নানা স্মৃতি মনে পড়ে মনিরা পারভীনের, বৈড়ইচারায় বিদ্যুৎ নাই, মতিনের কেনা এলইডি টিভিটা তার স্টোরে এখনো বাক্সবন্দী। মনিরা পারভীন ভাবে, বিদ্যুৎ পেলেও কি মতিনের বাবা-মার ছেলের আনা টিভিটিতে এমন অন্ধকার ছবি সহ্য হতো!

‘সামাজিক ব্যবসা মুনাফা অর্জনের বিষয় নয়’ -ড. ইউনূস

সামাজিক ব্যবসা কোন দান-খয়রাতের বিষয় নয়। মুনাফা অর্জনের বিষয়ও নয়। সমাজহিতকর বিষয়। আপনি শুধু এক বছর বিনিয়োগ করলেন। পরে আপনার টাকা আপনি ফেরত পেলেন। এর পরে যে মুনাফা অর্জন হবে তা দিয়ে ব্যবসাটি সমপ্রসারণ হবে। অর্থাৎ সামাজিক ব্যবসা হলো কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা। গতকাল চট্টগ্রাম সামাজিক ব্যবসা কেন্দ্র লিমিটেড (সিএসবিসিএল) ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চট্টগ্রাম ক্লাবে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় নোবেলজয়ী ড. ইউনূস এসব কথা বলেন। প্রচলিত ব্যবসার সঙ্গে সামাজিক ব্যবসার পার্থক্য উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, প্রচলিত ব্যবসা হলো ব্যক্তি হিতকর আর সামাজিক ব্যবসা হলো সমাজহিতকর। প্রচলিত ব্যবসায় ব্যক্তির মুনাফা অর্জনের বিষয় থাকে। সামাজিক ব্যবসায় মুনাফা নেয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে সামাজিক ব্যবসা কোন এনজিও কার্যক্রমও নয়। এটি অবশ্যই ব্যবসায়িক কোম্পানি হতে হবে। এর একজন মালিকও থাকতে হবে। সামাজিক ব্যবসা কোন স্থানীয় বিষয় নয়। এটি বিশ্বমাপের জিনিস। তিনি বলেন, ‘সামাজিক ব্যবসার পেছনে দু’টো জিনিস বড় জরুরি। একটা হচ্ছে সৃষ্টিশীলতা। মাথার মধ্যে এমন একটা পোকা থাকতে হবে। প্রথমে মনে হবে অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু পোকার কারণে তা সম্ভব হয়ে যায়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে সমস্যার সমাধান দিবে। তবে এটা ব্যবসায়িক ভিত্তিতে হতে হবে।’ নবীন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য করে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, চাকরি করার বিষয়টি তোমাদের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। তোমরা ব্যবসায়ী হবে, অন্যকে চাকরি দেবে। সহযোগিতার জন্য তোমাদের যা লাগে সব দেবো। সামাজিক ব্যবসা আগে থেকে ছিল উল্লেখ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সামাজিক ব্যবসা আমি যে আবিষ্কার করছি তা নয়, আমি তার রূপরেখা দিয়েছি। সামাজিক ব্যবসা হতে হলে কোম্পানি হতে হবে। কোন রেজিস্ট্রার্ড এনজিও’র কার্যক্রম সামাজিক ব্যবসা হতে পারে না। সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মালিক থাকতে হবে। এ সময় তিনি সামাজিক ব্যবসা নিয়ে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে দেশে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে চক্ষু হাসপাতাল, ব্রিজ, পানি, নার্সদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন অগ্রগতি তুলে ধরেন। ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. সিকান্দর খানের সভাপতিতে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন ফারুক-ই আজম বীরপ্রতীক, দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক, চট্টগ্রাম ক্লাবের সভাপতি এম এ সালাম, চট্টগ্রাম  সোশাল বিজনেস সেন্টার লিমিটেডের পরিচালক আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।

পিস্তলধারী ছাত্রলীগ নেতা জানে না পুলিশ

বকশীবাজারে বিএনপি-ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে শাহবাগ ও চকবাজার থানায় দু’টি মামলা হলেও অস্ত্রধারী যুবকের বিরুদ্ধে এখনও কোন মামলা হয়নি। ওই যুবকের ছবি বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তার পরিচয় সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির নেতা সে। তবে ঘটনার একদিন পর চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিজুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই যুবকের পরিচয় পাওয়া যায়নি। কোন ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। বুধবার বকশীবাজারে বিএনপির অবস্থানের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এ সময় অস্ত্র হাতে একজনকে গুলি করতে দেখা যায়। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা ফয়েজুল ইসলাম ফয়েজ বিএনপি নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। ফয়েজ ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিল। ২০১৩ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি পল্লব ও সাধারণ সম্পাদক সুইমের পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়। এতে ফারুক নামে এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটি কলেজ ছাত্রলীগের ওই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ফয়েজ কলেজের বহিষ্কৃত সভাপতি পল্লবের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। মাস্টার্স পড়ুয়া ছাত্রলীগের এ ক্যাডারের বাড়ি নোয়াখালীতে। থাকে কলেজের সাউথ হলে। সূত্র জানায়, ফয়েজ বহিষ্কৃত সভাপতি পল্লবের হয়ে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি করে। কলেজের আশপাশে ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু করে নিউ মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট, গ্লোব মার্কেটসহ বিভিন্ন শপিং মলে নির্ধারিত মাসোহারা পল্লবের নামে আদায় করে। বকশীবাজারের সংঘর্ষে শাহবাগ ও চকবাজার থানায় দু’টি মামলা হলেও বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত অস্ত্রধারী ফয়েজের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি।
এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিজুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন অস্ত্রধারী? পত্রিকায় প্রকাশিত ছবির কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, না এখনও কোন মামলা হয় নি। কোনপক্ষের ছিল তা-ও শনাক্ত করা যায়নি। তবে ওই অস্ত্রধারীকে খোঁজা হচ্ছে বলে। এ ছাড়া বকশীবাজারের সংঘর্ষে পত্রিকায় প্রকাশিত ওই ছবির বামপাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান পিকুল, পেছনে জহুরুল হক হলের সভাপতি রিফাত জামানকে দেখা গেছে।

আসামে আদিবাসীরা পালাচ্ছেন, মৃত ৮৩

(জঙ্গি হামলার পর আসামের শোণিতপুরের তেঙ্গানালা গ্রাম থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন গ্রামবাসী। বুধবার তোলা ছবি। ছবি: এএফপি) ভারতের আসাম রাজ্যের কোকড়াঝাড় ও শোণিতপুর জেলার বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮৩ জনে পৌঁছেছে। গত মঙ্গলবার রাতে কয়েকটি গ্রামে অস্ত্রধারীদের হামলায় ও গতকাল বুধবার পুলিশের গুলিতে তাঁরা নিহত হন। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোড়োল্যান্ড (এনডিএফবি) এ হামলা চালায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। মঙ্গলবারের ওই হামলার পর আসামজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। জারি করা হয়েছে কারফিউ। এ ঘটনায় ভয় পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের আলীপুরদুয়ার জেলায় পালিয়ে এসেছেন ছয় শতাধিক আদিবাসী। তাঁদের জন্য ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। আলীপুরদুয়ারের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁদের রাখা হয়েছে। কোকড়াঝাড় শহরের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ভিটেমাটি ফেলে আশ্রয় নিয়েছে পাঁচ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আজ বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনাকবলিত আসামের শোণিতপুরে যাচ্ছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেছেন, হামলাকারী জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযান চলবে। তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আসামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির আবেদন জানিয়েছে আসাম ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। জানা গেছে, আসামে হামলার ঘটনার তদন্তে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ যাচ্ছে।

আসামে মৃতের সংখ্যা ৭০ পুলিশের গুলি, কারফিউ

(ভারতের আসাম রাজ্যের কয়েকটি গ্রামে অস্ত্রধারীদের হামলার প্রতিবাদে গতকাল সেখানে রাস্তার ওপর আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আসাম টি ট্রাইবস স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলবার রাতের ওই হামলায় নিহত হয় অন্তত ৬৫ জন l ছবি: এএফপি) ভারতের আসাম রাজ্যে সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৭০-এ। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে কয়েকটি গ্রামে অস্ত্রধারীদের হামলায় নিহত হয় ৬৫ জন। আর এর প্রতিবাদে গতকাল বুধবার লোকজন বিক্ষোভ শুরু করলে গুলি চালায় পুলিশ। এতে নিহত হয় পাঁচজন। বিচ্ছিন্নতাবাদী বোড়ো সংগঠন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোড়োল্যান্ড (এনডিএফবি) এ হামলা চালিয়েছে বলে জানায় পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজ্যের কয়েকটি অংশে গতকাল কারফিউ জারি করা হয়েছে। খবর রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির। আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শোণিতপুর ও কোকড়াঝাড় জেলার একাধিক গ্রামে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা ধরে একের পর এক হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। এতে ক্ষুব্ধ আদিবাসীরা গতকাল বিক্ষোভ করে এবং বোড়ো সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় সহিংসতায় বোড়ো সম্প্রদায়ের দুজন নিহত হয়। পুলিশ বলছে, সম্ভাব্য গোলযোগ মোকাবিলার লক্ষ্যে কারফিউ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনী।
ভারতীয় পুলিশের মহাপরিদর্শক এস এন সিং এএফপিকে বলেন, মঙ্গলবারের হামলায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তত ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘটনাস্থলে আরও লাশ পড়ে আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুলিশের একাধিক দল প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এনডিএফবি এসব হামলায় জড়িত বলে ধারণা পুলিশের। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, সশস্ত্র জঙ্গিরা গ্রামবাসীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে ফুলবাড়ি গ্রামে। সেখানে হত্যা করা হয়েছে ৩০ জনকে। প্রত্যক্ষদর্শী অনিল মুরমু বলেন, চোখের সামনে নিজের স্ত্রী ও দুই ছেলেকে মরতে দেখেছেন। তিনি খাটের তলায় লুকিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।
আসামে হামলার ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত’ আখ্যা দিয়েছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরিস্থিতির খোঁজ নিতে আসাম গেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।
ভুটান ও বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন আসামে আদিবাসী বোড়ো সম্প্রদায়, মুসলমান এবং স্থানীয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ মঙ্গলবারের হামলা সম্পর্কে বলেন, এটি সাম্প্রতিক সময়ের বর্বরতম হামলাগুলোর একটি। জঙ্গিরা শিশুদেরও ছাড় দেয়নি। হামলাকারীরা পার পাবে না।
বোড়ো জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আলাদা ভূখণ্ডের দাবিতে দশকের পর দশক ধরে সহিংস আন্দোলন করছে এনডিএফবি। তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মুসলিম ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে।
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক কে জি সুরেশ বলেন, গ্রামবাসীর ওপর হামলা চালানোর কারণ অস্পষ্ট। তবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সরকারি অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে হামলা হয়ে থাকতে পারে।

কাশবনে স্মৃতি লেখে নগরের বাউল কবি by বিমল গুহ

মানুষ জন্মগতভাবে সৌন্দর্যপিপাসু। যখন মানুষের বুদ্ধি হয়েছে, বিবেক জাগ্রত হয়েছে, তখন থেকেই সে তার কথা জানাতে চেয়েছে। গুহাবাসী মানুষের জীবনাচরণ আমাদের সেই ধারণা দেয়। দেয়ালের গায়ে তাদের নানা আঁকিবুঁকির মধ্য থেকে তা অনুমেয়। এতদিন মনের ফ্রেমে যে দৃশ্যাবলি ধারণ করত, ক্যামেরা আবিষ্কারের পর মানুষ ছবি তোলার জন্য আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ক্যামেরায় তোলা ছবি পূর্ণাঙ্গ ছবি হয় না। সে ছবিতে ফুটে ওঠে একটা রূপ, একটা দিক। কিন্তু মানুষের চোখ তার চেয়ে অনেক বেশি দেখে। এই ছবি আঁকার জন্য কেউ হাতে নেয় তুলি, কেউ হাতে তুলে নেয় কলম। কবি কলম দিয়ে জীবনের যে-ছবি লেখেন তা চিন্তাজাত বলেই এর ব্যাপ্তি বেশি। প্রকৃত কবি সমাজ সভ্যতারই রূপকার। তেমন একজন কবি অরুণাভ সরকার, সম্প্রতি লোকান্তরিত হয়েছেন। যে-কবি বাউলের বেশে ঢাকা শহরের বাসিন্দা হয়েছিলেন, চলেও গেলেন সেই বাউলের বেশেই।
বাউলেরা সৃষ্টির মাহাত্ম্যে মুগ্ধ থেকে জীবনের রূপ-রসের সন্ধান করেন, বাউল-কবি তার থেকে বড় ব্যতিক্রমী ছিলেন কি! জীবনযাপনে এক ধরনের উদাসীনতা সব সময় ছিল এই কবির। কবিতা বা লেখালেখির ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারী ছিলেন বটে, উদাসীনতার আঁচ থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি কখনও। তার কাছে পাঠকের প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু পাঠককে দিখেছেন কম। কবিতার বই মাত্র তিনটি- ১) নগরে বাউল, ২) কেউ কিছু জানে না ও ৩) নারীরা ফেরে না। মানুষের জীবন-আচরণের সব বিষয় তার কবিতার বিষয়। দৈনন্দিন জীবনযাপনের যাবতীয় দিক কবিতার ছত্রে ছত্রে নিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন কবি। ভালোবাসা তার অনুভবে ও বর্ণনায় সর্বগ্রাসী ছায়া বিস্তার করে আছে সর্বত্র। তার শিশুতোষ গ্রন্থ ‘খোকনের অভিযান’ও উল্লেখযোগ্য রচনা। রয়েছে পেশাগত সম্পাদনার বইও। তবে মূলত কবিই ছিলেন তিনি।
কবিতার প্রতি তীব্র আসক্তি কবিকে বাউল করেছে- এ কথা তো বলাই যায়! যে কারণে অন্য কোনো বিষয়ে স্থিরতা হয়নি কোনো দিন। চাকরির ক্ষেত্রে বাউল প্রকৃতি তাকে স্থানচ্যুত করেছে বার বার। সাংবাদিতাই ছিল পেশা। কবিতার নেশার কারণে একটি সাহিত্যপত্রিকা দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন। পত্রিকার নাম- ঈষিকা। দেখা হলেই ‘ঈষিকা’র জন্য কবিতা চাই। আমাকে বেশি স্নেহই করে ফেলেছিলেন কবি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে নানা অভিযোগ। ফোন করিনি কেন! কবিতা পাঠাইনি কেন- এসব। ‘ঈষিকা’ ক্ষীণাঙ্গি হলেও মানসম্পন্ন কবিতা পত্রিকা। নামটা আমারও বেশ পছন্দের ছিল। এত পছন্দ যে, আমরা ১৯৮৩ সালে জন্মগ্রহণকারী আমাদের বড় মেয়ের নামই রেখেছি- ‘ঈষিকা’। কবিতা পত্রিকা ‘ঈষিকা’র আয়ুস্কাল ছিল ১৯৮৫ পর্যন্ত। আমার ঈষিকা এখন বড় হয়েছে। শুরুতে নিয়মিত শিশুতোষ সাহিত্যচর্চ্চা করত, এখন কম। আমার ঈষিকার ছড়ার বইও আছে একটা- ‘ছড়ার নাচন হাওয়ার নাচন’। অরুণদা তাতেই খুশি ছিলেন। বলতেন- অন্তত আপনার ঈষিকা বড় হচ্ছে। অরুণদা বরাবর আমাকে ‘আপনি’ই সম্বোধন করতেন! তবুও অগ্রজের স্নেহ থেকে কখনও বঞ্চিত হয়নি। দাদা যখন বেশ অসুস্থ, বৌদিকে নাকি বলতেন- বিমলকে ফোন ধরে দাও। এই অসুস্থতার মধ্যেও কথা হয়েছে। এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন- তা কি করে ভাবি! ফোনে বলেছিলেন বার বার- ‘বিমল একবার আসবেন আপনার সঙ্গে কথা আছে’! যাব যাব করেই কেটে গেল দুই সপ্তাহ। যাওয়া হল না, কী কথা তাও জানতে পারলাম না আর। মাফ করে দেবেন- অরুণদা!
কবি অরুণাভ সরকারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে। আমি তখন মতিঝিলে একটি বেসরকারি দফতরে চাকরি করতাম। ছিলাম মাত্র ছয় মাস। দেখি- এক দুপুরে আমার খোঁজে এসেছেন একজন কেউ। লম্বা গোছের মানুষ- অতি বিনয়ী। দেখেই পরিচয় দিলেন- ‘আমি অরুণ। মুখের দিকে তাকাতেই আবার বললেন- অরুণাভ সরকার’। আমি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। কবির লেখার সঙ্গে আমার আগেই পরিচয় ছিল। বললাম- আপনি আমার প্রিয় কবি। আমার ঠিকানা...? বললেন- কবি আহসান হাবীবের কাছে জেনেছি। এর আগের সপ্তাহে দৈনিক বাংলা’র সাহিত্য পৃষ্ঠায় আমার কবিতা পড়ে সেদিন আমাকে স্নেহের পরশে জড়িয়ে নিয়েছেন অরুণদা। তিনি নাকি কবি আহসান হাবীবের কাছে জানতে চেয়েছেন- কে এই তরুণ? হাবীব ভাই বলেছিলেন না কি- চট্টগ্রাম থেকে আসা এই ছেলে নিয়মিত লিখছে, সম্প্রতি চাকরিতে যোগদান করেছে ‘পদ্মা প্রিন্টার্সে’, মতিঝিলে অফিস। সেই মহৎ হৃদয়ের অরুণ’দা- এক অর্বাচীনকে খুঁজতে এসেছেন মতিঝিলে! আমি তো আপ্লুুত! সেই থেকে আমি পেয়েছি একজন আপন আত্মীয়কে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছি আগের বছর। এক আত্মীয়ের সুবাদে এই অস্থায়ী কাজে যোগদান। ঢাকা এসে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম কবি আহসান হাবীবকে। হাবীব ভাইয়ের কাছে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। প্রকৃত অভিভাবকই বটে। গেলে প্রথমেই খোঁজ নিতেন আমার কিছু হল কি না! তাই চাকরিতে যোগদানের খবর হাবীব ভাইকেই দিয়েছি সবার আগে। সেখানে আমার পরিচয় কবি নাসির আহমেদের সঙ্গে, পরে বন্ধুত্ব। হাবীব ভাইয়ের কাছে কবিতার পরীক্ষাও দিতে হয়েছে বহুবার। এমনও হয়েছে- কবিতা হাতে দিলেই নাসির আহমেদকে দিয়ে বলতেন- পড়। নিজের উপস্থিতিতে এই পরীক্ষা বড় কঠিনই ছিল! পরে অরুণদার সঙ্গে দু’একবার হাবীব ভাইয়ের দফতরেও দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। সাহিত্যের কথাই হতো। পরিমাণে কম লিখলেও সাহিত্যপ্রাণ মানুষ বলতে যা বোঝায়- অরুণদা তা-ই ছিলেন। কবিতা শুদ্ধতাই বিশ্বাস করতেন বলে কখনও আমার লেখা তার পছন্দ হলে বা পছন্দ না হলে ফোন করে খুশির প্রকাশ করতেন অথবা অভিযোগ করতেন। বলা যায়- প্রিয় অগ্রজের এক ধরনের শাসন! আমাকে ফোনে না পেলে আমার বন্ধু- যাকে অরুণদা সমান ভালোবাসতেন বা বেশি ভালোবাসতেন- কবি ফারুক মাহমুদ, তাকে বলতেন ও যেন আমাকে জানায়- অরুণদাকে শিগগিরই ফোন করতে। স্নেহের এই ভালোবাসার মানুষটিকে আর কখনও পাব না- তা ভাবলে মনটা হুহু করে ওঠে! অরুণদা, আপনি নেই, আপনার কবিতা আমাদের সাথী হয়ে থাকল!