Monday, August 24, 2026

ফিলিস্তিনের মানুষের গল্প বাঁচিয়ে রাখতে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ by রবিউল কমল

গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংসের মধ্যেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন লেখক হুসাম মারুফ।

১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক লেখায় নিজের এই উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে মারুফ পরিবারের সঙ্গে রাফাহ শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। চারপাশে তখন গোলাবর্ষণ চলছিল। প্রতিদিনই তাঁর মনে হতো, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

তবে শুধু মৃত্যুর ভয়ই তাঁকে ভাবিয়ে তুলছিল না। তাঁর ভয় ছিল, নিজের লেখা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই যদি তিনি মারা যান, তাহলে তাঁর গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলোও হয়তো হারিয়ে যাবে।

মারুফ মনে করেন, একজন মানুষের মৃত্যু আর তাঁর স্মৃতি মুছে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন মানুষ মারা যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর জীবন, ভালোবাসা, ভয়, স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতার চিহ্নগুলোও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সেটি আরও বড় ক্ষতি।

গাজায় তখন অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগার ধ্বংস হচ্ছিল। লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও থেমে যাচ্ছিল। তখনই মারুফের মনে প্রশ্ন আসে, এই সময়ের মানুষের গল্পগুলো কে সংরক্ষণ করবে?

এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘গাজা পাবলিকেশনস’।

গাজার ভেতরে তখন বই ছাপার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই মারুফ সিদ্ধান্ত নেন, বই গাজার বাইরে ছাপা হবে। তবে সম্পাদনা, নকশা ও অন্যান্য কাজ গাজা থেকেই শুরু করা হবে।

তিনি একজন সম্পাদক, প্রুফ রিডার, ডিজাইনার, বিপণনকর্মী এবং মুদ্রণ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করেন। তাঁদের কয়েকজনকে তিনি আগে চিনতেন না। কিন্তু সবাই উদ্যোগটির গুরুত্ব বুঝে স্বেচ্ছায় যুক্ত হন।

শুরুতে খুব অল্প সামর্থ্য নিয়েই কাজ শুরু হয়। তৈরি করা হয় একটি সাধারণ লোগো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ। এরপর এমন বই খোঁজা শুরু হয়, যেগুলোতে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের জীবন ও অভিজ্ঞতার কথা আছে।

‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর লোগোতে রয়েছে একটি বালুঘড়ি। তবে সেখানে বালু নিচে পড়ে না। মাঝখানে একটি বাধা থাকায় বালু আটকে থাকে। মারুফের কাছে এই বালুঘড়ি গাজার যুদ্ধকালীন জীবনের প্রতীক।

তাঁর মতে, গাজায় তখন সময় যেন থেমে গিয়েছিল। কাজ, পড়ালেখা, সামাজিক জীবন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কেবল বর্তমান মুহূর্তটি পার করার চেষ্টা করছিল।

প্রকাশনাটির প্রথম বই ছিল আমের আল-মাসরির ‘দ্য ম্যান হু লুকড ব্যাক’। বইটিতে কেবল বোমা হামলার কথা নেই। যুদ্ধের মধ্যে মানুষের ভয়, পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং নিজের পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টার কথাও রয়েছে।

বইটি প্রকাশের দিনই মারুফ জানতে পারেন, তাঁর এক কাজিনের মেয়ে ও সন্তানেরা বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। একই দিনে তাঁকে দুটি বিপরীত অনুভূতি সামলাতে হয়। একদিকে আনন্দ—গাজা থেকে একটি বই বের হয়ে পৃথিবীর পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে গভীর শোক—একটি পুরো পরিবার হারিয়ে গেছে।

সেদিনই তাঁর কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, বই প্রকাশের কাজটি শুধু সাহিত্য প্রকাশের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্মৃতি ধরে রাখারও একটি চেষ্টা।

দ্বিতীয় বই ছিল রেহাম আল-সাবির উপন্যাস ‘আই অ্যাম অ্যাট ইউর ডোর’। এতে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি নারীদের জীবনের কথা বলা হয়েছে। বাস্তুচ্যুতি ও ভয় ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সমস্যাগুলোও উঠে এসেছে।

যেমন স্যানিটারি প্যাড, সাবান, ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পুর মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব। স্বাভাবিক সময়ে এসব সাধারণ জিনিস হলেও যুদ্ধের সময় এগুলোর অভাব নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা ও মর্যাদায় বড় প্রভাব ফেলে।

তৃতীয় বই ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য সি শু’ লিখেছেন ফিলিস্তিনি লেখক বিসান নাতিল। শিশুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই বইয়ে শরণার্থীশিবিরের শিশুদের জীবন উঠে এসেছে। বাড়ি হারানো, বোমা হামলার ভয়, ক্ষুধা, পানির সংকট, খেলতে না পারা—সবকিছুর পাশাপাশি বইটিতে শিশুদের ছোট ছোট অনুভূতির কথাও বলা হয়েছে।

‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর কাজ চালাতে গিয়ে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেত, দলের সদস্যদের সঙ্গে দিনের পর দিন যোগাযোগ করা যেত না। একবার দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর তাঁরা ভেবেছিলেন, মারুফ হয়তো মারা গেছেন। পরে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়, কাজও আবার শুরু হয়।

বইগুলো পোল্যান্ডে ছাপা হয়েছে। এরপর জার্মানি, জর্ডান ও কায়রোর বিভিন্ন বিতরণকেন্দ্রের মাধ্যমে সেগুলো পাঠকদের কাছে পৌঁছেছে। বইগুলো নিয়ে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান মারুফ।

পরে নিজের পুরোনো বাড়ির জায়গায় ফিরে তিনি দেখেন, পুরো বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি গাছ এবং তার পাশে ছোট আরেকটি গাছ তখনো দাঁড়িয়ে আছে।

সেই ছোট গাছটির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, লেখাও অনেকটা এমন। লেখা যুদ্ধ থামাতে পারে না। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু চারপাশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও পরিচয় ধরে রাখতে পারে।

মারুফের কাছে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ সেই কাজটিই করছে—যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও যেন মানুষ কেবল সংখ্যা হয়ে হারিয়ে না যায়, বরং তার গল্প পৃথিবীর কাছে থেকে যায়।

(লিটারেরি হাবে প্রকাশিত হুসাম মারুফের কলাম অবলম্বনে)

গাজার প্রকাশনা সংস্থা ‘গাজা পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ও হুসাম মারুফের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গাজার প্রকাশনা সংস্থা ‘গাজা পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ও হুসাম মারুফের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে

আল–জাজিরাঃ মৃত বাবাকে কোথায় কবর দেবেন, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। তাঁর বাবা মোহাম্মদকে (৪০) গাজার ইয়েলো লাইনের কাছে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলিরা।

মোহাম্মদ গাজা নগরীর জায়তুন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। গত ১০ জুন ইসরায়েলিদের নির্ধারিত সামরিক এলাকা ইয়েলো লাইনের পাশে ফুটপাতের একটি দোকানে চা ও কফি বিক্রি করছিলেন। আচমকা একটি বুলেট এসে তাঁর ঘাড়ে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মারা যান।

ওমর তাঁর বাবার মরদেহ দাফনের জন্য জায়তুন করবস্থানে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, একের পর এক মরদেহে ঠাসা পুরো কবরস্থান। কোথাও একটুকরা জায়গা ফাঁকা নেই। এখানে শায়িত বেশির ভাগই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার।

জায়গার অভাব এবং যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে বেশির ভাগ কবর শুধু একটি পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। আর সেই পাথরে নিহত ব্যক্তির নাম লেখা একটি কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে।

ওমর আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, চারদিকে শুধু কবর আর কবর। চারদিকে বালুর স্তূপ, আর তার নিচেই দাফন করা হয়েছে মানুষের মরদেহ।’

ওমর আরও বলেন, যুদ্ধের আগে যেভাবে একটি কবর তৈরি বা প্রস্তুত করা হতো তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই। একটি কবরের ওপর শুধু পাথরের টুকরা রেখে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর এক টুকরা কাগজে নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় লিখে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে গাজায় একটি কবর প্রস্তুত করতে প্রায় ৫০০ শেকেল (১৬৭ মার্কিন ডলার) খরচ হয়। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই তাদের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।

ওমর বলেন, ‘সেখানে নতুন কোনো কবরের জায়গা ছিল না। তাই দাদার কবরেই বাবাকে দাফন করতে বাধ্য হয়েছি।’

গাজায় সব ধরনের নাগরিক পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এবং অনবরত ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকির কারণে যুদ্ধের সময় নিহত হাজারো ফিলিস্তিনির মরদেহ শনাক্ত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার তাঁদের স্বজনদের মরদেহ বাড়িঘরের আঙিনায়, তাঁবুর পাশে, উদ্বাস্তু শিবিরের মাঠে, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তখন পরিবারগুলো বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এবং অস্থায়ী কবর থেকে তাঁদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে কবরস্থানে নিয়ে দাফন করার সুযোগ পান।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত আরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জন্য দাফনের জায়গার প্রয়োজন ছিল। গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালের চত্বরে থাকা ৭টি গণকবর থেকে এ পর্যন্ত ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সহিংসতা কমায় মোহাম্মদের পরিবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে যথাযথ মর্যাদায় দাফনের জন্য কবরস্থানে নিয়ে যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি কবরস্থানগুলোও। ফলে এত মানুষের মরদেহ দাফনের জন্য কবরের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোয় কবরস্থানে প্রবেশেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এতে পরিবারগুলোর জন্য স্বজনদের দাফনের জায়গা খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় লাখো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের আশ্রয় দিতে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত অনেক জায়গাকে উদ্বাস্তু শিবিরে পরিণত করা হয়েছে।

গাজার কর্তৃপক্ষ বলেছেন, কবরের ফলক তৈরির পাথরসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকট রয়েছে। এ কারণে এখন একটি কবর তৈরিতে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল বা প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার খরচ হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করা হচ্ছে। পরে অর্থের ব্যবস্থা হলে স্থায়ী কবরের ফলক বসানো হচ্ছে।

গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোই যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল বলেন, নতুন কবরস্থান তৈরি করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

মন্ত্রণালয় নতুন কবরের জায়গা খুঁজছে। একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো কবরস্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। তবে ইচ্ছেমতো মরদেহ সরানো যায় না। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ কাজ করতে হয়।

গাজার খান ইউনিস কবরস্থানে ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করেন তাফেশ আবু হাতাব। তাঁর পুরো কর্মজীবনে গাজা যুদ্ধের মতো এত কঠিন সময় আর কখনো আসেনি।

যুদ্ধ শুরুর সময় কবরস্থানটিতে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। যুদ্ধের একপর্যায়ে তাফেশকে দিনে প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর খুঁড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাত আমরা কখনো দেখিনি। প্রতিদিনই কয়েক ডজন শহীদকে এখানে দাফন করতে হচ্ছে।’

তাফেশ যাঁদের জন্য কবর খুঁড়েছেন তাঁদের বড় একটি অংশ নারী ও শিশু। কখনো কখনো একটি পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে দাফন করতে হয়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪
ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

মার্কিন কোম্পানিগুলোয় হামলার হুমকি দিল ইরান

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তিতে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করলে মার্কিন কোম্পানিগুলোয় হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা যদি ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে তাদেরও শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের স্বার্থে আঘাত হানা হবে।

বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন মাত্রায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ আরোপ করা হবে। এর পর শনিবার রেজায়ি দাবি করেন, যুদ্ধে ইরানের হাতে এখনো অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা শুধু সামরিক ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানের আশপাশে এবং অন্যান্য জায়গায় রয়েছে। আমরা সেগুলোয় হামলা চালাব।’

ট্রাম্প তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ভূমিকম্পের মতো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন রেজায়ি।

কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম ইরান মার্কিন ও পশ্চিমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি দিল বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির তেল কোম্পানিগুলোর কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ইরানি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা সাইবার হামলা চালিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দিন বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এর আগে বুধবার ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, যেসব দেশ ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন এবং মিত্র দেশগুলোকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

ইরান অবশ্য কোন কোন মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা হামলার লক্ষ্য হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারিতে ইরান বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের কয়েকটি তথ্যকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতেও হামলার হুমকি দিয়েছিল তারা। তবে সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনার বাইরে মার্কিন স্বার্থে বড় ধরনের হামলা থেকে এত দিন তেহরান বিরত ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর ওপর হামলার আশঙ্কা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে।

ইরান এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র এবং সৌদি আরবের আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।

শনিবার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়িও মার্কিন বিমান ও জ্বালানি পরিবহনকারী ট্যাংকারকে আশ্রয় দেওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, পরে হামলার শিকার হলে তারা যেন অভিযোগ না করে। এমনকি বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শনিবার তিনি দাবি করেন, বিশ্ব ইতোমধ্যে ইরানের বিজয় মেনে নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘৃণিত হয়ে পড়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চালু থাকলেও তাতে তেহরানকে নত করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে চুক্তিতে বাধ্য করার চেষ্টা তাই কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ

তেহরানের জমহুরি সড়কের পাশে একটি বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ
তেহরানের জমহুরি সড়কের পাশে একটি বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

সামরিক দিক থেকে তুরস্ক এত শক্তিশালী হলো কীভাবে

তুরস্ক এখন শুধু ন্যাটোর বড় সামরিক শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলেও নিজেদের সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। দেশটির হাতে বিপুলসংখ্যক সেনা, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন রয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত শক্তিশালী করছে আঙ্কারা।

২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, তুরস্কের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার। এর সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার রিজার্ভ সেনা এবং দেড় লাখের মতো আধাসামরিক সদস্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।

স্থলবাহিনী তুরস্কের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির কাছে প্রায় ২ হাজার ২৮৪টি ট্যাংক এবং প্রায় ৯৮ হাজার বিভিন্ন ধরনের সামরিক যান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এক হাজারের বেশি স্বচালিত কামান, ৬৩৫টি টানা কামান এবং ২৩৭টি রকেট লঞ্চার।

আকাশপথেও তুরস্কের শক্তি বড়। দেশটির সামরিক বহরে প্রায় ১ হাজার ১০১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১টি যুদ্ধবিমান, ৮৪টি পরিবহন বিমান, ৩০১টি প্রশিক্ষণ বিমান এবং ৫০৯টি হেলিকপ্টার রয়েছে। তুরস্কের যুদ্ধবিমান বহরের মূল শক্তি এখনো এফ-১৬। পাশাপাশি নিজেদের তৈরি কেএএএন যুদ্ধবিমানও উন্নয়ন করছে দেশটি।

তবে তুরস্কের সামরিক শক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ড্রোন। দেশটির বায়কার কোম্পানির তৈরি বায়রাকতার টিবি-২ বিশ্বের পরিচিত সামরিক ড্রোনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তুরস্ক এখন বিভিন্ন দেশে এসব ড্রোন রপ্তানিও করছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

নৌবাহিনীতেও তুরস্কের বড় উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির নৌবহরে প্রায় ১৯২টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ফ্রিগেট, ৯টি করভেট এবং ১৪টি সাবমেরিন। কৃষ্ণসাগর, এজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের নৌবাহিনী সক্রিয়। বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালির নিয়ন্ত্রণও দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

তুরস্ক এখন নিজের অস্ত্র নিজেই তৈরির দিকে এগোচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি কোম্পানি কাজ করছে এবং প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। দুই দশক আগে যেখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি সামরিক সরঞ্জামের অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, এখন তা ৮৫ শতাংশের বেশি বলে তুরস্কের সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তুরস্কের সামরিক শক্তির পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থান করার পাশাপাশি দেশটির সীমান্ত রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, জর্জিয়া ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, বলকান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। তুরস্ক বহু বছর ধরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে এবং সিরিয়া ও ইরাকের উত্তরাঞ্চলেও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক প্রযুক্তির সুবিধাও পাচ্ছে দেশটি।

তবে শুধু ট্যাংক, বিমান বা যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক শক্তি পুরোপুরি বোঝা যায় না। এসব অস্ত্রের কতগুলো কার্যকর, আধুনিক যুদ্ধে কতটা সক্ষম এবং বিভিন্ন বাহিনী কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ওয়াইনেট নিউজ

ছবি: এপি
ছবি: এপি

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তিন ধাপে ব্যবস্থা নেবে তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনো দেশ যোগ দিলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভূমিকম্পসম’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তেহরান তিনটি ধাপ অনুসরণ করবে।

গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজাই এ হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান। রেজাই বলেন, কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

ইরানের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্ত হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথও এর আওতায় আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

তিন ধাপে পাল্টা ব্যবস্থা

ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল তিন ধাপে এগোবে বলে জানিয়েছেন রেজাই। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান।

তিনি বলেন, প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে আসার আহ্বান জানানো হবে। তারা এতে সাড়া না দিলে পরবর্তী ধাপে হামলা চালিয়ে ওই দেশের স্বার্থে আঘাত করা হবে।

রেজাইয়ের বক্তব্যে বিকল্প রপ্তানি পথের কথা উল্লেখ করায় বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। লোহিত সাগরে প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এবং এর ওপর আরোপিত অবরোধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক বার্তা দিতে চাইছে। তার ভাষ্য, কোনো সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিকেও ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

আজিজির মতে, ইরানের নতুন সামরিক কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি হলো সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকাতে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যটি হলো হামলা হলে তার চেয়ে বেশি মাত্রায় পাল্টা আঘাত করে প্রতিপক্ষের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

তার ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলে ইরানের হুঁশিয়ারি মূলত একটি ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’। ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো আরও এক দফা সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।

চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানের প্রতিবেশী এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাতের কারণে ক্রমেই কঠিন অবস্থার মুখে পড়ছে। তারা একদিকে ইরানের হামলার নিন্দা করছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতেও চাইছে না।

কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়।

গত সপ্তাহে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে ইরান। এর আগে ২০২২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।

অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখাই নিরাপদ, এমন হিসাব থেকেই ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। ইরানের সঙ্গে তাদের পাশাপাশি বসবাস ও কাজ করতেই হবে।

তার মতে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো তা চায় না। বরং তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী অংশকে দুর্বল করতে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে থাকতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সংকট সমাধানে কূটনীতির ওপর আস্থা কম থাকলেও এ অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে পারবে না।

তার মতে, এই বাস্তবতাই সংঘাতকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে ঠেকাবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল মজুতের পরিমাণও কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কারও জন্যই আকর্ষণীয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি

ইরানের হুঁশিয়ারির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পরদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই সুরে বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।’

ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা চীনের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনে থাকে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রোববার বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ রয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, মার্কিন হামলার মুখে ইরানের সরকার ভেঙে পড়বে এবং দেশটি ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরানের প্রতিরোধ, সংহতি ও ঐক্য বিশ্বকে বিস্মিত করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। জাতিসংঘও বিভিন্ন সময়ে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানি বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ এবং দেশটির প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি পণ্য আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরের বছর মার্কিন কংগ্রেস এমন আইন পাস করে, যাতে ইরানের জ্বালানি খাতে বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদও জব্দ করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) সই করে। চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।

তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর আবারও সব নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনেন। তেহরানের বিরুদ্ধে শুরু করেন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি।

২০১৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা খাত এবং দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনও ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।

গত সেপ্টেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বর্তমান সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন করে বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কতটা অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ধরে রাখবে, সেটিই এখন আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: আল জাজিরা

ছবি: আলজাজিরা থেকে নেওয়া।
ছবি: আল জাজিরা থেকে নেওয়া।

ভাই–বোন না থাকলে জীবনের যে ৭টি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবেন by আবৃতি আহমেদ

জীবনে যে সংকটই আসুক, ভাই-বোন পাশে থাকলে সবকিছুই সহজ হয়ে যায়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ভাই বা বোনটি মুখে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে যে আপনার কোনো ক্ষতি হলে তাদের কিছুই আসে যায় না। তাদের সেই সামান্য খোঁচা মারা কথা কিন্তু মুহূর্তেই আপনাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। ভালোবাসা, বিশ্বাস ও জীবন নিয়ে আপনাকে সে এমন কিছু শিক্ষা দিতে পারে, যা অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।

১. নিঃসংকোচ সত্যবাদিতাই সত্যিকারের ভালোবাসা

‘রেড ফ্ল্যাগ! ভুলে যাও’—কোনো কিছু না ভেবে সরাসরি এমন কথা শুধু ভাই-বোনেরাই বলে। আপনার পছন্দের মানুষটির ব্যাপারে কোনো দ্বিধা ছাড়াই আপনাকে সে সাবধান করবে। বলবে, ‘ও ছেলে বা মেয়েটি তোমার জন্য নয়।’ ভাই-বোনেরা কখনো মিষ্টি কথা বলে আপনাকে সান্ত্বনা দেবে না। তাদের সেই নির্মম সত্যবাদিতায় বিরক্ত হয়ে মাঝেমধ্যে নিজের অস্তিত্ব গোপন করতে ইচ্ছা করলেও মন তো ঠিকই জানে যে এটা আসলে একধরনের গভীর ভালোবাসা।

২. উচ্চবাচ্য না করেও অনুগত হওয়া যায়

হয়তো সে আপনার জন্মদিন ভুলে যাবে, কিন্তু আপনার মন ভেঙেছে শুনে ঠিকই রাত তিনটায় আপনার কাছে হাজির হবে। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ঘুরতে যাওয়া বাতিল করলেও দেখবেন বাসায় আপনার পছন্দের খাবার হাতে নিয়ে ফিরবে। ভাই-বোনেরা শেখায়, আনুগত্য কোনো দেখানোর জিনিস নয়, এটা আসলে অভ্যাস। এটা সেই নিশ্চয়তা দেয় যে কেউ একজন সব সময় আপনার পাশে আছে।

৩. হিংসা করে, আবার উৎসাহও দেয়

একসঙ্গে বড় হওয়ার দরুন অনেক পরিবারেই ভাইবোনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কাজ করে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতে মাঝেমধ্যে হিংসা ভাব আসাও স্বাভাবিক। কেউ প্রকাশ না করলেও একজনের ভালো ফল, ভালো চাকরি অন্যজনকে সাময়িকভাবে অপ্রস্তুত করে। তবে এমন মনোভাব দ্রুত কাটিয়ে উঠে ভাই–বোনের সাফল্যে আনন্দিত হই আমরা। নিজে সংগ্রাম করলেও অন্যের সাফল্যে হাসিমুখে আনন্দ করতে এবং উৎসাহ দিতে শিখি।

৪. ক্ষমা করতে শেখায়

প্রিয় পোশাক নষ্ট করেছে কিংবা আপনার সবচেয়ে গোপন কথাটি হয়তো মা–বাবাকে সে-ই বলে দিয়েছে। রাগ করে ‘আর কোনো দিন কথা বলব না’ ঘোষণা দিয়েও ঠিক পরদিনই কিন্তু তার সঙ্গে আবার কথা বলছেন। ক্ষমা যে কোনো নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি নয়; বরং জীবনে এগিয়ে যাওয়ার এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি কৌশলমাত্র, ভাই–বোনের সম্পর্ক আমাদের তা–ই শেখায়।

৫. সবকিছু ভাগ করে নেওয়া

শোবার ঘর থেকে জন্মদিনের কেক, টিভির রিমোট থেকে শুরু করে মানসিক আঘাত—ভাই–বোনের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই চলতে থাকে ভাগাভাগির এই শিক্ষা। কীভাবে আলোচনা করতে হয়, আপস করতে হয় এবং মিটমাট করতে হয়, সবই শেখায় এই সম্পর্ক।
৬.ভালো সম্পর্ক গড়তে একমত হওয়া জরুরি নয়

সম্পূর্ণ ভিন্ন মতামত নিয়ে ঝগড়া করেও কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায়, একে অপরকে ভালোবাসা যায়, এই শিক্ষা আপনি আপনার ভাই–বোনের কাছেই পেয়ে থাকেন। সম্পর্ক রাখার জন্য যে সব সময় একই মানসিকতা থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

৭. ভালোবাসার অনেক রূপ

সব ভালোবাসার ভাষা কাব্যিক নয়। কখনো কেকের বড় টুকরা রেখে দেওয়া, মায়ের বকা থেকে বাঁচানো, কখনো আবার খুনসুটি, গুঁতোগুঁতির মধ্যেও ভালোবাসা লুকানো থাকে। ভালোবাসা প্রকাশের যে অনেক রূপ হতে পারে, তা প্রথমত ভাই-বোনই শেখায়।

সূত্র: ফেমিনা

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-10%2Fee94a397-609e-48d8-94a1-b2df66f21832%2F_SY_7375.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভাইবোনের মতো মধুর সম্পর্ক পৃথিবীতে আর নেই। ছবি: অধুনা

মধ্যপ্রাচ্যে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি ছোট গুদামে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছেন শ্রমিকেরা। তাদের কাজ—থ্রিডি প্রিন্টেড বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে 'ইন্টারসেপ্টর' তৈরি করা, যা ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতিতে উড়ে এসে আকাশে ধ্বংস করতে পারে ইরানি ড্রোন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি ‘পাওয়ারআস’ কম খরচে ড্রোন ধ্বংসকারী এই অস্ত্র তৈরির জন্য গত মাসে আরব আমিরাতে এই কারখানা চালু করেছে। বিশ্বজুড়ে অস্ত্র সরবরাহের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে এটি তাদের প্রথম প্রবেশ। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী কারখানাগুলো বর্তমানে মাসে প্রায় ৩ হাজার ড্রোন ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বজুড়ে উৎপাদন বাড়িয়ে মাসে ১৫ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তবে আমিরাতে তাদের গ্রাহক ও চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ্যে আনেনি কোম্পানিটি।

প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর

প্রতিরক্ষা শিল্প সাধারণত ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ খরচের জন্য পরিচিত। কিন্তু মিত্রদেশগুলোর জরুরি চাহিদা মেটাতে সেই ধারা বদলাচ্ছে পাওয়ারআস। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা তৈরি করে অস্ত্র রপ্তানি করার পরিবর্তে তারা যে অঞ্চলে প্রয়োজন, সেখানকার স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের সঙ্গেই অংশীদারত্ব তৈরি করছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমিরাতের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধে এ পর্যন্ত আমিরাতের বিভিন্ন লক্ষ্যে ৫০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হয়েছেন, বন্ধ হয়েছে একটি তেল শোধনাগার এবং ধ্বংস হয়েছে অ্যামাজনের দুটি ডাটা সেন্টার। মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে আসায় এখন বিকল্প ও দ্রুত সরবরাহের ইন্টারসেপ্টরের চাহিদা সেখানে তীব্র।

লোগো খেলনার মতো সহজে জোড়া দেওয়া প্রযুক্তি

ইন্টারসেপ্টর হলো ছোট আকারের এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই আকাশে ড্রোন বা হুমকিকে ধ্বংস করে। পাওয়ারআস ‘গার্ডিয়ান’ নামের যে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করেছে, তার প্রতিটির খরচ মাত্র ৫ হাজার ডলার (প্রায় ৬ লাখ টাকা)। ইউক্রেনে রাশিয়ার 'শাহেদ' ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়া এক নকশার ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি।

এই গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টরগুলো তৈরি করা বেশ সহজ, সাধারণ 'লোগো' খেলনার মতো যন্ত্রাংশগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি আটকে দেওয়া যায়। এতে সহজে বাজারে পাওয়া যায় এমন মাইক্রোচিপ ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি লকহিদ মার্টিনের প্যাক-৩-এর মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে না পারলেও, ইরানের বহুল ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোন ধ্বংসে দারুণ কার্যকর।

যৌথ উৎপাদন ও বিশ্ববাজার

পাওয়ারআসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিনেনস্কি জানান, আমিরাতের কারখানায় মূলত ফিলিপাইন ও চীনের শ্রমিকেরা দিনে প্রায় ৩০টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছেন, যা শিগগিরই ১০০-তে উন্নীত করা হবে।

কোম্পানিটি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায় ২২ মিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্যিক চুক্তি সই করেছে। এছাড়া ভারতের মুম্বাইয়ের কাছে একটি প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েও তারা ইন্টারসেপ্টর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

এমনকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘লকহিদ মার্টিন’ ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে তাদের ২০ লাখ ডলার মূল্যের সেই মডেলটির পরীক্ষা ২০২৮ সালের আগে সম্ভব নয়।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’ আমিরাতে তাদের ‘কয়োটি’ ইন্টারসেপ্টর তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রতিটির আনুমানিক খরচ ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ ডলার। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ ‘নেরোস’ ৫ হাজার ডলারে ‘ব্যান্ডিট’ নামে আরেকটি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন বানাচ্ছে।

ব্যবসার পেছনের ট্রাম্প সংযোগ

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই 'পাওয়ারআস' শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গলফ কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওরিয়াস গ্রিনওয়ে হোল্ডিংস’-এর সঙ্গে একীভূত হয়। এই চুক্তির মধ্যস্থতা করে 'ডোমিনারি সিকিউরিটিজ' নামে একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, যার অংশীদার ও উপদেষ্টা বোর্ডে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বড় ছেলে—ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প।

এছাড়া কোম্পানিটির উপদেষ্টা বোর্ডে যোগ দিয়েছেন সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলগ। গত জুনে ট্রাম্প জুনিয়রের উপদেষ্টা থাকা ‘আনইউজুয়াল মেশিনস’ নামে একটি ড্রোন যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারআসে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। চলতি মাসে মার্কিন বিমান বাহিনীর কাছে ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের জন্য ৯০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্যের একটি চুক্তিও সই করেছে তারা।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পাওয়ারআস

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালালে পাওয়ারআসের বীজ বপন করা হয়। চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান 'উইশিল্ড'-এর মালিক মাইকেল সিনেনস্কি ও তার বন্ধু রোমান ভিনফেল্ড ইউক্রেনে গিয়ে ড্রোন যুদ্ধের তীব্রতা চাক্ষুস করেন এবং তাদের নিজেদের মানবিক সহায়তার গুদামটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

পরবর্তীতে সেখানে মার্কিন সেনা স্পেশাল অপারেশনের সাবেক সদস্য ব্রেট ভেলিকভিচ, অ্যান্ড্রু ফক্স এবং জিব মারমের সঙ্গে পরিচয় হয়। পাঁচজন মিলে গঠন করেন পাওয়ারআস। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি লাইসেন্স করে এবং 'ট্যান্ডেম ডিফেন্স' ও 'কাইজেন অ্যারোস্পেস'-এর মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য নর্থ ক্যারোলিনা ও ক্যালিফোর্নিয়ার কারখানায় কাজ শুরু করেন।

সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম খরচের গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টর মূল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সম্পূরক হতে পারে, তবে বিকল্প নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো স্টেসি পেটিজন বলেন, ইরান হয়তো দ্রুতগতির জেটচালিত 'গেরান-৩' ড্রোনসহ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বড় করছে। রাশিয়া ইউক্রেনে যেভাবে একযোগে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, ইরানও সেদিকে যেতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইআইএসএস) গবেষণা সহযোগী অ্যালবার্ট ভিডাল মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো লাখ লাখ ডলারের প্যাক-৩ ব্যবহার করে মাত্র ৪০ হাজার ডলারের শাহেদ ড্রোন ধ্বংস করার অর্থনৈতিক ঝুঁকি আর নেবে না। তাদের লক্ষ্য এখন যেকোনো উপায়ে নিজস্ব প্রযুক্তি গড়ে তোলা ও স্থানীয়ভাবে কম খরচে উৎপাদন করা। 

মধ্যপ্রাচ্যে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে ইরানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্যোগে সম্প্রতি গঠিত নতুন নিরাপত্তা জোট ‘মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার জন্য ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

শনিবার লেবাননভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনের এক প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ এক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

তবে ইরান সরকার কিংবা জোটভুক্ত তিন দেশের (সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ আমন্ত্রণের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

পর্যালোচনা করছে তেহরান

ইরানের পার্লামেন্টের সংবাদ সংস্থা ‘খানে মিল্লাত’-এর প্রধান মেহদি রাহিমী আল মায়াদিনকে জানান, ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য ইরান একটি আমন্ত্রণপত্র পেয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দেশগুলো এখন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসার দিকে এগোচ্ছে।

এটিকে ইরানের কৌশলগত বিজয় হিসেবে বর্ণনা করে তিনি দাবি করেন, তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আহ্বান জানিয়ে আসছিল।

মক্কা চুক্তি কী?

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যৌথভাবে ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’ সই করেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার ও প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জোটটি গঠন করা হয়।

এই চুক্তিতে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, জোটের তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণকে সবকটি দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই মেকানিজমকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই জোট ইরান বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত হয়নি।

ইতোমধ্যেই সদস্য দেশগুলো তাদের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক সমন্বয় জোরদার করতে কাজ শুরু করেছে। এর আওতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়মিত বৈঠক, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের পারস্পরিক সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জোটের সম্প্রসারণ ও নতুন সমীকরণ

তুরস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জোটটি ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হতে পারে। এমনকি সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে মিশরের নাম প্রকাশ্যে আলোচনা করা হয়েছে।

ইরান এখন পর্যন্ত এই চুক্তি নিয়ে সতর্ক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত ১০ আগস্ট দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, নতুন এই নিরাপত্তা জোট নিয়ে তেহরানের ‘উদ্বেগের কোনো কারণ নেই’।

তার মতে, এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এখন অন্যান্য দেশগুলোও উপলব্ধি করছে।

ইরানের অন্তর্ভুক্তির খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সত্য প্রমাণিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা তিনটি দেশের উদ্যোগে এই জোট তৈরি হলেও ইরান যুক্ত হলে এটি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে পরিণত হবে।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট 

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে ইরানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

গাজায় শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে ইসরাইলের হুমকি

গাজা উপত্যকায় শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানো বন্ধ না হলে গুপ্তহত্যা বাড়ানো ও আবাসিক এলাকা খালি করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। যদিও ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গাজার কাছে উদ্ধার করা চারটি ঘুড়িতে কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি এবং এগুলো জনসাধারণের জন্য কোনো ঝুঁকিও তৈরি করেনি।

গাজার বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে শিশুরা বিনোদনের জন্য নিয়মিত ঘুড়ি ওড়ায়। সুতা ছিঁড়ে গেলে বাতাসে ভেসে ঘুড়ি সীমান্তের ওপারে ইসরাইলি এলাকায় পৌঁছাতে পারে।

ঘুড়ি, বেলুন বা ড্রোন উৎক্ষেপণ অব্যাহত থাকলে হত্যাকাণ্ড বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ। রোববার কাৎজ বলেন, বিস্ফোরক থাকুক বা না থাকুক, ‘ঘুড়ি ড্রোনের মতোই’।

হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, শিশুদের খেলনাকে আগ্রাসন চালানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরাইল।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন; ধ্বংস হয়েছে উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো।

সূত্র: আনাদোলু

গাজায় শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে ইসরাইলের হুমকি
ছবি: সংগৃহীত।

ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান আলবানিজের

গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজি । তিনি বলেছেন, এ ধরনের উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি।

মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আলবানিজি বলেন, ‘তৃতীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর দায়িত্ব রয়েছে—আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায় অনুযায়ী ইসরাইলের অবৈধ দখলদারত্বের অবসানে পদক্ষেপ নেওয়া।’

২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া একটি পরামর্শমূলক রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি এ মন্তব্য করেন। ওই রায়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারত্বকে অবৈধ বলে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে দখলদারত্ব বজায় রাখতে সহায়তা না করার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

আলবানিজি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সাধারণ পরিষদের ‘ইউনাইটিং ফর পিস’ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। গাজা ও পশ্চিম তীরের সংঘাত নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

‘ইউনাইটিং ফর পিস’ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার আওতায় নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে কোনো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে পরিষদ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

সূত্র: আনাদোলু

ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান আলবানিজের

হরমুজ প্রণালিতে ভাঙল মার্কিন শক্তির দম্ভ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর ওয়াশিংটনের হিসাব ছিল সরল—বিপুল সামরিক শক্তির প্রয়োগে তেহরানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর সেই হিসাব বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে হরমুজ প্রণালির জলসীমায়।

একটি ডুবে যাওয়া টাগবোট, প্রায় এক ডজন নাবিকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়া এবং বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থা এখন দেখিয়ে দিচ্ছে—সামরিক আধিপত্য থাকলেই যে রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত হয় না, হরমুজ সংকট তারই বড় উদাহরণ।

আত্মসমর্পণের বদলে প্রণালি বন্ধ করল ইরান

খামেনি হত্যার জবাবে ইরান আত্মসমর্পণ না করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের মালিকানাধীন কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করলে সেটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় হামলা চালায়। পাল্টা ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা এবং সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনের মতো পদক্ষেপ নেয়। নৌ অবরোধ কখনো কঠোর হয়েছে, কখনো শিথিল হয়েছে, আবার কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পুনরায় আরোপ করা হয়েছে।

এপ্রিলের মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবে, কয়েক ডজন জাহাজকে বাধা দেওয়া ও কয়েকটি জাহাজ জব্দ করা হয়। ওয়াশিংটনের হিসাব অনুযায়ী, এতে ইরানের দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এত চাপের পরো হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে পুনরায় খুলে যায়নি।

মার্কিন নৌবহরেও বাড়ছে চাপ

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব এখন দৃশ্যমান মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ জাহাজের নাবিকদের কেউ কেউ ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছেন।

দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েনে খাদ্যসংকট, দূষিত পানি, নষ্ট পাইপলাইন এবং আবাসিক এলাকায় ছত্রাকের মতো সমস্যার কথা উঠে এসেছে। নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা জাহাজে মানসিক চাপ ও অবসাদ বাড়ার কথাও জানিয়েছেন। এমনকি কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনী প্রায় ১ হাজার ৬০০ নাবিকের ঘুম ও বায়োমেট্রিক তথ্য পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে।

এসব ঘটনা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে গেছে। তবে এগুলো এমন একটি সামরিক ব্যবস্থার দৃশ্যমান চাপের প্রমাণ, যা পরিকল্পনার তুলনায় অনেক দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাতে আটকে আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এই যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির সময়সীমা বা প্রকাশ্য ‘এক্সিট প্ল্যান’ নেই। ফলে সামরিক সক্ষমতার আগে রাজনৈতিক ধৈর্য ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

হরমুজ নিয়ন্ত্রণে নতুন দাবি তেহরানের

অন্যদিকে সংকটকে কাজে লাগিয়ে ইরান এমন একটি দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যা যুদ্ধের আগে খুব কম মানুষই সম্ভব বলে মনে করতেন। তেহরান এখন কার্যত হরমুজ প্রণালির পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে। মে মাসে ইরান ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ঘোষণা দেয়, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।

তবে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালির জলসীমা ইরান ও ওমানের মধ্যে বিভক্ত। ওমানও ইরানের এই একতরফা দাবিকে সমর্থন করেনি। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুদ্ধের আগে যে ব্যবস্থায় হরমুজ পরিচালিত হতো, সেখানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা তেহরানের নেই।

প্রণালি পুনরায় খুলতে ইরানের দাবিও কঠোর। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।

এসব দাবি এমন কোনো রাষ্ট্রের অবস্থান নয়, যে রাষ্ট্র দ্রুত পতনের মুখে রয়েছে। বরং এতে এমন একটি দেশের আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠছে, যারা মনে করছে প্রতিপক্ষই তাদের আগে বিকল্পহীন হয়ে পড়ছে।

ওয়াশিংটনের সামনে তিনটি কঠিন পথ

যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর হরমুজ সংকট ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কৌশলগত ডিলেমা তৈরি করেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। অথচ এত সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও সেই নৌপথ পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংসে কার্যকর হলেও একটি রাজনৈতিক সমঝোতা আদায়ে ততটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

এখন ওয়াশিংটনের সামনে মূলত তিনটি ঝুঁকি—আরো উত্তেজনা সৃষ্টি করলে উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরো বড় ধাক্কা আসতে পারে। অন্যদিকে কোনো সমঝোতা ছাড়াই পিছু হটলে সেটিকে পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে। আর যুদ্ধ চালিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যয়ের বোঝা বাড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো এড়িয়ে চলার কথা বলেছেন, অন্যদিকে তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অবস্থানও নিয়েছেন। ফলে এখন এমন একটি সংঘাত তৈরি হয়েছে, যেখানে বিজয়ের সংজ্ঞা যেমন অস্পষ্ট, তেমনি বেরিয়ে আসার পথও অনিশ্চিত।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মানচিত্র প্রকাশ করে হরমুজ প্রণালিকে নিজের দের এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এমন বক্তব্য সামরিক বা কূটনৈতিক প্রভাবের চেয়ে ওয়াশিংটনের হতাশাই বেশি প্রকাশ করছে—এমন ব্যাখ্যাই জোরালো হচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশল

হরমুজ সংকট উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের ‘হেজিং’ বা ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তারা এখনো ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তবে একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প সম্পর্কও গড়ে তুলছে।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং সৌদি আরবের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এই চুক্তি ভবিষ্যতে উপসাগরীয় নিরাপত্তার একটি বাস্তব দ্বিতীয় স্তম্ভে পরিণত হবে, নাকি কেবল কৌশলগত ‘হেজ’ হিসেবে থাকবে—তা আগামী দিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নতুন সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পাকিস্তান

এই পরিবর্তিত সমীকরণে পাকিস্তানের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে উপসাগর, ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ইসলামাবাদ একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা আয়োজন করেছে, অন্যদিকে রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। একই সময়ে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছে পাকিস্তান।

আফগানিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থলপথে যোগাযোগ সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য এটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছু মিলিয়ে পাকিস্তানের কৌশলটি কোনো একটি শক্তির সঙ্গে পুরোপুরি জোটবদ্ধ হওয়ার বদলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে একই সময়ে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ভারসাম্য কতটা টেকসই হবে এবং তা পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের বাড়তি গুরুত্ব

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অঞ্চল যখন নিজেদের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন পাকিস্তানের এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের গুরুত্ব তার নিজস্ব সীমারেখা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যকর এবং একই সঙ্গে বেইজিং ও তেহরানের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ফলে এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে একাধিক শক্তির মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে, পাকিস্তান বিরল একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ইসলামাবাদ এই অবস্থান ব্যবহার করে হরমুজ সংকটের একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করবে, নাকি দ্বিপক্ষীয় সুবিধা আদায়েই বেশি মনোযোগ দেবে—তা পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।

সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতার বড় শিক্ষা

হরমুজ প্রণালির সংকট ছয় মাসে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু সামরিক শক্তি একা রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না।

যে নৌপথ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের কেন্দ্র ছিল, তা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। মার্কিন নৌবহরে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের চাপ দৃশ্যমান, ইরান তার দাবি আরও জোরালো করছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।

অর্থাৎ হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক জয়-পরাজয় নয়। বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক সমাপ্তির পথ ছাড়া সামরিক শক্তি একটি যুদ্ধকে শেষ করার বদলে দীর্ঘায়িত করতে পারে।

আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় নিরাপত্তার পুরোনো কাঠামো—যেখানে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তই একসময় ছিল প্রধান নির্ধারক। এখন সেই একক নিয়ন্ত্রণের জায়গায় ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে বহু-মেরুকেন্দ্রিক এক নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ।

সূত্র: মিডলইস্ট মনিটর

হরমুজ প্রণালিতে ভাঙল মার্কিন শক্তির দম্ভ
হরমুজে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরানের হুঁশিয়ারি:- নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করলে জরিমানা, জাহাজ আটক বা বাজেয়াপ্তের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ ইরান) জানিয়েছে, কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের নির্ধারিত ব্যবস্থা লঙ্ঘন করেছে। এ কারণে ভবিষ্যতে এসব জাহাজের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ চলাচলের ক্ষেত্রে জরিমানা, জাহাজ আটক কিংবা বাজেয়াপ্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এছাড়া, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত জাহাজগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা অন্য জাহাজকেও নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। কোনো জাহাজ বা কার্গো মালিককে ওই তালিকা থেকে বাদ দিতে হলে প্রয়োজনীয় সহায়ক নথিপত্রসহ আবেদন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। শিপিং কোম্পানি ও কার্গো মালিকদের সম্ভাব্য জরিমানা বা অন্যান্য বিধিনিষেধ এড়াতে জাহাজ ব্যবহারের আগে কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ‘নন-কমপ্লায়েন্ট ভেসেলস লিস্ট’ বা নিয়ম না মানা জাহাজের তালিকা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। সূত্র: জিও নিউজ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন ট্রাম্প

দ্য গার্ডিয়ানঃ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোর পাশাপাশি এবার নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। তার প্রশাসনের একের পর এক নথি প্রকাশ, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ সামনে আনা এবং নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের দাবি নতুন করে সেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে ট্রাম্প জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন—এমন আশঙ্কা করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও তার সমালোচকেরা। ট্রাম্প নিজেও এ সম্ভাবনা নাকচ করেননি। বরং তাকে এ বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে বলেছেন, ‘অদ্ভুত ঘটনা এর চেয়েও ঘটেছে।’

ট্রাম্পের সাবেক রাজনৈতিক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, এমন ঘোষণা আসছে। ২৯ জুলাই নিজের ‘ওয়ার রুম’ ভিডিও পডকাস্টে তিনি বলেন, আগস্টের শেষ সপ্তাহের জন্য প্রস্তুত থাকতে।

তার বক্তব্যে ধারণা তৈরি হয়, মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে জাতীয় নিরাপত্তাজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে।

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও তা নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট এর আগে জরুরি অবস্থা জারি করে ভোট গ্রহণের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি।

নির্বাচনসংক্রান্ত মামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা আইনজীবী আরিয়া ব্রাঞ্চের ভাষ্য, প্রশাসন নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার আইনি ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে।

তার মতে, প্রেসিডেন্ট এমন করার যেকোনো সুযোগ খুঁজছেন।

‘সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে’

ভোটার অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ভোটার্স অব টুমরো’-এর প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো মেয়ারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সম্ভাব্য যেকোনো পদক্ষেপ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।

মেয়ারের মতে, ট্রাম্প বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। তাই তার সম্ভাব্য যেকোনো পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তার সংগঠনের লক্ষ্য হলো পর্যাপ্তসংখ্যক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নেওয়া, যাতে ট্রাম্প যা-ই করার চেষ্টা করুন, তা সফল না হয়।

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও ছড়ানো এবং ভোটকেন্দ্রে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) সদস্য মোতায়েনের মতো পরিস্থিতিও রয়েছে।

গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করা প্রগতিশীল সংগঠনগুলোও নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও নাগরিক সংগঠনও নভেম্বরের ভোটে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তুলসি গ্যাবার্ড, পুলটে ও নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ

সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে এফবিআইয়ের একটি অভিযানে তার উপস্থিতি আলোচনার জন্ম দেয়। পরে কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্যে গ্যাবার্ড বলেন, তিনি মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

গ্যাবার্ডের দল পুয়ের্তো রিকোয় ভোটিং সরঞ্জাম জব্দ ও পরীক্ষা করার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা কয়েক মাস ধরে ভোটিং মেশিনের সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে।

৩০ জুন গ্যাবার্ড পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দীর্ঘদিনের ট্রাম্প-সমর্থক বিল পুলটেকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেন ট্রাম্প। দুই দলের সদস্যরাই এ নিয়োগের সমালোচনা করেন। কারণ, পুলটের গোয়েন্দা বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। পরে জে ক্লেটন স্থায়ীভাবে ওই পদে দায়িত্ব নেন। তবে পুলটে আড়ালে থেকে নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়টি সামনে আনতে কাজ করেছিলেন বলে ব্যানন দাবি করেন।

ট্রাম্পের জুলাইয়ের ভাষণের রাতেই ব্যানন সিএনএনকে বার্তা পাঠিয়ে বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে অবিলম্বে জাতীয় নিরাপত্তাজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা দরকার। তার মতে, এটি এমন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।

ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউস আইনজীবী টাই কাবও একই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। পিবিএসকে তিনি বলেন, ট্রাম্পের ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের সময় বা তার কাছাকাছি জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করা।

কাবের মতে, ভোটকেন্দ্রে আইসিই সদস্যদের উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত। ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদেরও সেখানে মোতায়েন করা হতে পারে। তার আশঙ্কা, সংখ্যালঘু ও অভিবাসী ভোটারদের ভয় দেখানো এবং ভোটিং মেশিন জব্দের চেষ্টা হতে পারে।

২০২০ সালের নির্বাচনেও ভোটিং মেশিন জব্দ করতে ট্রাম্প চেয়েছিলেন বলে কাব উল্লেখ করেন। তবে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার তাঁকে জানিয়েছিলেন, এমন পদক্ষেপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

অ-নাগরিকদের ভোট নিয়ে নতুন প্রচারণা

ট্রাম্পের জুলাইয়ের ভাষণের পর হোয়াইট হাউসের ‘গভর্নমেন্ট ট্রান্সপারেন্সি টাস্কফোর্স’ নির্বাচন নিয়ে গোপনীয়তা তুলে নেওয়া বিভিন্ন নথি প্রকাশ শুরু করে। এতে জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের কার্যালয়, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি, সিআইএ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সদস্যরা যুক্ত ছিলেন।

প্রথম দফার নথিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের দুর্বলতা, অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটার নিবন্ধন তথ্যের ওপর বিদেশি প্রবেশাধিকার এবং বিদেশি ডিজিটাল হস্তক্ষেপের কৌশল নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল।

তবে এসব তথ্যের বড় অংশ আগেই প্রকাশ্যে এসেছিল। নথিগুলোতে এমন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নও ছিল যে চীন ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এর এক সপ্তাহ পর নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল জানান, সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে ৬ হাজার ৬০০ অ-নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৪০০ জনেরও কম ভোট দিয়েছিলেন।

ট্রাম্প ও তার মিত্ররা দ্রুত এই তথ্যকে সামনে আনেন। তারা দাবি করেন, ভোটার তালিকায় বিপুলসংখ্যক অ-নাগরিক রয়েছেন। এরপর ৩১ জুলাই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ একটি নোটিশ প্রকাশ করে। এতে নিউ জার্সির প্রশাসনিক ভুলকে কেন্দ্রীয়ভাবে ভোটার তালিকা তদারকির প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

টাস্কফোর্স মিশিগানের একটি মামলার নথিও প্রকাশ করে। সেখানে একটি ভোটার সংগঠনের বিরুদ্ধে সন্দেহজনক ভোটার নিবন্ধনের অভিযোগে এফবিআই তদন্ত করেছিল। তবে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।

অ্যারিজোনার মারিকোপা কাউন্টির ভোটার তথ্য সংগ্রহের একটি তদন্তসংক্রান্ত নথিও প্রকাশ করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব নথি প্রকাশের গতি আরো বেড়েছে। সোমবার টাস্কফোর্স চীনা গোয়েন্দা সংক্রান্ত একটি তদন্তের নথি প্রকাশ করে। এতে সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের সঙ্গে চীনা নাগরিক ক্রিস্টিন ফ্যাংয়ের সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। ফ্যাংয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচারণায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এর পরদিন মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরো জানায়, ২০২০ সালের নির্বাচনে ২৪ হাজার অ-নাগরিক ভোট দিয়েছেন—এমন তথ্য তারা পেয়েছে। ১২ কোটি ৮০ লাখ রেকর্ড প্রাথমিকভাবে মিলিয়ে এই সংখ্যা পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।

তবে কী পদ্ধতিতে এই হিসাব করা হয়েছে, তা প্রকাশ করেনি ব্যুরো। গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এ বিশ্লেষণের তীব্র সমালোচনা করেছে।

সেন্টার ফর ইলেকশন ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বেকার বলেন, প্রশাসনের এই বিশ্লেষণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। কীভাবে এই সংখ্যা পাওয়া গেছে, তার যথেষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

আরিয়া ব্রাঞ্চের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনে নির্বাহী আদেশ জারির আইনি ভিত্তি খুঁজছে।

তবে তার ধারণা, এমন কোনো আইনি ভিত্তি নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিরাপদ।

ব্রাঞ্চ বলেন, নির্বাচনে অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া কোনো ব্যাপক সমস্যা নয়। এ নিয়ে ভয় ও প্রচারণা মূলত আতঙ্ক তৈরি এবং ভবিষ্যতে পদক্ষেপ নেওয়ার ভিত্তি তৈরির জন্য করা হচ্ছে।

জুলাইয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ আরো একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার অ-নাগরিক ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত রয়েছেন। তবে অ-নাগরিকদের শনাক্ত করার পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি। কর্মকর্তারা নিজেদের হিসাবের ব্যাপারে কতটা নিশ্চিত, সেটিও জানানো হয়নি।

এ ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ভোটার তালিকায় অ-নাগরিক শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে বলে পরিচিত।

‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ নিয়ে চাপ

নির্বাচন নিয়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার সম্ভাবনা সম্পর্কে হোয়াইট হাউসকে প্রশ্ন করা হলে তারা তা নাকচ করেনি। তবে কাল্পনিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’-এর পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আমেরিকানদের নির্বাচন নিয়ে পূর্ণ আস্থা থেকে বঞ্চিত করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থানকে তিনি সমর্থন করেন।

এই আইনের মাধ্যমে ভোটের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এতে অঙ্গরাজ্যগুলোকে ভোটার তালিকা কেন্দ্রীয় সরকারের পরিদর্শনের জন্য জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে অযোগ্য মনে করা যেকোনো ব্যক্তির ভোটার নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

আইনটিতে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগও ব্যাপকভাবে সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ডাকযোগে ভোটের সমালোচনা করেছেন। তবে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রাইমারিতে চলতি সপ্তাহেও তিনি নিজে ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন বলে খবর রয়েছে।

এ ছাড়া ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় নাগরিকত্বের নথি দেখানো এবং ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ছবি-সংবলিত পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নির্বাচনী ক্ষমতা আরো কেন্দ্রীভূত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরিয়া ব্রাঞ্চ বলেন, প্রশাসনের বক্তব্যগুলো তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার মতে, এসব বক্তব্যও একধরনের ভয় দেখানোর কৌশল।

তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান স্পষ্ট। দেশটির প্রতিষ্ঠাতারাও নির্বাহী বিভাগের হাতে নির্বাচনসংক্রান্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।

তাই ট্রাম্প প্রশাসন এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে তা ঠেকাতে আদালতে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নির্বাচন সামনে রেখে অঙ্গরাজ্য, ভোটার অধিকার সংগঠন ও ডেমোক্র্যাটরা সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে নভেম্বরের নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থার ওপর নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়েও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

গাজায় লাশে ভরে গেছে কবরস্থান, দাফনের জায়গাও আর নেই

২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। সেখানে কাগজে-কলমে ‘যুদ্ধবিরতি’ চালু থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। এতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে দেড় লক্ষাধিক। সেই সঙ্গে ঘর ছাড়া হয়েছে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় এখন এমন সংকট দেখা দিয়েছে যে লাশ দাফন করার জায়গা পেতেও হিমশিম খাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। তেমনি গাজার ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। তার সামনে এখন এক কঠিন বাস্তবতা- বাবা মোহাম্মদকে কোথায় দাফন করবেন?

৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট একটি দোকানে চা-কফি বিক্রি করছিলেন। গত ১০ জুন ইসরাইলের নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে তার ঘাড়ে একটি গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।
বাবার মরদেহ দাফনের জন্য ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখতে পান, সেখানে কবরের জায়গা প্রায় ফুরিয়ে গেছে। গাজায় চলমান যুদ্ধ ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণে কবরস্থানগুলোতে ঠাসাঠাসি করে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে।
অনেক কবরেই স্থায়ী কোনো সমাধিচিহ্ন নেই। শুধু একটি পাথর এবং তার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির নাম লেখা একটি কাগজ লাগিয়ে রাখা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে জায়গার সংকট এবং নির্মাণসামগ্রীর অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ওমর আল-জাজিরাকে বলেন, আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসংখ্য কবর দেখেছি। চারদিকে বালুর পাহাড়, আর সেই বালুর নিচে মানুষকে দাফন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোথাও শুধু একটি পাথরের সঙ্গে শহীদের নাম লেখা কাগজ লাগানো হয়েছে। যুদ্ধের আগে যেভাবে কবর তৈরি ও প্রস্তুত করা হতো, এখন আর সেভাবে করার সুযোগ নেই।
বর্তমানে গাজায় একটি কবর তৈরির খরচ প্রায় ৫০০ শেকেল বা ১৬৭ ডলার। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তার ওপর নতুন কবর খোঁজার মতো জায়গাও ছিল না।
নতুন কবরের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের দাদার কবরে বাবাকে দাফন করতে হয়েছে, বলেন ওমর।

গাজায় যুদ্ধের কারণে সেবা ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি হামলার ঝুঁকির কারণে মৃতদের শনাক্ত করা ও যথাযথভাবে দাফন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধের সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ হিসেবে গণনা করা হয়েছে।
অনেককে বাড়ির আঙিনায়, তাবুর পাশে, বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরের ভেতরে, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাজায় ইসরাইলি হামলার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। এরপর পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে কিংবা অস্থায়ী কবরস্থানে থাকা স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১,২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন হয়েছে নতুন দাফনস্থল। গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, গাজায় কবরের সংকট শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধে নিহত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির কারণে নয়। ইসরাইলি হামলায় বহু কবরস্থানও ধ্বংস হয়েছে।
গাজার ধর্মীয় ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে।

এ ছাড়া ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে কবরস্থানে প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে পরিবারগুলোর জন্য দাফনের জায়গা আরও কমে গেছে।

গাজার ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব গত ১৯ বছর ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন। তার মতে, গাজায় চলমান যুদ্ধ তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
তিনি যে খান ইউনিস কবরস্থানে কাজ করেন, যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেই কবরস্থানে প্রায় ৬,০০০ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
যুদ্ধের একপর্যায়ে তাফেশকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।

গাজায় লাশে ভরে গেছে কবরস্থান, দাফনের জায়গাও আর নেই

হিজাব ছাড়াই রাস্তায় ইরানের তরুণীরা, কট্টরপন্থীদের চাপে সরকার

ইরানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নারীদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আবারও বড় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকরা হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি তুললেও বহু নারী প্রকাশ্যে নিয়ম অমান্য করছেন।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপাতত বড় ধরনের দমন অভিযান চালাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের তীব্র সময়ে সরকারি সমাবেশ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও হিজাব ছাড়া বহু নারীকে দেখা গেছে। তখন সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল বড় অগ্রাধিকার।

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজাববিহীন নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হিজাব আইন না মানার অভিযোগে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার খবরও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ’র তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই তেহরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন প্রয়োগ না করার অভিযোগে অন্তত ৭টি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোশাকবিধি অমান্য করার অভিযোগে বেশ কিছু অ্যাকাউন্টও ব্লক করা হয়েছে।

তেহরানের প্রসিকিউটর অফিসও জানিয়েছে, কিছু ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় ‘অশালীনতা’ এবং অনুমোদিত পোশাকবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপ্রচলিত বা অনুপযুক্ত পোশাক বিক্রির অভিযোগে কিছু দোকানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
পূর্ব ইরানের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশে ‘সামাজিক রীতি ও বাধ্যতামূলক হিজাব আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর নিউজ এজেন্সি।
চার বছর আগে তরুণী মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানে ‘ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। অনুপযুক্ত পোশাক পরার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে আন্দোলনটি কঠোরভাবে দমন করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের শেষ দিকে জানিয়েছিল, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্যকারী নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে ইরানি কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান সহিংস দমন অভিযান চালাচ্ছে।

তবে সেই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে দেশটির সমাজে। সতর্কবার্তা ও বিচ্ছিন্নভাবে আইন প্রয়োগের পরও বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে হিজাব আইন অমান্য করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে হেলমেট পরা কিন্তু হিজাব ছাড়া তরুণীদের মোটরবাইক চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দলবদ্ধভাবে নারীদের মোটরবাইক চালাতেও দেখা যাচ্ছে।
এক পোস্টে শিরাজের একদল নারী নিজেদের ‘শিরাজের মোটরবাইক গার্লস’ বলে পরিচয় দিয়েছে। ইসফাহানে প্রায় ২০ জন নারী মোটরসাইকেল চালানোর একটি ভিডিওকে ‘ইসফাহানে সবচেয়ে বড় নারী মোটরসাইকেল আয়োজন’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে হিজাবকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। এক রক্ষণশীল আলেমের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন করেন, আইন করে কি সত্যিই মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা যায়?
তিনি আরও বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তার মতপার্থক্য রয়েছে। তাহলে কি তাকে জোর করে নিজের মত মানাতে হবে- এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য গোলামালি জাফরজাদেহ ইমানাবাদিও কর্মকর্তাদের হিজাবের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে দেশটির কট্টরপন্থীরা হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন। কেহান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি বলেছেন, হিজাব আইন কার্যকর করা কর্মকর্তাদের জন্য একই সঙ্গে আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

তেহরান পৌরসভার তৈরি ‘পার্ক ওয়েস্ট’ নামের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও নারীদের পোশাক নিয়ে কয়েকটি পর্ব প্রচার করা হয়েছে এবং অনুমোদিত পোশাকবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের হিজাব পরার ওপর জোর দেয়া শুরু হয়। এর আগে রাজতন্ত্রের সময়ে নারীদের তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও পশ্চিমা ধাঁচের জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরা হতো।
বর্তমানে দেশটির সরকার হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি এবং তরুণীদের ব্যাপক অনীহার মধ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

হিজাব ছাড়াই রাস্তায় ইরানের তরুণীরা, কট্টরপন্থীদের চাপে সরকার

‘অনেক সমস্যায়’ ইরান, স্বীকার করলেন পেজেশকিয়ান

যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেয়ার মধ্যে দেশটির জনগণ বর্তমানে ‘অনেক সমস্যার’ মুখোমুখি বলে স্বীকার করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ ঠেলে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি বুঝতে পারছি, বর্তমানে আমাদের সমাজে অনেক সমস্যা রয়েছে। আমরা যতটা সম্ভব এসব সমস্যা প্রতিরোধের চেষ্টা করছি।

এদিন পেজেশকিয়ান আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বেকারত্বসহ বিভিন্ন সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, যাতে ইরানের মানুষ মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ইরানে একাধিক বড় বিক্ষোভ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ওঠানামার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াও এসব বিক্ষোভের অন্যতম কারণ। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে তেহরানে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ নেয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ সেই সময় জানায়, ওই অস্থিরতায় ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সহিংসতা উসকে দেয়ার জন্য দায়ী করে। তবে বিদেশভিত্তিক বিভিন্ন এনজিওর দাবি, ইরানি কর্তৃপক্ষের দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে।

এদিকে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যের একদিন পরই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করতে পারেন।
তিনি সম্ভাব্য নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কট্টরপন্থী নেতা মোহসেন রেজাই দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় প্রতিবেশী দেশগুলো সহযোগিতা করলে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত উপসাগরের তেল পরিবহন রুটগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে। এসব দেশের ‘স্বার্থে আঘাত’ করা হবে বলেও হুমকি দেন তিনি।

‘অনেক সমস্যায়’ ইরান, স্বীকার করলেন পেজেশকিয়ান

রোবট মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারছে; কিন্তু সূক্ষ্ম কাজে কতটা দক্ষ

রয়টার্সঃ চীনের হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবটগুলো যে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির অ্যাথলেটের চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে পারে, তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু কোনো কিছু প্যাকেটজাতকরণ ও গুদামের কাজের পাশাপাশি বিদ্যুতের তার–সংযোগের মতো সূক্ষ্ম কাজ রোবট মানুষের মতো নিখুঁতভাবে করতে পারবে কি না, সেটিই এখন তাদের সামনে আসল পরীক্ষা।

 শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। এখানে মানুষের খেলাধুলার আদলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা রয়েছে। পাশাপাশি সিমুলেটেড কারখানা, রেস্তোরাঁ, অফিস ও জরুরি পরিস্থিতিতে রোবটের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্যও বিভিন্ন আয়োজন রাখা হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত এই আয়োজনে মোট ৫১টি ইভেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং ২১টি বিভিন্ন পরিস্থিতিভিত্তিক প্রতিযোগিতা। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব ইভেন্টের ৪০ শতাংশের বেশি রোবটকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।

শনিবার ১০০ মিটার দৌড়ে দুটি রোবট অ্যাথলেটদের ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই রেকর্ডের মালিক বিশ্বের দ্রুততম অ্যাথলেট উসাইন বোল্ট। রোবটের ক্ষেত্রে এটা ২০২৫ সালের তুলনায় বড় অগ্রগতি। গত বছর ১০০ মিটার দৌড়ে বিজয়ী রোবটটি ২০ সেকেন্ডের বেশি সময় নিয়েছিল।

তবে রোবটগুলো দৌড় শেষে থামতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। ফিনিশিং লাইনের কয়েক মিটার পর আয়োজকেরা যে মোটা ম্যাট (মাদুর) রেখেছিলেন, তারা সেগুলোতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খায়।

হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের এবারের আসরে ১০০ মিটার দৌড়ের বিজয়ী রোবটটির একই মডেলের আরেকটি রোবট ৪০০ মিটার দৌড়ে ৩৯ দশমিক ৭ সেকেন্ডে প্রতিযোগিতা শেষ করে। এতে আরেকটি নতুন রেকর্ড হয়। ভেঙে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েড ভ্যান নিকের্কের ৪৩ দশমিক ০৩ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড।

দর্শক ও রোবোটিকস খাতে বিনিয়োগকারী শু ছিয়াওশেং বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিযোগিতার তীব্রতা বেশি। এর ফলে রোবটের ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও তাপনিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ছে।’

ছিয়াওশেং মনে করেন, ‘চীনের শিল্প খাতের উন্নয়নে এর (রোবটের) বিশাল গুরুত্ব রয়েছে।’

এবারের গেমসে কিছু রোবট দড়ি টানাটানি ও ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিয়েছে। তাই চি ও ‘পিচ-পট’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী চীনা খেলাতেও দেখা যাবে রোবটের অংশগ্রহণ। পিচ-পটে সরু মুখের পাত্রে তিরের মতো কাঠি ছুড়ে ফেলতে হয়।

ছোটখাটো ভুলেই আসল পরীক্ষা

দৃষ্টিনন্দন এসব প্রদর্শনীর বাইরে রোবটগুলো বাস্তব জগতের ছোটখাটো সমস্যা কতটা সামলাতে পারে, সেটিই হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ছোটখাটো সমস্যার উদাহরণ হিসেবে কোনো বিদ্যুতের তার ভুল কোণে থাকা, কোনো কিছু হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া, প্যাকেটের অবস্থান বদলে যাওয়া কিংবা কাজের কোনো ধাপে ভুল করার কথা বলা যায়।

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে রোবট কোনো বস্তু ঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারে কি না, নির্ভুলভাবে হাত ও শরীরের অবস্থান ঠিক করতে পারে কি না, নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে কি না এবং মানুষের সাহায্য ছাড়া ভুল শুধরাতে পারে কি না, তা বোঝা যাবে।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লুমোস রোবোটিকসের প্রধান নির্বাহী ইউ চাও বলেন, এই প্রতিযোগিতা রোবটের হার্ডওয়্যার উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে শিল্পটির সক্ষমতাও তুলে ধরা সম্ভব। তবে রোবটগুলো বাস্তব জীবনের সমস্যা কতটা ভালোভাবে সমাধান করতে পারে, তার ওপরই দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিযোগিতার গুরুত্ব নির্ভর করবে।

ইউ চাও আরও বলেন, ‘বাস্তব (জগতের) কাজের শেষ ধাপগুলোতে রোবট কাজ করতে পারলেই এর প্রকৃত মূল্য তৈরি হবে। শুধু দৌড়ানো আর লাফানো দক্ষতা বাড়ায় না।’

মানুষের খেলাধুলার আদলে তৈরি পরিচিত ইভেন্টগুলোর পাশাপাশি রোবটগুলো বৈদ্যুতিক গাড়িতে চার্জ দেওয়া, রেস্তোরাঁয় কাজ করা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। শিল্পকারখানায় যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো ও মালামাল তোলার ইভেন্টও রয়েছে। বিদ্যুতের তার সংযোগের একটি প্রতিযোগিতায় রোবটের দৃষ্টিশক্তি, যান্ত্রিকভাবে সঠিক সংযোগ স্থাপন এবং শক্তিনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

বেইজিংভিত্তিক রোবট নির্মাতা স্টার্টআপ গ্যালবট জানিয়েছে, তারা স্বয়ংক্রিয় হিউম্যানয়েড রোবটের টেনিস ম্যাচ আয়োজন করবে। এতে একক ও দ্বৈত দুই ধরনের ম্যাচেই রোবট অংশ নেবে। বলের গতিপথ অনুসরণ, সার্ভ করা ও প্রতিপক্ষের শট ফেরানোর মতো কাজ করতে হবে তাদের।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জিরোথের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা হুয়া রং বলেন, প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরই আসল পরীক্ষা শুরু হবে। তাঁর ভাষ্যমতে, পণ্যটি (রোবট) বিক্রি হওয়ার পর সেটি সত্যিই ব্যবহারকারীদের সমস্যার সমাধান করতে পারে কি না, (মূল) প্রতিযোগিতাটা হবে সেখানে। 

দড়িতে দৌড়াচ্ছে একটি হিউম্যানয়েড রোবট। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ২২ আগস্ট ২০২৬
দড়িতে দৌড়াচ্ছে একটি হিউম্যানয়েড রোবট। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ২২ আগস্ট ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

উত্তেজনা প্রশমনে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মোসাদপ্রধানের বৈঠক

সিরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ হিসেবে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গোফম্যান।

অ্যাক্সিওসের বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, রোববার (২৩ আগস্ট) এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি কোথায় হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার পর সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কমাতেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে দামেস্ককে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সিরিয়া ওই সতর্কবার্তায় সাড়া না দেওয়ায় হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে জেরুজালেম।

এই হামলার পর সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে তুরস্ক এবং তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাকও ইসরায়েলের হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন।

বৈঠকের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় অ্যাক্সিওসের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্রের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-শাইবানি বলেন, আমরা বর্তমানে ইসরায়েলকে বিশ্বাস করি না।

ইসরায়েল গত সপ্তাহে সিরিয়ার আবু আল দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলেও জানান তিনি।

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দামেস্ক আশা করছে শিগগিরই আলোচনা আবার শুরু হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে, যাতে তারা আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে।

ইসরায়েল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে বলেও অভিযোগ করেন আল শাইবানি। তার দাবি, এ ধরনের শক্তি প্রয়োগে ইসরায়েল সফল হয়নি।

সূত্র : দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

আসাদ আল শাইবানি ও রোমান গোফম্যান। ছবি : গেটি ইমেজেস
আসাদ আল শাইবানি ও রোমান গোফম্যান। ছবি : গেটি ইমেজেস

রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ

রংপুর শহরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে পুলিশ প্রথমে ধারণা করেছিল, এটা ডাকাতি। তবে গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করা হয় তাঁদের। পুলিশের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষকের স্বজনেরা।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।

হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের ভাষ্য

পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যা করা হয় তাঁদেরও। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

গণপতির পরিবারের সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দুজন মিলে একে একে পরিবারটির চার সদস্যকেই হত্যা করেন।

মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।

‘পুলিশ যা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়’

তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।’

এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলার পর এর আগে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।’

দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আজ (গতকাল) ভোরে আটক করা হয়। পরে তাঁরা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’

একেক জায়গায় পড়ে ছিল লাশ

পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। এরপর শনিবার ফোন দিলে বোন, জামাতা ও বোনের মেয়ে—সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে ওই বাসায় যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের একটি ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের জিনিসপত্র অগোছাল দেখতে পান। এরপরই খবর দেন পুলিশকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে রাত ১১টার দিকে। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ লাশ চারটি উদ্ধার করে বাড়িটি থেকে নিয়ে যায়।

রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।

নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।

হত্যার প্রতিবাদ, বিক্ষোভ

পরিবারসহ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে হত্যার ঘটনায় গতকাল দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন থেকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।

হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে রংপুর মহানগর জামায়াত। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেসক্লাবের সামনে এসে হয় সমাবেশ।

সমাবেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র দুজন মাদকসেবী কীভাবে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করলেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

‘কোথায় বাস করছি আমরা’

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১০ সালে কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের ভিড়। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, কিছুই বুঝতে পারেননি।
বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে–মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!’

রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি
রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে প্রতিবেশীদের শত্রু গণ্য করবে ইরান, ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলার ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধে যোগ দিলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে তাদের স্বার্থে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে তেহরান। তারা বলেছে, ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করার মার্কিন চেষ্টায় কোনো আঞ্চলিক দেশ অংশ নিলে তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই গতকাল শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন।

আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, ‘আমরা সব প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার জন্য বলছি। অন্যথায়, আমরা তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করব।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক হুমকি ক্রমাগত বাড়তে থাকার মুখে রেজাই এ মন্তব্য করলেন।

দুই দেশের মধ্যে চলমান শত্রুতার অংশ হিসেবে গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর সরকার ইরানের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ওই দিন এ দুই মিত্রদেশ যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় হামলা চালায়।

চলতি সপ্তাহে ইরানের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলার হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প এক নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের ‘লাইফলাইন’ বা সহায়তা দেওয়া দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র শিকার হওয়ার হুমকি দেন তিনি।

এর পরের দিনই ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মেলান মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অন্য দেশগুলোর উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘আপনারা হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, না হয় আমাদের বিরুদ্ধে।’

গতকাল দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে তিন পর্যায়ের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানো।

রেজাই বলেন, ‘প্রথমত আমরা আলোচনা করব। তারপর সুন্দর ভাষায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করব। কারণ, আমরা আসলে যুদ্ধ ছড়াতে চাই না। এরপরও যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া বজায় রাখবে, তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দেব। তবে তৃতীয় পর্যায়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ না করলেও রেজাই মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে ইরানের সমাজব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ভেঙে ফেলার বাজি ধরেছে। এর উদ্দেশ্য, (ইরানিদের) বিক্ষোভের মুখে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটানো।

একটি বিশেষ যুদ্ধবিমানের প্রসঙ্গ টেনে রেজাই বলেন, ‘তারা আশা করছে যে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে আমাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলে একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় নামবে। এতে তারা প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কাজটাই সহজ করে দেবে।’

গত ১৭ জুনের একটি সমঝোতা স্মারক ব্যর্থ হওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। ওই সমঝোতায় ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ আহ্বান জানানো হয়েছিল।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান দ্রুত এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ আগে রপ্তানির জন্য এ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে শুরু করে।

কিন্তু রেজাই সতর্ক করে দিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিকল্পনায় অংশ নেয়, তবে পারস্য উপসাগরের বাইরের বিকল্প তেল পরিবহন পথগুলোও লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান।

এদিকে মার্কিন এ নতুন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘভুক্ত সদস্যদেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতিকে ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে গতকাল মন্তব্য করেছে তারা।

তেহরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানোর কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিযানকে সমর্থন দেওয়া ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপরও আঘাত হানতে পারে ইরান।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

জেন-জির ক্ষোভ সামলাতে জোড়া ব্যবস্থা বিজেপির by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শুধু জেন–জি নয়, নতুন প্রজন্মের মন জিততে বিজেপি এখন থেকে জেন আলফাকেও সমান গুরুত্ব দিতে চলেছে। কারণ, আজ যারা ১৬–১৭, ২০২৯ সালে লোকসভা ভোটে তারা ভোটাধিকার পেয়ে যাবে। সংগঠনের দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের হাতে সঁপে দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৈরি করে দেওয়া ‘রোড ম্যাপ’ অনুযায়ী বিজেপি এখন নতুন প্রজন্মের মন জেতার ওপরই বেশি করে নজর দিতে চলেছে।

সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের নেতৃত্বে সদ্য গঠিত ৬৫ সদস্যের জাতীয় টিমের প্রথম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার ওই সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন, এত দিন দলীয় নেতারা সবাইকে কর্তব্য সম্পর্কে জানিয়ে এসেছেন। কী কী করতে হবে, সেসব ‘বাণী’ শুনিয়ে এসেছেন। এবার থেকে চলতে হবে নতুন করে। বাণী নয়, ভাষণ নয়, নেতাদের এবার থেকে নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি বসতে হবে। তাঁদের প্রশ্ন করতে দিতে হবে। অভিযোগ ও চাহিদার কথা বলতে দিতে হবে। নেতাদের মন দিয়ে সেসব কথা শুনতে হবে। সেই অনুযায়ী দলকে চালনা করতে হবে। ওপর থেকে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

অর্থাৎ বিজেপিতে নেতাদের একতরফা ভাষণবাজির দিন শেষ হতে চলেছে। প্রাধান্য পেতে চলেছে নয়া প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপ শুরুর দিন।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণও আছে। ভুঁইফোড়ের মতো গজিয়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে দেশের যুবসমাজ বা জেন–জি যেভাবে দিকে দিকে প্রতিবাদী হয়ে উঠছে, বিজেপির কাছে তা অশনিসংকেত। শুধু বিজেপিই নয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) নয়া প্রজন্মের এই অসন্তোষ টের পেয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সজাগ করে দিয়েছে। আরএসএস ও তার সঙ্গী সংগঠনগুলো, যাদের ‘সংঘ পরিবার’ মনে করা হয়, তাদের নেতারা সম্প্রতি অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপট্টনমে এক সমন্বয় বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। সংঘ নেতৃত্বের উপলব্ধি, তরুণদের মধ্যে হতাশা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, উপযুক্ত চাকরির আকালসহ নানা কারণে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। সরকারের ওপর তাদের আস্থা ও ভরসা টলে যাচ্ছে। সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত এই উপলব্ধির কথা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়ে বলেছেন, সরকারকে যেমন যথাযথ পদক্ষেপ করতে হবে, দলকে তেমন পরিচালনা করতে হবে নতুনভাবে, নতুন ভাবনায়।

একদিকে সংলাপ, অন্যদিকে প্রতিরোধ: বিজেপির সাঁড়াশি নীতি

তবে শুধু ‘ভুল শোধরানো’ নয়, তেলাপোকাদের দল সিজেপির মোকাবিলায় বিজেপি নেতৃত্ব কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নৈরাজ্য বন্ধে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিচ্ছে এবং সেটা প্রয়োগ করা হচ্ছে সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।

স্বাধীনতা দিবসের দিন, অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে সিজেপি দেশজুড়ে এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘স্কুল ঠিক করো’। দলীয় নেতা–কর্মীরা রাজ্যে রাজ্যে সরকারি স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছেন। স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কি না, অবকাঠামো কেমন, শিক্ষার পরিবেশ কেমন, পড়ুয়ারা কতটা সন্তুষ্ট—এসব তাঁরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন, যাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। সিজেপির এই কর্মসূচির কথা জানাজানি হওয়ার পর বহু জেন আলফা স্কুলপড়ুয়া নিজেরাই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছে। বিজেপি এই কর্মসূচির বিরোধিতা করছে। কোথাও সিজেপি নেতাদের মারধর করা হয়েছে। তাঁদের গাড়িবহরে হামলা করা হয়েছে। স্কুলে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কোথাওবা অনধিকার চর্চার মামলা করা হয়েছে।

যেমন রাজস্থানের এক গ্রামে সিজেপির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাংকাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কলকাতার কোথাও তাঁদের মিলনায়তন ভাড়া দেওয়া হয়নি। কোথাও প্রতিনিধিদের মারধর করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। অভিযোগ, দিপকেসহ সিজেপি নেতারা ওই স্কুলে বিনা অনুমতিতে ঢুকেছিলেন। পড়ুয়াদের সঙ্গে স্কুলের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করেছেন। সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের কাজে বাধা দিয়েছেন।

বিজেপির ‘হার্ড লাইনাররা’, মানে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, সংলাপের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি সিজেপিকে হতোদ্যম করাও জরুরি। তাদের এমন কিছু করতে দেওয়া ঠিক হবে না, যাতে সমাজে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। অরাজকতা দেখা যায়। এই কট্টরপন্থীদের কাছে ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী।

নৈরাজ্য–তত্ত্ব ও রাহুল গান্ধীর দাদাগিরি

শুধু তেলাপোকারাই নয়, নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও বিজেপির শীর্ষ নেতারা তুলতে শুরু করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গত ২০ জুলাই সাহিল লোচাব নামে ১৯ বছরের এক তরুণ পুলিশের ছোড়া ‘পেলেট’ বা ছররা গুলিতে আহত হন। তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি ছররার কারণে লোপ পেয়েছে। সাহিলের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি এফআইআর করতে পারছিলেন না। পুলিশ কোনো না কোনো উসিলায় তাঁর এফআইআর নিচ্ছিল না। ফিরিয়ে দিচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে তিনি রাহুল গান্ধীর শরণাপন্ন হন।

সাহিল, তাঁর মা ও সাহিলের আইনজীবীকে নিয়ে রাহুল সম্প্রতি দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে ধরনায় বসেন। পুলিশের বড় কর্তাদের তিনি বলেন, দিল্লি পুলিশকে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর নিতেই হবে। কোনো অজুহাতেই তা এড়ানো যাবে না। পুলিশ টালবাহানা করলে সাহিল, তাঁর মা ও আইনজীবীকে নিয়ে রাহুল থানার সামনে ধরনায় বসে যান। তাঁদের সঙ্গ দিতে একে একে চলে আসেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, জয়রাম রমেশ, সলমন খুরশিদ, পবন খেরাসহ বহু কংগ্রেস নেতা ও কর্মী। পার্লামেন্ট স্ট্রিটে বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। কংগ্রেসিরা সরকারবিরোধী স্লোগানে তল্লাট মুখর করে তোলেন। সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরনার পর অবশেষে দিল্লি পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়।

রাহুলের ওই প্রতিবাদী চরিত্র, থানার সামনে ধরনায় বসে যাওয়ার সমালোচনায় মুখর হন বিজেপির শীর্ষ নেতারা। সাবেক সভাপতি জে পি নাড্ডা বলেন, রাহুল নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এইভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনেও ধরনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রবিশংকর প্রসাদ সংবাদ সম্মেলন করে রাহুলের ‘অগণতান্ত্রিক’ মনোভাবের নিন্দা করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাহুলকে তাঁরা টলাতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে থেকে কংগ্রেসিদের বলপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে থেকে তা করা যায়নি, যেহেতু আইনত পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। রাহুলের অনমনীয়তার দরুন এত দিন টালবাহানা করা দিল্লি পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়। রাহুল তারপর বলেন, এটাই প্রতিবাদের জয়। ন্যায়ের জয়। পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। অথচ তা না নিয়ে তারাই আইন লঙ্ঘন করছিল।

বিজেপির ‘নৈরাজ্য–তত্ত্ব’ এবং মামলা দায়ের তেলাপোকাদের দমাতে পারছে না। এফআইআর করা সত্ত্বেও তারা ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি থেকে সরছে না। একইভাবে রাহুল গান্ধীও বন্ধ করছেন না ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি। গত শনিবার মহারাষ্ট্রের পুনেয় রাহুলের সমাবেশে ছাত্র–ছাত্রীদের বিপুল ভিড় দেখা যায়। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ও প্রশাসনের বাধা সত্ত্বেও ওই সমাবেশে জেন–জি ও জেন আলফার ভিড় ছিল চমকে দেওয়ার মতো। রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস এই কর্মসূচির আয়োজন করছে।

রাহুলকে ঘিরে এই ভিড় বিজেপির বাড়তি চিন্তার কারণ। সরকারের প্রতি হতাশ ও ক্ষুব্ধ জেন–জি এবং জেন আলফার সমর্থন কংগ্রেসের দিকে যাতে ঢলে না পড়ে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিজেপি জোর দেওয়ার সেটাও একটা বড় কারণ।

ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের মিছিলে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ২০ জুলাই ২০২৬
ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের মিছিলে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ২০ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স