Thursday, June 11, 2015

খালেদা জিয়ার ভুল by সোহরাব হাসান

যাঁরা মনে করেন, বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার রাজনীতি শতভাগ বিশুদ্ধ, তাঁদের সঙ্গে যেমন একমত হওয়া যাচ্ছে না, তেমনি যাঁরা তাঁর রাজনীতিটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চান, তাঁদের সঙ্গেও সহমত প্রকাশের সুযোগ কম। রাজনীতি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের মতো নয় যে পরীক্ষার খাতায় টিক বা ক্রস মার্ক দিলেই সহজ উত্তর মিলবে। রাজনীতি হলো রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দর্শন। আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অতীত নিয়ে এত বেশি আচ্ছন্ন যে বর্তমানে জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে আমলেই নিতে চায় না। তারা উভয়ই দুই প্রয়াত নেতার নামে রাজনীতি করেন এবং তাদের প্রবর্তিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে দেশবাসীর সব সমস্যার সমাধান খোঁজেন। যেন এর বাইরে কিছু নেই।
সত্য যে শেখ হাসিনার মতো খালেদা জিয়াও রাজনীতিতে এসেছেন একটি বেদনাদায়ক ঘটনার প্রেক্ষাপটে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত হলে দলটি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। শুরু হয় দলাদলি। জিয়া মারা যাওয়ার পর বয়োবৃদ্ধ বিচারপতি আবদুস সাত্তার, যিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের উপরাষ্ট্রপতি, তাঁকেই দলের ও দেশের দায়িত্ব দিতে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অতি আগ্রহের পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। জিয়া হত্যার পর ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের নায়ক জেনারেল মঞ্জুর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও কার নির্দেশে তাঁকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে হত্যা করা হয়, তা আজও অনুদ্ঘাটিত। কয়েক মাসের মাথায় এরশাদ বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন।
এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন এবং দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজের আপসহীন অবস্থান তুলে ধরেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদের নির্বাচনী ফাঁদে আওয়ামী লীগ পা দিলেও বিএনপি দেয়নি এবং যার ফল তারা ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তুলে নিতে সক্ষম হয়। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৯১-৯৬ সালের মেয়াদে অনভিজ্ঞ খালেদা জিয়া অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। দলের গঠনতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দাবি মেনে নিয়ে তিনি সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করেন। তাঁর প্রথম সরকারের প্রথম দুই-আড়াই বছর জাতীয় সংসদও মোটামুটি প্রাণবন্ত ও কার্যকর ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এসেই খালেদা জিয়া একের পর এক রাজনৈতিক ভুল করতে থাকেন; ২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ের পরপরই বিএনপির দলীয় মাস্তানেরা বিরোধী দল ও সংখ্যালঘুদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগের আমলে সন্ত্রাস বা মাস্তানি ছিল এলাকাভিত্তিক, আর বিএনপি আমলে সারা দেশে তার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন বিরোধী দলের নেতাকে হত্যা, দেশজুড়ে জঙ্গিবাদীদের তাণ্ডব, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা ঘটলেও সরকার এসবের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে সব দায় বিরোধীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। সে সময় হাওয়া ভবনকে ঘিরে এমন একটি চক্র গড়ে ওঠে যারা নিজেদের সরকারের চেয়েও শক্তিশালী মনে করত। এসবই ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভুল। কিন্তু তিনি বা তাঁর দল এ পর্যন্ত সেই ভুল স্বীকার করেনি। তাঁরা ভেবেছেন কেবল আওয়ামী লীগের ও ভারতের বিরোধিতা করে সত্তর ও আশির দশকের মতোই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা যাবে। বিএনপির যে নেতারা এখন ‘আমরা কখনো ভারতবিরোধী ছিলাম না’ বলে বিবৃতি দিচ্ছেন, তাঁরাই একসময় পার্বত্য চুক্তির ফলে দেশের এক-দশমাংশ ভারত হয়ে যাবে কিংবা গঙ্গার পানি চুক্তির পর ভারত থেকে ময়লা পানি আসবে বলে নসিহত করেছিলেন। সময় বদলেছে। কিন্তু বিএনপি নেতা–নেত্রীরা সেই বদলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। রাজনীতি করতে হলে অন্য দলের বিরোধিতা করতে হবে কেন? নিজ দলের কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরলে কিংবা তাঁদের দাবি দাওয়া নিয়ে মাঠে নামলে দলের জনপ্রিয়তা আপনাতেই বাড়বে।
সাধারণত ক্ষমতার বাইরে থাকলে দল সংগঠিত হয়, নেতা–কর্মীদের মধ্যে সমঝোতা ও সমন্বয় বাড়ে। কিন্তু বিএনপির নেতারা গত আট বছরেও দল গোছাতে পারেনি। একবার সম্মেলন করলেও একজন স্থায়ী মহাসচিব নির্বাচন করতে পারেনি। এখন বিএনপির ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, আসলে দলটি কে চালাচ্ছেন, কীভাবে চালাচ্ছেন? দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা জানেন না কোথা থেকে কর্মসূচি আসছে। খালেদা জিয়া যখন গুলশানের কার্যালয়ে তিন মাস অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারলেও সবার জন্য দ্বার উন্মুক্ত ছিল না। যে আন্দোলনের জন্য বিএনপি সর্বমহলে সমালোচিত, সেই তিন মাসের লাগাতার অবরোধ, হরতাল কিংবা হঠাৎ করে সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দলের স্থায়ী কমিটির কোনো ভূমিকা ছিল না। কখনো খালেদা জিয়া তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, কখনো লন্ডন থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে বলে দলের অনেকে মনে করেন। যেখানে লন্ডন থেকে তারেক রহমান জেলা–উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন, ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে তাঁদের নির্দেশ দেন, সেখানে জ্যেষ্ঠ নেতাদের গুরুত্ব কোথায়?।
গতকাল প্রথম আলোতে বিএনপিকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যার শিরোনাম ছিল, ‘এই বিএনপিকে দিয়ে হবে না’। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ টেলিফোনে এক কর্মীকে বলেছেন, ‘শোনো বলি, এই বিএনপি দিয়ে হবে না। এটুকু জেনে রাখো।... জিয়াউর রহমানের বিএনপি যদি করতে পারো...।’ আসলে এটি মওদুদের একার কথা নয়, দলের অধিকাংশ নেতাই এরকমটি ভাবেন। কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে পারেন না।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়: দলের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থায়ী কমিটির কোনো ভূমিকা থাকে না। চেয়ারপারসন নিজে অথবা ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেন।
সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই শীর্ষ নেত্রীই দলের ভেতরে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও শেখ হাসিনা দলকে ভাঙতে দেননি, যাঁরা তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তিনি তাঁদের মন্ত্রিত্ব না দিলেও জাতীয় সংসদের টিকিটটি দিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তাঁর দলের চ্যালেঞ্জকারীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেননি। মান্নান ভূঁইয়ার মতো নেতা বিএনপি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। ক্ষমতায় থাকতে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাও সবার জানা। এর পেছনে কোনো রাজনীতি ছিল না, ছিল ‘যুবরাজের’ মর্জি। অনেকেই মনে করেন, খালেদা জিয়ার পুত্রস্নেহের কাছে দলের নীতি–আদর্শ পরাজিত হয়েছে। সম্ভবত সেই স্নেহের দায় এখনো তাঁকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনা যেমন ২০০১ সালের নির্বাচনী ফল মেনে নিতে পারেননি, তেমনি খালেদা জিয়াও ২০০৮ সালের নির্বাচনকে ফখরুদ্দীন–মইনউদ্দিনের চক্রান্ত বলে প্রচার করে সান্ত্বনা খুঁজেছেন। সত্য স্বীকার না করলে ভুল সংশোধন হবে কীভাবে?
খালেদা জিয়ার অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েই দলের ভেতরে নানা প্রশ্ন থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না। আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে তিনি যে ২০–দলীয় জোট করেছেন, তার মধ্যে যেমন যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী আছে, তেমনি আছে চরম মৌলবাদী হেফাজতে ইসলামের অনুসারী চারটি ধর্মীয় দল। আছে সাত খুনের দণ্ডিত আসামির দলও। এসব দলের সংযোজনে বিএনপি লাভবান হয়নি; বরং তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ভুল হলেও মানুষ বিএনপিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী (প্রকারান্তরে বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ) রাজনীতির ধারক হিসেবেই দেখতে চায়, ধর্মের ঝান্ডাধারী দল হিসেবে নয়।
বিএনপির নেত্রীর সবচেয়ে বড় ভুল যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে অবস্থান নিতে না পারা। এমনকি কখনো কখনো তাঁর বক্তৃতা–বিবৃতি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে গিয়েছে, যা আওয়ামী লীগবিরোধী অথচ বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষও মানতে পারেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দল হিসেবে বিএনপি এই মুহূর্তে যে সংকটে পড়েছে, ১৯৮২ সালের পর কখনোই তাকে সে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। ডান পন্থার দিকে প্রবল ঝেঁাক সত্ত্বেও মধ্যপন্থী হিসেবে এত দিন বিএনপির যে অবস্থান ছিল, তা এখন আর নেই। আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা না করে বিএনপির নেতৃত্ব উগ্রবাদী জামায়াতে ইসলামী ও গোঁড়াপন্থী হেফাজতে ইসলামের ওপর ভরসা রেখে আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। নিজস্ব শক্তি-সামর্থ্য নয়, দুই চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাঁধে ভর করে বিএনপির সাম্প্রতিক আন্দোলন ছিল মারাত্মক ভুল।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

‘সিটি নির্বাচনে অনিয়মের তদন্ত না হওয়া লজ্জাজনক’ -বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসন

বাংলাদেশের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ব্যাপারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসন। তিনি বলেছেন, ওইদিন সকালে আমি ভোটে কোন বিচ্যুতি দেখিনি। যে কারণে নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুপুরের আগেই পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে থাকে। আমি যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মের খবর পাই। বিএনপিও নির্বাচন থেকে সরে যায়। এরপরও আমরা আশা করেছিলাম নির্বাচনে যেসব অনিয়মের অভিযোগ এসেছে তার তদন্ত হবে। কিন্তু তা আর হয়নি, যা খুবই লজ্জাজনক।
বৃহস্পতিবার প্রেস ক্লাবে ডিকাব আয়োজিত ডিকাব টক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এসময় ডিকাব সভাপতি মাসুদ করিম ও সাধারণ সম্পাদক বশির আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
ডিকাব টকে অংশ নিয়ে রবার্ট গিবসন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আবারও সংলাপে বসার আহবান জানান। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন তিনি। রবার্ট গিবসন বলেন, ওই নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়া ছিল দুভার্গ্যজনক। তবে নির্বাচনে না যাওয়া ঠিক না ভুল তা আমি বিচার করতে পারি না। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র পূর্বশর্ত নয়। তবে বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে ভোটের জন্য আকাঙ্খা রয়েছে।

আমি কখনও ভুল করিনি, ঈশ্বর চেয়েছিলেন আমি নিখুঁত হবো: পুতিন

বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম রাশিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। ইতালি সফরের কয়েকদিন আগেই দেশটির একটি সংবাদপত্রকে দেয়া বিরল এক সাক্ষাৎকারে পুতিন দাবি করেন, জীবনে তিনি কখনও ভুল করেননি। কারণ, ঈশ্বর চেয়েছিলেন তিনি নিখুঁত হবেন। এক্সপো ২০১৫ শীর্ষক আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিতে ইতালির মিলানে গতকাল পুতিন ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। ওই সাক্ষাৎকারের সর্বশেষ প্রশ্নটি ছিল, আপনার জীবনে এমন কি কোন কাজ করেছেন, যার জন্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি আক্ষেপে পুড়তে হয়, এমন কিছু যা আপনি ভুল হিসেবে বিবেচনা করেন এবং সে ভুলের পুনরাবৃত্তি আর কখনও ঘটাতে চান না? কিছুক্ষণ ভেবেই পুতিনের উত্তর, আমি আপনার সঙ্গে একেবারে অকপটেই বলছি। আমি সে ধরনের কোন কিছুই স্মরণ করতে পারছি না। এটা প্রতীয়মান যে, ঈশ্বর আমার জীবন তৈরি করেছেন এমনভাবে যে আমার আক্ষেপ করার কিছুই নেই। ঈশ্বর চেয়েছিলেন, আমি নিখুঁত হবো। সাক্ষাতে ইউক্রেন সঙ্কটকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্ব যে অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছে রাশিয়ার ওপর, তা শিথিলের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কথা বলেন পুতিন ও রেনজি। জি-৭ নেতাদের মধ্যে রেনজিও বলেছিলেন, যদি পূর্ব ইউক্রেনে সহিংসতা অব্যাহত থাকে, সেক্ষেত্রে ইতালিও রাশিয়ার বাণিজ্যের ওপর অবরোধ আরোপে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। পুতিন তার জবাবটা দিয়েছেন বেশ আস্থার সঙ্গেই। ওই সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদককে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাটা ইতালির জনগণের স্বার্থেই। ইউক্রেন সঙ্কটে রাশিয়ার আচরণের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটানো ‘আমাদের পছন্দ ছিল না’। আমরা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ওপর অবরোধ চাপিয়ে দিইনি। বরং, আমরা টার্গেট ছিলাম।

বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না জামায়াত

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লা- দু জনই ছিলেন জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী এরইমধ্যে তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লা দু জনই জামায়াতের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। জামায়াতের হয়ে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন কামারুজ্জামান। তার কারাবন্দি হওয়ার পর আরেক সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এ বিষয়টি দেখাশোনা করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, আবদুল কাদের মোল্লা বিভিন্ন দল ও বুদ্ধিভিত্তিক গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। জামায়াতের তাত্ত্বিক গুরু গোলাম আযমও এরইমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মারা গেছেন আরেক শীর্ষ নেতা মাওলানা একেএম ইউসুফ।
দুই/এক জন ছাড়া জামায়াতের পুরো শীর্ষ নেতৃত্বেরই এখন রাজনীতিতে কোন ভূমিকা নেই। তাদের রাজনীতিতে ফেরারও কোন সম্ভাবনা নেই। বেশিরভাগ শীর্ষ নেতাই এরইমধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজা পেয়েছেন। আপিল বিভাগে ১৬ই জুন রায় ঘোষণা হবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে আটক শীর্ষ নেতারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে জামায়াতের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে তাদের পরামর্শ সবক্ষেত্রে গুরুত্ব পায় না। কারাগারে বন্দি থাকাকালে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান চিঠি দিয়ে জামায়াতের নেতা এবং দলটির বুদ্ধিদাতাদের দলে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তার পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো কেউ কেউ তাকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিলেন।
জামায়াতের নীতিনির্ধারণে ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদের তেমন কোন ভূমিকা নেই। ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে থাকলেও দলটির নেতাদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। বিশেষকরে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং আইনি ক্ষেত্রে তিনি নিয়মিত পরামর্শ দেন। যদিও তার অনুপস্থিতির কারণে আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিপাকে রয়েছে জামায়াত। দলটিতে তার বিকল্প কোন সমমানের আইনজীবী নেই। শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তারের পর কয়েকজন সাবেক শিবির সভাপতি জামায়াতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু পরে একে একে তারা প্রায় সবাই গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘদিন ধরে তারাও কারাগারে আটক রয়েছেন। ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরকে মাঝে লাইমলাইটে দেখা গেলেও দলে তাকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শীর্ষ নেতাদের কোন বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না জামায়াত। দল নিষিদ্ধ হলে এরপর কি হবে তা জানেন না জামায়াত নেতারা। বিকল্প খুঁজে না পেয়ে হতাশ নেতারা সময় পার করছেন।

বৃষ্টিতেও যন্ত্রণার শেষ নেই

অসহ্য গরমের পর রাজধানীতে আজ বৃহস্পতিবার সকালে নামে বৃষ্টি। কিন্তু তাতেও স্বস্তি মেলেনি নগরবাসীর। রাস্তায় বের হয়েই পড়তে হয় দুর্ভোগে। জলাবদ্ধতা আর যানজটে দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা। ছবিগুলো পুরান ঢাকার চানখাঁরপুলের নাজিমুদ্দিন রোড থেকে তোলা।
.
বৃষ্টিতে এভাবেই পানি জমেছিল পুরান ঢাকার চানখাঁরপুলের নাজিমুদ্দিন রোডে। রিকশাভ্যানে করে পানি পার হচ্ছেন পথচারীরা। ছবি: সাজিদ হোসেন
.
বৃষ্টিতে পানি জমে রাস্তা হয়ে গেছে পুকুরের মতো। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো লেগেছে রিকশাজট। ছবি: সাজিদ হোসেন।
.
পানিতে আটকে গেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। ছবি: সাজিদ হোসেন
.
যে যেভাবে পারছেন পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। ছবি: সাজিদ হোসেন
.
বৃষ্টিতে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে শিশুদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়ে অভিভাবকেরা। ছবিটি পুরান ঢাকার আগাসাদেক সড়ক থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা
.
বৃষ্টিতে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে গিয়ে শিশুদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়ে অভিভাবকেরা। ছবিটি পুরান ঢাকার আগাসাদেক সড়ক থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

ইরাক-সিরিয়ায় আইএসের এক বছর

ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক কট্টর ইসলামপন্থী আন্তর্জাতিক সংগঠন ইসলামিক স্টেট আজ মঙ্গলবার থেকে এক বছর আগে ইরাকের একটি বিশাল অংশ দখল করে নেয়ার মাধ্যমে বড় পরিসরে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করেছিল। মৌলবাদী সংগঠনটির ধ্বংসযজ্ঞে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। গত এক বছরে আইএসের ধ্বংসযজ্ঞের দিনপঞ্জির একটি অংশ প্রকাশ করেছে এএফপি। পাঠকদের জন্য সংঘর্ষের সেসব চিত্রের খানিকটা তুলে ধরা হল-
জুন ৯, ২০১৪
ইরাকের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর মসুলে আক্রমণ করে আইএস। পরদিন ১০ জুন শহরটি ও একে ঘিরে থাকা নিনেভেহ প্রদেশের অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বেশকিছু বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আইএসের আক্রমণে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
জুন ১১
রাজধানী বাগদাদের উত্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর তিকরিতে হামলা শুরু করে আইএস এবং ১৩ তারিখ এ শহরটিও চলে যায় আইএসের নিয়ন্ত্রণে। ওই দিনই প্রথম শিয়া মুসলিমসহ এক হাজার সাতশরও বেশি মানুষকে হত্যার দাবি করে আইএস এবং হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যের ছবি প্রকাশ করে।
জুন ২৯
ইরাক ও সিরিয়ায় সীমান্ত ভেঙে একটি বৃহৎ ইসলামিক ‘রাষ্ট্র’ কায়েমের ঘোষণা দেয় আইএস। নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয় আবু বকর আল-বাগদাদির নাম।
আগস্ট ৮
ইরাকে আইএসবিরোধী বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এ হামলায় যোগ দেয় আরও বেশ কয়েকটি দেশ, গঠিত হয় একটি আন্তর্জাতিক জোট।
আগস্ট ১২
উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে নতুন করে হামলা শুরু করে আইএস এবং ইরাকের কুর্দিশ বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর গণহত্যা, দাসত্ব ও ধর্ষণের মতো বর্বরতা আরোপ শুরু হয়।
সে সময় ইয়াজিদি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে নিকটবর্তী সিঞ্জার পর্বতে আশ্রয় নিলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়।
আগস্ট ১৪
তৎকালীন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মালিকির ‘ভুল’ নীতির কারণে আইএস আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে- এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান মালিকি এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন হায়দার আল আবাদি।
আগস্ট ১৯
মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফোলেকে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে হত্যার দাবি ও হত্যার ভিডিও প্রকাশ করে আইএস। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিক স্টিভেন সটলফ, কেঞ্জি গোতো, ত্রাণকর্মী ডেভিড হেইন্স, অ্যালান হেনিং, পিটার ক্ল্যাসিগ এবং গোতোর বন্ধু হারুনা ইউকাওয়াসহ অসংখ্য বিদেশী নাগরিককে শিরñেদের মাধ্যমে হত্যার ভিডিও প্রকাশ শুরু হয়।
আগস্ট ২২
ইরাকের দিয়ালা রাজ্যের এক সুন্নি মসজিদে প্রতিশোধমূলক হামলা চালায় শিয়া জঙ্গিরা এবং ৭০ জনকে হত্যা করে।
সেপ্টেম্বর ২৩
সিরিয়াতেও সম্প্রসারিত হয় আইএসবিরোধী বিমান হামলা।
অক্টোবর ২৫
রাজধানী বাগদাদের কাছে অবস্থিত জুর্ফ আল শেখর এলাকা আইএসের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আইএসের বিরুদ্ধে ইরাক সরকারের প্রথম বিজয় ঘোষণা করেন আবাদি।
অক্টোবর ২৯
আলবু নিমর উপজাতির প্রায় একশ’ মানুষকে হত্যা করে আইএস এবং এরপর থেকেই মূলত ধারাবাহিক গণহত্যা শুরু করে সংগঠনটি।
নভেম্বর ১৪
ইরাকের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাইজি শহর আইএসের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুনরুদ্ধার করে ইরাকি বাহিনী এবং এর পরপরই আবারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েও ফেলে। সরকারি বাহিনীকে পিছু হঠতে বাধ্য করে আবারও শহরটি দখলে নেয় আইএস।
জানুয়ারি ২৫, ২০১৫
দিয়ালা প্রদেশে ৭০ জনেরও বেশি বাসিন্দাকে হত্যার জন্য শিয়া জঙ্গিদের দায়ী করে দেশটির সুন্নি নেতারা এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা।
জানুয়ারি ২৬
দিয়ালা প্রদেশ আইএসের হাত থেকে ‘মুক্ত’ হয়েছে বলে ঘোষণা দেন স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুলামির আল-জাইদি।
ফেব্রুয়ারি ৩
জর্ডানের নাগরিক এক বিমানচালক মাজ আল-কাসাবেহকে খাঁচার ভেতরে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার ভিডিও প্রকাশ করে আইএস। এর আগে ডিসেম্বর মাসে সিরিয়া থেকে ওই বিমানচালককে অপহরণ করেছিল আইএস জঙ্গিরা।
ফেব্রুয়ারি ২৬
মসুলের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন অমূল্য শৈল্পিক নিদর্শন ধ্বংস করার ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
মার্চ ২
আইএসের নিয়ন্ত্রণ থেকে তিকরিতকে পুনরুদ্ধারে বিশাল পরিসরে অভিযান শুরু করে ইরাক সরকার।
মার্চ ৫
ইরাকের প্রাচীন অ্যাসিরীয় আমলের শহর নিমরুদ ‘পিষে ফেলেছে’ আইএস, ঘোষণা দেয় দেশটির সরকার। পরে শহরটির প্রাচীন শৈল্পিক নিদর্শনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলে জায়গাগুলো বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার ভিডিও-ও প্রকাশ করে আইএস।
মার্চ ৩১
তিকরিত পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেন আবাদি। কিন্তু ইরাক সরকারের এ বিজয় কয়েকশ’ বাড়িঘর ও দোকানে লুটপাট চালানো ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ধুলায় ধূলিস্যাৎ করে দেয় খোদ সরকার সমর্থিত বাহিনীর সদস্যরাই।
এপ্রিল ৫
আরেক প্রাচীন শহর হাতরার শিল্পকলা ধ্বংসের ভিডিও প্রকাশ করে আইএস। শহরটি ইউনেস্কো ঘোষিত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ ছিল।
মে ১৭
ইরাকের আনবার প্রদেশের রাজধানী রামাদি দখল করে নেয় আইএস। একইসঙ্গে রামাদির সীমান্তবর্তী সিরিয়ার প্রাচীন শহর পালমিরাও দখল করে নেয় সংগঠনটির জঙ্গিরা। ইরাকের তিকরিত-রামাদি-মসুল ও সিরিয়ার পালমিরা দখলের মাধ্যমে ইরাক ও সিরিয়ার অর্ধেক অংশই দখল করে নিয়েছে আইএস এবং সংগঠনটির এক বছর পূর্তিতে এটিকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় হিসেবে ঘোষণাও করা হয়েছে।

নায়িকাদের কেন যৌন কর্মী বলা হয় না?

শরীর বিক্রি করে যারা চলে তাদের যদি ‘যৌনকর্মী’ বলা হয় তবে সিনেমার নায়িকাদেরও কেন এ পরিচয় দেয়া যাবে না? কারণ তারাও তো পর্দায় ‘শরীর বিক্রি’ করেন। তাহলে তাদের কেন যৌনকর্মী বা ‘সেক্স ওয়ার্কার’ বলা যাবে না? সম্প্রতি এমন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন অল ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক অব সেক্স ওয়ার্কার্স (এআইএনএসডব্লিউ) নামক একটি সংগঠন। এআইএনএসডব্লিউ’র নতুন কমিটির যুগ্ম সচিব এবং বিহারের পূর্ণিয়ার যৌনকর্মীদের সংগঠন অম্রপালি কল্যাণ সমিতির সচিব রেখা রানী এমন প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘ফিল্মের নায়িকা হওয়ার জন্যও তো শরীর বিক্রি করতে হয়। যারা শরীর বিক্রি করে নায়িকা হন, তাদের তো সেক্স ওয়ার্কার বলা হয় না?’
ক্ষোভের সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘শরীরের বিনিময়ে নায়িকা হওয়াও তো সেক্স ওয়ার্কারের মতো কাজ। আমরাও তো সেক্স করে উপার্জন করি। তা হলে, আমাদের ক্ষেত্রে কেন অন্য রকম আচরণ করা হবে? নায়িকা হওয়ার জন্য সেক্স করতে হয়, আর আমরাও পেট চালাতে সেক্স করি। দুই ক্ষেত্রই তো একই রকমের। তা হলে কেন আমাদের প্রতি অন্য রকমের ব্যবহার করা হবে?’ গত ৪ এবং ৫ জুন, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে জাতীয় স্তরের ওই সংগঠন এআইএনএসডব্লিউ’র দু’দিনের সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন রাজ্যের যৌনকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সেখানে এসব কথা বলেন রেখা রানী। এপি।

ভূমিকম্পে পাল্টে গেল নেপালের রাজনীতি

অবশেষে নেপালে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে ঐতিহাসিক চুক্তি সই হয়েছে। এর ফলে নেপাল আটটি প্রদেশে বিভক্ত হবে। তবে চালু থাকবে সংসদীয় ব্যবস্থাই। নতুন সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক বছর ধরে যে অচলাবস্থা বিরাজ করছিল এর মধ্যদিয়ে তার অবসান ঘটল বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর আলাপ-আলোচনা শেষে সোমবার রাতে সমঝোতার এ ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। দেশটিতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে হাজার হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। আর এ বিষয়টি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে রাজনীতিবিদদের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশটির দৈনিক ‘নাগরিক’ পত্রিকার সম্পাদক গোনা রাজ লুইটেল বলেছেন, ‘জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল। তারা ভাবছিল আর কখনোই হয়তো সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হবে না। কারণ রাজনীতিবিদরা কখনোই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু ভূমিকম্প সব কিছু পাল্টে দিয়েছে। দেশ পুনর্গঠনের জন্য সবারই যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা উচিত ভূমিকম্পের পর রাজনৈতিক দলগুলো তা উপলব্ধি করতে পেরেছে।’ তথ্যমন্ত্রী মীনেন্দ্র রাইজাল বলেন, ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৮ হাজার ৭শ’রও বেশি লোক প্রাণ হারায়।
ধ্বংস হয় পাঁচ লাখেরও বেশি বাড়িঘর। আর এ কারণেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একযোগে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হয়। নতুন এ সমঝোতার আওতায় নেপালে বর্তমান সরকার ব্যবস্থাই বহাল থাকবে। বর্তমান পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী এবং প্রেসিডেন্ট একজন আনুষ্ঠানিক প্রধানমাত্র। নতুন ফেডারেল কমিশন অভ্যন্তরীণ সীমানা নির্ধারণসহ পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য একটি প্রস্তাব জমা দেবে। আইন প্রণয়নকারীরা বলছেন, চূড়ান্ত সংবিধানের খসড়া জুলাইয়ে প্রস্তুত হবে। এতে পার্লামেন্টের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে। নেপালে গত ২৫ এপ্রিল ও ১২ মের ভয়াবহ ভূমিকম্পে আট হাজার ৭শ’রও বেশি মানুষ মারা গেছে। ধ্বংস হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ বাড়ি।

ফোনালাপ ফাঁস আতঙ্ক by কাজী সুমন

আতঙ্কের নাম ফোনালাপ ফাঁস। সবচেয়ে আতঙ্কে বিরোধী রাজনীতিবিদরা। একের পর এক ফাঁস হচ্ছে তাদের ফোনালাপ। ফাঁসকারীরা থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। আর যাদের ফোনালাপ ফাঁস হচ্ছে তারা পড়ছেন বিপাকে। হুমকির মুখে পড়ছে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। কাউকে কাউকে যেতে হয়েছে কারাগারেও। লঙ্ঘন হচ্ছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।
সর্বশেষ ফোনালাপ ফাঁসের কারণে বিপাকে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দু’সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান। যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা রইস উদ্দিনের সঙ্গে মাহবুবুর রহমানের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। এর আগে ছাত্রদলের সাবেক নেতা বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের সঙ্গে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ফোনালাপ ফাঁস হয়।
এমন করে গত দুই বছরে ধারাবাহিকভাবে বিএনপির অন্তত একডজন শীর্ষ নেতার ফোনালাপ ফাঁস করা হয়। এতে দলের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সন্দেহ-অবিশ্বাস। বিভ্রান্ত হচ্ছেন কর্মীরা। বেকায়দায় পড়ছেন সিনিয়র নেতারা। এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কের কারণে বিএনপি নেতারা এখন ফোনালাপে খুবই সতর্ক। এমনকি সাংবাদিকদের সঙ্গেও অত্যন্ত সতর্ক হয়ে কথা বলছেন তারা। দলের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন নেতিবাচক মন্তব্য মোবাইল ফোনে বলতে সাহস করছেন না। মন খুলে কথা বলছেন না দলের কর্মীদের সঙ্গেও। সবাইকে সামনাসামনি এসে কথা বলার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন, দলের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে অনেক নেতাই আত্মসমালোচনা করেন। সরকার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংস্থাগুলোকে দিয়ে এই ফোনালাপ ফাঁস করাচ্ছে।
বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদের শেষদিকে ফোনালাপ ফাঁসের প্রথম ঘটনাটি ঘটে। ২০১৩ সালে ২৬শে অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফোন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের প্রায় ৩৭ মিনিট কথোপকথন হয়। এর একদিন পরই একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ওই কথোপকথন সম্প্রচারিত হয়। এ ঘটনার পর দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ২০১১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর রাজধানীতে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের প্রস্তুতি হিসেবে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে খালেদা জিয়া মোবাইল ফোনে নানা দিকনির্দেশনা দেন। পুরনো ওই ফোনালাপের পাঁচটি অডিও দীর্ঘদিন পর ফাঁস হয় বাংলালিক নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে। ফোনালাপ ফাঁসের শিকার হন বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতা ফোন দিয়েছিলেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীকে। প্রায় ১০ মিনিটের কথোপকথনে আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন তারেক রহমান। এর কিছুদিন পরই বাংলালিক নামে ইউটিউব চ্যানেলে তাদের ফোনালাপটি ফাঁস হয়ে যায়। এই ফোনালাপটি ফাঁস হওয়ার পর দলের মধ্যে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন মির্জা আলমগীর। ফোনালাপ ফাঁসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে প্রায় ২৩ মিনিট ফোনে কথা বলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। একই সময় আরেক ব্যক্তির সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন তিনি। ফোনালাপে তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তারা। কয়েকদিন পরই তাদের ফোনালাপ ফাঁস করে দেয়া হয়। ওই ফোনালাপে সেনাবাহিনীকে উসকানি দেয়ার অভিযোগ এনে গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় মান্নাকে। ওই ঘটনায় এখনও কারাভোগ করছেন মান্না।
গত ২৮শে এপ্রিল সিটি নির্বাচন বর্জন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের ফোনালাপ ফাঁস করে দেয়া হয়। ওই কথোপকথনে নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে খালেদা জিয়ার মতামত আছে কিনা শিমুল বিশ্বাসের কাছে জানতে চেয়েছিলেন মওদুদ আহমদ। শিমুল বিশ্বাসও হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়েছিলেন। একদিন পরই ওই ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যায়। এরপর ফের ফোনালাপ ফাঁসের শিকার হন মওদুদ আহমদ। গত ৮ই মে দুপুরে ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি। এরপর তাদের দুই মিনিট ৮ সেকেন্ডের কথোপকথনের একটি অডিও ফাঁস করে দেয়া হয়। ওই ফোনালাপে আবেদকে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘এই বিএনপিকে দিয়ে হবে না। দলকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে এখন জিয়ার বিএনপি লাগবে। জামায়াতের ব্যাপারেও বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেন তিনি।’ এই কথোপকথন ফাঁসের পর জোটের শরিক দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সর্বশেষ ফোনালাপ ফাঁসের শিকার হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। গত ৩রা জুন যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রইসউদ্দিনের সঙ্গে প্রায় ২২ মিনিট দলের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। ৫ই জুন তাদের ওই কথোপকথন ফাঁস  করে দেয় বাংলালিক ইউটিউব চ্যানেল। ওই ফোনালাপে খালেদা জিয়ার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন মাহবুবুর রহমান। ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ না করা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, হাসিনা-খালেদা টেলিফোন আলাপ, চীন, জামায়াত, সেনাবাহিনী, ২০১৯ সালের নির্বাচনেও বিএনপির ক্ষমতায় আসতে না পারা, সিনিয়র নেতাদের জামিনসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন তিনি। ফোনালাপটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তোপের মুখে পড়েন কর্মীদের। এরপর থেকে জেনারেল মাহবুব অনেকটা আড়ালে চলে গেছেন। সভা-সমাবেশ ও দলীয় কর্মসূচিগুলোতেও তাকে দেখা যাচ্ছে না। এদিকে ফোনালাপটির ব্যাপারে জানতে চাইলে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি কিছু জানি না। অনেকের সঙ্গেই প্রতিদিন কথা হয়, খোলা মন নিয়েই কথা বলি। কিন্তু কে কখন ফোন রেকর্ড করে প্রকাশ করছে, এসব নিম্নশ্রেণীর আচরণ। ইদানীং তো চরিত্রহননে এসব করা হচ্ছে। এদিকে বিএনপি নেতাদের ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা ফোনে কথা বলতে রাজি হননি। সরাসরি বাসায় বা অফিসে গিয়ে কথা বলার আহ্বান জানান তারা।  এ ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আধুনিক যুগে প্রযুক্তির সাহায্যে টেলিফোনের কথাগুলো ট্র্যাপ করে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী বানিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রকাশ করছে। বিএনপিতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নেই- এমন কোন নেতা আছে বলে আমার মনে হয় না। যদি কোন ব্যতিক্রম থাকে তাহলে সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সরকারের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিএনপিতে কোন ধরনের প্রভাব পড়বে না।

মিয়ানমারে অপারেশনের মধ্য দিয়ে প্রতিবেশীদের ভারতের বার্তা

ভারতের সেনাবাহিনী মঙ্গলবার মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকে যে বিশেষ অপারেশন চালিয়ে উত্তরপূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু জঙ্গিকে মেরে ফেলেছে আর অন্তত দুটি শিবির ধ্বংস করেছে, তা নিয়ে আজ সেদেশে শুরু হয়েছে বিশ্লেষণ। ক্ষমতাসীন বি জে পি আর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ দাবী করছে এই বিশেষ অপারেশনের মাধ্যমে একটা কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে সব দেশকেই যে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসীদের রুখতে সীমান্ত পেরতেও ভারতীয় সেনারা পিছপা হবে না। এই অংশের ইঙ্গিত পাকিস্তানের দিকেই। বিশ্লেষকদের অন্য অংশের মতে এর আগেও বিদেশে অপারেশন চালিয়েছে ভারতীয় বাহিনী আর সর্বশেষ এই অপারেশন কখনই সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ রোখার জন্য এটা নতুন শক্তিশালী নীতির ফল নয়।
ভারতের সেনাবাহিনী দাবী করেছে যে তাদের প্যারাকমান্ডো আর ইনফ্যান্ট্রির সদস্যরা মঙ্গলবার ভোর রাত থেকে মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকে একটা বিশেষ অপারেশন চালিয়ে নাগা জঙ্গি গোষ্ঠী এন এস সি এন খাপলাং আর তাদের সহযোগী আরও কিছু জঙ্গিগোষ্ঠীর শিবির ধ্বংস করেছে আর অনেককে মেরেও ফেলেছে।
ঠিক কতজন জঙ্গি নিহত হয়েছেন, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়।
ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী বলছিলেন, “ভারত সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে বলেই এত বড় অপারেশন চালাতে পেরেছে সেনাবাহিনী। তারা নিজে থেকে কখনই এই অপারেশন চালিয়ে থাকতে পারে না।“
তাঁর মতে, “এই অপারেশনের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই বিভিন্ন দেশকে একটা বার্তা দেওয়া গেছে যে প্রয়োজন পড়লে বিদেশে গিয়েও সেনাবাহিনী জঙ্গি বা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালাতে পারে।
যেসব দেশের এই বার্তাটা বোঝা উচিত, আশা করা যায় তারা বুঝতে পারবে। তবে তার মানে এই নয় যে আবারও নিশ্চিতভাবেই এরকম অপারেশন চালানো হবে ভবিষ্যতে” বলছিলেন ভারতের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী।
এটা পরিষ্কার যে এই অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানের দিকেও একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে রাজনৈতিক মহল থেকে।
যদিও সেনাবাহিনী বলছে মনিপুরে গত চার তারিখে যেভাবে তাদের ২০ জন সদস্যকে হত্যা করেছে নাগা জঙ্গিরা, তার পরে এরকম প্রতিহিংসামূলক অপারেশন চালানো কিছুটা বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।
বিশ্লেষকদের একাংশ আবার এই অপারেশনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটাকেই বড় করে দেখছেন।
ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট অফ কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের কার্যনির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনী বলছিলেন, “এই অপারেশনের পরে সামরিক কৌশল নিয়ে আলোচনার থেকে বেশী দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক আস্ফালন।
কেন্দ্রীয় সরকার বা বি জে পি-র সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই অপারেশনটাকে ভারতের একটা নতুন সামরিক নীতি হিসাবে দেখাতে চাইছেন।
বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে যে সরকারের একটা শক্তিশালী নীতি, পেশীশক্তির প্রদর্শন হচ্ছে।
কিন্তু এধরণের অপারেশন আগেও চোরাগোপ্তা হয়েছে আর মঙ্গলবারের অপারেশনটার প্রয়োজনীয়তা ছিল একটা স্থানীয় হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।
এই অপারেশন থেকে কোনও বড়সড় কৌশলগত পরিবর্তন না হওয়ারই সম্ভাবনা।“
মি. সাহনী আরও বলছিলেন যে একটা অপারেশনে সেনাবাহিনী বিজয়ী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মিয়ানমারে অবস্থিত জঙ্গি শিবিরগুলি ধ্বংসের জন্য লাগাতার প্রচেষ্টা না থাকলে এই অপারেশনের কোনও গুরুত্বই থাকবে না।
প্রায় একই কথা বলছিলেন উত্তরপূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও জঙ্গিতৎপরতার বিশ্লেষক রাজীব ভট্টাচার্যি।
মি. রাজীব ভট্টাচার্যি বলছিলেন, জঙ্গি শিবিরগুলি আদৌ ধ্বংস করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
তিরিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে এই শিবিরগুলি গড়ে উঠেছে আর সেগুলোর সংখ্যা নিয়মিত বেড়েই চলেছে।
ভারতের সেনাবাহিনী নিশ্চয়ই এই শিবিরগুলো ধ্বংস করতে চাইবে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সুযোগ মিয়ানমার তাদের বারবার দেবে কি না।
কারণ মিয়ানমার সরকার বা তাদের সেনাবাহিনী একটা নতুন ফ্রন্ট খুলে উত্তরপূর্বের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে চাইবে না। “
এমাসের চার তারিখ মনিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে ৬নম্বর ডোগরা রেজিমেন্টের সদস্যদের ওপরে হামলা হয়।
রোজকার মতোই রোড ওপেনিং পেট্রল বা রাস্তার নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার জন্য সেনাবাহিনীর চারটি গাড়ি পারালং আর চারোং গ্রামের কাছে পৌঁছলে প্রথমে ভূমি মাইন ফাটানো হয়।
তারপরেই রকেট ছোঁড়া হয় আর স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে চলতে থাকে গুলি বৃষ্টি।
ওই জায়গাটি ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে।এই হামলার প্রেক্ষিতেই মঙ্গলবারের সেনা অপারেশন।
এই অপারেশনের পরিকল্পনা তৈরি করার জন্যই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বাংলাদেশ সফরে যান নি।
বাহিনীর ওপরে জঙ্গি হামলার পরেই মনিপুরের রাজধানী ইম্ফলে সেনাপ্রধান দলবীর সিং সুহাগ মঙ্গলবারের অপারেশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
- বিবিসি বাংলা
‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ভারতের অভিযান পরিচালিত হয়নি‘ -মিয়ানমার
মিয়ানমার সীমান্তের ভেতর ঢুকে নাগা অঞ্চলে ভারতের বিমান বাহিনী ও বিশেষ বাহিনীর পরিচালিত যৌথ সামরিক অভিযানে ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি নিহত’ হয়েছে। গতকাল ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এমন দাবি করেছেন। গত মঙ্গলবার এ অভিযান পরিচালিত হয়। তবে মিয়ানমার সরকার দৃঢ়তার সঙ্গেই দাবি করছে, মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে ভারতের যৌথ বাহিনীর এ অভিযানটি পরিচালিত হয়নি। একই সঙ্গে দেশটি বলছে, মিয়ানমারের মাটি ব্যবহার করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিদেশে হামলা চালানোর ব্যাপারেও অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে দেশটির সরকার। প্রতিবেশী দেশ ভারতে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলা চালানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের এক সরকারি কর্মকর্তা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মিয়ানমার টাইমস। এদিকে মিয়ানমারকে পরিকল্পিত এ সামরিক অভিযানের ব্যাপারে ভারত আগে থেকে সতর্ক করেছিল কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র দুটির মধ্যে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘দীর্ঘদিনের ইতিহাস’ রয়েছে। কিন্তু, মিয়ানমার সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ওই কর্মকর্তা মিয়ানমারের সীমান্তের ভেতর এ ধরনের হামলার ঘটনা অস্বীকার করেছেন। ভারতের সেনাবাহিনী এর আগে এক বিবৃতিতে বলেছিল, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের কাছে পৃথক দুটি স্থানে গত ৯ই জুন ভিন্ন দুটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা একত্রিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে এ অভিযান চালানো হয়। ভারতের সেনাবাহিনী মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকে বিশেষ এ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু জঙ্গিকে হত্যা করেছে ও কমপক্ষে দুটি শিবির ধ্বংসের কথা বলেছে। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কতোজন সদস্য নিহত হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ক্ষমতাসীন বিজেপি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ দাবি করছেন, বিশেষ এ অভিযানের মাধ্যমে কঠোর একটি বার্তা দেয়া হয়েছে সব রাষ্ট্রকেই। সে বার্তাটি হচ্ছে, জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসীদের আটকাতে সীমান্ত অতিক্রমেও ভারতের সেনারা পিছপা হবে না। তাদের এ ইঙ্গিতটা পাকিস্তানের দিকেই। তবে ভারতীয় বিশ্লেষকদের অপর একটি অংশ এটাকে কোন ভালো পদক্ষেপ হিসেবে মনে করছেন না। এদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহিল শরীফও ভারতের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
ভারতকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের হুশিয়ারি
মিয়ানমারে অভিযানের পর সীমন্তবর্তী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ভারতের মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান। পাক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ বলেছেন, ভারতের রাজনীতিকেরা শুধু জাতিসংঘের সনদই লঙ্ঘন করছেন না, অন্যের দেশে নাক গলিয়ে শ্লাঘা অনুভব করছেন। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না বলেও সাবধান করে দিয়েছেন শরিফ। অন্যদিকে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলি খান বলেছেন, পাকিস্তান মায়ানমারের মতো নয়। আমাদের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা একটা কথা ভাল করে জেনে রাখুক যে, সব রকম অ্যাডভেঞ্চারের জবাব দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।

বাল্যবিয়েতে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সারা বিশ্বে চতুর্থ। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের মতে, এ ক্ষেত্রে বিশ্বে নাইজার, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং চাঁদের পরেই দেশটির অবস্থান। ইউনিসেফের মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগেই। আর শতকরা ৬৫ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়সের আগেই। বাল্যবিয়ে সারা বিশ্বেই কতগুলো ক্ষতিকর পরিণতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে রয়েছে আগাম গর্ভধারণজনিত স্বাস্থ্যগত বিপদ, অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েদের শিক্ষার নিম্নহার, অধিকতর দাম্পত্য সংঘাত এবং ক্রমাগত দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা। এসব কথা বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত ‘বাল্যবিবাহ: বাংলাদেশ’ শীর্ষক ১৩৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্টে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, ২০-২৪ বয়সের মায়েদের তুলনায়, প্রসবকালীন সময়ে ১০-১৪ বছর বয়সের মেয়েদের মৃত্যুঝুঁকি পাঁচ গুণ বেশি। আর যেসব মেয়ের বয়স ১৫-১৯, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ২০-২৪ বয়সের মহিলাদের তুলনায় দ্বিগুণ। অশিক্ষা অথবা অল্পশিক্ষার সঙ্গে বাল্যবিয়ের সম্পর্ক নিয়ে করা গবেষণায় বাংলাদেশে দেখা গেছে, যারা কোন সময়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি, তাদের তুলনায়, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত মেয়েদের ক্ষেত্রে যথাক্রমে শতকরা ২৪, ৭২ ও ৯৪ ভাগের অল্প বয়সে বিয়ে করার সম্ভাবনা কম। বিশ্বের সাতটি দেশে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মেয়ের ১৫ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়, তার ২৫ বছর বয়সের পরে বিয়ে হওয়া মেয়েদের তুলনায় দাম্পত্য নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বিশ্বব্যাপী প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, শতকরা ২০ ভাগ গরিব পরিবারের মেয়েদের, শতকরা ২০ ভাগ ধনী পরিবারের মেয়েদের তুলনায় ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে করার সম্ভাবনা বেশি। অন্য অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়নের সফল উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নারীর অধিকারও। বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ১৯৯১-৯২ সালের তুলনায় ২০১০ সালে ৫৬.৭ শতাংশ থেকে ৩১.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টি জাতিসংঘকে ‘চমৎকৃত’ করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লিঙ্গগত সমতা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের মতে, দেশটিতে ২০০১ সালের তুলনায় ২০১০ সালে মাতৃমৃত্যু ৪০ ভাগ কমে এসেছে।
নানা বিষয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যে এ প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, তাহলে এখানে কেন এখনও বাল্যবিয়ের উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে? এ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তের খুঁজে বেড়ানো এবং বাল্যবিয়ে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সাফল্য অর্জনে বাংলাদেশ সরকার যেসব কার্যকর কৌশল অবলম্বন করতে পারে, সে উপায়গুলো বাতলে দেয়া।
বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের উচ্চ হারের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। সামাজিক অনেক রীতিনীতি ও প্রথা লিঙ্গবৈষম্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, যা জীবনের প্রতি পদে পদে মেয়েদের ক্ষতি করছে এবং বাল্যবিয়ের উচ্চহারের পেছনে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। চরম দারিদ্র্য বাংলাদেশের অনেক পরিবারেই দৈনন্দিন বাস্তবতা। অনেক বাবা-মাই মনে করেন, যে মেয়েকে তারা ঠিকমতো খাওয়াতে, লেখাপড়া করাতে এবং নিরাপত্তা দিতে পারেন না, তার ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে, তাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়া। বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পরিবারের দারিদ্র্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। যারা প্রান্তিক ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেন তাদের বেলায় এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতার ফলে বাংলাদেশ সরকারও তৎপর হয়েছে এবং দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। লন্ডনে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কন্যাশিশু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাল্যবিয়ের হার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন, যাতে বলা হয়, ২০৪১ সালের মধ্যে এটি একেবারে নির্মূল করা হবে। তিনি কথা দেন, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হবে এবং ১৫-১৮ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়েও এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা হবে। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি কথা দেন, তার সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধে প্রাসঙ্গিক আইন-বাল্যবিয়ে নিয়ন্ত্রণ আইন (সিএমআরএ) পর্যালোচনা করবে, ২০১৪ সালের আগেই বাল্যবিয়ে নিয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে, সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তনে আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সুশীলসমাজকে সম্পৃক্ত করবে।
কিন্তু বিশ্ব কন্যাশিশু সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেয়া আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে এর মধ্যেই কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে, বাল্যবিয়ে নিয়ন্ত্রণ আইন পর্যালোচনার সময় মেয়েদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স ১৬ ও ছেলেদের ১৮-তে নামিয়ে আনার সর্বনাশা প্রস্তাব। বাংলাদেশের সুশীলসমাজ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ওই প্রস্তাবের ঘোরতর বিরোধিতা করেছেন। এ প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে সরকার এ প্রস্তাবকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাল্যবিয়ে বন্ধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতিও বিলম্বিত হয়েছে এবং এ প্রতিবেদন লেখার সময় এটি শেষ হয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৪ সালের শেষের দিকে ১১৪ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এদের বেশির ভাগই শিশু ও নারী, যারা নিজেরাই বাল্যবিয়ের সরাসরি শিকার। এদের সঙ্গে কথা বলে, বাল্যবিয়ে বন্ধের সফলতার কথা যেমন জানা গেছে, তেমনি জানা গেছে, এ বিষয়ে সরকারের অনেক কিছুই করণীয় আছে এবং করা উচিত।
বাংলাদেশে এখন বিয়ের বৈধ বয়স হচ্ছে ছেলেদের জন্য ২১ ও মেয়েদের ১৮। ১৯২৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম বাল্যবিয়ে আইন পাস হয়। এরপর এটি বেশ কয়েকবার সংশোধিত হয়। ওই আইন অনুসারে ১৮ ও ২১ বছর বয়সের আগে ছেলে বা মেয়েদের বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু ওই আইন খুব কমই প্রয়োগ হয়।
বিভিন্ন পরিবারকে জিজ্ঞেস করা হয়, মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত কিভাবে তারা নিয়েছে। তারা বারবার তখন নিজেদের দারিদ্র্যের কথা বলেছে। অন্যদিকে মেয়েরা জানিয়েছে, শুধু ক্ষুদার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বাবা-মা তাদের বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ছে। দারিদ্র্য, শিক্ষা ও বাল্যবিয়ে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক পরিবার বলেছে, তারা এতই গরিব, মেয়েকে স্কুলে রাখার সামর্থ্য তাদের ছিল না। ১০টা পরীক্ষার ফি দেয়ার সামর্থ্যও তাদের নেই। সামাজিক রীতিনীতি ও লিঙ্গবৈষম্যের ফলে বাবা-মায়েরা মনে করেন, ছেলেসন্তান তাদের ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দেবে। কিন্তু মেয়েসন্তান পরিবারের বোঝা, যে একসময় শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে। ফলে টাকা-পয়সার টান পড়লেই, ওই পরিবারগুলো মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়। অসচ্ছলতার কারণে অনেক ছেলেও স্কুলে যেতে পারে না। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের ঝরে পড়তে না দেয়া, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় যৌন ও প্রজনন শিক্ষা দেয়া এবং বাল্যবিয়ের আইনগত ও ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে ধারণা দেয়ার ক্ষেত্রে স্কুলগুলো খুব সামান্য কিছুই করে থাকে।
বিভিন্ন পরিবারের চরম দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হওয়ার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এসবের সঙ্গে যোগ হওয়া, অনেক পরিবার ঘর-বাড়ি, জমি, ইত্যাদি বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সাক্ষাৎকার দেয়া বেশ কিছু পরিবার জানিয়েছে, তাদের সন্তানদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়ার পেছনে দুর্যোগের বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। অন্য পরিবারগুলোও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট সংকটের কথা জানিয়েছে। যার ফলে দ্রুত বিয়ে দেয়াই মেয়ে ও পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভাল উপায় মনে হয়। হয়রানি এবং ভয়ভীতিও বাল্যবিয়ের অন্যতম বড় অনুঘটক। অবিবাহিত উঠতি বয়সের মেয়েদের নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দেয় বখাটেরা। এর মধ্যে রয়েছে বিয়ের উদ্দেশ্যে অপহরণও। বাবা-মায়ের যখন মনে হয়, ওই বখাটেদের হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা করা সম্ভব নয়, পুলিশও সাহায্য করবে না, তখন মেয়েকে বিয়ে দেয়াই একমাত্র সমাধান মনে হয় তাদের। পাড়া-প্রতিবেশী ও সমাজের অন্যরাও পরিবারগুলোকে প্রভাবিত করে। সমাজে মনে করা হয়, ঋতুস্রাব হওয়া মানেই মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে যাওয়া। মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে বরকে যৌতুক দেয়ার বহুল চর্চিত রীতিও পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। ভাবা হয়, মেয়ের বয়স কম হলে, বিয়েতে যৌতুকও কম দেয়া যাবে বা না দিলেও চলবে। বাংলাদেশে ছেলেরাও বাল্যবিয়ের শিকার, কিন্তু মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের বাল্যবিয়ের সংখ্যা ১১ গুণ কম।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যেসব বিবাহিত মেয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, দেখা গেছে তারা পড়ালেখা পাকাপাকিভাবে ছেড়েই দিয়েছে। তাদের খুব দ্রুত গর্ভধারণ করতে হয়েছে, কখনও চাপের মুখে, কখনও জন্মনিরোধক সামগ্রী না থাকায় কিংবা পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ধারণা না থাকায়। স্বামীকে ছেড়ে দেয়া বা বিচ্ছেদের শিকার হওয়া অনেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের কারণে নতুন করে পড়ালেখা শুরু করতে পারেনি। আগাম গর্ভধারণের কারণে অনেকে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়েছে, কেউ কেউ মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অনেকের কাহিনী খুব করুণ। স্বামীর পরিত্যক্তা কিংবা স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক মেয়ে বিকল্প খুঁজে না পেয়ে স্বামীর কাছেই ফেরার আকুতি জানাচ্ছে।
বাল্যবিয়ে বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের চেষ্টা ও অঙ্গীকার পর্যাপ্ত কাজে রূপ নেয়নি। জন্মনিবন্ধন পদ্ধতি সম্প্রসারণে সরকারের সংস্কারের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভালভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাল্যবিয়ে বন্ধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর ফলে, একজন ব্যক্তির বয়স যাচাই করে দেখা সম্ভব, তিনি আইনসম্মতভাবে বিয়ের উপযুক্ত কিনা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় কর্মকর্তারা নিয়মিতই ঘুষের বিনিময়ে জাল জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে একরকম বাল্যবিয়েকে উৎসাহিত করেন। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করে সরকার সবার মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু কিছু ব্যয় এখনও রয়ে গেছে, যার ফলে অনেক গরিব শিশু স্কুলে যেতে পারছে না। মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষার অভাবের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে বাল্যবিয়ে। সরকারি যেসব সংস্থা গরিব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার পরিবারদের সাহায্য করছে, তাদের উচিত বাল্যবিয়ে বন্ধে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়া। বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রচলিত আইনটির সংস্কার প্রয়োজন। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আইনটির যথাযথ প্রয়োগ।
লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে আন্তর্জাতিক যেসব আইন আছে, সেখানে বলা হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের ন্যূনতম বয়স সমান হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়সে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হচ্ছে ১৮। বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য ন্যূনতম বয়স যেখানে ১৮, সেখানে ছেলেদের বয়স বেশি নির্ধারণ করা এক ধরনের ক্ষতিকর লিঙ্গবৈষম্য। এটি নিশ্চিত করে, বেশি বয়সী ছেলে কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে। আন্তর্জাতিক আইন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই সে কখন বিয়ে করবে তা নির্ধারণ করার স্বাধীনতা দেয়। অথবা নিজে স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও সাবালক হওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে স্থগিত রাখার অধিকার দেয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, নিজের নাগরিকদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যগত অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের যে কোন ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন সন্ত্রাস হতে রক্ষা করা।
হিউম্যান রাইটস প্রতিবেদন তৈরিতে যেসব গ্রামে গিয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগেই বাল্যবিয়ে কেবল গ্রহণযোগ্যই নয়, প্রত্যাশিতও। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে বাল্যবিয়ে বন্ধে রাজনৈতিক অঙ্গীকার গ্রহণ একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এ লক্ষ্য কখনোই অর্জিত হবে না, যদি সরকারের সর্বক্ষেত্রে, অর্থাৎ কার্যকর আইন, নীতি ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়েকে স্থায়ীভাবে প্রাধান্য দেয়া না হয়।

বাংলাদেশে উৎপাদিত সোয়েটার নিয়ে বিপাকে রাসেল ব্র্যান্ড

বৃটিশ কৌতুকাভিনেতা রাসেল ব্র্যান্ড বাংলাদেশে উৎপাদিত সোয়েটার বিক্রি করছেন ৬০ পাউন্ড (৭১৩৩ টাকা) করে। অথচ বাংলাদেশের যে কারখানায় সোয়েটারগুলো তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রতিজন শ্রমিক ঘণ্টায় মজুরি পান মাত্র ২৫ পেনি (১ পাউন্ডের চার ভাগের এক ভাগ বা ৩০ টাকা)! রাসেল ব্র্যান্ড বলছেন, সোয়েটার বিক্রির লাভের অর্থ ব্যয় হবে ‘ভাল কাজে’ তথা দাতব্য সংস্থায়। কিন্তু কত অর্থ কোথায় বা কিভাবে ব্যয় হয় - তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। শুধু তা-ই নয়, সোয়েটারের ভেতরের স্টিকারে দাবি করা হয়েছে, এটি উৎপাদন ও প্রিন্ট হয়েছে যুক্তরাজ্যে! অথচ ওই স্টিকার উল্টালেই দেখা যায়, লেখা রয়েছে: মেড ইন বাংলাদেশ! এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে বৃটেনে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বের করেছেন এ রকম আরও হাঁড়ির খবর। এ খবর দিয়েছে যুক্তরাজ্যের পত্রিকা দ্য ডেইলি মেইল। খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ওই কারখানার শ্রমিকরা জানিয়েছে প্রতিদিন তাদের ১১ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়। দিনশেষে তারা মাত্র ২ পাউন্ডের কাছাকাছি পান। অথচ, রাসেল ব্র্যান্ড সেসব সোয়েটার ৬০ পাউন্ড করে বিক্রি করছেন। বলছেন, এসব থেকে প্রাপ্ত লাভের এক পয়সাও তিনি নেবেন না। কিন্তু এসব অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, লাভের অঙ্কটিই বা কতো - এ নিয়ে কোন সদুত্তর নেই তার কাছে। শুধু বলছেন, সব আয়-ব্যয় হবে ‘ভাল কাজে’। ‘ভাল কাজ’ বলতে তিনি কি বোঝাচ্ছেন, তা-ও সুনির্দিষ্ট নয়। নিজেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরোধী বলে দাবি করা কোটিপতি কৌতুকাভিনেতা রাসেল ব্র্যান্ডের এসব দ্বিমুখী আচরণ প্রকাশ হবার পর, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদ ও সামাজিক কর্মীরা তাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘প্রথম শ্রেণীর ভণ্ড’ হিসেবে। সম্প্রতি রাসেল ব্র্যান্ড বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। ওয়ালমার্ট শ্রমিকদের যুক্তরাষ্ট্রের আইনানুযায়ী ন্যূনতম মজুরি দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্র্যান্ড নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য যে কোম্পানি থেকে পোশাক নিয়েছেন, তারা শ্রমিকদের যে মজুরি দেয়, তা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যূনতম মজুরির চেয়ে ৩১৭ গুণ কম। বেলজিয়াম-ভিত্তিক স্টানলে অ্যান্ড স্টেলা নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি এরপরও যুক্তি দেখাচ্ছে, তারা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শ্রমিকদের অর্থ দেয় বেশি, খাটায় কম। বৃহসপতিবার থেকে ব্র্যান্ড এ নিয়ে অসংখ্য প্রশ্নের বাণে জর্জরিত হচ্ছেন। তবে কোন প্রশ্নেরই উত্তর না দিয়ে নিজের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন তিনি।
ব্র্যান্ড তার সোয়েটারের ক্রেতাদের বলেছেন, ৬০ পাউন্ড দিয়ে শোয়েটার কিনলে আয়কৃত অর্থ যাবে দাতব্য সংস্থায়। কেউ চাইলে আরও বেশি অর্থ দিয়েও কিনতে পারেন। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদক ৬০ পাউন্ড দিয়ে একটি সোয়েটার কিনলে দেখতে পান, এর মধ্যে কত অর্থ দাতব্য সংস্থায় যাবে, তা রশিদে উল্লেখ নেই। কিন্তু ৬৫ পাউন্ড দিয়ে আরেকটি সোয়েটার কিনলে তাকে জানানো হয়, এখান থেকে মাত্র ১.৩৭ পাউন্ড ব্যয় হবে ভাল কাজে! এ ছাড়া কোন ‘ভাল কাজে’ ব্যয় হবে, তা-ও জানানো হয়নি ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইটে। এর অর্থ কি এই যে, ৬০ পাউন্ড দিয়ে সোয়েটার কিনলে, ব্র্যান্ডের কোন লাভই হয় না এবং তাই দাতব্য সংস্থায় কোন অর্থই যায় না?
কোন ‘ভাল কাজে’ ওই অর্থ ব্যয় হবে এমন প্রশ্নের জবাবে রাসেল ব্র্যান্ড বলেন, ওই অর্থ ‘সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পে’ ব্যয় হবে। ওই প্রকল্পের মধ্যে তার নিজের একটি ক্যাফেও আছে! সোয়েটার বিক্রির লাভের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়, বা তার ক্যাফে ব্যতীত অন্য কোন দাতব্য সংস্থায় সে অর্থ ব্যয় হয়েছে কিনা, সে সম্পর্কে কোন প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বৃটেনের চ্যারিটি কমিশন পর্যন্ত গড়িয়েছে। চারিটি কমিশন ব্র্যান্ডের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। গত বছর ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইটে লেখা ছিল, তার এ ধরনের বিভিন্ন জিনিস বিক্রির অর্থ রাসেল ব্র্যান্ড ফাউন্ডেশনে যাবে। বর্তমানে সে তথ্য ওয়েবসাইট থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া চ্যারিটি কমিশন জানিয়েছে, তাদের কাছে রাসেল ব্র্যান্ড ফাউন্ডেশন নামে কিছুই নথিভুক্ত নেই। ফাউন্ডেশন নিয়েও কোন প্রশ্নের জবাব দেননি কোটি পাউন্ডের মালিক এই অভিনেতা।

মিয়ানমারে ভারতের অভিযান চীন ও পাকিস্তানকে সতর্কবার্তা

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে অভিযান চালিয়েছে ভারতের সেনাবাহিনী। এতে মিয়ানমারে কমপক্ষে ১০০ জন নিহত হয়েছে। এ অভিযানের মধ্য দিয়ে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে চীন ও পাকিস্তানকে। ৪ঠা জুন ভারতের মণিপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর এ ‘প্রতিশোধমূলক’ হামলা চালায় ভারত। পাঁচদিন আগে থেকেই শুরু হয় হামলার পরিকল্পনা। মণিপুরের ঘটনার পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল মোদির সঙ্গে তার পূর্বনির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল করে মণিপুরে চলে যান। পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাজ্য সফর বাতিল করে একই কাজ করেন দেশটির সেনাপ্রধান দলবীর সিং সুহাগও। এছাড়া, এক সপ্তাহ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস. জয়শঙ্কর গোপনে মিয়ানমার সফর করেন। ওই সফরের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয় নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে মিয়ানমারের ভেতরে বিশেষ বাহিনীর পুরো অভিযানের বিষয়টি দেখভাল করেন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও সেনাপ্রধান দলবীর সিং। অজিত দোভাল কয়েকদিন ধরে মণিপুরে অবস্থান করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন। এরই ফলশ্রুতিতে মিয়ানমারের মধ্যে প্রবেশ করে হামলা চালায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো ইউনিট। এ খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টাইমস ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এতে আরও বলা হয়, দেশের বাইরে এ ধরনের অভিযান চালানোর ঘটনা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিরল। সূত্র বলেছে, ওই অভিযানে অন্তত ৫০ জনের হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত। তবে সংখ্যা আরও বেড়ে শতাধিকও হতে পারে। মঙ্গলবার রাত তিনটায় যখন অন্ধকার কাটেনি ঠিক তখনই ওই অভিযান শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় গতকাল বিকালে। অভিযান শেষে ভারতের তথ্য ও সমপ্রচারবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রাজ্যবর্ধন রাথোড় এক টুইট বার্তায় বলেন, ওই অভিযানটি ছিল পাকিস্তান সহ যে সব দেশ ও গোষ্ঠী ভারতে সন্ত্রাস চালানোর ইচ্ছা পোষণ করে, তাদের প্রতি সতর্ক বার্তা। সন্ত্রাসীদের কোন পরিচয় থাকতে পারে না। আমরা যখন চাইবো, আমরা হামলা চালাবো। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রাথোড় আরও বলেন, খুবই প্রয়োজনীয় এ অভিযানটির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে, দুইটি ভিন্ন গোষ্ঠী ভারতে আবারও হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু দুইটি শিবিরেই হামলা করা হয়েছে এবং সমপূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। বিশেষ বাহিনীর কারো কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। সমপ্রতি মোদির বাংলাদেশ সফরের দিকে ইঙ্গিত করে রাজ্যবর্ধন রাথোড় আরও বলেন, একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের প্রতি ভারতের ইচ্ছা ও পারসপরিক উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকার তৈরি হয়েছে ওই দেশটির সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে। তিনি বলেন, আমরা ভারত বা ভারতীয়দের ওপর কোন হামলা বরদাশত করবো না। আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে বা আক্রমণাত্মক কায়দায় এর বিরুদ্ধে উদ্যোগ চালাবোই। আমরা যেকোন জায়গায়, যেকোন সময় আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আক্রমণ চালাবো।
ভোর ৩টায় অভিযান চালানো হলেও, বিষয়টি সমপর্কে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দেশটিতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অবহিত করেন মঙ্গলবার সকাল ৯টায়। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওই একক অভিযান সমপর্কে মিয়ানমারকে জানানো না হলেও, কোন সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা করে নি ভারত। কারণ, দেশ দু’টোর মধ্যে ১৯৯০ সাল থেকেই একটি চুক্তি কার্যকর আছে। এর বলে উভয় দেশের সেনাবাহিনী পরসপরের ভূমিতে অভিযান পরিচালনা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আগে সংশ্লিষ্ট দেশকে অবহিত করতে হয়। কিন্তু তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় এ অভিযানের ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে আগে থেকে না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। কেননা, ধারণা করা হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যম ও নিম্ন পর্যায়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভালো সংযোগ রয়েছে। তবে দেশ দু’টোর মধ্যে এ ধরনের অভিযানের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৯৫ সালের এপ্রিল-মে’র দিকে ‘অপারেশন গোল্ডেন বার্ড’ নামে ভারত-মিয়ানমারের একটি যৌথ অভিযানে কমপক্ষে ৪০ জঙ্গি নিহত হয়। এরপর থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে উভয় দেশ পরসপরকে সহযোগিতা করে আসছে। ২০০১ সালে, ভারতের মণিপুরে প্রবেশ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। তবে এ অভিযানের মাধ্যমে চীনকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি বার্তা পাঠানো হলো বলে ভাবা হচ্ছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রমতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহযোগিতা দিচ্ছে চীন। একেবারে সামপ্রতিক একটি গোয়েন্দা তথ্য মোতাবেক, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া চীনের ইউনান প্রদেশে আশ্রয় চেয়েছেন। এছাড়া, সামপ্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ খবরও আসছিল যে, চীনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরেশ বড়ুয়ার উলফা ও আরেক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এনএসসিএন (কে) সহ মোট ৭টি সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন মিলে গঠন করেছে ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ওয়েস্টার্ন সাউথ-ইস্ট এশিয়া’ নামের একটি সংগঠন। মণিপুরে ৪ঠা জুনের যে হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন, সেখানে সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে ধারণা করছে ভারত। ভারতীয় গোয়েন্দাদের আরও ধারণা, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ওই অস্ত্র পেয়েছে ভিনদেশী সংস্থার কাছ থেকে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, ক্ষমতাসীন বিজেপি আর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ দাবি করছে এই বিশেষ অপারেশনের মাধ্যমে একটা কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে সব দেশকেই যে, জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসীদের রুখতে সীমান্ত পেরুতেও ভারতীয় সেনারা পিছপা হবে না। এই অংশের ইঙ্গিত পাকিস্তানের দিকেই। বিশ্লেষকদের অন্য অংশের মতে এর আগেও বিদেশে অপারেশন চালিয়েছে ভারতীয় বাহিনী আর সর্বশেষ এই অপারেশন কখনই সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ রোখার জন্য এটা নতুন শক্তিশালী নীতির ফল নয়। ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী বলেন, ভারত সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে বলেই এত বড় অপারেশন চালাতে পেরেছে সেনাবাহিনী। তারা নিজে থেকে কখনই এই অপারেশন চালিয়ে থাকতে পারে না। তার মতে, এই অপারেশনের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই বিভিন্ন দেশকে একটা বার্তা দেওয়া গেছে যে প্রয়োজন পড়লে বিদেশে গিয়েও সেনাবাহিনী জঙ্গি বা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অপারেশন চালাতে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশ আবার এই অপারেশনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটাকেই বড় করে দেখছেন। ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট অব কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের কার্যনির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনী বলেন, এ অপারেশনের পরে সামরিক কৌশল নিয়ে আলোচনার থেকে বেশী দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক আস্ফালন। কেন্দ্রীয় সরকার বা বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই অপারেশনটাকে ভারতের একটা নতুন সামরিক নীতি হিসাবে দেখাতে চাইছেন। বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে যে সরকারের একটা শক্তিশালী নীতি, পেশীশক্তির প্রদর্শন হচ্ছে। মি. সাহনী আরও বলেন যে, একটা অপারেশনে সেনাবাহিনী বিজয়ী হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মিয়ানমারে অবস্থিত জঙ্গি শিবিরগুলি ধ্বংসের জন্য লাগাতার প্রচেষ্টা না থাকলে এই অপারেশনের কোন গুরুত্বই থাকবে না। প্রায় একই কথা বলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও জঙ্গি তৎপরতার বিশ্লেষক রাজীব ভট্টাচার্যি। তিনি বলেন, জঙ্গি শিবিরগুলি আদৌ ধ্বংস করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিরিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে এই শিবিরগুলি গড়ে উঠেছে আর সেগুলোর সংখ্যা নিয়মিত বেড়েই চলেছে। ভারতের সেনাবাহিনী নিশ্চয়ই এই শিবিরগুলো ধ্বংস করতে চাইবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সুযোগ মিয়ানমার তাদের বার বার দেবে কি না। কারণ মিয়ানমার সরকার বা তাদের সেনাবাহিনী একটা নতুন ফ্রন্ট খুলে উত্তরপূর্বের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে চাইবে না।

মানব পাচারে থাই জেনারেলের বিরুদ্ধে বিতর্ক নতুন নয়

থাইল্যান্ডে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মানাস কোংপানের অতীত বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় উঠে আসছে দেশটির গণমাধ্যমে। ২০০৫-০৬ সালের দিকে তিনি উপকূলীয় প্রদেশ রানোং-এ একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্সের কর্নেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার দায়িত্ব ছিল থাইল্যান্ডের সমুদ্র সীমায় ঢুকতে চেষ্টারত অবৈধ অভিবাসীদের দিকে নজর রাখা। থাইল্যান্ডের বড় জুয়াড়িদের ওপরও চোখ রাখার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। মানাস কোংপানের সেনা ইউনিটটিকে দুর্ধর্ষ ভাবা হতো। কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে তার ব্যাপারে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। এ খবর দিয়েছে ব্যাংকক পোস্ট। সেখানে আরও বলা হয়েছে, ২০০৭ সালের অক্টোবরে, তিনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশে কাজ করার নির্দেশ পান মানাস। সে সময় সুংগাই কোলোক জেলার এক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীর বাসায় এক অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি। সেখানে প্রায় নগদ ৩ কোটি বাথ উদ্ধার করে তার ইউনিট। তখন অভিযোগ করা হয়, ওই মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সমপর্ক রয়েছে বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর। ওদিকে পরে বের হয়, ওই বাড়ি থেকে মূলত উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি বাথেরও বেশি অর্থ। সমস্ত অর্থ ওই বাড়িতে পিভিসি পাইপের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু মানাসের নজরেই দুইটি পিভিসি পাইপ গায়েব হয়ে যায়। পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় ৩ কোটি বাথ। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মানাসের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছিল। কিন্তু কোন প্রমাণ না থাকায় থমকে যায় তদন্ত। ওই অর্থ কোথায় হারিয়েছে, সেটি নিয়ে এখনও রহস্য বিদ্যমান।
লে. জেনারেল মানাসের সামরিক কর্মজীবনের বেশিরভাগই কেটেছে পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলে। এ কথা চাউর ছিল, তিনি দক্ষিণাঞ্চলীয় চতুর্থ সেনা রিজিয়নের প্রধান হিসেবে ২ বছরের মধ্যে অবসর নেবেন। ২০১৩ সালে সোংখালা প্রদেশের ৪২ তম মিলিটারি সার্কেলের প্রধান হিসেবে তিনি পদোন্নতি পান। এ পদকে বেশ প্রভাবশালী ভাবা হয়। এ পদের থাকা সেনা কর্মকর্তাকে একটি নতুন নাম দেয়া হয়, সেটি হলো, দ্য বস অফ ‘হাত আই’, অর্থাৎ সোংখালার বস। এ বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত নিজের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন মানাস। কিন্তু নতুন পদোন্নতির আগেই মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে সেনাবাহিনীর একজন বিশেষজ্ঞের পদ দেয়া হয়। একে এক প্রকার পদবনতি হিসেবেই দেখা হয়। এ মাসের শেষের দিকে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ‘না থাওয়ি’ প্রাদেশিক আদালত। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, মানব পাচারকারীদের সঙ্গে আঁতাত, অবৈধ অভিবাসীদের পাচারে জড়িত থাকা ও মানব পাচারের ভুক্তভোগীদের মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা। তার বিচার সামরিক আদালতের বদলে বেসামরিক আদালতেই হবে। গত বুধবার তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তার জামিনাবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের বর্তমান সামরিক সরকারের আমলে এমন একজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার আটকের বিষয়টি ইঙ্গিত দেয়, মানব পাচারের বিরুদ্ধে সরকার বেশ সিরিয়াস। এর অর্থ, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হলে মানাসকে বহু দূর পাড়ি দিতে হবে।
ওদিকে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের শিকার ৯৯ জনের মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটির জঙ্গলে গণকবর থেকে এসব উদ্ধার করা হয়। প্রথম থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, এসব গণকবর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের।

‘রাজনৈতিকভাবেই তিস্তার সমাধান করতে হবে’ by সিরাজুস সালেকিন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মোদির এবারের সফরে সবার দৃষ্টি ছিল তিস্তা চুক্তির দিকে। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি পরিষ্কারভাবে কিছু বলেননি। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোন সময়সীমার কথাও বলা হয়নি। বাংলাদেশীদের কাছে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানি বণ্টনের জট এখনও না খোলার ক্ষেত্রে আবার ‘গণতন্ত্রের’ যুক্তি দেখিয়ে অপেক্ষায় রেখেছেন মোদি। বাংলাদেশ ত্যাগের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত উন্মুক্ত বক্তৃতায় মোদি বলেন- ভারত অনেক বড় দেশ, অনেক রাজ্য ওখানে, আমাদের ওখানে গণতন্ত্র রয়েছে, তাই সবার মতৈক্য নিয়ে তা করতে সময় লাগবে। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, পানি সমস্যার সমাধানও আমরা করবো। মোদি আরও যোগ করেন, পাখি, বাতাস আর পানি সীমানা মানে না। তাই পানি নিয়ে কোন রাজনীতি হতে পারে না। সফরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গী হলেও তার পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য আসেনি। এ অবস্থায় তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিনের জন্য ঝুলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই বাংলাদেশ সরকারকে তিস্তা সমস্যা সমাধানে জোর তৎপরতা চালানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে জনমত গঠনের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তারা এ পরামর্শ দেন। পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, তিস্তা ইস্যুটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। এটা রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া দরকার। পানি বণ্টনের কারিগরি বিষয়গুলো ২০১১ সালেই হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ সরকার এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবে নাকি করবে না, এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবে যত দর-কষাকষির যত যন্ত্র আছে বাংলাদেশের ব্যবহার করা উচিত।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশ সরকারের বেশি কিছু করণীয় নেই। ক্ষমতায় থাকার জন্য নিজেদের স্বার্থ তুলে দিচ্ছে। যতই প্রপাগান্ডা করুক তারা কি দিয়েছে। সীমান্ত চুক্তি বহু আগে রেকটিফাইড হওয়ার কথা ছিল। এর বিনিময় মূল্য আমরা পাইনি। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন ও তাদের নিরাপত্তার জন্য ট্রানজিট নিয়েছে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র, নদীর ভেতরে বাঁধ সবকিছু দিয়েছে সরকার। এ দেয়াটা মোটেও সমতাপূর্ণ হয়নি। সরকার নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের সমর্থন জরুরি মনে করছে। পাওয়ার আগে দিয়ে দেয়াটা বোকামি। তারা যে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে তা বাস্তবায়নে অনেক সময় নেবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল  হক বলেন, সরকারের যা করণীয় তা করছে না। ভারত পানি সরিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে তা হিসাব করা দরকার। টাকার অংকে নয়। এটা ডলারের অংকে হিসাব করতে হবে। ভারত সরকারের কাছে এ ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি হতে পারে। পানি না পাওয়ায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। ডিপ টিউবওয়েল কাজ করছে না। সর্বোপরি পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটা প্রচার করতে হবে। শুধু লংমার্চ করলে হবে না। সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। যৌথ নদী কমিশনে সম্ভব না হলে সচিব পর্যায়ে বৈঠকে এটা তোলা দরকার।
আন্তর্জাতিক মহলে জনমত গঠনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের পানি প্রবাহ আইনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বিচার চাইতে পারে বাংলাদেশ। এভাবে বিশ্বমহলে জনমত গড়ে তুলতে হবে। নাহলে পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে চলে যাবে। টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা তিস্তার পানি বণ্টনে কোন প্রভাব ফেলবে না মন্তব্য করেন তিনি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দুইটা ভিন্ন জায়গা। টিপাইমুখের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে তা ভারতকে বোঝানো গেছে। যে কারণে তারা সেখানে বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ফেনী নদীর পানি বণ্টন সম্পর্কে এ পানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ফেনী নদী সীমান্ত বরাবর প্রবাহিত নদী, এর ৬০ ভাগ বাংলাদেশে। আর ৪০ ভাগ ভারতে। কিন্তু ভারত ৫০ পঞ্চাশ ভাগ পানি দাবি করছে। এবিষয়েও সোচ্চার হওয়া দরকার বাংলাদেশ সরকারের।

স্বপ্নপূরণ হলো না রেশমার

স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে জর্ডান গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন খুলনার রূপসা উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের গৃহবধূ রেশমা বেগম (৩৫)। গত ১৫ই এপ্রিল তিনি জর্ডান গিয়েছিলেন। দালালচক্র এই দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় ৭০ হাজার টাকা। জর্ডানের মুনিবদের খুশি করতে ব্যর্থ হয়ে লাশ হয়ে ফিরছে রেশমা বেগম। স্ত্রী ও জীবনে সঞ্চিত সব অর্থ হারিয়ে দুই সন্তানকে বুকে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন রেশমার স্বামী দেলোয়ার হোসেন। এখন  স্ত্রীর লাশটি ফিরে পাবেন কিনা এমনই শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। বুধবার খুলনা প্রেস ক্লাবে এসে এমনই অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করলেন।
দেলোয়ার হোসেন দিলু কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, প্রতিবেশী নন্দনপুরের ফজলে হাওলাদারের স্ত্রী নাসিমা বেগমের মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে চুক্তি হয় জর্ডানে যাবার। প্রতারক নাসিমা বেগম তার জামাই মো. জাকারিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় রেশমা বেগম ও তার স্বামী দেলোয়ার হোসেন দিলুকে। জাকারিয়া তাদের কথা দেয়, জর্ডান গেলে রেশমা বেগম প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে আয় করতে পারবে। জর্ডানে যেতে তার খরচ হবে ৭০ হাজার টাকা। এরইমধ্যে জাকারিয়া গ্রামে নিয়ে আসে ঢাকার মানবপাচারকারী চক্রের একজন হোতা মো. সোহেলকে। তাদের সকলের উপস্থিতিতে রেশমা বেগম ও তার স্বামী দেলোয়ার হোসেন দিলু জীবনের সঞ্চিত সর্বস্ব বিক্রি করে তুলে দেয় ৭০ হাজার টাকা। চলতি বছরের ১৫ই এপ্রিল দালালচক্রের সহায়তায় ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই জর্ডান পাড়ি দেয় রেশমা বেগম। ৭ বছরের আবীর হোসেন ও ৫ বছরের আমীর হোসেনকে ফেলে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর তিনি। জর্ডান পৌঁছানোর তিনদিন পর একবার ফোন করে স্বামী দিলুকে জানিয়েছিল ঠিকঠাক মতোই পৌঁছেছে সে। তবে কি কাজ করতে হবে সেটা জানায়নি তখনও। তার ১৫ দিন পর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আবারও ফোন করে বলেছিল ভালোই আছে সে। সর্বশেষ গত ৩রা জুন কান্নাজড়িত কণ্ঠস্বরে রেশমা বেগম ফোন করে স্বামী দিলুকে। বলে, ‘আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। আমি আর পারছি না। আমাকে নিয়ে যাও, না হলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে বলছে।’
দেলোয়ার হোসেন দিলু আরও বলেন, এরপর আর কথা হয়নি রেশমার সঙ্গে। ওর নম্বরটাও বন্ধ পেয়েছি। ৮ই জুন জর্ডানে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ফোন করে বলা হয়েছে রেশমা বেগমের লাশ উদ্ধার করেছে তারা। লাশের সঙ্গে থাকা মোবাইল সেটের ডায়াল কলের সর্বশেষ কললিস্ট নম্বরটিতেই ফোন করেছে দূতাবাস। এখন লাশ কিভাবে পাঠাবে তাই জানতে চায় দূতাবাস কর্তৃপক্ষ। এরপর দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দিলুকে ঘটনাটি কোথাও না জানাতে বলছে। কোথাও জানানো হলে তাকে ও তার দু’পুত্রের জীবন শেষ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। এ অবস্থায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন দেলোয়ার হোসেন দিলু। এসময় দুই পুত্রও হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে শেষ আশ্রয়স্থল বাবাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করছে, মা কোথায়?
রেশমা বেগম ডুমুরিয়ার শাহপুর ইউনিয়নের বর্নি গ্রামের মো. শাহজাহান বাওয়ালীর মেয়ে। শাহজাহান বাওয়ালী বলেন, ‘লাশ চাই না আমার মেয়েকে ফেরত চাই। দালালরা এখন আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে। কি হবে আবীর-আমীরের?’
এব্যাপারে জানতে দালালচক্রের সদস্য রূপসার নন্দনপুরের নাসিমা বেগমের জামাই ফুলতলার বাসিন্দা মো. জাকারিয়াকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘দেলোয়ার হোসেন দিলু রেশমা বেগমের স্বামী না। তার কাছেই শোনেন রেশমা কোথায়? একজন অভিযোগ দিলেই হবে? আপনারা যা পারার করেন, যান।’ দালালচক্রের মূল হোতা ঢাকার মো. সোহেলের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করলে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

সাগরে ভাসা মানুষের দুঃখের গাথা by মনজুরুল হক

হ্যাঁ, সেসব নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের কথা আমি বলছি, কেউ যাদের নিতে চায় না। বানভাসি মানুষ, সাগরভাসি মানুষ, অভুক্ত মানুষ, মৃত্যুতেও যাদের মেলে না কবর, বরং ছুড়ে ফেলা হয় অথই সাগরে সমুদ্র-প্রাণীর খাবার হিসেবে। মানবতার এই অবমাননা একবিংশ শতাব্দীর চমক জাগানো অগ্রগতির মধ্যেও আমাদের দেখে যেতে হয় এবং আমরা বুঁদ হয়ে থাকি ইন্টারনেট, ফেসবুক আর সেলফি কালচারে। আর মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে আমারই পাশের গ্রাম কিংবা পাড়ার কোনো এক অসহায় তরুণ, জীবনযুদ্ধে পরাজিত না হওয়ার প্রচণ্ড বাসনা যাকে অজান্তেই আটকে ফেলেছিল দালাল-ফড়িয়ার খপ্পরে।
অসহায় এসব মানুষের কথা বলতে গেলে তাই অজান্তেই আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কিছু অমানুষের কথাও এসে যায়, লোভ আর মোহ যাদের নিয়ে গেছে এমন এক অন্ধকার কুঠুরিতে, যাবতীয় মানবিক গুণ যেখানে তারা বন্ধক রেখেছে নগদপ্রাপ্তির কাছে। আর এ দুই দলের মাঝে আছে আরও একশ্রেণির মানুষ, বাহ্যিক পরিচয়ে যাদের অবস্থান আমাদের মতো নগণ্য শ্বাসজীবীদের অনেক ওপরে, তবে কাছে থেকে চোখ বুলিয়ে নিলে দেখা যাবে যার সবটাই হচ্ছে খোলস। আর সেই অমানুষ আর অর্ধেক মানুষদের অন্যের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলায় মত্ত হওয়ার মুখে নিজেদের মানব পরিচয় থেকে বঞ্চিত হয়ে অথই সমুদ্রে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হচ্ছে প্রতারিত কিছু মানুষকে। সে রকম এক ট্র্যাজিক নাটকের আমরা হলাম অসহায় কিছু দর্শক।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি আমার যে খুব অনুরাগ আছে, তা নয়। এর পেছনে প্রত্যক্ষ যে কারণ, তার মূলে আছে তিক্ত এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। বেশ কয়েক বছর আগে টোকিওতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরা একটি সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালকের দায়িত্ব আমি পালন করেছিলাম। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে এসেছিলেন তরুণ কয়েকজন রোহিঙ্গা, জাপানে শরণার্থী মর্যাদা লাভের আবেদন যাঁরা করেছিলেন এবং তাঁদের সেই আবেদনের নিষ্পত্তি হওয়ার অপেক্ষায় তাঁরা ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের শেষে এঁদের নেতার কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে কি না। তরুণ সেই রোহিঙ্গা নেতার তাৎক্ষণিক জবাব ছিল ইতিবাচক এবং আমাকে তিনি বলেছিলেন যে বছর পাঁচেক সেখানে তিনি কাটিয়েছেন। সেই সূত্রে তাঁর কাছে আমি আরও জানতে চেয়েছিলাম, বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সুযোগ তাঁর আদৌ হয়েছিল কি না। এবারের উত্তর কেবল নেতিবাচকই ছিল না, বরং আমাকে তিনি আরও বলেছিলেন যে বাংলা ভাষা তিনি শেখেননি, তবে শরণার্থী শিবিরের মুসলমান ভাইদের সহায়তায় আরবি আর উর্দু ভাষা তিনি সেখানে রপ্ত করার সুযোগ পান।
দেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে যে বেশ বড় রকমের ছক-কষা খেলা অনেক দিন থেকে চলছে, তাতে মনে হয় অনেকেই একমত হবেন। তবে এর অর্থ এটা নয় যে ন্যায্য অধিকার থেকে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করার জঘন্য যে খেলায় মিয়ানমারের প্রশাসন আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশ মত্ত রয়েছে, তার প্রতিবাদ আমরা করব না এবং ‘তোমার ঝামেলা আমার নয়’ বলে চোখ বন্ধ করে থাকব।
রোহিঙ্গাদের দাবার ঘুঁটি হয়ে ওঠায় লাভবান হচ্ছে নিশ্চয় একশ্রেণির মানুষ এবং এদের চিহ্নিত করা এখন মনে হয় বাংলাদেশের স্বার্থেই অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। নগদ অর্থের লেনদেন যেখানে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, মধুলোভী মৌমাছির ভিড় সেখানে স্বাভাবিক। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন তাদের দেখিয়ে এদের কাছ থেকে সহজেই জীবনের শেষ সম্বল হাতিয়ে নেওয়ার এক প্রাণঘাতী খেলায় যারা নিয়োজিত, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত প্রভাবশালী মানুষজনও জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরাখবরে সেই সত্যতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রায় রোহিঙ্গাদের এরা তুলে দিচ্ছে।
আর অসহায় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে স্বপ্নচারী বাংলাদেশি তরুণেরা তো আছেই, বিদেশে ‘উন্নত জীবনের স্বপ্নে’ এরা এতটাই প্রভাবিত যে জমি বিক্রি কিংবা ধারের অর্থে হলেও ডিঙি নৌকায় উপকূল পার হয়ে অদূরে অপেক্ষমাণ মাছ ধরার ট্রলারে উঠে যাওয়ার আগে অনিশ্চিত জীবনের চিন্তা এদের মাথায় একবারের জন্যও খেলে যায় না। অন্যদিকে ৮০০ রোহিঙ্গার ভিড়ে শ খানেক বাংলাদেশি স্বপ্নচারী তরুণ ট্রলারে জায়গা করে নেওয়ায় মিয়ানমার সরকারের পক্ষে এ রকম আন্তর্জাতিক প্রচারে লিপ্ত হওয়া সহজ হয়ে উঠছে যে সমুদ্রে ভাসমান অসহায় সেসব মানুষ দেশত্যাগী শরণার্থী মোটেও নয়, বরং তারা হচ্ছে অর্থনৈতিক অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশি। আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি অনেকটাই ভূলুণ্ঠিত করে দিচ্ছে। এর বাইরে ভিন্ন একটি দিক থেকেও আমাদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের সরকার জোর গলায় বলে আসছে যে মধ্য আয়ের দেশ হয়ে ওঠা আমাদের জন্য এখন সময়ের ব্যাপার। কিছুদিন আগে দেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। সে রকম একটি দেশ থেকে এত বেশি তরুণের উন্নত জীবনের সন্ধানে যেকোনো উপায়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়ার তো কথা নয়। তবে এরপরও তা হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে, সেদিকে মনে হয় সরকার আর নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়া দরকার। মাথাপিছু আয় একটি দেশের সার্বিক অবস্থার ঝাপসা কিছু ছবিই কেবল আমাদের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম। ঝাপসা সেই ছবি স্পষ্ট করে তুলতে হলে মাথাপিছু আয়ের বণ্টনের দিকেও নজর দিতে হবে। প্রাপ্তির সবটাই যদি শহুরে বিত্তবান শ্রেণির হাতে যায়, তাহলে মাথাপিছু আয়ের স্ফীতি কোনো কাজে আসবে না এবং দুর্গম পল্লি অঞ্চল আর শহরের ভাসমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তরুণ প্রজন্মের সামনে অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রা ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না।
এই দরিদ্র মানুষগুলোর প্রতারিত হয়ে বিদেশ যাওয়ার পেছনে যে আর্থসামাজিক সমস্যা আছে, সেগুলো দূর করতে জনমত গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আর তাই দাতাদেরও এদিকে বেশি দৃষ্টিপাত করা দরকার। তবে দাতারা মনে হয় মিয়ানমারের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির বয়ানে মুগ্ধ। সু চি বলে চলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক কি না, সেই প্রমাণ তাদের দিতে হবে। ভোটের হিসাব যে মানবিকবোধকেও বিসর্জন দিতে পারে, সেটাই প্রমাণ করলেন প্রতিবেশী দেশের এই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

আমার জীবদ্দশায় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি দেখি না -ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, তাঁর জীবদ্দশায় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল শান্তিচুক্তি হবে বলে তিনি মনে করেন না। দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা গত বছর ভেঙে পড়ার পর এমন নৈরাশ্যভরা মূল্যায়ন করা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি নেতা তিনি। খবর রয়টার্সের।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজনদের একজন।
ইয়ালনের অভিযোগ, আলোচনা অব্যাহত রাখার দরজা বন্ধ করে দিয়েছে ফিলিস্তিনিরাই। তবে ইয়ালনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে ফিলিস্তিন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আয়োজিত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা ২০১৪ সালের এপ্রিলে ভেঙে পড়ে। উভয়ের মধ্যে সমঝোতার পথে বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি স্থাপন, রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেতে ফিলিস্তিনিদের জাতিসংঘসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়া এবং গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামপন্থী সংগঠন হামাসের সঙ্গে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ঐক্য।
ইসরায়েলি রাজধানী তেলআবিবের কাছে অনুষ্ঠিত বার্ষিক হারজলিয়া সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়ালন বলেন, ‘একটি চুক্তিতে পৌঁছানো প্রশ্নে বলতে গেলে...একজন ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি বলে থাকেন, তিনি তাঁর মেয়াদে এমন কিছুর সম্ভাবনা দেখতে পান না।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতি ইঙ্গিত করেই এ কথা বলেন ইসরায়েলি মন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট ওবামা গেল সপ্তাহে একটি ইসরায়েলি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্যই করেছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ ওই সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি আমার জীবদ্দশায় একটি স্থিতিশীল চুক্তির সম্ভাবনা দেখি না। আর আমি একটু বেশি সময়ই বাঁচতে চাই।’
ফিলিস্তিনিরাই শান্তি আলোচনার দরজা রুদ্ধ করে দিয়েছে—এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগঠনের (পিএলও) কর্মকর্তা ওয়াসেল আবু ইউসেফ। তিনি বলেছেন, বড় ধরনের কিছু বসতি স্থাপনের কাজ শুরু এবং ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ফিরে আসার অধিকার হরণের মাধ্যমে আগের ও বর্তমান ইসরায়েলি সরকারগুলোই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ইউসেফ বলেন, নেতানিয়াহুর প্রশাসন বসতি স্থাপনের তৎপরতা চালানো, ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ফিলিস্তিনিদের চাপ দেওয়ার মাধ্যমে সমস্যা জিইয়ে রেখেছে।

আদালত অবমাননার অভিযোগে এক ঘণ্টার দণ্ড ভোগ করলেন জাফরুল্লাহ

আদালত অবমাননার দায়ে এক ঘণ্টা কারাদণ্ড ভোগ করলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল তাকে এ দণ্ড দেয়। একই সঙ্গে তাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। আগামী সাতদিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে একমাস কারাদণ্ড ভোগের কথা বলা হয়েছে আদেশে। একই অভিযোগে আরও ২২ জনকে সতর্ক করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী শুরুতে কাঠগড়ায় উঠতে অস্বীকৃতি জানান। পরে আদেশের কপি দেখার পর তিনি কাঠগড়ায় ওঠেন। দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উঠেন। দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে তিনি নেমে আসেন। তবে, রায় কার্যকরের পর ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানিয়েছেন, জরিমানার টাকা তিনি পরিশোধ করবেন না। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন তিনি। ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তিকৃত বিষয়ে মন্তব্য করার মাধ্যমে আদালত অবমাননা হয়েছে এমন অভিযোগে বাংলাদেশে বসবাসরত বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে গত বছরের ২রা ডিসেম্বর ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৭ দিনের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। তাকে ওইদিন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলা পর্যন্ত এজলাস কক্ষে বসে থাকার আদেশ দেয়া হয়। বার্গম্যানের সাজায় উদ্বেগ জানিয়ে একটি দৈনিক পত্রিকায় বিবৃতি দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ ৪৯ জন। বিবৃতি প্রদান করায় এতে আদালত অবমাননা হয়েছে মর্মে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে রুল জারি করে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ২৬ জন নিঃশর্ত ক্ষমতা চাওয়ায় তাদের ক্ষমা করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ২৩ জনকে আদালত অবমাননার অভিযোগে কেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে গত ১লা এপ্রিল রুল জারি করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল রায় ঘোষণার মাধ্যমে রুলের নিষ্পত্তি করা হলো। ট্রাইব্যুনালের আদেশে অব্যাহতি পাওয়া ২২ জন হলেন- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, নারী অধিকারকর্মী শিরিন হক, নৃ-বিজ্ঞান গবেষক রেহনুমা আহমেদ, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সি আর আবরার, সাংস্কৃতিক কর্মী লুবনা মরিয়াম, অধিকারকর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার, সাংবাদিক ও লেখক আফসান চৌধুরী, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক বীণা ডি কস্টা, লেখক শবনম নাদিয়া, লেখক মাহমুদ রহমান, চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসরিন সিরাজ এ্যানি, আলাল ও দুলাল ব্লগের সম্পাদক তীব্র আলী, নৃবিজ্ঞানী দেলোয়ার হোসেন, মাসুদ খান, অ্যাডভোকেট জিয়াউর রহমান, জরিনা নাহার কবির, আলী আহম্মেদ জিয়াউদ্দিন, সংগীতশিল্পী আনুশেহ আনাদিল, অধিকারকর্মী হানা শামস আহমেদ ও সাংস্কৃতিক কর্মী লিসা গাজী। সংক্ষিপ্ত রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ২২ বিবৃতিদাতার বিবৃতি আদালত অবমাননা হলেও প্রথমবার বিবেচনায় তাদের সতর্ক করে ক্ষমা করা হলো। তবে, জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে এর আগেও আদালত অবমাননার দায়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তাই তাকে এ সাজা দেয়া হলো।
রায় কার্যকরের পর এক প্রতিক্রিয়ায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সমালোচনা নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতান্ত্রিক দেশে কি আমি কথা বলতে পারবো না? এই দেশের জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেই দেশের কোন ব্যাপারে আমি মন্তব্য করতে পারবো না তাতো হয় না।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে অব্যাহতি পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন অভিযোগ করেন, কাঠগড়ায় ওঠাতে পুলিশ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে জোরাজুরি করে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। তিনি বলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার সঙ্গে পুলিশ অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। তার প্রতি এরকম আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ। আদালতের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু মুক্ত মতপ্রকাশ ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতাও থাকতে হবে।