Saturday, July 12, 2025

পশ্চিম তীরে মার্কিন নাগরিককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক মার্কিন নাগরিককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। নিহত ওই ব্যক্তির নাম সাইফুল্লাহ মুসালেত। শুক্রবার সিনজিল শহরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীরা তাকে আক্রমণ করে পরবর্তীতে তাকে হত্যা করে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই সময় আরও ফিলিস্তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। তবে নিহতের পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষায় এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। মুসালেত তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে ফ্লোরিডা থেকে ফিলিস্তিনে যান। অধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলেছেন, তারা একাধিকবার এমন ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন যেখানে বসতিস্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরে নাশকতা করেছে। তারা ঘরবাড়ি, শহরে আগুন দেয়া ও যানবাহনে হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী একাধিকবার ওই বসতিস্থাপনকারীদের নিরাপত্তা দিয়েছে। এমনকি কোনো  ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ করলে তাদের ওপর গুলিও চালিয়েছে। জাতিসংঘ ও অন্য মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছে। যদিও ২০২৩ সালে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বসতিস্থাপকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এদিকে এ বছরের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আরোপ করেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৯ মার্কিন নাগরিককে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এর মধ্যে আল জাজিরার সাংবাদিক শিরীন আবু আকলেহ অন্যতম। তবে এ বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। প্রতি বছর ইসরাইলকে কয়েক বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র। আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি সহিংসতা থেকে মার্কিন নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন প্রশাসন। শুক্রবার কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) ওয়াশিংটনকে মুসালেতের হত্যার জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে। সিএআইআর উপপরিচালক এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখনও পর্যন্ত মার্কিন নাগরিক খুনের যথাযথ বিচার করতে পারেনি। এ কারণে ইসরাইল একের পর এক এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে। এ সময় তিনি ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের কথা উল্লেখ করেন। বলেন, ইসরাইল যখন মার্কিন নাগরিকদের হত্যা করছে তখন ট্রাম্প যদি কোনো পদক্ষেপ না নিতে পারেন তাহলে এটি ‘আমেরিকা ফার্স্ট নয় বরং ইসরাইল ফার্স্ট’ প্রশাসন।

সূত্র: আল জাজিরা

mzamin

এটা কি পরিকল্পিত নৃশংসতা?

বর্বর। পৈশাচিক। নির্মম পাষন্ডতা। কোন শব্দেই এই ঘটনার নিষ্টুরতা প্রকাশ করা কঠিন। রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ-বাকরুদ্ধ পুরোদেশ। তোলপাড় চলছে সর্বত্র। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সাধারণ মানুষ। প্রকাশ্যে এমন নারকীয় ঘটনার দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত মানুষ। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দুদিন পর ভিডিও এবং খবর প্রকাশ ঘিরেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনার ভিডিও প্রকাশের পর এ নিয়ে তোলপাড় হলেও তার আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ভূমিকা না থাকাকেও রহস্যজনক মনে করা হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন করছেন, দুদিন কি করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া কারা ঘটনার ভিডিও ছড়িয়েছে সেই সূত্র খোঁজারও দাবি করেছেন কেউ কেউ।  শুক্রবার রাতে ঘটনার খবর ও ভিডিও ব্যাপক আকারে প্রকাশের পর বিভিন্ন দল তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেছে নানা স্থানে। ইতোমধ্যেই পুলিশ ও র‍্যাবের তৎপরতায় আসামীদের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই আসামী মহিন ও তারেককে আগেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে র‍্যাব মামলার আরও ২ আসামিকে গ্রেপ্তার করে।  এ হত্যাকান্ডের ঘটনায়  যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবারের ওই ঘটনা নিয়ে প্রথমে কোনো আলোচনা না থাকলেও ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহলে নিন্দার ঝড় উঠে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। গতকাল সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানা পুলিশ মানবজমিনকে ২ আসামী গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নিশ্চিত করে। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামী মাহিন ও তারেক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার বিষয়ে স্বীকার করে জানিয়েছে,  ভাঙারির ব্যাবসায়ে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে হত্যাকান্ডটি ঘটেছে। রাতে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পক্ষ থেকে এক ক্ষুদে বার্তায় র‍্যাব জানায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে চাঁদা না দেওয়ায় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথরের আঘাতে হত্যা মামলার ২ আসামিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ ইবনে সিনা হাসপাতাল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১০। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফুটেজ দেখে দেখে আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

ঘটনার সুত্রপাত যেভাবে: পুরান ঢাকায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে গেল বুধবার সন্ধ্যায় নিহত সোহাগের প্রায় বস্ত্রহীন রক্তাক্ত দেহ ফটকের ভেতর থেকে টেনে বের করতে দেখা যায় দুই যুবককে। এর মধ্যে একজন তার গালে চড় মারছে, আরেকজন এসে ওই ব্যক্তির বুকের ওপর লাফাচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পর আরেকজন এসে একই কাজ করছে। কেউ এসে তাঁর মাথায় লাথি মারছিলো। এক পর্যায়ে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতাল চত্বরেই পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তারপর মরদেহের ওপর চলে বর্বরতা। এ ঘটনার সিসি টিভি ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে।  সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে কম্পাউন্ডে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যবসায়ী চাঁদ মিয়া ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।  এরপর নিথর দেহ টেনেহিঁচড়ে কম্পাউন্ডের বাইরের সড়কে এনে শত শত মানুষের সামনে চলে উন্মত্ততা।

পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, ওই হত্যাকাণ্ডে যাদের অংশ নিতে দেখা গেছে, এবং নেপথ্যে যাদের নাম আসছে, তারা সবাই পূর্ব পরিচিত। একসময় তাদের কয়েকজন সোহাগের ব্যবসার সহযোগী ছিলেন। ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধে এমন ভয়ঙ্করভাবে কাউকে হত্যা করা হতে পারে, তা পরিচিতজনদের ধারনার বাহিরে।

ওই এলাকার একজন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবসায়ী বলছেন, পুরনো তারের ব্যবসার একটি বড় সিন্ডিকেট সেখানে রয়েছে, যার নিয়ন্ত্রণ করতেন সোহাগ। গ্রেপ্তার মহিন তার দলবল নিয়ে ওই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই চেষ্টায় তারা সোহাগের গোডাউনে তালা মেরে দেয়। তাদের মধ্যে এটা নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়। জড়িতদের কয়েকজন স্থানীয় যুবদলের রাজনীতিতে জড়িত। সোহাগও এক সময় যুবদল করতেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার ১৯ আসামির মধ্যে দুজন যুবদলের কেন্দ্রীয় ও মহানগরে নেতা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এখনো কনক্লুসিভলি বলার মত তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা শুধু জানি যে সেখানে নৃশংস একটা ঘটনা ঘটেছে। অনেকের কাছে ভিডিওটা আছে। আমরা জানার চেষ্টা করছি এই হত্যার মোটিভটা কী, কেন এভাবে হত্যা করা হল। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিহত সোহাগের বড় বোন কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসি টিভি ভিডিও সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত আসামি মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১) এবং তারেক রহমান রবিনকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে।

রবিনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে র‍্যাব আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব এবং পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে এবং ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচজন বহিষ্কার: ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের যাঁদের দেখা গেছে, তাদের এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের সংগঠন থেকেও আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল পুরান ঢাকার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচজনকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের কথা জানিয়েছে। তারা হলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক রজ্জব আলী (পিন্টু) ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবাহ করিম (লাকি), চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব অপু দাস, মাহমুদুল হাসান মাহিন ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু।

জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, বহিষ্কৃত নেতাদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায়দায়িত্ব সংগঠন নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বহিষ্কৃত নেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত নেতা অপু দাসের বিষয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন।এছাড়া মাহমুদুল হাসান মাহিন ২০১৮ সালের পূর্বে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কোন কার্যক্রমে জড়িত নেই। মাহিনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

সোহাগ হত্যাকাণ্ডকে রোমহর্ষক ও নৃশংসতম বলে মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ  বলেছেন, কোনো দুষ্কৃতকারীর অপরাধের দায় দল নেবে না। আমি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের যাদের দেখা গেছে, তাদের এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের নিন্দা: ব্যবসায়ী যুবককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা, প্রতিবাদ ও শোক জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এই ঘটনাটির অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করুন এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। আমি নিহত ব্যক্তির রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তার পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। শুক্রবার রাতে এক নিন্দা, প্রতিবাদ ও শোক বিবৃতিতে তিনি এ সব কথা বলেন।

পুরান ঢাকায় ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে মাথায় পাথর মেরে শত শত মানুষের সামনে এই হত্যার ঘটনা আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছে। এই নির্মম দৃশ্য জাহেলিয়াতের লোমহর্ষক নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতাকেই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশবিক এই হত্যার ঘটনায় মানুষ বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এভাবে পাশবিক কায়দায় মানুষ হত্যা সভ্য সমাজে বিরল।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘৯ জুলাই বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে মো. সোহাগ নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে মাথায় পাথর মেরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হত্যা করে তারা শুধু সোহাগকে উলঙ্গই করেনি, তাঁর লাশের ওপর নৃত্য করে আনন্দ উল্লাসও করেছে।’
পুরান ঢাকায় সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণসংহতি আন্দোলন। শুক্রবার দল দুটি বলেছে, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই নৃশংসতার রাজনীতি আর চলতে পারে না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল এক বিবৃতিতে বলেন, গত বুধবার বিকেলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. সোহাগকে যেভাবে পাথর দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নির্মম ও ভয়ংকর। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে মন্তব্য করে এ দুই নেতা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই নৃশংসতার রাজনীতি আর চলতে পারে না। বাংলাদেশ থেকে চিরতরে এই আতঙ্ক তৈরির রাজনীতি বন্ধ করার জন্য এই নৃশংস ঘটনার অবিলম্বে বিচার প্রয়োজন।
এদিকে শুক্রবার বিকেলে দলীয় কার্যালয়ে এক যৌথ সভায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ ইমতিয়াজ আলম বলেন, সোহাগ হত্যার ভিডিও কতটা ভয়াবহ, নির্মম ও নিষ্ঠুর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। এই নেতাকে উদ্ধৃত করে ইসলামী আন্দোলনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষমতায় গিয়ে কী করবে, ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে। ইমতিয়াজ আলম বলেন, পুরান ঢাকার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কর্তৃক সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বিএনপি যদি তাদের সন্ত্রাসীদের থামাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর পরিণাম শুভ হবে না।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ: মিটফোর্ডে হত্যাকান্ডকে নৃশংস এবং বর্বরোচিত হত্যাকান্ড বিবেচনা করে রাজধানীসহ দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল পাড়ায় এক বিক্ষোভ মিছিল করে ঢাবি শিক্ষার্থীরা। যা  ভিসি চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।  একই সময় বিক্ষোভ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা চত্বরে এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। রাত ৮টায় চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সন্ধ্যা  সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড় থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। 
mzamin

রাশিয়ার হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম যিনি গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন by শেখ নিয়ামত উল্লাহ

রাশিয়ার হাজার বছরের ইতিহাসে নানাভাবে শাসকেরা ক্ষমতায় এসেছেন। রুশ সম্রাট—জারেরা সিংহাসনে বসেছেন জন্মসূত্রে। বিপ্লব ক্ষমতায় এনেছিল ভ্লাদিমির লেনিনকে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ। তবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম রুশ নেতা ছিলেন বোরিস ইয়েলৎসিন। ৩৫ বছর আগে ১০ জুলাই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।

বোরিস ইয়েলৎসিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বহু উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। প্রায় এক দশক ক্ষমতায় থাকাকালে হয়েছেন নিন্দিত–নন্দিত। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান প্রতিরোধে ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর দেওয়া ভাষণ আজও স্মরণীয়–প্রশংসিত। আবার তাঁর নির্দেশেই রুশ পার্লামেন্টে ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়া হয়েছিল।

ইয়েলৎসিন ছিলেন একজন প্রকৌশলী। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ৩০ বছর বয়সে—১৯৬১ সালে। ওই বছর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৭৬ সালে জন্মস্থান সভের্দলোভস্ক (বর্তমান ইয়েকাতেরিনবার্গ) অঞ্চলে দলের সম্পাদক হন ইয়েলৎসিন। তখন স্তাভরোপোল শহরে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ছিলেন গর্বাচেভ। রাজনৈতিক সূত্রে সে সময় দুজনের মধ্যে পরিচয় হয়।

গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হন ১৯৮৫ সালে। ওই বছর তিনি ইয়েলৎসিনকে মস্কোয় দলীয় কাঠামোয় দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব দেন। পরের বছরই তাঁকে দলের পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেন গর্বাচেভ। পরে গর্বাচেভের সংস্কারের গতি নিয়ে সমালোচনা করায় ১৯৮৭ সালে তাঁকে দলের মস্কোর নেতৃত্ব এবং ১৯৮৮ সালের পলিটব্যুরো থেকে পদত্যাগ করতে হয়।

১৯৮৯ সালে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসেন ইয়েলৎসিন। এরই মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা চালু করেছিলেন গর্বাচেভ। নতুন গঠন করা সোভিয়েত পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পান ইয়েলৎসিন। ১৯৯০ সালে রাশিয়ার পার্লামেন্টেও বড় জয় পান তিনি। আর ১৯৯১ সালের জুনে ইয়েলৎসিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। ওই বছরের ১০ জুলাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন তিনি।

ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ

মিখাইল গর্বাচেভ ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত কাঠামোতে সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। জোর দিয়েছিলেন মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং উন্মুক্ত কূটনীতির ওপর। বছরের পর বছর ধরে চলা স্নায়ুযুদ্ধের পর এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কের ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। এর ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে।

গর্বাচেভের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন তাঁর সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নেতৃত্ব, রক্ষণশীল রাজনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা—এমনকি সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিও। তাঁরা মনে করতেন, গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। সমালোচনায় যোগ দিয়েছিলেন ইয়েলৎসিনও। তিনি অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্রুত কাজ করতে পারছেন না গর্বাচেভ।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯১ সালের আগস্টে এক অভ্যুত্থানের মুখে পড়েন গর্বাচেভ। তাঁকে ক্রিমিয়ায় নিজ বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। পদত্যাগ করতে চাপ দেওয়া হয়। তবে তাতে রাজি হননি গর্বাচেভ। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট গেনাদি ইয়ানায়েভের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের নেতারা জরুরি অবস্থা জারি করেন। চেষ্টা করেন সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার।

ঠিক এ সময়ে এগিয়ে আসেন ইয়েলৎসিন। তত দিনে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ার জনগণকে এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। এর জেরে ইয়েলৎসিনকে গ্রেপ্তার করতে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে রওনা দেয় সেনাবাহিনী। তবে পথে তাদের আটকে দেন সশস্ত্র–নিরস্ত্র সাধারণ লোকজন। তখনই পার্লামেন্ট ভবন থেকে জনগণের মধ্যে হাজির হন ইয়েলৎসিন।

এরপর তৈরি হয় নাটকীয় এক দৃশ্যের। সেনাবাহিনীর একটি ট্যাংকের ওপর উঠে দাঁড়ান ইয়েলৎসিন। মাইক হাতে নিয়ে সেনাসদস্যদের বলেন, তাঁরা যেন সাধারণ মানুষের বিপক্ষে না যান। অভ্যুত্থানকে আখ্যা দেন ‘সন্ত্রাসের নতুন রাজত্ব’ হিসেবে। ইয়েলৎসিনের আহ্বানে পিছু হটেন সেনারা। তাঁদের অনেকেই অভ্যুত্থানের বিপক্ষে অবস্থান নেন। এর মধ্য দিয়ে মাত্র তিন দিনের মাথায় ব্যর্থ হয় অভ্যুত্থান।

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর মুক্তি দেওয়া হয় গর্বাচেভকে। তবে অভ্যুত্থানের ধাক্কাটা সামাল দিতে পারেনি তাঁর সরকার। পরের কয়েক মাসে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি বিলুপ্ত করেন। স্বাধীনতা দেন বাল্টিক দেশগুলোকে। গর্বাচেভের এই দুর্বলতার সুযোগে রাশিয়ায় নিজের মতো অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন ইয়েলৎসিন। সোভিয়েত আইনের তোয়াক্কা না করে কেন্দ্রীয় বাজেটে রাশিয়া থেকে কর দেওয়া বন্ধ করে দেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে বেলারুশ ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন ইয়েলৎসিন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির। আর কোনো আশার আলো দেখতে না পেয়ে ২৫ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন গর্বাচেভ।

রুশ পার্লামেন্টে ট্যাংকের গোলা

গর্বাচেভের পদত্যাগকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছিলেন ইয়েলৎসিন। সোভিয়েত–পরবর্তী রাশিয়ায় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি। স্বাধীন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নেন। মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন। রাষ্ট্রীয় অনেক সম্পদ ছেড়ে দেন ব্যক্তিমালিকানায়। গড়ে ওঠে শেয়ারবাজার ও বেসরকারি ব্যাংক।

সোভিয়েত উত্তরসূরিদের বিপরীতে গিয়ে বেশ কিছু নজির গড়েছিলেন ইয়েলৎসিন। তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। সমালোচনাকে গ্রহণ করতেন। তাঁর সময়ে রাশিয়ায় পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। এ ছাড়া পারমাণবিক অস্ত্র কমাতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়া দেশগুলো থেকেও কিছু সেনাকে ফেরত এনেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ১৯৯৩ সালে বড় সংকটের মুখে পড়তে হয়েছিল ইয়েলৎসিনকে। মুক্তবাজার অর্থনীতি নিয়ে সংস্কারের কারণে পার্লামেন্টে ক্রমেই তাঁর বিরোধিতা বাড়তে থাকে। সোভিয়েত–পরবর্তী রাশিয়ায় ইয়েলৎসিন যে নতুন সংবিধানের প্রস্তাব করেছিলেন, তাতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও পার্লামেন্টে বড় বিভক্তি দেখা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অসাংবিধানিকভাবে পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করে দেন ইয়েলৎসিন। আহ্বান জানান নতুন নির্বাচন আয়োজনের। এর বিরুদ্ধে অক্টোবরের শুরুর দিকে বিদ্রোহ করেন পার্লামেন্টের কট্টরপন্থী সদস্যরা।

৩ অক্টোবর মস্কোয় বিদ্রোহের সমর্থনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। মেয়রের কার্যালয়ে চালানো হয় হামলা। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম দখলের চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নাজুক বুঝে পরদিন সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেন ইয়েলৎসিন। পার্লামেন্ট ভবনে ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়া হয়। এতে আগুন ধরে যায় ভবনটিতে। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল। সংঘর্ষে ১২৩ জন নিহত হয়েছিলেন বলে সে সময় জানিয়েছিল রুশ কর্তৃপক্ষ।

এই আন্দোলনকে সোভিয়েত–পরবর্তী রাশিয়ার ইতিহাস নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত বলে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছিলেন মস্কোর ন্যাশনাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক গ্রিগরি ইয়াভলিনস্কি। তাঁর ভাষ্যমতে, পার্লামেন্টের কট্টরপন্থীদের কারণে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে বলপ্রয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। তবে এই সংকট ও পরবর্তী সময়ে নতুন সংবিধান পাস রাশিয়াকে ভুল পথে ঠেলে দিয়েছিল।

চেচনিয়ায় হামলা, ৪০ হাজার প্রাণহানি

পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে চলে যান ইয়েলৎসিন। এটি তাঁর নৈতিকতার ওপর প্রভাব ফেলে। প্রায়ই তিনি না জানিয়ে মস্কো থেকে উধাও হয়ে যেতেন। মদ্যপানের কারণে ইয়েলৎসিনের শারীরিক অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। এতে তাঁর প্রশাসনে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দেয়। কারণ, বিভিন্ন গোষ্ঠী তখন প্রভাব সৃষ্টি করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিল।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে চেচনিয়ায় হামলা। ১৯৯১ সালে চেচনিয়া রাশিয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছিল। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে নিজের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রধান আলেকসান্দার কোরজাকভ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাভেল গ্রাচেভের প্ররোচনায় চেচেন নেতা ঝোকার দুদায়েভের ওপর হামলা শুরু করেন ইয়েলৎসিন। এ নিয়ে নিজ শিবিরেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।

রুশ সামরিক বাহিনী চেচনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা চালায়। এতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। হাজার হাজার মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হন। তারপরও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে পারেনি রুশ বাহিনী। পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে চেচনিয়ার সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেন ইয়েলৎসিন। ১৯৯৭ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি হয়।

শান্তিচুক্তি হওয়ার পরও চেচনিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এরই মধ্যে ১৯৯৯ সালের আগস্টে দাগেস্তানে হামলা চালায় চেচেন বিদ্রোহীরা। এর পরের কয়েক মাসে রাশিয়ায় সিরিজ বোমা হামলা হয়। চেচনিয়ার ওপর এর দায় চাপিয়েছিল মস্কো। এর জের ধরে চেচনিয়ায় আবার রুশ সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন ইয়েলৎসিন। পরে প্রায় এক দশক ধরে এই সংঘাত চলেছিল।

অবশেষে ক্ষমতা পুতিনের হাতে

প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে ইয়েলৎসিনের শারীরিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে তিনবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। এরপরও ১৯৯৬ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন। জয়ও পান। ১৯৯৮ সালের আগস্টে রুশ মুদ্রা রুবলের ব্যাপক দরপতন হয় এবং ট্রেজারি বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয় রাশিয়া। তবে এরপরই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল রুশ অর্থনীতি।

দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যাপক অজনপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল ইয়েলৎসিনকে। এরই মধ্যে ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সবাইকে অবাক করে দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইয়েলৎসিন। নিজের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য রুশ জনগণের কাছে ক্ষমা চান। নিজের উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনকে নির্বাচিত করেন। ক্ষমতায় আসার পর পুতিন ইয়েলৎসিনকে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন।

উত্তরসূরি হিসেবে পুতিনকে কেন ইয়েলৎসিন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিবিসিতে লিখেছিলেন সংবাদমাধ্যমটির হয়ে মস্কোয় কাজ করা সাংবাদিক স্টিভ রোজেনবার্গ। তাঁর মতে, পুতিনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ভ্যালেনটিন ইয়ুমাশেভের। তিনিও একসময় সাংবাদিকতা করেছিলেন। পরে ক্রেমলিনের কর্মকর্তা হন। ইয়েলৎসিনের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন ইয়ুমাশেভ। এমনকি ইয়েলৎসিনের মেয়ে তাতিয়ানার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তাঁর।

ইয়ুমাশেভ তখন ক্রেমলিনের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সুবাদে ১৯৯৭ সালে তিনি সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা পুতিনকে ক্রেমলিনে চাকরি দেন। এ সময় পুতিনের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ভালো ধারণা হয় তাঁর। পদত্যাগের আগে ইয়ুমাশেভের সঙ্গে নিজের উত্তরসূরি সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন ইয়েলৎসিন। তখন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের নাম প্রস্তাব করেন ইয়ুমাশেভ।

পরে ১৯৯৯ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুতিনকে নিয়োগ দেন ইয়েলৎসিন। পদত্যাগের মাত্র তিন দিন আগে নিজের বাসভবনে পুতিনকে তলব করেন তিনি। জানিয়ে দেন ৩১ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করবেন। ইয়েলৎসিনের পদত্যাগের পর রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন পুতিন। তিন মাস পর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পান ভ্লাদিমির পুতিন।

পদত্যাগের পর পুরোদমে অবসর কাটানো শুরু করেন ইয়েলৎসিন। ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যু হয় তাঁর। ইয়েলৎসিনের জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। নানা পদক্ষেপের জন্য সমালোচিত হলেও প্রশংসা কম কুড়াননি তিনি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেব দায়িত্ব নেওয়ার আগে ১৯৯০ সালে সংবাদমাধ্যম টাইমসের এক সাংবাদিককে তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মানুষকে উজ্জ্বল শিখার মতো বেঁচে থাকতে হবে। যতটা সম্ভব উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে হবে। আর শেষে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে। মিট মিট জ্বলে বেঁচে থাকার চেয়ে এটি অনেক ভালো।’

তথ্যসূত্র:

- বিবিসির প্রতিবেদন: দ্য ম্যান হু হেল্পড মেক এক্স–কেজিবি অফিসার ভ্লাদিমির পুতিন আ প্রেসিডেন্ট (প্রকাশিত: ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর)
- হিস্টোরি টেলিভিশনের প্রতিবেদন: সোভিয়েত হার্ড–লাইনারস লাঞ্চ কোপ এগেইনস্ট গর্বাচেভ (প্রকাশিত: ১৯৯১ সালের ১৮ আগস্ট)
- অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন: ৩০ ইয়ারস এগো ক্রেমলিন ক্রাশড আ পার্লামেন্টারি আপরাইজিং। (প্রকাশিত: ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর)
- জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি আর্কাইভ: ইয়েলৎসিন শেলড রাশিয়ান পার্লামেন্ট থার্টি ইয়ারস এগো।
- আল–জাজিরার প্রতিবেদন: অবিচুয়ারি: বোরিস ইয়েলৎসিন (প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০০৭)

বোরিস ইয়েলৎসিনের সঙ্গে বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
বোরিস ইয়েলৎসিনের সঙ্গে বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

এ কেমন হত্যাকাণ্ড? এ কেমন বীভৎসতা? by রাফসান গালিব

প্রতিদিন কত হত্যাকাণ্ড ঘটছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিভেদ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য—কত কারণেই মানুষ খুন হচ্ছে। মানুষকে খুন করায় মানুষের মধ্যে কোনো দ্বিধাও কাজ করছে না! তাই বলে এভাবে একজন মানুষকে মারতে হবে? এভাবে হত্যার শিকার হতে হবে একটা তরতাজা প্রাণকে?

রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় এক ভাঙারি ব্যবসায়ীতে চাঁদার দাবিতে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যার দিকের ঘটনা। ‘স্বাভাবিক চাঁদাবাজির ঘটনায় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও হয়েছে। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই দিন পর আজকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর কারও অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটি কোনো ‘স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড’ ছিল না। এটা ভয়ংকর এক মৃত্যু। বর্বরোচিত এক হত্যাকাণ্ড।

ঢাকার জনবহুল একটা এলাকায় এক রকম উল্লাস করে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে ওই ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। পিটিয়ে, কুপিয়ে, নির্যাতন করে পরনের কাপড় খুলে ফেলে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় ওই ব্যবসায়ীকে। এরপর বড় একটা পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে মাথা থেঁতলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতক। এই দৃশ্য কি কোনোভাবে নেওয়া যায়? এ কেমন নৃশংসতা? এ কেমন বীভৎসতা?

এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, লাল চাঁদ মিয়া ওরফে ওরফে মো. সোহাগ নামে ওই ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে রজনী ঘোষ লেনে ভাঙারি ব্যবসা করতেন। ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে পুরোনো বৈদ্যুতিক কেবল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন তিনি। ওই তার বেচাকেনার সিন্ডিকেট নিয়ে বিরোধ এবং চাঁদার দাবি জানিয়ে আরেকটা গ্রুপ কয়েক মাস ধরে সোহাগকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। এর প্রেক্ষিতে বুধবার সন্ধ্যায় সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সোহাগ ও তাঁকে হত্যাকারী পক্ষ সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

হত্যাকারীদের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসান মহিন সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, তিনি যুবদলের চকবাজার থানার সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে মিটফোর্ড হাসপাতালের ফুটপাত ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হাসপাতালের কর্মচারী নিয়োগেও মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাব্বিও স্বীকার করেছেন, তিনি মহিনকে চিনেন। মঈন যুবদলের সক্রিয় কর্মী। (দৈনিক যুগান্তর)

সোহাগকে শুধু হত্যা করেই থেমে থাকেনি সন্ত্রাসীরা। সোহাগের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও লাশের ওপর চলতে থাকে নৃশংসতা। রক্তাক্ত নিথর দেহটি রাস্তার মাঝখানে ফেলে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে চলে ভয়াবহ উন্মত্ত উল্লাস।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে অসংখ্য মানুষ ছিল। এত মানুষের সামনে পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে সোহাগকে। তাঁকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। স্থানীয়রা বলছেন, মঈন যুবদল নেতা। এলাকায় সে প্রভাবশালী। তাঁর ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। যদিও হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত মঈনসহ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যেভাবে মানুষ বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বৈরাচারের সশস্ত্র গুন্ডা বাহিনীর বিরুদ্ধে, গুলির মুখে দাঁড়িয়ে যেতে ভয় করেনি; এক বছর পর সেই মানুষই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড ‘উপভোগ’ করল! জুলাই নাকি মানুষকে সাহসী করেছে, মানুষকে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে, অপশক্তির সামনে মাথা না করতে শিখিয়েছে—এটিই কি তার নমুনা!

এ রকম ভয়ংকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের পুরান ঢাকার দরজি বিশ্বজিতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা কীভাবে তাঁকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল, সেই দৃশ্য এখনো আমরা ভুলতে পারি না। যুবদলের এই সন্ত্রাসী চাঁদাবাজের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার সোহাগের কথাও কি আমরা কখনো ভুলতে পারব?

জুলাই গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে সেই ট্রমাই মানুষ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে এমন হত্যাকাণ্ড আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? এই মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে এই জাতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

খুলনার দৌলতপুরে আজকে শুক্রবার আরেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেখানে থানা যুবদলের সাবেক এক নেতাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত সাবেক যুবদল নেতা কয়েক মাস আগে নিজেই রামদা হাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সেই সংঘর্ষের ঘটনার পর যুবদল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আজকে তিনি নিজেই খুন হলেন। স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিকভাবে বলছে, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা চলছে।

আজকে আরেকটি হত্যাকাণ্ড আমাদের হতবাক করে দেয়। চাঁদপুরে জুমার নামাজের পর এক ইমাম ও খতিবকে মসজিদের ভেতরেই কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছেন এক ব্যক্তি। খতিব সাহেব স্থানীয়ভাবে স্বনামধন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ওই ঘাতক ব্যক্তির নাকি ইমাম সাহেবের জুমার খুতবা পছন্দ না। এ জন্য আজকে আগ থেকে খতিব সাহেবকে হত্যার উদ্দেশে চাপাতি নিয়ে মসজিদে ঢুকেছিলেন ওই ব্যক্তি। তাঁর দাবি, ইমাম সাহেব ইসলামের নবী (সা.)-কে অবহেলা করে কথা বলেছেন।

কাউকে ‘শাতিম’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের আহ্বান আমরা কয়েক মাস আগে দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের আইন ও বিচারকে তোয়াক্কাই করা হয়নি। তার জ্বলন্ত নমুনা আজকে চাঁদপুরে দেখা গেল। যত্রতত্র যেভাবে শাতিম আখ্যা দিয়ে মানুষকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, মানুষের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে, তা আমাদের ধর্মীয় সমাজের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্নই করছে না, ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপজ্জনক পরিস্থিতিও কি ডেকে আনছে না? সরকার কি এসব ব্যাপারে চুপই থাকবে?

একটার পর একটা নৃশংস ঘটনা ঘটছে। বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ উঠছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার কী করছে? কোনো ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক ছুটে যেতে প্রশাসন কোথায়? থানা-পুলিশ কোথায়? সরকারের ব্যক্তিবর্গ কোথায়? এক বছরেও কেন দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা? পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি কেন সবচেয়ে ‘গুরুত্বহীন’ করে ফেলা হলো? দেশের মানুষকে এইভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য ছেড়ে দিয়ে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তারা? রাজধানীতে বসে শুধু ‘হুঁশিয়ারি বার্তা’ দিয়ে কি প্রশাসন চালানো যায়?

বিএনপিই কেন বা শুধু বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নিজের সাংগঠনিক দায়িত্ব শেষ করছে? দলীয় বিরোধে চট্টগ্রামের শুধু এক থানায় রাউজানেই ১৫ জনের বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেছে। উপজেলাটিতে ঢাকা থেকে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি দল গিয়েছিল কি?

কতভাবেই দলীয় শৃঙ্খলার পদক্ষেপ নেওয়া যায়। শুধু দূর থেকে সতর্কবাণী দিয়ে বা বহিষ্কার করে কি দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব? সাংগঠনিক দক্ষতা বলতে যে একটি বিষয় আছে, সেটি যে একেবারেই দলটির নেতৃত্ববৃন্দের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না, তা কি তারা নিজেরা বুঝতে পারছেন?

দেশজুড়ে দলটির অপকর্মের শেষ নেই। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আগামী নির্বাচনে বিএনপিই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বলে অধিকাংশ মানুষ মনে করে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগেই এও আশঙ্কা করছে এক ফ্যাসিবাদী শাসনের পর আরেক ফ্যাসিবাদী শাসনের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছে কি দেশ? এমন আশঙ্কা কীভাবে দূর করবে বিএনপি? জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা কি অধরাই থেকে যাবে?

* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

গত বুধবার বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে
গত বুধবার বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

জুলাই ঘোষণা নিয়ে কী হচ্ছে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ছিল অভ্যুত্থানকারীদের। সে লক্ষ্যে গত ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই ঘোষণা দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সরকারের হস্তক্ষেপে সেটি স্থগিত করতে হয়। সরকার সে সময় জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার নিজেই জুলাই ঘোষণা দেবে। সে লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করছে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু ৬ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো সেটি আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো জুলাই ঘোষণা নিয়ে সরকারকে চাপে রেখেছে। সরকার ইতিমধ্যে জুলাই ঘোষণার একটি খসড়াও তৈরি করেছে। যেটি পাঠানো হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। কিন্তু এ ঘোষণার খসড়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। এমতাবস্থায় ৫ই আগস্টের আগে জুলাই ঘোষণা দেয়ার বিষয়ে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি সেটি আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। শব্দগত জটিলতার পাশাপাশি সংবিধানের প্রস্তাবনায় এটি যুক্ত করার উদ্যোগেও একমত নয় বিএনপি। দলটি চায় এটি চতুর্থ তফসিলে যুক্ত করা হোক। এ ঘোষণা প্রস্তুতের সঙ্গে জড়িত সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি জানিয়েছেন- সরকার জুলাই ঘোষণা নিয়ে আন্তরিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি কোথাও আপত্তি দেখায় তাহলে এটি করা সরকারের জন্য মুশকিল। সরকার চায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এ ঘোষণাটা দিতে। এমতাবস্থায় আগামী ৫ই আগস্ট অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির আগে সরকার জুলাই ঘোষণা দিতে পারবে কিনা সে বিষয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সরকার এখন অপেক্ষা করছে জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের দিকে।

জুলাই ঘোষণার জন্য সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে। তারা ইতিমধ্যে একটি খসড়া করে রাজনৈতিক দলগুলোকেও পাঠিয়েছে। যেখানে ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ’৫২-’র ভাষা আন্দোলন, ’৬২-’র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-’র গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৭৫-’র ৭ই নভেম্বর, ’৯০-’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানসহ দেশের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের কথা গুরুত্বসহকারে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলায় হেফাজতের আন্দোলনে গণহত্যার কথাও আছে। তবে সরকার প্রণীত এ খসড়া ঘোষণাপত্রে কিছু শব্দগত মারপ্যাঁচ আছে বলে মনে করে কোনো কোনো দল। ইতিমধ্যে তারা সেটি সরকারকে জানিয়েছেও। এ ছাড়াও বিএনপি এ ঘোষণা সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করার বিরোধী। দলটি চায় সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে কেবল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে যুক্ত করতে। অন্যদিকে সরকার ও অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো মনে করে এটি যদি প্রস্তাবনায় যুক্ত করা না হয় তাহলে এটির গুরুত্ব লোপ পাবে। বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্ব, মর্যাদা, মহিমা ধারণ করে। আমরা এটাকে স্বীকৃতি দিই, সারা জাতি এটাকে স্বীকৃতি দেয়। এটাকে আমরা যথাযথ মর্যাদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে চাই। তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের চাওয়ায় জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সরকার মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নিয়েছে। কয়েকদিন আগে সরকারের এক উপদেষ্টা ঘোষণাপত্রের খসড়া বিএনপি মহাসচিবকে দিয়েছেন। বিএনপি এর আগে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি একটি খসড়া সরকারকে দিয়েছিল। এরপর আর অগ্রগতি ছিল না। এবারের খসড়ায় বিএনপি’র আগে দেয়া মতামতের কিছু প্রতিফলন রয়েছে। বুধবার রাতে সরকারকে এবারের খসড়ায় মতামত জানানো হয়েছে। সালাহউদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে ক্রান্তিকালীন বিধান-সংক্রান্ত সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে যুক্ত করে জুলাই অভ্যুত্থানকে স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতার মামলায় পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিলকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। তাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত জুলাই ঘোষণা চতুর্থ তফসিলে একটি অনুচ্ছেদে রেখে স্বীকৃতি দেয়া যৌক্তিক হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে আরেকটি অনুচ্ছেদে বর্তমান সরকারের স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে। তবে এ ধারণাকে নাকচ করে এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, নতুন সংবিধানের প্রস্তাবনায় জুলাই ঘোষণা রাখতে হবে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার পাথেয়। জুলাই ঘোষণার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ব্যাপারে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি মানবজমিনকে বলেন, সরকার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে ঠিক আছে। কিন্তু সরকারকে এ-ও মনে রাখতে হবে যে, কেবল রাজনৈতিক দল না, জনগণ এ সরকারের অন্যতম স্টেকহোল্ডার। তারা কী চায় সেটিও আমলে নিতে হবে। যদি রাজনৈতিকভাবে সমঝোতা না হয় তাহলে গণভোট দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা সরকারকে যথেষ্ট সময় দিয়েছি এটির জন্য। কারণ জুলাই ঘোষণা একটি স্ট্যাটাসের বিষয়। এর ওপরই নির্ভর করবে আমাদের নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে। শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দেয়নি- এটা সরকারকে মনে রাখতে হবে। আমরা ৩১শে জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। এর মধ্যে সরকার জুলাই ঘোষণা না দিলে ৩রা আগস্ট সচিবালয় ঘেরাও করবো। শরীফ ওসমান বিন হাদি আরও বলেন, জুলাই ঘোষণা সাংবিধানিক স্বীকৃতি জরুরি এ কারণে যে এটি না হলে আগামীতে জুলাই আন্দোলন রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই এটির আইনি ভিত্তি দরকার। তফসিলে আপত্তি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের তফসিলটি ৭ই মার্চের ভাষণসহ বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করে এটিকে অনেক হালকা করে ফেলা হয়েছে। সরকার চাইলেই কিছু একটা জুড়ে দিচ্ছে এর সঙ্গে। যেটি প্রস্তাবনায় এলে এর গ্রহণযোগ্যতা থাকে। চাইলেই কোনো সরকার সেটি বাদ দিতে পারবে না। তাই আমরা এটি প্রস্তাবনা চাই।

সার্বিক বিষয়ে জুলাই ঘোষণার দায়িত্বে থাকা সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, এটার জন্য সবার ঐকমত্য দরকার। দলগুলোকে আমরা একটা খসড়া পাঠিয়েছি। তারা কিছু শব্দগত বিষয় নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। দ্বিমত থাকলে তো আমরা কিছু করতে পারবো না। আমাদের ধারণা ছিল এ বিষয়ে দ্বিমত পাওয়া যাবে না। কারণ এটা জনআকাঙ্ক্ষার বিষয়। জুলাই অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার বা তার পরবর্তী সরকারের সাংবিধানিক বৈধতার বিষয় এটি। এটা হলে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হবে। এটার একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি দরকার। সবার উচিত এ বিষয়ে নিজেদের সম্মতি দেয়া। আমরা আশাবাদী ৫ই আগস্টের আগে এটি হবে।

mzamin

অগ্নিঝরা জুলাই: এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি নাঈমার বাবা-মা by ফাহিমা আক্তার সুমি

সন্তান হারানোর কষ্ট তো কোনোদিনও যাবে না। কীভাবে গুলিতে আমার মেয়ের মাথা ভেঙেচুরে গিয়েছিল সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে থাকে। তার সব স্মৃতি মনে পড়লে শরীর কাঁপে। ওর মৃত্যুর দিন থেকে আমরাও মারা গিয়েছি। বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে যদি এভাবে রক্তাক্ত হতে হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তাটা কোথায়? আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন খালি না হয়। ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিস্ট যেন তৈরি না হয়। এভাবে কথাগুলো বলছিলেন শহীদ নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহার। নাঈমা উত্তরার মাইলস্টোন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গত ১৯শে জুলাই উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর সড়কের ১৫ নম্বর বাড়ির নিচে পুলিশ ছাত্র-জনতাকে ধাওয়া দেয়। এ সময় চারতলা ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে কাপড় আনতে গিয়েছিল নাঈমা সুলতানা। পুলিশের ছোড়া একটি গুলি নাঈমার মাথার বাঁ পাশে লেগে মাথার মগজ বেরিয়ে যায়।

শহীদ নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহার মানবজমিনকে বলেন, সন্তান মারা যাওয়ার ট্রমা থেকে এখনো বের হতে পারছি না। সারাক্ষণ চোখের পানি ঝরতে থাকে। ১৯শে জুলাই বিকালের দিকে নাঈমা চারতলার বারান্দায় দাঁড়ানো অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়। বিকাল ৪টার দিকে নাঈমা তার রুমে বসে ‘বয়কট ছাত্রলীগ’, ‘কোটা সংস্কার চাই’ সহ নানা স্লোগানে রঙিন কালিতে প্রতিবাদী পোস্টার আঁকছিল। আঁকাআঁকি থেকে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মু পিৎজা বানাবো। ফ্রিজে চিকেন আছে নাকি? এরপর বলে, ‘বেলকনিতে কাপড়গুলো শুকিয়েছে আমি নিয়ে আসি’- এই কথা বলে বারান্দায় যায়। সে সময় উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে পুলিশ গুলি করতে করতে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় ছাত্ররা আমাদের বাসার নিচে অবস্থান করছিল। তখন বাসার ডানে-বামে যে বাসাগুলো রয়েছে সেখানের সব পরিবারের লোকজন বারান্দায়, ছাদের উপরে গিয়ে দেখছিল। ওই সময় আমার মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়ানো ছিল। আমি পেছনে ছিলাম এক-দুই মিনিটের জন্য পাশে থাকা রান্নাঘরে যাই। তখনই আবার রান্নাঘর থেকে ছুটে যাই মেয়েটাকে আনতে বারান্দার দিকে। গিয়ে দেখি আমার মেয়ে পড়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ওইদিন আমিও মেয়েটার সঙ্গে চলে যেতে পারতাম। আমি তার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, গুলির কোনো শব্দ পাইনি। মেয়েকে যে গুলিটা করা হয়েছে সেটি ছিল স্নাইপারের গুলি। ওর মাথার ক্ষত কতোটুকু গভীর হয়েছিল, সেটি এখনো চোখে ভাসে। মাথার মগজ বেরিয়ে গুঁড়ি হয়ে গিয়েছিল। আমার বাসা-বারান্দা রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। ছাত্ররা নিচ থেকে দেখেছিল গুলি লেগেছে কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি।

উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন নাঈমার পরিবার। তিন ভাই-বোন তাদের মাকে নিয়ে থাকতেন। বাবা পল্লি চিকিৎসক। তিনি গ্রাম থেকে আসা-যাওয়া করেন। নাঈমার ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে চিকিৎসক হবেন। আইনুন নাহার বলেন, ২০২২ সালে ঘর-বাড়ি ফেলে রেখে সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় আসি। অনেক স্বপ্ন ছিল- তাদের বড় করবো, মানুষের মতো মানুষ করবো। ভালো স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করাবো। নাঈমা অত্যন্ত মেধাবী ছিল। শুরু থেকে ওর প্রথম হওয়া কেউ ঠেকাতে পারতো না। নাঈমার জন্ম ২৫শে জুলাই ও মারা গেল ১৯শে জুলাই। কীভাবে যে আমাদের দিন যায়, কী হচ্ছে- একমাত্র আমরাই জানি। মেয়েটার জন্য ভালো-মন্দ রান্না করতাম। সব সময় ভালো-মন্দ খেতে চাইতো। জন্মদিন এলে ওর বড় বোন ওকে না জানিয়ে গিফট কিনতো, সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। আজ আর আমাদের কারও মনে খুশি নেই। আমাদের হাসি-খুশি সব হারিয়ে গেছে। খুব সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতো। আমি এবং ওদের বাবা দু’জনই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। নাঈমা সব সময় বলতো- আমার বাবা-মা আমার গর্ব। আমিও বড় হয়ে ডাক্তার হবো।
তিনি আরও বলেন, আমার খুব ইচ্ছা ছিল একবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য। অনেকে তার সঙ্গে দেখা করেছে কিন্তু আমার একবারের জন্যও দেখা হয়নি। আমার মেয়ে তো আন্দোলন নিয়ে অনেক কিছু করেছে। সে সব সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ থাকতো। ১৯শে জুলাই আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার, স্যালাইন কোথায় দিচ্ছে সেটি গ্রুপে গ্রুপে শেয়ার করতো। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুইটা লোক আমার বারান্দার দিকে বন্দুক ধরে আছে। তার মধ্যে একটা লোক নিচের দিকে গুলি করছে, আরেকটা লোক আমার নাঈমার দিকে টার্গেট করে গুলি করেছে। তিনি বলেন, আমার কষ্ট তো থামবে না। তবে একদিক থেকে আমি গর্বিত যে, আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে, আমি একজন শহীদের মা। কিন্তু আমি নিজেকে লজ্জিতও মনে করি, আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। একজন মায়ের পাশে থেকেও একজন সন্তানের নিরাপত্তা ছিল না। বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে যদি গুলি খেতে হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তাটা কোথায়? সবার কাছে আমার এই একটাই প্রশ্ন। এটার বিচারটা করা উচিত। যেন ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিস্ট তৈরি না হয়।

শহীদ নাঈমার বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, সন্তান হারানো কোনো বাবাই ভালো থাকতে পারে না। আজ এক বছর হয়ে এলো, আমার সন্তান আমাকে বাবা বলে ডাকে না। সেই ১৯শে জুলাই থেকে আমরা পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমার বাচ্চাকে টার্গেট করে গুলিটা করা হয়েছে। মাথার বাম দিকে গুলিটা ঢুকে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। চোখের সামনের এই দৃশ্য কি কখনো ভুলে থাকা যায়। ওর মা দেখে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারায়। আমাদের এখন মানসিক চিকিৎসক দেখাতে হচ্ছে। মেয়েটার মেধা ভালো দেখে তাকে মাইলস্টোন কলেজে ভর্তি করা হয়। এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। আমার দুই মেয়ে এক ছেলের মধ্যে নাঈমা ছিল মেজো। আমিতো আমার মেয়েকে আর কোনোদিন পাবো না। এই জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটি খুব ধীরগতিতে চলছে, এই কার্যক্রমটা আরও ত্বরান্বিত হতে হবে। যারা জীবন দিয়েছে তাদের হত্যার বিচার যেন সুষ্ঠুু এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হয়। সুষ্ঠু বিচার হলে এটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে থাকবে আজীবন এবং সমস্ত রাজনীতিবিদরা এখান থেকে শিক্ষা নেবে। বিচার সঠিক এবং স্বচ্ছ হতে হবে, কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়। যারা দোষী শুধুমাত্র তাদের বিচারটাই যেন হয়। তিনি বলেন, আমার মেয়ে যে স্বপ্ন বা উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধ করেছিল সেটি পূরণ হয়েছে। শুধু আমার মেয়ে নয়, সমস্ত শহীদরা যে উদ্দেশ্য-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। তাদের রক্তের বিনিময়ে সুন্দর একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই। যে আশা নিয়ে জুলাই আন্দোলন করেছিল, ফ্যাসিবাদমুক্ত করেছিল সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়। তাদের স্বপ্ন যেন পূরণ হয়। এই বাংলায় আমরা কোনো বৈষম্য চাই না। সবার জন্য হোক এই দেশটা। যেই ক্ষমতায় আসুক যেন বৈষম্যমুক্ত, শোষণমুক্ত এবং সবার জন্য যেন এই আবাসনটা একটা নিরাপদ ভূমিতে রূপান্তর হয়।

mzamin