Saturday, October 31, 2015

কার্যালয়ে ঢুকে জাগৃতির প্রকাশককে কুপিয়ে হত্যা

জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে আজ শনিবার কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে ভেতরে ফেলে রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে যায়।
আরেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের লালমাটিয়ার কার্যালয়ে ঢুকে স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করার কয়েক ঘণ্টা পর জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক খুন হলেন।
নিহত ফয়সালের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আবুল কাশেম ফজলুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আজ দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ফয়সাল তাঁর সঙ্গেই বাসায় ছিলেন। পরে তিনি শাহবাগে তাঁর প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানে যান। খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনি কয়েকবার ছেলেকে ফোন করেন। কিন্তু ছেলে ফোন ধরেননি। বিকেল চারটার দিকে তিনি আজিজ সুপার মার্কেটের তিন তলায় ১৩১ নম্বর রুমের সামনে যান। এটি তাঁর ছেলের কার্যালয়।
প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে আজিজ সুপার মার্কেট থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: সাজিদ হোসেন
নিহতের বাবা আরও বলেন, ওই সময় তিনি কার্যালয়ের দরজা খুলতে গিয়ে বন্ধ পান। এ সময় কাচের দরজা দিয়ে ভেতরে আলো জ্বলতে দেখেন। ছেলে বাইরে গেছে ভেবে তখন তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে ছেলের বউকে ফোন করলে জানতে পারেন, দুর্বৃত্তরা লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর মালিক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করেছে। এই কথা শুনে তিনি লোকজন নিয়ে আবার ছেলের কার্যালয়ে গিয়ে দরজা ভেঙে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর ছেলে পড়ে আছে।
‘হত্যাকারীদের বিচার চান না দীপনের পিতা’
রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার বিচার চান না তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাশেম ফজলুল হক। আজ সন্ধ্যায় আজিজ সুপার মার্কেটে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। প্রফেসর ফজলুল হক বলেন, যারা অভিজিৎকে হত্যা করেছে তারাই দীপনকে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। আমি এই হত্যাকা-ের বিচার চাই না। কেননা বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক। বিচার চেয়ে কি হবে? একজনের ফাঁসি দিয়ে কি হবে ? না দিলেই বা কি হবে? হয়তো নিয়ম অনুযায়ী আমাকে একটি মামলা করতে হবে। কিন্তু এর বিচার আমি চাই না।
ওই অবস্থায় ফয়সাল আরেফিনকে উদ্ধার করে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সন্ধ্যা সাতটার দিকে হাসপাতালের আবাসিক সার্জন রিয়াজ মোর্শেদ তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ফয়সাল আরেফিন দীপনের স্ত্রী চিকিৎসক। তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে। তাঁর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার্থী। আর মেয়েটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
আজিজ সুপার মার্কেটে ঘটনাস্থলে নিহত ফয়সালের এক বন্ধুর কান্না। ছবি: সাজিদ হোসেন
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একুশের বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ​ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। জাগৃতি থেকে অভিজিৎ​ রায়ের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামের দুটি বই প্রকাশিত হয়। আর শুদ্ধস্বর তাঁর লেখা ‘সমকামিতা: একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ ও ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ নামে দুটি বই প্রকাশ করে।
স্বজনের কান্না। ছবিটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতল থেকে তোলা। ছবি: সাজিদ হোসেন
‘শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় জাতি’
 দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে জাতি আজ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নিপতিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। শনিবার রাতে বিএনপির মুখপাত্র  ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। খালেদা জিয়া বলেন, জাগৃতি প্রকাশনী’র স্বত্ত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে তার কার্যালয়ে কুপিয়ে হত্যা এবং অপর আরেকটি প্রকাশনী সংস্থা ‘শুদ্ধস্বর’ এর কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করেছে। এ ধরনের কাপুরুষোচিত হত্যাকা- ও হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে দোষীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন তিনি। নিহত ফয়সাল আরেফিনের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, নিহত ফয়সাল আরেফিন দীপন জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের সহ-সভাপতি ছিলেন এবং শহীদ  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত একজন নিবেদিত সংগঠক ছিলেন। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে এ সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, দেশে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে-সমগ্র জাতি আজ এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নিপতিত হয়েছে।
বৃটিশ হাইকমিশনারের নিন্দা
 ব্লগারদের ওপর ফের আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ঢাকাস্থ বৃটিশ হাই কমিশনার ও কূটনৈতিক কোরের ডিন রবার্ট গিবসন। শনিবার সন্ধ্যায় এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, আমি ব্লগারদের ওপর ফের আক্রমণের নিন্দা জানাচ্ছি। সহিংসতা কোন জবাব হতে পারে না। কোন অবস্থাতেই এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষা জরুরি।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে রোববার খালেদা জিয়ার মতবিনিময়

লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে আগামীকাল রোববার মতবিনিময় করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
বিএনপির পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারি নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, রোববার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় সেন্ট্রাল লন্ডনের হিলটন হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে মতবিনিময় করবেন বেগম খালেদা জিয়া। যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা-কর্মীরাও এতে উপস্থিত থাকবেন।
এদিকে বেগম খালেদা জিয়া নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই দেশে ফিরবেন বলে জানা গেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান আজ রাতে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য সফর শেষ করে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার উদ্দেশে রওনা দেবেন বলে কথা রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, মাঝ সেপ্টেম্বরে ব্যক্তিগত সফরে খালেদা জিয়া লন্ডন যান। চোখ ও পায়ের চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করাই মূলত এ সফরের উদ্দেশ্য। তিনি সেখানে ঈদুল আযহাও উদযাপন করেন। ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের একটি চোখে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৪ নভেম্বর তার আবারো চিকিৎসকের সাথে এপয়েন্টমেন্ট করা আছে। ডাক্তার ছাড়পত্র দিলে অ্যামিরেটসের পরবর্তী এভেইলেবল ফ্লাইটেই তিনি ঢাকার পথে রওনা দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

জাসদকে যারা বাদ দিতে চান তারা ভুল করছেন : ইনু

জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি বলেছেন, যারা জাসদকে ধবংস করতে চাচ্ছেন, বাদ দিয়ে রাজনীতি সাজানোর কথা ভাবছেন তারা ভুল করছেন। জাসদ যে রাজনৈতিক আদর্শ ও শক্তি নিয়ে রাজনীতিতে অবস্থান করছে, সেই আদর্শ ও শক্তিকে বিবেচনায় নিতে হবে। যদি বাংলাদেশকে সামনে দিকে নিয়ে যেতে রাজনীতি করতে হয় জাসদকে অংশীদার করতেই হবে।
আজ শনিবোর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ দলের ৪৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী একথা বলেন।
ইনু আরো বলেন, জাসদ ঐক্যের দল। সমাজতান্ত্রিক দল। কিন্তু জাসদ ঐকবদ্ধ সংগ্রামের মাঝে সমাজতন্ত্রের পতাকা লুকিয়ে রাখে না। জাতীয়, দেশের প্রয়োজনে জাসদ ঐক্যর কৌশলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। জাসদ কখনোই দলের বা নেতাদের স্বার্থের হিসাব নিকাশ করে রাজনৈতিক কৌশলকে সাজায় না।
তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, জাসদ জাতীয় প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে ঐক্যের কৌশলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। জাসদ কখনোই দলের বা নেতাদের স্বার্থের হিসাব নিকাশ করে রাজনৈতিক কৌশল সাজায় না। তবে জাসদ ধরো মারো খাও এমন রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপি এবং জামায়াতের এজেণ্ডা নির্বাচন বা গণতন্ত্র নয়। শুরু থেকেই তাদের আসল মতলব পানি ঘোলা করে দেশকে সংবিধানের বাইরে ধাক্কা দিয়ে অঘটন ঘটিয়ে অস্বাভাবিক সরকার ক্ষমতায় আনা।
তিনি বলেন, যারা শেখ হাসিনার বিকল্প খালেদা-বিএনপি-জামায়াত তারা ভুল করছেন। অঘটন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ।
তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, জাতীয় শত্রুর সাথে কোনো সমঝোতা হবে না, সুযোগও নেই। তাছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার এখন দম নেয়ারও সুযোগ নেই। কারণ তিনি অঘটন ঘটানোর অস্বাভাবিক রাজনীতি করে নিজেই নিজেকে এমন পর্যায়ে নামিয়ে নিয়েছেন, তাকে আর রাজনৈতিক প্রতিযোগী, প্রতিদ্বন্দী, প্রতিপক্ষের অবস্থায় নেই।
রমনাস্থ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি বক্তব্য রাখার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। এজন্য জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরিফ নূরুল আম্বিয়া দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নাজমুল হক প্রধান এমপি, শিরিন আতখার এমপি, মীর আখতার হোসাইন, ডাঃ খন্দকার মোজাম্মেল হোসেন, লুৎফা তাহের প্রমুখ।

বিমান টিকিটের টোপেই ‘বাঘিনি’ খাঁচায়

বাঘিনিকে খাঁচা-বন্দি করতে টোপ লাগে। আর উত্তর-পূর্বের ‘বাঘিনি’কে লোভ দেখিয়ে খাঁচায় টানতে দিল্লি-কলকাতা যাওয়া-আসার একজোড়া বিমান টিকিটকেই টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন সিবিআইয়ের গোয়েন্দারা।
কে এই বাঘিনি?
তিনি সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত মনোরঞ্জনা সিংহ। সিবিআইয়ের এক তদন্তকারীর কথায়, জেরায় সময় নিজেকে তিনি বাঘিনি বলেই জাহির করতেন। বলতেন, ‘‘আই অ্যাম টাইগ্রেস!’’
প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী মাতঙ্গ সিংহের সঙ্গে সাংবাদিক মনোরঞ্জনার বিয়ে হয়েছিল ১৯৯৫-এ। কিন্তু গোয়েন্দাদের কাছে তিনি দাবি করেছেন, স্বামীর অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ২০০৮-এ নিজের ছেলেকে নিয়ে বাবার কাছে চলে এসেছিলেন তিনি। প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইও শুরু করেছেন।
সারদা কাণ্ডে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে গত এপ্রিল মাসে সিবিআইয়ের ডিরেক্টর অনিল সিন্হাকে সরাসরি চিঠি লিখেছিলেন মনোরঞ্জনা। চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আইন মেনেই তিনি ব্যবসা করেছেন। সিবিআই গোয়েন্দাদের কথায়, সারদার প্রায় ৪০ কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগে মনোরঞ্জনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সারদার ‘বেঙ্গল মিডিয়ার’ সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ওই টাকায় উত্তর-পূর্ব ভারতে ‘রাজধানী’ ও ‘ফ্রন্টিয়ার’ নামে টিভি ও রেডিও চ্যানেল শুরু হয়েছিল, চুক্তিপত্র অনুয়ায়ী যার চেক সই থেকে সংবাদ পরিবেশন— সব ক্ষমতাই ছিল মনোরঞ্জনার হাতে।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ করে সারদার পুঁজি দিয়েই মনোরঞ্জনা ব্যবসা করে মুনাফা করেছেন। গুয়াহাটিতে ‘রাজধানী’ ও ‘ফ্রন্টিয়ার’-এর অফিসে তল্লাশি চালিয়ে বহু নথি উদ্ধার করা হয়েছে, যা পরীক্ষা করে এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে দাবি সিবিআইয়ের। চুক্তিপত্র অনুযায়ী সারদার ‘বেঙ্গল মিডিয়া’র কাছ থেকে মাসে ১৫ লক্ষ টাকা করে বেতন নিতেন মনোরঞ্জনা। সঙ্গে বিলাসবহুল বাড়ি, চালক-সহ গাড়ি, অন্যান্য সুবিধা এবং ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক সফরের সব খরচ। সিবিআইয়ের ডিরেক্টরকে লেখা চিঠিতে মনোরঞ্জনা জানিয়েছেন, গুয়াহাটি বিমানবন্দরেই সারদা-কর্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। তার পরেই যৌথ ভাবে সংবাদ চ্যানেলের ব্যবসার পরিকল্পনা।
সিবিআইয়ের এক তদন্তকারীর কথায়, জেরার সময়ে গোয়েন্দাদের ঘোল খাইয়ে দিয়েছেন চতুরএই মহিলা। দিল্লিতে কংগ্রেস ও বিজেপির প্রথম সারির অনেক নেতার সঙ্গে মনোরঞ্জনার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একাধিক বার তা উল্লেখ করে তদন্তকারীদের চাপে রাখার চেষ্টা করতেন তিনি। সেই সঙ্গে বারে বারে একটা কথাই বলতেন, ‘‘আমার সঙ্গে পাঙ্গা লড়তে আসবেন না। রিমেমবার— আই অ্যাম টাইগ্রেস!’’
সেই বাঘিনি এখন খাঁচাবন্দি। এবং তার জন্য কম ঘাম ঝরাতে হয়নি সিবিআইকে। এক গোয়েন্দা কর্তার কথায়, সব তথ্য যাচাই করে আদলতগ্রাহ্য প্রমাণ হাতে আসার পরই মনোরঞ্জনাকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা করা হয়। বেশ কয়েক বার জিজ্ঞাসাবাদের পর মনোরঞ্জনা কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন তিনি গ্রেফতার হতে পারেন। তাই বার বার কালক্ষেপ করছিলেন। মনোরঞ্জনা দিল্লিতে থাকতেন। সেখান থেকে গ্রেফতার করতে কিছু
আইনগত সমস্যা ছিল সিবিআইয়ের। কয়েকটি নথিতে সইসাবুদ করার প্রয়োজনে ডাকা হচ্ছে বলে ফোনে তাঁকে জানানো হয়। পাশাপাশি দু’টি বিমানের টিকিটও তাঁর গুলমোহর পার্কের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একটি দিল্লি থেকে কলকাতা আসার, অন্যটি সে দিন বিকেলেই দিল্লি ফিরে যাওয়ার। সিবিআইয়ের এক কর্তার যুক্তি, এর ফলে চতুর মনোরঞ্জনা ভাববেন, তাঁকে গ্রেফতারের কথা ভাবাই হচ্ছে না। আর ওই ফাঁদেই পা দেন তিনি। সকালের বিমানে কলকাতা এসে সরাসরি সিজিও কমপ্লেক্সে আসেন। সেখানে কয়েক ঘণ্টা জেরার পরে বিকেলে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। দিল্লি ফেরার টিকিট তাঁর ব্যাগেই রয়ে যায়।
এক সিবিআই কর্তার কথায়, বাঘিনি এখনও খাঁচা-বন্দি। বর্তমান ঠিকানা জেল নয়, এসএসকেএম হাসপাতালের কেবিন। তিনি ‘অসুস্থ’। আত্মীয়দের সংস্রবে থাকতে চান বলে এখন আলিপুরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারক সৌগত রায়চৌধুরীর কাছে আর্জি জানিয়েছেন মনোরঞ্জনা। আদালত সূত্রে খবর, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোনও আত্মীয়কে তাঁর কাছে থাকার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন তিনি। তবে মনোরঞ্জনার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল বলেই জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

রাশিয়ার কাঁধে সিরিয়ার বোঝা by আলী রীয়াজ

স্কুলজীবনে বিশ্ব ইতিহাসের যেসব ঘটনা অবশ্যপাঠ্য ছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তার অন্যতম। এর কারণ ও ফলাফল দুই-ই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়েছে। সেই পাঠের সুযোগে এ কথা আমাদের অনেকের জানা আছে যে ‘সারায়েভোর ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ নয়, উপলক্ষ মাত্র।’ ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের ভাবি রাজা অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ড ও তাঁর স্ত্রী ডাচেস অব হোহেনবার্গ সোফিকে সারায়েভোর রাস্তায় গুলি করে হত্যা করে গাভ্রিলো প্রিন্সিপ। সে ছিল গোপন এক গোষ্ঠীর সদস্য, যারা দক্ষিণ স্লাভ প্রদেশগুলোকে ভেঙে নিয়ে যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে চাচ্ছিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়া সার্বিয়াকে যে চরমপত্র দিয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আকারে সার্বিয়া এত ছোট দেশ যে অস্ট্রো-হাঙ্গেরির জন্য তাকে মোকাবিলা করা খুব কঠিন ছিল না। কিন্তু সার্বিয়া হুমকির মুখে পড়ে শরণাপন্ন হয়েছিল রাশিয়ার। আর অস্ট্রিয়া শরণাপন্ন হয় জার্মানির। এর পরের ঘটনাবলির বিস্তারিত বলাবাহুল্য—যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও ব্রিটেন। কিন্তু এই দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক, তৎকালীন রাজনীতি—এসবই জড়িয়ে পড়ার কারণ। ফার্দিন্যান্ডকে হত্যা না করা হলে অন্য কোনো উপলক্ষে এই যুদ্ধ হতে পারত। কিন্তু তারপরেও ওই হত্যাকাণ্ডকে বাদ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস লেখা যাবে না।
এখন সিরিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার বোমাবর্ষণের ঘটনা শুরু হওয়ার পরে যাঁরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, তাঁরা তাঁদের সেই কথিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা বলে কোন ঘটনাকে চিহ্নিত করবেন? যদিও আমি এ ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত যে সিরিয়াকে কেন্দ্র
করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কল্পনাপ্রসূত মাত্র, তথাপি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এই ঘটনাবলির সূচনা হয়েছিল একটি দেয়াললিখনের কারণে। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়ার দারা শহরের বাজার থেকে কেনা স্প্রে পেইন্ট দিয়ে কয়েকজন কিশোর একটি দেয়ালে লিখে দিয়েছিল, ‘জনগণ এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চায়’ (আরবিতে লেখা এই দেয়াললিখনের ইংরেজি অনুবাদ—দ্য পিপল ওয়ান্ট টু টপল দ্য রেজিম)। আসাদ সরকার পরদিনই ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ১৫ জন কিশোরকে আটক করে, তাদের ওপর চালানো হয় অত্যাচার। এই আটকের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদে পথে নামে, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। ফলে যদি আমার অনুমান ভুল প্রমাণিত হয় এবং বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো ইতিহাসের ক্লাসে পড়বে—একটি দেয়াললিখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিল।
সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ফলে ওই কিশোরেরা মুক্তি পায় বটে কিন্তু ১৮ মার্চে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় একজন বিক্ষোভকারী। সাড়ে চার বছর পরে সিরিয়ায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার বেসামরিক ব্যক্তি। বেসামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে আছে সাড়ে ১২ হাজার শিশু, আট হাজার নারী। বিদ্রোহী যোদ্ধা মারা গেছে ৪৩ হাজারের বেশি। সরকারের পক্ষে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৯১ হাজার ৬৭৮, যার মধ্যে সরকারি সৈন্য ৫২ হাজার, কেবল লেবানন থেকে আসা হিজবুল্লাহ যোদ্ধা মারা গেছে কমপক্ষে ৯৭১ জন। নিহত ইরানিদের সংখ্যা আমরা জানি না। ২ কোটি ৩০ লাখ নাগরিকের মধ্যে ৩০ লাখ মানুষ দেশত্যাগ করে শরণার্থী হয়েছে এবং আরও ৬৫ লাখ হয়েছে গৃহহারা। অধিকাংশের গৃহ বলতে কিছু অবশিষ্ট আছে কি না সেটাই প্রশ্ন।
এখন এই যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ অনেক। যে কারণে নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় আছে ৩৭ হাজার মানুষ, যারা সিরিয়ায় ‘জিহাদ’ করতে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। ৩ হাজার ২৫৮ জনের পরিচয় মেলেনি। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে হিজবুল্লাহ ও ইরানিদের উপস্থিতি প্রমাণ করে এই যুদ্ধে তারাও অংশ নিচ্ছে, যদিও তারা সিরীয় নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি শক্তি উপস্থিত রয়েছে অনেক। সিরিয়ার যুদ্ধে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো, আছে রাশিয়া, ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহর সৈনিকেরা ও তুরস্ক। এসব বিদেশি শক্তির উপস্থিতি প্রত্যক্ষ, তার বাইরে এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও পরোক্ষভাবে এখানে উপস্থিত—অর্থ এবং প্রভাব তাদের উপস্থিতির স্মারক। প্রতিবেশী সৌদি আরব, কাতার ও অন্য উপসাগরীয় দেশের পরোক্ষ উপস্থিতি অনস্বীকার্য। দেশের ভেতরে আছে বাশার আল–আসাদের সরকার, দানবীয় আকারে উপস্থিত আইসিস, আছে আল-কায়েদার অনুসারী জাবহাত আল নুসরা, ইসলামপন্থী বলে পরিচিত ইসলামিক ফ্রন্ট, যাতে আছে আহরার আল-শাম, আল-হক ব্রিগেড, দ্য ইসলাম আর্মি এবং আরও কয়েকটি গোষ্ঠী; সেক্যুলারপন্থী বলে পরিচিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মি ও কুর্দিশ ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টির সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন কুর্দিস্তান পিপলস প্রটেকশন ইউনিট। এর বাইরে আছে ছোট ছোট বিদ্রোহী দল, যারা আঞ্চলিকভাবে উপস্থিত ও সীমিত ক্ষমতার অধিকারী।
এসব গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ভিন্ন ভিন্ন। নিজ নিজ স্বার্থ বাস্তবায়নে তারা যখন লড়াইয়ে ব্যস্ত, তার পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু, ধ্বংসলীলা। কিন্তু সিরিয়ার মানুষ যারা সাড়ে চার বছর আগে পথে নেমেছিল, তাদের হয়ে কে লড়ছে? নিঃসন্দেহে প্রতিটি পক্ষ দাবি করবে যে তারাই সিরিয়ার নাগরিকদের স্বার্থে লড়ছে। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে এখন এই প্রশ্নই প্রায় তিরোহিত। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গত কয়েক বছরে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো আইসিসের উত্থান। ইরাকে সূচনা হলেও সিরিয়ায় আইসিসের বিস্তার সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক সমাধানের অনুপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভ্রান্তিকর পররাষ্ট্রনীতির কারণে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো যে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছে, তাদের একাংশ হয় আল-নুসরা নতুবা আইসিস যোগদানের ফলে আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই শক্তিশালী হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাতে করে আশু ফলাফল হিসেবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে আইসিসের মতো ভয়াবহ সংগঠন।
২০১২ সালে সিরিয়া প্রশ্নে সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে জেনেভায় যে আলোচনা হয়, তাতে মতৈক্য তৈরি হয়েছিল এবং যার ভিত্তিতে একটি যুক্ত ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছিল, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্যের অভাব এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। ওই ইশতেহারে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছিল যে সিরিয়া সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান নেই, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে এবং এই প্রক্রিয়া চলাকালেই সিরিয়ায় আইসিসের বিস্তার ঘটে। এ বছরের গ্রীষ্মকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো এত দিন আসাদকে বাদ দেওয়ার যে পূর্বশর্ত দিয়েছিল, তা তারা দৃশ্যত বহাল রাখলেও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা মেনে নিতে তারা রাজি এবং তার বিকল্পও নেই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে আঞ্চলিক শক্তিগুলো, বিশেষত ইরানকে বাদ দিয়ে সিরিয়া সমস্যার সমাধান আদৌ হবে কি না। এসব আলোচনায় রাশিয়া উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল তুলনামূলকভাবে গৌণ। আসাদ সরকারের প্রধান সমর্থক রাশিয়ার প্রত্যক্ষ, কার্যকর অংশগ্রহণ এই আলোচনার সাফল্যের জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠে। কেননা, জাতিসংঘে সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ রাশিয়া ও চীনের বাধার কারণে আটকে যেতে থাকে।
এরই মধ্যে লাখো লাখো শরণার্থীর স্রোত ইউরোপে পৌঁছালে ওই দেশগুলো সিরিয়া সমস্যার সমাধানকে অতি জরুরি বলেই বিবেচনা করে। সেই প্রেক্ষাপটেই রাশিয়া সিরিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করে এবং ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় বিমান হামলার সূচনা করে। রাশিয়ার সামরিক অভিযানের লক্ষ্য যে আসাদ সরকারকে রক্ষা করা, সে বিষয়ে সন্দেহের কারণ নেই। কেননা, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তা সোজাসাপ্টা বলেই দিয়েছেন। আর তা করতে হলে কেবল আইসিসকে মোকাবিলা করাই যথেষ্ট নয়, সম্ভবত আইসিসকে মোকাবিলার আগেই আসাদের অন্য প্রতিপক্ষদের একেবারে নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে হবে। সেটা যে স্বল্প সময়ে সম্ভব হবে না, সেটা রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা বোঝেন। ফলে তাঁদের সামনে এখন বিকল্প দুটি; প্রথম বিকল্প দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধে লিপ্ত থেকে আসাদের সব প্রতিপক্ষের নির্মূল নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, আসাদ সরকার যে আশু বিপদের মুখে ছিল এবং যা তাকে আলোচনার ক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল, তার অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া। প্রথম বিকল্পের পথে বাধা দুটি; যেখানেই দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশিদের সামরিক উপস্থিতি থেকেছে, সেখানে বিদেশি শক্তি এবং তার সমর্থিত সরকার শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এখন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়ার বিরোধিতা করছে না, কিন্তু তারা তাদের সমর্থক বিদ্রোহীদের একেবারে ত্যাগ করবে এমন আশা করা যায় না। ফলে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ ‘প্রক্সি যুদ্ধে’ পরিণত হবে। প্রক্সি যুদ্ধ স্বল্প মেয়াদের যুদ্ধ নয়।
রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের ফলে আসাদের ভাগ্য এবং সিরিয়ার ভবিষ্যৎ কাঠামোবিষয়ক আলোচনায় রাশিয়া নিজের জন্য আগের তুলনায় একটা বড় আসনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে, এখন পর্যন্ত সেটা পুতিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দ্বিতীয়ত, সবার দৃষ্টি সিরিয়ায় নিবিষ্ট হওয়ার কারণে ইউক্রেনে রাশিয়ায় ব্যর্থতার যে কালো দাগ, তা থেকে বেরিয়ে এসে প্রেসিডেন্ট পুতিন তাঁর নিজের দেশে ও তাঁর মিত্রদের দেখাতে পারবেন তাঁর সাফল্যের ঝুলি খালি নয়। তৃতীয়ত, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর একক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধা দিতে সক্ষম হওয়ায় রাশিয়া এবং তার নেতা পুতিন ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পরিবর্তনশীল শক্তি ভারসাম্যের প্রত্যক্ষ অংশীদারে পরিণত হলেন।
এই অঞ্চলে ভারসাম্যের এই প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে আছে। সেখানে উপস্থিতির পরিণতি রাশিয়ার জন্য ইতিবাচক হবে বলে মনে হয় না, সেটা এই অঞ্চলে যুদ্ধ এবং সংঘাত দমনে সহায়ক হবে বলেও মনে হয় না। কেননা, সিরিয়ার এবং এই অঞ্চলের অনেক দেশের সমস্যারই কোনো সামরিক সমাধান নেই, দরকার রাজনৈতিক সমাধান; এবং তা বাইরের শক্তির চাপিয়ে দেওয়া সমাধান নয়, যে মানুষেরা ২০১১ সালে দেয়ালে ‘জনগণ এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চায়’ লিখেছিল, তাদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই বের করতে হবে। এত দিন তার দায়দায়িত্ব বর্তাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওপর, এখন তার দায়িত্বের একটা বড় অংশ রাশিয়া স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিল।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের হুমকি চীনের

দক্ষিণ চীন সাগরের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে যে কোনো সময় যুদ্ধ বাঁধতে পারে। শুক্রবার চীনের নৌ-কমান্ডার অ্যাডমিরাল উ শেঙ্গলি এক ভিডিও বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে এ হুশিয়ারি দেন। খবর রয়টার্স ও হিন্দুস্থান টাইমসের। ওই ভিডিও কনফারেন্সে চীনা নৌবাহিনী প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী প্রধান জন রিচার্ডসনকে বলেন, ‘যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে তবে এটি উভয় রাষ্ট্রের নৌ কিংবা বিমানবাহিনীকে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলবে।
এমনকি তুচ্ছ এ গোড়ামিতে যুদ্ধ পর্যন্ত বেঁধে যেতে পারে। এর আগে মঙ্গলবার চীনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএস লাসেন নামক এ ক্ষেপণাস্ত্র জাহাজ দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে রুটিন নজরদারি বলে দাবি করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-দফতরের বরাত দিযে রয়টার্স জানায়, ফ্রিডম অব নেভিগেশন ক্ষমতা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ-সীমানার যে কোনো জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ অধিকার রয়েছে। তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবি মানতে নারাজ। দক্ষিণ চীন সাগরে একটি দ্বীপপুঞ্জের অধিকার নিয়ে চীন আর ফিলিপিন্সের মধ্যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘ দিনের। বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরে মীমাংসা চেয়েছে ফিলিপাইন। কিন্তু, চীনের দাবি বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জের অধিকার তাদের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত। এই বিষয়ে অন্য কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা মানবে না। আন্তর্জাতিক আদালত অবশ্য চীনের এই সার্বভৌমত্বের দাবি নস্যাৎ করেছে। তারপরই ফিলিপিন্সের পাশে দাঁড়িয়েছে আমেরিকা। যে অংশকে চীন নিজেদের জলসীমা বলে দাবি করে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ হানা দিয়েছে সেখানেই। উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তে থাকায় আমেরিকা ও চীনের নৌবাহিনীর প্রধানরা ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনা করেন। সেখানেই চীনের তরফ থেকে আমেরিকাকে জানানো হয়েছে, এসব ছোটখাটো ঘটনা থেকেই যে কোনো সময় যুদ্ধ শুরু হতে পারে। চীনের জলসীমা ছেড়ে অবিলম্বে চলে যাওয়া উচিত ইউএসএস লাসেনের। তবে রণতরী ফিরিয়ে নেয়ার পথে এখনই হাঁটতে নারাজ আমেরিকা। ডেইলি মেইল, দ্য গার্ডিয়ান।
দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দীপপুঞ্জের জলসীমা অধিকার নিয়ে চীন ও ফিলিপিন্সের দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত মীমাংসা করতে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক আদালত এক শুনানির আয়োজন করে। ওই শুনানিতে বেইজিংয়ের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং পরবর্তী শুনানিতে ফিলিপিন্সের যুক্তি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানায় হেগ ভিত্তিক এ আদালত। খবর রয়টার্সের। এর আগে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দাবিকে বিরোধিতা করে ২০১৩ সালেই আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে ফিলিপিন্স। এ মামলার নথিতে জাতিসংঘ কনভেনশন অন দ্য ল’ অব দ্য সি অনুযায়ী ২০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা দাবি করেছিল ফিলিপিন্স। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতিতে ফিলিপিন্সের পক্ষ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র-চীন টালমাটাল সম্পর্ক : দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ অনুপ্রবেশ নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের টালমাটাল ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ ২০১৩ সালে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের নৌযানের অবস্থান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী জাহাজ তার দিক পরিবর্তন করেছিল। তার ঠিক পরের বছর, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ সীমার ৯ মিটারের ভেতর দিয়ে চীনা যুদ্ধ জেট উড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালের এক বিবৃতিতে চীনের এমন প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। রয়টার্স।
নৌ প্রধানের হুশিয়ারি
যদি যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে তবে এটি উভয় রাষ্ট্রের নৌ কিংবা বিমানবাহিনীকে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলবে। এমনকি তুচ্ছ এ গোঁড়ামিতে যুদ্ধ পর্যন্ত বেঁধে যেতে পারে রুশ জঙ্গিবিমানকে তাড়িয়ে দিল মার্কিন রণতরী জাপান সাগরের আকাশে দুটি রুশ জঙ্গিবিমানের গতিরোধ করেছে মার্কিন বিমান। মার্কিন নৌবাহিনী শুক্রবার এ খবর জানিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এদিন বলেন, মঙ্গলবার জাপান সাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস রোনাল্ড রিগানের এক নটিক্যাল মাইলের মধ্যে দুটি রুশ জঙ্গিবিমান ঢুকে পড়ে। এ অবস্থায় রুশ বিমানগুলোকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য ওই রণতরী থেকে চারটি এফ-১৮ জঙ্গিবিমান পাঠানো হয়। কোরীয় উপদ্বীপের আগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক পানিসীমায় মার্কিন রণতরীটি দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া চালাচ্ছিল। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস রোনাল্ড রিগানকে এসকোর্টকারী একটি জাহাজ থেকে প্রথমে রুশ জঙ্গিবিমানগুলোর সঙ্গে রেডিও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া না পাওয়ায় এগুলোর গতিরোধ করতে এফ-১৮ পাঠানো হয়। রাশিয়া ও আমেরিকার নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে এ ধরনের ঘনিষ্ঠ এনকাউন্টারের ঘটনা এটাই প্রথম নয়।

মিয়ানমারে মুসলিমদের ভোটার করতে আহ্বান জাতিসংঘের

মিয়ানমারে সরকারের প্রতি সংখ্যালঘু মুসলিম ও অভিবাসীদের ভোটার করতে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের তদন্তকারী দল। মিয়ানমারের মানবাধিকার কর্মী ইয়াংহি লি তথ্য উপাত্ত ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। ওয়াশিংটনে পোস্টের বরাতে শুক্রবার এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ডন। দেশটিতে নভেম্বর মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী ইয়াংহি লি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা নির্বাচনে অযোগ্য নির্বাচিত হয়েছে তাদের স্বাধীনভাবে রিভিউ করার সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে দু’জন মুসলিম রয়েছেন যারা বর্তমানে দেশটির সংসদ সদস্য বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, নভেম্বরের আট তারিখে যে নির্বাচন হবে তা মিয়ানমারের গণতন্ত্রের জন্য একটি মাইলফলক। কিন্তু নির্বাচনে সবাই অংশ না নিলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ হবে নির্বাচনের পরিবেশ কেমন তার উপর। এছাড়া সবাই যদি নির্বাচনে অবাধভাবে অংশ নিতে পারে তবেই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা অংশ নিতে না পারলে তারা এর স্বাদ অনুভব করতে পারবে না। তিনি জানান, রাখাইনে বসবাস করা ৭ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা যারা চীন এবং ইন্ডিয়া থেকে এসেছে তাদের অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশন কার্ড ছিল। তারা ২০১০ এবং ২০১২ সালের নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিল। কিন্তু মার্চে তাদের কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর নতুন করে যারা রেজিস্ট্রেশন করেছেন তারা ভোট দিতে পারবেন না। রাখাইনে যেসব রোহিঙ্গারা বাস করে তাদের বাংলাদেশী বলে মনে করে দেশটি সরকার এবং তাদের সব অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সমালোচনামূলক বলে মনে করেন লি। তাদের অধিকার চর্চা তাদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেফতার, কয়েদ করে রাখা, মত প্রকাশের, সমাবেশের স্বাধীনতা এবং সমিতির জন্য পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান লি। তবে মিয়ানমারের জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও টিন লি’র প্রতিবেদনকে বেঠিক এবং বিকৃত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন করতে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ।
সুচির দলের প্রার্থীর ওপর হামলা
মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় অং সান সুচির দলীয় এক প্রার্থীর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তার নাম নাইং গ্যান লিন। তাকে তোলোয়ারের আঘাতে আহত করে এক হামলাকারী। তবে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নিশ্চিত করেছে যে, আহত এমপি এখন আশংকামুক্ত রয়েছেন। শুক্রবার দলটির পক্ষ থেকে একথা জানানো হয়েছে। মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই ঘটনা ঘটল। খবর বিবিসি, এএফপি। বৃহস্পতিবার রাতে ইয়াঙ্গুনের থারকেতা শহরে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় এ হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী অপর এনএলডি প্রার্থী থেত তার উই ইউন বলেন, ‘এক ব্যক্তি এনএলডি’র এক সদস্যকে ঘুষি মারতে থাকেন। এরপর জনতা তাকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি একটি বড় ছোরা নিয়ে ফিরে আসেন।’ তিনি জানান, নাইং গ্যান লিন তাকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনায় অন্তত দু’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ছাত্র নেতা গ্রেফতার : মিয়ানমারে এক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে গত মার্চ মাসে বিক্ষোভের ডাক দেয়ার পর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন। সেখানে শিক্ষা সংক্রান্ত বিক্ষোভ-সমাবেশকে কেন্দ্র করে এটি হচ্ছে সর্বশেষ আটকের ঘটনা। এর আগে এ ধরনের ঘটনায় অনেককে গ্রেফতার করতে দেখা যায় এবং এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠে। মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় লাতপাদান শহরে শিক্ষার্থীদের সমর্থনে সাত মাস আগে ইয়াঙ্গুনে বিক্ষোভের ঘটনায় অল বার্মা ফেডারেশন অব স্টুডেন্ট ইউনিয়নসের সভাপতি কিওয়ান কো কোকে গ্রেফতার করা হয়।

আসাদকে সিরিয়ার ক্ষমতা ছাড়তেই হবে : সৌদি

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদকে ক্ষমতা ছাড়তেই হবে বলে ফের হুশিয়ারি দিয়েছে সৌদি আরব। সে সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত ইরানকেও মেনে নিতে হবে জানিয়েছে তারা। সিরিয়ার চলমান সংকট নিরসনে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় শুক্রবার ১৭ জাতি আলোচনার প্রাক্কালে সৌদি আরব এই মন্তব্য করল। সিরিয়ার চলমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে এ ধরনের বৈঠকে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করছে ইরান। বৈঠকে ইরান ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সৌদি আরব, ফ্রান্স, জার্মানি, মিসর, রাশিয়া, জর্ডান, ব্রিটেন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, লেবানন, ওমান ও চীনসহ ১৭টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করছেন। সে সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিয়েছেন জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও। তবে বৈঠকে সিরিয়ার কোনো প্রতিনিধি নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ একদিনের এ বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শুক্রবারের আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরুর আগে বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যথাক্রমে জন কেরি ও লাভরভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর আগে জাতিসংঘের উদ্যোগে দুইবার সিরিয়াবিষয়ক আন্তর্জাতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জেনেভা-১ ও জেনেভা-২ নামের ওই দুই বৈঠক সিরিয়া সংকটের সমাধান করতে পারেনি। সম্মেলনে তেহরানের উপস্থিতি বিশ্ববাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ায় দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ বন্ধে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সম্মেলনে ইরানকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংকট সমাধানে বিশ্ব শক্তিগুলোর প্রতি নেতৃত্বসুলভ এবং নমনীয় আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। তিনি বলেন, পাঁচ পরাশক্তির কাছে আমার আহ্বান, তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নেতৃত্বসুলভ ও নমনীয় আচরণ করবেন। নিজেদের কথা ভেবে আলোচনা দীর্ঘায়িত করলে, সিরিয়া এবং বিশ্ববাসীর ভোগান্তি বাড়বে। লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটির গবেষক লিনা খতিব আল জাজিরাকে বলেন, তেহরান এ ধরনের আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, এটা খুবই ভালো খবর। এখন তো সবাই বুঝতে পারছে যে, সামরিক শক্তি দিয়ে সিরিয়া সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে না। এ গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে হলে বিবাদমান সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে কথা বলতে হবে, ছাড় দিতে হবে। তবে সিরিয়ার বিরোধী দলগুলো এ আলোচনায় অংশ না নেয়ায় আশাহত তিনি। সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চ মাস থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। এ যুদ্ধে এ পর্যন্ত দুই লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি লোক আহত হয়েছে। এছাড়া, শরণার্থীতে পরিণত হয়েছে ৭৬ লাখ সিরীয়বাসী। জাতিসংঘ বলেছে, সিরিয়ার অন্তত এক কোটি ২২ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। এসব মানুষের মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ শিশু। এএফপি।

নীড়হারা পাখি ইমরান খানের দ্বিতীয় ঘরও ভাঙল

সেই যে পুরনো দিনের গান আছে না- দু’দিনের জোছনা, আবার অন্ধকার রাত। ঠিক তাই হল ইমরান খানের বেলায়। বিয়ের মাত্র ১০ মাস পর রেহাম খানের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে খান সাহেবের। আপসে দু’জন আলাদা হয়ে গেছেন। পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান বিরহের যন্ত্রণা নিয়ে বেশ কয়েকটি টুইটবার্তায় নিজের দ্বিতীয় বিয়েও ভেঙে যাওয়াটাকে বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। তার নিজের জন্য যেমন, তেমনি রেহাম এবং দুই পরিবারের জন্য এই ‘ছাড়াছাড়ি’ মোটেও সুখকর নয়। তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সবাইকে সম্মান জানানোর জন্যও অনুরোধ করেন তিনি। পাকিস্তানের বিরোধী দল তেহরিক-ই-ইনসাফের চেয়ারম্যান ইমরান খানের এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। ৬২ বছর বয়সী এই সাবেক ফাস্ট বোলার এ বছর জানুয়ারিতে তিন সন্তানের জননী ৪২ বছর বয়সী রেহাম খানকে বিয়ে করেছিলেন। রেহাম বিবিসি’র আবহাওয়াবিষয়ক অনুষ্ঠানের সাবেক সঞ্চালক।
শুক্রবার এক টুইটবার্তায় রেহাম খান বলেন, ‘আমরা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ডিভোর্সের জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছি।’ নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! বিবাহবিচ্ছিন্ন রেহাম সাবেক প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান খানের মাঝে নির্ভরতা খোঁজার প্রয়াসী হয়েছিলেন। ভাগ্য আবার তাকে বিচ্ছেদের চৌরাস্তায় এনে দাঁড় করিয়ে দিল। আর খান সাহেব। রূপসী রেহামের মতো তিনিও দ্বিতীয়বার ডিভোর্সের রোদমাখা পথে হাঁটলেন। ২০০৪ সালে প্রথম স্ত্রী জেমিমা খানের সঙ্গে সম্পর্ক চুকেবুকে যাওয়ার পর রাজনীতির চোরাগলিতে ঘুরপাক খাওয়াটাকে নিজের নিয়তি মেনে নিয়েছিলেন ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। হঠাৎ তার জীবনে রেহামের প্রবেশ। প্রস্থানটাও হল হঠাৎ। পদ্মপাতায় শিশির বিন্দুর মতো সম্পর্কটা ভেঙে চুরমার। ‘দুটি মন আর নেই দু’জনার’- এই গানটির মতোই এখন ইমরান-রেহাম। মাসছয়েক ধরে গুঞ্জনের মেঘ ভাসছিল। বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে, এমন গুজব ছিল। খান সাহেব এতদিন অস্বীকার করে এসেছেন। কিন্তু আগুন লাগলে তার আঁচ থেকে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পারে আশপাশে থাকা মানুষ। তাই ‘চলো আবারও আগন্তুক হয়ে যাই আমরা দু’জনে’- গানটির মতো দু’জনের পথ বেঁকে গেল দু’দিকে। দু’জনের মধ্যে ‘টিউনিং’ ঠিক হচ্ছিল না।
পাকিস্তানি মিডিয়ার খবর, রেহামকে তালাক দেয়ার জন্য পরিবারের চাপ ছিল ইমরান খানের ওপর। ইমরানের বোন আলিমা খান শুরু থেকেই এ বিয়ের ঘোর বিরোধী ছিলেন। শেষমেশ ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হল না। ‘সম্পর্ক বোঝা হয়ে দাঁড়ালে তা ভেঙে ফেলাই ভালো’- গানের এই অন্তরা মেনেই একসময়ের রমণীমোহন ইমরান খান রেহামকে নিজের জীবন থেকে আলাদা করে দিলেন। রেহাম লন্ডনে চলে গেছেন। সেখানেই হয়তো এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে সব বলবেন তিনি। জেমিমা খানও ডিভোর্সের পর পাকিস্তান ত্যাগ করেছিলেন। ফরাসি-ব্রিটিশ ধনকুবের জেমস গোল্ডস্মিথের আহ্লাদি কন্যা জেমিমার সঙ্গে ১৯৯৫তে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন ইমরান। সেই বিয়ে টিকেছিল ৯ বছর। দ্বিতীয় বিয়ে টিকল মাত্র ১০ মাস। আগের ঘরে দুই ছেলে রয়েছে ইমরানের। অক্সফোর্ডপড়ুয়া সুদেহী-সুদর্শন বিশ্বের অন্যতম সেরা সাবেক অলরাউন্ডার ইমরান খানের জীবনে নারীরা এসেছেন বহতা নদীর মতো। সেই জিনাত আমান থেকে শুরু করে রেহাম খান- বহু রমণী নিজেদের জড়িয়েছেন খান সাহেবের সঙ্গে। ৩৯ বছর বয়সে একটি অনভিজ্ঞ দল নিয়ে যিনি পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন, প্রণয় ও পরিণয়ের পৃথিবীতে তিনি কী করে এমন ‘অনভিজ্ঞ’ রয়ে গেলেন?

ফুটবলের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে এনেছে এই টুর্নামেন্ট

ফুটবলের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে এনেছে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ ফুটবল। এমনটিই মনে করেন জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার আশীষ ভদ্র। তিনি বলেন, ‘ফুটবলের জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল। শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে এনেছে। জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে এনেছে। স্টেডিয়ামমুখী করেছে দর্শকদের।’ এ টুর্নামেন্ট থেকে কী পেল বাংলাদেশ? কী পেল চট্টগ্রাম? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টুর্নামেন্ট দেশের ফুটবল জাগরণের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে দেশীয় খেলোয়াড়দের মানোন্নয়নে টনিক হিসেবেও কাজ করেছে।’ তার মতে, এ টুর্নামেন্টের মাধ্যমে দেশীয় খেলোয়াড়রা বিদেশী খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাদের দক্ষতা, টেকনিক্যাল স্টাইল, সর্বোপরি ভিন দেশের ফুটবল কসরত আয়ত্ত করতে পেরেছে। তিনি বলেন,
‘একসময় চট্টগ্রামবাসী ফুটবলপাগল ছিলেন। ক্রিকেটের সাফল্যের হাওয়ায় তা উড়ে গেছে। যে সময়টা ফুটবলের সোনালি অধ্যায় ছিল, সে সময় দেখেছি ফুটবলপ্রেমী মানুষের ঢল। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর এমন জোয়ার দেখছি শেখ কামাল ক্লাব কাপে।’ আশীষ বলেন, ‘ফুটবলে চট্টগ্রামের সোনালি অধ্যায় ফিরিয়ে এনেছে শেখ কামাল টুর্নামেন্ট। এটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন। তবেই স্বার্থক হবে এ টুর্নামেন্টের সাফল্য।’ জাতীয় দলের সাবেক আরেক ফুটবলার এজাহারুল হক টিপু শেখ কামাল টুর্নামেন্টকে হারিয়ে যাওয়া ফুটবলের ‘শিকড় সন্ধানী টুর্নামেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই টুর্নামেন্ট দেশীয় ফুটবলে একটি মাইলফলক। যার মাধ্যমে দেশের খেলোয়াড়রা লাভবান হবে। ঝিমিয়ে থাকা ফুটবলকে আবারও সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘টুর্নামেন্টে দেশীয় যে ক্লাবগুলো খেলছে, তাদের বদৌলতে যে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা সুযোগ পেয়েছে তারা আগামী দিনে চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের হয়ে নতুন ফুটবল তারকা হিসেবে বেরিয়ে আসবে।’

ছোটপর্দা থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা নেই

*বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?
**কলকাতা থেকে ফিরলাম। ওখানে ‘রাজকাহিনী’ ছবির প্রচারণার কাজছি। দেশে ফিরেই ‘পুত্র’ ছবির শুটিং করছি কয়েকদিন হল। আমি অনেক বেশি কাজ একসঙ্গে কখনও করি না। গুছিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। তাই আপাতত ছবির কাজ করছি। এছাড়া ‘বিউটি সার্কাস’ নামের একটি ছবির কাজের কথা চূড়ান্ত হয়েছে। কলকাতায় আরও দুটি ছবির কথা চলছে।
*রাজকাহিনী ছবিতে আপনার চরিত্রের গুরুত্ব খুব একটা ছিল না বলেই অনেকে বলছেন...
**আমার কাছে তা মনে হয়নি। পুরো ছবিজুড়েই তো ছিলাম। তাছাড়া সংলাপের কথা বলছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন, সংলাপই কী একটি ছবির চরিত্রের গুরুত্ব নির্ধারণ করে? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এত বড় একটা প্রজেক্টে কাজ করার সৌভাগ্যই বা ক’জনের হয়।
*‘পুত্র’ ছবিতে আপনার চরিত্র কেমন?
**পুত্র ছবিটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ছবি। মূলত ছবিটি একটি প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আমি একটি স্কুলের ম্যাডাম থাকি। সেখানেই আমি বাচ্চাটাকে দেখি। তখন তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসি। স্বাভাবিকভাবেই বাসায় তাকে কেউ মেনে নিতে চায় না। আমার শ্বশুরবাড়িতে তৈরি হয় নানা সমস্যা।
*বাংলাদেশ এবং ভারতে কাজের পার্থক্য কী মনে হয়?
**পরিবর্তন তো অনেক ক্ষেত্রেই আছে। সেখানে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়েছে সেটি হল সময় মেইনটেইন করা। সেটের প্রত্যেকে যে সময় কাজ শুরু হওয়ার কথা ঠিক ওই সময় কাজ শুরু করেন। তাছাড়া ওখানে ইউনিটের সবাই খুব গুছিয়ে কাজ করেন। সেটা একটা আর্টিস্টের কস্টিউম থেকে শুরু করে সব কিছু। এ বিষয়টি ভালোলাগার মতো।
*ছোটপর্দায় কী আর দর্শকরা জয়াকে দেখতে পাবেন না?
**অনেক ব্যস্ত থাকার কারণে সময়-সুযোগ হচ্ছে না টিভি পর্দায় কাজ করার। তাছাড়া টিভিপর্দায় আমি যে ধরনের কাজ করেছি সে ধরণের কাজ এখন মন মতো হচ্ছে না। অভিনয় না করার এটিও একটি কারণ অভিনয়কে ভালোবাসি। তাই ছোটপর্দা থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
সাদিয়া ন্যান্সি

টিভি শোই শিল্পার ভরসা!

সিনে পর্দার হট নায়িকা শিল্প শেঠিকে আগেও কয়েকবার টিভি পর্দায় দেখেছেন দর্শকরা। বিগ বস, নাচ বালিয়ের মতো শো উপস্থাপনা করেছেন বলিউডের এ গ্লামারকুইন। আরও একবার টিভিতে দেখা যাবে তাকে। এবার আসছেন একটি গেম শোয়ের হোস্ট হয়ে। সিনে দুনিয়া একসময় মাত হয়েছিল তার অভিনয় উন্মাদনায়। কিন্তু কালক্রমে সিনেমা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আসেন। যদিও সমালোচকদের মন্তব্য, নতুনদের ভিড়ে হারিয়ে গেছেন শিল্পা। অভিনয়ে না থাকলেও আলোচনায় কিন্তু ঠিকই রয়ে গেছেন এ বলি তারকা। বিয়ে, সন্তান ধারণ এসব তো রয়েছেই।
পাশাপাশি আইপিএলের মতো ক্রিকেট আসরে দলের মালিকানা নিয়ে বরাবরই লাইমলাইটে ছিলেন শিল্পা। মাঝে দুটি টিভি শোয়ের হোস্ট হিসেবেও দেখা গিয়েছিল। আবারও তিনি সেই ভূমিকায়। এ প্রসঙ্গে শিল্পা বলেন, ‘ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। স্পায়ের ব্যবসাটা বেশ জমে উঠেছে। পাশাপাশি ডিজাইনারের কাজও করছি। সবমিলিয়ে সময় হয়ে উঠেনি।’ ক্যামেরাকে যিনি ভালোবাসেন, তিনি আর কতদিন ক্যামেরা থেকে দূরে থাকতে পারেন! আর তাই আবারও ক্যামেরার মুখোমুখি তিনি। শিল্পা আরও জানিয়েছন, জীবনকে সবসময় কিছু না কিছু শিখিয়ে যাও। নতুন যে অধ্যায় শুরু হচ্ছে, সেখান থেকেও আবার নতুন কিছু শিখব।’ স্বভাবতই বোঝা যায়, ছোটপর্দাকেই আপাতত আলোচনার খোরাক হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিল্পা।

হামলার গোয়েন্দা তথ্য ছিল পাঁচ দেশীয় জোটের কাছে

জঙ্গিরা বাংলাদেশে বিদেশীদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে গত মাসে এমন তথ্য পেয়েছিল  পাঁচ দেশের গোয়েন্দা বাহিনী। ‘ফাইভ আইজ’ জোটের দেশগুলো হলো- অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে সতর্ক বার্তা দেয়। বাংলাদেশে সফর সতর্কতা হালনাগাদ করে অস্ট্রেলিয়া। সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করলেও তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি বাংলাদেশ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। ‘বাংলাদেশ পুশেস ব্যাক অ্যাজ ওয়ার্নিংস অব আইসিস এক্সপ্যানসন গ্যাদার স্টিম’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ও বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সংযোগহীনতায় বিভ্রান্ত বাংলাদেশী ও বিদেশীরা। আর এটা দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিস্তার প্রতিহত করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। আর বাংলাদেশে তাদের আবির্ভাব হতে পারে ভয়াবহ। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অর্থনৈতিক অগ্রগতি। মার্কিন কর্মকর্তারা গত মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল যে, ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তৎপরতা বৃদ্ধি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্য তাদের কাছে আছে। এর কয়েক দিন পর সিরিজ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ওই সতর্ক বার্তা যথার্থ ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় ইতালির এক নাগরিককে। আর এক জাপানিকে গুলি করা হয় দেশের উত্তরাঞ্চলে। গত শনিবার শিয়া মুসলিমদের একটি বিশাল জমায়েতে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী গলে ঢুকে পড়ে বোমা হামলাকারীরা। ওই হামলায় এক তরুণ নিহত হয়। আহত হয় অনেকে। প্রতিটি হামলার পর দায় স্বীকার করে আইএস। তাদের দায় স্বীকার যেসব সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে এসেছে সেগুলো উগ্রপন্থি দলটি ব্যবহার করে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব ঘটনাপ্রবাহের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সন্দেহ আর স্পষ্ট সংশয় নিয়ে। বিদেশী দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের সতর্কতা জানালেও বাংলাদেশী কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, আইএসের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। তারা স্পষ্টতই বিবেচনায় নিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও ত্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য প্রচার করেছে। যেমনটা হয়েছিল ইরাক অভিযানের সময়। শেখ হাসিনা বরং এসব ঘটনাকে তার সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে স্থানীয় বিরোধী নেতাদের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন।  বাংলাদেশ ও বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সংযোগহীনতায় বাংলাদেশী ও বিদেশীরা বিভ্রান্ত। এটা দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার প্রতিহত করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। এখানে তাদের আবির্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অর্থনীতি। আর বিস্তার ছড়িয়ে যেতে পারে ভারত ও পাকিস্তানে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্কের সঙ্গে লড়েছে। রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে এদের কয়েকটির যোগসূত্র ছিল। কিছু সময় সুপ্তাবস্থায় থাকার পর এ বছর আবার তারা পুনর্গঠিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মৌলবাদী ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলা চার জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে তারা। এদিকে, বিদেশী নিরাপত্তা সংস্থাগুলো লন্ডন ও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও অন্যান্য শহরগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশী অভিবাসীদের খুঁজে বের করেছেন যারা আইএসে নিয়োগকারী এবং যোদ্ধা হিসেবে সক্রিয়। এসব গ্রুপের মধ্যে ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ যোগসূত্র বাংলাদেশের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনবে। ঢাকাস্থ একজন সিনিয়র কূটনীতিক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘আমরা আইএসের দাবি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। সারা বিশ্বে আমরা তাদের বিস্তার দেখছি।’ এখন পর্যন্ত ওই যোগসূত্রের তথ্যপ্রমাণ খুবই সামান্য। বাংলাদেশের পুলিশ ৩০ জনেরও বেশি আইএসের সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, এদের বেশির ভাগ অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের এবং ছাত্র। তারা সিরিয়া বা আফগানিস্তানে লড়াই করতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। লন্ডনভিত্তিক এক ব্যক্তিকেও তারা গ্রেপ্তার করেছে বলে জানান মি. ইসলাম যে রিক্রুট করতে বাংলাদেশ এসেছিল।  ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলী রীয়াজ বলেন, তিনি বাংলাদেশে বড় জিহাদি গ্রুপগুলোর ‘সাংগঠনিক অবস্থান’ নিয়ে ‘অত্যন্ত সন্দিহান’। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গি সংগঠনগুলো যোগসূত্র স্থাপনে আগ্রহী। আলী রীয়াজ বলেন, ‘সুযোগ আসলে আর রাস্তা পেলে স্থানীয় এসব গ্রুপগুলো অচিরেই আইএসের ফ্রাঞ্চাইজ হয়ে উঠবে।’ গত মাসের সতর্ক বার্তাগুলো বাংলাদেশ ও বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীরে  প্রোথিত পারস্পরিক অবিশ্বাসের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে। যদিও তারা সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপে সহযোগিতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। মাসখানেক আগে ‘ফাইভ আইজ’ কথিত জোটরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে বিদেশীদের ওপর সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার তথ্য পেয়েছিল। ২৫শে সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সফরে তাদের সতর্কতা হালনাগাদ করে। এতে বলা হয়, ‘অস্ট্রেলিয়ানদের ওপর সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।’ ধারণা করা হয়েছিল হামলার টার্গেট ছিল বিদেশীদের কাছে জনপ্রিয় একটি বার্ষিক কস্টিউম পার্টি গ্লিটার বল। এই একই তথ্যের ভিত্তিতে সতর্কতা দেয় বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। ২৭শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গি হামলার শঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের তরফ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক সফররত শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী কর্মকর্তাদেরকে হুমকির বিস্তারিত অবহিত করেন। ওই সফরে শেখ হাসিনার একজন সফরসঙ্গী গওহর রিজভী বলেন, এসব সতর্কতা হতাশাজনক এবং সুনির্দিষ্ট নয় বলে মনে করেছেন প্রধানমন্ত্রী। রিজভী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর কোন গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে নি। আর তারা এও জানায় নি যে তথ্য কোথা থেকে এসেছে। এক সাক্ষাৎকারে রিজভী বলেন, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে আমাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এ দফায় কেন আপনি একতরফা পদক্ষেপ নিচ্ছেন আর তথ্য শেয়ার করছেন না? তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে ইরাকে ‘উইপন্স অব মাস ডেস্ট্রাকশন’ আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে ত্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল তাতে বিশ্বের বিশ্বাসপ্রবণতার পরীক্ষা হয়েছে।’ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নজরদারি করে থাকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ইতালিয়ান সিজার তাভেলা হত্যার  কয়েক ঘণ্টা পর আইএসের তরফ থেকে হামলার দায় স্বীকারের বার্তা আসে মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে আইএসের একটি সন্দেহভাজন অ্যাকাউন্টে। এছাড়াও বার্তা আসে আইএস ব্যবহার করে ধারণা করা হয় এমন দুটি টুইটার অ্যাকাউন্টে। বাংলাদেশ সরকার এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে অবিশ্বাস অনেক গভীরে প্রোথিত। আর এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কিছু বিষয় রয়েছে। দীর্ঘদিনের একটি সন্দেহ রয়েছে যে, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র হাত ছিল। আর সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৪ সালে তার দলের বিতর্কিত নির্বাচন বিজয়ে ওয়াশিংটনের ঠাণ্ডা প্রতিক্রিয়া আর দেশের তৈরী পোশাক শিল্পের বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়ায় তিনি হতাশ হয়েছিলেন। কিছু দেশ তার সংশয়ে সমর্থন দিয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার এ. নিকোলায়েভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হুমকিকে অতিরঞ্জিত করছে। দুটি হত্যাকাণ্ডের পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, দু ফোঁটা পানিকে বৃষ্টি বলে না। এক মাসের ব্যবধানে বিদেশীদের মধ্যে শঙ্কা কমে এসেছে। তারা আবারও ঢাকার মার্কেটে, হোটেলে যাতায়াত শুরু করেছেন। তবে এখন তারা রাস্তাঘাটে হাঁটেন না বা বাইসাইকেল, রিকশায় চড়েন না। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরী পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিমা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কিছু বায়ার তাদের বার্ষিক সফর বাতিল করেছেন। কূটনীতিকরা বলছেন হুমকি এখনও গুরুতর। সিনিয়র এক পশ্চিমা কূটনীতিক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, হুমকি বৃদ্ধির বিষয়টি পুরো পরিস্থিতিকেই পাল্টে দিয়েছে যা বিদেশীদের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, এটা হুট করে পাল্টে যাবে না। আর জঙ্গি কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশীদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বার্তায় উদ্বেগ বেড়েছে। প্রথম আলোর এক সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান বলেন, সরকার যেভাবে আইএসের অস্তিত্ব অস্বীকার করছে তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত মাসে চীনের উইঘুর ইসলামিক সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ে লেখার কারণে ফোনের মেসেজে হুমকি পেয়েছিলেন তিনি। দু’সপ্তাহ পর অপরিচিত এক ব্যক্তি মিজানুর রহমান খানের রিকশা আটকে বন্দুক দিয়ে হুমকি  দেয়। পুলিশকে অবহিত করলে তাকে রিকশা চড়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয় এক কর্মকর্তা। এরপর থেকে তার সম্পাদকের পরামর্শে টিভি প্রোগ্রামে যোগ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। কাজে যান বিভিন্ন রাস্তা ব্যবহার করে। তিনি বলেন, সত্যিকারের বিপদ অনুধাবনের ক্ষেত্রে আমরা খুবই কঠিন একটি অবস্থানে রয়েছি। এ হুমকি কি ছিল, সরকারের প্রতিক্রিয়া কি ছিল আর কেন তারা সহযোগিতা করছেন না এ নিয়ে আমরা সরকার বা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন কিছু শুনছি না।

রাজনৈতিক সংকট থেকেই সমস্যার শুরু by সিরাজুস সালেকিন

রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশে একের পর এক সমস্যা হচ্ছে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ । সময়ে সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনেও মূলত একই কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।  মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ প্রফেসর বলেন, কোন ঘটনা ঘটলে একবার সরকারই বলে আইএস জড়িত। আবার সরকারই বলে আইএস নাই। যদি এ ধরনের স্ববিরোধী কথাবার্তা থাকে তাহলে বাইরে থেকে তো লোকেরা চিন্তিত হবেই।
তিনি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে একবার বলা হচ্ছে অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে। আরেকবার বলছে সবকিছু কন্ট্রোলে। কথা হচ্ছে তাদের দিক থেকে মনে করছে তারা নিরাপদবোধ করছেন না। রাস্তায় বের হলে কেউ হয়তো আক্রমণ করতে পারে। যেহেতু একটা রাজনৈতিক সংকট রয়ে গেছে। সেহেতু অনেকেই সুবিধা নিচ্ছে এই রাজনৈতিক সংকটের কারণে। সেই জিনিসটাই তারা ভয় পাচ্ছে। আইএসের ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার কাছে প্রমাণ নেই বাংলাদেশে আইএস আছে কিনা। তবে আমি মনে করি না সেটা আমাদের দেশের বড় সমস্যা। আমাদের বড় সমস্যা এখনও দুই বড় দলের রাজনৈতিক সংকট। এটা যদি মনে করি তবে আমি মনে করি বড় দুই দলের সংকট কেটে যাবে।
বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের চলাফেরায় সতর্কবার্তা অব্যাহত রাখার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা মনে করছে এটা যৌক্তিক। কারণ দুজন বিদেশী যদি মারা যায়, স্বাভাবিকভাবে তারা চিন্তিত। একজন একেবারে হাই সিকিউরিটি জোনে মারা গেছে। তাদের দিক থেকে তারা মনে করে এটা চিন্তার ব্যাপার। সেই হিসাবে তারা সতর্কতা দিচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনীতির সংকট এখনও কাটেনি। তারা মনে করছে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে।
তারা যদি মনে করে বাংলাদেশে একটা সংকট চলছে এবং সেখানে তারা নিরাপদ মনে করছে না। আমাদের তো কিছু করার নেই। সতর্কবার্তা দেয়ার পরপরই দুজন বিদেশী হত্যার প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ বলেন, আগে থেকে তারা হয়তো খোঁজ-খবর নিচ্ছিল। বুঝতে পারছিল সংকট বাড়ছে। আসলেই তো সংকট বাড়ছে। অনেকেই তো মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক মামলা হয়েছে। তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। পশ্চিমা বিশ্বের একের পর এক সতর্কতা জারি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোন প্রকার প্রভাব ফেলছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবনতি তো আছেই। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে তো তারা সে ব্যাপারে খুশি না। তারা মনে করে নির্বাচনটা সঠিক হয়নি। সব দলের অংশগ্রহণে যেহেতু নির্বাচন হয়নি। অর্ধেকের বেশি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কোন ভোট ছাড়া। সেটা বিদেশীরা মনে করেন যে গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। এটা তাদের দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টিকোণ যদি তারা বজায় রাখে সেখানে আমাদের কিছু করার নেই। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতেও কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় সম্পর্কে ড. ইমতিয়াজ বলেন, আপাতত সংকট সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশে সংকট হয়েছে। এখনও একটা নতুন সংকট চলছে। বিশেষ করে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বড় একটি দল পার্লামেন্টের বাইরে। আবার যে একটা বিরোধী দল সেটার আবার অর্ধেক সরকারে। বোঝাই যাচ্ছে সমস্যাটা একদিন না একদিন কাটতেই হবে। যতদিন সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হয় ততদিন সংকট থাকবে। এই সংকট যতদিন থাকবে ততদিন স্বাভাবিকভাবে উন্নয়ন হবে না। স্থিতিশীলতা থাকবে না। যতটুকু থাকা দরকার ততটুকু থাকবে না। এ বিষয়টি আমাদের খেয়াল রাখা দরকার।

বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের জনজীবন এশিয়ার অনেক সমাজ থেকেই ভিন্ন। এই সমাজের বৈশিষ্ট্য মূলত গ্রামীণ সহজ সারল্য। তবে সব সমাজে যেমন, তেমনি বাংলাদেশের সমাজেও চোর-ডাকাত, লম্পট, গুন্ডা-বদমাশ চিরকালই কিছু ছিল। একসময় অধিকাংশ মানুষের উপজীবিকা ছিল কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম। গ্রামপ্রধান সমাজে আরও ছিল তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার, কুটিরশিল্পী, ছোট ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশাজীবী সম্প্রদায়। এখন ভূমিহীন কৃষক পরিবারের অনেক নারী-পুরুষ পেটের দায়ে শহরে শ্রমিকের কাজ করে কোনোমতে দুই বেলা দুই মুঠো অন্নের সংস্থান করতে পারছে। বিশ্বায়নের ধাক্কায় তথাকথিত উন্নয়নের নামে বাঙালি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জীবনে পরিবর্তন এলেও সমাজের মূল চরিত্র বিশেষ বদলায়নি। মানুষের পোশাক-আশাক দেখে বোঝা যাবে না বস্তুত চার ভাগের তিন ভাগ মানুষ দরিদ্র অথবা অসচ্ছল। এমন একটি জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দেবেন যেসব রাজনৈতিক নেতা, তাঁরা তো মোটামুটি তাঁদের মতো মানুষই হবেন। তাঁদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কেউ হবেন গ্রাম বা মফস্বলের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, কেউবা শহুরে মধ্যবিত্ত। অল্পসংখ্যক বিত্তবান বা শিল্পপতি থাকা অস্বাভাবিক নয়।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে জানি অনেক দিন থেকে। আগে তাঁর সম্পর্কে শুনেছি তাঁর এলাকার মানুষের মুখে। পরে তাঁর সান্নিধ্যে গিয়ে। অকপট আচরণ ও জীবনযাপনে সারল্যই তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতো তিনি তাঁর গ্রামীণ সারল্য অক্ষুণ্ন রেখেছেন। তিনি তাঁর গ্রাম ভাটি অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসে নাগরিক কৃত্রিমতা গ্রহণ করেননি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ঘরানার মানুষ আজ বিলুপ্তির পথে। আড়ালে-আবডালে এখনো কেউ কেউ আছেন প্রবীণদের মধ্যে এবং তা আছেন আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং বাম কোনো কোনো সংগঠনে।
গ্রামের তৃণমূল থেকে জনগণের মধ্যে রাজনীতি করে আবদুল হামিদ স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সাড়ে চার দশকে যত নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতে বিজয়ী হয়ে তিনি সাংসদ হয়েছেন। বস্তা বস্তা কালোটাকা ও হোন্ডা-গুন্ডাওয়ালা পেশিশক্তির প্রয়োজন হয়নি। তিনি প্রার্থী হয়েছেন, মানুষ তাঁকে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতির তিনি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত হপ্তায় তিনি গিয়েছিলেন তাঁর এলাকায়। সেখানে এক সমাবেশে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ সারল্য নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন।
প্রটোকল বলে একটা জিনিস আছে, যা রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পালন করা বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মতো ভিভিআইপি যখন কোনো সভায় উপস্থিত থাকেন, সেখানে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব। সে জন্য বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা বলয়ের ব্যবস্থা করা হয় আমাদের দেশের রীতি অনুযায়ী, যাতে যে কেউ মঞ্চের সামনে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করে সমাবেশে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দেওয়ার সময় জনগণকে উদ্দেশ করে ওই বেড়ার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন:
‘আমাকে বন্দী কইরা রাখা হইছে। আর আপনাদের রাখা হইছে বেড়া দিয়া।’ [ প্রথম আলো, ১২ অক্টোবর ২০১৫]
বন্দিত্ব বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন জনগণের সঙ্গে দূরত্ব। সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজভাবে মেশার বিধিনিষেধ। জনগণের নেতারা সুখ-দুঃখে জনগণের মধ্যে থাকবেন, সেটা প্রত্যাশিত। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে অনেকবার তিনি অবাধ মেলামেশার অসুবিধার কথা দুঃখ করে বলেছেন। আমাকেও তিনি অনেকবার বঙ্গভবনে বলেছেন, কী সব উপলক্ষ-টুপলক্ষে আসেন, এমনিতেই আইসেন, গপ্প-সপ্প করতাম।
ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ে উন্নতি করবেন, রাজনীতিবিদেরা দেশ ও জনগণের সেবায় নিবেদিত থাকবেন, সেটাই প্রত্যাশিত।
সারল্যের চেয়ে বড় ভূষণ আর মানুষের হয় না। সোজাসাপ্টা কথার মূল্য সাজিয়ে-গুছিয়ে পোশাকি বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি তাঁর জনগণের মধ্যে ওই অনুষ্ঠানে আরও কিছু কথা বলেছেন, যার তাৎপর্য অসামান্য। ওই সভায় তাঁর পুত্রও, যিনি তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে নির্বাচিত হয়েছেন, উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি কৃষকের সন্তান হয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছি। আজ রাষ্ট্রপতির সন্তান হইছে আপনাদের এমপি। আমি সারা জীবন সততার সঙ্গে রাজনীতি করছি। মামলা-হুলিয়া-পরোয়ান নিয়ে রাজনীতি করেছি। আদর্শের সঙ্গে কোনো সময় বিশ্বাসঘাতকতা করিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটা সময় আমি তিন উপজেলার বেশির ভাগ ঘরে গেছি। এখন আর তা সম্ভব না। সারা জীবন তো আমি রাষ্ট্রপতি থাকব না। সে সময় আবার আপনারা আমার কাছে যেতে পারবেন। তখন কোনো বাধা থাকবে না।’ [ দৈনিক সমকাল, ১২ অক্টোবর ২০১৫]
প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ কাউকে সমালোচনা করে নয়, অনেকটা স্বগতোক্তির মতো বলেছেন, রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। যেভাবেই হোক, এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। মানুষের কল্যাণে জনপ্রতিনিধিদের কাজ করতে হবে।
‘আমি কৃষকের সন্তান’—এ যে কত বড় স্বীকারোক্তি এবং মহৎ উচ্চারণ, তা নতুন শহুরে ভদ্রলোকদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পরে গ্রাম থেকে যাঁরা একটি পায়জামা-শার্ট ও স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে ঢাকায় এসেছিলেন এবং আল্লাহর রহমতে আজ যাঁদের গচ্ছিত বিদেশের ব্যাংকে অঢেল টাকা এবং চালান পাজেরো, বিএমডব্লিউ, কোমরে ও ব্রিফকেসে কয়েকটি পিস্তল, তাঁদের মুখ দিয়ে এমন অলক্ষুনে কথা কস্মিনকালেও বেরোতে পারে না: আমি কৃষকের সন্তান।
জাতীয় জীবনে প্রতিটি পেশাজীবীর আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ী ও শিল্প-কলকারখানার মালিকদের ভূমিকা কেউ অস্বীকার করে না। তাঁদের জগৎ আলাদা। তাঁরা সেই জগতে তাঁদের মেধা, দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। শিল্প-কারখানার মালিকেরা হাজার হাজার মানুষকে কর্মের সংস্থান করেন। অন্যান্য পেশার মানুষও তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।
একজন রাজনীতিবিদ ওই অর্থে কোনো পেশাজীবী নন। জীবিকার জন্য রাজনীতি করেন না। অর্থ উপার্জনের জন্যও নয়। জনগণের সার্বিক কল্যাণ তাঁর লক্ষ্য। সে জন্য তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়। জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়। জনাব আবদুল হামিদের মতো হুলিয়া-পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চলতে হয়। এ কালের অনেক জনপ্রতিনিধিও জেলে যান। গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য পালিয়ে বেড়ান। তবে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগ্রামের কারণে নয়। ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে। আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে জনগণকে খুন-জখম করার অভিযোগে। এই প্রজাতির রাজনীতিক-জনপ্রতিনিধির সঙ্গে খুনি-ডাকাত-রাহাজান-দস্যুদের পার্থক্য কোথায়?
সত্যিকারের রাজনীতিক যাঁরা, তাঁরা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও তাদের আবেগ-অনুভূতি অনুধাবন করেন। যেমন পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বাধিকার অর্জন এবং স্বশাসিত একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যাঁরা সংগ্রাম করেছেন, মানুষ তাঁদের ভোট দিয়ে ১৯৭০-এ নির্বাচিত করেন।
ছয় দফা আন্দোলনে যে নেতা নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তাঁকে যাঁরা সমর্থন দিয়েছেন, তাঁদের প্রধান অস্ত্র ও শক্তি ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনা। আমি কাছে থেকে দেখে যতটা জানি, বাংলাদেশের স্বাধিকার সংগ্রামে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তার কোনো নেতারই হাঁকানোর জন্য সবচেয়ে দামি জিপ এবং দু-তিনটি পিস্তল কোমরে থাকত না। সুতরাং কোনো পথচারী বা নিষ্পাপ কিশোরকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার প্রশ্নই আসেনি। বরং কোনো দুর্বৃত্ত গুলি ছুড়লে জনপ্রতিনিধি সেখানে ছুটে যেতেন। তখন রাজনীতি ছিল নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের লড়াই।
ব্যবসায়ীদের কেউ রাজনীতিতে আসতেই পারেন, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তানি আমলেও সামন্ত পরিবার থেকে এসেছেন। বাংলাদেশে অরাজনৈতিক ব্যক্তি, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ শুরু হয় সামরিক শাসনের সময় থেকে। অন্য জায়গা থেকে কেউ রাজনীতিতে আসতে পারবেন না তা নয়, কিন্তু রাজনীতি জিনিসটাই ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেলে সেটা অন্য ব্যাপার। জনগণ তাতে ক্ষমতাহীন-অভিভাবকহীন হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি সেই ইঙ্গিতই করেছেন।
সফল ব্যবসায়ীদের যোগ্যতার ঘাটতি নেই। তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারও অবকাশ নেই। একজন রাজনীতিক ভালো প্রশাসক নাও হতে পারেন। রাজনীতিবিদ মানুষ, তাই তাঁর ভুল হওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি তিনি জনগণের স্বার্থের বিষয়গুলো ভালো বোঝেন, তাহলে তাঁর অন্য সব গুণ কম থাকলেও ক্ষতি নেই। একজন ভালো রাজনীতিক তিনিই, যাঁর রয়েছে দূরদৃষ্টি। কী নীতি গ্রহণ করলে অত বছর পর অবস্থা এই রকম হতে পারে, সে জ্ঞান থাকা চাই। কোন কাজে কত ভাগ মানুষ উপকৃত হবে আর কোন কর্মসূচিতে কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা অঙ্ক না কষেই একজন রাজনীতিক বলতে পারেন।
আগের রাজনীতিবিদদের জনসেবার বিনিময়ে চাওয়া-পাওয়ার কিছু ছিল না। এখন চাওয়ার এবং পাওয়ার শেষ নেই। জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে যাঁরা গৃহহীন, জনসেবা করতে করতে যাঁরা নিজেদের জন্য মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই করতে পারেননি, সে রকম কারও জন্য তাঁর এলাকার পৌরসভায় একখণ্ড খাস জমি সরকার থেকে বরাদ্দ দিলে কারও কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু গয়রহ সবাইকে, এমপি হলেই, রাজউকের প্লট দিতে হবে—এ কোন নিয়ম? সব মানুষকেই শুল্কযোগ্য পণ্যে শুল্ক দিতে হয়। এমপিরা কেন গাড়ি আনবেন বিনা শুল্কে? এবং আনবেন সবচেয়ে দামি গাড়ি অন্যের কাছে বিক্রি করে দিতে?
জনপ্রতিনিধিদের অনাচার ও দুর্নীতি যদি সীমা ছাড়িয়ে যায়, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেরা বিত্তের পাহাড় গড়েন, জনগণ আর যদি কিছুই করতে না পারে, তাদের অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঘৃণাটা করতে পারে। প্রতিদিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের কারও বুকে হতাশা, কারও বুকের ভেতরে জ্বলে আগুন। তাদের কথা না ভেবে জনপ্রতিনিধিরা যদি কোমরে পিস্তল নিয়ে ঘোরেন এবং সবার ওপরে ছড়ি ঘোরাতে চান, তাহলেই বিপর্যয়ের আশঙ্কা এবং রাজনীতিকদের বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ে উন্নতি করবেন, রাজনীতিবিদেরা দেশ ও জনগণের সেবায় নিবেদিত থাকবেন, সেটাই প্রত্যাশিত। বহু আগেই বাংলার কবি বলে গেছেন: বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। যে যার জায়গা থেকে ভূমিকা রাখলে সেটাই সবচেয়ে সুন্দর ব্যবস্থা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

খুলছে জলকপাট, হচ্ছে কোথাও ভরাট by মলয় ভৌমিক

একদিকে নদী ভরাট, অন্যদিকে খুলছে জলকপাট। নদী রক্ষা কমিশনের এমন বিপরীত কর্মের খবর জানা গেল একই দিনের প্রথম আলো পাঠ করে। ১০ অক্টোবর প্রথম আলোর ‘সোনাই নদে ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় থেকে জানা যাচ্ছে, হবিগঞ্জের মাধবপুরে সোনাই নদের ওপর স্থাপিত ভবন নির্মাণের কাজ আবার শুরু হয়েছে নদী রক্ষা কমিশনের অনুমতি নিয়েই। ওই দিনই বিশাল বাংলা পাতায় প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হলো ‘চারঘাটে খুলবে জলকপাট, পানিতে ভরে যাবে বড়াল’। রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদের উৎসমুখ পরিদর্শন শেষে নৌপরিবহনমন্ত্রী ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এ সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান আগের দিন।
নদী রক্ষা কমিশন ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের উল্টোপাল্টা কর্মকাণ্ড যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কৃষিজীবী ও পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশে ভরাট হয়ে যাওয়া নদ-নদী খননের দাবি করে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীও এ দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে নদী খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়ার কথা নানা সময়ে উল্লেখ করেছেন। এ লেখাটি লিখতে লিখতেই জানতে পারলাম, মেহেরপুরে ভৈরব নদও খনন করা শুরু হয়েছে।
নদ-নদীর স্লুইসগেট বা জলকপাট খোলা এবং খননের খবরে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশা জাগছে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করছে শঙ্কা। এই শঙ্কা দুটি দিক থেকে: প্রথমত, নদীর যে বিরাট অংশ ইতিমধ্যে জবরদখলকারীদের হাতে গেছে, সেই অংশগুলো এই খনন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ধার হবে কি না, তা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ আছে। মাধবপুরে সোনাই নদের ওপর ভবন নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু হওয়ার খবরে এই সন্দেহ বেড়ে গেছে অনেকটাই।
বেশির ভাগ নদীই দখল হতে হতে এখন আর আগের মতো চওড়া নেই। নতুন করে খননের সময় যদি বর্তমানের ক্ষীণপ্রবাহটুকুই রেখে দেওয়া হয়, তাহলে জবরদখলকারীরা এর মধ্য দিয়ে একটা বৈধতা পেয়ে যেতে পারে। কাজেই অনেক প্রত্যাশার এই প্রকল্পগুলো যেন শেষ পর্যন্ত দখলবাজদের বৈধতা দেওয়ার প্রকল্পে রূপ না নেয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলছেন নদীতীরের মানুষেরা।
দ্বিতীয়ত, নদীতীরের মানুষের সব থেকে বড় শঙ্কা হলো, নদী খনন করার পর তাতে পানি থাকবে কি না। পানির প্রাপ্যতা নিয়ে এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। যেমন রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদের জলকপাট খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং এর উৎসমুখে ভরাট হওয়া ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ কাজ সম্পন্ন হলেও পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? বড়াল হলো পদ্মার (গঙ্গা) শাখা নদ। উজানে ভারতের ফারাক্কায় নির্মিত ব্যারাজের মাধ্যমে পদ্মার পানির স্বাভাবিক প্রবাহের বিরাট অংশই নিয়ে ফেলা হচ্ছে ভাগিরথিতে। ফলে পানি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি থাকছে না পদ্মায়।
৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বড়াল নদের প্রায় পুরোটাই গেছে দেশের সব থেকে বড় জলাশয় চলনবিলের মধ্য দিয়ে। এ বিলের মধ্যে ছোট-বড় ১০টির মতো নদ–নদী প্রবাহিত হলেও চলনবিলের মূল পানির উৎস হলো আত্রাই ও বড়াল। নৌপরিবহনমন্ত্রী ও নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বড়াল নদের উৎসমুখ পরিদর্শন করেন ৯ অক্টোবর। ১০ অক্টোবর একটি কাজে আমি মধ্য চলনবিলের উপজেলা সিংড়ায় যাই। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিশাল এলাকায় বিস্তৃত চলনবিল। এর মধ্যে বিলের একেবারে ভেতরে যে কটি উপজেলা রয়েছে, নাটোরের সিংড়া তার একটি। সিংড়া উপজেলা সদর আত্রাই নদের তীরে। আবার ‘বিলের নাম চলন, গ্রামের নাম কলম’ খ্যাত কলম গ্রামটিও সিংড়া সদরের সঙ্গেই। সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ওহিদুর রহমান শেখ, চলনবিল মহিলা কলেজের অধ্যাপক মো. আমির হামজা, মোহম্মদ রোকনুজ্জামান ও মো. গোলাম মোস্তফার সঙ্গে বড়াল নদের জলকপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিষয়ে কথা হয়। এর সুফল সম্পর্কে আমি তাঁদের মতামত জানতে চাই। সবাই বড়াল নদে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানান। অবশ্য তাঁরা এ ব্যাপারে একমত হন যে বড়াল খনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে ইদানীং যে ‘পকেট বন্যা’ (বিভিন্ন পকেটে পানি আটকে থাকা) হচ্ছে, তার হাত থেকে কিছুটা রেহাই মিলতে পারে। কেননা, নদে প্রতিবন্ধকতা না থাকলে দ্রুত পানি ভাটিতে নেমে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বড়াল নদ নিয়ে ইতিপূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকাণ্ডে চলনবিলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ‘বড়াল-ক্লোজার’ বা বড়ালের উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয় ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে। আশ্চর্য হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মার পানি প্রত্যাহার শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে। পানি প্রত্যাহার শুরুর দশ-এগারো বছর পর পদ্মা যখন মৃতপ্রায়, তখন ঠিক কী কারণে রাজশাহীর চারঘাটে উৎসমুখে বড়াল-ক্লোজার নির্মাণ করা হলো, তা কারও কাছেই বোধগম্য ছিল না। পদ্মার পানিতেই বড়াল সচল থাকত। সেই পদ্মায় যখন পানি নেই, তখন বড়ালের মুখ বেঁধে ফেলার অর্থ হলো বড়াল প্রবাহের শরীরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া। অনেকেই বিশ্বাস করেন, নদী দখলদারদের সুযোগ করে দেওয়া অথবা প্রকল্পের মাধ্যমে কাউকে কাউকে ‘করে খাওয়া’র সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই আত্মঘাতী এই কর্মকাণ্ডটি হাতে নেওয়া হয়েছিল।
বড়াল-ক্লোজার নির্মাণের কারণে গত তিন দশকে কেবল বড়াল নদই কঙ্কালসার হয়নি, ফসল ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে, উধাও হয়েছে মাছের অভয়াশ্রম। এমনিতেই সময়ের বিবর্তনে চলনবিল ঐতিহ্য হারাচ্ছিল, এর মধ্যে বড়াল-ক্লোজারের ধাক্কায় সেখানকার মানুষ আজ এক ভিন্ন জীবন-জীবিকায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছে।
চলনবিলের এক প্রান্তে বাড়ি হলেও ওই বিলের মধ্যাঞ্চলে আমি প্রথম যাই ১৯৭০ সালে। আমি সে সময় নবম শ্রেণির ছাত্র। শীতকালে চাটমোহর উপজেলার অষ্টমনিষা গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। ট্রেনে চড়ে নামতে হলো বড়াল ব্রিজ স্টেশনে। বোঝাই যাচ্ছে স্টেশনটির নামকরণ হয়েছে বড়াল নদের নামানুসারে। বড়াল অষ্টমনিষা গ্রামের বুক চিরে বেরিয়ে গেছে। শীতকালেও ওই নদের ভয়াল রূপ উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার স্মৃতিতে। অবশ্য পলি জমায় এ সময়ের আগে থেকেই চলনবিল অনেক স্থানে জেগে উঠতে শুরু করেছিল। উত্তরাঞ্চলে খরিপ মৌসুমে ইরি-বোরোর আবাদ শুরু হয় এই সময় থেকেই। বড়ালের দুই পারে ইরি-বোরোর আবাদও আমার চোখে পড়েছে।
১৯৮৫-৮৬ সালে দেশব্যাপী মুক্ত নাটক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজের অংশ হিসেবে আমাদের চলনবিল এলাকায় অনেকবার যেতে হয়। নাট্যকার মামুনুর রশীদ, মান্নান হীরা, অভিনেতা আজিজুল হাকিম, মাসুম রেজা, তপন দাশ, স্বদেশবন্ধু সরকারসহ অনেকেই আমরা চলনবিল এলাকায় কার্যকর মুক্ত নাটক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হই। এ সময় আমাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই শামিল হতেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। চলনবিলের করতকান্দি গ্রাম নিয়ে দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত তাঁর সিরিজ প্রতিবেদনের কথা অনেকেরই মনে থাকতে পারে। আমরা চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার গ্রামগুলোতে যখন কাজ করছিলাম, তখন বড়ালের উৎসমুখে দেওয়া জলকপাটের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ওই সময়ে প্রথম যে সমস্যাটি আমাদের চোখে পড়ে, তা হলো যাতায়াত ও পরিবহনব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা। আগে চলনবিলে সারা বছর পানি থাকায় নৌকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যেত, কিন্তু বড়াল-ক্লোজার নির্মাণের পর সেই সুবিধাও বন্ধ হয়ে গেল। না নৌকা, না পায়ে হাঁটার সুবিধা। সব মিলিয়ে এলাকার মানুষের এক দুর্বিষহ অবস্থা আমাদের চোখে পড়ে।
ত্রিশ-বত্রিশ বছর পর আজ চলনবিলের পেট চিরে অনেক পাকা রাস্তা হয়েছে। জীবন-জীবিকায় এসেছে পরিবর্তন। নতুনভাবে অভ্যস্ত হওয়া জীবনে তাই বড়ালের জলকপাট খোলার ঘোষণা ওই এলাকার মানুষের মধ্যে বড় কোনো বার্তা নয়। বরং মানুষের মাঝে বাড়ছে সন্দেহ। এ সন্দেহ নদী রক্ষা কমিশনকেই দূর করতে হবে।
একদা চলনবিলই ছিল দেশে সব থেকে বড় মাছের অভয়াশ্রম। চলনবিলের বিরাট একটা অংশে সারা বছর পানি থাকায় এবং সেই পানিতে জলজ উদ্ভিদ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করায় জাল ফেলা সম্ভব হতো না। মা-মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারত। এখন প্রাকৃতিক সেই অভয়াশ্রম নেই। সিংড়া থেকে ফেরার সময় অনেক হতাশার মধ্যেও আশার বাণী শোনান চলনবিল মহিলা কলেজের অধ্যাপক তেলিগ্রামের আমির হামজা। তিনি জানান, সিংড়ায় ‘সিংড়াদহ’ ছাড়াও কড়েরগ্রাম এবং গুড় নদ এলাকার স্থানীয় মানুষের প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি মাছের অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে নতুন করে। ছোট ছোট এই অভয়াশ্রমে সারা বছরই মাছ ধরা নিষেধ। বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে বাড়িয়ে দিয়েছে সহায়তার হাত।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। নাট্যকার।

‘ভারত সরকার হিন্দু স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটছে’

ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে এবার সামিল হয়েছেন দেশটির নামকরা বিজ্ঞানী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারা। এদের অনেকেই তাদের জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ভারতের একজন নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানী পি এম ভার্গব বৃহস্পতিবার তার পদ্মভূষণ পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার কথা ঘোষণা করেন।
পদ্মভূষণ ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার।
মিস্টার ভার্গব এবং তার ১০৭ জন সহকর্মী এ বিষয়ে একটি বিবৃতিও দিয়েছেন।
বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পি এম ভার্গব বলেন, তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পদ্মভূষণ ফিরিয়ে দিচ্ছেন, কারণ তার আশঙ্কা ভারত সরকার গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে হিন্দু স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটছে। তিনি আরো বলেন, ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার পরিচালিত হচ্ছে ডানপন্থী হিন্দু সংগঠন আরএসএস দ্বারা। তিনি আরো অভিযোগ করেছেন, সরকার জনগণকে এখন বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
এদিকে দশ জন চলচ্চিত্র নির্মাতা তাদের জাতীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে আছেন দিবাকর ব্যানার্জি এবং অনন্ত পট্টবর্ধন।
মুম্বাইতে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। ভারতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় অঙ্গীকার ঘোষণার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে বহু নামকরা ভারতীয় লেখকও তাদের জাতীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদ জানান। সূত্র : বিবিসি বাংলা

চাকরি দেয়ার নামে ধর্ষণ টাকা আত্মসাৎ by বকুল আহমেদ

আমি বিএ পাস করেছি। বাবা অনেক কষ্ট করে পড়ার টাকা জুগিয়েছেন। তার একার পক্ষে সংসার চালানো খুব কষ্টসাধ্য। এমএ পড়া হবে না- এ শংকা আর অভাবের সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করতে চাকরির সিদ্ধান্ত নিই। সে উদ্দেশে ঢাকায় এসে আমার সর্বনাশ হতে বসেছিল। তবে কৌশলে নিজেকে রক্ষা করি। কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার এক তরুণী। তিনি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে রমনা থানায় ১৩ অক্টোবর মামলা করেছেন।
তবে তার মতো অনেকেই প্রতারক চক্রের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। যেমন একই চক্রের হাতে ধর্ষিত হয়ে একই দিনে থানায় মামলা করেছেন ৮ম শ্রেণীর এক ছাত্রী। মামলা প্রত্যাহার করে নিতে দুজনকেই হুমকিও দিচ্ছে প্রতারক চক্র।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এমনি আরও অর্ধশতাধিক তরুণী চাকরির ফাঁদে পড়ে শিকার হয়েছেন যৌন নিপীড়নের। খুইয়েছেন টাকা। অনেককে ধর্ষণের পর দেহ ব্যবসায় নামানোর চেষ্টা চলছে। আর চাকরি দেয়ার নামে ১৫-২০ হাজার করে টাকা নেয়ার পর অযোগ্য আখ্যা দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বহু যুবককে।
রাজধানীর মগবাজারে এমন এক প্রতারক প্রতিষ্ঠান নিরাপদ ফোর্সগার্ড সিকিউরিটি সার্ভিস কোম্পানি লিমিটেড। তাদের প্রতারণার শিকার কয়েকজন তরুণী ও যুবকের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতারক চক্রের প্রধান জহিরুল ইসলাম মঞ্জুসহ চারজনকে গ্রেফতারের পর তদন্তেও এমন তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি।
নিরাপদ ফোর্সগার্ডের অফিস মগবাজার রেলক্রসিং সংলগ্ন ১৫ নম্বর ভবনের ৪র্থ তলায়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম মঞ্জু। এক সময় ছিলেন চা দোকানদার। কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে গড়ে তোলেন শক্তিশালী প্রতারক বাহিনী। তার প্রধান সহযোগী সুমন। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চটকদার বিজ্ঞাপন দিতেন। চাকরি দেয়ার নামে তরুণীদের ধর্ষণ করত মঞ্জু ও সুমন। চাকরির জন্য মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার নামে পাঠানো হতো বিভিন্ন স্থানে। সেখানেও তরুণীদের যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
২৫ অক্টোবর ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে কথা হয় নেত্রকোনার ওই তরুণীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৫ জুলাই বাড়িতে বসে ডিশ চ্যানেলে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেন। তাতে বলা হয়, থাকা-খাওয়া ফ্রি। পড়াশোনার সুব্যবস্থা আছে। দুই ঈদে বোনাস। আকর্ষণীয় বেতন। রিসিপসনিস্টসহ বিভিন্ন পদে চাকরির সুযোগ। যোগাযোগের ঠিকানার সঙ্গে দেয়া হয় মোবাইল নম্বরও (০১৭৫৩১৩২৯০৯)। তরুণী বলেন, ওই নম্বরে যোগাযোগ করি। আমাকে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দেয় এবং ২ সেট ইউনিফর্ম তৈরির জন্য ৩ হাজার টাকা বিকাশ করতে বলে। অফিস থেকে দেয়া ০১৯৬৭৭৯১২৮০ নম্বরে বিকাশ করি। ২ অক্টোবর মগবাজারের অফিসে চাকরিতে যোগ দিতে বলে। ওইদিন বিকালে সেখানে আসি। ৪র্থ তলায় এক ম্যাডামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। ম্যাডাম এমডি জহিরুল ইসলাম মঞ্জুর রুমে নিয়ে যায় আমাকে। সেখানে ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় এবং সার্ভিস চার্জ বাবদ সাড়ে ৫ হাজার টাকা নিয়ে পরদিন অফিসে আসতে বলে। পরদিন এলে এক নারীর নির্দেশে মঞ্জুর রুমে ঢোকেন তিনি। তরুণী বলেন, রুমে ঢুকে সুমন নামে একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মঞ্জু বলে, ইনি তোমার স্যার। স্যারকে খুশি কর। তাহলে চাকরি করতে সমস্যা হবে না। এরপরই সুমন আমার হাত ধরে। বলে, ঢাকায় চাকরি করতে হলে বসদের খুশি করতে হবে। আমি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলে পেছন থেকে মঞ্জু আমাকে জাপটে ধরে। আমি কৌশলে পালিয়ে আসি।
ধর্ষণের শিকার ছাত্রী জানান, বিজ্ঞাপন দেখে ২৫ জুলাই সে চাকরির জন্য যায়। মঞ্জু তাকে রুমে নিয়ে ধর্ষণ করে। বাইরে বেরিয়ে মানসম্মানের ভয়ে মুখ খোলেনি সে। চাকরি হয়ে গেছে প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ২৬ আগস্ট অফিসে নিয়ে আবারও ধর্ষণ করে মঞ্জু। পরে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী যুগান্তরকে জানান, বিজ্ঞাপন দেখে চাকরি নেয়ার উদ্দেশে ২৫ মে মঞ্জুর অফিসে যাই। ভালো কোম্পানিতে রিসিপসনিস্ট পদে তাকে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জামানত হিসেবে অগ্রিম ২০ হাজার টাকা নেয় মঞ্জু ও সুমন। সপ্তাহ পার হলেও তাকে চাকরি দেয়া হয় না। দেব দিচ্ছি করে ঘোরাতে থাকে। একদিন দুপুরে মঞ্জু অফিসে ডাকে। আমি তার কক্ষে গেলে মঞ্জু আমাকে কুপ্রস্তাব দেয়। সঙ্গে সঙ্গে সুমন আমার হাত ধরে। আমাকে বলে, চাকরি করতে হলে এসব কাজে রাজি হতে হয়। আমি চিৎকার করে অফিস থেকে বেরিয়ে আসি। ২০ হাজার টাকা এখনও ফেরত দেয়নি। আমার এক বান্ধবীও ২০ হাজার টাকা দিয়েছে। তাকেও শ্লীলতাহানি করেছে মঞ্জু ও সুমন। টাকাও ফেরত দেয়নি।
কিশোরগঞ্জ বাজিতপুরের বাগলপুর গ্রামের শামীম জানান, নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে চাকরি দেয়ার নামে জুন মাসে ৫ হাজার টাকা নিয়েছে। অথচ আমাকে চাকরি দেয়নি। কয়েকবার টাকা ফেরত নেয়ার জন্য গেলে আমাকে দরখাস্ত করতে বলে। দরখাস্ত করেও তারা টাকা দেয়নি। মাত্র ৫ হাজার টাকা তাই মামলা করিনি। শামীম জানান, তিনি যেদিন টাকা দিয়েছিলেন, সেদিন আরও ১৫ জনের কাছ থেকে মঞ্জুকে টাকা নিতে দেখেন তিনি। রাজবাড়ীর মাহাবুবুল হক, মাগুরার ঝুমপুরের জুয়েল ও চাঁদপুরের শাহীন মৃধাও একই অভিযোগ করেন।
মঞ্জুর প্রতিষ্ঠানে চার মাস কর্মরত ছিলেন এমন দুজন জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন আসত চাকরির জন্য। এর মধ্যে নারী ৪-৫ জন। তাদের কাছ থেকে চাকরি অনুযায়ী জামানত ও ইউনিফর্ম তৈরি বাবদ অগ্রিম ৩ হাজার থেকে শুরু করে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হত। প্রতিদিন অন্তত ২০ জন এ ফাঁদে পা দিয়ে টাকা দিত। প্রায় ২ বছর ধরে তারা এভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে মগবজারের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ওই ভবনের অপর এক অফিসের এক কর্মচারী বলেন, মঞ্জু গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে অফিস বন্ধ আছে।
১৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের কথিত এমডি জহিরুল ইসলাম মঞ্জু, তার সহযোগী শারকিম আনোয়ার রেজা ও শফিককে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের স্বীকারোক্তিতে পরে খলিল নামে আরেক সদস্যকেও গ্রেফতার করা হয়।
ডিবির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকী যুগান্তরকে বলেন, মঞ্জু প্রতারক চক্রের প্রধান। চাকরি দেয়ার নামে তরুণীদের শ্লীলতাহানি, যৌন নিপীড়ন করত। কয়েক হাজার বেকার তরুণ-তরুণীর কাছ থেকে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রের চার সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।