Tuesday, April 30, 2019

মোমেন-ল্যাভরভ বৈঠক: রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে রাশিয়া মানবিক সহায়তাসহ দেশটির সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে। মস্কো সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এ আশ্বাস দেন। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার মোমেন-ল্যাভরভ বৈঠক হয়। বৈঠকে মন্ত্রী মোমেন তার কাউন্টার পার্টকে বাংলাদেশে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থা ব্রিফ করেন। তিনি মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের রাখাইনে নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী ৫ সদস্যের অন্যতম রাশিয়ার সক্রিয় সমর্থন কামনা করেন। মন্ত্রী বিশেষভাবে রাশিয়ার কাছে একটি বিষয় চান তা হল- রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারকে যেন মস্কো উৎসাহিত করে। মিস্টার ল্যাভরভের সঙ্গে আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আসিয়ান জোটের অন্যান্য দেশগুলোকে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অবহিত করেন।
জবাবে ল্যাভরভ সংম্পৃক্তকরণে ঢাকার ওই আইডিয়াকে স্বাগত জানান। অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দুই মন্ত্রীর আলোচনা হয় জানিয়ে সেগুনবাগিচার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে মোমেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম মস্কো সফর। তবে দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণে সফরের বিবেচনায় এটি তার তৃতীয় বিদেশ সফর। মন্ত্রী মোমেন এর আগে জানুয়ারিতে তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে এবং দ্বিতীয় দ্বিপক্ষীয় সফরে চলতি মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে ওয়াশিংটন যান।
বিজ্ঞপ্তি মতে, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে মোমেনের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। যার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট রিজিওনাল এবং বহুপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুও ছিল। বৈঠকে মন্ত্রী একাত্তরের দুর্দিনে বাংলাদেশের প্রতি রাশিয়ার যে অকুন্ঠ সমর্থন ছিল সেটি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পূণর্গঠন এবং পূনর্বাসন প্রক্রিয়ায় দেশটির যে উদ্যোগ ছিল তা স্মরণ করে দুই দেশের সম্পর্কের বিদ্যমান অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। ড. মোমেন রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য  সম্পর্ক প্রত্যাশিত লেভেলে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশটির বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নব প্রতিষ্ঠিত হাইটেক পার্কসহ বিশেষ ১০০টি অর্থনৈতিক জোনে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। জবাবে ল্যাভরভ বলেন, সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠেয় অর্থনৈতিক সম্মেলনই হতে পারে রাশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের প্রতি আকৃষ্ট করার উপযুক্ত মাধ্যম (প্লাটফর্ম)।
ড. মোমেন ইউরোশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সদস্য হিসাবে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের কোটা ও শুল্ক মুক্ত সুবিধা চালুর অনুরোধ জানান। মন্ত্রী এ-ও বলেন, ওই ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশ শিগগির একটি সমঝোতা সই করতে যাচ্ছে। দুই মন্ত্রী রাশিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশে হতে যাওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সিগনেচার ইনশিয়েটিভ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুরের শান্তিপূর্ণ অগ্রগতিতে উভয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দুই মন্ত্রী বাংলাদেশে গ্যাজপ্রমের কার্যক্রমেও সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা দুই সরকারের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহায়তা সম্পর্কিত বৈঠকগুলো নিয়মিত হওয়ার প্রশংসা করেন। তারা দুই দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিনিময়েরও তাগিদ দেন। তারা দুই দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যে সহায়তামূলক সম্পর্ক তাতেও তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। মন্ত্রীদ্বয় আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সম অবস্থানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠকের পর দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ে মন্ত্রী মোমেনের বৈঠক হয় বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় কার্যত বোরকা নিষিদ্ধ

মুখ ঢেকে রাখা পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে শ্রীলঙ্কা। এতে কার্যত নেকাবের ওপরই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো। ইস্টার সানডে’তে সন্ত্রাসী হামলায় আড়াই শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে ‘ইমার্জেন্সি রেগুলেশনস’-এর অধীনে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার অফিস থেকে বলা হয়েছে, মুখ ঢাকা পোশাকের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে সোমবার থেকে। এটা করা হয়েছে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
ওদিকে হামলার পর প্রথম রোববার অতিক্রম হয়েছে দেশটিতে। কিন্তু এদিন সেখানে কোনো চার্চেই বড় কোনো প্রার্থনাসভা হয় নি নিরাপত্তার কারণে। লোকজন চার্চের বাইরে অথবা যার যার ঘরে প্রার্থনা সভার কাজ সেরেছে।
কালমুনাই, সম্মানথুরাই ও চালাভালাকাড়ে ছাড়া সব স্থান থেকে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এতে আরো বলা হয়, যে দুই ভাই আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল তাদের অন্য এক ভাইকে আটক করেছে শ্রীলঙ্কার স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। তার নাম মোহাম্মদ ইব্রাহিম ইফরান। রাজধানী কলম্বোর দেমাতাগোড়ায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করেছে এসটিএফ। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুনশেকারা। তিনি বলেছেন, দেমাতাগোড়ায় মহাবিলা স্কিমের একটি বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়েছে তাকে। ওদিকে সারা দেশে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এ অভিযানে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের। জব্দ করা হচ্ছে ‘সন্ত্রাসী’ কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি। এ অভিযানে মোহাম্মদ ইব্রাহিম ইফরানের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে জার্মানিতে তৈরি একটি এয়ারগান ও দুটি ছোরা। 
ইস্টার সানডে’র হামলার পর পরই পুলিশ ইব্রাহিম ইফরানের পিতা, বিলিয়ানিয়ার মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়েছে। তার দুই ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহিম ইনসাফ আহমেদ ও মোহাম্মদ ইব্রাহিম ইলহাম আহমেদ আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের অন্যতম, এটা জানার পরই শত কোটি টাকার মালিক ও মসলা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়া তার আরো দুই ছেলেকে আটক করা হয়েছে। অন্যজন পলাতক রয়েছে। মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মোট ৯ টি সন্তান রয়েছে।
রুয়ান গুনশেকারা বলেছেন, শুক্রবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের পর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আমপাড়ার শাহিনদামারুদু থেকে একজন নারী ও একটি শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। বোমা হামলার মূল হোতা জাহরান হাশিমের স্ত্রী ওই নারী। আর শিশুটি তাদের সন্তান। তারা হলো আবদুল কাদের ফাতিমা সাদিয়া ও তার চার বছরের শিশু মোহাম্মদ জাহরান রুহাইনা। বন্দুকযুদ্ধের সময় তারা আহত হয়েছে। বর্তমানে আমপাড়া বেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তারা। ওই নারী জাহরান হাশিমের স্ত্রী ও শিশুটি তাদের সন্তান বলে শনাক্ত করেছেন জাহরানের বোন ও বোনের স্বামী।

দর্শকশূন্যতার বড় কারণ হলের বাজে পরিবেশ by কামরুজ্জামান মিলু

বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম সিনেমা। আর এই সিনেমা দেখার জন্য চাই প্রেক্ষাগৃহ বা হল। দেশে কেমন ছিল সিনেমা হলের সূচনাকাল? আর তারপর ক্রমে সিনেমা হলের সংখ্যা বেড়ে চলা, এসবের উন্নয়ন, আধুনিকায়নের পথ পেরিয়ে দেশজুড়ে সিনেমা হলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাজানো হয়েছে ধারাবাহিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের সিনেমা হল। লিখেছেন কামরুজ্জামান মিলু। আজ প্রকাশ হচ্ছে এর চতুর্থ পর্ব ‘দর্শকশূন্যতার বড় কারণ হলের বাজে পরিবেশ’
শুরুতেই কয়েক দশক আগের কথা বলতে হয়। মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম তখনও ছিল চলচ্চিত্র বা সিনেমা। তরুণ ছেলেদের একসঙ্গে হয়ে সিনেমা হলের সামনে আড্ডা দেয়া, সেখানকার দেয়ালে লাগানো নতুন ছবির পোস্টার দেখে নানারকম আলোচনা-সমালোচনায় মুখর হওয়া কিংবা সিনেমা দেখায় মেতে ওঠায় কতই না আনন্দ ছিল তখন। শুধু তরুণই নয়, সব বয়সের দর্শকই সিনেমা হলে গিয়ে এ কাজগুলো করতো নির্ভয়ে।
সে সময়টাতে সিনেমা হলে বিভিন্ন শোয়ের পাশাপাশি নাইট শো-ও হতো। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সানন্দচিত্তে সেসব শো দেখতে যেত।
সারা দেশের সিনেমা হলের পরিবেশ ভালো ছিল বলেই দারুণ আনন্দে এসব করা যেত। কিন্তু একটা সময়ে এসে হঠাৎই বদলে যায় দৃশ্যপট। সারা দেশেই ক্রমশ সিনেমা হলের পরিবেশ খারাপ হতে থাকে। একশ্রেণির দর্শককে দেখা যায় ভাসমান পতিতাদের নিয়ে সিনেমা হলে ঢুকতে। অনেক সিনেমা হলেরই টয়লেট ব্যবস্থা নোংরা হয়ে পড়ে। সে সঙ্গে সিনেমা হলের পর্দা, শব্দের মানও ক্রমশ নিম্নমুখী হতে থাকে।
এসব কারণে পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে ছবি দেখতে আসা ছেড়ে দেন অনেক দর্শক। নারী দর্শক তো দূরে থাক অনেক পুরুষ দর্শকও একা সিনেমা হলে আসতে ভয় পেতে থাকেন তখন থেকে। এর ফলে ক্রমশ দর্শকশূন্য হতে থাকে সিনেমা হলগুলো। যে অবস্থা এ সময়ে সারা দেশের অনেক সিনেমা হলেই বিদ্যমান। এ প্রসঙ্গে দর্শকপ্রিয় নির্মাতা ইস্পাহানী আরিফ জাহান বলেন, সমাজ ব্যবস্থার কথা একবার চিন্তা করে দেখুন। আগে দিনের শোর পাশাপাশি নাইট শো দেখে দর্শকরা সিনেমা হল থেকে বের হতো। আর পরিবারের সকলে মিলে সিনেমা হলে ছবি দেখে আনন্দে বাড়ি ফিরতো।
মানুষ একটা ভালো সময় কাটাতেই সিনেমা হলে যেত। আর সেই সিনেমা হলের পরিবেশই যদি ভালো না থাকে তাহলে কেন মানুষ সেখানে যাবে? ছবির ব্যবসায়িক ব্যর্থতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে সিনেমা হলের পরিবেশ খারাপ হয়ে যাওয়া অন্যতম। এখন গ্রামেও অনেক ঘরে ড্রইংরুমে সোফাসেট আছে, রঙিন টিভি এবং ডিশ লাইন সংযোগ আছে। যা আগের সময়ে ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সবকিছু উন্নত হলেও সারা দেশেই সিনেমা হলের পরিবেশ খুব একটা ভালো হয়নি। হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ সিনেমা হলে ভালো পরিবেশের অভাবে দর্শকরা যাচ্ছে না।
তাই প্রায়শই দর্শকশূন্য থাকছে সিনেমা হল। এর সমাধান জরুরি। এদিকে সরজমিন খবর নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা ও দেশের নানা জায়গায় অনেক সিনেমা হলেরই টয়লেটে যাওয়ার মতো পরিবেশ নেই, দুর্গন্ধে দর্শকরা অসুস্থ হয়ে যায়। এ ছাড়া অনেক সিনেমা হলে এখনো পুরনো অশ্লীল সিনেমা চালানো হয়। আর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বেশকিছু সিনেমা হলের সামনেই পতিতা, তাদের খদ্দের, হিজড়া এবং এমন বিভিন্ন ধরনের লোকজন দেখা যায়, যারা সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের জন্য নানা বিড়ম্বনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এ ছাড়া সিনেমা হলের আশেপাশে বিচরণ করা ছিনতাইকারী এবং প্রতারকচক্র তো আছেই। এদের ভয়েও সিনেমা হলে যেতে চায় না অনেকেই।
কারণ অনেক সময়ই সিনেমা হলে ছবি দেখতে আসা সাধারণ দর্শকরা পড়ে যায় এসব নোংরা পরিবেশের ঝামেলায়। চলচ্চিত্র প্রযোজক ও প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক আহ্বায়ক নাসিরউদ্দিন দিলু বলেন, দেশের বেশিরভাগ সিনেমা হলের পরিবেশ এখন ভালো না। অনেক সিনেমা হলে এখনো ছারপোকা মারতে হয়, সিট থেকে নারিকেলের ছোবড়া বেরিয়ে থাকে, সিট ভাঙ্গা পাওয়া যায়, ঠিকমতো ফ্যান চলে না, দর্শকদের ঘামে ভিজে সিনেমা দেখতে হয়। তাই এসব সিনেমা হল থেকেও লাভ নেই। হলের পরিবেশ যদি সুন্দর না হয় তাহলে দর্শকরা কখনোই সিনেমা হলে যাবে না।
মানুষের হাতে হাতে এখন স্মার্টফোন। স্বল্প টাকার ইন্টারনেট ব্যবহার করে যার মাধ্যমে সহজেই যে কোনো ভাষার সিনেমা পাওয়া যায় বোতাম টিপলেই। তাহলে মানুষ কেন টাকা খরচ করে বাজে পরিবেশের সিনেমা হলে যাবে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিতে। তাই সিনেমা হলের পরিবেশ ঠিক করতে সংশ্লিষ্ট সকলের এগিয়ে আসতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। আর হলের পরিবেশের পাশাপাশি সিনেমার মান ভালো হলেই সিনেমা হলে দর্শকরা আবার যাওয়া শুরু করবে বলে বিশ্বাস করি আমি।

বিল নেই কাজ বন্ধ by দীন ইসলাম

টাকা নেই তাই বিল পাচ্ছেন না ঠিকাদাররা। তিন-চার বছর আগে কাজ শেষ করেও বিল পাচ্ছেন না কেউ কেউ। এভাবে ঠিকাদারদের পাওনার পাহাড় জমা হচ্ছে। বিল না পাওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে গেছে কোনো কোনো প্রকল্পে। সরকারের দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় কাজ করেও দিনের পর দিন ঘুরছেন ঠিকাদাররা। সরকারের দপ্তরগুলোর তহবিলে অর্থ না থাকায় দেন-দরবার করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। কাজ করে বিল না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যম শ্রেণির ঠিকাদাররা। পুঁজি কম থাকায় তারা একটি কাজের বিল তুলে আরেকটি কাজে হাত দেয়ার প্রস্তুতি নেন।
পুঁজি আটকে যাওয়ায় সেই সুযোগও তাদের বন্ধ হয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর , গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদাররা এমন সমস্যায় পড়েছেন। সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোতে অর্থ ছাড় বেশি হওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ২০ থেকে ৪০ ভাগ ছাড় করা হয়েছে। তাই ঠিকাদারদের মোটা অঙ্কের বিল আটকে গেছে। বিল না পাওয়ায় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। যদিও রাজউক বলছে, প্রকল্প প্রস্তাব রিভাইস হওয়ার কারণে বিল দেয়া যাচ্ছে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিল না পেয়ে প্রায় দুই শতাধিক ঠিকাদার কষ্টে আছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, বিল নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ডিএসসিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারদের বচসা হচ্ছে। মূলত ডিএসসিসির আয় কমে যাওয়ার কারণেই এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) ভাগ হওয়ার পর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রাজস্ব আদায়ে ধস নামে। কারণ, ৭৫ শতাংশ রাজস্বই পাওয়া যেত বর্তমানে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে। ভাগ হওয়ার পর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যে রাজস্ব আদায় হয়, তা দিয়ে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়ার কাজ চলে। উন্নয়নকাজ করা কঠিন হয়ে যায়। দুই বছর আগেও কর্মচারীদের সঞ্চিত প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা থেকে বেতন দেয়ার নজির রয়েছে। এমন অবস্থার মধ্যেও ফান্ডে টাকা নেই। তবুও প্রশাসকরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যখন চালাতেন তখন প্রায় পাঁচশ’ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করেন। এর মধ্যে সাবেক সচিব ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রশাসক জিল্লার রহমানের আমলে ২৫০ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করা হয়। এছাড়া প্রশাসক নজরুল ইসলামের সময় ১১২ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, প্রশাসকদের সময় দরকার না হলেও টেন্ডার আহ্বান করে কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন খেয়ে বসে আছেন। এখন বিল পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিসিসি ভাগ হওয়ার পর মূলত ডিএনসিসি’র লাভ হয়েছে। উন্নয়ন খাতে তাদের বাজেট দিন দিন বাড়ছে। বিপরীতে ঠিকাদারদের বকেয়া পরিমাণ খুব বেশি নয়। রাজস্ব আয় বেশি থাকায় ডিএনসিসি’র কর্মকর্তারা উন্নয়ন কাজ বেশি করতে পারছেন। দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে ঠিকাদারদের পাওনার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ দুই সিটি কর্পোরেশনে আগের মেয়াদে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা দায়িত্ব পালনের কারণে খুব বেশি উন্নয়ন কাজ করা যায়নি। যেসব উন্নয়ন কাজ করা গেছে ওই সব কাজের বিল এখনও বকেয়া পড়ে আছে। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে ঠিকাদারদের পাওনা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের বাইরে সরকারি অর্থায়নে যেসব কাজ হয় ওই সব কাজের বিল পেতে গেলে ঠিকাদারদের বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদাররা বেশ কষ্টের মধ্যে আছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টের পর যেসব ঠিকাদার কাজ করেছেন তারা এখনও বিল পাননি। আগামী বাজেটের দিকে তাদের তাকিয়ে থাকতে হবে। বাজেট অনুমোদনের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে যে অর্থ ছাড় হবে তা থেকেই দেন দরবার করে বিল নিতে হবে। এরপর নতুন করে কোন কাজ করলে তা বাকি পড়ে থাকবে। গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির একজন নেতা মানবজমিনকে বলেন, বাবার আমল থেকে ঠিকাদারি করি তাই গণপূর্ত অধিদপ্তরকে আকড়ে ধরে আছি। কাজ করলে বিল পাই না। বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। কিভাবে চলি বলেন। পরিবার নিয়ে টেকা দায় হয়ে গেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, মেরামত কাজের বাজেট সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ছাড় হয়। তখন রীতিমতো কামড়াকামড়ি চলে। নিজেদের মতো তদবির করে বিল নিয়ে যান তারা। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বিভাগে নির্মাণ ও মেরামত খাতে গেল অর্থ বছরের চেয়ে কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে মেগা প্রকল্পে বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। তাই এ অর্থ বছরে বরাদ্দ কম ছাড় হবে।

‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’ by আসাদুজ্জামান বাবুল

গত ২০শে এপ্রিল গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের শরীফ পাড়ার সৌদি প্রবাসী নিজাম উদ্দিন শরীফের মেয়ে স্কুলছাত্রী আরজু মনি। পুলিশ জানায়, দশম শেণীর ছাত্রী আরজু মনি তার শোবার ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে সে। তবে এটি শুধুই একটি আত্মহত্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে- প্রেম-বিচ্ছেদ, মান-অভিমান, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এক জটিল অঙ্ক। রয়েছে কিশোরী মনের অব্যক্ত আবেগ। 
পুলিশ বলছে, স্কুলছাত্রী আরজু মনি পালিয়ে গিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করে এলাকার রাহাত নামে এক যুবকের সঙ্গে। পরে তাদের আবারও বিয়ে দেয়া হবে- এমন আশ্বাসে ফিরে আসে তারা। কিন্তু ফিরে আসার পরই মত পাল্টায় আরজুর পরিবার।
যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় আরজু নিজেও। তার মা রাহাতকে জানিয়ে দেন, তার মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দেবেন না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দু’চার কথা শুনিয়েও দেয় রাহাত।
ঘটনার দিনে আরজুকে তার মা ঘরে আটকে রেখে বাইরে যান। ফিরে এসে দেখেন মেয়ের লাশ ঝুলছে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে। অনেকে এ ঘটনাকে বাড়াবাড়ি বলছেন। তবে আরজুর মা বলছেন, ভিন্ন কথা। তিনি বলছেন, তার মেয়ে নিজ হাতে ৫ পৃষ্টার একটি চিরকুট লিখে গেছে। তাতেই উল্লেখ আছে, কে তার মৃত্যুর জন্য দায়ি।
আরজু মনির মা লতিফা বেগম জানান, সে স্কুলে যাওয়া-আসার সময় গোপীনাথপুর গ্রামের শরীফপাড়ার রেজাউল শরীফের বখাটে ছেলে রাহাত শরীফ ও তার বন্ধুবান্ধব বেশকিছু দিন ধরে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। শুধু তাই নয়, স্কুলে যাওয়া আসার সময় তারা  মেয়ের পথরোধ করে নানান প্রকার বাজে কথাও বলতো। ওদের ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার মেয়েকে ওরা বাজে ইঙ্গিত করে কথা বলতো।
লতিফা বেগম জানান, চিরকুটে সে লিখেছে, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। ও মা, তুমি আমাকে মাফ করে দিও। আমি চাই না আমার মা-বাবার সম্মান নষ্ট হোক। আমি আগেই এখানে (বাড়িতে) না থাকার জন্য তোমাদের বলেছিলাম। কিন্তু তোমরা আমার কথা রাখো নি। আমার মৃত্যুর পর তোমরা আর এখানে থেকো না। কারণ এখানে থাকলে আর কেউ লেখাপাড়া শিখতে পারবে না। তাই তোমাদের কষ্ট হলেও এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যেও। মা, সত্যি কথা বলছি, রাহাতের সঙ্গে আমার কোন খারাপ সম্পর্ক ছিলো না। তবে রাহাত এবং অন্যরা আমার নামে যে মিথ্যা কথা বলে অপবাদ দিয়েছে তার বিচার আল্লাহ করবে। আমি আল্লার কাছে বিচার দিয়ে গেলাম, দেখো আল্লা একদিন ওর বিচার করবেই। আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দিও।’
আরজু মনির মা লতিফা বেগম অভিযোগ করে বলেন, রাহাত এবং তার বন্ধুবান্ধব আমার মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়ার পর আমি বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের জানাই। এরপর গ্রামবাসী এক শালিস বৈঠকের মাধ্যমে রাহাতকে শাসিয়ে দেয়ার পরেও সে থেমে থাকেনি। একের পর এক হুমকি-ধামকি দিয়ে বেড়িয়েছে। ওদের ভয়ে আমি মেয়েকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিই।
ঘটনার দিন গত ২০শে এপ্রিল আনুমানিক বেলা ১১টার সময় আমি মেয়ের জন্য নোটবুক কিনতে বাজারে যাই। প্রায় এক ঘন্টা পর ফিরে এসে দেখি আমার মেয়ে আরজু মনি তার শোবার ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এ সময় তার হাতের লেখা একটি চিরকুটও পাওয়া যায়। এ ঘটনায় গোপালগঞ্জ সদর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে অপমৃত্যু মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের এসআই মো. আউয়াল হোসেন রানা জানিয়েছেন, স্কুলছাত্রী আরজু মনির আত্মহত্যার ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত লিখিত কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
গোপিনাথপুর গ্রামের রাহাত নামে এক যুবকের উত্ত্যক্তের কারণে ওই স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে পরিবারে এমন অভিযোগের প্রেক্সিতে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, স্কুলছাত্রী আরজু মনির ময়নাতদন্তের পর ঘটনা তদন্তকালীন এলাকার একাধিক মানুষ সুত্রে জানা গেছে, রাহাতের সঙ্গে আরজু মনির দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গেলো উপজেলা নির্বাচন পরবর্তী তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে আদালতে গিয়ে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করেছিল। এরপর উভয়পক্ষের লোকজন তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দেয়ার কথা বলে বাড়িতে নিয়ে আসে। এ সময় কথা হয়, কিছুদিনের মধ্যেই তাদের বিয়ে দেয়া হবে। কিন্ত সেটা আর হয়ে ওঠে না।
এসআই মো. আউয়াল হোসেন রানা জানান, মেয়ের মা লতিফা বেগম মেয়েকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে সবসময় চোখের নজরে রাখতে শুরু করে। এক সময় রাহাতের  সঙ্গে আরজু মনির যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এমন ঘটনার পর রাহাত তার বিবাহিত স্ত্রীকে ফিরে পেতে আরজু মনির বাড়ির সামনে গিয়ে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানায়। কিন্ত তার মা লতিফা রাহাতকে একসময় সোজাসুজি জানিয়ে দেয়- তোমার সঙ্গে আমার মেয়ে বিয়ে দেবো না। এতে সে ক্ষিপ্ত হয়ে আরজু মনির মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সে।
ঘটনার দিন গত ২০শে এপ্রিল আনুমানিক বেলা ১১ টার সময় আরজু মনির মা লতিফা বেগম মেয়ের জন্য একটি নোট বুক কিনতে বাজারে যাওয়ার সময় আরজু মনিকে ঘরের ভেতরে আটকিয়ে রেখে দরজায় তালা লাগিয়ে বাজারে যায়। প্রায় ১ ঘন্টা পর বাজার থেকে বাড়ি ফিরে দরজা খুলে লতিফা বেগম তার মেয়ের লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখে চিৎকার করলে লোকজন জড়ো হয়। উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।
তাহলে আরজু মনির মৃত্যুর জন্য কে দায়ি? এমন প্রশ্নের উত্তরে এসআই আওয়াল রানা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর জন্য তার মা লতিফা বেগম, রাহাত ও সমাজ দায়ি। কারণ সমাজ এবং তার মা লতিফা বেগম তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দেয়ার কথা বলে বিয়ে না দেয়ায় রাহাত মেয়ের মাকে বকাবকি করেছে। এ কারণেই সে আত্বহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে রাহাত ও তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদেরকে পাওয়া যায়নি।

খালেদার সিগন্যালে তারেকের সিদ্ধান্ত

শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে সংসদে যোগ দিয়েছে বিএনপি। ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচিতদের শপথ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঐক্যফ্রন্টের হয়ে নির্বাচন করা গণফোরামের দুই এমপি শপথ নেন আগেই। বিএনপির নির্বাচিত ছয়জন শপথ নেবেন কিনা এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল নানা জল্পনা, হিসাব-নিকাষ। দল এবং জোটেও ছিল এ নিয়ে টানাপড়েন। এর মধ্যে বিএনপি নেতা জাহিদুর রহমান জাহিদ সংসদে যোগ দিয়ে নতুন আলোচনার জন্মদেন। দলটির নির্বাচিত অন্য পাঁচজনও শপথ নিচ্ছেন এমন আলোচনা চাউর হয় রাজনৈতিক ময়দানে। রাজনৈতিক জটিল সমীকরণটি অনেকটা সহজ করে দিয়ে গতকাল সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।
সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন চার এমপি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার এবং বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন। সন্ধ্যায় তাদের শপথ পড়ান স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। পরে রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে দলীয় সিদ্ধান্তেই এমপিরা শপথ নিয়েছেন বলে জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নিজেও দ্রুত সময়ের মধ্যেই শপথ নিচ্ছেন এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মতিতেই সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত দেন। এর আগে নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলেন তারেক রহমান।
এদিকে শপথ নেয়ার পরই সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন চার এমপি। তাদের মধ্যে হারুনুর রশিদ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে তিনি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তোলেন। এর আগে শপথ নিয়ে বের হয়ে সংসদ ভবনের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আজকের এই দিনটির জন্য গোটা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৩০শে ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতির নির্বাচনে মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদ গঠিত হয়নি। তাই আমাদের দল ভোট ডাকাতির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সংসদে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমরাও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এতোদিন শপথ গ্রহণ করিনি। এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমতি ও নির্দেশক্রমেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছি। ১৭ কোটি মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা সংসদে গিয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলতে চাই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাতে চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কারো কারো উপর শপথ নেয়ার জন্য চাপ ছিল। সাদা পোশাকধারী ও অন্যান্য এজেন্সির লোকেরা আমাদের কোনো কোনো সংসদ সদস্যকে শপথ গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিল।
পরে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে নির্বাচনই ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র পথ। তাই সত্যিকার অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন,  বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল একটি কলঙ্কজনক প্রহসনের নির্বাচন। যা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলও প্রহসনের নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই নির্বাচনের ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। দল মত নির্বিশেষে সকল ভোটারকেই জোর পূর্বক এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যা ক্ষমতাসীন মহলের কারো কারো মুখ থেকেও স্বীকারোক্তি হিসাবে বেরিয়ে এসেছে। নজিরবিহীন সন্ত্রাস, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ সর্বপরি নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে ভোটের দিনের আগের রাতেই ভোটের ফলাফল একতরফাভাবে তাদের পক্ষে সাজিয়েছে সরকার। আমরা সংগত কারণেই ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণের ক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এবং জাতীয় সংসদে আমাদের মনোনীত বিজয়ী প্রার্থীদের শপথ গ্রহণ না করার জন্য আহ্বান করেছিলাম। তিনি বলেন, আমাদের দল একটি উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা বিশ্বাস করি নির্বাচনই ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র পথ। কিন্তু ক্ষমতাসীন মহল নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আজ এমনভাবে দলীয়করণ করেছে যে, গোটা নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান আজ ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা প্রলম্বিত করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার জন্য সকল পদ্ধতিও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে এই সরকার তার গ্রহণযোগ্যতার জন্য ভোটারবিহীন এই সংসদকে সচল দেখাতে চায়। এইটুকুই কেবল আজ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার নূন্যতম সুযোগ হিসাবে বিরোধী জনমতের জন্য অবশিষ্ট আছে।
আমরা বরাবরের মতোই দাবী করছি, দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে জনগণের সংসদ নির্বাচন করাই এই সংকট সমাধান করার একমাত্র পথ। তাই একদিকে নতুন নির্বাচনের দাবী ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের অব্যাহত দাবী অন্যদিকে দেশের চলমান অর্থনৈতিক, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক চরম সংকট যথাক্রমে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকলুট, নারী নির্যাতন, গুম-খুন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে একটি কার্যকরী ও জোরালো গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আমাদেরকে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত হতে হবে।
ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের সংগ্রামকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করছি। জাতীয় রাজনীতির এই সংকটময় জটিল প্রেক্ষিতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা, মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের অংশ হিসেবে আমদের দল সংসদে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করি দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় অবিলম্বে একটি অবাধ জাতীয় নির্বাচন আদায় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রীসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্ত করে আমরা আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া ঘোষিত জাতীয় ঐক্যমতের বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন, ফখরুলের উত্তর
বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অনিয়মের অভিযোগ তুলে ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে, তাহলে এখন বিএনপি কিভাবে শপথ নিচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর লিখিত বক্তব্যের কাগজটি দেখিয়ে বলেন, এখানে সব তো ব্যাখ্যা করেছি। মানুষ যেহেতু ভোট দিতে পারেনি সেহেতু অবৈধ সংসদ বলেছেন, এখন কিভাবে সে সংসদে যাবেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের গণতন্ত্র চর্চার সবগুলো পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। আমরা সংসদে গণতন্ত্র চর্চার স্পেসটুকু ব্যবহার করার জন্য সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শেষমুহুর্তে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নেতৃত্বের অদূরদর্শীতাকে প্রকাশ করে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা এটা গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য যাচ্ছি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি, বিভিন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি ও কর্মীদের মতামত নিয়েছি। দলের এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল নেতাকর্মীরা কিভাবে নেবেন বলে মনে করেন- জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আশাকরি ভালোভাবেই নেবেন। এই সিদ্ধান্ত দলে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কথা আপনি বলতে পারেন, ভবিষ্যৎ বলতে পারে, আমি তো এখন বলতে পারবো না। তবে আমি আশা করি না।
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন চলছে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিনিময়ে বিএনপি সংসদে যাচ্ছে- এ ব্যাপারে মির্জা আলমগীর বলেন, এটা গুঞ্জনই। শপথ নেয়ার সঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইগুলো এক নয়। সংসদে যাওয়ার মধ্যে সরকারের সঙ্গে কোন ধরনের সমঝোতা আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমঝোতা পেলেন কোথায়? আমরা বলেছি, সংসদে এবং সংসদের বাইরে দুই জায়গাতেই আমরা লড়াইটা করতে চাই। এটা (সংসদ) একটি জায়গা। আমরা আমাদের কথাগুলো বলার জন্যই সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
শপথের জন্য কোন চাপ আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের উপর এখন কোন চাপ নেই। মহাসচিব, তাহলে কি আপনি কোন চাপে নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি? আমি তো মহাচাপে আছি। আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মামলা, আমাদের নেত্রী এখন জেলে। আজ (সোমবার) বিকালেই দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার সংসদে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এ ব্যাপারে মির্জা আলমগীর বলেন, এটা সিদ্ধান্তের আগের বক্তব্য। বিএনপি মহাসচিব শপথ নিচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সময় আসুক জানতে পারবেন। তিনি শপথের জন্য আবেদন করেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বলেছি তো- সময় হয়েই জানতে পারবেন। তিনি সময়ের জন্য আবেদন করেছেন কিনা- জানতে চাইলে মির্জা আলমগীর বলেন, আমি কি করেছি না করেছি সময় হলেই জানতে পারবেন।
দলীয় সিদ্ধান্তে শপথ নেয়া হলে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমানকে যে বহিষ্কার করা হলো তার কি হবে- এই প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সময় মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ২০ দলীয় জোটের শরিক দল এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বিএনপির এমপিদের শপথগ্রহণকে হঠকারি সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন, এই ব্যাপারে মির্জা আলমগীর বলেন- এটা উনার  বক্তব্য। বিএনপি নেতারা প্রথমে শপথ নেয়া জোটের দুই নেতাকে জাতীয় বেঈমান আখ্যায়িত করেছে, এখন বিএনপির এমপিদের জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত করা হবে বলে মনে করেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আলমগীর বলেন, পলিটিক্সে কালকে যেটা হবে সেটা আজকে বলা যাবে না তো। আমরা আজকে যেটা বলছি, কালকে অবস্থার প্রেক্ষিতে সেটা আমাদের পরিবর্তনও করতে হতে পারে। প্র্যাকটিক্যাল পলিটিক্স এটা। আমাদের যেটা প্রয়োজন দলের জন্য, রাজনীতির জন্য, দেশের জন্য সেটাই করেছি।

রানা প্লাজা ধসের ছয় বছর: স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান আহত শ্রমিকরা by হাফিজ উদ্দিন

সাভারে ভয়াবহ রানা প্লাজা ভবন ধসের ছয় বছর পূর্তি হলো। এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি রানা প্লাজায় আহতরা। ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে ধসে পড়ে ৯ তলাবিশিষ্ট বহুতল ভবন রানা প্লাজা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবন দুমড়ে মুচড়ে এক হয়ে যায়। ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায় পুরো এলাকা। প্রথমে চারদিকে ছুটোছুটি, তার কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় লাশের মিছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান  তৈরি পোশাক শ্রমিকসহ ১১শ’ ৩৬ মানুষ। আর আহত হয় আরো অন্তত ২ হাজার ৪ শ’ ৩৮ জন হতভাগা শ্রমিক।
ভবন ধসের ৬ বছর পার হলেও এখনো অনেক নিহত শ্রমিকের স্বজন ও আহত শ্রমিকরা পায়নি প্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতিপূরণ। ফলে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিতে না পারায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি তারা। এমনই হতভাগা শ্রমিকের নাম সালমা বেগম (৩৮), রানা প্লাজার ৮ম তলার নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড কারখানার শ্রমিক।
অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে স্বামীর সঙ্গে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে কাজ নেন তৈরি পোশাক কারখানায়। চাকরি করে নিজের সন্তানদের খাওয়ানোর পাশাপাশি তাদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন সালমা। কিন্তু তার সে আশা বেশিদূর এগোতে পারেনি। ২০১৩ সালে ২৪শে এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টায় হঠাৎ বিকট শব্দে ধসে পড়ে তার কর্মস্থল রানা প্লাজা। দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা পর ধসে পড়া ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধার হয়ে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিজেকে আবিস্কার করেন এই নারী শ্রমিক। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসা নেয়ার পর স্থানান্তর হন পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপিতে। মেরুদণ্ডের হাড় থেকে জেলি বের হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে তার অবস্থা বেশি ভালো নেই। কোনো রকমে ওষুধ খেয়ে এবং থেরাপি দিয়ে কিছুটা ভালো থাকলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসক। এ সমস্যার কারণে তিনি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না এবং ঝুঁকেও কাজ করতে পারেন না। সমস্যা আর অভাবের সংসারে দু’সন্তানকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে তাদেরকে ছেড়ে গেছেন পাষণ্ড স্বামী বাক্কার মিয়া।
এখন দু’সন্তান নিয়ে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন সালমা বেগম। এগারো বছরের মেয়ে জলি আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে ৫ শ্রেণিতে পড়লেও অর্থাভাবে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া দু’বছরের ছেলেকে দুধ খাওয়ানোর জন্য হাত পাততে হচ্ছে অন্যের কাছে। কোনো রকমে চেয়েচিন্তে একটি দুধের পট কিনে সপ্তাহখানেক খাওয়াতে পারেন ছেলেকে। সেটাও সব সময় সম্ভব না হলে না খেয়েই থাকতে হয় ওই শিশুটিকে। সবকিছু মিলিয়ে তিনি বলেন, নিজেই যেখানে অর্থের জন্য চিকিৎসা করাতে পারছি না সেখানে  ছেলেমেয়ের যত্ন নেবো কীভাবে। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা মিলেনি তার ভাগ্যে। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলো যা অনেক আগেই চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে। এখন দুটি শিশু সন্তানকে নিয়ে আমি কি করবো, আর কি খাবো? এদিকে আমার মাও অসুস্থ। তাকেও আমার দেখতে হয়। চিকিৎসক  মোস্তফা কামাল বলেন, সালমা আক্তারের আঘাত শতভাগ ভালো হওয়া সম্ভব নয়। তবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলাফেরা করলে এটাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অনেক সময় ব্যথা অসহনীয় মনে হলে অপারেশন করা হয়। কিন্তু সেখানেও ঝুঁকি থেকে যায়। তাই এ আঘাতের জন্য নিয়মিত ব্যথার ওষুধ সেবনের পাশাপাশি ফিজিও থেরাপি নিতে হবে।  পারুল আক্তার (২৮), সে রানা প্লাজার ৫ম তলার প্যান্টম টেক্স লিমিটেড কারখানার সুইং অপারেটর ছিলেন।
ভবন ধসের সময় দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করেন তিনি। এরপর কি হয়েছে আর কিছুই বলতে পারেন না তিনি। মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানার ধামসোরা গ্রামের মো. ইয়াসিন মিয়ার স্ত্রী পারুল আক্তার। স্বামীর সঙ্গে সাভারে ভাড়া বাসায় থেকে সংসারে সচ্ছলতা আনতে রানা প্লাজায় কাজ করতো বলে সে জানায়। ৬ বছর পার হতে চললেও এখনো পুরো সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি পারুল আক্তার। বর্তমানে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত পারুল হঠাৎ ভালো হঠাৎ খারাপ। স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় কিছুই মনে থাকে না তার। মাথা এবং মেরুদণ্ডের ব্যথার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ খেয়েও তার  কোনো উন্নতি হয়নি। সর্বশেষ চিকিৎসকের পরামর্শে এক্সরে করে জানতে পারেন তার কিডনিতে পাথর হয়ে গেছে। সেগুলো এমন আকার ধারণ করেছে যে অপারেশনের মাধ্যমে পেট কেটে বের করতে হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো কাজ করতে পারছেন না। তবুও অনেক কষ্ট করে সুস্থ হওয়ার আশায় চিকিৎসা নেয়ার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে বেড়ান।
পারুলের স্বামী মো. ইয়াছিনও রানা প্লাজা ধসে গুরুতর আহত হয়ে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ায় এবং মাথায় আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে ছিলেন। কিন্তু জীবিকার তাগিদে বেঁচে থাকার জন্য ঘরে বসে না থেকে একটি  পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। একজনের আয়ে কোনো রকমে একবেলা খেয়ে বেঁচে রয়েছেন তারা। ভবন ধসের ঘটনায় মাত্র এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান পেয়েছিলেন পারুল। যার পুরোটাই ব্যয় করেছে নিজের এবং স্বামীর চিকিৎসার পেছনে। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাননি বলে দাবি করেন এ নারী শ্রমিক। বর্তমানে তিনি দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতি সহায়তা কামনা করেন। আরেক শ্রমিক ধসে পড়া রানা প্লাজার ৮ম তলার নিউ ওয়েভ স্টাইল কারখানার লিপি আক্তার (৪০) ভবন ধসের ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এখনো সঠিক চিকিৎসার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। তবে টাকার অভাবে তিনি ওষুধ কিংবা পথ্য কিনে খেতে পারছেন না। লিপি আক্তার বলেন,  মেরুদণ্ডে ব্যথার কারণে অনেক জ্বালাপোড়া করে। এজন্য ঠিকমতো হাঁটতেও পারি না, আবার বেশিক্ষণ বসেও থাকতে পারি না। অসুস্থতার কারণে মুখে রুচি না থাকায় খাইতেও পারি না। তবুও বাঁচার তাগিদে জোর করে কিছু খাওয়ার চেষ্টা করি। তাতেও রক্ষা নাই, খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বমি হয়ে যায়। সাভারের সিআরপি এলাকায় কথা হয় লিপি আক্তারের সঙ্গে। বর্তমানে সাভার পৌর এলাকার আড়াপাড়া রশিদ মেম্বারের মোড় এলাকায় রিকশাচালক স্বামীর সঙ্গে ভাড়া থাকেন তিনি। কষ্টের সঙ্গে বলেন, সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী আমার স্বামী।
সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালাতে হয় তাদের। এর মধ্যে প্রতি মাসে শুধু ঘর ভাড়াই দিতে হয় তিন হাজার টাকা। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বামীর সামান্য আয়ে তার সংসার চলে না। এরপরও কোনো রকমে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। তাই দুঃখের সঙ্গে তিনি বলেন, টাকার অভাবে ঠিকমতো ওষুধই খেতে পারছি না। আবার পথ্য খাবো কীভাবে। শুধু ওষুধ খেলেই তো সুস্থ হওয়া যায় না। এর পাশাপাশি অন্য কিছু খাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।  বর্তমানে আহত শ্রমিকদের একটাই চাওয়া, সুস্থ হয়ে কাজ করে হলেও দু’বেলা খেয়ে পড়ে বাঁচতে চান তারা। কিন্তু সঠিক চিকিৎসার অভাবে তাদের সে আশার কোনো ফল দেখতে পারছে না। তাই সরকারের কাছে তাদের একটাই দাবি চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি ভবন ধসের ঘটনায় জড়িতদের উপযুক্ত বিচারের দাবি করেছেন রানা প্লাজার আহত শ্রমিকরা।

মন্ত্রণালয়ের সামারি লিখছেন কারা, নানা প্রশ্ন by দীন ইসলাম

সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ের সামারি (সার সংক্ষেপ) লিখছেন কারা? এমন প্রশ্ন এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। তারা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখন সামারি লিখতে চান না। মেধা শুন্যতার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের এ কাজে নিয়োজিত করছেন। এর বাইরে সাবেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সামারি তৈরির জন্য ডেকে আনা হচ্ছে। ‘বাইরের’ লোক দিয়ে সামারি তৈরির কারণে এগুলো থাকছে ভুলে ভরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,  মন্ত্রিসভা, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিসহ বিভিন্ন মন্ত্রিসভা কমিটি’র বৈঠকে মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো তাদের এজেন্ডার উপস্থাপন করে থাকে। এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা তাদের এজেন্ডা সার সংক্ষেপ পড়ে শোনান।
এসব সামারি বৈঠকে উপস্থিত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দেয়া হয়। সামারিতে ভুল থাকায় অনেক সময় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্রয় সংক্রান্ত প্রস্তাবের সার সংক্ষেপ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীন দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরগুলো তৈরি করে দিচ্ছে। প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে উপস্থাপিত সার সংক্ষেপেও মন্ত্রণালয় হাত না দেয়ার নজির রয়েছে। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই দাপ্তরিক কাজের চেয়ে নিজের পদ-পদবি ঠিক রাখতে ব্যস্ত। রুলস অব বিজনেসসহ সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। এ কারণেই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো সার-সংক্ষেপগুলোতে প্রায়ই নানা ভুলভ্রান্তি ধরা পড়ছে। সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো সচিবের দক্ষতা ও উপস্থাপিত সারসংক্ষেপ দেখে কখনও কখনও খোদ প্রধানমন্ত্রীই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রশাসনে দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার সংকটের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাবের কথা জানিয়ে সচিবদের সতর্ক করে এর আগেও একাধিক বার চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তবে এ পর্যন্ত তেমন কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো সারসংক্ষেপে ব্যাপক ভুল থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করার পাশাপাশি নির্ভুলভাবে সারসংক্ষেপ পাঠানোর তাগিদ দেয়া হয়। ১৪ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) দেওয়ান ড. হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। কিছু সারসংক্ষেপ ক্রটিপূর্ণ হওয়ায় তা নিষ্পত্তিতে অনাকাঙ্খিত বিলম্ব হয়। এ অবস্থায় সার-সংক্ষেপ প্রস্তুতকালে এ সংক্রান্ত সচিবালয়ের গাইডলাইন অনুসরণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এর আগে ২০১৩ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই সময়ের সিনিয়র সচিব (বর্তমানে ইতালীতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত) আবদুস সোবহান সিকদার কর্মকর্তাদের সাতটি বিষয়ে সতর্ক থেকে সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে অফিস আদেশ জারি করেছিলেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল বেশিরভাগ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্তসহ সুস্পষ্ট ও  যৌক্তিক মতামত থাকে না। প্রস্তাবের ফরোয়ার্ডিংয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি সংযুক্ত থাকে না। প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোর হালনাগাদ কপি পাঠানো হয় না। পদ সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও স্থায়ীকরণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্রে উল্লিখিত শর্তাদি যথারীতি প্রতিপালন করা হয় না। এমনকি প্রস্তাবিত নিয়োগবিধি ও সাংগঠনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠান প্রধান ও প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সচিব বা সিনিয়র সচিবের স্বাক্ষর থাকে না। এছাড়া ২০১২ সালের ১১ই নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের এক সারসংক্ষেপ নিয়ে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এজন্য সারসংক্ষেপ তৈরিতে আরও সতর্কতা এবং পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে নথি পাঠানোর অনুরোধ করে একটি আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভা, অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে ভুল-ভ্রান্তি থাকায় তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানোর ঘটনা অহরহই ঘটছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে চলেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিজেরা সামারি তৈরি না করার কারণে একই ভুল বার বার থেকে যাচ্ছে। কারণ যারা সামারি তৈরি করছে তারা বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন না। এজন্য একই ভুল থেকে যাচ্ছে।

Monday, April 29, 2019

উবার চালক কেন ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করলেন?

ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে অ্যাপস ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোতে রাইডাররা নিবন্ধন করেন বলে তথ্য প্রকাশ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রাইডারদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে অফিস থেকে নেয়া ঠিকানা অনুযায়ী তাদের খোঁজে পাওয়া যায় না। তাই এ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। নির্দেশ না মানলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার তার কার্যালয়ে এসব কথা বলেন। ২৫শে এপ্রিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য (২১) কাভার্ড ভ্যানের চাপায় নিহত হন। তিনি উবারের মটরসাইকেলের যাত্রী ছিলেন। ২৬শে এপ্রিল মোহাম্মদপুর থেকে লাবণ্যকে বহনকারী উবার চালক সুমন ও আশুলিয়া থেকে ২৭শে এপ্রিল কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে শেরে বাংলা নগর থানা পুলিশ।
তাদের গ্রেপ্তারের পরে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ঘটনার দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী লাবণ্য রাইড শেয়ারিং কোম্পানি উবারের চালককে অ্যাপসের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানান। লাবণ্য’র কল পেয়ে তার থেকে পাঁচ মিনিটের দুরত্বে থাকা চালক সুমন তাকে ১০ টা ৩৬ মিনিটে ফোন দেন। লাবণ্য তখন খিলগাঁও ছায়াবীথি মসজিদের সামনে যাওয়ার কথা বলে চালক সুমনকে শ্যামলী তিন নম্বর রোডের ৩১ নম্বর বাসার সামনে আসতে বলেন। লাবণ্যর দেয়া ঠিকানা থেকে তাকে নিয়ে কলেজ গেট দিয়ে খিলগাঁওয়ের উদ্দেশ্য রওনা দেন সুমন। তারপর লাবণ্যকে বাইকে উঠিয়ে বেপরোয়া গতিতে বাইক চালাতে থাকে সুমন। একপর্যায়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের কাছাকাছি আসলে পেছন থেকে বাইকটিকে ধাক্কা দেয় কাভার্ডভ্যান। এসময় বাইক থেকে ছিটকে পড়ে যান লাবণ্য। আর সঙ্গে সঙ্গে ওই কাভার্ডভ্যানটি তাকে চাপা দিয়ে চলে যায়। পরে পথচারি ও চালক সুমন লাবণ্যকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে লাবণ্যকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লব সরকার বলেন, উবার চালক সুমন হাসপাতালে যে ঠিকানা দিয়েছিলেন সে ঠিকানা ভুয়া। এমনকি তার যে ঠিকানা দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে সেই ঠিকানায় তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া উবার অফিসে যে ঠিকানা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন সেটিও ভুয়া। তিনি বলেন, উবারের অফিসে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রাইডাররা নিবন্ধন করে সড়কে রাইড শেয়ারিং করার অনুমতি পায়। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো কোন রকম যাচাই বাছাই ছাড়া চালকদের অনুমতি দিচ্ছে। এসব চালকদের মধ্যে অনেকেই দক্ষ চালক না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদক সেবন করে। নারীদের বাইকে তুলে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে অযথা ব্রেক ধরে। আরোহীদের জন্য নিম্নমানের হেলমেট দেয়া হয়। এগুলো মনিটরিং করার মত কেউ নাই। তাই এসব বিষয়ের দ্রুত সমাধান করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, চালক সুমন ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করায় তাকে খুঁজে পেতে পুলিশের অনেক সময় লেগেছে। উবার কর্তৃপক্ষও প্রথম দিকে কোন সহযোগিতা করেনি। পরে প্রযুক্তির সহযোগীতায় ২৬শে এপ্রিল সুমনকে মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ঘটনার পর পরই পালিয়ে চলে যায় কাভার্ডভ্যান চালক আনিছুর রহমান। আমরা ঘটনাস্থল থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু ফুটেজ ছিল অস্পষ্ট।
কাভার্ডভ্যানটিকে শনাক্ত করা যাচ্ছিলো না। পরবর্তীতে আরেকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে কাভার্ডভ্যানের গায়ে কোম্পানির নাম লেখা ছিল। সেই নাম দেখেই কাভার্ডভ্যান শনাক্ত করে আশুলিয়া থেকে চালককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিপ্লব সরকার বলেন, আমরা রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। কোনও দুর্ঘটনায় এসব প্রতিষ্ঠানের কোন গাফিলতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উবারের সিনিয়র ম্যানেজার মো. আলী আরমানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা তার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। এক পর্যায়ে সাংবাদিকরা জানতে চান কোনো ধরণের অনুমতি বা বৈধতা ছাড়াই কিভাবে উবার ব্যবসা করছে। এর জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো উপযুক্ত ব্যক্তি তিনি নন।
এদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্য নিহতের ঘটনায় তাকে বহনকারী উবার চালক সুমন হোসেন ও কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুর রহমানের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরে বাংলা নগর থানার উপ পরিদর্শক নুরুল ইসলাম আসামিদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ সুমনের দুই দিন ও আব্দুর রহমানের চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে শুনানিতে আসামি পক্ষের আইনজীবি শহিদুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করে বলেন, ওই ঘটনায় চালক সুমনও আহত হয়েছেন। তার হেলমেটও ভেঙ্গে গেছে। তিনি নিজেও মারা যেতে পারতেন। তাকে রিমান্ডে নেয়ার কোন যুক্তিকতা নাই।

শ্রীলঙ্কা হামলার মূলহোতা জাহরানের ১৮ নিকটআত্মীয় নিহত -বোনের দাবি

শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার পর এর মূলহোতা জাহরান হাশিমের ১৮জন আত্মীয় নিহত হয়েছেন। এমন দাবি করেছেন জাহরানের বোন মোহাম্মদ হাশিম মাথানিয়া। তিনি সিএনএনের কাছে বলেছেন, ওই হামলার পর তার পরিবারের ১৮ জন সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। তার আশঙ্কা হামলা পরবর্তী ঘেরাও অভিযানে এসব আত্মীয়-স্বজন নিহত হয়েছেন।
২১ এপ্রিল তিনটি গির্জা ও তিনটি অভিজাত হোটেলে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। এতে কমপক্ষে আড়াইশ মানুষ নিহত হন। প্রথমে নিহত ৩৫৯ বলা হলেও পরে এ সংখ্যা কমিয়ে ২৫৩ বলা হয়। হামলায় আহত হন কমপক্ষে ৫০০ মানুষ।
এর পরই সরকার সারাদেশে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আরো হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কায় উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে শ্রীলঙ্কা।
হামলার মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মোহাম্মদ জাহরান হাশিমকে। পাঁচ তারকা সাংগ্রি-লা হোটেলে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে সে নিহত হয়েছে। এতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার দেহের বিভিন্ন অংশ। সেগুলোর ছবি স্থানীয় একটি পুলিশ স্টেশনে নিয়ে রাখা হয়। জাহরান হাশিমের বোন মোহাম্মদ হাশিম মাথানিয়া শনিবার কথা বলেন সিএনএনের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, পুলিশ স্টেশনে তাকে ওইসব ছিন্নভিন্ন অঙ্গগুলোর যে ছবি দেখানো হয়েছে তা তিনি তার ভাইয়ের (জাহরান) বলে সনাক্ত করতে পেরেছেন। তিনি আরো বলেন, ওই হামলার পর আমার পরিবারের ৫ জন সদস্য নিখোঁজ। তারা হলেন আমার তিন ভাই, পিতা ও আমার এক দুলাভাই।
ওদিকে শুক্রবার রাতে শ্রীলঙ্কার পূর্ব উপকূলে সেইন্টামারুথু শহরে জঙ্গি ও পুলিশের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়। সেখানে ৬টি শিশু সহ নিহত হন কমপক্ষে ১৫ জন। শনিবার দিনের বেলা সূর্য্যরে আলো ফোটার পর ভয়াবহ ঘটনার প্রকাশ পেতে থাকে। ঘেরাও দেয়া ওই বাড়িতে পুড়ে কয়লা হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় মৃতদেহগুলো। তিনটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল সেখানে। এতে ওই বাসার ছাদ উড়ে যায়। এখানে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে একজনকে মোহাম্মদ নিয়াজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে বর্তমানে নিষিদ্ধ ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াতের প্রথম সারির সদস্য। একই সঙ্গে সে মাথানিয়ার দেবর বা ভাসুর।
এ সম্পর্কে মাথানিয়া সিএনএনের কাছে বলেছেন, যদি ওই নারী ও পুরুষদের মৃতদেহগুলো না দেখতাম তাহলে আমার হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হতো না। যখন আমাকে বলা হলো ৬টি শিশু নিহত হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো আমার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কেউ হবে। ওই বাড়িতে থাকতেন ৫ জন নারী। তারা হলেন আমার তিন ভাইয়ের বউ, আমার ছোটবোন ও মা। সব মিলিয়ে সেখানে ছিল সাতটি শিশু।
মাথানিয়া আরো বলেছেন, তার ভাই জাহরান হাশিমের স্ত্রী ও মেয়ে আহত হয়েছেন। তারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তারা বলেছে, শুক্রবার একটি বাড়ি ঘেরাও দেয়ার সময় আহত একজন নারী ও একটি শিশুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
শুক্রবারের অভিযানের সময় যখন বন্দুকযুদ্ধ হয় তখন আহত এক সন্দেহভাজন মোটরসাইকেলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আরো একজন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী পালিয়ে গেছে বলে আশঙ্কা শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর। কর্তৃপক্ষ শুক্রবার প্রথমদিকে বোমা তৈরির জন্য বিয়ারিংয়ের এক লাখ বল, আইসিসের পোশাক ও পতাকা উদ্ধার করেছে একটি গ্যারেজ থেকে। আইএস শ্রীলঙ্কা হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে এখনও হামলাকারী ও জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের মধ্যে সম্পর্ক থাকার বিষয়টি প্রমাণিত নয়। সরকার মনে করছে, হামলা চালিয়েছে ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াত। তবে এই গ্রুপটি হামলার দায় স্বীকার করে নি।

জলবায়ু পরিবর্তনে কোন ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে কড়া সতর্ক করেছেন দুই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান। যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কার্নি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ফ্রাঙ্কো ভিলেরোয় দে গালাউ এক খোলা চিঠিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে অশনিসংকেত দিয়েছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, যদি কোনো কোম্পানি বা শিল্প এই নতুন জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে।
এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন জলবায়ুভিত্তিক সংস্থা নেটওয়ার্ক ফর গ্রিনিং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমের (এনজিএফএস) প্রধান। এনজিএফএস ২০১৭ সালে গঠিত ৩৪টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি জোট। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে গত বুধবার প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই সংস্থা। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
গত বুধবার ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকে ওই চিঠি প্রকাশ করা হয়। এতে কার্নি ও ভিলেরোয় দে গালাউ ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়মূলক প্রভাব’ বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এর মধ্যে বিশ্বের ওপর পড়তে শুরু করেছে। যেমন উত্তর আমেরিকার দাবদাহ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঝড়, আফ্রিকায় ও অস্ট্রেলিয়ার খরা। তাঁরা বলছেন, এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অবকাঠামো ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যে, কমছে উৎপাদনশীলতা এবং ধ্বংস হচ্ছে সম্পদ।
এনজিএফএস এই ঝুঁকিকেই তাদের প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। ‘কল টু অ্যাকশন’ ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ব্যাপক অভিবাসন সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের মতো বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথা চিন্তা করেই ২০১৫ সালে বিশ্বনেতারা প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৩ দশমিক ৬ ফারেনহাইট) নিচে রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তাঁরা। তবে প্রতিটি দেশই আলাদা আলাদা ঝুঁকিতে আছে।
তিন ধরনের ঝুঁকির কথা বলছে এনজিএফএস। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি ও সরকারকে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। এক, শারীরিক ক্ষতি—এই ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে আমরা দেখতে পাই। যেমন ঝড়, খরায় ব্যাপক শস্যহানি ঘটে। দুই, অবস্থার পরিবর্তন—যখন কোনো ব্যবসাকে হঠাৎ করে কার্বন ঘনীভূত শিল্প ও প্রযুক্তি থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বা নষ্ট করে ফেলা হয়, তখন ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ে ওই প্রতিষ্ঠান। তিন, দায়বদ্ধতা—যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির মুখে পড়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করে, তখন বিমা কোম্পানিগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে।
কার্নি ও ভিলেরোয় দে গালাউ তাঁদের চিঠিতে আরেকটি বিশেষ ঝুঁকির কথা বলেছেন, সেটি হলো যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই সবুজ অর্থনীতিতে স্থানান্তর হওয়া। তাঁরা বলেন, কার্বন নিঃসরণ ২০১০ সালে যে অবস্থায় আছে, আগামী এক দশকের মধ্যে তার থেকে ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ এটি শূন্য শতাংশে পৌঁছাবে। আর জন্য মূলধনের পুনঃস্থাপন করতে হবে।
এনজিএফএস বলছে, যখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, একটি আকস্মিক পরিবর্তন আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির ওপর বিস্তৃত প্রভাব ফেলে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানেরা পরামর্শও দিয়েছেন। কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিনের কাজ তত্ত্বাবধান করে, আর্থিক স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক ঝুঁকিগুলোর পর্যবেক্ষণ করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন তাঁরা।

‘পাশার’ কিকে ‘ড্রাগন’ কুপোকাত by আনোয়ার পারভেজ

প্রাণপণে লড়ছে দুটি মোরগ। একটির নাম ড্রাগন, অন্যটি পাশা। ড্রাগন এই পাশাকে উড়ুক্কু লাথি (ফ্লাইং কিক) মারছে তো পাশা ফের পাল্টা আঘাত হানছে। কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। ডানা ঝাপটে ধুলো উড়িয়ে মোরগ দুটি লড়াইয়ে মগ্ন। দর্শকেরাও উত্তেজনার তুঙ্গে। ‘শাবাশ’ বলে বাহবা দিচ্ছেন, চলছে হাততালি আর শিস। লড়াই শেষে ‘ড্রাগনের’ হার, ‘পাশার’ জিত। বগুড়ার শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার অদূরে ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই।
লড়াই শেষে চ্যাম্পিয়ন হয় সাদা রঙের পাশা নামের মোরগটি। মোরগের মালিক নয়নের হাতে তুলে দেওয়া হয় ২১ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন। রানার আপ লাল–কালো রঙের ড্রাগন নামের মোরগের মালিক পারভেজ পেলেন সাউন্ডবক্স। ‘বাংলার মুখ’ বগুড়া শাখার উদ্যোগে এই মাঠেই বসে সাত দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। মেলায় প্রতিদিনই লাঠিখেলা, সাপখেলা, বানর খেলাসহ লোকজ ঐতিহ্যের নানা খেলার আয়োজন থাকছে।
মোরগ লড়াইয়ে অংশ নেয় নানা রঙের ২০টি তেজি আসিল মোরগ। গ্রামীণ এই ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই দেখতে মেলার মাঠে ভিড় করেন হাজারো দর্শক।
কারাতে, কুংফু ও মার্শাল আর্টের নানা কায়দা-কানুনের মতো এ লড়াইয়ে একেকটি দুর্ধর্ষ লড়াকু মোরগ নিজস্ব স্টাইলের ফ্লাইং কিক করছিল। কয়েক শতকের পুরোনো এই মোরগ লড়াই এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। এই খেলায় পালানোর কোনো পথ নেই। জিততে হলে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হয়।
মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়ার বৈশাখী মেলায় মোরগ লড়াইয়ের আয়োজন এখন রীতিমতো ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। ৩৮ বছর ধরে বৈশাখী মেলায় মোরগ লড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈশাখী মেলায় এই লড়াইকে সামনে রেখে কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয় মোরগকে তেজি করে তোলার তোড়জোড়। লড়াইয়ের জন্য অনেকেই তেজি মোরগ পুষে প্রশিক্ষণ দেন। লড়াকু মোরগকে পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত গোসল এবং চিকিৎসাও দেওয়া হয়।
আয়োজকেরা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের দেওয়ান বংশ একসময় ভারত থেকে এই আসিল মোরগ নিয়ে আসে। আগেকার দিনের রাজা-বাদশাহরা এটিকে পুষতেন বলে একে রাজকীয় মোরগও বলা হয়।
শোনা যায়, টিপু সুলতান, সম্রাট আকবরসহ অনেক রাজা এই মোরগ শখ করে পুষতেন। এদের লড়াই দেখাটাকে বিনোদনের অংশ হিসেবে নিতেন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, জাপানেও এই খেলার প্রচলন রয়েছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মোরগ লড়াইয়ের জন্য ১২ ফুট বাই ১২ ফুট স্কয়ার জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঝখানে ছয়টি মোরগ নিয়ে বসেছেন তাদের মালিকেরা। লড়াইয়ে এক মোরগকে অন্য মোরগের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ করে তুলে মল্লযুদ্ধ বাঁধিয়ে দিচ্ছিলেন মালিকেরা। এ পর্যায়ে হার-জিতের মধ্য দিয়ে খেলা শেষ হয়।
লড়াইয়ে কোনো মোরগ যখন কুলিয়ে উঠতে পারছে না, তখন সে দৌড়ে পালায়। এভাবে তিনবার দৌড়ে সীমানার বাইরে চলে গেলে সেই মোরগ পরাজিত ধরা হচ্ছে। কোনো কোনো মোরগ খুব জেদি। লড়াইও করে না, আবার পালিয়েও যায় না। মাঠেই মোরগটি বসে থাকে। নিয়মানুযায়ী, কোনো মোরগ হাঁটু গেড়ে বসলে এবং সেই বসার সময় এক মিনিট অতিক্রম করলে সেই মোরগ পরাজিত বলে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো মোরগ দৌড় দিচ্ছে না, বসেও পড়ছে না এবং লড়াইও করছে না। ওই মোরগকে প্রতিদ্বন্দ্বী মোরগ আক্রমণ করছে। নিয়মানুযায়ী, আক্রমণের শিকার কোনো মোরগের মাথার ঝুঁটি ১০ সেকেন্ডের বেশি নুয়ে থাকলে, তাকে পরাজিত ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। পরপর তিনবার পরাজিত হলে লড়াইয়ে অন্য মোরগটিকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।
বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী এই মোরগ লড়াইয়ের আয়োজক ও বৈশাখী মেলা কমিটির আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খান বলেন, এবার আসিল মোরগ লড়াইয়ে ২০টি মোরগ অংশ নিয়েছে। সব কটি লড়াকু মোরগের জাত ভারতীয়। দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতিটি রাউন্ডে লড়াই সময় ১৫ মিনিট। ফাঁকে ৫ মিনিট করে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়েছে লড়াকুদের। পরে সর্বোচ্চ পয়েন্টের ভিত্তিতে চূড়ান্ত লড়াইয়ে পাশা ও ড্রাগন ফাইনালে ওঠে। খেলা শেষে পাশা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। গতবারের চ্যাম্পিয়ন ‘টাইগার’ ও রানার আপ ‘সুলতান’ এবার প্রথম রাউন্ডেই ধরাশায়ী হয়েছে।
চ্যাম্পিয়ন পাশার মালিক নয়ন বলেন, বৈশাখী মেলায় মোরগ লড়াই দেখেই তাঁর লড়াকু মোরগ পোষার ইচ্ছে জাগে। বছরখানেক আগে সাদা জাভা ভারতীয় জাতের এই মোরগ কেনেন। নাম দেন পাশা। এক বছর ধরে দুর্ধর্ষ লড়াইয়ে পারদর্শী করে তোলেন পাশাকে। তাঁর মোরগটির বাজারমূল্য এখন ৩০ হাজার টাকা বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে রানার আপ ড্রাগনের মালিক পারভেজ বলেন, আট হাজার টাকায় এক বছর আগে ড্রাগনকে কেনেন তিনি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে পরাজিত হয়েছে ড্রাগন। এ কারণে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও আফসোস নেই তাঁর।

বিচার না পেয়ে কেঁদেছি, আর কেউ যেন না কাঁদেন: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা চাই প্রতিটি মানুষ ন্যায়বিচার পাক এবং সেই ব্যবস্থাটা যেন চালু হয়। আমরা যেমন বিচার না পেয়ে কেঁদেছি, আর কাউকে যেন এভাবে কাঁদতে না হয়। সকলে যেন ন্যায়বিচার পেতে পারে, সেটাই আমরা চাই।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ রোববার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৯’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে খুন, অগ্নিসন্ত্রাস, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা এবং ধর্ষণের মতো মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘খুন, অগ্নিসন্ত্রাস, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা, ধর্ষণ ও নানা ধরনের সামাজিক অনাচার চলছে। এগুলোর বিচার যেন খুব দ্রুত হয়, এদের কঠোর শাস্তি হয়। যাতে এর কবল থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পেতে পারে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে এমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো বৈষম্য থাকবে না। জনগণ মৌলিক অধিকারসমূহ ভোগ করে নিজেরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিটি মানুষ ন্যায়বিচার পাক এবং সেই ব্যবস্থাটা যেন চালু হয়। কারণ, আমরা চাই না ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের কারণে আমরা যেমন বিচার না পেয়ে কেঁদেছি, আর কাউকে যেন এভাবে কাঁদতে না হয়। সকলে যেন ন্যায়বিচার পেতে পেতে পারে, সেটাই আমরা চাই।’ তিনি বলেন, ‘অনেক মামলার দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রয়েছে, কেন যে আটকে রয়েছে, তারা নিজেরাও জানে না। তাদের দোষটা যেমন কেউ কেউ জানে না, তেমনি কীভাবে আইনগত সহায়তা নিতে পারে, তা-ও জানা নেই। সেই বিষয়টা দেখার জন্য আমরা ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং আমার মনে হয়, আইন মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।’
সম্পত্তি আইন অনুযায়ী দাদার সম্পত্তির বিষয়ে বাবা গত হলে তাঁর কন্যা ওয়ারিশরা যেন পুত্রসন্তানের ন্যায় অংশ ভাগ পায়, সেটা নিশ্চিত করার জন্যও প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিচারপতি এবং বিচারকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে আমাদের সামনে বিচারপতি বা অন্য সকলে রয়েছেন। তাঁদের আমি অনুরোধ করব। হ্যাঁ, আমাদের ইসলাম ধর্ম বা মুসলিম আইন (শরিয়াহ আইন) মানতে হবে, এটা ঠিক। কিন্তু কেবল শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে মা-মেয়েকে বঞ্চিত করে বাবার সম্পদ যে তাঁদের কাছ কেড়ে নেওয়া হয়, তার কোনো সুরাহা করা যায় কি না, আপনারা দয়া করে একটু দেখবেন। এটা করা দরকার।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেখানে মেয়ে-ছেলে না লিখে যদি সন্তান লিখে দেওয়া যায়, তাহলে সন্তান ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক, তার ভাগটা তো অন্তত সে পাবে। এর জন্য একটা উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’ তিনি আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, এটা বলতে গেলে অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ এবং মাওলানা এর বিরোধিতাও করতে পারেন। তবে তিনি এ বিষয়ে অনেক ধর্মীয় নেতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন; যাঁরা এই মেয়েদের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। দেখা গেছে, তাঁদের অনেকেরই ওয়ারিশ কেবল কন্যাসন্তান বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত আইনমন্ত্রীসহ সবাইকেই এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁদের ওয়ারিশ হিসেবে কন্যাসন্তান রয়েছে, তাঁরা আমৃত্যু যেন সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন এবং তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের কন্যারা যেন পৈতৃক সম্পত্তির ওপর নিজের অধিকার পায়।’ তিনি বলেন, ‘যদিও ইসলাম একমাত্র ধর্ম, যেখানে মা-বাবা মারা গেলে কন্যাসন্তানকে তাদের সম্পত্তির অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। তারপরও তারা অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়। কারণ, ভাইয়েরা দিতে চায় না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার একজন বিচারক। যিনি আইনসিদ্ধভাবে কীভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সহযোগিতা করেন। এর ফলে বিচারপ্রার্থী জনগণ মামলাজটের কবল থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাবে।’
‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সংশোধনী) আইন ২০০৯’ পাসের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের কাজটিকে স্থায়ী রূপ প্রদান করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের জন্য সাধারণ মানুষের চাপ সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলার বিচার সাধারণ আদালতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, সাধারণ আদালতে হবে এবং আদালত যে রায় দেবেন, আমরা মেনে নেব। আমরা আদালতের রায় মেনে নিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২০ সালে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা দারিদ্র্যমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত আলোকিত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করব, ইনশা আল্লাহ।’
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব এ এস এস এম জহুরুল হক এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। মানিকগঞ্জ ও কুমিল্লার দুজন উপকারভোগীও অনুষ্ঠানে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৯’ উপলক্ষে বেসরকারি সংস্থা, প্যানেল আইনজীবী এবং লিগ্যাল এইড—এই তিন ক্যাটাগরিতে বিশেষ সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।

সামনে চ্যালেঞ্জ!

কিছুদিন পর পর প্রশ্ন ওঠে কোথায় চলেছে বাংলাদেশ? এরশাদ আমলে বলা হতো, অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এরকম প্রশ্নের মধ্যে জিডিপি স্বাস্থ্যবান হয়। জাতির ললাটে মধ্যম আয়ের দেশের তকমা লাগে। গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন সোয়া ৫ হাজার টাকা  থেকে আট হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। 
এমনকি নাগরিকদের আয়ুষ্কালও বেড়ে যায়। এটা একটা বাস্তবতা। কিন্তু এটাই  শেষ নয়।
কারণ প্রশ্ন উঠছে, শান্তি  কোথায়? টাকা পয়সা বাড়ছে, শান্তি বাড়ছে কিনা। টাকা দিয়ে প্রতিদিন যত খাবার, ফলমূল, শাকসবজি তারা কিনছে, সেসবে  ভেজাল এতটাই ভয়াল ও কুটিল হয়ে উঠছে যে, তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। খাদ্যদ্রব্য সেফ নয়, জেনেও মানুষ তা এড়াতে পারছে না। কারণ তার সামনে  কোনো বিকল্প নেই। রমজান আসছে। মানুষ খাদ্যদ্রব্যের বিষয়ে বাড়তি সংবেদনশীল হবেন। যত্ন ও সতর্কতা থাকবে, ভেজালমুক্ত খাবার কেনা ও তা আহারের। কিন্তু তার সামনে বিকল্প সীমিত।
সবশেষ টিআইবি’র নতুন গবেষণা বলছে, ওয়াসার পানি পানে ঢাকার ৬৩ ভাগ মানুষ ডায়রিয়ায় ভোগে। জন্ডিসে ৩৪, চর্মরোগে ৩৭, টাইফয়েডে ১৯ ও কলেরায় আরো ১৩ শতাংশ মানুষ যে ভোগে তারও পেছনে ঢাকা ওয়াসার দূষিত পানি। এরকম একটি ভয়াবহ খবরের পর উন্নত বিশ্ব হলে হুলস্থূল কাণ্ড ঘটে যেত। কিন্তু বাংলাদেশ নীরব থাকে। কারণ তার সামনে কোনো বিকল্প নেই। পানি খেলেও মরণ, না  খেলেও মরণ। দুটির মধ্যে তফাৎ হলো, পানি খাওয়া বন্ধ করে দিলে তাৎক্ষণিক মরণ, আর খেলে তিলে তিলে নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাওয়া।
তাই কে কোথায় নিরাপদ, আর কে অনিরাপদ, সেটা কমবেশি প্রতিটি  পরিবারের জিজ্ঞাসা। ঘরে থাকলেও নিস্তার  নেই। রাস্তায় বেরুলেই দুর্ঘটনায় কারো অঙ্গহানি, প্রাণহানি ঘটতে পারে। কিন্তু  কোথাও যেন কারো কিছুই দেখার নেই। আইনের অভাব নেই। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভাব নেই। লোক-লস্করের অভাব  নেই। তাদের বর্ধিত বেতন-ভাতার অভাব  নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত আক্ষেপ করে বলেছেন, এত বেশি বেতন-ভাতা  দেয়ার পরেও জনপ্রশাসনের সদস্যরা দুর্নীতি করছেন কেন?
রাস্তায় আবরাররা মরছে। চকবাজারে, এফ আর টাওয়ারে মানুষ পুড়ে মরছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নুসরাতদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও অতি বড় অপরাধের পরেও দ্রুত বিচারের ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে না। কেউ কেউ মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অন্যকিছু অপরাধের বিচারের দ্রুততা এবং সেই বিষয়ে জনগণের সামনে প্রতি ঘণ্টায় হালনাগাদ তথ্য প্রদানে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গের উৎসাহের দিকটি এ প্রসঙ্গে স্মরণে রাখছেন। 
প্রতিদিন রাস্তায় ২০ জনের মতো মানুষ প্রাণ হারায়। কত মানুষের অঙ্গহানি ঘটে, তা জানা যায় না।
সবাই জানেন, বাংলাদেশ এনালগে নেই। আছে ডিজিটালে। কিন্তু কোন কারণে কত মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে, তার পরিষ্কার হিসাব কোথাও কেউ প্রকাশ করে না।  কেউ রাখে না। যেমন, পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইট। এখানে ধর্ষণের পরিসংখ্যান নেই। ধর্ষণ করে কত নারীকে প্রতিবছর হত্যা করা হয়, কিংবা কতগুলো গণধর্ষণ ঘটে, তার কোনো পরিসংখ্যান  নেই।
বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটে সড়কে দুর্ঘটনা সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পরে ২০১৮ সালের সড়ক আইন পাস হলো। এই আইনে ভয়ঙ্কর বিধান করা হয়েছে যে, মানুষের জীবনের দাম মাত্র তিন লাখ টাকা। অবহেলাজনিত কারণে দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটলে আদালত ঘাতক চালককে কোনো জেলদণ্ড না দিয়ে শুধু তিন লাখ টাকা জরিমানা করতে পারেন।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, সড়কে গড়ে ২০ জন মানুষ হত্যা এবং তাদের জীবনের দাম জাতীয় সংসদ যেদেশে মাত্র তিন লাখ টাকা নির্দিষ্ট করে আইন পাস করতে পারে,  সেই দেশের উচ্চ আদালত কতিপয় ক্ষেত্রে  বেশি অঙ্কের ক্ষতিপূরণ নির্দিষ্ট করে দিলেই পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি কিংবা বেপরোয়া মালিক-চালকদের রাশ টানতে তা কার্যকর হতে পারে না। ক্ষতিপূরণ আদায়ের হাতেগোনা কিছু উদাহরণ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সড়ক হত্যাকাণ্ডের তুলনায় বিচারের পরিসংখ্যান অত্যন্ত ধূসর। মিশুক মুনির ও তারেক মাসুদ হত্যাকাণ্ডের দায়ে একজনের যাবজ্জীবন হয়েছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে। ক্ষতিপূরণের সাড়ে চার  কোটি টাকা করে তাদের প্রত্যেকের পরিবার কবে পাবে, তা কারো জানা নেই। সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর পরিবার তো আইনি লড়াইয়ে জিতেও ক্ষতিপূরণের টাকা পেলো  না।
কিন্তু  ঘরে-বাইরে মৃত্যু ও বিচারহীনতার এত হাতছানির মধ্যেও মানুষ তাই বলে ঘরে বসে থাকে না। থাকতে পারে না। সবাই দেখে, মানুষ ছুটছে। আয় করছে। আয় বাড়ছেও অনেকের। অল্প মানুষের বাড়ছে রকেট গতিতে। স্বীকৃতমতেই চার লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়ে গেছে  দেশ থেকে। যারা লুটপাট করছেন, তাদের ভরসা নেই বাংলাদেশের জলবায়ুতে। তাই তারা টাকা সরিয়ে নিচ্ছেন।
সাবেক মন্ত্রী ও মহাজোট সরকারের  হেভিওয়েট নেতা রাশেদ খান মেনন সম্প্রতি সংসদে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে অতি ধনী চীনের থেকেও বেড়েছে। দেশের শীর্ষ ৫ শতাংশ ধনীর সম্পদ ১২১ গুণ  বেড়েছে। অন্যদিকে সব থেকে গরিব ৫ শতাংশের কাছে থাকা মাত্র ১ শতাংশ সম্পদ চার ভাগের এক ভাগের কমে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও বছরে ৮ লাখ করে বেকার বাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতির জন্য বিরাট হুমকি।’  
কিন্তু এটাও ঠিক যে, বাংলাদেশের ছবিটি শুধুই মলিন নয়। গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে আস্থাহীনতার মধ্যেও অনেকগুলো ফ্লাইওভার জটের মধ্যে রাজধানী ঢাকায়  মেট্রোরেল নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রকল্প ভবিষ্যতে কতটা কি বর্তমানের অসহনীয় যানজট (গুগলের সাবেক একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলীর নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পাঠক জরিপ বলেছে, বাংলাদেশেই এখন যানজটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন) থেকে দীর্ঘমেয়াদে পরিত্রাণ  দেয়, তা অনিশ্চিত।
নীরবে মেট্রোরেলের কাজ এগুচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেই যানজট মিটে যাবে, এমন আশ্বাস হাঁকডাক দিয়ে নাগরিকদের  কেউ দিচ্ছে না।
অন্যদিকে আরেক বহুল আলোচিত মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতুর মূল প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে বাস্তব ব্যয় শনৈ শনৈ বৃদ্ধির মধ্যে এটির নির্মাণ চলছে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রাশানদের থেকে ভারতীয় ব্যবস্থাপনায় উতরে গেছে কোনো বিতর্ক ছাড়াই। কক্সবাজার অঞ্চলে ২৫টির বেশি মেগা প্রকল্পে তিন লাখ কোটি টাকা খরচের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে এবং তার বাস্তবায়ন এগিয়ে চলেছে। এবিষয়ে কক্সবাজারের একজন সংসদ সদস্য সম্প্রতি একটি জনসভায় নির্দিষ্টভাবে তথ্য  দেন। কিন্তু যখন তার কাছে নির্দিষ্ট ভাবে জানতে চাওয়া হয়, প্রকল্পের মোট খরচের কত অংশ গত ৫ বা ১০ বছরে  ব্যয় করা হয়েছে, তখন তিনি ৫ থেকে ১০ হাজার  কোটি টাকার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এটা ঠিক দেশে একসঙ্গে মোটামুটি অনেকগুলো বৃহৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলছে। যা বাংলাদেশ আগে দেখেনি।    
কিন্তু কেউ কেউ যেটা দেখছে না, সেটা হলো নাগরিকরা শান্তিতে নেই। স্বস্তিতে  নেই। একটা ভয়, একটা উদ্বেগ, একটা অশান্তি তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। অনেকের দাবি, সর্বত্র সুশাসনের ঘাটতি প্রকট হচ্ছে। 
সামাজিক নিরাপত্তা তলানিতে। সড়কে, ইমারতে, মাদরাসার ছাদে সর্বত্র মৃত্যুর ভয়াল থাবাগুলো ওত পেতে আছে।  ব্যাংকগুলোতে যা ঘটে চলেছে, তাতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আস্থা কি দিন দিন বাড়ছে নাকি কমছে? এর উত্তর সম্ভবত মুখ ফুটে বলা নিরর্থক। এক লাখ কোটির বেশি টাকা ঋণ  খেলাপিদের কব্জায়।  
অন্যদিকে নীরবে সমাজে রাজনীতির প্রতি মানুষের নিরাসক্তি বাড়ছে। জনসভার ধারণাই উবে যেতে বসেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কমছে।
প্রশাসন ও সংসদ সহ সর্বত্রই নিরঙ্কুশ ধারণা জেঁকে বসেছে। গত ৩০শে ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং সন্দেহ-সংশয় ছিলই। তেমন কেউ আশা করেনি, বিএনপি সরকার গঠন করে ফেলবে। কিন্তু অনেকেই যা ভাবেন নি, সেটা হলো দেশের প্রধান বিরোধী দল ৩শ’ আসনের মধ্যে ১০টি আসনও পাবে না।
ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হলে কী হতে পারতো  সেটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার। কিন্তু বাস্তবতা হলো মধ্যরাত পেরোনো ফলটা সবাইকে মানতে হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের প্রশ্ন তুলে কোন লাভ নেই। সেলফ সেন্সরশিপে কাবু মিডিয়া। রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে আর ৪ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। গতবছর থাকা ১৪৬ তম থেকে এ বছর ৪ ধাপ পিছিয়ে ১৫০-এ নেমেছে বাংলাদেশ।
কিন্তু যে কারণে কেউ কেউ বলেন, সামনে  ঘোর বিপদ, সেটা দেশের বিরোধী দল  তৈরি করবে না। বিরোধী দল নির্মূল করতে গিয়ে কারো মতে রাজনীতি নির্মূল হচ্ছে কিনা। গত উপজেলা নির্বাচনে কোনো উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল না। এখন উৎসবে যোগ দিতে মাইকিং করতে হয়। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশের ছবি নয়।
দলের বিদ্রোহের সংজ্ঞা পাল্টাচ্ছে। এখানে আর শুধুই বিদ্রোহ নয়। এখন তা রূপ নিচ্ছে সশস্ত্র সংঘাতে, সশস্ত্র বিদ্রোহে।  
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত তিন মাসে  দেশে দৃশ্যত রাজনীতি না থাকলেও রাজনৈতিক সংঘাত থেমে নেই। এই তিন মাসে রাজনৈতিক মারামারিতে মারা গেছেন ২৩ জন। হাত-পা ভেঙে কিংবা গুলি খেয়ে হাসপাতালে গেছেন ১ হাজার ২৪ জন। এই সব ‘অংশগ্রহণমূলক কাইজ্যা’ হয়েছে মূলত সরকারপন্থি দলের নেতাকর্মীদের নিজেদের ভেতর।
গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের তিন মাসে কমপক্ষে ৯২টি রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে ১৪টি সংঘাত হয়েছে। এতে ১৯০ জন আহত ও ৪ জন নিহত হয়েছেন। যুবলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাত হয়েছে চারটি। এতে ২৭ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন। ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যেও চারটি সংঘাতে ১ জন নিহত ও ২২ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যুবলীগের সঙ্গে পুলিশের সংঘাতে ১ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন।
এভাবে বাংলাদেশে একটা সহিংস রূপান্তরকরণ চলছে। কারো মতে এটাই চ্যালেঞ্জ। আইনের শাসন ও সুশাসন বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসনে ও সমাজে প্রভাবশালীরা যার যার বলয় তৈরি করে নিচ্ছেন। সর্বশেষ অধ্যক্ষ সিরাজের  গ্রেপ্তারের পরে অনেকটা ঘোষণা দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে  কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পোড়ানোর ঘটনায় অনেকেই শঙ্কিত। তারা বলছেন, এটা একটা অশনিসংকেত। এটিকে এখনো পর্যন্ত একটি সাধারণ যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের প্রকাশ্য ও বেপরোয়া সমর্থনের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আততায়ীরা থানা পুলিশের কেয়ার কম করেছে। কেউ ভয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এটা একটা  ফেনোমেনার সূচনা কিনা? একটা বিভীষিকাপূর্ণ মডেল কিনা। আততায়ীরা জানতো, সাময়িক ঝামেলা হতে পারে, বিচার হবে না। সামাজিক মিডিয়ায় বিচার না হওয়ার আশংকাই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।
সব থেকে মোক্ষম প্রশ্নটি তুলেছেন মানবাধিকার  নেত্রী সুলতানা কামাল। বলেছেন, প্রতিটি যৌন নির্যাতনের মামলার আসামিদের বিচার শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হবে কিনা?
কেউ বলেন, এই প্রশ্নের মধ্যেই তিনি প্রকৃতপক্ষে ‘সামনে ঘোর বিপদের’ চিত্র এঁকে দিয়েছেন। কারণ এভাবে তো সমাজ চলতে পারে না।
তদুপরি কেউ কেউ বলছেন, এই সীমাবদ্ধতা, এইসব জ্বলন্ত প্রশ্ন, এইসব বাধা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ থামবে না। তারা বিশ্বাস করেন, তারা আশাবাদী থাকেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয় এমন একটি বিহীত ব্যবস্থা নেবেন, যাতে নাগরিকগণ শঙ্কামুক্ত হতে পারেন।

খাশোগি হত্যার বিচারে সৌদি রাজকীয় উপদেষ্টাদের একজন অভিযুক্ত অনুপস্থিত কেন!

বহুল আলোচিত সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সৌদি রাজপরিবার সংশ্লিষ্ট দু’জন উপদেষ্টা। তাদের একজনকে বলা হয় ‘মূলহোতা’। ওই হত্যায় ১১ সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে রুদ্ধদ্বার বিচার চলছে। কিন্তু সেখানে এই দু’জন উপদেষ্টার একজনকে অনুপস্থিত দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বিষয়টি নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে তাকে কি রাজপরিবার সুরক্ষা দিচ্ছে নাকি আলাদা কোন আদালতে তার বিচার হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সংস্থাটি বহু সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, গত বছর অক্টোবরে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি আরবের কনসুলেটের ভিতরে ওয়াশিংটন পোস্টের কলামনিস্ট জামাল খাসোগিকে হত্যা করা হয়। এ নিয়ে নানা রকম বক্তব্য দেয়ার পর সৌদি আরবের প্রসিকিউটররা বলেছেন, ওই হত্যা মিশন তদারকি করেছেন উপ গোয়েন্দা প্রধান আহমেদ আল আসিরি। তাকে পরামর্শ দিয়েছেন রাজকীয় আদালতের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সাউদ আল কাহতানি। এ দু’জনই ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের একেবারে ঘনিষ্ঠ। খাসোগি হত্যাকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এ মামলায় পাঁচটি শুনানিতে শুধু আসিরিকে দেখা গেছে আদালতে। এ তথ্য দিয়েছেন পশ্চিমা চার জন কর্মকর্তা।
এর মধ্যে একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিচার চলছে যে ১১ জনের বিরুদ্ধে তার মধ্যে কাহতানি নেই। তার এই অনুপস্থিতির অর্থ কি? সৌদি আরব কি তাকে সুরক্ষা দিতে উদগ্রিব নাকি তার বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে? কেউ জানে না।
১১ অজ্ঞাত সন্দেহভাজনের নামে গত নভেম্বরে অভিযোগ আনে সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউটর। এর মধ্যে এমন ৫ জন রয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডে তাদের মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে। এই বিচার প্রক্রিয়া চলছে। পুরোটাই শুনানি হয় আরবিতে। বিচার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫ সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়ার কূটনীতিকদের ও তুরস্কের কূটনীতিকদের আদালতে উপস্থিত থাকতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে তাদেরকে দোভাষী ব্যবহার করতে অনুমোদন দেয়া হয় নি। তা ছাড়া তাদেরকে স্বল্প সময়ের নোটিশে উপস্থিত থাকতে বলা হয়।
খাসোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে তার পরিবার সৌদি আরব সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেছে তার পরিবার। বিচারকাজ পর্যবেক্ষণের জন্য ওই পরিবারের একজন প্রতিনিধি একটি শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।
কর্মকর্তারা বলেছেন, যে ১১ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে তার মধ্যে রয়েছেন গোয়েন্দা বিষয়ক অপারেটিভ মাহের মুতরেব। তিনি ঘন ঘন ক্রাউন প্রিন্সের বিদেশে সফরসঙ্গী হতেন। আছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সালাহ আল তুবাইগি, সৌদি রয়েল গার্ডের সদস্য ফাহাদ আল বালাবি। এরা মৃত্যুদ-ের মুখোমুখি হতে পারেন। বিচারে বিবাদীদেরকে আইনজীবী নিয়োগের অনুমোতি দেয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে অভিযুক্তদের অনেকেই আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, অপারেশনের মূলহোতা আসিরির নির্দেশ অনুসরণ করেছেন মাত্র। এ বিষয়ে সৌদি আরবের তথ্য মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করে নি।

আমেরিকা ও বাহরাইনের কূটনীতিককে ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব!

ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের পাশাপাশি প্রতিবেশি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কিত এবং হস্তক্ষেপমূলক মন্তব্য করায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকা এবং বাহরাইনের কূটনীতিককে তলব করেছে।
ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আহমাদ আল শাহাফ গত শনিবার দেশটির আল সুমারিয়া টেলিভিশন চ্যানেলকে জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আল হাকিম মার্কিন চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স এবং বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার মন্ত্রণালয়ে তলব করেছেন। 
বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিদ বিন আহমেদ আল খালিফা সম্প্রতি তার টুইটার পেইজে যে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তাতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরাক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিদ ইরাকের প্রভাবশালী শিয়া আলেম মুকতাদা আল সদরের প্রতি নোংরা এবং অপমানসূচক মন্তব্য করেন। ইরাকের সাধারণ নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়ে মুকতাদা আল সদরের নেতৃত্বাধীন সাইরুন দেশটির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
মুকতাদা আল সদর বাহরাইনের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিদ তার টুইটার পেইজ অভিযোগ করেন। ইরাকের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদকে তিনি 'একজন বোকা এবং তাকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন।ইরান ইরাককে নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এক বিবৃতিতে ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যকে চরম আক্রমণাত্মক হিসেবে আখ্যায়িত করে এর নিন্দা জানায়। পাশাপাশি বাহরাইন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়।এছাড়া, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে কটুক্তির অভিযোগে ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে মার্কিন চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে।

খুন-ধর্ষণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

খুন, অগ্নিসন্ত্রাস ও ধর্ষণের মতো গুরুতর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, খুন,অগ্নি সন্ত্রাস, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা, ধর্ষণ ও নানা ধরণের সামাজিক অনাচার চলছে-এগুলোর বিচার যেন খুব দ্রুত হয়। এদের যেন কঠোর শাস্তি হয়। যাতে এর কবল থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পেতে পারে। তিনি বলেন, আমরা সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই যেখানে ধনী, দরিদ্রের কোনো বৈষম্য থাকবে না। জনগণ  মৌলিক অধিকারসমূহ ভোগ করে নিজেরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৯’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই প্রতিটি মানুষ ন্যায় বিচার পাক এবং সেই ব্যবস্থাটা যেন চালু হয়।
কারণ, আমরা চাই না ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের কারণে, আমরা যেমন বিচার না পেয়ে কেঁদেছি আর কাউকে যেন এভাবে কাঁদতে না হয়। সকলে যেন ন্যায় বিচার পেতে পারে সেটাই আমরা চাই । তিনি বলেন, অনেক মামলার দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রয়েছে, কেন যে আটকে রয়েছে তারা নিজেরাও জানে না। তাদের দোষটা যেমন কেউ  কেউ জানে না তেমনি কিভাবে আইনগত সহায়তা নিতে পারে তাও জানা নেই। সেই বিষয়টা  দেখার জন্য আমরা ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং আমার মনে হয়, আইন মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব এএসএসএম জহুরুল হক এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদানকারি সংস্থার পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
সম্পত্তি আইন অনুযায়ী দাদার সম্পত্তির বিষয়ে বাবা গত হলে তার কন্যা ওয়ারিশরা যেন পুত্র সন্তানের মতো অংশ ভাগ পায় সেটা নিশ্চিত করার জন্যও প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষকে দৃষ্টি দেয়ার পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিচারপতি এবং বিচারকদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, এইক্ষেত্রে আমাদের সামনে বিচারপতি বা অন্য সকলে রয়েছেন তাদের আমি অনুরোধ করবো। হ্যাঁ, আমাদের ইসলাম ধর্ম বা মুসলিম আইন (শরিয়া আইন) মানতে হবে, এটা ঠিক। কিন্তু কেবল শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে মা-মেয়েকে বঞ্চিত করে বাবার সম্পদ যে তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয় তাঁর কোন সুরাহা করা যায় কি না- আপনারা দয়া করে একটু দেখবেন। এটা করা দরকার।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেখানে মেয়ে-ছেলে না লিখে যদি সন্তান লিখে দেয়া যায় তাহলে সন্তান  ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক তাঁর ভাগটাতো অন্তত সে পাবে। এরজন্য একটা উদ্যোগ নেয়া দরকার। মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার মানুষই হয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি আপস-মীমাংসার অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। যাতে করে মৃত পিতার পরিবারের মেয়েরা সম্পদের যথাযথ ভাগ পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে জাতির পিতা বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত করেন। জাতিকে উপহার দিয়েছেন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও ন্যায়বিচারের এক অনন্য দলিল- বাংলাদেশের সংবিধান।
তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯০ জনকে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। একই সময়ে এ কার্যক্রমের আওতায় মোট ১ লাখ ৬৬৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিসারের মধ্যস্থতায় আপস মীমাংসার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে সর্বমোট ১৮ কোটি ৪৩ লক্ষ ২৪ হাজার ৩২৬ টাকা আদায় করে দেয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দাবি, প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন জাতিসংঘ কর্মকর্তা

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে ‘বিদেশীরা’ বাধা দিচ্ছেন মর্মে অভিযোগ তুলে পররাষ্ট্র মন্ত্রী তাদের ‘একহাত’ নিলেও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বললেন ভিন্ন কথা! তার দাবি জাতিসংঘের কোন সংস্থা বা ব্যক্তির এতে আপত্তি নেই। রোববার কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিকাব আয়োজিত সেমিনারে তিনি জাতিসংঘের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানান। ‘রোহিঙ্গা সংকট: সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান ভূমিকা’ শীর্ষক ডিকাব সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাসানচর সম্পর্কে না জেনেই অনেক বিদেশি গণমাধ্যম নেতিবাচক খবর দিয়েছে। এ সময় তিনি রয়টার্স এবং আলজাজিরার আগাম রিপোর্টের প্রসঙ্গ টানেন।
বলেন, কালই আমরা তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের কথা বলিনি। কিন্তু ওই সংবাদ মাধ্যমগুলো আচমকা খবর দিয়ে দিল ভাসানচর না-কী এখনও প্রস্তুত নয়। আমাদের চিন্তা ছিল কাজ শেষ হওয়ার পর সবাইকে দেখাবো, আলোচনা করবো। এর পর ১ লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তর করবো।
কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই রিপোর্ট হয়ে গেল। বলা হল ওই চর না-কী ঝুকিপূর্ণ! প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্বাস করি না জাতিসংঘের কেউ ভাসানচরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। কারণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের যে রিপোর্ট জমা পড়েছে তাতে ভাসানচর নিয়ে নেতিবাচক কিছু নেই। জাতিসংঘ প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে আশ্রয়দানের অব্যাহতভাবে প্রশংসা করেন। তারা বলেন, এই মুহূর্তে পৃথিবীতে অন্য কোনও দেশকে তারা কল্পনাও করতে পারেন না, যারা ১ মিলিয়ন বাস্তুচ্যুতকে আশ্রয় দিতে পারে। প্রতিমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে সরকার সঠিক পথেই আছে। নিরাপত্তা পরিষদে চীন মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিলেও দেশটি সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে এক ধরণের মধ্যস্থতা করছে সেটিও প্রতিমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট হয়।
তিনি জানান, সদ্য বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে নিয়ে বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আয়োজনে একটি বৈঠকও হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসাবে অংশ নেয়া জাতিসংঘের শরনার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টিভেন করলিস বলেন, ‘আমরাও মনে করি রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান।’ তবে ভাসানচর প্রশ্নে জাতিসংঘের ওই প্রতিনিধি নিজেদের অবস্থান খোলাসা করেননি। তিনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনটাই বলেননি। অনেকটা প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, ভাসানচর নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে, আরও আলোচনা হবে।
রাজধানীর ইস্কাটনস্থ বিস অডিটরিয়ামে ডিকাবের ওই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক প্রফেডর ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুটির আন্তর্জাতিকিকরণের পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের ৩ সচিব এতে উপস্থিত ছিলেন। ডিকাব প্রেসিডেন্ট রাহীদ এজাজ সেমিনারে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন। এ সময় সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম হাসিব মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

পাকিস্তানে বিমান হামলা : এবার নতুন কথা ভারতীয় বিমান বাহিনীর

কাশ্মিরের পুলামাওয়ায় ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর বহরের ওপর আত্মঘাতী হামলার জের ধরে ভারতীয় বিমান বাহিনী পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা চালায়। ওই সময় ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছিল, তাদের হামলায় 'জঙ্গিদের' আস্তানা ধবংস হয়েছে, অনেক লোক কিন্তু পাকিস্তান ওই দাবি নাকচ করে দেয়। পাকিস্তান বলেছিল, ভারতীয় বিমান বাহিনী আকাশসীমা লঙ্ঘন করলেও কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে পারেনি। তারা নির্জন বন এলাকায় বোমা ফেলেছে। আর পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে গেছে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমানগুলো। এর জবাবে পাকিস্তান বিমানবাহিনী অভিযান চালায়। এসময় আকাশযুদ্ধে অন্তত একটি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করা হয়। পাকিস্তানের ভেতরে ভারতীয় একটি মিগ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এর পাইলটও ধরা পড়ে পাকিস্তানের হাতে। পরে পাকিস্তান ওই পাইলটকে ফেরত দেয়।
ভারতীয় পক্ষ ওই সময় যে দাবি করেছিল, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এখন তারা তাদের দাবি পরিবর্তন করেছে। শুক্রবার ভারতীয় মিডিয়ায় বলা হয়, পরিকল্পনা বদলে যাওয়ায় তারা ওই হামলার ভিডিও করতে পারেনি।
কলকাতাভিত্তিক আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, সবটা পরিকল্পনামাফিক হয়নি। শেষ মুহূর্তে বদল করতে হয়েছিল ছক। আর তাই বালাকোটের 'জঙ্গি' ডেরায় হামলার ভিডিও নেই ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে। বিমানবাহিনীর রিপোর্টে এমনটাই জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে এক সংবাদ সংস্থায়।
ভারতীয় মিডিয়ার খবরে বলা হয়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বালাকোটে জৈশ-ই-মোহাম্মদের ডেরায় আকাশপথে হামলা চালায় বিমানবাহিনী। পুলওয়ামায় 'জঙ্গি' হামলার জবাব দিতেই ওই ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। কিন্তু তার পর থেকে বালাকোট নিয়ে বিতর্ক চলছেই। ‘হামলার প্রমাণ কই’ বলে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। সংবাদ সংস্থাটির দাবি, সম্প্রতি ভারতীয় বিমান বাহিনীর রিপোর্টে তার জবাব দেয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, সে দিন বালাকোটের 'জঙ্গি' শিবির ধ্বংস করতে ‘ক্রিস্টাল মেজ়’ নামে একটি ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র (আকাশ থেকে ভূমি) ছোড়ার কথাও ছিল। হামলার পাশাপাশি গোটা ঘটনা ভিডিও করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এই ক্ষেপণাস্ত্রটির। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি আর ছোড়া সম্ভব হয়নি। আর তাই সেনার হাতে ভিডিও নেই। কেবল উপগ্রহ চিত্র রয়েছে। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এই মুহূর্তে সেগুলোও প্রকাশ্যে আনা নিষেধ। ভবিষ্যতে আনা হবে কি না, তা-ও স্পষ্ট জানানো হয়নি।
রিপোর্টে বিমানবাহিনীর দাবি, ২৬ ফেব্রুয়ারি বালাকোটে বিমানবাহিনীর ‘মিরাজ ২০০০’ যুদ্ধবিমান বেশ কিছুটা নিচে নামে। তার পর সুযোগ বুঝে পাঁচটি ‘স্পাইস ২০০০’ পেনিট্রেটর গ্লাইড বোমা ফেলে। চারটি নিশানা ছিল ‘স্পাইস ২০০০’-এর। তিনটিতে গিয়ে আঘাত করে তা। একটিতে ফেলা হয়েছিল তিনটি বোমা। অন্য দু’টিতে একটি করে বোমা ফেলা হয়। কিন্তু ‘ক্রিস্টাল মেজ়’-এর মতো লাইভ ভিডিও করার ক্ষমতা নেই ‘স্পাইস ২০০০’-এর। তাই আকাশপথে' জঙ্গি' ডেরায় হামলা চালানোর ভিডিও নেই বিমানবাহিনীর কাছে।
বিমানবাহিনীর ওই সূত্রটি সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছে, সে দিন মেঘ অনেকটা নিচে ছিল। তার জন্যেই পূর্ব নির্ধারিতভাবে ‘স্পাইস ২০০০’-এর সঙ্গে ছ’টি ‘ক্রিস্টাল মেজ়’ উৎক্ষেপণ করা যায়নি। ঠিক ছিল একসঙ্গে হামলা করবে ‘ক্রিস্টাল মেজ়’ ও ‘স্পাইস ২০০০’। শিবিরের উপরের তলায় হামলা চালানোর কথা ছিল ‘ক্রিস্টাল মেজ়’-এর। নিচের তলায় আঘাত হানত অন্যটি। 'জঙ্গি' নিধনের পাশাপাশি শিবিরটিকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়া যেত তা হলে। জোড়া হামলা না হওয়ায় মিশন সম্পূর্ণ সফল হয়নি।
ও দিকে হামলার পরের দিনই ‘ইউরোপিয়ান স্পেস ইমেজিং’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যাড্রিয়ান জেভেনবার্গেন জৈশ শিবিরের কিছু ছবি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাতে হামলার কোনো চিহ্ন মেলেনি। বিতর্ক আরো ঘনীভূত হয়েছিল তাতে। প্রায় ‘অক্ষত’ শিবিরের জন্যও যে ‘ক্রিস্টাল মেজ়’ উৎক্ষেপণ করতে না পারাই দায়ী, রিপোর্টে সেই ইঙ্গিত।
আরো একটি বিষয় স্বীকার করে নিয়েছে ভারতীয় ভারতীয় বিমানবাহিনীর। রিপোর্টে বলা হয়েছে, কার্গিল যুদ্ধের পর থেকে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। তুলনায় ভারত কিছুটা পিছিয়ে। নিজেদের ঘাটতি দ্রুত সংশোধন করার প্রয়োজন রয়েছে। তারা জানিয়েছে, উপযুক্ত প্রযুক্তি হাতে থাকলে বালাকোটের পরে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হামলার সময়ে তাদের আরো শিক্ষা দেয়া যেত।

Sunday, April 28, 2019

শ্রীলঙ্কা হামলার 'মূলহোতা' জাহরান হাশিম আসলে কে? by জাহিদুল ইসলাম জন

শ্রীলঙ্কার আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলার সন্দেহভাজন মূলহোতা জাহরান হাশিম মোহাম্মদ। কাশিম মোহাম্মদ জাহরান নামেও পরিচিত সে। তাওহীদ জামাত নামে পরিচিত একটি স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা হাশিম। শ্রীলঙ্কা সরকারের সন্দেহ তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এনটিজে-ই রবিবারের সিরিজ হামলা চালিয়েছে। আইএস-এর পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, বাগদাদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে হাশিমের পরিকল্পনা মাফিক ওই হামলা হয়েছে।  এনটিজের হামলার সমন্বয় প্রক্রিয়া এবং সামরিক গ্রেডের বিস্ফোরক ব্যবহারের ধরণ দেখেও ধারণা করা হচ্ছে বিদেশি কোনও গ্রুপের সহায়তা পেয়েছে স্থানীয় ওই গ্রুপটি। শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিলের এক নেতার দাবি তিন বছর থেকেই হাশিমের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে আসছিলেন তিনি। তার সাথে দক্ষিণ ভারতের উগ্রবাদীদের সংশ্লিষ্টতাও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রবিবার (২১ এপ্রিল) খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ইস্টার সানডে উদযাপনকালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো ও তার আশপাশের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলসহ আটটি স্থানে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছে ৫০০ জনেরও বেশি।
হামলার পর সরাসরি দায়ী না করা হলেও স্থানীয় উগ্রবাদী গ্রুপ এনটিজেকে সন্দেহের শীর্ষে রেখে তদন্ত শুরু করে শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দারা। এক পর্যায়ে ওই উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে সরাসরি দায়ী করে দাবি করা হয়, হাশিম হামলার মূলহোতা।  আইএস-এর ছবি সম্বলিত বিবৃতিতে হামলাকারী হিসেবে যে ৮ জনের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে একমাত্র হাশমিকেই দেখা গেছে মুখ খোলা অবস্থায়। আইএস-ও তাকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে হাজির করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হাশিম। অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ারও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আইএসপন্থী সামাজিক যোগাযোগের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে হাজার হাজার অনুসারী যোগাড় করেছে সে। শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলমি আহমেদ দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, হাশিমের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড নিয়ে তিন বছর ধরে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে আসছিলেন তিনি। হাশমি তার কোরআন শিক্ষা ক্লাসে তরুণদের উগ্রবাদে আকৃষ্ট করছিলো বলে কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন তিনি। হিলমি দাবি করেন, ঘৃণাবাদী বক্তব্য সম্বলিত তার সবগুলো ইউটিউব ভিডিও ভারত থেকে আপলোড করা হয়েছে। চেন্নাই অথবা বেঙ্গালুরুতে তার ঘাঁটি রয়েছে।
ভারতের সিএনএন নিউজ ১৮ প্রথম এই হামলায় হাশিমের সম্পৃক্ততার খবর সামনে আনে। সংবাদমাধ্যমটির দাবি করে  কলম্বোর ভারতীয় হাইকমিশনে হামলা হতে পারে বলে লঙ্কান পুলিশকে এপ্রিলের শুরুতে সতর্ক করে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দারা। আরেক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়, ছয় মাস আগে তামিল নাড়ু থেকেআটক এক আইএস ঘনিষ্ঠকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শ্রীলঙ্কায় হামলার তথ্য পায় তারা।
নিক্কি এশিয়ান রিভিউ-এর খবর অনুযায়ী, রবিবারের হামলার  কয়েক মাস আগে থেকে দক্ষিণ ভারত থেকে  সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছিলো হাশিমের কর্মকাণ্ড। 
ভারতীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে হাশিমের সম্পৃক্ততার বিষয়টি  নিবিড় তদন্তের আওতায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার দাবি, ওই সিরিজ বোমা হামলা নিয়ে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল তাদের কাছে। কলম্বোর হাতে তা পৌঁছে দেওয়া হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।