Saturday, March 7, 2015

বিভিন্ন আইনে বাধাগ্রস্ত দুর্নীতির তদন্ত by সাঈদ আহমেদ

প্রচলিত কয়েকটি আইনের ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি আদেশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত। এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে নির্বাচন কমিশন, সিএজি (কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল) অফিস ও বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট আইনের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকছে অথবা যথাসময় সরবরাহ করছে না। এসব প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতার কারণে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই দায়সারাগোছের অনুসন্ধান বা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য হচ্ছেন দুদক কর্মকর্তারা। এতে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আদালতে প্রমাণ করা যাচ্ছে না দুর্নীতির অভিযোগ। কৌশলে পার পেয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
দুদক সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪-এর ১৯(১)(ঘ) ধারায় পাবলিক রেকর্ড তলব করার ক্ষমতা দুদক কর্মকর্তার রয়েছে। যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দণ্ডবিধির ৪০৯ এবং ১০৯ ধারা এবং দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় দুদককে সহযোগিতা প্রদানে বাধ্য। ২০১৩ সালে সংশোধিত ‘দুদক আইনের প্রাধান্য’ অংশে বলা হয়, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা থাকুক না কেন এই আইনের বিধানাবলী প্রাধান্য পাইবে’। সংযোজিত এ ধারার কারণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আইনের ঊর্ধ্বে দুদককে সহযোগিতা প্রদানে বাধ্য বলে মন্তব্য করেন দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
কিন্তু নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, ব্যাংক, সিএজি অফিসের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ ও সাক্ষ্য প্রদানে গড়িমসি করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে কখনো ১৮৯১ সালের ‘ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স অ্যাক্টের ৫ ও ৬ (১) ধারা, ১৮৯৮ সালের ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউরের ৯৪ (১) ধারা এবং ১৮৭২ সালের ‘পাবলিক ডকুমেন্টস’ অ্যাক্টকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
১৮৯১ সালের ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স অ্যাক্টের ৫ ধারায় বলা হয়েছে ‘কেস ইন হুইচ অফিসার অব ব্যাংক নট কম্পেলেবল টু প্রডিউস বুকস’। এ ধারা অনুযায়ী গ্রাহকের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কোনো তথ্য ব্যাংক কর্মকর্তা সরবরাহ করতে বাধ্য নয়। একই আইনের ৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘ইন্সপেকশন বুকস বাই অর্ডার অব কোর্ট অর জাজ’ (বিচারক বা কোর্টের আদেশে বই পরিদর্শন)। তথ্য-প্রমাণের জন্য আবেদনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আদালত কিংবা বিচারকের লিখিত আদেশ দ্বারা নির্দেশিত আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য-প্রমাণ পেতে পারেন। অর্থাৎ আদালতের পূর্বানুমোদনের বাধ্যকতা রয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধান পর্যায়ে ব্যাংকের কাছে তথ্য-প্রমাণ চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে মতামত চেয়ে পাঠিয়ে দেয় তাদের আইনি শাখায়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আইন কর্মকর্তা দুদককে তথ্য প্রদানের পরিবর্তে ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্সের রেফারেন্সসহ আদালত কিংবা বিচারকের লিখিত আদেশ আনার পরামর্শ দেন। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা ছাড়াই ফিরে আসেন দুদক কর্মকর্তা।
আরও জানা গেছে, ২০১৩ সালে নবম জাতীয় সংসদের ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়ন প্রকল্পে টাইগার আইটি (বিডি) নামক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানে নামে দুদক। এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়। এ ব্যাপারে ধারাবাহিক যোগাযোগের এক পর্যায়ে গত বছর একাধিকবার ইসি সচিবালয়কে চিঠি দেন দুদকের উপপরিচালক মো. নাসিরউদ্দিন। ৩ মার্চ ইসির উপসচিব মো. সাজাহান খান পাল্টা চিঠিতে দুদককে কোনো সহযোগিতা না করে জানান, নির্বাচন কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে সংবিধানের ভাবমূর্তি জড়িত। পরে ওই অনুসন্ধানটি আর এগোয়নি।
দুদকের চাহিদাকৃত তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা দুদকের চিঠি পাওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম অভিযোগটি পর্যালোচনা করার। দুদকের চিঠির জবাবে বিষয়টি দুদককে অবহিত করেছি মাত্র। দুদকের তাগাদাপত্র হস্তগত হয়েছে। আমরা বলেছি, নিজেরাই তথ্য দেব। হয়তো সময় লাগবে।
এছাড়া পেট্রোবাংলার অধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২২১ কোটি টাকার দুর্নীতি অনুসন্ধানে ২৫ অডিটরকে গত বছরের ১২ মে তলব করে দুদক। উপপরিচালক শেখ ফাইয়াজ আলম স্বাক্ষরিত তলবি নোটিশে ওই বছর ১৮ ও ১৯ মে অডিটরদের দুদকে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু নোটিশকে উপেক্ষা করেন অডিটররা। তাদের পক্ষে ২৪ আগস্ট সিএজির পক্ষে ডেপুুটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল পাল্টা চিঠি দিয়ে বলেন, অডিটররা দুদকে হাজির হলে তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বিঘœ ঘটার আশংকা রয়েছে।
ডেপুুটি কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল ড. শ্যামল কান্তি চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালের ১৮ আগস্ট দুদক চেয়ারম্যান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিএজিসহ অডিট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে একাটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দুদকের মামলায় বক্তব্য প্রদান ও সাক্ষ্য প্রদানে নিরীক্ষা কাজে নিয়োজিতদের জড়িত না করার বিষয়ে একমত পোষণ করে উভয়পক্ষ। সিএজি কর্মকর্তারা দুদকে হাজির হতে বাধ্য নন- এমন মন্তব্য করে ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, দুদকের তদন্তে সহায়তা প্রদানে সরকারের অধীনস্থ কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সশরীরে সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি দুদক আইন-২০০৪ ও দুদক আইন (সংশোধনী)-২০১৩ কিংবা কোনো বিধিতেও উল্লেখ নেই। ওই চিঠির পর অডিটররা শেষ পর্যন্ত দুদকে হাজির হননি। তাদের সাক্ষ্যের অভাবে এখনও সম্পন্ন হয়নি পেট্রোবাংলার ২২১ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান।
তথ্য না দেয়া প্রসঙ্গে ড. শ্যামল কান্তি চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, দুদকের কার্যক্রমে আমরা সব সময়ই সহযোগিতা করে আসছি। আমরা যে চিঠি দিয়েছি সেটির জবাব এখনও পাইনি। আমরা তো রেকর্ডপত্র দিচ্ছি। কিন্তু তলব করলে আমরা যেতে পারব না। এটি হয় না। যদি সাক্ষ্য দিতে হয় তাহলে অডিটররা অডিট করবেন কিভাবে? ভীতি কাজ করবে। অডিটকে কেন সাংবিধানিক রাখা হয়েছে? যাতে ইনফ্লুয়েঞ্জ করতে না পারে। সারা বিশ্বে অডিটকে সাংবিধানিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি অডিট বিভাগের কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ থাকে তাহলে অফিসে এসে তার কাছ থেকে জানতে চাওয়া যেতে পারে। দুদকে ডেকে নিয়ে নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, কক্সবাজারের সরকারদলীয় এমপি আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন মামলার তদন্ত শুরু করে দুদক। তদন্তের এক পর্র্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি সরকারি ব্যাংকের কাছে বদির আর্থিক লেনদেনসহ কিছু রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তা দুদকের তদন্ত টিমের হাতে ধরিয়ে দেন ২০০৯ সালের ২৩ জুন জারিকৃত দুদকেরই একটি অফিস সার্কুলার। ওই সার্কুলারে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে রেকর্ডপত্র সরবরাহ না করার অনুরোধ জানানো হয়। দুদকের তৎকালীন সচিব খোন্দকার আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত অফিস আদেশটিতে বলা হয়, ১৮৯১ সালের ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স অ্যাক্টের ৫ ও ৬ (১) ধারা এবং ১৮৯৮ সালের কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সিআরপিসি বা ফৌজদারি কার্যবিধি )’র ৯৪ (১) ধারা এবং পেনাল কোড বা দণ্ডবিধির ৪০৩, ৪০৬, ৪০৮ এবং ৪০৯, ৪২০, ৪২৪ ধারায় সংঘটিত অপরাধের অনুসন্ধানে দলিলাদি সরবরাহে আদালতের পূর্বানুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
দুদক সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সিআরপিসির ৯৪ (২) ধারায় ‘অন্যান্য ক্ষেত্রে’ দলিলাদি প্রদানের কথা বলা হয়েছে। ‘অন্যান্য ক্ষেত্র’ বলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক), আয়কর বিভাগের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং কোর্ট আদেশের কথা বলা হয়েছে। দুদকের কথা বলা হয়নি। ফলে আমানতকারী/হিসাবধারীর হিসাব সংক্রান্ত কোনো তথ্য দুদক পাচ্ছে না। তবে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষেত্রে সিআরপিসি ৯৪ (১), (২) কোনো বাধা নয় বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নিজেদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দাবি করে হয়তো দুদকের কার্যক্রমকে বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সহযোগিতা করছেন। আর দুদক আইনকে অন্য আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে দুদকের এ কমিশনার বলেন, অফিস আদেশ কখনো আইনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। যে অফিস সার্কুলারের দোহাই দিয়ে তথ্য-প্রমাণ দেয়া হচ্ছে না সেটি বাতিল করা হয়েছে দেড়বছর আগে। তবে বাতিলকৃত আদেশটি সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দুদক সচিবের। সেটি তিনি করেছেন কিনা আমার জানা নেই।
অনুসন্ধান ও তদন্তে দুদকের আইনি প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উদ্ভুত সংকটগুলোর এডহক ভিত্তিক সমাধানের চেষ্টা, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে পরিণামদর্শিতা, গবেষণার অভাব, আমলা নির্ভরতার ফলেই তথ্য-উপাত্ত প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে চূড়ান্তভাবে দুর্নীতিবাজরাই পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এটি দূর করতে দুদক আইন আরও সংশোধন করা প্রয়োজন।

দুই শিবিরেই দুশ্চিন্তা by আবদুল্লাহ আল মামুন ও হাবিবুর রহমান খান

টানা ৬০ দিনের অবরোধে দুশ্চিন্তায় পড়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ক্ষমতাসীনদের ধারণা ছিল আইনশৃংখলা বাহিনীর নেয়া কঠোর পদক্ষেপে অবরোধ থেকে পিছু হটবে বিএনপি। অন্যদিকে টানা অবরোধ ও থেমে থেমে হরতাল কর্মসূচিতে সরকার কিছুটা নমনীয় হয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে বলে ধারণা ছিল ২০ দলীয় জোটের। কিন্তু জাতিসংঘসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ ও বিশিষ্টজনদের নেয়া নানা উদ্যোগের পরও অপরিবর্তিত রয়েছে অস্থিতিশীল অবস্থা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পরবর্তী করণীয় নিয়ে সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ কষতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের চলমান কর্মসূচি ২ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো দাবি আদায় করতে পারেনি তারা। সরকার আগের অবস্থানেই অনড়। সরকারের পক্ষ থেকে নাশকতার দায় ২০ দলীয় জোটের ওপর চাপানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ প্রায় ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি নেতাকর্মী। সেই সঙ্গে প্রায় নিয়মিতভাবে কথিত বন্দুকযুদ্ধের শিকার হচ্ছেন অনেকে। সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ এখনও অব্যাহত রয়েছে। এমন অবস্থায় বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেকটাই পর্যুদস্ত। টানা কর্মসূচিতে অনেকের মাঝে ভর করেছে ক্লান্তির ছাপও। তারপরও আন্দোলনে কোনো ফল ছাড়া পিছু না হটার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বিএনপি।
অন্যদিকে বারবার অভয় দিয়েও সরকার জনজীবন স্বাভাবিক করতে পারেনি। পেট্রলবোমা ও আগুনে মানুষের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আমদানি-রফতানি, ব্যবসা-বাণিজ্য এক প্রকার বন্ধ। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। দূর হয়নি মানুষের মধ্যে থেকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অথচ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহলের চাপ অব্যাহত রয়েছে সরকারের ওপর। এ অবস্থায় গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
সরকারের দুশ্চিন্তার আরও কারণ, তারা ভেবেছিল খুব বেশি দিন কর্মসূচি টেনে নিয়ে যেতে পারবে না বিএনপি। তাই শুরুতে সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা এক সপ্তাহের মধ্যে কিংবা শিগগিরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু ২ মাস পর বাস্তবতা এই যে, ঢাকায় জীবনযাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক হলেও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটেনি। স্কুল-কলেজ সপ্তাহের ৫ দিনই বন্ধ থাকছে। শুক্র ও শনিবার হচ্ছে ক্লাস। এ নিয়ে অভিভাবকরাও রয়েছেন উৎকণ্ঠায়।
যতটা সরকার আশা করেছিল ঢাকার বাইরের অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এখনও রাতে সব রুটে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করছে না। বিভিন্ন স্থানে নাশকতা অব্যাহত রয়েছে। সব ধরনের আমদানি-রফতানি এক প্রকার বন্ধ। এমনকি জেলা শহরগুলো থেকে ঢাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ খুবই কম। যে কারণে হু হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। যার প্রভাব পড়ছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর।
জানতে চাইলে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউ যে ভালো নেই সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় একটাই, তাহলো সমঝোতা। সমঝোতা শুধু দুই দলের মধ্যে নয়, সবাইকে নিয়েই হতে হবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন নয়। ২০১৯ সালে হবে, না মধ্যবর্তী সময়ে হবে সে জন্য জনগণের মতামত নেয়া যেতে পারে। হাসিনা-খালেদার ইচ্ছায় তো হবে না, জনগণ কী চায় তাই করতে হবে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার মতে, এ সমস্যার সমাধান রাজনীতিবিদদেরই করা উচিত। তিনি শুক্রবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। ফলে দেশ সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। তাহলে এখন কী করা উচিত- জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, দু’পক্ষকেই ছাড় দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে। এতে বোমা, সন্ত্রাস বন্ধ হবে, সৃষ্টি হবে একটা শান্তির পরিবেশ। তখনই আলোচনা হবে।
আওয়ামী লীগ : সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেছিলেন টানা অবরোধ-হরতাল পালন করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্লান্ত হয়ে পড়বে। জনগণও নাশকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ঘর থেকে বের হয়ে আসবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকলে জনজীবন স্বাভাবিক হতে বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু নাশকতা কমে এলেও পুরোপুরি দূর হয়নি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঢাকার মানুষ গ্রামে যাচ্ছে না। আবার গ্রামের মানুষ ঢাকায় আসছে না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মাঠে নেই। তাদের কোথাও কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখা যাচ্ছে না।
সরকার নাশকতা দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগের হুংকার দিয়ে যাচ্ছে। নাশকতার অভিযোগে বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মী, সমর্থকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হচ্ছে। অব্যাহত রয়েছে ক্রসফায়ার। দেশব্যাপী অসংখ্য পুরনো মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। তারপরও কার্যকরভাবে বিএনপিকে নিবৃত্ত করা যায়নি। তারা দুই মাস ধরে অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। এ অবস্থায় মানুষের মৃত্যু এবং অর্থনেতিক ক্ষতিতে ভীষণ দুশ্চিন্তায় রয়েছে সরকারের হাইকমান্ড।
বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয় সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এক প্রকার জাতীয় সংকট। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নের জন্য বড় বাধা। এ অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সবারই সমস্যা হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণে আমাদের চিন্তা করতে হবে। এর আগে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, অবরোধ-হরতালের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের কৃষকরা। তারা পথে বসে গেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অবরোধ-হরতালে অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় স্বীকার করে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা যাচ্ছে না। যে কারণে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অবরোধ-হরতালে জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর রয়েছে নানামুখী চাপ। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা ক্রমাগত সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন। তারা সহিংসতা দূর ও স্থায়ী স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন। এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি দেশ ঢাকায় তাদের নাগরিকদের সতর্কভাবে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে। এর বাইরে সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী এবং দেশের ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
অচলাবস্থার দুই মাস অতিক্রান্ত হচ্ছে, তারপরও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এ অবস্থায় সরকারের করণীয় কি- জানতে চাইলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাচ্ছেন এর শান্তিপূর্ণ সমাধান। তিনি বলেন, এটা রাজনৈতিক সমস্যা, তাই এটা যাতে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা যায়, সে চেষ্টা রয়েছে। এ জন্য ধৈর্য ধরতে হবে।
বিএনপি : নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবিতে টানা দুই মাস আন্দোলন করে আসছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। সংকট নিরসনে চলছে দেশী-বিদেশী নানা উদ্যোগ। জাতিসংঘও সংকট নিরসনে তাগাদা দিয়ে আসছে। এসব নানামুখী চাপের পরও সরকার আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যত কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সরকারের এমন অনড় অবস্থানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে ভাবিয়ে তুলেছে। তবে এমন ভাবনা থাকলেও চলমান আন্দোলনে কোনো ফল ছাড়া তা থেকে সরে না আসার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে তারা।
বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, টানা দুই মাস আন্দোলনে অনেকের মাঝেই সৃষ্টি হয়েছে নানামুখী চিন্তা। আর কতদিন এভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে সারা দেশের অসংখ্য নেতাকর্মী গ্রেফতার, নির্যাতন, কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যাসহ সরকার নানাভাবে চাপে রাখছে। সরকারের এসব নির্যাতন মোকাবেলা করে রাজপথে টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্দোলন শুরুর পর সারা দেশে সক্রিয় নেতাকর্মীরা কেউ বাসায় থাকতে পারছেন না। অজ্ঞাত স্থান থেকে কর্মসূচি পালন করছেন। আত্মগোপনে থেকেও কেউ স্বস্তিতে নেই। সেখান থেকেও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেককে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে কর্মসূচি চালিয়ে গিয়ে অনেকেরই মাঝে ভর করেছে ক্লান্তির ছাপ।
সূত্র জানায়, এর পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মতো রসদও অনেক জায়গায় ঠিকমতো পাচ্ছে না। অর্থসহ অন্যান্য রসদ জোগান দিতে যেসব নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারাও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এদের অনেকেই এলাকায় ছেড়ে ঢাকায় নিরাপদে অবস্থান করছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার তাদের এলাকায় গিয়ে নেতাকর্মীদের খোঁজ ও আন্দোলন সমন্বয়ে কাজ করার নির্দেশ দিলেও তারা তা মানছেন না। এ নিয়ে তৃণমূল নেতারা বারবার চেয়ারপারসনের কাছে অভিযোগ করছেন। কিন্তু তারপরও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এলাকায় যাচ্ছেন না।
দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান আন্দোলনে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক হচ্ছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পরিবহন, শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সব সেক্টরে নেমে এসেছে স্থবিরতা। নেতাকর্মীদের নামে গণহারে মামলা, গ্রেফতার, নির্যাতনসহ নানাভাবে হয়রানির বিষয়টিও তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কিন্তু এমন বাস্তবতার পরও আন্দোলন যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেখান থেকে পিছু হটার কোনো উপায় নেই। একটা ফল নিয়েই এর পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। না হলে নেতাকর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে যাবে। ভবিষ্যতে তাদের ওপর আরও ভয়াবহ নির্যাতনও নেমে আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূল থেকে আন্দোলন স্থগিত না করার চাপও রয়েছে। সব মিলিয়ে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, টানা দুই মাস যেভাবে দেশ চলছে তা খুবই দুঃখজনক। টানা আন্দোলন চলার কারণে স্বাভাবিকভাবেই নেতাকর্মীদের মাঝে একটা ক্লান্তি বা হতাশার ছাপ আসতে পারে। এতদিনেও সরকার তাদের দাবির প্রতি কোনো কর্ণপাত করছে না। এভাবে আর কতদিন চালাতে হবে এমন ভাবনাও কেউ কেউ করছেন। কিন্তু টানা দুই মাস কর্মসূচি চালাতে পারবে এমনটাও তো অনেকে ভাবেনি। অন্যদিকে সরকার বারবার সবকিছু স্বাভাবিক করার ঘোষণা দিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। সারা দেশে সবকিছু স্থবির, আগুন জ্বলছে, এত বিপর্যস্ত অবস্থার মাঝেও সরকার দু’মাস টিকে রয়েছে এ জন্য তাদের ধন্যবাদ দিতে হবে।
তিনি বলেন, এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। দ্রুত এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত। দেশী-বিদেশী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, সহসাই এসব উদ্যোগ আলোর মুখ দেখবে এমনটা ভাবছি না। তবে অন্ধকারের মাঝে কিছুটা আলোর রশ্মি দেখা যাচ্ছে।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হচ্ছে?

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসার সামনে জুতা প্রদর্শন করছেন
আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের অ্যাকশন -রনি
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সেখানে আন্দোলনের নামে স্বয়ং শিক্ষকরাই রুদ্ধ করে দিয়েছেন শিক্ষার সব কার্যক্রম। ৪ মাস ধরে তারা ভিসিবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন অনুষদের দরজায়। তারা এমনকি অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার একাডেমিক কার্যক্রম পর্যন্ত বন্ধ করে আন্দোলন জোরদার করার পন্থা উদ্ভাবন করছেন! শিক্ষক সমাজের পক্ষে এমন অভিনব, উদ্ভট, আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের নজির বিশ্বের আর কোথায় আছে? সব সম্ভবের এ দেশে বুঝি সবই সম্ভব! যারা শিক্ষার আলো দেখাবেন, তারাই রচনা করছেন অজস্র অন্ধকার, তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে। এলাকার জনপ্রতিনিধিসহ দেশের একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ৯৪ হাজার পরীক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা জীবনের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার আবেদন জানিয়েও কোনো ফল পাননি। আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন। শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতি এবং পূর্বতন ভিসির সময়ে অবৈধভাবে নিয়োগকৃত ১৫২ জন কর্মচারীর নিয়োগের বৈধতা দাবি করে। আমাদের কথা হল, শিক্ষকের পদোন্নতি আন্দোলনের ইস্যু হলে ভবিষ্যতে শিক্ষকের যোগ্যতার মাপকাঠি হবে পেশিশক্তি। এভাবেই শিক্ষার দফারফা করা হচ্ছে এ আন্দোলনের মাধ্যমে। অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া ১৫২ জন কর্মচারীর নিয়োগ বৈধ করা হলে এই কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড যে বর্তমানের মতোই শিক্ষাবিরোধী ও নৈরাজ্যজনক হবে তাতে সংশয়ের অবকাশ নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা ছাত্রদের ভুল বুঝিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন। স্থানীয় অধিবাসীদের তারা বহিরাগত আখ্যা দিয়ে বৈরী প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তা কোনোক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। একই সঙ্গে আমরা এলাকাবাসীকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত উস্কানির ফাঁদে না জড়ানোর আহ্বান জানাই। সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যজনক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করুন। শিক্ষার অধিকারকে যারা পদদলিত করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

এবার অ্যাসিরীয় সভ্যতাও শেষ!

ইরাকে মসুলের পর এবার তিন হাজার বছরের পুরোনো নিমরুদের অ্যাসিরীয় নগরীতে ‘প্রাচীন সভ্যতা’ ধ্বংসের অভিযান শুরু করেছে আইএস। তারা অসুর্বানিপালের রাজপ্রাসাদসহ অ্যাসিরীয় সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী সব নিদর্শন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
পর্যটন ও পুরাকীর্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, আইএস ঐতিহাসিক নগরী নিমরুদে অভিযান চালাচ্ছে এবং ভারি যান দিয়ে অ্যাসিরীয় সভ্যতার সব নিদর্শন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
ইরাকের পুরাকীর্তিবিষয়ক এক কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজের পর এ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয় এবং শৈল্পিক সব নিদর্শনগুলো সরিয়ে নিতে বেশ কয়েকটি ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, দ্বিতীয় অসুর্বানিপাল প্রাসাদের ফটকে অবস্থিত লামাসু (পাখাসহ ষাঁড়ের মূর্তি) ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে মসুলের ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রাসাদটির ঠিক কোন কোন স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে তা এখনও পরিষ্কার নয়।
একটি সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহখানেক আগে আইএস সদস্যরা মসুলবাসীকে হুশিয়ার করেছিল যে তারা নিমরুদে মূর্তি ধ্বংসে অভিযান চালাবে। প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা দ্বিতীয় অসুর্বানিপাল। তিনি ইরাক, লেভান্ত, নিু মিসর ও তুরস্কের কিছু অংশ নিয়ে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৮৮৩ থেকে ৮৫৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন তিনি।
ইরাকের দ্বিতীয় নগরী মসুলের ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে নিমরুদ শহরটি অবস্থিত। খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দজলা নদীর তীরে গড়ে এ শহর। মসুল এখন আইএসের প্রধান ঘাঁটি।
স্টোনি ব্রোক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ আবদুলামির হামদানি বলেন, ‘আমার বলতে খুবই খারাপ লাগছে যে সবাই এটাই আশংকা করছিল। তাদের (আইএস) পরিকল্পনা একাধারে ইরাকের সব ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করে দেয়া।’ তিনি বলেন, ‘এরপর তাদের লক্ষ্য হবে হাতরা।’ হাতরা নিনেভা প্রদেশের সুন্দর একটি নগরী। এটি দুই হাজারেরও বেশি বছর আগে গড়ে উঠেছিল এবং এটি বর্তমানে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি নিদর্শন।
তিনি বলেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত। কিন্তু এই সময়ে এটি ঘটছে।’ আইএস তাদের সাম্প্রতিক হামলায় ইরাকের ঐতিহাসিক নিদর্শন বেছে নিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে তাদের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভারি সব যন্ত্রপাতি নিয়ে জঙ্গিরা মসুল জাদুঘরের মহামূল্যবান প্রাচীন নিদর্শনগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্যবিলনীয় সভ্যতার অন্যতম নির্দশন নিমরাদে (ব্যবিলনীয় ভাষায় কালাহ) ৭ হাজার বছর আগে লোকের বসবাস শুরু হয়। শহরটিতে প্রায় ৬০ হাজার লোকের বসবাস ছিল। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড নিমরুদকে বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন ঐতিহাসিক স্থানের তালিকাভুক্ত করে।
ইরাকের সাম্প্রতিক ঘটনাকে বহু প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞরা ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের বামিয়ান বৌদ্ধ মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এএফপি
প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংস যুদ্ধাপরাধ : ইউনেস্কো
ইরাকের প্রাচীন অ্যাসিরীয় নগরী নিমরাদে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে ঐতিহাসিক সব নিদর্শন ধ্বংসের নিন্দা জানিয়ে ইউনেস্কো প্রধান ইরিনা বোকোভা একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নিমরাদে ঐতিহাসিক সব প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংসের আমি কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, আমরা নীরব থাকতে পারি না।
ইরাক সিরিয়ায় স্থল অভিযান চায় -সৌদি আরব
সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রিন্স সৌদ আল ফয়সাল সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে বিমান হামলাকারী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটকে জিহাদিদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রিন্স সৌদ আল ফয়সাল বলেন, স্থলে আইএসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় অংশ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলাকে সমর্থন দিলেও পদাতিক সৈন্য মোতায়েনের বিষয় তিনি নাকচ করে দেন। ইরাকে ইরানের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ব্যাপারে সতর্কবাণী করে সৌদি মন্ত্রী অভিযোগ করেন, ইরান আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তার মাধ্যমে ইরাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

৭ই মার্চ স্বাধীনতাযুদ্ধের অনিবার্য মুখবন্ধ by কেয়া চৌধুরী

ইতিহাস কথা বলে। আমরা হয়তো সবসময় সেই শব্দমালা কানে শুনতে পাই না। কিন্তু ঘটনা প্রবাহে ইতিহাস আমাদের ফিরে নিয়ে যায় সত্য ও ন্যায়ের পথে। বাংলায় বসন্ত ঋতু আর ইংরেজিতে অগ্নিঝরা মার্চ মাস। বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় এই মাসটি, একাধারে আনন্দ-বেদনার এবং রক্তস্নাত নবজন্মে অধ্যায়ে রচিত। এ মাসেই ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান।  যিনি বাঙালি জাতিকে দিশা দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ইতিহাসের মহানায়ক হয়ে ওঠা শেখ মুুজিবুর রহমান ৭ কোটি বাঙালির প্রাণের নেতা। অথচ কোন কারণ ছাড়াই ’৭১ সালে ইয়াহিয়া পূর্বঘোষিত জাতীয় অধিবেশন স্থগিত করে শেখ মুজিবকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। তারা জানতো না এরই মধ্যে বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। সে কারণেই, ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ ইয়াহিয়া যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দিল। অল্প সময়ের মধ্যে মুক্তিকামী বাঙালি ইয়াহিয়ার ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করল। বিক্ষুব্ধ জনগণ যখন রাজপথে নেমে পড়ল, তখন বঙ্গবন্ধু ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত হোটেল পূর্বানীতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির বৈঠক করছিলেন। পহেলা মার্চের সেই বৈঠক থেকে, বঙ্গবন্ধু হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা ধৈর্য ধরুন। পরিস্থিতি বোঝে নির্দেশ দেয়া হবে। মনে রাখবেন, জয় আমাদের সুনিশ্চিত।’
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু মূলত একটি স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করেছিলেন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন ৭ই মার্চ। ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক উদ্বেলিত বাঙালির মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন ইতিহাসের অমোঘ বানী, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি সেদিন বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণায় অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়েছিল। অভিন্ন ভাষায় উচ্চারিত হয়েছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধ’ু ইত্যাদি রণধ্বনি। ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, আরও দেব, এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর আজন্মের। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন, ১৯৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত। তিনি সংগ্রাম করেছেন দেশবিরোধী চেতনার বিরুদ্ধে। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লড়েছেন, নীতিহীনতা, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি অসাদাচরণের বিরুদ্ধে। জনগণের রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন বলেই, বঙ্গবন্ধু নীতিবিহীন নেতাকে অপছন্দ করতেন। প্রজন্মের অমূল্য দলিল বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ তিনি বলেছেন, ‘নীতিবিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে কোন ফল পাওয়া যায় না। অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কোন দিন একসঙ্গে হয়ে দেশের কোন কাজে নামতে নেই।  তাতে দেশসেবার চেয়ে জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়’। বাংলার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামগ্রিক জীবনযাত্রায়, ব্যবহৃত প্রতিটি বক্তব্য বাস্তবসম্মত এবং প্রাসঙ্গিক। বেগম খালেদা জিয়া (আইএস) জঙ্গিবাদী চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে, টানা ২ মাসে নজিরবিহীন সহিংস রাজনীতির মাধ্যমে যে রেকর্ড সৃষ্টি করছেন, তা বাঙালির প্রতি পাকিস্তানি জুলুম-অত্যাচারের মতো প্রতিহত করার সময় এসেছে। গত দুই মাসে পেট্রলবোমার আগুনে পোড়া ১১৫টি তাজা জীবন কেড়ে নেয়ার রাজনীতি, কখনোই জনগণের রাজনীতি হতে পারে না। খালেদা জিয়ার মতো নীতিহীন নেত্রীর দ্বারা দেশসেবা নয়, বরং দেশ ও জনগণের ধ্বংস-সর্বনাশ অনিবার্য।
কেয়া চৌধুরী
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ শুধু স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে বাঙালিকে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো উজ্জীবিত করেনি। ১৯৭১ সাল থেকে আজ অবধি, বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে মূলস্তম্ভ হয়ে অবদান রেখে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র কর্তৃক পূর্ব বাংলার মানুষকে বঞ্চনা এবং নিপীড়নের নামে যে ইতিহাসের সৃষ্টি করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তার দেয়া ১৮ মিনিটের বক্তব্যে সে ইতিহাসকে চিরতরে কফিনবন্দি করেছিলেন। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা দেয়। শক্তি যোগায় মিথ্যা-প্রবঞ্চনা ও অপরাজনীতিকে স্তব্ধ করে দেয়ার। ৭ই মার্চের মহাকাব্যের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর আঙুলের হেলুনি, আমাদের পথ দেখায় সত্য সুন্দর ও সমৃদ্ধির। ৭ই মার্চের গর্জে ওঠা জাতির পিতার কণ্ঠস্বর আমাদেরকে নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী করে তোলে। তাই ঐতিহাসিকভাবেই অগ্নিঝরা ৭ই মার্চ গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধের অনিবার্য মুখবন্ধ।

পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গার্মেন্ট

বিদেশী ক্রেতারা এদেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে মুখ ফিরিযে নিতে শুরু করেছে
বাংলাদেশের দুই নেত্রীর দীর্ঘদিনের বিবাদ দেশটির ভঙ্গুর গণতন্ত্র হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে পরিস্থিতিও চলে যেতে পারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে, তবে দেশটির তৈরী পোশাক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে বৈশ্বিক তৈরী পোশাক বাজারে। গতকাল বাংলাদেশ নিয়ে এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে জাপানের অনলাইন নিকাই এশিয়ান রিভিউ। এতে আরও বলা হয়, ১৯৯১ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটি পর্যায়ক্রমে শাসন করে আসছেন ক্ষমতাধর এই দুই নেত্রী। তখন থেকেই ক্ষমতার লড়াই বেশ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে তাদের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছেন। প্রতিবেশী ভারতের সহযোগিতায় তার দল পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম সরকারও আওয়ামী লীগ গঠন করে। এ ইতিহাসের কারণে আওয়ামী লীগকে ভারতপন্থি ও সমাজতন্ত্রী ভাবা হয়। অপরদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি মধ্য-ডানপন্থি দল। এ দলটিকে ভারত-বিরোধী বলে ভাবা হয়। ২৫শে ফেব্রুয়ারি দুর্নীতিবিরোধী আদালত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। যদি সত্যি এমনটা ঘটে, তবে নিশ্চিতভাবে রাজপথে আরও সংঘর্ষ হবে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। ব্যাপক হরতালের পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। আবার ২০০১ সালে বিপুল পরিমাণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। আবারও প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। কিন্তু শেষের দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে সেনাবাহিনী আবারও রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। এরপর ২০০৯ সালে গণতন্ত্রে পুনরায় প্রবেশের পর আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। বহুবছরের রাজনৈতিক বিরোধিতার পর, এখন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনই শেষ করে দিতে চান শেখ হাসিনা- এমনটিই মনে হচ্ছে। পারসপরিক বিদ্বেষ আরও খারাপ অবস্থায় যায়, যখন বিরোধী দলগুলো গত বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে। প্রায় বিরোধিতা ছাড়াই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে হাসিনার আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্ত্বেও নির্বাচন হয়। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার পর ওই নির্বাচনের বৈধতা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। বহু দেশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পর্যবেক্ষক পাঠানো থেকে বিরত থাকে। খালেদা জিয়া বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নতুন নির্বাচনে ডাক দিয়েছেন। আর এ বছরের শুরুর দিক থেকে বিরোধী এ নেত্রীকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, নৈরাজ্য সৃষ্টিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছেন খালেদা জিয়া। এর পাল্টা হিসেবে বিরোধী দলগুলো প্রায় দিনই দেশব্যাপী অবরোধ ও হরতালের ডাক দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র একটি দেশ। ফলে দেশটির এমন রাজনৈতিক দ্বৈরথ বিশ্ব সমপ্রদায়ের মন্তব্যের বাইরে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বের তৈরী পোশাক চাহিদার অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী এ দেশটি বিশ্ব অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহু প্রতিষ্ঠানের কাপড় উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ফলে চীনের পর বাংলাদেশই বিশ্বের বৃহত্তম তৈরী পোশাক রপ্তানিকারক। গত বছরের জুনে শেষ হওয়া সর্বশেষ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.১ শতাংশ। তবে বর্তমান অচলাবস্থার ফলে উৎপাদন খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অবরোধের ফলে ব্যবসা বাণিজ্য চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক স্থানীয় কোমপানি পোশাক চালান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে পোশাক খাতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল বাংলাদেশের। এ বছর তা কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ, অনেকে ভয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে চাইছে না। বিদেশী কোমপানিগুলো ইতিমধ্যেই সমস্যার মুখোমুখি হতে শুরু করেছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে, আরেকটি অভ্যুত্থান। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবসানে যদি সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে চায়, তাহলে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাতে দেশটির অর্থনীতিতেও দীর্ঘ নেতিবাচক ছায়া পড়বে। তৈরী  পোশাক খাতের মালিকদের একটি সংগঠনের এক কর্মকর্তা জানালেন, এ দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় তৈরী পোশাক শিল্প। আমাদের উচ্চ উৎপাদন হার ও বিদেশী বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে, যদি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করে।

দুই মাসে দগ্ধ ১৬৫ জনের চিকিৎসা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ বার্ন ইউনিটে নাতি নিরঞ্জন সিনহাকে খাইয়ে
দিচ্ছেন দাদা বাবু সিনহা। গত বুধবার তোলা l ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
সিলেট শহরে গত সোমবার ককটেল হামলায় আহত শিশু l ছবি: প্রথম আলো
গত ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছিল বিএনপি-জামায়াতের টানা অবরোধ, এখনো চলছে। আর সহিংসতা শুরু হয়েছিল এক দিন আগে থেকে। সহিংস রাজনীতির এই দুই মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ১১৫ জন। এঁদের ৯০ জনই সাধারণ মানুষ। ৬২ জন মারা গেছেন পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে। অর্থনৈতিক ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে। টানা সহিংসতার দুই মাস নিয়ে এই আয়োজন।
টানা অবরোধ-হরতালে পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ রোগী আসা থামছে না ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নতুন পাঁচ রোগী ভর্তি হয়েছেন এই বার্ন ইউনিটে। তাঁদের একজনের অবস্থা গুরুতর।
এই পাঁচজনের তিনজন মানিকগঞ্জে ও দুজন কিশোরগঞ্জে দগ্ধ হয়েছেন। মানিকগঞ্জের তিনজন হলেন ট্রাকচালক ইকবাল হোসেন (৩৪), তাঁর সহকারী মোহাম্মদ সুমন ও দিনমজুর আবুল কালাম। তাঁরা ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে লাকড়ি নিয়ে মানিকগঞ্জ যাচ্ছিলেন। গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছার পর তিন-চারজন ট্রাকে পেট্রলবোমা মারে। ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। দগ্ধ তিনজনকে উদ্ধার করে একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসেন। দগ্ধদের মধ্যে ট্রাকচালকের অবস্থা গুরুতর। কিশোরগঞ্জে দগ্ধ দুজন হলেন জাহেদা বেগম (৪৫) ও আবদুল মালেক (৪২)।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান আবুল কালাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমায় দগ্ধ ১৬৫ রোগী এখন পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ৯৬ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন। মারা গেছেন ১৩ জন। নিহত ব্যক্তিদের একজন হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গিয়েছিলেন। এ সপ্তাহ থেকে স্থিতিশীল রোগীদের দেহে অস্ত্রোপচার শুরু হয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে পাঁচটি পর্যন্ত অস্ত্রোপচার লাগতে পারে।
বার্ন ইউনিট সূত্র জানায়, এখন চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের কমপক্ষে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁরা নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে আছেন।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষের শরীর ঢেকে রাখে যে চামড়া, তার স্তর সাতটি। পেট্রলবোমায় দগ্ধদের সাতটি স্তরই পুড়ে গেছে। কারও কারও মাংস পুড়েছে, কারও ক্ষেত্রে হাড়ও বাদ যায়নি। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে চামড়া কেটে পুড়ে যাওয়া জায়গায় লাগানো হচ্ছে।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন বলেন, অস্ত্রোপচার না হলে এসব রোগী স্বাভাবিকভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করতে পারবেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে ৯৬ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, তাঁদের আসলে চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায় শেষ হয়েছে। এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা। তাঁদের বেশির ভাগকে ফিজিওথেরাপি নিতে হবে। একটি বড় অংশকে পাঠানো হয়েছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এঁদের মানসিক চিকিৎসা জরুরি। এর বাইরে প্রতি মাসে একবার ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটেও তাঁদের আসতে হবে।
বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরা কয়েকজন রোগীর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে এঁরা নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছেন। এঁদের একজন ময়মনসিংহের সিদ্দিকুর রহমান। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জেলা স্কুলের সামনে পেট্রলবোমায় তিনি দগ্ধ হন, পুড়ে যায় তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন ইজিবাইকটি। অস্ত্রোপচারের এক সপ্তাহ পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি বাড়ি ফিরেছেন। তাঁর স্ত্রী শরিফা আক্তার বলেন, সিদ্দিক এখনো হাত নাড়তে পারেন না। অস্ত্রোপচারের জায়গাটি ফুলে উঠছে। সংসার চলছে কী করে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন। এতে উপকার হয়েছে। কিন্তু স্কুলপড়ুয়া তিন সন্তান, অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে দিনে ১২টি ডিম খাওয়াতে বলা হলেও চার-পাঁচটির বেশি জোগাড় করতে পারছেন না।
২৩ জানুয়ারি গুলিস্তান থেকে ভুলতাগামী বাসের যাত্রী ফার্মাসিস্ট দম্পতি সাইদা ফাতেমা ও ইয়াসির আরাফাত দগ্ধ হয়েছিলেন। ইয়াসির বাড়ি ফিরেছেন। হাতটা এখনো ভালো হয়নি। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিচ্ছে। সাইদার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা এ সপ্তাহে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানজিমুল হক ও তাঁর মা শামসুন্নাহার বেগমও হাসপাতাল ছেড়েছেন। পোড়া জায়গায় এখনো ফোসকা দেখা দিচ্ছে বলে জানালেন হাতিয়ার স্কুলশিক্ষিকা শামসুন্নাহার।
বার্ন ইউনিটে হরতাল-অবরোধে দগ্ধ রোগীদের একটি ওয়ার্ডে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বুধবার এ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে চিকিৎসা-সহায়তার পাশাপাশি সমাজের দানশীল লোকজনের আর্থিক সহযোগিতাও তাঁরা পেয়েছেন। কিন্তু দগ্ধদের প্রায় সবাই এত দরিদ্র যে হাসপাতালে থাকা অবস্থায়ই টাকাটা খরচ করে ফেলতে হচ্ছে। ১৯ বছরের মোটর সারাইকর্মী নিরঞ্জনের বাবা বাবু সেনা দেড় মাস ধরে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের বাইরে পেয়েছেন এক লাখ টাকা। সেই টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। ছেলে কবে সুস্থ হবে, মৌলভীবাজারে বাড়িতে ফিরবে তা এখনো জানেন না এই কৃষক বাবা।

কেন পারে না দক্ষিণ আফ্রিকা?

২০০৩ বিশ্বকাপ, বৃষ্টি-আইন হিসাবে গড়বড় করে ফেলল দক্ষিণ আফ্রিকা।
হতভম্ব পোলক! ছবি: ক্রিকইনফো
৮৯ বলে দরকার ৩২ রান; দক্ষিণ আফ্রিকার হাতে ২ উইকেট। এর চেয়েও বড় ব্যাপার, পাকিস্তানি বোলারদের ‘ত্রাস’ হয়ে উইকেটে বুক চিতিয়ে লড়ছেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। প্রচণ্ড চাপেও রানের গতি এগিয়ে নিচ্ছেন দারুণ গতিতে। ঠিক এ সময়ই সব এলোমেলো। সোহেল খানের শর্ট বলটা লং-অন দিয়ে সীমানা পার করার ভাবনায় ‘এবি’র টাইমিংয়ে গড়বড়, ব্যাটের বাইরের কানা ছুঁয়ে বল উইকেটরক্ষক সরফরাজের গ্লাভসে। নিজের উইকেটই নয়, প্রোটিয়া অধিনায়ক দারুণ এক জয়ের স্বপ্নটাও ছুড়ে এলেন মাঠে!
যদিও আজকের ম্যাচে হেরে দক্ষিণ আফ্রিকার সব শেষ হয়নি। তবে প্রোটিয়ারা আবারও সেই শব্দটির অনুরণন তোলার সুযোগ করে দিল-‘চোকার্স! চোকার্স! ’ ১৯৯২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দুঃখজনক সেই বিদায়ে না হয় বৃষ্টিকে দায়ী করা যেতে পারে। ২০০৭ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারটাকেও না হয় বলা গেল, দুর্দান্ত এক দলের কাছে হেরেছে তারা। কিন্তু ১৯৯৬,১৯৯৯, ২০০৩,২০১১ বিশ্বকাপে হারকে কী বলা যায়?
গত বিশ্বকাপে মিরপুরে সেই কোয়ার্টার ফাইনালের কথা মনে আছে? নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২২২ রানের লক্ষ্য পেরোতে গিয়ে গোত্তা খেয়ে পড়ল প্রোটিয়াদের ইনিংস। ৪৩.২ ওভারে ১৭২ রানে অলআউট হয়ে ৪৯ রানের পরাজয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় দক্ষিণ আফ্রিকার। সমর্থকদের এমন দীর্ঘশ্বাস উপহার দিয়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও। কথা হলো, বিশ্বকাপে কেন এমন ভেঙে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা?
যুক্তিবাদীরা বলবেন, ‘চাপ’। দুই অক্ষরের এ শব্দটা দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এভারেস্টের চেয়ে বড়। পরাজয়ের ছায়া দেখেই অসহায় আত্মসমর্পণ করা যেন প্রোটিয়াদের অলিখিত রীতি। কখনো কখনো সেটা এমনই ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিও লোপ পায় প্রোটিয়াদের। এর বাইরে আরও একটা ব্যাপার রয়েছে ‘অভিশাপ’। বিশ্বকাপ শব্দটাই যেন বড় অভিশাপ দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে।
নইলে হাতের মুঠোয় জয় এসে যাওয়ার পরও ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ল্যান্স ক্লুজনার অমন পাগলাটে দৌড় দেবেন কেন? কেনই বা ২০০৩ বিশ্বকাপে ডাক-ওয়ার্থ লুইস পদ্ধতি বুঝতে ভুল করবে? কেন ২০১১ বিশ্বকাপে সাধারণ এক নিউজিল্যান্ড কিংবা এবার বিপর্যস্ত পাকিস্তানের বিপক্ষে সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে প্রতিভাধর সব ব্যাটসম্যান নিজের উইকেটটা সহজলভ্য করে তুলবেন?
অবশ্য নকআউট পর্ব শুরু হয়নি। কাজেই দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যর্থতার ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত সময় এখনো আসেনি। কিন্তু অন্যতম ফেবারিট হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে আসা প্রোটিয়ারা অপেক্ষাকৃত সহজ গ্রুপে পড়ে যেভাবে দুটি ম্যাচ (ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে) হারল, তাতে ওই শব্দটা যেন আবারও উচ্চকিত-চোকার্স! চোকার্স!

কূটনৈতিক উদ্যোগও শর্তের বেড়াজালে

শিগগির চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। পরিস্থিতি উত্তরণে কূটনীতিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ খানিকটা 'ইতিবাচক' মনে হলেও তা আদৌ সুফল বয়ে আনবে কি-না, তা নিয়েও কম সংশয় নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনকারী বিরোধী দল বিএনপির পাল্টাপাল্টি শর্তের বেড়াজালে আপাতত আটকা পড়েছে এই উদ্যোগ। বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ, সহিংসতা-নাশকতা বন্ধ এবং টানা অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি প্রত্যাহারের শর্ত দিয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, মধ্যবর্তী নির্বাচন এজেন্ডাভুক্ত করে সংলাপের ঘোষণা, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং দলের নেতাকর্মীদের মুক্তির শর্ত দিয়েছে বিএনপি। কার্যত দু'পক্ষই যার যার আগের অবস্থানেই অনড়। গভীর এই সংকট নিরসনে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ উভয় পক্ষ।বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট কূটনীতিকদের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এ ব্যাপারে অনেকটা নিষ্পৃহ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকারের অনড় মনোভাবের প্রেক্ষাপটে বিএনপিও অনির্দিষ্টকালের অবরোধের মধ্যেই আগামীকাল রোববার থেকে হরতালসহ আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে সংকট নিরসনে সহিংসতা বন্ধ করে সংলাপে বসতে নাগরিক সমাজের উদ্যোগেও সাড়া দেয়নি দুই দল। পরে সে উদ্যোগটিই বিতর্কিত হয়ে পড়ে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল সমকালকে বলেন, কূটনীতিকদের তৎপরতাকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বরফের ওপর কিছুটা উত্তাপ পড়তে শুরু করেছে। তবে বল এখন সরকারের কোর্টে। তিনি আশা করেন, কূটনীতিকদের উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে সরকার সংকট সমাধানে এগিয়ে আসবে।খালেদা জিয়ার সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানকারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, সংকট নিরসনে সরকারকেই একটি সমঝোতার পথ খুঁজে বেরকরতে হবে। কূটনীতিকদের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনিও।
সূত্র জানায়, বৈঠককালে পশ্চিমা ১৬ কূটনীতিক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সংলাপের উদ্যোগের পরিবেশ তৈরিতে টানা অবরোধ-হরতাল স্থগিত, সহিংসতা-নাশকতা বন্ধ, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার শর্ত দিয়েছেন। বৈঠকে সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকটি করেছেন বলেও জানান কূটনীতিকরা।তবে খালেদা জিয়া তাদের মাধ্যমে পাল্টা কয়েকটি শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সব দলের অংশগ্রহণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য সংলাপের উদ্যোগ ঘোষণা, দলের নেতাকর্মীদের মুক্তি, সভা-সমাবেশে বাধা না দেওয়া এবং তার চলাচলে বাধা দূর করা অন্যতম। কূটনীতিকরা বিএনপি নেত্রীর দেওয়া শর্তগুলো সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া কূটনীতিকদের সঙ্গে দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। বিএনপি নেত্রী জানান, সংবিধানের ধারাবাহিকতার কথা বলে আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করেছে। তারা এক বছর সরকারকে সময় দিয়েছেন। সরকার সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তাকে, তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। খালেদা জিয়া দলের খুন ও গুম হওয়া নেতাকর্মীদের একটি তালিকাও কূটনীতিকদের হাতে তুলে দেন। অবশ্য খালেদা জিয়ার সঙ্গে ১৬ কূটনীতিকের বৈঠকের ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দু'দলই অস্তিত্ব লড়াইয়ে নেমেছে। আওয়ামী লীগ চায় বিএনপিকে ধাক্কা দিতে দিতে খাদে ফেলে দিতে। যেভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তাতে একসময় বিএনপি নিঃশেষ হয়ে যাবে বলে মনে করে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে চলমান আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ পাবে এবং সরকারের পতন অনিবার্য বলে মনে করে বিএনপি। এরপর দেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে তারা অচিরেই আবার ক্ষমতায় আসবে। এ পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা কম।
এদিকে জনমতের বিপরীতে 'ইস্যুবিহীন' আন্দোলন করতে গিয়ে এবং সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে সারাদেশেই বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছুটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলেও মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজপথে নেমে আন্দোলনের পরিবর্তে চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি কার্যকর করার কৌশল বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত।সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা আরও বলছেন, বিএনপি জোট লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে গেলেও তাতে কোনো ধরনের জনসম্পৃক্ততা ঘটাতে পারেনি; বরং জনগণ তাদের এই সহিংস আন্দোলন, বিশেষ করে পেট্রোল বোমা মেরে ও নৃশংস কায়দায় মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সবিশেষ ক্ষুব্ধ।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সংলাপ প্রশ্নে কূটনীতিকদের আহ্বানে সরকার কোনো চাপ অনুভব করছে না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিসের সংলাপ? ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে কোনো সংলাপ হবে না। আর ওই নির্বাচনের আগে যে সংলাপ হবে_ সেটি বিএনপির সঙ্গে নয়, নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে।দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, বিএনপি এখন সংলাপের নামে বিদেশি প্রভুদের কাছে ধরনা দিয়ে অনুনয়-বিনয় করছে। এতে লাভ হবে না। জনগণ না চাইলে কোনো বিদেশি প্রভুই তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে পারবে না।

‘ওমেন অব কারেজ’ অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশের নাদিয়া

জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে ব্যতিক্রমী সাহস, নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নের পক্ষে অবস্থান করার স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ওমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেয় তার হাতে। বিশ্বের ১০টি দেশের ১০ জন নারী সাংবাদিককে এ পুরস্কার দেয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম নাদিয়া শারমিন। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ডেপুটি সেক্রেটারি হিগিনবটম। যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। এ বিষয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র মেরি হার্ফ সাংবাদিকদের অবহিত করেন। তিনি বলেন, আজ আপনাদের সামনে খুব স্পেশাল একজন অতিথিকে নিয়ে এসেছি। নারী অধিকার, সাহস দেখানো ও নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দেয়া হচ্ছে সম্মানজনক ওই পুরস্কার। এমন একজন নারীকে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা সম্মানিত বোধ করছি। তিনি মিসেস নাদিয়া শারমিন। বাংলাদেশী সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী। দায়িত্ব পালনকালে তার ওপর হামলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি পেশাগত কাজ অব্যাহত রেখেছেন। সর্বত্র নারী ও পুরুষ সাংবাদিকদের কাছে তিনি একটি অনুপ্রেরণা। এ বছর এ পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন- আফগানিস্তান বিমান বাহিনীর ক্যাপ্টেন নিলুফার রহমানি, বাংলাদেশের সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন, বলিভিয়ার অফিসিনা জুরিডিকা পারা লা মুজের-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক মিসেস রোজা জুলিয়েটা মোন্টানো সালভাটিয়েরা, মিয়ানমারের জেন্ডার ইকুইটি নেটওয়ার্ক-এর মিসেস মে সাবি ফিউ, মধ্য আফ্রিকার ফন্ডেশন ভোয়েক্স ডু কোয়েউর-এর সভাপতি মিসেস বিট্রিস ইপায়ে, গায়েনায় ইবোলার সংক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া নার্স মিসেস মেরি ক্লেয়ার টেসিকোলা, জাপানের মাতাহারা নেট-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিনিধি মিসেস সায়াকা ওসাকাবে, কসোভোর জেরি’র প্রধান সম্পাদক মিসেস আরবানা সাররা, পাকিস্তানের খেন্ডো জিরগার প্রতিষ্ঠাতা মিসেস তাবাসসুম আদনান ও সিরিয়ার ওমেন নাউ ফর ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক পরিচালক মিসেস মাজদ চৌরবাজি। এতে বাংলাদেশের নাদিয়া শারমিন সম্পর্কে বলা হয়, নাদিয়া শারমিন নিবেদিত একজন সাংবাদিক। তিনি নারী অধিকারের একনিষ্ঠ কর্মী। তিনি মাধ্যমিকে পড়াশোনা করার সময়েই সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি ২০০৯ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। কাজ শুরু করেন ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে তাকে ইসলামপন্থিদের একটি গণজমায়েতের রিপোর্ট করতে এসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছিল। সেখানে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন এটা জানা সত্ত্বেও তিনি ওই রিপোর্ট কাভার করতে যান নির্ভয়ে। তাকে উদ্দেশ্য করে সেখানে কটু কথা বলা হয়। এক পর্যায়ে সমাবেশের লোকজন তার সঙ্গে উগ্র আচরণ করে। ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ তাকে প্রহার করে। লাথি দেয়। তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এতে তিনি মারাত্মক আহত হন। ওদিকে তাকে ওই এসাইনমেন্টে পাঠানোর কথা অস্বীকার করে তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। তারা তার চিকিৎসার খরচ দিতে অস্কীকৃতি জানায়। এমনকি তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে। স্থানীয় পুলিশ এ ঘটনায় অজ্ঞাত ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। কিন্তু তারপর প্রায় দুই বছর পার হতে চলেছে। হামলাকারীদের কেউ শনাক্ত ও গ্রেপ্তার হয় নি। তিনি বর্তমানে আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করছেন। সেখানেও তিনি ক্রাইম রিপোর্টার। এর মধ্য দিয়ে তিনি সামাজিক বিভিন্ন বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

‘বিরোধীদের ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হচ্ছে বিদেশী সাহায্য’

বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে বৃটিশ সরকারের ৫ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড সহায়তার অপব্যবহার করা হচ্ছে। নিরাপত্তা সেবা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এ কার্যক্রম গৃহীত হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল এ অর্থ তাদের প্রতিপক্ষকে টার্গেট করতে ব্যবহার করে থাকতে পারে। বৃটিশ সরকারের সহায়তা বিষয়ক পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অন এইড ইমপ্যাক্ট (আইসিএআই) এক রিপোর্টে এ উদ্বেগ জানিয়েছে। কিন্তু বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, তহবিল অপব্যবহারের কোন তথ্যপ্রমাণ নেই। বৃটেনের ডেইলি মেইল ও টেলিগ্রাফে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়, বৃটিশ সরকার বাংলাদেশী গোয়েন্দাদের মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা, ফোনকল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নজরদারির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ প্রশিক্ষণ ব্যবহার করে বিরোধী নেতাদের খুঁজে বের করে কারান্তরীণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইসিএআই। সংস্থাটির এ উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃটিশ সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক দপ্তর (ডিএফআইডি) প্রাথমিকভাবে বলেছিল, কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট অফিসারেরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়। কিন্তু আইসিএআই তাদের উদ্বেগ জনসমক্ষে প্রকাশ করার হুমকি দিলে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। ৪ঠা মার্চ ডিএফআইডি দাবি করেছে তাদের সহায়তা অপব্যবহার হচ্ছে বলে কোন তথ্যপ্রমাণ নেই। কমিশনের রিপোর্টে এ-ও উঠে এসেছে যে ডিএফআইডি বাংলাদেশ পুলিশকে ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়ার প্রশিক্ষণও দিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৪০ হাজার দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করা। কিন্তু গবেষকরা বাংলাদেশে এমন একটি কার্যক্রমের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যেখানে ফিঙ্গার প্রিন্ট তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিলযোগ্য নয়। আইসিএআই-এর গবেষণায় তথাকথিত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর পুলিশ ও নিরাপত্তা সেবা উন্নয়নে বৃটিশ সরকারের সহায়তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ উঠেছে। ২০১৩ সালে সুদানের স্থানীয় পুলিশকে শক্তিশালী করার উদ্দেশে গৃহীত একটি কার্যক্রম বাতিল করা হয়। সেখানে পথশিশুদের ওপর পুলিশের নৃশংসতা নিয়ে উদ্বেগ উঠেছিল। গত বছর ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতেও জাতিসংঘের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে একই রকম একটি কার্যক্রম বাতিল করা হয়। আইসিএআই এর পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশে ডিএফআইডি এবং জাতিসংঘ পরিচালিত কার্যক্রম সম্পর্কে জেনে বিস্মিত হয়েছেন। এ কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা কর্মপদ্ধতি উন্নয়নে সহায়তা করার লক্ষ্যে সহায়তা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নানা সফটওয়্যার এবং গোয়েন্দা বিভাগে নানা প্রশিক্ষণ প্রদান। সফটওয়ার ও প্রশিক্ষণগুলোতে মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা, কল ডাটা বিশ্লেষণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি শেখানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, এ প্রশিক্ষণ মানবপাচারকারী এবং পতিতাবৃত্তির গ্যাংগুলো ছত্রভঙ্গ করতে সহায়ক হয়েছে। তবে আইসিএআই তাদের রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ‘আমাদের উদ্বেগ হলো এ সহায়তা হয়তো অপব্যবহারও হয়ে থাকতে পারে। আমাদেরকে ডিএফআইডি এবং ইউএনডিপি উভয়ই জানিয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের রাজনীতিকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা প্রমাণ দেখেছি যে বিরোধী তৎপরতার সময়গুলোতে কারাগারের লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অবনতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৃটিশ সহায়তায় গঠিত গোয়েন্দা দক্ষতা বিরোধী দলগুলোকে পর্যবেক্ষণ এবং দমনপীড়নে ব্যবহার করা হতে পারে।’ কমিশনের এ রিপোর্টের জবাবে ডিএফআইডি বলেছে, এসব অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে এবং তারা জানতে পেরেছে যে ইউকে সহায়তা ব্যয় এবং রাজনৈতিক দমনপীড়নে যোগসূত্রের কোন প্রকার তথ্যপ্রমাণ নেই। বৃটেনের বিরোধী লেবার দল মন্তব্য করেছে যে, কমিশনের এ রিপোর্টে দেখা যায় এসব ইস্যু মোকাবিলা করার কোন কৌশল ছিল না মন্ত্রীদের।

সীমান্ত পার করলেই গুলি করা হবে : ভারতীয় মৎসজীবীদের হুমকি শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শ্রীলঙ্কা সফরের সপ্তাহ খানেকও বাকি নেই। তার আগেই ভারতীয় মৎসজীবীদের উদ্দেশ্য নজিরবিহীন হুমকি দিলেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহে।
ভারতীয় মৎসজীবীরা পানি সীমান্ত পার করে শ্রীলঙ্কায় প্রবেশের চেষ্টা করলে তৎক্ষণাৎ তাঁদের গুলি করা হবে বলে সেখানকার একটি তামিল সংবাদ চ্যানেলে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন বিক্রমসিংহে। তাতে মানবাধিকার ভঙ্গ হয় না বলেও জানিয়েছেন তিনি। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ আকবরউদ্দিন জানিয়েছেন, ভারত-শ্রীলঙ্কা সীমান্তে মৎসজীবীদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দুটি দেশই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি দেখছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি আলোচনা করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল তামিল টিভি চ্যানেলে বিক্রমসিংহে বলেন, "যদি কেউ আমার বাড়িতে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করে তাহলে আমি গুলি করতে পারি। তাতে যদি অনুপ্রবেশকারীর মৃত্যুও হয়, সেই অধিকার আইন আমাদের দিয়েছে।"
পানি সীমান্তে এমন আইন রয়েছে বলেও দাবি করেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী। এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কা সফরে রয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। শনিবার সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নানা বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা করার কথা তাঁর। গতকালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর মৎসজীবীদের হুমকির বিষয়টিই আলোচনায় প্রধান্য পাবে বলে জানা গিয়েছে। চলতি মাসের ১৩-১৪ তারিখ শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপালা সিরিসেনা ও অন্য শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করার কথা রয়েছে। তার আগে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য দুদেশের সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় সেটাই এখন দেখার।

অভিজিৎ হত্যার দায়, অগণতান্ত্রিক চর্চা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা by ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

আমরা যে কতটা অগণতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করছি, তা প্রমাণ করে আজকের এই মুক্তচিন্তার মানুষ অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বৃহস্পতিবার রাতে অজ্ঞাত সন্ত্রাসী কর্তৃক অভিজিত রায় হত্যা এবং তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় আমরা সবাই হতবাক।গোটা বিশ্ববাসী আজ বিস্মিত। দেশীয় আন্তর্জাতিক মহলে এ ঘটনার নিন্দার ঝড় উঠেছে। পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে দেওয়া এ হত্যাকাণ্ডে আলোড়িত হয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমও। এই হত্যাকাণ্ডকে যে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করুক না কেন, জনজীবনের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যর্থতার দায় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
কাগজে কলমে আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বাস্তবে কী আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশে বসবাস করছি? না অন্য কোনো অসভ্য সমাজে বসবাস করছি। তা এখন বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তো এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই কল্পনা করা যায় না।
গণতন্ত্র তো হলো সেই পরিবেশ- যেখানে সব মত-বিশ্বাসের মানুষ তাদের সব চিন্তা-চেতনার কথা মুক্তভাবে প্রকাশ ও চর্চা করতে পারে। ফলে গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো বই-পত্রিকা যেমন নিষিদ্ধ করা যায় না, তেমনি কোনো লেখককে হত্যা তো দূরের কথা, অপদস্থ করাও যায় না। লেখার প্রতিবাদ লেখা দিয়েই করতে হয়। কিন্তু সেটা কী আমাদের দেশে হচ্ছে?
আজ মুক্তবুদ্ধির লেখক হত্যা আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। এটা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। এ হত্যাকাণ্ডই প্রমাণ করে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো যে ক্রমেই ভেঙে পড়ছে এবং আমরা যে ক্রমেই কতটা অসভ্য হয়ে উঠছি।
এর আগে অভিজিৎ রায়ের অনেক নাম শুনেছি, কিন্তু তাকে বা তার স্ত্রীকে কখনো দেখিনি। তার লেখাও কোনো দিন পড়িনি। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় টিএসসি সংলগ্ন এলাকায় বইমেলা থেকে বের হওয়ার পরই অজ্ঞাত সন্ত্রাসী কর্তৃক অভিজিত রায় হত্যা এবং তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় আমাদের সবাইকে হতবাক করেছে। আরো বেশী উদ্বিগ্ন হয়েছি এ জন্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটলো, যেখানে সর্বদা মুক্তচিন্তার লোকদের সমাগম থাকে। মনে প্রশ্ন জাগে, তখন আমাদের এতো দক্ষ পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কোথায় ছিলেন? এতো ক্ষমতাধর সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্র কী করছিল!
ঘটনার পরপরই আনসার বাংলা সেভেন নামের একাউন্ট থেকে এর দায় স্বীকার করে টুইটে বলা হয়, ইসলাম বিরোধী ব্লগার মার্কিন-বাঙালি নাগরিক অভিজিৎ রায়কে রাজধানী ঢাকায় হত্যা করা হয়েছে তার ইসলাম বিরোধী অপরাধের জন্য।
অপর একটি টুইটে বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ড খোরাসান এবং শামে সম্প্রতি শহীদ আমাদের দুই ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ ( দ্য টার্গেট ওয়াজ এন আমেরিকান সিটিজেন। টু-ইন-ওয়ান। আমেরিকা রিসেন্টলি মার্টার্ড টু অফ আওয়ার ব্রাদার্স ইন খোরাসান অ্যান্ড শাম। রিভেঞ্জ। পানিশমেন্ট)।
এই সূত্র ধরেই আমাদের দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ এ হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক তথা ইসলামপন্থিদের ঘাড়ে চাপিয়ে বক্তব্য প্রদান করে আসছেন। এমন কী বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দাবি করেছেন- এই হত্যাকাণ্ড মান্না-খোকার টেলিসংলাপের ষড়যন্ত্রের ফসল।
তাদের এই বক্তব্য যদি সত্য বলেই ধরে নেয়া যায়, তবে আমাদের কথা হলো- মান্না-খোকার ষড়যন্ত্রের তথ্য তো দুইদিন আগেই ফাঁস হয়েছিল তবে কেন সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া গেলো না। কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে পারেনি।
আসলেই কী ব্যাপারটি সেরকম! না, আমাদের দেশে যে অগণতান্ত্রিক চর্চা চলে আসছে সেটারই ধারবাহিতা এই হত্যাকাণ্ড। মুক্ত চিন্তার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এটাই নতুন নয়, আগেও বিশিষ্ট লেখক হুমায়ুন আজাদ ও ব্লগার রাজীবসহ আরো অনেককে এভাবেই জীবন দিতে হয়েছে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের হাতে। প্রতিটি ঘটনার পরপরই ঢালাওভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও ইসলামপন্থিদের দায়ি করা হয়েছে।
এর ফলে আমরা কী দেখলাম- কোনো হত্যাকাণ্ডেরই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। অপরাধীরা থেকে গেছে ধরা ছুঁয়ার বাইরে। এবারও পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দশা একই হবে।
কেননা, হত্যাকাণ্ডের পর কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই ঢালাওভাবে একটি পক্ষকে দায়ি করা হয়েছে। এ ধরনের দাবি ভিকটিম পরিবারসহ বিভিন্ন মহল থেকে করতেই পারেন। কিন্তু তদন্ত ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের দায় কারো উপর চাপানো মানে মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করা তথা প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করা। এতে প্রকৃত অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে অনেকটা নিরাপদেই থেকে যাচ্ছে।
ফলে এ হত্যা আমাদের সব নাগরিকের জন্যই হুমকি স্বরূপ। এর বিচার না হলে আরও যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এক দশক পেরিয়ে গেলেও হুমায়ুন আজাদের উপর বর্বর সন্ত্রাসী হামলার বিচার না হওয়ায় আজ নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন তরুণ গবেষক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গিয়েছিলাম বইমেলায়, অন্যান্য দিনের তুলনায় এদিন মেলার পরিবেশটা কেমন জানি শুনসান ছিল। লেখক-পাঠক-দর্শকদের মধ্যে ছিল এক ধরনের শোকাতুর ভাব। বইমেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড। মুক্তচিন্তার এ ব্লগার ও লেখককে হত্যার প্রতিবাদে শুক্রবার প্রতিবাদমুখর ছিল বইমেলা। সবাই এ কাপুরুষোচিত হত্যার ঘটনার নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছে।
দেখা গেছে, বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছেন লেখক-প্রকাশকরা ও পাঠকরা। শুদ্ধস্বরের স্টলের সামনে গিয়ে দেখলাম, কালো ডিজিটাল ব্যানারে লেখা হয়েছে- ‘কলমযোদ্ধা শহীদ অভিজিৎ রায়। আমরা তোমাকে ভুলবো না।’ এ প্রকাশনা সংস্থা থেকে এবার এসেছে, অভিজিৎ রায় ও মীজান রহমানের যৌথ লেখা ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’। এছাড়া শুদ্ধস্বর প্রকাশনী থেকেই বের হয়েছিল অভিজিৎ রায়ের ‘সমকামিতা’, ‘অবিশ্বাসের দর্শন’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’-নামক বইগুলো।
আমাদের দেশে মূলত: গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকার কারণে এই হত্যার সংস্কৃতি চলে আসছে। ভিন্ন মত দমন-নিপীড়নের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করছে। ফলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে যেমনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা আবশ্যক, তেমনি ঘটনার পরপরই তদন্ত ব্যতিরেকে কোনো পক্ষের উপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। নিরপেক্ষভাবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের বের করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে সাম্প্রদায়িক তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চারের আগে সব ধরনের অগণতান্ত্রিক চর্চাকে সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই আশা করা যায়- রাষ্ট্রে শান্তি ফিরে আসবে এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
সবশেষে বলবো- অভিজিৎ রায় যে একজন বড় মাপের মুক্তচিন্তার লেখক ছিলেন এতে কারো কোনো সন্দেহ নেই। তার চিন্তা-চেতনা ও মতের সাথে আমাদের অনেকের চিন্তার অমিল থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটি থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে, এটা আবার কোন ধরনের মত। এটাকে আমি সন্ত্রাসবাদ ছাড়া আর কিছুই মনে করি না। এরা দেশ, জাতি ও মানবতার শত্রু। ফলে যে কোনো মূল্যে এই সন্ত্রাসবাদ রুখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। কিন্তু অভিজিৎ রায় হত্যার দুইদিন পরেও জড়িত কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। তাই আমাদের সবার দাবি অবিলম্বে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
একবিংশ শতাব্দীর এই সভ্য সমাজে সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত অভিজিৎ রায়ের শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার আশু সুস্থতা কামনা করে এবং এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের প্রত্যাশা রেখে আজ এখানেই শেষ করলাম।
লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক
ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

বিয়ের বয়স ১৮–ই থাকছে, মা–বাবা চাইলে ১৬, নতুন খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে by মানসুরা হোসাইন

মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮-ই থাকছে। তবে মা-বাবা চাইলে ১৬ বছরেও বিয়ে হতে পারে। বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬ করার পরিকল্পনা তীব্রভাবে সমালোচিত হওয়ার পর সরকার এই নতুন কৌশল অনুসরণের কথা ভাবছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪ নামে আইনের এই খসড়া মতামতের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোও হয়েছে। খসড়ায় উল্লেখ আছে, ‘যুক্তিসংগত কারণে মা-বাবা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর বয়সে কোনো নারী বিয়ে করলে সেই ক্ষেত্রে তিনি “অপরিণত বয়স্ক” বলে গণ্য হবেন না।’
খসড়া আইনটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৮ ডিসেম্বর যে অনুশাসন দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে, ‘বিয়ের বয়স ১৮, তবে পিতামাতা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সামাজিক সমস্যা কম হবে।’
তবে শিশু ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা সরকারের এই ভাবনার সঙ্গে একমত নন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিশু বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান প্রথম আলোকে বলেন, ১৮ বছর বয়সের আগে কারও বিয়ে হওয়া উচিত নয়। ১৮ বছরের আগে কেউ বিচার, বুদ্ধি-বিবেচনাবোধসম্পন্ন হতে পারে না। তা ছাড়া ১৮ বছর না হলে একজন ভোটও দিতে পারছে না। আর নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করলে কেউ কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারবে না।
গত ১২ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ে যে খসড়াটি মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে, তাতেও প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের কথা উল্লেখ আছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, অপরিণত বয়স্ক বা ‘মাইনর’ বলতে পুরুষ হলে অন্যূন ২১ এবং নারী হলে অন্যূন ১৮ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তিকে বোঝাবে। তবে যুক্তিসংগত কারণে মা-বাবা বা আদালতের সম্মতিতে অন্যূন ১৬ বছর বয়সী কোনো নারী বিয়ে করলে সে ক্ষেত্রে সে অপরিণত বয়স্ক বলে গণ্য হবে না।
শিশু আইন, শিশুনীতিসহ বিভিন্ন আইন ও নীতি এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদসহ বিভিন্ন সনদ অনুসমর্থন করে সরকার ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। তাহলে নতুন খসড়া এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, এ প্রশ্ন করা হলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বয়সের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে এসে গেছি। বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ হবে। কিন্তু বিয়ে ছাড়া কেউ প্রেগন্যান্ট (অন্তঃসত্ত্বা) হয়ে গেলে কী হবে?’ তাঁর মতে, প্রতিবন্ধী নারীসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশেও অভিভাবকদের সম্মতিতে এ ধরনের বিয়ের কথা বলা আছে। সব দিক বিবেচনা করে তাঁরা সূক্ষ্মভাবে আইনটি করতে চান বলে জানান।
প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন জাতিসংঘের সনদ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ বা সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারপারসন এবং বেসরকারি সংগঠন উইমেন ফর উইমেনের নির্বাহী কমিটির সদস্য সালমা খান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তাকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া সরকারের কাজ নয়। এখন অনেক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তার প্রতিকার চাইছে। বিষয়টি এখন আর এমন নয় যে ধর্ষণের কথা মুখেই আনা যাবে না। তাই সরকারকে স্বচ্ছ একটি আইন করতে হবে।
ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটির পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, এই বয়সী মেয়েরা কীভাবে নিরাপদ থাকবে, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। সরকার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। চুরি হয় বলে সরকার কী বলবে যে সব ঘরে তালা লাগিয়ে দাও? আর কেউ অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে বিয়ে দিয়ে দিলেই এ ধরনের সমস্যার সমাধান হবে না, বরং সমস্যা বাড়বে। এ রকম আইন হলে অনেক মা-বাবাই এ সুযোগ নেবেন এবং কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেবেন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাজা ও জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এই খসড়ায় নাবালকের সংজ্ঞায় পুরুষ হলে অন্যূন ২১ এবং নারী হলে অন্যূন ১৮ বছরের কথা উল্লেখ ছিল। একই বৈঠকে ১৯২৯ সালের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ থেকে ১৮ এবং মেয়েদের ১৮ থেকে ১৬ করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
এ খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা ও বিরোধিতা শুরু হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠন সরকারকে স্মারকলিপি দিয়ে, মানববন্ধন করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারী আন্দোলন ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠনগুলো প্রথম থেকেই একমত যে আইনে এমন কোনো ধারা বা উপধারা সংযোজন করা যাবে না, যাতে করে বিয়ের বয়স ১৮-কে বাধাগ্রস্ত করে। বরং পারলে বিয়ের বয়স বাড়াতে হবে।’ তাঁর মতে, বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে নিরাপত্তা, দারিদ্র্য মোচনসহ বিভিন্ন বিষয়ের দিকে নজর বাড়াতে হবে, অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
সরকারের ২০১১ সালের সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) বলছে, ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৬৬ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ১৯ বছরের মধ্যে প্রতি তিনজনের একজন কিশোরী গর্ভধারণ করছে বা সন্তানের জন্ম দিচ্ছে।
গত জুলাই মাসে জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফ ও যুক্তরাজ্য সরকারের যৌথ আয়োজনে ২১ থেকে ২৩ জুলাই লন্ডনে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছর বয়সের আগে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে সম্পূণর্ভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছিলেন।

চট্টগ্রামে পেট্রলবোমায় দগ্ধ রনজিতের মৃত্যু by আহমেদ মুসা

আমার স্বামীর কি অপরাধ ছিল। তিনি কোনোদিন রাজনীতি করেননি। দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন। রাজনীতির ধারে-কাছেও কোনোদিন যাননি। মিছিল-মিটিংয়েও যাননি। তারপরও তাকে কেন নোংরা রাজনীতির পেট্রলবোমায় দগ্ধ হতে হল। এখন আমার সংসারের কি হবে। আমার ছেলেমেয়ের পড়ালেখার দায়-দায়িত্ব কে নেবে। আমার স্বামীকে কেন মারল? আমি এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল মারা যাওয়া রনজিত নাথের স্ত্রী ছবি নাথ। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে চমেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউতে) তার মৃত্যু হয়। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর ফলে পরিবারটির সামনে শুধুই ঘোর অন্ধকার। রনজিতের বাড়ি হাটহাজারীর ধলই ইউনিয়নে। রনজিতের এমন মৃত্যুতে তার স্ত্রী-পুত্রসহ অন্য স্বজনরাও দিশেহারা হয়ে পড়েন। রনজিতের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে মর্গের সামনে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
নিহত রনজিতের বড় বোন রত্না নাথ যুগান্তরকে জানান, আমার ভাইয়ের (রনজিতের) শান্তা নাথ ও প্রান্ত নাথ নামে দুই ছেলেমেয়ে রয়েছে। তারা প্রথম ও তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। রনজিতকে মারার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট মেয়েদের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করেছে পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারীরা। আমরা এর বিচার চাই।
নিহত রনজিতের স্ত্রী ছবি নাথ আর্তনাত করতে করতে যুগান্তরকে বলেন, এখন আমার কি হবে। আমার পরিবারের কি হবে। কি হবে আমার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ। স্বামীর ওপর আমার পুরো পরিবার নির্ভর করত। পরিশ্রম করে দিনে যা আয় করে তা দিয়ে চারজনের পরিবার চলে।
বুধবার রাতে হাটহাজারীর চারিয়া মাদ্রাসার সামনে কালভার্টের ওপর পেট্রলবোমায় ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের দমদমা গ্রামের মাইজভান্ডার এলাকার সিএনজি অটোরিকশা চালক সাবের আহমেদ ও রনজিত দগ্ধ হন। সাবের আহমেদ চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আশংকাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শরীরের প্রায় ৪২ শতাংশ পুড়ে গেছে।
পরিবারকে লাখ টাকা অনুদান : রনজিৎ নাথের পরিবারকে এক লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। শুক্রবার দুপুরে নিহতের স্ত্রীর কাছে নগদ টাকা তুলে দেয়া হয়।
শ্মশানে সমাহিত : হাটহাজারী প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার চমেক হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে রনজিতের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পোড়া লাশের গন্ধে ভারি হয়ে ওঠে এলাকার আকাশ-বাতাশ, শুরু হয় ক্রন্দন রোল। এ সময় আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীরা ভিড় করে তার মৃতদেহাবশেষ এক নজর দেখার জন্য। বিকাল ৫টায় সৎকার শেষে তার লাশ পারিবারিক শ্মশানে সমাহিত করা হয়।

ত্বকীর মুখ আমাদের সাহস by আনু মুহাম্মদ

বাংলাদেশের জন্য গৌরবের এক কিশোর ত্বকী হত্যার দুই বছর হয়ে গেল। যে হত্যাকারীরা গ্রন্থপ্রেমী এক কিশোরকে গ্রন্থাগারের রাস্তা থেকে তুলে নির্যাতন করে হত্যার পর শীতলক্ষ্যায় ফেলে দিল, তারা এখন আর অজানা নয়। তদন্ত হয়েছে, অপরাধী শনাক্তও হয়েছে, কিন্তু তার পরও আটকে আছে বিচারকাজ। ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশের মানুষের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীও দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু অভিযুক্ত পরিবারের ক্ষমতা দলের চেয়ে বেশি। প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-নেতাদের মুখে নাশকতা আর মানুষ খুনের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনতে পাচ্ছি, খুনিদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার প্রত্যয় শুনতে পাচ্ছি, খুনিদেরকে ক্ষমা না করার উদাত্ত ঘোষণা শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু খুন, পেট্রলবোমা, ‘ক্রসফায়ার’ অব্যাহত আছে।
অভিজিৎ হত্যার তদন্ত ও বিচার কানাগলিতে প্রবেশ করছে। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পার হয়ে গেছে, তাঁদের হত্যাকারীদের বিচার তো দূরের কথা, তদন্তের ঘোরপ্যাঁচই কাটছে না। ঢাকার মিরপুরের কালশীতে বাইরে থেকে ঘরের তালা আটকে গানপাউডার ঢেলে শিশু-নারীসহ ছয়জন মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় এমপি। কোনো তদন্তের খবরই পাওয়া যায় না, বিচার তো দূরের কথা। ওদিকে গত কয় বছরে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে মুক্ত হয়ে গেছে খুনের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত বহু আসামি।
যে সমাজে আমরা বাস করি, নৃশংসতার নানা ঘটনা বারবার এই সমাজের প্রকৃত রূপ আমাদের সামনে হাজির করে। দেখায় এগুলো শুধু এক-দুই ব্যক্তির বিষয় নয়, এই দল বা সেই দলের বিষয়ও নয়, এদের ক্ষমতার জাল বহুদূর বিস্তৃত। শুধু এক-দুই খুন নয়, আরও বহুবিধ অপরাধে তারা লিপ্ত। তারা ভূমিদস্যু, একের পর এক জলাভূমি, সাধারণ মালিকানাধীন জমি তাদের দখলে। তারা চাঁদাবাজ, পরিবহন থেকে শুরু করে সব ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের শিকার। ফুটপাতের ছোট্ট ব্যবসা, রিকশা থেকে বাস, নদী-বন থেকে খেলার মাঠ সর্বত্র তাদের লোভের আগ্রাসন।
এই সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ তৈরি করতে প্রতিটি ক্ষেত্রে নাগরিকদেরই বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয়। দখল, লুণ্ঠন ও চাঁদাবাজি কার্যকর করতে এই মাফিয়াদের পুষতে হয় সন্ত্রাসী বাহিনী। এই ভাড়াটে বাহিনী শুধু ভাড়া খাটে না, নিজেদের ক্ষুধা মেটাতে নিজেরাও নতুন নতুন পথ সন্ধান করে। এদের হাতে নির্যাতন, ধর্ষণ, হয়রানি এগুলো তাই নিয়মিত ঘটনা। এই মাফিয়া গোষ্ঠীর হাতে বাঁধা থাকে প্রশাসন, পুলিশ, আইন-আদালত, সরকারি ক্ষমতা।
এই দুর্বৃত্ত জালের মধ্যেই ত্বকী হত্যা ও হত্যাকারীদের সংহতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ত্বকী স্কুলের মেধাবী ছাত্র, সৃজনশীল কিশোর। লেখাপড়া, কবিতা লেখাসহ সৃজনশীল কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত ও। লাইব্রেরি ছিল তার প্রিয় গন্তব্য, বই ছিল প্রিয় সঙ্গী, মানুষের সৃজনশীল মুক্ত সমতার ভবিষ্যৎ ছিল তার স্বপ্ন। আমরা জানি, মাফিয়া সন্ত্রাসীরা এ রকম মুক্তচিন্তার কিশোর-তরুণদের পছন্দ করে না। নারায়ণগঞ্জে এরা ক্ষমতার মদমত্তে গড়ে তুলেছে খুনি উৎপীড়কদের একটি অন্ধকার জগৎ। তারা যেকোনো অপরাধ করতে পারে, কোনো অপরাধেই তাদের কোনো বিচার হবে না এই বিশ্বাসই তাদের ঔদ্ধত্যের কারণ। খেলার ছলে মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেললেও না। কিন্তু ত্বকীর বাবা ও তার পরিবার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই মাফিয়াদের সব দখল-লুণ্ঠন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। এই প্রতিরোধ চুরমার করতেই দুর্বৃত্তরা বেছে নিয়েছিল ত্বকী হত্যার নিষ্ঠুরতম পথ। কিন্তু সফল হয়নি, ত্বকীর মুখ হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের চিহ্ন। ত্বকী হত্যার বিচার তাই একদিন হবেই।
বাংলাদেশ এখন সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, অসহিষ্ণুতা আর বিচারহীনতার দেশ। অনেকে এর জন্য পুলিশি অদক্ষতাকে দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। ওপরের নির্দেশ, ক্ষমতাবানদের প্রভাব বা সিদ্ধান্তের কোনো বাধা না থাকলে অপরাধী শনাক্ত করা, খুঁজে বের করা যে তাদের পক্ষে খুবই সম্ভব, তার বহু প্রমাণ আছে। সমস্যা দক্ষতার নয়, সমস্যা সিদ্ধান্তের।
ত্বকী অল্প বয়সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তার ওই বয়সেরই লেখা গদ্য, কবিতা, ওর আগ্রহ, ছবি সবকিছুতে বাংলাদেশের সেই স্বপ্ন, যা ধারণ করেই এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। অথচ এই ‘চেতনা’র নামাবলি গায়ে দিয়েই সরকার রক্ষা করছে ত্বকী হত্যাকারীদের। খুনি বীভৎস মুখ আড়াল করছে চেতনার ঝান্ডা দিয়ে। সেই মুখোশ খুলে দিতে ত্বকীর মুখই আমাদের সাহস।
নারায়ণগঞ্জ গডফাদার সন্ত্রাসীর এলাকা বলে পরিচিত। শীতলক্ষ্যা নদী খুনিদের উল্লাস বহন করতে করতে ক্লান্ত। এই নারায়ণগঞ্জই একই সঙ্গে হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের প্রতীক। আর তার কেন্দ্রে এখন ত্বকীর মুখ। মৃত্যুর পরও ত্বকী তাই প্রতিরোধের শক্তি।
আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

রাজনীতিতে নতুন মোড় : সরকারে অস্থিরতা by জাকির হোসেন লিটন

হঠাৎ করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যাচ্ছে । বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থানের কারণে সরকার কোনো পরিকল্পনায় স্থির থাকতে পারছে না। সরকারের ভেতরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর অস্থিরতা বাড়ছে। বিএনপি চেয়ারপারসনকে গ্রেফতার করা হবে; না গুলশান কার্যালয় থেকে বের করে বাসায় পাঠানো হবে ; না কার্যালয় তল্লাশি করে অন্য সবাইকে বের করে দেয়া হবে তা নিয়ে শেষ মুহুর্তে চরম সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা।
বিশেষ করে খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের খবরে রাজধানীসহ দেশজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হওয়া, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের মনোভাব এবং রাতে খালেদা জিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর ক’টনীতিকদের বৈঠকের খবরে পরিস্থিতি সামাল দেয়া এখন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে।
এর আগে খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থানের কারনে সরকারের নানা কৌশল বারবার ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাকে কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয় থেকে বের করার কৌশল নেয় সরকার। সরকারের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা মনে করছিলেন, এই পরোয়ানার কারণে খালেদা জিয়া নিজেই ওই অফিস থেকে বের হয়ে আদালতে জামিন চাইতে বাধ্য হবেন। কিন্তু খালেদা জিয়া কার্যালয় থেকে বের না হওয়ায় সরকারের এ কৌশলও ব্যর্থ হয়। এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার সরকার কঠোর অবস্থানে যাবার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থাকলেও শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তা চূড়ান্ত করতে পারেননি নীতি নির্ধারকরা। বরং পশ্চিমা কূটনীতিকদের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়াসহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়। পশ্চিমা কূটনীতিকরাও খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে সরকারের সবুজ সংকেতে গুলশান কার্যালয়ে যান।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, একদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং অন্যদিকে পরবর্তিত রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ ও সরকারের কট্ররপন্থী নেতা ও মন্ত্রীরা খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর মাধ্যমে চলমান সঙ্কটের সমাধান চান। কিন্তু অপেক্ষাকৃত মধ্যমপন্থী ও সিনিয়ররা মনে করছেন, এর মাধ্যমে আসলে সঙ্কটের চূড়ান্ত সমাধান না হয়ে আরো জটিল হতে পারে।
বিশেষ করে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুত্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সার্বক্ষণিক নজরদারি সদ্য সফর করে যাওয়া ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের মনোভাব এবং সারা দেশে সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের প্রস্তুতির খবর সরকারের জন্য খুব সুখের বিষয় নয়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব দেশটির পররাষ্ট্রনীতি যে আগের মতো চলবে না তার ইঙ্গিত দেন। এছাড়া প্রবল দমন পীড়নের পরও সরকার বিরোধী আন্দোলনের নতুনমাত্রা ভবিষ্যত পথচলা যে কঠিন হবে তা দলের সিনিয়র নেতারা উপলদ্ধি করে কিছুটা পিছু হটার নীতি গ্রহনের পরামর্শ দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়াকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার নাও করা হতে পারে। কারন খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর আলোচনার পথ যেমন রুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে তেমনি সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ এবং আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তাই তারা খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পক্ষে নন দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা। তবে আদালতের নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয় থেকে বের করে আদালতে হাজির করে জামিনের পক্ষেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু খালেদা জিয়া জামিনের মাধ্যমে কার্যালয়ে ফেরার নিশ্চয়তা পেলে আদালতে যেতে পারেন বলে তার আইনজীবীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের লাগাতার অবরোধ ও হরতাল সরকারের জন্য খুব উদ্বেগেরে কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান আন্দোলনে দেশের ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নিজেই জাতীয় সংসদে তথ্য দিয়েছেন। আর চলমান অবস্থানে জাতীয় সমস্যা ও দুর্যোগ বলে আখ্যায়িত করেছেন অর্থমন্ত্রী।
নানা চেষ্টার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এ সঙ্কট কিভাবে নিরসন হবে তা বলতে পারছেন না কেউ। হঠাৎ করে পরিস্থিতি আবারো অবনতি হওয়ায় সরকারের মন্ত্রীসভায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। ওই বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রীদের সাবধানে চলাফেরার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা নাও হতে পারে। তবে সারা দিন তিনি আদালতে না গেলে আজ রাতে অথবা আগামীকাল হয়তো তার কার্যালয়ে তল্লাশি করা হবে। এর মাধ্যমে সেখান থেকে ব্যাক্তিগত কর্মকর্তাদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করা হতে পারে। অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে সেখানে নি:সঙ্গ করে রেখে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে।

খালেদাকে গ্রেফতারের ঝুঁকি নিতে চায় না সরকার by জাকির হোসেন লিটন

বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও আপাতত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। চলমান সঙ্কট আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কা, জনমনে বিরূপ প্রভাব ও প্রবল কূটনীতিক চাপের মুখে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা। সেজন্য আদালতের নির্দেশের পরও এখনই খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের ঝুঁকি নেয়া হচ্ছেনা বলে আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন চাপের মুখে সাময়িকভাবে গ্রেফতার এড়ানো গেলেও খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবেনই। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সরকারের সর্বোচ্চ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রেফতার কার্যক্রম হতে পারে কয়েক ধাপে ও ভিন্ন কৌশলে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, সরকার খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে অনেক আগেই। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে এ কাজে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা। সেজন্য সব ধরণের প্রস্তুতিও শেষ করা হয়। তবে শেষ মুহুর্তে গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে ক’টনৈতিক তৎপরতা এবং উদ্ভুত রাজনৈতি পরিস্থিতি সরকারকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে চলমান অস্থিতিশীলতা চরম পর্যায়ে পৌঁছতে পারে এবং গণতন্ত্রের যাত্রাও ব্যাহত হতে পারে ঢাকায় অবস্থিত কূটনীতিকরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১৬ দেশের কূটনীতিকরা মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতও করেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার গ্রেফতার ও দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহলের কঠোর নজরদারি সরকারকে ভাবিয়ে তোলে।
এদিকে ব্রাসেলসভিত্তিক আর্ন্তজাতিক সংস্থা ‘ক্রাইসিস গ্রুপ’ গত মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনে গত জানুয়ারি থেকে ১০০ জনেরও বেশি লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের আদালত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট আরও বাড়বে।’
সরকারের ভেতরে বড় একটি অংশ মনে করছে, এ অবস্থায় দেশের সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হলে গণতান্ত্রিক সরকারের সবচেয়ে বড় অগণতান্ত্রিক আচরণই প্রমাণ হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা সরকারের জন্যে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে দুই মাস ধরে চলা বিএনপি জোটের অবরোধ-হরতালে ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি গভীর খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েচে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ি এরই মধ্যে প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে তাদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বাড়তে পারে অস্থিতিশীলতা ও নাশকতা। এতে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে চরম শঙ্কা দেখা দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এমন রিপোর্ট দিয়েছে। ফলে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারে নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও সরকার আপাতত সেখান থেকে সরে আসে।
ওদিকে ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ মনে করছেন, আন্দোলনে গতি আনতে এবং দেশ-বিদেশের আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে বেগম জিয়া নিজ থেকেই গ্রেফতার হতে চান। মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়ে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন তিনি। তাই সরকার তাকে এখনই গ্রেফতার করে ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছেনা। কারণ এতে গ্রেফতারের সুফল সরকারের চেয়ে বিরোধীদের ঘরেই যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বুধবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, আদালতে গরহাজির হয়ে খালেদা জিয়া নিজেই গ্রেফতার হতে চাইছেন। উনি (খালেদা জিয়া) বিদেশিদের সিমপ্যাথি (সহানুভূতি) চান। বিদেশি পত্রিকায় একটু পাবলিসিটি চান। এক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তবে ভিন্ন কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, হুটহাট এখনই গ্রেফতারের ঝুঁকি না নিলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হবে। আ্ওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী নেতাদের মতে তার উস্কানিতে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাই খালেদা জিয়াকে ছাড় দিতে চায় না সরকার। এ ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী যে কোনো সময় খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে একদফা তল্লাশি চালানো হতে পারে। ওই তল্লাশিতে কার্যালয়ে অবস্থানরত সব স্টাফদের বের করে দেয়া হবে।
এ অবস্থায় কমপক্ষে দুই-এক সপ্তাহ তাকে একা থাকতে হতে পারে। শেষ ধাপে আদালতের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হবে। এর আগে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারে দেশে-বিদেশে ইতিবাচক মনোভাব ও জনমত সৃষ্টি করতে নানা উদ্যোগ নেবে সরকার।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিম গতকাল বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারে আওয়ামী লীগ কোনো চাপের ভয় করে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর আইন অনুযায়ি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।