Thursday, February 25, 2016

এবার ভারতীয় স্কুলে মুসলিম ছাত্রীদের স্কার্ফ নিষিদ্ধ

মুসলিম ছাত্রীদের স্কার্ফ পরা নিষিদ্ধ করেছে ভারতের মণিপুর রাজ্যের বেসরকারি একটি স্কুল। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে দোপাট্টা (ওড়না) পরাও নিষেধ করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। মণিপুর রাজ্যের রাজধানী ইমফলের ‘ব্রাইটার একাডেমি’ নামে স্কুলে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার (টিওআই) খবরে বলা হয়, স্কুল কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে স্কুলের শিক্ষার্থীসহ মুসলিমদের বিভিন্ন সংগঠন। এ বিষয়ে গতকাল বুধবার টিওআইর কাছে প্রতিক্রিয়া জানান অল মণিপুর মুসলিম গার্ল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (এএমএমজিএসইউ) প্রেসিডেন্ট রুকশার চৌধুরী। তিনি টিওআইকে বলেন, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। বহু মুসলিম নারীর জন্য মাথা ঢেকে রাখা একটি অবশ্যপালনীয় ধর্মীয় রীতি।
রুকশার চৌধুরী বলেন, চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তি সম্পন্ন হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ নতুন ড্রেস কোড চালু করেছে। এ ধরনের কড়াকড়ি মুসলিম ছাত্রীদের মানসিক নির্যাতনের শামিল।
এএমএমজিএসইউর প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অনেক ছাত্রী মৌখিক প্রতিবাদ করেছে। কেউ কেউ স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ বিষয়ে আমরা স্কুলের অধ্যক্ষ, শিক্ষামন্ত্রী ও ইমফল পশ্চিমাঞ্চলের উপকমিশনারকে স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
‘যতক্ষণ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত (স্কার্ফ নিষিদ্ধ থাকা) থেকে সরে না আসা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করতে পারি।’

কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন সঞ্জয় দত্ত

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত বৃহস্পতিবার ইয়েরওয়াড়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তারা সাজা মেয়াদ সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ে ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণ মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।
আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর নীল রঙের শার্ট ও জিন্স পরিহিত হাস্যোজ্জ¦ল সঞ্জয় আজ সকালে জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর তিনি একটি গাড়িতে করে লোহেগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। বিমানবন্দরে একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে করে মুম্বাইয়ে যাবেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
৫৪ বছর বয়সী সঞ্জয় জেল ভবনের ওপর উড়তে থাকা ভারতের জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানান।
এ সময় পর্দার এই ‘খলনায়ক’ একটি ব্যাগ বহন করছিলেন। ব্যাগটিতে তার জিনিসপত্র ও বন্দির ফাইল ছিল।
সঞ্জয়ের স্ত্রী মান্যতা ও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজকুমার হিরানী এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন।
সিনেমার এই ‘মুন্নাভাই’ জেল থেকে বের হয়ে তার জন্য অপেক্ষমান গাড়িতে ওঠার আগে জেলখানার বাইরে দেশমাতৃকার প্রতি অভিবাদন জানান।
সঞ্জয় দত্ত তার ৫ বছরের সাজার মেয়াদের ৪২ মাস ইয়েরওয়াড়া কারাগারে ছিলেন।
তিনি এই ৫ বছরে বেশ কয়েকবার প্যারোলে মুক্তি পান। তার এই ঘন ঘন প্যারোলকে নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক দেখা দেয়।
তারা সমালোচকরা বলেন, সেলিব্রিটি হওয়ার কারণে তাকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষ ও তার আইনজীবীরা এই সব অভিযোগ অমূলক বলে প্রমাণ করেছেন।
১৯৯৩ সালের ১৯ এপ্রিল এই বলিউড তারকার কাছ থেকে একটি একে-৫৬ রাইফেল পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয়।
১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে মুম্বাইয়ে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ চালানোর জন্য যে অস্ত্র ও বিস্ফোরক মজুদ করা হয় সঞ্জয়ের কাছে পাওয়া অস্ত্রটি এর অংশ।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা তদন্ত ও বিচারের সময় তিনি ১৮ মাস কারাগারে ছিলেন।
২০০৭ সালের ৩১ জুলাই মুম্বাইয়ের টাডা আদালত অস্ত্র আইনের আওতায় তাকে ছয় বছরের কারাদন্ডাদেশ ও ২৫ হাজার ভারতীয় রুপি জরিমানা করেন।
২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই রায় বহাল রাখেন। তবে সাজার মেয়াদ হ্রাস করে ৫ বছর করা হয়। এরপর বাকি সাজা কাটানোর জন্য তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
কারা কর্মকর্তাদের মতে, সঞ্জয়কে জেলখানায় কাগজের ব্যাগ তৈরি করতে দেয়া হয়।
এই সময়ের মধ্যে ২০১৩ সালে ডিসেম্বরে তার ৯০ দিনের প্যারোল মঞ্জুর হয়।
পরে তার আরো ৩০ দিনের প্যারোল মঞ্জুর হয়।

আফগানিস্তানে দ্বিতীয় দফার ভোট ৭ নভেম্বর

আগামী ৭ নভেম্বর আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট নেওয়া হবে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই প্রথম দফার নির্বাচনে ৪৯.৬৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় ভোট গ্রহণ এড়ানোর জন্য শতকরা ৫০ ভাগ ভোটের প্রয়োজন ছিল। গতকাল মঙ্গলবার ভোট গ্রহণের নতুন এই তারিখ ঘোষণা করা হলো।
আফগানিস্তানের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করেছে যে, দ্বিতীয় দফার নির্বাচন এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় শতকরা ৫০ ভাগ ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন হামিদ কারজাই।
প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লড়বেন। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনকে গণতন্ত্রের পথে এক ধাপ অগ্রগতি হিসাবেও বর্ণনা করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত বৈধ ও সাংবিধানিক, যা গণতন্ত্রের পথে আমাদের যাত্রাকে শক্তিশালী করবে।’
দ্বিতীয় দফার নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন হামিদ কারজাই।
একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, চূড়ান্ত ভোট গণনার পর দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই পেয়েছেন শতকরা ৪৯.৬৭ ভাগ ভোট।
এর আগে গত সোমবার আফগানিস্তানে নির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে গঠিত জাতিসংঘ সমর্থিত প্যানেল জানিয়েছে, গত আগস্টে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হামিদ কারজাই যথেষ্ট পরিমাণ ভোট পাননি।
গত আগস্টে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কারজাইয়ের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ প্রথম থেকেই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করছিলেন। তবে গত মাসে ঘোষিত নির্বাচনী ফলাফলে দেখানো হয়, হামিদ কারজাই ৫৫ ভাগ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।

সুইস ব্যাংকগুলোয় ভারতীয়দের গচ্ছিত অর্থের হিসাব দেওয়া হবে

অবশেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে ভারতীয়দের গচ্ছিত কালো টাকার হিসাব দিতে সম্মত হয়েছে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে কালো টাকার হিসাব নিতে এ মাসেই সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে ভারত সরকারের একটি প্রতিনিধিদল।
সম্প্রতি ভারতে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ফিলিপ ওয়েলটি জানিয়েছেন, এ বছরের শেষের দিকে দ্বৈত কর সংশোধন করে চুক্তিতে কর ফাঁকির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর সুইস ব্যাংকে কাদের টাকা রয়েছে, তা জানাতে আর বাধা থাকবে না।
এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, এই অর্থ উদ্ধারের জন্য ভারত সরকার সুইজারল্যান্ড সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাবে।
এদিকে সুইস ব্যাংকগুলোর সংগঠন ‘স্যাব’ ভারতকে জানিয়ে দিয়েছে, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ধনী ব্যক্তিদের সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের ওপর এবার চড়া হারে কর আরোপ করতে চলেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার জেরে বিভিন্ন দেশ থেকে দাবি ওঠায় সুইস কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্যাবের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিভাগের প্রধান জেমস ন্যাসন বলেছেন, ‘ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আমাদের কাছে চিঠি দিয়ে কালো টাকা আমদানি বন্ধের সাহায্য চেয়েছে। আমরা সেই আবেদনের কপি সুইজারল্যান্ড সরকারের কাছে পাঠিয়েছি। আমরা সুইস সরকারের সিদ্ধান্ত জানার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
প্রসঙ্গত, ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও একই দাবি করেছে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে। সেই দাবিতে সাড়া দিয়ে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় সাড়ে চার হাজার গোপন ব্যাংক হিসাবের হদিস দিয়েছে।
এদিকে ভারতের প্রখ্যাত আইনজীবী রাম জেঠমালানি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করে সুইস ব্যাংক থেকে কালো টাকা উদ্ধারে ভারত সরকারের অবস্থান এখন কোন পর্যায়ে, তা জানতে চেয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি এ সংক্রান্ত ২১টি নথি ভারত সরকারকে সুুপ্রিম কোর্টে পেশ করার জন্যও আবেদন জানিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কে জি বালাকৃষ্ণন, বিচারপতি পি সত্যশিবম ও বিচারপতি বি এস চৌহানকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ জানান, সরকার ওই ২১টি নথির মধ্যে কিছু নথিকে ‘গোপন নথি’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন, আবার কিছু নথিকে প্রকাশ্যে আনতে পারেন।
এদিকে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভারত সরকারকে আরও জানিয়েছে, সেখানে ১০ লাখ কোটি রুপিরও বেশি বিদেশিদের অর্থ সঞ্চিত আছে। বিজেপি বলেছে, ওই অর্থের মধ্যে ভারতীয়দের রয়েছে ৫০ থেকে ১৪০ কোটি ডলার।
এখন এই কালো টাকা উদ্ধার নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে শাসক জোটের প্রধান দল কংগ্রেস এবং বিরোধী জোটের প্রধান দল বিজেপি ঘোষণা দিয়েছিল, তারা ক্ষমতায় গেলে ১০০ দিনের মধ্যে সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের গচ্ছিত কালো টাকার বিবরণ জানিয়ে দেবে দেশবাসীকে। এ কথা নির্বাচনের প্রচারের সময় ঘোষণা করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বিরোধীদলীয় নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি।
কিন্তু ১০০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও মনমোহন সরকার এ ব্যাপারে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে ইতালিতে অনুষ্ঠিত জি-৮ সম্মেলনে মনমোহন এ নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। সম্মেলনের সুপারিশ অনুযায়ী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বিদেশের ব্যাংকে, বিশেষ করে সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের গচ্ছিত হিসাববহির্ভূত বেআইনি টাকা উদ্ধারে নামার ঘোষণাও দেয়।
অন্যদিকে ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় অর্থবিলের ওপর জবাবি ভাষণ দিতে গিয়ে কালো টাকা অর্থ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করেন ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ও।
এরপর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জি-৮ভুক্ত দেশের সুপারিশ অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের গচ্ছিত অর্থের বিবরণ জানানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু এ চিঠি দেওয়ার পর সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রথমে ভারতকে জানিয়েছিল যে নীতি অনুযায়ী তারা ভারতীয়দের গচ্ছিত রাখা অর্থের বিবরণ দিতে অপারগ। পরে অবশ্য সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই অর্থ উদ্ধারে সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দেয় ভারতকে।

পিলখানায় সেনাহত্যার বিচারে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ by ডক্টর তুহিন মালিক

আজ সেই রক্তাক্ত ২৫ ফেব্রুয়ারি,
পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে দেশপ্রেমিক
সেনা অফিসার হত্যাযজ্ঞ দিবস
এক. ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডির সপ্তম বর্ষপূর্তি। ২০০৯ সালের এই দিনে বিদ্রোহের নাম দিয়ে গণহত্যা করা হয়েছিল ৫৭ সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে। এই ঘটনায় গত ছয় বছরে অসংখ্য মামলা করা হয়েছে। বিচার করে সাজা দেয়া হয়েছে অনেককে। খালাস পেয়েছে বহুসংখ্যক আসামি। জেলখানায় মারা গেছেন অনেকে। কিন্তু শুধু সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে করা এই হত্যাযজ্ঞটি সাধারণ কোনো ফৌজদারি নরহত্যার অপরাধের সংজ্ঞাভুক্ত হতে পারে না। বরং এটা সুস্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক আইনের ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার অপরাধ। অথচ আমরা এ গণহত্যাকে শুধু বিডিআর আইন এবং প্রচলিত ফৌজদারি আইনে বিচার করেছি। আর এটা করতে গিয়ে ন্যায়বিচারকেই যেন বন্দী করে ফেলেছি বিলম্বিত বিচারপ্রক্রিয়া এবং বিচারিক সীমাবদ্ধতার আইনি বেড়াজালে। অথচ ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০(৩) বলছে, কোনো গোষ্ঠীকে সম্পূর্র্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াসের নামই হচ্ছে গণহত্যা। এই অনুচ্ছেদে পরিকল্পিতভাবে কোনো গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য তাদের সদস্যদের হত্যা কিংবা শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন করাকেও গণহত্যা বলা হয়েছে। তাই শুধু সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার অপরাধে তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সংঘটিত এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি গণহত্যা কনভেনশন মতে সুস্পষ্টভাবে গণহত্যার অপরাধ। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে পিলখানার বর্বরোচিত গণহত্যাকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদলে ‘রেকট্রোস্পেকটিভ এফেক্ট’ বা ‘আইনের ভূতাপেক্ষা বলবৎকরণের’ মাধ্যমে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের আইন আমাদের সংবিধান পরিপন্থী হবে না বলে সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা দেয়া আছে। সেই সাথে আমাদের সংবিধানের ৪৭ক অনুচ্ছেদ মোতাবেক এই আইনে আগের যেকোনো সময়ের সংঘটিত অপরাধের বিচার ’রেকট্রোস্পেকটিভ এফেক্টে’ করা যাবে। এমনকি এসব ঘাতক সংবিধানের অধীনে কোনো প্রতিকারের জন্য উচ্চ আদালতে কোনো ধরনের আবেদন করার যোগ্যতাও হারাবে বলে সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা দেয়া আছে। তাই এসব গণহত্যাকারীর দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের একমাত্র বিকল্পই হচ্ছে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা। অন্য আরো অনেক বিকল্প হয়তো আছে, তবে সেগুলোও বরাবরের মতোই দীর্ঘমেয়াদি আইনি অন্ধকারে হারিয়ে যাবে বলে দৃঢ় আশঙ্কা রয়েছে।
দুই. বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য, বা অন্য কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান-সংবলিত কোনো আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোনো বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থী, এই কারণে তা বাতিল বা বেআইনি বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনো বাতিল বা বেআইনি হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।’ যার ফলে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনকে সংশোধন করতে আমরা দেখেছি। এমনকি আবদুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরও ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে ১৯৭১ সালের সংঘটিত অপরাধকে ’রেকট্রোস্পেকটিভ এফেক্ট’ বা ভূতাপেক্ষা কার্যকারিতা দেয়া হয়। পরে এই আইন সংশোধন করে সংশোধিত বিধানের কার্যকারিতা ২০০৯ সাল থেকে বলবৎ করা হয়। আর এসবই করা হয়েছে সংবিধানের বর্ণিত ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ বলে। যদিও আমাদের সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টত বলা আছে, অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ আইনে দণ্ড ছাড়া কাউকে ভিন্ন কোনো দণ্ড দেয়া যাবে না। কিন্তু গণহত্যা কিংবা যুদ্ধাপরাধের কারণে সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক এসব অপরাধীর সংবিধানের আওতায় কোনো প্রতিকার পাওয়া, এমনকি মৌলিক অধিকারপ্রাপ্তি পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা হলে প্রশ্ন জাগে, ঠিক একইভাবে পিলখানায় সংঘটিত সশস্ত্র, প্রতিরক্ষা বা সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপারে অর্থাৎ সহায়ক বাহিনী হিসেবে বিডিআরের সদস্যদের করা; সেনাকর্মকর্তাদের গণহত্যার অপরাধটিও বিদ্যমান আইনটির সংশোধন করে পেছনের দিকে কার্যকর বা বলবৎ করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা যাবে না কেন?
আজ সেই রক্তাক্ত ২৫ ফেব্রুয়ারি,
পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে দেশপ্রেমিক
সেনা অফিসার হত্যাযজ্ঞ দিবস
তিন. পিলখানার সেনাহত্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। পরিকল্পিতভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শুধু সেনাবাহিনীর সদস্য ও তাদের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে চালানো হয় এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিডিআর সদর দফতরে সকাল ৯টায় যখন দরবার বসেছিল তার আগেই পরিকল্পনামাফিক পিলখানার ভেতরে একদল বিডিআর সৈনিক ঢুকে পড়ে। তাদের একজন বিডিআর মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই সব সেনাসদস্যকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করা হয়। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর বীভৎস নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। আক্রমণকারীরা পরিকল্পনামাফিক অস্ত্রগুদাম খুলে সদর দফতরের চারটি প্রবেশ গেটে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে থাকে। অথচ পরিকল্পিতভাবেই সেদিন নিরস্ত্র সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণকে বিদ্রোহের নাম দেয়া হয়েছিল, যা স্বল্প সময়ের মধ্যেই সদর দফতরের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়ে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে সেদিন স্পষ্টত দেখা গেছে, লাল কাপড় মাথায় বাঁধা হত্যাকারীরা কিভাবে দৌড়াদৌড়ি করেছে। সংবাদমাধ্যমে এমনও খবর বেরিয়েছে যে, এ ঘটনার সাথে ইউনিফর্ম পরিহিত নয় এমন কিছু মানুষও যোগ দিয়েছিল। বাইরে থেকে গাড়ি প্রবেশের কথাও বলা হয়েছে। রক্তাক্ত বিদ্রোহের নাম দিয়ে এভাবে গণহত্যা করা হয়েছিল ৫৭ সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে। পিলখানা মুহূর্তেই পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। আবিষ্কৃত হয় গণকবরের। এত লাশ আর ধ্বংসযজ্ঞ দেখে সমগ্র জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। সমাজের সর্বস্তর থেকে দোষীদের বিচারের দাবি ওঠে। বিদ্রোহের বিচারের এসব মামলায় অভিযুক্ত বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। একই সাথে রহিত হয়ে যায় ১৯৭২ সালের বিডিআর আইন। নতুন আইনে বর্তমানে শৃঙ্খলাবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আইনে বিচার করা হবে বাহিনীর সদস্যদের। আর আইন সংশোধন করে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ সাজা করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এসবই করা হয়েছে ভবিষ্যতে অনুরূপ কোনো অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য। আর ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দফতরে যা ঘটে গেছে তার জন্য করা হয়নি আইনের সংশোধন!
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
চার. বিডিআর ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে বিডিআরকে করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিডিআর নামেই পরিচিত ছিল বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। ২০০৯ সালের বিদ্রোহ ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর বিডিআর আইন পরিবর্তনের দাবি ওঠে। সংসদে এ নিয়ে বিল ওঠার পর কণ্ঠভোটে তা পাসও হয়। এর আগে পরিবর্তিত হয়েছে বাহিনীর পোশাক। নাম ও পোশাক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এ আইনে। ১১২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে এক বা একাধিক বর্ডার গার্ড আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে এবং তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনালে একজন সভাপতি ও দু’জন সদস্য থাকবেন। মহাপরিচালকের অনুপস্থিতিতে ন্যূনতম উপমহাপরিচালক পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হবেন এবং পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা সদস্য হবেন। এ ছাড়া বাহিনীর কার্যাবলি, ক্ষমতা ও দায়িত্ব আরো বিস্তৃৃত ও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। সুযোগ রাখা হয়েছে জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতির। বাকস্বাধীনতা, সংগঠন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান আগে ছিল না, বর্তমান আইনে তা রাখা হয়েছে। কিন্তু ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দফতরে সংঘটিত নৃশংসতম গণহত্যার জন্য সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদের আওতায় বিদ্যমান পেছনের ঘটনাকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। ফলে আইন-কানুনসহ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করা হয়েছে ঠিকই; তবে এসবই করা হয়েছে শুধু ভবিষ্যতের কোনো অপরাধের জন্য। পিলখানার হতভাগা নিহত সেনাদের ভাগ্যে এসব আইনের কোনো সুফল জুটবে না কখনো!
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯: জাতির এক কলঙ্কময় দিন
পাঁচ. শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে একসাথে এত সেনাকর্মকর্তার হত্যার কোনো নজির নেই। পরিকল্পনামাফিক পিলখানার এই হত্যাযজ্ঞকে মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সারা দেশের ৫৭টি ইউনিটে। কোনোরকম পূর্বপরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র ছাড়াই কী করে বিডিআরের সাধারণ সৈনিকেরা আচমকা তাদের সাধারণ কিছু পেশাগত দাবি-দাওয়ার কারণে এভাবে বেছে বেছে সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের লোকজনকে নিমর্মভাবে হত্যা করতে যাবে? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে? কারা এর পরিকল্পনাকারী, কারা ষড়যন্ত্রকারী, আর কারাই বা উসকানি বা মদদদাতা, এত দিনেও কেন আমরা তাদেরকে খুঁজে বের করলাম না? এদের বিরুদ্ধে কি কোনো তদন্ত করা হয়েছে এত দিনে? আইনের অপ্রতুল শাস্তি দিয়ে আর ৪০ হাজার পৃষ্ঠার নথি তৈরি করে কি আমরা এই গণহত্যার সুবিচার করতে পেরেছি? স্বয়ং আদালত তার রায়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এখানে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ছিল চরমভাবে দৃশ্যমান। রায়ে আদালতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল গোয়েন্দা ব্যর্থতা। রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এবং সামরিক বাহিনীতে যোগদান নিরুৎসাহিত করতে এমনটি করা হয়েছে।’ তা ছাড়া মামলার তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দী-জেরায় প্রকাশ, এই বিদ্রোহ ও গণহত্যার মূল হোতারা পলাতক। এরা পরিকল্পনামাফিক দেশত্যাগ করেছে। এদের হদিসও কেউ জানে না।
পিলখানায় ৫৭ সেনা অফিসার হত্যা
ছয়. বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে রায় ঘোষণার পর নিহত সেনা পরিবারের স্বজনেরা নতুন করে তদন্তের দাবি করাতে এটা স্পষ্ট যে, সংক্ষুব্ধ পরিবার ন্যায়বিচার পায়নি। নিহত লে. কর্নেল লুৎফর রহমানের মেডিক্যালে পড়–য়া মেয়ে ফাবলিহা বুশরার আক্ষেপ ‘বাবা অফিসে গেলেন আর ফিরে এলেন না। মর্গে গিয়ে আমরা তার মৃতদেহ খুঁজে পেলাম। বিচার হলো, কিন্তু জানতে পারলাম না কারা, কেন তাকে খুন করেছে। আমার মতো সবার বাবাকে কিভাবে মারা হয়েছে, আমরা তা জানতে চাই।’ নিহত কর্নেল মুজিবুল হকের স্ত্রীর আকুতি ‘শহীদ সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। ওরা খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেন ওদের বাবাকে হত্যা করা হলো। সন্তানেরা হত্যাকারীদের সম্পর্কে জানতে চায়।’ নিহত সেনা পরিবারের দাবি, ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণার। দিনটিকে শহীদ সেনাদিবস ঘোষণা করার। পাঠ্যপুস্তকে এই ঘটনা যুক্ত করার। একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবিও উঠেছে। নিহত সেনা অফিসারদের মরণোত্তর বীরত্বের পদক দেয়ার জন্যও তারা সরকারকে অনুরোধ জানায়। কিন্তু সব দাবি ছাপিয়ে সবার যেন একটাই চাওয়া। তা হলো, এ ঘটনার পেছনের কুশীলব কারা তা উদঘাটন করা। এই জানতে চাওয়াটা শুধু শহীদ পরিবারের সন্তানদের একার নয়। দেশবাসীও জানতে চায় প্রকৃত অপরাধী কারা? এই গণহত্যার পেছনের রাঘব-বোয়ালদের উন্মোচিত মুখোশগুলোকে দেখতে চায় দেশের মানুষ।
বাংলাদেশের ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ
সাত. জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান দেশপ্রেমিক সেনারা আমাদের গর্ব, অহঙ্কার আর সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ১৬ কোটি মানুষের চরম আস্থা, বিশ্বাস, সংহতি আর নিরাপত্তার প্রতীক। অথচ তাদেরকেই আমরা নিরাপত্তা দিতে পারলাম না! কিন্তু এখন যদি তাদেরকে ন্যায়বিচারও না দিতে পারি, তা হলে এর দায় বহন করবে কে? আর এখন তো দেখছি ন্যায়বিচারটাও গৌণ আর রাজনীতিটাই মুখ্য হয়ে পড়েছে। নিহতের অসহায় পরিবারকে জোর করে রাজনীতির খেলায় অংশ নিতে বাধ্য করা হলো, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেত্রীর উচ্ছেদ করা বাসভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়ে। নিহতের প্রতিবাদী সহকর্মীদের অবস্থাও সবার জানা। অসংখ্য রাজনৈতিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। এর সাথে অনেক অনাকাক্সিক্ষত মিথ জন্ম নিয়েছে। সত্য-মিথ্যা-গুজব সব মিলিয়ে চাপা পড়ে আছে সহস্র্র প্রশ্নের উত্তর। অসংখ্য আঙুল তাড়া করে ফিরছে অনেকের সেই সময়কার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে। সাধারণ মানুষের মনেও হাজারো জিজ্ঞাসা। রাজনৈতিক বিভাজিত সমাজে একে অন্যের সম্পৃক্ততাও খুঁজে বেড়াচ্ছে। শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও রয়েছে চরম হতাশা। তবে অপরাধ বিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র মতে, কোনো ঘটনার সুবিধাভোগীরাই সন্দেহের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাই আমাদের সেনাবাহিনী, বিডিআর কিংবা আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী কিংবা আমাদের সীমান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হলে কারা সুবিধাভোগী সেই সমীকরণ খুঁজতে ব্যস্ত অনেকে। তবে সবার আগে পর্দার পেছনের নাটের গুরুদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাটাই হচ্ছে ন্যায়বিচারের প্রধান শর্ত। আর এই অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের একমাত্র বিকল্পই হচ্ছে অবিলম্বে ‘গণহত্যা ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা।
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail : drtuhinmalik@hotmail.com

একটা চরম মুহূর্তে জিয়াউর রহমান সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন

জিয়াউর রহমান সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন। বিএনপি নামের একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি, যা টিকে আছে আজও। তার নেতেৃত্বের স্ফুরণ ঘটেছিলো ১৯৭১ সালেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে। তার উত্থান ছিল নাটকীয়তায় ভরা। মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘বিএনপি সময়-অসময়’ শীর্ষক বইয়ে এসব কথা লিখেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ২৫শে মার্চ রাতে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। চট্টগ্রাম বন্দরে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে গোলাবারুদ খালাস করার জন্য রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুর রশিদ জানজুয়া ক্যাপ্টেন চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে আদেশ দেন। পরে মত বদলে জিয়াকে বন্দরে যেতে বলেন। খালেকুজ্জামানের বর্ণনা মতে:
জানজুয়া বলেন, ‘জিয়া ইউ গো ফার্স্ট। খালিক উইল পলো ইউ।’ আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছে, হোয়াই ডিড হি এগ্রি টু গো? হাসির খবর এটা। আর্মিতে ট্রুপস হ্যাভ টু ওভে, ইউ ক্যান্ট রিফিউজ। জিয়া গাড়িতে উঠলেন। সঙ্গে দুজন অফিসার, সে. লে. হুমায়ুন এবং সে. লে. আজম। আমি ওপাশে গেলাম। জিয়া বললেন, খালেকুজ্জামান, কিছু শুনলে জানিও। দ্যাট ওয়াজ অ্যা মেসেজ ফ্রম আল্লাহ থ্রু হিম। গাড়ি চলে গেল। জানজুয়া বাসায় চলে গেলেন, আলহামরা বিল্ডিংয়ে। শওকত চলে গেলেন। ওলি চলে গেল ওপরে। আমি এখন চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন ওলি ওপর থেকে বলল, স্যার, আপনার একটা ফোন আসছে। আমি গেলাম। বাই দ্যাট টাইম ওলি হ্যাজ টক্ড। ফোনে ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অব স্ট্যান্ডার্ড ব্যাক আবদুল কাদের। খুব ¯েœহ করতেন আমাকে, চাচার মত। বললেন, ‘ঢাকায় তো ইপিআরের ওখানে ফায়ারিং শুরু হয়ে গেছে। আর্মি হ্যাজ রেইডেড দ্য ক্যাম্পস। তোমরা কী করছ।’ আরও কিছু বললেন, আমাকে এক্সাইটেড করলেন। আমি ওলিকে বললাম, আই অ্যাম গোয়িং টু গেট ব্যাক আওয়ার বস জিয়া। দিস ইজ, আল্লাহ হ্যাজ ইনফিউজড সামথিং ইন মি।
পিকআপ আসলো। রাস্তায় ব্যারিকেড। দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের সামনে, ওখানে আল্লাহর রহমতে ওইটা (ব্যারিকেড) ছিল। জিয়া, লাইক এ ড্যান্ডি ম্যান, স্মার্ট, হাতে ফিল্টার উইলস, দ্যাট ফেমাস উইলস। সিগারেট খাচ্ছে। বললেন, ‘ইয়েস খালিক, হোয়াট হ্যাপেন্ড?’ আই সেইড, ফঅয়ারিং হ্যাজ স্টার্টেড। ইউপআর ক্যাম্প হ্যাজ বিন অ্যাটাকড, ব্লা ব্লা ব্লা। উনি তখন চিন্তা করলেন। ‘খালিকুজ্জামান, খালিকুজ্জ¥ান’। উনি শাউট করলে আমি আস্তে কথা বলি। সেম টোনে বলি না। বললাম, স্যার স্যার।
জিয়া: হোয়াট শ্যাল উই ডু?
আমি: ইউ নো বেটার।
জিয়া: ইন দ্যাট কেইস উই রিভোল্ট অ্যান্ড শো আওয়ার এলিজিয়েন্স টু দ্য গর্ভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের তখন কোন খবর নাই। লিডার হ্যাজ টু টেক লিডারশিপ। ফিরে এসে...হুমায়ুন আর আজম গাড়িতে বসা ছিল। তাদের কোয়াটার গার্ডে নেওয়া হলো। দে অয়্যার স্টান্ট। জিয়া বললেন, ‘খালিক লেট মি গো অ্যান্ড গেট দিজ বাস্টার্ড (জানজুয়া)।
২৫ মার্চের মধ্যরাতে জিয়ার নেতৃত্বে অষ্টম বেঙ্গলের বাঙ্গালি সদস্যরা বিদ্রোহ করলেন। এর আগে জিয়া সবার কাছে আনুগত্য চেয়েছিলেন। মেজর শওকতকে জিয়া ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলেন। ইউনিট লাইনে তিনি শওকতকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আই হোপ, ইউ আর উইথ আস?....ইট ইজ বেটার টু সেটল দ্য ডিল বিফোর উই আর ইন অ্যা নিরিয়াস গেম।
ওখানে কনফিউশন, কেউ কিছু বলে না।
খালেকুজ্জামান শওকতকে বলেছিলেন, ‘স্যার বলেন না মেজনর জিয়া টু আই সি উইল টেক ওভার লিডারশিপ?’
শওকত বললেন, ‘ভাইসব, আপনারা শোনেন, এখন এখন টু আইসি সাহেব কিছু বলবেন।’
খালেকুজ্জামানের বর্ণনা অনুযায়ী: ‘ এ লিডার মাস্ট বি সিন অ্যান্ড হার্ড। খালি পর্দার পেছন থেকে লিডার যদি বলে, ইফেক্ট ইজ নটদ্য সেম। ড্রামটা ফেলে দিলাম। জিয়া তো মানুষ ছোটখাটো। ওনাকে কেউ ধরে টরে ওপরে দাঁড় করিয়ে দিল। দেন হি কুড স্ট্যান্ড। ইট ইজ অ্যা ফ্যাক্ট দ্যাট হি ডেলিভার্ড। ইউ আর বিইং লেড। ওয়ান হু ইজ বিইং লেড, তার অত চিন্তা আসে না। লিডার টেকস দ্য রেসপনসিবিলিটি। লিডারের চিন্তা বেশি। সো হি ওয়াজ অ্যাংগশাস।
একটা চরম মুহূর্তে জিয়াউর রহমান সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ, ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন, লে. শমসের মবিন চৌধুরী, লে. মাহফুজুর রহমান এবং অষ্টম বেঙ্গলের অন্যান্য বাঙ্গালি সদস্যরা ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।
জিয়াইর রহমানকে নানা ভাবে ছোট করার চেষ্টা হয়েছে। মুক্তিযদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের স্মৃতিকথা নিয়ে লেখা একটি বইয়ের ভূমিকায় বইয়ের সম্পাদক শাহরিয়ার কবির উল্লেখ করেছেন , মেজর রফিকুল ইসলামের বিশাল গ্রন্থের কোথাও জিয়াউর রহমান নামে একজন সেক্টর কমান্ডার যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তার কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না, যদিও জিয়ার রণকুশলতা সর্ম্পকে ভারতের ইষ্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল অরোরো যথেষ্ট প্রশংসা করেছেন। রফিকুল ইসলামের বইটি ছাপা হয়েছে জিয়ার মৃত্যুর পর। শাহরিয়ার কবিরের মন্তব্য হলো,  মেজর রফিকুল ইসলাম তার স্মৃতিকথায় অন্য সব প্রসঙ্গ উত্থাপনের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিলেও জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে যে তিনি কাল ও প্রেক্ষিতের সুযোগ গ্রহণ করেছেন- একথা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিভাজনের রাজনীতির বিয়োগান্ত শিকার হয়েছেন যে কয়েকজন, জিয়াউর রহমান তাদের একজন। জিয়া শেখ মুজিবকে নেতা মানতেন এবং সব সময় তার সর্ম্পকে ইতিবাচক কথা বলতেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে যথেষ্ট সম্মান দেয়নি ‘আমরা বীরের সম্মান দিতে জানি না। কলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলাদেশের একজন মাত্র মুক্তিযোদ্ধার ছবি আছে, বুকের ওপর দু-হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়ানো। তিনি জিয়াউর রহমান।

বেকহাম যেন বারাক ওবামা

বেলারুশের বিপক্ষে মাত্র ত্রিশ মিনিট খেলেছেন। গোলটোলও করেননি। অথচ ম্যান অব দ্য ম্যাচ কি না ডেভিড বেকহাম! ইংল্যান্ড দলের ইতালীয় কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলো জানালেন, তিনিও এতে বিস্মিত। পরে বেকহামের এই পুরস্কার জয়ের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও একটা মিল খুঁজে পেলেন, ‘৩০ মিনিট খেলেই? ওবামা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৯ মাস দায়িত্ব পালন করেই নোবেল পুরস্কার পেলেন, এটা যেন ঠিক তা-ই।’ বেকহাম জানিয়েছেন তিনি নিজেও এই পুরস্কার পেয়ে একটু ‘বিব্রত’। তবে ওটুকু সময়েও বেকহাম ভালোই বুঝিয়েছেন তাঁর উপস্থিতি। মাঠে নামার এক মিনিট পরই কর্নার গোলমুখে না মেরে শর্ট কর্নার নিয়েছিলেন বেকহাম, আর সেটিই হয়েছে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় গোলের উত্স। ম্যাচের শেষ দিকে বেকহামের একটা শট পোস্টে লেগেও ফিরেছে। প্রত্যুত্পন্নমতি এই ডেভিড বেকহামকে পছন্দ ক্যাপেলোর, ‘ডেভিড বেকহাম ৫, ১০, ১৫ মিনিটই খেলুক বা খেলুক ম্যাচের অর্ধেকটা, সব সময়ই দারুণ একাগ্রতা নিয়ে সে খেলে। অনেক খেলোয়াড়ের জন্যই এটা কঠিন, কিন্তু বেকহাম এটা খুব ভালোভাবেই পারে।’ এ কথায় বিশ্বকাপের দলে বেকহামকে নেওয়ার ইঙ্গিতটা দিয়েই দিয়েছেন ক্যাপেলো। সেটিকে আরও নিশ্চিত করতে আগামী নভেম্বরে এসি মিলানে ফেরাটাও একরকম নিশ্চিত। বেকহামই তো ফিরবেন, নাকি ‘বারাক ওবামা’? ক্যাপেলোর এই মন্তব্যের পর সতীর্থরা না বেকহামকে ‘ওবামা’ বলে ডাকতে শুরু করেন!

সখীপুরে ফুটবল লিগ

ম্যাট্রিক্স সোয়েটার ফুটবল লিগের কালকের খেলায় নলুয়া ক্রিকেট একাদশ ৬-০ গোলে হারিয়েছে বহেড়াতৈল মুজিব স্মৃতি সংঘকে। নাজমুল ও রফিক ২টি করে গোলকরেছেন।—সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি

পিলখানা ট্র্যাজেডি: ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনের দাবি

বিডিআর ট্র্যাজেডির ঘটনায় নেপথ্য মদতদাতা হিসেবে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনের দাবি জানিয়েছেন শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে তারা ২৫শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে সরকারিভাবে  শহীদ সেনা দিবস হিসেবে পালন করার আহ্বান জানান। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে পিলখানা শহীদদের স্মরণে এক আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের স্বজনরা এসব দাবি জানান। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। আলোচনা সভা শেষে শহীদ পরিবারের সদস্যরা মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রেস ক্লাব চত্বরে আলোর মিছিলে শরিক হন। শহীদ পরিবারবর্গ ও দেশ উই আর কন্সার্নড নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ অর্জন করতে হয়েছে অনেক রক্তের বিনিময়ে, রক্ষাও করতে হচ্ছে অনেক রক্তের বিনিময়ে। পিলখানায় যে সেনা সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে, এই ক্ষত কোনো দিন সেরে উঠবে না। তিনি বলেন, কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়টি লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি হয়েছিল। কিন্তু একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এর পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে আমরা কিছুই জানতে পারলাম না। সুলতানা কামাল বলেন, নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের শেষটা যদি জানতে না পারি তাহলে জাতি হিসেবে এই আফসোস আমাদের থেকে যাবে।
আলোচনা সভার শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দিতে গিয়ে পিলখানায় নিহত কর্নেল কুদরত ইলাহীর বাবা হাবিবুর রহমান ছেলের স্মৃতিচারণ করেন। পরে তিনি বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় আক্ষেপ নিয়ে বলেন, আমরা জীবদ্দশায় তো নয়ই, তাদের (পিলখানায় নিহত সেনাকর্মকর্তারা) স্ত্রী-সন্তানরাও এই বিচার দেখে যেতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের সন্তানেরা বিচারের যে রায় হয়েছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন চায়। একই সঙ্গে বিচারবিভাগীয় একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে এই ঘটনার নেপথ্য মদতদাতাসহ পুরো ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরার দাবি জনান তিনি।
শহীদ কর্নেল মুজিবের স্ত্রী নাসরীন ফেরদৌসি বলেন, আমাদের জীবনে প্রতিদিন, প্রতিরাত, প্রতিক্ষণই ২৫শে ফেব্রুয়ারি। আমরা দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের সন্তানদের মন থেকে এখনো ‘ট্রমা’ কাটেনি। আমরা চাই এই দিনটিকে সরকারিভাবে বিশেষ দিবস হিসেবে পালন করা হোক। এর বাইরে আমাদের বিশেষ কিছু চাওয়া নেই। নিহত কর্নেল মুজিবের স্ত্রী নিজের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেখলেই সবাই বলে ‘তোমরা তো সরকার থেকে অনেক কিছু পেয়েছ’। কিন্তু আমরা যা হারিয়েছি তা কি কিছু দিয়ে পূরণ হতে পারে। আর আমরা যা পেয়েছি তা ন্যায্য জিনিস। এর মধ্যে পেনশনের ৫০ শতাংশ এককালীন এবং বাকিটা মাসে মাসে পাচ্ছি। সরকারের কাছ থেকে ঘটনার পর ১০ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। ডিউটিরত অবস্থায় সেনা কর্মকর্তা নিহত হলে বাহিনী থেকে কিছু অর্থ দেয়া হয়, সেটা পেয়েছি। আর যে প্লটের কথা বলা হয় এগুলো মৃত্যুর আগেই পাওয়া। এসব প্রাপ্ত জিনিস কোনোভাবেই অনুদান নয়। ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, একমাত্র তারা যে মাসে ৪০ হাজার করে টাকা দেয় সেটি আমার সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে।
শহীদ মেজর মোহাম্মদ সালেহ’র স্ত্রী নাসরীন আহমেদ বলেন, আমার বেশি কিছু বলার নেই আমরা শুধু ২৫শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে শহীদ সেনা দিবস হিসেবে পালন করার আহ্বান জানাই। আর বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার যে হয়েছে পুরোপুরি জানতে চাই এই ঘটনার পেছনে কারা ছিল? তাদের উদ্দেশ্য কি ছিল? এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। এজন্য এটুকু আমরা জানতে চাই, আমাদের সন্তানেরা জানতে চায়।
শহীদ মেজর মাহবুবুর রহমানের স্ত্রী রীতা রহমান বলেন, ঘটনার দিন এত অফিসার কেন একসঙ্গে ডেকে আনা হলো? যার পোস্টিং ছিল না তাকেও ডেকে আনা হয়েছিল- এর কারণ কি ছিল আমরা সেই কারণটা জানতে চাই। তিনি বলেন, পিলখানায় স্বামী হারানোর তিন বছরের মাথায় আমার একমাত্র ছেলেটা মারা যায়, এর এক বছর পর আমার বাবা মারা যান। আমার মতো সব হারানো আর কেউ হয়তো নেই।
আলোচনা সভার আয়োজক, দেশ উই আর কন্সার্নড সংগঠনের পরিচালক ও পিলখানায় নিহত শহীদ কর্নেল কুদরত ইলাহীর ছেলে সাকিব রহমান বলেন, স্মরণকালের এত বড় একটি হত্যাযজ্ঞের পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদের এখনো বের করা যায়নি। তাদের যখন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে তখনই কেবল আমরা শান্তি পাব। একটি তদন্ত কমিটির রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে সাকিব বলেন, সেই প্রতিবেদনের ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘পেছনের ষড়যন্ত্রকারীরা কিন্তু পর্দার আড়ালেই রয়ে গেছে’। শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে এটা মেনে নেয়া আমাদের জন্য কষ্টের। এ সময় তিনি ২৫শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ সেনা দিবস ঘোষণার দাবি জানান।

৬ই নভেম্বর জাসদের গোপন বৈঠকে বলা হয়েছিল, জিয়াকে হত্যা করা উচিত

সবার পরামর্শক্রমে ৬ নভেম্বর বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য ফিরে গেলাম ফ্লায়িং ক্লাবে একটি এয়ারক্রাফট নিয়ে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি রণাঙ্গনে এই ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করি এবং রণাঙ্গনে এই ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলাম। তাই আমি যদি ঐ রাতে খালেদ, হুদা, হায়দারের সাথে ১০ম ইস্ট বেঙ্গলে থাকতাম, তাদেরকে হয়তো বাঁচাতে পারতাম, না হয় ওদের সাথে আমারও এই পরিণতি হতো। জাসদের সাথে জিয়ার সমঝোতার নাটকের অবসানের পর জিয়া কিন্তু ব্যস্ত ছিলেন সিভিল প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা, কূটনেতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং সর্বোপরি অফিসারদের নিজ নিজ ইউনিটে ফিরিয়ে এনে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করা অর্থাৎ সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজানোয়। তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত জেনারেল মঞ্জুরকে সিজিএস করলেন। ব্রিগেরিয়ার মহসীনকে ডিএমও এর দায়িত্ব দিলেন, ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হককে ৪৬ ব্রিগেডের দায়িত্ব দিলেন। মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম (শিশু) কে এজি এর দায়িত্ব ও মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীকে ৯ পদাতিক ডিভিশন এর জিওসি নিয়োগ দিলেন। জে: এরশাদ ডেপুটি চিফ অব আর্মি। এমনি করে তার পক্ষের সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসালেন এবং কিছু সময়ের মধ্যে ঢেলে সাজানোর কাজ সম্পাদন করে নিজেই ডেপুটি চিফ মার্শাল ‘ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর থেকে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এর দায়িত্ব নিলেন। যদিও পরবর্তীতে জাসদের কিছু করার ছিল না। তবুও তীক্ষœ বুদ্ধির জিয়া জাসদের ওপর কড়া নজরই শুধু রাখেননি, কি করে জাসদকে শিক্ষা দেয়া যায় সে ব্যাপারেও সজাগ ছিলেন। তিনি জানতেন তার ব্যাপারে জাসদের মন-মানসিকতা। ৬ নভেম্বর গুলশানের এক বাড়িতে জাসদের এক গোপনীয় বৈঠকে বলা হয়েছিল যে ‘জিয়াকে বিশ্বাস করা যায় না, তিনি কালসাপ, জিয়াকে হত্যা করা উচিত’।
জাফর ইমাম, বীর বিক্রম ‘দাম দিয়ে কিনেছি এই বাংলা’ শীর্ষক বইয়ে এসব কথা লিখেছেন। ঐতিহ্য থেকে সদ্য প্রকাশিত এ বইয়ে আরও লেখা হয়েছে, যদিও অনেকে সেই বৈঠকে এর আপত্তি করেছিল কিন্তু সেটা ছিল পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যে (ইনুর সাক্ষাৎকার ৬ নভেম্বর ভোরের কাগজ ৯৮) । অনেকের ধারণা, সেই মুহূর্তগুলোকে জিয়ার সাথে সিরাজুল আলম খানের হয়তো যোগাযোগ ছিল। সিরাজুল আলম খানকে কিন্তু তাহের, ইনুর সাথে শেষ পর্যায়ে আর কোনো বৈঠকে দেখা যাচ্ছিল না। জিয়া তাহের ইনুকে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে ৭ নভেম্বর জিজ্ঞেসও করেছিলে. সিরাজুল আলম খান কোথায়?
জিয়া সেনাবাহিনীতেও সৈনিক সংস্থার সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কী করে দমানো যায়, সে ব্যাপারে গোপনীয় তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে ছোটখাটো অনেক বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছিল। অনেককে এসব ঘটনায় প্রাণও দিতে হয়েছিল। সেনানিবাসের বাইরে জাসদের পরবর্তী কার্যকলাপের ওপর চলছিল গোয়েন্দার কড়া নজর। ইতোমধ্যে ধরপাকড়ও শুরু হয়ে যায়। ২২ নাভেম্বর তাহেরে ভাই ইউসুফকে ও ২৩ নভেম্বর তাহেরকে বন্দী করা হয় । ২৬ নভেম্বর ভারতীয় দূতাবাসে হামলার প্রচেষ্টা চালায় গণবাহিনী, যদিও তাহেরের ভাই আবু ইউসুফ ( ৫ নভেম্বর ৯৮ ভোরের কাগজ) এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল মতিঝিল আদমজী কোর্টে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রদূতকে জিম্মি করা। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত করা হয়নি।
ভারতীয় দূতাবাসে হামলার ষড়যন্ত্র ও অব্যাহত জাসদের গোপন বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের খবরের সূত্র ধরেই কিন্তু ২২ ও ২৩ নভেম্বর আবু ইউসুফ ও তাহেরকে বন্দী করা হয়েছিল। ভারতীয় দূতাবাসে হামলার রহস্য অনেকের আজো অজানা। জাসদ এই হামলার মাধ্যমে দেশবাসীকে হয়তো ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিল যে, বর্তমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে যে খেলা, এর পেছনে ভারত রয়েছে। অথবা জাসদ ভারতীয় দূতাবাস আক্রমণ করে রাষ্ট্রদূতসহ সবাইকে যদি হত্যা করতে পারত, সে ক্ষেত্রে জসদ হয়তো মনে করেছিল যে, ভারত মৈত্রী চুক্তি মোতবেক আমাদের দেশে সৈন্য পাঠাতে বাধ্য হবে। অথবা ঐ হামলার (যদি সফল হতো) ধারাবাহিকতায় অন্যান্য গুরুত্বপূণ টার্গেটে হামলা অব্যাহত রেখে পুরো দেশে একটি বিশৃঙ্খলা তথা চুড়ান্ত লক্ষ্য একটি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করা। অবশ্যই জাসদের একটি উদ্দেশ্য ছিল, না হলে এ ধরনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হঠাৎ ঘটত না।
জাসদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো মহল হয়তো দেশের পরিস্থিতি অন্য ধারায় প্রবাহিত করার জন্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছিল। বিধায় এই হামলা পরিকল্পনার ঘটনার নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্রে ছিলেন, তারা হয়তো ভরতপন্থী ছিলেন না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল হয়তো ঘালা পানিতে মাছ শিকার করা । তখন কিন্তু জাসদের ভিতরে নের্তৃত্বের সমন্বয়ের সংকটও ছিল । এছাড়া ভারতও কিন্তু মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে পুরো পরিস্থিতি খুব সতর্কথার সাথে পর্যবেক্ষণ করছিল এবং বাংলাদেশের তখনকার বিরাজমান অবস্থায় নিজেদের উদ্বেগও প্রকাশ করেছিল। কর্নেল তাহেরের ভাই আবু ইউসিফ খান বীর বিক্রমের ৫ নভেম্বর ৯৮ সালে ভোরের কাগজে এক সাক্ষাৎকারে উপরের উল্লিখিত কথাগুলোর যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

ঠিক এই সময় জামায়াত নতুন এক রাজনৈতিক দাবি নিয়ে মাঠে হাজির হয়

১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এরশাদ ঘোষণা করেন যে পরবর্তী ২৬ মার্চ থেকে অবাধ রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং ২৭ মে একই দিনে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৭ ও ১৫ দলীয় জোট সবার আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দাবি করে। তারা জোটভুক্ত দলের নেতা-কর্মীদের উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বিরত থাকার আহবান জানায়। তাদের দাবির মুখে এরশাদ ১৮ মার্চ (১৯৮৪) উপজেলা নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় বিএনপিতে একটি পরিবর্তন আসে। ১ এপ্রিল (১৯৮৪) দলের বর্ধিত সভায় বেগম খালেদা জিয়া ভাষণ দেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ঠিক এই সময় জামায়াতে ইসলামী নতুন এক রাজনৈতিক দাবি নিয়ে মাঠে হাজির হয়। ১০ এপ্রিল (১৯৮৪) জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এবং তাদের নেতা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ ‘বিএনপি: সময়-অসময়’ শীর্ষক বইতে এসব তথ্য লিখেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, দুই জোটের মধ্যে নিয়মিত কথাবার্তা চলছিল। তবে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল ঠুনকো। মনে হচ্ছিল এরশাদ সরকার নানা ছুতোনায় এ সম্পর্কে চিড় ধরাতে এবং কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে জোটভুক্ত নেতাদের কিংবা কোনো একটি জোটকে বগলদাবা করে ফেলতে পারবে।
এরশাদ ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে ‘জনদল’ তৈরি করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে দলের আহবায়ক বানান। রাষ্ট্রপতির চাকরি হারানোর পর আহসানউদ্দিনের এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর্ম বা অপকর্ম। বিএনপি, মুসলীম লীগ, জাসদ, ন্যাপ (ভাসানী) এবং আওয়ামী লীগেরও কয়েকজন নেতা অবলীলায় জনদলে যোগ দেন।
সাত দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া আগাগোড়াই নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিপক্ষে ছিলেন। তার ধারণা, এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নিলে এরশাদের পতন হবে। অবশ্য তার জোটের দুটি দলের নেতা- কাজী জাফর ও সিরাজুল হোসেন খান নির্বাচনের পক্ষে ছিলেন। বিএনপির একটি অংশ শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে গোপনে এরশাদকে সমর্থন করেছিল ও নির্বাচনের পক্ষে ছিল। এরা নির্বাচনের পক্ষে বিবৃতিও দিয়েছিল। এরা সবাই মন্ত্রিত্বের লোভে নির্বাচনের পক্ষে ছিল, আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার কৌশল হিসেবে নয়। মানুষ তাদের দালাল ভাবতে থাকে। বেগম জিয়ার নির্বাচনবিরোধী অনড় ভূমিকার জন্য ১৫ দলীয় জোটের বাম দলগুলোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরশাদ সরকারের বদলে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম এবং সামরিক শাসন প্রত্যাহার- এই দুটি দাবি মেনে না নিলে নির্বাচনে যাওয়া যাবে না- এই ছিল নির্বাচনবিরোধীদের মূল কথা।

জাসদের নির্দেশ ছিল সৈনিক সংস্থা সরাসরি জিয়াকে এলিফ্যান্ট রোডে নিয়ে আসবে

জাসদ সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে উত্তেজনার বীজ ছড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করেছিল কিন্তু ঐ চাকরিরত অফিসার নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে বাইরে রাজনৈতিক সফলতা যদি অর্জনও করত তাহলে ওই সফলতা ধরে রাখতে পারত না। সময়ে মোশতাকের অবস্থা হতো। সেনানিবাসে জিয়াভক্ত ও অন্যান্য গ্রুপগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে এবং জিয়ার পরামর্শ অনুযায়ী নিজ নিজ ইউনিট অফিসারদেরকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাতে থাকে। জিয়াকে যে গৃহবন্দি থেকে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে আনা হয়েছিল, সেখানে যদিও সৈনিক সংস্থার সদস্যদের ভূমিকা ছিল কিন্তু জিয়াভক্ত ও অন্যান্য সাধারণ সৈনিক ছিল প্রচুর। দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট ছিল কর্নেল রশিদের ইউনিট। তিনি ছিলেন মোশতাকের অন্যতম সহযোগী। সেই ইউনিটে সৈনিকরা নিয়ে আসল জিয়াকে। বস্তুত তখন থেকে সৈনিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেতে থাকে। সেই ইউনিটেই সমবেত হতে থাকলেন সকল সিনিয়র অফিসারেরা।
জাফর ইমাম বীর বিক্রম ‘দাম দিয়ে কিনেছি এই বাংলা’ শীর্ষক বইয়ে এসব কথা লিখেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, দ্বিতীয় ফিল্ডে যখন জিয়ার সাথে জাসদ নেতৃবৃন্দ দেখা করতে গেলেন ও পরের দিন রেসকোর্স এর সমাবেশে ভাষণের প্রস্তাবসহ অনেক রাজনৈতিক প্রস্তাব দিলেন, তখন কিন্তু সৈনিক সংস্থা ও জাসদের পাল্টা কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। জিয়া বুঝলেন সম্পূর্ণ ব্যাপারটা একটা হঠকারিতা। জিয়া তখন সাধারণ সৈনিক অফিসার নিয়ে খুব শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। তাই জিয়া জাসদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
গৃহবন্দি থেকে সৈনিকেরা জিয়াকে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে গেল। জাসদের নির্দেশ ছিল সৈনিক সংস্থা জিয়াকে সরাসরি এলিফ্যান্ট রোডে নিয়ে আসবে। জিয়ার সাথে ৭ই নভেম্বরের আগে জাসদের কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা অন্য কোন আঁতাত ছিল না এবং সেই মুহূর্তে জাসদ যেহেতু রাজনৈতিকভাবে একেবারে ব্যর্থ হয়েছে জিয়া বুঝলেন তিনি কেন তাদের হাতে সব তুলে দিবেন। জাসদকে সমর্থন দিলে টিকে থাকা হবে ক্ষণস্থায়ী, এমনকি তার নিজ জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি এটাও বুঝলেন যে জাসদ সৈনিক সংস্থা আর কোন ফ্যাক্টর নয়।

গণমাধ্যমকে চতুর্থ এস্টেট হিসেবে কাজ করতে দেয়া উচিত -সুমিত গালহোত্রা

সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্যতম বিদিত সংবাদপত্রের সম্পাদক মাহফুজ আনাম যখন কয়েক বছর আগের একটি সম্পাদকীয় বিবেচনার ত্রুটি স্বীকার করেছিলেন, তিনি ধারণা করতে পারেন নি এর জের ধরে আইনি প্রতিক্রিয়া আসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কিত অসমর্থিত তথ্য প্রকাশ নিয়ে আনামের স্বীকারোক্তি তার বিরুদ্ধে একের পর এক অবমাননা ও রাষ্ট্রদোহ মামলার স্তুপ সৃষ্টি করেছে। সেইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আর দ্য ডেইলি স্টার বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ মাসে আনামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইতিমধ্যে নিষ্পেষিত স্বতন্ত্র গণমাধ্যম কি ধরণের চাপের মুখে আছে। মি. আনামের বিরুদ্ধে যারা রাষ্ট্রদোহ ও মানহানির মামলা দায়ের করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ৫৩টিরও বেশি জেলার আইনজীবী, দলের সদস্য এবং রাজনৈতিক গ্রুপ। আর নারায়নগঞ্জের একটি আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে (সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী)। দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মামলার সংখ্যা ৭৯টিতে ঠেকেছে। আর অবমাননার দায়ে যে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে তার অঙ্ক ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে রাষ্ট্রদোহ মামলায় যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে।
৩রা ফেব্রুয়ারিতে এটিএন নিউজ চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠানে মাহফুজ আনামের স্বীকারোক্তি থেকে আইনি চ্যালেঞ্জগুলোর সূত্রপাত। স্বীকারোক্তিটা ছিলÑ ২০০৭-০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) থেকে দেয়া তথ্য স্বতন্ত্রভাবে যাচাইবাছাই ছাড়াই ছেপেছিলেন। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, কমপক্ষে ১১টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল পর্যাপ্ত যাচাই বাছাই ছাড়া; যেসব প্রতিবেদনে হাসিনা ও তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি খালেদা জিয়াকে বিরূপভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
‘নিউজ আওয়ার এক্সট্রা’ অনুষ্ঠানে আনামের স্বীকারোক্তির প্রতিক্রিয়া আসার পর, ডেইলি স্টার তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। গোয়েন্দা সংস্থা এখনও কোন প্রতিক্রিয়া জানায় নি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আনাম তার সম্পাদকীয় বিবেচনার ত্রুটিকে ‘একটি বড় ভুল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটা তাকে প্রশংসা এনে দেয়া উচিত, নিন্দা নয়। সম্পাদকীয়কে ডেইলি স্টার উল্লেখ করেছে যে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেষ হওয়ার অনেক বছর পরও সাংবাদিকরা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই বাছাই ছাড়া কতৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশ করা অব্যাহত রেখেছে। 
অন্যান্য গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে অনেক বাংলাদেশি সংবাদপত্র একই তথ্য প্রকাশ করেছিল। দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত এ মাসে একটি টক শোতে বলেন, তার পত্রিকাও এমন প্রতিবেদন ছেপেছিল। তিনি বলেন, ওই সময়ে সম্পাদকরা অনুভব করেছিলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাল মেলানো ছাড়া তাদের কোন সুযোগ নেই, এপির রিপোর্ট।
সরকারপন্থী কিছু গণমাধ্যমে মি. আনামকে যেমন ‘গণতন্ত্রের শত্রু’ হিসেবে বলা হচ্ছে , পক্ষান্তরে অপর সম্পাদকরা তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান এক সম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনামের প্রতি আসা প্রতিক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গনতন্ত্রকে নস্যাত করা এবং অগণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠার কোন এজেন্ডার অংশ হিসেবে তিনি (আনাম) তা করেছিলেন এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আর যে মানুষটি তার এ দেশের সেবায় নিজের জীবনকে নিয়োজিত করেছেন এবং জাতীয় স্বার্থ ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধের জন্য কাজ করবার যার দীর্ঘ ও গর্বের রেকর্ড রয়েছে তার প্রতি এমন ধারণা পোষণ করা বিরাট অন্যায়।’
আনাম ও তার পত্রিকার ওপর আরোপিত চাপ, দেশের স্বতন্ত্র গণমাধ্যমের ওপর বিদ্যমানে চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গত বছর আমার বাংলাদেশ সফরে আমি যেমনটা উল্লেখ করেছিলাম- ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফের পর থেকে হাসিনা বলতে গেলে রাজনৈতিক বিরোধীদের নিষ্ক্রিয় করেছেন। সেইসঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়েছে বিরোধী-সংশ্লিষ।ট অনেক গণমাধ্যম। ডেইলি স্টারের সহ-প্রকাশনা প্রথম আলোর সাংবাদিকরা আমাকে বলেছেন, তারা আইনি হওয়ানির মুখোমুখি হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা ও মানহানির অনেক মামলা রয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগই অমীমাংসীত থাকে। ২০১৪ সালে বিশেষ একটি যুদ্ধাপরাধ আদালতের কাজ নিয়ে লেখার পর ঢাকা-ভিত্তিক বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে অবমাননার দায়ে দ-িত করে ওই আদালত। আর চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মতিউর রহমান চৌধুরির টক শো ‘ফ্রন্টলাইন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। অনুষ্ঠানটি সমালোচনামূলক অতিথিদের জন্য সুপরিচিত ছিল। সম্প্রচার বন্ধের কারণ হিসেবে সে সময় চ্যানেলের চেয়ারমেন সাময়িক কারিগরি জটিলতার কথা বলেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দলের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে সংসদের প্রায় সব আসন। হাসিনা যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে তার উচিত গণমাধ্যম যেন চতুর্থ এস্টেট হিসেবে কাজ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। আনামের স্বীকারোক্তির পর কিভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে আরও শক্তিশালী করা হয় তা নিয়ে অর্থবহ বিতর্ক হওয়া উচিত, এক ঝাক আইনি চ্যালেঞ্জ উস্কে দেয়া আর স্বতন্ত্র গণমাধ্যমের ওপর হামলা নয়।
[সিপিজের ব্লগে প্রকাশিত ‘৭৯ কেসেস এন্ড কাউন্টিং: লিগ্যাল চ্যালেঞ্জেস পাইল আপ ফর ডেইলি স্টার এডিটর হু এডমিটেড এরর ইন জাজমেন্ট’ শীর্ষক লেখার ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ। লেখক সুমিত গালহোত্রা, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, সিপিজের এশিয়া কার্যক্রমের গবেষণা অ্যাসোসিয়েট। অতীতে তিনি সিএনএন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচে কর্মরত ছিলেন।]