Monday, March 31, 2014

যশোবন্তকে বিজেপি থেকে আবার বহিষ্কার

যশোবন্ত সিং
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা যশোবন্ত সিং (৭৬) আবার দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এবার তাঁকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে রাজ্যস্থান রাজ্যের বারমার আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারে অনঢ় থাকায় গত শনিবার তাঁকে বহিষ্কার করে বিজেপি। এর আগে ২০০৯ সালে বিজেপি যশোবন্তকে একবার দল থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
নিজের একটি বইয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর গুণকীর্তন করায় সেবার তিনি দলের বিরাগভাজন হন। অবশ্য, ১০ মাসের মাথায় যশোবন্তকে আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ভারতের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে যশোবন্ত পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং থেকে নির্বাচিত হন। জীবনের শেষ নির্বাচন বলে এবার তিনি নিজের জন্মস্থান বারমার থেকে লড়তে চেয়েছিলেন। তবে বিজেপি তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে সোনারাম চৌধুরীকে ওই আসনে মনোনয়ন দেয়। এনডিটিভি।

প্রতিবেশীর প্রতি কঠোর হবেন মোদি

নরেন্দ্র মোদি
ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচন নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হতে পারে বলে আভাস মিলছে। বিজেপি জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হবেন হিন্দু জাতীয়তাবাদী কট্টরপন্থী নেতা ও গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে?
বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশ পাকিস্তান ও চীনের প্রতি তাঁর নীতি কী হবে—এসব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। মোদি অবশ্য নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া বিভিন্ন ভাষণে পররাষ্ট্রনীতিতে কট্টর হওয়ার আভাস দিয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বড় প্রতিবেশীর প্রতি আক্রমণাত্মক কথাও বলেছেন তিনি। চীনকে সতর্ক করে মোদি বলেছেন, চীনকে ‘সম্প্রসারণবাদী নীতি’ থেকে সরে আসতে হবে। আর ভারতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলার জন্য বরাবরই পাকিস্তানকে দায়ী করছেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে গত মাসে নির্বাচনী সমাবেশে মোদি বলেন, ‘আমি এই মাটির নামে শপথ নিচ্ছি, এই দেশকে অবশ্যই রক্ষা করব।’ চীন ওই অঞ্চলকে নিজের দাবি করে আসছে। অবশ্য নিজের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সুস্পষ্টভাবে কখনোই কিছু বলেননি মোদি। তবে বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির পররাষ্ট্রনীতির প্রশংসা করেন তিনি। বাজপেয়ির আমলে ১৯৯৮ সালে কয়েক দফায় পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায় ভারত। ভারত, পাকিস্তান ও চীন—তিন দেশই পারমাণবিক শক্তিধর। ভারত ইতিমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধ করেছে। চীনের সঙ্গে ১৯৬২ সালে বিচ্ছিন্ন লড়াই হয়েছে।
২০০১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল ভারত। এর পর থেকে নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা শান্ত বলা যায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ৬৭ বছরের মধ্যে ৫০ বছরই ক্ষমতায় ছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেস। মোদি কংগ্রেসের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দুর্বল বলে মনে করেন। যদিও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যেই ভারত এক হাজার ২৭০ কোটি মার্কিন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। মোদির ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী বলছেন, মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি আরও শক্তিশালী ও গঠনমূলক হবে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা না বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে গুরুত্ব দেবে। বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন নেতা বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে অর্থনীতিতে গতিশীল ধারা সৃষ্টি করা। পররাষ্ট্রনীতির পুরো ধারণাই হবে দেশের অর্থনীতিকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে অন্য দেশের সঙ্গে সমঝোতার সময় নিজের স্বার্থের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া যায়।’ মোদির একজন উপদেষ্টা না প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোদির পররাষ্ট্রনীতি হবে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাজিব ডোগরা বলেন, অভ্যন্তরীণ চাপ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্যই বিজেপির পররাষ্ট্রনীতি আগের চেয়ে কঠোর হতে পারে বলেই মনে হচ্ছে। রয়টার্স।

কে জিতেছে উপজেলা নির্বাচনে? by বদিউল আলম মজুমদার

২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চতুর্থ দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। প্রথম আলোর (২৪ মার্চ ২০১৪) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৭৭ উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ ১৬৮টিতে, বিএনপি ১৪৪টিতে, জামায়াতে ইসলামী ৩৩টিতে, জাতীয় পার্টি তিনটিতে এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সমর্থিত প্রার্থীরা ২৯টিতে জয়ী হয়েছেন; যদিও বিধিবিধান অনুযায়ী এ নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার কথা নয়। আর প্রাপ্ত ৩৭৪ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ২৫৫ জন, বিএনপির ২৭১ জন, জামায়াতের ১২৯ জন, জাতীয় পার্টির নয়জন এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সমর্থিত ৭৭ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ, চার পর্বের নির্বাচনের পর সার্বিকভাবে অধিকসংখ্যক চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা বেশিসংখ্যক ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন।

বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম by মইনুল ইসলাম

১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় একটি সত্য কথা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। ‘বাংলাদেশ এখন আর ফকিরের দেশ নয়। বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে।’

এক আত্মপ্রত্যয়ী নারী-নুরুননাহার ফয়জননেসা by লতিফা আকন্দ

নুরুননাহার ফয়জননেসা এখন নেই, কোথাও নেই। তাঁর আত্মা অমরত্ব পেয়েছে নীল গগনে নীহারিকা হয়ে। তিনি এখন স্মৃতিতে ঠাঁই পেয়েছেন। কত কথা আমরা ভুলে যাই, হারিয়ে ফেলি কত স্মৃতি। তারই মাঝে কিছু কিছু স্থায়িত্ব পায় আমাদের চেতনায়। এই নিজের চেতনা, নিজ নিজ উপলব্ধিনির্ভর এবং একটি সরলরেখায় গ্রন্থিত করা যায় না।

‘রক্তস্নান’ চেয়েছিলেন কিসিঞ্জার? by মিজানুর রহমান খান

যুক্তরাষ্ট্রের লেখক, বুদ্ধিজীবী, জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান ছিল বিপরীত। মার্কিন দলিল থেকেই একাত্তরের মার্চের একটি অজানা অধ্যায় এখানে তুলে ধরা হলো প্রথম আলোর সংগ্রহ করা একটি মার্কিন দলিল একাত্তরের গণহত্যায় হেনরি কিসিঞ্জারের ভূমিকাকে নতুন করে নির্দিষ্টভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতি হেনরি কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত সমর্থনের সপক্ষে একাত্তরের ৬ মার্চে প্রস্তুত এই দলিলটিকে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ তিনি সুপরিকল্পিতভাবে ইয়াহিয়ার সম্ভাব্য রক্তস্নান নীতির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি এমনকি বলেছিলেন, ‘আমাকে শয়তানের পক্ষে ওকালতি (ডেভিলস অ্যাডভোকেট) করতে দাও।’

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিঞ্চিৎ উচ্চাভিলাষী। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটানোর পর দেশে ও বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়ে এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। সেই আশাতেই তিনি ভোটের মুখে আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর সেই সাধের ফেডারেল ফ্রন্ট শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কারণ, জয়ললিতা, চন্দ্রবাবু নাইডু, নবীন পট্টনায়েক, নীতিশ কুমারের মতো আঞ্চলিক দলের নেতারা ভোটের ফল না দেখে আগেভাগে এ রকম কোনো জোটে নাম লেখাতে রাজি হননি। ফলে, এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসে মমতা এখন বলছেন, প্রিপেইড নয়, খেলাটা পোস্টপেইড ধাঁচে হবে। একের পর এক দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের ভাবমূর্তি অনেকটাই কালিমালিপ্ত। বিপরীতে নিজের ভাবমূর্তিতে সাদা রং চড়াতে মমতা এর পরেই আন্না হাজারের শরণ নেন। একদা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বিখ্যাত এই আন্না হাজারে এখন তাঁর ভাবশিষ্য এবং আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল দ্বারা পরিত্যক্ত। ফলে তাঁরও একটা মঞ্চ দরকার ছিল। সম্ভবত সে কারণেই আন্না হাজারেও মমতাকে পাশে বসিয়ে তড়িঘড়ি ঘোষণা করেন, মমতাই প্রধানমন্ত্রী পদের যোগ্যতম দাবিদার।
তিনি মমতার প্রার্থীদের হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচারে যোগ দেবেন। সেই মতো মমতাও ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, অসমসহ বিভিন্ন রাজ্যে কিছু প্রার্থী দাঁড় করানোর কথা ঘোষণা করলেন। ঠিক হলো, দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না ও মমতার যৌথ জনসভার মধ্য দিয়ে তূণমূল দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবে। কিন্তু এর পরেই মমতা আবারও ধাক্কা খেলেন। রামলীলা ময়দানে একেবারেই লোক হাজির হয়নি খবর পেয়েই আন্না হাজারে সেই জনসভায় হাজির হতে রাজি হলেন না। অপ্রস্তুত মমতা ও তাঁর সঙ্গী নেতারা ফাঁকা মাঠে কয়েক শ কৌতূহলী দর্শকের সামনে কিছুক্ষণ মঞ্চে হাজির থেকে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন। আন্না সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, তাঁর দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে দিল্লিতে যে লোকসমাগম হতো, তাঁরা এখন তাঁকে ছেড়ে আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে ভিড়েছেন। আর সেই সঙ্গে এটাও দেখতে পেলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মমতার না আছে কোনো মজবুত সংগঠন, না আছে জনভিত্তি। এই অবস্থায় আন্না জানিয়ে দিলেন যে মমতার হয়ে তিনি প্রচারে নামবেন না। মাত্র কদিন আগেই মমতাকে সততার প্রতিমূর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতম প্রার্থী বলে দরাজ সার্টিফিকেট দেওয়ার পরে আন্নার এ ডিগবাজি ভোট রাজনীতিতে কিঞ্চিৎ কৌতুকের জোগান দিয়েছে। আন্নাকে পাশে না পেয়ে মমতা এখন রাজনীতির সর্বভারতীয় আঙিনা ছেড়ে নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মনোনিবেশ করেছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যত বেশি আসন নিয়ে ভোট পরবর্তী দর-কষাকষিতে অংশ নেওয়া। মমতার ঘনিষ্ঠ মহল, বিশেষ করে দলে মমতার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন নেতা মুকুল রায়।
মুকুল রায়ের হিসাবে দল এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মোট ৪২টি আসনের মধ্যে অন্তত ৩৩ থেকে ৩৫টি আসন জিতবে। এর সঙ্গে ঝাড়খন্ড ও অসম প্রভৃতি রাজ্য থেকে যদি একটি বা দুটি আসন পাওয়া যায়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস ৩৫টি আসন হাতে নিয়ে ভোটের পরে যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। মমতা শিবিরের এ অঙ্কের পেছনে হিসাবটা হলো, নির্বাচনের ফলে যে দল বা জোটই এগিয়ে থাকুক না কেন, মোট ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ন্যূনতম প্রয়োজন যে ২৭২টি আসন, তা কোনো দলই পাবে না। এ ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনার কথা তাঁরা মাথায় রেখেছেন। প্রথমত, বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট যদি ভোটের ফলে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে, তাহলেও ২০০ বা তার কাছাকাছি আসন পাবে। ২৭২ থেকে বেশ কমই থাকবে। তখন কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য তাদের নির্ভর করতে হবে অন্য দলগুলোর ওপর। তখন ৩০ থেকে ৩৫ আসন যার হাতে থাকবে, দর-কষাকষিতে তার গুরুত্বও সবচেয়ে বেশি হবে। দ্বিতীয়ত, এটাও হতে পারে যে বিজেপির জোট ১৫০ থেকে ১৬০ সংখ্যার মধ্যেই আটকে থাকল এবং আঞ্চলিক দলগুলো ভালো ফল করল। তখন শুরু হবে আসল দরাদরি। তামিলনাড়ুর জয়ললিতা, ওডিশার নবীন পট্টনায়েক, বিহারের নীতিশ কুমার, উত্তর প্রদেশের মায়াবতী, অন্ধ্র প্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, জগমোহন রেড্ডি, প্রস্তাবিত নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও প্রমুখকে নিয়ে তখন শুরু হবে একদিকে বিজেপির টানাটানি, অন্যদিকে একটি তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার চেষ্টা।
কিন্তু তাতেও পেছন থেকে কংগ্রেসের সমর্থন লাগবে। ১৯৯৬ সালে যেমন ভোটের পর এ রকমভাবেই কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে দেবগৌড়া যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যদি সত্যিই বিজেপি জোট ভোটের ফলে সরকার গড়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে, তখন এই আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট সরকার গড়ার চেষ্টা গতি পাবে। আর তখন মমতা (ঝুলিতে যদি ৩৫ আসন থাকে) চেষ্টা করবেন সেই জোটের নেত্রী হওয়ার জন্য। জয়ললিতা, মায়াবতী, নবীনেরা যে সহজে জায়গা ছেড়ে দেবেন, তা নয়। কিন্তু সম্ভাবনাটা থেকেই যাচ্ছে। আর সেই সম্ভাবনাটা জোরালো করতেই মমতা এখন পশ্চিমবঙ্গের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত প্রচারে ব্যস্ত। আর প্রচারে নেমে বুঝতে পারছেন, এবার লড়াইটা বেশ জটিল। ২০০৯ সালে মমতার জনপ্রিয়তা যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে লড়ে মমতা পেয়েছিলেন ১৯টি, কংগ্রেস ছয়টি আসন। সঙ্গে ছোট বাম দল এসইউসি ছিল, তারাও পেয়েছিল একটি আসন। কিন্তু এবার কংগ্রেস সঙ্গে নেই, এসইউসিও নেই। যদিও গত পাঁচ বছরে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে আরও দুর্বল হয়েছে। কেন্দ্রে মনমোহন সিংহ সরকারের ব্যর্থতাও কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা আরও কমিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও নদীয়া জেলার একাংশে তাদের এখনো কিছুটা প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থীরাও এখন যথেষ্ট দুর্বল।
সিপিএমের একাংশ গত তিন বছরে ক্ষমতাসীন তৃণমূলে যোগ দিয়েছে। কিন্তু চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বিজেপি। এই প্রথম বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনেই প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। ফলে খাতা-কলমে ৪২টি আসনেই লড়াই হতে চলেছে চতুর্মুখী। এবার যেহেতু নরেন্দ্র মোদিকে সামনে তুলে ধরে বিজেপি প্রচারে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, তাই বিজেপির ভোট কিছুটা হলেও পশ্চিমবঙ্গে বাড়বে বৈকি। মমতার চিন্তার কারণ এটাই। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বিজেপির এমনিতেই নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক রয়েছে। এবার সেটা আরও বাড়লে ভোট কাটাকুটিতে একাধিক আসনের ফলই অপ্রত্যাশিত মোড় নিতে পারে। এমনিতেই দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমোর্চাকে ভয় দেখিয়ে ও বুঝিয়ে কোনো লাভ হয়নি। তারা বিজেপির প্রার্থীকে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেছে। ফলে আসনটি এবারও বিজেপির হাতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তার ওপর বিজেপির বাড়বাড়ন্ত উত্তর কলকাতা, কৃষ্ণনগর, জঙ্গিপুর, রায়গঞ্জ, আলিপুরদুয়ার প্রভৃতি আসনের ফল উল্টে দিতে পারে। অর্থাৎ বিজেপি নিজে না জিতলেও অন্যের পরাজয়ের কারণ হতে পারে। কোথায় বিজেপি কোন দলের ভোট কতটা কাটতে পারে, সেই হিসাব কষতেই ব্যস্ত এখন তৃণমূলের নেতারা। এই হিসাবের কথা মাথায় রেখেই মমতার কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়ছে।
রজত রায়: সাংবাদিক, পশ্চিমবঙ্গ।

তরুণদের প্রাণের আকুতি শুনুন

আমাদের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আছে, আনন্দ আছে, বেদনাবোধ আছে, অনুভূতি আছে, দুর্দমনীয় সাহস আছে—নেই শুধু সেসব কাজে লাগানোর সুযোগ ও সামর্থ্য। এ সমাজ তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করতে অক্ষম। ক্ষমতাবানেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই মশগুল যে সাধারণ মানুষ তথা তরুণদের নিয়ে ভাবার ফুরসত পান না। আমাদের তরুণেরা দেশে কাজ পান না। তাই জায়গা-জমি বিক্রি করে, ধার-দেনা করে বহু কষ্টে বিদেশে পাড়ি জমান ভাগ্যান্বেষণে। কিন্তু সেখানেও নানা রকম হয়রানির শিকার হন। ধারদেনা শোধ করে যখনই ভবিষ্যতের কথা ভাবেন, তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘোষণা আসে, চাকরি নবায়ন করা হবে না, দেশে ফিরে যেতে হবে। জানতে পারলাম, কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবেই এই দুর্ভোগ। হায়, দুর্ভাগা দেশ! লাখ লাখ প্রবাসী তরুণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। পরিতাপের বিষয় হলো, সেই অর্থেরও সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে না।
সেটি হলে তাঁদের প্রবাসজীবনের কষ্টকে কষ্ট বলে মনে হতো না। তাঁরা ভাবতেন, দেশের জন্য কিছু করতে পারছি। প্রবাসীদের কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং সঞ্চয়ের পরিমাণ কমছে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না, নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এভাবে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশের কী অবস্থা হবে, তা সহজেই অনুমেয়। নিজ দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করে কলকারখানা গড়ে তুলে উৎপাদিত দ্রব্য নিজ দেশে ভোগ এবং বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে দেশে বেকারত্ব কমত। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর পড়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, আবেগে আপ্লুত হতে হয়। এই সংবাদটুকু থেকে আমাদের কিছুই শেখার নেই? গতানুগতিক ভাবধারার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। রাজনীতিকদের জীবনধারণের প্রণালি দেখলে মনে হয়, তাঁরা সম্পদের প্রতিনিধি, জনগণের নন। দেশ যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারত, তাহলে তরুণদের চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে বঙ্গোপসাগরে আত্মাহুতি দিতে হতো না। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ায় চাকরির জন্য যেতে হতো না। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান, উত্তাল তরঙ্গ, কালো মেঘে ছাওয়া আকাশ, অথই জলরাশি—সে এক ভয়াবহ অবস্থা! ভাবতে পারেন সেই অবর্ণনীয় কষ্টের কথা? যাঁরা আরামে আছেন, আয়েসে আছেন—তরুণদের সেই দুঃসহ কষ্টের বাষ্প এসব সুখী মানুষকে স্পর্শ করে না।
এই তরুণদের অনেক সময় ধরা পড়লে শাস্তি পেতে হচ্ছে অথবা সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে সলিলসমাধি হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট লাগে, যখন কোনো প্রতিকার খুঁজে পাই না। প্রসঙ্গক্রমে আমি শুধু একটি বছরের বেকারত্বের চিত্র তুলে ধরব। ১৯৯৬-৯৭ সালে শ্রমশক্তি ছিল ৪২ দশমিক ৯৭, সেখানে অভ্যন্তরে নিয়োগ পায় ২১ দশমিক ৬২ এবং বিদেশে কর্মসংস্থান হয় ১ দশমিক ৩৪, মোট কর্মসংস্থানপ্রাপ্তির সংখ্যা ৩০ দশমিক ৯৬ এবং বেকারত্বের হার হয় ২৭ দশমিক ৯৫। এই যখন আমাদের দেশের চিত্র, তখন বেঙ্গালুরুভিত্তিক সিলিকন ইন্ডিয়া ম্যাগাজিন এক তথ্য প্রকাশ করেছে: ৩ দশমিক ৭১৬ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের মতো গরিব দেশ থেকে ভারত নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম প্রবাসী আয়ের উৎস। এখন পাঁচ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে বসবাস করছে বলে উল্লেখ রয়েছে। বেশির ভাগই তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে কর্মরত। হতে পারে ভারতের শ্রমিকেরা আমাদের তুলনায় দক্ষ। তাহলে আমরা কেন আমাদের তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি না, তাঁদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলছি না? দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকলে সবকিছুই করা সম্ভব। তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প—এই দুই সেক্টরে শ্রমশক্তি বিদেশ থেকে আমদানি কোনোক্রমেই দেশের স্বার্থের অনুকূলে নয়। স্বাধীনতার লক্ষ্য যে ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, তা আমরা কতটা অর্জন করতে পেরেছি?
স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও রাজনৈতিক অঙ্গন যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হচ্ছে। তার পরও আমরা আশাহত হতে চাই না। আমরা স্মরণ করি আমাদের প্রেমে ও রণে সততজয়ী কাজী নজরুল ইসলামের তারুণ্যের জয়গান। ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের একটি সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার একমাত্র সম্বল আপনাদের তরুণদের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা প্রাণের টান।’ তাই আমাদের সত্য উপলব্ধি করার সময় এসেছে। আমরা কি কেবল পুরোনোকে আঁকড়ে পেছনের দিকে যাব, নাকি সব তরুণকে একতাবদ্ধ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব? সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হলে পুরো জাতিকে তার মাশুল দিতে হবে। বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সাধনে তরুণেরা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহূত হবেন না। তারুণ্যের রঙে উদ্ভাসিত কবি সুকান্তের একটি কবিতা যেন আমাদেরই মনের কথা বলে: ‘আমরা সিঁড়ি,/ তোমরা আমাদের মাড়িয়ে/ প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,/ তারপর ফিরেও তাকাও না (আমাদের) পিছনের দিকে;’। পরিশেষে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য সম্ভাবনাময় আলোর দ্বার খুলে যাবে—এ প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি।
সৈয়দা নীলুফার: কলেজশিক্ষক।

Sunday, March 30, 2014

তথ্যচিত্রে নগ্নতা ও ভারতীয় রাজনীতি

পরিচালক নিশা পাহুজার তথ্যচিত্র ‘দ্য ওয়ার্ল্ড বিফোর হার’ নিয়ে বলিউডে তুমুল শোরগোল৷  ভারতীয় হিন্দু পরিষদ ও সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই তথ্যচিত্রের গল্পক বাঁকা চোখে দেখছে মুম্বাইয়ের সিনেমা মহল৷ তবে শুধু সিনেমা মহল নয়, ভোটের আগে এরকম একটি বির্তকিত ছবির মুক্তি নিয়ে কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে ভারতীয় রাজনীতি মহলেও৷

তবে পরিচালক নিশার পাশে রয়েছেন বেশ কিছু বলি স্টার ৷ শুধু পাশে থাকা নয়, ছবি দেখে রীতিমতো প্রশংসায় পঞ্চমুখ অনুরাগ কাশ্যপ, স্মিথ আমিন, দীপা মেহেতা, লিসা রে ও নন্দিতা দাস৷

পরিচালক নিশার কথায়, এই তথ্যচিত্র অনেকবেশি বোল্ড৷ একদিকে ভারতে নারীর স্থান এবং বর্তমান রাজনীতিকে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে৷ অন্যদিকে সুন্দরী প্রতিযোগিতার অন্দরে ঘটে যাওয়া এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে ছবিতে যা ছবির মুক্তিতে বাঁধা দিতে পারে৷’

জানা গিয়েছে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড বিফোর হার’ রয়েছে বেশ কিছু নগ্ন দৃশ্য৷ যার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় রাজনীতিকে৷ আর সেখান থেকেই নিশার এই তথ্যচিত্র হয়ে উঠেছে বির্তকিত৷ ছবিটি ভারতের সিনেমা হলে মুক্তি পেতে পারে ২৫ এপ্রিল৷

রাজনীতির জন্য অবসর নেওয়া রাজনীতিক by কামাল আহমেদ

সংসদীয় গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে খ্যাত ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসার জন্য প্রায় অর্ধশতক আগে যিনি প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন, সেই রাজনীতিকের নিথর দেহ শেষবারের মতো ওয়েস্টমিনস্টার ঘুরে গেছে ২৭ মার্চ। ইউরোপের বামপন্থী রাজনীতির কিংবদন্তি ও যুদ্ধবিরোধী শান্তি আন্দোলনের নেতা টোনি বেন হলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি, যাঁর মরদেহ পার্লামেন্টের চ্যাপেলে বিশেষ মর্যাদায় শায়িত রাখা হয়েছিল। অন্য যে ব্রিটিশ রাজনীতিক মরণোত্তর এই অনন্য সম্মান পেয়েছেন, তিনি হলেন ডানপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতিক লৌহমানবী হিসেবে খ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার। মার্গারেট ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং ফকল্যান্ডের যুদ্ধজয়ের কৃতিত্বের দাবিদার। কিন্তু টোনি বেন তাঁর দল লেবার পার্টি ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় দলের নেতৃত্বের নির্বাচনে মধ্যপন্থী নেতা ডেনিস হিলির কাছে হেরে গেছেন। তার পরও ব্রিটিশ রাজনীতির মূলধারায় তাঁর প্রভাব অন্যদের ছাপিয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি মমতা by রজত রায়

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিঞ্চিৎ উচ্চাভিলাষী। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটানোর পর দেশে ও বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়ে এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। সেই আশাতেই তিনি ভোটের মুখে আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর সেই সাধের ফেডারেল ফ্রন্ট শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কারণ, জয়ললিতা, চন্দ্রবাবু নাইডু, নবীন পট্টনায়েক, নীতিশ কুমারের মতো আঞ্চলিক দলের নেতারা ভোটের ফল না দেখে আগেভাগে এ রকম কোনো জোটে নাম লেখাতে রাজি হননি। ফলে, এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসে মমতা এখন বলছেন, প্রিপেইড নয়, খেলাটা পোস্টপেইড ধাঁচে হবে।

ইরান-সিরিয়া নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগ

বাদশা আবদুল্লাহ
ইরান ও সিরিয়াকে নিয়ে উদ্বিগ্ন সৌদি আরবকে আশ্বস্ত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে গত শুক্রবার রিয়াদে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব সম্পর্ক আরও সংহত করার আহ্বান জানান তিনি। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম সৌদি আরব সফরে গেলেন ওবামা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস তাঁর সঙ্গে ছিলেন। শুক্রবার বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন ওবামা। মার্কিন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ছয় পরাশক্তির সঙ্গে তেহরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতা নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। এ ছাড়া তিন বছরের বেশি সময় ধরে সিরিয়ায় চলমান সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি ওবামার সামনে তুলে ধরেন।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ওবামা বৈঠকে বাদশাহ আবদুল্লাহকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ‘বাজে চুক্তি’ ওয়াশিংটনও মেনে নেবে না। ওবামা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, ওয়াশিংটন-রিয়াদের স্বার্থ একই সমান্তরালে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কর্মকর্তা জানান, দুই নেতা মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি বিষয়সহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। সৌদি আরবের সুন্নি শাসকদের সঙ্গে শিয়াশাসিত ইরানের বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্কের বিষয়টি রিয়াদের জন্য অস্বস্তির। তাই সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে সৌদি সরকার। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে ছয় পরাশক্তির সঙ্গে তেহরানের সমঝোতাকে শুরু থেকেই সন্দেহের চোখে দেখছে ইরান। রিয়াদের মতে, এই সমঝোতার মাধ্যমে ইরান লাভবান হয়েছে। সমঝোতার সুযোগ নিয়ে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে। এএফপি ও বিবিসি।

‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ নেই: মিয়ানমার

মিয়ানমারে আজ রোববার থেকে আদমশুমারি শুরু হচ্ছে। এর আগে সরকার গতকাল শনিবার জানিয়ে দিয়েছে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। মিয়ানমারে তিন দশকের মধ্যে প্রথম এই আদমশুমারি জাতিগতভাবে বিভাজিত দেশটিতে আগ্রহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারও জন্ম দিয়েছে। অনেকেই সরকারের এ পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখছে। ১২ দিন আদমশুমারির কাজ চলবে। আদমশুমারি সফল করতে মিয়ানমারের উত্তরের পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে সহিংসতাপ্রবণ সীমান্তবর্তী জঙ্গল এলাকা ও দক্ষিণের ক্রান্তীয় এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হাজার হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যার সঠিক হিসাব মেলানোর পাশাপাশি যেসব বিষয়ে সঠিক তথ্য না থাকার কারণে নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই সমস্যার সম্মুখীন হন, এই আদমশুমারির মাধ্যমে সেসব বিষয় স্পষ্ট করা হবে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) মিয়ানমারের এই আদমশুমারি বাস্তবায়ন করছে। জাতিসংঘ আশ্বস্ত করেছিল, সরকার সব জনগোষ্ঠীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করবে। তবে আদমশুমারির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতির পথ প্রশস্ত হবে, এমন আশঙ্কা থেকে রাখাইনের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা আদমশুমারি বর্জনের ঘোষণা দেয়। এরপরই সরকার ‘রোহিঙ্গা’ নামে কাউকে নিবন্ধিত না করার ঘোষণা দিল। ইয়াঙ্গুনে সরকারের একজন মুখপাত্র ইয়ে হটুট সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো পরিবার যদি তাদের “রোহিঙ্গা” হিসেবে পরিচয় দিতে চায়, তবে আমরা তাদের নিবন্ধন করব না। তবে কেউ চাইলে নিজেদের “বাঙালি” হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে।’
মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ বেশির ভাগ রোহিঙ্গাকেই প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখে থাকে। এদিকে এই আদমশুমারি নিয়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটছে। এর কারণ হচ্ছে, আদমশুমারির জন্য যেসব প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ। অন্যান্য প্রশ্নের সঙ্গে কোনো আন্দোলন বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, সেই তথ্যও দিতে হচ্ছে তাদের। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া লোকজনের মধ্যে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। ঝুঁকি গবেষণাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ম্যাপলক্রফটের গবেষক ড্যানিয়েল গ্রে বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন ও সাধারণ ক্ষমা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিধিবহির্ভূত আটকসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীই এগুলো করছে। নাগরিকদের ব্যাপারে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহে সরকারের এ পদক্ষেপ উদ্বেগের কারণ বটে।’ হামলার শিকার ত্রাণকর্মীদের রাখাইন ত্যাগ: রাখাইনের রাজধানী সিত্তে শহরে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ইউএনএফপি) কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার হামলা চালায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়লে ১১ বছর বয়সী একটি মেয়ে গুলিতে নিহত হয়। এ ঘটনার পর আরও সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিদেশি ত্রাণকর্মীরা গত শুক্রবার রাখাইন ছেড়ে চলে যান। এএফপি।

এখনো সমঝোতার সুযোগ আছে- সাক্ষাৎকারে নিজাম উদ্দিন আহমদ by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

নিজাম উদ্দিন আহমদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক। এ বিভাগের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। অধ্যাপনার পেশায় আছেন ১৯৭৯ সাল থেকে। ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে ‘স্থানীয় পর্যায়ে আমলাতন্ত্র ও স্থানীয় রাজনীতি’ বিষয়ের ওপর গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দ্য পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশ, নন পার্টি কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ইন বাংলাদেশ: এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড প্রসপেক্টসহ আটটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী

‘কাঁচা মরিচ’ প্রতীক চান রাখি

রাখি সাওয়ান্ত
অভিনেত্রী রাখি সাওয়ান্ত চলচ্চিত্র শিল্পকে বিদায় জানিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাঁর নতুন দলের নাম রাষ্ট্রীয় আম পার্টি (আরএএপি)। নির্বাচনে মুম্বাই উত্তর-পশ্চিম আসনে গতকাল শনিবার তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। রাখি আশা করছেন, তাঁর দল প্রতীক হিসেবে ‘কাঁচা মরিচ’ পাবে।
গত শুক্রবার ওডিশায় সংবাদ সম্মেলনে রাখি তাঁর দল গঠন ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। কাঁচা মরিচ আকৃতির কানের দুল ও ব্রেসলেট পরে আসেন রাখি। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

একই দিন ধাক্কা খেল কংগ্রেস ও বিজেপি

ভারতে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে একই দিনে কংগ্রেস ও বিজেপি জোর ধাক্কা খেল। উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের কংগ্রেসের প্রার্থী ইমরান মাসুদকে গতকাল শনিবার ভোরে রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে জনতা দল (সংযুক্ত) থেকে বিতাড়িত নেতা বিহারের রাজ্যসভার সদস্য সাবির আলীর বিজেপিতে যোগদান নিয়ে দলটি বেকায়দায় পড়েছে। দলের নেতাদের প্রবল আপত্তির মুখে অবশ্য তাঁকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। সাহারানপুরের কংগ্রেসের প্রার্থী ইমরান মাসুদকে শনিবার ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, নির্বাচনী সভায় তিনি বক্তৃতায় হিংসা ছড়াতে প্ররোচনা দিয়েছেন। রাজ্য পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি-আইনশৃঙ্খলা) অমরেন্দ্র সেনেগার জানান, ইমরানের বিরুদ্ধে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের নানা ধারায় হিংসায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। ইমরান অবশ্য বলেছেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি। বিজেপি বা মোদির কাছে ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশও করবেন না। বরং মোদির বিরোধিতা করে তিনি শতবার কারাগারে যেতে প্রস্তুত। ইমরানকে বক্তৃতায় বলতে শোনা যায়, ‘আমি রাস্তার লোক। নিজের মানুষের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। মরতে বা মারতে আমি ভয় পাই না। মোদি ভাবেন, এটা গুজরাট। কিন্তু গুজরাটে মাত্র ৪ শতাংশ মুসলমান, এখানে (উত্তর প্রদেশে) ৪২ শতাংশ। ওকে কুচিকুচি করে কেটে ফেলব।’ গ্রেপ্তারের পর ইমরানকে ১৪ দিনের জন্য কারা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
দলীয় প্রার্থী গ্রেপ্তার হওয়ায় ওই আসনে কংগ্রেসের নির্বাচনও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কংগ্রেস দোলাচলে। এ ঘটনায় কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী সাহারানপুরের জনসভা বাতিল করে দিতে বাধ্য হন। কংগ্রেস বলেছে, তারা হিংসা বরদাস্ত করে না। অথচ দলের রাজ্য শাখার পক্ষে বলা হচ্ছে, যে ভিডিওটি দেখানো হয়েছে, তা অনেক পুরোনো। এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে বিজেপির নতুন সংকটের পেছনে দায়ী একটি সিদ্ধান্ত ও তার বিরোধিতা করে দলের শীর্ষ নেতা মুখতার আব্বাস নাকভির একটি টুইট। মোদির খোলামেলা প্রশংসা করায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার সম্প্রতি রাজ্যসভার সদস্য সাবিরকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। রাজ্য নেতৃত্বের সুপারিশে রাজনাথ সিং ও নরেন্দ্র মোদি বিতাড়িত এই নেতাকে দলে নেন। এর পরই দলের সহসভাপতি মুখতার আব্বাস নাকভি টুইট করেন, ‘সন্ত্রাসবাদী ইয়াসিন ভটকলের বন্ধু সাবির দলে এল, এবার শিগগিরই দাউদ ইব্রাহিমও যোগ দেবে।’ নাকভিকে সমর্থন করে বিবৃতি দিতে থাকেন আরএসএসের মুখপাত্র রাম মাধব, এস গুরুমূর্তি, বিজেপির নেতা বলবীর পুঞ্জ, শাহনাওয়াজ হুসেন, কলরাজ মিশ্রসহ অনেকেই। প্রত্যেকেরই অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে সাবিরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রবল বিরোধিতার মুখে গতকাল বিকেলে দলের মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ জানান, সাবিরের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।

তরুণদের প্রাণের আকুতি শুনুন by সৈয়দা নীলুফার

আমাদের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আছে, আনন্দ আছে, বেদনাবোধ আছে, অনুভূতি আছে, দুর্দমনীয় সাহস আছে—নেই শুধু সেসব কাজে লাগানোর সুযোগ ও সামর্থ্য। এ সমাজ তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করতে অক্ষম। ক্ষমতাবানেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই মশগুল যে সাধারণ মানুষ তথা তরুণদের নিয়ে ভাবার ফুরসত পান না।

পুলিশের ক্ষমতা অপব্যবহার বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সুপারিশ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে আসা দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (ইপি) উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে  সরকারকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহনের আহবান জানান। ক্রমবর্ধমান নির্যাতন ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তে জাতিসংঘের বিশেষ টীমকে আমন্ত্রন জানানোর ওপরও জোর দেন প্রতিনিধি দলটি।

ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে সফরকারী ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বরাত দিয়ে এসব কথা বলা হয়। 
প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠক করেন। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই শীর্ষ নেতার সাথে বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলটি বিদ্যমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানায়।
গত জানুয়ারিতে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা এবং পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের নিয়ে রীতিমতো রশি টানাটানিতে চরম উদ্বেগ জানায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। এমতাবস্থায় দুই দলকে সংলাপে বসার আহবান জানায় প্রতিনিধি দলটি। দুই দলকেই এমন একটি পথ খুজে বের করা উচিত যাতে বাংলাদেশের মানুষ অচিরেই একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের প্রতিনিধি বাছাই করার সুযোগ পান। 
ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পুন:গর্ঠনের আহবান জানিয়ে বলেন, এই ক্ষেত্রে বিগত কয়েক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিয়েছে। নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে একটি পূর্নাঙ্গ তদন্তের ওপরও গুরুত্বারোপ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলটি। 
প্রতিনিধি দলটি সুশীল সমাজকে কাজ করার সুযোগ দানে সরকারের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সংশোধনের মাধ্যমে যেন কোন ধরণের দুরভিসন্ধির বাস্তবায়ন করা না হয় সেদিকে নজর দেয়ারও আহবান জানান এই দলটি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিচারবহি:র্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের খবরে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিনিধি দলটি এসব ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো তদন্ত দাবি করে। 
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের ডেলিগেশন টিমের চেয়ারপারসন জিয়ান লিম্বার্টের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি গত ২৪-২৫ মার্চ দুই দিনের বাংলাদেশ সফর করেন। গত ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটাই ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উচ্চ পর্যায়ের প্রথম সফর।
প্রতিনিধি দলটি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও পোশাক শিল্পের সাথে জড়িতদের সাথে দীর্ঘ আলোচনায় বসে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের সাথে  ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক জড়িত উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় গত ৩ বছরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৫৭শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট পোশাক কারখানার বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলেও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। বিশেষ করে শ্রম আইন সংশোধন ও ২শ নতুন নিরাপত্তা পরিদর্শক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তের সুফল কতটা পোশাক খাতে পড়ছে তা পর্যবেক্ষণ করছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট।
কিন্তু এখনও করণীয় বিষয়ের বেশিরভাগই অসম্পূর্ণ রয়েছে-এমন মন্তব্য করে প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মনে করে ইউরোপীয় ক্রেতা ও বাংলাদেশের পোশাক মালিকদের তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করা উচিত। আন্তর্জাতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ইউরোপ ও বাংলাদেশের মধ্যে যে মতৈক্য রয়েছে তার আলোকেই উভয় পক্ষকে প্রতিশ্রুতি পালনে আন্তরিক হওয়া দরকার বলেও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। 
ইউরোপ শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারকে আরও সচেষ্ট হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, দ্রুত পরিদর্শক নিয়োগ জরুরী এবং তাদের প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশিত ও পর্যালোচনা হওয়া উচিত। শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরী বৃদ্ধি হওয়া উচিত বলেও মত দেন ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট।
সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও জোর দেন ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি। আগামী ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধ্বসের একবছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হওয়া দরকার বলেও মত দেন তারা।
বাংলাদেশ সফরে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের চেয়ারপারসন লিম্বার্টের বরাত দিয়ে প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “যখন ইউরোপীয় ক্রেতারা কোন পোশাক কেনেন, তারা এটা নিশ্চিত হতে চান যে যারা এই পোশাকটি তৈরি করেছেন তারা কর্মস্থলে নিরাপদে আছেন এবং একটি সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করছেন”।
প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সাথে বৈঠককালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করেন।  ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি এ ধরনের ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি আরও মানবিক হওয়ার ওপর জোর  দেন। একই সাথে উদ্বাস্তুদের সহায়তায় কর্মরত বিদেশী এনজিদের এদেশে প্রবেশে ও কাজ করার সুযোগদানে সরকারের আরও উদার ভূমিকা প্রত্যাশা করেন প্রতিনিধি দলটি।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্থিতিশীল ও বহুমুখী সম্পর্কের উন্নয়নকে স্বাগত জানান বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও বাংলাদেশের সহযোগীতামূলক কার্যকলাপেরও প্রশংসা করেন প্রতিনিধি দলটি। বিশেস করে দারিদ্র বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন ও লিংগ বৈষম্য দূরীকরণে বাংলাদেশের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিনিধি দলটি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের প্রাককালে বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে প্রতিনিধি দলটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রান দিয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং বাংলাদেশের সমস্ত মানুষের প্রতি শুভকামনা জানান। বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতার জন্য প্রতিনিধি দলটি কৃতজ্ঞতা জানান।

তারেক রহমানের অভিনব ‘রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’

ইতিহাস যাঁরা নির্মাণ করেন, তাঁরা কখনোই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক করেন না। করার প্রয়োজনও হয় না। ইতিহাস নিয়ে তাঁরাই অহেতুক বিতর্ক করেন, ইতিহাসে যাঁদের অবদান রাখার ন্যূনতম সামর্থ্য ও সাহস নেই। কথাটি মনে পড়ল বৃহস্পতিবার পত্রিকায় লন্ডনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তৃতাটি পড়ে। সেখানে বিএনপি আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের সেমিনারে তিনি বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক।’ তাঁর দাবি, ‘এটি ইতিহাসে লাল অক্ষরে লেখা আছে।’ স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এটি জিয়া-তনয়ের আবিষ্কারই বটে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন সাড়ে পাঁচ বছর, খালেদা জিয়া ছিলেন ১০ বছরের বেশি। এ দীর্ঘ সময়ে বিএনপির কোনো নেতা-নেত্রী কিংবা সমর্থক বুদ্ধিজীবীও দাবি করেননি যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এখন তারেক রহমান বলছেন, তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতি। এ ব্যাপারে সম্ভবত তিনি বিএনপির আমলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘সংশোধিত’ ইতিহাসকে সাক্ষ্য মানবেন।প্রত্যুত্তরে আমরা জিয়াউর রহমান আমলের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করছি। দলিলপত্রের তৃতীয় খণ্ডে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি এবং জিয়াউর রহমানের দুটি ঘোষণা ছাপা হয়েছে। প্রথম ঘোষণায় শেখ মুজিব বলেছেন, ....‘এটি আমার শেষ বার্তা হতে পারে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যে আপনারা যেখানে এবং যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ চালিয়ে যান।
বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানের শেষ সেনাটি বিদায় না হওয়া এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ করে যেতে হবে।’ জিয়ার দ্বিতীয় ঘোষণায়ও নিজে সরকার গঠনের দাবি করেননি। এমনকি বেঁচে থাকতে তিনি নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেও প্রচার করেননি। কেবল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা বেলাল মোহাম্মদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর ঘোষিত বার্তাটি যে কলমে লেখা হয়েছিল, সেটির খবর তিনি জানেন কি না। ২৭ মার্চ প্রচারিত ঘোষণায় জিয়া বলেছেন, ‘আমি জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী কমান্ডার ইন চিফ, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আরও ঘোষণা করছি যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা একটি স্বাধীন ও আইনানুগ সরকার গঠন করেছি, যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর ২৪ বছর পর ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে জিয়ার একটি নতুন বার্তা যোগ করে এবং বঙ্গবন্ধুর বার্তাটি গায়েব করে দেয়। এটি নিয়ে আইনি লড়াইয়েও তাঁরা হেরে গেছেন। এখন সেই ‘সংশোধিত’ ইতিহাসের অস্তিত্ব নেই। তারেক রহমান বলেছেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ২৭ মার্চ তিনি শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নিজে অস্থায়ী কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ঘোষণার আগে আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নানও একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর এসব ঘোষণার আগেই দেশের মানুষ যার যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ শুরু করেছিল। ২৫ মার্চ রাতে পিলখানায় ইপিআরের জওয়ানরা এবং রাজারবাগে পুলিশ সদস্যরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা কারও ঘোষণা বা নির্দেশের অপেক্ষা না করেই।
তারেক রহমানের পর খালেদা জিয়াও ২৭ মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানই প্রথম রাষ্ট্রপতি।’ গতকাল দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া তাঁর আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে প্রবাসী সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত কার সরকার ছিল? দিশেহারা জাতিকে পথ প্রদর্শন করেছেন জিয়াউর রহমান, তা প্রমাণ করে সে সময় তিনি দেশের মূল ভূমিকা পালন করে দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া বা করা বা চালাতে হয়েছে, সে ব্যবস্থায় তিনি তা করেছেন। (প্রথম আলো অনলাইন, ২৮ মার্চ ২০১৪) বিএনপির এই নেতা বলতে চেয়েছেন, ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তার মানে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামেরা প্রবাসী সরকার গঠন করেছেন জিয়ার নেতৃত্বে এবং তাঁর নির্দেশেই। সেনাবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী এবং অন্য সেক্টর কমান্ডাররাও যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জিয়ার নির্দেশেই। অদ্ভুত ও উদ্ভট যুক্তি। জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হতে হলে তাঁকে একটি সরকার গঠন করতে হতো। সেটি করার ম্যান্ডেট কি তাঁর ছিল? যদি না থাকে, তাহলে তিনি কী করে প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন? কয়েক বছর আগে এই লেখকের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেছিলেন, স্বাধীনতা তাঁরাই ঘোষণা করতে পারেন, জনগণ যাঁদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে তিনি এ-ও বলেছিলেন, আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কর্নেল পদমর্যাদার এক সেনা কর্মকর্তা স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার কারণে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
কেননা, স্বাধীনতা ঘোষণার এখতিয়ার তাঁর ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগকে ম্যান্ডেট দিয়েছিল। কিন্তু সেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে না দেওয়ায় স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। সত্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই একাত্তরের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ঘোষণা আসে এবং ছয় সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সেই ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতা ঘোষণার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে দুটি দেশেরই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ।’ ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়, যার রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। সেই মন্ত্রিসভার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানীর অধীনে অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারের মতো জিয়াউর রহমানও একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি জিয়া ফোর্সের প্রধান হন। তারেক রহমানের ভাষায় লাল অক্ষরে লেখা এই ইতিহাস থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে একাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে সরকার গঠিত হয়, তার নেতৃত্ব ও আনুগত্য মেনে নিয়েই জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কেবল তারেক রহমান প্রবাসে বসে এ ঘোষণাটি দিলে তা তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে মানা যেত। কিন্তু এক দিন পর তাঁর মা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশেও একই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধার দল নয়, জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক।’ তবে বিএনপির চেয়ারপারসন এটি বলেননি যে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের নেতারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। সেটি তিনি বলবেন না।
কেননা, বললে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদানকে স্বীকার করা হয়। আমাদের রাজনীতিতে এখন চলছে অস্বীকারের সংস্কৃতি। আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক যেসব প্রতিক্রিয়া আশা করা গিয়েছিল, তার চেয়ে কম কেউ দেননি। দলের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, তারেক রহমান যা বলেছেন, তা সংবিধান পরিপন্থী। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, খালেদা জিয়াকে ক্ষমা চাইতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দল আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় বলেছেন, তাঁরা (বিএনপি) এত দিন বলেছেন জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক, এখন বলছেন প্রথম রাষ্ট্রপতি। ...এখন ফর্মুলা পাল্টেছে, কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে ইয়াহিয়া খান তাঁকে গ্রেপ্তার করল না কেন? তিনি জিয়াকে নামেই মুক্তিযোদ্ধা বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের দুটি দিক আছে। প্রথমত, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বলে উল্লেখ করেছেন। এটি ঐতিহাসিক সত্য। এ সত্য কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। অতীতে অনেকে চেষ্টা করে সফল হননি। ভবিষ্যতেও তাঁরা সফল হবেন না। কিন্তু এ-ও সত্য যে আওয়ামী লীগ একাই মুক্তিযুদ্ধ করেনি। আরও অনেক দল এমনকি দলের বাইরের মানুষ এ যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। ইতিহাসের ভাগাভাগিতে আমরা যেন তাঁদের কথা ভুলে না যাই। আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষণীয় যে তাঁরা নিজেদের ছাড়া অন্য কারও অবদান স্বীকার করতে চান না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জিয়াউর রহমান নামেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এর মাধ্যমে কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরই শুধু খাটো করলেন না, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তী যে সরকার তাঁকে বীর উত্তম খেতাব দিল, তাকেও অসম্মান করলেন। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসেও আমরা কে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, কে প্রথম রাষ্ট্র্পতি ছিলেন এসব নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করছি। সামনে তাকাচ্ছি না। এ দীর্ঘ সময়ে আমরা কেন শিক্ষার হার ৬০ শতাংশের ওপরে নিতে পারলাম না, কেন এখনো ২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, কেন ৩৭ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার, সে প্রশ্ন করছি না। কেন আমাদের দেশ প্রতিবেশীদের চেয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে, সে নিয়েও রাজনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ নেই। তাঁরা কেবল ইতিহাসে বন্দী হয়ে আছেন। মাত্র দুই দিন আগে আমরা স্বাধীনতা দিবসে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গেয়ে জাতিকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করলাম। আর দুই দিন পরই বিভেদ ও বিদ্বেষে পরস্পরকে বিদ্ধ করে চলেছি। এই আত্মঘাতী ইতিহাস চর্চা থেকে জাতিকে রক্ষা করবে কে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

পণ্য নয়, মর্যাদায় ধন্য হোন

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাক্জীবীরা (টক শোয় অংশগ্রহণকারী) বিভিন্ন চ্যানেল সরগরম রাখলেন এ দিবসের তাৎপর্য বা করণীয় নিয়ে। সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রা, পত্রপত্রিকার অবদানও কম নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, মানসিক অত্যাচার, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা হলো। বিজ্ঞাপনে নারীর অবস্থানকেও আলোচনায় আনা হলো। কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন পণ্য করা হবে, যেমন গাড়ির বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন বিশেষ পোশাকে বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে—এসব নিয়ে বাগিবতণ্ডা। বিজ্ঞাপননির্মাতাদের নারীর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে বা নারীকে সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে ইত্যাদি। উপস্থাপক প্রশ্ন রাখেন, তাহলে যেসব নারী মডেলকে ও রকম অসম্মানজনক বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়, তাঁরা প্রতিবাদ করেন না কেন? উত্তরে বাক্জীবী বলেন, এটা হয়তো তাঁর পেশা বা জীবিকা। তিনি নির্মাতা যেভাবে বলবেন, সেভাবে না করলে জীবিকা হারাবেন। উচিত, নির্মাতাদেরই সংশোধিত হওয়া। বিখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমিকে এক চিত্রপরিচালক একবার একটি দৃশ্যে স্বামীর পায়ে হাত বোলাতে বলেছিলেন। কাহিনির প্রয়োজনে সে দৃশ্যের খুব একটা দরকার ছিল না। শাবানা সে দৃশ্যে অভিনয় করতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি এ ধরনের মর্যাদাহানিকর অনাবশ্যক দৃশ্যে কেউ অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলেও উচ্চারণ করেছিলেন।
তো আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করতে হবে। একবার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ফোরামের এক পিকনিকে নামকরা সংগীতশিল্পীদের আনা হয়েছিল গান পরিবেশনের জন্য। নারী শিল্পী প্রথমেই গাইলেন: ‘আমি তোমার বধূ, তুমি আমার স্বামী, খোদার পরে তোমায় আমি বড় বলে জানি’। উপস্থিত নারী কর্মকর্তা ও অন্যান্য মর্যাদাসম্পন্ন নারী খুবই বিরক্ত হলেন। দু-একজন পুরুষও উসখুস করলেন। দর্শক কারা, তা বিবেচনায় রেখে গান নির্বাচন করা উচিত বলে অনেকে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলেন। নারীকে নিজেই মর্যাদাবান হতে হবে। ছোটবেলা থেকেই মেয়ে আর ছেলের বৈষম্য নিরসনে পরিবারের বড়দের কর্তব্যের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের মর্যাদাবান হতেও শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর এক প্রবন্ধে। সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ কাউকে অবমাননা করতে পারেন না বা তাঁরা কাউকে অসম্মানের আসনেও বসতে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন না। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, যে ব্যক্তির অধীনে নারীরা কাজ করেন বা যাঁরা নারীদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা কি শিক্ষিত নন? নিশ্চয় তাঁদের উচ্চশিক্ষার সনদ রয়েছে। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়নি। তাই যে বাবা-মা সন্তানদের উচ্চমূল্যে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন, তাঁরা যে সন্তানদের হাতে খুন বা নিগৃহীত হবেন না, তা কেউ বলতে পারে না।
কারণ, মূল্যবোধ বা মর্যাদাবোধ পয়সা দিয়ে কেনা যায় না। আচার-ব্যবহারে, আদানে-প্রদানে, চালচলনে ও শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় তা আপনিই হয়ে ওঠে। একসময় আমাদের ভাড়া বাড়ির একদিকে বাস করতেন এক চিকিৎসক পরিবার, অন্যদিকে এক শালকার (ধোপা) পরিবার। ধনী চিকিৎসকের দোতলা থেকে প্রতিরাতে ঝগড়া, জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ির আওয়াজ, দরজা ধাক্কাধাক্কি, কান্নাকাটি নিত্যকার ঘটনা। অন্যদিকে, শালকার পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক এবং দারিদ্র্যও প্রকট। কিন্তু তাদের বাসা থেকে কেউ কোনো দিন কাউকে জোরে কথা বলতে শোনেনি। তাদের অভাব ছিল, উচ্চশিক্ষা ছিল না; কিন্তু ধোপদুরস্ত পুরোনো দুর্বল কাপড় পরিহিত তাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটিকে দেখলে সবাই সম্মানে নত হতেন। কেন? কারণ তাঁর চালচলন ও চোখে-মুখে এমন কিছু ছিল, যা ওই শিক্ষিত চিকিৎসকের ছিল না। নারীকেও চালচলনে মর্যাদাবান হতে হবে। নারী কারও খেলার পুতুল নয়, তা পরিবার থেকেই জানাতে হবে। পারিবারিক শিক্ষায় আত্মমর্যাদাবোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নারীকে পণ্য করার সাহস যেন কেউ না পায়, সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। সেটাও নির্ভর করে পরিবারের পুরুষেরা নারীদের প্রতি কেমন আচরণ করছেন, তার ওপর। পরিবারের ছেলেশিশুটি যেন না বুঝতে পারে মেয়েরা অধস্তন, পুরুষ শ্রেষ্ঠ, নারী দ্বিতীয় সারির।
তাই এ ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকাও কম নয়। পরিবারের পুরুষেরা যেসব মেয়েকে বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখেন, সেসব মেয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগে নিজেদের অবস্থানকে উঁচুতে তুলতে পারেন না। তাঁরা ভাবেন, এটাই তাঁদের প্রাপ্য। তখন কর্মক্ষেত্রে তাঁরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। বিজ্ঞাপনে নারী তাঁর কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করছেন। তাঁরা সেখানে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। নারীকে পণ্য করার পাঁয়তারা অনুদার ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের থাকবেই। তাদের সে মনোভাবের সহায়ক হবেন না আত্মমর্যাদাবান নারী। রাউলিংয়ের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘মাদার ইন ম্যানভিল’ পড়েছেন অনেকেই। গল্পের সেই দরিদ্র ছোট্ট কাঠুরে জেরি লেখিকার দয়া বা সহানুভূতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ গল্পটি এখনো উচ্চমাধ্যমিকে পড়ানো হয় কি না, জানি না। আসলে এসব গল্প পাঠ্যপুস্তকে রাখার অর্থ হলো, এ থেকে শুধু আনন্দই সংগ্রহ নয়, শিক্ষাও। সিমন দা বেভোয়ার বলেছেন, ‘নারী হয়ে কেউ জন্মান না, নারী হয়ে ওঠেন।’ কিন্তু নারী কি নিজে নারী হয়ে ওঠেন? পারিপার্শ্বিকতার বলি নারীকে মর্যাদাবান মানুষ হয়ে উঠতে সহায়তা করতে হবে সবাইকে, নারীর নিজেকেও।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

Saturday, March 29, 2014

‘নির্ভরযোগ্য তথ্যে’ নতুন অঞ্চলে তল্লাশি

স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়া দ্বীপের কাছে সাগরে এই
ছবিটি ধরা পড়ার পর রটে যায়—মালয়েশিয়ার
নিখোঁজ বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। দ্রুত
সেখানে পাঠানো হয় উদ্ধারকর্মীদের। পরে জানা যায়,
জিনিসটি আসলে একটি টাগ বোট। এতে বহন
করা হচ্ছে বড় আকৃতির কোনো কিছু। বিবিসি
মালয়েশিয়ার নিখোঁজ উড়োজাহাজ অনুসন্ধানে গতকাল শুক্রবার ভারত মহাসাগরের নতুন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি আগের অনুসন্ধান এলাকা থেকে প্রায় ৭০০ মাইল উত্তরে। অভিযানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘নির্ভরযোগ্য তথ্যের’ ভিত্তিতেই নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক কর্তৃপক্ষ (এএমএসএ) গতকাল জানিয়েছে, নিউজিল্যান্ডের বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ থেকে তোলা ছবিতে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে ১১টি বস্তু দেখা গেছে, যা মালয়েশীয় বোয়িং বিমানটির ধ্বংসাবশেষ হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে আজ শনিবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অনুসন্ধান অভিযানের সমন্বয়কারী এএমএসএ গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের কাছ থেকে পাওয়া নতুন তথ্যের ভিত্তিতে নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই তদন্ত দল রাডারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে উড়োজাহাজটির গতি আগের ধারণার চেয়ে বেশি ছিল। এর ফলে এর জ্বালানির ব্যবহার যেমন বেড়ে যায়, তেমনি সম্ভাব্য গন্তব্যের দূরত্বও কমে যায়। ওই সময় উড়োজাহাজটির অবস্থান ছিল ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে। বিবৃতিতে বলা হয়, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আগের এলাকা থেকে ৬৮৪ মাইল উত্তরে নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
নতুন অনুসন্ধান এলাকার অবস্থান হবে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ বন্দর থেকে এক হাজার ৮৫০ মাইল পশ্চিমে, যা আগের অনুসন্ধান এলাকার চেয়ে স্থলভাগের বেশি কাছে। নতুন এলাকা সাগরের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল ‘গর্জনশীল চল্লিশা’র বাইরে হওয়ায় অনুসন্ধান অভিযান আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত পরিবহনমন্ত্রী হিশামুদ্দিন হুসেইন গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, নিখোঁজ উড়োজাহাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের দেওয়া নতুন তথ্য ‘বিবেচনার’ দাবি রাখে। যদিও অনুসন্ধান অভিযান এখন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, নতুন অনুসন্ধান এলাকা চিহ্নিত করার মানে এটা নয় যে সম্ভাব্য ধংসাবশেষ হিসেবে বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইটে পাওয়া কয়েক শ বস্তুর বিষয় একেবারেই অবজ্ঞা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজটি ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে গত ৮ মার্চ নিখোঁজ হয়। মধ্যরাতের পর কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করে এক ঘণ্টা পরই রাডারের সঙ্গে এর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিবিসি, এএফপি ও সিএনএন।

কোনো দলে নেই আমির খান

আমির খান
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের দৌড়ে বলিউডের তারকাদের লম্বা লাইন পড়ে গেছে। প্রার্থী হয়েছেন অনেক। এর মধ্যে অভিনেতা আমির খানকে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়ে জানাতে হলো তিনি কোনো দলের সঙ্গে নেই। চিঠিতে আমির খান জানান, তিনি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির (এএপি) সমর্থক নন।
ওই দলের সমর্থক বলে তাঁকে নিয়ে যে গুজব রটেছে, সেটি বন্ধ করতে তিনি নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানান। আমির খানের ছবিসংবলিত একটি ‘পোস্টার’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই পোস্টারে লেখা হয়েছে, এবার আমির এএপিকে ভোট দেবেন। এএপিই ওই প্রচারণা চালিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এনডিটিভি।

সৌদি আরবের পাকিস্তানমুখী যাত্রা by মাই ইয়ামানি

কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সুরক্ষাদাতা যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব ক্রমেই বেড়েছে। মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারকে মেনে নেওয়ার বিষয়টিকে সৌদি আরব বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছে। তারপর এল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নিজের ঘোষিত ‘লাল রেখা’ বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি। তবে চূড়ান্ত আঘাতটি হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে সাম্প্রতিক সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, যখনই সৌদি আরব তার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি অনুভব করেছে (দেশটি ইরানের আঞ্চলিক উচ্চাভিলাষকে সেই রকম একটি হুমকি মনে করে), তখনই সে নিজেকে রক্ষার জন্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তিস্তার পানি by মিজানুর রহমান খান

ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে অন্তত আলোচনায় টিকে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা নিয়ে মুখ খুলেছেন। তবে রংপুরে তিস্তা আরও শুকাচ্ছে। সেখানকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বললেন, ২০ মার্চ তাঁরা ৫০০ কিউসেক পানি মেপেছেন। সেখানে থাকার কথা কমপক্ষে তিন হাজার কিউসেক। ঢের সময় বাদে তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খবরের শিরোনাম হতে দেখা গেল। ভারতে নির্বাচন কড়া নাড়ছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু কলকাতায় তিস্তা চুক্তি না হওয়া নিয়ে সরাসরি মমতাকে অভিযুক্ত করেন। বামদের এমন অকপট অবস্থানও নতুন। বিমান বসু যথার্থই বললেন, ‘তিস্তা ও ছিটমহল চুক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালেই হতে পারত। মমতা তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে বাংলাদেশের ভারতবিরোধী মৌলবাদীদের উৎসাহ জুগিয়েছেন।’

পণ্য নয়, মর্যাদায় ধন্য হোন by উম্মে মুসলিমা

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাক্জীবীরা (টক শোয় অংশগ্রহণকারী) বিভিন্ন চ্যানেল সরগরম রাখলেন এ দিবসের তাৎপর্য বা করণীয় নিয়ে। সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রা, পত্রপত্রিকার অবদানও কম নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, মানসিক অত্যাচার, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা হলো। বিজ্ঞাপনে নারীর অবস্থানকেও আলোচনায় আনা হলো। কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন পণ্য করা হবে, যেমন গাড়ির বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন বিশেষ পোশাকে বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে—এসব নিয়ে বাগিবতণ্ডা। বিজ্ঞাপননির্মাতাদের নারীর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে বা নারীকে সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে ইত্যাদি।

ও ক্রিকেট, ভালোবাসা ফিরিয়ে দাও by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

এ চ্যানেল সে চ্যানেল ঘুরে বিটিভি ওয়ার্ল্ডে আটকে গেল চোখ। চিরচেনা জার্সি পরে বল নিয়ে ছুটোছুটি করছে দুই দলের খেলোয়াড়েরা। নিমেষে আবিষ্কার করলাম, দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল আবাহনী ও মোহামেডানের খেলা চলছে। কিন্তু গ্যালারিতে দর্শক কোথায়?

তারেক রহমানের অভিনব ‘রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’ by সোহরাব হাসান

ইতিহাস যাঁরা নির্মাণ করেন, তাঁরা কখনোই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক করেন না। করার প্রয়োজনও হয় না। ইতিহাস নিয়ে তাঁরাই অহেতুক বিতর্ক করেন, ইতিহাসে যাঁদের অবদান রাখার ন্যূনতম সামর্থ্য ও সাহস নেই।

সামনের লড়াই আরও কঠিন হবে by আবদুল মান্নান

ছাব্বিশে মার্চ ছিল বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবস। আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ এদিন বেলা ১১টায় ঢাকার জাতীয় প্যারেড ময়দানে সমবেত হয়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেছেন। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় যে যেখানে আছেন, এই সময়ে সেখানে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছেন। দেশের বাইরেও বাঙালিরা এই সময়ে একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লিভ টুগেদার by শর্মী চক্রবর্তী

আমি আমার বাবা-মাকে ছেড়ে এসেছি, সবকিছু ভুলে তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই, আমার বাবা-মাও এখন আমাকে নিতে চাইবে না, এখন তুমি যদি আমাকে বউ হিসেবে স্বীকৃতি না দাও তাহলে আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না- গত বুধবার রাতে এ কথাগুলোই ছিল রানার সঙ্গে বর্ণির শেষ কথা। বিয়ে করার প্রতিশ্রুতিতে রানার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল বর্ণি। তার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল রানাকে। সম্পর্কের গভীরতা যখন বাড়তে শুরু করে তখন বর্ণি রানাকে বিয়ে করার কথা বলে, তখন সে ‘না’ বলে দেয়।

ক্রিকেট: মা, তোর বদনখানি মলিন হলে...

খুব মন খারাপ করে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিলাম। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। রাতের অন্ধকার চিরে গাড়ি করে বাড়ি ফিরছি। হাতে একটা পতাকা-স্ট্যান্ড। সেটা কামড়াচ্ছি। নানা কথা মনে হচ্ছে। আমরা কেন এত ক্রিকেট নিয়ে মেতে আছি? আমরা কেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে এত সমর্থন দিই? কেন দল হারলে আমরা মুষড়ে পড়ি। ভেবে ভেবে বের করি, ক্রিকেটাররা আমাদের বেশ কিছু জয় দিয়েছেন। আমরা জানি, আমাদের ফুটবল দল বিশ্বকাপের ফাইনাল রাউন্ডে খেলবে না। আমরা আসলে জাতীয় ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন স্তরে মার খেতে খেতে জয়ের জন্য তৃষিত হয়ে আছি; কেউ যদি কোথাও আমাদের একটু জয় এনে দেয়! আমরা বিজয়ীর সঙ্গে থাকতে চাই। যেহেতু নিজের জীবনে জয় নেই, জাতীয় জীবনেও জয় নেই, তাই আমরা আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলকে আঁকড়ে ধরি। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি আমাদের জয় এনে দেবে, এই আশায় বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা মাতোয়ারা হয়ে থাকি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হেরে গেছে, আমাদের ভীষণ রাগ, ভীষণ হতাশা! কেন তোরা আমাদের জয় এনে দিতে পারিস না? না পারলে খেলতে যাস কেন? আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা কথা বলেন। সক্রেটিসকে প্লেটো জিজ্ঞেস করেছিলেন, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম কী? সক্রেটিস জবাব দিয়েছিলেন, সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কাজটুকুন করা। সাকিব বা তামিমকে দোষ দেওয়ার আগে আমি আমার নিজের বুকে হাত রেখে প্রশ্ন করি, তুমি কি তোমার কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করছ? তুমি কি এমন কিছু করেছ, যাতে দেশের মুখোজ্জ্বল হয়? দেশের উপকার হয়?
এই প্রশ্ন আজ আমাদের প্রত্যেককে করতে হবে। আমার ধারণা, আমাদের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বেশির ভাগ নাগরিকই দেশের জন্য এমন কিছু করে না, যা নিয়ে গর্ব করা যায়। আমরা বিদেশে যাওয়ার সময় ডলার নিয়ে যাই, আর কাঁড়ি কাঁড়ি শপিং করে আনি। আমরা বিদেশে নাগরিকত্ব নিই, দেশের ফ্ল্যাট, জমিজমা বিক্রি করে হুন্ডি করে টাকা নিয়ে বিদেশে স্থায়ী হই। আর দুর্নীতি করি, দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাঠাই। আমরা আমাদের বন-নদী-জমি ধ্বংস করি। উপকার যদি দেশের কিছু হয়ে থাকে, তা করছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা, যাঁরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ডলার আয় করেন আর তা দেশে পাঠান। করছেন আমাদের গার্মেন্টস-শ্রমিকেরা, শরীরের রক্ত পানি করে তাঁরা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা দিচ্ছেন। আমাদের জন্য করছেন কৃষকেরা, ১৬ কোটি মানুষকে অন্ন জোগাচ্ছেন। আর আমরা তথাকথিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত দুর্নীতি করি। দুর্নীতিপোষক ব্যবস্থাকে কায়েম রাখি আর তার ননি-মাখন তুলে তুলে খাই। আর টেলিভিশনের সামনে বসে মন্তব্য করি, খেলতে পারিস না, খেলতে যাস কেন? অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের চেহারাটা যেন আমরা আয়নায় দেখে নিই। আমি এমন কী করেছি যা বিশ্বসভায় আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল হতে খানিকটা সাহায্য করেছে? আমার চেয়ে ঢের ভালো ভেড়ামারার রাসেল আহমেদ, যিনি ওই গ্রামে বসে আউটসোর্সিং করছেন, মাসে মাসে ডলার আনছেন, যাঁর সঙ্গে কাজ করছে গ্রামের হাজার যুবক। বিনা পয়সায় স্কুলে পড়েছি, কলেজে পড়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি আর দেশের টাকা বাইরে পাচার করছি। দেশের জল-মাটি-বনানী ধ্বংস করছি।
আমি আবারও বলি, সর্বোচ্চ দেশপ্রেম হলো সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কাজ করা। একটা কথা প্রচলিত আছে, খালি মুরগি কেনার বেলায় আমরা দেশপ্রেম দেখাই, আমরা দেশি মুরগি খুঁজি; তবে আমার মনে হচ্ছে, শুধু মুরগি কেনার বেলায় নয়, আমরা ক্রিকেট দেখার সময় দেশপ্রেমিক হয়ে যাই। এটা সাকিব বা তামিমের দোষ নয় যে তারাই আমাদের দেশের সেরা খেলোয়াড়! আমাদের গরিব দেশ। আমরা মারকুটে স্বভাবের নই। আমরা পররাজ্যে হামলা করিনি। উপনিবেশ স্থাপন করিনি। এখানে ১৭ জন ঘোড়সওয়ার এসে রাজ্য দখল করে নিয়েছে, এখানে কয়েকজন বণিক বাণিজ্য করতে এসে দুই শ বছর শাসন করেছে। আমরা আকারে ছোটখাটো, মনটা মায়ায় ভরা, এখানে কবি আছে, যোদ্ধা কম। কেবল ১৯৭১ সালেই আমরা জেগে উঠেছিলাম বিপুল বিক্রম নিয়ে। ক্রিকেট শারীরিক সক্ষমতারও খেলা। আমরা অপুষ্টির শিকার। শৈশব আমাদের কাটে দারিদ্র্যে, তারপর টাকার মুখ দেখলেই আমরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ি। তবু আশার কথা যে শচীন টেন্ডুলকার কিংবা ম্যারাডোনা-মেসি কেউ লম্বা নন। কেবল শারীরিক বল দিয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল হয় না। খেলায় ভালো করার জন্য লাগে প্রতিভা, প্রশিক্ষণ, নিরলস সাধনা, জিগীষা, মানসিক দৃঢ়তা, খেলোয়াড় তৈরির অবকাঠামো ও ব্যবস্থা, অনুকূল পৃষ্ঠপোষকতা, নেতৃত্ব, প্রতিজ্ঞা, সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। তবে আমাদের টিমের অবস্থা এখন বোধ করি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ।
শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নানা ফর্মে একটা খেলাতেও জিতিনি, এশিয়া কাপেও হোয়াইটওয়াশ হয়েছি, এমনকি আফগানিস্তানের কাছেও হেরেছি খারাপভাবে। টি-টোয়েন্টি প্রথম পর্বে হংকংয়ের কাছে খেলার দিনও কি প্রত্যাশার চাপ ছিল? এই প্রশ্ন নিশ্চয়ই করতে পারি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে খেলার দিন মনে হয়েছে, সাকিব কেন তিন ওভার বল করবেন, সোহাগ গাজী কেন চার ওভার। আরেকটা প্রশ্নও আছে, ধরলাম, আমরা খেলতে পারি না, আমাদের সক্ষমতাই নেই। কিন্তু আমরা পিচও কেন আমাদের মতো করে বানাতে পারি না? পিচ কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য সহায়ক হয়? এখন একটু ভাবি, যাঁরা বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন দেন তাঁদের কথা। সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়, দুঃসময়ে হায় হায় কেউ কারও নয়। মঙ্গলবারে বাংলাদেশ জিতলে আমি বলতাম, আমার জন্যই জিতেছে। আমি যে গ্র্যান্ড-স্ট্যান্ডে বসে ছিলাম। হারার সময়ও অবশ্য বলছি, অনেকেই বলছেন, দূর আমি গেলেই হারে। বা আমি অমুক শার্ট পরলে হারে। এই সব কোনো অজুহাত মাত্র নয়। আপনি-আমি তো আর মাঠের মধ্যখানে গিয়ে ব্যাট বা বল করে দিয়ে আসতে পারব না। সমালোচনা করতে পারব, সেটা তো আমরা পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, রোনালদোরও করি। কাজেই এখন ১৬ কোটি ক্রিকেট বিশেষজ্ঞের পরামর্শের ঝড় বয়ে যাবে। বিশেষ করে আমার মতো নিধিরাম সর্দারদের তো আছেই ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার। আমরা তো বলবই—মুশফিকের খেলা দেখলে মনে হয়, এই একটা ছেলেরই মাত্র দায়িত্ব দলটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া।
আর কারও কোনো দায়দায়িত্ব নেই। এটা কেন মনে হয়। মুশফিক যদি ধরে খেলতে পারেন, অন্যরা কেন পারেন না? যা-ই হোক, এর চেয়েও খারাপভাবে মিরপুর থেকে ফিরে এসেছিলাম। গত বিশ্বকাপের আসরে, ৪ মার্চ ২০১১। ৫৮ রান নিয়ে। এবার তো তবু ৯৮। তারপর পরের খেলায় আমরা জিতেছিলাম। ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিলাম। পরে এশিয়া কাপে ভালো করেছিলাম। আমাদের এগোতেই হবে। আমরা আবার আশায় আশায় বুক বাঁধব। বাংলাদেশের ক্রিকেট-ভক্তরা পৃথিবীর সেরা। তাদের দল চ্যাম্পিয়ন নয়, কিন্তু তাতে দলের প্রতি তাদের ভালোবাসা কমে না। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেই তো আওয়াজ উঠেছে, আমরা দলের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব। হারুক জিতুক। আর ‘চার-ছক্কা হইহই’ গানটা নিয়ে যতগুলো ফ্ল্যাশ মব হয়েছে, তা নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে পর্যন্ত লেখালেখি হচ্ছে। একক একটা গান নিয়ে এর আগে এত ফ্ল্যাশ মব আর হয়নি বলেই শোনা যাচ্ছে। নিউইয়র্ক থেকে কাতার, টরন্টো থেকে প্যারিস, লন্ডন থেকে সিডনি, নোয়াখালী থেকে রংপুর, বিয়েবাড়ি থেকে সুপার মল—সর্বত্রই হচ্ছে ফ্ল্যাশ মব, হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে একটা গানের তালে নাচ। সেটাও তো ক্রিকেটের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসারই প্রতিফলন। আমাদের টিমের দরকার তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। আমরা পারব। আমরা তো অতীতে পেরেছি।
গত এশিয়া কাপেই আমরা ভারতকে হারিয়েছি। বিশ্বকাপে আমরা ভারতকে হারিয়েছি। আবারও পারব। আর দরকার দলের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য। আমাদের টিমটা যেন সব সদস্য মিলে এক দেহ, এক মন হয়ে ওঠে। এই সব বিষয়ে কাজ করতে হবে কাউন্সেলরদের, থিঙ্কট্যাংককে। ক্রিকেট মনেরও খেলা। মনের খেলায় যেন আমরা না হারি। বনের বাঘ আসার আগে যেন মনের বাঘে আমাদের না খেয়ে ফেলে। আমাদের ক্রিকেটাররা স্বাধীনতা দিবসে লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে মিলে জাতীয় সংগীত গেয়েছেন। সেই ছবি দেখে খুব ভালো লাগল। জাতীয় সংগীতে একটা লাইন আছে, ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।’ সুমনা শারমীন, আমাদের সহকর্মী সাংবাদিক, একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। তাঁরা কয়েকজন নারী সাংবাদিক গেছেন আমেরিকায়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওরা বলল, এই, তোমরা গান গেয়ে শোনাও একটা। সবাই জানেন, এমন গান কী আছে? মেয়েরা গাইতে শুরু করলেন জাতীয় সংগীত। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ গাইতে গিয়ে প্রত্যেকের চোখে জল গড়াতে লাগল, তাঁরা হাউমাউ করে কাঁদছেন আর গাইছেন। আমেরিকানরা অবাক। তোমরা কাঁদো কেন?
আমরা যে জাতীয় সংগীত গাইছি!
জাতীয় সংগীত গাইতে গেলে বুঝি মানুষ কাঁদে? কই, আমরা তো কাঁদি না?
তোমরা এটা বুঝবে না। আমাদের দেশ নিয়ে, আমাদের পতাকা নিয়ে, আমাদের জাতীয় সংগীত নিয়ে আমাদের কী যে আবেগ, কী যে বেদনা, কী যে ভালোবাসা, বাইরের মানুষকে আমরা তা বোঝাতে পারব না। আমাদের ক্রিকেটাররাও নিশ্চয়ই সেটা খুব ভালো করে জানে। তারাও তো এটা উপলব্ধি করে, তাদের জীবনেও এটা সত্য হয়ে ওঠে—‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।’ গত এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে দুই রানে হারার পরে সাকিবের কোলে মুশফিকের মাথা, সাকিবের চোখে জল টলমল করছে, এই দৃশ্য আমরা ভুলব না। ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে জেতার পরেও সাকিবের চোখ জল চিকচিক করছিল। প্রিয় ক্রিকেটারগণ, তোমরা হারো জেতো, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। তবে তোমরা সবচেয়ে ভালোভাবে নিজের কাজটুকু করছ, সে জন্য যতটা পরিশ্রম, সাধনা, আত্মত্যাগ দরকার, তোমরা তা স্বীকার করছ, আমরা তা বিশ্বাস করি। একইভাবে আমার কর্তব্য হলো সবচেয়ে সুন্দরভাবে নিজের কাজটুকু করা। নিজের কাজে ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেটারদের সমালোচনা করাটা বোধ হয় ততটা কাজের কাজ হবে না।
জয় বাংলাদেশের হবেই।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

দেশটার মালিক কারা?

জীবনে যাদের কিছুই হয়নি, তাদেরও বলার মতো অনেক কথা থাকে। যার কিছু নেই, তার কেবলই আছে অভিজ্ঞতা, স্মৃতির বুদ্বুদ তাদের মনে ওঠে আর ফেটে পড়ে। আমাদের স্বাধীনতার গৌরবমাখা ইতিহাস আছে, অমর আত্মদানের শোক আছে, কিন্তু স্বাধীনতার সোনালি হাসি দেখি না তো ১৬ কোটি মানুষের মুখে। স্বাধীনতা তাহলে কি আসেনি? জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর একটি রাষ্ট্র আমাদের আছে। আমরা দেশের মানুষ থুয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড গড়ি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সত্যিকার রেকর্ড তো গড়া হয় মানুষের মনে। সেখানে কোন রেকর্ড গঠিত হচ্ছে, কোন হতাশার রেকর্ড বাজছে, সে খবর রাখে কে? রেকর্ড, ব্র্যান্ডিং—এগুলো বাজারি শব্দ। দেশ মানে ব্র্যান্ড না, দেশ মানে ঠিকানা, দেশ মানে গর্বের পরিচয়। বাজারের মহাজনেরা স্বাধীনতার চেতনাকে একদিকে উৎসবের জ্বালানি বানাচ্ছেন, অন্যদিকে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ অপব্যবহারে অপব্যবহারে নিজেই চেতনানাশক হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা অতীতের ব্যাপার নয়, স্বাধীনতা প্রতিদিনের যাপনের বিষয়। এই চেতনার প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য। ভবিষ্যতে কেমন দেশ চাই, তার নিরিখ হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ঘোষিত-অঘোষিত আকাঙ্ক্ষা। সমতাভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জনমানুষের সুখী দেশ আমাদের প্রাপ্য ছিল। এত ছোট দেশে এত বড় গণহত্যার প্রতিদান এর চেয়ে কম হতে পারে না। স্বাধীনতা দিবস এলেই তাই কবি আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতাটা মনে পড়ে। বিজয়ের পরপরই তিনি কেন এমন কবিতা লিখেছিলেন,
তাই ভাবি। কবিতাটি শুরু হয় এভাবে: লক্ষ্মী বউটিকে আজ আর কোথাও দেখি না/ হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে কোথাও দেখি না/ কতগুলো রাজহাঁস দেখি/ নরোম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি/ কতোগুলো মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না/ শিশুটিকে কোথাও দেখি না। কবিতাটি শেষ হয় এই আক্ষেপ নিয়ে: কেবল পতাকা দেখি/ কেবল পতাকা দেখি/ স্বাধীনতা দেখি। লক্ষ্মী বউটি বা নরম নোলক পরা বোন বা ছোট ভাই বা শিশুটি আর ফিরবে না। তাদের অন্তিম নিঃশ্বাসের কষ্টে বাংলার আকাশ আজও নীল। কিন্তু শহীদদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ‘সোনার বাংলার’ স্বপ্নটিও কি হারিয়ে গেল? রাজহাঁসের মতো গর্বিত একদল ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষ দেখি। মুখস্থ ইতিহাসের জিকির আর মুখস্থ স্লোগানের জয়জয়কার দেখি। আর কেবল পতাকা দেখি, কেবল স্বাধীনতা দেখি। ২৬ মার্চে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে ক্লান্ত পায়ে অজস্র কিশোর-কিশোরীকে দেখি পতাকা হাতে ফিরে যাচ্ছে। ওরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? যে শ্রমিকদের সেখানে আনা হয়েছিল, তারা কি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে মানুষের স্বাধীনতা, জবানের স্বাধীনতা, নিরাপদ মৃত্যুর স্বাধীনতা, রুটিরুজির নিশ্চয়তার স্বাধীনতা কতজনের? আমরা লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। কিন্তু সেই বিজয়ের ফল খেয়ে গেল কোন ইঁদুরেরা? একাত্তরে যত মানুষ দেশে ছিল, তত মানুষ এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। জাতির সবচেয়ে কর্মঠ আর শ্রমপ্রাণ অংশের অপচয়ের শেষ নেই। পোশাকশিল্প আর প্রবাসী শ্রমশিবিরগুলোতে যে বাংলাদেশিরা কাজ করে,
তারা বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের শ্রমদাস। সোনার বাংলার যত সম্পদ, তার একাংশ পাচার হয়, অন্য অংশ ব্যয় হয় ভোগবিলাস আর অনুৎপাদনশীল খাতে। শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের ৪৭ শতাংশই বেকার। যে সবুজ-শ্যামল নদীমাতৃক বাংলাদেশের ছবি আমাদের জাতীয় সংগীতে আঁকা, সেই বাংলাদেশের নদী-পাহাড়-অরণ্য দখলে আর লুণ্ঠনে মুমূর্ষু। বিশ্বব্যবস্থায় এই কাবু বাংলাদেশ নিয়ে দেশবাসীর কতজন গর্বিত বোধ করে? ইতিহাস অমূল্য সম্পদ, কিন্তু বর্তমানের সার্থকতা ছাড়া সেই ইতিহাসকে অক্ষয় রাখার তো আর উপায় নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেবল ইতিহাস শুনে শান্ত হবে না, তারা চাইবে বর্তমানে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবির স্বীকৃতি। চাইবে সম্মানজনক সমৃদ্ধ জীবন। এই তরুণেরা দুনিয়াদারি দেখে ফেলেছে, উন্নত দেশের তরুণদের কাছে তারা হীনম্মন্য হয়ে থাকতে চায় না। অনেকের মুখেই শুনি, এই দেশে আর থাকা যাবে না। এর থেকে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে! তরুণ বললে কেবল সচ্ছল চমক আর চুমকি নর-নারীদের বুঝলে চলবে না। যারা কারখানায় কাজ করে, যারা মাঠে শ্রম ঢেলে জাতির অন্ন জোগায়, যারা সড়কের সব রকমের বাহন চালায়; সংখ্যায় তারাই বেশি। তারা তাজরীনে পোড়ে, তারা রানা প্লাজায় ধসে মরে, তাদের ফসল পানির দরেও বিকায় না। কীভাবে ১০ বছরে স্বাধীন দেশের ২০ হাজার শ্রমিক প্রবাসে শ্রমের চাপে মারা যায়?
তাদের রেমিট্যান্স কার কাজে লাগে? মধ্যবিত্ত তরুণেরাও হতাশ। সৎ ব্যবসায়িক উদ্যোক্তারা দুর্নীতির পাকে-চক্রে হয়রান হয়ে যান। আর গরিবেরা হয়তো পাকিস্তান আমলের চেয়ে উন্নত-গরিব হয়েছে, কিন্তু বৈষম্য অতীতের যেকোনো আমলের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের হাতে ক্ষমতা আসেনি। ২২ পরিবারের জায়গায় ২২ শ পরিবার এখন দেশ চালায়। তাই বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ভাষণ যখন শুনি, মনে হয় এখনো তিনি ক্ষমতাসীনদের সামনে আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, ‘আর দাবায়া রাখবার পারবা না...’। শুনি তিনি বলছেন, ‘এ দেশকে আমরা গড়ে তুলব। এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস...মুমূর্ষু নর-নারীর আতর্নাদের ইতিহাস।...এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ পাকিস্তানের ২৩ বছরের জায়গায় স্বাধীনতার ৪৩ বছর বসালে আজকের সময়ে ৭ মার্চের প্রাসঙ্গিকতাটা আমরা ধরতে পারব। তিনি হুঁশিয়ার করেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে।’ আমরা কি সেই শত্রুদের চিনি?
চিনি না বলেই আত্মকলহে লিপ্ত দেশে চলছে হানাহানি আর লুটের কারবার। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় তাই বলতে চাই, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম?...’ কী অন্যায় বাংলাদেশের মানুষের? তারা তো জীবন দিতে পিছপা হয় না। তারা তো গতর খাটাতে নারাজ নয়। তারা তো ভোট দিতে দ্বিধা করে না। তারা তো ভক্তি-ভালোবাসায় কৃপণ নয়। তাহলে কেন জীবনদান বৃথা যায়? কেন শ্রমিক তার যোগ্য সম্মান আর প্রতিদান পায় না? কেন কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পায় না? কেন ভোটের অধিকার বারবার হাতছাড়া হয়? কেন জনগণের দেশপ্রেমের আলো শাসকদের ক্ষমতাপ্রেমের অন্ধকারে হারিয়ে যায়? কেন শাসকদের দোষে দেশ দুই পা এগোয় তো তিন পা পেছায়? ২৬ মার্চ অতীত হয়ে যায়নি। ৭ মার্চের ভাষণ এখনো মুক্তির ডাক দিয়ে যায়। একাত্তরের তরুণ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, আজকের তরুণেরা কি কেবলই বিষাক্ত রাজনীতির গোলকধাঁধায় চক্কর খাবে, নাকি আত্মমর্যাদা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে! দেশ একটাই আমাদের, সুযোগও কিন্তু একটাই। একে সার্থক করতে হলে দেশের মালিক যে জনগণ, সংবিধানের সেই ঘোষণাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতা তখন মুক্ত হবে, মুক্ত হবে দেশ।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

স্বাধীনতা জন্মগত অধিকার

স্বাধীনতা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বিশেষ নিয়ামত; স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্বাধীনভাবে বিচরণের অধিকার দিয়েছেন, নিয়ামতের ভান্ডার উন্মুক্ত করেছেন এবং জ্ঞান ও অধিকার বরাদ্দ করেছেন। যারা এসব কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে জয় করার সংগ্রাম-সাধনা করে, স্বাধীনতা তাদেরই জন্য। স্বভাবগতভাবেই মানুষ স্বাধীনচেতা জীব। সে পরাধীন বা অন্যের অধীনে থাকতে চায় না। প্রয়োজনে স্বাধীনতার জন্য সে নিজের জীবনও বিসর্জন দেয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মানবসন্তান প্রকৃতি বা ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ (মিশকাত) প্রত্যেক মানুষই স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চায়, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে চায়। স্বাধীনতাই মানুষের অস্তিত্বে লালিত সুপ্ত প্রতিভা ও শক্তিকে ক্রমাগত উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে বিকশিত করতে সহায়তা করে। এ চিরন্তন সত্য উপলব্ধি করে গণতান্ত্রিক জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যুগে যুগে অনেক জাতি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ-সংগ্রাম করেছে। মানুষ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন থাকতে চায় না। ইসলামও এমন পরাধীনতা সমর্থন করে না। পরাধীনেরা তাদের স্বীয় মাতৃভূমি উদ্ধার ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করবে—এটাই ইসলামের বিধান। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেক ত্যাগ স্বীকার করে মদিনায় হিজরত করে একটি স্বাধীন ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠন করেন। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করার নিমিত্তে মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিকদের নিয়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানবিক ও ধর্মীয় অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন,
যা ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত। বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে নিয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মহতী লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি এ সমঝোতা সনদ প্রণয়ন করেন। একটি স্বাধীন জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এটিই পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বা সংবিধান, যাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া চিন্তা ও মতামত প্রকাশের পরিপূর্ণ সুযোগ প্রদান করে মহানবী (সা.) ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বতোরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। আরব দেশে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ নানা দিক বিবেচনা করে প্রণীত সনদে মদিনায় বসবাসরত সব ধর্মাবলম্বীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের যথোপযুক্ত স্বীকৃতি ছিল। এভাবে মদিনায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সবার ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হয়েছিল। ফলে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয়। নবী করিম (সা.) মদিনা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এমনকি অনেক আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত অধিকারবঞ্চিত মানুষের স্বাধীনতার জন্য জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলন ও সংগ্রাম করাকে তিনি শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি, বরং সার্বভৌমত্ব অর্জন ও দেশ রক্ষায় জীবনদানকে শহীদের সম্মানজনক মর্যাদা দিয়েছেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও আক্রমণ প্রতিহত করে কার্যত বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে, বিনা ধ্বংসে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি জালিম, সন্ত্রাসী ও পৌত্তলিকদের কবল থেকে মক্কাকে স্বাধীন করলেন।
মক্কাবাসী কর্তৃক দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েও মক্কা বিজয়ের পর আজাদির সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করে তিনি পরাজিত সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘হে আমার দেশবাসী! তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। তোমরা মুক্ত, স্বাধীন।’ স্বদেশবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অতুলনীয় দেশপ্রেম, উদারতা ও মহানুভবতার অনুপম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন স্থাপন করেন। অতঃপর সামান্য সময়ের ব্যবধানে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধিকে বিস্তৃত করে পুরো আরব ভূখণ্ডকে অবারিত শান্তি ও নিরাপত্তায়, অভূতপূর্ব শৃঙ্খলায়, অপূর্ব সুষম বণ্টনে, অবর্ণনীয় ভ্রাতৃত্ববোধে ও স্বপ্নাতীত জনকল্যাণে ভরে দিয়েছিলেন। মহানবী (সা.) স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সব বিষয়কে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। ফলে সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক জনগণই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে থাকে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতা পেতে থাকে। স্বাধীনতার সুমহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পরাধীনতা আর গোলামির শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। যে স্বাধীনতার জন্য শোকর আদায় করে শেষ করা যায় না। যাঁদের সুমহান আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের বিনিময়ে আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা লাভ করেছি, যাঁদের অশেষ অবদানে বাঙালি জাতি গৌরব অনুভব করে, আমরা কখনোই তাঁদের ভুলতে পারি না। তাই কষ্টার্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা সমুন্নত রাখা আমাদের ইমানি দায়িত্ব এবং পবিত্র কর্তব্য। স্বাধীনতা সুরক্ষায় জাতীয় ঐকমত্য ও জনসংহতি খুবই প্রয়োজন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত আত্মনির্ভরশীল দেশ গড়ার লক্ষ্যে উন্নয়নের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিকের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা উচিত।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

Friday, March 28, 2014

দেশটার মালিক কারা? by ফারুক ওয়াসিফ

জীবনে যাদের কিছুই হয়নি, তাদেরও বলার মতো অনেক কথা থাকে। যার কিছু নেই, তার কেবলই আছে অভিজ্ঞতা, স্মৃতির বুদ্বুদ তাদের মনে ওঠে আর ফেটে পড়ে। আমাদের স্বাধীনতার গৌরবমাখা ইতিহাস আছে, অমর আত্মদানের শোক আছে, কিন্তু স্বাধীনতার সোনালি হাসি দেখি না তো ১৬ কোটি মানুষের মুখে। স্বাধীনতা তাহলে কি আসেনি? জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর একটি রাষ্ট্র আমাদের আছে। আমরা দেশের মানুষ থুয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড গড়ি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সত্যিকার রেকর্ড তো গড়া হয় মানুষের মনে। সেখানে কোন রেকর্ড গঠিত হচ্ছে, কোন হতাশার রেকর্ড বাজছে, সে খবর রাখে কে?

ইউক্রেন: ঠান্ডা লড়াই, গরম লড়াই by হাসান ফেরদৌস

প্রায় ৪০ বছর আগের ঘটনা, কিন্তু দিন-তারিখ স্পষ্ট মনে আছে। ৬ মে। আমি তখন কিয়েভে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তার নাম ছিল ইউক্রেনের জাতীয় কবি তারাস শেভচেনকোর নামানুসারে। রুশ জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন শেভচেনকো। তাই তাঁকে কারাবন্দী করা হয়, নিষিদ্ধ করা হয় তাঁর গ্রন্থ। শেভচেনকো মারা যান ১৮৬১ সালের ১০ মার্চ। জারের নির্দেশ ছিল, মৃত্যুর পরেও তাঁর মরদেহ ইউক্রেনে নেওয়া চলবে না। অনেক দেনদরবারের পর শেভচেনকোর মরদেহ ইউক্রেনে নেওয়া হয় ৬ মে। তাই দিনটি জাতীয়তাবাদী ইউক্রেনিদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

নানা উৎপাতে বিপন্ন শিক্ষাঙ্গন by আলী ইমাম মজুমদার

২৩ মার্চ প্রথম আলো পাশাপাশি পৃষ্ঠায় দুটি সচিত্র প্রতিবেদন ছেপেছে। একটি একজন প্রতিমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে একই উপজেলার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে চৈত্রের খরতাপে শিক্ষার্থীদের রাস্তার দুই পাশে দাঁড় করিয়া রাখা। অপরটি একজন সাংসদ তাঁর নির্বাচনী এলাকায় একটি অঞ্চলে গেলে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের রোদে একইভাবে দাঁড়িয়ে রাখার দৃশ্য। এ বিষয়ে বহু খবর হয়েছে। পাঠকেরাও হয়তো ক্লান্ত হয়ে গেছেন এসব পড়ে পড়ে। তাও সংবাদপত্র নাছোড়বান্দার মতো পিছু লেগে রয়েছে। প্রত্যাশা, একসময় টনক নড়বে। অবসান ঘটবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত উৎপাতের।

মানবিক ব্যাংকিং সোনার পাথরবাটি? by ফারুক মঈনউদ্দীন

অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা কিংবা ইনক্লুসিভ ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের পাশাপাশি মানবিক ব্যাংকিং সেবার একটা ধারণা সম্প্রতি আলোচনায় চলে আসছে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে মানবিক কথাটা হয়তো খাপছাড়া শোনাতে পারে, এ যেন সোনার পাথরবাটি। সে জন্যই বোধ হয় আমেরিকান ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন কৌতুক করে মন্তব্য করেছিলেন, ব্যাংকার হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আকাশে সূর্য থাকলে ছাতাটি ধার দেন, কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ামাত্র সেই ছাতা ফেরত চান।

দ্বিতীয় বয়ানের আগে by মুহম্মদ সবুর

সেই কবে দেখেছি তাকে, বয়ঃসন্ধিকালে। কনিষ্ঠ এই আমি পেয়েছি ঠাঁই তার কাছে অনায়াসে দূরত্ব-দূর ব্যবধান সত্ত্বেও। গণঅভ্যুত্থানের সেই ঊনসত্তর সালে চট্টগ্রাম থেকে এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়া শহীদুল হককে পেয়েছিলাম পরবর্তী বছর সত্তর সালে। যখন আমি প্রথম বর্ষে, তখন তিনি দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র। কী সপ্রতিভ, মিষ্টিহাসি আর লাবণ্যমাখা শহীদুলের মধ্যে তখন থেকেই গুরু-গম্ভীরভাব মাঝে মাঝেই ফুটে উঠত। ‘আমরা হেঁটেছি যারা পৌষের সন্ধ্যায়’ তাদের একজন ছিলেন আমাদের শহীদুল হক কিংবা শহীদুল জহির। হিম হিম সন্ধ্যায় খড়ের গাদার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে সোঁদা গন্ধের আমেজ তাকে কাবু করত কিনা কখনও স্পষ্ট হতো না। বহুদিন-বহু রাত একই ছাদের নিচে কিংবা খোলা আকাশের নিচে মুখোমুখি বসে নির্বাক কাটিয়ে দিয়েছি যে যার ভাবনার জগতে। এবাড়ি-ওবাড়ি গিয়ে নানা ভোজে অংশ নেয়া দু’জনের মাঝে কথা হতো যেন কার্টুনের ভাষায়। সংক্ষিপ্ত শব্দ, বাক্য ব্যবহারের অনুশীলন চলত। সেই সত্তর সাল থেকে নানা সময়ে নানা আয়োজনে দেখেছি তাকে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্কুল জীবন শহীদুলের কেমন কেটেছিল জানি না। কাছাকাছি স্কুলের ছাত্র হিসেবে জানা ছিল সে সময়কাল, অস্থিরতার দিন-রাত। দেশজুড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশে। সেই সময় পেরিয়ে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঢাকা কলেজ পড়ার সময়টি ছিল উত্তাল আন্দোলনের দিন-রাত। সত্তর সালের আগস্টেই সম্ভবত শহীদুলের সঙ্গে পরিচয়পর্ব ঢাকা কলেজ ক্যান্টিনে। সহপাঠী কালাম চৌধুরীর সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলাম। একই টেবিলের একপাশে বসে সিঙ্গারা চিবুচ্ছিল শহীদুল। কথার ঢেউ তার কর্ণকুহরে অবলীলায় ঢুকে পড়ে এবং তাগাদা দেয় তাকেই পরিচয় হতে। শহীদুলই প্রশ্ন তোলেন,- ‘অ’নেরা কি পইট্টাত্তন আইস্সনদে’?
এরপর কিছু বাক্যালাপ, স্কুল জীবন কোথায় কেটেছে ইত্যাদি। এসএসসিতে প্রথম বিভাগ পেয়ে কলেজে ভর্তি হন তিনি। মাঝেমাঝে ক্যান্টিনে দেখা হতো, ‘কেন্ আছন দে’ কিংবা উত্তর হতো ‘গম ন’লা’র’। পুরনো ঢাকায় তখন শহীদুল থাকতেন। একবার আমাদের বাসায় এসেছিলেন, সম্ভবত সত্তরের অক্টোবরে। ভাগ্নের জন্মদিনে সতীর্থের মধ্যে তাকেও বলেছিলাম। যথারীতি এসেছিলেন; ফ্রাঙ্কলিন পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘বিশ্বের সেরা রূপকথা’ বই হাতে। যাওয়ার সময় আমার সংগ্রহ থেকে নিয়েছিলেন দস্তয়ভয়স্কির ইডিয়ট উপন্যাসের ইংরেজি সংস্করণ আর নরেন্দ্রনাথ মিত্রর উপন্যাস কাঠগোলাপের গন্ধ। ততোদিনে অসহযোগ আন্দালন শুরু। কলেজ বন্ধ। তারপর মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় চলে গেলে শহীদুল হক বিস্মৃত হতে থাকেন আরও অনেক কিছুর মতো।
স্বাধীন দেশে কলেজে ফিরে এসে শহীদুল হককে আর পাইনি। তিনি ততোদিনে কলেজ ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে গেছেন। ৭৩ সালে আবার দেখা, আমিও তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিউমার্কেটে মনিকো রেস্তোরাঁয় হঠাৎ দেখি শহীদুলকে। সম্পর্কটা আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসা সম্ভব হয়নি উভয়ের স্বভাবগত কারণেই। ‘বদ্দা ক্যান আছন’ জানতেই ‘গম আছি’ বলে সহাস্যে করমর্দন করেছিলেন। হাতে কলকাতার মাসিক চতুরঙ্গ ছাড়াও দেখেছিলাম একটি বই। সম্ভবত অমিয় ভূষণ মজুমদারের কোনো উপন্যাস। এখন মনে পড়ছে না। আলাপচারিতায় প্রসঙ্গ ছিল কারা কারা যুদ্ধে গেছেন, সেসবও। তারপর মাঝে মাঝে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন কিংবা মধুর ক্যান্টিনে দেখা হয়েছে। কুশলাদি ছাড়া আলোচনা তেমন আর এগুতো না।
এইচএসসি, বিএ সম্মান এবং এমএতে ভালো রেজাল্ট ছিল। সম্ভবত ’৭৭ সালে ক্যাম্পাস ছেড়েছিলেন শহীদুল, তারপর যোগাযোগহীন। ’৮১ সালে আবার দু’জনে দেখা অগ্রজ সহপাঠী এবার সতীর্থের সারিতে পড়ে গেলেন।
বিসিএস ’৮১ ব্যাচের সতীর্থ শহীদুল ২২০০ নম্বরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডার পেয়েছিলেন। পদোন্নতির ভাগ্যও ছিল সুপ্রসন্ন। অনেক মেধাবী সহকর্মী তার অগ্রযাত্রার সারিতে পৌঁছতে না পেরে রয়ে গেছে পশ্চাতে। হয়তো এ পদোন্নতি তাকেও করত বিব্রত। পদোন্নতি না পাওয়া ব্যাচমেটদের প্রতি তার মনোভাবটা ছিল সহানুভূতিশীল।
’৮১ সালে ৬ মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে দেখা তার সঙ্গে। শাহবাগের কোটায় আবাসিক প্রশিক্ষণকালে একসঙ্গে ক্লাস করেছি কত সকাল, বিকাল, দুপুর, সন্ধ্যায় একসঙ্গে হেঁটেছি, রাত জেগেছি। কোর্সের বিষয়, প্রশিক্ষকদের জ্ঞানদান পদ্ধতি, চাকরি জীবনের পোস্টিং ইত্যাকার বিষয়াদি আলোচনায় এলেও সাহিত্য সচরাচর আসেনি। প্রশাসন ক্যাডারের শহীদুল আর ট্রেড ক্যাডারের এ আমি স্বল্পবাক হওয়ার কারণে আড্ডাবাজ হওয়ার সুযোগ কম ছিল। শাহবাগের আকাশের নক্ষত্র চিনিয়েছিল শহীদুল অনেক রাত জেগেও। গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে তার আগ্রহ অপরিসীম, মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গ মাঝে মাঝে তিনিই তুলতেন। বিশ্বজুড়ে তখন সমাজতান্ত্রিক জাগরণ তুঙ্গে। শহীদুল যে বামঁেঘষা তা স্পষ্টতই বুঝতে পারতাম। তবে সেটা যে সক্রিয় কোন সাংগঠনিক আবরণের নয়, তা-ও বোঝা যেত। নির্লোভ-নির্মোহ এ ব্যক্তি সমাজকে দিতে চেয়েছিলেন অনেক।
‘৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি শহীদুল সহকারী সচিব হিসেবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও সড়ক পরিবহন বিভাগে যোগ দেন। ’৮৪ সালের ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে আর দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, ’৮৪ সালের মার্চে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন সহকারী সচিব পদে। ছিলেন ’৮৭ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ’৮৭ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৯১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব। ’৯১ সালের ১ আগস্ট থেকে ৯২ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত ওএসডি থাকার পর পল্লী উন্নয়ন সমবায় বিভাগে (১৮/৭/৯২-২৯/৯/৯৪), সিনিয়র সহকারী সচিব, ৩০/১২/৯৫ পর্যন্ত সাভার বিপিএটিসিতে অপারেটিভ বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টর ছিলেন। এরপর যোগ দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে (২৫/৩/৯৯-১৪/৪/৯৯)। ’৯৯ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ওএসডি থাকার পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব পদে যোগ দেন (১৫/৪/৯৯-৭/১১/০১)। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর যোগ দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক পদে। ছিলেন ২০০৩ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৩ সালের ৩০ আগস্ট অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগ দেন, ছিলেন ২০০৫ সালের ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত। মাস খানেক ওএসডি থাকার পর অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর যোগ দেন টিসিবির চেয়ারম্যান পদে। ৬ মাস এই পদে থাকার পর ২০০৬ সালের ৩ মার্চ বীমা অধিদফতরের প্রধান বীমা নিয়ন্ত্রক পদে যোগ দেন। প্রায় ৪০ দিন এ পদে ছিলেন। এরকম একটি পদ যে আছে, তা আর জানা ছিল না। এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর যোগ দেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদে। ছিলেন ২০০৮ মাসের ৮ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। ২০০৮ মাসের ১০ ফেব্র“য়ারি ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে যোগ দেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। প্রতিটি কর্মস্থলে ছিল এক ধরনের সফলতা।
১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্ম নেয়া শহীদুল হক ১৯৮১ সালের ৩০ জানুয়ারি চাকরিতে যোগ দেন। বাবা নুরুল হক এবং মা জাহানারা বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তানটি ৯১ ও ২০০১ সাল আমেরিকা ও ব্রিটেনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন পরিকল্পনা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। ফরাসি ভাষা শিখেছেন ৯০ সালে। ফরাসি সাহিত্য পাঠের জন্য সম্ভবত। সে সময় নিয়মিত অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে যেতেন এবং ফরাসি চলচ্চিত্র ও দেখতেন। এ তথ্য নিজেই জানিয়েছিলেন।
’৯০ সালে শহীদুলের সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা গোড়ানে শ্বশুরালয়ে। ওই দিন জানা গেল, তিনি আমার স্ত্রীর বড় বোনের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী শুধু নন, শ্বশুরের এলাকায় বাড়ি। সেই সুবাদে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে পূর্ব পরিচয় তাদের। ঢাকা কলেজের শহীদুল সেই থেকে আমার কাছে হয়ে গেলেন শ্বশুরবাড়ির লোক। মাঝে মাঝে আমাকে ঠাট্টা করে ‘জামাই বাবাজী’ সম্বোধনও করেছেন। পারিবারিক অনেক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত হতো। শ্বশুরবাড়িতেই শহীদুল জহিরের লেখা ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ গ্রন্থটি প্রথম দেখেছিলাম। কিন্তু সেটি যে তারই লেখা, জেনেছিলাম অনেক পরে। যখন তিনি তার ‘পারাপার’ গ্রন্থটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। শহীদুলের বাসায় আমাদের কখনও যাওয়া হয়নি, তিনিই এসেছেন বিভিন্ন আমন্ত্রণে। এসে চুপচাপ থাকতেন। তবে সবার কুশলাদি জানতে চাইতেন। বেশিরভাগ সময় বইপত্র নাড়াচাড়া করেই কাটাতেন।
কর্মজীবনে ৬ বছর কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত থাকা অবস্থায় কয়েকবার ফোনে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল; হয়তো সে সময়টায় তিনি আমার শ্বশুরবাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলেই। আমার শ্বশুর আলহাজ এফাজুদ্দিন মল্লিক লেখালেখি করতেন। ৪ খানা বই নানা বিষয়ে প্রকাশিত হয় তার। ব্যাংকার জীবনের অবসরে সমাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে রীতিমতো পোস্টারিংও করেছেন এলাকায়। শ্বশুরের সঙ্গে শহীদুল জহিরের সখ্য ছিল বলা যায়। শহীদুল হক তার লেখালেখি নিয়ে আলাপ করতে চাইতেন না। বরং অনেক সময় নতুন কিছু লিখছেন কিনা জানতে চাইলে মৃদু হেসে বলতেন, এই আর কি। আমার সঙ্গে চাটগাঁর ভাষায় কথা বলাটা ছিল তার সহজাত।
হয়তো শহীদুল হক কিংবা শহীদুল জহির নেই। হয়তো আছেন, হয়তো ঘুমিয়ে আছেন, হয়তো আছেন সতীর্থ, সহকর্মী, সহমর্মী, সহযোদ্ধাদের মনে এবং দীর্ঘদিন জুড়ে থাকবেন পাঠকের মনে অন্য আলোড়নে। সতীর্থের পুরাণ কাহিনী শেষ হওয়ার নয়। মানুষের হৃদয়ে মননে, চিন্তায় নবজাগরণে আরও বেশি আলোড়িত হবেন শহীদুল জহির। ছিলেন যিনি আমাদের সতীর্থ। শহীদুলের লেখায় চট্টগ্রাম এসেছিল নানাভাবে। ডলু-শঙ্খ-কর্ণফুলী নদী তাকে আলোড়িত করেছে। তার লেখায় এর প্রতিফলন ঘটেছে। সতীর্থ শহিদুল তার কর্মে, শ্রমে, মেধায়-মননে চিরজাগরুক থাকবেন। তার বিষয়ে অদূর ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হবে। বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে তার অবস্থান অটুট থাকবে।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা by ফজলুল হক সৈকত

সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ শিক্ষক ছিলেন। ছিলেনশিক্ষা-সংগঠকও। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে যেমন শিক্ষার প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করেছেন, তেমনই সেই বিদ্যাপীঠে লেকচার প্রদান করে হয়েছেন অনুকরণীয় বিদ্যোৎসাহী। শিক্ষা-বিষয়ক নিবন্ধ রচনা করেও তিনি সমকালে ও উত্তরকালে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। স্বদেশ-সমাজ নিয়ে ভাবনার নানাবিধ প্রবণতায় রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা আমাদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বহুকাল। ‘শিক্ষা’ নামক গ্রন্থে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের, বিশেষ করে, বাঙালির অনুসৃত শিক্ষা-কাঠামো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, শিক্ষা-পরিস্থিতি এবং শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মতামত প্রকাশ করেছেন। ‘শিক্ষার হেরফের’, ‘শিক্ষা-সংস্কার’, ‘শিক্ষাসমস্যা’, ‘জাতীয় বিদ্যালয়’, ‘আবরণ’-এই ৫টি অভিভাষণ ও নিবন্ধে স্থান পেয়েছে সমকালীন শিক্ষার দুরবস্থার বাস্তব ছবি। অবশ্য লেখক কেবল সংকটের কথা উপস্থাপন করেই থেমে থাকেননি, সমস্যা থেকে উত্তরণের বিচিত্র পথেরও সন্ধান দিয়েছেন। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, রবিঠাকুর আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য পথ বাতলিয়েছেন।
শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ মনে করেন বাঙালি সমাজ শিক্ষাদীক্ষায় বাস্তবে অনেক পিছিয়ে। আর খুব বেশি পরজাতিনির্ভর। অন্তত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আমাদের অহেতুক ঝোঁককে তিনি কখনও ভালো চোখে দেখেননি। শিক্ষা-ব্যবস্থাপনায় যে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকমিটির ওপর নির্ভরশীল আমাদের সিলেবাস ও কারিকুলাম, সেই কাঠামো ও পদ্ধতির ঘোর বিরোধী ছিলেন শিক্ষা-সংগঠক রবীন্দ্রনাথ। তার মতে, কমিটি দ্বারা ‘পাঠ্যপুস্তক’ নির্বাচন বা মনোনয়ন করা গেলেও ‘শিক্ষাপুস্তক’ নির্ধারণ করা আদৌ সম্ভব নয়। বিশেষত শিক্ষা-পরিকল্পনায় শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের দিকে তিনি সতর্কভাবে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। কেবল পরীক্ষা পাসের পড়াশোনায় কোনো ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তাশক্তির যে বিকাশ হয় না, তা হয়তো চিন্তাবিদ রবীন্দ্রনাথের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আর তাই তিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরেও অনেক বই পড়ার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যে শিক্ষায় কোনো আনন্দ নেই, সেই শিক্ষা কাউকে সাফল্য এনে দিতে পারে না- এ কথা রবীন্দ্রনাথের কল্পনাকে প্রভাবিত করেছিল। তাই তিনি শিক্ষাকে ‘গ্রহণশক্তি-ধারণাশক্তি-চিন্তাশক্তি’র সমাবেশস্থল ভেবেছেন।
লেখাপড়ার মাধ্যম যে মাতৃভাষাই হওয়া উচিত- এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন। শিক্ষার্থীর কল্পনাশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাশক্তি প্রকাশ কিংবা বিকাশের জন্য মাতৃভাষার কোনো বিকল্প তিনি দেখতে পাননি। কাজেই বাঙালির ইংরেজিপ্রীতি ছেড়ে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও আসক্তি স্থাপনে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তার শিক্ষা-বিষয়ক চিন্তা পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। টেনেটুনে পরীক্ষায় পাস করা অথবা ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠ পাড়ি দিয়ে প্রকৃতপক্ষে যে কোনো জ্ঞান অর্জনই সম্ভব নয়, তা তিনি জানতেন। কাজেই শিক্ষাগ্রহণের সঙ্গে অন্তর-বাহির, নানান বর্ণ ও গন্ধ, পৃথিবীর বিচিত্র গতি ও গীতি এবং প্রীতি ও প্রফুল্লতার নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের দিকে তিনি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। শিক্ষালাভের পথে শৃংখলা-সৌন্দর্য ও সুষমার সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছেন শিক্ষা-উদ্যোক্তা রবীন্দ্রনাথ। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা হবে মানুষের জীবনের আশ্রয়স্থল। আর ওই আশ্রয়স্থলটিকে সবার জন্য উপযোগী করার প্রয়াসে, ‘মানব-জনম’ আবাদের অবিরাম কর্ষণ-পীড়ন ও রসবোধ সৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি শিক্ষার সময় ও পরিবেশ-প্রতিবেশকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতে, সময় ফুরিয়ে গেলে অনেক বৃষ্টি ঝরলেও তাতে বৃক্ষরাজির কোনো উপকার হয় না। সে কারণেই শিক্ষা-সংগঠক রবি শিশুর শিক্ষা ও মনোবিকাশের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আর নবীন বয়সে শিক্ষাগ্রহণের প্রতি সবার আগ্রহকে আকর্ষণ করতে চেয়েছেন তিনি।
ভিনদেশী শিক্ষাদর্শন-বিজ্ঞানভাবনা-ন্যায়চিন্তা এবং সংস্কারমুক্তি যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য কত প্রয়োজন, তা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছেন- ধন নয় জ্ঞান উপার্জন করতে হবে। প্রথাগত চিন্তা কিংবা পুরুষানুক্রমে লালিত সংস্কার থেকে মুক্তিলাভের প্রত্যাশাও প্রকাশ করেছেন কবি। ভাবের সঙ্গে ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শিক্ষা-অর্জনের পথে হাঁটতে বলেছেন। মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা ঝেড়ে ফেলার পরামর্শও প্রদান করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আমাদের এই শিক্ষার সহিত জীবনের সামঞ্জস্যসাধনই এখানকার দিনের সর্বপ্রধান মনোযোগের বিষয় হইয়া দাঁড়াইছে।’ বিধাতাকে অনুরোধ জানিয়েছেন এই বলে- ‘আমাদের ক্ষুধার সহিত অন্ন, শীতের সহিত বস্ত্র, ভাবের সহিত ভাষা, শিক্ষার সহিত জীবন কেবল একত্র করিয়া দাও।’ রবীন্দ্রনাথ আশা করেছিলেন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচলিত হেরফের বা অব্যবস্থাপনা দূর হয়ে ‘পানি’ ও ‘পিপাসা’র মধ্যে তৈরি হবে মেলবন্ধন।
বিশেষ করে ইউরোপের শিক্ষা-সমস্যা ও শিক্ষা-আন্দোলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের শিক্ষা-সংক্রান্ত সুবিধা-অসুবিধার একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন। আর দেশীয় বাস্তবতায় তার সমাধানের দিকও বাতলে দিয়েছেন। আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কারের মধ্যে থেকেই যে শিক্ষা-সম্পর্কিত সমস্যার নিরসন সম্ভব, তা তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষার পারিভাষিক শব্দ প্রয়োগ, প্রকৃতির সঙ্গে বিদ্যালয়ের সম্পর্কস্থাপন, মাতৃভাষার ওপর নির্ভরতা, দরকারি বাজেট বরাদ্দ প্রভৃতির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। কমিটিনির্ভর কিংবা কারখানা-জাতের বিদ্যালয় নির্মাণের চেয়ে তিনি প্রকৃতির ছায়াঘেরা পরিবেশে মনের বিকাশের উপযোগী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন। নকল ও উদাহরণকে লেখাপড়ার আশ্রয় না ভেবে তিনি শিক্ষাকে স্বাধীন মতপ্রকাশের লীলাভূমি করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, রাজনীতির প্রভাব ও শাসনবিভাগের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শিক্ষা-প্রদান ও বিস্তারে প্রধান সমস্যা। আর তাই, শিক্ষাকে সর্বতভাবে অন্যের দাসত্ব করার প্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখতে বলেছেন। ‘চাকরির অধিকার নহে, মনুষ্যত্বের অধিকারের যোগ্য হইবার প্রতি’ শিক্ষার লক্ষ্যকে প্রসারিত করতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাসনা ও সৃজনশীলতাকে ক্রিয়াশীল রেখে চারু ও কারুবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার প্রতি অভিনিবেশ স্থাপন করেছেন শিক্ষা-সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ। একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা-কাঠামো তৈরি করার আগে যে দেশের সর্বসাধারণের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তার বাস্তবতাকে ধারণ করতেন তিনি। তার মতে, ‘কী কী বই পড়ানো হইবে’, তার চেয়ে ঢের বেশি দরকার ‘কোন ভাবে এই শিক্ষাকার্য চলিবে’। ‘অর্ডার অনুযায়ী সাপ্লাই দেওয়া হয়’ জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে শিক্ষার্থীদের তেমন কিছুই শেখানো যায় না। আর প্রকৃত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে মানুষ তার প্রতিবেশ এবং পরিবার ও সমাজ থেকে শিক্ষা লাভ করে অনেক বেশি। কাজেই শিক্ষা-কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাকে আমাদের পরিচিত সমাজ-কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা না গেলে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। আবার অর্জিত শিক্ষাকে যদি প্রায়োগিক জীবনে কাজে লাগানো না যায়, তাতেও শিক্ষা মূলত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষাকে আদর্শ ও রসসমৃদ্ধ হতে হবে। যাকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তার মনে যদি তা ঠিকমতো প্রবেশ না করে, তাহলে কমিটি-সভা-পাঠদান ও অধ্যাপকের সব প্রচেষ্টা অচিরেই বিনষ্ট হবে। শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথের মতে বিদ্যালয় পরিপূর্ণভাবে আবাসিক হওয়া আবশ্যক। এবং প্রকৃতির মনোরম আবহঘেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফসলের জমি, বাগান-খামার প্রভৃতির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। অবসরে কিংবা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কৃষি-উৎপাদনেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সমবেত সম্পৃক্তির দিকে জোর দিয়েছেন। নীতি-উপদেশের প্রাবল্যকে দূরে রেখে, অসত্য ও ভান পরিহার করে শ্রদ্ধার সঙ্গে, মুক্ত আলো-বাতাসের ভেতর দিয়ে শিক্ষাকে আত্মস্থ করতে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘নৈতিক জ্যাঠামি’র চেয়ে তিনি গুরুর আদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি ভিনদেশী আদর্শে আসবাবনির্ভর শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলেও বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই, আজকের বাস্তবতায় প্রযুক্তির ব্যাপক প্রবাহের কালে আমরা তার চিন্তার সঙ্গে সমকালীন প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগে আন্তরিক থাকলে উপকার বৈ ক্ষতি হবে না। শিক্ষার সঙ্গে পণ্য ও দোকানদারির যে সম্পর্ক, তাকে তিনি যথাসম্ভব পরিহার করার পরামর্শ প্রদান করেছেন। আর ‘বিদ্যালাভ’ ও ‘জ্ঞানলাভের’ পার্থক্য বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। কারণ ‘মনুষ্যত্ব টাকায় কেনা যায় না’। রবীন্দ্রনাথ বিশেষত, পুঁথি-মাস্টার-সিনেট-সিন্ডিকেট নির্ভরতার বাইরে অধ্যাপকদের পাঠমুখিতা ও জ্ঞানচর্চার ওপর শিক্ষার ভিত তৈরির দিকে সচেতনমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার শিক্ষাভাবনামূলক নিবন্ধে।
জাতীয় পাঠ্যক্রম কিংবা জাতীয় বিদ্যালয়ের উপযোগিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মতামতও সমকালে এবং উত্তরকালে বেশ প্রাসঙ্গিক। কেবল লাভ-সুবিধা-প্রয়োজনকে বিবেচনায় না রেখে জাতীয় শক্তির তেজ এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ-তিতিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করে যে বৃহৎ আয়োজন করা সম্ভব এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে যে জাতীয় গৌরব অর্জন করা যেতে পারে, তা নিবন্ধকার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ইংরেজ শাসনামলে তখনকার বাংলাদেশে নিজস্ব ভাব-সম্পদে পরিপূর্ণ শিক্ষাভাবনা যে কী পরিমাণ উপকার আমাদের জন্য বয়ে এনেছে, সেই ইতিবাচকতা তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। শৈলিথ্যকে প্রশ্রয় দিলে শিক্ষার পথচলা কঠিন হয়ে পড়ে; তখন তা পরিহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশ গুণী লোকের কদর করতে না পারায় ভয়ানক ক্ষতি হয়েছে। তবে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সারা দেশ থেকে শিক্ষিত-যোগ্য-অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনেও এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এছাড়া দেশের পরিবেশ ও সামর্থ্য উপযোগী ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর প্রদানে আহ্বান জানিয়েছেন। দাতা বা ডোনার এবং গ্রহীতা বা শিক্ষার্থীর চেতনা ও কর্মের মেলবন্ধন তৈরির দিকেও রবীন্দ্রনাথের তীক্ষè দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল। শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে মানুষ আত্মরক্ষার যে প্রচেষ্টা আয়ত্ত করে এবং শেষত যে জাতীয় ও ব্যক্তিক আত্মসম্মান অর্জন করে, তাতেই শিক্ষা-ব্যবস্থাপনার মূল মনোযোগ স্থির থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেছেন। তার মতে, ‘সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে তাহা মানুষকে অভিভূত করে না, তাহা মানুষকে মুক্তিদান করে।’ আপন ইতিহাস ও পলিটিক্যাল ইকোনমির ওপর নির্ভর করে যে শিক্ষা-কাঠামো গড়ে ওঠে, তার ভিত অনেক মজবুত হয়। অবশ্য একথাও ঠিক যে জ্ঞানসামগ্রীর কোনো সীমা নেই; দেশান্তর ও যুগান্তর পর্যন্ত এর পরিসীমা প্রসারিত।
মননশক্তির চর্চায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং শিক্ষকের পারফরম্যান্সের গুরুত্বকে বিবেচনায় রেখেছেন প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষকের ভাষাভঙ্গি ও বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ যে পাঠদানের আদর্শ, তা তিনি বিশ্বাস করতেন। আর কেবল বই পাঠ ও অনুকরণ দ্বারা জ্ঞানলাভের দিকে ঝুঁকে না পড়ে বিশ্বপ্রকৃতির দরবারে শিক্ষার জন্য দৃষ্টি ও মন প্রসারিত রাখতে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ।