Showing posts with label তুহিন ওয়াদুদ. Show all posts
Showing posts with label তুহিন ওয়াদুদ. Show all posts

Thursday, August 13, 2026

কেমন আছে রাজবাড়ী জেলার নদীগুলো by তুহিন ওয়াদুদ

রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা পদমদী গ্রাম। সেখানেই শায়িত আছেন বাংলা ভাষার বিখ্যাত লেখক নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন। তাঁর ১৭৮তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে ১৩ নভেম্বর ২০২৫ বাংলা একাডেমির আয়োজনে পদমদীতে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্রে আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল। আমি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সচিব, পরিচালক, কয়েকজন উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, রাজবাড়ীর ডিসি, বালিয়াকান্দির ইউএনও উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় বেশ কয়েকজন কবি-লেখক-সাহিত্যিকের সঙ্গে দেখা হলো।

অনুষ্ঠান শেষে ইউএনওকে বললাম চত্রা নদী দেখতে যাব। নদীতে যাওয়ার একটি ব্যবস্থা করার অনুরোধ করি তাঁকে। দুটি মোটরসাইকেল প্রয়োজন। ইউএনও উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি। চত্রা নদীর কথা বলতে মনে হলো তিনি চিনতে পারলেন না। হয়তো নতুন এসেছেন। তবে দুজন ব্যক্তিকে সঙ্গে দিলেন নদী দেখানোর জন্য। অপূর্ব রায় ও তপু আহমেদ।

চত্রা নদী রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার সিরাজপুর হাওর নদীর শাখানদী। দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ কিলোমিটার। নদীটি দেখতে গেলাম নারুয়া ইউনিয়নে। যে স্থানে চত্রা নদী দেখতে গেলাম, সেই স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি স্লুইসগেট আছে। ওই বাজারের নামও স্লুইসগেট বাজার। স্লুইসগেট–সংলগ্ন নদীর ভেতরে একটি টিনের চালাঘর। এখনই যদি টিনের চালাঘরটি তুলে দেওয়া না যায়, তাহলে দখল আরও বাড়তে থাকবে।

স্লুইসগেট থেকে তিন-চার শ মিটার ভাটিতে গড়াই নদে চত্রা নদী মিলিত হয়েছে। মিলিত স্থান দেখতে গেলাম। গড়াই নদে অনেক পানি আছে। যে স্থানে চত্রা নদী মিলিত হয়েছে, সেখানে নারী-শিশু-বৃদ্ধ গোসল করছেন, কাপড় পরিষ্কার করছেন। শিশুদের লাফালাফি দেখতে ভালোই লাগছিল।

দুটি নদীর মিলিতস্থলে একটি নৌকা ভেড়ানো। একজন মাঝি জাল থেকে মাছ নামাচ্ছেন। জেলে কী মাছ পেয়েছেন, তা দেখতে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম ইলিশ মাছ ধরছেন। মাঝির নাম রেজাউল ইসলাম। বয়স ৪০-৪৫ বছর। ছোটবেলা থেকে ইলিশ মাছ ধরেন। কোনো কোনো দিন একাই ১৫-২০ কেজি ইলিশ মাছও পান। তবে এ রকম দিন কম। তিন জানালেন, এ বছর গড়াই নদে পৌনে দুই কেজি ওজনের ইলিশ অনেক পাওয়া গেছে। দিনে–রাতে ইলিশ ধরা চলে। যাঁদের জাল আছে, তাঁরাই মাছ ধরতে পারেন।

গড়াই নদে ভাঙন আছে। দেখলাম ‘গড়াই কফি হাউস অ্যান্ড ফুড ভ্যালি’ নামক দোকান প্রায় ভাঙনে পড়েছে। পাকা সড়কে চলে আসছে নদী। অপূর্ব রায় জানালেন, নদীর বাঁ তীরে কয়েক শ মিটার ভেঙেছে। নদী–লাগোয়া বাড়িওয়ালা এক চাচা ভাঙন বন্ধের দাবি জানাচ্ছিলেন। বাড়ি ভেঙে গেলে কোথায় যাবেন জানেন না।

চত্রা নদী দেখে আমরা গেলাম বাটিখাল নদী দেখতে। এই নদীতেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট আছে। স্লুইসগেট যেহেতু নদীর প্রস্থের চেয়ে ছোট প্রস্থের, তাই স্লুইসগেটকে নদীর প্রস্থ হিসেবে ধরে দখলপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই স্থানটি বকচর স্লুইসগেট নামে পরিচিত। এই নদীটিও বালিয়াকান্দি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত। নদীটি গড়াই নদের উপনদী।

রাজবাড়ীর একটি নদীর নাম চন্দনা। কী সুন্দর নাম! নদীটি বালিয়াকান্দি উপজেলা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। তপু আহমেদ জানালেন, এই নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যায়। তাঁর কাছে জানলাম গত বছর বড়শি দিয়ে অনেকেই প্রচুর ট্যাংরা মাছ ধরেছেন। ডাহুক এবং ছোট পানকৌড়ি দেখলাম। নদীটিতে দূষণ আছে। প্লাস্টিক-ময়লা-আবর্জনা ফেলছে অনেকে।

চন্দনা নদী দেখার পর আমরা যাচ্ছিলাম হড়াই নদ দেখতে। হড়াই নদে যাওয়ার আগে বহরমপুর নিমতলা বাজারের কাছে আরেকটি প্রবাহ চোখে পড়ল। দেখতে নদী মনে হচ্ছিল। কচুরিপানায় ভর্তি। তপু আহমেদের কাছে জানলাম এর নাম মরাচন্দনা। এর প্রবাহ কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হলো।

এখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে লিজ দেওয়া হয়। যারা লিজ নিয়েছিল, তারা ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পলাতক। সে জন্য মাছ চাষও নেই, কচুরিপানাও সরানো হয়নি। নদীটির পুরোনো প্রবাহ ফেরানো যায় কি না, উপজেলা কিংবা জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি সরেজমিন দেখতে পারেন।

কবি সালাম তাসির নিজের লেখা একটি বই ওই দিন উপহার দেন। বইটিতে একটি কবিতা আছে। কবিতার নাম ‘হড়াই নদীর বাঁকে’। হড়াই নদ রাজবাড়ী এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাকে আলাদা করেছে। দেখলাম ছিমছাম হড়াই নদ বয়ে গেছে। সন্ধ্যায় দেখতে গেলাম পদ্মা নদী। পদ্মা এই জেলায় গোয়ালন্দে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলায় কতগুলো নদী আছে, তা জানার চেষ্টা করলাম। সরকারি তালিকায় রাজবাড়ী জেলার নদ–নদীর সংখ্যা মাত্র ৯। চত্রা, চন্দনা, হড়াই, গড়াই, পদ্মা, যমুনা, সিরাজপুর হাওর, মরাকুমার ও কৈজুরী খাল। এই তালিকায় নেই বাটি খাল কিংবা মরাচন্দনা। মরাকুমার ও সিরাজপুর হাওর নদী ছাড়া অন্য নদীগুলো আমার দেখা।

রাজবাড়ী জেলার নদীগুলোর সব কটিকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। দখল-দূষণসহ অন্য যেসব ক্ষতিকর দিক এ জেলার নদীগুলোতে আছে, তা দূর করা সম্ভব। অনেক জেলায় নদীবিষয়ক সংগঠন আছে। এ রকম একটি কার্যকর সংগঠন রাজবাড়ীতে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা রাজবাড়ীর নদীগুলোর সংকট চিহ্নিতকরণ ও সুরক্ষায় কাজ করবে। সরেজমিন অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তালিকার বাইরে আরও নদী রয়েছে।

আমাদের দেশে নদীগুলোর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা লাগবেই। কিন্তু বারবার বদলি আর নানাবিধ কাজের কারণে যাঁদের নদী সুরক্ষায় কাজ করা প্রয়োজন, তাঁরা নদীগুলোই চেনেন না। এ জন্য সামাজিক সংগঠনগুলোর একটি বড় দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।

* তুহিন ওয়াদুদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় চত্রা নদী। নদী দখল তৈরি করা হয়েছে টিনের ঘর।
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় চত্রা নদী। নদী দখল তৈরি করা হয়েছে টিনের ঘর। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

Friday, June 6, 2025

সরকারিভাবে নদী মারার ফল ‘ভবদহ জলাবদ্ধতা’ by তুহিন ওয়াদুদ

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক না রাখলে পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে, তা যশোরের ভবদহে দেখে এলাম। গণমাধ্যমসূত্রে দীর্ঘকাল ধরে যশোরের ভবদহের জলাবদ্ধতার কথা শুনে আসছি। সরেজমিন সেই জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করে এলাম। ভবদহে জলাবদ্ধতার যে ধরন দেখে এলাম, দেশে সরকারিভাবে এমন জলাবদ্ধতা তৈরি করার দৃষ্টান্ত অনেক আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এই কাজে সিদ্ধহস্ত।

ভবদহ জলাবদ্ধতা বোঝার আগে আমাদের সেখানকার নদী সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। যশোর সদর উপজেলা থেকে মুক্তেশ্বরীর নামে একটি নদী চলে এসেছে অভয়নগরের দিকে। মাঝপথে একটি প্রবাহের সঙ্গে মিলিত হয়ে মুক্তেশ্বরীর নাম হয় টেকা।

অভয়নগর বাজারের ঠিক পাশেই শ্রী নামে একটি নদী এসে মিলিত হয়েছে টেকা নদীর সঙ্গে। এরপর টেকা নাম বদলে হয়েছে হরি নদ। ঠিক যেখানে হরি নাম হয়েছে, তার বাঁ তীর থেকে শ্রী নামে আরেকটি নদী বিল ডাকাতিয়া দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। হরি নদের ভাটিতে আপারভদ্রা নামে আরেকটি নদী এসে মিলিত হয়েছে। তখন হরি নদের নাম হয়েছে তেলিগাতী গ্যাংরাইল, যা শিবসা নদী হয়ে চলে গেছে সমুদ্রে।

ভবদহ বাজার থেকে নদীর ভাটিতে প্রচুর পলি জমেছে। নদীটির দুই দিকে অনেকাংশ অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। মাছের ঘের, দোকানপাট, বাড়িসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে নদীতে। দেখলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ড হরি নদের মাটি তুলে নদের ভেতরে ফেলেছে। ফলে নদটি অনেক সংকুচিত হয়েছে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উজানে চলে আসে। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ষাটের দশকে হরি নদের ভবদহ নামক স্থানে জোয়ারের পানি যাতে আসতে না পারে, সে জন্য ২১ ভেন্টের একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করে। কেবল তা–ই নয়, শ্রী নামের উপনদী এবং শাখানদী—উভয় অংশের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। হরি নদের শাখা হিসেবে যে অংশ প্রবাহিত হতো, সেটিও ৪০০-৫০০ ফুট প্রশস্তের।

২১ ভেন্টের স্লুইসগেট তৈরি করার মাধ্যমে সমুদ্রের লোনাপানি টেকা নদী ও শ্রী নদীতে যাওয়া বন্ধ করা হয়েছে। এতে প্রথম কয়েক বছর লবণাক্ত জোয়ারের পানির প্রবাহ বন্ধ করে চাষাবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছিল। ১৫-২০ বছরের মধ্যেই স্লুইসগেটের ভাটিতে প্রচুর পলি জমা হয় এবং বর্ষার পানি স্লুইসগেট খুলে দিলেও আর নিচে নামে না। কারণ, ভাটিতে পলি পড়ে অনেক উঁচু হয়েছে। গত শতকের আশির দশক থেকে ক্রমে জলাবদ্ধতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

ভবদহ এলাকায় অনেক নিম্নাঞ্চল আছে। ভবদহের যে স্থানে ২১ ভেন্টের স্লুইসগেট আছে, তার উজানে ৫২টি নিম্নাঞ্চল আছে। নদীর ডান তীর–সংলগ্ন আরও ১২৯টি নিম্নাঞ্চল আছে। আগে এগুলোতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করত। এখন লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে না। কিন্তু ভাটি উঁচু হওয়ার কারণে অভয়নগর থেকে শুরু করে যশোর জেলা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। জলাবদ্ধতায় কয়েকটি উপজেলায় বাড়িঘর-সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়।

ভবদহ জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুবার ড্রেজার মেশিনও আনা হয়েছিল খননের জন্য। এ ছাড়া কয়েকবার খনন করা হয়েছে। কিন্তু খননের কয়েক বছরের মধ্যে আবার পলি পড়ে ভরাট হয় নদী। একবার এ নদীর জোয়ারের পানি একটি বিলের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেটাতে কিছুটা ভালো ফল পাওয়া গেছে।

ভবদহ এলাকায় দেখলাম, ২১ ভেন্ট এবং ৬ ভেন্টের উজানে মোট ২০টি পাম্প দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পানি তুলে ভাটিতে দেওয়া হয়। আরেকটি ৩ ভেন্টের স্লুইসগেট তৈরি করেছে বিএডিসি। স্থানীয় লোকজন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ সাপেক্ষে সেখানেও পাম্প চালু করেছে। কেবল পাম্প করে পানি তুলে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান হতে পারে। টিআরএম পদ্ধতিতে উপকূলীয় নদীর সমস্যা সমাধান হতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু টিআরএম বলতে স্থানীয় মানুষ যা ভাবেন, সেটাই উপযুক্ত পদ্ধতি কি না, ভাবতে হবে। স্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকে টিআরএম পদ্ধতি সম্পর্কে যা বোঝালেন, তা অনেকটা এ রকম—স্লুইসগেট ঠিক রেখে পাশ দিয়ে হরি নদে আসা জোয়ারের পানি একটি–দুটি বিলের সঙ্গে সংযোগ দিলে সমাধান হবে। তখন সংযোগ দেওয়া বিল ভরাট হবে। যত বছরের জন্য যে বিলের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হবে, ওই বিলের যাঁরা মালিক, তাঁদের ওই কয় বছরের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

মুক্তেশ্বরী, হরি, শ্রী, আপারভদ্রা, তেলিগাতী গ্যাংরাইলসহ সংযুক্ত নদ–নদীর সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। প্রকৃত মাপ ধরে এমনভাবে খনন করতে হবে, যাতে পানি দ্রুত নেমে যায়। সংযুক্ত সব উপনদী এবং শাখানদীর সংযোগ উন্মুক্ত করতে হবে। সেতুবিহীন আড়াআড়ি সড়কে সেতু স্থাপন করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় ২১ ভেন্টের যে স্লুইসগেটটি তুলে দেওয়া। ২১ ভেন্ট স্লুইসগেট করার সময় নদীর প্রবাহ অনেক ছোট করা হয়েছে। নদীর প্রকৃত প্রস্থ অনুযায়ী প্রবাহ সচল রাখতে হবে। কেবল একটি সেতু সেখানে করতে হবে।

নদীকে নদীর মতো থাকতে দেওয়া না গেলে ভবদহ জলাবদ্ধতা দূর হবে না। বর্তমানে ভবদহ এলাকায় ঘেরপদ্ধতিতে প্রচুর মাছ চাষ করা হয়। নদী উন্মুক্ত থাকলে ঘেরপদ্ধতিতে মাছ চাষ করা কঠিন হবে না। ভবদহ সংকট নিরসনে দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ-প্রতিবেশের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জানতে পেরেছি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হরি নদ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবদহ সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষাপূর্বক একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। আমরা চাই, ভবদহের স্থায়ী সমাধান। নদী বাঁচুক, জীববৈচিত্র্য বাঁচুক, বাঁচুক মানুষ।

* তুহিন ওয়াদুদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক
- wadudtuhin@gmail.com

ভবদহে কপালিয়া বাজারের পাশে হরি নদে এই সেতুটি নদের প্রকৃত মাপের চেয়ে অনেক ছোট। পানি উন্নয়ন বোর্ড দুই পাশে মাটি ফেলে সেই সেতুর মাপের চেয়ে আরও সংকুচিত করেছে নদটিকে
ভবদহে কপালিয়া বাজারের পাশে হরি নদে এই সেতুটি নদের প্রকৃত মাপের চেয়ে অনেক ছোট। পানি উন্নয়ন বোর্ড দুই পাশে মাটি ফেলে সেই সেতুর মাপের চেয়ে আরও সংকুচিত করেছে নদটিকে। ছবি: তুহিন ওয়াদুদ

Friday, April 4, 2025

পঁচিশ ক্যাডার বনাম এক ক্যাডার: সরকার কোন পক্ষে by তুহিন ওয়াদুদ

একই বিসিএসের মাধ্যমে যোগদান করে প্রশাসন ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তা সিনিয়র সচিব কিংবা মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন; আর কেউ তাঁদের চেয়ে পাঁচ-ছয় ধাপ নিচের পদ থেকে অবসরে যান। কোনো ক্যাডার কর্মকর্তারা সরকারি গাড়ি-বাড়ি-চালক সুবিধা পান; আর কেউ অফিস চালানোর ন্যূনতম আবর্তন ব্যয়টুকুও পান না, নিজের টাকায় অফিস চালান। কেউ গাড়ি কেনার ব্যাপক সুবিধা পান, কেউ পান না।

অতীতে যে ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের যত বেশি ক্ষতি করেছেন, তাঁরাই সুবিধাও পেয়েছেন তত বেশি। যাঁরা ক্ষতি করেননি, তাঁদের কোনো সুবিধাও নেই। বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে মোট ক্যাডারের সংখ্যা ২৬। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারের বৈষম্যের চিত্র চূড়ান্ত পর্যায়ের। এই বৈষম্য থেকে সৃষ্ট বিরোধ চরমে পৌঁছেছে।

ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তার মধ্যকার বৈষম্য দূর করার জন্য ২৫ ক্যাডারের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’। এই সংগঠনের স্লোগান ‘ক্যাডার যার, মন্ত্রণালয় তার’। নিজেদের দাবি আদায়ে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন। এ পরিষদের আয়োজনে ‘জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রত্যাশিত সিভিল সার্ভিস’ শীর্ষক একটি সেমিনার ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয়। আমাকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই সেমিনারে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন পরিষদের সমন্বয়ক ড. মুহম্মদ মফিজুর রহমান।

সেমিনারে লিখিত বক্তব্যে সমস্যার কথা যেমন তুলে ধরা হয়েছে তেমনি সমাধানের পথও দেখানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সব ক্যাডারের পদোন্নতি প্রশাসন ক্যাডারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজেদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন। অন্যেরগুলোর সঙ্গে সমতা বিধান করেন না। সমস্যা নিরসনে পিএসসির অধীনে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণের দাবি তোলা হয়েছে। প্রশাসনসহ সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পিএসসি দেবে।

উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের যেকোনো কাজ প্রশাসন ক্যাডারের অধীনে থাকায় সেই কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে ও অন্তঃকোন্দল সৃষ্টি হচ্ছে। সে জন্য প্রশাসন ক্যাডারের অধীনতা থেকে এসব কাজ মুক্ত করার দাবি জানানো হয়। মন্ত্রীদের খুব কাছে থাকার সুবাদে চাকরির অনেক সুবিধা কেবল প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পান বলেও উল্লেখ করা হয়। সব ক্যাডারের জন্য সমসংখ্যক পদসোপান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, যাতে একই সময়ে একই বিসিএসের সবার পদোন্নতি নিশ্চিত করা যায়।

উল্লিখিত সেমিনারপত্রে ওই সময়ের প্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পুলিশ ও পশু সম্পদ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তুলনামূলক একটি চিত্র হাজির করা হয়েছে। সেমিনারপত্র অনুযায়ী, ওই সময়ে Ñপ্রশাসন ক্যাডারে মোট কর্মকর্তা ৭ হাজার ৭৬ জনের মধ্যে ১০৪ জন ছিলেন প্রথম গ্রেডে, ৪৬১ জন ছিলেন দ্বিতীয় গ্রেডে, ৮৫১ জন তৃতীয় গ্রেডে। এ ছাড়া কয়েকজন সিনিয়র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদের সচিব ছিলেন।

পুলিশের ৩ হাজার ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে প্রথম গ্রেডে ছিলেন ২ জন, দ্বিতীয় গ্রেডে ছিলেন ৮, তৃতীয় গ্রেডে ছিলেন ১৩৫ জন। কৃষি ক্যাডারের ৩ হাজার ২০০ জনের মধ্যে প্রথম গ্রেডে কেউ নেই, দ্বিতীয় গ্রেডে ছিলেন ৫, তৃতীয় গ্রেডে ছিলেন ৪৯ জন। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ১৫ হাজার ৫০০ জন। তাঁদের মধ্যে একজনও প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেডে নেই। স্বাস্থ্য ক্যাডারে ৩২ হাজার জনের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডে একজনও নেই। তৃতীয় গ্রেডে ছিলেন ৬৫৭ জন। পশু সম্পদ ক্যাডারে ২ হাজার ৯৩ জনের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডে কেউ নেই। তৃতীয় গ্রেডে ছিলেন ৩৩ জন। ওই সময়ের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি, বরং বৈষম্য আরও বেড়েছে বলে মনে হয়।

শিক্ষা ক্যাডারের সাড়ে ১৫ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে একজনও প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় গ্রেডে নেই। অবিশ্বাস্য বৈষম্য! কেন চতুর্থ গ্রেডের ওপরে কেউ নেই—এর কোনো সদুত্তর আছে কি? তাঁরা এক নম্বর গ্রেডে গেলে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর কি ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে? বরং চার নম্বর গ্রেডে গিয়ে থেমে যাওয়ার কারণে তাঁরা মানসিকভাবে আহত হচ্ছেন। রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার ওপর সৃষ্ট বিরক্তি হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। যার প্রভাব পড়ছে পাঠদানে।

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রায় সবাই পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত হবেন। প্রথম গ্রেডেও যাবেন অনেকে। কেবল তা–ই নয়, সুপার গ্রেডে সিনিয়র সচিব মন্ত্রিপরিষদ সচিব হবেন অনেকেই। সিনিয়র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব—দুটি গ্রেড এক নম্বর গ্রেডেরও ওপরে। স্পেশাল গ্রেডের পদ। আপাতদৃষ্টে বেতন স্কেলে ২০টি ধাপ মনে করা হলেও প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ২২টি। ওপরের দুটি সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, এতটাই ওপরে তাঁরা।

আনুপাতিক হারে চিকিৎসকদের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ দিলে কি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম সর্বনাশ হতো? চিকিৎসকেরা প্রথম–দ্বিতীয় গ্রেডে গেলে কি তাঁদের সেবার মান খারাপ হয়ে যেত? অন্য যেকোনো ক্যাডারের চেয়ে একাডেমিক অনেক বেশি যোগ্যতা নিয়েও কেন তাঁরা ওই দুই গ্রেডে যেতে পারবেন না, এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। স্বাস্থ্য ক্যাডারের অনেক পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে সেগুলোয় পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। কোনো কোনো বিভাগে গত ছয় বছরে একবারও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন, বৈষম্য দূর হবে। বাস্তবে সেই বৈষম্য আরও বাড়ছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মাসখানেকের মধ্যে একেকজন কর্মকর্তা কয়েকবার পদোন্নতিও নিয়েছেন। মৃত কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নেই।

এখন বিসিএসের ব্যাচ ধরেই পদোন্নতি হয়েছে ও হচ্ছে। স্বাস্থ্য ক্যাডারেও সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এর ভিন্নতা হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বৈষম্য সৃষ্টিতে নতুন নজির স্থাপিত হবে। বৈষম্য দূরীকরণের চেষ্টায় যেন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি না হয়। স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা কতটা দুর্ভাগা যে তাঁদের পদোন্নতির জন্য কর্মবিরতি পালনের মতো কর্মসূচিও দিতে হচ্ছে।

পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা দুজন ছাড়া কেন অন্যরা এক নম্বর গ্রেডে যেতে পারছেন না? এক নম্বর গ্রেডে বেশিসংখ্যক গেলে কি তাঁরা আইনশৃঙ্খলার সামাল দিতে পারবেন না? সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় পুলিশসহ অন্যান্য ক্যাডারের কেউ কেন হতে পারবেন না? কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কেউ কেন এক নম্বর গ্রেডে যেতে পারবেন না? পশু সম্পদ ক্যাডারের কর্মকর্তা তো তৃতীয় গ্রেডে চাকরির ইতি টানতে হয়। কেন এত বৈষম্য, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

কেবল উল্লিখিত কয়েকটি ক্যাডার নয়, দুজন পুলিশ এবং প্রশাসন ছাড়া অন্য সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এক নম্বরে রাখা হয়নি কী কারণে? প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সবার ভাগ্য নির্ধারণ করার দায়িত্ব পেয়েছেন বলে কি তাঁদের সবার ওপরের আসনে বসে থাকতে হবে? এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো, পদোন্নতির সঙ্গে খুব বেশি আর্থিক লাভালাভ থাকে না। এর কারণ, বার্ষিক বৃদ্ধিতে বেতন এমনতিই স্কেলের উচ্চতায় চলে যায়।

একই সঙ্গে একই প্রশ্নের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগদান করেন। কেবল তা–ই নয়, চাকরি স্থায়ীকরণ ও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষাও হয় একই প্রশ্নে। এখানে মেধার প্রশ্ন নয়। সবাই অভিন্ন প্রশ্নপত্রে প্রতিযোগিতা করে এসেছেন। কেউ যদি বিশেষ সুবিধা পান, তাহলে তা হওয়া উচিত বিশেষায়িত বিষয়ের ক্যাডার কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, কৃষি কিংবা পশু সম্পদ।

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নাকি বেশি মেধাবী, তাই তাঁদের বেশি সুবিধা পাওয়া উচিত—এমন একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন আদালত। ওই বিচারক হয়তো জানেন না, সম্মিলিত মেধার পেছনে থাকা কতজন প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করেন। ‘জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রত্যাশিত সিভিল সার্ভিস’ শীর্ষক সেমিনারপত্রে দেখানো হয়েছে, ২৫তম বিসিএস পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধার দিক থেকে শেষ ৫০ জনের মধ্যে ৩০ জন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েছেন।

বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাঁরা চাকরিতে যোগদান করেন, তাঁরা প্রত্যেকে সেবকমাত্র। এসব সেবকের মধ্যে একটি ক্যাডারের নামকরণ যখন হয়, প্রশাসন তখন আর সেবকচরিত্রে তাঁদের মধ্যে থাকে না। এ জন্য এই ক্যাডারের নামও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আন্তক্যাডার বৈষম্য দূরীকরণ এখন দেশের স্বার্থে জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশেষ একটি ক্যাডারের প্রতি অন্তর্বতী সরকারের যে বিশেষ দরদ, তা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অথচ বিগত দিনগুলোতে জনস্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তুলনা নেই।

ভোটের অধিকার থেকে অনেক অধিকার ক্ষুণ্ন করার ক্ষেত্রে এই ক্যাডার সর্বাগ্রে ছিল। ভবিষ্যতে যাতে কোনো রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ করে দেশকে নিলামে তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষেই সহজেই সম্ভব এই বৈষম্যমূলক পদ্ধতির মূলোৎপাটন করা। বৈষম্যবিরোধী সরকারের হাত ধরে আন্তক্যাডার বৈষম্য দূর হোক। এটি বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের যুগ যুগ ধরে চলে আসা জটিলতা দূর করবে। ২৫টি ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের দাবি আমলে নেওয়া হোক। দেশটা আমাদের সবার। এমনও আছে, পরিবারের একেকজন একেক ক্যাডারের কর্মকর্তা। আমরা চাই, সবার যৌথ প্রচেষ্টায় দেশ এগিয়ে যাক।

* তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

পঁচিশ ক্যাডার বনাম এক ক্যাডার: সরকার কোন পক্ষে

Wednesday, January 27, 2016

উন্নয়নে বগুড়াবাসীর স্বস্তি ও প্রত্যাশা by তুহিন ওয়াদুদ

গত মাসে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ওঁরাওদের জাতীয় শিক্ষা সম্মেলন ২০১৬-এ সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় গিয়েছিলাম। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সহস্রাধিক ওঁরাও শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম নিজ জেলা সিরাজগঞ্জকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কী কী করেছেন এবং করতে চান, তা উল্লেখ সাপেক্ষে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে গিয়েছিলাম বগুড়ায়। নগরের বনানীর পথ ধরে বগুড়া শহরে প্রবেশ করার সময়ে চার লেনের বিশাল সড়ক আর সড়ক বিভাজনের মাঝখানের সবুজ গাছ শোভিত দৃশ্য শহরের উন্নয়ন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়। এ জেলার উন্নয়নেও নিজ জেলার রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ ভূমিকাই মুখ্য। জেলা শহর হিসেবে বগুড়া শহরের ভৌত অবকাঠামো অনেক উন্নত।
করতোয়া-নাগর-যমুনা-বাঙ্গালী নদীবিধৌত বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। কিংবদন্তিতুল্য বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর বগুড়ার মহাস্থান গড়ে অবস্থিত। পাল রাজাদের আমলেও এখানে অনেক বিহার গড়ে উঠেছিল। নিহাররঞ্জন রায় ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ (আদিপর্ব)-এ উল্লেখ করেছেন, ‘খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক দ্বিতীয় শতকের মহাস্থান-ব্রাহ্মী লিপিতে এক পুন্দনগল বা পুণ্ড্রনগরের উল্লেখ আছে। এই পুন্দনগলই বোধ হয় ছিল তদানীন্তন পুণ্ড্রের রাজধানী বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থান, যাহার পুরোনো ধ্বংসাবশেষ ঘেঁষিয়া এখনো করতোয়ারÿ ক্ষীণধারা বহমান।’
উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর দুই বিভাগের মধ্যে বগুড়ায় দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বিশব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে দারিদ্র্যের গড় হার ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও বগুড়ায় এই হার মাত্র ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। বগুড়ায় দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা কিছু শিল্প-কারখানা এখানকার উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। বগুড়ায় বিশেষত কৃষি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ তৈরির অনেক কারখানা রয়েছে। সাবান কারখানার জন্য বগুড়ার খ্যাতি আছে। রবিশস্য উৎপাদনের জন্যও মাটি খুবই উপযোগী।
বগুড়ার সন্তান জিয়াউর রহমান। তিনি নিজে সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি তিন দফায় ক্ষমতায় ছিল। তবে বৃহৎ উন্নয়ন হয়েছে শেষবারের ক্ষমতায়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে। এ সময়ে বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, শিশু হাসপাতাল, এয়ারপোর্ট, শহরের মধ্যে চার লেন সড়ক, সড়ক বিভাজনের মধ্যে দৃষ্টিনন্দন গাছ, বাইপাস সড়ক, পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস-সংযোগসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবনও সেই সময়ে শুরু হয়। আবার সেই সময়েই বগুড়ায় জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই তৈরি হয়।
বগুড়া শহরের উন্নয়নে যে সরকারই ভূমিকা রাখুক না কেন, সুবিধা ভোগ করছে বগুড়ার সর্বস্তরের নাগরিক।
বগুড়া শহরের আল আমিন মার্কেটে জননী গার্মেন্টসের বিক্রেতা বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছিলেন, ‘বিএনপি আরেকবার ক্ষমতায় এলে বগুড়াকে দ্বিতীয় রাজধানী করবে। সরকারি-বেসরকারি এমন কোনো ব্যাংক নেই যার শাখা বগুড়াতে নেই।’ মোহাম্মদ আলী মিউজিয়াম অ্যান্ড পার্কের ভেতর ঢুকে দেখি তার জীর্ণদশা। ৩০ টাকা করে টিকিট হলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য কিছুই নেই। নবাববাড়ির যে সামান্য স্মৃতি সেখানে আছে, তারও যত্ন নেই। বগুড়ায় একটি চার তারকা হোটেল এবং আন্তর্জাতিক মানের শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম রয়েছে।
সার্কিট হাউসের পাশে রাস্তার ধারের এক ছোট্ট পানের দোকানের পাশে বসে পান বিক্রেতার সঙ্গে বগুড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলছিলাম। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, বগুড়ায় বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীর কোনো খোঁজখবর রাখেনি। এমন সময়ে আওয়ামী লীগের এক সমর্থক সেখানে উপস্থিত হন। দুজনের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ লেগে যায়। বাগ্বিতণ্ডার এক ফাঁকে পান বিক্রেতা বলেন, ‘শেখ হাসিনা যে বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করেননি, সেটা ভালোই হয়েছে। সিটি করপোরেশন ঘোষণা করলে সারা জীবন আওয়ামী লীগ বলত তারা সিটি দিছে।’ আওয়ামী লীগ সমর্থক বলছিলেন, ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় করার ঘোষণা দিছে।’ বিএনপির সমর্থক একেবারেই বিশ্বাস করেন না যে বর্তমান সরকার বগুড়ার উন্নয়ন করবে। তবে এখন বগুড়াবাসীর দাবি বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হোক।
আওয়ামী লীগ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মমতাজ উদ্দীনের সঙ্গে কথা বললাম তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়ায় কয়েক দিন আগে আসছিলেন। তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য এত লোক আসছিল যে এত লোক কোনো দিন বগুড়ার কোনো জনসভায় হয়নি। খালেদা জিয়ার জনসভাতেও না। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিছে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হোইবে। আরও অনেক উন্নয়ন হোইবে।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তৌফিক হাসান। তিনি বগুড়া থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা। বগুড়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘বগুড়ায় অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় কিন্তু সেগুলোর কোনো লক্ষ্য নেই। লক্ষ্য ঠিক করে অনুষ্ঠান করা উচিত।’ বগুড়া অঞ্চলের নিজস্ব কিছু লোককথা রয়েছে। সেগুলো তিনি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
বগুড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনেক। শুধু বগুড়া জেলাতেই সরকারি কলেজের সংখ্যা ছয়টি। মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। হারম্যান মেইনার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বগুড়া জিলা স্কুল, সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সহ বেশ কটি ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরও ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বগুড়া শহরের উন্নয়নে যে সরকারই ভূমিকা রাখুক না কেন, সুবিধা ভোগ করছে বগুড়ার সর্বস্তরের নাগরিক।
একটি জেলা শহর হিসেবে বগুড়ায় যত ভৌত উন্নয়ন হয়েছে, দেশের আর কোনো জেলা শহরে এত উন্নয়ন হয়নি। উত্তরাঞ্চলের শিল্প রাজধানী বলে খ্যাত এ শহর। উন্নয়ন নিয়ে বগুড়াবাসীর মধ্যে তৃপ্তির ঢেকুর আছে, প্রত্যাশা আছে আরও উন্নয়নের। বিএনপির সময়ে তারেক রহমানের কাছে বগুড়া এবং আওয়ামী লীগের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রীর কাছে সিরাজগঞ্জ যেমন নিজ নিজ জেলা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক একইভাবে যদি তাঁরা ৬৪ জেলার প্রতি আন্তরিক হতেন, তাহলে উন্নয়নবৈষম্য সহজেই দূর হতো।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Saturday, December 5, 2015

‘ভিক্ষা করে যৌতুকের টাকা সংগ্রহ’ by তুহিন ওয়াদুদ

ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সামাজিকতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ, এমনকি আইনবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও বহাল রয়েছে যৌতুকের প্রথা। যৌতুকের ধরন উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত কিংবা বিত্তহীনের এক নয়। কেউ আছেন শ্বশুরের কাছ থেকে স্ত্রীর নামে জমি-ফ্ল্যাট কিনে নেন, কেউ কেউ মেয়েপক্ষের কাছ থেকে দামি ফার্নিচার গ্রহণ করেন, কেউ কেউ প্রচুর অলংকার দিতে বাধ্য করেন, আবার কেউ কেউ সরাসরি অর্থই গ্রহণ করেন। অনেকের ক্ষেত্রে মেয়েপক্ষকে সারা জীবন ধরে যৌতুক দিতে হয়। কখনো কখনো মেয়ের বাবা-মা জমি-অলংকার-গৃহপালিত পশু বিক্রি করে সংগ্রহ করেন যৌতুকের টাকা। মীরবাগ এলাকার শফিকুল ইসলাম নামের একজন জানালেন, ‘কেউ কেউ ভিক্ষা করে যৌতুকের টাকা সংগ্রহ করেন।’ যৌতুকের দাবিতে স্বামীর অত্যাচারের বিবরণ আমরা প্রায় প্রতিদিনই কমবেশি গণমাধ্যমে জানতে পারি। কখনো কথা দিয়ে, কখনো হাত দিয়ে, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্যাতন করা হয়। কখনো শরীরে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। যে মেয়ের বিয়ের পর স্বামী যৌতুক দাবি করেন এবং সেই মেয়ে বাবাকে যৌতুকের কথা বলতে না পেরে স্বামীর নির্যাতন সহ্য করেন, তাঁর মানসিক অবস্থা কীরূপ, শাসকগোষ্ঠী কখনো বোঝার চেষ্টা করেছে? সমাজের কাছে নারী কি এতটা অসহায় হয়েই থাকবে? যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার জন্য শাস্তির কোনো খবর পাওয়া যায় না। আর সে কারণে আইন থাকা সত্ত্বেও যৌতুক প্রথা উৎসাহিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন আমাদের শিক্ষাবর্ষেরই এক মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করেন তাঁর এক বন্ধুকে। কিছুদিন পরই খবরে দেখলাম যৌতুক দিতে সম্মত হয়নি বলে স্বামীর অবর্ণনীয় অত্যাচারে খুন হয়েছেন তিনি। যৌতুক দিতে পারেনি, কিংবা দেয়নি এই কারণে কত মেয়ের সংসার ভেঙেছে তার ইয়ত্তা নেই। কত নারী যে মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করেন, শরীরে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে জীবন যাপন করেন, তারও সংখ্যা অগণিত।
অনেক সময় মেয়ের স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মেয়ের বাবার জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে বাবা-মা মেয়ের মুখে হাসিই দেখতে চান। যেমনটি দেখতে চান রিকশাওয়ালা হাশেম আলী। হেমন্তের হালকা কুয়াশায় ঢাকা রংপুর। রাত তখন সাড়ে দশটা। রাস্তায় মানুষের সংখ্যাও অনেক কম। এত রাতে কেন পঞ্চাশোর্ধ্ব হাশেম আলী রিকশা চালান, আলাপচারিতায় বের হলো তার কারণ। কয়েক দিন আগে মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিতে হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। এই ৭০ হাজার টাকার সিংহভাগই তিনি ঋণ নিয়েছেন বেসরকারি সংস্থা থেকে। মেয়ের বিয়ের পর থেকে দিনে এবং রাতে রিকশা চালাতে হয়। আগে শুধু দিনে রিকশা চালাতেন। যত রাতই হোক, কিস্তির টাকা না হওয়া পর্যন্ত রিকশা তাঁকে চালাতে হবে। এখন আর তিন বেলা ঠিকমতো খাওয়ারও উপায় নেই। হাশেম আলীর এসব কথায় যখন আমি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কথা ভাবছিলাম, তখন তিনি বাবার সুরে বললেন, ‘তাও যদি বেটিটা সুখোত থাকে।’
আইনের প্রয়োগ হতে থাকলে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া হবে গোপনে। অনেক সময় কনেপক্ষ, বরপক্ষ উভয়ই যৌতুকের কথা স্বীকারই করেন না। আইনের প্রয়োগ শুরু হলে, হয়তো আরও স্বীকার করতে চাইবেন না। কনেপক্ষ যৌতুকের বিষয়ে অভিযোগ না করলেও এলাকাবাসী কিংবা সরকারের লোকও যদি খুঁজে পায় তাহলে সেটাকে আইনের আওতায় আনতে হবে সম্প্রতি নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় গিয়েছিলাম আরডিআরএসের একটি অনুষ্ঠানে। সেখানকার অফিসে রান্নার কাজে নিয়োজিত রাশেদা খাতুনের সঙ্গে কথা হলো। তাঁর স্বামী বেঁচে নেই। দুই মেয়ে। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। যৌতুক দিতে হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। তাঁকে বললাম, যৌতুক ছাড়াই বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ কথায় আমাকে অজ্ঞ ধরে নিয়ে বললেন, ‘কী যে কন, ডিমেন্ড (যৌতুক) ছাড়া বেটিক কাঁইয়ো নেবে?’ রংপুরের সাতমাথা এলাকার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা ছাড়া গরিবের বেটিক কেউ বিয়া কইরবার চায় না।’
সরকার চাইলেই যৌতুক বন্ধ করা সম্ভব। ১৯৮০ সালে যৌতুক নিরোধ আইন হয়েছে। শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) হয়েছে, এ আইনেও যৌতুকের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যৌতুক নিরোধ আইন অনুযায়ী, যৌতুক গ্রহণ করা এবং যৌতুক প্রদান করা উভয় অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের জেল এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, ক্ষেত্রবিশেষে উভয়টিও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ না থাকার কারণে, অনেকেই জানেন না যে যৌতুকবিরোধী কোনো আইন আছে। কয়েক দিন আগে লালমনিরহাটে ধরলা নদীর পারে একটি চায়ের দোকানে যৌতুক নিয়ে এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলছিলাম। যৌতুক যে একটি অপরাধ, সেটাই তিনি জানেন না। আমি যখন আইনের কথা বললাম, তখন তিনি বিশ্বাসই করতে চাইলেন না। বরং তিনি খানিকটা চ্যালেঞ্জের সুরেই বললেন, ‘আইন থাকলে বিচার হইল হয়। আর আইন থাকলে হামরা জাননোং (জানতাম) হয়।’
আইনের প্রয়োগ হতে থাকলে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া হবে গোপনে। অনেক সময় কনেপক্ষ, বরপক্ষ উভয়ই যৌতুকের কথা স্বীকারই করেন না। আইনের প্রয়োগ শুরু হলে, হয়তো আরও স্বীকার করতে চাইবেন না। কনেপক্ষ যৌতুকের বিষয়ে অভিযোগ না করলেও এলাকাবাসী কিংবা সরকারের লোকও যদি খুঁজে পায় তাহলে সেটাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থা ‘জীবিকা’র উদ্যোগে কুড়িগ্রামের চর শিতাই ঝাড়ে যৌতুক না দেওয়ার পক্ষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছিল এ উদ্যোগে। ওয়ার্ল্ড ভিউ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন এ উদ্যোগ নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিল। সেটি বিবিসিতে প্রচারও হয়েছিল। প্রায় তিন বছর সেখানে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া বন্ধ ছিল। সংস্থাটির কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আবার যৌতুক চালু হয়। উদ্যোক্তাদের একজন মানিক চৌধুরী যৌতুক বন্ধের প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানুষের সংঘবদ্ধ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।’ বর্তমানে নিম্নবিত্ত পরিবারে, বিশেষত রংপুর অঞ্চলে প্রায় শতভাগ বিয়েতে যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার প্রচলন আছে।
একটি সময় ছিল যখন ছেলেরা নয়, মেয়ের বাবা পণ গ্রহণ করতেন। সে সময়ে সমাজে যোগ্য বর পাওয়া যেত না। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিখ্যাত ‘রস’ গল্পের নায়ক মোতালেফ অনেক কষ্টে পণের টাকা সংগ্রহ করে পণ দিয়ে মাজু খাতুনকে বিয়ে করেন। এরূপ অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।
সনাতন ধর্মানুসারীরা সতীদাহ প্রথাকে ধর্মের অংশ মনে করত। ১৮২৯ সালে আইন করে সেই সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকলে যৌতুকও বন্ধ করা সম্ভব। সেই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, মেয়েদের শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হতে হবে।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudutuhin@gmail.com

Monday, August 24, 2015

এসব ছিটমহলবাসীর কী হবে? by তুহিন ওয়াদুদ

ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার কারণে ছিটমহলবাসীর অনেক বড়
একটি অংশ এখন হতাশায় নিমজ্জিত
ছিটমহল বিনিময়-প্রক্রিয়া সামান্য ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার কারণে ছিটমহলবাসীর অনেক বড় একটি অংশ এখন হতাশায় নিমজ্জিত। ৩১ জুলাই ছিটমহল বিনিময় হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের যারা ভারতের মূল ভূখণ্ডে যেতে চাইবে, আগামী ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তারা যেতে পারবে। যারা যাবে না, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হবে। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ জরিপ হয়। সেই জরিপে যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তারাই কেবল কোন দেশে থাকবে, সেই মতামত নেওয়া হয়েছে ৬ থেকে ১৬ জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে। যারা তখন অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি, তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। তাহলে জরিপে যারা বাদ পড়েছে, তারা ছিটের মানুষ বলে আপাতত স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়া ব্যক্তির সংখ্যা কত হবে, তা কেউই নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। অনেকের অনুমান, এই সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত হাজারও হতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরের বৃহৎ ছিটমহল দাশিয়ার ছড়া। ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বাস্তবতা বোঝার জন্য ঈদের আগের দিন গেলাম সেখানে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার খড়িবাড়ী বাজার থেকে দাশিয়ার ছড়া ছিটমহলে ঢুকেই ছোট কামাত এলাকায় এক বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। নাম মনমোহন রায়। জিজ্ঞাসা করলাম, ভারতে যাবেন, নাকি বাংলাদেশে থাকবেন? তিনি খুব হতাশ চিত্তে নাগরিকত্ব হারানোর কথা শোনালেন। তিনি জোর করে তাঁর বাড়ির ভেতরে আমাকে ডেকে নিলেন। অনেক পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাঁর জমির দলিল বের করে এনে বললেন, ‘আমার বাবা ও তাঁর বাবা এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২০১১ সালের জরিপে আমাদের নাম নেই। আমরা এখন কোন দেশের তাহলে?’ মনমোহন রায়ের সঙ্গে কথা বলতেই তাঁর উঠানে আরও কয়েকজন উপস্থিত হলেন, যাঁদের নাম নেই ২০১১ সালের জরিপে। তাঁদের একজন সুদীপ রায় বলছিলেন, ‘আমরা এখন না ভারতের নাগরিক, না বাংলাদেশের নাগরিক।’ মনমোহন রায় ভারতে যেতে চেয়েছিলেন। পাশেই দাঁড়ানো কমলিনী রায়, শ্বশুরবাড়ি ভারতে। তাঁরও ইচ্ছা ভারতে যাওয়ার। ২০১১ সালের জরিপে তাঁর নাম না থাকার কারণে মনঃকষ্ট নিয়ে আছেন। তিনি এর সমাধান চান।
যাদের দেশ থেকেও নেই, তাদের দেশ দেওয়ার চেষ্টাতেই ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে, কাউকে দেশহীন করার জন্য নয়। তাই যারা দেশহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে আছে, তারা কেউই যেন দেশহীন হয়ে না পড়ে।
কয়েক বাড়ি এগিয়ে গেলে বৃদ্ধা জাহানারার সঙ্গে কথা হলো। তিনিও জানালেন, অনেকেই বাদ পড়েছেন জনগণনা থেকে। তিনি বলছিলেন, ‘জরিপে বাদ পড়া লোকজন তো ইতিম হইল। তাদের এখন কোনো দেশ নাই। তবে একটু চেষ্টা করলেই এই ইতিমের মা-বাবা পাওয়া যাইবে। দুই দেশের সরকার যেন এদের মা-বাবাক আনি দেয়।’ আরও একটু এগিয়ে গেলে মোটরবাইক আর চালানো যায় না, এতটাই বেহাল দশা সড়কের। বাড়ির ভেতরের নারীর কাছে কণ্ঠ উঁচু করে জানতে চাইলাম, জরিপে এ বাড়ির কেউ বাদ পড়েছে নাকি? শরিফা নামের একজন এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমারই তো নাম নাই।’ মেয়েকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এরও নাম নাই।’ জানতে চাইলাম আশপাশে আর কারও নাম বাদ পড়েছে নাকি। তিনি জানান, পাশের বাড়ি রফিকুলের নাম বাদ পড়েছে। রফিকুলের বাড়ি গেলাম। সেখানে গিয়ে শুনলাম তাঁর পরিবার, তাঁর ভাইয়ের পরিবারসহ অনেকেরই নাম নেই ২০১১ সালের জরিপে।
মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। তিনিও জানান, অনেকেই বাদ পড়েছেন জরিপ থেকে। তিনি আমাকে একটু পাশেই মহির নামের একজনের নাম বাদ পড়ার কথা জানালেন। মহিরের বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন বসে আছেন। তাঁদের অনেকেই বাদ পড়েছেন। মহিরের পরিবারের ১১ জনের কারও নাম নেই। জহুরুল, খালেকসহ অনেকেই বলছিলেন তাঁদের নাম না থাকার কথা। সেখানে সাইকেল চালিয়ে এসে দাঁড়ালেন আফসার আলী। কণ্ঠ থেকে গড় গড় করে ক্ষোভ ঝরে পড়ছে। তিনি দিল্লিতে চাকরি করেন। দিল্লি থেকে এসে দেখেন নাম নেই।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশের সরকারের প্রচেষ্টাই হচ্ছে ছিটমহলবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করা। সেখানে কোনো ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে সেটা যথাসময়ে দূর করাও ভীষণ প্রয়োজন। ২০১১ সালে যে জরিপ হয়েছে, তখন ভারতে যেতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৪৩ জন। এখন সেই সংখ্যা ৯৭৯ জন। ২০১১ সালের জরিপ যে সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করা হচ্ছে, তা-ও নয়। আবার সেই জরিপের পর নতুন করে জন্ম নেওয়া এবং বৈবাহিক সূত্রে অধিকারপ্রাপ্তদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাহলে যারা ২০১১ সালে বাদ পড়েছে, তারা কেন নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ছিটমহল বিনিময়ে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদেরও অনেকেই বাদ পড়েছেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে বাদ পড়া প্রকৃত ছিটমহলবাসীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।’ দািশয়ার ছড়ার স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ২০০২-২০০৭ মেয়াদের পঞ্চায়েতপ্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপের কাজ করে বাদ পড়া বৈধ ছিটমহলবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
কয়েক হাজার ছিটমহলবাসীর নাম বাদ পড়েছে ২০১১ সালের জরিপ থেকে। ৩১ জুলাইয়ের পর জরিপে বাদ পড়া ছিটমহলবাসীর অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা কম নয়। অবৈধ অভিবাসীদেরও নিজস্ব একটা দেশ থাকে। কিন্তু এরা হয়ে উঠবে দেশহীন। যাদের দেশ থেকেও নেই, তাদের দেশ দেওয়ার চেষ্টাতেই ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে, কাউকে দেশহীন করার জন্য নয়। তাই যারা দেশহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে আছে, তারা কেউই যেন দেশহীন হয়ে না পড়ে; সেটাই আমরা বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের কাছে আশা করি।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail. com

Thursday, August 13, 2015

দূর হোক সব ছিটমহলবাসীর দীর্ঘশ্বাস by তুহিন ওয়াদুদ

স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর ছিটমহলবাসীর আনন্দমিছিল
গত ৬ মে ভারতের লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের পর থেকে খুব দ্রুতই চলছে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ। ৩১ জুলাই মধ্য রাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হবে। সেই লক্ষ্যে ৬ জুলাই থেকে ছিটমহলবাসী কারা কোন দেশে থাকতে চায়, তার জরিপ শুরু হয়েছে, চলবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত। যারা ছিটমহল ছেড়ে নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যেতে চায়, উভয় রাষ্ট্র তাদের জন্য ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ট্রাভেল পাস ইস্যু করবে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ী, বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা, সাহেবগঞ্জ-বাগবন্দর চেক পয়েন্ট দিয়ে তারা যাওয়া-আসা করতে পারবে।
চলমান জরিপের আগেই কিছু কিছু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি ছিল। ছিটমহলগুলোতে জমি নিবন্ধনের ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেক সময় সাদা কাগজে লিখে জমি বিক্রি হয়েছে। অনেকের জমি আছে কিন্তু দলিল নেই। সরকারিভাবে এই মালিকানার মূল্য নেই। এ রকম জমির মালিক ভারতের মূল ভূখণ্ডে গেলে তাঁর জমি ব্যবস্থাপনা কী হবে, তা তাঁরা জানতে চান।
২২ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জমি বিক্রি বন্ধ। ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট সময়ে যাঁরা নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যাবেন, তাঁরা নিজ নিজ স্থানীয় ডিসি/ডিএমের অনুমতি নিয়ে ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত জমি বিক্রি করতে পারবেন। ভালো হতো, যদি নিজ জন্ম ভূখণ্ড ছেড়ে যাওয়া লোকজনের জমি ওই দেশের সরকার কিনে নিত।
যাঁরা ভারতে যাবেন কিংবা বাংলাদেশে আসবেন, তাঁরা সরকারিভাবে কী কী সুবিধা পাবেন, সেটা তাঁরা জানেন না। বর্তমানে চলতে থাকা জরিপের আগেই যদি এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যেত, তাহলে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে কে কোন দেশে থাকবেন তা নির্ধারণ করতে পারতেন।
ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট ফিল্ড ক্যাম্প’ লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চলছে জরিপের কাজ। এ রকম একটি ক্যাম্পে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলে ৮ জুলাই ভারতের একজন অবজারভার বিধানচন্দ্র সাধুখারকে আমি কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা ভারতে গিয়ে কী পাবেন? যাঁরা জমি রেখে যাবেন, তাঁদের জমি ব্যবস্থাপনা কী হবে?  যাঁরা ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়েছেন, তাঁদের কী হবে? এই জরিপের আগে কি এসব জানানো জরুরি ছিল না?’ উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, ‘এসব আপনার ভ্যালিড কোশ্চেন। আমি ওপরে জানাব।’
চলতি জরিপে মানুষ গণনা হচ্ছে না। ২০১১ সালে যখন ছিটমহল বিনিময় হওয়ার কথা ছিল, তখন বাংলাদেশ-ভারত উভয় সরকারের উদ্যোগে ছিটমহলে জনসংখ্যা জরিপ চালানো হয়েছিল। সেই তালিকা ধরেই চলছে বর্তমান জরিপের কাজ। সেই জরিপে অনেকেই বাদ পড়েছিলেন। তাঁরা এখন ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন। বাদ পড়াদের মধ্যে যাঁরা ভারতে যেতে চান, ২০১১ সালের জরিপে নাম না থাকলে তাঁরা ভারতে যেতে পারবেন না, আবার বাংলাদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। একই পরিবারের কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আবার কারও হয়নি। দুঃখ করে কবিচন্দ্র নামের একজন বলছিলেন, ‘আমরা ছয় ভাই। দুই ভাইয়ের নাম নাই। একজন ভারতে যাই-যাই করছিল, তার নামই নাই। আমি রংপুরে অসুস্থ হয়া ছিলাম। আমারও নাম নাই।’ কমলিনী রায় বলছিলেন, ‘ডকুমেন্ট হিসেবে জমির কাগজ আছে, তা–ও নাম নাই। এখন আমাদের কী হবে?’ যাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন না, তাঁরা জমির মালিকানা পাবেন কী করে? যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে তাঁরা আমৃত্যু ভাসমান হয়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বৈবাহিক সূত্রে যে মেয়েরা ছিটমহলের বাসিন্দা হয়েছেন এবং ২০১১ সালের পর যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা ছাড়া আর কেউ নতুন জরিপে আসছে না। যঁারা ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়েছেন, তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
অনেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজের সন্ধানে গেছেন। ১১১টি ছিটমহলের অনেকেই বৈধ পাস না থাকার কারণে আসতে পারছেন না। ছিটমহলের মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের কারণে ভারতে যাওয়ার বৈধ পাস না থাকলেও তারা জীবন ধারণের তাগিদে সেখানে গেছেন। সীমান্তে তাঁদের জন্য বিশেষ পাস থাকলে তাঁরা হয়তো সবাই নাগরিকত্ব পেতেন। আর তা সম্ভব না হলে ভারতে রেখেও তাঁদের এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ২০১১ সালের জরিপে এঁদের অনেকের নাম আছে, অনেকের নাম নেই। যাঁরা বাংলাদেশে থাকতে চান, তাঁদের কেউ কেউ ভারত থেকে চলে এসেছেন। আবার যাঁরা ভারতে থাকতে চান, তাঁদেরও কেউ কেউ জরিপে নাম লেখানোর জন্য এসেছেন। এ রকম দুজন আলমগীর ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হলো কুড়িগ্রামের দাসিয়ার ছড়ায়। তাঁরা পাঁচ ভাই দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করেন। আলমগীর বলছিলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করি। ছিটমহলে না খায়া আছনোং। একটা ছেঁড়া লুঙ্গি পরি দিল্লি গেছি। আমরা ভারতে থাকব। ছিটমহলে যে টিনের বাড়ি দেখেন, এগুলা দিল্লিতে কাজ করার টাকায় হইচে।’
যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা অনেকেই ভীতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। ৮ তারিখ পর্যন্ত কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ার ছড়ায় একজনও ভারতে যাওয়ার জন্য নাম লেখেননি। তাঁদের আশঙ্কা, অনেকেই তাঁদের ওপর আক্রমণ করবেন। ৮ জুলাই বিকেলে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ার ছড়া ইউনিটের সভাপতি আলতাব হোসেনের উঠানে বাংলাদেশ-ভারতের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তাঁদের কাছে ভারতে যেতে আগ্রহীরা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করছিলেন। সেখানেই গজেন চন্দ্র বর্মণ অভিযোগ করেন, একজন তাঁর পা কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় অংশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়ে ভারতে যেতে ইচ্ছুকগণ ৯ তারিখ থেকে জরিপে নাম লেখাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। উপস্থিত সবার মধ্যে আফতাব হোসেন ভারতে যেতে ইচ্ছুক ছিটমহলবাসীর অভিযোগের বিরোধিতা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবাইকে আশ্বস্ত করেন এবং নিশ্চয়তা দেন, তাঁদের কোনো অসুবিধা হবে না। ফুলবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাও কেউ কোনো হুমকি দিলে অথবা অসুবিধা সৃষ্টি করলে লিখিত অভিযোগ করার কথা বলেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আমাকে বলেন, ‘আমরা কাউকে বাধা দিতে চাই না। যাঁরা ভারতে যেতে চান তাঁদেরও আমরা সহযোগিতা করতে চাই। যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা যেন কারও প্ররোচনায় কান না দেন এবং তাঁরা যেন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রশাসনের কাছে পরামর্শ নেন।’
কৃষ্ণকান্ত বর্মণ নামের একজন বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত উভয় সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, ভারতে যাওয়া পর্যন্ত দুই সরকার যেন আমাদের নিরাপত্তা দেয়।’ এই আকুতি ভারতে যেতে চাওয়া দাসিয়ার ছড়ার প্রায় সব ছিটমহলবাসীর।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের উচিত, যাঁরা নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যেতে চান, তাঁদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করা। ছিটমহলে যাঁরা থাকবেন এবং যাঁরা ছিটমহল ছেড়ে মূল ভূখণ্ডে যাবেন, তাঁদের সবার জীবনই হোক আনন্দপূর্ণ।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Friday, July 17, 2015

কাঁদতেও ভুলে গেছে কুড়িগ্রামের মানুষ! by তুহিন ওয়াদুদ

স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে, বেড়েছে শিক্ষিতের হার। রাজধানীর চকচকে গাড়ির বহর আর আকাশছোঁয়া অট্টালিকা বলে দেয়, দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে অনেকখানি। দারিদ্র্য-মানচিত্রে অভাবী মানুষের সংখ্যাও কমে আসছে। বেড়েছে জিডিপি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিলে জমার পরিমাণ রেকর্ড করেছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্যে অভাবনীয় উন্নতিও চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ২০১০ সালের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গত বছর বাংলাদেশের দারিদ্র্য-মানচিত্র প্রকাশ করে। সেই গবেষণা অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। উন্নয়ন দেশের সর্বত্র সমানভাবে না হওয়ার কারণে কুড়িগ্রাম জেলায় দারিদ্র্যের হার শতকরা ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ আর কুষ্টিয়ায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানে কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলার মধ্যে সব উপজেলারই অবস্থা করুণ। কোনো কোনো উপজেলায় ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত দরিদ্র। এসব উপজেলায় হতদরিদ্রের হার প্রায় ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রামে ২০ লাখ জনগণের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখই দরিদ্র। এই ১৩ লাখের মধ্যে ৯ লাখ মানুষ অতিদরিদ্র। দেশের কোনো মন্ত্রী-সাংসদকে বলতে শোনা যায় না, হতদরিদ্র কুড়িগ্রামবাসীর জন্য সরকারের কোনো করণীয় আছে কি না। কুড়িগ্রামের যে কজন সাংসদ আছেন এবং বিগত সময়ে সাংসদ ছিলেন, তাঁরা কেউই কুড়িগ্রামের উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি, বরং ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদেরা তাঁদের ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধি করেছেন।
স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকেও কুড়িগ্রামের অনাহারী বাসন্তীদের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতাধরেরা এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রাষ্ট্রনায়কেরা বরাবরই সম্পদের বৈষম্যপূর্ণ ব্যবহারের দিকে নজর দেননি।
ধনী জেলাগুলো আরও ধনী হতে থাকবে আর গরিব জেলাগুলো আরও গরিব হতে থাকবে? গরিব জেলার প্রতি রাষ্ট্রের কি কোনো দায়িত্ব নেই? সরকারের গবেষণা করে বের করতে হবে কোন উপায়ে কুড়িগ্রামের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে।
সবচেয়ে গরিব জেলা হিসেবে চিহ্নিত কুড়িগ্রামে অভাবী মানুষদের শুধু অর্থ, ত্রাণ দিয়ে অভাব দূর করা যাবে না। সে জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে সবচেয়ে কম দরিদ্র্য বিভাগ হচ্ছে চট্টগ্রাম। দ্বিতীয় কম দরিদ্র বিভাগ সিলেট। বিদেশে শ্রম বিনিয়োগ করতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা এই দুই বিভাগে সবচেয়ে বেশি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় যদি কুড়িগ্রামে এমন একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকত, যেখানে কুড়িগ্রামের বেকার যুবকেরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিনা সুদে সরকারি ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে পারতেন, তাহলে এখানকার মানুষের অভাব কমানো সম্ভব হতো। কুড়িগ্রাম থেকে প্রচুর শ্রমিক প্রতিদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসা করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের ছাদে করেই দূরদূরান্তে যান। গরিব জেলার কথা বিবেচনা করেও সরকার দুটি ট্রেন দিতে পারত ঢাকার সঙ্গে কম খরচে যাওয়া-আসার জন্য। কুড়িগ্রামে ছোট-বড় মিলে ১৬টি নদ-নদী রয়েছে। নদীর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া কুড়িগ্রামের উন্নয়ন অসম্ভব। কুড়িগ্রামে নদীতীরবর্তী মানুষ নয় মাস ধরে যা সঞ্চয় করে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হয় তিন মাসের বন্যায়।
কুড়িগ্রামের বিত্তহীন মানুষগুলোর মাথার ওপর কয়েকটি করে বেসরকারি সংস্থার ঋণের বোঝা রয়েছে। এই ঋণের বোঝা মওকুফ করা সম্ভব হলে ঋণগ্রহীতারা অনেকটাই নিস্তার পেতেন সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, বিশ্বব্যাংক এবং ইফাদের আয়োজনে ‘দারিদ্র্য মানচিত্রে রংপুর এবং অপুষ্টি মানচিত্রে রংপুর’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় উপস্থিত ছিলাম। আয়োজকেরা রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলায় একটি করে, উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে খাদ্য কর্মসূচি গ্রহণ করার ঘোষণা দেন। কুড়িগ্রাম থেকে কোন উপজেলা বাছাই করা হবে, এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যানসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। তখন চিলমারী উপজেলার চেয়ারম্যান শওকত আলী বীর বিক্রম করুণভাবে আবেদন জানাচ্ছিলেন কর্মসূচি তাঁর উপজেলায় দেওয়া হোক। অনেকে অনেক রকম মত দিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই ছাড়তে রাজি নন। তিনি বারবার বলছিলেন, প্রতিবছর বন্যার ভাঙনে অসহায় মানুষগুলোর সহায়-সম্বল বলতে কিছুই থাকে না। সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাদ্য কর্মসূচি তাঁর উপজেলায় পাওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন।
দেশি ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা কর্তৃক দারিদ্র্য-মানচিত্র প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকারের প্রথমত করণীয় ছিল দেশের জেলাভিত্তিক উন্নয়নবৈষম্য দূরীকরণে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শুধু তা-ই নয়, কোন কোন সূচকে উন্নয়ন ঘটালে স্বাধীনতা-পরবর্তী গ্রহণ করা প্রতিটি বাজেটের বৈষম্য দূর করা যেতে পারে, তার একটি গবেষণা হওয়াও প্রয়োজন ছিল। সরকারের চোখের সামনে একটি জেলা সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত থাকার পরও বৈষম্য দূরীকরণে কোনো উদ্যোগ থাকবে না, তা কী করে সম্ভব? স্বাধীনতার পর কোনো অর্থমন্ত্রী রংপুর আসেননি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোরশেদ হোসেন রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০১২ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবে অর্থমন্ত্রীকে বলেছিলাম দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তো কোনো মন্ত্রী রংপুরে যাননি। এ কথা শুনে তিনি রংপুরে আসবেন কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁরা রংপুর আসেননি।’
কুড়িগ্রামের বিত্তহীন মানুষগুলোর মাথার ওপর কয়েকটি করে বেসরকারি সংস্থার ঋণের বোঝা রয়েছে। এই ঋণের বোঝা মওকুফ করা সম্ভব হলে ঋণগ্রহীতারা অনেকটাই নিস্তার পেতেন।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ছিটমহলের মানুষ বাংলাদেশে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। সেই বিবেচনায় শুধু কুড়িগ্রামে প্রায় ১৫ হাজার বেকার-অদক্ষ ভারতীয় কুড়িগ্রামের বাসিন্দা হবে। এতে করে কুড়িগ্রামের দারিদ্র্যের হার আরও বাড়বে।
রংপুর-কুড়িগ্রামের মানুষের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নবৈষম্য রোধে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের কাছে অনুরোধ করার মতো উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদও নেই। উত্তরাঞ্চলের জনগণকে তাই কাঁদতে হয় নিভৃতে। সে কান্নার শব্দ কিংবা জল কোনোটাই সরকারের কাছে পৌঁছায় না। তাই, কুড়িগ্রামের মানুষ হয়তো কাঁদতেও ভুলে গেছে। একেই বলে অতি শোকে পাথর।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Monday, July 6, 2015

অন্ধকারে আলোর রেখা by তুহিন ওয়াদুদ

মুক্তির আনন্দ ছিটমহলের ঘরে ঘরে, উল্লাস
দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে ছিটমহলের বাসিন্দারা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছে, তাদের পার্শ্ববর্তী দেশের মানুষ অসুস্থ হলে সরকারি চিকিৎসা নিয়েছে, বন্যা-খরায় সম্পদ নষ্ট হলে সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থা পাশে দাঁড়িয়েছে। ছিটমহলের বাইরের শিশুরা স্কুলে যেতে পারে, ছিটমহলের মানুষ নিজেদের সন্তানকে স্কুলে দিতে হলে তার জন্য মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করতে হয়েছে। ছিটমহলের ভেতরে বিদ্যুৎ নেই, সড়ক নেই। নিজ দেশের মুদ্রার প্রচলন নেই। ছিটমহল থেকে বাইরে বেরোলেই ছিটমহলবাসী দেখে, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের নাগরিকের জন্য পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল—সবই আছে। তারা বিপদে পড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতাও আছে। ছিটমহলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অসহায়ের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের মানুষের আনন্দময় জীবন দেখেছে আর নিজেদের কষ্টের রংকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।
গত ১৬ জুন আবারও গিয়েছিলাম কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে। সেখানে কালির হাটের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হচ্ছিল ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মইনুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফাসহ অনেকের সঙ্গে। চিকিৎসাসেবাবঞ্চিত জীবনের কথা বলতে গিয়ে ছিটমহলবাসী মুনির হোসেনের চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি জানালেন, তাঁর স্ত্রীকে ফুলবাড়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি ছিটমহলের মানুষ হওয়ায়। লালমনিরহাট হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা যান।
মিথ্যাচার, নিজ দেশে পরবাসী জীবন, অভিভাবকহীনতা—সবকিছুর অবসান ঘটতে যাচ্ছে ছিটমহলবাসীর। আগামী ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে কার্যকর হবে ছিটমহল বিনিময়। সে কারণে ছিটমহলগুলোয় আনন্দের বন্যা বইছে। চারদিকে স্বস্তির সুবাতাস। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে তাদের জন্য। সরকারের এই উদ্যোগে তারা উল্লসিত। দাসিয়ারছড়ার নীলকমল নদের পাশে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা জেবের আলী বলছিলেন, ‘আমি ছিলাম শেখ মুজিবের সৈনিক। একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করছি, কিন্তু তখন স্বাধীনতা পাই নাই। এখন হামার মুক্তি হলো।’ ৩১ জুলাইয়ের পর তাঁরা যখন বাংলাদেশি হবেন, তখন যেন তাঁরা যোগ্যতা অনুসারে চাকরি পান, সেই দাবি তাঁদের। এ প্রসঙ্গে মোজাফফর নামের একজন বললেন, ‘যোগ্যতা অনুযায়ী আমাদের জন্য সরকারের কাছে বিশেষ কোটায় চাকরির জন্য আবেদন জানাচ্ছি।’
ছিটমহলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে ভূমি ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১১১টি ছিটমহলের মধ্যে ৪২টিতে কোনো মানুষ বাস করে না। আবার অনেক জমি বিক্রি হয়েছে মৌখিক কিংবা সাদা কাগজে লিখে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জরুরি।
দীর্ঘ ৬৮ বছর ছিটমহলবাসী যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছে, এর দায় ছিটমহলের মালিকরাষ্ট্রের। উভয় রাষ্ট্র ছিটমহলের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের মোট জমির পরিমাণ ১৭ হাজার ১৫৮ একর। তার মধ্যে শুধু দাসিয়ারছড়ার আয়তন প্রায় দুই হাজার একর। এ দুই হাজার একর ছিটমহলের ভেতরে ১০৭ একর জমির একটি বাংলাদেশি ছিটমহল ‘ছিটচন্দ্রখানা’। বাংলাদেশ-ভারত ১৬২টি ছিটমহলের বাইরে এই ছিটমহল। এখানে প্রায় দেড় শ পরিবারের বসবাস। সেখানে একটি বাড়ির উঠানে কয়েকজন নারী বসে গল্প করছিলেন। ওখানেই কথা হলো বৃদ্ধ রাবেয়া, শ্যামলীসহ অনেকের সঙ্গে।
ছিটমহল বিনিময় প্রসঙ্গ তুলতেই অনেকগুলো কথা সবাই একসঙ্গে বলতে শুরু করলেন, ‘হামরা কারেন্ট চাই, রাস্তা চাই, স্কুল চাই, হাসপাতাল চাই।’ একজন জবুথবু বৃদ্ধ নারী নিজের একটি অচল হাত দেখিয়ে বলছিলেন, ‘হামরা কোনো বয়স্ক ভাতাও পাই না, বাবা। হামার একনা ব্যবস্থা করি দেও।’ ছোট কয়েকটি অপুষ্ট শিশুকে দেখিয়ে দিয়ে একজন বলছিলেন, ‘তাদের স্কুল অনেক দূরে। বাচ্চারা যেতে চায় না।’ লেখাপড়া না থাকার কারণে বাল্যবিবাহের প্রবণতা সেখানে প্রকট। ওই উঠানেই দেখা গেল ১৩-১৪ বছরের আবুল হোসেনকে। সে ওই বাড়ির জামাই। বিয়ে করেছে তৃতীয় শ্রেণি পাস করা একটি মেয়েকে। সেখানে পাশাপাশি কয়েকটি বাড়িতে কথা বলে জানা গেল, সেখানকার অনেকেই দিল্লিতে গেছেন কাজের সন্ধানে। তবে তাঁরা এখন ফিরে আসছেন। দিল্লিফেরত দাসিয়ারছড়াবাসী মোফাজ্জলের সঙ্গে কথা হলো। তাঁরা দুই ভাই ছিলেন দিল্লিতে। তাঁদের ছিটমহল বাংলাদেশ হচ্ছে শুনে আনন্দে ভাসতে ভাসতে দেশে ফিরেছেন। যদিও বাংলাদেশ-ভারতের দুই দালালকে দুই ভাই উৎকোচ দিয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার টাকা। যে ছিটমহলবাসী ভারতে কাজের সন্ধানে গেছেন, তাঁদের সরকারি উদ্যোগে ফেরাতে পারলে এই দুর্ভোগের শিকার হতে হবে না।
দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের উন্নয়নের জন্য ২৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। গত ৯ মে যখন আমি দাসিয়ারছড়ায় যাই, সেখানে কালির হাট নামক স্থানে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির একটি সাইনবোর্ড লাগানো কার্যালয় এবং তার কয়েক গজ দূরে ‘ছিটমহল ইউনাইটেড কাউন্সিল’ নামের সাইনবোর্ড লাগানো আরেকটি কার্যালয় দেখেছিলাম। এখন ‘ছিটমহল ইউনাইটেড কাউন্সিলের সাইনবোর্ড নেই। এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা অনেকেই বলেন, যেহেতু ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে, ছিটমহল ইউনাইটেড কাউন্সিলের দাবি পূরণ হচ্ছে না, তাই তাঁরা তাঁদের সাইনবোর্ড তুলে নিয়ে গেছেন। কিন্তু ছিটমহল ইউনাইটেড কাউন্সিলের দাসিয়ারছড়া ইউনিটের সভাপতি মিজানুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি। বাজারে যেতে পারছি না। কোনো সাংবাদিক এলে কথা বলতে পারি না। আমরা যে ভারতে যাব, সেটাও বলতে পারি না। পুনর্বাসনের সুবিধাও আমরা পাই কি না, সন্দেহ।’ যদি এ অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ছিটমহলগুলোয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, তার তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করার কাজ চলছে। ছিটমহলবাসীর জীবনের ৬৮ বছরের বঞ্চনা চাইলেও দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Tuesday, May 19, 2015

ছিটমহলবাসীর স্বাধীনতা by তুহিন ওয়াদুদ

দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের বাসিন্দাদের আনন্দ মিছিল
মনির উদ্দীন। বয়স প্রায় ৫৫ বছর। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ভারতের ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় বাড়ি। ৯ মে সেখানেই তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ছিটমহল সমস্যা নিরসনের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেকের মতো তিনিও আবেগী কণ্ঠে বলেন, ‘এত দিন আমরা মানুষ হিসেবে গণ্য হইতে পারি নাই। কিন্তু আইজ আমার আনন্দে বুক ভরি যাচ্ছে। আজকে বাংলাদেশ সরকার আমাদের সত্যিকার পরিচয় আনি দিল। এর জন্য আমরা তার কাছে চিরঋণী।’
ছিটমহলবাসী বললেন, তাঁদের স্বাধীনতা লাভ হলো। মুক্তির আনন্দে তাঁরা কথা বলার ভাষা হারিয়েছেন। ছিটমহলগুলোতে এখন কী রকম আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সেটা ওখানে না গেলে বোঝা যাবে না। তবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আবেগকে যাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁরা উপলব্ধি করতে পারবেন ছিটমহলবাসীর আনন্দটা কেমন।
দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের কামারপুরে অনেক মানুষের ভিড়ে প্রায় শতবর্ষী এক বৃদ্ধ বললেন, ‘১৯৪৭ সালের পর গত ৬৮ বছরে আর কোনো উন্নয়ন সেখানে হয়নি।’ ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান পেয়েছে স্বাধীনতা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি (১৭ হাজার ১৫৮ একর) এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি (৭ হাজার ১১০ একর) ছিটমহলের মানুষ হারিয়েছে দেশ। পাকিস্তানিদের শোষণযন্ত্র থেকেও বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে ১৯৭১ সালে। কিন্তু ছিটমহলবাসীর মুক্তি তখনো হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে ছিটমহল সমস্যা দূর করার জন্য মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি করেছিলেন। ৪১ বছর পর সেই চুক্তির বাস্তবায়ন হতে চলেছে। ১৬২টি ছিটমহলের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ সেই অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
সে কারণে ছিটমহলবাসী বারবার বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। বারবার উচ্চারণ করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আনন্দ মিছিল চলছে প্রতিদিনই। জনসভায় যাঁরাই কথা বলতে আসছেন, তাঁরা সবাই বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধী-শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করছেন। ছিটমহলবাসীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করা সংগঠন ‘বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি’-এর সাইনবোর্ডেও ছোট করে ওপরে লেখা ‘৭৪–এর চুক্তি, ছিটবাসীর মুক্তি’।
ছিটের ভেতরে রয়েছে ছিট। দাসিয়ারছড়া ভারতের ছিটমহল। তার মধ্যে বাংলাদেশের ছিটমহল ‘ছিট চন্দ্রঘোনা’। সেখানকার বাসিন্দা ছিটমহলবাসীর মুক্তি আন্দোলনের সংগঠক রফিকুল আলম বলছিলেন, ‘আমরা গত ৬৮ বছর অপরাধ করলে আসামি হয়েছি, কিন্তু আমরা কেউ বাদী হতে পারিনি। ভারতও আমাদের আসামি করেছে, বাংলাদেশও।’ বাজারের মধ্যে ছোট্ট একটা দোকানের ভেতরে দেখি একটি বিছানা পাতানো। দোকানি আবদুল লতিফ বললেন, ‘ছিটে তো কোনো বিচার নেই। রাতে চুরি হলেও কিছুই করার নেই, তাই রাতে এই বিছানায় থেকে দোকান পাহারা দিয়ে রাখি।’
অসুস্থ হলে মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করে ছিটমহলবাসী চিকিৎসা নিয়েছে। হজ করার জন্যও মিথ্যা ঠিকানা ব্যবহার করতে হয়েছে। জমি বিক্রি হয়েছে সাদা কাগজে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। বিদ্যুৎ নেই। পথঘাট নেই। ছিটমহলবাসী মাওলানা আবদুল হামিদ খান বললেন, ‘বাইরার ঠিকানা নেওয়া, মিথ্যা কথা কওয়া বন্ধ হলো। জীবনের সব সমস্যার সমাধান আল্লাহর রহমতে হয়ে গেল। আমরা খুবই আনন্দিত।’
হোসেন আলী নামের এক কৃষক অনুভূতি ব্যক্ত করছিলেন এই বলে, ‘এখন আমাদের খুব ভালো লেগেছে। যে আনন্দের কোনো শেষ নাই, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এত আনন্দ লেগেছে আমাদের। আমরা তো এত দিন খাঁচার ভেতরে বন্দী ছিলাম। এখন মুক্ত আকাশ দেখতে পাব।’
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মেজাফফর হোসেন এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রথমেই একটা ন্যাশনাল আইডি কার্ড দরকার। হাসপাতাল দরকার। বিদ্যুৎ দরকার। আমার মেয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। তাকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করি। বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার, রাস্তাঘাট দরকার।’
অনেককেই জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কেউ ভারতে যেতে চায় কি না। তারা কেউই ভারতে যেতে চায় না। জন্মভূমি ছেড়ে যেতে তারা নারাজ। ‘জননী, জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরীয়সী’। তবে কেউই যাবে না, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ছিটমহলে কিছু মানুষ আছে, যারা চেয়েছিল ছিটমহল বিনিময় না হোক। এর নেপথ্যে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বিরাজমান। শোনা যায়, তারা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত। যারা ছিটমহল সমস্যার নিষ্পত্তি চেয়েছে, তারা এই অসাধুদের রাজাকার বলে উল্লেখ করছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক ঘর ভারতে যেতে চায়, তারা এই সংগঠনের। ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় ৬ ও ৭ মে সীমান্ত বিল পেশ হওয়ার পর যাতে করে ছিটমহলগুলোতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বাংলাদেশ-ভারত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্স করে শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছিটমহল পরিদর্শন করেছেন।
ছিমহলগুলো ছিল অপরাধীদের অভয়ারণ্য। বাংলাদেশ-ভারতের অনেকেই অপরাধ করে ছিটমহলগুলোতে আশ্রয় নিত। কী রকম অপরাধ হতো, তার অনেক তথ্য–প্রমাণ আছে। দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে একটি বাজারের নাম ‘টংকার মোড় ডাইলের বাজার’। এখানে ৬ মে পর্যন্ত প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হতো। সব সময় কয়েক শ মোটরসাইকেল সেখানে থাকত। ঈদের সময় কয়েক হাজার মোটরবাইকে সেখানে যেত নেশার উদ্দেশ্যে। ৬ তারিখের পর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি বন্ধ হয়েছে।
ছিটমহলবাসীর কষ্ট স্বতন্ত্র, সমস্যাও স্বতন্ত্র। সে জন্য উভয় দেশের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হলো তাদের সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ইতিহাসের অন্ধকার গলিতে আলোর পথ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার, ভারত সরকার তথা যারা চেষ্টা করেছে, তাদের সবাইকে প্রজন্ম পরম্পরায় গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে ছিটমহলবাসী। সর্বোপরি এ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর। আর বাস্তবায়নের কৃতিত্ব শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির। ছিটমহলবাসী একবার নিজ চোখে এ দুই প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে চায়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তাতে করে বাংলাদেশের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যে আগামী মাসে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে তিস্তার পানি বণ্টনসহ চুক্তিও হবে।
রাষ্ট্রিক আনুকূল্যে রচিত হোক মানুষের জয়গাথা।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudutuhin@gmail.com

Wednesday, May 13, 2015

অযত্ন আর অবহেলায় রংপুরের রেল by তুহিন ওয়াদুদ

রংপুরে প্রয়োজনের তুলনায় রেলসুবিধা খুবই অপ্রতুল। পরিকল্পনাহীনতা আর কিছুটা সদিচ্ছার অভাবে রংপুর রেল সীমিত ব্যবস্থায় যে সেবাটুকু দিতে পারত, তা-ও পারছে না। মহাজোট সরকার রংপুরের উন্নয়নের প্রতি কিছুটা সদয় হলেও রেলসংশ্লিষ্টদের খামখেয়ালিপনার কারণে রংপুর বিভাগের মানুষ রেলসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রেল যোগাযোগের আধুনিকায়ন এবং রেলসেবা গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মহাজোট সরকার রেল মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু রংপুরের রেল উন্নয়নের জন্য রেল মন্ত্রণালয়ের উল্লেখযোগ্য কোনো কাজই দৃষ্টিগোচর হয়নি। রংপুর রেলস্টেশনের একজন প্রবীণ কর্মচারী দুঃখ করে বলছিলেন, কোনো দিন রংপুরে নতুন রেল ইঞ্জিন কিংবা নতুন কোচ দেয়নি সরকার। সরকার মনে করে, রেল মানেই চট্টগ্রাম আর সিলেট। যে ইঞ্জিন-কোচ ওখানে চলে না, সেগুলো রংপুরে দেয়।
সম্প্রতি রংপুর রেলস্টেশনে গিয়েছিলাম রেলের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। স্টেশনে পৌঁছাতেই একটি ট্রেন এসে থামল। ট্রেনটি পার্বতীপুর থেকে এসেছে, যাবে লালমনিরহাট। দেখলাম, ট্রেনের ভেতর দাঁড়ানোর মতো স্থান নেই। ছাদেও অনেক যাত্রী। স্টেশনমাস্টার শেখ আবদুল জব্বারের কাছে জানতে চাইলাম, মাত্র ছয়-সাতটি কোচ কেন? ইঞ্জিনটি কি এর চেয়ে বেশি কোচ টানতে পারে না? স্টেশনমাস্টার জানালেন, ১৬টি কোচ টানতে পারে ট্রেনটি। শুধু কয়েকটি কোচের অভাবে যাত্রীদের ভোগান্তির শেষ নেই।
ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা বিলম্বে এসেছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ মাসুম নামের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ট্রেন বিলম্বে আসার প্রতিকার কী হতে পারে? তিনি বললেন, ট্রেন কেন বিলম্বে এসেছে, এর কৈফিয়ত চাওয়া হয় না, বিলম্বের জন্য কোনো শাস্তি হয় না। সে জন্য সংশ্লিষ্টরা ইচ্ছেমতো ট্রেন চালায়।
রংপুর থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের সংখ্যা এক। সপ্তাহে ছয় দিন চলে। রোববার বন্ধ। ফলে অফিস খোলা অবস্থায় মাত্র চার দিন চলে এ ট্রেন। প্রায় প্রতিদিনই কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে যাওয়া-আসা করে। রংপুর এক্সপ্রেসের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিকল। ট্রেনটির ১১টি কোচ ছিল। যাত্রীর ভিড় থাকা সত্ত্বেও দুটি কোচ অজ্ঞাত কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ ১৬টি কোচ নিয়ে অনায়াসে চলতে পারত এই ট্রেন। কোচ-সংকট রংপুরের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করা প্রতিটি ট্রেনেই। যাত্রীর অভাব নেই। কিন্তু কোচের সংখ্যা সাত-আটের বেশি নয়। সামান্য কয়েকটি কোচ দিলেই দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হতো। এই উদাসীনতার দায় রেল মন্ত্রণালয় কি এড়াতে পারবে?
রংপুর বিভাগ থেকে মোট পাঁচটি ট্রেন ঢাকায় যায়। দিনাজপুর থেকে দুটি, নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে একটি, লালমনিরহাট থেকে একটি, রংপুর থেকে একটি। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকাগামী কোনো ট্রেন যোগাযোগ নেই। অথচ তিনটি জেলা থেকে সংযোগ ট্রেন দিয়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যেত।
রংপুর থেকে সোজা বগুড়া পর্যন্ত একটি রেললাইন স্থাপন করার অভাবে ঢাকায় যেতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় বেশি লাগে। সে বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ জরুরি। এ ব্যবস্থা করা গেলে মাত্র ২০০ টাকায় রংপুর থেকে ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হবে।
রংপুর থেকে রাজশাহী, যশোর ও খুলনাগামী কোনো ট্রেন নেই। এর অন্যতম কারণ, রংপুর থেকে পার্বতীপুর মাত্র ৪০ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন না থাকা। পার্বতীপুর পর্যন্ত তৃতীয় লাইন হিসেবে একটি লাইন স্থাপন করা গেলে রংপুর থেকে রাজশাহী-খুলনা-যশোরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যেত। সেই সঙ্গে ব্রডগেজ লাইনে ঢাকায়ও যাওয়া যেত। যত দিন ব্রডগেজ লাইন না হয়, তত দিন সংযোগ ট্রেন রেখেও রাজশাহী-যশোর-খুলনার সঙ্গে রংপুরের রেল যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। তা ছাড়া এই ৪০ কিলোমিটার লাইন ব্রডগেজ করা গেলে তেল পরিবহনে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যেত। ব্রডগেজ লাইনটুকু না থাকার কারণে খুলনা থেকে তেলবাহী ব্রডগেজ লাইনের ট্রেনগুলো তেল নিয়ে এসে পার্বতীপুর ডিপোতে রাখে। সেখান থেকে রংপুরের ৮৭টি পাম্পে তেল বিক্রি হয়। রংপুর পর্যন্ত এই তেল নিয়ে আসা সম্ভব হলে রেল কর্তৃপক্ষ এবং রংপুরের তেল ব্যবহারকারীরা অনেকটা সুবিধা পেত। চট্টগ্রাম থেকে একবার মিটারগেজ লাইনে তেল পরিবহন করে রংপুর নিয়ে এলে ভাড়া বাবদ রেল বিভাগ পায় প্রায় ১০ লাখ টাকা। মিটারগেজ হওয়ার কারণে খুলনা থেকে রংপুরে তেলবাহী ট্রেন আসে না। ব্রডগেজ লাইন স্থাপনের ব্যয় শুধু তেল পরিবহন থেকে আয়কৃত টাকায় কয়েক মাসে পরিশোধ করা সম্ভব।
রংপুর থেকে লালমনিরহাট-কুড়িগ্রামে যেতে তিস্তা নদীর ওপরের মেয়াদোত্তীর্ণ রেলসেতুটির কাজ পুনরায় করা প্রয়োজন। তা না হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এই কাজে মিটারগেজ এবং ব্রডগেজ উভয় ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাহলে রংপুর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ করা গেলে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট থেকে ছাড়তে পারবে রাজশাহী-যশোর-খুলনাগামী ট্রেনগুলো।
শেখ আবদুল জব্বার জানান, যদি কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দিয়ে একটি ব্রিজ করে ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রেলপথ করা যেত, তাহলে চার ঘণ্টায় ঢাকায় যাওয়া যেত। যাত্রীর পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল থেকে পণ্য পরিবহন করা যেত অনেক সুলভে। এতে করে রেল কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষ অনেক লাভবান হতো।
রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সদস্যসচিব খন্দকার আরিফ বলেন, কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকার জন্য একটি ট্রেন চললে গরিব মানুষ স্বল্প টাকায় ঢাকা যেতে পারবে। দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রামের অভাব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা দীর্ঘদিন ধরে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেনের জন্য আন্দোলন করে আসছে।
রংপুর-ঢাকা রুটে আন্তনগর ট্রেন তিস্তা ও একতা চালুর দাবিতে গত ০৭ জানুয়ারি ২০১১ রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদ দিনব্যাপী রেললাইনে অবস্থান করে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। এতে প্রায় সাত ঘণ্টা এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এ সময় দিনাজপুর থেকে ছেড়ে আসা সান্তাহারগামী দোলনচাঁপা ও লালমনিরহাট থেকে ছেড়ে আসা দিনাজপুরের বিরলগামী কমিউটার ট্রেন আটকা পড়ে। এতে রংপুর রেলস্টেশনসহ আশপাশের বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া অন্তত ১০টি ট্রেনের কয়েক হাজার যাত্রীকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। পরে তাদের দাবি পূরণে সংসদ সদস্য টিপু মুন্সী এবং জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক আবুল মনসুর আহমেদের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে অবরোধ-কারীরা তাদের অবরোধ তুলে নেয়। আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেন। এতে তাঁরা উল্লেখ করেন একসময় রংপুরের ওপর দিয়ে ঢাকাগামী দুটি আন্তনগর ট্রেনসহ ১০টি ট্রেন চলাচল করত। চারদলীয় জোট সরকার ২০০২ সালে আকস্মিকভাবে আন্তনগর এ ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেয়। গত বছর রংপুর রেলওয়ে স্টেশন দিয়ে উত্তরাঞ্চলে চলাচলকারী আরো ১০টি ট্রেনের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে মাত্র তিনটি ট্রেন রংপুর রেলস্টেশন থেকে লালমনিরহাট, দিনাজপুরে চলাচল করছে। নেতারা জানান, রংপুর-ঢাকা চলাচলকারী আন্তনগর ট্রেন দুটি চালু হলে প্রতিদিন সরকারের কমপক্ষে এক লাখ টাকা রাজস্ব আয় হতো। শুধু তাই নয়, প্রশাসনিক কারণেই রংপুর থেকে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ দরকার, যা রংপুর বিভাগবাসীর মৌলিক ও নাগরিক অধিকার। স্মারকলিপিতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব ট্রেন চালুর দাবিসহ রংপুর বিভাগবাসীর বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। অবরোধ চলাকালে রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের আহ্বায়ক ওয়াদুদ আলীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ নেতা আ ক ম শামীম খান রাজু, শামীম তালুকদার, অ্যাডভোকেট রথীশ চন্দ্র ভৌমিক, রংপুর জেলা দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মিলন প্রমুখ। >কালের কণ্ঠ
রংপুর রেলে উন্নয়ন করতে হলে উল্লিখিত সমস্যা সমাধান করা ছাড়াও রংপুরের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগের আধুনিকায়নসহ ডুয়েল গেজ, ডাবল লাইন পদ্ধতি প্রয়োজন। রংপুর বিভাগের সব জেলা থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য একটি করে ট্রেনের ব্যবস্থা করা ভীষণ জরুরি। রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের আহ্বায়ক ওয়াদুদ আলী বলেন, বাসমালিকেরা কিছুতেই চান না সাধারণ মানুষ স্বল্প ব্যয়ে রেলে যাতায়াত করুক। সে জন্য তাঁরা রেলের উন্নয়নে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করে। বাস ব্যবসায়ীদের চক্রান্তে যেন রেলসেবার সুযোগ নস্যাৎ না হয়, সেদিকেও সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Monday, April 6, 2015

শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? by তুহিন ওয়াদুদ

‘সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বৃদ্ধি করে ৩৫ করা হোক—এ আলোচনা, এ দাবি অনেক দিন ধরেই চলছে। কী কী কারণে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, সে বিষয়েও বিস্তর লেখালেখি-আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। এমনকি চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের অর্থ-সময়-শ্রম বিনিয়োগ করে এই দাবিতে মানববন্ধন, সেমিনার, স্মারকলিপি প্রদানসহ অনেক কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
মহাজোট আমলের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে সরকার কিছু জনকল্যাণমূলক কাজের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই কাজের তালিকায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। এর আড়ালে হয়তো তাদের নির্বাচনে সমর্থন পাওয়াই লক্ষ্য ছিল, তবু এটি করলে সত্যি সত্যি একটি ভালো কাজ করা হতো। বাংলাদেশে যেখানে শিক্ষার্থীদের স্নাতকোত্তর পাস করতেই জীবনের ২৭-২৮ বছর পেরিয়ে যায়, সেখানে ৩০ বছরেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা শেষ হওয়াকে কোনো অবস্থাতেই স্বাভাবিক বলা যায় না।
বাংলাদেশ হচ্ছে হরতাল-অবরোধের দেশ। প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচনকেন্দ্রিক বিড়ম্বনার কারণেও শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে হরতাল-অবরোধেও যে পরিমাণ সেশনজট তৈরি হলো, তার দায় কি শিক্ষার্থীদের নিতে হবে? সেশনজট সৃষ্টির বহুবিধ কারণের কোনোটা না কোনোটা ঘটছেই। ফলে যথাসময়ে শিক্ষাজীবন শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। যদি হরতাল-অবরোধ কোনো কিছু না-ও থাকে, তবু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট দূর করা নিকট ভবিষ্যতে সম্ভব বলে মনে হয় না। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি যেহেতু অনেকটাই শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রমের মতো, তাই এখানে বেশিসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গড়ে ২ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন মাত্র কর্মকর্তা। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর সেশনজট দূর করা সম্ভব হবে না। বিভাগীয় পর্যায়ে যে কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, তা–ও সেশনজট নিরসনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নয়।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ১৮.৫ বছর + ভর্তি প্রক্রিয়ায় দশমিক ৫ বছর + স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ৮ বা ৯ মোট ২৭-২৮ বছর প্রয়োজন হয়। অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও অভিন্ন চিত্র। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বয়সী প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করেন। এ দুই লাখ বাদ দিলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৬ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। এই ১৬ লাখ শিক্ষার্থীর প্রায় ৮৫ শতাংশ পড়ালেখা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বাস্তবতায় তাঁরা বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দু-তিন বছর চেষ্টার সুযোগ পান। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার দেড় বছরাধিক পর ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। এ রকম হলে একটি বিসিএস পরীক্ষার চেয়ে বেশি চেষ্টা করার উপায় নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর কোর্সের চেয়ে এক বছর বেশি পড়ালেখা করতে হতো। সে জন্য তাদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা করা হয়েছে ৩২ বছর। এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও স্নাতক পর্যায়ে এক বছর কোর্স বাড়ানো হয়েছে। সেই বিবেচনায় সেশনজট যদি না-ও থাকত, তবু চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা দুই বছর এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির জন্য চাকরির মেয়াদ ৫৭ থেকে ৫৯ করার কারণে আরও দুই বছর বাড়িয়ে ৩৪ করা প্রয়োজন।
যদি আমরা তাত্ত্বিকভাবে হিসাব করি, তাহলে একজন শিক্ষার্থীর ১৮ বছরে উচ্চমাধ্যমিক, চার বছরে স্নাতক (সম্মান) এবং এক বছরে স্নাতকোত্তর কোর্স সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হওয়ার কথা ২৩ বছর। একজন শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর শেষ করতে ২৩ বছর, এরপর প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার জন্য যে সময় বেশি প্রয়োজন হবে, সেই সময়টুকু তাঁকে চাকরির চেষ্টার জন্য বেশি সুযোগ দিতে হবে। যদি একজন শিক্ষার্থী ২৮ বছর বয়সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে তাঁকে সবার জন্য নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নষ্ট হওয়া আরও পাঁচ বছর সুযোগ দিতে হবে। নির্ধারিত বয়সের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সময়টুকু দাবি করা একজন শিক্ষার্থীর ন্যায্য অধিকার। স্বাভাবিকভাবে জন্ম তারিখের সঙ্গে ৩০ বছর যোগ করে চাকরিতে প্রবেশের সময় নির্ধারণ করা হয়। এ নিয়ম চালু করলে স্নাতকোত্তর পাসের দিন থেকে সাত বছর যুক্ত করে একজন চাকরিপ্রার্থীর চাকরিতে প্রবেশের বয়স নির্ণয় করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের জন্য এক দিনও সময় নষ্ট না করে, তাহলে প্রতিষ্ঠান যে সময় নষ্ট করে দিচ্ছে, সেই সময়টুকুর দায় তো তার নয়। দায় প্রথমত প্রতিষ্ঠানের, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি ব্যক্তির যেকোনো ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে সময় নষ্টের ক্ষতিপূরণ কেন দেবে না?
পিএসসির একটি প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা দেখানো হয়েছে। তার মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি চাকরির বয়সসীমা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘চাকরিপ্রার্থীদের বয়স বাংলাদেশের সরকারি চাকরির মতো সীমাবদ্ধ নেই। অর্থাৎ চাকরিপ্রার্থীদের বয়স ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বয়সে আবেদন করতে পারে।’ কানাডিয়ান সিভিল সার্ভিসে নিয়োগে বয়সসীমা ২০ থেকে ৬০ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ম্যারিল্যান্ডে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২০ থেকে ৫৯ বছর। আসাম পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, সেখানে চাকরিতে প্রবশের বয়সসীমা উল্লেখ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৩৮ বছর। শ্রীলঙ্কায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছর।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বয়সে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা লক্ষ করা যায়। তাহলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে শিক্ষাজীবনে প্রচুর সময় নষ্ট হয়, সেখানে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা কেন ৩৫ বছর করা হবে না?
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Sunday, March 1, 2015

মমতার আশ্বাস ও তিস্তা-তীরবর্তী মানুষের কষ্ট by তুহিন ওয়াদুদ

সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা চুক্তি করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। আসার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। কিন্তু তিনি আসেননি এবং তাঁর বিরোধিতার কারণেই সেই চুক্তি হয়নি।
প্রায় চার বছর পর সেই তিনি বাংলাদেশ সফর করলেন এবং তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে তাঁর ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানালেন। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে তাঁর আন্তরিকতা যে কম, তা বোঝা যায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা সূত্রে। ২০ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকা আসার আগমুহূর্তে কলকাতায় বলে এসেছেন, ‘তিস্তা নিয়ে কিছু বলছি না। তবে ছিটমহল নিয়ে অবশ্যই কথা হবে।’ অর্থাৎ তিস্তা নিয়ে তিনি কোনো কথাই বলতে চাননি। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের পরবর্তী প্রায় চার বছরে তিস্তার পানি দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি কখনোই তাঁর দেশে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেননি। বরং ‘বাংলাদেশে তিস্তার পানি পাচার হচ্ছে’—এমন অভিযোগই করেছেন। ভারতের কংগ্রেস সরকার তিস্তা চুক্তি করতে চেয়েছিল, বিজেপি সরকারেরও আপত্তি নেই। তাই মোদি সরকার চাইলে এবার তিস্তা চুক্তি হতে পারে—এমনটাই আমরা আশা করতে পারি।
তিস্তায় অভিন্ন অধিকার প্রশ্নে ২০১৪ সালের ১৭ আগস্টের আগের প্রেক্ষাপট এবং তার পরের প্রেক্ষাপটও এক নয়। ১৯৯৭ সালের ‘পানিপ্রবাহ কনভেনশন’ অনুযায়ী ৩৫টি দেশের অনুসমর্থনের ৯০ দিন পর তা আইনে পরিণত হওয়ার কথা। ২০১৪ সালের ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে চুক্তিটি অনুসমর্থন করেছে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ১৭ আগস্ট থেকে সব অভিন্ন নদীতে আমাদের আইনি অধিকারও তৈরি হয়েছে। অবশ্য তিস্তার পানি চাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ কতখানি আন্তরিক, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ চুক্তিটি অনুসমর্থন করেনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আশ্বাস দিয়েছেন, সেটাকে কাজে পরিণত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখা উচিত হবে না। কারণ, ভারত বাংলাদেশকে পানি না দিলে ভারতের ক্ষতি নেই, ক্ষতি বাংলাদেশের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নীরব থাকলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময়ই তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে আসছে। ২০১৩ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছিলেন, ‘তিস্তা সই হয়নি ঠিকই, কিন্তু তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহেও ভারত বাধা দেয়নি।’ এসব মৌখিক নিশ্চয়তা বক্তব্যসর্বস্ব হিসেবেই আছে এখন পর্যন্ত।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এই মুহূর্তে যে সংকটে পড়েছে, তা হলো তিস্তা সেচ প্রকল্প প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ সালে তিস্তা সেচ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগে বোরো মৌসুমে প্রায় ৭ হাজার কিউসেক পানি থাকার কারণে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ১১ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা নির্ণয় করা হয়। কিন্তু ১৯৯৩ সালে সেচ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর পানি কম থাকায় সর্বোচ্চ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়েছে। ভারত পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল। ২০১৪ সালে ভারত আন্তনদীসংযোগ প্রকল্প অনুযায়ী তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে সেই পানির পরিমাণ ৩০০ কিউসেকে নেমে এসেছিল। এ বছরের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই নেমে এসেছে ১৫০-১৬০ কিউসেকে। ভারত অংশে তিস্তায় পানি নেই, তা নয়। ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এই হাহাকার দেখা দিয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে পানি বেশি করে প্রত্যাহার করার কারণে গত বছর ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রকল্পের অধীনে চাষাবাদ শুরু হলেও ১০-১২ হাজার হেক্টরের চেয়ে বেশি জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষকেরা চরম সংকটে পড়েছিলেন। বাসদসহ (মার্ক্সবাদী) অনেক সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারের কাছে দাবি করে আসছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২০ হাজার হেক্টর জমি। কিন্তু এই জমিতেও পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিস্তার পানি চেয়ে এ বছর বাসদ (মার্ক্সবাদী) ১৯ ফেব্রুয়ারি তিস্তা অভিমুখে রোডমার্চ করেছে। রোডমার্চের সঙ্গে গিয়েছিলাম আমিও। বড়ভিটা নামক স্থানে একটি পথসভায় যোগ দিয়েছিলেন অনেক সাধারণ কৃষক। সেখানকার একজন কৃষক খুব দুঃখ করে বলছিলেন, ‘শুধু রোয়া লাগানোর সময়ে জমিতে সেচের পানি পাইছি, আর নাই।’ সেচ প্রকল্পের একজন মাস্টাররোল কর্মচারী জিকরুল বললেন, ‘রেশনিং সিস্টেমে ছয় দিন পর পর পানি দেওয়া হয়।’ নীলফামারীর জলঢাকাসংলগ্ন সেচ প্রকল্পের খালের পাশে কথা হচ্ছিল কয়েকজন সুবিধাভোগীর সঙ্গে। পাশেই ছানারুল নামের অন্য একজন কৃষক বললেন, ‘পানি এত কম থাকে যে একটু উঁচু জমিতে পানি যায় না। যেটুকু বা যায়, এক দিনেই শুকি যায়।’ অশীতিপর বৃদ্ধ জমশেদ নামের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেচ প্রকল্প হওয়ার আগে এখানকার মানুষের জীবন কেমন ছিল? তিনি বললেন, ‘এটেকোনা (এখানে) ধান হইত না। পাট আর কাউন হইত। অভাবে এখানকার মানুষে কাউনের ভাত খায়া আচলো (ছিল)। সেচের পানি পাওয়ার পর থাকি এঠাকার (এখানকার) মানুষের ভাগ্য বদলি গেইছে। পানি না থাকলে ফির অভাব হইবে।’
সেচ প্রকল্প এলাকার অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এক একর জমিতে ধান চাষ করতে সেচ প্রকল্পের পানিতে মোট খরচ হয় ৪৮০ টাকা। আবার নদীর পানিতে সারও কম দিতে হয়। যদি গভীর নলকূপের পানিতে ধান চাষ করতে হয়, তাহলে এলাকাবিশেষে ১৫ থেকে ২০ গুণ, অর্থাৎ প্রায় ছয় হাজার থেকে আট হাজার টাকা দিতে হয় পানি বাবদ। আবার সারও প্রয়োজন হয় তুলনামূলক বেশি। সে জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশের কালক্ষেপণ করা যাবে না। যদি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে যে সামান্য পানি পাওয়া যাচ্ছে, সেই পানিই পাওয়া যায়, তাহলে তিস্তা নদীকে বাঁচাতে তিস্তা সেচ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। তিস্তাপারের মানুষের জীবনে এটা হবে একটি ভয়াবহ বিপর্যয়। তিস্তায় পানি না থাকলে যমুনেশ্বরী, বুড়ি তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়াসহ অনেক নদীই শুকিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় তিস্তা পানিশূন্য থাকলে উত্তরাঞ্চল মরুকরণের আশঙ্কাও আছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে থেকে আগ্রহ করে বাংলাদেশ সফর করেছেন। এই সফরে দ্বিদেশীয় সম্পর্কোন্নয়নের চেয়ে তাঁর নিজের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ছিল অনেক বেশি। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ ওঠার কারণে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং নিজ দেশে তাঁর সমর্থনও কমেছে। ঢাকায় আসার পর বাংলাদেশের মানুষের তিস্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা লক্ষ করে তিনি কৌশলে আশ্বাসবাণী শুনিয়ে গেছেন কি না, সেটাও ভাবার বিষয়।
তিস্তা ও স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে ৪ আগস্ট ২০১৩ প্রথম আলোয় প্রকাশিত রাজ্যসভা টিভির একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক তিনজন হাইকমিশনার দেব মুখার্জি, বীণা সিক্রি ও রঞ্জিত মিত্তারের আলোচনার সারকথা উদ্ধৃত করা হয়, ‘আলোচনার নির্যাস হচ্ছে, দুই চুক্তি বাস্তবায়নে ভারত যে প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশকে দিয়েছিল, তা যেকোনোভাবেই পূরণ করা দরকার ছিল।’
তিস্তার পানি পেতে হলে আরও কূটনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে অভিন্ন নদীতে অভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে আইন প্রণীত হয়েছে, তার আলোকে হলেও আমাদের নদী অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও সংগঠক, রিভারাইন পিপল।
wadudtuhin@gmail.com

Thursday, February 19, 2015

নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায় না by তুহিন ওয়াদুদ

এ বছর এসএসসি (মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট) পরীক্ষায় যদি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন আসে—বাঙালির জাতিগত পরিচয় কী এবং উত্তরে যদি দেওয়া থাকে: (ক) সীমারের জাতি (খ) বীরের জাতি (গ) দেশপ্রেমিক জাতি (ঘ) বর্বর জাতি। বোধকরি বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী (ক) অথবা (ঘ) উত্তরকেই ঠিক ভেবে বৃত্ত ভরাট করবে। সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতিতে এ উত্তরেও নম্বর দিতে হবে। দেশের চালক যাঁরা হতে চান কিংবা যাঁরা চালান, তাঁদের মধ্যে যদি পাষাণ হৃদয় সীমারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে, তাহলে আমরা কার কাছে আশ্রয় খুঁজব? ২০১৩ সালে রাজনৈতিক রেষারেষি প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। এ বছর অবরোধ শুরু হওয়ার দিন থেকে তাই এসএসসি পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা পরীক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। ২ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। এটা ধরে নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রথম দিন বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। ২০-দলীয় জোট ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭২ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করায় পরীক্ষার্থীরা অকূল পাথারে নিক্ষিপ্ত হয়। তারা বুঝে উঠতে পারছিল না এখন কোন বিষয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।
১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিলেন, প্রথম দিনের পরীক্ষা স্থগিত। অবরোধ-হরতাল আহ্বানকারী জোটের প্রধান দলের শীর্ষ নেতাদের একজন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন ‘কিসের পরীক্ষা কিসের কী?’ মন্তব্য করে পরীক্ষাবিরোধী দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করেন। হাফিজ উদ্দিনের পক্ষে এ কথা বলা স্বাভাবিক। তাঁদের কর্মসূচি হলো, মানুষের পোড়া লাশের ওপর দিয়ে হলেও কিংবা অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা। মানুষের জীবন তাঁদের কাছে গৌণ, ক্ষমতাটাই মুখ্য। সেসব বিবেচনায় পরীক্ষা তো অনেক ক্ষুদ্র বিষয়। ফলে তাঁরা বেছে বেছে পরীক্ষার দিনগুলোতে হরতালের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকো মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী নিজ সন্তানের লেখাপড়ার কথা ভেবে দ্রুত মালয়েশিয়ায় গেছেন। হাফিজ উদ্দিন কিংবা খালেদা জিয়ার ঘরে এসএসসি পরীক্ষার্থী সন্তান রেখে এই কর্মসূচি দেওয়া সম্ভব হতো না। ঘরের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী সন্তানের অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁরা এ কর্মসূচি পরিহার করতেন। তাঁদের সন্তানদের পরীক্ষা নেই বলেই কি তাঁদের মাথাব্যথা নেই?
এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী সিদ্দিক মেমোরিয়াল স্কুলের সুবহা বলছিল, ‘পলিটিকস খুবই খারাপ। আমাদের পরীক্ষার কদিন হরতাল-অবরোধ না দিলে হতো না?’ তার মা শারমিন আফরোজ একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। তিনি বলছিলেন, ‘কোন পরীক্ষা হবে, কোন পরীক্ষা হবে না, আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আজ শনিবার ইংরেজি দ্বিতীয় পরীক্ষা। কাল যদি গণিত পরীক্ষা হয়, তখন কী হবে? এই ভেবে আজকের পরীক্ষার পড়ার পাশাপাশি মেয়েকে অনেকটা সময় গণিতও পড়ালাম।’ পরীক্ষার রুটিন ঠিক না থাকার কারণে চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে পরীক্ষার্থীদের লেখাপড়া করতে হচ্ছে। সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে অভিভাবকেরা অপেক্ষা করছিলেন। পেট্রলবোমার আতঙ্ক নিয়ে তাঁরা অনেকেই কথা বলছিলেন। একজন বললেন, ‘এই যে বাচ্চার মায়েরা একসঙ্গে অপেক্ষা করছেন, এখানে যদি কেউ বোমা মারে?’ এমন সময় কয়েকজন বিজিবি সদস্য সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি ওঠাচ্ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, ছবি ওঠাচ্ছেন কেন? একজন বিজিবি সদস্য বললেন, ‘আমরা দায়িত্ব পালন করছি কি না, সে জন্য ছবি তুলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেখাতে হবে। পুলিশ-বিজিবি মিলে যথাসম্ভব নিরাপত্তার চেষ্টা করছি।’
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমদ হোসেন বললেন, ‘হরতাল-অবরোধে আমাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ভেঙে পড়েছে। এ রকম হলে পরীক্ষার্থীদের রেজাল্টে খারাপ প্রভাব পড়বে।’ কারমাইকেল কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহ. সুজন শাহ-ই ফজলুল হরতাল-অবরোধে সেখানকার কয়েক রকম অসুবিধার কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘কলেজে উপস্থিতি কমে গেছে, মৌখিক পরীক্ষাগুলো নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বাইরের কলেজ থেকে পরীক্ষকেরা আসতে পারছেন না। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এদের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।’
খালেদা জিয়া অবরোধ আহ্বান করেছেন। কর্মসূচি সম্পূর্ণ সফল না হওয়ার কারণে মাঝে মাঝেই দিচ্ছেন হরতাল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হরতাল-অবরোধে ঠিকমতো ক্লাস-পরীক্ষা চলার কারণে প্রথমে ছাত্রদল, পরে ছাত্রশিবির ধর্মঘট আহ্বান করেছিল। এতেও ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করতে না পেরে বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া থেকে সরে এসেছেন। যে শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁদের কর্মসংস্থান, তাদেরই ক্লাস বন্ধ করলেন। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়েছে গুটি কয়েক আন্দোলনকারীর শিক্ষা কার্যক্রম বর্জন করার মতো নির্মম কর্মসূচির কারণে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছাত্রদলের ধর্মঘট।
দেশের সংকটের কথা না ভেবে আন্দোলনকারীরা ৯০ হাজার ভর্তি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষাকেও জিম্মি করেছে। দারিদ্র্যপীড়িত অভিভাবকদের দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সেশনজট বাড়ছে। চাকরির প্রতিযোগিতায় তাদের সম্ভাবনা কমে আসছে। উপাচার্য ক্যাম্পাসে কম থাকেন বলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাহলে আন্দোলনকারীরা এবং উপাচার্য উভয়েই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করার জন্য দায়ী। অবরোধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল। এত দিন এখানে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হতো। আন্দোলনকারীদের অসহযোগিতার কারণে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন দেশের যে অবস্থা, তাতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা দূর হলেও পরীক্ষা কখন হবে, তা অনিশ্চিত।
হরতাল-অবরোধে সেই সব শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েছে, যারা একটু দূর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে। এ বছর প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি নেই। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি শিক্ষাব্যবস্থাকে সর্বনাশের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নগর পুড়লে দেবালয় যেমন রক্ষা হয় না, তেমনি দেশ ধ্বংস করার মতো কর্মসূচি থাকলে শিক্ষাব্যবস্থাও রক্ষা হয় না। তার পরও আমরা স্বপ্ন দেখি, যারাÿ ক্ষমতাসীন হয়ে জনগণের বুকে শাবল চালায়, যারা রাজনীতির নামে গণবিরোধী কর্মসূচি দিয়ে জীবন বিপন্ন করে, নির্বাচনে যেন সাধারণ মানুষ তাদের বর্জন করে। তাহলেই কেবল বাংলাদেশে ঔদ্ধত্যপূর্ণ রাজনীতি বন্ধ হতে পারে।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Tuesday, February 3, 2015

‘হামার গায়ের আগুনে আলু পুড়ে খায়’ by তুহিন ওয়াদুদ

‘রশিদুলের মাও ভিক (ভিক্ষা) করি খায়। রশিদুলের কাজ-কাম নাই জন্যে আমাক কয়, “তোর গাড়িতে আমাকে হেলপার করি সাথে নে। দুই দিন থাকি খাবার নাই।” সেই জন্যে রশিদুলকে ট্রাকের হেলপার করি নিয়া রংপুর গেইছলাম। রংপুর থাকি ফেরার পথে রাইত দেড়টার সময় দিনাজপুরের কাছে পেট্রলবোমা মারে। সম্পূর্ণ শরীর তার পুড়ে গেছল। তারপর তো মরি গেল। ওকে তো তার মাও-ছাওয়ার কাছে পৌঁছে দিবার পারলাম না।’ শনিবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিছানায় শুয়ে অর্ধদগ্ধ আনিস ড্রাইভার এ কথাগুলো যখন বলছিলেন, তখন তাঁর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর সামনের বিছানায় বিবর্ণ ট্রাক ড্রাইভার মো. রফিকুল ইসলাম। অবরোধ জেনেও কেন গাড়ি চালিয়েছেন? জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, ‘আমার না যেয়ে কোনো উপায়ই ছিল না। আমি মারা গেলেও আমাকে গাড়ি চালানোই লাগত। আমার মেয়ে চট্টগ্রামে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ে। মেয়ের পড়ার টাকার জন্য গাড়ি চালাইতে গিয়ে যদি মারাও যাইতাম, তাও আমরা কোনো দুঃখ নাই।’ এই কথাগুলো বলার সময়ে তাঁরও অগ্নিদগ্ধ গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইজতেমা থেকে আসা এক যাত্রী। তিনি পুড়ে মারা গেছেন। দেশের অচলাবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা তো রাজনীতি করি না। আওয়ামী লীগও না বিএনপিও না। আমরা গরিব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ। আমরা পেটনীতির মধ্যে আছি। সেটাতেও তো শান্তি নাই।’ রিকশাচালক আসাদুল। রংপুরের বদরগঞ্জে বাড়ি। এলাকায় কাজ নেই। পরিবারে ছয় সদস্য। উপায়ন্তর না দেখে রওনা দিয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশে, রিকশা চালানোর জন্য। বগুড়ার কাছাকাছি পথেই আসাদুলের আশা দগ্ধীভূত হয়। এখন চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন আনিস ড্রাইভারের পাশের বেডে। তাঁর পুড়ে যাওয়া শরীরের দিকে তাকানো যায় না। তাঁর চোখে-মুখে হতাশা, বাঁচা-মরার ভীতি। ডানে-বাঁয়ে না ফিরে সোজা হয়ে ধীরে ধীরে অসহায় কণ্ঠে একটু একটু কথা বলতে পারেন। তাঁর পাশে আর একটি বিছানায় আর এক ড্রাইভার। মুখমণ্ডলের সবটুকুই পুড়ে গেছে। মধ্যবয়সী এক নারী তাঁকে সকরুণ কণ্ঠে বলছেন, ‘বাবা কথা কন, কথা কন।’ দগ্ধমুখে বিড়বিড় করে কী যেন বললেন ড্রাইভার। আর একটি বেডে শুয়ে আছেন বাসের হেলপার স্বপন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘রাজনীতি করা নেতারা হামার গায়ের আগুনে আলু পুড়ে খায়।’ সেখানে আরও অনেকেই অবরোধ-হরতালে দগ্ধীভূত হয়ে চিকিৎসাধীন।
শ্রমজীবী মানুষই হচ্ছে বাংলাদেশের মেরুদণ্ড, যাঁরা কোনো দিন কাউকে ঠকাননি। ভূমির মালিক, পোশাক কারখানার মালিক এমনকি রাষ্ট্র পর্যন্ত তাঁদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তবু তাঁরা বলেননি কৃষি উৎপাদনে যাব না, পোশাক উৎপাদন করব না। সোনালি স্বপ্ন বন্যায় ডুবে যায়, শেষ আশ্রয় বন্যায় ভেঙে যায়, নিজেরা পুড়ে যান তাজরীন পোশাক কারখানায়, চাপা পড়ে মারা যান রানা প্লাজায়। হরতাল-অবরোধ দগ্ধীভূত হন। তবু তাঁদের ছুটতেই হয়। অবরোধে গাড়ি ঠিকমতো চলছে না বলে কৃষকেরা রবিশস্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে অবরোধ। আগুনে পুড়ে মরা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। টিভির সামনে বসলে মন বিষণ্ন হয়, পত্রিকার পাতা পাতায় বিষাদের বীজ, কোথাও কোনো আলো নেই। বন্ধুদের আড্ডায়ও শোকসংলাপ। এক বন্ধু মন ভার করে বলছিলেন, ‘পেট ভরে ভালো করে খেলে কেমন যেন একটা অপরাধবোধ কাজ করে। সেই সব শ্রমিক-দিনমজুরের কথা মনে আসে, যাঁরা অবরোধে কাজের সন্ধান করতে পারেননি। তাঁদের স্ত্রী-সন্তানেরা খেতে পেরেছেন কি না কে জানে!’ এই কথা শুনে কয়েক দিন আগে এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথোপকথনের কিছুটা অংশ মনে পড়ে। বৃদ্ধ চাচা বলছিলেন, ‘এই তো বিশ-পঁচিশ বছর আগোত হামরা তিন বেলা খাবার পাই নাই, সন্ধ্যাবেলা বাড়ি বাড়ি বউগুলা কাঁদত, ছাওয়ার খাওয়ার অভাবে।’ বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে—রংপুরের মানুষের ভাগ্য কি আবার ওই পরিণতির দিকে যাচ্ছে? কুড়িগ্রামের এক বৃদ্ধ রিকশাচালক বলছিলেন, ‘সারা দিন খাটলে এক শ-দেড় শ টাকার বেশি কামাই হয় না। লোনের কিস্তি কী দিয়া দেই, চাউল কিনি কী দিয়া। এক ঘণ্টা ধরি বসি আছি, ভাড়া নাই। অবরোধ না থাকতে সারা দিন খাটলে তিন-চার শ টাকা পাওয়া যাইত।’ নিম্নবিত্ত-বিত্তহীনদের মধ্যে এনজিগুলো ক্ষুদ্রঋণের নামে জমজমাট সুদের বাণিজ্য করে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদেরও কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। ব্র্যাকের এক কর্মী বলছিলেন, ‘কিস্তি ওঠানোয় ডিসেম্বরের চেয়ে জানুয়ারির রেজাল্ট খারাপ।’
ব্যবসায়ীদের অবস্থাও করুণ। প্রাইম মেডিকেলের একজন কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীর পার্টটাইম চাকরি চেয়ে অনুরোধ করতে ফোন করেছিলাম। তাঁকে বলছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সৃষ্ট অচলাবস্থায় অনেক শিক্ষার্থীকে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বাড়ি যেতে হয়েছে। যে দুজনের জন্য অনুরোধ করছি, একটা কর্মসংস্থান না হলে তাদেরও লেখাপড়া ছাড়তে হবে। তিনি আমাকে বলছিলেন, ‘দেশের যে অবস্থা, তাতে করে লোক ছাঁটাই করা লাগবে মনে হয়। এভাবে দেশ চলতে থাকলে ব্যবসা চলবে না।’
রংপুর সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী ‘ঈগল আই’-এর মালিক মেরাজুল মোহসিন বলছিলেন, ‘কোনো কোনো দিন কোনো কোনো দোকানে এক টাকাও বিক্রি হয় না। নিজেদের জমানো টাকা ভাঙিয়ে খেতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে।’ দেশের জনজীবন বিপন্ন করার প্রতিবাদে এবং এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করার দাবিতে শান্তিকামী মানুষের সংগঠন ‘জাগো রংপুর’ রংপুর শহরে প্রায় ছয় কিলোমিটার মানববন্ধন করেছে। সংগঠনের সদস্যসচিব চিকিৎসক সৈয়দ মামুনুর রহমান ‘জাগো রংপুর’-এর সভায় বলছিলেন, ‘আমরা সামান্য হলেও রংপুরবাসীর মনে আশার সঞ্চার করতে পেরেছি।’ সভায় অনেকেই বলছিলেন দেশব্যাপী এ রকম কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।
অবরোধ আহ্বানকারীর বাসার প্রধান ফটক পার হতে পারেননি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দূর থেকে তাঁর কাছে সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা কি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব? যাঁরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মানুষ মারার ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠেছেন, তাঁরা ক্ষমতাসীন হলে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন—এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে বিপর্যস্ত জনজীবন, তার দায় নিতে হবে উভয় জোটকেই।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com