Wednesday, October 18, 2023

পাইলস রোগে ইউনানি চিকিৎসা by ডা: মো: শাহজালাল চৌধুরী

রিয়াজ, একজন ছাত্র। বয়স ২০ বছর। বিগত তিন থেকে চার বছর সে পেটের আমাশয় রোগের পাশপাশি, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া সমস্যায় ভুগছিলেন, তারপর বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে চিকিৎসক তার রোগের উপসর্গ ইতিহাস শুনে এবং দৈহিক পরীক্ষা করে জানালেন- তার দ্বিতীয় পর্যায়ের পাইলস বা হেমোরয়েড হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক তাকে মুখে খাওয়ার কিছু পাইলসের ওষুধ দিলেন এবং পায়ুপথে লাগানোর একটা মলম দিলেন। এতে তিনি রোগের কিছুটা উন্নতি পেলেও পুরোপুরি সেরে উঠলেন না। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ইউনানি চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।
চিকিৎসকের পরার্মশক্রমে প্রায় দুই থেকে তিন মাস হামদর্দের এ সমস্যার চিকিৎসা গ্রহণ করলেন। তারপর থেকে তার রক্তবিহীন স্বাভাবিক পায়খানা হয় এবং পায়ুমুখে বাহ্যিক আর কোনো ফুলাও অনুভূত হয় না। রিয়াজের মতো বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৫০ বছরের নিচে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে পাইলসের উপসর্গ বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়।
হেমোরয়েড় সাধারণত পায়ুপথে ত্বকের নিচের ও মলাশয়ের ভেতরে এক ধরনের রক্তজালিকা। যখন পায়ুপথের এসব শিরার সংক্রমণ এবং প্রদাহ হয়, চাপ পড়ে, তখন হেমোরয়েড বা পাইলস সৃষ্টি হয়। সাধারণ কথায় যাকে অর্শ রোগ বলা হয়। আর ইউনানি পরিভাষায় বাওয়াসির বলে।
বাওয়াসির বা হেমোরয়েড বা অর্শ রোগের অবস্থান সাধারণত দুই ধরনের যথা-
* পায়ুপথের বহিঃ অর্শ রোগ।
** পায়ুপথের অন্তঃ বা ভেতরের অর্শ রোগ।
*** আবার কখনো দুটো প্রকার বা অবস্থা একসাথেও থাকতে পারে।

পায়ুপথের ভেতরের অর্শ রোগ বা হেমোরয়েড ফুলে পায়ুমুখের বাইরে বের হয়ে আসার ডিগ্রির ভিত্তিতে চারটি পর্যায় বিভক্ত যথা :
প্রথম পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে না, প্রলেপস হয় না)। দ্বিতীয় পর্যায়, (পায়খানার পর হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে এবং তারপর আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যায়)। তৃতীয় পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে এবং নিজে ঠিক করতে হয়। চতুর্থ পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে বা প্রলেপস হয়ে এবং তা আর নিজে ঠিক করা যায় না)
পাইলসের (বাওয়াসির) প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- দীর্ঘ দিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা, ক্রনিক ডায়রিয়া, মলত্যাগে দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা। এ ছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, আশযুক্ত খাবার কম খাওয়া, ভারী মালপত্র বহন করা, স্থূলতা, কায়িক শ্রম কম করা, গর্ভকালীন পায়ুপথে যৌনক্রিয়া, যকৃত রোগ বা লিভার সিরোসিস ইত্যাদি কারণে রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সর্বোপরি পোর্টলি ভেনাস সিস্টেমে কোনো ভাল্ব না থাকায় উপরিউক্ত যেকোনো কারণে পায়ু অঞ্চলে শিরাগুলোতে চাপ পড়ে, ফলে হেমোরয়েড সৃষ্টি হয়।
অর্শ রোগে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হচ্ছে- পায়ুপথের অন্তঃ বা ভেতরের অর্শ রোগে সাধারণত তেমন কোনো ব্যথা বেদনা, অস্বস্তি থাকে না। অন্যদিকে পায়ুপথের বহিঃ অর্শ রোগে- পায়ুপথ চুলকায়, বসলে ব্যথা করে, পায়খানার সাথে টকটকে লাল রক্ত দেখা যায় বা শৌচ করা টিস্যুতে তাজা রক্ত লেগে থাকে, মলত্যাগে ব্যথা লাগা, পায়ুর চারপাশে এক বা একের অধিক থোকা থোকা ফোলা থাকে।
চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করে ও রোগীর উপসর্গ শুনেই অর্শ রোগ শনাক্ত করতে পারবে। এ ছাড়া পায়ুনালীর সমস্যাগুলো খুব খারাপ কি না বা অন্য কোনো রোগ আছে কি না তা জানতে অ্যানোস্কপি বা সিগময়ডস্কপি বা কলোনস্কপি পরীক্ষা, মলের লুকায়িত রক্ত নির্ণয় পরীক্ষা (ওবিটি), মলের আণুবীক্ষণিক পরীক্ষা করাতে পারেন।
একটা কথা আমরা সবাই জানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম, অর্শ রোগ যেহেতু জীবনধারা ও খাদ্যাভাসের সাথে অনেকাংশে জড়িত। তাই শৃঙ্খলিত জীবন যাপনই রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় তথা প্রথম মাধ্যম। তাই নিয়ম করে অতিরিক্ত কোথ না দিয়ে সাবলীলভাবে মলত্যাগ করা, যেগুলো ফল খোসাসহ খাওয়া যায়, তা খোসাসহ খাওয়া। আশযুক্ত খাবার শাকসবজি বেশি খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত ব্যয়াম করা, লাল গোশত পরিহার করুন, প্রাথমিক অবস্থায় উষ্ণ পানি এবং ক্রনিক বা রোগ পুরনো হলে শীতল পানিতে নিতম্ব স্নান করতে পারেন।
অর্শ রোগ প্রতিকারের আগে মূল লক্ষ্য হবে অর্শ রোগ হওয়ার মূল কারণগুলো শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা। অর্শ রোগ প্রতিকারে যেসব ভেষজ উপাদান কার্যকর তা হচ্ছে- বাসক, থানকুনি, আমলকী, হরিতকি, মেহেদি পাতা, ইসবগুল, নিমপাতা ও নিমতেল, ভাংপাতা, মুকিল, জিংগবিলোবা।
অর্শ রোগকে রোগের ধরনভেদে চারটি ডিগ্রিতে ভাগ করে এর পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় ডিগ্রির সাধারণত ওষুধ দিয়ে সারে। রক্তপাতযুক্ত অর্শ রোগে বাসক পাতার রস ১ চামচ করে দিনে তিনবার সেবন করুন।
অথবা হরিতকি ওই এক চামচ পরিমাণ দৈনিক একবার গরম পানিসহ সেবন করুন।
সাতটি নিমফুল বা নিম বীজের মজ্জা পানিসহ সকালে সেবন করুন। ইসবগুল এক চামচ পরিমাণ পানিসহ রাতে সেবন করুন। আর ইসবগুল, নিমপাতা ও নিমতেল, মুকিল এ-জাতীয় বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি ইউনানি ওষুধ ট্যাবলেট টোনালেক্স, হ্যানরয়েড, হ্যানরয়েড বি, কবি, মুকিল, মাজুন ওশবা, সফুফ ইন্দেমালি, ট্যাবলেট পিবলিউ (বন্দিশ খুন) হামদর্দের ক্লিনিকগুলো থেকে চিকিৎসকের পরার্মশ মতো খেতে পারেন। এ ছাড়া অর্শ রোগ যদি ভেষজ ওষুধ যা অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ও প্রতিরোধ চিকিৎসায় না সারে, তাহলে একজন কলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ মতো চিকিৎসা নিতে পারেন। যদি এ রোগ ডায়াগনোসিস না করানো হয় বা চিকিৎসা না নেয়া হয়, তাহলে দেহ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে, পায়ুপথে ক্যান্সার হতে পারে।
তাই আসুন, আমরা প্রাকৃতিকভাবে অর্শ রোগ প্রতিরোধ করে, চিকিৎসা নেই, অর্শ রোগজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দূর করি। এতে অর্শ রোগজনিত অস্ত্রোপচার/সার্জিক্যাল/শল্য চিকিৎসা বা খরচ যেমন অনেক কমবে, তেমনি আমাদের জীবন হবে সুস্থ, সুন্দর ও আনন্দময়।
>>>লেখক : লেকচারার, কমিউনিটি মেডিসিন, হাকিম সাঈদ ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, নিমতলী, ঢাকা। ফোন : ০১৬৭৮৭৬৪৬৬০

Friday, October 13, 2023

গল্প- অন্ত্যজা by শাশ্বত নিপ্পন

এ অঞ্চলে নদী বলতে এই একটিই। নাম মৌরি। নামটা অনেকটা পাহাড়ী নদীর মত। যদিও মৌরি নদী জড়িয়ে আছে পাঁচ গ্রামকে, তারপরও মৌরি পাড়ের মানুষ বলতে বুঝায় মনোহরপুর বাজার আর কামদেবপুর গ্রামের পাশ ঘেসে মৌরি যেখানে বাঁক নিয়েছে নিজস্ব ঢংঙে ঠিক তার পূর্ব পার্শে মাইল খানেক উচু জায়গায় গড়ে ওঠা বেশ্যা পল্লীটিতে যারা বসবাস করে তাদেরকে। এক সময়ের দোর্দন্ড প্রতাপ মৌরির বাঁকের মুখে কবে এই পতিতা পল্লীর জন্ম -এ নিয়ে এ অঞ্চলের কারো ভাবনা নেই। তবে পরিচিতির কমতি নেই। এই পাড়ায় দূর দুরান্ত থেকে খদ্দের আসে যন্ত্রচালিত নৌকা ভাড়া করে। সন্ধ্যায় আসে সকালে চলে যায়, আবার দুই একদিন থেকেও যায় কখনো কখনো। তাই মৌরি এখানকার মানুষের নির্ভরতার অনেকখানি। এরা মৌরি জলে স্নান সেরে পবিত্র হয়, মৌরির জলেই বাঁচে, আবার ভেসেও যায়। বর্ষার মুখে মৌরির যৌবন আসতে শুরু করে। আষাঢ়ের শুরতে মৌরির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালে মনে হয় নদীটি কেমন যেন দুলছে। বৃষ্টির চাপ বাড়ার সাথে সাথে নদীও হিংস্র হয়ে উঠতে থাকে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। পরিণত খরিস সাপের মত ফনা দোলাতে থাকে। সারা বছরের অবজ্ঞার প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ হয়ে ওঠে। পাঁচ গ্রাম ধোয়া ঘোলা জলে ঘুর্ণি খেলতে শুরু করে। সেই ঘুর্ণিতে দূর থেকে ভেসে আসে মরা পেট ফোলা গরু, ছাগল, ঘরের টিন, ঘুমানোর চৌকি আবার মানুষের লাশ -যার চোখ খেয়েছে মাছে। পেট ফোলা লাশের উপর নিশ্চুপ বসে থাকে কাক। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মৌরির ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে থাকে। এ সময় বেশ্যা পাড়ার রোগা ডিগডিগে কালো কালো ছেলেদের সামান্যতম বেয়াদবী, দুষ্টুমি অথবা ছেলেমানুষী মৌরি সহ্য করেনা। ভেসে আসা অভিশপ্ত টিন অথবা চৌকিতে প্রলুব্ধ হয়ে বেশ্যা পাড়ার অভাবী মানুষগুলো ঘোলা জলে ঝাপ দিলেই মৌরি আবার তার জলে ঘুর্ণি তোলে। একটানে তাকে নিয়ে যায় বহুদূর। যেখানে বেশ্যাপাড়ার নিত্যদিনের হিসেব নিকেষ, হাহাকার আর বেবুশ্যেদের চিৎকার অথবা হা-হুতাশ পৌঁছেনা। এভাবে বহু প্রাণ ভেসে গেছে আজ অবধি। তবু লোভ যায়না অভাবি মানুষগুলোর। চৌকিতে শোয়ার লোভ সামলাতে পারেনা এখানকার মানুষগুলো। প্রিয়জনকে নদীর পাড়ে অপেক্ষায় রেখে ওরা ভেসে যায় নদীর জলে। শোকের তুফান ওঠে বেশ্যাপাড়ায়। বুক চাপড়ে প্রলাপ করতে থাকে আরতি, পূর্ণিমা, রেবতিরা। সেই শোকে সংক্রামিত হয় শাবানা, অলিভিয়া, ববিতাদের মাঝেও। এ সবই নিজেদের রাখা নাম। এরা নিজে নিজেই নিজের নাম রাখে অথবা খালা দিয়ে দেয় একটা বাহারী নাম; অথবা খদ্দেরে। খদ্দেরের পছন্দ মোতাবেক বেশ্যারা কেউ হিন্দু অথবা মুসলমান হয়। মৌরির জলে যেদিন কেউ ভেসে যায় সেদিন আর হাঁড়ি চড়েনা বেশ্যাপাড়ার হেঁসেলে। পিতৃ পরিচয়হীন শিশুর শোকে নামহীন গোত্রহীন বেশ্যারা সেদিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়। সবাই সেদিন একত্র হয় হরেন মাস্টারের ঘরে। হরেন মাস্টার এদের ভগবান, এদের আল্লাহ, এদের প্রাণ। পাড়ার সকলেই মাস্টারকে মান্য করে। নতুন পুরাতন সব মেয়েমানুষ তাকে পথে দেখলে পথ ছেড়ে দেয়। হরেন মাস্টারের কি জাত তা এরা জানে না- এ নিয়ে এদের মাথাব্যথাও নাই কারো। শুধু বেশ্যাগুলো জানে হরেন মাষ্টার ওদের এক ধরণের আশ্রয়। সামান্যতেই এদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। চুল ছেড়াছিড়ি ঝগড়া; খিস্তি-খেউর। খদ্দেরের ফেলে যাওয়া বাংলা বোতলের তলানিটুকু গিলে এক ঘরের মাগী অন্য ঘরের মেয়েছেলের উপর চড়াও হয়। এও ছাড়ার পাত্র নয়; একজন অন্যজনকে ‘খানকি’‘বেশ্যা’ বলে গালাগাল দেয়। বাড়াবাড়ির রূপ নিলেই গলা খেঁকরে বেরিয়ে আসে হরেন মাস্টার। গম্ভীর গলা বলে ওঠে,
– যাও, অনেক হয়েছে, এখন শান্ত হও।
জোঁকের মুখে নুনের ছিটে যেন। কুঁকড়ে যায় দু’পক্ষ। তারপর দু’জনেই ফিরে যায় দু’জনের ঘরে।
অদ্ভুত রহস্যময় এই মানুষটি। সুন্দর সুপুরুষ এই মানুষটিকে সহজেই এখানকার মানুষগুলোর মধ্য থেকে আলাদা করা যায়। বর্তমানে সে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত নয়; অতীতেও ছিল কিনা জানেনা কেউ- তবু তিনি মাস্টার। এই নিষিদ্ধ পাড়ার পিতৃ পরিচয়হীন শিশুগুলোকে কলা-পাউরুটির লোভ দেখিয়ে নিজের ঘরের মেঝেতে পড়তে বসায় হরেন মাস্টার। নিজের অন্যান্য খরচ বাঁচিয়ে সস্তা পেনসিল, কাগজ, স্লেট আর পাউরুটি নিজের পয়সাতেই শহর থেকে কিনে আনে সে। শিশুরা দুলে দুলে সুর করে পড়তে থাকে। পড়তে পড়তে ভুল হলে হাত পাখার লাঠি দিয়ে সেই ভুল শুধরে দেয় হরেন মাস্টার। কখনো কোন চিঠি পত্র উড়ে পাড়ায় এসে পড়লে হরেন মাস্টারই তা পড়ে দেয়। বেশ্যাদের টাকা কড়ির হিসাবও হরেন মাস্টার রাখে সারা বছর। পড়া শেষে সব ছেলেগুলোকে কাছে বসিয়ে নিজেই খাওয়ায় হরেন মাস্টার আর বলে,
– খা, খা, খেয়ে জোয়ান হয়ে ওঠ তো দেখি তাড়াতাড়ি; মস্ত বড় বিদ্যান হবি একদিন, তখন এই মাস্টার দাদুকে একটা লজেন্স কিনে দিস। ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে আদরের ফুলি তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়,
– তখন তো তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, তোমার দাঁত পড়ে যাবে, চকলেট খাবা কি করে?
খিলখিল করে হেসে ওঠে শিশুগুলো। সে হাসিতে হরেন মাস্টারও যোগ দেয়। তখন অন্য গ্রামের ভদ্র পাড়ার মত সুন্দর হয়ে ওঠে মৌরি নদীর পাড়ের বেশ্যা পাড়াটা। সারা রাতের ধকল সহ্য করা ক্লান্ত বেশ্যাগুলো দুর থেকে এই পবিত্র দৃশ্য দেখে। তাদের সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চোখে চকিতে একচিলতে স্বপ্ন খেলে যায়। হরেন মাস্টারের প্রতি ওদের শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা বাড়ে।
ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মেয়ে শিশুর সংখ্যায় বেশি। এ পাড়ায় মেয়ে জন্মায় বেশি। আর মেয়ে জন্মালেই এ পাড়ার খালা/ মাসী খুশি হয়। বাঁচলে এরাই হবে পাড়ার লক্ষি। ছেলে হলে খুশি যে একেবারে হয় না তাও ঠিক না। ছেলে বড় হলে মাস্তান হবে। চুরি করবে; পুলিশে ধরবে; হাজত খাটবে; বের হবে আবার। এক সময় খুনের মামলায় পড়িয়ে পড়বে; অবশেষে দাগী আসামী হয়ে কোন মাগীর ঘরে লুকিয়ে চুরি করে বাংলা মদ, গাঁজা বিক্রি করবে। তারপর এক সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়বে। জেলে যাবে বড় সময়ের জন্য অথবা ক্রসফায়ার। আর মেয়েগুলো পাড়াতেই থাকে। বড় হয়ে ওঠে কলাগাছের মত। তারপর একদিন সন্ধ্যায় গন্ধ তেলে চুল ভিজিয়ে, টাইট ব্লাউজ আর রঙিন সায়া পরে দাঁড়িয়ে থাকে তার মায়ের ঘরের সামনে। এটাই যেন নিয়ম এখানকার। এর ব্যতিক্রম নেই। শুধু ব্যতিক্রম ঘটেছিল ফুলির জন্মের সময়। শেফালী যে পোয়াতী ছিল তা পাড়ার মেয়েছেলেরা ভালো করে জানতো না। যেদিন শেফালী পাড়া কাঁপিয়ে ‘ওয়াক’ করতে লাগল, তখন সবাই তার দিকে তাকালেও তেমন গায়ে মাখলো না কেউ, …… এ দৃশ্য পাড়ায় নতুন না। তারপরও ছুটে এসেছিল খালা। এক বালতি জল এনে চোখে মুখে জলের ছিটে মেরে মমতাময়ী হয়ে বলেছিল, – প্রথম তো; এ সময় এমন হয়; চিন্তা করিসনি; মেটার্নীতে গিয়ে ঠিক করে দেব।
অন্যরা বলেছিল,
– খালা সোহাগি মাগীর ছিনালী; আবার মেটার্নী হাসপাতাল! কতই আর দেখবো লো; এখনই ছমিরন ধাইকে খবর দিলেই হয় ; হাত ভরে দিয়ে টেনে আনবে আপদ।
খিলখিল করে হেসে উঠেছিল উপস্থিত সবে। শুধু হাসেনি হরেন মাস্টার। উতলা হয়ে অযথা দৌড়ে বেড়িয়েছে সারা পাড়া। আর মাঝে মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে শেফালীর ঘরে। আস্তে ধীরে সব অস্থিরতা থেমে আসে। শুধু স্থিরতা আসে না খালা আর শেফালীর বুকে। শেফালী দেখতে শুনতে ভাল। ভদ্র বাড়ীর মেয়েদের মত দেখায়। পাড়াতে তার দামও কিছুটা বেশী। থানার বাবুরা মাঝ রাতে এলে শেফালীকেই খোঁজে। তাই খালা তাকে লক্ষিজ্ঞান করে -আর সে কারণেই শেফালী অন্যদের চক্ষুসুল। তাই শেফালীর অবস্থা যত তাড়াতাড়ি মেটানো সম্ভব হবে ততই খালার ব্যবসার জন্য ভাল। আর এজন্যই মেটার্নীর ব্যবস্থা। হরেন মাস্টার নির্বাক। কেবল প্রতিবাদ করেছিল শেফালী। ও বলল,
– আমি হাসপাতালে যাব না; ছমিরণ দাইকে মাছ কাটা বটি দিয়ে ফালা ফালা করে ফেলব আমি। খালা বলল,
– তোর ও পাপ তুই কতদিন বইবি?
– ও পাপ না-বিধাতার অমোঘ লিখন-আশীর্বাদ; না হলে ও বেশ্যার পেটে আসবে কেন? তীক্ষè গলায় উত্তর করে শেফালী।
তারপর অনেক কথা জল্পনা-কল্পনা শেষ করে শেফালী একদিন সাধ খেল পাড়ার এক বেশ্যার ঘরে। অবশ্য এর ব্যবস্থা হরেন মাস্টারই করেছিল। সাধ খেতে বসে মাস্টার যখন শেফালীকে একটা নতুন কাপড় দিয়ে আশীর্বাদ করতে গেল, শেফালী তখন বলল,
– আশীর্বাদ কর মাস্টার, আমার যেন জুঁই ফুলের মত সাদা ধবধবে একটা মেয়ে হয়।
শুনেই সবাই দাঁতে জিব কেটেছিল। একে পাপ তারপর আবার মেয়ে -এ তুই কি বলছিস শেফালী? রেবতির প্রশ্নে ফুঁসে উঠেছে শেফালী,
– এ পাপ না; মুখ সামলে কথা বলবি তোরা।
শেফালীর রুদ্র মুর্তির সামনে রেবতি যেন চুপসে গিয়েছিল সে সময়।
তারপর সামনের বর্ষার শুরুতে এক রাতে যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠল শেফালী। দিশে না পেয়ে খালা দৌড়ে গিয়ে মাস্টারকেই ডাকতে লাগল,
– মাস্টার, ও মাস্টার একবার এদিকে এস দিকিনি, শেফালীর যে ব্যথ্যা উঠেছে …
শুনেই লাফ দিয়ে মাস্টার। তারপর পড়িমরি করে ছুটে আসে শেফালীর ঘরের দিকে। ছমিরণ দাইকেও ডাকা হলো। একজন একজন করে অন্যরাও এসে হাজির হল শেফালী ঘরের। শেষ রাতের দিকে যমে মানুষে টানাটানি শেষে শেফালী শান্ত হলো। মুহূর্তে সে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল মৌরি পাড়ার বেশ্যা পাড়ার কোনে কোনে। হঠাৎ একটা মহা খুশির রোল পড়ে গেল সবার মাঝে। একটি মেয়ে শিশুকে সাহসের সাথে জন্ম দেওয়ার আনন্দে আজ সকলেই আনন্দিত। শেফালীর যে চরম শত্রু ছিল সে ছুটে এসে সদ্যজাতকে কোলে নিয়ে আনন্দে চিৎকার করতে লাগল,
– ওরে দেখে যা আমাদের কি টুকটুকে একটা মেয়ে হয়েছে; ও মাস্টার একটা নাম রাখ দিকিনি আমাদের মেয়ের।
ঘরের সামনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ সবকিছু দেখছিল মাস্টার। রেবতির কথায় চেতন ফিরে পেল হরেন মাস্টার। মিন মিন করে জিজ্ঞেস করল,
– শেফালী কেমন আছে? ভাল তো?
ছমিরণ ধাই জবাব দেয়,
– চিন্তা করো না মাস্টার, ও মাগী ভালই আছে।
– ফুলের মত মেয়ের নাম তাহলে ফুলকুমারী থাক; ছোট করলে দাঁড়ায় ফুলি। সেদিন থেকে ফুলি সবার মেয়ে হয়ে গেল। পিতৃপরিচয়হীন বেশ্যার মেয়ে ফুলি আর পাঁচটা মেয়ের মত সকলের মেয়ে হয়ে বাড়তে লাগল মৌরি পাড়ের বেশ্যা পাড়ায়।
গোল বাধল ফুলির বয়স যখন আট মাস। তখন ফুলি হাসতে শিখেছে; অল্প অল্প হামাও দেয়। আর দিনের বেশি সময় হরেন মাস্টারের কাঁধে কাঁধে থাকে তখন। একদিন সকালে সামান্য কারণে যথারীতি বেধে যায় তুমুল ঝগড়া। ঝগড়ার এক ফাঁকে খালা বলেই দেয়,
– তোর দেমাগ আমি শেষ করে দেব। তুই কার পাপ জন্ম দিয়েছিস আমি জানিনা ভেবেছিস, কচি খুকি পেয়েছিস; ছি! ওরকম মানুষটার সাথে শুতে তোর লজ্জাও করল না; তোর কি নরকেরও ভয় নেই লো মাগী?
শেফালী চিৎকারা করে কিছু বলতে গিয়েও যেন বলতে পারল না শেষ পর্যন্ত। তারপরও খালা চালিয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ তারপর আস্তে ধীরে সেদিনকার মত সব শান্ত হয়ে আসে। সূর্য ডুবল আবার মৌরি পাড়ের বেশ্যা পাড়া জীবন ফিরে পায়। গন্ধ তেলে চুল ভিজিয়ে বেশ্যাগুলো খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। লঘু তামাশায় হাসির বন্যা বয়। কেউ কেউ সস্তা গানও গায়। শুধু শেফালীর ঘরে লন্ঠন জ্বলে না; শেফালী আজ চুল বাঁধেনি। শুধু বিকেল বেলা হরেন মাস্টারের কোলে ফুলিকে দিয়ে সে চলে আসে। আর কোন হদিস মেলেনি এ পর্যন্ত। যখন শেফালীর হদিস মিলল তখন, তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। বিষক্রিয়ায় তার মুখ কালচে হয়ে গেছে। ঠোঁটের কোনে জমে থাকা ফেনা শুকিয়ে গেছে। কোথা থেকে যে শেফালী বিষ জোগাড় করল তা আজো রহস্য। শেফালীর মৃত্যু সমস্ত পাড়াকে স্তব্ধ করে দেয়। শেফালীর এই মৃত্যু সংবাদের বিষে পাড়াটা যেন নীল হয়ে পড়ে। পাগলের মত কাঁদতে লাগল ববিতা, আরতি, পূর্ণিমা, শাবানারা। এমনকি পাষাণ হৃদয় খালাও শেফালীর লাশের পরে আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদেছে দীর্ঘক্ষণ। শুধু নির্বাক ছিল হরেন মাস্টার। শুধু শেফালীর মাথার কাছে বসে এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর থেকে একটি একটি করে সরিয়ে দিচ্ছিল ও। আর বিড় বিড় করে বলছিল,
– এ কি করলি গো তুই’ নিজে পালিয়ে গেলি অভিমানী’।
এক পর্যায়ে ছমিরণ ধাই বলে ওঠে,
– উঠ মাস্টার, এখন অনেক কাজ!
এখন যে অনেক কাজ তা মাস্টারের অজানা নয়। বেশ্যা পাড়ায় কোন অপঘাত মৃত্যুতে পুলিশী ঝামেলা নেই। সমাজপতিরনা এদেরকে পতিতা করেছে। এখানে কেই মরলে শ্মশানে তাদের যাওয়ার অধিকার নেই আবার কবরস্থানেও তাদের জায়গা হয় না। কারণ এদের জাতের ঠিক নেই। অবশ্য এসব নিয়ম এ পাঁচ গ্রামের সমাজপতিদের তৈরী করা। কিন্তু তারা গোপনে এখানে আসেন। নানা ছুতোতে তারা ওদের ঘরে ঢোকে। বেশ্যাগুলোর শরীর হাতরায়। কখনো কখনো এদের শরীরের মধ্যে ডুব দিয়ে আকন্ঠ পান করে নর্দমার নোংরা সুস্বাদু সুধা। কিন্তু এসব ঘরে অন্ধকারে। দিনের আলোতে এদের সাথে কথা বললে সমাজপতিদের মান যায়। তাই এরা মরলে লাশের স্থান হয় মৌরির বুকে। যথাসম্ভব রীতিনীতি মেনে লাশের বুকে একটা ভারি কিছু বেঁধে হরেন মাস্টার
কাঁধে নিয়ে মৌরির দিকে এগুতে থাকে; পিছনে শোকস্তব্ধ একদল নামহীন জাতহীন, গোত্রহীন বেশ্যা আর ফুলকুমারী। মৌরির পাড়ে দাঁড়িয়ে ওরা সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করে, যিনি ওদের সৃষ্টি করেছেন, ওদের বেশ্যা বানিয়েছেন। তারপর ওরা মৌরি নদীকে ওদের ভক্তি নিবেদন করে, যে নদী এই বেশ্যা পাড়ার জীবন প্রবাহকে বাঁচিয়ে রাখে তারপরও শেফালীকে শুইয়ে দেওয়া হয় মৌরির জলে। মুহূর্তে শেফালী তলিয়ে যেতে থাকে। পা হাত বুক মাথা এক সময় চুলও। এক অন্ধকার জীবনে তলিয়ে যাওয়া শেফালী আর এক অন্ধকারে হারিয়ে যায় মুহূর্তেই। এক এক করে সবাই ফিরে আসে নিজেদের কুঁড়েতে। শুধু হরেন মাস্টার মৌরির পাড়ে বসে থাকে ফুলিকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্বাক।
এসব পুরনো কথা। সবাই ভুলেছে। বেশ্যাদের এত অনুভূতিপ্রবণ হলে চলেনা। কিন্তু ফুলি বড় হয়েছে এখন। ফুলির সাথে যারা কলা পাউরুটির লোভে হরেন মাস্টারের ঘরে যায় তারা এখনো পর্যন্ত শুধু যায়-ই। ফুলিই ব্যতিক্রম। এখন ফুলি বেশ ক’টি ইংরেজী ছড়া পড়তে পারে; ছোট ছোট হিসেব কষতে পারে। চিঠি লিখতে ও পড়তে শিখেছে সে ইতিমধ্যে। এমনকি ওর খালা/মাসীদের যৌন রোগের ঔষধের খোসাগুলো পড়ে দেয় মাঝে মধ্যে। ফুলি পাড়ার আশা-আকাঙ্খার সলতে। আজ হরেন মাস্টার সবাইকে তার ঘরে ডেকেছেন। সকলেই হাজির হয়েছে এই পড়ন্ত বেলায়। তবে কিছু নতুন মেয়ে আসেনি এখনো। পাড়ায় কিছু নতুন মেয়েও এসেছে এখন; তাদের কাছে হরেন মাস্টার বুড়ো বৈ আর কিছুই নয়। তবুও অনেকেই তাকে মানতে বাধ্য হয়। খানিক পর হরেন মাস্টার ফুলিকে কাঁধে নিয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়ায়। অবিকল আগের মত ফুলি মাস্টারের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। অনেকেই সেই পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে আর চোখ ভিজেক উঠল নিজেদের অজান্তে। এর মাঝে হরেন মাস্টার বলে উঠল,
– তোমরা সবাই আসাতে আমি খুশি; আজ একটা বিশেষ কারণে তোমাদেরকে এখানে ডেকেছি;
ছমিরণ ধাই এখন কানে শোনে না ভাল। সেও একটু এগিয়ে আসে। মাস্টার বলে চলে,
– ফুলি আজ পড়তে লিখতে শিখেছে; ও তোমাদের সন্তান; তোমরা সবাই ওর মা।
‘মা’ কথাটা শুনেই পুর্ণিমা, শাবানা আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে নেয়। মাস্টার বলে,
– আগামী কাল ফুলিকে উজ্জ্বলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে যাব। সবই মুখ চাওয়া-চায়ি করে। এ পাড়ার কেউ স্কুলে ভর্তি হওয়া, এমনকি পড়া লেখা করার কথা কল্পনা করাও গতকাল পর্যন্ত পাপ ছিল। আজ এই আনন্দ সংবাদে মৌরি পাড়ের বেশ্যারা হু হু করে কেঁদে ওঠে। আনন্দে বিস্ময়ে। হরেন মাস্টার বলে,
– তোমরা সকলেই ফুলির মা, ফুলি তোমাদের সন্তান; পরীক্ষায় পাশ করলেই সে স্কুলে ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তোমরা সকলেই তোমাদের সন্তানের জন্য প্রার্থনা কর;
কথা শেষ করে হরেন মাস্টার ফুলিকে নামিয়ে চোখের জল আড়াল করতে দ্রুত ঘরে চলে যায়। রেবতি দৌড়ে এসে ফুলিকে কোলে নিয়ে কাঁদতে থাকে। কাঁদছে সবাই, আবার হাঁসছেও সবাই। কান্না-হাসির দোলায় দুলছে মৌরি পাড়ের বেশাপাড়া। এর মধ্যে সুর্য পশ্চিমে ডুব দেয়।
পরদিন বেশ্যা পাড়ায় সকালটা হল একটু অন্য রকমের । সকলেই মৌরির জলে ¯œান সেরে নিজেকে পবিত্র করেছে। সারিবদ্ধ ভাবে জড় হয়ে মৌরির পাড়ে প্রতিক্ষা করছে তারা কখন হরেন মাস্টার ফুলিকে নিয়ে নৌকায় উঠবে। বলতে বলতে মাষ্টার আর ফুলিকে আসতে দেখা যায়। আজ ফুলি হেঁটে আসছে; ফুলির পিছনে ওর এ পাড়ার বন্ধুরা; খালি গায়ে; খালি পায়ে। হরেন মাস্টার নৌকায় পা দেওয়ার আগে বলল,
– তোমরা ফুলিকে আদর করে দাও; ও যেন পরীক্ষায় ভাল করে।
রেবতি, পূর্ণিমা, শাবানা সকলেই ফুলির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, আঁচলে চোখ মুছল। মাাস্টার বলল,
– মাঝি নৌকা ছাড়, বেলা বাড়ছে।
মাঝি নৌকার দাড়ি তুলে নেয়। মৌরির ঢেউ কেটে নৌকা এগিয়ে চলে উজ্বলপুরের দিকে। এ পাড়ের বেশ্যাগুলো মানুষ সেজে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের পিতৃপরিচয়হীন এক দঙ্গল কঙ্কালসার ছেলেমেয়েদের নিয়ে। নৌকার উপর দাঁড়িয়ে ওদের আশা-আকাঙ্খার সলতে ফুলি, ওদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে। সকালের আলো এসে পড়েছে মাস্টার আর ফুলির মুখে। সেই চকচকে আলোয় ফুলির মুক্তা দানার মত মুখটা অবিকল ওপারের ভদ্র মানুষের বাচ্চার মত দেখাচ্ছে।

আপনার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে? তার স্বাস্থ্য বৃদ্ধির জন্য আপনি যা খাওয়াবেন

বাংলাদেশের মা ও শিশু
কলা, ছোলা আর চিনাবাদাম দিয়ে তৈরি খাবার অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে বলে এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে চালানো এক মার্কিন গবেষণায় জানা যাচ্ছে, এসব খাদ্য শিশুদের পাকস্থলীতে স্বাস্থ্যবর্ধক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
শিশুর হাড়, মস্তিষ্ক এবং শারীরিক বিকাশে এই খাবারগুলো খুবই কার্যকর বলে গবেষকরা জানতে পেরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিবিআর-এর বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণা চালান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সারা বিশ্বে ১৫ কোটি শিশু এখন অপুষ্টিতে ভুগছে।
এসব শিশু যেমন শারীরিকভাবে দুর্বল হয়, আকারে ছোট হয়, তেমনি এদের পাকস্থলীতে যে স্বাস্থ্যবর্ধক 'ভাল' ব্যাকটেরিয়া থাকে তাদের সংখ্যাও থাকে কম।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, দেহের দুর্বলতার জন্যও এসব ব্যাকটেরিয়ার অভাব অনেকাংশে দায়ী।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের সুস্থ শিশুদের পাকস্থালীতে যেসব প্রধান ব্যাকটেরিয়া থাকে তার পরীক্ষা করেন।
এরপর ইঁদুর এবং শূকরের ওপর পরীক্ষা করে দেখেন যে কোন্ ধরনের খাবার দিলে এসব ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
এরপর এক মাসব্যাপী এক পরীক্ষায় অপুষ্টিতে ভোগা ৬৮টি বাংলাদেশী শিশুকে বিভিন্ন ধরনের ডায়েট খেতে দেন।
শিশুদের অপুষ্টি কেটে গেলে তারা দেখেন এক ধরনের ডায়েট তাদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী।
আর তা হলো কলা, সয়া, চিনাবাদামের গুড়া আর ছোলার গুড়ান তৈরি বিশেষ মিশ্রণ।
এই খাদ্য ব্যবহারে শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বেড়ে যায় বলে গবেষণার ফলাফলে জানা যায়।
পাকস্থলীর ভাল ব্যাকটেরিয়াগুলিকে মাইক্রোবাইওম নামে ডাকা হয়।

Tuesday, October 10, 2023

টমেটোর এতো গুণ!

টমেটো আমাদের কাছে একটি সুস্বাদু সবজি হিসেবে পরিচিত। টমেটোকে বলা হয় গরিবের আপেল। এটা শুধু কথার কথা না কি সত্যিই এটি একটি মূল্যবান সবজি, তা উঠে আসল গবেষণায়। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, বেশি পরিমানে টমেটো খাওয়া আপনার লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে, যেই ক্যান্সার সাধারণত অধিক চর্বি জাতিয় খাবার গ্রহণ থেকে ঘটে থাকে। ‘ক্যান্সার প্রিভেনশন রিসার্চ’ জার্নালে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
ইদুরের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা যায় টমেটোতে প্রচুর পরিমানে লাইকোপিন থাকে, যা প্রদাহ প্রতিরোধক, ক্যান্সার প্রতিরোধক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই টমেটো মেদবহুল লিভারের নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের তাফত্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়াং ডং ওয়াং বলেন, আস্ত টমেটো, টমেটোর সস, টমেটো থেকে তৈরি নানা দ্রব্য প্রচুর পরিমানে লাইকোপিনের যোগান দিয়ে থাকে। তিনি বলেন, ‘মজার বিষয় হল, আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, পরিশোধিত লাইকোপিনের চেয়ে টমেটো গুঁড়ো লিভার ক্যান্সার নিরাময়ে বেশি কর্যকর। কারণ, টমেটোতে ভিটামিন-ই, ভিটামিন-সি, মিনারেলস, ফেনোলিক কম্পাউন্ড এবং ডায়েটারি ফাইবার থাকে।’
এছাড়া টমেটো গুঁড়ো খাবার হিসেবে গ্রহণের ফলে উপকারি মাইক্রোবাইয়োটার বৈচিত্র ও উন্নতি আসে এবং প্রদাহের সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যাক্টেরিয়ার অতিবৃদ্ধি রোধ হয়।
অন্যান্য ফল, যেমন, পেয়ারা, তরমুজ, জাম্বুরা, পেঁপে প্রভৃতি ফলের মধ্যেও লাইকোপিন থাকে।
কিন্তু টমেটোর তুলনায় তাতে থাকা লাইকোপিনের পরিমান খুবই কম। টমেটো ও টমেটো জাতীয় খাবার লিভার ক্যান্সার ছাড়াও কার্ডিওভেস্কুলার রোগ, অস্টেওপরোসিস, ডায়াবেটিস, এবং অন্যান্য ক্যান্সার, প্রোস্টেট, লাঞ্জ, ব্র্যাস্ট এবং কোলোন ক্যান্সারের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

Monday, October 9, 2023

ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রাণ কি এতই তুচ্ছ by রাফসান গালিব

আজকের দিনটি আগামী দিনের থেকে হয়তো ভালো,

কেবল মৃত্যুগুলোই আজ নতুন

প্রতিদিনই জন্ম নেয় যে নতুন শিশুরা

তারা ঘুমোতে যাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে, মৃত্যুতে ।

তাদের গণনা করা মূল্যহীন।

—ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার কবি মাহমুদ দারবিশ

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিশেষ করে টুইটারে একটি কার্টুন অনেকেরই নজর কেড়েছে। কার্টুনটিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ফিলিস্তিনি নারীকে দুইভাবে আঁকা হয়েছে। এক পাশে দেখা যাচ্ছে, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। আরেক পাশে সেই মা বহন করছেন শিশুসন্তানের মরদেহ। শিশুটি রক্তাক্ত, তার দেহে জড়ানো ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী রুমাল ও লাল-সবুজ পতাকা। আর মায়ের চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

আলা আল লাগতা নামে এক কার্টুনিস্ট এ কার্টুনটি এঁকেছেন। তিনি আরবিতে একটি ক্যাপশনও দিয়েছেন। সেটির ইংরেজি করা হয়েছে এভাবে: ইন প্যালেস্টাইন, দ্য মাদার ক্যারিজ হার সন টুয়াইজ! এর মানে দাঁড়ায়, একজন ফিলিস্তিনি মা তার ছেলেকে দুইবার বহন করেন—একবার গর্ভধারণের সময়, আরেকবার মৃত্যুর সময়।

কোনো মা-বাবার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ, সন্তানের মরদেহ বহন করা। আর সেই কঠিন কাজটিই করতে হয় ফিলিস্তিনিদের। কারণ, ইসরায়েলিদের হামলার লক্ষ্যবস্তুই থাকে ফিলিস্তিনি ছেলেশিশু, কিশোর ও তরুণেরা। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলাতেও তেমনটি আমরা দেখি। তাদের ভাষায়, সেটি অভিযান। এর একটি চটকদারি নামও দিয়েছে—‘ট্রুথফুল ডোন’ (সত্য ভোর)।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত শুক্রবার থেকে গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। অথচ গাজা থেকে ইসরায়েলের দিকে কোনো রকেট ছোড়া হয়নি, অন্যান্য সময় যে যুক্তি দিয়ে হামলা চালানো হয়। গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক জিহাদের হামলার আশঙ্কা থেকে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর পাল্টা জবাব দেয় ইসলামিক জিহাদ।

তিন দিন ধরে পাল্টাপাল্টি হামলার পর মিসরের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতিতে যায় দুই পক্ষ। এবারের ঘটনায়ও বরাবরের মতো ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের শিকার হয়েছে ফিলিস্তিনিরাই। ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৪ ফিলিস্তিনি, এর মধ্যে শিশু ১৫টি। ফেসবুক ও টুইটারে রক্তাক্ত ফিলিস্তিনি শিশুদের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। যার প্রেক্ষিতেই ফিলিস্তিনি মায়েদের নিয়ে বেদনাদায়ক কার্টুনটি আমরা দেখতে পাই।

অন্যান্যবার হামাস যুক্ত থাকলেও, এবার তাদের দেখা যায়নি। হামাস যুক্ত হলে যুদ্ধপরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতো। ইসরায়েলও সম্ভবত তেমনটি চাইছিল। কিন্তু গাজার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চাপে আছে হামাস, যেহেতু সেখানকার সরকার তারা। ফলে ইসরায়েলের আশা পূর্ণ হলো না বলা চলে!

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গত বছর রমজানের শেষ দিকে ইসরায়েল সবচেয়ে বড় হামলা চালায় গাজায়। সেবার হামাস, ইসলামিক জিহাদসহ সাধারণ ফিলিস্তিনি সবাই পাল্টা জবাবে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের হামলায় গাজা শহর রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। টানা এগারো দিনের হামলায় আড়াই শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের ছোড়া রকেটে ইসরায়েলি মারা যান বারো জন। নিহত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শিশুই ছিল ৬৬টি। ইসরায়েলি হামলায় একসঙ্গে এত ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু স্মরণকালে আর ঘটেনি।

বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর দাবি করেছিল, ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে। এর তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু এ বিশ্বে ইসরায়েলের বিচার কে করবে!

সেবার ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে গাজাবাসীর প্রতি সংহতি জানিয়েছিল বিশ্বের অনেক মানুষ। মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্সের মতো দেশের শহরে শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি ইসরায়েলি দূতাবাসের সামনেও জমায়েত হয়। এবারের হামলায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়। গতবারের তুলনায় এবারের হামলা তীব্র না হলেও বা দীর্ঘায়িত না হলেও তুলনামূলকভাবে বিশ্ববাসীর তেমন প্রতিবাদ দেখা যায়নি।

যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের জমিতে অবৈধ দখলদার ইসরায়েল। একটু একটু করে ফিলিস্তিনের প্রায় গোটা মানচিত্রই গিলে ফেলছে দেশটি। একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডের ওপর এমন দখলদারি ও আগ্রাসন বিশ্ববাসী শুরু থেকেই মেনে নেয়নি। ফলে ফিলিস্তিনের কোথাও ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় বিশ্বের নানা জায়গা থেকে প্রতিবাদের আওয়াজ ওঠে।

এবারের চিত্র ভিন্ন হওয়ার প্রধান কারণ, বিশ্বের মনোযোগ এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে। তাছাড়া করোনা মহামারি পরবর্তী এ যুদ্ধের ধাক্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সাম্প্রতিক তীব্র দাবদাহ ও দাবানলের কারণে ইউরোপের পরিস্থিতিও ভয়াবহ।

এবারের ইসরায়েলি হামলায়ও পশ্চিমা মোড়লদের একই সুর আমরা পাই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের ভাষ্য ছিল এমন, ইসরায়েলের নিজেকে রক্ষার অধিকার রয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে একই বাক্যই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে থাকেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাসও ইসরায়েলের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মূলত ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার ন্যায্যতাই দেওয়া হয়।

আরও লক্ষণীয় বিষয় ছিল, এবারের ঘটনায় আরব দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদও খুব একটি চোখে পড়েনি। আরব লীগ প্রতিক্রিয়া জানালেও সেটি তেমন জোরালো ছিল না। ফিলিস্তিনিদের প্রতি বরাবরই এমন আচরণ কি করে না আরব বিশ্ব? আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে সরাসরি স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে—বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় সেটি শুরু হয়।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সফরকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের আকাশও উন্মুক্ত হয়ে গেল ইসরায়েলের জন্য। ফলে এমন পরিস্থিতিতে নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের পাশে আরব বিশ্বকে আশা করাই এখন ভুল।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমা মিডিয়ার একচোখা নীতি নতুন নয়। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি প্রাথমিক স্কুলে ১৯ জন শিশু নিহত হয়েছিল বন্দুকধারীর হামলায়। এমন ঘটনায় গোটা বিশ্বের মিডিয়াই মানবিক হয়ে ওঠে। এমন ঘটনায় আমরাও স্তব্ধ হয়ে যাই। সেটিই স্বাভাবিক। তবে ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্ষেত্রে তেমন মানবিকতা আমরা পাই না পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর কাছে।

ইউক্রেনেও রাশিয়ার হামলায় নিহত হচ্ছে শিশুরা। গত মাসের মাঝামাঝিতে রুশ হামলায় নিহত হয় লিজা নামে তিন বছর বয়সী এক ইউক্রেনীয় শিশু। পরির মতো ফুটফুটে শিশুটির মৃত্যুই প্রমাণ করে যুদ্ধের ভয়াবহতা। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে ইউক্রেনের একটি শিশুর নামকে এককভাবে তুলে আনল, তেমনটি আমরা দেখি না ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্ষেত্রে। ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনের এত এত শিশু নিহত হয়, তাদের কারও নামটি জানা হয় না আমাদের।

বিষয়টি খুবই করুণভাবে ওঠে আসে ফিলিস্তিনি পলিসি নেটওয়ার্ক আল-শাবাকার সদস্য ইয়ারা হাওয়ারি কণ্ঠে। ৯ আগস্ট কাতারভিত্তিক আলজাজিরায় এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘আমরা জানি, আমরা ইউক্রেন না। আমরা জানি, আমরা ইউক্রেনীয়দের মতো একই ধরনের সমর্থন পাব না। দখলধারী শক্তিকে প্রতিরোধ করতে আমাদের যে অধিকার, সেটিকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসবে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের শহীদদের মহিমান্বিত করে কোনো ছবি প্রকাশ করবে না। পপ তারকা, হলিউড অভিনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীরা গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমাদের পরিবারগুলোকে দেখতে আসবে না।’

এমন সহজ-সরল বয়ানের মাধ্যমে পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ইসরায়েলি দখলদারির নির্মম শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে সামনের দিনগুলোতেও হয়তো আমরা ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তাক্ত হতে দেখব।

একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তার শিশুদেরই আগে শিকার করতে হয়, সেটি কে না জানে। তবে তা হতে না দিতে ফিলিস্তিনি নারী বা মায়েরা কতটা বদ্ধ পরিকর সেটিও আমাদের জানা আছে। সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়া এসব মায়েরা একেকটি সাহসী ও নির্ভীক প্রজন্মই জন্ম দিয়ে যান, ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে লড়তে। মাহমুদ দারবিশও তাঁর কবিতায় বলে গেছেন—

‘আমাদের এই ভূমি বন্ধ্যা নয়

প্রতিটি ভূমির রয়েছে একটি জন্মক্ষণ

প্রতিটি সকালেই রয়েছে বিপ্লবের জন্য প্রতিশ্রুতি।’

* রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক। ইমেইল: galib.mujahid@prothomalo.com

ফিলিস্তিনি মায়েদের নিয়ে আঁকা আলোচিত কার্টুন।
ফিলিস্তিনি মায়েদের নিয়ে আঁকা আলোচিত কার্টুন। টুইটার থেকে সংগৃহীত