Saturday, April 14, 2018

কক্সবাজারে তানিয়াকে পুরুষের হাতে তুলে দেন রোকেয়া by ওয়েছ খছরু

সিলেটের মা ও পুত্র খুনের ঘটনায় জড়িত তানিয়াকে নিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিলেন নিহত রোকেয়া বেগম। সেখানে থ্রি-স্টার হোটেলে রোকেয়া রূপসী তানিয়াকে ঠেলে দিয়েছিলেন পরপুরুষের হাতে। এতেও রাজি ছিলেন না তানিয়া। কিন্তু রোকেয়ার নির্দেশের কারণে তিনি কক্সবাজারে গিয়েও ওই পুরুষদের মনোরঞ্জনে জড়িয়ে পড়েন। গ্রেপ্তারের পর তানিয়া এমনটি জানিয়েছে সিলেটের পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইয়ের কাছে। পিবিআই সূত্র জানায়, সুন্দরী হওয়ার কারণে তানিয়ার চাহিদা ছিল সবার কাছে। সিলেটের কয়েক যুবক রোকেয়ার সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেন। এরপর রোকেয়া তানিয়াকে নিয়ে যান কক্সবাজারে। আর ওখানে একাধিক পুরুষের শয্যাসঙ্গী হতে হয়েছে তানিয়াকে। ১লা এপ্রিল নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়ার ১৫-জে নম্বর বাসার নিচ তলা থেকে রোকেয়া বেগম ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রূপমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের দিনই আত্মীয় স্বজনরা নিহত রোকেয়ার ফেসবুক আইডি ঘেটে ছবি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এ সময় তারা দেখতে পান সম্প্রতি সময়ে কক্সবাজারে রোকেয়ার বেশ কয়েকটি ছবি রয়েছে। এসব ছবি বেশির ভাগই ছিল সাগরের তীরে তোলা। নানা ভঙ্গিমায় রোকেয়া এসব ছবি মোবাইল ফোনে তোলেন। কয়েকটি ছবি ছিল রূপমের সঙ্গেও। এর মধ্যে মা রোকেয়া ও ছেলে রূপমকে নিয়ে কোমর সমান সাগরের পানিতে নেমে ছবি তোলেন। খুনের ঘটনার পর ওই ছবিটি কয়েকটি গণমাধ্যম প্রকাশ করে। পুলিশ জানায়, রোকেয়া ও তার ছেলে রূপম খুন হয়েছে মার্চ মাসের ৩০ তারিখ। আর ওই মাসের প্রথম দিকে তারা কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। সঙ্গে গিয়েছিলেন তানিয়াও। কারা রোকেয়াকে কক্সবাজার নিয়ে গিয়েছিল- সেটি তানিয়ার মুখ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়নি। তবে, সিলেটের কয়েকজন যুবক ছিল। রোকেয়া ওই সময় বলেছিল, কক্সবাজার বেড়ানের খরচ তুলতে হবে। বেড়ানোর খরচ তোলার জন্য তানিয়াকে ব্যবহার করেছে। পুলিশ জানায়, রোকেয়া কক্সবাজার থেকে ইয়াবা কিনে নিয়ে আসে। সেখানের ইয়াবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রয়েছে। রোকেয়া শুধু বেড়ানোর জন্যই নয়, ইয়াবার চালান নিয়ে আসার জন্য কক্সবাজার গিয়েছিল এবং তারা কক্সবাজার থেকে ইয়াবার চালানও নিয়ে এসেছে। এ বিষয়টি নিয়ে তারা বিশদ তদন্ত করছে। ওদিকে, তানিয়া রোকেয়াকে ‘বড় আপা’ বলে ডাকতো। রোকেয়াও তানিয়াকে ছোট বোনের মতো মনে করতো। কিন্তু নিহত রোকেয়ার ছেলে রূপমের বাড়াবাড়ি তার কাছে ছিল অসহনীয়। ঘরের মধ্যে সবার সামনে তানিয়াকে ঝাপটে ধরতো রূপম। সেটি রোকেয়া দেখলেও কোনো নিষেধ দেননি। বরং তানিয়ার সঙ্গে রূপমের মেলামেশা তিনি সহজভাবে নিয়েছেন। কিন্তু তানিয়ার কাছে বিষয়টি ছিল বিরক্তিকর। এদিকে, সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশের রিমান্ডে থাকা নিহত রোকেয়ার প্রেমিক নাজমুলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সাত দিনের রিমান্ডে থাকা নাজমুল খুনের ঘটনা সম্পর্কে পুলিশের কাছে মুখ খোলেনি। তবে, রোকেয়ার সঙ্গে তার প্রেম এবং রাতের পর রাত কাটানোর কথা সে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। পুলিশের ধারণা, এই খুনের ঘটনার সঙ্গে নাজমুলসহ একটি চক্র সহযোগী হিসেবে রয়েছে। খুনের নির্দেশনা দিয়েছে মোবাইল থেকে মোবাইলে একটি মেসেজ পৌঁছে। তানিয়ার মোবাইলেও এ নির্দেশনা ছিল। ফলে নির্দেশনা কার, সেটি এখনো পরিষ্কার হয়নি। খুনের ঘটনার দিনও রোকেয়ার ঘরে দীর্ঘসময় একান্তে কাটিয়েছে নাজমুল। পুলিশ জানায়, নাজমুল নিহত রোকেয়াকে স্ত্রীর মতো ব্যবহার করেছে। এর বাইরেও রোকেয়ার আরো কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। নাজমুল বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর তারা রোকেয়ার কাছে আসতো। ওদের সঙ্গে নাজমুলের অজান্তেও রোকেয়ার ইয়াবা ব্যবসা ছিল। আবার রোকেয়াও তরুণী সরবরাহ করে তাদের চাহিদা পূরণ করতেন। তদন্তে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিহত রোকেয়ার বাসা ছিল অপরাধ আস্তানা। মধ্যবয়সী নারী রোকেয়া। দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের পুরুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে তার বাসা গড়ে তোলা হয়েছিল নিরাপদ সেক্স স্পটে। বাসা ছাড়াও হাই-প্রোফাইল কয়েকজন পুরুষদের সঙ্গেও তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ওই সব ব্যক্তিদের সঙ্গে রোকেয়ার মোবাইল ফোনে কথা হতো। কললিস্ট ঘেটে এসব তথ্য জানা যায়। ইয়াবা নেটওয়ার্কেও রোকেয়া ছিল পরিচিত ব্যবসায়ী। গেল এক বছর ধরে অনেকটা বেপরোয়া ছিলেন রোকেয়া। তার নেটওয়ার্কের অনেককেই পাত্তা দিতো না। নগরীর নয়াসড়ক এলাকায় বসবাসকারী দিলারার সঙ্গেও ছিল তার ভালো সর্ম্পক। এক সময় একসঙ্গে তারা দেহ ব্যবসার নেতৃত্ব দিতো। কিন্তু রোকেয়া ও দিলারার মধ্যে টাকা আয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। এ কারণে দিলারার আস্তানার সুন্দরী নারী তানিয়াকে এক বছর আগে নিজের করে নিয়েছিলেন রোকেয়া। পুলিশ সন্দেহের বাইরে রাখছে না দিলারাকে। ঘটনার পর থেকে অন্তরালে চলে গেছে দিলারা। সাম্প্রতিক সময়েও দিলারার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছিল। যাদের সঙ্গে রোকেয়ার সর্ম্পক ছিল, দিলারার সর্ম্পকও ছিল তাদের সঙ্গে। ফলে দিলারার সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুলিশ তদন্তে রেখেছে। এখন অনেকটা নীরব দিলারার আস্তানাও। সবাই আড়ালে চলে গেছেন। তবে, দিলারা নিজেকে রক্ষা করতে তার কাছে থাকা হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের দিয়ে তদবির চালাচ্ছেন। তার এক ইয়াবা ব্যবসায়ী পার্টনার পুলিশ বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। তিনিও দিলারাকে ঝামেলা থেকে রক্ষা করতে তদবির চালাচ্ছেন।

আজ খুলছে উত্তর সিলেটের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার by মিনহাজ উদ্দিন

উৎসবের আমেজে বর্ষ বরণের পাশাপাশি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনের আনন্দে মাতোয়ারা সিলেটের গোয়াইনঘাটের পূর্ব-জাফলং এলাকা। বাংলা নববর্ষের প্রথমদিনে সিলেটের সীমান্ত জনপদখ্যাত  গোয়াইনঘাটে আজ যাত্রা শুরু হচ্ছে আরও এক নবদিগন্তের। উদ্বোধন হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাফলং সেতুর। সেতুটির উদ্বোধনের সঙ্গে সাথে উপজেলা সদর গোয়াইনঘাটের সাথে জাফলংয়ের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি উত্তর সিলেটের ৩টি উপজেলার সাথে সহজতর যোগাযোগ, পর্যটন সম্ভাবনার উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায়ও নবদ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। উত্তর সিলেটের সর্ব বৃহৎ ও মেগা উন্নয়ন প্রকল্প জাফলং ব্রীজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আজ। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় বেয়ে আসা প্রমত্তা পিয়াইন নদীর জাফলং খেয়াঘাট এলাকায় এলজিডি’র তত্ত্বাবধানে প্রায় ২৯  কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৬০ মিটার দৈর্ঘ্য এই ব্রিজটি উদ্বোধন হওয়ার ফলে উপজেলা সদর গোয়াইনঘাট, জেলা সদরের সাথে উপজেলার ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের যোগাযোগ দূরত্ব কমে আসা এবং সহজতর হবে। উক্ত ব্রিজ নির্মাণে স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যাটি সমাধানে আশ্বাস ছাড়া বাস্তবায়নে উদ্যোগী ছিলনা কেই। ২০০৮ সালের শেষের দিকে এ ব্রিজ বাস্তবায়ন প্রকল্প গ্রহণে সর্বশেষ উদ্যোগী হন বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ। তিনি তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভা, সভা সমাবেশে উক্ত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে এলাকাবসিকে আশ্বস্ত করেন। তৎকালীন সময়ে জাফলং আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বেসরকারি টিভি চ্যানেল একুশের ডকুমেন্টারি তৃণমূল একুশে সংলাপ অনুষ্ঠানেও এই ব্রিজ নির্মাণে আওয়ামী লীগের উদ্যোগের বিষয়টি ইমরান আহমদের হয়ে তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া হেলাল। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে চতুর্থদফা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ জাফলং ব্রিজ প্রকল্প উন্নয়নে সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হন। উক্ত প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যান সাংসদ ইমরান আহমদ। শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক দৌড়ঝাঁপ। এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নিরলস পরিশ্রম করে উক্ত প্রকল্প দাঁড় করান তিনি এবং ২০১৩ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাফলং ব্রিজ প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সরকারের  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ এ সময়ে কাজ হয়ে চলিত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। খেয়া পারাপারসহ জনদুর্ভোগ লাগবে সম্প্রতি জনসাধারণ ও যানবাহন চলাচলের জন্য ব্রিজটি খুলেও দেয়া হয়। আজ বাংলা নববর্ষের প্রথমদিনে আনুষ্ঠানিকভাবে উক্ত মেঘা উন্নয়নপ্রকল্পটি উদ্বোধন করবেন সরকারের ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সিলেট-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ। উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফখরুল ইসলাম জানান, নির্মাণ কাজ শেষ করে ইতিপর্বে ব্রিজটি আমাদের কাছে হ্যান্ড অভার করেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। উদ্বোধনের জন্যও সকল প্রস্তুতি ইতিপুর্বে শেষ হয়েছে। এ ব্যাপারে কথা হলে গোয়াইনঘাট প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাংবাদিক আবদুল মালিক জানান, জাফলং ব্রিজটি শুধু ব্রিজই নয়, একটি ইতিহাসের মাইলফলকও। এই ব্রিজ উত্তর সিলেটের যোগাযোগ, পর্যটন সম্ভাবনা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নবদ্বারের উন্মোচন করেছে। আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য ইমরান আহমদসহ সরকারের কাছে গোয়াইনঘাটবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। জাফলং পিয়াইন পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগনেতা আবদুল মালিক জানান, জাফলং ব্রিজ অত্রাঞ্চলের সহজতর যোগাযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা বাণিজ্য কৃষি আবাদ উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। এখন থেকে জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুলসহ সবক‘টি পিকনিক স্পটে পর্যটকরাও সহজে যেতে পারবেন। ব্রিজটির বাস্তবায়নের ফলে তামাবিল স্থল বন্দর, জাফলং, বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারিসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে গোয়াইনঘাটসহ গোটা উত্তর সিলেট আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো। স্থানীয় সাংসদ জননেতা ইমরান আহমদের প্রচেষ্টায় এ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আমাদের দল আওয়ামী লীগ তথা নৌকার বিজয়ে এ ব্রিজ অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান লেবু জানান, জাফলং ব্রিজ এখন ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায়, অত্রাঞ্চলের মানুষজন, যানবাহন সহজে যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ ব্রিজ। গোয়াইনঘাটের উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ৫নং আলীরগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া হেলাল জানান, এক সময় জাফলং ব্রিজ স্বপ্ন ছিলো, আর এখন তা বাস্তব এবং নতুন ইতিহাস। এই ব্রিজ বাস্তবায়নের ধারা আবারও প্রমাণ হলো আমাদের এমপি ইমরান আহমদ জনগণকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখান না, যা বলেন তা বাস্তবায়ন করেন। আমার বিশ্বাস এ উন্নয়ন প্রকল্পসহ অত্রাঞ্চলের অভূতপুর্ব উন্নয়ন বাস্তবায়ন করায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানকার বিবেকবান জনগণ আবারও জননেতা ইমরান আহমদকে নৌকায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন। এ ব্যাপারে কথা হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য জননেতা ইমরান আহমদ বলেন, আমি কখনই জনসাধারণকে মিথ্যা উন্নয়ন প্রকল্পের আশ্বাস দেই না। কেননা আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি নয়, কাজে বিশ্বাস করে। আমি অত্রাঞ্চলের মানুষের ভোটে বার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। তাদের পবিত্র আমানত নিয়ে এমপি হয়ে তাদের সঙ্গে কখনই প্রতারণা করতে পারি না। আজকের জাফলং ব্রিজ স্বপ্নই নয় বাস্তব। এ ব্রিজের সুফল গুটা উপজেলাবাসী সহ উত্তর সিলেটের সবক’টি উপজেলাবাসী ভোগ করবেন, উপকৃত হবেন। এখানকার পর্যটন এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও এগিয়ে যাবে। সুদৃঢ় হবে। ব্রিজটি বাস্তবায়ন হওয়ায় দেশ-বিদেশের পর্যটকরা সহজেই এই উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে দেখতে পারবেন।

সিলেটে ডাক্তারের অবহেলায় দুই প্রসূতির মৃত্যু, উত্তেজনা

পরিবারের মুখ আলো করে নতুন সন্তান জন্ম নেবে। এ কারণেই পরিবারের সবার ছিল সতর্কতা। ডাক্তারের পরামর্শে হাসপাতালে না গিয়ে ক্লিনিকেই ভর্তি করালেন প্রসূতি মায়েদের। কিন্তু সন্তান জন্ম দিলেন ঠিকই, ডাক্তারদের গাফিলতির কারণে চিরতরে পরপাড়ে চলে গেলেন মা। সিলেটের মীর্জা জাঙ্গালের সেইফওয়ে হাসপাতালে এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ রোগীর স্বজনরা। মৃত্যুবরণকারী প্রসূতি মায়েরা হচ্ছেন- সিলেটের শাহপরাণ থানাধীন কল্লোগ্রামের সাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী আসমা বেগম (২৩) ও জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের চোলাহাটি গ্রামের ব্যবসায়ী রুবেল হোসেনের স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৈতি (২১)। আসমা বেগম শুক্রবার ভোরে ও ফয়জুন নাহার চৈতি সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মৃত্যুবরণ করেন। ডিএমটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সকাল ৯টার দিকে ফয়জুন নাহার চৈতিকে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির জন্য নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আসমা বেগম ও ফয়জুন নাহার চৈতি দু’জনেই বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে সুস্থ অবস্থায় দুটি সন্তানের জন্ম দেন। পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ডাক্তার মিনতি সিনহা তাদের সিজার করেন। জন্ম নেয়া বাচ্চা দুটি সুস্থ আছে বলে জানা গেছে। শুক্রবার ভোরে প্রায় একই সময়ে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। অবস্থা খারাপ দেখে রোগীদের স্বজনরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বার বার ডাক্তারের জন্য ধর্ণা দিলেও সেখানে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। হাসপাতালের দায়িত্বরত যারা ছিলেন তারা ‘ডাক্তার আসছেন, আসবেন’ বললেও কোনো ডাক্তার আসেনি। আসমার পরিবারের দাবি- ভোরেই আসমার মৃত্যু হয়। এদিকে, এই মৃত্যুর সংবাদে ভীত হয়ে পড়েন চৈতির পরিবারের লোকজন। তার অবস্থাও ধীরে ধীরে অবনতি হওয়ায় ডিএমটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তারা তাকে নিয়ে যান রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সকাল ১০টার দিকে এই হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার চৈতিকে মৃত ঘোষণা করেন। রাগীব রাবেয়া হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেন- মৃত অবস্থায়ই চৈতিকে তাদের হাসপাতালে আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে ডাক্তার মিনতি সিনহা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- আমি রাতে সিজারের পর দু’জনকেই সুস্থ অবস্থায় রেখে এসেছি। সকালে হঠাৎ করে কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছি না। এদিকে ঘটনার পর পরই হাসপাতাল থেকে সটকে পরেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমনকি সেসময়ে কর্তব্যরত কোনো ডাক্তারেরও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সেই ‘হালখাতা’ আর নেই

পহেলা বৈশাখ আজ। বর্ষবরণের নানা আয়োজন দেশজুড়ে। রমনার বটমূল থেকে চট্টগ্রামের ডিসিহিল-সিআরবি, জেলা-উপজেলায় সবখানে যেন উৎসবমুখর পরিবেশ।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে হালখাতা উৎসব। পুরনো হিসেব চুকিয়ে নতুন হিসেব খোলা মানেই হালখাতা। পুরনো পাওনা আদায় খুশির ব্যাপারই তো বটে। এ নিয়ে চলে মিষ্টিমুখও।
চট্টগ্রামের বাণিজ্যকেন্দ্র খ্যাত চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে হাজার বছর ধরে এ ঐতিহ্য চলে আসলেও বর্তমানে সে আনন্দ আর নেই। ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে হালখাতার জৌলুস।
এমন কথাই জানিয়েছেন দুই বাণিজ্য কেন্দ্রের ব্যবসায়ীদের অনেকেই।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহম্মদ বলেন, নতুন বছরের শুরুতে পুরনো পাওনা আদায় হলেও এখন আর হালখাতা উৎসব হয় না। তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রে আদায় হচ্ছে পুরনো লেনদেন। তবে এ ঐতিহ্য এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন কিছু ব্যবসায়ী। 
তিনি বলেন, ১৫-১৬ বছর আগেও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা হালখাতা করতেন বাংলা নববর্ষে। পুরনো রীতিতে নতুন বছরে নতুন খাতায় হিসাব খোলেন তারা। যথাসম্ভব আদায় করে নেন পাওনা টাকা। দোকান সাজাতেন বর্ণিল সাজে। পাওনাদার এলেও হাসিমুখে তুলে দিতেন মিষ্টি। এদিন তারা বেচাকেনা ভুলে মেতে উঠতেন নানা আনন্দ-উৎসবে।
তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আছাদগঞ্জে তিন হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় প্রায় ১৫০০ থেকে ১৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে ৮০ শতাংশ লেনদেনই হয় বাকিতে। কিন্তু তারপরও বর্তমানে সেই ঐতিহ্য এখন তেমন চোখে পড়ে না। সীমিত পরিসরে কিছু প্রতিষ্ঠান হালখাতা করে থাকে।
সৈয়দ ছগির আহমেদ বলেন, ‘গুটিকয়েক হিন্দু ব্যবসায়ীরা লাল কাপড়ে বাঁধানো খাতায় এখনো হালখাতার রেওয়াজ ধরে রেখেছেন। তবে কয়েক বছর আগেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে যেভাবে জাঁকজমকভাবে হালখাতার অনুষ্ঠান হতো তা এখন আর নেই।
এ প্রসঙ্গে কাঁচামাল আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, এক সময় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে হালখাতা খোলার উৎসব জমজমাট করে পালন করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দায় এখন এ ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স সততা বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী রতন রায় বলেন, নতুন বছরটা ভালোভাবে যাবে এমন আশা নিয়ে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলেন। তবে একসময় বৈশাখের প্রথম দিনটি খাতুনগঞ্জে উৎসবের সঙ্গে পালন করতেন ব্যবসায়ীরা। তবে একের পর এক চেক প্রতারণা, বিশ্বাস ভঙ্গ ও অর্থনৈতিক মন্দাভাবের কারণে এখন আর হালখাতা সেভাবে উদযাপন করা হয় না।
অন্যদিকে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন ব্যবসায়িক কাজের বেশির ভাগই সম্পন্ন হচ্ছে কম্পিউটারের মাধ্যমে। টাকা-পয়সার লেনদেনও হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলে। এছাড়া দেনা-পাওনার হিসাবও হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে। দেশে অর্থবছরের হিসাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্যবসায়ীরাও এখন হিসাব বর্ষ শেষ করেন জুন অথবা ডিসেম্বর। তবে খাতুনগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ীরা এখনো বংশপরমপরায় চেষ্টা করছেন হালখাতা উৎসব ধরে রাখতে।
নগরীর চাক্তায়ের শত বছরের পুরনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাবা লোকনাথ ট্রেডার্সের মালিক হরিপদ দাশ (৭৬) জানান, হিসাব হালনাগাদ করা থেকেই হালখাতা শব্দের উদ্ভব। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের শাসনামল থেকে নতুন বছরের শুরুতে হালখাতার প্রচলন শুরু হয়। আর আমাদের দেশে বাংলা সালের প্রথম দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে দোকানপাটের হিসাব হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াই ব্যবসায়ীদের কাছে পরিচিত হালখাতা হিসেবে। 
বছরের প্রথম দিনে দেশের গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানের পাইকারি বাজার ও আড়তে আগের বছরের হিসাব-নিকাশের ফয়সালা করেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে নববর্ষের দিন থেকে নতুন খাতায় লেনদেনের তথ্য টুকে রাখতে শুরু করেন। তবে ঐতিহ্যবাহী এ প্রথার জৌলুস এখন আর আগের মতো নেই।
ঢাকাসহ দেশের বড় নগরী ও শহরগুলোর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারগুলোতে আগের মতো হালখাতা নিয়ে মাতামাতি হয় না। দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতে আলাদা আয়োজনের দৃশ্য চোখে পড়ে না। কিন্তু সেই পুরনো জৌলুস এখন আর নেই। দিনে দিনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ প্রথার প্রচলন কমে যাচ্ছে।
ক্রেতাদেরও পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে দোকানে দোকানে গিয়ে লেনদেনের হিসাব চুকিয়ে দিতে দেখা যায় না। তবুও পুরান ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার এবং আড়তের কিছু দোকানে সীমিত পরিসরে হলেও অনেকে ধরে রেখেছেন এ রীতি।
তিনি বলেন, দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে নববর্ষে হিসাবের নতুন খাতা এখনো খোলা হয় আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। দেনাদার ও পাওনাদারদের মুখরোচক মিষ্টি ও ঠাণ্ডাপানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে পাওনা শোধ করার কথা বিনীতভাবে মনে করিয়ে দেয়া হয় এ দিনে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিঃ উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরার ফোনালাপের ব্যাপারে কথা বলেছেন সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক। বলেছেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্পেইসের ব্যাপারে আমরা উদ্বেগ জানিয়েছি। মহাসচিব ফোন করেছিলেন এবং কথা বলেছেন। এতে রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। আর আমি মনে করি লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় মহাসচিব পুনরায় বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বর্ষাকাল এগিয়ে আসায় উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, আশ্রয় শিবিরগুলোর ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না-ও হতে পারে। নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সহায়তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কাজ করছে। নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডুজাররিক এসব কথা বলেন। তার কাছে প্রশ্ন করা হয়- বাংলাদেশের মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে মহাসচিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন এবং তারা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। আরো জানতে চাওয়া হয়, মহাসচিব কী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো আলোচনা করেছেন, যখন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী কারাগারে এবং তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছেন। এ ছাড়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও সেখানকার নিরাপত্তা অবস্থার কারণে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক হওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ডুজাররিকের কাছে। তাকে প্রশ্ন করা হয়, মিয়ানমারের মন্ত্রী বাংলাদেশে আসার পর থেকে সে বিষয়ে জাতিসংঘ নতুন কিছু জানে কিনা। উত্তরে ডুজাররিক বলেন, না, মানে, আমরা বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখেছি। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে যে, শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছাকৃত হতে হবে। এটা মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে। তাদের নিজেদের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা থাকতে হবে। যেখান থেকে তারা এসেছে। অন্য কোনো জায়গায় না, যেখানে তাদেরকে যেতে বাধ্য করা হবে। এই অবস্থানের নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এরপর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। ডুজাররিককে প্রশ্ন করা হয়- রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে জাতিসংঘ মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলেছে কি না, যে নাগরিকত্ব তাদের এখন পর্যন্ত দেয়া হয়নি। জবাবে ডুজাররিক বলেন, এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের জন্য আমাদের অবস্থান হচ্ছে (কফি) আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন।
এদিকে, এই মাসের শেষের দিকে একটি তথ্য অনুসন্ধানী অভিযানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করবেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা। ২৬শে এপ্রিল থেকে ২রা মে পর্যন্ত এই সফর করবেন তারা। এ সময় রোহিঙ্গা সংকট গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন তারা। এ বিষয়ে ডুজাররিক বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ পুনরায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশা ও এই মানবিক অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য প্রতিনিয়ত প্রয়োজনীয় তহবিলের দিকে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

ঢাবিতে হলে হলে আতঙ্ক, ইশার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার by ফররুখ মাহমুদ ও মুনির হোসাইন

নানা চাপ। হুমকি। আতঙ্কে কোটা সংস্কার আন্দোলনে জড়িত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এরই মধ্যে হল ছেড়েছেন। এই যখন অবস্থা তখন কবি সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রী নির্যাতনে অভিযুক্ত হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান ইশাকে স্বপদে ফিরিয়েছে ছাত্রলীগ। গতকাল সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এরপর দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ছাত্রলীগ নেত্রী ইশাকে ছাত্রত্ব ফিরে দেয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার ভিসির মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবারই তার প্রটোকল অফিসার ধরে জানিয়েছেন ‘ভিসি স্যার ব্যস্ত আছেন।’ এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রলীগ নেত্রী ইশা হলে ফিরছেন এমন আতঙ্কে রাতেই হল ছেড়েছেন প্রায় দেড় ডজন সাধারণ ছাত্রী। গতকালও সকাল থেকে বেশ কিছু ছাত্রী হল ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলেও কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাওয়া শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ধরনের হুমকি, হয়রানি ও ব্লেমগেইম চলছে আন্দোলনকারীদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধেও। অন্যদিকে আন্দোলনকারী কোনো শিক্ষার্থী বা কেন্দ্রীয় কমিটির কাউকে কোনো ধরনের হয়রানি হলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। হয়রানি না করতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরর সঙ্গে।
ইশার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে ওই টেলিভিশন চ্যানেলকে ভিসি বলেন, ‘শুধু ছাত্রত্ব ফিরে পাবে না, বরং সম্মানিত হবে এবং সেটি উচিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সেটি হবে। কারণ আমরা তো কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি অবিচার করতে পারি না। ওই মেয়েটির কাছ থেকে আমরা যেটি শুনেছি যে ওই মেয়ে একটি দরজায় পা দিয়ে আঘাত হানার কারণে তার পা কেটে গেছে।’ এদিকে ইশাকে ছাত্রত্ব ফিরে দেয়ার বিষয়ে ভিসির দেয়া বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আমি জানি না। ছাত্রত্ব ফিরে দেয়ার বিষয়ে কেউ আমার সঙ্গে আলোচনাও করেনি। আমি জানিও না। তবে ভিসি স্যার যদি বলে থাকেন, তাহলে তো তিনি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলবেন।’
এদিকে ইশার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে ছাত্রলীগের দেয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সংগঠটির চার সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ইশা। তাই তাকে স্বপদে বহাল করা হলো। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করার পর থেকেই ছাত্রলীগের একটি অংশ ইশাকে নির্দোষ প্রমাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন। যাদের অনেকে ওইদিনের সংঘটিত ঘটনার পর ইশার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইশার বাসায় গিয়ে তাকে ফুলের মালা পরিয়েছেন সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগের নেতা-নেত্রীরা। অন্যদিকে ইশা হলে ফিরছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই হল ছেড়েছেন সুফিয়া কামাল হলের প্রায় দেড় ডজন ছাত্রী। আতঙ্ক বিরাজ করছে হলটির সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। যারা কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। হলটির একাধিক ছাত্রী জানান, ইশা হলটির নেতৃত্বে আসার পর থেকে সাধারণ ছাত্রীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন করে থাকেন। বিভিন্ন সময় মারধরও করা হয়েছে অনেককে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা সক্রিয় তাদের নানা ধরনের হুমকি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এত দিন কেউ ভয়ে মুখ খুলেননি। সর্বশেষ গত সোমবারের ঘটনার পর অনেকে ইশার নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়ে মুখ খুলেছেন, তাই এখন ইশা হলে ফিরলে আগের চেয়েও বেশি নির্যাতন শুরু হবে সাধারণ ছাত্রীদের ওপর। তাই আমরা হলে এখন অনিরাপদ বোধ করছি। গতকাল সন্ধ্যায় হল ছাড়ার সময় এক ছাত্রী বলেন, ‘হলের সভাপতি হলে আসছেন শুনে আমরা হল ছাড়ছি। তিনি আমাদের মারধর করেন। সেদিন এক ছাত্রীর পা কেটে দেয়ায় আমরা তার প্রতিবাদ করি। তিনি হলে আসলে আমরা আবারো নির্যাতিত হবো। তাই চলে যাচ্ছি।’ অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘তিনি আমাকে মারধর করেছেন। গেস্টরুমে নির্যাতন করতেন। তিনি হলে আসলে আবারো এই কাজ করবেন বলে আমি হল ছাড়ছি।’ তবে হলটির প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান বলেন, ‘সে বহিষ্কৃত। তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত হলে উঠতে পারবে না। আর যেসব মেয়েরা হল ছাড়ছে তাদের বিষয়ে আমি অবগত নই।’
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে হলটির প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিতা রেজওয়ানা রহমান হলের ছাত্রীদের নিয়ে এক সাধারণ সভার আয়োজন করেন। যেখানে শিক্ষার্থীরা ইশার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে। সাধারণ সভায় হলটির এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ম্যাম আমরা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক হল চাই। সেখানে কেন সিট বাণিজ্য থাকবে? কেন পলিটিক্যাল ফ্লোর এবং নন পলিটিক্যাল ফ্লোর থাকবে। আমরা এখানে সিটের আশায় উঠেছি, রাজনীতি করার জন্য উঠি নাই। একজন পদত্যাগ করেছে। আরো একজন হলে আছে। তারা আমাদের সমস্যা করবে। আমাদের দায়ভার কে নেবে।’ আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা রাজনীতি মুক্ত হল চাই। মেয়েরা যেটার জন্য এত ভয় পায় সেটা হলো নোংরা সিট পলিটিক্স। যার হুমকি দিয়ে মেয়েদের নির্যাতন করা হয়। পলিটিক্যাল মেয়েদের দায়িত্বও প্রশাসন নিক। অন্য কেউ অভিভাবক নয়।’
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অন্যান্য হলের ছাত্রছাত্রীদেরও নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছে ছাত্রলীগ- এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন ‘অপপ্রচার’। ইতিমধ্যে হল ছেড়েছে অনেকে। গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অপপ্রচার চালানোর প্রতিবাদ ও হয়রানি অভিযোগ করে আন্দোলনকারীদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফেসবুক গ্রুপ থেকে লাইভে বক্তব্য রাখেন। এসময় রাশেদ তার বক্তব্যে নিজের ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভাইয়েরা আমাকে এখন বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও ভিসি স্যারের বাসায় হামলা করেছি বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আমি বলতে চাই, আমি এসবের কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। যদি সম্পৃক্ত থাকতাম তাহলে গত দুই মাস যাবৎ গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমার পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পায়নি কেন? আপনারা কী গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও বেশি এক্সপার্ট ও আইটি বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন? এসময় রাশেদ বলেন, যারা এখন অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তারা চাচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে বানচাল করতে। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সত্যের পক্ষে ছিলাম। এখনো আছি। আর আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও আন্দোলনকারীদের ওপর যদি কোনো ধরনের হয়রানি না হয় সে বিষয়ে সবাই সজাগ থাকবেন। রাশেদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান ওই গ্রুপে লেখেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় কমিটি এক আছি। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন। যে কোনো অন্যায়ের দাঁত ভাঙা জবাব দেয়া হবে।’ আর যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর বলেন, ‘নতুন নাটক তৈরি করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বোকা বানাতে চেষ্টা করবেন না। শিক্ষার্থীরা আবার রাজপথে নামলে কিন্তু পালাবার পথ পাবেন না।’
এদিকে আন্দোলকারীদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তারা ভিসির বাসভবনে হামলার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি চেয়েছেন। দাবি করেছেন হলে যেন আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা নিরাপদে থাকতে পারে। কাউকে যেন হয়রানি না করা হয়। ভিসি তখন তাদের কোনো সংগঠন কর্তৃক কাউকে হয়রানি যেন না করা হয় সে বিষয়ে প্রশাসনের সজাগ থাকার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। এছাড়াও আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকেও অবহিত করেছেন যেন কাউকে সারা দেশের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের হয়রানি না করা হয়। মন্ত্রীও তাদের আশ্বস্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ধরনের হয়রানি না করা হয়, সে বিষয়ে আমরা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও আমাদের ভিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে কাউকে কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘এরপরও যদি কাউকে হয়রানি করা হয়, তাহলে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটি ব্যবস্থা নিবো।’ অন্যদিক ছাত্রলীগ নেত্রীর ইশার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে ফারুক হাসান বলেন, ‘এ বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এই ইস্যুতে এখনো আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো বক্তব্য নেই। যদি কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত থাকে তাহলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।’
সে রাতে ঢাবির ছাত্রী হলে যা ঘটেছে
রাত সাড়ে ৯টায় হলে আসি। এ সময় অনেকে সর্তক করছিল, তোমাদের ওপর হামলা হতে পারে। যারা আন্দোলনে গেছো তাদের ওপর গোপন হামলা হতে পারে। সবাই সাবধানে থেকো। পরে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে দরজা আটকে শুয়ে পড়েছি। হঠাৎ করে শুনি চিৎকার। অনেক জোরে চিৎকার। একটা আপু দরজা ধাক্কা দিয়ে বললো হলের নিচে নামো। কাউকে মারছে মনে হয়। আমরা দৌড়ে নিচে নামলাম। পরে কয়েকজন ইশার রুমের সামনে গেলাম। সেখান থেকেই চিৎকার এসেছিল। রুমের সামনে গিয়ে দেখি কয়েকটা পলিটিক্যাল মেয়ে দাঁড়ানো। তারা নিজেদের মধ্যে ফান করছে। আমরা তাদের জিজ্ঞেস করলাম এত জোরে চিৎকার করলো কে? তখন তারা বললো গায়ের ওপর একটা পোকা পড়েছিল তাই চিৎকার দিচ্ছে। এ কথা শুনে আমরা চলে আসছিলাম। পরে বড় আপুরা বলতেছে, পোকার কারণে এত জোরে চিৎকার করবে কেন? এসময় আমরা ইশার রুম থেকে সিঁড়ি পর্যন্ত রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখি। কয়েকজন বললো বেসিনেও দাগ দেখেছে তারা। এরপর মেয়েরা একত্রিত হয়ে ইশার রুমের সামনে যায় এবং দরজা খোলার জন্য বলে। একপর্যায়ে ইশা দরজা খুলে। একসঙ্গে এত মেয়েকে দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। কান্না করে দেয়। তাকে মারধর যাতে না করে সেজন্য অনুরোধ করতে থাকে। মেয়েরা জানতে পারে ৫-৬ জনকে মারধর করেছে ইশা। এর মধ্যে দুজনের পা কেটে যায়। ছাত্রীরা ইশাকে নিচে নামিয়ে আনতে চাইলে সে দৌঁড় দেয়। একপর্যায় উত্তেজিত হয়ে কিছু মেয়ে তার গায়ে হাত তুলে। মারধর করে। নিচে নামিয়ে আনে। খবর পেয়ে প্রক্টর ও হল কর্তৃপক্ষ আসে। তাদের সামনে ইশা নিজের দোষ স্বীকার করে। সবার কাছে ক্ষমা চায়। কিন্তু মেয়েরা তাকে গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের দাবি জানায়। জুতোর মালা পরিয়ে দেয়। টেলিভিশনে দেখি তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তারপর রুমে চলে আসি। গত ১০ই এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলে সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী। বর্ণনারত ওই ছাত্রী বলেন, হলের মেয়েরা ইশার ওপর আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ, ইশা মেয়েদের নানাভাবে কষ্ট দিতো। তাদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করতো। আগে থেকেই মেয়েরা তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। কিছু হলেই মেয়েদের মারধর করতো। হুমকি দিতো। 
ওই রাতে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান ইশা কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়ায় বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে মারধর করে। এদের মধ্যে একজন ছাত্রীর পায়ের গোড়ালির ওপরের অংশ কেটে যায়। খবরটি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সুফিয়া কামাল হলের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। মেয়েরা হলের ভেতরে অবস্থান করে। ছাত্রীরা দাবি জানায়, ইশাকে হল, ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কারও করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ও প্রক্টর অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ইশাকে বহিষ্কার করেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও এই বহিষ্কারাদেশকে স্বাগত জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেন। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই আবার ইশার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলনে নামেন। গতকাল রাজু ভাস্কর্যে মানববন্ধন করেন। আগের দিন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা বিবৃতিতে দেন এবং রাতে ইশাকে ফুলের মালা পরিয়ে দেন। ছাত্রলীগ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তাদের প্রতিবেদনে ইশা সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ প্রমাণিত হয়। যার ওপর ভিত্তি করে ইশার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করে ছাত্রলীগ। এদিকে ওই দিন রাতে ইশার রুমের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে আন্দোলনে যাওয়া মেয়েদের সঙ্গে ইশার কথোপকথন শোনা যায়। সেখানে ইশা মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলছেন, “এত কুরকুরানি না। যারা যারা প্রোগ্রামে গেছে কাল এবং আজ তারা ছাড়া সবাই চলে যা। অথবা পেছন থেকে সামনে আয়। এক মেয়েকে ইঙ্গিত করে ইশা বলেন, এই তুই সামনে আয়। মোবাইল দে। আমি কি বলছি। নাটক... (প্রকাশের অযোগ্য)। হুম। ওরা কি খুব সংস্কার করে দিছে। হলের মধ্যে তোমার ভাইয়েরা এসে ঠেকাবে না। বুজছো। ওই পাওয়ারগিরি দেখাতে আসবা না। পিছনে কে আছে দেখা যাচ্ছে না, সর। আরেক মেয়েকে বলে, তুইও গেছিলি। আমি তোকে নিজে নিষেধ করছিলাম। পাশের জনকে উদ্দেশ্য করে ইশা বলেন, জিজ্ঞেস কর। আমি নিজে নিষেধ করেছি। কেন গেছিলি? আমি নিষেধ করার পরও কেন গেছিলি? মুন আপু (খালেদা হোসাইন মুন, ওই হলের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি) তোকে গালি দিসিলো না। বেয়াদব বলেছিল না। তুই আসলেই একটা বেয়াদব। সোজা হয়ে দাঁড়া। তোদের চেহারাগুলো দেখি। তোদের মধ্যে গডফাদার পল? এই তুই, তুই। তুই তো যাবি। তুই তো হাড়েহাড়ে শয়তান। মিনমিনে শয়তান। চেহারাটা দেখ কি সুন্দর করে রাখে। মনে হয় পৃথিবীর একটা ইনোসেন্ট। আর ভিতরে ভিতরে এত রস। তুই গণরুমে চলে যাবি। রুমে থাকতে পারবি না। সব গোছাইছিস। গোছাইসনি কেন? আমি এখন চারটা মেয়ে পাঠাবো। তোরা গণরুমে চলে যাবি। তিনজনের জন্য এই শাস্তি। তোরা সবাইরে নিয়ে গেছিলি। তোদের পদে পদে কঠিন শাস্তি দিতে হবে। আন্দোলনে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে কথা বলিসনি কেন? এখন থেকে হলে থাকতে হলে প্রতিদিন আমার সঙ্গে কথা বলবি। তুই, তুই আর তুই। এই তিনজন। আর কেউ না। এক মেয়েকে ইঙ্গিত করে ইশা আরো বলেন, এই তুই তোর আব্বুকে কল দে। মেয়েটি দিতে অস্বীকৃতি জানালে ইশা বলে না হলে আমি কল দিবো। তখন অনেক খারাপ হবে। তুই কল দে। আমি যেটা বলি সেটা করেই ছাড়ি। হলের গেট ভেঙে তোরা আন্দোলনে যাস। এটা তোর আব্বুকে বলে দিবো। তখন তোর পরিবারের সবাই বিষয়টি জানবে। কাল থেকে কেউ আমাকে না বলে কোথাও বের হবি না।’ এদিকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারাদাশে প্রত্যাহার করায় হলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ১২ই এপ্রিল রাতেই হল থেকে ১৫/২০ জন ছাত্রী বাড়ি চলে যায়। হলে অবস্থানরতদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে ইশার ওপর থেকে বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভিসি ড. আখতারুজ্জামান বলেন, শুধু ছাত্রত্ব ফিরে পাবে না। বরং সম্মানিত হবে। সেটি উচিত হবে। কারণ, আমরা তো কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি অবিচার করতে পারি না। যদিও ঘটনার দিন রাতেই ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। ওই দিন তিনি বলেন, তাকে শারীরিকভাবে আহত করেছে। এটা জানার পর আমি দুই দিক থেকে ভেরিফাই করলাম। প্রক্টর এবং হল প্রশাসন বললো। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যেহেতু ওই মেয়ে আরেকজনকে আঘাত করেছে তাই তাকে বহিষ্কার করলাম।”

এ কেমন মা? মায়ের নির্মমতার শিকার ২ শিশু

নির্মম, নৃশংস এক মায়ের কাহিনী। কতটা পাষাণ হলে মানুষ এমন করতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। যে মা দশ মাস দশ দিন শত কষ্টের মাঝে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন। সেই সন্তানকে নিজেই আবার কিভাবে পুড়িয়ে হত্যা করে? গ্রামবাসী ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ওই মায়ের দিক থেকে। তাদের মন্তব্য এই মহিলা ‘মা’ নামের কলঙ্ক। পুলিশ ঘাতক মাকে আটক করে থানা হাজতে রেখেছে। মায়ের অনৈতিক কাজের সাক্ষী হওয়ায় ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে দুই অবুঝ সন্তানের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় শেফালী আক্তার (২৮)। ঘটনাস্থলে পুড়ে কয়লা হয় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক সন্তান। দ্বিতীয় সন্তান মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। মর্মস্পর্শী ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার শেষ রাতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার উচিৎপুরা ইউনিয়নের বাড়ৈপাড়া এলাকায়। আগুনে ঝলসে যাওয়া অপর শিশু সন্তান জিহাদ হোসেন শিপন (৭)কে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত শিশু হৃদয় হোসেন (৯) উপজেলার বাড়ৈপাড়া ৩৫নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণি ও জিহাদ হোসেন শিপন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহত হৃদয়ের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। খবর পেয়ে গতকাল বিকালে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মতিউর রহমান, সিনিয়র এএসপি রশীদ ও আড়াইহাজার থানার ওসি এমএ হক ঘটনাস্থল পরির্দশন করেন।
৩৫নং বাড়ৈপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বাড়ৈপাড়া এলাকার জয়নাল আবেদীন জানান, নিহত হৃদয় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল। প্রায় ১১ বছর আগে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ইসলামপুর এলাকার সুন্দর আলীর মেয়ে শেফালীর সঙ্গে স্থানীয় বিল্লাল টেইলারের ছেলে আনোয়ার হোসেনের বিয়ে হয়। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরেই আনোয়ার হোসেন বাহরাইন প্রবাসী। উচিৎপুরা ইউনিয়নের বাড়ৈপাড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতেই দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন শেফালী। এরই মধ্যে একই এলাকার জনৈক মোমেনের সঙ্গে শেফালীর পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠে। এরই জের ধরে তিন মাস আগে আনোয়ারের সঙ্গে শেফালীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কিন্তু দুই সন্তান নিয়ে শেফালী ওই বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার দিন শেষে রাতে মোমেন শেফালীর ঘরে অবস্থান করছিল। মায়ের সঙ্গে অন্যপুরুষের অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি দেখে ফেলায় দুই সন্তানকে ঘুমের ট্যাবলেট সেবন করিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ সময় ঘটনাস্থলেই হৃদয় মারা যায়। অপর সন্তান জিহাদও ঝলসে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডাক্তার উত্তম জানান, শিশু জিহাদের এক হাত ও দু’পা ঝলসে গেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। তবে, তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
স্থানীয় এক যুবক জানান, মোমেনের সঙ্গে শেফালীর দীর্ঘদিন ধরেই পরকীয়া সম্পর্কের কারণে তার প্রবাসী স্বামী বিবাহ বিচ্ছেদ করেন। কিন্তু এরপরও সে সন্তানদের নিয়ে এখানেই বসবাস করতে থাকেন।
আড়াইহাজার থানার ওসি এমএ হক বলেন, ঘটনাস্থল থেকে শিশু হৃদয়ের পুড়ে যাওয়া লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ও জিহাদকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। মা শেফালীকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

আজ বর্ষবরণে জল-স্থল আকাশে কঠোর নিরাপত্তা

আজ পহেলা বৈশাখ। সূর্যোদয়ের মাধ্যমে শুরু হলো নতুন বাংলা সন ১৪২৫। বর্ণিল সাজে চিরায়ত বাংলার বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ নতুন বছরকে বরণ করছে বাঙ্গালীরা। এ উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে আয়োজন করা হয়েছে বর্ষবরণের নানা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইউনেস্কো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মঙ্গল শোভাযাত্রা। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে রমনাসহ পুরো রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শুধু স্থল বা জল নয়, আকাশেও জোরদার করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা। বর্ষবরণ নিরাপদ করতে রাজধানীর অনুষ্ঠানস্থল ও রাস্তায় রাস্তায় থাকছে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহুমুখী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। হাতিরঝিল ও রবীন্দ্র সরোবরসহ পানিতে থাকছে নৌ-পুলিশ। রমনা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ঘিরে আকাশে র‌্যাব সদস্যরা চক্কর দেবে হেলিকপ্টারে। পর্যবেক্ষণ করা হবে পরিস্থিতি। নারী হয়রানি রোধে হাতিরঝিল ও রমনায় থাকছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এছাড়া মঙ্গল শোভাযাত্রা ও ছায়ানটের বর্ষবরণ হবে পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে। থাকছে পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার, আর্চওয়ে, ডগ স্কোয়াড, সোয়াট টিম, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, গোয়েন্দা সদস্য ও মোবাইল কোর্ট। যান চলাচল বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বহু সড়কে। এদিকে গতকাল রমনার বটমূলে র‌্যাবের বিভিন্ন প্রস্তুতির কথা জানান এলিট ফোর্সটির মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমদ। এ সময় তিনি বলেন, দেশবাসী বর্ষবরণের জন্য উন্মুখ। আগামীকাল উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখতে দেশব্যাপী নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে র‌্যাব। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র রমনা হলেও গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীর হাতিরঝিল, রবীন্দ্র সরোবর, উত্তরাসহ বিভিন্নস্থানে অনুষ্ঠান হয়। বেশি জায়গায় অনুষ্ঠান হলে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বেড়ে গেলেও রমনায় জনসমাগমটা কম হয় না। জনগণের উৎসব আনন্দমুখর করতে আমরা যে কোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুত। রমনাসহ অন্যান্য জায়গায় সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিশ্চিত করবে র‌্যাব।
তিনি আরো জানান, রমনায় প্রতিবার র‌্যাবের কন্ট্রোলরুম থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো হাতিরঝিলেও তা খোলা হবে। রমনা পার্ক এলাকায় পেট্রোল করা হবে। রমনা পার্ক ও মঙ্গল শোভাযাত্রা এলাকায় আকাশ থেকে হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পেট্রোল টিমের পাশাপাশি থাকবে র‌্যাবের চেকপোস্ট। তিনি আরো বলেন, প্রথমবারের মতো র‌্যাব শিশু ও বৃদ্ধদের বিশ্রামের জন্য রমনা ও হাতিরঝিলে বৈশাখী লাউঞ্জ করছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানস্থল নজরদারিতে রয়েছে।
অবশ্য নববর্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গতকাল আশেপাশের বস্তি ও আবাসিক হোটেলে অভিযান চালায় এবং সন্দেহভাজন ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উপর নজরদারি থাকছে বলেও জানান তিনি।
রাজধানীজুড়ে পুলিশের নিরাপত্তা বলয়: এ উপলক্ষে রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আরো ব্যাপক ও বহুমুখী নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, একই দিন মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান শবে মেরাজ থাকায় রাজধানীর উন্মুক্ত স্থানে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান বিকাল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সবাইকে ভেন্যু ছাড়তে হবে। তবে রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠান ৭টা পর্যন্ত চলবে। আর উন্মুক্ত স্থানে বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান ঘিরে থাকছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি অনুষ্ঠান স্থলে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে হবে আর্চওয়ে দিয়ে তল্লাশির মাধ্যমে। ওয়াচ টাওয়ারে পর্যবেক্ষণ করা হবে পরিস্থিতি। ধূমপান ও ইভটিজিং রোধে মাঠে থাকছে মোবাইল কোর্ট। মুখে নয়, মুখোশ রাখতে হবে হাতে। বাজবে না ভুভুজেলা। পুরো রাজধানীতে থাকছে পুলিশের সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ সদস্যরা। ইতিমধ্যে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপ করা হয়েছে বহু ভেন্যু। কোনো ধাতব বস্তু দা, নেইল কাটার, ব্লেড ও দাহ্য পদার্থ যেমন দিয়াশলাই ইত্যাদি বহনে নিষেধ রয়েছে। দমকল বাহিনী, অ্যাম্বুলেন্স এবং বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে মাঝপথে কেউ ঢুকতে পারবে না।
রমনা পার্ক ও সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট: মূল অনুষ্ঠানস্থল রমনা পার্কে শুধু প্রবেশের জন্য তিনটি গেট উন্মুক্ত থাকবে। তা হলো, রমনা রেস্তরাঁ গেট, অস্তাচল গেট (শিশু পার্কের বিপরীতে) ও অরুণোদয় গেট (সুগন্ধার বিপরীতে)। দর্শনার্থীদের বের হওয়ার দু’টি গেট হলো, উত্তরায়ণ গেট (মিন্টু রোডের পশ্চিম প্রান্ত) ও বৈশাখী গেট (আইইবির বিপরীতে)। একই সঙ্গে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য খোলা থাকবে শ্যামলীমা গেট (কাকরাইল মসজিদের দক্ষিণে) ও স্টার গেট (মৎস্য ভবন ক্রসিং)। অপর দিকে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ব্যবহার হবে ৫টি গেট। প্রবেশ পথগুলো হলো, শিখা চিরন্তন গেট, বাংলা একাডেমির বিপরীতে নতুন গেট ও তিন নেতার মাজার সংলগ্ন গেট। বের হওয়ার জন্য খোলা থাকবে কালী মন্দির গেট ও আইইবি গেট। তবে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি ও ছবিরহাট গেট দু’টি বন্ধ থাকবে।
আজ বন্ধ থাকবে যেসব রাস্তা: পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক ও সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান ও পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং রবীন্দ্র সরোবরে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। বন্ধ থাকবে বাংলা মটর-রূপসী বাংলা-শাহবাগ-টিএসসি-দোয়েল চত্বর রোড, রূপসী বাংলা-কাকরাইল-মৎস্য ভবন-কদম ফোয়ারা রোড, মৎস্য ভবন-শাহবাগ-কাঁটাবন রোড, পলাশী-শহীদ মিনার-দোয়েল চত্বর-হাইকোর্ট ক্রসিং রোড, বকশী বাজার-শহীদ মিনার-টিএসসি রোড, শহীদুল্লাহ হল ক্রসিং-দোয়েল চত্বর রোড এবং নীলক্ষেত-টিএসসি রোড।
বিকল্প রোড: তবে যান চলাচলের জন্য কিছু বিকল্প রোড হিসেবে আজ ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এগুলো হচ্ছে, মিরপুর রোড-সায়েন্স ল্যাবরেটরি-নিউ মার্কেট-আজিমপুর-বকশী বাজার-চাঁনখার পুল-গুলিস্তান রোড, রাসেল স্কোয়ার-সোনারগাঁও-রেইনবো-মগবাজার-মালিবাগ-রাজমনি-ইউবিএল-গুলিস্তান রোড, মহাখালী-সাতরাস্তা-মগবাজার-কাকরাইল-রাজমনি-ইউবিএল-গুলিস্তান রোড, ফার্মগেট-সোনারগাঁও-বাংলা মটর-মগবাজার-মৌচাক-মালিবাগ-খিলগাঁও রোড এবং ফার্মগেট-সোনারগাঁও-বাংলা মটর-মগবাজার-কাকরাইল চার্চ-রাজমনি-পল্টন-মতিঝিল রোড।
রমনা পার্ক ও সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান কেন্দ্রিক ডাইভারশন পয়েন্টগুলো: পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানস্থল রমনা পার্ক ও সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানমুখী যানবাহনগুলোকে অন্যপথ দিয়ে ঘুরে যেতে বেশ কিছু পয়েন্ট নির্ধারণ করছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। তা হলো, সোনারগাঁও ক্রসিং, বাংলা মটর ক্রসিং, পরিবাগ গ্যাপ, নেভাল চীফ গলি, সাকুরার গলি, পুলিশ ভবন ক্রসিং, সবজি বাগান ক্রসিং, মিন্টো রোড পূর্ব প্রান্ত, অফিসার্স ক্লাব ক্রসিং, সুগন্ধা ক্রসিং, কাকরাইল চার্চ ক্রসিং, শিল্পকলা একাডেমি গলি, দুদকের গলি, কার্পেট গলি, মৎস্য ভবন ক্রসিং, ইউবিএল ক্রসিং, জিরো পয়েন্ট ক্রসিং, হাইকোর্ট ক্রসিং, রোমানা চত্বর ক্রসিং, বকশী বাজার ক্রসিং, পলাশী ক্রসিং, নীলক্ষেত ক্রসিং, কাঁটাবন ক্রসিং, আজিজ সুপার মার্কেট ক্রসিং, প্রশাসন একাডেমি গলি ও শাহবাগ ক্রসিং।
গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা: আজ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য যে সড়কগুলোর এক লেন ব্যবহার করা যাবে সে সড়কগুলো হলো, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল রোড (উত্তর হতে আগত), পুরাতন এলিফ্যান্ট রোড (উত্তর হতে আগত), আবদুল গণি রোড (পূর্ব-দক্ষিণ দিকের গাড়িসমূহ), কার্জন হল হতে বঙ্গ বাজার হয়ে ফুলবাড়িয়া (দক্ষিণ দিকের গাড়িসমূহ), মৎস্য ভবন থেকে কার্পেট গলি (আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িসমূহ), শিল্পকলা একাডেমি গলি (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িসমূহ), সুগন্ধা হতে অফিসার্স ক্লাব (ভিআইপি ও মিডিয়ার গাড়িসমূহ) ও কাঁটাবন হতে নীলক্ষেত হয়ে পলাশী পর্যন্ত (দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের গাড়িসমূহ)

পরিচ্ছন্নতায় রেকর্ড গড়েছে ঢাকা, স্বীকৃতির অপেক্ষা

ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ৮টা। নগর ভবন এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই নাই। হাতে ঝাঁড়ু, মাথায় টুপি, পরনে সাদা গেঞ্জি ও হাতে ব্যাজ পরে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। সবাই ঢাকাকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে নাম লেখাতে চায়। নগর ভবনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছাড়াও বাদ যায়নি ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য, জাতীয় স্কাউট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), ফায়ার সার্ভিস। সম্মিলিতভাবে সবাই প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির মাধ্যমে রেকর্ড গড়তে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের আমন্ত্রণে হাজির হয়েছিলেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগর ভবন, ফুলবাড়িয়া, গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট ও আশপাশের এলাকা লোকে-লোকারণ্য হয়ে যায়। বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে আগতদের রেজিস্ট্রেশন করে একটি প্রতিষ্ঠান। সকাল ৭টা থেকে দুটি বুথে ৮০টি কাউন্টারের মাধ্যমে একযোগে রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়। এর মধ্যে ফুলবাড়িয়া বুথে ৫৫টি কাউন্টার ও নগর ভবনের সামনে ২৫টি কাউন্টার ছিল। হিসাব অনুযায়ী সেখানে ১৫ হাজার ৩১৩ জন রেজিস্ট্রেশন করেছে। এর বাইরে আরো কয়েক হাজার লোক রয়েছে যারা রেজিস্ট্রেশন করেনি ও করার সুযোগ পায়নি। সিটি করপোরেশন দাবি করছে সেখানে সব মিলিয়ে অন্তত লাখের কাছাকাছি লোক জমায়েত হয়েছিল।
স্বচ্ছ ঢাকা গড়তে এ আয়োজন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সহযোগিতা করেছে ডেটল। আতশবাজি, জাতীয় সংগীতের পরে বেলা পৌনে ১১টায় মেয়র সাঈদ খোকন ডেটল পরিচ্ছন্ন ঢাকার উদ্বোধন করেন। পরে ১ মিনিট প্রত্যেকের অবস্থান থেকে ঝাড়ু দেয়া হয়। এসময় সেখানে মেয়রের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন গাজী গ্রুপের চেয়ারম্যান গাজী গোলাম দস্তগীর, সানজিদা খানম, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা, ডিএমপি কমিশানার আছাদুজ্জামন মিয়া, আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মুরাদ, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, রেকিট বেনজিকারের মার্কেটিং ডিরেক্টর সৈয়দ তানজিম রেজওয়ান, জিটিভির মার্কেটিং ডিরেক্টের আমান আশরাফ ফায়েজ, চিত্রনায়ক রিয়াজ, ডিএনসির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হক প্রমুখ। এসময় অতিথিরা মেয়রের এই উদ্যেগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই শহর আমাদের। এই শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদের। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আজ বিশ্ব রেকর্ড তৈরি হলো। অনুষ্ঠান শেষে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, আমরা হয়তো পুরো ঢাকাকে আজ পরিষ্কার করতে পারি নাই। তবে এখান থেকে একটা সচেতনতা তৈরি হবে। কারণ মন সুন্দর যার, সে রাখে দেশ পরিষ্কার। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে যারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন তারা সুন্দর মনের মানুষ। মেয়র বলেন, ঢাকাবাসী বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। আর তার সাক্ষী হয়ে থাকলেন আপনারা। এই রেকর্ডটি আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করলাম।
উল্লেখ্য, ভারতের গুজরাটে ২০১৭ সালের ২৮ মে বদোধারা শহরে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন পাঁচ হাজার ৫৮ জন কর্মী নিয়ে এক কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে নাম ওঠায়। শহরের একতা ডান্ডিয়া বাজার রোড পরিষ্কার করে এ রেকর্ড গড়া হয়। সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ার পরিকল্পনা ডিএসসিসির। কর্মসূচি সফল করতে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেছেন।

নবযাত্রার স্বপ্ন by কাফি কামাল

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রমনায় র‌্যাবের নিরাপত্তা মহড়া
‘নিশি অবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত/আমি আজি ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত/বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে রও, ক্ষমা কর আজিকার মত/পুরাতন বরষের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’ আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্দা উঠবে নতুন বঙ্গাব্দের। স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নেবে ঘটনাবহুল ১৪২৪। ব্যতিক্রমহীনভাবেই কবিগুরুর গানে আহ্বান জানানো হবে নতুন বছরকে। অনেকটা প্রার্থনাসংগীতের মতোই জরা ও গ্লানির পুরাতন মুছে মঙ্গলময় আগামী নির্মাণের প্রত্যয়ও ঘোষিত হবে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজন আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ স্বাগত জানানো হবে ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে। শুভ বাংলা নববর্ষ, স্বাগত অভিবাদন। নববর্ষ আসে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয় নিয়ে। সব অশুভ ও   অসুন্দরকে পেছনে ফেলে বৈশাখ আসে নতুনের কেতন উড়িয়ে। বিপুল বৈভব, সম্ভাবনা, নতুনের আহ্বান, পুরাতন দিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত বাঙালি। পহেলা বৈশাখে আমরা সুন্দর, সুচি আর চিরমঙ্গলের জয়গান করি। স্নাত হই বৈশাখের রৌদ্র খরতাপে, দূর করি বৎসরের যত আবর্জনা। গ্লানি মুছিয়ে, জরা ঘুচিয়ে শপথ নিই বিশুদ্ধতার। নতুন বছরে সবার আশা এক বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে না কোনো ভয়, হতাশা কিংবা অশুভ শক্তির। গণমানুষের অধিকার আদায় আর শান্তি-স্বস্তির স্মারক হয়ে উঠুক আজ। হাজার বছরের বয়ে চলা লোকজ সংস্কৃতি আমাদের নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে। নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয়ে নতুন কুঁড়ির মতো আমাদের সমাজ, জীবনে এবং রাষ্ট্রে সম্ভাবনার নতুন নতুন পালক যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা গণমানুষের। বিশ্বকবির ভাষায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ 
পয়লা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। এ উৎসবের সার্বজনীনতা অসাধারণ। বাঙালি জাতি তার নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, আর এ ধারা চলে আসছে গানে-কবিতায়, লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দেশের বৃহত্তম অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের সঙ্গে বাংলার সাহিত্য, বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই বাংলা সন গণনার শুরু মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন। পরে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। অমর্ত্য সেন তার আর্গুমেন্টিভ ইন্ডিয়ানে বলেছেন, ‘আকবর সব ধর্মবিশ্বাসীর সমান উপযোগী একটি বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।’ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল আকবরনামায় লিখেছেন,  ‘ফসল সংগৃহীত হয় সৌর বর্ষপঞ্জি অনুসারে। তাই হিজরি সালের পাশাপাশি একটি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন ছিল। দ্বীন-এ-ইলাহির মতো আকবর সেটির নাম দিয়েছিলেন তারিখ-ই-ইলাহি।  বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয় ১৫৫৬ সালে। মাসের নামগুলো নেয়া হয় নক্ষত্রের নাম থেকে। তারিখ-ই-ইলাহি চালুর পর ১৪টি নতুন উৎসবের কথা ঘোষণা করেন আকবর। এই রকম এক নওরোজেই শাহজাদা খুররমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মমতাজের। এ কারণে অনেকে বলতে চান, পহেলা বৈশাখ না হলে সৃষ্টি হতো না প্রেমের অমর স্মৃতি তাজমহল।
বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। পয়লা বৈশাখ এখন সব বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সমপ্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। কৃষকসমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও পরে সংযোগ ঘটে রাজনৈতিক ইতিহাসের। আমাদের পরাধীনতার কালে এই উৎসব আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালিও সোচ্চার ছিল প্রতিবাদে। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে সূচিত ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে করেছে বেগবান। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসামপ্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্ব্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেসকো এ শোভাযাত্রাকে দিয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা। প্রথমদিকে পয়লা বৈশাখের উৎসব ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। শহরে-বন্দরেও তা সীমিত ছিল হালখাতায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বর্ণিল, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ উৎসব পালিত হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি নগর-মহানগরে। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আদলে প্রায় সর্বত্র আয়োজিত হয় এ অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনো এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছে। আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরো বেশি উজ্জ্বলতায়। দেশের পথেঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসবমুখরতার বিহ্বলতা। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারা দেশ। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। সর্বত্র দেখা যায় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। কবির ভাষায়- ‘অনাগত আগামীর অফুরান বাদ্য/নতুনের আবাহনে হয়’।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি বছরের হিসাব করে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী। নববর্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা জনজাতির বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু মিলিয়ে এ বৈসাবি। বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের অনিন্দ্য আমেজ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিও মেতে উঠবে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। নববর্ষে উৎসব-পার্বণে ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাদ্যতালিকায় রসগোল্লা, নকশিপিঠা, কদমা-বাতাসা, ভর্তা, আচার, খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস অনিবার্য। পালা-পার্বণ, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবে এসব সুস্বাদু খাবার শত বছর ধরে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। নববর্ষ উপলক্ষে চারদিকে ধুম পড়বে বাঙালির বাংলা খাবার আস্বাদনে।
নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিশ্বের বাঙালিদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। কেবল রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেক পোস্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।
বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান: বর্ষবরণে রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন থাকবে। দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ছায়ানট’ ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সরোদবাদন দিয়ে শুরু করবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপন ১৪২৫ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’- প্রতিপাদ্য ও মর্মবাণী ধারণ করে অনুষ্ঠিত হবে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দুই বছর বিরতি দিয়ে এবার বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে পহেলা বৈশাখে। বাংলা একাডেমি সকালে সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে একাডেমি চত্বরে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে হাজারো কণ্ঠে’ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। বিকাল তিনটায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সকাল নয়টায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবারের আয়োজন রেখেছে।

ঘুষের টাকাসহ গ্রেপ্তার প্রধান নৌ-প্রকৌশলী কারাগারে

পাঁচ লাখ টাকা ঘুষসহ গ্রেপ্তার নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এস এম নাজমুল হকের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে দুদক। এ সময় মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল ওয়াদুদ। অপরদিকে নাজমুল হকের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম জামিনের আবেদন করেন। আদালতে দুদকের পক্ষে আবুল হাসান জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সুব্রত ঘোষ শুভ তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সেগুন রেস্তোরাঁ থেকে দুদকের উপ-পরিচালক নাসিম আনোয়ারের নেতৃত্বে একটি দল গ্রেপ্তার করে নৌ-প্রকৌশলী নাজমুল হককে। সৈয়দ শিপিং লাইন নামের একটি শিপিং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেয়ে সব আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ফাঁদ পাতে দুদক। পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীকে সেগুন রেস্তোরাঁয় আসার কথা বলেন নাজমুল হক। সেখানে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল দুদকের দলটি। ঘুষ নেয়ার পররপরই দুদকের দলটি হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে নাজমুল হককে। সৈয়দ শিপিং লাইনের জাহাজের রিসিভ নকশা অনুমোদন ও নতুন জাহাজের নামকরণের অনুমোদনের জন্য ১৫ লাখ টাকা ঘুষ চান নাজমুল। এর মধ্য থেকে পাঁচ লাখ টাকা আগেই নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় কিস্তির পাঁচ লাখ টাকা নিতে গিয়ে দুদকের ফাঁদে পড়লেন তিনি। দুদক সূত্র জানায়, এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুদক তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করছে।
এর আগে গত বছরের জুলাই মাসে একই দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কে এম ফখরুল ইসলামকে ঘুষের টাকাসহ গ্রেপ্তার করেছিল দুদক। একটি জাহাজের নকশা অনুমোদন করতে মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে অধিদপ্তরের কার্যালয়ে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার সময় তাকে হাতেনাতে তখন গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর এ ঘটনায় দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াদুদ বাদী হয়ে ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। পরে তিনি জামিন নিয়ে মুক্তি পান। তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে করা মামলাটি বিচারাধীন।

বৈশাখ উদযাপন: ১২০ টন ইলিশ মজুত by মোরশেদ আলম

মজুত ইলিশ দিয়ে চাঁদপুরে বৈশাখ উদযাপন। এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ১২০ টন ইলিশ মজুত করেছে জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে খন্দকার ফিশ প্রসেসিং কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ। ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে মিয়ানমারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় স্বাদবিহীন ইলিশ দিয়েই হবে এবারের পহেলা  বৈশাখ উদযাপন। অবশ্য বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে ইলিশের চাহিদা থাকলেও চাঁদপুর নৌ-সীমানার মতলবের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত ১শ্থ কিলোমিটার এলাকা অভয়াশ্রম ঘোষণা করায় নদীতে কোনো প্রকার জাল ফেলা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ফলে নদীতে জাল ফেলে ইলিশ ধরতে পারছে না জেলেরা। তাই মজুত ইলিশের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বৈশাখ উদযাপনে।
চাঁদপুর জেলার একমাত্র ইলিশ মজুত করার বেসরকারি কোল্ড স্টোরেজ খন্দকার ফিশ প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মালেক খন্দকার জানান, সরকারি অনুমতি নিয়ে তিনি এ বছর ১২০ টন ইলিশ মজুত করেছেন। পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মজুত করা ইলিশ সরবরাহ করা হচ্ছে। ১০ কেজি করে প্যাকেটজাত করা হয়েছে এসব ইলিশ। এর মধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ২৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৩৫০ টাকা কেজি, ৫০০ গ্রাম থেকে কেজি পর্যন্ত ৮০০ থেকে ১ হাজার পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। গত বছর চাহিদা বেশি থাকলেও এ বছর কিছুটা কম। তাই দামও কিছুটা কম রয়েছে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকী জানান, জাটকা ধরা প্রতিরোধে চাঁদপুরের এই এলাকা অভয়াশ্রমের মধ্যে রয়েছে। তাই এবছর খন্দকার ফিশ প্রসেসিং কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ১২০ টন বাইরের ইলিশ মজুত করেছে।
সরজমিনে চাঁদপুরের ইলিশের মাছঘাট বড়স্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এ রকম চিত্র। ইলিশ মাছ নেই। তাই মাছের আড়ৎদাররা শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা রুই কাতলাসহ বিভিন্ন মাছ নিয়ে কিছুটা সময় কাটাচ্ছে। আবার কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা কেটে যাওয়ার আগেই নিজেদের আড়ৎ ও আশপাশের এলাকা অবকাঠামো নতুন করে মেরামত করছেন। ব্যস্ত মাছ ঘাট অনেকটাই নীরব। চৈত্র পেরিয়ে বৈশাখ আসার সময় হয়েছে, তাই ব্যবসায়ীরা তাদের অভ্যন্তরীণ হিসাব মেলাতে ব্যস্ত।
মাছঘাটে উপস্থিত মাছের ক্রেতা প্রফেসর অরুন চন্দ্র সরকার জানান, পহেলা বৈশাখে ইলিশ খেতে হবে, তা কেন। আমরা অন্য কিছু খাবো। জাটকা রক্ষা করতে পারলে আমরা বড় ইলিশ খেতে পারবো। তাছাড়া দামও হাতের নাগালে থাকবে। পহেলা বৈশাখে না হয় দুধের স্বাদ ঘোলেই মেটাবো।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত জানান, ইলিশ মাছ চাঁদপুরের ব্র্যান্ডিং হওয়ায় এখন আমাদেরকে অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। মাছ ঘাটে পৌঁছার পর থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত সবকিছুই এখন তদারকির আওতায়। আন্তর্জাতিক সংগঠন হেসাফও আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তারা বছরে কয়েকবার চাঁদপুর মাছঘাট পরিদর্শন করে। এ সময় তিনি ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশ রপ্তানির দ্বার খুলে দেয়ার দাবি জানান।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আঃ খালেক মাল জানান, ২ মাসের নিষেধাজ্ঞার কারণে বেকার এখানকার ব্যবসায়ীরা। বৈশাখে মজুত ইলিশের উপরই আমাদের ভরসা করতে হবে। তিনি জানান, অন্যবারের তুলনায় এবার ইলিশের চাহিদা কম।
মৎস্যজীবী ও ব্যবসায়ী আলী আকবরের দোকানে গিয়ে দেখা গেল, ফ্রিজে ইলিশ মাছ। এই ইলিশ মাছের কথা জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, এগুলো অনুমতিপ্রাপ্ত বেসরকারি কোল্ড স্টোরেজ খন্দকার ফিশ প্রসেসিং থেকে সরবরাহকৃত। তিনি জানান, এখানে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ হলেও সুরেশ্বরসহ বিভিন্ন স্থানে অবাধে বড় ও জাটকা ইলিশ ধরা হচ্ছে। এগুলো রুখবে কে?