Showing posts with label জন্মদিন. Show all posts
Showing posts with label জন্মদিন. Show all posts

Thursday, July 10, 2025

শততম জন্মদিন: মাহাথিরের দীর্ঘ ও সফল জীবনের রহস্য by কাজী আলিম-উজ-জামান

শতবর্ষ বয়স পূর্ণ হয়েছে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে পরিচিত মাহাথির মোহাম্মদের। আজ বৃহস্পতিবার ছিল তাঁর শততম জন্মদিন। দীর্ঘ এ জীবনে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি সাফল্যের এক অনুপ্রেরণা। শততম জন্মদিনেও তাই থামতে নারাজ মালয়েশিয়ার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, ‘অবসর মানে আপনি কিছুই করছেন না।’ শততম জন্মদিনে অনুপ্রেরণার বাতিঘর মাহাথির মোহাম্মদকে আমাদের স্মরণ।

মানবজীবন দীর্ঘ হতেই পারে। কিন্তু সব দীর্ঘজীবনই মহিমান্বিত হয় না। দীর্ঘ সে জীবন যদি ত্যাগ স্বীকারের হয়, অপরের কল্যাণে হয়, তবে সে জীবন একই সঙ্গে হয় সফল।

দীর্ঘ ও সফল জীবনের এক উদাহরণ ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি, যিনি প্রথম দফায় (১৯৮১-২০০৩) দীর্ঘ ২২ বছর সফলভাবে দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। মালয়েশিয়াকে করেছেন একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র।

ড. মাহাথির চল্লিশের দশকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সিতি হাসমাহর। পরিচয় থেকে অন্তরঙ্গতা, এরপর বিয়ে। সিতি হাসমাহও ওই মেডিকেলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন।

দ্বিতীয় দফায় (২০১৮-২০২০) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসেন ৯৪ বছর বয়সে। তাঁর কর্মস্পৃহা, উদ্যম রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। এখন ১০০ বছর বয়সেও প্রায় সুস্থ জীবন যাপন করছেন মাহাথির।

২০২৩ সালে ঢাকার বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে হয়ে যাওয়া লিট ফেস্টে একটি সেশনে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন মাহাথিরকন্যা মেরিনা মাহাথির। তিনি একজন সুপরিচিত মানবাধিকারকর্মী ও লেখক। মাহাথিরকে নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘দ্য অ্যাপল অ্যান্ড দ্য ট্রি’ নিয়েই মূলত আলোচনা হচ্ছিল। সেখানে মানবাধিকারসহ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ছোট্ট করে উঠে এল মাহাথিরের দীর্ঘ জীবনের প্রসঙ্গও।

সেই জায়গা থেকেই এ লেখার অনুপ্রেরণা। আসলেই তো! মাহাথিরের দীর্ঘ ও সফল জীবনের প্রকৃত রহস্যটা কী?

মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবন, বিরোধী মত দমন, মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে তাঁর সীমিত অঙ্গীকার—এসব নিয়ে কম আলোচনা, তর্কবিতর্ক হয়নি। এখনো হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁর জীবনবোধ, একনিষ্ঠতা, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাও আলোচনায় এসেছে।

কিন্তু যে মানুষ শত বছর বয়সেও কর্মক্ষম থাকেন, সেই মানুষটি ভিন্ন।

মাহাথিরের জীবনের পাণ্ডুলিপি

মাহাথিরের জীবনের পাণ্ডুলিপিতে চোখ বুলিয়ে আসা যাক। জন্ম মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের প্রধান শহর আলোর সেতারে। তাঁর দাদা ভারতের কেরালা থেকে সেখানে অভিবাসী হন। বিয়ে করেন এক মালয় নারীকে।

ছোটবেলা থেকেই তুখোড় মেধাবী ছিলেন মাহাথির। বাবা মোহাম্মদ ইস্কান্দার, যিনি ছিলেন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শৈশবেই ছেলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও একাগ্রতার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন। পড়াশোনা করতে গিয়ে তাই খেলাধুলায় মনোযোগ দিতে পারেননি মাহাথির।

ড. মাহাথির চল্লিশের দশকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সিতি হাসমাহর। পরিচয় থেকে অন্তরঙ্গতা, এরপর বিয়ে। সিতি হাসমাহও ওই মেডিকেলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে মেডিকেল কলেজ বন্ধ থাকে। এ সময় মাহাথির কফি, চকলেট বিক্রি করে কিছু উপার্জন করেন।

গাইনোকোলজিতে এমবিবিএস শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন মাহাথির। পাশাপাশি নিজ অঞ্চল কেদাহর আলোর সেতারে ফিরে চিকিৎসাসেবা শুরু করেন। সে সময় আলোর সেতারে একমাত্র চেম্বারটি ছিল মাহাথিরের। একসময় তাঁর মধ্যে ধারণা আসে, ডাক্তারি পেশা দিয়ে সীমিতসংখ্যক মানুষের উপকারে আসা সম্ভব। কিন্তু বিপুল মানুষের সেবা করতে হলে রাজনীতির বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকে রাজনীতির ময়দানে পা ফেলেন ১৯৬৪ সালে, তখন তাঁর বয়স ৪০-এর কাছাকাছি।

মাহাথির-সিতি দম্পতির এক মেয়ে, চার ছেলে। মেরিনা পরিবারের বড় সন্তান। পরে অবশ্য তাঁরা আরও দুটি সন্তান দত্তক নেন।

১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর সামলেছেন মাহাথির। নির্ধারিত সময়ের আগেই নিজ দপ্তরে পৌঁছে যান তিনি। এক মিনিট দেরির রেকর্ড তাঁর নেই। এ নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ জরুরি

ছাত্রজীবন থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষ মাহাথির। তাঁর একটি প্রিয় কথা হলো, ‘আমাদের বাঁচার জন্য খাওয়া উচিত। খাওয়ার জন্য বাঁচা উচিত নয়। যেটুকু প্রয়োজন, এর বেশি খাওয়া একেবারেই উচিত নয়।’

তাঁর পরামর্শ, স্থূলতা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। কেউ বেশি দিন যদি বাঁচার আশা করেন, তবে তাঁকে শরীর থেকে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলতে হবে।

শরীরের চাহিদার চেয়ে খাবার বেশি গ্রহণ করা হচ্ছে কি না, সেটা একজন মানুষ কীভাবে বুঝবে? এ বিষয়ে মাহাথির বলেছেন, কারও কোমরের চারপাশে যদি ফ্যাট বা চর্বি জমে যায়, তবে বুঝবেন, তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করছেন। তখন তাঁকে প্লেটের খাবার চার ভাগের এক ভাগে বা তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনতে হবে।

নিউ স্ট্রেইট টাইমস পত্রিকায় এক কলামে মাহাথির লিখেছেন, শর্করা (ভাত) ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তাহলে কোমরের চারপাশের চর্বি কমতে শুরু করবে।

খাদ্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর ওজন ৩৫ বছর ধরে ৬২ থেকে ৬৪-এর মধ্যে বেঁধে রাখতে পেরেছেন।

এমনিতে মালয়েশিয়া স্থূল মানুষের দেশ হিসেবে এশিয়ায় পরিচিত। দেশটির অর্ধেক মানুষের ওজন বেশি অথবা স্থূল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গত দুই দশকে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে।

নারকেলের তেল দিয়ে ব্যঞ্জন সেখানে খুব জনপ্রিয়। আর ফাস্ট ফুডের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। মাহাথিরের কথায়, খাবার যখন স্বাদের হয়, তখন খাওয়া বেশি হয়। এতে পাকস্থলী দিন দিন স্ফীত হতে থাকে। তখন একে বশে রাখতে আরও খাবারের চাহিদা তৈরি হয়। অতিরিক্ত খাবারের কারণে ধীরে ধীরে লিভার, কিডনি, প্যানক্রিয়াসের ওপর চাপ পড়ে। উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি হয়।

২০০৭ সালে মাহাথিরের নিজেরও দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়। ওই বছর ১০ মাসের মধ্যে দুবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। তাঁর বাইপাস সার্জারি হয়। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

গ্রিল করা মহিষের মাংস তেঁতুলের সস দিয়ে খেতে খুব পছন্দ করেন মাহাথির। এ ছাড়া মুরগির মাংস দিয়ে চ্যাপটা রুটি (রোটি চেনাই) তাঁর আরেকটি প্রিয় খাবার। মাছ খেতে তেমন একটা পছন্দ করেন না।

মাহাথিরের পরামর্শ

যাঁদের বয়স ৬০ পেরিয়েছে বা যাঁরা অবসরজীবন যাপন করছেন, তাঁদের জন্য মাহাথিরের পরামর্শ হলো, সব সময় সক্রিয় থাকার চেষ্টা করতে হবে। হাঁটতে হবে, শরীরচর্চা করতে হবে। বয়স্কদের দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকার পক্ষে নন মাহাথির, বিশেষ করে দিনের বেলায়। তিনি যেমন এই বয়সেও সকালে কাজ শুরু করে শেষ করেন রাত ১০টা বা ১১টায়।

সব মিলে প্রতিদিন সাত ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন মাহাথির। তাঁর মতে, এর বেশি ঘুমালে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। একটু কম ঘুমের পাশাপাশি যদি শরীরচর্চা করা যায়, তবে মাংসপেশি ও হাড় শক্তিশালী থাকে। এতে ব্রেনও সক্রিয় থাকে।

মাহাথিরের পরামর্শ, ব্রেনকে যদি কাজে লাগানো না হয়, তবে সে-ও হাল ছেড়ে দেবে, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। ব্রেনের পতন ঠেকাতে সক্রিয় থাকতে হবে, কথা বলতে হবে, বই পড়তে হবে, লিখতে হবে, সমস্যার সমাধান করতে হবে, যুক্তি দিতে হবে, বিতর্ক করতে হবে। যাঁরা এ কাজগুলো করেন না, তাঁরা ব্রেনের প্রধান প্রধান কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখেন। মাহাথির বলেন, তাঁর এ অভিমত কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে নয়, কেবলই তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

মাহাথির মনে করেন, সংবাদ বা খবরের মধ্যে থাকা মানসিক মনোবল বৃদ্ধির একটা উপায়। তাঁর মতে, প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠ মনকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। একজন বয়স্ক মানুষ সাধারণত বর্তমানের চেয়ে অতীতে স্মৃতিচারণায় বেশি আগ্রহী হন। সংবাদপত্র ও বই পাঠ করা এবং কথা বলার মধ্য দিয়ে এ ক্ষেত্রে তাঁদের উন্নতি হয়।

মাহাথিরের মতে, ব্রেনকে সক্রিয় ও সুস্থ রাখার আরেকটি উপায় হলো লেখালেখি করা। মালয়েশিয়ার চতুর্থ ও সপ্তম এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লেখালেখি আপনার ব্রেনকে সব সময় সক্রিয় রাখতে সাহায্য করবে। সাধারণত আপনি এমন কিছু লিখতে চান, যা পাঠযোগ্য, অন্যরা পছন্দ করবে। এমন কিছু লিখতে গেলে আপনাকে কথা বলতে হবে, চিন্তা করতে হবে, তর্ক করতে হবে এবং নিজের সঙ্গে প্রয়োজনে ঝগড়াও করতে হবে।’

মাহাথির নিজেও লেখালেখি করতে পছন্দ করেন। মেডিকেলের ছাত্র থাকার সময় থেকেই লেখালেখি করছেন। তাঁর একটি ছদ্মনাম রয়েছে—‘ছেদেত’। ছাত্রজীবন থেকেই এই ছদ্মনামে সংবাদপত্রে কলাম লিখছেন তিনি। এই নামে তাঁর একটি ব্লগও রয়েছে। মালয় ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই সেখানে লেখালেখি করেন মাহাথির। ওই সাইটের ভিউর সংখ্যা তিন কোটির ওপরে, যা কেবল বাড়ছেই।

ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে ১০০ হাত দূরে থাকেন ইসলাম ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী মাহাথির। কখনো তিনি কুঁজো হয়ে বা বাঁকা হয়ে দাঁড়ান না, বসেন না, একজন সামরিক অফিসারের মতো সোজা হয়ে বসেন, সোজা হয়ে দাঁড়ান।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মাহাথির বিশেষ কোনো ডায়েট চার্ট দিতে চান না। তাঁর মতে, শর্করা (ভাত, রুটি) কম খেতে হবে। শাকসবজি, মৌসুমি ফলমূল বেশি খেতে হবে। এটুকু মানলেই যথেষ্ট।

মাহাথিরের মতে, দীর্ঘদিন বাঁচা একটা বিষয়। আর দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচা আরেকটা বিষয়। তিনি বলেন, ‘সবকিছু আমাদের হাতের মধ্যে নেই, কিন্তু যেটুকু আছে, সেটুকু মেনে চললে বুড়ো বয়সেও সুস্থ থাকা যায়।’

সূত্র: এশিয়া টাইমস, বারনামাসহ একাধিক গণমাধ্যম।
কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক
alim.zaman@prothomalo.com

১০০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মাহাথির মোহাম্মদ। পুত্রজায়ার পেরদানা লিডারশিপ ফাউন্ডেশনে একটি বিশেষ আয়োজনে, ১০ জুলাই ২০২৫

Sunday, June 22, 2025

জন্মদিনে স্মরণ- ইরানি সিনেমার কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি by মুমিত আল রশিদ

আব্বাস কিয়ারোস্তামি—আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ নামগুলোর একটি। একাধারে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, কবি, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক ও আলোকচিত্রী। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন শুভ্র তুষারের বুনো সৌন্দর্যের আলবোরর্জ পর্বতমালার পাদদেশে গ্রীষ্মের প্রথম দিনে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। দার্শনিক কবি ওমর খৈয়াম পরবর্তী পাশ্চাত্যে সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়—কিয়ারোস্তামি।

২০১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী তেহরানে ৩৫তম আন্তর্জাতিক ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে কিয়ারোস্তামির ৭৫তম জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে উৎসব থিম হিসেবে ‘বন্ধুর বসত এখানে’ (খনে দুস্ত ইনজাস্ত) চিত্তাকর্ষক বাক্যটি ব্যবহার করে। আয়োজক কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল কিয়ারোস্তামির ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ (Where Is the Friend’s House? ১৯৮৭ খ্রি.) চলচ্চিত্রটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা অনুধাবন ও অনুরণন।

ইরানি চলচ্চিত্রের মহান কবি আশির দশকের শেষভাগে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত অমর চলচ্চিত্র খনে দুস্ত কোজাস্ত। এর মাধ্যমে শুধু নিজেরই নন, বিশ্ব দরবারে ইরানি চলচ্চিত্রেরও কদর বাড়িয়ে দেন বহুগুণ। সিনেমাটি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দারুণ সাড়া ফেলে। বিশ্বের তরুণ পরিচালকদের মধ্যে তুমুল আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। ইরানের সিনেমার পথচলাও শুরু হয় নতুনভাবে।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি আবারও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন ক্লোজ আপ বা নামায়ে নাজদিক (১৯৯০ খ্রি.) ও মাশক্বে শাব (Homework, ১৯৮৯ খ্রি.) সিনেমা দিয়ে। এ দুটো চলচ্চিত্র প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের আঙিনায়ও তাঁর অনন্য দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। চলচ্চিত্র দুটোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে আমরা দেখব, এতে ফারসি সাহিত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি দিক ‘রেভায়াত পারদাজি’র সফল প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। রেভায়াত পারদাজি বলতে বোঝায়—গল্পের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছকে কথা বলা, লেখা, গান, সিনেমা, টেলিভিশনের কোনো কাজ, কম্পিউটার গেম, আলোকচিত্র, থিয়েটার বা কোনো সিকোয়েন্সে সংঘটিত গল্প অথবা অনাগত ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো গল্প যা এখনো সংঘটিত হয়নি—এ রকম কিছু। আব্বাস কিয়ারোস্তামি উপর্যুক্ত দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে রেভায়াত পারদাজির অত্যন্ত সফল চিত্রায়ণ করেছেন। তাঁর ক্লোজ আপ চলচ্চিত্র বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনেমা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপরিহার্য একটি বিষয় হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে।

এই চলচ্চিত্র ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার, লেখক ও কবি ক্রিস মার্কার ও স্পেনের চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকারের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মতো দর্শকের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—নিগূঢ় সত্য কী? বা বস্তুনিষ্ঠ বিষয় কী? অবশ্য সব বাস্তবতা, যুক্তি-দলিল, আধুনিকতার বিবেচনা আমাদের শেষ পর্যন্ত এই ফলাফলে পৌঁছতে সাহায্য করে যে, বিষয়বস্তু হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাসের কোন দিকটি ভয়ংকর? বিশ্বাস কি প্রশান্তি দেয়? কোনো মুক্তি বা উপহারের বার্তা দেয়?

অন্যদিকে আব্বাস কিয়ারোস্তামি তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় প্রায় কাছাকাছি গল্পে নির্মাণ করেন মাশক্বে শাব। ‘আভভালি হা’ ও ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত’ চলচ্চিত্র দুটি নির্মাণের মাধ্যমে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন কিয়ারোস্তামি। বিশেষ করে, খনে দুস্ত কোজাস্ত নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রচুর প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেন। গ্রামের সহজ-সরল শিশুদের চিন্তার সুপ্ত বিকাশমান ধারা, একে-অপরের প্রতি ভালোবাসা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, কষ্টসহিষ্ণু জীবনধারা, নির্লোভ জীবনের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি দেশকাল ভেদ করে চলচ্চিত্রটির প্রতি দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। উল্লেখ্য, এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের নজির যদিও পূর্বে ছিল না, কিন্তু ‘ইয়েক ইত্তেফাক্বে ছদেহ’ (A Simple Event, ১৯৭৪ খ্রি.) চলচ্চিত্রে ছোট্ট শিশুটির কাস্পিয়ান সাগর-তীরবর্তী এলাকা থেকে মাছের থলে কাঁধে নিয়ে দৌড়ানোর দৃশ্য দেখে, স্কুলের কাজ দেখে, মায়ের প্রতি কর্তব্যবোধ দেখে অনেকেই হয়তো আব্বাস কিয়ারোস্তামির হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস?-এর নায়ক আহমাদের সহপাঠী বন্ধু নেয়ামতযাদেহর কর্তব্যবোধের কারণে বারবার পাহাড়ের একপাশের গ্রাম থেকে অন্যপাশের গ্রামে দৌড়ে ছুটে যাওয়ার কথা স্মরণ করতে পারেন। শুধু কি তাই? ছোট্ট মনের আকুতি-মিনতির এই পার্থিব অর্থকে অনেক বিজ্ঞ চলচ্চিত্র সমালোচক ইহজাগতিক তৃষ্ণা থেকে পরমাত্মার যাত্রার কথাই ইঙ্গিত করেছেন।

হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের নামটি ইরানের কবি সোহরাব সেপেহরির (জন্ম ১৯২৮ খ্রি.- মৃত্যু ১৯৮০ খ্রি.) বিখ্যাত কবিতা ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর লেখক বেহরুজ তাজুর দাবি করেন যে, সিনেমার গল্পটি তাঁর ছোট গল্প ‘চেরা খানম মোআল্লেম গেরিয়ে কার্দ?’ (নারী শিক্ষক কেন কান্না করেছেন?) থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিয়ারোস্তামি প্রদর্শনীর সময় সিনেমার গল্পটি বেহরুজের গল্প থেকে নেওয়া হয়নি বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।

সিনেমার পটভূমি, লোকেশন, কলাকুশলী নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে যিনি সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়েছেন, সেই কিউমারছ পুর আহমাদি চমকপ্রদ কিছু তথ্য দিয়েছেন। কিউমারছ পুর আহমাদি পরবর্তীকালে সিনেমা ও টেলিভিশন মাধ্যমে ইরানিদের মাঝে মাজিদ নামের নস্টালজিক চরিত্রের রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের বিহাইন্ড দ্য সিনের বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছিলেন, যা খনে দুস্ত কোজাস্ত নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই সময়ে কিয়ারোস্তামি জেন্দেগি ভা দিগার হিচ (Life, and Nothing More, ১৯৯২ খ্রি.) ও জিরে দেরাখ্‌তনে জেইতুন (Through the Olive Trees, ১৯৯৪ খ্রি.) নামে আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দুটি চলচ্চিত্রই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সকলের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো হয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ড’স হোম চলচ্চিত্রের পর এই দুইটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় গিলান প্রদেশে।

সত্তরের দশকের আগে ইরানের শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিল, বিপ্লবের পরও তা অব্যাহত ছিল। এ সময় অসাধারণ সব চলচ্চিত্রকারের আগমন ঘটে। শিশু ও কিশোরদের জন্য অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এ ক্ষেত্রে যিনি বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁর আরেকটি বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.)। চলচ্চিত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া অন্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘জিরে দেরাখ্তনে জেইতুন’ (‘Through the Olive Trees’, ১৯৯৪ খ্রি.), ‘মেছলে ইয়েক আ’শেক্ব’ (‘Like Someone in Love’, ২০১২ খ্রি.) উল্লেখযোগ্য।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি তত দিনে ইরান ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একজন চলচ্চিত্রকার। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসার জোয়ারে ভাসছিল। এই সময়ে নির্মাণ তিনি করেন ‘বদ ম রা খহাদ বোর্দ’ (‘The Wind Will Carry Us’, ১৯৯৯ খ্রি.), ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.), ‘এবিছি আফ্রিকা’ (ABC Africa, ২০০১ খ্রি.) ও ‘দাহ’ (‘Ten’, ২০০২ খ্রি.)। ‘টেস্ট অব চেরি’ এর মধ্যে সবচেয়ে দেদীপ্যমান সিনেমা, যেটির মাধ্যমে কিয়ারোস্তামি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। আব্বাস কিয়ারোস্তামি ফ্রান্স-ইতালিতে নির্মিত ‘কপি বরাবর আছলি’ (‘Certified Copy’, ২০১০ খ্রি.) নিয়ে ২০১০ সালে কান উৎসবে অংশগ্রহণ করেন এবং চলচ্চিত্রটির নায়িকা জুলিয়েত বিনোশ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এ সিনেমার মাধ্যমে একটি যুগের অবসান হয়।

আব্বাস কিয়ারোস্তামিও বিশ্বখ্যাত গায়ক জিম মরিসন, ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড, ভিক্টর হুগো, দার্শনিক রুশোর মতো— প্যারিসকে অন্তিম যাত্রার জন্য বেছে নেন। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই প্যারিসেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোয় ইরানি চলচ্চিত্রের বিস্তৃত এক বেলাভূমির সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত সারা বিশ্বের দর্শক, সমালোচক, চলচ্চিত্রপ্রেমীরা অবগাহন করছেন। ৮৫তম জন্মদিনে তেহরানের অদূরে লাভাসানের ছোট্ট মফস্বল শহরে ঘুমিয়ে থাকা এ মহান শিল্পীর প্রতি একরাশ মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Thursday, August 19, 2010

পরম নামে ডাকি -নির্লিপ্ত নয়ন

সময় কি রূপকথার সেই আগুনমুখা একচক্ষু দৈত্য, চোখের পলকে মুহূর্তকে শুধু স্মৃতি করে দেয়! গল্পগাথার মতো বহুবর্ণিল স্মৃতির মহাফিলে কত না দৃশ্যের সার্কারামা রোজ ওঠে আর নামে। খুব দ্রুতই পুরোনো হয়ে যায় দিনপঞ্জির রাত্রিদিন। এই তো তিনি আমাদের দিকে সুতীক্ষ চাহনিতে তাকালেন, ওই তো শেষ বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে সুরে-বেসুরে ধরলেন ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে...’। সবকিছু কি আজ স্মৃতি বলে মেনে নিতে হবে? জানি, একচক্ষু দৈত্য দেবে না কোনো উত্তর। বনশ্রীবালা, চুক্কুলি, নোলক, সাঁঝমালা কিংবা যমুনাপারের আবছা—তাঁর নাটকের এই চরিত্ররা কী করে এখন, স্রষ্টার জন্মদিনে বইয়ের কালো অক্ষরের ভেতর থেকে তারা কি কাঁদছে? তারা কি নীরবে আনন্দ-প্রদীপ ভাসাচ্ছে তাদের স্রষ্টার জন্মোৎসবের ক্ষণে? উত্তর নাই।
‘উত্তর নাই’ বাক্যাংশটিও সেলিম আল দীন রচিত কথানাট্য প্রাচ্য থেকে ধার করা। নাটকে নোলকের সর্পদংশনের পর মুহূর্তের বর্ণনায় বাক্যটি ব্যবহার করেছিলেন তিনি। আর আমরা যাঁরা আজ নিজের ভেতরে স্মৃতির দংশন অনুভব করছি, তাঁরা ই-বা কী করব এখন? হঠাৎ হঠাৎ আমাদের নচ্ছার মন যখন অচলায়তন নাটকের পঞ্চকের মতো করে চারপাশের বন্ধ দেয়ালগুলো ভাঙতে চাই; মনে পড়ে, কেই বা বলবে আর ‘হাসতে হাসতে দেয়াল ভাঙো দাদাঠাকুর’। আমাদের যে দাদাঠাকুর নেই, আমাদের যে আচার্য নেই। সেলিম আল দীন আমাদের আচার্য। আজ তাঁর ৬১তম জন্মদিনে সব স্মৃতি যেন বা ফিরে আসছে একচক্ষু দৈত্যের হাত ঘুরে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হরীতকী-মহুয়াগাছের সারি পেছনে ফেলে আমরা যাঁরা তাঁর সঙ্গে প্রতিদিন হাঁটতাম; লাল ইটের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো কোথাও হঠাৎই দাঁড়িয়ে যেতেন তিনি। পথ থেকে অনামা লতাগুল্ম কুড়িয়ে নিয়ে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বলতেন, ‘দেখেছিস, দেখেছিস...এই গাছের নাম জানিস...দুপুরবেলা সূর্যের আলো পড়ার পর গাছের পাতার রং কেমন হয় দেখেছিস কখনো...এসব না জানলে তো সাহিত্য লিখতে পারবি না, বাবা।’
তাঁর কথার অবসরে অনেকেই সেদিন মুখটিপে হেসেছি আমরা। এসব কী বলেন স্যার, লিখতে গেলে এও চিনতে হবে নাকি! অনেক পূর্ণিমা রাতে তন্ময় হয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকেছেন আকাশে। তাঁর গলায় সে সময় রবিঠাকুর ও গীতবিতান। উন্মুক্ত মাঠের ভেতের সেই চাঁদ-ভাসানো রাতে দুরন্ত শিশুর মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি আর হতচকিত আমরা বিস্ময় নিয়ে দেখছি কাণ্ড! সেদিন বুঝিনি, কিন্তু আজ মনে হয়, পাঠশালায় নিয়মিত বেতের বাড়ি খাওয়া আমাদের তিনি যেন এভাবেই দাদাঠাকুরের সেই দর্ভকপল্লিতে নিয়ে যেতেন। বলতেন, ‘দ্যাখ, চোখ মেলে চারপাশটা দেখে নে শালার পুত।’ আজ যখন ইট-কাষ্ঠঘেরা নাগরিক অচলায়তনে হাঁসফাঁস করতে করতে পঞ্চকের কণ্ঠ বাজিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে...’, তখন দাদাঠাকুরকে কোথায় পাই? লেখার টেবিলভর্তি কাগজের স্তূপ ঠেলে হোমার, মধুসূদন, জীবনানন্দ কিংবা রবীন্দ্রনাথের মহাভুবন প্রসঙ্গে তিনি কী কথা বলবেন আবার? নিজের সদ্য লেখা শোনাতে শোনাতে কিছুটা গৌরবে কি হেসে উঠবেন শিশুর সারল্যে? আমাদের কাঁচা হাতে লেখা দুর্বল কোনো কবিতা পড়ে কেউ কি আর কখনো বলবে, ‘এটা আমার ছাত্রের লেখা...এই শব্দ প্রয়োগটা কিন্তু ভালো হয়েছে।’
এক উন্মূল জীবন ডিঙিয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ার সৌভাগ্যে বাংলা ভাষার অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ নাট্যকারকে কাছাকাছি পেয়েছিলাম কিছুদিন। কিন্তু আমাদের মনে তো সেদিন পঞ্চকের মতো বন্ধন মুক্তির রং জাগেনি, তাই দাদাঠাকুরকে হয়তো চিনতেও পারিনি ঠিকঠাক।
চেনা-অচেনার দোলাচল নিয়ে আজও যখন তাঁর ঘুম-জাগরণের সি/৪৭-এর সেই ঘরে যাওয়া হয়, দেখি, দাদাঠাকুর ছবি হয়ে তাকিয়ে আছেন! অথচ এই ঘরেই তো একদিন ‘ঊষা উৎসব’-এর সিসিথাপ্পা ঢোল বাজিয়েছে, পুত্র নাটকের আবছা ও মাইটাল সিরাজ ঝগড়ায় মশগুল হয়েছে—আমরা মুখোমুখি বসে শুনেছি সেসব। ২০০৭ সালের ১৭ আগস্ট জীবদ্দশায় নিজের শেষ জন্মতিথি উদ্যাপনের ক্ষণে কবি শামসুর রাহমানের প্রয়াণের সংবাদে এই ঘরেই তো বিষণ্ন, স্তব্ধ হয়ে গেছেন তিনি। শামসুর রাহমানের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন আর কবির লেখা কখনো আমার মাকে কবিতাটি কতবার না আওড়েছিলেন সেদিন। সময়ের নিষ্ঠুর একচক্ষু দৈত্যের চোরাটানে সবকিছুই কি স্মৃতি হয়ে গেল আজ!
অনেক দিন হরীতকী-মহুয়া আর শোনপাংশুদের দলে মিশে দর্ভকপল্লিতে যাওয়া হয়নি। অনেক দিন তাঁর ‘অত্যাচারের’ আঁচ থেকে মাথামুণ্ডুসহ বেঁচে গিয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আর গুনতে হয় না এই শুকতারা ওই সপ্তর্ষি...তবু কেন এ ছিন্ন লেখায় তাঁর জন্য আজ সাজাই তরণী, প্রভাতের ওপারে দাঁড়িয়ে তাঁরে কেন পরম নামে ডাকি? ‘ওরে ভোলামন, নিরঞ্জনকে চিনতে হলে একবার তাকাও আপনাতে...’ হরগজ নাটকের গানে এ কথা বলেছিলেন একদিন। আজ আপনার দিকে তাকাতেই দেখি, আমাদের চারদিকে সময়-দৈত্য এবং তার পিঠের ওপর ক্রমাগত বড় হচ্ছে অচলায়তনের দেয়াল। সেই দেয়ালের পাষাণভার হাসতে হাসতে কে আর ভাঙবে আজ? গানে গানে কে আর বলবে দাদাঠাকুর, ‘আমি নদীর কাছে গিয়েছিলাম/ নদী তোমার কী নাম/ ভাঙা কিনারার ধু-ধু চরে মেলে না উত্তর।’

Tuesday, July 20, 2010

তিতাশ চৌধুরী: জন্মদিনের শুভেচ্ছা by জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

সাহিত্যের অঙ্গনে তিতাশ চৌধুরীর পদচারণ বহু বছরের। দীর্ঘ অধ্যাপনা-জীবনের শেষে তাঁর এক পরিচয়, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। পেশাজীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন কুমিল্লা শহরে। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। কুমিল্লার সঙ্গে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক। কুমিল্লা জেলার ইতিহাস ছাড়াও তিনি রচনা করেছেন ‘কুমিল্লায় নজরুল স্মৃতি, প্রেম ও পরিণয়’, ‘কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস’, ‘কুমিল্লা জেলার লোকসাহিত্য’। তাঁর গবেষণা ও সাহিত্যকর্মে কুমিল্লার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে। কুমিল্লাবাসী কুমিল্লার প্রতি তাঁর এই আগ্রহ, অনুরাগ ও আনুগত্যের সকৃতজ্ঞ স্বীকৃতি দিয়েছে তাঁকে। সম্মাননা ও সংবর্ধনা দিয়ে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন তাঁকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করেছে। তিনি অলক্ত নামের একটি মানসম্মত পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন কুমিল্লা থেকেই। স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রয়েছে। মফস্বল থেকে প্রকাশিত আর কোনো পত্রিকা—উচ্চমানের পত্রিকা—এত দীর্ঘকাল টিকে থাকার নজির বোধহয় আর দ্বিতীয়টি নেই। একই কথা বলা যায় অলক্তর সঙ্গে জড়িত ও তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রবর্তিত ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’ সম্পর্কেও। ১৯৮১ থেকে আজ পর্যন্ত যাঁরা অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন, সেই তালিকা থেকে যে কেউ ধারণা করতে পারবেন। কোনো সংকীর্ণ বিবেচনা প্রশ্রয় পায়নি এই পুরস্কারের মানোন্নয়নে। পুরস্কারের অর্থমূল্য নয়, সোনার মেডেলে কতটা সোনা আছে, তাও বিবেচ্য নয়, একমাত্র বিচেনার বিষয়, কোন মানদণ্ডে নির্বাচন করা হয়েছে পুরস্কৃত জনকে। ব্যক্তি উদ্যোগে ও বেসরকারি পর্যায়ে এদিক দিয়ে অলক্ত পুরস্কারের সঙ্গে তুলনীয় একমাত্র ফরিদপুরের আলাওল পুরস্কার। আলাওল পুরস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়েছে কি না জানি না, তবে শত অসুবিধার মধ্যেও যেভাবে তিতাশ চৌধুরী একদিকে অলক্ত পত্রিকা, একই সঙ্গে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার—দুটিকে পিতৃস্নেহে লালন করছেন, তার প্রশংসার ভাষা আমার জানা নেই।
তিতাশ চৌধুরীর পরিচয় যে জন্মসূত্রে বা কর্মসূত্রে নয়, তাঁর স্বভাবের মর্মকেন্দ্রে, সে তাঁর সাহিত্যের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য। শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে, কালক্রমে কবিতা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়েছেন গদ্যে, প্রবন্ধে, গবেষণায়। গবেষণায় জায়গা করে নিয়েছে কুমিল্লা—তার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে, তার প্রিয় অতিথি নজরুলকে নিয়ে, তার গর্বের প্রতিষ্ঠান ভিক্টোরিয়া কলেজকে নিয়ে। কুমিল্লার ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণতার দাবি করতে পারবে না, তবে কলেজের ইতিহাস রচনায় তিনি প্রায় অসাধ্য সাধন করেছেন। এমন তথ্যবহুল ও একই সঙ্গে আকর্ষণীয় কোনো কলেজের ইতিহাস রচিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
একাডেমিক সমালোচনায় তিতাশ চৌধুরী কতটা আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ তাঁর একজন সাহিত্য-স্রষ্টার সৃষ্টিকর্মের বাইরের পরিচয়ে। এই ধারায় তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা অন্যরকম রবীন্দ্রনাথ। কবি পরিবারের বাইরে রবীন্দ্রনাথের যে নানামুখী পরিচয়, সেটি তিনি তুলে ধরেছেন এই বইয়ে। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘রবীন্দ্রনাথ জীবনে নানাভাবে চিত্রিত, নানারূপে, রঙে ও রেখায় বর্ণিত, বিচিত্র বর্ণে ও কর্মে স্পন্দিত এবং প্রত্যেক মানুষের জীবনের সর্বগ্রাসী মননপিপাসা নিবারণে নন্দিত। তবু যে রবীন্দ্রনাথকে আমি এখানে পাঠক দরবারে ভীরু পদক্ষেপে হাজির করেছি—সে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের বাইরে থেকেও “চিত্ররূপময়”—বিচিত্র বর্ণাঢ্য এক অপরূপ রবীন্দ্রনাথ। এ রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরচেনা রবীন্দ্রনাথ থেকে একটু ভিন্ন হলেও তাঁকে চিনে নিতে কারও ভুল হওয়ার কথা নয়। বস্তুত তিনি অন্য খ্যাতিতে ভাস্বর এক অন্য রকম রবীন্দ্রনাথ।’
তিতাশ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথকে দেখেননি, তবু মানুষ রবীন্দ্রনাথকে তিনি চিনেছেন ও চিনিয়েছেন। যাঁদের দেখেছেন, যাঁদের ব্যক্তিত্বের প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করেছেন, তাঁদের নিয়ে তাঁর বই দেখা অদেখার স্মৃতি। ১৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই বইয়ের বিষয়; তবে তিতাশ চৌধুরীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তাঁরা যেভাবে ধরা দিয়েছেন, তাঁদের সেই খণ্ডিত পরিচয়ে। ১৪ জনের মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে দুজনকে বাদ দিলে (প্রবোধচন্দ্র সেন, আহমদ শরীফ) বাকি ১২ জনই হয় কবি বা গল্পকার। দেখা অদেখার স্মৃতির পাতায় আমরা তিতাশ চৌধুরীর যে পরিচয় পাই, তাঁর সংবেদনশীলতা, তাঁর গুণগ্রাহিতা, প্রতিভার প্রতি বিনম্র প্রণতি—তা এ বইয়ের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
তিতাশ চৌধুরী আত্মজীবনী লেখেননি, তবে তাঁর অনেক রচনায় নিজেকেই তিনি কিছুটা পরোক্ষভাবে তুলে ধরেছেন। জীবনের যে অনেক কৌতুকপ্রদ দিক রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সজাগচক্ষু। তিনি যেমন রবীন্দ্রনাথের কৌতুকপ্রিয়তা নিয়ে লেখেন, একইভাবে তাঁর নিজের পরিচ্ছন্ন কৌতুকপ্রিয়তার প্রকাশ ঘটান রঙ্গরসের গল্প লিখে। সংবাদপত্রের কলাম লেখার তাগিদে তাঁর দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাঁর স্মৃতি শাণিত হয়ে ওঠে, তাঁর বিচারবুদ্ধি নানা প্রসঙ্গে ধাবিত হয়। হালকা ভঙ্গিতে লেখা হলেও তাঁর কলামভিত্তিক বই আপনভুবন তাঁকে সমকালের একজন বোদ্ধা দর্শক ও বিচারক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে। এভাবেই কুমিল্লার সঙ্গে নাড়ির বন্ধনে বাঁধা তিতাশ চৌধুরী হয়ে ওঠেন সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ।
একজন পরিশ্রমী ও নিবেদিত সাহিত্যকর্মী তিতাশ চৌধুরী কখনো আত্মপ্রচারের পথে চলেননি। তাঁর পরিচয় তবু পাওয়া যায় তাঁর সাহিত্যকর্মে। বিচিত্র এই সাহিত্যকর্ম। গতকাল ছিল তাঁর ৬৫তম জন্মদিন। তাঁকে তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এই সামান্য রচনা।

Saturday, March 13, 2010

অধ্যাপক রেহমান সোবহান: স্যারের প্রতি by এম এম আকাশ

আমার প্রত্যক্ষ শিক্ষক না হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তিকে আমি ‘স্যার’ বলি, তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। স্যারের সঙ্গে ঠিক প্রথম কবে পরিচয় হয়েছিল, তা এখন আর আমার মনে নেই। কমপক্ষে ৩০-৩৫ বছর তো হবেই। তবে তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচিতির আগেই, ১৯৭৪ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রথম বর্ষে পা দিই, তখনই তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে তাঁর অন্য সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশে ‘সমাজতান্ত্রিক’ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সে সময় অর্থনীতি বিভাগের করিডরে চারজন অর্থনীতিবিদের নাম খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। তাঁরা হলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন ও অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত প্রখর ব্যক্তিত্ব। এর মধ্যে অনেকের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি স্বপ্নচারী সমাজতন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক আনিসুর রহমান। অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে দেখা হতো অনেকটা আদ্যোপান্ত পেশাদার দক্ষ একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে। অধ্যাপক মোশাররফ হোসেনকে ভাবা হতো মাটির অনেক কাছাকাছি একজন ভূমিপত্র হিসেবে। তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বৈশিষ্ট্য ছিল অনেক দিক দিয়েই বেশ কিছুটা অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী। অধ্যাপক রেহমান সোবহান ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। স্বপ্নের সমাজতন্ত্রের প্রতি হূদয়ের টান থাকলেও বাস্তবতার প্রতি বুদ্ধিদীপ্ত আকর্ষণ তিনি কখনোই ছাড়তে পারেননি। তাই আসলে তিনি হচ্ছেন ‘স্বপ্নের সমাজতন্ত্র’ এবং ‘রূঢ় বাস্তবতার’ মধ্যে সেতুবন্ধন নির্মাণের লক্ষ্যে নিবেদিত একজন অবিরাম একাগ্র গবেষক। একই সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের একগুচ্ছ সমাজ-মনস্ক তরুণ অর্থনীতিবিদের অন্যতম অভিভাবক বা প্রেরণাদাতা ‘মেন্টর’।
এতগুলো ‘বিশেষণ’ আরোপের পর থমকে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ‘ভুল বললাম কি?’ না। আমার মনে হয়, আমি ঠিকই বলেছি। ১৯৯০-এ সোভিয়েত ব্যবস্থার যখন বিপর্যয় হলো, চীনেও যখন নতুন বাজার সমাজতন্ত্রের জয়-জয়কার, তখন আমরা অনেক দুর্বলচিত্ত মানুষকে দেখেছি—হয় ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন অথবা উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে কঠিন সত্যের মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান এ সময় এ দুটোর কোনোটাই করেননি। নিজের পুরোনো স্বপ্নটাকে নতুন বাস্তবতায় সৃজনশীলভাবে পুনর্গঠিত করে নিয়েছেন মাত্র। সৃজনশীল গবেষক অধ্যাপক রেহমান সোবহান এই ৭৫ বছর বয়সে ব্যাপৃত হয়েছেন নতুন এক মৌলিক গবেষণায়। তাঁর গবেষণার বিষয় নতুন ধরনের মালিকানাপদ্ধতি নির্মাণ, যা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার শোষিত-দরিদ্রদের শোষণ থেকে মুক্ত করে আমলাতন্ত্রের হাতে বন্দী করে ফেলবে না, বরং পরিণত করবে মূলধারার অর্থনীতির একজন শক্তিশালী নায়কে। সূচিত হবে স্যারের ভাষায় ‘অন্তর্ভুক্তির অর্থনীতি’ (Inclusive Economy) এবং ‘অন্তর্ভুক্তির গণতন্ত্র’ (Inclusive Democracy)। স্যারের এই গবেষণায় কিছুটা শরিক থাকার সুবাদে স্যারের এ বাস্তবভিত্তিক স্বপ্নের কথাটা আমার জানা আছে। স্যার এ গবেষণাটি শুরুর সময় আমাকে বলেছিলেন, এটি হবে তাঁর জীবনের অন্যতম কাজ। স্যার নিশ্চয়ই এ কাজ সমাপ্ত করে যাবেন, এ প্রত্যাশাই আমরা করব।
একজন সফল মানুষ সম্পর্কে প্রায়ই বলা হয়, ‘তাঁর কীর্তির চেয়ে সে মহত্’। অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্পর্কে এ কথা নির্দ্বিধায় আমরা স্বীকার করব। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি রচনা করেছিলেন বিখ্যাত ‘দুই অর্থনীতি’ শীর্ষক রচনা—যেটি পাঠ করে তত্কালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘কে এই ছোকরা?’
এরপর তাঁর লেখা ও অবদান আর থেমে থাকেনি। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত খাত, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, আশির দশকে পরনির্ভরতার অর্থনীতি, বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট, প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত তিন খণ্ডের টাস্কফোর্স রিপোর্ট, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক সংস্কার নিয়ে গবেষণা, ভূমি সংস্কার নিয়ে মৌলিক গ্রন্থ প্রণয়ন ইত্যাদি গবেষণা কাজের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন নানা প্রতিষ্ঠান। বিআইডিএসের পরিচালক ছিলেন তিনি। তার পর ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন এ দেশের অন্যতম ‘থিংক ট্যাংক’ সিপিডি। এখনো তিনি সিপিডির চেয়ারম্যানের পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিয়মিত গবেষণা-চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে সিপিডি থেকে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক সোবহানের নির্বাচিত রচনাবলির সংকলন। অধ্যাপক সোবহানের ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে প্রকাশিত এ সংকলনের ভূমিকা-লেখক অমর্ত্য সেন ভূমিকায় লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদের জন্য এই রচনাবলি একটি রত্নভান্ডারবিশেষ। পাশাপাশি এ রচনাগুলো হচ্ছে এই কর্মময় বিশ্বের একজন নেতৃস্থানীয় যুক্তিবাদী সাহসী মানুষের জীবনের সাক্ষী, যার ভিত্তিতে আমরা তাঁর জীবনকে উদ্যাপনও করতে পারি। এই মহত্ সৃষ্টির অংশবিশেষ আগেই আমার দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখনই আমি ভেবেছিলাম কী বিপুল মহত্ সৃষ্টি সামনে অপেক্ষা করে আছে। তিন খণ্ডে সমাপ্ত এই রচনাবলি সেই মহত্ কর্মময় জীবনের এক বিস্ময়কর বিবরণ।’
স্যারের কি কোনো সমালোচনা নেই? আছে। স্যার নিজেই সম্ভবত সে বিষয়ে খুবই সচেতন। তাঁর মুখে আত্মপ্রশংসা কখনো শুনেছি বলে মনে হয় না। এক সময় তিনি প্রথম আলোয় একটা কলাম লিখতেন, যার শিরোনাম ছিল—
‘আমার সমালোচক আমার বন্ধু’।
স্যারের সমালোচক বন্ধুরা স্যার সম্পর্কে একটি অভিযোগ করেন। আওয়ামী লীগের প্রতি স্যারের ঐতিহাসিক সহজাত পক্ষপাতিত্ব। আমি বলব, মজার ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগ স্যারকে কিন্তু ততটা বন্ধু এখন আর মনে করে না।

Sunday, February 28, 2010

বিভাজনের বাইরে এক মূসাভাই by রিয়াজউদ্দিন আহমেদ

আজকের সাংবাদিকতা জগতে এক মহীরুহ আমাদের প্রিয় মূসাভাই। সবার কাছে ও সব মহলে সমান গ্রহণযোগ্য একজন নির্ভীক সাংবাদিক। রাজনৈতিক বিভাজনের এই সমাজে কারও পক্ষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া অতি দুরূহ। এই বিভাজনের সমাজে আপনি হয় আমার সঙ্গে, না হয় আমার বিপক্ষে। এই বিভাজনের সীমারেখা অতিক্রম করতে পেরেছেন এবিএম মূসা।
সাংবাদিকতা জগতের সর্বত্র বিচরণ করেছেন অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল। সাব-এডিটর ও রিপোর্টার, এমনকি ক্রীড়া প্রতিবেদক থেকে সফল নিউজ এডিটর, পরে সম্পাদক, বিদেশি পত্রিকার প্রতিনিধি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের সংবাদদাতা। এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন কলামিস্ট মূসাভাই।
এই মূসাভাই আগামীকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮০ বছরে পা রাখবেন। এই দীর্ঘ সময়ের অর্ধেকটা আমি নানাভাবে তাঁর খুব কাছে কাছে ছিলাম। এখনো আছি প্রেসক্লাবের আড্ডায়, প্রেস কনফারেন্সে, জনপ্রিয় টিভি টকশোতে আর সামাজিক অনুষ্ঠানে। শুরুটা হয়েছিল ষাটের দশকের শেষ দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে আমি যখন তদানীন্তন পাকিস্তান অবজারভার-এ যোগ দিই। সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম অনুসন্ধানী রিপোর্টিং করার জন্য রিসার্চ সেলে। এক বছর কাজ করার পর অবজারভার পত্রিকার রিপোর্টিং টিমে যোগদানের আদেশ। এই রোমাঞ্চকর অবস্থার মধ্যেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কারণ মূসাভাই তখন জাঁদরেল বার্তা সম্পাদক। অফিসে শুধু তাঁর গলার আওয়াজ শুনলেই আমরা যারা নতুন, ভয়ে তাঁর দিকে তাকাতেও পারতাম না। তাই যখন অবজারভার-এর ম্যানেজিং এডিটর মাহবুবুল হক আমাকে রিপোর্টিংয়ে যোগ দিতে বললেন, তখন দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, তাঁর রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়াতেই পারব কিনা সংশয় রয়েছে, রিপোর্ট লিখব কেমন করে? কিন্তু মাহবুব ভাই মূসাভাইকে ডাকলেন। বললেন, ‘রিয়াজ অর্থনৈতিক বিষয়ে রিপোর্ট করবে। তোমাকে সে ভয় পায়, ওকে কিছু বলো না।’ মূসাভাই চোখ বড় বড় করে কটমট করে তাকালেন। তবে কিছুই বললেন না।
মরহুম শহীদুল হক, এনায়েতউল্লাহ খান (হলিডে), আতাউস সামাদ, আবদুর রহিম টাইপরাইটারের সামনে। ডেস্কে বসে আছেন মূসাভাই, কে জি (মুস্তাফা) ভাই; ভয়ে টাইপরাইটার চলে না। এর মধ্যে মূসাভাই কাছে এলেন, কী রিপোর্ট করতে হবে বললেন, আরও কিছু নির্দেশ দিলেন—কী সাইজের কাগজে টাইপ করতে হবে, কীভাবে রিপোর্ট শুরু করতে হবে—শিক্ষকের মতো এসব বলে চলে গেলেন। কাজ করতে গিয়ে দেখি, সে এক অন্য মূসাভাই, যাঁর ছিল সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা আর পাণ্ডিত্য গভীর, প্রখর নিউজ সেন্স, আর সহকর্মীদের জন্য মমত্ববোধ। অনেক ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে তাঁর সাহসের পরিধি। মহাপ্রলয়ের বছর। ১৯৭০ সাল। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চলে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু। মূসাভাই বললেন, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির হেলিকপ্টারে আমাকে পটুয়াখালী যেতে হবে। পরদিন সকালে পটুয়াখালী হয়ে চর বাইসদিয়ার ওপারে গভীর সমুদ্রে ব্রিটিশ রণতরী এইচএমএস ইনট্রিপিডে গেলাম। ওই যুদ্ধজাহাজেই হেলিকপ্টার অবতরণ করে। ওই জাহাজে হাজার হাজার যানবাহন, রাবার ডিঙি আর সেনা ত্রাণকাজে নিয়োজিত। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে লিখতে বসলাম। সেনা জনসংযোগ বিভাগ থেকে ফোন। মেজর সালেক সিদ্দিকী (২৫ মার্চ, ’৭১-এ ঢাকায় ছিলেন এবং নয় মাস সব অভিজ্ঞতার ওপর Witness to Surrender বই লেখেন) বললেন রিপোর্টটি কীভাবে লিখতে হবে। কারণ তিনি জানতেন, রিপোর্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ত্রাণকাজের সমালোচনা করা হবে। মূসাভাইকে আমি মেজর সালেকের নির্দেশের কথা বললাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলে মেজর সালেককে বললেন, ‘নাক গলাবেন না।’ ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর অবশ্য সব বদলে যায়। সালেক সিদ্দিকীদের কথায়ই তখন সব চলত। কিন্তু মূসাভাই তাঁর কথায় চলতেন না। অবশ্য তখনকার অবস্থায় তা প্রতিহত করাও ছিল দুরূহ ব্যাপার। জুন মাসের কোনো এক সময় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি দেশ ত্যাগ করেন। আমিও ঢাকা ছেড়ে চলে যাই।
মূসাভাইয়ের সংবাদ পরিবেশনায় অসংখ্য মুনশিয়ানার আরেকটি উদাহরণ দেব। ষাটের দশকে পাকিস্তান অবজারভার ছিল আইয়ুব শাহীর ত্রাস। সারা পাকিস্তানে এই কাগজের প্রভাব ছিল অনেক। সেই কাগজের নিউজ এডিটর মূসাভাই। তখন শুনতাম, পাকিস্তানে যে কয়জন তুখোড় নিউজ এডিটর ছিলেন, মুসাভাই ছিলেন তাঁদের একজন। দ্রুততার সঙ্গে কপি এডিটিং, চমকপ্রদ হেডিং আর রিপোর্ট এডিটিং ছিল দেখার মতো। একটি হেডিং আমার আজও মনে আছে। একজন লোক ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটলেন, গন্তব্যে গেলেন। তিনি সেখানে মারা যান। লাশ আনতে একই উড়োজাহাজ দাবি করল কয়েক শ টাকা ভাড়া। মূসাভাই হেডিং দিলেন ‘Costly when dead’ (জীবিতের চেয়ে লাশের মূল্য বেশি)। আবার ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কে কত বড় বাঙালি, তা প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে একজন রিপোর্ট করলেন—খাজা খয়ের উদ্দিন বক্তৃতায় বলেছেন, ‘কোন বোলতা হামি বাঙ্গালি না, হামি ভি বাঙ্গালি আছে।’ মূসাভাই কপিটি এডিট করে খাজা খয়ের উদ্দিনের এ কথাটি বাংলায় ইংরেজির ভেতরে পাঞ্চ করে দিলেন। তাঁর সম্পাদনার এই মুনশিয়ানা, কৌশলী পরিবেশনা সেই সময়ে ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ ধরনের আরও অনেক মজার ঘটনা আছে মূসাভাইকে নিয়ে।
যার রক্তচক্ষুর ভয়ে রিপোর্টার হতে চাইনি, সেই মূসাভাইকে পাই বড়ভাই, সাংবাদিকতার গুরু আর একজন অকৃত্রিম সুহূদ হিসেবে। তাঁর সঙ্গে মেশার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ৮০ বছর বয়সে পা দিয়েও প্রেসক্লাব মাতিয়ে রাখেন। ছোটবড় সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন। তিনবার তিনি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চারবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ক্লাব তাঁকে আজীবন সদস্য পদের সম্মাননা দিয়েছে।
মূসাভাই রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ‘সবার মূসাভাই’ হতে পেরেছেন। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গনের সকল দলের সমর্থক ও নেতা-নেত্রীর সমান শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সন্মান এবং সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন ও পাচ্ছেন। তাই তাঁর অবস্থান এখন মুরব্বির আসনে। আর আমাদের সাংবাদিকদের কাছে তিনি হয়ে আছেন শুধু প্রিয় মূসাভাই, নির্ভীক ও আদর্শবাদী সাংবাদিকতার আদর্শবান অভিভাবক। আশিতে পা-দেওয়া আমাদের মূসাভাই দীর্ঘজীবী হোন।
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ: দৈনিক নিউজ টুডে-র সম্পাদক।

Monday, January 4, 2010

স্বদেশ বোস: ভালোবাসার মানুষ -জন্মদিন by জোবাইদা নাসরীন

স্বদেশ বোস একজন দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ। আজ তাঁর ৮২তম জন্মদিন। প্রতিবার তাঁর জন্মদিনের আয়োজনে তাঁর সান্নিধ্য স্বজনেরা উপভোগ করতেন। কিন্তু এবার তাঁর অনুপস্থিতি এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করবে। এক মাস আগে পৃথিবীর সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করে স্বদেশ বোস চিরবিদায় নেন।
বাংলাদেশের রত্নগর্ভা অঞ্চল বরিশালে তাঁর জন্ম। এই অঞ্চল ধারণ করেছে অনেক সাহসী, বিপ্লবী ও ত্যাগী মানুষকে। ১৯২৮ সালের ২ জানুয়ারি বরিশালের কাশিনাথ গ্রামে জন্মগ্রহণ করা স্বদেশ বোস কিশোর থেকেই স্বদেশি আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তখন বরিশাল আন্দোলনের তপ্ত জায়গা এবং স্বদেশি আন্দোলনের ঘাঁটি ছিল।
বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার অনন্য এই সৈনিক ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ভাষার দাবি তোলার প্রথম দিকে বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। সেই শুরু। এরপর দফায় দফায় মামলা দিয়ে দীর্ঘ সময় তাঁকে জেলের ভেতর রাখে পাকিস্তান সরকার। তাঁর আত্মীয়স্বজন সবাই যখন ওই অবস্থায় ভারতে চলে গেল, তখন তিনি একাই পড়ে রইলেন এ দেশে। স্বপ্নের দেশে থাকার সুফল স্বদেশ বোস ভোগ করতে পারলেন না। বরং ‘কমিউনিস্ট’ পরিচয়ের কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ভিসা দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন কারাভোগ স্বদেশ বোসকে শারীরিকভাবে কাবু করেছিল, কিন্তু তাঁর প্রতিভাকে চাপিয়ে রাখতে পারেনি। যে কারণে পরবর্তী সময়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে এসে যোগদান করেন আগের কর্মস্থল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসে (পিআইডিই)। শুধু বিপ্লবী জীবনের জন্য স্বদেশ বোস আলোর পথের যাত্রী নন, তাঁর পিএইচডি গবেষণাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বহু আগেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়া জাগানো শিক্ষার্থী কর্মজীবনেও রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর; কি দেশে, কি বিদেশে। চিরকাল সযতনে নিজেকে আড়াল করা এ মানুষটি ১৯৬৬ সালের ছয় দফার সঙ্গে নিজেকে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত করেন এবং অনেকের সঙ্গে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস (পিআইডিই) থেকে দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরেন।
স্বদেশ বোস ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের একজন সদস্য ছিলেন। ছিলেন কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য। শুধু তা-ই নয়, স্বদেশ বোস বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে একটি সমস্যা হবে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বাংলাদেশে খাদ্য সরবরাহ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।
ভারতে তাঁর আত্মীয়স্বজনের বড় অংশ চলে গেলেও স্বদেশ বোস কখনো এ দেশ ছেড়ে যাননি। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর স্বজনেরা তাঁকে নিতে পারেনি ভারতে। নিজের ভাইয়ের সঙ্গে ২৫ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে দেখা হয়েছে স্বদেশ বোসের। কিন্তু দেশকে ভালোবেসে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থেকে যান বাংলাদেশে।
শিক্ষায়, জীবনবোধে, ভালোবাসায় প্রথাগত বর্ণাঢ্য জীবনের বাইরে সমাজ পরিবর্তনে দায়বদ্ধ জীবন বলতে যা বোঝায়, তা-ই তৈরি করেছিলেন তিনি। তরুণ প্রজন্ম তাঁর সেই তারুণ্যের, জেল-জীবনের কিংবা সাম্যবাদের স্বপ্নে বিভোর হওয়া দিনগুলো দেখেনি। প্রথা ভেঙে, সমাজ ভেঙে, জীবন সাজানোর গল্প কেবল শোনা গেছে। তাঁর সম্পর্কে যিকঞ্চিত্ বইয়ে পড়া, বিভিন্ন জার্নালে তাঁর লেখার রেফারেন্স—সবকিছু মিলিয়ে এটুকুই সম্বল। শেষ বয়সে তাঁর উপস্থিতি ছিল একেবারে নির্বাক। সদা ফিটফাট, হাতে ঘড়ি, মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো স্বদেশ বোসকে দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো, তিনি কথা বলতে পারছেন না। অথচ অন্য সবাই তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি হাসতেন, হাত উঁচিয়ে এটা-ওটা দেখাতেন, চোখ তুলে, চোখের ভাষায় খুশি ভাবটি প্রকাশ করতেন। শিশুদের মতো মাথা দুলিয়ে কোনো বিষয়ে তাঁর সম্মতি-অসম্মতি জানাতেন।
কিন্তু দিন দিন শরীর ভেঙে পড়ছিল। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার ফলে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক ছিলেন বহুদিন। প্রথমে লিখে, কম্পিউটারে মনের ভাব প্রকাশ করলেও পরবর্তী সময়ে সেটিও হয়ে পড়েছিল অসম্ভব তাঁর পক্ষে। কিন্তু দেখা হলেই রোগা কিন্তু হূদয়ের উষ্ণতামাখা হাত দুটো দিয়ে ধরে থাকতেন প্রিয়জনদের। সেই উষ্ণতার জন্য অনেকেই ছুটে হাজির হয়েছেন তাঁর বাসায়। দেখতে নয়, সঙ্গ দিতে। মানুষের সঙ্গ তিনি উপভোগ করতেন।
শেষবিদায়ের আগে স্বদেশ বোস তাঁর প্রিয় বরিশালে যেতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন বরিশালে তাঁর প্রিয়জনদের দেখতে। চল্লিশের দশকে রক্ত-সূত্রীয় প্রিয়জনদের সঙ্গে ভারতে না গিয়ে মনোরমা মাসিমা ও ঘনিষ্ঠজনদের ভালোবাসায় এ দেশে থেকে গেলেন, সেই তিনিই মৃত্যুর পরও মনোরমা বসুর ভালোবাসায়, আশ্রয়ে থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। তাই তো তাঁর দেহভস্ম সমাধিস্থ হয়েছে বরিশালে মনোরমা বসুর সমাধির সঙ্গে। দেশপ্রেমিক স্বদেশ বোসের জন্মদিনে অভিবাদন।