Showing posts with label জার্মানি. Show all posts
Showing posts with label জার্মানি. Show all posts

Monday, June 22, 2026

ইসরাইলকে যুদ্ধের বিদেশী অর্থের বৃহত্তম যোগানদাতা জার্মান-মার্কিন কোম্পানি

জার্মান বীমা প্রতিষ্ঠান আলিয়াঞ্জ এবং তাদের সহযোগী মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পিমকো ইসরাইলি সরকারি বন্ডে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, যার ফলে তারা ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ বিদেশী বন্ডধারক হিসেবে উঠে এসেছে।

গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর সামরিক অভিযানের মধ্যে বিশ্বমঞ্চের এক করপোরেট জায়ান্ট ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বিদেশী অর্থদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই একটি কোম্পানি ইসরাইলি সরকারের কাছ থেকে যে পরিমাণ বন্ড বা ঋণপত্র কিনেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিশ্বের অন্য সব দেশের মোট কেনার চেয়েও বেশি।

এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি জার্মানির বীমা ও আর্থিক পরিষেবা জায়ান্ট ‘আলিয়াঞ্জ’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক এক সহযোগী বন্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ‘পিমকো’।

আমস্টারডাম-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা প্রফেন্দোর বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ আলিয়াঞ্জ গ্রুপ ইসরাইলি সরকারের প্রায় ২৬৭ কোটি ডলারের বন্ড নিজেদের কবজায় নিয়েছে। সহজ ভাষায়, যুদ্ধকালীন ভয়াবহ মুহূর্তে ইসরাইলের মোট বিদেশী বন্ডের অর্ধেকের বেশি ছিল এই একটি মাত্র যৌথ কোম্পানির হাতে, যা বাকি গোটা বিশ্বের সম্মিলিত বিনিয়োগকেও হার মানায়।

একটি দেশের সরকার যখন আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসঙ্ঘের তদন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গণহত্যা চালায়, তখন সেই দেশের বন্ড কেনা আইনি ও নৈতিক ঝুঁকির বিষয়। কিন্তু রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধকে পুঁজি করে অধিক মুনাফার লোভ সামলাতে পারেনি এই পশ্চিমা কোম্পানি।

যুদ্ধের বাজারে নিজেদের বন্ডের সুদ এক লাফে ৫.৫৬ শতাংশে বাড়িয়ে দেয় ইসরাইল, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ১.৪ শতাংশ। এই বাড়তি মুনাফার লোভেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা।

মানবাধিকার সংস্থা ব্যাংকট্র্যাক-এর কর্মী ম্যাক্স হ্যামার বলছেন, গাজায় চলমান গণহত্যার মুখেও পিমকোর এই বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করেছেন, ইসরাইলকে অর্থ দেয়ার অর্থই হলো যুদ্ধাপরাধ ও ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি অংশ নেয়া।

তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ইসরাইলের যুদ্ধ চাঙ্গা করতে পশ্চিমা পুজির সরবরাহ বেড়েছে। এই সময়ে ইসরাইলি বন্ডে বিদেশী বিনিয়োগ ১১৬ কোটি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪৯১ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আর এই পুরো বিনিয়োগের ৯০.৭ শতাংশই এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির পকেট থেকে। ২০২৪ সালে আলিয়াঞ্জের বিনিয়োগ যেখানে ছিল মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, এক বছরের মাথায় তা আকাশচুম্বী আকার নেয়। ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন কিংবা ইরানের ওপর আগ্রাসন চালাতে ইসরাইলের যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার বড় জোগানদার এই মার্কিন-জার্মান অক্ষ।

যদিও এই যুদ্ধের তহবিল জোগানোর ক্ষেত্রে ইউরোপের অনেক দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আয়ারল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের বেশ কিছু বড় ফান্ড ইসরাইলি বন্ড ও ব্যাংক থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমনকি মানবাধিকার কর্মীদের আন্দোলনের মুখে আলিয়াঞ্জ ব্রিটেনের মাটিতে ইসরাইলি অস্ত্র কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসের বীমা সুবিধা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা ইসরাইলি সরকারের হাতে ঠিকই তুলে দিয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

প্রকৃতপক্ষে, আলিয়াঞ্জ-পিমকোর আসল বিনিয়োগ ২৬৭ কোটি ডলারের চেয়েও অনেক বেশি, কারণ তারা বিভিন্ন বিদেশী ক্লায়েন্ট ও পেনসন ফান্ডের হয়েও গোপনে বিপুল পরিমাণ ইসরাইলি বন্ড কিনেছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা এই নির্মম যুদ্ধের পেছনে মার্কিন ও পশ্চিমা পুজিই যে মূল চালিকাশক্তি, তা আরো একবার বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত হলো।

সূত্র : মিডলইস্ট আই
ইসরাইলি সৈনিক
ইসরাইলি সৈনিক। সংগৃহীত

Wednesday, May 27, 2026

বার্লিনের মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখেন শহরের মাঝখানে উঁচু প্রাচীর by মেহেদি হাসান

১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট। পূর্ব জার্মানির মানুষ গভীর ঘুমে। কিন্তু একদল মানুষ নির্ঘুম। তাঁরা কাঁটাতার দিয়ে প্রাচীর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত, যে প্রাচীর পূর্ব জার্মানিকে পশ্চিম জার্মানি থেকে আলাদা করে দেয়। অসংখ্য পরিবারের সদস্যদের মুখ–দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। প্রাণের বন্ধুকে চিরতরে হারাতে হয়। প্রায় ২৮ বছর পর ভাঙা হয় বার্লিন প্রাচীর। আবারও একত্র হন দুই জার্মানির মানুষ।

বার্লিন প্রাচীর কেন নির্মাণ করা হয়েছিল

১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে জার্মানি। মিত্রশক্তির মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন।

যুদ্ধ শেষে মিত্রশক্তির দেশগুলো জার্মানিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিটি দেশ জার্মানির একটি করে অঞ্চলের দায়িত্ব নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স নেয় পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ, আর পূর্বাঞ্চল দখলে রাখে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

জার্মানির রাজধানী বার্লিনের অংশ পড়ে পূর্বাঞ্চলে। তাই শহরটিকে চারটি অংশে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি দেশ বার্লিনের একটি করে অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পশ্চিম বার্লিন চলে যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের হাতে আর পূর্ব বার্লিনের নিয়ন্ত্রণ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

১৯৪৯ সালের মধ্যে জার্মানি দুটি আলাদা দেশে ভাগ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের দখলে থাকা অংশের নামকরণ করা হয় ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি (পশ্চিম জার্মানি)। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে থাকা অংশের নাম হয় জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (পূর্ব জার্মানি)।

জার্মানি ভাগ হওয়ার পরপরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা ছিল সমাজতন্ত্র, যা মিত্রশক্তি বা পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা থেকে একদমই আলাদা।

পশ্চিম জার্মানির শাসনব্যবস্থা ছিল অনেকটা এখনকার যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো। সেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতেন, নিজের পছন্দমতো গান শুনতেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারতেন।

অন্যদিকে পূর্ব জার্মানি কঠোরভাবে শাসন করা হতো। মানুষ কীভাবে আচরণ করবেন, তা নিয়ে ছিল কঠিন নিয়মকানুন। প্রতিটি কাজের ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি ছিল।

জার্মানি ভাগের পর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিমে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে শেষমেষ পশ্চিম বার্লিন ঘিরে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। নাম দেওয়া হয় বার্লিন প্রাচীর।

বার্লিন প্রাচীর যেভাবে তৈরি হলো

তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মানি থেকে মানুষের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণের আদেশ দেন। তাঁর আদেশ অনুযায়ী ১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট রাতের আঁধারে তৈরি করা হয় প্রাচীর।

প্রাচীরটি এত অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল যে সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তাঁরা এক পাশে আটকা পড়েছেন। পশ্চিমে থাকা বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। প্রথমে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বার্লিন শহরকে ভাগ করা হয়েছিল।

এরপর ধীরে ধীরে অসংখ্য শক্তিশালী প্রাচীর তৈরি করা হয়। সঙ্গে বসানো হয় কড়া পাহারা ও টহল, যাতে কেউ এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে না পারে।

বার্লিন প্রাচীর কত বড় ছিল

বার্লিন প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫৫ কিলোমিটার (৯৬ মাইল)। উচ্চতা ৪ মিটার বা ১৩ ফুট। ১৯৮৯ সালে ভেঙে ফেলা পর্যন্ত প্রাচীরে ৩০২টি ওয়াচ টাওয়ার (নজরদারি টাওয়ার) ছিল।

দুটি সমান্তরাল দেয়ালের সমন্বয়ে প্রাচীরটি তৈরি করা হয়। দুটি দেয়ালের মাঝখানে একটি ফাঁকা অংশ রাখা হয়। এই অংশে সৈন্য মোতায়েন করা হতো। শুধু তা–ই নয়, কেউ যাতে লুকিয়ে সীমান্ত পার না হতে পারেন, সে জন্য মাইন পুঁতে রাখা হতো।

দ্রুতই এই প্রাচীর ইউরোপের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের বিভেদের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘আয়রন কার্টেন’ বা লোহার পর্দা নামে পরিচিতি পায়।

সোভিয়েত নেতারা বার্লিন প্রাচীরকে বলতেন সুরক্ষার আবরণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছে এটি ছিল একধরনের কারাগার, যে কারাগার থেকে পূর্ব জার্মানির মানুষকে বের হতে বাধা দেওয়া হতো।

বার্লিন প্রাচীর থাকার সময় জীবন যেমন ছিল

পূর্ব জার্মানি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বার্লিন প্রাচীর টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রাচীর টপকানো ছিল অত্যন্ত কঠিন ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ২৮ বছরে এই পথে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

পূর্ব বার্লিনে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল কঠিন। কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রতিটি কাজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। জীবনযাপনের নিয়মও ছিল অত্যন্ত কঠোর। এ ধরনের নানা কারণে যাঁরা আগে পশ্চিম বার্লিনে কাজ করতেন, তাঁরা চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন।

কড়াকড়ি ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানিতে থাকা পরিবারগুলো বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৮৯ সালে প্রাচীর ভাঙার আগপর্যন্ত অনেকের মধ্যে আর দেখা করার সুযোগ হয়নি।

বার্লিন প্রাচীরের পরিণতি

১৯৮০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপের অনেকে দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। পূর্ব ইউরোপের মানুষেরা আরও বেশি স্বাধীনতা চাইছিলেন। তাঁরা যেখানে খুশি সেখানে যাওয়ার অধিকার চান। এ ছাড়া নিজের পছন্দের গান শোনা এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার চান, যা সোভিয়েত শাসনে সম্ভব ছিল না। একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতির দাবি জোরালো হতে থাকে।

পূর্ব জার্মানি থেকে শত শত মানুষ হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশের মাধ্যমে পালিয়ে যেতে থাকেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে পূর্ব বার্লিন সরকারের পক্ষে পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশের দাবি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অবশেষে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন পূর্ব জার্মানির নেতা টেলিভিশনে একটি ভাষণ দেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সীমান্ত খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর পূর্ব জার্মানি থেকে হাজার হাজার মানুষ বার্লিন প্রাচীরের কাছে জড়ো হন। তাঁরা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফটক খুলে দিতে বলেন।

বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে পিছু হটেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। এরপর হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশ করেন।

বার্লিন প্রাচীর পতন

সেদিন বার্লিন প্রাচীরের পশ্চিম পাশের মানুষ পূর্ব জার্মানির মানুষের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এত বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে সঙ্গে সঙ্গেই উৎসব শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ প্রাচীরের ওপর ওঠে নাচতে থাকেন।

বার্লিন প্রাচীরের পতন হয় ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর। তবে ওই দিন পুরো প্রাচীর একবারে ধ্বংস করা হয়নি।

এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে অসংখ্য হাতুড়ি দিয়ে প্রাচীর ভাঙতে থাকেন মানুষ। তাঁরা প্রাচীরের টুকরাগুলো রেখে দেন। কারণ, প্রাচীরের টুকরাগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। জার্মান সরকার শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে প্রাচীরটি ধ্বংস করে। তবে দর্শনার্থীদের পরিদর্শনের জন্য প্রাচীরের অনেক অংশ এখনো অবশিষ্ট হয়েছে।

এরপর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বার্লিন প্রাচীর পতনের ১১ মাস পর ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে মিলিত হয়ে আজকের পরিচিত জার্মানি রাষ্ট্র গড়ে তোলে।

তথ্যসূত্র;
১. বার্লিন ওয়াল ফাউন্ডেশন,
২. বিবিসি,
৩. ডয়চে ভেলে,

বার্লিন প্রাচীর তৈরির কাজে ব্যস্ত একজন শ্রমিক
বার্লিন প্রাচীর তৈরির কাজে ব্যস্ত একজন শ্রমিক। ফাইল ছবি: এপি

Monday, April 6, 2026

হিটলারের মুখোমুখি সুভাষ বসু by সরাফ আহমেদ

২৯ মে ১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে। ভারতের বরেণ্য নেতা সুভাষচন্দ্র বসু মুখোমুখি বসলেন অক্ষবাহিনীর নেতা হিটলারের মুখোমুখি। ‘কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে?’ এই প্রশ্নে তর্কবিতর্ক এখনো গরম। জার্মান মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এই দুই নেতার কথোপকথন। সঙ্গে সেই সাক্ষাতের বিরল কিছু অভূতপূর্ব ছবি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে। মধ্য ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যে জার্মানির দখলে; কিন্তু হিটলারের চোখ আরও পুবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে। নাৎসি বাহিনী ইতিমধ্যে সোভিয়েত ককেশীয় অঞ্চল পেরিয়ে পৌঁছে গেছে ভলগা অববাহিকায়, কিন্তু স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে ঘেরাও হয়ে পড়েছে সোভিয়েত রেড আর্মির হাতে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের কপালে চিন্তা ও উদ্বেগের ছাপ। এ রকম সন্ধিক্ষণে, ১৯৪২ সালের ২৯ মে হিটলারের সঙ্গে অবশেষে দেখা হলো ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসুর।

ঘটনার পূর্বাপর

সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২১ সালে আইসিএস পরীক্ষা শেষে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে মুম্বাই গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে। ৫১ বছর বয়স্ক গান্ধী তখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সুভাষচন্দ্রকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত করেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি কেবল গান্ধীর অহিংস আন্দোলন না করে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন। সে সময় বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী এই আওয়াজ সুভাষচন্দ্র বসুর মতো অনেক আদর্শবাদী তরুণ-যুবককে আকৃষ্ট করেছিল।

সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৩ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি দুবার সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনীতির কারণে বিশ বছরে এগারোবার জেল খেটে, অত্যাচারিত ও অপমানিত হয়ে তিনি খুব ভালো করে বুঝেছিলেন, এইভাবে ভারতবর্ষকে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। তাই বিকল্প পথ খুঁজেছিলেন।১

সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে কলকাতা ছাড়েন। কোন পথে কোথায় যাবেন, সেই ছক এঁকে নিয়েছিলেন আগেই। তাঁর বড় ভাই শরৎ বসুর বাড়ি ছিল কলকাতার এলগিন রোডে। সেই বাড়ির কাছেই উডবার্ন পার্কের বাড়িতে থাকতেন শরৎ বসুর ছেলে, ভাইপো শিশির বসু। পরিকল্পনা অনুযায়ী শিশির বসু জার্মানির চেমনিজ শহরে তৈরি ভান্ডারা ডব্লিউ-৪ মডেলের একটি গাড়ি সেই বাড়িতে এনে পার্ক করে রাখেন। সুভাষ বসু সেই গাড়িতে করে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেন ১৬ জানুয়ারি রাত দেড়টায়; তখন তাঁর পরনে পাঠান পোশাক, মাথায় টুপি, মুখভর্তি দাড়ি। কলকাতা থেকে ঝাড়খন্ড (পূর্ব বিহার), ঝাড়খন্ডের গোমো স্টেশনে তিনি উঠে বসেন দিল্লি-কালকা মেইলে। সেই ট্রেন তাঁকে নিয়ে পৌঁছায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার স্টেশনে। মুহম্মদ জিয়াউদ্দিন ছদ্মনামে সুভাষ বসু পেশোয়ার স্টেশনে নামেন ১৯ জানুয়ারি। সেখানে তাঁর দল ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা আকবর শাহ তাঁকে গ্রহণ করেন; তিনি দুর্গম যাত্রাপথে তাঁর সহায়তার দায়িত্বে নিয়োগ করেন ফরোয়ার্ড ব্লকের তিন কর্মীকে: আবাদ খান, মহম্মদ শাহ ও ভগৎ রাম তালোয়ার। সুভাষ বসু প্রথমে পেশোয়ারের একটি হোটেলে ওঠেন, কিন্তু সেখানে নিরাপত্তার অভাববোধ হলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয় আবাদ খানের বাড়িতে। ২৬ জানুয়ারি আবাদ খানের গাড়িতে মহম্মদ শাহ ও ভগৎ রাম তালোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ বসু রওনা করেন ইংরেজদের সীমান্ত চেকপোস্ট জামরুদের দিকে। গন্তব্য কাবুল।

দুঃসাহসিক রাজনীতির সমরযাত্রা

১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতবিষয়ক নানা নথিপত্র রয়েছে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাফেজখানায়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে আদান-প্রদানকৃত চিঠিপত্র, তারবার্তা এবং আরও নানা ধরনের তথ্যসমৃদ্ধ কাগজপত্র। আরও আছে ইতালি, ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান, রাশিয়াসহ নানা দেশ–সম্পর্কিত নথিপত্র। সেখানেই খুঁজে পাওয়া গেল সুভাষ বসুর কাবুল আগমন এবং সেখানে তাঁকে নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের তথ্য। জানা গেল সুভাষ বসুকে নিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বার্লিন, রোম ও মস্কোতে যোগাযোগের নানা তথ্য। সেগুলো থেকে জানা যায় নানা কূটনৈতিক কৌশলের খুঁটিনাটি।

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের দুর্গম উপজাতি এলাকার মধ্য দিয়ে সুভাষ বসুর সেই কাবুলযাত্রা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য, দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর। তিনি তাঁর বন্ধু-সহযোদ্ধা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসী ভগৎ রাম তালোয়ারের সঙ্গে কাবুল পৌঁছান ১৯৪১ সালের ২৭ জানুয়ারি বেলা ১১টায়। তাঁরা আশ্রয় নেন লাহোরি গেটের কাছে একটি সাধারণ সরাইখানায়।

কাবুলে সুভাষ বসু প্রথমে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছিলেন। তাঁর জানা ছিল যে ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির মধ্যে একটি গোপন অনামক্রণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে (মলোতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি) এবং তখন পর্যন্ত জার্মানি সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ চালায়নি। জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় দেশ ব্রিটিশদের সাধারণ শত্রু। শত্রুর শত্রু বন্ধু হবে—এই ধারণা থেকে সুভাষ বসুর প্রত্যাশা ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কাবুল পৌঁছার এক দিন পরেই তিনি সেখানকার সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সোভিয়েত দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাঁদের দূতাবাস ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। এমনকি সোভিয়েত বাণিজ্য প্রতিনিধির মাধ্যমে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও সেই প্রতিনিধির অনীহার কারণে ব্যর্থ হয়।২

সোভিয়েতদের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে সুভাষ বসু জার্মানির দিকে ঝোঁকেন। তিনি বার্লিনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মুক্তিসংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং সেই পরিকল্পনা জার্মানদের জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ভগৎ রাম তালোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে কাবুলের জার্মান দূতাবাসে যান। সেখানে তাঁদের স্বাগত জানান জার্মান রাষ্ট্রদূত হান্স পিলজার। সুভাষ বসু তাঁকে তাঁর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। সেই সঙ্গে তিনি জার্মান রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে সোভিয়েত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বার্লিন যাওয়ার অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। রাষ্ট্রদূত পিলজার সেদিনই বার্লিনে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে একটি তারবার্তা পাঠান। তিনি লেখেন:

কাবুল, ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১, টেলিগ্রাম নং ৩২; অত্যন্ত গোপনীয়।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু ছদ্মবেশে গোপনে কাবুলে চলে এসেছেন। তিনি আজ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুরোধ করেছেন, আমি যেন তাঁকে সোভিয়েত দূতাবাসের মাধ্যমে বার্লিনে যাত্রা করতে সাহায্য করি, যাতে তিনি সেখান থেকে ভারতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমি দ্রুত আপনাদের সিদ্ধান্ত প্রার্থনা করছি, কারণ বসু এখানে ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, তিনি আফগানদের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত হতে পারেন। এই কারণে জরুরি তারবার্তা নির্দেশনা প্রার্থনা করছি। পিলজার।’৩

এই তারবার্তার উত্তরে জার্মান পররাষ্ট্রসচিব আর্নস্ট ফন ভাইজেকার কাবুল দূতাবাসকে জানান, সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সুভাষ বসুকে ট্রানজিট ভিসা দেয়, তাহলে বসু জার্মানি আসতে পারেন। বার্লিনের ভিলহেল্ম সড়কে অবস্থিত জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকেরা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রাম সম্পর্কে বেশ আগ্রহী ছিলেন। হিটলারের জাতীয় সমাজতন্ত্রের প্রতি সুভাষ বসুর সমালোচনামূলক মনোভাব দৃশ্যত এই আগ্রহকে কমিয়ে দেয়নি। বার্লিনের পররাষ্ট্র দপ্তরে ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই ভারতের বিষয়ে আগ্রহ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছিল।

কাবুলের জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে বার্লিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তারবার্তা বিনিময় থেকে বোঝা যায়, জার্মান সরকার নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির প্রসার ঘটাতে সেই সময় ভারতে ব্রিটিশবিরোধীদের সহযোগিতার জন্য উন্মুখ ছিল। কাবুলের জার্মান দূতাবাস সুভাষ বসুর বার্লিনে পৌঁছার বিষয়ে মস্কো ও ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ করে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

জার্মান রাষ্ট্রদূত পিলজার ১৯৪১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বার্লিনে আরেকটি তারবার্তা পাঠান; তিনি লেখেন, ‘(সুভাষ) বসু নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দূতাবাসে এসেছিলেন। আফগান নজরদারি ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে আমি তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে পরামর্শ দিই, তিনি যেন এখানে তাঁর ভারতীয় বন্ধুদের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকেন। আমি তাঁর বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কথাবার্তা বলেছি। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বসুকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব এবং বসুর সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের পেছনে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে; এ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগানিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এই সন্দেহের কারণ বসু গোপনে আফগান সীমান্ত পার হয়ে এসেছেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত বসুর প্রতি তাঁর অবিশ্বাসের কথা মস্কোকে তারবার্তায় জানিয়েছেন এবং মস্কোর নির্দেশনা চেয়েছেন। বসুর যাত্রার জন্য মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যাবশ্যক। ইতালীয় রাষ্ট্রদূত রোমের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।৪

সুভাষ বসু ইউরোপে পৌঁছে কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা করেছেন, রাষ্ট্রদূত পিলজার তা বার্লিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরকে অবহিত করেন। তিনি ১৯৪১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক তারবার্তায় বার্লিনকে লেখেন, বসু ইউরোপ থেকে রেডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের অন্যায়-অনাচার সম্পর্কে ভারতীয়দের অবহিত করতে চান। কারণ, ভারতীয়দের এমন বিশ্বাস ছিল না যে বহির্বিশ্ব তাদের ইংরেজদের শোষণ-শাসন থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসবে; তারা ইংরেজদের পরাজয়ে বিশ্বাস করত না। সুভাষ বসু নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি ভারতীয় জনগণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবেন। জার্মানি বিজয়ী হলে স্বাধীন ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথাও তিনি ভেবেছিলেন।৫

রাষ্ট্রদূত পিলজার কাবুলে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুভাষ বসুর বিষয়ে সোভিয়েতদের মনোভাব বদলাতে সক্ষম হননি। তবে ১৯৪১ সালের ৪ মার্চ জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বার্লিন থেকে তাঁকে জানান, তাঁর পাঠানো ৪৭০ নম্বর তারবার্তার উত্তরে সোভিয়েত পররাষ্ট্র দপ্তর মস্কো থেকে জানিয়েছে, বসু আফগানিস্তান থেকে জার্মানি যাওয়ার জন্য মস্কোর ট্রানজিট ভিসা পেতে পারেন। বসু বার্লিনে পৌঁছে ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন।৬

সুভাষ বসুর বার্লিন যাত্রায় কাবুলে ইতালীয় রাষ্ট্রদূত পিয়েত্রো কোয়ারনির সহযোগিতা করেন। তাঁর দূতাবাসের রেডিও অপারেটর অরলান্দো মাজোতার ইতালীয় পাসপোর্টে আফগান কর্তৃপক্ষ বহির্গমন ভিসা যুক্ত করার পর মাজোত্তার ছবি সরিয়ে সেখানে সুভাষ বসুর ছবি সেঁটে দেওয়া হয়। জার্মান পাসপোর্টের পরিবর্তে তাঁকে ইতালীয় পাসপোর্ট দেওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে কাবুলে অবস্থানরত জার্মান কূটনীতিকেরা আফগানদের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন।

আফগান সরকার যাতে এই ভ্রমণ অভিযান সম্পর্কে জানতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিষয়েও কাবুলের জার্মান দূতাবাস গুরুত্ব আরোপ করেছিল। সুভাষ বসু ভেঙ্গার নামে একজন প্রকৌশলী এবং লুফথানসার দুই কর্মচারী শোয়ার্জ ও হিলপার্টকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মস্কো পৌঁছান। সেখানে তিনি জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন এবং একই দিনে বার্লিন রওনা হয়ে যান।

মস্কোর জার্মান রাষ্ট্রদূত ফ্রিডরিখ ভের্নার গ্রাফ ফন শুলেনবুর্গ এক তারবার্তায় বার্লিনকে জানান:

মস্কো, ৩১ মার্চ ১৯৪১

বসু অরলান্দো মাজোতা নামের ইতালীয় পাসপোর্টধারী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার ভেঙ্গারের সাহচর্যে আজ দূতাবাসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই তারবার্তা নির্দেশনার আগেই ভেঙ্গার ও বসুকে জানানো হয়েছে যে সহযাত্রী শোয়ার্ৎস ও হিলপার্ট যেন বসুর পরিচয় জানতে না পারে। বসু বার্লিনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।৭

মস্কোয় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালে সুভাষ বসুকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যদি কিছুটা আভাস দিত, তাহলে তিনি হয়তো মস্কোকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে ভাবতেন। তিনি সে সময় তাঁর সাম্যবাদী ভাবাদর্শ ও রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনীতির মিল রয়েছে বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসেনি। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত রাশিয়া সম্ভবত ব্রিটিশবিরোধী ফ্রন্ট খুলতে আগ্রহী ছিল না।

ভারতবর্ষ নিয়ে হিটলারের ভাবনা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে হিটলারের চিন্তাভাবনা ও আচরণ ছিল বিক্ষিপ্ত ও পরম্পরাহীন। এই ক্ষেত্রে তিনি নানা দোলাচলে ভুগতেন। আজ যাঁকে বন্ধু ভাবতেন, কিছুদিন পরেই তাঁকেই স্থান দিতেন শত্রুর খাতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো স্তালিনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময়, ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট তিনি স্তালিনের সঙ্গে এই মর্মে এক গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন যে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে (মলোতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি), কিন্তু সে চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার ভান করেছেন, আবার তাদের বিস্তারে ঈর্ষান্বিত হয়েছেন এবং বৈরী আচরণ করেছেন।

ভারতবর্ষের ব্যাপারে হিটলারের চিন্তাভাবনা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের পক্ষে অনুকূল ছিল না। ১৯৩২ সালের ২৭ জানুয়ারি ডুসেলডর্ফ শহরে জার্মান শিল্পপতিদের উদ্দেশে এক নীতিনির্ধারণমূলক ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে ভারতের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ইংরেজদের ভারত শাসন করার অধিকার আছে, কারণ শ্বেতাঙ্গ জাতি হিসেবে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের তুলনায় বহুগুণ শ্রেষ্ঠ। তিনি ভারতকে একটি উপনিবেশিত ও অসমর্থ জাতি হিসেবে দেখতেন, যা তাঁর বর্ণবাদী নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতীয়রা নিজেদের শাসন করতে সক্ষম নয়।

অবশ্য ভারত কখনো হিটলারের রাজনৈতিক চিন্তা বা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো। তাই তিনি কখনো প্রকাশ্যে কোনো ‘ভারতপন্থী’ নীতি গ্রহণ করতে চাননি। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ শুরু হলে হিটলার ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অনিচ্ছুক সহযোগী হয়ে ওঠেন। তবু তিনি ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না।

অথচ অ্যাডলফ হিটলারের জন্মের অনেক আগেই ভারতবর্ষের সঙ্গে জার্মানির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। শিল্প, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্র দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। ১৮৭১ সালে জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তদানন্তীন ব্রিটিশ ভারতে জার্মান স্বার্থসমূহ সমন্বয় করতে ১৮৮৬ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় ইম্পেরিয়াল জার্মান কনস্যুলেট জেনারেল বা কাইজারলিশ-ডয়েচস জেনারেল কনস্যুলেট। জার্মান সম্রাটের ইংল্যান্ডের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় জার্মানির কোনো ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। বরং তারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মাধ্যমে ভারতের শাসন কৌশলকে প্রশংসা করত।৮

হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণের আগে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব ছিল ১৯১৮ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত। জার্মান কবি-দার্শনিকদের তীর্থভূমি ভাইমার শহরকে ঘিরে মানবতাবাদী ও উদারপন্থীদের সমন্বয়ে সবকিছু ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির আগে রাজতন্ত্রীদের রাজ্যজয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল বলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। আবার অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি দমন–পীড়ন, গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি অস্থিরতা ছিল। অনৈক্য ছিল জার্মান বাম ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর মধ্যে। বাম রাজনীতির জন্মভূমি জার্মানিতেও ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল। জার্মান ইতিহাসবিদদের এক বিরাট অংশ এখনো মনে করে, জার্মানির বামপন্থীদের মধ্যে আপস-সমঝোতার অভাবের কারণেই ফ্যাসিবাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল।

১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গের আনুকূল্য নিয়ে হিটলার নতুন সরকার গঠন করেন। রাইখ বা জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে ন্যাশনাল সোশ্যালিজমের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু করেন তিনি। ন্যাশনাল সোশ্যালিজমকে একটি জাতীয় সংস্কৃতির ধারক মনে হলেও আসলে তা ছিল স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির শত্রু।

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের (১৯১৮-১৯৩৩) সময়টা ছিল জার্মানি ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের যুগ। সে সময় যেসব বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্ব জার্মানি সফর করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু, তাঁর পিতা মোতিলাল নেহরু, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময়ে বার্লিনে বেশ কিছু উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী তরুণ-যুবকের সমাবেশ ঘটেছিল, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শের অনুসারী; তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালিও ছিলেন। তাঁরা বার্লিনে ভারতীয় স্বাধীনতা কমিটি গঠন করেছিলেন এবং ইউরোপজুড়ে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে পত্রপত্রিকা প্রকাশ ও প্রচারসহ নানা রকম কর্মকাণ্ডে তৎপর ছিলেন। কিন্তু ত্রিশের দশকে হিটলার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ভারতীয়দের বার্লিনকেন্দ্রিক কর্মতৎপরতা ক্রমে থেমে যায়। জার্মানদের মনোভাব বর্ণবাদী চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে।

ভারতীয়দের নিয়ে হিটলারের তাচ্ছিল্য

ভারত সম্পর্কে অ্যাডলফ হিটলারের ধারণা ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটে তাঁর মাইন ক্যাম্ফ গ্রন্থে। সেখানে তিনি লেখেন:

আমি এখনো স্মরণ করি, ১৯২০–২১ সালের দিকে তথাকথিত ‘জাতীয়তাবাদী’ মহলে এক শিশুসুলভ ও অযৌক্তিক আশা জেগেছিল যে ভারতে নাকি ইংল্যান্ডের শাসন চাপের মুখে মুখ থুবড়ে পড়ছে। কিছু এশীয় ভণ্ড কিংবা সত্যিকারের ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী তখন ইউরোপে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তারা সাধারণ মানুষদেরও এই ধারণায় বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিল যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যার কেন্দ্রবিন্দু ভারত, সেখানে নাকি ব্রিটিশরা নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।…ইংল্যান্ড যদি প্রশাসনিক যন্ত্রে বর্ণগত অবক্ষয়ে পতিত হয়, তবেই কেবল ভারতবর্ষে পরাজিত হবে, যা আপাতত সম্পূর্ণভাবে অপ্রাসঙ্গিক। অথবা ভারতে ব্রিটিশদের পরাজয় ঘটতে পারে যদি ভারতীয় বিদ্রোহীরা কোনো শক্তিশালী শত্রুর তরবারির সহযোগিতায় তাদের পরাজিত করে। তারা তা কখনোই করতে পারবে না।…তা ছাড়া আমি একজন জার্মান হিসেবে অন্য যেকোনো শাসনের চেয়ে ইংরেজ শাসনের অধীনেই ভারতকে দেখতে বেশি পছন্দ করি। কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র, যে নিজের অস্তিত্বের জন্য শেষ রক্তবিন্দুটিও দিতে প্রস্তুত, তাকে কিছু অক্ষম মানুষের জোট দিয়ে ধ্বংস করা অসম্ভব। একজন জাতীয়তাবাদী মানুষ হিসেবে আমি মনুষত্বের মূল্য বর্ণগত ভিত্তিতেই নির্ধারণ করছি। এই তথাকথিত ‘দমিত জাতিগুলোর’ (প্রান্তিক জাতিগুলোর) বর্ণগত অধমতার (নিকৃষ্টতম) স্বীকৃতি থেকেই আমি আমার জাতির ভাগ্য তাদের সঙ্গে বেঁধে দিতে পারি না।৯

অ্যাডলফ হিটলারের দৃষ্টিতে ভারত কেমন, তা নিয়ে নানা কথা রয়েছে। ঔপনিবেশিক নিষ্পেষণে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রাম, জার্মানিতে সংগঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ বা সুভাষ বসুকে সহযোগিতার বিষয়ে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। এসব বিশ্লেষণ এসেছে ভারতীয়, জার্মান ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও লেখকদের কাছ থেকে।

তবু কেন হিটলারের কাছে

এত কিছু জানার পরও সুভাষ বসু কেন হিটলারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন? সুভাষ ছিলেন বাম ঘরানার বা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও কৌশলের মধ্যে পার্থক্য ছিল। তিনি প্রথমে ভারতীয় স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর ঝোঁক সর্বজনবিদিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যেকোনো মূল্যে ভারতকে মুক্ত করতে হবে।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল তাঁর প্রধান শত্রু এবং সেই সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শক্তিগুলোর সাহায্য নেওয়াকে তিনি কৌশলগতভাবে যৌক্তিক মনে করেছিলেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘আমার শত্রুর শত্রুই আমার সম্ভাব্য মিত্র।’ তিনি হিটলারের ফ্যাসিবাদ বা বর্ণবাদী নীতির সঙ্গে একমত ছিলেন না। হিটলারও প্রথমে তাঁকে খুব গুরুত্ব দিতে চাননি। কিন্তু সুভাষ বসু মনে করতেন, বিশ্বযুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। ব্রিটিশরা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, এই সময় বিদেশি সমর্থন নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানো সম্ভব।

সুভাষ বসু হিটলারের কাছ থেকে যা চেয়েছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা: জার্মানিতে অবস্থানরত ব্রিটিশ ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন; আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা ও জার্মান সামরিক সহায়তা।

বাবাকে নিয়ে সুভাষ-কন্যা অনিতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশান্ত পরিবেশ। সেই সময় সুভাষ বসুর ব্যক্তিগত জীবনেও ঘটে যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন একমাত্র কন্যা, তাঁর নাম রাখা হয় অনিতা। এখন তাঁর বয়স ৮৩। বহু বছর জার্মানির অউগসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অধ্যাপনার পর তিনি তাঁর স্বামী মার্টিন ফাফের সঙ্গে অবসর জীবন যাপন করছেন। তাঁর বাবার জীবন ছিল যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি তাঁর কন্যার জীবনেও রয়েছে নানা ঘটনার গল্প। তিনি মাত্র তিন বছর বয়সে পিতাকে হারান; অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি।

সম্প্রতি আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ করার উদ্দেশ্য তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। নানা কথার মধ্যে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার বাবা ভারতের স্বাধীনতার জন্য নাৎসি জার্মানির সঙ্গে মৈত্রী করেছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে জার্মানিসহ অন্যান্য দেশে অনেক বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। আপনি এ বিষয়ে কী বলেন?’

উত্তরে অনিতা বললেন, ‘এ বিষয়ে সেই সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আমার বাবা ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত থেকে ছদ্মবেশে প্রথমে কাবুল যান। সেখানে তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে সফল হননি। কয়েক সপ্তাহ ধরে জার্মানি, ইতালি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছিল, কীভাবে তারা এই প্রচেষ্টায় তাঁকে সহযোগিতা করবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে জড়াতে রাজি ছিল না, তবে বাবাকে জার্মানিতে যাওয়ার জন্য একটি ট্রানজিট ভিসা দিতে প্রস্তুত ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি ও ইতালি তাঁকে জার্মানিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

‘একজন সমাজতন্ত্রী রাজনীতিক হিসেবে সুভাষ বসুর পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়া নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বেশি কাম্য ছিল। সে সময় বোঝা যায়নি কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহায়তা করতে চায়নি। তবে কয়েক মাস পর, যখন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ করে বসে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটিশদের মিত্রে পরিণত হয়। বিষয়টি তখন আরও পরিষ্কার হয়, তারা কেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে নারাজ ছিল।

‘১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সমঝোতা হয়, যা হিটলার-স্টালিন প্যাক্ট বলে পরিচিত। তাতে কিছু গোপন বিষয় ছিল। পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশসমূহ ভাগাভাগি করে নেওয়াসহ আরও একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় ছিল। বিষয়টি হলো, ভবিষ্যতে কার কর্তৃত্বে যাবে উপনিবেশ ভারত। কেউ জানত না যে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপীয়দের উপনিবেশগুলো ভাগ করে নেবে। গোপন চুক্তি অনুসারে সেই ভাগাভাগিতে ভারতের কর্তৃত্ব যেত সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। সেই কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি। স্তালিন ছিলেন একজন কৌশলী রাজনীতিবিদ।’

বাবা বার্লিনে কেন এলেন

অনিতা বললেন, ‘আমার বাবা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নে থেকে যেতেন, তাহলে তাঁর কপালে কী ঘটত, তা কেবল কিছুটা অনুমান করা যায়। সেখানেও তখন জার্মানির মতোই নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে হত্যা ও নির্যাতন চলছিল। স্তালিনীয় কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক বিরোধীদের, এমনকি বিদেশ থেকে যেসব কমিউনিস্ট পালিয়ে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ওপরেও দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল। এ থেকে বোঝা যায় ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে সেখানে বিশেষ আশার কিছু ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান কমিউনিস্ট হার্বার্ট ভেরনার যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। পরে তিনি লিখেছিলেন, সেই নির্বাসন জার্মান কমিউনিস্টদের জন্যও অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল।’

হার্বার্ট ভেরনার ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত মস্কোর হোটেল লাক্সে নির্বাসিত ছিলেন। স্তালিনবাদী শুদ্ধি অভিযানে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি বটে, তবে তিনি নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে জার্মানি ফিরতে পেরেছিলেন এবং পরে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে জার্মান পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, একপর্যায়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

অনিতা আরও বলেন, দুই বাঙালি কমিউনিস্ট বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, যাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামে এবং সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী বার্লিন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন; কিন্তু দুজনেই মস্কোতে স্তালিনের নৃশংস ‘শুদ্ধি অভিযানের’ শিকার হয়ে প্রাণ হারান।

অনিতা বলেন, ‘আমার বাবা জার্মানি ও দূরপ্রাচ্যে থাকার সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতা বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তবে জার্মানি ও ইতালি বাবাকে সমর্থন দিতে রাজি হয়। “আমাদের শত্রুর শত্রুই আমাদের বন্ধু”—এই চিন্তায় পৌঁছান আমার বাবা। তাঁর পক্ষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ ছিল না। তিনি কোনোভাবেই ফ্যাসিস্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন পুরোপুরি একজন সমাজতন্ত্রী। তবে তাঁর কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল ভারতের স্বাধীনতা।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের কংগ্রেস পার্টির একাংশ ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়ায়। সেই অংশের রাজনীতিকেরা বলতেন, আমাদের ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন করতে হবে, যাতে তারা যুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা দিয়ে দেয়। এর অর্থ ছিল ব্রিটিশদের দয়া ও সদিচ্ছার ওপর ভরসা করা। কিন্তু আমার বাবা সব সময় এর বিরোধিতা করতেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা ভিক্ষা করে নিতে হবে, তা তিনি কখনোই চাননি।’

অনিতা আরও বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, আমার বাবার পক্ষ থেকে জার্মানি, ইতালি ও জাপান—তথাকথিত অক্ষশক্তির সাহায্য চাওয়া একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসেবে বাস্তববাদী রাজনীতি অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি সেই সব দেশেই গিয়েছিলেন, যারা মূলত ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়ছিল এবং যেখানে প্রচুর ব্রিটিশ-ভারতীয় যুদ্ধবন্দী ছিল। তিনি অক্ষশক্তি এবং ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের সাহায্য নিয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়তে চেয়েছিলেন।

‘ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশগুলো ছাড়া আর কোন দেশই-বা ভারতের পাশে দাঁড়াত? তবে নেহরুসহ কতিপয় স্বাধীনতাসংগ্রামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কাছ থেকে সহযোগিতার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁরা বরং ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু সুভাষ বসুর কাছে ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।’

ভারত সফরের অভিজ্ঞতা থেকে অনিতা বলেন, ‘অনেক ভারতীয় মনে করেন, নাৎসি জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আন্তরিকভাবে ভারতের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করেছিল। এই ধারণা অবশ্যই শিশুসুলভ এবং ভুল। প্রকৃতপক্ষে জার্মানি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী শুধু যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ভারতের সংগ্রামকে সমর্থন করেছিল। ভারতের মুক্তির প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জার্মান নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। জার্মান প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কিছু অংশ সুভাষ বসুর দাবি ইতিবাচক বিবেচনা করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, গণহত্যাকারী জার্মান প্যারামিলিটারি বাহিনী এসএস বা শুটসস্টাফেল-এর প্রধান হাইনরিখ হিমলার ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন; হিটলারের ব্যর্থ হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত অ্যাডাম ফন ট্রট জু সোলজ সুভাষ বসুর পরিকল্পনার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু অ্যাডলফ হিটলার শুরু থেকেই সুভাষ বসুর প্রতি বিরূপ ছিলেন। হিটলারের মুখোমুখি সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য সুভাষ বসুকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, ভারতের ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবেই থাকা উচিত। উপরন্তু, তাঁর প্রচারিত বর্ণবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতীয়রা ছিল “নিকৃষ্ট জাতি”। কিন্তু ভারতে গিয়ে আমি শুনে অবাক হয়েছি, কেউ কেউ হিটলারকে মহান ব্যক্তি মনে করেন। বেশির ভাগ জার্মান এই মূল্যায়ন সমর্থন করেন না।’

অনিতা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি জানো যে ভারতের মুক্তির জন্য জার্মানি ও পূর্ব এশিয়ায় গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলিম, শিখ সব ধর্ম ও জাতের মানুষ একসঙ্গে বসবাস ও আহার করতেন? তাঁরা একে অপরকে সম্মান করতেন এবং নিজেদের ধর্মীয় উৎসবে অন্যদের আমন্ত্রণ জানাতেন। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল এমনটিই হবে স্বাধীন ভারতবর্ষ। যদি তিনি ভারত বিভাগের সময়ের দাঙ্গা ও হত্যাকাণ্ড দেখতে পেতেন, তবে তা হতো তাঁর জন্য হৃদয়বিদারক।’

খুঁজে পাওয়া দলিল

সুভাষ বসু ও হিটলারের মধ্যে আলোচনার কোনো দলিল কি উদ্ধার করা সম্ভব? বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি। আসলেই হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, তা খুঁজতে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটির পাশাপাশি ১৯৪২ সালের ২৭ মে বার্লিনে হিটলারের সঙ্গে সুভাষ বসুর সাক্ষাতের মূল প্রটোকলটি খুঁজতে থাকি। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভে নানা দলিল-দস্তাবেজ খুঁজে পেলেও এই দলিলটি পাওয়া যায়নি। অবশেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক মহাফেজখানার মিসেস লুসিয়া ভন লিন্ডেকে চিঠি লেখার বেশ কিছুদিন পর জার্মান ভাষায় লিখিত ১৫ পৃষ্ঠার সেই দলিলটি হাতে পেলাম। হিটলার ও সুভাষ বসুর মধ্যকার আলোচনাটি রেকর্ড করা হয়েছিল, তা থেকে লিপিবদ্ধ করা হয়। দুজনের কথোপকথন পড়লে উভয়ের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে প্রকৃত ধারণা পাওয়া যাবে।

বার্লিনে অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে সুভাষচন্দ্র বসু হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। তিনি একাই গিয়েছিলেন হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। দিনটি ছিল বুধবার, ২৭ মে ১৯৪২। বিকেল নাগাদ তিনি পৌঁছান ভস সড়কে নতুন চ্যান্সেলর ভবনে। সেখানে প্রথমে দেখা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপের সঙ্গে, তারপর আসেন হিটলার।

সুভাষ বসু দীর্ঘ সময় ধরে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন, কারণ তিনি জার্মানির সঙ্গে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জার্মানির কাছ থেকে এ যাবৎ যে সমর্থন পেয়েছেন, তার জন্য প্রথমেই হিটলারকে ধন্যবাদ জানান। তারপর হিটলারকে একজন পুরোনো ও অভিজ্ঞ বিপ্লবী হিসেবে বর্ণনা করে তাঁর পরামর্শ চান।

হিটলার-সুভাষ বসু সাক্ষাৎ

২৭ মে ১৯৪২

ফুয়েরার সদর দপ্তরে ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর কথোপকথনের রেকর্ড। উপস্থিত ছিলেন: আর এ এম বা পররাষ্ট্রসচিব কেপলার এবং সচিব হেভেল।

সুভাষ বসু প্রথমেই ফুয়েরারকে (নেতা) একজন প্রবীণ বিপ্লবী হিসেবে শুভেচ্ছা জানান এবং এই সাক্ষাতের মাধ্যমে যে সম্মান তিনি তাকে প্রদান করলেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানান; এই দিনটি তাঁর জীবনের একটি ঐতিহাসিক দিন হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি জার্মান সরকারের যে আতিথেয়তা ও সৌজন্য পেয়েছেন, তিনি তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর দেশকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় লেজিয়ন (আজাদ হিন্দ ফৌজ) গঠনের কাজে তিনি জার্মানির সহায়তা পেয়েছেন।

সুভাষ বসু বলেন, গত বছরের জানুয়ারিতে যখন তিনি ভারত ত্যাগ করেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য তাঁর সংগ্রাম নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধ থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং এখন তিনি বলতে পারেন, দেশের সর্বোত্তম স্বার্থেই তিনি কাজ করেছেন। আজ তিনি পেছনে তাকিয়ে বলতে পারেন যে তিনি তাঁর দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করেছেন।

ভারতের জন্য ত্রিদেশীয় চুক্তিবদ্ধ শক্তিগুলোর সাহায্য প্রয়োজন, যদিও প্রকৃত স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য ভারতকেই লড়তে হবে। ভারত যদি এই সংগ্রামকে একান্তই নিজের কর্তব্য মনে করে, তবু তার বহির্বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থনের প্রয়োজন। এখন জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু করার সময় এসেছে। মুক্ত ভারত গড়তে জার্মানি ও ইতালির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপন এবং এই দেশগুলোর সহানুভূতি ও সহায়তা অর্জন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারত কেবল জাপানের ওপর নির্ভর করতে চায় না।

এরপর সুভাষ বসু তাঁর পূর্ব এশিয়ার যাত্রার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, তিনি এমন একটি স্থানে যেতে চান, যা ভারতের যতটা সম্ভব নিকটে অবস্থিত, যেন তিনি সেখান থেকে ভারতে বিপ্লব পরিচালনা করতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই জার্মানিতে তাঁর অনুপস্থিতির সময় তাঁর রেখে যাওয়া বিশ্বস্ত সহকর্মীরা তাঁর বক্তব্যের প্রচারণা আগের মতোই চালিয়ে যাবেন।

আলোচনার শেষে সুভাষ বসু একজন পুরোনো ও অভিজ্ঞ বিপ্লবী হিসেবে হিটলারের কাছে পরামর্শ চান। ভারত যদিও জার্মানি থেকে অনেক দূরে এবং সেখানকার পরিস্থিতি জার্মানি ও ইউরোপের পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন, তবু বিপ্লবের কিছু মৌলিক নীতি আছে, যেগুলো সর্বত্রই প্রযোজ্য। তিনি বলেন, ইংরেজদের প্রচারাভিযান ভারতকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তিনি যে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন, তা পুরোনো দার্শনিক ভারত নয়, বরং একটি আধুনিক, সক্রিয় ও নতুন ভারত।

উত্তরে হিটলার জার্মানি ও ভারতের অভিন্ন শত্রুদের (বিশেষ করে ইংল্যান্ড) প্রসঙ্গ টেনে একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেন। তিনি বলেন, ইংল্যান্ড ভারত দখল করে রেখেছে এবং ইউরোপের অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রেখে সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এটা খুব স্পষ্ট যে সমস্যা কেবল ইংল্যান্ডের সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। পরাজিত হলে ইংল্যান্ড তার প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ হারাবে।

ব্রিটিশদের পাশাপাশি বলশেভিক ও আমেরিকানরা জার্মানির অভিন্ন শত্রু। ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং রাশিয়া একে অপরের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছে না। আমেরিকা ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকার চায়, রাশিয়া চায় উভয়ের উত্তরাধিকার। জার্মানি ও ভারতের ক্ষেত্রে তা নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের উত্তরাধিকার। আমেরিকা ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকারে প্রতারণা করেছে নাকি রুশরা শেষ পর্যন্ত উভয় অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশকে প্রতারণা করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, নেহরুর বলশেভিকপন্থী চিন্তাভাবনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে। ভারত যেন রাশিয়ার দিক থেকে বিপদের আশঙ্কা অগ্রাহ্য না করে বা চোখ বন্ধ করে না রাখে।

জার্মানি ও ভারতের মধ্যে বিশাল দূরত্ব। উভয় দেশের শত্রুরা এক ও অভিন্ন, তবু সেই শত্রুদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে। দূরত্ব সত্ত্বেও ভারত ইউরোপে জার্মানির বিজয়ের প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। গত আড়াই বছরে জার্মানির সাফল্য না থাকলে জাপানের পক্ষে পূর্ব এশিয়ায় এ রকম অগ্রগতি অর্জন করা তো দূরের কথা, যুদ্ধেই প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হতো। সুতরাং ভারত ও জার্মানি একই শত্রুর বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ লড়ছে, তা তারা যেখানেই এই শত্রুর সম্মুখীন হোক না কেন। ইংরেজ শাসন উৎখাত করবার জন্য সোভিয়েতের করায়ত্ত না হয়েও ভারতের সামনে এখন অন্যান্য সুযোগ এসেছে। তা ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন অচিরেই জার্মানির হাতে সম্পূর্ণরূপে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।

হিটলার নিজের দেশ জার্মানির জন্য যে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তা কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বা প্রচারণার জন্য নয়। মূলত একজন সৈনিক হিসেবে ক্ষমতার রাজনীতির জন্য তিনি তা করছেন। এটা করার সময়, তিনি মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী না করার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। তিনি কখনো নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নয়। তিনি বলেন, যা তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই, তা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে তিনি রাজি নন। এ কারণেই তিনি এখন মিসর সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করছেন না।

গত পরশু দিন থেকে জেনারেল রোমেল আক্রমণ শুরু করেছেন। এই অভিযান ইংরেজ ফ্রন্টকে ধ্বংস করতে পারবে কি না, তা তিনি এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। যা–ই হোক না কেন, জার্মানি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। রক্ত ও শ্রমের চেয়ে বেশি কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। যদি রোমেল সীমিত সাফল্য অর্জন করেন, তাহলে এখন মিসর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী শুধু ক্ষতিই ডেকে আনবে। কিন্তু যদি রোমেল শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হন, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এ জন্য তিনি এখন মিসরের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলছেন না। রোমেলের অভিযান সফল হলে তিনি মিসরীয় জনগণকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাবেন, তখনই তা যুক্তিযুক্ত হবে। হিটলার বলেন, তিনি অন্য জাতিগুলোকে বিপদে ফেলতে চান না, যেমনটা ইংরেজরা করে। তিনি সত্যিকারের বিজয় এনে দিতে চান। এখনই আরবদের বিদ্রোহে আহ্বান জানানো দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। সময়োপযোগী আহ্বানের পেছনে জার্মানির শক্তি ও সদিচ্ছা থাকবে।

হিটলার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশি শাসনকে অপসারণ করার আহ্বান জানাতে সব সময় খুব সতর্ক থেকেছেন। তাঁর মাতৃভূমি অস্ট্রিয়া সম্পর্কে তিনি অস্ট্রিয়ানদের কাছে প্রথম আবেদনটি জানিয়েছিলেন ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ, অর্থাৎ আক্রমণের এক দিন আগে। একজন রাজনীতিবিদ সব সময় চাইবেন তাঁকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হোক, তাই তিনি চাইলেই সবকিছু করতে পারেন না।

আরব প্রশ্নে তিনি একই মনোভাব গ্রহণ করছেন। যদি জার্মানি ইতিমধ্যে ককেশাসের দক্ষিণে উপস্থিত থাকত এবং যদি তার কাছে অর্ধডজন ট্যাংক ডিভিশন এবং কয়েকটি মোটরচালিত ডিভিশন থাকত, তাহলে তা মিসরীয় এবং আরব বিদ্রোহীদের সাহায্য পাঠানো যেত। তখন তিনি আরবদের উদ্দেশে একটি আহ্বান জানাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কিন্তু এখন জার্মানি আরবের যুদ্ধাঞ্চল থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে। তাই এখন এমন আহ্বান জানানো সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। হিটলার ইংরেজ নন। তিনি অন্য জাতিগুলোকে কেবল আহ্বানের মাধ্যমে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে চান না। তিনি মিসর ও বিপ্লবী আরবদের ধ্বংস চান না, বরং তিনি চান তাদের একটি বাস্তব সফলতার ভিত্তিতে সাহায্য করতে। তিনি ব্রিটিশদের মতো শুধু একটি গৌণ বা ছোটখাটো আক্রমণ পরিচালনা করতে চান না।

তিনি অন্য জাতিগুলোকে আহ্বান করে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিতে চান না। তিনি মিসর ও বিপ্লবী আরবদের ধ্বংস চান না, বরং তাদের প্রকৃত সাফল্য অর্জনে সাহায্য করতে চান। তিনি নিজের স্বার্থে কোনোভাবেই তাদেরকে একটি দায়মুক্তিমূলক অভিযান চালানোর জন্য ব্যবহার করতে চান না, যার মূল্য দিতে হবে তাদের নিজেদের রক্তের বিনিময়ে। মিসরের উদ্দেশে একটি আহ্বান জানানো সেই মুহূর্তেই দায়িত্বপূর্ণ হবে, যখন সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে। সেটা হয়তো তিন মাস পর কিংবা এক বা দুই বছর পর হতে পারে। তখন যেকোনোভাবেই হোক জার্মানি মিসরের দ্বারপ্রান্তে সেনাশক্তি জড়ো করতে পারবে, যাতে দেশটির মুক্তি নিশ্চিত হয়। আরবের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

ভারত জার্মানি থেকে অনেক দূরে। জার্মানির সঙ্গে তার কেবল স্থলপথে ও আকাশপথে সংযোগ স্থাপনের উপায় রয়েছে। যদি দক্ষিণ দিকের পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে স্থলপথটি পারস্য উপসাগরের উপকূল দিয়ে যাবে। উত্তর দিক থেকে হলে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, এই পথ শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেই উন্মুক্ত করা সম্ভব।

গত ছয় মাসের বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর মধ্যে হিটলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জাপানের বিস্ময়কর দ্রুত অগ্রগতিকে; জাপানি সেনাবাহিনী কার্যত ভারতের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তিনি জাপানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য জানতেন না। তিনি জানতেন না জাপানিরা প্রথমে চিয়াং কাই-শেকের হুমকি থেকে তাদের মুক্ত করা এবং তার সঙ্গে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, নাকি তারা প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকতে চায় নাকি ভারতের দিকে। পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশদের আধিপত্য ধ্বংস করা গেলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে। ব্রিটিশদের পতন অবশ্যই জার্মানির জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয় হবে এবং তার ফলে জার্মান রক্তক্ষয় হ্রাস পাবে। এ কারণেই জার্মানি পূর্ব এশিয়ায় ঘটমান ঘটনাবলি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজে থেকে সম্ভাব্য সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিচ্ছে। এটা আমরা করছি, যেখানে সম্ভব সেখানেই আমরা ব্রিটিশ শাসনকে আঘাত করছি।

এ প্রসঙ্গে ফুয়েরার হিটলার সাবমেরিন যুদ্ধের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধের জন্য একটি পরোক্ষ সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। যেমন ব্রিটিশ শিল্পকেন্দ্রগুলোর ওপর বিমান হামলা ও উত্তর আফ্রিকায় যুদ্ধ। যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হওয়া প্রতিটি ইংরেজ ডিভিশন থেকে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদের বন্দী করা হয়, যেন পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের লড়াইয়ে তাদের ব্যবহার করা যায। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু করা জার্মানির পক্ষে সম্ভব নয়।

জার্মানি যদি এখনই জাপানের মতো ভারতের সীমান্তে উপস্থিত থাকত বা যেখানে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পৌঁছাতে পারত, তাহলে ফুয়েরার হিটলার সুভাষ বসুকে অনুরোধ করতেন তাঁর সঙ্গে থেকে জার্মান সেনাদের সঙ্গে ভারতে প্রবেশ করতে, যাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লব প্রজ্বলিত করা যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সুভাষ বসুকে কেবল এই পরামর্শই দিতে পারেন যে তিনি যেন জাপানিদের কাছে যান এবং ভারতের সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে বিপ্লবী সংগ্রাম ছড়িয়ে দেন।

হিটলার একজন পুরোনো বিপ্লবী হিসেবে সুভাষ বসুকে কেবল এই পরামর্শই দিতে পারেন যে ভারতের ভেতরে একটি বিপ্লবের সুযোগ তখনই কাজে লাগানো উচিত, যখন বাইরের দিক থেকে শত্রুর চাপ শুরু হয়। নেহরুর ফ্যাসিবাদবিরোধী ও জাতীয় সমাজতন্ত্রবিরোধী চিন্তাধারা বা গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধ দ্বারা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ফল পাওয়া যাবে বলে হিটলার মনে করেন না। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনকে কেবল তখনই দমানো যাবে, যখন ভারতের জনগণ বাইরের আক্রমণের সঙ্গে ভেতরেও জেগে উঠবে। এমন একটি অভিযান আরও ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব, যখন যতটা বেশি সেই দেশটির কাছাকাছি থাকা যায়। তাই বসুর পক্ষে সবচেয়ে ভালো হবে সেখানে যাওয়া, যেখানে তিনি ভারতের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবেন এবং যেখান থেকে ভারতে ইংরেজদের ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। জাপানিরা এই চাপ সত্যিই প্রয়োগ করতে চায় কি না, তা হিটলার জানেন না। তারা জার্মানিকে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। অন্যদিকে তিনি বিশ্বাস করেন না যে বাইরের সাহায্য ছাড়াই একটি বিদ্রোহ ভারতীয়দের স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে।

পুরোনো বিপ্লবী হিসেবে হিটলার জানেন, আধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক সৈন্য যদি সঠিকভাবে সংগঠিত করা যায় এবং তারা অস্ত্র ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তবে একটি বড় দেশকে আটকে ফেলা সম্ভব হতে পারে। যখন বাইরের দিক থেকে সামরিক চাপ যুক্ত হবে এবং দেশের অভ্যন্তরের বিপ্লবী শক্তিগুলো যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে রসদ সরবরাহ ও সৈন্য পরিবহনে বাধা দিতে সক্ষম হবে, কেবল তখনই সামরিক পতনে তা অবদান রাখতে পারবে।

পরিস্থিতি যেমন দাঁড়িয়েছে, তাতে হয়তো ভারতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে জার্মানির আরও অন্তত দু-এক বছর লেগে যাবে। কিন্তু জাপানের প্রভাব কয়েক মাসের মধ্যেই দেখতে পাওয়া সম্ভব। তাই বসুর উচিত জাপানিদের কাছে যাওয়া, যাতে তিনি শুধু নিজের দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার নয় বরং উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে জাপানিদের মনস্তাত্ত্বিক ভুল করা থেকেও বিরত রাখতে পারেন।

তবে ফুয়েরার হিটলার সুভাষ বসুকে আকাশপথে যাত্রা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন। ইংরেজরা তাদের রাত্রিকালীন নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে তাঁকে জরুরি অবতরণ করতে সহজেই বাধ্য করতে পারে। তিনি (সুভাষ বসু) একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন পরীক্ষামূলক যাত্রায় অংশ নেওয়া তাঁর উচিত হবে না। তার জন্য অবশ্যই একটি নিরাপদ পথ নির্বাচন করতে হবে। একটি জাপানি সাবমেরিন ইউরোপে পৌঁছেছে এবং সেটি যদি শিগগিরই ফিরে যায়, তবে সেটি সুভাষ বসুকে নিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় তিনি (ফুয়েরার হিটলার) বসুর জন্য একটি জার্মান সাবমেরিন প্রদান করবেন, যা তাঁকে ব্যাংকক পৌঁছে দেবে। তারপর ফুয়েরার সুভাষ বসুকে একটি মানচিত্র দেখিয়ে সম্ভাব্য যাত্রাপথ ব্যাখ্যা করেন, যা উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাবে এবং তাঁর হিসাবে যাত্রাকাল প্রায় ছয় সপ্তাহ হবে।

হিটলার সুভাষ বসুকে ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে নেটাল ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে এবং মাদাগাস্কার ও ভারতের উপকূলে ইউ-বোট ব্যারিকেড স্থাপনের মাধ্যমে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করা যেতে পারে।

আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে সুভাষ বসু হিটলারকে আরও দুটি অনুরোধ করেন। ব্রিটিশরা প্রচারণার মাধ্যমে ফুয়েরার হিটলারের মাইন ক্যাম্ফ বইটিতে প্রকাশিত ভারতবিষয়ক মন্তব্যগুলো খুবই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে এবং তা জার্মানির বিরুদ্ধে প্রচারণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই তিনি ফুয়েরারকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন কোনো উপযুক্ত সময়–সুযোগে ভারতের ব্যাপারে জার্মানির অবস্থান সম্পর্কে কিছু স্পষ্ট কথা বলেন। এটি ভারতীয় জনগণের কাছে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিয়ে আসবে। এরপর সুভাষ বসু আবারও ভারতের পক্ষে জার্মানির নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের অনুরোধ জানান, যাতে ভারতকে শুধু জাপানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে না হয়।

উত্তরে ফুয়েরার হিটলার ভারতের জন্য যেসব করণীয় নির্ধারণ করেন, সেগুলো এই: ব্রিটিশ প্রভাব অপসারণ, সোভিয়েত প্রভাব পরিহার, জাপানের সঙ্গে ভারতের পূর্ব সীমা–সম্পর্কিত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা এবং ভারতের ঐক্য অর্জনের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা জার্মান ঐক্য প্রতিষ্ঠার মতো ১০০ থেকে ২০০ বছর সময় নিতে পারে।

ফুয়েরার হিটলার তাঁর বইটির বক্তব্যের বিকৃত উপস্থাপন বিষয়ে বলেন, তিনি শুধু এমন কিছু প্রবণতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন, যা শোষিত জাতিগুলোকে তাদের শোষকদের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠনে উৎসাহিত করবে। তিনি অত্যাচারিত জাতিগুলোর অক্ষমতার প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণভাবে ভুল বলে মনে করতেন। বিশেষ করে জার্মানিতে যে মহলগুলো এই ধরনের চিন্তাধারার পেছনে ছিল, তারা জার্মান সাম্রাজ্যের জন্যও ভারতের ধাঁচে একধরনের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ সমর্থন করত, যা একইভাবে সম্পূর্ণ ভুল পন্থা ছিল।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রতি জার্মানির সমর্থন প্রসঙ্গে ফুয়েরার মন্তব্য করেন, সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক সহায়তাবিষয়ক হতে পারে। সুভাষ বসু যেন ভুলে না যান যে একটি দেশের শক্তি কেবল তত দূর পর্যন্তই বিস্তৃত, যত দূর তার নিজের তলোয়ার পৌঁছায়।

বিদায়ের সময় ফুয়েরার সুভাষ বসুকে তাঁর যাত্রা ও পরিকল্পনার সফলতার জন্য আন্তরিক শুভকামনা জানান।

বার্লিন, ৩০ মে ১৯৪২, স্মিট।

(রেকর্ড করা আলোচনা ৩০ মে ১৯৪২ টাইপ করা হয়। আর্কাইভ, জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ১৯৪২)১০

ভারতীয় রাজনীতিবিদ সুভাষ বসুকে সেদিন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মতো সম্মান দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছিল। সুভাষ বসু এই সাক্ষাৎকারটিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বজনীন স্বীকৃতি হিসেবে দেখেছিলেন।

শেষ কথা

সুভাষচন্দ্র বসুর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছিল ব্যাপক। আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে তিনি কীভাবে সেসব যোগাযোগ সমন্বয় করতেন, তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। তিনি ১৯৪২ সালে তাঁর জরুরি কিছু লেখা বইয়ে লেখেন, ‘অতীতে ভারতের অধঃপতনের অন্যতম কারণ ছিল বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতা। ভবিষ্যতের জন্য ভারতের উচিত অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা। ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের অবস্থান পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝামাঝি হওয়ায় নিজস্ব এক সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে। কিন্তু যে জাপান, ইতালি ও জার্মানি এখন ভারতের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপন করাই হবে ভারতের পক্ষে স্বাভাবিক কাজ।’ তাঁর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্লিনে জার্মান সাময়িকী ইচ্ছা ও ক্ষমতার আগস্ট ১৯৪২ সংখ্যায়।১১

মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরু অক্ষশক্তি অর্থাৎ জার্মানি, ইতালি ও জাপানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের ও পরে মিত্রশক্তির লড়াইয়ে ভারতের অংশ নেওয়ার বিরোধিতা করেননি। তবে তাঁরা শর্ত দিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভারতের ঔপনিবেশিক অবস্থানের পরিবর্তন করতে হবে এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাঁদের এই অবস্থান সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে বিপ্লবাত্মক বা ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি।

তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুভাষ বসু ঔপনিবেশিক জোয়াল থেকে ভারতের দ্রুত মুক্তির জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শত্রু অক্ষশক্তির সঙ্গে একটি জোট বাঁধতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ব্যাপারে নাৎসি নেতৃত্বের কিছু নিজস্ব হিসাব-নিকাশ ও কৌশল ছিল। তারা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করলেও ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামকে সরাসরি সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

হিটলারের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির কৌশল ও বর্বরতা সম্পর্কে বলার শেষ নেই। বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও তাঁর সঙ্গীরা জার্মানি তথা ইউরোপে যে বর্বরতা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের একটি নৃশংস অধ্যায়। হিটলারি বর্বরতার উদাহরণ পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। নাৎসি বাহিনী শুধু প্রতিবেশী জাতিগুলোকেই ধ্বংসের চেষ্টা করেনি, নিজের জাতির মধ্যেও শুদ্ধীকরণের নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় আশি বছর পর আজও সে যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি ইউরোপ তথা সারা পৃথিবীর মানুষ ভুলতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোট প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

জার্মান ফ্যাসিবাদের পতন সম্ভব হয়েছিল মূলত বাইরের শক্তিগুলোর রণকৌশলের মাধ্যমে। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্বল্পসংখ্যক প্রতিবাদী গোষ্ঠী ছিল। অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদবিরোধী গোষ্ঠী হয় দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল, নয়তো হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে প্রাণ হারিয়েছিল। মিত্রশক্তির নৈতিক জোর ও রণকৌশলের কারণে শেষ পর্যন্ত বর্বরতম ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন হয়েছিল। জার্মান ফ্যাসিবাদ শুধু ইউরোপ এবং পৃথিবীর জন্য যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও রাজ্য জয়ের বর্বর লিপ্সাই উসকে দেয়নি, জার্মান জাতির জন্যও এটি ছিল তাদের ইতিহাসের করুণতম অধ্যায়।

সুভাষ বসু ও হিটলারের মধ্যে আলোচনাটি ছিল ঐতিহাসিক। পরবর্তী সময়ে সুভাষ বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অধিকাংশ কর্মপরিকল্পনা ও অভিযানের ছক সেই আলোচনা থেকেই উঠে এসেছিল।

সূত্র

১. Gordon, L A (1964). Brothers against the Raj: eine Biographie des indischen Nationalisten Sarat und Subhas Chandra Bose. Columbia University Press. New York, USA.

২. Talwar, B R (1976). The Talwars of Pathan Land and Subhas Chandras Great Escape (pp. 81-88). People Publishing House. New Delhi, India.

৩. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 1). Telegramm Nr. 32 [Telegram]. AA-PA/R29534. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.

৪. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 5). Telegramm Nr. 39 [Telegram]. AA-PA/R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.

৫. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 25). Telegramm Nr.71 [Telegram]. AA-PA/R29615 Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.

৬. AA/USt Pol (Woermann) an AA/StS (Weizsäcker). (1941, March 4). Telegramm Nr.176 [Telegram] AA-PA/ R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.

৭. Bot.Moskau (Schulenburg) an AA. (1941, March 31). Telegramm Nr.744 [Telegram] AA-PA/R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.

৮. Gunther, L (1999). Remer Hans Joachim, Inder, Indien und Berlin, 100 Jahre Geschichte (p. 24). Lotus Publishing. Berlin.

৯. Hitler A (1925). Mein Kampf (pp. 746-747). Franz Eher Nachf. Verlag. München, Germany.

১০. RZ 248-27848. 19 /42 gRs. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.

১১. বোস, এস কে, অ্যান্ড বোস, এস (ইডিএস), ২০২৩, জরুরি কিছু লেখা (পৃ. ২০৬) আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা, ভারত।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-20%2Fw4cyn0re%2F2.-Subhas-Chandra-Bose-meeting-Adolf-Hitler.jpg?rect=0%2C0%2C800%2C533&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুভাষচন্দ্র বসু ও অ্যাডল্ফ হিটলার, বাঁয়ে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দোভাষী পাউল ওটো স্মিট। বার্লিন, জার্মানি, ২৭ মে ১৯৪২। সূত্র: জার্মান কেন্দ্রীয় মহাফেজখানা

Sunday, February 22, 2026

জার্মানি কেন ‘আরেকটি ইসরায়েল’ হয়ে উঠছে by জুর্গেন ম্যাকার্ট

জার্মানির রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গাজায় চলমান গণহত্যার ক্ষেত্রে সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জার্মানির সম্পৃক্ততা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে চলমান অবরোধের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের কারণে।

একইসাথে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান দেশটির রাজনৈতিক সততাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতিও জার্মানির সরকারের দায়বদ্ধতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ইসরায়েলি শাসনের সহযোগী হয়ে ওঠার পর থেকে জার্মানির শীর্ষ নেতৃত্ব ধীরে ধীরে একই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল গ্রহণ করেছে। তাঁদের নীতিতে শিষ্টাচারের অভাব স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকেও তারা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক ও সাবেক চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধাদের হাতে ইসরায়েলি নারীদের ধর্ষণের একটি ভিডিও তাঁরা দেখেছেন; কিন্তু এমন কোনো ভিডিও কখনো প্রকাশিত হয়নি। এই বক্তব্য জার্মানির জনগণকে বিভ্রান্ত করার শামিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এর চেয়ে গুরুতর ঘটনা আর কী হতে পারে! কিন্তু সময় দেখাল, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় কতটা গভীর হয়েছে।

গত সপ্তাহে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল এমন একটি পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যে কুৎসা রটনার কৌশল চালু আছে, তিনি সেটিকেই অনুসরণ করেন।

তাঁর ফরাসি সহকর্মীর সঙ্গে মিলে তিনি জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানেজের পদত্যাগ দাবি করেন। অভিযোগ আছে, আল–জাজিরা ফোরামে আলবানেজ নাকি ইসরায়েলকে মানবতার শত্রু বলেছেন। ফরাসি রাজনীতিক ক্যারোলিন ইয়াদান এ বক্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে আখ্যা দেন।

কিন্তু আলবানেজ আসলে যা বলেছিলেন, তা ভিন্ন। তিনি বলেছিলেন, যাঁদের হাতে বিপুল অর্থ, অ্যালগরিদম বা অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে নেই, মানবজাতি হিসেবে তাঁদের জন্য একটি অভিন্ন শত্রু রয়েছে। বক্তব্যটি সাধারণ মানবিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছিল। এটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়।

ওয়াডেফুল ও তাঁর মন্ত্রণালয় সূত্র যাচাইয়ের প্রয়োজনও মনে করেননি। আরেকজন ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন শুনেই তিনি সেই সুরে সুর মিলিয়েছেন। এ ঘটনাকে সাম্প্রতিক জার্মান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উদ্বেগজনক অধ্যায় বলা যায়।

এরপর আরও একটি ঘটনা ঘটে। জার্মানির পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট জুলিয়া ক্লোকনার ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরায়েল সফর করেন। সফর শেষে তিনি জার্মানির সরকারি টেলিভিশন এআরডিতে বক্তব্য দেন। তিনি গাজার সীমান্তবর্তী ইয়েলো লাইনে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রচারণার পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁর বক্তব্যে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের কোনো সমালোচনা ছিল না।

জুলিয়া ক্লোকনার বলেন, কিছু বসতি ও তাঁবু ধ্বংস হয়েছে, এ ছাড়া কিছু না। যে অংশটি তিনি দেখেছেন, তা অন্য অংশের মতো এতটা বিধ্বস্ত নয়। কারণ, অনেক জিম্মিকে সেখানে রাখা হয়েছিল। এই বক্তব্য প্রশ্নের জন্ম দেয়।

যদি ইসরায়েল জানত জিম্মিরা কোথায় আছে, তবে তাদের উদ্ধারের বদলে চারপাশে ব্যাপক বোমাবর্ষণ কেন হলো?

ক্লোকনার আরও বলেন, সেখানে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেন আরেকটি গাজা; কিন্তু তিনি সীমান্তে দাঁড়িয়ে কীভাবে এই সুড়ঙ্গ দেখলেন? তিনি কি কোনো সুড়ঙ্গে গিয়েছিলেন? কোনো ছবি বা ভিডিও কি তিনি দেখাতে পেরেছেন? এমন কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক রেডক্রসের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন।

তাঁর দাবি, ইয়েলো লাইন বা হলুদ রেখা স্থাপনের পর গুলি ও লড়াই বন্ধ হয়েছে। খাদ্য ও ওষুধসহ সহায়তা বেড়েছে। তবে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের নিয়মের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম ধীরে পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হামাস তাদের লোকজনকে সামনে পাঠিয়ে কষ্ট দিচ্ছে।

এই বক্তব্যও বিতর্কের জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, গাজায় সহায়তা প্রবেশে নানা বাধা রয়েছে। খাদ্য, পানি, তাঁবু ও ওষুধ সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্লোকনারের বক্তব্যে এসব উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়নি। সমালোচকেরা বলছেন, জার্মান নেতৃত্ব ইসরায়েলের বক্তব্যকে যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করছে। গাজার হাসপাতাল ধ্বংসের পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, তাতেও অনেকে অসংগতি খুঁজে পেয়েছিলেন। তবু জার্মানির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে খুব কমই প্রশ্ন তুলেছেন।

এই ধারাবাহিক অবস্থান জার্মান নীতিকে বিতর্কিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা এখন সমালোচনার মুখে। দেশে ও দেশের বাইরে অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক সততা ও স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখার বদলে জার্মান নেতৃত্ব একতরফা অবস্থান নিচ্ছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, জার্মানি কি তার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা পালনের নামে অন্যায়ের প্রতি নীরব সমর্থন দিচ্ছে? সমালোচকদের মতে, দেশটি যেন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির বদলে অন্যের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে। এতে জার্মান গণতন্ত্র ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি জার্মান রাজনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব এবং নাগরিকদের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও গভীর হবে। জার্মান নেতৃত্বের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, তারা কি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেবে, নাকি বিতর্কিত নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।

* জুর্গেন ম্যাকার্ট, জার্মানির পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-17%2F0pxqxy27%2FU2GM54IBGJL6JKEAAUPOJCUHQQ.jpg?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জার্মানি ও ইসরায়েলের পতাকা। ছবি : রয়টার্স

Sunday, February 15, 2026

গাজা নিয়ে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজকদের বিতর্কিত মন্তব্য, সরে দাঁড়ালেন অরুন্ধতী রায়

ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায় ফিলিস্তিনের গাজা ঘিরে আয়োজকদের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি জানান, উৎসবের জুরি প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ভিম ভেন্ডার্সের মন্তব্যের প্রতিবাদে তিনি উৎসবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে গাজা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ভেন্ডার্স বলেছিলেন, চলচ্চিত্র ‘রাজনীতির বাইরে থাকা’ উচিত।

বিবৃতিতে অরুন্ধতী বলেন, বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে ভেন্ডার্স ও জুরির অন্য সদস্যদের প্রতিক্রিয়া আমাকে ‘স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ’ করেছে।

অরুন্ধতীর উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার জিতে। এবারের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে ১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভজ ইট দোজ ওয়ানজ’-এর পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ দেখানোর কথা ছিল। অরুন্ধতী চিত্রনাট্য লেখার পাশাপাশি এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

অরুন্ধতী বলেন, ভেন্ডার্স ও জুরির অন্য সদস্যদের ‘বিবেকবর্জিত’ মন্তব্য তাঁকে ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে’ নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির ইসরায়েলের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভেন্ডার্স বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে আমরা আসলেই ঢুকতে পারি না।’ তিনি নির্মাতাদের ‘রাজনীতির পাল্টা ভারসাম্য’ রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।

জুরির আরেক সদস্য ইভা পুশ্চিন্সকা বলেন, এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নিতে জুরির কাছে প্রত্যাশা করা ‘কিছুটা অন্যায্য’।

বিবৃতিতে অরুন্ধতী বলেন, ‘শিল্প রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়, তাঁদের এ মন্তব্য সত্যিই হতবাক করে দেওয়ার মতো ব্যাপার।’

গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েল রাষ্ট্রের গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেন অরুন্ধতী রায়।

অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নির্মাতা ও শিল্পীরা যদি দাঁড়িয়ে এটা বলতে না পারেন, তাহলে তাঁদের জেনে রাখা উচিত, ইতিহাস তাঁদের বিচার করবে।’

অরুন্ধতী ভারতের বিখ্যাত জীবিত লেখকদের একজন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীব্র সমালোচক এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থক।

গাজা ইস্যুতে এবারের উৎসব কর্তৃপক্ষের অবস্থানের প্রতিবাদে মিসরের দুই প্রয়াত নির্মাতার দুটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র দুটি হলো আতিয়াত আল আবনুদির ‘স্যাড সং অব তোহা’ ও হুসেন শরিফের ‘দ্য ডিজলোকেশন অব আম্বার’।

এক বিবৃতিতে উৎসবের এক নারী মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ‘বার্লিনালে (বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব) এসব সিদ্ধান্তকে সম্মান জানায়।’

এ মুখপাত্র আরও বলেন, উৎসবে ‘আমরা তাঁদের স্বাগত জানাতে পারছি না বলে দুঃখিত। তাঁদের উপস্থিতি উৎসবের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করত।’

রাজনীতি থেকে দূরে থাকা

বার্লিনালের ঐতিহ্যগতভাবে সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল আয়োজনের খ্যাতি আছে, কিন্তু এবারের আসরে এখন পর্যন্ত অনেক তারকাকে সমসাময়িক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে অবস্থান গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

‘সানি ড্যান্সার’ ছবির মার্কিন অভিনেতা নিল প্যাট্রিক হ্যারিসকে শুক্রবার প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি আপনার শিল্পকে রাজনৈতিক বলে মনে করেন? এটি কি ‘ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’ সাহায্য করতে পারে?

উত্তর হ্যারিস বলেন, আমি ‘অরাজনৈতিক কাজ করতে আগ্রহী।’ আমি এমন কাজ করতে চাই, যা আমাদের ‘বিকটভাবে অ্যালগরিদমভিত্তিক ও বিভক্ত পৃথিবীতে’ মানুষের মধ্যে সংযোগ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

এবারের আসরে সম্মানসূচক ‘গোল্ডেন বিয়ার’ বিজয়ী মালয়েশীয় অভিনেত্রী মিশেল ইয়োকে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, সেখানকার পরিস্থিতির ‘সবকিছু বুঝি, আমি এমনটি দাবি করতে পারি না।’

আগের বিতর্ক

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব এর আগেও গাজা প্রসঙ্গ নিয়ে বিতর্কিত হয়েছে।

২০২৪ সালে এই উৎসবের সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছিল ‘নো আদার ল্যান্ড’। প্রামাণ্যচিত্রটি ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনপদ বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নিয়ে নির্মিত।

জার্মানির সরকারি কর্মকর্তারা সে বছরের পুরস্কার অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ছবির পরিচালক এবং অন্যদের গাজা–বিষয়ক বক্তব্যকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।

হামাসের যোদ্ধারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায়। এতে ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন। জবাবে গাজায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায়
ভারতের সুপরিচিত লেখক অরুন্ধতী রায়। ছবি: লেখকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে

Monday, January 19, 2026

যে কারণে নতুন বন্ধু খুঁজছেন জার্মান চ্যান্সেলর by সরাফ আহমেদ

তুষারময় শীতকে পেছনে ফেলে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস দুই দিনের সফরে ভারতে গেছেন। সফর শুরুর দিনেই তিনি জানিয়েছেন, জার্মানি ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। দুই দেশের লক্ষ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও শক্তিশালী করা। তবে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ও একমুখী পররাষ্ট্রনীতিই কি তার পুরোনো মিত্রদের নতুন বন্ধু খুঁজতে বাধ্য করছে?

জার্মানির গণমাধ্যমগুলো এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে জার্মানি যখন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় জার্মান চ্যান্সেলরের ভারত সফর স্পষ্টতই গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে।

এই সফরের কয়েক দিন আগেই, ৮ জানুয়ারি, জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার বার্লিনে তাঁর ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ব যেন ‘লুটেরাদের আড্ডায়’ পরিণত না হয়। বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ভাঙনের দিকে নীরব দর্শক হয়ে না থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ব্রাজিল ও ভারতের মতো দেশগুলোকে বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসতে রাজি করাতে হবে।

জার্মানির প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের সুর ধরেই ভারত সফররত চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, ভারত যেন কৌশলগত ক্ষেত্রে কেবল রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, জার্মানি ভারতের সঙ্গে সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।

জার্মানি সরকারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই সফরকে বার্লিন বিশেষ সম্মানের নিদর্শন হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে ভারত সরকারও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে চ্যান্সেলর তাঁর প্রথম এশিয়া সফরে চীনকে অগ্রাধিকার না দিয়ে আগে ভারতে এসেছেন। যদিও আগামী ফেব্রুয়ারিতে তাঁর চীন সফরের কথা রয়েছে, তবু ভারত সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য দিল্লির কাছে পরিষ্কার বলে মনে করা হচ্ছে।

সফরের শুরুতে চ্যান্সেলর সরাসরি রাজধানী নয়াদিল্লিতে না গিয়ে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটে। মোদির আমন্ত্রণে সেখানে তিনি একটি ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেন এবং ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা মহাত্মা গান্ধীর একটি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন। রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী কর্মসূচিকে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রকাশের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভারতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ টোবিয়াস শলৎসের মতে, চ্যান্সেলরের এই সফরের সময়টি কৌশলগতভাবে অনুকূল। তাঁর ভাষায়, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন জোট ও অংশীদারত্ব গঠনের প্রয়োজন তৈরি করেছে, আর সেই প্রেক্ষাপটেই জার্মান সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ভারত ও জার্মানির মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে এই জায়গায় যে তারা এমন এক বিশ্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে চীন একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে সরে যাচ্ছে এবং রাশিয়া ক্রমেই আরও বেশি সমস্যাপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে ভারতের সঙ্গে জার্মানির মতভেদও রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। ভারত এখনো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রাশিয়া থেকে আমদানি করে। কিন্তু টোবিয়াস শলৎসের মতে, রাশিয়া ভারতের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদার নয়।

জার্মানির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল এআরডি বলছে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জার্মানি মনে করছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের জন্যও জার্মানি ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট অর্থনীতি, গবেষণা এবং বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ। চ্যান্সেলর মের্ৎস ভারতে অস্ত্রশিল্পে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে চান এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বুন্দেসটাগে জার্মানি-ভারত সংসদীয় দলের দীর্ঘদিনের সদস্য ডির্ক ভিসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ক্রমে নানা সমস্যায় পড়ছেন, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে হঠাৎ করে ভিসা বাতিলের ঘটনা বাড়ছে। তাঁর মতে, এসব শিক্ষার্থীকে আরও বেশি করে জার্মানির দিকে আকৃষ্ট করা উচিত। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জার্মানি ও ভারতের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৬০ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থী রয়েছেন। এই সফরের সময় স্বাস্থ্যসেবা খাতে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সফরের দ্বিতীয় দিনে চ্যান্সেলর মের্ৎস জার্মানির শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বেঙ্গালুরুতে শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করবেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি এবং কাঁচামাল খাতে ভারত জার্মানির কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

দুই দিনের এই সফরে ভারত ও জার্মানি একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে ভারতে দুই হাজারেরও বেশি জার্মান কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিগুণ হয়ে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও চীনের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য এখনো এর পাঁচ গুণ, তবু ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত, এবং সেই প্রবৃদ্ধিতে অংশ নিতে চায় জার্মানি।

চ্যান্সেলর মের্ৎস ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও ভারতে এসেছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর আলোচনার পর জানুয়ারির শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জার্মানির পত্রিকা ডি সাইট লিখেছে, এই সফর ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নতুন বন্ধু খোঁজার’ অংশ। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ এবং শীতল যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জার্মানির সরকার এই নির্ভরতা কমাতে চায়। একই সঙ্গে ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা এবং সেই বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাও বার্লিনের কৌশলের অংশ।

সময়টি উভয় দেশের জন্যই অনুকূল বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে, যা জার্মানির ক্ষেত্রেও বিভিন্নভাবে প্রযোজ্য। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে নির্বিঘ্নে তেল কিনছে। মাত্র এক মাস আগে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি যেভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, প্রায় একই উষ্ণতায় স্বাগত জানানো হয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর মের্ৎসকেও।

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক থেকে জার্মানির সরকার ঠিক কী অর্জন করতে চায়, আর ভারত সত্যিই রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। তবে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় জার্মানি যে নতুন মিত্র খুঁজছে, তা এই সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

* সরাফ আহমেদ, প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি। ই–মেইল: sharaf.ahmed@gmx.net
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইল
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, December 18, 2025

ইউক্রেন নিয়ে জার্মানির নতুন পরিকল্পনা

দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে এবং দুই দেশের হাজার হাজার সেনাও মারা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শেষ করার জোর চেষ্টা করলেও তাতে সায় দিচ্ছে না ইউরোপীয় জোট। এরই মাঝে এবার ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষায় দেশটিতে ইউরোপীয় নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক ফোর্স পাঠানোর কথা জানিয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মের্ৎস। মঙ্গলবার পাবলিক ব্রডকাস্টার ডেজডিএফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন চাঞ্চল্যক তথ্য জানিয়েছেন।

জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ইউক্রেনে বহুজাতিক ফোর্স মোতায়েনের ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপের দেশই যুক্ত থাকবে না, এতে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও একাধিক দেশ অংশ নেবে।

গত দুই দিন ধরে জার্মানির বার্লিনে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এমন সিদ্ধান্তের কথা জানালেন ফ্রেডরিক মের্ৎস। ইউরোপের নেতৃত্বধীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত এই বাহিনী ইউক্রেনের আকাশ ও সমুদ্র নিরাপত্তায় কাজ করবে। তবে পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছেন তিনি ইউক্রেনে বিদেশি কোনো সৈন্য মোতায়েন মেনে নেবেন না।

তবে জার্মান চ্যান্সেলর জানান, তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন যাতে রাশিয়া এই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। এদিকে ইউরোপের কাছে থাকা রুশ সম্পদ জব্দ করা নিয়ে বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে বৈঠকে বসছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা। এতে ২৭ দেশের নেতারা অংশ নেবে।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপে সবচেয়ে বড় একটি মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ নিয়ে সহজে সমাধান মিলবে কিনা তা নিয়ে জোর আলোচনা-সমালোচনা চলছে। 

প্রতীকী ছবি

Wednesday, December 17, 2025

বার্লিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে আলোচনায় কী পেল ইউক্রেন

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে একটি শান্তিচুক্তির জন্য সবশেষ জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে ইউরোপ ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে কিয়েভকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র কী কী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ ইউরোপের নেতারা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার একটি তালিকা সামনে এনেছেন। এতে বলা হয়েছে, কিয়েভ বাহিনীকে সহায়তা এবং দেশটির আকাশ ও জলসীমা রক্ষার জন্য ইউরোপের নেতৃত্বে একটি বাহিনী গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে হামলা থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করার জন্য আইনি প্রতিশ্রুতি দেবে ইউরোপ।

তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। ইউক্রেনের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দেশটিকে সহায়তা করবে ইউরোপ। এই বাহিনীর সেনাসংখ্যা আট লাখের মধ্যে সীমিত থাকবে। যদিও একটি শান্তিচুক্তির জন্য ইউক্রেনের এর চেয়ে অনেক কম সেনা থাকতে হবে বলে দাবি করে আসছে মস্কো।

ইউক্রেনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে। সেটি হলো রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করবে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবস্থা। ইউক্রেনে ভবিষ্যতে কোনো হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা দেবে তারা। এ ছাড়া তালিকায় ইউক্রেনের পুনর্গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসতে পারে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে।

এর আগেও শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হয়েছে। তবে কিয়েভের সুরক্ষার জন্য বার্লিনে ইউরোপীয় নেতাদের তুলনামূলক বেশি জোর দিতে দেখা গেছে। এবারের বৈঠকে কিয়েভে জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয়টি হলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য ইউক্রেনের মাটিতে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সেনাদের পেতে পারে তারা।

নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওই তালিকায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানি ছাড়াও ইউরোপের আরও সাত দেশের নেতারা সই করেছেন। দেশগুলোর ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধে রাজি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনে বিরাট নিরাপত্ত নিশ্চয়তা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সহায়তা দেবে এই তালিকা। আর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, ‘এখন আমাদের সত্যিকারের শান্তিপ্রক্রিয়ার সুযোগ রয়েছে।’

তাহলে কি এখন যুদ্ধ থেমে যাবে? এখনই তা বলা যাচ্ছে না। কারণ, আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এখন এই তালিকা রাশিয়ার কাছে নিয়ে যাবেন। এটা এখনো স্পষ্ট নয় যে ইউরোপের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার এই তালিকা আদৌ ক্রেমলিন মেনে নেবে কি না।

কারণ, প্রথমত, রাশিয়া চায় না ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ন্যাটোর কোনো সেনা মোতায়েন করা হোক। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। শিগগিরই হবে বলেও মনে হয় না। এরপরও মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, চুক্তির ৯০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে তাঁরা গুছিয়ে এনেছেন। এ বক্তব্যের সঙ্গে মাঠের চিত্র মেলালে সামনে শুধু অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-16%2Fd53o3n0k%2Fberlin.jpg?rect=10%2C0%2C678%2C452&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে বার্লিনে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিয়েভের আলোচনা। ছবি: রয়টার্স

Thursday, October 16, 2025

ইউরোপের কঠোর নিয়ম যেভাবে পরিবারগুলোকে আলাদা করে দিচ্ছে

গার্ডিয়ানের রিপোর্টঃ জুন মাসে জার্মান সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে আহমেদ শেখ আলি অশ্রু সংবরণ করছিলেন। হাতে তুলে ধরেন তার তিন বছরের ছেলের অস্পষ্ট একটি ছবি। দুই বছরেরও বেশি আগে আলেপ্পো থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে তিনি সবকিছু করেছিলেন ছেলের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য। হ্যানোভার শহরে বসবাস শুরু করেন। পূর্ণকালীন চাকরি পান। আর পরিবারকে কাছে আনার জন্য কাগজপত্রের অসংখ্য ঝামেলা পেরিয়ে আসেন। সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। তিনি প্রায় পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। তার আবেদনটির আগে মাত্র দুটি মামলা বাকি ছিল। কিন্তু হঠাৎই জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষ জুনে একটি বিল পাস করে।

তাতে বলা হয় তার মতো অভিবাসীদের জন্য পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া অন্তত দুই বছরের জন্য স্থগিত থাকবে। কান্নাভেজা কণ্ঠে আহমেদ জানান, এই সিদ্ধান্ত জানার পর থেকে আমি ঘুমাতে পারি না। জীবন চালিয়ে নিতে পারি না। যখন আমি ছেলেকে রেখে আসি, সে হামাগুঁড়ি দিত। সে এখন হাঁটছে। অনলাইন গার্ডিয়ানে তার এই দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই অবস্থা আরও অনেকের। রিপোর্টে বলা হয়, এটি কেবল এক ব্যক্তির কষ্ট নয়। কয়েক মাসে ইউরোপের একাধিক সরকার এমন পরিবারের পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাজনীতিবিদরা নিজেদের ‘অভিবাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সেভ দ্য চিলড্রেন ইউরোপের ফেদেরিকা তোসকানো বলেন, এটি আসলে কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। রাজনীতিবিদরা একদিকে বলছেন অভিবাসনকে সুশৃঙ্খল, ন্যায্য আর পরিকল্পিত করতে চান। আর পরিবারগুলোর পুনর্মিলনই তো সবচেয়ে সুরক্ষিত, আইনসম্মত আর সমাজে একীভূত হওয়ার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি।
মার্চে অস্ট্রিয়া প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে শরণার্থীদের জন্য পরিবারিক পুনর্মিলন সাময়িকভাবে স্থগিত করে। অজুহাত দেয় সমাজসেবার ওপর বাড়তি চাপের কথা। পরে জার্মানি, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড এবং বেলজিয়ামও একই পথে হাঁটে। বেশ কয়েকটি সরকার জরুরি পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। অথচ এসব পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন ও ইইউ চার্টারে স্বীকৃত ‘পারিবারিক জীবনের অধিকার’-এর সঙ্গে।

তোসকানোর ভাষায়, পারিবারিক ঐক্য আমাদের সমাজে এক মহান মূল্যবোধ। কিন্তু বিদেশিদের পরিবার হলে সেটি যেন কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। সেভ দ্য চিলড্রেন ফিনল্যান্ডের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া গড়ে সাড়ে ছয় বছর সময় নেয়। কেউ কেউ এমনকি ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেছেন। এদিকে পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে আসা মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রিয়ায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পারিবারিক পুনর্মিলন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৮০০০ মানুষ গিয়েছে। এর মধ্যে ১৩০০০ই শিশু। তারা অনেকেই বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে দীর্ঘ, বেদনাদায়ক সময় পার করেছে। তোসকানোর মতে, যত বেশি সময় এই প্রক্রিয়া নেয়, তত বেশি মানসিক আঘাত সঞ্চিত হয় শিশুদের মনে।

mzamin

Sunday, October 12, 2025

প্রেমিকাসহ খুন হন ‘ফ্যাসিবাদের জনক’, জনসমক্ষে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয় দুজনের মরদেহ by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

২৯ জুলাই ১৮৮৩, ইতালির এক নিভৃত গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন এমন একজন, যাঁর নাম একসময় সারা ইউরোপের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বেনিতো মুসোলিনি শুধু ইতালিরই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, ফ্যাসিবাদ নামের এক ভয়াল রাজনৈতিক মতবাদের প্রথম রাষ্ট্রীয় রূপদাতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর উত্তাল সময় মুসোলিনি ইউরোপীয় রাজনীতির এক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত হন। যুদ্ধ, একনায়কতন্ত্র, দমন–পীড়ন আর জাতীয়তাবাদে মোড়া তাঁর শাসনব্যবস্থা ইতালিকে যেমন এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়েছিল, তেমনই বিশ্বরাজনীতিতে এক ভয়ংকর দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছিল।

ইতালির ছোট্ট শহর প্রেদাপ্পিওতে জন্ম নেওয়া এ মানুষটির জন্মদিনে ফিরে দেখা জরুরি, কীভাবে একজন শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর একনায়ক। তাঁর উত্থান–পতনের গল্প শুধু এক ব্যক্তির নয়, একটি গোটা সমাজ তথা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিবর্তনেরই কাহিনি।

দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবার থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে

বেনিতো আমিলকারে আন্দ্রেয়া মুসোলিনি জন্ম নিয়েছিলেন ইতালির উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় প্রেদাপ্পিও শহরের ডোভিয়া এলাকার এক দরিদ্র পরিবারে। বাবা ছিলেন সমাজতন্ত্রী মনোভাবাপন্ন এক কামার, আর মা ছিলেন একজন শিক্ষক। বাবা অ্যান্ড্রেয়া ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি ও বিপ্লবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। নামের মধ্যেই এর ছাপ ছিল। ‘বেনিতো’ নামটি রাখা হয় মেক্সিকোর বিপ্লবী নেতা বেনিতো জুয়ারেজের অনুপ্রেরণায়।

ছোটবেলা থেকেই বেনিতো ছিলেন খ্যাপাটে স্বভাবের, রগচটা ও অগাধ আত্মবিশ্বাসী। পড়াশোনায় মাঝারি হলেও ভাষা আর বক্তৃতায় তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে এক সহপাঠীকে ছুরি মারার ঘটনায় স্কুল থেকে বহিষ্কার হন মুসোলিনি।

তবুও ১৮ বছর বয়সে শিক্ষকতার যোগ্যতা অর্জন করে কিছুদিন স্কুলে পড়ান মুসোলিনি। কিন্তু সেই পেশাগত স্থিরতা তাঁর বিপ্লবী চেতনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরে রাজনীতির উত্তাল আবহ তাঁকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত করে। পাশাপাশি সাংবাদিকতা শুরু করেন স্থানীয় পত্রিকাগুলোয়।

সমাজতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদে যাত্রা

মুসোলিনি শুধু রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন এক অসাধারণ লেখক ও সাংবাদিক। সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ছড়িয়ে দিতে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ১৯১১ সালে তিনি ‘আভান্তি!’ নামে মিলানের এক সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার পত্রিকার সম্পাদক হন। এ সময় তিনি জোরালোভাবে শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রমিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইতালির পুনরুজ্জীবনের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা জরুরি। এই মতের কারণে তাঁকে সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বহিষ্কার করা হয় (১৯১৪ সাল)।

এ সিদ্ধান্তই মুসোলিনির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমাজতন্ত্র থেকে সরে এসে তিনি নতুন জাতীয়তাবাদী ও যুদ্ধপন্থী মতবাদের দিকে ঝোঁকেন, যা ভবিষ্যতের ফ্যাসিবাদের ভিত্তি গড়ে দেয়।

১৯১৯ সালে বেনিতো মুসোলিনি প্রতিষ্ঠা করেন উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন ‘ফ্যাসিও দি কমবাত্তিমেন্তো’। পরে জাতীয় ফ্যাসিবাদী দলে (ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি বা পিএনএফ) পরিণত হয় এটি। দলের সদস্যদের পরনে ছিল কালো শার্ট, হাতে লাঠি আর মুখে জাতীয় শৃঙ্খলার কথা।

এই ব্ল্যাক শার্টধারীরা বামপন্থী আন্দোলন ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি সহিংসতা চালাতেন। গণতন্ত্রকে দুর্বল বলে তাঁরা জাতীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলার নামে শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। তাঁদের মূল কৌশল ছিল—ভয় দেখানো, মারধর ও হত্যা। একরকম সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তাঁরা ইতালির রাজনীতিতে ফ্যাসিজমের জন্ম দেন।

১৯২২ সালের অক্টোবরে মুসোলিনি প্রায় ৩০ হাজার ব্ল্যাক শার্টধারী নিয়ে ‘মার্চ অন রোম’ নামের এক বিক্ষোভ শুরু করেন। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইতালির রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল তৃতীয় সামরিক হস্তক্ষেপ না করে মুসোলিনিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান।

এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই শেষ হয় ইতালির গণতন্ত্রের অধ্যায়। শুরু হয় একনায়কত্বের যাত্রা। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেও দ্রুতই মুসোলিনি নিজের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৯ বছর।

একনায়কতন্ত্র কায়েম

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুসোলিনি দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। ১৯২৫ সালের পর থেকে তিনি নিজেকে ‘ইল দুচে’ অর্থাৎ ‘দ্য লিডার (নেতা)’ বলে অভিহিত করতে থাকেন। এ পর্যায়ে এসে পার্লামেন্টের ক্ষমতা খর্ব করেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনেন ও বিরোধীদের নির্যাতন–নিপীড়ন শুরু করেন।

এভাবে মুসোলিনি একটি ‘করপোরেট রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যস্থতায় সব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। তবে বাস্তবে এ নীতির আড়ালে ছিল সরকারি দমন, বিধিনিষেধ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আয়োজন।

মুসোলিনির শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা। শিশুদের জন্য ফ্যাসিবাদী আদর্শে গড়া স্কুল, যুবকদের জন্য মিলিশিয়া আর সংবাদমাধ্যমের জন্য সরকারের গাইডলাইন—সবই ছিল একনায়কের বন্দনায় নিবেদিত। নিজেকে ‘রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি ইতালির জাতীয়তাবাদকে উসকে দেন।

মুসোলিনির এই ফ্যাসিবাদী শাসন ইউরোপের বাক্‌স্বাধীনতার ওপরে ছিল প্রথম বড় আঘাত।

যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা

মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালি ১৯৩০–এর দশকে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই তাঁর সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেন। ১৯৩৫ সালে তিনি আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) আক্রমণ করে জয় করেন এবং জাতিপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আগ্রাসন চালিয়ে যান।

স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী বাহিনীকেও সমর্থন দেন মুসোলিনি। ধীরে ধীরে তাঁর আদর্শ নাৎসি জার্মানির হিটলারের সঙ্গে মিলতে শুরু করে। ১৯৩৯ সালে হিটলারের সঙ্গে ‘প্যাক্ট অব স্টিল’ নামের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ইতালিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির আনুষ্ঠানিক মিত্র করে তোলেন তিনি।

আদর্শিকভাবে নাৎসিবাদের সঙ্গে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের কিছু পার্থক্য থাকলেও উভয় শাসকই কর্তৃত্ববাদ, জাতীয়তাবাদ ও সহিংসতা ব্যবহার করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।

হিটলার ও মুসোলিনির জোট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে।

পতনের শুরু ও করুণ পরিণতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির পক্ষে অবস্থান নেওয়া মুসোলিনির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে। ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনীর আক্রমণে ইতালির বিভিন্ন এলাকা হাতছাড়া হতে শুরু করে। ইতালির জনগণ ফ্যাসিবাদের প্রতি আস্থা হারান।

মুসোলিনিকে ইতালির রাজার পক্ষ থেকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে হিটলারের নাৎসি বাহিনী তাঁকে মুক্ত করে পুতুল রাষ্ট্র ‘সলো প্রজাতন্ত্র’ গঠনের পর এর প্রধান বানায়। তবে এ পুতুল রাষ্ট্র স্থায়ী হয়নি।

১৯৪৫ সালের এপ্রিলে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রার মুখে পালানোর চেষ্টা করেন মুসোলিনি। কিন্তু লাভ হয়নি। লোম্বার্দি অঞ্চলে পার্বত্য পথে পালানোর সময় প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাঁকে আটক করেন। ২৮ এপ্রিল প্রেমিকা ক্লারা পেতাচ্চির সঙ্গে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরদিন মুসোলিনি ও তাঁর প্রেমিকার মরদেহ মিলান শহরের পিয়াতসালে লোরেতো চত্বরে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ দৃশ্য একই সঙ্গে যেমন প্রতীকী বিদ্রোহ ও ঘৃণা, তেমনই ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম রাজনৈতিক সমাপ্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।

বিতর্কিত উত্তরাধিকার

মুসোলিনির উত্তরাধিকার অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ, শাসনব্যবস্থা ও ইতালির ইতিহাস ও সমাজে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজও বিতর্কিত হয়ে আছে। অনেকে তাঁকে আধুনিক ইতালির একজন দৃঢ় নেতৃত্বের নির্মাতা বলে দেখেন। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক ভয়ংকর একনায়ক; যাঁর ভুল সিদ্ধান্তে ইতালিকে ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

ইতালিতে এখনো কিছু চরম ডানপন্থী দল মুসোলিনির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। বিশেষ করে তাঁর নাতনি আলেসান্দ্রা মুসোলিনি একসময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন ডানপন্থী দল থেকে।

ফ্যাসিবাদ: ইতিহাসের শিক্ষা

ফ্যাসিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়। এটি একটি সামাজিক প্রকল্প, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, গণতান্ত্রিক চর্চা—সবকিছুই রাষ্ট্রের পূজায় বলি দেওয়া হয়। মুসোলিনি এ মতাদর্শকে নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন।

ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, নেতার অন্ধ অনুসরণ, যুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদের নামে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ কখনো একটি জাতিকে উন্নতির পথে নিতে পারে না; বরং তা এগিয়ে নিয়ে যায় ধ্বংসের দিকেই।

{তথ্যসূত্র: দ্য ডকট্রিন অব ফ্যাসিজম, বেনিতো মুসোলিনি; রিচার্ড বসওয়ার্থ, মুসোলিনি: আ বায়োগ্রাফি; ক্রিস্টোফার হিবার্ট, মুসোলিনি: দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব ইল দুচ; বিবিসি হিস্ট্রি; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা}

অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে বেনিতো মুসোলিনি (ডানে)
অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে বেনিতো মুসোলিনি (ডানে) ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

Friday, August 8, 2025

গাজায় সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি স্থগিত করতে পারে জার্মানি

গাজা উপত্যকায় ব্যবহার করা হতে পারে, ইসরায়েলে এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি স্থগিত করবে জার্মানি। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস আজ শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এক বিবৃতিতে মার্ৎস বলেন, ‘জার্মান সরকার পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় ব্যবহার হতে পারে, এমন কোনো সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে রপ্তানির অনুমোদন দেবে না।’

গাজায় চলমান মানবিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে জার্মানি এই ঘোষণা দিয়েছে। এতে ইসরায়েলকে ঘিরে তাদের নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গত জুনে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের আগে দেওয়া এক বক্তব্যে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস বলেন, ‘ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষা আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।’ তাঁর এমন বক্তব্যের পর গাজায় ব্যবহার করা হতে পারে, এমন সামরিক অস্ত্র ইসরায়েলে রপ্তানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত জার্মানির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।

ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি)-এর তথ্য অনুসারে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির ৩৩ শতাংশ জার্মানি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে (যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ৬৬ শতাংশ)। এই অস্ত্রের মধ্যে ছিল, নৌযুদ্ধযান (যেমন ফ্রিগেট, টর্পেডো)। তবে সাঁজোয়া ট্রাক, ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ও গোলাবারুদও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে মার্ৎস হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করার অধিকারে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অবশ্য বলেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা ‘ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’

বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার দায়বোধ থেকে সৃষ্টি হওয়া ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির দীর্ঘদিনের সমর্থন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকায় এবং মানবিক সংকটে জার্মানরা সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস। ছবি: রয়টার্স

Saturday, July 19, 2025

রাশিয়াকে মোকাবিলায় মার্কিন নির্ভরশীলতা, কোন পথে ইউরোপের রাজনীতি

ইউরোপের মার্কিন নির্ভরশীলতার কথা স্বীকার করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। বিবিসি’র টুডে প্রোগ্রামে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইউরোপ অতীতে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এখন সময় এসেছে নিজেদের দায়িত্ব নেয়ার।

ওই সাক্ষাৎকারে মের্ৎস আরও বলেন, আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের আরও কিছু করতে হবে। আমরা অতীতে ফ্রি-রাইড করেছি, এটা সত্যি। এখন আমেরিকা চাইছে আমরা আরও দায়িত্ব নিই- আর আমরা সেটা নিচ্ছিও।

ঐতিহাসিক এক মৈত্রী চুক্তি করতে বৃটেন সফর করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা ও যুব উন্নয়ন কর্মসূচি আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মের্ৎস জানান, জার্মানি-বৃটেনের নতুন মৈত্রী চুক্তি পরস্পরের প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। যা আগে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অংশ হিসেবে ছিল এবং এখন ন্যাটোর অংশ হিসেবেও বহাল।

দুই দেশের কোম্পানি ইতিমধ্যে টাইফুন যুদ্ধবিমান ও বক্সার সাঁজোয়া যান উৎপাদনে যৌথভাবে কাজ করছে। এখন তারা ২০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণেও একত্রে কাজ করছে। শিগগিরই  ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানিয়েছেন মের্ৎস। বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন ভালো। নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন ফোনে কথা হয়। একসঙ্গে কাজ করছি। ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য ও শুল্কের মতো বিষয়গুলো সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি জানান, চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার চার দিনের মাথায় তিনি কিয়েভ সফর করেন, সেখানে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোনের সঙ্গে দেখা করেন।

ইউরোপের জন্য এখন রাশিয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন মের্ৎস। বলেছেন, আমরা এক বিশাল হুমকি দেখছি। এই হুমকির নাম রাশিয়া। এটা শুধু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে না, এটা ইউরোপের শান্তি, স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর হামলা।

জার্মান নির্বাচনের আগে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপের মিত্রদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় কথা বলেন। এতে ইউরোপ জেগে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কোনরাড অ্যাডেনাওয়ার ফাউন্ডেশনের লন্ডন অফিসের কানান আতিলগান বলেন, মিউনিখে মের্ৎসের উপলব্ধি ছিল- আমরা আমেরিকাকে হারিয়েছি, এখন নিজেদেরকেই নিজেদের রক্ষা করতে হবে। তার ওই মন্তব্যের পরেই জেলেনস্কির হোয়াইট হাউস সফরের চিত্র বদলে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেয়ার আগেই মের্ৎস জার্মান সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। যাতে প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বাড়ানো যায়। তিনি বিবিসিকে বলেন, আমাদের সেনাবাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাই আমাদের বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।

বর্তমানে একত্রে কাজ করছে বৃটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স। ‘ই থ্রি’ নামের একটি ত্রিদেশীয় জোট গড়ে তুলতে চায় তারা। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হবে। মের্ৎস বলেন, আমি এখন কিয়ের স্টারমারের খুব কাছের মানুষ, ম্যাক্রোনের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন আগামী সপ্তাহে বার্লিন সফরে যাচ্ছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

বিজয়ের রাতেই মেৎর্স মন্তব্য করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের প্রতি প্রায় উদাসীন। এখনো সেই মন্তব্যে অটল তিনি। মের্ৎস বলেন, ট্রাম্প আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো স্পষ্ট বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এ কারণেই ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আত্মনির্ভরতা বাড়ানো জরুরি।

আগামী ১লা আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সমঝোতার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন গিয়েছেন ইইউ’র বাণিজ্য আলোচক মারোস শেফচোভিচ। মের্ৎস বলেন, উচ্চ শুল্ক জার্মান রপ্তানি শিল্প ধ্বংস করে দেবে। তবে আমার মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট নিজেও বিষয়টি বুঝছেন এবং সমাধান চাচ্ছেন।

নতুন চুক্তিতে রয়েছে মানব পাচার রোধে জার্মান আইন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। জার্মানিতে ছোট নৌকা জমিয়ে রাখা পাচারকারীদের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। তাছাড়া লন্ডন-বার্লিন সরাসরি রেল সংযোগ, এবং শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। মের্ৎস আশা করেন, সবার আগে এই মৈত্রী চুক্তির বাস্তব ফল পাবে শিক্ষার্থীরাই। কেননা উভয় দেশের ভবিষ্যত সম্পর্ক তারাই নেতৃত্ব দেবে।

mzamin

Saturday, June 21, 2025

ইরানে হামলা: যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানির অস্ত্র নিয়ে ১৪ কার্গো বিমান ইসরায়েলে

অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চালান নিয়ে আরও কয়েকটি পরিবহন উড়োজাহাজ (কার্গো) গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ কথা জানিয়েছে। এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি থেকে এসেছে বলে তুরস্কের সরকারি সংবাদমাধ্যম আনাদলু জানায়।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের হামলা শুরুর পর এ নিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ১৪টি কার্গো ইসরায়েলে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর ৮০০ কার্গো এ ধরনের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ইসরায়েলে এসেছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, অস্ত্রের এই সরবরাহ ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর আভিযানিক ধারাবাহিকতা জোরদার এবং এর সব ধরনের চাহিদা মেটানোর প্রচেষ্টারই অংশ। এটি যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন এবং প্রস্তুতি ও মজুত বাড়ানো, উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন এসব চালানে কী ধরনের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি কর্তৃপক্ষও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এমন সময় অস্ত্রের নতুন চালানের এ কথা জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, যখন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে ইসরায়েলের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ‘অ্যারো’র ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর) মজুত ফুরিয়ে আসছে। যদিও এ খবর নাকচ করে দিয়েছেন ইসরায়েলের কর্মকর্তারা।

ইসরায়েল ১৩ জুন ভোররাতে ইরানে নজিরবিহীন হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে গত কয়েক দিনে ১৪ দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার কথা জানিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বেশির ভাগই আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো নিয়ে চিন্তা

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে অবগত আছে এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে কাজ করছে।

গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি ইরান একই গতিতে আক্রমণ চালিয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ছাড়া অথবা মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছাড়া ইসরায়েল আর ১০-১২ দিন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়ন সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি এ তথ্য জানান।

উল্লিখিত ব্যক্তি জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ দিক থেকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হয়তো কমসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে সক্ষম হবে। কারণ, তাদের প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ পালা করে ব্যবহার করতে হবে।

বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় নাম না প্রকাশ করার শর্তে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, তাদের (ইসরায়েল) বেছে নিতে হবে তারা কোনটা (ক্ষেপণাস্ত্র) আটকাতে চায়। ইতিমধ্যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জিবিইউ-৫৭ ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল এ পর্যন্ত ইরানের ফোর্দোয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। কেন্দ্রটি পাহাড়ের ভূগর্ভে তৈরি করা হয়েছে, এর মূল কক্ষগুলো মাটির নিচে ৮০ থেকে ৯০ মিটার (প্রায় ২৬০ থেকে ৩০০ ফুট) গভীরে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক কেলসি ডেভেনপোর্ট বলেন, ইসরায়েল যদি এসব ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলা করতে চায়, তাহলে সম্ভবত তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দরকার হবে। কারণ, সেখানে ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম বোমা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে।

জিবিইউ-৫৭ বাংকার বাস্টার নামে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমাটি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) নামে পরিচিত। এতে ১২ টনের বেশি বিস্ফোরক থাকে।